সুদীপ দেব

মোহনপুর গ্রামে আজ বেজায় খুশির দিন। অনেকদিন পরে একটা ঘটনার মতো ঘটনা ঘটেছে। সরকারবাবুদের পুকুরে একটা কুমির দেখা গেছে। নিতাই প্রামানিক লোটা হাতে পুকুরপারে ভোরের কাজ সারতে এসে প্রথম দেখতে পায়। প্রথমে ভেবেছিল গোসাপ। পরে ভুল ভাঙে বিশাল দাঁতালো হাঁ দেখে। কুমিরটা শান-বাঁধানো ঘাটে উদাস হয়ে বসে ছিল। নিতাই পুকুর থেকে জল ভরার জন্য ঘাটের কাছে যেতেই নড়েচড়ে তারপর ওই হাঁ-টা দেখিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিল। নিতাই কুমির সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে আনন্দে আটখানা হয়ে ছুটতে ছুটতে এসে ভাঙা বটতলার পাশে দামুখুড়োকে পেয়ে তাকে ধরে নিয়ে চলল পুকুরপারে। কুমিরটা তখনও সেইভাবেই বসে।
তবে তার বোধহয় দামুখুড়োকে তেমন পছন্দ হয়নি, কারণ তারপর সেই যে নড়েচড়ে জলে ডুব মেরেছে—তারপর আর তার দেখা নেই।
কিন্তু মোহনপুরের ছেলে-বুড়ো সবার দেখা পাওয়া যাবে এখন এই সরকারবাবুদের পুকুরের পাশে।
অন্ধ কানাই প্যারোডি গান শুনিয়ে মোহনপুর হাটে ভিক্ষে করে, তার নতুন গান আজ বেশ হিট হয়েছে, “চোখের আলোয় দেখেছিলুম কুমিরছানারে, ভালো করে দেখব বলে এলুম পুকুরপারে।”
দেদার ভিক্ষেও জুটছে। পাঁচুর মা গান শুনে ভাবে গদগদ হয়ে চোখ মুছতে মুছতে একফালি কুমড়োই দিয়ে গেল কানাইয়ের ঝুলিতে।
মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে আচার আর মশলা বাদাম বিক্রি করে লটাই। জীবনবিজ্ঞানের মাস্টারমশাই জীবনানন্দবাবু প্রায় সব ছাত্রদের নিয়ে এক্সকারশানে চলে এসেছেন পুকুরপারে, তাই আজকের মতো স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। লটাইও তার ঝাঁকা নিয়ে চলে এসেছে এবং বিক্রিবাটাও বেশ তুঙ্গে উঠেছে।
তবে তাকে ছাপিয়ে গেছে পুনপুনের বোম্বাই মিঠাই। দশটাকাতে এমন সুন্দর একটা কুমির বানিয়ে দিচ্ছে পুনপুন, যে তার বোম্বাই মিঠাইয়ের গোল্লাটা প্রায় শেষ। এখন সে অগ্রিম বুকিং নিচ্ছে পাঁচটাকার বিনিময়ে। আজ বুক করে রাখলে কাল পাওয়া যাবে।
পুকুরপারে একটা খেজুর গাছের তলায় দামুখুড়োকে ঘিরে রয়েছে একটা বিশাল ভিড়। খুড়ো পায়ের ওপর পা তুলে কিং সাইজ বিড়ি ধরিয়ে বেশ তারিয়ে তারিয়ে কুমির দেখার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করছেন।
শুধু পুকুরের পশ্চিম পাড়ে যে বাঁশবাগানটা আছে তার ভেতর একটা ফাঁকামতো জায়গায় একা একা বসে আছে বুবুল। মোহনপুরে আসার পর এবং নতুন স্কুলেও এখনও তার কোনও নতুন বন্ধু হয়নি। বরাবরই সে একটু চুপচাপ স্বভাবের। চট করে সবার সঙ্গে মিশতে পারে না। তবু কলকাতার স্কুলে তার দু-জন প্রাণের বন্ধু ছিল। সেখানকার স্কুলের সাহেবি কেতার সঙ্গেও এখানকার সরকারি বাংলা স্কুলের বিস্তর অমিল। এত সব সত্ত্বেও বুবুলের কিন্তু একটুও মন খারাপ নয়। বরং সে বেশ খোশমেজাজেই আছে। এখানে পদে পদে তার পেছনে কেউ কিটকিট করছে না। সকাল-বিকেল নিয়ম করে মোট সাত ঘন্টা পড়া আর স্কুলের সময়টুকু বাদে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। যখন খুশি বেড়িয়ে পড়ছে। বাগানে ঘুরছে। পুকুরে সাঁতার কেটে স্নান করছে। সবই দারুণ। দাদুর কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে ছোটদের ছোটবেলা যেন কেড়ে না নেওয়া হয়। একটাই শুধু অসুবিধা, এখানে রাত ন-টায় শুয়ে পড়তে হয় আর ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠতে হয়। এ ব্যাপারেও দাদুর কড়া নির্দেশ জারি আছে।
অথচ দাদু কিন্তু অনেক রাত পর্যন্ত তাঁর ল্যাবরেটরির ঘরে আলো জ্বালিয়ে জেগে থাকেন। প্রথম কয়েকদিন তো অত তাড়াতাড়ি বুবুলের ঘুম পায়নি। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে পা টিপে টিপে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখানকার রাতও কলকাতার থেকে অনেক আলাদা। অনেক বেশি কালো আর নিস্তব্ধ। বেশ ভয়-ভয় লাগে। বুবুলের অবশ্য ভূতের ভয় নেই। সে জানে ভূত বলে কিচ্ছু হয় না। যদি হত তাহলে তো কবেই মা এসে দেখা দিত। মা মারা যাওয়ার আগে তাকে বলেছিল যখনই মন খারাপ করবে, মা-কে দেখতে ইচ্ছে করবে তখনই যেন চোখ বন্ধ করে সে মা-কে ডাকে। তাহলে মা যেখানেই থাকুক ঠিক এসে দেখা দেবে। এই তিন বছরে কতবার সে চোখ বন্ধ করে মা-কে ডেকেছে। একবারও তো কই মা আসেনি। তাই এখন বুবুল জেনে গেছে, ভূত বলে কিছু হয় না।
তবে দাদু নাকি ল্যাবরেটরিতে ভূত নিয়েই কী গবেষণা করছেন। নিতাইদাদা বলছিল। এই কারণেই বুবুলের আরও কৌতূহল দাদুর ওই ঘরটাকে নিয়ে। সারাদিন তো দাদু একবারও ল্যাবরেটরিতে ঢোকেন না! রাত্রিবেলা যখন চারিদিকে ঝিঁঝিঁপোকার ডাকে কান ঝালাপালা হয়ে যায়, তখন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে বুবুল দেখেছে মামারবাড়ির পুব দিকের ওই রহস্যময় ল্যাবরেটরিতে আলো জ্বলে ওঠে। সে আলো কখন নেভে তা অবশ্য এখনও দেখা হয়নি। কারণ কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর একঘেয়ে লাগে। আবার ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ে সে।
আজ এই কুমিরের ব্যাপারটায় বুবুল বেশ মজা পেয়েছে। গ্রামের লোকেদের স্বভাবই এই। কিছু একটা পেলেই সেটা নিয়ে সবাই মেতে ওঠে। নিতাইদাদা কি-জানি কী দেখতে কী দেখেছে। আর দামুদাদুর তো চোখে ছানি। বুবুল ক্লাস সেভেনে পড়ে। সে ভালোভাবেই জানে যে পুকুরে কখনও কুমির থাকতে পারে না। আর এই মোহনপুর গ্রামের ত্রিসীমানাতেও কোনও নদীটদী নেই, যে সেখান থেকে কুমির আসবে।
এই বাঁশবাগানটা ঠিক সেই গুপী গাইন বাঘা বাইন সিনেমার ভূতের রাজার বাঁশবাগানটার মতো। ওইরকম একটা ভূতের রাজা এলে বেশ হয়। তবে বাঘটাঘ না আসাই ভালো বাবা। সে তো এখনও ভূতের রাজার বর পায়নি যে গান গেয়ে বাঘকে থামিয়ে রাখতে পারবে।
বুবুল একা-একা বাঁশ বাগানে বসে এইসব চিন্তা করছে, খেয়ালই করেনি যে, চারপাশের কোলাহল থেমে গিয়ে কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। একটা কান ঝালাপালা করে দেওয়া ঝিঁঝিঁর ডাকের মতো আওয়াজে তার চটকা ভাঙল। চোখের সামনেটা কেমন জানি অন্ধকার অন্ধকার লাগছে। সন্ধে হয়ে এল নাকি রে বাবা! কতক্ষণ বসে আছে সে!
“সন্ধে হয়নি, সবে তো বিকেল চারটে।”
কে বলল কথাটা? কেমন মিহি যন্ত্রের মতো গলাটা। যেন কথা-বলা পুতুলের কণ্ঠস্বর।
“যদি অভয় দাও যে আমায় দেখে ভয় পাবে না, তাহলে তোমার সামনে আসতে পারি।”
“কে আপনি? আপনাকে দেখে ভয় পাব কেন?”
“কারণ আমার চেহারাটা এখন ঠিক মানুষের মতো নেই। কিন্তু আদপে আমি মানুষই বটে।”
“আপনি কি ভূত?”
“না, না। আমি তো দিব্যি বেঁচেবর্তে রয়েছি এখনও। ভূত হব কী করে?”
বুবুল বেশ লজ্জা পেয়ে বলল, “আপনি আমার সামনে আসতে পারেন। আমি ভয় পাব না, কথা দিচ্ছি।”
সামনের ঝোপের আড়াল থেকে হলুদ আর কালো ডোরাকাটা একটা অবয়ব দেখা গেল। তারপর বেরিয়ে এল ঠিক বাঘের মতো দেখতে একটা জন্তু। বাঘ যে নয়, তা বোঝা যাচ্ছে ওর আকার দেখে। বেড়ালের চেয়ে একটু বড় আকৃতির। অর্থাৎ বাঘের বাচ্চা হতে পারে। আর যা-ই হোক এর হাতে প্রাণ যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। তাই বুবুল সত্যি সত্যিই তেমন ভয় পেল না। তবে যারপরনাই অবাক হল।
“তুমিই ওরকম পুতুল-পুতুল গলায় মানুষের মতো কথা বলছিলে?”
“মানুষের মতো কী গো? আমি তো মানুষই। চেহারাটা এরকম হয়ে গেছে শুধু। তাও বরাবরের জন্য নয়।”
কলকাতায় থাকতে অনেক ইংরেজি সিনেমায় বুবুল দেখেছে অ্যানিমেশানে জীবজন্তুরা অবিকল মানুষের মতো কথা বলছে। এরকমটা যে বাস্তবেও হতে পারে তা সে জীবনেও ভাবেনি। সে স্বপ্ন দেখছে না তো? চারপাশের আলোটা এখনও সেইরকমই কম-কম লাগছে। মেঘ করে এল নাকি? আকাশটাও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না।
“বললাম না, সন্ধে হয়েও আসেনি। আকাশে মেঘ করেও আসেনি। তোমার চারপাশে পাঁচ ফুট বৃত্তাকার জায়গা জুড়ে আলোটা একটু কমিয়ে দিয়েছি।”
“তুমি কি মনের কথাও পড়তে পারো? আলোটা কমিয়ে দিয়েছ মানে?”
“হেঁহেঁ। এতে অবাক হওয়ার কী আছে? রেগুলেটার ঘুরিয়ে পাখা কমানো বাড়ানো দেখোনি? নাকি নব ঘুরিয়ে গ্যাস উনুনের আগুন কমাতে বাড়াতে দেখোনি। এটা অনেকটা সেরকমই ব্যাপার।”
“তা তোমার চেহারাটা এরকম হল কী করে?”
“সে অনেক কথা। সবটা তুমি ঠিক বুঝবেও না। এটুকু জেনে রাখো, সামনে তোমার দাদুর ঘোর বিপদ।”
“দাদুর বিপদ! কেন?”
“তোমার দাদু একটা দারুণ জিনিস আবিষ্কার করেছেন। কী সেটা এখনই বলতে পারব না। শোনো, এখন তুমি সোজা বাড়ি চলে যাও। তোমার দাদুকে দু-একদিন তোমরা কেউ খুঁজে পাবে না। উনি নিজেই একটা জায়গায় গা ঢাকা দিয়ে আছেন। এখনও বাড়িতে কেউ টের পায়নি এই কুমিরের হট্টগোলে। তবে টের পাওয়ার পরে সেটা যাতে গ্রামে না জানাজানি হয় সেই ব্যাবস্থা তোমায় করতে হবে।”
“আ-আমি কী করব?”
“সেটা তুমিই ভেবে বের কর। তোমার নাকি দারুণ বুদ্ধি। তোমার দাদুই তোমার ওপর এই কাজের ভারটা দিতে আমায় পাঠালেন।”
“তোমার নাম কী?”
“সেও বড্ড খটমট নাম গো। তুমি উচ্চারণ করতে পারবে না। তবে তুমি আমায় সেভেনটিন বলে ডাকতে পারো।”
“সেভেনটিন? এরকম কারও নাম হয় নাকি?”
“আমাদের ওখানে হয়। বললাম না, তুমি ঠিক বুঝবে না। তবে আমি দরকার হলে তোমার কাছে আসব। তোমার দাদু যতক্ষণ না ফেরেন।”
“তোমাদের ওখান মানে? তুমি কোথায় থাক?”
“আমি যেখানে থাকি তার নাম লিম্বাটু।”
“আচ্ছা একটা কথা বলবে? আজ আমাদের পুকুরে যে কুমিরটা দেখা গেল, তার সঙ্গেও কি দাদুর যোগাযোগ আছে?”
“তুমি সত্যিই খুব বুদ্ধিমান বুবুল।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন