রোজ রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর খাবার টেবিলে আমরা একসঙ্গে বসে নানা আলোচনা করি। মেজমামা এর নাম রেখেছেন, 'দাদার দরবার'। মোগল সম্রাট আকবরের দরবারের মতোই এই দরবার অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ও কালে বিখ্যাত বলে ইতিহাসে উল্লেখিত হবেই হবে। আমরা সব অমাত্যবর্গ। মাসিমার ধারণা ভূত-প্রেতবর্গ। একজন বদ্ধ পাগল, বাকি সব হাফ, কোয়াটার। একজনই ফুল ম্যাড। বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বলবেন, 'পাগলে কি না বলে, ছাগলে কি না খায়! জ্ঞানী, গুণী, প্রতিভাবানদের চিনতে হলে নিজের ভেতরে কিছু মাল থাকা চাই। হিংসা, দ্বেষ ইত্যাদি আবর্জনা ভেতরে থাকলে সত্য দর্শন অসম্ভব। যার চোখে যে রঙের চশমা, বাইরেটা সে সেই রঙেরই দেখে।'
উত্তরে মাসিমা একটি সংস্কৃত বলবেন, 'অমৃতং বাল ভাষিতং', বালকের কথা অমৃত সমান।
মেজমামা বলবেন, 'অনেকের আশি বছরেও বুদ্ধিসুদ্ধি হয় না, সে আর কী করা যাবে?'
বড়মামার মুখে ফুটবে স্বর্গীয় হাসি। বলবেন, 'শ্রদ্ধাবানং লভতে জ্ঞানম। আমার ভেতরে যা আছে, তার ছিটে-ফোঁটা যদি কেউ নেয় সে তরে যাবে। লোকে ধন্য ধন্য করবে। হাত জোড় করবে। তেড়ে আসবে প্রণাম করার জন্যে। আমি যেখানে যাই, সেখানে তো এইরকমই হয়। এই সেদিন রক্তদান শিবিরে গেলুম স্ট্যামপিড হয়ে গেল। হে-রে-রে-রে করে আমাকে প্রণাম করতে আসছিল, ছেলেরা ভাবলে ডাক্তার পেটাতে আসছে, হাতাহাতি, ধস্তাধস্তি। আরে বাবা, আমি কি সেই রকম ডাক্তার! আমি তো ফাদার। রোগীর ঘরে ঢোকামাত্রই বিছানায় উঠে বসে।'
মাসিমা বললেন, 'হ্যাঁ, তারপর জিভ বের করে ধপাস করে সেই যে শুয়ে পড়ে, আর কোনোদিন ওঠে না।'
বড়মামা বললেন, 'আপন যারা, তাদের যুগ যুগ ধরে সেই একই ধর্ম, একই ধরন, দেখেও দেখে না, শুনেও শোনে না। দিকে দিকে যার প্রভূত প্রশংসা, প্রভাত সূর্যের ন্যায় যাহার প্রতিভা কৃষকের পর্ণকুটীর হইতে ধনীর প্রাসাদ পর্যন্ত প্রসারিত হইয়াছে, তাহাকে চিনিতে চেষ্টিতা নন এই মহীয়সী, মহামান্যা রমণী। আশ্চর্য, অতি আশ্চর্য, কিমাশ্চর্যম অতঃপরম!'
হাসি হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বাবা পঞ্চানন, রমণীমোহন, অসুরদলন! আমার পাইপ?'
বড়মামা জীবনে ধূমপান করেননি। ডাক্তারি পাশ করার পর ডক্টর গোস্বামীর অনুপ্রেরণায় একটি চুরুটে একটান মেরে পুরো একটি ঘণ্টা নন স্টপ কেশেছিলেন, আর থেকে থেকে বলেছিলেন, 'বাপরে! এ যে দেখি মানুষমারা টর্পেডো।' কিন্তু বড়মামার ভীষণ ইচ্ছে, চলচ্চিত্রের ডাক্তারদের মতো লংকোট পরবেন, ঠোঁটের কোণে দাঁত দিয়ে চেপে ধরা পাইপ, লেজ ঝোলা টিয়াপাখি যেন, সেই অবস্থায় ঠোঁট বাঁকিয়ে বলার চেষ্টা করছেন, হেপাটাইটিস, অস্টিয়ো আরথারাইটিস। মারকাট ব্যাপার। ইংল্যান্ডের পি.এম. ভারতের ডি.এম, আমেরিকার মার্লোন স্যান্ডো, ফ্রানসের জাঁপল, সব ঠোঁটে পাইপ, পাইপে ঠোঁট। কিন্তু, 'নো তামাক, ডেনজারাস ফর হেলথ।' বড়মামার পাইপে ঠাসা থাকে তামাক নয়, জোয়ান। যেই টান মারবেন দুটো দানা মুখে। ফোঁটা ফোঁটা স্যালাইন চালানের মতো, মুখে দানা দানা জোয়ান। মেজমামা বললেন, 'এমন একটা বস্তু পৃথিবীতে একবারই জন্মায়, জাস্ট ওয়ান পিস। নোবেলও নাগাল পাবে না।'
বড়মামা সাদা রঙের পাইপটা হাতে ধরে এদিকে-ওদিকে তাকালেন, 'এইবার তাহলে কিছু কাজের কথা হতে পারে, তাই তো? আচ্ছা, আমরা কীভাবে বাড়িতে ঢুকি? প্রথমে গেটটা খুলে বাগান। বাগানের পথ পেরিয়ে বাড়িতে ঢোকার দরজা। একটি কলিংবেল। অধিকাংশ সময়ই অচল। কড়া খটখট। দাঁড়িয়ে থাকা। ভেতরে কে কোথায় কী মহৎ কাজে ব্যস্ত! খট খটা খট। ধড়াস। দরজা খোলা হল। ঘড়ি দ্যাখো—মূল্যবান মিনিট পনেরো সময় আয়ুর পুঁজি থেকে বেরিয়ে গেল। ফিরবে না। টাইম অ্যান্ড টাইড ওয়েট ফর নান। আচ্ছা, গেট থেকে দরজা, কতটা গজ হবে?'
মেজমামা বললেন, 'অনেকটা। মেপে দেখা হয়নি। হাজার, দু'হাজার, দশ হাজার গজ।'
বড়মামা জোয়ান-পাইপে টান মারলেন। কয়েক দানা জোয়ান মুখে এল। পাইপ হাতে। দাঁত কুটকুট। 'আমি একটা স্কাইওয়াক নির্মাণ করাব, ফ্রম গেট টু দোতলার বারান্দা। দোতলা থেকে তিনতলায় যাওয়ার জন্যে ছোট্ট একটা এসক্যালেটার। নিট অ্যান্ড ক্লিন। গেট থেকে বারান্দায় ল্যান্ড করে সু-উ-স তিনতলায় আমার পার্লারে। লর্ড এডগার হ্যামিলটন এইটটিন এইইটি ফাইভে হাউস অফ কমনসে বলেছিলেন, লিভ ইন স্টাইল, ডোন্ট থিংক ফর আদার্স। এই কথাটাই আমরা একটু অন্যভাবে বলি—নিজে বাঁচলে বাপের নাম। এই বাঁচাটা হবে সগৌরবে। অন্যের চোখ কপালে উঠে যাবে। হিংসায় পোড়া শালপাতার মতো চচ্চড় করবে। মানুষকে আমরা কিই-বা দিতে পারি বল। না অর্থ, না সেবা। সামান্য একটু সুযোগ যদি করে দেওয়া যায়, যাতে হিংসায় জ্বলে পুড়ে আনন্দ পায়! পরনিন্দা, পরচর্চার চেয়ে আনন্দ আর কিসে পাওয়া যায়।'
মাসিমা বললেন, 'আপনাদের দুই দামড়ার অনুমতি নিয়ে আমার একটি প্রার্থনা এই দরবারে পেশ করতে পারি?'
'অবশ্যই, অবশ্যই। কোনো বাধা নাই।'
'আমি ভারত ভ্রমণে যেতে চাই। প্রথমে উত্তর ভারতে, তারপর দক্ষিণ ভারতে।'
দুই মামা সমস্বরে বললেন, 'অসম্ভব, নট অ্যালাউড।'
'স্কাইওয়াক, এসক্যালেটার, গাঁজাখুরি, লাখ টাকা, কোটি টাকা, ভাগ্য ভালো পাতাল রেল করতে চাওনি; কিন্তু একমাত্র একটা হতভাগ্য বোনের জন্যে কিছু খরচে মহা আপত্তি!'
বড়মামা বললেন, 'মেজো, কী বলেছিলুম? আমাদের ঐশ্বর্যে, আমাদের প্রিয় বোনের ঈর্ষা। যারা কোটি, কোটি টাকা স্কাইওয়াকে খরচ করল, তারা একমাত্র প্রিয় বোনের কয়েক মাইল ভ্রমণে কয়েকশো টাকা খরচে কুণ্ঠিত হবে? অভিমানীর অভিমান হয়েছে। ওরে বোন! আমার মনের কথাটা শোন, তোকে ছাড়া আমরা এক মিনিটও থাকতে পারব না। শূন্য, শূন্য সব...'
গলা ধরে এসেছে। মুখ ফিরিয়ে টিস্যু পেপার দিয়ে চোখ মুছছেন। মেজমামা অবাক হয়ে বললেন, 'এই দাদা, তুমি কাঁদছ না কি? আশ্চর্য, আশ্চর্য এক মানুষ। একেবারে ছেলেমানুষ; এত বড় এক ডাক্তার, কিন্তু তার মনটা? বালক, অসহায় এক বালক। ওর মনে একটা দুঃখ আছে। সেটা কী? কেউ জানে না। জানবেও না কোনোদিন।'
বড়মামা জানলার ধারে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ছ'ফুট লম্বা সুন্দর এক মানুষ। এক মাথা এলোমেলো চুল। খাড়া একটা নাক। অবিকল আমার দাদুর মতো দেখতে। জানলার বাইরে বিশাল একটা মাঠ। হ্যালোজেনের আলোয় একা রাত জাগছে। দুটো কুকুর ছোটাছুটি করছে। মাসিমা এসে দাঁড়িয়েছেন। পিঠে হাত রেখে বললেন, 'কফি তো খেতে হবে। একটু শীত শীত করছে, তাই না?'
বড়মামা মাসিমার কাঁধে হাত রেখে চেয়ারে ফিরে এলেন। মাসিমা হাঁক পাড়লেন, 'সাবিত্রী, কফি।'
এই সাবিত্রীদি এক অসাধারণ মহিলা। মাসিমা তাঁকে উদ্ধার করে এনেছেন। তাঁর মহিলা সমিতির কত কাজ। হাতের কাজ, জ্যাম, জেলি, আচার, বড়ি তৈরি, উলের পোশাক তৈরি, সুতির পোশাক তৈরি। বড়মামার ডাক্তারি ক্যাম্প। বিরাট ব্যাপার। সাবিত্রীদি ইনচার্জ। এই বাড়িরও ইনচার্জ। মাসিমার ডান হাত। মেয়েদের রূপের কথা বলতে নেই। ভগবান পাপ দেন। আমার ইচ্ছে করে, সাবিত্রীদি যদি সত্যি সত্যি আমার দিদি হত। মুখটা ধারালো। সরু-উঁচু নাক। নাকের পাশ দুটো একটু টেপা। যখন যেদিকে তাকান দুটো ভুরুর মাঝখানে পূর্ণচ্ছেদের মতো ভাঁজ পড়ে। চোখের দৃষ্টি সরু, তীক্ষ্ন, উজ্জ্বল। বেশ লম্বা, ছিপছিপে গড়ন। সব সময় নিট অ্যান্ড ক্লিন। হালকা নীল রঙ দিদির পছন্দের। ভেরি সুইফট। কাজকর্ম ভীষণ গুছানো। কোনো কিছু এলোমেলো দেখলে ইশ ইশ শব্দ করেন। সঙ্গে সঙ্গে ঠিকঠাক করতে লেগে যান। চলা ফেরার পথে দরজার পাপোশ একটু বেঁকে গেলে বলবেন, ওটাকেও রেসপেকট করতে শেখো। হিন্দি, ইংরিজি, বাংলা—তিনটে ভাষাই জানেন; কিন্তু কেউ জানে না, সাবিত্রীদির মা, বাবা কে? মাসিমা আর দিদি একই ঘরে। এপাশে, ওপাশে খাট। ঘরটা কি সাজানো! বাপরে! ঢুকতে ভয় করে। এমনিই তো মেয়েদের ঘরে ছেলেদের না ঢোকাই ভালো। উচিত নয়। নিজস্ব ঘর মানে গোপনীয়তা, প্রাইভেসি। মাসিমা ডাকলে তবেই তাঁর ঘরে যাই, কখনো-কখনো মাধবীদিও থাকে, কোনো কাজে। কাজ ছাড়া তাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখিনি। হয় জামাকাপড় ভাঁজ করছে, না হয় বই-পত্তর গুছোচ্ছে, ধুলো ঝাড়ছে, খাতায় হিসেব লিখছে। দিদিকে ভীষণ ভালো লাগে, সে কথাটা কারোকে বলতে পারি না।
দুই
রাত হয়েছে অনেক। গভীর রাত। মেজমামাকে প্রচুর লেখাপড়া করতে হয়। নামি কলেজের অধ্যাপক। বিদেশের কোন কলেজে পর পর তিনটে লেকচার দিতে যাবেন। মাসিমার পাশের ঘরটাই তাঁর ঘর। বেশ বড় দুটো টেবিল। একটা বড়, একটা ছোট। ছোটটায় একটা কমণ্ডলু রয়েছে। সাধু-সন্ন্যাসী হওয়ার চানস নেই। সকালে মামা-পান করেন। স্বামী রামানন্দের সাতদিনের 'যোগা ক্লাস' করে এসেছেন। ভুঁড়িটাকে সামহাও বাগে রাখতে হবে, যেন একটা দেহ ছাড়া অবাধ্য 'মেম্বার'। ফুলছে তো ফুলছেই। স্বামী কৃষ্ণনন্দ ভাঙা ভাঙা বাংলা বলেন। ইংরেজি, বাংলা, হিন্দির মিশ্রণে বেশ মজার একটা ভাষা। লুক, প্রফেসার, যোগা ইজ এ মাস্ট ভুঁড়ি। সামালনে হোগা, আন্ডারস্ট্যান্ড! কোতো বোড়ো কোরবেন? জয় ঢাক? ফ্যাট মিনস সুগার, সুগার মিনস যোতো রোকোমের ব্যাধি। স্টে ইয়াং ফর এভার ফর এভার। কি কোরে তা হোবে? অ্যানসার—ইয়োগা। জাস্ট হাফ অ্যান হাওয়ার। থার্টি মিনিটস।
নাসাপান হল, ওই কমণ্ডলু দিয়ে নাকের ফুটোয় ঘোঁত ঘোঁত করে জল ঢালা, সেই জল গলা দিয়ে বেরোবে। খেয়ে ফেলাও যায়। এক কমণ্ডলু জল পান করা। শরীর শীতল, নো নাক বোজা, নো মাথা ধরা। খুব সুন্দর 'হ্যান্ডি' কমণ্ডলুটা সাবিত্রীদি মেজমামাকে এনে দিয়েছেন। জন্মদিনের উপহার। মেজমামার জন্মদিন বছরে দুবার হয়, অফিসিয়াল, আন-অফিসিয়াল। বড়মামা বলেন, 'একবার জন্মেই অস্থির কাণ্ড, এই ছাগলটা দুবার জন্মেছে।'
তিনতলাটা বড়মামার আর আমার। খোলা একটা ছাত আছে। অনেক দূর দূর দেখা যায়। শেষ সীমানায় বিরাট একটা নিমগাছ। নিমের বাতাস স্বাস্থ্যকর। ভূতেরও প্রিয়। বড়মামার মতে, মাঝেমধ্যে ভূত দেখা ভালো। ভালো ভূত মানুষের খুব উপকার করে। ভালো ভূতের শরীরে থাকে আতরের গন্ধ। ভূতের সেভাবে কোনো শরীর থাকে না। ঝাপসা, ঝাপসা একটা ব্যাপার। কুয়াশার মতো। শরীরটা ঠিক মতো বসেনি। দই না বসলে যেমন হয়, অনেকটা সেই রকম। একটা ভূতকে সাহস করে জাপটে ধরলে, দেখা যাবে কিছুই ধরিনি, নিজেকেই ধরে আছি। বড়মামা বলছিলেন, 'আমি স্বপ্নে একবার একটা চোর ধরে খুব চেল্লাচ্ছি—ধরেছি। সবাই ধড়মড় করে উঠে বসে দেখলে, আমি নিজের বুকটাকে জাপটে ধরে ঘুমের ঘোরে গাঁক গাঁক করে চিৎকার করছি। তবে একটা কথা খেয়াল রেখো, ভূত আছে, দে আর ভেরি মাচ দেয়ার। আমার এক পেশেন্ট মৃত্যুর পর আমার চেম্বারে এসে বলেছিলেন, ''ডাক্তার, আমি চলে যাচ্ছি। ওই যে আমার শরীরটা যাচ্ছে। অনেক ধন্যবাদ!'' ঠিক সেই সময় সামনের রাস্তায় শবযাত্রা—বলো হরি, বলো হরি। হরেনবাবুর কেসটায় কী হল, হরেনবাবুকে লাস্ট দেখতে গেলুম, গিয়ে দেখি হরেনবাবুর মাথার কাছে হরেনবাবু দাঁড়িয়ে। এক দৃষ্টিতে নিজের দেহের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ভ্যানিশ। বসে বসে ডেথ সার্টিফিকেট লিখলুম। কেউ বিশ্বাস করবে, কেউ করবে না। সো হোয়াট! আমার অভিজ্ঞতা, আমার কাছেই থাক। শোন, একটু পাগলাটে থাকা কিন্তু ভালো। ওটা একটা ঢালের মতো। লোকের গালমন্দ তেমন গায়ে লাগে না, হড়কে চলে যায়। নিজের ভেতরটা বেশ সাফা থাকে। বুঝলে ভাগনে, কোথাও কিছু নেই। কারো কাছে কিছু নেই। সব আছে নিজের কাছে।'
বড়মামা একটা দূরবীন কিনেছেন। তারাগুলো বেশ বড় বড় গোটা গোটা দেখায়। চাঁদের পাহাড় স্পষ্ট হয়। আমার বড়মামা সত্যিই ছেলেমানুষ। তিনি মনে করেন, রাতের বেলা আকাশ পথে অনেক কিছু ঘুরে বেড়ায়—যেমন পরী, স্বর্গলোকের অপ্সরা, মহাভারতের ঋষিরা। অচেনা, অদ্ভুত পাখি। শ্রীকৃষ্ণের রথ। আমরা ছাতে এসেছি। বড়মামা স্ট্যান্ডে টেলিস্কোপটা লাগিয়ে উত্তরের আকাশটা দেখছেন। ধ্রুবতারার কাছে কিছু একটা খুঁজছেন। হঠাৎ ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বললেন, 'দ্যাখ, দ্যাখ।'
আইপিসে চোখ রাখলুম। আশ্চর্য ব্যাপার, বহু দূরে একটা চাদর উড়ে যাচ্ছে। ধীরে, পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে। বড়মামা বললেন, 'নোটিস।'
'কিসের নোটিস?'
'বাড়ি ছাড়ার নোটিস।'
'তার মানে?'
'ওটা একটা শবাচ্ছাদনী। শবের শরীরে যে-চাদরে ঢাকা থাকে, সেই চাদর। আমাকে জানাতে চাইছে, ডাক্তার তোমার দিন শেষ। পূব থেকে পশ্চিমে যাচ্ছে। উদয় থেকে অস্তে। সূর্য কোনদিকে অস্ত যায়? পশ্চিমে। অনেক গুলতানি করেছ তুমি, এইবার বাড়ি চলো। অস্ত সূর্যের দেশে। তোমার মা কতদিন হয়ে গেল অপেক্ষা করছেন। তুমি তাঁর প্রথম সন্তান, তোমার বাবা তখন বিদেশে ছিলেন। মা লিখেছিলেন, ''আমার কোলে একটি গোপাল এসেছে।'' মার কাছে যাব আমি, মার কাছে যাব।'
'আপনার স্কাই ওয়াক?'
'স্কাই ওয়াক-ই তো! আকাশ পথে এক খণ্ড কাপড় উড়তে উড়তে চলে যাবে। আগে যাব মায়ের কাছে। মা বলবে, যাও কত্তার সঙ্গে দেখা করে এসো। ও তো রোজ দূরবীন দিয়ে তোমাদের দেখে। বলে, সব ঠিকই আছে। তোমার ছেলে দুটো আর মেয়েটা ঠিক তোমার মতোই হয়েছে।'
মেজমামা পণ্ডিত রামশঙ্করের কাছে বেহালা শিখছেন। বেহালার চেয়ে তাঁর প্রিয় হলেন বিশ্ববিখ্যাত বেহালাবাদক—ইহুদি মেন হুউন। বেহালা যেমনই বাজুক, মেজমামা কাঁধে ঠেকিয়ে বেহালা ধরার স্টাইলটা রপ্ত করে ফেলেছেন। বেহালার সঙ্গে কথা বলেন, বাজো, বাজো করুণ সুরে। ঘুরতে ফিরতে এই কথাটাই শোনান, আরে ভাই রিটায়ার করার পর কাকে নিয়ে থাকবে? এই যে, বুকের কাছে কান্না বাজে। মেজমামার একটা টিম হয়েছে। বড়মামা বলেন, 'সবক'টা পাগল।' টিমে আছেন, মাসিমা, সাবিত্রীদি আর আমাদের ম্যানেজার কাম সব কিছু নিরঞ্জনকাকু। এই কাকুটা ডেনজারাস পাগল। কখন যে কী করে বসবে কেউ জানে না। একটা ভয়ংকর ইচ্ছা, মাঝরাতে ময়দানে গিয়ে মনুমেন্টে উঠবে। একটা লণ্ঠন থাকবে হাতে, এদিকে-ওদিকে দোলাবে। বাগানে যে বড় আমগাছটা আছে তার দুটো ডালের মাঝখানে বড়মামাকে একটা ঘর বানিয়ে দেবেন। মই দিয়ে উঠতে হবে। ওই ঘরে বসে বড়মামা পাকা-পাকা আম পছন্দ মতো পেড়ে পেড়ে খাবেন।
মেজমামার টিম ছাতে এসে গেছে। তারা ভরা আকাশের তলায় বেহালা-বাদন হবে। আমি মাসিমার কানে কানে বড়মামার টেলিস্কোপে যে 'নোটিস' এসেছে, সেটা বলে দিলুম। মাসিমা মেজমামাকে বললেন, 'মেজো দেখ তো, ভোলেবাবার টেলিস্কোপে পরলোকের নোটিস ঝুলছে, সাদা একটা থান কাপড়। দুলছে, যেন বলছে, পাগলা ভোলা চলে আয়।'
মেজমামা সাবিত্রীদির হাতে বেহালা আর ছড়িটা দিতে দিতে বললেন, 'বাবা! টেলিস্কোপ কবে থেকে পরলোকের ডাক বিভাগ হল?'
মেজমামা আইপিসে চোখ রেখে বললেন, 'আরে এখানে আকাশ কোথায়? ও তো ফোকাস করেছে দূরে বসাকবাড়ির পাঁচতলার ছাতে। দড়িতে একটা ধুতি ঝুলছে। জোর বাতাসে পত পত করে উড়ছে।'
মাসিমা বললেন, 'সাবিত্রী, মাল কনফিসকেট কর। ওটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে আমার আলমারিতে ডবল লক। ওর চেলাটা ডেনজারাস। উদ্ধার করে আনবে। বেড়ালের মতো নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায়।'
আমার খুব মনে লাগল। বললুম, 'মাসিমা আপনি আমাকে এত বড় অপবাদ দিলেন? আমি বড়মামার চেলা? আমি তো আপনার ডান হাত।'
সাবিত্রীদি বললে, 'আমি ডান হাত। তুমি বাঁ-হাত হতে পার, তাও যদি অ্যালাও করে।'
বড়মামা বললেন, 'যাঃ বাবা, আমরা দুটো ভাই কি বানের জলে ভেসে এসেছি!'
মেজমামা মাঠটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বেশ উত্তেজিতভাবে বললেন, 'চুপ, চুপ। সামথিং ফিশি। দুটো ছেলে একটা বস্তা নিয়ে মাঠের অন্ধকার দিকটার, ঝোপঝাড়ের দিকে যাচ্ছে। মে বি এ ডেড বডি। টেলিস্কোপ, টেলিস্কোপ।'
মেজমামা দূরবীনটা ঘুরিয়ে চোখ রাখলেন। বড়মামা বললেন, 'রিলে রিলে।'
মেজমামা, 'দুজনে এগোচ্ছে। হাফ প্যান্ট, টি-শার্ট। মিডিয়াম বিল্ট। বস্তার ভেতরটা নড়ছে, তার মানে ভিকটিম বেঁচে আছে। ঝোপের সামনে বস্তাটা রেখে খুলছে, ওয়ান-টু, একে একে বেরোচ্ছে...।'
'কী বেরোচ্ছে? মানুষ?'
'বেড়াল-বেড়াল, ফাইভ-সিক্স। মোট ছ'টা। সারা মাঠে ছুটছে, দুটো কুকুর তাড়া করেছে। দারুণ-দারুণ!'
সাবিত্রীদি বলল, 'একটা বেড়ালও যদি মরে, আমি ওদের আস্ত রাখব না।'
'তুই চিনবি কী করে?' মাসিমা বললেন।
'ওর মধ্যে একটার নাম মান্তু। ওর কাজই হল বেড়াল ছাড়া। 'পার' বেড়াল ফাইভ রুপিস। আমার কাছে সব খবর আসে। আমার নাম সাবিত্রী।'
বড়মামা বললেন, 'আই সাজেস্ট, বেড়ালগুলোকে রেসক্যু করে ওদের জায়গায় পৌঁছে দেওয়াই হবে আমাদের কাজ; অ্যাজ দ্যাট ইজ মানবতা।'
সাবিত্রীদি বললে, 'ওরা নিজেরাই নিজেদের জায়গায় ফিরে যাবে। মান্তু একই বেড়াল দশ-বারোবার ছাড়ে। এইটাই ওর ব্যবসা। ওর মা আমাদের সমিতিতে কাজ করে। বলেছিল, ছেলেটা বহুত চালু।'
'তাহলে, এক রাউন্ড বেহালা হয়ে যাক। কান্নাকাটির সুর শুনলে ভালো হয়। ছাতে বসার জায়গা করা আছে। লম্বা-লম্বা কয়েকটা বেদি। বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়া যায়। খুব মন খারাপ হলে আমি তাই করি। সাবিত্রীদি আমার পাশে বসে আছে। আমার দুঃখটা কোথায়, তা বুঝতে পারে। কেন জানি না, আমায় খুব ভালোবাসে। জানে তো আমার মা নেই। বাবা বিদেশে। বলাগড়ে আমাদের বাড়িটা তালাবন্ধ পড়ে আছে। ভূতের বাড়ি হয়ে। আমার মায়ের ফট করে মারা যাওয়াটা খুব অন্যায় হয়েছে। তোকে আমি বিলেত পাঠাব, ডাক্তার করব। দেরাদুনে আমাদের একটা বাংলো হবে। আপেল বাগান। স্বপ্ন দিয়ে ঘুমটা কেড়ে নিলেন। ঘুম যদি না আসে মা, স্বপ্ন কোথা থেকে আসবে? মাসিমা ভালো, খুব ভালো, তবে মা তো নয়। আগে আমি খুব মা-মা করতুম, চোখে জল আসত। এখন সব ভেতরে। ধুর, কেউ কারুর জন্যে কিছু ভাবে না। যে যার সে তার। সারাটা দিন শুধু কাজ আর কাজ, আর হই-চই। সাবিত্রীদি আমার চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, তারপর একটু হেসে চলে যায়। কপালটা কী সুন্দর! কোঁকড়া চুলের দু-একটা পাক স্প্রিং-এর মতো দলছুট হয়ে ঝুলে থাকে প্রায় সব সময়। বাইরের কপালটা যার এত সুন্দর, তার ভেতরের কপালটা অমন কেন? ওই দুটো সুন্দর চোখে যেন একটা প্রশ্ন থাকে, তুই আমার কে? কে আমি? বছরে-বছরে আমি যতই বড় হচ্ছি, নিজেকে যেন কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। বড়মামা মাঝে মাঝে রসিকতা করে বলেন, 'ভাগনে মানে জানিস? যে, মামার সব কিছুর ভাগ নেয়। নরাণং মাতুলক্রমঃ। ভাগনেরা মামার মতো হয়—সেকেন্ড মামা, ফটো কপি। কোনোভাবে ভাগনের বয়েসটা বাড়িয়ে মামার বয়সি করে দেওয়া যায়, আর যদি তারা পাশাপাশি বসে থাকে, তাহলে মনে হবে, 'ডবল' মামা বসে আছে। ব্যাপারখানা বুঝতে পারছিস—কী ডেনজারাস! রুগির আত্মীয়-স্বজন, যখন পেটাতে আসবে তখন মামার বদলে ভাগনেকে পিটিয়ে যাবে। ডাক্তারমামার ভাগনে হলে যেমন বিপদ, সেই রকম ডাক্তার ভাগনের মামা হওয়াও মহা সমস্যার। আসলে মামা-ভাগনে সম্পর্কটাই গোলমেলে। কৃষ্ণের মামা কংস। শ্রীযুক্ত কংসর ভাগনে শ্রীকৃষ্ণ। ভেরি বিটার রিলেসান। কংস ক'টা কুস্তিগীর ফিট করেছে ভাগনেকে তালগোল পাকিয়ে দেওয়ার জন্যে। কংসবুড়ো লর্ড কৃষ্ণের পাওয়ার আন্ডার এস্টিমেট করে ফেলেছিল। ভগবান কৃষ্ণ মামাকে হেঁইসোমারি বলে তুলে ছুড়ে ফেলে দিলেন স্টেডিয়ামের বাইরে। মামা খতম। ব্যাপারটা তো ঘটে আছে। ভগবানদের মধ্যে যদি এই হয়, মানুষের মধ্যে কী হবে, হতে পারে একবার ভাব। অবশ্য আমাদের দুজনের সম্পর্ক 'ইউনিক'। তুলনাহীন। তুই আমার জন্যে আমি তোর জন্যে জীবন দিতে পারি। আমি যে পারি তার উদাহরণ আমি রাখতে পেরেছি। মনে পড়ে, মধুপুরে তোকে কুকুরে তাড়া করেছিল, তখন আমি কুকুরদের তাড়া করেছিলুম, কুকুর তোকে ছেড়ে আমাকে তাড়া করলে, তুই আবার কুকুরদের তাড়া করলি, শেষে কে কাকে তাড়া করছে, বুঝতে না পেরে কুকুরগুলো স্টেশানের দিকে চলে গেল। মনে আছে?'
না, আমার বড়মামা, শকুনি মামা নন। মহাভারতের মামাদের মধ্যে 'ডিফেকট' আছে। সবক'টা মামাই কেমন যেন। একমাত্র কৃষ্ণমামা একেবারে অন্যরকম। সে তিনি ভগবান ছিলেন। ভগবানের কথা সব সময় আলাদা। তাও তো অভিমন্যুকে বাঁচাতে পারলেন না। মেজমামা বেশ বাজাচ্ছেন। করুণ একটা সুর, টেনে, টেনে লম্বা করছেন। আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে ধূপের ধোঁয়ার মতো। সাবিত্রীদি আমার মাথাটা বুকের কাছে চেপে ধরে আছে। বুকের কাছে একটা লকেট রয়েছে। শরীরে মশলার গন্ধ। সমিতিতে গুঁড়ো মশলা তৈরি হয়, ধনে, জিরে, এই সব। সেন্টের গন্ধের চেয়ে ভালো। আমার গালে টপ করে এক ফোঁটা জল পড়ল। সাবিত্রীদি কাঁদছে। আমার মুখটা খুব জোরে বুকের ওপর কিছুক্ষণ চেপে ধরে রইল। শরীরটা কাঁপছে ভেতরে ভেতরে। কী একটা হচ্ছে বুঝতে পারছি না। কী একটা কষ্ট! সাবিত্রীদি কানের কাছে মুখ এনে বলল, 'আমাকে দু-হাতে বেশ করে জড়িয়ে ধর তো, ভীষণ শীত করছে। জ্বরটা আবার বোধহয় আসছে।'
মেজমামা অসাধারণ বাজাচ্ছেন একটা সুর। আমাকে মাঝে মাঝে, মেজাজ ঠিক থাকলে রাগ-রাগিণী শেখাবার চেষ্টা করেন। মেজমামা বাজাচ্ছেন বাগেশ্রী। এই রাগে রবীন্দ্রনাথের গান 'যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে'। আমগাছের ওপরের ডালের পাতার আড়াল থেকে কে যেন বলে উঠল, ভারি গলায়, 'বেশ হচ্ছে, বেশ হচ্ছে।'
বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বেশ জোর গলায় বললেন, 'নিরঞ্জন, তুই আমাকে এই বুড়ো বয়েসে জেল খাটিয়ে ছাড়বি।'
নিরঞ্জনদা এক পাশে বসেছিল, বললে, 'আমি কী করেছি? আমি তো এইখানে বসে আছি।'
'তাহলে গাছে কে?'
ঠিক এই সময় নিমগাছের ডালে বসে থাকা একজোড়া প্যাঁচা হই-হই করে ডেকে উঠল। গঙ্গার ধারে থানা। একটা পেটা ঘড়ি আছে। পাহারাদার লোহা ঠুকে বাজাচ্ছে এক, দুই, তিন...। বারোটা বাজল। ভরা গঙ্গা, ভরা রাত। পেঁচা প্রহরে, প্রহরে ডাকে। হু-হু করে অদ্ভুত একটা শব্দ, ঠিক এই সময় উঠে আসে বহু দূর থেকে। ঠিক এই সময় আলোটালো দিয়ে সাজানো একটা স্টিমার দক্ষিণে, কলকাতার দিকে থেকে এসে উত্তরে বারাণসীর দিকে চলে যায়। ভেতরের মানুষদের কালো কালো দেখায়। উঠছে, বসছে, চলছে।
বড়মামা বললেন, 'দি গ্রেট ব্রহ্মদৈত্য। মেজো, তোর আজ সিদ্ধিলাভের রাত। হোলি ঘোস্ট তোকে আশীর্বাদ করলেন। আমাদের ঘোষাল জেঠু। মৃত্যুর মুহূর্তে আমি পাশে ছিলাম। আমাকে বললেন, 'যাচ্ছি, কিন্তু যাব না। তোমাদের আমগাছে থাকব, বড় নাতনিটার যদ্দিন না বিয়ে হচ্ছে তদ্দিন। তোমাদের বাড়িটাও আগলাব।
মাসিমা বললেন, 'এত বড় একটা ব্যাপার এই বাড়িতে রয়েছে, তুমি তো আগে আমাদের বলোনি!'
'আমি বিশ্বাস করিনি। ডাক্তার, বিজ্ঞানের ছাত্র, কত মৃত্যু দেখলুম, কত জীবন, ভূত, প্রেত-ব্রহ্মদৈত্য, এসব আমার মাথায় আসে না। আজ প্রমাণ পেলুম। তবে এখনো আমার সন্দেহ আছে। এটা আমাদের মহান, মহৎ নিরঞ্জনকুমারের কারসাজি হতে পারে।'
'ও তো আমাদের মধ্যেই রয়েছে, আমগাছে গেল কখন!'
'ও যাবে কেন, ওর গলা যাবে। ওর গুণের শেষ আছে? একটা সার্কাসের দলে বেশ কিছুকাল ছিল। হরবোলা, পাখির ডাক নকল করত, আর ভেনট্রিলোকুইজম, দূর থেকে কথা বলা, বসে আছে এখানে, কথা আসছে আকাশ থেকে, দৈববাণী। কি নিরঞ্জন, ঠিক কি না?'
নিরঞ্জনকাকু বললেন, 'বড়দা, কথাটা ঠিক, তবে আজকের ব্যাপারটা অন্য, আমাদের কেরামতি নয়। রাত্তিরবেলা আমগাছের ডালে বসে আমি আম খেয়েছি, লিচু খেয়েছি, মিথ্যে কথা বলব না, নিজে ভূত সেজেছি; আজকের এই ঘটনার পর আমি আর রাত্তিরবেলা গাছে চড়ব না। ওই গাছটিকে আমি কাল থেকে পুজো করব। ব্রহ্মদৈত্যরা দেবতার মতোই। ভীষণ উপকারী। দক্ষিণেশ্বরে রানিমার কালীবাড়িতে একজন ছিলেন। পঞ্চবটীতে। ঠাকুরকে, ঠাকুরের গুরু তোতাপুরীকে দর্শন দিয়েছিলেন। কোম্পানির সঙ্গে যখন পঞ্চবটীর দখলদারি নিয়ে মামলা চলছিল, সেই মামলা জিতিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের বাড়ির সৌভাগ্য যে, এই বাড়িতে একজন আছেন। আর আমাদের ভাবনা নাই।'
মাসিমা বললেন, 'কাল আমি মায়ের মন্দিরে পুজো দোবো।'
সাবিত্রীদি বললেন, 'কেঁপে জ্বর এল। ছেলেকে বললুম আমাকে জাপটে ধরে থাক। মনে হয় ডেঙ্গু।'
বড়মামা বললেন, 'একালের এই এক সমস্যা, সবাই ডাক্তার। একটা ক্যালপল খেয়ে ঘুম লাগাও।'
মেজমামা বললেন, 'একটা মশা আমার নাকে ঢোকার চেষ্টা করছিল।'
বড়মামা বললেন, 'ওটা নস্যি মশা, লেটেস্ট ভ্যারাইটি।'
বড়মামা ঘরে এসেই বললেন, 'রোজ ডায়েরি লেখা হচ্ছে?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ।'
'নো আজ্ঞে! ''আজ্ঞে আজ্ঞে'' শুনলে আমার গা জ্বলে যায়। তুই হাবিলদার?'
'নো স্যার।'
'ইয়েস, দ্যাটস রাইট, চলবে। আজকের ডেটটা স্টার মার্ক দিয়ে রাখবে। ব্রহ্মদৈত্যের প্রসঙ্গ আন্ডার লাইন। মার্জিনে লিখবে, নিডস ইনভেস্টিগেশন। আমি এখনি একবার আমতলায় যাবো। ইনভেস্টিগেশান।'
'সাপ আছে।'
'আই ডোন্ট কেয়ার।'
'মাসিমাকে বলে দোবো।'
'আই ডোন্ট কেয়ার।'
'এ-কথাটাও মাসিমাকে বলে দোবো।'
'যা, বলগে যা। অমন একজন স্নেহময়ী, মমতাময়ী, শ্রীময়ী, ধীময়ী রমণীকে তোরা জুজুর মতো করে তুলেছিস! ওই আসছে, বাঘ আসছে, ভাল্লুক আসছে, জটে বুড়ী আসছে। শি লাভস মি। আমাকে ''টার্জেনের'' মতো দুঃসাহসী, রবিনহুডের মতো জঙ্গলবাসী, মার্কোপোলোর মতো...'
কথা শেষ হল না, চটির শব্দ, মাসিমার চটি। বড়মামা বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, পাশবালিশ জড়িয়ে ধরে ফলস নাক ডাকতে শুরু করলেন। মাসিমা ঘরে ঢুকে বললেন, 'কে এই মাঝরাতে বকবক করছিল?'
বড়মামা বললেন, 'আমি না, ও, সেই কখন থেকে আমাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না, কেবল বলছে, মাসিমাকে বলে দোবো। কী বলবি তুই, কী বলবি? আমার মতো লক্ষ্মী, সোনার চাঁদ ছেলে ভূ-ভারতে আর দুটো আছে? আমি তোর মাসির মুখ উজ্জ্বল করে হ্যালোজেনের মতো জ্বলছি।'
'দাঁত ব্রাশ করেছ?'
'করেছি মনে হয়।'
'মনে হয়! ওষুধ খেয়েছ?'
'বারোটা বেজে গেছে।'
'মানে? কার বারোটা?'
'আমাদের সকলের। ক্যালেন্ডারে ডেট, ডে সব চেঞ্জ হয়ে গেছে। কাল ছিল পনের। কাল আর নেই, আজ ষোলো, গুড মরনিং মাই ডিয়ার সিস্টার, নিবেদিতা, হেলেন কেলার...'
'সাবিত্রী!'
'ইয়েস ম্যাম।'
'তুই এখানে কী করছিস?'
'এই যে ডাকবে, আর আমি সাড়া দোবো।'
'বেতটা আন তো, আগে পালের গোদা, পরে শুঁড়ির সাক্ষীটাকে পেটাব। রাত দুটোর সময় যেন ফূর্তির ফোয়ারা।'
সাবিত্রীদি বললে, 'এখন আর শাসন করলে কী হবে, আগে থেকেই সব বিগড়ে বসে আছে। সারা পাড়া ঘুমিয়ে পড়েছে। আর একটু পরেই পাখি ডাকবে।'
আমি এক ডোজ চাপিয়ে দিলুম, 'এখন বলছেন, আমতলায় যাবেন, ব্রহ্মদৈত্যের সঙ্গে দেখা করতে। অনেক সব জরুরি কথা আছে। ওখানে সাপখোপ থাকতে পারে। আমার কথা শুনছেন না।'
বড়মামা বললেন, 'ঘুমটা জাস্ট এসেছিল, সব চটকে দিলে।'
মাসিমা বললেন, 'জামা-কাপড় না পাল্টেই শুয়ে পড়েছ? আমি কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি?'
বড়মামা বললেন, 'সাবিত্রীর জন্যে ক্যালপল খুঁজছিলুম। বেচারার কেঁপে জ্বর এসেছে। সব ওষুধ আছে, কেবল ওইটাই...।'
মাসিমা টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ওই বড় পেটিটায়?'
বড়মামা হাঁউমাঁউ করে উঠলেন, 'না-না, ওতে সব অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টি...।'
মাসিমা খুলে ফেলেছেন, 'উরে বাপরে, সাবিত্রী দেখে যা, দেখে যা, বুড়ো খোকা আর ছোট খোকার কাজটা দেখে যা, মুঠো মুঠো চকোলেট।'
সাবিত্রীদি বললে, 'একটা দাওনা, মুখে ফেলে দেখি। দুপুরবেলা খেয়েছি, মাঝরাতে খাইনি কোনোদিন।'
'এটা আবার আর একটা। আমার বরাতে সব জোটে ভালো!'
'তুমি একবার ভেবে দেখো, রাত দুটোর সময় আমরা দুপুরের খাবার খেতে বসেছি—পুঁইশাক-চালতার অম্বল, পটল পোস্ত। কেমন লাগবে?'
মাসিমা বড়মামাকে নিয়ে পড়লেন, 'সুগার কত? সুগার? মুঠো মুঠো চকোলেট।'
'আমার চকোলেট খাওয়ার বয়েস আছে?'
'মিথ্যে কথা বললে কেন? অ্যান্টিবায়োটিক আছে।'
'ভয়ে। ভয় পেয়ে। বকুনির ভয়।'
'সাবিত্রী, শুনলি? কে বলবে, এত বড় একজন ডাক্তার! আমার সেই ছোট্ট, পিঠোপিঠি ভাইটা। মারামারি হত, ভাব হত। দুজনে মাঠে ফড়িং ধরার জন্যে দৌড়তুম। দুপুরবেলা চুরি করে আচার খাওয়া। বর্ষাকালে পিছল পথে আছাড় খাওয়া। মায়ের বকুনি। মা আমাকে বকলে ও মাকে বকত। শুধু-শুধু বড় হয়ে কী লাভ হল বল?'
সাবিত্রীদি বললে, 'তোমরা কি বড় হয়েছ? তোমাদের কাণ্ডকারখানা আমার কাছে অবাক লাগে। তোমরা এই রকমই থাকো। ভগবান তোমাদের সব দিয়েছেন, দিতে কিছু বাকি রাখেননি।'
মাসিমা বললেন, 'বড়বাবু, আমতলায় যাবার চেষ্টা করবে না।'
'কিন্তু ব্যাপারটা?'
'সে পরে দেখা যাবে। কাল মন্দিরে গিয়ে পুরোহিতমশাইকে জিগ্যেস করব।'
'কেউ যেন জানতে না পারেন। পাঁচ কান হলেই ঝামেলা।'
সাবিত্রীদি যাওয়ার সময় আমার হাতে জোরে একটা চাপ দিয়ে বললে, 'একা শুতে ভয় করবে?'
আমি কিছু না বলে তাকিয়ে রইলুম। আমগাছ, বাগান, বড়মামার জানলার দিকে। আমার দিকে রাস্তা আর ওই বিরাট মাঠটা, তারপর ঝিল। ভোরবেলা মাছ ধরা হয়, একটা নৌকো আছে। সত্যব্রতবাবুর মর্নিংওয়াক সঙ্গে মেঘনাদবাবু।
বড়মামা বললেন, 'উঃ আজ একটা হল বটে, ডে অফ অল ডেজ। শোন, ধপাস করে শুয়ে পড়বি না। একটা জবরদস্ত প্ল্যান মাথায় এসেছে। একটা অ্যাডভেঞ্চার। একটু পরে তোকে পা টিপে টিপে মাসির ঘরে ঢুকতে হবে, ঠিক যে-ভাবে চোররা ঢোকে। তুই চুরি করতে নয়, একটা জিনিস মাসির টেবিলে রাখতে ঢুকবি।'
'সে আবার কি? ডেকে, মাসিমার হাতে দিলেই তো হয়।'
'আজ্ঞে না, হয় না। সান্টাক্লজের উপহার!'
'সে তো শীতকালে?'
'এ গ্রীষ্মকালের সান্টা। সান্টা পরিযায়ী পাখির মতো। নিজের দেশে খুব শীত পড়লে গ্রীষ্মের দেশে পালিয়ে আসে। আজ রাতে আমাদের বাগানে এসেছে। শুনতে পাচ্ছিস না? দূরে দূরে কত কুকুর ডাকছে। এই গভীর রাত—সান্টার স্লেজ গাড়িটা মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাঘা বাঘা ছ'টা কুকুর মাঠে ছোটাছুটি করছে। গ্রীষ্মের দেশে সান্টা এসেছে, পাঞ্জাবি-পাজামা পরে। অবিকল আমার মতো দেখতে।'
'সান্টা বেঁটে-মোটা। আপনি লম্বা।'
'গরমে লম্বা হয়ে গেছে; আবার শীতের দেশে গেলে কুঁকড়ে ছোট হয়ে যাবে। এ সব বাজে কথা ছাড়। কাজের কথাটা শোন—তোর মেজমামার ঘরের ভেতরের দরজা দিয়ে ওদের ঘরে ঢোকা যায়। ওদের সামনের দরজাটা বন্ধ থাকবে। মেজ এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। তুই প্রথমে নাক ডাকাটা শুনে নিবি। ও মহা ভীতু। ঘরে নীল একটা বেডল্যাম্প জ্বলে। তুই পা টিপে টিপে ঢুকবি, একদম পাক্কা চোরের মতো, আসলে তুই দাতা। ওই চকোলেটের পেটিটা। আমি লিখে দিচ্ছি—From Summer Santa Clause. দরজাটা আস্তে আস্তে ফাঁক করবি, দেখে নিবি কে কী অবস্থায় আছে। প্রয়োজনে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকবি। জোরে জোরে শ্বাস নিবি না। ভ্যাঁচ করে হেঁচে ফেলবি না, খুক করে কাশবি না, কোনো কিছুতে হোঁচট খাবি না—গ্রেট অ্যাডভেঞ্চার! আমি দূরে দূরে থাকব। কোনো ভয় নেই। আমি যার সহায় তার আবার কিসের ভয়!'
'ভীষণ ভয় করছে। এ আমি পারব না।'
'পারিব না এ কথাটি বলিও না আর, কেন পারিবে না তাহা ভাবো শতবার। চল, চল, নওজোয়ান, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল, চল রে, চল রে চল।'
'বড়মামা, আমার যে বাথরুম পাচ্ছে।'
'ও নার্ভাস ডায়েরিয়া। পাকা চোরদেরই হয়, ''পটি'' করে ফেলে দোর গোড়ায়, তুই তো নভিস। মনে সাহস আন। দরজাটা খুলবি, বেড়ালের মতো ঢুকবি, বাক্সটা রাখবি, চলে আসবি। ''অপারেশান চকোলেট'', ডান।'
তিনতলা থেকে দোতলায় নামা হল। চওড়া বারান্দা। বাইরের আলোয় ঝলমল করছে। এপাশে, ওপাশে বেতের মোড়া, হেলানো চেয়ার, সেন্টার টেবিল। বাইরে একটা ঝাউ গাছ। ছায়াটা দেয়ালে এসে পড়েছে। বাতাসে গাছটা দুলছে, ছায়াটা যেন কোনো জটাধারী, এদিকে-ওদিকে মাথা দোলাচ্ছে। সত্যি, সত্যিই আমরা চোরের মতো পা টিপে টিপে এগোচ্ছি। ডানদিকে দুটো ঘর। বড় বড় দুটো মেহগনি কাঠের দরজা। ঝকঝকে পালিশ। পেতলের বড় বড় দুটো আংটা, এক একটা দরজায়। মেজমামার দরজাটা ঠেলতেই খুলে গেল। খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন তিনি। বিশাল ভুঁড়ি। ভুঁড়ির ওপর একটা থ্যাবড়া বালিশ। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে উঠছে, নামছে। সিঁ, সিঁ করে একটা আওয়াজ হচ্ছে নাকে। প্রেশার কুকারের যেমন হয়।
ডান দিকের দেয়ালের দরজাটা দিয়ে মাসিমার ঘরে যাওয়া যায়। মেজমামার বেহালাটা বাঁ-পাশে একটা সোফার ওপর, ছড়িটা বুকে নিয়ে নিশ্চিন্ত আরামে নিদ্রিত। দেয়ালঘড়ির টক টক শব্দ। সময় বলছে—talk, talk। মাসিমার ঘরের দিকের দরজাটা টানতেই খুলে গেল। পাল্লাটা ঠাঁই করে মাথায় এসে লাগল। উঃ-বলতে গিয়েও বললুম না, ঘোঁৎ করে একটা শব্দ হল গলায়; যেন বোয়াল মাছ এক ঢোঁক জল খেল। খাটে মাসিমা শুয়ে আছেন ডানপাশ ফিরে। সাবিত্রীদি শুয়ে আছেন বাঁ-পাশে ফিরে। ছায়া, ছায়া অন্ধকার। কিছু স্পষ্ট, কিছু অস্পষ্ট। বাঁ-পাশে ওই তো টেবিল। প্যাকেটটা রাখব। সাবধানে এগোচ্ছি। ডানপাশে খাট। টেবিলের ওপর একটা কাচের গেলাস, সেটার মাথায় একটা স্টিলের ঢাকনা, ছোট্ট একটা ডিশ। প্যাকেটের একটা কোণ, অন্ধকারে ঠিক আন্দাজ করতে পারিনি, ডিশটাকে ছিটকে মেঝেতে ফেলে দিল। সেটা একই সঙ্গে নৃত্য এবং গীত পরিবেশন করতে করতে খাটের তলার গ্রিনরুমে চলে গেল। গেলাসটা উল্টেছে। গড়াচ্ছে, মেঝেতে পড়ল বলে। একটা পেপার ওয়েটে আটকে গেল। টেবিলটা জল থই থই।
সাবিত্রীদি ধড়মড় করে উঠে বসেই চিৎকার জুড়ে দিল, 'উরে বাবারে, ব্রহ্মদত্যির বাচ্চারে, ওই জানলা দিয়ে ঢুকেছে রে! হরে কৃষ্ণ হরে রাম, নিতাই গৌর রাধে-শ্যাম। উরে বাবারে বাচ্চা ব্রহ্মদত্যিরে!'
মাসিমা বেডস্যুইচ টিপে আলো জ্বেলেছেন। ঘুম চোখ। বলে চলেছেন, 'ওটা কে রে? ওটা কে রে?' তারপর বলছেন 'আরে এটা কে তো পিন্টুর মতো দেখতে!'
আমি চোর নই, তবু চোরের মতো ভয়ে কাঁপছি—'মাসিমা, আমি পিন্টু।'
'তুই এত রাতে এ ঘরে ঢুকলি কী করে?'
'মেজমামার ঘরের ভেতর দিয়ে।'
'মতলবটা কী?'
'এই যে সান্টাক্লজ চকোলেট পাঠিয়েছে।'
'গ্রীষ্মকালে সান্টাক্লজ?'
বড়মামা বললে, 'সামার সান্টাক্লজ শীতের ভয়ে এখানে পালিয়ে এসেছে, যেমন পাখিরা আসে।'
মেজমামা ওদিকে ধড়মড় করে উঠে বসে দুলে দুলে বলতে শুরু করেছেন, 'সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, মনে মনে বলি, আবার ধপাস করে একটু শুয়ে পড়ি। লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, নো নয়েজ, সাইলেনস, সাইলেনস। এইবার যে গোলমাল করবে তাকে ক্লাসের বাইরে বার করে দেব।'
মাসিমা বললেন, 'ওরে! তোর ঘর দিয়ে এই ঘরে এসে ঢুকেছে ব্রহ্মদৈত্যের বাচ্চা, বাচ্চা ব্রহ্মদৈত্য।'
'ইগনোর ইট, ইগনোর ইট, দিনের আলো ফুটলে অটোমেটিক বেরিয়ে যাবে।'
মাসিমার ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বড়মামার বলছেন, 'এনি থিঙ্গ রঙ্গ, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক? কনসাল্ট ডক্টর মুখার্জি, এম.বি.বি.এস., এফ.আর.এস., এম.আর.সি.পি.।'
বড়মামা সামনের বারান্দায় চেয়ারে বসেছেন। খুব সকালে তাঁকে দেখলে মনে হয় মহাভারতের কালের কোনো ঋষি। বললেন, 'অনেকদিন পরে আমরা উষা দেখছি—অপূর্ব সুন্দর! ওই ছোকরাটিকে এখানে আসতে বলো। ভোর হোলো দোর খোলো। উষার ইংরেজি 'ডন'। ব্যায়ামকারীদের ডন-বৈঠকের সময়। আমরাও বৈঠক করব, ওভার এ কাপ অফ দার্জিলিং-টি। আমার কিছু বলার আছে। ভাগনে ওই চকোলেটের পেটিকাটা আনো।'
মেজমামা ছোট, বড়, হরেকরকমের হাই তুলতে তুলতে এলেন, যেন নধর একটি বালিশ। পুডিং, পুডিং চেহারা। চেয়ারে বসে বললেন, 'আজ তুমি অনেকটা বেশি সময় পাবে বড়দা।'
বড়মামা ছোট্ট, ছোট্ট শব্দ করে হাসলেন, 'সময়? তা বটে। কার হাতে কতটা সময়। ঘড়িটা থামতে কতক্ষণ? চকোলেটের বাক্সটা হাতে নিয়ে আবেগ মেশানো গলায় বললেন, 'মনে পড়ে বোন! সেই ছেলেবেলার কথা! ভোরবেলা মিত্তিরদের বাগানে আমরা কনক চাঁপা ফুল তুলতে যেতুম। ছড়ানো বকুল, একটা, দুটো, তিনটে তুলে তুলে এক জায়গায় জমা করতুম, হলুদ ঠোঁট সেই দুটো রাজহাঁস। ছোট্ট পুকুরে পদ্ম আর শালুক। ইউক্যালিপটাসের পাতার গন্ধ, নিম-ফল, বট-ফল, নতুন-নতুন ঘাসের কচি সবুজ, সেই টিয়াপাখির ঝাঁক—আমরা তখন সবে বড় হচ্ছি, আর আজ বুড়ো হতে চলেছি। তোমরা শোনো, আমাদের এই বোনটির দুটি জিনিস খুব প্রিয় ছিল—আইসক্রিম আর চকোলেট। আমি থাবা মেরে খেয়ে নিতুম, ও ফ্যালফ্যালে মুখে, জলভরা চোখে তাকিয়ে থাকত। আমি অপরাধী? না, ভগবান আমাকে দিয়ে করিয়েছেন—জন্মেছি ডাক্তার, মরবে একজন ডাক্তার। ওর দাঁত, ওর স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্যে। ভগবান আমাকে দিয়ে এই কাজ করিয়েছেন। নিজের ক্ষতি হবে জেনেও ওর হিতের জন্যে আমি হামলা করেছি, খামচাখামচি করেছি। ও আমাকে কামড়ে দিয়েছে ''টেট ভ্যাক'' নিইনি। সেই বাল্যকাল থেকে আমি জন-সেবক, পরের কারণে স্বার্থ দিয়ে বলি—
এ জীবন, মন সকলি নাও। কিন্তু, আজ আমি প্রায়শ্চিত্ত করব। সেদিন যত চকোলেট আমি হরণ করেছি, সব আমি প্রত্যর্পণ করব এই প্রসন্ন প্রাতে সকলের সমক্ষে। এ আমার পূজা। কে কী চোখে আমার ভাগিনীকে দেখে, আমি জানি না, আমার চোখে সে দেবী, সুরেশ্বরী, ভগবতী।'
নিরঞ্জনকাকু ইজ নিরঞ্জনকাকু। চায়ের কেটলি, কাপ, সব নিয়ে আসছে। বড়মামা বললেন, 'তুমি শাঁখটা আনো বাজাতে হবে।'
মাসিমা বললেন, 'প্রথম দিকে মাথাটা ঠিকই ছিল, হঠাৎ খারাপ হতে শুরু করল।'
বড়মামা হাসলেন, 'আমি আবেগপ্রবণ, আমাকে কেউ বুঝতে পারেনি, পারবেও না। ঠিক আছে এই চকোলেটের পেটিটা আমি দেবীর হস্তে অর্পণ করলাম, তৃপ্ত হলাম; বিদেশি অতি স্বাদু, খাঁটি কোকো। হাততালি দেবার প্রয়োজন নেই। আপনারা বসুন।'
মেজমামা বললেন, 'পরীক্ষা প্রার্থনীয়'।
বড়মামা বললেন, 'মালিকের কাছে আবেদন করা যেতে পারে।'
মাসিমা বললেন, 'আজ চিলড্রেনস ডে, এ-সব বালক-বালিকাদের বিতরণ করা হবে আমাদের সমিতিতে, আর তুমি কিছু টাকা দেবে, ফিস্ট হবে। আর হ্যাঁ, আমিও তোমাকে অতীতের একটা জিনিস আজ ফেরত দোবো, একটু অপেক্ষা করো।'
মাসিমা ঘরে গেলেন, কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এলেন, একটা কিছু নিয়ে। বললেন, 'আগে চা, তারপরে এইটা। এটা ইতিহাস।'
কাপ-কেটলি সরে গেল। নিরঞ্জনকাকু টেবিলে কিছু টাটকা ফুল রেখে গেলেন। চাঁপা-গন্ধরাজ। ওই দূরে একটা মোড়ায় বসেছেন। অসাধারণ এক মানুষ। তাঁকে ছাড়া আমরা ভীষণ অসহায়। মাসিমা শুরু করলেন, 'ক্লাস টেন। বাবু কার পাল্লায় পড়ে ফুকু করতে শিখেছেন। কারো কথা শুনবে না। লুকিয়ে-লুকিয়ে চলছে। ছাতে-বাগানে। মা বললে, কী করা যায় বল তো। আমি তক্কে তক্কে ছিলুম, প্যাকেটটা সরিয়ে নিলুম। এই সেই প্যাকেট। তারপর? আমার গলা বুজে আসছে, মায়ের সেপটিক ফিভার চলছিল। মা সকালে বলেছিল, জানত না, বিকেলেই ডাক আসবে! যাবার আগে মা ওর হাত ধরে করুণ স্বরে বলেছিলেন, খাস না—আমাদের পরিবারে নেশা ঢোকেনি। আর আমাকে বললে, ''কেউ রইল না, দুটোকে দেখিস।'' এই সেই প্যাকেট। ভেতরে পাঁচটা সিগারেট। মা যেমন জীবনটাকে শেষ পর্যন্ত টানতে পারল না, প্যাকেট শেষ হল না, আমাদের বড়বাবুও প্যাকেটের পাঁচটা টেনে শেষ করতে পারেনি। মা চলে গেছে, এই সিগারেট পাঁচটা আজও রয়েছে। ধোঁয়া হয়ে যেতে পারত, ঠোঁট পায়নি। এই সেই প্যাকেট, আজ তোকে দিলাম। যত্ন করে রাখ।'
বড়মামা কাঁদছেন, হু-হু করে কাঁদছেন।
মেজমামা উঠে ওই পূর্বপ্রান্ত চলে গেছেন। মাঠের মাথার সূর্যদেব ঠেলেঠুলে নিজেকে অনেকটা তুলেছেন। এক ঝাঁক সাদা পায়রা আকাশের নীল সাগরে চান করছে। হিমালয়ের মেঘের ভেলা ঝাউ গাছের মাথায়। আগাম ঘোষণা—জগতের মা আসছেন।