হাতের মুঠোয় মৃত্যু

সৈকত মুখোপাধ্যায়

ডিসেম্বর মাসের বাইশ তারিখ। পাহাড়তলির শহর কুচবিহারের বাতাসে তাই ভালোরকম শীতের কামড় টের পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো আরেকটু বেলা বাড়লে, রোদ উঠলে, ঠান্ডা একটু কমবে। তবে এখনো তার দেরি আছে। এই তো সবে সকাল সাতটা বাজল।

চৌবেসাহেবের অবশ্য আর শীত করছিল না। সবেমাত্র তিনি সাগরদিঘির পাড়ের বাঁধানো রাস্তা ধরে দিঘিটার চারপাশে পাঁচবার চক্কর দিয়েছেন।

দিঘির তীরে একটা সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে গায়ের উইন্ড-চিটারটা খুলতে খুলতেই চৌবেসাহেব লক্ষ্য করলেন, কোর্টের দিক থেকে একটা জিপ ধীরগতিতে এগিয়ে আসছে। চেনা নম্বর। চৌবেসাহেবের মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি হাত নাড়লেন। জিপটা রেলিংয়ের ওপাশে্র রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল। ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে নেমে এল বিনায়ক। বিনায়ক বসু—চৌবেসাহেবের ভাবশিষ্য। আলিপুরদুয়ার থানার অফিসার-ইন-চার্জ।

চৌবেসাহেবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিনায়ক স্যালুট করে বলল, ‘গুডমর্নিং স্যার।’

‘গুডমর্নিং। এই সাতসকালে কোথায় চললে?’

বিনায়ক বুঝতে পারল চৌবেসাহেব তার লেগ-পুল করছেন। উনি খুব ভালো করেই জানেন, কুচবিহারে বিনায়ক আসে শুধুমাত্র ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্যে। তবু সে চৌবেসাহেবের ইয়ার্কি গায়ে না মেখে বলল, ‘একটা পিকিউলিয়ার কেসে আটকে গেছি, স্যার। আদৌ এটা কোনো ক্রাইম কিনা তাও নিশ্চিত নই। তবু কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে। আপনি একটু শুনবেন পুরো ঘটনাটা?’

বিনায়ক আর কিছু বলার আগেই চৌবেসাহেব উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘চলো। হাঁটতে হাঁটতে শুনি।’

‘হেঁটে ফিরবেন, স্যার? জিপটা আছে...’ কিন্তু কিন্তু করে বলল বিনায়ক।

‘নিতান্ত প্রয়োজন না পড়লে যে, আমি সরকারি গাড়িতে চাপি না সে তো তুমি জানো, বিনায়ক। ড্রাইভারকে বলো আমার বাড়িতে গিয়ে ওয়েট করতে।’

চৌবেসাহেবের ছাদের বাগানে গার্ডেন চেয়ার পেতে ওঁরা দু’জন বসেছিলেন। সামনের টেবিলে জলখাবারের প্লেট আর চায়ের কাপ। একটুকরো ফ্রেঞ্চ ওমলেট মুখে পুরে বিনায়ক বলল, ‘কপিল সিং নামটা কি আপনার চেনা লাগছে? ভোলারডাবড়ির কপিল সিং?’

চৌবেসাহেব একটু চিন্তা করে উত্তর দিলেন, ‘পড়ছে। প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা। আমি তখন শিলিগুড়ির স্পেশাল সুপারিন্টেডেন্ট। একবার চোরাই কাঠের কেসে ধরেছিলাম লোকটাকে। তা, হঠাৎ তার কথা কেন? কী করছে সে এখন?’

বিনায়ক তেতো গলায় বলল, ‘এখন সে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে স্যার। অনেক টাকার মালিক। ভিআইপি-দের সঙ্গে ওঠাবসা।

‘এর আগে কপিলের দু’জন পার্টনারের আন-ন্যাচরাল ডেথ হয়েছিল। একজন মারা গিয়েছিলেন দু’হাজার তেরোয়, রেলে কাটা পড়ে। আর একজন দু’হাজার উনিশে, হাই ভোল্টেজ লাইনের ছেঁড়া তারে পা জড়িয়ে। খোঁজ নিয়ে দেখেছিলাম, দুটো মৃত্যুতেই কপিল আর্থিক দিক থেকে বিশাল লাভবান হয়েছিল।

‘আমি নিশ্চিত, দু’জনকেই আসলে কপিল সিংই খুন করেছিল। নিজের হাতে না করুক, লোক লাগিয়ে একজনকে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঠেলে ফেলে দেওয়া কিংবা চলার পথে হাই-টেনশন লাইনের খোলা তার বিছিয়ে রাখা ওর মতো মানুষের পক্ষে কঠিন কিছু নয়। কিন্তু প্রমাণ করতে পারিনি।’

‘আচ্ছা! তারপর?’ আগ্রহ দেখে বোঝা গেল, জাত-গোয়েন্দা চৌবেসাহেব রহস্যের গন্ধ পেয়েছেন।

বিনায়ক বলল, ‘তিন নম্বর মৃত্যুটা ঘটেছে গত পরশু রাতে। মার্ডার নয়, সুইসাইড নয়। এমনকী আগের দু’বারের মতো সাজানো দুর্ঘটনাও নয়। প্লেন অ্যান্ড সিম্পল হার্ট-অ্যাটাক। কিন্তু এবারেও কপিলের লাভের অঙ্ক অনেক। আর তার চেয়েও বড় কথা, ভদ্রলোক মারা গেছেন কপিলের নিজের বাড়িতে, ওঁর সঙ্গে ডিনার করতে করতে। আমি স্যার ছাড়ব না। সে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে যাই বলুক।’

কিছুক্ষণ হাতের মুঠোর ওপরে চিবুক রেখে চুপ করে কী যেন ভাবলেন চৌবেসাহেব। তারপর বললেন, ‘এমনিতে আমি তোমাকে শেখাই, কোনো বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে তদন্ত শুরু না করতে। কিন্তু এক্ষেত্রে তোমাকে দোষ দিতে পারছি না। একইধরনের অ্যাক্সিডেন্ট যখন বারবার ঘটে, তখন সেটা আর অ্যাক্সিডেন্ট থাকে না। ইনসিডেন্ট হয়ে যায়। কে মারা গেছেন? আবার কোনো পার্টনার?’

বিনায়ক চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘উঁহু। মারা গেছেন চন্দ্রনাথ ভাদুড়ী। শিলিগুড়ির বনেদি ফ্যামিলির লোক। বেশ কয়েকটা টি-গার্ডেন আর রাইস-মিলের মালিক। পয়সার কথাই যদি ধরেন, তাহলে চন্দ্রনাথ ভাদুড়ী কপিল সিংকে বলে বলে পাঁচ গোল দেবেন। স্যরি...বলা উচিত—দিতে পারতেন। পরশু রাতেই তো ভদ্রলোক পাস্ট টেন্স হয়ে গেছেন।

‘পরশু রাত আটটা নাগাদ চন্দ্রনাথবাবু নিজের গাড়িতে ভোলারডাবড়ি গিয়েছিলেন; ওখানেই এখন কপিলের প্লাইউডের কারখানা আর কারখানার কাছেই বাড়ি। চন্দ্রনাথবাবুর সঙ্গে ছিল খালি ওঁর ড্রাইভার।’

চৌবেসাহেব ছোট্ট করে জানতে চাইলেন, ‘কেন গিয়েছিলেন? উদ্দেশ্য কী?’

বিনায়ক বলল, ‘কপিল সিং বলছে চন্দ্রনাথবাবু ওকে শিলিগুড়ির কাছেই ষোলো বিঘের একটা জমি বিক্রি করতে চলেছিলেন। সেই ব্যাপারে সইসাবুদ করবার জন্যেই নাকি উনি কপিলের বাড়ি গিয়েছিলেন। কথাটা মনে হয় সত্যি, কারণ ওরকম একটা সেল-ডিড কপিল আমাদের দেখিয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ডিডে যে জমির কথা আছে, সেটার মালিক চন্দ্রনাথবাবুই ছিলেন বটে। এবং তার চেয়েও বড় কথা, ওই জমি বিক্রির ডিডে পরশুর তারিখেই চন্দ্রনাথবাবুর সই রয়েছে। সই রয়েছে কপিলেরও।

‘যেটা অবিশ্বাস্য, সেটা হচ্ছে জমিটার দাম। শিলিগুড়ির কাছে ষোলো বিঘে জমি যে দামে চন্দ্রনাথবাবু কপিলকে বিক্রি করতে চলেছিলেন, সেই দামে ওখানে একটা পানবিড়ির দোকানও কেনা যায় না। বুঝতেই পারছি, ইনকাম-ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার জন্যে দু’জনে সাট করে দাম কম দেখিয়েছিল। আসল দাম দশ টাকা হলে ডিডে দেখিয়েছিল চার টাকা। বাকি ছ’টাকা নিশ্চয়ই কপিল ক্যাশে চন্দ্রনাথবাবুকে দিত। কিন্তু সেটা আর দিতে হল না, কারণ মোক্ষম সময়ে চন্দ্রনাথবাবু সব দেনাপাওনার ঊর্ধ্বে চলে গেলেন। এই যে ডিডে সই করার পরেই উনি মারা গেলেন, এইজন্যেই আমি স্যার নিশ্চিত যে, কপিল ওঁকে খুন করেছে। কিন্তু আপনাকে তো বললাম, পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট বলছে খুন নয়, হার্ট-অ্যাটাক।’

‘রিপোর্ট কবে পেয়েছ?’

‘গতকাল দুপুরে পোস্টমর্টেম হয়েছে। আমি গতকাল রাতেই রিপোর্ট পেয়ে গেছি। ভিসেরায় বিষের চিহ্ন নেই, বড় কোনো আঘাত নেই। অন্যদিকে চন্দ্রনাথবাবুর বয়স হয়েছিল পঁয়ষট্টি। মোটাসোটা মানুষ। আর্টারিতে সামান্য ব্লকেজ ছিল। হাইপারটেনশনও ছিল।’

চৌবেসাহেব একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘বাবা! এত সব জানলে কেমন করে?’

‘কাল রাতেই চন্দ্রনাথবাবুর হাউস-ফিজিশিয়ান ডক্টর অনিমেষ মণ্ডলকে ফোন করেছিলাম।’

‘পারোও বটে। আর কী বললেন ডক্টর মণ্ডল?’

‘উনি বললেন, যখন-তখন স্ট্রোক হওয়ার মতো খারাপ অবস্থা ছিল না ঠিকই; মেডিসিনের প্রোটেকশনও ছিল। তবে খুব টেনশন, রাগ কিংবা উত্তেজনা থেকে এরকম মানুষদের হার্ট-অ্যাটাক হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।’

চৌবেসাহেব বিনায়কের চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘তুমি কী ভাবছ সেটা আস্তে আস্তে ক্লিয়ার হচ্ছে আমার কাছে। যদি কপিল সিং কোনোভাবে চন্দ্রনাথবাবুকে প্রচণ্ড টেনশন কিংবা আতঙ্কের মধ্যে ফেলতে পারে তাহলে...কিন্তু তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে বিনায়ক? একটা কথা মনে রাখবে, চন্দ্রনাথবাবুর মতো ব্যবসায়ীরা কিন্তু অত চট করে উত্তেজিত কিংবা ক্রুদ্ধ কিংবা আতঙ্কিত হন না।’

বিনায়ক বলল, ‘সেই জন্যেই তো স্যার আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। একবার চলুন না আমার সঙ্গে ভোলারডাবরি। যেখানে ঘটনাটা ঘটেছে সেই জায়গাটা দেখবেন। তার থেকে যদি কিছু বেরিয়ে আসে। মানে...ধরুন যদি দেখা যায় যে, কপিল এমন কিছু করেছিল, যাতে চন্দ্রনাথবাবুর ভয়ের চোটে হার্টবিট থেমে যায়...’

চৌবেসাহেব মুচকি হেসে বললেন, ‘কী বলতে চাও? কপিল ওঁকে ভূতের মুখোশ পরে ভয় দেখিয়েছিল কি না সেটা আমাকে খুঁজে বের করতে হবে?’

বিনায়ক দুঃখিতমুখে বলল, ‘কবে আপনি আমার কথাগুলোকে একটু সিরিয়াসলি নেবেন, স্যার?’

চৌবেসাহেব ওর পিঠে চাপড় মেরে বললেন, ‘চা-টা শেষ করো। আমি তৈরি হয়ে আসছি। এখনই বেরোব।’

সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ ওরা দু’জন ভোলারডাবড়ি পৌঁছে গেলেন। বহুদিন বাদে আলিপুরদুয়ারের উপকণ্ঠে এই জায়গাটায় এলেন উমাশঙ্কর চৌবে। একসময়ের শান্ত গঞ্জটা এখন ভিড়াক্রান্ত শহর। তবে উত্তরদিকে আর কিছুটা যাওয়ার পরেই বাড়িঘর কমে এল। রাস্তার দু’পাশে দেখা দিল কদম আর গামার গাছের প্ল্যান্টেশন। সেরকমই এক প্ল্যান্টেশনের আড়ালে দাঁড়িয়েছিল কপিল সিংয়ের বাড়ি।

উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা অনেকখানি জমির মাঝখানে চারতলা বাড়ি। থানার জিপ দেখে দারোয়ান তাড়াহুড়ো করে লোহার গেট খুলে সেলাম দিয়ে সরে দাঁড়াল। বিনায়ক জিপ নিয়ে সোজ়া চলে গেল বাড়িটার সদর দরজার সামনে।

বিনায়ক আর চৌবেসাহেব গাড়ির দরজা খুলে জমিতে পা দিতে না দিতেই বাড়ির ভিতর থেকে হন্তদন্ত হয়ে এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। বিনায়ক আলাপ করিয়ে দিল, ‘এই যে স্যার। ইনিই কপিল সিং।’

চৌবেসাহেব একপলকেই কপিল সিংকে ভালো করে মেপে নিলেন। পঁচিশ বছরেও লোকটা খুব একটা বদলায়নি।

কপিলের চেহারাটা ছোটখাটো, কিন্তু বেশ মাস্ক্যুলার। যাকে বলে ‘ব্যায়ামপুষ্ট’। মোটামুটি ফরসা গায়ের রঙ। পরিষ্কার করে কামানো মুখে হালকা পক্সের দাগ। কাঁচাপাকা চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো। মালকোঁচা দিয়ে একটা সাদা ধুতি পরেছিল আর পিরানের ওপরে জড়িয়ে রেখেছিল নস্যিরঙের উলেন চাদর।

‘আসুন স্যার আসুন। গরিবখানায় পা রাখুন স্যার।’ কপিল এমন বিগলিত ভাবে হাসছিল যে, মনে হচ্ছিল চৌবেসাহেব যেন ওর কতদিনের গুরুঠাকুর। তিনি ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘অনেক বছর আগে একবার আমাদের দেখা হয়েছিল, মনে আছে?’

‘মনে আছে স্যার, মনে আছে। তখন কমবয়সের জোশে কিছু গলতি করে ফেলেছিলাম। আপনি আমাকে শুধরে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে একদম সোজা রাস্তায় হাঁটছি স্যার। বিশ্বাস করুন।’

বিনায়ক বসু হাড়েমজ্জায় বাস্তববাদী পুলিশ-অফিসার। কথার মারপ্যাঁচে সময় নষ্ট করা ওর একেবারেই পোষায় না। গম্ভীরগলায় বলল, ‘মিস্টার সিং। চৌবেসাহেবকে নিয়ে একবার ওই ছাদটায় যাব, যেখানে পরশু চন্দ্রনাথবাবুকে নিয়ে ডিনার সারতে বসেছিলেন।’

‘নিশ্চয়ই স্যার। এ তো আপনাদেরই বাড়ি। যেখানে খুশি যাবেন। আর আপনাকে তো আগেই বলেছি স্যার, বাড়িতে এই-মুহূর্তে আমি, আমার বেটা কাঞ্চন আর আমার দিদি ছাড়া কেউ নেই। এত বড় বাড়ি ফাঁকাই পড়ে আছে। কাজেই যে-ঘরে ইচ্ছে আপনারা ঢুকে পড়তে পারেন। এই তো কাঞ্চন এসে গেছে। যা তো বেটা। সাহেবদের একটু মকান-টা ঘুরিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আয়। লিফট ধরে উঠবি।’

কাঞ্চন সিংয়ের বয়স কুড়ি-বাইশ বছরের বেশি হবে না। চেহারা বাপের বিপরীত। ছ’ফুটের ওপর হাইট। ঘাড় অবধি লুটিয়ে পড়া বাবরি চুল, পাকানো মোচ। গাঢ় সবুজ সাফারিতে অবিকল একটি মহিষাসুরের মতো দেখতে লাগছিল। চোখদুটোতে বাপের মতই ধূর্ত দৃষ্টি। চৌবেসাহেব ফিসফিস করে বিনায়ককে বললেন, ‘কপিল ভাগ্যবান। খুনখারাপির জন্যে বাইরে থেকে লোক ভাড়া করতে হবে না।’

বিনায়কও নিচুগলায় উত্তর দিল, ‘এগজ্যাক্টলি স্যার। ছেলেটার নামে এর মধ্যেই কটা গুন্ডামির কেস উঠে গেছে।’

লিফট ধরে ওপরে উঠতে উঠতে চৌবেসাহেব খুব স্নেহভরা গলায় কাঞ্চনকে জিগ্যেস করলেন, ‘বাড়ির বাকি লোকজন সব কোথায় বাবা?’

কাঞ্চন বলল, ‘ছটপুজোর সময় সবাই দেশে গেছে। এখনো ফেরেনি। বাড়িতে শুধু আমি, বাবা আর আমার পিসি আছেন।’

লিফটটা ওদের চারতলার বারান্দার একপ্রান্তে নামিয়ে দিল। তারপর চৌবেসাহেব আর বিনায়ক কাঞ্চনকে অনুসরণ করে বারান্দা ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। বারান্দার গায়ে পর পর চারটে ঘর। সবকটারই দরজায় তালা। চারনম্বর ঘরের পরেই বারান্দাটা একটা খোলা ছাদে গিয়ে শেষ হয়েছে। ওখানেও একটা ঘর বানানোই যেত, কিন্তু বানানো হয়নি।

‘এখানেই?’ সংক্ষেপে জিগ্যেস করলেন চৌবেসাহেব।

‘হ্যাঁ স্যার।’ বলল বিনায়ক।

কাঞ্চন বলল, ‘এখানেই পরশু পাপাজি আর ভাদুড়ী আঙ্কল খেতে বসেছিলেন। জানকীপিসির হাতের ফুলকা আর গোবি-কড়াইশুঁটির সবজি খুব পছন্দ করতেন আঙ্কল।’

‘তুমি কী করছিলে?’ চৌবেসাহেব জিগ্যেস করলেন।

‘আমি সার্ভ করছিলাম। আগে থেকেই একতলার পাকশাল থেকে ক্যাসারোলে সব খাবার নিয়ে এসেছিলাম। ছাদে আলো আছে। গার্ডেন-আমব্রেলাও খাটিয়ে দিয়েছিলাম। এই দেখুন, সেই ছবি।’

চৌবেসাহেব খুব আগ্রহ নিয়ে কাঞ্চনের হাত থেকে ওর মোবাইল-ফোনটা নিয়ে স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, কপিল সিং আর চন্দ্রনাথবাবু মুখোমুখি দুটো প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছেন। মাঝখানে টেবিলে ডিনারের প্লেট গ্লাস ইত্যাদি। দুজনেই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। চন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর পরনে গ্রে কালারের ব্লেজার, মাথায় খয়েরি-সাদা চেক কাটা ‘বেরে ক্যাপ’। ভদ্রলোক চশমা পরতেন না।

ফোনটা কাঞ্চনের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে চৌবেসাহেব প্রশ্ন করলেন, ‘নীচে তোমাদের খাবার ঘর নেই?’

একটু অস্বস্তি নিয়ে কাঞ্চন বলল, ‘আছে। তবে ভাদুড়ী আঙ্কল কখনোই ওখানে খেতে কম্ফর্টেবল ফিল করতেন না। বলতেন, নাকে খাটালের গন্ধ লাগে। তাই উনি এলে পাপাজি এখানেই খাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট করতেন।’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কী?’ দুঃখিত ভঙ্গিতে হাত ওলটালো কাঞ্চন সিং। বলল, ‘খাওয়ার মাঝপথেই আঙ্কল বুকে হাত দিয়ে চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন। আমিই ওঁকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে লিফট ধরে নীচে নামলাম। ওঁর ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে বাইরে ওয়েট করছিল। সেই গাড়িতেই আমি আঙ্কলকে নিয়ে উঠে পড়লাম। পাপাজিও আমাদের গাড়িটা নিজেই ড্রাইভ করে আমাদের সঙ্গে চললেন। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, লাভ নেই। যা হবার হয়ে গেছে।’

‘তারপর?’

‘সরকারি হাসপাতালে তো অ্যাডমিট করল না। ওখান থেকেই ডক্টররা পুলিশে ফোন করলেন।

‘আঙ্কলের রিলেটিভদের মধ্যে শুধু আঙ্কলের বহিনজি আর দামাদ কাছাকাছি থাকেন। উনি ব্যাচেলর ছিলেন জানেন বোধহয়? তা, খবর পেয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ওঁরা শিলিগুড়ি থেকে চলে এলেন। তারপর বোসসাহেব এলেন।’ বিনায়কের দিকে ইঙ্গিত করে দেখাল কাঞ্চন। ‘বোসসাহেব বললেন কী, আনন্যাচরাল ডেথ। পোস্টমর্টেম করতে হবে। আমরা বললাম, করে নিন। কীসের অসুবিধা? কানুন তো মানতেই হবে।’

তারপর কাঞ্চন বিনায়কের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আঙ্কলের বডি কবে রিলিজ হবে, স্যার? এমনি জিগ্যেস করছি।’

বিনায়ক উত্তর দিল, ‘মিস্টার ভাদুড়ীর ভাই আমেরিকা থেকে আসছেন। আজ রাতেই এখানে পৌঁছে যাবেন। ওদের রিকোয়েস্টেই হাসপাতালের মর্চুয়ারিতে বডি রাখা আছে। তার সঙ্গে আমাদের, মানে পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই।’

‘ও, আচ্ছা।’ তারপর কাঞ্চন চৌবেসাহেবের দিকে তাকিয়ে কিছু জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল। কিন্তু জিগ্যেস করতে পারল না, কারণ চৌবেসাহেবের সম্পূর্ণ মনোযোগ হঠাৎই অন্যদিকে গিয়ে পড়েছে।

যে-ছোট ছাদটায় ওঁরা দাঁড়িয়েছিলেন, তার তিনদিকে নিচু পাঁচিল আর চতুর্থদিক দিয়ে উঠে গেছে সেই চারনম্বর ঘরের বাইরের দেয়াল। ওই দেয়াল গিয়ে মিশেছে বড় ছাদে, মানে চারতলার ওপরের ছাদে, যেটাকে হিসেবমতো পাঁচতলা বলা যায়। চারতলার ছোট-ছাদে দাঁড়িয়ে, চৌবেসাহেব ঊর্ধ্বমুখে সেই পাঁচতলার বড় ছাদের দিকেই তাকিয়েছিলেন। একটু বাদে বিনায়কের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘একবার ওই ছাদটায় ঘুরে আসবে নাকি?’ তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই সিঁড়ির দিকে হাঁটা লাগালেন। লম্বা লম্বা পায়ে সিঁড়ি ভেঙে চটপট উঠে পড়লেন বাড়ির আসল ছাদে। পেছন পেছন কাঞ্চন আর বিনায়কও সেখানে পৌঁছে গেল।

এই ছাদটা নীচের ছোট ছাদের মতো পরিষ্কার কিংবা সাজানো-গোছানো নয়। কাপড় টাঙাবার তার ছাড়াও এদিকে-ওদিকে ভাঙা ফুলের টব, পোড়া আতসবাজির টুকরো, কাপড়ের ক্লিপ এইসব পড়ে রয়েছে।

চৌবেসাহেব অন্যমনস্ক ভাবে পায়চারি করতে করতে হঠাৎ বললেন, ‘দেখেছ, চশমাটা নীচে ফেলে এসেছি। অথচ স্কাইলাইনে আজ কী বিউটিফুল পাহাড় দেখা যাচ্ছে! বাবা কাঞ্চন, যদি কিছু মনে না করো, একবার চট করে জিপের পেছনের সিট থেকে আমার চশমাটা নিয়ে এসো না, প্লিজ।’

কাঞ্চন হা হা করে উঠল, ‘প্লিজ কীসের স্যার? এক্ষুনি যাচ্ছি।’

কাঞ্চন সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া মাত্র বিনায়ক বলল, ‘ছেলেটাকে সরিয়ে দিলেন, বুঝতে পারছি। নিতান্ত ছোট লেখা পড়ার সময় ছাড়া আপনার চশমা লাগে না। কিন্তু সরালেন কেন? কারণটা কী?’

চৌবেসাহেব সে-কথার উত্তর না দিয়ে, চট করে ছাদের পাঁচিলের পাশে দুটো ফুলের টবের মাঝখান থেকে একটা খয়েরি-সাদা চেক কাটা ‘বেরে ক্যাপ’ তুলে নিয়ে বিনায়কের হাতে দিয়ে বললেন, ‘পকেটে পুরে ফ্যালো। টুপিটা চন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর।’

‘চন্দ্রনাথবাবু এই ছাদে উঠেছিলেন!’ অবাক হয়ে জিগ্যেস করল বিনায়ক।

‘সম্ভবত স্বেচ্ছায় ওঠেননি। ওরা তুলে নিয়ে এসেছিল।’

আর কিছু না বলে চৌবেসাহেব ছাদের উত্তরদিকের পাঁচিলের ওপর থেকে মুখ বাড়িয়ে নীচের দিকে তাকালেন। বাকি তিনদিকে সোজা পঞ্চাশ-ফুট খাড়াই দেয়াল নীচের জমি অবধি নেমে গেছে, কিন্তু এইদিকে নেমেছে মাত্র দশ ফুট। কারণ এইদিকেই সেই তিনতলার ছোট ছাদ, একটু আগেই যেখানে ওঁরা দাঁড়িয়েছিলেন। যেখানে পরশু রাতে চন্দ্রনাথবাবু আর কপিল সিং ডিনার খেতে বসেছিল।

চৌবেসাহেব একবার মাত্র নীচের ছোট ছাদটাকে দেখে নিয়েই মন দিলেন ছাদের পাঁচিলে। পাঁচিলটার মাথায় সিমেন্টের গায়ে কিছু খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে চললেন এবং মনে হল, যা খুঁজছিলেন তা যেন পেয়েও গেলেন। হৃষ্টমুখে বিনায়কের দিকে ফিরে বললেন, ‘চলো বিনায়ক। এবার আলিপুরদুয়ারের হাসপাতালের মরচুয়ারিতে যাওয়া যাক। কী ভাগ্যিস ডেডবডিটা ইতোমধ্যে দাহ হয়ে যায়নি। আহা দাঁড়াও! আগে কাঞ্চন আমার চশমাটা আনুক, একটু পাহাড় দেখি। না হলে সন্দেহ করবে তো!’

বলতে না বলতেই কাঞ্চন সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল। চৌবেসাহেব সত্যিই ওর হাত থেকে চশমাটা নিয়ে খুব মন দিয়ে আকাশের গায়ে ভুটানপাহাড়ের সারি দেখলেন। পাহাড়ের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে আহা উহুও করলেন। তারপর বললেন, ‘থ্যাঙ্কিউ কাঞ্চন। চলো, এবার আমরা বেরোই।’

শেষ অবধি যখন বিনায়ক আর চৌবেসাহেব আলিপুরদুয়ার হাসপাতালের মরচুয়ারিতে চন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর মৃতদেহের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন বিকেল চারটে বেজে গেছে। ঠান্ডা আলমারি থেকে মৃতদেহের ট্রেটা ঘটাং করে টেনে বার করে দিয়ে, ডোম ভানুকুমার তাগাদা দিল, ‘একটু তাড়াতাড়ি করুন স্যার। আমার ডিউটি শেষ হয়ে গেছে।’

চৌবেসাহেব নিজের চাকুরিজীবনে এই মর্গে কম আসেননি। ভানুকে প্রায় বাচ্চাবয়স থেকে চেনেন। সস্নেহে বললেন, ‘এদিকে আয়। পোস্টমর্টেমের সময় তুই-ই ছিলিস তো?’

‘হ্যাঁ স্যার।’

‘হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল?’

‘একদম স্যার। হার্টের প্রায় পুরোটা জুড়ে ইনফ্রাকশন ছিল।’

বিনায়ক বা চৌবেসাহেব কেউই অবাক হলেন না। বছরের পর বছর কাজ করতে করতে এই ডোমেরা অ্যানাটমি আর প্রয়োজনীয় মেডিকাল টার্মগুলো ডাক্তারদের মতোই শিখে যায়। সত্যিকথা বলতে কী, পোস্টমর্টেমটা ডাক্তারবাবুর উপস্থিতিতে ডোমেরাই করে থাকে।

চৌবেসাহেব আবার জিগ্যেস করলেন, ‘এক্সটার্নাল ইনজুরি কিছু ছিল?’

ভানু বলল, ‘সামান্য। অত ভারী চেহারা নিয়ে চেয়ার থেকে উলটে পড়লে কিছু ব্রুইজ তো হবেই। পিঠে কালশিটে ছিল।’

‘চেয়ার থেকে যখন একটা মানুষ পড়ে, তখন তার চোট লাগে শরীরের পাশের দিকে। কিংবা যদি সামনে উপুড় হয়ে পড়ে, তাহলে মুখে...বুকে। পিঠে লাগবে কেমন করে? পিঠের দিকে চেয়ারের ব্যাকরেস্টটা থাকে না?’

ভানু মাথা চুলকোতে শুরু করল। এদিকটা সে ভাবেনি।

‘এদিকে আয়। গ্লাভসটা পরে নে। তারপর ডেডবডির হাতের মুঠিদুটো খোল। আগে দেখিসনি তো?’

ভানু ঘাড় নেড়ে বলল, ‘যখন কাজ শুরু করেছি, ততক্ষণে রিগার-মর্টিস সেট করে গিয়েছিল। হাত মুঠো হয়ে গিয়েছিল। তাই দেখিনি। দেখিও না তো কখনো।’ তারপর চৌবেসাহেবের কথামতো মৃত চন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর মুঠো-করা হাতের পাতার আঙুলগুলো টেনে টেনে খুলল। ভালোরকম জোর লাগাতে হল, কারণ এই দু’দিনে মৃতদেহ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল।

চৌবেসাহেব মৃতদেহের ওপরে ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘বিনায়ক, তোমার মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটা ভাদুড়ীবাবুর হাতের পাতার দিকে ফ্যালো তো।’

বিনায়কের মোবাইলের আলোয় দেখা গেল, চন্দ্রনাথ ভাদুড়ীর দুটো হাতের পাতাই ক্ষতবিক্ষত। আঁচড়গুলোর পাশে শুকনো রক্ত লেগে আছে। এমনকী নখের ডগাগুলো অবধি উপড়ে এসেছে।

ভানু আর বিনায়ক অবাক হয়ে ওই হাতের পাতাদুটোর দিকে তাকিয়েছিল। কিছুক্ষণ বাদে বিনায়ক চৌবেসাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এরকম অবস্থা কখন হল স্যার? কীভাবে হল?’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘কখন হল এই প্রশ্নের উত্তরে এটুকুই বলতে পারি, হয়েছে ডিডে সই করার পরে। এমনকী খাওয়া অর্ধেকটা হয়ে যাওয়ারও পরে। কারণ, বুঝতেই পারছ, এরকম ক্ষতবিক্ষত হাত দিয়ে কেউ কলম ধরতে পারে না, রুটি ছেঁড়া তো আরোই কঠিন। আর কীভাবে হয়েছিল, সেটা একটু বাদে বলছি।’

তারপর চৌবেসাহেব ভানুকে বললেন, ‘আমরা বেরিয়ে যাচ্ছি, বুঝলি। তুই সব গুছিয়ে বন্ধ করে চলে যা।’

বিনায়ক মরচুয়ারির বাইরে বেরিয়ে এসে বলল, ‘স্যার, এবার একটু বুঝিয়ে না বললে তো...।’

উমাশঙ্কর চৌবে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘আগে তুমি একবার চট করে সুপারের ঘর থেকে ঘুরে এসো। বলে এসো, এই ডেডবডি এখন ক্রিমেশন করা যাবে না। দরকার হলে আবার পোস্টমর্টেম করতে হবে। ঘুরে এসো, তারপর বলছি কী বুঝলাম।’

জিপের পেছনের সিটে একাই বসেছিলেন চৌবেসাহেব। ড্রাইভার ছেলেটিকে বিনায়ক কিছু খেয়ে আসবার জন্যে ছুটি দিয়েছিল। সুপারের অফিস থেকে ঘুরে এসে বিনায়ক চৌবেসাহেবের পাশের সিটে উঠে বসে বলল, ‘বলুন স্যার।’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘পুরো ঘটনাটাই আমি কল্পনা থেকে রিকনস্ট্রাক্ট করেছি। মন দিয়ে শোনো। কোথাও অসঙ্গতি দেখতে পেলে বলবে।

‘ডিডে সই করলেন কপিল সিং আর চন্দ্রনাথ ভাদুড়ী। ক্যাশ-টাকার ব্যাগ ভাদুড়ীবাবুর হাতে ধরিয়ে দিল কপিল। চন্দ্রনাথবাবু ব্যাচেলর মানুষ, কপিল সিংয়ের বাড়ি এলে ঘরোয়া রান্না খেয়ে যান। সেদিনও দুই বন্ধু খেতে বসলেন। কিছুটা খেলেনও নিশ্চয়...ইনফ্যাক্ট খেতে দেওয়া হল। কপিল সিং জানত, এর ফলে ওর গল্পটা আরো বিশ্বাসযোগ্য হবে—ওই খাওয়ার মাঝখানে বুকে হাত দিয়ে লুটিয়ে পড়ার গল্পটা।

‘যাই হোক, খাওয়ার মাঝপথে হঠাৎই কাঞ্চন সিং ভাদুড়ীবাবুকে পেছন থেকে ধরে, ওঁর হাতদুটো পিছমোড়া করে ধরে, টানতে টানতে সিঁড়ি দিয়ে তুলে নিয়ে গেল বড় ছাদে। কপিলও গেল সঙ্গে। বাপ-ব্যাটা দুজনে মিলে ভাদুড়ীবাবুর মাথার ওপর দিয়ে একটা হুড পরিয়ে দিল। ফাঁসির আসামির মাথায় যেমন পরানো হয়...দেখেছ তো? উপরন্তু মুখের ওপর দিয়েও নিশ্চয়ই বাঁধন দিয়েছিল, না হলে চিৎকার শোনা যেত। তখনই ওঁর মাথা থেকে টুপিটা খুলে ছাদে পড়ে গিয়েছিল, কপিলরা খেয়াল করেনি।

‘যাই হোক, এর পর সেই অবস্থাতেই ওরা চন্দ্রনাথবাবুকে ছাদের একটা পাঁচিল দিয়ে বাইরের দিকে ঝুলিয়ে দিল। মৃত্যুভয়ে চন্দ্রনাথ ভাদুড়ী পাঁচিলের কানাটা দু’হাতে আঁকড়ে ধরলেন। কপিল শয়তানের মতো হাসতে হাসতে চন্দ্রনাথবাবুকে বলল, ‘ঝোলো ভাদুড়ীবাবু, ঝোলো। যতক্ষণ দম আছে, এইভাবে ঝুলে থাকো। তারপর পঞ্চাশ ফুট নীচে আছাড় খেয়ে মরো।’ এই বলে ওরা দু’জনে নীচে নেমে গেল।

‘ট্র্যাজেডি হচ্ছে, চন্দ্রনাথ ভাদুড়ী বুঝতেও পারলেন না, পঞ্চাশ ফুট নয়, ওঁর পায়ের মাত্র ছ’ফুট নীচেই চারতলার ছোট ছাদ। কপিল সিং আর কাঞ্চন ওঁকে ওইদিকেই ঝুলিয়ে দিয়েছিল। উনি যদি হাত ছেড়ে দিতেন, তাতেও কিছুই হতো না। বড়জোর পা-টা একটু মচকাত, কিংবা বাস্তবে যেমন পিঠে কালশিটে পড়েছে সেরকম কালশিটে পড়ত। কিন্তু উনি তো ভাবছেন, তাকে খুন করার জন্যে কপিল সিং অন্য তিনদিকের কোনো একটা পাঁচিলে ঝুলিয়ে দিয়েছে। তিনি আতঙ্কে আঁকড়ে ধরলেন সিমেন্টের পাঁচিলের কিনারা।

‘ঝুলতে থাকলেন, ঝুলতেই থাকলেন। মানুষের বাঁচার আকাঙ্ক্ষা যে কী জিনিস তা তুমি জানো বিনায়ক। কতক্ষণ উনি ওই ভারী শরীর নিয়ে ঝুলে থাকতে পেরেছিলেন, তা আমরা বলতে পারব না। তবে বেঁচে থাকার আকুল চেষ্টায় উনি বারবার আলগা হয়ে আসা হাতের তালু দিয়ে নতুন করে চেপে ধরছিলেন ছাদের পাঁচিল। ওঁর নখগুলো গেঁথে যাচ্ছিল সিমেন্টের ভেতরে, উপড়ে যাচ্ছিল নখগুলো। খড়খড়ে সিমেন্টের ঘষায় হাতের তালুর চামড়া ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। শেষকালে তীব্র আতঙ্কে বন্ধ হয়ে গেল ওঁর হৃদপিন্ডের ধুকপুকুনি। মরার ভয় পেতে পেতে শেষ অবধি মরেই গেলেন চন্দ্রনাথ ভাদুড়ী।’

চৌবেসাহেব থামলেন। বিনায়ক বলল, ‘ছাদের পাঁচিলে কি আপনি তখন...?’

‘হ্যাঁ। মিস্টার ভাদুড়ীর মরিয়া লড়াইয়ের চিহ্নগুলোই খুঁজছিলাম। পেয়েছি খুঁজে। তুমি এখনো গেলে দেখতে পাবে, প্রায় চার-হাত জায়গা জুড়ে ছাদের পাঁচিলের মাথায় শুকনো শ্যাওলা আর আর চুন-বালির আস্তরণের ওপরে হাতের গ্রিপ আর নখের আঁচড়ের দাগ।’

বিনায়ক কিছুক্ষণ চুপ করে দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করল। মনে হল কেঁপে উঠল একটু। তারপর বলল, ‘কিন্তু একটা ব্যাপার স্যার। বাইরের রাস্তায় চন্দ্রনাথবাবুর ড্রাইভার অপেক্ষা করছিল। সে কিছু দেখতে পেল না?’

চৌবেসাহেব বললেন, ‘পাবার কথা নয়। প্রথমত, ছাদের যে পাঁচিল থেকে চন্দ্রনাথবাবু ঝুলছিলেন, সেটা রাস্তার দিকে নয়, পাশের দিকে। দ্বিতীয়ত, নীচের ছাদটায় উজ্জ্বল আলো থাকার জন্যে ওপরের অন্ধকার আরোই গাঢ় হওয়ার কথা। আর তৃতীয়ত, এটাই প্রধান কারণ—রাতের ঘন কুয়াশা। তুমি তো জানো, সন্ধের পর এখন দু’হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না।’

বিনায়ক মাথা নিচু করে আপনমনে বলল, ‘আপনাকে এইসব সময়ে ম্যাজিশিয়ান মনে হয়, স্যার। মুশকিল হচ্ছে, সাফিসেন্ট এভিডেন্স কোথায়? প্রমাণ করব কেমন করে?’

চৌবেসাহেব গলা নামিয়ে বললেন, ‘একটা কাজ করো। যেভাবে পারো একটা অ্যারেস্ট-ওয়ারেন্ট বার করে কাঞ্চন সিং আর কপিল সিং দু’জনকেই থানায় তুলে নিয়ে এসো। দু’জনকে আলাদা ঘরে বসাও। কিছুক্ষণ কাঞ্চনকে একা থাকতে দাও। তারপর ওর ঘরে ঢুকে বলো, এইমাত্র তুমি ওর বাবাকে জেরা করে এলে। জেরার মুখে কপিল সব স্বীকার করেছে। ও ন্যাচরালি জিগ্যেস করবে, কী স্বীকার করেছে? তখন আমি তোমাকে যা যা বললাম তার সবটাই ওকে বোলো।

‘ওকে বোলো, কপিল স্বীকার করেছে, খাওয়ার মাঝখানেই তোমরা দু’জনে চন্দ্রনাথবাবুকে ওপরের ছাদে তুলে নিয়ে গিয়েছিলে। তারপরে ওঁর মুখে পট্টি বেঁধে, হুড দিয়ে পুরো মাথা ঢেকে, পাঁচিলের কিনারায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলে। বোলো, কিছুক্ষণ স্ট্রাগল করার পরে উনি হার্ট অ্যাটাকে মারা যান আর এই সবটাই তুমি তখনই কপিল সিংয়ের মুখ থেকে শুনে আসছ। দেখবে, তাহলেই ও ভেঙে পড়বে। সব স্বীকার করে নেবে। আর একবার ছেলের মুখ থেকে বলিয়ে নিতে পারলে, তারপর বাবা কতক্ষণ অস্বীকার করবে?’

‘ওকে স্যার।’ বিনায়কের গলা শুনেই বোঝা গেল ও এবার কনফিডেন্স ফিরে পেয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই ড্রাইভারকে ফোন করে ডাকিয়ে আনালো; তারপরেই গাড়ি ছোটালো পুলিশ-সুপারের বাংলোর দিকে। ওয়ারেন্ট বানাতে হবে।

শুধু একবারই ওকে আলিপুরদুয়ার বাসগুমটির কাছে জিপ থামাতে হয়েছিল। ওখানেই চৌবেসাহেব জিপ থেকে নেমে গেলেন। পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর উমাশঙ্কর চৌবে পারতপক্ষে সরকারি গাড়িতে চাপেন না, আর বিনায়ক ভালো করেই জানে যে, উনি যখন একবার বলেছেন বাস ধরেই কুচবিহারে ফিরবেন, তখন ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর এসে বোঝালেও সেই ডিসিশন উনি চেঞ্জ করবেন না।

জিপ থেকে নামতে নামতে চৌবেসাহেব বিনায়ককে বললেন, ‘কী রেজাল্ট হল জানিও।’

জানিয়েছিল বিনায়ক। সেদিন রাতেই ফোন করে জানিয়েছিল, কপিল সিং আর তার ছেলে দু’জনেই আলাদা আলাদা করে একই জবানবন্দি দিয়েছে আর সেই জবানবন্দির সঙ্গে চৌবেসাহেব ঘটনাটাকে যেভাবে রিকনস্ট্রাক্ট করেছিলেন, তা হুবহু মিলে গেছে। ওরা অবশ্য তারপরেও বারবার বিনায়কের কাছ থেকে জানতে চাইছিল, বিনায়ক এতসব জানল কেমন করে! চারিপাশে কোনো আই-উইটনেস তো ছিল না।

‘তুমি কী বললে?’ সকৌতুকে জানতে চাইলেন চৌবেসাহেব।

‘আমি বললাম, একজন ম্যাজিশিয়ান এসে আমাকে সব বলে গেছেন।’

‘গুড। ভেরি গুড।’ মুচকি হেসে ফোন রেখে দিলেন উমাশঙ্কর চৌবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%