সৈকত মুখোপাধ্যায়

দুপুরবেলায় খাওয়া-দাওয়া সেরে একটা দু’ফর্মার পাতলা কবিতার বই খুলে পড়তে বসেছিলেন রিটায়ার্ড অ্যাডিশনাল এস পি উমাশঙ্কর চৌবে। তার মধ্যেই আলিপুরদুয়ার থানার ওসি বিনায়ক বসুর কল এল, ‘স্যার, একটা পিকিউলিয়ার কেসে ফেঁসে গেছি।’
‘কী ব্যাপার?’ গম্ভীর গলায় জিগ্যেস করলেন উমাশঙ্কর চৌবে।
‘এক ভদ্রলোক মার্ডার হয়েছেন। গলায় ফাঁস। আজকেরই ঘটনা, এক ঘণ্টা আগে খবর পেয়েছি। একবার দেখে যাবেন নাকি স্যার?’
চৌবেসাহেব একটু অবাক হলেন। সাধারণত নিজে পুরোদস্তুর চেষ্টা করে হালে পানি না পেলে তবেই বিনায়ক তাঁর শরণাপন্ন হয়। আজ কী হল যে, একেবারে দিনের দিন ফোন লাগাল?
চৌবেসাহেব একবার জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। চড়চড় করছে রোদ। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স লাগোয়া এইসব অঞ্চলে অগাস্টের মাঝামাঝি কয়েকটা দিনই সত্যিকারের গরম পড়ে। আজ সেরকমই একটা দিন। উপরন্তু আর্দ্রতা খুব বেশি, তাই ওয়েদারটা আরো কষ্টকর মনে হচ্ছে। একেবারেই বেরোতে ইচ্ছে করছিল না, তবু প্রিয় শিষ্যটি মনে আঘাত পাবে বলেই চৌবেসাহেব না করতে পারলেন না। জিগ্যেস করলেন, ‘অকুস্থলটি কোথায়?’
‘এই তো স্যার বাণেশ্বরে। আমি স্পটেই আছি। গাড়িটা আপনার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ঠিক আছে স্যার?’
‘বেশ, পাঠাও।’
চৌবেসাহেব দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালেন। সাড়ে তিনটে বাজে। মিসেস টিভিতে সিরিয়াল দেখছিলেন। চৌবেসাহেব বললেন, ‘বিনায়ক ডাকছে। একটু ঘুরে আসি, বুঝলে?’
চৌবেসাহেবের গৃহিণী টিভির পর্দা থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন, ‘বয়স হচ্ছে। এবার এই রক্তারক্তি কাণ্ডগুলো থেকে একটু দূরে থাকলেই ভালো হয় না?’
চৌবেসাহেব টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সেখানে একটা কাপালিক টাইপের লোক নরবলির আয়োজন করছে। হাড়িকাঠের পাশে একটা বাচ্চাছেলেকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। তিনি আর কিছু না বলে পাশের ঘরে গিয়ে পোশাক বদলাতে শুরু করলেন। একটু বাদেই আলিপুরদুয়ার থানার গাড়ি নীচের রাস্তায় দাঁড়িয়ে হর্ন বাজাল। চৌবেসাহেব সিঁড়ি দিয়ে চটপট নীচে নেমে গেলেন।
কুচবিহার থেকে আলিপুরদুয়ার যাবার রাস্তার মাঝামাঝি জায়গায় বাণেশ্বর। এখানে বাণেশ্বর-শিবের একটি প্রাচীন মন্দির রয়েছে। সেই মন্দিরের নামেই শহরেরও নাম। মন্দিরের লাগোয়া পুকুরে অনেক কচ্ছপ আছে। ‘মোহন মোহন’ বলে ডাক দিলে, তারা খাবার জন্যে জলের ওপরে উঠে আসে।
বাণেশ্বরে পৌঁছে, থানার ড্রাইভার জিতু একটা বাই-রোডের মধ্যে গাড়িটাকে ঢুকিয়ে দিল। সরু রাস্তাটা ধরে কিছুটা এগোতেই দু’পাশে বাড়িঘরের সংখ্যা কমে গেল; পালটে গেল তাদের চেহারাও। এখানে বেশিরভাগই পুরোনো আমলের কাঠের একতলা বাড়ি, টিনের ছাদ। প্রত্যেকটা বাড়িকে ঘিরেই সুপুরিবাগান। যেতে যেতে বাড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে দূরে কালজানি নদীর চর দেখতে পাচ্ছিলেন চৌবেসাহেব। ওইরকমই একটা বাড়ির সামনে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে, জিতু গাড়ি থেকে নেমে চৌবেসাহেবের পাশের দরজাটা খুলে ধরল। বলল, ‘এই বাড়িটা স্যার।’
বলার দরকার ছিল না। বাড়ির সামনে আলিপুরদুয়ার থানার আরেকটা গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। দু’জন কনস্টেবল বাগানে কাঁঠাল গাছের ছায়ায় বসেছিলেন, তাঁরা চৌবেসাহেবকে দেখে অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তাছাড়া গেটের বাইরে ঘুরঘুর করছিলেন পাড়ার কয়েকজন মাতব্বর। তার মানে খুনের খবরটা ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে।
