তেরো নম্বর ছোরা

সৈকত মুখোপাধ্যায়

আজ বিনায়ক বসু পুরো গল্পের মুডে। সাধারণত চৌবেসাহেবের কাছে বিনায়ক দৌড়ে এসেছে মানেই বুঝতে হবে আলিপুরদুয়ার থানার তরুণ দারোগাটি কোনও জটিল কেসে ফেঁসে গেছে। আজ কিন্তু ব্যাপারটা একদমই উলটো। ওদের থানার সেকেন্ড অফিসার নীলাদ্রি মিত্র একটা দারুণ কেস সলভ করেছে। চৌবেসাহেবের ছাদের বাগানে একটা ডেক-চেয়ারে বসে আরাম করে চা খেতে খেতে বিনায়ক চৌবেসাহেবকে সেই গল্পই শোনাচ্ছিল।

শুরুতেই বিনায়ক বেশ নাটকীয়ভাবে বলল, ‘বুঝলেন স্যার, আফসোস শুধু একটাই। এত ভালো অফিসারটি পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে।’

চৌবেসাহেব একটু অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘কে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে?’

‘নীলাদ্রি, স্যার। এই কেসটার ইনভেস্টিগেটিং-অফিসার।’

‘কেন?’

‘যে রোমান্টিক আইডিয়া নিয়ে ও পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছিল, তার সঙ্গে বাস্তবের অভিজ্ঞতা নাকি একেবারেই মিলছে না। কোনও স্যাটিসফ্যাকশন পাচ্ছে না কাজ করে।

‘এখানে নাকি ক্রাইমের পেছনেও কোনও বুদ্ধির ছাপ নেই। মাঠের মধ্যে একশো লোকের সামনে দিনদুপুরে এক ভাই আরেক ভাইকে দা দিয়ে কুপিয়ে দিল। কিংবা বাড়ির চাকর, মালিককে খুন করে টাকা-গয়না হাতালো ঠিকই, কিন্তু সেসব নিয়ে উঠল গিয়ে কোথায়? না নিজের গ্রামের বাড়িতে—যেখানে তার জন্যে আগে থেকেই পুলিশের লোক ওয়েট করছে। এমন সব কেসে ইনভেস্টিগেশনের স্কোপ কোথায়? বুদ্ধির লড়াই লড়বে কার সঙ্গে? নীলাদ্রির কথাগুলো কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো নয় স্যার।’

চৌবেসাহেব মজা পাওয়া মুখ করে বললেন, ‘তাই? তা নীলাদ্রি এখন কী করবে?’

‘ও কলেজ-সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় পাশ করে শ্রীরামপুর-কলেজে লেকচারারের চাকরি পেয়ে গিয়েছে। সামনের সপ্তাহেই জয়েন করবে। তবে তার আগেই দেখিয়ে দিয়ে গেল, বুদ্ধি কাকে বলে! একবারই চান্স পেয়েছিল বুদ্ধিমান ক্রিমিনালের মোকাবিলা করার। অ্যান্ড আই মাস্ট সে, হি হ্যাজ হ্যান্ডলড ইট ইন আ ওয়ান্ডারফুল ওয়ে। শুনবেন নাকি স্যার ঘটনাটা? দু’দিন আগের ঘটনা। জল্পেশ্বরের মেলা চলছিল তখন!’

‘বলো, শুনি।’ চৌবেসাহেব গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে চেয়ারের ওপর পা তুলে বসলেন।

বিনায়ক তার কাহিনি শুরু করল—

‘খবরটা ছোট করে গতকালের কাগজে বেরিয়েছিল। আপনিও দেখেছেন নিশ্চয়! হ্যাঁ, জল্পেশ্বরের মেলায় ফেমাস সার্কাসের তাঁবুর মধ্যে ওই খুনের ঘটনাটার কথাই বলছি। একজন মহিলা-খেলোয়াড় খুন হয়েছিলেন। প্রথমে অবশ্য আমরা খুন বলে বুঝতে পারিনি, ভেবেছিলাম অ্যাকসিডেন্ট। কাগজের রিপোর্টেও অ্যাকসিডেন্টই লিখেছে।’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘খুব ডিটেলে কিছু জানি না। সবাই অ্যাকসিডেন্ট ভেবেছিল? তার মানে কি সার্কাসের খেলা চলাকালীন খুনটা হয়েছিল?’

‘একদম ঠিক ধরেছেন স্যার। নেচার অফ ক্রাইমটা বুঝতে গেলে ওই খেলার ডিটেলটা আপনাকে একটু মন দিয়ে শুনতে হবে। প্রায় সমস্ত সার্কাসেই এটা খুব পপুলার একটা ইভেন্ট। ‘নাইফ-থ্রোয়িং’এর খেলা। আপনিও নিশ্চয়ই দেখেছেন। একটা মানুষ-প্রমাণ কাঠের চাকা লোহার ফ্রেমের ওপর এমন ভাবে ফিট করা থাকে, যাতে সেটা অনায়াসে ঘুরতে পারে। চাকাটার মাঝখানে ছোট কাঠের পাদানি লাগানো থাকে; সেই পাদানির ওপরে পা রেখে দাঁড়ায় একটি মেয়ে। উপরন্তু মেয়েটির হাতের পাতা দুটোও ওপরের দিকে দুটো চামড়ার ফাঁসের সঙ্গে আটকে দেওয়া হয়। না হলে তো চাকা ঘুরতে শুরু করলেই সে গড়িয়ে পড়ে যাবে।

‘ফেমাস সার্কাসে এই মেয়েটা ছিল সাবিত্রী... সাবিত্রী গুণশেখরন। কেরালার মেয়ে, বছর পঁচিশেক বয়স।

‘চাকাটা থেকে হাত দশেক দূরে একটা এক-চাকার সাইকেলের ওপর ভারসাম্য রেখে স্থির হয়ে দাঁড়াত কেশবন। সেও ছিল কেরালার লোক। প্রথমে শুনেছিলাম সাবিত্রীর সঙ্গে নাকি কেশবনের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। পরে অবশ্য জানলাম, সেটা ঠিক নয়।

‘খেলাটা দেখানোর জন্য দুজন সহকারীরও প্রয়োজন হতো। একজন সাইকেলের ওপর ব্যালেন্স করে দাঁড়ানো কেশবনের হাতে একটা একটা করে ধারালো ছোরা তুলে দিত আর অন্যজন হাতের ঠেলায় কাঠের চাকাটাকে একটা সমান স্পিডে ঘুরিয়ে যেত। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরত সেই মেয়েটাও। এই চাকা ঘোরানোর কাজটা বহুদিন ধরে নটরাজন নিজের হাতে করত।’

‘কে নটরাজন?’ প্রশ্ন করলেন উমাশঙ্কর চৌবে।

বিনায়ক উত্তর দিল, ‘নটরাজন আর কেশবন ছিল ফেমাস সার্কাসের দুজন পার্টনার। কেশবনের খেলা যেমন নাইফ-থ্রোয়িং, নটরাজনের তেমনি ছিল বাঘ-সিংহের খেলা। একসময় ওর চাবুকের আওয়াজে নাকি কুড়িটা হিংস্র পশু একসঙ্গে ওঠাবসা করত। তখন ফেমাস সার্কাসের এক নম্বর আইটেম ছিল বাঘের মুখে নটরাজনের মাথা ঢুকিয়ে দেওয়ার খেলা। নটরাজনের সঙ্গেই সাবিত্রীর বিয়ে হবে, এমনটাই সবাই জানত।

‘তারপর হঠাৎই আইন করে সার্কাসে বাঘ-সিংহের খেলা বন্ধ করে দেওয়া হল। প্রায় বেকার হয়ে গেল নটরাজন। তার আগের খ্যাতি আর রইল না। তখনই নটরাজনকে ত্যাগ করে সাবিত্রী কেশবনকে বিয়ে করার জন্যে উঠেপড়ে লাগল।

‘তবে এই ঘটনায় নটরাজন আর কেশবনের বন্ধুত্ব চিড় খায়নি। ওরা আগের মতোই একে অন্যের খেলা দেখানোর সময় সাহায্য করতে এগিয়ে যেত।’

‘বেশ! তারপর ওই নাইফ-থ্রোয়িং-এর কথা কী বলছিলে বলো।’ চৌবেসাহেব তাগাদা দিলেন।

বিনায়ক বলল, ‘ওই একচাকার সাইকেলে ব্যালেন্স করে বসেই, পরপর বারোটা ছুরি, ঘুরন্ত সাবিত্রীর শরীর ঘিরে অব্যর্থ টিপে গেঁথে দিত কেশবন। এরপরেই থাকত শেষ চমক। নটরাজন আঠা দিয়ে একটা লাল বেলুন আটকে দিত সাবিত্রীর মাথার মাত্র ইঞ্চি চারেক ওপরে। দর্শক-আসন থেকে একজন কেউ এগিয়ে এসে একটা ফেট্টি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিত কেশবনের চোখ দুটো। কোনও সন্দেহের অবকাশ না রেখে, এর ওপরে আবার একটা কালো কাপড়ের থলি দিয়ে কেশবনের মাথা থেকে কাঁধ অবধি ঢেকে দিত নটরাজন।’

‘ইন্টারেস্টিং।’ নড়েচড়ে বসলেন চৌবে সাহেব। বললেন, ‘তারপর?’

‘তারপর তাঁবুর অন্য সব আলো নিভে যেত। কাঠের চাকাটার মাথার কাছে জ্বলে উঠত একটা নীল আলো, যাতে শুধু সাবিত্রী আর কেশবনকে ঘিরে একটু জায়গাতেই আলো পড়ত। নীল আলোর সুইচটা থাকত নটরাজনের হাতের কাছে।’

‘তারপর?’

‘সাবিত্রীকে মাঝখানে রেখে এতক্ষণ যে চাকাটা ঘুরছিল, হঠাৎই নটরাজনের হাতের চাপে তা একদম স্থির হয়ে যেত। থেমে যেত সার্কাসের অর্কেস্ট্রার সমস্ত বাজনা-বাদ্যি। দর্শকরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখত, নীল আলোর বৃত্তের মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাবিত্রী। তার শরীর ঘিরে ইতিমধ্যেই গেঁথে গেছে বারোটা ছোরা। তেরো-নম্বর ছোরার ফলাটা ডানহাতের দুই আঙুলে ধরে চোখে ফেট্টি বাঁধা অবস্থায় কেশবন সাইকেলটা নিয়ে সামান্য আগুপিছু করছে। ঠিক করে নিচ্ছে নিশানা। এরকম সময়ে বোধহয় একটা পিন পড়লেও সার্কাসের তাঁবু কেঁপে উঠত, এতটাই চরমে পৌঁছত নৈঃশব্দ্য।

‘তারপর হঠাৎই নীল আলোর মধ্যে দিয়ে কেশবনের নিক্ষিপ্ত ছোরা এক বিদ্যুতের রেখার মতন গিয়ে বিঁধত বেলুনটার গায়ে। যে দর্শকেরা এতক্ষণ উদ্বেগে স্তব্ধ হয়ে বসেছিল, সাবিত্রীকে অক্ষত দেখে তারা হাততালিতে ফেটে পড়ত। সাবিত্রী আর কেশবন হাতে হাত রেখে হাসতে-হাসতে অ্যারেনা ত্যাগ করত।

‘কিন্তু পরশু...।’

‘হ্যাঁ, পরশু কী হয়েছিল বলো তো ঠিক করে।’ চৌবেসাহেবের গলাতেও উৎকণ্ঠা।

বিনায়ক বলল, ‘পরশু সন্ধের শোয়ে, বেলুনের বদলে সাবিত্রীর কণ্ঠমণিতে গিয়ে বিঁধেছিল তেরো-নম্বর ছোরাটা। মুহূর্তের মধ্যে মারা গিয়েছিল মেয়েটি। ঘটনাটা সন্ধের শোয়ের শেষ দিকে... মানে রাত ন’টা নাগাদ ঘটেছিল। আধঘণ্টার মধ্যেই নীলাদ্রি তার টিম নিয়ে জল্পেশ্বরের মেলায় ফেমাস সার্কাসের তাঁবুতে পৌঁছে যায়। দর্শকশূন্য তাঁবুতে তখন সেই মরণঘূর্ণিকে ঘিরে হতভম্ব হয়ে বসেছিল নটরাজন, কেশবন-সহ আরো প্রায় তিরিশজন বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। সকলেই প্রায় কেরালার লোক, সার্কাসের কর্মী। তারা একবাক্যে বলল, এ এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়। আর সার্কাসে যারা খেলা দেখায়, মৃত্যু যে তাদের নিত্য-সহচর, সে তো সবাই জানে।

‘তবু নীলাদ্রির মন মানছিল না। সে ঘুরে গিয়ে দাঁড়াল কাঠের চাকাটার পেছনে। দেখল সুইচবোর্ড থেকে একটা ইলেকট্রিকের তার উঠে গেছে ফ্রেমের উপরে লাগানো নীল আলোটার দিকে—অন্যসব আলো নিভে যাওয়ার পরেও যে-আলোটা জ্বলত। কিন্তু মাঝপথে ওই তারটা থেকে আরেকটা তার বেরিয়ে, একটা কাঠের আড়ালে ঢুকেছে।

‘দ্বিতীয় তারটার গতিপথ অনুসরণ করতে গিয়ে নীলাদ্রি দেখল, সহজে চোখে পড়ে না এমন একটা জায়গায় লাগানো আছে একটা ইলেকট্রো ম্যাগনেট। এই দেখুন তার ছবি—’

বিনায়ক নিজের মোবাইল থেকে একটা ছবি চৌবেসাহেবকে দেখালো। চৌবেসাহেব দেখলেন, একটা ক্যারমের স্ট্রাইকারের সাইজের উজ্জ্বল বস্তু। সেটার গায়ে তার জড়ানোর জন্যে দুটো টার্মিনালও রয়েছে।

বিনায়ক ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে বলল, ‘এরই গায়ে জড়ানো ছিল সেই দ্বিতীয় তারের নেগেটিভ আর পজিটিভ এন্ড। মানে বুঝলেন স্যার?’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘বাহ। গুড ফাইন্ডিং। অ্যাক্সিডেন্ট নয়; এ তো খুন। বেলুনের দিকে ছুটে যাওয়া ছোরাটাকে সাবিত্রীর গলার দিকে নামিয়ে দিয়েছিল এই চুম্বকের টান। নিশ্চয়ই কাঠের চাকার যেদিকে সাবিত্রীর গলা, তার ঠিক উলটোদিকেই এটা লাগানো ছিল?’

‘একদম ঠিক ধরেছেন। তাহলে বলুন তো খুনটা কে করেছে?’

‘কেন? নটরাজন। সাবিত্রী ওকে বিয়ে করতে চায়নি, তারই শোধ নিল আর কী। ওর হাতেই তো নীল আলোর সুইচ ছিল বললে। শয়তানটা এমনই কল বানিয়েছিল যে, আলোও জ্বলেছে আর সাবিত্রীর মৃত্যুও নিঃশব্দে ওঁত পেতে দাঁড়িয়েছে তার গলার পেছনে। ভয়ংকর!’

বিনায়ক মুচকি হেসে বলল, ‘ব্যাপারটা অত সরল নয়, স্যার। নীলাদ্রি বুঝিয়ে না বললে আমিও বুঝতে পারতাম না। ভাবুন তো, নটরাজন যদি চুম্বকের ফাঁদ পেতেই থাকত, তাহলে কাজ মিটে যাওয়ার পরেই সে ওটাকে সরিয়ে ফেলল না কেন? গ্যালারি থেকে ওই চাকার পেছনে ঘন অন্ধকারে ও কী করছে, তা বোঝা তো কারও পক্ষেই সম্ভব ছিল না। ওর কাছাকাছি যে দুজন মানুষ ছিল, তাদের মধ্যে সাবিত্রী ততক্ষণে মৃত আর কেশবনের চোখ বাঁধা। ওরা তো কিছু দেখতেই পেত না। তাহলে কেন পুলিশ আসা অবধি এমন দুর্দান্ত প্রমাণটা নটরাজন ওখানে রেখে দিল?’

চৌবেসাহেব মাথা চুলকে বললেন, ‘তাও তো ঠিক। তাহলে কি নটরাজন না জেনেই অন্য কারও পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিল? কে হতে পারে সেই খুনি?’

‘কেন? কেশবন।’

‘তার মানে? তুমি কী বলছ বিনায়ক! নটরাজনের অজান্তে কেশবন চাকার পেছনে ম্যাগনেট লাগিয়ে রেখেছিল? কিন্তু তা কী করে হবে বিনায়ক? নটরাজন ছিল ওর প্রিয় বন্ধু আর সাবিত্রী ছিল কেশবনের বাগদত্তা। তাকে ও খুন করবে কেন?’

বিনায়ক বলল, ‘কিছু ফ্যাক্ট নীলাদ্রি খুঁজে বের করেছে। ফেমাস সার্কাসের পুরোনো কয়েকজন কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনেছে যে, সাবিত্রী যেমন কিছুদিন আগে নটরাজনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তেমনি ক’দিন আগে বাতিল করেছিল কেশবনকেও। সাবিত্রী নিজে ছিল খুবই দক্ষ ট্রাপিজের খেলোয়াড়। ওকে উত্তর ভারতের বিখ্যাত ‘স্টার সার্কাস’ অনেক বেশি বেতন দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এই মাসটাই ছিল ফেমাসের সঙ্গে সাবিত্রীর চুক্তির শেষ মাস।’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘বুঝলাম। কিন্তু তারপরও তো কয়েকটা প্রশ্ন থেকে যায়।’

‘বলুন স্যার!’ আত্মপ্রত্যয়ের সুর বিনায়কের গলায়।

‘এক, কেশবনই যদি খুনটা করে থাকে, তাহলে ওর মোটিভ কী ছিল?’

বিনায়ক উত্তর দিল, ‘একাধিপত্য। নটরাজন জেলে গেলে কেশবন ফেমাস সার্কাসের পার্টনার থেকে মালিক হয়ে বসত।’

‘মানলাম। কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়। সাবিত্রীকে খুন করার কাজটা কেশবন অমন কঠিন করে নিল কেন? ও তো চোখ খুলেই বারোটার মধ্যে একটা ছুরি সাবিত্রীর শরীরে গেঁথে দিতে পারত। লোকে ভাবত অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ।’

বিনায়ক নাক দিয়ে একটা আওয়াজ ছেড়ে বলল, ‘এটাও বুঝতে পারছেন না? সে ক্ষেত্রে কি নটরাজনকে ফাঁসানো যেত?’

উমাশঙ্কর চৌবে কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে। আমার শেষ প্রশ্ন, কেশবন কীভাবে নিশ্চিত হয়েছিল যে, চোখ বাঁধা অবস্থাতেও সে সাবিত্রীর গলাতে ছুরি বসাতে পারবে? লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না? সে যে প্রতিদিন সাবিত্রীর মাথার চার ইঞ্চি ওপরে বেলুনটাকে বিঁধতে পারত, সেটা নিশ্চয়ই ওর দীর্ঘ অনুশীলনের ফল। কিন্তু নতুন টার্গেটে, অর্থাৎ সাবিত্রীর গলায় ছুরি বেঁধানোর জন্যে কোনও অনুশীলন তো ও করেনি; সবার চোখ এড়িয়ে তা করা সম্ভবও নয়। কেমন করে ও সেই কাজটা পারল?’

‘আপনি ঠিক ধরেছেন!’ হাঁটুর ওপর চাপড় মেরে চেঁচিয়ে উঠল বিনায়ক। ‘ঠিক ধরেছেন আপনি। আমার বিশ্বাস শুধু নটরাজনকে ফাঁসানোর জন্যই নয়, তেরোনম্বর ছোরাটিকে অব্যর্থ-লক্ষ্যে চালিত করবার জন্যও কেশবনের এটা দরকার হয়েছিল।’ মোবাইলের স্ক্রিনে চুম্বকের ছবিটা দেখতে-দেখতে বিনায়ক বলল, ‘এবার শুধু কেশবনের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করতে হবে।’

চৌবেসাহেব কিছু বলছেন না দেখে বিনায়কের সন্দেহ হল। বলল, ‘আপনার কী মনে হচ্ছে স্যার? এটা একটা আশ্চর্য ডিটেকশন নয়। আই উইল রিয়েলি রিয়েলি মিস দা বয়। আই মিন নীলাদ্রি।’

চৌবেসাহেব মাথার পেছনে হাতদুটো ভাঁজ করে রেখে পা দুটো সামনে ছড়িয়ে দিলেন। বিনায়ক জানে, এটা ওঁর গভীর চিন্তার লক্ষণ। ও কিছুক্ষণ চৌবেসাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ভয়ে-ভয়ে বলল, ‘কী হল স্যার? এনি খটকা?’

‘মেনি খটকাস, টু টেল ইউ দা ট্রুথ। তুমি আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দাও তো বিনায়ক। প্রথমে বলো, ওই ম্যাগনেটটা, ওটা কি নীলাদ্রি প্রথমবারেই সার্কাসের তাঁবুতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছিল, নাকি সেকেন্ড অ্যাটেম্পটে?’

বিনায়কের চোখদুটো গোল-গোল হয়ে উঠল। বলল, ‘আপনি কেমন করে জানলেন! না। প্রথমবারে পায়নি। ওইদিনই একটু বেশি রাতের দিকে নীলাদ্রি আবার ফেমাস-সার্কাসে ফিরে গিয়েছিল। একা। ও আমাকে বলেছে, ওর মন বলছিল, ভাইটাল কোনও ক্লু মিস করেছে। সেইজন্যেই ও আবার গিয়েছিল ওখানে। তখনই ও চুম্বকটাকে খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু আপনি কেমন করে ...।’

‘পরে বলছি। এবার বলো, তোমরা নিশ্চয়ই ফেমাস-সার্কাসের অফিস থেকে কাগজপত্র সিজ করেছ।’

‘ইয়েস স্যার।’

‘তার মধ্যে সাবিত্রীর নামে ইনসিওরেন্সের কোনও সার্টিফিকেট পেয়েছ?’

বিনায়ক শক খাওয়ার মতন দাঁড়িয়ে উঠল। বলল, ‘ইউ আর এ উইজার্ড। হ্যাঁ স্যার। পেয়েছি। পঞ্চাশ-লক্ষ টাকার ইনসিওরেন্স কভারেজ। মাত্র গত-বছরেই সার্কাস কোম্পানির টাকায় সাবিত্রীর নামে ওটা করানো হয়েছিল।’

‘ও তো মারা গেছে। এখন টাকাটা কে পাবে?’

‘দুই পার্টনার, মানে কেশবন আর নটরাজন সমানভাবে। কিন্তু এটা কি ইম্পর্ট্যান্ট?’

‘ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট বিনায়ক। সাবিত্রীকে সার্কাসের দুই পার্টনার মিলে খুন করেছে। ওই পঞ্চাশ-লক্ষ টাকা ডুবন্ত সার্কাসকে বাঁচাতে পারত। কাজেই ধরে নাও সার্কাসের স্বার্থে ওরা দুজনে মিলে সাবিত্রীকে বলি দিয়েছে।’

বিনায়ক একরোখা গলায় বলল, ‘কিন্তু ওরা যদি অ্যাক্সিডেন্ট থিয়োরিকেই কাজে লাগাবে, তাহলে চুম্বকটাকে সরিয়ে রাখল না কেন? এখনো তো সাক্ষ্য-প্রমাণ সব কেশবনের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে। ওই তো চুম্বকটাকে লাগিয়েছিল, যাতে ছুরিটা সাবিত্রীর ঠিক গলার মাঝখানেই বেঁধে।’

চৌবেসাহেব অধৈর্য গলায় বললেন, ‘সরায়নি তার কারণ, ওদের দুজনের মধ্যে কেউই চুম্বকটার কথা জানত না। চুম্বকটার সঙ্গে এই খুনের ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই। আচ্ছা বিনায়ক, তুমি কি সত্যিই আমাকে বিশ্বাস করতে বলো যে, একটা তীব্র বেগে ছুটে-আসা ভারী ছোরার গতিবেগ বদলে দিতে পারে ওই ছোট্ট একটা চুম্বক? আড়াইশো ওয়াটের বিদ্যুতে যা কাজ করে।’

বিনায়ক গোঁয়ারের মতো বলল, ‘তাহলে কি আপনি বলতে চান, কেশবনের অলৌকিক ক্ষমতা ছিল? চুম্বক ছাড়া লক্ষ্যভেদের ব্যাপারে ও কীভাবে অমন নিশ্চিত হল, আমাকে বোঝান তো।’

চৌবেসাহেব শান্তভাবে উত্তর দিলেন, ‘যেভাবে ম্যাজিশিয়ানরা নিশ্চিত থাকেন চোখ বেঁধে বোর্ডে অংক কষার ব্যাপারে, কিংবা ভিড়ের রাস্তায় গাড়ি চালানোর ব্যাপারে। শোনো বিনায়ক, কেশবন একটা বহু পুরোনো ম্যাজিক ট্রিকের আশ্রয় নিয়েছিল। তুমি যখনই বলেছিলে, দর্শকদের মধ্যে থেকে একজন এসে কেশবনের চোখে ফেট্টি বেঁধে যাওয়ার পরেও আবার নটরাজন নিজের হাতে একটা কালো কাপড়ের ঢাকনা দিয়ে তার মাথা ঢেকে দিত, তখনই আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।

‘ওই ঢাকনাটা কেশবনের মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে দেয়ার সময় হাতের দ্রুত টানে নটরাজন কেশবনের চোখের ফেট্টি-টা নামিয়ে দিত। তুমি খোঁজ নিয়ে দেখো, দেখবে ঢাকনাটাও ছিল কালো মশারির কাপড়ের মতন এক রকমের কাপড় দিয়ে তৈরি, যার ফলে কেশবন তার মধ্যে দিয়ে পুরো বাইরের জগৎটাই দেখতে পেত। কিন্তু দর্শকরা বুঝতে পারত না যে কেশবনের চোখের বাঁধন সরে গেছে।

‘খেলা দেখানো হয়ে গেলে আগে চোখের ফেট্টিটা আবার চোখে ফিরিয়ে এনে, তারপর কাপড়ের ঢাকনাটা মাথা থেকে খুলত কেশবন। অতএব বুঝতেই পারছ, সাবিত্রীকে কেশবন ঠান্ডা মাথায় দেখে শুনে খুন করেছে এবং তার জন্য চুম্বকের কোনও প্রয়োজন হয়নি। অবশ্য নটরাজন পুরো ব্যাপারটাই জানত। সে এই খুনের সহযোগী।’

চৌবেসাহেবের পুরো কথাটার মানে বুঝতে বিনায়কের একটু সময় লাগল। তারপর স্তিমিতস্বরে সে বলল, ‘কিন্তু তাহলে ওই ম্যাগনেট? ওটার তো কোনও প্রয়োজনই ছিল না। কোথা থেকে এল ওটা?’

চৌবেসাহেব সরাসরি বিনায়কের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তরটা দিতে খুবই খারাপ লাগছে বিনায়ক। নীলাদ্রির সম্বন্ধে তোমার ধারণাটা সম্পূর্ণ বদলে দিতে খুবই খারাপ লাগছে আমার। কিন্তু আমার ধারণা আমি ঠিকই বলছি। তুমি নিজে একবার নীলাদ্রিকে জিগ্যেস করলে ও নিশ্চয়ই স্বীকার করবে। দ্বিতীয়বারে সার্কাসের তাঁবুতে যাবার সময় চুম্বকটাকে ও নিজেই পকেটে করে নিয়ে গিয়েছিল। নীলাদ্রিই চাকাটার পেছনদিকটায় ক্লু খুঁজবার নাম করে গিয়ে ওটাকে ওখানে লাগিয়ে দিয়েছিল।’

‘কিন্তু কেন? কেন স্যার?’ বিনায়ক প্রায় চিৎকার করে উঠল।

চৌবেসাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে একটা দোপাটি-গাছের পাতা থেকে টোকা মেরে একটা ছোট্ট মাকড়সাকে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘মানুষের মন বড় জটিল বিনায়ক। নীলাদ্রি পুলিশের চাকরি ছেড়ে চলে যাবার আগে তোমাকে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিল, একজন বুদ্ধিমান ক্রিমিনাল পেলে, ও তার সঙ্গে কতটা টক্কর দিতে পারে।

‘বাট আই অ্যাম সরি টু সে, ও পারেনি। এই ক্রাইমটার পেছনে নটরাজন আর কেশবনের যে ম্যাজিক-ট্রিকটা ছিল, নীলাদ্রি সেটা ধরতে পারেনি। ও ভেবেছিল, এটা একটা সিম্পল অ্যাক্সিডেন্ট। সেটাকেই ও রং চড়িয়ে ক্রাইম বানাতে গিয়েছিল।’

বিনায়ক মাথা নিচু করে বসেছিল। চৌবেসাহেব ওর পেছনে এসে দাঁড়ালেন। ওর কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘এই ইনভেস্টিগেশনটা এখন তুমিই নিশ্চয় চালিয়ে নিয়ে যাবে। মনে হয় কেশবনের চোখের বাঁধনটা যে নকল ছিল সেটা প্রমাণ করতে অসুবিধে হবে না। ভালো করে জেরা করলে ওরা দুজন কনফেসও করে নেবে সবকিছু। কিন্তু আমার একটা রিকোয়েস্ট, পুরো রিপোর্টের মধ্যে এই চুম্বকের গল্পটার কোনও উল্লেখ কোরো না। নীলাদ্রির মতো রোমান্টিক মানুষেরা মাঝে-মাঝে ভুল করে ফেলে। তাদের ক্ষমা করতে হয়।’

বিনায়ক চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ও.কে, স্যার।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%