সপ্তম অধ্যায়

সোমজা দাস

‘কিন্তু স্যার...’

‘নো ‘কিন্তু’ সংঘমিত্রা৷ দিস কনভার্সেশন এন্ডস হিয়ার৷ অম্লান চক্রবর্তীর বাড়ির ভিতর এভাবে কোনো মিশন করা যায় না, এটা আপনাকে বুঝতে হবে৷’

‘স্যার, অফ কোর্স আই আন্ডারস্ট্যান্ড৷ আর সেজন্যই বলছি আমি যেতে চাই৷ পুলিশ সেখানে যেতে পারবে না৷ কিন্তু আমি তো পুলিশ নই৷ ধরা পড়লে আপনি আমায় চেনেন না ব্যস৷ আমার সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগের কথা আপনি অস্বীকার করবেন৷ আমি কাজটা নিজ দায়িত্বে করতে চাইছি৷ স্যার প্লিজ, আমার কোনো স্বার্থ নেই এক্ষেত্রে৷ আমি শুধু সুবিনয়বাবুকে বাঁচাতে চাইছি৷’

সৌরভ সান্যাল গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘সে দায়িত্ব পুলিশের৷ পুলিশ প্রপার ওয়েতে এগোবে৷ ইউ ডোন্ট ওয়ারি৷’

‘কিন্তু স্যার, ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে,’ টাপুরদির গলায় আকুতি৷

‘স্টপ ইট সংঘমিত্রা৷ আমি আর আপনার সঙ্গে আরগিউ করতে চাই না৷ হেয়ারবাই আই ডিসমিস ইউ ফ্রম দিস কেস৷ অ্যান্ড বয়েজ, কাম ব্যাক টু অফিস অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল,’ সৌরভবাবুর কণ্ঠে আদেশের নির্ঘোষ৷

ফোন ডিসকানেক্ট করে রজতবাবু টাপুরদির দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকালেন৷ টাপুরদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর মুখ থমথম করছে৷ রজতবাবু বললেন, ‘চলুন ম্যাডাম, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই৷’

টাপুরদি ফিকে হেসে বলল, ‘ইটস অলরাইট মিস্টার দত্ত৷ আমরা চলে যাব৷’

বলে পকেট থেকে বের করে রিভলভারটা ভদ্রলোকের হাতে দিল টাপুরদি৷

‘অ্যাজ ইউ উইশ৷ কিন্তু বেশিক্ষণ এখানে থাকবেন না৷ এনিওয়ে, গুড নাইট৷ চলো অর্জুন, যাওয়া যাক,’ বলে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন রজতবাবু৷

অর্জুনদার মুখের অভিব্যক্তিতে একাধারে দুঃখ ও স্বস্তির মিশেল৷ আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল অর্জুনদা৷ টাপুরদি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে৷ অর্জুনদা একবার হতাশ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল৷ কয়েক মুহূর্ত মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল অর্জুনদা, তারপর মুখ তুলে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘টাপুর, আমি জানি তুমি আমার উপর রেগে আছ৷ তোমার রাগ ভাঙানোর, তোমায় বোঝানোর চেষ্টা করব না৷ কারণ জানি, তুমি আমায় বুঝবে না৷ শুরু থেকে এই কেসে আমি তোমায় বাধা দিয়েছি৷ কারণ আমি ভয় পেয়েছি, তোমাদের বিপদের ভয়৷ ভেবো না আমি কোনও কৈফিয়ত দিচ্ছি৷ এই কেসে যে সমস্ত রাঘববোয়ালরা জড়িয়ে আছে, নিজেদের ইমেজ বাঁচানোর জন্য তোমাদের মতো দুটো মেয়েকে শেষ করে দিতে তাদের হাত কাঁপবে না৷ যাই হোক, আজ এই মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে লালবাজারের পুলিশ অফিসার হিসেবে নয়, তোমার বন্ধু হিসেবে আমি তোমাকে বলছি, তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবে, তোমার সব সিদ্ধান্তে আমি তোমার সঙ্গে আছি৷’

অর্জুনদা আর দাঁড়াল না৷ একবার আমার দিকে তাকিয়ে পিছু ফিরে গাড়ির দিকে এগোল৷

পুলিশের গাড়ি বেরিয়ে যেতে আমি টাপুরদির দিকে তাকালাম৷ দেখলাম ওর চোখ ছলছল করছে৷ এতদূর এগিয়ে এসে এভাবে পিছিয়ে আসা ওর বরদাস্ত হচ্ছে না বুঝতে পারছি৷ টাপুরদি যেন ভুলেই গেছে আমি সঙ্গে আছি৷ একা একা অন্যমনস্কভাবে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগোল৷ আমি ছুটে এগোলাম টাপুরদির পাশে৷ বললাম, ‘এবার টাপুরদি?’

টাপুরদি শূন্যদৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে৷ গভীরভাবে কিছু যেন ভাবছে৷ তারপর বলল, ‘চল, আজ বাইরে কোথাও ডিনারটা সেরে নিই৷’

‘তাহলে আমাদের কেস কি এখানেই শেষ? আর এগোবে না তুমি? তন্ময়ের কী হবে তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করলাম৷

এতদূর এগিয়ে এসে পিছিয়ে যেতে আমার এতটা খারাপ লাগছে, টাপুরদির না জানি কত কষ্ট হচ্ছে! টাপুরদি বলল, ‘এখান থেকে পিছিয়ে আসার কোনো প্রশ্নই আসে না মিতুল৷ তবে আমি একা যাব, তুই না৷ আই ক্যানট পুট ইয়োর লাইফ অ্যাট রিস্ক৷ তুই ডিনার সেরে বাড়ি যাবি৷’

চলতে চলতে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি৷ বললাম, ‘প্রথম থেকে আমি এই কেসে তোমার সঙ্গে আছি৷ আজ তুমি বলছ, ইউ ক্যানট পুট মাই লাইফ অ্যাট রিস্ক? এর আগে রিস্ক নিইনি আমরা? এর আগে আমি যাইনি বিপদের মাঝখানে? টাপুরদি, আমি তোমার মতো অত সাহসী নই, তোমার মতো শারীরিক, মানসিক শক্তিও আমার নেই৷ যতই তুমি আমায় তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে লোকের কাছে পরিচয় দাও, আমি জানি তোমাকে অ্যাসিস্ট করার কোনো যোগ্যতাই আমার নেই৷ আমি শুধু তোমার সঙ্গে, তোমার পাশে থাকতে পারি, আর সেটুকুই করি৷ যাই হোক, তুমি আমায় সঙ্গে নিতে না চাও, নিয়ো না৷ কিন্তু আমি যাব৷ তুমি না নিলে একাই যাব৷ কিন্তু এখন এই মুহূর্তে তোমাকে একা আমি ওখানে যেতে দেব না৷’

টাপুরদি চোখ বড়ো বড়ো করে আমার দিকে তাকাল৷ তারপর বলল, ‘বা রে, আজ সবাই আমায় দেখছি একদফা করে ইমোশনাল স্পিচ ঝেড়ে যাচ্ছে৷ তোর কিছু হলে আমি তোর বাবা-মাকে কী জবাব দেব ভেবে দেখেছিস?’

‘কিছু জবাব দিতে হবে না৷ আমার বা তোমার কারওরই কিছু হবে না৷ এখন চলো তো৷ পেটে ইঁদুর দৌড়োচ্ছে৷ আর জাস্ট পারা যাচ্ছে না,’ হেসে বললাম আমি৷

‘অম্লানবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি আমরা৷ জরুরি প্রয়োজন৷’

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সিকিউরিটি অফিসারকে নিজের কার্ডটা এগিয়ে দিল টাপুরদি৷ উলটেপালটে দেখে অবহেলা ভরে টাপুরদির হাতে ফেরত দিয়ে বললেন, ‘দেখা হবে না৷ এখন স্যার কারও সঙ্গে দেখা করেন না৷ কাল সকালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসবেন৷’

টাপুরদি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘প্রয়োজনটা খুবই জরুরি৷ এখনই দেখা করতে হবে আমাদের৷ আপনি ওঁকে বলুন, সংঘমিত্রা ব্যানার্জি এসেছেন৷ দেখা করতে চাইছেন৷’

লোকটি বিরক্ত মুখে বললেন, ‘বললাম না, অর্ডার আছে কাউকে বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়ার৷ দেখা হবে না৷ যান এখন৷’

টাপুরদির চোয়াল শক্ত হল৷ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, যাচ্ছি৷ কিন্তু আজ আমায় দেখা করতে না দেওয়ার জন্য কাল যদি অম্লানবাবু কোনো বিপদে পড়েন, তখন কিন্তু আপনাকেই জবাবদিহি করতে হবে৷ স্বার্থটা আমার নয়, অম্লানবাবুর৷ তাঁর প্রয়োজনের জন্যই দেখা করতে এসেছি৷’

টাপুরদির কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল, যা ভদ্রলোক পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারলেন না৷ কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত দেখাল তাঁকে৷ বললেন, ‘আপনি অপেক্ষা করুন৷ আমি ভেতরে খবর পাঠাচ্ছি৷’

টাপুরদি বলল, ‘অম্লানবাবুকে শুধু এটুকু বলবেন, তন্ময়ের পেনড্রাইভ আমার কাছে আছে৷’

ভদ্রলোক ওয়াকিটকিটা নিয়ে একটু ভিতরের দিকে যেতে আমি টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম৷ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী মনে হয় টাপুরদি? ওরা ডাকবে আমাদের ভিতরে?’

‘ডাকবে ডাকবে৷ ডাকতে বাধ্য,’ বলল টাপুরদি৷ নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করেও টাপুরদি উত্তেজনা লুকোতে পারছে না৷ পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে দ্রুত কিছু টাইপ করল টাপুরদি৷ তারপর সেটা আবার পকেটে ঢোকাল৷

ভদ্রলোক ফিরে এলেন৷ বললেন, ‘যান, ভিতরে ডাকছেন আপনাদের৷’

আমি আর টাপুরদি চোখ চাওয়াচাওয়ি করলাম একবার৷ টাপুরদি ফিসফিস করে বলল, ‘এখনও সময় আছে মিতুল৷ ভেবে দেখ যাবি কি না৷’

বাবার মুখটা মনে পড়ে গেল এই মুহূর্তে৷ গলার ভিতর একটা ব্যথা দলা পাকাচ্ছে৷ সেটাকে গিলে নিয়ে বললাম, ‘ভাবার কিছু নেই টাপুরদি৷ আমি যাব৷’

‘চল তবে,’ বলল টাপুরদি৷

‘এক মিনিট দাঁড়ান,’ বলে পেছন থেকে এগিয়ে এলেন সিকিউরিটি অফিসার৷ আমাদের সামনে এসে বললেন, ‘সিকিউরিটি চেক হবে৷ ওয়েট করুন৷’

বুঝলাম এই নির্দেশটাও ভিতর থেকে এসেছে৷ কারণ আগে যতবার এসেছি, এমন কিছু হয়নি৷

সিকিউরিটি চেকিং সেরে বাড়ির ভিতর গেলাম আমরা৷ ভিতরে বসার ঘরে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখলাম না৷ কী করব ভাবছি, এমন সময় মনোময়বাবু ঘরে ঢুকলেন৷ আমাদের দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বসুন৷’

আমরা বসলাম৷ মনোময়বাবু আমাদের সামনে দাঁড়ালেন, বসলেন না৷ একইরকম গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কী ব্যাপার?’

টাপুরদি একটু হাসল৷ বলল, ‘অম্লানবাবুর কাছে একটা কাজে এসেছি৷’

‘এখন? এটা কি কাজের সময় বলে মনে হয় আপনাদের?’ ভুরু কুঁচকে বিরক্ত মুখে তাকালেন মনোময়বাবু৷ এর আগে মনোময়বাবু কখনো আমাদের সঙ্গে কথা বলেননি৷ ওঁকে দেখে আমার কেমন ঘাড় হেলানো রোবট বলে মনে হত৷ যেন উপরওয়ালার নির্দেশ পালন করাই তাঁর জীবনের মোক্ষ৷ অম্লানবাবুর সঙ্গে ছায়ার মতো সেঁটে থাকা ছাড়া তাঁর জীবনের যেন কোনো উদ্দেশ্য নেই৷ আজ প্রথম তাঁর কণ্ঠস্বর শুনলাম৷ তারপর বললেন, ‘যাই হোক, কী কাজ বলুন৷’

‘সেটা ওঁকেই বলব না হয়,’ মিষ্টি হেসে বলল টাপুরদি৷

‘উনি ব্যস্ত আছেন৷ এখন দেখা করতে পারবেন না৷ যা বলার আমায় বলুন,’ বললেন মনোময়বাবু৷

‘ব্যস্ত আছেন? তাহলে আমাদের ভিতরে দেখা করতে ডাকলেন যে?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘বললাম তো, উনি এখন আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না৷ যা বলার আমাকে বলুন, উনি খবর পেয়ে যাবেন৷ আর হ্যাঁ, অম্লানবাবু এই রাজ্যের ভাবী মুখ্যমন্ত্রী৷ তাঁর সঙ্গে রাতবিরেতে যখন খুশি বাড়িতে এসে দেখা করতে চাইলেই দেখা করা সম্ভব নয় এভাবে, সেটা আপনার জানা উচিত৷’

‘জানি না যে তা তো নয়৷ তবে প্রয়োজনটা আমাদের থেকে বেশি অম্লানবাবুর৷ তাই এসেছিলাম৷ যাক গে, তিনি যখন দেখা করতে পারবেন না, আমরা তবে আসি আজ৷ শুধু অম্লানবাবুকে বলে দেবেন, তন্ময়ের পেনড্রাইভটা আমার কাছে আছে৷ ওঁর যদি সেটা দরকার থাকে, তবে যেন আমার সঙ্গে দেখা করেন৷ চল মিতুল, যাওয়া যাক,’ অকম্পিত, ঠান্ডা গলায় বলল টাপুরদি৷

অবাক হলাম৷ এভাবে এসে ফিরে যাব? তাহলে সুবিনয়বাবুকে উদ্ধারের কী হবে? টাপুরদি আমায় চোখের ইশারা করল৷ দরজার দিকে এগোলাম আমরা৷

‘দাঁড়ান,’ পেছন থেকে প্রায় হুংকার দিয়ে ডাকলেন মনোময়বাবু৷ আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম৷ টাপুরদির ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি৷

ঘুরে দাঁড়াল টাপুরদি, সঙ্গে আমিও৷ টাপুরদি ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কিছু বলবেন?’

‘পেনড্রাইভটা কোথায়?’ জিজ্ঞাসা করলেন মনোময়বাবু৷

‘সেটা আমি অম্লানবাবুকেই বলব মনোময়বাবু৷ আমি কোনো তৃতীয় ব্যক্তি মারফত কথোপকথন পছন্দ করি না৷’

মনোময়বাবুর চোখটা যেন মুহূর্তে হিংস্র শ্বাপদের মতো জ্বলে উঠল৷ ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘আপনারা বসুন৷ অম্লানবাবু একটা জরুরি ফোনে ব্যস্ত আছেন৷ আমি গিয়ে বলছি আপনাদের কথা৷ একটু হয়তো সময় লাগবে৷ অপেক্ষা করতে হবে৷’

‘সে ঠিক আছে৷ অপেক্ষা করছি আমরা,’ বলল টাপুরদি৷

মনোময়বাবু পরদা সরিয়ে ভিতরে গেলেন৷ আমি টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কী টাপুরদি? অম্লানবাবু ব্যস্ত, দেখা করতে পারবেন না? তাহলে আমাদের ডাকলেন কে?’

টাপুরদি দেখলাম দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরেছে৷ বলল, ‘শুধু চুপচাপ এখন দেখে যা মিতুল৷ কোনো প্রশ্ন করিস না৷ যেকোনো পরিস্থিতির জন্য মনকে প্রস্তুত রাখ৷’

মিনিট পাঁচেক বসে রইলাম চুপচাপ৷ কারও কোনো সাড়া পেলাম না৷ তারপর ভিতর থেকে পরদা সরিয়ে এক মহিলা ঘরে এলেন৷ আগের দিনও দেখেছি এই মহিলাকে এই বাড়িতে, সম্ভবত গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন৷ হাতে একটা ট্রেতে দুই কাপ কফি আর একটা প্লেটে কিছু বিস্কুট৷ আমাদের সামনে টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে বললেন, ‘আপনারা খান, দাদাবাবু আসবেন এখনই৷’

কফিটা তুলে চুমুক দিতে যাচ্ছিলাম, টাপুরদি আমার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকাল৷ তাড়াতাড়ি কাপটা টেবিলের উপর রেখে দিলাম৷

বসে আছি তো আছিই৷ অম্লানবাবুর দেখা নেই৷ প্রায় মিনিট বিশেক এভাবেই কাটল৷ তারপর পরদা সরিয়ে সুনয়নাদেবী ঘরে এলেন৷ সম্ভবত অন্য কোনো কাজে ঢুকেছিলেন, আমাদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ বিস্মিত যে হয়েছেন তা মুখ দেখেই বোঝা গেল৷ বললেন, ‘আরে তোমরা এখানে? কখন এলে? কী ব্যাপার?’

টাপুরদি বলল, ‘অম্লানবাবুর কাছে একটা কাজে এসেছি৷ বেশ কিছুক্ষণ আগেই এসেছি, অপেক্ষা করছি৷’

‘ও মা, সে কী? অম্লান জানে তোমরা এসেছ? এভাবে তোমাদের বসিয়ে রেখেছে কেন? দাঁড়াও, আমি দেখছি,’ বলে দরজার দিকে এগোলেন৷ তারপর কী মনে হতে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তার চেয়ে বরং এক কাজ করো৷ তোমরাও চলো আমার সঙ্গে৷’

আমরা উঠে দাঁড়ালাম৷ সুনয়নাদেবীর পিছে পিছে এগোলাম৷ করিডর ধরে কিছুটা এগোতে দেখলাম সিঁড়ি দিয়ে মনোময়বাবু নেমে আসছেন৷ আমাদের দেখে ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘এ কী, আপনারা এখানে কেন?’

‘মনোময়৷ এই যে ওরা এসেছে অম্লানের সঙ্গে দেখা করতে৷ অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে বলল৷ তাই আমি ওদের দেখা করতে নিয়ে যাচ্ছিলাম,’ সুনয়নাদেবী বললেন৷

মনোময়বাবু একটু কড়া গলায় সুনয়নাদেবীকে বললেন, ‘আপনি কেন নীচে এসেছেন? বাইরের লোককে এভাবে বাড়ির ভিতরে ঢুকিয়ে আনছেন, অম্লান শুনলে কিন্তু রাগ করবে৷ আপনি উপরে নিজের ঘরে যান৷’

সুনয়নাদেবী কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘আহা, রাত হয়েছে৷ মেয়েদুটো আবার একা ফিরবে৷ ওদের কী কাজ আছে করে দাও না বাপু৷ অম্লানের সঙ্গে কথা বলিয়ে দাও না৷’

এই বাড়িতে সুনয়নাদেবীর অবস্থান বোধ করি মনোময়বাবুরও নীচে৷ তাই মনোময়বাবুও তাঁর উপর চোখ পাকাতে পারেন৷ অথচ ক’দিন আগেই সুনয়নাদেবী ছিলেন এই রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী৷ মানুষের ভাগ্যের চাকা এইভাবে ঘোরে, অবস্থান পালটায়৷ মনে হল, অম্লানবাবু মাকে হয়তো যথেষ্ট তাচ্ছিল্য করেন বলেই মনোময়বাবুও এ-রকম ব্যবহার করতে সাহস পান৷ আজ এই মুহূর্তে ভদ্রমহিলার উপর আমার সত্যিই করুণা হল৷

সুনয়নাদেবী নরম গলায় একটু যেন ভয়ে ভয়েই বললেন, ‘মনোময়, আমার প্রেশারের ওষুধটা ফুরিয়ে গেছে৷ নীচে তো কাউকে দেখলাম না৷ একটু আনিয়ে দেবে কাউকে দিয়ে?’

‘আপনি উপরে যান,’ বলে রীতিমতো গর্জে উঠলেন মনোময়বাবু, ‘ওষুধ আপনার ঘরে দিয়ে আসবে৷’

‘আর ওদের একটু...,’ করুণ স্বরে কিছু বলতেই ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন মনোময়বাবু৷ বললেন, ‘আপনি এসবের মধ্যে থাকবেন না৷ যান, উপরে যান৷ এদের অম্লান বুঝে নেবে৷ আপনাকে ভাবতে হবে না৷’

রাগে গা জ্বলে গেল আমার৷ একজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কেউ এভাবে কথা বলে? আমরা তো বাইরের লোক৷ আমাদের সামনে একজন ভদ্রমহিলাকে এভাবে অপমান করছেন মনোময়বাবু, আর টাপুরদি কোনো প্রতিবাদ না করে চুপ অরে আছে দেখে অবাক লাগল৷ টাপুরদিকে যতটা চিনি, এই ব্যবহার টাপুরদির স্বভাববিরুদ্ধ৷ আমি আর থাকতে না পেরে বলে উঠলাম, ‘এভাবে কথা বলছেন কেন ওঁর সঙ্গে?’

মনোময়বাবু আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন৷ সুনয়নাদেবী একবার মনোময়বাবুর মুখের দিকে আরেকবার আমাদের মুখের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলেন৷ মনোময়বাবু এবার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনারা আসুন আমার সঙ্গে৷’

‘কোথায়?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

মনোময়বাবুর ঠোঁটে ফুটে উঠল ক্রুরতার হালকা হাসি৷ বললেন, ‘অম্লান চক্রবর্তীকে ব্ল্যাকমেল করতে এসে নিজেই সিংহের গুহায় মাথা ঢুকিয়ে দিলেন৷ এখন ভয় পাচ্ছেন টিকটিকি ম্যাডাম?’

টাপুরদিও হেসে উত্তর দিল, ‘ভয় না পেয়ে উপায় কী? আপনারা যেভাবে পথের কাঁটা সরাতে লেগেছেন, তাতে আমি যে খুব বেশি সুরক্ষিত অবস্থায় নেই, তা কি আমি আর জানি না? আপনাদের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড়ো পথের কাঁটা তো আমি৷ তবে সত্যি বলতে কী, খুব বেশি ভয় আমার করছে না৷ কারণ পেনড্রাইভের কপি আমি সেফ জায়গায় রেখে এসেছি৷ আমার কিছু হলে পেনড্রাইভের সিক্রেট ফোল্ডারের কন্টেন্ট দেশের সব ক’টা নিউজ চ্যানেলে লাইভ টেলিকাস্ট হবে৷ সুতরাং আপনিই ভেবে দেখুন কী করবেন৷’

‘কী চাই আপনার? কত টাকা চাই বলুন?’ মনোময়বাবু চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন৷

‘আমার যা চাই তা আমি অম্লানবাবুর সামনেই বলব, আপনাকে নয়’, বলল টাপুরদি৷

মনোময়বাবুর দৃষ্টিতে যেন দপ করে আগুন জ্বলে উঠল৷ ক্রুর হেসে বললেন, ‘টিকটিকি ম্যাডাম, একটা কথা আপনার জ্ঞাতার্থে জানাই৷ আপনাদের অম্লানবাবু শুধু চেয়ারে বসেন৷ চেয়ারের পেছনে আঙুলটা আমার ঘোরে৷ সুতরাং যা জানানোর আমাকে স্বচ্ছন্দে জানাতে পারেন৷’

মনোময়বাবুর কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম৷ কী অপরিসীম অহংকার লোকটার৷ তার মানে কী সব কিছুর পেছনে এই মনোময় মজুমদারই রয়েছেন? অম্লানবাবুকে সামনে রেখে দাবার চাল এই মনোময়বাবুই দিচ্ছেন? তিনি যেভাবে সুনয়নাদেবীকে ধমকালেন দেখলাম, আর এখন অম্লানবাবুর সঙ্গে আমাদের দেখা করতে দিচ্ছেন না, তাতে সেই সন্দেহই দৃঢ় হচ্ছে৷ এই বাড়িতে যে এই ভদ্রলোকের ক্ষমতা অসীম তা বুঝতে কষ্ট হয় না৷ সুনয়নাদেবী না হয় বৃদ্ধা, কিন্তু অম্লানবাবু কেন মেনে নিচ্ছেন এই উদ্ধত লোকটির অবিভাবকত্ব? কে জানে?

টাপুরদি ঠান্ডা চোখে তাকাল মনোময়বাবুর মুখের দিকে৷ তারপর বলল, ‘তা আপনি যখন এত করে জানতে চাইছেন, তাহলে আপনাকে বলেই দিই বরং৷ দেখুন ওই পেনড্রাইভে যা আছে, সে নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই৷ সেটা আমি অনায়াসেই অম্লানবাবুর হাতে দিয়ে দেব৷ কিন্তু আমার দুটো শর্ত আছে৷ প্রথমত, পুরো ডিলটাই হবে অম্লানবাবুর সঙ্গে, আপনার সঙ্গে নয়৷ দ্বিতীয়ত, আমি এই বাড়ি থেকে সুবিনয় মুখার্জিকে সঙ্গে করে নিয়ে ফিরব৷ সুবিনয় মুখার্জিকে ছেড়ে দিন, পেনড্রাইভ নিন৷ দ্যাটস ইট৷’

‘সুবিনয় মুখার্জি? সে এখানে কেন থাকবে?’ ভ্রূ কোঁচকালেন মনোময় মজুমদার৷

‘সে তো আমার চেয়ে আপনিই বেশি ভালো জানবেন মিস্টার মজুমদার৷ আমার যা বলার আমি বলেছি৷ বাকিটা আপনি বুঝে নিন কী করবেন,’ টাপুরদি বলল৷

মনোময়বাবুকে আমার এই মুহূর্তে সাপের চেয়েও নিষ্ঠুর আর খল বলে মনে হচ্ছে৷ কিছু সময় আমাদের দুজনের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন তিনি৷ তারপর হেসে বললেন, ‘আপনাদের যখন তাই-ই ইচ্ছে, তবে তাই হোক৷ চলুন, যাওয়া যাক৷’

আমার জ্ঞান অবশ্য ফিরেছিল, কিন্তু ঘোর কাটতে সময় লেগেছিল৷ শরীরের তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি অবশ্য৷ এর মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি আমার মগ্ন চৈতন্যের উপর দিয়ে হালকা তুলির টানের মতো বুলিয়ে গেছে শুধু, বোধের স্তরে প্রবেশাধিকার পায়নি৷ মাঝে মাঝে ছেঁড়া ছেঁড়া চেতনা ও অচৈতন্যের ঢেউয়ে দুলেছি পুরো সময়টা৷ জ্ঞান যখন ফিরল, দেখি টাপুরদি আমার মুখের উপর ঝুঁকে তাকিয়ে আছে৷ আমি চোখ খুলে তাকাতে মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘উঠে বসতে পারবি?’

হাতে ভর দিয়ে উঠে বসতে চেষ্টা করতেই মাথাটা টলে গেল৷ টাপুরদি তাড়াতাড়ি আমায় ধরে ফেলল৷ নরম গলায় বলল, ‘আস্তে আস্তে৷’

টাপুরদির হাত ধরে উঠে বসলাম৷ স্যাঁৎসেঁতে বদ্ধ একটা ঘরের মেঝেতে বসে আছি৷ একটা পয়েন্ট ফাইভ ওয়াটের বালব টিমটিম করে জ্বলছে৷ মেঝের একপাশে কিছু ডাঁই করে রাখা কার্টন ও গৃহস্থালির বাতিল সরঞ্জাম পড়ে আছে অবহেলা ভরে৷ চারিদিকে তাকিয়ে এতক্ষণে লক্ষ করলাম, এই ঘরে কোনো জানালা নেই৷ টাপুরদি মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা কর৷’

মাথার ভিতরটা ঝিম ঝিম করলেও উঠে দাঁড়াতে অসুবিধে হল না৷ মনে পড়ে গেল কীভাবে মনোময়বাবুর সঙ্গে কথার মাঝপথে পেছন থেকে আমার ও টাপুরদির মুখে রুমাল চেপে ধরা হয়েছিল৷ কখন মনোময়বাবুর লোকেরা আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল খেয়ালই করিনি৷ আমাদের আরও বেশি সাবধান হওয়া উচিত ছিল৷ হাতঘড়ির দিকে তাকালাম৷ রাত আড়াইটে বাজে৷ মাঝে কেটে গেছে বেশ কয়েক ঘণ্টা৷

টাপুরদি বলল, ‘তোর জ্ঞান ফেরার অপেক্ষাতেই ছিলাম৷’

‘আর তুমি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

টাপুরদি হাসল৷ বলল, ‘মুখে রুমাল চেপে ধরতেই নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলেছিলাম৷ তবু যে একেবারেই কিছু হয়নি, তা নয়৷ তবে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে এসেছে৷’

‘টাপুরদি, বেরোব কী করে এখান থেকে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘ঘণ্টায় ঘণ্টায় একজন এসে দেখে যাচ্ছে৷ এতক্ষণ তোর জন্য কিছু করতে পারিনি৷ পেনড্রাইভটা না পাওয়া অবধি ওরা আমাদের কিছু করবে না৷ অজ্ঞান অবস্থায় নিশ্চয়ই আমাদের বডি সার্চ করেছে ওরা৷ কারণ মোবাইল ফোন নিয়ে নিয়েছে৷ পেনড্রাইভ না পেয়ে এখানে বন্ধ করেছে আমাদের ভয় দেখিয়ে সেটা হস্তগত করার জন্য৷’

‘বডি সার্চ করেছে?’ ঘৃণায় মুখ বাঁকালাম আমি৷

‘গেট আপ মিতুল৷ এখন ওসব নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই৷ তোর কি ভয় করছে?’

‘না,’ বললাম আমি৷ রাগে গা রি রি করছে আমার৷

‘ভেরি গুড৷ লোকটার আবার রাউন্ডে আসার সময় হয়ে এল৷ তৈরি থাক,’ বলে উঠে গিয়ে সুইচ টিপে লাইটটা নিভিয়ে দিল টাপুরদি৷ ঘরের ভেতর এই মুহূর্তে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার৷

‘চোখটা অন্ধকারে সইয়ে নেওয়ার চেষ্টা কর মিতুল,’ টাপুরদি বলল৷

মিনিট পনেরো এভাবেই কাটল৷ বাইরে খুটখাট শব্দ হতেই কান খাড়া করলাম৷ টাপুরদি ফিসফিস করে বলল, ‘মিতুল, গেট রেডি৷’

পদশব্দ এবার দরজার বাইরে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে৷ দরজার পেছনে দাঁড়ালাম আমরা দুইজন৷ চোখের দৃষ্টি এখন অন্ধকারে অনেকটাই সয়ে এসেছে৷ বাইরে থেকে দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলাম৷ পরক্ষণেই একজন লোক ভিতরে এসে ঢুকল৷ ঘরের ভিতর পা রেখেই হতচকিতভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা৷ ঘরের ভেতর এমন নিকষ আঁধার স্বাভাবিকভাবেই সে আশা করেনি৷ টাপুরদিও এই মুহূর্তের জন্যেই অপেক্ষা করছিল৷ অন্ধকারে চিতাবাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার উপরে৷ হতভম্ব লোকটা আত্মরক্ষার চেষ্টাটুকু করারও সময় পেল না৷ তার আগেই টাপুরদি লোকটাকে মাটিতে পেড়ে ফেলে তার বুকের উপর চেপে বসল৷ ডান ও বাঁ-হাতে লোকটার চোয়াল ও নাক লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটা ঘুসি ঝাড়তেই লোকটা নেতিয়ে পড়ল৷ ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে৷ লোকটাও শেষ মুহূর্তে ডান হাত তুলে টাপুরদির মুখে আঘাত করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু টাপুরদি তাকে সেই সুযোগ দিল না৷ চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় মুখ সরিয়ে নিয়ে শেষ একটা মোক্ষম ঘুসি মারতেই লোকটা জ্ঞান হারাল৷

আমি আর টাপুরদি মিলে লোকটাকে ধরে টেনে ঘরের এক কোণে কার্টনের আড়ালে শোয়ালাম৷ তারপর টাপুরদি ঘরের দরজার দিকে এগোল৷ আমায় ঘরের ভিতরে থাকতে বলে নিজে দরজা দিয়ে বাইরে উঁকি দিল৷ তারপর নিঃশব্দে আমায় ইশারায় ওর সঙ্গে বেরোনোর জন্য ডাকল৷

দুজনে ঘরের বাইরে পা রাখলাম৷ একটা টিমটিমে আলো যতটা না আলো ছড়াচ্ছে, তার চেয়েও বেশি কোণের খাঁজে খাঁজে অন্ধকারকে প্রকট করছে৷ জায়গাটা ঠিক কোথায় বুঝতে পারছি না৷ একটা সিঁড়ি উঠে গেছে উপরের দিকে৷ সিঁড়িগুলোতে অযত্নের ছাপ, ভেঙে গেছে অনেক জায়গায়৷ আশেপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে আর কোনো ঘর চোখে পড়ল না৷

আমি বললাম, ‘টাপুরদি, এখানে তো আর কোনো ঘর দেখছি না৷ তাহলে সুবিনয়বাবুকে ওরা কোথায় রেখেছে?’

টাপুরদি বলল, ‘আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে সুবিনয়বাবু এ বাড়িতেই কোথাও নিশ্চয়ই আছেন৷ কোথায় আছেন জানি না৷ সেটাই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে৷ বেশি সময় হাতে নেই৷ খুব শিগগিরই ওরা টের পেয়ে যাবে যে আমরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি৷ খোঁজ শুরু হলে ধরা পড়তে সময় লাগবে না৷ চল উপরে যাওয়া যাক৷’

আমরা দুজনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম৷ সিঁড়ির মুখে দরজাটা ভেজানো৷ হাত দিয়ে আলতো করে ঠেলে দেখল টাপুরদি৷ না, তালা লাগানো নেই৷ সম্ভবত লোকটা আমাদের দেখতে আসার সময় দরজা খোলা রেখে এসেছিল৷ দরজার বাইরের আংটাতে একটা চাবিসুদ্ধু বড়ো তালা ঝুলছে৷ টাপুরদির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটতে দেখলাম৷ সবচেয়ে বেশি অবাক লাগল যেটা দেখে, তা হল, দরজাটা দিয়ে বেরোতেই আমরা বাড়ির মেন বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এলাম৷ অর্থাৎ, যে ঘরে আমাদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল, সেটা আন্ডারগ্রাউন্ড ঘর৷ আমি স্তব্ধ বিস্ময়ে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম৷ বললাম, ‘মাই গড টাপুরদি, এ যে মাটির নীচের গুপ্তকক্ষ গো!’

টাপুরদি ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে আমায় কথা না বলতে নির্দেশ করল৷ দরজাটা আলতো করে আরেকটু ঠেলতেই জুঁইফুলের গন্ধ আমাদের দুজনের নাকেই ধাক্কা মারল৷ টাপুরদি আমার দিকে তাকাল৷ সেদিন সুনয়নাদেবীর সঙ্গে দেখা করতে এসে রাতে এই জুঁইয়ের গন্ধ পেয়েছিলাম৷ এ বাড়ির পেছনের দেয়ালের কাছে জোড়া জুঁইয়ের গাছ সেদিনই চোখে পড়েছিল আমাদের৷ তার মানে, এটা বাড়ির পেছন দিক৷

দুইজনে বাইরে বেরিয়ে এলাম৷ এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে টাপুরদি পেছন ফিরে দ্রুত হাতে তালাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল৷ চাবিটা নিজের ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল, ‘চল৷ তবে খুব সাবধান৷ চারিদিকে সিকিউরিটির লোকেরা ঘুরছে৷’

উপরের দিকে চোখ তুলে মইটা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে জরিপ করল টাপুরদি৷ বাড়ির পেছনে বাঁ-দিকে সীমানা প্রাচীরের গা ঘেঁষে মইটা সোজা উঠে গেছে উপরে৷ বাড়ি যিনি বানিয়েছিলেন, বোধ করি তিনি ইউরোপীয় রুচিতে বাড়িটি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন৷ বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ড ঘর, ফায়ার এস্কেপ দেখে সেই সন্দেহই জোরদার হচ্ছে৷ পরবর্তীতে অমিয় চক্রবর্তী বাড়িটি কিনে নিলে এই ফায়ার এস্কেপের কোনো যত্ন হয়নি কস্মিনকালে, তা এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়৷ ইউরোপীয় ছবিতে যেমন সুচারু শৈল্পিক ফায়ার এস্কেপ সিঁড়ি দেখা যায়, তেমন কিছু নয়৷ নেহাতই একখানা লোহার মই গোছের বস্তু, যার ধাপগুলি একে অপরের থেকে এতটাই দূরে যে একটি ধাপে দাঁড়ালে পরেরটি একজন মাঝারি উচচতাসম্পন্ন ব্যক্তির কোমরের উপরে পড়বে৷ মইটি না শোভাবর্ধক, না সত্যিকারের প্রয়োজনের সময় কাজে আসার উপযোগী৷ যেন শুধু বানানোর জন্যেই বানানো হয়েছে৷ নিতান্ত কপিপ্রজাতির না হলে এই মই বেয়ে ওঠা অসম্ভব৷ তার উপর অব্যবহারে, অযত্নে এতটাই জীর্ণ অবস্থা, পা রাখতে ভয় হয়, বুঝি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে৷

টাপুরদি টেনেটুনে মইয়ের অবস্থা পরীক্ষা করে বলল, ‘পারবি মিতুল?’

আমার প্রায় কেঁদে ফেলার উপক্রম৷ টাপুরদি বার বার বলত, ‘মিতুল একটু এক্সারসাইজ কর, ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়া৷’ তখন কানে নিইনি৷ রেখাদেবীর বাড়ির গাছে যদি বা উঠতে পেরেছি, এই মইয়ে উঠব কীভাবে?

টাপুরদি আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ঠিক পারবি৷ শুধু একটু সাহস করতে হবে৷’

মইয়ের প্রথম ধাপটি মাটি থেকে প্রায় বুকসমান উচচতায়৷ কী জানি বাড়ির তদানিন্তন মালিকের বোধ হয় মনে হয়েছিল, আগুন লাগলে পুড়ে মরার চেয়ে লাফিয়ে পড়ে কোমর ভেঙে মরা বেশি সম্মানের৷ তাই এই ব্যবস্থা৷

‘কী করে এখানে উঠব টাপুরদি! পা তো পৌঁছোবেই না অতদূর অবধি,’ কাতর স্বরে বললাম আমি৷

টাপুরদি বলল, ‘আমি তোকে তুলে ধরছি৷ তুই ওঠ৷’

টাপুরদি আমার কোমর ধরে উপরে শূন্যে তুলে ধরল৷ টাপুরদির শারীরিক শক্তির পরিচয় আগেও পেয়েছি অনেকবার৷ তাই অবাক হলাম না৷ নির্দ্বিধায় আমার বাহান্ন কেজির শরীরটাকে উপর দিকে তুলে প্রায় ছুড়ে দিল টাপুরদি৷ আমিও দ্বিতীয় ধাপটিকে হাত দিয়ে লুফে ধরলাম৷ ঝুলন্ত অবস্থায় পা রাখলাম নীচের প্রথম ধাপে৷ নিজের কৃতিত্বে নিজেই মুগ্ধ হলাম৷

টাপুরদি নীচ থেকে চাপা গলায় বলল, ‘মিতুল, চেষ্টা কর পরের ধাপে পা রাখতে৷’

পরবর্তী প্রতিটি ধাপ নীচের ধাপের চেয়ে আমার কোমর সমান উঁচু৷ মা দুর্গার নাম করে তৃতীয় ধাপটা ধরে ঝুলে আগের মতোই দ্বিতীয় ধাপে পা রাখলাম৷

নীচ থেকে শুনলাম টাপুরদি বলল, ‘শাবাশ মিতুল৷ উঠতে থাক৷’

নীচ থেকে টাপুরদিও উঠে আসছে টের পেলাম৷ একবার মনে হল, এতদিনের পুরোনো জীর্ণ মই দুজনের ওজন নিতে না পেরে দেহ রাখলেই চিত্তির৷ তখন বন্দিদশা তো ঘুচবেই না, উপরিপাওনা হবে ভাঙা হাত-পা৷ টাপুরদি নীচ থেকে আমাদের আরণ্যক পূর্বপুরুষদের মতো দ্রুতগতিতে উঠে আসছে৷ আমি ধীরে ধীরে ওঠা শুরু করলাম৷ অনেকটা কসরত করে শেষমেষ শেষ ধাপে পা রাখতে সমর্থ হলাম৷ ছাদের কার্নিশের শেষ প্রান্ত থেকে এই ধাপ অনেকটাই নীচে শেষ হয়েছে৷ এখান থেকে ছাদে ওঠার কোনও উপায় খুঁজে পেলাম না৷ ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এবার? এবার কী করব টাপুরদি?’

টাপুরদি একেবারে আমার পেছনের ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে৷ উপরটা মাথা তুলে দেখে বলল, ‘ভালো করে দেখ মিতুল৷ ছাদের ধার থেকে ইঞ্চিখানেক দূর থেকে কার্নিশের গাঁথনি উঠেছে৷ ওখানে পা রেখে উঠতে হবে৷ আর কোনো উপায় নেই৷’

‘অসম্ভব,’ আঁতকে উঠে বললাম আমি, ‘দোতলার ছাদ থেকে নীচে পড়লে যদি বা প্রাণে বাঁচি, হাড়গোড় একটাও বাঁচবে না টাপুরদি৷ ওইটুকু স্পেসে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, পাও রাখা যাবে না৷ রক্ষে করো, আমার দ্বারা হবে না৷’

‘পারবি৷ এতদূর যখন উঠতে পেরেছিস, এটাও পারবি৷ আর আমি তো আছি তোর পেছনে৷ তোকে আমি পড়তে দেব ভাবলি কী করে?’

অন্ধকারে নীচের ধাপে দাঁড়ানো টাপুরদির মুখ আমি দেখতে পাচ্ছি না৷ টাপুরদির কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল, আমার চোখটা হঠাৎ জ্বালা করে উঠল৷ অন্ধকার রাতে ভগ্নপ্রায় ফায়ার এস্কেপের শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে দোতলার ছাদের কার্নিশ পেরোনোর আগে চোখ জ্বালা করা মোটেই কাজের কথা নয়৷ তবে টাপুরদির কথায় মনে বেশ কিছুটা জোর এল৷ মনে হল, চেষ্টা করলে পারতেও পারি৷ কিন্তু ধরব কী?

‘হাত বাড়িয়ে ছাদের কার্নিশ ধর মিতুল,’ নীচ থেকে বলল টাপুরদি৷

টাপুরদির কথামতো ডান হাতটা উপরে বাড়াতে ছাদের কার্নিশ হাতে ঠেকল৷ কিছুটা স্যাঁৎসেঁতে, অন্ধকারে চোখে দেখা না গেলেও বুঝলাম পরিচর্যার অভাবে শ্যাওলা পড়েছে৷ টাপুরদি ফিসফিস করে বলল, ‘হাতে বেশি সময় নেই মিতুল৷ ওঠ, তুই পারবি৷’

বাঁ-হাতটা ছাড়তেই ব্যালেন্স হারালাম৷ মুখ থেকে একটা ভয়ার্ত আর্তনাদ বেরিয়ে আসতেই টাপুরদি নীচের ধাপ থেকে আমার কোমরটা একহাতে সবলে জড়িয়ে ধরল৷ কোনোরকমে ছাদের বর্ধিত অংশ ধরে নিজেকে সামলালাম৷

‘সাবধান,’ বলল টাপুরদি, ‘নীচে তাকাস না মিতুল৷’

এবার আর ভুল করলাম না৷ সাবধানে একে একে দুই হাত বাড়িয়ে কার্নিশের ধারটা ধরে ফেললাম শক্ত হাতে৷ টাপুরদি কিছু নির্দেশ দেওয়ার আগেই ডান পায়ের হাঁটু ভেঙে ছাদের ধারের অংশতে পা রাখলাম৷ আমার পায়ে স্নিকার পরা৷ মনে হল, খালি পায়ে থাকলে বোধ হয় সুবিধে হত৷ কিন্তু এখন কিছু করার নেই৷ হাতে ভর দিয়ে শরীরটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে তুলে ধরতেই বাঁ-পাটাও পৌঁছে গেল ডানপায়ের পাশে৷ এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে কার্নিশ পেরিয়ে ছাদে পা রাখতে বিশেষ কসরত করতে হল না৷ টাপুরদিও একইভাবে উঠে এসে দাঁড়াল আমার পাশে৷ দুজনেরই মুখে যুদ্ধজয়ের হাসি৷ টাপুরদি আমার পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে বলল, ‘ওয়েল ডান৷ এবার থেকে আর ফাঁকি নয়৷ রোজ এক্সারসাইজ করবি, মনে থাকে যেন৷’

ফিক করে হেসে মাথা নাড়লাম আমি৷

পরের চ্যালেঞ্জটা যে সহজেই উতরানো গেল, তার জন্যে এই বাড়ির পরিচর্যার অভাবই দায়ী৷ আগে থেকে অবশ্য ভেবেই রেখেছিলাম সিঁড়ির দরজা ভিতর থেকে বন্ধ থাকবে, এবং তা ছিলও৷ ভিতরে কাঠের দরজার বাইরে কোলাপসিবল গেটে একটা তালা ঝুলছিল অবশ্য, সেটা টাপুরদি অনায়াসেই খুলে ফেলল৷ বাড়ির গেটে আমাদের সার্চ করা হবে জানাই ছিল৷ টাপুরদির জিনসের কোমরে যে বেল্টটা থাকে, সেটা অর্ডার দিয়ে বিশেষভাবে বানানো৷ গত সপ্তাহেই এটা হাতে এসে পৌঁছেছে৷ জিনিসটা ভারি সুন্দর৷ বিশেষ করে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের জন্য খুবই কাজের জিনিস৷ উপর থেকে দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই৷ চামড়ার পেছনে সার সার সরু পকেটে ছোটো আকারের কিছু মিনিয়েচার যন্ত্রপাতি থাকে, বেশিরভাগই বেশ নমনীয়৷ যন্ত্রপাতিগুলি কিছু বিদেশি সাইট থেকে অনলাইনে কেনা, বাকিগুলি অর্ডার দিয়ে ধর্মতলার কোনো দোকান থেকে বানিয়ে এনেছে টাপুরদি৷ ওর সুঠাম পাতলা কোমরে বেল্টটা সেঁটে থাকে, কিছু বোঝা যায় না৷

বেল্ট থেকে একটা স্ক্রু -ডাইভারের মতো দেখতে পাতলা যন্ত্র বার করে আনল টাপুরদি৷ সামনেটা খাঁজকাটা মতো৷ তালার ভিতর ঢুকিয়ে হালকা মোচড় দিতেই খুট করে শব্দ হল৷ পুরোনো মরচে পড়া তালা খুলতে বেশি কষ্ট করতে হল না৷ কাঠের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ৷ কয়েকবার হাত দিয়ে ঠেলে বোঝা গেল ভিতরে দরজার উপরের দিকে ছিটকিনি লাগানো আছে৷

‘কী করবে টাপুরদি? খুলবে কী করে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘দাঁড়া, চেষ্টা করে দেখি৷ এতদূর এসে খালি হাতে ফিরব না,’ চাপা গলায় বলল টাপুরদি৷

দরজাটা নড়ছে৷ কাঠের দরজা ছিটকিনির কারণে উপরে শক্ত হয়ে এঁটে থাকলেও নীচের দিকটা ঠ্যালা দিলে নড়ছে৷ দরজাটা ছাদের দিকে খোলে৷ টাপুরদি ঝুঁকে দেখে বলল, ‘আজ আমাদের কপাল ভালো রে মিতুল৷ দরজার হিঞ্জটা দেখ৷’

দেখলাম৷ কোনো অজ্ঞাত কারণে নীচের দিকের হিঞ্জের স্ক্রু খুলে এসেছে৷ যতটা নিঃশব্দে পারা যায়, বেশ কয়েকবার ঠেলতে উপরের হিঞ্জটাও নড়বড়ে হয়ে এল৷ টাপুরদি হাতের স্ক্রু ডাইভারের মতো বস্তুটি ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে বেশ কয়েকবার গায়ের জোরে চাড় দিল৷ মনে হল, ভাগ্যিস বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ছিল, নইলে ব্যাপারটা এতটা সহজে হত না৷ অমিয়বাবু, অম্লানবাবু ব্যস্ততার কারণে হয়তো বাড়ির বাইরেই বেশি সময় থাকতেন৷ আর সুনয়নাদেবীকে যতটুকু দেখেছি, মনে হয়েছে সাংসারিক ব্যাপারে কিছুটা যেন উদাসীন৷ সেই কারণেই বহুদিন এই বাড়ির লোকজন বোধ হয় বাড়ির যত্নের দিকে খেয়াল রাখেনি৷ তাদের উদাসীনতা আজ আমাদের কাজটা সহজ করে দিল৷ মিনিট পনেরো বিশেকের চেষ্টার পর দরজাটা হিঞ্জের দিক থেকে খুলে গেল৷ আরও একটু ঠেলতে মড়মড় শব্দ করে ছিটকিনির দিকের কাঠ কিছুটা ভেঙে উলটোদিক দিয়ে আমাদের ঢোকার মতো দরজা ফাঁক হল৷

টাপুরদি প্রথমে ঢুকল ভিতরে, আমি পিছে পিছে ঢুকলাম৷ সিঁড়িতে ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ টাপুরদিকে অনুসরণ করে পা টিপে টিপে নীচে নামলাম আমরা৷

আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘টাপুরদি, আমরা ঘুরে-ফিরে সেই সিংহের গুহাতেই যেচে মাথা গলালাম৷ এখন যদি সুবিনয়বাবু এখানে না থাকেন?’

‘যদি না থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে আমার ডিডাকশন নিতান্তই বোগাস৷ আমার গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেওয়া উচিত,’ মৃদু অথচ গম্ভীর গলায় বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে থাকল টাপুরদি৷ অগত্যা আমিও পিছু নিলাম৷

সিঁড়িটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে সামনে কিছুটা প্রশস্ত জায়গা৷ একদিকের দেওয়ালে অমিয় চক্রবর্তীর রাজনৈতিক জীবনের বেশ কিছু ছবি লাগানো আছে৷ তার ডান হাতে একটা করিডর গিয়েছে৷ আগের দিন ওই পথেই আমরা সুনয়নাদেবীর ঘরে গিয়েছিলাম৷ উলটোদিকের একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল টাপুরদি৷ আমি জিজ্ঞাসা করতে যেতেই নিজের ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে মুখ বন্ধ রাখতে ইশারা করল৷ কান পাততে কথাবার্তার মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল৷ গলার স্বর দুটো যথেষ্ট চাপা হলেও দুটোই পুরুষ কণ্ঠ সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না৷ দরজার কাছে এগিয়ে গেল টাপুরদি, পিছে পিছে আমি৷ এবার কথাবার্তার শব্দ কিছুটা পরিষ্কার হল৷ দুজন পুরুষের মধ্যে চাপা গলায় উত্তেজিত বাগবিতণ্ডা চলছে৷

‘পুলিশ সন্দেহ করছে৷ মেয়েদুটোকে এভাবে আটকে রাখা যাবে না৷ তা ছাড়া ওরা বোকা নয়, আটঘাট বেঁধেই এসেছে৷ পুলিশের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ আছে৷’

‘কিছু করার ছিল না৷ এই অবস্থায় কোনোরকম রিস্ক নেওয়া যাবে না৷ ওরা সুবিনয়ের রিলিজ চাইছে পেনড্রাইভের বদলে৷’

‘সুবিনয়কে এভাবে আটকে রাখার কোনো মানে হয় না৷ সুবিনয়কে একটা পদ দিলেই ঝামেলা মিটে যেত৷’

‘ঝামেলা যে মিটে যেত সে গ্যারান্টি কে দিত? সুবিনয়? এই রাজনীতিতে কেউ কারও হয় না৷ সেটা শিখতে আর কত সময় লাগবে তোমার?’

‘এত অবিশ্বাস, এত ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকো কী করে? ক্লান্তি আসে না? নিজের উপর রাগ হয় না? রাজনীতি, ক্ষমতা, লোভ, আরও আরও উঁচুতে ওঠার তৃষ্ণা, আর কত?’

‘রাজনীতিতে আবেগের কোনো জায়গা নেই৷ নিজের জন্য কেউ কিছু করছে না৷ মানুষের জন্য লড়াইয়ে যদি নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়, তাতে অন্যায় কিছু নেই৷’

‘মানুষের জন্য লড়াই?’ এবার চাপা ব্যঙ্গাত্মক হাসির শব্দ শোনা গেল৷ তারপর হিসহিসে গলায় বলল, ‘সত্যি মানুষের জন্য এত কাণ্ড করছ? কাকে ঠকাচ্ছ? জনগণকে, আমাকে না নিজেদের? এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার কি কোনো শেষ নেই? আর কত হারাতে হবে এই খেলায়, ভেবে দেখেছ? যে জনতা মাথায় তুলতে পারে, সে ছুড়ে ফেলতেও মুহূর্তের জন্যে দ্বিধা করবে না৷ আমি আর পারছি না, বিশ্বাস করো৷ এই খেলা থেকে আমায় রেহাই দাও এবার৷’

‘জনতা যাতে আস্থা না হারায়, সেজন্যই এত কিছু করা হচ্ছে৷ যেভাবেই হোক, এই পেনড্রাইভের কনটেন্ট বাইরে আসা চলবে না৷’

‘ওই পেনড্রাইভে যা আছে তা অতীত৷ একটা পুরানো পাপকে ঢাকার জন্য একটার পর একটা পাপ ঘটে চলেছে৷ ছি ছি, এ মানা যায় না৷ তোমাদের এই অন্যায়কে মেনে নিয়ে আমিও এই পাঁকে ডুবে চলেছি৷ আমি আর নিতে পারছি না৷’

‘নিতে তো হবেই৷ ভুলে যেয়ো না, আইনের চোখে তুমিও সমান অপরাধী৷ পালানোর উপায় নেই তোমার৷’

‘না, আমি অপরাধী নই৷ শুধু ষড়যন্ত্রের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছি৷ কিন্তু আর পারছি না আমি, আর পারছি না৷’

ভিতরে খচমচ শব্দ শোনা গেল৷ চাপা গলায় আরও কিছু কথা হল যা আমাদের কর্ণগোচর হল না৷ টাপুরদি হঠাৎ আমার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নিল৷ দেয়ালে পিলারের পেছনে দাঁড়াতেই অন্ধকারে দেখলাম ঘরের দরজা খুলে গেল৷ দরজা দিয়ে যে ব্যক্তি বেরিয়ে এলেন তাঁকে আমরা ভালোভাবেই চিনি৷ তিনি মনোময় মজুমদার৷ গটগট করে হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন মনোময়বাবু৷ সেদিকে তাকিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘অপরজন কে টাপুরদি?’

‘চিনতে পারলি না? অম্লানবাবু৷’

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘অম্লানবাবু মনোময়বাবুকে দিয়ে জোর করে এসব করাচ্ছেন? তার মানে অমিয়বাবুকে হত্যা করার পেছনেও অম্লান চক্রবর্তীর হাত আছে?’

অন্ধকারেও টাপুরদির হাসি চোখ এড়াল না আমার৷ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হাসছ যে?’

‘হাসছি, কারণ তুই শুধু কথাগুলোই শুনেছিস৷ কণ্ঠস্বর দুটো চিনতে পারিসনি,’ বলল টাপুরদি৷

‘মানে?’ আমার বিস্মিত জিজ্ঞাসা৷

‘মানে হল তুই যা ভাবছিস, ব্যাপারটা তার ঠিক উলটো৷ তবে এখন আর কথা নয়৷ পরে সব বুঝিয়ে বলব৷ এখন ঠিক সময় নয়,’ বলে চুপ করে গেল টাপুরদি৷

জানি এখন আর টাপুরদিকে কিছু জিজ্ঞাসা করে কোনো লাভ নেই, উত্তর পাব না৷ আর এখন সেই পরিস্থিতিও নেই৷ কিন্তু ব্যাপারটা উলটো, একথার মানে কী? মনোময়বাবু অম্লান চক্রবর্তীকে দিয়ে এসব করাচ্ছে? তাহলে কি মনোময়বাবুই এই সব কিছুর পেছনে আসল মুখ? যাক গে, সেসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে৷

ডান দিকের করিডর দিয়ে আমরা আগের দিনও গিয়েছি৷ এদিকটা আমাদের চেনা৷ আগের দিনই দেখেছিলাম, করিডরের প্রথমে একটা ছোট স্টাডি মতো ঘর রয়েছে৷ এর পাশেই ঠাকুরঘর৷ একদম শেষে সুনয়নাদেবীর ঘর৷

‘সুবিনয়বাবু কোথায় থাকতে পারেন টাপুরদি? এখানে তো এই ক’টাই ঘর? তাহলে কি নীচের তলায় কোন ঘরে আটকে রাখা হয়েছে ভদ্রলোককে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

টাপুরদি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই নীচে একটা শোরগোলের শব্দ শোনা গেল৷ দ্রুতপদে দোতলার করিডরে শেষ প্রান্তের জানালা দিয়ে উঁকি দিল টাপুরদি, সঙ্গে আমিও৷ নীচে কিছু লোককে টর্চ হাতে ছোটাছুটি করতে দেখা গেল৷ টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম আমি৷ সিঁড়িতে লোকজনের পায়ের শব্দ শোনা গেল৷

টাপুরদির মুখে উত্তেজনার চিহ্ন স্পষ্ট৷ ফিসফিসে স্বরে বলল, ‘আমাদের খুঁজছে৷ ওরা জেনে গেছে যে আমরা পালিয়েছি৷’

হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা চেপে ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে টাপুরদি ছুটে ঢুকল সামনের ঠাকুরঘরে৷ ভিতর থেকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল, আলো জ্বালল না৷ ঘরটি প্রস্থে বেশ চওড়া, দৈর্ঘ্য অপেক্ষাকৃত অনেকটাই কম৷ মারবেলের মেঝে, কাঠের টাইলস লাগানো দেওয়ালে৷ সিলিং থেকে ঝুলছে একটা বেশ ছিমছাম সুন্দর ঝাড়বাতি৷ অন্ধকারে অন্দরসজ্জা খুব বেশি চোখে পড়ছে না৷ ঘরের ভিতরে ধূপের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে৷ অন্য সময় হলে এমন সুন্দর গন্ধে হয়তো মনটা শান্ত হয়ে আসত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্যরকম৷ বুকের ভিতরে দামামা পিটছে৷ হৃৎযন্ত্রের লাবডুব বাইরে থেকে শুনতে পাচ্ছি৷ এরা যেমন ভয়ংকর মানুষ, ধরা পড়লে দুটো নিরস্ত্র মেয়েকে খতম করে লাশ গায়েব করে দিতে খুব বেশি অসুবিধে হওয়ার কথা নয়৷

ঠাকুরের সিংহাসনটি ঘরে ঠিক মাঝ বরাবর প্রতিষ্ঠিত৷ মার্বেলের উপর কারুকার্য করা বড়োসড়ো আকারের সিংহাসন, ভিতরে ঠাকুরের মূর্তি অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না৷ ঘরটা দৈর্ঘ্যে কম হওয়ায় সামনে বসে পুজো করার জায়গাটা বেশ কম৷ সিংহাসনটা আরেকটু পিছিয়ে বসালে আরেকটু জায়গা বেরোত, এই ব্যাপারটা যে কেন কারও মাথায় আসেনি, সেটাই আশ্চর্য! যাই হোক, এতে আমাদের কিছুটা সুবিধেই হল৷ টাপুরদি আর আমি সিংহাসনের পেছনে গিয়ে বসলাম৷ তেমন সুরক্ষিত জায়গা নয় বটে, অন্তত এখানে আমাদের খুঁজতে এলে সহজেই খুঁজে পাবে৷ তবু এই মুহূর্তে এখানে লুকোনো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই৷ অতএব সিংহাসনের পেছনে গুটিসুটি মেরে বসলাম৷ টাপুরদি কিন্তু বসল না৷ বরং আমার পাশে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল৷

‘কী হল টাপুরদি? বসে পড়ো৷ কেউ এসে গেলে ধরা পড়ে যাবে তো!’ বললাম আমি৷

‘ধরা তো পড়তেই হবে ডার্লিং৷ ওরা ধরতে না পারলে নিজেদেরই ধরা দিতে হবে,’ মৃদুস্বরে হেসে বলল টাপুরদি৷

‘ধরা দেবে? সে কী? ধরা পড়লে আর বেঁচে বেরোতে পারব না এই বাড়ি থেকে৷ যা সব ভয়ংকর লোকজন এখানে! তুমি প্লিজ এসব অলক্ষুণে কথা বলে আমার হার্ট রেট বাড়িয়ে দিয়ো না৷’

টাপুরদি এখনও বসেনি৷ বরং খুব মন দিয়ে সিংহাসনের পেছনটা হাতড়ে হাতড়ে দেখছে৷

‘কী খুঁজছ এখানে বলো তো?’ জানতে চাইলাম আমি৷

‘এই ঘরটা দৈর্ঘ্যে এত ছোটো কেন? ভেবে দেখ মিতুল৷ এর পাশের ঘরটাই সুনয়নাদেবীর শোওয়ার ঘর, যেখানে আমরা সেদিন গিয়েছিলাম৷ সেটা তো বেশ লম্বা, ওদিকের স্টাডিরও দৈর্ঘ্য প্রস্থের চেয়ে অনেকটাই বেশি৷ তাহলে এটার দৈর্ঘ্য এত কম কেন? অথচ পেছন দিকে তো দেওয়াল সরলরেখা বরাবরই গিয়েছে,’ চিন্তান্বিত স্বরে বলল টাপুরদি৷

‘তাহলে?’ আমার সংক্ষিপ্ত জিজ্ঞাসা৷

‘তাহলে জটায়ুর ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় হাইলি সাস্পিশাস’, বলল টাপুরদি৷ একমাত্র টাপুরদিই পারে এ-রকম দমবন্ধ উত্তেজনার মধ্যে দাঁড়িয়ে জটায়ু আওড়াতে৷ টাপুরদি পেছনের দেয়ালে হাত বুলিয়ে কিছু খুঁজছে৷ আমার আর এসব এখন ভালো লাগছে না৷ মনে হচ্ছে এখান থেকে বেরোতে পারলে বাঁচি৷ স্বীকার করতে লজ্জা নেই, আমি টাপুরদির মতো অত সাহসী নই৷ এখন, এই মুহূর্তে খুব ভয় করছে আমার৷ এই প্রাক গ্রীষ্মেও শরীরে শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে৷

ঠাকুরের সিংহাসনের গায়ে সেঁটে বসলাম আমি৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার পা সিংহাসনের পাশের দিকের কারুকার্য করা অংশে ঠেকে গেল৷ হাত বাড়িয়ে প্রণাম করতে যাব, ঠিক তখনই অনুভব করলাম, সিংহাসনের সেই অংশটা যেন নড়ে উঠল৷ একটু চমকে উঠলাম৷ আমার মনের ভুল কি না বোঝার জন্য আবার হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলাম জায়গাটা৷ না সত্যিই নড়ছে৷ চাপ পড়তেই শ্বেতপাথরে কারুকার্য করা স্ল্যাবের গা থেকে ইঞ্চি দুয়েকের বর্গাকার অংশ দেবে গিয়ে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে৷

‘টাপুরদি, এদিকে দেখো৷ তাড়াতাড়ি এসো,’ উত্তেজিত স্বরে ডাকলাম আমি৷

টাপুরদি এগিয়ে এসে নীচু হয়ে বসল৷ জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে রে?’

আমি ব্যাপারটা দেখালাম টাপুরদিকে৷ টাপুরদি সেখানে হাত বুলিয়ে উত্তেজিত স্বরে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘ব্র্যাভো!’

তারপর হাত দিয়ে জোরে চেপে ধরল সিংহাসনের বর্গাকার অংশটা৷ একটা খুব হালকা খস খস শব্দ করে পেছনের দেয়ালের কাঠে টাইলসের একটা অংশ সরে গেল ধীরগতিতে৷ লাফ দিয়ে টাপুরদি এগিয়ে গেল সেই দিকে৷ আমিও এগোলাম পিছনে পিছনে৷ পেছনে একটা ছোট্ট কুঠুরি মতো অন্ধকার জায়গা৷ অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না৷ আমি পায়ে পায়ে ফিরে এলাম ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে৷ বেশি খুঁজতে হল না৷ সামান্য হাতড়াতেই হাতে এল বস্তুটি, একটি দেশলাই বাক্স৷ সেটা নিয়ে গিয়ে টাপুরদির পাশে দাঁড়িয়ে একটা কাঠি বের করে জ্বালালাম৷ মুহূর্তের মধ্যে ঘরটি হালকা আলোয় ভরে উঠল৷ সেই আলোয় দেখলাম৷ ঘরের মেঝেতে মুখ, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছেন সুবিনয় মুখার্জি৷ চোখ বন্ধ, সম্ভবত মূর্ছিত৷

‘টাপুরদি...’ চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলাম আমি৷

‘শশশশশ...’ টাপুরদি সাবধান করল আমায়৷ সুবিনয় মুখার্জির হাতের কবজিটা ধরে পালস চেক করল, তারপর বুকে কান ঠেকিয়ে হৃৎস্পন্দন শুনে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠাকুরের আসনের সামনে খুঁজে দেখ তো মিতুল, জল পাস কি না৷ জল না থাক, অন্তত গঙ্গাজলের শিশি তো ঠাকুরঘরে অবশ্যই থাকবে৷ খুঁজে দেখ৷ পেলে নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি৷’

টাপুরদির অনুমান ঠিক৷ একটা নয়, দুটো গঙ্গাজলের ছোটো বোতল রাখা ঠাকুরের সিংহাসনের পাশে৷ একটার সিল খোলা, অপরটা বন্ধ৷ দুটোই হাতে নিয়ে ছুটে গেলাম টাপুরদির কাছে৷

জলের ছিটে বেশ কয়েকবার দিল টাপুরদি৷ সুবিনয়বাবুর জ্ঞান ফেরার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না৷ রীতিমতো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ভদ্রলোক৷ দেশলাই কাঠির স্বল্প আলোতে টাপুরদির মুখের হতাশার রেখাগুলো লুকোনো যাচ্ছে না৷

হঠাৎই বাইরে লোকজনের কথাবার্তার শব্দ শোনা গেল৷ শব্দটা এদিকেই এগিয়ে আসছে৷ টাপুরদি আর আমি দুজন দুজনের মুখের দিকে তাকালাম৷ জানি না কেন, টাপুরদিকে তেমন চিন্তিত মনে হল না আমার৷ টাপুরদির মনের ভিতর কী চলছে তা টাপুরদিই জানে৷ কিন্তু আমার মনের অবস্থা বলার মতো নয়৷ হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে৷ টাপুরদির পাশে ঘেঁষে দাঁড়ালাম৷

‘ভয় করছে?’ নিষ্কম্প স্বরে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল৷

শুধু মাথা নাড়লাম, কথা বলতে গেলে গলার স্বর যদি না বেরোয় সেই ভয়ে৷

টাপুরদি বলল, ‘তুই এখানে থাক৷ আমি দেখছি৷’

আমি বললাম, ‘দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলে ওরা আর এখানে ঢুকতে পারবে না টাপুরদি৷’

‘কতক্ষণ? দরজা ভেঙে ঢুকতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয় ওদের৷ আর তা ছাড়া অপরাধীকে ধরতে হলে আজ ওদের কনফ্রন্ট করতেই হবে মিতুল,’ শান্ত কণ্ঠে বলল টাপুরদি৷

‘তোমার ভয় করছে না টাপুরদি?’ বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে এই পরিস্থিতিতেও জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম৷

ক্ষণিক নীরবতা৷ তারপর টাপুরদি মাথা নেড়ে মৃদুকণ্ঠে বলল, ‘করছে৷’

‘পেনড্রাইভটা আমাদের চাই,’ গম্ভীর গলায় বললেন মনোময় মজুমদার, যিনি এই মুহূর্তে আমাদের সামনে একটা কাঠের টুলের উপরে বসে আছেন৷ আমার আর টাপুরদির দুই পাশে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দুইজন মুসকো মতো লোক দাঁড়িয়ে৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%