ছোট্ট একফালি বারান্দার গায়েই বাড়িতে ঢুকবার একমাত্র দরজাটা। দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকবার আগে একমুহূর্ত থমকালেন চৌবেসাহেব। তাকিয়ে দেখলেন, দরজার মাথায় একটা টিনের সাইনবোর্ড। হলুদের ওপরে কালো রঙ দিয়ে লেখা ‘মমতা টিম্বার কোং, বর্মনপাড়া, বাণেশ্বর’।
সামনের ঘরটার চেহারা কিছুটা অফিসঘর আর কিছুটা বৈঠকখানা মেশালে যা হয় সেইরকম। দেয়ালের তাকে পরপর বছর ধরে সাজানো রয়েছে সেলস-ট্যাক্স আর ইনকাম-ট্যাক্সের ফাইল। মেঝের ওপরে এক কোনায় বান্ডিল-বাঁধা খাতাপত্র রাখা আছে। ঘরের মাঝখানে টেবিল চেয়ার যেমন আছে, তেমনি অন্য একদিকে একটা সোফাসেটও রাখা আছে। ডেডবডিটা ওই সোফাসেটের সামনে মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়েছিল। চৌবেসাহেবের সাড়া পেয়ে ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এল বিনায়ক বসু, বিনায়কের সেকেন্ড-অফিসার সুমন্ত্র আর এক বৃদ্ধা।
বিনায়কের কথায় যা জানা গেল, তা হচ্ছে এই—
যিনি খুন হয়েছেন, তার নাম বিরূপাক্ষ বর্মন। বাণেশ্বর বাজারে ওঁর একটা কাঠগোলা আছে। প্রয়াত বিরূপাক্ষবাবু চেরাই করা কাঠ কিনে বিক্রি করতেন।
বিরূপাক্ষবাবুর বয়স পঁয়ষট্টি। প্রায় দশ বছর হল স্ত্রী মারা গেছেন। স্ত্রীয়ের নাম ছিল মমতা, যার নামে ব্যবসার নাম। ভদ্রলোক নিঃসন্তান। আত্মীয়ের মধ্যে এক শ্যালক, যিনি থাকেন শিলিগুড়িতে। তাঁকে খবর দেওয়া হয়েছে। তিনি আসছেন। তবে তিনি ফোনেই বিনায়ককে জানিয়েছেন, দিদি মারা যাওয়ার পর থেকে জামাইবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছিল। ইদানীং তো বছরে একবার বিজয়া দশমীর দিন ছাড়া আর ফোনেও কথাবার্তা হতো না।
বিনায়কের পিছনে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ভয়ার্তমুখে যিনি দাঁড়িয়েছিলেন, সেই বৃদ্ধার নাম শৈলী। উনি বিরূপাক্ষবাবুর সব কাজ করতেন। ঘর মোছা, কাপড় কাচা থেকে শুরু করে রান্না অবধি।
এমনিতে শৈলীদি রোজ দুপুর একটার সময় একবার এসে বিরূপাক্ষবাবুর দুপুরের এঁটো বাসনগুলো মেজে দিয়ে যেতেন, কিন্তু আগের দিন বিরূপাক্ষবাবু তাকে বলে রেখেছিলেন একটু দেরি করে আসতে। এই দুটো নাগাদ। বলেছিলেন, কোথাও একটা যাবেন; তাই অন্যদিনের চেয়ে খাওয়া-দাওয়া সারতে একটু দেরি হবে।
এইখানে বিনায়কের কথা থামিয়ে চৌবেসাহেব শৈলীকে জিগ্যেস করেছিলেন, ‘দুপুর একটার মধ্যে রোজ বিরূপাক্ষবাবুর চান-খাওয়া সারা হয়ে যেত? এত তাড়াতাড়ি! বাজার তো দুটোর আগে বন্ধ হয় না।’ তাতে শৈলীদি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘গত একবছর ধরে তো গোলা বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। দাদাবাবু বাজারে যেতেন কোথায়?’
চৌবেসাহেব তখন বিনায়ককে বললেন, ‘আচ্ছা, তুমি বলে যাও।’
বিনায়কের কথা শুনতে শুনতেই তিনি দেয়ালের তাক থেকে আগের বছরের ইনকাম ট্যাক্সের ফাইলটা নামিয়ে ব্যালেন্স শীটে চোখ বোলাতে শুরু করলেন। বিনায়ক বলল, ‘শৈলীদি দুটোর সময় এসে দ্যাখেন, বাড়ির দরজা ভেজানো। এমনিতে বিরূপাক্ষবাবু সবসময়েই ভেতর থেকে দরজায় খিল দিয়ে রাখতেন। তারপর শৈলীদি ঘরে ঢুকে দ্যাখেন, এই ব্যাপার। নিখুঁত কাজ! নাইলন রোপ দিয়ে পেছন থেকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে খুন করেছে। দড়িটা এখনো গলায় জড়ানো রয়েছে, তবে ওই মেটিরিয়ালের ওপরে হাতের ছাপ পাব না।’ একটু চুপ করে থেকে, বিনায়ক যোগ করল, ‘শৈলীদিই চিৎকার করে লোকজন ডাকেন। তারা আবার থানায় ফোন করে।’
চৌবেসাহেব ফাইল থেকে মুখ তুলে শৈলীদিকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি যখন ঘরে ঢুকলে, তখন কি সিলিং ফ্যানটা চলছিল, না এরকমই বন্ধ ছিল?’
শৈলীদিকে ভাবতে হল না। সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল, ‘আলো-পাখা দুটোই বন্ধ ছিল। এমনিতে দাদাবাবু দুপুরবেলাটা এই ঘরেই পাখা চালিয়ে বসে থাকতেন। আজ তাই ঘরে ঢুকেই আমার অবাক লেগেছিল, ভাবছিলাম হল কী? তারপর তো দেখি ওই কাণ্ড।’
ফাইলটা যথাস্থানে তুলে রেখে চৌবেসাহেব এবার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। মৃতদেহের প্যান্ট-জামার পকেট থেকে যা যা পাওয়া গিয়েছিল, সেই সবই সুমন্ত্র টেবিলের ওপরে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছিল। কোনোকিছু না ছুঁয়ে শুধু চোখের নজরে যতটা দেখা যায়, দেখতে দেখতে তিনি বিনায়ককে জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার ফাইন্ডিংস কী বিনায়ক?’
বিনায়ক তার সেকেন্ড-অফিসার সুমন্ত্র আর শৈলীদিকে বলল, ‘যাও তো, তোমরা বাইরে গিয়ে ওয়েট করো।’ ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ টুপিটা খুলে মাথা চুলকাল। তারপর বলল, ‘সেটাই তো প্রবলেম স্যার। মার্ডারারকে কেউ দেখেনি। সে কখন এসেছিল, কীভাবে এসেছিল, জানি না। কোনো আলমারি ভাঙা হয়নি, কাগজ সরানো হয়নি। তাই মোটিভও খুঁজে পাচ্ছি না। এমনকী বিরূপাক্ষবাবু কোথায় গিয়েছিলেন, তাও বুঝতে পারছি না। সেই জন্যেই আপনার শরণাপন্ন হলাম।’
চৌবেসাহেব বললেন, ‘একটা কথা ভুল বললে। বিরূপাক্ষবাবু বাইরে থেকে ফেরেননি, বাইরে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিলেন। দ্যাখো না, বাইরের দরজায় যে পালাম ব্র্যান্ডের তালাটা ঝুলছে, তার চাবি এই রিং-এ রয়েছে; এই যে, যে রিং-টা ওঁর পকেট থেকে পেয়েছ। যদি বাইরে থেকে ঘুরেই আসতেন, তাহলে চাবিটা কি আর পকেটে থাকত?’
বিনায়ক আশ্চর্য হয়ে টেবিলের জিনিসগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ল। চৌবেসাহেব বললেন, ‘তাছাড়া আজকে যেরকম গরম পড়েছে, তাতে বাইরে থেকে ঘুরে এলে ফ্যানটা চালাতেন না? আসলে উনি ফ্যানের সুইচ অফ করে, আলো নিভিয়ে বেরোতে যাচ্ছিলেন, সেই সময়েই গলায় ফাঁসের টান পড়েছিল। তার মানে খুনটা সকালের দিকেও হয়ে থাকতে পারে। শৈলীদি আসার পরে আমরা জানতে পারলাম। অ্যাম আই ক্লিয়ার?’
‘ইয়েস স্যার।’
‘এই ভাঁজ করা কাগজটা কী? দেখেছ?’
‘দেখেছি স্যার। বিরূপাক্ষবাবুর বুকপকেটে কাগজটা ছিল। গোল্ড লোনের অ্যাপ্লিকেশন-ফর্ম। এই দেখুন।’
বিনায়ক কাগজটা মেলে ধরল। উমাশঙ্কর চৌবে খুব আগ্রহ নিয়ে কাগজটার ওপরে ঝুঁকে পড়লেন। ‘কুবের ফিনান্স লিমিটেড’ নামে একটা সংস্থার কাছে পনেরো ভরি সোনা বন্ধক রেখে তার বদলে টাকা ধার করার আবেদন জানিয়েছেন বিরূপাক্ষবাবু। মৃতা স্ত্রীর গয়না নিশ্চয়ই। একই ফর্মে ছাপানো প্রশ্নাবলির পাশে পাশে হাতে লিখে উত্তর দিয়েছেন তিনি। নাম, বাবার নাম, ঠিকানা, পেশা এইসব।
চৌবেসাহেব কিছুক্ষণ নিজের স্মার্টফোনটা হাতে নিয়ে কীসব খুটখাট করলেন। তারপর বললেন, ‘কুবের ফিনান্সের নাম শুনেছ? ফর্মের ওপরে যে অ্যাড্রেসটা ছাপা আছে, সেটা তোমার থানার এলাকাতে; কোর্ট মোড়ে। তবে সম্ভবত এরকম কোনো ফিনান্সারের অস্তিত্ব নেই, কারণ গুগল সার্চ করে দেখলাম, নো ইনফর্মেশন। তবু ঠিকানাটা মনে রাখো। থানায় ফেরার পথেই একবার কোর্ট মোড়ে নেমে দেখে যাব।’
ইতিমধ্যে হসপিটালের অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছেছিল, সঙ্গে ফরেনসিকের দু’জন অফিসার। ওরাই আর কিছুক্ষণ বাদে মৃতদেহ নিয়ে মর্গে রওনা হয়ে যাবে আর তারপর যা কাজ বাকি থাকে, সুমন্ত্র করে ফেলবে। বিনায়ক বলল, ‘স্যার, একবার থানায় এই জিনিসপত্রগুলো নামিয়ে রেখে তারপর যদি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি, অসুবিধে হবে?’ উমাশঙ্কর চৌবে বললেন, ‘ধুর, কীসের অসুবিধে? বরং যেতে যেতে আরো একটু কথা বলা যাবে।’
বিনায়ক আর চৌবেসাহেব জিতুর গাড়িটা নিয়েই আলিপুরদুয়ারের দিকে রওনা হলেন। গাড়িতে উঠে বিনায়ক জিগ্যেস করল, ‘আপনি কি ওই গোল্ড লোনের ব্যাপারটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন?’
চৌবেসাহেব উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, বিনায়ক। আমি বিরূপাক্ষবাবুর গতবছরের ব্যালেন্স শীটে চোখ বোলাচ্ছিলাম। ব্যবসার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। বাজারে প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকা ধার ছিল ওঁর। শৈলীদির কথা থেকে তো বুঝতেই পারলে, কাঠের গোলা এখন পুরোপুরি বন্ধ। এই অবস্থায় উনি মরিয়ার মতো টাকার জোগাড় করতে চাইবেন, সেটাই স্বাভাবিক। এই সুযোগটাই খুনি নিয়েছে। বুঝতে পারছ আমি কী বলতে চাইছি?
‘যে খুন করেছে সে নিশ্চয়ই ফিনান্স কোম্পানির এজেন্ট সেজেই বিরূপাক্ষবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। নিশ্চয়ই নিজের একটা ভুয়ো আইডেন্টিটি কার্ডও দেখিয়েছিল। এবং বিরূপাক্ষবাবুকে বলেছিল, আজ নিজে এসে তাকে নিয়ে যাবে আলিপুরদুয়ারে, তিনি যেন গয়নাগুলো সঙ্গে নিয়ে বেরোন। আজ সে একটা কম্পিউটারে ছাপা নকল ফর্মও ফিল-আপ করিয়েছিল একটা অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে। বিরূপাক্ষবাবুর বিশ্বাস নিশ্চয়ই এতে আরো পোক্ত হয়েছিল।
‘তারপর আর কী? এমন নিঃসঙ্গ একজন মানুষের থেকে সহজ শিকার আর কে হতে পারে! বুঝতে পারছ, কেন কোনো ধস্তাধস্তি, আলমারি ভাঙার চিহ্ন কিছুই খুঁজে পাচ্ছ না? কেমন করে পাবে? ভিক্টিম বলতে গেলে নিজে থেকেই খুনির হাতে পনেরো ভরি গয়না তুলে দিয়েছিলেন যে।’
শুনতে শুনতে বিনায়কের চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে উঠল। সে তখনই নিচু গলায় বিভিন্ন লোকের সঙ্গে ফোনে একটানা প্রায় পনেরো মিনিট কথা বলে গেল। তারপর হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
চৌবেসাহেব ওকে লক্ষ্য করছিলেন। বললেন, ‘ইনফর্মারদের ফোন করছিলে? বলতে পারল কিছু?’
‘না স্যার।’ ঘাড় নাড়ল বিনায়ক। ‘এরকম প্রফেসনাল কিলার এই এরিয়ায় ঘুরবে, অথচ আমি জানব না, আমার ইনফর্মাররা জানবে না—এটা খুবই অবাক লাগছে।’
চৌবেসাহেব বললেন, ‘দ্যাখো, তাহলে মনে হয়, অন্য স্টেট থেকে ঢুকেছে। নর্থ বেঙ্গলের এইটাই তো সমস্যা। হাত বাড়ালেই বিহার। তাছাড়া নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান সবার সঙ্গেই বর্ডার শেয়ার করি আমরা। কত ক্রিমিনালের রেকর্ড রাখবে?’
আলিপুরদুয়ার শহরে ঢোকার কিছুক্ষণ পরে, হঠাৎ বিনায়ক জিতুর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘এই দাঁড়া, দাঁড়া। দাঁড় করা একটু। স্যার, ওই ফিনান্স কোম্পানির অ্যাড্রেসটা এখানেই কোথাও হবে। আমি চট করে একবার ঘুরে আসছি। আপনি গাড়িতেই একটু বসুন।’
বিনায়ক নেমে যাওয়ার পরে চৌবেসাহেব কিছুক্ষণ হাঁটুতে আঙুল ঠুকে একটা গানের সুর ভাঁজলেন। তারপর বললেন, ‘এই জিতু! আমি একটু ওই এটিএমটা থেকে ঘুরে আসছি। টাকা তুলতে হবে।’ গাড়ির জানলা দিয়েই দেখা যাচ্ছিল, একটু দূরেই একটা বাড়ির একতলায় প্রাইভেট ব্যাঙ্কের এটিএম বুথ। চৌবেসাহেব সেদিকে কিছুটা এগিয়েও আবার বিরক্তমুখে ফিরে এলেন। জিতু বলল, ‘কী হল স্যার?’
‘আরে ধুৎ! দরজার বাইরে ঝুলিয়ে রেখেছে—নো ক্যাশ। এই এক কায়দা হয়েছে আজকাল। ক্যাশ নেই তো শাটার টেনে দে না বাপ।’ গজগজ করতে করতে আবার সিটে উঠে বসলেন চৌবেসাহেব। জিতু জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে, ঠিক উলটোদিকে একটা দর্জির দোকানের কারিগরকে জিগ্যেস করল, ‘এটিএমটা কখন থেকে বন্ধ গো চাচা?’
চাচা বলল, ‘বন্ধ নাকি? আমি নিজেই তো চারটের সময় টাকা তুলে আনলাম। তারপরে ক্যাশ ফুরিয়েছে তাহলে।’
‘সামনে আর আছে?’
‘এই তো ফায়ার ব্রিগেডের উলটোদিকেই পেয়ে যাবেন।’
ইতিমধ্যে বিনায়ক ফিরে এল। চৌবেসাহেব কিছু বলার আগেই দু’দিকে ঘাড় নাড়ল। কুবের-কোম্পানির খোঁজ পাওয়া যায়নি। চৌবেসাহেব বললেন, ‘তাহলে তো এখন আর কিছু করার নেই। ওয়েট করো, ফরেনসিক থেকে যদি কোনো ক্লু পাও। কাল বর্মনপাড়ায় একটু ভালো করে এনকোয়ারি করো, কেউ যদি ভিক্টিমের বাড়িতে সকালের দিকে কাউকে ঢুকে থাকতে দেখে থাকে। আর মার্কেটে একটু খোঁজ নিও, বিরূপাক্ষবাবুর কোনো বিজনেস-রাইভ্যাল ছিল কিনা।’
‘করব স্যার। আপনি যেমন যেমন বলছেন, করব।’ বলল বিনায়ক।
করবে যে, সে ব্যাপারে চৌবেসাহেবেরও সন্দেহ ছিল না। বিনায়ক এনকোয়ারির ব্যাপারে একদম রুলবুক মেনে চলে। যা যা করার কথা কিছুই বাদ দেয় না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তার বাইরে কিছু করার কথাও ভাবতে পারে না, যেটা আবার চৌবেসাহেব খুব ভালো পারেন।
থানায় ঢুকে চট করে মৃতের জামা-প্যান্টের পকেট থেকে পাওয়া জিনিসপত্রগুলো লকারে ঢুকিয়ে রেখে বিনায়ক বেরিয়ে এল। বলল, ‘চলুন স্যার, আমি আপনার সঙ্গেই আবার ফিরে যাই। বাণেশ্বরে নেমে যাব। জিতু আপনাকে কুচবিহারে নামিয়ে দিয়ে আবার বাণেশ্বরেই ফিরে আসবে।’
আটটা বেজে গেছে। যে রাস্তা দিয়ে এসেছিলেন, সেই রাস্তা দিয়েই আবার ফিরে চললেন চৌবেসাহেব আর বিনায়ক। এটাই আলিপুরদুয়ারের প্রধান সড়ক। মুহুর্মুহু বাস লরি ছুটে যাচ্ছে। তবে এখন সন্ধে হয়ে গেছে বলে অটো, স্কুটার, রিক্সা কিংবা পায়ে চলা লোক নেই বললেই হয়।
হঠাৎই জিতু কড়া ব্রেক কষে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘হায় হায় রে!’
‘কী হল জিতু?’ প্রশ্ন করল বিনায়ক।
‘দেখুন স্যার! আবার একজনকে চাপা দিয়ে গেছে।’ মহা উত্তেজিত স্বরে বলল জিতু। ‘এই মাল-বওয়া ট্রাকগুলো স্যার, পাগলের মতো চালাবে আর মানুষকে চাপা দিয়ে চলে যাবে। আহা রে! এইমাত্র মেরে গেল মনে হচ্ছে।’
জিতু কিছু ভুল বলেনি। আসবার পথে ঠিক যে জায়গাটায় বিনায়কের কথায় ও গাড়ি দাঁড় করিয়েছিল, ঠিক সেইখানেই একজন পুরুষমানুষের দেহ উপুড় হয়ে পড়েছিল।
ওরা তিনজন রাস্তা পেরিয়ে চটপট লোকটার কাছে পৌঁছে গেল। লোক বলার থেকে ছেলে বলাই ভালো। উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে। রোগা ডিগডিগে চেহারা, ঘাড় অবধি বাবরি চুল। পরনে ফুলহাতা সাদা শার্ট আর খয়েরি ট্রাউজার। মোটা বেল্ট। পাশেই একটা সস্তা অ্যাটাচি-কেস আর কাঁধব্যাগ পড়ে রয়েছে। আর একটা স্টিলের চৌকোনা টিফিন-কৌটো...ওই অ্যাটাচির পাশেই পড়ে ছিল।
ছেলেটার শরীরে প্রাণ আছে কি নেই দেখবার জন্যে চৌবেসাহেব হাঁটু মুড়ে বসে, ওর বাঁ-হাতের কবজিটা ছুঁয়ে দেখলেন। কিছুক্ষণ পালস দেখে তারপর সাবধানে ওকে চিৎ করে নাকের কাছে হাতটা নিয়ে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন, নিশ্বাস পড়ছে কিনা। তারপর দুঃখিত মুখে দু’দিকে ঘাড় নাড়লেন। মুখে বললেন, ‘মারা গেছে।’
তারপর কী মনে হতে, আরেকবার ছেলেটার হাতের কবজিটা নিজের হাতে তুলে নিলেন। তবে এবারে আর পালস দেখলেন না। ছেলেটার রিস্ট-ওয়াচের চওড়া স্টিলের ব্যান্ডটা আঙুলের ডগা দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলেন বেশ কয়েকবার। তারপর প্রায় দৌড়ে গিয়েই টিফিনকৌটোটা হাতে তুলে নিয়ে সেটাকেও হাতের চেটোর এপিঠ ওপিঠ দিয়ে বেশ কয়েকবার ছুঁলেন। তারপর যেটা করলেন, সেটা আরও অদ্ভুত। ছেলেটার ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বার করে আনলেন বেশ কয়েকটা কয়েন। সেগুলোকে এক এক করে গালে ছুঁইয়ে দেখে আবার ওর পকেটেই ঢুকিয়ে রাখলেন। চৌবেসাহেবের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠল।
বিনায়ক একটু অবাক হয়েই চৌবেসাহেবের কাণ্ডকারখানা দেখছিল। এবার আর থাকতে না পেরে বলল, ‘কী করছেন স্যার?’
‘টেম্পারেচার দেখছি বিনায়ক। বাইরে যখন এইরকম তাণ্ডব গরম, গলগল করে ঘামছি আমরা, তখনো ছেলেটার ঘড়ির ব্যান্ড, টিফিন-কৌটো, পকেটের পয়সা—সব কী ঠান্ডা দ্যাখো! আচ্ছা, ও কি এইমাত্র কোনো এসি-বাস থেকে নামল?’
জিতু আর বিনায়ক দু’জনেই বলল—অসম্ভব। এই সময়ে আলিপুরদুয়ারের মধ্যে দিয়ে কোনো এসি-বাস যায় না।
ইতিমধ্যে হতভাগ্য ছেলেটির পরিচয় জানার জন্যে বিনায়ক ওর বুকপকেট থেকে কাগজপত্রগুলো বার করে এনেছিল।
প্রথমেই একটা হোটেলের বিল। হোটেলটা পাশের গলিতেই, নাম পণ্ডিত রেসিডেন্সি। বিনায়ক খুব ভালো করে চেনে হোটেলটা। একটু ঘেটো-টাইপের জায়গা। আধার কার্ড, ভোটার কার্ডের কড়াকড়ি নেই বলে অনেক সময়েই আন্ডার-ওয়ার্ল্ডের লোকেরা ওখানে লুকিয়ে থাকে, আর বিনায়ক আর তার দলবল তাদের টেনে বার করে নিয়ে যায়।
বোঝা গেল, ছেলেটা টাকা মিটিয়ে একটু আগে ওখান থেকেই বেরিয়েছিল।
কিছু দশ-বিশ টাকার নোট।
আর সেদিনই নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে ভাগলপুর জংশনে যাওয়ার ট্রেনের পেপার টিকিট। টিকিটটা চোখের কাছে তুলে ধরে মুখে ‘চিক চিক’ আওয়াজ করল বিনায়ক। চৌবেসাহেব জিগ্যেস করলেন, ‘কী হল?’
বিনায়ক বলল, ‘বেচারা ট্রেন মিস করেছিল মনে হয়। আজকেই পাঁচটায় ট্রেনের টাইম ছিল। এখন বোধহয় স্টেশনে যাচ্ছিল, এর পরে বিহারের দিকে কোন ট্রেন আছে দেখতে।’
কাগজের বান্ডিলের ভেতর থেকে এরপর যে জিনিসটা বেরোল, সেটা হাতে নিয়ে চৌবেসাহেব আর বিনায়ক দু’জনেই অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটা ল্যামিনেট করা অফিস-আইডেন্টিটি কার্ড। ছেলেটির ছবি। নীচে নাম—রামকুমার যাদব। অফিসের নাম ‘কুবের ফিনান্স লিমিটেড’। ঠিকানা আলিপুরদুয়ার, কোর্ট মোড়। সেই অস্তিত্ববিহীন অফিস, বিরূপাক্ষবাবুর পকেটে যাদের অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম পাওয়া গিয়েছিল।
একটু বাদে চৌবেসাহেব গলাখাকারি দিয়ে বললেন, ‘দা মার্ডারার হ্যাজ বিন মার্ডারড। না কি বিনায়ক?’
বিনায়ক বলল, ‘তাই তো মনে হচ্ছে স্যার। এই জিতু, অ্যাটাচিটা খুলতে হবে রে!’ জিতু একদৌড়ে গাড়ির গ্লাভস কম্পার্টমেন্ট থেকে একটা স্ক্রু-ড্রাইভার নিয়ে এল।
এখন জায়গাটা একদম ফাঁকা আর চারপাশটা বেশ অন্ধকার। এটাই আর কয়েকঘণ্টা আগে হলে এতক্ষণে লোকের ভিড় জমে যেত। এখন আসবেই বা কে? আশেপাশে যে ক’টা দোকানঘর ছিল, সব বন্ধ হয়ে গেছে। এটিএম কাউন্টারটার দরজায় এখনো পিচবোর্ডে লেখা সেই নোটিসটা ঝুলছে—নো ক্যাশ। এখান থেকেই সেটা দেখা যাচ্ছে। আলো বলতে ওই এটিএম কাউন্টারের বাইরের আলো।
জিতু স্ক্রু-ড্রাইভারের চাড় দিয়ে অ্যাটাচি-কেসের ডালাটা খুলে ফেলল। দেখা গেল, ভেতরে শুধু কয়েকটা ভাঁজ করা জামাকাপড় আছে।
ব্যাগের চেনটাও খোলা হল। সেখানে শুধু হোটেল থেকে কেনা খাবারের প্যাকেট, জলের বোতল, গামছা এইসব। না গয়না নেই। উমাশঙ্কর চৌবে শান্ত গলায় বললেন, ‘জানতাম, থাকবে না।’
‘কেমন করে জানলেন?’ জিগ্যেস করল বিনায়ক।
‘গয়নাগুলো ওই টিফিন-কৌটোয় ছিল। মনে হয় বিরূপাক্ষবাবুরই কৌটো। এই মক্কেল, রামকুমার যাদব, বিরূপাক্ষবাবুকে খুন করার পরে ওই কৌটোসুদ্ধই পনেরো ভরি গয়না ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। যে ওকে খুন করেছে, সে গয়নাগুলো বার করে নিয়ে খালি কৌটোটা ফেলে দিয়ে গেছে। না হলে তুমি বলো না, কেউ কি অ্যাটাচি-কেস আর টিফিন-কৌটো আলাদা করে হাতে ধরে নিয়ে যায়?’
‘খুন বলছেন স্যার?’
‘আমি নাইনটি-নাইন পার্সেন্ট শিওর, বিনায়ক। লরিতে ধাক্কা মারলে আরো কিছু ইনজুরি মার্ক থাকত, শুধু মাথার পেছনে একটা ইনজুরি—ও তোমার ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে মারলেও হতে পারে।’
চৌবেসাহেব আরেকবার খালি টিফিন-কৌটোটা হাতে তুলে নিলেন। বললেন, ‘কী যেন একটা মিস করে যাচ্ছি, বিনায়ক। আচ্ছা, ওই পণ্ডিত রেসিডেন্সিতে কি এয়ারকন্ডিশনড রুম আছে? রামকুমার কি সেখান থেকেই বেরোল?’
বিনায়ক বলল, ‘কী যে বলেন স্যার! গোরুর গাড়ির আবার হেডলাইট! পণ্ডিতের হোটেলে অনেক ঘরে পাখাই ঠিকমতো চলে না, তার আবার এসি-মেশিন।’
ইতিমধ্যে বিনায়ক থানায় ফোন করে দু’জন কনস্টেবলকে বলেছিল, একটা গাড়ি নিয়ে আসতে। তারা আসার আগে অবধি আপাতত আর কিছু করার নেই।
চৌবেসাহেব দু’হাতের মুঠিতে মাথার কাঁচাপাকা চুলগুলো খামচে ধরে দ্রুতপায়ে পায়চারি করতে আরম্ভ করলেন। বিনায়ক হতাশমুখে দাঁড়িয়ে রইল।
পায়চারি করতে করতে একবার চৌবেসাহেব মুখ তুলে এটিএম কাউন্টারের দরজাটার দিকে তাকালেন। তারপর কাচের দরজার বাইরে দিয়ে একবার ভেতরে উঁকি মেরেই ফিরে এলেন বিনায়কের কাছে। ফিসফিস করে বললেন, ‘তোমার কাছে রিভলভার আছে? গুড। স্ট্রেট ওই কাউন্টারে ঢুকে যাও। পাহারাদার লোকটা মেশিনের পেছনের খুপরিটায় লুকিয়ে বসে আছে। পিঠটুকু দেখা যাচ্ছে। ওর মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে বার করে আনো। সাবধানে কাজ করবে। লোকটা খুনি।’
চৌবেসাহেবের মুখ দেখে বিনায়ক আর কথা বাড়াল না। ঠিক দু’মিনিটের মাথায় লোকটার রগে রিভলভার ঠেকিয়ে বার করে আনল। অত্যন্ত চোয়াড়ে চেহারার একজন মাঝবয়সি লোক। গায়ে সিকিউরিটি গার্ডের ছাইরঙের উর্দি। চোখে আগুন।
জিতু যতক্ষণে ওর হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধছিল, তার মধ্যেই চৌবেসাহেব কাউন্টারে ঢুকে পড়লেন। প্রথমে নিজের কার্ড দিয়ে দু’হাজার টাকা তুললেন। দিব্যি সুড়সুড় করে চারটে পাঁচশো টাকার নোট বেরিয়ে এল। নোট আর এটিএম কার্ড পকেটে পুরে রেখে এবার তিনি ঢুকলেন গার্ডের কিউবিকলে। একটু খুঁজতেই একটা বাজারের থলির মধ্যে বিরূপাক্ষবাবুর গয়নাগুলো পেয়ে গেলেন। থলিটা নিয়ে বেরিয়ে এসে একবার থলির মুখটা ফাঁক করে বিনায়ককে দেখালেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, ‘এত তাড়াতাড়ি জোড়া-খুনের কেস আগে কখনো সলভ করেছ, বিনায়ক?’
বিনায়ক এটিএমের গার্ডটাকে ধাক্কা মেরে গাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজাটা লক করে দিল। তারপর বলল, ‘আমি কোথায় সলভ করলাম স্যার? আপনিই তো লোকটাকে মার্ডারার বলে আইডেন্টিফাই করলেন। কেমন করে করলেন, সেটা অবশ্য বুঝতে পারছি না।’
চৌবেসাহেব একটা তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, ‘আরে, ওই পাঁচটার ট্রেনের টিকিট শুনেই প্রথম খটকাটা লাগল। স্টেশনের এত কাছে থেকে ট্রেন মিস করবে কেন? তখনই মনে হল, ছেলেটা তখনই, মানে ওই পাঁচটার কিছু আগে, হোটেল থেকে বেরিয়েই খুন হয়নি তো?’
‘তারপর মনে মনে ঘটনাটা রিকনস্ট্রাক্ট করার চেষ্টা করলাম। বিকেল থেকে তো আর ডেডবডিটা এখানে পড়ে নেই। তার মানে মার্ডারার ওটাকে লুকিয়ে রেখেছিল; তারপর রাস্তায় ভিড় কমতেই বার করে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। একটা অ্যাক্সিডেন্টের চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল আর কী! প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল?
‘নিশ্চয় কোনো ঠান্ডা ঘরে। সেই জন্যেই মারা যাওয়ার চার ঘণ্টা বাদেও রামকুমারের শরীরে রিগর মর্টিস সেট করেনি। আর সেই জন্যেই মেটালের জিনিসগুলো এখনো এত ঠান্ডা রয়ে গেছে। কোথায় সেই ঠান্ডা ঘর, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না।
‘তোমার মনে আছে, বিনায়ক, সেই খেলার নাম খুনের ঘটনায় তোমাকে বলেছিলাম, ম্যাপের গায়ে সবচেয়ে বড় করে যে নামটা লেখা থাকে, সেটাই আমরা দেখতে পাই না। আজকেও তাই হতে যাচ্ছিল। ঠান্ডার প্রসঙ্গে এসি-বাসের কথা ভাবছি, হোটেলের এসি-রুমের কথা ভাবছি, কিন্তু চোখের সামনেই যে এটিএম কাউন্টারটা দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেটার কথা ভাবতে পারছিলাম না।
‘ভাবা উচিত ছিল। নো ক্যাশের নোটিসের সঙ্গে খুনের সময়টা বড্ড মিলে যাচ্ছে, তাই না?’
চৌবেসাহেব থামতেই বিনায়ক বলল, ‘এক্সেলেন্ট স্যার! এক্সেলেন্ট। ভাবা যায় না! শুধু একটা কথা বলুন। এই স্কাউন্ড্রেলটা জানল কেমন করে, রামকুমারের ব্যাগে গয়না রয়েছে?’
চৌবেসাহেব বললেন, ‘মনে হয় একেবারেই বাই চান্স। রামকুমার মনে হয় স্টেশনে রওনা হবার আগে গয়নাগুলোকে কাঁধব্যাগ থেকে বার করে অ্যাটাচিতে লুকিয়ে রাখতে গিয়েছিল আর তার জন্যে সে বেছে নিয়েছিল ওই ফাঁকা এটিএম কাউন্টারটাকে। এটিএম কাউন্টারের একটা সুবিধে আছে মানো তো যে, তুমি যতক্ষণ দরজার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে কিছু করছ, ততক্ষণ আর কেউ ঢুকবে না। হ্যাঁ, একজনই ঢুকতে পারে। আর রামকুমারের দুর্ভাগ্য, সে-ই ঢুকেছিল। এটিএমের গার্ড। ওই যে, তোমার অতিথি। ও লোভ সামলাতে না পেরে রামকুমারকে খুন করে। লোকটার অতীত সম্বন্ধে খোঁজ নিয়ে দেখো, নিশ্চয়ই ক্রিমিনাল কানেকশন পাবে।’
বিনায়ক বলল, ‘বুঝতে পেরেছি। এটিএম কাউন্টারে লাশ লুকোনো রয়েছে, এই অবস্থায় অন্য কাস্টমাররা ভেতরে ঢুকলে মুশকিলে পড়বে বলে বদমাশটা দরজায় নো ক্যাশের নোটিস ঝুলিয়ে দিয়েছিল।’
একবার বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিতে মুখ নিচু করে বসে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বিনায়ক বলল, ‘ব্যাটার বুদ্ধি আছে, মানতে হবে। আপনি মোক্ষম সময়ে এখানে এসে না দাঁড়ালে, এতক্ষণে সেফলি অতগুলো গয়না নিয়ে বেরিয়ে যেত। আপনি যে কীভাবে ওই সামান্য ঠান্ডা জিনিসপত্রের ক্লু থেকে...’
বিনায়ককে কথা শেষ করতে না দিয়ে চৌবেসাহেব হাঃ-হাঃ করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘লোকটা ঠান্ডা মাথায় খুনটা করেছিল ঠিকই, কিন্তু ঠান্ডার ব্যাপারটা মাথায় রাখতে পারেনি। পারে না, বুঝলে বিনায়ক? কিছু না কিছু চিহ্ন থেকেই যায়। চলো, তোমার লোকজন চলে এসেছে। আমি এবার এগোই। গুডনাইট।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন