খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না

সৈকত মুখোপাধ্যায়

বিনায়ক ভারি চিন্তিত মুখে বলল, ‘বাণ মারা সম্বন্ধে আপনার ধারণা কী?’

চৌবেসাহেব ডালিয়ার টবের মাটি খোঁচাচ্ছিলেন। মুখ না তুলেই উত্তর দিলেন, ‘অত্যন্ত উচ্চ ধারণা। প্রাচীনকাল থেকে যুদ্ধবিগ্রহে মানুষের সহায় হচ্ছে ধনুর্বাণ। কাজেই যিনি বাণ মারতে পারেন, তিনি হলেন পরম ক্ষত্রিয়।’

‘স্যার!’ আর্তনাদ করে উঠল বিনায়ক, মানে বিনায়ক বসু। কুচবিহার থানার ওসি। বলল, ‘আপনি রসিকতা করছেন? এদিকে আমার যে ঘুম উড়ে যাবার জোগাড় সেটা বুঝছেন না?’

চৌবেসাহেবের বাড়ির ছাদেই দু’জনের কথা হচ্ছিল। ছাদের প্রায় সবটা জুড়েই তাঁর শখের টবের বাগান। এখন জানুয়ারি মাস, উত্তরবঙ্গে ভরা শীত। চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া আর নানারঙের মরসুমি ফুলে ছাদ আলো হয়ে আছে।

ফুলের বাগানের মাঝখানে একজায়গায় হালকা বেতের টেবিল আর তাকে ঘিরে সাজানো চারটে গার্ডেন চেয়ার। টেবিলের ওপরে টিকোজি ঢাকা দিয়ে রাখা ছিল চায়ের পট আর বোন চায়নার সুদৃশ্য কাপ-প্লেট। একটু আগে পর্যন্ত একটা বড় পাত্রে কয়েক টুকরো কেভেন্টার্স প্লেন কেকও ছিল, কিন্তু এখন শুধুই কেকের গুঁড়ো পড়ে আছে। কথা বলতে বলতে বিনায়ক সবটুকু কেকই খেয়ে ফেলেছে।

চৌবেসাহেব জানেন, তাঁর এই প্রিয় শিষ্যটির টেনশনে খিদে বেড়ে যায়। কেক না থাকার জন্যে কোনো ক্ষতি হয়নি অবশ্য, কারণ, সত্তর বছর বয়সেও পুলিশের প্রাক্তন বড়কর্তা উমাশঙ্কর চৌবে যে এমন সুন্দর ছিপছিপে এবং ঋজু চেহারাটি ধরে রেখেছেন, তার পেছনে ব্যায়ামের মতো তাঁর পরিমিত আহারের অভ্যেসও দায়ী।

ছাদের কোনায় বেসিনে হাত ধুয়ে এসে চৌবেসাহেব বিনায়কের মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলেন। নিজের জন্যে পট থেকে এক কাপ সুগন্ধী মকাইবাড়ির চা ঢেলে নিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, তাহলে সিরিয়াসলি বলি। এইসব বাণমারা, বাটি চালানো, ঝাড়ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্র, ওঝাগিরি—এসব সম্বন্ধে আমার ছোটবেলা থেকেই প্রবল অবিশ্বাস এবং ঘৃণা কাজ করে। তার কারণ, যারা এসব করে, তারা শুধু যে কারও উপকার করতে পারে না তাই নয়; ক্ষতি করে। ওঝাগিরির কথাই ধরো। এরা আছে বলেই এখনো প্রত্যন্ত গ্রামদেশে সাপে-কাটা লোককে হাসপাতালে নিয়ে যায় না, কিংবা নিয়ে যেতে দেরি করে। যতক্ষণে ওঝা তার হাবিজাবি মন্ত্র পড়া থামায়, ততক্ষণে দেখা যায় অনেক দেরি হয়ে গেছে; আর কোনো অ্যান্টিভেনমেই কোনো কাজ হয় না। ফলে লোকটির প্রাণ যায়।’

তারপর চায়ের কাপে একটা বড় চুমুক দিয়ে চৌবেসাহেব বললেন, ‘কিন্তু ব্যাপারটা কী বলো দেখি। তোমাকেও তো যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ বলেই জানতাম। হঠাৎ বাণমারা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লে কেন?’

বিনায়ক বলল, ‘যুক্তি বুদ্ধি সব টলে যাচ্ছে, স্যার। এটা কিন্তু পুলিশ-কেস নয়; আমার পার্সোনাল ব্যাপারই ধরতে পারেন। আমার স্কুলের বন্ধু, প্রাণের বন্ধু চাঁদু, মানে চন্দ্রনাথ বর্মনকে বাণ মেরেছে তান্ত্রিক চণ্ডী হালদার। তারপর থেকেই চাঁদু দিনকে দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। পনেরো দিন হয়ে গেল বমি-পটি-জ্বর নিয়ে বিছানায় পড়ে আছে। কোনো ট্রিটমেন্টেই রেসপন্ড করছে না। আমি নিজে ব্যাপারটাকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফেল মেরে গেছি। এখন আপনিই ভরসা। ঘটনাটা যদি একটু মন দিয়ে শোনেন।’

‘বলো, শুনছি,’ চৌবেসাহেব বললেন।

‘চন্দ্রনাথ আমারই বয়সি, যেহেতু আমার ক্লাসমেট ছিল। মানে এই চল্লিশ-টল্লিশ হবে। অরিজিনাল বাড়ি এখানেই, কুচবিহারে। বর্মনরা কয়েক পুরুষের বড়লোক। নানারকমের ব্যবসা আছে ওদের। কাঠের ব্যবসা, রাইসমিল, সিমেন্ট... সবক’টার নাম আমিও জানি না। তবে চাঁদু নিজে গত তিন বছর ধরে জানপ্রাণ দিয়ে যে ব্যবসাটাকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করছে, করে ফেলেওছে বলা যায়, সেটা হচ্ছে জলদাপাড়া জঙ্গলের গায়েই একটা রিসর্ট। রাইনো লজ।

‘আমি গিয়েছি ওখানে। চাঁদু নেমন্তন্ন করেছিল বলেই গিয়েছি। অপূর্ব জায়গা, বুঝলেন স্যার। হাইওয়ে থেকে সামান্য ভেতরে ঢুকেই প্রায় পাঁচ একর জায়গার ওপরে রিসর্ট। তার ঠিক গায়েই জলদাপাড়া রিজার্ভ ফরেস্ট। কোথায় যে রিজার্ভ ফরেস্টের সীমানা শেষ হচ্ছে, আর কোথায় যে রিসর্টের এরিয়া শুরু হচ্ছে আপনি বুঝতেই পারবেন না। ওদিকেও যেমন গহন শালবন, এদিকেও সেরকমই গহন শালবন। আর সেই শালবনের ফাঁকে ফাঁকেই একটা করে ছবির মতো সুন্দর কটেজ। ওরকম যে-কোনো একটা কটেজের সামনের বারান্দায় বসেই আপনি দেখতে পাবেন ময়ূর, দেখতে পাবেন হরিণ। ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া আর পাহাড়ি ময়না এসে আপনাকে গান শুনিয়ে যাবে। কপাল ভালো থাকলে ওইখানে বসেই আপনি দেখতে পাবেন, জঙ্গল ভেঙে এগিয়ে চলেছে হাতির পাল।

‘সবকিছুই ভালো চলছিল। মাত্র দুটো ট্যুরিস্ট সিজনের মধ্যেই বিভিন্ন ট্র্যাভেল-ব্লগ, রাইনো লজের নামে প্রশংসাবাক্যে ভরে গেল। বহু ইউটিউবার স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে চাঁদুর লজের ভিডিও আপলোড করতে লাগল। মাস দুয়েক আগে যখন ওর সঙ্গে কথা হল, তখন চাঁদু খুব খুশি খুশি গলায় আমাকে বলেছিল, “বুকিং দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছি নারে বিনু। ভাবছি আরো অন্তত দুটো কটেজ বাড়িয়ে নেব।”

‘এইসব কাজের জন্যেই ও পার্মানেন্টলি কুচবিহারের বাড়ি ছেড়ে মাদারিহাটে ওর নিজের রিসর্টে গিয়েই উঠেছিল। অসুবিধে কিছুই ছিল না, কারণ, আপনাকে বলতে ভুলে গেছি, চাঁদু ব্যাচেলর। বাড়িতে দুই দাদা, দুই বৌদি, ভাইপো, ভাইঝি সবাই আছে। কিন্তু কারও সঙ্গেই ওর এমন ঘনিষ্ঠতা নেই যে, ও বাড়িতে না থাকলে ওকে খুব মিস করবে। কাজেই ও দিব্যি ওখানে নিজের কোয়ার্টারে রয়েছে।

‘মানে, দিব্যি ছিল। এখন আর নেই। এখন খুবই কষ্টে আছে। বাঁচে কিনা ঠিক নেই। আমি খবর পেয়ে গতকালই দেখতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম বিছানার সঙ্গে প্রায় মিশে গেছে।’

এতক্ষণে চৌবেসাহেব বিনায়ককে তাঁর কথায় প্রথমবার বাধা দিলেন। বললেন, ‘চিকিৎসা হয়নি? মাদারিহাট তো বড় শহর। আমিই ওখানকার অন্তত দু’জন এমন ফিজিশিয়ানকে চিনি যাঁদের চিকিৎসার ব্যাপারে খুবই সুনাম।’

‘হয়েছে স্যার। ডক্টর সুবীর ব্যানার্জি নিয়মিত ওকে দেখে যাচ্ছেন। ওষুধ-বিষুধও দিচ্ছেন, কিন্তু অসুখ কমছে না। অসুখ বলতে ওই যা বলছিলাম আপনাকে, মাঝেমাঝে পেটে তীব্র ব্যথা, মাঝেমাঝে বমি ও পটি। দু’মাসের মধ্যে মাথার সিকিভাগ চুল ঝরে গেছে। চোখদুটো ঢুকে গেছে কোটরে।

‘গতকাল ওকে যখন দেখতে গেলাম, ও আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে ধরে বলল, “বিনু, আমার এটা কোনো সাধারণ অসুখ নয়। বুঝতে পারছি, আর সেরে উঠব না। ওই পাগলাচণ্ডী আমাকে বাণ মেরেছে।” ’

‘পাগলাচণ্ডী কে?’

‘ওকে জিগ্যেস করে জানলাম, যে পৈতৃক জমির ওপরে ও রিসর্ট বানিয়েছে, ওর সেই জমির মধ্যেই জবরদখল করে আশ্রম বানিয়ে বসে গিয়েছিলেন চণ্ডীদাস হালদার নামে এক ধর্ম-ব্যবসায়ী। বাবাজিও বলতে পারেন। তিনি নাকি এইসব মারণ-উচাটন, সম্মোহন, বাণমারায় সিদ্ধহস্ত। বছর পাঁচেক চাঁদুর ওই জমির মধ্যে আশ্রম বানিয়ে তান্ত্রিকগিরি চালিয়েছিলেন এবং তার মধ্যেই মাদারিহাট আর তার আশেপাশে প্রচুর ভক্তও বানিয়ে ফেলেছিলেন।

‘বাবাজির মেজাজটা ছিল তান্ত্রিকসুলভ উগ্র। যখন তখন খেপে গিয়ে একে-ওকে হোমের কুণ্ড থেকে জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ তুলে মারতেন। অভিশাপ-টভিশাপও দিতেন। যত এসব করতেন, ততই বাবাজির জনপ্রিয়তা বাড়ত। কারণ, এইসবই তো একজন সিদ্ধপুরুষের লক্ষণ। তবে ওই মেজাজের জন্যেই আবার লোকজন আড়ালে তাঁকে পাগলাচণ্ডী বলে ডাকত।

‘চাঁদু এই বাবাজিকে প্রথমে ওর জমি থেকে ভদ্রভাবে উঠে যেতে বলেছিল। তাতে উনি চাঁদুকে অকথ্য গালাগাল দেন। পরেরদিন চাঁদু লোকাল থানার পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে বাবাজিকে তুলে দিয়েছিল। খারাপ ব্যবহার করেনি, বরং একটা ভ্যান ডেকে নিজের পয়সায় বাবাজির ঘরের কাঠের তক্তা, টিনের চাল, কালীমূর্তি এবং নরকরোটি সব গুছিয়ে তুলে দিয়ে বলেছিল, বাবাজি যেখানে যেতে চান সেখানেই যেন তাঁকে সসম্মানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

‘চণ্ডীদাস হালদার পুরো সময়টা জুড়েই চাঁদু এবং থানার অফিসারকে যা নয় তাই অভিশাপ দিচ্ছিলেন। ওরা কেউ তাতে গা করেনি। তবে একবারে গাড়ি ছাড়ার মুখে মাটি থেকে একমুঠো ধুলো তুলে নিয়ে, বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে চাঁদুর গায়ে ছুড়ে মারেন এবং বলে যান, “এই তোকে বাণ মেরে গেলুম। তিনমাস পেরোবে না, তুই মরবি।”

‘এখন চাঁদুর ধারণা, সেই বাণের এফেক্টেই ও মারা যাচ্ছে।’

চৌবে সাহেব বললেন, ‘ইন্ট্রেস্টিং, ভেরি ইন্ট্রেস্টিং। তা তোমার বন্ধু চন্দ্রনাথবাবুর মৃত্যুতে লাভবান হবেন এমন কেউ আছেন নাকি?’

‘তা তো আছেই। চাঁদুর যেহেতু বউ ছেলেমেয়ে নেই, তাই ওর ভালোমন্দ কিছু ঘটে গেলে ওর ভাগের সম্পত্তিটা পুরোটাই অন্য দুই ভাই পেয়ে যাবেন। কিন্তু সে-কথা কেন আসছে স্যার? ওর পরিবারের কেউ তো ওর ত্রিসীমানায় নেই। আছে শুধু ওর বহুদিনের সঙ্গী—পরিচারক বলুন, পাচক বলুন, প্রহরী বলুন—গগন সুব্বা। কুড়ি বছর আগে দার্জিলিং-এর রাস্তা থেকে অনাথ গগনকে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিল চাঁদু। সেই এখন অষ্টপ্রহর ওকে আগলে রেখেছে। ওকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াচ্ছে। নিজের হাতে ওষুধ খাওয়াচ্ছে।’

হাতের মুঠোয় থুতনি রেখে চৌবেসাহেব তাঁর চেনা ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ কী যেন চিন্তা করলেন। তারপর বিনায়ককে বললেন, ‘আমাকে কী করতে বলো?’

‘একবার রাইনো লজে যাবেন স্যার? মাদারিহাটে? আগামীকাল তো রবিবার। কাল সকালে চলুন না। দুপুরের খাওয়াটা ওখানে খেয়ে, সন্ধের আগেই ফিরে আসব। তার মধ্যে যদি আপনার কিছু চোখে পড়ে।’

“চৌবেসাহেব বললেন, ‘বেশ। যাব।’ তারপর হঠাৎ বললেন, ‘আচ্ছা বিনায়ক, চন্দ্রনাথবাবু কি ফোন ধরতে পারছেন? একবার ফোন করে জিগ্যেস করো তো, উনি রসুনের গন্ধ পাচ্ছেন কিনা?’

বিনায়কের চোখদুটো মনে হল সকেট থেকে খুলে বেরিয়ে আসবে। বলল, ‘র র রসুন! মানে গা গা গার্লিক?’

“হ্যাঁ রে বাবা, গার্লিক। জিগ্যেস করো না।’

বিনায়ক নিতান্ত অনিচ্ছা নিয়ে ফোন করল তার বন্ধুকে। কিছুক্ষণ কথা হল। তারপর ফোন কেটে দিয়ে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল উমাশঙ্কর চৌবের মুখের দিকে। যেন পাথরের মূর্তি!

চৌবেসাহেব অধৈর্য স্বরে বললেন, ‘কী হল? কী বললেন, চন্দ্রনাথবাবু?’

বিনায়ক উত্তর দিল, ‘আপনি কি উইজ়ার্ড? ব্ল্যাক ম্যাজিক জানেন?’

‘এইসব বলল?’

‘না, চাঁদু বলেনি। আমি জিগ্যেস করছি আপনাকে। না হলে জানলেন কেমন করে যে, ও যেদিন থেকে অসুস্থ হয়ে বিছানা নিয়েছে, সেদিন থেকেই সমস্ত খাবারে, এমনকী জলে অবধি রসুনের গন্ধ পাচ্ছে আর তার জন্যে দিনরাত সুব্বাকে যা নয় তাই বলে গালাগাল করছে।’

চৌবেসাহেব মুচকি হেসে বললেন, ‘যাক। আন্দাজে একটা ঢিল ছুড়েছিলাম। সেটা টার্গেটে লেগে গেল দেখছি। ব্যাপারটা কী জানো বিনায়ক? আর্সেনিকের বেশিরভাগ যৌগে রসুনের গন্ধ থাকে। তোমার বন্ধুর শরীরে কেউ নিয়মিত আর্সেনিক অর্থাৎ সেঁকোবিষ ঢুকিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু ওর মুখে রসুনের স্বাদ লেগে আছে, তাই মনে হচ্ছে খাদ্য বা পানীয়ের সঙ্গেই ঢোকাচ্ছে।’

বিনায়ক বলল, ‘কিন্তু সেটা আপনি বুঝলেন কেমন করে?’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘খুনের মতো দেখতে লাগবে না অথচ খুনই করা হবে, এর জন্যে আদর্শ ইনস্ট্রুমেন্ট হচ্ছে আর্সেনিক। কারণ অন্যান্য বিষ যেমন একেবারে অনেকটা খাইয়ে মারা হয়, আর্সেনিকের ক্ষেত্রে সেটা না করলেও চলে। অল্প অল্প করে নিয়মিত আর্সেনিক দিলেও সেটা শরীরে জমতে থাকবে। তারপর একসময় কাজের কাজটা করে দেবে। দেখতে লাগবে ঠিক চণ্ডীদাসের বাণমারার মতো। তাই না?

‘তার ওপরে আর্সেনিক দিয়ে স্লো-পয়জনিং করা হলে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়—জ্বর, পেটেব্যথা, বমি, পটি—সেগুলো তোমার বন্ধুর রোগের লক্ষণের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ডাক্তারবাবু যদি জানতেন যে, একজন বদমাশ লোক চন্দ্রনাথবাবুকে অলরেডি থ্রেট করে গেছে, তাহলে উনিও হয়তো পয়জনিং-এর সম্ভাবনার কথা ভাবতেন। কিন্তু যেহেতু জানতেন না, তাই ওঁকে দোষ দেওয়া যায় না। আমি তোমার কাছ থেকে জানলাম, তাই সম্ভাবনাটা আমার মাথায় এল।’

বিনায়ক বলল, ‘কিন্তু স্যার, কে বিষ দেবে? কীভাবে দেবে? আপনি সিচুয়েশনটা একবার ভাবুন। জঙ্গলের মধ্যে মূল বাড়ির থেকে অনেকটা দূরে একটা কটেজে শুয়ে আছে চাঁদু। সেখানে সুব্বার চোখ এড়িয়ে কারও ঢোকার উপায় নেই। আমি গতকালই দেখে এসেছি, একটা ট্যাবলেট খাওয়াতে হলে সেটাও খাওয়াচ্ছে সুব্বা। রান্নাবান্না, তাও সুব্বা করছে। শাকসবজি ফলমূল সব ওই-ই কিনে আনছে। ওষুধও। বিষ দিতে গেলে একমাত্র সুব্বাই দিতে পারে। কিন্তু সুব্বা কেন তা করবে? ওর আনুগত্য আর ভালোবাসার কথা ছেড়ে দিলাম; চাঁদুকে মেরে ওর লাভ কী হবে? চাঁদু নিশ্চয় মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে সুব্বার নামে সম্পত্তি উইল করে দিয়ে যায়নি।’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘এগুলো তো এতদূর থেকে বলা যাবে না, বিনায়ক। কাল মাদারিহাট গিয়ে যদি বোঝা যায় বিষটা কীভাবে ওনার শরীরে ঢুকছে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে এটাও বোঝা যাবে, কে ঢোকাচ্ছে।’

বিনায়ক চেয়ারের পিঠে ঝুলিয়ে রাখা জ্যাকেটটা গায়ে চড়াতে চড়াতে বলল, ‘ওকে স্যার! তাহলে কাল সকাল আটটায় চলে আসছি।’

বিনায়ক চলেই যাচ্ছিল। ওকে ডেকে ফেরালেন উমাশঙ্কর চৌবে। বললেন, ‘শোনো। ডক্টর সুবীর ব্যানার্জিকে ফোনে ধরো। নিজের পুলিশ পরিচয়টা দিয়েই ধরবে। বলো, এখনই যেন চন্দ্রনাথের ইউরিন স্যাম্পেল নিয়ে কোনো বড় প্যাথোলজিকাল ক্লিনিকে পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা করান। আমাদের সন্দেহের কথাটাও বলবে। প্যাথোলজিকাল ক্লিনিক যেন এই কেসটাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে, সেটাও তুমি এনশিওর করবে। মোট কথা, কাল আমরা ওখানে পৌঁছে যেন ইউরিন রিপোর্ট হাতে পাই।’

‘ইউরিন?’

‘হ্যাঁ, আর্সেনিকের ট্রেস ব্লাডে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় চুলে, দাঁতে, হাড়ে। আর প্রস্রাবে।’

মাদারিহাট অবধি যেতে হয়নি। বিনায়ক আর চৌবেসাহেব যখন মাঝরাস্তায়, তখনই ওখানকার প্যাথোলজিকাল ক্লিনিক থেকে বিনায়কের মেইল আইডিতে চন্দ্রনাথের ইউরিন কালচার রিপোর্ট পৌঁছে গিয়েছিল, যাতে দেখা যাচ্ছিল, আর্সেনিকের পরিমাণ খুব বেশি। যাকে ইংরিজিতে বলা হয় ‘ফ্যাটাল ডোজ়’, অর্থাৎ প্রাণঘাতী মাত্রা, তার কাছাকাছি।

রাইনো লজের গেটের কাছে ওদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন ডক্টর সুবীর ব্যানার্জি। আসবার পথেই তাঁকে ফোন করেছিল বিনায়ক। ডক্টর ব্যানার্জির বয়স বেশি নয়, ত্রিশের কাছাকাছি হবে। স্পষ্টতই তিনি খুব অপ্রস্তুত বোধ করছিলেন। বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছিলেন। হাতে হাত ঘষছিলেন। বোঝাই যায়, আর্সেনিক পয়জনিং-এর ব্যাপারটা যে তাঁর মাথায় আসেনি, এর জন্যে নিজেকে অপরাধী মনে করছেন। চৌবেসাহেবই তাঁকে বোঝালেন, তাঁর এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই। ডাক্তারবাবুকে নিয়েই বিনায়কের গাড়ি রিসর্টের কম্পাউন্ডে প্রবেশ করল এবং অন্যান্য সমস্ত কটেজকে পাশ কাটিয়ে সোজা চলে গেল মালিকের লিভিং কোয়ার্টারের সামনে।

শুকনো শালপাতার ওপরে গাড়ির চাকার আওয়াজ পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সদাসতর্ক সেই নেপালি যুবক—গগন সুব্বা। ওদের তিনজনকে মহা সমাদরে সেই ঘরটায় নিয়ে গেল, যেখানে চন্দ্রনাথবাবু শুয়ে ছিলেন।

শুধু শারীরিকভাবে নয়, চন্দ্রনাথবাবুকে দেখা গেল মানসিক দিক দিয়েও বিধ্বস্ত। তিনি বিশ্বাস করেই বসে ছিলেন, তাঁর এই অসুখ একটা অভিশাপ ছাড়া কিছু নয়, এবং সেইজন্যেই এর কোনো চিকিৎসা নেই। তবে চৌবেসাহেব এবং ডক্টর ব্যানার্জি মিলে তাঁকে ধীরে ধীরে আসল কারণটা বুঝিয়ে বলার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল তাঁর অসুস্থতা অর্ধেক কমে গেল। তিনি কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসলেন। বললেন, ‘কিন্তু কে কীভাবে আমাকে আর্সেনিক খাওয়াচ্ছে? প্লিজ, এ কথা বলবেন না যে সুব্বা এই কাজ করছে। ওটা অসম্ভব।’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘না চন্দ্রনাথবাবু, আমরা সে-কথা বলছি না। সত্যি কথা বলতে কী, খাবার আর জলের কথাটা আমরা হিসেব থেকে বাদই দিয়ে দিয়েছি, যেহেতু সুব্বা নিজের হাতে বাজার করে রান্না করে আপনাকে খাওয়ায়। জলও আপনারা এই রিসর্টের যে কমন জলের সোর্স সেখান থেকেই খান। আপনি জল খেয়ে অসুস্থ হলে আপনার স্টাফ আর বোর্ডাররাও সুস্থ থাকতেন না।

‘আমাদের সন্দেহের তির একজনের দিকেই। সে হচ্ছে ওই বুজরুক তান্ত্রিক... কী যেন নাম, চণ্ডী না কী। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এখান থেকে আপনি তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর সে পুরুলিয়ার একটা শহরে গিয়ে ব্যবসা ফেঁদেছে। এদিকে আর পা দেয়নি।

‘তাতে অবশ্য কিছু আটকায় না। মাদারিহাট অঞ্চলে চণ্ডীর অনেক ভক্ত ছিল। তাদেরই কেউ নিশ্চয়ই বিষ দেওয়ার কাজটা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে!’

চন্দ্রনাথবাবুর এই কোয়ার্টারে মাত্র তিনটে ঘর। একটা বসার ঘর। তার দু’দিকে দুটো শোয়ার ঘর। শোয়ার ঘরগুলোর একটায় গগন সুব্বা থাকে, অন্যটায় থাকেন চন্দ্রনাথবাবু নিজে। দুটো ঘরেই অ্যাটাচড বাথ আছে। এছাড়া পেছনের দিকে আছে একটা ছোট স্টোর রুম আর কিচেন। চৌবেসাহেব আর বিনায়ক চন্দ্রনাথবাবুর অনুমতি নিয়ে সবক’টা ঘরই ঘুরে দেখলেন। সন্দেহজনক কিছুই পেলেন না।

বিনায়ক প্রথম থেকেই বলছিল, ‘দেখবেন স্যার, ওই ওষুধগুলোর মধ্যেই আর্সেনিক পাবেন, ওই যে ওষুধগুলো চাঁদু প্রতিদিন খায়।’ চৌবেসাহেব ওকে বারবার বলছিলেন, ‘এভাবে আত্মহত্যা কে করবে বিনায়ক? কোন ওষুধের দোকানদার?’ দেখা গেল, চৌবেসাহেবের কথাই ঠিক হল। সবক’টা ওষুধের বোতল বা স্ট্রিপের ওপরে কিউ-আর কোড ছিল। স্ক্যান করে দেখা গেল, কোনো ওষুধই নকল নয়, সব অরিজিনাল কোম্পানির ব্যাচ নম্বরের প্রোডাক্ট। এবং প্রতিটি বোতলের সিল যে সুব্বা নিজের হাতে খুলেছিল সে ব্যাপারটা সুব্বাই শপথ করে বলল।

এই প্রথম কোনো রহস্যের সামনে চৌবেসাহেবকেও অসহায় লাগছিল।

জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একটা তিন-কামরার বাড়ি। সেখানে বাসিন্দা বলতে শুধু একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ আর তাঁর অনুগত সঙ্গী। আর তৃতীয় কেউ নেই। বাইরে থেকে ওষুধ ছাড়া আর কিছুই সেই বাড়িতে ঢুকছে না; এবং সেই ওষুধগুলোও দেখা যাচ্ছে জেনুইন। অথচ প্রায় দু’মাস ধরে ওই মানুষটির শরীরে আর্সেনিক ঢুকছে। কীভাবে? কার হাতে?

প্রায় আধঘণ্টা ধরে ছটফট করে বেড়ানোর পর চৌবেসাহেব আক্ষেপের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন, ‘নাঃ। এইভাবে হবে না। নতুন করে ভাবতে হবে। সেটা এখানে বসে হবে না।’

বিনায়ক পাশ থেকে নিচু গলায় বলল, ‘বাগান করতে করতে ভাববেন?’

‘ঠিক ধরেছ। চলো, বেরোই।’

তারপর চন্দ্রনাথবাবুর হাতের ওপর নিজের হাত রেখে উমাশঙ্কর চৌবে বললেন, ‘চলি চন্দ্রনাথবাবু। এবার ডক্টর ব্যানার্জি আপনার যে-চিকিৎসা করবেন, তাতে আপনি কিছুদিনের মধ্যেই সেরে উঠবেন। শরীর থেকে সমস্ত আর্সেনিক বেরিয়ে যাবে।’

‘আর নতুন যেটুকু ঢুকবে?’ তেতো গলায় প্রশ্ন করলেন চন্দ্রনাথ বর্মন। চৌবেসাহেব উত্তর দিতে পারলেন না। তবে হঠাৎই বলে উঠলেন, ‘আপনার তো বেশ জ্বর আছে মনে হচ্ছে। হাতটা খুব গরম।’

ডক্টর সুবীর ব্যানার্জিও যাবেন বলে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘জ্বর! আমি তো সুব্বাকে দিনে তিনবার টেম্পারেচার নিয়ে চার্ট রাখতে বলেছিলাম। চার্টে তো স্টেডি নাইনটি-এইট পয়েন্ট ফাইভ দেখাচ্ছে। কই, দেখি,’ বলে উনি এগিয়ে এসে চন্দ্রনাথবাবুর কপালে একবার হাত দিয়ে পালসটা ধরলেন। ভুরু দুটো কুঁচকে গেল। বললেন, ‘প্রায় একশো এক। এটা কীরকম হল সুব্বা?’

সুব্বা বলল, ‘তাহলে কি থার্মোমিটারে গন্ডগোল আছে স্যার?’

‘থার্মোমিটার!’ এমন স্বরেই চৌবেসাহেব কথাটা বললেন যে বাকি চারজন চুপ করে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চৌবেসাহেব কিন্তু ওদের দেখতেই পাচ্ছিলেন না। তিনি নিজের মনেই বলে যাচ্ছিলেন, ‘তাই তো! এই তো একটা জিনিস, খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না। খাদ্য নয়, পানীয় নয়, অথচ চন্দ্রনাথবাবু রোজ তিনবার করে জিনিসটাকে মুখে পুরছেন আর সেইসঙ্গে... বিনায়ক, ওটাকে সাবধানে কালেক্ট করো তো। হ্যাঁ হ্যাঁ, থার্মোমিটারটার কথাই বলছি। ইট মাস্ট গো থ্রু এ ফরেন্সিক এগজামিনেশন।’

দু’দিন বাদে বিনায়ক থানা থেকে চৌবেসাহেবকে ফোন করল। ‘স্যার, ফরেন্সিক রিপোর্ট পেয়েছি। আপনার অনুমানই ঠিক। থার্মোমিটারটায় অনেক রকমের কারিকুরি করে রেখেছিল ওরা। অ্যাকচুয়ালি, নীচে মার্কারির চেম্বারটা ছিল আর্সেনিক সল্ট দিয়ে ঠাসা। আর কাচটার গায়ে ছিল সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ছিদ্র।’

‘দেখেছ? তার মানে চাঁদুবাবু দিনে তিনবার করে মুখে থার্মোমিটার নিয়েছেন আর তিনবার করে পেটে আর্সেনিক ঢুকেছে, যদিও খুব অল্প পরিমাণে। কিন্তু এই বিষটা তো শরীর থেকে বেরোয় না। অল্প অল্প করেই অনেকটা জমে যায়। তা, থার্মোমিটারের ওই কারিকুরিটা করেছিল কে? সেটা জানা গেল?’

‘গেল বইকি স্যার। ডুয়ার্স ফার্মেসির মালিক, বলাই মুখার্জি। তান্ত্রিক চণ্ডীদাস হালদারের অন্ধভক্ত। কারণ, চণ্ডী একবার যজ্ঞ করে ওকে একটা বড় মামলা জিতিয়ে দিয়েছিলেন। আর তাছাড়া রাইনো রিসর্টের ওই জমিটা নাকি বলাই মুখুজ্জে অনেকবার কিনতে চেয়েছিল—শুধু গুরুদেবের জন্যে নয়—নিজে একটা গোডাউন বানাবে বলেও। চাঁদুকে রীতিমতো থ্রেট করেছিল লোকটা। কাজেই চাঁদুকে খুন করার ব্যাপারে ওর উৎসাহই ছিল।

‘সুযোগটা ও পেয়ে গেছিল যখন মাদারিহাটে থাকতে গিয়ে একবার চাঁদুর হালকা জ্বর হল। তখনই ও ওর সেই ঘাতক থার্মোমিটারটি গগন সুব্বাকে গছিয়ে দিয়েছিল। পুরো প্ল্যানটা করেছিলেন অবশ্য চণ্ডীদাস হালদার নিজে। সেটা উনি স্বীকার করেছেন।’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘লোকটাকে অ্যারেস্ট করেছ?’

‘করেছি স্যার। সেদিনই। চণ্ডীদাসকেও আনাচ্ছি। গুরুশিষ্য আপাতত একই সেলে থাকবে।’

‘বেশ বেশ। আচ্ছা বিনায়ক, একটা কথা বলো তো!’

‘বলুন স্যার।’

‘বাণ মারা সম্বন্ধে তোমার ধারণা কী?’

বিনায়ক এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, ‘অত্যন্ত উচ্চ ধারণা।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%