রামুদা

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়



রামুদার চালাবাড়ির উত্তরদিকে শীত এসে গেছে। চুপিচুপি এসে বসে আছে। জায়গাটা ছায়া ছায়া। লম্বা একটা সজনে গাছ। মাঝে মাঝে উত্তরের বাতাসে মাথার দিকটা দুলে উঠছে। শালিকদের ঠোঁট শীত এলে আরো হলদে হয়ে যায়। একটা দাঁড়কাক কোথা থেকে চলে এসেছে এদিকে। অদ্ভুত তার ডাক—খাং-খাং। সাধারণ কাকেরা মিশমিশে কালো ওই কাকটাকে সহ্য করতে পারে না। ওটা ডাকলেই এরাও ডাকতে শুরু করে। রোজ সকালে এদিকে একবার আসি। আজ এক মাসেরও বেশি হয়ে গেল—রামুদা ফিরে এল না।—পুরোনো দরজায় মরচে ধরা একটা তালা। একটা জানলা আধখোলা। দাওয়াটায় ধুলো জমেছে। শীতের পাতা ঝরা শুরু হয়েছে। সেই সব ঝরাপাতা দাওয়ায় উঠে পড়েছে। বাতাসে সব কোণের দিকে জমেছে। আশ্চর্য ব্যাপার! রামুদা কারোকে কিছু না বলে কোথায় চলে গেল! সুন্দর একজন মানুষ। গত বছর মা মারা গেছে। সেই থেকে সবসময় একটা দুঃখু-দুঃখু ভাব। কেবলই বলত, 'মা চলে গেলে পৃথিবীতে কী আর থাকল! সবই গেল। আমি এখন কী করি? আমি যে কিছুই জানি না'। দাওয়াটায় চুপটি করে বসে থাকত। দূরের দিকে তাকিয়ে। একদিন গিয়ে দেখি ফ্যান গালতে গিয়ে দুটো হাত পুড়িয়ে বসে আছে, বড় বড় ফোস্কা। বললে, 'ও কিছু না, সেরে গেলেই সেরে যাবে।'
রামুদার রামায়ণ গান, যে একবার শুনেছে সে আর ভুলবে না। 'আমাকে শেখাবে রামুদা।' বললে, 'তুই আগে ভক্ত হ। যেদিন রাম বললেই চোখে জল আসবে, সেই দিন বুঝবি ভক্ত হয়েছিস। তবে তোর এই বয়েসেই শেখা উচিত। এখন সব মুখস্থ হয়ে যাবে তাড়াতাড়ি। তোর বাবা রাগী মানুষ, রাগ করবেন। আমার ভয় করে ভীষণ।'
আধখোলা জানলা দিয়ে ঘরের ভেতরে তাকাই। তক্তাপোশের বিছানার ওপর হারমোনিয়ামটা পড়ে আছে। দু-তিনটে বাঁধানো খাতা। একটা গায়ের চাদর। দেয়ালে মায়ের ছবি। ঠিক যেন মীরাবাঈ। পাশাপাশি দুটো ঘর। এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যাওয়ার দরজা। সব খাঁ খাঁ করছে। কেউ কোথাও নেই। হঠাৎ কী মনে হল, জোরে ডাকলুম—'রামুদা!'
কী আশ্চর্য! কে একজন উত্তর দিল—'বল, কী চাই?,
ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। কে রে বাবা! আবার একবার ডাকলুম—'রামুদা! তুমি কোথায়?'
উত্তর এল, 'এই তো এখানে।'
আর দাঁড়ায়! দৌড় দৌড় সোজা বাড়িতে। রামুদা মরে ভূত হয়ে ফিরে এসেছে।
আমাদের বিশাল বেলগাছের মোটা একটা ডালে বিরাট মৌচাক হয়েছে। মা আর বড়মা ঘাড় উঁচু করে গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে আছেন। মৌমাছিরা ভয়ঙ্কর ব্যস্ত। একদল যেই চাকে আসছে, সঙ্গে সঙ্গে চাক থেকে একদল খুস খুস করে ঝরে পড়ছে। যারা এল তারা বসে পড়ল চাকে। কোথা থেকে মধু সংগ্রহ করে এনেছে। চাকে রেখে উড়ে যাবে। আর একদল তখন এসে গেছে। মা বলছেন, 'দিদি, ছোট্ট একটা ঢিল টুক করে মেরে দেখবো কী হয়!'
'ওরে তুলসী! তোকে নিয়ে আমি কী করব রে। তোর মতো দুষ্টু মেয়ে আমি দুটো দেখিনি। মৌচাকে ঢিল মারলে বাঁচবি? মৌমাছির কামড় খেয়েছিস কোনোদিন, সুন্দরী কমলা। তোকে আমি দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখবো।'
'আমি বাঁচাও-বাঁচাও বলে আয়সা চেল্লাবো।'
বড়মা আমাকে দেখে বললেন, 'হাপরের মতো হাঁপাচ্ছিস কেন?'
'রামুদা!'
'ফিরে এসেছে?'
'না। তালা ঝুলছে। কিন্ত যেই রামুদা বলে ডাকলুম—কে উত্তর দিল! একবার নয় দু'বার। রামুদা মরে ভূত হয়ে গেছে।'
'চল তো তুলসী, দেখি কী বলছে!'
আমরা আবার বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। কেউ কোথাও নেই। উত্তরের দমকা বাতাসে রামুদার ঘরের দাওয়ায় শুকনো পাতা খড়খড় করে উড়ে যাচ্ছে এদিক থেকে ওদিকে। দুটো শালিক পায়চারি করছে। আমাদের দেখে নিজেদের মধ্যে কী বলাবলি করতে করতে উড়ে গেল। অনেক দূরে মাঠের পথে একটা মেয়ে দৌড়ে দৌড়ে কুমোরপাড়ার দিকে যাচ্ছে। ইচ্ছে করে চুলের বিনুনিটা এদিকে-ওদিকে পটাং পটাং করে দোলাচ্ছে। ওর নাম গৌরী। আমাকে খুব ভালোবাসে। আমাকে বলে, 'আমার চুল দেখেছিস? বেড়েই যাচ্ছে, বেড়েই যাচ্ছে। কেন বল তো? তোকে বাঁধবো বলে।'
বড়মা বললেন, 'আমার একটা ঝ্যাঁটা চাই। রামুর দাওয়াটার কী অবস্থা! ও থাকলে এমন নোংরা ফেলে রাখত! চারপাশ তকতক করত।' আমাকে বললেন, 'একবার ডাক তো।'
'রামুদা!' 'রামুদা!'...কোনো উত্তর নেই।
আমরা বাড়িটার পেছন দিকে গেলুম। রামুদার ছোট্ট বাগান। তুলসীবন। এদিকেও একটা দাওয়া। পড়ে আছে ছেঁড়া ছেঁড়া একটা কম্বল, এক বান্ডিল বিড়ি, এক প্যাকেট দেশলাই, আর ছাই। বড়মা বললেন, 'তাই তো! মনে হচ্ছে, হঠাৎ উঠে গেছে। কিন্তু কোথায়?'

অধ্যায় ৭ / ৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%