বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
দিন পনেরো পরে শঙ্কর ও আলভারেজ উজিজি বন্দর থেকে স্টিমারে টাঙ্গানিয়াকা হ্রদের বক্ষে ভাসল। হ্রদ পার হয়ে আলবার্টভিল বলে একটা ছোটো শহরে কিছু আবশ্যকীয় জিনিস কিনে নিল। এই শহর থেকে কাবালো পর্যন্ত বেলজিয়াম গভর্নমেন্টের রেলপথ আছে। সেখান থেকে কঙ্গো নদীতে স্টিমারে চড়ে তিনদিনের পথ সানকিনি যেতে হবে, সানকিনি নেমে কঙ্গোনদীর পথ ছেড়ে, দক্ষিণ মুখে অজ্ঞাত বনজঙ্গল ও মরুভূমির দেশে প্রবেশ করতে হবে।
কাবালো অতি অপরিষ্কার স্থান, কতকগুলো বর্ণসংকর পর্তুগিজ ও বেলজিয়ানের আড্ডা।
স্টেশনের বাইরে পা দিয়েছে এমন সময় একজন পর্তুগিজ ওর কাছে এসে বললে—হ্যালো, কোথায় যাবে, দেখছি নতুন লোক, আমায় চেনো না নিশ্চয়ই। আমার নাম আলবুকার্ক।
শঙ্কর চেয়ে দেখলে আলভারেজ তখনও স্টেশনের মধ্যে।
লোকটার চেহারা যেমন কর্কশ, তেমনি কদাকার। কিন্তু সে ভীষণ জোয়ান, প্রায় সাতফুটের কাছাকাছি লম্বা, শরীরের প্রত্যেকটি মাংসপেশি গুনে নেওয়া যায়, এমনি সুদৃঢ় ও সুগঠিত।
শঙ্কর বললে—তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে সুখী হলাম।
লোকটা বললে—তুমি দেখছি কালা আদমি, বোধ হয় ইস্ট-ইণ্ডিজের। আমার সঙ্গে পোকার খেলবে চলো।
শঙ্কর ওর কথা শুনে চটেছিল, বললে—তোমার সঙ্গে পোকার খেলবার আমার আগ্রহ নেই। সঙ্গে সঙ্গে সে এটাও বুঝলে, লোকটা পোকার খেলবার ছলে তাদের সর্বস্ব অপহরণ করতে চায়। পোকার একরকম তাসের জুয়াখেলা—শঙ্কর নাম জানলেও সে খেলা কখনো জীবনে দেখেওনি, নাইরোবিতে সে জানত বদমাইশ জুয়াড়িরা পোকার খেলার ছল করে নতুন লোকের সর্বনাশ করে। এটা এক ধরনের ডাকাতি।
শঙ্করের উত্তর শুনে পোর্তুগিজ বদমাইশটা রেগে লাল হয়ে উঠল। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরুতে চাইল। সে আরও কাছে ঘেঁষে এসে, দাঁতে দাঁত চেপে, অতি বিকৃত সুরে বললে—কী? নিগার, কী বললি? ইস্ট ইণ্ডিজের তুলনায় তুই অত্যন্ত ফাজিল দেখছি! তোর ভবিষ্যতের মঙ্গলের জন্যে তোকে জানিয়ে দিই যে, তোর মতো কালা আদমিকে আলবুকার্ক এই রিভলভারের গুলিতে কাদাখোঁচা পাখির মতো ডজনে ডজনে মেরেছে। আমার নিয়ম হচ্ছে এই শোন। কাবালোতে যারা নতুন লোক নামবে, তারা হয় আমার সঙ্গে পোকার খেলবে, নয়তো আমার সঙ্গে রিভলভারে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করবে।
শঙ্কর দেখল এই বদমাইশ লোকটার সঙ্গে রিভলভারের লড়াইয়ে নামলে মৃত্যু অনিবার্য। বদমাইশটা হচ্ছে একজন ক্র্যাক-শট গুণ্ডা, আর সে কী? কাল পর্যন্ত রেলের নিরীহ কেরানি ছিল। কিন্তু যুদ্ধ না করে যদি পোকারই খেলে তবে সর্বস্ব যাবে।
হয়তো আধমিনিট কাল শঙ্করের দেরি হয়েছে উত্তর দিতে, লোকটা কোমরের চামড়ার হোলস্টার থেকে নিমেষের মধ্যে রিভলভার বার করে শঙ্করের পেটের কাছে উঁচিয়ে বললে—যুদ্ধ না পোকার?
শঙ্করের মাথায় রক্ত উঠে গেল। ভীরুর মতো সে পাশবিক শক্তির কাছে মাথা নীচু করবে না, হোক মৃত্যু।
সে বলতে যাচ্ছে—যুদ্ধ, এমন সময় পেছন থেকে ভয়ানক বাঁজখাই সুরে কে বললে—এই! সামলাও, গুলিতে মাথার চাঁদি উড়ল! দুজনেই চমকে উঠে পেছনে চাইল। আলভারেজ তার উইনচেস্টার রিপিটার বাগিয়ে উঁচিয়ে পোর্তুগিজ বদমাইশটার মাথা লক্ষ্য করে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে। শঙ্কর সুযোগ বুঝে চট করে পিস্তলের নলের উলটোদিকে ঘুরে গেল। আলভারেজ বললে—বালকের সঙ্গে রিভলভার ডুয়েল? ছো:, তিন বলতে পিস্তল ফেলে দিবি—এক—দুই—তিন—
আলবুকার্কের শিথিল হাত থেকে পিস্তলটা মাটিতে পড়ে গেল।
আলভারেজ বললে—বালককে একা পেয়ে খুব বীরত্ব জাহির করছিলি না?
শঙ্কর ততক্ষণে পিস্তলটা মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়েছে। আলবুকার্ক একটু বিস্মিত হল, আলভারেজ যে শঙ্করের দলের লোক, তা সে ভাবেওনি। সে হেসে বললে—আচ্ছা, মেট, কিছু মনে কোরো না, আমারই হার। দাও, আমার পিস্তলটা দাও ছোকরা। কোনো ভয় নেই, দাও। এসো, হাতে হাত দাও। তুমিও মেট। আলবুকার্ক রাগ পুষে রাখে না। এসো, কাছেই আমার কেবিন, এক এক গ্লাস বিয়ার খেয়ে নাও।
আলভারেজ নিজের জাতের লোকের রক্ত চেনে! ও নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে শঙ্করকে সঙ্গে নিয়ে আলবুকার্কের কেবিনে গেল। শঙ্কর বিয়ার খায় না শুনে তাকে কফি করে দিল। প্রাণখোলা হাসি হেসে কত গল্প করলে, যেন কিছুই হয়নি।
শঙ্কর বাস্তবিকই লোকটার দিকে আকৃষ্ট হল। কিছুক্ষণ আগের অপমান ও শত্রুতা সে এখন বেমালুম ভুলে গিয়ে, যাদের হাতে অপমান হয়েছে, তাদেরই সঙ্গে এমনি ধারা দিলখোলা হেসে খোশগল্প করতে পারে, পৃথিবীতে সে ধরনের লোক বেশি নেই।

আলভারেজ বললে-বালকের সঙ্গে রিভলভার ডুয়েল? ছোঃ... !
পরদিন ওরা কাবালো থেকে স্টিমারে উঠল কঙ্গোনদী বেয়ে দক্ষিণ মুখে যাবার জন্যে। নদীর দুই তীরের দৃশ্যে শঙ্করের মন আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠল।
এরকম অদ্ভুত বনজঙ্গলের দৃশ্য জীবনে কখনো সে দেখেনি। এতদিন সে যেখানে ছিল, আফ্রিকার সে অঞ্চলে এমন বন নেই—সে শুধু বিস্তীর্ণ প্রান্তর, প্রধানত ঘাসের বন, মাঝে মাঝে বাবলা ও ইউকা গাছ। কিন্তু কঙ্গোনদী বেয়ে স্টিমার যত অগ্রসর হয়, দুধারে নিবিড় বনানী, কত ধরনের মোটা লতা, বনের ফুল; বন্যপ্রকৃতি এখানে আত্মহারা, লীলাময়ী, আপনার সৌন্দর্যে ও নিবিড় প্রাচুর্যে আপনি মুগ্ধ।
শঙ্করের মধ্যে যে সৌন্দর্যপ্রিয় ভাবুক মনটি ছিল, (হাজার হোক সে বাংলার মাটির ছেলে, ডিয়েগো আলভারেজের মতো শুধু কঠিন-প্রাণ স্বর্ণান্বেষী প্রসপেক্টর নয়) এই রূপের মেলায় সে মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে রাঙা অপরাহ্ণে ও দুপুর রোদে আপন মনে কত কী স্বপ্নজাল রচনা করে।
অনেক রাত্রে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, অচেনা তারাভরা বিদেশের আকাশের তলায় রহস্যময়ী, বন্য প্রকৃতি তখন যেন জেগে উঠেছে—জঙ্গলের দিক থেকে কত বন্যজন্তুর ডাক কানে আসে। শঙ্করের চোখে ঘুম নেই, কিন্তু সৌন্দর্য-স্বপ্নে ভোর হয়ে, মধ্য আফ্রিকার নৈশ শীতলতাকে তুচ্ছ করেও জেগে বসে থাকে।
ওই জ্বলজ্বলে সপ্তর্ষিমন্ডল—আকাশে অনেকদূরে তার ছোট্ট গ্রামের মাথায়ও আজ এমনি সপ্তর্ষিমন্ডল উঠেছে, ওই রকম এক ফালি কৃষ্ণপক্ষের-গভীর-রাত্রির চাঁদও। সে-সব পরিচিত আকাশ ছেড়ে কতদূরে সে এসে পড়েছে, আরও কতদূরে তাকে যেতে হবে, কী এর পরিণতি কে জানে?
দুদিন পরে বোট এসে সান কিনি পৌঁছুল। সেখান থেকে ওরা আবার পদব্রজে রওনা হল—জঙ্গল এদিকে বেশি নেই, কিন্তু দিগন্তপ্রসারী জনমানবহীন প্রান্তর ও অসংখ্য ছোটো বড়ো পাহাড়, অধিকাংশ পাহাড় রুক্ষ ও বৃক্ষশূন্য, কোনো কোনো পাহাড়ে ইউফোর্বিয়া জাতীয় গাছের ঝোপ। কিন্তু শঙ্করের মনে হল, আফ্রিকার এই অঞ্চলের দৃশ্য বড়ো অপরূপ। এতটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে মন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, সূর্যাস্তের রং, জ্যোৎস্নারাত্রির মায়া, এই দেশকে রাত্রে, অপরাহ্ণে রূপকথার পরিরাজ্য করে তোলে।
আলফারেজ বলল—এই ভেল্ড অঞ্চলে সব জায়গা দেখতে একরকম বলে পথ হারাবার সম্ভাবনা কিন্তু খুব বেশি।
কথাটা যেদিন বলা হল, সেদিনই এক কান্ড ঘটল। জনহীন ভেল্ডে সূর্য অস্ত গেলে ওরা একটা ছোটো পাহাড়ের আড়ালে তাঁবু খাটিয়ে আগুন জ্বালল—শঙ্কর জল খুঁজতে বেরোল। সঙ্গে আলভারেজের বন্দুকটা নিয়ে গেল, কিন্তু মাত্রা দুটো টোটা। আধঘণ্টা এদিক-ওদিক ঘুরে বেলাটুকু গেল, পাতলা অন্ধকারে সমস্ত প্রান্তরকে ধীরে ধীরে আবৃত করে দিল। শঙ্কর শপথ করে বলতে পারে, সে আধঘণ্টার বেশি হাঁটেনি। হঠাৎ চারিধারে চেয়ে শঙ্করের কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হল, যেন কী একটা বিপদ আসছে, তাঁবুতে ফেরা ভালো। দূরে দূরে ছোটো বড়ো পাহাড়, একই রকম দেখতে সব দিক, কোনো চিহ্ন নেই, সব একাকার।
মিনিট পাঁচ-ছয় হাঁটবার পরই শঙ্করের মনে হল সে পথ হারিয়েছে। তখন আলভারেজের কথাটা তার মনে পড়ল। কিন্তু তখনও সে অনভিজ্ঞতার দরুন বিপদের গুরুত্ব বুঝতে পারল না। হেঁটেই যাচ্ছে—একবার মনে হয় সামনে, একবার মনে হয় বাঁয়ে, একবার মনে হয় ডাইনে। তাঁবুর আগুনের কুন্ডটা দেখা যায় না কেন? কোথায় সেই ছোটো পাহাড়টা?
দু-ঘণ্টা হাঁটবার পরে শঙ্করের খুব ভয় হল। ততক্ষণে সে বুঝেছে যে, সে সম্পূর্ণরূপে পথ হারিয়েছে এবং ভয়ানক বিপদগ্রস্ত। একা তাকে রোডেসিয়ার এই জনমানবশূন্য, সিংহসংকুল অজানা প্রান্তরে রাত কাটাতে হবে,—অনাহারে এবং এই কনকনে শীতে বিনা কম্বলে ও বিনা আগুনে। সঙ্গে একটা দেশলাই পর্যন্ত নেই।
ব্যাপারটা সংক্ষেপে এই দাঁড়াল যে, পরদিন সন্ধ্যার পূর্বে অর্থাৎ পথ হারানোর চব্বিশ ঘণ্টা পরে উদ্ভ্রান্ত, তৃষ্ণায় মুমূর্ষু শঙ্করকে, ওদের তাঁবু থেকে প্রায় সাত মাইল দূরে, একটা ইউফোর্বিয়া গাছের তলা থেকে আলভারেজ উদ্ধার করে তাঁবুতে নিয়ে এল।
আলভারেজ বলল—তুমি যে পথ ধরেছিলে শঙ্কর, তোমাকে আজ খুঁজে বার করতে না পারলে, তুমি গভীর থেকে গভীরতর মরুপ্রান্তরের মধ্যে গিয়ে পড়ে, কাল দুপুর নাগাদ তৃষ্ণায় প্রাণ হারাতে। এর আগে তোমার মতো অনেকেই রোডেসিয়ার ভেল্ডে এ ভাবে মারা গিয়েছে। এ-সব ভয়ানক জায়গা। তুমি আর কখনো তাঁবু থেকে ওরকম বেরিয়ো না, কারণ তুমি আনাড়ি। মরুভূমিতে ভ্রমণের কৌশল তোমার জানা নেই। ডাহা মারা পড়বে।
শঙ্কর বললে—আলভারেজ, তুমি দুবার আমার প্রাণ রক্ষা করলে, এ আমি ভুলব না।
আলভারেজ বললে—ইয়াং ম্যান, ভুলে যাচ্ছ যে তার আগে তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ। তুমি না থাকলে ইউগাণ্ডার তৃণভূমিতে আমার হাড়গুলো সাদা হয়ে আসত এতদিন।
মাস দুই ধরে রোডেসিয়া ও এঙ্গোলার মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ ভেল্ড অতিক্রম করে, অবশেষে দূরে মেঘের মতো পর্বতশ্রেণি দেখা গেল। আলভারেজ ম্যাপ মিলিয়ে বলল—ওই হচ্ছে আমাদের গন্তব্যস্থান, রিখটারসভেল্ড পর্বত, এখনও এখান থেকে চল্লিশ মাইল হবে। আফ্রিকার এই সব খোলা জায়গায় অনেক দূর থেকে জিনিস দেখা যায়।
এ অঞ্চলে অনেক বাওবাব গাছ। শঙ্করের এ গাছটা বড়ো ভালো লাগে—দূর থেকে যেন মনে হয় বট কী অশ্বত্থ গাছের মতো, কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায়, বাওবাব গাছ ছায়াবিরল অথচ বিশাল, আঁকা বাঁকা, সারা গায়ে যেন বড়ো বড়ো আঁচিল কী আব বেরিয়েছে, যেন আরব্য উপন্যাসের একটা বেঁটে, কুদর্শন, কুব্জ দৈত্য। বিস্তীর্ণ প্রান্তরে এখানে ওখানে প্রায় সর্বত্রই দূরে নিকটে বড়ো বড়ো বাওবাব গাছ দাঁড়িয়ে।
একদিন সন্ধ্যাবেলায় দুর্জয় শীতে তাঁবুর সামনে আগুন করে বসে আলভারেজ বললে—এই যে দেখছ রোডেসিয়ার ভেল্ড অঞ্চল, এখানে হিরে ছড়ানো আছে সর্বত্র, এটা হিরের খনির দেশ। কিম্বার্লি খনির নাম নিশ্চয়ই শুনেছ। আরও অনেক ছোটোখাটো খনি আছে, এখানে ওখানে ছোটো বড়ো হিরের টুকরো কত লোকে পেয়েছে, এখনও পায়!
কথা শেষ করেই বলে উঠল—ও কারা?
শঙ্কর সামনে বসে ওর কথা শুনছিল। বললে, কোথায় কে?
কিন্তু আলভারেজের তীক্ষ্ণদৃষ্টি তার হাতের বন্দুকের গুলির মতোই অব্যর্থ, একটু পরে তাঁবু থেকে দূরে অন্ধকারে কয়েকটি অস্পষ্ট মূর্তি এদিকে এগিয়ে আসছে, শঙ্করের চোখে পড়ল। আলভারেজ বললে—শঙ্কর, বন্দুক নিয়ে এসো, চট করে যাও, টোটা ভরে—
বন্দুক হাতে শঙ্কর বাইরে এসে দেখলে, আলভারেজ নিশ্চিন্ত মনে ধূমপান করছে; কিছুদূরে অজানা মূর্তি কয়টি এখনও অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আসছে। একটু পরে তারা এসে তাঁবুর অগ্নিকুন্ডের বাইরে দাঁড়াল। শঙ্কর চেয়ে দেখলে আগন্তুক কয়েকটি কৃষ্ণবর্ণ, দীর্ঘকায়—তাদের হাতে কিছু নেই, পরনে লেংটি, গলায় সিংহের লোম, মাথায় পালক—সুগঠিত চেহারা, তাঁবুর আলোয় মনে হচ্ছিল, যেন কয়েকটি ব্রোঞ্জের মূর্তি।
আলভারেজ জুলু ভাষায় বললে—কী চাও তোমরা?

আলভারেজ নিশ্চিন্ত মনে ধুমপান করছে,...অজানা মূর্তি কয়টি...আসছে ।
ওদের মধ্যে কী কথাবার্তা চলল, তার পরে ওরা সব মাটির ওপর বসে পড়ল। আলভারেজ বললে—শঙ্কর, ওদের খেতে দাও—
তার পরে অনুচ্চস্বরে বললে—বড়ো বিপদ। খুব হুঁশিয়ার, শঙ্কর!
টিনের খাবার খোলা হল। সকলের সামনেই খাবার রাখলে শঙ্কর। আলভারেজও ওই সঙ্গে আবার খেতে বসল, যদিও সে ও শঙ্কর সন্ধের সময়েই তাদের নৈশ আহার শেষ করেছে। শঙ্কর বুঝল আলভারেজের কোনো মতলব আছে, কিংবা এদেশের রীতি অতিথির সঙ্গে খেতে হয়।
আলভারেজ খেতে খেতে জুলু ভাষায় আগন্তুকদের সঙ্গে গল্প করছে, অনেকক্ষণ পরে খাওয়া শেষ করে ওরা চলে গেল। চলে যাবার আগে সবাইকে একটা করে সিগারেট দেওয়া হল।
ওরা চলে গেলে আলভারেজ বলল—ওরা মাটাবেল জাতির লোক। ভয়ানক দুর্দান্ত, ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের সঙ্গে অনেকবার লড়েছে। শয়তানকেও ভয় করে না। ওরা সন্দেহ করেছে আমরা ওদের দেশে এসেছি হিরের খনির সন্ধানে। আমরা যে জায়গায়টায় আছি, ওটা ওদের একজন সর্দারের রাজ্য। কোনো সভ্য গভর্নমেন্টের আইন এখানে খাটবে না। ধরবে আর নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে মারবে। চলো আমরা তাঁবু তুলে রওনা হই।
শঙ্কর বললে—তবে তুমি বন্দুক আনতে বললে কেন?
আলভারেজ হেসে বলল—দ্যাখো, ভেবেছিলুম যদি ওরা খেয়েও না ভোলে, কিংবা কথাবার্তায় বুঝতে পারি যে, ওদের মতলব খারাপ, ভোজনরত অবস্থাতেই ওদের গুলি করব। এই দ্যাখো রিভলভার পেছনে রেখে তবে খেতে বসেছিলাম। এ কটাকে সাবাড় করে দিতাম। আমার নাম আলভারেজ, আমিও একসময়ে শয়তানকেও ভয় করতুম না, এখনও করি নে। ওদের হাতের মাছ মুখে পৌঁছোবার আগেই আমার পিস্তলের গুলি ওদের মাথার খুলি উড়িয়ে দিত।
আরও পাঁচ-ছ’ দিন পথ চলবার পরে একটা খুব বড়ো পর্বতের পাদমূলে নিবিড় ট্রপিক্যাল অরণ্যানীর মধ্যে ওরা প্রবেশ করলে। স্থানটি যেমন নির্জন তেমনি বিশাল। সে বন দেখে শঙ্করের মনে হল, একবার যদি সে এর মধ্যে পথ হারায়, সারাজীবন ঘুরলেও বার হয়ে আসবার সাধ্য তার হবে না। আলভারেজও তাকে সাবধান করে দিয়ে বললে—খুব হুঁশিয়ার শঙ্কর, বনে চলাফেরা যার অভ্যাস নেই, সে পদে পদে এইসব বনে পথ হারাবে। অনেক লোক বেঘোরে পড়ে বনের মধ্যে মারা পড়ে। মরুভূমির মধ্যে যেমন পথ হারিয়ে ঘুরেছিলে, এর মধ্যেও ঠিক তেমনিই পথ হারাতে পারো। কারণ এখানে সবই একরকম, এক জায়গা থেকে আর এক জায়গাকে পৃথক করে চিনে নেবার কোনো চিহ্ন নেই। ভালো বুশম্যান না হলে পদে পদে বিপদে পড়তে হবে। বন্দুক না নিয়ে এক পা কোথাও যাবে না, এটিও যেন মনে থাকে। মধ্য আফ্রিকার বন শৌখিন ভ্রমণের পার্ক নয়।
শঙ্করকে তা না বললেও চলত, কারণ এসব অঞ্চল যে শখের পার্ক নয়, তা এর চেহারা দেখেই সে বুঝতে পেরেছে। সে জিজ্ঞেস করলে—তোমার সেই হলদে হিরের খনি কতদূরে? এই তো রিখটারসভেল্ড পর্বতমালা, ম্যাপে যতদূর বোঝা যাচ্ছে।
আলভারেজ হেসে বলল—তোমার ধারণা নেই বললাম যে। আসল রিখটারসভেল্ডের এটা বাইরের থাক। এরকম আরও অনেক থাক আছে। সমস্ত অঞ্চলটা এত বিশাল যে পুবে সত্তর মাইল ও পশ্চিমদিকে একশো থেকে দেড়শো মাইল পর্যন্ত গেলেও এ বন ও পাহাড় শেষ হবে না। সর্বনিম্ন প্রস্থ চল্লিশ মাইল। সমস্ত জড়িয়ে আট ন’ হাজার বর্গমাইল সমস্ত রিখটারসভেল্ড পার্বত্য অঞ্চল ও অরণ্য। এই বিশাল অজানা অঞ্চলের কোনখানটাতে এসেছিলুম আজ সাত আট বছর আগে, ঠিক সে জায়গাটা খুঁজে বার করা কী ছেলেখেলা, ইয়াং ম্যান?
শঙ্কর বললে—এদিকে খাবার ফুরিয়েছে, শিকারের ব্যবস্থা দেখতে হয়, নইলে কাল থেকে বায়ুভক্ষণ ছাড়া উপায় নেই।
আলভারেজ বলল—কিছু ভেবো না। দেখছ না গাছে গাছে বেবুনের মেলা? কিছু না মেলে বেবুনের দাপনা ভাজা আর কফি দিয়ে দিব্যি ব্রেকফাস্ট খাব বলে কাল থেকে। আজ আর নয়, তাঁবু ফেলো, বিশ্রাম করা যাক।
একটা বড়ো গাছের নীচে তাঁবু খাটিয়ে ওরা আগুন জ্বালাল। শঙ্কর রান্না করল, আহারাদি শেষ করে যখন দুজনে আগুনের সামনে বসেছে, তখনও বেলা আছে।
আলভারেজ কড়া তামাকে পাইপ টানতে টানতে বললে—জানো শঙ্কর, আফ্রিকার এইসব অজানা অরণ্যে এখনও কত জানোয়ার আছে, যার খবর বিজ্ঞানশাস্ত্র রাখে না? খুব কম সভ্য মানুষ এখানে এসেছে। ‘ওকাপি’ বলে যে জানোয়ার সে তো প্রথম দেখা গেল ১৯০০ সালে। এক ধরনের বুনো শুয়োর আছে, যা সাধারণ বুনো শুয়োরের প্রায় তিনগুণ বড়ো আকারের। ১৮৮৮ সালে মোজেস কাউলে, পৃথিবী পর্যটক ও বড়ো শিকারি, সর্বপ্রথম ওই বুনো শুয়োরের সন্ধান পান বেলজিয়ান কঙ্গোর লুয়ালাবু অরণ্যের মধ্যে। তিনি বহু কষ্টে একটা শিকারও করেন এবং নিউইয়র্ক প্রাণীবিদ্যা সংক্রান্ত মিউজিয়মে উপহার দেন। বিখ্যাত রোডেসিয়ান মনস্টারের নাম শুনেছ?
শঙ্কর বললেন—না, কী সেটা?
—শোনো তবে। রোডেসিয়ার উত্তর সীমায় প্রকান্ড জলাভূমি আছে। ওদেশের অসভ্য জুলুদের মধ্যে অনেকেই এক অদ্ভুত ধরনের জানোয়ারকে এই জলাভূমিতে মাঝে মাঝে দেখেছে। ওরা বলে তার মাথা কুমিরের মতো, গণ্ডারের মতো তার শিং আছে, গলাটা অজগর সাপের মতো লম্বা ও আঁশওলা দেহটা জলহস্তীর মতো, লেজটা কুমিরের মতো। বিরাটদেহ এই জানোয়ারের প্রকৃতিও খুব হিংস্র। জল ছাড়া কখনো ডাঙায় এ জানোয়ারকে দেখা যায়নি। তবে এই সব অসভ্য দেশি লোকের অতিরঞ্জিত বিবরণ বিশ্বাস করা শক্ত।
কিন্তু ১৮৮০ সালে জেমস মার্টিন বলে একজন প্রসপেক্টর রোডেসিয়ার এই অঞ্চলে বহুদিন ঘুরেছিলেন সোনার সন্ধানে। মি: মার্টিন আগে জেনারেল ম্যাথিউসের এডিকং ছিলেন, নিজে একজন ভালো ভূতত্ত্ব ও প্রাণীতত্ত্ববিদও ছিলেন। ইনি তাঁর ডায়েরির মধ্যে রোডেসিয়ার এই অজ্ঞাত জানোয়ার দূর থেকে দেখেছেন বলে উল্লেখ করে গিয়েছেন। তিনিও বলেন, জানোয়ারটা আকৃতিতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের ডাইনোসর জাতীয় সরীসৃপের মতো ও বেজায় বড়ো। কিন্তু তিনি জোর করে কিছু বলতে পারেননি, কারণ খুব ভোরের কুয়াশার মধ্যে কোভিরাণ্ডো হ্রদের সীমানায় জলাভূমিতে আবছায়া ভাবে তিনি জানোয়ারটাকে দেখেছিলেন। জানোয়ারটার ঘোড়ার ‘চিঁহিঁ’ ডাকের মতো ডাক শুনেই তাঁর সঙ্গে জুলু চাকরগুলো ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে পালাতে বললে—সাহেব পালাও, পালাও, ডিঙ্গোনেক,! ডিঙ্গোনেক! ডিঙ্গোনেক ওই জানোয়ারটার জুলু নাম। দু-তিন বছর এক আধবার দেখা দেয় কি না দেয়, কিন্তু সেটা এতই হিংস্র যে তার আবির্ভাব সে দেশের লোকের পক্ষে ভীষণ ভয়ের ব্যাপার। মি: মার্টিন বলেন, তিনি তাঁর ৩০৩ টোটা গোটা দুই উপরি ছুড়েছিলেন জানোয়ারটার দিকে। অতদূর থেকে তাক হল না, রাইফেলের আওয়াজে সেটা সম্ভবত জলে ডুব দিল।
শঙ্কর বললে—তুমি কী করে জানলে এসব? মি: মার্টিনের ডায়েরি ছাপানো হয়েছিল নাকি?
—না, অনেকদিন আগে বুলাওয়েও ক্রনিকল কাগজে মি: মার্টিনের এই ঘটনাটা বেরিয়েছিল। আমি তখন সবে এদেশে এসেছি। রোডেসিয়া অঞ্চলে আমিও প্রসপেক্টিং করে বেড়াতুম বলে জানোয়ারটার বিবরণ আমাকে খুব আকৃষ্ট করে। কাগজখানা অনেকদিন আমার কাছে রেখেও দিয়েছিলুম। তারপর কোথায় হারিয়ে গেল। ওরাই নাম দিয়েছিল জানোয়ারটার—রোডেসিয়ান মনস্টার।
শঙ্কর বললে, তুমি কোনো কিছু অদ্ভুত জানোয়ার দ্যাখোনি?
প্রশ্নটার সঙ্গে সঙ্গে একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল।
তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে নেমে এসেছে। সেই আবছায়া আলো-অন্ধকারের মধ্যে শঙ্করের মনে হল—হয়তো শঙ্করের ভুল হতে পারে—কিন্তু শঙ্করের মনে হয় সে দেখলে আলভারেজ দুর্ধর্ষ ও নির্ভীক আলভারেজ, দুঁদে ও অব্যর্থলক্ষ্য আলভারেজ ওর প্রশ্ন শুনে চমকে উঠল—এবং—এবং সেইটাই সকলের চেয়ে আশ্চর্য—যেন পরক্ষণেই শিউরে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে আলভারেজ যেন নিজের অজ্ঞাতসারেই চারিপাশের জনমানবহীন ঘন জঙ্গল ও রহস্যভরা দূরারোহ পর্বতমালার দিকে একবার চেয়ে দেখল, কোনো কথা বলল না। যেন এই পর্বতজঙ্গলে বহুকাল পরে এসে অতীতের কোনো বিভীষিকাময়ী পুরাতন ঘটনা ওর স্মৃতিতে ভেসে উঠেছে, যে স্মৃতিটা ওর পক্ষে খুব প্রীতিকর নয়।
আলভারেজ ভয় পেয়েছে।
অবাক! আলভারজের ভয়! শঙ্কর ভাবতেও পারে না। কিন্তু সেই ভয়টা অলক্ষিতে এসে শঙ্করের মনেও চেপে বসল। এই সম্পূর্ণ অজানা বিচিত্র রহস্যময়ী বনানী, এই বিরাট পর্বতপ্রাচীর যেন এক গভীর রহস্যকে যুগ যুগ ধরে গোপন করে আসছে—যে বীর হও, যে নির্ভীক হও, এগিয়ে এসো সে—কিন্তু মৃত্যুপণে ক্রয় করতে হবে সে গহন রহস্যের সন্ধান। রিখটারসভেল্ড পর্বতমালা ভারতবর্ষের দেবতাত্মা নগাধিরাজ হিমালয় নয়—এদেশের মাসাই, জুলু, মাটাবেল প্রভৃতি আদিম জাতির মতোই ওর আত্মা নিষ্ঠুর, বর্বর, নরমাংসলোলুপ। সে কাউকে রেহাই দেবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন