প্রথম অধ্যায়

প্রচেত গুপ্ত

ঘটনাটা ঘটল বসন্তের এক দুপুরে। ঠিক টিফিনের পর। ফিফথ পিরিয়ড শুরু হবে। কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের মাস্টারমশাইরা তখনও ক্লাসে ঢোকেননি। টিচার্সরুম থেকে সবে চক-ডাস্টার হাতে নিয়ে বেরিয়েছেন। ক্লাসরুমগুলো থেকে ছেঁড়া-ছেঁড়া হইচই ভেসে আসছে। ঠিক হইচই নয়, হইচইয়ের মতো একটা ভাব। টিফিনের পর এরকম হয়। স্কুল পুরোপুরি শান্ত হতে সময় লাগে। ছেলেদের ছোটাছুটি, মারপিট, হাসি-মজা থেমে গেলেও তার রেশ আরও একটু থেকে যায়। মাস্টারমশাইরা ক্লাসে ঢুকলে আবার সব চুপচাপ।

সুশীলস্যার টিচার্সরুমে নিজের চেয়ারে সোজা হয়ে বসে আছেন। তাঁর মুখ কঠিন, চোখ স্থির। তিনি তাকিয়ে আছেন সামনের দেওয়ালের দিকে। দেওয়ালে একটা ক্যালেন্ডার। আট পাতার এই ক্যালেন্ডারের বিষয় ‘পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য’। এক-একটা পাতায় এক-একটা আশ্চর্য। এখন যে পাতাটা রয়েছে সেটায় পিরামিডের ছবি। ফ্যানের হাওয়ায় পিরামিড দুলছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে, সুশীল পাত্র ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে পিরামিডের দুলুনি দেখছেন। যদিও আসল ঘটনা তা নয়। ক্যালেন্ডার কেন, কোনও কিছু দেখার মতো মনের অবস্থাই সুশীলবাবুর এখন নেই।

এটা কী হল! নিজের কানে এ কী শুনলেন তিনি! যা শুনলেন তা কি সত্যি?

সুশীলকুমার পাত্র চন্দনপুর বয়েজ স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক। দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছর ছেলেদের পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি, পরিমিতি ত্রিকোণমিতি, ক্যালকুলাস শেখানোর মধ্যে আছেন। টানা সাঁইত্রিশ বছর অঙ্কের মধ্যে থাকা সহজ ব্যাপার নয়। এতে মনের ভিতর অনেক রকমের বিশ্বাস তৈরি হয়। সেই বিশ্বাস কখনও ঠিক, কখনও ভুল, কখনও আবার উদ্ভট। সেই সঙ্গে চরিত্রের উপরও প্রভাব পড়ে।

সুশীলবাবুর চরিত্রেও প্রভাব পড়েছে। এমনিতেই তিনি একজন রাগি শিক্ষক। এখন হয়ে উঠেছেন ভীষণ খিটখিটে আর ভয়ংকর বদমেজাজি। তাঁর অন্যতম হবি হল, কঠিন অঙ্ক দিয়ে ছেলেদের নাস্তানাবুদ করা। বদমেজাজি হওয়ার পর থেকে অঙ্কের সেই কঠিন ভাব তিনি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। স্বাভাবিক কারণেই ছাত্ররা সেই অঙ্ক আবার ভুল করে। তিনি আরও কঠিন অঙ্ক খুঁজে বের করেন। সমানুপাতের অঙ্কে ক্ষেত্রফল ঢুকিয়ে প্যাঁচ দেন। ক্ষেত্রফলের অঙ্কে কোণানুপাতের সমস্যা দিয়ে গোলমাল পাকিয়ে ফেলেন। ছেলেরা হাবুডুবু খায়। রাতে দুঃস্বপ্ন দ্যাখে, বড় বড় নখ-দাঁত নিয়ে তেড়ে আসছে পাটিগণিত।

মজার কথা হল, এখানেই থেমে যান না কাঞ্চনগড়ের অঙ্কস্যার। ছেলেদের এই কষ্টে তাঁর মন বিন্দুমাত্র নরম হয় না। তাঁর স্বভাবে দুর্বলতার কোনও জায়গা নেই। বইয়ের কঠিন অঙ্ক ফুরিয়ে গেলে, বাড়িতে রাত জেগে তিনি নিজেই অঙ্ক বানান। সেই প্রশ্ন দেখে ছেলেদের মাথা বনবন করে ঘুরতে থাকে।

সুশীলবাবু ক্লাস এইটের ক্লাসটিচার। তাদের দুঃখ সবচেয়ে বেশি। তিনতলার এক কোণে তাদের ক্লাসরুম। স্কুলের বাকি ঘরগুলো থেকে একটু দূরে। অন্যরা সাড়াশব্দ পায় না। সেই ঘরে সুশীলস্যার পায়চারি করেন আর গর্জন করেন।

“শোনো ছেলেরা, মন দিয়ে শোনো। অসুখ শক্ত হলে ওষুধও শক্ত হতে হবে। সামান্য সর্দি-কাশি-জ্বরের ওষুধ কি ম্যালেরিয়া সারাতে পারে হে? পারে না। তার জন্য লাগে কুইনাইন। কুইনাইন খেলে মাথা তো ঘুরবেই বাছাধন! তোমাদেরও তাই হয়েছে, শক্ত অঙ্কে মাথা ঘুরছে।”

ঘন রাগ, তিরিক্ষি মেজাজ আর প্রচণ্ড বিরক্তিতে সরু গোঁফ, লম্বা নাক, মোটা ভুরুর ফিনফিনে চেহারার মানুষটির গলা হয়ে গিয়েছে বাঁজখাই এবং খ্যাসখ্যাসে। প্রথম দিকে কিন্তু এরকম ছিল না। স্কুলে যোগ দেওয়ার প্রথম বছরের বার্ষিক অনুষ্ঠানে তিনি মঞ্চে উঠে আবৃত্তি পর্যন্ত করেছেন, ‘হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগোরে ধীরে…’। সুন্দর গলা। চমৎকার উচ্চারণ। নতুন স্যারের আবৃত্তি শুনে ছেলেরা হাততালি দিয়েছিল প্রচুর। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, যত দিন যাচ্ছে, মানুষটির গলার স্বর খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ছাত্রদের অঙ্ক দিয়ে নাস্তানাবুদ করার সঙ্গে গলার কোনও সম্পর্ক আছে কি না জানা যায়নি। তবে এখন উনি কথা বললেই মনে হয়, ধমক দিচ্ছেন। সে ক্লাসেই হোক আর বাজারে ঝিঙে-পটল কিনতে গেলেই হোক। বাড়িতেও এই নিয়ে অশান্তি আছে। সুশীলবাবুর স্ত্রী নমিতাদেবী স্বামীর এই আচরণ একেবারেই বরদাস্ত করেন না। তিনি বিরক্ত হন।

“ধমক দিচ্ছ কেন?”

সুশীলবাবু অবাক হয়ে বললেন, “ধমক! ধমক কোথায় দিলাম? আমি তো ভাত চাইলাম। স্কুলের টাইম হয়ে গিয়েছে, তাই ভাত চাইলাম।”

নমিতাদেবী বললেন, “ভাত কি শান্ত গলায় চাওয়া যায় না?”

সুশীলবাবু খ্যাসখ্যাসে গলায় বললেন, “আমার গলাটাই তো এরকম, আমি কী করব?”

নমিতাদেবী বিরক্ত হয়ে বললেন, “তুমি কিছু করবে না, সকলকে শুধু ধমক দিয়ে বেড়াবে!”

“আমি তো আর গলা বদলাতে পারি না।” সুশীলবাবুও গজগজ করে উঠলেন।

নমিতাদেবী ভাত বাড়তে বাড়তে বললেন, “কেন পার না? অবশ্যই পারো। রাগ আর খিটখিটে মেজাজটা কমাও, দেখবে গলাটাও নরম হয়ে গিয়েছে। সবচেয়ে ভাল হয়, যদি ক’টাদিন অঙ্ক থেকে সরে থাকো। তাতে তোমার রাগও কমবে। মাথা ঠান্ডা হবে। সারাদিন অঙ্কের প্যাঁচ নিয়ে পরে থাকলে শুধু গলা কেন, শরীরটাও ধীরে ধীরে পাকিয়ে যাবে।”

সুশীলবাবু ধমক দেওয়া গলায় বললেন, “ঠিক আছে, অনেক হয়েছে। এবার থামো দেখি! এইটের ছেলেদের আজ একটা টেস্ট নেব ভেবেছি। বড় কিছু নয়, ছোট টেস্ট। ছেলেদের মাঝেমধ্যে পরীক্ষা না নিলে তাদের ভয় কেটে যাবে। এটা ঠিক নয়। ভয় না থাকলে আর সবকিছু চলে, ম্যাথমেটিক্স চলে না। আজ ভোরের দিকে দু’টো মারাত্মক কোয়েশ্চেন মাথায় এসেছে নমিতা। একটাতে আবার ক্যালকুলাসের একটু টাচ আছে। ক্লাস এইটের ছেলেরা ক্যালকুলাস জানে না। তারা সেই অঙ্ক দেখে মাথার চুল ছিঁড়বে।”

নমিতাদেবী বুঝতে পারেন, এই মানুষটিকে মাথা ঠান্ডা করতে বলার কোনও মানে হয় না। তিনি চুপ করে যান।

এর পর বিশ্বাসের কথা। সম্প্রতি কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের অঙ্কস্যারের মনে এক উদ্ভট বিশ্বাসের জন্ম হয়েছে। তাঁর মনে হচ্ছে, জগতে অঙ্ক ছাড়া বাকি সবকিছুরই দাম শূন্য। এমনি শূন্য নয়, একেবারে মহাশূন্য। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘বিগ জিরো’। সুতরাং স্কুলের আটটা পিরিয়ডের মধ্যে পাঁচটা পিরিয়ড শুধু অঙ্কের জন্যই বরাদ্দ থাকা দরকার। পারলে ছ’টা। বাকি দু’টোর একটায় পরিবেশ, অন্যটায় স্বাস্থ্য। কবিতা, গল্প, ব্যাকরণ, ইতিহাস, ভূগোল, ড্রয়িং-এর কোনও দরকার নেই। এতে ছেলেদের অঙ্কের প্রতি ভীতি তৈরি হবে। সেই ভয় থেকে তৈরি হবে এক পাকাপোক্ত শৃঙ্খলাবোধও। ছাত্রজীবনে শৃঙ্খলাই আসল, বাকি সব নকল, সব অর্থহীন।

এই বিশ্বাস সুশীল পাত্র নিজের মনে লুকিয়ে রাখেননি। স্কুলের হেডমাস্টারমশাই শশাঙ্কশেখর ধরের কাছে মুখ ফুটে বলে ফেলেছেন। স্কুলের অন্য শিক্ষকরা তাঁদের এই সহকর্মীর প্রতি মোটেই খুশি নন। পছন্দ তো করেনই না, উলটে বদমেজাজের কারণে ভয়ে এড়িয়েই চলেন। তাঁরা মনে করেন এই খিটখিটে স্বভাবের মানুষটির সঙ্গে যত কম কথা বলা যায় তত মঙ্গল। আড়ালে হাসাহাসি চলে। সুশীলবাবুও এঁদের মোটেই পাত্তা দেন না। তিনি একাই অঙ্কের প্যাঁচপয়জারে ডুবে থাকতে ভালবাসেন। ব্যতিক্রম শুধু হেডমাস্টারমশাই শশাঙ্কশেখর ধর। অঙ্কস্যারের প্রতি তাঁর একটা প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি আছে। তাঁর অঙ্ক পাগলামি মাঝেমধ্যে তিনি বেশ উপভোগই করেন। তা ছাড়া উনি এই স্কুলের একজন সিনিয়র টিচার। অবসরের বাকি রয়েছে মাত্র ক’টা বছর। এত বছর যখন জ্বালাতন সহ্য করা গিয়েছে, আর ক’টা দিন চুপ করে থাকতে ক্ষতি কী? তবে তিন নম্বর এবং সবচেয়ে বড় কারণ হল, এই মুহূর্তে কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলে দ্বিতীয় কোনও অঙ্কশিক্ষক নেই। শিক্ষা বিভাগে জানানো হয়েছে, এখনও উত্তর আসেনি। ফলে সবেধন নীলমণি অঙ্কশিক্ষকটিকে খুব একটা চটাতে চান না তিনি। মানুষটা যতই বদমেজাজি আর খ্যাসখ্যাসে গলায় সকলকে ধমক দিন না কেন!

