বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
দুপুরের রোদে যখন দিকে-দিগন্তে আগুন জ্বলে উঠল, একটা ছোট্ট পাথরের ঢিবির আড়ালে সে আশ্রয় নিলে। ১৩৫° ডিগ্রি উত্তাপ উঠেছে তাপমান যন্ত্রে, রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে এ উত্তাপে পথ হাঁটা চলে না। যদি সে কোনো রকমে এই ভয়ানক মরুভূমির হাত এড়াতে পারত, তবে হয়ত জীবন্ত অবস্থায় মানুষের আবাসে পৌঁছুতেও পারত। সে ভয় করে শুধু এই মরুভূমি, সে জানে কালাহারি মরু বড়ো বড়ো সিংহের বিচরণভূমি, কিন্তু তার হাতে রাইফেল আছে—রাতদুপুরেও একা যত সিংহই হোক, সম্মুখীন হতে সে ভয় করে না— কিন্তু ভয় হয় তৃষ্ণা-রাক্ষসীকে। তার হাত থেকে পরিত্রাণ নেই। দুপুরে সে দু-বার মরীচিকা দেখলে। এতদিন মরুপথে আসতেও এ আশ্চর্য নৈসর্গিক দৃশ্য দেখেনি, বইয়ের পড়েছিল মরীচিকার কথা। একবার উত্তর-পূর্ব কোণে, একবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, দুই মরীচিকাই কিন্তু প্রায় একরকম—অর্থাৎ একটা বড়ো গম্বুজওয়ালা মসজিদ বা গির্জা, চারিপাশে খর্জুরকুঞ্জ, সামনে বিস্তৃত জলাশয়। উত্তর-পূর্ব কোণের মরীচিকাটা বেশি স্পষ্ট।
সন্ধ্যার দিকে দূরদিগন্তে মেঘমালার মতো পর্বতমালা দেখা গেল। শঙ্কর নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলে না। পূর্বদিকে একটাই মাত্র বড়ো পর্বত, এখান থেকে দেখা পাওয়া সম্ভব, দক্ষিণ রোডেসিয়ার প্রান্তবর্তী চিমানিমানি পর্বতমালা। তাহলে কি বুঝতে হবে যে, সে বিশাল কালাহারি পদব্রজে পার হয়ে প্রায় শেষ করতে চলেছে। না ও-ও মরীচিকা?
কিন্তু রাত দশটা পর্যন্ত পথ চলেও জ্যোৎস্নারাত্রে সে দূর-পর্বতের সীমারেখা তেমনি স্পষ্ট দেখতে পেল। অসংখ্য ধন্যবাদ হে ভগবান, মরীচিকা নয় তবে। জ্যোৎস্নারাত্রে কেউ কখনো মরীচিকা দেখেনি।
তবে কি প্রাণের আশা আছে? আজ পৃথিবীর বৃহত্তম রত্নখনির মালিক সে। নিজের পরিশ্রমে ও দুঃসাহসের বলে সে তার স্বত্ব অর্জন করেছে। দরিদ্র বাংলা মায়ের বুকে সে যদি আজ বেঁচে ফেরে।
দুদিনের দিন বিকালে সে এসে পর্বতের নীচে পৌঁছুল। তখন সে দেখলে পর্বত পার হওয়া ছাড়া ওপারে যাওয়ার কোনো সহজ উপায় নেই। নইলে পঁচিশ মাইল মরুভূমিতে পাড়ি দিয়ে পর্বতের দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে আসতে হবে। মরুভূমির মধ্যে সে আর কিছুতেই যেতে রাজি নয়। সে পাহাড় পার হয়েই যাবে।
এইখানে সে প্রকান্ড একটা ভুল করলে। সে ভুলে গেল যে সাড়ে বারো হাজার ফুট একটা পর্বতমালা ডিঙিয়ে ওপারে যাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। রিখটারসভেল্ড পার হওয়ার মতোই শক্ত। তার চেয়েও শক্ত, কারণ সেখানে আলভারেজ ছিল, এখানে সে একা।
শঙ্কর ব্যাপারের গুরুত্বটা বুঝতে পারলে না, ফলে চিমানিমানি পর্বত উত্তীর্ণ হতে গিয়ে প্রাণ হারাতে বসল, ভীষণ প্রজ্বলন্ত কালাহারি পার হতে গিয়েও সে এমন ভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর সম্মুখীন হয়নি।
চিমানিমানি পর্বতের জঙ্গল খুব বেশি ঘন নয়। শঙ্কর প্রথম দিনে অনেকটা উঠল—তার পর একটা জায়গায় গিয়ে পড়ল, সেখান থেকে কোনোদিকে যাবার উপায় নেই। কোন পথটা দিয়ে উঠেছিল সেটাও আর খুঁজে পেল না—তার মনে হল, সে সমতলভূমির যে জায়গা দিয়ে উঠেছিল, তার ত্রিশ ডিগ্রি দক্ষিণে চলে এসেছে। কেন যে এমন হল, এর কারণ কিছুতেই সে বার করতে পারলে না। কোথা দিয়ে কোথায় চলে গেল, কখনও উঠছে, কখনও নামছে, সূর্য দেখে ঠিক করে নিচ্ছে, কিন্তু সাত-আট মাইল পাহাড় উত্তীর্ণ হতে এতদিন লাগছে কেন?
তৃতীয় দিনে আর একটা নতুন বিপদ ঘটল। তার আগের দিন একখানা আলগা পাথর গড়িয়ে তার পায়ে চোট লেগেছিল। তখন তত কিছু হয়নি, পরদিন সকালে আর সে শয্যা ছেড়ে উঠতে পারে না। হাঁটু ফুলেছে, বেদনাও খুব। দুর্গম পথে নামা-ওঠা করা এ অবস্থায় অসম্ভব। পাহাড়ের একটা ঝরনা থেকে ওঠবার সময় জল সংগ্রহ করে এনেছিল, তাই একটু একটু করে খেয়ে চালাচ্ছে। পায়ের বেদনা কমে না যাওয়া পর্যন্ত তাকে এখানেই অপেক্ষা করতে হবে। বেশিদূর যাওয়া চলবে না। সামান্য একটু-আধটু চলাফেরা করতেই হবে খাদ্য ও জলের চেষ্টায়, ভাগ্যে পাহাড়ের এই স্থানটা যেন খানিকটা সমতলভূমির মতো, তাই রক্ষা।
এই সব অবস্থায়, এই মনুষ্যবাসহীন পাহাড়ের বিপদ তো পদে পদেই। একা এ পাহাড় টপকাতে গেলে যে-কোনো ইউরোপীয় পর্যটকেরও ঠিক এই রকম বিপদ ঘটতে পারত।
শঙ্কর আর পারে না। ওর হৃৎপিন্ডে কী একটা রোগ হয়েছে, একটু হাঁটলেই ধড়াস ধড়াস করে হৃৎপিন্ডটা পাঁজরায় ধাক্কা মারে। অমানুষিক পথশ্রমে, দুর্ভাবনায় অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে, কখনও বা অনাহারের কষ্টে, ওর শরীরে কিছু নেই।
চারদিনের দিন সন্ধ্যাবেলা অবসন্ন দেহে সে একটা গাছের তলায় আশ্রয় নিলে। খাদ্য নেই কাল থেকে। রাইফেল সঙ্গে আছে, কিন্তু একটা বন্য জন্তুর দেখা নেই। দুপুরে একটা হরিণকে চরতে দেখে ভরসা হয়েছিল, কিন্তু রাইফেলটা তখন ছিল পঞ্চাশ গজ তফাতে একটা গাছে ঠেস দেওয়া, আনতে গিয়ে হরিণটা পালিয়ে গেল। জল খুব সামান্যই আছে, চামড়ার বোতলে। এ অবস্থায় নেমে সে ঝরনা থেকে জল আনবেই বা কী করে? হাঁটুটা আরও ফুলেছে। বেদনা এত বেশি যে, একটু চলাফেরা করলেই মাথার শির পর্যন্ত ছিঁড়ে পড়ে যন্ত্রণায়।
পরিষ্কার আকাশতলে আদ্রতাশূন্য বায়ুমন্ডলের গুণে অনেকদূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দিকচক্রবালে মেঘলা করে ঘিরেছে নীল পর্বতমালা দূরে দূরে। দক্ষিণ-পশ্চিমে দিগন্ত-বিস্তীর্ণ কালাহারি। দক্ষিণে ওয়াহকুহকু পর্বত, তারও অনেক পেছনে মেঘের মতো দৃশ্যমান পল ক্রুগার পর্বতমালা—সলসবেরির দিকে কিছু দেখা যায় না, চিমানিমানি পর্বতের এক উচ্চতর শৃঙ্গ সেদিকে দৃষ্টি আটকেছে।
আজ দুপুর থেকে ওর মাথার ওপর শকুনির দল উড়েছে। এতদিন এত বিপদেও শঙ্করের যত হয় নি, আজ শকুনির দল মাথার ওপর উড়তে দেখে শঙ্করের সত্যই ভয় হয়েছে। ওরা তাহলে কি বুঝেছে যে শিকার জোটবার বেশি দেরি নেই?
সন্ধার কিছু পরে কী একটা শব্দ শুনে চেয়ে দেখল, পাশের শিলাখন্ডের আড়ালে একটা ধূসর রঙের নেকড়ে বাঘ—নেকড়ের লম্বা ছুঁচালো কান দুটো খাড়া হয়ে আছে, সাদা সাদা দাঁতের ওপর দিয়ে রাঙা জিবটা অনেকখানি বার করে লক লক করছে। চোখে চোখ পড়তেই সেটা চট করে পাথরের আড়াল থেকে সরে দূরে পালাল।
নেকড়ে বাঘটাও তাহলে কী বুঝেছে? পশুরা নাকি আগে থেকে অনেক কথা জানতে পারে।
হাড় ভাঙা শীত পড়ল রাত্রে। ও কিছু কাঠকুটো কুড়িয়ে আগুন জ্বাললে। অগ্নিকুন্ডের আলো যতটুকু পড়েছে তার বাইরে ঘন অন্ধকার।
কী একটা জন্তু এসে অগ্নিকুন্ড থেকে কিছু দূরে অন্ধকারে দেহ মিশিয়ে চুপ করে বসল। কোয়োট, বন্যকুকুর জাতীয় জন্তু। ক্রমে আর একটা, আর দুটো, আর তিনটে। রাত বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে দশ-পনেরোটা এসে জমা হল। অন্ধকারে তার চারিধার ঘিরে নি:শব্দে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে যেন কীসের প্রতীক্ষা করছে।
কী সব অমঙ্গলজনক দৃশ্য।
ভয়ে ওর গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। সত্যিই কি এতদিনে তারও মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে (।) এতদিন পরে এল তা হলে! সে-ও পারলে না রিখটারসভেল্ড থেকে হিরে নিয়ে পালিয়ে যেতে!
উঃ, আজ কত টাকার মালিক সে। হিরের খনি বাদ যাক, তার সঙ্গে যে ছ-খানা হিরে রয়েছে, তার দাম অন্তত দু-দিন লক্ষ টাকা নিশ্চয় হবে। তার গরিব গ্রামে, গরিব বাপমায়ের বাড়িতে যদি এই টাকা নিয়ে গিয়ে উঠতে পারত... কত গরিবের চোখের জল মুছিয়ে দিতে পারত, গ্রামে কত দরিদ্র কুমারীকে বিবাহের যৌতুক দিয়ে ভালো পাত্রে বিবাহ দিত, কত সহায়হীন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার শেষ দিন ক-টা নিশ্চিন্ত করে তুলতে পারত.....
কিন্তু সে-সব ভেবে কী হবে, যা হবার নয়? তার চেয়ে এই অপূর্ব রাত্রির নক্ষত্রালোকিত আকাশের শোভা, এই বিশাল পর্বত ও মরুভূমির নিস্তব্ধ গম্ভীর রূপ, মৃত্যুর আগে শঙ্করও চায় চোখ ভরে দেখতে, সেই ইটালিয়ান যুবক গাত্তির মতো। ওরা যে অদৃষ্টের এক অদৃশ্য তারে গাঁথা সবাই, আত্তিলিও গাত্তি ও তার সঙ্গীরা, জিম কার্টার, আলভারেজ, সে...
রাত গভীর হয়েছে। কী ভীষণ শীত!... একবার সে চেয়ে দেখলে, কোয়োটাগুলো এরই মধ্যে কখন আরও নিকটে সরে এসেছে। অন্ধকারের মধ্যে আলো পড়ে তাদের চোখগুলো জ্বলছে। শঙ্কর একখানা জ্বলন্ত কাঠ ছুড়ে মারতেই ওরা সব দূরে সরে গেল—কিন্তু কী নি:শব্দ ওদের গতিবিধি আর কী অসীম তাদের ধৈর্যও! শঙ্করের মনে হল, ওরা জানে শিকার ওদের হাতের মুঠোয়, হাতছাড়া হবার কোনো উপায় নেই।
ইতিমধ্যে সন্ধ্যাবেলা সেই ধূসর নেকড়ে বাঘটাও দু-বার এসে কোয়োটদের পেছনে অন্ধকারে বসে গিয়েছে।
একটুও ঘুমুতে ভরসা হল না ওর। কী জানি কোয়োট আর নেকড়ের দল হয়তো তা হলে জীবন্তই তাকে ছিঁড়ে খাবে মৃত মনে করে। অবসন্ন, ক্লান্ত দেহে জেগেই বসে থাকতে হবে তাকে। ঘুমে চোখ ঢুলে আসলেও উপায় নেই। মাঝে মাঝে কোয়োটগুলো এগিয়ে এসে বসে, ও জ্বলন্ত কাঠ ছুঁড়ে মারতেই সরে যায়...দু-একটা হায়েনাও এসে ওদের দলে যোগ দিলে....হায়েনাদের চোখগুলো অন্ধকারে কি ভীষণ জ্বলছে!
কী ভয়ানক অবস্থাতে পড়েছে। জনবিরল বর্বর দেশের জনশূন্য পর্বতের সাড়ে তিন হাজার ফুট ওপরে সে চলৎশক্তিহীন অবস্থায় বসে... গভীর রাত, ঘোর অন্ধকার... সামান্য আগুন জ্বলছে...মাথার ওপর জলকণাশূন্য স্তব্ধ বায়ুমন্ডলের গুণে আকাশের অগণ্য তারা জ্বল জ্বল করছে যেন ইলেকট্রিক আলোর মতো...নীচে তার চারিধার ঘিরে অন্ধকারে মাংসলোলুপ নীরব কোয়োট, হায়েনার দল।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার এটাও মনে হল, বাংলার পাড়াগাঁয়ে ম্যালেরিয়ায় ধুঁকে সে মরেছে না। এ মৃত্যু বীরের মৃত্যু। পদব্রজে কালাহারি মরুভূমি পার হয়েছে সে—একা। মরে গিয়ে চিমানিমানি পর্বতের শিলায় নাম খুদে রেখে যাবে। সে একজন বিশিষ্ট ভ্রমণকারী ও আবিষ্কারক। অতবড়ো হিরের খনি সে-ই তো খুঁজে বার করেছে! আলভারেজ মারা যাওয়ার পরে, সেই বিশাল অরণ্য ও পর্বত অঞ্চলের গোলকধাঁধা থেকে তো সে একাই বার হতে পেরে এতদূর এসেছে! এখন সে নিরুপায়, অসুস্থ, চলৎশক্তি-রহিত। তবুও সে যুঝছে, ভয় তো পায় নি, সাহস তো হারায়নি। কাপুরুষ, ভীরু নয় সে। জীবন মৃত্যু তো অদৃষ্টের খেলা। না-বাঁচলে আর তার দোষ কি?
দীর্ঘ রাত্রি কেটে গিয়ে পূর্বদিক ফরসা হল। সঙ্গে সঙ্গে বন্য জন্তুর দল কোথায় পালাল। বেলা বাড়ছে, আবার নির্মম সূর্য জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে শুরু করছে দিকবিদিক। সঙ্গে সঙ্গে শকুনির দল কোথা থেকে এসে হাজির। কেউ মাথার ওপর ঘুরছে, কেউ বা দূরে দূরে গাছের ডালে কি পাথরের ওপরে বসেছে। খুব ধীরভাবে প্রতীক্ষা করছে। ওরা যেন বলছে—কোথায় যাবে বাছাধন? যে ক-দিন লাফালাফি করবে, করে নাও। আমরা বসি, এমন কিছু তাড়াতাড়ি নেই আমাদের।
শঙ্করের খিদে নেই। খাবার ইচ্ছেও নেই। তবুও সে গুলি করে একটা শকুনি মারলে। রৌদ্র ভীষণ চড়েছে। আগুন-তাতা পাথরের গায়ে পা রাখা যায় না! এ পর্বতও মরুভূমির সামিল, খাদ্য এখানে মেলে না, জলও না। সে মরা শকুনটা নিয়ে আগুন জ্বেলে ঝলসাতে বসল। এর আগে মরুভূমির মধ্যেও সে শকুনির মাংস খেয়েছে। এরাই এখন প্রাণধারণের একমাত্র উপায়, আজ ও খাচ্ছে ওদের, কাল ওরা খাবে ওকে। শকুনিগুলো এসে আবার মাথার ওপর জুটেছে।
তার নিজের ছায়া পড়েছে পাথরের গায়ে, সে নির্জন স্থানে শঙ্করের উদভ্রান্ত মনে ছায়াটা যেন আর একজন সঙ্গী মনে হল। বোধ হয় ওর মাথা খারাপ হয়ে আসছে...কারণ বেঘোর অবস্থায় ও কতবার নিজের ছায়ার সঙ্গে কথা বলতে লাগল... কতবার পরক্ষণের সচেতন মুহূর্তে নিজের ভুল বুঝে নিজেকে সামলে নিলে।
সে পাগল হয়ে যাচ্ছে নাকি? জ্বর হয় নি তো?... তার মাথার মধ্যে ক্রমশ গোলমাল হয়ে যাচ্ছে সব। আলভারেজ.... হিরে খনি...পাহাড়, পাহাড়, বালির সমুদ্র....আত্তিলিও গাত্তি...কাল রাত্রে ঘুম হয়নি..... আবার রাত আসছে, সে একটু ঘুমিয়ে নেবে।
কীসের শব্দে ওর তন্দ্রা ছুটে গেল। একটা অদ্ভুত ধরনের শব্দ আসছে কোন দিক থেকে? কোনো পরিচিত শব্দের মতো নয়। কীসের শব্দ? কোন দিক থেকে শব্দটা আসছে তাও বোঝা যায় না। কিন্তু ক্রমশ কাছে আসছে সেটা।
হঠাৎ আকাশের দিকে শঙ্করের চোখ পড়তেই সে অবাক হয়ে চেয়ে রইল...তার মাথার ওপর দিয়ে আকাশের পথে বিকট শব্দ করে কী একটা জিনিস যাচ্ছে। ওই কি এরোপ্লেন? সে বইয়ে ছবি দেখেছে বটে।
এরোপ্লেন যখন ঠিক মাথার ওপর এল, শঙ্কর চিৎকার করলে, কাপড় ওড়ালে, গাছের ডাল ভেঙে নাড়লে, কিন্তু কিছুতেই পাইলটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে না। দেখতে দেখতে এরোপ্লেনখানা সুদূরে ভায়োলেট রঙের পল ক্রুগার পর্বতমালার মাথার ওপর অদৃশ্য হয়ে গেল।
হয়তো আরও এরোপ্লেন যাবে এ পথ দিয়ে। কি আশ্চর্য দেখতে এরোপ্লেন জিনিসটা। ভারতবর্ষে থাকতে সে একখানাও দেখেনি।
শঙ্কর ভাবলে, আগুন জ্বালিয়ে কাঁচা ডাল পাতা দিয়ে সে যথেষ্ট ধোঁয়া করবে। যদি আবার এ পথে যায়, পাইলটের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে ধোঁয়া দেখে। একটা সুবিধে হয়েছে, এরোপ্লেনের বিকট আওয়াজে শকুনির দল কোন দিকে ভেগেছে।
সেদিন কাটল। দিন কেটে রাত্রি হবার সঙ্গে সঙ্গে শঙ্করের দুর্ভোগ হল শুরু। আবার গত রাত্রির পুনরাবৃত্তি। সেই কোয়োটের দল আবার এল। আগুনের চারিধারে তারা আবার তাকে ঘিরে বসল। নেকড়ে বাঘটা সন্ধ্যা না হতেই দূর থেকে একবার দেখে গেল। গভীর রাত্রে আর একবার এল।
কীসে এদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়? আওয়াজ করতে ভরসা হয় না—টোটা মাত্র দুটি বাকি। টোটা ফুরিয়ে গেলে তাকে অনাহারে মরতে হবে। মরতে তো হবেই, তবে দুদিন আগে আর পিছে; যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।
কিন্তু আওয়াজ তাকে করতেই হল। গভীর রাত্রে হায়েনাগুলো এসে কোয়োটদের সাহস বাড়িয়ে দিলে। তারা আরও এগিয়ে সরে এসে তাকে চারধার থেকে ঘিরলে। পোড়াকাঠ ছুড়ে মারলে আর ভয় পায় না।
একবার একটু তন্দ্রামতো এসেছিল—বসে বসেই ঢুলে পড়েছিল। পর মুহূর্তে সজাগ হয়ে উঠে দেখলে, নেকড়ে বাঘটা অন্ধকার থেকে পা টিপে টিপে তার অত্যন্ত কাছে এসে পড়েছে। ওর ভয় হল; হয়তো ওটা ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ভয়ের চোটে একবার গুলি ছুড়লে, আর একবার শেষ রাত্রের দিকে ঠিক এ রকমই হল। কোয়োটগুলোর ধৈর্য অসীম, সেগুলো চুপ করে বসে থাকে মাত্র, কিছু বলে না। কিন্তু নেকড়ে বাঘটা ফাঁক খুঁজছে।
রাত ফরসা হবার সঙ্গে সঙ্গে দুঃস্বপ্নের মতো অন্তর্হিত হয়ে গেল কোয়োট, হায়েনা ও নেকড়ের দল। সঙ্গে সঙ্গে শঙ্করও আগুনের ধারে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ল।
একটা কীসের শব্দে শঙ্করের ঘুম ভেঙে গেল।
খানিকটা আগে খুব বড়ো একটা আওয়াজ হয়েছে কোনো কিছুর। শঙ্করের কানে তার রেশ এখনও লেগে আছে।
কেউ কি বন্দুকের আওয়াজ করেছে? কিন্তু তা অসম্ভব। এই দুর্গম পর্বতের পথে কোন মানুষ আসবে?
একটিমাত্র টোটা অবশিষ্ট আছে। শঙ্কর ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে সেটা খরচ করে একটা আওয়াজ করলে। যা থাকে কপালে, মরেছেই তো। উত্তরে দুবার বন্দুকের আওয়াজ হল।
আনন্দে ও উত্তেজনায় শঙ্কর ভুলে গেল যে তার পা খোঁড়া, ভুলে গেল যে সে একটানা বেশিদূরে যেতে পারে না। তার আর টোটা নেই—সে আর বন্দুকের আওয়াজ করতে পারলে না—কিন্তু প্রাণপণে চীৎকার করতে লাগল, গাছের ডাল ভেঙে নাড়তে লাগল, আগুন জ্বালাবার কাঠকুটোর সন্ধানে চারিদিকে আকুল-দৃষ্টিতে চেয়ে দেখতে লাগল।
ক্রুগার ন্যাশন্যাল পার্ক জরিপ করার দল, কিম্বার্লি থেকে কেপ টাউন যাবার পথে, চিমানিমানি পর্বতের নীচে কালহারি মরুভূমির উত্তর-পূর্ব কোণে তাঁবু ফেলেছিল। সঙ্গে সাতখানা ডবল টায়ার ক্যাটারপিলার চাকা বসানো মোটর গাড়ি। এদের দলে নিগ্রো কুলি ও চাকর-বাকর বাদে ন’জন ইউরোপীয়। জন চারেক হরিণ শিকার করতে উঠেছিল চিমানিমানি পর্বতের প্রথম ও নিম্নতম থাকটাতে।
হঠাৎ এ জনহীন অরণ্যপ্রদেশে সভ্য রাইফেলের আওয়াজে ওরা বিস্মিত হয়ে উঠল। কিন্তু ওদের পুনরায় আওয়াজের প্রত্যুত্তর না পেয়ে ইতস্তত খুঁজতে বেরিয়ে দেখতে পেলে, সামনের একটা অপেক্ষাকৃত উচ্চতর চূড়া থেকে, এক জীর্ণ কঙ্কালসার কোটরগতচক্ষু প্রেতমূর্তি উন্মাদের মতো হাত পা নেড়ে তাদের কী বোঝাবার চেষ্টা করছে। তার পরনে ছিন্নভিন্ন অতি মলিন ইউরোপীয় পরিচ্ছদ।
ওরা ছুটে গেল। শঙ্কর আবোল-তাবোল কী বকলে, ওরা ভালো বুঝতে পারল না। যত্ন করে ওকে নামিয়ে পাহাড়ের নীচে ওদের ক্যাম্পে নিয়ে গেল। ওর জিনিসপত্রও নামিয়ে আনা হয়েছিল। তখন ওকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হল।
কিন্তু এই ধাক্কায় শঙ্করকে বেশ ভুগতে হল। ক্রমাগত অনাহারে, কষ্টে, উদ্বেগে, অখাদ্য কুখাদ্য ভক্ষণের ফলে, তার শরীর খুব জখম হয়েছিল—সেই রাত্রেই তার বেজায় জ্বর এল।
জ্বরে সে অঘোর অচৈতন্য হয়ে পড়ল—কখন যে মোটর গাড়ি ওখান থেকে ছাড়ল, কখন যে তারা সলসবেরিতে পৌঁছল শঙ্করের কিছুই খেয়াল নেই। সেই অবস্থায় পনেরো দিন সে সলসবেরির হাসপাতালে কাটিয়ে দেন। তারপর ক্রমশ সুস্থ হয়ে মাসখানেক পরে একদিন সকালে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাইরের রাজপথে এসে দাঁড়াল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন