সৈকত মুখোপাধ্যায়

সাতচল্লিশ বছর ধরে কোনো স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা সহজ কথা নয়, যদি না সেটা তীব্র আনন্দ কিংবা গভীর দুঃখের কোনো স্মৃতি হয়। কিংবা খুব ভয়াবহ...খুব নিষ্ঠুর কোনো স্মৃতি! তখন আর চেষ্টা করতে হয় না। এমনিতেই সেই স্মৃতি বেঁচে থাকে।
জনকপুর শহরে আমার একটা বছর সেভাবেই কেটেছিল। দুঃখ নয়, আনন্দও নয়। বীভৎসতায় মোড়া একটা বছর। স্মৃতির পাতায় ওই এক বছরের অন্ধকারের রং এখনো এতটুকু ফিকে হয়নি।
মনে করতে চাই না, তবু সেদিন বিনায়কের একটা কথায় জনকপুরের প্রসঙ্গ এসেই গেল। তখনই দেখলাম, কিছুই ভুলিনি এখনো।
বিনায়ক কে? বলছি।
ওর পুরো নাম বিনায়ক বসু। আমার মতোই ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিসের অফিসার। তবে আমার থেকে অনেক জুনিয়র। ওর বয়স এখনো চল্লিশ ছাড়ায়নি আর আমি উমাশঙ্কর চৌবে, ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশের প্রাক্তন অ্যাডিশনাল এসপি, অবসর নিয়েছি দশ বছর আগে।
তবু যে আমাদের মধ্যে একটা অসমবয়সি বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে, তার একটা বড় কারণ, আমরা দু’জনেই উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা। বিনায়কের পৈতৃক বাড়ি ধূপগুড়িতে আর আমি অবসর নেওয়ার পরে কুচবিহার এয়ারপোর্টের পাশে একটা বাড়ি বানিয়ে এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে গেছি। ফলে বিনায়ক খুব সহজেই আমার সঙ্গে যোগাযোগটা রেখে চলতে পারছে। এতদিন অবধি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন থানাতেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ওর পোস্টিং হয়েছে। যেখানেই থাকুক, মাসে অন্তত দু’বার ও আমার বাড়িতে আসবেই। অনেকক্ষণ গল্পগুজব করে বাড়ি ফিরবে।
এ কথা ঠিক যে, বেশ কিছু কেসের সমাধানে আমি বিনায়ককে সাহায্য করেছি। কিন্তু তাতে অফিসার হিসেবে বিনায়ক বসুর কৃতিত্ব কোথাও খাটো হয়ে যায় না।
আসলে একটা অপরাধের তদন্তে নামলে দুটো জিনিস সমানভাবে প্রয়োজন হয়। এক, এভিডেন্স...প্রমাণ। প্রমাণের মধ্যে যেখানে অপরাধ ঘটেছে সেখানে অপরাধীর ফেলে যাওয়া নানান রকমের চিহ্ন যেমন থাকে, তেমনই থাকে ফরেন্সিক এবং পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট। আজকাল তো ফোন-কলের লিস্ট, সিসি-টিভির ফুটেজ এসবও প্রমাণ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আর দুই, তদন্তকারী অফিসারের কল্পনাশক্তি। জড়ো করা এভিডেন্স থেকে বাস্তবে যা ঘটেছিল সেটাকে অনুমান করে নেওয়ার ক্ষমতা।
বিনায়ক এভিডেন্স জোগাড় করায় মাস্টার, কিন্তু ওর কল্পনাশক্তিটা কম। ফলে অনেক সময় হাতের কাছে সূত্রগুলো থাকা সত্ত্বেও ও বুঝে উঠতে পারে না বাস্তবে কী ঘটেছিল। সেই ব্যাপারেই আমি কয়েকবার ওকে সাহায্য করেছি।
এখনই যেমন মনে পড়ছে, বারোবিশার অজিত বর্মনের মার্ডার কেসের কথা। অজিত বর্মন ছিলেন সন্ত্রাসবাদীদের এক নম্বর টার্গেট এবং তখন এই বিনায়কই ছিল অজিত বর্মনের সিকিউরিটির চার্জে। ও কাজে ফাঁকি দেয়নি। ওই বাড়িতে বাইরের কোনো লোককে ঢুকতে দেয়নি তো বটেই, চেক না করে একটা পাউরুটির প্যাকেটও নিয়ে যেতে দেয়নি বাড়ির ভেতরে। এত কড়াকড়ি সত্ত্বেও একদিন সকালে আর ডি এক্স বিস্ফোরণে অজিত বর্মনের দেহটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তিনি তখন ছিলেন দোতলার ঘরে, একা।
টাইম-বোম নয়, ফরেনসিক রিপোর্টে বলা ছিল, বিস্ফোরণের সময়েই বোমটাকে ডিটোনেট করা হয়েছিল, অর্থাৎ আর ডি এক্সের পাতের মধ্যে একটা বিদ্যুতের প্রবাহ চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কে ডিটোনেট করল বোমটাকে? দোতলায় তো অজিত বর্মন ছাড়া আর কেউ ছিলেন না!
এই কেসটায় সত্যি কথা বলতে কী কোনো এভিডেন্সই ছিল না। একটা ছোট ঘরের মধ্যে ওরকম একটা বিস্ফোরণের পরে আর কী প্রমাণই বা অবশিষ্ট থাকতে পারে? কাজেই অজিতবাবুর ঘরে আর ডি এক্স পৌঁছল কেমন করে, সেটা ভেবে বিনায়ক তো বটেই, আমিও যখন কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না, তখনই একটা দৃশ্য দেখে মুহূর্তের মধ্যে মোডাস অপারেন্ডিটা ধরে ফেলতে পেরেছিলাম।
কিছুই না, সকালে যে কাগজের হকার বর্মনবাড়ির দোতলার বারান্দায় কাগজ ছুড়ে দিয়ে যেত, সেই ছেলেটাই সেদিন খবরের কাগজের মধ্যে আর ডি এক্স এবং ডিটোনেটর পুরে দোতলার বারান্দায় ছুড়ে দিয়ে গিয়েছিল। অজিত বর্মন যখনই সেই মুড়িয়ে রাখা কাগজ খুলেছেন, তখনই বিস্ফোরণ ঘটেছে। অর্থাৎ অজান্তেই তিনি নিজের মৃত্যুবাণকে নিজে সক্রিয় করে তুলেছিলেন।
এসব অবশ্য দশ বছর আগের ঘটনা। এখন বিনায়ক অনেক ম্যাচিওর, অনেক বেশি চিন্তাশীল। ও অবশ্য বলে, যদি ওর কিছু উন্নতি হয়েই থাকে, তাহলে সেটা আমার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে করতেই নাকি হয়েছে। অস্বীকার করব না, কথাটা শুনতে ভালো লাগে।
সেদিনও বিনায়ক নিছক আড্ডা দিতেই আমার বাড়িতে এসেছিল। বাড়িটা যখন বানিয়েছিলাম, তখন দোতলায় ঘর বারান্দা এসবের বাইরে একটুকরো ছাদ বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। এখন ওখানেই আমার টবের বাগান, ওটাই আমার বই পড়ার জায়গা। প্রতিদিন ভোরে ওই ছাদে দাঁড়িয়েই আধঘণ্টা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করি।
ছাদটায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকালে চোখে পড়ে দিগন্তে ভুটান পাহাড়ের সারি। বাঁদিকে এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্টের বাঁদিকের সীমানা জুড়ে রাজার আমলের সেগুনবাগান। তারও ওপাশ দিয়ে তোর্সা নদীর একটা শাখা বয়ে গেছে। গাছের ফাঁক দিয়ে কোথাও কোথাও তার চিকমিকে স্রোত দেখতে পাওয়া যায়।
সেদিন বিনায়কের আসতে একটু দেরি হয়েছিল। তখন সন্ধে প্রায় সাতটা। কার্তিক মাস শেষ হতে চলেছে। উত্তরবঙ্গের বাতাসে শীতের ছোঁয়া ছিল, তবে বাইরে বসতে না পারার মতো ঠান্ডা তখনো পড়েনি। তাই আমি আর বিনায়ক আমার ওই ছাদের বাগানের মাঝখানেই বেতের চেয়ারে বসে ফুলকপির শিঙাড়া আর চা খাচ্ছিলাম। সেদিন আকাশে বেশ জ্যোৎস্না ছিল। চাঁদের আলোয় পাহাড়-নদী-বন সবকিছুকেই বেশ মায়াময় লাগছিল।
ওই সৌন্দর্যের টানেই বোধহয়, চায়ের খালি কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বিনায়ক ছাদের পাঁচিলের ধারে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ সেগুনবনের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল বিনায়ক। ডাকল, স্যার!
বললাম, বলো।
ও একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসল, যেটা আগে কখনো করেনি। বলল, স্যার! এতরকমের চাকরি থাকতে আপনি পুলিশের চাকরিতে ঢুকলেন কেন?
ওর প্রশ্নের ধরন শুনে হেসে ফেললাম। বললাম, কেন? আর কী করতে পারতাম?
বিনায়ক বলল, অনেক কিছুই পারতেন। আপনার কতরকমের আগ্রহের বিষয় রয়েছে। পশুপাখি আর গাছপালাকে যে এত ভালোবাসেন, কখনো মনে হয়নি, ফরেস্ট সার্ভিসে চাকরি নিলে ভালো হতো? তারপর ধরুন, আমাদের ট্রেনিং পিরিয়ডে আপনার ক্লাসও তো আমি অ্যাটেন্ড করেছি। সেই জন্যেই জানি, টিচার হিসেবে আপনি অসাধারণ। অনায়াসেই কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় বসতে পারতেন। সেসব ছেড়ে পুলিশের চাকরিতেই এলেন কেন?
বললাম, দ্যাখো বিনায়ক! আমি কিন্তু চাকুরি জীবনের প্রতিটা দিন উপভোগ করেছি। বেশিরভাগ সময়টাই হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টে পোস্টেড ছিলাম। সেখানে কতরকমের মৃত্যুরহস্যের সমাধান করতে হয়েছে। আর তুমি তো জানো, একটা খুনিকে গারদের ভেতরে পুরতে পারলে মনে হয় সাধারণ নাগরিকদের জন্যে পৃথিবীটাকে আরও একটু নিরাপদ করতে পারলাম। এসবের দাম নেই?
বিনায়ক তবুও গোঁয়ারের মতো বলে চলল, কিন্তু আপনি যে এই মার্ডার ইনভেস্টিগেশনের কাজটা ভালো পারেন, সেটা তো জানলেন চাকরিতে ঢোকার পরে। যদি না পারতেন? যদি রক্ত দেখে আপনার গা গুলোত? ভায়োলেন্সের সিনে দাঁড়িয়ে যদি পা কাঁপত, তখন কী করতেন? চাকরিতে ঢোকার আগে এসব নিয়ে ভাবেননি কখনো?
বিনায়কের মতো এত স্পষ্টভাবে না করলেও, এই একই প্রশ্ন এর আগেও কেউ কেউ আমাকে করেছেন। যাঁরা করেছেন তাঁদের দোষ দিতে পারি না। তার কারণ, আমি জানি, আমার চেহারা এবং চরিত্রের মধ্যে কিছু জিনিস রয়েছে যেগুলো সাধারণত দুঁদে পুলিশ অফিসার বলতে যে চেহারাটা চোখে ভাসে তার সঙ্গে খাপ খায় না।
কাজের সময়ের বাইরে আমি গান শুনতাম, কবিতা পড়তাম, পাহাড়ে-জঙ্গলে একা একা ঘুরতে চলে যেতাম। এখনো যাই। আমি লোককে ধমক-চমক করতে ভালোবাসি না, শান্তভাবে কথা বলি। আমি জানি, কাঁচাপাকা চুল আর মোটা কালো ফ্রেমের চশমায় আমাকে পুলিশ অফিসারের চেয়ে একজন অধ্যাপকের ভূমিকায় অনেক ভালো মানায়।
তবু একইসঙ্গে আমি এটাও জানতাম যে, ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনে আমি সফল হবই। হ্যাঁ, চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার আগেই আমি এগুলো জেনে ফেলেছিলাম। জেনেছিলাম ওই জনকপুর শহরের একবছরের অভিজ্ঞতায়। আর সেই জন্যেই জনকপুর থেকে ফিরে আমি ফরেস্ট সার্ভিসের পরীক্ষায় বসিনি, কলেজ সার্ভিসের পরীক্ষায় বসিনি, বসেছিলাম পুলিশ সার্ভিসের পরীক্ষায়; এবং সফল হয়েছিলাম।
সেই কথাটাই সেদিন বিনায়ককে বললাম। বললাম, তুমি শুনলে অবাক হবে বিনায়ক, আমি কিন্তু পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই জেনে ফেলেছিলাম যে রক্ত দেখলে আমার গা গুলোয় না। জেনেছিলাম যে, আমি ভয়ংকর ভায়োলেন্সের মধ্যেও স্থির থাকতে পারি। এবং সর্বোপরি জেনেছিলাম যে, আমি সামান্য কিছু সূত্র থেকে পুরো ক্রাইম সিনটাকে চোখের সামনে তৈরি করে নিতে পারি।
তুমি যা বলছ তাও ঠিক। হয়তো আমি অধ্যাপক হতে পারতাম, জীববিজ্ঞানী হতে পারতাম। কিন্তু মাত্র তেইশ বছর বয়সে জনকপুর নামে এক শহরতলিই আমাকে জানিয়ে দিয়েছিল যে, আমি সবকিছুর চেয়ে রহস্যভেদের কাজটাই ভালো করে পারি।
বিনায়ক অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, জনকপুর! তেইশ বছর বয়সে! এরকম কোনো জায়গায় যে আপনি কখনো ছিলেন, তা তো বলেননি কখনো? আমি তো জানতাম, আপনার পড়াশোনা সবটাই কলকাতায়।
সে ঠিকই জানো। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করা আর এই পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়া, এর মধ্যে তো দু-তিন বছর গ্যাপ ছিল। ওই সময়টায় কী করেছিলাম, সেটা তো তোমাকে বলার প্রয়োজন হয়নি কখনো।
বিনায়কের চোখেমুখে উত্তেজনার চিহ্ন ফুটে উঠল। ও আমার দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, তার মানে কি ওখানে, ওই জনকপুরেই আপনার ক্রাইম ডিটেকশনে হাতেখড়ি হয়েছিল? পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই?
আমি মুখে কিছু না বলে, হেসে ঘাড় হেলালাম।
তখন আপনার তেইশ বছর বয়স ছিল বলছেন। তার মানে আপনি তখন নিতান্তই ছোট। ধরে নেব কি ক্রাইমগুলোও সেই অনুপাতে ছোট ছিল? কী হয়েছিল স্যার? ইভটিজিং? দোকান থেকে মাল সরানো?
বিনায়কের গলায় একটু রসিকতার সুর শুনলাম যেন! সরাসরি ওর কথার উত্তর না দিয়ে বললাম, আচ্ছা বিনায়ক, তুমি তো জনকপুর জায়গাটার নাম আগে কখনো শোনোনি, তাই না?
ও বলল, না স্যার।
তবু, নামটা শুনে তোমার কেমন ইম্প্রেশন হচ্ছে? চোখ বুজে যদি জনকপুর বলে একটা ছোট শহরের কথা ভাবো, কেমন ছবি ফুটে উঠবে তোমার চোখের সামনে?
বিনায়ক সত্যিকারেই চোখ বুজে ফেলল। তখনো ওর ঠোঁটে সামান্য কৌতুকের হাসি লেগে আছে। চোখ বুজেই বলল, আহা! ছোট্ট স্টেশনে দিনে দুটো প্যাসেঞ্জার ট্রেন দাঁড়ায়। স্টেশন থেকে বেরোলেই শালের জঙ্গল চিরে চলে গেছে আঁকাবাঁকা লালমাটির রাস্তা। এখানে ওখানে একেকটা বাগান-ঘেরা বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। পাখির ডাক আর ঘোড়ায় টানা টাঙাগাড়ির টকটক শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই বিশেষ।
আমি হো-হো করে হেসে উঠতেই বিনায়ক চোখ খুলে ফেলল। বলল, কী হল? ভুল বললাম?
আমি হাসতে হাসতে বললাম, জানতাম, এরকমই কিছু বলবে। জনকপুর নামটার মধ্যেই যে একটা শান্ত সুর মিশে আছে। যাই হোক, এবার আসলে জায়গাটা কীরকম সেটা শোনো—
হাওড়া-আসানসোল মেইন লাইনে পাণ্ডবেশ্বর স্টেশনে নেমে একটা পিচ ওঠা, খানাখন্দে ভরা রাস্তা ধরে পনেরো কিলোমিটার পথ পেরোলে তবে ওখানে পৌঁছনো যায়। আমি যখনকার কথা বলছি, তখন দিনে দুটো বাস ছাড়া আর কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ছিল না। জনকপুরের দু-চারজন বড়লোকের বাড়িতে মোটরগাড়ি ছিল বটে। তবে বাকিদের বিপদে-আপদে ভরসা ছিল ভ্যান-রিকশা।
জায়গাটা রুক্ষ্ম, পাথুরে। তাই শীতকালে যেমন ঠান্ডা পড়ত, গ্রীষ্মকালে তেমনি গরম। পাণ্ডবেশ্বর থেকে ওই পনেরো কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশে কোথাও সবুজের চিহ্ন ছিল না, যদিও সবটাই ছিল ফাঁকা জমি। ফাঁকা হলে কী হবে? ঘাস অবধি গজাত না ওখানে। এখানে-ওখানে দুয়েকটা বেঁটে বেঁটে খেজুরগাছ আর ফণীমনসার ঝোপ। চোখ জ্বলে যেত সেই পাথুরে ডাঙার দিকে তাকালে।
তারই মধ্যে হঠাৎ করেই কীভাবে যেন গজিয়ে উঠেছিল শহরটা। পুরো শহরটার চেহারার মধ্যে প্ল্যানিং বলে কোনো বস্তুর ছাপ দেখিনি। ছিরিছাঁদহীন বাড়িগুলোর গায়ে রঙ তো দূরের কথা, প্লাস্টার অবধি ছিল না। রাস্তার চেয়ে গলিপথ বেশি। সারা শহরটায় রাস্তার ধারে তেমন কোনো বড় গাছ দেখিনি। রুক্ষ্ম জায়গাতেও তো কিছু গাছ জন্মায়—বাবলা, কৃষ্ণচূড়া, সোনাঝুরি। সেরকম গাছও কি কেউ লাগাতে পারত না?
দূর থেকে জনকপুরকে দেখলে মনে হতো আকাশ থেকে যেন কেউ একঝুড়ি আবর্জনা ওখানে মাঠের ভেতরে ঢেলে দিয়েছে।
কিছুদিন ওখানে থাকার পরেই বুঝতে পেরেছিলাম, সৌন্দর্য নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায় না ওখানে। শহরটার বেশিরভাগ মানুষ এতটাই গরিব ছিল যে, সৌন্দর্যের কথা চিন্তা করা ছিল তাদের পক্ষে বিলাসিতা। আবার উলটোদিকে এমন কিছু লোক ছিল যাদের টাকার কুমির বললেও কম বলা হয়। কিন্তু যেনতেন প্রকারেণ পয়সা রোজগার করা ছাড়া অন্য কোনোদিকে মন দেওয়াকে তারাও বোকামি মনে করত।
গোটা শহরটায় একটাও লাইব্রেরি ছিল না। লোকাল ছেলেদের দুটো ক্লাব ছিল ঠিকই, কিন্তু খেলাধুলার চেয়ে পুজোর নামে চাঁদা তুলে, সেই টাকায় মৌজমস্তি করার দিকেই তাদের বেশি উৎসাহ ছিল।
বিনায়ক বলল, জনকপুরের লোকেদের জীবিকা কী ছিল স্যার? চাষবাস তো হতো না বলছেন।
উত্তর দিলাম, কয়লাখনি। কোল-মাইনস। শহরটাকে ঘিরে ছিল ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেডের তিন-তিনটে মাইনস। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ওখানকার প্রতিটা মানুষ সেই কয়লাখনিগুলোর ওপরে নির্ভরশীল ছিল।
আসলে শহরটা তৈরিই হয়েছিল কয়লাখনির জন্যে; আজ নয়, প্রায় দেড়শো বছর আগে। তখন সবে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর কয়লার ব্যবসায় নেমেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কোল কোম্পানির প্রথম কয়েকটা খনির মধ্যে একটা ছিল জনকপুর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে তুকসালি বলে একটা জায়গায়।
বিনায়ক কুণ্ঠিতভাবে বলল, আগের মন্তব্যটা উইথড্র করলাম স্যার। আমি জানি, খনি-এলাকার হাওয়ায় কাঁচা টাকা ওড়ে। তার ওপরে ঢিলছোড়া দূরত্বে ঝাড়খণ্ডের বর্ডার। ক্রাইম জিনিসটা ওখানে ডাল ভাত। এই তো, গত মাসেই রানিগঞ্জের তিনজন সুপারি-কিলার ফালাকাটায় এসে গা ঢাকা দিয়ে বসেছিল। ওখান থেকে একটা টিম এসে আমাদের সাহায্য নিয়ে তাদের অ্যারেস্ট করল। বুঝতে পারছি, সেরকম কোনো বড়সড় ঝঞ্ঝাটেই আপনি জড়িয়েছিলেন। আপনার জীবনের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা। আচ্ছা স্যার...
বলো!
আপনিও কি তাহলে ইসিএল-এ চাকরি পেয়েছিলেন?
উঁহু। আমি স্কুলশিক্ষকের চাকরি পেয়েছিলাম। জীবনের প্রথম চাকরি। সালটা উনিশশো ছিয়াত্তর। আমার তখন তেইশ বছর বয়স, সদ্য এম এস সি পাশ করেছি। যে স্কলারশিপটা পেয়ে কলকাতায় পড়তে গিয়েছিলাম, পাশ করামাত্রই সেটারও মেয়াদ শেষ হয়ে গেল। বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের হস্টেলটাও ছেড়ে দিতে হল। বর্ধমানের গ্রামে আমার দেশের বাড়িতে ফিরে যেতে পারতাম, কিন্তু ইচ্ছে করল না। সেখানেও তো দাদা-বউদির অভাবের সংসার। আবার আমি গিয়ে তাদের ভার বাড়াব?
কী করব কিছুই যখন বুঝতে পারছি না, তখন আমার ইউনিভার্সিটিরই এক সহপাঠী, শ্যামল মল্লিক, সে আমাকে ওই চাকরিটার খবর দিল। শ্যামলের বাড়ি ছিল দুর্গাপুরে। ওদিকের একটা লোকাল নিউজপেপারে স্কুলটিচারের চাকরির বিজ্ঞাপনটা বেরিয়েছিল।
শ্যামল বিজ্ঞাপনটা আমাকে দেখিয়ে বলল, ভেকেন্সিটা তোর জন্যেই ভগবান তৈরি করেছেন। দেখ উমা, এরা লিখেই দিয়েছে, অ্যাপ্লিকেশন করতে হলে স্কুল লেভেলে ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ থাকতে হবে হিন্দি। সেটা আমাদের মধ্যে একমাত্র তোরই রয়েছে।
কথাটা ও মিথ্যে বলেনি। স্কুলের পড়াশোনা তো করেছিলাম বিহারের পূর্ণিয়ায়। ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ হিন্দিই ছিল আমার। তবু কিন্তু কিন্তু করছিলাম। এত কষ্ট করে এতদূর অবধি লেখাপড়া শিখলাম। তা কি ওই পাণ্ডবেশ্বরের পাণ্ডববর্জিত শহরে জীবন কাটানোর জন্যে?
শ্যামল আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে বলল, দেখ উমা, তোকে তো ভালো করেই চিনি। এখন কলকাতায় থাকলে তুই আড্ডা মারা ছাড়া আর কিছু করবি না। বড়জোর এসপ্ল্যানেডের হলগুলোয় গিয়ে ইংরিজি সিনেমা দেখবি আর নয়তো কফিহাউসে গিয়ে উঠতি কবিদের আড্ডায় আঁতলামি করবি। তার চেয়ে জনকপুরে চলে যা।
স্যালারি ওরা যা দিচ্ছে সেটা কলকাতার বেস্ট স্কুলেও দেয় না। কাজের চাপও মনে হয় না তেমন থাকবে, কারণ, ওসব দিকে ইলেভেন-টুয়েলভ অবধি পৌঁছনোর আগেই বেশিরভাগ ছেলে পড়াশোনা ছেড়ে, হাতে গাঁইতি নিয়ে কয়লা কাটতে নেমে যায়, আর মেয়েগুলোর বিয়ে হয়ে যায়।
হাতে পয়সা পেলি। অখণ্ড অবসর পেলি। আর কী চাই? এক-দু’বছর মন দিয়ে চাকরির পরীক্ষার প্রিপারেশন নে। তারপর বড়সাহেব হয়ে আবার কলকাতায় ফিরে আয়।
শ্যামল আমার শুভাকাঙ্ক্ষী বলেই এমন পরামর্শ দিয়েছিল। আমি ওর কথা মেনে নিলাম। এরকমই এক অক্টোবর মাসের দুপুরে, হাতে একটা স্যুটকেস নিয়ে জনকপুরের বাসস্ট্যান্ডে নামলাম। দুপুর হয়ে গিয়েছিল বলেই বাসস্ট্যান্ডের বেশিরভাগ দোকানেই দেখলাম ঝাঁপ বন্ধ। তবে সামনেই একটা ওষুধের দোকান খোলা ছিল। কাউন্টারের ওদিকে চেয়ারে বসে এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক মন দিয়ে কী যেন একটা বই পড়ছিলেন। কাউন্টারের এপাশে দাঁড়িয়ে তাঁকেই জিগ্যেস করলাম, কাশীনাথ হিন্দি হাইস্কুলটা কোনদিকে?
দোকানদার ভদ্রলোক অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন দেখে তাড়াহুড়ো করে বললাম, আমি ওই স্কুলে টিচার হিসেবে জয়েন করতে এসেছি।
তাই শুনে মুখে চুকচুক শব্দ করে ভদ্রলোক বললেন, স্কুল তো এখন বন্ধ ভাই। পুজোর ছুটি চলছে। ফোন করে আসেননি?
সত্যিই ফোন করে যাইনি। কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভদ্রলোক, একটু পরেই জেনেছিলাম তাঁর নাম জগদীশ মাহাতো, বললেন, চাকরি আপনার পালাবে না। কিন্তু এখন থাকবেন কোথায়? খাবেন কী? চলুন তো! চলুন আমার সঙ্গে।
তখন কি জানতাম, সেদিন প্রথম আলাপেই যিনি আমার সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, পরের এক বছরে সেই জগদীশ মাহাতোই বারবার একইভাবে আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন! সেদিন দোকান থেকে বেরিয়েই তিনি আমাকে বললেন, এত বাচ্চা ছেলেকে বাবু, স্যার, এসব বলে ডাকতে পারব না। নাম কী তোমার?
বললাম, উমাশঙ্কর চৌবে।
বেশ। উমা বলেই ডাকব তাহলে। আমার নাম জগদীশ মাহাতো। এই কোলফিল্ড মেডিসিন দোকানটা আমারই। তুমি আমাকে আপাতত জগদীশদা বলে ডেকো। দেখো, আস্তে আস্তে ওটা জগাদা হয়ে যাবে। তাইই যায়।
এরকমই মজা করে কথা বলত জগদীশদা। আচ্ছা, ওঁর কথায় আবার পরে আসব। জনকপুরে প্রথম পদার্পণের সেই দিনটা কীভাবে কাটল সেটা আগে বলে শেষ করি।
জগদীশদা একটা কমবয়সি ছেলেকে ডেকে দোকানটা দেখতে বলে, রাস্তায় বেরিয়ে এলেন। চটিটা কাউন্টারের বাইরে খুলে রেখেছিলেন। সেটা পায়ে গলিয়ে নিয়ে বললেন, চলো।
কোথায় যাব? জিগ্যেস করলাম।
মোহিতবাবুর নাম শুনেছ?
বললাম, কই, না তো!
বলো কী! মোহিতলাল চট্টোপাধ্যায়... নাম শোনোনি? তোমার চাকরির চিঠির নীচে সই কে করেছেন?
খেয়াল হল, সত্যিই তো! স্কুলের প্রেসিডেন্টের রাবার-স্ট্যাম্পের ওপরে উজ্জ্বল নীল কালিতে পাকা হাতের যে ইংরিজি সইটা দেখেছিলাম, সেটা তো জনৈক এম এল চ্যাটার্জীরই বটে। তাই জগদীশদাকে জিগ্যেস করলাম, স্কুল-বোর্ডের প্রেসিডেন্ট যিনি?
ঠিক। তবে ওঁর আরও অনেক পরিচয় রয়েছে।
যেমন?
ইসিএল-এর সবচেয়ে বড় দশজন তালিকাভুক্ত ঠিকাদারের মধ্যে একজন হচ্ছেন মোহিতলাল চ্যাটার্জী। এখানকার সবচেয়ে পুরোনো বাসিন্দাও ওঁরাই। ওঁদের বাড়িটার বয়সই হবে একশো বছরের ওপর। ইদানীং একটু পড়তি অবস্থা, তবু এখনো চাটুজ্জে পরিবারই হচ্ছে জনকপুরের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী পরিবার। যে স্কুলটায় তুমি চাকরি করতে এসেছ, সেই স্কুলটাও মোহিতবাবুর দাদু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আর?
জগদীশদা বললেন, আমাদের এই জনকপুরের সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর যোগাযোগ খুবই কম। কলকাতার কথা ছেড়েই দাও, দুর্গাপুর কিংবা বর্ধমানের ক’জন লোক জনকপুরের নাম শুনেছে হাতে গুনে বলে দেওয়া যায়। তবু তার মধ্যে একজনই আছেন, ওই মোহিত চ্যাটার্জী, যিনি ইয়ং বয়সে অনেকগুলো কারণে কলকাতার অভিজাত মহলে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।
কী রকম? আমি কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলাম।
জগদীশ মাহাতো বললেন, দেখতে তো অসম্ভব সুদর্শন ছিলেনই, সে তুমি এখন এই আশি বছরের চেহারা দেখলেও বুঝতে পারবে। ভালো ক্রিকেট খেলতেন। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ‘ব্লু’ ছিলেন। অভিনয়ের ঝোঁক ছিল। শুনেছি, কয়েকটা বাংলা সিনেমায় ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। গানের গলা ভালো। চমৎকার হাতসাফাইয়ের ম্যাজিক দেখাতে পারতেন। একটা আড্ডা বা পার্টিতে এরকম একজন মানুষ যে মধ্যমণি হয়ে উঠবেন সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?
আমি জগদীশবাবুর কথা শুনতে শুনতে আড়চোখে ওঁর দিকে তাকাচ্ছিলাম। মোহিতলাল চট্টোপাধ্যায় কেমন মানুষ, সে তো আলাপ হলেই দেখতে পাব। কিন্তু আপাতত জগদীশ মাহাতোকেও আমার খুব অন্যরকম লাগছিল। মার্জিত চেহারা, মার্জিত ভাষা। জনকপুরের মতো হতচ্ছাড়া জায়গার পক্ষে বেশ বেমানান লাগছিল। প্রশ্ন করে বসলাম, আচ্ছা, আপনি কি অরিজিনালি এখানকারই লোক?
তিনি বললেন, হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
না, এমনিই জিগ্যেস করছি।
তিনি হাসলেন। বললেন, হুঁশিয়ার ছেলে দেখছি। ঠিকই ধরেছ। আমাদের বাড়ি পুরুলিয়া টাউনে। ওখানেই সাতপুরুষের বাস। তবে ছোটবেলা থেকেই স্বভাব ছিল শ্যাওলার মতো ভাসমান। ভাসতেই ভাসতেই দশ বছর আগে এই জনকপুরে এসে ঠেকেছিলাম। আগামীদিনে যে আবার অন্য কোথাও চলে যাব না, তার গ্যারান্টি দিতে পারছি না।
আগেই বলেছি, মাসটা ছিল অক্টোবর। অক্টোবরের শেষদিকের একটা দিন। তবু সেই দুপুরের রোদ্দুর গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছিল। একটা ভাঙাচোরা সর্পিল রাস্তা ধরে আমরা শহরের অন্য এক দিকে এগিয়ে চলেছিলাম। যতই হাঁটছিলাম, ততই মনটা বিরূপ হয়ে উঠছিল। রাস্তার মধ্যেই এখানে-ওখানে ডাঁই করে রাখা আবর্জনার স্তূপ। কোথাও এতটুকু ছায়া নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, বাড়ি, ঘর, দোকান, পার্ক করে রাখা কয়লার ডাম্পার—সবকিছুর ওপরেই কেমন যেন একটা কালো ধুলোর আস্তরণ। এমনকী ওই দুপুরে রাস্তায় যত লোক দেখেছিলাম, তাদেরও চোখে-মুখে যেন জড়িয়ে ছিল সেই কালো ধুলো।
কিছুক্ষণ হাঁটবার পরেই আমার চোখদুটো কড়কড় করতে শুরু করল। দাঁতের মধ্যেও কিচকিচ করছিল বালির মতো কণা। এদিক-ওদিক তাকালাম, যদি একটা টিউবওয়েল বা কল পাওয়া যায় তাহলে মুখটা একটু ধুয়ে নিতাম। পেলাম না।
জগদীশবাবু আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন। একটা তেতো হাসি হেসে বললেন, চোখ কড়কড় করছে তো? অভ্যেস হয়ে যাবে। আসলে আমাদের এই জনকপুরের চারিদিকে অনেকগুলো চোরাই কয়লা খাদান রয়েছে। চোরাই খাদানে তো আর পলিউশন কন্ট্রোলের ব্যবস্থা থাকে না, তাই এরকম জোরালো হাওয়া দিলেই কয়লার গুঁড়ো এসে শহরটাকে ভরিয়ে দেয়।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমার দোকানে কোন ওষুধের বিক্রি সবচেয়ে বেশি জানো? হাঁপানির। ওই কয়লার গুঁড়োর জন্যেই এখানকার বাচ্চা থেকে বুড়ো, সবাই ফুসফুসের অসুখে ভোগে। যাকগে, ওই দেখো, তোমার স্কুল।
আমরা তখন যে জায়গাটায় গিয়ে পৌঁছেছিলাম, সেটা জনকপুরের প্রান্তিক এলাকা। একটাই মোরামের রাস্তা ধু-ধু মাঠের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে দিগন্তের দিকে চলে গিয়েছিল। তবে সেই মোরামের রঙ আমাদের চিরপরিচিত স্নিগ্ধ লাল নয়। তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে কয়লার গুঁড়ো মিশে যাওয়ার ফলে রঙটা দাঁড়িয়েছিল শুকনো রক্তের মতো কালচে লাল।
প্রায় মাইল খানেক দূরে একটা কয়লাখনির চানক দেখা যাচ্ছিল। স্টিলের টাওয়ারের ওপরে বসানো বিশাল দুটো লোহার হুইল। ওই হুইলদুটো লাটাইয়ের মতো ঘুরতে ঘুরতে খনির গভীরে লোহার ডুলি নামায় আর ওঠায়। সেই ডুলিতে চড়েই লেবাররা নামা ওঠা করে। কয়লাভর্তি ঠেলাগাড়িগুলোও ডুলিতে চেপেই উঠে আসে খনির মুখে।
কিন্তু চানকের দিকে নয়। জগদীশবাবু আমাকে রাস্তার বাঁ-পাশে নিচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা বিশাল কম্পাউন্ডের দিকে তাকাতে বলছিলেন। তাকালাম। সেই প্রথম মনে হল, ইচ্ছে করলে এই জায়গাটাকেও সুন্দর করে গড়ে তোলা যেত। নিচু বাউন্ডারি-ওয়ালের ধার বরাবর বড় বড় জারুল, অর্জুন, অশ্বত্থ আর নিমের গাছ। তারপর ছোট এক টুকরো খেলার মাঠ। মাঠের দু’দিকে সাদা রঙ করা গোলপোস্ট। তারপরেই স্কুল বিল্ডিং। দোতলা একটা বাড়ি—বয়সের ভারে জীর্ণ। শুনশান, নিস্তব্ধ। কারণ, তখন পুজোর ছুটি চলছিল।
স্কুলবাড়িটাকে বেড় দিয়ে পেছনদিকে যেতেই চোখে পড়ল অনেকখানি জমির মাঝখানে একটা দোতলা বাড়ি। বাড়িটার স্থাপত্য দেখলেই বোঝা যায় সেটা ব্রিটিশ আমলে তৈরি। সেই উঁচু থামের মাথায় ধরে রাখা গাড়িবারান্দা, স্টেয়ারকেস আর খড়খড়ি লাগানো ফ্রেঞ্চ ইউন্ডোর সারি। জগদীশদা বাড়িটাকে দেখিয়ে বললেন, চলে এসেছি। এই হচ্ছে চ্যাটার্জী ম্যানসন।
চ্যাটার্জী ম্যানসনের বাগানেও অনেক বড় বড় গাছ দেখলাম। মনে হল আম, লিচু, কাঁঠাল ইত্যাদি ফলের গাছই বেশি। ঢোকার মুখেই বিশাল লোহার গেট। গেটের পাল্লাদুটো মোটা চেন আর তালা দিয়ে এমনভাবেই বন্ধ করা ছিল যাতে গাড়ি কিংবা গোরু কোনোটাই না ঢুকতে পারে, কিন্তু মানুষের যাতায়াতে অসুবিধে না হয়।
জগদীশবাবুর পেছন পেছন ভেতরে ঢুকলাম। প্রথমেই যে কথাটা মাথায় এল সেটা হল, এই বাড়িতেও কি পুজোর ছুটি চলছে? এই বাড়ির বাসিন্দারাও কি বাড়ি ফাঁকা করে অন্য কোথাও চলে গেছে?
আমার এরকম ভাবার মধ্যে কোনো দোষ ছিল না। এরকম বিশাল একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ালে কিছু শব্দ তো পাওয়ার কথা—মানুষের কথা বলার আওয়াজ, রেডিওর গান, বাসনকোসনের শব্দ। কিন্তু কিছুই ছিল না, কিচ্ছু না।
তবে মাথা তুলে দোতলার দিকে তাকাতেই মানুষের বসবাসের চিহ্ন দেখতে পেলাম। বারান্দায় দড়িতে কিছু জামাকাপড় শুকোচ্ছিল। তার মধ্যে অনেকগুলো সাদা বেডশিট ছিল, এবং বালিশের ওয়ার...সেগুলোও সাদা। মহিলাদের মাথা থেকে গলিয়ে পরার ঢোলা সেমিজ অন্তত তিনটে। তাছাড়া রেলিং-এর ওপরে মেলে রাখা ছিল একটা বড় অয়েলক্লথ...যেরকম অয়েলক্লথ বিছানায় পাতা হয়।
বাড়িটা এরকম চুপচাপ লাগছে কেন জগদীশদা? প্রশ্ন করলাম। লোকজন নেই?
উনি বললেন, আছে বইকি। তবে এত বড় বাড়ির তুলনায় নিতান্তই কম। সাকুল্যে সাড়ে চারজন। মোহিতবাবু, ওনার স্ত্রী, ওনার বড় ছেলে আর নাতি। নাতির বয়স বারো বছর, তাই গুনতিতে ওকে অর্ধেক ধরলাম।
বললাম, তাতেও তো সাড়ে তিন হল। আরেকজন কে?
ওঃ। আরেকজন সুশীলা। সব সময়ের কাজের লোক।
মোহিতবাবুর স্ত্রী কি অসুস্থ? বেডরিডেন?
জগদীশদা দাঁড়িয়ে পড়লেন। অবাক হয়ে বললেন, তুমি কেমন করে জানলে?
দোতলার বারান্দায় মেলে রাখা জামাকাপড়গুলোর নেচার দেখে মনে হল।
বাব্বা! তোমার নজর তো খুব তীক্ষ্ণ। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। গত তিন বছর ধরে উনি প্যারালাইজড হয়ে পড়ে রয়েছেন। নড়াচড়া করতে পারেন না। কথা বলার ক্ষমতাও নেই। প্রায় জড় পদার্থের মতো পড়ে থাকেন।
সুশীলা তাহলে সাধারণ কাজের লোক নয়। মিসেস চ্যাটার্জীর নার্স, তাই তো?
হ্যাঁ। অন্যান্য কাজের জন্যে একগাদা ঠিকে লোক রয়েছে। রাঁধুনি, সুইপার, মালি, ড্রাইভার। তবে তারা কেউই এই বাড়িতে থাকে না। সুশীলা থাকে। ওকে থাকতেই হয়।
কথা বলতে বলতে আমি আর জগদীশদা গাড়িবারান্দার নীচে পৌঁছে গিয়েছিলাম। দু’ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠেই বিশাল সদর দরজা। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, তবে নক করার প্রয়োজন হল না। সদর দরজার কাছে পৌঁছতে গেলে একতলার একটা ঘরের সামনে দিয়ে আসতে হয়। সেই ঘরেরই জানলার পাশে, বিরাট এক সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপরে ঝুঁকে যে বৃদ্ধ মানুষটি কাগজপত্র দেখছিলেন, বলে দিতে হয় না যে তিনিই মোহিতলাল চ্যাটার্জী।
উনিও আমাদের আসতে দেখেছিলেন। নিজেই উঠে এসে দরজা খুলে দিলেন। বললেন, কী ব্যাপার জগদীশ? এমন অসময়ে? সঙ্গে এ কাকে নিয়ে এলে?
জগদীশদা বললেন, আপনার ইস্কুলের নতুন মাস্টারমশাই, স্যার। নাম উমাশঙ্কর চৌবে। জয়েন করতে এসেছেন। জানতেন না এখন স্কুল বন্ধ।
কথাটা শুনেই মোহিতবাবু আক্ষেপের ভঙ্গিতে দু’দিকে মাথা নেড়ে বললেন, ছি ছি ছি! আমারই ভুল হে জগদীশ। স্কুলের হেডক্লার্ক বাঁধা গতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার লিখে দিয়েছে—ইউ হ্যাভ টু রিপোর্ট ইমিডিয়েটলি, আর আমিও কিছু না ভেবেই সেই চিঠিতে সই করে দিয়েছি। আমাদেরই তো ওখানে লিখে দেওয়া উচিত ছিল, কাম অন অমুক ডেট। যাই হোক, এসো বাবা, ভেতরে এসো। তুমিও এসো জগদীশ।
এরপর যা হল সংক্ষেপে বলি। স্কুলের চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্যে যেখানে যা সই-টই করানোর সে মোহিতবাবুই আমাকে দিয়ে করিয়ে নিলেন। এমনকী তাঁর কথামতো স্কুলের দপ্তরীমশাই অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টার নিয়ে এসে আমাকে দিয়ে সই করিয়ে নিয়ে গেলেন। তারপর প্রশ্ন উঠল থাকব কোথায় এবং খাব কী? জগদীশদা আর মোহিতবাবুর কথাবার্তা থেকে বুঝলাম, গোটা জনকপুরে আমার মতো বাইরের লোকেদের থাকার মতো পরিচ্ছন্ন হোটেল কিংবা মেসবাড়ি একটিও নেই। অতএব মোহিতবাবু বলে দিলেন, তুমি আজ থেকে এই বাড়িতেই থাকবে, খাবে।
স্বাভাবিকভাবেই আমি ‘না না’ করে উঠলাম। মোহিতবাবু তাঁর সেই নায়কোচিত ভরাট গলায় বললেন, অত লজ্জা পাওয়ার কিছু হয়নি উমাশঙ্কর। তোমাকে আমি এমনি এমনি এই বাড়িতে অতিথি হতে বলছি না। তুমি আমার নাতিকে দু’বেলা পড়াবে। মানে, তুমি হবে ওর গৃহশিক্ষক, ঠিক আছে?
পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, উনি আমাকে সংকোচের হাত থেকে রেহাই দিতেই এই ব্যবস্থাটি করলেন। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। অন্য কিছু নয়, সারাদিন শিক্ষকতার চাকরির পরে নিজের পড়াশোনার জন্যে একটু নিরিবিলি জায়গা আর সময়, এটাই তখন আমার মাথায় ঘুরছিল।
আমার একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে জগদীশদা ফিরে গেলেন। অবশ্য মোহিতবাবু ওঁকেও বলছিলেন আমার সঙ্গেই বসে একটু ডাল-ভাত খেয়ে যেতে, কিন্তু উনি রাজি হলেন না। বললেন, না স্যার। একটা বাচ্চা ছেলের হাতে দোকান ছেড়ে দিয়ে এসেছি। আমার আর একটুও দেরি করলে চলবে না।
আমি ব্যাগটা চাটুজ্জেবাড়ির বৈঠকখানাতেই নামিয়ে রেখে জগদীশদাকে গেট অবধি এগিয়ে দিয়ে এলাম। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করলাম, আপনার সঙ্গে মোহিতবাবুর এমন হৃদ্যতা তৈরি হল কেমন করে?
উনি বললেন, ওষুধের দোকানের মালিকের সঙ্গে রুগির বাড়ির যেভাবে হৃদ্যতা তৈরি হয়। গত তিন বছরে কতবার যে এই বাড়িতে ওষুধ পৌঁছে দিতে এসেছি তার ঠিক নেই। তাছাড়া বার দুয়েক ম্যাডামের এমন বাড়াবাড়ি অবস্থা হয়েছে যে, আমাকেই এখানে এসে অক্সিজেন, ইন্ট্রাভেনাস ড্রিপ এইসবের ব্যবস্থা করে যেতে হয়েছে। রাতে থাকতেও হয়েছিল। এইভাবেই আর কী!
তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, আরেকটা কথা কী জানো তো? যত বড় মানুষই হন, তিনি একটু কথা বলার সঙ্গী খোঁজেন। মোহিত চ্যাটার্জী যেমন কালচার্ড লোক, এই জনকপুরে ওঁর কথা বলার সঙ্গী কে আছে বলো তো। সেই জন্যে দরকার না থাকলেও উনি আমাকে মাঝে মাঝে ডেকে পাঠান। আমি নিজে থেকেও কখনো কখনো চলে আসি। উনি পুরোনো দিনের গল্প করেন। কলকাতা থেকে ভিপিতে প্রতিমাসেই প্রচুর বই আর পত্রপত্রিকা আনান। সেগুলো আমাকে পড়তে দেন। পড়া হয়ে গেলে আমার সঙ্গে তাই নিয়ে আলোচনা করেন।
এই যে, এক কথাতেই তোমাকে নিজের বাড়িতে থাকবার ব্যবস্থা করে দিলেন, এর পেছনে সেটাও একটা কারণ। তোমার বুদ্ধিদীপ্ত চোখমুখ দেখেই উনি বুঝেছেন তোমার সঙ্গে কথা বলে আরাম পাওয়া যাবে। মিলিয়ে নিও আমার কথা।
সত্যি বলতে কী, জগদীশদার মুখে নিজের প্রশংসা শুনে যত না খুশি হলাম, উদ্বিগ্ন হলাম তার চেয়ে বেশি। বুড়োমানুষরা যে কী পরিমাণে বকবক করতে পারে, তার কিছু পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছিল। ইনিও যদি সেরকম হন, তাহলে আমার চাকরির প্রিপারেশন নেওয়ার প্ল্যান নয়ছয় হয়ে যাবে। তবে সেরকম কিছু হয়নি। তার একটা কারণ, মোহিতলাল চাটুজ্জে বেকার ছিলেন না। তাঁর বৈষয়িক কাজকর্ম ছিল প্রচুর। উপরন্তু স্কুল পরিচালনার কাজ। আমার সঙ্গে গল্প করতে ভালোবাসতেন ঠিকই, তবে সেটা কখনোই মাত্রাছাড়া নয়। আর সেইসব গল্পগাছায় ওঁর চেয়ে বেশি আমিই উপকৃত হতাম।
আর দ্বিতীয় কারণ...সেটা তো এককথায় বলা যাবে না। আমি জনকপুরে পা রাখার কিছুদিন পর থেকেই মোহিতলাল চ্যাটার্জীর বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে যে নারকীয় ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করেছিল, তাদের কথাই তো তোমাকে বলতে বসেছি, বিনায়ক। তখন থেকে চ্যাটার্জী ম্যানসনে হালকা মেজাজে সাহিত্য আলোচনা করার মতো সময় কিংবা পরিবেশ কিছুই আর ছিল না।
মোহিতবাবুর ডাকে একজন বেশ স্নেহময়ী পিসিমা গোছের মহিলা এসে আমাকে বললেন, চলো ভাই, চান-খাওয়া সেরে নেবে চলো। বেলা হয়েছে।
পরে দেখেছিলাম বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে তাঁকে ও-বাড়ির সবাই মিনুপিসি বলে ডাকে। তিনি নাকি পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই বাড়িতে রাঁধুনির কাজ করছেন। আমিও তাঁকে মিনুপিসি বলেই ডাকতাম।
মিনুপিসি আমাকে রাস্তা দেখিয়ে একতলারই পিছনদিকের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। আমি দখল নেওয়ার আগে হয়তো ঘরটা গেস্ট রুম হিসেবেই ব্যবহৃত হতো, কারণ, দালানের দিকের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলেই বাকি বাড়িটার সঙ্গে ঘরটার আর কোনো সম্পর্ক থাকত না।
ঘরের দ্বিতীয় দরজাটা ছিল বাড়ির পেছনের বাগানের দিকে। যতদিন ছিলাম, আমি ওই বাগানের দিকের দরজা দিয়েই যাতায়াত করতাম। শুধু বেরোবার সময় দরজাটায় একটা তালা লাগিয়ে বেরোতাম।
ঘরের লাগোয়া বাথরুম। সারাদিন ধুলো-ধোঁয়া-গরমে জেরবার হবার পরে কলের স্ফটিকস্বচ্ছ ঠান্ডা জলে স্নান করে শরীরটা জুড়িয়ে গেল। জনকপুরে পঞ্চায়েতের জলের সাপ্লাই বলে কিছু ছিল না। চ্যাটার্জী ম্যানসনের জল নাকি আসত পেছনের এক পরিত্যক্ত কয়লা-খাদানের জমা জল থেকে। মোহিতলাল চ্যাটার্জী নিজের খরচে বাড়ি অবধি পাইপলাইন আর ছাদের ট্যাঙ্কে জল তোলার পাম্প বসিয়েছিলেন।
স্নান শেষ হওয়া মাত্রই সেই মিনুপিসিই আবার আমাকে নিয়ে গেলেন রান্নাঘরের লাগোয়া একটা ঘরে। মিনুপিসি সেখানে ইতিমধ্যেই মেঝেতে আসন পেতে আমার ভাত বেড়ে দিয়েছিলেন।
পেটে ভাত পড়তেই চোখদুটো ঘুমে জড়িয়ে এল। স্বাভাবিক। রাত থাকতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাওড়া স্টেশনের দিকে রওনা হয়েছিলাম।
নিজের ঘরের দিকে যাবার আগে একবার মোহিতবাবুর কাজের ঘরের দরজা দিয়ে উঁকি দিলাম। ইচ্ছে ছিল ওঁকে একটু কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যাব। কিন্তু দেখলাম সে ঘরের দরজায় বাইরে থেকে হুড়কো টানা। হয়তো বেরিয়েছিলেন। কিংবা ওপরের ঘরে গিয়েছিলেন বিশ্রাম নিতে।
ততক্ষণে একটা জিনিস বুঝতে পেরেছিলাম। বাড়ির একতলায় বৈঠকখানা, মোহিতবাবুর অফিসঘর, রান্নাঘর এবং আরো কয়েকটা তালাবন্ধ ঘরই শুধু রয়েছে। অর্থাৎ চ্যাটার্জী পরিবারের মানুষদের থাকা-খাওয়া সবই দোতলায়।
সেদিনই সন্ধেবেলায় মোহিতবাবুর পরিবারের বাকি সদস্যদের সঙ্গে আলাপ হল। মোহিতবাবুই আলাপ করিয়ে দিলেন। তিনি কখন ফিরেছিলেন জানি না। আমি তখন আমার ঘরটা সবে নিজের মতো করে একটু গুছিয়ে রাখছি...মানে, জামাকাপড়গুলো আলনায়, বইখাতাগুলো টেবিলে...এমন সময় মিনুপিসি এসে বললেন, দাদাভাই। মেসোমশাই তোমাকে ওপরে ডাকছেন। আমার সঙ্গে এসো।
একতলার দালানের মাঝামাঝি অংশ থেকে চওড়া সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। তার মেহগনি কাঠের রেলিং আরশোলার পিঠের মতো চকচক করছে। সিঁড়ির চাতালে ব্রোঞ্জের প্রমাণ সাইজের নটরাজ মূর্তি। পেতলের টবে বাহারি পাতার গাছ। ঠিক মনে হচ্ছিল পুরোনো দিনের বাংলা সিনেমার কোনো সেটের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। এক্ষুনি যেন কমল মিত্র মশাই ড্রেসিং-গাউন গায়ে, দাঁতে পাইপ কামড়ে দোতলা থেকে ওই সিঁড়ির বাঁকে এসে দাঁড়াবেন।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে দেখলাম একতলার মতোই লম্বা বারান্দা। তার একদিকে সারি সারি ঘর। অন্যদিকে ঢালাই লোহার বাহারি রেলিং। ঝুঁকে পড়লে নীচের উঠোন দেখা যাচ্ছে। সামনে তাকালে দূরে জনকপুরের বাজার আর বাসস্ট্যান্ড।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই সামনে যে ঘরটা পড়ে, সেই ঘরের দরজার মুখোমুখি একটা আরাম কেদারায় বসে বই পড়ছিলেন মোহিতবাবু। আমাকে দেখে বইটা ভাঁজ করে সামনের টেবিলের ওপরে রেখে বললেন, এসো উমাশঙ্কর!
ঘরটায় ঢোকার পর বেশ কিছুক্ষণ শুধু এদিক-ওদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতেই আমার সময় কেটে গেল। দেখবার মতোই ঘর আর তার আসবাবপত্র। একদিকে মেহগনি কাঠের একটা বিশাল পালঙ্ক। অন্যদিকে অপূর্ব এক কাঠের আলমারি, যার সারা গায়ে আঙুরলতার মতো কারুকার্য আর দু’পাল্লায় দুটো প্রমাণ সাইজের বেলজিয়ান গ্লাসের আয়না। তাছাড়াও এদিকে-ওদিকে ছড়ানো ছিটোনো অনেকগুলো কর্নার টেবিল আর বেডসাইড টেবিল। আর তাদের প্রত্যেকটার ওপরেই নানারকমের বিদেশি শো-পিস—মার্বেল আর ব্রোঞ্জের ছোট ছোট মূর্তি, পোর্সেলিনের ফ্লাওয়ার ভাস, টেবিল ক্লক ইত্যাদি।
মোহিতবাবুর নির্দেশে আমি একটা হালকা গদি আঁটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। উনি বললেন, তুমি তো আজ থেকে আমাদের বাড়ির লোক। তাই বাড়ির অন্য মানুষগুলোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব বলে তোমায় ডাকলাম। মিনুপিসির সঙ্গে তো আলাপ হয়ে গেছে আশা করি। উনিও আমাদের ফ্যামিলি মেম্বার।
আমি ঘাড় হেলালাম।
উনি তখন গলা তুলে হাঁক দিলেন, ঝন্টু! ঝন্টু! একবার এদিকে আসতে পারবে?
খানিক দূর থেকে উত্তর ভেসে এল, আসছি বাবা।
একটু বাদেই বছর চল্লিশের যে ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন, তাঁর সঙ্গে চড়াইপাখির খুব মিল। ভদ্রলোকের শরীরটা ছোট এবং দুর্বল ঠিকই তবে, মিলটা শরীরের চেয়েও বেশি ছিল মুখে। কাঁচাপাকা কদমছাঁট চুলে ঠাসা নিখুঁত গোল একটা মাথা, পাখির ঠোঁটের মতো সামনের দিকে ঠেলে বেরোনো নাক। আর ভীষণ চঞ্চল দুটো চোখের তারার মধ্যে অবিকল একটা চড়াইপাখির ভাব ছিল।
সেই জন্যেই মোহিতবাবু যখন তাঁর দিকে ইশারা করে বললেন, আমার পুত্র মনোজিৎ, তখন আমি একটু অবাক হলাম। আমি ভেবেছিলাম মোহিতবাবুর ছেলেও তাঁর মতোই লম্বা-চওড়া হবেন। অবশ্য আমার এরকম ভাবনার পেছনে যুক্তি ছিল না।
মোহিতবাবু ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, বুঝলে ঝন্টু, উমাশঙ্কর আমাদের স্কুলে আজ টিচার হিসেবে জয়েন করল। ও খুব ভালো ছাত্র। ওকে বলেছি আমাদের বাড়িতেই থাকতে আর বুলানকে একটু পড়াটড়াগুলো দেখিয়ে দিতে। ভালো হবে না?
ঝন্টুবাবুর নজর কোনো একজায়গায় স্থির হচ্ছিল না। কখনো দেয়ালের দিকে তাকাচ্ছেন, কখনো ছাদের দিকে তাকাচ্ছেন আবার কখনো মেঝের দিকে। মোহিতবাবু বা আমার কারওরই মুখের দিকে তাকাতে পারছেন না। মোহিতবাবুর প্রশ্নের উত্তরে কোনোরকমে সেই সরু গলায় বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। ভালো হবে, খুব ভালো হবে।
তারপরেই ‘আচ্ছা, আমি আসি’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মোহিতবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ওর শরীরটা ভালো নেই। আমি মনে মনে বললাম, শরীর নয়, মন। মনোজিৎ চ্যাটার্জীর মনের অসুখ আছে।
ঘরের যেদিকে বড় পালঙ্কটা রাখা ছিল, তার উলটোদিকের দেয়ালে একটা দরজা ছিল। দরজার পাল্লাদুটো খোলা, কিন্তু তার ওপরে একটা মোটা পর্দা ঝুলছিল। উনি ওই দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ওই ঘরে আমার স্ত্রী শুয়ে আছেন, বন্দনা। গত তিন বছর ধরে এইভাবেই শুয়ে আছেন...সেরিব্রাল স্ট্রোক। হতাশভঙ্গিতে হাতদুটো একবার ওলটালেন। তারপর বললেন, কথা বলতে পারেন না। বোধশক্তিও নেই। তবু যাও, একবার দেখে এসো। সুশীলা!
শেষের ডাকটা শুনে পর্দা সরিয়ে একজন মহিলা উঁকি মারলেন। শক্তসমর্থ গড়ন, শ্যামলা গায়ের রঙ।
মোহিতবাবু বললেন, এই দাদাবাবু আজ থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকবেন, শুনেছ বোধহয়। যাও এঁকে একটু বন্দনার সঙ্গে দেখা করিয়ে আনো।
সুশীলার পেছন পেছন পাশের ঘরে ঢুকলাম। মোহিতবাবুর ঘরের সঙ্গে এই ঘরের এতটাই তফাত যে, চোখে ধাঁধা লেগে যায়। ওই ঘরে যেমন ফার্নিচার আর ঘর সাজানোর জিনিসের বাহুল্য, এই ঘর তেমনই নিরাভরণ...শূন্য। একটা কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছিল। সেই আলোয় দেখলাম, ঘরের মাঝখানে একটা স্টিলের হসপিটাল-কট। ঠিক হাসপাতালে যেমন দেখা যায়—চারটে লোহার পাইপের পায়া। তাদের ওপরে স্টিলফ্রেমের খাট। মাথার দিকটা ইচ্ছেমতো ওঠানো নামানো যায়। সাদা চাদরে মোড়া গদি।
খাটের ওপরে সাদা চাদরে আবৃত একটা নিথর শরীর। মুখটুকু ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবে মনে হল মিসেস বন্দনা চ্যাটার্জীর চেহারাটা বিশাল। পেটটা পাহাড়ের মতো ওপরদিকে ঠেলে উঠেছিল। এই ধরনের শয্যাশায়ী রুগিদের ক্ষেত্রে সেটা যে অস্বাভাবিক নয়, তা জানতাম। কোনো নড়াচড়া না থাকার জন্যে শরীরে চর্বি জমে যায়।
চাদরের বাইরে শুধু বন্দনাদেবীর মুখটুকু বেরিয়ে ছিল। দু’চোখ বোজা। সুন্দর করে আঁচড়ানো সাদা চুলে দুটো বিনুনি। খাটের পাশে একটা স্টিলেরই ছোট মিটসেফের মতো জিনিস, এটাও সরকারি হাসপাতালে দেখা যায়। তার ওপরে অনেকগুলো ওষুধের শিশি। ঘরের অন্যদিকে একটা সরু কাঠের চৌকি আর চেয়ার। একটা আলনাও ছিল। বোঝাই যাচ্ছিল ওগুলো সুশীলার জন্যে।
আমি ফিসফিস করে সুশীলাকে জিগ্যেস করলাম, উনি কি সবসময়েই ঘুমোন?
সুশীলা উত্তর দিল, না। কখনো কখনো চোখদুটো খোলেন। মুখে খুব আস্তে কিছু আওয়াজ করেন।
ঘরটায় আরেকটা দরজা ছিল—যে বারান্দার কথা একটু আগে বললাম, সেই বারান্দার দিকে। হঠাৎ দেখি সেই দরজার পর্দা সরিয়ে একটা বাচ্চা ছেলে উঁকি মারছে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সুট করে মুখটা সরে গেল। আমি হেসে ফেললাম। সুশীলাকে জিগ্যেস করলাম, বুলানবাবু?
হ্যাঁ। ও উত্তর দিল।
আচ্ছা, আমি ও ঘরে গেলাম। এই বলে আমি আবার মাঝখানের দরজা দিয়ে মোহিতবাবুর ঘরে ফিরে এলাম এবং দেখলাম ইতিমধ্যে বুলান দালানের দিকের দরজা দিয়ে সেই ঘরে ঢুকে পড়েছে এবং ওর দাদুর চেয়ারের পেছনদিকটা আঁকড়ে ধরে লজ্জা লজ্জা মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি আবার আগের চেয়ারটায় বসে ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। বললাম, তোমার ভালো নাম কী, বুলান?
শ্রী মধুময় চট্টোপাধ্যায়। ও উত্তর দিল।
বাঃ, খুব সুন্দর নাম তো! কোন ক্লাসে পড়ো?
ক্লাস সিক্স।
এখানে বলে রাখি, বুলান কিন্তু জনকপুরের কাশীনাথ বিদ্যালয়ে পড়ত না। ও পড়াশোনা করত আসানসোলের কী যেন এক মিশনারি স্কুলে। নামটা এখন মনে পড়ছে না। বাড়ির গাড়ি ওকে সকালে স্কুলে দিয়ে আসত। আবার বিকেলে ছুটির পরে নিয়ে আসত।
মনোজিৎবাবু আর তাঁর মা, পরপর দু’জন অসুস্থ মানুষকে দেখার পরে বারো বছরের সেই সুন্দর বালকটিকে দেখে মনে হল যেন একঝলক তাজা বাতাসের ছোঁয়া পেলাম। ওর সঙ্গে আমার খুব তাড়াতাড়ি ভাব হয়ে গেল। এতটাই যে ও আমাকে ‘ছোড়দা, তুমি’ বলে ডাকতে শুরু করল। ছোড়দা কেন জানতে চেয়েছিলাম। ও বলেছিল যেহেতু মোহিতবাবুকে ও ‘দাদাই’ বলে ডাকে, তাই তিনি হলেন ওর বড়দা আর আমি ছোড়দা।
সেদিনই ও আমাকে হাত ধরে টানতে টানতে ওর ঘরে নিয়ে গেল। ঘরটা ও-বাড়ির ছাদের ঘর। যাকে বলে চিলেঘর।
চিলেঘর হলেও মোটেই অযত্নের ঘর নয়। বোঝাই যায় মোহিতবাবু নাতির জন্যে নতুন করে ঘরটা সাজিয়ে দিয়েছেন। ছোটদের ঘরের মতোই গোলাপি আর লেবু-সবুজ রঙে রাঙানো কাঠের ছোট ছোট চেয়ার টেবিল, বইয়ের ব়্যাক। একদিকে রেলের বাঙ্কের মতো দেয়ালে ঝোলানো শোবার খাট, যেটাকে ইচ্ছে করলেই দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখা যায়।
প্রচুর দেশি-বিদেশি গল্পের বই ছিল বুলানের। টেনিস ব়্যাকেট ছিল, নানান রকমের ইন্ডোর গেমস ছিল। এমনকী সেই উনিশশো ছিয়াত্তর সালে যা ভীষণ দুর্লভ ছিল, সেরকম ক্যাসেট প্লেয়ারও আমি প্রথম দেখি ওর ঘরেই।
হতে পারে ঘরটা খুব সুন্দর। কিন্তু তবু একটা বারো বছরের ছেলে একা একা ওই ছাদের ঘরে বাস করছে, এটা ঠিক মেনে নিতে পারছিলাম না। প্রশ্নটা সরাসরি ওকে করেই ফেললাম। বললাম, তোমাদের একতলা-দোতলায় তো অনেক ঘর বুলান। তুমি এই ছাদের ঘরে থাকো কেন?
ও বেশ বয়স্ক মানুষের মতো গম্ভীর মুখে উত্তর দিল, বাবা খুব ডিস্টার্ব করে। যখন-তখন ঘরে ঢুকে আসে। চিৎকার করে। তাই আমি এখানে চলে এসেছি।
ভয় করে না? প্রশ্ন করলাম আমি।
উঁহু। ভয় কীসের? ভূতের? যারা মরে যায় তারা মোটেই ভূত হয়ে যায় না। আমার মাও তো মারা গেছে। মা কি এখন মানুষকে ভয় দেখাতে আসে?
আমি ওর কথার কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। চুপ করে রইলাম।
ও একটু থেমে, হাসিহাসি মুখ করে বলল, মাঝে মাঝে ভাবি, ছাদে যদি একদিন একটা স্পেসশিপ নেমে আসে খুব ভালো হয়। দাদাই বলে, সন্ধেবেলায় ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে বসতে। আমি বন্ধ করি না। এই চেয়ারটায় বসে বসে দেখি, আকাশের তারাগুলো যেন ওই নারকোল গাছটার ওপরের পাতাগুলোকে ছুঁয়ে ফেলেছে। একদিন ওই তারায় তারায় পা ফেলে যদি অ্যাঙ-এর মতো আমারও একজন বন্ধু এখানে চলে আসে, খুব ভালো হয়।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, তুমি বঙ্কুবাবুর বন্ধু পড়েছ?
পড়েছি, বললাম আমি।
আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। একটা কমবয়সি ছেলে এমন নিঃসঙ্গতায় ভুগছে, ভাবতে ভালো লাগছিল না। তখনই ঠিক করলাম, যতটা পারব বুলানকে সঙ্গ দেব। শুধু স্কুলের পড়া পড়ানো নয়, আরো একটু বেশি কিছু।
আমি জনকপুরে পৌঁছনোর পনেরো দিন বাদেই স্কুলের ছুটি শেষ হল। আমিও শিক্ষকতা শুরু করলাম। ঢুকেছিলাম বায়োলজির শিক্ষক হিসেবেই, কিন্তু মফসসলের ছোট স্কুলে যা হয়—বায়োলজি ছাড়া অন্যান্য সাবজেক্টের ক্লাসও নিতে হতো। অঙ্ক, ইংরিজি, ভূগোল, ইতিহাস... যখন যা দরকার। কিন্তু আমার খারাপ লাগত না।
বিকেলের মধ্যে আমার কাজ শেষ হয়ে যেত। চ্যাটার্জী ম্যানসনে ফিরে আসতাম। এসে দেখতাম, বুলান ইতিমধ্যেই স্কুল থেকে ফিরে, হাত মুখ ধুয়ে রেডি। ওর সঙ্গে আমাকে বেড়াতে যেতে হতো।
আগেই বলেছি, বুলানের কোনো সঙ্গী ছিল না। তার একটা কারণ, ও জনকপুরের স্কুলে পড়ত না। আর দ্বিতীয় কারণ, জনকপুরের বাকি ছেলেদের সঙ্গে ওদের সোশাল স্ট্যাটাসের পার্থক্য। চারপাশের গরিবগুরবো ছেলেমেয়েরা বুলানের কাছে ঘেঁষতেই ভয় পেত। যদিও আমার মনে হতো ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না। ও খুব মিষ্টি স্বভাবের ছেলে ছিল। একটা বারো বছরের ছেলের মনে তো অহংকার পুরোপুরি বাসা বাঁধতে পারে না।
কোথায় যেতাম আমরা বেড়াতে?
সেরকম জায়গার অভাব ছিল না। সেই যে মোরামের রাস্তাটার কথা বলেছিলাম, যার শেষে একটা কয়লাখনির চানক দেখা যেত, সেই রাস্তা ধরে মিনিট দশেক হাঁটলেই একটা ভারি সুন্দর জায়গায় পৌঁছে যেতাম আমরা। চারদিকের মরুভূমির মধ্যে জায়গাটা যেন একটা ওয়েসিস। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই ঢুকে পড়তাম একটা ঘন জঙ্গলের মধ্যে। চারিদিকে বাবলা, বেল, নিম, অশ্বত্থ আর আশশ্যাওড়ার ঝুপসি ছায়া। পায়ের নীচে ছোট বড় পাথর। পাথরের ওপর পাথর সাজিয়ে প্রকৃতিদেবীই যেন ওখানে একটা ঝুলনের পাহাড় বানিয়ে রেখেছিলেন।
প্রথমবার জায়গাটা দেখেই অবাক হয়ে ভেবেছিলাম, হঠাৎ এখানটায় এত গাছপালার ভিড় কেন? আর একটু এগোতেই অবশ্য উত্তরটা পেয়ে গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম, ওই ছোট্ট পাথুরে টিলাটার গায়ের একটা ফাটল দিয়ে বেশ তোড়ে জল বেরিয়ে আসছে। স্বচ্ছ, ঠান্ডা জল। সেই জলধারা একটা ঝোরার রূপ ধরে বনের ভেতর দিয়ে কোথায় চলে গেছে, কে জানে। ওই সরু ঝোরাটার কল্যাণেই ওখানে অমন গাছপালার বাড়বাড়ন্ত।
সঙ্গে সঙ্গেই যে প্রশ্নটা মনে জেগেছিল, সেটা হল, এমন সুন্দর জায়গাটায় এখনো মানুষের থাবা পড়েনি কেন? আদিকাল থেকেই তো মানুষ জলের ধারে বসতি পেতেছে। এরকম খরার দেশে কেন এই সুন্দর স্রোতস্বিনীকে ওরা রেহাই দিয়েছে?
প্রথম দিন ওখানে পা রেখেই নিজের মনে প্রশ্নটা করে ফেলেছিলাম। এখানে কেউ থাকে না কেন?
বুলান আমার হাতের মুঠোটা ধরে হাঁটছিল। ও শুনতে পেয়ে বলল, কেমন করে থাকবে? এটা তো শ্মশান। শ্মশানে কেউ থাকে?
শুনে চমকে উঠলাম। বললাম, তাই নাকি? বুঝতে পারিনি তো!
বুলান আমার হাতে টান দিয়ে বলল, চলো, দেখাচ্ছি।
তারপরে সেই ছোট-বড় বোল্ডারের পাশ কাটিয়ে ও আমাকে নিয়ে তু্লল একটা পায়ে চলা রাস্তায়। চ্যাটার্জী ম্যানসন থেকে যে মোরামের রাস্তা ধরে বুলান আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিল, এটা সেই রাস্তাটা নয়। এটা এসেছে জনকপুরের ঘিঞ্জি এলাকার দিক থেকে। বুঝলাম, শহরের লোক মৃতদেহ নিয়ে এই শর্টকাট রাস্তা ধরেই শ্মশানে আসে।
ওই রাস্তাটা ধরে আর একটু এগোতেই আমরা সেদিন পৌঁছে গিয়েছিলাম এমন একটা জায়গায় যেখানে ঝোরাটা হঠাৎই অনেকখানি চওড়া আর গভীর হয়ে একটা কুণ্ডের রূপ নিয়েছে। কুণ্ডের পাড়ের পাথুরে চাতালের ওপর শবদাহের চিহ্ন দেখলাম। ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা পোড়া কাঠ। খাটিয়ার বাঁশ। ছেঁড়াখোঁড়া তোষক বালিশ।
গ্রামের শ্মশান এরকমই হয়।
বুলান বলল, এই বনটার নাম কী জানো? সাধু চাঁড়ালের বন। খুব সুন্দর না জায়গাটা? আমি মাঝেমাঝে এখানে এসে বসে থাকি।
বুলান ছেলেটা যে বেশ অন্যরকম, সেটা ওই ক’দিনে বুঝে গিয়েছিলাম। একেকটা বাচ্চা থাকে না, যারা জেগে জেগেও স্বপ্ন দেখে, ও ছিল ঠিক সেইরকম। তবু শ্মশানে এসে বসে থাকে, এটা শুনে ভীষণ একটা ধাক্কা খেলাম। বললাম, ভয় করে না?
ও কুণ্ডের পাথুরে তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ভয় করবে কেন? এখানেই তো শেষবারের মতো মাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম। এখানে এলে মা আমার পাশে এসে বসে। আমি মায়ের সঙ্গে কথা বলি।
স্যার! আপনি মধুময়দের বাড়িতে থাকেন? প্রশ্নটা করল ক্লাস সিক্সের একটা ছেলে।
আমি ছিলাম সিক্সের ক্লাস টিচার। আর যেহেতু ততদিনে কাশীনাথ স্কুলে মাস তিনেক পড়িয়ে ফেলেছি, তাই ওই ক্লাসের চল্লিশটা ছেলের মধ্যে প্রায় সবারই নাম মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। এই ছেলেটার নাম বিজন মুর্মু। রোগা, শ্যামলা গায়ের রঙ। মাথার ঘন চুলে এত তেল মাখে যে, মনে হয় জুলপি বেয়ে তেল যেন গড়িয়ে পড়ছে।
একটা ক্লাসে নানান ধরনের ছেলে থাকে। এই বিজন ছেলেটা খুব শান্ত আর ভিতু ভিতু। মন দিয়ে পড়াশোনা করবার চেষ্টা করে। তাই ওকে আমি ভালোবাসতাম। ও নিশ্চয়ই ভালোবাসাটা টের পেত, তাই ক্লাসের পরেও অনেক সময় আমার পায়ে পায়ে ঘুরত, এটা-ওটা জানতে চাইত।
সেদিনও আমি ফার্স্ট পিরিয়ডের পরে যখন করিডর ধরে টিচার্স রুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছি, তখন বিজন পেছন থেকে দৌড়তে দৌড়তে এসে আমাকে ধরল। তারপর ওই প্রশ্নটা করল, স্যার! আপনি মধুময়দের বাড়িতে থাকেন?
মধুময় যে কে, সেটা মনে পড়তে দু’সেকেন্ড সময় লাগল। তারপর বুঝলাম ও মোহিতলাল চ্যাটার্জীর নাতি, মানে আমাদের বুলানের কথা বলছে। বুলানই তো বলেছিল, ওর ভালো নাম মধুময়।
বললাম, হ্যাঁ, ওদের বাড়িতেই থাকি তো। কেন রে?
বিজন মুর্মু চট করে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। দরকার ছিল না, কারণ, সেই মুহূর্তে আমাদের আশেপাশে কেউই ছিল না। তবু চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ও আমার আরেকটু কাছে সরে এল। তারপর ফিসফিস করে বলল, আপনার ভয় করে না? আপনি কিছু দেখেননি?
কী দেখব? কীসের ভয়?
না, সবাই বলে যে, মধুময়ের মা নাকি ওর কাছেকাছেই থাকে। ওকে পাহারা দেয়। অনেকে নাকি দেখেছে, মধুময় যখন রাতে ওদের ছাদে ঘুরে বেড়ায় তখন ওর পেছনে একজন মেয়েছেলে ছায়ার মতো ঘোরে।
এই অবধি শুনেই আমি বিজনকে এক ধমক লাগালাম। বললাম, পালা এখান থেকে! যতসব আজগুবি কথা। আর শোন, কথার মধ্যে মেয়েছেলে শব্দটা আর কখনও ব্যবহার করবি না। মহিলা বলবি, কেমন?
বিজন বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় হেলিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, আপনি কিন্তু সাবধানে থাকবেন স্যার। ভুলেও কখনও মধুময়কে মারা বকা করবেন না।
কী হবে তাহলে? মজা করেই জিগ্যেস করলাম।
ওর মা আপনার ঘাড় মটকে দেবে। জানেন, গতবছর কী হয়েছিল?
কী হয়েছিল?
পুরো দুটো দিন মধুময়কে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওর দাদু, মানে আমাদের প্রিন্সিপাল স্যার, থানা-পুলিশ সবাইকে কাজে লাগিয়েছিল...
লাগিয়েছিল নয়, লাগিয়েছিলেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ। লাগিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও ওকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপরে কোথায় পাওয়া গেল জানেন?
কোথায়?
সাধু চাঁড়ালের বনে। কারা যেন মড়া পোড়াতে গিয়েছিল। গিয়ে দ্যাখে, একটা গাছের নীচে শুয়ে ও ঘুমোচ্ছে।
বিজনের কথাগুলোকে আর হালকাভাবে নিতে পারছিলাম না। ওকে নিয়ে স্কুল-বাড়িটার পেছনদিকে একটা শিশু গাছের নীচে বসলাম। তারপর জিগ্যেস করলাম, বুলানকে তোরা জিগ্যেস করিসনি, দু’দিন ধরে কোথায় ছিল, কী করেছিল?
বিজন বলল, আমরা কেমন করে জিগ্যেস করব? আমরা কি ওদের বাড়ির গেট পেরোতে পারি? তবে পুলিশ জিগ্যেস করেছিল। ও বলেছিল, কিছু মনে নেই। ও নাকি দু’দিন ধরে খালি ঘুমিয়েছিল। আর ঘুম ঘুম চোখেই দেখেছিল, একটা মেয়েছেলে...না মহিলা...ওকে জল খাওয়াচ্ছে, খাবার খাওয়াচ্ছে।
তারপর একটু থেমে বিজন আবার বলল, তাহলে বুঝতে পারছেন তো স্যার, ও কেমন ভূতে-পাওয়া ছেলে? সেই জন্যেই বলছি, ওকে মারা-বকা করবেন না।
আচ্ছা বেশ, করব না, তুই এখন ক্লাসে যা। এই বলে আমি টিচার্স-রুমে গিয়ে ঢুকলাম। সেকেন্ড পিরিয়ডটা আমার অফ ছিল। হিন্দির শিক্ষক রতনলাল মিশ্র স্যারও দেখি টিচার্স-রুমের একদিকে, মুখের সামনে একটা খবরের কাগজ খুলে ঝিমোচ্ছেন। আমি ওঁর পাশে গিয়ে বসলাম। উনি কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের ওপরে নামিয়ে রেখে বললেন, কী চৌবেসাহেব, কী খবর?
সিনিয়র মাস্টারমশাইয়েরা সকলেই আমাকে স্নেহ করতেন। বয়সে তো ওঁদের হাঁটুর বয়সি ছিলাম, সেই জন্যেই হয়তো। উনি আমাকে আদর করেই ‘চৌবেসাহেব’ বলে ডাকতেন। না হলে একটা তেইশ বছরের ছেলেকে ‘সাহেব’ বলার আর কী কারণ থাকতে পারে?
আমি বিশেষ ভূমিকা-টুমিকা না করেই ওঁকে জিগ্যেস করলাম, গতবছর প্রিন্সিপাল-সাহেবের নাতি হারিয়ে গিয়েছিল? তারপর আবার দু’দিন বাদে নিজে থেকেই ফিরে এসেছিল? এগজ্যাক্টলি কী ঘটেছিল বলতে পারবেন?
উনি একটা হাই তুলে বললেন, ওই তো, তুমি যা বললে, তাই।
বললাম, এ তো সাংঘাতিক ঘটনা! থানা-পুলিশ হয়নি? তারা কী বলেছিল?
থানা-পুলিশ আবার কী বলবে? বাড়ির লোকেরাই যখন বলছেন ভৌতিক ঘটনা, তখন থানার বড়সাহেবের কোন দায়টা পড়েছে আগ বাড়িয়ে কিছু বলার? নাতিকে ফিরে পাওয়ার পর মোহিতবাবু যখন ঘটা করে সত্যনারায়ণের পুজো দিলেন, তখন বড়বাবুও ভোগ খেতে এসেছিলেন। আমরা দু’জন পাশাপাশিই বসেছিলাম। উনি আমাকে বললেন, মোহিতলাল চ্যাটার্জী বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি যে ভৌতিক ঘটনাকে ভৌতিক ঘটনা বলে চিনতে পেরেছেন, এতেই আমরা খুশি।
আর আপনি? আমি জিগ্যেস করলাম।
রতনলালবাবু ভাঁজ করে রাখা কাগজটা আবার মুখের সামনে খুলে ধরে বললেন, আমিও খুশি। একটু বাদে বললেন, তুমিও এইটি জেনেই খুশি থাকো চৌবেসাহেব। ওই বাড়িতেই থাকছ, খাচ্ছ। কাজেই বেশি কৌতূহল দেখাতে যেও না।
কৌতূহল দেখাতে যেও না বললেই কি আর কৌতূহল চেপে রাখা যায়? তাই সেদিনই রাতের দিকে বুলানকে পাকড়াও করলাম। সন্ধেবেলায় ও যথারীতি আমার কাছে পড়তে বসেছিল। তখন ইচ্ছে করেই কিছু বলিনি। জানতাম, রাত দশটা নাগাদ ও ডিনার শেষ করে ছাদের ঘরে শুতে যায়। তখনই আমিও ওর সঙ্গে ছাদে উঠলাম।
এখনও মনে আছে, রাতটা ছিল মেঘলা। সন্ধেবেলায় একচোট কালবৈশাখীর ঝড়বৃষ্টি হয়ে গেছে। তারই রেশ থেকে গিয়েছিল। পশ্চিমদিক থেকে বেশ ঠান্ডা বাতাস বইছিল। দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছিল গায়ে। বিদ্যুৎও চমকাচ্ছিল। তারই মধ্যে বুলান
ছাদের পাঁচিলে কনুইদুটো ভাঁজ করে রেখে অন্ধকার মাঠের দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল।
আমাকে দেখে ও চমকাল না। আমি বললাম, ঠান্ডা হাওয়াটার মধ্যে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকো না, বুলান। ঘরে চলো।
চলো। বিনা বাক্যব্যয়ে ও আমাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।
মুখোমুখি দুটো চেয়ারে দু’জনে বসলাম। তারপর ওকে বললাম, আমি জানতাম না, তুমি একবার দু’দিনের জন্যে হারিয়ে গিয়েছিলে। আজকেই জানলাম। এর পেছনের গল্পটা আমাকে একটু বলবে?
বুলান একটু থেমে থেমে বলে চলল, সেদিন ছিল রবিবার, তাই আমার স্কুল ছুটি ছিল। আমি প্রথমে স্কুলের মাঠে গিয়ে কিছুক্ষণ খেলা দেখলাম। তারপর ওখান থেকেই বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম একটা বই কেনার জন্যে। তখন সন্ধে নেমে গেছিল। লোহাপট্টির ওখানে রাস্তাটায় কেমন ধোঁয়া জমে থাকে দেখেছ তো? দু’দিকের কামারশালাগুলো থেকে যে ধোঁয়া বেরোয়, সেই ধোঁয়া।
ছোটবেলা থেকে অনেকবার ওই ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করেছি, তুমিও নিশ্চয়ই করেছ। কারওরই কিছু হয় না। কিন্তু সেদিন ধোঁয়াটায় একটা অদ্ভুত গন্ধ পেলাম। একটা মিষ্টি গন্ধ। তারপর আর আমার কিছু মনে নেই। কেমন যেন ঘুমের ঘোরে চলে গেছিলাম। শুধু আবছা মনে পড়ে, মায়ের মতো একজন মহিলা আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে, বাথরুমে নিয়ে যাচ্ছে।
তোমার মা?
না।
আচ্ছা, তারপর কী হল?
তারপর তো অনেক লোকের গলার আওয়াজে জ্ঞান ফিরল। দেখলাম, সাধু চাঁড়ালের বনের মধ্যে শুয়ে আছি।
ওকে জিগ্যেস করলাম, তুমি যে সেদিন সন্ধেবেলা বই কিনতে বাজারের দিকে যাবে, সেটা কে কে জানতেন?
বুলান বলল, শুধু দাদু জানত। দাদুর কাছ থেকেই তো সকালবেলায় পয়সা চেয়ে রেখেছিলাম।
সকালবেলায়! অত আগে চাইলে কেন? বিকেলে নিলেই তো পারতে।
দাদু সেদিন কলকাতায় যাবে জানতাম। তাই সকালেই নিয়ে রেখেছিলাম।
উনি ছাড়া আর কেউ জানতেন না?
উঁহু। বুলান জোরে জোরে দু’দিকে ঘাড় নাড়ল।
বিনায়ক বসু এতক্ষণ চুপ করে চৌবেসাহেবের কথা শুনছিল। এবার সে বলে উঠল, আপনার চিন্তাভাবনা কোন লাইন ধরে দৌড়চ্ছিল বুঝতে পারছি স্যার। ইউ ওয়্যার রাইট।
চৌবেসাহেব হেসে ফেললেন। বললেন, তাই? ধরে ফেলেছ? বলো তো দেখি, কী বুঝলে।
আপনি ওইসব ভূতুড়ে ব্যাপার-ট্যাপার মোটেই বিশ্বাস করেননি। এখনও করেন না, তখনও করেননি। আপনি ভাবছিলেন কিডন্যাপিংয়ের কথা। বুলানকে কেউ কিডন্যাপ করেছিল।
চৌবেসাহেব হাত বাড়িয়ে বিনায়কের কাঁধে দুটো চাপড় মেরে বললেন, এক্সেলেন্ট! একদম ঠিক বলেছ। আমার সন্দেহটা আরও পোক্ত হল যখন বুলান বলল, লোহাপট্টির রাস্তায় ওর নাকে মিষ্টি গন্ধের একটা গ্যাস ঢুকে গিয়েছিল আর তারপর থেকেই ওর কিছু মনে নেই। বোঝাই যাচ্ছে, কেউ ওকে অজ্ঞান করে গাড়িতে তুলে নিয়ে চম্পট দিয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, সে কে?
বিনায়ক বলল, সেটা জানবার জন্যেই আপনি বুলানকে জিগ্যেস করেছিলেন, ও যে বিকেলে বাজারের দিকে যাবে সেটা কে কে জানত। না জানলে কিডন্যাপিংয়ের প্ল্যানটা করবে কীভাবে? কিন্তু স্যার, সেখানে তো একটা বড় ধোঁয়াশা রয়ে গেল। বুলান তো বলল, ওর দাদু ছাড়া আর কেউ জানত না। কিন্তু মোহিতলালবাবু তো আর নিজের নাতিকে নিজে কিডন্যাপ করেননি।
চৌবেসাহেব এত বছর বাদেও যেন সেদিনের সংকটের কথা ভেবে চিন্তার মধ্যে ডুবে গেলেন। বললেন, প্রশ্ন একটা নয় বিনায়ক, প্রশ্ন ছিল অনেকগুলো। যারা কিডন্যাপ করেছিল, তারাই আবার বুলানকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। কেন? তাদের দাবি মিটে গিয়েছিল? কে মিটিয়েছিলেন, মোহিতলাল চট্টোপাধ্যায়? কী ছিল তাদের দাবি, টাকাপয়সা নাকি অন্য কিছু?
সব থেকে বড় প্রশ্ন, অত ক্ষমতাবান পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও মোহিতলাল কেন ইচ্ছে করে ঘটনাটাকে অলৌকিকের মোড়ক দিয়ে ধামাচাপা দিলেন? কীসের ভয়ে? তার নিজেরও কি তাহলে কোনও কলঙ্কের কথা ছিল, পুলিশ তদন্তে নামলে যা ফাঁস হয়ে যেতে পারত।
বিনায়ক বলল, সেটা কি জানতে পেরেছিলেন?
পেরেছিলাম। তবে তখনই নয়, বেশ কিছুদিন বাদে। মনে রেখো, তখন আমি পুলিশের গোয়েন্দা নই। এক সামান্য স্কুলশিক্ষক। তার ওপরে যে বাড়িতে আশ্রিত, সেই বাড়িরই ঘটনা। তাই কাউকে কিছু জিগ্যেস করতে পারিনি, কোনওরকম বাড়তি কৌতূহল দেখাতে পারিনি। কিন্তু আমার চিন্তাকে তো কেউ আটকে রাখতে পারত না, আর চিন্তা জিনিসটার সুবিধে হচ্ছে, ওটাকে বাইরে থেকে দেখাও যায় না। কাজেই আমি চিন্তা করে যাচ্ছিলাম।
চিন্তা করছিলাম আর বাড়ির লোকগুলোকে ভালো করে লক্ষ করছিলাম। কারও সন্দেহের উদ্রেক না করে তাদের সম্বন্ধে যতটা খবর নেওয়া যায় নিয়ে রাখছিলাম।
এ ব্যাপারে আমার খুব বড় সহায় ছিলেন দু’জন—মিনুপিসি আর জগদীশ মাহাতো।
মিনুপিসিকে মনে আছে তো? ও বাড়িতে যিনি পঁচিশ বছর ধরে রাঁধুনির কাজ করছেন। পঁচিশ বছর! ভেবে দ্যাখো বিনায়ক। তার মানে ঝন্টুবাবুকে তিনি বালক বয়স থেকে দেখছেন। মিনুপিসিকে একদিন কথায় কথায় জিগ্যেস করেছিলাম, বুলানের মা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন? অত কম বয়সে...অকালমৃত্যু তো বটেই। কিন্তু কীভাবে? অসুখে? দুর্ঘটনায়?
উনি উত্তর দিয়েছিলেন, দুর্ঘটনাই বলতে পারো। এদিকে বর্ষার পরে বনে-জঙ্গলে একধরনের ব্যাঙের ছাতা জন্মায়। দুর্গাছাতু বলি আমরা। ভালো করে রান্না করলে তার স্বাদ মাংসকে হার মানায়। কিন্তু মুশকিল হল, মাঝেমাঝে ওই ছাতুর মধ্যেই মিশে থাকে আরেক জাতের ছাতু, যেগুলো মারাত্মক বিষাক্ত। দু’জাতের ছাতুকে আলাদা করে চিনতে পারাও খুব কঠিন। বেচারি জয়া...
জয়া কে? বুলানের মা?
হ্যাঁ। ঝন্টুর স্ত্রী। জয়া ওই বিষাক্ত ছাতু খেয়ে ফেলেছিল।
রান্না কে করেছিল, তুমি?
না ভাই। সেটাই তো আমার সারা জীবনের আক্ষেপ হয়ে থাকবে। আমি ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে অনেক দুর্গাছাতু কুড়িয়েছি। আমি সেদিন থাকলে বিষাক্ত ছাতু আলাদা করতে পারতাম। কিন্তু আমি ছিলাম না। আমার ভাইপোর বিয়ে ছিল, তাই এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বাঁকুড়া গিয়েছিলাম। জয়া নিজেই রান্না করেছিল।
বললাম, আচ্ছা মিনুপিসি, এর আগে কখনও এরকম হয়েছে? মানে, আমি বলতে চাইছি, আপনি রান্নাঘরে গিয়ে দেখলেন, বাজার থেকে যে দুর্গাছাতু এসেছে, তার মধ্যে বিষাক্ত ছাতু মিশে আছে, আপনি সেগুলোকে বেছে ফেললেন, হয়েছে এরকম?
উনি একটু ভেবে উত্তর দিলেন, না ভাই। সেরকম কখনও হয়নি। সবই মানুষের কপাল!
আমার মনে প্রথমেই প্রশ্ন জাগল, এটা কীরকম হল? একটা সপ্তাহই মাত্র মিনুপিসি বাড়ির বাইরে রইলেন, আর সেই সপ্তাহের মধ্যেই একদিন চাটুজ্জেবাড়ির হেঁশেলে ঢুকল বিষাক্ত ব্যাঙের ছাতা! এটা কি খুব কাকতালীয় ঘটনা নয়? তার মধ্যে অবশ্য আরেকটা প্রশ্ন মাথার মধ্যে কুটকুট করতে শুরু করেছে। মিনুপিসিকে জিগ্যেস করলাম, আচ্ছা, ওই ছাতু খেয়ে বাড়ির আর কেউ অসুস্থ হননি? বুলান, ঝন্টুদাদা, মেসোমশাই?
না। জয়া নিজে প্রথমে একটুখানি ছাতুর তরকারি টেস্ট করেছিল। তাতেই ওর বমি শুরু হয়ে যায়, আর অসহ্য পেটে ব্যথা। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। এ সবই আমার শোনা কথা। আমি তো আর ওইদিন ছিলাম না।
এর পরে যে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই মনে এল, সেটা মিনুপিসিকে করে লাভ ছিল না। তাই বিকেলের দিকে বেড়াতে বেড়াতে চলে গেলাম কোল্ডফিল্ড মেডিসিনে। আমাকে দেখে জগদীশদা একগাল হেসে বললেন, এসো মাস্টার। কয়েকদিন দেখিনি কেন?
বললাম, বোঝেনই তো। চাকরির পরীক্ষার প্রিপারেশনের জন্যে একটু সময় দিতে হচ্ছে। আচ্ছা জগদীশদা...
বলো ভাই।
ঝন্টুদার স্ত্রী জয়াদেবীর মৃত্যুর পরে কোনও পোস্টমর্টেম, ফরেনসিক-টেস্ট ইত্যাদি হয়েছিল?
উঁহু।
কেন?
তুমি বাচ্চা ছেলে, তাই জানো না। একশোটা অস্বাভাবিক মৃত্যুর কেসের মধ্যে নিরানব্বইটা কেসে মৃতের বাড়ির লোক চায় না, ডেডবডির ওপরে কোনও কাটাছেঁড়া হোক। অর্থাৎ তারা পোস্টমর্টেম এড়িয়ে যেতে চান। আর এক্ষেত্রে তো মৃত্যুর কারণ ছিল ক্লিয়ার ফুড-পয়জনিং। বাড়ির ডাক্তারও ডেথ-সার্টিফিকেটে সেটাই কারণ হিসেবে লিখেছিলেন। মোহিতবাবুর কানেকশনও প্রচুর। কাজেই পোস্টমর্টেম হয়নি। কিন্তু তুমি হঠাৎ এতদিন বাদে এসব প্রশ্ন করছ কেন বলো তো?
না, এমনিই। আসলে আজকেই প্রথম ওঁর মৃত্যুর কারণটা শুনলাম তো। এমন অদ্ভুত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা আগে কখনও শুনিনি।
জগদীশদা বললেন, তুমি না শুনলেও এই বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং লাগোয়া অঞ্চলগুলোতে বিষাক্ত ছাতু খেয়ে মৃত্যু খুব কমন ঘটনা। প্রতি বছরই দু’-দশজন এইভাবে মারা যায়। জয়াদেবী বড় ঘরের বউ ছিলেন বলে, এখনো লোকে মনে রেখেছে। না হলে সাপে কাটা কিংবা বাজ পড়ে মরার মতোই লোকে এই কেসগুলোও ভুলে যায়।
যাতে জগদীশদার মনে কোনও সন্দেহ না জাগে, তাই সেদিন দ্রুত অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়েছিলাম।
তবে সেদিন ওখান থেকে চ্যাটার্জী ম্যানসনে ফিরে দেখি, সেখানে ততক্ষণে হইহই কাণ্ড, রইরই ব্যাপার। দু’দিন আগে থেকেই দেখছিলাম বটে, কাজের লোকেরা নীচের বন্ধ ঘরগুলোকে খুলে পরিষ্কার করছে। বিছানা বালিশ রোদে দিচ্ছে। সেদিন বাড়ি ফিরে দেখি, ঘরদুটোতে লোক এসে গেছে।
শুনলাম, ওঁরা হচ্ছেন মনোজিৎ চ্যাটার্জী অর্থাৎ বুলানের বাবা ঝন্টুদার শ্বশুরবাড়ির তরফের আত্মীয়। দলে মোট পাঁচজন লোক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে যিনি প্রধান, তাঁকে মোহিত চ্যাটার্জী কানুবাবু বলে ডাকছিলেন। আসল নাম ছিল কানাইবাঁশি লাহিড়ী। তিনি হচ্ছেন ঝন্টুদার মৃতা স্ত্রী জয়াদেবীর কাকা। জয়াদেবীর বাবা-মা ছোটবেলায় মারা গেছিলেন। এই কাকা-কাকিমার কাছেই নাকি তিনি মানুষ হয়েছিলেন।
কানাইবাবুর বয়স পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্নর বেশি হবে না। বেঁটে, গায়ের রঙ শ্যামলা, মাথাজোড়া টাক। চোখমুখে এবং কথাবার্তায় অশিক্ষার চিহ্ন প্রকট। পরনে ধুতি আর সাদা পাঞ্জাবি। কাপড়গুলো দামি হলেও ইস্ত্রিবিহীন এবং ময়লা। মোট কথা সুপুরুষ মোহিতবাবুর পাশে কানাইবাঁশিকে রীতিমতো সাদামাটা বলা যায়।
কিন্তু যে কথাটা শুনে আশ্চর্য হলাম, সেটা হল, অমন আনইম্প্রেসিভ চেহারা নিয়েও কানাইবাঁশি লাহিড়ী নাকি একজন বড় টিম্বার মার্চেন্ট, অর্থাৎ কাঠের ব্যবসায়ী।
আসলে কানাইবাঁশি ছিলেন একজন মাফিয়া।
মনে রেখো বিনায়ক, আমি প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা বলছি। সংরক্ষিত অরণ্য থেকে কাঠ চুরি এখনো হয়, তখন আরও বেশি হতো। বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার প্রাচীন শাল-সেগুনের বনগুলোয় বেআইনিভাবে যত গাছ কাটা হতো, তার সিংহভাগ এসে জমা পড়ত কানাইবাবুর চারটে করাত-কলের মধ্যে যেকোনো একটায়। একবার সেখানে গাছের গুঁড়িগুলো চেরাই হয়ে গেলে আর কার ক্ষমতা থাকত কোন বনের গাছ বোঝে। আর চেরাই হওয়াই বা আটকাত কে? পুলিশ, অরণ্যরক্ষী থেকে রাজনৈতিক নেতা, সবাই ছিল কানাইবাবুর পকেটে।
তুমি বলবে, এত কথা আমি জানলাম কোত্থেকে। কেন? সেই যে আমার অগতির গতি জগদীশ মাহাতো। তিনিই আমাকে মোহিতবাবুর অতিথিদের সম্বন্ধে যতটা সম্ভব ইনফর্মেশন দিয়েছিলেন। স্বেচ্ছায় দেননি। আমিই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাঁর কাছ থেকে সব জেনেছিলাম।
তো, সেদিন যে পাঁচজন মানুষ চ্যাটার্জী ম্যানসনের নীচের ঘরগুলোতে এসে থানা গাড়লেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন এই কানাইবাঁশি।
বাকিরা কারা?
বাকিরা কানাইবাবুর পরিবার আর কর্মচারী।
পরিবার বলতে কানাইবাবুর স্ত্রী আর ছেলে। তাদের মধ্যে এমন কোনো বিশেষত্ব ছিল না যার জন্যে সাতচল্লিশ বছর বাদে তাদের মনে রাখতে পারি। আবছাভাবে মনে পড়ছে, ওঁর স্ত্রী ছিলেন খুব ছোটখাটো চেহারার ভারি স্নেহময়ী একজন মহিলা। লালপাড় গরদের শাড়ি, সিঁথিভর্তি সিঁদুর, হাতভর্তি মোটা মোটা সোনার বালা, চুড়ি, তাগা ইত্যাদি। তাঁর কাছে গেলেই দোক্তাপানের মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যেত। প্রথম দেখাতেই আমাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তার একটা বড় কারণ, তাঁর একমাত্র ছেলেটির বয়স আর আমার বয়স ছিল একেবারেই কাছাকাছি।
তার মানে ছেলেটির বয়স ছিল একুশ-বাইশ। চেহারায় স্বভাবে বাপের একেবারে বিপরীত। রোগা, ফর্সা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর একমাথা এলোমেলো চুল। চোখে অন্যমনস্ক দৃষ্টি। দেখলেই মনে হতো পড়ুয়া ছেলে। এবং সত্যিই সে ছিল ভালো ছাত্র। তখন সে দুর্গাপুর আর.ই. কলেজে মাইনিং-ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিল। নাম ছিল বোধহয় সুমন্ত্র।
তাহলে কানাইবাবু, তাঁর স্ত্রী আর ছেলে—এই হল তিনজন। এই তিনজন উঠলেন একতলার সবচেয়ে বড় ঘরটায়।
বাকি দুজনের মধ্যে একজন শুনলাম কানাইবাবুর ম্যানেজার। তাঁর নাম ছিল প্রফুল্ল প্রামাণিক। বয়স্ক মানুষ। দাড়িগোঁফ কামানো। মাথার চুলগুলো তুলোর মতো সাদা। তীক্ষ্ণ নাক, উজ্জ্বল চোখ।
জগদীশদা বললেন, প্রফুল্ল প্রামাণিককে সঙ্গে না নিয়ে কানাইবাবু দু’কদমও হাঁটেন না। মানে যাকে ভালো বাংলায় বলে ‘নিত্য সহচর’, কানাইবাবুর কাছে তিনি ছিলেন তাই। তার কারণও ছিল। ব্যবসার দু’নম্বরি খাতাপত্র বানানোতেই হোক, মামলা-মোকদ্দমার নকল কাগজ সাজানোতেই হোক আর রাজনৈতিক নেতা কিংবা পুলিশের বড়সাহেবদের ঘুষ দিয়ে তুষ্ট করার কাজেই হোক, ওই প্রফুল্ল প্রামাণিক নামে মানুষটি সব কাজেই ছিলেন সিদ্ধহস্ত। কানাইবাবুকে দেখলেই বোঝা যেত, ভদ্রসমাজে দুটো কথা বলার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। তাঁর হয়ে সমস্ত কথাবার্তা বলতেন প্রফুল্লবাবু।
পঞ্চম ব্যক্তিটি তাহলে কে?
তার চেয়ে ইন্টারেস্টিং মানুষ আমি এই দীর্ঘ জীবনে কমই দেখেছি। তিনি ছিলেন একজন তান্ত্রিক। কানাইবাঁশি লাহিড়ীর কুলগুরু এবং পুরোহিত। তাঁর নাম ছিল দধিবামন।
আমাদের পুরাণকথা অনুসারে দধিবামন কে জানো তো বিনায়ক? যিনি বিষ্ণুর বামন অবতার, তাঁরই আরেক নাম দধিবামন।
জনকপুরে সেদিন যে দধিবামনকে দেখলাম, তিনিও ছিলেন সত্যিকারেই একজন ডোয়ার্ফ। বামন। সার্কাসে যেমন বামনরা জোকার সেজে খেলা দেখায়, প্রায় সেরকমই। তাদের চেয়ে একটু লম্বা হবেন। তবু চার ফুটের বেশি কিছুতেই নয়। সেই অনুপাতে রোগা। মানে, সব মিলিয়ে একটি দশ-এগারো বছরের বালকের মতো শরীর।
এবার ভাবো তো, ওই শরীরের ওপরে যদি একটি চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের মানুষের মুখ বসিয়ে দাও তাহলে কেমন দেখতে লাগবে। দধিবামন ছিলেন ঠিক তাই। তবে মুখটা চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের হলেও, সেই মুখের মধ্যে কোথাও যেন একটা বালকের সারল্য লেগেছিল।
ওঁরা এসেছিলেন এক বিকেলে। সেদিন রাতেই খাওয়ার টেবিলে মোহিতবাবুর ছোট বেয়াই কানাইবাঁশি আর তাঁর স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। কিন্তু দধিবামনের সঙ্গে আলাপ হল পরদিন সকালে। আমি বরাবরই ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে পড়ি। জনকপুরে থাকাকালীন ওই ভোরেই প্রাতঃকৃত্য সেরে আমি একটু ঘুরতে বেরোতাম। লাল মাটির রাস্তাটা ধরে কিছুটা দূর অবধি হেঁটে গিয়ে একটু ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম-ট্যায়াম করে আবার ফিরে আসতাম চ্যাটার্জী ম্যানসনে।
সেদিন ভোরে বাগানটা পেরোতে গিয়ে দেখি, দধিবামন বাগানে ঘুরছেন। গায়ে রক্তবস্ত্র। হাতে ফুলের সাজি। দেখে বোঝা যাচ্ছিল, স্নান-টান সারা হয়ে গেছে। আমাকে দেখেই একগাল হাসলেন। কুচকুচে কালো দাড়ি-গোঁফের ফাঁকে ধবধবে সাদা দাঁতের হাসিটি ভারি চমৎকার...ঝলমলে। বললেন, কী ভাই, কোথায় চললে? যেন আমি কতদিনের পরিচিত।
বললাম, এই একটু ঘুরতে যাচ্ছি।
এসো, একটা মজার জিনিস দেখে যাও।
গেলাম।
বাগানের একপ্রান্তে একটা জায়গা যত্নের অভাবে জঙ্গলে ঢেকে গিয়েছিল। সেখানেই একটা কুলগাছের নীচে গজিয়েছিল বেশ বড়সড় একটা উইঢিবি। ওদিকটায় আমি আগে কখনো যাইনি, তাই ঢিবিটাকে দেখিওনি। উনি সেইদিকেই আঙুল দেখিয়ে বললেন, ওই দ্যাখো।
কী যে দেখব বুঝতে পারছিলাম না। উইঢিবি এমন কী অপূর্ব জিনিস যে, সেটাকে আলাদাভাবে মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে?
কিন্তু উনি ছাড়লেন না। বললেন, যাও, কাছে গিয়ে দ্যাখো। কিন্তু খুব সাবধানে। বাবাজির বেরোনোর চিহ্ন তো দেখছি না। তার মানে তিনি এখন ভেতরেই রয়েছেন। কী হল? দাঁড়িয়ে রইলে কেন? যাও।
অগত্যা পায়ে পায়ে ঢিবিটার দিকে এগিয়ে গেলাম। খুব ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, উইঢিবিটার মাঝামাঝি অংশে একটা গর্ত আর সেই গর্তের গভীরে হিরেকুচির মতো দুটো চোখ জ্বলছে। আর দু’পা সেদিকে এগোতেই চাপা হিসহিস শব্দ শুনতে পেলাম। আমি আবার পায়ে পায়ে পিছিয়ে এসে ওঁকে চাপা গলায় প্রশ্ন করলাম, ওটা কী?
উনিও গলা নামিয়ে উত্তর দিলেন, পদ্মগোখরো। ঢিবিটা আসলে তো বানিয়েছিল উইপোকারা। তারপর তাদের উৎখাত করে ভেতরে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বাসা বানাল মেঠো ইঁদুর। তারপর আবার সেই মেঠো ইঁদুরকে খেয়ে ইনি সেখানে আস্তানা গেড়েছেন। উইঢিবির অবস্থা ঠিক তোমার পেছনের ওই বাড়িটার মতো।
আমি চমকে দধিবামনের মুখের দিকে তাকালাম। চ্যাটার্জী ম্যানসনের কথা বলছেন। কিন্তু কী বলছেন ঠিক বুঝলাম না।
আমার মুখের ভাব দেখে দধিবামন নিজেই বললেন, বুঝলে না তো? এই বাড়িটাতেও সাপ ঢুকেছে। সাপের আরেক নাম নিয়তি। আমাদের জয়া মাকে ছোবল দিয়ে মেরেছে সেই কালসর্প। আস্তে আস্তে বাকি সবাইকেও মারবে। কিন্তু তার আগেই সেই সাপকে মারার জন্যে দধিবামন এখানে পৌঁছে গিয়েছে। হাঃ হাঃ হাঃ।
আমারও হাঃ হাঃ হাঃ করে হাসতে ইচ্ছে করছিল। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, পুজোআচ্চার বুজরুকির জন্যেই তাহলে এঁদের এখানে আগমন। তবে হাসলাম না। গম্ভীর মুখে সেখান থেকে প্রস্থান করলাম।
পরদিন চ্যাটার্জী ম্যানসনের একতলা জুড়ে দক্ষযজ্ঞ বেধে গেল। দিনটা ছিল রবিবার। তাই আমার কোনার ঘরে বসে ভোরবেলা থেকে দেখতে লাগলাম দধিবামনের শান্তিযজ্ঞের আয়োজন।
গাড়িবারান্দার নীচের জায়গাটাকেই তিনি যজ্ঞস্থল হিসেবে পছন্দ করেছিলেন। সেটা একদিক দিয়ে ভালোই করেছিলেন। কারণ, আগের দিন রাত থেকেই টিপটিপ করে বৃষ্টি নেমেছিল। আকাশ কালো করে মেঘ জমেছিল আর ঝোড়ো হাওয়া বইছিল। যাকে বলে সাইক্লোনিক ওয়েদার। ওই আবহাওয়ায় গাড়িবারান্দার ছাদটাই সবাইকে বাঁচাবে।
যজ্ঞের খুঁটিনাটি আর তোমাকে বলছি না। সত্যি কথা বলতে কী, এত বছর বাদে আর সবকিছু মনেও নেই। শুধু দুটো জিনিস মনে আছে। এক, পুজোর শুরুতেই দধিবামন একটা বিশাল রামদা নিয়ে চললেন সেই উইঢিবিটার দিকে। সেখানে গিয়ে প্রথমে এক কোপে অত বড় ঢিবিটাকে মাঝখান থেকে চিরে ফেললেন। আর তারপরেই কিলবিল করে বেরিয়ে আসা গোখরো সাপের মুন্ডুটাকে আরেক কোপে কেটে ফেলেই সেই সাপের রক্ত আর উইঢিবির মাটি একটা পেতলের সরায় করে নিয়ে তিনি ফিরে এলেন যজ্ঞস্থলে।
ছোটখাটো চেহারার বামনের পেশিশক্তি দেখে সেদিন অবাক হয়ে গিয়েছিলাম বলেই এখনো ঘটনাটা মনে আছে।
তারপর সেই সাপের রক্ত দিয়ে মাখা উইঢিবির মাটিটুকুকে কেন্দ্রে রেখে চৌকোনা এক যজ্ঞবেদি তৈরি হল। তার ওপরে স্তূপ করে সাজানো হল বেলকাঠ। এল, সের সের ঘি। যজ্ঞস্থল ঘিরে আমাদের সবাইকে স্নানটান করে শুদ্ধ পোশাকে বসে থাকতে হল। আসেননি শুধু মোহিতবাবুর স্ত্রী বন্দনাদেবী, যেহেতু তিনি প্যারালাইজড আর তাঁকে আগলাবার জন্যেই পুজো দেখতে আসেনি তাঁর আয়া সুশীলা।
বাকি সবাই ছিল। হ্যাঁ, আমিও। ছোটবেলা থেকেই আমার বুজরুকদের ওপরে ভারি টান। কারণ সমাজের সেরা ক্রিমিনাল মাইন্ডগুলোকে তুমি ওই ধর্মগুরুদের মধ্যেই খুঁজে পাবে—সমস্ত ধর্মের গুরুদের মধ্যে।
সারাজীবন ওদের এত মন দিয়ে লক্ষ করেছি বলেই, যেদিন আলিপুরদুয়ার কোর্টের চত্বর থেকে তান্ত্রিক মাতা ভবানী ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছিলেন, সেদিন দু’ঘণ্টার মধ্যে তাকে আবার খুঁজে বার করে দিতে পেরেছিলাম। সেই ঘটনা তো তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই।
যাই হোক, সারাদিন ধরে চলল সেই যজ্ঞ। মোহিতলালবাবুকে দেখলাম তদ্গত-ভঙ্গিতে বসে রইলেন। সেটাই স্বাভাবিক। সংসারটা তো ওঁরই। যদি শোনেন সেই সংসারে কালসাপ ঢুকেছে, একে একে সবাই মারা পড়বে, তাহলে ওঁরই মনের ভেতরে তোলপাড় সবচেয়ে বেশি হবার কথা। সেইজন্যেই উনি ছেলের শ্বশুরবাড়ির তরফে আয়োজিত এই শান্তিযজ্ঞে মানসিক শান্তি খুঁজছিলেন।
মনোজিৎ অর্থাৎ ঝন্টুদা এমনিতে প্রচণ্ড ছটফটে লোক। সেটা ওঁর মানসিক ব্যাধিরই লক্ষণ। কিন্তু সেদিন দেখলাম, কী এক ম্যাজিকে যেন তিনিও ওইখানে ঝিমিয়ে বসে রয়েছেন। সন্দেহ হল, ওকে খাবারের সঙ্গে এরা কেউ ঘুমের ওষুধ-টষুধ মিশিয়ে দেয়নি তো?
সবচেয়ে করুণ অবস্থা হয়েছিল বুলানের। একটা বারো বছরের ছেলে, সে পারে নাকি ওইভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপ করে বসে থাকতে? প্রথমে বুলান ওর দিদার পাশে গিয়ে বসেছিল। একটু বাদে উঠে এসে আমার পাশে বসল। ফিসফিস করে বলল, ভালো লাগছে না।
বুলানকে নিয়ে আমি উঠে পড়লাম। সবাই, এমনকী দধিবামনও মুখ তুলে আমাদের দিকে তাকালেন। আমি ইশারায় বললাম, এখনই ফিরে আসছি। তারপর ওর ঘরে গিয়ে দুটো টিনটিনের কমিক্স নিয়ে আবার নেমে এলাম। একটা ওর, আরেকটা আমার। আমারও চুপচাপ বসে থাকতে বোর লাগছিল।
নামবার সময় দোতলার ল্যান্ডিং-এর কাছে যখন পৌঁছেছি, তখন মাঝের ঘর থেকে সুশীলাদি বেরিয়ে এসে আমাকে বলল, দাদাবাবু, আপনি তো নীচে যাচ্ছেন। মিনুপিসিকে একটু বলবেন তো, মাসিমার জন্যে দুধ-কর্নফ্লেক্স দিয়ে যেতে। ওনার জলখাবার খাওয়ার সময় হল।
আচ্ছা, বলছি, বলে আমরা নীচে নেমে এলাম। দেখলাম মিনুপিসি ইতিমধ্যেই পুজোর জায়গা ছেড়ে উঠে এসেছেন। বোধহয় বন্দনাদেবীর জলখাবারের ব্যবস্থা করার জন্যেই তিনি রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। তাকে সুশীলাদির কথা বললাম। তিনি বললেন, এক্ষুনি দিচ্ছি।
যাই হোক, আমরা কিছুটা সময় টিনটিন পড়ে, কিছুটা সময় আকাশ দেখে কাটিয়ে দিলাম। দধিবামন সবাইকে শান্তিজল-টল দিয়ে একেবারে শেষে যেটা করলেন, সেটার কথাই তোমাকে বলেছিলাম। এটাই সেই দ্বিতীয় ঘটনা যেটা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে।
খালি হাতে যজ্ঞের গরম ছাই সরিয়ে দধিবামন একটা ছুরি বার করে আনলেন। ছুরিটা সরু, অনেকটা লম্বা আর দেখেই বোঝা যাচ্ছিল অসম্ভব ধারালো। ধারটা ফলার দু’পাশেই। গবাদি পশুর চামড়া ছাড়ানোর জন্যে কসাইরা এইরকম ছুরি ব্যবহার করে থাকে। ছুরিটাকে অনেকক্ষণ ধরে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করলেন দধিবামন। তারপর সেটাকে দু’হাতের চেটোর ওপর নিয়ে ঘুরে ঘুরে আমাদের দেখালেন।
ওঁর বক্তব্য ছিল, ওই ছুরির জন্ম হয়েছে এইমাত্র, ওই যজ্ঞের আগুন থেকে; এবং যে ব্যক্তি চ্যাটার্জী পরিবারের আর কোনো অনিষ্ট চাইবে, এই ছুরি নিজে গিয়ে তাকে খুন করে আসবে।
দধিবামন ক্লেইম করছিলেন, ওটি নাকি অট্টহাসিনী নামে এক দেবী, যজ্ঞের আগুনের মধ্যে রেখে গিয়েছেন। তাই শুনে বাকিদের চোখেমুখে এমন ভক্তি এবং ভয়ের প্রাবল্য দেখলাম যে, আমি কোনোরকমে হাসি চেপে বসে রইলাম।
ভাবছিলাম, যজ্ঞের আগুনে এতবার কাঠ, বেলপাতা, ঘি, আরো দশরকমের আহুতি দিয়েছেন দধিবামন, তারমধ্যেই কোনোটার সঙ্গে ওই ছ’ইঞ্চি লম্বা সরু লিকলিকে ছুরিটাকে আগুনের শিখার আড়ালে চালান করে দেওয়া কি এতই কঠিন কাজ?
কিন্তু এসব কথা বলতে গেলে চ্যাটার্জী ম্যানসন থেকে ঘাড়ধাক্কা তো খাবই, সাধের চাকরিটাও খোয়াতে পারি। তাই আর কিছু বললাম না। তবে হাতের অঞ্জলিতে করে যখন আমার সামনে তিনি ছুরিটা বাড়িয়ে ধরেছিলেন, তখন এক নজরেই দেখে নিয়েছিলাম, বাঁটের নীচে ফলার গায়ে সালেম স্টিলের বরফি-মার্কা লোগো।
অর্থাৎ স্বর্গ অথবা নরক যেখান থেকেই ওই ছুরি আসুক, সেটি বানাতে এই পৃথিবীর সেরা জাতের স্টিল ব্যবহার করতে হয়েছে।
যজ্ঞ হয়ে গিয়েছিল। আমরা সকলে এবং পাড়া-প্রতিবেশী যারা এসেছিলেন, সকলেই প্রসাদ-টসাদ মুখে দিয়ে স্নান-খাওয়া সারতে গেলাম। মিনুপিসি, কানাইবাবুর স্ত্রী, এরকম দু’-চারজন মহিলা মিলে পুজোর জায়গাটা পরিষ্কার করতে লেগে গেলেন।
এখনো যেমন, তখনো তেমনি, আমার সিক্সথ সেন্স আমাকে বিপদ সংকেত দিত। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, ওই ছুরিটা বিপদ ডেকে আনবে।
দেখলাম, অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে ছুরিটা নিয়ে মিনুপিসি দোতলার ঠাকুরঘরে চলে গেলেন। আমি বুলানকে দোতলায় পৌঁছে দেওয়ার ছলে একবার দোতলায় গিয়ে দেখে এলাম। ঠাকুরঘরের দরজার সামনেই একটা ছোট জলচৌকির ওপরে লাল শালু বিছিয়ে, তার ওপরে মালা চন্দন দিয়ে ছুরিটাকে মহা ভক্তিভরে শুইয়ে রাখা হয়েছে। আমি যখন ওই ঘরের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন স্বয়ং মোহিতলাল চ্যাটার্জী চৌকিটার সামনে সাষ্টাঙ্গে শুয়ে ওটাকে প্রণাম করছিলেন।
তারপর আমি নীচে আমার নিজের ঘরে নেমে আসি। পুজোর কারণে সেদিন মধ্যাহ্ন আহারের পালা শেষ হতে হতে প্রায় সাড়ে তিনটে বেজে গিয়েছিল। তারপরেই পুরো বাড়িটা হঠাৎই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আসলে সকাল থেকে পরিশ্রমের পর সবারই শরীর চাইছিল একটু গড়িয়ে নিতে।
আমিও একতলার দালান ধরে আমার নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে দেখলাম, একটার পর একটা সমস্ত ঘরেরই দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কানাইবাঁশিবাবু যে ঘরে নিজের পরিবার নিয়ে রয়েছেন সেই ঘর, তার পাশেই পরপর দুটো ছোট ঘর, যে ঘরদুটোয় রয়েছেন প্রফুল্ল প্রামাণিক এবং দধিবামন—সব ঘরেরই দরজা ভেতর থেকে ভেজানো।
দোতলার অবস্থাও নিশ্চয় তাই। আমাদের সবার খাওয়া শেষ হবার পরে, এই মিনিট পাঁচেক আগে, সুশীলাদি এসেছিল ওর নিজের খাবার নিয়ে যেতে। সেও ভাতের থালা নিয়ে দোতলায় চলে গেছে। ও যে বন্দনাদেবীর ঘরের একদিকে বসেই খাওয়া-দাওয়া সারে, সেটা জানি। রুগিকে একলা ফেলে বেশিক্ষণ নীচে থাকতে চায় না বলেই এই ব্যবস্থা।
আমিও বুকের ওপরে একটা জিকের বই খুলে একটু টানটান হয়ে শুয়ে নিলাম। তোমাকে তো আগেই বললাম, দিনটা ছিল মেঘলা। টিপ টিপ করে বৃষ্টি ঝরেই চলেছিল। হয়তো সেইজন্যেই চোখদুটো ঘুমে জড়িয়ে এসেছিল।
হঠাৎই দোতলা থেকে দরজা পেটার শব্দ ভেসে এল। দুটো বন্ধ দরজার পাল্লায় কেউ সর্বশক্তি দিয়ে ঘা মারছিলেন। শব্দটা কতক্ষণ ধরে চলছিল জানি না। তবে আমার তন্দ্রার ঘোর কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শব্দটা থেমে গেল। তার জায়গায় মোহিতবাবুর উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ডাক শুনলাম, সুশীলা, সুশীলা! কী করছিস তুই? দরজা খোল।
আমি বিছানায় উঠে বসলাম কিন্তু মেঝেতে পা দেওয়ার আগেই আরো তিন-চারবার প্রবল ধাক্কার শব্দ আর তারপরেই পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, হুড়মুড় করে পাল্লাদুটো ভেঙে পড়ল।
আমি দালান পেরিয়ে দোতলার দিকে ছুটলাম। ততক্ষণে বাড়ির অন্য মানুষরাও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
তোমাকে তো আগেই বলেছি বিনায়ক, সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠেই দালানের গায়ে যে প্রথম ঘরটা, সেটাই মোহিতবাবুর শোয়ার ঘর। ওই ঘরের মধ্যে দিয়েই চলে যাওয়া যায় পাশের ঘরে, যেটা তার পক্ষাঘাতগ্রস্তা স্ত্রী বন্দনাদেবীর ঘর। যে ঘরে দিনের মধ্যে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা বন্দনাদেবীর সঙ্গে থাকত তাঁর সেবিকা, সুশীলা।
এই দুটো ঘরের মাঝখানে একটা দরজা রয়েছে।
তাছাড়া আরেকটা দরজাও রয়েছে বন্দনাদেবীর ঘরে, যেটা বারান্দার দিকে খোলে। তোমার মনে আছে নিশ্চয়, বুলানের সঙ্গে আমার প্রথম যেদিন দেখা হয়, সেদিন ও ওই বারান্দার দিকের দরজাতে দাঁড়িয়েই আমাকে লাজুকদৃষ্টিতে দেখছিল।
এটা তোমাকে আবার বললাম, কারণ এরপর যে রহস্যের সূত্রপাত হল তার সঙ্গে দুটো ঘরের এই প্ল্যান অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
দোতলা থেকে মোহিতলালবাবুর চিৎকার আর দরজা ভাঙার আওয়াজ শুনে সবার প্রথমে আমিই ওপরে গিয়ে পৌঁছেছিলাম। সেটাই স্বাভাবিক। একতলায় আর যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে একমাত্র কানাইবাবুর ছেলে সুমন্ত্র ছাড়া আর সকলেই তো বয়স্ক লোক। সুমন্ত্রর বয়স কম হলেও ও বহিরাগত। আমি যখন সিঁড়ির দিকে দৌড়চ্ছি, তখনও ও ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করছে আওয়াজটা কোথা থেকে আসছে।
সেইজন্যেই অন্য সবার চেয়ে ঢের আগে, একসঙ্গে সিঁড়ির দুটো-তিনটে করে ধাপ পেরিয়ে আমি সোজা ঢুকে পড়েছিলাম মোহিতলালবাবুর ঘরে।
উত্তেজনার মধ্যে মানুষ অনেক সময় খুঁটিনাটি জিনিস দেখতে ভুলে যায় কিংবা দেখলেও মনে রাখতে পারে না। রাস্তায় একটা গাড়ি কাউকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যাক, তুমি দেখবে একশোজন লোক যদি অ্যাকসিডেন্টটা দেখে থাকে, তাদের মধ্যে একজনও সেই গাড়ির নম্বরটা মনে করে বলতে পারবে না। তুমি পুলিশে চাকরি করো, এসব কথা তো তুমি জানোই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেদিনই প্রথম খেয়াল করেছিলাম যে, আমার মনের গড়নটা একটু আলাদা। আমি ওই ঘরে পা দেওয়ার পর থেকেই অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পুরো দৃশ্যপটটা মনের ভেতরে গেঁথে নিয়েছিলাম। এতটাই গভীর ছিল সেই ছাপ যে, আজও মনে হয় চোখের সামনে দেখছি।
প্রথমেই মোহিতলাল চ্যাটার্জীর দিকে চোখ পড়ল। দুই ঘরের মাঝখানের দরজাটা পার হয়ে তাঁর স্ত্রীয়ের ঘরের ভেতরে দু’পা ঢুকে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। ভাঙা পাল্লাদুটো কবজার সঙ্গে লেগে ঝুলছিল। যে ছিটকিনি দিয়ে সুশীলা দরজাটা ওদিক থেকে বন্ধ করে রেখেছিল, সেই ছিটকিনিটা ছিল পলকা। মোহিতবাবুর বিশাল চেহারার দুটো ধাক্কাতেই সেটা ভেঙে পড়েছে।
আমি সবটাই দেখলাম ওঁর পেছনে দাঁড়িয়ে। উনি যে স্তম্ভিত হয়ে গেছেন, সেটা পেছনদিক থেকেও বুঝতে পারছিলাম। এতটুকু নড়াচড়া ছিল না শরীরে। সামান্য ঝুঁকে, ভেঙে পড়া মানুষের মতো ঘরের ভেতরের দিকে চেয়েছিলেন।
আরও কয়েকটা জিনিস দেখলাম—
এক, বন্দনাদেবীর ঘরের বারান্দার দিকের দরজাটা ভেতরদিক থেকে খিল দিয়ে এঁটে বন্ধ করা রয়েছে। অর্থাৎ সুশীলা ঘরের দুটো দরজাই ভেতরদিক থেকে বন্ধ করে দিয়েছিল। তার মধ্যে একটা সেইমাত্র ভেঙে ফেলেছেন বাড়ির মালিক, মোহিতলাল চ্যাটার্জী।
দুই, বন্দনাদেবীর ঘরের দুটিমাত্র জানলা। সেই দুটি জানলাও ভেতরদিক থেকে বন্ধ ছিল। আগেই বলেছি, সারাদিনই ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। সেটাই নিশ্চয় জানলা বন্ধ রাখার কারণ।
তিন, ঘরের মাঝখানে হসপিটাল-কটের ওপরে বন্দনাদেবী চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। সাদা চাদরে গলা থেকে পা অবধি ঢাকা। চোখদুটো বোজা। এটাই তাঁর চেনা চেহারা। যতবার দেখেছি, ঠিক এই ভঙ্গিতেই তাঁকে দেখেছি। চেহারাটা বিশাল বলেই দরজার কাছে দাঁড়িয়েও নিঃশ্বাসের ছন্দে তার বুকের ওঠানামা দেখতে পাচ্ছিলাম এবং দেখতে পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম। যাক, ওঁর কিছু হয়নি।
এবার মোহিতবাবু সম্মোহিতের মতো পায়ে পায়ে ঘরের ভেতরে আরেকটু এগিয়ে গেলেন। পেছন পেছন আমিও। এবং তখনই চোখে পড়ল এক বীভৎস দৃশ্য। বন্দনাদেবীর বিছানার মাথার কাছে, লাল সিমেন্টের মেঝের ওপরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে সুশীলাদি। চোখদুটো বিস্ফারিত, স্থির, নিষ্পলক। মারা যাওয়ার আগে পা ছুড়েছিল নিশ্চয়। প্রবল তাড়নায় দু-পাটি প্লাস্টিকের চটিই ছিটকে দূরে গিয়ে পড়েছে। হাতের নাগালে একটা টুল পেয়ে আঁকড়ে ধরতে গিয়েছিল—যে টুলটার ওপরে জলের জগ, গ্লাস এইসব রাখা থাকে। সেটাও সবসুদ্ধ মেঝেতে উলটে পড়েছে।
লাল মেঝের ওপর দিয়ে ততধিক গাঢ় লাল রক্ত গড়িয়ে যাচ্ছে। তখনও জমাট বাঁধার সময় পায়নি। সুশীলাদির গলাটা আড়াআড়িভাবে কেউ চিরে দিয়েছে। যেটা দিয়ে চিরেছে, সেটাও ওর বুকের ওপরে রাখা ছিল। আর কিছু নয়, একটু আগে যজ্ঞ থেকে উঠে আসা অট্টহাসিনীর ছুরি, যেটা দোতলার ঠাকুরঘরেই একটু আগে দেখে গিয়েছিলাম।
পেছন থেকে কে যেন কঠিন গলায় বলে উঠলেন, ব্যস ব্যস। আর ঢুকবেন না। বেরিয়ে আসুন! বেরিয়ে আসুন দু’জনেই। যতক্ষণ পুলিশ না আসছে ততক্ষণ ঘরটা বাইরে থেকে বন্ধ করে রাখুন।
মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, কানাইবাঁশি লাহিড়ী ইতিমধ্যে দোতলায় উঠে এসেছেন এবং ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েই তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে যা দেখার দেখে নিয়েছেন। ওঁর কথার মধ্যে অবশ্য যুক্তি ছিল। যে ঘরে একটা খুনের ঘটনা ঘটে গেছে, সেই ঘরটাকে যথাসম্ভব বাঁচিয়ে চলাই তো উচিত।
হ্যাঁ, খুন তো বটেই। নিখুঁতভাবে নিজের গলা কেটে সুইসাইড যদি বা কেউ করতে পারে, তারপরে ছুরিটাকে তো আর যত্ন করে নিজের বুকের ওপরে রেখে দিতে পারে না। আর তাছাড়া বললামই তো, ধস্তাধস্তির চিহ্ন ছিল যথেষ্ট।
কানাইবাবুর কথায় যুক্তি থাকলেও একটা বড় সমস্যাও যে ছিল সেটা তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ। ওই একই ঘরে একজন অচৈতন্য রোগিণীও যে শুয়ে রয়েছেন। তাঁকে ভেতরে রেখে কীভাবে আমরা দরজা বন্ধ করে চলে যাব? সেটা কি সম্ভব?
স্যার! থানায় একটা ফোন করা দরকার, এখনই।
কথাটা বললেন কানাইবাবুর সেক্রেটারি প্রফুল্ল প্রামাণিক। ইতিমধ্যে বাড়ির আর সকলেও দোতলায় উঠে এসেছিলেন। আমার পেছনে তখন রীতিমতো আট-ন’জন মানুষের একটা জটলা। তারমধ্যে কানাইবাবুর স্ত্রী আর পুত্র ছিলেন, মিনুপিসি ছিলেন। বুলান নেমে এসেছিল তার ছাদের ঘর থেকে আর তার বাবা মানে ঝন্টুদা তো দোতলায় নিজের ঘরেই ছিলেন। তিনিও একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন। দু’জন পরিচারক আর একজন রাঁধুনিও ছিল। এছাড়া মোহিতবাবু, কানাইবাবু আর প্রফুল্ল প্রামাণিক তো ছিলেনই।
প্রফুল্ল প্রামাণিকের মুখে ফোনের কথা শুনে মোহিতবাবু অসহায়ভাবে এদিক-ওদিক তাকালেন। বললেন, ফোনটা তো কাল থেকে ডেড হয়ে পড়ে আছে। ঝড়বৃষ্টি হলেই এই হয়। তারপরেই তাঁর চোখ পড়ল আমার দিকে। পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম তো। বললেন, বাবা উমা, তুমি একবার থানায় গিয়ে খবরটা দিয়ে আসতে পারবে? আর তো সেরকম কাউকে দেখছি না।
বললাম, এক্ষুনি যাচ্ছি জ্যাঠামশাই।
না, একটু দাঁড়াও। আমি ওসি মিস্টার বাজপেয়ীকে দু’লাইন চিঠি লিখে দিই। সেটা নিয়ে যাও। না হলে তোমাকে গুরুত্ব দেবেন না, এই বলে মোহিত চ্যাটার্জী নিজের ঘরের কোনায় রাখা টেবিলটার সামনে গিয়ে বসলেন। আমিও তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
তিনি যতক্ষণ চিঠিটা লিখছিলেন তার মধ্যেই দেখলাম, ঝন্টুদা আর প্রফুল্ল প্রামাণিক দু’জনে মিলে বন্দনাদেবীর চাকা লাগানো হসপিটাল-কটটাকে সাবধানে টানতে টানতে ওই ঘর থেকে অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন। স্বীকার করলাম, ওই পরিস্থিতিতে ওটাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত কাজ। একটা বীভৎস মৃতদেহের সঙ্গে একজন রুগিকে একঘরে ফেলে রাখাটা অমানবিক। তাছাড়া বন্দনাদেবীর মুহূর্তে মুহূর্তে পরিচর্যারও প্রয়োজন হয়। ইউরিন পট দেওয়া, অয়েলক্লথ পালটানো, তরল খাবার খাওয়ানো—এগুলো করতে গেলে ওই ঘরের যাবতীয় এভিডেন্স, যদি কিছু থাকে, নষ্ট হয়ে যাবে।
চিঠিটা ভাঁজ করে একটা খামে ভরে আমার হাতে দিয়ে মোহিতবাবু বললেন, ফেরার পথে একবার জগদীশ মাহাতোকেও খবর দিয়ে এসো। বোলো, পারলে যেন একজন নতুন নার্সকে সঙ্গে নিয়ে এখনই আসে। সুশীলাকে যে মারল সে তো একইসঙ্গে বন্দনাকেও মেরে রেখে গেল। ওকে ছাড়া বন্দনা বাঁচবে কেমন করে? হে ভগবান! আমি এখন কী করব?
উনি দু’হাতে মুখ ঢেকে টেবিলের ওপরে মাথা রাখলেন। অমন ব্যক্তিত্বশালী মানুষটিকে এইভাবে ভেঙে পড়তে দেখে খারাপ লাগছিল খুবই। কিন্তু আমিই বা কী করব?
চিঠিটা নিয়ে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছি, তখনই পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, তান্ত্রিক দধিবামন বিমর্ষমুখে আমার পেছন পেছন নেমে আসছেন। আমি ল্যান্ডিং-এ পৌঁছে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বললাম, আপনি কোথায় ছিলেন? দেখলাম না তো।
উনি বিষণ্ণ গলাতেই উত্তর দিলেন, আমার খর্ব আকৃতির জন্য হয়তো দেখতে পাওনি। ছিলাম সবার পেছনে দাঁড়িয়ে।
তারপর বললেন, যেটা আশঙ্কা করছিলাম সেটাই ঘটে গেল। অট্টহাসিনীর আয়ুধ খুব দ্রুতই তার শিকারকে খুঁজে নিল।
বললাম, কিন্তু আপনি বলেছিলেন না, যে ব্যক্তি চ্যাটার্জীবাড়ির ক্ষতি করছে তাকে ইয়ে...বিনাশ করার জন্যই আপনার যজ্ঞ। সুশীলাদিই কি সেই ব্যক্তি? তা কী করে হতে পারে? ও তো ছিল সামান্য একজন নার্স।
কথা বলতে বলতে একতলায় নেমে এসেছিলাম।
চ্যাটার্জী ম্যানসনে একটা এজমালি বাইসাইকেল ছিল। সেনব়্যালে কোম্পানির চমৎকার এক সাইকেল। বেরোনোর মুখে, সিঁড়ির নীচে সাইকেলটা রাখা থাকত। যখন যার প্রয়োজন হতো ওটা নিয়ে বেরিয়ে যেত। আবার ফিরে এসে ঠিক ওইখানেই রেখে দিত। কথা বলতে বলতে আমি সাইকেলটা বার করছিলাম। সেটা লক্ষ করে উনি আমাকে জিগ্যেস করলেন, কোথায় যাওয়া হচ্ছে?
বললাম, থানায়। মনে মনে বললাম, আপনি ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন না ঠাকুরমশাই। থাকলে এই প্রশ্নটা করতেন না। মোহিতবাবু সবার সামনেই আমাকে থানায় যাওয়ার কথা বলেছিলেন। আপনিও সেই নির্দেশ শুনতে পেতেন।
দধিবামন অবশ্য আমার মনের কথা শুনতে পেলেন না। বললেন, চলো, তোমার সঙ্গে যাই। ওই যে জিগ্যেস করছিলে না, সুশীলা এই বাড়ির কালসর্প হতে পারে কিনা, যেতে যেতে তোমাকে তার উত্তরটা দিই।
খুবই অবাক হলাম ওঁর এই প্রস্তাবে। কিন্তু আপত্তি করার মতোও কিছু খুঁজে পেলাম না।
ওঁর শারীরিক সক্ষমতা দেখবার মতো। চার ফুট শরীর নিয়ে একটা হালকা লাফে আমার সাইকেলের সামনের রডে উঠে বসলেন। তারপর কয়লার গুঁড়ো আর লাল মোরামের রাস্তা ধরে আমরা চললাম শহরের দিকে...থানার দিকে। যেতে যেতে উনি বললেন, জয়া মায়ের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল শুনেছ নিশ্চয়। সেদিন এক জাতের বিষাক্ত ব্যাঙের ছাতা মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল চাটুজ্জেবাড়ির বাজারের থলিতে।
অবাক হয়ে বললাম, আপনি জানেন?
কেন জানব না? জয়া ছিল আমাদের মেয়ে। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারানোর পর থেকেই ও কানাইবাবু আর তাঁর স্ত্রীয়ের কাছে মানুষ হয়েছিল। কানাইদার বেলিয়াতোরের বাড়িতে আমারও কত বছরের যাতায়াত; আমিও ওনার ফ্যামিলিরই একজন বলতে পারো। বিয়ে হলেই কি জয়া আমাদের পর হয়ে গেল?
কিছু না বলে সাইকেল চালাতে লাগলাম। একটু চুপ করে থেকে দধিবামন আবার বললেন, জয়ার মৃত্যুর পরে কানাইবাবুর মতো ইনফ্লুয়েনসিয়াল লোক একটু খোঁজখবর করবেন না, এটা হয়? খোঁজখবরে কী জানা গিয়েছিল জানো? ওই সুশীলার এক ভাইপো তার আগেরদিন বিকেলে পিসির সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সেই ভালোবেসে সবার জন্যে মাশরুম নিয়ে এসেছিল।
কথাটা শুনে বাস্তবিকই চমকে উঠলাম। বললাম, বলেন কী! তাহলে ওকে, মানে সুশীলাদিকে তখনই চেপে ধরা হল না কেন?
দুটো কারণে কিছু করা গেল না। এক তো এরমধ্যে বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে গিয়েছিল। কেউ যে ওর কাছে এসেছিল, সেই লোকই যে মাশরুম নিয়ে এসেছিল, এসব কথা প্রমাণ করব কেমন করে? আর দুই, মোহিত দাদাবাবুর সুশীলার ওপরে নির্ভরতা চিরকালই বড় বেশি। একথা সত্যি, ওঁর স্ত্রীকে বাঁচিয়ে রেখেছিল ওই সুশীলাই। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর একভাবে একজন রুগির ঘরে বসে থেকে তার সেবা করে যাওয়া কম কথা নয়।
তাই কানাইদা যখন মোহিত দাদাবাবুকে তাঁর সন্দেহের কথা বলেছিলেন, তখন উনি কানাইদার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন দেখুন ছোট বেয়াই, প্রমাণ তো কিছুই পাওয়া যাবে না। মাঝখান থেকে সুশীলাকে পুলিশ উঠিয়ে নিয়ে যাবে আর তার ফলে আমার স্ত্রী প্রাণ হারাবে। আপনি দয়া করে এমন কিছু করতে যাবেন না।
কানাইদাই বা এ-কথা শুনবার পরে আর কী করেন! মেনে নিয়েছিলেন।
কিন্তু ভাই উমা, মানুষে মেনে নিলেও দৈব তো আর মানবে না। যজ্ঞের আগুন থেকে যে অস্ত্রের জন্ম, সে তো কালসর্পকে খুঁজে নিয়ে বধ করবেই। আমাদের প্রার্থনাই তো ছিল তাই।
অনেক কথাই ঘুরছিল মাথার মধ্যে। তবু তখন দধিবামনকে শুধু একটা কথাই বলে উঠতে পারলাম। আপনি সত্যিই বিশ্বাস করেন, ওই ছুরির হাতলে কোনো মানুষের হাত ছিল না? ছুরিটা নিজে থেকেই সুশীলার গলা কেটে দিয়েছে?
আরে! তোমার সেই ব্যাপারে অবিশ্বাস আছে নাকি? শহুরে ছেলেদের এই এক দোষ! বড্ড বেশি অবিশ্বাস তোমাদের। আচ্ছা, তুমি তো আজ প্রথম থেকেই ওই ঘরের দরজায় দাঁড়িয়েছিলে। বলো তো, যে ঘরের দুটো দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, যে ঘরের জানলা দুটোও ভেতর থেকে বন্ধ, যে ঘরে একটা হসপিটাল-কট আর একটা দু’ফুট উঁচু ছোট কাবার্ড ছাড়া আর মাত্র দুটো মোড়া রয়েছে, অর্থাৎ একটা বেড়ালেরও লুকিয়ে থাকার জায়গা নেই যেখানে, সেখানে কোনো বাইরের মানুষ ঢুকে খুন করবে কেমন করে? যদি ঢুকতই বা, মোহিত দাদাবাবু দরজা ভাঙার পরে সেই খুনি গেল কোথায়? হাওয়ায় উবে গেল নাকি?
আমি বললাম, ছুরিটাই বা ঘরে ঢুকল কোথা দিয়ে?
দধিবামন এবার রেগে গেলেন। বললেন, বারবার অমন অশ্রদ্ধা ভরে ছুরি ছুরি বোলো না। অস্ত্রটি দেবীর অংশ। কোনো ইট কাঠ পাথরের দেয়াল কি ওনার গতিরোধ করতে পারে? বলে কিনা মানুষের হাত! আরে, মানুষের হাতই যদি অস্ত্রটিকে ধরবে, তাহলে অস্ত্রের গায়ে তো সেই হাতের ছাপও থাকবে।
নেই? আমি সাবধানে জিগ্যেস করলাম।
নাঃ। কোথায় রয়েছে? তুমি দেখো গিয়ে।
আপনি দেখেছেন?
উত্তর দেওয়ার আগে দধিবামন অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। ভুল চাল দিয়ে ফেলার পরে একজন দাবাড়ু যেভাবে অনেকক্ষণ ধরে নিঃশব্দে বোর্ডের চেহারাটা জরিপ করে। তারপর বললেন, না দেখলেও আমি জানি, কোনো আঙুলের ছাপ-টাপ থাকবে না। মনে রেখো, আমারই যজ্ঞ থেকে ওই আয়ুধের জন্ম।
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। ইতিমধ্যে আমরা জনকপুরের বাজার এলাকায় ঢুকে পড়েছিলাম। আর কিছুটা গেলেই থানা। উনি বললেন, চলো, বাকি রাস্তাটুকু হেঁটেই যাই। আসলে বিকেলের চা-টা জোটেনি তো আজ। এক ভাঁড় করে চা খেয়ে নিলে নিশ্চয় খুব দেরি হয়ে যাবে না।
একটু অবাক হয়েই বললাম, আপনি এখানকার থানাও চেনেন?
দধিবামন হেঃ হেঃ করে একটু হাসলেন, বিনয়ের হাসি। তারপর বললেন, জয়া এই শহরে বউ হয়ে এসেছিল কত বছর আগে? পনেরো বছর, তাই না? তখন থেকেই শহরটায় আসা-যাওয়া। কাজেই এখানকার সবই ধরো চিনি।
চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে উনি বললেন, পুলিশকে ওনারা ডাকছেন ঠিকই। তবে এই কেসে পুলিশের কিছু করার নেই। দু’-চার বছর দেখবে। তারপর ফাইল চাপা দিয়ে দেবে। অলৌকিক ঘটনা ছাড়া এটাকে তো আর কোনোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে না, তাই না? তুমি হলে পারতে?
আমি চায়ের দাম মিটিয়ে দিয়ে সাইকেলটা টেনে নিলাম। ওখান থেকে জনকপুর থানার গেট দেখা যাচ্ছিল। দধিবামনের প্রশ্নের উত্তরে বললাম, পারতাম।
কী পারতে? দধিবামন সতর্ক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকালেন।
বললাম, বন্ধ ঘরের মধ্যে সুশীলাদির হত্যা-রহস্যের অন্তত দুটো সম্ভাব্য সমাধান এখনই দিতে পারি।
বিনায়ক এতক্ষণ যেন নিশ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিল। একমনে শুনে যাচ্ছিল চৌবেসাহেবের কথা। এবার নড়েচড়ে বসল। বলল, আমাকে একটা চান্স দিন স্যার, প্লিজ। একবার চেষ্টা করে দেখি, দুটো সমাধান আমিও দিতে পারি কিনা।
চৌবেসাহেব স্মিত হেসে বললেন, বলো।
বিনায়ক অত্যন্ত সিরিয়াস মুখ করে বলল, তার আগে আরেকবার পুরো সিচ্যুয়েশনটা ঝালিয়ে নিই। দেখুন, কিছু ভুল বুঝেছি কি না। দোতলার টানা বারান্দা, তার গায়ে সারি সারি ঘর। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই বাঁ-দিকে প্রথম ঘরটা বাড়ির মালিক মোহিতলাল চ্যাটার্জীর শোয়ার ঘর। সেই ঘরের দুটো দরজা—একটা বারান্দার দিকে, যেটা দিয়ে আপনি ঢুকেছিলেন। অন্য দরজাটা দিয়ে পাশের ঘরে, মানে মোহিতবাবুর স্ত্রী বন্দনা চ্যাটার্জীর ঘরে যাওয়া যায়।
আপনি যখন দোতলায় পৌঁছলেন, জাস্ট তখনই মাঝের দরজাটা ভেঙে মোহিতবাবু পাশের ঘরে ঢুকেছেন। সেই ঘরে আসবাব এতই সামান্য যে তার আড়ালে কোনো মানুষের লুকোনোর মতো জায়গা ছিল না। সবক’টা দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, তাই বাইরে থেকেও কারও পক্ষে ঘরে ঢুকে সুশীলাকে খুন করে আবার বাইরে বেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব। তবুও আপনি দেখলেন, বন্দনাদেবীর সর্বক্ষণের নার্স সুশীলা রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝের ওপরে পড়ে আছে। তার গলাটা কেউ ছুরি চালিয়ে কেটে দিয়েছে।
দুটো ঘরের মাঝখানের দরজাটার ভাঙা পাল্লার সামনে হতভম্ব অবস্থায় দাঁড়িয়েছিলেন মোহিতবাবু। বন্দনাদেবীর ঘরটা ওখানে দাঁড়িয়েই দেখা যাচ্ছিল। ওই ঘরে তিনি যেমন অচৈতন্য অবস্থায় শুয়ে থাকেন, সেইভাবেই হসপিটাল-কটের ওপরে শুয়েছিলেন। আর তৃতীয় কোনো জীবিত ব্যক্তি ওই ঘরে ছিল না। তাহলে প্রশ্ন, সুশীলাকে খুনটা করল কে? ক্যান উই কল ইট এ লকড রুম মার্ডার মিস্ট্রি?
বললাম, ইয়েস, ইউ ক্যান। বন্ধ ঘরের হত্যা রহস্য।
বিনায়ক বলল, আপনি যখন বলছেন, ঘরের আসবাবের আড়ালে কেউ লুকিয়ে ছিল না, তখন ধরে নিচ্ছি কথাটা ঠিক।
বললাম, তুমি নিজেই ভেবে দ্যাখো না, একটা হসপিটাল-কট, একটা চৌকি, একটা আলনা—এর মধ্যে একজন মানুষ লুকিয়ে থাকবে কোথায়?
কেন? ওই আলনাটার আড়ালে... বলতে শুরু করেছিল বিনায়ক। আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, মাত্র একজন মহিলার কাপড় রাখার আলনা। শুধু সুশীলাদির জামা-কাপড়ই থাকত ওখানে। সে আর ক’টা হবে? তার কোনো আড়াল হয় না। চৌকির নীচটাও আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম, ফাঁকা।
বেশ। এবার তাহলে যে-দুটো সম্ভাবনার কথা বলছিলাম, সে-দুটো বলি। দেখুন তো, আমার আইডিয়া আর আপনার আইডিয়া মিলছে কি না। বিনায়ক বলল।
বিনায়ক দেখলাম বেশ টেন্সড হয়ে রয়েছে। বললাম, বলো শুনি, তুমি কী ভাবছ!
ও বলল, আপনিই কিন্তু বারবার বলেন, শুনতে যতই অসম্ভব হোক, কোনো সম্ভাবনাকেই হিসেবের মধ্যে থেকে বাদ দেবে না। কাজেই আমি যা বলছি তা শুনে কিন্তু হাসতে পারবেন না।
না না, হাসব না। তুমি নিশ্চিন্তে বলো।
এক্ষেত্রে প্রথম সম্ভাবনা, মোহিতবাবুর স্ত্রী বন্দনাদেবীকে সবাই প্যারালাইজড বলে জানলেও তিনি আদৌ প্যারালাইজড ছিলেন না। তিনি ভান করতেন। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বন্দনাদেবীই সেদিন তাঁর নার্স সুশীলাকে খুন করেছিলেন। তারপর আবার বিছানায় উঠে চাদর ঢাকা নিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন।
ব্রিলিয়ান্ট! আর দু’নম্বর সম্ভাবনা?
আমার প্রশংসায় বিনায়কের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, দ্বিতীয় সম্ভাবনা, বন্দনাদেবী নন, নাটকটা করেছিলেন মোহিতবাবু। তিনিই বাইরে থেকে দরজা ভেঙে প্রথমে সুশীলার গলায় ছোরা বসিয়েছিলেন। তারপর পায়ে পায়ে পিছিয়ে এসে ভাঙা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে শুরু করেছিলেন, যেন দরজা ভেঙেই দেখেছেন, সুশীলা মরে পড়ে আছে। আপনি বলেছেন, দোতলায় উঠে দেখেছিলেন মোহিতবাবু হতভম্ব মুখে ঘরের ভিতরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু সেটা তাঁর অভিনয় হতে পারে। জগদীশ মাহাতো তো আপনাকে প্রথম দিনেই জানিয়েছিলেন, যুবক বয়সে মোহিতবাবু কলকাতার স্টেজে, এমনকী সিনেমায় অবধি অভিনয় করেছিলেন। কাজেই এইটুকু অভিনয় তো ওঁর পক্ষে কিছুই নয়।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে বিনায়কের পিঠ চাপড়ে দিলাম। বললাম, ব্রাভো, বিনায়ক। ব্র্যাভো। বিশ্বাস করবে না, আমি সেদিন জনকপুর থানায় ঢুকবার আগে দধিবামনকে ঠিক এই দুটি সম্ভাবনার কথাই বলেছিলাম। তবে তাতে যে খুব একটা লাভ হয়েছিল তা নয়।
আচ্ছা, এবার তাহলে আবার সেই সময়টায় ফিরে যাই, যখন আমি আর দধিবামন খুনের খবর নিয়ে জনকপুর থানায় ঢুকলাম।
জনকপুর থানায় তখন সবেমাত্র এক নতুন অফিসার ওসির দায়িত্ব নিয়েছেন। একেবারেই কম বয়স, পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশের বেশি হবে না। শিক্ষিত, সুপুরুষ। নাম যোগব্রত রায়। আসানসোলে বাড়ি। কালক্রমে এই যোগব্রত রায়ের সঙ্গে আমার দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। আমার পুলিশে চাকরি নেওয়ার পেছনে যোগোদার বিশাল ভূমিকা ছিল। সেসব কথা পরে বলছি। আপাতত সেদিন যা যা হল, সংক্ষেপে বলি।
জনকপুর থানার পুলিশের টিম আমাদের কাছে খবর পাওয়ামাত্রই চ্যাটার্জী ম্যানসনে চলে এল। সেদিন তেইশ বছর বয়সে যে পুলিশ-প্রসিডিওর বিস্ফারিত নেত্রে দেখেছিলাম, পরে সেগুলোই আমার জীবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। ঘণ্টা-তিনেকের মধ্যে আসানসোল থেকে ফরেনসিকের একটা টিমও চলে এল।
তুমি শুনলে খুশি হবে, এইমাত্র তুমি যে সম্ভাবনা দুটোর কথা বললে সেই দুটো সম্ভাবনাই সেদিন ওসি যোগব্রত রায়ের মাথাতেও এসেছিল। তার মধ্যে প্রথম সম্ভাবনাটার কথা বাদ দিতে হল, কারণ, সরকারি হাসপাতালের একজন ডাক্তারকে দিয়ে ওঁরা বন্দনাদেবীকে পরীক্ষা করিয়েছিলেন এবং তাতে দেখা গিয়েছিল বন্দনাদেবীর প্যারালিসিস মোটেই অভিনয় নয়। উনি নড়াচড়া করতে তো পারেনই না, মস্তিষ্কও অকেজো। ওঁর পক্ষে খুন করা কেন, বিছানায় পাশ ফিরে শোয়াও সম্ভব নয়। অতএব পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য একজন অপরাধীর দিকেই অঙ্গুলিনির্দেশ করছিল—তিনি হলেন মোহিতলাল চ্যাটার্জী।
গল্পের গোয়েন্দারা যেভাবে এজাহার নেন সেইভাবেই যোগব্রত রায় একটা ফাঁকা ঘরে আমাদের একজন একজন করে ডেকে এজাহার নিচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কেবল একজন স্টেনোগ্রাফার। এক্ষেত্রে আমার সাক্ষ্যই সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছিল। কারণ, মোহিতবাবুর চিৎকার শুনে আমিই সবার আগে দোতলায় পৌঁছেছিলাম।
বললাম, দরজা পেটানোর শব্দে কীভাবে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সেই শব্দ কতক্ষণ ধরে চলছিল তা বলতে না পারলেও আমার ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই যে শব্দটা থেমে গিয়েছিল সেটা বললাম। শুনতে পেয়েছিলাম, মোহিতবাবু চিৎকার করে বলছেন—সুশীলা, সুশীলা! কী করছিস তুই? দরজা খোল। তারপরেই আরো তিন-চারবার প্রবল ধাক্কার শব্দ আর শেষমেশ বুঝতে পারলাম, পাল্লাদুটো ভেঙে পড়ল। ঠিক তখনই আমি সিঁড়ির দিকে দৌড়তে শুরু করেছিলাম।
আমার কথা শুনে ওসি সাহেব বললেন, তোমার কী মনে হয়? ওই দরজা ভাঙার শব্দ আর তোমার দোতলায় গিয়ে পৌঁছনো, এর মাঝের সময়টুকুতে কেউ ওই ঘরে ঢুকে, খুনটা করে আবার বেরিয়ে যেতে পারে?
অর্থাৎ তুমি বুঝতেই পারছ বিনায়ক, ওসি সাহেব আরেকটা তৃতীয় সম্ভাবনার কথা ভাবছিলেন। সেটা হল, মোহিত চ্যাটার্জী নিজের হাতে দরজা ভাঙেননি, নিজের হাতে খুনও করেননি। তিনি শুধু অন্য কাউকে খুনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যে অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু এই সম্ভাবনাটাও দাঁড়ায় না। দরজা ভাঙার শব্দ আর আমার দোতলায় পৌঁছনোর মধ্যে বড়জোর তিন মিনিট সময় কেটেছিল। অতটুকু সময়ের মধ্যে কারও পক্ষে ঘরে ঢুকে খুন করে লম্বা বারান্দাটা পেরিয়ে লুকিয়ে পড়া সম্ভব নয়; সেরকম কিছু হলে আমি নিশ্চিতভাবেই খুনিকে দেখতে পেতাম। সেটাই বললাম ওসি যোগব্রত রায়কে।
ওঁর ভুরু দুটো কুঁচকে গেল। স্বগতোক্তি করলেন, তাহলে তো আর... কথাটা শেষ না করেই থেমে গেলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আচ্ছা, তুমি এবার আসতে পারো।
মাথায় যে কী দুর্বুদ্ধি ভর করল, বলে বসলাম, সারকামস্টানসিয়াল এভিডেন্স থেকে তো তাহলে মোহিতবাবুকেই মার্ডারার বলে মনে হচ্ছে, তাই না?
উনি গম্ভীরভাবে আমার মুখের দিকে তাকালেন। বললেন, খুব ডিটেকটিভ গল্প পড়া হয় বুঝি? ফেভরিট ডিটেকটিভ কে? শার্লক হোমস না আগাথা ক্রিস্টি?
উত্তর দিলাম, আজ্ঞে ওই দু’জনের মধ্যে কেউই নন। ইনস্পেক্টর মেইগ্রে এবং ফাদার ব্রাউন।
একটা নিশ্বাস ফেলে উনি বললেন, বুঝলাম। একটু অ্যাডভান্সড লেভেলের গোয়েন্দাগিরি পছন্দ করো। এই কেসটার ব্যাপারে তোমার ধারণা কী? চোখ দেখে বুঝতে পারছিলাম, উনি আমাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেন।
বললাম, আপনার ফরেনসিক-এক্সপার্টরা শুধুমাত্র বন্দনাদেবীর ঘর থেকে স্যাম্পেল কালেক্ট করছেন কেন?
তাইই তো করবে। ওটাই তো সিন অফ মার্ডার। যোগব্রতবাবু একটু অসন্তুষ্ট স্বরেই উত্তর দিলেন।
বললাম, সিন অফ মার্ডার থেকে একটা অংশ যদি অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়, সেই জায়গাটা স্ক্যানারের নীচে আনবেন না?
মানে?
মানে বন্দনাদেবীর বিছানা...হসপিটাল-কট। ওটাকে ফরেনসিক-এগজামিশনের আওতায় আনা প্রয়োজন নয়?
উনি অন্তত আধ মিনিট আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি ওঁর চোখ থেকে চোখ সরালাম না। তারপর হঠাৎ উনি হেসে উঠে বললেন, থ্যাঙ্কিউ। তুমি ঠিকই বলেছ। আমি ওদের বলে দিচ্ছি।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। উনি বললেন, শোনো। কাল একবার থানায়...না না, থানায় নয়, আমার বাসায় এসো। আসলে এই বাড়িতে আর যাঁরা রয়েছেন, আমি তাঁদের কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না। তুমি হচ্ছ একমাত্র ব্যক্তি, চ্যাটার্জী ম্যানসনের সঙ্গে যার কোনো স্বার্থ জড়িত নেই অথচ যে অনেক কিছুই জানে, অনেক কিছুই দেখেছে।
উত্তর দিলাম, যাব স্যার। অবশ্যই যাব।
ঠিক এইখানে বিনায়ক আমার কথার মধ্যেই বলে উঠল, একটা কথা জিগ্যেস করি, স্যার। মোহিতবাবু আপনাকে বলেছিলেন ফেরার পথে জগদীশ মাহাতোকে ডেকে নিয়ে যেতে। গিয়েছিলেন?
বললাম, হ্যাঁ। তবে সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। মোহিতবাবু ওঁকে আরেকজন বিশ্বাসযোগ্য এবং কমপিটেন্ট নার্স জোগাড় করে দিতে বলেছিলেন। তা উনি দিয়েওছিলেন।
তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সেদিনই সন্ধের দিকে মোহিতলাল চ্যাটার্জীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করল। তাছাড়া উপায়ও ছিল না। ওই যে আগেই বললাম, সারকামস্টানসিয়াল-এভিডেন্স অর্থাৎ পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য তাঁর বিরুদ্ধে গিয়েছিল।
মোহিতবাবু ছিলেন শহরের একজন মানী লোক, শ্রদ্ধেয় মানুষ। তাঁর গ্রেপ্তারির খবরে জনকপুরের বাসিন্দারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হল। ছাত্র, শিক্ষক, কোলিয়ারির কর্মচারী-সংগঠন সবাই আলাদা আলাদাভাবে থানায় গিয়ে বিক্ষোভ দেখাল। গতিক দেখে যোগব্রতবাবু তাঁকে আর জনকপুর থানায় রাখার রিস্ক নিলেন না, সরাসরি আসানসোলে চালান করে দিলেন। এমনিতেই তো পরদিন তাঁকে আসানসোল কোর্টে প্রোডিউস করার কথা ছিল, সেটাকেই কারণ হিসেবে দেখানো হল।
তাঁকে পুলিশে নিয়ে যাবার আধঘণ্টার মধ্যে বাড়ি খালি করে কানাইবাঁশি লাহিড়ী, তাঁর স্ত্রী, পুত্র, সেক্রেটারি প্রফুল্ল প্রামাণিক এবং দধিবামন সকলেই বাঁকুড়ায় ফিরে গেলেন। তবে যাবার আগে তাঁদের থানায় মুচলেকা দিয়ে যেতে হল, তদন্তের স্বার্থে যখনই ডাকা হবে, তাদের জনকপুরে উপস্থিত হতে হবে।
পরদিন সন্ধে সাতটা নাগাদ হাঁটতে হাঁটতেই চলে গেলাম জনকপুরের একপ্রান্তে শালগোড়া বলে একটা জায়গায়। এককালে ওখানে কয়লাখনির সাহেবদের জন্যে পাশাপাশি দশ-বারোটা বাংলো তৈরি হয়েছিল। এখন সেই বাংলোগুলিতেই সরকারি অফিসারদের বাস। তার মধ্যে যেটির দেউড়ির নেমপ্লেটে যোগব্রত রায়ের নাম দেখলাম, সেটার কম্পাউন্ডে ঢুকে পাহারাদারকে বললাম, সাহেবকে গিয়ে বলো, উমাশঙ্কর চৌবে দর্শনপ্রার্থী।
যোগব্রতবাবু নিজেই বারান্দায় বেরিয়ে এসে আমাকে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলেন। বসার ঘরে ঢুকে প্রথমেই তাঁর বইয়ের কালেকশন দেখে মুগ্ধ হলাম। বুঝতেই পারছিলাম রীতিমতো শিক্ষিত লোক তিনি। তারপর আলাপ হল তাঁর স্ত্রী আর ন’বছরের কন্যা জপমালা অর্থাৎ ঝুপুর সঙ্গে। সেই যে পরিবারটির সঙ্গে এক প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হলাম, সেটা আর সারাজীবনে নষ্ট হয়নি। যোগোদা আর বউদি গত হয়েছেন। কিন্তু ঝুপুর সঙ্গে আমার এখনও দিব্যি যোগাযোগ রয়েছে। সেদিনের জোড়াবেণি দোলানো বাচ্চা মেয়েটা এখন অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস সার্ভিসের প্রবীণ অফিসার। দেরাদুনে পোস্টেড।
যাই হোক, সেদিন জনকপুর থানার ওসি যোগব্রত রায় সরাসরি আমার সাহায্য চাইলেন। বললেন, উমাশঙ্কর! সূর্যাস্ত হয়ে গিয়েছিল বলে গতকাল পোস্টমর্টেম করানো যায়নি, আজ হল। কাল বিকেলের আগে রিপোর্ট পাব না। ফরেনসিক-রিপোর্ট পেতেও হপ্তাখানেক সময় লাগবে। কিন্তু এটা যে একটা মার্ডার কেস সে ব্যাপারে তো সন্দেহ নেই। এবং খুনটা যে করেছেন মোহিতবাবু, সে ব্যাপারেও আমি নিশ্চিত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে খুনের মোটিভটা কী? সেটা না জানতে পারলে তো চার্জশিট দুর্বল হয়ে যাবে। একজন সাধারণ খেটে খাওয়া মহিলা, তাকে মোহিতবাবু খুন করতে যাবেন কেন? তুমি কি এ ব্যাপারে কোনো আলোকপাত করতে পারো? তুমি ওই বাড়িতে বাস করো বলেই তোমার কাছে জানতে চাইছি।
বললাম, অন্যদের জেরা করে কী জানলেন? কানাইবাবু আর তাঁর স্ত্রী তো চ্যাটার্জীদের আত্মীয়। বহু বছরের যাতায়াত। ঝন্টুবাবুও সুশীলাদিকে প্রথম থেকেই দেখছেন। তাঁরা কিছু বলতে পারলেন না?
উনি উত্তর দিলেন, বলতে পারলেন না কিংবা বলতে চাইলেন না। মোট কথা, বাকি কারও এজাহার থেকে কাজের কথা কিছুই বার করতে পারিনি। কানাইবাবু এবং তাঁর সেক্রেটারি, পুরোহিত এবং পরিবার, তাঁরা সবাই বলছেন খুনটা যখন হয়, তখন তাঁরা নীচের ঘরে ছিলেন। ঝন্টুবাবু ছিলেন দালানের একদম অন্য প্রান্তে একটা ঘরে। বাচ্চা ছেলেটি...কী যেন নাম...হ্যাঁ, মধুময়। সে ছিল ছাদের ঘরে। এদের প্রত্যেকের অ্যালিবাই অকাট্য।
আর মোহিতবাবু? তিনি নিজে কী বলছেন?
তিনি বারবারই এক কথা বলছেন। সারাদিনের পরিশ্রমের ফলে তাঁর একটু চোখ লেগে এসেছিল। দুটো ঘরের মাঝখানের দরজাটা তার কিছুক্ষণ আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল সুশীলা। সেটা আশ্চর্য কিছু নয়। দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবারই ঘরটার দুটো দরজাই ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে সে মোহিতবাবুর স্ত্রীর জামাকাপড় বদলায়। সেরকমই কিছু করছিল নিশ্চয়। হঠাৎই মোহিতবাবুর মনে হল, সুশীলা বেশ উঁচু গলায় কাউকে বলল, না। কিছুতেই সম্ভব না।
কথাগুলো মোহিতবাবুর ঠিক মনে আছে? ঠিক এটাই শুনেছিলেন উনি?
উনি তো তাই বলছেন। বলছেন, তখনই উনি সচকিত হয়ে বিছানার ওপরে উঠে বসেন। এক মুহূর্ত সব চুপচাপ! তারপরেই আবার সুশীলার গলা পান। ভয়ার্ত এক স্বর। প্রচণ্ড আতঙ্কে যেন সুশীলা চেঁচাতেও ভুলে গেছে। যেন কাউকে মিনতি করছে—না না না না না!
শুনেই মোহিতবাবু খাট থেকে নেমে ওই মাঝের দরজার সামনে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দেন। দ্যাখেন, ভেতর থেকে দরজায় খিল তোলা। উনি দৌড়ে বারান্দায় বেরোন এবং দেখেন সেদিকের দরজাও একইভাবে ভেতর থেকে বন্ধ। তখন উনি আবার নিজের ঘরে ফিরে এসে, বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন, সুশীলা, সুশীলা! কী করছিস তুই? দরজা খোল। তুমি ঠিক এই কথাগুলোই তোমার একতলার ঘরে বসে শুনতে পেয়েছিলে, তাই না?
আমি মাথা নেড়ে জানালাম, হ্যাঁ।
ওসি সাহেব বলে চললেন, সুশীলার সাড়া তো তিনি পেলেনই না। উপরন্তু একটা ঘড়ঘড়ানি শুনতে পেলেন তিনি। এখন আমরা বুঝতে পারছি সেটা ছিল সুশীলার মৃত্যু-আক্ষেপ। কিন্তু মোহিতবাবু আওয়াজটা শুনে ভেবেছিলেন তাঁর স্ত্রী বন্দনাদেবী মারা যাচ্ছেন। তাই সর্বশক্তিতে দরজায় ধাক্কা দিয়ে দরজাটা ভেঙে ফেলেন এবং দ্যাখেন...যা দ্যাখেন সে তো তুমি জানোই। তুমিও তার একটু পরেই ওখানে পৌঁছে গিয়েছিলে।
মোহিতবাবুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আর কী জানলেন? ঘরের ভেতর থেকে সুশীলা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো মানুষের গলার আওয়াজ পাননি তিনি? আমি প্রশ্ন করলাম।
ওসি সাহেব বললেন, না। সেইজন্যেই মনে হচ্ছে উনি মিথ্যে কথা বলছেন। আর কেউ যদি ঘরের ভেতরে না-ই থাকবে, তাহলে সুশীলা কোন প্রস্তাবের উত্তরে বলেছিল, না, কিছুতেই সম্ভব না। এখানে মোহিতবাবু নিজের মিথ্যে কথার জালে নিজেই জড়িয়ে গেছেন।
ওসি সাহেবের এই কথাটা মানতে পারলাম না। বললাম, হয়তো উনি ঘুমোচ্ছিলেন বলে সেই দ্বিতীয় ব্যক্তির কথাগুলো শুনতে পাননি। সে হয়তো খুব আস্তে বলেছিল কথাগুলো, তাই ওনার ঘুম ভাঙেনি। ঘুম ভেঙেছিল সুশীলার উঁচু গলায় বলা উত্তরটা শুনে।
যোগব্রত রায় চোখ কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি এখনো ভাবছ, ঘরের ভেতরে সুশীলা এবং বন্দনাদেবী ছাড়া তৃতীয় কেউ ছিল, যে খুনটা করেছে? যদি থাকেই, সে গেল কোথায়? হাওয়ায় উবে গেল নাকি?
বললাম, আর কিছুদিন যাক না স্যার। হয়তো এর একটা উত্তর অন্য কোথাও থেকে বেরিয়ে আসবে। আপনি একটু আগে বলছিলেন, সুশীলাদির মতো একজন সাধারণ খেটে খাওয়া মহিলাকে কে খুন করবে? খুনের পেছনে কী মোটিভ থাকতে পারে? এখন বরং সেই বিষয়েই দুটো কথা বলি। শুনলে আপনি বুঝবেন, সুশীলাকে যতটা সাধারণ মহিলা মনে করছেন, সে হয়তো অতটা সাধারণ ছিল না।
যোগব্রত রায় চেয়ারটা আমার দিকে একটু টেনে নিয়ে বললেন, বলো শুনি।
বললাম, মোহিতবাবুর নাতি মধুময় অর্থাৎ বুলান যে গতবছরে দু’দিনের জন্যে হারিয়ে গিয়েছিল সেটা কি আপনি জানেন?
যোগব্রতবাবু ভারি অবাক হয়ে বললেন, না তো! আমি অবশ্য জয়েন করেছি মাত্র তিন মাস আগে। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। থানার রেকর্ডে তো এরকম কোনো মিসিং ডায়েরি নেই।
বললাম, মোহিতবাবু মিসিং ডায়েরি করেননি। ব্যাপারটা অনেকটা তাঁর ইচ্ছেতেই ধামাচাপা পড়ে গিয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, পড়া উচিত হয়নি। সেদিনের ঘটনার কথা যতটা জানতে পেরেছি, আপনাকে বলছি। শুনলে আপনিও নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে সহমত হবেন।
দিনটা ছিল রবিবার। বুলান সন্ধে হবার মুখে একাই একটা বই কেনার জন্যে বাজারের দিকে যাচ্ছিল। চ্যাটার্জী ম্যানসন থেকে বাজার যাওয়ার রাস্তার মধ্যে লোহাপট্টি বলে একটা জায়গা পড়ে, আপনি জানেন নিশ্চয়ই। যেখানে রাস্তার দু’দিকে কয়েকটা কামারশালা রয়েছে। সবসময়েই ধোঁয়া জমে থাকে জায়গাটায়। সাধারণ কয়লার ধোঁয়া। কিন্তু সেদিন বুলান ওখানে পৌঁছতেই একটা মিষ্টি গন্ধ পায় এবং তারপরেই জ্ঞান হারায়। জ্ঞান ফিরলেও আচ্ছন্নতা কাটেনি। তাই ওর প্রায় কিছুই মনে নেই। শুধু এইটুকু মনে আছে, ও যেখানে ছিল, সেখানে এক মহিলা ওর যত্ন নিচ্ছিলেন।
বুলানকে পাওয়া গিয়েছিল পাক্কা দু’দিন বাদে, সাধু চাঁড়ালের বনে, ওইরকম আচ্ছন্ন অবস্থাতেই।
যোগব্রতবাবু ভারি অবাক হয়ে বললেন, এ তো ক্লিয়ার কেস অফ কিডন্যাপিং! বাড়ির লোক কিছু করল না? এত ক্ষমতাবান লোক ওঁরা।
আমি বললাম, দেখুন স্যার। বাচ্চাটার মা নেই। বাবাকেও ঠিক স্বাভাবিক বলে মনে হয় না। এমনকী বেচারার ঠাকুমা অবধি পক্ষাঘাতে জড় পদার্থের জীবন কাটাচ্ছেন। এঁরা যদি থাকতেন তাহলে নিশ্চয় একটা হইহল্লা হতো। কিন্তু তাঁরা তো নেই। থাকবার মধ্যে একমাত্র ওর দাদু, মোহিতলাল চ্যাটার্জী। তিনি যে কেন ব্যাপারটা এত সহজে ছেড়ে দিলেন, সেটাই তো রহস্য। শুধু ছেড়েই দেননি, যা জেনেছি তাতে মনে হয়েছে তাঁর উদ্যোগেই ঘটনাটার ওপরে একটা অলৌকিকের আবরণ পড়েছিল।
যোগব্রত রায় কিছুক্ষণ মুঠোর ওপরে চিবুক রেখে গভীরভাবে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, সুশীলার সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক কী?
বললাম, যারা বুলানকে কিডন্যাপ করেছিল তারা একদম শিওর ছিল যে, ওইদিনই বুলান বিকেলে বাজারে যাবে। না হলে অজ্ঞান করার ওষুধ নিয়ে, গাড়ি নিয়ে, একদম ঠিক জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে থাকা ওদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কেমন করে তারা জানল বুলান কখন কোথায় যাবে?
আমি বুলানকে জিগ্যেস করেছিলাম, ও যে সেদিন বিকেলে বই কিনতে বাজারের দিকে যাবে সেটা কে কে জানতেন। ও উত্তর দিয়েছিল, একমাত্র ওর দাদু জানত। কারণ, মোহিতবাবু যেহেতু সেদিন ব্যবসার কাজে কলকাতা যাচ্ছিলেন, তাই ও সকালেই নিজের প্রয়োজনের কথা বলে তাঁর কাছ থেকে বই কেনার টাকা নিয়ে রেখেছিল।
বুলান ওর শিশুর বুদ্ধিতে ঠিকই বলেছিল। দাদুর ঘরে দাঁড়িয়ে দাদুকে যদি বিকেলে বাজারে যাওয়ার কথা বলে তাহলে তো আর কারও জানার কথা নয়। কিন্তু আমরা জানি কথাটা আর একজনের কানে যেতে পারত...শুধুমাত্র আর একজনের কানেই। অ্যান্ড সুশীলা ইজ দ্যাট পারসন। কারণ সে ছিল ঠিক পাশের ঘরেই। মাঝখানের দরজাটা বন্ধ না থাকলে এ-ঘরের কথা ও-ঘরে পরিষ্কার শোনা যায়, আমি পরখ করে দেখেছি। এমনকী দরজা বন্ধ থাকলেও শোনা যায়।
সেই জন্যেই আমি নিশ্চিত, কিডন্যাপারদের কানে বুলানের গতিবিধির কথা পৌঁছে দিয়েছিল ওই সুশীলাই।
যোগব্রতবাবু বললেন, সেটা খুবই সম্ভব। আর কিছু?
হ্যাঁ। মোহিতবাবুর পুত্রবধূ অর্থাৎ জয়া চ্যাটার্জীর মৃত্যু হয়েছিল বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে। সাধারণ মাশরুমের মধ্যে কোনোভাবে বিষাক্ত মাশরুম মিশে গিয়েছিল। ঘটনাটাকে অ্যাকসিডেন্ট বলেই ধরা হয়। কিন্তু এখানেও আমার একটু খটকা রয়েছে।
কেন? প্রশ্ন করলেন ওসি সাহেব।
বললাম, জয়াদেবীর মৃত্যুর পরে পুলিশি তদন্ত হয়নি ঠিকই। কিন্তু তাঁর কাকা কানাইবাঁশিবাবু নিজের উদ্যোগে কিছু খোঁজখবর নিয়েছিলেন এবং তার ফলে জানতে পেরেছিলেন, সেদিন ওই বিষাক্ত মাশরুম, চ্যাটার্জী ম্যানসনে পৌঁছে দিয়েছিল যে ছেলেটি, সে সম্পর্কে সুশীলার ভাইপো। বাঁকুড়ার গ্রাম থেকে পিসির কাছে বেড়াতে আসার সময় আহ্লাদ করে মাশরুম, যাকে গ্রামাঞ্চলে বলা হয় দুর্গাছাতু, নিয়ে এসেছিল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, এই তথ্যটা পেয়েছি দধিবামন মশাইয়ের কাছ থেকে। কতটা বিশ্বাসযোগ্য জানি না। তবে যদি সত্যি হয়, তাহলে সুশীলাকে আর অতটা নিরীহ বলা যাচ্ছে না। অতএব তার খুন হওয়ার সম্ভাবনা ছিলই।
যোগব্রতবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে অস্থির পায়ে ঘরের মধ্যেই কিছুক্ষণ পায়চারি করলেন। তারপর আবার চেয়ারে এসে বসলেন। বললেন, যে মহিলা তাঁর নাতিকে কিডন্যাপ করাল, তারও আগে যে মহিলা তাঁর পুত্রবধূকে খুন করাল, তাকে মোহিতবাবু নিজের ঘরে অ্যালাউ করছিলেন কেন? দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষার কারণ কী?
আমি এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, জানি না স্যার। মাত্র দুয়েকজনের মুখের কথা শুনে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তবে আপনি চাইলে আরো খোঁজখবর নিতে পারেন। আমি আপনাকে অনুরোধ করব সেটাই করতে। কারণ আমার মন বলছে...
কী বলছে তোমার মন?
বলছে, চ্যাটার্জী ম্যানসনে মৃত্যুমিছিল এখনো শেষ হয়নি। খুব শিগগিরই আরো ভয়ানক কিছু ঘটতে চলেছে ওখানে।
উনি বললেন, তুমি খুব ইন্টেলিজেন্ট ছেলে উমাশঙ্কর। ইউ উড মেক আ ভেরি গুড পুলিশ অফিসার। পুলিশ সার্ভিসের পরীক্ষাগুলো দেওয়ার কথা সিরিয়াসলি ভাবতে পারো।
সেই প্রথম আমি পুলিশে যোগ দেওয়ার প্রস্তাবটা শুনলাম। উড়িয়ে দিতে পারলাম না। কারণ আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম, চ্যাটার্জী ম্যানসনের ঘটনাগুলো আমাকে দূরে ঠেলছে না, আমাকে টানছে। ক্রাইম আমাকে টানছে। আমি কল্পনা করার চেষ্টা করছি বাস্তবে কী হয়েছিল এবং সম্ভবত সফলও হচ্ছি। যাই হোক, তখন অবশ্য যোগব্রত রায়ের কথার উত্তরে শুধু একটু হেসেছিলাম।
আমি যখন দু’ধাপ সিঁড়ি বেয়ে বাংলোর বাগানে নেমেছি, তখন ওসি সাহেব প্রশ্ন করলেন, তুমি এখন জনকপুরেই থাকছ তো?
আমি বললাম, না স্যার! এমনিতেই সামনের সপ্তাহে স্কুলে পুজোর ছুটি পড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বাড়িটার এখন যা অবস্থা, আমার থাকতে মন চাইছে না। আমি কালকেই কলকাতায় ফিরে যাচ্ছি। আসব আবার এক মাস পরে। তখন ঠিক করব আর চ্যাটার্জী ম্যানসনে থাকব, নাকি অন্য কোথাও ঘর খুঁজে নেব।
উনি বললেন, বেশ। আমার এই কোয়ার্টারে একটা সরকারি টেলিফোন আছে। নম্বরটা কাগজে লিখে দিলাম। যখন খুশি ফোন কোরো।
ওঁর হাত থেকে কাগজের স্লিপটা নিয়ে বেরিয়ে এলাম।
সত্যিই পরদিন কলকাতায় ফিরে গিয়েছিলাম। ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস থেকে নেমে হাওড়া স্টেশনের বাইরে ভিড়ে ভিড়াক্কার চত্বরটায় পা দিয়েই কেমন যেন ধাঁধা লেগে গেল। প্রায় পাঁচ মিনিট বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবছিলাম, কোথায় জনকপুরের বাড়ির চারপাশের সেই দিগন্তবিস্তৃত ঊষর ডাঙাজমি, দূরে দূরে একেকটা কোলিয়ারির চানক। কোথায় ঘরের মধ্যে পড়ে থাকা এক মহিলার কণ্ঠনালি কাটা মৃতদেহ, এক নিঃসঙ্গ শিশু, তার জড়বুদ্ধি পিতা, পক্ষাঘাতগ্রস্তা ঠাকুমা। আর কোথায় চারিপাশের এই তুমুল কোলাহল, ভিড়, আলো, বাস-ট্রাম, ট্যাক্সি আর মুটেদের ঠেলাঠেলি। ওখানে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে জনকপুরকে আমার মনে হচ্ছিল এক অলীক স্বপ্ন মাত্র।
অবশ্য পরের দু’-তিনদিনের মধ্যেই আমি আবার কলকাতার জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। হ্যারিসন রোডের একটা মেসবাড়িতে থাকার জায়গা পেয়ে গেলাম। সারাদিন সেই ঘরে বসেই চাকরির পরীক্ষার জন্যে পড়াশোনা করতাম। বিকেল হলেই বাস ধরে চলে যেতাম কখনো দক্ষিণে রবীন্দ্র সদন, কখনো উত্তরে হাতিবাগানের থিয়েটার পাড়ায়। তাছাড়া হাতের কাছেই কলেজস্ট্রিটের বইবাজার তো ছিলই। দিব্যি কাটছিল দিনগুলো।
এর মধ্যে একদিন সেই যে আমার ইউনিভার্সিটির বন্ধু শ্যামল মল্লিক, সে কী যেন কাজে কলকাতায় এসে আমার ঘরেই রাত কাটিয়ে গেল। শ্যামল জিগ্যেস করল, পুজোর ছুটি তো পাঁচদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে রে। তুই আর জনকপুরে ফিরবি না?
একটা আড়মোড়া ভেঙে বললাম, ইচ্ছে করছে না।
ধ্যাৎ, এরকম করিস না। খুনখারাপি পৃথিবীর কোথায় নেই বল তো? তার জন্যে এত ভালো চাকরিটা ছাড়িস না।
বললাম, দেখি ভেবে।
পরের দিন সন্ধেবেলায় আমার সেই মেসবাড়ির মালিকের অফিস থেকে পয়সা দিয়ে একটা কল করলাম। কলটা করলাম যোগব্রত রায়কে। উনি তিনটে খবর দিলেন। এক, আসানসোল কোর্টে প্রথম শুনানিতেই মোহিতবাবু জামিন পেয়ে গেছেন। পাবেন যে সেটা সকলেই জানত। কারণ, ওঁর বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রমাণ আনা যায়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, ওয়েপন অফ মার্ডার, খুনের অস্ত্র, যে জিনিসটা যেকোনো মার্ডার কেসে ভীষণই গুরুত্বপূর্ণ, সেটার গায়ে কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি।
শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ল, দধিবামন আমাকে বলেছিলেন যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যাবে না।
দ্বিতীয় কথা যেটা উনি আমাকে ফোনে বললেন সেটা হল, ফরেনসিক রিপোর্টে বন্দনাদেবীর ঘর থেকে সেরকম কোনো এভিডেন্স পাওয়া যায়নি। মেঝেতে অনেকেরই পায়ের ছাপ ছিল। আসবাবপত্রের ওপরে ছিল অনেকেরই হাতের ছাপ। কিন্তু সেই সবই চ্যাটার্জী ম্যানসনে যারা সেদিন উপস্থিত ছিলেন তাদের হাত বা পায়ের ছাপ। সেটাই স্বাভাবিক। যেহেতু বাড়িতে সেদিন পুজো ছিল, তাই বন্দনাদেবীর থেকে যারা বয়সে ছোট তারা সকলেই তাকে কোনো না কোনো সময়ে প্রণাম করার জন্যে ঘরে ঢুকেছিল। আমিও ঢুকেছিলাম এবং আমার হাতের ছাপও পাওয়া গেছে ওখানে। এর মধ্যে থেকে কে যে খুনি সেটা বার করা অসম্ভব।
পাওয়া যায়নি শুধু মোহিতবাবুর হাত বা পায়ের ছাপ। তাঁর তো বন্দনাদেবীকে প্রণাম করার কথা নয়। তবে সঙ্গে সঙ্গে এটাও প্রমাণিত হয় যে তিনি সুশীলাকে খুন করতেও ওই ঘরে ঢোকেননি।
আমি প্রশ্ন করলাম, বন্দনাদেবীর বিছানায় সেদিন যে চাদর, বেডকভার ইত্যাদি পাতা ছিল সেগুলোরও তো ফরেনসিক টেস্ট হওয়ার কথা ছিল। সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি?
যোগব্রত রায় এক মিনিট সময় নিলেন। ফোনের মধ্যেই কিছু কাগজপত্রের খসখস শব্দ শুনতে পেলাম। বুঝলাম উনি রিপোর্টটা উল্টেপাল্টে দেখছেন। তারপর বললেন, ‘না, সেখানেও অ্যাবনর্মাল কিছু পাওয়া যায়নি। ওনার চুলের তেল, ওষুধ ইত্যাদির দাগ ছাড়া আর যা ছিল তা হল কিছু সিঁদুর এবং চন্দনের ট্রেস।
আমি স্থান-কাল-পাত্র ভুলে বেশ উঁচু গলাতেই বললাম, এগুলো অ্যাবনর্মাল নয়?
যোগব্রত রায় বললেন, কেন? অ্যাবনর্মাল হবে কেন? এই যে তোমার মিনুপিসি পুজোর জায়গা থেকে উঠে এসে ওঁকে খেতে দিয়েছিলেন, কিংবা ঝন্টুবাবু আর লাহিড়ীমশাই মিলে যে ওই কটটাকে ঠেলতে ঠেলতে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের কারও হাত থেকেই তো ওই সিঁদুর-চন্দন ওঁর গায়ের চাদরে লেগে গিয়ে থাকতে পারে।
আমি গোঁয়ারের মতো প্রশ্ন করলাম, দাগগুলো চাদরের বাইরের পিঠে ছিল না ভেতরের পিঠে?
এই মরেছে। কই, সেসব তো কিছু লেখেনি রিপোর্টে। লেখাটা অসম্ভবও বটে। ল্যাবোরেটরিতে বসে যিনি চাদরটা দেখছেন, তার পক্ষে কি বলা সম্ভব, একটা সাদা চাদরের কোনটা বাইরের পিঠ আর কোনটা ভেতরের পিঠ?
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেলাম।
উনি বললেন, শোনো উমাশঙ্কর! পুলিশ অফিসার হিসেবে নয়, একজন সাধারণ সামাজিক মানুষ হিসেবে তোমাকে একটা অনুরোধ করছি। তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জনকপুরে ফিরে এসো এবং বুলানের দায়িত্ব নাও। আমাকে কাজের সূত্রে মাঝেমাঝেই চ্যাটার্জী ম্যানসনে যেতে হচ্ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি, বাচ্চাটা অসম্ভব ট্রমাটাইজড হয়ে রয়েছে...অসম্ভব নিঃসঙ্গতায় ভুগছে। দুটোই খুব স্বাভাবিক। এই মুহূর্তে একমাত্র মিনুপিসি ছাড়া ওর পাশে স্বাভাবিক মানুষ বলতে আর কে আছে বলো? মোহিতবাবু? তিনিও তো চোদ্দোরকম কাজ এবং তদুপরি এই কেসের দেখভাল নিয়ে ব্যস্ত।
আগেরদিন যখন ও-বাড়িতে গেছি তখন বাচ্চাটা পায়ে পায়ে আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, উমাদাদাকে আসতে বলবেন? বলবেন, আমার রাতে একা শুতে খুব ভয় করে। বলবেন, আমি হোমটাস্ক করতে পারছি না, ম্যাম আমাকে মেরেছে। বলতে বলতে বুলান কেঁদেই ফেলল। সেইজন্যেই বলছি উমা, তুমি চলে এসো।
যোগব্রতবাবুর কথা শুনে আমি লজ্জায় অধোবদন হয়ে গেলাম। সত্যিই তো এত স্বার্থপর, এত নিষ্ঠুর আমি কেমন করে হতে পারলাম! শুধু নিজের কথাই ভাবলাম এতদিন ধরে! একবার সেই সরল শিশুটির মুখ মনে পড়ল না!
বললাম, আমি আসছি স্যার। কাল ভোরবেলায় ট্রেন ধরে আমি জনকপুরে পৌঁছচ্ছি।
সত্যিই তারপরের দিন আবার জনকপুরে ফিরে গেলাম। চ্যাটার্জী ম্যানসনের গেট খুলে বাগানে পা দিয়েই দেখলাম, ছাদের পাঁচিলের আড়ালে একটা মুখ, সুট করে লুকিয়ে গেল। বুলান। অভিমান হয়েছে। অবশ্য সেই অভিমান বেশিক্ষণ রইল না। কলকাতা থেকে ওর জন্যে অনেকগুলো গল্পের বই নিয়ে এসেছিলাম। সেগুলোর দৌলতেই খুব শিগগির আবার আমাদের ভাব হয়ে গেল।
ওসি যোগব্রত রায় ওই বাড়ির পরিবেশ নিয়ে যা বলেছিলেন, তার মধ্যে খুব একটা ভুল ছিল না। সত্যিই বড্ড বিমর্ষ হয়ে ছিলেন সবাই। সেটাই স্বাভাবিক। তবে কাজকর্ম সব আগের মতোই চলছিল। সুশীলার জায়গায় আরেকজন চব্বিশ ঘণ্টার নার্স বহাল হয়েছিল। তার নাম রুবি বা রেবা এরকম কিছু একটা ছিল, এখন আর ঠিক মনে নেই। জগদীশদাই তাকে জুটিয়ে এনেছিল। মোহিতবাবুর স্ত্রী আবার আগের মতোই মোহিতবাবুর পাশের ঘরে অধিষ্ঠিতা হয়েছিলেন।
মিনুপিসি তো ছিলেনই। তাঁর তত্ত্বাবধানে বাজারহাট, রান্নাবান্নার কাজ আগের মতোই চলছিল। শুধু মোহিতবাবুর ছেলে ঝন্টুদা অর্থাৎ মনোজিৎ চ্যাটার্জীর মধ্যে একটা আশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ করছিলাম। মনে হচ্ছিল, উনি যেন আগের তুলনায় অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছেন।
এটা যে আমার কেন মনে হচ্ছিল, বুঝিয়ে বলতে পারব না। এমনিতে উনি সেই আগের মতোই অস্থির ছিলেন; আগের মতোই মানুষ দেখলে লুকিয়ে পড়ার প্রবণতা, সেটাও ছিল। কিন্তু এসবের মধ্যেই কিছুটা সময় যেন একেবারে স্বাভাবিক আচরণও করছিলেন। ব্যাপারটা সবার চোখে পড়ত না। কিন্তু আমার পড়ত। তার কারণ, আমি একটা বিশেষ কারণে ঝন্টুদার দিকে একটু বিশেষভাবে নজর রেখেছিলাম। এবং সেইজন্যেই আমি মাঝেমাঝে ওর ঘরের জানলার পাল্লার ফাটলে চোখ লাগিয়ে দেখতে পেতাম, উনি বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে কোনো কঠিন বিষয়ের ওপরে একটা বই পড়ছেন কিংবা টেবিলের ওপরে অফিস-ফাইল খুলে ভেতরের কাগজপত্রে ডুবে গেছেন।
চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। পেছনদিকে টেনে আঁচড়ে রাখা কাঁচাপাকা চুল। নিখুঁতভাবে কনুই অবধি গুঁটিয়ে রাখা জামার হাতা। এবং সর্বোপরি ওই বই বা কাগজের ওপরে ঝুঁকে পড়া নিমগ্ন ভঙ্গি। সব মিলিয়ে ওঁকে কোনো কলেজের অধ্যাপক বলেই মনে হতো তখন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, ঘরের খিল খুলে যে মুহূর্তে উনি বাইরে বেরোচ্ছেন, তখন চশমা খুলে রাখছেন। তখন জামার হাতা লটপট করছে। চুলগুলো দেখলেই বোঝা যেত ইচ্ছে করে ঘেঁটে রেখেছেন। ক্রমশ আমার সন্দেহ আরও গাঢ় হতে শুরু করল যে, ঝন্টুদা পাগল নন। পাগলামিটা ওঁর একটা ভান মাত্র।
একদিন একথা সেকথার মধ্যে জগদীশদাকে জিগ্যেস করলাম, আচ্ছা, ঝন্টুদা নিয়মিত কোনো নার্ভের ওষুধ খান?
উনি বললেন, কই না তো! খেলেও আমার দোকান থেকে সেই ওষুধ কেনা হয় না।
সন্দেহটা পাকাপোক্ত হল। কিন্তু সেই সঙ্গে একটা বড় প্রশ্নেরও জন্ম হল। ঝন্টুদা তো বাড়ির বাইরে একদমই বেরোন না। তাহলে এই পাগলের ছদ্মবেশের প্রয়োজন কী? বাড়ির মানুষদের কাছ থেকে কেউ নিজেকে লুকিয়ে রাখে? আর সেরকম মানুষ বলতে তো একমাত্র ওঁর বাবা, মোহিত চ্যাটার্জী। তাহলে কি ঝন্টুদা বাবার কাছ থেকেই নিজেকে কোনো কারণে লুকিয়ে রাখছে?
ক’দিন বাদে এক সন্ধেয় যোগব্রত রায়ের কোয়ার্টারে গিয়ে হানা দিলাম। উনি আমাকে দেখে খুব খুশি হলেন।
কোয়ার্টারটা একতলা হলেও বেশ বড়সড়। তোমাকে আগেও বলেছি বোধহয়, ওই বাঙলোগুলো বানানো হয়েছিল কয়লাখনির সাহেব কর্মচারীদের জন্যে। সেইজন্যেই বাড়িটার নকশায় পরিষ্কার বিলিতি ছাপ ছিল। লাল টালির ঢালু ছাদ। পুরো বাড়িটাকে ঘিরে চওড়া বারান্দা। সামনের বারান্দা পেরিয়ে প্রথমেই একটা বড় ড্রয়িংরুম। তার দু’দিকে দুটো-দুটো করে চারটে শোবার ঘর আর পেছনদিকে রান্নাঘর, বাথরুম আর সার্ভেন্টস কোয়ার্টার।
আমাকে নিয়ে উনি ড্রয়িংরুমেই বসলেন। বেতের সোফাসেট সাজানো ছিল। মেঝেতে একটা হালকা রাগ বিছানো ছিল। তার ওপরে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল যোগব্রতবাবুর পোষা ডালমেশিয়ান দামু।
দামুর সঙ্গে আমার আগের দিনই আলাপ হয়ে গিয়েছিল। তাই আমাকে ঢুকতে দেখে সে একবার শুধু চারপাশে চক্কর দিয়ে আর হাতটা অল্প একটু চেটে তার আহ্লাদ জানাল; তারপর আবার তার নিজের জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
চা আর ডালমুট খাবার ফাঁকে ফাঁকে যোগব্রতবাবু বললেন, সুশীলা-হত্যা মামলার চার্জশিট দেবার সময় ক্রমশ এগিয়ে আসছে অথচ উনি অত্যন্ত জরুরি কয়েকটা জিনিসই জোগাড় করে উঠতে পারছেন না। তাই নিয়ে খুব চিন্তিত রয়েছেন।
বললাম, যেমন?
যেমন, বন্দনাদেবীর ঘরে সেদিন মোহিতবাবুর উপস্থিতির প্রমাণ। সেরকম কোনো প্রমাণ তো সত্যিই নেই। নেই ওয়েপন অফ মার্ডারের হাতলে কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট। তবে...
কী একটা বলতে গিয়েও যেন যোগব্রতবাবু চুপ করে গেলেন। আমি বললাম, তবে কী?
উনি বললেন, গত দু’-মাসে মোহিত চ্যাটার্জী নামের মানুষটার ব্যবসা সংক্রান্ত কাজকর্ম নিয়ে খোঁজখবর করতে গিয়ে নিশ্চিত হয়েছি, ভদ্রলোকের বাইরের সৌম্য শান্ত রূপটা ওঁর আসল রূপ নয়। ব্যবসায় ওঁর উন্নতিটা খুব সোজা পথে হয়নি। তার জন্যে গত চল্লিশ বছর ধরে উনি বহু অপরাধ করেছেন। স্ত্রী অসুস্থ হবার পর থেকে নিজেকে একটু সামলেছেন। কিন্তু তার আগে অবধি উনি যখন যা চেয়েছেন তাই হাসিল করে ছেড়েছেন এবং তার জন্যে কম্পিটিটরদের মারধোর, গুম করা, বাড়িতে আগুন দেওয়া এমনকী খুন করে ফেলা অবধি, কোনো কাজেই পিছপা হননি।
কথাগুলো শুনে এতই অবাক হলাম যে অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারলাম না। তারপর বললাম, তাহলে এত মানুষ ওঁকে শ্রদ্ধা করে কেন? আপনি যা বলছেন, তাতে তো ওঁর জেলখানার বাইরেই থাকার কথা নয়।
যোগব্রত রায় হাসলেন। বললেন, উনি একজন উঁচু দরের মাফিয়া লিডার। মাফিয়াদের কাজের ধরনটাই এরকম। তারা কোনো অপরাধটাই নিজেদের হাতে করে না। মোহিতবাবুও একটাও অপরাধ নিজের হাতে করেননি। বহু দূর থেকে করিয়েছেন। আমি যে কথাগুলো বলছি সেগুলো সবই ওঁর সমসাময়িক অন্যান্য সাধারণ মানুষদের মুখ থেকে শোনা। আসানসোল, অন্ডাল, রানিগঞ্জ এইসব জায়গার লোক তারা। কেউ কয়লাখনির লেবার, কেউ ছোট ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে একটাই মিল। তারা সকলেই কোনো না কোনো সময়ে মোহিত চ্যাটার্জীর বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছিল এবং এর ফলে তাদের সর্বনাশ হয়েছে।
কারও নিকট আত্মীয় রোড-অ্যাকসিডেন্টে মারা পড়েছে। কারও বাড়িতে হঠাৎ আগুন লেগে গেছে। এমনকী এ-কথাও একসময় সকলেই জানত যে, মোহিত চ্যাটার্জীকে কন্ট্র্যাক্ট না দেওয়ার দুঃসাহস দেখাবেন যে অফিসার, তাকে খুব শিগগিরই দেখা যাবে ট্রান্সফার হয়ে অনেক দূরে কোথাও চলে গেছেন...ইসিএল-এর উঁচু মহলে এতটাই যোগাযোগ ছিল তাঁর।
বললাম, আপনি বলছেন, এই সবই শোনা কথা? কোনো প্রমাণ নেই? কোনো সাক্ষী?
বললাম যে, উনি সাক্ষী রেখে কোনো কাজ করতেন না। তাছাড়া গত সাত-আট বছরে তো আর এরকম কোনো দুষ্কর্ম করেননি। কিন্তু উমাশঙ্কর, ধানবাদ থেকে বর্ধমান অবধি একটা বিশাল অঞ্চল জুড়ে বহু সাধারণ মানুষ, বিশেষত যারা এখন বৃদ্ধ হয়েছেন, তাঁরা যখন মোহিত চ্যাটার্জীর নামটা শুনলেই আঁতকে ওঠেন, তখন তো কথাগুলোকে অবিশ্বাসও করা যায় না।
আমি তখনো একগুঁয়ের মতো বললাম, আমি কিন্তু জনকপুরে ওঁর নামে এই ধরনের কোনো দুর্নাম শুনিনি। বরং আপনিও দেখেছেন, যেদিন ওঁকে গ্রেপ্তার করলেন, সেদিন এখানকার কয়লাখনির শ্রমিক থেকে শুরু করে দোকানদার, ছাত্র-ছাত্রী, স্কুলশিক্ষক সকলেই কেমন ফুঁসে উঠেছিল।
উনি একটু হেসে বললেন, ডাকাতদের মধ্যে এটা অনেক পুরোনো প্রথা। তারা নিজেদের গ্রামে ডাকাতি করে না। জানতে না তুমি?
কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে বললাম, এখন কী করবেন?
উনি বললেন, কী করব, সেটা তোমাকে বলার কথা নয়। বলা মানে তোমারই বিপদ বাড়ানো। বুঝতেই পারছ, যারা বাড়ি ভর্তি লোকের মধ্যে একটা অমন নৃশংস খুন করে যেতে পারে তারা আর যাই হোক অ্যামেচার নয়। তারা প্রফেশনাল। কাজেই তারা যদি জানতে পারে তোমার কাছে কিছু ইনফর্মেশন রয়েছে, তাহলে তোমাকেও ছেড়ে দেবে না। তবুও যে বলছি, তার কারণ, পুরো ঘটনাটাতে তোমার কোনো স্বার্থ জড়িয়ে নেই। তবে তার আগে তোমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, যা বলছি তা ঘুণাক্ষরে কোথাও আলোচনা করবে না। কাউকে বলবে না, সে তোমার যতই ঘনিষ্ট হোক কিংবা তাকে দেখে যতই নিরীহ লাগুক।
আমি বললাম, প্রতিজ্ঞা করছি কাউকে বলব না।
যোগব্রত রায় গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, আমি একজন লোকের সন্ধান পেয়েছি, বুঝলে। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে তার বাবাকে মোহিত চট্টোপাধ্যায় খুন করিয়েছিলেন। খুনটা হতে সে নিজের চোখে দেখেছিল। সে দেখেছিল, অন্ডাল রেলওয়ে সাইডিংয়ে এক বর্ষার রাতে, মোহিত চট্টোপাধ্যায় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তার বাবাকে খুন করাচ্ছে। খুনিদের মধ্যে অনেকেই আজও বেঁচে আছে। তাদেরও সে চিনিয়ে দিতে পারে। এতদিন অবধি সে প্রাণের ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারেনি। কারণ, এতদিন পুলিশও ছিল মোহিত চ্যাটার্জীর হাতের মুঠোয়। কিন্তু আমি যে একটু অন্য ধাতুতে গড়া, তা তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। সেই লোকটিও বুঝতে পেরেছে। তাই এখন সে রাজি হয়েছে কোর্টরুমে দাঁড়িয়ে সরকারি সাক্ষী হিসেবে এই কথাগুলো বলতে।
ওই লোকটিকে আমি এই খুনের মামলায় অ্যাডেড পার্টি করে নেব, উমাশঙ্কর। তাতে একটা সুবিধে হবে, আদালতকে বিশ্বাস করাতে পারব যে, মোহিত চ্যাটার্জী একজন বিপজ্জনক মানুষ। বাইরে থাকলে তিনি অনেক সাক্ষ্য-প্রমাণ লোপাট করতে পারেন। তাই তাকে আবার জেলে ঢোকানোই দরকার। আজ বুধবার। পরের বুধবার কেসটা কোর্টে উঠছে। তখনই তাকে সামনে আনব।
সামনে আনবেন? আমার কানে কথাটা খট করে বাজল। তার মানে এখন কি আপনি তাকে আড়ালে রেখেছেন?
অবশ্যই। এই কয়লাখনি অঞ্চলে বাড়ির দেয়ালগুলোও মোহিত চ্যাটার্জীর হয়ে কাজ করে। তারা যা শোনে, চাটুজ্জেমশাইকে বলে দেয়। কাজেই লোকটাকে নিরাপত্তা না দিলে চলবে কেমন করে?
বুঝলাম এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাওয়া উচিত হবে না। তাছাড়া সেই মুহূর্তে আমার মাথাটা কেমন যেন ঘুলিয়ে গিয়েছিল। মোহিত চ্যাটার্জীর সৌম্য চেহারা, তাঁর শান্ত গম্ভীর কণ্ঠস্বর, স্নেহময় ব্যবহার—এইসবের সঙ্গে কিছুতেই একজন দুর্ধর্ষ ক্রিমিনালকে মেলাতে পারছিলাম না।
ঝন্টুদার কথাও ভাবছিলাম। তারও বাইরের চেহারা আর ঘরের চেহারা মেলাতে পারছিলাম কি?
সুশীলাদি। সবার চোখে সাধারণ একজন নার্স। কিন্তু সত্যিই কি সে সাধারণ একজন মহিলা ছিল? নিশ্চয়ই ছিল না। থাকলে এইভাবে খুন হতো না।
কানাইবাঁশি লাহিড়ী। ঝন্টুদার খুড়শ্বশুর। সমাজের চোখে একজন ব্যবসায়ী। কিন্তু আসলে কাঠের চোরাচালানকারী।
আর দধিবামন? সেও কি শুধুমাত্র একজন পুরোহিত? আর কিছু নয়? তা যদি নাই হবে, তাহলে যজ্ঞের ছাই থেকে অট্টহাসিনীর ছোরা খুঁজে পাওয়ার মতো এত বড় একটা মিথ্যে গল্প তৈরি করল কেন? সেই ছুরির আঘাতে যখন সুশীলা খুন হল, তখন কেন সেটাকে দৈবী ক্রোধ বলে চালানোর চেষ্টা করল? আর আগে থেকে জানলই বা কীভাবে যে, সেই রক্তমাখা ছুরির হাতলে কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যাবে না?
অর্থাৎ জনকপুরে আসার পর থেকে যতজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তারা কেউই নিজেদের আসল চেহারাগুলো দেখায়নি। এখন ক্রমশ প্রকাশ পাচ্ছে। শুধু বুঝতে পারছিলাম না, যোগব্রতবাবু কেন দধিবামনের বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিচ্ছেন না। আমার চোখে তো সেইই সবচেয়ে বড় সন্দেহভাজন।
আর থাকতে না পেরে বলেই বসলাম, আপনি দধিবামনের সম্পর্কে একটু খোঁজ নেবেন?
উনি ভারি অবাক হয়ে বললেন, দধিবামন! সেই শর্ট হাইটের পুরুতটা? ওকে তো দেখে আমার একটা জোকার বলেই মনে হয়েছিল। কথাবার্তাও সেইরকম, যত তন্ত্রমন্ত্রের আগডুম বাগডুম। ও কীভাবে পিকচারে আসছে?
বললাম, ওর একটা অন্য রূপ আছে, স্যার! আমি নিজের চোখে ওকে দেখেছি। রামদার এক কোপে পাথরের মতো শক্ত একটা উইঢিবিকে মাঝামাঝি চিরে ফেলতে। শুধু তাই নয়, তারপর সেই ঢিবির মধ্যে বাসা বেঁধে থাকা একটা বিশাল গোখরো সাপের মাথাটাও ওই রামদা দিয়ে কেটে তার রক্ত দিয়ে পুজো করতেও দেখেছি। হাইট কম হলেও ওর শক্তি কিংবা হিংস্রতা কম নয়।
কিন্তু এই কেসে ওর প্রাসঙ্গিকতা কী? তুমিও তো বলেছিলে, সেদিন বন্দনাদেবীর ঘরে যাদের দেখেছিলে, তাদের মধ্যে দধিবামন ছিল না।
আমি উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই হঠাৎ দামু বিকট চিৎকার করে আমাদের পেছনদিকে একটা জানলা লক্ষ করে ধেয়ে গেল। আগেই বলেছি, যোগব্রতবাবুর বাংলোর চারিদিকে বাগান ছিল। বাগানে প্রাচীন সব গাছপালা, আম, জাম, নিম, সবেদা। আলোর ব্যবস্থাও তেমন ছিল না। পাহারা বলতে সামনের গেটে একজন হোমগার্ড। যে জানলাটার কথা বলছি, সেটা ওই অন্ধকার বাগানের দিকেই খুলত।
দামু চিৎকার করে জানলাটার দিকে ছুটে যেতেই আমি এবং যোগব্রতবাবু মুখ ফিরিয়ে সেইদিকে তাকালাম এবং পরিষ্কার দেখলাম, খোলা জানলাটার ওপাশ থেকে একটা মুখ সরে গেল। পরক্ষণেই শুকনো পাতা মাড়িয়ে কারও দৌড়ে যাবার শব্দ পেলাম। যোগব্রতবাবু ড্রয়ার থেকে সার্ভিস-রিভলভারটা বার করে সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে বাগানের দিকে ছুটে গেলেন। পেছন পেছন আমি।
ততক্ষণে বাংলোর গেট থেকে পাহারাদার হোমগার্ডটি হাতে একটা পাঁচ-সেলের টর্চ নিয়ে দৌড়ে এসেছে। সেই আলোয় পুরো বাগানটা আমরা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলাম, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। দেখতে পাওয়ার কথাও ছিল না, কারণ, পাঁচিলটা এমন কিছু উঁচু ছিল না। বুঝতেই পারছিলাম, জানলায় যে আড়ি পেতেছিল, সে ওই পাঁচিল টপকে পালিয়েছে।
আমরা আবার ঘরে ফিরে এলাম। যোগব্রতবাবু থানায় ফোন করে ঘটনাটার কথা জানালেন। যে অফিসার ডিউটিতে ছিলেন, তাকে নির্দেশ দিলেন তখনই পুরো এরিয়াটা খুঁজে দেখতে সন্দেহজনক কাউকে দেখা যায় কিনা অথবা লোকটাকে কেউ দেখেছে কিনা।
তারপর তিনি আমাকে বললেন, তুমি আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়ো, উমাশঙ্কর! আমারই ভুল। মোহিত চ্যাটার্জীর বাড়ির একজন বাসিন্দা যদি জনকপুর থানার ওসির কোয়ার্টারে দেখা করতে আসে, তাহলে তো তাদের সন্দেহ হবেই। তারা তো জানতে চাইবেই, কী কথা হচ্ছে তোমার আর আমার মধ্যে। আমার আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল।
মনে মনে ভাবলাম, ভুলটা তো আমারও। একই কথা আমারও মাথায় আসা উচিত ছিল।
তুমি এবার বেরিয়ে পড়ো, বললেন যোগব্রতবাবু। একটু ভেবে বললেন, না দাঁড়াও। আমি তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি। এই বলে আমার বারণ না শুনেই, গাড়িটা বার করে নিজেই ড্রাইভ করে আমাকে নিয়ে চ্যাটার্জী ম্যানসনের রাস্তা ধরলেন।
যেতে যেতে বললেন, ধরো কোনো একটা অজুহাতে তোমাকে ওরা বাড়ি থেকে বার করে দিল...
এতই অবাক হলাম যে ওঁর কথার মধ্যেই বললাম, কেন? বার করে দেবে কেন?
কী আশ্চর্য! দুধ-কলা দিয়ে কি কেউ কালসাপ পোষে? তুমি খোদ চ্যাটার্জী ম্যানসনে বসে চ্যাটার্জীদের ওপর গোয়েন্দাগিরি চালাবে, ওরা কি এটা মেনে নেবে?
একটু হেসে বললাম, নিশ্চিন্ত থাকুন। খুদে চ্যাটার্জী, মানে বুলানই আমার ওই বাড়িতে থাকার গ্যারান্টি।
বুঝতে পেরেছি তুমি কী বলতে চাইছ। যোগব্রতবাবুও হাসলেন। তবু তোমার সাবধানে থাকা দরকার। এখন কিছুদিন আর আমার সঙ্গে দেখা কোরো না। যদি একান্তই কিছু জানানোর দরকার পরে, কোনো নিরাপদ জায়গা থেকে ফোন কোরো। শোনো, চ্যাটার্জী ম্যানসনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। আর এগোব না। তুমি এখানেই নেমে পড়ো। বাকি রাস্তাটা হেঁটে চলে যাও।
কিছুটা হেঁটে যাওয়ার পরে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, কুয়াশার আড়ালে যোগব্রতবাবুর জিপটা আলো নিভিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উনি আমার ওপরে নজর রাখছেন। গা-টা শিরশির করে উঠল। উনি ছাড়া আর কেউ কি এই মুহূর্তে একইভাবে আমার ওপর নজর রাখছে? আর কেউ কি এই অন্ধকার আর কুয়াশার আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে অনুসরণ করছে আমাকে?
করতেই পারে। কিছুক্ষণ আগে যে লোকটি পুলিশ কোয়ার্টারের জানলার ফাঁকে মুখ রেখে আমাদের কথা শুনছিল, সে তো আর হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। এই জনকপুরেই সে আছে...থাকবে। শুধু তার পরিচয়টা জানি না।
হয়তো সে আমার খুব চেনা কেউ।
চ্যাটার্জী ম্যানসনের বাগানের গেটের ছিটকিনিটা যখন খুলছি, তখনই অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটা পাথর উড়ে এসে আমার কপালে লাগল। পেয়ারার সাইজের ভারী পাথর। খুব কাছ থেকে ছোড়া হলে মাথাটা ফেটে যেত। তা হয়নি বলেই মাথা ফাটল না, তবে চোখে অন্ধকার দেখলাম। গেটের ফ্রেমটাকে চেপে ধরে আস্তে আস্তে মাটিতে বসে পড়লাম। কপালে হাত বুলিয়ে দেখলাম, ইতিমধ্যেই কপালের ডানদিকটা ফুলে উঠেছে।
কয়েক সেকেন্ড বাদে চোখ খুলে দেখলাম, পাথরটা আমার পায়ের কাছেই পড়ে আছে। তার সঙ্গে সুতো দিয়ে জড়ানো রয়েছে একটা ভাঁজ করা কাগজ।
জায়গাটাতে আলো ছিল। গেটের মাথায় যে উজ্জ্বল বাল্বটা লাগানো ছিল, তারই আলো বৃত্তাকারে এসে পড়েছিল গেটের সামনে। পাথরটা যেই-ই ছুড়ে থাকুক, ওই আলোটার জন্যেই তার পক্ষে আমাকে টার্গেট করা সহজ হয়েছিল। যাই হোক, সেই আলোতেই ঢিলের গা থেকে কাগজটাকে খুলে নিয়ে পড়লাম। রোমান হরফে, ইংরিজি ভাষায় লেখা ছিল, Don’t cross your limit। সোজা বাংলায় বলতে গেলে সীমানা ছাড়িও না। অর্থাৎ যাকে বলে হুমকি চিঠি।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, ওসি সাহেবের গাড়ি ততক্ষণে অনেক দূরে চলে গেছে। পাথরটা কে ছুড়ল দেখার কোনো উপায় নেই, কারণ চারিদিক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢাকা। কাজেই পায়ে পায়ে বাগান পেরিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ইচ্ছে করেই তাড়াহুড়ো দেখালাম না, কারণ জানতাম অন্ধকারের আড়াল থেকে আমার ওপরে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে। ভয় যে পেয়েছি, সেটা তাদের দেখাব কেন?
এতক্ষণ বাদে বিনায়ক আমার কথার স্রোত থামিয়ে একটা প্রশ্ন করল। বলল, সত্যিই কি আপনি ভয় পেয়েছিলেন স্যার?
বললাম, অস্বীকার করব না, পেয়েছিলাম। আর পাওয়াটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? তখন কী-ই বা আমার বয়স আর কী-ই বা ক্ষমতা! সেইজন্যেই খুবই ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু ভয়কে ছাপিয়ে উঠেছিল ওই বয়সে যেটা প্রবল পরিমাণে থাকে—অহংকার। একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম, ক্রিমিনালরাও আমাকে ভয় পাচ্ছে। না হলে আমাকে হুমকি চিঠি দেবে কেন?
আপনি তারপর কী করলেন? বিনায়ক জিগ্যেস করল।
সিদ্ধান্ত নিলাম, খুব বেশি বাইরে ঘোরাঘুরি করব না। যতদূর সম্ভব স্কুল আর বাড়ির মধ্যেই যাতায়াত সীমাবদ্ধ রাখব। বিশেষত বিকেলের দিকে যে লালমাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে যেতাম, সেটা একেবারেই বন্ধ করে দিলাম।
বিনায়ক একটু ইতস্তত করে বলল, না, মানে আমি জানতে চাইছিলাম ওই চিঠিটা... ওটা পুলিশকে দেখালেন না?
না না। ওটা পুলিশকে দেখানোর কথা মাথাতেই আসেনি, কারণ, লেখাগুলো কার তা তো আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম। জানতাম, পুলিশ ওটার সূত্র ধরে কোথাও পৌঁছতে পারবে না।
বিনায়ক ভারি অবাক হয়ে বলল, বলছেন কী? একবার দেখেই বুঝে গেলেন, এত চেনা হাতের লেখা! কে সে?
মুচকি হেসে বললাম, বুলান।
বিনায়ক বলল, বুলান আপনাকে লিমিট ক্রস না করতে বলেছিল? হুমকি দিয়েছিল আপনাকে? মানে পাথরটাও ও ছুড়েছিল? বিনায়কের মুখের হাঁ বন্ধ হচ্ছিল না।
আহা, এতসব কোথায় বললাম? আমি তো শুধু বললাম, হাতের লেখাটা বুলানের।
শোনো বিনায়ক, বুলান মোটেই হুমকি হিসেবে কথাগুলো লেখেনি; গল্প হিসেবে লিখেছিল। তোমাকে বলেছিলাম, মনে আছে নিশ্চয়, ওর গল্প-কবিতা লেখার নেশা ছিল। ইংরিজিতেই লিখত। সাহিত্যচর্চার জন্যে ওর দাদু আসানসোল থেকে ওকে সুন্দর নীলচে কাগজের একটা মোটা বাঁধানো খাতা কিনে এনে দিয়েছিলেন। একমাত্র আমাকেই ও সেই খাতা খুলে নিজের লেখা গল্প-কবিতা পড়ে শোনাত। সেরকমই কোনো খাতার পাতার একেবারে শেষ লাইনের মাঝামাঝি জায়গায় ও ওই কথাগুলো কোনো গল্পের অংশ হিসেবেই লিখেছিল—Don’t cross your limit।
শেষ লাইনের মাঝামাঝি জায়গায়? এটা কীভাবে বোঝা গেল? বিনায়ক বলল।
খুবই সহজ। বুলানের খাতা থেকে ওই জায়গাটুকু যে ছিঁড়ে নিয়েছিল সে ছিঁড়েই নিয়েছিল...কাঁচি কিংবা ব্লেড দিয়ে কেটে নেয়নি। এইভাবে ছিঁড়ে নিলে ছেঁড়া অংশের প্রান্তটুকু যে একটু এবড়োখেবড়ো হয় সেটা দেখেছ নিশ্চয়ই? আমাকে হুমকি চিঠি হিসেবে যে অংশটুকু পাঠানো হয়েছিল, তার ওপরের দিক, ডান দিক আর বাঁ-দিক, এই তিনদিক ছিল ওরকম এবড়োখেবড়ো। অর্থাৎ ওই তিনদিকেই অন্যান্য লেখা ছিল, যেগুলোকে হাত দিয়ে ছিঁড়ে বাদ দিতে হয়েছিল। শুধু নীচের দিকটাই ছিল মসৃণ। সেইজন্যেই বললাম, শেষ লাইনের মাঝামাঝি জায়গায় ছিল লেখাটা। আর বুলানের হাতের লেখা ভুল করার তো কোনো প্রশ্নই নেই, যেহেতু আমি ছিলাম ওর গৃহশিক্ষক।
বিনায়ক বলল, বুঝলাম। তাহলে দুষ্কর্মটা কে করেছিল? ওর বাবা মনোজিৎবাবু? আপনার ঝন্টুদা? একটু আগেই তো বললেন, তিনি নাকি পাগলামির ভান করছিলেন, আসলে পাগল ছিলেন না।
দাঁড়াও। একটা কথা তোমাকে বলা হয়নি। যে ফিতেটা দিয়ে ওই কাগজের টুকরোটা পাথরের সঙ্গে বাঁধা ছিল, সেটাও ছিল আমার চেনা। অ্যাকচুয়ালি ওইরকম সবুজ রিবন, ওপরে কালো কালিতে CCC ছাপ, ওরকম রিবন দিয়েই মোহিতবাবুর কোম্পানির, মানে চ্যাটার্জী কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ফাইলপত্তর বাঁধা হতো। চ্যাটার্জী ম্যানসনের একতলায়, মোহিতবাবুর অফিসঘরের ব়্যাকে, ওরকম খালি ফাইল-কভার আর ফিতে টাল দিয়ে রাখা থাকত।
বিনায়ক বলল, তাহলে কি মোহিতবাবু?
আমি হেসে ফেললাম। তাই দেখে বিনায়ক তাড়াহুড়ো করে বলল, দাঁড়ান দাঁড়ান। আপনি হাসছেন মানে কোথাও একটা ভুল করছি। আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি—ওই কাগজ, ওই ফিতে সবই বড্ড স্পষ্ট করে বাড়ির লোকেদের দিকে ইঙ্গিত করছে, তাই না?
আমি কিছু না বলে ওকেই বলবার সুযোগ দিলাম। বিনায়ক মহা উৎসাহে বলে চলল—পৃথিবীতে কাগজ কলম ফিতে কোনো জিনিসেরই এত অভাব হয়নি যে, কালপ্রিটকে সবক’টা জিনিসই চাটুজ্জে বাড়ির ভেতর থেকে নিয়ে যেতে হবে। এমনকী যদি বলেন, হাতের লেখাটা অচেনা কারও হওয়া দরকার ছিল, তাহলেও বলব, বুলান ছাড়া আরো অন্তত পাঁচশো অচেনা বাচ্চা ছিল জনকপুরে, যাদের যে কাউকে একটা লজেন্স দিয়ে ওই চারটে ওয়ার্ড একটা কাগজে লিখিয়ে নেওয়া যেত। পুলিশ কিংবা আপনার, কারও ক্ষমতা হতো না সেই বাচ্চার কাছাকাছি পৌঁছবার।
বললাম, তার মানে দ্বিতীয়বার ভাবনা-চিন্তা করে তুমি বলছ, কালপ্রিট বাইরের লোক?
বিনায়ক এইবার ঘাবড়ে গেল। বলল, আপনার কী মনে হয়েছিল বলুন তো?
আমি দুটো হাত মুঠো করে বিনায়কের সামনে টেবিলে পেতে ধরে বললাম, ছোটবেলায় একটা খেলা নিশ্চয় খেলেছ। কোন হাতে টক্কা, কোন হাতে ফক্কা। আমার এক মুঠিতে একটা ছোট্ট ঢেলা কিংবা কাগজের কুচি কিংবা পুঁতি যা হোক থাকবে আর অন্য মুঠি থাকবে শূন্য। তোমাকে বলতে হবে কোন মুঠিতে টক্কা আর কোন মুঠি শূন্য অর্থাৎ ফক্কা।
ধরো প্রথমবার ডানহাতে ছিল টক্কা আর বাঁ-হাতে ফক্কা। তোমার প্রতিপক্ষের যদি বুদ্ধি কম হয় তুমি দ্বিতীয়বারে সিকোয়েন্সটা জাস্ট উলটে দেবে। বাঁ-হাতে রাখবে টক্কা আর ডানহাতে ফক্কা। তোমার প্রতিপক্ষ আগেরবারের অভিজ্ঞতায় বলে বসবে, ডানহাতে ঢেলা রয়েছে, মানে ডানহাতে টক্কা এবং হারবে।
কিন্তু তুমি যদি জানো যে, তোমার প্রতিপক্ষ অ্যাভারেজ বুদ্ধির লোক, তাহলে তুমি দ্বিতীয়বারেও প্রথমবারের সিকোয়েন্সই বজায় রাখবে—মানে ডান হাতে রাখবে ঢেলা কিংবা কাগজকুচি আর বাঁ-হাত রাখবে শূন্য মানে ফক্কা। তোমার প্রতিপক্ষ ভাববে, তুমি সিকোয়েন্স পালটে দিয়েছ। কিন্তু আসলে তো পালটাওনি। তাই এবারেও সে হারবে।
আর তুমি যদি জানো যে, তোমার প্রতিপক্ষের বুদ্ধি অ্যাভারেজের চেয়ে বেশি তাহলে তুমি কী করবে? তাহলেও তুমি প্রথমবারের সিকোয়েন্স পালটে দেবে। তোমার প্রতিপক্ষ ভাববে যেহেতু তুমি তাকে বুদ্ধিমান বলে জানো তাই সিকোয়েন্স পালটাওনি এবং সে হারবে।
এ একেবারে পিওর মনস্তত্ত্বের খেলা। এবার এই খেলার সঙ্গে চাটুজ্জেবাড়ির ঘটনাটাকে মেলাও। যারা একটু তলিয়ে ভাববে, তারা ধরতে পারবে যে, এর মধ্যে সত্যিই বাড়ির লোকেরই হাত রয়েছে। ‘বাড়ির লোক কি আর বাড়ির জিনিস ব্যবহার করবে’, এই যুক্তিতে সবাই তাদের সন্দেহের আওতা থেকে বাদ দিয়ে দেবে—সেই আশাতেই তারা বাড়ির জিনিস ব্যবহার করেছিল। অন্তত আমি তখন সেরকমই ভেবেছিলাম।
বিনায়ক বলল, আপনার সেই ভাবনা কি বাস্তবের সঙ্গে মিলেছিল?
একটু হেসে বললাম, সেটা ক্রমশপ্রকাশ্য। তখনকার মতো আমি ওই পাথরের ঘা খাওয়ার ব্যাপারটা যোগব্রতবাবুর কাছে একবারে চেপে গেলাম। অবশ্য তাঁকে জানাতামই বা কীভাবে? বাড়ি আর স্কুলের বাইরে কোথাও যাওয়া তো বন্ধই করে দিয়েছিলাম। একমাত্র ভরসা ছিল মোহিতবাবুর অফিসের টেলিফোন। কিন্তু সেই ঘর তখনই খোলা হয় যখন মোহিতবাবু অফিসে কাজ করেন। ওঁর সামনে তো আর ফোনে এইসব আলোচনা করা যেত না। কাজেই নিজের মনে কাজকর্ম, পড়াশোনা এইসব করে যাচ্ছিলাম। স্কুলে ক্লাস নিচ্ছিলাম। আর সুশীলাদির মৃত্যু নিয়ে আকাশ-পাতাল ভেবে যাচ্ছিলাম।
এর মধ্যেই অবশ্য একবার বুলানকে জিগ্যেস করেছিলাম, ওর কোনো গল্প লেখার খাতা মিসিং কিনা! ও খুব অবাক হয়ে আমাকে বলল, তুমি কি ম্যাজিক জানো? সত্যিই একটা খাতা খুঁজে পাচ্ছি না।
আমি বললাম, কবে থেকে?
ও উত্তর দিল, সেটা তো ঠিক জানি না। এই দু’দিন হল অন্য একটা খাতা খুঁজতে গিয়ে দেখছি ওটা নেই।
ওই খাতায় লাস্ট কবে লিখেছিলে, মনে আছে?
ও বলল, হ্যাঁ। সুশীলাপিসি যেদিন মারা গেলেন, তার আগের দিন রাত্রে।
মনে মনে বললাম, তার মানে সেদিন বাইরের লোক যারা বাড়িতে ছিলেন—কানাইবাঁশি, তার আত্মীয় এবং কর্মচারী, মিনুপিসি, অন্যান্য কাজের লোক—তাদের সবারই খাতাটা চুরি করার সুযোগ ছিল। তবে চুরিটা যেই করুক, তাকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বলতে হবে। সে তখনই জানত, একদিন ওই খাতার লেখাগুলো তার কাজে লাগবে।
এরমধ্যেই একদিন হঠাৎ জগদীশ মাহাতো স্কুলে এসে হাজির হলেন। বললেন, চ্যাটার্জী ম্যানসনে মাসকাবারি ওষুধের সাপ্লাই দিতে এসে মনে হয়েছিল, অনেকদিন আমাকে দেখেননি। তাই ফেরার পথে সাইকেলটা সোজা স্কুলেই ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
খুব খুশি হলাম। আমার তখন অফ পিরিয়ড চলছিল। জগদীশদাকে নিয়ে স্কুল-বিল্ডিংয়ের পেছনে শিশু গাছটার নীচে বাঁধানো বেদিতে গিয়ে বসলাম এবং আমার ওপরে আঘাত এবং হুমকি চিঠির কথা সবই তাকে খুলে বললাম। বললাম, সেইজন্যেই বাড়ি থেকে বেরোনো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি।
জগদীশদা বুদ্ধিমান মানুষ। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, কিন্তু ওসি সাহেবকে তোমার অনেক কিছু বলার আছে, তাই না? না, থানায় কিংবা ওসি সাহেবের কোয়ার্টারে এখন যাওয়া তোমার পক্ষে ঠিক হবে না। ওরা তোমাকে যত পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখবে ততই সাবধান হয়ে যাবে। সেটা হবে মস্ত ক্ষতি। তুমি এক কাজ করো উমা। আমি এখানেই একটু বসছি। তুমি যোগব্রতবাবুকে যা যা বলতে চাও সব একটা কাগজে লিখে, মুখবন্ধ খামে করে আমার হাতে দিয়ে দাও। আমি ওনাকে দিয়ে দেব। আমার দিকে কেউ নজর রাখবে না জানি।
আইডিয়াটা খুবই পছন্দ হল।
ওইসব দিনে আমার কাঁধের ব্যাগে সবসময় কাগজ, কলম, জেমস ক্লিপ, আলপিন, গাম, সাদা খাম, ডাকটিকিট ইত্যাদি মজুত থাকত। তখনকার দিনে যে বেকার ছেলেরা চাকরির অ্যাপ্লিকেশন করত, তাদের এসব সঙ্গে রাখতে হতো। আমি দুটো সাদা পাতার মাঝখানে একটা কার্বন পেপার রেখে একটা চিঠি লিখলাম। কার্বন কপিটা এখনো আমার কাছে আছে। তুমি একটু বোসো। আমি ওটা নিয়ে আসি। কপিটা থেকেই পড়ি, তোমার মজা লাগবে।
এই বলে ঘর থেকে ফাইল ঘেঁটে সেদিনের সেই চিঠির কার্বন কপি নিয়ে এলাম। তারপর পুরোটাই বিনায়ককে পড়ে শোনালাম—
শ্রদ্ধেয় স্যার,
সুশীলাদি কীভাবে খুন হয়েছিলেন তার একটা চতুর্থ সম্ভাবনা প্রথম থেকেই আমার মাথায় ঘুরছিল। মনে হচ্ছে সেটা আপনাকে এখনই বলা প্রয়োজন। পরে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
ধরুন পুরো ব্যাপারটা ঘটেছিল এইভাবে...মোহিতবাবু তাঁর নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছেন। মাঝখানের দরজা বন্ধ করে পাশের ঘরে কাজ করছে সুশীলা। বন্দনাদেবী বরাবরের মতোই বিছানায় শুয়ে রয়েছেন, পা থেকে গলা অবধি চাদর দিয়ে ঢাকা।
এমন সময় বারান্দার দিকের দরজায় আলতো টোকা। সুশীলা নিশ্চয়ই জানত টোকাটা পড়বে। কে দেখা করতে চায় সেটা সে জানত। তাই চট করে দরজাটা খুলে দিল। ঘরে ঢুকে এল দধিবামন। সুশীলা আবার বারান্দার দিকের দরজাটা বন্ধ করে দিল।
এরপর দধিবামন সুশীলাকে এমন একটা কোনো কাজ করার কথা বলে যা শুনে সুশীলা সাবধানতার কথা ভুলে যায় এবং গলা তুলে প্রায় চিৎকার করেই বলে ওঠে, না। কিছুতেই সম্ভব না। সেই আওয়াজে মোহিতবাবুর ঘুম ভেঙে যায়। তিনি বিছানার ওপরে উঠে বসেন।
ওদিকে দধিবামন তৈরি হয়ে এসেছিল। তার পোশাকের আড়ালে লুকোনো ছিল অট্টহাসিনীর ছোরা। সেইটা এবার সে বার করে। সুশীলা বুঝতে পারে দধিবামন তাকে খুন করতে যাচ্ছে। সে দারুণ আতঙ্কে বলে ওঠে—না না না না। এই কথাগুলোও মোহিতবাবু শুনতে পেয়েছিলেন। এরপরেই দধিবামন ছোরা দিয়ে সুশীলার গলা কেটে খুন করে এবং তারপরেই যেটা করে সেটা সাধারণ মানুষের ভাবনার অতীত। সে ছোরাটাকে সুশীলার বুকের ওপরে ফেলে দিয়ে, নিজে ঢুকে পড়ে বন্দনাদেবীর চাদরের তলায়।
বন্দনাদেবীর চেহারা আপনি দেখেছেন। পাহাড়ের মতো বিশাল। তাঁর গায়ের চাদরটা তাই ছোটখাটো চেহারার দধিবামনকে একটা তাঁবুর মতোই ঢেকে নিয়েছিল।
এরপরে মোহিতবাবু দরজা ভেঙে ফেলেন। আমি দৌড়তে দৌড়তে ওপরে উঠি...আমার পেছন পেছন আর সবাই। একটা প্রচণ্ড কনফিউশন তৈরি হয়। কে আর তখন খেয়াল করে দেখছে বন্দনাদেবীর গায়ের চাদর টানটান আছে কিনা। সত্যি কথা বলতে কী, আমিও দেখিনি। আমার মাথাতেও তখন এই সম্ভাবনার কথা আসেনি। পরে ভেবে দেখেছি, এ ছাড়া আর কিছু হওয়া সম্ভব নয়।
এরপর যা হয়েছিল সেটাও আপনার মনে আছে নিশ্চয়। কানাইবাঁশি লাহিড়ী প্রথম প্রস্তাব দেন ঘরটাকে বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হোক। তাই শুনে ঝন্টুদা এবং কানাইবাঁশির সেক্রেটারি প্রফুল্ল প্রামাণিক বন্দনাদেবীর কটটাকে ধরে ঠেলতে ঠেলতে অন্য ঘরে নিয়ে যান। সেই কটের সঙ্গেই অন্য ঘরে ট্রান্সফার হয়ে যায় সুশীলাদির হত্যাকারী অর্থাৎ দধিবামন। ফলে আমাদের কাছে ব্যাপারটা বন্ধঘরের হত্যারহস্য হয়ে দাঁড়ায়।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস এছাড়া এই রহস্যের আর কোনো ব্যাখ্যা নেই। কারণ দরজা ভাঙার শব্দ আর আমার দোতলায় পৌঁছনো, এর মধ্যে এতই অল্প সময়ের ব্যবধান ছিল যে, তার মধ্যে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ওই ঘরে ঢুকে খুন করে বেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আর মোহিতবাবু যে খুন করেননি সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যেহেতু ওই ঘরের মধ্যে তাঁর পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি।
এখন নিশ্চয় আপনি বুঝতে পারছেন, কেন আমি জোর দিয়েছিলাম বন্দনাদেবীর বিছানার চাদরটার যেন ফরেনসিক এগজামিনেশন করানো হয়। আমার আন্দাজ যে ঠিক, তার প্রমাণ, ওই চাদরে সিঁদুর চন্দনের দাগ পাওয়া গেছে। ওই দাগ এসেছে দধিবামনের শরীর থেকে।
আপাতত আমার আরো একটা সন্দেহের কথা বলে শেষ করি। এই পুরো ষড়যন্ত্রের সঙ্গে দুটি মানুষ নিশ্চিতভাবেই যুক্ত। একজন হচ্ছেন প্রফুল্ল প্রামাণিক আর অন্যজন মনোজিৎ চ্যাটার্জী অর্থাৎ ঝন্টুবাবু। ওরা দুজনেই বন্দনাদেবীর হসপিটাল কট ঠেলে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন। চোখে দেখে যা বোঝা যায় না, কটটাকে ঠেলতে গেলে তা নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পারার কথা...সেটা হল একজন বাড়তি মানুষের ওজন। তবু ওরা দু’জনেই টুঁ শব্দ যে করেননি তাইই নয়, অন্য ঘরে গিয়ে দধিবামনকে ওই কট থেকে নেমে পালানোর সুযোগও করে দিয়েছিলেন।
এসব কথা কীভাবে প্রমাণ করা যাবে আমি জানি না। হয়তো ওদের দু’জনকে—না, দু’জন নয়, তিনজন—প্রফুল্লবাবু, ঝন্টুদা এবং দধিবামন, এদের তিনজনকে পুলিশ কাস্টডিতে নিয়ে জেরা করলে অনেক কিছুই বেরোবে।
আমি যে কেন এখন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ যোগাযোগ করছি না তা জগদীশদার মুখেই শুনতে পাবেন। তবে আপনার যদি আমাকে কিছু জানানোর থাকে, জগদীশদার মাধ্যমেই জানাতে পারেন। প্রণামান্তে,
উমাশঙ্কর চৌবে।
চিঠির কপিটা যথাস্থানে রেখে এসে আবার বিনায়কের মুখোমুখি চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। দেখলাম ও মুঠোর ওপরে চিবুক রেখে গভীরভাবে কী যেন ভাবছে। একটু বাদে মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, নাঃ। ক্রাইম সিনকে আপনি যেভাবে কল্পনা করেছিলেন তার মধ্যে আমি অন্তত কোনো ফাঁক খুঁজে পাচ্ছি না। এর পরে কী হয়েছিল, স্যার? ঝন্টুবাবু এবং প্রফুল্ল প্রামাণিক কি নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছিলেন? খুনে সাধুটা ধরা পড়েছিল?
বললাম, ঠিক অতটা মসৃণভাবে সবকিছু মেটেনি। তবে এটুকু বলতে পারি, আমার চিন্তায় কোনো ভুল ছিল না। দধিবামনই খুন করেছিল সুশীলাদিকে এবং বন্দনাদেবীর খাটের ভেতরে লুকিয়ে তাকে ঘর ছাড়তে সাহায্য করেছিল ওই দু’জন—ঝন্টুদা এবং প্রফুল্ল প্রামাণিক। ফলে পুরো ব্যাপারটার ওপরে বেশ একটা অলৌকিকের আবরণ নেমে এসেছিল।
পুলিশও যখন ক্রমশ ব্যাপারটার মধ্যে থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে ঠিক তখনই জগদীশদার হাতে পাঠানো আমার সেই চিঠিতে ওসি যোগব্রত রায় একটা পথের দিশা পেলেন। খুব সংক্ষেপে একটা উত্তর লিখে জগদীশদার হাত দিয়েই আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি লিখেছিলেন—তিনটেকেই তুলে আনার ব্যবস্থা করছি। তবে একটু সময় লাগবে। কানাইবাঁশি প্রভাবশালী লোক। তার বাড়িতে যারা আশ্রয় পেয়েছে, অর্থাৎ প্রফুল্লবাবু আর দধিবামন, তাদের জন্যে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বার করাতে একটু সময় লাগবে।
ঠিক পরের দিন, রাত তখন ন’টা হবে। জনকপুরের চ্যাটার্জী ম্যানসনের পক্ষে সেটা অনেক রাত। অত বড় একটা বাড়ি। কাজের লোকটোক নিয়ে মাত্র ছ’-সাতজন বাসিন্দা। দিনের বেলাতেই বাড়িটাকে ভূতের বাড়ি বলে মনে হয়; রাত ন’টায় সেই বাড়ির চেহারা কেমন হবে বুঝতেই পারছ। আমি বুলানকে পড়ানো শেষ করে ছাদে এসে দাঁড়িয়েছি। সিঁড়ি বেয়ে নামতে যাচ্ছি, তখনই হঠাৎ চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম অন্ধকার মাঠের রাস্তা ধরে তিনটে গাড়ির ছ’টা হেডলাইটের আলো এইদিকেই এগিয়ে আসছে।
ঠিক দু’মিনিট বাদে চ্যাটার্জী ম্যানসনের সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে গেল। চিলেঘর থেকে বুলানবাবু চেঁচিয়ে উঠল, উমাদাদা, লোডশেডিং হল নাকি?
দূরে মূল শহরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আলোর আভা দেখা যাচ্ছে। একবার ছাদের পশ্চিমদিকের পাঁচিলের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে স্কুলবাড়িটার দিকেও তাকালাম। দেখলাম স্কুলের দেউড়ি, বাগান আর বারান্দায় সারা রাত ধরে যে আলোগুলো জ্বলে, সেগুলোও দিব্যি জ্বলছে।
আমি বুলানবাবুর ঘরে ঢুকে ওকে হ্যারিকেন জ্বালানোয় সাহায্য করলাম। তারপর ওকে বললাম, তুমি একটু ছবিটবি আঁকো। আমি নীচ থেকে একবার চট করে দেখে আসছি, কী হল। মনে হয় ফিউজ উড়ে গেছে।
এই বলে আমি অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম। দোতলার চাতালে, দেয়ালের গায়ে কয়েকটা ঘুলঘুলি ছিল। নামতে নামতেই ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলাম সেই গাড়ি তিনটে, চ্যাটার্জী ম্যানসনের সামনে পৌঁছে গেছে। জনকপুর থানার গাড়ি—একটা অ্যাম্বাসাডর, দুটো জিপ। তিনটে গাড়ি থেকেই দ্রুতগতিতে সশস্ত্র পুলিশেরা নামতে শুরু করেছে। পরক্ষণেই একতলার সদর দরজায় গুমগুম বাড়ি আর যোগব্রতবাবুর ভরাট গলায় ডাক, মোহিতবাবু, মোহিতবাবু! দরজা খুলুন।
হঠাৎই আমার মাথায় খেলে গেল—এ তো তাহলে সাধারণ ফিউজ উড়ে যাওয়া কিংবা কেবল ফল্টের ঘটনা নয়! পুলিশকে আসতে দেখেই বাড়ির ভেতর থেকে কেউ মেন অফ করে দিয়েছে।
কেন দিয়েছে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম। এবং যে উত্তরটা পেলাম সেটা মারাত্মক।
তোমাকে শুরুতেই বলেছিলাম, একতলায় আমার যে থাকার ঘর, সেই ঘরেই একটা দরজা ছিল, যেটা দিয়ে চ্যাটার্জী ম্যানসনের পেছনের বাগানে যাওয়া যেত। দরজার বাইরেই ছিল দুটো জোরালো আলো, যে আলোদুটোর কাজ ছিল বাড়ির পেছনের অংশটাকে আলোকিত করে রাখা, যাতে রাতের বেলায় চোর-ছ্যাঁচড়রা ওই জায়গাটাকে ব্যবহার করতে না পারে। এবং এটাও বলে রাখি, ওই আলোদুটোর সুইচ ছিল বাড়ির সামনের গেটে যে চৌকিদারের ঘর, সেই ঘরের ভেতরে।
মন বলল, সদর দরজায় পুলিশ এসেছে বলে কেউ ওই পেছনের দরজা দিয়ে পালাতে চাইছে। যে পালাতে চাইছে, সে জানে যে, খিড়কি দরজার বাইরে আলোদুটো জ্বললে সে পালানোর সময় ধরা পড়ে যাবে এবং সে এটাও জানে যে, ওই আলো বাড়ির ভেতর থেকে নেভানো যায় না। তাই সে মেইন সুইচ অফ করে দিয়েছে।
আমি দ্রুতপায়ে একতলায় নেমে এলাম। নামতে নামতেই দেখলাম মোহিতবাবু হাতে একটা টর্চ নিয়ে দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে এসেছেন এবং খুব উদ্বিগ্নমুখে হাঁকাহাঁকি করছেন, ও গৌর। ও আনোয়ার। তোরা সব কোথায় গেলি? একবার সদর দরজাটা খুলে দে না কেউ।
উনি ভুলে গেছেন যে, গৌর বা আনোয়ারের মতো কাজের লোকেরা বহু আগেই ছুটি পেয়ে যে যার বাড়ি ফিরে গেছে। থাকার মধ্যে পেছনের রান্নাঘরে রয়েছে মিনুপিসি।
কিন্তু মিনুপিসিই বা এতক্ষণ ধরে কী করছে? দরজা খুলছে না কেন?
দেখলাম বুলান হাতে লণ্ঠন নিয়ে নেমে এসেছে। ও যাচ্ছে সদর দরজার খিল খুলতে। নিশ্চিন্ত হলাম। আর একটু দেরি হলে যোগব্রতবাবু হয়তো দরজা ভেঙেই ফেলতেন। আমি এবার একতলার ভেতরের দালান ধরে দৌড়লাম। না, ঠিক দৌড়তে পারলাম না, কারণ, আগেই বলেছি, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে ছিল চারিধার। তাই পড়ে থাকা ঝুড়ি-চুবড়ি, বালতি-কোদাল ইত্যাদি বাঁচিয়ে যতটা জোর পায়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব, হেঁটে গিয়ে ঢুকে পড়লাম আমার ঘরে।
ঝন্টুদা তখন সবেমাত্র পেছনের দরজাটা খুলেছেন। আমার পায়ের শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকালেন। মনে হল অন্ধকার ঘরটার মধ্যে একটা কোণঠাসা নেকড়ে বাঘের মুখোমুখি পড়ে গেছি। নেকড়ের মতোই ধকধক করে জ্বলছিল ওঁর চোখদুটো। প্রবল আক্রোশে ঠোঁটদুটো ফাঁক হয়ে গিয়ে নেকড়ের মতোই বেরিয়ে এসেছিল নীচের দাঁতের পাটি। ভয় যে একটু পাইনি তা নয়, তবু সেই মুহূর্তে কর্তব্যের ডাক অনেক বেশি প্রবল হয়ে উঠেছিল। একজন অপরাধী এইভাবে পালাবে? আমি কিছু করতে পারব না?
আমি ঝন্টুদার ওপরে ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম। ঝন্টুদা একপাশে সরে গিয়ে ঘৃণা মেশানো স্বরে বলল, পুলিশের দালাল। তোকে আমি ছাড়ব না। আমি ব্যালেন্স ফিরে পাওয়ার আগেই ঝন্টুদা দরজার খিলটা তুলে নিয়ে আমার মাথা লক্ষ্য করে প্রবলবেগে চালিয়ে দিলেন।
ভাগ্যিস মাথাটা সরিয়ে নিতে পেরেছিলাম, না হলে সেদিনই আমার মৃত্যু ঘটত। তবু পুরোপুরি বাঁচলাম না। সলিড শালকাঠ দিয়ে তৈরি খিলটা এসে পড়ল আমার বাঁ-কাঁধের ওপরে এবং সঙ্গে সঙ্গেই আমি জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান হারানোর পূর্ব মুহূর্তে দেখলাম ঝন্টুদা অন্ধকার বাগান ধরে পেছনের পাঁচিলের দিকে দৌড় দিয়েছেন।
খুব বেশিক্ষণ অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকিনি অবশ্য। মুখের ওপরে জলের ঝাপটায় চৈতন্য ফিরল। দেখলাম আমার ঘরে আলো জ্বলছে, দালানে আলো জ্বলছে, এমনকী বাইরের বাগানের জোরালো সার্চলাইট দুটোও জ্বলে উঠেছে। তার মানে ইতিমধ্যেই কেউ মেইন সুইচ অন করে দিয়েছেন। পুলিশদের মধ্যেই কেউ হবেন।
যোগব্রতদা আমার পাশেই মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন। আমাকে চোখ মেলতে দেখে দু’জন কনস্টেবলকে ইশারা করলেন। তারা আমাকে খুব যত্ন করে তুলে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা একটা গাড়ির দিকে নিয়ে চলল। জিগ্যেস করলাম, কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? তারা উত্তর দিল, হাসপাতালে। বড়বাবু বলেছেন, আপনার ইলাজের প্রয়োজন আছে। ও হ্যাঁ, আমার সঙ্গেই অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হল মিনুপিসিকে। ঝন্টুদা যখন মেইন সুইচ অফ করতে যাচ্ছেন তখন মিনুপিসি তার হাত ধরে নিবৃত্ত করতে গিয়েছিল। তাকে সরাতে গিয়ে এতটাই জোরে ধাক্কা দিয়েছিলেন ঝন্টুদা যে, মিনুপিসি ছিটকে পড়ে এবং একটা চেয়ারের পেছনে লেগে তার মাথা ফেটে যায়।
কথায় বাধা পড়ল। আমার স্ত্রী করুণা ইভিনিং ওয়াকে বেরিয়েছিল। একটু আগে বাড়ি ফিরেই কিচেনে ঢুকেছিল। এখন একটা ট্রে-তে তিনকাপ চা আর প্লেটে কুমড়োফুলের বড়া নিয়ে আড্ডায় যোগ দিল। আমার শেষ কথাটা শুনতে পেয়ে বিনায়কের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, পুলিশে ঢোকার আগেই গুন্ডার হাতে মার খেয়েছে। তোমার স্যার কেমন বীরপুরুষ ভাবো।
আমি বললাম, শেষ লড়াইটা কিন্তু আমিই জিতেছিলাম।
করুণা বলল, জানি।
বিনায়ক দু’হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল, বউদি, বউদি! প্লিজ কিছু বলবেন না। আমি কিন্তু প্রথমবার এই গল্পটা শুনছি।
করুণা বলল, ওই অংশটা শুনেছ তো? যেখানে সুশীলার হত্যাকারী বন্দনাদেবীর বিছানার মধ্যে লুকিয়ে পালিয়েছিল আর উনি সেটা ধরে ফেলেছিলেন?
হ্যাঁ। স্যার সেটা একটু আগেই বললেন। ব্রিলিয়ান্ট ক্রাইম অ্যান্ড ইকুয়ালি ব্রিলিয়ান্ট ডিটেকশন। কিন্তু এরপরেও তো গল্প আরো বাকি আছে।
আমি বললাম, আছে। ঠিক এরপরেই জনকপুরে ঘটে গিয়েছিল আরো এক হত্যার ঘটনা। দ্বিতীয়বারে যে খুন হয়েছিল, মৃত্যুর পরেও তাকে এখানে-ওখানে দেখা যাচ্ছিল।
বিনায়ক সবে আস্ত একটা কুমড়োফুলের বড়া মুখে পুরেছিল। আমার কথা শুনে বিষম-টিষম খেয়ে একাকার। একটু সামলে নিয়ে, একঢোক চা দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে বলল, যাঃ! কী যে বলেন! মৃত্যুর পরেও কেউ ঘুরে বেড়াতে পারে! এ কি ভূতের গল্প নাকি?
বললাম, প্রথমটায় সকলে সেরকমই ভেবেছিল, এমনকী আমিও। পরে অবশ্য...। উঁহু, এভাবে লাফ মেরে কাহিনির অন্তিমে পৌঁছে গেলে চলবে না। বরং যেরকমভাবে ঘটনাগুলো ঘটেছিল, সেইভাবেই বলি—
পাণ্ডবেশ্বর হাসপাতালে দুটো রাত কাটিয়েই বাড়ি ফিরে এলাম...আমি এবং মিনুপিসি দু’জনেই। আমাদের কারওরই আঘাত খুব ভেতরে পৌঁছয়নি, ফার্স্ট-এইডেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে মোহিত চ্যাটার্জী আমাকে বলেছিলেন, ক’টা দিন কলকাতায় নিজের বাড়িতে কাটিয়ে আসতে পারো তো। সেখানে যত্ন বেশি পাবে।
লজ্জার মাথা খেয়ে তাকে বলতে বাধ্য হয়েছিলাম, পৃথিবীতে আমাকে যত্ন করার মতো কেউ যদি থেকে থাকে তাহলে তারা এই বাড়িতেই রয়েছে। মিনুপিসি আর বুলান। একটু চুপ করে থেকে যোগ করলাম, আর আপনি।
কথাটা সত্যি। উনি বরাবরই আমার ঠিকঠাক যত্নআত্তি হচ্ছে কিনা, সে ব্যাপারে খোঁজখবর রাখতেন; যদিও তাঁর নিজের জীবনটা সেই সময়ে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। বুঝতে পারছ তো, কেন এ-কথা বলছি? একে তো তখন তাঁর নিজের মাথার ওপরে মার্ডার কেসের খাড়া ঝুলছিল। এবার তাঁর একমাত্র সন্তানও সেই কেসে জড়িয়ে পড়লেন। জড়িয়ে পড়লেন শুধু তাইই নয়, এক অর্থে পলাতক হয়ে স্বীকার করে নিলেন তাঁর অপরাধ।
আর পালাবার আগে বাড়ির আশ্রিত এক প্রৌঢ়া ও এক যুবককে আঘাত করে গেলেন। আমাকে তো খুন করতেই চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি।
নিজের সন্তানকে খুনি বলে জানার যে কষ্ট, সেই কষ্টের ছাপ তখন মোহিত চ্যাটার্জীর চোখেমুখে জড়িয়ে থাকত। কিন্তু তবু সাংসারিক কর্তব্যে তাঁর কোনো শিথিলতা দেখিনি। প্রতিদিন খাওয়ার সময় একবার করে অপরাধীর মতো মুখ করে আমার পাশে এসে দাঁড়াতেন। প্রশ্ন করতেন, খাচ্ছ তো বাবা? ঠিক করে খাও। বড় অস্বস্তিবোধ করতাম। বলতাম, আপনি বিশ্রাম নিতে যান জ্যাঠামশাই। মিনুপিসি থাকতে আমার খাওয়ার কোনো অযত্ন হবে না।
বড় অপরাধী...বড় অপরাধী হয়ে রইলাম তোমার কাছে উমা—এই বলে বিশাল জীর্ণ শরীরটাকে টানতে টানতে তিনি ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে যেতেন। সেদিকে তাকিয়ে আমি ভাবতাম, যোগব্রতদা ওঁর সম্বন্ধে যত ইনফর্মেশন জড়ো করেছেন, সেগুলোর ওপরে বিশ্বাস রাখলে বলতে হয় এককালে এই মানুষটি অপরাধপ্রবণ ছিলেন। হয়তো সত্যিই মানুষের ঘর জ্বালিয়েছেন, এমনকী খুন অবধি করিয়েছেন। কিন্তু সে তো অনেক বছর আগে। তার পর কি ওঁর মধ্যে মানসিক পরিবর্তন আসতে পারে না?
কিছুতেই বিশ্বাস হতো না সুশীলাদির খুনের পেছনে...এমনকী তারও অনেক আগে ওঁর পুত্রবধূ জয়া চ্যাটার্জীর মৃত্যুর পেছনে এই মানুষটির কোনো হাত থাকতে পারে।
হাসপাতাল থেকে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট শুধু মনোজিৎ চ্যাটার্জী অর্থাৎ ঝন্টুদার নামেই বেরোয়নি, বেরিয়েছিল প্রফুল্ল প্রামাণিক এবং দধিবামন ভট্টাচার্যের নামেও। কারণ ওসি যোগব্রত রায়ের মনে হয়েছিল আমার বিশ্লেষণ অকাট্য, এবং তাতে ওই তিনজনই প্রত্যক্ষভাবে খুন এবং খুনের প্রমাণ লোপাটের অপরাধে অপরাধী।
দধিবামনকে অ্যারেস্ট করা হল। কিন্তু শুনে আশ্চর্য হলাম, ঝন্টুদার মতো প্রফুল্ল প্রামাণিকও অ্যাবস্কন্ডিং অর্থাৎ ফেরার।
ঝন্টুদা ফেরার হওয়ার পর থেকে আমি নির্ভয়ে বাড়ির বাইরে ঘুরছিলাম। কারণ ততদিনে আমাদের সবার কাছেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, কে আমাকে পাথর ছুড়ে মেরেছিল আর কেই বা হুমকি চিঠি পাঠিয়েছিল। ঝন্টুদা ছাড়া ওসব আর কারও কাজ নয়।
যাই হোক, ঘটনার তৃতীয় দিনে, ঘুরতে ঘুরতে থানায় গিয়ে হাজির হলাম। ওসির চেম্বারের পর্দা সরিয়ে উঁকি মারতেই যোগব্রতদা আমাকে ভেতরে ডেকে নিলেন। অত্যন্ত বিরক্তমুখে বললেন, কাকে আর দোষ দেব? বুঝতে পারছি, আমার টিমের মধ্যেই ওদের স্পাই লুকিয়ে বসে আছে। না হলে দু’জনেই শেষ মুহূর্তে খবর পেয়ে যায়? জনকপুরে যেভাবে একদম লাস্ট মোমেন্টে মনোজিৎবাবু খবর পেয়ে পালালেন, ঠিক একইভাবে আমাদের বাঁকুড়ার পুলিশপার্টি প্রামাণিকের বাড়িতে পৌছনোর ঠিক পাঁচ মিনিট আগে সেও হাওয়া হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, বুঝলে উমা, প্রফুল্ল প্রামাণিক বাঁকুড়ার বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গিয়েছিল বলে খবর পেয়েছি। কাজেই সে দূরে কোথাও চলে গিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ঝন্টুবাবুর জন্যে সে সুযোগ রাখিনি। যে মুহূর্তে আমাদের প্রায় নাকের ডগা দিয়ে উনি চ্যাটার্জী ম্যানসন ছাড়লেন, সেই মুহূর্তেই আমি পুরো জনকপুর নাকাবন্দি করে দিয়েছি। এই তিনদিনের মধ্যে মনোজিৎবাবুর পক্ষে কিছুতেই জনকপুর ছাড়া সম্ভব নয়।
অথচ পুরো জনকপুরের যত সম্ভাব্য জায়গা, গুন্ডাদের যত ডেন, যত ভবঘুরেদের থাকার জায়গা, বাজার এলাকা, স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, সমস্ত তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওঁকে খুঁজে পাচ্ছি না। দেখেছ নিশ্চয়, ওঁর ছবি দিয়ে ‘সন্ধান চাই’ বলে চতুর্দিকে পোস্টার দিয়েছি। কারও বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেওয়াও তাই ওঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
সেইজন্যেই তোমাকে বলছি, চ্যাটার্জী ম্যানসন আর ওই স্কুলবাড়ি, এই দুটো জায়গার দিকে একটু খেয়াল রেখো। হতেই পারে, এই দুই জায়গায় কোথাও উনি গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে। আত্মীয়-স্বজনরা হয়তো সব জেনেও আমাদের জানাচ্ছেন না।
ঝন্টুদা কোথায় ভ্যানিশ হলেন এই চিন্তা নিয়েই থানা থেকে বেরিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে হাঁটতে শুরু করেছিলাম। একটু বাদে যখন হুঁশ ফিরল, তখন দেখলাম, কখন যেন সেই লালমাটির রাস্তায় উঠে পড়েছি। সেই যে রাস্তাটা ধরে আমি আর বুলান বেড়াতে যেতাম। যে রাস্তাটার ওপরে সাধু চাঁড়ালের বন। যে বনের ভেতরে শ্মশান থেকে বুলানকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। আরো এক কিলোমিটার গেলে যে রাস্তার শেষে একটা ছোট কোলিয়ারি। নিউ-তুকসালি কোলিয়ারি।
মাঠের পাড়ে সূর্য ডুবছিল। অস্তসূর্যের আভার সামনে কালো সিল্যুয়েট হয়ে দাঁড়িয়েছিল নিউ তুকসালি কোলিয়ারির চানক। বিশাল ইস্পাতের টাওয়ারের ওপর প্রকাণ্ড দুই চাকা, লাটাইয়ের মতো ঘুরতে ঘুরতে যারা খনির গহ্বরে নামিয়ে দিচ্ছে লোহার কেজ। আবার তুলেও আনছে।
ওইদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় এল। আমি আবার উলটোদিকে ঘুরে থানার রাস্তায় পা চালালাম।
থানায় যোগব্রত রায়ের চেম্বারে ঢুকে অবাক হলাম। দেখলাম এর মধ্যেই একজন নতুন অতিথি তাঁর ঘরে প্রবেশ করেছেন। বসে আছেন তাঁর টেবিলের উলটোদিকে। ভদ্রলোকের হাইট বেশি নয়, গায়ের রঙ ময়লা, মাথাজোড়া টাক। পেছন থেকেও চিনতে অসুবিধে হল না—কানাইবাঁশি লাহিড়ী।
আমি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই দু’জনেই মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। যোগব্রতদা বোধহয় আমাকে ফিরে আসতে দেখেই বুঝেছিলেন, বিশেষ কোনো প্রয়োজন নিয়ে এসেছি। এটাও বুঝেছিলেন, কানাইবাঁশিবাবুর সামনে কোনো কথা বলাই আমার পক্ষে অসম্ভব। তাই উনি বললেন, একটু ঘুরে আসবে উমা? এই ধরো আধঘণ্টা।
আমি বললাম, নিশ্চয়ই। কোনো অসুবিধে নেই।
আধঘণ্টা কোথায় কাটাব সেটা নিয়ে ভাবতে হল না। জগদীশদার দোকান থানার একদম গায়েই বলা চলে। ঠিক পেছনের রাস্তাটায়। চলে গেলাম কোল্ডফিল্ড মেডিসিন। দোকানে একদমই ভিড় ছিল না। জগদীশদা যথারীতি মন দিয়ে একটা বই পড়ছিলেন। আমাকে দেখে ভারি খুশি হয়ে বললেন, এসো মাস্টার, সাইকেলটা ওখানে স্ট্যান্ড করে রাখো, তারপর ভেতরে এসো। বাঃ, তুমি তো একদম ফিট হয়ে গেছ দেখছি। মাথায় আর ব্যথা-ট্যাথা নেই তো? থাকলে বোলো, একটা ভালো পেইন-কিলার দিয়ে দেব।
আমি বললাম, না না। ওসব কিছু নেই।
জগদীশদা হাঁক দিয়ে উলটোদিকের দোকানে চা আর টোস্ট বিস্কুটের অর্ডার দিয়ে বললেন, বলো, কী খবর? কোথায় এসেছ?
বললাম, নতুন খবর সেরকম কিছু নেই। ঝন্টুবাবু এখনো মিসিং।
সে তো জানি, বললেন জগদীশদা।
ওদিকে প্রফুল্ল প্রামাণিকও অ্যাবস্কন্ডিং, মানে বেপাত্তা। পুলিশ তাকে ধরতে পারছে না।
অ্যাঁ! আমার দ্বিতীয় কথাটা শুনে চমকে উঠলেন জগদীশদা। বললেন, সে কেন অ্যাবস্কন্ডিং হবে? তাকে তো সেদিনই দেখলাম।
কবে? আমি ভারি অবাক হলাম।
যেদিন তুমি মাথায় চোট খেলে, তার পরেরদিন সকালে। মানে পরশুর আগেরদিন। তখন ন’টা বাজে। আমি তখন সবে দোকান খুলছি। প্রামাণিক বাস থেকে নামল, একেবারে খালি হাতে। আমি ভাবলাম চাটুজ্জেবাড়িতেই যাচ্ছে নিশ্চয়ই। কিন্তু খালি হাতে কেন? সাধারণত একটা মিষ্টির হাঁড়ি তো থাকে। আমি তো আর জানি না তার নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে, সে আদৌ চ্যাটার্জী ম্যানসনে যাচ্ছে না। জানলে একবার টুক করে থানায় গিয়ে বলে আসতাম না হয়। তা ব্রাদার, প্রামাণিকের দোষটা কী? ওর নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বেরোল কেন? সুশীলাকে ও-ই মেরেছে নাকি?
ভেবে দেখলাম, প্রফুল্ল প্রামাণিক আর ঝন্টুদা মিলে কীভাবে দধিবামনকে খুনের পর লুকিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল সেসব কথা এখনই জগদীশদাকে বলা উচিত হবে না। কথা ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগে না। তাই চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে বললাম, কে জানে! পুলিশের ব্যাপার। আমি কী করে জানব বলুন?
জগদীশদা বিষণ্ণভাবে ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, ঝন্টুবাবুর ব্যাপার-স্যাপারও বুঝতে পারছি না। লোকটাকে চিরকাল নির্বিরোধী ভালোমানুষ বলেই জানতাম। সে এরকম ভায়োলেন্ট হয়ে গেল কীভাবে?
একটু হেসে বললাম, শুধু ভায়োলেন্টই নয়, অত্যন্ত সতর্কও হয়ে পড়েছেন। এতটাই সতর্ক যে তিনদিন ধরে পুলিশ তাকে ধরতেই পারছে না। আচ্ছা, জগদীশদা, আপনি যখন প্রফুল্ল প্রামাণিককে বাস থেকে নামতে দেখেছিলেন, তখন কি তাঁর সঙ্গে আর কেউ ছিলেন? কিংবা বাসস্ট্যান্ডে কি কেউ তাঁকে নিতে এসেছিলেন?
জগদীশদা একটু চিন্তা করে বললেন, একটা বাচ্চা ছেলে ওর সামনে সামনেই যাচ্ছিল। ছেলেটা কি ওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল? ঠিক নিশ্চিত নই, বুঝলে? পোশাকে-আশাকে একেবারেই কুলিবস্তির বাচ্চা। হতে পারে এমনিই একা একা রাস্তায় ঘুরছিল।
খুব সতর্কভাবে প্রশ্ন করলাম, কী বললেন, জগদীশদা? কুলিবস্তির ছেলে? কেমন করে বুঝলেন?
জগদীশদা হেসে ফেললেন। বললেন, এই দ্যাখো। নয় নয় করে তোমারও তো অনেকদিন এই জনকপুরে থাকা হয়ে গেল। কুলিবস্তির ছেলে কেমন করে চিনলাম জিগ্যেস করছ মাস্টার? সেই সর্বাঙ্গে কয়লার কালি-মাখা চেহারা। পায়ের জুতোটা কোলিয়ারির ইস্যু করা ডিউটি-বুটস, বাবা কাকার বাতিল করা ছিঁড়ে যাওয়া জুতো। গায়ের খাকি শার্টটাও তাই। কুলিবস্তির বাচ্চা চিনতে কি ভুল হয়?
জগদীশদার কথাগুলো শুনে আমার হৃদ্পিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্যে থমকে গেল। এতক্ষণ যেটা ছিল শুধুই একটা ধারণা, একটা কল্পনা, সেটাই যে এত তাড়াতাড়ি কনফার্মড হয়ে যাবে তা ভাবিনি।
বুঝলে বিনায়ক, চাকরি-জীবনেও বহুবার, বহু ইনভেস্টিগেশনে দেখেছি, যখন মনে হয়েছে সমস্ত রাস্তা এসে একটা কানাগলির মুখে আটকে গিয়েছে, তখনই হঠাৎ কোথা থেকে যেন নতুন একটা পথের বাঁক দেখতে পেয়েছি। কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা না থাকলে বোধহয় পৃথিবীতে কোনো সাফল্যই আসে না। তবে, এটাও দেখেছি, যারা ভাগ্যের ওপরে ভরসা করে বসে থাকে না, ভাগ্য শুধু তাদেরই সহায়তা করে।
যাই হোক, বুঝতে পারলাম জগদীশ মাহাতোর কাছ থেকে আর কোনো ইনফর্মেশন পাব না। কেমন করে পাব? উনি তো দোকান ছেড়ে বেরোতে পারেননি। দোকানে বসে যেটুকু দেখেছেন, আমাকে বলেছেন। কিন্তু সেটাও অনেক।
কথায় কথায় আধঘণ্টা কেটে গিয়েছিল। বললাম, উঠি জগদীশদা।
কোথায় যাবে?
থানায় যাওয়ার কথাটা আর বললাম না। বললাম, বুলানবাবুর জন্যে একটা ড্রয়িং খাতা কিনতে এসেছিলাম। ওটা কিনে নিয়ে বাড়ি যাব।
জগদীশদার ওখান থেকে আবার গেলাম যোগব্রত রায়ের চেম্বারে। কানাইবাঁশি লাহিড়ী দেখলাম চলে গেছেন। উনি একাই বসে বসে ভয়ংকর চিন্তিত মুখে একটা পেপারওয়েটকে টেবিলের কাচের ওপরে লাট্টুর মতো পাক খাওয়াচ্ছিলেন। আমাকে ঢুকতে দেখে সেটা একদিকে সরিয়ে রেখে বললেন, এসো উমাশঙ্কর।
টেবিলের উলটোদিকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। আমি কিছু বলার আগেই উনি বললেন, বুঝলে উমাশঙ্কর, সুশীলাদেবীর হত্যারহস্যের সমাধান হিসেবে তুমি যে সম্ভাবনার কথা বলেছ, তা অকাট্য। ও ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু একটা জিনিস নিয়ে আমি প্রথম থেকেই ভারি বিব্রত ছিলাম।
মোটিভ? আমি জিগ্যেস করলাম।
উনি সপ্রশংস দৃষ্টিতে আমাকে একবার দেখে নিয়ে বললেন, একদম ঠিক বলেছ। মোটিভ। এই যে তিনজন মানুষকে আমরা খুন এবং খুনের প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে সন্দেহ করছি, তাদের উদ্দেশ্যটা কী ছিল? স্রেফ খেয়ালের বশে তো আর মানুষ খুন করে না, এক যদি না সাইকোপ্যাথ কিলার হয়। আর সাইকোপ্যাথরা একা একা অপারেট করে, তারা দল বেঁধে কাজ করে না।
সত্যি কথা বলতে কী, যোগব্রতদার এই প্রশ্ন আমাকেও জ্বালিয়ে মারছিল। মাঝেমাঝেই ঠিক এই কথাগুলোই ভাবতাম। এটা বুঝতে পারতাম, সুশীলাদির অতীতে যদি আলো ফেলতে না পারা যায়, তাহলে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু সেই আলো ফেলার ক্ষমতা আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের নেই। সেটা পারে একমাত্র পুলিশ।
আমার এই চিন্তার মধ্যেই যোগব্রতদা বলে উঠলেন, একটু আগে কানাইবাঁশিবাবু যা বলে গেলেন তাতে এই প্রশ্নের একটা জবাব পাওয়া গেল। ইনফ্যাক্ট, উনি সেই কথাগুলো বলবার জন্যেই আজ এসেছিলেন। পুরোটা তোমাকে বলতে পারব না, ভেরিফাই না করে বলা উচিতও নয়। তবে এইটুকু বলতে পারি, কানাইবাঁশিবাবুর একটা বক্তব্যের সত্যতা সম্বন্ধে আমি এখনই নিশ্চিত। আর সেটা হল, এই বাড়িতে আয়া হয়ে কাজে যোগ দেওয়ার অনেক আগে থেকেই সুশীলা দাস ছিল মোহিত চ্যাটার্জীর বিশ্বস্ত অনুচর। তার বহু অপকর্মের সঙ্গী।
এই কথাটা উনি না বললেও আমি জানতাম, কারণ, সুশীলার অতীত জীবন সম্বন্ধে খোঁজ নিতে গিয়ে আমি আগেই এগুলো জেনেছিলাম। মাত্র সতেরো বছর বয়সে ও প্রতিবেশী এক দেশে নিষিদ্ধ ওষুধ স্মাগল করা দিয়ে অপরাধজগতে প্রবেশ করে। পরের পাঁচ বছরে সুশীলা নিজেই ছোটখাটো একটা স্মাগলিং গ্যাংয়ের লিডার হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের মেয়েদের শত্রুর অভাব হয় না। সুশীলাকে খুন করার জন্যেও আরো বড় এক গ্যাং-লিডার আদাজল খেয়ে লেগে পড়ে। তখন সুশীলা মোহিত চ্যাটার্জীর কাছে শেল্টার চায়। মোহিত চ্যাটার্জী ওকে শেল্টার দেন।
এসব প্রায় কুড়ি বছর আগের কথা। মোহিতবাবুর অনেকগুলো কালা-ধান্দার মধ্যে একটা ছিল ব্ল্যাকমেলিং। তুমি জানো বোধহয়, টালিগঞ্জের ফিল্ম-দুনিয়ার সঙ্গে ওঁর ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। যোগাযোগটা এমনি এমনি রাখতেন না। উনি মাঝারি মাপের অনেক গায়ক নায়ক পরিচালকের ড্রাগের নেশা বা এই ধরনের অপরাধের খবর জানতেন। জানতেন মানে, পুলিশের সন্দেহ সেইসব অপরাধে উনি নিজেই মদত দিতেন। তারপর সেইসব কথা অন্যদের জানিয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে সেইসব গায়ক-নায়ক-পরিচালকদের থেকে টাকা আদায় করতেন। গায়িকা অথবা নায়িকারাও বাদ যেতেন না।
নিজের হাতে তো টাকা নিতেন না। ওর হয়ে টাকাগুলো আদায় করত সুশীলা। সুশীলা খুন হওয়ার পরে আমি এরকম দুয়েকজনের কাছে সুশীলার ছবি নিয়ে গিয়ে বলেছি, চিনতে পারেন? বিশ্বাস করবে না উমা, এত বছর বাদেও সেইসব সেলিব্রিটিদের মুখ মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ভয়ে। সুশীলার ভয়ে।
কিন্তু বছর পাঁচেক আগে এমন একটা কিছু হয় যাতে সুশীলাকে আর কলকাতায় রাখা বিপজ্জনক হয়ে যায়। এদিকে তখন মোহিতবাবুর স্ত্রীও প্যারালাইজড হয়ে পড়েন। সবদিক ভেবে মোহিতবাবু ওকে নিজের বাড়িতেই এনে রাখেন।
আমি আর না পেরে বলে উঠলাম, এসব সত্যি? এত বড় অভিনেতা মোহিত চ্যাটার্জী?
যোগব্রতদা মুচকি হেসে বললেন, সিনেমা জগতের প্রবীণ মানুষেরা এখনো ওঁর অভিনয় মনে রেখেছেন। তাঁরা বলেন, মোহিত চ্যাটার্জীর ভেতরে যদি একটা জন্মগত অপরাধপ্রবণতা না থাকত, যদি উনি মন দিয়ে শুধু অভিনয়টাই করতেন, তাহলে ছবি বিশ্বাস আর বসন্ত চৌধুরীর ভাত মারতে পারতেন, এমনই ছিল ওঁর চেহারার অ্যারিস্টোক্রেসি আর অভিনয়-ক্ষমতার কম্বিনেশন।
আমার মুখে কথা জোগাচ্ছিল না। ওই স্নেহময় বৃদ্ধ, তিনি একজন ব্ল্যাকমেলার, একজন খুনি! কী অবিশ্বাস্য অভিনয়-ক্ষমতা থাকলে মানুষ এইভাবে নিজের আসল রূপ লুকিয়ে রাখতে পারে তাই ভাবছিলাম।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে যোগব্রতদা বললেন, আমি কানাইবাঁশি লাহিড়ীকে সরাসরি আজ চার্জ করেছিলাম। বলেছিলাম আপনি ভালোমানুষ সাজার চেষ্টা করবেন না। আমরা ভুলে যাইনি যে, চ্যাটার্জী ম্যানসনে দধিবামন এবং প্রফুল্ল প্রামাণিককে আপনিই এনে ঢুকিয়েছিলেন। আপনি না চাইলে মোহিত চ্যাটার্জী ওইসব যাগযজ্ঞের দিকে যেতেনই না। এক অর্থে আপনিও খুনিদের সাহায্যকারী। তাতে উনি কী বললেন জানো?
কী? আমি জিগ্যেস করলাম।
উনি বললেন, ওরা ওকে ভয় দেখিয়ে রাজি করিয়েছিল। বুলানের প্রাণের ভয়। ভাইঝি জয়াকে ছোটবেলা থেকে উনিই মানুষ করেছিলেন। জয়া চ্যাটার্জী ছিলেন ওঁর নিজের মেয়ের চেয়েও বেশি। আর সেই জয়ার একমাত্র সন্তান বুলান। তাই বুলানও ওঁর প্রাণ। দধিবামন এবং প্রফুল্ল প্রামাণিক যখন সেই বুলানের অনিষ্ট করার হুমকি দিল, তখন উনি ওদের চ্যাটার্জী ম্যানসনে না নিয়ে এসে পারেননি। তবে সুশীলাকে মারার প্ল্যান আছে এটা ওঁরা নাকি ঘুণাক্ষরেও কানাইবাঁশিকে জানায়নি। জানলে উনি তখনই পুলিশকে জানাতেন।
আমি বললাম, এটা ডাহা মিথ্যে কথা।
কেন? উনি প্রশ্ন করলেন।
বললাম, ঝন্টুদাও তো ওদের দলে আর বুলান ঝন্টুদার ছেলে। ঝন্টুদা নিজের ছেলের ক্ষতি করবে?
যোগব্রতদা বললেন, কথাটা আর কাউকে বোলো না। বুলান মোটেই মনোজিৎবাবুর মানে ঝন্টুবাবুর ছেলে নয়। ও হচ্ছে জয়াদেবীর আগের পক্ষের ছেলে। বুলানের যখন মাত্র এক বছর বয়স তখন জয়াদেবীর আগের হাসব্যান্ড মারা যান। তখন ঝন্টুবাবু জয়াদেবীকে বিয়ে করেন। কাজেই বুলানের প্রতি ঝন্টুবাবুর কোনো মায়া মমতাই নেই। এমনকী কানাইবাঁশির বিশ্বাস, বুলানের কিডন্যাপিং-এর পেছনে ঝন্টুবাবুরই হাত ছিল।
আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছিল। যোগব্রতদার আনানো তেওয়ারির দোকানের স্পেশাল মশলা চা পুরো এক কাপ শেষ করার পরে সেটা কিছুটা কাটল। যোগব্রতদা বললেন, হ্যাঁ, এবার বলো তোমার পুনরাগমনের হেতু। চাটুজ্জেবাড়িতে আবার কিছু ঘটল নাকি?
বললাম, না না। অন্য একটা কথা মাথায় এল। সেটাই বলতে এসেছিলাম।
বলো।
কথাটা প্রফুল্ল প্রামাণিক আর ঝন্টুদার সম্ভাব্য লুকোনোর জায়গা নিয়ে।
যোগব্রতদা টেবিলের ওপাশ থেকে আমার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। বললেন, বাঃ! সত্যিই যদি লোকদুটোকে খুঁজে দিতে পারো বড় উপকার হয়। আমি তো ওপরওলাদের কাছে বেইজ্জত হয়ে যাচ্ছি।
বললাম, এটা একটা সম্ভাবনা মাত্র। ভুল হতেই পারে। তবে জনকপুরের খুব কাছে, খুব ভালো লুকিয়ে থাকার জায়গা হচ্ছে নিউ তুকসালি কোলিয়ারির কুলিবস্তি। সেদিন আমাকে আঘাত করার পর ঝন্টুদা, চ্যাটার্জী ম্যানসনের পেছনদিক দিয়ে যে রাস্তা ধরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, সেই রাস্তায় লুকোনোর জায়গা মাত্র দুটি। এক সাধু চাঁড়ালের বন আর দুই ওই কোলিয়ারি। প্রথমটি নিশ্চয়ই আপনারা ভালো করে দেখেছেন...
আমাকে থামিয়ে দিয়ে যোগব্রতদা বললেন, দ্বিতীয়টিও দেখেছি। পরদিন সকালেই তুকসালির কুলিবস্তিতে সার্চ করেছি।
আর কোলিয়ারি? খাদের নীচটা? সেটা দেখেছেন?
যোগব্রতদা বললেন, খাদের মধ্যে অমন হুট করে বাইরের লোক নেমে যেতে পারে নাকি? নামতে হলে ডুলিতে চেপে নামতে হবে। তার জন্যে চানকের লাইনে দাঁড়াতে হবে। ওই কোলিয়ারির লেবার হতে হবে...
এবার আমি ওঁর কথায় বাধা দিয়ে বললাম, আপনি যা যা বলছেন, সব সাধারণ মানুষদের জন্যে অ্যাপ্লিকেবল। কিন্তু মনোজিৎ চ্যাটার্জী হচ্ছেন মোহিত চ্যাটার্জীর ছেলে। সেই মোহিত চ্যাটার্জী, যার অঙ্গুলিহেলনে ইসিএল-এর বড় বড় সাহেবরা এদিক থেকে ওদিক ট্রান্সফার হয়ে যায়। কাজেই তাদের পক্ষে অন্তত পুলিশ যখন রেড করছে সেই সময়টায় মাটির নীচে ঢুকে পড়াটা কঠিন নয়।
বহুবচন ব্যবহার করছ কেন? তাদের পক্ষে মানে কাদের পক্ষে? যোগব্রতদার প্রশ্ন।
বললাম, বহুবচন নয়, অ্যাকচুয়ালি দ্বিবচন। প্রফুল্ল প্রামাণিকও সম্ভবত ঝন্টুবাবুর সঙ্গেই আছেন।
যোগব্রতদার ভুরুদুটো কপালের দিকে উঠে গেল। একটু আগে জগদীশদার মুখ থেকে কী শুনে এসেছি সেটা ওঁকে জানালাম। প্রফুল্ল প্রামাণিকের নামে ওয়ারেন্ট ইস্যু হওয়ার আগেই যে উনি জনকপুরে এসে বাস থেকে নেমেছেন এবং কুলিবস্তির একটি ছেলের সঙ্গে তাকে যেতে দেখা গেছে সবটাই বললাম যোগব্রতদাকে। যোগব্রতদা বললেন, তাহলে আর দেরি করে লাভ কী? চলো, দেখে আসি তোমার অ্যাসাম্পশন সত্যি কিনা।
বললাম, আমি যাব?
চলো না। ভয় কীসের? অফিসিয়ালি তো আর যাচ্ছ না। তুমি থাকলে লোকদুটোকে আইডেন্টিফাই করতে সুবিধে হয়। আমি ঝন্টুবাবুকে এক-দু’বার দেখেছি। প্রফুল্ল প্রামাণিককে চাক্ষুষ দেখিইনি। আমার টিমের কেউই দেখেনি। সেই জন্যেই বলছি।
এক-মুহূর্ত চিন্তা করে আমি দু’দিকে মাথা নাড়লাম। বললাম, সেটা ঠিক হবে না যোগব্রতদা। আমি কিন্তু এখনো মোহিত চ্যাটার্জীর বাড়িতেই থাকি, বলতে গেলে তার থাবার নীচেই। এই কেসটায় খুব অ্যাকটিভলি জড়িয়ে পড়লে তিনি আমাকে ক্ষমা নাও করতে পারেন।
সেটা ঠিক। বললেন যোগব্রত রায়। ঠিক আছে, তাহলে ছবির ওপরে ভরসা করেই এগোই। তুমি বেরিয়ে পড়ো।
যখন সাইকেল নিয়ে চ্যাটার্জী ম্যানসনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, তখন আমাকে ওভারটেক করে জনকপুর থানার তিনটে জিপ আটজন পুলিশকর্মীকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, লালমাটির রাস্তায় লাল ধুলো উড়িয়ে ওরা নিউ তুকসালি কোলিয়ারির দিকে ছুটে যাচ্ছে। সন্ধের অন্ধকার আরো কিছুটা ঘন হয়ে এসেছে।
বুঝলে বিনায়ক, পরে অনেকবার ভেবেছি, সেদিন যদি আমি যোগব্রতদার সঙ্গে যেতাম তাহলে হয়তো আর এক অলৌকিক হত্যাকাণ্ডের ইলিউশন আমাদের অত সহজে নাস্তানাবুদ করতে পারত না।
ব্যাপারটা এককথায় এইভাবে বলে দেওয়া যায়—জনকপুর থানার পুলিশ-বাহিনীর তল্লাশির শুরুতেই মনোজিৎ চ্যাটার্জী অর্থাৎ ঝন্টুদা পালাতে গিয়ে পিটহেড থেকে খনির গহ্বরে পড়ে যান এবং তৎক্ষণাৎ তাঁর মৃত্যু হয়।
ইংরিজিতে পিটহেড বা বাংলায় চানক জিনিসটা কেমন সেটা তোমাকে একটু বুঝিয়ে দিই বিনায়ক। তুমি যদি তিন-চারশো ফিট গভীর চতুষ্কোণ একটা কুয়োর কথা কল্পনা করতে পারো, তাহলে সেটাই হচ্ছে মাটির ওপর থেকে খনির গভীরে ওঠানামার পথ। কিন্তু ওই খাড়া গর্তে উঠবে নামবে কেমন করে? তার জন্যে থাকে লোহার বড় খাঁচার মতো একটা লিফট, যাকে কোলফিল্ডের ভাষায় বলে ‘ডুলি’ বা ‘কেজ’। সেই ডুলিতে চড়ে গাঁইতি-কোদাল হাতে খনির শ্রমিকরা নামাওঠা করে, আবার ওইরকম আরেকটা ডুলিতে চেপে খনির নীচ থেকে বোঝাই করে দেওয়া কয়লা ওপরে উঠে আসে।
ইস্পাতের দড়ি দিয়ে ডুলিগুলো খনির মধ্যে ঝোলানো থাকে। বাষ্পচালিত দুটো কপিকল লাটাইয়ের মতো ঘুরে ঘুরে কেজগুলোকে একবার নীচে নামায়, আবার ওপরে ওঠায়।
ঠিক যে জায়গাটায় ডুলিগুলো মাটির ওপরে উঠছে, সে জায়গাটাকে ন্যাচারালি খুবই সুরক্ষিত রাখা হয়, না হলে তো যে কেউ ডুলিতে চড়ে বসবে। ডুলির প্রবেশপথ থাকে একটা বিশাল ঘরের মধ্যে। সেই ঘরটায় সবাই ঢুকতে পারে না। শুধু খনির কর্মীরাই পাস দেখিয়ে ঢুকতে পারে।
এই খনির মুখ, কেজ, কেজের ঘর, কপিকল—সবটা নিয়েই ‘পিটহেড’ বা চানক। যে কোনো কয়লাখনির প্রাণকেন্দ্র।
সেদিন জনকপুর থানার পুলিশ-পার্টি কুলিদের থাকার জায়গায় গিয়ে সময় নষ্ট করেনি। তারা সরাসরি পিটহেডের বড় ঘরটার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল এবং এগোতে গিয়েই দেখেছিল ঘরটার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন মনোজিৎ চ্যাটার্জী।
নিখুঁত ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন তিনি। যোগব্রতবাবুরা তাঁকে চিনতে পারতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু এই সময়ে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়। খুব সাদামাটা চেহারার একজন লোক যোগব্রতবাবুর পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় ফিসফিস করে বলে যায়, আপনারা যাকে খুঁজছেন সে ওই পিলারটার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। ভালো করে দেখুন। গায়ে লেবারের ইউনিফর্ম। এই ইনফর্মেশন দিয়ে যাওয়া লোকটা যে কে, সেটা যোগব্রতবাবু খেয়াল করেননি। পরে তাকে দেখলেও চিনতে পারবেন না, কারণ, সেই মুহূর্তে তাঁর সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিল পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ছদ্মবেশী ঝন্টুবাবু।
পুলিশকে তার দিকে এগোতে দেখেই ঝন্টুবাবু উলটোদিকে ঘুরে দৌড়তে শুরু করেন। পেছন পেছন তাড়া করে যান ওসি যোগব্রত রায় এবং তাঁর দলবল।
সন্ধের শিফট প্রায় একঘণ্টা আগে শেষ হয়ে গেছে। শ্রমিকেরা সকলেই প্রায় ফিরে গেছে নিজের নিজের বাসায়। ইচ্ছে করেই পুলিশের দলটা ওইসময়ে গিয়েছিল যাতে জায়গাটাকে খালি পায়।
যাই হোক, ঝন্টুবাবু দিশাহারার মতো একবার এদিক একবার ওদিক দৌড়তে শুরু করেন। দৌড়তে দৌড়তে তিনি ঢুকে পড়েন পিটহেডের সেই বড় ঘরটার মধ্যে, যে ঘরের মধ্যে কেজগুলো ওঠানামা করে।
যোগব্রত রায় ছিলেন ঠিক ওঁর পেছনে। তাঁর পেছনে আরো সাত-আটজন পুলিশকর্মী। যোগব্রতবাবুর মুখে পরে ঘটনার যে বিবরণ শুনেছিলাম, তা এইরকম। উনি চিৎকার করে ঝন্টুবাবুকে থামতে বলেন। বলেন, ভয় নেই। তার ওপরে কোনোরকমের টর্চার করা হবে না। শুধু কোর্টের নির্দেশমতো তাঁকে অ্যারেস্ট করা হবে।
কিন্তু ঝন্টুবাবু সেসব কথায় কর্ণপাতই করেন না। বরং পাগলের মতো মাথার ওপরে দুটো হাত তুলে চেঁচিয়ে ওঠেন, এই রুখো... রুখো।
কাকে তিনি থামতে বলছিলেন?
বলছিলেন মানুষ ওঠানামা করানোর খাঁচাটাকে। ঠিক সেই মুহূর্তে খাঁচাটা খনির নীচে নামতে শুরু করেছিল। খাঁচার ভেতরে দু’জন কর্মী ছিলেন। এই দু’জনের পরিচয় পরে পুলিশ পেয়েছিল। একজন হচ্ছেন খনির সেফটি সুপারভাইজার অভয় কুমার আর অন্যজন তার জুনিয়র অফিসার বিমল মান্না।
অভয় কুমারের বক্তব্য, শেষ ট্রিপের কুলিরা ওপরে উঠে এসে রিপোর্ট করে যে, খনির একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে স্যান্ড-ফিলিংয়ের কাজ অর্ধেক শেষ করে তারা ফিরে এসেছে। কয়লা কেটে নেওয়ার পরে সেই জায়গাটাকে বালি দিয়ে ভালো করে ভরাট না করে দিলে খনির ছাদ ধসে যেতে পারে। সেই জন্যে তিনি নিজে একবার অবস্থাটা দেখে আসার জন্যে নীচে নামছিলেন।
যাই হোক, পাগলের মতো দাঁড়াও দাঁড়াও বলে চিৎকার করতে করতে ঝন্টুবাবু কেজটার দিকে ছুটে গেলেন। হয়তো আর একমিনিট আগে পৌঁছলে তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হতো। তিনি ওই কেজের মধ্যে চড়ে বসতে পারতেন। কিন্তু তা হল না। তাঁর পৌঁছতে এক মিনিট দেরি হয়ে গেল।
বুঝলে উমাশঙ্কর, বললেন যোগব্রত রায়, আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, খাঁচাটা দ্রুতগতিতে শ্যাফটের মধ্যে নেমে গেল আর নিজের গতি সামলাতে না পেরে ওই গভীর গর্তের মধ্যে উলটে পড়লেন মনোজিৎবাবু। একটু বাদে একটা ভয়ার্ত আর্তনাদ উঠে এল গহ্বরের নীচ থেকে। আর্তনাদটা আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে এল। তারপর একসময় থেমেও গেল।
যোগব্রতবাবু বলেছিলেন, চোখের সামনে এই বীভৎস ঘটনা ঘটতে দেখে তাঁরা সকলেই কিছুক্ষণের জন্যে স্থবির হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর দৌড়েছিলেন পিটহেডের অন্য প্রান্তে অপারেটর্সের ঘরের দিকে। তাঁরা অপারেটরকে বলতে গিয়েছিলেন, এক্ষুনি যেন কেজ-টাকে ওপরে তুলে আনা হয়, কিন্তু তার দরকার পড়েনি। অপারেটরের ঘরে পৌঁছেই শুনতে পেয়েছিলেন ঘরের মধ্যে পাগলাঘণ্টির মতো আওয়াজ করে একটা ঘণ্টা বাজছে।
সাধারণ সময়ে নীচ থেকে ওই ঘণ্টার বোতাম টিপেই অপারেটরকে সংকেত পাঠানো হয়—এবার কেজ তুলে নাও, কিংবা ওপর থেকে কেজ পাঠাও, আমরা উঠব। সাধারণ সময়ে একবার বা দু’বার ঘণ্টা বাজালেই যথেষ্ট কাজ হয়। কিন্তু তখনকার কথা আলাদা।
সেফটি অফিসার অভয় কুমার আর বিমল মান্না পরে পুলিশকে জানিয়েছিলেন, কেজের মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা পরিষ্কার দেখেছিলেন, তাদের দু’হাত দূর দিয়ে আর্তনাদ করতে করতে উল্কার মতো নীচে নেমে গেল এক লেবারের শরীর। বেশিক্ষণ দেখতে পাননি। কারণ শ্যাফটের মধ্যে আলকাতরার মতো অন্ধকার। শুধু কেজের সামনে দিয়ে যখন বডিটা যাচ্ছিল, তখন কেজের ভেতর থেকে বাইরে ছিটকে পড়া আলোতেই যেটুকু দেখতে পেয়েছিলেন।
কিন্তু ভালো করে দেখেছিলেন কেজটা খনির বেডে গিয়ে থামবার পরে।
ডুলিটা নীচে যেখানে গিয়ে দাঁড়ায়, সেটাও ওপরের ওই বড় ঘরটার মতোই একটা ঘর। তফাত এইটুকুই যে এই ঘরের দেয়াল, সিলিং, মেঝে সবকিছুই নিকষ কালো কয়লার তৈরি। আসলে ঘরটাও বানানো হয়েছে কয়লার স্তরে গাঁইতি চালিয়ে। ওখানে দুটো টিমটিমে বাল্ব জ্বলছিল। তাছাড়া অভয় কুমার আর বিমল মান্নার হেলমেটের কপালের অংশেও সেফটি ল্যাম্প লাগানো ছিল।
কেজ থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে ওঁরা দু’জন দেখলেন রক্তের এক ছোটখাটো পুকুরের মধ্যে পড়ে আছে সেই লোকটা। উপুড় হয়ে পড়েছিল, তাই মুখটা দেখতে পাননি। তবে ইউনিফর্ম দেখে লেবার বলেই ভেবেছিলেন। এই দৃশ্য দেখে ওরা দু’জনে পাগলের মতো ঘণ্টা বাজাতে শুরু করেন। ওপরে ওদের গলা পৌঁছবে না জেনেও চিৎকার করে বলেছিলেন, নীচে এসো। সাংঘাতিক অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে গেছে এখানে।
ওপরে দাঁড়িয়ে যোগব্রতবাবুরা সেই পাগলাঘণ্টির আওয়াজই শুনেছিলেন। তিনি নিজেও তখন অপারেটরকে বলেছিলেন কেজ নামাতে। ইতিমধ্যে কোলিয়ারির নিজস্ব সিস্টেমে চারদিকে অ্যাক্সিডেন্টের খবর পৌঁছে গিয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে ছুটে এসেছিলেন কোলিয়ারির ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারসহ অন্যান্য অফিসারেরা। কোলিয়ারির নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স পিটহেডের কাছেই অষ্টপ্রহর মজুত থাকে। সাইরেন বাজিয়ে সেই অ্যাম্বুলেন্সও চলে এসেছিল এবং এসেছিলেন কোলিয়ারির নিজস্ব ডাক্তার।
শেষ অবধি নীচ থেকে অভয় কুমার আর বিমল মান্নাকে নিয়ে কেজ ওপরে উঠে এল। ওদের দু’জনেরই অবস্থা তখন খুব খারাপ। ঘেমে চান করে গেছে। ভয়ে আর উত্তেজনায় ভালো করে কথা বলতে পারছে না। চোখের সামনে এরকম নিষ্ঠুর একটা দৃশ্য দেখা সত্যিই কঠিন।
সেই ডুলিতেই রেসকিউ টিম নীচে নামল। তাতে ডাক্তার, চারজন প্যারামেডিক এবং কোলিয়ারির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ছাড়া আর ছিলেন যোগব্রত রায় এবং একজন পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর ব়্যাঙ্কের অফিসার।
মৃতদেহ ওই খাঁচায় ভরেই ওপরে নিয়ে আসা হল। যোগব্রত রায় পরে আমাকে বলেছিলেন, সে এক বীভৎস দৃশ্য।
তিনশো ফুট, মানে প্রায় ত্রিশ তলা এক বাড়ির ছাদ থেকে কেউ যদি কঠিন জায়গার ওপরে আছড়ে পড়ে, তাহলে যা হওয়া উচিত, মৃতদেহের অবস্থা তাই-ই হয়েছিল। শরীরের একটাও হাড় আস্ত ছিল না বলেই মনে হল, ইনক্লুডিং স্কাল অ্যান্ড ফেস-বোন।
ইনফ্যাক্ট, ম্যানেজারসাহেব আমাকে জিগ্যেস করেছিলেন, মোহিত চ্যাটার্জীকে ওখানে ডেকে আনা উচিত কিনা। আমি বারণ করেছিলাম। মনে হয়েছিল, একজন বাবার পক্ষে একমাত্র সন্তানের মৃত্যু যদিও বা সহ্য করা সম্ভব, এই রক্তাক্ত মুখ সহ্য করা সম্ভব নয়। এই মুখের স্মৃতি তাঁকে সারাজীবন যন্ত্রণা দেবে। তাই বলেছিলাম, না। লেট দি বডি কাম আউট ফ্রম দা মর্গ ফার্স্ট। তখন অন্তত মুখটা একটু সাফসুতরো করা থাকবে। ভাঙাচোরা শরীরটাও জড়ানো থাকবে সাদা কাপড়ে। ওরা আমার কথা মেনে নিয়েছিল। বডি রওনা করে দিয়েছিলাম মর্গের দিকে।
আর হ্যাঁ, এর মধ্যেও আমাদের কয়েকজন স্টাফ কোলিয়ারির পিটহেড এবং আশপাশটা খুঁজে এসেছিল। ঝন্টুবাবুর সহকারী প্রফুল্ল প্রামাণিকের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বুঝতেই পারছি, ডামাডোলের মধ্যে সে হতভাগা আবার ভেগেছে। সম্ভবত জনকপুর থেকেই পালিয়েছে, কারণ, তুকসালির ওই ঘটনার পর আমি সব জায়গা থেকে চেক-পয়েন্ট তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। তখন তুকসালিতেই আমার অনেক লোকের প্রয়োজন ছিল। আমাদের ছোট থানা, তুমি তো জানো লোকবল কত কম।
এই অবধিই সেদিন কথা হয়েছিল যোগব্রত রায়ের সঙ্গে। ‘সেদিন’ মানে যেদিন ওঁরা তুকসালিতে রেড করলেন তার পরের পরেরদিন বিকেলে। তার আগেরদিন মর্গে কাটাছেঁড়ার পরে, চ্যাটার্জী ম্যানসন ঘুরে, ঝন্টুদার মৃতদেহ চলে গিয়েছে সাধু চাঁড়ালের শ্মশানের দিকে। সেই শবযাত্রায় মোহিতবাবু ছিলেন সবার পিছনে, গাড়িতে। হাঁটার ক্ষমতা ছিল না তাঁর। কাছে গিয়ে শুনেছিলাম, উনি বারবার একটা কথাই বলছিলেন—ঝন্টুর মা ভাগ্যবতী। ও বেঁচে থেকেও পুত্রশোক পেল না। আমাকে কেন ভগবান ওর মতো অসাড় করে দিলেন না? তাহলে আমাকেও আজ ছেলের শবযাত্রায় যেতে হতো না।
ওর কথাগুলো বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারিনি। বুলানের হাতটা মুঠির মধ্যে ধরে পিছিয়ে গিয়েছিলাম অনেকখানি।
ঝন্টুদার মৃত্যুর খবরটা আসার পর থেকেই বুলানকে আমি কাছছাড়া করিনি। মনে মনে ভাববার চেষ্টা করছিলাম কতখানি দুঃখ বুকের মধ্যে চেপে রেখেছে ওইটুকু একটা ছেলে। মাকে তো ও কতদিন আগেই হারিয়েছে। এবার বাবাকেও হারাল। হতে পারে সৎ বাবা। কিন্তু বুলান তো সে কথা জানে না। ও তো বাবা বলতে ঝন্টুদাকেই জানত।
মুখাগ্নি হয়ে যাওয়ার পর বুলানকে বললাম, তোমার এই আগুনের আঁচে দাঁড়িয়ে থাকার দরকার নেই। চলো, ওদিকটায় গিয়ে বসি।
চিতা থেকে অনেকটা দূরে একটা মাটির ছোট ঢিবির ওপরে উঠে বসলাম দু’জনে। একটু বাদে পেছনে পায়ের শব্দ শুনে মুখ ঘুরিয়ে দেখলাম যোগব্রত রায় এসেছেন। ইউনিফর্মে নয়, আজ উনি সিভিল ড্রেসে এসেছেন। সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা, চোখে ডার্ক কালারের সানগ্লাস। একবার বুলানের মাথায় আলতো করে হাতটা বুলিয়ে দিয়ে আমার পাশেই হাঁটু মুড়ে বসলেন।
বুঝতে পারছিলাম একটা বিশাল অপরাধবোধ ওঁকে এখনো জ্বালিয়ে মারছে। উনি নিশ্চয়ই এই সত্যটা ভুলতে পারছেন না যে, ওনার তাড়া খেয়ে পালাতে গিয়েই ঝন্টুদা ডুলির শ্যাফটের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন।
জ্বলন্ত চিতাকে ঘিরে এদিকে-ওদিকে অনেকেই দাঁড়িয়েছিলেন। কানাইবাঁশিবাবুকে দেখলাম তাঁর স্ত্রী এবং পুত্রকে নিয়ে এসেছেন। জগদীশদা তো প্রথম থেকেই নিজের হাতে শবযাত্রার সমস্ত ব্যবস্থা করছেন। আমাদের স্কুলের অনেক শিক্ষক এসেছেন আর এসেছেন ইসিএল-এর বেশ কিছু কর্মী।
মোহিত চ্যাটার্জীর ছেলে যে লেবারের ছদ্মবেশে তুকসালি কোলিয়ারির ভেতরে লুকিয়ে ছিল, এই তথ্যটা অনেকের মনে ঝন্টুদার সম্বন্ধে ঘৃণার উদ্রেক করেছে ঠিকই, কিন্তু তার জন্যে মোহিতবাবুর সম্মান কিছু কমেনি। বরং একজন হতভাগ্য পিতা হিসেবে উনি আরো বেশি সংখ্যক মানুষের সহানুভূতি পাচ্ছেন।
যোগব্রতদা হঠাৎ বললেন, ওই যে দেখছ ডুমুরগাছটার নীচে দু’জন লোক দাঁড়িয়ে আছে, একজনের গায়ে নীল সাফারি স্যুট আর অন্যজনের খয়েরি ফুলহাতা শার্ট, ওরা হল অভয় কুমার আর বিমল মান্না। অ্যাক্সিডেন্টের সময় যারা কেজে করে নামছিল।
বুঝলে বিনায়ক! অনেক সময় ভাবি আমাদের জীবন কিছু সমাপতনের সমষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়। কোইনসিডেন্স... শুধুই কোইনসিডেন্স। না হলে কেন সেদিন যোগব্রতবাবু আমাকে চিনিয়ে দেবেন ওই দু’জন লোককে? কোনো দরকার তো ছিল না। কেনই বা অভয় কুমার আর বিমল মান্না শ্মশানে এসেছিল সে প্রশ্নের উত্তরও কোনোদিন খুঁজে পাইনি। না আসলেই তো পারত ওরা।
যাই হোক, পরের কথা পরে। আপাতত সেদিনের কথায় ফিরে যাই। ঝন্টুদার দাহকাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে পুরোহিতমশাই বললেন, এবার খোকাকে তিনটে ডুব দিয়ে আসতে বলুন। খোকা অর্থে বুলান। বললাম, চলো বুলান। আমি তোমার শুকনো জামাকাপড় নিয়ে এসেছি। চান করে ওগুলো পরে নেবে।
এই প্রথম বুলান রুখে উঠল। এতক্ষণ দিব্য ভালোছেলের মতো যা যা বলা হচ্ছিল সব শুনছিল। এবার ঘাড় গোঁজ করে বলল, আমি চানও করব না, ন্যাড়াও হব না।
আমি বললাম, ন্যাড়া তো এখন হতে হচ্ছে না। আর চান করবে না কেন? শীত করছে?
না।
তাহলে?
ওই লোকটা তো আমার বাবা নয়, তোমরা ওকে বাবা ভাবছ কেন? ওর জন্যে আমি এতসব করব কেন?
বুলানের কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আহা! এইভাবে বাবার অভাবকে ভুলতে চাইছে ও। বাবা যে মারা গেছে, সেই ঘটনাটাকেই অস্বীকার করছে।
আমি বলতে পারতাম, বুলান, তোমার দাদু নিজে মর্গে গিয়ে আইডেন্টিফাই করে এসেছেন যে উনি মনোজিৎ চ্যাটার্জী—তোমার বাবা। কিন্তু বললাম না। বরং পুরোহিতমশাইয়ের কাছে গিয়ে অনুমতি নিয়ে এলাম, যাতে চানের বদলে মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে নেওয়া যায়।
চোদ্দো
ঝন্টুদার সৎকারের পরদিন সকালবেলায় নিজের ঘরে বসে আছি। দিনটা ছিল রবিবার। স্কুলের ছুটির দিন। হঠাৎ জগদীশদা ঘরে ঢুকলেন। ভূমিকা না করেই বললেন, চলো। থানায় ডাক পড়েছে।
বুঝলাম যোগব্রত রায় আবার নতুন কিছু শোনাবেন বলে ডেকেছেন।
জগদীশদা সাইকেল নিয়ে এসেছিলেন। আমিও চ্যাটার্জীবাড়ির এজমালি সাইকেলটা নিয়ে ওঁর সঙ্গেই বেরিয়ে পড়লাম। ভালোই লাগছিল বাড়িটা থেকে বেরোতে পেরে। ঝন্টুদার মৃত্যুর পর থেকে বাড়িটা থম মেরে আছে। অমন পরিবেশে বেশিক্ষণ থাকতে হলে কেমন যেন পাগল পাগল লাগে।
বাড়ির সামনের গেট দিয়ে বেরিয়ে একটা পাক খেয়ে আমরা পেছনের দিকে চলে গেলাম। ওদিক দিয়েই একটা শর্টকাট রাস্তা ধরে মিনিট সাতেকের মধ্যে জনকপুর থানায় পৌঁছনো যায়। পেছনে একটা মোটরভ্যান হর্ন দিচ্ছিল। সরু রাস্তা। ভ্যানটাকে সাইড দেওয়ার জন্যে মাটিতে পা রেখে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনদিকে তাকালাম। দেখতে চেয়েছিলাম, ভ্যানটার বেরিয়ে যাবার মতো যথেষ্ট জায়গা আছে কিনা। কিন্তু চোখ আটকে গেল চ্যাটার্জী ম্যানসনের দোতলার একটা ঘরের জানলার দিকে। ওটা মোহিত জ্যাঠামশাইয়ের ঘর। জোরালো হাওয়ায় জানলার পর্দা উড়ছিল। যখনই পর্দাটা সরে যাচ্ছিল, তখনই দেখা যাচ্ছিল তিনজন লোক জানলার পাশে একটা টেবিলকে ঘিরে বসে মাথা নিচু করে কী যেন আলোচনা করছেন।
তাঁদের মধ্যে একজনকে খুব সহজেই চিনতে পারলাম, কারণ, তাঁকে গত দেড়বছর ধরে প্রায় প্রতিদিনই দেখছি। মোহিত চ্যাটার্জী। বাকি দু’জনকে দু’দিন আগে হলেও চিনতে পারতাম না। কিন্তু গতকালই তাঁদের পরিচয় পেয়েছি। শ্মশানঘাটে ওঁরা উপস্থিত ছিলেন। যোগব্রত রায় আমাকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন—ইসিএল-এর সেফটি সুপারভাইজার অভয় কুমার আর তাঁর জুনিয়র কলিগ বিমল মান্না।
মনে আছে বিনায়ক, একটু আগে তোমাকে বলেছিলাম জীবনটা কিছু সমাপতনের সমষ্টি ছাড়া কিছু নয়?
ভাবো তো, ঝন্টুদার দাহকার্যের সময় যদি যোগব্রতদা আমাকে ওই লোকদুটোকে চিনিয়ে না দিতেন, তাহলে তো আমি ওই দৃশ্যটাকে পাত্তাই দিতাম না। অমন কত লোক প্রতিদিন মোহিত জ্যাঠামশাইয়ের কাছে আসে যায়। কে তাদের খেয়াল করে দ্যাখে?
বিনায়ক বলল, ওই দুই অফিসারের মোহিতবাবুর সঙ্গে দেখা করতে আসাটা কি অস্বাভাবিক?
বললাম, ভীষণ অস্বাভাবিক। মনে রেখো, মোহিতবাবু যত অভিজাতই হোন, যতই বড়লোক হোন আর যতই তাঁর দানধ্যান থাকুক, ইসিএল-এর কাছে তো তিনি বহু রেজিস্টার্ড কন্ট্র্যাকটরের মধ্যে একজন মাত্র। তার ওপরে তাঁর পাস্ট রেকর্ডকে সাধুভাষায় বলা যায় কালিমালিপ্ত। তাঁর বাড়িতে... বাড়িতেই শুধু নয়, একেবারে তাঁর বেডরুমে দু’জন অফিসার আসবেন কেন?
তার চেয়েও বড় কথা, কোন দু’জন অফিসার এসেছেন? না, যে দু’জন তাঁর পুত্রের মৃতদেহ প্রথম দেখেছিলেন। আমার মাথার মধ্যে সেই অদৃশ্য পাগলাঘণ্টিটা আবার বাজতে শুরু করল। আর সিক্সথ সেন্স কানে কানে বলতে লাগল, এই দৃশ্যটা ভুলো না উমাশঙ্কর, এই দৃশ্যটা ভুলো না।
জগদীশদা আমাকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে নিজেও দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। বললেন, কী হল? চলো।
বললাম, হ্যাঁ দাদা। এই গাড়িটাকে পাশ দিলাম। চলুন।
জগদীশদা থানার গেট থেকে বিদায় নিলেন। অসামান্য আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। যেখানে ওঁকে ডাকা হয়নি সেখানে উনি যাবেন না। আমাকে ডেকে দেওয়াটা ওঁর কাজ ছিল, সেই কাজটুকু সেরে চলে গেলেন। আমি ওসি-সাহেবের ঘরে উঁকি মেরে দেখলাম, যোগব্রতদা একাই আছেন। আমাকে দেখতে পেয়ে ভেতরে ডাকলেন।
বললেন, একটা বড়সড় ডেভলপমেন্ট হয়েছে। দধিবামন কনফেস করেছে যে, খুনটা ও-ই করেছে। এবং মোডাস-অপারেন্ডি তুমি যেমনটা আন্দাজ করেছিলে হুবহু তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সুশীলার গলায় ছুরি বসানোর পরে ও বন্দনাদেবীর বিছানায় উঠে চাদরের নীচে ঢুকে পড়েছিল। ছোটখাটো চেহারা, তাই বাইরে থেকে বোঝা যায়নি। কিন্তু ও একটা কথা বলছে, যেটা বিশ্বাস করব কিনা বুঝতে পারছি না।
কী বলছে? আমি জিগ্যেস করলাম।
ও বলছে, পুরো খুনের প্ল্যানটা করেছিলেন মোহিত চ্যাটার্জীর ছেলে মনোজিৎ। প্রফুল্ল প্রামাণিক জানতই না যে বিছানার চাদরের নীচে দধিবামন লুকিয়ে রয়েছে।
বলেন কী! দধিবামন ঝন্টুদার লোক! আমি বললাম।
ও তো তাই বলছে। বলছে মনোজিৎ চ্যাটার্জী এর জন্যে ওকে টাকা দিয়েছিলেন, প্রচুর টাকা। টাকাগুলো ক্যাশে দিয়েছিলেন, সেই টাকা আমরা ওর ঘরে লুকোনো জায়গা থেকে খুঁজেও পেয়েছি। কিন্তু কে দিয়েছিলেন প্রমাণ করব কী করে?
অবাক হয়ে বললাম, কিন্তু সুশীলা তো মোহিত জ্যাঠামশাইয়ের নিজের লোক, তাঁর একসময়ের সহযোগী। তাকে মনোজিৎবাবু কেন খুন করাতে চাইবেন?
কারণ, সুশীলা মোহিতবাবুকে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করেছিল। মোহিতবাবুর বহু পুরোনো পাপের সাক্ষী ছিল সুশীলা। তার কিছু কিছু প্রমাণও ওর হাতে থেকে গিয়েছিল। দধিবামন সেদিন প্রথমে সেই প্রমাণগুলোই সুশীলার কাছে ফেরত চেয়েছিল। সুশীলা বলেছিল, অসম্ভব। মনোজিৎ চ্যাটার্জীর পরিষ্কার নির্দেশ ছিল, ব্ল্যাকমেলিং-এর হাতিয়ারগুলো যদি সুশীলা ফেরত দিতে না চায়, তাহলে যেন ওকে আর বাঁচিয়ে না রাখা হয়। ঠিক সেই কাজটাই করেছিল দধিবামন।
বললাম, কিন্তু একটা কথা বলুন তো। এটা নিয়ে অনেকদিন ভেবেছি, কিন্তু উত্তর পাইনি। বারান্দার দিকের দরজা কিংবা মোহিতবাবুর ঘরের মধ্যেকার দরজা, যে দরজা দিয়েই দধিবামন সেদিন বন্দনাদেবীর ঘরে ঢুকুক, সুশীলা ওকে দরজা খুলে দিল কেন?
খুলে দিল তার কারণ, সুশীলা এবং দধিবামন একে অন্যকে বহুদিন ধরে চিনত। সুশীলার মতোই দধিবামনও ছিল টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় মোহিতবাবুর বহু কুকর্মের সঙ্গী। তুমি শুনলে অবাক হবে, বছর কুড়ি আগে দধিবামন নিজেও অনেকগুলো বাংলা সিনেমায় কমিক রোলে অভিনয় করেছিল। অবশ্য দধিবামন নামে কোনোদিনই ও অ্যাকটিং করেনি। যা ওর আসল নাম, সেই সমীরণ নন্দী নামেই অ্যাকটিং করত। দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল বাদ দিয়ে ওর মুখটা ভাবো, তাহলেই বুঝতে পারবে দধিবামন আর সমীরণ নন্দী এক মানুষ।
এবার আপনারা কী করবেন? আমি প্রশ্ন করলাম।
যোগব্রতদা কিছুক্ষণ চিন্তা করে উত্তর দিলেন, দধিবামনের মুখ দিয়ে কিছুতেই এই মার্ডার-কেসে মোহিতবাবুর কোনো ইনভলভমেন্টের কথা কবুল করাতে পারিনি। ও সারাক্ষণ বলে যাচ্ছে, পুরোটাই মনোজিৎবাবুর প্ল্যান ছিল। বাবাকে বাঁচাবার জন্যে তিনিই যা করবার করেছিলেন। এবং দ্যাখো, যেদিন সুশীলা খুন হল, মোহিতবাবুর সেদিনের পুরো অ্যাকটিভিটির কথা যদি ভাবো, তাহলে সেটা খুব একটা অবিশ্বাসও করতে পারবে না। না হলে কেন বলো তো মোহিতবাবু নিজের ঘরের লাগোয়া একটা ঘরে ওকে খুন করাবেন। বাড়িতে তো জায়গার অভাব ছিল না। আর বাইরে তো পুরো দুনিয়াটাই ছিল। এর ফলে ওঁকে তো কিছুদিন জেলেও কাটাতে হয়েছিল।
মনে মনে বললাম, হয়তো সেইজন্যেই পাশের ঘরে খুন করিয়েছিলেন, যাতে ওঁর ওপরে সন্দেহ না জাগে।
মুখে বললাম, তাহলে তো এখন কঠিন পরিস্থিতি। দধিবামনকে শাস্তি দেওয়াই যায়। খুনি হিসেবে ও খুব কঠোর শাস্তিই পাবে নিশ্চয়। কিন্তু অপরাধের পেছনে যে আসল মাস্টারমাইন্ড, সেই মনোজিৎ চ্যাটার্জী তো মারা গিয়ে শাস্তির হাত থেকে বেঁচে গেলেন।
সেটাই আফসোস, বললেন যোগব্রতদা। তারপর বললেন, শোনো, তোমাকে যে জন্যে ডেকেছিলাম। প্রফুল্ল প্রামাণিক এখনও মিসিং। তিনিও যে ওই তুকসালি কোলিয়ারিতেই লুকিয়ে ছিলেন তার এভিডেন্স পাওয়া গেছে। মনোজিৎবাবুর সঙ্গেই ছিলেন। এখন আর নেই। এই জনকপুর শহরে তাঁর বেশি লুকোবার জায়গা নেই আর শহর থেকে তাঁর বেরোবারও উপায় রাখিনি। আমাদের ইনফর্মাররা চতুর্দিকে নজর রাখছে। সেই জন্যেই মনে হচ্ছে, প্রফুল্লবাবুর পক্ষে এখন নিরাপদে লুকোবার জায়গা একটিই...
যোগব্রতদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, চ্যাটার্জী ম্যানসন।
এগজ্যাক্টলি। তুমি একটু খেয়াল রেখো।
হঠাৎই মনে পড়ে গেল, আসবার পথে যে দৃশ্যটা দেখেছিলাম, তার কথা। মোহিত জ্যাঠামশাইয়ের দোতলার শোবার ঘরে ইসিএল-এর দুই অফিসারের উপস্থিতি। সেফটি সুপারভাইজার অভয় কুমার আর তাঁর জুনিয়র কলিগ বিমল মান্না। কথাটা কি যোগব্রতদাকে বলা উচিত? একটা মন বলল, না। এই ঘটনা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। ওঁরা তো সমবেদনা জানাবার জন্যে আসতেই পারেন। কিন্তু আমার সিক্সথ সেন্স তখনও বলে যাচ্ছিল, ভুল। ভীষণই গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনাটা।
শেষপর্যন্ত কিছু না বলেই থানা থেকে চলে এলাম। বেশ কিছুদিন ধরে মনে অন্য একটা ব্যাপারে খটকা লাগছিল। সেটা ক্লিয়ার করতে পারেন এমন একজনকেই চিনি—জগদীশ মাহাতো। তাঁর কাছেই গেলাম।
জগদীশদা তখন একজন ভদ্রমহিলার প্রেসার মাপছিলেন। আড়চোখে আমাকে দেখে নিয়ে বললেন, ভেতরে এসে বোসো মাস্টার। তারপর কাজগুলো সেরে আমার পাশে এসে বসলেন। বললেন, বলো।
সরাসরিই জিগ্যেস করলাম, মোহিতবাবুর সম্পর্কে কানাইবাঁশি লাহিড়ীর এমন অ্যালার্জির কারণটা কী?
তাহলে শোনো। জয়াদেবীকে মনোজিৎবাবু বিয়ে করেছিলেন স্রেফ সম্পত্তির লোভে। জয়াদেবী তাঁর মৃত পিতার দিক থেকে এবং মৃত স্বামীর দিক থেকে, দু’দিক থেকেই বিরাট প্রপার্টি ইনহেরিট করেছিলেন। তুমি তো জানোই, জয়াদেবীর মৃত্যুর পেছনে রহস্য রয়েছে। খুব স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না সেটা। কানাইবাঁশি লাহিড়ীর বিশ্বাস, মোহিত এবং মনোজিৎ, এই পিতা-পুত্র ওঁর আদরের ভাইঝিকে সম্পত্তির লোভে বিষ খাইয়ে মেরেছে।
এটাই রাগের কারণ। এবং তোমাকে আরেকটা কথা বলে রাখি। প্রমাণ দিতে পারব না। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ওই যে যজ্ঞ, ওই যে লোকলস্কর নিয়ে কানাইবাঁশির জনকপুরে আগমন, তার পেছনে একটাই উদ্দেশ্য ছিল, মনোজিৎকে হত্যা করা। এটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল কানাইবাঁশির পক্ষে। কেন বলো তো?
কেন? জিগ্যেস করলাম।
কারণ, স্ত্রীকে খুন করার পরে মনোজিতের নেক্সট টার্গেট ছিল ছেলে।
কী বলছেন! আমি এমন লাফিয়ে উঠলাম যে একটা ওষুধের তাকে মাথাটা ঠুকে গেল।
জগদীশদা বললেন, বোসো, বোসো। উত্তেজিত হয়ো না। এটা তোমার এত অবিশ্বাস্য লাগছে কেন? তুমি তো জানো, মধুময় অর্থাৎ বুলান, চ্যাটার্জী-বংশের কেউ নয়। সে হচ্ছে জয়াদেবীর আগের পক্ষের সন্তান। তার মানে, জয়াদেবীর আগের পক্ষের স্বামীর যে বিপুল সম্পত্তি, তার আসল উত্তরাধিকারী কিন্তু বুলানই। বুলানের অভিভাবক হিসেবে মনোজিৎবাবু ওই সম্পত্তি দেখাশোনা করছিলেন মাত্র। কিন্তু আঠারো বছর বয়স হলেই বুলান তার বাবার সমস্ত সম্পত্তি পেয়ে যাবে। এবং কে বলতে পারে, তখন বুলান আদৌ আর জনকপুরে থাকবে কিনা। হয়তো বাঁকুড়ায় কানাইবাবুর কাছে চলে যাবে।
তুমি তো বুলানকে ভালো করেই চেনো। নিশ্চয়ই বুঝতে পারো, মনোজিৎবাবুকে ও পছন্দ করতে না। নিজের বাবা বলেই জানত, তবু পছন্দ করত না, কারণ, শিশুরা ঘৃণা জিনিসটা খুব ভালো অনুভব করতে পারে। ও বুঝতে পারত, মনোজিৎবাবু ওকে ঘৃণা করতেন।
বুলান চ্যাটার্জীবাড়িতে আছে কেবল মোহিতবাবু আর মিনুপিসির জন্যে। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মোহিতবাবু কিন্তু তাঁর এই নাতিটিকে খুব ভালোবাসেন। এটা আমার কাছেও একটু আশ্চর্য লাগে। মোহিতবাবু মানুষটিও তো সুবিধের নন। প্রচুর খারাপ কাজের ইতিহাস আছে ওঁর পেছনে। তবু বুলানকে যে কীভাবে...
অবাক হয়ে বললাম, আপনি সব জানেন জগদীশদা!
উনি একটু হেসে বললেন, দোকানদারি করার এই এক সুবিধা। তুমি না চাইলেও অনেক কথা তোমার কানে এসে যাবে। আর কম দিন তো হল না এখানে রয়েছি।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম। কানাইবাবু খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিলেন, মনোজিৎ আর কিছুদিন সময় পেলেই তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় নাতি, তাঁর জয়া-মার সন্তান বুলানকে খুন করবে। ইতিমধ্যেই একবার সেই চেষ্টা করেছিল।
কিডন্যাপিং! আমি অবাক হয়ে বললাম।
জগদীশদা মাথা নেড়ে জানালেন, হ্যাঁ।
কী আশ্চর্য! আমি ভেবেছিলাম, ওটা সুশীলা করিয়েছিল, যেহেতু সুশীলাই জানত সেদিন সন্ধেবেলায় বুলান কোথায় যাবে।
শুধু সুশীলা কেন? মনোজিৎবাবু্র ঘরও তো ছিল ওই দোতলাতেই। তিনিও জানতেন। তিনিই বুলানকে কিডন্যাপ করিয়েছিলেন। যদিও কোথাও নিজের চিহ্ন রাখেননি। অত কাঁচা কাজ ঝন্টু চ্যাটার্জী করতেন না।
তারপর?
যেটুকু খবর কানে এসেছিল তাতে বুঝেছিলাম, কানাইবাঁশিবাবু অপহরণকারীদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। উনি নিজেও তো অপরাধজগতের লোক। কাজেই ওটুকু পেরেছিলেন। নিজে যাননি। ওঁর হয়ে সমস্ত খুনখারাপি যে করত সেই প্রফুল্ল প্রামাণিকই পৌঁছে গিয়েছিল এবং তার পর হয় টাকা দিয়ে নয় ভয় দেখিয়ে বুলানকে উদ্ধার করে এনেছিল।
কিন্তু এই ঘটনাতেই কানাইবাঁশিবাবু বুঝে গিয়েছিলেন, আর বেশিদিন মনোজিৎবাবুকে বাঁচতে দেওয়া যাবে না। কাজেই তিনি দলবল নিয়ে চলে এলেন জনকপুরে। যাগযজ্ঞের অভিনয়টাও চমৎকার করেছিলেন। কিন্তু তারপর পুরো ব্যাপারটাই যে উলটে গেল কী করে, সেটাই ভেবে পাচ্ছি না। মরার কথা মনোজিতের, অথচ মরল সুশীলা।
জগদীশদা বিমর্ষ মুখে চুপ করে গেলেন। আমি দেখলাম, এই লোকটাকে অন্ধকারে রাখা উচিত নয়। এত কিছু জেনেও যখন কাউকে এতদিন কিছু বলেননি, তখন এঁকে বিশ্বাস করা যায়। তাই সবকথাই জগদীশদাকে খুলে বললাম। বললাম, কীভাবে মোহিত জ্যাঠামশাই এবং ঝন্টুদা দধিবামনকে প্রচুর টাকা দিয়ে নিজেদের দলে টেনে নিয়েছিলেন। কীভাবে কানাইবাঁশিবাবুর অস্ত্র দিয়ে নিজেদের পথের কাঁটা সুশীলাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
সব শুনে জগদীশদা আমার হাতদুটো চেপে ধরে বললেন, ব্রিলিয়ান্ট। ব্রিলিয়ান্ট মাস্টার। তুমি একদিন নিশ্চয়ই গোয়েন্দা হবে। কিন্তু তারপর নিজে যে মন্তব্যটা করলেন, সেটাও আমার কানে একইরকম ব্রিলিয়ান্ট শোনাল। উনি বললেন, সুশীলা শুধুই ব্ল্যাকমেইল করত বলছ? আমার তো মনে হয় সুশীলা কানাইবাঁশিবাবুর হয়েও কাজ শুরু করেছিল। মানে একদম বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা তৈরি করে ফেলেছিলেন কানাইবাঁশিবাবু। কিন্তু এরা বাপ-ছেলে এতই ধুরন্ধর খেলোয়াড় যে, ওদের অস্ত্র দিয়েই সেই বাসা ভেঙে দিল। এমন চমৎকার প্ল্যান বানিয়েছিল যে, তুমি না থাকলে পুলিশ এখনও অলৌকিকের পেছনে দৌড়ে বেড়াত।
চায়ের দোকানের ছেলেটা দু’ভাঁড় চা দিয়ে গিয়েছিল। চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, কিন্তু ঝন্টুদা চলে যাওয়ার পরে এখন তো খেলা ঘুরে গেল, জগদীশদা।
উনি বললেন, তাই কি? এই খেলায় যে একটা তৃতীয় পক্ষ ঢুকে পড়েছে সেটা ভুলে যেও না। পুলিশ আর তার সঙ্গে তোমার মতো গোয়েন্দা। সেই তৃতীয় পক্ষকে মোকাবিলা করার জন্যে চ্যাটার্জীপক্ষ আর কানাইবাঁশিপক্ষ নিজেদের মধ্যে হাত মেলায়নি তো?
মানে?
তুমিই বলো না, তা না হলে মোহিতবাবু নিজের ছেলের লুকোনোর জন্যে যে আস্তানাটা ঠিক করে দিয়েছিলেন—আমি নিউ তুকসালি কোলিয়ারির কথা বলছি—সেখানে কানাইবাঁশির পোষা খুনে প্রফুল্ল প্রামাণিক পৌঁছে গেল কী করে? সে কীভাবে ওখানে শেল্টার পেল?
জগদীশদার এই কথাটাও ফেলবার মতো নয়। প্রফুল্ল প্রামাণিক কোথায় গেল সেটাই ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরলাম। সারা দুপুর সামনে একটা বই খুলে বসে রইলাম কিন্তু পড়াশোনা কিছুই হল না। মাথার মধ্যে বিগত দেড় বছরের মধ্যে দেখা বিভিন্ন মানুষের লোভ, ক্রোধ আর প্রতিহিংসার কথা ঘুরতে লাগল। কী অকল্পনীয়ভাবে মাত্র এই দেড় বছরের মধ্যে তিনটে জলজ্যান্ত মানুষের জীবন নষ্ট হয়ে গেল! সুশীলাদি খুন হলেন। দধিবামন বাকি জীবনটা জেলে পচবে। আর ঝন্টুদা অপঘাতে মারা গেলেন।
আরও কিছু কি বাকি আছে? আরও কোনো জীবন কি নষ্ট হবে? হলে কার?
সন্ধের দিকে আর বাড়ি ছেড়ে বেরোলাম না। বুঝতে পারছিলাম বড্ড বেশি জড়িয়ে পড়ছি এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে। আমি আউটসাইডার, আউটসাইডারের মতো থাকলেই বোধহয় ভালো করতাম। কিন্তু বুঝলে বিনায়ক, ওই তোমাকে প্রথমেই যে কথা বলেছিলাম। আমার স্বভাবের মধ্যেই একটা এমন কিছু রয়েছে যাতে কোনো অস্পষ্টতা, কোনো আনসলভড মিস্ট্রি একদম বরদাস্ত করতে পারি না। সেটা ওই জনকপুরে গিয়েই প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম। তারপর সারা জীবনে আরও বহুবার বুঝেছি।
যাই হোক, বিকেলের দিকে চ্যাটার্জীবাড়ির ছাদে উঠে গেলাম। তখন রোদ পড়ে গিয়েছিল। উঁচু ছাদটা থেকে বহুদূর অবধি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। লালমাটির ঢেউখেলানো ডাঙা জমি, এখানে ওখানে তাল-খেজুরের গুচ্ছ। কী একটা সরু নদী অনেক দূর দিয়ে বয়ে চলেছে। তার তীরে কাশফুলের চাদর দুলছে। পুজো আসছে।
ছাদের ঘরের দরজা খুলে মিনুপিসি বেরিয়ে এলেন। হাতে খালি দুধের গ্লাস। প্রতিদিন এই সময়ে উনি বুলানকে দুধ খাইয়ে যান। মনে মনে ভাবলাম, সত্যি! মিনুপিসি যদি হাল না ধরতেন তাহলে এই দুঃসময়ে চ্যাটার্জী ম্যানসনের অবস্থা ঝড়ের মুখে পড়া জাহাজের থেকেও খারাপ হয়ে যেত। এই ছোটখাটো শান্ত মহিলার মনের জোর অসামান্য। যতই মাথার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাক, বাড়ির ডেইলি রুটিনের একটুও এদিক-ওদিক হতে দেননি।
আমাকে দেখতে পেয়ে মিনুপিসি বললেন, যাও ভাই। একটু খেলা করে এসো ছেলেটার সঙ্গে।
আমাকে ঘরে ঢুকতে হল না। বুলান নিজেই বেরিয়ে এল।
আমরা দু’জন শেষ-বিকেলের আলোয় বিরাট ছাদটায় পায়চারি করতে করতে নানান বিষয়ে গল্প করছিলাম। তারপর যখন সন্ধে হয়ে গেল তখন আমি ওকে বললাম, এবার একবার নীচ থেকে ঘুরে আসি বুলান।
ও হঠাৎ কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই বলল, কাল রাত্তিরে বাবা এসেছিল।
আমি একটু কড়া গলাতেই বললাম, আবার! তুমি না শিক্ষিত ছেলে! এসব কেমন সুপারস্টিশন তোমার?
না, সত্যিই। বুলান সরল চোখদুটো আমার চোখে রেখে বলল, কেন বিশ্বাস করছ না? বাবা মারা যায়নি। ওটা অন্য কোনো লোক।
আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, কোথায় এসেছিলেন তোমার বাবা?
দাদুর ঘরে। ওই ঘরটা তো ঠিক আমার এই ঘরটার নীচে, তাই বালিশে কান পেতে শুলে, ওই ঘরের কথাবার্তা একটু একটু শোনা যায়। তখন অনেক রাত। আস্তে আস্তে কারা যেন দাদুর ঘরে কথা বলছিল। সেই আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। আমি সিঁড়ির চাতাল অবধি নেমে মুখ বাড়িয়ে দেখলাম, বাবা পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে।
বুলানের কথা শুনে আমার গা-টা কেমন যেন শিরশির করে উঠল। বললাম, আজ থেকে তুমি আমার কাছে শোবে, ঠিক আছে? আমি মিনুপিসিকে বলে দেব, তোমার বিছানা একতলায় নামিয়ে দিতে।
আচ্ছা, বলে ও ভালোছেলের মতো ঘাড় হেলাল। তারপর বলল, আজ সকালে দাদুকে জিগ্যেস করেছিলাম, বাবা কেন এসেছিল! দাদু ভীষণ চমকে উঠল। তারপর ঠিক তোমার মতোই বলল, তুমি ভুল দেখেছ। কেন যে কেউ আমার কথা বিশ্বাস করছে না...
আমি ওর মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, ছোটদের আর বড়দের জগৎটা যে আলাদা বুলানবাবু। তোমরা অনেক কিছু দেখতে পাও, শুনতে পাও, যেগুলো আমরা দেখতে পাই না, শুনতেও পাই না। যাকগে, বাবাকে নিয়ে আর বেশি ভেবো না। তিনি স্বর্গে চলে গেছেন। ভালো আছেন।
সেদিন রাতে আমিও ঝন্টুদাকে দেখলাম। তার জন্যে আমাকে যে স্বর্গে যেতে হয়নি তা তো বুঝতেই পারছ। আমার ঘরের জানলা দিয়ে দেখলাম, পেছনের বাগানের রাস্তা ধরে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন।
সারা রাত ঘুম এল না। বারবার ওই জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম, যদি আর একবার ঝন্টুদাকে দেখা যায়। অস্বীকার করব না, প্রথমে ভূতের ভয়ই পেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম ঝন্টুদাই মৃত্যুর ওপার থেকে ফিরে এসেছেন। তারপর চার্বাক ঋষির শ্লোক আউড়ে মনকে বোঝালাম, ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ? যে দেহটিকে সাধু চাঁড়ালের শ্মশানে নিজের চোখে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে দেখেছি, সে দেহ ফিরে আসবে কীভাবে? আর ওটি যে রক্তমাংসের দেহ, ছায়া যে নয়, তাও তো দেখলাম। ছায়ামূর্তি হলে কি লোহার গেটটা ঠেলে খুলতে পারত?
যাই হোক, এইসব যুক্তি দিয়ে মনকে বুঝিয়ে আর ঘাড়ে-মাথায় প্রচুর ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল বেশ বেলায়। চা-জলখাবার খেয়েই সাইকেল নিয়ে জনকপুর থানার উদ্দেশে দৌড়লাম। ওসি যোগব্রত রায়কে বললাম আগের রাতে ঝন্টু-দর্শনের কথা। উনি শুনে সেটাই বললেন, যেটা বলা স্বাভাবিক—পেট গরম হয়েছে।
আমি হাসলাম না। খুব গম্ভীরভাবে বললাম, আপনাকে ক’টা কথা জিগ্যেস করতে চাই, যদি অনুমতি দেন।
উনি বোধহয় বুঝলেন, আমি সিরিয়াস। বললেন, অফকোর্স।
আপনি কি ঝন্টুদাকে তিনশো ফিট নীচে পড়তে দেখেছিলেন?
উনি চোখ কুঁচকে খানিকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, গট ইওর পয়েন্ট। না, আমি ওকে পিটের মুখ থেকে গর্তের মধ্যে উলটে পড়ে যেতে দেখেছিলাম। কিন্তু পুরো পথটা পড়ে যেতে দেখিনি। দেখতে পেতাম, যদি তখনই পিটের কিনারায় গিয়ে ঝুঁকে পড়তাম। কিন্তু...
জানি। মনে আছে। আপনি বলেছিলেন, চোখের সামনে ওই বীভৎস ঘটনাটি ঘটতে দেখে আপনি কিছুক্ষণের জন্যে স্থবির হয়ে গিয়েছিলেন। আপনি আরেকটা কথা বলেছিলেন। মনোজিৎবাবু নিজের গতিবেগ সামলাতে না পেরে পিটের মধ্যে উলটে পড়লেন আর একটু বাদে একটা ভয়ার্ত আর্তনাদ উঠে এল গহ্বরের নীচ থেকে।
উনি ঘাড় হেলালেন। বললেন, একদম এরকমটাই ঘটেছিল। এখনো যেন সেই আর্তনাদ আমার কানে বাজে।
আমি আবার আগের কথার খেই ধরে বললাম, যোগব্রতদা, ‘একটু বাদে’ এই কথাটার ওপর জোর দিতে চাইছি। সত্যিই কি ঝন্টুদা পিটের কিনারা থেকে নীচে পড়ে যাওয়ার ‘একটু বাদে’ আর্তনাদটা হয়েছিল?
উনি দু’আঙুলে কপালের দুটো রগ টিপে ধরে, মাথাটা ঝুঁকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর মুখ তুলে বললেন, হ্যাঁ। মনোজিৎবাবুর পড়ে যাওয়া আর ওঁর আর্তনাদ করে ওঠার মধ্যে প্রায় দশ সেকেন্ডের একটা গ্যাপ ছিল।
শেষ প্রশ্ন। আপনি বলেছিলেন যে, যখন ঝন্টুদাকে তাড়া করে পিটহেডের ঘরটায় ঢোকেন, তখন অলরেডি কেজটা নীচে নামতে শুরু করেছে। তার মানে কেজের মধ্যে এগজ্যাক্টলি ক’জন এবং কে কে ছিলেন সেটা আপনারা কেউই দেখতে পাননি, তাই তো?
যোগব্রতদা অধৈর্য ভঙ্গিতে বললেন, হোয়াট ইউ আর আপ টু উমাশঙ্কর? তুমি কী প্রমাণ করতে চাইছ? যখন মৃতের বাবা মোহিতবাবু নিজে মর্গে গিয়ে মনোজিৎবাবুকে শনাক্ত করে এসেছেন...
আমি হাত তুলে বললাম, উত্তেজিত হবেন না, প্লিজ। আপনি জীবিত অবস্থায় কখনোই ঝন্টুদাকে মুখোমুখি দেখেননি। ওঁকে চিনতেন ছবিতে। তাই না? আর মর্গ থেকে ঝন্টুদার মৃতদেহ কীভাবে আপনাদের হাতে ডেলিভার করা হয়েছিল সেটাও আমি দেখেছি। ওঁর মাথা এবং মুখের অর্ধেকটা ব্যান্ডেজ দিয়ে জড়ানো ছিল। খুব কাছাকাছি চেহারার একজনকে যদি ঝন্টুবাবু বলে আপনাকে দেখানো হয়, আপনার ভুল হতে পারে না?
আর মোহিতবাবুর কথা বলছেন? সাক্ষী হিসেবে উনি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? ছেলেকে বাঁচানোর জন্যেই যদি উনি ছেলেকে মৃত সাজান?
যোগব্রত রায় এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হ্যাঙ্গার থেকে টুপিটা নিয়ে মাথায় চড়িয়ে হাঁক ছাড়লেন, ডিউটি!
ডিউটির হাবিলদার দৌড়ে এসে স্যালুট দিয়ে দাঁড়াল।
গাড়ি রেডি করো। বেরোব। চারজন আর্মড কনস্টেবল থাকবে। তারপর
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, চলো উমাশঙ্কর। আরেকবার পুরো পিটহেডটা চেক করে আসি।
বললাম, সেটাই ভালো। আর শুনুন। এরপর আপনাকে আর একা পাব না, তাই দুটো কথা এখনই জানিয়ে রাখি। প্রথম কথা, গতকালই আমি মোহিতবাবুর ঘরে দু’জন লোককে দেখেছিলাম। সেফটি সুপারভাইজার অভয় কুমার আর তার জুনিয়র অফিসার বিমল মান্না। যে দু’জন... ওই ডুলিতে ছিলেন বলে ক্লেইম করছেন।
আর দ্বিতীয় কথাটা এই যে, কাল রাতে আমি ঝন্টুদাকে দেখার আগেই, পরশু রাতে বুলানও তাকে দেখেছে। মোহিতবাবুর ঘর থেকে ও বাবাকে বেরোতে দেখেছে। ও কিন্তু সেই শ্মশানঘাট থেকেই আমাকে বলে আসছে, এটা তো আমার বাবা নয়। আমি ওর কথাকে অন্য অর্থে ধরেছিলাম, ভেবেছিলাম সৎ বাবা বলে এমন কথা বলছে। এখন মনে হচ্ছে, ভুল করেছিলাম। যাই হোক, কোনটা ভুল, কোনটা ঠিক একটু বাদেই বোঝা যাবে।
পুলিশ আসার খবর পেয়ে কোলিয়ারির এজেন্ট সুশীল মণ্ডল এসে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। যোগব্রতদা তাঁকে বললেন, একটা রিকোয়েস্ট করছি। আমরা যতক্ষণ না গ্রিন সিগনাল দিচ্ছি, ততক্ষণ কাউকেই আপনাদের এই এরিয়া ছেড়ে বেরোতে দেবেন না। এজেন্টসাহেব বললেন, আমি এখনই সিকিউরিটিকে অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি।
তারপর আমরা ডুলি ওঠানামার গহ্বরের মুখে গিয়ে দাঁড়ালাম। যোগব্রতদার অনুরোধে একজন অপারেটর ফাঁকা ডুলি বা কেজটাকে নীচে নামিয়ে দিল। কেজটা ওপরে থাকলে জায়গাটাকে ভালো করে দেখা যায় না। একটাই সুবিধে হয়েছিল—দিনটা ছিল রবিবার। ফলে সেদিন খনির ওপরের কাজ অল্পস্বল্প চললেও, খনির নীচ থেকে কয়লা উত্তোলন বন্ধই ছিল। দু’জন কনস্টেবল ছয়-ব্যাটারির দুটো বিশাল টর্চের আলো চৌকোনা গর্তটার মুখে ফেললেন। এজেন্টসাহেব অবাক হয়ে বললেন, টর্চ কেন লাগছে স্যার?
আমরা একটু পিট-টা খুঁটিয়ে দেখতে চাই, যোগব্রতদা উত্তর দিলেন।
সে তো বুঝতে পারছি। কিন্তু তার জন্যে টর্চ লাগবে কেন? ওপর থেকে নীচ অবধি নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর ইলেকট্রিক বাল্ব লাগানো আছে তো। আপনি বললেই সেগুলো জ্বালিয়ে দিতে পারি।
যোগব্রতদা থতমত খেয়ে বললেন, ওহো। আমি জানতাম না। আচ্ছা, বেশ তো। দিন না জ্বালিয়ে।
মণ্ডল সাহেব কাকে কী বললেন জানি না, মুহূর্তের মধ্যে তিনশো ফিট গভীর পিট-টা বাল্বের আলোয় মোটামুটি আলোকিত হয়ে উঠল।
আমার অবশ্য পুরোটা দেখবার প্রয়োজন ছিল না। যা দেখতে চাইছিলাম, সেটা দেখতে পেলাম পিটের কিনারা থেকে ঠিক চার ফুট নীচে। দেয়ালের গা থেকে বেরিয়ে আসা লোহার রড দিয়ে তৈরি একটা মাচা, যেটা পিটের পুরো পরিধি জুড়ে গাঁথা রয়েছে এবং কার্নিসের মতো বাইরে বেরিয়ে রয়েছে।
আমি লোহার মাচাটার দিকে আঙুল দেখিয়ে এজেন্টসাহেবকে জিগ্যেস করলাম, ওই লোহার স্ট্রাকচারটার কাজ কী?
কোনটা? উনি ঝুঁকে পড়ে দেখলেন। তারপর বললেন, ওঃ, ওটা ইনস্পেকশন প্লাটফর্ম। এই পিটটারও তো মাঝেমধ্যে রিপেয়ারিং-এর প্রয়োজন পড়ে। তখন মেকানিকেরা ওই প্লাটফর্মের ওপরে দাঁড়িয়ে সেই কাজগুলো সারে। এরকম প্লাটফর্ম কিন্তু এই একটাই নয়, পঞ্চাশ ফুট অন্তর পুরো পিটটা জুড়েই লাগানো আছে। ওগুলোর গা ঘেঁষেই কেজ-টা ওঠানামা করে।
ওঁর কথাটা শেষ হওয়ামাত্রই আমি পিটের কিনারা থেকে নীচে লাফিয়ে পড়লাম। ওপর থেকে একটা হইহই আওয়াজ পেলাম। তারপরেই যোগব্রতদার আতঙ্কিত চিৎকার—উমাশঙ্কর! উমাশঙ্কর!
আমি প্লাটফর্মটার ওপরে লাফ দিয়ে পড়েই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। তারপর গড়িয়ে গিয়েছিলাম দেয়ালের গায়ে। আগেই দেখে নিয়েছিলাম, লোহার প্লাটফর্মটা দেয়ালের গায়ে অনেকটা ঢুকে আছে। প্লাটফর্মের ওই ঢুকে থাকা অংশটায় যদি কোনো মানুষ শুয়ে থাকে, তাহলে ওপর থেকে মুখ বাড়িয়ে কারও পক্ষে তাকে দেখতে পাওয়া অসম্ভব, বিশেষত পিট যখন অন্ধকার।
বাস্তবে ওই প্লাটফর্মে নামবার জন্যে মাত্র চার ফুট লাফাতে হয়েছিল আমাকে। কিন্তু যোগব্রতদা নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন তিনশো ফুট নীচে গিয়ে পড়েছি। গলা শুনে তাই মনে হচ্ছিল। তবে ওঁদের চিন্তায় ফেলা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। তাই সাড়া দিলাম, আমি এখানে। আমাকে দেখতে পাচ্ছেন যোগব্রতদা?
যোগব্রতদা আমার কথার উত্তর দিলেন না। তার পরিবর্তে পরপর আরো দু’জন মানুষের লাফিয়ে পড়ার শব্দ পেলাম। পরক্ষণেই দেখলাম যোগব্রতদা এবং একজন কনস্টেবল হামাগুড়ি দিয়ে আমাকে দেখছেন।
যোগব্রতদা বললেন, আর কিছু বলতে হবে না। বুঝে গিয়েছি। চলো, ওপরে ওঠা যাক।
ওপরে উঠেই যোগব্রতদা সেফটি সুপারভাইজার অভয় কুমার আর তার জুনিয়র অফিসার বিমল মান্নাকে যার যার কোয়ার্টার থেকে তুলে আনলেন। যে কনস্টেবলরা ওদের ধরে আনতে গিয়েছিলেন, তারা ফিরে এসে বললেন, দু’জনেই নাকি ব্যাগ গুছিয়ে, গাড়ি ডেকে অপেক্ষা করছিলেন। সিকিউরিটির একটু ফাঁক পেলেই পালাতেন।
যাই হোক, ওই দু’জনকে তুলে নিয়ে থানায় চলে এলেন যোগব্রতদা। আরো কয়েকটা টিম বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেল। তার মধ্যে একটা গেল চ্যাটার্জী ম্যানসনের দিকে—মোহিতলাল চ্যাটার্জীকে অ্যারেস্ট করার জন্যে। আমি অবশ্য যোগব্রতদার সঙ্গে থানাতেই গেলাম। কারণ, যেটা আন্দাজ করেছিলাম সেটা ঠিক কিনা জানবার জন্যে তীব্র কৌতূহল হচ্ছিল। এবং সেটা জানবার একমাত্র উপায় অভয় কুমার আর বিমল মান্নার জেরার জবাব।
পুলিশি জেরা কাকে বলে সেটা সেই প্রথম চাক্ষুষ করলাম। ওদের ব্রেক ডাউন করাতে মোটামুটি আধঘণ্টা সময় লাগল। যেটাকে আমরা ঝন্টুদার দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ভেবেছিলাম অথচ আসলে যেটা ঝন্টুদার মৃত্যু ছিলই না, ছিল অন্য একজনের হত্যাকাণ্ড, সেই ঘটনার পুরো শয়তানি ব্লু-প্রিন্ট ওরা দু’জনে ফাঁস করে দিল। সেটাই তোমাকে বলছি, শোনো।
শুরুটা তো অবশ্যই হয়েছিল পুলিশের গ্রেপ্তারির হাত থেকে মনোজিৎ চ্যাটার্জী ওরফে ঝন্টুদাকে বাঁচানোর তাড়না থেকে। মোহিত চ্যাটার্জীর কাছে সেই সুযোগ এসে গেল একেবারে আশাতীতভাবে, যখন প্রফুল্ল প্রামাণিক পুলিশের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে মোহিতবাবুর কাছে শেল্টার চাইলেন।
মোহিতবাবু তাকে সাদরে জনকপুরে ডেকে নিলেন। বললেন, চলে এসো। তোমাকে আর ঝন্টুকে একই জায়গায় লুকিয়ে থাকবার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি—নিউ তুকসালি কোলিয়ারির লেবার বস্তিতে।
প্রথম ক’টাদিন সত্যিই প্রফুল্ল প্রামাণিক আর মনোজিৎ চ্যাটার্জী, সুশীলা-হত্যার দুই অংশীদার, সেখানেই লুকিয়ে রইলেন। কিন্তু মোহিতবাবু তাতে নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না। তিনি জানতেন চিরকাল ঝন্টুবাবু ওইভাবে লুকিয়ে থাকতে পারবেন না। এর একটা স্থায়ী সমাধান চাই।
কীভাবে সেটা সম্ভব?
সম্ভব হতে পারে, যদি পুলিশকে বিশ্বাস করানো যায় যে, ঝন্টুবাবু মারা গেছেন। তাতে আরেকটা বড় সুবিধে হবে, সুশীলা-হত্যা-মামলাও কমজোরি হয়ে পড়বে। তিনজন ষড়যন্ত্রীর মধ্যে দধিবামন নিতান্ত ভাড়াটে খুনি ছাড়া কিছু নয়। সুশীলাকে মেরে তার নিজের অর্থ ছাড়া আর কিছু লাভ হয়নি। কাজেই তার সাক্ষ্যের কোনো গুরুত্ব নেই। এই অবস্থায় যদি প্রফুল্ল প্রামাণিককে নিখোঁজ এবং মনোজিৎ চ্যাটার্জীকে মৃত হিসেবে দেখানো যায় তাহলে কেসটা বন্ধ হয়ে যাবে।
মোহিতবাবুর মাথায় একটা অসামান্য প্ল্যান এল। ইসিএল-এর ভেতরে একশ্রেণীর অসৎ অফিসারের সঙ্গে তাঁর চিরকালই সাংঘাতিক দহরম মহরম ছিল। সেরকমই দু’জন অফিসার হলেন সেফটি সুপারভাইজার অভয় কুমার আর তার জুনিয়র অফিসার বিমল মান্না। লেবার কলোনির মধ্যে প্রফুল্ল আর মনোজিৎকে লুকিয়ে রাখার কাজে এরাই ছিলেন মোহিতবাবুর সহায়। এবার, নতুন প্ল্যানটাতেও তারা দু’জন সাহায্য করতে রাজি হলেন। তার বদলে মোহিতবাবু তাদের প্রচুর টাকা তো দিয়েছিলেনই, সঙ্গে দিয়েছিলেন প্রোমোশনের আশ্বাস।
যাই হোক, ওই দু’জনকে সঙ্গে পেয়ে মোহিতবাবু এইবার পুরো দাবার ছকের মতো ঘুঁটি সাজালেন।
জনকপুর থানার ভেতরে যে মোহিতবাবুর ইনফর্মার ছিল সে কথা যোগব্রতদা নিজেই স্বীকার করেছেন। যে মুহূর্তে সেই ইনফর্মার মোহিতবাবুকে খবর দিল যে একটা পুলিশ-টিম মনোজিৎ আর প্রফুল্লকে ধরার জন্যে তুকসালির দিকে রওনা হয়েছে, সেই মুহূর্তে কোল কোম্পানির এই অফিসারেরা একসঙ্গে দুটো কাজ করলেন।
প্রথমত, প্রফুল্ল প্রামাণিককে ভয় দেখিয়ে লেবার কলোনি থেকে ডাকিয়ে আনলেন। বললেন, লেবার কলোনিতে পুলিশের রেড হবে। তিনি যেন ইমিডিয়েটলি পিট-হেডের দিকে চলে আসেন। তারা প্রফুল্লর জন্যে কেজের মধ্যে অপেক্ষা করছেন। প্রফুল্ল এলেই তাকে নিয়ে নীচে নেমে যাবেন। আর একবার খনির নীচে মাকড়সার জালের মতো সুড়ঙ্গে পৌঁছে যেতে পারলে পৃথিবীর কোনো পুলিশের ক্ষমতা নেই তাকে খুঁজে বার করে।
দ্বিতীয় কাজ যেটা করলেন, সেটা হল, ওদেরই একজন সহযোগীকে মুখে কাপড় জড়িয়ে পিটহেডের বাইরে দাঁড় করিয়ে দিলেন। যোগব্রত রায় তার পুলিশ-টিম নিয়ে পিটহেডের বাউন্ডারির মধ্যে ঢোকামাত্রই সেই লোকটি যোগব্রতদার কানে কানে বলে গেল, আপনারা যাকে খুঁজছেন সে ওই পিলারটার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। ভালো করে দেখুন। গায়ে লেবারের ইউনিফর্ম।
প্রফুল্ল প্রামাণিক ততক্ষণে কেজে উঠে পড়েছেন, যে কেজের মধ্যে তার সঙ্গে রয়েছেন বিমল মান্না আর অভয় কুমার। তখনো তিনি জানেন না, একটু বাদেই কী ভয়ংকর মৃত্যু অপেক্ষা করছে তাঁর জন্যে।
পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়েছিলেন ঝন্টুদা। ইচ্ছে করেই তিনি ওখানে দাঁড়িয়েছিলেন, যাতে সহজেই পুলিশের চোখে পড়েন।
পুলিশ তাড়া করল তাঁকে।
ঝন্টুদা মানে মনোজিৎ চ্যাটার্জী এমন অভিনয় করলেন যেন হঠাৎই তিনি পুলিশের সামনে পড়ে গেছেন এবং প্রাণভয়ে পিটের দিকে দৌড়চ্ছেন। আসলে যে তিনি পুলিশ আসার খবর পেয়েই ওখানে অপেক্ষা করছিলেন, সেটা কেউ বুঝল না।
এরপর ঝন্টুদা পিটের কিনারা থেকে ঝাঁপ দিলেন। যোগব্রতদা তাঁর পেছন পেছন চলমান কেজ লক্ষ্য করে ছুটে আসছিলেন। তিনি দেখতেও পেলেন না কেজের ভেতরে ক’জন আছে বা কে কে আছে। তিনি শুধু দেখলেন, দ্রুত অবতরণশীল খাঁচাটিকে ধরতে গিয়ে মনোজিৎ চ্যাটার্জী পিটের কিনারা থেকে নীচে পড়ে গেলেন।
আসলে মনোজিৎ চ্যাটার্জী পিটের কিনারা থেকে স্বেচ্ছায় লাফ মেরে, ওই একটু আগেই তোমাকে যে লোহার প্লাটফর্মের কথা বলছিলাম, তার ওপরে বসে পড়লেন এবং গড়িয়ে দেয়ালের আড়ালে চলে গেলেন।
ওদিকে ঠিক সেই সময়ে কেজের ভেতর থেকে বিমল আর অভয় দু’জনে মিলে প্রফুল্ল প্রামাণিককে ঠেলে নীচে ফেলে দিলেন।
বিনায়ক প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, বলেন কী!
বললাম, হ্যাঁ। তোমার মনে আছে নিশ্চয়, যোগব্রতদাকে আমি থানায় বসেই যে প্রশ্নগুলো করেছিলাম, তার মধ্যে একটা ছিল, ঝন্টুদার পড়ে যাওয়া আর নীচ থেকে উঠে আসা আর্তনাদটার মধ্যে কোনো গ্যাপ ছিল কিনা। উনি উত্তর দিয়েছিলেন, প্রায় দশ সেকেন্ডের একটা গ্যাপ ছিল। এটাই আমার সন্দেহকে বাড়িয়ে তুলেছিল। একজন মানুষ খাদে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আর্তনাদ করে উঠবে না? সাধারণ বুদ্ধি তো তাই বলে। মাঝখানে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকবে কেন?
আসলে ঝন্টুদার কার্নিসে লাফিয়ে পড়া আর প্রফুল্ল প্রামাণিককে ওদের কেজ থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়া—এই দুটো ঘটনার মধ্যে গ্যাপ ছিল ওই দশ সেকেন্ড মতো। চিৎকারটা করেছিলেন প্রফুল্ল প্রামাণিক। তার মধ্যে কোনো অভিনয় ছিল না। ওটা ছিল তাঁর মরণ-চিৎকার।
এরপর যেটা হয়েছিল, বুঝতেই পারছ। প্রফুল্ল প্রামাণিক এবং ঝন্টুদার চেহারা যে একই রকম সেটা আগেও বলেছি। দু’জনেই লম্বা, রোগা। দু’জনেরই পরিষ্কার করে কামানো দাড়িগোঁফ। সবচেয়ে বড় কথা, সেদিন দু’জনেই পরেছিলেন কয়লাখনির লেবারের ইউনিফর্ম।
সবাই চোখের সামনে দেখেছিল ঝন্টুদা পিটের কিনারা থেকে লাফ মারছে। কাজেই পিটের নীচে পড়ে থাকা মৃতদেহটা যে ঝন্টুদা ছাড়া আর কারও হতে পারে, এটা কেউ ভাবতেই পারেনি। তার ওপরে বিমল এবং অভয় ওপরে উঠে এসে চমৎকার একটা মিথ্যে কথা বললেন। বললেন, তারা নাকি দেখেছেন ওপর থেকে একটা শরীর কেজের পাশ দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে নীচে নেমে গেল। একদমই মিথ্যে কথা। ঝন্টুদা ওপরেই থেকে গিয়েছিলেন আর প্রফুল্ল প্রামাণিককে ওরা দু’জনে কেজের ভেতর থেকেই ধাক্কা মেরে নীচে ফেলেছিলেন।
এরপরেও কারও যদি এক কুঁচিও অবিশ্বাস থেকে থাকত, সেই সম্ভাবনাকে নির্মূল করে দিলেন স্বয়ং মোহিতলাল চ্যাটার্জী। একজন পিতা যখন মর্গে গিয়ে সন্তানের মৃতদেহ শনাক্ত করেন, তখন তাকে আর অবিশ্বাস করে কে? যোগব্রতদাও তাঁর সাক্ষ্যের ওপরেই জোর দিয়েছিলেন। আর শ্মশানভূমিতে তাঁর নিখুঁত অভিনয় তো ছিলই। দাহ হচ্ছে প্রফুল্ল প্রামাণিকের দেহ আর সন্তানশোক প্রকাশ করছেন মোহিত চ্যাটার্জী। তিনি সত্যিই একজন প্রতিভাবান অভিনেতা ছিলেন।
মোহিত চ্যাটার্জীর প্ল্যান বর্ণে বর্ণে খেটে গিয়েছিল। সবাই ধরে নিয়েছিল যে, প্রফুল্ল প্রামাণিক পলাতক এবং মনোজিৎ চ্যাটার্জী মৃত। আসলে যে ব্যাপারটা ঠিক উলটো, মনোজিৎ পলাতক এবং প্রফুল্ল প্রামাণিক মৃত, সেটা কেউ বুঝতে পারেনি। না, ভুল বললাম। আমি বাদে আরেকজন বুঝেছিল। সে হচ্ছে বুলান।
বুলান খুব কাছ থেকে মৃতদেহের মুখ দেখবার সুযোগ পেয়েছিল বলেই সে বুঝেছিল, ওটা তার বাবার দেহ নয়। আর তারপর দাদুর ঘর থেকে বাবাকে বেরোতে দেখে আরোই নিঃসন্দেহ হয়েছিল।
তারপর? বিনায়কের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল সে আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারছে না।
এরপরে আর খুব বেশি ঘটনা তো বাকি থাকতে পারে না, বিনায়ক! কারণ চ্যাটার্জী ম্যানসনের ওই অভিশপ্ত এক বছরের কুশীলব যারা, তারাই তো আর কেউ ছিল না। মোহিত চ্যাটার্জী যে মুহূর্তে খবর পেয়েছিলেন যে, পুলিশের টিম দ্বিতীয়বারের জন্যে তুকসালি কোলিয়ারির দিকে গিয়েছে এবং অভয় কুমার আর বিমল মান্নাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে, সেই মুহূর্তে তিনি চ্যাটার্জী ম্যানসন ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
তবে বেশিদিন পালিয়ে থাকতে পারেননি। এক বছরের মাথায় ঝাড়খণ্ডের এক শহরে ধরা পড়েছিলেন। ধরা পড়ার ছ’মাসের মধ্যে মারাও গিয়েছিলেন। ন্যাচারাল ডেথ।
ঝন্টুদার খোঁজ, পুলিশ কোনোদিনই আর পায়নি। একটা উড়ো খবর শুনেছিলাম, তিনি নাকি বাবার ব্ল্যাকমেলিং-এর ব্যবসাটার হাল ধরতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার মতো জোরদার গুন্ডাবাহিনী তো আর তাঁর হাতে ছিল না। ফলে উলটে নিজেই খুন হয়ে গিয়েছিলেন।
সুশীলাদেবী-মার্ডার কেসের একমাত্র দণ্ডিত আসামী দধিবামন নিশ্চয়ই এতদিনে শাস্তির পুরো মেয়াদ কাটিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে, যদি বাড়ি বলে কিছু তার থেকে থাকে।
বিনায়ক জিগ্যেস করল, আর জনকপুরের চ্যাটার্জী ম্যানসন? বুলান? তাদের কী হল?
বললাম, অনেক বছর বাদে একটা কাজে জনকপুরের ওপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে ফিরতে হয়েছিল। পুরোনো স্মৃতির টানে চ্যাটার্জী ম্যানসনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখলাম, সেটা এখন স্কুলের ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ওখান থেকে আবার কোলফিল্ড মেডিসিন নামের দোকানটার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। জগদীশদা দোকানে ছিলেন। আমাকে পুলিশের ইউনিফর্মে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, কী মাস্টার? বলেছিলাম না, মাস্টারি তোমার লাইন নয়। তুমি একদিন গোয়েন্দা হবে...
তাঁর কাছেই শুনলাম, বুলানকে কানাইবাঁশি লাহিড়ী মানুষের মতো মানুষ করেছেন। সে এখন মস্ত ডাক্তার, ব্যাঙ্গালোরে এক হসপিটালে কাজ করে। না, ফোন নম্বর দিতে পারেননি। জগদীশদার সঙ্গে তারপর ফোনেই কথা হতো। গত বছর তিনিও চলে গেলেন।
আমার জনকপুরের স্মৃতিচারণ শেষ হল। দু’জনে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। তারপর বিনায়ক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, আপনার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন পুলিশের চাকরিতেই এলেন। আর কোনো কাজ আপনাকে টানল না কেন?
আমার প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে গেছি স্যার। ভগবান আপনাকে তৈরিই করেছিলেন গোয়েন্দা হিসেবে। আর কোনো কাজে আপনাকে মানাত না। পায়ে তো হাত দিতে দেবেন না, মনে মনেই আপনাকে একটা প্রণাম জানালাম। চলি স্যার। গুড নাইট।
আমিও উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, গুডনাইট বিনায়ক। আবার এসো।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন