বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
চার মাস পরের ঘটনা। মার্চ মাসের শেষ।
মোম্বাসা থেকে রেলপথ গিয়েছে কিসুমু-ভিক্টোরিয়া নায়ানজা হ্রদের ধারে—তারই একটা শাখা লাইন তখন তৈরি হচ্ছিল। জায়গাটা মোম্বাসা থেকে সাড়ে তিনশো মাইল পশ্চিমে। ইউগাণ্ডা রেলওয়ের নুডসবার্গ স্টেশন থেকে বাহাত্তর মাইল দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। এখানে শঙ্কর কনস্ট্রাকশন ক্যাম্পের কেরানি ও সরকারি স্টোরকিপার হয়ে এসেছে। থাকে ছোটো একটা তাঁবুতে। তার আশ-পাশে অনেক তাঁবু। এখানে এখনও বাড়িঘর তৈরি হয় নি বলে তাঁবুতেই সবাই থাকে। তাঁবুগুলো একটা খোলা জায়গায় চক্রাকারে সাজানো—তাদের চারিধারে ঘিরে বহু দূরব্যাপী মুক্ত প্রান্তর, দীর্ঘ দীর্ঘ ঘাসে ভরা, মাঝে মাঝে গাছ। তাঁবুগুলোর ঠিক গায়েই খোলা জায়গার শেষ সীমায় একটা বড়ো বাওবাব গাছ। আফ্রিকার বিখ্যাত গাছ, শঙ্কর কতবার ছবিতে দেখেছে, এবার সত্যিকার বাওবাব দেখে শঙ্করের যেন আশ মেটে না।
নতুন দেশ, শঙ্করের তরুণ তাজা মন—সে ইউগাণ্ডার এই নির্জন মাঠ ও বনে নিজের স্বপ্নের সার্থকতাকে খুঁজে পেলে! কাজ শেষ হয়ে যেতেই সে তাঁবু থেকে রোজ বেরিয়ে পড়ত—যেদিকে দু-চোখ যায় সেদিকে বেড়াতে বার হত—পুবে, পশ্চিমে, দক্ষিণে, উত্তরে। সব দিকেই লম্বা লম্বা ঘাস, কোথাও মানুষের মাথা সমান উঁচু, কোথাও তার চেয়েও উঁচু।
কনস্ট্রাকশন তাঁবুর ভারপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার সাহেব একদিন শঙ্করকে ডেকে বললেন—শোনো রায়, ওরকম এখানে বেড়িয়ো না। বিনা বন্দুকে এখানে এক পাও যেয়ো না। প্রথম, এই ঘাসের জমিতে পথ হারাতে পারো। পথ হারিয়ে লোকে এসব জায়গায় মারাও গিয়েছে জলের অভাবে। দ্বিতীয়, ইউগাণ্ডা সিংহের দেশ। এখানে আমাদের সাড়াশব্দ আর হাতুড়ি ঠোকার আওয়াজে সিংহ হয়তো একটু দূরে চলে গিয়েছে—কিন্তু ওদের বিশ্বাস নেই। খুব সাবধান। এসব অঞ্চল মোটেই নিরাপদ নয়।
একদিন দুপুরের পরে কাজকর্ম বেশ পুরোদমে চলছে, হঠাৎ তাঁবু থেকে কিছু দূরে লম্বা ঘাসের জমির মধ্যে মনুষ্যকন্ঠের আর্তনাদ শোনা গেল। সবাই সেদিকে ছুটে গেল ব্যাপার কী দেখতে। শঙ্করও ছুটল—ঘাসের জমি পাতি-পাতি করে খোঁজা হল—কিছুই নেই সেখানে।
কীসের চীৎকার তবে?
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এলেন। কুলিদের নাম-ডাকা হল, দেখা গেল একজন কুলি অনুপস্থিত। অনুসন্ধানে জানা গেল সে একটু আগে ঘাসের বনের দিকে কী কাজে গিয়েছিল, তাকে ফীরে আসতে কেউ দেখে নি।
খোঁজাখুঁজি করতে করতে ঘাসের বনের বাইরে বালির ওপরে ক-টা সিংহের পায়ের দাগ পাওয়া গেল। সাহেব বন্দুক নিয়ে লোকজন সঙ্গে পায়ের দাগ দেখে দেখে অনেক দূর গিয়ে একটা বড়ো পাথরের আড়ালে হতভাগ্য কুলির রক্তাক্ত দেহ বার করলেন।
তাকে তাঁবুতে ধরাধরি করে নিয়ে আসা হল। কিন্তু সিংহের কোনো চিহ্ন মিলল না। লোকজনের চিৎকারে সে শিকার ফেলে পালিয়েছে। সন্ধ্যার পূর্বেই কুলিটা মারা গেল।
তাঁবুর চারিপাশের লম্বা ঘাস অনেকদূর পর্যন্ত কেটে সাফ করে দেওয়া গেল পরদিনই। দিনকতক সিংহের কথা ছাড়া তাঁবুতে কোনো গল্পই নেই। তারপর মাসখানেক পরে ঘটনাটা পুরোনো হয়ে গেল, সে কথা সকলের মনে চাপা পড়ে গেল। কাজকর্ম আবার বেশ চলল।
সেদিন দিনে খুব গরম। সন্ধ্যার একটু পরেই কিন্তু ঠাণ্ডা পড়ল। কুলিদের তাঁবুর সামনে অনেক কাঠকুটো জ্বালিয়ে আগুন করা হয়েছে। সেখানে তাঁবুর সবাই গোল হয়ে গল্পগুজব করছে। শঙ্করও সেখানে আছে, সে ওদের গল্প শুনছে এবং অগ্নিকুন্ডের আলোতে ‘কেনিয়া মর্নিং নিউজ’ পড়ছে। খবরের কাগজখানা পাঁচদিনের পুরোনো। কিন্তু এ জনহীন প্রান্তরে তবু এখানেতে বাইরের দুনিয়ার যা কিছু একটু খবর পাওয়া যায়।
তিরুমল আপ্পা বলে একজন মাদ্রাজি কেরানির সঙ্গে শঙ্করের খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল। তিরুমল তরুণ যুবক, বেশ ইংরেজি জানে, মনেও খুব উৎসাহ। সে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়। শঙ্করের পাশে বসে আজ সন্ধ্যা থেকে ক্রমাগত দেশের কথা, তার বাপ মায়ের কথা, তার ছোটো বোনের কথা বলছে। ছোটো বোনকে সে বড়ো ভালোবাসে। বাড়ি ছেড়ে এসে তার কথাই তিরুমলের বড়ো মনে হয়। একবার সে দেশের দিকে যাবে সেপ্টেম্বর মাসের শেষে। মাস-দুই ছুটি মঞ্জুর করবে না সাহেব?
ক্রমে রাত বেশি হল। মাঝে-মাঝে আগুন নিভে যাচ্ছে, আবার কুলিরা তাতে কাঠকুটো ফেলে দিচ্ছে। আরও অনেকে উঠে শুতে গেল। কৃষ্ণপক্ষের ভাঙা চাঁদ ধীরে ধীরে দূর দিগন্তে দেখা দিল—সমগ্র প্রান্তর জুড়ে আলো-আঁধারে লুকোচুরি আর বুনো গাছের দীর্ঘ-দীর্ঘ ছায়া।
শঙ্করের ভারি অদ্ভুত মনে হচ্ছিল বহুদূর বিদেশের এই স্তব্ধ রাত্রির সৌন্দর্য। কুলিদের ঘরের একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে একদৃষ্টে সে সমুখের বিশাল জনহীন তৃণভূমির আলো-আঁধার-মাখা রূপের দিকে চেয়ে চেয়ে কত কী ভাবছিল। ওই বাওবাব গাছটার ওদিকে অজানা দেশের সীমা কেপটাউন পর্যন্ত বিস্তৃত—মধ্যে পড়বে পর্বত, অরণ্য, প্রাগৈতিহাসিক যুগের নগর জিম্বারি—বিশাল ও বিভীষিকাময় কালাহারি মরুভূমি, হীরকের দেশ, সোনার খনির দেশ!
একজন বড়ো স্বর্ণান্বেষী পর্যটক যেতে যেতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। যে পাথরটাতে লেগে হোঁচট খেলেন—সেটা হাতে তুলে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলেন, তার সঙ্গে সোনা মেশানো রয়েছে। সে জায়গায় বড়ো একটা সোনার খনি বেরিয়ে পড়ল। এ ধরনের কত গল্প সে পড়েছে দেশে থাকতে।
এই সেই আফ্রিকা, সেই রহস্যময় মহাদেশ, সোনার দেশ, হিরের দেশ—কত অজানা জাতি, অজানা দৃশ্যাবলি, অজানা জীবজন্তু এর সীমাহীন ট্রপিক্যাল অরণ্যে আত্মগোপন করে আছে, কে তার হিসেব রেখেছে?
কত কী ভাবতে-ভাবতে শঙ্কর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ কীসের শব্দ তার ঘুম ভাঙল। সে ধড়মড় করে জেগে উঠে বসল। চাঁদ আকাশে অনেকটা উঠছে। ধবধবে সাদা জ্যোৎস্না দিনের মতো পরিষ্কার। অগ্নিকুন্ডের আগুন গিয়েছে নিবে। কুলিরা সব কুন্ডলী পাকিয়ে আগুনের ওপর শুয়ে আছে! কোনোদিকে কোনো শব্দ নেই।
হঠাৎ শঙ্করের দৃষ্টি পড়ল তার পাশে—এখানে তো তিরুমল আপ্পা বসে তার সঙ্গে গল্প করছিল। সে কোথায়? তা হলে হয়তো সে তাঁবুর মধ্যে ঘুমোতে গিয়ে থাকবে।
শঙ্করও নিজে উঠে শুতে যাবার উদ্যোগ করছে এমন সময় অল্প দূরেই পশ্চিম কোণে মাঠের মধ্যে ভীষণ সিংহগর্জন শুনতে পাওয়া গেল। রাত্রির অস্পষ্ট জ্যোৎস্নালোকে যেন তাঁবু কেঁপে উঠল সে রবে। কুলিরা ধড়মড় করে জেগে উঠল। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব—বন্দুক নিয়ে তাঁবুর বাইরে এলেন। শঙ্কর জীবনে এই প্রথম শুনলে সিংহের গর্জন—সেই দিক-দিশাহীন তৃণভূমির মধ্যে শেষরাত্রের জ্যোৎস্নায় সে গর্জন যে কী এক অনির্দেশ্য অনুভূতি তার মনে জাগালে!—তা ভয় নয়, সে এক রহস্যময় ও জটিল মনোভাব। একজন বৃদ্ধ মাসাই কুলি ছিল তাঁবুতে। সে বললে, সিংহ লোক মেরেছে। লোক না মারলে এমন গর্জন করবে না।
তাঁবুর ভেতর থেকে তিরুমলের সঙ্গী এসে হঠাৎ জানাল তিরুমলের বিছানা শূন্য। সে তাঁবুর মধ্যে কোথাও নেই।
কথাটা শুনে সবাই চমকে উঠল। শঙ্কর নিজে তাঁবুর মধ্যে ঢুকে দেখে এল সত্যিই সেখানে কেউ নেই। তখনি কুলিরা আলো জ্বেলে লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সব তাঁবুগুলোতে খোঁজ করা হল, নাম ধরে চিৎকার করে ডাকাডাকি করলে সবই মেলে—তিরুমলের কোনো সাড়া মিলল না।
তিরুমল যেখানটাতে শুয়েছিল, সেখানটাতে ভালো করে দেখা গেল তখন, একটা কোণে ভারী জিনিসকে টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগ মাটির ওপর সুস্পষ্ট। ব্যাপারটা বুঝতে কারও দেরি হল না। বাওবাব গাছের কাছে তিরুমলের জামার হাতার খানিকটা টুকরো পাওয়া গেল। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব বন্দুক নিয়ে আগে আগে চললেন, শঙ্কর তাঁর সঙ্গে চলল। কুলিরা তাঁদের অনুসরণ করতে লাগল। সেই গভীর রাত্রে তাঁবু থেকে দূরে মাঠে চারিদিকে অনেক জায়গা খোঁজা হল, তিরুমলের দেহের কোনো সন্ধান মিলল না। এবার আবার সিংহগর্জন শোনা গেল—কিন্তু দূরে। যেন এই নির্জন প্রান্তরে অধিষ্ঠাত্রী কোনো রহস্যময়ী রাক্ষসীর বিকট চিৎকার।
মাসাই কুলিটা বললে—সিংহ দেহ নিয়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু ওকে নিয়ে আমাদের ভুগতে হবে। আরও অনেকগুলো মানুষ ও ঘাল না করে ছাড়বে না। সবাই সাবধান। যে সিংহ একবার মানুষ খেতে শুরু করে, সে অত্যন্ত ধূর্ত হয়ে ওঠে।

তখনি কুলিরা আলো জ্বেলে লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ।
রাত তখন তিনটে, তখন সবাই ফিরল তাঁবুতে। বেশ ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় সারা মাঠ আলো হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার এই অংশে পাখি বড়ো একটা দেখা যায় না দিনমানে, কিন্তু এক ধরনের রাত্রিচর পাখির ডাক শুনতে পাওয়া যায় রাত্রে—সে সুর অপার্থিব ধরনের মিষ্ট। এইমাত্র সেই পাখি কোনো গাছের মাথায় বহুদূরে ডেকে উঠল। মনটা এক মুহূর্তে উদাস করে দেয়। শঙ্কর ঘুমোতে গেল না। আর সবাই তাঁবুর মধ্যে শুতে গেল—কারণ পরিশ্রম কারও কম হয়নি। তাঁবুর সামনে কাঠকুটো জ্বালিয়ে প্রকান্ড অগ্নিকুন্ড করা গেল। শঙ্কর সাহস করে বাইরে বসতে অবিশ্যি পারলে না—এরকম দুঃসাহসের কোনো অর্থ হয় না। তবে সে নিজের খড়ের ঘরে শুয়ে জানলা দিয়ে বিস্তৃত জ্যোৎস্নালোকিত অজানা প্রান্তরের দিকে চেয়ে রইল।
মনে কী এক অদ্ভুত ভাব। তিরুমলের অদৃষ্টলিপি এই জন্যেই বোধ হয় তাকে আফ্রিকায় টেনে এনেছিল। তাকেই বা কী জন্যে এখানে এনেছে তার অদৃষ্ট, কে জানে তার খবর?
আফ্রিকা অদ্ভুত সুন্দর দেখতে—কিন্তু আফ্রিকা ভয়ংকর। দেখতে বাবলা বনে ভরতি বাংলাদেশের মাঠের মতো দেখালে কী হবে, আফ্রিকা অজানা মৃত্যুসংকুল! যেখানে সেখানে অতর্কিত নিষ্ঠুর মৃত্যুর ফাঁদ পাতা... পরমুহূর্তে কী ঘটবে, এ মুহূর্তে তা কেউ বলতে পারে না।
আফ্রিকা প্রথম বলি গ্রহণ করেছে—তরুণ হিন্দু যুবক তিরুমলকে। সে বলি চায়।
তিরুমল তো গেল, সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পে পরদিন থেকে এমন অবস্থা হয়ে উঠল যে আর সেখানে সিংহের উপদ্রবে থাকা যায় না। মানুষ-খেকো সিংহ অতি ভয়ানক জানোয়ার! যেমন সে ধূর্ত তেমনি সাহসী। সন্ধ্যা তো দূরের কথা দিনমানেই একা বেশিদূর যাওয়া যায় না। সন্ধ্যার আগে তাঁবুর মাঠে নানা জায়গায় বড়ো বড়ো আগুনের কুন্ড করা হয়, কুলিরা আগুনের কাছ ঘেঁষে বসে গল্প করে, রান্না করে, সেখানে বসেই খাওয়া-দাওয়া করে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব বন্দুক হাতে রাত্রে তিন-চারবার তাঁবুর চারিদিকে ঘুরে পাহারা দেন, ফাঁকা দ্যাওড় করেন—এত সতর্কতার মধ্যেও একটা কুলিকে সিংহে নিয়ে পালাল তিরুমলকে মারবার ঠিক দুদিন পরে সন্ধ্যা-রাত্রে। তার পরদিন একটা সোমালি কুলি দুপুরে তাঁবু থেকে তিনশো গজের মধ্যে পাথরের ঢিবিতে পাথর ভাঙতে গেল—সন্ধ্যায় সে আর ফিরে এল না।
সেই রাত্রেই, রাত দশটার পরে, শঙ্কর ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের তাঁবু থেকে ফিরছে, লোকজন কেউ বড়ো একটা বাইরে নেই, সকাল সকাল যে যার ঘরে শুয়ে পড়েছে, কেবল এখানে ওখানে দু-একটা নির্বাপিত প্রায় অগ্নিকুন্ড। দূরে শেয়াল ডাকছে—শেয়ালের ডাক শুনলেই শঙ্করের মনে হয় সে বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ে আছে—চোখ বুজে সে নিজের গ্রামটা ভাববার চেষ্টা করে, তাদের ঘরের কোণের সেই বিলিতি-আমড়া গাছটা ভাববার চেষ্টা করে—আজও সে একবার থমকে দাঁড়িয়ে তাড়াতাড়ি চোখ বুজলে।
কী চমৎকার লাগে! কোথায় সে? সেই তাদের গাঁয়ের বাড়িতে জানলার কাছে তক্তপোশে শুয়ে? বিলিতি আমড়া গাছটার ডালপালা চোখ খুললেই চোখে পড়বে? ঠিক? দেখবে সে চোখ খুলে?
শঙ্কর ধীরে ধীরে চোখ খুললে।
অন্ধকার প্রান্তর। দূরে সেই বড়ো বাওবাব গাছটা অস্পষ্ট অন্ধকারে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ তার মনে হল সামনের একটা ছাতার মতো গোল খড়ের নীচু ডালের ওপর একটা কী যেন নড়ছে। পরক্ষণেই সে ভয়ে ও বিস্ময়ে কাঠ হয়ে গেল।

সিংহ চালার খড় খুঁচিয়ে গর্ত করতে ব্যস্ত....শঙ্করকে সে এখনও দেখতে পায়নি ।
প্রকান্ড একটা সিংহ খড়ের চাল থাবা দিয়ে খুঁচিয়ে গর্ত করবার চেষ্টা করছে ও মাঝে মাঝে নাকটা চালের গর্তের কাছে নিয়ে গিয়ে কীসের যেন ঘ্রাণ নিচ্ছে!
তার কাছ থেকে চালাটার দূরত্ব বড়ো জোর বিশ হাত।
শঙ্কর বুঝলে সে ভয়ানক বিপদগ্রস্ত। সিংহ চালার খড় খুঁচিয়ে গর্ত করতে ব্যস্ত, সেখান দিয়ে ঢুকে সে মানুষ নেবে—শঙ্করকে সে এখনও দেখতে পায়নি। তাঁবুর বাইরে কোথাও লোক নেই, সিংহের ভয়ে বেশি রাত্রে কেউ বাইরে থাকে না। নিজে সে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, একগাছা লাঠি পর্যন্ত নেই হাতে।
শঙ্কর নি:শব্দে পিছু হঠতে লাগল ইঞ্জিনিয়ারের তাঁবুর দিকে সিংহের দিকে চোখ রেখে। এক মিনিট...দু মিনিট... নিজের স্নায়ুমন্ডলীর ওপর যে তার এত কতৃত্ব ছিল, তা এর আগে শঙ্কর জানত না। একটা ভীতিসূচক শব্দ তার মুখ দিয়ে বেরোল না বা সে হঠাৎ পিছু ফিরে দৌড় দেবার চেষ্টাও করল না।
ইঞ্জিনিয়ারের তাঁবুর পর্দা উঠিয়ে সে ঢুকে দেখল, সাহেব টেবিলে বসে তখনও কাজ করছে। সাহেব ওর রকম-সকম দেখে বিস্মিত হয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই ও বললে—সাহেব, সিংহ!..
সাহেব লাফিয়ে উঠল—কই? কোথায়?
বন্দুকের র্যাকে একটা ৩৭৫ ম্যানলিকার রাইফেল ছিল—সাহেব সেটা নামিয়ে নিল। শঙ্করকে আর একটি রাইফল দিল। দুজনে তাঁবুর পর্দা তুলে আস্তে আস্তে বাইরে এল। একটু দূরেই কুলি লাইনের সেই গোল চালা। কিন্তু চালার ওপর কোথায় সিংহ? শঙ্কর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন—এই মাত্র দেখে গেলাম স্যার। ওই চালার ওপর সিংহ থাবা দিয়ে খড় খোঁচাচ্ছে।
সাহেব বললে—পালিয়েছে। জাগাও সবাইকে।
একটু পরে তাঁবুতে মহা শোরগোল পড়ে গেল। লাঠি, সড়কি, গাঁতি, মুগুর নিয়ে কুলিরা দল হল্লা করে বেরিয়ে পড়ল—খোঁজ খোঁজ চারিদিকে, খড়ের চালে সত্যিই ফুটো দেখা গেল। সিংহের পায়ের দাগও পাওয়া গেল। কিন্তু সিংহ উধাও হয়েছে। আগুনের কুন্ডে বেশি করে কাঠ ও শুকনো খড় ফেলে আগুন আবার জ্বালানো হল। সে রাত্রে অনেকেরই ভালো ঘুম হল না, কিন্তু তাঁবুর বাইরেও বড়ো একটা কেউ রইল না। শেষ রাত্রের দিকে শঙ্কর নিজের তাঁবুতে শুয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল—একটা মহা শোরগোলের শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। মাসাই কুলিরা ‘সিম্বা সিম্বা’ বলে চিৎকার করছে। দুবার বন্দুকের আওয়াজ হল। শঙ্কর তাঁবুর বাইরে এসে ব্যাপার জিজ্ঞাসা করে জানল সিংহ এসে আস্তাবলের একটা ভারবাহী অশ্বতরকে জখম করে গিয়েছে—এই মাত্র। সবাই শেষ রাত্রে একটু ঝিমিয়ে পড়েছে আর সেই সময়ে এই কান্ড।
পরদিন সন্ধ্যার ঝোঁকে একটা ছোকরা কুলিকে তাঁবুর একশো হাতের মধ্যে থেকে সিংহে নিয়ে গেল। দিন চারেক পরে আর একটা কুলিকে নিল বাওবাব গাছটার তলা থেকে।
কুলিরা আর কেউ কাজ করতে চায় না। লম্বা লাইনে গাঁতিওয়ালা কুলিদের অনেক সময়ে খুব ছোটো দলে ভাগ হয়ে কাজ করতে হয়—তারা তাঁবু ছেড়ে দিনের বেলাতেও বেশিদূর যেতে চায় না। তাঁবুর মধ্যে থাকাও রাত্রে নিরাপদ নয়। সকলেরই মনে ভয়—প্রত্যেকেই ভাবে এবার তার পালা। কাকে কখন নেবে কিছু স্থিরতা নেই। এই অবস্থায় কাজ হয় না। কেবল মাসাই কুলিরা অবিচলিত রইল—তারা যমকেও ভয় করে না। তাঁবু থেকে দু-মাইল দূরে গাঁতির কাজ তারাই করে, সাহেব বন্দুক নিয়ে দিনের মধ্যে চার-পাঁচবার তাদের দেখাশোনা করে আসে।
কত নতুন ব্যবস্থা করা হল, কিছুতেই সিংহের উপদ্রব কমল না। কত চেষ্টা করেও সিংহ শিকার করা গেল না। অনেকে বললে সিংহ একটা নয়, অনেকগুলো—ক-টা মেরে ফেলা যাবে? সাহেব বললে—মানুষ-খেকো সিংহ বেশি থাকে না। এ একটা সিংহেরই কাজ।
একদিন সাহেব শঙ্করকে ডেকে বললে বন্দুকটা নিয়ে গাঁতিদার কুলিদের একবার দেখে আসতে। শঙ্কর বললে—সাহেব, তোমার ম্যানলিকারটা দাও।
সাহেব রাজি হল। শঙ্কর বন্দুক নিয়ে একটা অশ্বতরে চড়ে রওনা হল—তাঁবু থেকে মাইল খানেক দূরে একজায়গায় একটা ছোটো জলা। শঙ্কর দূর থেকে জলাটা যখন দেখতে পেয়েছে, তখন বেলা প্রায় তিনটে। কেউ কোনো দিকে নেই, রোদের ঝাঁঝ মাঠের মধ্যে তাপ-তরঙ্গের সৃষ্টি করেছে।
হঠাৎ অশ্বতর থমকে দাঁড়িয়ে গেল। আর কিছুতেই সেটা এগিয়ে যেতে চায় না। শঙ্করের মনে হল জায়গাটার দিকে যেতে অশ্বতরটা ভয় পাচ্ছে। একটু পরে পাশের ঝোপে কী যেন একটা নড়ল। কিন্তু সেদিকে চেয়ে সে কিছু দেখতে পেলে না। সে অশ্বতর থেকে নামল। তবুও অশ্বতর নড়তে চায় না।
হঠাৎ শঙ্করের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। ঝোপের মধ্যে সিংহ তার জন্যে ওঁত পেতে বসে নেই তো? অনেক সময়ে এরকম হয় সে জানে, সিংহ পথের পাশে ঝোপঝাপের মধ্যে লুকিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত নি:শব্দে তার শিকারের অনুসরণ করে। নির্জন স্থানে সুবিধা বুঝে তার ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে। যদি তাই হয়? শঙ্কর অশ্বতর নিয়ে আর এগিয়ে যাওয়া উচিত বিবেচনা করল না। ভাবল তাঁবুতে ফিরেই যাই। সবে সে তাঁবুর দিকে অশ্বতরের মুখটা ফিরিয়েছে, এমন সময় আবার ঝোপের মধ্যে কী একটা নড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ানক সিংহগর্জন এবং একটা ধূসর বর্ণের বিরাট দেহ সশব্দে অশ্বতরের ওপর এসে পড়ল। শঙ্কর তখন হাত চারেক এগিয়ে আছে। সে তখনই ফিরে দাঁড়িয়ে বন্দুক উঁচিয়ে উপরি উপরি দুবার গুলি করল। গুলি লেগেছে কি না বোঝা গেল না, কিন্তু তখন অশ্বতর মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে—ধূসর বর্ণের জানোয়ারটা পলাতক। শঙ্কর পরীক্ষা করে দেখল অশ্বতরের কাঁধের কাছে অনেকটা মাংস ছিন্নভিন্ন, রক্তে মাটি ভেসে যাচ্ছে। যন্ত্রণায় সেটা ছটফট করছে। শঙ্কর এক গুলিতে তার যন্ত্রণার অবসান করল।

হঠাৎ অশ্বতর থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
তারপর সে তাঁবুতে ফিরে এল। সাহেব বলল, সিংহ নিশ্চয়ই জখম হয়েছে। বন্দুকের গুলি যদি গায়ে লাগে তবে দস্তুরমতো জখম তাকে হতেই হবে। কিন্তু গুলি লেগেছিল তো? শঙ্কর বললে—গুলি লাগালাগির কথা সে বলতে পারে না। বন্দুক ছুঁড়েছিল, এই মাত্র কথা। লোকজন নিয়ে খোঁজাখুঁজি করে দু-তিন দিনেও কোনো আহত বা মৃত সিংহের সন্ধান কোথাও পাওয়া গেল না।
জুন মাসের প্রথম থেকে বর্ষা নামল। কতকটা সিংহের উপদ্রবের জন্যে, কতকটা বা জলাভূমির সান্নিধ্যের জন্যে অস্বাস্থ্যকর হওয়ায় তাঁবু ওখান থেকে উঠে গেল।
শঙ্করকে আর কন্সট্রাকশন তাঁবুতে থাকতে হল না। কিসুমু থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে একটা ছোটো স্টেশনে সে স্টেশন মাস্টারের কাজ পেয়ে জিনিসপত্র নিয়ে সেখানেই চলে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন