প্রথম অধ্যায়

সোমজা দাস

দুপুরের পর থেকেই আকাশের মুখ গোমড়া ছিল৷ চৈত্রের দুপুরের পিচগলা রোদ্দুর হঠাৎই তার তীব্রতা হারিয়ে ধূসর চাদরে মুখ ঢেকেছিল কে জানি কী অভিমানে৷ দেওয়াল ঘড়ির কাঁটা এখন সন্ধে ছ’টা পেরিয়েছে৷ পার্টির প্রধান কার্যালয়ের তিন তলার কাচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে রাস্তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে ছিলেন অমিয় চক্রবর্তী৷ ক’দিন থেকে মন বড়ো অস্থির অমিয়বাবুর৷ সারাজীবনে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা তিনি অতিক্রম করেছেন, অনেক লড়াই লড়েছেন৷ আজ তিনি যেখানে আছেন, সেখানে সকলে পৌঁছোতে পারে না৷ এর জন্য অনেক ত্যাগ দরকার, দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা দরকার৷ সুদীর্ঘকাল বিরোধী দলে থেকে নেতৃত্ব দিতে হলে শক্ত স্নায়ুর প্রয়োজন৷ রাজনীতির পথ সহজ নয়৷ ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পুণ্যের স্রোতে মন টালমাটাল হলে মনকে চোখ পাকিয়ে শাসন করতে হয়৷ দুর্বলতার কোনো জায়গা নেই এখানে৷ কত বার ক্ষমতাসীন দল থেকে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদের প্রস্তাব দিয়ে আমন্ত্রণ করা হয়েছে৷ কিন্তু তিনি যাননি৷ কারণ শুরু থেকে তিনি খুব স্পষ্টভাবে জানতেন তিনি আসলে কী চান৷ এই দলকে টিকিয়ে রাখার জন্য, খারাপ সময়ে দলীয় কর্মীদের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য কী-ই না করেছেন তিনি?

আজ তাঁর সারাজীবনের স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে৷ পথটা সহজ ছিল না৷ ঘরে-বাইরে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাত দিতে হয়েছে৷ এতদিনের পরিশ্রমের ফল তিনি পেয়েছেন৷ সুদীর্ঘ আঠাশ বছর ধরে যে লড়াই তিনি লড়ে এসেছেন, আজ তা সফল৷ বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে তাঁর দল৷ মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল৷ তিনি মানুষকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাতে পেরেছেন৷ তিনি দক্ষ রাজনীতিক, জানেন দিনের শেষে স্বপ্নই জিতে যায়৷ স্বপ্ন পূরণের আশা হয়তো রাখে মানুষ, শর্ত রাখে না কেউ৷ অমিয়বাবু রাজ্যবাসীর কাছে সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে এসেছিলেন৷

কাল তাঁর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান, রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন অমিয় চক্রবর্তী৷ তিনি চেয়েছিলেন তাঁর নিজের লড়াইটা জিততে৷ আজ তিনি জয়ী৷ রাজ্যবাসী খুশি, দলীয় কর্মীরা খুশি৷ কিন্তু তবু অমিয়বাবু খুশি হতে পারছেন না কেন? কেন তাঁর মনে হচ্ছে, কোথাও যেন তাল কেটে গেছে? তাঁর ভাগ্য যেন আজ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে অট্টহাসি হাসছে৷ যে অতীতকে কবরে পুরে এত বছর নিশ্চিন্ত ছিলেন, সেই অন্ধকার অতীত আজ তাঁর ও তাঁর সাফল্যের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে৷ অথচ এ-রকম হওয়ার তো কথা ছিল না৷

সেই যৌবনে যখন রাজনীতিতে দীক্ষা নিয়েছিলেন অমিয় চক্রবর্তী, সেই সময় তাঁর গুরু রথীন ঘোষ বলেছিলেন, ‘আর যাই করো বাপু, কাউকে বিশ্বাস করবে না৷ রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করা চলবে না৷’ সেই নীতিই তো তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসছিলেন এত বছর ধরে৷ এত দলীয় কর্মীদের সঙ্গে এত বছর ওঠ-বস করেছেন, তাদের চালনা করেছেন, কিন্তু বিশ্বাস কাউকে করেননি৷ অবশ্য সেটা বুঝতেও দেননি কাউকে৷ নেতা হিসেবে তিনি সফল৷ তাই আজ এতটা পথ পার করে এসে আর ভুলের অবকাশ নেই৷ বিশ্বাস তিনি করেন না কাউকে করবেনও না৷ তিনি জানেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে এই ভুলের চরম মূল্য চোকাতে হবে তাঁকে৷ আর ফেরবার উপায় নেই তাঁর৷ একটা দীর্ঘশ্বাস তাঁর বুক ঠেলে বেরিয়ে এল৷ চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল৷

বড়ো সেক্রেটারিয়েট টেবিলে এসে বসলেন তিনি৷ আজ তিনি অফিসের সকলকে ছুটি দিয়েছেন৷ আজ শেষবারের মতো এই অফিসে তিনি একা কাটাতে চান৷ দুই যুগের অনেক বেশি সময় ধরে এই ঘর, এই টেবিল তাঁর সাম্রাজ্য৷ এখানে বসেই কত মিটিং করেছেন তিনি, কত কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন৷ এই ঘরের সঙ্গে কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তাঁর৷ এই ঘরেই তো...! কাল থেকে তাঁর নতুন অফিস হবে, যে অফিসে একদিন মাথা উঁচু করে ঢোকার স্বপ্ন তিনি এতগুলো বছর ধরে লালন করেছেন সংগোপনে৷ মুখ্যমন্ত্রীর কেবিনে তাঁর নামের নেমপ্লেট সাজানো থাকবে৷ এই রাজ্যের সর্বোচচ ক্ষমতা থাকবে তাঁর করায়ত্ত৷ সবই যখন একদম ঠিক পথে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই কেন এল এই ঝড়? এর থেকে কীভাবে বেরোবেন অমিয়বাবু? একটা ছোট্ট ভুলের জন্য তাঁর এতদিন ধরে তিন তিল করে গড়ে তোলা ভাবমূর্তি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে? ভুলই তো, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে সমস্যাটাকে জিইয়ে রাখার ভুল৷ ঊনত্রিশ বছর আগে সেদিনই যদি সমূলে উপড়ে দিতেন সমস্যার শেকড়, তাহলে আজ এই দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটাতে হত না তাঁকে৷ কিন্তু, ব্যবস্থা আজই নেবেন অমিয়বাবু, নইলে আজ যারা তাঁকে মাথায় তুলে জয়ধ্বনি দিচ্ছে, কাল তারাই তাঁর গায়ে থুতু ছেটাবে৷ ন্যায়মূর্তি, সততার প্রতীক অমিয় চক্রবর্তীর মুখটা তখন সকলের কাছে মুখোশ বলে মনে হবে৷ লক্ষ লক্ষ হাত, নখ, দাঁত এগিয়ে আসবে সেই মুখোশটা টেনে ছিঁড়ে দেওয়ার লক্ষ্যে৷ সকলকে কী জবাবদিহি করবেন অমিয় চক্রবর্তী?

মাথার ভিতর তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে অমিয় চক্রবর্তীর৷ ঘরের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলেন অমিয়বাবু৷ ফ্লাস্কে তাঁর স্পেশাল দুধ চিনি ছাড়া কালো চা সবসময়ই তৈরি থাকে৷ শেষ হতেই কেউ না কেউ ভরে রেখে যায়৷ আজ বিকেলের পর থেকে কাজ গোটানোর চাপে আর চা খাওয়া হয়নি৷ তাই বোধ হয় মাথাটা দপ দপ করছে৷ কাপে ঢেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন তিনি৷ নতুন মন্ত্রীসভায় কাদের কোন পদ দেবেন, সেই নিয়ে একের পর এক মিটিং করতে হয়েছে৷ এমনিতেই অমিয়বাবু হাই ব্লাডপ্রেশারের রোগী৷ নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়৷ মাইগ্রেনের সমস্যাও আছে৷ যাই হোক, আজ আর সেসব সমস্যা নিয়ে ভাবনা নেই৷ ধীরে ধীরে আয়েশ করে চা-টা শেষ করলেন তিনি৷ তারপর পকেট থেকে চাবি বার করে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ড্রয়ারটা খুললেন অমিয়বাবু৷ ফাইলপত্রের নীচে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছে তাঁর ছোট্ট কালো কুচকুচে প্রিয় অস্ত্রটা৷ হাতে তুলে নিয়ে সেটার গায়ে আদর করে হাত বোলালেন তিনি৷ লোড করলেন যত্ন নিয়ে৷ ব্যারেলের মাথায় সেট করলেন সাইলেন্সার৷ তারপর নিজের মাথার এক পাশে ঠেকালেন সেটা৷ সামনে জানালার কাচে নিজের প্রতিফলনের দিকে চেয়ে রইলেন একদৃষ্টিতে৷ ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল তাঁর৷ কোনো প্রমাণ রাখা চলবে না৷ সেই ব্যবস্থা অবশ্য তিনি করেই রেখেছেন৷ আর ঘণ্টা দুয়েক৷ তারপর সব শেষ৷

সারা সপ্তাহের অফিস শরীর মনের সব শক্তি নিংড়ে নেয়৷ শনিবারের সকালটাতে আমি সারা সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি সুদে-আসলে উসুল করে নিতে চেষ্টা করি৷ অবশ্য অভ্যেস বশে ঘুমটা যথারীতি সাতটাতেই ভেঙে যায় রোজ৷ তারপর আমি পাশ ফিরে শুয়ে আবার নিদ্রাদেবীর আরাধনা শুরু করি৷ আরেক রাউন্ড ঘুম শেষ করে সাড়ে ন’টা নাগাদ বিছানা ছাড়ি৷

আজও সেরকমই ইচ্ছে ছিল৷ সেইমতো পাশ ফিরে পায়ের কাছে অবহেলায় পড়ে থাকা চাদরটা টেনে নিয়ে চোখ বুজেছিলাম৷ এমন সময় বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল৷ ঘুমচোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নামটা দেখলাম, টাপুরদি৷ ব্যস, বেজে গেল ঘুমের বারোটা৷ এখনই এত বেলা অবধি বিছানায় শুয়ে থাকার জন্য এক পশলা জ্ঞান বর্ষণ হবে৷ ফোনটা স্পিকারে দিয়ে বালিশে মুখ গুঁজলাম আমি৷ ফোনের ও প্রান্তে টাপুরদির উত্তেজিত কণ্ঠে শুনতে পেলাম, ‘মিতুল, আজ সকালে নিউজ দেখেছিস?’

বালিশ থেকে মুখ না তুলেই জবাব দিলাম, ‘সকাল সাড়ে সাতটাই তো বাজে৷ এত সকালে কে টিভি চালায় টাপুরদি?’

‘তাড়াতাড়ি টিভিতে যেকোনো নিউজ চ্যানেল চালা৷ আমি ধরছি’, বলল টাপুরদি৷

আর কী? টাপুরদির আদেশের পরও শুয়ে থাকা সম্ভব নয় কোনোমতেই৷ সুতরাং ব্যাজার মুখে উঠে আমার বেডরুমের টিভিটা চালালাম৷ এটা আমি দুই মাস হল কিনেছি৷ ড্রয়িংরুমে টিভি আছে বটে, তবে আজকাল রাত জেগে কিছু ওয়েব সিরিজ দেখি মাঝে মাঝে৷ কনটেন্টের জন্য সেসব ড্রয়িংরুমে বসে দেখাটা একটু মুশকিল হয়ে যায়৷ সন্ধে থেকে মায়ের সিরিয়াল চলতে থাকে একের পর এক৷ তাই অফিস থেকে ফিরে নিজের ঘরে এক কাপ চা নিয়ে জম্পেশ করে বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে নিজের ইচ্ছেমতো টিভি দেখার মজাই আলাদা৷

টিভিতে নিউজ চ্যানেল চালাতেই খবরটা দেখলাম৷ রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী অমিয় চক্রবর্তীকে তাঁর অফিসে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে৷ রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী সুনয়নাদেবী ফোনে তাঁকে না পেয়ে অফিসের নম্বরে ফোন করেন৷ ফোন বেজে যায়, কেউ ধরে না৷ তারপর অমিয়বাবুর সেক্রেটারি মনোময় মজুমদার অমিয়বাবুর বাড়িতেই থাকেন৷ সেদিন তিনি তখনও বাড়ি ফেরেননি৷ তাঁকে ফোন করেন সুনয়নাদেবী৷ তাঁর থেকেই জানতে পারেন তিনি আজ সকলকে ছুটি দিয়েছেন৷ মনোময়বাবু অফিসের সিকিউরিটিকে ফোন করে নিজেও রওনা দেন অফিসে৷ অফিসে পৌঁছে দেখেন সিকিউরিটি অফিসার সমেত আরও দুই-তিনজন গার্ড অমিয়বাবুর কেবিনের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ অনেক ডাকাডাকি করেও ভিতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা৷ দরজা ভেঙে দেখা যায় অমিয়বাবু চেয়ারে বসে আছেন সামনের টেবিলে মাথা রেখে, প্রাণহীন দেহ৷ দেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি৷

খবরটা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম৷ ভুলেই গিয়েছিলাম টাপুরদি ফোন ধরে আছে৷ মনে পড়তেই ফোনটা তুলে কানে লাগালাম৷

‘হ্যালো, টাপুরদি?’

‘হ্যাঁ, দেখলি নিউজটা?’ উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘হ্যাঁ,’ বললাম আমি, ‘আজই তো মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল৷ তার আগেই...?’

‘সেটাই তো! কাল রাতে সাড়ে বারোটা নাগাদ অর্জুন ফোন করেছিল৷ তখনই সব জানতে পারি,’ বলল টাপুরদি৷ আমার শুনে একটু অভিমান হল৷ কাল রাতে জেনেও আমায় আজ সকালে জানাল টাপুরদি৷ সেটা মুখে প্রকাশ না করে বললাম, ‘কিন্তু এ-রকম হাই প্রোফাইল কেসে তো তোমার কিছু করার নেই৷ হয়তো ডিরেক্ট সিআইডির হাতে যাবে কেসটা৷ ফ্যামিলি সিবিআই তদন্তও ক্লেম করতে পারে৷ তা তোমার কী মনে হয়? নর্মাল ডেথ না মার্ডার?’

‘সেটা কী করে বলি রে? বডি তো আর আমি দেখিনি৷ পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট এলে জানা যেতে পারে৷ তবে অর্জুনের কাছে শুনলাম শরীরে কোনো ক্ষতচিহ্ন নেই৷ অথচ অদ্ভুত ব্যাপার জানিস? অর্জুন বলল, টেবিলের উপর লোডেড রিভলভার রাখা ছিল একটা, সাইলেন্সার লাগানো৷’

‘সে কী? ব্যাপারটা তাহলে বেশ ফিশি, কী বলো?’

‘হুম৷ ফিশি তো বটেই৷ তবে আমার মাথা ঘামিয়ে লাভ কী?’ বলল টাপুরদি৷ আমি ফোনের ওপ্রান্ত থেকে টাপুরদির দীর্ঘশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলাম৷ হেসে বললাম, ‘কী আর করবে? বাড়িতে বসে মাথা ঘামাও৷ হাতে এখন কেস তো কিছু নেই আপাতত৷’

‘কে বলল নেই?’ টাপুরদি গম্ভীর গলায় বলল৷

‘আছে?’ লাফিয়ে উঠলাম আমি, ‘কী কেস? কবে এল?’

‘আসেনি এখনও, আসবে৷ আজ সকাল সাড়ে ন’টায়৷ কাল বিকেলে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছেন একজন৷ নাম বলল রিদ্ধিমা দেশাই৷ আজ সকালে আসবেন৷ কী কেস, সেটা তিনি এলেই জানতে পারব৷ তুই চলে আয় চটপট৷ ব্রেকফাস্ট এখানে করবি,’ বলে কটাস করে ফোনটা কেটে দিল টাপুরদি৷ আর শুয়ে থাকার উপায় নেই৷ সুতরাং বিছানা ছাড়তেই হল৷

টাপুরদির ফ্ল্যাটে যখন পৌঁছোলাম, ঘড়ির কাঁটায় ঠিক পৌনে ন’টা বাজে৷ কলিংবেল টিপতে টাপুরদি দরজা খুলল৷ দেখে বুঝলাম, সকাল সকাল ব্যায়াম সেরে স্নান করে নিয়েছে টাপুরদি৷ রান্নাঘর থেকে সরষে কারিপাতা ফোড়নের গন্ধ ভেসে আসছে৷

‘কী বানাচ্ছ গো?’ জিজ্ঞাসা করলাম৷

‘চিঁড়ের পোলাও,’ বলে রান্নাঘরে ঢুকে গেল টাপুরদি৷ বসার ঘরের টিভিতে নিউজ চলছে৷ একই খবর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখানো হচ্ছে বার বার৷ টাপুরদি ট্রেতে সাজিয়ে দুজনের চিঁড়ের পোলাও আর দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা দার্জিলিং চা নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ খেতে খেতে নিউজ চ্যানেলে চোখ রেখে বলল, ‘আজ অমিয় চক্রবর্তীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল৷ তাহলে গতকাল তো অনেক কাজ থাকার, অনেক লোকজন দেখা করতে আসার কথা৷ সেক্ষেত্রে বিকেলে সকলকে অফিস থেকে ছুটি দিয়ে তিনি একা অফিসে রয়ে গেলেন কেন বল তো?’

‘কে জানে? কী চলছিল ভদ্রলোকের মনে সে আর এখন কী করে জানা যাবে?’ বললাম আমি, ‘বাই দ্য ওয়ে, চিঁড়ের পোলাওটা বেড়ে হয়েছে৷’

‘হুম,’ অন্যমনস্কভাবে বলল টাপুরদি৷ খাওয়া শেষ করে প্লেট-টেট গুছিয়ে রান্নাঘরে রেখে এলাম৷ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি এমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠল৷ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ন’টা পঁচিশ বাজে৷ অর্থাৎ আমাদের অতিথি ‘বিফোর টাইম’ পৌঁছে গেছেন৷

ভদ্রমহিলার বয়স ঊনত্রিশ-ত্রিশ হবে৷ প্রথম দর্শনে কেমন যেন চেনা ঠেকল৷ ছিপছিপে সুন্দরী, দীর্ঘাঙ্গী, বেশ তরতরে ধারালো মুখ, একবার দেখলে দ্বিতীয়বার ঘুরে দেখতে ইচ্ছে হয়৷ ঘরে ঢুকে আমাদের দিকে তাকিয়ে দুই হাত জোড় করে নমস্কার করল৷ তারপর ঝরঝরে বাংলায় বলল, ‘আমার নাম রিদ্ধিমা দেশাই৷ আমিই কাল ফোন করেছিলাম৷ আপনাদের মধ্যে মিস ব্যানার্জি কে?’

টাপুরদি হেসে বলল, ‘আমিই সংঘমিত্রা ব্যানার্জি৷ আমার সঙ্গেই কথা হয়েছে আপনার৷ এ হল মৈথিলী সেন, আমার বন্ধু তথা সহকারী৷ এর সামনে নির্দ্বিধায় সব বলতে পারেন আপনি৷’

রিদ্ধিমা একবার দ্বিধাভরে আমার দিকে তাকাল৷ তারপর বলল, ‘আমার সমস্যাটা একটু অদ্ভুত৷ বুঝতে পারছি না, ঠিক কী বলি আপনাকে৷’

‘আপনি নিশ্চিন্তে বলতে পারেন যা বলতে চান৷ ডোন্ট ওয়ারি, আমরা আপনাকে জাজ করব না,’ হেসে রিদ্ধিমা দেশাইকে আশ্বস্ত করল টাপুরদি৷

রিদ্ধিমা বলতে শুরু করল, ‘আমি জন্মসূত্রে গুজরাটি বাবার মেয়ে হলেও এখানেই বড়ো হয়েছি৷ কারমেল কনভেন্টে লেখাপড়া করেছি৷ উনিশ বছর বয়সে যখন আমি কলেজের ফার্স্ট ইয়ার, সেই সময়ে কলকাতার একটা বিউটি পিজেন্ট জিতি৷ তারপর থেকে টুকটাক মডেলিং করতাম৷ টেলিভিশন, ফিল্মে চেষ্টা করেছিলাম৷ কিন্তু আমার চেহারাটা ঠিক গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের মতো নরম-সরম নয়৷ তাই অভিনয় লাইনে সফল হতে পারিনি৷ খুব বেশি চেষ্টাও যে করেছিলাম, তাও নয়৷ আমার মা ছিলেন সিঙ্গল পেরেন্ট৷ আমার জন্মের পর পরই বাবার সঙ্গে মার ডিভোর্স হয়ে যায়৷ তারপর মা আমায় নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন৷ ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, আমার মা কিন্তু বাঙালি৷’

‘বাবাকে আমি দেখিনি৷ স্কুলের ফাইলে অভিভাবকের নামের জায়গায় মায়ের নামই ছিল৷ তবে বাবার পরিচয় আমি জানতাম, মা লুকোননি কখনো৷ বাবা আমাদের খোঁজ নেননি কোনোদিন৷

ডিভোর্সের পরে মাও তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি৷ বাবা এখন বিবাহিত, এই পক্ষের ছেলে-মেয়ে আছে৷ আমার সঙ্গে তাঁর কোনোরকম যোগাযোগ কখনো হয়নি৷ আমি তাঁকে চোখেও দেখিনি৷ তবে মায়ের কাছে ছোটোবেলায় ছবি দেখেছিলাম৷’

‘হুম, এবার বলুন আপনার সমস্যাটা কী?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘বছর দুই আগে আমার মা মারা যান৷ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, হসপিটালে নিয়ে যাওয়ারও সময় পাইনি৷ আমি একাই থাকি৷ আমার এক বয়ফ্রেন্ড আছে, সে মাঝে মাঝে এসে আমার ফ্ল্যাটে থাকে; একটি সিকিউরিটি এজেন্সিতে চাকরি করে৷ ওর নাম তন্ময়৷’

‘এবার আসি আসল কথায়৷ ইলেকশনের আগে থেকে তন্ময়দের এজেন্সির কাজের চাপ বেশ বেশি ছিল৷ সবাই বুঝতে পারছিল, এবারের ইলেকশনের রেজাল্ট অন্যরকম হবে৷ একটা বড়োসড়ো বদল আসতে যাচ্ছে৷ ওদের এজেন্সির ক্লায়েন্টরা সমাজের উঁচুতলার লোক৷ অভিনেতা থেকে শুরু করে নেতা, শিল্পপতি সকলেই রয়েছে সেই তালিকায়৷ অনেক পলিটিশিয়ানরা নিজেদের সরকারি সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও পরিবারের জন্য বেসরকারি সুরক্ষা হায়ার করেন ওদের এজেন্সি থেকে৷ স্বাভাবিকভাবেই ইলেকশনের আগে কাজের প্রেশার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই বেশি থাকে৷ ইলেকশনের কিছুদিন আগে থেকে তন্ময়কে কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল৷ সবসময় অন্যমনস্ক, বড্ড বেশি গম্ভীর৷ ওর উদবেগের কারণ জিজ্ঞাসা করলে উত্তর পেতাম না, একটুতেই রেগে যেত৷ যেসব রাতে ও আমার ফ্ল্যাটে থাকত, দেখতাম সারারাত ছটফট করছে৷ মাঝরাতে দেখতাম ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে৷’

‘ইলেকশনের সপ্তাহখানেক আগে রাত দুটো নাগাদ আমার ফ্ল্যাটে এল তন্ময়, হাতে একটা ছোটো ট্রলিব্যাগ৷ দেখে মনে হচ্ছিল কোথাও যাচ্ছে ও৷ মুখ দেখে মনে হল কোনো কারণে খুব ভয় পেয়েছে৷ এসে বলল, ‘আজকের রাতটা থাকব এখানে৷ কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবে না আমি এখানে আছি৷’ অবাক হয়েছিলাম, কিন্তু বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করিনি আর৷ সেদিন ভোর সাড়ে চারটা নাগাদ ওর মোবাইলে একটা ফোন এল৷ তড়িঘড়ি ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে গেল কিছু না বলে৷ সেই ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা৷ তারপর দেড় মাস কেটে গেছে৷ অনেক চেষ্টা করেও ওর কোনো খোঁজ পাইনি৷ ওর ফোন সুইচড অফ৷ ওর কলিগদের কাছে খবর নিয়ে জেনেছি অফিসেও যাচ্ছে না৷ ওরও আমার মতোই কেউ নেই৷ এক দিদি ছিল, বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন৷ দিদির সঙ্গে একেবারেই অ্যাটাচমেন্ট নেই৷ আমার ভয় হচ্ছে ও কোনো বিপদে পড়েছে৷ কিছু হয়েছে ওর৷’

‘পুলিশের কাছে যাননি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘গিয়েছি তো৷ লোকাল থানায় ডায়েরিও করেছি৷ ওরা খুব বেশি গুরুত্ব দিল বলে মনে হল না৷ সবাই ভোট নিয়ে ব্যস্ত ছিল এতদিন৷ বলল, খবর পেলে জানাবে৷ এভাবে হাত গুটিয়েও বসে থাকতে পারছি না৷ তাই আপনার কাছে এলাম,’ বলল রিদ্ধিমা৷

‘হুম,’ গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবল টাপুরদি৷ তারপর বলল, ‘আপনি কী করেন? মানে প্রফেশন কী আপনার? মডেলিং?’

‘না, মডেলিং টুকটাক করি৷ সেটা আমার আসল প্রফেশন নয়৷ আমার মা ছিলেন একটি বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিকের জার্নালিস্ট৷ মার ইচ্ছেতেই জার্নালিজম নিয়ে পড়েছিলাম৷ আমিও ফ্রিল্যান্সিং করি বেশ কয়েকটি নিউজপেপারে৷ মার ইন্টারেস্ট ছিল পলিটিক্স, আমি অবশ্য আমার মডেলিং কন্ট্যাক্ট ইউজ করে পেজ থ্রি করি৷’

‘ও আচ্ছা৷ আপনি একটু মনে করার চেষ্টা করে দেখুন তো, তন্ময় আপনাকে এমন কিছু বলেছিল, বা আপনি এমন কিছু লক্ষ করেছিলেন যেটা এই কেসে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে,’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘না মিস ব্যানার্জি৷ গত কয়েকদিনে আমি অনেক ভেবেছি৷ ওর দুজন কলিগের সঙ্গেও কথা বলেছি৷ কেউ কিছুই বলতে পারছে না,’ বিমর্ষ মুখে বলল রিদ্ধিমা৷

‘ওকে৷ তন্ময়বাবু এজেন্সিতে কী কাজ করত আপনি জানেন?’

‘হ্যাঁ জানি৷ আগে ও ইন্টারনাল এনকোয়ারি সংক্রান্ত রেকর্ডস রাখত৷ গত বছর প্রোমোশন হল৷ সিক্রেট ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টে চলে আসে৷ বিভিন্ন ইনভেস্টিগেশনে পার্টিসিপেট করত৷ একটু বুঝিয়ে বলি৷ আসলে এই ধরনের হাই প্রোফাইল এজেন্সিগুলোতে শুধু ক্লায়েন্টদের সিকিউরিটিই প্রোভাইড করা হয় না, সিকিউরিটি ডিসপিউটস, প্রোবাবল থ্রেটস, এ ছাড়া ক্লায়েন্ট রিকোয়ারমেন্ট অনুসারে বিভিন্ন ইনভেস্টিগেশনও টেক আপ করে থাকে ওরা৷ সেই সেকশনেই কাজ করত তন্ময়৷’

‘ইন্টারেস্টিং! তন্ময়বাবুর ফ্ল্যাটে তিনি একাই থাকতেন তো? সেই ফ্ল্যাটের চাবি পাওয়া যাবে? একবার সেখানে যেতে পারলে ভালো হত৷’

‘আমার কাছে একটা ডুপ্লিকেট চাবি আছে৷ কখন যেতে চান বলুন,’ জিজ্ঞাসা করল রিদ্ধিমা৷

‘আজই৷ বিকেল পাঁচটা নাগাদ৷ আপনি আমায় অ্যাড্রেস আর তন্ময়বাবুর একটা ছবি হোয়াটস্যাপ করবেন,’ টাপুরদি বলল৷

‘কেসটা কিন্তু বেশ কমপ্লিকেটেড,’ আমি বললাম, ‘এজেন্সির ভিতরে ইনভেস্টিগেট করবে কী করে? ওরা তোমায় ভিতরে ঢুকতেই দেবে না৷’

রিদ্ধিমা দেশাই চলে গেছেন কিছুক্ষণ হল৷ আমি আর টাপুরদি চায়ের কাপ নিয়ে বসেছি৷ টাপুরদি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, ‘কমপ্লিকেটেড তো বটেই৷ সেইজন্যই চ্যালেঞ্জটা নিতে ইচ্ছে হল৷ জানি, কোনো কিছুই সহজ হবে না৷ তবু একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী?’

‘আমার কিন্তু রিদ্ধিমা দেশাইকে দেখেই খুব চেনা চেনা লাগছিল৷ পরে মনে হল, মডেল যখন, কোনো অ্যাডে দেখে থাকতে পারি,’ বললাম আমি৷

‘সেটাই স্বাভাবিক,’ বলল টাপুরদি৷ তারপর রিমোট দিয়ে টিভিটা অন করল৷ সংবাদ উপস্থাপিকা সপ্রতিভ ভঙ্গিতে বলে যাচ্ছে, কাল কীভাবে অমিয় চক্রবর্তীর দেহ উদ্ধার হয় তাঁর নিজের অফিসের বন্ধ কেবিন থেকে৷ দেহ পোস্ট মর্টেমের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷ দলীয় ও বিরোধী দলের বিভিন্ন নেতারা গম্ভীর মুখে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন৷ সকলেই যেন বক্তব্য রাখার ব্যাপারে একটু বেশি সাবধানি এই মুহূর্তে৷ দিল্লি থেকে প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেছেন, এবং অমিয়বাবুর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন৷ অমিয় চক্রবর্তীর স্ত্রী সুনয়না চক্রবর্তী কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারাচ্ছেন বার বার৷ তিনি সাংবাদিকদের সামনে আসতে অপারগ৷ তবে অমিয়বাবুর ছেলে অম্লান চক্রবর্তী সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছেন কেন্দ্রের কাছে৷ আশা করা যাচ্ছে কেন্দ্র তাঁর দাবি মেনে নিয়ে অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যু রহস্য উৎঘাটনের দায়িত্ব সিবিআইকে সমর্পণ করবে শীঘ্রই৷

‘ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ফিশি, টাপুরদি৷ দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, অথচ অমিয়বাবু মৃত৷ হাতের সামনে লোডেড রিভলভার, অথচ মৃতদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পর্যন্ত নেই৷ পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এলে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হবে,’ বললাম আমি৷

‘বেল পাকলে কাকের কী?’ গম্ভীর মুখে বলল টাপুরদি৷ বুঝলাম কেসটা নিয়ে টাপুরদি যথেষ্ট কৌতূহলী৷ অথচ এখানে ওর কিছুই করার নেই শুধু টিভিতে খবর দেখা ছাড়া৷

বিকেল ঠিক পৌনে পাঁচটা নাগাদ আমরা তন্ময়ের বিল্ডিংয়ের নীচে পৌঁছোলাম৷ মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই রিদ্ধিমা এল সেখানে৷ আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অপ্রস্তুত মুখে বলল, ‘অনেকক্ষণ এসেছেন? সরি একটু লেট হয়ে গেল৷’

টাপুরদি মৃদু হেসে বলল, ‘না না, ঠিক আছে৷ আমরাও এই এলাম৷ চলুন উপরে যাওয়া যাক৷’

গেট দিয়ে ঢুকে কার পার্কিংয়ের সামনেই লিফট৷ তিনজনে লিফটে উঠলাম৷ রিদ্ধিমা পাঁচ নম্বরের সুইচ টিপল৷ লিফট দিয়ে উঠে ফিফথ ফ্লোরে লিফটের বাঁ-দিকের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাগ থেকে চাবি বার করল রিদ্ধিমা৷ চাবি ঘুরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই থমকাতে হল৷ ফ্ল্যাটের অবস্থা দেখে মনে হল ভিতরে যেন ঝড় বয়ে গেছে৷ জিনিসপত্র সব ওলটপালট, বিছানার তোশক বালিশ কেউ যেন প্রবল আক্রোশে ধারালো কিছু দিয়ে ফালা ফালা করেছে৷ ওয়ার্ডড্রোবের জামাকাপড় সব মেঝেতে ছড়িয়ে আছে৷ বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার পুরোটা খুলে উলটে পড়ে আছে৷ টেবিলের উপর রাখা একটা ফোটো ফ্রেম থেকে ফোটো খুলে পড়ে আছে নীচে৷ রিদ্ধিমা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়ল৷ মৃদু কম্পিত স্বরে বলল, ‘এসব কী? হে ভগবান!’

টাপুরদি কোনো উত্তর না দিয়ে নীচু হয়ে মেঝে থেকে ফোটোটা কুড়িয়ে নিল৷ সাদা-কালো পুরোনো ছবি৷ এক ভদ্রমহিলার কোলে একটি তিন-চার বছরের ছেলে৷ ছবিটা রিদ্ধিমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা কার ছবি? তন্ময়ের?’

রিদ্ধিমা উপরে-নীচে মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘ইনি তন্ময়ের মা৷ খুব কম বয়সে মারা যান৷ ওর বাবা অবশ্য আরও আগেই মারা গিয়েছিলেন৷’

‘আপনি বলেছিলেন, ওর দিদি আছে৷ তাঁর কাছে খবর নিয়েছিলেন? সেখানে যায়নি তো তন্ময়?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘না,’ মাথা নেড়ে বলল রিদ্ধিমা, ‘দিদি তন্ময়ের চেয়ে বয়সে প্রায় চোদ্দো বছরের বড়ো৷ তন্ময়ের যখন মাত্র আট বছর বয়স, তখন দিদি বিয়ে হয়ে জামসেদপুরে শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়৷ তন্ময়ের মা মারা যান যখন, তন্ময় সবে পনেরো৷ ওর আর কেউ ছিল না৷ স্বাভাবিকভাবেই দিদির কাছে গিয়ে ছিল বছরখানেক৷ আমায় পরিষ্কার করে কখনো কিছু না বললেও জানি, সেখান থেকে নিজেই চলে আসে ও৷ কেন, কী হয়েছিল আমি কখনো জিজ্ঞাসা করিনি৷ ও দিদির ব্যাপারে কথা বলতে চাইত না৷ ওর মনের দুর্বল জায়গায় আঘাত দিতে চাইনি৷ দিদি জামাইবাবু বাবা-মায়ের প্রপার্টি বিক্রিবাটা করে ওর নামে সামান্য কিছু টাকা ব্যাঙ্কে রাখার ব্যবস্থা করে, বাকিটা পুরোটাই নিজেরা আত্মসাৎ করে নিয়েছিল৷ সেই ব্যাঙ্কের জমানো টাকা দিয়ে তন্ময়ের লেখাপড়ার খরচ চলে৷ কলেজে থাকতেই নিজে টুকটাক রোজগার করতে শুরু করেছিল ও৷ নিজের খরচটুকু উঠে আসত৷ দিদিকে ও ঘৃণা করে৷ আর যাই হোক, দিদির কাছে যাবে না ও৷’

‘হুম,’ চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল টাপুরদি৷ বলল, ‘ব্যাপারটা ক্রমেই ঘোরালো হয়ে উঠছে৷ তন্ময়ের ঘরে কেউ অবশ্যই ঢুকেছিল, তোলপাড় করে কিছু খুঁজেছে৷ কী খুঁজেছে, সেটা আদৌ পেয়েছে কি না আমরা জানি না৷ কিন্তু সব দেখে মনে হচ্ছে, তন্ময় কোনো বড়োসড়ো বিপদের মধ্যে ছিল৷ রিদ্ধিমা, আমার মনে হয় আপনার এখনই পুলিশকে সব জানানো উচিত৷ আই মিন, ঘরের এই অবস্থার কথা পুলিশকে জানান৷ কিছু ব্যাপারে পুলিশের সাহায্য ছাড়া এগোনো সম্ভব নয়৷ বুঝতেই পারছেন, পুলিশের যতটা রিচ আছে, সেটা আমাদের প্রাইভেট ডিটেকটিভদের নেই৷’

বিমর্ষ মুখে মাথা নাড়ল রিদ্ধিমা৷ মাথা নীচু করে বলল, ‘আমার খুব ভয় করছে মিস ব্যানার্জি৷ মনে হচ্ছে তন্ময় সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছে৷ ওর কিছু হয়নি তো? মানে, ও বেঁচে আছে তো?’

টাপুরদি চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘এই ঘর দেখার পর আমার মনে হচ্ছে, কিছু লোক তন্ময়ের কাছ থেকে কিছু চাইছে৷ যার জন্য তন্ময় এখান থেকে পালিয়ে গেছে৷ সেই জিনিসটা হাতে না পাওয়া অবধি ওরা তন্ময়কে মারবে না৷ কিন্তু সেটা কী জিনিস, এবং কারা সেটা খুঁজছে তা না জানা অবধি এগোনোটা মুশকিল৷ লেট’স সার্চ৷ যদিও যারা খুঁজতে এসেছিল, তারা ঘরের কোনো কোনাই ছাড়েনি৷ তবু অধিকন্তু ন দোষায়৷’

পরবর্তী প্রায় চল্লিশ মিনিট সময় আমরা তিনজনে মিলে সারা ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজলাম৷ মাঝে একবার একটা ফোন আসতে রিদ্ধিমা ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল৷ আমি আর টাপুরদি দরজা খুলে বাথরুমে উঁকি দিলাম৷ অবাক হয়ে দেখলাম, কমোডের পাশে পড়ে আছে অনেকটা কাগজ পোড়া ছাই৷ লক্ষ করলাম টাপুরদি নির্লিপ্ত মুখে সেটা নাড়াঘাটা করতে করতে সবুজ রঙের কিছু একটা জিন্সের পকেটে চালান করল৷ আমিও কিছু দেখিনি ভাব করে বেরিয়ে এলাম বাথরুম থেকে৷ ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রিদ্ধিমা কিছুটা উত্তেজিত ভঙ্গিতে ঘরে এসে ঢুকল৷ আমরা দুজনেই তার দিকে তাকালাম৷ রিদ্ধিমা ক্রমান্বয়ে আমাদের দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তন্ময়ের কলিগ রূপম ফোন করেছিল৷ ও বলছে, তন্ময় নাকি ওদের এজেন্সির কিছু সিক্রেট ডকুমেন্টস চুরি করে পালিয়েছে৷ আপনি বিশ্বাস করুন মিস ব্যানার্জি, তন্ময়কে আমি চিনি, ও এ-রকম করতে পারে না৷ সামথিং মাস্ট বি ভেরি রং, মিস ব্যানার্জি৷ দেয়ার মাস্ট বি সাম সর্ট অফ কন্সপিরেসি এগেন্সট হিম!’

রিদ্ধিমাকে দেখে মনে হল ও রীতিমতো ভেঙে পড়েছে৷ টাপুরদিকেও কিছুটা চিন্তিত দেখাল৷ একটু ভেবে টাপুরদি বলল, ‘দেখুন রিদ্ধিমা, তন্ময়কে খুঁজে বার করতে হলে প্রথমে আমাদের জানতে হবে, কী চুরি করেছে ও? কেন এভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছে? সেজন্য আমাদের রূপমের সঙ্গে কথা বলতে হবে৷ আপনি সেই ব্যবস্থা করতে পারবেন তো? আর এই দেখা হওয়ার ব্যাপারটা যেন গোপন থাকে সেটা দেখবেন৷’

রিদ্ধিমা ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাল৷ ওর দু’চোখে জল টলটল করছে৷

‘তন্ময় যে ডকুমেন্টস চুরি করেছে, সেটা ধরা পড়ল কীভাবে?’

আমরা বসে আছি ই এম বাইপাসের ধারে একটি ক্যাফেতে৷ তন্ময়ের সহকর্মী রূপম মিনিট পাঁচেক হল এসে পৌঁছেছে৷ রূপম এভাবে দেখা করতে প্রথমে ভয় পাচ্ছিল৷ এজেন্সিতে তন্ময়ের ব্যাপারটা নিয়ে ইন্টারনাল এনকোয়ারি শুরু হয়েছে৷ রিদ্ধিমা অনেক কাকুতিমিনতি করায় কেবল মিনিট পনেরো সময় দিতে রাজি হয়েছে রূপম৷

‘রাতের বেলা অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নিজের এমপ্লয়ি পাস ব্যবহার করে অফিসে ঢুকেছিল তন্ময়৷ গার্ডকে বলেছিল, ফ্ল্যাটের চাবি ভুল করে ফেলে গেছে৷ সেটা নিতে হবে৷ সিসিটিভিতে দেখা গিয়েছে, তন্ময় নিজের সিস্টেমে বসে পেনড্রাইভে কোনো কিছু স্টোর করছে৷ তারপর চুপচাপ বেরিয়ে গেছে অফিস থেকে,’ বলল রূপম৷

‘তাই যদি হয়, তাহলে সেই কাজটা তো তন্ময় অফিস টাইমেই করতে পারত৷ সবাই নিশ্চয়ই সারাদিন তার দিকে তাকিয়ে বসে থাকেনি৷ অফিসে কাজের ফাঁকে সুযোগ বুঝে যা ডকুমেন্ট বার করার, সেটা সহজেই করে নিতে পারত৷ কেউ টেরও পেত না৷ এত রিস্ক নেওয়ার তো কোনো দরকার ছিল না৷ তা ছাড়া তন্ময় নিশ্চয়ই জানত, ফ্লোরে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে৷ সবাই জেনেই যাবে ওর চুরির কথা, তাই না? আপনার কী মনে হয় রূপমবাবু? ও বোকার মতো এ রকম রিস্ক কেন নিল?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল৷

‘নো আইডিয়া! কেন যে তন্ময় এমন বোকার মতো একটা কাজ করল?’ বিমর্ষ মুখে বলল রূপম৷

‘হুম, অফিসের ভিতর তন্ময়ের কোনোরকম সাস্পিশাস অ্যাক্টিভিটি সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে কি?’ টাপুরদি জানতে চাইল৷

‘আমি ঠিক বলতে পারব না৷ আমি তো ভিডিয়োটা দেখিনি৷ অফিসে যেটুকু কানাঘুসো শুনেছি, তার বেসিসে বললাম৷ রিদ্ধিমাকে জানানোটা দরকার বলে মনে হল, তাই ফোন করেছিলাম ওকে৷ মনে হয়েছিল, জানলে একমাত্র ওই জানতে পারে তন্ময় কোথায় আছে,’ রিদ্ধিমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল রূপম৷ মনে হল, ওর এখনও বিশ্বাস যে রিদ্ধিমা তন্ময়ের ব্যাপারে জানে৷

রিদ্ধিমা উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘আমি কী করে জানব রূপম? আমি জানি না বলেই তো আপনাকে ফোন করে জানতে চেয়েছিলাম আপনি কিছু জানেন কি না৷ এমনকী ও যে অফিসে যাচ্ছে না, সেটাও আপনার কাছেই প্রথম জেনেছিলাম আমি৷’

টাপুরদি এবার রিদ্ধিমাকে বাধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘রূপম, তন্ময় কোন ধরনের প্রজেক্টে কাজ করছিল, আপনি কি আমাকে বলতে পারবেন?’

রূপমের অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট দ্বিধা দেখা গেল৷ তারপর বলল, ‘দেখুন, এসব এজেন্সির হাইলি কনফিডেনশিয়াল ইনফর্মেশন৷ এভাবে বলাটা...’

‘প্লিজ রূপম! উই নিড ইয়োর হেল্প,’ গলা নামিয়ে কণ্ঠস্বরে হালকা মাদকতা মিশিয়ে রূপমের চোখে চোখ রেখে বলল টাপুরদি৷ উফফ, টাপুরদি পারেও বটে! বেচারা রূপম কেমন যেন লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, ‘না না, তন্ময়ের ব্যাপারে হেল্প করতে চাই বলেই তো রিদ্ধিমা ডাকতেই এসেছি৷ আসলে এসব ব্যাপার একটু সেন্সিটিভ তো৷ তাই আর কী...! তন্ময় খুব সিনসিয়ার ছিল কাজের ব্যাপারে৷ শুরুতে জাস্ট ডেটা এন্ট্রির কাজই করত, যেমন সব ফ্রেশাররাই করে থাকে৷ কিন্তু খুব কম সময়ের মধ্যে অনেকটা প্রগ্রেস করে ফেলেছিল ও৷ গত তিন বছরে বেশ কিছু ইমপর্ট্যান্ট প্রজেক্টে যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে কাজ করেছিল তন্ময়৷ প্রমোশনও হয়েছিল৷ ইভেন সিইও স্যারও ওর উপরে যথেষ্ট ভরসা করতেন৷ গত বছরের মাঝামাঝি দিকে আমি আর তন্ময় একসঙ্গে একই প্রজেক্টে কাজ শুরু করি৷’

‘কী প্রজেক্ট?’ জানতে চাইল টাপুরদি৷

একটু ইতস্তত করল রূপম৷ তারপর বলল, ‘দেখুন, আমি আপনাদের জানিয়েছি এই কথাটা বাইরে এলে আমি কিন্তু ভীষণ বিপদে পড়ে যাব৷ চাকরি তো যাবেই, আরও যে কী কী হতে পারে, ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া৷’

‘কেউ জানবে না, আই প্রমিস৷ এই কথাগুলো আমাদের তিনজনের বাইরে বেরোবে না,’ রূপমকে আশ্বস্ত করে বলল টাপুরদি৷

রূপম গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, ‘আমাদের এজেন্সি বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিকে ফিজিক্যাল ও ডেটা সিকিউরিটি প্রোভাইড করে৷ বিভিন্ন সিকিউরিটি অ্যাপ তৈরি করে৷ এ ছাড়াও বিভিন্ন হাই প্রোফাইল ক্লায়েন্টদের রিকোয়ারমেন্ট মতো ইনভেস্টিগেশনসও করে থাকে৷ পুরো ব্যাপারটাই একদম প্রাইভেট অ্যাফেয়ার৷ গত বছর একটা ভীষণ ইমপর্ট্যান্ট, কিন্তু হাইলি কনফিডেনশিয়াল প্রজেক্ট আসে আমাদের এজেন্সিতে৷ এই বছর মার্চের শেষে ছিল ইলেকশন৷ কার তরফ থেকে এসেছিল প্রজেক্টটা তা আমাদের জানানো হয়নি৷ অফিশিয়ালি এর সঙ্গে সরকারের কোনো যোগ ছিল না৷ অমিয় চক্রবর্তীর অতীত সম্পর্কে যতটা সম্ভব খুঁড়ে বার করার নির্দেশ ছিল আমাদের উপর, যতটা লুপহোলস পাওয়া যায়, ততই ভালো৷ সেইসব ইনফর্মেশন যে অমিয় চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ইলেকশন ক্যামপেইনে ব্যবহার করা হবে, তা বুঝতে অসুবিধে হয় না৷’

টাপুরদি আড়চোখে আমার দিকে তাকাল৷ তারপর রূপমের দিকে চেয়ে বলল, ‘হুম, তারপর? পেলেন কিছু সেরকম গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য?’

‘সেরকম কিছু নয়৷ রাজনৈতিক নেতাদের নানারকম ডার্ক সিক্রেটস তো থাকেই৷ কিন্তু অমিয় চক্রবর্তী লোকটার অতীতে আমরা সিরিয়াস কোনো অফেন্স খুঁজে পাইনি৷ হয় তিনি সারপ্রাইজিংলি অনেস্ট, নইলে অত্যন্ত চালাক৷ অনেক আগে টুকটাক যেটুকু বা দাগ পাওয়া গেছিল, এখন এতদিন পরে সেগুলো দিয়ে সেরকম কিছু পলিটিক্যাল ফায়দা তোলা সম্ভব ছিল না বিরোধীদের পক্ষে৷ আমরা একটা টিম হিসেবে কাজ করছিলাম৷ উপর লেভেলের নির্দেশমতো পুরো টাস্কটা ভাগ করে নিয়েছিলাম৷ সকলে নিজের নিজের ফাইন্ডিংসের রেকর্ড রাখত৷ সপ্তাহে একবার মিটিং করে সেইসব রেকর্ডসের মধ্যে যেগুলো ইমপর্ট্যান্ট, সেগুলো ফাইনাল করে রিপোর্ট পাঠাতাম৷ টিম হিসেবে কাজ করলেও সকলের মধ্যেই একটা চাপা প্রতিযোগিতা চলত, কে কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন খবর সংগ্রহ করতে পারে৷’

‘ইন্টারেস্টিং,’ মাথা নেড়ে বলল টাপুরদি, ‘তাহলে আপনি বলতে চাইছেন অমিয় চক্রবর্তীর এগেন্সটে সেরকম কোনো খবর আপনারা জোগাড় করতে পারেননি?’

দুই পাশে মাথা নাড়ল রূপম৷ বলল, ‘এমন কিছু অবশ্যই নয়, যেগুলো ব্যবহার করে ভদ্রলোকের খুব বেশি ক্ষতি করা চলে৷’

ঘড়ির দিকে দেখল রূপম৷ আমিও দেখলাম৷ পনেরো মিনিটের জায়গায় আধ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে৷ রূপম তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল৷ বলল, ‘আমি এখন চলি৷’ তারপর একবার রিদ্ধিমার দিকে, একবার টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি যেটুকু জানতাম, বলেছি আপনাদের৷ এর বেশি সাহায্য করা সম্ভব হবে না আমার পক্ষে৷ আমিও চাই তন্ময় ফিরে আসুক৷ সব মিটে যাক৷ কিন্তু প্লিজ, আমাকে আর এসবের মধ্যে জড়াবেন না৷’

রিদ্ধিমা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘প্লিজ রূপম, তোমার কোনো আইডিয়া আছে তন্ময় কোথায় যেতে পারে?’

রূপম স্থির চোখে রিদ্ধিমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সেটা তো তোমার জানার কথা, রিদ্ধিমা৷ তবে ও ফোন করলে ওকে বলে দিয়ো যেন ফিরে আসে৷ নিজের তরফ থেকে ওর বক্তব্য এজেন্সির সামনে রাখার সুযোগ আছে ওর কাছে৷ না হলে কিন্তু পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে৷ আরও বেশি বিপদে পড়বে ও৷ আই থিঙ্ক ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আই মিন৷’

রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে সোফায় বসলাম আমি আর টাপুরদি৷ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘অর্জুনদার সঙ্গে কথা হল, টাপুরদি?’

টাপুরদি মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘অমিয় চক্রবর্তী মারা যাওয়ায় এখন পুলিশের উপর খুব চাপ৷ পুরো ডিপার্টমেন্টের সম্মানের ব্যাপার৷ এখন ওকে ফোন করে বিরক্ত করার মানে হয় না৷’

‘হুম,’ মাথা নেড়ে বললাম আমি, ‘যাক গে, তোমার দুঃখ ছিল মুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যু রহস্যে মাথা ঘামানোর সুযোগ পাচ্ছ না বলে৷ এবার তন্ময়ের কেসের সূত্রে সেই অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গেই জড়িয়ে গেলে৷’

টাপুরদি চিন্তিত মুখে বলল, ‘কেসটা খুব সেনসিটিভ রে মিতুল৷ তন্ময়কে নিয়ে সত্যিই চিন্তা হচ্ছে৷’

‘তোমার কি মনে হয় তন্ময় এমন কিছু জানতে পেরেছিল, যেটা লুকোনোর জন্যই ও পালিয়েছে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘হতে পারে৷ কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হল, জানতেই যদি পারে সেটা সে এজেন্সিকে না জানিয়ে পালাল কেন? এজেন্সির হাতে সেরকম গোপন কোনো তথ্য তুলে দিতে পারলে তো আখেরে ওরই লাভ হত৷ প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট বাঁধা ছিল৷ সেটা না করে ও সেই তথ্য নিয়ে পালাল কেন? আবার দেখো, রিদ্ধিমার কথামতো, পালানোর ক’দিন আগে থেকেই তন্ময় কিছুটা ডিস্টার্বড ছিল৷ এবার প্রশ্ন হল, কেন? ওর হাতে যদি তেমন ইমপর্টেন্ট কোনো তথ্য এসে থাকে, ওর তো খুশি হওয়ার কথা, তাই না? তাহলে ও অত ভয় কেন পেল? গোলমাল আছে রে মিতুল, পুরোদস্তুর গোলমাল আছে৷ এক কাজ করা যাক, ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসের সম্পর্কে ইন্টারনেটে কী কী পাওয়া যায়, খুঁজে দেখি,’ বলে উঠে দাঁড়াল টাপুরদি৷ ল্যাপটপটা নিয়ে ফিরে এসে সোফাতে বসল৷

সার্চ ইঞ্জিনে এজেন্সির নামটা দিয়ে সার্চ করতে অনেকগুলো লিংক এল৷ প্রথম লিংকটা এজেন্সির নিজস্ব ওয়েবসাইটের লিংক, সেটাতেই ক্লিক করল টাপুরদি৷ পরবর্তী প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কোম্পানির সাইটে থাকা প্রতিটি ছবি, প্রতিটি অক্ষর মন দিয়ে বুঝে নিল৷ আমি কিছুক্ষণ দেখার পর টিভিতে নিউজ চালিয়ে বসলাম৷ আজ খুব স্বাভাবিক কারণেই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান করা যায়নি৷ অমিয়বাবুর কেন্দ্রে ফের উপনির্বাচন করতে হবে৷ দলীয় ও বিরোধী পক্ষের নেতারা বিভিন্ন বক্তব্য রাখছেন৷ বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোস অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে জানিয়েছেন, অমিয়বাবুর মতো মহান নেতার মৃত্যুতে রাজ্য রাজনীতিতে গভীর শূন্যতা তৈরি হল৷ রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভেদ থাকলেও অমিয় চক্রবর্তীর সততা ও লড়াকু মনোভাবের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল৷ বিনয়বাবুর বক্তব্য শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল আজ ক্যাফেতে শোনা রূপমের কথাগুলো৷ বিনয়বাবুর পার্টির তরফ থেকে ইউনিকর্ন এজেন্সিকে অ্যাপয়েন্ট করা হয়েছিল অমিয়বাবুর লুপহোলস খোঁজার জন্য৷ কী আশ্চর্য এই রাজনীতির জগৎটা!

টাপুরদির ফোনটা ডাইনিং টেবিলের উপর বাজছে৷ উঠে গিয়ে ফোনটা এনে দিলাম টাপুরদির হাতে, অর্জুনদার ফোন৷ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত সাড়ে এগারোটা বাজে৷ টাপুরদিকে শুভরাত্রি জানিয়ে শুতে গেলাম ঘরে৷ অর্জুনদা এত ব্যস্ততার মধ্যেও টাপুরদিকে ফোন করেছে৷ এর মধ্যে আমি আর থাকি কেন?

টাপুরদির ডাকে ঘুম ভাঙল, দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সবে ভোর পাঁচটা বাজে৷ বালিশে মুখ গুঁজে বললাম, ‘এত ভোরে উঠে কী করব?’

টাপুরদি নিষ্ঠুরের মতো পরদা টেনে খুলে দিল৷ সকালের সূর্যের আলো আমার শোয়ার ঘরে ঢুকে সারা ঘর ঝলমল করে উঠল, ঘুমের রেশটুকু নিমেষে কেটে গেল৷ বিছানায় উঠে বসলাম৷ বললাম, ‘কী ব্যাপার বলো তো? কীভাবে এগোবে কিছু ঠিক করলে?’

‘আমরা আজ জামশেদপুর যাব৷ তাড়াতাড়ি স্নান করে রেডি হয়ে নে, কুইক৷ সাড়ে সাতটায় হাওড়া থেকে ট্রেন৷ ছ’টার মধ্যে এখান থেকে বেরোতে হবে৷ দেরি হলে ট্রেন মিস করব,’ বলল টাপুরদি৷

‘জামশেদপুরে?’ প্রশ্নটা করেই মনে হল তন্ময়ের দিদির বাড়ি জামশেদপুরে৷ রিদ্ধিমার মুখে শুনেছিলাম৷

‘কোথাও থেকে তো শুরু করতে হবে, তাই না? জামশেদপুর থেকেই শুরু করা যাক৷ দেখা যাক, যদি কিছু থ্রেড পাওয়া যায়!’ টাপুরদি বলল৷

দেরি না করে বিছানা ছাড়লাম৷ আধ ঘণ্টার মধ্যে স্নান সেরে ত্বরিতগতিতে তৈরি হয়ে নিলাম৷ আদ্যন্ত স্বাস্থ্য সচেতন টাপুরদি দেখি তড়িঘড়ি করে কতকটা বাধ্য হয়েই ইন্সট্যান্ট নুডলস বানিয়ে ফেলেছে৷ দুই জনে গোগ্রাসে সেটাই গলাধঃকরণ করলাম৷ আর সময় নেই, বেরোতে হবে৷ টাপুরদি ক্যাব বুক করে ফেলল৷ সব সেরে যখন আমরা ক্যাবে উঠলাম, ঘড়িতে ঠিক পাঁচটা পঞ্চান্ন বাজে৷

নম্বর মিলিয়ে ট্রেনের জানালার ধারের সিটে গুছিয়ে বসে টাপুরদিকে প্রশ্ন করলাম, ‘তন্ময়ের সঙ্গে তো শুনেছি ওর দিদির সম্পর্ক ভালো ছিল না৷ যোগাযোগও তেমন একটা ছিল না৷ ওখানে গিয়ে কি লাভ কিছু হবে আদৌ? তোমার কি মনে হয় ও কলকাতা থেকে পালিয়ে জামশেদপুর যাবে?’

জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল টাপুরদি, ‘না রে৷ ওকে জামশেদপুরে পাব, সেই আশা নিয়ে ওখানে যাচ্ছি না৷ বরং আমি নিশ্চিতভাবে জানি, ওকে ওখানে পাব না৷ সমস্যা হল, এই কেসটা বলতে পারিস ডেডলক হয়ে আছে৷ ঢোকার দরজা সব বন্ধ৷ এজেন্সির ভিতরে ঢুকে আমরা ইনভেস্টিগেট করতে পারব না৷ ওখানে আদতে কী হয়েছিল সেটা বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়৷ এজেন্সির সঙ্গে আমাদের যে ক্ষীণ যোগসূত্র ছিল রূপম, সেও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে সে কোনোরকম সাহায্য করতে পারবে না৷ এগোতে না পারলে কেসটা ছেড়ে দিতে হয়৷ তার আগে একটু চেষ্টা করে দেখতে চাই রে৷ দেখা যাক, অন্য রাস্তা দিয়ে ঢোকা যায় কি না!’

‘অনেক বছর হয়ে গেল তন্ময়ের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই,’ গম্ভীর মুখে বলল সনকা আইচ, তন্ময়ের দিদি৷ টাপুরদি সম্ভবত রিদ্ধিমার থেকে জোগাড় করেছিল তন্ময়ের দিদির ঠিকানা৷ এখানে এসে পরিচয় দিয়ে আসার কারণ জানাতে প্রায় গলাধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল৷ বেশ বোঝা গেল, দিদি ও ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কটা যারপরনাই তিক্ত৷ অথচ মাতৃপিতৃহীন ভাই-বোনের ক্ষেত্রে তো উলটোটাই হওয়ার কথা ছিল৷

অনেক সাধ্যসাধনার পর বেশি সময় নষ্ট করব না কথা দিয়ে ভিতরে ঢোকার অনুমতি পেয়েছি আমরা৷ ছোট্ট দোতলা বাড়ি, একতলাটা ভাড়া দেওয়া৷ দোতলায় আইচ দম্পতি থাকেন৷ সনকাদেবীর স্বামী বাড়িতে নেই৷ সনকাদেবীকে দেখে মনে হল আমাদের উপস্থিতিতে তিনি যথেষ্ট বিরক্ত৷ দরজার সামনে দাঁড়িয়েই জানিয়ে দিলেন তন্ময়ের কোনো খোঁজ তিনি রাখেন না, রাখার প্রয়োজনও বোধ করেন না৷

ঘরে এসে বসলাম৷ ছিমছাম সাজানো গার্হস্থ৷ সনকাদেবীর বয়স পঁয়তাল্লিশের কম হবে বলে মনে হয় না৷ মোটাসোটা থলথলে চেহারার কারণে আরও বেশি বয়স্ক লাগে৷ কিছু মানুষ আছে যাদের মুখের রেখায় চিরস্থায়ী অসন্তাোষ বিরাজ করে৷ সনকাদেবীও মনে হল সেই গোত্রের মানুষ৷ অযাচিত হয়েই আমরা সোফায় বসলাম৷ গৃহকর্ত্রী দাঁড়িয়েই রইলেন ঠায়৷ যেন আমাদের বিদায় করেই একবারে বসবেন তিনি৷ আমার নিজেরও এক মুহূর্ত আর সেখানে বসতে ইচ্ছে করছিল না৷ টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত৷ টাপুরদি শান্ত গলায় বলল, ‘সেরকম কেন, সেটাই তো জানতে চাইছি৷’

উত্তেজিত ভঙ্গিতে সনকাদেবী বললেন,‘সেটা আপনাকে কেন বলব? আমাদের পারিবারিক ব্যাপার আপনার কাছে ডিসক্লোজ করব কেন? দেখুন, আপনাদের এখানে আসাটা আমার হাজব্যান্ড পছন্দ করবেন না৷ এখান থেকে আপনারা চলে যান৷’

‘পারিবারিক ব্যাপার?’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি, ‘কেমন পরিবার বলুন তো? আপনার একমাত্র ভাই মিসিং, তার কোনো খোঁজই রাখেন না আপনি৷ অনাথ ভাইয়ের সমস্ত সম্পত্তি গাপ করে তাকে পথে বসানোটাই বুঝি আপনার পারিবারিক মূল্যবোধ?’

‘কার সম্পত্তি? কে গাপ করেছে?’ দপ করে জ্বলে উঠলেন সনকাদেবী৷

টাপুরদি একইরকম নির্লিপ্ত গলায় বলল, ‘কার আবার সম্পত্তি? বাবামায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকার আপনারা ভাই-বোন দুজনে হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক৷ কিন্তু সকলেই জানেন আপনারা তন্ময়বাবুর নাবালকত্বের সুযোগ নিয়ে ওকে বঞ্চিত করেছেন৷’

টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল টাপুরদি বোধ হয় সনকাদেবীকে ইচ্ছে করে আরও বেশি করে রাগিয়ে দিচ্ছে৷ সনকাদেবীর মুখখানি আগুনের মতো গনগনে লাল হয়ে উঠেছে৷ ভদ্রমহিলা বোধ হয় উচচ রক্তচাপের রোগী, কিছুটা স্নায়বিক প্রকৃতির৷ ঘোঁতঘোঁতে স্বরে বলে উঠলেন, ‘কী জানেন আপনি আমাদের ব্যাপারে? হ্যাঁ? কে লাগিয়েছে আপনাকে আমাদের পেছনে? তন্ময়, না? বেশি চালাক ভাবে ও নিজেকে? জেনে রাখুন, আমরা যদি চাইতাম, ওকে পড়াশোনা শেখানোর টাকাটুকুও দিতাম না, বোর্ডিংয়ে রেখে পড়ানোর খরচও বইতাম না৷ ঘাড় ধরে রাস্তায় বের করে দিলেও কেউ কিছু বলতে পারত না আমাদের৷ আইনত আমার বাবার সম্পত্তিতে তন্ময়ের কোনো অধিকারই নেই৷ যেটুকু দিয়েছি, দয়া করে দিয়েছি৷ স্বামীর বিরুদ্ধে, পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে দিয়েছি ওকে৷ গিয়ে বলে দেবেন তন্ময়কে৷ আইন আদালত করতে চাইলে আমরাও ছাড়ব না৷ তাতে আমাদের কিছু যাবে আসবে না, ওরই সম্মান নষ্ট হবে৷’

টাপুরদিও এবার যেন তন্ময়ের হয়ে ওকালতি করতে শুরু করল৷ গম্ভীর মুখে বলল, ‘এ-রকম আপনি কীভাবে বলতে পারেন? তন্ময় যদি তার বাবামায়ের সম্পত্তি ক্লেইম করতে চায়, কোর্ট অফকোর্স ওর ডিমান্ডকে গুরুত্ব দেবে, তাই না? আপনারা অন্যায়ভাবে ওর ভাগের সম্পত্তিও দখল করে বসে আছেন৷’

‘অন্যায়ভাবে?’ প্রায় গর্জন করে উঠলেন সনকাদেবী, ‘কে বলেছে অন্যায়ভাবে? ন্যায়ত আমার বাবার অর্জিত অর্থের উপর ওর কোনো অধিকারই নেই৷ কারণ ওর সঙ্গে আমাদের বংশের কোনো সম্পর্কই নেই৷’

‘মানে?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘কেন? যে আপনাকে এখানে ওকালতি করতে পাঠিয়েছে, সে বলেনি আপনাকে?’ মুখ বেঁকিয়ে বিরক্তি ভরে জিজ্ঞাসা করলেন সনকাদেবী৷ বললেন, ‘না জেনে থাকলে জেনে রাখুন, তন্ময় আমার মায়ের অবৈধ সন্তান৷ যদিও ওই মহিলাকে মা বলতে ঘেন্না করে আমার৷ ছোটো থেকে তন্ময়কে নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে অশান্তি দেখে বড়ো হয়েছি৷ বাবা হার্ট অ্যাটাক করে মারা যানও সেই অশান্তির জেরেই,’ ভদ্রমহিলা জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে বলতে থাকলেন, ‘পাপ পাপ, বুঝলেন না? মায়ের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছিল৷ গলায় দড়ি দিলেন তাই৷ আমি জানি না কী হয়েছিল৷ ততদিনে আমি বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়িতে৷ তন্ময় জানলেও জানতে পারে৷ তবে যা হয়েছে বেশ হয়েছে৷ নিজের মা বলে তার প্রতি আমার একটুও করুণা হয় না৷ আর শুনুন, আমার মা চাকরি করতেন৷ মায়ের মৃত্যুতে যা টাকাপয়সা মায়ের ছিল, তা আমরা পুরোটাই তন্ময়ের নামে করে দিয়েছিলাম৷ যদিও মায়ের গর্ভজাত সন্তান হিসেবে তাতে আমারও ভাগ ছিল, কিন্তু আমি সেই টাকা ছুঁইনি৷ আমি ঘেন্না করি আমার মাকে৷ ওই টাকা দিয়েই নামি বোর্ডিংয়ে থেকে লেখাপড়া করেছে তন্ময়৷ তবে আমার বাবার সম্পত্তি থেকে এক পয়সাও পাবে না ও৷ আপনারা যা করতে পারেন, করে নিন গে৷’

‘তন্ময় তাহলে জানে ওর জন্মবৃত্তান্ত?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘জানবে না কেন? সবই জানে,’ বললেন সনকাদেবী, ‘এসব কথা কি চাপা থাকে? জন্ম থেকেই বাবা-মায়ের অশান্তিগুলো তো ও-ও দেখেছে৷ ঝগড়াঝাঁটি তো ওকে লুকিয়ে কিছু হয়নি৷’

‘শেষ প্রশ্ন,’ উঠে দাঁড়িয়ে বলল টাপুরদি, ‘আপনার আর বেশি সময় নেব না৷ কিন্তু এই প্রশ্নটার উত্তর আশা করি পাব আপনার থেকে৷’

সনকাদেবী উত্তর দিলেন না, শুধু তাকালেন টাপুরদির মুখের দিকে৷ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘তন্ময়ের বাবা কে?’

‘আমি জানি না,’ বললেন সনকাদেবী৷ তাঁর মুখের রেখা বেশ কঠিন৷ বোঝা গেল, জানলেও বলবেন না৷ একটু থেমে বললেন, ‘কেন, তন্ময়কেই জিজ্ঞাসা করে নিন না৷ সে-ই সব বলবে৷’

টাপুরদি ব্যাগ থেকে নিজের কার্ড বের করে সনকাদেবীর হাতে দিল৷ বলল, ‘যদি কিছু বলতে চান, কিছু মনে পড়ে আমাকে ফোন করে জানাবেন৷ তন্ময় খুব বিপদের মধ্যে আছে৷ হয়তো আপনার দেওয়া কোনো ছোটোখাটো ইনফর্মেশনও ওকে বাঁচাতে আমাদের কাজে লাগতে পারে৷’

আমাদের বাইরের গেট অবধি এগিয়ে দিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে গেটটা টেনে বন্ধ করলেন সনকাদেবী৷ তারপর হঠাৎ কী মনে করে বললেন, ‘আপনি ডিটেকটিভ?’

টাপুরদি কিছু বলল না, শুধু হাসল৷ সনকাদেবী একটু দ্বিধা করে মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন আছে তন্ময়? কী হয়েছে ওর? ও একদম মায়ের মতো দেখতে ছিল ছোটো থেকে৷ অনেকদিন দেখি না ওকে!’

‘দেখতে চেয়েছিলেন কখনো?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

সনকাদেবী কিছু বললেন না, শুধু উৎগত দীর্ঘনিশ্বাস চেপে বললেন, ‘আপনারা এখন আসুন৷ আমার স্বামীর ফেরার সময় হল৷ আর আসবেন না এখানে৷’

ফোনটা রিং হয়ে হয়ে বেজে গেল৷ আবার কল করতে কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওই প্রান্তে রিদ্ধিমার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘সরি, অন্য ঘরে ছিলাম৷ ফোনের রিং শুনতে পাইনি৷ কিছু খবর পেলেন তন্ময়ের?’

ফোনের স্পিকার অন রেখেছিল টাপুরদি৷ সব কথাই শুনতে পাচ্ছিলাম আমি৷ টাপুরদি রিদ্ধিমার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, ‘রিদ্ধিমা, আপনি কি আমায় বলতে পারবেন তন্ময়ের মা কোথায় চাকরি করতেন? আর হ্যাঁ, ওর মায়ের নাম কী?’

‘তন্ময়ের মা?’ রিদ্ধিমার কণ্ঠে বিস্ময়৷

‘হ্যাঁ, জানেন আপনি কিছু? এনিথিং ক্যান বি হেল্পফুল!’

‘যতদূর জানি, বিরাটির দিকে কোনো প্রাইমারি স্কুলের টিচার ছিলেন৷ কোথাকার বলতে পারব না৷ নাম অনামিকা রায়৷ আসলে তন্ময় ওর অতীতের ব্যাপারে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করত না৷ প্রথম প্রথম আমি জিজ্ঞাসা করতাম, ও ভাসা ভাসা জবাব দিয়ে এড়িয়ে যেত বরাবর৷ তারপর মনে হয়েছিল ছোটোবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে, দিদির থেকে আঘাত পেয়ে ওর মনের ভিতর যে ক্ষতটা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা ওকে যন্ত্রণা দেয়৷ সেটা থেকে পালাতে চায় ও৷ তাই পরে আর আমিও কিছু জিজ্ঞাসা করতাম না৷ আসলে কী জানেন তো মিস ব্যানার্জি, আমরা দুজনেই নির্বান্ধব, ভীষণ একা৷ আমাদের একাকীত্ব ও তিক্ত শৈশবের যন্ত্রণা আমাদের বেঁধেছিল৷ তন্ময় যদি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়, এই পৃথিবীতে কারও কিছু যাবে আসবে না বিশ্বাস করুন৷ কিন্তু আমি আবার একা হয়ে যাব৷’

টাপুরদি একটু চুপ করে রইল৷ ফোনের ওপ্রান্তে রিদ্ধিমার আবেগ, যন্ত্রণার তরঙ্গ আমাদেরও স্পর্শ করছিল৷ টাপুরদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর মুখের রেখাগুলি কোমল হয়ে এসেছে৷ নীরবতা ভঙ্গ করে টাপুরদি বলল, ‘তন্ময়কে খুঁজে পেতে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব রিদ্ধিমা৷ কিন্তু সে জন্য আমাদের ওর সম্পর্কে আরও জানতে হবে৷ আর ওর এজেন্সিতে ঢুকতে হবে, যেভাবেই হোক৷ আপনাকে কোনোভাবে রূপমকে কনভিন্স করতে হবে৷ পারবেন?’

‘না মিস ব্যানার্জি, আমার মনে হয় না রূপম আর রাজি হবে,’ বিষণ্ণ স্বরে বলল রিদ্ধিমা৷

‘ওই অফিসে আপনাকে কে কে চেনে তন্ময়ের গার্লফ্রেন্ড হিসেবে?’ টাপুরদি জানতে চাইল৷

‘দুই-তিন জন৷ তন্ময় ব্যক্তিগত জীবন সবার সঙ্গে শেয়ার করা পছন্দ করত না৷ একটু চুপচাপ, মুখচোরা স্বভাবের ছিল ও,’ বলল রিদ্ধিমা৷

‘তার মানে আপনার পক্ষে ওই অফিসে ঢোকা সেফ হবে না৷ সেক্ষেত্রে আমায় যেতে হবে,’ বলল টাপুরদি৷

‘আপনি যাবেন? ইউনিকর্নের অফিসে? সেটা বেশি রিস্ক নেওয়া হয়ে যাবে না? ওদের সিকিওরিটি খুব স্টং৷ ঢুকবেন কী করে?’ রিদ্ধিমার কণ্ঠে বিস্ময়৷

‘সেই ব্যবস্থা আপনাকে করতে হবে রিদ্ধিমা৷ আপনার জার্নালিজমের ব্যাকগ্রাউন্ড আমাদের সাহায্য করবে৷ আপনি আমাদের দুইজনের জন্য ফেক আইডেন্টিটিতে আপনার খবরের কাগজের দুটো জার্নালিস্ট আই-কার্ড জোগাড় করে দিতে পারবেন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

রিদ্ধিমা চুপ করে থেকে একটু ভাবল৷ তারপর বলল, ‘সে না হয় ব্যবস্থা করা গেল৷ কিন্তু ওরা আজ না হোক কাল আপনার আসল পরিচয় খুঁজে বার করেই ফেলবে৷’

‘জানি৷ তাতে কিছু যাবে আসবে না৷ আমি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে পরিচয় দেব৷ ঝামেলা হলে পরে দেখা যাবে সেটা কীভাবে মেটানো যায়৷’

‘ঠিক আছে, আমি দেখছি৷ যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি,’ বলল রিদ্ধিমা৷

ফোনটা রাখার পর আমি টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘রিদ্ধিমাকে বললে না আমাদের জামসেদপুর যাওয়ার খবরটা?’

‘কী দরকার?’ একটু অন্যমনস্ক গলায় বলল টাপুরদি, ‘এই মুহূর্তে কাউকেই কিছু বলার দরকার নেই,’ বলতে বলতে টাপুরদি মোবাইলে কাউকে ডায়াল করতে শুরু করল৷ ফোনটা কানে ধরে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর অপর প্রান্তে কেউ বোধ হয় ফোন তুলল৷ টাপুরদি হাসিমুখে কুশল বিনিময়ের পর বলল, ‘তুই তো প্রাইমারি স্কুল বোর্ড কাউন্সিলে আছিস, তাই না মিহিকা?’

অপর প্রান্তে টাপুরদির মিহিকা নাম্নী বন্ধুটি সম্ভবত সম্মতি জানাল৷ টাপুরদি বলল, ‘আমায় একটা হেল্প কর না৷ বিরাটির দিকে কোনো প্রাইমারি স্কুলে অনামিকা রায় নামের টিচার ছিলেন৷ বছর পনেরো-ষোলো আগে মারা গেছেন৷ তাঁর সম্পর্কে ডিটেলস চাই৷ জানি কাজটা সহজ নয়৷ কিন্তু খবরটা খুব দরকার রে৷’

আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ফোনটা রাখল টাপুরদি৷ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি হঠাৎ তন্ময়ের মাকে নিয়ে পড়লে কেন?’

‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই৷ তাই আমিও ছাই ওড়াচ্ছি৷ দেখ মিতুল, এতদিন ধরে আমার সঙ্গে কাজ করার পর এটা বোধ হয় বুঝেছিস, জুতোর কাদা দেখে, হাতের কাটা দাগ দেখে সব কিছু জেনে যাওয়া সেসব গল্পে হয়৷ বাস্তবে যদি হয়ও, তাহলেও আমি মেনে নিচ্ছি আমার অত বুদ্ধি নেই৷ শার্লক হোমস শুধু অবজার্ভেশন দিয়ে কেস সলভ করতে পারেন৷ মিস মার্পল কেস শুনেই শুধু ডিডাকশন দিয়ে বলে দিতে পারেন অপরাধী কে! আমরা রিয়েল লাইফ গোয়েন্দারা অতটা ব্লেসড নই৷ অবজার্ভেশন ক্ষমতা না থাকলে ডিটেকটিভ হওয়া যায় না এটা যেমন সত্যি, আবার শুধু অবজার্ভেশন দিয়ে কেস সলভ হয় না এটাও সত্যি৷ আমাদের মাথার সঙ্গে সঙ্গে গা-ও ঘামাতে হয়, ছোটাছুটি করতে হয়৷ সব পসিবিলিটি খতিয়ে দেখতে হয়৷ আমার জন্য কোনো সিধু জ্যাঠা বা মাইক্রফট হোমস নেই৷ ঘরের কোণে বসে শুধু বুদ্ধি খাটিয়ে অপরাধী ধরতে পারি না আমি৷ আমায় ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথডে ডিডাকশন করতে হয়৷ ভুল করি, আবার ভুল থেকে শিক্ষা নিই৷ এক্ষেত্রেও তাই৷ আমি জানি না এই কেস পোয়ারো বা ফেলুদার হাতে গেলে তাঁরা কী করতেন, কিন্তু আমি কোনো নির্দিষ্ট পথ এখনও খুঁজে পাইনি৷ তাই সব সম্ভাবনাই আমায় খতিয়ে দেখতে হবে৷’

মনে হল টাপুরদি একটু হতাশ হয়ে পড়েছে৷ টাপুরদি মুখে যাই বলুক, আমি খুব ভালো করেই জানি টাপুরদির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অত্যন্ত প্রখর৷ একেকটা কেসের পেছনে টাপুরদি কতটা পরিশ্রম করে সেটা আর কেউ না জানুক, আমি জানি৷ টাপুরদির সঙ্গে থেকে জেনেছি, আসল ইনভেস্টিগেশন কাকে বলে৷ সেটা গল্প-উপন্যাস থেকে অনেকটাই আলাদা৷ গল্পের গোয়েন্দারা ক্লান্ত হয় না, হারে না, ভয় পায় না, তাদের মানসিক শক্তি অসীম৷ টাপুরদিকে না জানলে আমি জানতেও পারতাম না, বাস্তবে গোয়েন্দাগিরিও আর পাঁচটা পেশা থেকে আলাদা নয়৷ গোয়েন্দারাও মানুষ, কোনো সুপারহিরো নয়৷

তন্ময় বেশ কিছুদিন হল নিরুদ্দেশ৷ আদৌ ও কী অবস্থায় আছে, আমরা কেউ জানি না৷ এখনও আমরা পুরোটাই অন্ধকারে আছি৷ ব্যর্থতাকে টাপুরদি ভয় পায় না জানি৷ কিন্তু যেখানে একটি মানুষের প্রাণের ভয় আছে, তার ভালো-মন্দ জড়িয়ে আছে, সেখানে এগোতে না পারাটা টাপুরদিকে ভিতরে ভিতরে অশান্ত করে তুলেছে৷ টাপুরদির মনটা একটু অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য টিভিটা চালালাম৷ টিভিতে অমিয় চক্রবর্তীর ছেলে অম্লান চক্রবর্তী স্টুডিয়োতে স্টার রিপোর্টারকে ইন্টারভিউ দিচ্ছেন৷ অম্লান চক্রবর্তী পার্টির যুব নেতা, বয়স পঁয়তাল্লিশের বেশিই হবে৷ দলে তাঁর প্রতিপত্তি অমিয়বাবুর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়৷ অমিয়বাবু তাঁকেই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তুলছিলেন৷ অমিয়বাবুর অবর্তমানে পার্টির রাশ তাঁরই হাতে৷ সদ্য শেষ হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে অম্লানবাবু তাঁর কেন্দ্র থেকে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন৷ পরের সপ্তাহে অমিয়বাবুর নির্বাচন কেন্দ্রে উপনির্বাচনের দিন স্থির হয়েছে, যদিও নির্বাচনের ফলাফল কী হবে তা সকলেরই জানা৷ খুব স্বাভাবিক, অমিয়বাবুর মৃত্যুতে সিমপ্যাথি ভোটের পুরোটাই পাবে তাঁর কেন্দ্রের নতুন প্রার্থী৷ অফিশিয়ালি ঘোষণা করা না হলেও অমিয়বাবুর অবর্তমানে তাঁর ছেড়ে যাওয়া কুর্সিতে যে অম্লানবাবু বসবেন, সে ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, তাঁর থেকে আর যোগ্য কে-ই বা আছে? পার্টির ভিতরেও অম্লানবাবুর প্রভাব অপরিসীম, পার্টির যুব সংগঠনকে গোড়া থেকে গড়ে তুলেছেন তিনি নিজের হাতে৷ দলকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন তিনি৷

সন্ধেবেলায় আজ অর্জুনদা ফোন করেছিল৷ যদিও এখনও পুলিশ অফিশিয়ালি কিছু ঘোষণা করেনি, কিন্তু অমিয় চক্রবর্তীর পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট এসে গেছে আজ দুপুরে৷ মৃত্যুর কারণ যদিও হার্ট অ্যাটাক, কিন্তু অমিয়বাবুর শরীরে পাওয়া গেছে মারাত্মক বিষ বাট্রাকোটক্সিন৷ টাপুরদি দেখলাম নিউজ দেখতে দেখতে এবার গুগলে বিষের নাম দিয়ে সার্চ করছে৷ দেখে ভালো লাগল, কিছু সময়ের জন্য হলেও টাপুরদির মন অন্য ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে৷ টাপুরদিকে হতাশ দেখতে আমার ভালো লাগে না৷

আমার ফোনটা বাজছে৷ হাতে নিয়ে দেখলাম অফিস থেকে ফোন৷ কথা বলা শেষ করে ফোন কাটতে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘কী রে, এখন অফিসের ফোন?’

হাই তুলে বললাম, ‘হুম৷ আসলে রাত তিনটেতে একটা জব রান করে৷ তাতে সারাদিন ধরে বিভিন্ন সিস্টেমে স্টোর করা সব ফাইলের মেইন সার্ভারে ব্যাক আপ হয়৷ সেই জবটা যে দেখে তার শরীর খারাপ৷ তাই আমারও কপাল খারাপ৷ আজ আমার নাইট ডিউটি৷’

টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন কিছু ভাবছে গভীরভাবে৷

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার আবার কী হল? কী এত ভাবছ?’

টাপুরদির মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল উজ্জ্বল হাসিতে৷ বলল, ‘তুই নোবেল প্রাইজ পাবি মিতুল৷’

নিউটাউনে ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসের রিসেপশনের লবিতে বসে আছি আমি আর টাপুরদি৷ বুকের ভিতরটা ধুকপুক করছে৷ আজ আমরা সংঘমিত্রা ব্যানার্জি ও মৈথিলী সেন নই৷ টাপুরদির নাম নয়নিকা দাস, আমি রত্নদীপা নিয়োগী৷ টাপুরদি একজন ফ্রিল্যান্স নিউজ রিপোর্টার, আমি ফোটোগ্রাফার৷ আমরা এখানে এসেছি, ইউনিকর্নের বর্তমান মালিক ও সিইও সুবিনয় মুখার্জির ইন্টারভিউ নিতে৷ পুরো ব্যাপারটা প্রায় নিখুঁতভাবে সাজিয়েছে রিদ্ধিমা৷ মানুষ দুটি মিথ্যে হলেও নামদুটি সত্যি৷ দুজনেই ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্টার৷ ইউনিকর্ন থেকে যদি নাম দিয়ে ভেরিফাই করেও, মিথ্যেটা ধরা পড়বে না সহজে৷ রিসেপশনে একজন বেশ সুন্দরী তরুণী বসে আছেন৷ রিসেপশন ডেস্কের সামনে ব্রোঞ্জের তৈরি ইউনিকর্নের লোগো৷ সকলে যে যার কাজে ব্যস্ত৷ বেশ একটা পেশাদারি পরিবেশ অফিস জুড়ে৷ বুঝতে অসুবিধে হয় না, ইউনিকর্ন নেহাত ছোটোখাটো সিকিউরিটি এজেন্সি নয়, বরং এই ব্যাপারে অগ্রণী সংস্থা৷

প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর সিইওর ঘরে ডাক পড়ল আমাদের৷ সুবিনয় মুখার্জি সম্পর্কে মোটামুটি রিসার্চ করেই এসেছিলাম, গুগলে ছবিও দেখেছিলাম৷ কিন্তু সিইওর বিশাল কেবিনে ঢুকে থমকে গেলাম৷ গুগলের অস্পষ্ট ছবি দেখে সত্যিই বোঝা যায়নি ভদ্রলোক এতটা সুদর্শন৷ গুগল বলছে বয়স পঁয়তাল্লিশ, কিন্তু সেটা দেখে বোঝার উপায় নেই৷ ঘন নীল রঙের স্যুট পরিহিত সুবিনয় মুখার্জি বসে আছেন বিশাল টেবিলের ওপ্রান্তে৷ আমাদের দেখে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের জন্য ভ্রূ-টা সামান্য কোঁচকালেন, তার পরে হাসিমুখে ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টের ইংরেজিতে বললেন, ‘আসুন আসুন৷ আসন গ্রহণ করুন!’

এত সুন্দর করেও কেউ হাসতে পারে! এই মুহূর্তে আমার মনে হল, সুবিনয়বাবু অনায়াসে সিনেমায় হিরো হতে পারতেন৷ কিছু কিছু মানুষের উপস্থিতিটাই অনেক কিছু বদলে দেয়, সুবিনয় মুখার্জি হলেন সেই গোত্রের লোক৷ টাপুরদি আমার মুগ্ধ হতভম্ভ দশা দেখেই বোধ হয় কনুই দিয়ে আস্তে করে ঠেলা মারল৷ আমরা টেবিলের সামনে রাখা দুটি চেয়ারে গিয়ে বসলাম৷

টাপুরদি নিজেদের ছদ্ম পরিচয় দিয়ে বলল, ‘তাহলে ইন্টারভিউটা শুরু করা যাক?’

সুবিনয়বাবু তাঁর সবচেয়ে সুন্দর হাসিটা হেসে বললেন, ‘কিন্তু কলকাতা শহরে এত বিখ্যাত লোক থাকতে হঠাৎ আমার ইন্টারভিউ কেন, সেটা তো বললেন না?’

টাপুরদিও জবরদস্ত অভিনেত্রী৷ মিষ্টি হেসে বলল, ‘বিখ্যাত মানুষের অভাব নেই সত্যি৷ কিন্তু বাঙালি সফল ব্যবসায়ীর বড়ো অভাব৷ আর এই ধরনের ব্যাবসার দিকে কম বাঙালিই যায়৷ ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেস আজ শুধু একটা সিকিউরিটি এজেন্সিতে থেমে নেই৷ এতটা ভার্সেটাইল ওয়েতে বিজনেস স্প্রেড করার কথা যে মানুষটি ভেবেছেন, তার কথা আরও বেশি লোকের জানা দরকার বই কী!’

সুবিনয়বাবু এতক্ষণ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে টাপুরদির কথা শুনছিলেন৷ এবার টেবিলের দিকে একটু ঝুঁকে বসে ভরাট গলায় বললেন, ‘বলুন, কী জানতে চান?’

টাপুরদি রেকর্ডার অন করল৷ তারপর সেটা টেবিলের উপর রেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘এই বিজনেসে আসার কথা ভাবলেন কেন?’

সুবিনয়বাবু বলতে শুরু করলেন, ‘আমাদের কিন্তু তিন প্রজন্মের ব্যবসায়ী পরিবার৷ এই এজেন্সি ছাড়াও আমাদের বেশ কিছু পারিবারিক ব্যাবসা আছে৷ সেগুলি আমার ফ্যামিলির অন্যরা দেখাশোনা করে৷ ইংল্যান্ড থেকে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পড়ে আসার পর আমি নিজের আলাদা বিজনেস শুরু করার কথা ভাবি৷ আমি কিন্তু বরাবরই খেলাধুলোয় ভালো ছিলাম৷ স্টেট জুনিয়র লেভেলে ক্রিকেট খেলেছি৷ ফাস্ট বোলার ছিলাম৷ ইউকেতে থাকাকালীন প্রফেশনাল রেসলিং করেছি৷ যাই হোক, সংক্ষেপে বলছি, খেলাধুলো, শরীরচর্চার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধির চর্চাটাও বেশ পছন্দ করি আমি৷ তাই ভাবলাম, এমন কিছু করা যাক, যাতে আমার ইন্টারেস্টগুলো কাজে লাগানো যাবে৷ এই হল গে ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসের গোড়াপত্তনের গল্প৷’

‘ইন্টারেস্টিং!’ বলল টাপুরদি, ‘ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেস তো হাই প্রোফাইল ক্লায়েন্টদের নিয়ে কাজ করে, তাই না?’

‘হ্যাঁ, আমাদের বেশ কিছু ভিআইপি ক্লায়েন্টস আছে৷ আসলে ইউনিকর্ন খুবই প্রফেশনাল৷ সেজন্য মার্কেটে অন্যান্য কম্পিটিটরদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে৷ আমাদের কর্মীরা ভীষণ ডেডিকেটেড৷ হাই প্রোফাইল ক্লায়েন্টরা আমাদের এজেন্সির এই অ্যাপ্রোচটাই পছন্দ করে,’ বললেন সুবিনয় মুখার্জি৷

‘আপনারা তো সিকিউরিটি প্রোভাইডার৷ নামে ‘অ্যান্ড সার্ভিসেস’গুলো কী কী? জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷ বুঝলাম সন্তর্পণে আসল প্রশ্নের দিকে এগোচ্ছে টাপুরদি৷

সুবিনয় মুখার্জি তাকালেন টাপুরদির দিকে৷ একটু থামলেন৷ লক্ষ করলাম তাঁর দৃষ্টিতে কৌতুক৷ একটু আশ্চর্য লাগল৷ তিনি বললেন, ‘সার্ভিসেস অনেকরকমই আছে৷ সে ধরুন বিভিন্ন অফিসের বা ব্যক্তিবিশেষের সম্পূর্ণ সিকিউরিটির দিকটা দেখা, সফটওয়ার সিকিউরিটি অ্যাপ ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট, এ-রকম আরও অনেক কিছু৷’

টাপুরদি এতক্ষণ ডিফেন্সে খেলছিল৷ এবার সোজাসুজি অ্যাটাকে গেল৷ বলল, ‘আমি শুনেছি আপনারা ক্লায়েন্টের হয়ে ইনভেস্টিগেশনসও করেন৷ সেটা কি সত্যি?’

সুবিনয়বাবু এবার সোজা হয়ে বসলেন৷ সহজ গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ, করি তো৷’

‘কী ধরনের ইনভেস্টিগেশনস জানতে পারি কি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি৷

‘ক্লায়েন্টদের গোপনীয়তা রক্ষা করা আমাদের পেশার মূল শর্ত৷ সুতরাং আপনার এই প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দিই বলুন তো মিস ব্যানার্জি, ওহ সরি মিস দাস? অবশ্য সেটা তো আপনি নিজে ভালোই জানেন,’ বলে হেসে উঠলেন সুবিনয় মুখার্জি৷ আমার বুকের ভিতর দিয়ে সেই মুহূর্তে যেন একটা হিমশীতল তরঙ্গ খেলে গেল৷ কী সাংঘাতিক লোক, ইনি শুরু থেকেই তার মানে আমাদের পরিচয় জানতেন৷ তবু এতক্ষণ কেমন ভাবলেশহীন মুখে অভিনয় করে গেলেন৷ টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম৷ দেখলাম টাপুরদি স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুবিনয় মুখার্জির চোখের দিকে৷ যেন বক্সিংয়ের রিং-এ দুইজন প্রতিপক্ষ পরস্পরকে মেপে নিচ্ছে৷ লড়াইটা সমানে সমানে৷ সুবিনয়বাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল আমার৷ মনে হল, এ সহজ লোক নয়৷ তাঁর দুই চোখে কৌতুক খেলা করছে৷ এই মুহূর্তে তাঁর সুন্দর মুখটা দেখতে কেমন নিষ্ঠুর লাগছে, কাচের মতো স্বচ্ছ, ছুরির ফলার মতো ধারালো চোখের দৃষ্টি৷ সেই দৃষ্টি দিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন৷ টাপুরদি কিন্তু চোখ সরায়নি৷ এই টাপুরদিকে আমি চিনি, জানি৷ অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে শুধু মনের জোরে কাবু করার ক্ষমতা রাখে টাপুরদি৷

কত মুহূর্ত, সেকেন্ড, মিনিটের হিসেব রাখিনি৷ একসময় মনে হচ্ছিল এই যুদ্ধ বুঝি বা অনন্তকালের৷ কিন্তু একসময় শেষ হল লড়াই৷ কে জিতল কে হারল বোঝা গেল না৷ দেখলাম দুজনের ঠোঁটের কোণেই মৃদু হাসি৷ এবার নীরবতা ভেঙে পাশে রাখা রেকর্ডারটা বন্ধ করল টাপুরদি৷ তারপর হেসে বলল, ‘তাহলে সোজা কথা সোজাভাবেই বলা ভালো, তাই না মিস্টার মুখার্জি? আমার কিছু কথা জানার আছে৷ সেগুলো জেনে গেলেই আমি চলে যাব৷’

‘আর যদি আমি না বলি মিস সংঘমিত্রা ব্যানার্জি? মানে, আপনি ভাবলেন কী করে আপনি নাম ভাঁড়িয়ে আমার অফিসে, আমার কেবিনের ভিতর ঢুকে আসবেন, আর আমি জানতে পারব না? হাউ সিলি! আপনাকে পুলিশের হাতে তুলে দিইনি, এই আপনার অশেষ ভাগ্য৷ বাই দ্য ওয়ে, অনেক নাম শুনেছিলাম আপনার৷ আলাপ করে ভালো লাগল৷ কিন্তু অনেস্টলি, আপনাকে যতটা বুদ্ধিমতী ভেবেছিলাম, ততটা আপনি নন৷ আর এ ক্ষেত্রে তো একটু বেশিই বোকামি করে ফেলেছেন৷ আরেকবার প্রমাণ হল, এই শহরে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন্সের ক্ষেত্রে আই অ্যাম দ্য বেস্ট!’ বলে হা-হা করে অট্টহাসি হাসলেন সুবিনয় মুখার্জি৷ তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, ‘এনি ওয়ে, আই মাস্ট সে দ্যাট ইউ লুক রিয়েলি প্রিটি, ভেরি প্রিটি ইনডিড৷ আপনি যদি ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসের হয়ে কাজ করতে চান, ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম৷ জানেন নিশ্চয়ই আমাদের কাজে প্রিটি ফেসের প্রায়ই দরকার পড়ে৷ তা ছাড়া আপনার আবার লালবাজারেও স্পেশ্যাল কানেকশন্স আছে৷’

রাগে সারা শরীর রি রি করে উঠল৷ টাপুরদি নির্বিকার; হেসে বলল, ‘থ্যাঙ্কস আ লট ফর ইয়োর প্রোপোজাল, মিস্টার মুখার্জি৷ বাট আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড৷ অ্যাকচুয়ালি আই উড প্রেফার ইউ টু বি মাই অপোন্যান্ট, রাদার দ্যান মাই বস! যাই হোক, প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে আমি অবশ্যই আপনাকে জোর করতে পারব না৷ আর আপনি অলরেডি যে কাদায় গলা অবধি ডুবে আছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে আপনি ভয় পাবেন, সেটাই স্বাভাবিক৷ আই টোটালি আন্ডারস্ট্যান্ড ইয়োর সিচুয়েশন!’

‘কী বলতে চাইছেন আপনি?’ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন সুবিনয় মুখার্জি৷ সুবিনয়বাবুর মুখটা দেখে হাসি পেয়ে গেল আমার৷ একেই বলে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি৷

‘আপনি জানেন না আমি কী বলতে চাইছি? আমি কিন্তু আপনাকে আরেকটু বেশি বুদ্ধিমান বলে মনে করেছিলাম,’ কঠিন স্বরে বলল টাপুরদি, ‘ভণিতা না করে এবার কাজের কথায় আসি৷ শুনুন মিস্টার মুখার্জি, আপনি এক্কেবারে যাচ্ছেতাইভাবে ফেঁসে গেছেন৷ বুঝতেই পারছেন, তন্ময়ের হাতে যে ডকুমেন্টগুলো আছে, সেগুলো বাইরে বেরোলে আপনার পায়ের তলার মাটি আর থাকবে না৷ না সরকারে ক্ষমতাসীন দল, না বিরোধী দল, আপনাকে কেউই ছাড়বে না৷ আপনি না বললেও আপনার ক্লায়েন্ট যে যথেষ্ট ক্ষমতাবান লোক, সেটা ধারণা করতে কষ্ট হয় না৷ তো তিনি কি জানেন, আপনি এত গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট জাস্ট হারিয়ে ফেলেছেন?’

‘হারিয়ে ফেলিনি৷ দ্যাট ইডিয়ট তন্ময়...’ গর্জন করে উঠে টেবিলে এক ঘুসি মারলেন সুবিনয় মুখার্জি৷

‘ইয়েস, তন্ময়! সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আমরা দুজনেই তন্ময়কে খুঁজছি, যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে৷ কিন্তু তন্ময়কে খুঁজে বার করাটা খুব জরুরি৷ তন্ময় আপনার এমপ্লয়ি৷ আপনি ভালোভাবেই জানেন ওর যদি কোনো ক্ষতি হয়, যদি ডকুমেন্টগুলো অন্য কারও হাতে গিয়ে পড়ে, ব্যাপারটা অন্তত আপনার জন্য সুখকর হবে না আশা করি৷ তাই যদি আপনি সেগুলি ফেরত পেতে চান, কোঅপারেট করুন আমার সঙ্গে,’ কঠিন কণ্ঠে বলল টাপুরদি৷

‘হাহ, আপনি কি মনে করেন তন্ময়কে খুঁজে বার করার জন্য আমাদের আপনাকে দরকার পড়বে মিস ব্যানার্জি? সেরকম ভাবলে আমি বলব আপনি এখনও মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন,’ মিস্টার মুখার্জি বললেন৷

‘পড়বে মিস্টার মুখার্জি, দরকার পড়বে,’ বলে চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করে বসল টাপুরদি৷ তারপর হেসে বলল, ‘তন্ময় কম্পিউটার থেকে আপনাদের গোপন নথি চুরি করেছে৷ এই কথাই তো সকলকে বলেছেন আপনারা, তাই না?’

‘হ্যাঁ, সেটাই ঘটেছে,’ বললেন সুবিনয়বাবু৷

‘অর্ধসত্য,’ ঠান্ডা গলায় বলল টাপুরদি৷ এবার সামনে এগিয়ে এসে সামনে ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘আমি প্রথম থেকেই ভাবছিলাম, যদি পেনড্রাইভে করে কোনো ফাইল বার করেই নিতে হয়, সেটা তো ও অফিস টাইমে সকলের সামনেই করতে পারত৷ লুকিয়ে কেন করল? তারপর মনে হল, ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অত সহজ নয়৷ ও সেরকম করলেও মূল ফাইলটা আপনাদের সিস্টেমে রয়েই যেত, যেটা মেইন সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত৷ অফিসের সব ক’টা সিস্টেমে স্টোরড সব ফাইলের ব্যাক আপ সেখানেই থাকে৷ তখনই বুঝলাম, ও রাতে লুকিয়ে এসেছিল অন্য কোনো কারণে৷

‘কী কারণ হতে পারে? ভাবতে শুরু করলাম৷ তারপর আমার এই বোনটি দু’দিন আগে কথায় কথায় বলল, ওর অফিসে রাত তিনটের সময় একটা জব রান হয় সিস্টেমে৷ যার ফলে সারাদিনে অফিসে যা যা ডেটা বিভিন্ন সিস্টেমে স্টোর হয়, সেগুলির ব্যাক আপ রাত তিনটেতে গিয়ে মেইন সার্ভারে সেভ হয়ে যায়৷ আমার মাথায় তখুনি ব্যাপারটা ক্লিক করল৷ এই অফিসেও সেরকমই কিছু হয়৷ সেই কারণেই তন্ময় সেদিন রাতে ছুটে এসেছিল৷ সেদিন দিনের বেলায় ফাইলটা সিস্টেমে স্টোর করেছিল ও৷ আপনাকে জানিয়েওছিল সেটার কন্টেন্টের ব্যাপারে৷ আপনি ওকে বিশ্বাস করতেন, তাই আর ফাইলের কপি নিজের কাছে নিয়ে রাখেননি৷ ভেবেছিলেন ব্যাক আপ তো থাকবেই৷ কিংবা হয়তো ওকে বলেছিলেন আপনাকে মেল করে পাঠিয়ে দিতে৷ কিন্তু সেটা ও করেনি৷ হয়তো বাড়ি ফিরে শেষ মুহূর্তে মত বদলেছিল ও৷ তাই ওর সিস্টেমে স্টোর করা ডেটার ব্যাক আপ স্টোর হওয়ার আগেই সেটাকে বের করে নেওয়ার দরকার পড়েছিল৷ ও আসলে কিছু চুরি করতে নয়, নিজের স্টোর করা ফাইলটা সিস্টেম থেকে ডিলিট করতে রাতে লুকিয়ে এসেছিল৷ ঠিক সেই কারণেই ওর পেছনে হন্যে হয়ে পড়েছেন আপনারা৷ যেভাবে শোরগোল বাঁধিয়ে আপনারা তন্ময়কে খুঁজতে শুরু করেছেন, তাতে এই কথাটা বাইরে চাউর হয়ে গেলে আপনারা কিন্তু বেশ বিপদে পড়বেন৷’

সুবিনয় মুখার্জি জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল টাপুরদির দিকে৷ টাপুরদি হেসে বলল, ‘এবার আশা করি মানবেন যে প্রিটি ফেসের সঙ্গে গ্রে ম্যাটারের কোনো ঝগড়া নেই৷ দুটো একসঙ্গেই থাকতে পারে কারও কারও মধ্যে৷ আর একটা কথা, আপনি যে আমাদের আসল পরিচয় জানেন, সেটা আমার শুরু থেকেই জানা ছিল৷ আপনার সম্বন্ধে যেটুকু জেনেছিলাম, তাতে বুঝেছিলাম আপনি চ্যালেঞ্জ পছন্দ করেন৷ তাই মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম, ব্যাপারটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েই আপনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন৷ ছদ্মবেশ ধরে আপনাকে বোকা বানানো নয়, আসলে এজেন্সির ভিতরে আপনার কেবিনে ঢোকাটাই আমার উদ্দেশ্য ছিল৷ আশা করি, একসঙ্গে এই কেসে কাজ করতে আর কোনো আপত্তি নেই আপনার?’

সুবিনয় মুখার্জি চুপ করে কিছু ভাবলেন৷ তারপর বললেন, ‘বলুন, কী জানতে চান?’

টাপুরদি দীর্ঘ একটা নিশ্বাস চেপে হেসে বলল, ‘বেশি কিছু নয়, আপনার ক্লায়েন্টের নামটা, যিনি অমিয় চক্রবর্তীর ইতিহাস খুঁড়ে বার করার কাজে লাগিয়েছিলেন আপনাদের৷’

‘সঞ্জয় পাল,’ গম্ভীর মুখে বললেন সুবিনয় মুখার্জি৷

ইউনিকর্ন থেকে বেরিয়ে ঘড়ি দেখল টাপুরদি৷ তারপর বলল, ‘চল মিতুল, লাঞ্চটা বরং বাইরেই সেরে নেওয়া যাক৷’

সিটি সেন্টারের ফুড কোর্টে বসে চাউমিন আর চিলি চিকেন খেতে খেতে বললাম, ‘তুমি ভদ্রলোককে বেশ কড়কে দিয়েছ, টাপুরদি৷’

টাপুরদি গরম থুকপা চামচে তুলে মুখে দিয়ে বলল, ‘না রে, সুবিনয় মুখার্জি ভীষণ প্রফেশনাল লোক, আর তেমনই বুদ্ধিমান৷ এ-রকম প্রতিপক্ষ পেলে লড়েও সুখ৷’

‘লোকটা কী ভীষণ হ্যান্ডসাম টাপুরদি, দেখে মনে হয় হলিউড হিরো৷ প্রথমবার দেখে আমার মাথা ঘুরে গিয়েছিল পুরো,’ হেসে বললাম আমি৷

‘সেটা ঘরে ঢোকার পর তোর মুখের ভেবলে যাওয়া দশা দেখে শুধু আমি কেন, সুবিনয় মুখার্জি নিজেও বুঝেছেন৷ যা ড্যাবড্যাব করে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে ছিলি৷ তবে ভদ্রলোক বোধ হয় মহিলাদের চোখে মুগ্ধতা দেখে অভ্যস্ত৷ আর তোর জ্ঞাতার্থে জানাই, সুবিনয় মুখার্জির মা ছিলেন ডাচ৷ পরবর্তীতে ডিভোর্স করে ও দেশেই থেকে যান উনি৷ সুবিনয়বাবুর বাবা ছেলেকে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন৷ তার উপর উনি স্পোর্টসম্যান৷ তাই তোর ওঁকে হলিউড হিরো বলে মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়,’ বলল টাপুরদি৷

‘বাপ রে, তুমি সুবিনয় মুখার্জির এত ঠিকুজিকুষ্ঠি জানলে কী করে?’ চিকেনে কামড় বসিয়ে বললাম আমি৷

‘চোখ-কান খোলা রাখতে হয় বাছা৷ সুবিনয়বাবুর ফ্যামিলি বেশ বিখ্যাত, তিন প্রজন্মের ব্যবসায়ী ওরা সে তো শুনলিই৷ এ ছাড়াও আরও অনেক রকম ব্যাবসা আছে৷ সুবিনয় মুখুজ্জেকে কিন্তু গুগলবাবুও চেনেন৷ একটু সার্চ করলে অনেক তথ্য তুইও পেয়ে যেতিস৷ বাকিটা জেনেছি রূপমের কাছে,’ বলল টাপুরদি৷

‘আচ্ছা, বুঝলাম,’ বলে খাওয়াতে মন দিলাম৷ টাপুরদির খাওয়া হয়ে গেছে৷ বসে বসে মোবাইলে খুটখাট করছিল৷ এমন সময় ফোনটা বাজতে শুরু করল৷ তাকিয়ে দেখলাম টাপুরদির ভুরুতে ভাঁজ৷ ফোন তুলে গম্ভীর গলায় বলল, ‘হ্যালো!’

ওদিক থেকে কে কথা বলছে বোঝা না গেলেও ফোনটা কানে নিয়ে টাপুরদির মুখের ভাবে পরিবর্তন লক্ষ করলাম৷ ফোন রাখতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কার ফোন, টাপুরদি?’

‘সনকাদেবী,’ বলল টাপুরদি৷

‘সে কী গো? সেদিন তো আমাদের প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিলেন৷ আজ নিজে থেকে ফোন করেছেন, কী ব্যাপার?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি৷

‘ভদ্রমহিলা বোধ হয় স্বামীকে খুব ভয় পান, বুঝলি? ভাইয়ের প্রতি টান আছে৷ কিন্তু সম্ভবত সনকাদেবীর হাজব্যান্ড তন্ময়কে পছন্দ করে না৷ কারণ বোধ করি ওদের ফ্যামিলি হিস্ট্রি,’ বলল টাপুরদি৷

‘তো আজ কী বলতে ফোন করেছিলেন?’ জানতে চাইলাম আমি৷

‘তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ কর৷ গড়িয়া যেতে হবে,’ টাপুরদি বলল৷

‘গড়িয়া? গড়িয়ায় আবার কী আছে?’ চিলি চিকেনের শেষ টুকরোটা মুখে ঢোকাতে ঢোকাতে জিজ্ঞাসা করলাম৷

‘সনকাদেবী জানালেন, তাঁর মায়ের এক খুব কাছের বান্ধবী গড়িয়াতে থাকেন৷ যখন তাঁর বাবার সঙ্গে মায়ের সমস্যা চলছিল, তন্ময় তখন খুব ছোটো৷ মাঝে মাঝে অশান্তি চরমে উঠলে বাড়ি ছেড়ে তন্ময়কে নিয়ে সেই বান্ধবীর বাড়িতে চলে যেতেন তাঁর মা৷ মেয়েকেও নিয়ে যেতে চাইতেন৷ সনকাদেবী মাকে ঘৃণা করতেন, তাই যেতেন না সঙ্গে৷ যাই হোক, যেটা কাজের কথা সেটা হল, সেই সময় তিনি দেখেছিলেন, তন্ময় তার মায়ের সেই বন্ধুর খুব ন্যাওটা ছিল৷ পরেও যখন সনকাদেবী তাকে বোর্ডিংয়ে রেখে আসেন, তখনও ছুটিছাটাতে তন্ময় সেই ভদ্রমহিলার বাড়িতেই গিয়ে থাকত মাঝেমধ্যে৷ তিনিও খুব স্নেহ করতেন তন্ময়কে৷’

‘আচ্ছা টাপুরদি, তন্ময়ের ফোন লোকেশন ট্রেস করা হয়েছে?’ জিজ্ঞাসা করলাম৷

টাপুরদি আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন ভস্ম করে দেবে৷ বলল, ‘এত কাণ্ড করে হন্যে হয়ে কাল জামশেদপুর, আজ গড়িয়া করছি সে কি ফোন ট্রেস না করে? কী আশ্চর্য! আর তোর এতদিনে মনে হল ফোন লোকেশন ট্রেস করার কথা? মিতুল, কাল থেকে রাতে রোজ একশোটা করে অঙ্ক করবি৷ তোর গ্রে ম্যাটারগুলো দিনে দিনে অকেজো হয়ে যাচ্ছে৷ তন্ময়ের ফোন অনেকদিন থেকেই সুইচড অফ৷’

সিটি সেন্টারের আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে গাড়ি বার করে বিশ্ববাংলা সরণি দিয়ে আমরা ছোটালাম৷ টাপুরদির ফোনটা বাজছে৷ গাড়ি ড্রাইভ করার সময় ফোন ধরে না টাপুরদি৷ একটু থেমে আবার বাজতে শুরু করল৷ তারপর আবার থেমে গেল৷ এবার শুনলাম পিক পিক করে মেসেজ ঢুকছে৷ আমায় বলল, ‘দেখ তো কার মেসেজ!’

টাপুরদির ব্যাগ থেকে ফোনটা বার করে দেখলাম অর্জুনদার ফোন৷ মেসেজও অর্জুনদার৷ অমিয় চক্রবর্তীর যে সমস্ত জিনিসপত্র সিজ করা হয়েছিল, তার মধ্য থেকে ফ্লাস্কে ও কাপের চায়ে বিষ ছিল, বাট্রাকোটক্সিন৷ টাপুরদিকে খবরটা বলতে ওর মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখলাম না৷ সামনে রাস্তার দিকে চোখ রেখে বলল, ‘সেটাই তো স্বাভাবিক৷ বন্ধ ঘরে আর কোথা থেকে বিষ আসবে, যদি না সেটা আগে থেকেই কেউ অমিয়বাবুর খাবারে মিশিয়ে দিয়ে যায়? পুলিশ নিশ্চয়ই ক্যান্টিনের ছেলেটাকে ধরেছে?’

‘তাই হবে৷ ছেলেটাকে ধরে কড়কে দিলে কথা বের হবে,’ আমি বললাম৷

‘ছাই হবে৷ যে বা যারা হবু মুখ্যমন্ত্রীকে মারার মতো দুঃসাহস দেখায়, তারা অমন প্রমাণ রেখে কাজ করবে বলে তোর মনে হয়? ছেলেটাকে দিয়ে যদি বিষ মেশাত, তাহলে ছেলেটাকেও আর এতদিন বাঁচিয়ে রাখত না৷’

‘কে মারতে পারে বলো তো অমিয়বাবুকে? তোমার কী মনে হয় টাপুরদি,’ জানতে চাইলাম আমি৷

‘কী করে বলি বল তো? তবে, এত বছর ধরে রাজনীতি করছেন, শত্রুর তো অভাব থাকার কথা নয়৷ যেমন ধর, বিরোধী নেতা তথা আমাদের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোস৷ গত ষোলো বছর ধরে গদিতে বসে আছেন তিনি৷ এবার গদি ছাড়তে হল৷ খুব খুশি তো হওয়ার কথা নয়৷ অথচ তিনি অমিয়বাবুর মৃত্যুর দিন বিকেলে তাঁর অফিসে নিজে গিয়েছিলেন শুভকামনা জানাতে৷ সুবিনয়বাবুর মুখে তো শুনলিই বিনয় বোসের সেক্রেটারি সঞ্জয় পাল তাঁর ক্লায়েন্ট ছিলেন৷ আদতে সঞ্জয় পাল তো পাপেট, আসল কলকাঠি ছিল বিনয় বোসের হাতে৷ মানে সুবিনয়বাবুর আসল ক্লায়েন্ট হলেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোস৷

‘তারপর ধর, দলের মধ্যে ইদানীং একটু টেনশন তৈরি হয়েছিল বলে শুনেছি৷ অমিয়বাবু যেভাবে মিনিস্ট্রি সাজিয়েছিলেন, সেটা নিয়ে দলের মধ্যেই অসন্তাোষ তৈরি হয়েছিল৷ এইসব বিক্ষুব্ধ এমএলএ-দের মধ্যে বিশেষ করে বলতে হলে বলা যায় সনাতন বিশ্বাসের নাম৷ কোlত্রদ্ধ মিনিস্ট্রি না পাওয়ায় তিনি নাকি আরও কিছু এমএলএ-দের একত্র করে দল ছেড়ে বেরিয়ে আসার প্ল্যান করছিলেন৷ ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি নাকি বলেছিলেন, অমিয়বাবুকে উচিত শিক্ষা দেবেন তিনি৷ সেদিন কিন্তু তিনিই শেষ ব্যক্তি যিনি অমিয়বাবুর ঘরে ঢুকেছিলেন হুমকি দিতে,’ বলল টাপুরদি৷

‘উরিববাস, তুমি তো ঘরে বসেই কেস গুছিয়ে ফেলেছ দেখছি৷ এত তথ্য পেলে কোথা থেকে? অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর তদন্তের হাল-হকিকত তো পুলিশ গোপন রেখেছে, প্রেস মিডিয়াকে জানাচ্ছে না৷ কিন্তু তুমি তো সবই জানতে পারছ দেখছি,’ হেসে বললাম আমি৷

টাপুরদি হাসল, কিছু বলল না৷ ভালো করেই জানি ভিতরের খবরগুলো কে সরবরাহ করছে টাপুরদিকে৷

অধ্যায় ১ / ৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%