শঙ্কর আমার বন্ধু। স্কুলের বন্ধু। সেই ক্লাস ফাইভ থেকে আমরা দুজনে সমান তালে বড় হয়ে চলেছি। ইঞ্চি, ইঞ্চি করে বড় হচ্ছি। একেবারে সমান, সমান মাপ। কাঁধে কাঁধ মিলে যাবে। মাথা দুটো নিয়ে সামান্য সমস্যা। ওর মাথাটা ডাবের মতো, আমারটা নারকোল। ও চিঁড়ে ভাজা খেতে ভালোবাসে, আমি বাসি চিঁড়ে ভিজে। সে কোনো ব্যাপার নয়। কেউ ভালোবাসে মিষ্টি, কেউ বাসে ঝাল। তাতে বন্ধুত্বের কোনো সমস্যা হয় না। একটা, দুটো ব্যাপারে তো আমাদের অসম্ভব মিল, যেন, 'একই বৃন্তে ফুটে আছি আমরা দুটি ফুল—বন্দে মাতরম'। 'বন্দে মাতরম'—বলার কারণ, এই লাইনটার সঙ্গে বলতে হয়। আমরা দুজনেই ভূত ভালোবাসি। ভয় তো করেই; কিন্তু ভয়টাকেই ভালোবাসি। বেশ জেনে-শুনেই সেইসব জায়গায় যাই, যেখানে ভূত থাকতে পারে। ভূত অনেকটা পাখির মতো। উড়ে, উড়ে, ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে ডালে এসে বসে। ভূতের তো আরো সুবিধে। মনে করলেই মনের মতো জায়গায় হাজির।
আসলে আমরা সেই ভূতের রাজাকে খুঁজছি, যে গুপী আর বাঘাকে দিয়েছিল, 'জবর-জবর-তিন বর'। একটু অন্যরকমের বর। রাজার জামাই হতে চাই না। আগে জখবদস্ত লেখাপড়া। সবকটা ডিগ্রি আমাদের চাই—ফার্স্ট ক্লাস। শঙ্কর বলছে, ম্যারিন ইঞ্জিনিয়ার হবে। প্রথমে জলের ওপরে, তারপরে জলের তলায়। কী জানি কেন, ওর সাবমেরিনটাই বেশি পছন্দ। ডুবে ডুবে চলে যাবে এক দেশ থেকে আর এক দেশে। হঠাৎ ভুস করে ভেসে উঠবে। কায়রো, আলেকজেন্ড্রিয়া। যে-সব রাজ্য জলের তলায় তলিয়ে আছে সেই সব দেখবে। সমুদ্রের তলায় কত ধনরাশি—সেই সব দেখবে। আমাকে না জানিয়ে ও সমুদ্র নিয়ে প্রচুর লেখাপড়া করেছে, আরো করবে। গুরু পেয়ে গেছে, আমাদের 'ছাত্রবন্ধু পাঠাগারের' গ্রন্থাগারিক ভবেশদাকে। যেখন লেখাপড়া, সেইরকম দুঃসাহসী। ইয়েতির খোঁজে তিব্বত যাবেন। সেদিনে বিকেলে শঙ্করদের বাড়িতে এসেছিলেন। শঙ্কররা বেশ 'রিচ ম্যান'; তবে 'রিচ' হলেও 'নীচ' নয়। সবাই বেশ খোলামেলা, হাসি, গল্প, গান। বাইরে কোনো শো নেই। ধবধবে চুলঅলা ধবধবে দাদু। দাদুর বাবা ছিলেন ইংরেজ আমলের 'রায়বাহাদুর'—খেতাব পেয়েছিলেন—'নান্যসর্দার'। তাঁর নামেই রাস্তার নাম। তিনখানা তিনতলা বাড়ি। গোপাল মন্দির। রথ আছে। আবার দুর্গাপুজো হয়। সন্ধিপুজোর শুরু হয় তোপ দেখে। ধাঁই করে শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকের বোল, যুদ্ধের বাজনা গিজতা গিজাং, গিজতা গিজাং। তোপ দাগার যন্ত্রটা দেখেছি, তিনতলার ছাতে। গান-মেটাল দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটা কামান। চাকা ফিট করা। বারুদ গেদে আগুন দিলেই বিকট শব্দ। কামানটা গড়গড়িয়ে পেছন দিকে চলে যাবে হাত দশেক। এই বাড়িতেও ভবেশদা ছোট একটা লাইব্রেরি তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁর পরামর্শে প্রত্যেক মাসে নতুন বই কেনা হয়। মোটা একটা রেজিস্টারে ক্যাটালগ—প্রত্যেকটা বইয়ের মলাটে নম্বর লাগানো গোল টিকিট। ভবেশটা আজে-বাজে কথা পছন্দ করেন না। কেবল বলতে থাকেন, কাজের কথা বল, কাজের কথা। প্রত্যেকের সময় ফুরিয়ে আসছে। আমরা সবাই এক-একটা প্রদীপ। এ-প্রদীপ শুধু জ্বলতে জানে, তেল ঢালতে পারে না। জ্বলতে, জ্বলতে একদিন দপ করে নিবে যাবে, তাই যতটা পারো, পড়ে যাও, জেনে যাও, শিখে যাও—এমন মানব-জনম আর পাবে না। মন যা চায় ত্বরায় কর এই ভবে। গঙ্গার ধারে ছোট্ট একটা দোতলা বাড়িতে একেবারে একা থাকেন। সেই বাড়ির ছাতে একতারা বাজিয়ে লালনের এই সব গান তিনি করেন। বাড়িটায় দুপাশে দুটো গাছ, পাকুড় আর নিম। গাছ দুটোর গা বেয়ে ছমছমে একটা অন্ধকার নীচের দিকে গড়িয়েছে। সেই জায়গাটায় ভবেশদা নানা রঙের নুড়ি বিছিয়ে রেখেছেন। শিল্পীমনের মানুষ। গঙ্গা থেকে মাঝে মাঝে সাপ উঠে আসে। একবার একটা ময়াল সাপ এসে তিন দিন ধরে এই জায়গাটায় বিশ্রাম নিয়েছিল। কতরকমের পাখি গাছের ডালে, ডালে। তাদের আলাপ-আলোচনার শেষ নেই। একটু বেশি রাতে একজোড়া প্যাঁচা এসে পাকুড়ের ডালে বসে, কর্কশ স্বরে রাতের অন্ধকারকে ধমক দেয়। ধারালো ছুরি দিয়ে অন্ধকার ফালা ফালা করে। নিমগাছের তলায় মা শীতলার একটি মূর্তি কারা রেখে গেছে; পুজোর পর মা শীতলাকে বিসর্জন দিতে নেই, গাছের তলায়, ঘাটের একপাশে ফেলে রাখতে হয়। পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় চরাচর যখন ভেসে যায় আলোর বানে, তখন মা শীতলাকে মনে হয় জীবন্ত। শঙ্কর আমাকে বলেছিল, দিনের বেলা যে সব বস্তু জড়, প্রাণহীন, রাত বারোটার পর সেই সব বস্তু জীবন্ত, যেমন—টেবিল, চেয়ার, মন্দিরের মূর্তি, ঘরে যেসব পুতুল ও ছবি থাকে।
শঙ্কর সমুদ্রপথে যাবে, আমি উড়ব আকাশে। বিমানচালক হব। পাইলট। ককপিটে বসে থাকব, পাইলটের পোশাকে। প্লেন ঢুকে যাবে মেঘের মধ্যে। নীচের পৃথিবীকে দেখা যাবে না। মেঘের ঘর, মেঘের প্রাসাদ, মেঘের সমুদ্র, ঢেউ। সূর্যটা নেমে আসবে নীচে। কোনোদিন রকেটে চড়ে পৌঁছে যাব চাঁদে।
ভাবেশদা বললেন, 'জানিস তো, পৃথিবীকে ''আর্থ'' না বলে ''ওশান'' বলাই উচিত ছিল। এর ৭০.৮ ভাগই হল জল। স্থল আর কতটুকু? তিরিশ ভাগেরও কম। সৌরজগতে এমন জলময় গ্রহ আর দ্বিতীয় নেই। জলের মতো এমন দ্রাবক জগতে আর দুটি নেই। জলে প্রায় সব কিছুই গুলে যায়, ডিজলভ মোর সাবস্ট্যান্সেস দ্যান এনি আদার লিকুইড নোন। বুঝলি কিছু!'
ইয়েস স্যর। শঙ্কর আসছে, 'ইংরিজি থোড়া থোড়া বুঝতা হ্যায়।'
'তোর হিন্দিটা সাংঘাতিক। চেষ্টা না করাই ভালো।'
'ভবেশদা, আমি তেইশটা ভাষা শিখব—ল্যাটিন, গ্রিক, হিস্পানি, অ্যারেবিক, টিবেটান। আমি সারমেরিনের ক্রু হব জলের তলা দিয়ে, তলা দিয়ে বিরাট একটা তিমি মাছের মতো পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। দুঃসাহসী শঙ্কর। আমার গায়ের রং হয়ে যাবে রুপোলি, চুলগুলো শরতের মেঘের মতো সাদা, চোখ দুটো নীলচে সবুজ—আই উইল বি আ গ্রেট নেভিগেটর।'
'বুঝবি, যখন ক্র্যাকেনের পাল্লায় পড়বি।'
'ক্র্যাকেন?'
ইয়েস সি! নরওয়ের সমুদ্রে তলে তলে চককর দিয়ে ফিরছে। ক্র্যাকেন, সে এক ভয়ংকর প্রাণী। দেড় মাইল জায়গা জুড়ে বিরাট একটা চাকার মতো প্রাণী। সেই চাকাটা থেকে বেরিয়ে এসেছে লম্বা লম্বা শুঁড়। ইলি-বিলি-কিলি-কিলি। এইগুলোই হল প্রাণীটার বাহু; মানে অক্টোপাসের বিশাল সংস্করণ। লোহার মতো শক্ত, করাতের মতো দাঁত কাটা। গোটা একটা জাহাজকে পাশ থেকে জাপটে ধরে মড় মড় করে ভেঙে দিতে পারে। একেবারে তালগোল। ১৭৫২ সালের একটি ঘটনা, এক বিশপ লিখে রেখে গেছেন। সমুদ্রের দেড় মাইল এলাকার জল হঠাৎ কালো হয়ে গেল—একেবারে কালির মতো ঝুল কালো। বিশাল একটা চাকার মতো প্রাণী, লম্বা, লম্বা, ইস্পাতের মতো অজস্র শুঁড়, জাহাজটার দিকে এগিয়ে আসছে। ওটা কী? ওটা কী? করতে করতেই জাহাজটাকে, যাত্রীসমেত সমুদ্রের গভীরে টেনে নিয়ে গেল। বিশপ ও আরো কয়েকজন যাত্রী সেই থকথকে কালো জলে, প্রভুর কৃপায় কোনোরকমে বেঁচে গেলেন। কালো একটা তরল ওই প্রাণীটার শরীর থেকে বেরোচ্ছিল। শ্রদ্ধেয় বিশপ জলজন্তুটার নাম রাখলেন, ''ক্র্যাকেন''।'
ভবেশদা বললেন, 'আজ থেকে তিন-চারশো বছর আগে মানুষ সমুদ্রের কতটাই বা জানত? স্থলচর প্রাণী মানুষ শত, শত বছর ধরে ধারণা পোষণ করত—পাথর আর মাটির উপাদানে তৈরি এই পৃথিবীর প্রায় সবটাই ডাঙা। জায়গায়, জায়গায় সামান্য পরিমাণ জল আছে। যেমন ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণসাগর (Black Sea)। অতলান্তিক সাগরের কথাও জানত, তবে ধারণাটা ছিল অদ্ভুত। একটা নদী, পৃথিবীটাকে গোল করে বেড় দিয়ে রেখেছে। জলের বর্ডার পাড়।
সেকালের জ্ঞান সেকালের মতো। পৃথিবীর চারপাশে সূর্য ঘুরছে। পৃথিবী একটা গোল চাকতি। তিনের চারভাগ জল জেনেছে অনেক পরে। জলই জীবন, জীবনই জল। জল থেকেই জীবন উঠে এসেছে স্থলে, ভাগ হয়েছে এইভাবে—জলচর, স্থলচর, উভচর, নভোচর। আর বড়, ছোট সমস্ত প্রাণী এক একটি কেমিকেল ফ্যাকট্রি। জীবন কাণ্ডে যে কত কাণ্ডই হয়। আমাদের শরীরের সত্তর ভাগই জল। জলময় এই পৃথিবী। বুঝলে ভায়া, প্রশান্ত মহাসাগর কতটা গভীর জানো কি? পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে একটা খাদ আছে, যাকে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বলেন, 'মারিয়ানা ট্রেঞ্চ' (Mariana Trench )। যার মধ্যে এভারেস্টকে ফেলে দিলে তলিয়ে যাবে। এভারেস্টের উচ্চতা উনত্রিশ হাজার আঠাশ ফুট, আর এই খন্দটার গভীরতা ছত্রিশ হাজার দুশো চার ফুট। তোর সাবমেরিনের ক্ষমতাই হবে না ওই ট্রেঞ্চটার মধ্যে ঢোকার।
সূর্যের আলো সমুদ্রের জলে প্রবেশ করে। ঢেউয়ের ফেনায় দুধ ঢেলে দেয়। জলস্তরকে দু-ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে পরীক্ষা করে দেখা গেছে হাজার ফুট গভীরেও আলো আছে, তারপরেই গভীর ঘন অন্ধকার। আলো কমতে কমতে শেষে চির-আঁধার, শুধু জল আর জল, তরল অন্ধকার। কালো জলে পড়ে আছে আঁধার জীবন। মানুষ কতটুকু জানে, জানতে পারবেই বা কতটুকু! চোখের দেখা না হলে, শুধু জেনে কি মন ভরবে? ডুবুরি-যান 'ট্রিয়েস্ট' (Trieste) হাজার ফুট পর্যন্ত নেমেছিল। মাত্র হাজার ফুট। পোর্টহোল দিয়ে যতটুকু দেখা যায় দেখেছিল অজানা সেই মায়া জগতের রূপ। কুবেরের ঐশ্বর্য ভাণ্ডার। বরুণদেবের রাজ্যপাট। এই দুঃসাহসী অভিযানে সাত মাইল গভীরে পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। ৫০০ ফুটের পরে স্তিমিত আলোর দেশ। সেখানে আছে—'সামুদ্রিক ঘাস'। সবুজ, এককোশী অদ্ভুত ধরনের সূক্ষ্ম, সূক্ষ্ম তৃণ। জলজ। এই ঘাস তৈরি করেছে চিনি আর শ্বেতসার। জীবনের প্রধান দুটি উপাদান—বিজ্ঞানীরা বলছেন—গ্রেট ফুড পিরামিড অফ দ্য ওশান। সমুদ্রের ওপরে ঢেউয়ের দোলায় দুলতে, দুলতে জাহাজে ভ্রমণ করলে কিছুই তেমন জানা যাবে না বন্ধু, গভীরেই আছে সৃষ্টির যত রহস্য। তলদেশ সদাচঞ্চল। ভূমিস্তর অনবরতই পিছলে পিছলে যাচ্ছে। পরস্পর সংঘর্ষ হচ্ছে। আগ্নেয়গিরি আছে। সাগরেও অগ্নি আছে। কত শত ক্ষুদ্র-বৃহৎ প্রাণী। বিশাল, বিশাল জলচর। ক্ষুদ্র, রঙিন মাছ। ঝিনুক, মুক্তো। সি-হর্স, সি-লায়ন, মারমেড, শংকর মাছ, নীল তিমি, হাঙর। কতরকমের ক্ষুদ্র কীট, তারার মতো, করাতের মতো। জলে আছে প্রাণের খেলা। যারা জল থেকে ডাঙায় উঠেছিল, তারাই ক্রমে মানুষ হল।'
গ্রন্থাগারিক ভবেশদা। তাঁর লেখাপড়ার শেষ নেই। জ্ঞানের সমুদ্র। শঙ্কর বললে, 'আমার ভেতরে আমি সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার শব্দ শুনতে পাই। স্বপ্ন দেখি, বেলাভূমিতে বিরাট ঢেউ আছড়ে পড়ে ফিরে গেল সমুদ্রে, ছড়িয়ে রেখে গেল মুঠো মুঠো মুক্তো। একঝাঁক শঙ্খচিল উড়ে যাচ্ছে সবুজ জল ছুঁয়ে নীল আকাশে। ফার্ডিনান্ড ম্যাগেলানের কাছে তাঁর অভিযানের গল্প শুনি। ক্যাপটেন কুক এসে বলেন, চল, আর একবার মেরু অভিযানে যাই।'
ভবেশদাকে খুব সুন্দর দেখতে। আমার মা বলেন, 'টুলটুলে মুখ, ঢুলঢুলে চোখ।' ঘুম আসার আগে মানুষের চোখ দুটো যে-রকম হয়ে যায়।
ফর্সা রং। কোঁকড়া চুল। আমার মনে হয় যেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু। ভবেশদা বললেন, 'সেই একটা সময়। চোদ্দোশো, পনেরোশো, ষোলোশো যে যেখানে জন্মেছে, সেই জায়গাটাই সে জানে, তার দেশের বাইরে, ওই দিগন্তছোঁয়া জলরাশির পারে, কিছু কি আছে? ওই দিকেই কি স্বর্গ? দেবতাদের বাস, অজানা মেঘলোক! দুঃসাহসী মানুষ, স্বপ্ন দেখা মানুষ আকাশকে জয় করার আগে, সমুদ্র জয় করে ফেলল। জাহাজ এল। কতরকমের জাহাজ। প্রথমে বাতাস চালিত। বড় পাল, মাঝারি পাল, ছোট ছোট পালের বাতাস ধরা আর ছাড়ার কেরামতি। আকাশের নক্ষত্র দিক বলে দেবে। একটা চোঙা দূরবীন। বিজ্ঞান তখন যতটা এগিয়েছে, ততটাই।
ম্যাগেলানের অভিযানের কথা ইতিহাস চিরকাল মনে রাখবে। প্রথম এক ইয়োরোপীয়। স্বপ্ন দেখেছিলেন, প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেবেন, দেখবেন ওপারে কী আছে, কারা আছে। নিজে পর্তুগিজ; কিন্তু পর্তুগালের রাজা তাঁকে কোনোরকম সাহায্য করলেন না। সাহায্য করলেন স্পেনের রাজা প্রথম চার্লস। পাঁচটি জাহাজের এক বহর নিয়ে অভিযান শুরু করলেন স্পেনের বারামেজ বন্দর থেকে, ১৫২০ সালের অক্টোবর মাসে। প্রথমে তিনি আবিষ্কার করলেন একটি প্রণালী; Strait, সমুদ্রের আর-একটি সমুদ্রের যোগাযোগের জলপথ। এই প্রণালীটি আজ তাঁরই নামে বিখ্যাত। প্রশান্ত মহাসাগরের নাম প্রশান্ত, তিনিই রেখেছিলেন। সাগরের সঙ্গে সাগর যুক্ত হয়ে আছে অজস্র প্রণালী সংযোগে। সাগর তৈরি করেছে উপসাগর। কোনো দেশ, মহাদেশ বিচ্ছিন্ন নয়। স্থলপথে, জলপথে, পর্বতের গিরিসংকট, মহাসাগর, সাগর, উপসাগর, নানাভাবে সাহসী মানুষের দুঃসাহসী অভিযানের জ্ঞানে পৃথিবী মধ্যযুগের সংকীর্ণ ধারণা থেকে বর্তমানে মুক্তি পেয়েছে। জলের ওপরে সৃষ্টিকর্তা ভাসিয়ে দিয়েছেন স্থলের 'নেকলেস', 'মুক্তোমালা'।
তোমাদের বলি, কলম্বাস, ম্যাগেলান, কুক—এঁরা আমার হিরো। জলের সমুদ্র নয়, জ্ঞানের সমুদ্রে এঁরা বেপরোয়া সাহসের জাহাজ ভাসিয়েছিলেন। ম্যাগেলানকে খুন করা হল, ১৫২০ সালের অক্টোবর মাসের কোনো এক তারিখে ম্যাকটান দ্বীপে। সম্ভবত সেই দ্বীপের মানুষরা এই আগন্তুকদের নিরাপদ ভাবেননি। ভেবেছিলেন লুণ্ঠনকারী। পাঁচটি জাহাজের মধ্যে চারটিই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল; ফিরতে পেয়েছিল মাত্র একটি জাহাজ, সেটির নাম ছিল, 'ভিকটোরিয়া'। এই পরিক্রমাই ছিল প্রথম 'বিশ্ব পরিক্রমা'—অবশ্যই জলপথে—ফার্স্ট 'Voyage' অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড। নায়ক কিন্তু ফিরলেন না। বিশ্ব পরিক্রমার স্বপ্ন নিয়ে যে-বন্দর পরিত্যাগ করেছিলেন মহা সমারোহে, সেই বন্দরে প্রত্যাবর্তন করল একটি মাত্র বিধ্বস্ত জাহাজ।
ক্যাপটেন কুকের কথাও ভাবি। সমুদ্র তাঁকেও ঘরছাড়া করেছিল। তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন ম্যাগেলানের অনেক পরে ১৭২৮ সালে। যখন তাঁর বয়েস মাত্র বারো, তখন থেকেই সমুদ্র। সমুদ্র ভীষণ মায়াবী। সাগরের টান। নীলের বুকে সবুজ ঢেউ, ফেনার হাসি, শিশুদের কলকণ্ঠ, খলখল, কলকল, নোনা-নোনা, ভিজে ভিজে গন্ধ। ম্যাগেলান ছিলেন পর্তুগিজ। কুক খাঁটি ইংরেজ। বারো বছর বয়সেই এক জাহাজ কোম্পানির খালাসি। যে বড় হবে, বিখ্যাত হবে, তাকে কে আটকাবে? ভাগ্য তো তার হাতের মুঠোয়। বত্রিশ বছর বয়সে ১৭৫৯ সালে তিনি 'মেট' থেকে 'মাস্টার' হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে নৌবাহিনীর জাহাজ 'মার্কারি'-র পোতাধ্যক্ষ নিযুক্ত হলেন। নিউফাউন্ডল্যান্ড ও ল্যাব্র্যাডর শহরটি সম্পর্কে দুটি 'পেপার' প্রকাশ করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। ১৭৬৯ সালে 'রয়্যাল সোসাইটি' তাঁকে একটি অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে তাহিতিতে পাঠান। ফেরার পথে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার তটভাগ পরিদর্শন করে, সংগ্রহ করলেন প্রচুর অজানা তথ্য। ১৭৭১ সালে উন্নীত হলেন কম্যান্ডারের পদে। এইবার তিনি অবতীর্ণ হবেন তাঁর বিখ্যাত কুমেরু অভিযানে। পদোন্নতি হয়েছে, কম্যান্ডার থেকে 'ক্যাপটেন'। জাহাজটির নাম 'Resolution'। ১৭৭৬ সাল থেকে ১৭৭৮ এই দু-বছর তাঁর নাবিক জীবনে তিনি অসাধ্য সাধন করবেন। নিউজিল্যান্ড থেকে কেপ হর্ন, পুনরাবিষ্কার করবেন 'স্যান্ডউইচ আইল্যান্ড'—যার নাম পরবর্তীকালে হবে 'হাওআই'। আমেরিকার উত্তর তটভাগ ছুঁয়ে বেরিং স্ট্রেট। এই স্যান্ডউইচ দ্বীপটি বিতর্কিত 'ফকল্যান্ডের' অন্তর্ভুক্ত। সাগরে এইরকম অনেক ছেঁড়াখোঁড়া ভূমির টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠীর অধিকারে। সশস্ত্র একটি দল কুক ও তাঁর সঙ্গীদের আক্রমণ করল। রক্তাক্ত যুদ্ধে ক্যাপটেন জেমস কুকের মৃত্যু হল—১৭৭৯ সালে। ঝোড়ো সমুদ্রে উত্তাল জলরাশির সঙ্গে জীবন-মরণ সংগ্রাম, ভাঙা মাস্তুল, ছেঁড়া পাল, মিশকালো অন্ধকার রাত, ঢেউয়ের মাথায় ফসফরাসের বাতি হাতে জলকন্যাদের নৃত্য, মুখোশধারী ঘাতকদের নিক্ষিপ্ত বিষাক্ত তির, নরখাদক ক্যানিবল, বেপরোয়া জলদস্যু, টাইফুন—জলই জীবন, জলই মৃত্যু।
এইবার আমার সমুদ্র-অভিজ্ঞতার কথা শোনো, তখন আমি বড় একটি কাগজে সাংবাদিক; আদেশ হল, কিছুদিনের জন্যে তোমাকে জলে যেতে হবে। আন্দামানের চিফ কমিশনার ভারতবর্ষের প্রথম সারির কয়েকটি সংবাদপত্রের প্রতিনিধিদের তিনি আহ্বান করেছেন—তাঁর নিজস্ব জাহাজে চড়ে আন্দামান সাগরে দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে ঘুরতে হবে, তারপর সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে হবে বেশ বড় আকারে। যাত্রা শুরু হবে পোর্টব্লেয়ার থেকে, শেষ হবে নিকোবরে। জাহাজই হবে আমাদের ভাসমান, চলমান ঘরবাড়ি। আনন্দে লাফিয়ে ওঠার মতো একটা ব্যাপার। পুরীর তটে বসে সাগরের লাফালাফি দেখেছি। জলকণায় চশমার কাচ থেকে থেকে ঝাপসা হয়েছে, জামা ভিজে ভিজে, চুল সাগরের নোনা বাতাসে চিটচিটে। এ একেবারে অন্য অভিজ্ঞতা হবে। ঢেউয়ের মাথায় দোল খাব। আন্দামানের চারপাশে বঙ্গোপসাগরের জল কালো। আন্দামানেই আছে সেই কুখ্যাত সেলুলার জেল। সেখানে বন্দি করে রাখা হত বিপ্লবীদের, বলা হত কালাপানির পারে চির নির্বাসন, অকথ্য অত্যাচার।
আন্দামান সম্পর্কে বলা হত, 'মাইটি ওশান, মাইটি গর্জন (গর্জন গাছ), মাইটি সি.সি (চিফ কমিশনার)। 'কমিশনারের জাহাজটি খুব একটা পেল্লায় নয়, ছিমছাম সুন্দর। অনেক বড় করে বলব না, তোদের ধৈর্য থাকবে না। আমি বলব, একটি ঝড়ের রাতের কথা। শরৎচন্দ্রের 'শ্রীকান্তে' পড়েছিস 'কাপ্তেন কইসে, সাইক্লোন হতি পারে।' সেই একই সমুদ্র বঙ্গোপসাগর; সেই একই সাইক্লোন। আমাদের জাহাজের কাপ্তেন যেন এক দেবদূত। ছ-ফুট লম্বা, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, টানা টানা চোখ। চোখে যেন সাগর লেগে আছে। কম কথা, মিষ্টি হাসি। সাগর মনে হয় মানুষকে এইরকমই শান্ত, গম্ভীর করে দেয়।
কাপ্তেনের সঙ্গে ভাবটা আমার একটু বেশিই হল; কারণ আমি হয়ে গেলুম তাঁর ছাত্র; আমাকে সমুদ্র শেখান, জল কেন কালো। মাঝে, মাঝে উড়ুক্কু মাছের ঝাঁক, লাফ মেরে জাহাজের ডেকে এসে পড়ছে ঠকাস ঠকাস শব্দে—এরা কেন এত চঞ্চল! এক এক রকমের প্রাণী এক এক এলাকায়! বোকার মতো এক একটা প্রশ্ন। তিনি কিন্তু স্মিত হেসে সব কিছু বোঝাবার চেষ্টা করতেন। একদিন বললেন, আজ বেলা তিনটের মধ্যে রাতের খাবার খেতে হবে। রাত আটটার সময় আমাদের জাহাজ টেন ডিগ্রি চ্যানেল ক্রস করবে—ওয়ার্স্ট চ্যানেল ইন সি। উত্তাল, বিক্ষুব্ধ সমুদ্র। জাহাজ দু-রকম দোলায় দুলবে। একই সঙ্গে 'রোলিং' আর 'পিচিং'। এপাশে-ওপাশে দুলবে। দুলবে সামনে, পেছনে। বাসনপত্র, গেলাস-প্লেট, টুকরো-টাকরা সমস্ত জিনিস ক্যাবিনেটে ঢুকিয়ে, কাপড় গুঁজে প্যাক করে রাখতে হবে, নইলে ভেঙে চুরমার। এই অবস্থায় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। বাংকে শুয়ে থাকতে হবে। তাও সাবধানে। জাহাজের নৃত্যে ছিটকে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা। আমাকে একটা সমুদ্রের ম্যাপ খুলে দেখালেন, 'এই দ্যাখো ডানকান প্যাসেজ। এই জলপথ দিয়ে পূর্বদিকে গেলে থাইল্যান্ড, আর পশ্চিমে গেলে মাদ্রাজ, আর সোজা দক্ষিণে সেই টেন ডিগ্রি চ্যানেল; এই দ্যাখো আরো দক্ষিণে নিকোবর।
ভরদুপুরে ডিনার শেষ করে, বসার কেবিনে সবাই বসে আছি গম্ভীর মুখে—কী জানি কী হয়! যেদিকে তাকাই শুধু জল আর জল, আর বিরাট আকাশ। দুটোই সীমাহীন। জাহাজের তো থামার উপায় নেই। জল কেটে চলেছে তো চলেছে। কোনো দিকে তীর নেই, ঘাট নেই। কী মুশকিল! চট করে নেমে শক্ত ডাঙায় এক চককর ঘুরে আসব, সে উপায় নেই। বসে বসে দোল খাচ্ছি।
কাপ্তেন সাহেব এসে ভারী একটা সুখবর দিলেন, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আসছে বিশাল ঝড়। তুফান আসছে, তুফান। ঝড়ের গতিবেগ দুশোর কাছাকাছি। আসছে পশ্চিমদিক থেকে। ভয়ের কিছু নেই। লাইফ জ্যাকেট আছে। জাহাজ ডুবে গেলেও আপনারা ভেসে থাকবেন। পশ্চিমদিক থেকে বড় একটা জাহাজ আসছে, যাচ্ছে থাইল্যান্ড।...
কাপ্তেনের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। আমাদের কাছাকাছি থাকবে। ওদের জাহাজে এখন নাচ-গান হচ্ছে। আমাদের জাহাজটাই নাচছে, আর আমাদের নাচাচ্ছে।
রাত আটটার কাছাকাছি সময়ে এল সেই তুফান! জাহাজটা যেন মোচার খোলা। মাঝে মাঝে পোর্টহোলগুলো চলে যাচ্ছে জলের তলায়। ডেকের ওপর দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে। বাতাসের কী ভয়ংকর গতি! চেন দিয়ে বাঁধা ডেক চেয়ারগুলো সমুদ্রে উড়ে যাওয়ার জন্যে ছটফট করছে।
সঙ্গীদের কয়েকজন এতটাই ভয় পেয়েছেন যে কথা বলতে পারছেন না। মিশকালো আকাশ। আকাশের অনেকটা জুড়ে ফালাফালা বিদ্যুতের রেখা। এতখানি আকাশ তো ডাঙায় দেখা যায় না। এখানে মাথার ওপর শুধুই আকাশ, আর নীচে শুধুই জল। মনে হচ্ছিল, মানুষের জন্যে ভগবানের কোনো ভাবনা নেই। পারলে আমাদের জাহাজটা উড়িয়ে নিয়ে যাবেন, কোথায় কোন অকূলে ঠিক-ঠিকানা নেই। ভগবানের কেন এত রাগ? হঠাৎ তীব্র একটা কান্নার শব্দ সমুদ্রের ওপর দিয়ে ছুটে চলে গেল, দূর থেকে দূরে; যেন কোনো নারী! অভিজ্ঞ একজন বললেন, 'বাতাস। হাউলিং উইন্ড!'
আর একজন বললেন, 'প্রেতের হাহাকার। এখন প্রার্থনা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। কী জীবন!
অসহায় আমরা এই মানুষ!'
একজন বললেন, 'কার কাছে প্রার্থনা?'
সেই মুহূর্তে জাহাজ এতটাই ঝটকা খেল যে আমাদের সব কথা বন্ধ হয়ে গেল। মুখে মুখে মৃত্যুর ছায়া। বাঁচার কোনো আশা আছে বলে মনে হল না।
হঠাৎ মনে হল, আমরা ভীষণ স্বার্থপর। নিজেদের কথাই ভাবছি, এতক্ষণ একবারও ভাবিনি, আমাদের কাপ্তেন কী করছেন, তাঁর কন্ট্রোল কেবিনে। কারোকে কিছু না বলে বেরিয়ে এলুম লোয়ার ডেকে। বাতাসের দাপটে মাথাটা শরীর থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবে মনে হল। বৃষ্টির ছাঁটে নিমেষে ভিজে গেলুম। লোয়ার ডেক থেকে আপার ডেকে ওঠার ঘোরানো লোহার সিঁড়ি। হামাগুড়ি দিয়ে উঠছি। যে-কোনো মুহূর্তে খড়কুটোর মতো উড়ে উজান সমুদ্রে গিয়ে পড়তে পারি।
কাচের ঘর। তিনি সামনের উইন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনের টেবিলে বিরাট একটা ম্যাপ। সেক্লট্যান্ট, কম্পাস, লেন্স, দূরবিন, সেইটুকু জায়গাই আলোকিত। দু-হাতে ন্যাভিগেটিং হুইলের হাতল দুটো ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, ধ্যানমূর্তি। চতুর্দিকে অন্ধকার, রাগি সমুদ্র। আমাকে দেখে চমকে উঠেছেন, 'এ কী? এতটা রিস্ক নিয়ে এসেছেন?'
'আপনার জন্যে খুব উদ্বেগ হল। পাগলা সমুদ্রের সঙ্গে একা লড়াই করছেন। থাকতে পারলুম না।'
ঘরের সবটাই অন্ধকার। অন্ধকার না হলে বাইরেটা দেখা যাবে না, শুধু সি-চার্টটার ওপর একটু আলো। মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন, সামনে ঘন অন্ধকার। যারা সমুদ্রকে তীরে বসে দেখেছে, তারা জলরাশির এই ভয়ংকর অপরিচিত আকৃতি দেখে আঁতকে উঠবে। শীতল রাত, সারা শরীর বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে, এমনিই শীত করছে, সমুদ্রের এই রূপ দেখে ভেতরটা গুড়গুড় করে কেঁপে উঠল। কে বলেছে, মানুষ ক্ষুদ্র, প্রকৃতির কাছে অসহায়। এই তো আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন একজন মানুষ, বিশালের সঙ্গে লড়াই করছেন। দূর ঢেউয়ের মাথায় কে হঠাৎ যেন গলানো পেতল ঢেলে দিল; কী ওটা? কী হচ্ছে সমুদ্রে? সারি, সারি ঢেউয়ের মাথায় সোনার তবক! কাপ্তেন বললেন, দুটো ব্যাপার হতে পারে, হয় মাছচোরদের ট্রলার, নাহয় দূরপাল্লার কোনো লাইনারের সার্চলাইট। আড়াআড়ি পুব থেকে পশ্চিমে চলেছে। সে এক অলৌকিক দৃশ্য! অন্ধকারের বুক চিরে একটা আলোর রেখা। সমুদ্রের ঢেউ বিরাট বিরাট ময়াল সাপের মতো একটার সঙ্গে আর একটা জড়াজড়ি করছে, পাকিয়ে পাকিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। ঝড়ের গোঁ-গোঁ শব্দ। চাপ চাপ অন্ধকার। একসঙ্গে অনেক রাক্ষসীর চিৎকার। কাপ্তেন জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়েছেন। চালাবার চেষ্টা করলেই ডুবে যাবে। নৌকোর মতো স্রোতের টানে ভেসে চলেছে থাইল্যান্ডের দিকে।
ভয়ংকর সেই রাত। কে যেন কানে, কানে বলেছে—জীবনটাকে কোলে করে সাবধানে রাখো। অন্ধকারে তাকিয়ে দ্যাখো—মৃত্যু কেমন নাচছে। স্থলের জীবন জলে বড় অসহায়। ওই দ্যাখো আকাশ—মেঘ লেপে দিয়েছি। বিদ্যুতের করাত দিয়ে আকাশ চিরে ফেলছি। জীবন যেন টেবল টেনিসের বল, সাবধান! লাফাতে লাফাতে রেলিং টপকে 'ডেক'-এর বাইরে জলে গিয়ে পড়ো না, আর তোমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
হঠাৎ দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে বিরাট স্তম্ভের মতো অন্ধকার একটা বস্তু সোজা আকাশের দিকে উঠে গেল। মাথাটা যেন 'সহস্রশীর্ষ' নাগের মতো, হেলছে, দুলছে, মাঝে মাঝে চিকমিক করে উঠছে। এ কোন জলজন্তু!
কাপ্তেন বললেন, 'এই প্রথম দেখছেন, ভীষণ ভয় পেয়েছেন, তাই তো? ওটা জলস্তম্ভ, যেখানে আছে, সেইখানেই থাকবে, তেড়ে আসবে না। হঠাৎ একসময় ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে। কয়েক টন জল। মাছও আছে অনেক। সব উঠে গেছে আকাশের দিকে। কী মজা, তাই না!'
ভবেশদা বললেন, 'বুঝলে, আমার সাগরের অভিজ্ঞতা অনেক, এই একটু তোমাদের বললুম—এ তো সব ওপরের কথা। ভেতরের রহস্য কীভাবে জানা যাবে? বিজ্ঞান এগিয়ে এসেছে। ''স্টেট অফ আর্ট'' সাবমেরিন তৈরি হয়েছে। যুগ, যুগ ধরে সাগর কত কী গিলে বসে আছে। কত শহর, রাজ্য, সভ্যতা। আটলান্টিস, দ্বারকা! আমারও ইচ্ছে করে সাগরে যেতে। আকাশটাকে উলটে নিলেই তো সাগর! সেই কতকাল আগে পড়েছিলুম ''মেসফিল্ড''-এর কবিতা, আজও আমার মনে আছে,
I must down to the seas again,
to the lonely sea and the sky.
And all I ask is a tall ship
And a star to steer her by.
নির্জন সমুদ্রের মাথায় নির্জন আকাশ, চলো যাই, বারে বারে যাই, শুধু চাই একটি উঁচু জাহাজ আর আকাশে ধ্রুবতারা, আর সেই তারাটাই পথ বলে দেবে।
নাবিক, তুমি পথ হারাবে না।'
ভবেশদা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মস্ত বড় এক মানুষ। ছ-ফুটেরও বেশি লম্বা। হাসতে, হাসতে বললেন, 'আজ তবে এতটুকু থাক, বাকি কথা হবে সাগরে।'