সোমজা দাস
‘একটা ব্যাপারে একটু খটকা লাগছে টাপুরদি৷ খবরে শুনেছি, সেদিন অমিয়বাবু সন্ধের পর অফিসের সকলকে ছুটি দিয়েছিলেন৷ এমনকী সিকিউরিটির লোকেদেরও চলে যেতে বলেছিলেন অফিস ছেড়ে৷ আর সেদিনই তিনি খুন হলেন৷ এটা কেন?’
টাপুরদি এবারেও চুপ করে রইল৷ মনে হল টাপুরদি নিজেও ভাবছে এই বিষয়ে৷ একটু পরে মেন রোড থেকে একটা গলিতে গাড়ি ঢুকিয়ে কিছুটা এগিয়ে বাঁ-দিকে একটা বাড়ির সামনে গাড়িটা দাঁড় করাল৷ বলল, ‘নাম মিতুল, আমরা এসে গেছি৷’

কলিংবেল বাজিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ৷ আবার বেল বাজাল টাপুরদি৷ এবারও কেউ দরজা খুলল না৷
‘বাড়িতে কেউ নেই বোধ হয়!’ বললাম আমি৷
‘আছে,’ টাপুরদির সংক্ষিপ্ত উত্তর৷ বলতে বলতেই একটি অল্পবয়সি মেয়ে এসে দরজা খুলে দিল৷ আমাদের দেখে বোধ হয় একটু বিস্মিত হল৷ জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকে চান?’
টাপুরদি উত্তর দিল, ‘রেখা মজুমদারের বাড়ি তো এটা? আমরা ওঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি৷’
মেয়েটি বলল, ‘জুতোটা বাইরে খুলে ভিতরে এসে বসুন আপনারা৷ মাসিমার শরীর ভালো নেই৷ শুয়েছেন৷ আমি ডাকছি৷’
মেয়েটি ভিতরে চলে গেল৷ আমরা সোফার উপর বসে রইলাম৷ ছোট্ট ফ্ল্যাট, ছিমছাম গোছানো৷ দেওয়ালে একজন কমবয়সি ভদ্রলোকের মালা পরানো ছবি৷ মালা বদলানো হয়নি অনেকদিন, ফলে শুকিয়ে হলদে হয়ে গেছে৷ দরজার পাশে একটা শুর্যাক রাখা৷ ঘরে একটা পুরোনো আমলের বক্স টিভি৷ ঘরের দক্ষিণ দিকে ছোট্ট একটা ব্যালকনি, তাতে নাইলনের দড়িতে কিছু কাপড়চোপড় মেলা৷ মেয়েটি সম্ভবত রেখাদেবীর পরিচারিকা৷
মিনিট পাঁচেক পরে যিনি বেরিয়ে এলেন, তাঁর বয়স ষাট-পঁয়ষট্টি হবে৷ তাঁকে দেখেই অসুস্থ মনে হল৷ ধরা গলায় বললেন, ‘আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না!’
টাপুরদি আমাদের পরিচয় দিল৷ বলল, ‘আপনি বোধ হয় অসুস্থ৷ আপনাকে বিরক্ত করতে খারাপ লাগছে৷ বেশি সময় নেব না৷’
রেখাদেবী সোফায় বসলেন৷ মনে হল, বসতে কষ্ট হল তার৷ একটু হাঁফ নিয়ে একটু ধরা গলায় বললেন, ‘কোমরের ব্যথাটা পূর্ণিমা অমাবস্যায় বাড়ে৷ তখন কষ্ট হয়৷ আর ঠান্ডা লেগে একটু জ্বর মতো এসেছে৷ তেমন কিছু না৷ আসলে আমার একটু বেশিবার স্নান করার স্বভাব তো, তাই৷ যাক গে, বলো, আমি তোমাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’
টাপুরদি বলল, ‘আপনি অনামিকা রায়কে চেনেন?’
‘অনামিকা?’ রেখাদেবী ভুরু কোঁচকালেন৷ বললেন, ‘হ্যাঁ, চিনব না কেন? অনামিকা আমার ছোটোবেলার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল৷’
‘অনামিকাদেবী সম্পর্কে তাহলে তো আপনি সবই জানেন৷ তাই না?’
‘হ্যাঁ, ওর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ওর জীবনের সব কিছু আমি জানি৷ ও আমার কাছে কিছু গোপন করত না,’ রেখাদেবীর মুখের রেখাগুলি কোমল হয়ে এল৷
‘আমরা আপনার কাছে অনামিকাদেবী সম্পর্কে জানতে চাই৷ আসলে আমরা তন্ময়ের খোঁজ করছি৷’ বলল টাপুরদি৷
‘কী জানতে চান বলুন৷ তার আগে বলুন তো ব্যাপারটা কী? আজ এতদিন পরে হঠাৎ অনামিকার সম্পর্কে জানার দরকার পড়ল কেন?’ জিজ্ঞাসা করলেন রেখাদেবী৷
‘তন্ময়কে চেনেন তো আপনি?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল৷
‘ও মা, তন্ময়কে কেন চিনব না? অনেকদিন ধরে দেখাসাক্ষাৎ হয় না ছেলেটার সঙ্গে৷ তবে ফোন-টোন করে মাঝে মাঝে৷’
‘শেষ কবে ফোন করেছে আপনাকে?’
রেখাদেবী সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন একটু৷ তারপর বললেন, ‘তাও মাস দুয়েক হবে৷’
‘এর পরে আর তন্ময়ের সঙ্গে দেখা বা কথা হয়নি আপনার?’ জানতে চাইল টাপুরদি৷
‘না, হয়নি৷’ জোর দিয়ে বললেন রেখাদেবী৷
‘তন্ময়কে পাওয়া যাচ্ছে না৷ হয় তো কোনো বিপদে পড়েছে ও৷ আমায় অ্যাপয়েন্ট করেছে ওর বান্ধবী রিদ্ধিমা৷ ও খুব চিন্তায় আছে তন্ময়কে নিয়ে৷ সেই কারণেই আপনার কাছে আসা৷’ বলল টাপুরদি৷
‘সে কী!’ রেখাদেবীর মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ল৷ বললেন, ‘কোথায় গেল ছেলেটা? কোনো বিপদ হয়নি তো ওর?’
‘সেটা আমরা এখনও জানি না৷ তবে ওর কাছে এমন কিছু জিনিস আছে, যেগুলি হাতে না পাওয়া অবধি ওর কেউ ক্ষতি করবে না৷ একবার পেয়ে গেলে তারপর অবশ্য করতে পারে৷ আর যতদূর মনে হচ্ছে জিনিসটা এখনও কারও হাতে যায়নি৷ গেলে এতদিনে সারা দেশ জেনে যেত৷’ টাপুরদি একটু অন্যমনস্কভাবে কথাগুলো বলল, যেন নিজেই নিজের যুক্তিজালকে খতিয়ে দেখছে৷
‘আমার খুব চিন্তা হচ্ছে৷ যাই হোক, তোমরা কী জানতে চাও বলো৷’
‘আপনি অনামিকাদেবী সম্পর্কে যা যা জানেন আমাদের বলুন প্লিজ৷’
রেখাদেবী একটু ভেবে বলতে শুরু করলেন, ‘অনামিকা ও আমি স্কুল-কলেজে একসঙ্গে পড়েছি৷ ও আগে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেল৷ পরের বছর আমি পোস্ট অফিসে ক্লার্ক হয়ে ঢুকলাম৷ চাকরি পাওয়ার পর ওর বিয়ে হয়ে যায়৷ বছর দেড়েকের মধ্যে সনকা হল৷ আমার আরও তিন বছর পর বিয়ে হল৷ ওর সঙ্গে যোগাযোগটা একটুও আলগা হয়নি৷ তখন তো আর এখনকার মতো অত ফোন, মোবাইল ছিল না৷ আমার অফিসে অবশ্য ফোন ছিল, কিন্তু ওর স্কুলে ছিল না৷ ও পাবলিক বুথ থেকে আমার অফিসে ফোন করলে কথাবার্তা হত৷ সময় সুযোগ করে দেখাও করতাম৷ আমার স্বামী পুলিশে চাকরি করতেন৷ খুব ভালোমানুষ ছিলেন৷ বিয়ের তিন বছরের মাথায় একটা অ্যাকশন করতে গিয়ে সমাজবিরোধীদের গুলিতে মারা যান তিনি৷’
রেখাদেবী দেওয়ালে লাগানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন৷ টাপুরদি বলল, ‘ওহ, আই অ্যাম সরি!’
রেখাদেবী মুখে হাসি টেনে বললেন, ‘না না, সরি কেন? অনেকদিনের কথা এসব৷ আর তা ছাড়া আমি খুব ভাগ্যবতী৷ স্বল্পদৈর্ঘ্যের হলেও আমার বিবাহিত জীবনে সুখের অভাব ছিল না৷ কিন্তু অনামিকার ভাগ্য আমার মতো ভালো ছিল না৷ ওর স্বামীকে ঠিক কী বলা যায় আমার জানা নেই৷ উপর থেকে দেখলে মনে হত ওরকম গভীরভাবে স্ত্রীকে ভালোবাসতে কেউ পারে না৷ কিন্তু আসলে লোকটা একটা মানসিক রোগী ছিল, জানেন? তার উপর অসম্ভব রকম মদ খেত৷ দিনরাত নেশা করে থাকত৷ অনামিকার প্রতি ওর ভালোবাসাটা একটা অবসেশনের রূপ নিয়েছিল৷ প্রতি মুহূর্তে অনামিকাকে ও সন্দেহে করত, চোখে চোখে রাখত৷ এমনকী অনামিকা স্কুলে গেলেও ফলো করত ওকে৷ অনামিকা আমার কাছে কাঁদত৷ বলত, ‘আমি আর পারছি না রে রেখা৷’ ডিভোর্স নিতে চাইলে আত্মহত্যার ভয় দেখাত লোকটা ওকে৷ সনকাও বড়ো হচ্ছিল৷ রোজ রোজ বাড়িতে অশান্তি দেখতে দেখতে মেয়েটার মনও বিষিয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ৷ মাকে ও ঘৃণা করতে শুরু করছিল৷
‘বিয়ের পর এভাবেই ষোলো-সতেরো বছর কেটে গিয়েছিল৷ এরপর অনামিকা দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হল৷ আর তার পরেই শুরু হল আসল সমস্যা৷’
‘সরি আমি আপনাকে ইন্টারাপ্ট করছি৷ অনামিকাদেবীর কি কারও সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল? কিছু মনে করবেন না, কিন্তু সনকাদেবী আমাদের জানিয়েছেন, তন্ময় তাঁর মায়ের অবৈধ সন্তান,’ টাপুরদি দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল৷
রেখাদেবী বিস্ময়মাখা চোখ তুলে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালেন৷

‘কিছু কি জানতে পারলেন?’ জিজ্ঞাসা করল রিদ্ধিমা৷ আজ গড়িয়া থেকে ফিরে টাপুরদির ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছে দেখি রিদ্ধিমা লিফট থেকে বেরোচ্ছে৷ আমাদের দেখে হালকা হেসে বলল, ‘এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম৷ ভাবলাম দেখা করে যাই৷ ফোন না করেই চলে এসেছিলাম৷ এসে দেখি কোল্যাপ্সিবল গেটে তালা ঝোলানো৷ তাই ফিরে যাচ্ছিলাম৷’
টাপুরদি হেসে বলল, ‘তোমার কাজেই বেরিয়েছিলাম৷ চলো, ঘরে চলো৷’
সন্ধে হয়েছে৷ বাইরের আকাশে অন্ধকারের একটা অস্বচ্ছ পরদা ঢেকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে৷ একটা দুটো করে তারা ফুটছে আকাশের চাঁদোয়ায়৷ জানলাগুলো সব খুলে দিল টাপুরদি৷ সারাদিন বন্ধ ঘরে জমে থাকা তপ্ত, বদ্ধ বাতাসটুকু হালকা হয়ে এল৷ দক্ষিণের জানলা দিয়ে ফুরফুর করে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে, সারাদিনের দৌড়োদৌড়িতে ক্লান্ত শরীর যেন জুড়িয়ে যায়৷ টাপুরদি রিদ্ধিমাকে বসতে বলে সোজা ঢুকে গেল কিচেনে৷ গ্যাস ওভেনে সসপ্যানে চায়ের জল চড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল৷ ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে সকলের জন্য চায়ের কাপ আর স্ন্যাকস ট্রেতে সাজিয়ে এনে সামনে রেখে নিজে সোফার উপরে বসল৷
রিদ্ধিমার প্রশ্নের উত্তরে বলল, ‘না রিদ্ধিমা, কিছু এখনও জানতে পারিনি৷ মিথ্যে আশা দেব না তোমায়৷’
‘ইউনিকর্নে গিয়ে কিছু লাভ হল? কিছু জানা গেল?’ জানতে চাইল রিদ্ধিমা৷
‘নাথিং ইম্পর্ট্যান্ট!’ বলল টাপুরদি৷ সুবিনয়বাবুর কেবিনে হওয়া নাটকের কথা বেমালুম চেপে গেল দেখলাম৷
রিদ্ধিমা চেষ্টা করেও হতাশা লুকোতে পারছে না৷ ওর মনের উপর দিয়ে যে ঝড় চলছে তার চিহ্ন ওর চেহারাতেও পড়েছে৷ এই ক’দিনেই যেন কয়েক বছর বয়স বেড়ে গেছে ওর, যেন একটু বেশি শীর্ণ, চেহারাতে অযত্নের ছাপ একটু নজর করে দেখলেই চোখে পড়ে৷ ওর বিষাদ আমাদেরও ছুঁয়ে যাচ্ছে৷ টাপুরদি মরমি স্বরে বলল, ‘চিন্তা কোরো না রিদ্ধিমা৷ আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি৷’
রিদ্ধিমা মুখ নীচু করে চায়ের কাপে চুমুক দিল৷ তারপর বাইরে জানলার দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে উদাস কণ্ঠে বলল, ‘কী জানি মিস ব্যানার্জি, আমি আর নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করি না৷ আমার সঙ্গে কখনো কিছু ভালো হয়নি জানেন৷ তন্ময় ওয়াজ দ্য বেস্ট থিং এভার হ্যাপেন্ড টু মি৷ হি ওয়াজ নট অনলি মাই লভ, হি ওয়াজ মাই লাইফ! তন্ময়ের মতো করে এতটা ভালো আমাকে কেউ কখনো বাসেনি৷ যেসব পুরুষ আমার কাছে এসেছে, তারা আমার রূপে মুগ্ধ হয়ে এসেছে, আমার শরীরকে চেয়ে কাছে এসেছে৷ ভালোবাসার উপর থেকে বিশ্বাসটাই হারিয়ে গেছিল, জানেন? ঠিক সেই মুহূর্তে তন্ময় এসেছিল আমার জীবনে৷ কিন্তু আমার কপাল দেখুন, ওকেও ধরে রাখতে পারলাম না৷’
টাপুরদি উঠে গিয়ে রিদ্ধিমার পাশে গিয়ে বসল৷ ওর পিঠে হাত রেখে বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি হতাশ হবেন না রিদ্ধিমা৷ আমার ধারণা তন্ময় ঠিক আছে, সুস্থ আছে৷’
রিদ্ধিমা চোখ তুলে বলল, ‘নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করি না আমি৷ আসলে কী জানেন, আমিও আমার মায়ের মতো দুর্ভাগ্য নিয়েই জন্মেছি৷’ রিদ্ধিমা আজ যেন বুকের ভিতরের জমা কষ্টটুকু বের করে দিতে চায়৷ মনের কথা কাউকে খুলে বলতে না পেরে সেও হাঁপিয়ে উঠেছে৷ টাপুরদি ওকে বাধা দিল না৷ রিদ্ধিমা বলতে থাকল, ‘জানেন মিস ব্যানার্জি, আমার মায়ের জীবনটাও খুব কষ্টের ছিল৷ আমার মা কিন্তু আমার চেয়েও বেশি সুন্দরী ছিল৷ বাবাদের ফ্যামিলি ছিল ভীষণ অর্থোডোক্স, টিপিক্যাল গুজরাটি ফ্যামিলি৷ প্রেমের বিয়ে ছিল বাবা-মায়ের৷ বিয়ের আগে মা সেটা বোঝেনি৷ আগের দিন আপনাকে বলেছিলাম না, আমার মা জার্নালিস্ট ছিলেন৷ কলকাতার একটি নামকরা ইংরেজি দৈনিকে স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন মা৷ বিয়ের পর তাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হল৷ মা মেনেও নিয়েছিলেন, সংসারী হতে চেষ্টা করেছিলেন৷ কিন্তু বাবার ফ্যামিলির লোকেরা মায়ের জীবনটা নরক বানিয়ে ছেড়েছিল৷
একটা সময় মা সিদ্ধান্ত নিলেন, অনেক সয়েছেন, আর না৷ কলকাতার সেই দৈনিকে আবার যোগাযোগ করলেন৷ শুরু করলেন ফ্রিল্যান্সিং৷ শ্বশুরবাড়ির তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও কলকাতায় আসা-যাওয়া শুরু করলেন৷ বাবার সঙ্গে মায়ের মানসিক দূরত্ব বেড়েই চলেছিল৷ আমার মা ছিলেন ক্রাইম রিপোর্টার৷ সেই সময় পলিটিক্যাল ক্রাইমস খুব বেড়েছিল সারা রাজ্য জুড়ে৷ মা সেইসব নিউজ কভার করতেন৷ শুনেছি, মায়ের সাহসী জার্নালিজমের কারণে সেই সময়কার ক্ষমতাসীন সরকারের লোকেরা মায়ের উপর বেশ কয়েকবার হামলা অবধি করেছে, এমনকী মাকে খুন করার চেষ্টাও হয়েছে বেশ কয়েকবার৷ কলকাতায় থাকলেও মাঝে মাঝে সুরাটে বাবার কাছে গিয়ে থাকতেন মা, কিন্তু সম্পর্কের ভাঙনটা তাতেও সামাল দেওয়া যায়নি৷ এর পরেই আমার মা প্রেগন্যান্ট হন৷ আমার জন্মের পরেই ডিভোর্সটা হয়ে যায়৷ মা আমায় নিয়ে বরাবরের জন্য কলকাতায় চলে আসেন৷ বাবা বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন৷ আমার মা কিন্তু আর বিয়ে করেননি৷ আমি জানি, মাকে কত কিছু ফেস করতে হয়েছে, কত লড়াই লড়তে হয়েছে৷’
টাপুরদি রিদ্ধিমার কথার মাঝে বলে উঠল, ‘তোমার মায়ের নাম কী রিদ্ধিমা?’
‘মল্লিকা৷ মল্লিকা দাশগুপ্ত৷’ উত্তর দিল রিদ্ধিমা৷
রিদ্ধিমা বেরিয়ে গেছে ঘণ্টাখানেক হল৷ টাপুরদি রান্নাঘরে রান্না বসিয়েছে৷ তারই মাঝে ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে৷ আমি টিভিটা চালিয়ে বসলাম৷ নিউজ চ্যানেলে কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে দেখাচ্ছে৷ তাকে ঘিরে ধরেছে মিডিয়া রিপোর্টাররা৷ সবাই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চায়৷ তিনি গম্ভীর মুখে বলছেন, ‘অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর তদন্ত চলছে৷ পুলিশের হাতে বেশ কিছু সূত্র এসেছে৷ আশা করা যাচ্ছে খুব শিগগিরই রহস্যের কিনারা হবে৷’
একটি মাঝারি মাপের নিউজ চ্যানেলের তরফ থেকে একজন রিপোর্টার জিজ্ঞাসা করল, ‘কলকাতা পুলিশ কি আদৌ এই কেসের রহস্যভেদ করতে পারবে? আপনাদের উপরে কি কোনোরকম পলিটিক্যাল প্রেশার আসছে? আপনার কি মনে হয় না কেসটা সিবিআইকে দেওয়া উচিত?’
লক্ষ করলাম, কমিশনারের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল মুহূর্তের জন্য৷ তারপর আবার সহজ গলায় তিনি বললেন, ‘না, কোনোরকম পলিটিক্যাল প্রেশার নেই৷ কলকাতা পুলিশ এর আগেও অনেক জটিল কেসে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, আশা রাখি এই কেসেরও দ্রুত মীমাংসা হবে৷ আর কেন্দ্র যদি কেসটা সিবিআইকে দিতে চায়, সেক্ষেত্রে কলকাতা পুলিশ তদন্ত কমিটিকে পূর্ণ সহযোগিতা করবে৷’
ভিড় ঠেলে লালবাজার হেডকোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে গেলেন কমিশনার৷ সত্যি, সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে কী আশা করে কে জানে? একটা তদন্তের জন্য কতটা পরিশ্রম করতে হয়, পুলিশের চাকরিতে কতটা সমর্পণ, ত্যাগ প্রয়োজন সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না৷ যারা পুলিশে চাকরি করে, তারাও তো মানুষ৷ এই অমিয় চক্রবর্তীর মার্ডারের মতো হাই প্রোফাইল কেস নিয়ে পুলিশ যে কতটা খাটছে, অর্জুনদার সূত্রে জানি৷ ক্যান্টিনের যে ছেলেটি সেইদিন চা করেছিল, তার জবানবন্দি অনুসারে জানা গিয়েছে, সাধারণত পার্টি অফিসের ক্যান্টিন বন্ধ হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই৷ ইলেকশনের আগে সারারাত খোলা থাকত ক্যান্টিন৷ কারণ অনেক কর্মীরা সারারাতই কাজ করত৷ ফলে তাদের চা দিতে হত ঘন ঘন৷ অফিসে একজনও থাকলে ক্যান্টিন খোলা রাখতে হয়৷ এটাই নিয়ম৷
অমিয়বাবু খুব ঘন ঘন চা খেতেন৷ তাঁর চা ক্যান্টিনের চা পাতা দিয়ে বানানো হত না৷ তাঁর জন্য স্পেশাল পাতা আসত৷ অমিয়বাবুই বলেছিলেন, বার বার চায়ের জন্য তলব করা অসুবিধে৷ তাই তাঁর চা যেন একবারে করে ফ্লাস্কে ভরে তাঁর টেবিলে রাখা হয়৷ সেই ব্যবস্থাই এতদিন বহাল ছিল৷
সেদিনও বিকেলের কিছু আগে কেউ একজন ফ্লাস্ক নিয়ে এসে জানিয়েছিল, অমিয়বাবুর চা শেষ হয়ে গেছে৷ নতুন করে বানিয়ে ভরে দিয়ে আসতে৷ ক্যান্টিনের ছেলেটি মনে করতে পারছে না অফিসের এতজন কর্মীর মধ্যে কে বলেছিল কথাটা৷ ছেলেটি নিজে হাতে চা বানিয়ে ফ্লাস্কে গরম চা ভরে সে নিজেই দিয়ে এসেছিল অমিয়বাবুর ঘরে৷ এর বেশি আর সে কিছু জানে না৷
এইসব কথাই অবশ্য আমার টাপুরদির মুখে শোনা৷ আর টাপুরদি জেনেছে অর্জুনদার কাছে৷ নইলে এসব আমার জানার কথা নয়৷ অর্জুনদা এই কেসের দায়িত্বে থাকা টিমের একজন সদস্য৷ তাই মেঘ না চাইতে জলের মতো কিছু তথ্য টাপুরদির কানে আসে৷ অবশ্য ঠিক না চাইতে কি না জানি না৷ আমার ধারণা টাপুরদি মুখ্যমন্ত্রীর কেসটা নিয়ে যথেষ্ট ইন্টারেস্টেড৷ টাপুরদি এমন মানুষ, রহস্যের গন্ধ পেলেই যার মস্তিষ্ক স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কাজ করতে শুরু করে দেয়৷ তন্ময়কে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও অমিয় চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ড টাপুরদিকে ভাবাচ্ছে, সে আমি জানি৷
রান্না চড়িয়ে তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে টাপুরদি আমার পেছনে এসে দাঁড়াল৷ দৃষ্টি টিভি স্ক্রিনে স্থির৷ এখন টিভিতে অমিয় চক্রবর্তীর স্ত্রী সুনয়নাদেবীকে দেখাচ্ছে৷ ভদ্রমহিলার বয়স পঁয়ষট্টির আশেপাশে হওয়ার কথা৷ এই বয়সেও তিনি যথেষ্ট সুন্দরী৷ এক সময় তিনি রাজনীতিতে অমিয়বাবুর সহযোদ্ধা ছিলেন৷ পরবর্তীতে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে আসেন৷ সুনয়নাদেবীর চোখে-মুখে স্পষ্ট শোকের চিহ্ন৷ বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাঁকে৷ নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন তিনি৷ অমিয়বাবুর মৃত্যুর পরে এই প্রথম তিনি মিডিয়ার সামনে এলেন৷ রিপোর্টার মেয়েটি প্রশ্ন করল, ‘আপনার কী মনে হয়? কে হত্যা করতে পারে অমিয়বাবুকে?’
সুনয়নাদেবী কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন৷ তারপর বললেন, ‘সেদিনের পর থেকে এই প্রশ্নের উত্তর তো আমিও খুঁজে যাচ্ছি৷ আসলে রাজনীতির মঞ্চটা তো খুব পরিষ্কার নয় কোনোদিনই৷ অমিয় প্রায়ই বলত যে ও যেকোনো দিন খুন হয়ে যেতে পারে৷ ভয় যে আমারও ছিল না তা তো নয়৷ তবু মনে হত এত মানুষ ওকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, ওর সঙ্গে খারাপ কিছু হতে পারে না৷ আজ মনে হচ্ছে আমিই ভুল ছিলাম৷ কে ওকে খুন করল তা আমার জানা নেই৷ কিন্তু সেভাবে তলিয়ে ভাবতে গেলে মনে হচ্ছে, যে মানুষের মঙ্গলের জন্য সমস্ত জীবনটা উৎসর্গ করে, তার শত্রু থাকাটাই তো স্বাভাবিক৷ এমন শত্রু যারা ওকে থামিয়ে দিতে চাইবে, ওর আদর্শকে ধ্বংস করে দিতে চাইবে৷ কিন্তু আজ আমি সুনয়না চক্রবর্তী অমিয়র খুনিকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি৷ অমিয়র নশ্বর দেহকে সে হত্যা করতে পারে, কিন্তু অমিয়র আদর্শকে হত্যা করা অত সহজ নয়৷ অমিয় বেঁচে থাকবে সারা রাজ্যের লাখ লাখ পার্টির প্রতি সমর্পিত প্রাণ কর্মীদের মধ্যে, অমিয় বেঁচে থাকবে যারা তাকে বিশ্বাস করে, ভালোবেসে ক্ষমতায় এনেছেন তাঁদের হৃদয়ে, অমিয়র আদর্শ বেঁচে থাকবে তার সন্তানের মধ্যে৷ অম্লান স্পোর্টসম্যান, ও চ্যালেঞ্জ নিতে জানে৷ অমিয়র শূন্যস্থান কখনোই পূরণ হওয়ার নয়, কিন্তু অম্লানও ওরই সন্তান৷ আশা রাখি, সেও তার বাবার মতো প্রাণমন দিয়ে রাজ্যের সেবা করবে৷’
‘আপনি কি কেন্দ্রর কাছে সিবিআই তদন্ত দাবি করবেন?’ জানতে চাইল রিপোর্টার৷
‘না৷’ বলিষ্ঠ কণ্ঠে উত্তর দিলেন সুনয়নাদেবী, ‘নতুন যে মিনিস্ট্রির তালিকা তৈরি করেছিল অমিয়, তাতে মুখ্যমন্ত্রীত্বের সঙ্গে পুলিশ বিভাগও সে নিজের হাতেই রেখেছিল৷ অমিয়র যথেষ্ট আস্থা ছিল এই রাজ্যের পুলিশের উপর৷ আমারও আছে৷ তাই আমি চাই কলকাতা পুলিশই এই কেসের তদন্ত করুক৷’
‘শেষ প্রশ্ন,’ বলল রিপোর্টার মেয়েটি, অমিয়বাবুর অবর্তমানে এ-রকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে কি আপনি পার্টির হাল ধরার জন্য আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসবেন?’
‘নাঃ৷’ বললেন সুনয়নাদেবী, ‘অম্লান যথেষ্ট যোগ্য৷ এ ছাড়া পার্টিতে আরও অনেক বর্ষীয়ান ও অভিজ্ঞ নেতারা আছেন৷ তাঁদের অবিভাবকত্বে অমিয়র অবর্তমানেও এই রাজ্য সুরক্ষিত হাতেই থাকবে৷’
সাক্ষাৎকার শেষ হল৷
রাতে খেতে বসে টাপুরদি বলল, ‘আমার বন্ধু মিহিকা ফোন করেছিল রে৷’ অনামিকাদেবীর ওয়ার্ক প্রোফাইল খুঁজে বার করেছে ও৷ বলল, ‘প্রথমে বারাসাতে পোস্টিং ছিল৷ পরে এক রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত রেফারেন্সে বাড়ির কাছে পোস্টিং পান৷ ওয়ার্ক হিস্ট্রি ক্লিন৷’
‘কোন রাজনৈতিক নেতা?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘অমিয় চক্রবর্তী,’ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল টাপুরদি৷ আমি হেঁচকি তুলে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম তার দিকে৷

‘কেসটা ক্রমেই ঘেঁটে ঘ হয়ে যাচ্ছে টাপুরদি গো৷ সব মাথার ভিতর জট পাকিয়ে গেল,’ বেসিনে হাত ধুতে ধুতে বললাম আমি৷
টাপুরদি হেসে বলল, ‘যাই বলিস মিতুল, বেশ একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার আছে কিন্তু কেসটাতে৷ যত ভাবছি এই বুঝি ব্যাপারটাকে বেশ বাগে আনা গেছে, অমনি কোথা থেকে একখান নতুন অ্যাঙ্গেল এসে উপস্থিত হচ্ছে৷ আমি কিন্তু দারুণ এনজয় করছি৷’
আমি বললাম, ‘করো তুমি এনজয়৷ আমি আর অফিসে ছুটি নিতে পারছি না৷ এবার প্রোজেক্ট ম্যানেজার পেছনে বাম্বু দেবে, বুঝলে৷ আমি তো আর তোমার মতো নিজেই নিজের বস নই! যে রেটে লিভ নিচ্ছি, এরপর কোম্পানি আদর করে আমায় বহির্নিগমনের পথ দেখিয়ে দেবে হাতে পিংক স্লিপ ধরিয়ে৷’
‘হুম,’ চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি, ‘এই সমস্যা সমাধানের উপায় আপাতত আমার হাতে নেই৷ তাহলে আর কী? কাল থেকে সমরসজ্জা করে কর্মক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হও বৎসে৷’
রণাঙ্গনই বটে৷ মনটা খারাপ হয়ে গেল৷ এভাবে মাঝপথে কেস ছেড়ে যেতে কোনোদিনই ভালো লাগে না৷ কিন্তু প্রায়ই সেটা করতে হয়৷ বললাম, ‘অফিস থেকে ফিরে পুরো আপডেট চাই কিন্তু৷’
অফিস জয়েন করতেই হু-হু করে বন্যার জলের মতো কাজের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল আমার কাঁধের উপর৷ টাপুরদির কাছে আপডেট নেব কী, ফোন করার কথাই মাথায় রইল না আর৷ কোথা দিয়ে যে ক’টা দিন কেটে গেল টেরই পেলাম না৷ ঠিক চারদিন পর অফিস ফেরত টাপুরদির ফ্ল্যাটে হানা দিলাম৷ টাপুরদি ঘরেই ছিল৷ আমায় দেখে বলল, ‘সময় হল আসার?’
বললাম, ‘সব ওই বাম্বুর মহিমা৷ তুমি কী বুঝবে?’
টাপুরদি উঠে কিচেনে গিয়ে দুইজনের জন্য দুই কাপ চা আর পেঁয়াজ-লঙ্কা-চানাচুর দিয়ে দিব্যি ঝালঝাল মুড়ি মাখা করে নিয়ে এল৷ বলল, ‘নে৷ খা৷’
জমিয়ে বসে খেতে খেতে বললাম, ‘এবার বলো, কত দূর এগোল৷’
টাপুরদি বলল, ‘ক’দিন শুধু ভাবলাম রে!’
‘শুধু ভাবলে? যাববাবা!’
‘চল, আমরা বরং মুখে মুখে কেসের আপডেটগুলোকে একটু সাজিয়ে নিই, কী বলিস?’ বলল টাপুরদি৷
‘চলো, হয়ে যাক!’ মুড়ি চিবোতে চিবোতে বললাম আমি৷
‘প্রথমে আমাদের কাছে এল রিদ্ধিমা দেশাই, তার বয়ফ্রেন্ড তন্ময়, যে কিনা ইউনিকর্ন সিকিউরিটি এজেন্সিতে কাজ করত, সে মিসিং৷ রিদ্ধিমার কাছে আমরা জানতে পারছি, বিগত কয়েক মাস ধরে তন্ময় একটি পলিটিক্যাল প্রোজেক্টে কাজ করছিল৷ রূপমের কাছ থেকে আমরা জানতে পারছি, কাজটা হল অমিয় চক্রবর্তীর হিস্ট্রি ঘেঁটে লুপহোলস বার করা৷ তাই তো?’
‘ঠিক ঠিক৷ বলে যাও,’ অর্ধনিমীলিত নেত্রে কাঁচালঙ্কায় কামড় লাগিয়ে বললাম আমি৷ এই ঝালমুড়ি ব্যাপারটা টাপুরদির হাতে দিব্যি খোলে৷
‘রূপমের কাছেই আমরা জানতে পারছি যে তন্ময় এজেন্সির কিছু ডকুমেন্টস চুরি করে পালিয়েছে৷ এজেন্সির লোকেরা ওকে পাগলা কুকুরের মতো খুঁজছে৷ ডকুমেন্টগুলি ছিল অমিয় চক্রবর্তী সম্পর্কে কিছু তথ্য, যেগুলি তন্ময়ের অফিসের সিস্টেমে সেভ করা ছিল৷ সুবিনয় মুখার্জি আমাদের ধারণাতে মৌন থেকে স্ট্যাম্প লাগিয়েছেন৷ সুবিনয়বাবুর হাতে সেগুলি এখন আর নেই৷ তার মানে দাঁড়াচ্ছে, সেই নথিগুলি এই মুহূর্তে শুধুমাত্র তন্ময়ের কাছেই আছে, যদি না তন্ময় সেগুলোকে নষ্ট করে ফেলে থাকে৷ সেই নথিগুলি কী ছিল? আমরা আন্দাজ করতে পারি, নিশ্চয়ই সেগুলি অমিয় চক্রবর্তী সম্বন্ধীয় কিছু ছিল৷ এমন কিছু, যেগুলি অমিয়বাবুর বিরোধীদের হাতে গেলে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের ক্ষতি হতে পারত৷ কারণ এক্ষেত্রে সেই কাজ করার জন্যই ইউনিকর্নকে অ্যাপয়েন্ট করা হয়েছিল৷’
‘এবার প্রশ্ন হল, তন্ময় এ-রকম করল কেন? এই প্রোজেক্টের ক্লায়েন্ট ছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোসের বকলমে তাঁর সেক্রেটারি সঞ্জয় পাল৷ সুতরাং প্রোজেক্টটা একাধারে হাইলি কনফিডেনশিয়াল এবং হাই প্রোফাইল৷ এই প্রোজেক্টটা সফলভাবে ডেলিভার করতে পারলে নিঃসন্দেহে তন্ময়ের কেরিয়ারের মুকুটে একটা পালক যোগ হত৷ ওর প্রোমোশন, ইনক্রিমেন্ট বাঁধা ছিল৷ তা সত্ত্বেও এমন একটা বাজে রিস্ক ও নিল কেন? ওর ব্যক্তিগত স্বার্থটা কী?’
‘ঠিক এই জায়গাটাতে এসেই আটকে গেলাম আমি৷ মনে হল, তন্ময়ের এভাবে এতটা রিস্ক নেওয়ার পেছনে কারণ কী? কেন এভাবে নিজের জীবন বিপন্ন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ও? আর সেই নথিটাই বা কী, যা এতটা মূল্যবান? যেটা বিনয় বোসের হাতে এলে অমিয় চক্রবর্তীর বড়োসড়ো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল? ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মনে হল, তাহলে সেই জিনিসটা কি এমন কিছু যা অমিয় চক্রবর্তীকে তন্ময়ের সঙ্গে জোড়ে? তাহলে কি তন্ময়ের কোনো সম্পর্ক আছে অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে, যে জন্য ও এতটা রিস্ক নিচ্ছে? নাকি তন্ময় নিজেই ব্ল্যাকমেল করতে চেয়েছিল অমিয়বাবুকে?’
এতটা বলে থামল টাপুরদি৷ আমি তখন মুড়ি চেবানো বন্ধ করে হাঁ করে টাপুরদির যুক্তিজাল শুনছিলাম৷ এবার বললাম, ‘মাই গড, টাপুরদি! তার মানে কি অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর সঙ্গে তন্ময়ের নিরুদ্দেশ হওয়ার কোনো যোগ আছে?’
টাপুরদি চিন্তিত মুখে বলল, ‘সেটা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় রে৷ থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে৷ আমি আপাতত অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যু নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না৷ ওটা পুলিশের কাজ, পুলিশ করছে৷ ওটা নিয়ে আমার আপাতত সময় নষ্ট করে লাভ নেই৷ আমি ভাবছি অন্য কথা৷ তন্ময়ের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর যোগসূত্রটা কী? কেন তন্ময় এভাবে পালাল?’
‘আচ্ছা, তোমার বন্ধু মিহিকাদি জানাল, অনামিকা রায়ের ট্রান্সফারে অমিয় চক্রবর্তীর হাত ছিল৷ তাহলে তো ধরে নেওয়া যেতে পারে, অনামিকা রায় অমিয় চক্রবর্তীকে চিনত,’ বললাম আমি৷
‘হুম, তা ধরে নেওয়া যায় বই কী৷ কিন্তু কতটা ঘনিষ্ঠভাবে চিনত সেটা ভাববার বিষয়,’ বলল টাপুরদি, ‘দেখ, যেই সময়ে এই ঘটনাগুলি ঘটেছিল, সেটা আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছরেরও আগে৷ সেই সময় অমিয়বাবুর দলই কিন্তু এই রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল৷ রথীন ঘোষ তখন মুখ্যমন্ত্রী, যাকে অমিয় চক্রবর্তীর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু বলা যায়৷ সেই সময়েও অমিয় চক্রবর্তী কিন্তু দলের প্রমিনেন্ট ফেস, ক্ষমতাশালী যুব নেতা৷ টিকিট পেয়ে এমএলএ হয়েছেন৷ কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গের অনেকটা জুড়ে ধীরে ধীরে তাঁর আধিপত্য বিস্তৃত হচ্ছিল৷ অমিয়বাবু ছিলেন সুবক্তা, সুপুরুষ, সর্বোপরি অত্যন্ত সুচতুর নেতা৷ খুব কম সময়ের মধ্যেই দলের মধ্যে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছিলেন তিনি৷ জানিস, অমিয়বাবু আর সুনয়নাদেবীর কিন্তু লাভ ম্যারেজ৷ এখানে তাঁদের অতীত নিয়ে সামান্য নাড়াচাড়া করলে আমরা জানতে পারছি যে বিয়ের আগে কিন্তু সুনয়নাদেবীও রাজ্য রাজনীতিতে একজন প্রতিষ্ঠিত নেতা ছিলেন৷ বিয়ের পর থেকে ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে দূরে সরে আসেন৷’
‘আমি কোত্থেকে জানব?’ বললাম আমি, ‘অত বছর আগেকার কথা, আমি তখন জন্মাইনি৷’
‘চোখ কান খোলা রাখলেই জানা যায়৷ গুগলদাদু আছেন কী করতে? শুধু অজুহাত,’ ভুরু কুঁচকে চোখ পাকাল টাপুরদি, ‘যাই হোক, ব্যাপারটা হল, গত বাইশ বছর ধরে লড়াইটা চালিয়ে আসছেন অমিয়বাবু৷ ইলেকশনে হারার বছর দুয়েকের মধ্যেই রথীন ঘোষ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান৷ তারপর থেকে অমিয়বাবুই দলের চেয়ার পার্সন হন৷’
‘আচ্ছা টাপুরদি, অমিয়বাবুদের দল তো শুনেছি বেশ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল৷ হঠাৎ হারলেন কেন তাঁরা?’ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলাম আমি৷ এমনিতে রাজনীতিতে আমার তেমন কোনো উৎসাহ নেই৷ সেভাবে বুঝিও না৷ কিন্তু এই কেসটার গভীরে যত ঢুকছি, তত কৌতূহল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে৷ টাপুরদি যা-ই বলুক, আমার মন চাইছে যেন অমিয় চক্রবর্তীর হত্যা রহস্যের সঙ্গে তন্ময়ের কেসের কোনো যোগসূত্র বেরোয়৷ তাহলে বেশ ভালো হবে৷ অন্তত এই সূত্রে অমিয় চক্রবর্তীর হত্যার কেসে টাপুরদি কিছু অন্তত নিজের মাথা ঘামানোর সুযোগ পাবে৷
টাপুরদি বলল, ‘একটা দল বেশি দিন ক্ষমতায় থাকলে নিজেদের সর্বশক্তিমান ভেবে বসার প্রবণতা তৈরি হয়, বুঝলি? রথীন ঘোষের রাজত্বেও তাই হয়েছিল৷ রথীনবাবুর বয়স হয়েছিল৷ গ্রাউন্ড লেভেলের কর্মীদের উপর থেকে তাঁর রাশ আলগা হয়ে গেছিল৷ তার ফলে বেড়েছিল দুর্নীতি, সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার৷ সেই সময় মানুষ তাদের উপর বিরক্ত হয়ে উঠেছিল৷ কিছু বিখ্যাত খবরের কাগজও ক্রমাগত তাদের দুর্নীতির খবর প্রচার করে যাচ্ছিল৷ যদিও রথীন ঘোষের সরকার তাদের মুখ বন্ধ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি৷ জনগণের মন বিষিয়ে উঠেছিল৷ পরিণাম, ভোটের ব্যালটে জনতা জনার্দন নিজেদের উষ্মা উগড়ে দিল৷’
‘টাপুরদি, তোমার মনে আছে সেই দিন রিদ্ধিমা বলছিল ওর মা নাকি সেই সময় সরকারের এগেন্সটে কাগজে লিখত?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘আছে রে, মনে আছে,’ মুচকি হাসি হেসে বলল টাপুরদি৷
‘হাসলে যে?’ জিজ্ঞাসা করলাম৷
‘অঙ্ক করছিস বুঝি আজকাল? স্মৃতিশক্তিটা বেশ কাজ করছে দেখছি,’ হেসে বলল টাপুরদি৷

রাতে ডিনারের পর টাপুরদি ল্যাপটপ নিয়ে বসল৷ একবার উঁকি দিয়ে দেখলাম, সার্চবারে অম্লান চক্রবর্তী লিখে সার্চ করছে৷ সারাদিন অফিসে খাটুনির পর ঘুম পেয়ে গেছিল, আমি ঘরে চলে গেলাম শুতে৷ রাত প্রায় দুটো নাগাদ টাপুরদির গলার স্বরে ঘুম ভাঙল একবার৷ কারও সঙ্গে গুনগুনিয়ে কথা বলছে৷ আমি জানি, ফোনের ওপারের ব্যক্তিটি অর্জুনদা ছাড়া আর কেউ হতে পারে না৷ দুজনেই যে যার কাজ নিয়ে সারাটা দিন ব্যস্ত থাকে৷ দিনের শেষে দুজনাই দুজনার ক্লান্তিটুকু ভাগ করে নেয় নিজেদের মতো করে৷ আমি জানি, টাপুরদির মতো স্বাধীনচেতা, শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী মেয়ের খুঁটি হওয়ার জন্য কোনো পুরুষের দরকার নেই৷ কিন্তু একজন বন্ধুর দরকার বোধ হয় সকলেরই থাকে, দিনের শেষে যে হতে পারে হৃদয়ের আশ্রয়৷ কখনো মন অস্থির হলে, আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরলে যে পাশে দাঁড়িয়ে কানে কানে বলতে পারে, ‘আমি আছি৷ হাল ছেড়ো না, ঠিক পারবে তুমি৷’ অর্জুনদা টাপুরদির কাছে সেই আশ্রয়৷ টাপুরদি মুখে স্বীকার না করলেও আমি জানি, অর্জুনদা টাপুরদির মনে অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে৷
সাধারণত ভোরের সূর্য আমার দর্শন কোনোদিনই পায় না৷ আজ কিন্তু খুব ভোরে ঘুমটা ভেঙে গেল, আর সেটাও একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে৷ দেখলাম, অমিয় চক্রবর্তী মারা গেছেন৷ টাপুরদি আর আমি পুলিশের সঙ্গে সেখানে তদন্ত করতে গিয়েছি৷ গিয়ে দেখলাম অমিয় চক্রবর্তী নন, মারা গিয়েছে রিদ্ধিমা৷ আমি টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘রিদ্ধিমা কেমন করে মরে গেল?’ টাপুরদি, গম্ভীরভাবে বলল, ‘রিদ্ধিমা মুখ্যমন্ত্রী হবে, তাই ওকে মেরে ফেলেছে কেউ৷’ ঘুম ভেঙে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ স্বপ্নটা মাথায় ঘুরছে৷ এ আবার কী অদ্ভুত স্বপ্ন? রিদ্ধিমা শুধুমুধু কেন মরতে যাবে? মা বলে ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়, ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠল৷ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সাড়ে পাঁচটা বাজে৷ টাপুরদি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিছানা ছাড়বে৷ টাপুরদি উঠলে ওকে বলতে হবে একবার রিদ্ধিমাকে ফোন করতে৷ ও ঠিক আছে সেটা না জানা অবধি মনের অস্থিরতাটা কাটবে না৷ রিদ্ধিমার জন্য খারাপ লাগছে৷ তন্ময়কে ও সত্যিই ভালোবাসে৷ তন্ময়ের অন্তর্ধানে ও ভেঙে পড়েছে পুরোপুরি৷
রিদ্ধিমা আর তন্ময়ের কথাই ভাবছিলাম৷ কখন টাপুরদি পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি৷ ধ্যান ভাঙল টাপুরদির কণ্ঠস্বরে৷
‘কী রে? এত মন দিয়ে কী ভাবছিস?’
ঘুরে তাকিয়ে হাসলাম৷ টাপুরদি আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘আজ তোর হল কী? কাক ডাকা ভোরে উঠে বসে আছিস যে?’
টাপুরদিকে স্বপ্নটার কথা বললাম৷ টাপুরদি মন দিয়ে শুনল৷ তারপর বলল, ‘চিন্তা করিস না৷ আসলে ক’দিন ধরে সারাদিন ওদের নিয়েই ভাবনাচিন্তা কথাবার্তা চলছে তো৷ তাই ঘুমের মধ্যেও ওদের নিয়েই স্বপ্ন দেখেছিস৷ আরেকটু বেলা হোক, তোর মনের শান্তির জন্য আমি রিদ্ধিমাকে ফোন করে নেব, কেমন?’
রিদ্ধিমাকে ফোন করতে হল না৷ প্রাতঃকৃত্য সেরে বাথরুম থেকে বেরোচ্ছি, এমন সময় দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল৷ ঘড়িতে এখন ছ’টা বাজে, এত সকালে কে এল? বিস্মিত দৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম৷ টাপুরদি আমাকে দাঁড়াতে বলে নিজে গিয়ে দরজা খুলল৷ অবাক হয়ে দেখলাম রিদ্ধিমা দাঁড়িয়ে আছে৷ চোখের নীচে কালি, মাথার চুল উশকোখুশকো৷ ভীষণ উত্তেজিত দেখাচ্ছে ওকে৷ টাপুরদি তার হাত ধরে ভেতরে এনে বসাল৷ আমি এক গ্লাস জল এনে রিদ্ধিমার হাতে দিলাম৷ ঢক ঢক করে পুরো জলটা একনিশ্বাসে খেয়ে নিয়ে বলল, ‘একটা ফোন এসেছিল মিস ব্যানার্জি৷’
‘ফোন? কার ফোন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
‘আমি জানি না৷ মোবাইলে কোনো নম্বর শো করেনি৷ নম্বর মাস্ক করা ছিল৷ প্রাইভেট নম্বর লেখা দেখাচ্ছিল৷ তবে কোনো মহিলার গলা’, উত্তেজিত কণ্ঠে বলল রিদ্ধিমা৷
‘কী বলল?,’ টাপুরদি জানতে চাইল৷
‘বলল তন্ময়কে না খুঁজতে৷ সময় হলে ও নিজেই আসবে৷ বেশি খোঁজাখুঁজি করলে ওর বিপদ বাড়বে বই কমবে না৷’ রিদ্ধিমা কাতর স্বরে বলল, ‘এবার কী হবে মিস ব্যানার্জি? তার মানে কি তন্ময়কে কেউ কিডন্যাপ করেছে?’
‘সেটা আমার মনে হয় না,’ চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি৷
‘তাহলে ওই মহিলা কে? সে কীভাবে তন্ময়ের ব্যাপারে জানে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না এসব কী হচ্ছে৷ তন্ময়ের কোনো ক্ষতি হবে না তো? আমার খুব ভয় করছে মিস ব্যানার্জি৷’ বলে দুই হাতে মাথার চুল খামচে ধরল রিদ্ধিমা৷ মাথা নীচু করে বসে রইল অনেকক্ষণ৷ টাপুরদি এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখল৷ বলল, ‘ধৈর্য ধরুন রিদ্ধিমা৷ একটু সময় দিন আমায়, প্লিজ৷’
‘আর কত ধৈর্য ধরব মিস ব্যানার্জি? আর কত সময়?’ কেঁদে উঠল রিদ্ধিমা, ‘আমি যে আর পারছি না৷ জানেন সারারাত আমি জেগে থাকি৷ সামান্য শব্দ হলেই চমকে উঠি৷ মনে হয় এই বোধ হয় তন্ময় ফিরে এল৷ মনে হয়, আমি ঘুমিয়ে পড়লে যদি তন্ময় এসে ফিরে যায়? আমার শোওয়ার ঘরের জানালা দিয়ে রাস্তা দেখা যায়৷ বার বার গিয়ে জানালায় দাঁড়াই আমি৷ ভিড়ের মধ্যে ওকেই খুঁজি৷ আমি নিজেও কখনো বুঝিনি যে তন্ময় আমার ঠিক কতটা জুড়ে আছে৷
‘জানেন মিস ব্যানার্জি, ছোটো থেকে অনেক লড়াই করে বড়ো হয়েছি৷ বাবাকে জ্ঞান হওয়া ইস্তক চোখেই দেখিনি৷ আমার মার জীবনে তাঁর কাজই ছিল সব কিছু৷ নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন৷ আমি কাজের লোকের কাছে বড়ো হয়েছি৷ শেষ জীবনে মানসিক সমস্যা হয়েছিল মার৷ শিশুর মতো আগলাতে হত সবসময়৷ সেও এক লড়াই৷ কোনো পুরুষকে সহ্য করতে পারতেন না৷ এমনকী আমাকেও সহ্য করতে পারতেন না মাঝে মাঝে৷ ভাবতে পারেন, তাঁর মতো একজন একনিষ্ঠ সাংবাদিক নিউজ চ্যানেলে পলিটিক্যাল নিউজ দেখলে মাঝে মাঝে হিংস্র হয়ে উঠতেন৷ হাতের কাছে যা পেতেন ছুড়ে মারতেন টিভিতে৷ মাকে সামলাতে গিয়ে নিজের কেরিয়ারে কনসেনট্রেট করতে পারলাম না৷’
‘মডেল ছিলাম আমি৷ অভিনেত্রী হতে চেয়েছিলাম৷ সামান্য রোলের বিনিময়ে পেতাম একের পর এক কাস্টিং কাউচের অফার৷ সারাটা জীবন পুরুষের চোখে শুধু লুব্ধ দৃষ্টিই দেখেছি৷ তন্ময়ই প্রথম মানুষ, যে আমায় আমার সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তেও ভালোবেসে গ্রহণ করেছে৷ আমার ভালো মন্দ সবটুকু নিয়ে আমায় ও ভালোবেসেছে৷ আমার কষ্টটুকুকেও ও আপন করে নিয়েছে৷ ও আমায় খুব ভালোবাসে, এত ভালো আমায় কেউ কোনোদিন বাসেনি৷ আমার জন্য ও সব করতে পারে৷ ওকে ছাড়া বাঁচতে হলে আমার মরে যাওয়া ভালো৷’
কাঁদছে, ভীষণ কাঁদছে রিদ্ধিমা৷ আমি অসহায় দৃষ্টিতে তাকালাম টাপুরদির দিকে৷ টাপুরদি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে৷ বোধ হয় ইচ্ছে করেই ওকে কাঁদতে দিচ্ছে৷ ওর অবরুদ্ধ কষ্টটুকু, কাউকে বলতে না পারা যন্ত্রণাটুকু আমাদের সামনে মুক্ত করে হালকা হতে চাইছে ও৷ টাপুরদি সোফায় গিয়ে রিদ্ধিমার পাশে বসল৷ রিদ্ধিমার পিঠে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘রিদ্ধিমা, আমি এই মুহূর্তে হয়তো তন্ময়কে আপনার কাছে এনে দিতে পারছি না৷ বাট ট্রাস্ট মি, আমি বলছি, তন্ময় ঠিক আছে৷ হয়তো ও বিপদের মধ্যে আছে৷ কিন্তু, সুরক্ষিত আছে ও৷ সেই বিপদ থেকে ওকে বার করে নিয়ে আসার জন্যই আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি৷ যাতে ও সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত হয়ে আপনার কাছে ফিরে আসতে পারে৷ আমার ধারণা ফোনটা ও-ই কাউকে দিয়ে করিয়েছে আপনাকে, যাতে আপনি দুশ্চিন্তা না করেন৷’
‘আপনি বলছেন? তন্ময় ঠিক আছে?’ রিদ্ধিমা প্রশ্ন করল, ঠিক যেভাবে ডুবন্ত মানুষ খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরতে চায় সেভাবে৷
‘আছে রিদ্ধিমা৷ তন্ময়কে যারা খুঁজছে তারা জিনিসটা না পাওয়া অবধি ওর কোনো ক্ষতি করবে না৷ আর সেটা যে ওরা পায়নি এখনও, সেই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত৷ বাই দ্য ওয়ে, ফোনটা যে মহিলা করেছিল, তার গলাটা কেমন ছিল?’
রিদ্ধিমা মনে করার চেষ্টা করল৷ তারপর বলল, ‘কেমন যেন, একটু ধরা ধরা!’
লক্ষ করলাম টাপুরদির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল৷
রিদ্ধিমা মাথা নীচু করে নীরবে বসে রইল অনেকক্ষণ৷ তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি তবে আসি৷’

রিদ্ধিমা চলে যাওয়ার পরও টাপুরদি অনেকক্ষণ চুপচাপ সোফার উপর বসে রইল৷ আমায় অফিস বেরোতে হবে৷ তাই স্নান করতে ঢুকে গেলাম৷ স্নান সেরে বেরিয়ে দেখলাম টাপুরদি ল্যাপটপ নিয়ে বসে খুব মন দিয়ে কিছু করছে৷ টাপুরদিকে বিরক্ত না করে নিজেই কিচেনে গিয়ে দুইজনের জন্য ব্রেকফাস্ট আর চা বানালাম৷ টাপুরদি সেদিকে চেয়েও দেখল না, গভীর মনোযোগের সঙ্গে কী যেন দেখে চলেছে৷ অফিস বেরোনোর আগে একবার টাপুরদির ল্যাপটপে উঁকি মারলাম৷ দেখলাম, অনেক পুরোনো কিছু খবরের কাগজের প্রতিবেদন মন দিয়ে পড়ছে৷
অফিস থেকে ফিরতে রাত আটটা বাজল৷ কলিংবেল টিপতে টাপুরদি হাসিমুখে দরজা খুলে দিল৷ আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার? বেশ খুশি খুশি লাগছে?’
টাপুরদি বলল, ‘ফ্রেশ হয়ে নে, আমি চা বসাই৷’
ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলাম টাপুরদি রান্নাঘরে গুনগুন করে গান গাইছে৷ দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেসটা কী?’
টাপুরদি সুর করে বলল, ‘হলদে সবুজ ওরাং ওটাং/ ইট পাটকেল চিতপটাং/ মুশকিল আসান উড়ে মালি/ ধর্মতলা কর্মখালি৷৷’
‘মানে?’ অবাক চোখে তাকিয়ে বললাম৷
‘সে এক ভারি কঠিন ধাঁধা৷ তুই বুঝবি না,’ গম্ভীর মুখে বলল টাপুরদি৷
‘বুঝব না কেন? এ তো দির্ঘাংচুতে আছে৷’ অভিমান ভরে বললাম, ‘না হয় তোমার মতো অত দিগগজ নই আমি৷ তবে ওটুকু জানি৷ কিন্তু এর সঙ্গে কেসের কী সম্পর্ক?’
‘সবটাই সম্পর্কিত রে মিতুল৷ সম্পর্কের অদ্ভুত এক সমীকরণ৷’
‘মানেটা কী? কীসব বলে চলেছ, কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না আমার,’ বললাম আমি, ‘তুমি কি রহস্যটা সমাধান করে ফেলেছ?’
হাসল টাপুরদি৷ বলল, ‘রহস্য তো কিছু ছিল না মিতুল৷ আমার কাজ ছিল তন্ময়কে খুঁজে বার করা৷ তা সে কাজ অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে৷’
‘অনেকদিন আগে হয়ে গেছে?’ আমি হাঁ করে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম৷ বলে কী টাপুরদি? তাহলে আমরা ছুটছি কীসের জন্য?
আমার বিহ্বল দশা দেখে টাপুরদি বোধ হয় মজা পেল৷ বলল, ‘অমন হাঁ করে থাকলে মুখে মাছি ঢুকে যাবে৷ মুখ বন্ধ কর৷’
‘মানে? এটাকে কিন্তু টর্চার বলে টাপুরদি৷ তখন থেকে তুমি হেঁয়ালি করে যাচ্ছ৷ এখন বলছ, তন্ময়কে খোঁজা নাকি তোমার অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে৷’ গম্ভীর মুখে বললাম আমি৷
‘রাগ করছিস কেন?’ বলে হেসে টাপুরদি আমার গাল টিপে দিল৷ তারপর বলল, ‘আমি যেখানে যেখানে গিয়েছি, যা যা শুনেছি বা দেখেছি, তুইও সবই জেনেছিস৷ তারপরও তুই যদি তন্ময়কে খুঁজে না পাস, সে কি আমার দোষ?’
‘বললেই হল?’ রাগ রাগ গলায় বললাম আমি, ‘আমি তো অফিসের গুঁতোয় চারদিন আসতেই পারিনি৷ তখন তুমি নিশ্চয়ই কেস সলভ করে ফেলেছ৷’
‘না রে বাবা৷ তুই সবই দেখেছিস, জানিস৷ কিন্তু নিজের মাথাটাকে ব্যবহার করিসনি৷ এইজন্য বলি, রোজ অঙ্ক কর৷’ বলল টাপুরদি৷
‘জাস্ট পারলাম না৷ দিনে দশ ঘণ্টা অফিসে কোডিং করে করে বাড়ি এসে অঙ্ক করতে পারব না৷ আমি তোমার অ্যাসিস্ট্যান্টই ঠিক আছি, গোয়েন্দা হওয়ার শখ নেই আমার৷’ গোমড়া মুখে বললাম৷
ট্রেতে করে চা আর ড্রাই ফ্রুটস সাজিয়ে নিয়ে টাপুরদি বসার ঘরের সেন্টার টেবিলে রাখল৷ তারপর সোফায় গা এলিয়ে বলল, ‘সন্দেহ আমার প্রথম দিনই হয়েছিল৷ সন্দেহ কেন, নিশ্চিতই ছিলাম বলতে পারিস৷ বাকিটা তন্ময় নিজেই জানিয়ে দিল৷’
‘ওয়েট,’ হাত তুলে থামালাম টাপুরদিকে, ‘প্লিজ টাপুরদি, আমার বুদ্ধি অত্যন্ত কম তা তুমি জানো৷ সুতরাং হেঁয়ালি ছেড়ে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলো যাতে আমিও বুঝতে পারি৷ এখনও অবধি যা যা বলেছ, সব আমার মাথার উপর দিয়ে ট্যাঞ্জেনশিয়ালি পাস করে বেরিয়ে গেছে৷’
টাপুরদি হেসে উঠল৷ বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা৷ বেশ৷ আগে তুই একটা কথা বল, তুই যদি কোথাও লুকিয়ে থাকতে চাস, কোথায় লুকোবি?’
‘কোনো সেফ প্লেসে, অফ কোর্স৷’
‘আর কোন প্লেসটা সেফ?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
আমি একটু ভেবে বললাম, ‘যেখানে আমায় কেউ চিনবে না, বা চিনলেও ধরিয়ে দেবে না৷’
‘ঠিক৷ এমন কারও কাছে, যাকে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারি৷ তাই তো?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই৷ তন্ময়ও সেটাই করেছে৷ এবার ভেবে বল তো মিতুল, তন্ময় কাকে ভরসা করতে পারে?’ টাপুরদি ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করল৷
‘রিদ্ধিমাকে,’ বললাম আমি৷
‘হ্যাঁ, রিদ্ধিমাকে তো বটেই৷ তাই ও প্রথমে ওর কাছেই গেছিল৷ কিন্তু যারা ওকে খুঁজছে, তারা খুব সহজেই রিদ্ধিমার কাছে পৌঁছে যেতে পারে৷ রিদ্ধিমা’স ফ্ল্যাট ইজ নট আ ভেরি সেফ প্লেস ফর হাইডিং, অ্যাট লিস্ট ফর তন্ময়৷ তাহলে আর কোথায় যেতে পারে ও?’
‘দিদির কাছে যাবে না ও৷ কারণ দিদির সঙ্গে ওর সম্পর্ক খারাপ৷ তাহলে কোনো বন্ধুর বাড়ি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘হল না৷ আরও ভাব৷ যারা তন্ময়কে খুঁজছে, তারা খুব পাওয়ারফুল লোক৷ বন্ধুদের কি ভরসা করা যায় পুরোপুরি? যত কাছের বন্ধুই হোক, চাপের মুখে গোপন কথা ফাঁস করে দিতেই পারে তো! পারে না?’
‘পারে৷ তাহলে আর কে?’ জানতে চাইলাম আমি৷ জিজ্ঞাসা করেই বিদ্যুৎচমকের মতো মনে পড়ল, ‘রেখাদেবী?’
টাপুরদি হাসল, মুখে কিছু বলল না৷
আমি আবার বললাম, ‘সত্যিই? রেখাদেবী? মাই গড! তুমি প্রথম থেকে জানতে রেখাদেবীর বাড়িতেই আছে তন্ময়?’
‘জানতাম বলব না, আন্দাজ করেছিলাম৷’ দুটো কাঠবাদাম মুখে ফেলে চিবোতে চিবোতে বলল টাপুরদি৷
‘তার মানে সেদিন রেখাদেবী আমাদের সামনে পুরোপুরি অভিনয় করে গেলেন? ওয়েট! এর মানে দাঁড়াচ্ছে, আজ সকালে রিদ্ধিমাকে রেখাদেবীই ফোনটা করেছিলেন, তাই তো টাপুরদি? কিন্তু তুমি কীভাবে বুঝলে?’
টাপুরদি হাসল৷ বলল, ‘আমরা যেদিন রেখাদেবীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তোর মনে আছে, দরজা খুলতে কত দেরি করেছিল? অথচ বাড়িতে দুজন লোক ছিল৷ আই হোলে বেশ কয়েকবার ছায়া পড়তে দেখেছি আমি৷ অর্থাৎ ধরে নিতে পারি, ভিতরে যারা ছিলেন তারা আমাদের প্রতি সন্দেহবশত বার বার দেখছিলেন৷ তারপর সমস্ত ব্যবস্থা করে, মানে তন্ময়ের লুকোনোর ব্যবস্থা করে দরজা খোলে৷’
‘হুম৷ তা না হয় হল৷ কিন্তু শুধু দরজা খুলতে দেরি হওয়ায় তুমি এত নিঃসন্দেহ হলে কী করে?’
‘না, শুধু সেটুকুতে নয় রে৷ রেখাদেবী খুব কম বয়সে বিধবা হয়েছেন৷ এই বয়সে এসে অনেক বয়স্ক মানুষদের মধ্যে অনেক সময় অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার, শুচিবাই গোছের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়৷ রেখাদেবী যখন আমাদের সামনে বসে কথা বলছিলেন, আমি ওঁর মধ্যে ওসিডির লক্ষণ দেখেছি৷ মনে আছে, রেখাদেবী বলেছিলেন, তাঁর বার বার স্নান করার অভ্যেস আছে? রেখাদেবীর পরিচারিকাটি আমাদের জুতো খুলে ঘরে ঢুকতে বলল৷ রেখাদেবী সম্ভবত পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে৷ যে কারণে, তন্ময়ের লুকোনোর ব্যবস্থা করলেও তন্ময়ের জুতোটা শুর্যাকেই ভিতরের দিকে রেখেছিলেন৷ সেটাকে ভিতরে রাখেননি৷ একজন বৃদ্ধা মহিলা ও তাঁর পরিচারিকার সংসারে পুরুষ পায়ের নয় নম্বরের জুতো শুর্যাকে থাকাটা একটু অদ্ভুত নয় কি?’
‘নয় নম্বর জুতো? আমি তো জুতোই দেখলাম না৷ তুমি নম্বরও দেখে ফেললে? বুঝলে কী করে সেটা তন্ময়েরই জুতো?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘বুঝলাম না, আন্দাজ করলাম৷ ব্যালকনিতে জামাকাপড় মেলা ছিল৷ সবই মহিলাদের কাপড়চোপড়৷ কিন্তু এক কোণে যে চামড়ার বেল্টটা ছিল, সেটা অন্তত সে বাড়ির কোনো মহিলার পরিধেয় নয়, সেটা অনুমান করা যায়৷ এ বিষয়ে আমার সন্দেহ ছিল না, রেখাদেবীর বাড়িতে কোনো পুরুষ নিশ্চয়ই আছে৷ তবে সেটা তন্ময় কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম না৷ আজ যখন সকালে শুনলাম এক মহিলা ফোন করেছিল রিদ্ধিমাকে, এবং তাঁর কণ্ঠস্বর ধরা ধরা, তখনই নিশ্চিত হলাম৷ আমাদের কথা শুনে তন্ময় বুঝেছিল, রিদ্ধিমা যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় আছে৷ অথচ নিজে ফোন করে তাকে প্রবোধ দিতেও পারছিল না৷ তাই রেখাদেবীকে দিয়ে ফোন করিয়েছিল এটুকু জানাতে যে সে বেঁচে আছে, ঠিক আছে৷’
‘তার মানে তোমার কেস সলভড৷ এখন কী করবে? রিদ্ধিমাকে জানাবে না?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘কী করে জানাই? যতদিন না তন্ময় স্বেচ্ছায় রিদ্ধিমার সামনে আসছে, ততদিন তো জানানো সম্ভব নয় কোনোমতেই৷ বিশেষ করে যেখানে তন্ময়ের প্রাণের ভয় আছে৷’
‘কিন্তু কেসটা কি আদৌ সলভ হল, টাপুরদি? খুশি হব কি হব না ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না!’ বললাম আমি৷
টাপুরদি হাসল৷ বলল, ‘দেখ, আমাকে রিদ্ধিমা তন্ময়কে খুঁজে বার করার দায়িত্ব দিয়েছিল৷ সেটা আমি বার করেছি৷ এখন আমি জানি তন্ময় কোথায় আছে৷ কিন্তু তাকে সুরক্ষিতভাবে রিদ্ধিমার কাছে পৌঁছে দেওয়ার সময় এখনও আসেনি৷ তন্ময় বিপদের মধ্যে আছে৷ তাকে এখনও আমি বিপদমুক্ত করতে পারিনি৷ সেক্ষেত্রে কেস সলভড, কী করে বলি বল তো?’
‘হুম, আমারও মনটা খুঁতখুঁত করছিল,’ বললাম আমি৷
টাপুরদি এতক্ষণ সোফায় বসে কথা বলছিল৷ এবার উঠে দাঁড়াল, বলল, ‘বিরিয়ানি খাবি তো? বসাচ্ছি৷’
‘আরিববাস৷ বিরিয়ানি? কীসের ট্রিট? তন্ময়কে খুঁজে বার করার?’ হেসে জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘এমনিই৷ ইচ্ছে হল রাঁধতে,’ কিচেনের দিকে এগোতে এগোতে বলল টাপুরদি৷ হঠাৎ কী মনে হতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বাই এনি চান্স, আজ কি অর্জুনদা আসছে?’
টাপুরদি হাসল, কিছু বলল না৷ আমিও হাসলাম, ঠিক ধরেছি৷

‘উরিববাস, ভুরভুর করে খোশবাই ছাড়ছে যে!’ জুতো খুলতে খুলতে বলল অর্জুনদা৷ আজ অনেকদিন পরে অর্জুনদা এল৷ অমিয় চক্রবর্তীর কেসটা শুরু হওয়ার পর থেকে কলকাতা পুলিশের রাতের ঘুম ছুটে গেছে৷ দরজা দিয়ে ঢুকে জুতো খুলতে খুলতে হেসে বলল, ‘আহা, ফাটাফাটি গন্ধ৷ এইজন্য আজ সকাল থেকে আমার মনটা বিরিয়ানি বিরিয়ানি করছিল৷’
আমি হেসে ফেললাম অর্জুনদার কথার ধরনে৷ বললাম, ‘টাপুরদি আজকাল ঘরে বসে তোমার মনের কথাও টের পাচ্ছে বুঝি? তা ভালো৷ অন্তত তোমার অনারে আজ আমার কপালেও এহেন সুখাদ্য জুটছে৷ নইলে এমন ভাগ্য আমার থোড়াই হয়? অন্যদিন তো টাপুরদির সো কলড হেলদি ফুড চিবোতে হয়৷’
কিচেনে খুটখাট করলেও টাপুরদির কানটা এদিকেই সেটা বোঝা গেল৷ কিচেন থেকেই বলে উঠল, ‘তুই হেলদি ফুড খাস মিতুল? বাজে বকা বন্ধ কর৷ একটা ফ্যামিলি সাইজ চিপসের প্যাকেট পাঁচ মিনিটে একা সাবাড় করিস তুই৷’
‘ইশ, আর তুমি যে রোজ আমায় স্যালাডের নামে গাদাগুচ্ছের হাবিজাবি কাঁচা সবজি খাওয়াও, সেই বেলা?’ আমিও উত্তর দিলাম৷
অর্জুনদা বলল, ‘ব্যস ব্যস, আর না৷ একটু চা খাওয়াও আমাকে৷ মাথাটা ধরে আছে সেই সন্ধে থেকে৷’
টাপুরদি কিচেন থেকেই উত্তর দিল, ‘বোসো, চা বসিয়েছি৷’
আমি বললাম, ‘দেখলে তো, টাপুরদি কেমন তোমার মনের কথা না বলতেই বুঝে যায়?’
অর্জুনদা মুখে ছদ্মবিষাদ মেখে নীচু গলায় বলল, ‘শুধু যেটা বোঝা দরকার, সেটাই বোঝে না৷’
হেসে উঠলাম আমি৷ বললাম, ‘বোঝে বোঝে সব বোঝে৷ না বুঝলে কি আর তুমি আসবে জেনেই বিরিয়ানি রাঁধতে বসে? লক্ষ্মী লাভ করতে চাইলে ধৈর্য ধরতে হবে৷ এভাবেই পূর্ণ সমর্পণ নিয়ে লেগে থাকো, দেবী বরদান করার আগে ভক্তের পরীক্ষা নেন, জানো না বুঝি?’
‘পরীক্ষাটা একটু লম্বা হয়ে যাচ্ছে না ভাই? অর্জুনদা সোফায় গা এলিয়ে বসে বলল৷
টাপুরদি ট্রেতে করে চায়ের কাপ সাজিয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ বলল, ‘তোরা কী ফিসফাস করছিস রে?’
অর্জুনদা গম্ভীর মুখে বলল, ‘সব তোমায় জানতে হবে নাকি? এসব মিতুলের সঙ্গে আমার গোপন কথাবার্তা৷ তোমায় কেন বলব? অত কৌতূহল ভালো নয় মিস ব্যানার্জি৷’
টাপুরদি কটমট করে একবার অর্জুনদার মুখের দিকে একবার আমার মুখের দিকে তাকাল৷ আমি টাপুরদির হাত ধরে টেনে এনে সোফায় বসালাম৷ হেসে বললাম, ‘অর্জুনদা তোমার লেগপুল করছে৷ বসো তো৷’
চায়ে চুমুক দিতে দিতে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘কেস কতদূর এগোল তোমাদের?’
‘ধুর, এদিকে আমরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিন-রাত এক করে খেটে যাচ্ছি, ওদিকে মিডিয়া পুলিশের অপদার্থতা নিয়ে গলা ফাটাচ্ছে দিনরাত৷ কেস কেন এখনও সিবিআইকে দেওয়া হচ্ছে না, সেই নিয়ে গোল করছে৷ এইভাবে কাজ করা যায় নাকি?’ বিরক্ত মুখে বলল অর্জুনদা৷
টাপুরদি বলল, ‘কিছু জানতে পারলে?’
অর্জুনদা একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘জানতে পারা বলতে সেরকম জরুরি কিছু নয়৷ আজ সকালে ক্যান্টিনের ছেলেটা নিজে থেকেই জানাল যে, অমিয়বাবুর স্পেশাল চায়ের পাতা তাঁর বাড়ি থেকে আসত৷ সেদিন নাকি চা বানানোর সময় নতুন প্যাকেট খুলেছিল ওরা৷’
নড়েচড়ে বসল টাপুরদি, বলল, ‘পাতা পরীক্ষা করানো হয়েছে?’
‘হ্যাঁ,’ বলল অর্জুনদা, ‘ক্লিন৷ পাতায় বিষ নেই৷’
টাপুরদি কিছুক্ষণ অন্যমনস্কভাবে অর্জুনদার মুখের দিকে চেয়ে রইল৷ তারপর বলল, ‘এভাবে হবে না অর্জুন৷ আমার মন বলছে, এই কেসে এগোতে হলে অমিয়বাবুর মৃত্যুর কারণ আগে জানতে হবে৷ মানে, কেন মারা হল ওঁকে, সেটা জানা দরকার৷ পলিটিক্যাল রাইভ্যালরি, না অন্য কিছু৷’
‘সেই অ্যাঙ্গেলগুলো সবই দেখা হয়েছে, টাপুর৷ সেদিন যারা যারা অমিয়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, যাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে সবই খতিয়ে দেখা হয়েছে৷ প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলা হয়েছে৷ দলের মধ্যে কিছু অস্থিরতা ছিল৷ সে তো সব রাজনৈতিক দলেই কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে৷ অশান্তি বাড়লে বিক্ষুব্ধ নেতারা দলবদল করে নেয়, খুন করতে যায় না, তাও আবার অমিয় চক্রবর্তীর মতো হেভিওয়েট নেতাকে যে পরদিন মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছে৷’
‘বিনয় বোসের বক্তব্য কী? কী বলছেন তিনি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
‘বলছেন রাজনীতির মাঠে ঝগড়া লড়াই হয়৷ তা বলে হবু মুখ্যমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানানো তাঁর কর্তব্য৷ তাই গিয়েছিলেন৷ কিন্তু আসল কথাটা হল, বিকেল নাগাদ তিনি বেরিয়ে আসার পর থেকে নাকি অমিয়বাবুকে কিছুটা অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল,’ অর্জুনদা বলল, ‘কিন্তু সমস্যা হল, তিনি বেরিয়ে আসার পরেও অনেকক্ষণ অমিয়বাবু বেঁচে ছিলেন৷ সুতরাং খুনের ব্যাপারটা বিনয় বোসের ক্ষেত্রে ঠিক খাটে না৷’
‘কেউ কি সেই সময় অমিয়বাবুর কেবিনে উপস্থিত ছিল?’
‘না, তবে বিনয়বাবু চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে ছেলে অম্লানবাবুকে কেবিনে ডেকেছিলেন অমিয়বাবু৷ দুজনের মধ্যে কিছু কথাবার্তা হয়৷ এর পরে সনাতন বিশ্বাস দেখা করতে আসেন৷ অম্লানবাবুও সেই সময় ঘরেই ছিলেন৷’
‘সনাতন বিশ্বাসের সঙ্গে কী কথা হয়েছিল? অম্লানবাবু নিশ্চই বলেছেন?’ জানতে চাইল টাপুরদি৷
‘হ্যাঁ, সনাতন বিশ্বাস থ্রেট দিতে এসেছিলেন৷ বলেছেন, তাঁকে যদি নতুন মন্ত্রীসভায় রাখা না হয়, সেক্ষেত্রে তিনি তাঁর অনুগামী বাইশ জন এমএলএ নিয়ে পার্টি ছাড়বেন৷ তার ফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এমনিই আর থাকবে না৷’
টাপুরদি মাথা নেড়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘অমিয়বাবু নিশ্চয়ই রাজি হননি?’
‘না,’ বলল অর্জুনদা, ‘সনাতন বিশ্বাসের নামে অনেকগুলো কেস ঝুলছে৷ তাঁর ভাবমূর্তি জনমানসে একেবারেই পরিচ্ছন্ন নয়৷ যথেষ্টই বাগবিতণ্ডা হয়েছিল দুজনের মধ্যে৷ অম্লানবাবু দুই পক্ষকেই শান্ত করার চেষ্টা করেন৷ কিন্তু সনাতন বিশ্বাস হুমকি দিয়েছিলেন, যদি অমিয়বাবু নিজের সিদ্ধান্ত না বদলান, তিনিও দেখে নেবেন কী করে পরদিন মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ করেন তিনি৷’
‘হুম, সনাতন বিশ্বাস দেখছি বেশ কনফিডেন্ট ছিলেন যে তাঁর দাবি না মানলে অমিয় চক্রবর্তী শপথগ্রহণ করতে পারবেন না! তা, ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে নিশ্চয়ই? কী বলছেন তিনি?’
‘বলছেন তাঁর পরিকল্পনা ছিল সেদিন রাতের মধ্যে মন্ত্রীমণ্ডলীর তালিকাতে তাঁর নাম না ঢোকানো হলে তিনি তাঁর বাইশজন অনুগামী নিয়ে ওয়াকআউট করতেন৷ খুন-টুনের কথা তিনি নাকি ভাবেনওনি৷’ অর্জুনদা হাসল৷ তারপর বলল, ‘লোকটার নামে গুন্ডাগিরি, এক্সটরশনসহ দুইখানা খুনের মামলা নয় দশ বছর ধরে এই আদালত থেকে সেই আদালতে ক্যারামের ঘুঁটির মতো ছিটকে বেড়াচ্ছে৷ সনাতন বিশ্বাসকে ভরসা করা যায় না কিছুতেই৷’
টাপুরদি চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল৷ তারপর বলল, ‘সনাতন বিশ্বাস অমিয়বাবুর কেবিনে আসার আগেই কি ফ্লাস্কে নতুন করে চা ভরা হয়েছিল?’
‘সেখানেই তো আটকে যাচ্ছে তদন্তটা,’ বিমর্ষ মুখে বলল অর্জুনদা, ‘সনাতন বিশ্বাস অফিস থেকে বেরিয়ে যান পৌনে ছ’টা নাগাদ৷ ক্যান্টিনের ছেলেটি জানাচ্ছে, ফ্লাস্কে নতুন করে চা ভরা হয়েছিল বিকেল পাঁচটার আশেপাশে৷’
‘তাহলে তো সনাতন বিশ্বাসেরও অ্যালিবাই সত্যিই স্টং, যদি না তিনি অমিয়বাবুর কেবিনে বসে ফ্লাস্ক খুলে বিষ মিশিয়ে দেন৷ সেটা বেশ কঠিন ব্যাপার৷ আরেকটা ব্যাপার হল, সনাতন বিশ্বাসের অতীত যত অন্ধকারাচ্ছন্নই হোক না কেন, যেই কাজটা একটু মোচড় দিলেই হতে পারে, তার জন্য অমিয় চক্রবর্তীর মতো হেভিওয়েট নেতা, তথা হবু মুখ্যমন্ত্রীকে খুন করাটা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি লাগছে৷ কারও উদ্দেশ্যটাই তেমন জোরদার হচ্ছে না৷ খুন করাটা তো আর যেমন-তেমন ব্যাপার নয়৷ নেহাত অনন্যোপায় না হলে খুনি এতটা রিস্ক নেবে কেন?’ বলল টাপুরদি৷
‘এটা কিন্তু আমিও ভেবেছি টাপুর৷ হত্যার পেছনে উদ্দেশ্য কি পুরোটাই রাজনৈতিক?’ ভুরু কুঁচকে চিন্তিত মুখে বলল অর্জুনদা, ‘আরেকটা ব্যাপার আছে৷ অমিয়বাবুর ডেডবডির পাশে একটা সিগারের বক্স পাওয়া গেছে৷ অমিয়বাবু স্মোক করতেন না৷ বাক্সটা কেউ আইডেন্টিফাই করতে পারেনি৷’
‘ফিঙ্গারপ্রিন্টস?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
‘ফরেনসিকে দেওয়া হয়েছে৷ অফিসের কারও সঙ্গে ম্যাচ করেনি৷’

সোজা হয়ে বসল টাপুরদি৷ বলল, ‘যাক, বাইরের কানেকশন পাওয়া যাচ্ছে, এটা ভালো কথা৷ তবে সিগারের বাক্সের মালিকই যে খুনি, এমনটা নাও হতে পারে৷ মোডাস অপারেন্ডি এখনও পর্যন্ত আমরা যেটুকু বুঝেছি তা হল, কেউ অমিয় চক্রবর্তীর ফ্লাস্কে চায়ে বিষ মিশিয়েছিল৷ কিন্তু কে? চায়ের ফ্লাস্কে বিষ মেশানো কার কার পক্ষে সম্ভব? সেভাবে দেখতে গেলে অনেকের পক্ষেই সম্ভব৷ ক্যান্টিনের কোনো কর্মী, যে অমিয় চক্রবর্তীর ঘরে ফ্লাস্ক পৌঁছে দিয়েছিল, যে বা যারা তাঁর ঘরে গিয়েছিল তাদের মধ্যে যে কেউ কাজটা করতে পারে৷ কিন্তু একদম বাইরের লোকের পক্ষে ব্যাপারটা একটু কঠিন৷ বাই দ্য ওয়ে, পার্টি অফিসে সিসিটিভি নেই?’
অর্জুনদা বলল, ‘আছে, মানে, ছিল৷ তবে নামেই থাকা৷ সারাক্ষণ সিসিটিভির সামনে বসে থাকে না কেউ৷ কেউ খেয়ালই করেনি যে হত্যার দিন দুপুরের পর থেকে সিসিটিভি কেউ বন্ধ করে রেখেছিল৷ কিছুই রেকর্ডিং হয়নি৷’
‘সিসিটিভি বন্ধ ছিল? মানে অফিসের কেউ কাজটা করেছে৷ যে করেছে, সে সিসিটিভির পাসওয়ার্ড জানত তার মানে?’ বলল টাপুরদি৷
‘নাঃ, অত কষ্ট করেনি৷ সিমপ্লি তার টেনে খুলে দিয়েছিল৷’ বলল অর্জুনদা৷
‘সেদিন সবাইকে কেন ছুটি দিয়েছিলেন অমিয়বাবু, কিছু জানা গেল কী?’
‘অমিয়বাবুর সেক্রেটারি মনোময় মজুমদার বললেন, পরের দিন শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল৷ তারপর অমিয়বাবুকে মুখ্যমন্ত্রীর অফিসে বসতে হত৷ সেই কারণে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন অমিয়বাবু৷ এত বছর ধরে ওই অফিসে রয়েছেন তিনি, শেষ দিন সেখানে কিছুটা সময় একা কাটাতে চেয়েছিলেন৷’ বলল অর্জুনদা৷
‘সে ঠিক আছে৷ কিন্তু একা কাটাবেন বলে সিকিউরিটিকেও চলে যেতে বলবেন, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ব্যাপারটা একটু সাস্পিশাস লাগছে অর্জুন৷ একটু খতিয়ে দেখো৷’ ভুরু কুঁচকে বলল টাপুরদি৷
‘কেন বলো তো? কী চলছে তোমার মাথায়?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা৷
কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে ভাবল টাপুরদি৷ তারপর কাউকে কিছু না বলে উঠে শোওয়ার ঘরে চলে গেল৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এল হাতে ল্যাপটপ নিয়ে৷ বলল, ‘আজ তোমাকে কিছু জিনিস দেখানোর জন্য ডেকেছি৷ জানি না, এতে কোনো লাভ হবে কি না৷’
আমি আর অর্জুনদা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালাম টাপুরদির দিকে৷ মনে পড়ল আজ সারাদিন টাপুরদি ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে কাটিয়েছে৷ ল্যাপটপটা টেবিলের উপরে রেখে অন করল টাপুরদি৷
সার্চবারে গিয়ে নাম টাইপ করল ‘মল্লিকা দাশগুপ্ত’৷ নামটা চেনা ঠেকল৷ পরমুহূর্তেই বিদ্যুৎচমকের মতো স্মৃতিতে ভেসে উঠল নামটা৷ আমি একটু অবাক হয়ে তাকালাম টাপুরদির মুখের দিকে৷ রিদ্ধিমার মুখে শুনেছিলাম মল্লিকা দাশগুপ্তের নাম, এই মল্লিকা দাশগুপ্ত রিদ্ধিমার মা৷
টাপুরদি বলতে শুরু করল, ‘আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে মল্লিকা দাশগুপ্ত ছিলেন বিখ্যাত একটি ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্টার৷ পলিটিক্স ও ক্রাইম নিয়ে কাজ করতেন তিনি৷ সেই সময় অমিয়বাবুদের পার্টি মসনদে ছিল৷ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, অমিয়বাবুর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু রথীন ঘোষ৷ রথীনবাবু অভিজ্ঞ নেতা৷ কিন্তু যেই সময়ের কথা বলছি, তখন তাঁর বয়স হয়েছে যথেষ্ট৷ শারীরিকভাবেও পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না৷ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মীদের উপরে রথীনবাবুর কোনো কনট্রোল ছিল না৷ সেই সুযোগে বেলাগাম স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়েছিল৷ সেইসব নিয়েই কলমে আগুন ঝরাচ্ছিলেন এক নির্ভীক সাংবাদিক৷ তিনি মল্লিকা দাশগুপ্ত৷ নেটে সার্চ করলে মল্লিকাদেবীর কিছু রিপোর্ট এখনও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে৷ বাঙালি হলেও মল্লিকা দাশগুপ্তের স্বামী ছিলেন গুজরাটি, সুরাটের বাসিন্দা৷ যদিও পরে তাঁর বিয়ে ভেঙে যায়৷ তিনি পাকাপাকিভাবে সুরাট ছেড়ে মেয়ে নিয়ে এসে কলকাতায় সেটল করে যান৷ কলকাতায় এসে তিনি তাঁর সাংবাদিকতা চালিয়ে যান৷ তিনি মূলত ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করতেন, অসম্ভব দুঃসাহসী মহিলা৷ তাঁর রিপোর্টগুলিতে অমিয়বাবুদের পার্টিকে তিনি সরাসরি আক্রমণ করেছেন বার বার৷ আমরা মল্লিকা দাশগুপ্তের সেই সময়কার রিপোর্টগুলো মন দিয়ে ফলো করলে অমিয় চক্রবর্তীর উত্থানের একটা গ্রাফ পাই৷ রথীন ঘোষ অস্তাচলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্টিতে অমিয় চক্রবর্তী অঘোষিত নেতা হয়ে ওঠেন৷’
‘এই কেসের সঙ্গে মল্লিকা দাশগুপ্তের সম্পর্ক কোথায়?’ জানতে চাইল অর্জুনদা৷
‘আহ, শোনোই না৷ শুনতে দোষ কোথায়? সম্পর্ক আদৌ আছে কি না তা আমি নিশ্চিত নই৷ আমি শুধু আমার ফাইন্ডিংস তোমায় বলছি৷ দেখো, তোমার কেসে কোনো কাজে লাগে কি না৷’
‘বলো শুনি৷’ হেসে বলল অর্জুনদা৷
‘তন্ময়ের কেসটা তোমায় আমি বলেছিলাম৷ তন্ময়ের কেসের ব্যাপারে খোঁজখবর করতে গিয়ে সুবিনয় মুখার্জির সঙ্গে কথা হয় আমার৷ অমিয় চক্রবর্তীর অতীত থেকে লুপহোলস খুঁজে বার করার বরাত পেয়েছিলেন তাঁরা৷ বিগ ক্লায়েন্ট, রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী, বকলমে তাঁর সেক্রেটারি৷ ইলেকশন শেষ৷ তন্ময় যে ডকুমেন্টস চুরি করেছে, তা নিয়ে এখন আর বিরোধীদের কোনো মাথাব্যথা থাকার কারণ নেই৷ অবশ্য সেরকম লুপহোল বেরোলে যেকোনো সময় সেটা হাতে পেলেই লাভ৷ যাই হোক, আমার শুধু মনে হচ্ছিল, ওঁরা ডকুমেন্টগুলোর জন্য এ রকম হন্যে হচ্ছেন কেন? কী এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে এতে? সুবিনয়বাবুর এত তাগিদ কেন? পুরোটাই কি শুধুই ব্যাবসায়িক?
‘কথাচ্ছলে সুবিনয় মুখার্জি জানালেন তিনি একসময় স্পোর্টসম্যান ছিলেন, রাজ্যস্তরে ক্রিকেট খেলেছেন৷ কথাটা তখন আমার তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি৷ তারপর টিভিতে সুনয়নাদেবীর ইন্টারভিউ দেখলাম৷ ইন্টারভিউতে তিনি জানালেন, অম্লান চক্রবর্তী একসময় স্পোর্টসম্যান ছিলেন৷ রাতে ইন্টারনেটে সার্চ করে দেখলাম, প্রায় টানা তিন বছর অম্লান চক্রবর্তী ও সুবিনয় মুখার্জি একই সময়ে স্টেট জুনিয়র টিমে একসঙ্গে ক্রিকেট খেলেছেন৷ দুই জনে অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিলেন৷ সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, ইউনিকর্নের প্রোজেক্টটের ব্যাপার অম্লানবাবুর অজানা নয়৷ তিনি জানতেন বিরোধী দল এ-রকম একটা কাজের বরাত দিয়েছে সুবিনয়বাবুর দলকে৷’
‘সেটা তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছ কী করে টাপুর?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা, ‘ইউনিকর্নের মতো প্রফেশনাল এজেন্সি ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্য নিজেদের সুনাম, দায়িত্ব কম্প্রোমাইজ করবে কী করে ভাবলে?’
‘করবে অর্জুন, যদি আরও বড়ো কোনো ইন্টারেস্ট থাকে৷ সেটা আছে কি না খোঁজ নেওয়ার দায়িত্ব তোমার, মানে পুলিশের৷ খোঁজ লাগাও অম্লানবাবুর অ্যাকাউন্ট থেকে বড়ো কোনো অ্যামাউন্ট ট্রান্সফার বা উইথড্র হয়েছে কি না৷ অবশ্য বেশিরভাগ পলিটিক্যাল পার্টি নগদ ফান্ড নিয়ে কাজ করে৷ ব্ল্যাক মানি থাকে প্রচুর৷ তাই টাকার হিসেব লাগানোটা একটু মুশকিল, বিশেষত ইলেকশনের আগে৷’
‘হুম, বলে যাও,’ বলল অর্জুনদা৷
‘আমার ধারণা যদি সত্যি হয়, সেক্ষেত্রে অম্লানবাবুও জানেন এই ডকুমেন্ট চুরির কথা৷ কিংবা হয়তো এখনও জানেন না৷ তিনি জেনে যাওয়ার আগে সেটাকে উদ্ধার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছেন সুবিনয় মুখার্জি৷’ বলল টাপুরদি৷
‘টাপুর, তোমার ধারণা যদি সত্যি হয়, তাহলেও কি এই রহস্যের সঙ্গে অমিয়বাবুর মৃত্যুর কিছু যোগ আছে বলে তোমার মনে হয়?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা৷
‘আমি নিশ্চিত নই৷ সেটা জানতে হলে আগে জানা দরকার কী সেই মহার্ঘ্য বস্তু, যেটা পাওয়ার জন্য সুবিনয় মুখার্জি হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করছে৷’
‘তন্ময়কে না পাওয়া গেলে সেটা জানা যাবে কী করে?’ অর্জুনদা বলল৷
আমি উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলতে গেলাম যে তন্ময়ের খোঁজ আমরা জেনে গেছি৷ তার আগেই টাপুরদি বলে উঠল, ‘হুম, সে তো ঠিক কথা, তন্ময়কে আগে খুঁজে বার করতে হবে৷’ তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ‘ও বাবা, অনেক রাত হয়ে গেল তো! তোমাদের খেতে দিয়ে দিই৷’

অর্জুনদা চলে যাওয়ার পরে টাপুরদিকে চেপে ধরলাম, ‘তুমি কেন অর্জুনদাকে বললে না যে তন্ময়ের খোঁজ তুমি জেনে গেছ? অর্জুনদা তোমার কেসে সবরকম করে সাহায্য করে৷ আর তুমি এত ভাইটাল খবরটা অর্জুনদার কাছে চেপে গেলে?’
টাপুরদি বলল, ‘না রে৷ সেজন্য নয়৷ এই মুহূর্তে আমার একটা সামান্য ভুলের জন্যেও তন্ময়ের প্রাণসংশয় হতে পারে৷ আমি এমন কিছু করতে পারি না, যাতে তন্ময়ের ক্ষতি হয়৷ পুলিশের কার্যপ্রণালী একটু অন্যরকম৷ হয়তো ওরা গিয়ে রেখাদেবীর বাড়িতে তন্ময়কে জেরা করতে চলে গেল৷ কিংবা ওকে উঠিয়ে নিয়ে গেল৷ তখন কিন্তু ভীষণ বিপদ হয়ে যেতে পারে৷ ভুলে যাস না, এই কেসে অনেক ক্ষমতাশালী মানুষও সন্দেহভাজনের তালিকায় আছে৷ সেক্ষেত্রে পুলিশকেও পুরোপুরি বিশ্বাস করা সম্ভব নয়৷ অর্জুন সৎ অফিসার বলে ডিপার্টমেন্টের সবাই যে সৎ সেটা তুই কীভাবে শিয়োর হচ্ছিস? পুলিশ স্টেশনেও তন্ময় সম্পূর্ণ সুরক্ষিত নয় রে৷ তাই বাধ্য হয়েই চেপে যেতে হল৷’
ব্যাপারটা বুঝলাম৷ এতক্ষণ টাপুরদির অদ্ভুত ব্যবহারটা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল ক্রমাগত৷ টাপুরদি অর্জুনদার কাছ থেকে তথ্য গোপন করবে, সেটা মেনে নিতে পারছিলাম না মন থেকে৷ এখন একটু শান্তি পেলাম৷ আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, টাপুরদি অকারণে কিছু করে না৷ বললাম, ‘তাহলে এখন কী করবে টাপুরদি?’
‘সত্যি বলতে কী, আমার তরফ থেকে আর কিছু করার নেই এখন৷ পুলিশি তদন্তে নাক গলানোর এক্তিয়ার আমার নেই৷ কিন্তু হাত গুটিয়ে বসেও থাকতে পারছি না৷ তন্ময় রেখাদেবীর বাড়িতে বেশি দিন লুকিয়ে থাকতে পারবে না৷ আজ না হয় কাল ধরা পড়েই যাবে৷ তখন আমি অন্তত নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না রে মিতুল৷’ চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি৷
‘তাহলে কীভাবে এগোবে? ভেবেছ কিছু?’ জিজ্ঞাসা করলাম৷
‘তন্ময়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে রে৷ জানতে হবে, কোন সত্যকে ও আড়াল করে লুকিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে৷ কীসের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে সকলে মিলে সেটাই জানার৷’
‘সে না হয় হল৷ কিন্তু তন্ময় কি তোমাকে বলবে? যদি বলেও বা, এতে কি আদৌ লাভ কিছু হবে?’
‘জানি না কীসে কী লাভ হবে৷ শুধু জানি, চেষ্টাটা করতে হবে৷ দেখ মিতুল, অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যু রহস্য নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই৷ আমি আগেও বলেছি, সেটা পুলিশের কাজ৷ কিন্তু আমার কাজ হল, তন্ময়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা৷ সেই চেষ্টা আমি করবই৷’ বলল টাপুরদি৷
‘কীভাবে করবে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘ভাবতে হবে মিতুল, মাথা খাটাতে হবে৷ তবে আমার প্রথম কাজ হল তন্ময়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা৷ কিন্তু রেখাদেবীর বাড়িতে আর যাওয়া যাবে না৷ আমার ধারণা যদি ভুল না হয়, সুবিনয় মুখার্জির লোক আমার প্রতিটা স্টেপের পর নজর রাখছে৷’
লাফিয়ে উঠলাম আমি, ‘কী বলছ? সেই ভয়ে তুমি দুইদিন ধরে চুপচাপ ঘরে বসে আছ?’
মাথা নাড়ল টাপুরদি৷ বলল, ‘না, ঠিক ভয় নয়৷ তবে আমি চাই না আমি কী ভাবছি তা সুবিনয় মুখার্জি ঘুণাক্ষরেও টের পাক৷’
‘তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী?’
‘তুই কাল অফিস যাবি৷ তোদের অফিসের ল্যান্ডফোন থেকে ফোন করবি রেখাদেবীর বাড়িতে৷ নিজের পরিচয় দিয়ে তন্ময়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইবি৷ যেভাবে হোক, ওকে কনভিন্স করার দায়িত্ব তোর৷ পারবি তো?’
বললাম, ‘চেষ্টা করব টাপুরদি৷ কিন্তু তন্ময় কি আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হবে? রেখাদেবী আদৌ হয়তো স্বীকারই করবেন না যে তন্ময় তাঁর বাড়িতে আছে৷’
টাপুরদি আমার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘পারতে তোকে হবেই মিতুল৷ রহস্যের চাবি তন্ময়ের হাতে আছে৷ ওকে বাঁচাতে হলে আমায় জানতেই হবে, ওর কাছে কী আছে৷’
অফিস যাওয়ার আগে টাপুরদি আমায় পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিল তন্ময়কে কী জিজ্ঞাসা করতে হবে৷ আমার বুকের ভিতরটা ধুকপুক করছে৷ টাপুরদি আমার উপর অনেকটা ভরসা করেছে৷ জানি না আদৌ পারব কি না, তবু চেষ্টা করব৷ অফিসে পৌঁছে ফোন করলাম রেখাদেবীর বাড়ির নম্বরে৷ দুইবার রিং হতেই ওপারে ভারী পুরুষ কণ্ঠে প্রশ্ন ভেসে এল, ‘কে বলছেন?’
যথাসম্ভব বিস্ময় গোপন করে নিজের পরিচয় দিলাম৷
ফোনের ও প্রান্ত থেকে পুরুষ কণ্ঠ আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘রেখাদেবীকে আপনি কীভাবে চেনেন?’
কী বলি৷ চটজলদি ভেবে নিয়ে বানিয়ে বললাম, ‘অনেকদিন আগে আলাপ হয়েছিল৷ তারপর মাঝে মাঝে ফোন করে খবরাখবর নিতাম৷ তিনি একা মানুষ, বলতেন লোকজন ফোন করলে ভালো লাগে, তাই আর কী৷ রেখাদেবীও আমায় স্নেহ করতেন৷ কিন্তু আপনি কে বলছেন?’
ও প্রান্তের ভদ্রলোক ভারী গলায় বললেন, ‘কাল রাতে কিছু সমাজবিরোধী সম্ভবত ডাকাতির উদ্দেশ্যে রেখাদেবীর বাড়িতে ঢোকে৷ রেখাদেবী খুন হয়েছেন৷ পেটে ছুরি মারা হয়েছে৷ সম্ভবত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মারা গেছেন৷ বাকিটা পোস্ট মর্টেম হলে বোঝা যাবে৷’
আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল৷ হাত কাঁপছে রীতিমতো৷ কম্পিত কণ্ঠে বললাম, ‘বাড়িতে আর কেউ ছিল না?’
‘না৷ রেখাদেবীর কাজের মেয়েটি দু’দিন হল নিজের গ্রামের বাড়িতে গেছে৷ প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, রেখাদেবী একাই থাকতেন৷ আচ্ছা, রাখছি৷’

‘তুমি জানতে, তন্ময় রেখাদেবীর বাড়িতে আছে? তুমি আমায় একবার জানালে না?’ অর্জুনদা নিজের অসন্তাোষ লুকোতে পারছে না, ‘হাউ ক্যান ইউ বি সো রেকলেস টাপুর? তুমি একবারও ভাবলে না যে তন্ময়ের কারণে রেখাদেবীরও ক্ষতি হতে পারে?’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন