বড়মামা, মেজমামা কাশীতে

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়



সকালে চায়ের আসর দোতলার চওড়া বারান্দায়। ওই একটা সময়েই সকলে একসঙ্গে। মাসিমার শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা— ভোরবেলাতেই চান হয়ে যায়, সূর্য প্রণাম। দশ মিনিট প্রাণায়াম। তিনবার শাঁকে ফু। শ্বাস-নালির ব্যায়াম। যেদিন ফুঁয়ের জোর কোনো কারণে কম থাকে, বা ফুঁ ফস্কে যায়, সেদিন বেশ চিন্তিত থাকেন। খাওয়ার তালিকায় অদল-বদল। মাসিমার থিওরি—মানুষকে চালায় তার পেট, মাথা নয়। সদবুদ্ধি, বদবুদ্ধি সব পেটে জন্মায়। ছানা-পোনা সব পেটে। কোনোটা ছাগল, কোনোটা রামছাগল, ষাঁড়, বাইসন।
বড়মামার কানে কথাটা গিয়েছিল। বড় মামা দুটো নাম যোগ করেছিলেন, কৈকেয়ী, মন্থরা। গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, রামচন্দ্রকে মাত্র দশজন ঋষি ভগবান বলে চিনতে পেরেছিলেন। চেনার ক্ষমতা থাকা চাই। অধ্যাপক? অহংকার! বিদ্যার জাহাজ! বিদ্যার ভারে ভুড়ভুড় করে ডুবে গেল। এইবার নোনা জল গিলে মরো। হাঙরের পেচ্ছাপ, তিমির পটি। সেবা, সেবা! সেবাই ধর্ম, মহৎ ধর্ম। এক মাত্র ডাক্তারই সেই ধর্মের অধিকারী। স্বর্গেই তার সিংহাসন।
বড়মামার এই মন্তব্যের লক্ষ্য কারা, সে তো বোঝাই যায়। আজকের চা পর্বে বড়মামার আসতে একটু দেরি হচ্ছে। চেয়ারটা খালি। মেজমামা দক্ষিণের খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ওখানে একটা নীল পাহাড় থাকলে বেশ হত। সাদা-সাদা ভেড়া।'
মাসিমা বললেন, 'বেশি নয়, দুটো। একটা বড়, একটা মেজ। দুই ভাই, কাজ নাই, কর্ম নাই, শুধুই গুঁতোগুঁতি।'
বড়মামা প্রবেশ করছেন। ওই যেমন বলে, 'মঞ্চে প্রবেশ মাননীয় মন্ত্রীর', মেপে মেপে পা ফেলছেন, বাংলা সিনেমায় সন্ন্যাসীরা যে ভাবে হাঁটেন—'সন্ন্যাসী রাজায়' উত্তম কুমার। হলুদ রঙের আলখাল্লা, হাতে গোটা গোটা রুদ্রাক্ষের মালা, পায়ে নরম জুতো। কপালে একটা টিপ। চোখ দুটো আকাশের দিকে। ধীরে ধীরে চেয়ারে বসলেন। হাতের মালাটাকে একটু নাড়াচাড়া করে কপালে ঠেকিয়ে গম্ভীর গলায় বলার চেষ্টা করলেন, ও ও ও ম। একটানা বেরোল না, কেটে কেটে গেল। মুখ দেখে মনে হল, অখুশি। নিজের মনেই বললেন, 'পাহাড়ের সুর কি সমতলে বেরোয়। একদল সংসারী যেখানে শ্বাসে-প্রশ্বাসে কার্বন ডাই অকসাইড, ভাইরাস বাতাসে ছড়াচ্ছে। দেহ, মন যাদের অপবিত্র। দ্বেষ, বিদ্বেষ, হিংসা। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'শোনো, তোমার এই উঠতি বয়েস, তোমাকেই বলে যাই, সম্মানিত গুণীজনকে সম্মান জানালে, তুমি যে ভদ্রসমাজভুক্ত সেটা বোঝা যায়, তোমার জাত চেনা যায়। গোখরো সাপের ফোঁস, বাঘের হালুম, শেয়ালের হুককা হুয়া, গরুর হাম্বা, ছাগলের ব্যাব্যা, সর্বত্যাগী বনচারী, গুহাবাসীর উদাত্ত ওঙ্কার। আমি যখন এলুম তখন তোমাদের উচিত ছিল, উঠে দাঁড়ানো, তারপর আমি বসলে, ধীরে ধীরে অবনত মস্তকে আসন গ্রহণ। আমি চিত্রটা কী দেখলুম, একজন মহামান্য সরস্বতীর বরপুত্র, তাঁর ভুঁড়িটি সামনের দিকে ঠেলে দিয়ে, পেছন দিকে হেলে, পা দুটোকে ছেতরে আত্ম সুখে বিভোর। আর একজন লাবণ্যময়ী, দোর্দণ্ড প্রতাপ সম্রাজ্ঞী, প্রজাকুলের যথেচ্ছ নির্যাতনকারী থেবড়ে বসে আছেন, একটি অহঙ্কারের পুঁটলি—জগৎকে এঁরা কী দিতে পারেন? প্রেম, সেবা, ভালোবাসা, সহানুভূতি, মর্যাদা? এঁরা জলশূন্য ডাব, ফলশূন্য বৃক্ষ, মেঘশূন্য আকাশ, কষ্ঠিপাদুকা, কুটকুটে কম্বল, ধু-ধু বালুচর, উটমুখো উট, বিষধর সর্প; এঁদের কাছে এই জগৎটা একটা এ.টি.এম। জগতে এসেছেন নিতে, দিতে নয়। এতকাল আমি ছিলুম ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি, আজ আমি জেগে উঠেছি, অগ্নি উৎগীরণ করব, আমার বাণী উত্তপ্ত প্রস্তর খণ্ডের মতো মূঢ়, মূক, ভেটকিমাছের মতো ভেটকে থাকা মানুষদের আঘাত করবে, ঘুঘুর বাসায় আগুন ধরাবে, সুখ নিদ্রা ঘুচিয়ে দেবে। উপনিষদের বাণী আমার মধ্যে জেগে উঠেছে, আমি জীবন্ত গীতা, পার্থসারথীর দক্ষিণ হস্ত।'
উত্তেজিত বড়মামা আলখাল্লা মোড়া একটা প্যাকেটের মতো, বারান্দায় পায়চারি শুরু করলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বসে আছিস? লজ্জা করছে না? ওঠো, জাগো! আমার পেছনে পেছনে জোড় হাতে ঘোরো, আমার ভেতর থেকে শক্তির একটা তরঙ্গ বেরোচ্ছে। সেই তরঙ্গের বৃত্তে এসে উজ্জীবিত হও। বদলে যাও। দুনিয়াটাকে বদলে দাও। আমি জানি, তোমরা অবাক হয়ে ভাবছ, মানুষটার মধ্যে হঠাৎ এই পরিবর্তন এল কী ভাবে? কৃপা, কৃপা! সেদিন গভীর রাতে একটা আলো এল আমার ঘরে। বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলো নয়, স্বর্গীয় আলো। উজ্জ্বল, শীতল, মধুর। সেই আলো থেকে প্রকাশিত হলেন এক মহাপুরুষ। না, আমি এখন বসব, এক চুমুক চা খাব। তারপর ধীরে ধীরে বলব সেই মহা আবির্ভাবের কথা। তোমাদের রোমাঞ্চ হবে, তোমরা জানতে পারবে, এতকাল যাকে তোমরা পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ ডাক্তার হিসেবে চিনে এসেছ, তিনি একজন মহাপুরুষ। তিনি একজন পরিত্রাতা সেভিয়ার, প্রফেট।'
বড়মামা জপের মালাটা গলায় ঝুলিয়ে চায়ের কাপের দিকে হাত বাড়ালেন।
মেজমামা বললেন, 'আমার একটা বিনীত প্রশ্ন, মহাপুরুষরা কি চা পান করেন? গৌতম বুদ্ধ, যিশু খিস্ট, শ্রীচৈতন্য?'
'মূর্খ, তুমি জানো না, আহারের সঙ্গে ধর্মের কোনো যোগ নেই; তা ছাড়া, চা হল এক ভেষজ আরক, এক ধরনের পাতার নির্যাস। এই নির্যাসে আছে কেফিন, ট্যানিন। শরীরের পক্ষে উপকারী। শরীরকে সতেজ, সবল না রাখলে মন দুর্বল হয়ে পড়বে। সাধন, ভজন মনের ব্যাপার। ভগবান আসবেন মনে, বসবেন মনে। কথা হবে মনে মনে, কানে কানে, প্রাণে প্রাণে।'
মেজমামা বললেন, 'গভীর রাতে কে এসেছিলেন তোমার কাছে?'
'চায়ে ডুবিয়ে এক টুকরো বিস্কুট মুখে পুরি, দেহ দেবতাকে শান্ত করি, তারপর, তারপর...'
বড়মামা টাইম অ্যাডজাস্ট করতে পারেননি। কাপ থেকে ঠোঁটে পৌঁছবার আগেই বিস্কুট ভেঙে থ্যাস করে কোলে। বড়মামা মধুর হেসে বললেন, 'বুঝেছি, বুঝেছি প্রভু! তুমি বিস্কুট চাইছ না। আমার ইচ্ছা তোমার ওপর চাপাতে চেয়েছিলুম। আমাকে গালাগাল দাও, বলো, ননসেনস, ইডিয়েট, রামছাগল।'
মেজমামা সব সময় কাজের কাজটাই করেন। এরই মধ্যে চা প্রায় শেষ। চতুর্থ বিস্কুটে কামড় মারছেন। মাসিমার হাতে চাষবাস সংক্রান্ত একটা বই। মাথায় ঢুকেছে, গোলাপ, গাঁদার চাষ করে কী হবে! জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষ করবেন, গোবিন্দ ভোগ। পেছন দিকে পাঁচ কাঠা জমি পড়ে আছে। সেলফ হেল্প। নিজের খাবার ব্যবস্থা নিজেই করে নেবেন। মাসিমা পড়েই যাচ্ছেন, কারো কথা শুনছেন না। বাজে কথা শোনা, বাজে কথা বলা, মানে জীবনটাকে হেলায় নষ্ট করা। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। ইচ অ্যান্ড এভরি মোমেন্ট। আমরা প্রত্যেকেই এক একটা ঘড়ি। হার্ট একটা ড্রাইসেল ব্যাটারি। এমন হিউম্যান লাইফ আর কি পাবে? মন যা করার কুইকলি কর এই ভাব। মাসিমা নিজের মনেই বলে উঠলেন, 'ভার্মি কম্পোস্ট, মাইক্রো ফার্টিলাইজার, বোরন কপার, ম্যাগনেসিয়াম, নাইট্রোজেন, ধনচে।'
মেজমামা অবাক চোখে তাকালেন একবার। তারপর খুব আদুরে গলায় বড়মামাকে বললেন, 'বাবা তোমাকে একটি রামছাগল বলেই শনাক্ত করেছিলেন, অ্যা গ্রেট স্মেলি রাম গোট ইন গ্লোরিয়াস মুকার্জি ফ্যামিলি।'
'ঠিক, কিন্তু তুমি বাকিটা শোনো নি। পুরাণে আছে, অথর্ব বেদের হারিয়ে যাওয়া চ্যাপ্টারে আছে। সাধনা, তীব্র সাধনা। সব মানুষই ছাগল, দিকে দিকে, ঘরে ঘরে ব্যা ব্যা করছে। এদের মধ্যে দু-একটা গুরু কৃপায় সাধন সহায়ে রামছাগল হয়। ব্যাকরণে আছে—ব্যাকরণ মানে ব্যা করণ। ব্যাকরণে একটা পদ্ধতি বলা আছে। কণ্বমুনির আশ্রমে একটা পাঁঠা ছিল। পাঁঠার যা স্বভাব—ভরদ্বাজ মুনির বেড়ায় মাথা ঢুকিয়ে একটা গাছের কচি কচি পাতা মশ মশ করে খাচ্ছিল। এরপর মাথাটা গেছে আটকে। বের করতে পারছে না। মুনি অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলেন, 'রে মূঢ়! অর্ধাচীন অন্ত্যজ, শূন্য মস্তিষ্ক, নীচ বুদ্ধি, মৃতনয়ন, নির্বোধ তৃণভোজী আমার যত্নের উদ্যান চর্বন করেতিছিস! অদ্যই তোকে যম সদনে প্রেরণ করিব, নরকের কীট!' সেই বেদের কাল থেকে এই আধুনিক কাল ছাগলের একই ভূমিকা। এর ছাগল ওর বেড়া ভেঙে গাছ খাবে, ওর ছাগল খাবে এর গাছ। লেগে গেল ঝগড়া, ঝগড়া থেকে দাঙ্গা। থানা, পুলিশ, মামলা, ফৌজদারি। সামান্য একটা 'ব্যা-অ্যা', তার কী শক্তি! মা কালী কি এমনি এমনি ভালোবাসেন! পাঁঠা ছাড়া পুজো হবে! ভেজিটেরিয়ান মা কালী দেখেছ? কালীঘাটে গিয়ে দেখে এসো—এপাশে ভক্তদের লাইন, ওপাশে পাঁঠাদের। গভীর রাতে মহাশ্মশানে খাঁড়া কাঁধে কাপালিক পায়চারি করছে, এবার পাঁঠা হল তরতাজা একটি মানুষ। মুক্তির পথটা তাহলে কী হল? তোমাকে ছাগল হতে হবে, ম্যা ম্যা করে মায়ের কাছে যেতে হবে। মা বলবেন, 'কইরে কোথায় গেলি, এটাকে হাড়িকাঠে ফিট করে ঘ্যাচাং ফু করে দে।' দেহ থেকে মাথার ভারটা নেমে গেলে কতটা হালকা লাগে, সে খবর কত জন রাখে! মাথাটা তো একটা হাণ্ডা। যত ডান্ডা তো ওইখানেই এসে পড়ে। সবাই তো গোটা দেহের ওজন মাপে, মাথার ওজন আলাদা ভাবে মাপা যায় কি? মাথাটা কেটে ওজন যন্ত্রে চাপালে মানুষটা তো মারা যাবে!'
'দুই মুনি দলবল, মানে নিজের নিজের শিষ্যদের নিয়ে আশ্রমের বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। হাতাহাতি শুরু হয় হয়। সংস্কৃতে তীব্র কথা কাটাকাটি; এমন সময় বীণা বাজাতে বাজাতে নারদমুনি আকাশ থেকে নেমে এলেন—ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি। তিনি দুপক্ষের কথা ধৈর্য সহকারে শুনলেন। স্বর্গের নার্সারি থেকে আনা একশোটা গাছের মধ্যে ছাগলে পঞ্চাশটা মুড়িয়ে খেয়েছে। নির্লজ্জ চতুষ্পদ একান্নতম চারাটি মুখে পুরেছে। নারদমুনি এক রাউন্ড বীণা বাজিয়ে বললেন, 'সবই প্রভুর ইচ্ছা। আজ একটি নতুন সাধন পদ্ধতির জন্ম হল—মনে হচ্ছে। ওই ছাগল ওখানেই আটকে থাক। বেড়ার ওপাশে মাথা, এপাশে দেহ। দুই মুনি বেড়ার ওপাশ থেকে ওটাকে খাওয়াতে থাকুন; যেন মরে না যায়। আমি বিশ্বপরিক্রমা করে ফিরে আসছি। তুচ্ছ কারণে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টি করবেন না। আমার এই মোহন বীণার সুরে সুর মিলিয়ে সমবেত কণ্ঠে বলুন, 'ছাগলের কাজ ছাগল করুক, আমরা সবাই মানুষ।'
ভরদ্বাজ মুনি বললেন, 'দেবর্ষি, আমরা মানুষ নই, আমরা ঋষি, এক প্রকার ভগবান; সুতরাং মানুষের স্লোগান এখানে চলবে না। তবে, এই নির্বোধ ছাগলটি আমার আশ্রমের বেড়ায় মস্তক প্রবেশ করিয়েছে, ইহার আর নিস্তার নাই, ইহাকে আমি সাধনার দ্বারা সমুন্নত করিব।'
ছাগলটা দিনের পর দিন বেড়াতেই আটকে রইল। ঘাস, পাতা, দানা, শসা খেতে থাকল। দেহটা চচ্চড় করে বাড়তে লাগল, পুষ্ট থেকে পুষ্টতর হল। একদিন নিজের শক্তিতে বেড়া ভেঙে বেরিয়ে এল। সেইদিন আশ্রমে একটি উৎসব হল—'বেড়া ভাঙা উৎসব।' হোম, যাগ, যজ্ঞ। সেই বিরাট ছাগল, গলায় ঝুলছে বেড়ার খণ্ডাংশ। মুনিরা আশীর্বাদ করে উপাধি দিলেন—'রামছাগল'। ঋষি ভরদ্বাজ নতুন একটি সাধন পদ্ধতির প্রবর্তন করলেন—'শেষ সাধন, সিদ্ধিলাভের নিশ্চিত উপায়। নির্বাচিত শিষ্যদের মাথা শক্ত-পোক্ত বেড়ায় আটকে দিলেন। তাদের দেহ বাড়তে লাগল, পুষ্ট হতে থাকল, বিরাট বিরাট আকৃতি, চিবুকে ছাগল দাড়ি, লাল লাল চোখ, একদিন বেড়া সমেত সবাই উঠে দাঁড়াল, স্বর্গ হতে পুষ্পবৃষ্টি, দেবতারা নেমে এলেন, বিরাট উৎসব, অভিষেক, উপাধি প্রদান ইত্যাদি। সকলেই মৌনী, কদাচিৎ একটি দুটি ঋষিবাক্য। সেই সব বাক্যের অর্থ বোঝার ক্ষমতা কারো ছিল না, আজও নেই। তাঁরা যা বলতেন, তা 'লুপ্ত বেদ' নামে পরিচিত। গ্রন্থাগারে পর পর বই, হঠাৎ একটা ফাঁক—ওই ফাঁকটাই হল 'লুপ্ত বেদ' খণ্ড এক, খণ্ড দুই...। ক্যাটালগে নম্বর ফেলা আছে, বইটা নেই, অদৃশ্য। এই প্রকারে প্রথম যে-ছাগলটি রামছাগল হল, তাকে নিয়ে স্বর্গে প্রবল হইচই। দেবীদের মধ্যে হাতাহাতি, মারামারি। এ বলেন, আমি বাহন করব, আর একজন বলেন আমি। মা শীতলা বললেন, আমার গাধাটাকে বিদায় করে এই ছাগলটায় আরোহন করে বাঙলার গ্রামে গ্রামে 'মায়ের দয়া' বিতরণ করে বেড়াব। আমার সন্তানরা উন্মুখ হয়ে আছে। দিবা দ্বিপ্রহরে আমি যখন বৃক্ষতলে বিশ্রাম করব, তখন আমার বাহন গ্রামবাসীর বাগানের বেড়া ভেঙে লাউ, কুমড়ো, শিম, শসা গাছ খেয়ে তাদের ধন্য করবে। বছরে একবার শীতলা পুজোর মতো, মহাসমারোহে ছাগ ষষ্ঠী পালন করা হবে।
দেবীদের নিয়ে দেবতারা তাঁদের পার্লামেন্টে বসলেন। দেবরাজ ইন্দ্র সভাপতি। মা শীতলা বললেন, 'আমি ওই রামছাগলটিকে আমার দ্বিতীয় বাহন হিসাবে গ্যারেজে রাখতে চাই।' মা দুর্গা বললেন, 'ওটিকে আমি পোষ্যপুত্র করব।' মা সরস্বতী বললেন, 'আমার বডি ওয়েট বেড়েছে, হাঁস আমাকে সামলাতে পারছে না, ওই ছাগলটিকে আমার চাই।'
দেবীদের ক্যাঁচর ম্যাঁচর শুনে দেবরাজ ইন্দ্র ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, 'তোমাদের অসভ্যতা ক্রমশই বাড়ছে। এরপর মানুষ আর তোমাদের পুজো করবে না।'
মা দুর্গা তার বাহন সিংহের কেশরে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, 'দেবরাজ, আপনি মর্তের কোনো খবরই রাখেন না। আর কদিন পরে লন্ডনের টেমস নদীর তীরে আমার পুজো হবে, বিরাট সমারোহে মেম দুর্গা।'
মেজমামা বললেন, 'তুমি সময়টা গোলমাল করে ফেললে। মিটিংটা হচ্ছে হাজার বছর আগে, বেদের কালে, তুমি ঢুকে গেলে কালকের খবরের কাগজের নিউজে—টেমস ফেস্টিভ্যাল!'
বড়মামা মালাটা মাথায় ঠেকিয়ে বললেন, 'এই হল মানুষের জ্ঞান। দেয়াল ঘড়িতে পেণ্ডুলামের মতো টুকটুক করে দুলছে, সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা। ওরে মহাকালে অতীত, বর্তমান বলে কিছু নেই। একটা জমাট পাথর। তার ভেতরে পরতে পরতে সব রয়েছে।
গত সাতদিন ধরে কুট হুমি আমাকে কৃপা করে সব বোঝাচ্ছেন, দেখাচ্ছেন। কাল রাতে আমাকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ দেখালেন, অভিমন্যু বধ। একটা ঝাঁকড়া গাছের ডালে পাতার আড়ালে বসে দেখলুম। সেই সময় আমি একটা পাখি ছিলুম।
অমন পাখি পৃথিবীতে সাধারণত দেখা যায় না। স্বর্গের পশ্চিম উদ্যানে, একটি সরোবর আছে, সে-সরোবরের কপি (copy) হল আমাদের মানস সরোবর। স্বর্গের ওই স্বচ্ছ সরোবরের তটে একটি বৃক্ষ আছে। সেই বৃক্ষের কোটরে আমার পিতা মাতা থাকেন। এই 'আমি' নই, ওই 'পাখি-আমি'। ওই স্থানে টেম্পারেচার দশ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বসন্তের বাতাস। কাক নেই, বক নেই। আমার গুরু 'কুট হুমি' বললেন, 'সরোবরে নিজের প্রতিবিম্ব প্রত্যক্ষ করো।' আহা সে কী রূপ! যেন চাঁদের আলো পাখি হয়েছে। মাঝে মাঝে সোনার পালক। চোখ দুটো রুবির। মোবাইল থাকলে সেলফি তুলতুম। ওই সরোবরে পঞ্চপাঞ্চব আত্মবিসর্জন করে পাঁচটি পর্বত হয়েছেন। কত অঙ্গ আমার, দুবরাজপুরের 'মামা-ভাগনে' পাহাড় দুটির একটি হল শকুনি, অন্যটি দুর্যোধন—পানিশমেন্ট। মহাত্মা কুট হুমি আমাকে বললেন, 'মনে রেখো যেমন কর্ম তেমন ফল। তোমার অবিশ্বাসী, নাস্তিক ভ্রাতাটিকে বোলো—'জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পিতৃসম। যথোচিত সম্মান, যথেষ্ট সেবা না করলে একটি উই ঢিবিতে পরিণত হবে।'
মেজমামা বললেন, 'তোমার এই মহাপুরুষটি কে? অদ্ভুত বিকট নাম।'
বড়মামা বললেন, 'কুট হুমি একজন তিব্বতী মহাসাধক। পাঁচ হাজার বছর আগে এই পৃথিবীতে ছিলেন। আজও আছেন। শরীর নেই, 'স্পিরিট'। মাদাম ব্লাভাতাস্কির নাম শুনেছ?'
'না, তিনি আবার কে?'
'একটু লেখাপড়া করো। আর কতকাল অন্ধকারে হাবুডুবু খাবে? থিওজফিক্যাল সোসাইটির ফাউন্ডার মিস ব্লাভাতাস্কি। একদিন তাঁর সামনে আকাশ থেকে নেমে এলেন এই মহাপুরুষ। বিরাট চেহারা। যেন বিরাট একটা কুমড়ো, তার ওপর ফিট করা একটা চালকুমড়ো। পা দুটো আমাদের বড় খাটটার পায়ার মতো। হাত দুটো যেন বিশাল দুটো মুলো। চোখ দুটো ছোট্ট ছোট্ট দুটো টোম্যাটো।'
'মানে, ভেজিটেরিয়ান?'
'অফকোর্স। মাছ, মাংস, ডিম, এসব নরকের খাদ্য। যমদূতরা কাবাব, মোগলাই, মাটন—এই সব খায়। দিনের বেলা আন্ডার ওয়ারলডে গাদাগাদি করে থাকে, রাত্তিরবেলা সব শহরে আসে শিকারের খোঁজে। সেই মহাপুরুষ প্রথমেই আমাকে এই তিব্বতী আলখাল্লা আর জপের মালাটা দিলেন। এই মালাটা শ্রীকৃষ্ণের রথের পাদানিতে পড়েছিল। সম্ভবত অর্জুনের। যুদ্ধের ভয়ে হাত থেকে গাণ্ডীব খসে পড়ার সময়, গলার এই মালাটা নিয়ে পড়েছিল। ফোরফর্টি ভোল্ট। তোমাদের মতো সাধারণ মানুষ স্পর্শ করলেই—আঁক—ছাই হয়ে যাবে—ডাস্ট।'
মেজমামা মাসিমাকে বললেন, 'ডাক্তার চৌধুরীকে একবার খবর দিতে হবে। আর ফেলে রাখা ঠিক হবে না। বাবা আমাকে বলেছিলেন, ঘেঁটু সংক্রান্তিতে জন্মেছে। ক্রমশই, ক্রমশই ভয় হচ্ছে, রাস্তায় না বেরিয়ে পড়ে। চোখে চোখে রাখতে হবে।'
বড়মামার মুখে ফুটে উঠল অদ্ভুত এক ক্ষমা সুন্দর হাসি, বললেন, 'কাল রাতে আমার গুরুদেব ঠিক এই কথাটিই বলে গেলেন, 'কেউ ভাববে পাগল, কেউ ভাববে ছাগল, তুমি কিন্তু স্টেডি থাকবে। এই পৃথিবীতে যত মানুষ, ঠিক তত প্রেত আর পিশাচ, মিলিত মিশ্রিত হয়ে আছে, পাশে পাশে ঘুরছে। কুমতলব, কুপরামর্শ দিচ্ছে। ঠেলে, ঠেলে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তোমার এই বাড়িতেও একটা অন্ধকার দিক আছে। সেখানে তোমাকেই আলো জ্বালাতে হবে; তা না হলে তোমার পিতার আত্মা দুঃখ পাবেন। বৃষ্টির জলের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের চোখের জলও মিশে আছে।'
আমি জিগ্যেস করলুম, 'প্রভু! কীভাবে তা সম্ভব? যতবার আলো জ্বালাই, ওরা ফুস করে ফুঁ দিয়ে নিবিয়ে দিচ্ছে। ওরা অন্ধকারের দূত। মাছের মাথা খায়, মুরগির ঠ্যাং। ওদের শ্বাসে পেঁয়াজ আর রসুনের বিশ্রী গন্ধ। আহারের পর ঢেউ করে ঢেকুর তোলে। দৈত্যের মতো নাক ডাকিয়ে ঘুমোয়।'
প্রভু বললেন, 'তোমাকে আমি একজোড়া রেড-ইন্ডিয়ান প্রেত উপহার দেব। প্রয়োজনে তাদের কাজে লাগিও।'
মেজমামা বললেন, 'পাগলদের বেশ মজা লাগে। কোথা দিয়ে যে সময় কেটে যায়। ভেরি এনজয়িং। এদের নিয়ে ''শো'' করা যায়!'
'অ্যায়! ঠিক বলেছিস!' বড়মামা আলখাল্লা খুলে ফেললেন। সাদা প্যান্ট, ঘি-রঙের টি-শার্ট, হোল এপিসোডটা তোর কেমন লাগল?'
মেজমামা অবাক হয়ে বললেন, 'এতক্ষণ অভিনয় করছিলে?'
'অফ কোর্স! পেশেন্টদের হাতে ধোলাই খেতে রাজি নয়। খুব হয়েছে ডাক্তারি! এইবার আমি আমার প্রতিভাকে কাজে লাগাব। কুণ্ডুমশাইয়ের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে, যাত্রার দল করব, 'আরতি অপেরা', আরতি আমার মায়ের নাম। মায়ের প্রতিভার আশি ভাগ পায় বড় ছেলে। বাকি কুড়ি ভাগ যে পাবে সে পাবে। বড় ছেলেই তো পিতা মাতার সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার শক্তি-ভরা বীজ। যার মধ্যে আছে নিখুঁত একটি বৃক্ষ। বাকিগুলো সব দুর্বল। মা কবিতা, গান, নাটক লিখতেন। সেকালে এসব কেউ ভালো চোখে দেখবে না, তাই ঠাকুর ঘরে একটা বেতের বাক্সে রাখতেন। আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলতেন, সব তোর, সব তোর, আমার মেধা, আমার প্রতিভা, আমার কল্পনা, কণ্ঠ, সুর, সঙ্গীত সব তোর। এই অপেরার পালাকার, পরিচালক, মুখ্য অভিনেতা, প্রচারক, সব আমি; এমন কি গীতিকার, সুরকার। আর ডাক্তারি নয়। আর রচনা ও অভিনয়ের সামান্য তোমরা দেখলে, অবশ্যই মোহিত হলে।'
মেজমামা বললেন, 'সামান্য পদরেণু গ্রহণ করতে পারি?'
'এখনই না। প্রতিভা আর একটু পুষ্ট হোক। পুষ্প প্রস্ফুটিত হলে ভ্রমর আপনিই আসবে। ব্যান্ড বাজাতে হবে না। অহঙ্কার! কীসের অহঙ্কার? মা প্রায়ই বলতেন, আপনারে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়!'
মেজমামা বললেন, 'তোমার অপেরায় আমার যদি কোনোরকমে একটু স্থান হয়, তাহলে অধ্যাপনা ছেড়ে দেব, আর পারা যাচ্ছে না। কী অসম্মান? কখনো গাঁট্টা মারছে, কান মলে দিচ্ছে, ঘরে আটকে রাখছে। রোজ জিগ্যেস করতে হয় আপনারা কি দয়া করে পড়বেন? কয়েকটা বিষয় বোঝাবার একটু চেষ্টা করব? কে কার কথা শোনে? অধ্যক্ষের চেয়ার আছে, তিনি নেই। সাতবার ঘেরাও হয়েছেন। সেদিন বলছিলেন, জেলে থাকলেই তো হয়। তোমার এই কুট হুমি চরিত্রটা আমার খুব ভালো লেগেছে। চেহারাতেও মিল আছে। আমাকে তো অবিকল শিব ঠাকুরের মতো দেখতে।'
বড়মামা বললেন, 'শরীরের নীচের দিকটা মোটামুটি ঠিকই আছে, তবে মুখটায় তেমন দেবভাব নেই। থ্যাবড়া, গোল নাকটা ক্রমশই বসে যাচ্ছে। থাক, সে ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে। মেক-আপে সবই সম্ভব। নাকে একটু 'হাইলাইট' মেরে দিলেই নাকটা বেরিয়ে আসবে।'
মেজমামা বললেন, 'তা হলে জেনে রাখ, আমিও তোমার সঙ্গে আছি। খুব হয়েছে ভাই, আর অধ্যাপনা নয়। নায়কের রোলও তো পেতে পারি?'
'বয়েসটা একটু বেশি হয়ে গেছে, তাই না?'
'তা হোক না। তুমি দেখো, উত্তরকুমার যখন প্রথম নায়ক হলেন, কম বয়েস। তারপর বছরে বছরে বয়েস বাড়ছে, তখনো নায়ক।'
'তা ঠিক। সে দেখা যাবে, ভাবা যাবে। সেই ভাবে পালা লিখতে হবে।'
মাসিমা একমনে একটা বই পড়ছেন, 'ফুলের চাষ', আমি জানি, পড়তে পড়তেই সব শুনছেন। বই থেকে মুখ না তুলেই বললেন, 'আমাদের কাশীর বাড়ির চাবিটা কার কাছে আছে?'
বড়মামা যেন আকাশ থেকে পড়লেন, 'কাশীতে আমাদের বাড়ি আছে না কি?'
মাসিমা বললেন, 'গা জ্বলে যায়।'
মেজমামা বললেন, 'সে বাড়ি কি এখনো আছে? দখল হয়ে গেছে।'
হরিদা, আমাদের ম্যানেজার, চারটে লম্বা-লম্বা চিচিঙ্গা নিয়ে মাসিমাকে দেখাতে এসেছেন। মাসিমার বাগানে হয়েছে। চোখে, মুখে আনন্দ। সত্যিই দেখার মতো। হরিদা বললেন, 'কে বলেছে নেই? ফাসক্লাস আছে। লাস্ট মানথে আমি ভিজিট করে এসেছি। চাবি আমার কাছে। কত্তামশাই আমাকে কেয়ারটেকার করে গেছেন। ওই বাড়ি আমি বুক দিয়ে আগলাবো। কত্তাবাবুর কথা ভাবলে চোখে টিয়ারস আসে। সাক্ষাৎ মহাদেব। আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, হবে! তোর কোনোদিন টাক পড়বে না।'
মেজমামা বললেন, 'তুই চাবি নিয়ে কী করবি?'
'কাশীতে থাকব।'
'মামার বাড়ি! আমরা কার কাছে থাকব? আমরা জলে ভেসে এসেছি। দুটো রত্ন। এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায় দেখ।'
মাসিমা বললেন, 'নিজেরা দেখাদেখি করো, আর না। হরিদা তুমি আমার সঙ্গে যাবে। তুমি টিকিট কাটো।'
মেজমামা বললেন, 'আমরা মা-মরা অসহায় দুটি বালক, আমরাও পেছনে পেছনে যাব। ত্রিভুবনে আমাদের আর তো কেউ নেই। তা সবাই মিলে এক সঙ্গে একবার কাশীতে গেলে মন্দ হবে না। আমাদের বেড়ানোটা একেবারে নেই বললেই হয়। দ্যাটস ভেরি ব্যাড। আমরা বিশ্বনাথজীকে দর্শন করব। বর চাইব—আমাদের অপেরার যেন জয়জয়কার হয়। দিকে দিকে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। পদক, মানপত্র। উঃ ভাবা যায় না।'
মাসিমা বললেন, 'হরিদা, এই দুটোর হাত থেকে আমাকে রক্ষা করতে পারো?'
'না দিদি, এইটাই এই পরিবারের এক মস্ত আনন্দ; এ আর কোথাও নেই।'
'এই আনন্দ যে আর সহ্য করা যাচ্ছে না। দুজনে সব ছেড়ে যাত্রার দল করবে।'
'জানি তো, কাল রাতে আমাকে পাইক-বরকন্দাজ সাজিয়ে মোবাইলে ছবি তুলেছে। কী সুন্দর দেখাচ্ছে! নিজেকেই নিজে চিনতে পারছি না। একটা পুরোনো আমলের পালকির খোঁজ করতে হবে। না পাওয়া গেলে তৈরি করাতে হবে। পালাটার নাম খুব সুন্দর, শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে—প্রহরে প্রহরে শেয়ালের ডাক। দুটো ভূত আছে—একটা ভালো, আর একটা বদমাইশ।'
'দুটোই তো সামনে বসে আছে।'
হরিদা বললে, 'কী বলছ গো, দুটো দেবতা।'
কম্পাউন্ডারকাকু হন্তদন্ত হয়ে হাজির! বড়মামাকে 'বড়দা' বলেন। এক সময় দারুণ ফুটবল খেলতেন। মারাত্মক সেন্টার ফরোয়ার্ড। পায়ে বল পড়লেই নির্ঘাত গোল। আমাকে বলেছিলেন, শয়নে, স্বপনে গোলপোস্ট দেখবে। যে কোনো গোল বস্তুকেই মনে করবে বল। পায়ের কাজই হল, কিক মারা। জগতে একটাই শব্দ আছে 'ধাঁই।'
কম্পাউন্ডারকাকু বললেন, 'আবার শুরু হয়েছে, একবার চলুন বড়দা। থামার কোনো লক্ষণ নেই। যে কাছে থাকছে সেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে—হিক হিক হিক।'
কম্পাউন্ডারকাকুর শ্বশুরমশাই, কাকু বলেন 'ফাদার ইন ল'—তিনি লাগাতার হেঁচকি তুলে চলেছেন, কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। শোয়ালে বেড়ে যাচ্ছে। দাঁড় করালে সামান্য কমছে। সেকেণ্ডে একটা থেকে তিন সেকেণ্ডে একটা।
বড়মামা আমাকে বললেন, 'চল। কালীপুজোর চকলেট বোম তোর কাছে ক'টা পড়ে আছে?'
'তিন চারটে।'
'সবক'টা নে। দেশলাই নিতে ভুলিস না।'
মেজমামা বললেন, 'রোগের চিকিৎসায় আজকাল কি বোমা ব্যবহার করা হচ্ছে?'
বড়মামা বললে, 'প্রযুক্তিগত চিকিৎসা। ব্যবহারিক চিকিৎসা।'
'চকলেট বোম খাওয়াবে?'
'সিক্রেট। বলা যাচ্ছে না।'
যেতে যেতে বড়মামা আমাকে বললেন, 'ওদের বাড়ির পেছন দিকের খালি জায়গাটায় চলে যাবি। আমি ঘরে রুগি দেখার ছলনা করব, এটা ওটা সেটা। তুই তখন দাম করে একটা ফাটাবি, একেবারে আচমকা।'
'যদি কেউ কিছু বলে?'
'বলবি, আগামী টি টোয়েন্টিতে ভারত জিতবে, তাই আগেই ফাটিয়ে রাখছি। এটা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
ঠিক আছে! সব কথার শেষে 'ঠিক আছে' বলবি, এতে 'জাত' চেনা যায়; যেমন জাত-সাপের 'ফোঁস', ঠিক আছে! দ্যাখ, আমিও কীরকম অভ্যাস করে ফেলেছি, ঠিক আছে!'
পেছন দিকে কোনোকালে বাগান মতো একটা কিছু ছিল, এখন আঁস্তাকুড়। কী নেই সেখানে! জঞ্জালের ঐশ্বর্য কি কম? বাড়ির ভেতরে কতটুকু থাকে? বেশিটাই তো থাকে আবর্জনায়। একটা নিরীহ গাছকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে তেলাকচু লতা। প্রচুর ফল ধরেছে, ছোট ছোট পটলের মতো। লজ্জাবতীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। প্রচুর মশা ডেঙ্গু অভিযানের জন্যে তৈরি হচ্ছে। দিন থাকতে থাকতে কামড়াতে হবে। রাত্তিরবেলায় নামবে গাইয়ে মশার দল।
বড়মামা বলেছিলেন, সিগন্যাল দেব, বলব, 'তারা-তারা'।
কানে এল, 'তারা-তারা।'
সঙ্গে সঙ্গে পলতে আগুন, কান ফাটানো শব্দ।
কোন আড়ালে বিশ্রাম করছিল একটা কুকুর! কুকুরদের সমাজেও মাস্তান টাইপের দু-একটা থাকে। এটা সেই রকমের। রাতে 'অ্যাকসান', দিনে বিশ্রাম। তেড়ে এসেছে। পরের দৃশ্য—আমি দৌড়াচ্ছি, কুকুর দৌড়চ্ছে, তার পেছনে কম্পাউন্ডারকাকু। শব্দ শুনে তিনটে দোকান ঝাঁপ ফেলে দিয়েছে। শিবুদার রেস্তোরাঁর বাইরের বেঞ্চিতে বসেছিল পাড়ার এক মাস্তান 'জ্যাকি', বুকের ছাতি ছাপ্পান্ন, আমাকে পকেটমার ভেবে আটকাবার চেষ্টা করতেই কম্পাউন্ডারকাকু চিৎকার করে উঠলেন, 'ডোন্ট, ডোন্ট, ফিজিও, ফিজিও।'
কুকুরটা তার বেপাড়ায় এসে পড়েছে দেখে আর এগোয়নি। কেটে পড়েছে।
জ্যাকি জিগ্যেস করছে, 'ফিজিও মানে?'
'আরে ও আমাদের ডাক্তারবাবুর ভাগনে। ডিসপেপসিয়ায় ভুগছে। ওষুধে নো উপকার, তাই কুকুর লেলিয়ে দৌড় করানো হচ্ছে। এক মাইল, দুমাইল, তিন মাইল।'
'দৌড়ে হবে না। আমার ভায়ের জিমে পাঠিয়ে দাও। অনেকরকম কোর্স আছে। একেবারে শেষ করে দেবে।'
'একটা মাত্র ভাগনে। শেষ করে দিলে হাহাকার পড়ে যাবে।'
'আরে মশাই ডিসপেপসিয়া শেষ করে দেবে। ওই রোগের দাওয়াই হল ওয়েট লিফটিং। চেয়ার তোলো, টেবুল তোলো, চালের বস্তা, গমের বস্তা। ডাক্তারবাবুর কাছে আমাকে একবার যেতে হবে, তখন আমি বলব। আমরা কী করতে আছি? আমাদের স্লোগান হল, সুস্থ ভারত। কম খাও, সবটা হজম করো। এক ভাগ স্থল, তিন ভাগ জল। দিনে একবার সপ্তাহে ছবার। যারা বেশি খায় তারা দেশের শত্রু। দেশ গঠনের কাজে আমরা নেমে পড়েছি। ডাক্তারবাবুকে আমরা চাই। অলিম্পিকে যেমন 'ম্যাস্কট' হয়। ডাক্তারবাবু সেই রকম আমাদের 'ম্যাস্কট'।
'বড়দা ডাক্তারি ছেড়ে দিচ্ছেন।'
'যাঃ, ডাক্তারি ছাড়া যায় না কি? একবার হয়ে গেলে, হয়ে গেল। সারা জীবনের মতো খতম। ডাক্তারবাবুকে উদ্ধার করতে হবে। আজে-বাজে কিছু লোক টাকা হাতাচ্ছে। আসলে মাথার ওপর কেউ নেই। মেজ ভাইটা ফালতু। পণ্ডিত। অহঙ্কারে মটমট করছে। আমার বাবাকে বলেছিল, আপনার বড় ছেলেটা তো লোফার হয়ে গেছে। তখন আমার কোমরের দু'পাশে দুটো মেশিন সব সময় মজুত। দু'হাতে চালাই—ঠাঁই, ঠাঁই, ঠাঁই। জ্যাকির নামে পাড়া-বেপাড়া কাঁপত। ডাক্তারবাবুর ভাই বলে ওই রাঙা মুলোটাকে কিছু বলিনি। এখন আমার ক্যানসার ধরা পড়েছে, বাঁচব না বেশিদিন। হাতি পাঁকে পড়লে চামচিকিতেও লাথি মারে। আগের মতো আর অ্যাকসান হয় না। এখন কেবল সুটসাট। তোলাবাজি। সব কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। একজনও নেই, যে আমাদের মতো দেশের কথা ভাবে। ডাক্তারবাবুর কাছে একবার যাব। মানুষটা ভীষণ ভালো। জাত মানে না। বজ্জাত বলে কখনো আমাকে বেইজ্জত করেননি। কেবল বলতেন, জ্যাক-ভঅ, সব সময় মনে রাখবি—হেলথ ইজ ওয়েলথ। জ্যাক-ভঅ মানেটা কী?'
কম্প-কাকু বললেন, 'বিদেশি শব্দ। এক ধরনের পাখি, গাছের উঁচু ডালে আকাশের কাছাকাছি সারাদিন বসে থাকে; আর জঙ্গল-কাঁপানো গলায় ভগবানের নাম গান করে।'
'আইব্বাস! আমাকে এত্তা বড় সম্মান! আমি ডাক্তারবাবুর কাছে যাব আমার মায়ের জন্যে। আমি মেরেকেটে আর বছর খানেক। মাকে তো সারাজীবন চোখের জল ফেলিয়েছি। ডাক্তারবাবুদের কাশীতে একটা বাড়ি আছে। কেউ থাকে না। মায়ের শেষ জীবনটা যদি ওখানে কাটে! আমি টাকাপয়সা, নগদ-ক্যাশ রেখে যাব। পাপের পয়সা নয়। সৎপথে রোজগার। আমারও ইচ্ছে, কাশীতে মায়ের কোলে এই ক্ষত-বিক্ষত দেহটা ছাড়ব। মণিকর্ণিকায় পুড়ে ছাই হবে। কাশীতে মরলে আর জন্মাতে হবে না। আমি খুব ভালো ছাত্র ছিলুম; কিন্তু কি যে কী হল সব! মিছা কথা ভাবিতে যে ব্যথা বড় লাগে প্রভু পরাণে।' আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ভাগনে! সাবধানে বড় হও, ভগবান হওয়ার দরকার নেই। একটা ভালো মানুষ হয়ে নিজের মতো থাকো। আমার কাছে অনেক ভালো ভালো বই আছে। তোমাকে দিয়ে যাব।'
দুই
চায়ের আসর। বড়মামা আজ সবার আগে এসে নিজের চেয়ারে বসে পড়েছেন। খাঁকি পোশাক। কেমন যেন ব্রিগেডিয়ার ব্রিগেডিয়ার লাগছে। যুদ্ধে-টুদ্ধে যাবেন না কি! মাসিমা আসছেন। দূর বারান্দায় দেখতে পাচ্ছি। হরিদা সঙ্গে রয়েছে। দুজনেই উত্তেজিত। কানে আসছে, মাসিমা বলছেন, 'গাছের অত সুন্দর প্রথম লাউটা চুরি হয়ে গেল, আর আমরা পড়ে পড়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোলুম। তুমি না কি সারা রাত জেগে থাকো, জপ-ধ্যান কর!'
'ওই ভোরের দিকে যখন চোখ লেগে যায়, চুরিটা সেই সময় হয়েছে। হাতের নাগালেই ছিল, ক্যাচ করে...'
'যে ক্যাচ করল, তাকে ক্যাচ করা গেল না—এই তো? চুরি, ছিনতাই, দেশটার কী হাল হল! সামান্য একটা লাউ তাও চুরি!'
'দিদি! লাউ আর সামান্য নয়। বাজারে সবজির এখন খুব দাম।'
মাসিমা বড়মামার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এই যে, গা এলিয়ে বসে আছেন হাবিলদার। ওই যে আর একজন, লতানে লবঙ্গলতিকা, শেক্সপিয়ার, কলির কিংলিয়ার।'
বড়মামার হাতে বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে প্রেয়ার হুইল। একদিন মাঝরাতে অশরীরী তিব্বতী ধর্মগুরু কুট হুমি দিয়ে গেছেন। প্রকৃত তথ্য—ভুটানে গিয়েছিলেন ডাক্তারদের সভায়। সেই সময় এক মনাস্ট্রি থেকে কিনেছেন। একটাই কথা—জগতের পরিবর্তন নয়, নিজের পরিবর্তন। আমাকে একটা ডায়েরি দিয়ে বলেছেন, মনটাকে নীল আকাশে পায়রার মতো উড়িয়ে দিবি, মনে ভাব আসবে, ভাষা আসবে, চটপট লিখে ফেলবি। সেই ডায়েরিতে মাঝে মাঝে তিনিও লেখেন। কাল লিখেছেন,
How doth little busy bee.
lmprove eaeh shining hocr,
And gather honey all the day
From every opening flower.
মেজমামা চেয়ারে নিজেকে অ্যাডজাস্ট করতে করতে বললেন, 'এই ভাবেই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, সাম্রাজ্যের পতন হয়, গুপ্তঘাতকের হাতে নৃপতির মৃত্যু হয়, রামচন্দ্রের বনবাস, সীতাহরণ। লঙ্কা দহন, হনু-নৃত্য, সুতানুটি, গোবিন্দপুর, সিপাহি বিদ্রোহ, মঙ্গল পাণ্ডে, জুলিয়াস সিজার, মেটিয়াব্রুজ...'
মাসিমা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন।
বড়মামার হাতে লাট্টু ঘুরছে; তিনি শুরু করলেন,
আনিমুলা ভাগুলা ব্লাণ্ডুলা,
হশপেস কমেস কিউ করপোরিস
পাল্লিডুলা বিজিতা নুড়ুলা
হোককাইডো, হলুলুলু, কামকাটসকা
মাসিমা তেড়েফুঁড়ে উঠে বললেন, 'আজ এসপার-ওসপার, সব গাছ টেনে তুলে বাগান ধ্বংস করে দেব, যে-বাড়িতে দুটো বীর হনুমান, সে বাড়িতে ভালো কিছু হবার নয়। হরিদা কাটারিটা নিয়ে চলো তো।'
বড়মামা হুঁ-হুঁ করে কিছুক্ষণ সুর ভেঁজে সামান্য ধরা ধরা গলায় গাইতে লাগলেন,
ওই দেখা যায় বাড়ি আমার
চারিদিকে মালঞ্চ বেড়া,
ভ্রমর সেথায় গুনগুন করে
কোকিলেতে দিচ্ছে সাড়া।
'বালিকে! উত্তেজনা প্রশমিত করো। তোমার অলাবু আমার এই ব্যাগে।'
বড়মামার পায়ের কাছে নীল রঙের একটি ব্যাগ। ব্যাগের গায়ে বড় বড় করে লেখা—'রক্তদান, জীবন দান'। নীচু হয়ে বোঁটা সমেত লাউটি টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়ালেন। হাত জোড় করলেন। বললেন, 'উঠে দাঁড়াও সকলে, বন্দনা করো। আজ 'অবতরণ দিবস'। আমি 'নিমপিঠের' কৃষিমেলায় কৃষি প্রদর্শনী দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আজ এই অসাধারণ, নিখুঁত সুন্দর লাউটি দিয়ে এই বারান্দায় একটি একক প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হল। এর পাশে এই দুটি চিচিঙ্গা, ছটি করলা, একটি গন্ধরাজ লেবু, তিনটি শসা, ও ভিমের গদার আকৃতি এই সুবৃহৎ মানকচুটি এই আসরে স্থাপিত হল; এবং আমাদের উদ্যানপালিকাকে এই পদকটি পরিধান করাতে চাই—'উদ্যানশ্রী', তিনি লক্ষ্মী, সরস্বতী কম্বাইনড, কখনো শীতলা, মনসা কখনো—আপনারা তাঁকে সম্মান জানান। এই লাউটি শুষ্ক হইলে আমাদের সাধকভাই হরিদা এটি একতারা বানাইয়া হরিনাম করিবে। এখন সমবেত সঙ্গীত—
সাধের লাউ, সাধের লাউ
বানাইল মোরে বৈরাগী।
মাসিমা লাউটিকে কোলে নিয়ে আঁচল দিয়ে মোছাতে, মোছাতে বলতে লাগলেন, 'পাগলের পাল্লায় পড়েছিস মা! আরো কত বড় হতিস।'
মেজমামা বললেন, 'না, না, ঠিক আছে, কচি লাউই ভালো, চিংড়ি দিয়ে।'
বড়মামা ধপাস করে বসে পড়লেন। হাহাকার করে উঠলেন, 'হবে না, হবে না, এদের কিস্যু হবে না। উদর সর্বস্ব। লোভী। বড়ি এবং নারকোল কোরা সহ আর একটি সুস্বাদু, স্নিগ্ধ পদ প্রস্তুত করা যায়—তামসিক মন সেদিকে গেল না—গেল পোকা-মাকড়ের দিকে। আমি ব্যথিত, লজ্জিত, মর্মাহত...।'
মেজমামা বললেন, 'দেখলে, বাঙালির দল কী ভাবে ভেঙে যায়। আমি অধ্যাপনা ছেড়ে কাল তোমার যাত্রার দলে যোগ দিলুম। আমি একটা অ্যাসেট। আমার প্রতিভা, আমার চেহারা, কণ্ঠস্বর! এখনো চব্বিশ ঘণ্টা কাটেনি, তুমি আমাকে সর্বজন সমক্ষে যার পর নাই অপমান করছ! সব লাউয়েই কি একতারা হয়! অত বাউল কোথায়! যেমন সব মানুষ কি বাউল হয়!'
বড়মামা বললেন, 'আমি দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তুমি দল ত্যাগ কোরো না। এই অপেরার সমস্ত দায় দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। কারণ আমি এক যুগান্তকারী, অতি বিপজ্জনক পরীক্ষা করতে চলেছি।'
'কী পরীক্ষা?'
'বিরাট একটা অজগর সাপের পেটে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করব। পরিবেশ, পরিস্থিতি, আবহাওয়া, আলো অন্ধকার, সম্পদ। ওই জগতটার খবর তো কেউ জানে না। এই অভিযান থেকে যদি বেঁচে ফিরে আসতে পারি, তাহলে ডবল নোবেল পুরস্কার।'
'বেঁচে ফেরার কোনো চান্স নেই। একমাস পরে অজগরের পেট থেকে খানিকটা পটি বেরোবে। আধার কার্ডটা সঙ্গে রেখো, ওটা হজম করতে পারবে না। ওইটা দেখে তোমার পরিবর্তিত অবস্থাটা আমরা নিঃসন্দেহে চিনে নিতে পারব।' মেজমামা বেশ গম্ভীর মুখে আরো একটি কথা বললেন, যা অঙ্ক—একটা ইকোয়েসান—বড়মামা অজগরের 'পটিতে' পরিণত হলে, কতটা ওজন হবে! তিনি ছোটখাটো একটা লেকচারও দিলেন। সব বস্তুরই দুটি ভাগ—সার ও অসার; যেমন, একসের সন্দেশ। তুমি খেলে, তারপর বেরিয়ে এল বিশ্রী একটি বস্তু; তার ওজন কত? ধরা যাক আমার ওজন চল্লিশ সের। সুন্দরবনের রয়াল বেঙ্গল পুরোটাই খেয়েছে—না, না টাইগারে খেলে হবে না, সে ব্যাটা হাড়গুলো চিবোবে, থু-থু করে বাইরে ফেলে দেবে—আমাদের কাঁটা বেছে মাছ খাওয়ার মতো। ট্যাবলেটের মতো কোঁত করে গিলতে হবে! অতএব অজগরই এই পরীক্ষার জন্যে 'গুড সিলেকসান'! খেয়েছে চল্লিশ কেজি ওজনের ক্যাপসুল। ওয়েট অ্যান্ড সি। কবে, কখন, কোথায় তোমাকে পরিবর্তিত আকারে রিলিজ করে! আমার চল্লিশ কেজি ওজনের বড়দার প্রকৃত ওজন কতটা? এইটাই হল আসল মাল।'
'এত কথা বলিস কেন? এত কথা? আমার গুরু সেদিন মাঝরাতে এসে খোঁচা মেরে আমাকে ঘুম থেকে তুলে একটা কথাই তিনবার বলে জানলা গলে বেরিয়ে গেলেন, বললেন, বিষ্ঠা আর চন্দন এক, এক, এক। জগতে এক ছাড়া দুই নেই রে মূর্খ! একটা ঘটনা শোন, এক মহাপুরুষের কাছে এক যুবক এসে বলছে, 'প্রভু! আমাকে দীক্ষা দান করুন।' মহাপুরুষ বললেন, 'আপত্তি নেই। তবে তোমাকে আমি পরীক্ষা করে নিতে চাই।' 'বলুন, কী পরীক্ষা?'
'তুমি আগে সমস্ত তীর্থ পরিদর্শন করে, আমার জন্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট যে বস্তু, সেই বস্তুটি নিয়ে এসো।'
'যুবকটি সমস্ত তীর্থ পরিদর্শন করল। হন্যে হয়ে খুঁজছে নিকৃষ্টতম বস্তু। কী হতে পারে সেই বস্তুটি? বড় কঠিন পরীক্ষা। না, হল না। ডাহা ফেল। হতাশ যুবক, ফিরে আসার পথে দেখেছে, পথের একপাশে খানিকটা বিষ্ঠা পড়ে আছে। আরে! এই তো, এই তো সেই জঘন্য, নিকৃষ্টতম বস্তু। এই খানিকটা তুলে নিয়ে যাই। হাত বাড়িয়েছে...। হঠাৎ কণ্ঠস্বর—বিষ্ঠা কথা বলছে—'কী চাও?'
'তোমার কিছুটা আমি নিয়ে যেতে চাই। আমার যিনি গুরু হবেন, তিনি আমাকে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম বস্তু আনতে বলেছেন।'
'তোমার বিচারে আমি সেই বস্তু তাই তো? তা হলে শোনো, কাল রাতে আমি ছিলুম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখাদ্য—তোমার মতো একজন মানুষের সংসর্গে এসে আজ আমার এই অবস্থা।'
গুরুর কাছে ফিরে এসে সেই যুবক মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে। গুরু প্রশ্ন করলেন, 'কী হল, এনেছ?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ।'
'কই দেখি।'
'এই যে আমি।'
'ধাতঃ! বুঝতে পারলে আশা করি। আমি কতটা বিষ্ঠা হতে পারি, তুমি জানতে আগ্রহী? ওরে! আমি যে তারো চেয়ে নিকৃষ্ট এক বস্তু। আমি কী তোমাদের অনুমতি নিয়ে একটি গান শোনাতে পারি?'
মাসিমা বললেন, 'নাচটাই বা বাকি থাকে কেন?'
'ভগিনী! যথা সময়ে নৃত্যও দেখবে, আপাতত সঙ্গীতে পরিতুষ্ট থাকো। এটি বাউল গান। পুরোটা আমি গাইব না; সেই জায়গাটি গাইব, যাতে আমার এই খাতাটির সামান্য জ্ঞানোদয় হয়। আমার গলাটা আজ ঠিক টিউন-এ নেই, তবু আমি চেষ্টা করব।'
হরিদা বললে, 'আমি গলা লাগাব?'
'আমি যখন ইশারা করব।'
বড়মামার গান:
চল গুরু দুজনে যাই পারে।
আমার একলা যেতে ভয় করে।।
এ দেহ ছিল শ্মশানের সমান।
গুরু এসে মন্ত্র দিয়ে করল ফুলবাগান।।
বড়মামা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছেন—'গেট আপ, গেট আপ, দু-হাত তুলে নাচো সবাই, নাচো, নাচো।
নাচে বাহু তুলে, ভাবে ভুলে, বম বম ববম বাজে গাল জটা জলদজাল।
মাসিমা হাত বাড়িয়ে লাউ, চিচিঙ্গা সব সরাতে যাচ্ছিলেন, বড়মামা হাঁ হাঁ করে উঠলেন, 'ও নো নো। প্রদর্শনী। আমি ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করব। এই প্রদর্শনী সাতদিন চলবে।'
বড়মামা চেয়ারে বসে বললেন, 'এই, তোমাদের সঙ্গে বসে ক'টা দিন আনন্দ করা। সামনের মাসে বাই দিস টাইম আমি থাইল্যান্ডে। এক্সপেরিমেন্টটা পরিচালনা করবেন, ডক্টর বার্টন। সেই পাইথনটাকে ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটা বাগানে কর্মরত এক মহিলাকে আস্ত গিলে ফেলেছিল। জুতো দুপাটি বাইরে পড়েছিল। স্কুবা ডাইভিং-এ সাতদিনের একটা কোর্স আমাকে করতে হবে। পাইথনটাকে প্রথমে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার গেলানো হবে। তাহলে কী হবে? তার বিশাল উদর গহ্বরটি হবে অক্সিজেনের তাঁবু। আমি ডুবুরির পোশাক পরে প্রবেশ করেছি। আমার সঙ্গে রয়েছে ডিজিট্যাল ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার, ট্র্যানসমিটার আর লেসার। প্রথমেই তার পরিপাক যন্ত্রটি অকেজো করে দেব। সমস্যা একটাই আমি তো মাথাটা ঢুকিয়ে প্রবেশ করেছি। আমার পা দুটো তার মুখের দিকে। বেরোবার সময় শরীরটাকে ঘোরাতে হবে—সেই স্পেস কি পাব?'
মেজমামা বললেন, 'তুমি মুখ দিয়ে ঢুকে নীচের ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আসবে। নো প্রবলেম। কয়েক কেজি জোলাপ নিয়ে প্রবেশ কোরো।'
কম্পাউন্ডারকাকু এসে বললেন, 'জ্যাকি এসেছে মাকে নিয়ে। এখানে আনব?'
এতক্ষণ বড়মামা মজা করছিলেন, এইবার সিরিয়াস। বললেন, 'নিয়ে এসো, নিয়ে এসো।'
মায়ের মতো সুন্দরী এক মহিলা। আগে দু-একবার সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়িতে হঠাৎ, হঠাৎ দেখেছি। আজ দেখছি রোদ ঝলমলে দোতলার চওড়া বারান্দায়। মাসিমার অপরাজিতা লতার নীল আর হালকা নীল ফুলের শোভায় বারান্দার থামগুলো ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। জীবন্ত যেন! চেয়ার থেকে সকলেই উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন, 'আসুন, আসুন।' আমার মাসিমার তো কোনো তুলনা নেই, এগিয়ে গিয়ে হাত ধরেছেন। ভদ্রমহিলা মাসিমার মাথায় ডান হাতটা রেখে মিষ্টি গলায় বললেন, 'তুমি ভালো আছ?'
না, জ্যাকিদা আর বলব না। অনেকদিন মারা গেছে। সেই রাজনীতিক দলটারও এখন শেষ অবস্থা। জ্যাকিদা এখন জগন্নাথদা। সুন্দর বনেদী চেহারা। আগের চেয়ে অনেক ফর্সা। সাদা শার্ট, হালকা রঙের প্যান্ট।
বড়মামা, মেজমামাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার চেষ্টা করলেন।
বড়মামা বললেন, 'সেই কবে একবার এসেছিলেন!'
জগন্নাথদা বললেন, 'আমার জন্যেই মা কোথাও যেতে পারত না। আমি তো কলঙ্ক।'
বড়মামা অদ্ভুত একটা কথা বললেন, 'শোনো, শোনো, হিরের আংটি রামচন্দ্রের আঙুলে, হিরের আংটি রাবণের আঙুলে, দোষ আংটির নয়। আমার চোখে, আমার বিচারে তুমি হিরে। তুমি 'ভিকটিম'। আমি তোমাকে চিনি। অতীত ভুলে যাও।'
জগন্নাথদার মাকে আমি কী বলব? 'বড়মাসি'। বড়মাসি বললেন, 'সব আগের মতোই সুন্দর আছে। আরো সুন্দর হয়েছে।'
বড়মামা বললেন 'সব আমাদের ওই বোনের কৃতিত্ব। এই যে টেবিলের ওপর কৃষি-প্রদর্শনী। ফার্মিং। ও উদ্যানপালনের দিকে এগোচ্ছে। ডাক্তারি আমার ভালো লাগছে না, আমার ভাইয়েরও ভালো লাগছে না অধ্যাপনা। সবই কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে।'
বড়মাসি বললেন, 'আমি একটা প্রার্থনা নিয়ে এসেছি। বারো বছর হয়ে গেল, ওর বাবা তো ফিরে এল না—নেই, সে আর নেই। শাস্ত্র মেনে এইবার তার শ্রাদ্ধ করতে হবে। আমার জীবনে দুটো অপেক্ষা ছিল—সে ফিরে আসবে আর জগা মানুষের মতো মানুষ হবে।'
বড়মামা বললেন, 'আমি মনে করি, আপনার জগন্নাথ একজন মানুষের মতো মানুষ। সে একদল সমাজবিরোধীকে এতকাল দাবিয়ে রেখেছে। এ পাড়ার ছেলে-মেয়েদের সে নিরাপদে রেখেছে। আমরা রাতে শান্তিতে ঘুমোতে পারি। কত বড় স্যাক্রিফাইস!'
মা বললেন, 'আমি একটা আশা নিয়ে এসেছি, কাশীতে আপনাদের একটা বাড়ি আছে, আমার এই অসুস্থ ছেলেটাকে নিয়ে সেখানে কিছুদিন থাকতে চাই। যদি অনুমতি করেন!'
বড়মামা বললেন, 'বাবার আমলে আমাদের এই দুটো পরিবার খুব কাছাকাছি ছিল, এ-বাড়ি আর ও-বাড়ি। তারপর সময় বদলে গেল। রাজনীতির কাস্তে কুড়ুলে মানুষে মানুষে ভাব-ভালোবাসার সম্পর্ক ভেঙে পড়ল। জগার চিকিৎসা আমি করব। ওকে বিলেতে নিয়ে যাব; সেখানে অনেক উন্নত পদ্ধতি বেরিরেছে।'
জ্যাকিদা বললে, 'দাদা, আপনি আমার সত্যিকারের দাদা; একটা কথা বলি, আমি আর বাঁচাতে চাই না। এই দেহটা পাল্টাতে হবে। কালো কালো দাগ লেগে গেছে। এ আর ওঠার নয়। বাবা বিশ্বনাথ আমাকে ডাকছেন। মা অন্নপূর্ণা আমাকে ডাকছেন। আমি আমার এই মায়ের কোল থেকে ওই মায়ের কোলে চলে যাব। মণিকর্ণিকায় জ্বলছে চিতার পর চিতা। ছাই হয়ে ভেসে চলে যাব সাগরে। দাদা এক সময় আমি লিখতুম। ভাবতুম আমি মস্ত বড় এক কবি হব। জীবনের অন্ধকারে কবিতার কারাবাস। অক্ষরগুলো সব ডোরাকাটা জামা পরা কয়েদি। মা গঙ্গা দু-হাত বাড়িয়ে আমাকে লুফে নেবেন। নাচতে নাচতে দোলাতে দোলাতে ঘুম পাড়িয়ে শুইয়ে দেবেন মহাসাগরের বুকে।
মহাদেব মহাপ্রাণ মহাযোগিনমীশ্বরম।
মহাপাপহরং দেব মকারার নমোনমঃ।।
জ্যাকিদা মায়ের কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজিয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। কোলের ওপর ফেলে রাখা ডান হাতটা থির থির করে কাঁপছে। আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে আছি। মায়ের কাঁধ থেকে ধীরে ধীরে মাথাটা তুলে জ্যাকিদা মৃদু গলায় বললে, 'মাঝে মাঝে মাথাটা ঘুরে যায়, তখন সব অন্ধকার। ও কিছু নয়, ও কিছু নয়।'
তিন
আমার বড়মামার সব কিছুই বড় বড়। আমাকে রোজই একবার করে বলবেনই বলবেন, 'থাকবি ছোট আর ভাববি বড়।' আবার বলবেন, 'কাজে আনন্দ, আনন্দে কাজ।' আবার শেখাবেন কোন কোন প্রাণীর কাছ থেকে কী, কী নিতে হবে—গন্ডারের গোঁ, গজের গতি, কাকের কেরামতি, চামচিকির চক্কর, আরো কত কী?' বড়মামা রেলের পুরো একটা কামরা ভাড়া করেছেন। আমরা কাশী যাচ্ছি। বড়মামা, মেজমামা, মাসিমা, আমাদের মানুদি, হরিকাকু, কম্পাউন্ডারকাকু, জ্যাকিদা, তাঁর মা, আর ইন্দিরা। ইন্দিরার মা মারা গেছেন। তার বাবা বিদেশে চাকরি করেন। ইন্দিরাকে দেখাশোনা করেন বৃদ্ধা ঠাকুমা। বড়মামা ইন্দিরাকে খুব পছন্দ করেন। সত্যি কথা বলতে কী—আমার একটু হিংসেই হয়। মিষ্টি মেয়ে। তার মানে, আমি একটা তিক্ত ছেলে। ইন্দিরা মিষ্টি আপেল; আমি একটা তেঁতো করলা। আমার ডায়েরিতে এই সব আমার লেখা রইল। মনের কথা বলার তো কেউ নেই। কাকে বলব! সকাল থেকে শুধু উপদেশই শুনি। মানুষ হতে হবে। আমি কি গরু! নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আমি কি শুয়ে আছি? এমন একটা কাণ্ড করতেই হবে, যাতে মানুষ আমাকে চিরকাল মনে রাখে। তার মানে, মরে গিয়ে মূর্তি হতে হবে। 'ফুল' না হতে পারলেও 'হাফ বাস্ট।'
আমি কারোকে কিছু বলব না। আমার ঠিক করাই আছে। কাশী থেকে সোজা উঠে যাব হরিদ্বার; তারপর পাকদণ্ডী পথে হিমালয়ে। পরিষ্কার একটা গুহা বেছে নিয়ে ধ্যানে বসে যাব। ভগবান গুরু পাঠিয়ে দেবেন। সিদ্ধিলাভ করে নেমে এসে কাশীর কেদারঘাটে বসে পড়ব। মাথায় জটা, বুক পর্যন্ত ঝোলা দাড়ি। পাশে একটি ত্রিশূল, কমণ্ডলু। ব্যোম শঙ্কর। হর হর মহাদেব। আমার তখন নাম হবে কেদারবাবা। চোখ দিয়ে বেরোবে লেসার বিম। গা দিয়ে কারেন্ট। যার দিকে তাকাব সে ফুটো ফুটো হয়ে যাবে। যাকে স্পর্শ করব, সে নেতিয়ে পড়বে। বিধ্বংসী পাওয়ার। চারদিকে রব উঠবে—বাবা, বাবা। সব ভেউ ভেউ করে কাঁদবে। আমি শুধু একটা আঙুল দিয়ে টাচ করে দেব। অজ্ঞান। বাতাস স্তব্ধ করে দেব। শ্বাস নিতে কষ্ট হবে। করুণ কণ্ঠে হাঁস-ফাঁস করতে করতে বলবে—'কেদারবাবা,' 'কেদারবাবা!' তখন আমার বডি ওয়েট হবে তিন মন বাইশ সের। আমার দুটো শত্রু। একটা ওই নন্দিতা। জানলার ধারে ট্যাঁপা ট্যাঁপা গালে লম্বা লম্বা দুটো আঙুল আলতো ফেলে রেখে কেমন বসে আছে। ট্রেন ছুটছে ভোঁ-ভোঁ। ফুরফুর করে চুল উড়ছে। নিজেকে ভাবেটা কী। সিনেমার নায়িকা!
আর একটা শত্রু দোয়েল। স্কুলের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমি নিচের মাঠে আমার সাইকেলের চেনটা ঠিক করছিলুম। ঢাঁই করে পিঠে কী একটা এসে পড়ল। চকলেট। ওপর দিকে তাকালুম। দোয়েল অত্যন্ত অপমানজনক একটা মুখভঙ্গি করলে। আমি সেই চকলেটটা টিপ করে ছুঁড়লুম। নাকের ডগায় লাগল। ফ্যাঁচ করে হাঁচি। চকলেটটা আবার ছুঁড়ল। ছোঁড়া-ছুঁড়ি যখন বেশ জমে উঠেছে মিতালিম্যাম, মর্নিং সেকসানের বড়দি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। যত দোষ নন্দ ঘোষ। হেডস্যারের ঘরে বিচার সভা। দোয়েল বললে, 'ও রোজ আমাকে চকলেট ছুঁড়ে মারে।'
মানে, কী ধরনের মিথ্যেবাদী! এরা একদিন মা হবে। ছেলে মানুষ করবে! ভাবা যায়। কেদারবাবা! তুমি ভাবতে পারো? হেডস্যার বললেন, 'ছেলেদের এই গোঁপ বেরোবার কালটা ভেরি ভেরি ডেঞ্জারাস।'
হেডস্যার অস্ত্রটা, অর্থাৎ চকলেটটা ভালো করে দেখতে দেখতে লাফিয়ে উঠলেন, হোয়াট ইজ দিস! ভালোবাসি। কী সাংঘাতিক বানান! ওরে মূর্ধন্যা'স' দিয়ে ষাঁড় হয়, গুঁতিয়ে পেট ফেঁড়ে দেয়। ভালোবাসা ভেরি সফট। কোমল। টক খেলে দাঁত যেমন সিসসির করে, সিসসির, সিসসির—সৃষ্টির আদি কথা ভালোবাসা, দন্ত্য 'স'। তোরা বাংলা ভাষার সর্বনাশ করে দিলি। ভাষাকে ভালোবাস আগে। শ, ষ, স, ন, ণ, র, ড়, ঢ়—কিছুতেই তোরা শিখবি না! অশিক্ষিত, বর্বর, টার্টার, হুন। আমার কাঁদতে ইচ্ছে করছে। পতির শোকে সীতার মতো। লেখ সতী বানানটা লেখ।'
আমিও তো তেমনি! লিখলুম— স ত ি/ী—either/or।
কাগজটা হাতে নিয়ে স্যার স্তব্ধ। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। মিতালি দিদিমণির হাতে কাগজটা তুলে দিয়ে বললেন, 'স্কুলটা তুলে দাও। একটা কারখানা, করবখানা, কি পায়খানা করে দাও। আমি কাশীবাসী হব।'
দিদিমণি বললেন, 'স্যার! আপনি ভাষা, বানানের দিকে চলে গেলেন! কথাটা হচ্ছিল, একটা ছাত্র আর ছাত্রীর মধ্যে 'ভালোবাসা' লেখা চকোলেটের ক্ষেপ ও প্রক্ষেপ।'
স্যার ভীষণ উত্তেজিত হয়ে গলাবন্ধ কোটের গলায় বোতামটা খুলে দিয়ে বললেন—'ভালোবাষা ইজ নট ইওর ভালোবাসা—আগে ওদের শিক্ষিত করুন, তারপর বিবাহের কথা ভাবা যাবে। কেস ডিসমিসড।'
আমি আমাদের দেয়াল ম্যাগাজিনে একটা ছড়া লিখলুম—
ন্যাড়া গাছের ডালে বসে
দুল দুল দুল দুলছে দোয়েল
কাকের ঠোকোর খাবে যেদিন
দোলা দুলি বেরিয়ে যাবে।
এরপর আর চকলেট নয়। বাতাসে ভেসে এল একটা টিস্যু পেপার, তিন ফোঁটা জলের দাগ।
একের পর এক সাজানো, গোজানো স্টেশন, অপেক্ষমান যাত্রী, বাক্স নিয়ে পেছন দিকে চলে যাচ্ছে। কত রকমের মানুষ। স্টেশন চলে যাওয়ার পরেই আসছে গ্রাম, সবুজ মাঠ, বড়-ছোট পুকুর, পল্লী চিত্র, ফাঁকা মাঠ। হঠাৎ পাশে এসে বসল নন্দিতা। হাতের তালুতে একটা চকোলেট ঢুকিয়ে দিয়ে বললে, 'খাও। কী ভাবছ তখন থেকে?'
কেমন করে বলব—কী ভাবছি? আমার কাছে রয়েছে একটা বই 'বারাণসী'। যে-জায়গায় যাচ্ছি, সেই জায়গার সব কিছু জানতে তো হবে। তবেই না, ভ্রমণটা ঠিক ঠিক হবে। বইটা দেখিয়ে বললুম—'এই যে কাশী। এতে সব আছে। কোথায় যাচ্ছি সেটা জানতে হবে তো! এই দেখ কী লেখা আছে, পড়ছি শোনো—শহরটি উচ্চ অর্ধবৃত্তাকার নদীতীরের উপর অবস্থিত, ক্রমশ তা নেমে এসেছে একেবারে জলের কিনারায়। মসজিদ, প্যাগোডা, মন্দির নানা ধরনের সৌধ কিংবা হরেক অর্চনাস্থল পর্যন্ত উঠে আসা বিশাল সোপানশ্রেণি, বেগবান জলপ্রবাহ এবং নদীটির দর্শনীয় বিস্তার...বাংলাটা একটু খটমট লাগছে—তাই না?'
'ঠিক বলেছ। একটু সহজ করে লিখলে বেশ হত।'
'আমরা এই সব ঘাটে যাব—দশাশ্বমেধ, অসিঘাট, তুলসীদাস ঘাট, পরেশনাথ ঘাট, হরিশচন্দ্র ঘাট, মণিকর্ণিকা, কেদারঘাট, এই ঘাটের কাছেই আমাদের বাড়িটা। এই ঘাটে আমি সারারাত বসে থাকব। মহাদেব আসবেন, আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবেন হিমালয়ে, কেদারনাথে, সেইখানেই তাঁর মন্দির, দুর্গম, চতুর্দিকে বরফ, মন্দাকিনী নদী, হুড়হুড় জলের শব্দ, চারদিকে বরফ, শন শন বাতাস, কী ভীষণ ঠান্ডা...!'
'আমি তোমাকে জড়িয়ে রাখব, আমার একটা কুটকুটে কম্বল আছে।'
'তুমি কী করে যাবে? মহাদেব তোমাকে নিয়ে যাবেন কেন?'
'সোমবার, সোমবার বাবার মাথায় কে জল ঢালে, শিবরাত্তিরে কে উপোষ করে! তুমি না আমি?'
'আমি তো আর ফিরব না, আরো ওপরে উঠে যাব। চল্লিশ বছর পরে ফিরে আসব এই কাশীতে কেদারঘাটে, তখন আমি কেদারবাবা। যাঃ, প্ল্যানটা বলে ফেললুম, তুমি কিন্তু কারোকে বলবে না। তিন সত্যি!'
'আমাকে সঙ্গে না নিলে, বলে দেব। সাফ কথা।'
'কী আশ্চর্য! আমি তো সন্ন্যাসী হব। গুহায় আমার গুরু বসে আছেন।'
'জানি তো। তিনি আমাকে বলেছেন, দোয়েলের হাত থেকে বোকাটাকে উদ্ধার করে আমার কাছে নিয়ে আয়।'
'দোয়েল?'
'দোয়েল, চকলেট, কবিতা, কাক হয়ে ঠোকরাবে।'
'কে বলেছে?'
'দোয়েল।'
'মিথ্যে কথা।'
'সত্যি-মিথ্যে জানি না, কেদারবাবা! তুমি আমার।'
জীবনে এই প্রথম শুনলুম—এত বড় একটা পৃথিবীতে একজন আমাকে বললে—'তুমি আমার'। মনের এই একটা দোষ, সুযোগ পেলেই চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসে; কখনো আগুন, কখনো জল। নন্দিতা বলছে, 'এই চোখে জল কেন? কাঁদছ না কি?'
'না না, কিছু পড়েছে, টড়েছে।'
'না, তুমি কাঁদছ।'
'হ্যাঁ, কাঁদছি। আমাকে কেউ কখনো ভালোবাসেনি। কেবল উপদেশ। আমি যেন একটা দোকান। তাই তো আমি এইখান থেকেই অদৃশ্য হয়ে যাব। আমি কিচ্ছু চাই না।'
'আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না?'
'তুমি তো একটা মেয়ে।'
'তার মানে?'
'তুমি তো এখনো ছোট মেয়ে। যখন বড় হবে তখন?'
'গতকাল আমি ষোলো বছরে পড়েছি—তার মানে অ্যাডাল্ট। কচি খুকি নই। এইবার ভোটার লিস্টে নাম উঠবে।'
'আমি তো ছাত্র, জানো মেয়েদের কথা ভাবলে পরীক্ষায় ফেল করে। বড়মামা আমাকে বিলেতে পাঠাবেন, ডাক্তার হব। এফ আর সি এস, এম আর সি পি।'
'পাগলের মতো কথা। ওই জন্যেই দোয়েল তোমাকে ছাগল বলে।'
'বলুক গে।'
'তুমি জানো না। তুমি মেয়েদের কিচ্ছু কিচ্ছু জানো না। দোয়েল তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে। ওরা ক'দিন আগে পুনাতে চলে গেল। ওর বাবা ওখানে বিরাট একটা কারখানা করেছেন। আমাকে কী বলে গেল জানো, ছেলেটাকে তুই দেখিস। ওর মুখটা ভারি করুণ।'
'তাই বুঝি তুমি আমাকে এই সব বলছ?'
'আজ্ঞে না। আমি বলছি আমার মনের কথা। মেয়েরা ভালোবাসলে ছেলেদের জীবনে সুখ আসে, উৎসাহ আসে, সাফল্য আসে। তারা বড় থেকে আরো বড় হয়। সব সময় গোমড়া মুখ করে বসে থাকে না, আবোল তাবোল কথা বলে না। হিমালয়ে চলে যাব বলে না। পাগলামি করে না।'
ট্রেন একটা বড় স্টেশনে ঢুকছে। মোগলসরাই, মোগলসরাই। নন্দিতা চমকে উঠল, 'আমার বাবা এইখানেই কাজ করতেন। মোগলসরাই।'
হরিদা ওদিক থেকে এদিকে চলে এসে বললেন, 'ট্রেন এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াবে। প্ল্যাটফর্মে নামবে না কি? কী একটা বই নিয়ে একপাশে বসে আছ!'
মোটঘাট মাথায় নিয়ে মানুষের দৌড়াদৌড়ি। চিৎকার। চার-পাঁচজন সাধু পাশের কামরায় উঠছেন। নন্দিতা বললে, 'নামব, আমার বাবা এখানে ছিলেন।'
কী হল জানি না, খপ করে ওর হাতটা চেপে ধরে বললুম, 'না, তুমি নামবে না। কখন ঝপ করে ট্রেন ছেড়ে দেবে, দৌড়ে উঠতে গেলে পড়ে যাবে। তখন কী হবে? কী হবে তখন?'
নন্দিতা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা মুখ। আকাশের চাঁদের চেয়েও কাছে। আমার ডায়েরিতে লিখে রাখি— 'আমার বুকে হল আজ চাঁদের উদয়!' এইবার নন্দিতার চোখে জলের জোয়ার।
লিখে রাখি, 'দুটো শুকনো গাছে বৃষ্টির জল। সবুজ পাতার নাম? কী নাম বলো তো!'
চার
কেদারঘাট। উল্টোদিকে বিশাল এই বাড়ি। সব পাথর। দেয়াল, মেঝে। উঁচু উঁচু সিলিং। হরিদা বলছে, 'কী পেল্লায় বাড়ি। হারিয়ে না যাই!'
কেয়ারটেকার পরিবারটি খুব ভালো। সরকারের শিক্ষাবিভাগে চাকরি করেন। পণ্ডিত অযোধ্যা নাথ। ফর্সা ধবধবে। নাকটা খুব উঁচু। মুখটা একটু লম্বাটে। সব সময় হাসছেন। শরীরে চন্দনের গন্ধ। তাঁর কাজের লোকটির নাম পাণ্ডে। বেঁটে, কিন্তু ভীষণ চেহারা। মুগুর ভাঁজেন। মাথার ওপর ভারী পাথর তোলেন। মহাবীরের সেবা করেন। একবার বুকের ওপর দিয়ে হাতি চালিয়েছিলেন।
দোতলায় গঙ্গার দিকে টানা বারান্দায় বসে এই সব কথা হচ্ছিল। বড়মামার মুখে হাসি ফুটেছে। জ্যাকিদা একটু সুস্থ বোধ করছেন। ব্যায়াম, কুস্তি তাঁর বিষয়। এক সময় খুব করেছেন। মেয়েরা সব ভেতরে। অনেকদিন পরে ঘুমন্ত বাড়িটা জেগে উঠেছে। আকাশের গায়ে মন্দিরের চূড়া। গঙ্গা এখানে আশ্চর্যজনক ভাবে উত্তরমুখী। কেদারঘাটটা কী সুন্দর! দেখতে পাচ্ছি চওড়া চওড়া পাথরের ধাপ নীচে জলের দিকে নেমে গেছে। বড়মামা, মেজমামাকে বলছেন, 'এখানে এত বড় একটা বিস্ময় অবহেলায় পড়ে আছে, তোরা দেখলি না?'
'এই তোরা-র দলে তুমিও আছ।'
'আই অ্যাম এ বিজি ডকটর।'
'অ্যাই অ্যাম ইকোয়ালি বিজি—এ প্রফেসার।'
'অফ এ ক্লোজড কলেজ—যে কলেজে ক্লাস হয় না। পণ্ডিতজি আমার এই ভাইটা পণ্ডিত মানুষ, কিন্তু শাস্ত্র, সংস্কৃত জানে না, ভেরি লজ্জার ব্যাপার। যে ক'দিন এখানে আছি, একে আর আমার এই ভাগনেটাকে আপনি রোজ দু-ঘণ্টা করে সংস্কৃত শেখাবেন। এই সব মূঢ়, ম্লান মুখে দিতে হবে ভাষা—ভাষা মানে সংস্কৃত। এদের এখনো বয়েস আছে, যা পারে শিখে নিক। আজ থেকেই শুরু করে দিন।'
মেজমামা বললেন, 'গুরুদক্ষিণাটা তা হলে আগেই আপনার শ্রীহস্তে অর্পণ করি।'
পণ্ডিতমশাই বললেন, 'অর্থ নয়, শ্রদ্ধাই শ্রেষ্ঠ গুরুদক্ষিণা।'
মেজমামা বললেন, 'শ্রদ্ধা তো বটেই; তবে পণ্ডিতমশাই, নিশ্চয় কোনো না কোনো সময়ে দেখেছেন, হ্যান্ডপাম্পে জল আটকে গেলে একটু জল ঢেলে জল বের করতে হয়। গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে কানে জল ঢুকলে, একটু জল ঢুকিয়ে জল বের করতে হয়। সেই পদ্ধতিতে আমি বিদ্যা দিয়ে বিদ্যা বের করব। প্রথম এক ঘণ্টা আমি আপনাকে ইংরিজি শেখাব। কেমন?'
সহজ, সরল পণ্ডিতমশাই একটু হেসে বললেন, 'কত্তামশাইয়ের ঘরটা খুলেছি, দেখবেন চলুন। সব ঠিকঠাক সাজানো আছে। তাঁর সময় ঠিক যেমনটি ছিল।'
কত্তামশাই মানে আমার দাদু। হরিদা বললে, 'ছাতটায় একবার যাওয়া যাবে না?'
'যাবে না কেন, তবে বাঁদরের উৎপাত। কাশীতে বাঁদরও বিখ্যাত। দেখছেন না, বারান্দাটা জাল দিয়ে ঘেরা। ওই দেখুন, তিনজন বসে আছে। আপনাদের দেখছে।'
দাদুর বিরাট ঘরটা যেন রাজসভা। উঁচু খাট। সোফা সেট। ড্রেসিং টেবিল। আয়না। কার্পেট। ঝাড়লণ্ঠন। দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে বড়-ছোট টেবল। একটা বড় টেবলের ওপর একটা বড় হারমোনিয়াম। দু-কোণে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত দুটো তানপুরা। জ্যাকিদা বললে, 'বাবা এ তো সাত অকটেভের হারমোনিয়াম প্যারিস রিড। আমার গুরুদেবের ছিল। একবার দেখতে পারি?'
বড়মামা বললেন, 'অবশ্যই পার। তুমি তো একসময়ে রীতিমতো ওস্তাদ ছিলে। তোমার গান আমি মিশনে শুনেছি। সেই রাতে, সেই আসরে গোলাম আলি সায়েব ছিলেন। তোমাকে খুব আশীর্বাদ করেছিলেন।'
জ্যাকিদা কার্পেটে বসে পড়লেন। পাণ্ডেজি সাবধানে যন্ত্রটা সামনে নামিয়ে দিলেন। বাইরে কাশীর রোদ। সব ঝলমল ঝলমল করছে। জাফরি দিয়ে ভেতরে এসেছে। মেঝেতে নকশা লুটিয়ে আছে, আলপনার মতো। রিডের ওপর এপাশ থেকে ওপাশ দ্রুত হাত চালালেন। সুর চমকে উঠল। সকলে স্তব্ধ। একে একে সবাই এসে গেছেন। একটু আলাপ, তারপর গান, মহাদেবের স্তব, গম্ভীর সুরেলা গলা। এ জ্যাকিদা নয়, অন্য কেউ।
হে বিশ্বনাথ শিবশঙ্কর দেব দেব
গঙ্গাধর প্রথম নায়ক নন্দিকেশ।
বারাণসী পুরপতে মণিকর্ণিকেশ
বীরেশ দক্ষমখকাল বিভো গণেশ
ভস্মাঙ্গরাগ নৃকপাল কলাপমাল
সংসার দুঃখগহনাজ্জগদীশ রক্ষ।।
বারাণসীপুরপতিং ভজ বিশ্বনাথম।
জ্যাকিদার মা চোখ মুছছেন। পণ্ডিতজি ধ্যানস্থ। পাণ্ডেজির ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে গেছে। বড়মামার মুখে একটা আলো। মাসিমা নন্দিতাকে জাপটে ধরেছেন।
পণ্ডিতজি বললেন, 'অন্নপূর্ণা মন্দিরে এর গানের আয়োজন করব। এত সুন্দর কণ্ঠ, সুর, বিশুদ্ধ উচ্চারণ—দেখবেন, শহরে আপনার নাম ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের তো এখন স্নানে যেতে হবে। অন্নপূর্ণা মন্দিরে প্রসাদ গ্রহণের ব্যবস্থা করেছি। বিশ্বনাথ মন্দিরে বাবাকে দর্শন করবেন। ওই যে উনি গাইলেন—বারাণসী পুরপতং বিশ্বনাথম।'
এই সেই দশাশ্বমেধ ঘাট। নীচের দিকে নেমে গেছে, কত সিঁড়ি। সেই নীচে জল। কুলকুলু গঙ্গা। একটা ঘাট না কি? পর পর কত ঘাট! এই ঘাটের জল সবচেয়ে পবিত্র। পঞ্চতীর্থের একটি তীর্থ। পুরাণে আছে, একবার ভগবান ব্রহ্মা কাশীর রাজা দিবোদাসের সহায়তায় দশটি অশ্ব বলি দিয়ে এইখানে একটি যজ্ঞ করেছিলেন; সেই কারণে এই নাম 'দশাশ্বমেধ'। আবার আর এক মতে, দ্বিতীয় শতাব্দীতে ভারশিব রাজারা কুষাণদের পরাস্ত করে এখানে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। রাজাদের যেমন জীবন! শান্তি আছে না কি? মা গঙ্গা কী করবেন! পাহাড় থেকে সাগর, এই তো তাঁর পথ। গঙ্গার পরপারের জায়গাটার কী নাম? বোধ হয় রামনগর। কত রকমের সুন্দর সুন্দর পানসি! বিকেলে বাবুরা হাওয়া খাবেন। কত নারী পুরুষ। স্নান করছেন, মন্ত্র পড়ছেন, দান করছেন, অঞ্জলি দিচ্ছেন। ওপরে রাস্তার ধারে বড় বড় বাড়ি। সবই প্রাচীন। কত রকমের সাইন বোর্ড। পর পর ছাতা। ছাতার তলায় বসে আছেন পণ্ডিত, পাণ্ডা, গণৎকার, তাগা তাবিজ বিক্রেতা, অসহায় বৃদ্ধা, ভবঘুরে, উন্মাদ। কেউ চিৎকার করছেন—'বাবা, বাবা'। গাঁজায় দম দিয়ে ছাইমাখা সাধু তেড়ে ফুঁড়ে বলছেন—ভোলে বোম। ভালো মন্দ সব গিয়ে পড়ছে জলে। ফুল-বেলপাতা, আবর্জনা। আমার কেবল ভয় করছে নন্দিতা না পা পিছলে গভীর জলে চলে যায়। আশ্চর্য এই মন। বড় হতে এখনো অনেক বাকি, কিন্তু মনে পাক ধরেছে। মেজমামা জল থেকে উঠছেন, 'ঠিক যেন মহাদেব। বড়মামা হাত জোড় করে বলছেন, 'বাবা! কৃপা কিজিয়ে। লাখো জনম বিত গয়ে।'
বড়মামাও সুর ধরলেন, 'বাবা, কৃপা করো।'
মেজমামা বলতে লাগলেন, 'কী হচ্ছেটা কী?'
অনেকেই এগিয়ে আসছেন। এক বাঙালি সাধু জিগ্যেস করছেন, 'আপনি কোন মঠের?'
মেজমামা তাড়াতাড়ি ওপরে ওঠার চেষ্টা করলে কী হবে! এক গাদা উঁচু উঁচু সিঁড়ি। হঠাৎ এক পাগলি ঘাটের ওপর দিকে বসেছিল, বাঙালি, চিৎকার শুরু করল—'মাসিমা, মাসিমা, তোমার ছেলে পালিয়ে এসে ভোলে বোম্বা হয়েছে। ভোল ব্যোম, তারক ব্যোম।' পাগলি আসছে। পড়ি মড়ি করে আমরা রাস্তায় উঠে এলুম। সেখানে আবার দুটো ষাঁড়ে গুঁতোগুঁতি। আরো একটু দূরে দুই কাশীর পলোয়ানে হাতাহাতি। এর নাম কাশী। বাবা বিশ্বনাথের রাজধানী। একদিকে বাবা বিশ্বনাথ, আর একদিকে মা অন্নপূর্ণা। সরু সরু গলি, বিশাল বিশাল ষাঁড়, মানুষের ঠেলাঠেলি, চটজলদি বাঁদরের দল, ছিনতাইয়ে ওস্তাদ। কেউ কারো নয়, সবাই যাচ্ছে। যার ভীষণ তাড়া, সে হে-রে-রেরে করে ষাঁড়ের মতো গুঁতোতে গুঁতোতে যাচ্ছে। বন্ধ বাড়ির দরজায় দরজায় পলোয়ানের ছবি আঁকা। হিন্দিতে লেখা হয়েছে—ভীম পহেলবান।
আমাদের দলের আগে আগে মেজমামা। সাদা গামছাটা মাথার পাগড়ি। মাঝে মাঝে হুঙ্কার দিচ্ছেন—জয় বাবা বিশ্বনাথ। পণ্ডিতজি বলছেন, 'বাবা ভর করেছেন!' নন্দিতার হাত ধরে একটা বাঁদর দুপায়ে মানুষের বাচ্চার মতো হাঁটছে। আর একটা হাত ধরে আছে জ্যাকিদা। হরিদা কম্পাউন্ডারকাকুর সঙ্গে বকবক করছে। মাসিমা চুপচাপ! অনবরত ধাক্কা খেতে খেতে আমরা অবশেষে মন্দিরে। এই সেই মন্দির! মোগলসম্রাট আকবরের শাসনকালে টোডরমলের নিলামে মন্দিরটি জিতে নিয়ে নারায়ণ ভট্ট শিবলিঙ্গটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিধর্মীদের আক্রমণ এল। শিবলিঙ্গটি মন্দির থেকে সরিয়ে পাশের কূপে ফেলে দেওয়া হল। কূপটির নাম হল 'জ্ঞানবাপী'। ভক্তরা সেই কূপেই জল ঢালতেন। এর পরে রানি অহল্যাবাঈ এই মন্দিরটি নির্মাণ করলেন। কূপ থেকে লিঙ্গটি উদ্ধার করে মন্দিরে স্থাপন করা হল। সে ১৭৭৭ সালের কথা। মন্দিরটি কিন্তু আরো প্রাচীন। ১৬৬৯ সালে নির্মিত। সাড়ে বাইশ মন সোনার পাতে মোড়া মন্দিরের চূড়া। এটি করে দিয়েছিলেন লাহোরের মহারাজা রণজিৎ সিং ১৮৩৯ সালে। বিশ্বনাথ মন্দিরকে সেই জন্যেই বলা হয় 'স্বর্ণ মন্দির'।
পণ্ডিতজি আর পাণ্ডেজির জন্যে আমাদের আলাদা ভাবে পূজা করার ব্যবস্থা হয়েছিল। জ্যাকিদা অল্প একটু স্তোত্র পাঠ করলেন। সকলেই মুগ্ধ। এক সাধু বললেন, 'বেটা তুমহারা হো গিয়া।'
জ্যাকিদা বললেন, 'হাঁ মহারাজ হো গিয়া।'
মেজমামাকে বললেন, 'শিউজি! কাঁহাসে আয়ি।'
এর পরেই অন্নপূর্ণা মন্দির। ১৭৮১ সালে তৈরি। বিষ্ণু মহাদেব নামে এক মারাঠি এটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। চূড়ায় আছে একটি স্বর্ণকলস। চারদিকে মন্দির, সূর্যদেবের মন্দির। সাত ঘোড়ার রথে বসে আছেন সূর্যদেব, আছেন গণেশ, কুবেরেশ্বর, পরশুরামেশ্বর, শ্রীরামচন্দ্র, উপাসনা কক্ষ, সুন্দর নাট মন্দির, সবই সেই বিষ্ণুমহাদেবের কীর্তি।
নন্দিতা বললে, 'জায়গাটা ভারি সুন্দর! থাকতে ইচ্ছে করছে। ভৈরবী হয়ে এখানে আসব।'
মেজমামা আর জ্যাকিদা নাটমন্দিরে বসে পড়েছেন। আমরা এইখানেই প্রসাদ পাব। বড়মামা কম্পাউন্ডার কাকুকে চুপিচুপি বলছেন, 'জ্যাকির পক্ষে এতটা বোধ হয় ভালো হল না।'
'ভাববেন না, বাবার স্থান।'
'আমার চিন্তা হচ্ছে। প্রেসারটা একবার দেখাতে পারলে হত।'
'ভাববেন না, সব ঠিক আছে।'
সার দিয়ে আমরা খেতে বসলুম। জ্যাকিদার পাশেই আমার আসন। পণ্ডিতজি মেজমামাকে বলছেন, 'নিজেকে এখনো চিনতে পারেননি।'
'কীরকম?'
'সাক্ষাৎ মহাদেব।'
বড়মামা বললেন, 'চিনবে কী করে? বাহন নেই যে। বাহন ছাড়া দেব-দেবীদের চেনা যায়? সিংহ ছাড়া মা দুর্গা, গাধা ছাড়া মা শীতলা, হাঁস ছাড়া মা সরস্বতী, প্যাঁচা ছাড়া মা লক্ষ্মী, ইঁদুর ছাড়া গণেশ। একটা ষাঁড়ের পিঠে বসিয়ে দিলেই বোঝা যাবে, নিজেও বুঝতে পারবে।'
জ্যাকিদা আমার হাঁটুতে হাত রেখে বললেন, 'ভালো হবে, খুব ভালো, সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। তোমাদের জীবন খুব খুব সুখের হবে। আমি তখন থাকব না। দেখবে। তখন আমার আজকের কথা তোমার মনে পড়বে। এই শিব ভূমিতে মায়ের স্থানে বসে আমি তোমাদের ভবিষ্যৎ বলে গেলুম। ওকে সুখে রেখো, তাহলে তুমি সুখী হবে। এই দুনিয়ায় চেষ্টা করলে সব পাওয়া যায়, মনের মানুষ পাওয়া খুব কঠিন।'
জ্যাকিদা কী ভাবে জানতে পারলেন! আশ্চর্য ব্যাপার। বড়মামা- মেজমামা, মাসিমা জানতে পারলে কী হবে! এখনো লেখা-পড়া শেষ হয়নি; এখনো কত বাকি! কত দূর যেতে হবে! বড়মামা আমাকে ডাক্তার করবেন। সে কী সহজ ব্যাপার। চার বছর, ছ'বছর। মাথা হেঁট করে খেয়ে যাচ্ছি। মা অন্নপূর্ণার প্রসাদ। মেয়েদের দিকে নন্দিতা বসে আছে। একবার তাকাই। অন্নপূর্ণা।
মাসিমা কী একটা বলছেন, হাসছে। খুব হাসছে। পাণ্ডেদা আড়াল করে দাঁড়াল।
বেলা তিনটে। সবাই বাড়ি ফিরে এসেছি। এখনো বাইরে ঝাঁ-ঝাঁ রোদ। বাড়ির ভেতরটা মোটামুটি ঠান্ডা। শেষ বেলার রোদ জাফরির ফাঁক দিয়ে বারান্দার মেঝেতে এসে পড়েছে। পাণ্ডেজি প্রচুর খেটেছেন। এখন মেঝেতে চিৎ। বুকের ওপর একটা জর্দার কৌটো। বেনারসী পাণ্ডি। মিহি সুরে নাক ডাকছে। অত বড় শরীরে যা বেমানান। বড়মামা দাদুর ঘরে আরাম কেদারায়। মেজমামা আর একটায়। দুজনেই ঘুম ঘুম ভাব। জ্যাকিদা ক্লান্ত। ছোট একটা খাটে তাঁকে জোর করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। প্রেশার অনেকটা নেমে গেছে। হয়তো স্যালাইন চালাতে হবে। বড়মামার মুখ গম্ভীর। চিন্তিত।
আমি পেছনের একটা সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা নেমে ভয়ে পালিয়ে এলুম। কোথায়, কোন দেশে গেছে কে জানে! অনেক কথা শুনতে পাচ্ছি, কারোকে দেখতে পাচ্ছি না। কী বাড়ি বানিয়েছিলেন আমার দাদু! একটা বড় ঘরে মেয়েরা শুয়ে আছে। শাড়ির তলা দিয়ে বেরিয়ে থাকা ফর্সা দুটো পা দেখে মনে হল, নন্দিতা, অন্নপূর্ণা। ফিরে এলুম বারান্দায়—কাঠের চেয়ারে। পায়ে পায়ে সন্ধ্যা আসছে। গঙ্গার খালি খালি ঘাট আবার ভরে উঠছে। কত রকমের মানুষ, কত রঙের পোশাক! ধনুকের মতো বাঁকা গঙ্গা উত্তর থেকে দক্ষিণে। স্রোত কিন্তু উত্তরে হিমালয়ের দিকে, তাই এই গঙ্গা এত পবিত্র, অতুলনীয়। বারাণসী শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান। কত ইতিহাস। অলিতে-গলিতে, মন্দিরে, মসজিদে, প্রাসাদে, উদ্যানে, গৃহে। জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ এখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এসেছিলেন হরিশচন্দ্র, তুলসীদাস, কবীর, নানক, ত্রৈলঙ্গস্বামী, শ্রীরামকৃষ্ণ। অজস্র সরু সরু গলি। কিছু আলো, কিছু অন্ধকার। এই পথেই অতীতে হেঁটেছেন গৌতম বুদ্ধ, শঙ্করাচার্য, রামানুজ, আরো কত মহাপুরুষ, সাধু সন্ত।
ধীরে ধীরে দিনের চোখ বুজে গেল। আকাশ লাল থেকে ক্রমে অন্ধকার। ঘাটে ঘাটে শুরু হল গঙ্গা আরতি। প্রদীপের শিখা বাতাসে নাচছে, দুলছে, ঘুরছে, বাদ্য-বাজনা, জয়ধ্বনি। সে সবও শেষ হল। কেদারঘাটের একপাশে বসে আছি। সামনের গঙ্গাপথে একের পর এক ভেসে যাচ্ছে পানসি। ছিলুম একলা, হঠাৎ নন্দিতা এল।
'একা বসে আছ?'
'বেশ ভালো লাগছে, আবার কবে আসা হবে কে জানে! তুমি এলে? কেউ কিছু বলবে না তো?'
'পণ্ডিতজিকে বলে এসেছি। তোমার পাশে বসব?'
'বোসো না।'
'তোমার পিঠে হাত রাখব?'
'রাখো; কিন্তু কথা বোলো না। শুধু শোনো—কাশীর আকাশ ভরে গেছে আরতির ঘণ্টাধ্বনিতে।' বাতাসে ভাসতে ভাসতে একটা শব্দ আর একটা শব্দের গায়ে গিয়ে পড়ছে। কেদারঘাট প্রায় শূন্য। আলোর মালা তৈরি হয়েছে গঙ্গার কুলে। চারপাশের বাড়িগুলো সব জমাট অন্ধকারের জ্যামিতি। দু-এক ধাপ নীচে পাশাপাশি বসে আছেন এক বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা।
হঠাৎ আমাদের বাঁ-পাশ দিয়ে লম্বা একটা ছায়া মূর্তি ধাপে ধাপে নীচে জলের দিকে নেমে যাচ্ছে। জ্যাকিদা! নন্দিতা, জ্যাকিদা! জ্যাকিদা, জ্যাকিদা! কোনো উত্তর নেই। কোথায় যাচ্ছ? আমি দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামছি ধরার জন্যে। জলে চলে গেছে। নন্দিতা আমাকে দুহাতে জাপটে ধরে বলছে, 'যেও না, যেও না, মাটিতে পা ঠেকে নেই। ভাসছে ভাসছে।'
আমরা দুজনে জড়াজড়ি করে পড়ে গেছি। জ্যাকিদা ততক্ষণে মাঝ গঙ্গায়, ধীরে ধীরে গঙ্গার জলে মিশে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ওপার থেকে ফোঁস করে আকাশে উঠল একটা তারাবাজি। ছড়িয়ে পড়ল আলোর ফুল। বেরিয়ে এল একটা আলোর মালা। যে জায়গায় ছায়া মূর্তিটি জলে মিলিয়ে গেল তার মাথায় আকাশে এসে মালাটা স্থির হল। টস টস করে আগুন ঝরছে। দুজনেই খুব ভয় পেয়েছি। তাকিয়ে দেখলুম সেই বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা নেই। ঘাট একেবারে নির্জন।
আমরা ভয়ে ভয়ে বাড়িতে ঢুকেছি। সব চুপচাপ। কোথাও কোনো কথা নেই। বারান্দায় বড়মামা দাঁড়িয়ে আছেন, বুকে হাত রেখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে। ঘরে সবাই বসে আছেন স্তব্ধ হয়ে, যেন ধ্যানে বসেছেন। খাটে জ্যাকিদা চির নিদ্রায়। যাওয়ার আগে মাকে একটি কথাই বলেছিলেন, হাতের একটা আঙুল বুকের ওপর তুলে, 'এই আংটিটা দিয়ে ওদের আশীর্বাদ কোরো।' তারপর আঙুলটা ধীরে ধীরে নেমে গেল।
'কাদের আশীর্বাদ করব?'
কোনো উত্তর এল না। সব শেষ।
রাত বারোটা। মণিকর্ণিকা ঘাট। সারি সারি চিতা জ্বলছে। এই শ্মশানে আগুন কখনো নেভে না। আর একটি চিতা জ্বলে উঠল। পণ্ডিতজি মন্ত্র পড়ছেন। মাঝে মাঝে তাঁর গলা ধরে আসছে। চোখ মুছছেন। আবার পড়ছেন। আগুনের শিখা লকলকিয়ে উঠছে। দেয়াল না পেয়ে আমার বুকেই মাথা ঠুকছে। বুকটা আমার ভিজে গেছে। চিতার আগুন দু-জোড়া চোখের জল শুকিয়ে দিতে পারবে কি? গঙ্গোত্রীর কীসের গর্ব? গঙ্গা নামিয়েছিলেন। সব মানুষের সব চোখের জল এক করলে তুমি হেরে যাবে। বিদায় কাশী! বিদায়! চোখের জলে বিদায়। হাসতে হাসতে এসে কাঁদতে কাঁদতে ফেরা।
অধ্যায় ১ / ৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%