সব ক্লাস অঙ্কের করতে হবে শুনে শশাঙ্কশেখরবাবু মুচকি হেসে বললেন, “প্রস্তাবটা খারাপ নয়, তবে সমস্যা হল, এত শিক্ষক পাব কোথায়? ছ’টা করে পিরিয়ড বলছেন, এদিকে স্কুলে অঙ্কশিক্ষক তো মোটে একজন, আপনি।”

সুশীল পাত্র বাঁজখাই গলায় বললেন, “সে চিন্তা আমার। শিক্ষকের কোনও অসুবিধা হবে না। বাংলা, ইংরেজি, ভূগোল, ইতিহাস আর ড্রয়িংটিচারদের আমি নিজে অঙ্ক শিক্ষার ট্রেনিং দিয়ে দেব। চিকিৎসার জন্য আছে সংক্ষিপ্ত প্যারামেডিকেল কোর্স, তেমনই এটা হবে প্যারাম্যাথমেটিক্স কোর্স। শনিবার হাফ ছুটির পর স্কুলেই ব্যবস্থা করা যাবে। স্টুডেন্টদের বয়স বেশি হওয়ার কারণে সময় একটু বেশি লাগবে এই যা! আপনি বোধহয় জানেন শশাঙ্কবাবু, বয়স বেশি হয়ে গেলে বুদ্ধি শক্ত হয়ে যায়!”

শশাঙ্কশেখরবাবুর পেট থেকে হাসি উঠে এল। তিনি চোয়ালেই সেই হাসি আটকে দিলেন। সিরিয়াস মুখ করে বললেন, “আইডিয়াটা মন্দ নয়। মনে হচ্ছে, মাস্টারমশাইরা সকলেই রাজিও হয়ে যাবেন। এই বয়সে নতুন করে অঙ্ক শেখা একটা অ্যাডভেঞ্চারের মতো হবে। আপনি বরং একটা কাজ করুন সুশীলবাবু, পরিকল্পনাটা আরও ডিটেলসে তৈরি করে ফেলুন। ওই যে কোর্সটা, কী যেন নাম বললেন, প্যারাসুট না কী যেন?”

সুশীল পাত্র ভুরু কুঁচকে বললেন, “প্যারাসুট নয়, প্যারাম্যাথমেটিক্স। বাংলায় বলা যেতে পারে ‘প্রায়-অঙ্ক’।”

“বাঃ, তা ওই প্রায়-অঙ্কের সিলেবাসটা কেমন হবে? পরীক্ষা থাকলে ক’টা থাকবে, একটা নাকি দু’টো? রেজাল্টে নম্বর থাকবে, নাকি শুধু গ্রেডেশন? এই সব আপনি তৈরি করে ফেলুন দেখি! তারপর সবটা পাঠিয়ে দিন স্কুল সিলেবাস কমিটির কাছে। শুধু কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলে এটা চালু করলেই হবে না, সব স্কুলে যাতে চালু হয় সেটাও দেখতে হবে, তাই না?”

গোটা লেখাপড়াটাই অঙ্কময় করে তোলার আলোচনা যে এত গুরুত্বপূর্ণ হবে সুশীলবাবু আশা করেননি। তিনি খুশি হলেন। গমগমে গলায় বললেন, “দেখুন শশাঙ্কবাবু, আমার রিটায়ারমেন্টের খুব বেশি দিন আর বাকি নেই। তার আগে এটা যদি চালু করে দিতে পারি, তা হলে শান্তি পেতাম।”

হেডমাস্টারমশাই কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, “আপনি চিন্তা করবেন না। মনে হয় সিলেবাস কমিটি আপনার আপনার প্রস্তাব মেনে নেবে। তবে একটা কথা বলি সুশীলবাবু, এসব এখনই স্কুলের অন্য টিচারদের বলতে যাবেন না। সকলেই তো আমার মতো নয়, বিষয়ের গুরুত্ব বুঝতে পারবেন না। হাসি-ঠাট্টা করবেন। চটেও যেতে পারেন। এই বয়সে অ্যারিতমেটিক্স, অ্যালজেব্রা শেখার কথা শুনলে চটে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।”

অঙ্কস্যার মুখ দিয়ে ‘ফোঁস’ ধরনের একটা আওয়াজ করলেন। রাগের আওয়াজ। বললেন, “আপনি বোধহয় ভুলে গিয়েছেন, যাঁরা অঙ্ক জানেন না তাঁদের সঙ্গে অকারণ কথা বলে আমি সময় নষ্ট করা পছন্দ করি না। আপনার সঙ্গেও করতাম না। নেহাত হেড অফ দ্য ইনস্টিটিউশন বলে করলাম।”

