১৪

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

সলসবেরি! কত দিনের স্বপ্ন! ...

আজ সে সত্যিই একটা বড়ো ইউরোপীয় ধরনের শহরের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে। বড়ো বড়ো বাড়ি, ব্যাংক, হোটেল, দোকান, পিচঢালা চওড়া রাস্তা, একপাশ দিয়েই ইলেকট্রিক ট্রাম চলেছে, জুলু রিকশাওয়ালা রিকশা টানছে, কাগজওয়ালা কাগজ বিক্রি করছে। সবই যেন নতুন, যেন এসব দৃশ্য জীবনে কখনো দেখে নি।

লোকালয়ে তো এসেছে, কিন্তু সে একেবারে কপর্দকশূন্য। এক পেয়ালা চা খাবার পয়সাও তার নেই। কাছে একটা ভারতীয় দোকান দেখে তার বড়ো আনন্দ হল। কতদিন যে দেখে নি স্বদেশবাসীর মুখ! দোকানদার মেমন মুসলমান, সাবান ও গন্ধদ্রব্যের পাইকারী বিক্রেতা! খুব বড়ো দোকান। শঙ্করকে দেখেই সে বুঝলে এ দুঃস্থ ও বিপদগ্রস্ত। নিজে দু-টাকা সাহায্য করলে ও একজন বড়ো ভারতীয় সওদাগরের সঙ্গে দেখা করতে বলে দিলে।

টাকা দুটি পকেটে নিয়ে শঙ্কর আবার পথে এসে দাঁড়াল। আসবার সময় বলে এল—অসীম ধন্যবাদ টাকা দুটির জন্যে, এ আমি আপনার কাছে ধার নিলাম, আমার হাতে পয়সা এলে আপনাকে কিন্তু এ টাকা নিতে হবে। সামনেই একটা ভারতীয় রেস্টুরেন্ট। সে ভালো কিছু খাবার লোভ সংবরণ করতে পারলে না। কতদিন সভ্য খাদ্য মুখে দেয় নি। সেখানে ঢুকে এক টাকার পুরি, কচুরি হালুয়া, মাংসের চপ, পেট ভরে খেলে। সেই সঙ্গে দু-তিন পেয়ালা কফি।

চায়ের টেবিলে একখানা পুরোনো কাগজের দিকে তার নজর পড়ল। তাতে একটা জায়গায় বড়ো বড়ো অক্ষরের হেড লাইন লেখা আছে—

National Park Survey Party’s Singular Experience

A Lonely Indian Found in the Desert

Dying of Thirst and Exhaustion

His Strange Story

শঙ্কর দেখল, তার একটা ফোটোও কাগজে ছাপা হয়েছে। তার মুখে একটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক গল্পও দেওয়া হয়েছে। এরকম গল্প সে কারও কাছে করেনি।

খবরের কাগজখানার নাম ‘সলসবেরি ডেলি ক্রনিকল’। সে খবরের কাগজের অফিসে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলে। তার চারপাশে ভিড় জমে গেল। ওকে খুঁজে বার করবার জন্যে রিপোর্টারের দল অনেক চেষ্টা করেছিল জানা গেল। সেখানে চিমানিমানি পর্বতে পা-ভেঙে পড়ে থাকার গল্প বলে ও ফোটো তুলতে দিয়ে শঙ্কর পঞ্চাশ টাকা পেল। ও থেকে সে আগে সেই সহৃদয় মুসলমান দোকানদারের টাকা দুটি দিয়ে এল।

ওদের দৃষ্ট আগ্নেয়গিরিটার সম্বন্ধে সে কাগজে একটা প্রবন্ধ লিখল। তাতে আগ্নেয়গিরিটার ও নামকরণ করলে মাউন্ট আলভারেজ। তার মধ্য-আফ্রিকার অরণ্যে লুকোনো একটা বড়ো আস্ত জীবন্ত আগ্নেয়গিরির এই গল্প কেউ বিশ্বাস করল, কেউ করল না। অবিশ্যি রত্নের গুহার বাষ্পও সে কাউকে জানতে দেয়নি। দলে দলে লোক ছুটবে ওর সন্ধানে।

তার পরে একটা বইয়ের দোকানে গিয়ে সে এক রাশ ইংরেজি বই ও মাসিক পত্রিকা কিনল। বই পড়েনি কতকাল। সন্ধ্যায় একটা সিনেমায় ছবি দেখল। কতকাল পরে রাত্রে হোটেলের ভালো বিছানায় ইলেকট্রিক আলোর তলায় শুয়ে বই পড়তে পড়তে সে মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে নীচের প্রিন্স আলবার্ট ভিক্টর স্ট্রিটের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। ট্রাম যাচ্ছে নীচে দিয়ে, জুলু রিকশাওয়ালা রিকশা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, ভারতীয় কফিখানায় ঠুনঠুন করে ঘণ্টা বাজছে, মাঝে মাঝে দু-চারখানা মোটরও যাচ্ছে।....এর সঙ্গে মনে হল আর একটা ছবি—সামনে আগুনের কুন্ড, কিছু দূরে বৃত্তাকারে ঘিরে বসে আছে কোয়োট ও হায়েনার দল। ওদের পিছনে নেকড়েটার দুটো গোল গোল চোখ আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলছে অন্ধকারের মধ্যে।

কোনটা স্বপ্ন?...চিমানিমানি পর্বতে যাপিত সেই ভয়ংকর রাত্রি, না আজকের এই রাত্রি? ইতিমধ্যে সলসবেরিতে সে একজন বিখ্যাত লোক হয়ে গেল। রিপোর্টারের ভিড়ে তার হোটেলের হল, সব সময় ভরতি। খবরের কাগজের লোক আসে তার ভ্রমণবৃত্তান্ত ছাপাবার কন্ট্রাক্ট করতে, কেউ আসে ফোটো নিতে।

আত্তিলিও গাত্তির কথা সে ইটালিয়ান কনসাল জেনারেলকে জানালে। তাঁর আপিসের পুরোনো কাগজপত্র ঘেঁটে জানা গেল, আত্তিলিও গাত্তি নামে একজন সম্ভ্রান্ত ইটালিয়ান যুবক ১৮৭৯ সালের আগস্ট মাসে পোর্তুগিজ পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে জাহাজডুবি হবার পরে নামে। তার পর যুবকটির আর কোনো পাত্তা পাওয়া যায়নি। তার আত্মীয়-স্বজন ধনী ও সম্ভ্রান্ত লোক। ১৮৯০-৯৫ সাল পর্যন্ত তারা তোদের নিরদিষ্ট আত্মীয়ের সন্ধানের জন্যে পূর্ব পশ্চিম ও দক্ষিণ আফ্রিকার কনসুলেট আপিসকে জ্বালিয়ে খেয়েছিল, পুরস্কার ঘোষণা করাও হয়েছিল তার সন্ধানের জন্যে। ১৮৯৫ সাল থেকে তারা হল ছেড়ে দিয়েছিল।

পূর্বোক্ত মুসলমান দোকানদারটির সাহায্যে সে ব্ল্যাকমুন স্ট্রিটের বড়ো জহুরি রাইডাল ও মর্সবির দোকানে চারখানা পাথর সাড়ে বত্রিশ হাজার টাকায় বিক্রি করলে। বাকি দুখানার দর আরও বেশি উঠেছিল, কিন্তু শঙ্কর সে দু-খানা পাথর তার মাকে দেখাবার জন্যে দেশে নিয়ে যেতে চায়। এখন বিক্রি করতে তার ইচ্ছে নেই।

নীল সমুদ্রে!...

বম্বেগামী জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে পোর্তুগিজ পূর্ব-আফ্রিকার বেইরা বন্দরের নারিকেল-বনশ্যাম তীরভূমিতে মিলিয়ে যেতে দেখতে দেখতে, শঙ্কর ভাবছিল তার জীবনের এই অ্যাডভেঞ্চারের কথা। এই তো জীবন। এইভাবেই তো জীবনকে ভোগ করতে চেয়েছিল সে। মানুষের আয়ু মানুষের জীবনের ভুল মাপকাঠি। দশ বৎসরের জীবন উপভোগ করেছে সে এই দেড় বছরে। আজ সে শুধু একজন ভবঘুরে পথিক নয়, একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরির সহ-আবিষ্কারক। মাউন্ট আলভারেজকে সে জগতে প্রসিদ্ধ করবে। দূরে ভারত মহাসমুদ্রের পারে জননী জন্মভূমি পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের জন্য এখন মন তার চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তার মনটি উৎসুক হয়ে আছে, কবে দূর থেকে দৃশ্যমান বোম্বাইয়ের রাজাবাই টাওয়ারের উঁচু চুড়োটা মাতৃভূমির উপকূলের সান্নিধ্য ঘোষণা করবে...তারপর বাউলকীর্তনগান-মুখরিত বাংলাদেশের প্রান্তে তাদের শ্যামল ছোট্ট পল্লি...সামনে আসছে বসন্ত কাল... পল্লিপথে যখন একদিন সজনে ফুলের দল পথ বিছিয়ে পড়ে থাকবে, ‘বউ কথা-কও’ ডাকবে ওদের বড়ো বকুল গাছটায়...নদীর ঘাটে গিয়ে লাগবে ওর ডিঙি।

বিদায়! আলভারেজ বন্ধু! ...স্বদেশে ফিরে যাওয়ার এই আনন্দের মুহূর্তে তোমার কথাই আজ মনে হচ্ছে। তুমি সেই দলের মানুষ, সারা আকাশ যাদের ঘরের ছাদ, সারা পৃথিবী যাদের পায়ে চলার পথ—আশীর্বাদ কোরো তোমার মহারণ্যের নির্জন সমাধি থেকে, যেন তোমার মতো হতে পারি জীবনে, অমনি সুখ-দুঃখে নিস্পৃহ, অমনি নির্ভীক।

বিদায় বন্ধু আত্তিলিও গাত্তি। অনেক জন্মের বন্ধু ছিলে তুমি।

তোমরা সবাই মিলে শিখিয়েছ চিন দেশে প্রচলিত সেই প্রাচীন ছড়াটির সত্যতা—

ছাদের আলসের দিব্যি চৌরস একখানা টালি হয়ে অনড় অবস্থায় সুখে-স্বাচ্ছন্দ্য থাকার চেয়ে স্ফটিক প্রস্তর হয়ে ভেঙে যাওয়াও ভালো, ভেঙে যাওয়াও ভালো, ভেঙে যাওয়াও ভালো।

আবার তাকে আফ্রিকায় ফিরতে হবে। এখন জন্মভূমির টান বড়ো টান। জন্মভূমির কোলে এখন সে কিছুদিন কাটাবে। তারপর দেশেই সে কোম্পানি গঠন করবার চেষ্টা করবে— আবার সুদূর রিখটারসভেল্ড পর্বতে ফিরবে রত্নখনির পুনর্বার অনুসন্ধানে—খুঁজে সে বার করবেই।

ততদিন—বিদায়

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%