একসময় আমার টেররিফিক ভূতের ভয় ছিল। আমার দোষ নেই, ভূতরা যে কোনো কারণে আমাকে লাইক করত। ভূতদেরও দোষ নেই। একসময় তারা তো মানুষই ছিল। সেই স্মৃতি। কাঁহাতক ভূতেদের মধ্যে থাকা যায়। নাকি সুরে একই রকম কথা। আর সব কথাই তো দুষ্টুমির কথা। কার ঘরের বন্ধ জানলা ধধধড় করে কাঁপিয়েছে। জলের গেলাস টেবিলের ওপর উলটে দিয়েছে। দলিল দস্তাবেজ ভিজে জাব। একজন খাটে ঘুমোচ্ছিল, মাঝরাতে তার ঠ্যাং ধরে টেনে খাট থেকে ফেলে দিয়ে পালিয়েছে। মানে যত রকমের বদমাইশি। আজ পর্যন্ত কোনো ভূত একটা ভালো কাজ করেছে এমন শোনা গেছে কি। আমার দিদি একটা অদ্ভুত দিদি। ভূত-প্রেত কিছুই বিশ্বাস করে না। একটা গোঁয়ার গোবিন্দ। ভূতদের আর পাড়ার দাদাদের ভক্তি, শ্রদ্ধা ও যথেষ্ট খাতির করা উচিত। আমি কিন্তু বলে দিলুম, আমার দিদি যদি স্বভাব না পাল্টায় ভীষণ বিপদে পড়বে। আমি একজন আছি, কান ধরে টানছে, চুলের মুঠি ধরে মাথাটা ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে, পিঠে ঢাক বাজাচ্ছে। কিছু বললেই বলবে, বেশ করেছি, তুই না আমার ভাই! এই কথাটা শুনলেই আমার ভেতরটা কেমন করে। মনে মনে বলি, 'আমার দিদি, আমার দিদি!'
আমাকে টানতে টানতে মসজিদে নিয়ে গেল। পীরবাবা শুনে বললেন, 'ভূত আছে, থাকবে। আমি ভূত ছাড়াতে পারব না, ভূত অনেক উপকারও করে, আমি এর ভয়টা ঝেড়ে দিচ্ছি।'
পীরবাবার হাতে একটা মাঝারি মাপের ঝাড়ু ছিল, সেইটা দিয়ে বেশ কয়েকবার আমার আগাপাশতলা ঝেড়ে দিলেন। কী একটা ভাষায় নানা রকম মন্ত্র পড়লেন। তারপর বিদঘুটে একটা জিনিস আমার মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন, 'চিবো। চিবিয়ে চিবিয়ে গিলে ফেল। একটু পরেই খুব জ্বর আসবে। ঠিক রাত দুটোর সময় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর ছেড়ে যাবে। তখন ঘরের উত্তর দিকের দরজাটায় খুব শব্দ হবে। ছাতে ধুপধাপ শব্দ হবে। ডারো মাত। তোমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকে একটা বড় বেল গাছ আছে। একটু দূরেই গঙ্গা।'
'হ্যাঁ, আছে তো। আশ্চর্য! আপনি কী করে জানলেন?'
'আমি আকাশ পথে মাঝে মাঝে প্যাঁচা হয়ে উঠে বেড়াই যে। যারা ওপর দিকে রয়েছে, তাদের দেখা শোনা করতে হবে তো!
তোমাদের বেল গাছে বত্রিশটা বেল ছিল। আজ সকালে একটা পড়ে গেছে।'
'আপনি এত সব জানেন?'
'সাধন-ভজন করতে হয়, তবেই না হয়। মাসে আমি তিন দিনের জন্যে মরে যাই, তারপর আবার বেঁচে উঠি। আমি এই ভাবে এখনো পর্যন্ত তিন হাজার বার মরেছি, তিন হাজার বার জন্মেছি। আমার বয়েস সব সময় ২৭ দিন। তার মানে, সাত আর দুয়ে নয়, তারপরেই শূন্য। অঙ্ক জানো?'
'খুব কম নম্বার পাই। বাবা রেগে গিয়ে বলেন গবেট, ডানস, ইডিয়েট। ইঞ্জিনিয়ার হতে পারব না। ইংল্যান্ড, আমেরিকা যেতে পারব না।'
'বলেছেন? এদিকে আয়। মাথাটা নিয়ে আয়, ডানদিকটা একটু চড়িয়ে দি। বুঝলি, মাথা একটা তবলা। ওইতেই যত বোল, একতাল, তিনতাল, চৌতাল, ফাঁকতাল।'
পীরবাবা ছোট্ট একটা রুপোর হাতুড়ি এনে মাথার ডানদিকে ঠুকঠুক করে কয়েকবার মারলেন, আর বলতে লাগলেন, 'খুল যা খুল যা সিম সিম।' তারপর আমার হাতে ছোট্ট একটা ডিবে দিয়ে বললেন, 'ওই বাইরেটায় গিয়ে শোঁকো, তারপর কবার হাঁচি হয় গুনে আমাকে বল।'
'মোট সাতাত্তরটা হল।'
বললেন, 'যাও, অঙ্কে সাতাত্তর।'
'আশি হলে ভালো হত। লেটার।'
'সে আর কি করা যাবে; তুমি যে তিনটে হাঁচি কম হাঁচলে!'
দিদি বললে, 'পীরবাবা। এটা ভীষণ একগুঁয়ে, কারো কথা শোনে না। যা মনে হবে তাই করবে। করবেই করবে।'
পীরবাবা বললেন, 'ও তো দেখতেই পাচ্ছি, ভেতরে একটা উল্কা ঢুকে গেছে।'
'উল্কা?'
'হ্যাঁ, আকাশে যে উল্কাপাত হয়। খোলা ছাতে হাঁ করে শুয়েছিল, ঢুকে গেছে।'
'কী হবে তা হলে?'
'রোজ সকালে এক গেলাস করে বার্লি খাওয়াও টানা একমাস। আর খেয়াল রাখ, এই যে ঝেড়ে দিলুম ওর ভেতর থেকে একটা চামচিকি বেরিয়ে ঘরে তিনটে পাক মেরে জানলা দিয়ে হুস করে বেরিয়ে যাবে।'
কথা শুনে দিদির চোখ গোল্লা গোল্লা হয়ে গেছে। আমার খুব মজা লাগছে। দিদি বললে, 'আমাকে একবার চামচিকিতে লাথি মেরেছিল, কিছু হবে না তো বাবা?'
'রোগা হয়ে যাবে। সামান্য ওজন কমে যাবে। এই আর কি? রোজ ছাতু খাও। ভুট্টা খেতে পার। টক দই।'
সুতোর মালা গলায় পরে আমরা মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলুম। সেবার জন্যে দিতে হল পাঁচসিকে এক আনা। আমাদের মুখে দুটো করে কিসমিস। পীরবাবাকে খুব সুন্দর দেখতে। যৌবনে ঘোড়ায় চড়তেন। দুজনেই বৃদ্ধ হয়েছেন। এই অঞ্চলের সবাই বাবাকে খুব শ্রদ্ধা, ভক্তি করেন।
এক মাসের মধ্যে আমার ভূতের ভয় এতটাই কমে গেল যে শ্মশানেও রাত কাটাতে পারি। তারকদা তান্ত্রিক। তারাপীঠে ছোট্ট একটা আশ্রম আছে। ভয় কাকে বলে জানেন না। আমাকে কিছু কিছু ব্যাপার বলেছেন। এক নম্বর মোস্ট ইমপর্টেন্ট, 'তোর সঙ্গে তোর যে ছায়াটা ঘোরে, সেটা তোর ভূত। ওটা বড় হয়, যখন তুই বড় চিন্তা করিস, ওটা ছোট হয় যখন তুই বাজে বাজে জিনিস ভাবিস। যখন ভয় পাস তখন ছায়াটা কুঁকড়ে যায়, যখন শরীর খারাপ তখন ছায়াটা পাতলা হয়ে যায়। রোজ বেলা বারোটার সময়ে ছায়ার মৃত্যু হয়। সূর্য তখন আকাশে আমাদের মাথার ওপর থাকে। রাত বারোটার সময় যত ছায়া সব শ্মশানে শ্মশানে ভিড় করে।' দ্বিতীয় জরুরি কথা, 'মাঝরাতে জানলার বাইরে হাত বাড়াবি না। তোর ভেতরটা টেনে নিয়ে চলে যাবে। রস টেনে নেবে, তুই গাছের পাতার মতো শুকিয়ে যাবি। অমাবস্যার মধ্যরাতে শ্মশানে গিয়ে চিতার পাশে দাঁড়াবি, আগুনের উত্তাপ, ধোঁয়া গায়ে মাখবি। মানুষের সারবস্তু সব ওই সময় বেরিয়ে আসে। আগুনের মধ্যে মা কালীকে দেখতে পাবি। মায়ের লকলকে জিভে আগুন খেলা করছে। যে মরতে ভয় পায় না, দুনিয়ায় সেই হচ্ছে প্রকৃত সাহসী।' তারকদা মড়ার মাথার খুলি নিয়ে খেলা করেন। বাতির সামনে খাড়া করে রাখেন। দুটো চোখ আর নাকের গর্ত দিয়ে আলো বেরিয়ে আসে। প্রথম যেদিন দেখি, সেদিন প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম। তিন রাত্তির ঘুমোতে পারিনি। দিদিকে কিছু বলিনি।
পীরবাবা বলেছিলেন, 'তোমাদের বেল গাছে একজন ব্রহ্মদৈত্য আছেন, আমাকে খুব ভালোবাসেন।'
প্রথমে আমি বিশ্বাস করিনি। দিদি করেছিল। একদিন ঝাপসা মতো কারোকে যেন দেখেছিল। সাদা ধুতি। সাদা পৈতে। আমাকে বলে ভীতু। নিজে কী? সবে শাড়ি পরতে শিখেছে। ছুটে পালাতে গিয়ে শাড়িতে পা জড়িয়ে ধপাস। রাতে বিছানায় শুয়ে আমাকে বললে, 'আছে রে, আছে।'
'কে আছে?'
'বেল গাছে, তিনি আছেন। লম্বা, চওড়া সাদা ধুতি, মোটা পইতে। ব্রহ্মদৈত্য স্যার।'
'কিছু বললেন?'
'আর বললেন! ভয়ে দৌড়। চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে—দাম! হাঁটুতে অ্যায়সা লেগেছে।'
'মাকে বলেছিস?'
'না, বিটুইন ইউ অ্যান্ড মি।'
'তুই রাজরানী হবি।'
'থাম তো, যত সব বাজে বাজে মেয়েলি কথা। রাজরানী হলে কত কিলো গয়না পরতে হয় জানিস? আর ছবিতে রাজাদের চেহারা দেখেছিস তো! ঘোড়ার মতো মুখ, ওলের মতো মুখ, পেল্লায় পেল্লায় ভুঁড়ি। এক একটার ওজন দু'মন, তিন মন। হাতির পিঠে যখন বসে, হাতি দেবে যায়। ইতিহাসে পড়িসনি, রাজা ইয়াসুদ্দিন খণ্ডঘোষের যুদ্ধে কী ভাবে নিশা খাঁর কাছে পরাস্ত হলেন। যুদ্ধটা হচ্ছিল বিরাট একটা খেলার মাঠে। ইয়াসুদ্দিন হাতির পিঠে উঠতেই তার চারটে পা মাটিতে এক ফুট করে দেবে গেল। ড্যাঙোস মারলে কী হবে? হাতিটা শুঁড় তুলে ডাক ছাড়ছে। ওদিকে বাঁশ পাতার মতো লিকলিকে সাতফুট লম্বা নিশা খাঁ চোদ্দো ফুট লম্বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বিদ্যুৎবেগে এসে এক কোপ। মুন্ডুটা ছিটকে পড়ল পেনাল্টি এরিয়ায়, ওদের সেন্টার ফরোয়ার্ড টুক করে ঠেলে দিল গোলে। ওই মাঠে নিশা খাঁর হাজার ফুট উঁচু একটা মূর্তি বসান হয়েছিল। ইংরেজ বণিকরা এসে পড়ল। দুর্দান্ত, দুঃসাহসী ক্লাইভ ওই মূর্তিটায় রোপ ক্লাইম্বিং প্র্যাকটিস করতেন। ওয়াটসনও কম যেতেন না। মূর্তিটার কাঁধে পা ঝুলিয়ে বসে জয়নগরের মোয়া খেতেন।'
'তোর এই ইতিহাসটা কোথায় আছে?'
'সম্ভবত তিব্বতের কোন গুহায়। বিশেষ ভাবে লুক্কায়িত। চোমং লামাকে আমি দার্জিলিং চা খাওয়াতুম। আমাকে বেটি, বেটি বলে ডাকতেন। আমার এত বড় বড় চুল হল কী করে? চোমংদাদু আমাকে এক দলা ইয়াকের চর্বি দিয়ে বলেছিলেন, টিকের আগুনে গলিয়ে গরম গরম মাথায় চাঁদিতে মালিশ করবি। দেখবি বালিশের ওপর চুল পড়ে আছে, সড়সড় করে বেড়ে যাচ্ছে। চুল জীবন্ত, চুলের আলাদা প্রাণ আছে। চুল কখনো মরে না।'
'রাখ তো, তোর যত আজগুবি কথা। কাল অমাবস্যা, একবার চেষ্টা করে দেখলে হয় না?
'কী চেষ্টা?'
'ওই ব্রহ্মদৈত্য স্যার। আমার কিছু প্রশ্ন আছে রে!'
'মা জানতে পারলে?'
'রাত বারোটায় সবাই ঘুমোবে।'
'তাহলে একটা মোটা পইতে চাই।'
'সে হয়ে যাবে। আমি কালীবাড়িতে গিয়ে তারকদাকে দিয়ে করিয়ে আনব।'
'ডান।'
'থ্যাঙ্ক ইউ দিদি।' দিদিকে জড়িয়ে ধরলুম। 'ছাড়, ছাড়, আমার চুল বাড়ছে। তুই পেঁয়াজ খেয়েছিস?'
'সে তো বিকেলে। আশু আলুকাবলি খাওয়ালে।'
'আমাকে খাওয়ালি না?'
'একদম বাজে। তেঁতুল গোলা জল দেয়নি। গুচ্ছের ঝাল। কাঠি দেয়নি। গিঁতে গিঁতে খাবো তো। শুকনো ধনেপাতা।'
'ছেড়ে দে। ইমলি কি পানি ছাড়া ফুচকা আর কাবলি হয়! নে, নে ঘুমিয়ে পড়। সদরের পেটা ঘড়িতে বারোটা বাজছে। এখুনি শুরু হবে চৌকিদারদের লাঠি ঠকঠক। কালও গঙ্গায় ডাকাতদের ছিপ নৌকো দেখা গেছে। পরপর তিনটে পাঁই পাঁই করে বাগবাজারের দিকে চলে গেল। কার সর্বনাশ করতে গেল কে জানে! আমরা বড়লোক হইনি, বেশ আছি, কী বল?'
'শোন দিদি, তুই রাজরানী হোস না। তুই আমার দিদিই থাক।'
অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার। কালীবাড়িতে পইতে করাতে গিয়ে তারকদার কাছে জেনে এসেছি, রাত দশটা পনেরো মিনিটে লেগেছে। পাওয়ারফুল অমাবস্যা। সিদ্ধেশ্বরী কালী বাড়িতে ঝম ঝম করে আরতি হচ্ছে। মহাশ্মশান থেকে মা আজ মন্দিরে আসবেন। মহাদেব উঠে বসবেন। দিনের পর দিন একভাবে শুয়ে থাকতে ভালো লাগে!
বেল গাছের তলাটা খুব সুন্দর করে বাঁধানো। মা সন্ধেবেলায় ধূপ-দীপ রেখে যায়। দিদি সকালে গঙ্গাজল ঢালে। আকন্দের মালা, ধুতুরা ফুল দিয়ে পুজো করে। একটু দূরে উত্তর দিকে বাঁধানো একটা রক আছে। গ্রীষ্মের দুপুরে এখানে মহিলা মহল বসে। চৈত্র, বৈশাখ মাসে দুম দাম বেল পড়ে; কিন্তু কখনো কারো মাথায় পড়ে না। মা বলেছে, 'জানিস মা, বেলের দুটো চোখ আছে। একটা বেল হাতে নিয়ে দেখিস।'
আমাদের সঙ্গে রয়েছে ছোট্ট একটা কমণ্ডলুতে গঙ্গাজল, পইতে, একজোড়া খড়ম, দুটো ধুতুরা ফুল। গায়ে গঙ্গাজল ছিটিয়ে চুপ করে বসে আছি। দিদি বলছে চোখ বুজে এক মনে ধ্যান কর, আর বল, 'বাবা এসো, বাবা এসো।'
তাই করছি, 'বাবা এসো, বাবা এসো।' প্রার্থনাটাকে আরো শক্তিশালী করার জন্যে মাঝে মাঝে একটু ইংরিজিও ঢুকিয়ে দিচ্ছি, 'বাবা কাম, প্লিজ কাম। কাম বাবা কাম।' বেশ মশাও আছে, কামড়ে শেষ করে দিচ্ছে। আধখাওয়া ফ্যাকাশে একটা চাঁদ আছে, শেষ রাতে পশ্চিমের আকাশে এসে হাজির হয়। দেখলেই শরীরটা কেমন করে ওঠে। কবর, কফিন, ক্রশ এই সব মনে পড়ে। কিছু দিন আগে স্বপ্ন দেখেছিলুম, চশমা পরা কঙ্কাল, আমাদের পড়ার টেবিলে বসে, আমারই খাতায়, আমার কলম দিয়ে, কী সব লিখছে। এই চাঁদটা ভালো নয়। আমরা একবার পুরী গিয়েছিলুম। হোটেলের সামনেই সমুদ্র নাচছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে। আকাশে এই ক্ষেয়ো চাঁদটা। দিদি বলেছিল, 'আমরা ঘুমোবো না। হোটেলের বারান্দায় বসে সমুদ্র দেখবো।' সেই চাঁদটাই বেল গাছের আড়ালে এসে হাজির। আকাশ বেয়ে পশ্চিমের দিকে নামছে।
উঃ, কতক্ষণ বসে আছি। থানার ঘড়িতে ঘুমন্ত চৌকিদার হাতুড়ি ঠুকে জানিয়ে দিল, রাত দুটো। প্রথম শব্দটা বেশ জোরে, পরেরটা দুর্বল। অল্প দূরেই গঙ্গার ওপর বালির ব্রিজ। সেই মালগাড়িটা ধিকিয়ে ধিকিয়ে যাচ্ছে। মাঝরাতে এই আওয়াজটাকে খুব ভয় পাই। চারিদিকে ঘন, তরল অন্ধকার, গাছের পাতাগুলো ভোরের অপেক্ষায় থমকে আছে। শেষ একটা জোনাকি একেবারে একা, তার সামান্য অবশিষ্ট আলো নিয়ে চলেছে কোথায়, একেবারে দিশেহারা! গঙ্গার ওপারে কোথাও একটা বড় কারখানা আছে, ঝাং করে অনেক লোহা ফেলার শব্দ। বেশ বড়, কালো একটা বাদুড় বেলগাছের মাথার ওপর দিয়ে 'ড্রাকুলার' মতো উড়ে গেল।
হঠাৎ বেল গাছের একটা দিক খুব নড়ে উঠল। দুম করে একটা বেল মাটিতে পড়ে কিছু দূর গড়িয়ে গেল। আমি চাপা গলায় বললুম, 'দিদি!'
'চুপ। চুপ কর।'
বেশ ভারী একটা কণ্ঠস্বর, 'আমি এসেছি। তোমরা আমাকে দেখতে পাবে না। গভীর রাতে আমাকে দেখা যায় না। ভর সন্ধেবেলায় চেষ্টা করে দেখতে পার। আমি তোমাদের ওপর খুব সন্তুষ্ট হয়েছি। তোমাদের দুজনের, তোমাদের পরিবারের খুব ভালো হবে। এখন শোনো, ওই পইতে, কাপড়, কমণ্ডলু গঙ্গার ধারের শিব মন্দিরের পূজারিকে দিও। একটা বড় গামছাও দেবে। বলবে, সদানন্দ দিয়েছে। আমি যখন বেঁচে ছিলুম, তখন আমার নাম ছিল সদানন্দ সান্যাল। আমিই ওই মন্দিরের পূজারি ছিলুম। এখন যে পুজো করে সে আমার ছেলে। ভাদ্রমাসের বানে আমি গঙ্গায় ডুবে মারা গিয়েছিলুম। ও আমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিল। হাতটা ধরেও ছিল; কিন্তু স্রোতের টানে ধরে রাখতে পারেনি। ওর হাতে আমার হাতটা আজও ধরা আছে, তাই আমি এই লোক ছেড়ে অন্য লোকে যেতে পারছি না। ওকে একটা কথা তোমরা বোঝাবার চেষ্টা কোরো—এই পৃথিবীটা ছাড়াছাড়ির জায়গা। কেউ কারোকে ধরে রাখতে পারবে না, আসবে কিছুকাল থাকবে আবার চলে যাবে, আবার আসবে। থাকবে শুধু প্রাণের প্রবাহ। শোনো, আমি যে এসেছিলুম তার প্রমাণ, আমার অদৃশ্য পায়ে ওই খড়মজোড়া পরে নিলুম। এইবার আমি চলে যাচ্ছি, শব্দ শোনো।'
দিদি আর আমি জড়াজড়ি। একটা শব্দ ঠক, ঠক, ঠক দূর থেকে পশ্চিমে চলে যাচ্ছে। সেই জোনাকিটা নেই। ধূপ, ধুনোর গন্ধ। খড়ম জোড়াটা নেই, সত্যি সত্যি নেই। পড়ে আছে টাটকা, সাদা একটা জবা ফুল। একটা কথা—'এটা টপ সিক্রেট! বিটুইন ইউ অ্যান্ড মি!'