দাগ

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়



পায়ের ওপর পা তুলে বেশ আরামে বসে আছি দোতলার পুবের বারান্দায় একটা গার্ডেন চেয়ারে। সকাল এখন ক'টা হবে? দশটা। ঘড়ির সঙ্গে আজ আমার কোনো সম্পর্ক নেই; কারণ আজ রবিবার। তা ছাড়া স্কুলের ছুটি। পায়ের কাছে রোদ খেলা করছে। ফাইন ওয়েদার। সামনে সবুজ মাঠ। মাঠের পরেই সরষের খেত। হলুদে হলুদ। নীল আকাশে পায়রার ঝাঁক গোল হয়ে চককর মারছে। ডানায় যখন রোদ পড়ছে চিকির-মিকির করছে। নিজের মনেই বলে উঠছি—'বিউটি বিউটি'। এই বলাটা আমি আমার বন্ধু শ্যামলের কাছ থেকে শিখেছি। এক ধরনের মুদ্রা দোষ। থেকে থেকেই বলে ওঠে 'বিউটি বিউটি'। এর ফলে মাঝে মধ্যে বিপদেও পড়ে।
এই তো কদিন আগে আমরা দুজনে চন্দননগরে একেবারে গঙ্গার ধারে ওর মাসিমার বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলুম। আগেও গেছি। ফরাসি আমলের বাড়ি। সেই রকমের আর্কিটেকচার। সুন্দর বাগান গঙ্গার দিকে। বাগানের এদিকে-ওদিকে শ্বেতপাথরের সব মূর্তি। একজায়গায় পাথরের দুটো পায়রা পদ্মকাটা একটা পাত্র থেকে ঠোঁট ডুবিয়ে পেছন উঁচু করে জল খাচ্ছে। কল খুলে দিলে ভুকভুক করে জল বেরোয়। সবই সেকালে প্যারিস থেকে আনানো।
পূর্ব পুরুষদের সকলেই ছিলেন বড় বড় পদে। একজন ফরাসি সৈন্যবাহিনীতে কমান্ডার। বাংলার নবাব সিরাজের দোস্ত। নবাব পায়রার ডিমের মাপের একটি নীলাভ হিরে দিয়েছিলেন। পরের প্রজন্মের কেউ একজন ইংরেজ ভক্ত, সেই বহুমূল্য হিরেটি কুইনকে উপহার দিয়ে লন্ডনে নিজের ভাগ্য ফিরিয়েছিলেন। 'শেম শেম!' এটা মাসিমার কথা। তিনিও সব কথা দুবার বলেন।
সেই অসাধারণ বাড়িতে আমরা মাঝে মাঝেই যাই। মাসিমা আমাদের পছন্দ করেন। পরিবারের লোকসংখ্যা কমে গেছে। পেল্লায় বাড়ি। দামি দামি জিনিস। পূর্বদিকে হু-হু গঙ্গা। ফরাসিরা চলে গেছেন। শহরটা আর আগের মতো নেই। এইটুকু বলার দরকার ছিল তাই বললুম। শ্যামল বলে—বাড়িটা একটা 'বিউটি'। এখানে একবার, দুবার নয়।
রোববার। হাওড়া থেকে ট্রেন ধরেছি। তেমন ভিড় নেই। জানলার ধারে দুজনে জমিয়ে বসেছি। ঝলমলে সকাল। উলটো দিকের আসনে সুন্দর চেহারার এক ভদ্রলোক বসে আছেন, তাঁর পাশে আমাদেরই বয়সি একটি মেয়ে। বেশ সুন্দরী। তাই তাকাচ্ছি না। আমরা তো লোফার নই। চারপাশে এর চেয়েও সুন্দরী সুন্দরী মেয়ে অনেক আছে। একবার তাকানোর বদ অভ্যাস হয়ে গেলে, দেখতে হবে না। কলকাতার ট্রামে কাটা পড়ে মরতে হবে। একবার দেখে নিয়েছি সেই যথেষ্ট। কপালের ওপর এক কুচি চুল ঝুলে আছে। ফ্যাশান! মরগে যা।
শ্যামল বেশ বাইরের দৃশ্য দেখছিল, হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে ভেতরের দিকে তাকিয়ে আচমকা বলে উঠল, 'বিউটি, বিউটি।'
সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক সামনে ঝুঁকে ওর জামার কলারের কাছটা খামচে ধরে বললেন, 'কী বললি রাসকেল! আমার মেয়েকে?' শ্যামলটা নাম্বার ওয়ান ভীতু। কেঁদে ফেলেছে। কাঁদতে কাঁদতে বলছে, 'বিশ্বাস করুন, আমি দিদিমণিকে বলিনি, বলেছি আপনার গোঁফকে। এত সুন্দর গোঁফ ছিল গুডউইনের।'
'কে গুডউইন?'
'আজ্ঞে স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশি স্টেনোগ্রাফার। স্বামীজির যত বক্তৃতা তাঁর জন্যেই ছাপা সম্ভব হয়েছে। জে. জে. গুডউইন। স্বামীজি বলতেন, মাই ফেথফুল গুডউইন।'
'তুমি স্বামীজি পড়ো?'
