বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
মাঝরাত্রে শঙ্করের ঘুম ভেঙে গেল! কী একটা শব্দ হচ্ছে ঘন বনের মধ্যে, কী একটা কান্ড কোথায় ঘটেছে বনে। আলভারেজও বিছানায় উঠে বসেছে। দুজনেই কান-খাড়া করে শুনলে—বড়ো অদ্ভুত ব্যাপার। কী হচ্ছে বাইরে?
শঙ্কর তাড়াতাড়ি টর্চ জ্বেলে বাইরে আসছিল, আলভারেজ বারণ করল। বলল—এসব অজানা জঙ্গলে রাত্রিবেলা ওরকম তাড়াতাড়ি তাঁবুর বাইরে যেয়ো না, তোমাকে অনেকবার সতর্ক করে দিয়েছি। বিনা বন্দুকেই বা যাচ্ছ কোথায়?
তাঁবুর বাইরে রাত্রি ঘুটঘুটে অন্ধকার! দুজনেই টর্চ ফেলে দেখল—
বন্য জন্তুর দল গাছপালা ভেঙে ঊর্ধ্বশ্বাসে উন্মত্তের মতো দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে পশ্চিমের সেই ভীষণ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে, পূর্বদিকে পাহাড়টার দিকে চলেছে। হায়েনা, বেবুন, বুনো মহিষ। দুটো চিতাবাঘ তো ওদের গা ঘেঁষে ছুটে পালাল। আরও আসছে... দলে দলে আসছে...ধাড়ি ও মাদি কলোবাস বাঁদর দলে দলে ছানাপোনা নিয়ে ছুটেছে। সবাই যেন কোনো আকস্মিক বিপদের মুখ থেকে প্রাণের ভয়ে ছুটেছে... আর সঙ্গে সঙ্গে দূরে কোথায় একটা অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে—চাপা, গম্ভীর, মেঘগর্জনের মতো শব্দটা—কিংবা দূরে কোথাও হাজারটা জয়ঢাক যেন এক সঙ্গে বাজছে!
ব্যাপার কী! দুজনে দুজনের মুখের দিকে চাইলে। দুজনেই অবাক। আলভারেজ বলল—শঙ্কর, আগুনটা ভালো করে জ্বালো—নয়তো বন্যজন্তুর দল আমাদের তাঁবুসুদ্ধ ভেঙে মাড়িয়ে চলে যাবে।
জন্তুদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলল যে! মাথার ওপর পাখির দল বাসা ছেড়ে পালাচ্ছে। প্রকান্ড একটা স্প্রিংবক হরিণের দলে ওদের দশগজের মধ্যে এসে পড়ল।
কিন্তু ওরা দুজনে তখন এমন হতভঙ্গ হয়ে গিয়েছে ব্যাপার দেখে যে, এত কাছে পেয়েও গুলি করতে ভুলে গেল। এমন ধরনের দৃশ্য ওরা জীবনে কখনো দেখেনি।
শঙ্কর আলভারেজকে কী একটা জিজ্ঞাসা করতে যাবে, তার পরেই—প্রলয় ঘটল। অন্তত শঙ্করের তো তাই বলেই মনে হল। সমস্ত পৃথিবীটা দুলে এমন কেঁপে উঠল যে, ওরা দুজনেই টলে পড়ে গেল মাটিতে, সঙ্গে সঙ্গে হাজারটা বাজ যেন নিকটেই কোথায় পড়ল। মাটি যেন চিরে ফেঁড়ে গেল—আকাশটাও যেন সেই সঙ্গে ফাটল।
আলভারেজ মাটি থেকে ওঠবার চেষ্টা করতে করতে বললে—ভূমিকম্প।
কিন্তু পরক্ষণেই তারা দেখে বিস্মিত হল, রাত্রির অমন ঘুটঘুটে অন্ধকার হঠাৎ দূর হয়ে, পঞ্চাশ হাজার বাতির এমন বিজলি আলো জ্বলে উঠল কোথা থেকে?
তারপর তাদের নজর পড়ল, দূরের সেই পাহাড়ের চূড়াটার দিকে। সেখানে যেন একটা প্রকান্ড অগ্নিলীলা শুরু হয়েছে। রাঙা হয়ে উঠেছে সমস্ত দিগন্ত সেই প্রলয়ের আলোয়, আগুন-রাঙা মেঘ ফুঁসিয়ে উঠছে পাহাড়ের চুড়ো থেকে দু-হাজার আড়াই হাজার ফুট পর্যন্ত উঁচুতে—সঙ্গে সঙ্গে কী বিশ্রী গন্ধকের উৎকট নিশ্বাস-রোধকারী গন্ধ বাতাসে!
আলভারেজ সেদিকে চেয়ে ভয়ে ও বিস্ময়ে বলে উঠল—আগ্নেয়গিরি! সান্টা আনা প্রাৎসিয়া ডা কর্ডোভা!
কি অদ্ভুত ধরনের ভীষণ সুন্দর দৃশ্য! কেউ চোখ ফিরিয়ে নিতে পারল না ওরা খানিকক্ষণ। লক্ষটা তুবড়ি এক সঙ্গে জ্বলছে, লক্ষটা রংমশালে একসঙ্গে আগুন দিয়েছে, শঙ্করের মনে হল। রাঙা আগুনের মেঘ মাঝে মাঝে নীচু হয়ে যায়, যেমন আগুনে ধুনো পড়লে দপ করে জ্বলে ওঠে, অমনি দপ করে হাজার ফুট ঠেলে ওঠে। আর সেই সঙ্গে হাজারটা বোমা ফাটার আওয়াজ।
এদিকে পৃথিবী এমন কাঁপছে, যে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না—কেবল টলে টলে পড়তে হয়। শঙ্কর তো টলতে টলতে তাঁবুর মধ্যে ঢুকল—ঢুকে দেখে একটা ছোটো কুকুর ছানার মতো জীব তার বিছানায় এক সঙ্গে গুটিশুটি হয়ে ভয়ে কাঁপছে। শঙ্করের টর্চের আলোয় সেটা থতমত খেয়ে আলোর দিকে চেয়ে রইল, আর তার চোখ দুটো মণির মতো জ্বলতে লাগল। আলভারেজ তাঁবুতে ঢুকে দেখে বললে—নেকড়ে বাঘের ছানা। রেখে দাও, আমাদের আশ্রয় নিয়েছে যখন প্রাণের ভয়ে।
ওরা কেউ এর আগে প্রজ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি দেখেনি, তা থেকে বিপদ আসতে পারে ওদের জানা নেই—কিন্তু আলভারেজের কথা ভালো করে শেষ হতে না হতে, হঠাৎ কী প্রচন্ড ভারী জিনিসের পতনের শব্দে ওরা আবার তাঁবুর বাইরে গিয়ে যখন দেখল যে, একখানা পনেরো সের ওজনের জ্বলন্ত কয়লার মতো রাঙা পাথর অদূরে একটা ঝোপের ওপর এসে পড়েছে—সঙ্গে সঙ্গে ঝোপটাও জ্বলে উঠেছে—তখন আলভারেজ ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললে—পালাও, পালাও; শঙ্কর—তাঁবু ওঠাও—শীগগির—
ওরা তাঁবু ওঠাতে ওঠাতে আরও দু-পাঁচখানা আগুন-রাঙা জ্বলন্ত ভারী পাথর এদিক ওদিকে সশব্দে পড়ল। নিশ্বাস তো এদিকে বন্ধ হয়ে আসে, এমনি ঘন গন্ধকের ধূম বাতাসে ছড়িয়েছে।

শঙ্করের টর্চের আলোয় সেটা থমমত খেয়ে আলোর দিকে চেয়ে রইল...।
দৌড়....দৌড়...দৌড়। দু ঘণ্টা ধরে ওরা জিনিসপত্র কতক টেনে হিঁচড়ে, কতক বয়ে নিয়ে পূর্বদিকের সেই পাহাড়ের নীচে গিয়ে পৌঁছুল। সেখানে পর্যন্ত গন্ধকের গন্ধ বাতাসে। আধঘণ্টা পরে সেখানেও পাথর পড়তে শুরু করল। ওরা পাহাড়ের ওপর উঠল, সেই ভীষণ জঙ্গল আর রাত্রির অন্ধকার ঠেলে। ভোর যখন হল, তখন আড়াই হাজার ফুট উঠে পাহাড়ের ঢালুতে বড়ো গাছের তলায়, দুজনেই হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ল।
সূর্য ওঠবার সঙ্গে সঙ্গে অগ্ন্যুৎপাতের সে ভীষণ সৌন্দর্য অনেকখানি কমে গেল, কিন্তু শব্দ ও পাথর-পড়া যেন বাড়ল। এবার শুধু পাথর নয়, তার সঙ্গে খুব মিহি ধূসরবর্ণের ছাই আকাশ থেকে পড়ছে...গাছপালা লতাপাতার ওপর দেখতে দেখতে পাতলা একপুরু ছাই জমে গেল।
সারাদিন সমানভাবে অগ্নিলীলা চলল—আবার রাত্রি এল। নিম্নের উপত্যকা ভূমির অত বড়ো হেমলক গাছের জঙ্গল দাবানলে ও প্রস্তরবর্ষণে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেল। রাত্রিতে আবার সেই ভীষণ সৌন্দর্য কতদূর পর্যন্ত বন ও আকাশ, কতদূরের দিগন্ত লাল হয়ে উঠেছে পর্বতের অগ্নিকটাহের আগুনে—তখন পাথর পড়াটা একটু কেবল কমেছে। কিন্তু সেই রাঙা আগুনভরা বাষ্পের মেঘ তখনও সেই রকমই দীপ্ত হয়ে আছে।
রাত দুপুরের পরে একটা বিরাট বিস্ফোরণের শব্দে ওদের তন্দ্রা ছুটে গেল—ওরা সভয়ে চেয়ে দেখল জ্বলন্ত পাহাড়ের চূড়ার মুন্ডটা উড়ে গিয়েছে—নীচের উপত্যকাতে ছাই, আগুন ও জ্বলন্ত পাথর ছড়িয়ে পড়ে অবশিষ্ট জলঙ্গলটাকেও ঢাকা দিল। আলভারেজ পাথরের ঘায়ে আহত হল। ওদের তাঁবুর কাপড়ে আগুন ধরে গেল। পেছনের একটা উঁচু গাছের ডাল ভেঙে পরল পাথরের চোট খেয়ে।
শঙ্কর ভাবছিল—এই জনহীন অরণ্য অঞ্চলে এত বড়ো একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয় যে ঘটে গেল, তা কেউ দেখতেও পেত না যদি তারা না থাকত। সভ্য জগৎ জানেও না আফ্রিকার গহন অরণ্যে এ আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব। কেউ বললেও বিশ্বাস করবে না হয়তো।
সকালে বেশ স্পষ্ট দেখা গল, মোমবাতি হাওয়ার মুখে জ্বলে গিয়ে যেমন মাথার দিকে অসমান খাঁজের সৃষ্টি করে, পাহাড়ের চূড়াটার তেমনি চেহারা হয়েছে। কুলপি বরফটাতে ঠিক যেন কে আর একটা কামড় বসিয়েছে।
আলভারেজ ম্যাপ দেখে বললে—এটা আগ্নেয়গিরি বলে ম্যাপে দেওয়া নেই। সম্ভবত বহু বৎসর পরে এই এর প্রথম অগ্ন্যুৎপাত। কিন্তু এর যে নাম ম্যাপে দেওয়া আছে, তা খুব অর্থপূর্ণ।
শঙ্কর বললে—কী নাম?
আলফারেজ বলল—এর নাম লেখা আছে ‘ওলডোনিও লেঙ্গাই’—প্রাচীন জুলু ভাষায় এর মানে ‘অগ্নিদেবের শয্যা’। নামটা দেখে মনে হয়, এ অঞ্চলের প্রাচীন লোকদের কাছে এ পাহাড়ের আগ্নেয়-প্রকৃতি অজ্ঞাত ছিল না। বোধ হয় তার পর দু-একশো বছর কিংবা তারও বেশিকাল এটা চুপচাপ ছিল।
ভারতবর্ষের ছেলে শঙ্করের দুই হাত আপনা-আপনি প্রণামের ভঙ্গিতে ললাট স্পর্শ করল। প্রণাম, হে রুদ্রদেব, প্রণাম। আপনার তান্ডব দেখবার সুযোগ দিয়েছিলেন, এজন্যে প্রণাম গ্রহণ করুন, হে দেবতা। আপনার এ রূপের কাছে শত হীরকখনি তুচ্ছ হয়ে যায়। আমার সমস্ত কষ্ট সার্থক হল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন