সৈকত মুখোপাধ্যায়

রিটায়ার্ড অ্যাডিশনাল এস পি উমাশঙ্কর চৌবে বিকেলবেলায় তাঁর বাড়ির ছাদের ফুলগাছগুলোতে ঝারি করে জল দিচ্ছিলেন। পরনে সাদা-কালো স্ট্রাইপ দেওয়া পোলোনেক গেঞ্জি আর নেভি-ব্লু টেনিস শর্টস। পাঁচ বছর হল চৌবেসাহেব পুলিশ সার্ভিস থেকে রিটায়ার করেছেন। তার মানে ওঁর বয়স এখন পঁয়ষট্টি। কিন্তু সাদা চুলগুলো ছাড়া আর কোথাও বয়সের ছাপ পড়েনি। চৌবেসাহেবের চেহারা এখনো বেতের মতো ছিপছিপে, চোখের মণি ষোলো বছরের কিশোরের চোখের মতো উজ্জ্বল।
জল দেওয়ার কাজটা চৌবে সাহেব মন দিয়েই করছিলেন, তবে তার মধ্যেও একটা ফোন-কলের জন্যে নিশ্চয়ই তাঁর প্রতীক্ষা ছিল। না হলে হাতের কাছে সিমেন্টের ছোট বেদিটায় মোবাইল-ফোনটা রাখা থাকবে কেন? সেই কল অবশেষে এল। রিং হতেই তিনি তাড়াতাড়ি একটা ছোট তোয়ালেতে হাতের জলটা মুছে নিয়ে কল রিসিভ করলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ বিনায়ক, বলো। আমি তো দুপুর থেকেই ভাবছি তোমার কাছ থেকে একটা খবর পাব। এত দেরি হল যে?’
গতকাল দুপুরেই বিনায়ক এক সমস্যা নিয়ে চৌবেসাহেবের বাড়ি এসেছিল। পরনে ছিল পুরোদস্তুর পুলিশ ইউনিফর্ম, তবে ঘামে আর ময়লায় সেই ইউনিফর্ম বেশ বিধ্বস্ত। বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল ইউনিফর্মের মালিককেও। চিন্তাক্লিষ্ট মুখ। মাথার টুপিটা টি-টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলে বিনায়ক হতাশ গলায় বলেছিল, ‘যত ঝামেলার কেস আমার ঘাড়েই এসে পড়ে কেন বলুন তো?’
চৌবেসাহেব মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘তোমার ঘাড়টা শক্ত বলে। আগে আরাম করে বসো। তারপর বলো, কী হয়েছে?’
বিনায়কের মুখে পুরো ব্যাপারটা শুনে চৌবেসাহেব বুঝেছিলেন, এবারের ব্যাপারটা খুন-জখম কিংবা টেররিজমের মতো অত ভয়ঙ্কর কিছু নয়। তবে তা না হলেও বিনায়কের পক্ষে খুব চ্যালেঞ্জিং। একটা হিরে চুরির কেস! এই কেসটাকে পেটি-কেস হিসেবেই দেখা যেত, যদি না হিরেটা হতো ভুটানের রাজার এক রিলেটিভের। এই জন্যেই কেসটা চ্যালেঞ্জিং। হিরেটা উদ্ধার না করতে পারলে প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্রের কাছে মুখ থাকবে না। জেলা পুলিশের বড়কর্তারা বিনায়ককে বলে দিয়েছেন, আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে যে করে হোক হিরেটা খুঁজে বার করে, রাজার আত্মীয়ের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। তা না হলে, তার প্রোমোশন টোমোশন আটকে যেতে পারে।
ঘটনাটা এই রকম। ভুটানের রাজার এক খুড়তুতো ভাই সপরিবারে বেড়াতে এসেছেন ডুয়ার্সের এক ফরেস্ট বাংলোয়। ওই জায়গাটা চৌবেসাহেব খুব ভালো করে চেনেন। বাংলোটা রায়ডাক নদীর ধারে। চারিদিকে ঘন বন আর সীমাহীন নির্জনতা, অথচ বাংলোর ভেতরে চমৎকার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। সেইজন্যেই রায়ডাকের এই বাংলোটা দেশ-বিদেশের ভিআইপিদের কাছে চিরকালই ছুটি কাটানোর খুব প্রিয় জায়গা। চৌবেসাহেব নিজে যখন সার্ভিসে ছিলেন, তখন তাঁকেও অনেকবার ওই বাংলোয় ভিআইপিদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। সেইজন্যেই বাংলোটা তাঁর চেনা।
যাই হোক, এখন ওই বাংলোয় যিনি অতিথি, ভুটানরাজের সেই ভাই থাকেন ভুটান-ইন্ডিয়া বর্ডারের কাছেই ফুন্টশোলিং শহরে। সেখানেই তাঁর প্রাসাদের মতো বড় বাড়ি। রাজার ভাইয়ের আসল নামটা মস্ত বড়। তাই সবাই তাকে ছোট করে জিমি সাহেব বলে ডাকে।
জিমি সাহেবের রাজকীয় উত্তরাধিকার যা আছে, তা তো আছেই। তা ছাড়াও রয়েছে বিশাল পারিবারিক ব্যবসা। তার মধ্যে ফ্রুট-জুস তৈরির কারখানা, প্লাইউডের মিল, তিন তারা হোটেল, বিদেশি গাড়ির এজেন্সি... কী নেই? এই সব কিছুর মালিক জিমি, যদিও তাঁর বয়স এখনো চল্লিশ ছোঁয়নি।
তবে এত ক্ষমতা আর অর্থ থাকা সত্ত্বেও জিমি মানুষটি ভীষণই ভদ্র। চুরির খবর পেয়ে যখন বিনায়ক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ছুটে গিয়েছিল, তখনও তিনি বিনায়কের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেছিলেন। এমনকী তার জন্যেই যে বিনায়ককে আলিপুরদুয়ার থেকে অত সকালে রায়ডাক ছুটে আসতে হয়েছিল, এর জন্যে তিনি খুবই সঙ্কুচিত বোধ করছেন বলে জানিয়েছিলেন।
জিমি সাহেবের স্ত্রী মন্দিরাও ভীষণ সাদামাটা এবং ভদ্র মহিলা, যদিও পরে বিনায়ক জানতে পেরেছে, মন্দিরা লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের গ্র্যাজুয়েট। হাবেভাবে, আচার আচরণে জিমি বা মন্দিরা কারুরই কোনো সাহেবিয়ানা নেই। বিনায়ক আর তার অ্যাসিস্ট্যান্টদের ব্রেকফাস্ট না করিয়ে ওঁরা কিছুতেই ফিরতে দেননি। পুলিশের চাকরিতে ঢোকার পর থেকে বিনায়ক কোনো ভিআইপির কাছ থেকে প্রথমবার এমন মানবিক ব্যবহার পেল।
জিমি সাহেব আর তাঁর স্ত্রী মন্দিরার সঙ্গে রয়েছে তাঁদের একমাত্র ছেলে বীজেশ। বীজেশের বয়স দশ। ওই বয়সের একটা ছেলে যেরকম হয়, বীজেশও ঠিক সেই রকম। একটু গুন্ডা টাইপের। কিন্তু দারুণ ইনটেলিজেন্ট। গাছে চড়ছে, খেলনার তির ছুড়ছে। আবার মুহূর্তের মধ্যে রুবিক-কিউবের রং মিলিয়ে দিচ্ছে। হ্যাঁ, যে কোনো দশ বছরের ছেলের মতোই বীজেশও প্রথমটায় পুলিশ দেখে ভীষণ ভয় পাচ্ছিল, তবে আধঘণ্টার মধ্যেই বিনায়ক তার বন্ধু হয়ে গিয়েছিল।
আগের দিন বিনায়ক একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা কনস্টেবলকে নিয়ে যখন রায়ডাক বাংলোয় পৌঁছেছিল, তখন সকাল ন’টা। তার আগে সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে জিমি আবিষ্কার করেছেন, তাঁর ডান হাতের অনামিকার আংটিটা রয়েছে; কিন্তু আংটিতে গাঁথা পদ্মরাগ হিরেটা নেই।
এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে। আগের রাতে জিমি সাহেব একবার বাথরুম যাবার জন্যে উঠেছিলেন। বাথরুম থেকে বেরিয়ে তিনি ডাইনিং-স্পেসের বেসিনে মুখ-হাত ধুয়েছিলেন। তারপর আবার বেডরুমে ঢুকে শুয়ে পড়েছিলেন। বেসিনে হাত-মুখ ধোয়ার সময়েই নিশ্চয় আংটি থেকে আলগা হয়ে পাথরটা বেসিনের মধ্যে খসে পড়েছিল। রায়ডাক বাংলোয় এখনো বিদ্যুতের আলো নেই। জিমি যখন বাথরুমে গিয়েছিলেন, তখন বারান্দার এক কোণে একটা দেয়ালগিরি তেল ফুরিয়ে টিমটিম করে জ্বলছিল। সেই দেয়ালগিরির আবছা আলোয় ঘুমজড়ানো চোখে জিমি বুঝতেও পারেননি, কখন পাথরটা খসে পড়ল।
সকালে যখন জিমি দেখেন আংটির পাথরটা নেই, তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে ডেকে তোলেন। তিনি ও মন্দিরা বেডরুম থেকে বেরিয়ে প্রথমে বেসিন, তারপর ডাইনিং স্পেস এবং তারপর নিজেদের বেডরুম তন্ন তন্ন করে খুঁজেছেন। পদ্মরাগ হিরেটা তাঁরা খুঁজে পাননি। তখন জিমি বাংলোর কেয়ারটেকারের মাধ্যমে পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যাপারটা জানান। তারপরেই বিনায়ক তাঁর সহকারীদের নিয়ে রায়ডাক বাংলোয় পৌঁছে যায়।
ওখানে পৌঁছে বিনায়ক জানতে পারে, ডাইনিং স্পেসের দরজা রাতে ভেতর থেকে বন্ধ করা হয় না। ডাইনিং স্পেসের দু’দিকে দুটো বেডরুম। তার মধ্যে যেটা বড়, সেটায় স্ত্রী এবং ছেলেকে নিয়ে শুয়েছিলেন জিমি ওয়াংচুক। অন্যটায় বীজেশের গভর্নেস মার্থা গোমেজ। দুটো বেডরুমের দরজাই ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।
ওই সকালে খোলা ডাইনিং স্পেসে ঢোকার এবং বেসিনে পড়ে থাকা হিরেটা দেখার সম্ভাবনা ছিল মাত্র তিনজনের। এক, বাংলোর খানসামা রামরতন। সে সকাল সাড়ে ছ’টায় রোজকার মতো ডাইনিং-স্পেসের টেবিল থেকে রাতের খাওয়ার বাসনপত্র সরিয়ে নিয়ে নতুন টেবিল ক্লথ পেতে দিয়ে গিয়েছিল। কারণ, ওই টেবিলেই সাড়ে সাতটার সময় অতিথিদের চায়ের পট সাজিয়ে দিতে হয়।
দুই, জিমি ওয়াংচুকের নিজস্ব ড্রাইভার পাশাং নোরবু। নোরবু এমনিতে বাংলোর আউট হাউসে আস্তানা গেড়েছে। তবে সকালে ঘুরতে ঘুরতে খোলা ডাইনিং স্পেসে ঢুকে পড়াটা তার কাছে অসম্ভব কিছুই নয়।
তিন, মার্থা গোমেজ। বীজেশের গভর্নেস। বীজেশের স্নান খাওয়া, পড়াশোনা, খেলাধুলো—সবকিছুর দায়িত্ব বছর চল্লিশের ওই গোয়ানিজ ভদ্রমহিলার হাতে। আগেই বিনায়ক বলেছে, দুটো বেডরুমের মধ্যে ছোটটায় শুয়েছিল মার্থা। রাত সাড়ে তিনটের পরে কখনো নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং স্পেসের বেসিনের কাছে গেলেই মার্থা হিরেটাকে দেখে ফেলতে পারে। তারপর সেটাকে সরিয়ে ফেলতেই বা কতক্ষণ?
তিনজনেরই বডি এবং ঘর সার্চ করা হয়ে গেছে। বলেছিল বিনায়ক। হিরেটা পাওয়া যায়নি।
এই অবধি শোনার পর উমাশঙ্কর চৌবে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘হিরেটার সাইজ কেমন?’
বিনায়ক উত্তর দিয়েছিল, ‘বেশি বড় নয়, একটা মটরশুঁটি দানার মতো। তবে জিমিসাহেব বললেন, পদ্মরাগ হিরে খুব রেয়ার। তার ওপরে এই হিরেটার কোয়ালিটি এবং কাট্ ছিল আনপ্যারালাল। এখনকার বাজারে ওটার দাম কম করেও কুড়ি থেকে পঁচিশ লাখ টাকা হবে।’
উমাশঙ্কর চৌবে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, ‘এ তো খড়ের গাদা থেকে সূচ খোঁজার চেয়েও শক্ত কাজ বিনায়ক। ধরো, ওই খানসামা রামরতন। সে যদি হিরেটা পেয়ে থাকে, তাহলে নিজের ঘরে বা শরীরের কোথাও লুকিয়ে রাখতে যাবে কেন? বাংলোর বাইরে অত বড় জঙ্গলটার যে কোনো গাছের কোটরে লুকিয়ে রাখতে পারে। পরে সবকিছু থিতিয়ে গেলে সেখান থেকে নিয়ে গিয়ে বেচে দেবে।’
বিনায়ক একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, ‘হ্যাঁ, তা পারে। তবে কী জানেন স্যার, রামরতনের পাস্ট রেকর্ড যা দেখেছি, তাতে ওকে চোর বলে ভাবতে একটু কষ্ট হচ্ছে। ও গত তিরিশ বছর ধরে ওই বাংলোয় খানসামার কাজ করছে। ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার রজত গুপ্ত আমাকে বললেন, এর আগে বহুবার ও অমন দামি জিনিস পড়ে থাকতে দেখে সেগুলো মালিকের হাতে ফেরত দিয়ে দিয়েছে। লোকটার এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। ফলে টাকার লোভও নেই। তাছাড়া একটা চোরাই হিরে বিক্রি করতে যাওয়ার যে বিপদ সেটা কি ও জানে না? রামরতনকে যখন ইন্টারোগেট করেছি তখনও ও এই কথাই বলেছিল আমাদের, “কার জন্যে চুরি করব স্যার? আমার পয়সায় খাবে কে?” ’
‘বেশ!’ বললেন চৌবেসাহেব। ‘এবার এসো ড্রাইভার পাশাং নোরবুর কথায়। ঘরে বা নিজের শরীরে না লুকিয়ে সে যদি হিরেটাকে জিমিসাহেবের গাড়ির কোনো এক খাঁজে লুকিয়ে রাখে?’
বিনায়ক বলল, ‘প্রথমেই সেই সম্ভাবনার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু কাল বিকেলে জিমিসাহেব নিজেই গাড়িটা ড্রাইভ করে জঙ্গলের রাস্তায় ঘুরতে বেড়িয়েছিলেন। বাংলোয় ফিরে এসে গাড়ি লক করে চাবিও উনি নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলেন। তাছাড়া রজত গুপ্ত যেমন রামরতনের সততা নিয়ে নিঃসন্দেহ, তেমনি জিমি সাহেব তাঁর ড্রাইভারের সততা নিয়ে। পাশাং নাকি ক’দিন আগেই গাড়ির সিটে পড়ে থাকা হিরের ব্রোচ মন্দিরা ম্যাডামকে ফেরত দিয়ে দিয়েছে। জিমি সাহেব বার বার আমাদের বলেছেন, “পাশাং-কে যেন হ্যারাস্ করা না হয়।”
চৌবেসাহেব বাঁকা হেসে বললেন, ‘মানুষের চরিত্র সম্বন্ধে যদিও নিঃসন্দেহ হয়ে কখনোই কিছু বলা যায় না, তবু আপাতত তৃতীয়জনের কথাই ভাবা যাক। কী যেন নামটা বললে? মার্থা না?’
‘হ্যাঁ, মার্থা গোমেজ। মহিলা গোয়ার এক কনভেন্টের টিচার ছিলেন। কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে বীজেশের গভর্নেসের চাকরির জন্যে অ্যাপ্লাই করেন। জিমি এবং মন্দিরা বলছেন, ওঁর কাগজপত্র সবই ও.কে। ওঁর ঘর এবং বডি, মহিলা কনস্টেবলকে দিয়ে সার্চ করিয়েছি। কিছু পাওয়া যায়নি। ওঁর ক্ষেত্রে অবশ্য হিরেটা বাইরে কোথাও সরিয়ে ফেলার সুযোগ সব চেয়ে কম। উনি সারাদিনই মন্দিরাদেবীর চোখে চোখে থাকেন। কাজেই ওঁর কাছে হিরেটা নেই, মানে উনি ওটা নেননি বলেই ধরে নেওয়া যায়।’
চৌবেসাহেব সবটাই শুনলেন, কিন্তু কোনো মন্তব্য করলেন না। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বিনায়ক অধৈর্য হয়ে বলল, ‘স্যার, এখন কী করব? কিছু তো বলুন।’
চৌবেসাহেব বললেন, ‘বিনায়ক, তুমি কি জিমি সাহেবের বেডরুম সার্চ করতে পারবে?’
প্রস্তাবটা শুনেই বিনায়ক শিউরে উঠল। বলল, ‘কী বলছেন স্যার? চাকরিটা খোয়াব? তাছাড়া ওখানে কেউ হিরেটাকে রাখবেই বা কেন? চোর তো চাইবে ওটাকে জিমি সাহেবের থেকে যতটা পারা যায় দূরে নিয়ে চলে যেতে।’
‘উঁহু। ঠান্ডা মাথায় ভাবলে দেখবে, যে-ই হিরেটা চুরি করে থাকুক, তার পক্ষে সেটাকে লুকিয়ে রাখার সবচেয়ে ভালো জায়গা কিন্তু জিমি সাহেবের ঘর। কারণ ওখানে কেউ হিরেটাকে খোঁজার কথা ভাববেই না।’
বিনায়ককে আইডিয়াটা হজম করার জন্যে প্রয়োজনীয় সময়টা দিয়ে চৌবেসাহেব বললেন, ‘তুমি কাল আরেকবার রায়ডাক বাংলোয় যাও বিনায়ক। একাই যাও।’
‘তারপর?’
‘তারপর ওঁদের সঙ্গে মিশে যাও। ওঁদের সঙ্গেই বাংলোর আশেপাশে ঘুরে বেড়াও। গল্প করো। ওঁরা যেরকম সজ্জন, তাতে আপত্তি করবেন বলে তো মনে হয় না।’
‘তারপর?’
‘এইসবের মধ্যেই চোখ রাখো বাংলোর প্রত্যেকটা লোকের গতিবিধির ওপর। কে কী করছে? কোনদিকে তাকাচ্ছে? কোনো ছোটখাটো অস্বাভাবিকতাকেও হিসেবের বাইরে রেখো না। দেখো, আমার মনে হয় এভাবেই হিরের খোঁজ পেয়ে যাবে।’
চৌবেসাহেবের সামনের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিনায়ক কুণ্ঠিত স্বরে ডাকল, ‘স্যার!’
‘কী হল?’
‘আপনি যা বললেন আমি তাই করব। কাল একাই যাব রায়ডাক বাংলোয়। শুধু মাঝখানে একবার আপনাকে ফোন করব। কে কী করছে না করছে ফোনেই আপনাকে জানাব। আপনি বলে দেবেন, কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা অস্বাভাবিক।’
চৌবেসাহেব হেসে ফেললেন। বললেন, ‘আচ্ছা আচ্ছা। তাতে অসুবিধে নেই। চলো, বেস্ট অফ লাক।’
সেই ফোন এল এই একটু আগে, যখন চৌবেসাহেব ঝারি করে তাঁর ছাদের বাগানের গাছে জল দিচ্ছিলেন। চৌবে সাহেব জিগ্যেস করলেন, ‘বলো বিনায়ক, কী খবর?’
‘স্যার, জিমি ওয়াংচুক আর ওঁর মিসেস একটু অসন্তুষ্ট।’
‘কেন?’
‘আমি স্যার কাল থেকেই বাংলোর গেটে পুলিশ পোস্টিং করে দিয়েছিলাম, যাতে রামরতন, পাশাং নোরবু কিংবা মার্থা গোমেজ বাংলো থেকে বেরোতে না পারে। গাড়িটাকেও বাংলোর চৌহদ্দির মধ্যে আটকে রেখেছি। জিমি সাহেবকে আমি রিকোয়েস্ট করেছি, আজকের দিনটুকু এই অসুবিধেগুলো একটু সহ্য করে নিতে। এমনিতেই কালকে ওঁরা ভুটানে ফিরে যাচ্ছেন। সেরকমই ওঁদের প্রোগ্রাম ছিল। তার মানে আজ রাতটুকুই আমি সুযোগ পাচ্ছি।’
‘বাকিদের খবর কী?’
‘রামরতন তার কাজ করে যাচ্ছে। মুখটুখ কালো। সেটা ভয়েও হতে পারে, আবার অপমানেও হতে পারে। আসলে দুয়েকজন কর্মচারী, যারা ওর রান্নার জিনিসপত্র নিয়ে বাংলোয় ঢুকেছিল, বেরোনোর সময় তাদের প্রত্যেকের থরো বডি-সার্চ করে তবেই বেরোতে দেওয়া হয়েছে। সেটাতে বোধহয় রামরতনের অপমান হয়েছে।’
‘তা আর কী করা যাবে? তোমার কাজ তো তোমাকে করতেই হবে। পাশাং নোরবু কী করছে?’
‘সারাদিন আউট হাউসে বসে ড্রিঙ্ক করে যাচ্ছে, আর আমার দিকে আগুন চোখে তাকাচ্ছে।’
‘ম্যাডাম মার্থা?’
‘সে-ও সমান বিষণ্ণ। প্রায় সারাটা দিনই নিজের ঘরে বসে ছুরি, কাঁচি, পিচবোর্ড আর অ্যাডহেসিভ নিয়ে বীজেশের স্কুলের প্রোজেক্ট বানাচ্ছে। মন্দিরাদেবীর সঙ্গে গল্প করতে করতে জানলাম, বীজেশের স্কুলের ভেকেশন পরশুই নাকি শেষ হচ্ছে, আর তখনই ওই সব মডেল-টডেল জমা দিতে হবে। স্যার, মডেলগুলো আমি একফাঁকে চেক করে দেখেছি। ওখানে হিরে নেই।’
‘না দেখলেও পারতে। লুকোনোর জায়গা হিসেবে ওটা বড্ড অবভিয়াস। বীজেশের খবর কী?’
‘ওরই অবস্থা সবথেকে শোচনীয়। ওইটুকু বাচ্চা গৃহবন্দি হয়ে থাকতে চায় কি? মন্দিরা আর মার্থার পক্ষে ওকে সামলে রাখাই দায় হয়ে যাচ্ছে। শেষমেশ আমাকেও মাঠে নামতে হল।’
‘বটে! কী করলে?’
‘লুডো খেলছিলাম স্যার। “পুলিশ-আংকল, পুলিশ-আংকল” বলে ডেকে বাচ্চাটা আমাকেই হাত ধরে টেনে লুডো খেলতে বসিয়ে দিল। আমিও দেখলাম ভালোই হল। এই সুযোগে একটু আপনি যেমন বলেছিলেন, ওঁদের বেডরুমের ভেতরটা নজর রাখা গেল। ওইজন্যেই আপনাকে ফোন করতে দেরি হয়ে গেল স্যার।’
‘লুডোখেলায় কে জিতল বিনায়ক?’ হালকা চালেই জিগ্যেস করলেন উমাশঙ্কর চৌবে।
একটু অপ্রস্তুত গলায় বিনায়ক বলল, ‘হেঁ হেঁ...ওই ইয়ে আর কী! কী বলব স্যার, ওইটুকু বাচ্চা বলে বলে ছক্কা ফেলছে। শেষকালে আমি যখন হেরে গো-ভূত হয়ে উঠে আসছি, তখন আমাকে কায়দাটা শিখিয়ে দিল। বলল, “পুলিশ-আংকল, ছক্কা যদি ফেলতে চাও তাহলে ছক্কার উলটোদিকটা, এই যে দ্যাখো, এই চারটে ফোঁটা যেদিকটায় আছে, সেই দিকটাকে ওপরে রেখে ঘুঁটি চালবে, বুঝলে? তাহলেই ছক্কা পড়বে।” ’
‘আবার বলো বিনায়ক।’ হঠাৎই চৌবেসাহেবের গলা ভীষণ গম্ভীর শোনাল। ‘আবার বলো, বাচ্চাটা কী বলল?’
আমতা আমতা করে বিনায়ক বলল, ‘স্যার, ও বলল, ছক্কার ছ’টা ফোঁটা যেদিকটায় আঁকা আছে, তার উলটোদিকটা, মানে যেদিকে চারটে ফোঁটা আঁকা আছে সেদিকটাকে ওপরে রেখে...’
‘বিনায়ক, তুমি কি নিজের চোখে দেখেছ, ছ’টা ফোঁটা যেদিকে আঁকা আছে, তার উলটো পিঠে চারটে ফোঁটা?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘তুমি হিরে পেয়ে গেছ বিনায়ক।’
জিমি ওয়াংচুকের হাতে তাঁর হারিয়ে যাওয়া পদ্মরাগ হিরে তুলে দিয়ে বিনায়কের কাজ শেষ হল না। এমনকী মার্থাকে হাজতে ঢুকিয়েও নয়। অত রাতে আলিপুরদুয়ার থেকে সার্ভিস জিপে চড়ে বিনায়ককে কুচবিহার এয়ারপোর্টের পাশের রাস্তায় সেই বাড়িটায় যেতে হল, যে বাড়িটার ছাদে চমৎকার ফুলের বাগান। চৌবেসাহেব ছাদের এককোণে গার্ডেন-চেয়ারে বসে মন দিয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি পড়ছিলেন। বিনায়ক সরাসরি সেইখানে উপস্থিত হয়ে বিনা ভূমিকায় বলল, ‘আপনাকে বলতেই হবে স্যার, কেমন করে বুঝলেন মার্থা লুডোর ছক্কার মধ্যে হিরে লুকিয়ে রেখেছে?’
‘ও হো, এতো খুবই সহজ। লুডোর ছক্কা দেখেছ কখনো?’
‘হাজার বার দেখেছি। আজকেই দুপুর থেকে ওই ছক্কাটা কিছু না হলে একশোবার হাতে নিয়েছি।’
‘উঁহু, মন দিয়ে দ্যাখোনি। দেখলে জানতে পারতে, পৃথিবীর সর্বত্র লুডোর ছক্কা বানানোর সময় একটাই নিয়ম মানা হয়। মুখোমুখি দুটো পিঠের ফোঁটার যোগফল সবসময়েই হবে সাত। কী, বুঝতে পারলে না?
‘ধরো, চারটে ফোঁটা যে পিঠে আছে, তার উলটো পিঠে থাকবে তিন ফোঁটা। চার আর তিন যোগ দিলে কত হয়? সাত। দুটো ফোঁটা যেদিকে আছে, তার উলটো পিঠে থাকবে পাঁচ ফোঁটা। পাঁচ আর দুইয়ের যোগফল? সাত। ছটা ফোঁটা যে পিঠে আছে তার উলটো পিঠে থাকবে...’
চৌবেসাহেবের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বিনায়ক বলল, ‘পুট।’
‘ব্যস, এটা জানলে আর কী বাকি রইল? তুমি তো আগেই বলেছ, মার্থার ঘরে ছিল, ছুরি আর অ্যাডহেসিভ। রাত্তিরে ওই মেয়েটা ডাইনিং-স্পেসে বেরিয়েছিল। দেখেছিল বেসিনের মধ্যে পড়ে আছে পদ্মরাগ হিরে। লোভ সামলাতে না পেরে সেই হিরে নিয়ে এসে কোথায় লুকোবে, কোথায় লুকোবে ভাবতে ভাবতে দেখল, ঘরের কোনায় পড়ে আছে বীজেশের লুডোর বোর্ড। ব্যস, তখনই ছক্কার ছ’টা সাইড খুলে ফেলে, মটরদানার মতো হিরেটাকে তার ভেতরে ভালো করে আঠা দিয়ে লাগিয়ে আবার ছ’টা সাইড এঁটে দিল।
‘এরই মধ্যে ধর্মের কল বাতাসে একটু নড়ে গেল। ছক্কার হিসেবটা মার্থার জানা ছিল না বলে সে ছ’ফোঁটার উলটোদিকে লাগিয়ে দিল চার ফোঁটা। আর তুমিও অমনি খপ করে ধরে ফেললে, হিরেটা কোথায় লুকোনো আছে।’
‘স্যার, আর লজ্জা দেবেন না।’ বিনায়ক নিচু হয়ে চৌবেসাহেবকে প্রণাম করতে যেতেই চৌবেসাহেব তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন