পঞ্চম অধ্যায়

সোমজা দাস

টাপুরদির ফোনটা বাজছে৷ গাড়ি চালাতে চালাতে টাপুরদি ফোন ধরে না৷ আমায় বলল, ‘ফোনটা ধর মিতুল৷’

অর্জুনদার ফোন৷ কথা শেষ করে ফোনটা রাখতে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ব্যাপার?’

‘কিছু না৷ জিজ্ঞাসা করছে আমরা বাড়ি আছি কি না৷ আমি বললাম, আর পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছোচ্ছি৷’

‘এখন আসবে অর্জুন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘হুম৷ তাই তো বলল,’ বললাম আমি৷

টাপুরদি কোনো কথা বলল না৷ আজকাল কেন জানি না মনে হচ্ছে টাপুরদি আর অর্জুনদা দুজনে একটা সাঁকোর দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে৷ মধ্যবর্তী দূরত্বটা তারা যেন চেয়েও অতিক্রম করতে পারছে না৷ দুজনেই একই পেশায় থাকার এটাই বোধ হয় খারাপ দিক৷ না চাইতেও কোথাও একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা চলেই আসে৷ মানুষের মনের চেয়ে জটিল বোধ হয় আর কিছু নেই৷ এসব ভাবলেই মনটা বড়ো খারাপ হয়ে যায়৷ ওদের দুজন দূরে সরে গেলে সত্যিই আমি খুব কষ্ট পাব৷

অর্জুনদা এল রাত ন’টা নাগাদ৷ খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে অর্জুনদাকে৷ ঘরে ঢুকেই বলল, ‘একটা মাথা ব্যথার ওষুধ থাকলে দাও তো!’

টাপুরদি ঘর থেকে অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট এনে দিল অর্জুনদাকে৷ জল দিয়ে ট্যাবলেটটা গিলে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজল অর্জুনদা৷ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘খুব চাপ যাচ্ছে, না অর্জুনদা?’

‘খুউউব!’ বলে ফিকে হাসল অর্জুনদা৷ তারপর বলল, ‘উপর লেভেল থেকে চাপ আসছে অমিয় চক্রবর্তীর কেসটা ক্লোজ করে দেওয়ার জন্য৷’

‘অর্থাৎ ধনঞ্জয় মণ্ডলকে মার্ডারার হিসেবে ফ্রেম করে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলার জন্য৷ তাই তো?’ বলল টাপুরদি৷

‘হুম, সেরকমই বলতে পারো৷ আর সব সাক্ষীসাবুদ, প্রমাণ, এমনকী সুইসাইড নোটও তো ধনঞ্জয়ের দিকেই ইঙ্গিত করছে৷’

‘সেসবই তো বুঝলাম৷ কিন্তু তাই বলে সেটা একবার খতিয়ে দেখা হবে না, যে ধনঞ্জয় মণ্ডল যা দাবি করছে সেটা কতটা সত্যি? এমনও তো হতে পারে যে কেউ কাজটা ওকে দিয়ে করিয়েছে? যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে ধনঞ্জয় মণ্ডলই খুনি, তবু এই খুনের পেছনে মাস্টারমাইন্ড যে অন্য কেউ নয়, সে ব্যাপারে কীভাবে এত শিয়োর হচ্ছে সকলে?’ বিরক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘শিয়োর হচ্ছে তো বলিনি৷ বলেছি, উপর মহল থেকে চাপ আসছে কেস ক্লোজ করে দেওয়ার জন্য৷ আমরা তো সরকারি কর্মচারী টাপুর৷ মাথার উপর যাঁরা বসে আছেন, ইচ্ছেয় হোক, অনিচ্ছেয় হোক, তাঁদের কথা আমাদের মেনে চলতে হয়৷ আর মানাতে না পারলে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়৷ পুলিশের হাতে অনেক ক্ষমতা, কিন্তু সত্যি বলতে কী, আমরা নেতা মন্ত্রীদের হাতের পাপেট ছাড়া আর কিছু নই৷ সুতো তাঁদের হাতে’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল অর্জুনদা৷ তারপর বলল, ‘ঘরে কফি আছে?’

‘আছে,’ বলল টাপুরদি৷

‘কড়া করে একটু ব্ল্যাক কফি খাওয়াতে পারো? তাতে যদি মাথাটা ছাড়ে একটু,’ বলে চোখ বুজল অর্জুনদা৷

টাপুরদি বলল, ‘তুমি ঘরে গিয়ে একটু শোও৷ একটু বিশ্রাম করলে হয়তো আরাম পাবে৷ আমি কফি করে আনছি৷’

‘নাঃ, শোব না৷ এখানেই বসি৷ তুমি কফি দাও আমায়,’ বলল অর্জুনদা৷

টাপুরদি কফি বানিয়ে নিয়ে ফিরে এল কিছুক্ষণ পর৷ কফির কাপটা টেবিলের উপর রেখে অর্জুনদার সামনে বলল, ‘অর্জুন, আমি বুঝতে পারছি এই কেসটা নিয়ে তোমরা অনেক পরিশ্রম করেছ৷ এতটা এগোনোর পর এটা বন্ধ করে দিতে হলে তোমাদের কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক৷ তুমি সরকারি কর্মচারী৷ তোমার হাত বাঁধা, কিন্তু আমার তো তা নয়৷ আমি তো এগোতে পারি কেসটা নিয়ে৷ পারি না?’

‘তুমি বুঝতে পারছ না, টাপুর,’ বলল অর্জুনদা, ‘আমাদের কেস ক্লোজ করে দিলে তোমাকে দেওয়া পারমিশনও ফিরিয়ে নেওয়া হবে৷ সেক্ষেত্রে তুমিই বা কী করে এগোবে? আর তা ছাড়া, আমি জানি তুমি আমায় ভুল বুঝবে, তবু বলছি এই কেসটা ভীষণ বিপজ্জনক৷ এই কেসে রাজনীতির সব রাঘববোয়ালদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে৷ তাদের ল্যাজে পা পড়লে ওরা তোমাকেও ছাড়বে না৷ ওরা...’

‘অর্জুন,’ অর্জুনদাকে থামিয়ে দিয়ে বলল টাপুরদি, ‘তুমি আমাকে বিশ্বাস করো তো?’

অর্জুনদা উত্তর না দিয়ে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল৷

টাপুরদি আবার বলল, ‘আমায় বলো, আমার হাতে আর ক’দিন আছে? কেস ক্লোজ করতে হলে ক’দিনের মধ্যে সেটা করা হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?’

‘অফিশিয়াল কাজকর্ম মিটিয়ে ফাইনাল রিপোর্ট জমা দিতে বড়োজোর দিন চারেক৷ কারণ সামনে উপনির্বাচন৷ তার আগে উপর মহল ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে চাইছেন,’ বিমর্ষ মুখে বলল অর্জুনদা৷

‘বেশ৷ আমি তাহলে চারদিন ধরেই এগোচ্ছি৷ মানে আমাদের হাতে আর চার দিন আছে কোনো এসপার বা ওসপার করার জন্য৷ শেষ মুহূর্ত অবধি লড়ব অর্জুন৷ অমিয় চক্রবর্তীর জন্য না লড়লেও তন্ময়ের জন্য লড়ব৷ তন্ময় খুব বিপদের মধ্যে আছে৷ আমি ওর কাছে পৌঁছোনোর আগে যদি অম্লান চক্রবর্তী বা সুবিনয় মুখার্জি ওর কাছে পৌঁছে যায়, ওকে বাঁচানো কঠিন হবে৷

‘তুমি কি তন্ময়ের লাইফ থ্রেট আছে বলে মনে করছ?’ অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল৷

‘মনে করছি না৷ আমি শিয়োর৷ আর তন্ময়ও সেটা জানে বলেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে,’ বলল টাপুরদি৷

‘কিন্তু কেন? কীসের বেসিসে তুমি এই বিষয়ে শিয়োর হচ্ছ এত? তন্ময়ের পেনড্রাইভ এখন আমাদের কাছে,’ অর্জুনদা কফিতে চুমুক দিয়ে বলল৷

‘হ্যাঁ, পেনড্রাইভ তোমার কাছে আছে৷ কিন্তু সেটা তুমি জানো, আমি জানি, অম্লান চক্রবর্তী বা সুবিনয় মুখার্জি জানেন না৷ তাই না? আর পেনড্রাইভে যাই থেকে থাকুক সেটা আমরা জানি না৷ জানেন শুধু তিনজন৷ অম্লানবাবু, সুবিনয়বাবু আর তন্ময়৷ সেই তথ্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তার জন্য অম্লান চক্রবর্তী সুবিনয় মুখার্জিকে বিধানসভায় সিট অবধি দিতে পারেন৷ সুতরাং তাঁদের দুজনের কেউই নিশ্চয়ই চাইবেন না যে সেই সিক্রেটের আর অংশীদার থাকুক৷’

‘না টাপুর, তুমি যাঁদের কথা বলছ, তাঁদের মধ্যে একজন রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী, আরেকজন হবু বিধায়ক৷ তাঁরা এমন রিস্ক নেবেন কেন?’ অর্জুনদা বলল৷

‘নেবেন, নেবেন৷ রিস্ক ওঁরা নেবেন যদি সেই রিস্কটা না নিলে নিজেদের সম্মান হারানোর বা গদি হারানোর ভয় থাকে৷ যাক গে ছাড়ো, মোট কথা আমাদের হাতে আর চার দিন সময় আছে৷ তার মধ্যে যা করার করতে হবে,’ টাপুরদি বলল৷

‘কী করতে চাও, বলো,’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা৷

‘সনাতন বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করতে চাই,’ স্থির গলায় বলল টাপুরদি৷

একটু সময় লাগল মনে করতে, কে এই সনাতন বিশ্বাস৷ তার পরেই মনে পড়ে গেল, ইনি হলেন সেই বিক্ষুব্ধ বিধায়ক, যিনি দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিতে চাইছেন৷ অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর দিন এই সনাতন বিশ্বাসই শেষবারের মতো গিয়েছিল অমিয় চক্রবর্তীর কেবিনে৷

অর্জুনদা বলল, ‘সনাতন বিশ্বাস? তোমার মাথা খারাপ? তিনি কেন কথা বলবেন প্রাইভেট ডিটেকটিভের সঙ্গে?’

‘ঠিক,’ বলল টাপুরদি, ‘প্রাইভেট ডিটেকটিভের সঙ্গে কথা বলবেন না৷ কিন্তু রিপোর্টারের সঙ্গে তো কথা বলবেন৷ নয়নিকা দাস আর রত্নদীপা নিয়োগীর ছদ্মবেশটার প্রয়োজন আরও একবার পড়বে আমাদের৷’

অর্জুনদা বোধ হয় টাপুরদির অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে৷ তাই আজকাল অবাক হওয়াও ছেড়ে দিয়েছে৷ হেসে নরম গলায় বলল, ‘ধরা পড়লে কী হবে জানো? এত রিস্ক নাও কেন টাপুর? সুবিনয় মুখার্জি আর সনাতন বিশ্বাস কিন্তু এক নন৷ সুবিনয় মুখার্জি এখনও রাজনীতিতে পুরোপুরি আসেননি৷ আর সনাতন বিশ্বাস পোড়-খাওয়া রাজনীতিক৷ আর যতদূর শুনেছি, মেয়েঘটিত ব্যাপারে লোকটার রেকর্ড ভালো নয়৷ আমি কিন্তু অফ রেকর্ড বলছি৷ তোমাদের দুজনের যাওয়াটা ঠিক হবে না৷’

‘বাহ বাহ তোমার অফ রেকর্ডে বলা সনাতন বিশ্বাসের রেকর্ডখানা ভারি কাজের,’ জোরে জোরে হেসে উঠে বলল টাপুরদি৷

‘বি সিরিয়াস টাপুর,’ গম্ভীর গলায় বলল অর্জুনদা, ‘আগুন নিয়ে খেলতে যেয়ো না৷ সনাতন বিশ্বাস এমনিতেও তোমাকে অম্লান চক্রবর্তীর এগেনস্টে কিছু বলবে বলে মনে হয় না৷ অমিয় চক্রবর্তী সনাতন বিশ্বাসকে মন্ত্রীসভার লিস্ট থেকে বাদ দিয়েছিলেন৷ কিন্তু শুনতে পাচ্ছি অম্লান চক্রবর্তীর মন্ত্রীসভায় সনাতন বিশ্বাসকে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে৷ সনাতন বিশ্বাস আরও ক-জন বিধায়ক নিয়ে দল ছাড়ার হুমকি দিয়েছিলেন৷ সেটাতেই সম্ভবত কাজ হয়েছে৷ এই অবস্থায় সনাতন বিশ্বাস অম্লান চক্রবর্তীকে চটাবে না৷ সুতরাং আমি বলব, তোমরা অন্যভাবে ভাবো৷ অন্য কোনো দিক দিয়ে এক্সপ্লোর করা যায় কি না সেটা দ্যাখো৷’

‘অন্য দিকও আমার ভাবা আছে৷ সেখানেও যেতে হবে৷ কিন্তু তার আগে সনাতন বিশ্বাসের সঙ্গে একবার দেখা করব৷ এনিওয়ে, অন্য দিকের কথা যেটা বললাম, তার জন্য তোমায় আমাকে একটা ঠিকানা আর একজনের সম্পর্কে ডিটেইলস জোগাড় করে দিতে হবে৷ খুব তাড়াতাড়ি৷’

‘কে সে?’ জানতে চাইল অর্জুনদা৷

‘একটা মেয়ে৷ নাম মৌবনী চক্রবর্তী,’ বলল টাপুরদি৷

এ আবার কে ঠিক বুঝতে পারলাম না৷ অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, অর্জুনদা স্থিরদৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে৷

‘কী জানতে চান বলুন, বেশি টাইম দিতে পারব না,’ সনাতন বিশ্বাস বললেন৷

এই মুহূর্তে সনাতন বিশ্বাসের অফিস ঘরে বসে আছি আমরা৷ এই অবধি আসতে আমাদের বিশেষ বেগ পেতে হয়নি৷ টাপুরদি আজ সকালেই সনাতন বিশ্বাসের সেক্রেটারিকে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিল নিজেদের রিপোর্টার হিসেবে পরিচয় দিয়ে৷ রিপোর্টার জানার পরেও সনাতন বিশ্বাস রাত দশটায় আসতে বলেন৷ কিন্তু এখানে এসে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম, তাতে মনে হচ্ছে না এলেই ভালো হত৷

সনাতন বিশ্বাসের বয়স পঞ্চান্নর আশেপাশে হবে৷ তাঁর ইতিহাস ভূগোল সম্পর্কে কিছুটা খোঁজখবর নিয়েই এসেছিলাম৷ দক্ষিণ চবিবশ পরগনার একটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত বিধায়ক তিনি৷ ওই কেন্দ্র থেকেই বরাবর তিনি দাঁড়িয়ে আসছেন৷ যদিও এর আগে মাত্র একবারই জিতেছেন৷ প্রায় তিরিশ বছর ধরে রাজনীতি করছেন, অমিয়বাবুর দলে আছেন বছর দশেক ধরে৷ আগে অন্য দলে ছিলেন, কিন্তু সেখান থেকে নিয়মভঙ্গের জন্য বিতাড়িত হন৷ তারপর অমিয়বাবুর দলে যোগ দেন৷ কিন্তু অমিয় চক্রবর্তীও তাঁর ব্যবহারে সন্তুষ্ট ছিলেন না৷ শেষের দিকে ফাটলটা আরও গভীর হয়েছিল৷ কিন্তু যেহেতু সনাতন বিশ্বাসের কেন্দ্রে তাঁর কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্যতা আছে, আর তাঁর বেশ কিছু বশংবদ নেতা ও বিধায়ক আছে, সর্বোপরি সনাতন বিশ্বাসের সোজা ও বাঁকা পথে উপার্জিত প্রচুর টাকা আছে ভোট কেনার মতো, তাই ভোটের আগে অমিয় চক্রবর্তী তাকে সরাতে চাননি৷ কিন্তু সনাতন বিশ্বাসের ধারণা ছিল, তিনি অমিয় চক্রবর্তীর মন্ত্রীসভায় থাকবেন৷ তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ করেননি অমিয় চক্রবর্তী৷

সনাতন বিশ্বাস আদতে দক্ষিণ চবিবশ পরগনার ফুলডুবি গ্রামের ছেলে৷ স্কুলের গণ্ডি পেরোননি৷ অসামাজিক কাজকর্মে হাত পাকিয়েছিলেন কৈশোর থেকেই৷ অল্পবয়সেই এলাকায় বেশ দাদা হয়ে ওঠেন৷ সেখান থেকে সোজা উড়ান রাজনীতিতে৷ নানান ঘাটের জল খেয়ে আপাতত অম্লানবাবুর দলে আছেন৷ বেশ বড়ো প্রাচীর ঘেরা চারতলা বাড়ির একতলায় তার অফিস৷ এলাকার লোকেরা নানান প্রয়োজনে দেখা করতে আসে এমএল-এর সঙ্গে৷ আমাদের সামনের বারান্দায় পাতা সার সার বেঞ্চের একটাতে বসে অপেক্ষা করতে হল৷ একজনকে জিজ্ঞাসা করতে জানলাম, এমএলএ সাহেব অফিসেই আছেন৷ জরুরি মিটিং চলছে৷ ঘরের দরজা বন্ধ৷ এখন রাত বলেই বোধ হয় দর্শনাভিলাষীদের ভিড় নেই৷ আমাদের পাশের বেঞ্চে লুঙ্গি আর ফেজ টুপি পরা এক গ্রাম্য চেহারার লোক বসে আছে৷ উদাস দৃষ্টিতে আকাশের তারা দেখছে৷ প্রায় আধ ঘণ্টা পরে জরুরি মিটিং শেষ হল৷ দরজা খুলে একটি বছর বিশ-বাইশের রোগা বউ মাথায় ঘোমটা টেনে বেরিয়ে এসে আমাদের পাশের বেঞ্চে বসা বুড়োটার কাছে এসে দাঁড়াল৷ বুড়ো লোকটার উদাস দৃষ্টি এতক্ষণে বেশ সজাগ হয়ে উঠেছে৷ তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘কী রে, জমিটার কথা কী বলল সাহেব? ফয়সালা আমাদের হকে হবে তো?’

বউটি মুখে কিছু না বলে মাথা নীচু করে উপর-নীচে মাথা নাড়ল৷ বুড়োটা আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘কালকে আবার আসতে হবে?’

বউটি এবার আমাদের দেখতে পেল৷ সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর না দিয়ে বারান্দা থেকে নেমে হনহন করে বাইরের দিকে হাঁটা দিল৷ বুড়োও তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল৷ টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম আমি৷ টাপুরদি দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরেছে দেখলাম৷ আমি বললাম, ‘চলো টাপুরদি, ফিরে যাই৷ অর্জুনদা ঠিকই বলেছিল৷ লোকটা ভালো না৷ তার উপর এত রাত হয়ে গেছে৷’

‘চিন্তা করিস না৷ অর্জুন বাইরে আছে৷ একটা কল করলেই চলে আসবে৷ আর আমি তো আছিই৷ চল, কাজটা যেটা করতে এসেছি, করে নিই৷’

সনাতন বিশ্বাসের অফিসঘরটা বেশ বড়ো৷ একটা বড়ো সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পেছনে একটা দামি রিভলভিং চেয়ার ও সামনে পরপর চারখানা চেয়ার রাখা৷ ঘরের একপাশে আরও পাঁচ ছ’টা চেয়ার সারি দিয়ে রাখা আছে দেখলাম৷ বোঝা যায়, এই ঘরে বেশ লোকসমাগম হয়৷ একপাশে একটা বেড কাম ডিভান রাখা আছে৷ সেদিকে তাকিয়ে অস্বস্তিতে চোখ ফিরিয়ে নিলাম৷ আমরা ঢুকতেই সনাতন বিশ্বাস উদ্ধত গলায় বলল, ‘কী জানতে চান বলুন৷ বেশি টাইম দিতে পারব না৷’

টাপুরদি বলল, ‘আপনার একটা ইন্টারভিউ চাই৷ ফোনে বলেছিলাম সকালে৷’

সনাতন বিশ্বাস এবার টাপুরদি ও আমার সারা শরীরের উপর আলগোছে দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন৷ তারপর টেবিলের সামনে ঝুঁকে এসে বললেন, ‘এই যে রাতবিরেতে ইন্টারভিউ করে বেড়াও, বাড়ির লোকে কিছু বলে না?’

সনাতন বিশ্বাসের মুখ থেকে ভকভক করে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে৷ কথা জড়িয়ে আসছে৷ টাপুরদি মুচকি হেসে মাথা নাড়ল, বলল, ‘না তো, কই কিছু তো বলে না৷’

‘এইজন্যই তো৷ এইজন্যই মেয়েদের সঙ্গে এত রেপ হয়,’ মাথা নেড়ে একটা বিচ্ছিরি হাসি হেসে সনাতন বিশ্বাস, ‘মেয়েমানুষের জায়গা হল ঘরে৷ বয়স তো খুব কম বলে মনে হয় না৷ বিয়ে-থা করে সংসার সামলাও, বাচ্চা মানুষ করো৷ তা না করে রাতবিরেতে ছেলেদের মতো রাস্তায় ঘুরে যদি বলো রেপ কেন হল, তাহলে চলবে? অ্যাঁ? ছেলেদের মুখের সামনে খাবার সাজিয়ে দিয়ে বলবে, খেল কেন, চলবে তাহলে?’

একটু আগে এই ঘর থেকে মেয়েটির মাথা নীচু করে ঘোমটা টেনে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা মনে পড়ে গেল আমার৷ তার উপর এইসব কথাবার্তা শুনে গা-টা ঘিনঘিন করে উঠল৷ কী অসহ্য নোংরা লোক এই সনাতন বিশ্বাস৷ ছি!

টাপুরদির মাথা আমার থেকে অনেক ঠান্ডা৷ আমি এক ঝটকায় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে গেলাম৷ টাপুরদি টেবিলের তলা দিয়ে আমার হাত চেপে ধরল৷ সনাতন বিশ্বাসের কথার জবাব না দিয়ে মুখের হাসি বজায় রেখে বলল, ‘তাহলে ইন্টারভিউটা শুরু করি?’

টেপ রেকর্ডারটা বার করে টেবিলের উপর রাখল টাপুরদি৷ সেদিকে তাকিয়ে সনাতন বিশ্বাস বললেন, ‘করুন৷’

‘আপনি তো অনেক বছর ধরে রাজনীতিতে আছেন৷ কীভাবে রাজনীতিতে এলেন আপনি?’

সনাতন বিশ্বাস একটু ভাবলেন৷ তারপর বললেন, ‘সেসব অনেক গপ্পো৷ রাজনীতিতে আসার আগে আমি সমাজসেবা-টেবা করতাম আর কী৷ বিনয় বোস তখন বিরোধী নেতা৷ তা বিনয় বোসের এক খুড়তুতো ভাই ছিল মোহন৷ মোহন আমার বন্ধু মানুষ৷ মানে এক বোতলের ইয়ার আর কী৷ এসব আবার লিখবেন না যেন৷ তা বন্ধুর জন্য একটু-আধটু কাজকর্ম করে-টরে দিতাম৷ তা মিথ্যে বলব না, সেও আমাকে সময়-অসময়ে নানান লাফড়া থেকে বাঁচাত৷ পরে ভাবলাম, কদ্দিন আর অমন চরে বেড়িয়ে জীবন কাটাব৷ মোহনকে ধরে দলে নাম লেখালাম৷ তিরিশ বছর ধরে রাজনীতি করছি ম্যাডাম৷’

টাপুরদি খুব সহমর্মী মুখ করে বলল, ‘সে তো বটেই৷ আপনার মতো পোড়-খাওয়া রাজনীতিবিদ রাজ্য রাজনীতিতে ক-জন আছেন? আমার তো ধারণা ছিল এবার আপনি একটা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব পাবেন৷ সেটা হল না দেখে শুধু আমি কেন, বহু মানুষ খুব অবাক হয়েছেন৷ এটা কিন্তু খুব অন্যায় হল আপনার সঙ্গে৷ আপনি তো দলকে কম দেননি৷’

সনাতন বিশ্বাসের চোয়াল কঠিন হল৷ গম্ভীর গলায় বলল, ‘দেবে না মানে? শালা শুয়োরের বাচ্চা, আলবাত দেবে৷ সনাতন বিশ্বাসকে চেনে না শালা৷ এই সনাতন বিশ্বাস চাইলে ওদের সরকার বানানোর স্বপ্নে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিতে পারে বুইলেন?’

টাপুরদি মুখ দিয়ে চুক চুক শব্দ করে বলল, ‘সেই তো, অমিয় চক্রবর্তীর কাছে আপনি গিয়েছিলেন৷ তা তিনি নাকি রাজি হননি আপনাকে মন্ত্রীত্ব দিতে৷ আপনার নিশ্চয়ই খুব রাগ হয়েছিল, তাই না? আপনার জায়গায় আমি হলে তো রাগের চোটে খুনই করে ফেলতাম৷’

সনাতন বিশ্বাস চোখ পিটপিট করে তাকালেন টাপুরদির দিকে৷ নেশার ঘোরে ভদ্রলোক বোধ হয় ভুলেই গেছের যে রেকর্ডার অন আছে৷ খিকখিক করে হেসে বললেন, ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে৷ সনাতন বিশ্বাস অত সহজে কাউকে ছাড়ে না৷ সনাতন বিশ্বাসের ল্যাজে পা দিলে পোকার মতো পিষে মারে সনাতন বিশ্বাস৷ মরতে হল তো অমিয় চক্কোত্তিকে? কি?’

টাপুরদি বিগলিত হেসে বলল, ‘আমি কিন্তু আপনার দারুণ ফ্যান, স্যার৷ আপনি যদি অমিয় চক্কোত্তিকে এমনি ক্ষমা করে দিতেন, তাহলে আমার ভালো লাগত না৷ কিন্তু এখন অম্লান চক্কোত্তি কি আপনাকে মন্ত্রিত্ব দেবে?’

‘দেবে দেবে৷ না দিলে ওর দশাও ওর বাপের মতো হবে৷ আমি সনাতন বিশ্বাস৷ আমার সঙ্গে লাগতে এলে ফল ভালো হয় না,’ চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন সনাতন বিশ্বাস৷ আমার সারা শরীর শিউরে উঠল৷ মনে হল, এই রাতে প্রেতপুরীর মতো এই বাড়িতে একটা লম্পট মাতাল ক্রিমিনালের সামনে বসে এভাবে সহজভাবে কথা বলতে কীভাবে পারে টাপুরদি? ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে৷ মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে ছুটে পালিয়ে যাই এখান থেকে৷

হাই তুললেন সনাতন বিশ্বাস তারপর জিব উলটে টাকরায় একটা অশালীন শব্দ করলেন৷ তারপর অর্ধনিমীলিত চোখে একটা ইশারা করে বললেন, ‘এবার যাও মামনিরা৷ বেশি রাত অবধি সনাতন বিশ্বাসের গুহায় থাকতে নেই৷ যাও যাও৷’

রেকর্ডার বন্ধ করল টাপুরদি৷ সনাতন বিশ্বাস লাল চোখে সেদিকে তাকিয়ে জিভ দিয়ে নীচের ঠোঁট চেটে বললেন, ‘ইন্টারভিউটা ডিলিট করে দিয়ো মামনি৷ এসব ছাপতে নেই৷ কচি কচি মেয়ে তোমরা, রাস্তাঘাটে কখন কী হয়ে যায় বলা তো যায় না৷ দুনিয়া খুব খারাপ, বুইলে না?’

উঠে দাঁড়াল টাপুরদি৷ বেরিয়ে যেতে যেতে আবার পেছন ফিরে দাঁড়াল৷ বলল, ‘ধনঞ্জয় মণ্ডলকে তাহলে আপনিই পাঠিয়েছিলেন অমিয় চক্রবর্তীকে খুন করতে?’

বুকটা কেঁপে উঠল আমার৷ পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল যেন৷ টাপুরদি ও সনাতন বিশ্বাস একে অপরের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে৷ আমি টাপুরদির হাত ধরে টানলাম, ফিসফিস করে বললাম, ‘চলো, প্লিজ৷’

টাপুরদির ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল৷ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চল৷’ তারপর সনাতন বিশ্বাসের দিকে একবারও না তাকিয়ে ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে এল টাপুরদি৷

‘ইউ আর জাস্ট ইনকারিজিবল, টাপুর! তুমি ওরকম পরিস্থিতি দেখেও কীভাবে ভিতরে গেলে? তোমার ফিরে আসা উচিত ছিল,’ অর্জুনদা বলল, ‘তুমি জানো, এখানে আমার কতটা টেনশন হচ্ছিল? দোষটা আমার৷ সনাতন বিশ্বাসের রেপুটেশন জানার পরেও তোমার অদ্ভুত সব আইডিয়ায় আমার রাজি হওয়াই উচিত হয়নি৷’

সনাতন বিশ্বাসের বাড়ির গেট থেকে বেরিয়ে এখনও আমি স্বাভাবিক হতে পারিনি৷ এর আগেও বিভিন্ন কেসের সূত্রে নানারকম লোকেদের মুখোমুখি হতে হয়েছে৷ সময়ে-অসময়ে সাংঘাতিক সব লোকেদের ডেরায় হানা দিতে হয়েছে৷ কিন্তু সনাতন বিশ্বাসকে সামনে থেকে দেখে মনে হল, এই লোক হাসতে হাসতে মানুষ খুন করতে পারে৷ চোখের দৃষ্টি কী বিশ্রী, ছি, এমন মানুষ নাকি জনপ্রতিনিধি! এদের হাতেই দেশের রাশ৷ ভাবতে লজ্জা হয় এই দেশ পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র৷ অথচ, এমন সব নোংরা মানুষ সেই গণতন্ত্রের কাঠামো৷

অর্জুনদা বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই অপেক্ষা করছিল৷ আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি৷ অর্জুনদার সামনে পৌঁছেই গড়গড় করে ভিতরের সব কাহিনি উগরে দিলাম৷ অর্জুনদার কথা শুনে টাপুরদি শুধু বলল, ‘যাওয়াটা দরকার ছিল অর্জুন৷ দরকার না থাকলে তো যেতাম না৷’

অর্জুনদা আর কথা বাড়াল না৷ গম্ভীর মুখে বলল, ‘গাড়িতে ওঠো৷’

সারা রাস্তা কেউ কোনো কথা বলল না৷ আমারও কথা বলতে ইচ্ছে হল না আজ৷ সনাতন বিশ্বাসের কথা মনে হলেই যেন বিবমিষা জাগছে৷ বাড়ির সামনে নেমে টাপুরদি বলল, ‘অর্জুন, আমার কাছে এখন সব কিছুর চেয়ে তন্ময়কে বাঁচানোটা বেশি জরুরি৷ তার জন্য যদি আমায় বাঘের গুহায় ঢুকতে হয়, তাও ঢুকব৷ একটা মানুষের জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মুহূর্তে আমার কাছে আর কিছু নয়৷ আশা করি তুমি বুঝবে৷’

আমি দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকাটা সমীচীন বোধ করলাম না৷ সম্পর্কগুলো সবসময় সোজা পথে হাঁটে না জানি৷ বিস্তর চড়াই-উতরাই বন্ধুর পথ অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে, মতপার্থক্য সত্ত্বেও পরস্পরের মতকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই একটা সম্পর্ক পূর্ণতা পায়৷ টাপুরদি আর অর্জুনদার সম্পর্কটার শুরু থেকে সাক্ষী থেকেছি আমি৷ আমি জানি, অর্জুনদা ও টাপুরদির দুজনের মনেই পরস্পরের প্রতি সেই শ্রদ্ধার জায়গাটা আছে৷ আজ হয়তো দুজনের মধ্যে দূরত্ব এসেছে৷ কিন্তু আমি নিশ্চিত, দুজন পরিণত মনের মানুষ নিজেদের ইগোকে সম্পর্কের মাঝে আসতে দেবে না৷

রাতে ঘুম ভালো হল না৷ ঘুমের মধ্যেও সনাতন বিশ্বাস ফিরে ফিরে আসছিল দুঃস্বপ্ন হয়ে৷ সকালে উঠে চটপট তৈরি হয়ে নিলাম৷ গতকালই অর্জুনদা অম্লান চক্রবর্তীর একমাত্র মেয়ে মৌবনী সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জোগাড় করে দিয়েছিল টাপুরদিকে৷ আগেই টাপুরদির মুখে শুনেছিলাম, অম্লান চক্রবর্তীর স্ত্রী বিয়ের পর বছর দুয়েকের মধ্যেই আত্মহত্যা করেন৷ তাঁদের একটি মেয়ে আছে যে তার দাদু-দিদার কাছে থাকে৷ পরশুদিন টাপুরদির মুখে মৌবনী চক্রবর্তী নামটা শুনে চিনতে পারিনি৷ পরে বুঝলাম, এই-ই অম্লান চক্রবর্তীর সেই মেয়ে৷ কিন্তু সে জ্ঞান হওয়া ইস্তক দাদু-দিদার কাছে মানুষ, এই কেসে তার সঙ্গে দেখা করে লাভ কী হবে সেটা বুঝতে পারিনি৷ গাড়িতে করে যেতে যেতে সেটাই জিজ্ঞাসা করলাম টাপুরদিকে৷ টাপুরদি বলল, ‘আমি মৌবনীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি কে বলল তোকে?’

‘মানে?’ বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম আমি, ‘তুমি তো মৌবনীর ঠিকানাই চাইলে অর্জুনদার কাছে৷’

‘হুম, তা চাইলাম৷ কিন্তু সেই ঠিকানায় কি মৌবনী একা থাকে?’ মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

তাই তো৷ এই কথাটা তো আমার মনে হয়নি৷ মৌবনী ওর দাদু-দিদার সঙ্গে থাকে৷ কিন্তু তাঁদেরই বা এই কেসের সঙ্গে কী সম্পর্ক? জানতে চাইলাম টাপুরদির কাছে৷

টাপুরদি বলল, ‘সম্পর্ক কিছু যে আছেই, তা বলতে পারি না৷ কিন্তু অমিয় চক্রবর্তীর ইতিহাস কি শুধু বাইরে বাইরেই খুঁজব রে? ঘরের ভিতরে খুঁজতে হবে না?’

‘কিন্তু সেটা এঁরা কী করে জানবেন? তাও আবার এতদিন পরে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘অম্লান চক্রবর্তীর শ্বশুর-শাশুড়ি মেয়ে হারিয়েছেন৷ অম্লানবাবু বা তাঁর পরিবারের লোকজনের উপর তাঁদের রাগ থাকা স্বাভাবিক৷ আর সাধারণত নতুন বিয়ের পর মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি সংক্রান্ত কথাবার্তা বাবার সঙ্গে না হোক, মায়ের কাছে শেয়ার করেই৷ সুতরাং সেই সূত্রে অমিয় চক্রবর্তীর সংসারের কথা এঁদের কিছুটা হলেও জানা উচিত৷’

আমি আর কথা বাড়ালাম না৷ টাপুরদির মাথার ভিতর কী চলছে সেটা টাপুরদিই জানে৷

অর্জুনদার দেওয়া ঠিকানা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হল না তেমন৷ সিঁথির মোড় পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে বাঁ-দিকের রাস্তা ধরে সামান্য এগোলেই বুক সমান দেওয়াল ঘেরা ছিমছাম দোতলা বাড়ি৷ গেট খুলে কয়েক পা এগিয়ে গ্রিলের ভিতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে কলিংবেল টিপল টাপুরদি৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষা৷ দ্বিতীয়বার কলিংবেল টেপার আগেই একটি সতেরো-আঠারো বছরের ঝলমলে মেয়ে বেরিয়ে এল৷ এই বয়সের স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য বাদ দিলেও মেয়েটির চেহারার মধ্যে অদ্ভুত একটা কোমলতা আছে৷ দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়, মন শান্ত হয়ে আসে৷

‘কাকে চাইছেন?’ জিজ্ঞাসা করল মেয়েটি৷ মনে হল, এই-ই মৌবনী৷

টাপুরদি বলল, ‘মৌবনী, বাড়িতে বড়োরা কেউ আছেন?’

অচেনা মানুষের মুখে নিজের নাম শুনে মৌবনী অবাক হল৷ বলল, ‘দিদান আছে৷ আসুন, ভিতরে আসুন৷’

গ্রিলের গেটের তালা খুলে একপাশে সরে দাঁড়াল মৌবনী৷ আমরা জুতো খুলে ভিতরে বারান্দায় পা রাখতে সে বলল, ‘আপনারা ভিতরে বসুন৷ দিদান পুজোয় বসেছে৷ দাদুন বাজারে গেছে৷ একটু অপেক্ষা করতে হবে৷’

পরদা সরিয়ে বসার ঘরে ঢুকলাম৷ ছিমছাম পরিপাটি করে সাজানো ঘর৷ টাপুরদি হেসে বলল, ‘তুমি বোসো, ততক্ষণ বরং তোমার সঙ্গে গল্প করি৷’

মৌবনী বেশ সপ্রতিভ মেয়ে৷ আমাদের মুখোমুখি চেয়ারে বসল৷ বলল, ‘আপনারা কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন? দিদান, না দাদুন?’

টাপুরদি মুচকি হেসে বলল, ‘যদি বলি তোমার সঙ্গে?’

‘আমার সঙ্গে? কেন?’ খুব অবাক হয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল মৌবনী৷

টাপুরদি সেকথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কী পড়ো?’

‘ক্লাস টুয়েলভে পড়ি৷ এই বছর বোর্ড দেব,’ বলল মৌবনী৷

‘কোথায় পড়ো?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল৷

‘অক্সিলিয়াম কনভেন্টে,’ উত্তর দিল মৌবনী৷

‘সাবজেক্ট?’

‘হিউম্যানিটিজ,’ বলল মৌবনী, ‘তবে আমার লিটারেচার পড়তেও খুব ভালো লাগে৷’

‘তাই? বাহ! খুব ভালো৷ কার লেখা পছন্দ?’ টাপুরদি জানতে চাইল৷ মনে হচ্ছে টাপুরদি যেন হালকা চালে আড্ডা দিতে এসেছে এখানে৷

‘আমি সব পড়ি, জানেন৷ কিচ্ছু ছাড়ি না৷ বাংলা, ইংরেজি দুই ভাষাতেই যা বই পাই, পড়ে ফেলি৷ রোজ নিয়ম করে খবরের কাগজ পড়ি৷ এটা অবশ্য দাদুন শিখিয়েছে৷ দাদুন আমায় লাইব্রেরিতেও মেম্বারশিপ করিয়ে দিয়েছে৷ তবে এই বছর বোর্ড তো৷ তাই বাধ্য হয়েই রাশ টানতে হচ্ছে একটু,’ হেসে বলল মৌবনী৷

‘তা তো হবেই৷ ক’টা দিন একটু মন দিয়ে পড়ে নাও৷ তারপর অন্য বই পড়ার অনেক সময় পাবে৷ এরপর কী নিয়ে পড়াশোনা করতে চাও? কী হতে চাও?’

মৌবনী মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘দেখি রেজাল্ট কী হয়৷’

এবার টাপুরদি সামান্য গম্ভীর গলায় বলল, ‘তুমি জানো আমরা এখানে কেন এসেছি?’

‘না,’ মাথা নাড়ল মৌবনী৷

টাপুরদি বলল, ‘তুমি তো রোজ খবরের কাগজ পড়ো বললে৷ অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর খবর পড়েছ নিশ্চয়ই?’

মৌবনীর মুখ এবার গম্ভীর হল৷ মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘পড়েছি৷’

‘কে রে মৌ? কে এসেছে?’ বলতে বলতে এক বয়স্ক মহিলা ঘরে ঢুকলেন৷ আমাদের দেখে অবাক দৃষ্টিতে একটু থমকালেন৷ তারপর বললেন, ‘আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না৷’

টাপুরদি উঠে দাঁড়াল৷ আমিও দাঁড়ালাম৷ দুই হাত জোড় করে নমস্কার করে টাপুরদি বলল, ‘আমার নাম সংঘমিত্রা ব্যানার্জি৷ আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ৷ আর এ হল আমার সহকারী, তথা বন্ধু মৈথিলী সেন৷’

‘গোয়েন্দা? গোয়েন্দা কেন?’ আঁতকে উঠলেন ভদ্রমহিলা৷

‘ওঁরা অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে এসেছেন,’ বলল মৌবনী৷

‘অমিয় চক্রবর্তী? এখানে কেন? আমরা কী জানি?’ প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন ভদ্রমহিলা৷ ধপ করে চেয়ারে বসে গড়গড় করে যন্ত্রের মতো বললেন, ‘এখানকার ঠিকানা কোত্থেকে পেলেন আপনারা? মৌ কিছু জানে না৷ ও বাচ্চা মেয়ে৷ আপনারা এখান থেকে যান৷’

টাপুরদি নরম গলায় বলল, ‘আপনি ভয় পাবেন না৷ আমরা আপনাদের নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করব না৷ মৌবনী খুব ছোটো৷ ওর মনের উপর যাতে কোনো চাপ না পড়ে, সেটা দেখা আমার কর্তব্য৷ আর সত্যি বলতে কী, মৌবনীর সঙ্গে নয়, বরং আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই আমি৷’

‘আমার সঙ্গে? আমার সঙ্গে কী কথা? আমরা কেউ কিছু জানি না৷ আমাদের বিরক্ত করবেন না৷ অমিয় চক্রবর্তীর ব্যাপারে আমরা কী করে জানব?’ বলে প্রায় কেঁদে উঠলেন ভদ্রমহিলা৷ মৌবনী গিয়ে দিদানের কাঁধে হাত রাখল৷ চাপা গলায় বলল, ‘আহ দিদান, অমন করছ কেন? ওঁরা কী জানতে চান শোনোই না!’

‘কে কী জানতে চায় রে?’ বলে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বাইরে থেকে বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন৷ আমাদের দেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন৷ তারপর বললেন, ‘আপনারা? আপনাদের তো ঠিক...’

কথা শেষ করার আগেই মৌবনী বলল, ‘দাদুন, এঁরা অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর ব্যাপারে কথা বলতে এসেছেন, প্রাইভেট ডিটেকটিভ৷’

টাপুরদি নিজের কার্ড এগিয়ে দিল ভদ্রলোকের হাতে৷ সেটায় চোখ বুলিয়ে একবার মৌবনীর দিকে, একবার নিজের স্ত্রীর দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে টাপুরদির দিকে তাকালেন ভদ্রলোক৷ তারপর বললেন, ‘বসুন৷ কী জানতে চান বলুন৷ শুধু একটা অনুরোধ৷ মৌ খুব ছোটো৷ ওকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না৷ যা জানতে চান, আমাদের জিজ্ঞাসা করুন৷ আমি বলব৷’

ভদ্রলোকের স্ত্রী ককিয়ে উঠলেন, ‘কী বলছ তুমি? তুমিই না বলেছিলে, ওই বাড়ির কথা, ওদের সম্পর্কে কোনো কথা এই বাড়িতে আর কোনোদিন আলোচনা হবে না?’

ভদ্রলোকের চোয়াল শক্ত হল৷ বললেন, ‘বলেছিলাম৷ ভেবেছিলাম মৌকে ওই বাড়ির আওতা থেকে বের করে আনব৷ ওকে সুস্থ পরিবেশে বড়ো করব৷ কিন্তু এখন মৌ বড়ো হয়েছে৷ কতদিন আর এভাবে ওকে সব থেকে দূরে রাখা সম্ভব? আজ না হয় কাল এই পরিস্থিতির সম্মুখীন ওকে হতেই হবে৷ ওর জীবনের সিদ্ধান্ত ওকেই নিতে হবে৷ তার চেয়ে এই-ই ভালো৷’

‘আপনার মেয়ে মধুরিমা অম্লান চক্রবর্তীর স্ত্রী ছিলেন৷ শুনেছি তিনি আত্মহত্যা করেন৷ কেন?’ সরাসরি জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

মৌবনীর দাদুন একটু চুপ করে থেকে বলতে শুরু করলেন, ‘কোত্থেকে শুরু করি? আমার নাম অনিমেষ রায়৷ আমার স্ত্রী নীলিমা৷ মধুরিমা, আমাদের একমাত্র মেয়ে৷ লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল, জানেন? ছোটো থেকেই খুব চুপচাপ, শান্তশিষ্ট প্রকৃতির মেয়ে ছিল ও৷ পাড়ার সক্কলে খুব ভালোবাসত ওকে৷ ভালো গান গাইত, ছবি আঁকত, কবিতা লিখত৷ ভীষণ অভিমানীও ছিল৷ বকার দরকার পড়ত না ওকে৷ তবু যদি ওর মা কোনো কারণে বকত, কখনো উত্তর দিত না মেয়েটা৷ শুধু কয়েকদিনের জন্য ভীষণরকম চুপ হয়ে যেত৷’

‘কলেজে পড়াকালীন অম্লানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হল ওর৷ অম্লানের বাবা অমিয় চক্রবর্তী তখন এ রাজ্যের ডাকসাইটে বিরোধী নেতা৷ সরকারে না থাকলেও তাঁর দাপট কম নয়৷ অম্লানও কলেজে রাজনীতি করত৷ কে জানে কেমন করে আমার শান্তশিষ্ট মেয়েটা অমিয়র প্রেমে পড়ল!

‘আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ৷ আমি সরকারি চাকরি করতাম৷ তিন বছর আগে অবসর নিয়েছি৷ আমাদের জীবনযাপন খুব সাধারণ৷ একটা মাত্র মেয়ে৷ লেখাপড়া শিখবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে৷ ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দেব এ-রকমই আমি ও আমার স্ত্রী ভেবে রেখেছিলাম৷ বিশাল কিছু স্বপ্ন আমাদের ছিল না৷ অমিয় চক্রবর্তীর ছেলে ওদের সঙ্গে পড়ত জানতাম৷ কিন্তু মধু কলেজে রাজনীতির ধার মাড়াত না কখনো৷ কীভাবে যে ওদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হল আমাদের জানা নেই৷’

‘মধুর মুখেই জানতে পেরেছিলাম আমরা৷ ও কিছু লুকায়নি আমাদের থেকে৷ কোনোদিন মুখ ফুটে আমাদের থেকে কিছু চায়নি মেয়েটা৷ সেদিন চেয়েছিল৷ ও অম্লানকে ভালোবেসেছিল, বিয়ে করে সারাজীবন একসঙ্গে কাটাতে চেয়েছিল৷ খুব সরল ছিল আমাদের মেয়েটা, জানেন৷ বোঝেনি, ওদের সঙ্গে আমাদের মেলে না৷ ওরা আমাদের থেকে আলাদা৷ ওদের পারিবারিক মূল্যবোধ, নিয়মনীতি আমাদের মতো নয়৷ অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল ওর মা৷ সেদিন যদি আমাদের কথা মেনে নিত, আজ তাহলে হয়তো ও বেঁচে থাকত৷’

বৃদ্ধ মানুষ দুটোকে দেখে বড়ো কষ্ট হল৷ আমার বাবার কথা মনে পড়ে গেল৷ মেয়েকে হারিয়ে নাতনিকে আঁকড়ে বেঁচে আছে দুটি মানুষ৷ মনে হল, এখানে না এলেই বুঝি ভালো হত৷ শুধু এঁদের বেদনার জায়গাটা খুঁচিয়ে তোলা হল৷

টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘অম্লানবাবুর বাড়ি থেকে সবাই রাজি ছিলেন?’

মাথা নাড়লেন অনিমেষবাবু৷ বললেন, ‘নাঃ, ছিলেন না৷ অম্লানের রাজনৈতিক কেরিয়ার নিয়ে ওর মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল৷ অন্তত অত তাড়াতাড়ি ছেলে বিয়ে করুক, চাননি ওঁরা৷ সে তো আমরাও চাইনি৷ কিন্তু ওরা দুজন কাউকে না জানিয়ে বন্ধুদের নিয়ে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করল৷’

‘তারপর?’ জানতে চাইল টাপুরদি৷

‘তারপর আর কী? আমি সেই সময় খুব রেগে গেছিলাম৷ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, রাগের থেকে কষ্ট বেশি পেয়েছিলাম৷ ঠিক করেছিলাম, জীবনে আর মুখ দেখব না মেয়ের৷ তখন কী আর জানতাম, যে মেয়েটাই সেই ব্যবস্থা করে দেবে?’

অনিমেষবাবুর চোখ ছলছল করে উঠল৷ হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালেন তিনি৷ বললেন, ‘মধুর বিয়ের পর থেকে আমার সঙ্গে ওর আর কথাবার্তা হত না৷ তবে আমার স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলত ও৷ শত হলেও মা তো৷ বাবার মতো পাষাণপ্রাণ হতে পারেনি ও৷ মেয়ে সব কথাই মাকে বলত৷ বাকি কথাগুলো তাই ও-ই আপনাকে ভালো বলতে পারবে৷ আমি একটু আসছি৷ আপনারা কথা বলুন৷’

সারা ঘরে পিনপতন স্তব্ধতা নেমে এল৷ অনিমেষবাবু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন৷ একটুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না৷ তারপর নীলিমাদেবী বললেন, ‘বিয়ের পর মধু আর অম্লান এ বাড়িতে এসেছিল জোড়ে, আমাদের আশীর্বাদ নিতে৷ ইনি কথা বললেন না৷ আশীর্বাদ করলেন না৷ বলে দিলেন, মুখ দেখতে চান না ওদের৷ মেয়েটা মুখ চুন করে চোখের জলে ফিরে গেল৷ আমি তো মা, কী করে মেয়েকে ত্যাগ করি বলুন তো?’

‘বিয়ের এক সপ্তাহ পরে মধু একদিন ফোন করল আমায়৷ বলল, শ্বশুর-শাশুড়ি কথা বলেন না ওর বা অম্লানের সঙ্গে৷ কিন্তু অম্লান খুব ভালোবাসে ওকে৷ আমি শুনে সুখী হয়েছিলাম৷ প্রেমের বিয়েতে শুরু শুরুতে অমন রেগে থাকে অভিভাবকরা৷ আমার ইনিও তো রেগে ছিলেন৷ স্বামী ভালোবাসে, সেই অনেক৷ আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে৷ কিন্তু আমি ভুল ভেবেছিলাম৷’

‘মধু আমাকে প্রায়ই ফোন করত৷ ওর সংসারের সব খবরই পেতাম আমি৷ বিয়ের তিন মাসের মাথায় প্রেগনেন্সি কনফার্ম হল ওর৷ আমি বুঝতে পারছিলাম না খুশি হওয়া উচিত না দুঃখিত হওয়া উচিত৷ এত তাড়াতাড়ি সন্তান আসুক চাইনি আমরা৷ আরেকটু গুছিয়ে নিক ও, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়াটা আরও মজবুত হোক, তারপর আসুক সন্তান৷ কিন্তু যার আসার ছিল, সে তো এলই৷’

‘এইসময় থেকেই অম্লান আরও বেশি করে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে থাকল৷ মধুর কাছে শুনতাম, অম্লান চাইত সদ্যোজাত মেয়ের কাছে থাকতে, স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটাতে, কিন্তু ওর বাবা-মা চাইতেন না অম্লান সংসারে জড়িয়ে যাক৷ একটা সময় নাকি অম্লান সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে চাকরিবাকরি করবে, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার করবে৷ ওর আর ভালো লাগছিল না পলিটিক্স৷ ও সাধারণের জীবন চাইছিল৷’

‘বাচ্চা হওয়ার পর থেকেই অম্লানের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে৷ অমিয় চক্রবর্তী অম্লানকে পার্টির কাজে বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতে শুরু করেন৷ অবশ্য অমিয়বাবু বাড়িতে খুব কম সময়ই কাটাতেন৷ ছেলের সংসারে নাক গলানোর মতো সময় তাঁর ছিল না৷ কিন্তু মধুর শাশুড়ি চাইতেন অম্লান রাজনীতিতে আসুক৷ ছেলের প্রতি তাঁর ভীষণরকম অধিকারবোধ ছিল৷ অমিয়বাবুকে দিয়ে তিনিই অম্লানকে আরও বেশি করে রাজনৈতিক কাজকর্মে যুক্ত করতে থাকেন৷ ঝগড়াঝাঁটি করার মতো শাশুড়ি তিনি ছিলেন না৷ আমি বারদুয়েক দেখেছি ওঁকে৷ ব্যবহারে কোনো খুঁত পাবেন না আপনি৷ কিন্তু কথা বলে স্বস্তি হয় না৷’

‘অম্লান যত বাইরের দুনিয়ায় জড়িয়ে পড়তে থাকল, মধু তত একা পড়ে যেতে থাকল৷ মেয়েকে নিয়ে সারাদিন কেটে যেত ওর৷ আয়া, কাজের লোক সবই ছিল৷ তেমন কোনো কাজও করতে হত না ওকে৷ তবু যেন ভিতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছিল মেয়েটা৷ মাঝেমধ্যেই অম্লানের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া হত৷ মধু চাইত অম্লান ওকে, ওদের মেয়েকে আরও সময় দিক৷ অম্লানের কাছে আর সংসারে সময় কাটানোর মতো সময় ছিল না৷ যত দিন যাচ্ছিল, ততই ও আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়ছিল রাজনীতিতে৷ ততদিনে ওর মাথা থেকে নতুন বিয়ে, নতুন বউয়ের নেশা কেটে গেছে৷ রাজনীতি ছেড়ে সাধারণ জীবনযাপন করার ভূতও মাথা থেকে নেমে গেছে৷’

‘কবে কোন মুহূর্তে আমার মেয়েটা একাকিত্বে ভুগে ভুগে মনের অসুখ বাধিয়ে বসেছিল, কে জানে? শেষের দিকে আমাকেও ফোন করা কমিয়ে দিয়েছিল৷ আমি ফোন করলেও ওর গলাটা কেমন বিষণ্ণ, ক্লান্ত শোনাত৷ আমি বলেছিলাম, ‘ক’টাদিন বাড়িতে এসে থেকে যা৷’ বলত, ‘বাবা কি আমাকে মেনে নেবে?’ আমি বলেছিলাম, ‘তোর বাবাকে বোঝানোর দায়িত্ব আমার৷ তুই ওসব ভাবিস না মা৷ তুই বাড়ি আয়৷’ কিছু বলত না৷ আমার স্বামীকে তো আমি জানি৷ প্রথমে রাগ করলেও পরে মেয়ের জন্য সারাক্ষণ মন খারাপ থাকত তাঁর৷ ভেবেছিলাম ওর বাবাকে রাজি করিয়ে দুইজনে মিলে ও বাড়িতে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসব৷ কিন্তু মেয়েটা সেই সময়ই দিল না৷ তার আগেই কাণ্ডটা করে বসল৷ পরে শুনেছি, ওর নাকি ডিপ্রেশনের চিকিৎসা চলছিল৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমরা সেসব কিচ্ছু জানি না৷ মধু কখনো আমাদের সেই বিষয়ে কিছু বলেনি৷ সেরকম কিছু হলে তো আমি জানতাম, বলুন?’

এতক্ষণ নীলিমাদেবীর কথা শুনে যাচ্ছিলাম চুপচাপ৷ তিনি থামতে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘মধুরিমার মৃত্যুর পর অম্লানবাবুর কী প্রতিক্রিয়া ছিল?’

নীলিমাদেবী বললেন, ‘অম্লান সেই সময় ছিল না কলকাতায়৷ সেই সন্ধেতেই ও বাঁকুড়া গেছিল৷ যাওয়ার আগে নাকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খুব ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল৷ মৌয়ের জ্বর ছিল৷ মধু চেয়েছিল, অম্লান থেকে যাক৷ কিন্তু অম্লান রাজি হয়নি৷ বলেছিল, মেয়েকে দেখার জন্য বাড়িতে আরও অনেক লোক আছে৷ দরকার হলে ডাক্তার বাড়িতে থাকবে সারারাত৷ কিন্তু ওকে যেতেই হবে৷ ও চলে যাওয়ার পর মধু দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল কাঁদতে কাঁদতে৷ তারপর দরজা ভেঙে খুলতে হয় ওর মৃতদেহ বের করার জন্য৷ ছোট্ট মেয়েটা একা বিছানায় শুয়ে কাঁদছিল৷ এসব কথা ওদেরই বাড়ির এক কাজের লোকের কাছে আমার শোনা৷’

‘আমরা খবর পেয়ে ও বাড়ি যাই৷ অম্লানও ফিরে আসে৷ অম্লান খুব কান্নাকাটি করছিল৷ মধুকে বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছিল৷ পাগলের মতো করছিল৷ তারপর দুইবার অজ্ঞানও হয়ে গেল আমাদের সামনে৷ অমিয়বাবু ছিলেন বাড়িতে৷ তিনি ছেলেকে সামলাতে চেষ্টা করছিলেন৷ কিন্তু অম্লানকে সামলানো যাচ্ছিল না৷ আমার আর তখন এর বেশি দেখার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না৷’

‘মৌবনীকে যে আপনারা আপনাদের কাছে নিয়ে এলেন, অম্লানবাবু আপত্তি করেননি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘না৷ অমিয়বাবু অবশ্য বাধা দিয়েছিলেন৷ বলেছিলেন, তাঁদের বংশের মেয়ে তাঁদের বাড়িতেই থাকবে৷ কিন্তু আমার স্বামী তখন হুমকি দিয়েছিলেন, যে মৌকে আমাদের না দিলে তিনি আদালত অবধি যাবেন৷ এরপর অম্লানের মা-ও বলেন, অম্লান কাজে ব্যস্ত থাকবে, অত ছোটো বাচ্চাকে কে যত্ন-আত্তি করতে পারবে? তার চেয়ে ও আমাদের কাছেই থাকুক৷ তবে অম্লান আমাদের বাধা না দিলেও চেয়েছিল মেয়ে ওর কাছে থাকুক৷ বার বার বলেছিল, মধু চলে গেল৷ মেয়েও যদি না থাকে, তাহলে কী নিয়ে বাঁচবে ও৷ কিন্তু আমার স্বামী শোনেননি৷ মৌকে আমরা আমাদের কাছে নিয়ে আসি,’ বললেন নীলিমাদেবী৷

‘এখন কি অম্লানবাবু মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘আমি রাখতে দিইনি,’ বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন অনিমেষবাবু৷ আসত ও এখানে৷ মেয়েকে দেখতে চাইত৷ দেখুন, আমরা এ পাড়ায় অনেকদিন ধরে থাকি৷ অম্লানের মতো হেভিওয়েট নেতা আসা-যাওয়া করলে পড়শিরা কৌতূহলী হয়ে ওঠে৷ মেয়েকে তো আমরা হারিয়েছি ওই পলিটিক্সের জন্য৷ নাতনিকে হারাতে চাই না৷’

বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছি, মৌবনী এগিয়ে এল৷ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘বাবার সঙ্গে আমার দেখা হয়৷ বাবা মাঝে মাঝে স্কুল ছুটির সময় আমার স্কুলের বাইরে দেখা করতে আসে৷ ঠাম্মির কাছেও বাবা আমায় নিয়ে গিয়েছে দু’দিন৷ দাদুন দিদান জানে না৷ ওঁদের বলবেন না প্লিজ৷ ওঁরা কষ্ট পাবে৷’

টাপুরদি বিস্মিত দৃষ্টিতে মৌবনীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল৷ মৌবনী আবারও সেরকমই মৃদুস্বরে বলল, ‘আপনি তখন জিজ্ঞাসা করছিলেন না, আমি বড়ো হয়ে কী হতে চাই? আমি বাবার মতো পলিটিশিয়ান হতে চাই৷ ঠাম্মি আমায় বলেছে, আমাদের বংশে রাজনীতি সকলের রক্তে৷ আমাকেও সেই ধারা বজায় রাখতে হবে৷ আর হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন, আমার বাবা খুব ভালো, আমায় খুব ভালোবাসে৷’

‘মৌ,’ কখন বাইরে বেরিয়ে এসেছেন অনিমেষবাবু খেয়াল করেনি৷

আমাদের সামনে এসে হাত দিয়ে গেট খুলে দিলেন তিনি৷ মৌবনীর দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তুই ঘরে যা মা৷’

মৌবনী একবার দাদুর দিকে আরেকবার আমাদের দিকে তাকিয়ে ভিতরে চলে গেল৷ খেয়াল করলাম যাওয়ার আগে টাপুরদির দিকে তাকিয়ে সে চোখের ইশারা করল, যাতে টাপুরদি অনিমেষবাবুকে কিছু বলে না দেয়৷

মৌবনী ভিতরে চলে যাওয়া অবধি সেদিকে তাকিয়ে রইলেন অনিমেষবাবু৷ তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বললেন, ‘মৌ আপনাদের কী বলছিল আমি জানি৷ আমি এও জানি মৌ ওর বাবার সঙ্গে দেখা করে৷’

টাপুরদি চোখ সরু করে অনিমেষবাবুর দিকে তাকাল৷ তারপর বলল, ‘সেই রাগে বুঝি অমিয়বাবুকে খুন করলেন? মেয়েকে হারিয়েছেন৷ আবার ওরা নাতনির দিকেও হাত বাড়াচ্ছে, রাগ হওয়াই তো স্বাভাবিক৷ আপনার জায়গায় যে কেউ থাকলে তারও রাগ হত৷’

আমি অবাক হয়ে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম৷ কী বলছে এসব টাপুরদি? অনিমেষবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘আমি জানতাম আপনারা আসবেন৷ সেদিনের ব্যাপারটা চাপা যে থাকবে না জানতাম৷ অমিয়বাবুর কেবিনে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল দেখেছি৷ আর আমিও কাউকে লুকিয়ে যাইনি৷ আমি অমিয়বাবুর সঙ্গে দেখা করেছিলাম, তাঁকে বলেছিলাম যাতে মৌয়ের দিকে হাত বাড়ানোর ভুল না করে৷’

‘হুম, জানি তো৷ কবে যেন গিয়েছিলেন? ওই তো সেদিন না, যেদিন...,’ বলে থেমে গেল টাপুরদি৷

অনিমেষবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘সবই তো জানেন, তাহলে জিজ্ঞাসা করছেন কেন? যেদিন অমিয়বাবু খুন হলেন সেদিনই গিয়েছিলাম, সন্ধে ছ’টা নাগাদ৷ কিন্তু তাঁকে খুন করিনি আমি৷ তবে লোকটা মরেছে, সেইজন্য একটুও দুঃখ নেই আমার৷’

‘ধনঞ্জয় মণ্ডলকে চিনতেন আপনি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘না, পেপারে পড়েছি লোকটা নাকি অমিয় চক্রবর্তীকে খুন করেছে৷ যা করেছে, বেশ করেছে,’ ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন অনিমেষবাবু৷

‘কী বুঝলে টাপুরদি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

টাপুরদির দৃষ্টি রাস্তায়৷ সিঁথির মোড়ের এদিকটায় রাস্তায় খুব ভিড়৷ অসাবধান হলেই দুর্ঘটনা অবধারিত৷ তাই চুপ করে ড্রাইভিং-এ মন দিল টাপুরদি৷ মোড়টা পেরিয়ে ফাঁকা রাস্তায় এসে বলল, ‘সত্যি কথা বলব? কিছুই বুঝলাম না৷ যে জন্য গিয়েছিলাম, সেটা আরও গুলিয়ে গেল৷’

আমি হেসে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী গুলিয়ে গেল?’

‘অনিমেষবাবু সেদিন অমিয়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন৷ তিনি জানতেন না সিসিটিভি ক্যামেরা খারাপ ছিল৷ তাই ধরা পড়ে গেছেন ভেবে স্বীকার করে নিলেন৷ নইলে জানা যেত না,’ টাপুরদি বলল৷

‘তোমার কি মনে হয় অনিমেষবাবু অমিয়বাবুকে সত্যিই খুন করতে পারেন?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘না পারার তো কিছু নেই৷ বয়সটা কোনো ফ্যাক্টর নয়৷ এমনিতেই তিনি ওদের পরিবারের উপর তীব্র ঘৃণা পুষে রেখেছিলেন দীর্ঘদীন যাবৎ৷ মেয়েকে হারিয়েছেন তিনি ওদের পরিবারের কারণে৷ স্বাভাবিকভাবে মৌবনীর দিকে ওদের হাত বাড়ানোটা সহ্য হওয়ার কথা নয় অনিমেষবাবুর পক্ষে৷

‘একটা কথা বলব টাপুরদি?’

‘কী, বল!’

‘সেদিন মনে আসেনি৷ আজ হঠাৎ মনে হল, সেদিন মৃণালবাবু বললেন, ধনঞ্জয়কে তিনি টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন৷ স্বাভাবিকভাবেই ধনঞ্জয় কৃতজ্ঞ ছিল তাঁর কাছে৷ এমন কি হতে পারে, যে মৃণালবাবুও দীর্ঘদিন ধরে রাগ পুষে রেখেছিলেন অমিয়বাবুর উপর৷ তাই...’

ঘ্যাঁচ করে হঠাৎ সজোরে ব্রেক কষল টাপুরদি৷ রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ একটা বিশাল ষাঁড় নেমে এসেছে৷

‘সাবধানে,’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি৷ বুঝলাম টাপুরদি একটু অন্যমনস্ক৷ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমি ড্রাইভ করব?’

‘নাহ, ঠিক আছে,’ বলে হর্ন বাজাল টাপুরদি৷ ষাঁড়টা ধীরে ধীরে রাজকীয় চালে রাস্তা পার হয়ে সরে গেল৷

কিছুটা পথ চুপচাপ পেরোলাম৷

‘দেড়দিন চলে গেল,’ বলল টাপুরদি৷

আমি কিছুটা অন্যমনস্ক ছিলাম৷ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কীসের দেড়দিন?’

‘চারদিনের থেকে দেড়দিন গেল, সেটাই বলছি,’ উদবিগ্ন স্বরে বলল টাপুরদি৷

‘হুম,’ একটু থেমে আমি বললাম, ‘আর একটা কথা বলি?’

‘বলে ফেল,’ বলল টাপুরদি৷

‘সনাতন বিশ্বাসও কিন্তু খুন করাতে পারে অমিয়বাবুকে৷ আর কাল রাতে তো সেই কথা নিজের মুখেই বলল লোকটা৷ সাংঘাতিক লোক সনাতন বিশ্বাস৷ সব কিছু করতে পারে লোকটা৷’

‘তুই কি রহস্য সমাধানের চেষ্টা করছিস, না আরও বেশি কনফিউজ করছিস?’

‘না না৷ মানে তুমি দেখো, এদের প্রত্যেকেরই কিন্তু স্পষ্ট মোটিভ আছে৷ ঠিক কি না তুমিই বলো? আর সনাতন বিশ্বাস লোকটা যে একটা জানোয়ার, সে সম্বন্ধে কি সন্দেহ আছে তোমার?’

‘তা ঠিক৷ লোকটা খুব খারাপ, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই আমার,’ সামনের দিকে রাস্তায় চোখ রেখে বলল টাপুরদি৷

‘আর তা ছাড়া, সনাতন বিশ্বাসের মোটিভও স্টং৷ অমিয় চক্রবর্তীকে ধমকধামক দিয়েও টলানো যাচ্ছিল না কিছুতেই৷ সুতরাং তাঁকে দুনিয়া থেকেই সরিয়ে দাও৷ তাহলেই ল্যাটা চুকে যায়৷ অম্লান চক্রবর্তী তো শুনলাম সনাতন বিশ্বাসের দাবি মেনেই নিয়েছে৷ মন্ত্রীসভার যে তালিকা অমিয়বাবু বানিয়েছিলেন, তাতে রদবদল হচ্ছে শুনলাম৷ সুতরাং সনাতন বিশ্বাসের উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হয়েছে৷ আর সেদিন অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে শেষ ব্যক্তি সনাতন বিশ্বাসই দেখা করতে এসেছিল৷

‘তুই দেখছি সনাতন বিশ্বাসকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিস,’ হেসে বলল টাপুরদি, ‘ভেবে দেখ মিতুল, শুধু ধারণার উপর নির্ভর করে কাউকে ফাঁসিতে ঝোলানো যায় না৷ প্রমাণ লাগে৷ আর চরিত্রহীন হলেই যে কেউ খুনি হবে, এমনটা নাও হতে পারে৷ এবার বল কী করে প্রমাণ করবি সনাতন বিশ্বাসই আদতে অমিয় চক্রবর্তীর খুনি? ব্যাপারটা অত সহজ নয় রে৷’

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম৷ আমাদের গাড়ি এখন যশোর রোড ধরে এগোচ্ছে৷ সময় কমে আসছে৷ মনটাও অস্থির লাগছে৷ টাপুরদি কি হেরে যাবে এবার? কে আছে অমিয় চক্রবর্তীর খুনের পেছনে তা কি আর জানা হবে না? তন্ময় কি হারিয়ে যাবে? কোথায় কীভাবে আছে সে, কে জানে? গতকাল টাপুরদি সারাদিন ধরে বাইরে বাইরে ঘুরে বেরিয়েছে৷ এ ক’দিন বাড়ি থেকে কাজ করলেও গতকাল একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং-এর জন্য অফিস যেতে হয়েছিল৷ সারাদিন অফিসের কাজ শেষ করে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরেই আবার ছুটেছিলাম সনাতন বিশ্বাসের ডেরায়৷ টাপুরদি সারাদিন কী কী করল তা আর জিজ্ঞাসা করা হয়নি৷

এবার জিজ্ঞাসা করলাম, ‘গতকাল সারাদিনে কিছু এগোলে টাপুরদি?’

‘তেমন কিছু না৷ কয়েকটা ফোন করেছি, কাল কয়েক জায়গায় যেতে হয়েছিল,’ হালকা গলায় বলল টাপুরদি৷

‘কোথায়?’ জানতে চাইলাম৷

‘অনামিকা রায়ের অতীত খুঁড়ে বার করতে গেছিলাম৷’

আমি সোজা হয়ে বসলাম৷

‘সে কী? বলোনি তো!’

‘আরে বলার সময়টা পেলাম কোথায়? যা ছোটাছুটি চলছে দু’দিন ধরে,’ টাপুরদি হেসে বলল৷

আমার একটু অভিমান হল৷ সেটাকে প্রকাশ না করে বললাম, ‘কিছু পেলে? গুরুত্বপূর্ণ কিছু?’

‘অনামিকা রায়ের ব্লাড গ্রুপ ও পজিটিভ, তাঁর স্বামীর ব্লাড গ্রুপ এ পজিটিভ, আর তন্ময়েরও এ পজিটিভ,’ অভিব্যক্তিহীন মুখে বলল টাপুরদি৷

‘তো? তাতে কী প্রমাণ হয়?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘প্রমাণ তেমন কিছুই হয় না৷ অমিয় চক্রবর্তীর ব্লাড গ্রুপ বি পজিটিভ, বুঝলি?’

‘নাঃ, কিছু বুঝলাম না,’ বললাম আমি, ‘এর মধ্যে আবার অমিয় চক্রবর্তী এল কোত্থেকে?’

টাপুরদি বলল, ‘কোত্থেকে এল, এল কি আদৌ এল না, সেটা তুই-ই ভাব৷ একটু তো মাথাটা খাটা৷ কাল অনামিকা রায়ের কলেজের ও পরবর্তীকালের কিছু বন্ধুবান্ধবের কাছে খোঁজ নিলাম৷ কলেজে থাকতে অমিয়বাবু তাঁদের কলেজে গেস্ট হিসেবে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু অনামিকা রায়ের সঙ্গে তাঁর কোনোরকম যোগাযোগের কথা কেউ বলতে পারল না৷ প্রাইমারি স্কুল বোর্ডের অফিসে খোঁজ নিলাম৷ অত পুরোনো কথা, কে কার ট্রান্সফারের জন্য রেফার করেছিল সেসব আজ আর কেউ মনে রাখেনি৷ তবে, পার্টির থ্রুতে বদলি-টদলিগুলো হয় অনেকাংশেই৷ বিভিন্ন পার্টির ইউনিয়ন মেম্বাররা সুবিধে পায়৷ পার্টির কোটা থাকে৷ অনামিকাদেবী অমিয়বাবুর পার্টির ইউনিয়নে ছিলেন৷ সেই কারণে হয়তো ট্রান্সফারটা তিনি রেফার করে থাকতে পারেন৷’

‘তার মানে অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে অনামিকা রায়ের ঘনিষ্ঠ কোনো সম্পর্ক ছিল না বলছ?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ তো তাই বলছে,’ ঠোঁট উলটে বলল টাপুরদি৷

‘তাহলে সনকাদেবী যে বলেছিলেন, তন্ময় অনামিকাদেবীর অবৈধ সন্তান? সেটা বেসলেস তার মানে?’

‘বেসলেস কি না সেটা নিশ্চিত হয়ে বলি কী করে? রেখাদেবী ছিলেন অনামিকা রায়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী৷ তিনি কিন্তু বলেছিলেন, এসব অনামিকাদেবীর স্বামীর মিথ্যে সন্দেহ৷ অনেক খুঁজেও অনামিকা রায়ের সম্পর্কে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কোনো প্রমাণ মেলেনি৷ আমি অন্তত খুঁজে পাইনি কিছু৷’

‘যাক, তাহলে এই অনামিকা রায়ের বিষয়কে আপাতত মাথা থেকে বের করে দেওয়া যেতে পারে৷ তাই তো?’

‘তোর মৌবনীকে দেখে কী মনে হল মিতুল?’ হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

একটু ভেবে বললাম, ‘ওকে প্রথমে দেখে যেরকম ধারণা হয়, আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও বুদ্ধিমতী৷’

‘পলিটিশিয়ান হওয়ার প্রস্পেক্ট আছে বলছিস?’ একটু হেসে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘তা আছে৷ রক্ত কোথায় যাবে? দাদু-দিদা সারাটা জীবন ওকে রাজনীতি থেকে দূরে রেখে মানুষ করলেন৷ কিন্তু লাভ কী হল তাতে? মেয়েকে পলিটিক্সই টানছে৷ রাজনৈতিক পরিবার এঁরা৷ এই পরিবারের বাচ্চারা রাজনীতি মায়ের পেট থেকে শিখে আসে৷ সুনয়নাদেবী ওর ব্রেনওয়াশ করেছেন৷ যাতে বংশপরম্পরায় ক্ষমতা পরিবারের মধ্যেই থাকে৷ ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এঁরা সব করতে পারেন৷ ইনিও এতদিনে তাই মেয়ের খোঁজ নিচ্ছেন,’ বললাম আমি৷

এতক্ষণ খেয়াল করিনি, এবার টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভুরু কুঁচকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে কিছু যেন ভাবছে৷ আমি আর বিরক্ত করা সমীচীন বোধ করলাম না৷ গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তার দিকে চোখ রাখলাম৷ এগারোটা বাজতে চলল, বাসে ট্রামে অফিসযাত্রীদের ভিড়৷ আমরা এগিয়ে চলেছি সেই ভিড় ঠেলে৷ কোথায় পৌঁছোব, সেটাই শুধু জানা নেই৷

‘কী ব্রাদার, এত মন দিয়ে কী ভাবছ?’ অর্জুনের পিঠে আলতো চাপড় মেরে সিনিয়ার ইন্সপেক্টর রজত দত্ত একটা চেয়ার টেনে পাশে বসলেন৷ অনেকক্ষণ ধরেই তিনি লক্ষ করছেন, ইন্সপেক্টর অর্জুন টেবিলের উপর রাখা রাইটিং প্যাডে আঁকিবুকি কাটছে৷ ছেলেটার বয়স কম, একটু বেশিই আবেগপ্রবণ৷ যেকোনো কেসের ক্ষেত্রে নিজেকে উজাড় করে দেয়৷ পরিশ্রম করতে পারে খুব৷ অল্প সময়ের মধ্যেই ডিপার্টমেন্টের সকলের মন জয় করে নিয়েছে অর্জুন৷ রজত দত্তের নিজের চাকরি জীবনের শুরুর দিনগুলো মনে পড়ে যায়৷ অমিয় চক্রবর্তীর কেসটার ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই অনেক পরিশ্রম করেছে৷ এখন কেসটা যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে আর এর পেছনে পরিশ্রম করার অর্থ ভস্মে ঘি ঢালা৷

এ-রকমই হয়ে থাকে৷ প্রায় বাইশ বছরের চাকরি জীবনে কম তো দেখলেন না রজত দত্ত৷ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে রজত দত্ত জানেন, শুরু শুরুতে অমন উৎসাহ সবার থাকে৷ তারপর যখন দেখবে এতে করে লাভ কিছু হয় না, তখন শুধু গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে চলা৷ কত ক্ষেত্রেই তো দিন-রাত নাওয়া-খাওয়া ভুলে পরিশ্রম করে তারপর কেস ছেড়ে দিতে হয়েছে৷ বেগড়বাই করলে বদলির খাঁড়া মাথার উপর ঝোলে৷ এই দপ্তরে কাজ করতে হলে নেতা-মন্ত্রীদের সামনে ‘জো হুজুরি’ই দস্তুর৷ মেনে নিতে পারলে ভালো, না হলে প্রোমোশনের মোড়কে মুড়ে পানিশমেন্ট ট্রান্সফার হাসিমুখে মাথা পেতে নিতে হয়৷

অর্জুনের মতো আইপিএস দিয়ে সোজা উঁচু পদমর্যাদায় এসে বসেননি রজত দত্ত৷ ধীরে ধীরে পরিশ্রম করে একটু একটু করে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উঠে আজ এখানে পৌঁছেছেন৷ রগের কাছে চুলে যে পাক ধরেছে, সেগুলো এমনি এমনি ধরেনি৷ এই ডিপার্টমেন্টের হাল-হকিকত তিনি খুব ভালো করে জানেন৷ এই কেসটা যে ছেড়ে দিতে হবে, সেটা আগেই বুঝেছিলেন রজত দত্ত৷ এটা শুরুই হয়েছিল, যত শিগগিরই সম্ভব ইতি টেনে দেওয়ার জন্য৷ নইলে এমন হাই প্রোফাইল কেস অনেক আগেই সিবিআই-এর হাতে দিয়ে দেওয়া হত৷ আসলে কেউ চায়ই না যে কেসটা সলভ হোক৷ তার উপর ধনঞ্জয় মণ্ডলকে পেয়ে সকলে হাতে চাঁদ পেয়ে গেল৷ যেটুকু বা পাবলিকের সামনে তদন্তের নাটকের প্রয়োজন ছিল, সেটুকুও মিটে গেল৷ অম্লান চক্রবর্তী এখন নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর৷ একমাত্র একজনই পারতেন চাপ তৈরি করে কেসটাকে চালিয়ে যেতে৷ তিনি অমিয় চক্রবর্তীর স্ত্রী সুনয়নাদেবী৷ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, তিনিও আর লড়াইটা চালিয়ে নিয়ে যেতে উদ্যোগী হলেন না৷ হয়তো, ছেলের কথা, পার্টির ইমেজের কথা ভেবে পিছিয়ে গেলেন তিনিও৷ কিংবা হয়তো তাঁরাও ধনঞ্জয় মণ্ডলের ব্যাপারটা মেনেই নিয়েছেন৷ অতীত আঁকড়ে তাঁরাও আর পড়ে থাকতে চান না৷

অর্জুন রাইটিং প্যাড থেকে মাথা তুলে বিষণ্ণ হাসি হেসে বলল, ‘কেসটা নিয়ে আমরা এতদিন ধরে বৃথাই খাটলাম, রজতদা!’

রজত দত্ত ফিকে হেসে বললেন, ‘এসব ভেবো না অর্জুন৷ ভেবো না, কারণ ভেবে লাভ নেই৷ আমরা সরকারি চাকরি করি৷ ওপরে যারা বসে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন, তারা যেমন চাইবেন তাই করতে হবে ভাই৷ জানো তো, কর্তার ইচ্ছেই কর্ম৷ কেসটা নিয়ে আমরা লড়েছিলাম, দিনরাত পরিশ্রম করেছি, কারণ সেটা আমাদের ডিউটি৷ কাল আবার নতুন কোনও কেস এলে আবার সেটা নিয়ে খাটব...’

‘আর তারপর উপরতলা থেকে প্রেশার এলে সেটারও ফাইল ক্লোজ করে আবার অন্য কেসে মন দেব? তাহলে পুলিশে কেন এলাম? কর্পোরেট জব অনায়াসে করতে পারতাম৷ অন্তত নিজের বিবেকের কাছে তো জবাবদিহি করতে হত না তাতে!’ বলল অর্জুন৷

রজত কিছুক্ষণ চুপচাপ চেয়ে রইলেন অর্জুনের দিকে৷ তারপর বললেন, ‘কী করতে চাও তুমি?’

‘আমার চাওয়া না চাওয়াতে কী যায়-আসে, রজতদা? কিছু করার সময় পেলাম কোথায়? ইশ, যদি আর একটু সময় পেতাম! তুমি কেসের রিপোর্ট তৈরি করছ৷ আর বড়োজোর দুই দিন৷ ধনঞ্জয় মণ্ডলকেই যদি মার্ডারার ডিক্লেয়ার করে কেস ফাইল ক্লোজ করতে হত, সে তো অনেক আগেই করা যেত৷ এতদিন খাটলাম কেন আমরা?’

রজত দত্ত গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ঠিক বলেছ অর্জুন৷ তেমনি এটাও ঠিক যে খেটেও কিছু করতে পারিনি আমরা৷ যে অন্ধকারে ছিলাম, সেই অন্ধকারেই আছি৷ ধনঞ্জয় মণ্ডলকে ফ্রেম করা ছাড়া আর কিছু দেখানোর মতো রেজাল্ট আছে কি আমাদের হাতে? সত্যি কথা তো এটাই, অর্জুন, এই কেসে আমরা ফেইল করেছি৷ এ-রকম হাই প্রোফাইল কেসে সময় পাওয়া যায় না৷ প্রেস, মিডিয়া, জনতা, উপরওয়ালা সবাই রেজাল্ট চায়৷ আমরা সেই রেজাল্ট দিতে পারিনি৷ বরং বলা ভালো, ধনঞ্জয় মণ্ডল মরে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে৷ আমাদের মুখরক্ষা করেছে৷ আমি বলব, তুমিও আর এটা নিয়ে ভেবো না৷ একটা কেস নিয়ে পড়ে থাকলে হবে? সামনে এগোতে হবে না? তোমার বয়স কম, এখনই তো এগোনোর সময়৷ এসব পলিটিক্যাল কেসে বেশি মাথা গলাতে যেয়ো না৷ যেচে আগুনে হাত দিতে নেই৷ তোমার ভালোর জন্যই বলছি৷’

অর্জুন চুপ করে রইল৷ রজত দত্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা তুলে বললেন, ‘তুমি কষ্ট পাচ্ছ, তাই বলছি, দুইদিন সময় আছে তোমার কাছে৷ দুইদিনে যদি কিছু বার করতে পারো, আমায় জানিয়ো৷ আই প্রমিস ইউ, আমি কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলব৷ বুঝতেই তো পারছ৷ আরেকটা কথা, সব কথা সৌরভ স্যারকে জানানোর দরকার নেই৷ বোঝোই তো, তাঁর উপরেও পলিটিক্যাল প্রেশার আছে৷ তুমি যদি সত্যিই কিছু বের করতে পারো, সরাসরি আমাকে জানাবে৷ আমি কমিশনার স্যারের সঙ্গে কথা বলব৷ আমি আমার রিপোর্টে তোমার ফাইন্ডিংস লিখব৷’

‘কিন্তু যদি কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোয় রজতদা?’ অর্জুন জিজ্ঞাসা করল৷

রজত দত্ত হাসল৷ বলল, ‘নো ওয়ারিজ৷ আমি আছি তো৷ তবে হ্যাঁ, সময় কিন্তু সেই দুই দিনই৷ আমার রিপোর্ট তৈরি তার আগেই হয়ে যাবে৷ শুধু তোমার জন্য আটকে রাখব আমি৷’

অর্জুন উঠে দাঁড়াল৷ ওর মুখটা ঝলমল করছে৷ রজত দত্তর হাতটা দুই হাত দিয়ে ধরে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ রজতদা৷ কী বলে যে তোমাকে...’

‘সময়টা কি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েই কাটিয়ে দেবে? যাও৷ কী করছ, কোথায় যাচ্ছ আমায় জানাবে৷ বুঝতেই পারছ, রিস্কি অপারেশন৷ আমার জানা থাকা দরকার, যাতে বাই চান্স তুমি বিপদে পড়লে অন্তত সেখানে ছুটে যেতে পারি৷ ডিসিডিডিকে আমি ম্যানেজ করে নেব৷ আমাকে ফোন কোরো৷ চলো, আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়ো৷’

অর্জুন প্রায় দৌড়েই বেরোল বড়ো হল ছেড়ে৷ সেদিকে তাকিয়ে রজত দত্ত ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসলেন শুধু৷ তারপর মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে কাউকে নম্বর মেলালেন৷ চাপা গলায় কাউকে বললেন, ‘হুম, এখনই বেরোল৷’

‘শুভম, পেনড্রাইভটা কতদূর?’ অর্জুন জিজ্ঞাসা করল৷

শুভম কলকাতা পুলিশের সাইবার সেলের অফিসার৷ বয়স সবে তেইশ পেরিয়েছে৷ কৈশোর এখনও বুঝি তাকে ছেড়ে যায়নি পুরোপুরি৷ মুখখানা যেন সারল্যে মাখামাখি, শুধু চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এ ছেলে সাধারণ নয়৷ এই বয়সেই সে কলকাতা পুলিশের অ্যাসেট, একজন প্রতিভাবান এথিক্যাল হ্যাকার৷

শুভম ল্যাপটপে মুখ গুঁজে ছিল৷ অর্জুনের ডাকে মুখ তুলে তাকাল একবার৷ তারপর আবার ল্যাপটপে দৃষ্টি ডোবাল৷ কালো স্ক্রিনে ঝড়ের বেগে কোড লিখে চলেছে তার হাত৷ আরও প্রায় দুই মিনিট পরে লেখা শেষ করে এন্টার কী টিপে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল৷ এ ছেলে সিনিয়ার জুনিয়ার বড়ো ছোটো একেবারেই মানে না৷ মাঝে মাঝে ভুলে যায়, সে কলেজে নেই, লালবাজারের লাল বিল্ডিং-এ বসে আছে৷ অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এ অর্জুনদা, ধুর, কী মাল গছিয়েছ মাইরি!’

অর্জুন এদিক-ওদিক তাকিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘স্যার... অর্জুনদা নয় অফিসে৷’

‘ধ্যাত্তেরিকি! জানো তো আমার ওসব আসে না৷ মনেও থাকে না৷ যাই হোক, তোমার ওই পেনড্রাইভ হেবিব ফালতু চিজ আছে অর্জুনদা৷ কে জানে কী অ্যাটম বোমার নকশা ভরে রেখেছে, পাসওয়ার্ডের পর পাসওয়ার্ড মেরে গেছে৷ তবে মানতে হবে, যে কাজটা করেছে, পাবলিক কাজ জানে ভালো৷ দারুণ কোড সেট করেছে,’ সপ্রশংস গলায় বলল শুভম৷

‘শুভম, শুভম বাবা, কাজটা করে দাও তাড়াতাড়ি৷ সময় নেই৷ খুব আর্জেন্ট,’ কাতর কণ্ঠে বলল অর্জুন৷

‘তোমরা তো সকলে আর্জেন্ট বলেই খালাস৷ এদিকে ইন্ডিয়ান কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কে কাস্টমারদের অ্যাকাউন্ট থেকে বন্যার জলের মতো টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে৷ সেই নিয়ে ওদিক থেকে দিনে বিশবার করে হুড়কো আসছে৷ কত দিক দেখি বলো তো?’ বলল শুভম৷

অর্জুন জানে, এই মুহূর্তে শুভমকে হাতে রাখা ছাড়া গতি নেই৷ এই পেনড্রাইভের ব্যাপারটা পাঁচকান হোক, সেটাও চায় না অর্জুন৷ শুভম মুখে যাই বলুক, অর্জুন জানে শুভমের দায়িত্ববোধ দারুণ৷ আর ওর মতো এফিশিয়েন্ট হ্যাকার এই ডিপার্টমেন্টে কমই আছে৷ তাই বলল, ‘কেসটা হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে শুভম৷ কোনো ব্রেক থ্রু না পেয়ে কেস ক্লোজ করে দেওয়া হচ্ছে৷ এই পেনড্রাইভটা খোলা ভীষণ জরুরি৷ এর বেশি আর কী বলব? এবার সব তোমার হাতে৷ জানি তোমার উপরেও চাপ কম নয়৷ কিন্তু এটার গুরুত্ব যে কতটা আমি এই মুহূর্তে তোমায় বলতে পারছি না৷ তবে এটুকু বলতে পারি, এটার ভিতর যাই থাকুক, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে৷ অনেক কিছু, লিটারেলি৷’

শুভমের বয়স কম হলেও সে বোকা নয়৷ এই ডিপার্টমেন্টে কাজ করতে গিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে সে শিখেছে৷ মাথা নেড়ে বলল, ‘দেখছি৷ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করার চেষ্টা করছি৷’

অর্জুন বেরিয়ে এল অফিস থেকে৷ গন্তব্য রাজারহাট৷ ধনঞ্জয় মণ্ডলের ইতিহাস টাপুর খুঁড়ে বার করেছে৷ কিন্তু তার শেষ দিকের জীবন সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি এখনও৷ একাই থাকত৷ শেষের দিকে নাকি প্রায় সারাদিনই নেশায় ডুবে থাকত৷ পার্টি অফিসে যেত, টুকটাক কাজও করত৷ কিন্তু চোখ তার লালই থাকত৷ অর্জুন খবর নিয়ে জেনেছে এই অঞ্চলের দেশি মদের ঠেকগুলোই ছিল ধনঞ্জয় মণ্ডলের আস্তানা৷ অর্জুনের নিজস্ব সোর্স এসব অঞ্চলে অনেক আছে৷ এদের মধ্যে থেকেই দুজনকে লাগিয়েছিল ধনঞ্জয় মণ্ডলের ঠিকুজিকুষ্ঠি বার করার জন্য৷ আজ সকালেই তাদের মধ্যে একজন ফোন করেছিল৷ সেইজন্যই আজ এখানে আসা৷ হাল ছেড়ে দেওয়ার আগে একবার শেষ লড়াইটা লড়ে দেখতে চায় অর্জুন৷

নিউটাউন অ্যাকশন এরিয়া ছাড়িয়ে রাজারহাটে ভিতরের দিকে প্রচুর দেশি মদের ঠেক৷ নির্বিচারে লাইসেন্স ছাড়াই চোলাই তৈরি হয়৷ পুলিশ অনেকবার ভাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে, লোক ধরে ধরে হাজতে পুরেছে৷ লাভ কিছু হয় না৷ ক’দিন সব শান্ত থাকে৷ তারপর আবার গজিয়ে ওঠে শুঁড়িখানা৷ এই অঞ্চলে নিম্নমধ্যবিত্ত লোকেদের বসবাস বেশি৷ খোঁজ নিলে এদের মধ্যে প্রায় সব পরিবারেই গড়ে অন্তত একজন করে মাতাল বেরোবেই বেরোবে৷ এলাকার মহিলারা মিলে বেশ কয়েকবার লোকাল এমএল-এর কাছে দরবার করেছে, নিজেরাই দলবেঁধে ঠেক ভেঙেছে৷ কিন্তু সকলেই জানে এই ঠেকগুলো গজিয়ে ওঠার পেছনে নেতা বিধায়কদের প্রচ্ছন্ন স্নেহচ্ছায়া থাকে৷ যে দলই ক্ষমতায় আসুক, এদের সংসারের পরিচিত চিত্র বদলায় না৷ এগুলো ছাড়াও লাইসেন্সপ্রাপ্ত শুঁড়িখানাও কম নেই এই অঞ্চলে৷ আবগারি শুল্ক থেকে সরকারের উপার্জনের একটা বড়ো অংশ আসে৷ সেই পথটা বন্ধ করার উপায় নেই৷ দিনের শেষে গলা অবধি মদ গিলে বাড়ি ফিরে বউ পেটানো এদের সংসারের চেনা ছবি৷ পুলিশ সবই জানে৷ কিন্তু কিছু করার নেই৷ এদের ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কেসে থানায় তুলে নিয়ে গেলে মার খাওয়া বউ এসেই আদর করে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে৷

নারায়ণপুর বাজার পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে গলির বাইরে গাড়ি দাঁড় করাল অর্জুন৷ এই সরু গলিতে গাড়ি ঢুকবে না৷ গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে গলির ভিতরে ঢুকল অর্জুন৷ দুটো বাড়ির পর একটা বড়ো পুকুর, সেটা পেরোলেই একটা ইটের ঘর৷ ঘরের গায়ে প্লাস্টার পড়েনি, মাথায় টালির ছাদ৷ দরজার সামনে একটা বাচ্চা মাটিতে ধুলোয় বসে খেলছিল৷ অর্জুনকে দেখে ছুটে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল৷ অর্জুন দরজায় টোকা দিল বারদুয়েক৷ খালি গায়ে লুঙ্গি পড়ে একজন লোক বেরিয়ে এল৷ অর্জুনকে দেখেই ‘ও স্যার, আপনি? এক মিনিট’ বলে আবার ভিতরে ঢুকে গেল৷ গায়ে একটা গেঞ্জি চড়িয়ে, তারপর গামছা দিয়ে মুখটা প্রায় ঢেকে বেরিয়ে এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই৷ একে অর্জুন চেনে৷ এর নাম মতিউর রহমান, পেশায় ড্রাইভার৷ ‘ছোট হাতি’ চালায়৷ ছোটো সাইজের ট্রাককে আদর করে এরা ছোটো হাতি বলে থাকে৷ বিভিন্ন কারখানা থেকে বিভিন্ন জায়গায় মাল সাপ্লাই করে৷ যখন বাড়িতে থাকে, গলা অবধি মদ গিলে পড়ে থাকে৷ মতিউরের আরেকটা গোপন পরিচয় আছে৷ সে পুলিশের খোঁচড়৷ বিভিন্ন সময়ে মাল সরবরাহের সূত্রে অনেক গোপন খবরও রাখতে হয় তাকে৷ ছোটো হাতির পেটের ভিতর সব মাল যে আইনত বৈধ হয় সবসময়, তেমন নয়৷ মতিউরের মতো অনেকেই গোপনে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে৷ কাজটা বিপজ্জনক, ধরা পড়লে বেঁচে না ফেরার সম্ভাবনাই বেশি৷ তাই পুলিশও এদের পেছনে টাকা খরচ করে৷ সারা কলকাতা জুড়ে এ-রকম কয়েক হাজার খোঁচড় আছে৷ এরা কলকাতা পুলিশের একটা বড়ো শক্তি৷ এদের মধ্যে অনেকেই অসাধারণ প্রতিভাবান, জেমস বন্ডের বাবা৷ এরা সাধারণের মধ্যে মিশে থাকে, সময়ে-অসময়ে গোপন খবর দিয়ে পুলিশকে সাহায্য করে৷

‘চলেন, স্যার,’ বলল মতিউর, ‘চলতে চলতে কথা কই৷’

অর্জুন জানে মতিউর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে না৷ যদিও অর্জুন আজ সাদা পোশাকেই এসেছে, কিন্তু অর্জুনের মতো চেহারার লোক এ অঞ্চলে সচরাচর চোখে পড়ে না৷ ইতিমধ্যেই আশপাশ থেকে দু’-চারজন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে৷

হাঁটতে হাটতে অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, ‘লোকটা কে, মতিউর?’

‘ধনঞ্জয় সাহেবের খাস দোস্ত, স্যার৷ নাম আনিসুর ইসলাম৷ গেলাসের ইয়ার৷ বড়ো ট্রাক চালায়৷ সারা দেশে মাল সাপ্লাই করে৷ যখন এখানে থাকে, দুই জনে একসঙ্গে ঠেকেই পড়ে থাকত সারাদিন৷ গলায় গলায় ইয়ারি,’ চাপা গলায় বলল মতিউর৷

কথা বলতে বলতে তারা গলির মুখে ফিরে এসেছে৷

‘পাব কোথায়?’ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন অর্জুনের৷

লুঙ্গির খুঁট থেকে একটা চিরকুট বার করে দিল মতিউর৷ অর্জুন সেটা পকেটে চালান করে নিল৷ অন্য পকেট থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটা গোলাপি নোট, সেটাও নিঃশব্দে চালান হয়ে গেল মতিউরের লুঙ্গির খুঁটের ভিতর৷ পুরো ব্যাপারটাই ঘটে গেল অত্যন্ত গোপনে, নীরবে৷ একটাও বাড়তি কথা না বলে অর্জুন গাড়িতে গিয়ে উঠল৷

গাড়ির ড্রাইভার রতন ছেলেটার বয়স বেশি নয়৷ নতুন পুলিশে জয়েন করেছে কনস্টেবল ড্রাইভার হিসেবে৷ একটু বেশি ছটফটে, তবে বুদ্ধিমান৷ অর্জুন গাড়িতে উঠতেই জিজ্ঞাসা করল, ‘এখন কোথায় স্যার?’

‘সামনে এগিয়ে চলো৷ এদিকে আগে এসেছ কখনো?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন৷

‘হ্যাঁ স্যার, আমার বাড়ি তো এখানেই?’ হেসে বলল রতন৷

‘এখানে? বাহ, তাহলে তো এদিকটা ভালোই চেনো নিশ্চয়ই৷’

‘ঠিক এখানেই নয় স্যার, আরও সামনে, লাউহাটিতে আমার বাড়ি৷ তবে এদিকটা চিনি স্যার,’ বলল রতন৷

অর্জুন পকেট থেকে বের করে চিরকুটটা দিল রতনের হাতে৷ দেখো তো, অ্যাড্রেসটা ঠিক কোথায়৷

হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে চোখ বুলিয়ে ফেরত দিল রতন৷ বলল, ‘এখানে যাবেন এখন?’

‘হ্যাঁ,’ বলল অর্জুন, ‘চেনো জায়গাটা?’

‘চিনি স্যার৷ চলুন৷’

ঘরেই ছিল আনিসুর৷ গতকাল রাতেই মাল খালি করে ট্রাক নিয়ে ফিরেছে বিহার থেকে৷ মালিকের শেলটারে ট্রাক জমা দিয়ে বাকি রাতটা মদ গিলে ভোরের বেলা ফিরে এসে হাত-পা ছড়িয়ে উঠোনে খাটিয়ায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে৷ গালে অন্তত সাতদিনের না-কামানো কাঁচা-পাকা দাড়ি৷ হাঁ করা মুখের পাশ দিয়ে লালা গড়িয়ে শুকিয়ে সাদা খড়খড়ে হয়ে আছে৷ মাছি উড়ছে গোটা কয়েক৷ পরনের লুঙ্গি হাঁটু ছাড়িয়ে ঊরুর উপর বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে৷ পাঁজরার হাড় ক’টা নিশ্বাসের তালে তালে ওঠা-নামা করছে৷

একটি অল্পবয়সি মহিলা উঠোনের একপাশে এক কাঁড়ি বাসন মাজছিল৷ অর্জুনকে দেখে মাথার ঘোমটা টেনে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল৷ মহিলা সম্ভবত আনিসুরের মেয়ে হবে৷ অর্জুন বলল, ‘আপনার বাবাকে ডাকুন৷ কথা বলতে হবে৷’

মেয়েটা উঠে দাঁড়াল৷ বয়স আন্দাজ আঠারো-উনিশ হবে৷ একবার অর্জুনের মুখের দিকে, একবার ঘুমন্ত আনিসুরের দিকে তাকাল৷ তারপর ফিক করে হেসে মৃদু গলায় বলল, ‘আমার মিঞা৷’

অর্জুন অপ্রস্তুত৷ একবার আড়চোখে তাকাল আনিসুরের দিকে৷ লোকটার বয়স পঞ্চাশের কম কিছুতেই হবে না৷ এই বিবি ওর কত নম্বর পক্ষ কে জানে! এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলা খাঁকরে বলল, ‘ডাকুন আপনার মিঞাকে৷’

‘ডাকলে মারবে,’ আনিসুরের বিবির শঙ্কিত উত্তর৷

‘মারবে না৷ আমি পুলিশ৷ ডাকুন,’ কড়া গলায় ধমক দিল অর্জুন৷

আনিসুরের বিবির দৃষ্টিতে স্পষ্ট আতঙ্ক৷ এরা বরের মারকে যতটা না ভয় পায়, তার চেয়েও পুলিশের নামে ডরায়৷ তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে শাড়ির আঁচলে হাত মুছে উঠে দাঁড়াল বউটি৷ আনিসুরের পাশে গিয়ে মৃদু গলায় ডাকল, ‘শুনতাছেন? ওঠেন৷ পুলিশ আসছে৷ আপনার সঙ্গে কথা কইতে চায়৷ শুনেন মিঞা, ওঠেন৷’

বেশ খানিকক্ষণ ডাকাডাকির পর বাধ্য হয়ে অর্জুনকেই আসরে নামতে হল৷ এঁটো বাসনগুলো ছড়ানো ছিল উঠোনের প্রান্তে৷ তারই একটাতে কল থেকে জল ভরে এনে আনিসুরের মুখের উপর উপুড় করে দিল৷ আনিসুরের বিবি আঁতকে উঠে এক লাফে তিন পা পিছিয়ে গেল৷ আর আনিসুর নিজে গাঁক গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠে বসল৷

‘কে? কে অ্যাঁ? কে?’

‘পুলিশ,’ গম্ভীর স্বরে বলল অর্জুন৷

‘পুলিশ? ক্যান?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল আনিসুর৷

‘ধনঞ্জয় মণ্ডলকে চিনিস?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন৷

‘কে ধনঞ্জয় মণ্ডল? আমি চিনি না,’ ঘোঁৎঘোঁৎ করে বলল আনিসুর৷

‘ভেবে দেখ চিনিস কি না৷ এখানে মনে পড়লে ভালো, নইলে থানায় তুলে নিয়ে যাব৷ কী করে মনে পড়াতে হয় খুব ভালো করে জানা আছে আমার৷ শালা, সারা বাংলা এখন চেনে ধনঞ্জয় মণ্ডলকে, আর তুই চিনিস না?’

‘চিনি না, বললাম তো!’ আবার ঘোঁৎঘোঁৎ৷

‘চল তাহলে লালবাজারে৷ সেখানে মুরলি যাদব আছে, সিনিয়ার কনস্টেবল৷ যারা চেনা লোককে চিনতে পারে না, তাদের স্মরণশক্তি ফেরানোর স্পেশালাইজেশন আছে মুরলির৷ বেশি টাইম নেয় না ও,’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল অর্জুন৷

‘কী জানেন কয়া দ্যান না,’ পাশ থেকে শঙ্কিত কণ্ঠে মিনমিন করে বলল আনিসুরের বিবি৷

‘চোপ শালি, ‘চেঁচিয়ে উঠল আনিসুর, ‘যা ঘরের ভিতর যা৷ শুধু মদ্দমানুষ দ্যাখলেই সামনে আইস্যা দাঁড়ানো? তরে বলছি না পরদা করবি বাইরের লোকের সামনে?’

বউটি ব্যাজার মুখে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল৷ অর্জুন সেদিকে একবার তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে আনিসুরের গাল টিপে ধরল গায়ের জোরে৷ আনিসুরের মুখ খুলে গেল৷ অ অ করে জান্তব শব্দ করে উঠল৷ অর্জুন বলল, ‘বাড়ির মেয়েদের উপর পুরুষত্ব ফলাচ্ছিস শালা? চল থানায়, ওখানে তোকে শেখাব পুরুষ হওয়া কাকে বলে৷’

আনিসুর বাঁকা চোখে একবার তাকাল অর্জুনের দিকে৷ তেমন ভয় পেয়েছে বলে বোধ হল না৷ বলল, ‘ছাড়েন কত্তা৷ একটা বিড়ি খাব৷’

অর্জুন আনিসুরকে ছেড়ে দাঁড়াল৷ লোকটার সাহস আছে, পুলিশ দেখেও টলছে না৷ বিড়ি ধরিয়ে আনিসুর গলা চড়িয়ে আওয়াজ দিল ওর বিবিকে, ‘এ ছলমা, বাবুর জন্য মোড়া দ্যে যা৷’

বউটির নাম সলমা৷ একমুখ ঘোমটা টেনে একটা বেতের মোড়া নিয়ে বেরিয়ে এল সে৷ উঠোনের উপর সেটা বসিয়ে রেখে আবার ফিরে গেল৷

‘বসেন কত্তা,’ বিড়িতে টান মেরে বলল আনিসুর৷

অর্জুন মোড়াটা টেনে বসল৷ পুরোনো মোড়া মড়মড় শব্দ করে তীব্র আপত্তি জানাল৷

‘মণ্ডল দাদা ভালোমানুষ ছেল৷ আফনেরা তো তারে খুনি বানায়ে দিলেন,’ বলে বিষণ্ণ মুখে বিড়িতে টান দিল আনিসুর৷

‘খুন করলে তো খুনিই বলে আনিসুর,’ বলল অর্জুন৷

আনিসুর এবার চোখ তুলে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকাল অর্জুনের দিকে৷ বলল, ‘তাইলে তো কত্তা হ>লডিই খুনি৷ যারা যারা মণ্ডল দাদার ছেলেডারে খুন করল, তাদেরকে জেলে ঢোকান৷ পারবেন?’ মাথা নাড়ল আনিসুর৷ বলল, ‘জানি, পারবেন না৷ আফনেও জানেন আফনে পারবেন না৷ তারা তো বড়োলোক৷ কত ট্যাকা, ক্ষমতা৷ তারা দিনকে রাত, রাতকে দিন করতে পারে৷ মণ্ডলদাদার তো ট্যাকাও ছেল না, ক্ষমতাও না৷ আসলে কী জানেন কত্তা, আমরা হ>লেই মণ্ডলদাদার মতো৷ আমাদের কিছু নাই, কেউ নাই৷ আমাদের ছেলেপিলে জন্মায়৷ বরাত জোর থাকলে বাঁচে, নাইলে কুত্তা বিলাইয়ের মতো মরে৷ কেউ দেখতেও আসে না৷ আইজকে আফনে আসচেন কত্তা, যেইদিন ছেলেডারে বাঁচানোর জন্য হ>লের কাছে ট্যাকার জন্য ঘুরতেছেল মণ্ডলদাদা, আফনে, আফনারা কোথায় ছেলেন, কন দেখি৷ পারবেন কইতে? পারবেন না কত্তা৷ যাউক গিয়া, কী জানতে চান, জিগান৷ যতটুক জানি, কব৷’

‘ধনঞ্জয়কে ছেলের চিকিৎসার জন্য টাকা কে দিয়েছিল?’ অর্জুন জিজ্ঞাসা করল৷

‘আমি জানি না৷ জিজ্ঞাসা করছিলাম আমি মণ্ডলদাদাকে৷ বলে নাই নাম৷ কইল, ছেলেডাই যখন বাঁচল না, তখন আর নাম দিয়া কী অইব৷ শোকা তাপা মানুষ৷ ছেলের জন্য কান্না করত, আর মদ গিলত৷ কইত, হ>লডিরে দেইখ্যা নিবে৷ কইত, খুনিদের খুন করলে পাপ লাগে না৷ এই আমি আফনেরে কইতেসি কত্তা, উপরে গিয়ে দেখবেন, মণ্ডলদাদার জন্নত নসিব হইছে ঠিক৷ আর আফনের ওই অমিয় চক্কোত্তি জাহান্নমে পচব গিয়া৷’

‘বাজে কথা বন্ধ করো,’ বলল অর্জুন, ‘ধনঞ্জয়ের সঙ্গে কেউ দেখা করতে আসত? পার্টির মধ্যে কারও সঙ্গে বেশি ভাব ছিল?’

আনিসুর একটু ভাবল৷ তারপর বলল, ‘কার সঙ্গে ভাব ছেল না ছেল আমি জানি না৷ কিন্তু যেইদিন অমিয় চক্কোত্তি মারা গেল, তার কয়দিন আগ থেইক্যে মণ্ডলদাদা চুপচাপ থাকত৷ আমি জিগাইলে কইত, সময় আইছে রে আনিসুর৷ সব হিসাব নিব৷ হিসাব তো নিতেই লাগত, শুধু ঠিক সময়ের অপিক্ষা৷’

‘ঠিক সময়ের অপেক্ষা?’ কীসের ঠিক সময়? ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল অর্জুন৷

‘তা জানি না৷ তবে একদিন মদের নেশায় কারে একটা ফোন করছিল মণ্ডলদাদা, আমার সামনেই করছিল৷ কারে জিগাইতেছিল, আর কতদিন দেরি? দাদার আমার রোগ অইসিল, মরণ রোগ৷ প্যাটে ক্যানছার৷ সব হিসাব কিতাব না মিটাইলে মণ্ডলদাদা মইরাও শান্তি পাবে না বলতেছেল ফোনে৷ অমিয় চক্কোত্তির মরার আগের দিন ঠেক থেইক্যা বেরায়তেছি, একটা ফোন আসল মণ্ডলদাদার৷ দাদা আমারে কইল, তুই বাড়ি যা আনিসুর৷ আমি তখন দূরে রাস্তায় পেচ্ছাপ করতে গেলাম৷ দূর থেইক্যাই দেখলাম একটা গাড়ির সামনে দাঁড়ায়ে আছে মণ্ডলদাদা৷ হাতে একটা লম্বামতো কীসের য্যানে বাক্স৷ গাড়িটা চইলা গেল৷ আমি আগায়ে গিয়া মণ্ডলদাদার পাশে গেলাম৷ জিগাইলাম, এইডা কী গো দাদা? মণ্ডলদাদা বাক্সটা লুকায়ে নিল জামার তলায়৷ এক ঝলক দেখলাম, বাক্সের উপর ফেলাসের ফোটোক৷’

‘ফেলাস? সেটা কী?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুন৷

‘ফেলাস৷ ফেলাস জানেন না? ওই যাইতে কইরা গরম চা, গরম জল রাখলে গরম থাকে৷ ওই ফেলাস৷’

‘ফ্লাস্ক?’ অর্জুনের বিস্মিত প্রশ্ন৷

‘হ্যাঁ, ওই... ফেলাস৷’

অর্জুন রীতিমতো উত্তেজিত৷ ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে ওর৷ জিজ্ঞাসা করল, ‘গাড়ির ভিতর কাউকে দেখেছিলে? কেমন গাড়ি? নম্বর মনে আছে?’

‘নাঃ, দেখি নাই কাউরে৷ আন্ধার ছেল৷ তয় গাড়িখান মনে আসে, কালো বড়োü গাড়ি৷ এসইউভি৷ নম্বর মনে নাই কত্তা৷’

অর্জুন উঠে দাঁড়াল৷ পকেট থেকে কিছু টাকা বার করে আনিসুরের দিকে এগিয়ে দিল৷ আনিসুর সেই দিকে তাকিয়ে বলল, ‘টাকা নিব না কত্তা৷ আল্লাহর কসম, যা কইলাম মণ্ডলদাদার জন্য কইলাম৷ নাইলে, মাইরা ধইরাও আফনেরা এই আনিসুর মিঞার প্যাট থেইক্যা কথা বাইর কত্তে পারতেন না৷’

আনিসুরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অর্জুনের গাড়ি বড়ো রাস্তায় এল৷ তার সন্দেহই ঠিক৷ ধনঞ্জয় মণ্ডল হয়তো অমিয় চক্রবর্তীকে খুনটা করেছে, কিন্তু এর পেছনে মাস্টারমাইন্ড ছিল অন্য কেউ, যে বিষমাখা ফ্লাস্ক আগের দিনই ধনঞ্জয়ের হাতে তুলে দিয়েছিল গোপনে? কে সে?

গভীর চিন্তায় ডুবে গেল অর্জুন৷ খেয়াল করল না একটা বাইকে কালো হেলমেট পরা একজন লোক গোপনে তার গাড়ি থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তার পিছু নিয়েছে৷

‘আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি টাপুরদি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘রিদ্ধিমার সঙ্গে দেখা করতে৷ ওকে বাইপাসে একটা ক্যাফেটেরিয়াতে আসতে বলেছি,’ গাড়ি ড্রাইভ করতে করতেই উত্তর দিল টাপুরদি৷

‘রিদ্ধিমা? কেন? সেই সবুজ ডায়েরি?’ জানতে চাইলাম আমি৷

‘আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে, রিদ্ধিমাকে আমরা ঠিকমতো এক্সপ্লোর করিনি৷’

‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তুমি কী বলছ? রিদ্ধিমা তোমার কাছে এসেছিল তন্ময়ের জন্য৷ এ ছাড়া রিদ্ধিমার সঙ্গে এই কেসের যোগ কোথায়?’

উলটোডাঙা ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে চলছে আমাদের গাড়ি৷ টাপুরদি বলল, ‘যোগ আছে রে মিতুল৷ নিশ্চয়ই যোগ আছে৷ আর আমরা সেটাই মিস করে গেছি৷ কাল সারারাত আমি অনেক ভেবেছি৷ সব থ্রেড এসে রিদ্ধিমাতেই থামছে৷’

‘আমি কিন্তু সত্যি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না টাপুরদি৷ এনিওয়ে এখান থেকে আমাকে একটু অফিস যেতে হবে আজ৷ রিদ্ধিমার সঙ্গে কথা বলেই যাব না হয়,’ বললাম আমি৷

‘আচ্ছা বেশ৷ যাস৷’

‘রিদ্ধিমার ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলো প্লিজ,’ বললাম আমি৷

‘বলছি৷ সবুজ ডায়েরির ছবিগুলো না দেখলে ব্যাপারটা আমার মাথাতেও আসত না৷ সবুজ ডায়েরিটা তন্ময় পেয়েছিল রিদ্ধিমার বাড়ি শিফট করার সময় জিনিসপত্রের মধ্যে৷ তাই তো?’

‘হ্যাঁ,’ মাথা নাড়লাম আমি৷

‘আর সেই ডায়েরিটা ছিল রিদ্ধিমার মায়ের, মানে মল্লিকা দাশগুপ্তর৷ মল্লিকা দাশগুপ্ত অমিয়বাবুর দলের বিরুদ্ধে লিখতেন৷ সুতরাং আমরা ধরে নিতে পারি ওই ডায়েরিতে এমন কিছু ছিল, যা অমিয় চক্রবর্তীর পলিটিক্যাল কেরিয়ারের ক্ষতি করতে পারত৷ কোনো অপরাধ, বা কোনো কুকীর্তির কথা যেটা সামনে এলে দলের ভাবমূর্তিতে কালি লাগতে পারে৷’

‘আবার দেখ, তন্ময় ইউনিকর্নে যে প্রজেক্টে কাজ করছিল, সেটার উদ্দেশ্যও ছিল অমিয় চক্রবর্তীর অতীত হাতড়ে এ-রকমই কিছু তথ্য খুঁজে বার করা৷ রিদ্ধিমার বাড়ি শিফটিং-এর সময় ডায়েরিটা পড়ল তন্ময়ের হাতে৷ সেদিন তন্ময়ের বাড়ি থেকে আমরা সবুজ প্লাস্টিকের টুকরো পেয়েছিলাম মনে আছে? সেটা সম্ভবত এই ডায়েরিরই কভারের টুকরো৷ তন্ময় ডায়েরিটা পায় রিদ্ধিমার বাড়ি থেকে৷ উলটেপালটে সেটাকে দেখে বুঝল, সেটা সোনার খনি৷ ওই একটা ডায়েরি দিয়েই সে কেরিয়ারে উন্নতির শিখরে পৌঁছোতে পারে৷ উৎসাহের বশে সেই ডায়েরির কথা, এবং ডায়েরির তথ্য সম্পর্কে সে সুবিনয় মুখার্জিকে জানিয়ে দিল৷ আর ডায়েরিটা স্ক্যান করে সফট কপি বানিয়ে অফিসের ডেস্কটপে সেভ করে রাখল সে৷’

‘কিন্তু তারপর তন্ময়ের মনে হল, সেই তথ্যগুলি সে সুবিনয় মুখার্জিকে দেবে না৷ সেই কারণে রাতের অন্ধকারে এজেন্সিতে ঢুকে তন্ময় সিস্টেম থেকে ফাইলটা ডিলিট করে দিল৷ নিজের কাছে একটা কপি রাখল পেনড্রাইভে৷

‘এবার প্রশ্ন হল, তন্ময় কেন হঠাৎ মত বদলাল?’ প্রশ্ন করল টাপুরদি৷

‘কেন?’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম৷

‘আমি তোর কাছে জানতে চাইছি, আর তুই উলটো আমাকেই জিজ্ঞাসা করছিস? মাথাটা খাটা৷ নিজে ভাব৷’

বুঝলাম টাপুরদি এখন আর কিছু বলবে না৷ গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম, কেন তন্ময় ফাইলটা সরিয়ে নিল? যদি সত্যিই সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য থেকে থাকে ওই ফাইলে, তাহলে ওর চাকরিতে উন্নতি, ইনক্রিমেন্ট বাঁধা ছিল৷ তবে কেন?

হঠাৎ একটা চিন্তা বিদ্যুৎচমকের মতো মাথায় খেলে গেল৷ বললাম, ‘আচ্ছা টাপুরদি, তন্ময় নিজেই অমিয়বাবুকে ব্ল্যাকমেল করতে চায়নি তো? মনে করো, এমনও তো হতে পারে যে ও নিজেই অমিয়বাবুকে ব্ল্যাকমেল করতে গেছিল৷ এমন সময় অমিয়বাবু খুন হয়ে গেলেন৷ এদিকে সুবিনয় মুখার্জিও ওকে খুঁজছে৷ বাধ্য হয়েই তন্ময় গা-ঢাকা দিল৷’

টাপুরদি একটুক্ষণ চুপ করে রইল৷ তারপর বলল, ‘এই তো তোর মাথা খুলছে৷ আপাতত এই সম্ভাবনাটার কথাই গত ক’দিন ধরে আমারও মাথায় ঘুরছে রে৷ রিদ্ধিমা যত সহজভাবে কথাটা আমাদের কাছে বলেছে, সেটা নাও হতে পারে৷ এখন মনে হচ্ছে সেটা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি৷ তুই ঠিক বলেছিস৷ অমিয়বাবুর মৃত্যুর পর হয়তো ওরা ভয় পেয়ে গেছিল৷ তাই রিদ্ধিমা আমার কাছে এসেছিল৷’

‘এত শিয়োর হচ্ছ কীভাবে তুমি?’

‘শিয়োর হচ্ছি না ঠিক৷ তবে তুই খেয়াল করে দেখলে দেখবি, তন্ময়ের অনুসন্ধানের ব্যাপারে শুরুতে রিদ্ধিমার যত আগ্রহ ছিল, ততটা এখন আর নেই৷ এর দুটো কারণ হতে পারে৷ এক, তন্ময়ের প্রতি রিদ্ধিমার প্রেমে চিড় ধরেছে৷ আউট অব সাইট, আউট অব মাইন্ড আর কী! দুই, রিদ্ধিমা জানে তন্ময় কোথায় আছে৷ কিন্তু সেই কথাটা সরাসরি আমায় জানিয়ে আমায় আর এগোতে মানা করতে পারছে না যেহেতু পুলিশের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে৷’

রিদ্ধিমা আমাদের আগেই ক্যাফেটেরিয়াতে উপস্থিত হয়েছে দেখলাম৷ আমাদের দেখে উঠে দাঁড়াল৷ মুখ শুকনো হলেও আগের দিনের মতো বিধ্বস্ত বলে মনে হল না৷ টাপুরদিকে দেখে ফিকে হাসল৷ বলল, ‘কোনো খবর পেলেন?’

টাপুরদি রিদ্ধিমার কথার জবাব না দিয়ে প্রশ্ন করল, ‘সবুজ ডায়েরিটাতে কী ছিল রিদ্ধিমা?’

রিদ্ধিমাকে ভগ্নাংশ মুহূর্তের জন্য যেন কিছুটা অপ্রস্তুত লাগল৷ তারপর বলল, ‘আমি জানি না৷ মায়ের জার্নালিজমের ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ ছিল না কোনোদিনই৷’

‘হতে পারে৷ কিন্তু তন্ময় ডায়েরিটা পড়ে নিশ্চয়ই আপনাকে জানিয়েছিল কিছু?’ রিদ্ধিমার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘না, আমায় ও কিছু জানায়নি৷ কেন বলুন তো? ওই ডায়েরির ব্যাপারে কেন জিজ্ঞাসা করছেন? ডায়েরির সঙ্গে তন্ময়ের অন্তর্ধানের কী সম্পর্ক?’ জিজ্ঞাসা করল রিদ্ধিমা৷

‘রিদ্ধিমা, আপনি সত্যিই কিছু জানেন না, এটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়’, টাপুরদি বলল৷

রিদ্ধিমা টাপুরদির মুখের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ৷ তারপর বলল, ‘আপনার কী ধারণা মিস ব্যানার্জি? আমি সব জেনেশুনে তন্ময়ের জন্য আপনার কাছে গেছিলাম? হ্যাঁ এটা ঠিক যে ওই ডায়েরিটা তন্ময় পড়ছিল সেদিন, কিন্তু সেটা যে সত্যিই ততটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু তা আমায় বলেনি৷ আর সত্যি বলতে কী, আমার নিজের এখনও মনে হয় না ওটা নিয়ে বেশি ভাবার কিছু আছে৷ আপনি কেন ডায়েরিটাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছেন বুঝতে পারছি না৷’

টাপুরদি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রিদ্ধিমার মুখের দিকে, যেন ওর মনের ভিতরটা পড়ে নিতে চাইছে৷ তারপর বলল, ‘রিদ্ধিমা, একটা কথা বলি আপনাকে৷ তন্ময়ই যেখানেই থাকুক, ও কিন্তু সুরক্ষিত নয়৷ সুতরাং যদি ওর ভালো চান, দয়া করে কিছু লুকোবেন না আমার থেকে৷’

‘যতক্ষণ রিদ্ধিমা আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল, রাস্তার উলটোদিকে একটা কালো এসইউভি দাঁড়িয়ে ছিল, খেয়াল করেছিস?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘কালো এসইউভি?’ অবাক হলাম আমি৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%