প্ল্যাটফর্ম

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়



প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে লম্বা ট্রেনের শেষ গার্ডের কামরাটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে। পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন একা গার্ড সাহেব। একেবারে একা। এদিকে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে শঙ্কর।
মাঝখানের সাদা কামরাটায় জানলার ধারে বসে আছে প্রাণের বন্ধু সুখেন। সুখেন চলে গেল পুনায়। বাকি লেখা-পড়াটা সে ওইখানেই করবে। জীবনে বড় হতে হবে, আরো বড়। টাকা-পয়সার অভাব তো নেই। একটাই অভাব, সুখেনের মা নেই। অনেক আগেই মারা গেছেন। শঙ্করের মাকেই সে মা বলত। বেশির ভাগ সময় শঙ্করদের বাড়িতেই কাটাত। এক সঙ্গে খাওয়া। একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে দেশ-বিদেশের কত গল্প। আলো নেভানো ঘরে চাঁদের আলো এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিছানায়। বাইরে নারকোল গাছের পাতা বাতাসে যখন দুলছে তখন মনে হচ্ছে রুপোর ঝালর। সুখেন বলত, 'যাই বল শঙ্কর, পৃথিবীটা কিন্তু খুব সুন্দর। কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে। ছন্দ মেলাতে পারি না।
ট্রেনটা আর নেই। দৃষ্টিপথের একেবারে বাইরে। জোড়া জোড়া ইস্পাতের লাইন। কাঠের স্লিপার, গোটা গোটা খোয়া। খড়াং করে একটা শব্দ হল, সিগন্যালটা উঠে গেল। সুখেন চলে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে। শঙ্কর চোখ মুছে এদিকে-ওদিকে তাকাল। প্ল্যাটফর্ম প্রায় খালি। একটু দূরে একটা লম্বা বেঞ্চে বসে আছে একা একটি ছেলে। পরনে হাফপ্যান্ট, আধময়লা একটা গেঞ্জি। পায়ের কাছে একটা বস্তা। ছেলেটিকে বেশ সুন্দর দেখতে। অনেক চুল। কিছুটা কপালে ঝুলছে। ছেলেটি এক মনে রঙ-চঙে একটা কাগজের টুকরো দেখছে। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে তালগোল পাকিয়ে বস্তাটার ভেতর ঢুকিয়ে দিল।
শঙ্কর পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে বললে, 'তোমার পাশে একটু বসব?'
ছেলেটি তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। শঙ্কর জিগ্যেস করল, 'কী হল?'
ছেলেটি অদ্ভুত একটি কথা বলল, 'ভদ্দরলোকরা বসলে ছোটলোকদের উঠে যেতে হয়।'
শঙ্কর স্তম্ভিত। ছেলেটা বলে কী—'তুমি এ-রকম বলছ কেন?'
'এই রকমই তো হয়। এই বসার জায়গাগুলো সব ভদ্দরলোকদের। আমাদের বসতে দেখলেই হ্যাট হ্যাট করে হটিয়ে দেবে। আমরা তো কাগজকুড়ুনি, খালের ধারে, খানার পাশে থাকি, নোঙরা, অসুখ ছড়াই। আমার পাশে বসলে তোমার পোশাক ময়লা হয়ে যাবে।'
শঙ্কর ছেলেটির পাশে বসতে বসতে বললে, 'আমি ভদ্দরলোক, ছোটলোক নই, আমি একটা লোক, ঠিক লোকও নই, একটা ছেলে, তোমার চেয়ে একটু বড়। তোমার নাম কী?'
'শঙ্কর।'
এই মরেছে, আমার নামও শঙ্কর! তুমি এত কথা শিখলে কোথা থেকে?'
কেন, শিখতে পারি না? কাগজ কুড়োই বলে?'
'বড় ঝগড়া করো তুমি, সব সময় গরম হয়ে আছ।'
'আমরা তো সারাদিন ঝগড়া করেই বেঁচে আছি। সকাল থেকে মাঝরাত। তা তুমি কাঁদলে কেন? চোখে জল!'
'ওই ট্রেনে আমার বন্ধু বিদেশে চলে গেল। মনটা খুব খারাপ হল। তাই চোখে জল এল।'
'তুমি খুব নরম। আমার মতো একটু গরম হওয়ার চেষ্টা করো। আমার বাবা কী বলে জানো, 'শঙ্কর! নিজেকে শক্ত কর। ময়দার তাল হলে লোকে তোকে লুচি করে খেয়ে ফেলবে।'
'তোমার বাবা কী করেন?'
'আমাকে দেখে বুঝতে পারছ না? রাজমিস্তিরির জোগাড়ে। দিনের বেলায় আকাশে দোল খায়, রাতের বেলায় ভুঁয়ে গড়াগড়ি। আমাকে বলেছে, শঙ্কর বোতোল হবি না তাহলেই বেতাল। তালে থাক, তাহলেই ফাঁক তালে বেরোতে পারবি। আমি তো সারাটা জীবন বাঁশ বেয়ে পাঁচতলা, সাততলা করলুম, তোকে উঠতে হবে সিঁড়ি দিয়ে ধাপে ধাপে।
আমাদের বস্তিতে রোজ উমাদি আসে আমাদের পড়াতে-শেখাতে। উমাদি আমাদের বলে তোরা আমার চ্যালেঞ্জ। প্রত্যেকে এক এক পাটি জুতো।'
'বাপরে, কী সাংঘাতিক কথা গো!'
'উমাদিকে দেখলে তুমি আর মন্দিরে গিয়ে মাকে প্রণাম করবে না। উমাদি আমাদের জ্যান্ত দুর্গা।'
'এই কাগজ কুড়োনোটা ছেড়ে দিলে হয় না?'
'কী বলতে চাইছ? ভিক্ষে করব? স্কুল, কলেজের ছেলে-মেয়েদের পুরিয়া সাপ্লাই, ঝুমুরওয়ালিদের বোতোল, পুলিশের খোঁচোর? বাবা বলেছে, শঙ্কর না খেয়ে মরবি—সেও ভালো, নিজেকে বিক্রি করবি না। উমাদি এই বস্তুটাকে কী বলে জানো—তোমাদের এই সভ্যতার পুঁটলি। দেখবে, একটু আগে আমি এই কাগজের টুকরোটা দেখছিলুম, তারপর গোল্লা পাকিয়ে ফেলে দিয়েছি। এই দেখো, বিজ্ঞাপন—একটা ছেলে আর মেয়ে, সং সেজে ঠ্যাং তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এদের কী বলে জানো—মডেল। আমাদেরও এই রকম সাজতে হবে। খেয়ে দেয়ে কাজ নেই আমাদের। কী বোকা বোকা! চুলের কায়দা দেখো। তুমি এই রকম সাজবে? ওই যে দেখছ দূরে মস্ত বাড়িটা—শপিং মল—ওইখানে এই সব বিক্রি হয়। টাকা হলে মানুষ পাগল হয়ে যায়। মদ খেয়ে যেই নেশা হয় ভেউ ভেউ করে কাঁদে। আবার মা কালীকে গান শোনায়। তুমি গান গাও?'
'নাঃ, গলায় তেমন সুর নেই।'
'উমাদি আমাদের গানও শেখায়। বলেছে সব কিছু শিখে রাখ, যখন যেটা কাজে লাগে।'
'তোমার মা কী করেন?'
'রান্না। সকালে তিন বাড়ি, রাত্তিরে তিন বাড়ি।'
'তুমি বুঝি মাঝে মাঝে এখানে এসে বসে থাকো?'
'কত কি দেখা যায়! এই তো ক'দিন আগে যা হল। বুড়ি মা, সঙ্গে তার ছেলে, হোঁতকা মতো। ছেলে আগে উঠে গেল, ট্রেন চলতে শুরু করেছে। ছেলে চেল্লাচ্ছে—উঠে পড়ো, উঠে পড়ো, এই নাও হাতটা ধরো। হাতটা এগিয়ে দিয়ে, ধরার আগে ঝট করে টেনে নিল। আমি আগেই বুঝে গেছি, কি করতে চায়। প্ল্যাটফর্ম আর ট্রেনের মাঝের ফাঁকটায় ফেলে মারতে চায়। আমি এক লাফে গিয়ে জাপটে ধরেছি। দুজনেই প্ল্যাটফর্মে গড়াগড়ি। তুমি শুনবে, সেই শয়তানটা ট্রেন থেকে নামল না। এখনকার ট্রেন, জানো তো ঝট করে স্পিড উঠে যায়!'
'তারপর?'
'তারপর? আমি একজন দিদা পেয়েছি, আর আমার মা পেয়েছে একজন মা। ওই দেখো আমার মা আসছে আমার খোঁজে। আমার মাটাকে দেখো শঙ্করদা, আমার মা। আচ্ছা, গুডবাই।'
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%