এই সুশীলপাত্র আজ ক্লাস না নিয়ে টিচার্স রুমে বসে আছেন। তাঁর সামনে খাতার পাহাড়। হাই ইয়ারলি পরীক্ষার অঙ্কখাতা। কালই খাতা জমা দেওয়ার শেষ দিন। আজ তিনি একটানা খাতা দেখছেন। কাজ প্রায় শেষ। টিফিনেও মুখ তুলতে পারেননি সুশীলপাত্র। খাতায় চোখ রেখেই দু’টো টোস্ট আর-একটা ডিম সেদ্ধ খেয়েছেন। তারপর চা। না দেখে কাপ তুলতে গিয়ে একবার তো কাপ উলটেই ফেললেন। তবে কাপের আর দোষ কী, উলটোবেই তো! যথারীতি এবারও খাতার অবস্থা শোচনীয়। প্রশ্ন না হয় এবার বেশি কঠিনই করেছিলেন, তা বলে এতটা খারাপ হবে? ক্লাস এইটে হাইয়েস্ট নম্বর উঠেছে তেরো। ওনলি থার্টিন! অন্য ক্লাসগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। এই অবস্থায় চায়ের কাপ ওলটানো কী আর এমন ব্যাপার? তবে সুশীল পাত্র খুশি। ছেলেরা অঙ্ক না পারলে তিনি খুশিই হন। তাদের ব্যর্থতা মানে তাঁর সাফল্য।

খাতা দেখার ঠিক শেষ মুহূর্তে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটল!

হাতের লাল কালির কলমটা টেবিলের উপর দু’বার ঠুকলেন সুশীল পাত্র। পাশে পড়ে থাকা ভাঙা চকটা গড়িয়ে দিলেন সামনে। তারপর মুখের কাছে ডান হাতটা মুঠো করে কাশতে চেষ্টা করলেন। কাশিটা ঠিকমতো হল না। জোর করে হাঁচি-কাশির এই এক অসুবিধে। কিছুতেই ঠিকমতো হয় না। বাধ্য হয়ে গলাখাঁকারি দিলেন। তাকালেন চারপাশে। কেউ কি শুনতে পেল? না, টিচার্সরুমে শিক্ষকরা কেউ নেই। এটা একটা বাঁচোয়া। তার মানে কেউ শুনতে পাননি, তিনি নিজেই শুধু শুনেছেন। কিন্তু সত্যি কি শুনেছেন? সত্যি কি তাঁর গলা থেকে…? এ কখনও হতে পারে? অসম্ভব, কখনও হতে পারে না। ভুল শুনেছেন। নিশ্চয়ই ভুল শুনেছেন। ভুলে ভরা অঙ্কের ভিতর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকলে ভুল শোনাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এরপর হয়তো তিনি ভুল দেখবেনও।

সুশীলবাবু ঠিক করলেন নিজের ভুল নিজেই শুধরোবেন। তিনি ছেলেমানুষ নন। এই বয়সের একজন মানুষ এরকম ভুল একটা ধারণা নিয়ে বসে থাকতে পারে না। খানিক আগে তিনি স্কুলের পিয়ন নবলালকে একগ্লাস জল দিতে ডেকেছিলেন, ঘটনাটা ঘটেছে তখনই। সুতরাং আবার নবলালকে ডাকতে হবে। দেখতে হবে একই জিনিস হয় কি না।

সুশীল পাত্র রেগেমেগে বাজখাঁই গলায় হাঁক দিলেন, “নব, অ্যাই নব, নবলাল, কখন থেকে ডাকছি, কথা কানে যাচ্ছে না?”

কথা আদ্দেকটা বের হল। নিজের গলায়, “নব, অ্যাই নব, নবলাল, কখন থেকে ডাকছি...” পর্যন্ত শুনতে পেলেন সুশীলবাবু। ব্যস এইটুকু। এখানেই তাঁর নিজের গলা শেষ। বাকিটুকু শোনা গেল শুধু কোকিলের ডাক! একবার ডাক নয়, পর পর তিনবার ডাক!

‘কুহু, কুহু, কুহু।’

যতটা বাজখাঁই গলায় হাঁক দিয়েছিলেন সুশীল পাত্র, গলা থেকে বেরিয়ে আসা কোকিলের ডাক ততটাই সুরেলা! সুরেলা আর তীক্ষ্ণ!

কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ অঙ্কস্যারের মনে হল, পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠছে। তাঁর ভয় করে উঠল, ভীষণ ভয়। এ কী কাণ্ড! মানুষের গলায় কোকিলের ডাক!

টিচার্সরুমে চেয়ারগুলো বিচ্ছিরি। পিঠ দিলে যেন শক্ত কাঠের খোঁচা লাগে। ভয়ের প্রথম ধাক্কাটা সামলে সুশীল পাত্র তবু চেয়ারে হেলান দিলেন, পিঠে খোঁচা লাগলেও দিলেন। উপায় নেই, মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন এখনই। শক্ত করে চেপে ধরলেন হাত দু’টো। বুকের ভিতর ধড়াস ধড়াস করছে। শিরদাঁড়ার উপর দিয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে গেল। ডান পায়ের হাঁটুটা কাঁপছে নাকি? নবলাল কখন ঘরে ঢুকে সামনে জলের গ্লাস রেখে গিয়েছে, দেখতে পাননি। কোনওরকমে হাত বাড়িয়ে সেই গ্লাস তুলে লম্বা চুমুক দিলেন। হাত দু’টোও ভারী ভারী ঠেকছে। মানুষ ঘাবড়ে গেলে কি শরীর ভারী লাগে?

সুশীলবাবু মনে মনে বললেন, অসম্ভব। নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। ছোটখাটো মাথা খারাপ নয়, বড় ধরনের মাথা খারাপ। মাথা খারাপ হলে মানুষ অনেক অদ্ভুত আচরণ করে, ভয়ংকর ভয়ংকর সব ভুলে দেখে, ভুল শোনে। যা সত্যি নয়, সেটাকে খুব সত্যি বলে মনে হয়। কিন্তু নিজের গলায় কোকিলের ডাক শুনতে পায় কি? কই, এরকম তো কখনও শোনা যায়নি! পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করতে ভুলে গেলেন সুশীল পাত্র। জামার হাতা দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন। চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে এলে কেমন হয়? জলের ঝাপটায় অনেক সময় কাজ দেয়। মাথা ঠান্ডা হয়, গুলিয়ে যাওয়া বুদ্ধি-বিবেচনা কাজ করতে শুরু করে। টেবিল ধরে সাবধানে উঠে দাঁড়ালেন অঙ্কস্যার।

টিচার্সরুম লাগোয়া ছোট বাথরুম। বেসিনের উপর আয়না। চশমাটা খুলে সুশীলবাবু সেই আয়নার দিকে তাকালেন। না, চোখে-মুখে অসুখের কোনও ছাপ নেই। লম্বা নাক, সরু গোঁফ, মোটা ভুরু। চোখদু’টো লাল পর্যন্ত হয়নি। যে-কোনও অসুখের প্রথম লক্ষণ হল চোখ লাল। তা হলে?

সত্যি-সত্যি বারকয়েক জলের ঝাপটা দেওয়ার পর যেন খানিকটা যুক্তি-বুদ্ধি ফিরে এল। আচ্ছা, প্রথমবারের মতো দ্বিতীয়বারও ভুল শোনেননি তো? হতে পারে। মানুষ কি একই ভুল দু’বার করে না? এই তো পরীক্ষার খাতায় ক্লাস এইটের দীপায়ন বৃত্তের অঙ্কটা সাতবার করেছে, সাতবারই ভুল। ছোটদের যদি সাতবার ভুল হতে পারে, বড়দের মাত্র দু’বার ভুল হতে অসুবিধে কোথায়? কোনও অসুবিধে নেই। সবচেয়ে ভাল হত আরও একজনকে নিজের গলাটা শোনাতে পারলে। নবলালকে শোনালে কেমন হয়? কী বলবেন?

“নবলাল, দ্যাখ তো আমার গলাটা মানুষের মতো কি না?”

অবশ্য কিছু না বললেও চলে, এমনই সাধারণ দু’টো-চারটে কথার পরই বোঝা যাবে। তবে এতে ঝুঁকি আছে। সত্যি যদি কথার মাঝখানে আবার কোকিলের ডাক বেরিয়ে আসে? বাপরে! সে এক কেলেঙ্কারি! নিমেষের মধ্যে স্কুলে খবর ছড়িয়ে পড়বে। শুধু স্কুল কেন? গোটা কাঞ্চনগড়ে জানাজানি হয়ে যাবে। তখন?

তখন কী হবে সুশীলবাবু কল্পনাও করতে পারছেন না। মানুষের গলায় পাখির ডাক শোনা গেলে কী হয়, এতদূর কল্পনা করবার ক্ষমতা তাঁর নেই। তবে তিনি এইটুকু বুঝতে পারছেন, মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে হবে। জটিল অঙ্ক কষবার মতো মাথা ঠান্ডা দরকার। পরীক্ষানিরীক্ষা যা করার করতে হবে গোপনে। সেইমতো বাথরুমে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটা একবার ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। দরজার ছিটকিনিটা তুলে দিলেন সাবধানে। বেসিনের কলটা খুলে দিলেন পুরো। যাতে বাইরে কেউ কিছু শুনতে না পায়। তারপর ফিসফিস করে শুরু করলেন তেষট্টির নামতা।

“তেষট্টি এক্কে তেষট্টি, তেষট্টি দু’গুণে একশো ছাব্বিশ, তিন তেষট্টি একশো উননব্বই, চার তেষট্টি কুহু, পাঁচ তেষট্টি কুহু, কুহু, ছয় তেষট্টি কুহু কুহু কুহু, সাত তেষট্টি চারশো একচল্লিশ, আট তেষট্টি পাঁচশো চার, ন’ তেষট্টি কুহু কুহু…।”

যে মানুষটিকে দেখলে স্কুলসুদ্ধু ছেলের মুখ ভয়ে আমসি হয়ে যায়, তাঁর মুখটাই এখন হয়ে গিয়েছে ফ্যাকাশে। রক্তশূন্য। এত ভয় তিনি জীবনে কখনও পাননি। ঘটনা তা হলে সত্যি? সত্যি তাঁর গলা থেকে কোকিলের ডাক বের হচ্ছে!

সুশীলবাবু আবার পরীক্ষা চালালেন। শেষবারের মতো পরীক্ষা। গলা সামান্য তুলে, আয়নার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, “আমাদের ছোট নদী, চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে/পার হয়ে যায় গোরু কুহু/পার হয় গাড়ি কুহু কুহু…।”

না, আর সন্দেহ নেই, ঘটনা একশো শতাংশ সত্যি। কাঞ্চনগড় বয়েজ স্কুলের ডাকসাইটে রাগি খ্যাসখ্যাসে গলার অঙ্কের শিক্ষক সুশীল পাত্র এখন পাখির মতো ডাকছেন! এমনই পাখি নয়, একেবারে চমৎকার গলায় কোকিলপাখি! কাঁপা হাতে বাথরুমের দরজা খুলতে খুলতে সুশীলবাবুর মনে হল, এই বিপদের মধ্যে একটাই আশার কথা। সবটাই পাখির গলা নয়, কিছু কিছু কথা এখনও মানুষের মতো বলতে পারছেন। এই ক্ষমতাও কি তিনি ধীরে ধীরে হারাবেন? পুরোটাই কোকিল হয়ে ‘কু কু’ করবেন? উফ, কী ভয়ংকর! কী মারাত্মক!

দরজা খুলে বেরোতেই সুশীলবাবু দেখলেন, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নবলাল। তার চোখে-মুখে উদ্‌বেগ, “স্যার, আপনার কি শরীর খারাপ? বাথরুমের দরজা এতক্ষণ বন্ধ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”

চোখে-মুখে স্বাভাবিক থাকবার চেষ্টা করলেন সুশীলবাবু। নবলালের দিকে তাকিয়ে শুকনো হাসলেন। হেসেই বুঝতে পারলেন, কাজটা ঠিক হল না। তিনি একজন গম্ভীর মুখের মানুষ। হাসি তাঁর মুখে স্বাভাবিক জিনিস নয়। এতে সন্দেহ কমবে না, বাড়বে। ফলে দ্রুত মুখ গম্ভীর করে টেবিলে ছড়ানো খাতাগুলো গোছাতে শুরু করলেন। সেইসঙ্গে ভাবতে লাগলেন, এই মুহূর্তে কর্তব্য কী? আগে স্কুল ছেড়ে বাড়ি চলে যেতে হবে। কেউ কিছু জানবার আগেই পালাতে হবে। বাড়ি বসে শান্ত মাথায় ভাবতে হবে।

নবলাল আবার প্রশ্ন করল, “স্যার, শরীর ঠিক আছে তো? চোখ-মুখ কেমন বসা বসা মনে হচ্ছে!”

নবলাল চিরকালই বেশি কথা বলে। তাকে ধমক দিয়ে থামাতে হয়। সুশীলবাবুর মনে হচ্ছে, আজ কথা আরও বেশি বলছে। কথার মধ্যে আবার হাজারটা প্রশ্ন। ‘চোপ’ বলে কষে একটা ধমক দিলে চুপ করে যাবে। দেবেন? থাক, দরকার নেই। ঝুঁকির কাজ হয়ে যাবে। তা ছাড়া চেঁচিয়ে কথা তো একেবারেই নয়। যেটুকু কথা না বললেই নয়, সেটাও বলতে হবে আস্তে, গলা নামিয়ে। গলা থেকে পশু-পাখি যারই ডাক বেরোক না কেন, সেই ডাক ঠিকমতো যেন শোনা না যায়।

খাতা গোছানো হয়ে গেলে এক টুকরো কাগজে লাল ডটপেনটা দিয়েই খসখস করে কয়েকটি লাইন লিখলেন সুশীলবাবু। হেডমাস্টারমশাইকে চিঠি, ‘খাতা দেখা শেষ। ভেবেছিলাম নম্বরগুলো আলাদা কাগজে টুকে জমা দেব, কিন্তু শরীর খারাপ লাগছে বলে সেটা পারছি না। কাজটা অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নেবেন। মনে হচ্ছে, প্রেশারের সমস্যা। তবে হাই না লো প্রেশার বোঝা যাচ্ছে না। আমি বাড়ি চললাম। ইতি সুশীল পাত্র।’

চিঠি ভাঁজ করে সুশীলবাবু উপরে লিখলেন, ‘আর্জেন্ট।’ তারপর এগিয়ে দিলেন নবলালের দিকে।

নবলাল চিঠি নিয়ে বলল, “হেডস্যারকে দেব তো?”

সুশীলবাবু মাথা নাড়ালেন। নবলাল চলে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। একগাল হেসে বলল, “স্যার, একটু আগে একটা মজার কাণ্ড হয়েছে। বলব?”

সুশীলবাবু টেবিল থেকে নিজের ব্যাগ আর ছাতাটা তুলতে তুলতে ভুরু কুঁচকে তাকালেন।

নবলাল হাসি হাসি মুখেই বলল, “খানিক আগে আপনি যখন আমাকে ডাক দিলেন স্যার, তখন মনে হল, কোথায় যেন কোকিল ডাকে! খুব জোরে ডাকে। এক্কেবারে কাছে। যেন এই ঘরের ভিতরেই! বোঝেন কাণ্ড স্যার! আমি তো ঘাবড়ে গিয়েছি, টিচার্সরুমে কোকিল ঢুকল নাকি! মানুষের ঘরে চড়ুই-শালিখ ঢোকে, কোকিল ঢোকে বলে তো কখনও শুনিনি। তাড়াতাড়ি এসে দেখি, না সেরকম কিছু নয়। আমিই ভুল শুনেছি।”

নবলালের হাসির মাঝখানেই অঙ্কস্যার ব্যাগ আর ছাতা হাতে থমথমে মুখে টিচার্সরুম থেকে বেরিয়ে পড়লেন। তা হলে নবলালও শুনেছে? যাক, বিপদ সম্পর্কে আর কোনও সন্দেহ রইল না।

সুশীল পাত্র স্কুল থেকে বেরিয়ে ছাতা না খুলেই কড়া রোদের মধ্যে হাঁটতে শুরু করলেন। মানুষ যখন বড় ধরনের বিপদের মধ্যে পড়ে তখন রোদ-বৃষ্টি খেয়াল থাকে না।

সুশীল পাত্র খুব ভাল করেই বুঝতে পারছেন, তিনি একটা বড় ধরনের বিপদের মধ্যে পড়েছেন।

অধ্যায় ১ / ৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%