বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
শঙ্করের সেবাশুশ্রূষার গুণে ডিয়েগো আলভারেজ সে যাত্রা সেরে উঠল এবং দিন পনেরো শঙ্কর তাকে নিজের কাছেই রাখল। কিন্তু চিরকাল যে পথে বেড়িয়ে এসেছে, ঘরে তার মন বসে না। একদিন সে যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শঙ্কর নিজের কর্তব্য ঠিক করে ফেলেছিল। বললে, চলো, তোমার অসুখের সময় যে-সব কথা বলেছিলে, মনে আছে? সেই হলদে হিরের খনি?
অসুখের ঝোঁকে আলফারেজ যে-সব কথা বলেছিল, এখন সে সম্বন্ধে বৃদ্ধ আর কোনো কথা বলে না। বেশির ভাগ সময় চুপ করে কী যেন ভাবে। শঙ্করের কথার উত্তরে বৃদ্ধ বললে—আমিও কথাটা যে না ভেবে দেখেছি, তা মনে কোরো না! কিন্তু আলেয়ার পেছনে ছুটবার সাহস আছে তোমার?
শঙ্কর বললে—আছে কি না দেখতে দোষ কী? আজই বলো তো মাভো স্টেশনে তার করে আমার বদলে অন্য কোনো লোক পাঠাতে বলি।
আলভারেজ কিছু না ভেবেই বললে—করো তার। কিন্তু আগে বুঝে দেখো। যারা সোনা বা হিরা খুঁজে বেড়ায় তারা সব সময় তা পায় না। আমি আশি বছরের এক বুড়ো লোককে জানতাম, সে কখনো কিছু পায়নি—তবে প্রতিবারই বলত, এইবার ঠিক সন্ধান পেয়েছি, এইবার পাব! আজীবন অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে আর আফ্রিকার ভেলডে প্রসপেকটিং করে বেড়িয়েছে।
আরও দিন দশেক পরে দুজনে কিসুমু গিয়ে ভিক্টোরিয়া নায়াগ্রা হ্রদে স্টিমার চড়ে দক্ষিণ মুখে মেয়ানজার দিকে যাকে ঠিক করল।
পথে এক জায়গায় বিস্তীর্ণ প্রান্তরে হাজার হাজার জেব্রা, জিরাফ, হরিণ চরতে দেখে শঙ্কর তো অবাক, এমন দৃশ্য সে আর কখনো দেখেনি। জিরাফগুলো মানুষকে আদৌ ভয় করে না, পঞ্চাশ গজ তফাতে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল।
আলভারেজ বলল—আফ্রিকার জিরাফ মারবার জন্যে গভর্নমেন্টের কাছ থেকে বিশেষ লাইসেন্স নিতে হয়। যে সে মারতে পারে না। সেজন্যে মানুষকে এদের তত ভয় নেই।
হরিণের দল কিন্তু ভীরু, এক এক দলে দু-তিনশো হরিণ চরছে, ওদের দেখে ঘাস খাওয়া ফেলে মুখ তুলে একবার চাইল, তার পরক্ষণেই মাঠের দূর প্রান্তের দিকে সবাই চার পা তুলে দৌড়।
কিসুমু থেকে স্টিমার ছাড়ল—এটা ব্রিটিশ স্টিমার, ওদের পয়সা নেই বলে ডেকে যাচ্ছে। নিগ্রো মেয়েরা পিঠে ছেলেমেয়ে বেঁধে মুরগি নিয়ে স্টিমারে উঠেছে। মাসাই কুলিরা ছুটি নিয়ে দেশে যাচ্ছে—সঙ্গে নাইরোবি শহর থেকে কাচের পুঁতি, কম দামের খেলো আয়না, ছুরি প্রভৃতি নানা জিনিস।
স্টিমার থেমে নেমে আবার ওরা পথ চলে। ভিক্টোরিয়া হ্রদের যে বন্দরে ওরা নামলে—তার নাম মোওয়ানজা—এখান থেকে তিনশো মাইল দূরে ট্যাবোরা, সেখানে পৌঁছে কয়েক দিন বিশ্রাম করে ওরা যাবে টাঙ্গানিয়াকা হ্রদের তীরবর্তী উজিজি বন্দরে।

পথে এক জায়গায় বিস্তীর্ণ প্রান্তরে হাজার হাজার জেব্রা...।
এই পথে যাবার সময় আলভারেজ বললে—টাঙ্গানিয়াকার মধ্য দিয়ে যাওয়া বড়ো বিপজ্জনক ব্যাপার। এখানে এক রকম মাছি আছে, তা কামড়ালে স্লিপিং সিকনেস হয়। স্লিপিং সিকনেসের মড়কে টাঙ্গানিয়াকা জনশূন্য হয়ে পড়েছে। মোওয়ানজা থেকে ট্যাবোরার পথে সিংহের ভয়ও খুব বেশি। প্রকৃতপক্ষে আফ্রিকার এই অঞ্চলও ‘সিংহের রাজ্য’ বলা চলে।
শহর থেকে দশ মাইল দূরে পথের ধারে একটা ছোটো খড়ের বাংলো। সেখানে এক ইউরোপীয় শিকারি আশ্রয় নিয়েছে। আলভারেজকে সে খুব খাতির করল। শঙ্করকে দেখে বলল—একে পেলে কোথায়? এ তো হিন্দু! তোমার কুলি?
আলভারেজ বললে—আমার ছেলে।
সাহেব আশ্চর্য হয়ে বললে—কী রকম?
আলভারেজ আনুপূর্বিক সব বর্ণনা করল, তার রোগের কথা, শঙ্করের সেবাশ্রুশ্রূষার কথা। কেবল বলল না কোথায় যাচ্ছে ও, কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছে।
সাহেব হেসে বললে—বেশ ভালো। ওর মুখ দেখে মনে হয় ওর মনে সাহস ও দয়া দুইই আছে। ইস্ট ইণ্ডিজের হিন্দুরা লোক হিসেবে ভালোই বটে। একবার ইউগাণ্ডাতে একজন শিখ আমার প্রতি এমন সুন্দর আতিথ্য দেখিয়েছিল, তা কখনো ভুলতে পারব না। আজ তোমরা এসো, রাত সামনে, আমার এখানেই রাত্রি যাপন করো। এটা গভর্নমেন্টের ডাকবাংলো। আমিও তোমাদের মতো সারাদিন পথ চলে বিকেলের দিকে এসে উঠেছি।
সাহেবের একটা ছোট্ট গ্রামোফোন আছে, সন্ধ্যার পরে টিনবন্দি বিলাতি টোমাটোর ঝোল ও সার্ডিন মাছ সহযোগে সান্ধ্যভোজন সমাপ্ত করার পরে সবাই বাংলোর বাইরে ক্যাম্প চেয়ারে শুয়ে রেকর্ড শুনে যাচ্ছে, এমন সময় অল্প দূরে সিংহের গর্জন শোনা গেল। বোধ হল, মাটির কাছে মুখ নামিয়ে সিংহ গর্জন করছে—কারণ মাটি যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। সাহেব বললে—টাঙ্গানিয়াকায় বেজায় সিংহের উপদ্রব আর বড়ো হিংস্র এরা। প্রায় অধিকাংশ সিংহই মানুষখেকো। মানুষের রক্তের আস্বাদ একবার পেয়েছে, এমন মানুষ ছাড়া আর কিছু চায় না।
শঙ্কর ভাবলে খুব সুসংবাদ বটে। ইউগাণ্ডা রেলওয়ে তৈরি হবার সময়ে সে সিংহের উপদ্রব কাকে বলে খুব ভালোই দেখেছে।
পরদিন সকালে ওরা আবার রওনা হল, সাহেব বলে দিল সূর্য উঠে গেলে খুব সাবধান থাকবে। স্লিপিং সিকনেসের মাছি রোদ উঠলেই জাগে। গায়ে যেন না বসে।
দীর্ঘ দীর্ঘ ঘাসের বনের মধ্যে দিয়ে সুঁড়িপথ। আলভারেজ বললে—খুব সাবধান, এই সব ঘাসের বনেই সিংহের আড্ডা। বেশি পেছনে থেকো না।
আলভারজের বন্দুক আছে, এই একটা ভরসা। আর একটা ভরসা এই যে আলভারেজ, যাকে বলে ‘ক্র্যাক শট’ তাই। অর্থাৎ তার গুলি বড়ো একটা ফসকায় না। কিন্তু অত বড়ো অব্যর্থ—লক্ষ্য শিকারির সঙ্গে থেকেও শঙ্কর বিশেষ ভরসা পেল না, কারণ ইউগাণ্ডার অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে, সিংহ যখন যাকে নেবে, এমন সম্পূর্ণ অতর্কিতেই নেবে, যে পিঠের রাইফেলের চামড়ার স্ট্র্যাপ খোলবার অবকাশ পর্যন্ত দেবে না।
সেদিন সন্ধ্যা হবার ঘণ্টাখানেক আগে দূরবিস্তীর্ণ প্রান্তরের মধ্যে রাত্রের বিশ্রামের জন্য স্থান নির্বাচন করে নিতে হল। আলভারেজ বলল—সামনে কোনো গ্রাম নেই—অন্ধকারের পর এখানে পথ চলা ঠিক নয়।
একটা সুবৃহৎ বাওবাব গাছের তলায় দু-টুকরো কেম্বিস ঝুলিয়ে ছোট্ট একটু তাঁবু খাটানো হল। কাঠকুটো কুড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে রাত্রে খাবার তৈরি করতে বসল শঙ্কর। তারপর সমস্তদিন পরিশ্রমের পরে দুজনেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
অনেক রাত্রে আলভারেজ ডাকল—শঙ্কর, ওঠো।
শঙ্কর ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল।
আলভারেজ বলল—কী একটা জানোয়ার তাঁবুর চারিপাশে ঘুরছে—বন্দুক বাগিয়ে রাখো।
সত্যিই একটা কোনো অজ্ঞাত বৃহৎ জন্তুর নিশ্বাসের শব্দ তাঁবুর পাতলা কেম্বিসের পর্দার বাইরেই শোনা যাচ্ছে বটে। তাঁবুর সামনে সন্ধ্যায় যে আগুন করা হয়েছিল—তার স্বল্পাবশিষ্ট আলোকে সুবৃহৎ বাওবাব গাছটা একটা ভীষণদর্শন দৈত্যের মতো দেখাচ্ছে। শঙ্কর বন্দুক নিয়ে বিছানা থেকে নামবার চেষ্টা করতে বৃদ্ধ বারণ করল।
পরক্ষণেই জানোয়ারটা হুড়মুড় করে তাঁবুটা ঠেলে তাঁবুর মধ্যে ঢুকবার চেষ্টা করবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁবুর পর্দার ভেতরে থেকেই আলভারেজ পর পর দুবার রাইফেল ছুড়ল। শব্দটা লক্ষ্য করে শঙ্করও সেই মুহূর্তে বন্দুক ওঠাল। কিন্তু শঙ্কর ঘোড়া টেপবার আগে আলভারেজের রাইফেল আর একবার আওয়াজ করে উঠল।
তারপরেই সব চুপ।
ওরা টর্চ জ্বেলে সন্তর্পণে তাঁবুর বাইরে এসে দেখল তাঁবুর পুবদিকের পর্দার বাইরে পর্দাটা খানিকটা ঠেলে ভেতরে ঢুকেছে এক প্রকান্ড সিংহ।
সেটা তখনও মরেনি, কিন্তু সাংঘাতিক আহত হয়েছে। আরও দুবার গুলি খেয়ে সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলে।
আলভারেজ আকাশের নক্ষত্রের দিকে চেয়ে বললে—রাত এখনও অনেক। ওটা এখানে পড়ে থাক। চলো আমরা আমাদের ঘুম শেষ করি।
দুজনেই এসে শুয়ে পড়ল—একটু পরে শঙ্কর বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলে আলভারেজের নাসিকা-গর্জন শুরু হয়েছে। শঙ্করের চোখে ঘুম এল না।
আধঘণ্টা পরে শঙ্করের মনে হল, আলভারেজের নাসিকা-গর্জনের সঙ্গে পাল্লা দেবার জন্যে টাঙ্গানিয়াকা অঞ্চলের সমস্ত সিংহ যেন একযোগে ডেকে উঠল। সে কী ভয়ানক সিংহের ডাক। .... আগেও শঙ্কর অনেকবার সিংহগর্জন শুনেছে, কিন্তু এ রাত্রের সে ভীষণ বিরাট গর্জন তার চিরকাল মনে ছিল। তা ছাড়া ডাক তাঁবু থেকে বিশ হাতের মধ্যে।
আলভারেজ আবার জেগে উঠল। বললে—না:, রাত্রে দেখছি একটু ঘুমুতে দিলে না। আগের সিংহটার জোড়া। সাবধান থাকো। বড়ো পাজি জানোয়ার।
কী দুর্যোগের রাত্রি! তাঁবুর আগুনও তখন নিবু-নিবু। তার বাইরে তো ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাতলা কেম্বিসের চটের মাত্র ব্যবধান—তার ওদিকে সাথিহারা পশু। বিরাট গর্জন করতে করতে সেটা একবার তাঁবু থেকে দূরে যায়, আবার কাছে আসে, কখনও তাঁবু প্রদক্ষিণ করে।
ভোর হবার কিছু আগে সিংহটা সরে পড়ল। ওরাও তাঁবু তুলে আবার যাত্রা শুরু করল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন