সোমজা দাস
‘ভালোই তো৷’ বলল টাপুরদি৷
‘ভালো-মন্দের কথা কে জানতে চাইছে? ধুর! আমি জিজ্ঞাসা করছি, কী মনে হল? ভদ্রমহিলা কিন্তু খুব শক্ত ধাতুতে গড়া, তাই না?’
‘সে তো হবেই৷ ভুলে যাস না, তিনি শুধু অমিয় চক্রবর্তীর স্ত্রী-ই নন, একসময় নিজেও একজন প্রথম সারির নেত্রী ছিলেন৷ ওয়ান্স আ পলিটিশিয়ান ইজ অলওয়েজ আ পলিটিশিয়ান৷’
‘এই কোটটা আবার কোত্থেকে পেলে?’ হেসে জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
অর্জুনদা মুখ টিপে হেসে বলল, ‘মাতা সংঘমিত্রা উবাচ!’
টাপুরদি বলল, ‘সে যেই বলে থাকুক, কথাটা ভুল নয়৷ আসলে পলিটিক্যাল ইন্টেলেক্ট সবার থাকে না৷ পলিটিক্যাল কেরিয়ারে সাক্সেসফুল হতে গেলে এমন কিছু বিশেষ গুণ থাকা দরকার, যেগুলি সবসময় শিখে হয় না৷ অনেকসময় জিনের মধ্যেই সেগুলো নিয়ে জন্মায়, বা পরিবারের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবেশ থাকলে ছোটো থেকে ব্যক্তিত্বের মধ্যে মিশে যায় রাজনীতি৷ সুনয়নাদেবী আপাতভাবে অ্যাকটিভ পলিটিক্স থেকে সরে এলেও রাজনীতি থেকে কখনোই দূরে যাননি৷ ওঁদের পরিবারটাই রাজনৈতিক পরিবার৷ তুই ভাব মিতুল, যেখানে বাড়িতে চলতে-ফিরতে-ঘুমোতে-জাগতে সবসময় রাজনীতি নিয়ে কথাবার্তা, ভাবনাচিন্তা চলছে, সেই বাড়িতে থেকে কি রাজনীতি থেকে দূরে থাকা সম্ভব আদৌ?’
‘হুম, কিন্তু টাপুরদি, তুমি আজ যেভাবে সুনয়নাদেবীকে দুম করে অনামিকা রায়ের কথা জিজ্ঞাসা করে বসলে, তাতে আমি সিরিয়াসলি বলছি, পুরো চমকে গেছিলাম৷’
অর্জুনদা বলল, ‘আগ বাড়িয়ে দুঃসাহস দেখানোয় তোমার দিদির স্পেশাল এক্সপার্টাইজ আছে, সে আমি বরাবরই জানি৷’
টাপুরদি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘মনে হল জিজ্ঞাসা করা দরকার৷ তাই জিজ্ঞাসা করলাম৷ আমি আসলে সুনয়নাদেবীর অভিব্যক্তিটা দেখতে চেয়েছিলাম৷’
‘তুমি জানো টাপুর, সুনয়না চক্রবর্তী চাইলে তোমার এই কেসে তদন্ত করায় ইতি টেনে দিতে পারেন৷ ভুলে যেয়ো না, সুনয়নাদেবী এই রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রীর মা৷ অনেক কষ্টে ডিসিডিডি স্যার তোমার জন্য পারমিশনটা বের করেছেন৷ এখন তুমি যদি এভাবে সবার এফোর্টে জল ঢেলে দাও, তাহলে আর কিছু বলার নেই তোমায়৷’ গম্ভীর মুখে বলল অর্জুনদা৷
এই রে, পরিবেশ আবার গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে৷ তাড়াতাড়ি বললাম, ‘আচ্ছা অর্জুনদা, ধনঞ্জয় মণ্ডলের কাছে যে সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে, সে নিজেকে অমিয় চক্রবর্তীর খুনি বলে ক্লেইম করেছে, সেটা পুলিশ তো খতিয়ে দেখেছে? কতটা যুক্তিগ্রাহ্য সেটা?’
‘কোনো সন্দেহ নেই৷ খুনটা ধনঞ্জয় মণ্ডলই করেছে৷’ বলল অর্জুনদা৷
‘তুমি শিয়োর?’ জিজ্ঞাসা করলাম৷
‘সমস্ত এভিডেন্স তো তাই বলছে৷ ক্যান্টিনের ছেলেটাও সার্টিফাই করেছে, ফ্লাস্কটা ধনঞ্জয় মণ্ডলই ক্যান্টিনে পৌঁছে দিয়ে বলেছিল চা করে অমিয়বাবুর কেবিনে পাঠাতে৷ সেদিন ধনঞ্জয় পার্টি অফিসে গিয়েছিল বিকেল নাগাদ, বেশিক্ষণ থাকেনি৷ ইদানীং ধনঞ্জয় মণ্ডল একটু চুপচাপ থাকত৷ কিন্তু সেদিন নিজে থেকেই কয়েকজনকে ডেকে কথাবার্তা বলেছে৷ তবে অমিয়বাবুর ঘরে দেখা করতে গিয়েছিল একবার৷ একজন স্টাফ তাকে ফ্লাস্ক হাতে নিয়ে কেবিন থেকে বেরোতে দেখেছে শুনলাম৷ স্টাফরুমে গিয়ে ঘুরে এসেছে বারদুয়েক৷ মোটামুটিভাবে তাকে সেদিন অফিসে ও অমিয়বাবুর রুমে অনেকেই দেখেছে৷’
টাপুরদি এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল৷ এবার বলল, ‘এতদিন চুপচাপ থাকত৷ তেমনভাবে কথা বলত না৷ হঠাৎ করে যেদিন অমিয়বাবুকে খুন করবে, সেদিনই সকলের সঙ্গে কথা বলল, অফিসে ঘুরে বেড়াল, সকলের সামনে দিয়ে ফ্লাস্ক নিয়ে গেল৷ কেন? ধনঞ্জয় মণ্ডল কি ইচ্ছে করেই সাক্ষী রাখছিল? যাতে সবাই সহমত হয়ে সাক্ষী দিতে পারে?’
আমি বললাম, ‘ধনঞ্জয় মণ্ডল যদি খুনি হয়, তাহলে তো কেস ক্লোজ হয়েই গেল৷ আর কী খুঁজছ তাহলে?’
অর্জুনদা হাসল৷ বলল, ‘ক্লোজ হয়ে যাওয়াই তো উচিত৷ যেখানে খুনি নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে, সব এভিডেন্স তার দাবিকেই সত্যি বলে মেনে নিচ্ছে, সেক্ষেত্রে কেসের আর কিছু বাকি থাকে না৷ সারা রাজ্যে কত ক্রাইম হচ্ছে, রোজ কত ফাইল জমা হচ্ছে, সেখানে একটা খুন নিয়ে বসে থাকলে পুলিশের চলে না৷ কিন্তু এক্ষেত্রে ভিকটিম হলেন রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী৷ তাই এত সহজে ফাইলটা বন্ধ করে সরিয়ে রেখে অন্য কাজে মন দেওয়া যাচ্ছে না৷ বাই চান্স, কাল যদি অন্য কোনো অ্যাঙ্গেল বেরোয়, প্রেস মিডিয়া পুলিশকে ছিঁড়ে খাবে, বুঝলে সখি?’
টাপুরদি এবার হেসে বলল, ‘তোমরা মিডিয়াকে এত ভয় পাও কেন বল তো?’
অর্জুনদা টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চাকরির প্রশ্ন, ম্যাডাম৷ হাত পেতে সরকার বাহাদুরের থেকে মাইনা নিই৷ আপনার মতো দুঃসাহস আমার কোথায়?’ তারপর হাত উলটে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এবার উঠি৷’
টাপুরদি বলল, ‘চুপ করে বোসো৷ খেয়ে যাবে৷’
বরফ গলছে৷

রাতে খাওয়া-দাওয়া সারা হলে পরে অর্জুনদা বেরিয়ে গেল৷ কাজকর্ম সারা হতে হতে রাত সাড়ে এগারোটা বাজল৷ আমি বিছানায় শুতে যাওয়ার সময় দেখলাম, টাপুরদি ল্যাপটপ নিয়ে সোফার উপর বসে নিবিষ্টমনে কিছু দেখছে৷ আমি আর বিরক্ত করলাম না, ঘরের শুতে চলে গেলাম৷
সকালে উঠে দেখি টাপুরদি বসার ঘরে সোফার উপরে এক কোণে গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে৷ দেখে মনে হল ভোরের দিকেই ঘুমিয়েছে৷ আর ডাকলাম না৷ বাথরুম সেরে ফিরে এসে দেখি টাপুরদি সোফায় উঠে বসেছে৷ ঘুম জড়ানো চোখে হাই তুলে বলল, ‘অনেক বেলা হয়ে গেল তো!’
‘একদিন বেলায় ঘুম থেকে উঠলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয় শুনি? তুমি ফ্রেশ হও, আজ আমি চা করছি৷’ বলে কিচেনে ঢুকলাম৷ আমি জানি টাপুরদি চায়ের ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে৷ চা-টা টাপুরদির বিলাসিতা৷ বাজারের বেস্ট কোয়ালিটির মাসকাটেল ফ্লেভারের দার্জিলিং চা আসে টাপুরদির কিচেনে৷ সেই চা আবার ভীষণ অভিমানী৷ বানানোর ক্ষেত্রে সামান্য ভুলচুক হলেই চিত্তির৷ অবশ্য টাপুরদির ট্রেনিংয়ে আমি এখন বেশ চা বানাতে শিখে গেছি৷ বাবা প্রায়ই বলে, ‘টাপুর এই একটা অন্তত কাজের কাজ করেছে৷ মেয়েটাকে চা-টা অন্তত নিজে হাতে করতে শিখিয়েছে৷’ অফিসে এত এত কোডিং করছি, ফরেন ক্লায়েন্টদের মাথায় হাত বুলোচ্ছি, টাপুরদির সঙ্গে গোয়েন্দার অ্যাসিস্ট্যান্টগিরি করছি, সেসব যেন কিছু না৷ বাবার অপদার্থ মেয়ে চা বানাতে শিখেছে বলে বাবা ভারি খুশি৷
ট্রেতে দুই কাপ চা সাজিয়ে এনে বসার ঘরের সেন্টার টেবিলের উপর রাখলাম৷ তারপর ঘরের জানালার পরদাগুলো সরিয়ে দিতেই সকালের এক ঝলক নরম আলো দুষ্টু ছেলের দলের মতো ছুটে এসে ধুয়ে দিল গোটা ঘরটাকে৷ সোফায় এসে বসলাম৷ টাপুরদি চায়ের কাপে চোখ বুজে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বেড়ে বানিয়েছিস চা-টা৷’
‘সারারাত জেগে করলেটা কী?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘একটু গবেষণা করলাম৷’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি৷
‘তা সেটা কেমন গবেষণা?’ আমি জানতে চাইলাম৷
‘এই কেসটা কেমন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে৷ তথ্যগুলো হাতে আসছে, কিন্তু বাঁধা পড়ছে না৷ সেগুলোকে এক সুতোয় বাঁধতে পারলে ব্যাপারটাকে কিছুটা গুছিয়ে তোলা যায়৷ তাই চেষ্টা করলাম সুতোয় বাঁধতে৷’
‘গেল বাঁধা?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
টাপুরদি মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘নাঃ, বিস্তর ফাঁকফোকর রয়ে গেছে এখনও রে৷ তবে বেশ কিছু নতুন ব্যাপার আবিষ্কার করলাম, যেগুলো এতদিন চোখে পড়েনি৷’
‘নতুন কোনো ডিসকভারি?’ জানতে চাইলাম৷
‘নতুন তেমন কিছু নয়৷ তবে পুরোনো খবরের কাগজ ঘেঁটে-টেটে মনে হল, অমিয়বাবুর চরিত্রে বেশ কালোর ছোপ রয়েছে হয়তো৷ এখনকার কথা বলছি না, তবে অতীতে তিনি আর যাই হোক, ঠিক সাধুসন্ত ধরনের মানুষ বোধ হয় ছিলেন না৷ আমার ধারণা সেটা জেনেই বিনয়বাবু ইউনিকর্নকে প্রজেক্টটা দিয়েছিল, অতীত খুঁড়ে প্রমাণ বের করার জন্য৷’
‘আর সেই প্রমাণের পিছনেই এখন সকলে ছুটছে৷ গ্রেট! তাহলে নেক্সট মুভ কী?’
‘আরেকটু জানতে হবে রে মিতুল৷ এই কেসের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলিকে আরেকটু বেশি বুঝতে হবে৷ তাদের জীবনের, চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে৷ আমরা এখনও অন্ধকারে হাতড়াচ্ছি৷ এখনও জানি না যে অমিয়বাবুর মৃত্যু রহস্য উন্মোচিত হয়ে গেছে কি না৷ অর্থাৎ, যদি ধনঞ্জয় মণ্ডলই হত্যাকারী হয়ে থাকে, তাহলে এই কেসে আর নতুন করে খোঁজার আদৌ কিছু আছে কি? অম্লানবাবুর সঙ্গে একটু সামনাসামনি কথা বলতে পারলে ভালো হত৷’
‘উনি কি আর কথা বলবেন? পুলিশের সঙ্গে যদি বা বলেন, প্রাইভেট ডিটেকটিভের সঙ্গে বলতে চাইবেন না হয়তো৷’ বললাম আমি, ‘আফটার অল, অম্লান চক্রবর্তী এই রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী৷’
‘সেটাই চিন্তা৷ কিন্তু কথা বলাটা খুব দরকার রে মিতুল৷ একটা মানুষকে সামনাসামনি না দেখলে তাকে জানার অনেকটাই বাকি থেকে যায়৷’
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা, অম্লানবাবু বিয়ে করেননি, না?’
‘কে বলেছে করেননি?’ চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলের উপর রেখে বলল টাপুরদি৷
‘করেছেন? জানতাম না তো? কোনোদিন তো অম্লানবাবুর স্ত্রী বা পরিবার সম্পর্কে কিছু শোনা যায়নি!’ বিস্মিত কণ্ঠে বললাম৷
‘জানা যায়নি, কারণ সেই খবরগুলোকে ইন্টেনশনালি চেপে দেওয়া হয়েছে৷ অম্লানবাবুর বিয়ে হয়েছে প্রায় কুড়ি বছর আগে৷ প্রেমের বিয়ে৷ ইউনিভার্সিটির জুনিয়ার ছিলেন তাঁর স্ত্রী৷ তাঁর স্ত্রীর পরিবার রাজনীতি জগতের লোক নন৷ বিয়ের বছর খানেকের মাথায় একটি মেয়ে হয় তাঁদের৷ ঠিক তার ছয় মাসের মাথায় অম্লানবাবুর স্ত্রী আত্মহত্যা করেন৷ পুলিশি তদন্তে জানা যায়, পোস্ট পার্টাম ডিজর্ডার অর্থাৎ সন্তানের জন্ম-পরবর্তী অবসাদে ভুগছিলেন তিনি৷ অম্লানবাবুও সময় দিতে পারতেন না স্ত্রীকে৷ একাকিত্ব, অবসাদ দিনে দিনে গভীরতর হয়ে উঠেছিল, কেউ সেটা বোঝেনি৷ তার পরিণাম আত্মহত্যা৷’
‘যাহ, এটা কিন্তু ভীষণ দুঃখজনক ব্যাপার৷’ বললাম আমি৷
‘হুম, আসলে আমাদের সমাজে এখনও মনের অসুখকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না রে৷ মন খারাপকে অবসাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে বেশিরভাগ মানুষ৷ সে যাই হোক, সেই সময় খবরের কাগজ, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এই মৃত্যু নিয়ে বেশ জলঘোলা করেছিল৷ এমনকী বধূহত্যার অভিযোগও এনেছিল বউয়ের বাপের বাড়ির তরফ থেকে, যদিও পরে কেস তুলে নেয়৷ শুনেছি, অম্লানবাবুর মেয়েটি এখন দাদুর বাড়িতেই থাকে৷ সেখানেই বড়ো হচ্ছে৷’
‘আর এই তথ্যগুলো কোথা থেকে জানলে তুমি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি, ‘তোমার মধ্যরাতের রিসার্চ?’
‘ইয়েস৷’ হেসে বলল টাপুরদি৷
‘হিসেবমতো মেয়েটির বয়স এখন আঠারো-উনিশ৷ তাই না টাপুরদি?’
‘হ্যাঁ৷ তাই তো দাঁড়াচ্ছে৷’ বলল টাপুরদি৷
‘আচ্ছা, এত বছরে অম্লানবাবু আর বিয়ে করলেন না কেন?’
‘আমি কী করে জানব কেন করলেন না৷’ ঠোঁট উলটে বলল টাপুরদি৷
‘হুম, ইন্টারেস্টিং,’ মাথা নেড়ে বললাম আমি, ‘আর কী কী জানলে কাল রাত জেগে?’
‘সেসব পরে হবে৷ এখন উঠে ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করি৷ রাত জাগলে বড্ড খিদে পায়৷’ বলে উঠে পড়ল টাপুরদি৷
ব্রেকফাস্ট শেষ হওয়ার আগেই অর্জুনদার ফোন এল৷ জানাল, অম্লান চক্রবর্তী দেখা করতে চেয়েছেন টাপুরদির সঙ্গে৷
‘আরে এ তো মেঘ না চাইতেই জল৷ ব্যাপারটা কী টাপুরদি?’ টোস্টে কামড় বসিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘কী আর৷ সুনয়নাদেবী ছেলেকে বলেছেন আমার ব্যাপারে৷ তাই তলব৷ চাকরিটা যাওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা৷’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি৷
‘তোমার আবার চাকরি! তুমি হলে নিজেই নিজের মালিক৷ চাকরির চিন্তা তো আমার মতো দরিদ্র কনিষ্ঠ কেরানিদের করতে হয়৷ পান থেকে চুন খসল কিনা ব্যস, হয়ে গেল চাকরির দফারফা৷ ক্লায়েন্ট ব্যাজার, বসের মুখ ভার, প্রোজেক্ট ম্যানেজারের হুড়কো, খাসা জীবন আমার৷ তোমার একটা কেস হাত থেকে গেলে লাইন দিয়ে আরও ক’টা এসে যায়৷ অম্লান চক্রবর্তীর চোখ রাঙানিতে বয়েই গেল তোমার৷’ বললাম আমি৷
‘বয়ে গেলে কি চলবে? ভুলে যাস না, তন্ময়কে আমরা এখনও খুঁজে পাইনি৷ তন্ময় কোথায় আছে, কীভাবে আছে কিচ্ছু জানি না আমরা৷’ বলল টাপুরদি৷ টাপুরদিকে যেন কিছুটা চিন্তিত দেখাল৷

ঠিক দুপুর সাড়ে বারোটায় আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলেন অম্লান চক্রবর্তী৷ সেইমতো আমরা সোওয়া বারোটা নাগাদ পার্টি অফিসে পৌঁছে গেলাম৷ অর্জুনদা এল বারোটা পঁচিশ নাগাদ৷ দেখেই মনে হল খুব ব্যস্ত৷ ঠিক বারোটা পঁয়ত্রিশ নাগাদ অম্লান চক্রবর্তীর কেবিনে ডাক পড়ল আমাদের৷ অর্জুনদা নীচু গলায় বলল, ‘অম্লান চক্রবর্তী এখন অমিয় চক্রবর্তীর কেবিনে বসছেন৷ এই ঘরেই খুন হয়েছিলেন অমিয়বাবু৷’
ঘরে ঢুকে দেখলাম অমিয়বাবু ল্যাপটপে কিছু করছিলেন৷ অর্জুনদা দরজায় নক করতে তিনি ভিতরে আসতে বললেন৷ আমরা তিনজন ভেতরে গিয়ে সামনে দাঁড়াতে মাথা না তুলেই বললেন, ‘বসুন৷’
বিরাট সেক্রেটারিয়ট টেবিলের সামনে অনেকগুলি চেয়ার রয়েছে৷ আমরা তিনজন চেয়ার টেনে বসলাম৷ অম্লান চক্রবর্তী ঝড়ের বেগে টাইপ করে চলেছেন৷ আমরা যে সামনে বসে আছি, যেন মনেই নেই তাঁর৷ মিনিট পাঁচেক কাটল৷ এর মধ্যে অর্জুনদা বার তিনেক ঘড়ি দেখল, আমিও উশখুশ করছি৷ শুধু টাপুরদি স্থির, অচঞ্চল৷
মিনিট পাঁচেক পর ল্যাপটপ থেকে মুখ তুললেন অম্লান চক্রবর্তী৷ তাঁর দৃষ্টি পর্যায়ক্রমে আমাদের তিনজনের দিকে একবার ঘুরে গেল৷ তারপর অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার নাম কী, অফিসার?’
অর্জুনদা বলল, ‘অর্জুন রায়৷’
‘হুম৷ আইপিএস?’
‘হ্যাঁ,’ অর্জুনদা মাথা নেড়ে বলল৷
অম্লানবাবু বললেন, ‘বাহ, খুব ভালো৷ তা আপনি আমার বাবার মৃত্যুর তদন্ত করছিলেন?’
অর্জুনদা বলল, ‘স্যার, আমি তদন্তদারী দলের সদস্য৷ আমি ছাড়াও আরও অনেকে আছে দলে৷ আর অমিয়বাবুর মৃত্যুর মতো হাই প্রোফাইল কেসে ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল নিজে টিমকে লিড করছেন৷ কমিশনার সাহেবকে তদন্তের প্রতি মুহূর্তের আপডেট জানানো হচ্ছে৷’
‘কীসের তদন্ত?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন অম্লান চক্রবর্তী৷
অর্জুনদা এবার একটু থমকাল৷ বলল, ‘স্যার, আমি অমিয়বাবুর মৃত্যুর তদন্তের কথা বলছি৷’
‘কিন্তু আমি যতদূর জানি, বাবার খুনি ধনঞ্জয় মণ্ডল৷ সে খুনের দায় স্বীকার করে আত্মহত্যা করেছে৷ সবরকম প্রমাণও পাওয়া গেছে তার দাবির সপক্ষে৷ তাই তো?’
‘হ্যাঁ স্যার,’ অর্জুনদা বলল৷
অম্লানবাবু চোখ ছোটো করে অর্জুনদার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাহলে কীসের তদন্ত চলছে এখনও? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না৷ একটু খোলসা করে বললে ভালো হয়৷’
অর্জুনদা দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল, ‘আসলে খুনি সুইসাইড করেছে ধরে নিলেও কেস ক্লোজ করার আগে আমাদের কিছু সার্টেন প্রোসিডিয়োরের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়৷ খুনির দাবি সম্পর্কে একশো শতাংশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কেস ক্লোজ করা যায় না৷ আর ভিকটিম এক্ষেত্রে রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী৷ তাই আমাদের সব দিক খতিয়ে দেখাটা দরকার৷’
‘নিশ্চয়ই, সে তো একশোবার,’ বলে হাসলেন অম্লান চক্রবর্তী, ‘এইজন্যই কলকাতা পুলিশ হল দ্য মোস্ট এফিশিয়েন্ট ওয়ান ইন দ্য কান্ট্রি৷ আচ্ছা, সে যাই হোক, এঁদের তো চিনলাম না!’ আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন অমিয়বাবু৷ যেন ভুলেই গেছেন যে নিজেই ডেকে পাঠিয়েছেন আমাদের৷
অর্জুনদা টাপুরদির ও আমার পরিচয় দিলেন অম্লানবাবুকে৷ অম্লানবাবু স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ টাপুরদির দিকে৷ তারপর হেসে উঠলেন৷ বললেন, ‘দ্য মোস্ট এফিশিয়েন্ট কলকাতা পুলিশের তাহলে আজকাল প্রাইভেট ডিটেকটিভের হেল্প দরকার হচ্ছে কেস সলভ করার জন্য৷ বাই দ্য ওয়ে, আপনারা চা খাবেন, না কফি?’
চা-কফির প্রস্তাব শুনেই মনে পড়ে গেল এই কেবিনে বসেই অমিয়বাবু বিষ মেশানো চা খেয়ে মারা গেছেন৷ আমি ‘খাব না’ বলার আগেই অর্জুনদা বলল, ‘না স্যার৷ অন ডিউটি আছি৷’
অম্লান চক্রবর্তী হেসে বললেন, ‘আরে মশাই আপনি না হয় অন ডিউটি আছেন৷ হোয়াট অ্যাবাউট দ্য লেডিজ? পুলিশের তদন্তে মাথা গলানো আশা করি প্রাইভেট ডিটেকটিভের ডিউটির আওতায় পড়ে না!’
অর্জুনদা অপ্রস্তুত মুখে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই টাপুরদি বলল, ‘আমি কিন্তু চা খাব৷ দার্জিলিং ব্ল্যাক টি, উইদাউট সুগার অ্যান্ড মিল্ক৷ পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই?’
আমি আর অর্জুনদা চমকে উঠে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম৷ টাপুরদির দুঃসাহস যেন দিন দিন সীমা ছাড়াচ্ছে৷ কার সামনে আমরা বসে আছি, টাপুরদি কি ভুলে গেছে? অম্লান চক্রবর্তীও বুঝি কিছুটা চমকালেন, কিন্তু তিনি অসম্ভব বুদ্ধিমান লোক৷ মুখের অভিব্যক্তিটাকে মুহূর্তে স্বাভাবিক করে হেসে বললেন, ‘নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে৷ বাবার জন্য বেস্ট কোয়ালিটির দার্জিলিং ব্ল্যাক টি আসত৷ সেই চা থেকেই তো...৷’
বলতে বলতে বেল বাজিয়ে কাউকে ডাকলেন তিনি৷ একজন উর্দি পরা লোক ভিতরে ঢুকল৷ এই ঘরে ঢোকার মুখে এই লোকটাকে আমরা বাইরে টুলে বসে থাকতে দেখেছি৷ অম্লানবাবু তাকে এক কাপ ব্ল্যাক টি আনতে বললেন৷ লোকটা দরজা টেনে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে অম্লানবাবু টাপুরদির দিকে ফিরলেন৷ বললেন, ‘তা আপনি তো প্রাইভেট ডিটেকটিভ, তাই তো?’
মাথা নাড়ল টাপুরদি৷ অম্লানবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘লাইসেন্স আছে?’
টাপুরদি আবার সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল৷
অম্লানবাবু বললেন, ‘গুড৷ কাল তো আপনারা আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন শুনেছি৷ তা অফিসার, আমার বাড়িতে যাওয়ার আগে আমার কাছে পারমিশন নেওয়াটা বোধ হয় তেমন জরুরি বলে বোধ হয়নি, না? মানে শিয়োর, আপনি তো আর নিজের ইচ্ছেয় যাননি৷ চাকরি বলে কথা৷ তা সৌরভ সান্যালের তো অনেক বছর চাকরি হল৷ এসব তো তাঁর জানা উচিত৷ ঠিক কি না?’
অর্জুনদা অপ্রস্তুত গলায় বলল, ‘আসলে সুনয়নাদেবীর সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার হয়ে পড়েছিল৷ তাই আমিই গিয়েছিলাম৷ ডিসিডিডি স্যার জানতেন না৷’
অম্লান চক্রবর্তী অর্জুনদার দিকে ঠান্ডা চোখে তাকালেন৷ তারপর বললেন, ‘আপনার মনে হল আমার মার সঙ্গে দেখা করা দরকার৷ আর আপনি উইদাউট এনি পারমিশন প্রাইভেট গোয়েন্দা সঙ্গে করে আমার বাড়ি চলে গেলেন! গুড৷ বাই দ্য ওয়ে, আপনি আইপিএস ট্রেনিং কবে শেষ করলেন?’
অর্জুনদা বলল, ‘দুই বছর হল৷’
‘ওহ, শুরুতেই লালবাজারে পোস্টিং, আপনি তো মশাই দারুণ ভাগ্যবান,’ বলে হো-হো করে উচচকণ্ঠে হাসলেন অম্লানবাবু৷ তারপর হাসি থামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ঝাড়গ্রামের দিকটা খুব রেস্টলেস, জানেন তো? ঝামেলা লেগেই থাকে৷ আপনার মতো সাহসী, এলিজিবল অফিসারকে ওই অঞ্চলে খুব প্রয়োজন৷ ভাবছি আপনাকে ওখানে রেকমেন্ড করি৷ আপনি কী বলেন?’
অর্জুনদা সামান্য কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল৷ তারপর মুখে মৃদু হাসি টেনে বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলল, ‘স্যার, আইপিএসে চান্স পাওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি৷ বাড়ির লোকেরা, বন্ধুবান্ধব চেয়েছিল আমি আইএএস ট্রাই করি৷ আমি করিনি, করতে চাইনি৷ কারণ, আমি পুলিশ সার্ভিস জয়েন করতে চেয়েছিলাম৷ আর সেক্ষেত্রে আমাকে যেকোনো জায়গায়, যেকোনো পরিস্থিতিতে কাজ করতে হবে জেনেই সেটা চেয়েছিলাম৷ চাকরির ক্ষেত্রে যেখানে আমায় পোস্টিং দেওয়া হবে, সেখানেই যাব৷ চেয়ার টেবিলে বসে আরামের চাকরি করতে হলে আইএএস-এর জন্য চেষ্টা করতাম স্যার৷ আরেকটা কথা, যেখানেই চাকরি করব, সেখানেই সম্পূর্ণ সততার সঙ্গে করব৷ পুলিশের চাকরি শুরুর আগে আমাদের ওথ নিতে হয়েছিল স্যার৷ আর পরিস্থিতি বিশেষে যা প্রয়োজনীয় বলে মনে হবে, সেটাই করব৷’
অম্লানবাবু চুপচাপ চেয়ে রইলেন অর্জুনদার মুখের দিকে৷ আমি আড়চোখে টাপুরদির মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম, টাপুরদি মুগ্ধদৃষ্টিতে অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে আছে৷ এইরকম পরিস্থিতিতে না থাকলে হয়তো খুশি হতে পারতাম, কিন্তু অম্লান চক্রবর্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে৷ দরজায় টোকার শব্দ হল৷ তারপর ট্রেতে করে চায়ের কাপ নিয়ে ভিতরে এল বেয়ারা৷ কাপটা টাপুরদির সামনে টেবিলের উপর রেখে জিজ্ঞাসা করল আর কিছু লাগবে কি না৷ টাপুরদি মাথা নাড়তে লোকটি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷ চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল৷
অম্লানবাবু সেদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যাক, কাজের কথায় আসা যাক৷ আমি জানি না বাবার হত্যার ব্যাপারটা নিয়ে পুলিশ কী ভাবছে৷ এই ব্যাপারে আমায় কমিশনারের সঙ্গে কথা বলতে হবে৷ তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি এই ব্যাপারে কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভের নাক গলানো পছন্দ করছি না৷ কিন্তু আমার মায়ের আবার আপনাকে বেশ পছন্দ হয়েছে৷ তাঁর ইচ্ছে, পুলিশ যা করছে করুক, ডিটেকটিভ ম্যাডামকেও নিজের মতো কাজ করতে দেওয়া হোক৷ আমার মা খুব একগুঁয়ে৷ তাই মায়ের যখন ইচ্ছে, তখন আপনারা কাজ করুন৷ কিন্তু, তদন্তের স্টেপস যেন আমাকে জানানো হয়৷ আমার সেক্রেটারির নম্বর নিয়ে যাবেন যাওয়ার সময়৷’
তারপর টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘সুবিনয় মুখার্জির অফিসে আপনিই তো গিয়েছিলেন, তাই না?’
টাপুরদি চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বাহ, চা-টা ভালো৷’ তারপর অম্লানবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, ‘হ্যাঁ, আমিই গিয়েছিলাম৷ সঙ্গে আমার এই বোনটি৷’
অর্জুনদার মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে অম্লানবাবু টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তন্ময়ের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল?’
টাপুরদি বলল, ‘আপনারাও তো খুঁজছেন৷ আপনাদের সোর্সও অনেক বেশি আমার থেকে৷ তো আপনারাই যদি ওকে না পান, আমি কী করে পাব বলুন তো?’
একেই বোধ হয় বলে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি৷ অম্লানবাবু এবার অর্জুনদার দিকে তাকালেন৷ বললেন, ‘আপনি এবার আসতে পারেন অফিসার৷ আমি একটু ডিটেকটিভ ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলব৷’
অর্জুনদা ও টাপুরদির মধ্যে চকিতে একবার চোখাচোখি হল৷ তারপর অর্জুনদা বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে৷
অর্জুনদা পুরোপুরি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করলেন অম্লান চক্রবর্তী৷ তারপর টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখুন, আপনি তদন্ত যেমন করছেন করুন৷ তবে পুলিশকে সব তথ্য দেওয়ার দরকার নেই৷ আপনি আপনার ফাইন্ডিংস আমায় জানাবেন৷ আর তন্ময়কে পেলে সেটাও আমাকে আগে জানাবেন৷ আর সুবিনয়কে কিছু বলার দরকার নেই৷ তন্ময়ের ব্যাপারেও নয়৷’
টাপুরদি কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে অম্লানবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল৷ তারপর বলল, ‘রেখাদেবীকে যারা খুন করেছে, তাদের কে পাঠিয়েছিল অম্লানবাবু? আপনি, না সুবিনয় মুখার্জি?’
অম্লানবাবুর মুখের রেখায় একসঙ্গে অনেকরকম অভিব্যক্তি খেলে গেল৷ চিবিয়ে চিবিয়ে তিনি বললেন, ‘কী বলতে চান আপনি?’
টাপুরদি মৃদু হেসে সহজ কণ্ঠে বলল, ‘আপনার না বোঝার মতো কিছু তো জিজ্ঞাসা করিনি আমি৷ খুব সহজ একটা প্রশ্ন করেছি শুধু৷ এর মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই৷ তবে জবাবটা আপনি দেবেন কি না, সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ জবাব দিন আর না দিন, আমি উত্তরটা খুঁজে বার করে ফেলব৷ আর শুনুন, আমি সরকারের বেতনভুক কর্মচারী নই৷ কাউকে কোনো জবাব দিতেও বাধ্য নই৷ আমি জানি, আপনার অনেক ক্ষমতা৷ আপনি চাইলে আমার কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারেন৷ আমার লাইসেন্স ক্যানসেলও করে দিতে পারেন৷ এমনকী রেখাদেবীর মতো আমাকেও সরিয়ে দিতে পারেন সহজেই৷ তা আপনার যা ইচ্ছে আপনি করুন৷ কিন্তু আমায় কিনতে চেষ্টা করবেন না প্লিজ৷’
অম্লানবাবুর কেবিন থেকে বেরিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘চা-টা কীভাবে খেলে তুমি? আমার তো ভয়ে বুক কাঁপছিল৷ অম্লানবাবু বললেন, ওই চা খেয়েই তো...’
‘ধুর বোকা,’ হেসে বলল টাপুরদি, ‘সেই চায়ের কৌটো এখন পুলিশের জিম্মায়৷’
‘তাহলে অম্লানবাবু যে বললেন?’ আমি বললাম৷
‘আমাদের সঙ্গে একটু প্যাকটিক্যাল জোক করছিলেন,’ বলে হাসল টাপুরদি৷

গেটের বাইরে অর্জুনদা দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের অপেক্ষায়৷ আমরা বেরোতেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল টাপুরদির দিকে৷ টাপুরদি হেসে বলল, ‘যাওনি তুমি এখনও?’
উত্তর না দিয়ে অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী বললেন?’
‘তেমন কিছু না৷ একটু আমায় বাজিয়ে দেখছিলেন আর কী৷’
আমি কথা বলতে যেতেই টাপুরদি আমার হাতে দিল এক রামচিমটি৷ আমি ঢোঁক গিলে চুপ করে গেলাম৷ টাপুরদি হেসে অর্জুনদাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি এখন অফিসে ফিরবে?’
‘হ্যাঁ, তোমরা বাড়ি যাবে তো?’ অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল৷
টাপুরদি মাথা নাড়ল অন্যমনস্কভাবে৷ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখলাম, পার্টি অফিসের উলটো ফুটে কয়েক পা দূরে একটা চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে আছে একটা লোক, দৃষ্টি আমাদের দিকেই নিবদ্ধ৷ লোকটাকে কোথাও দেখেছি বলে মনে হল৷ কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না কোথায় দেখেছি৷ আমরা যখন গাড়িতে উঠে বসছি একবার পিছু ফিরে দেখলাম, লোকটাও দোকানের সামনে রাখা বাইকে স্টার্ট দিল৷
অর্জুনদা পুলিশের জিপে অফিসের দিকে রওনা হয়েছে একটু আগে৷ টাপুরদি ড্রাইভিং সিটে বসে সামনের ফ্রন্ট মিররটা অ্যাডজাস্ট করে নিল৷ আমি বললাম, ‘টাপুরদি, পেছনের লোকটা...’
‘দেখেছি,’ বলল টাপুরদি, ‘ফলো করছে৷’
‘কে লোকটা চিনতে পারলে? মুখটা চেনা লাগছে৷ ঠিক মনে পড়ছে না৷’
‘সুবিনয় মুখার্জির অফিসের স্টাফ৷ অফিসেই দেখেছিস,’ বলল টাপুরদি৷
‘তার মানে সুবিনয় মুখার্জি আমাদের পেছনে লোক লাগিয়েছে?’ বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷
‘তাই তো দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা,’ বলে হাসল টাপুরদি৷ বলল, ‘চল, আজ একটু কলকাতা ঘোরা যাক৷’
সারাটা দিন ঘুরে বেড়ালাম আমরা৷ অফিসের কাজের চাপে, ব্যস্ততার মাঝে কতদিন এভাবে একটা পুরো দিন কাটানো হয়নি৷ কতদিন এভাবে উদ্দেশ্যহীনভাবে তিলোত্তমার বুকে ঘুরে বেড়ানো হয়নি৷ গড়ের মাঠে বাদাম খেলাম, অ্যাকাডেমিতে এক্সিবিশন দেখলাম, কত বছর পরে আবার আজ জাদুঘরে গেলাম, পার্কস্ট্রিটের রেস্তরাঁতে দুপুরের লাঞ্চ সারলাম৷ সারাদিন ধরে লোকটা আমাদের পিছু ছাড়ল না দেখলাম৷
গাড়িতে করে বাড়ি ফেরার রাস্তায় আমি জিজ্ঞাসা করলাম টাপুরদিকে, ‘কী বুঝছ?’
টাপুরদি ড্রাইভ করতে করতে সামনে রাস্তায় চোখ রেখে মুচকি হেসে বলল, ‘রাজনীতি ব্যাপারটাই বড়ো ঘোরালো রে মিতুল৷ আসলে রাজনীতি বলা ভুল, বলা ভালো ক্ষমতার লোভ৷ সেই লোভ মানুষের ভিতরকার যাবতীয় ভালো প্রবৃত্তিগুলোকে নষ্ট করে ফেলে৷ পরিবর্তে সেখানে জায়গা করে নেয় ঈর্ষা, অবিশ্বাস৷ অম্লানবাবু ও সুবিনয়বাবু ছোটোবেলাকার বন্ধু৷ কিন্তু এই মুহূর্তে দুজনের সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বের মধ্যে আটকে নেই৷ সম্পর্কটা এখন লেনদেনের, পাওয়া ও পাইয়ে দেওয়ার, স্বার্থের৷ আর সেই কারণে দুই বন্ধুর সম্পর্কেও এখন এসেছে অবিশ্বাস৷ একদিকে অম্লানবাবু অনেক কিছু সুবিনয়বাবুর কাছ থেকে গোপন করে চলেছেন৷ অপর দিকে, সুবিনয়বাবুও অম্লানবাবুকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না৷ তাই লোক লাগিয়েছেন অম্লানবাবুর অফিসের দিকে নজর রাখার জন্য৷ অফিসে কে আসছে কে যাচ্ছে, সব খবর সেই লোক পৌঁছে দেয় সুবিনয়বাবুর কাছে৷ তুই হয়তো খেয়াল করিসনি, আমরা যখন অফিস থেকে বেরিয়ে অর্জুনের সঙ্গে কথা বলছিলাম, লোকটা মোবাইলে ফোনে কথা বলছিল৷ সম্ভবত সুবিনয়বাবুকে জানাচ্ছিল আমাদের ব্যাপারে৷ এরপর সুবিনয়বাবুর নির্দেশেই আমাদের ফলো করতে শুরু করে৷’
‘কী কাণ্ড গো টাপুরদি,’ আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, ‘এরা নাকি বন্ধু! এ কেমন বন্ধুত্ব?’
হাসল টাপুরদি৷ বলল, ‘এ-রকম বন্ধুত্ব না বোঝাই ভালো রে৷ মোদ্দা কথা হল, সুবিনয়বাবু অম্লানবাবুকে ব্ল্যাকমেল করে টিকিট পেয়েছেন৷ জিতেও যাবেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে৷ সেক্ষেত্রে পার্টির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর সুযোগ তিনি পেয়ে যাবেন৷ অম্লানবাবুর হাতে সুবিনয়বাবুর দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া ছাড়া গতি নেই এই মুহূর্তে৷ আর স্বাভাবিক কারণেই সেগুলো তিনি যে খুব খুশিমনে মানছেন এমন নয়৷’
‘তাই অম্লানবাবু চান, যাতে আমি গোপনে তন্ময়ের খবর তাকে এনে দিই৷ এই কথাগুলি তিনি তো আর পুলিশকে বলতে পারেন না৷ তাই প্রাইভেট ডিটেকটিভ পেয়ে ভাবলেন, তন্ময়কে খুঁজে পেলে টাকার বিনিময়ে আমি তন্ময়কে খুঁজে তাঁর হাতে তুলে দেব৷ আবার এদিকে সুবিনয়বাবুও গদি না পাওয়া অবধি অম্লানবাবুকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না৷ ফলে তাঁর গতিবিধি জানার জন্য অফিসের সামনে লোক লাগিয়েছেন৷’
‘বাপ রে,’ মাথায় হাত দিয়ে বললাম আমি, ‘কী নাটক! কিন্তু সেই লোক তো আমাদের পিছে পিছে সারাদিন ধরে সারা শহর ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ এখন অম্লানবাবুর অফিস পাহারা দেবে কে?’
‘তোর কি মনে হয় একজনই লোক ছিল ওখানে? আশেপাশে পার্টি অফিস ঘিরে অন্তত তিন-চার জন লোক আছে৷ এক্কেবারে যাকে বলে আঁটসাঁট পাহারা, ‘পালাবার পথ নাই’ গোছের৷’
আমি হেসে বললাম, ‘যাই বলো টাপুরদি, লোকটা কিন্তু আজকে দারুণ জব্দ হয়েছে৷ সারাদিন ধরে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বেজার মুখ করে সারা কলকাতা চরকিপাক মেরে বেড়াতে হয়েছে বেচারাকে৷ মোকাম্বোর সামনে তো লোকটার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল আমাদের পারলে ভস্ম করে দেবে৷ খিদে পেয়েছিল বোধ হয়৷’
‘সুবিনয়বাবুও ঘোড়েল লোক রে মিতুল৷ ফোনে আমাদের কথা জানতে পেরে ঠিক সন্দেহ করেছে যে তন্ময়ের ব্যাপারে হয়তো অম্লানবাবু আমাদের সাহায্য চাইবেন, বা হয়তো আমরা তাকে সাহায্য করছি,’ বলল টাপুরদি৷
‘তার মানে হল, এখন তন্ময়কে নিয়ে অম্লানবাবু ও সুবিনয়বাবুর মধ্যে টাগ অফ ওয়ার চলছে৷ তাই তো?’
‘হুম, অনেকটা সেরকমই দাঁড়াচ্ছে বই কী!’ বলল টাপুরদি৷
সারা শহর ঘুরে টাপুরদির ফ্ল্যাটের গেট দিয়ে যখন আমাদের গাড়ি ঢুকছে, হাতঘড়িতে সন্ধে পৌনে সাতটা বাজে৷ রিয়র মিররে দেখলাম আমাদের অনুসরণকারী লোকটি কিছু দূরে একটা দোকানের সামনে বাইক থামাল, তারপর হতাশ দৃষ্টিতে আমাদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বার করল৷ সেদিকে তাকিয়ে আমি আর টাপুরদি দুজনেই হেসে উঠলাম৷ হাসতে হাসতেই বললাম, ‘ইউনিকর্ন মশাই এবার রাগে-দুঃখে মাটিতে শিং ঘষবে৷’

অর্জুনদার ফোনটা এল রাত ন’টা নাগাদ৷ কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে চুপচাপ সোফায় এসে বসল টাপুরদি৷ তাকে যেন একটু চিন্তিত দেখাচ্ছে৷ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী হল? কোনো সমস্যা?’
টাপুরদি মাথা নেড়ে বলল, ‘তা সমস্যা তো বটেই৷ বড়োসড়ো সমস্যা৷ পেনড্রাইভটা খোলা যতটা সহজ মনে হয়েছিল, ততটা সহজ হচ্ছে না৷ বিটলকার পাসওয়ার্ড ব্রেক হয়ে গেছে৷ পেনড্রাইভে কয়েকটা ফোল্ডার আছে৷ তার মধ্যে দুটোতে তেমন কোনো কাজের জিনিস নেই বলল৷ একটাতে রিদ্ধিমার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে তোলা বেশ কিছু ফোটো আছে, আরেকটাতে কিছু কম্পিটিটিভ এক্সামের স্টাডি মেটেরিয়ালস৷ কিন্তু তিন নম্বর ফোল্ডারটা থ্রি স্টেপ পাসওয়ার্ড দিয়ে সুরক্ষিত করা৷ অর্জুন জানাল, সেটা খুলতে সমস্যা হচ্ছে৷ সাইবার সেলের লোক চেষ্টা করছে৷ হয়তো একটু সময় লাগবে, কিন্তু হয়ে যাবে বলল৷ তন্ময় টেকনিক্যালি বেশ সাউন্ড ছিল, সন্দেহ নেই৷’
‘যাহ, তাহলে তো কেসটা আবারও ঝুলে গেল,’ বললাম আমি৷
‘একটু পিছিয়ে গেল বটে৷ আমরা আসলে এই পেনড্রাইভটার উপরে বড্ড বেশি নির্ভর করে ছিলাম৷ এখন যতদিন না পাসওয়ার্ড ব্রেক করা যাচ্ছে, আমাদের অন্যান্য দিকগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে৷ অন্যভাবে এগোতে হবে৷ সময় বেশি নেই৷ আগামী সপ্তাহে উপনির্বাচন৷ তার আগে তন্ময়কে খুঁজে বার করার চেষ্টা করতে হবে,’ বলল টাপুরদি৷
‘উপনির্বাচনের আগে কেস সলভ করতে হবে বলছ? কেন? মানে কোনো নির্দিষ্ট কারণ আছে কি?’ কৌতূহল চাপতে না পেরে জানতে চাইলাম আমি৷
‘কেস সলভ তো করতে হবেই৷ অমিয়বাবুর হত্যারহস্য নিয়ে যদি মাথা নাও ঘামাই, তন্ময়কে খুঁজে বার করাটা জরুরি৷ আমরা এখনও জানি না ও কী অবস্থায় আছে, কোথায় আছে৷ দ্বিতীয়ত, তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে যে সবচেয়ে বেশি গভীরভাবে জড়িত, সে হল সুবিনয় মুখার্জি৷ এ ছাড়া অম্লান চক্রবর্তী তো আছেনই৷ আগামী সপ্তাহেই অম্লানবাবুর শপথগ্রহণ৷ অর্থাৎ এর পরে তিনি এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী৷ সেক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতা এক লহমায় অনেকটাই বেড়ে যাবে৷ ইলেকশনে জিতে গেলে সুবিনয়বাবুর ক্ষেত্রেও সেই একই কথা প্রযোজ্য৷ সুতরাং বুঝতেই পারছিস, সেক্ষেত্রে এদের মধ্যে কেউ যদি অপরাধী হন, বা কোনোভাবে অমিয়বাবুর হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকেন, কিংবা যদি সেসব কিছু নাও হয়, তবু তন্ময়ের বিপদ বাড়বে বই কমবে না৷ তাই আমি চাইছি, তার আগেই কেসটার গভীরে পৌঁছাতে৷ তুই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস যে এই কেসে আমাদের অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে৷ সুতরাং তাঁদের শক্তি আরও বেড়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়,’ বলে মৃদু হাসল টাপুরদি৷
‘তাহলে এখন কী কর্তব্য?’ জানতে চাইলাম৷
‘ছবি দেখি আপাতত,’ বলে উঠে গিয়ে শোওয়ার ঘর থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে ফিরে এল৷
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কীসের ছবি?’
‘পেনড্রাইভে কিছু ছবি আছে একটা ফোল্ডারে, বললাম না তোকে?’ টাপুরদি বলল৷
‘ওহ, অর্জুনদা পাঠিয়েছে? কিন্তু সে তো বললে রিদ্ধিমার সঙ্গে তন্ময়ের ছবি৷ সে দিয়ে কী হবে?’
‘কী দিয়ে কী হয়, কে বলতে পারে রে? নেই কাজ তো খই ভাজ৷ ছবি দেখতে দোষ কী?’ টাপুরদি গুগল ড্রাইভে লগ ইন করতে করতে বলল৷
মোট তিনশো সাতাশিখানা ছবি রয়েছে দেখলাম গুগল ড্রাইভে শেয়ার করা ফোল্ডারে৷ আগে রিদ্ধিমার মোবাইলে তন্ময়ের ছবি দেখেছি৷ এখানে আরও ভালো করে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে অনেক ছবি দেখে বুঝলাম, তন্ময় যথেষ্ট সুদর্শন৷ রিদ্ধিমার মতো সুন্দরীর পাশে একেবারেই বেমানান লাগে না দেখতে৷ ছবিগুলো পর পর দেখতে থাকলাম৷ বেশিরভাগ ছবিই কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় তোলা হলেও দেখলাম দিঘা, ডায়মন্ড হারবারেও দুজনের ছবি আছে৷ কিছু ছবি তো যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ৷ টাপুরদি অলস চোখে ছবিগুলোতে আলগা দৃষ্টি বোলাচ্ছে দেখলাম৷ কিছু ছবিতে দেখা যাচ্ছে অনেক বাক্স প্যাঁটরার মাঝখানে দুজনে হাসিমুখে বসে আছে৷ পরের ছবিটাতে তন্ময় কাঁধে করে একটা কার্টন তুলছে হাসিমুখে৷ একটা সেলফিতে দেখলাম, ছড়ানো জিনিসপত্রের মাঝে মেঝেতে বসে তন্ময় একটা সবুজ রঙের ডায়েরিতে খুব মন দিয়ে কিছু দেখছে, আর রিদ্ধিমা পাশে উবু হয়ে বসে হাসিমুখে সেলফিটা তুলেছে৷ অথচ তন্ময়ের সেদিকে দৃষ্টি নেই৷
ছবিটা টাপুরদি অন্যগুলির মতো দ্রুত পেরিয়ে গেল না৷ মন দিয়ে দেখল সময় নিয়ে৷ পরের ছবিটাতে দেখলাম রিদ্ধিমা একটা কার্টনে কিছু বাসন-কোসন ঢোকাতে ঢোকাতে ঠোঁট উলটে দুঃখী মুখ করে সেলফি তুলেছে৷ বুড়ো আঙুল দিয়ে পেছনে সেই সবুজ ডায়েরিতে মুখ গুঁজে বসে থাকা তন্ময়ের দিকে নির্দেশ করছে৷ এই ছবিতেও তন্ময় একইভাবে একই জায়গায় ডায়েরি নিয়ে বসে আছে৷ টাপুরদি নড়েচড়ে বসল৷ পরের বেশ কয়েকটা ছবিতে তন্ময় ও রিদ্ধিমাকে জিনিসপত্র গোছগাছ করতে দেখা গেল৷ টাপুরদি নিঃশব্দে আঙুল দিয়ে দেখাল, সব ক-টি ছবির ফ্রেমে সবুজ ডায়েরিটা দেখা যাচ্ছে হয় তন্ময়ের হাতে অথবা টেবিলের উপরে৷
টাপুরদি দ্রুত হাতে মোবাইল ফোনটা হাতে তুলে নিল৷ রিদ্ধিমার নম্বর ডায়াল করল ফোনটা স্পিকারে দিয়ে৷ বার দুয়েক রিং হতেই ওপারে রিদ্ধিমার কণ্ঠস্বর শোনা গেল৷
‘হ্যালো!’
হ্যালো রিদ্ধিমা, আমি সংঘমিত্রা বলছি৷’
‘মিস ব্যানার্জি, তন্ময়ের কোনো খবর পেলেন?’
‘না রিদ্ধিমা, এখনও পাইনি৷ তোমার কাছ থেকে একটা ইনফর্মেশন চাই,’ বলল টাপুরদি৷
ফোনের ওপাশে রিদ্ধিমার দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট শোনা গেল৷ বলল, ‘হ্যাঁ বলুন, কী জানতে চান!’
টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘রিদ্ধিমা, আপনারা কি ইদানীং বাড়ি শিফট করেছিলেন?’
‘হ্যাঁ,’ রিদ্ধিমা বলল, ‘তবে ইদানীং ঠিক নয়, দুই মাস আগে৷ আসলে মা মারা যাওয়ার পর মায়ের ফ্ল্যাটে আমার থাকতে আর ভালো লাগছিল না৷ খুব একা হয়ে গেছিলাম ওই সময়ে৷ অত বড়ো ফ্ল্যাটে আমি একা মানুষ, মন টিকত না একদম৷ তখন তন্ময়ই বলেছিল, ওই ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে নতুন ফ্ল্যাট কেনার কথা৷ সেইমতো আমি কাছেপিঠেই একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মায়ের পুরোনো ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দিই৷ কিন্তু কেন জিজ্ঞাসা করছেন? এর সঙ্গে তন্ময়ের নিরুদ্দেশ হওয়ার সম্পর্ক কী?’
টাপুরদি বলল, ‘সম্পর্ক আছে কি না, সেটা এখনই বলা সম্ভব নয় রিদ্ধিমা৷ যাই হোক, এই শিফটিংয়ের সময় কি তন্ময় আপনাকে সাহায্য করেছিল?’
‘হ্যাঁ, নইলে আমার একার পক্ষে অত জিনিসপত্র নিয়ে শিফট করা সম্ভব ছিল না৷ আগের ফ্ল্যাটটা অনেক বড়ো ছিল৷ তিনটে বেডরুম ছিল৷ বড়ো ড্রয়িংরুম, মায়ের স্টাডি ছিল৷ এখন আমি যেই ফ্ল্যাটে থাকি, সেটা টু বিএইচকে৷ ছোটো, তবে কোজি৷ বেশ কিছু পুরোনো জিনিসপত্র, ফার্নিচার অনলাইন স্টোরে বিক্রি করে দিতে হয়েছে,’ রিদ্ধিমা বলল৷
‘সে ঠিক আছে৷ আপনি আমায় বলুন, সেইসব জিনিসপত্রের মধ্যে কি কোনো সবুজ রঙের ডায়েরি ছিল?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল৷
রিদ্ধিমা বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কী করে জানলেন? হ্যাঁ, আমার মায়ের প্রচুর বইপত্র, ফাইল, কাগজপত্র একটা ট্রাঙ্কে ছিল৷ কোনো কাজের না, সব মায়ের পুরোনো সব প্রজেক্টের হাবিজাবি জমানো রিপোর্ট, হাতে লেখা নথি এইসব৷ আমি তো ফেলেই দিতাম৷ তন্ময় সেগুলো ঘেঁটে দেখতে বসল৷ ওই ওখান থেকেই একটা সবুজ ডায়েরি বেরিয়েছিল৷ আমার মায়ের জিনিস৷ তন্ময় ওটা নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে উলটেপালটে দেখছিল৷’
‘আপনি কি দেখেছেন সেই ডায়েরিতে কী ছিল?’ জানতে চাইল টাপুরদি৷
‘না, মার কাজের ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ ছিল না কোনোদিনই’, অভিমানী গলায় বলল রিদ্ধিমা, ‘সত্যি কথা বলতে কী, আমার আর মায়ের মধ্যে সম্পর্কে উষ্ণতার একটু অভাব ছিল৷ মা আমার থেকে নিজের কাজকে বেশি ভালোবাসতেন৷ আই গ্রিউ আপ হেটিং মাই মাদার’স ওয়ার্ক৷’
টাপুরদি উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘সেই ডায়েরি এখন কোথায় রিদ্ধিমা?’
‘তা তো বলতে পারব না,’ রিদ্ধিমা টাপুরদির যাবতীয় উত্তেজনায় জল ঢেলে দিয়ে বলল, ‘ওই দিনের পর থেকে আমি তো আর দেখিনি ডায়েরিটাকে৷ অত জিনিসপত্র ওলটপালট হয়েছিল সেই সময়৷ একটা ছোট্ট ডায়েরি নিয়ে মাথা ঘামাইনি আর৷ ট্রাঙ্কের সব কাগজপত্র রদ্দিওয়ালাকে বেচে দিয়েছিলাম৷ ওর সঙ্গে চলে গেছে হয়তো৷’
‘একটু মনে করার চেষ্টা করুন রিদ্ধিমা৷ শেষ কখন ডায়েরিটাকে দেখেছিলেন আপনি? বাই এনি চান্স, তন্ময় কি ওটা নিয়ে গেছিল?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
‘আমার ঠিক মনে পড়ছে না মিস ব্যানার্জি৷ তবে তন্ময় যদি নিয়ে যায়, সেটা আমার জানা নেই৷ নিলেও সেই নিয়ে আমি বদার্ডও নই৷ ওটা আমার কোনো কাজের জিনিস নয়৷ তন্ময় যদি নেয় তো নিতেই পারে৷ সেজন্য কী হল? আমি কিছু বুঝতে পারছি না,’ একটু যেন বিরক্ত স্বরেই বলল রিদ্ধিমা৷
টাপুরদি একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘ঠিক আছে৷ আপনার যদি কিছু মনে পড়ে আমায় জানাবেন৷’
কথোপকথন শেষ করে ফোন অফ করল টাপুরদি৷ আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার টাপুরদি? তোমার কি মনে হয় ডায়েরিটা সত্যিই এতটা ইম্পর্ট্যান্ট?’
‘জানি না রে মিতুল৷ তবু কোথাও থেকে একটা তো শুরু করতে হবে,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল টাপুরদি৷ তারপর মনযোগ সহকারে ছবিগুলো দেখতে থাকল৷

ভোরের দিকে কিছু একটা স্বপ্ন দেখছিলাম, টাপুরদির ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙল৷ দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম যতটা ভোর ভেবেছিলাম ততটা নয় মোটেই৷ সাড়ে ছ’টা বাজে৷ তবে আমার জন্য সাড়ে ছ’টাও কাকভোর৷ জড়ানো গলায় বললাম, ‘টাপুরদি, তুমি জানো তো একজন সুস্থ পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য দিনে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুম দরকার৷’
‘কথা না বাড়িয়ে চটপট উঠে পড়,’ বলে পরদাগুলো টেনে খুলে দিল টাপুরদি৷
চোখে আলো পড়তেই বালিশে মুখ গুঁজে মৃদু প্রতিবাদ করলাম, ‘আরে বাবা, আমি তো তোমার মতো সুপারউওম্যান নই যে রাতে তিন চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে বা না ঘুমিয়েও দিব্যি রাত কাটিয়ে দেব৷’
‘বেশি না বকে ওঠ৷ একদিন একটু কম ঘুমোলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না৷ উঠে চটপট রেডি হ’৷ বেরোব,’ বলল টাপুরদি৷
চোখের উপর থেকে বালিশটা সরিয়ে বললাম, ‘কোথায় যাবে গো?’
‘উফ, সব প্রশ্নের উত্তর কি তোর বিছানায় শুয়েই চাই? তুই উঠলি, না গায়ে জল ঢেলে দেব?’ ছদ্ম কোপ দেখিয়ে বলল টাপুরদি৷
টাপুরদির চোখ রাঙানো উপেক্ষা করে কাঁহাতক আর শুয়ে থাকা যায়? তা ছাড়া ঘুমটাও গেছে চটে৷ মনের মধ্যে কৌতূহলও যে উঁকিঝুঁকি মারছে না, তা বললে অনৃতভাষণ হবে৷ কে জানে, সকাল সকাল কোথায় যাওয়ার প্ল্যান আঁটছে টাপুরদি?
রেডি হয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে আটটা বাজল৷ এতক্ষণ কিছু জিজ্ঞাসা করিনি, গাড়িতে বসে এবার বললাম, ‘কোথায় যাচ্ছি জানতে পারি কি?’
‘অবশ্যই পারিস৷ যাচ্ছি হুগলি, চুঁচড়োর কাছাকাছি,’ গাড়িতে স্টার্ট দিতে দিতে বলল টাপুরদি৷
‘হুগলি! কেন? মানে হুগলি কেন?’ আমার বিস্মিত প্রশ্ন৷
‘ভাব তো দেখি,’ হেসে বলল টাপুরদি৷
হুগলিতে আবার কে আছে? আমাদের কেসের মধ্যে হুগলি এল কোত্থেকে অনেক ভেবেও মাথায় এল না৷ অগত্যা হাল ছেড়ে বললাম, ‘ধুর, আমার মাথা কাজ করছে না৷ প্লিজ তুমিই বলো হুগলি কেন যাচ্ছি আমরা৷’
টাপুরদি রাস্তায় চোখ রেখে বলল, ‘যাচ্ছি ধনঞ্জয় মণ্ডলের শেকড়ের সন্ধানে৷ বুঝলি হাঁদা?’
‘ধনঞ্জয়ের সঙ্গে হুগলির কী সম্পর্ক? সে তো কলকাতাতেই থাকত বলে জানি,’ বললাম আমি৷
টাপুরদি বলল, ‘সেদিন সুনয়নাদেবী কী বললেন শুনিসনি? হুগলিতে একটা জনসভা থেকে ধনঞ্জয় মণ্ডলকে প্রথম পার্টিতে এনেছিলেন রথীন ঘোষ৷ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অর্জুন ঠিকানাটা জোগাড় করেছে৷ সেখানেই যাব আপাতত৷’
‘সেখানে কি কিছু পাওয়া যাবে আদৌ?’ সন্দিগ্ধ স্বরে প্রশ্ন করলাম আমি৷
‘সে কী করে বলি রে? পাওয়া যাবেই যে তা কি জোর দিয়ে বলা যায়? আবার কিছু পাওয়া যাবে না তাও বলতে পারি না৷ চল, খুঁজে দেখতে দোষ কী?’
রাস্তায় একবার থেমে চা খেলাম৷ সকালে কিছু না খেয়েই বেরোতে হয়েছে৷ খিদে পেয়েছিল জববর৷ দুটো নানখাটাই বিস্কুট দিয়ে ঘন দুধে জাল দেওয়া চা-টা যেন অমৃত মনে হল৷ গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা টাপুরদি, এত বছর পরে ধনঞ্জয় মণ্ডলের সম্পর্কে কি কেউ কিছু বলতে পারবে? তার রাজনৈতিক জীবনের পুরোটাই তো প্রায় কলকাতায় কেটেছে৷’
‘হ্যাঁ, খালি হাতে ফেরার সম্ভাবনাটাই বেশি৷ তবু দেখি, যদি কিছু মিলে যায়,’ বলে হাতের চায়ের খুড়িটা নীল ড্রামে ফেলল টাপুরদি৷ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোর হল রে? এক কাপ চা খেতে তো দিন কাবার করে দিলি৷’
‘চলো হয়ে গেছে৷’
কলকাতা ছাড়ার দেড় ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম ধনঞ্জয় মণ্ডলের পুরোনো পাড়ায়৷ আগে এই অঞ্চলটা কোনোকালে হয়তো গ্রাম ছিল, এখন নাগরিক জীবনের স্পর্শ থেকে নিজেকে বাঁচাতে না পেরে ছোটোখাটো টাউনে পরিণত হয়েছে৷ ছোটোবেলায় একবার কোনো এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বিয়ে উপলক্ষে বাবা-মায়ের সঙ্গে চুঁচুড়াতে এসেছিলাম মনে আছে৷ ব্যান্ডেল চার্চ, হংসেশ্বরী মন্দির ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম৷ এতদিন পরে এসে সেইসব স্মৃতি মনে পড়ে গেল৷ মনে হল, কাজের পেছনে ছুটতে ছুটতে কতদিন মা-বাবার সঙ্গে একটু সময় কাটানো হয় না, কোথাও যাওয়া হয় না ওদের নিয়ে৷ মা প্রায়ই অভিযোগ করে আমি ওদের সময় দিই না বলে৷ বাবা অবশ্য কিছু বলে না৷ কিন্তু আমি জানি আমি বাবার সঙ্গে কিছু সময় বসলে বাবা খুব খুশি হয়৷
ধনঞ্জয় মণ্ডলের পুরোনো পাড়া অবশ্য চুঁচুড়া টাউনের মধ্যে নয়, বরং কিছুটা বাইরের দিকে৷ আধুনিকতার ছোঁয়াচ লাগলেও পুরোনো পাড়ার গন্ধটা এখনও ছেড়ে যায়নি পুরোপুরি৷ সে একদিক থেকে ভালো৷ এই পুরোনো পাড়াগুলি মহানগরের মতো স্মৃতিহীনতার রোগে ভোগে না৷ বরং, জীর্ণ বাতিল দিনগুলোকে বুকের গোপন কুঠুরিতে ভরে রাখে সযত্নে৷
ঠিকানা খুঁজে বার করতে তেমন বেগ পেতে হল না সংগত কারণেই৷ জায়গাটা কলোনি ধরনের৷ ঠিকানাটা পুরোনো, এখন সেই জায়গায় একটা ছিমছাম দোতলা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে৷ গলির মোড়ে টাইম কলের পাশে ক-জন মহিলা জটলা করে গল্পগুজব করছে, সামনে কয়েকটা বালতি গামলা সার দিয়ে রাখা৷ নাইটির উপর ওড়না চাপিয়ে বাচ্চাকে স্কুলবাসে তুলে দিতে বাচ্চার হাত ধরে ছুটছে মা৷ সামনেই একটা চায়ের দোকান৷ বড়ো সসপ্যানে দুধের চা ফুটছে৷ একজন মধ্যবয়সি মহিলা চা বানাচ্ছেন, আরেকজন বয়স্ক প্রৌঢ় সেই চা কাচের গ্লাসে করে খদ্দেরদের হাতে হাতে তুলে দিচ্ছেন৷ কয়েকটা বয়ামে রাখা বিভিন্ন রকমের বেকারি বিস্কুট ও কেক৷ সামনের পাতা বেঞ্চে কয়েকজন বয়স্ক লোক আড্ডা দিচ্ছে, চায়ে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজ পড়ছে৷
টাপুরদির ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল৷ বিড়বিড় করে বলল, ‘কোনো পাড়া কারও সম্পর্কে যদি কিছু খবর জানতে চাস কখনো, মনে রাখবি এই চায়ের দোকানের আড্ডাধারীরা যেকোনো নিউজ এজেন্সিকে হার মানান৷ দিস ইজ দ্য প্লেস৷’
টাপুরদি এগিয়ে গিয়ে আমাদের দুজনের জন্য দুই কাপ চা দিতে বলল৷ কাচের জারে বাপুজি কেকগুলো দেখে আবার আমার শৈশবের এক ঝলক টাটকা বাতাস ছুঁয়ে গেল আমায়৷ আমি একটা কেক দিতে বললাম৷ হাতে নিয়ে গন্ধ শুঁকলাম৷ সেই একই গন্ধ, এত বছরে কিচ্ছুটি বদলায়নি৷ কিছু জিনিস কখনো বদলায় না বলেই হয়তো স্মৃতিগুলো বেঁচে থাকে৷
চায়ের গ্লাসটা হাতে নিতে বেঞ্চে বসা একজন বয়স্ক লোক একটু সরে বসলেন, সম্ভবত আমাদের বসার জায়গা করে দিতে৷ যদিও জায়গা বিশেষ হল না৷ তবু দেখলাম টাপুরদি নির্দ্বিধায় সেই একচিলতে জায়গায় বসে পড়ল৷ মুখোমুখি বসা এক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে আমাদের জরিপ করছিলেন অপাঙ্গে৷ এবার কৌতূহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনারা কি বাইরে থেকে আসছেন? আগে তো এই পাড়ায় দেখিনি!’
টাপুরদি মুচকি হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, কলকাতা থেকে আসছি৷ একজনের সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নেওয়ার ছিল৷ তাই আসা৷’
ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এখানে? কার সম্পর্কে জানতে চান আপনারা?’
‘ধনঞ্জয় মণ্ডল নামে কাউকে চেনেন?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল৷
ভদ্রলোক এবার সোজা হয়ে বসলেন৷ চকিতে পাশে বসা টাকমাথা এক প্রৌঢ় ভদ্রলোকের সঙ্গে চোখাচোখি করলেন দেখলাম৷ অন্যরাও যেন সচকিত হয়ে উঠল৷ টাকমাথা ভদ্রলোক গলা খাঁকরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনারা কি পুলিশ?’
বুঝলাম, ধনঞ্জয় মণ্ডল বহু যুগ পাড়া ছাড়া হলেও তার খবর এই পাড়ায় পৌঁছে গেছে৷ টাপুরদির ধারণা ভুল ছিল না৷ ধনঞ্জয় মণ্ডলের ইতিহাস এখানেই জানা যাবে৷

‘ওই যে দোতলা বাড়িটা দেখছেন, ওখানে ওদের বাড়ি ছিল,’ বললেন টাকমাথা ভদ্রলোক, ‘ধনঞ্জয়ের বাবা হাই স্কুলে পিয়োনের চাকরি করত৷ ধনঞ্জয় আমাদের থেকে অনেকটাই ছোটো ছিল৷ পড়াশোনায় তেমন ভালো ছিল না, তবে স্কুলের টিমে ফুটবল খেলত৷ সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলত৷ ভালো প্লেয়ার ছিল৷ কেন যে মরতে রাজনীতি করতে গেল!’
টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘ধনঞ্জয় মণ্ডল কেমন মানুষ ছিল, জানেন আপনারা?’
অপর প্রৌঢ় ভদ্রলোক বললেন, ‘ধনঞ্জয় স্কুলে আমার চার বছরের জুনিয়র ছিল৷ সেই ছোটো থেকে চিনি ওকে৷ বরাবর খুব ডানপিটে স্বভাবের ছিল ও৷ ক্লাসের থেকে ক্লাসের বাইরে ওকে বেশি পাওয়া যেত৷ তেমনি সাহসীও ছিল৷ পাড়ায় যেকোনো বাড়িতে কারও বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ত৷ তবে ছেলেটার মনটা ছিল নরম৷ পাড়ার রাস্তার সব কুকুর-বেড়াল ছিল ওর পোষ্য৷ একটারও কিছু হলে রাগে পাগল হয়ে যেত৷ একবার একটা বেড়ালছানাকে একটা গাড়ি চাপা দিয়েছিল৷ ধনঞ্জয় সেই গাড়ির নম্বর দেখে গাড়ির ড্রাইভারকে খুঁজে বার করে চন্দননগরে গিয়ে পিটিয়ে এসেছিল৷ পাড়ার লোকেরা ওকে ভালোই বাসত৷ ছেলেটা খারাপ ছিল না৷ পেপারে, নিউজ চ্যানেলে ধনঞ্জয় অমিয় চক্রবর্তীকে খুন করেছে জেনে আমরা সকলে অবাক হয়ে গেছি৷’
‘হুম,’ গম্ভীর মুখে বলল টাপুরদি, ‘তা ধনঞ্জয় মণ্ডল রাজনীতিতে এলেন কী করে?’
টাকমাথা ভদ্রলোক এবার বললেন, ‘টেনেহিঁচড়ে কোনোক্রমে স্কুলের গণ্ডি পার করেছিল ধনঞ্জয়৷ কলেজে গিয়ে পড়াশোনাটা আর এগোল না ওর৷ বরং কলেজ ইউনিয়নের প্রমিনেন্ট মুখ হয়ে উঠল খুব তাড়াতাড়ি৷ হাতে ক্ষমতা এলে যা হয়, এলাকার বেশ উঠতি মস্তান হয়ে উঠল৷ একে ধমকাচ্ছে, তাকে চমকাচ্ছে৷ কলেজে ছাত্র ভরতি করতে হলে ধনঞ্জয়ের ইউনিয়নকে প্রণামি না দিলে যত ভালোই রেজাল্ট হোক, ভরতি হতে পারত না৷ তবে হ্যাঁ, গরিব ছাত্রদের থেকে এক পয়সাও নিত না ও৷ বরং ফান্ডের টাকা খরচ করে তাদের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে ধনঞ্জয়, এমনও শুনেছি, বুঝলেন? বললাম না, ছেলেটার মনটা নরম ছিল৷’
‘শুনেছি রথীন ঘোষ জনসভায় ধনঞ্জয় মণ্ডলকে দেখে কলকাতায় নিয়ে গেছিলেন৷ এই কথাটা কি সত্যি?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল৷
টাকমাথা ভদ্রলোক একটু চিন্তা করে বললেন, ‘দেখুন এতসব কথা তো আমরা জানি না৷ ওদের বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই৷ তবে এক কাজ করতে পারেন, সামনে একটু এগিয়ে বাঁ-দিকে একটা গলি ছেড়ে পরের গলিটাতে ধনঞ্জয়ের বোন বীণার বাড়ি৷ ওর বাবা-মা তো অনেক দিন আগেই মারা গেছেন৷ থাকার মধ্যে আছে ওই বোন৷ এই পাড়াতেই বিয়ে হয়েছে৷ ওর কাছে গিয়ে দেখতে পারেন৷ তবে শুনেছি, ধনঞ্জয়ের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ ছিল না৷ গলিতে ঢুকে কাউকে জিজ্ঞাসা করবেন নীরেন হালদারের বাড়ি কোনটা৷ যে কেউ বলে দেবে৷ নীরেন হল গে ধনঞ্জয়ের বোন জামাই৷ তিন বছর আগে মারা গেছে অবশ্য৷ তবে ধনঞ্জয়ের বোন আছে৷’
‘অসংখ্য ধন্যবাদ,’ বলে উঠে দাঁড়াল টাপুরদি৷ আমিও দাঁড়ালাম৷ চায়ের গ্লাসটা পাশে রাখা অ্যালুমিনিয়ামের র্যাকে রেখে দাম মিটিয়ে রাস্তায় নামলাম৷
গলিতে ঢুকে একটি অল্পবয়সি ছেলেকে জিজ্ঞাসা করতেই নীরেন হালদারের বাড়ি দেখিয়ে দিল৷ ছোটো একতলা বাড়ি, প্রাচীনত্বের চিহ্ন বাড়ির সর্বত্র৷ একটা বক্স ভাঙা কলিংবেলও দেখলাম৷ হাত দিতে ভয় হল, যদি কারেন্ট লাগে৷ টাপুরদি একবার কাছ থেকে কলিংবেলটা নিরীক্ষণ করে সুইচটা টিপল৷ দ্বিতীয়বার বাজানোর আগেই দরজাটা খুলে গেল৷ একটি কমবয়সি বউ দরজা খুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল আমাদের দিকে৷ টাপুরদি বলল, ‘এটা তো নীরেনবাবুর বাড়ি৷ ওঁর স্ত্রী, মানে বীণাদেবী বাড়িতে আছেন? আমরা একটু তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই৷’
‘মার সঙ্গে?’ বউটি এমন বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাল, মনে হল এই বাড়িতে এ-রকম অতিথি বুঝি প্রথম এল যে নীরেনবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চায়৷ তারপর বলল, ‘আসুন, ভিতরে আসুন৷ মাকে ডাকছি৷’
মহিলা ভিতরে চলে যেতে আমি বললাম, ‘বীণাদেবীর মেয়ে বোধ হয়!’
‘না, সম্ভবত ছেলের বউ,’ ফিসফিস করে বলল টাপুরদি, ক্যাবিনেটের উপরে রাখা ছোট্ট ফ্রেমে এক নবদম্পতির ছবির দিকে নির্দেশ করল৷ বউটিকে চিনতে পারলাম৷
পরদা সরিয়ে একজন খুব রোগা, বয়স্ক মহিলা ঘরে ঢুকলেন৷ তাঁর চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট৷ তিনি ঘরে ঢুকতে আমরা উঠে দাঁড়ালাম৷ বুঝলাম ইনিই ধনঞ্জয়বাবুর বোন বীণাদেবী৷ সামনের চেয়ারের উপর জড়োসড়ো হয়ে বসলেন তিনি৷ বউটি দেখলাম দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, চোখে কৌতূহলী দৃষ্টি৷ শাশুড়িকে অপরিচিত লোকদের সঙ্গে একা ছাড়তে সে রাজি নয় বোঝা গেল৷
টাপুরদি বলল, ‘আমরা কলকাতা থেকে এসেছি৷ ধনঞ্জয়বাবুর ব্যাপারে আপনার থেকে কিছু জানার ছিল৷’
‘আপনারা পুলিশ?’ বীণাদেবী একটু সংকুচিতভাবে বললেন৷
টাপুরদি দেখলাম অবলীলায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল৷ বীণাদেবী একটু অস্বস্তি ভরে দরজায় দাঁড়ানো পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বললেন, ‘বউমা, এঁদের জন্য একটু চা করে আনো৷’
বউটি বলল, ‘মা, আপনার ছেলেকে ফোন করি? উনি বলেছিলেন, ‘তুমি একা কারও সঙ্গে মামাবাবুর ব্যাপারে কথা বলবে না৷ কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেবে না৷’ এসে শুনলে উনি রাগ করবেন৷’
বীণাদেবী মাথা নাড়লেন৷ অসহায় দৃষ্টিতে টাপুরদির দিকে তাকালেন৷ টাপুরদি এবার কড়া গলায় বউটিকে শুনিয়ে বলল, ‘আমরা কলকাতা থেকে এসেছি৷ যেটুকু জানার জেনে চলে যাব৷ এটা অফিশিয়াল এনকোয়ারি৷ পুলিশের কাজে বাধা দিলে কলকাতায় লালবাজারে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে৷ আপনার ছেলে যদি সমস্যা তৈরি করার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর ক্ষেত্রেও পুলিশি কাজে বাধা দেওয়ার জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷’
বউটি আর কিছু বলল না৷ ভিতরে চলে গেল বোধ হয় চা আনতে৷ বীণাদেবী সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাকালেন আমাদের দিকে৷ টাপুরদি এবার নরম গলায় বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই৷ আমরা আপনার কাছ থেকে ধনঞ্জয়বাবুর ব্যাপারে জানতে এসেছি৷’
এবার যেন বীণাদেবীর চোখের পাতা দ্রব হল৷ হলুদের দাগ ধরা সাদা শাড়ির আঁচল তুলে চোখ মুছে বললেন, ‘ওর ব্যাপারে আর আমি কী বলব? সে তো আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতই না৷ আগে তো তবু ভাইফোঁটা নিতে আসত৷ তারপর বউদি মারা যাওয়ার পর আসা বন্ধ করে দিল৷ কেমন যেন বদলে গেল দাদা৷’
টাপুরদি বলল, ‘ধনঞ্জয়বাবু কলকাতায় কবে যান?’
বীণাদেবী একটু ভাবলেন৷ তারপর উদাস কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন, ‘কলেজে পড়ার সময় সেই যে রাজনীতিতে জড়াল, ওই রাজনীতিই দাদাকে খেল৷ কোন সাল হবে সেটা ঠিক মনে নেই৷ বছর তিরিশ হবে বোধ হয়৷ কলেজে পড়াশোনা তো করল না৷ তখন দাদা এই এলাকার উঠতি নেতা৷ এখান থেকে কলকাতা গেল৷ নাকি রাজনীতি করবে৷ বড়ো নেতারা তাকে কলকাতায় ডেকেছে৷ দাদা তো পার্টিকে নিজের সবটা দিয়েছিল, কিন্তু কী পেল বলুন তো? সারাজীবন ধরে মুখের রক্ত তুলে পার্টির জন্য খেটে গেল৷ না পেল কোনো পদ, না কোনো ক্ষমতা৷ মরলও বদনাম নিয়ে৷’
‘আজকাল দেখি পার্টি করতে গিয়েই কত অল্পসময়ের মধ্যে লোকে কত পদ, সম্মান পেয়ে যায়৷ আমার দাদাটা তো কই কিছু পেল না? আমার উনি ছিলেন দাদার বন্ধু৷ সবসময় বলতেন, ‘ধনাটা ভারি বোকা৷ পার্টি ওকে ব্যবহার করে নিল৷ ও ফিরে পেল না কিছু৷’ সত্যিই তাই৷ বউদি গেল, ছেলেটা গেল৷ দাদা তো মরেই গেছিল কবেই৷ আত্মহত্যা-টত্যা সব বাজে কথা৷ রাজনীতিই দাদাকে মেরে ফেলল৷ আমি বললে আপনি হয়তো এখন বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু আমার দাদা সত্যিই খুব ভালোমানুষ ছিল৷’
টাপুরদি চুপ করে থেকে বীণাদেবীকে কিছুটা সামলে নেওয়ার সময় দিল৷ তারপর বলল, ‘ধনঞ্জয়বাবু যখন কলকাতায় যান, সে সময়ের কথা আপনার মনে আছে?’
বীণাদেবী মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘হ্যাঁ, তখন অবশ্য আমার বিয়ে হয়ে গেছে৷ তবে একই পাড়ায় বাপের বাড়ি শ্বশুরবাড়ি তো, সবসময়েই যাওয়া আসা চলত৷ তা ছাড়া আগেই বললাম না আপনাদের, আমার উনিও ছিলেন দাদার বন্ধু৷ দাদার সঙ্গে পার্টিও করতেন৷ তবে উনি দাদার মতো অতটা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েননি৷ দাদা কলকাতায় চলে যাওয়ার পর রাজনীতি থেকে দূরে চলে আসেন৷ দাদাকে আমি অনেক মানা করেছিলাম কলকাতায় যেতে৷ তখন বাবা মারা গেছেন৷ দাদা সদ্য বিয়ে করেছে৷ বউদি যে কী ভালো ছিল, বলে বোঝাতে পারব না৷ অমন মেয়ে হয় না৷ বুক ফাটলেও মুখ ফুটত না মেয়ের৷ বউদিকে বলেছিলাম, দাদাকে যেতে মানা করো৷ তা বউদি তো দাদাকে ভগবানের মতো পুজো করত৷ সে আর কী বলবে৷ দাদা মা আর বউদিকে নিয়ে এখানকার পাট তুলে দিয়ে কলকাতায় চলে গেল৷’
‘ঠিক কী ঘটেছিল এইসময়, মনে আছে আপনার?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷ এমন সময় বীণাদেবীর পুত্রবধূ হাতে করে দুটো প্লেটের উপর চায়ের কাপ সাজিয়ে নিয়ে এল৷ সঙ্গে চায়ের প্লেটের উপরেই এক দিকে দুটো করে বাটার বিস্কুট৷ তার শরীরী ভাষায় স্পষ্ট অসহযোগিতা ও বিরক্তি৷ কাপদুটো টেবিলের উপর বেশ শব্দ করে রাখল৷ কিছুটা চা চলকে পড়ল প্লেটে রাখা বিস্কুটের উপর৷ সেটা দেখেও গম্ভীর মুখে ভিতরে চলে গেল সে৷ বোঝা গেল শাশুড়ি ও আমাদের উপর সে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ৷
বীণাদেবী বলে চললেন, ‘সেই সময় পলিটিক্সে এই অঞ্চলে দাদার বেশ নামডাক হয়েছে৷ চন্দননগরে একটা সভা ছিল৷ সেখানে রথীন ঘোষ এসেছিলেন৷ সঙ্গে অন্যান্য অনেক নেতারাও ছিলেন৷ বেশ বড়ো সভা৷ সেখানেই দাদাকে দেখেছিলেন রথীন ঘোষ৷ এরপর মৃণাল দত্ত দাদাকে বলেন কলকাতায় যাওয়ার জন্য৷ আরও বলেন তার মতো পার্টিকর্মীদেরই দরকার পার্টিতে৷’
‘মৃণাল দত্ত কে? আমি তো শুনেছিলাম অমিয় চক্রবর্তী ধনঞ্জয়বাবুকে কলকাতায় যেতে বলেন,’ বলল টাপুরদি৷
‘না না৷ অমিয় চক্রবর্তীও ছিলেন সেদিনের সভায়৷ কিন্তু তিনি দাদাকে বলেননি৷ মৃণালবাবুকে দাদা খুব শ্রদ্ধা করত৷ তাঁর কথাতেই দাদা কলকাতায় গিয়েছিল৷ আমার স্পষ্ট মনে আছে,’ বীণাদেবী বললেন৷
‘এই মৃণাল দত্ত কে?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
বীণাদেবী বললেন, ‘মৃণাল দত্তকে চেনেন না? অবশ্য আপনারা এ যুগের মেয়ে, তাঁকে চিনতে নাও পারেন৷ সেই সময়ে অমিয় চক্রবর্তী যদি হন রথীন ঘোষের ডান হাত, তাহলে মৃণাল দত্ত ছিলেন তাঁর বাঁ-হাত৷ খুব সৎ রাজনীতিক ছিলেন তিনি৷ রথীন ঘোষের মৃত্যুর পর দলে অমিয় চক্রবর্তীর ক্ষমতা যত বাড়তে থাকল, মৃণাল দত্ত নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকলেন৷ কয়েক বছরের মধ্যে নিজেকে হঠাৎই রাজনীতি থেকে সরিয়ে নেন তিনি৷’
টাপুরদি নড়েচড়ে বসল৷ বলল, ‘ধনঞ্জয়বাবুর সঙ্গে পরে আর যোগাযোগ ছিল মৃণালবাবুর?’
‘সেটা তো আমি আর জানি না,’ বললেন বীণাদেবী, ‘আমার সঙ্গেই দাদা আর যোগাযোগ রাখেনি৷ দাদার কোনো খবরই পেতাম না৷ এতদিন পরে যদি বা খবর পেলাম, সেটাও দাদার মৃত্যুর খবর৷’
আমরা বিদায় নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম৷ বীণাদেবীও উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তে ‘একটু দাঁড়ান আপনারা, আমি এখনই আসছি’ বলে পরদা সরিয়ে ভেতরে চলে গেলেন৷ ফিরলেন সামান্য পরেই৷ টাপুরদির হাতে দিলেন একটা ল্যামিনেট করা পেপার কাটিং ও একটা ছবি৷
টাপুরদির পাশে এগিয়ে গেলাম৷ ছবির লোকটিকে টিভি স্ক্রিনে দেখেছি, ধনঞ্জয় মণ্ডল৷ তবে এই ছবিতে তার বয়স অনেক কম, বড়োজোর পঁচিশ ছাবিবশ হবে৷ গায়ে গরদের পাঞ্জাবি৷ হাসিমুখ৷ তাগড়াই জোয়ান চেহারার ধনঞ্জয় মণ্ডলের মুখের হাসিটা অমলিন৷ বীণাদেবী বিষণ্ণ স্বরে বললেন, ‘এই ছবিটা দাদার বিয়ের দিন তোলা৷ দেখুন কী সুন্দর লাগছে দাদাকে৷’
পেপার কাটিংটা কোনো সভার৷ বীণাদেবী নিজেই বললেন, ‘এই ছবিটা সেই দিনের সভার পরে পেপারে ছাপা হয়েছিল৷ দেখুন, স্টেজে রথীন ঘোষ আছে৷ এই যে অমিয় চক্রবর্তী,’ বলে তিনি আঙুল দিয়ে দেখালেন৷
‘আর এই যে ইনি হলেন মৃণাল দত্ত,’ বলে একজনের দিকে নির্দেশ করলেন৷ দেখলাম স্টেজে ঠিক রথীন ঘোষের পাশে দাঁড়িয়ে একজন দীর্ঘদেহী পুরুষ৷ রথীন ঘোষের পাশে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছেন, আর রথীনবাবু তাঁর কানে কানে কিছু বলছেন৷
‘আর এই দেখুন দাদা,’ বলে স্টেজের একপাশে দাঁড়ানো যুবক ধনঞ্জয় মণ্ডলকে দেখালেন বীণাদেবী৷ এই ছবিটা পেপারে বেরোনোর পর আমার স্বামী ল্যামিনেট করে এনে দিয়েছিলেন আমায়৷ এটাই আমার কাছে দাদার শেষ ছবি ছিল৷ এটা আপনি রাখুন৷
এতটা বলে একটু থামলেন বীণাদেবী৷ কয়েকবার জোরে জোরে নিশ্বাস নিলেন৷ বললেন, ‘দেখুন, আমার দাদা বলে বলছি না৷ কিন্তু ওকে আমি চিনি৷ রাজনীতির জন্য নিজের সব হারিয়েছে ও৷ তবু শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতিকে বুকে আঁকড়ে বেঁচেছে দাদা৷ তার এভাবে অপমানের মৃত্যু আমি মেনে নিতে পারছি না৷ আমার বয়স হয়েছে, আর ক’দিনই বা বাঁচব? যদি দাদার মাথার উপর থেকে এই বদনামের দাগ মুছতে পারেন, আমি মরেও শান্তি পাব৷’

গতকাল চুঁচুড়া থেকে ফিরে এসে টাপুরদি অর্জুনদাকে ফোন করেছিল৷ বলেছিল, ‘মৃণাল দত্তের খোঁজ চাই৷’ আজ দুপুরে ফোন করে অর্জুনদা মৃণাল দত্তের ঠিকানা, ফোন নম্বর জানিয়েছিল টাপুরদিকে৷ টালিগঞ্জে বাড়ি মৃণাল দত্তর৷ দুপুরেই ফোন করে মৃণালবাবুর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিল টাপুরদি৷ মৃণালবাবু কিছু জিজ্ঞাসা করেননি৷ শুধু বলেছিলেন, ‘সন্ধেবেলায় আসুন, ছ’টা নাগাদ৷’
টালিগঞ্জ মেট্রোর কাছেই গলির ভিতর দোতলা বাড়ি৷ যখন বাড়ির সামনে পৌঁছোলাম, হাতঘড়িতে ছ’টা বাজতে দশ সময় দেখাচ্ছে৷ গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে কলিংবেল বাজালাম৷ এক মধ্যবয়সি ভদ্রমহিলা গ্রিলের তালা খুলতে খুলতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনাদেরই কি বাবার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল?’
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল টাপুরদি৷ ভদ্রমহিলা গেটের তালা খুলে হাসিমুখে বললেন, ‘আসুন ভিতরে৷ বসুন৷ আমি সুপর্ণা দত্ত, মৃণাল দত্ত আমার বাবা হন৷ বাবা সন্ধেবেলায় একটু হাঁটতে বেরোন৷ এখুনি চলে আসবেন৷’
টাপুরদি বলল, ‘আপনাকে বড্ড চেনা লাগছে৷ আপনি কি থিয়েটার করেন?’
সুপর্ণা দত্ত হাসলেন৷ বললেন, ‘ওই টুকটাক করি৷ সেরকম কিছু নয়৷’
টাপুরদি বলল, ‘আমি আপনার ‘শখের বাগান’ নাটকটা দেখেছি৷ অনবদ্য অভিনয়, উফফ মনে পড়লে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়৷ ম্যানারিজমহীন, মাপা এক্সপ্রেশন, একদম ন্যাচারাল অভিনয় আপনার৷ শেষে বাগানের মাঝখানে বসে ছেলের মৃতদেহ জড়িয়ে আপনার সেই বুকভাঙা কান্না আমি ভুলব না৷’
সুপর্ণা দত্ত মিষ্টি করে হাসলেন৷ বললেন, ‘বাহ, আমার অভিনয় কেউ মনে রেখেছে জেনে ভারি আনন্দ পেলাম৷’
টাপুরদি বলল, ‘শুধু আমি কেন, ‘শখের বাগান’-এ আপনার অভিনয় যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা আপনার অভিনয় ভুলতে পারবেন না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত৷ বাই দ্য ওয়ে, ‘আমি সংঘমিত্রা ব্যানার্জি, আর ও হল মৈথিলী সেন’ বলে ব্যাগ থেকে নিজের কার্ড বের করে সুপর্ণার হাতে দিল টাপুরদি৷
‘প্রাইভেট ডিটেকটিভ?’ চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করলেন সুপর্ণা, ‘কেন?’
‘সেরকম কিছু নয়,’ হেসে বলল টাপুরদি, ‘একটা ব্যাপার একটু জানার ছিল৷ তাই আসা৷ গুরুতর কিছু নয়৷ যাই হোক, আপনি কতদিন ধরে এই অভিনয় জগতে আছেন?’
বুঝলাম কথার অভিমুখ ঘোরানোর জন্যই জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
‘আসলে বাবার উৎসাহেই খানিকটা বেশি বয়সে আমার অভিনয়ে আসা,’ বললেন সুপর্ণা, ‘শখ ছিল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে অল্পসল্প স্টেজে অভিনয় করেছি৷ তারপর বিয়ের পর সব বন্ধ৷ আমি আশুতোষ কলেজে পার্টটাইম লেকচারার৷ চাকরি, সংসার, ছেলে নিয়ে অভিনয়ের জন্য সময় থাকত না৷ তারপর এখানে ফিরে আসার পর অভিনয়টা আবার শুরু করি৷ খুব বেশি সময় পাই না৷ যেটুকু পাই, তাতেই করার চেষ্টা করি আর কী৷’
‘আপনি সত্যিই অসাধারণ অভিনেত্রী,’ বলল টাপুরদি৷
সুপর্ণা হাসলেন৷ বললেন, ‘কিন্তু বাবার কাছে আপনারা কী ব্যাপারে এসেছেন, বললেন না কিন্তু৷ আসলে কী জানেন, বাবার বয়স হয়েছে৷ বিপি, সুগার হাই৷ তাই বাবাকে নিয়ে একটু টেনশনে থাকি৷’
‘বুড়ো ছেলেকে নিয়ে তোর চিন্তার আর শেষ নেই, সুপু,’ বলতে বলতে হাসিমুখে যিনি ঘরে ঢুকলেন, তাঁকে দেখে আমি আর টাপুরদি দুজনেই উঠে দাঁড়ালাম৷ ইনিই মৃণাল দত্ত৷ বীণাদেবীর দেওয়া ছবিতে দেখেছি তাঁকে৷ কাল টাপুরদি গুগল করেও কিছু পুরোনো ছবি বার করে দেখিয়েছে আমায়৷ কিন্তু সেসবই তাঁর যৌবনের ছবি৷ এখন যে অতি সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তাঁকে দেখে মনে হল, রাজনীতিবিদ না হলে তিনি অনায়াসে অভিনেতা হতে পারতেন৷ টকটকে ফর্সা গায়ের রং, মাথার চুল ধবধবে সাদা, তীক্ষ্ণ নাসা, নরম চোখের দৃষ্টি, দীর্ঘ দেহ সব মিলিয়ে যেন সেলুলয়েডের কোনো রূপবান বৃদ্ধ রাজা৷ রাজাসুলভ আভিজাত্যই ঘিরে আছে মানুষটাকে৷
আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন৷ বললেন, ‘আপনাদের মধ্যে কে কাল ফোন করেছিলেন আমায়?’
টাপুরদি বলল, ‘আমি করেছিলাম৷’
মৃণালবাবু বললেন, ‘চলুন, আমার স্টাডিতে বসে কথা বলা যাক৷’
তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার স্টাডিতে সবার জন্য চা পাঠিয়ে দে সুপু৷’
মৃণালবাবুর স্টাডিটিকে রত্নখনি বললে কম বলা হয়৷ ঘরের দেওয়ালে একটি দরজা ও দুটি জানলা বাদে বাকি সর্বত্র দেওয়ালজোড়া বুক শেলফে ঠাসা শুধু বই আর বই৷ মাঝে একটা ছোট্ট স্টাডি টেবিলের উপরেও বই রাখা৷ টেবিলের এক কোণে একটা ফোটোফ্রেমে সুপর্ণার কোলে একটি চার-পাঁচ বছরের বাচ্চা ছেলের ছবি, সম্ভবত সুপর্ণার ছেলে৷ একদিকে একটা সিংগল খাটে শুধু পাতলা তোশকের উপর সাদা চাদর টান টান করে পাতা৷ মেয়েলি হাতের যত্নের ছোঁয়া সর্বত্র৷ ঘরে ঢুকে মনে হল এ কোনো জ্ঞানতাপসের সাধনাস্থল৷ মৃণালবাবু বললেন, ‘তোমাদের তুমি বলে সম্বোধন করছি৷ তোমরা আমার সুপুর চেয়েও অনেক ছোটো৷ তোমাদের এই ঘরে ডাকলাম কারণ যে বিষয় নিয়ে তোমরা আলোচনা করতে এসেছ, সেসব কথা আমি সুপুর সামনে করতে চাই না৷ বসার জায়গায় একটু অভাব আছে৷ তোমরা দুজনে বরং বিছানার উপর আরাম করে বোসো৷ আমি এখানে চেয়ারে বসি৷’
টাপুরদি ঘুরে ঘুরে বই দেখছিল৷ বলল, ‘এত বই, সব পড়েছেন আপনি?’
মৃণালবাবু হেসে বললেন, ‘এই সংগ্রহের মোটামুটি সবই আমার পড়া৷ অসীম জ্ঞানসমুদ্র, জীবন বড়ো ছোটো৷ তবে আমি বেকার মানুষ৷ কোনো কাজ তো নেই৷ চা ছাড়া নেশাও নেই কোনো৷ এই বই-ই আমার নেশা বলতে পারো৷ পড়াশোনা নিয়ে সময় দিব্যি কেটে যায়৷’
‘অসাধারণ সংগ্রহ আপনার৷ আজ কাজের জন্য এসেছি৷ তবে আপনি যদি বিরক্ত না হন, এবং যদি অনুমতি দেন, তবে পরে আবার আসব আপনার এই সংগ্রহ আরও ভালোভাবে দেখার জন্য৷’
‘নিশ্চয়ই আসবে৷ একশোবার আসবে৷ বই কারও একার নাকি? যে বলে আমার বই, সে মূর্খ৷ টাকা দিয়ে কিনলেই কি আর বইয়ের মালিক হওয়া যায়, না ভিতরের জ্ঞানটাকে কিনে ফেলা যায়? সে যে অগাধ, অসীম৷ যত পড়ো, যতই বিলোও, তা শেষ হবে না কখনো৷’
টাপুরদি এসে বসল৷ নিজের কার্ডটা এগিয়ে দিল মৃণালবাবুর হাতে৷ মৃণালবাবু আলগোছে তাতে চোখ বুলিয়ে মুচকি হাসলেন৷ বললেন, ‘সংঘমিত্রা৷ তোমার নাম তো সংঘমিত্রা৷ তুমি জানো সংঘমিত্রা কে ছিলেন?’
টাপুরদি হাসল৷ বলল, ‘জানি৷ সম্রাট অশোকের কন্যা ছিলেন রাজকন্যা সংঘমিত্রা৷’
‘ঠিক,’ মাথা নেড়ে বললেন মৃণালবাবু, ‘রাজকন্যা সংঘমিত্রা৷ কালের প্রবাহচক্রে কত রাজা-রানি-রাজপুত্র-রাজকন্যার নাম ইতিহাস ভুলে গেছে৷ কিন্তু সংঘমিত্রাকে মনে রেখেছে৷ কেন জানো?’
‘রাজকন্যা সংঘমিত্রা সিংহলে গিয়েছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারের জন্য,’ বলল টাপুরদি৷
‘সিংহলে গিয়েছিলেন, ঠিক,’ মাথা নাড়লেন মৃণালবাবু৷ তারপর বললেন, ‘তবে বলাটা যত সহজে বলছি আমরা, সেই যুগে কাজটা এত সহজ ছিল না৷ একজন সম্রাটের কন্যা, যে আজীবন বিলাসিতায় অভ্যস্ত, একদিন মনে করলেন সব ছেড়ে সন্ন্যাসী হবেন৷ ভাবতে পারো সংঘমিত্রা? কী নেই তাঁর কাছে? রাজকন্যা তিনি৷ স্বামী, সন্তান, সংসার, আজন্মলালিত চার দেওয়ালের সংস্কার, সুখ সম্পদ, বিলাসব্যসন সব এককথায় ছেড়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন৷ সিংহলের রাজা দেবানামপিয় তিস্য রাজকন্যা সংঘমিত্রাকে নিজ রাজত্বে আমন্ত্রণ জানিয়েছে রাজ্যে নারীদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারের জন্য৷ সংঘমিত্রা তো এক পায়ে খাড়া৷ সম্রাট অশোক কন্যার ছেলেমানুষিকে গুরুত্ব দিলেন না৷ তখন সংঘমিত্রা তাঁর বাবা, না, এক সম্রাটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে বললেন, ‘রাজপুত্র মহেন্দ্রর যাওয়াটা যদি রাজধর্মের জন্য জরুরি হয়, আমার যাওয়াটাও তবে আমার হৃদয়ের ধর্মের জন্য, আরও অনেক নারীকে ধর্মের সঠিক দিশা দেখানোর জন্য জরুরি৷’ ভাবতে পারো সংঘমিত্রা, আজ থেকে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে, যখন আমাদের দেশের সংস্কৃতি নারীর অধিকারকে পৌরুষের অহংকারে দলিত করে চলেছিল, বলছিল ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্যমর্হতি’, সেখানে সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এক নারী এক সম্রাটের চোখে চোখ রেখে নিজের হৃদয়ের ধর্মকে অনুসরণ করার অনুমতি চাইছেন, দাবি জানাচ্ছেন৷ কী অপরিসীম দার্ঢ্য, ভেবে দেখো৷ জন্মসূত্রে পাওয়া সুখসৌভাগ্যকে এককথায় ছেড়ে সন্ন্যাসিনীর কৃচ্ছ্রকে বরণ করে নিতে কতটা মনের জোর লাগে ভাবতে পারো?’
টাপুরদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম টাপুরদি মুগ্ধদৃষ্টিতে মৃণালবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর কথা শুনছে৷ সত্যি, মুগ্ধ হওয়ার মতোই মানুষ তিনি৷
এবার মৃণালবাবু বললেন, ‘আচ্ছা দেখো, আমি একাই বকে চলেছি৷ বুড়ো হয়েছি তো৷ তাই আজকাল বেশি বকবক করি৷ সুপুও তাই বলে৷ যা হোক, তোমরা যে জন্য এসেছ, এবার সেই ব্যাপারে কথা বলা যাক৷’
‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমি কেন এসেছি?’ নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

হাসলেন মৃণালবাবু৷ বললেন, ‘জানি৷ আমি নিজেকে যতই দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি, আমার অতীত আমায় ছাড়ে না৷ অতীত বড়ো বিষম বস্তু, বুঝলে হে৷ আমরা ভাবি, কালকে বুঝি খুব সহজেই অতিক্রম করা যায়৷ ভুল ভাবি৷ কাল হল সেই গর্বোদ্ধত সম্রাট, সে চলার পথের প্রতি প্রান্তে তার পদচিহ্ন ছেড়ে যায়৷ আমার অতীত আমার সঙ্গেই চলে পরম বন্ধুর মতো৷ বলো, কী জানতে চাও৷’
‘অমিয় চক্রবর্তীকে আপনি কবে থেকে চেনেন?’
মৃণালবাবু খোলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন, বাইরে সন্ধে নেমেছে৷ তাঁর চোখ দেখে মনে হল তাঁর মন ফিরে যাচ্ছে তাঁর ফেলে আসা অতীতে৷ একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃণালবাবু বললেন, ‘অমিয় আমার থেকে বছর পাঁচেকের ছোটো ছিল৷ আশুতোষ কলেজে পড়ত৷ ইউনিয়ন করত জমিয়ে, দারুণ ব্রাইট৷ উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও প্রতিভাবান৷ খুব দ্রুত উন্নতি করছিল৷ আমাদের দল তখন সরকারে ক্ষমতায়৷ মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে অমিয়র রাজনৈতিক কেরিয়ারের গ্রাফ তরতরিয়ে উপরে উঠল৷ কলেজ ইউনিয়ন থেকে শুরু করে মাত্র বছর পাঁচেকের মধ্যে দলের প্রমিনেন্ট যুবনেতা হয়ে উঠল অমিয়৷ রথীনদা খুব স্নেহ করতেন ওকে৷ আমায় প্রায়ই বলতেন, ‘দেখিস মৃণাল, এই ছেলেটা অনেক উপরে যাবে৷’ ওর মধ্যে কিছু করার, আরও উপরে ওঠার একটা খিদে ছিল৷’
‘সরি, চা-টা দিতে একটু দেরি হয়ে গেল,’ বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন সুপর্ণা৷
‘আরে না না, কোথায় দেরি?’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর হাত থেকে চায়ের ট্রেটা নিলাম আমি৷ টেবিলের উপর রাখতে সুপর্ণা এগিয়ে এসে একটা কাপ নিয়ে মৃণালবাবুর হাতে এগিয়ে দিলেন৷ বললেন, ‘বাবার চিনি ছাড়া৷’ তারপর মৃণালবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাবা, কিছু লাগবে আর?’
‘না রে, তুই যা, রেওয়াজে বসবি তো?’ বললেন মৃণালবাবু৷
‘আসছি৷ আপনারা কথা বলুন,’ বলে মিষ্টি করে হেসে সুপর্ণা বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে৷
সেদিকে তাকিয়ে টাপুরদি বলল, ‘আপনিও তো রথীনবাবুর খুব কাছের লোক ছিলেন৷ অমিয়বাবুর উত্থানে আপনার খারাপ লাগেনি?’
মৃণালবাবু হাসলেন৷ তারপর বললেন, ‘হিংসে হয়েছিল কি না জানতে চাইছ? আজ এতদিন পরে মিথ্যে বলে লাভ কী? তা একটু হয়েছিল৷ আসলে অমিয়কে আমি হাতে ধরে তৈরি করেছিলাম৷ কলেজের রাজনীতি আর সত্যিকারের মাঠে নেমে রাজনীতির ময়দানে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে পার্থক্য তো আছে৷ কলেজ ইউনিয়নের নেতা থেকে শুরু করে দলের যুবনেতা হওয়ার পথটা আমিই ওকে পার করিয়েছিলাম৷ কারণ রথীনদার মতো আমারও মনে হয়েছিল, ছেলেটার মধ্যে মেটেরিয়াল আছে৷ ও নিজেও সেই সময় আমার খুব ন্যাওটা ছিল৷ সারাক্ষণ মৃণালদা মৃণালদা করে সঙ্গে সেঁটে থাকত৷ ওকেও আমি ছোটো ভাইয়ের মতো ভালোবাসতাম৷’
‘তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম, অমিয় ভীষণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী৷ ও শুধু যুবনেতা হয়ে থেমে যাওয়ার জন্য পলিটিক্সে আসেনি৷ ওর লক্ষ্য আরও দূরে, আরও উঁচুতে৷ আমি ছিলাম রথীনদার কাছে পৌঁছোনোর জন্য ওর সিঁড়ি৷ সেই সময় একটু রাগ হয়েছিল৷ দুঃখ পেয়েছিলাম৷ কিন্তু জানো তো, রাজনীতিতে এইসব সেন্টিমেন্টের কোনো দাম নেই৷’
‘সুনয়নাদেবীকে চিনতেন আপনি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
‘সুনয়না? ভারি ভালো মেয়ে৷ কী অপূর্ব গাইত মেয়েটা! আমায় দাদা বলে ডাকত, শ্রদ্ধা করত৷’
‘শুনেছি সুনয়নাদেবীও অমিয়বাবুর সঙ্গে একইসঙ্গে রাজনীতি করতেন সেই সময়?’
মৃণালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, অমিয় আর সুনয়না একসঙ্গে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিল৷ সত্যি বলতে কী, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, সুনয়নার রাজনৈতিক প্রতিভা ও বুদ্ধি দুটোই অমিয়র চেয়ে অনেকটাই বেশি ছিল৷ লেগে থাকলে কে বলতে পারে, আজ হয়তো অমিয়র জায়গায় ও গদিতে বসত৷ কিন্তু কেন কে জানে, বিয়ের পর থেকে ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে দূরত্ব বাড়তে থাকল ওর৷ তারপর অম্লানের জন্মের পরে পুরোপুরি সরে গেল৷ অথচ ওকে দেখে মনে হত, রাজনীতি ও ভালোবাসে৷ তবু কেন সরে গেল, ভিতরের কথা জানি না আমি৷ তবে আমাদের সমাজে তো স্যাক্রিফাইস বরাবর নারীরাই করে,’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন মৃণালবাবু৷
‘ধনঞ্জয় মণ্ডলকে চিনতেন আপনি?’ জানতে চাইল টাপুরদি৷
‘চিনতাম৷ আসলে দলে গ্রাসরুট লেভেল থেকে উপরতলা অবধি লক্ষাধিক কর্মী কাজ করে৷ সবাইকে মনে রাখা সম্ভব নয়৷ কিন্তু ধনঞ্জয়কে মনে আছে৷ কারণ, রথীনদা ওকে পছন্দ করতেন৷ আমি ওদের বাড়ি গেছিলাম৷ খুব কাজের ছেলে ছিল৷ পার্টির জন্য প্রাণ দিতেও পারত৷ আমাদের দল ক্ষমতা হারাল৷ এতগুলো বছরে কত লোক যে পার্টি বদলাল, তার ইয়ত্তা নেই৷ কিন্তু ধনঞ্জয় মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে৷ ও রাজনীতি যে খুব ভালো বুঝত, তা নয়৷ সেইজন্যই হয়তো এত বছরে তেমন উন্নতি করতে পারেনি৷ দলের সাধারণ কর্মী হয়েই রয়ে গেছিল৷ তবে সে নিয়ে ওর দুঃখ ছিল বলে মনে হয় না৷ দলকে ও ভালোবাসত৷ আমি যে ধনঞ্জয়কে চিনতাম, সে ভীষণ আবেগপ্রবণ নরম মনের ছেলে ছিল৷ ও অমিয়কে খুন করেছে, এ আমি মানতে পারি না৷ আবার এটাও ঠিক যে, এ-রকম নরম মনের আবেগপ্রবণ মানুষেরা সেরকম আঘাত পেলে ভয়ানক হয়ে ওঠে৷ ধনঞ্জয়ের সঙ্গে হয়তো তাই-ই হয়েছিল৷’
‘ধনঞ্জয়ের সঙ্গে আপনার পরে আর যোগাযোগ হয়নি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
‘হয়েছিল,’ বললেন মৃণালবাবু৷ একটু থেমে বললেন, ‘ওর ছেলে তখন খুব অসুস্থ৷ ও আমায় ফোন করেছিল৷ বলেছিল, ওর টাকার খুব দরকার৷ অমিয় নাকি টাকা দেবে বলেও দেয়নি৷’
টাপুরদি উত্তেজিত ভঙ্গিতে সামনে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি দিয়েছিলেন টাকা?’
মৃণালবাবু মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘দিয়েছিলাম কিছু৷ যদিও সেটা ওর প্রয়োজনের পক্ষে যথেষ্ট ছিল না৷ তখন সন্ধের পর ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে গেছিল৷ এটিএমে টাকার উইথড্রয়ালের লিমিট আমার খুব বেশি নয়৷ ওকে বলেছিলাম, পরের দিন আসতে৷ ব্যাঙ্ক থেকে তুলে আরও কিছু দেব৷ কিন্তু ও আর আসেনি৷ পরে শুনেছি সেদিনই শেষ রাতে ওর ছেলে মারা যায়৷’
‘এবার একটু অন্য কথায় আসি৷ আপনি কেন সরে এলেন রাজনীতি থেকে?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
পাশের ঘরে সুপর্ণা রেওয়াজ করছেন৷ বিলম্বিত ইমন গাইছেন অপূর্ব সুরে৷ দীর্ঘ আলাপ গেয়ে চলেছেন একতালের বিলম্বিত লয়ে৷ বাতাসে সুর ভাসছে দীর্ঘায়িত কান্নার মতো৷ সেদিকে কান পেতে চুপচাপ কিছুক্ষণ শুনলেন মৃণালবাবু৷ তারপর বললেন, ‘আমার রাজনীতি থেকে সরে আসার সঙ্গে কি এই কেসের সত্যিই কোনো সম্পর্ক আছে?’
‘হয়তো নেই৷ তবু জানতে ইচ্ছে করছে৷ আপনি বলতে না চাইলে বলবেন না,’ বলল টাপুরদি৷
মৃণালবাবু চায়ের কাপটা শেষ করে বললেন, ‘তোমাদের চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে৷ খেয়ে নাও৷’
উঠে গিয়ে খোলা জানলার সামনে দাঁড়ালেন তিনি৷ পাশের গলিতে রিকশার ঠুংঠাং ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে৷ মাঝে মাঝে দু’চারটা গাড়ি হুসহাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ মৃণালবাবু কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ৷ তারপর ফিরে এসে আবার চেয়ারে বসলেন৷ বললেন, ‘আমার আর ভালো লাগছিল না৷ ক্লান্ত বোধ করছিলাম৷’
‘সেই ক্লান্তি কি অমিয় চক্রবর্তীর উত্থানবশত?’ প্রশ্ন করল টাপুরদি৷
মৃণালবাবু হাসলেন৷ তারপর বললেন, ‘না৷ তুমি যেটা ভাবছ, সেটা নয়৷ প্রথমদিকে অমিয়র দ্রুত উত্থানে ঈর্ষা হয়তো সামান্য হয়েছিল, আফটার অল, আমিও তো মানুষ৷ রিপুর নিগড়ে আমিও তো বাঁধা৷ কিন্তু আমি মনে মনে মেনে নিয়েছিলাম যে অমিয় আমার থেকে যোগ্য ব্যক্তি৷ আসলে আমার জীবনে রাজনীতি নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না, যেটা অমিয়র ছিল৷ শুধু রাজনীতি কেন, যেকোনো কেরিয়ারেই যদি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকে, তাহলে বেশি দূর এগোনো যায় না৷’
‘আপনি বলতে চান আপনি অমিয় চক্রবর্তীর জায়গায় নিজেকে দেখতে চাননি?’
‘তখনও আমাদের দল ক্ষমতায়৷ রথীনদা মুখ্যমন্ত্রী৷ রথীনদাকে টপকে সেই জায়গায় আমি নিজেকে ভাবতে চাইনি৷ রথীনদা আমার ও অমিয়র দুজনেরই রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু৷ খুব শ্রদ্ধা করতাম আমি মানুষটাকে৷’
‘তারপর সময় বদলাল৷ আমাদের দল বিধানসভা ভোটে হেরে গেল, ক্ষমতা থেকে সরে গেল৷ ইলেকশনের আগের বছরই রথীনদার একটা হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল৷ সে যাত্রায় বেঁচে উঠলেও ভিতরে ভিতরে দুর্বল হয়ে গেছিলেন রথীনদা৷ বয়সও হয়েছিল৷ দলের ভিতরে রথীনদার মুঠি আলগা হচ্ছিল একটু একটু করে৷ অস্বীকার করব না, এত বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার ফলে দলের মধ্যেও বেনোজল ঢুকছিল৷ ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হয়েছিল৷ খবরের কাগজে সেসব নিয়ে বিস্তর লেখালেখি শুরু হয়েছিল৷ কয়েকটা নিউজ পেপার তো আমাদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছিল৷ দলের ভিতরে অমিয়রও ক্ষমতা বাড়ছিল ক্রমশ৷
এরপর ইলেকশনে আমাদের দলের হার হল৷ রাজ্যে আমাদের বিরোধী দল ক্ষমতায় এল৷ দলে দলে আমাদের দলের নেতা কর্মীরা গিয়ে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিতে শুরু করল৷ মুঠোর মধ্যে বালির মতো ক্ষমতা আমাদের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে থাকল৷ যারা সেই অবস্থাতেও দলে টিকে রইল, তাদেরও মনোবল তলানিতে৷’
‘সরি, আমি একটু ইন্টারাপ্ট করছি,’ বলে উঠল টাপুরদি, ‘আমি সেই সময়ের খবরের কাগজ কিছু দেখেছি ইন্টারনেটে৷ অমিয়বাবুর সম্পর্কে যা যা ছাপা হত, সব নিশ্চয়ই মিথ্যে নয়?’
মৃণালবাবু সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকালেন টাপুরদির দিকে৷ বললেন, ‘ইন্টারনেটে অত পুরোনো খবরের কাগজও পাওয়া যায় বুঝি? আমি পুরোনো মানুষ৷ বই বুঝি, ইন্টারনেট-টেট অত ভালো বুঝি না৷ তবে মেল চেক করতে পারি, সুপু শিখিয়ে দিয়েছে৷ তবে তুমি কেসটা নিয়ে বেশ খেটেছ দেখে ভালো লাগল৷’
‘আসলে কী জানো, অমিয়রও তখন বয়স কম৷ ওর কাজ করার ধরন আলাদা ছিল৷ একটু বেশিই অ্যাগ্রেসিভ ছিল৷ ফলে ওকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হত৷ মানুষ হিসেবে কারও বিচার করার অধিকার আমার নেই৷ আর আমি অনেকদিন ধরে রাজনীতির বাইরে আছি৷ এখন আর এইসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না৷ অমিয় চলে গেল৷ আমি এটুকু জানি, যেই স্বপ্নটা ওর লড়াইয়ের প্রেরণা ছিল, সেই স্বপ্ন সার্থক হওয়ার মুখে এসে ওকে চলে যেতে হল, এর চেয়ে দুঃখের আর কিছু হতে পারে না৷’
টাপুরদি বলল, ‘তার মানে আপনি বলছেন, অমিয়বাবুর সঙ্গে স্বার্থের সংঘাতে আপনি পলিটিক্স ছাড়েননি?’
‘স্বার্থের সংঘাত?’ মৃণালবাবু একটু ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকালেন টাপুরদির দিকে৷ তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘না মা৷ স্বার্থ আমার ছিল না৷ রথীনদার জন্য রাজনীতিতে ছিলাম আমি৷ রথীনদার আদর্শকেই নিজের আদর্শ বলে মেনেছিলাম৷ রথীনদা চলে গেলেন৷ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, অমিয় দলকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে চাইছিল৷ ওর কর্মপন্থা, চিন্তাভাবনার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারছিলাম না৷ স্বার্থের সংঘাত নয়, বলতে পারো আদর্শের সংঘাত৷ তা ছাড়া আমার স্ত্রীও অসুস্থ ছিলেন৷ ক্যানসার৷ ওঁর আমাকে দরকার ছিল৷ এখন মাঝে মাঝে ভাবি, ধনঞ্জয়ও যদি আমার মতো সময় থাকতে পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারত, তাহলে বোধ হয় আজ অনেক কিছু অন্যরকম হত৷ আজ জীবনের এই পর্যায়ে এসে বুঝেছি, দিনের শেষে পরিবারই সঙ্গে থাকে৷’
‘একজন জার্নালিস্ট সেই সময় অমিয় চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে খুব লেখালেখি করতেন৷ নাম মল্লিকা দাশগুপ্ত৷ আপনি চিনতেন তাকে?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷
মৃণালবাবু বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালেন টাপুরদির মুখের দিকে৷ বললেন, ‘মল্লিকা দাশগুপ্ত? চিনতাম বই কী! আগুনের মতো মেয়ে মল্লিকা দাশগুপ্ত৷ ভীষণ সাহসী, লড়াকু মেয়ে৷ হ্যাঁ, ও আমাদের দলের এগেন্সটে লিখত৷ কিন্তু আমায় খুব শ্রদ্ধাও করত৷ সত্যি বলতে কী, ও একাই সেই সময় আমাদের দলের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল৷ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট ছিল মল্লিকা দাশগুপ্ত৷ পলিটিক্স নিয়ে লিখত৷ পাগলি মেয়ে, আমায় এসে বলত, আপনাকে আমি এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই মৃণালদা৷ নিজের কাজ নিয়ে দারুণ সিরিয়াস ছিল মেয়েটা৷’
‘আপনার কি মনে হয় অমিয় চক্রবর্তী সম্পর্কে কোনো গুরুতর তথ্য তাঁর হাতে এসেছিল?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল৷
‘আমি বলতে পারব না এই বিষয়ে৷ সেরকম কিছু থেকে থাকলেও আমার জানা নেই৷ কিন্তু হঠাৎ মল্লিকার কথা আসছে কেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না৷ অমিয়কে তো ধনঞ্জয় খুন করেছে বলে শুনেছি৷ তুমি এতসব জানতে চাইছ, কারণটা কী বলো তো? তাহলে কি অমিয়র মৃত্যুতে কোনো রহস্য আছে?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন মৃণালবাবু৷
‘রহস্য আছে কি না তা এখনও জানি না৷ সেটাই খুঁজে দেখার চেষ্টা করছি আপাতত৷ আজ তাহলে আসি,’ বলে উঠে দাঁড়াল টাপুরদি৷ আমিও উঠে দাঁড়ালাম৷ আমার দিকে তাকিয়ে মৃণালবাবু হেসে বললেন, ‘মৈথিলী, আজ তোমার সঙ্গে কথা হওয়ার সুযোগ হল না৷ এরপর যবে আসবে, তোমায় আরেকজন মৈথিলীর গল্প শোনাব, যিনি রাজ্যসুখ, স্বামী, সন্তান সব ত্যাগ করেছেন শুধু আত্মসম্মানের জন্য৷ রামায়ণের গল্প তো সবাই জানে, মৈথিলীকে আসলে চেনে ক-জন? অনেকে বলে মহাকাব্যের সবচেয়ে বলিষ্ঠ নারী চরিত্র যাজ্ঞসেনী৷ আমি কিন্তু তা মনে করি না৷ আমার মনে হয়, মৈথিলীকে পরবর্তী অনুবাদক ও কবিরা ঠিকমতো এক্সপ্লোর করেনি৷ বাল্মীকির মৈথিলী জানকী এক অনন্যসাধারণ চরিত্র৷’
ঘর থেকে বেরোনোর সময় স্টাডি টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে গেল টাপুরদি৷ ফোটোফ্রেমটা হাতে তুলে হেসে বলল, ‘এটি বুঝি আপনার নাতি? তা কোথায় সে? দেখলাম না তো? বাড়িতে নেই বুঝি?’
মৃণালবাবু ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ও তো নেই৷ থ্যালাসেমিয়া নিয়েই জন্মেছিল৷ তিন বছর হল চলে গেছে আমাদের ছেড়ে, ওর মাকে ছেড়ে৷ বড়ো একা হয়ে গেছে মেয়েটা৷’
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷ পাশের ঘরে সুপর্ণার গলায় বিলম্বিত ইমনের বন্দিশ বাতাসে যেন মাথা কুটে কেঁদে বেড়াচ্ছে,
‘মেরা মন বাঁধ লিনোরে, হাঁ রে ইন যোগিয়াকে সাথ,
সদারঙ্গ করম করো কিউ না ইন প্রাণনাথ কি হাথ...’

মৃণালবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় অনেকক্ষণ কারও মুখে কোনো কথা জোগাল না৷ টাপুরদি নিঃশব্দে ড্রাইভ করতে লাগল৷ আমি গাড়ির জানালা দিয়ে চেয়ে রইলাম বাইরের দিকে৷ আজকের দিনটা আমার জীবনের অভিজ্ঞতার খাতায় সঞ্চিত হল৷ মনটা বড্ড ভারী হয়ে আছে, কথা বলতে ইচ্ছে করছে না৷ জানি টাপুরদিরও মনের একই অবস্থা৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন