বাংলা সংস্কৃতি চলবে কী চলবে না

তসলিমা নাসরিন

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান মুসলমান এবং ধর্মমুক্ত মানুষ সবাই আমরা পালন করতাম পয়লা বৈশাখ। বাংলা গান গাইতাম, বাঙালি খাবার খেতাম। বৈশাখি মেলায় গিয়ে দা-বটি, শিল নোড়া, বেলান পিঁড়ি, হাঁড়িকুড়ি, মুড়ি-মুড়কি, খই-খেলনা, মাটির পুতুল-টুতুল আর বাঁশি বেলুন কিনে আনতাম। বিকেলে বাবার হাত ধরে জুয়েলারির দোকানে-দোকানে গিয়ে হালখাতার মণ্ডা-মিঠাই খাওয়া ছিল আমাদের পয়লা বৈশাখ।

ঢাকার রমনায় ছায়ানটের গান, ইলিশ-পান্তা খাওয়া বা রাস্তায় মঙ্গল শোভাযাত্রা নিতান্তই নতুন ট্রাডিশান, বাঙালি এলিট শ্রেণি ওভাবেই কয়েক দশক আগে পয়লা বৈশাখের আধুনিকীকরণ করেছে। আমি দুটো উৎসবই দেখেছি, গ্রামের এবং শহরের উৎসব, পুরোনো এবং নতুন উৎসব। দুটোই জরুরি।

বেশ কয়েকবছর যাবৎ খবর পাচ্ছি, বাংলাদেশের ধর্মান্ধ মৌলবাদীগোষ্ঠী ঘোষণা করেছে তারা পয়লা বৈশাখের কোনও উৎসব অনুষ্ঠান চায় না। ভালো কথা, যারা চায় না তারা উৎযাপন না করুক, যারা চায় তারা করুক। এরপর শুনি, তারা নিজেরা তো উৎযাপন করবেই না, তারা কাউকেই উৎযাপন করতে দেবে না। এ কেমন কথা! বাংলাদেশ তো জানতাম গণতান্ত্রিক দেশ। আমি একা বলে না হয় আমাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছে, পয়লা বৈশাখ পালন করছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। লক্ষ লক্ষ মানুষের সংস্কৃতি গুটিকয় মৌলবাদীর হুমকির সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে? গুটিকতক হয়তো এখন আর গুটিকতক নেই।

ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা বাংলা সংস্কৃতি পছন্দ করে না, তাদের পছন্দ ইসলামি সংস্কৃতি, তারা বাংলা সংস্কৃতিকে বলছে হিন্দু সংস্কৃতি। হিন্দু সংস্কৃতি বলে দোষ দিলে হিন্দু বিদ্বেষী মুসলমানরা পয়লা বৈশাখ ত্যাগ করবে। করছেও হয়তো। তারা আজ যে করেই হোক আরব দেশের কালচার আনবে বাংলাদেশে! সে কারণেই হিজাব পরাচ্ছে মেয়েদের। তারা জানে হিজাব কখনও হিজাবে থেমে থাকবে না। হাঁটিহাঁটি পা-পা করে হিজাব যাবে বোরখার দিকে।

সৌদি আরবে সব মেয়েরই বোরখা পরা বাধ্যতামূলক। আপাদমস্তক বোরখায় ঢাকা মেয়েরাও কিন্তু ধর্মীয় পুলিশের চাবুক থেকে রেহাই পায় না। রাস্তাঘাটে, মাঠে-ময়দানে ধর্মীয় পুলিশরা কোনও মেয়ের কপালে দু’একটা মাথার চুল কোনও ফাঁক-ফোকর দিয়ে অসাবধানে কখনও বেরিয়ে এলো কি না দেখার জন্য টহল দেয়। বেরোলেই চাবুক।

তাহলে ঢাকা শহরে পয়লা বৈশাখের ভিড়ে ওরকম ‘ধর্মীয় পুলিশ’ মোতায়েন করেছিল তারা, যারা বাংলাদেশে আরব দেশের কালচার আনতে চাইছে! শাড়ি-পরা যে মেয়েদের নাভি দেখা যায়, ঝুঁকলেই যে মেয়ের ক্লিভেজ শো করে, তাদের তারা শাস্তি দিয়েছে। এ নিতান্তই মহড়া। হাঁটিহাঁটি পা-পা করে ধর্মীয় পুলিশরা যাচ্ছে সেই ভয়ঙ্কর দিনের দিকে, যে দিন তারা বোরখা পরা মেয়েদেরও কপালে চুল দেখা গেলে পেটাবে।

অলরেডি ধর্মান্ধ জল্লাদ বেরিয়ে গেছে রাস্তায়। আরব দেশের জল্লাদরা যেমন পাবলিক প্লেসে তলোয়ার দিয়ে অপরাধীদের মুণ্ডু এক কোপে ফেলে দেয়, তেমনি বাংলাদেশের ধর্মান্ধ জল্লাদরাও মানুষের মুণ্ডু ফেলছে। তবে এক কোপে না ফেলতে পারলেও কয়েক কোপের দরকার পড়ছে। রাজীব, অভিজিৎ, বাবুদের ওপর দেশি জল্লাদরা মহড়া চালিয়েছে। হাঁটিহাঁটি পা-পা করে সেই দিনের দিকে তারা যাচ্ছে, যে দিন চাপাতি-টাপাতির ঝামেলা না করে ইসলামি মতেই বৈধ তরবারি হাতে নেবে, সরকারি আদেশে এক একটা বৈধ কোপে বিধর্মী , বুদ্ধিজীবি আর মুক্তমনা লেখক-ব্লগারদের মুণ্ডু ফেলবে।

হাঁটিহাঁটি পা-পা করে? মাঝে মাঝে মনে হয় বিশাল-বিশাল লম্ফ দিয়েই যাচ্ছে। খুব দ্রুতই যাচ্ছে।

আমি জানি না বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী। বাংলাদেশ কি সৌদি আরব হতে যাচ্ছে, পাকিস্তান হতে যাচ্ছে, নাকি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা এককালে দেখেছিলাম, বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে সেই বাংলাদেশ? বাংলাদেশ তার বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরবে, বাংলাদেশের কোনও রাষ্ট্রধর্ম থাকবে না, কোনও একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বাকি ধর্মের মাথার ওপর বসে ছড়ি ঘোরাবে না, কাউকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করবে না বাংলাদেশ, বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদের কোনও স্থান থাকবে না– এরকম বাংলাদেশ আজকাল আমার মনে হয় অসম্ভব তৈরি হওয়া। বাহান্নোতে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, উনসত্তরে যে বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলাম, একাত্তরে যে বাংলাদেশ গড়বো বলে ঘর ছেড়েছিলাম, সেই বাংলাদেশকে গড়ার সুযোগ আমরা হাতে পেয়েও কাজে লাগাইনি, একে নষ্ট করে ফেলেছি, একে হায়েনার মুখে জেনে-শুনে ছুড়ে দিয়েছি। জানি দেশ আর দেশ নেই, তারপরও শাহবাগ আন্দোলনের আর পয়লা বৈশাখের বিশাল জনস্রোত দেখে আশা জাগে। তাহলে হয়তো হায়েনার মুখ থেকে ছিনিয়ে এনে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত দেশটাকে শুশ্রুষা করে আবার সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পারি। ত্রিসীমানা থেকে আগে দূর করতে হবে হায়েনাকে।

পেণ্ডুলামের মতো দুলি আমি আশা আর নিরাশায়।

সকল অধ্যায়
১.
লিঙ্গসূত্র
২.
যৌবনে ছেলেরা ডেয়ারিং
৩.
পতিতা প্রথা বন্ধ হোক
৪.
অপ্রত্যাশিত
৫.
বিয়ের প্রয়োজনীয়তা আদৌ আছে কি?
৬.
পুরুষ নিয়ে মেয়েদের কাড়াকাড়ি বাড়াবাড়ি
৭.
নারীর যৌন কামনা থাকতে নেই
৮.
দেশ আর দেশ নেই
৯.
আমার গৌরব, আমি স্বেচ্ছাচারী
১০.
ধর্মে নেই, উৎসবে আছি
১১.
বেলা যায় মেলা যায়
১২.
তোমাকে অভিবাদন, এলফ্রিডা
১৩.
যাই বল নইপল
১৪.
আমার দেহ নিয়ে আমি যা খুশি করব
১৫.
বাবা
১৬.
সেক্সবয় (গল্প)
১৭.
সকল গৃহ হারালো যার
১৮.
অন্ধকার আমাকে গ্রাস করতে থাকে
১৯.
মেয়েদের শরীর পুরুষের চোখে
২০.
পৃথিবীর প্রাচীনতম নির্যাতন
২১.
পেছনের দিনগুলো ধুসর ধুসর
২২.
খারাপ মেয়ের গল্প (গল্প)
২৩.
হুমায়ূন : পুরুষতন্ত্রের সম্রাট
২৪.
তুই নিষিদ্ধ তুই কথা কইস না
২৫.
অনুমতি না নিয়ে আমার শরীর স্পর্শ করেছিলেন সুনীল
২৬.
পৃথিবীর পথে
২৭.
পৃথিবীর পথে ২
২৮.
মিডিয়া এবং মানুষ
২৯.
নারীবিদ্বেষের কারণ পুরুষতন্ত্র
৩০.
সন্ত্রাস
৩১.
বিহারি সমস্যা
৩২.
রঘু রাই এবং শরণার্থী
৩৩.
এ লড়াই প্রাচ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের নয়
৩৪.
বেড়ালের গল্প
৩৫.
ফিলিস্তিন এক টুকরো মাটির নাম
৩৬.
পর্নোগ্রাফি
৩৭.
সেইসব ঈদ
৩৮.
কামড়ে খামচে মেয়েদের ‘আদর’ করছে পুরুষেরা
৩৯.
সুন্দরী
৪০.
ধর্ম থাকবে, নারীর অধিকারও থাকবে, এটা হয় না
৪১.
সানেরার মতো মেয়ে চাই- আছে?
৪২.
প্রতিবেশি দেশ
৪৩.
বামপন্থীদের ভুল
৪৪.
বাঙালির বোরখা
৪৫.
শাড়ি ব্লাউজ
৪৬.
বিয়ের বয়স
৪৭.
সেইসব ঈদ
৪৮.
ন্যাড়া কি বেলতলা যায়
৪৯.
লতিফ সিদ্দিকী এবং মানুষের ধর্মানুভূতি
৫০.
বাকস্বাধীনতার অর্থ কি এতটাই কঠিন?
৫১.
কেন পারি না
৫২.
নাবালিকা ধর্ষণ
৫৩.
রেলমন্ত্রীর বয়স এবং বিয়ে
৫৪.
চুমু চুমু চুমু চুমু
৫৫.
এত ঘৃণা করে ওরা মেয়েদের!
৫৬.
সুমন চট্টোপাধ্যায় থেকে কবির সুমন
৫৭.
তারপর কী হলো
৫৮.
কিছু প্রশ্ন। কিছু উত্তর।
৫৯.
দূর থেকে হয় না
৬০.
আরীব মজিদরা জেলের বাইরে থাকলে আমরা অনেকেই নিরাপদ নই
৬১.
এতদিনে ভারতে সভ্য আইন
৬২.
বোয়াল মাছের গল্প
৬৩.
মেয়ে বলে ‘কম মানুষ’ নই
৬৪.
উপন্যাস : ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে
৬৫.
প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি ব্যক্তিগত চিঠি
৬৬.
ধর্মান্তরণ
৬৭.
গণধর্ষণ
৬৮.
নির্বাসিত একটি ছবির নাম
৬৯.
শার্লি আবদো
৭০.
কল্পনার রাজ্য
৭১.
কোকো, খালেদা আর দেশের দগ্ধ সন্তানেরা
৭২.
গরিবের গ্রেনেড
৭৩.
বাংলা একাডেমির অসভ্যতা
৭৪.
অভিজিৎকে যেভাবে চিনি
৭৫.
নারী দিবস
৭৬.
বাঘ আর বেড়াল
৭৭.
বাংলাদেশিদের দেশপ্রেম
৭৮.
বাক স্বাধীনতা
৭৯.
স্যানিটারি প্যাডে প্রতিবাদ
৮০.
বাংলাদেশের কী কী করা উচিত ছিল এবং ছিল না
৮১.
বাংলা সংস্কৃতি চলবে কী চলবে না
৮২.
ঢাকাও কমাতে পারে জ্যাম আর দূষণ
৮৩.
গ্যালিলিও এবং তার ‘জারজ মেয়ে’
৮৪.
লজ্জাহীনতা
৮৫.
প্রচলিত নারীবিদ্বেষী শব্দ ও প্রবাদ
৮৬.
নিজের গোলা শূন্য
৮৭.
শৃংখল ভেঙেছি আমি
৮৮.
দেশপ্রেম না থাকাও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার
৮৯.
ঢাকার বইমেলা ও একটি প্রেমের গল্প
৯০.
খুব কাছে ওত পেতে আছে আততায়ী
৯১.
নারী দিবস
৯২.
ভারত এবং গরু
৯৩.
আমার প্রথম সংসার
৯৪.
খাজুরাহোর অভিজ্ঞতা
৯৫.
চীনের অভিজ্ঞতা
৯৬.
আমার জন্য কথা বলার কেউ নেই…
৯৭.
সমাজ কি থেমে আছে?
৯৮.
পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ
৯৯.
কিছু প্রশ্ন, কিছু আশা
১০০.
এই বাংলাদেশ আমার অচেনা
১০১.
দেশের ভবিষ্যৎ
১০২.
রোজা রাখার স্বাধীনতা
১০৩.
চারদিকে প্রচুর ওমর মতিন
১০৪.
আমার চোখের জলের ঈদ
১০৫.
যদি পুরুষ হতাম
১০৬.
জাকির নায়েকের বাকস্বাধীনতা
১০৭.
কিছু সেলিব্রিটি মেয়ে তো ফাটাফাটি
১০৮.
বিরুদ্ধ স্রোত
১০৯.
মেয়েরা সেরা
১১০.
মেয়েদের কাপড় চোপড়
১১১.
মেয়েদের কাপড় চোপড়
১১২.
সত্য বললে বিপদ
১১৩.
আমরা আর তারা
১১৪.
এরা কি মানুষ!
১১৫.
লজ্জা বইটি এখনও নিষিদ্ধ কেন?
১১৬.
বায়ু দূষণ
১১৭.
সাঁওতালদের কথা
১১৮.
হাতে টাকা নেই
১১৯.
শিশুদের জন্য লোভের জিভ
১২০.
যৌনকর্ম নাম দিয়ে পতিতাবৃত্তিকে বৈধ করার ষড়যন্ত্র
১২১.
বুদ্ধিজীবী দিবস
১২২.
সন্ত্রাস কোনো সমস্যার সমাধান নয়
১২৩.
বাংলা একাডেমির হয়েছেটা কী
১২৪.
যে বই তোমায় দেখায় ভয়, সে বইও পড়া উচিত
১২৫.
পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন
১২৬.
দঙ্গলের মেয়ে
১২৭.
নিষিদ্ধের তো একটা সীমা আছে
১২৮.
ভারতে অসহিষ্ণুতা
১২৯.
মেয়েদের পোশাক নিয়ে লোকের এত মাথাব্যথা কেন?
১৩০.
ভ্যালেন্টাইন ডে’র ভাবনা
১৩১.
উদারতার চেয়ে মহান কিছু নেই
১৩২.
নারীবাদী হওয়া সহজ নয়
১৩৩.
নেপাল থেকে বলছি
১৩৪.
বাংলাদেশ বদলে গেছে
১৩৫.
কেন আত্মঘাতী বোমারু হতে ইচ্ছে করে
১৩৬.
অপুরা যেন হেরে না যায়
১৩৭.
শেখ হাসিনার জন্য দুশ্চিন্তা
১৩৮.
ওরা কেন আমাদের চেয়েও ভালো
১৩৯.
ধর্ষকদের পৃথিবীতে বেঁচে যে আছি, এই তো অনেক
১৪০.
চাই ধর্ষণহীন দিন
১৪১.
আমার গ্রিন কার্ড, আমেরিকার ট্রাম্প কার্ড

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%