'খুব পড়ি। স্বামীজি না পড়লে মানুষ হব কী করে? আমরা দুজনে যে-স্কুলে পড়ি, সেই স্কুলে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক বিপ্লবী পড়তেন। আপনি আমাকে রাসকেল বললেন?'
'অ্যাম সরি, ভেরি সরি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।'
মেয়েটি বললে, 'বাবা, তোমাকে কতবার বলেছি, সপ্তাহে একবার নখ কাটবে। দেখো তো ওর গলার কাছটা তোমার নখে চিরে গেছে। একটু একটু রক্ত বেরোচ্ছে। তুমি ভীষণ মারকুটে!'
'কী করব বল, আমি তো বডিবিল্ডার। প্রফেসার ঘোষের জিমন্যাসিয়ামে দশটা বছর ধরে বডি তৈরি করেছি। মিস্টার বেঙ্গল হয়েছি। ওর ওই জায়গাটায় কী লাগানো যায়। ইস, ইস, লজ্জা করছে। শেম, শেম।'
মেয়ে বললে, 'দাঁড়াও বাবা, আমি ট্রিটমেন্ট করছি।'
'কী ট্রিটমেন্ট করবি?'
'আমার ব্যাগে লিপষ্টিক আছে। অ্যান্টিসেপটিক।'
কিছু বলার বা বোঝার আগে ঝট করে উঠে এসে খ্যাঁচ করে একটা টান। চকোলেট রঙের একটা পটি। শ্যামল যেন কেমন হয়ে গেল। ঘাবড়ে গেছে। আমি এখানে একটা কথা বলব, সে শ্যামল যাই মনে করুক। মেয়েরা যত দূরে থাকে তত ভালো, একেবারে ঘাড়ের ওপর এসে পড়াটা বা পড়তে দেওয়াটা ঠিক নয়। এই উঠতি বয়েসটা তো ভালো নয়। এই কথাটা আমার মেজো পিসিমা প্রায় বলেন। জমিদারনি। আমাদের বাড়িতে এসে থাকেন মাঝে মাঝে, গঙ্গায় স্নান করবেন, কালিঘাটে যাবেন। আমি ছাতে উঠে আকাশের গায়ে কবিতা লিখি। একদিন আমাকে বললেন, 'অভ্যাসটা ভালো নয়।' বোঝো ঠেলা। হালদার বাড়ির ছাতে দুপুরবেলা সন্ধ্যা চুল এলো করে দাঁড়িয়ে থাকে, একবার এ আলসে, একবার ও আলসে। কশকশ করে জামরুল খায়। আমাকে একবার আখরোট ছুঁড়ে মেরেছিল। সেটা আমি যত্ন করে রেখেও দিয়েছি। কবিতা লেখায় সাহায্য হবে বলে। একটা জিনিস দেখছি, মানুষের পয়সা হলে, যা খুশি তাই বলার অধিকার জন্মায়। আমি কী করব, না করব অন্য আর একজন বলে দেবেন! সন্ধ্যা যখন ওদের বাড়ির ছাতে থাকে না, তখন থাকে টবে পোঁতা একটা মনসাগাছ। পিসিমা বলবেন, না, না, আরো একটা ব্যাপার থাকে, আশা, আবার যদি আসে। নাঃ, এই গুরুজনদের কিছু বলার নেই। এত সন্দেহ নিয়ে মানুষ বাঁচে কী করে! নারকোল নাড়ু করে দিনের মধ্যে চব্বিশবার গুনছেন দুটো যেন নেই মনে হচ্ছে! ভুরু কুঁচকে গেল। হরি হে মাধব!
মেয়েটি তার হাতব্যাগ থেকে দুটো চকোলেট বের করে একটা শ্যামলের হাতে দিল। শ্যামল খপ করে নিয়ে নিল। 'ইডিয়েট'! দুধ সাদা চাঁপার কলির মতো আঙুল। অনামিকায় লাল পাথর বসানো আংটি। সাপের ছোবল। খুব কাছ থেকে আমি গোখরো সাপ দেখেছি আমার কাকাবাবুর বাগানে। ইডিয়েটটা আমার পাশে আছে। গলায় লিপস্টিকের দাগ।
মেয়েটির চকোলেট ধরা হাত আমার দিকে এগিয়ে এল। আমি বাইরের দিকে তাকিয়ে ডাঁটা চিবনো গলায় বললুম, 'আমাকে দিতে হবে না। তোমার বাবা তো আমাকে আঁচড়াননি।'
চকোলেটটা আমার কোলে টপাস করে ফেলে দিয়ে বললে, অভদ্র। মেয়েদের সঙ্গে কী ভাবে ব্যবহার করতে হয় জানে না।'
'না, জানি না।'
ভদ্রলোক বললেন, 'কী হচ্ছে তনুকা! তোর ভীষণ রাগ। তোমরা কিছু মনে কোরো না। মা মরা মেয়ে, ভীষণ অভিমানী। এমনি খুব ভালো মেয়ে। দয়া-মায়া। আমি তো বেশিরভাগ বাইরে থাকি। কী করব প্রফেসন। পিসির কাছে থাকে। আমার ছোট বোন। কী স্যাক্রিফাইস! আমার মেয়ের জন্যে বিয়েই করলে না। তনুকার কী হবে! এইটারই আমার ভীষণ চিন্তা!'
মেয়েটি বললে, 'বাবা! তোমাকে কতবার বলেছি ঘরের কথা বাইরে বলবে না।'
'সরি, মা সরি! এই আমার দোষ। পেটে কথা রাখতে পারি না। তোর মা আমাকে পথে বসিয়ে দিয়ে গেছে। তোকে নিয়েই বেঁচে আছি।'
'আবার? এই নাও রুমাল, চোখ মোছো।'
এই সব কথা শুনে আমার মনটা কেমন যেন হু-হু করে উঠল। আমারও তো মা নেই। বিধবা পিসিমা। আমার জন্যেই বাবা দ্বিতীয়বার বিবাহ করেননি। বলেছিলেন, পাগল হয়েছ, কে না কে এসে ছেলেটাকে পার করে দেবে।
আমার মনটা ঘুরে গেল। মেয়েটিকে বললুম, 'দাও, নিজের হাতে এটা চকোলেট দাও। দুটো হবে। একটা আমার, একটা আমার মায়ের।'
'তোমার মা কোথায়?'
'কোথায় আবার? তোমার মায়ের কাছে। যে সব মায়েরা বাঁচতে জানে না তারা মা হয় কেন?'
তনুকা বললে, 'তুমি ঠিক বলেছ। কোনো বাবার এই সব মাকে বিয়ে করা উচিত নয়। আমি বাবাকে সেই কথাই বলি। এই সব স্বার্থপর মায়ের জন্যে কাঁদবে না। এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলবে না। দিনের পর দিন একা একা একটা বাড়িতে থেকে দেখ না, কেমন লাগে!'
তনুকার বাবা জিগ্যেস করলেন, 'তোমরা দুজনে চললে কোথায়?'
'আমরা যাব চন্দননগরে। ওখানে একেবারে গঙ্গার ওপরে এই শ্যামলের মেসোমশাইয়ের সুন্দর একটা বাগান বাড়ি আছে। মেসোমশাই খুব বড় ডাক্তার, এখন ভিয়েনায়। মাসিমা একেবারে একা। আমরা একদিন, দুদিন থাকব।'
'বাঃ, খুব ভালো। আমরা যাচ্ছি ব্যান্ডেলে। সেখানে গঙ্গার ধারে ছোট মতো একটা বাড়ি করা আছে। ওর মা খুব গঙ্গা ভালোবাসত। তা সে আর ক'দিন। বাড়িটা সহ্য হল না।'
তনুকা বাবাকে আবার শাসন করল, 'তোমাকে বলেছি না, মায়ের কথা যখন-তখন বলবে না।'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই তো। ঠিকই তো। মেয়ে কী বলছে জানো, বাড়িটা বিক্রি করে দাও। কিন্তু, স্মৃতি! যাক গে, ও সব কথায় কাজ নেই। পেয়ারা গাছটায় ফল ধরেছে, কাশীর পেয়ারা। পায়রা আর পাখিগুলো রোজই মনে হয় আসে। সে খেতে দিত; এখন আর কে দেবে?'
'বাবা! আবার?'
'না, না, কন্ট্রোল, কন্ট্রোল।'
স্টেশানে নামলুম। ট্রেনের জানলায় তনুকার মুখ। হাত নাড়ছে। চলে, চলে যাচ্ছে, দূর থেকে দূরে। এই একবারই আর দেখা হবে না। শ্যামল হঠাৎ ইশ করে উঠল, 'ঠিকানাটা রাখলে হত!'
'কী হত! এই ভালো, তোর গলায় এঁটো লিপস্টিকের কী সুন্দর দাগ! দেগে দিয়ে গেছে। দেখ না দশবছর পর কী হয়! আমরা কে কোথায়, কী ভাবে থাকি! পৃথিবী ঘুরছে, ঘটনাও ঘুরছে। হঠাৎ কোথাও তোর সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যেতে পারে, তখন কিন্তু মনে রাখিস, ওর মা নেই!'
শ্যামল বললে, 'মিল তোর সঙ্গেই বেশি, তোরও মা নেই। ফিল আপ দি ব্যাঙ্ক।'
'শ্যামল! এখন একটা সত্যি কথা বল তো, তুই বিউটি, বিউটি কী দেখে বলেছিলিস?'
'জানি না, মুখ ফসকে...।'
'একটা ম্যাজিক দেখবি?'
'কী?'
'বল তো এটা কী?'
'লিপস্টিক!'
'ও চকোলেটের বদলে এইটা আমার কোলে ফেলেছিল, আমি ফেরত দিইনি। এটা তোর কাছেই অপেক্ষায় থাকবে। কখনো যদি সে আসে...আচ্ছা! আমরা দাঁড়িয়ে আছি কেন, ফাঁকা লাইনের দিকে তাকিয়ে! তোর গলার দাগটা কিন্তু বিউটি, বিউটি।'
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%