সেগুনবন অন্ধকার

সৈকত মুখোপাধ্যায়

এক

লক-ডাউনের দিনগুলোয় আলিপুরদুয়ার থানার ওসি বিনায়ক বসুর কাজের চাপ একদম কমে গেছে৷ রাস্তায় লোকজন কম, তাই অ্যাকসিডেন্ট, ক্রাইম সবই কম৷ প্রথমদিকটায় তাও পাবলিক কোভিড-বিধি মানছে কিনা সেদিকে নজর রাখতে হচ্ছিল৷ তখন বিনায়ক সারপ্রাইজ-চেকিংয়ের সময় কিছু ব্যাদড়া ছেলেকে বাইক থেকে নামিয়ে বাটাম দিয়েছিল৷ তারপর থেকেই সেসব শুধরে গেছে৷

এখন যে-কাজগুলো করতে হচ্ছে, সেগুলো বিনায়কের খুব মনের মতো কাজ৷ তার থানা-এলাকার মধ্যে যত ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষজন থাকে, যারা এই লকডাউনের দিনগুলোতে জীবিকা হারিয়েছে, তাদের যাতে খালি পেটে থাকতে না হয় তার জন্যে ওরা থানার সব কর্মচারী মিলে থানার ঠিক পাশেই একটা লঙ্গরখানা খুলেছে৷ সকাল এগারোটার পর থেকে সেখানে বহু নারী-পুরুষ এবং শিশু খেতে আসে৷ বিনায়কেরও অনেকটা সময় ওখানে দাঁড়িয়ে লাইনের তদারকির কাজে কেটে যায়৷

লাইন সামলাতে সামলাতেই সে শোনে, কার বাবার হঠাৎ হার্ট-অ্যাটাক হয়েছে, হসপিটালে বেড পাচ্ছে না। কোথায় অক্সিজেনের ক্রাইসিস! এমনকী কেউ বাচ্চার জন্যে দুধের জোগাড় করতে না পারলেও খাবারের লাইন থেকে বেরিয়ে এসে বড়বাবুর সামনে হাতজোড় করে দাঁড়ায়৷ বলে, ‘আপনি ছাড়া কাকে বলব বড়বাবু?’

ওরা বুঝে গেছে বিনায়ককে বাইরে থেকে দেখতে রাগী হলেও এবং একটু হাঁকডাক করে কথা বললেও, মানুষটার মনটা খুব নরম৷

বিনায়ক মুখে তাদের ধমক দেয় ঠিকই, কিন্তু থানার গাড়ি পাঠিয়ে সেই হার্টের পেশেন্টকে কোনো নন-কোভিড হসপিটালে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কাজটাও করে দেয়৷ নিজের পকেটের পয়সায় বেবি-ফুডের টিন কিনে পৌঁছে দেয় বস্তির ঘরে৷

এর মধ্যেই প্রতিদিন ও রাতের দিকে একবার করে ওর গুরুদেব, মানে রিটায়ার্ড অ্যাডিশনাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশ উমাশঙ্কর চৌবেকে নিয়ম করে ফোন করে৷ জিগ্যেস করে, ‘কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো স্যার? যা যা প্রয়োজন সব বাড়িতে আছে তো? নইলে বলবেন, আমি পৌঁছে দিয়ে আসব৷’

প্রতিবারই অন্যদিক থেকে চৌবেসাহেব জবাব দেন, ‘একদম ঠিক আছি বিনায়ক৷ আমাদের দু’জন মানুষের প্রয়োজনই বা কতটুকু? চিন্তা কোরো না৷ প্রথম প্রথম মর্নিং-ওয়াকটা বন্ধ হয়ে গেল বলে একটু মনখারাপ লাগত, এখন ছাদে হাঁটা অভ্যেস করে নিয়েছি৷ তবে তুমি কিন্তু সাবধানে থেকো৷ তোমাকে তো পাবলিকের টাচে আসতেই হচ্ছে৷’

উমাশঙ্কর চৌবে আর বিনায়ক বসুর সম্পর্কটাকে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক বললে একটু কম বলা হয়৷ কখনো কখনো মনে হয় ওঁরা দুই ভাই৷ কখনো মনে হয় দুই বন্ধু৷ একে অন্যের মনের অনেক কথা সহজেই বুঝে নিতে পারে৷

সেইজন্যেই সেদিন সকাল সাড়ে দশটার সময় চৌবেসাহেবের ফোন পেয়ে বিনায়ক অবাক হল৷ আগের দিনই রাতেই চৌবেসাহেবের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে৷ তারপর আবার এত সকালে ফোন কেন?

বিনায়ক বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, বলুন৷’

‘ইয়ে মানে একটু অসময়ে ডিস্টার্ব করলাম৷ তুমি তো নিশ্চয়ই অফিসে?’

‘হ্যাঁ স্যার৷ একটু আগেই ঢুকলাম৷ এনি প্রবলেম স্যার?’

‘না৷ মানে ঠিক আমার কোনো প্রবলেম নয়৷ তবে কাল রাতে একটা ব্যাপার দেখে একটু অ্যাবনর্মাল লাগল৷ তোমার কি মিনিট পাঁচেক সময় হবে?’

‘কী বলছেন স্যার! আমার হাতে এখন প্রচুর সময়৷ আপনি ফোন না করলে আমি এখন কম্যুনিটি-কিচেনে গিয়ে কুমড়োগুলো ঠিকঠাক সাইজমতো কাটা হচ্ছে কিনা, তার তদারকি করতাম৷ আপনি বলুন স্যার, কী দেখেছেন? কোথায় দেখেছেন?’

ও. সি. আলিপুরদুয়ার কুমড়ো কাটা সুপারভাইস করছেন, ভেবেই চৌবেসাহেব হেসে ফেললেন৷ তারপর বললেন, ‘আমি যে আজকাল রাতে ডিনার সারার পরেও কিছুক্ষণ ছাদে পায়চারি করি সে তো তোমাকে বলেইছিলাম৷ আর তুমি তো আমার বাড়ির ছাদে অনেকবার উঠেছ৷ মনে পড়ছে নিশ্চয়ই, পূবদিকে অনেকখানি জায়গা নিয়ে এয়ারপোর্ট, রানওয়ে...৷ তারপরে সেগুনবন৷ আবার দক্ষিণদিকেও বহুদূর অবধি কোনো লোকালয় নেই, যে জন্যে তোর্সা নদীও ছাদ থেকে পরিষ্কার দেখা যায়৷’

‘হ্যাঁ স্যার৷ মনে পড়ছে৷ ওখানে যা কিছু লোকালয় সব আপনার বাড়ির উত্তরে আর পশ্চিমে৷’

‘হ্যাঁ৷ সেইজন্যেই আমি উত্তরে বা পশ্চিমে তাকিয়ে চোখকে কষ্ট দিই না৷ বরং বাকি দু’দিকে তাকাই৷ সেগুনের বনে জোনাকির জ্বলা নেভা দেখি৷ তোর্সার জলে চাঁদের আলোর আঁকিবুকি দেখি৷ আকাশ পরিষ্কার থাকলে দক্ষিণের স্কাইলাইনে ভুটান-পাহাড়ও দেখা যায়৷’

‘জানি স্যার৷’

সত্যিই উমাশঙ্কর চৌবের প্রকৃতি-প্রেমের কথা বিনায়কের অজানা নয়৷ এইসব কারণেই মানুষটাকে তার এত বিস্ময়কর মনে হয়৷ চাকরি-জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই যিনি কাটিয়েছেন হোমিসাইড-ডিপার্টমেন্টের চিফ হিসেবে, দিনের পর দিন যার কেটে গেছে হসপিটালে, মর্গে কিংবা খুনখারাপির অকুস্থলে, পোড়া, থেঁতলানো, রক্তাক্ত সব মৃতদেহের মধ্যে, তিনি যে কেমন করে ছাদের বাগানে এতরকমের গোলাপ ফোটান, শুধু ডাক শুনে বলে দেন পাখিটা রোজ-ফিঞ্চ না লিফবার্ড, সেটাই বিনায়ক বুঝে উঠতে পারে না৷

তবে এইটুকু সে জানে যে, যদি সুযোগ থাকে তাহলে সত্যিই উমাশঙ্কর চৌবে দোকান-বাজার-বস্তির দিকে না তাকিয়ে নদী, বন আর পাহাড়ের দিকেই তাকিয়ে থাকবেন৷ সেইজন্যেই রিটায়ারমেন্টের পরে কলকাতার মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সিকিউরিটি-অ্যাডভাইসর হওয়ার ডাক উপেক্ষা করে, কুচবিহারের নিরালা এক কোণে, মনের মতো এক বাড়ি আর বাগান বানিয়ে বসবাস করছেন৷

‘কাল রাতেও ওইভাবেই ছাদে পায়চারি করছিলাম, বুঝলে?’ আগের কথার রেশ ধরে বললেন চৌবেসাহেব৷ ‘হঠাৎ এমন একটা দৃশ্য দেখলাম, যেটা গত দশবছর এই বাড়িতে বাস করে কখনো দেখিনি৷ দেখলাম, সেগুনবনের মধ্যে কয়েকটা টর্চের আলো ঘোরাঘুরি করছে৷ সেগুনবন জায়গাটা সম্বন্ধে তোমার আইডিয়া না থাকলে তুমি বুঝতে পারবে না, ঘটনাটা কতটা অস্বাভাবিক৷ উপরন্তু এই সময়ে, যখন লোকজন নিজের বাড়ির সামনের রাস্তাতেই পা রাখছে না, তখন রাত এগারোটার সময় ওই ভূতুড়ে জঙ্গলে টর্চের আলো দেখে বিচলিত হয়েই পড়েছি৷’

‘হয়তো কেউ ওই জঙ্গল ধরে শর্টকাট করছিল৷ তাছাড়া আর কী হবে?’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘উঁহু৷ টর্চের আলোর ঘোরাঘুরির প্যাটার্ন ঠিক রাস্তা ধরে হেঁটে যাওয়ার মতো ছিল না বিনায়ক৷ তুমি তো পুলিশে চাকরি করো—বহু কুম্বিং-অপারেশনে অংশ নিয়েছ, যাকে বাংলায় বলে চিরুনি-তল্লাশি৷ তখন তোমরা যেভাবে টর্চের মুখ নীচের দিকে রেখে, চারিদিক থেকে গোল হয়ে সেন্টারের দিকে এগিয়ে আসো, এগিয়ে আসার সময় কাল্পনিক বৃত্তের প্রতিটা ইঞ্চি মাপতে মাপতে এগোও, কাল রাতে আলোগুলো ঠিক সেইভাবে সেগুনবাগানের জমি মাপছিল৷ একটা করে এরিয়ায় তল্লাশি শেষ করেই চলে যাচ্ছিল পাশের অংশে৷

‘খুব কম করে চারজন লোকের একটা টিম কাজটা করছিল এবং পাক্কা একঘণ্টা ধরে ওরা কাজটা চালিয়ে গিয়েছিল৷ মুশকিল হচ্ছে জায়গাটার দূরত্ব আমার বাড়ি থেকে আধ-মাইলের কম নয়৷ তাই না পেয়েছি কোনো শব্দ, আর না পেরেছি আলো ছাড়া অন্য কিছু দেখতে৷’

একটু চুপ করে থেকে চৌবেসাহেব বললেন, ‘দৃশ্যটা আমাকে খুবই অবাক করেছে৷ কারণ জায়গাটা না, তুমি নিজের চোখে না দেখলে তোমাকে আমি বোঝাতে পারব না জায়গাটা ঠিক কেমন৷ তবে এইটুকু বলছি বিনায়ক, ওখানে ঝরা সেগুনের পাতা ছাড়া আর খুঁজে পাওয়ার মতো কিছু আছে বলে আমার জানা নেই৷’

বিনায়কের বুঝতে অসুবিধে হল না যে, চৌবেসাহেবের ইচ্ছে হয়েছে তাকে সঙ্গে নিয়ে একবার জায়গাটা দেখে আসার, এবং বিনায়ক তার অভিজ্ঞতা থেকে এটাও জানে যে, হাওয়ায় একটা টুপি উড়ে যেতে দেখলেই ধরতে ছুটবেন, এমন মানুষ উমাশঙ্কর চৌবে নন৷ দুঁদে মাছশিকারিরা যেমন ফাতনার সামান্য নড়াচড়া থেকে জলের গভীরে মাছের গতিবিধি বুঝে নেন, চৌবেসাহেবও তেমনি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য ঘটনা থেকে অপরাধের পূর্বাভাস পেয়ে যান৷

তাছাড়া সত্যিই তো! কেনই-বা এই প্যানডেমিকের মধ্যে লোকজন রাতদুপুরে বনের মধ্যে কিছু খুঁজে বেড়াবে? তাই সে বলল, ‘আমি আসছি স্যার৷ ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি৷ তারপর দু’জনে মিলে জায়গাটা দেখে আসব৷’

চৌবেসাহেবের গলা শুনেই বোঝা গেল, তিনি নিশ্চিন্ত হলেন৷ বললেন, ‘চলে এসো৷ বাড়িতে বলে এসো, দুপুরে এখানে লাঞ্চ করে ফিরবে৷’

বিনায়ক ফোনটা নামিয়ে রেখে, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ হুংকার ছাড়ল, ‘ডিউটি!’

ওর চেম্বারের বাইরে তখন ডিউটি দিচ্ছিল হাবিলদার জনার্দন বিশ্বাস৷ ডিউটি দিচ্ছিল মানে একটা টুলের ওপরে বসে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল৷ সাহেবের ডাক শুনে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে স্যালুট দিয়ে দাঁড়াল৷

দেয়াল-আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশ-ক্যাপটা মাথায় ঠিক করে বসাতে বসাতে বিনায়ক আয়নার মধ্যে দিয়েই জনার্দনের মুখটা দেখে নিল৷ তারপর দ্বিগুণ জোরে চেঁচাল, ‘মুখে মাস্ক নেই কেন? মরবার ইচ্ছে হয়েছে?’

‘হ্যাঁ স্যার, না স্যার, মানে এই তো স্যার...’

বিনায়ক কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে তার দিকে চেয়ে থেকে দাঁতে দাঁত চিপে বলল, ‘অপদার্থ৷’ তারপর নিজের ড্রয়ার থেকে একটা সার্জিকাল মাস্ক বার করে টেবলের ওপর রাখল৷ বলল, ‘পরে ফেলো৷ তারপর ড্রাইভারকে গিয়ে বলো জিপটা বার করতে৷ বেরোব৷’

‘স্যার, ফোর্স?’

‘লাগবে না৷ আর শোনো, বাবুকে বলে দেবে গাড়িটাকে যেন স্যানিটাইজ করে নিয়ে আসে৷’

কুচবিহার এয়ারপোর্টের লাগোয়া দোতলা বাড়িটায় পৌঁছতে ওদের ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগল৷ পঞ্চাশ মিনিটের মাথায় দোতলার খোলা ছাদে বিনায়কের মুখোমুখি চেয়ারে এসে বসলেন উমাশঙ্কর চৌবে৷ তার হাতের প্যাকেটটার দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওটা আবার কী নিয়ে এসেছ?’

‘গোপালধারা টি-গার্ডেনের অটাম-ফ্লাশ, স্যার৷ এটা তো আপনি বরাবর আলিপুরদুয়ার থেকেই আনাতেন৷’

চৌবেসাহেব একগাল হেসে হাত বাড়িয়ে চায়ের প্যাকেটটা নিয়ে বললেন, ‘বেঁচে থাকো৷ সত্যি, লক-ডাউনে তোমার বউদির আর আমার ডিমসেদ্ধ-আলুসেদ্ধ দিয়ে ভাত খেতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না৷ কিন্তু এই চা না পেয়ে চোখে অন্ধকার দেখছিলাম৷ দাঁড়াও, দামটা দিয়ে দিই৷’

বিনায়কের মুখটা একটু কালো হয়ে গেলেও সে কোনো আপত্তি করল না৷ সে ভালো করেই জানে, দামটা তাকে দিতে না পারলে চৌবেসাহেব ওই চা ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন৷

দুই

বিনায়কের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে চৌবেসাহেব বললেন, ‘এটাকে অবশ্য ঠিক বন বলা যায় না৷ মানে ন্যাচরাল-ফরেস্ট নয়৷ সব মানুষের হাতে পোঁতা গাছ, যাকে বলে প্ল্যানটেশন৷ তবে গাছগুলোর বয়স অনেক৷ কুচবিহার যখন স্বাধীন রাজ্য ছিল, তখন লাগানো হয়েছিল৷’

বিনায়ক অবাক হয়ে চারিদিকে দেখছিল৷ বড়জোর দশ মিনিট আগে তারা রানওয়ের পাশের পাকা রাস্তাটা ছেড়ে একটা মাটির রাস্তা ধরে সেগুনবনের মধ্যে ঢুকেছে৷ কিন্তু এর মধ্যেই তারা এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে শহর কুচবিহারের আর কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷

এখানে যতদূর চোখ যায়, গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটার পর একটা আকাশছোঁয়া সেগুনগাছ৷ যেদিকে তাকাচ্ছে বিনায়ক, যত দূরেই তাকাচ্ছে, সেগুনগাছের সারি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না৷

মাঝে মাঝে একটা পোকা কিট কিট কিট কিট করে ডেকে উঠছে৷ তাছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই৷ চারিদিক এতই নিস্তব্ধ যে, ওদের নিজেদের পায়ের চাপে গুঁড়িয়ে যাওয়া শুকনো সেগুনপাতার মচমচ শব্দটাও ভীষণ জোরে কানে বাজছিল৷ হঠাৎ একটা স্টর্ক বিলড কিংফিশারের তীক্ষ্ণ চিৎকারে বিনায়ক চমকে উঠল৷ বলল, ‘জায়গাটা কিন্তু খুব আনক্যানি স্যার৷ কেমন যেন গা ছমছম করছে৷’

চৌবেসাহেব মুচকি হেসে বললেন, ‘তাও তো এখনো এই সেগুনবনের ভূতের গল্পগুলো শোনোনি!’

‘ভূতের গল্পও আছে নাকি?’

‘তা থাকবে না? আমি তো এমন একটিও জঙ্গল দেখিনি যেখানে ভূত থাকে না৷ তাহলে বলি শোনো৷ এই যে দু’মাইল লম্বা আর দু’মাইল চওড়া সেগুনবন, এর দক্ষিণদিকে তোর্সার ওই শাখাটা বয়ে চলেছে, যার নাম মরাতোর্সা৷ আর পূব দিকে জঙ্গলের সীমানায় রয়েছে পাঁচিলঘেরা বিশাল এক পোড়ো জমি৷ জায়গাটার নাম রানিবাগান৷ অমন নাম কেন বলো তো?’

‘কেন স্যার?’

‘কারণ ওই জমিতেই একসময় রাজবংশের মহিলাদের সৎকার করা হতো৷ অন্তঃপুরের নারী বলেই সাধারণ শ্মশানঘাটে লোকজনের চোখের সামনে তাঁদের দাহ করা হতো না৷ আমি একবার ভেতরে ঢুকে দেখে এসেছি৷ চিতার ওপরে গড়ে তোলা পাথরের ছোট ছোট সমাধি রয়েছে, যেগুলো রানিমা আর রাজকুমারীদের সমাধি৷ যদিও এখন সবই ধবংসস্তূপ৷ লোকে বলে, এই সেগুনবাগানে এখনো তাঁরা হাওয়া খেতে আসেন৷’

বিনায়ক চমকে উঠল, ‘কারা স্যার?’

‘ওই রানিরা৷ তাছাড়া বালিকা রাজকুমারীরা নাকি এখনো দল বেঁধে এখানে সেগুনগাছের গুঁড়ির আড়ালে লুকোচুরি খেলে বেড়ায়৷ অনেকেই তাদের দেখেছে৷ দেখার পরে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো সমস্যা হয়নি৷ খুকি-ভূতেরাও নিজেদের মনে খেলা করে চলে গেছে, জ্যান্ত মানুষকে পাত্তা দেয়নি৷ তবে...’

‘তবে কী স্যার?’

‘কখনো তারা খেলা থামিয়ে যদি কোনো পথিকের দিকে চোখ তুলে দেখেছে, তাহলে সেই বেচারা পথিক তারপরে আর তিন রাত্তিরের বেশি বাঁচেনি৷ সেইজন্যেই দুপুরের পরে লোকজন প্রাণ গেলেও এই সেগুনবাগানে ঢোকে না, বুঝলে?’

বিনায়ক কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘আআ—আপনি স্যার আমাকে ভয় দেখানোর জন্যে এসব বানাচ্ছেন, তাই না?’

‘আরে না, বিনায়ক৷ বিশ্বাস করো, সত্যিই৷’

চৌবেসাহেবের কথা শেষ হবার আগেই অনেক দূর থেকে খুব পরিষ্কার একটা আওয়াজ ভেসে এল, ‘টুউউকি!’

বাচ্চা মেয়ের গলার আওয়াজ৷

বিনায়ক যে অবস্থাতে ছিল, সেই অবস্থাতেই পাথরের মতো জমে গেল৷ উমাশঙ্কর চৌবে খুব দ্রুত পায়ে যেদিক থেকে ডাকটা ভেসে এসেছিল, সেদিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন৷ বোঝা যাচ্ছিল, উনি চেষ্টা করছেন মেয়েটাকে দেখতে৷ কিন্তু এত ঘন বনের মধ্যে দেখতে পাওয়া কঠিন৷ একটু পরেই আরো দূর থেকে, মনে হল মরা-তোর্সার বাঁধের ওদিক থেকে আরো অনেকগুলো বাচ্চা মেয়ের খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এল৷

একবারই৷ তার পরেই সব আবার চুপ৷ শুধু পোকার কিট-কিট আওয়াজ৷

বিনায়ক জোরে জোরে মাথাটা দু’দিকে ঝাঁকিয়ে নিজের বোধবুদ্ধিটাকেই যেন ফিরিয়ে আনল৷ তারপর বলল, ‘চলুন স্যার৷ আর বেশিক্ষণ এখানে ঘোরাঘুরি করে লাভ নেই৷ কাল রাতে যদি কেউ এখানে এসেও থাকে, এখন আর তাদের চিহ্ন খুঁজে পাব বলে মনে হচ্ছে না৷ আর যখন তেমন ক্রাইমের খবর কিছু এখনো অবধি পাওয়া যায়নি, তখন আপনিই বা ভাবছেন কেন?’

চৌবেসাহেব মনঃক্ষুণ্ণ হলেন, তবে বিনায়কের কথাটা মেনেও নিলেন৷ বললেন, ‘ঠিকই বলেছ৷ এত শক্ত আর শুকনো মাটি এখানে, ফুট-প্রিন্ট টিন্ট পাওয়া যাবে না বলেই মনে হচ্ছে৷ আরে দাঁড়াও! ওটা কী?’

যেটা দেখে চৌবেসাহেব আর বিনায়ক দাঁড়িয়ে পড়েছিল, সেটা আর কিছুই নয়, বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা একতলা বাড়ি৷

হাঁটতে হাঁটতে ততক্ষণে ওরা সেগুনবনের এয়ারপোর্ট-প্রান্তের একেবারে বিপরীত দিকে চলে এসেছিল৷ সামনে তাকালে দেখা যাচ্ছিল একটানা একটা উঁচু পাঁচিল৷

একটু আগেই চৌবেসাহেব যা বলেছিলেন তার থেকে বিনায়কের বুঝতে অসুবিধে হল না, ওটাই সেই রানিবাগান৷ চৌবেসাহেব ওই পাঁচিলটা লক্ষ করেই হাঁটছিলেন৷ বিনায়ককে বলেওছিলেন, ওখান থেকেই পাতাকুড়ার রাস্তা ধরে আবার নিজের বাড়ির দিকে ফিরে যাবেন৷

কিন্তু সেই মুহূর্তে ওদের দু’জনের মধ্যে কেউই যে সেগুনবন থেকে বেরোনোর কথা ভাবছিলেন না, তার কারণ, বাঁদিকে ওই একতলা বাড়িটা৷ চৌবেসাহেবের মুখ দেখেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, তিনি বাড়িটা আগে কখনো দেখেননি৷ এর আগে তিনি এতদূর অবধি আসেনইনি৷

হলুদ এলা দিয়ে রঙ করা বাড়িটার বেশ জীর্ণদশা৷ কার্নিশের গায়ে বট-অশ্বত্থ চারা গজিয়ে উঠেছে৷ রেইনওয়াটার-পাইপের আধখানা ভেঙে দেয়ালের গায়ে ঝুলছে৷ সামনের একফালি বারান্দার গ্রিলের ফাঁকে অজস্র মাকড়শার জাল৷ তবে এসব সত্ত্বেও বাড়িটা যে কোন কাজে ব্যবহৃত হয় তা বুঝতে ওদের অসুবিধে হচ্ছিল না, কারণ, সদর দরজার মাথার ওপরেই অর্ধেক লাল, অর্ধেক সবুজ রঙে রাঙানো একটা টিনের সাইনবোর্ডের ওপরে বেশ বড় বড় করে রোমান হরফে লেখা ছিল, ‘অ্যানিমাল রেসকিউ সেন্টার, কুচবিহার ফরেস্ট ডিভিশন, রেঞ্জ থ্রি৷’

অর্থাৎ, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পশু-উদ্ধার কেন্দ্র এটি৷

প্রশ্ন হচ্ছে, পশু কোথায়? উদ্ধারকারীরাই বা কোথায়? কাল রাতের টর্চ-রহস্যের পান্ডারা এখানেই লুকিয়ে নেই তো?

বিনায়ক আর উমাশঙ্কর চৌবে কাঠের গেট ঠেলে বাড়িটার উঠোনে পা দিলেন৷ সেখান থেকে দু’ধাপ সিঁড়ি ভেঙে সরু বারান্দা৷ বারান্দার গায়েই একটা বড় ঘর৷ দরজার পাল্লা দুটো ভেজানো৷

‘কেউ আছেন?’ বিনায়ক গলা তুলে হাঁক পাড়ল৷ চৌবেসাহেব দরজার পাল্লার গায়ে লাগানো কড়াটা ধরে কয়েকবার খট-খটালেন৷ কোনোটাতেই সাড়া মিলল না৷ বিনায়ক দরজার পাল্লাদুটো একটু খুলে ভেতরে তাকাল৷ তারপর ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা নাচাল, অর্থাৎ ভেতরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না৷

ওরা দু’জনে আবার উঠোনে নেমে এল৷ উঠোনের ডানদিকে একটা করুগেটেড শেডের নীচে একটা অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়েছিল৷ তার গায়ে লেখা ‘ফর ভেটেরিনারি ইউজ অনলি৷’ দেখে মনে হল, শেডটার ভেতর দিয়ে, গাড়িটাকে পাশ কাটিয়ে, বাড়িটার পেছনদিকে যাওয়া যায়৷

বিনায়ক আর চৌবেসাহেবের মধ্যে চোখে চোখে কথা হয়ে গেল৷ দু’জনে পা টিপে টিপে পেছনের জমিটায় হাজির হল৷ প্রথমেই তাদের চোখ আটকে গেল, একটা শেডের নীচে সাজিয়ে রাখা অনেকগুলো খাঁচার দিকে৷ কিছু খাঁচা খালি, কয়েকটার মধ্যে বাসিন্দা রয়েছে৷ চৌবেসাহেব একনজরে প্রায় সবক’টাকেই চিনতে পারলেন---প্যাঁচা, বেজি, শজারু এইসব ছোট ছোট পশুপাখি৷ সবমিলিয়ে প্রায় আট-দশটা৷ পুরো জায়গাটাতেই চিড়িয়াখানার মতো গন্ধ৷

ওই শেডটা পার হয়েই ওরা যাকে খুঁজছিল তাকে পেয়ে গেল৷ একটা ছোট ডোবার পাড়ে তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভদ্রলোক৷ এতটাই তন্ময় যে, বিনায়ক একবার গলা-খাকারি দিতে সেটাও শুনতে পেলেন না৷

বিনায়ক এবার গলা তুলে ডাকল, ‘হ্যালো, গুডমর্নিং৷’

এবার তিনি শুনতে পেলেন৷ চট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিস্ফারিত চোখে একবার ওদের দু’জনকে দেখলেন এবং তারপরেই ওঁর মুখের ভাবে যেরকম পরিবর্তন এল, সেরকমটা সচরাচর দেখা যায় না৷ ওঁর মুখ থেকে সমস্ত রক্ত যেন পায়ের দিকে নেমে গেল৷ ফ্যাকাসে হয়ে গেল মুখটা৷ ঠোঁটদুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল৷ দুটো হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে কোনোরকমে বললেন, ‘আমি আমি...৷’ হাত থেকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট খসে মাটিতে পড়ে গেল৷

চৌবেসাহেব আর বিনায়ক দু’জনেরই মনে হল ভদ্রলোক বোধহয় আর নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না৷ পড়ে যাবেন৷ ছয়-ফুটিয়া বিনায়ক লম্বা লম্বা পায়ে ঠিক দুটো স্টেপ ফেলে ওঁর পাশে পৌঁছে গেল৷ দু’হাত দিয়ে ওঁর কাঁধের ওপরের দিকটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, ‘স্টেডি, স্টেডি স্যার৷ আপনি এত নার্ভাস হচ্ছেন কেন? দেখুন, আমরা জাস্ট এখানে ঘুরতে এসেছিলাম৷ আপনার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নিয়ে আসিনি৷ শান্ত হোন৷’

ভদ্রলোক তাই শুনে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ বিনায়কের হাত ছাড়াবার কোনো চেষ্টা করলেন না৷ উলটে ওর হাতের ওপরে ভর দিয়েই আস্তে আস্তে মুখ তুলে তাকালেন৷ বললেন, ‘স্যরি! আসলে একটা কারণে আমার নার্ভগুলো খুব স্ট্রেনের মধ্যে রয়েছে৷ তারমধ্যে হঠাৎ আপনাদের দেখে... স্যরি এগেন৷’

এই পুরো সময়টাই চৌবেসাহেব চুপ করে একদিকে দাঁড়িয়ে ওঁকে ভালো করে লক্ষ করছিলেন৷ ভদ্রলোকের বয়স মনে হল পঞ্চাশের কাছাকাছি৷ বেঁটেখাটো, গোলগাল, সুখী টাইপের চেহারা৷ মাথাজোড়া টাক৷ ওঁর পরনে যা যা ছিল, ডার্ক ব্লু টেনিস শর্টস, সাদা পোলো-নেক গেঞ্জি, পায়ের রিবকের স্লিপার এবং চোখের রে-ব্যানের চশমা সবই বেশ দামি এবং ব্র্যান্ডেড৷ হাতের মোবাইলটা যে অ্যাপলের, সেটা লোগো দেখেই বোঝা যাচ্ছিল৷ কবজির স্মার্ট-ওয়াচের ব্র্যান্ডটা চৌবেসাহেব ওই দূরত্ব থেকে বুঝতে পারছিলেন না, তবে নিঃসন্দেহে সেটাও বিদেশি৷

কিন্তু একইসঙ্গে তিনি এটাও খেয়াল করলেন যে, ভদ্রলোকের চোখেমুখে অসম্ভব ক্লান্তি এবং উদ্বেগের ছাপ৷ অন্তত দু’দিন শেভ করেননি৷ রাতে ঘুমিয়েছেন কি? মনে হয় না৷ চোখদুটো লাল হয়ে রয়েছে৷ ডানহাতের কবজির একটু ওপরে ফর্সা চামড়ার ওপরে একটা নীলচে কালশিটের দাগ৷ মনে হচ্ছে, ওই জায়গাটায় কেউ হাতটা মুচড়ে ধরেছিল৷ ওখানে যে ব্যথাও রয়েছে সেটা বোঝা গেল, যখন উনি পায়ের কাছে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের প্যাকেটটা ডানহাত দিয়ে তুলতে গিয়েও মুখটা যন্ত্রণায় বিকৃত করে আবার বাঁহাত বাড়িয়ে সেটা তুলে নিলেন৷ তারপর বললেন, ‘বুঝতে পারছি, ভগবানই আপনাদের পাঠিয়েছেন৷ চলুন স্যার, ঘরে চলুন৷’

বিনায়ক আর চৌবেসাহেবকে সামনের ঘরে একটা সোফায় বসিয়ে, ভদ্রলোক নিজে ওদের মুখোমুখি একটা বেতের চেয়ারে বসলেন৷ কথা বলতে বলতে মাঝেমাঝেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন৷ ফলে বক্তব্য একটু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল৷ তবু প্রাথমিকভাবে যা বোঝা গেল, উনি কুচবিহার ফরেস্ট ডিভিশন-থ্রির ভেটেরিনারি অফিসার৷

ভদ্রলোক নিজের নাম বললেন, শমীক হাজারিকা৷

এ-ও জানালেন যে তিনি অরিজিনালি আসামের ধুবড়ির লোক৷ চাকরিজীবনের বেশিরভাগ সময়টা আসামেরই বিভিন্ন রিজার্ভ ফরেস্টে কাটিয়েছেন৷ মাত্র তিনমাস আগে তিনসুকিয়া থেকে এখানে বদলি হয়ে এসেছেন৷ তবে ফ্লুয়েন্ট বাংলা বলেন৷

চৌবেসাহেব মৃদুস্বরে জিগ্যেস করলেন, ‘এখানে আপনাদের কাজটা কী?’

শমীকবাবু বললেন, ‘কাজটা অনেকটা রিহ্যাব-সেন্টারের মতো৷ একসময় খুবই চাপ ছিল৷ তবে এখন আশেপাশে একই কাজের জন্যে কয়েকটা স্পেশালাইজড-সেন্টার খুলে যাওয়ায় কাজ প্রায় কিছুই নেই৷’

‘রিহ্যাব সেন্টার! কাদের জন্যে?’ বিনায়ক প্রশ্ন করল৷

শমীকবাবু বললেন, ‘বনের পশুপাখিদের জন্যে৷ বিশেষ করে মা-মরা ছানাদের জন্যে৷ আমরা ফরেস্টে টহল দিতে গিয়ে এরকম অনেক বাচ্চা কুড়িয়ে পাই৷ তার মধ্যে টিয়াপাখির ছানা থেকে ভালুক কিংবা চিতাবাঘের বাচ্চা, সবই থাকে৷ একসময় মা-মরা হাতির বাচ্চাদেরও এখানে রেখে, কিছুটা বড় করে তুলে, তারপর অন্য জায়গায় পাঠানো হয়েছে৷

‘তাছাড়া স্মাগলারদের কাছ থেকে যেসব পশুপাখি উদ্ধার করা হয়, তাদেরও শরীরের হাল বেশিরভাগ সময় খুব খারাপ থাকে৷ বন্দিদশায় খুব ক্রুয়েলি ট্রিট করা হয় তো বেচারাদের! তাই ওদেরও চিকিৎসার প্রয়োজন হয়৷ এখানে কিছুদিন রেখে সুস্থ করে তোলার পরে আবার ওদের নিজেদের এনভায়রনমেন্টে ফিরিয়ে দেওয়া হয়৷

‘পেছনে একটা ডোবা দেখলেন না? ওর মধ্যে এখনো তিরিশটা স্টার-টার্টল রয়েছে৷ স্টার-টার্টল বোঝেন তো? ছোট মাপের একজাতের কচ্ছপ৷ বিদেশের পেট-মার্কেটে খুব ডিম্যান্ড৷ চোরা-শিকারিরা ওগুলোকে বস্তা ভর্তি করে নেপালের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের ফরেস্ট-গার্ডরা খবর পেয়ে উদ্ধার করে এনেছে৷ এখন ওরা অনেকটা সামলে উঠেছে অবশ্য৷ আপনারা যখন এলেন, তখন ওদেরই ফিড দিচ্ছিলাম৷’

চৌবেসাহেব আবার খুব শান্ত গলায় বললেন, ‘কী যেন একটা সমস্যার কথা বলছিলেন?’

শমীকবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, বলছি৷ দেখুন, এই লক-ডাউন শুরু হওয়ার পর থেকেই এখানে যে চারজন হেল্পার আর গার্ড ছিল, তাদের আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ বুঝতে পারছি ওদের কিছু করার নেই, কারণ ওরা কেউ দিনহাটা থেকে, কেউ ময়নাগুড়ি থেকে, কেউ বা আবার জয়গাঁ থেকে পাবলিক বাসে চেপে চাকরি করতে আসত৷ এখন বাস, ট্রেন সবই বন্ধ৷ ওরা আসবেই বা কীভাবে? হ্যাঁ, অথরিটির যদি সদিচ্ছা থাকত, তাহলে হয়তো ওদের মধ্যে অন্তত দু’জনকে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন৷ কিন্তু মনে হচ্ছে, এই সেন্টারটার কথা সকলে ভুলেই গেছেন৷ আমি পায়ে হেঁটে কয়েকবার ডিভিসন-অফিসে গিয়ে দরবার করে এসেছি৷ প্রতিবারই বড় সাহেবরা হচ্ছে-হবে করে কাটিয়ে দিয়েছেন৷

‘কাজেই গত দশদিন ধরে একাই রয়েছি৷ নিজে যেটুকু পারি, সবজি মাছ জোগাড় করে নিজেও খাচ্ছি, অসুস্থ জন্তুগুলোকেও খাওয়াচ্ছি৷ তবে ওদের ওষুধ ফুরিয়ে গেছে৷ আর কতদিন বিনা ওষুধে বাঁচিয়ে রাখতে পারব জানি না৷ এরমধ্যেই গতকাল রাতে...’

শমীকবাবুর কথার মধ্যেই চৌবেসাহেব বলে উঠলেন, ‘কত রাতে?’

‘তখন রাত সাড়ে দশটা হবে৷ আমি শুয়ে পড়েছিলাম৷ এমন সময় বাইরের দরজায় কেউ নক করল৷ বেশ জোরালো নকিং৷ মনে হচ্ছিল, দেরি করলে দরজা ভেঙেই ফেলবে৷’

‘আমি দরজা খুলতেই চারজন লোক আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল৷ ঘর তো বেশি নেই, মাত্র তিনটে৷ এই ঘরটা আর ওই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে আরো দুটো ঘর রয়েছে৷ ওরা তিনটে ঘরই তছনছ করে দিল৷ আমি যত জিগ্যেস করি, কে আপনারা? এখানে কী খুঁজছেন? কোনো উত্তর দেয় না৷ তারপর যেমন এসেছিল, তেমনি বেরিয়েও গেল৷’

বিনায়ক বলল, ‘কী খুঁজছে সে সম্বন্ধে কিছু বলেনি?’

‘উঁহু৷ তবে মনে হয় জিনিসটা বড়সড় কিছু হবে৷ কারণ ওরা ড্রয়ার কিংবা কাবার্ডের মতো জায়গাগুলোয় হাতই দেয়নি৷ বরং খাটের তলা, বাথরুমের কোণ, ফলস-সিলিংয়ের ওপরটা এইরকম সব জায়গায় কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছিল৷ দশ-পনেরো মিনিট ধরে ওই তাণ্ডব চালাল৷ তারপর বেরিয়ে গেল৷

‘আচ্ছা, এরকম কি হতে পারে যে, ওরা কোনো মানুষকে খুঁজছিল? হয়তো ওরা কাউকে খুন করার জন্যে তাড়া করেছিল৷ করতেই পারে৷ ওদের প্রত্যেকের হাতেই তো ছোরা কিংবা গুপ্তির মতো অস্ত্র ছিল৷ একজনের হাতে তো একটা ওয়ান-শটার অবধি দেখেছিলাম বলে মনে হচ্ছে৷ আর এখানে তাড়া খাওয়া লোকের লুকোনোর জায়গা তো এই একটাই, এই বাড়িটা৷ হয়তো সেইজন্যেই৷’

শমীকবাবু দৃশ্যটা কল্পনা করে শিউরে উঠলেন৷ তারপর চুপ করে মুখ নামিয়ে বসে রইলেন৷

চৌবেসাহেব জিগ্যেস করলেন, ‘আপনার ওপরে কোনো টর্চার করেছিল?’

‘না না,’ জোরে জোরে দু’দিকে মাথা নাড়ালেন শমীকবাবু, ‘আমাকে পাত্তাই দেয়নি৷’

বিনায়ক বলল, ‘শমীকবাবু! আমাদের পরিচয় কী, আমরা এখানে কেন এসেছি, সেসব আপনাকে আগেই বলা উচিত ছিল৷’ বিনায়ক তার আর চৌবেসাহেবের পরিচয় দিল৷ সঙ্গে চৌবেসাহেবের গতরাত্রের অভিজ্ঞতার কথাও বলল৷ তারপর বলল, ‘একবার আপনার বাড়িটা ঘুরে দেখতে পারি?’

শমীকবাবু অপ্রস্তুত মুখ করে বললেন, ‘সে তো একশোবার পারেন৷ কিন্তু মুশকিল হয়েছে কী বলুন তো? আপনারা যে আসবেন তা তো আমি জানতাম না৷ তাই ঘরগুলো অনেকটাই গুছিয়ে ফেলেছি৷ এমনকী অভ্যেসমতো সকালে একদফা সুইপিং-ও করে ফেলেছি৷ তাই যাকে আপনারা ‘এভিডেন্স’ বলেন, সেরকম কিছু বোধহয় আর পাবেন না৷’

তিন

কিন্তু পাওয়া গেল৷

এভিডেন্স পাওয়া গেল৷

শমীকবাবুর কাছ থেকেই একটা টর্চ চেয়ে নিয়ে উমাশঙ্কর চৌবে আর বিনায়ক বসু দু’জনে মিলে তিনটে ঘর, দুটো ওয়াশরুম, বারান্দা এবং একটা ওয়াশরুমের ছাদের সঙ্গে লাগানো সেলারটা খুব খুঁটিয়ে দেখলেন৷ এবং তার ফলে ওদের চোখে পড়ল, খাটের নীচে জমে-থাকা ধুলোর ওপরে হাঁটু আর কনুইয়ের ঘষটানির দাগ৷ চোখে পড়ল, রডের আংটা থেকে ছিঁড়ে নামিয়ে আনা শাওয়ার-কার্টেন আর কবজার গায়ে ঝুলে-পড়া সেলারের ট্র্যাপ-ডোর৷

সন্দেহ নেই, একদল লোক এই বাড়িতে খানা-তল্লাশি চালিয়ে গেছে৷ তারা যা খুঁজছিল তা এখানে না পেয়ে নিশ্চয়ই ওরাই আবার সেগুনবনে টর্চ জ্বালিয়ে জিনিসটা খুঁজে বেড়াচ্ছিল৷ জিনিসটা, নাকি মানুষটা? কী খুঁজছিল ওরা?

চৌবেসাহেব শমীকবাবুর অনুমতি নিয়ে একবার ওঁর ড্রয়ার আর কাবার্ডগুলোও খুলে দেখলেন৷ দেখলেন, ব্যক্তিগত ব্যবহারের অল্প কিছু পোশাক-আশাক আর প্রসাধনী ছাড়া আর সমস্ত জায়গাই নানারকম ওষুধ, অ্যানিমাল-ফিড আর পোলট্রি-ফিডের স্যাম্পেলে ভর্তি৷ একজন চিকিৎসকের ঘরে সেটাই তো স্বাভাবিক৷ সবকিছুই সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা ছিল৷ দেখলেই বোঝা যায় ওসব জায়গায় কাল রাতে কারও হাত পড়েনি৷

চৌবেসাহেব একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘আপনার এই ঘড়ি, চশমা, পার্স, মোবাইল—এসব নিশ্চয় ওই ড্রয়ার বা কাবার্ডের মধ্যেই কোথাও রাখা ছিল?’

শমীকবাবু ম্লান হেসে বললেন, ‘অত ভেতরেও নয়৷ ওই টেবিলটার ওপরে সব পড়েছিল৷ ওরা ছুঁয়েও দেখেনি৷ সেইজন্যেই মনে হচ্ছে, ওরা কোনো জিনিস খুঁজতে আসেনি৷ মানুষ খুঁজতে এসেছিল৷’

চৌবেসাহেব আর বিনায়ক শমীক হাজারিকার সঙ্গে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল৷ চৌবেসাহেব একবার ঘড়ি দেখলেন৷ দুপুর দেড়টা বেজে গেছে৷ বললেন, ‘মিস্টার হাজারিকা, আমার মনে হয়, আপনার এখনই একবার কুচবিহার থানায় ইনফর্ম করা উচিত৷ এবং একইসঙ্গে আপনার অফিসে—ফরেস্ট অফিসে৷ আপনি যদি চান, আমরা আপনার সঙ্গে দুটো জায়গাতেই যেতে পারি৷’

শমীকবাবু বিনায়কের উর্দির দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘আপনাকে বললে হবে না? থানায় যেতে হবে?’

বিনায়ক হেসে ফেলল৷ বলল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ আমার জুরিসডিকশন আলাদা৷ এই জায়গাটা কুচবিহার সদর থানার আন্ডারে৷ চলুন না, আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি৷ কুচবিহারে এখন ওসি হচ্ছেন পার্থদা, পার্থসারথি রায়৷ আমার দু’ব্যাচ সিনিয়র৷ খুব ভালো মানুষ, কোনো অসুবিধে হবে না৷’

বুকের কাছে দু’হাত জড়ো করে শমীক হাজারিকা বললেন, ‘না স্যার, না স্যার৷ ওই ভুলটা আমি করব না৷’

চৌবেসাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘সে আবার কী? পুলিশে জানানোটা ভুল হবে বলে মনে হচ্ছে আপনার?’

‘অবশ্যই ভুল হবে৷ দেখুন, একটা জিনিস তো বোঝাই যাচ্ছে, আমি ওদের টার্গেট ছিলাম না৷ আমাকে ওরা টাচ অবধি করেনি৷ তাহলে আমি কেন পুলিশে রিপোর্ট করে ওদের সঙ্গে শত্রুতা তৈরি করব বলুন?’

ওরা কিছু বলার আগেই শমীকবাবু আবার বললেন, ‘এই হতচ্ছাড়া জঙ্গলের মধ্যে আমাকে সম্পূর্ণ একা থাকতে হয়৷ শত্রুতা করে কতদিন বাঁচব? পারলে আপনারাই আমার একটা উপকার করুন স্যার৷ কুচবিহার থানায় বলে এখানে রাতে একটা টহলদারির বন্দোবস্ত করুন৷ তবে অবশ্যই বলে দেবেন, যেন আমার ওপরে সন্দেহ না পড়ে, এইভাবে করতে৷ মানে, ধরুন এই ফরেস্টের বাউন্ডারি বরাবর এক-দু’বার ঘুরে গেল, কোনো সন্দেহজনক গাড়ি-টাড়ি দেখলে আটকাল, এই আর কী৷’

বিনায়ক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ঠিক আছে মিস্টার হাজারিকা, আমরা এখন চলি৷ আমার ফোন নম্বরটা রেখে দিন৷ সন্দেহজনক কিছু দেখলে কল করবেন৷ তারপর আমি যা করবার করব৷’

শমীক হাজারিকাকে নিজের ফোন নম্বরটা দিয়ে, ওঁর ফোন নম্বরটাও সেভ করে রাখল বিনায়ক৷ তারপর ও আর চৌবেসাহেব রানিবাগানের পাশ কাটিয়ে পাতাকুড়ার রাস্তায় এসে উঠল৷ পাতাকুড়ার মোড়ে এসে বিনায়ক বলল, ‘পারমিশন দিন স্যার, বাবুকে এখানে ডেকে নিই৷ আপনার বাড়ি থেকে আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি৷ এখনই দুটো বাজে৷ হেঁটে ফিরতে গেলে বিকেল হয়ে যাবে৷’

চৌবেসাহেব ভুরু কুঁচকে একমনে কী যেন ভাবছিলেন৷ অন্যমনস্কভাবেই বললেন, ‘ডাকো৷’

কিছুক্ষণ উসখুস করে বিনায়ক জিগ্যেস করল, ‘অত কী ভাবছেন স্যার? শমীক হাজারিকা যা বলল, তা নিয়ে কি আপনার কোনো ডাউট জাগল?’

‘জাগবে না! তোমার জাগেনি?’

‘না তো৷’

‘সত্যিই ভাগ্যবান তুমি৷ আমি এক এক করে সন্দেহের কারণগুলো বলে যাব? শুনবে?’

বিনায়কের উত্তরের অপেক্ষা না করেই চৌবেসাহেব বলে চললেন, ‘ডাউট নাম্বার ওয়ান, শমীকবাবু পুলিশের লোক দেখে ওরকম ফ্যাকাসে মেরে গেলেন কেন? কেন দু’হাত তুলে নিজেকে ডিফেন্ড করার জন্যে কথা বলতে শুরু করে দিয়েছিলেন? তুমি আগ বাড়িয়ে ওকে অভয় দিয়ে দিলে, তাই! না হলে আমি বলতাম, হ্যাঁ, আমরা সব জানি৷ ভালো চাও তো স্বীকার করো৷ কড়কে কথা বার করে নিতাম৷’

‘এ হে হে হে,’ জিভ কাটল বিনায়ক, ‘বড় ভুল হয়ে গেছে তো!’

‘যাক্েগ৷ তারপর ডাউট নাম্বার টু৷ একজন মাঝারি মাপের সরকারি চাকুরে নিজেকে অমন ব্র্যান্ডেড মালে সাজিয়ে রাখতে পারেন কেমন করে? কোত্থেকে অত পয়সা পান?

‘ডাউট নাম্বার থ্রি, যে লোক নিজেই বলে ভয়ঙ্কর স্ট্রেসের মধ্যে রয়েছে, সে সকালে উঠে ঘর ঝাঁট দেয় কীভাবে? আর তার চেয়েও বড় কথা, সে পুলিশে খবর দিতে চায় না কেন? এতই যদি সে নিশ্চিন্ত যে, তার ওপরে আর অ্যাটাক হবে না, তাহলে তো স্ট্রেস থাকারও কথা নয়, তাই না?

‘অ্যান্ড লাস্ট বাট নট দি লিস্ট, ও তো টর্চারড হয়েছিল৷ হাতের কালশিটেটাই তার সাক্ষী...’

‘কালশিটে? কই আপনি আমাকে কিছু বললেন না তো!’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘কী মুশকিল! ওর হাতটা তোমার চোখের সামনে ধরে দেখাব নাকি, এই দ্যাখো, এই হচ্ছে কালশিটে৷ নিজে দেখতে পাও না? যা বলছিলাম... টর্চারড যে হয়েছিল সেটা উনি লুকোচ্ছেন কেন? আমি তোমাকে বলছি বিনায়ক, এই শমীক হাজারিকা ভদ্রলোক কালপ্রিটদের খুব ভালো করে চেনেন৷’

চৌবেসাহেবকে এরকম তিরিক্ষে মেজাজে সচরাচর দেখা যায় না৷ একমাত্র তখনই দেখা যায়, যখন উনি কোনো একটা ঘটনার ঠিকঠাক ব্যাখ্যা পান না৷ বিনায়ক জানে, তখন বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে ওঁকে নিজের মতো থাকতে দেওয়া৷ গভীরভাবে ভাবতে দেওয়া, যতক্ষণ না ভেবে ভেবে উনি ব্যাখ্যাটা বার করে ফেলছেন৷

কাজেই বিনায়ক গাড়িতে ওঠার পরে মিনিট তিনেক চুপ করে বসে রইল৷ কিন্তু তারপর আর না পেরে ডেকেই বসল, ‘স্যার!’

‘বলো৷’

‘বলছিলাম কী, শমীকবাবু যা-ই বলুন, আমাদের বোধহয় উচিত একবার কুচবিহার সদর থানায় গিয়ে পার্থদাকে পুরো ঘটনাটা জানিয়ে আসা৷’

চৌবেসাহেব আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে বিনায়কের দিকে তাকালেন৷ তাঁর ভুরুর জটগুলো একটা একটা করে খুলে গেল৷ ঠোঁটের সরু হাসি ক্রমশ চওড়া হতে হতে পুরো মুখটাকেই আলো করে তুলল৷ পরক্ষণেই ভারী হাতের পাঞ্জা দিয়ে বিনায়কের কাঁধে একটা চাপড় মেরে বললেন, ‘এইজন্যেই তোমাকে এত ভালোবাসি বিনায়ক৷ দিস ইজ কলড ইনট্যুইশন৷ বাংলায় যাকে বলে পূর্বানুমিতি৷ একজন ইনভেস্টিগেটিং-অফিসারের সবচেয়ে বড় সম্পদ হল এই ইনট্যুইশন৷ এই যে তোমার মনে হচ্ছে, পার্থকে জানানো উচিত, আমি বলছি, খুব শিগগিরই তুমি দেখবে এর চেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত আর হয় না৷’

বিনায়ক লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে বলল, ‘থ্যাঙ্কিউ স্যার৷ তাহলে আপনার ওখানে লাঞ্চ সেরেই আমরা সদর থানায় একবার ঢুঁ মেরে আসব৷ আপনি কিন্তু সঙ্গে যাবেন স্যার৷’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘অবশ্যই যাব৷ আফটার অল, এই কেসটা আমিই ইনিশিয়েট করেছি৷ সোজা বাংলায় কেঁচোটা আমিই খুঁড়েছি৷ এবার সেই কেঁচোর পেছন পেছন গোখরো সাপ বেরোয় কিনা সেটাই দেখার৷ উমাশঙ্কর চৌবের ইনট্যুইশন বলছে, বেরোবে৷’

খুব তাড়াহুড়ো করে খাওয়া-দাওয়া সারলেও, ওদের আবার বেরোতে বেরোতে বেজে গেল সাড়ে তিনটে৷ তারপরেও সরাসরি থানায় যাওয়া গেল না৷ আটকালেন চৌবেসাহেবই৷

গাড়িটা যখন সবে ওঁর বাড়ির সামনে দিয়ে বাঁক নিয়ে মেন রোডে উঠেছে, তখনই উনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আরে থামো, থামো৷ দাঁড় করাও একবার৷’

বাবু রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিল৷ বিনায়ক অবাক হয়ে বলল, ‘কী হল স্যার? কিছু আনতে ভুলে গেলেন নাকি?’

স্বাভাবিক প্রশ্ন, কারণ লক-ডাউনের জনশূন্য রাস্তায় দ্বিতীয় কোনো প্রাণীকে দেখা যাচ্ছিল না৷

চৌবেসাহেব দরজা খুলে নামতে নামতে বললেন, ‘আরে না৷ অরুময় মিত্র, মানে ডেপুটি কনজার্ভেটর অফ ফরেস্ট দেখছি ওখানে বসে আছেন৷ চলো, ওঁর সঙ্গে একটু শমীক হাজারিকার ব্যাপারে কথা বলে যাই৷’

এই নীলকুঠি জায়গাটা কুচবিহার শহরের ভি.আই.পি. পাড়া৷ চওড়া রাস্তার একপাশে এয়ারপোর্টের পাঁচিল-ঘেরা জমি৷ অন্যপাশে সার দিয়ে পরপর এলাহি সব রাজার আমলের বাংলো৷ ডিস্ট্রিক্ট-ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ-সুপার, ডেপুটি-কনজার্ভেটর-অফ-ফরেস্ট, সবারই আবাসন এই মহল্লায়৷ ওরা যে বাংলোটার সামনে দাঁড়িয়েছিল, সেটা ডেপুটি-কনজার্ভেটর অরুময় মিত্রের বাংলো৷ রাস্তা থেকেই বিনায়ক দেখতে পেল, বলিষ্ঠ চেহারার সুপুরুষ এক ভদ্রলোক পোর্টিকোয় বসে বই পড়ছেন৷ পরনে ধবধবে সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা৷

কাঠের গেটটা খুলে ওরা দু’জন নুড়ি বিছানো রাস্তায় পা দিতেই, তিনি মুখ তুলে তাকালেন৷ তারপর ভাঁজ করা বইটা হাতে ধরে রেখে, ওদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললেন, ‘আরে, উমাদা যে! কী সৌভাগ্য! কতদিন বাদে দেখলাম আপনাকে৷ আসুন দাদা৷’

চৌবেসাহেব চাপা গলায় বললেন, ‘বুঝলে, অরুময় আমার ব্রিজ খেলার পার্টনার৷ সেইজন্যে ফর্মালিটি নেই৷’

কিন্তু তিনি আর বেশিদূর এগোলেন না৷ পোর্টিকোর নীচে দাঁড়িয়েই মুখের মাস্কটা ঠিক করে নিয়ে বললেন, ‘অরুময় ভাই, এই পরিস্থিতিতে আর তোমার প্রাসাদে পা দেব না৷ আমার এই চেলাটি আলিপুরদুয়ার থানার ওসি৷ নাম বিনায়ক বসু৷ এর প্রয়োজনেই তোমাকে দুটো কথা জিগ্যেস করে চলে যাব৷’

‘এ হে হে! আমি ভাবলাম আজ বোধহয় একহাত খেলা হবে৷ কিন্তু না, আপনি ঠিকই বলেছেন৷ এখন সাবধানতাই ভালো৷ বলুন দাদা, কী জানতে চাইছেন?’

‘শমীক হাজারিকা৷ লোকটা কেমন?’

নামটা শোনামাত্রই অরুময় মিত্রের সুন্দর মুখটা বিকৃত হয়ে গেল৷ একমুহূর্ত না ভেবেই উনি বললেন, ‘স্কাউন্ড্রেল! একদম ফার্স গ্রেডের স্কাউন্ড্রেল! কেন? সে আবার কী করেছে?’

চৌবেসাহেবও এরকম উত্তরে একটু থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন৷ সামলে নিয়ে বললেন, ‘তেমন কিছু করেননি এখনো৷ ধরো, পুলিশ প্রোটেকশন চেয়েছেন৷ কিন্তু তার আগে বলো তো, ‘‘স্কাউন্ড্রেল’’ বলছ কেন? কী করেছেন উনি?’

অরুময় মিত্র বিরক্ত মুখে বললেন, ‘ভাবতে পারেন, আমাদের অ্যাম্বুলেন্সটা নিয়ে ধুবড়ি চলে গিয়েছিল৷ তোর বাপের গাড়ি ওটা? জুরিসডিকশনের বাইরে একটা অন্য স্টেটে গাড়িটা নিয়ে চলে যাচ্ছিস, কারও পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজন নেই? আমি ওকে আজকালের মধ্যেই সাসপেন্ড করব উমাদা৷ তারপর ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি শুরু হবে৷ আচ্ছা, ও কি আমার এগেইন্সটেই প্রোটেকশন চেয়েছে নাকি?’

‘আরে না না৷ সে অন্য ব্যাপার, পরে তোমাকে বলব৷ কিন্তু উনি গিয়েছিলেন কোথায়? খবর নিয়েছ?’

অরুময় মিত্র চিরতা-খাওয়া গলাতেই বললেন, ‘বলছে তো ফ্যামিলির জন্যে খুব মনকেমন করছিল, তাই অন্য ট্রান্সপোর্ট পায়নি বলে অ্যাম্বুলেন্সটা নিয়েই নাকি ধুবড়িতে ওর ফ্যামিলির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল৷ নিজেই ড্রাইভ করে গিয়েছিল৷ বাড়ির জন্যে এত মনকেমন করল যে, একটা অ্যাম্বুলেন্স চালিয়ে নিয়ে তিনি বাড়ি চলে গেলেন৷ অপদার্থ উল্লুক না হলে এরকম কেউ করে, বলুন?’

চৌবেসাহেব এক সেকেন্ড মুখ নিচু করে কী যেন ভাবলেন৷ তারপর বললেন, ‘এই কাণ্ডটা কবেকার?’

‘এই তো, আজ লকডাউনের টেনথ-ডে তো? তার মানে এগারো দিন আগের ঘটনা৷ একরাত ওখানে কাটিয়ে, লকডাউনের সকালেই আবার ফিরে এসেছিল বলে খবর পেয়েছি৷’

‘অ্যাম্বুলেন্সটা তো এখনো ওঁর কাছেই, মানে তোমাদের রেসকিউ-সেন্টারেই রয়েছে দেখলাম৷’

এবার অরুময় মিত্রর অবাক হওয়ার পালা৷ বললেন, ‘সেকী! আপনারা রেসকিউ-সেন্টারেও গিয়েছিলেন নাকি? কী ব্যাপার বলুন তো দাদা৷ ও হ্যাঁ, গাড়িটা ওখানে আছে ঠিকই, তবে গাড়ির চাবি আর লগবুক তুলে নিয়ে চলে এসেছি৷ চালাতে পারবে না৷ কিন্তু বললেন না যে, কী হয়েছে?’

জোরকদমে ব্যাক করতে করতে উমাশঙ্কর চৌবে উত্তর দিলেন, ‘সন্ধেবেলায় বলব অরুময়৷ এখন জরুরি কয়েকটা কাজ সেরে আসি৷’

জিপে উঠে চৌবেসাহেব বললেন, ‘সদর থানা চেনো তো বাবু? নৃপেন্দ্রনারায়ণ পার্কের পেছনের রাস্তাটায়৷ চলো৷’

বিনায়ক পাশ থেকে ডাকল, ‘স্যার!’

চিন্তামগ্ন চৌবেসাহেব সংক্ষিপ্ততম উত্তর দিলেন, ‘হুঁ৷’

‘কেসটা ক্রমশ ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠছে না?’

‘আরো হবে৷ বাই-দা-ওয়ে, একটা কথা এখনই বলে রাখি৷ পরে হয়তো ভুলে যাব৷ ফেরার পথে একবার আলিপুরদুয়ার কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে নেমে যেও৷ তোমারই জুরিসডিকশন৷ শমীক হাজারিকার অ্যাকাউন্টে রিসেন্টলি কেমন ট্র্যানজাকশন হয়েছে দেখে আমাকে জানিও৷’

‘ওই ব্যাঙ্কে যে ওঁর অ্যাকাউন্ট আছে জানলেন কেমন করে?’

‘ড্রয়ারে চেকবইটা ছিল৷ একদম নতুন৷ অ্যাকাউন্ট নাম্বারের লাস্ট চারটে ডিজিট হল ফাইভ থ্রি এইট থ্রি৷’

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের গাড়িটা সদর থানার কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে পড়ল৷ চৌবেসাহেব বিনায়ককে বললেন, ‘ক’টা বাজে দ্যাখো তো?’

বিনায়ক মোবাইলটা বার করে, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চারটে এগারো৷’

‘ইস! আমরা শমীক হাজরিকার কোয়ার্টার থেকে বেরিয়েছি বোধহয় পৌনেদুটোয়, তাই না? মানে মাঝখানে প্রায় আড়াই ঘণ্টা কেটে গেছে৷ বড্ড দেরি হয়ে গেল বিনায়ক৷’

‘কীসের দেরি স্যার?’

‘বিনায়ক, আমার মন বলছে শমীকবাবু খুব বড় বিপদের মধ্যে আছেন৷ আমাদের উচিত ছিল রেসকিউ-সেন্টার থেকেই স্ট্রেট এই থানায় আসা৷ কিন্তু তখনও তো জানতাম না যে, শমীকবাবু ধুবড়ি গিয়েছিলেন৷ না আর দেরি করা যাবে না৷ চলো, নামো৷’

বিনায়ক চৌবেসাহেবের উদ্বেগের কারণটা পরিষ্কার না বুঝলেও একটু টেন্সড হয়ে গেল৷ ও জানে, চৌবেসাহেব খুব ভালো বিপদের গন্ধ পান৷

সেলফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে গিয়েও কী যেন একটা দেখে বিনায়ক বলে উঠল, ‘ইসস!’

‘কী হল?’

‘একটা মিসড কল৷ ও মাই গড! শমীকবাবু ফোন করেছিলেন৷ ফোনটা মিউট করে রেখেছিলাম, তাই বুঝতে পারিনি৷’

বিনায়কের কথাটা শুনেই চৌবেসাহেব স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ বললেন, ‘শমীক হাজারিকা! কখন করেছিলেন?’

বিনায়ক বলল, ‘আড়াইটের সময়৷’

‘তার মানে আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে আসার ঠিক পরেই৷ বিনায়ক, আমি আর ভেতরে ঢুকছি না, গাড়িতে বসছি৷ তুমি পার্থকে বলো, পাঁচ মিনিটের মধ্যে যেটুকু টিম মোবিলাইজ করতে পারে, তাই নিয়ে বেরিয়ে আসতে৷ বলবে, যেতে যেতে সব এক্সপ্লেইন করব৷’

ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথাতেই কুচবিহার সদর থানার ওসি পার্থসারথি রায় চারজন কনস্টেবল আর দুটো গাড়ি নিয়ে বিনায়কের গাড়িটাকে ফলো করলেন৷ পার্থবাবু নিজেও ট্রেনিং পিরিয়ডে উমাশঙ্কর চৌবের কাছে ক্রিমিনোলজির প্রথম পাঠ নিয়েছেন, তাই সাহেবের ওপরে তাঁরও অগাধ শ্রদ্ধা৷ স্যার নিজে বাইরে গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছেন শুনে, তিনি আর দেরি করেননি৷

তবে তাড়াহুড়ো করে লাভ হল না কিছুই৷

সেগুনবনের মধ্যে দিয়ে হাঁটা-পথটুকু ডাবল-মার্চ করে পেরোতে পেরোতেই ওরা দেখতে পাচ্ছিল, রেসকিউ-সেন্টারের সামনের দরজাটা হাট করে খোলা৷ ঘরটায় ঢুকে দেখল, সোফার ওপরে শমীক হাজারিকা একটা ন্যাকড়ার পুতুলের মতো এলিয়ে পড়ে আছেন৷ দুটো হাত পিছমোড়া করে বাঁধা৷

বিনায়ক প্রথমে ভেবেছিল, ভদ্রলোকের মুখটা বোধহয় কেউ একটা টকটকে লাল সিল্কের রুমাল দিয়ে ঢাকা দিয়ে গেছে৷ অবশ্য পরক্ষণেই ভুল ভাঙল৷ রুমাল নয়, রক্ত৷ ওঁর কপাল থেকে গলা অবধি পুরো জায়গাটাই চিটচিটে রক্তের একটা আস্তরণে ঢেকে রয়েছে৷

চৌবেসাহেব একটু ঝুঁকে, শমীকবাবুর মুখটা একবার কাছ থেকে দেখে নিয়েই আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন৷ নিজের মনেই বললেন, ‘কথা বার করার জন্যে ক্ষুর দিয়ে ক্রমাগত মুখের চামড়ায় কাটাকুটি করে গেছে৷ চেঁচিয়েছিলেন নিশ্চয়ই, কিন্তু এখানে কে আর চেঁচানি শুনবে? তবে কথা বার করতে পারেনি৷ সেইজন্যেই যাবার সময় গলার নলিটা কেটে দিয়ে গেছে৷’

তারপর পার্থসারথি রায়ের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘পার্থ, বুঝতেই পারছ প্রফেশনাল কোনো গ্যাং-এর কাজ৷ খুব সম্ভবত বাইরে থেকে এসেছে৷ তবে এখানেও ওদের সাহায্যকারী আছে৷ কাছাকাছির মধ্যে যে-ক’টা ক্রিমিনালদের ডাগ-আউট আছে, এই ধরো খালাসিপট্টি কিংবা কামেশ্বরী রোড, সবক’টা জায়গাতে এখনই ছাপ্পা মারিয়ে দাও৷ দ্যাখো, আউটসাইডার কারা আছে৷’

পার্থসারথি ঘাড় হেলিয়ে বললেন, ‘ইয়েস স্যার৷ এখনই ব্যবস্থা করছি স্যার৷’

আধঘণ্টা বাদে রানিবাগানের রাস্তার দিকে আরো কয়েকটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়াল৷ তাছাড়া একটা অ্যাম্বুলেন্স৷ কয়েকজন লোক স্ট্রেচার বয়ে নিয়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে৷ ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের গাড়িটাও চৌবেসাহেবের চোখ এড়াল না৷

পার্থসারথি রায় দু’জন লোক নিয়ে বাড়িটাকে কর্ডন করতে শুরু করেছিলেন৷ চৌবেসাহেব তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, ‘পার্থ, তোমরা কাজ করো৷ আমার তো এখন আর এখানে কোনো ফাংশন নেই৷ আমি বাড়ি চললাম৷’

বিনায়ক হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এসে বলল, ‘আমার গাড়িটা আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসুক স্যার৷’

চৌবেসাহেব হাত নেড়ে বললেন, ‘দরকার নেই৷ এইটুকু রাস্তা, হেঁটেই চলে যাব৷ কাল একবার ফোন কোরো৷’

সেগুনবাগানের মধ্যে খুব দ্রুত বিকেলের ছায়া নেমে আসছিল৷ মিনিট-দুয়েকের মধ্যেই রেসকিউ-সেন্টারের বধ্যভূমি চৌবেসাহেবের চোখের আড়ালে চলে গেল৷ পাঁচ মিনিটের মধ্যে মুছে গেল ওখান থেকে ভেসে আসা মানুষের গলার স্বর৷

আরো কিছু হাঁটার পরে চৌবেসাহেব শুনতে পেলেন, দূর থেকে একটা বাচ্চা মেয়ে একবার চেঁচিয়ে উঠল, ‘টুকি৷’ তারপরেই শুনতে পেলেন আরো অনেকগুলো মেয়ের খিলখিল হাসি৷

চৌবেসাহেব নিজের মনেই বলে উঠলেন, ‘অকালমৃতা সব রাজকুমারী৷ সেগুনবনে খেলতে এসেছে৷’

চার

পরের দিন সকালেই চৌবেসাহেবের কাছে পরপর দুটো ফোন এল৷

সাড়ে এগারোটা নাগাদ ফোন করল বিনায়ক৷ সে জানাল, আলিপুরদুয়ার কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টটা শমীকবাবু খুলেছিলেন দু’বছর আগে৷ আশ্চর্য ব্যাপার, তখন কিন্তু ওঁর পোস্টিং ছিল আসামের তিনসুকিয়ায়, ডিব্রু-শইখোয়া রিজার্ভ-ফরেস্টে৷ তবু পাঁচশো কিলোমিটার দূরের এক শহরে, একটা ছোট্ট ব্যাঙ্কে তিনি অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন৷ অ্যাকাউন্টটা থেকে একটা টাকাও বেরোয়নি, শুধুই ঢুকেছে৷ একেকবারে কুড়ি-তিরিশহাজার টাকা৷ এইভাবে দু’বছরে মোট জমার পরিমাণ তিন লক্ষর কাছাকাছি৷ সমস্ত টাকাই এসেছে একটাই অ্যাকাউন্ট থেকে৷

চৌবেসাহেব নিচু গলায় স্বগতোক্তি করলেন, ‘রে-ব্যান আর রিবকের উৎস পাওয়া গেল,’ তারপর গলা তুলে বললেন, ‘যে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা জমা পড়েছে, সেটার খোঁজ নিয়েছ?’

‘নিয়েছি স্যার৷ ওই ব্র্যাঞ্চেরই অ্যাকাউন্ট৷ অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের নাম বিষ্ণুপদ বর্মন, অ্যাড্রেস নিউটাউন, আলিপুরদুয়ার৷ কিন্তু...’

‘কিন্তু নিউটাউনে ওই নামে কেউ নেই, তাই তো? ফেক ডকুমেন্টস দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলেছে৷’

‘এগজ্যাক্টলি স্যার৷’

‘ইনফর্মেশনটা পার্থকে জানিয়ে দাও৷’

বিনায়ক কল করার একটু পরেই ওসি কুচবিহার, পার্থসারথি রায় কল করলেন৷ বললেন, ‘স্যার! কুচবিহার, বানেশ্বর, মধুপুর থেকে ওদিকে ভেটাগুড়ি অবধি যত ডাগ-আউট ছিল সব তন্ন-তন্ন করে খুঁজলাম৷ কিন্তু বাইরের গ্যাং বলে কিছু পেলাম না৷ এমনি চোর-পকেটমার টাইপের যে লোকগুলো থাকে, তারাই রয়েছে৷ ও-বেটাদের রক্ত-টক্ত দেখলে হাঁটু কাঁপে৷ খুনখারাপি ওরা করবে না৷’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘না পার্থ৷ আমি খোঁজ নিতে বলে ভুল করেছিলাম৷ এখন মনে হচ্ছে, গ্যাং-টা আসামের৷ আমরা কুচবিহারে তাদের খোঁজ পাব কেমন করে? কুচবিহার থেকে আসাম যাওয়ার জন্যে কাঁচায়-পাকায় অন্তত দশটা এগজিট পয়েন্ট রয়েছে৷ লোকজন নদী পেরিয়ে পায়ে হেঁটে আসামে চলে যায়৷ আমার ধারণা শমীকবাবুর হত্যাকারীরা তাই করেছে৷ এসেছে, কাজ সেরেছে, আবার পায়ে হেঁটে তুফানগঞ্জ বক্সিরহাট হয়ে আসামে ঢুকে পড়েছে৷ ওরা এখানে বসে থাকবে কেন?’

পার্থবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার, বিনায়কের ফোন পাবার পর আমারও তাই মনে হচ্ছে৷ এমন একটা গ্যাং কাজ করে গেছে, যাদের সঙ্গে শমীক হাজারিকার রীতিমতো দোস্তি ছিল৷ সেই ডিব্রু-শইখোয়ায় পোস্টিং-এর সময় থেকেই শমীকবাবু ওদের কাছ থেকে হিস্যা পাচ্ছিলেন৷ কিন্তু স্যার, আমি তাহলে এখন কী করব? খুনের মোটিভও তো খুঁজে পাচ্ছি না৷ অথচ ভিকটিম একজন সরকারি অফিসার৷ অলরেডি চার্জশিট দেওয়ার জন্যে সেন্ট্রাল ফরেস্ট সার্ভিস থেকে চাপ আসতে শুরু করেছ৷ তাও তো মিডিয়া এখন লকডাউনের খবর নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে৷ না হলে চাপ আরও বাড়ত৷’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘আমিও ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছি, পার্থ৷ কোনো ব্রেক-থ্রু পেলেই তোমাকে জানাব, কেমন?’

‘প্লিজ স্যার৷ আপনার ওপরেই ভরসা করে আছি৷’

পার্থর সঙ্গে কথা বলে চৌবেসাহেব একটা খুরপি নিয়ে চলে গেলেন তাঁর ছাদের বাগানে৷

সকলেই জানে, টবের মাটি খোঁচানোর জন্যে দুপুরবেলাটা মোটেই উপযুক্ত সময় নয়৷ ওই কাজটা করতে হয় সকালে কিংবা বিকেলে৷ শুধু চৌবেসাহেবের স্ত্রী জানেন, যখন খুব গভীরভাবে কিছু ভাবতে হয়, যখন ক্রিমিনালের মনের মধ্যে ঢুকে তার গতিবিধিগুলোকে আন্দাজ করতে হয়, তখন গাছের গোড়ার মাটি খোঁচালে খুব ভালো কাজ হয়৷ তাই তিনি চৌবেসাহেবকে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে উঠে যেতে দেখেও কিছু বললেন না৷ থাক, ভাবুক৷

হ্যাঁ, ভাববার জন্যেই ছাদে উঠে এসেছিলেন চৌবেসাহেব৷ ভাবনা তো একটা নয়, অনেকগুলো৷

এক, খুনেগুলো পরশু রাতে কী খুঁজতে শমীকবাবুর ঘরে হানা দিয়েছিল?

দুই, শমীকবাবু ওদের কী বুঝিয়েছিল, যার জন্যে ওরা নিজেরাই তারপরেও টর্চ জ্বেলে সেগুনবাগানে আতিপাতি করে জিনিসটা খুঁজতে শুরু করেছিল?

জিনিস? মানুষ নয়? শমীকবাবু যে বলেছিল ওরা বড়সড় কিছু খুঁজছে৷

চৌবেসাহেবের হাতটা কয়েক মুহূর্তের জন্যে জিনিয়া গাছের গোড়ায় থেমে গেল৷ তারপর তিনি ঘাড় নাড়লেন৷ উঁহু৷ শমীকবাবু মিথ্যে কথা বলেছিল৷ নিজের চোখেই তো দেখলাম, সবক’টা টর্চের আলোর ফোকাস জমির দিকে নামানো ছিল৷ ওটা মানুষ খোঁজার ধরন নয়৷ মানুষ খুঁজতে হলে টর্চের ফোকাস থাকত বুক বরাবর, সামনে৷ ওরা মাটিতে পড়ে থাকা কোনো জিনিসই খুঁজছিল৷

আচ্ছা, তাই না হয় হল৷ কিন্তু পরদিন দুপুরে ওরা আবার ফিরে এল কেন? তাহলে কি শমীকবাবু ওদের কথা দিয়েছিল, নিজেই জিনিসটা খুঁজে রাখবে? কথা রাখতে পারেনি৷ তারপর খুনিরা আর ওকে বিশ্বাস করেনি৷ ওরা ধরেই নিয়েছিল শমীকবাবু জিনিসটা লুকিয়ে রেখেছেন৷ সেইজন্যেই টর্চার, সেইজন্যেই খুন?

জিনিসটা কী? শমীকবাবু কি সেটা ওদের কাছ থেকে চুরি করে নিয়ে এখানে পালিয়ে এসেছিল? সেই জিনিসটা আনার জন্যেই কি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের গোপনীয়তার প্রয়োজন পড়েছিল? না হলে কুচবিহার থেকে ধুবড়ি যাওয়া-আসাটা তো তেমন কোনো সমস্যা নয়৷

দোপাটি গাছের গোড়া থেকে চুপিচুপি গজিয়ে ওঠা একটা আগাছার চারাকে উপড়ে তুলে, চৌবেসাহেব উঠে দাঁড়ালেন৷ বিড়বিড় করে বললেন, ‘তাহলে যদি পুরো ব্যাপারটার সারসংক্ষেপ করি, তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে?

‘দাঁড়াচ্ছে এই যে, আসামের কোনো গ্যাং-এর হাত থেকে অত্যন্ত মূল্যবান কোনো বস্তু নিয়ে শমীক হাজারিকা পালিয়ে এসেছিল৷ পালিয়ে এসে অবশ্য বাঁচতে পারল না৷ ওরাও পেছন পেছন তাড়া করে এসে লোকটাকে খতম করে দিয়ে গেল৷

‘গ্যাং-টি নিশ্চিতভাবেই ফরেস্ট-মাফিয়াদের গ্যাং; যারা গন্ডারের খড়্গ, বাঘের চামড়া থেকে শুরু করে চন্দনকাঠ অবধি সবকিছুরই চোরাকারবারে জড়িত থাকে এবং বেশিরভাগ সময় উত্তর-পূর্ব ভারতের অজস্র সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের কোনো একটার মদতে কাজ করে৷ শমীক হাজারিকার হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যে পেশাদারিত্ব এবং নিষ্ঠুরতা দেখা যাচ্ছে, সেটা সন্ত্রাসবাদী এবং মাফিয়াদের সঙ্গে চমৎকার খাপ খেয়ে যাচ্ছে৷

‘তাছাড়া ফরেস্ট-মাফিয়া ছাড়া ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মচারীকে নিয়মিত ঘুষ আর কে দেবে? ব্যাঙ্কের টাকাগুলো যে ওই গ্যাং-এর হাত থেকেই এসেছিল, সে-ব্যাপারে তো সন্দেহ নেই৷

‘এটা তো গেল হত্যাকারীদের কথা৷ এবার দেখা যাক, যার জন্যে শমীক হাজারিকাকে খুন হতে হল, সেই জিনিসটার সম্বন্ধে কী-কী জানা যাচ্ছে৷

‘প্রথমত, বস্তুটি আয়তনে ছোট৷ দ্বিতীয়ত, ছোট হলেও সেটিকে খোলা রাস্তায় বার করলে লোকের চোখ টানবে৷ সেইজন্যেই অ্যাম্বুলেন্সের মতো একটা ঢাকা গাড়ির প্রয়োজন হয়েছিল৷ তৃতীয়ত, মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, জিনিসটির উৎস জঙ্গল৷

‘তাহলে জিনিসটা কী? গন্ডারের খড়্গ? বাঘের ছাল?

‘হতে পারে৷ কিন্তু তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়, সেটা শমীক হাজারিকা মানে মানে ওদের ফেরত দিয়ে দিল না কেন? কেন খুন হতে চলেছে বুঝেও ফিরিয়ে দিল না?

‘নাঃ৷ বাড়িতে বসে এসব রহস্যের সমাধান করা যাবে না৷ বেরোতে হবে৷ লোকজনকে জিগ্যেস করতে হবে৷

‘লোকজন? আরে ধুর! সেগুনবনে সাক্ষী কোথায় পাব?’

সাক্ষী কোথায় পাব?—প্রশ্নটা মাথার মধ্যে আসতেই কে যেন উত্তরটাও তাঁকে জুগিয়ে দিলেন৷ কে যেন তাঁকে ভয়ঙ্কর ধমক দিয়ে বললেন, কেন? রাজকুমারীরা৷ সেগুনবনে যারা খেলা করে বেড়ায়৷ ওঃ উমাশঙ্কর! তুমি সত্যিই এবার বুড়ো হচ্ছ! ওদের কাছে যাওয়ার কথাটা কাল থেকে তোমার মাথায় আসেনি কেন?

চৌবেসাহেব প্রায় নাচতে নাচতেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন৷ নামতে নামতেই চিৎকার ছাড়লেন, ‘কী গো! দুটো বাজতে চলল, আজ কি আর খেতে-টেতে দেবে না নাকি?’

চৌবেসাহেবের গিন্নি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে, প্রখর দৃষ্টিতে কর্তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গা জ্বালানো কথাগুলো আর বোলো না৷ এমনিতেই মানুষজনের মন ভালো নেই৷ তুমি যদি বেলা বারোটার সময় পাগলের মতো খুরপি নাচাতে নাচাতে ছাদে বাগান করতে যাও, তাহলে কার জন্যে ভাত বাড়ব? ভূতের জন্যে?’

‘আহা রাগছ কেন? রাগছ কেন? ভূত অতি উপকারী বস্তু৷’ বলতে বলতে চৌবেসাহেব চট করে স্নানঘরে ঢুকে পড়লেন৷

পাঁচ

মুখে মাস্ক, হাতে স্যানিটাইজারের শিশি৷ খাওয়া-দাওয়ার পর হাঁটতে হাঁটতে তোর্সানদীর তীরে গিয়ে দাঁড়ালেন উমাশঙ্কর চৌবে৷

তাঁর পেছনে সবুজ সেগুনবন৷ সামনে নদী৷ নদীর ওপাশে গাঢ় সবুজ রেখার মতো শুয়ে রয়েছে অন্য এক অরণ্য৷ দূরে একটা বাঁশের তৈরি অস্থায়ী জেটি দেখা যাচ্ছে৷ স্বাভাবিক সময়ে ওখান থেকে খেয়া ছাড়ত৷ এখন লক-ডাউনে অন্য সবকিছুর মতো সেই খেয়াও বন্ধ৷

কিন্তু ওসব তো দূরের দৃশ্য৷ চৌবেসাহেবের একদম হাতের কাছেই দেখার মতো আরো অনেক কিছু ছিল৷ তিনি সেগুলোই দেখছিলেন৷

সেই রাজার আমল থেকে যে বিশাল মাটির বাঁধটা কুচবিহার শহরকে তোর্সার বন্যার হাত থেকে বাঁচিয়ে আসছে, সেই বাঁধের ঠিক নীচে, নদীতীরের বালির চরায়, কিছুদিন হল, ছোট একটা বস্তি গজিয়ে উঠেছে৷ অন্তত পঞ্চাশটা হতদরিদ্র পরিবার, আর কোথাও ঠাঁই না পেয়ে এই বিপজ্জনক জায়গায় এসে ঘর বেঁধেছে৷

বর্ষাকালে তোর্সার জল বেড়ে উঠে এই বস্তিকে ডুবিয়ে দেয়৷ সারাবছর ঘরের আশেপাশে বিষাক্ত সাপ ঘুরে বেড়ায়, ছোবলও মারে কতজনকে৷ বিদ্যুৎ নেই, পানীয় জলের সংযোগ নেই৷ তবু এখানেই ওরা পড়ে থাকে৷

অদ্ভুত ওদের প্রাণশক্তি৷ এরমধ্যেই প্রতিটি টিনের ঘরের আশেপাশে কলার বাগান মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে৷ গাছে গাছে ঝুলছে সোনালি রঙের মালভোগ কলার কাঁদি৷ প্রতিটি টিনের চালের ওপরে লতিয়ে উঠেছে লাউ-কুমড়োর লতা৷ বাড়ির পেছনে নড়বড়ে মাচায় হলুদ ফুল ফোটাচ্ছে ঝিঙে গাছ৷

ওরা ভালো করেই জানে, এই সব কিছুরই আয়ু আর দু’মাস৷ মে মাসের শেষেই বর্ষার জল পেয়ে ফুঁসে উঠবে তোর্সা৷ ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাবে ঘর বাগান সব৷ বর্ষার সেই ক’টা মাস মানুষগুলো বাঁধের ওপরে সরকারি ত্রাণের কালো প্লাস্টিক-শিটের তাঁবু বানিয়ে বাস করবে৷ কিন্তু এটাও ঠিক, বর্ষা চলে গেলে, নদীর জল নেমে গেলে, আবার ওই চরের বুকেই ঘর বানাবে ওরা৷

একটু বাদেই আট-দশটা বাচ্চা মেয়ে বস্তির ঘর থেকে বেরিয়ে চৌবেসাহেবের পাশ কাটিয়ে বাঁধের ওপরে উঠে এল৷ একটু বড় যারা, তাদের পরনে শতচ্ছিন্ন ফ্রক৷ খুব বাচ্চা যারা, তারা খালি গায়েই বেরিয়ে পড়েছে৷ সবারই তেলহীন লালচে চুল৷ গালে, কনুইয়ে আর হাঁটুতে চাপ-চাপ ময়লা জমে আছে৷ ওদের মধ্যে যেটাকে দেখে একটু দিদি গোছের মনে হল, তাকে হাতের ইশারায় ডাকলেন চৌবেসাহেব৷ মেয়েটার বারো-তেরো বছর বয়স হবে৷ মুখটা খুব মিষ্টি৷ চৌবেসাহেব বললেন, ‘কোথায় চললে মা? সেগুনবনে খেলা করতে?’

মেয়েটা খুব সন্দেহের চোখে চৌবেসাহেবের দিকে তাকাল৷ ভালো জামাকাপড় পরা লোকেদের ওরা সন্দেহের চোখেই দেখে৷ ঘাড় গোঁজ করে বলল, ‘হুঁ৷’

‘আমাকে খেলতে নেবে? আমার কাছে একটা ভালো খেলনা আছে৷’ চৌবেসাহেব হাতের প্যাকেট থেকে একটা লাল রঙের প্লাস্টিকের ফ্লাইং-সসার বার করলেন৷ তারপর সেটাকে তেরছা ভাবে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন৷ নদীর হাওয়ায় ভাসতে-ভাসতে সসারটা প্রায় সেগুনবনের কিনারায় গিয়ে ল্যান্ড করল৷ পেছন পেছন হইহই করে বাচ্চাগুলোও ছুটে গেল৷

এই দিদি-টাইপের মেয়েটাও ছুটতে যাচ্ছিল৷ চৌবেসাহেব খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেললেন৷ বললেন, ‘তুই ছুটছিস কেন? তোর জন্যে তো একটা আলাদা চাকি নিয়ে এসেছি৷ এই দ্যাখ৷ পছন্দ হয়?’ এবার প্যাকেট থেকে যে-সসারটা বার করলেন তিনি, সেটার রঙ নীল৷ মেয়েটার চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠল৷ হাত বাড়িয়ে বলল, ‘দাও৷’

চৌবেসাহেব হাতটা সরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘দিচ্ছি৷ আগে বল তোর নাম কী?’

‘কৌশল্যা৷’

‘বাঃ, দিব্যি নাম৷ তা হ্যাঁ রে কৌশল্যা, তোরা তো রোজই ওই সেগুনবনে লুকোচুরি খেলিস, তাই না?’ চৌবেসাহেব পকেট থেকে দুটো ক্রিম বিস্কুট বার করে কৌশল্যার হাতে দিলেন৷ বিস্কুটদুটো কিন্তু ও খেল না, জামার কোঁচড়ে রেখে দিল৷ চৌবেসাহেব ব্যাপারটা লক্ষ করে বললেন, ‘তোর বোনেদের জন্যেও এনেছি৷ এ-দুটো তুই খেয়ে নে৷’

কৌশল্যা দুটো বিস্কুট একসঙ্গে মুখে পুরে নিল৷ চৌবেসাহেব ওর মুখের খাবার ফুরানোর জন্যে অপেক্ষা করলেন৷ তারপর বললেন, ‘গত কয়েকদিনের মধ্যে বাইরের কোনো লোককে এখানে দেখেছিস?’

‘তুমি কি পুলিশ?’ মেয়েটা ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল৷

‘না তো৷ হঠাৎ পুলিশের কথা বলছিস কেন?’

‘ওদিকে একটা চিড়িয়াখানা-ঘর আছে, দেখেছ? ওখানে যে-লোকটা কাজ করত সে কাল খুন হয়ে গেছে৷ তারপর আমাদের পাড়াতেও পুলিশ এসেছিল৷ ঘরে ঘরে ঢুকে খুঁজে গেছে বাইরের লোক আছে কিনা৷’

‘ছিল না বাইরের লোক?’

‘না৷ আমাদের বাপ-দাদারা বাইরের কাউকে পাড়ায় ঢুকতে দিচ্ছে না তো৷ কোভিড হচ্ছে তো, তাই৷’

‘পাড়ার কথা ছাড়৷ বনের মধ্যে বাইরের কোনো লোককে দেখিসনি?’

‘উঁহু৷’ কৌশল্যা ঘাড় নাড়ল৷

চৌবেসাহেব একটু চিন্তা করে বললেন, ‘ওই চিড়িয়াখানার কাছ থেকে তোরা কোনো জিনিস কুড়িয়ে পেয়েছিস? তুই বা তোর বন্ধুদের মধ্যে কেউ?’

কৌশল্যার মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল৷ বলল, ‘না তো৷ সত্যি বলছি, পাইনি৷’ এই বলে এক দৌড়ে গাছপালার ভিড়ে কোথায় যে হারিয়ে গেল, চৌবেসাহেব অনেক চেষ্টা করেও মেয়েটাকে আর খুঁজে পেলেন না৷

চৌবেসাহেবের কাছে ব্যাপারটা এতটাই সন্দেহজনক লেগেছিল যে, পরদিন সকালেই আবার ওদের বস্তিতে ফিরে গেলেন৷ একাই৷

একটা লোক তিনটে ছাগল নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল৷ তাকে জিগ্যেস করতেই কৌশল্যাদের টিনের ঘরটা দেখিয়ে দিল৷ চৌবেসাহেব ঘরটার সামনে গিয়ে হাঁক পাড়লেন, ‘কৌশল্যা, ও কৌশল্যা৷’

একজন বউমানুষ ঘোমটা টানতে টানতে টিনের ঝাঁপ খুলে বেরিয়ে এল৷ বলল, ‘আমি কৌশল্যার মা৷ কৌশল্যাকে ডাকছেন কেন?’

চৌবেসাহেব সেই নীল রঙের ফ্লাইং-সসার আর কয়েকটা বিস্কুটের প্যাকেট কৌশল্যার মায়ের হাতে দিয়ে বললেন, ‘কাল তোমার মেয়ের সঙ্গে কত গল্প হল৷ বললাম, তোর জন্যে দুটো জিনিস এনেছি৷ তা, খেলার নেশায় না নিয়েই চলে গেল৷ ও কোথায়?’

জিনিসগুলো হাতে নিয়ে কৌশল্যার মায়ের মুখটা খুশি খুশি হয়ে উঠল৷ বলল, ‘আছে তো ঘরের মধ্যেই৷ কিন্তু মুখপুড়ি মেয়ে কি ডাকলে বেরোবে? তার খুব মনখারাপ৷ সকাল থেকে কেঁদে কেঁদে অস্থির হচ্ছে৷ আপনি আসুন বাবু৷ ভেতরে আসুন৷’

চৌবেসাহেব মাথা নিচু করে ঘরটায় ঢুকতে-ঢুকতে বললেন, ‘কেন? মনখারাপ কেন?’

‘আর বলবেন না বাবু৷ আমাদের পোষা বেড়াল মিনির ছানা হয়েছিল৷ কাল রাত থেকে মিনিকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷ ছানাগুলোকেও না৷ মেয়েকে কত করে বোঝাচ্ছি, হুলোর ভয়ে ওরা ওরকম ছানা নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়, দ্যাখ না, ঠিক আবার ফিরে আসবে৷ তা কোনো কথাই শুনছে না৷ এই কুশি, ওঠ৷ দ্যাখ কে এসেছেন, তোর জন্যে কী নিয়ে এসেছেন৷’

ঘরটা এই দিনদুপুরেও ছায়ায় ঢাকা৷ মেঝে থেকে ভিজে-মাটির সোঁদা গন্ধ উঠছে৷ ঘরের একপাশে একটা তক্তপোশের ওপরে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়েছিল কৌশল্যা৷ মায়ের ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে চৌবেসাহেবকে দেখে ক্ষীণ হাসল৷ চৌবেসাহেব বললেন, ‘খুব ভালোবাসিস বুঝি মিনিকে?’

কৌশল্যা এবার উঠে বসে বলল, ‘হুঁ, ছানাগুলোকে আরো বেশি ভালোবাসতাম৷ কিন্তু ওদের নিশ্চয়ই হুলোয় খেয়ে নিয়েছে৷’ এই বলে আবার ফোঁচ ফোঁচ করে

কাঁদতে বসল৷

চৌবেসাহেব বলে উঠলেন, ‘না রে৷ খায়নি৷ তাহলে মিনি আবার ফিরে আসত৷ তোর মা ঠিকই বলেছে৷ বেড়ালরা না বাচ্চাদের মুখে করে নিয়ে খালি একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় লুকিয়ে বেড়ায়৷ একদম চিন্তা করিস না, দেখবি আজ-কালের মধ্যেই আবার বাচ্চাদের নিয়ে এখানে ফিরে আসবে৷’

‘আচ্ছা৷’ বলে কৌশল্যা হাত বাড়িয়ে সসারটা নিয়ে খেলতে শুরু করল৷ চৌবেসাহেব তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একবার ঘরটার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, ‘মিনি কোথায় থাকত রে? ওর বাচ্চাদের জন্যে বিছানা পাতিসনি? ফিরে এসে থাকবে কোথায়?’

কৌশল্যার মা বলল, ‘সে আবার নেই? পেছনে একটা ঘর আছে, ওর বাপের কাজের জিনিস রাখার গুদাম৷ সেখানেই মিনির আঁতুড় পেতেছিল আমার মেয়ে৷’

‘তাই! বাঃ, বেশ৷’ বলে চৌবেসাহেব ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন৷ তারপর কৌশল্যার মাকে বললেন, ‘ওই ঘরটা একবার দেখে আসি, চলো তো৷’

চৌবেসাহেবের কথা শুনে সে ভারি অবাক হল৷ বলল, ‘কী ব্যাপার বলুন তো বাবু?’

চৌবেসাহেব হেসে ফেললেন৷ বললেন, ‘ঠিকই ধরেছ৷ ব্যাপার একটা আছে৷ আমি পাশেই থাকি, নীলকুঠিতে৷ পরশুর আগের দিন বিকেলে সেগুনবনে হাঁটতে এসে একটা জিনিস হারিয়ে ফেলেছি৷ তোমার মেয়ে তো শুনলাম ওখানেই খেলাধুলো করে৷ ও হচ্ছে লিডার৷ তাই ভাবলাম যদি ও বা অন্য কোনো মেয়ে জিনিসটা কুড়িয়ে পেয়ে থাকে৷’

কৌশল্যার মা সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘না বাবু৷ অন্য লোকের জিনিস নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে দেখলে আমার মেয়ের হাড় একদিকে, মাস একদিকে করে দেব৷ সেটা ও জানে৷ তাই কুশি রাস্তায় কোনো জিনিস কুড়িয়ে পেলেও সেটা আমার হাতেই দিয়ে দেয়৷ নিজের কাছে রাখে না, সে যত দামি জিনিসই হোক৷’

‘বেশ৷’ চৌবেসাহেব বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালেন৷

ছয়

একটা সতেরো-আঠারো বছরের ছেলে এতক্ষণ কৌশল্যাদের পাশের ঘরটার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটা স্কুটারের পুরোনো স্পার্ক-প্লাগ নিয়ে একমনে কী যেন করছিল৷ চৌবেসাহেব খেয়াল করেছিলেন, স্পার্ক-প্লাগটা নেহাত অছিলা৷ আসলে ছেলেটা কান পেতে ওঁর আর কৌশল্যার মায়ের কথোপকথন শুনছে৷ বস্তি থেকে বেরিয়ে সেগুনবনের দিকে কিছুটা এগোনোর পরেই উনি বুঝতে পারলেন, ছেলেটা তাঁর পেছন পেছন আসছে৷

চৌবেসাহেব ওর দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন৷ ভালো করে মেপে নিলেন ছেলেটাকে৷ সস্তার পোশাকেও যতটা সম্ভব হিরোগিরির ছাপ৷ রগের দু’পাশে ছোট করে ছাঁটা চুলের মরচে রঙের হেয়ার-ডাই৷ টি-শার্টের কলারটা ঘাড়ের ওপরে ওঠানো৷ কবজিতে কটকটে সবুজ ডায়ালের চাইনিজ হাতঘড়ি৷ ছেলেটা চৌবেসাহেবকে ঘুরে দাঁড়াতে দেখে একটুও ঘাবড়াল না৷ নিজেও দাঁড়িয়ে পড়ল৷ তারপর হাতের মুঠোয় স্পার্ক-প্লাগটা ঘোরাতে ঘোরাতে শান্ত গলায় বলল, ‘কুশির মা জানে না৷ আপনি যেদিনের কথা বলছেন, সেদিন কিন্তু কুশি ওই চিড়িয়াখানা-বাড়ির সামনে থেকে একটা কিছু কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিল৷ আমি নিজের চোখে দেখেছি৷’

‘তাই নাকি? তুমি এখানেই থাকো?’

‘হ্যাঁ৷ কুশিদের পাশের ঘরটাই আমাদের৷ আপনাকে আমি চিনি৷ রেলগুমটিতে প্রকাশদার যে মোটর-গ্যারেজটা আছে, ওখানে কাজ করি তো, ওখান থেকে আপনার বাড়ি দেখা যায়৷ সবাই বলে, আপনি আগে পুলিশের খুব উঁচু পোস্টে চাকরি করতেন, কিন্তু মোটেই পুলিশের মতো নন৷ আপনি দেবতা৷’

‘আচ্ছা! তাহলে পুরো ব্যাপারটা একটু গুছিয়ে বলো তো বাবু৷ বুঝতেই পারছ, জিনিসটা হারিয়ে আমি খুব মুষড়ে পড়েছি৷’

ছেলেটা বুঝদারের মতো হাসল৷ বলল, ‘আমার কাছে লুকোনোর দরকার নেই, স্যার৷ আপনি যেটা খুঁজছেন, সেটা আপনার জিনিস নয়৷ ওই যে-লোকটা খুন হল, তার জিনিস৷’

চৌবেসাহেবের চোখদুটো বড় হয়ে গেল৷ মনে মনে বললেন, উঁহু৷ এ-ছেলেকে দুধভাত ভাবলে তো চলবে না৷ এ তো দেখছি প্রখর ইনটেলিজেন্ট৷ মুখে বললেন, ‘একদম ঠিক বলেছ! এবার বলো, তুমি এত কথা জানলে কেমন করে?’

‘বলছি স্যার৷ গত পরশু চিড়িয়াখানার লোকটা খুন হল তো! তার আগের দিনের কথা৷ তখন সন্ধে হয়ে এসেছিল৷ আমি গ্যারেজ থেকে সেগুনবনের মধ্যে দিয়ে ফিরছিলাম...’

‘গ্যারেজ এখন কোভিডের জন্যে বন্ধ না?’ ছেলেটার কথার মধ্যেই চৌবেসাহেব প্রশ্ন করলেন৷

‘হ্যাঁ, বন্ধ৷ কিন্তু আমি গিয়েছিলাম প্রকাশদার কাছে আমার বকেয়া মাইনে আনতে৷ ফেরার পথে কুশিকে দেখলাম ওই চিড়িয়াখানা-বাড়ির সামনের জমি থেকে কিছু একটা কুড়িয়ে নিয়ে ফ্রকের কোঁচড়ে ভরে নিল৷ তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়েই ছুট দিল বস্তির দিকে৷ অনেকটা দূরে ছিলাম বলে ও আমাকে দেখতে পায়নি৷’

‘তারপর?’

‘আমি কুশিকে ডাকতে যাচ্ছিলাম৷ কিন্তু তার আগেই ওই টাকমাথা ডাক্তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে তন্ন-তন্ন করে কী যেন খুঁজতে লাগল৷ বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পরে মুখ তুলে এদিক-ওদিক তাকাতে গিয়ে আমাকে দেখেই চমকে উঠল লোকটা৷ তারপর যেটা করল স্যার, সেটাতেই আমার দিমাগ চেটে গেল৷ সোজা এগিয়ে এসে আমার হাতের যন্ত্রের ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে সেটার মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে দেখতে গেল ওর হারানো জিনিস আমি চুরি করেছি কিনা৷’

‘তারপর?’

‘আমি বললাম, হেই মিস্টার৷ জাদা উছালনা মত৷ হাম গরিব হো সকতা হ্যায়, মগর চোর নেহি হ্যায়৷ আপনকো তুম কেয়া সমঝতে হ্যায়? পাইম-মিনিস্টার?’

‘আরেব্বাপ৷ তুমি তো দারুণ হিন্দি বলো৷ নাম কী বাবা তোমার?’

‘আমার নাম পোনোব স্যার৷ মগর দুনিয়া মুঝকো পোনা বোলকে জানতে হ্যায়৷’

‘পোনোব! ও আচ্ছা, প্রণব৷ তারপর লোকটা কী করল প্রণব?’

‘লোকটা প্রথমে আমাকে স্যরি-টরি বলল৷ তারপর বলল, এদিক দিয়ে কাউকে যেতে দেখেছ ভাই? আমি স্যার ওকে মিথ্যে কথা বলেছিলাম৷ কুশির কথা ওকে বলিনি৷ বলেছিলাম, না৷ কাউকে দেখিনি৷’

‘কেন? ওনাকে বললে না কেন?’

‘লোকটা ভালো ছিল না স্যার৷ চোর-গুন্ডাদের সঙ্গে মাখামাখি ছিল৷’

‘তুমি কেমন করে জানলে?’

‘ওর কাছে মোটামুটি দু’-তিন মাস অন্তর, আসামের দিক থেকে কয়েকজন লোক আসত৷ লোকগুলোকে দেখলে আপনি ভাববেন পাতি পাবলিক, কিন্তু ওরা যে-গাড়িটায় চেপে আসত সেটা ছিল দু’নম্বরি৷ মেরুন কালারের বোলেরো ক্যাম্পার৷ ওয়েস্টবেঙ্গলের ফলস নাম্বার-প্লেট, আসলে আসামের গাড়ি৷’

চৌবেসাহেব যতই প্রণবের কথা শুনছিলেন, ততই অবাক হচ্ছিলেন৷ প্রশ্ন করলেন, ‘কেমন করে বুঝলে ওটা আসাম-গাড়ি?’

‘বোঝা যায়, স্যার৷ আমরা যারা গাড়ির লাইনে আছি তারা গাড়ির সাজগোজ দেখে, গায়ের স্টিকার, ড্যাস-বোর্ডের ফিটিংস দেখে বলে দিতে পারি কোনটা কোথাকার গাড়ি৷ একেক জায়গার মিস্তিরিদের পছন্দ একেক রকমের হয় তো৷ তাছাড়া একদিন গাড়িটার ফুয়েল-ট্যাঙ্ক ফুটো হয়ে গিয়েছিল বলে আমাদের গ্যারেজে নিয়ে এসেছিল৷ তখন দেখেছিলাম, চেসিসের ওপরে লুকোনো চেম্বার বানিয়ে রেখেছে৷ ও নির্ঘাত স্মাগলারদের গাড়ি স্যার৷ তবে আমি কাউকে বলিনি৷ পুলিশের কাজ পুলিশে করুক৷ আমার কী দরকার আছে কাউকে বলার?’

‘ঠিক৷’ চৌবেসাহেব একটু চিন্তা করে বললেন, ‘তোমাদের পাড়ায় তো আজ সকালে পুলিশ এসেছিল শুনলাম৷ তাদেরও কিছু বলোনি?’

‘নো স্যার৷ কুশিকে নিয়ে পুলিশ হুজ্জুতি করুক সেটা আমি চাই না৷’

‘তাহলে আমাকে বললে কেন?’

এইবার পোনার মতো স্মার্ট ছেলেও একটু মুশকিলে পড়ে গেল৷ রং-করা চুলের ভেতর আঙুল চালাতে-চালাতে বলল, ‘আপনাকে দেখে কেমন একটা ভরসা হয় স্যার৷ আপনি স্যার কুশিকে বাঁচিয়ে নিন৷ বুঝতে পারছি, ও খুব বড় খতরার মধ্যে গিরেছে৷ মগর আই লাভ কুশি৷’

চৌবেসাহেব প্রণবের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘নিশ্চিন্ত থাকো৷ কেউ ক্ষতি করতে পারবে না৷ আচ্ছা প্রণব?’

‘বলুন স্যার৷’

‘ওই গাড়িটার নাম্বার নিয়ে তো কোনো লাভ নেই, তাই না? তুমিই তো বললে ফলস নাম্বার৷’

‘গোলি মারিয়ে না নাম্বার-প্লেটকো৷ হাম আপকো চেসিস-নাম্বার দে দেতে হ্যায়৷ মোটর-ভেহিকলসকে ওই চেসিস-নাম্বার দিলে, ওরা আপনাকে আসলি রেজিস্ট্রেশন নাম্বার, কার গাড়ি, কোথায় বাড়ি সব বাতলে দেবে৷’

চৌবেসাহেব অবাক হওয়ার ক্ষমতাও যেন ক্রমশ হারিয়ে ফেলছিলেন৷ বললেন, ‘চেসিস-নাম্বার পেলে কোথা থেকে?’

‘কেন স্যার? এইমাত্র বললাম না, ফুয়েল-ট্যাঙ্ক সারাতে গাড়ির নীচে ঢুকেছিলাম৷ বোলেরোর চেসিস-নাম্বার খোদাই করা থাকে সামনের ডানদিকের চাকার ওপরের লোহার গায়ে৷ ফাইলিং না করে ও নাম্বার কেউ মুছতে পারবে না৷ লাস্ট ছ’ডিজিট বলছি স্যার৷ ফাইভ থ্রি থ্রি নাইন... লিখছেন?’

উমাশঙ্কর চৌবে তাঁর মোবাইলের ওয়ার্ড-বুকে নাম্বারটা লিখে নিয়ে বললেন, ‘থ্যাঙ্কিউ প্রণব৷ এবার তোমার ফোন নম্বরটা দাও৷ তোমাকে আমার কাজে লাগবে৷’

‘আমার তো ফোন নেই স্যার৷ তবে গ্যারেজে খবর দিলে আপনার বাড়িতে চলে আসব৷ গ্যারেজ বন্ধ দেখে ঘাবড়াবেন না৷ প্রকাশদা পেছনের ঘরটাতেই থাকে৷’

প্রণব চলে যাওয়ার পরে চৌবেসাহেব খুব নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে রেসকিউ সেন্টারের দিকে হাঁটা লাগালেন৷

রহস্যটা ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে আসছে৷ এখন শুধু কিছু জিনিস ভেরিফাই করে নিতে হবে৷

এমনিতে যে-কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে চারদিকে একবার তাকালেই জায়গাটার একটা প্যানোরামিক-ভিউ তাঁর মাথায় প্রিন্ট হয়ে যায় ঠিকই, তবু কনফার্মড হয়ে নেওয়া দরকার৷ প্রথমদিনে ওই বাড়িতে একটা জিনিস দেখেছিলেন৷ সেটা ঠিক দেখেছিলেন তো?

বাড়িটার সামনে গিয়ে চৌবেসাহেব দেখলেন, এখনো দরজায় কুচবিহার থানার সিল লাগানো আছে৷ গেটের সামনে একজন মাত্র কনস্টেবল গার্ড দিচ্ছিল৷ চৌবেসাহেবকে দেখে হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল৷ চৌবেসাহেব বললেন, ‘বোসো৷ বোসো৷ আমি যদি একবার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ওই বারান্দাটা উঁকি মেরে দেখি, তাতে তোমার আপত্তি নেই তো?’

কনস্টেবল লোকটা লজ্জা পেল৷ বলল, ‘কী যে বলেন স্যার? ভেতরে আসুন৷’

সত্যিই যেটুকু বলেছিলেন, সেটুকুই করলেন চৌবেসাহেব৷ বাইরের বাগানে দাঁড়িয়েই গ্রিলের মধ্যে দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বারান্দায় যা যা জিনিস ডাঁই করে রাখা ছিল তার একটা তালিকা মনে মনে বানিয়ে নিলেন৷

অর্ধেকটা জায়গা জুড়ে ছিল ওষুধের খালি কার্টন-বক্স৷ তাছাড়া একটা বাতিল বাই-সাইকেল৷ একটা উলটোনো কার্টন-বক্সের পাশে কয়েকটা পুরোনো তোয়ালে, গামছা, ছেঁড়া পায়জামা—এইসব বেশ পরিপাটি করে ভাঁজ করে রাখা ছিল৷ তাছাড়া ভাঙা বালতি, মগ, পুরোনো খবরের কাগজের স্তূপ, একটা ছোট ফিডিং-বটল আর একটা খালি খাঁচা৷ বোঝাই যায়, বারান্দাটাকে বাতিল জিনিসপত্র রাখার জন্যেই ব্যবহার করতেন শমীকবাবু৷

রেসকিউ-সেন্টার থেকে বেরিয়ে কনস্টেবল-লোকটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবার চৌবেসাহেব ডেপুটি কনজার্ভেটর অফ ফরেস্ট অরুময় মিত্রের বাংলোর দিকে হাঁটা লাগালেন৷ ওর কাছ থেকে কয়েকটা ব্যাপার জানতে হবে৷

যেতে যেতেই উনি পার্থসারথি রায়ের সঙ্গে একটা ফোনালাপ সেরে ফেললেন৷ প্রণবের পরিচয় আর তার কাছ থেকে যা যা শুনেছেন সেগুলো ওকে বললেন৷ তারপর প্রণব যে চেসিস-নাম্বারটা দিয়েছিল, সেটা হোয়াটস্যাপে পার্থবাবুকে পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কী করতে হবে, বুঝতেই পারছ৷ আপাতত গাড়িটাকে শুধু শ্যাডো করে যাও৷ এখানে থাকলে তো কাজটা তুমিই করতে পারবে, উইথ দ্য হেল্প অফ মোটোর-ভেহিকলস ডিপার্টমেন্ট৷ আর আসামে থাকলে তোমার কাউন্টার-পার্টকে বোলো৷’

সাত

ঘণ্টা দেড়েক বাদে, অরুময় মিত্রের বাড়ি ঘুরে চৌবেসাহেব সবে নিজের বাড়িতে পা রেখেছেন৷ পার্থসারথি রায় রিং-ব্যাক করলেন৷ খুব উত্তেজিত গলায় বললেন, ‘গাড়িটা এখানেই রয়েছে স্যার! এই কুচবিহারেই! ডব্লিউ বি নাম্বার লাগিয়ে ঘুরছে৷ সামনে আবার এমার্জেন্সি মেডিকাল সার্ভিসের একটা নোটিশ চিপকেছে৷ কোথা থেকে চার-পাঁচটা খালি অক্সিজেন সিলিন্ডারও জোগাড় করে পেছনের মাল তোলার জায়গাটায় রেখে দিয়েছে৷ মানে, সব মিলিয়ে লকডাউনের বাজারেও যাতে কেউ না আটকায়, তার জন্যে পারফেক্ট ছদ্মবেশ৷

‘চারজন লোক আছে গাড়িটার সঙ্গে৷ গত তিনদিন ধরে তারা নাকি কুচবিহার হাসপাতালের সামনে গাড়িটাকে পার্ক করে রেখে হাসপাতালের চত্বরেই মশারি খাটিয়ে ঘুমোচ্ছে৷ ওখানেই ক্যান্টিনে খাওয়া-দাওয়া করছে৷ সবাই ভাবছে হেলথ-ওয়ার্কার৷ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শয়তানগুলো কীসের জন্যে এত কিছু করছে?’

চৌবেসাহেব এ কথার উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘কয়েকটা কাজ করতে হবে পার্থ৷ পরপর বলে যাচ্ছি, দরকার হলে লিখে নাও৷ রেসকিউ-সেন্টারের সামনে তোমার যে কনস্টেবল ডিউটিতে আছেন, তাকে এখনই তুলে নাও৷ যার ওপর একশোভাগ ভরসা করতে পারো এরকম কোনো অফিসারকে ওখানে ডিউটি দাও৷ আমি নিশ্চিত, ওই গাড়ির লোকগুলোর মধ্যে একজন বা দু’জন খুব শিগগিরই ওখানে গিয়ে প্রশ্ন করবে তিনি কিছু দেখেছেন কিনা, কোনো শব্দ পেয়েছেন কিনা৷ যাকে নতুন ডিউটি দেবে তাকে শিখিয়ে দিও, বলতে হবে যে, হ্যাঁ৷ দেখেছি৷ কুশি বলে একটা মেয়ে তোর্সাচরের বস্তিতে থাকে৷ সে এই বনে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে আসে৷ তারপর জিনিসটা বা জিনিসগুলোকে দেখতে পেয়ে তুলে নিয়ে চলে গেছে৷’

‘কী জিনিস স্যার?’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘আই অ্যাম নট কনফার্মড ইয়েট৷ তাই বলছি, যা ওরা খুঁজবে, তাই৷ যদি হিরে খোঁজে, হিরে৷ যদি জিরে খোঁজে, জিরে৷ ক্লিয়ার? এই মিথ্যেটা বলার সময় চোখের পাতাও কাঁপবে না৷ সেই জন্যেই খুব ইনটেলিজেন্ট কোনো লোককে পোস্টিং দিতে বলছি৷’

‘ওকে স্যার৷ ডান৷ তারপর?’

‘দ্বিতীয় কাজ, ওই চারজন লোককেও শ্যাডো করতে শুরু করে দাও৷ আমি নিশ্চিত, তোমার রেসকিউ-সেন্টারের গার্ড ওদের কুশির বাড়ির কথা জানালেই ওরা তোর্সাচরের বস্তিতে ওই বাড়িতে হানা দেবে৷ দিনের বেলায় যাবে না নিশ্চয়ই, রাতেই যাবে৷ এমন অ্যারেঞ্জমেন্ট করে রাখো যাতে ওদের আগেই তোমার টিম ওখানে পৌঁছে পুরো বস্তিটাকে গোপনে ঘিরে ফেলতে পারে৷ ওরা ওখান থেকে বেরোলেই ধরবে৷ সেই টিমের মধ্যে আমি আর ডেপুটি কনজার্ভেটর অফ ফরেস্ট অরুময় মিত্র সাহেবও থাকব৷ ঠিক আছে?’

‘ঠিক আছে স্যার৷ আর কিছু?’

‘না৷ আপাতত এই৷ আর কিছু মাথায় এলে তোমায় পরে জানাব৷ আর হ্যাঁ, শমীকবাবুর মোবাইল নাম্বারটা থেকে কিছু পেলে?’

‘না স্যার৷ মামুলি সব কল৷ বাড়ির আর অফিসের লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা৷ মনে হয় কারবার নিয়ে যা-কথা, সব মুখোমুখিই বলতেন৷’

‘ঠিক আছে৷ সব জানা যাবে৷’

সন্ধে ছ’টা৷ পার্থসারথি রায় চৌবেসাহেবকে ফোন করে জানালেন, ওরা এসেছিল৷ দু’জন লোক এসে রেসকিউ-সেন্টারের গার্ডকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গেছে৷ চৌবেসাহেব যেমনটি শিখিয়ে দিয়েছিলেন, গার্ড সেরকমটাই উত্তর দিয়েছে৷

রাত আড়াইটে৷ চৌবেসাহেবের ফোনে ফের পার্থসারথির উত্তেজিত গলা, ‘স্যার! গেট রেডি স্যার৷ মিত্রসাহেবকেও বলে দিয়েছি৷ ওরা বেরিয়ে পড়েছে৷ তবে পায়ে হেঁটে যাচ্ছে তো, ওদের আগেই আমরা পৌঁছে যাব৷ আপনাদের নিতে আমি নিজেই যাচ্ছি৷ নীলকুঠি থেকে এয়ারপোর্টের এন্ড অবধি আমরা জিপে যাব৷ ওখান থেকে সেগুনবনকে বাইপাস করে, বাঁধের আড়াল দিয়ে হেঁটে বস্তিতে পৌঁছে যাব৷ গাড়ির হেডলাইট নেভানো থাকবে স্যার৷ একটু খেয়াল রাখবেন৷’

রাত সাড়ে তিনটে৷ চারজন লোক কৌশল্যাদের ঘরের দরজার খিল বাইরে থেকে লোহার পাত ঢুকিয়ে তুলে ফেলল৷ ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে৷ ওদের প্রত্যেকেরই গায়ে ছিল গাঢ় রঙের টি-শার্ট আর ট্রাউজার৷ মুখে কালো হুড৷

রাত তিনটে পঁয়ত্রিশ৷ ওসি পার্থসারথি এবং তার আর্মড-সার্ভিসের চারজন বাছাই অফিসার কুশিদের ঘরে ঢুকে ওই চারজনকে মাথার পেছনে রিভলভার ঠেকিয়ে বাইরে বার করে আনলেন৷ ওদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না৷ ছুরি ছিল৷ পুলিশের ঢুকতে যে পাঁচ মিনিট সময় লেগেছিল, তার মধ্যেই ওই চারজন দুষ্কৃতী কুশি এবং তার বাবা-মাকে ঘরের এককোনায় ঠেলে ফেলে দিয়েছিল৷ আরেকটু সময় পেলে হয়তো পিছমোড়া করে বেঁধেও ফেলত৷

ওরা বেরিয়ে আসার পরে চৌবেসাহেব কুশিদের ঘরে ঢুকলেন৷ লণ্ঠনের আলোয় দেখলেন, কুশি আর তার বাবা-মা তখনো ওই মেঝেতে বসেই থরথর করে কাঁপছে৷ চৌবেসাহেব ওদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বললেন, ‘ভয় নেই৷ আর ভয় নেই৷ বস্তির চারিদিকে পুলিশ পাহারায় থাকছে৷ আপনারা উঠুন৷ দরজা বন্ধ করে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ুন৷’

কুশি কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, ‘জেঠু, আমার দিয়া, হিয়া, মুসকান?’

চৌবেসাহেব একটু হেসে ওর তেলহীন চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাচ্চাগুলোর ওইসব নাম দিয়েছিলিস বুঝি? কিন্তু ওদের যে নাম হয় না রে মা৷ ওরা তো জঙ্গলে থাকে৷ তোকে আমি বরং দুটো খরগোশের বাচ্চা দিয়ে যাব, কেমন? এখন চলি৷ তুই ঘুমিয়ে পড়৷’

বাইরে বেরিয়ে এসে চৌবেসাহেব যা দেখলেন, তাতে মনে মনে কুচবিহার থানার কর্মদক্ষতার প্রশংসা না করে পারলেন না৷ বস্তির একটা লোকও টের পায়নি যে, এতবড় একটা কাণ্ড ঘটে গেল৷ ইতিমধ্যেই রানিবাগানের দিকে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের গাড়িগুলো বেরিয়ে গেছে৷ সঙ্গে নিয়ে গেছে চারজন ক্রিমিনালকে৷

বাঁধের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছেন কেবল পার্থসারথি রায় আর অরুময় মিত্র৷ চৌবেসাহেব ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই অরুময় মিত্র খুব অসহায়ের মতো বললেন, ‘এটা কী হল স্যার? আপনার কথামতো সবই তো করলাম৷ কিন্তু শমীক হাজারিকার মার্ডারের সঙ্গে এরা কীভাবে লিঙ্কড সেটাই তো বুঝলাম না৷’

ওঁর কথা শেষ হতে না-হতেই চৌবেসাহেব বললেন, ‘ওই নাও৷ তোমার মিসিং-লিঙ্ক এসে গেছে৷’ অরুময় মিত্র আর পার্থসারথি রায় অবাক হয়ে দেখলেন, পাঙ্ক টাইপের একটা ছোকরা হাতে কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা একটা খাঁচা নিয়ে বস্তির রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে৷ ওদের কাছাকাছি এসেই ছেলেটা মাটির ওপরে খাঁচাটা নামিয়ে রেখে, সম্মানজনক দূরত্বে সরে দাঁড়াল৷

চৌবেসাহেব বললেন, ‘পার্থ! এই হচ্ছে প্রণব, যার কথা তোমাকে বলেছিলাম৷ ও এখন যা করছে, আমার ইনসট্রাকশনেই করছে৷ আমি মাঝখানে একবার প্রকাশের গ্যারেজে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করে এসেছিলাম৷ ছেলেটি একদম জুয়েল৷ পারলে ওর জন্যে কিছু কোরো৷’

তারপর প্রণবকে বললেন, ‘কী রে, কোনো অসুবিধে হয়নি তো?’

প্রণব কুণ্ঠিতভাবে হেসে বলল, ‘একটু৷ বস্তির পঞ্চাশটা ঘরের মধ্যে একটা বেড়ালকে খুঁজে পেতে যেটুকু অসুবিধে হয় সেটুকুই আর কী৷’

‘আর ওদের ধাইমা মিনি তোকে অ্যাটাক করেনি?’

প্রণব বলল, ‘সেটাই অবাক লাগল, জানেন৷ মিনি তেমন কিছু বলল না৷ আসলে ওর নিজের তিনটে বাচ্চা আছে তো! সেই তিনটের রঙ সাদা৷ আর এই তিনটে কালো৷ আমার মনে হয়, মিনি জানত, এই তিনটে বেশিদিন ওর কাছে থাকবে না৷’

‘তাই হবে হয়তো’, এই বলে উমাশঙ্কর চৌবে খাঁচাটার দিকে তাকালেন৷ ইতিমধ্যে অরুময় মিত্র খাঁচার ঢাকনাটা সরিয়ে দিয়ে, হাঁটু গেড়ে বসে, খুব মনোযোগ দিয়ে খাঁচার বাসিন্দাদের দেখছিলেন৷ দেখবার জন্যে সাহায্য নিচ্ছিলেন একটা পেনসিল-টর্চের, যেটা তিনি সঙ্গে করেই এনেছিলেন৷

বাসিন্দা বলতে তিনটে বেড়ালছানার মতো ছানা৷ তিনটেরই গায়ের রঙ কুচকুচে কালো৷ সদ্যই চোখ ফুটেছে মনে হয়। খাঁচার মেঝেতে বুক ঘষে ঘষে চলছিল আর বেড়ালছানার মতোই মিউ-মিউ করে ডাক দিয়ে মাকে খুঁজছিল৷

চৌবেসাহেব বললেন, ‘কী দেখলে অরুময়? আমাদের আইডিয়া কি ঠিক আছে?’

‘একদম ঠিক আছে৷ তিনটেই ক্লাউডেড লেপার্ডের বাচ্চা৷ দশদিন লাগে এদের চোখ ফুটতে৷ তার মানে এগুলোর বয়স হবে বড়জোর পনেরো দিন৷ জন্মের সময় একেকটার ওজন থাকে দু’শো গ্রাম মতো, কাজেই বেড়ালের বাচ্চা বলে ভুল করা কিছুই আশ্চর্য নয়৷’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘ভাগ্যিস ভুল হয়৷ ভাগ্যিস কুশিরও ভুল হয়েছিল৷ নাহলে এরা এতক্ষণে বিদেশে চালান হয়ে যেত৷ পার্থ, তুমি কি ব্যাপারটা এইবার বুঝতে পারছ? পারছ না? আচ্ছা দাঁড়াও, আমি যেভাবে পুরো ঘটনাটা রিকনস্ট্রাক্ট করেছি, সেটা তোমাকে বলে যাই৷ তুমি পরে ওই চারটে লোককে ইন্টারোগেট করে কিছু সংশোধন করার থাকলে করে নিও৷ চলো, যেতে যেতে বলছি৷’

খাঁচাটা পার্থসারথির হাতে তুলে দিয়ে প্রণব ওর ঘরে ফিরে গেল৷ অরুময় মিত্র, পার্থসারথি রায় আর চৌবেসাহেব ধীরেসুস্থে এয়ারপোর্টের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা জিপটার দিকে হাঁটা লাগালেন৷ যেতে যেতে চৌবেসাহেব বললেন, ‘আমার ধারণা, আসামের বিভিন্ন রিজার্ভ-ফরেস্টে পোস্টেড থাকার সময়েই শমীক হাজারিকার সঙ্গে জঙ্গল-মাফিয়াদের যোগাযোগ তৈরি হয়৷ উনি যখন যেখানে চাকরি করতেন, সেখানকার রেসকিউ-সেন্টার থেকে দুর্লভ পশুপাখির বাচ্চা স্মাগলারদের হাতে তুলে দিতেন৷ একা তো এইধরনের কাজ হয় না৷ অনেক ডকুমেন্ট লোপাট করতে হয়, পান খাইয়ে অনেকের মুখ বন্ধ করতে হয়৷ কাজেই আসাম বনদপ্তরের মধ্যে উনি নিশ্চয়ই নিজের অনুগত একটা ব়্যাকেট তৈরি করে নিয়েছিলেন৷ তবে তাদের খোঁজ এখন পাবে কিনা সন্দেহ আছে৷

‘যাই হোক, ওই জন্তু বিক্রি করার টাকার ভাগই শমীকবাবুর আলিপুরদুয়ারের অ্যাকাউন্টে জমা পড়ত৷ বেশ চলছিল৷ মুশকিল হয়ে গেল কুচবিহারে বদলি হয়ে৷ আসামের জঙ্গলের প্রাণী-সম্পদের সঙ্গে তো কুচবিহারের কোনো তুলনা হয় না৷ কুচবিহার রেঞ্জ থ্রি তো দেখাশোনা করে মূলত সোশাল-ফরেস্ট্রি, মানে এই সেগুনবনের মতো মানুষের তৈরি গাছের বাগান৷ এখানে চিতার বাচ্চাই বা কোথায়, ভালুকের বাচ্চা কিংবা হর্নবিল পাখিই বা কোথায়? তার ওপরে এখানে শমীকবাবু যে রেসকিউ-সেন্টারটার দায়িত্ব পেলেন, সেটায় আরোই কোনো কাজ নেই৷

‘যারা একবার কালো টাকার স্বাদ পেয়ে গেছে, তারা বেশিদিন ওরকম টাকা না পেলে হাঁপিয়ে ওঠে৷ শমীকবাবুরও দশা হয়েছিল তাই৷ এরমধ্যেই হঠাৎ তিনি আসাম থেকে সেই মাফিয়াদের ডাক পেলেন, এখুনি একবার আসতে হবে৷

‘কেন? না, ওরা কোথাও থেকে তিনটে ক্লাউডেড লেপার্ডের বাচ্চা জোগাড় করেছে৷ ক্লাউডেড কিনা তখনো জানতাম না৷ তবে কুশির বেড়ালছানা হারিয়েছে শুনে লেপার্ডের বাচ্চার কথাটা আন্দাজ করেছিলাম৷ তারপর অরুময়কে খোঁজ নিতে বলেছিলাম৷ ও খোঁজ নিয়ে জানাল, লকডাউনের ঠিক আগে-আগেই ডিব্রু-শইখোয়ার জঙ্গলে পোচাররা বিষ দিয়ে একটা মা-চিতাবাঘকে মেরে ফেলেছে৷ চারটে বাচ্চা ছিল, সেগুলোর তখনও খোঁজ পাওয়া যায়নি৷ আমাদের দু’জনেরই তখন মনে হয়েছিল, একটা বাচ্চা পোচারদের হেফাজতেই মারা পড়েছে, আর বাকি তিনটে পৌঁছে গেছে এখানে, কুচবিহারে৷ ঠিকই ভেবেছিলাম৷

‘যাই হোক, স্মাগলাররা খুব ভালো করে জানত এই তিনটে জীবিত বাচ্চার দাম৷ অ্যাকচুয়ালি দাম বলে কিছু হয় না৷ বিদেশের বাজারে এরা অমূল্য৷ একবার কোনোরকমে বাচ্চা তিনটেকে আরবে পৌঁছে দিতে পারলে সেখানকার শেখেরা যা দাম চাইবে, তাই দেবে৷ কারণ শেখেরা এমনিতেই ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায় চিতা পোষে, চিতা নিয়ে শখের শিকার-খেলা খেলতে বেরোয়৷ সেখানে এগুলো হচ্ছে দুষ্প্রাপ্যতম চিতাবাঘ—ক্লাউডেড লেপার্ড!’

পার্থসারথি এতক্ষণ চলতে চলতে মাঝে মাঝেই খাঁচাটাকে মুখের সামনে তুলে ধরে উঁকিঝুঁকি মেরে বাচ্চা তিনটেকে দেখছিলেন৷ এই সুযোগে জিগ্যেস করে নিলেন, ‘নামটা এরকম অদ্ভুত কেন বলুন তো স্যার? ক্লাউডেড৷ মেঘের সঙ্গে কোথায় মিল এদের? গর্জনে নাকি?’

চৌবেসাহেব আর অরুময় মিত্র দু’জনেই হেসে ফেললেন৷ অরুময় মিত্র বললেন, ‘এখন ওদের কালো চামড়ার ওপরে কালো স্পটগুলো মিশে আছে তো, তাই মিলটা বুঝতে পারবেন না৷ কিন্তু একটু বড় হলেই ওই ফোঁটাগুলোর রঙ হয়ে যাবে ঠিক বর্ষার মেঘের মতো ধূসর৷ তাছাড়া, এদের ক্ষেত্রে সাধারণ চিতাবাঘের মতো স্পটগুলো ঠিক গোল-গোলও হয় না৷ মেঘের মতোই নানান শেপ আর সাইজে শরীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকে৷ সেইজন্যেই অমন নাম৷ বাংলা বই-টইতেও আজকাল দেখি ‘‘মেঘলা চিতা’’ বলে উল্লেখ করে৷’

চৌবেসাহেব সায় দিয়ে ঘাড় নাড়লেন৷ তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম, শমীকবাবুকে তো মাফিয়ারা খবর পাঠাল, একদম সদ্যোজাত তিনটে ক্লাউডেড লেপার্ডের বাচ্চা হাতে পেয়েছি৷ আপনি যেভাবেই হোক একবার আসুন৷ বলে দিয়ে যান, বাকি তিনটে বাচ্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে কী করতে হবে৷ কী ওষুধ লাগবে, কোন ভ্যাকসিন আর কেমনই বা ফিড৷ ওনাকে এসব ব্যাপারে ভরসা করা স্বাভাবিক, কারণ এতদিন অবধি শমীকবাবুই এক হাতে ফরেস্টের জন্তুদের ছানাপোনাকে সামলেছেন, আর অন্য হাতে স্মাগলারদের জন্তুদের৷ একইসঙ্গে দু’দলেরই পশু-চিকিৎসক ছিলেন তিনিই৷ যাকে বলে ডাবল-ডিলিং!

‘কিন্তু এবার তাঁর মাথায় আরো জটিল দুর্বুদ্ধি ঘনাল৷ তিনি ভাবলেন, অনেকদিন রোজগারপাতি নেই৷ একটা বড় দাঁও মারি৷ এই ভেবে তিনি সরাসরি বিদেশের ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের অফার দিলেন, তিনটে ক্লাউডেড লেপার্ডের বাচ্চা তোমাদের হাতে তুলে দেব৷ চলে এসো৷

‘যেটা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি, সেটা হল, লকডাউন ঘোষণা হয়ে যাবে৷ ফলে না যেতে পারবেন ক্লায়েন্টদের বলে দেওয়া হাত-বদলের জায়গায়, না ক্লায়েন্টরা পৌঁছতে পারবে তাঁর কাছে৷ উপরন্তু তাঁর চারপাশ থেকে ফরেস্ট-ডিপার্টমেন্টের সমস্ত পাহারা সরে তো যাবেই, অরুময় মিত্র সাহেব তাঁর পালিয়ে যাওয়ার একমাত্র ভরসা অ্যাম্বুলেন্সটিকে অবধি সিজ করে নেবেন৷ অন্যদিকে আসামের মাফিয়াদের ঠেকাবে কোন লকডাউন? তারা ঠিকসময়েই পৌঁছে গেল শমীকবাবুর ডেরায়৷

‘দুর্ভাগ্যের ওপরে দুর্ভাগ্য! ওরা আসার আগেই, বাচ্চা তিনটে বাক্স উলটিয়ে, বারান্দার নালি গলে, ঝাঁপ দিল বাইরের জমিতে৷ আফটার-অল বাঘেরই বাচ্চা তো! তারা কেন বাক্সবন্দি হয়ে থাকতে চাইবে? তাও হয়তো তিনি ওগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারতেন, যদি না সেই সময়েই কুশি ওগুলোকে দেখতে পেয়ে বেড়ালের সুন্টুনি-মুন্টুনি ছানা ভেবে কুড়িয়ে নিয়ে চলে যেত৷ শমীকবাবু পড়লেন অকূল পাথারে৷ তাঁর সঙ্গে যখন আমার আর বিনায়কের দেখা হয়েছিল, তখন তিনি সাঁতরে পাড়ে ওঠার শেষ চেষ্টা করছিলেন৷ আর সেইজন্যেই তিনি পুলিশের ইউনিফর্মে বিনায়ককে দেখে এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন৷ জানোই তো, চোরের মন সবসময়েই পুলিশ-পুলিশ করে৷

‘সেদিন কিছুই না জেনে আমরা তাঁকে পুলিশ প্রোটেকশন দিতে চেয়েছিলাম৷ তিনি রিফিউজ করলেন দেখে অবাকও হয়েছিলাম৷ আসলে পুলিশকে তাঁর শত্রুদের কথা জানালে পুলিশ তাঁর দুষ্কর্মের খোঁজও পেয়ে যেত, এই ভয়েই তিনি সরাসরি প্রোটেকশন চাননি৷ বরং চেয়েছিলেন বেণি না ভিজিয়ে চান করতে৷ আশেপাশে পুলিশ ঘুরবে, বাইরের কেউ এলে তাকে ধরবে, কিন্তু তাঁকে ছোঁবে না, এরকম একটা বন্দোবস্ত৷ কিন্তু তা তো আর হয় না! খুনেরা সেদিন দুপুরেই ফিরে এল৷ এবং ছানাগুলো কোথায়, শমীকবাবু যখন ওদের বলতে পারলেন না, তখন তাঁকে খুন করল৷

‘খুন করল, কিন্তু কুচবিহার ছেড়ে গেল না৷ ওদের মনে ক্ষীণ আশা ছিল, বাচ্চাগুলো কোথাও না কোথাও বেঁচেবর্তে রয়েছে৷ হয়তো ভেবেছিল, শমীকবাবু নিজেই ওগুলোকে কারও কাছে রাখতে দিয়েছেন৷ তাই আমি ওদের কানে তোমার গার্ডের মাধ্যমে কুশির ঠিকানা পৌঁছে দিলাম৷ ব্যস, চারটে ঘুঘুপাখি ফাঁদে পা দিয়ে ফেলল৷

‘এখন তোমরা জিগ্যেস করতে পারো, লেপার্ডের বাচ্চাই যে আমাদের হারানিধি, সেটাই বা জানলাম কেমন করে?

‘না, আমি কিছুই জানতাম না৷ আমি শুধু সারকামস্টেনসিয়াল-এভিডেন্সের ওপরে ভর করে কিছু জিনিস আন্দাজ করেছিলাম৷ কেমন এভিডেন্স? না, হারানো জিনিসগুলো ছোট, কিন্তু তবু তাদের ড্রয়ারে বা কাবার্ডে রাখা যায় না৷ ছোট, কিন্তু তবু তাদের নিয়ে আসতে গেলে একটা ঢাকা-গাড়ি লাগে৷ ছোট, কিন্তু তাদের রাখতে হয় বারান্দার কার্ডবোর্ডের বাক্সে, যে বাক্সের পাশে দুধের বোতল আর ছেঁড়া কাপড়ের বিছানা পড়ে থাকে৷

‘এর পরেও কি জিনিসগুলোর পরিচয় আন্দাজ করা খুব কঠিন?’

পার্থসারথি বললেন, ‘আপনার কাছে যে কঠিন নয় তা তো বুঝতেই পারছি৷ তবে আমার কাছে বেশ কঠিন৷’

চৌবেসাহেব আর অরুময় মিত্র দু’জনেই হেসে ফেললেন৷ তারপর বললেন, ‘আর একটা কথাই বলা বাকি৷ প্রণব বলে ছেলেটার সঙ্গে দেখা হওয়াটা এই পুরো কাহিনির টার্নিং-পয়েন্ট৷ ও যদি আমাকে কুশির কিছু তুলে আনার কথা না জানাত, ও যদি না ক্রিমিনালদের গাড়ির নম্বর দিত, এবং সবশেষে আজ যদি না ও দায়িত্ব নিত ছানাগুলোকে খুঁজে এনে নিজের কাছে আগলে রাখার, তাহলে আমরা সাকসেসফুল হতাম কিনা সন্দেহ৷’

কথা বলতে বলতে ওঁরা তিনজন গাড়ির কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন৷ সিটে উঠে বসার পর অরুময় মিত্র হাত বাড়িয়ে পার্থসারথির কাছ থেকে খাঁচাটা নিয়ে যত্ন করে নিজের কোলের ওপরে রাখলেন৷ বললেন, ‘চিন্তা করবেন না উমাদা৷ বাচ্চাগুলোর দেখাশোনার দায়িত্ব তো আমি নিলামই, তাছাড়া এই পুরো ক্রাইমটার পেছনে কারা আছে সেটাও আমি বার করে ছাড়ব৷ কালকেই চিফ কনজার্ভেটর অফ ফরেস্টকে আমি পুরো ঘটনাটা ব্রিফ করছি৷’

কথা বলতে বলতেই গাড়িটা চৌবেসাহেবের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল৷ চৌবেসাহেব গাড়ি থেকে নেমে বললেন, ‘গুডনাইট এভরিবডি৷ এ কী পার্থ, তুমি আবার গাড়ি থেকে নামছ কেন? আমি তো একাই...’

‘একটা কাজ যে বাকি রয়ে গেছে স্যার!’ ওসি কুচবিহার হঠাৎ নিচু হয়ে চৌবেসাহেবকে চট করে প্রণাম করে আবার গাড়িতে উঠে পড়লেন৷

বেশ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন চৌবেসাহেব৷ গাড়িটা নীলকুঠির রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%