রুপোর কাঠি

সৈকত মুখোপাধ্যায়

এক

ভেবে দেখতে গেলে, খড়ের গাদা থেকে সুচ খোঁজার কাজটা এমন কিছু কঠিন নয়। বললেন চৌবেসাহেব, মানে রিটায়ার্ড অ্যাডিশনাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশ, উমাশঙ্কর চৌবে। যাকে বললেন, তার নাম বিনায়ক বসু, আলিপুরদুয়ার থানার ওসি। দু’জনের সম্পর্কটা গুরু-শিষ্যের। গত পাঁচ বছরে বিনায়কের হেফাজতে থাকা পাঁচটা জটিল কেস চৌবেসাহেব মাথা খাটিয়ে সলভ্ করে দিয়েছেন।

যতদিন চাকরির মধ্যে ছিলেন, ততদিন ইনভেস্টিগেটিং অফিসার হিসেবে ওই মাথা খাটানোটাই ছিল চৌবেসাহেবের বিশেষত্ব। কোনোদিনই তিনি অত পোস্টমর্টেম, ফরেনসিক, জুতোর দাগ, রক্তের ছোপের ধার ধারতেন না। এখনো মাঝেমধ্যেই বিনায়ককে বলেন, অপরাধীর মনের মধ্যে ঢুকে পড়ো বিনায়ক! ইনভেস্টিগেশনের সময় নিজেই মনে মনে ক্রিমিনাল হয়ে যাও। ভাবো, ওই সময়ে তুমি হলে কী করতে!

বিনায়ক শ্রদ্ধা নিয়ে চৌবেসাহেবের কথা শোনে। চেষ্টা করে, ওঁর মতোই তথ্যের ফাঁক-ফোঁকরগুলো কল্পনা দিয়ে ভরাট করতে। কিন্তু পেরে ওঠে না। সবাই তো আর উমাশঙ্কর চৌবে নন।

তবে হ্যাঁ, বিনায়ক নামে এই যুবক অফিসারের মধ্যেও এমন কিছু গুণ রয়েছে, যেগুলোর মর্ম উমাশঙ্কর চৌবে বোঝেন এবং অ্যাপ্রিশিয়েট করেন। যেমন, সততা, পরিশ্রম করার ক্ষমতা আর সর্বোপরি একটা নাছোড় মনোভাব। বিনায়ক বসু যে কেসের পেছনে পড়ে, তার শেষ না দেখে ছাড়ে না। যেখানে নিজের ক্ষমতায় শেষ অবধি এগোতে পারে না, সেখানেই বিনায়ক উমাশঙ্কর চৌবেকে এসে ধরে। এই আজকেই যেমন এসেছে।

রিটায়ার করার পর চৌবেসাহেব কুচবিহারের এয়ারপোর্টের লাগোয়া একটা জমিতে সুন্দর দোতলা বাড়ি বানিয়ে বাস করছেন—উনি আর ওঁর স্ত্রী। ছেলে বিদেশে। বাড়ির ছাদে চৌবেসাহেবের নিজের হাতে তৈরি টবের ফুলবাগান রয়েছে। এখন শীতকাল, তাই সেই বাগান আলো হয়ে রয়েছে নানান রঙের ডালিয়া আর চন্দ্রমল্লিকায়। ছাদেরই একপাশে দুটো গার্ডেন চেয়ারে শীতের রোদে পিঠ দিয়ে বসেছিলেন চৌবেসাহেব আর বিনায়ক বসু। এয়ারপোর্টের শেষপ্রান্তে টকটকে নীল আকাশের গায়ে চারকোলে আঁকা ভুটান পাহাড় যেন কোনো শিশুর ড্রয়িং খাতা।

চৌবেসাহেবের বয়স পঁয়ষট্টি ছাড়িয়েছে, কিন্তু মাথায় কালোর মধ্যে মিশে থাকা অল্প কিছু সাদা চুল আর দু’চোখের কোনায় দুটো শালিখ পাখির পায়ের ছাপ ছাড়া তাঁর বাকি শরীরে বয়সের আর কোনো চিহ্ন নেই। ছিপছিপে শরীর, উজ্জ্বল চোখ। বিনায়ক তাঁর বাড়িতে আসার অল্প কিছু আগেই তিনি মর্নিং-ওয়াক সেরে ফিরেছেন। এখনো তাঁর পরনে তাই ট্রাকস্যুট আর হালকা একটা উইন্ড-চিটার।

বিনায়ক আগেই চৌবেসাহেবকে ফোন করে জানিয়ে রেখেছিল যে সে আসছে। ও যখন চৌবেসাহেবের বাড়িতে ঢুকল, তখন সাতটা বাজে। বিনায়ক যখনই আসে, তখনই এইরকম সাতসকালে আসে। তার কারণ, বিনায়ক আবার ঘড়ি ধরে ন’টায় তার নিজের অফিসে ঢুকে পড়তে চায়। এ ব্যাপারে ও ভীষণ ডিসিপ্লিনড। আর সেটা করতে গেলে, তাকে কুচবিহার থেকে আলিপুরদুয়ারের দিকে রওনা হতে হয় অন্তত সোয়া আটটার মধ্যে। তার আগে কথাবার্তা সারার সময় চাই তো!

সময় কম বলেই বিনায়ক বোধহয় সরাসরি কাজের কথায় চলে এল। চায়ের কাপটায় শেষ একটা চুমুক দিয়ে, সেটাকে সেন্টার টেবলে নামিয়ে রেখে বলল, স্যার, একটা সমস্যায় পড়েছি। খুনজখমের মামলা নয়। একটা জিনিস হারিয়েছে... মানে চুরি গিয়েছে... যেটা একইসঙ্গে অত্যন্ত দামি আর সেনসিটিভ। রিপোর্টাররা খবর পেলে এক্ষুনি কাগজের হেডলাইন হয়ে যাবে। এদিকে আবার ব্যাপারটার মধ্যে দু-একজন ভি.আই.পি. জড়িত রয়েছেন। কাজেই আমাদের যে চালু প্রসেসগুলো রয়েছে, সেগুলোও অ্যাপ্লাই করতে পারছি না।

চৌবেসাহেব দিব্যি হাতের মুঠোর ওপরে চিবুক রেখে, মন দিয়ে বিনায়কের কথাগুলো শুনছিলেন। হঠাৎ মুখটুখ কুঁচকে বললেন, তোমাদের চালু প্রসেস মানে ওই থানায় তুলে এনে থার্ড ডিগ্রি দিয়ে পেট থেকে কথা বার করা? নো নো নো। আই অলওয়েজ ডিসলাইকড দ্যাট প্রিমিটিভ মোড অফ ইনভেস্টিগেশন।

বিনায়ক মাথা চুলকে বলল, আপনার কথা আলাদা স্যার। আপনি ক্রিমিনালদের মন পড়তে পারেন। আমরা তো আর তা পারি না। আমাদের তাই একটু-আধটু ওসব লাগে। যাই হোক, তারপর বলি?

বলো! জিনিসটা কী? গম্ভীরমুখে জানতে চাইলেন চৌবেসাহেব।

জিনিসটা স্যার একটা সুচ।

চৌবেসাহেব একটু চিন্তিতমুখে বিনায়কের মুখের দিকে তাকালেন। ছেলেটার মধ্যে যে অনেক গুণ রয়েছে তা তিনি জানেন; কিন্তু রসিকতা করার ক্ষমতাটা তার মধ্যে পড়ে না। সত্যি কথা বলতে কী, বিনায়ক কথায়-বার্তায় আচার-আচরণে একটু কাঠখোট্টাই আছে। তাহলে? আজ হঠাৎ হল কী?

চৌবেসাহেবের চোখের দৃষ্টির মানে বুঝতে পেরেই বিনায়ক হাত তুলে হাউমাউ করে উঠল, না, স্যার! সত্যি কথাই বলছি। একটা সুচই চুরি গেছে। আ নীডল, আ পোলোনিয়াম নীডল।

মাই গুডনেস! চৌবেসাহেব শরীরের ওপরের অংশটা ঝুঁকিয়ে নিয়ে এলেন বিনায়কের কাছাকাছি। তারপর ফিসফিস করে বললেন, তুমি কি সত্যিই পোলোনিয়াম নীডল বললে? নাকি আমি ভুল শুনলাম?

বিনায়ক এর আগে তার গুরুকে কখনো নার্ভাস হতে দ্যাখেনি। এই প্রথম চৌবেসাহেবের মুখে উদ্বেগের ছাপ দেখে সেও ভয় পেয়ে গেল। ভয় পাওয়া গলাতেই বলল, না স্যার, ভুল শোনেননি। সত্যিই হাসিমারা এয়ার-বেসের রিসার্চ-ল্যাবরেটরি থেকে কাল সকালে একটা পোলোনিয়াম নীডল চুরি হয়েছে। জিনিসটার দাম কয়েক কোটি টাকা। সেটা বড় কথা নয়। যেহেতু জিনিসটা প্রচণ্ড রেডিও-অ্যাকটিভ, তাই ও জিনিস যেখানে থাকবে, সেখানেই মারাত্মক রেডিয়েশন ছড়াবে। তার মানে ইনজুরিয়াস টু পাবলিক হেলথ। তার মানে...

বিনায়কের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে চৌবেসাহেব বললেন, তার মানে চ্যানেলে চ্যানেলে ব্রেকিং-নিউজ আর কাগজে কাগজে কুড়ি পয়েন্টের হেডলাইন। বুঝলাম। এবার একটু ডিটেইলসে বলো।

সবটা আমিও বলতে পারব না স্যার। সিকিওরিটির প্রশ্ন জড়িত রয়েছে বলে আমাকেও আর্মির অফিসারেরা সব কথা খুলে বলেননি। যেমন, নীডলটা ওঁরা কোথা থেকে এনেছিলেন, কোন ধরনের রিসার্চে ওটা কাজে লাগত, এইসব আর কী!

চৌবেসাহেব হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বললেন, বাদ দাও। রেডিও-অ্যাকটিভ এলিমেন্ট নিয়ে মিলিটারি আর নতুন কী করবে? মানুষ মারার নতুন কল বানাবে, তা ছাড়া আর কী? আর তোমার ইনভেস্টিগেশনের কাজে জিনিসটা ‘কোথা থেকে এসেছিল’ সেটা জরুরি নয়। জরুরি হল, ‘জিনিসটা কোথায় গেছে’ সেইটা জানা।

এগজ্যাক্টলি স্যার।

চৌবেসাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে ডালিয়াগাছের একটা শুকিয়ে যাওয়া পাতা নখ দিয়ে কেটে ফেলে দিয়ে আবার নিজের চেয়ারে এসে বসলেন। বললেন, তোমাকে যতটা চিনি বিনায়ক, তাতে এটা বলতে পারি, খবরটা পাওয়ার পরে গত চব্বিশঘণ্টা তুমি চুপ করে বসে থাকোনি। কী কী করলে, কী কী দেখলে, সব খুলে বলো।

দেখলাম অনেক কিছুই স্যার। জানলামও প্রায় সবকিছু। তাতেই মাথাটা আরো গুবলেট হয়ে গেল। এ তো আক্ষরিক অর্থে খড়ের গাদা থেকে সুচ খোঁজার কাজ।

তখনই চৌবেসাহেব ওই কমেন্টটা করলেন। ঘাড়ের পেছনে দুটো হাতের পাতা জড়ো করে তার ওপরে মাথাটা হেলিয়ে দিয়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ভেবে দেখতে গেলে, খড়ের গাদা থেকে সুচ খোজার কাজটা এমন কিছু কঠিন নয়। কারণ, সুচের চেহারার সঙ্গে খড়ের চেহারার কোনো মিল নেই। কাজটা সত্যিই কঠিন হতো, যদি তোমাকে সুচের বান্ডিল থেকে একটা বিশেষ সুচ-কে খুঁজে বার করতে হতো, কিংবা খড়ের গাদা থেকে একটা বিশেষ খড়ের ডগাকে।

বিনায়ক কিছুক্ষণ চৌবেসাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই রিল্যাক্সড মুখটার দিকে তাকিয়ে সে কী বুঝল কে জানে, কিন্তু তার নিজের মুখ থেকে এতক্ষণের নৈরাশ্যের ছায়া খুব দ্রুত সরে গেল এবং সে বেশ ফুর্তির সঙ্গেই এর পর পনেরো মিনিট ধরে কেসের খুঁটিনাটি বর্ণনা করে গেল।

দুই

হাসিমারা এয়ার-বেস এমনিতেই সুরক্ষিত এলাকা। বাইরের কোনো লোকের পক্ষে অনুমতি ছাড়া গেট টপকানো না-মুমকিন। তার ওপরে রিসার্চ-ল্যাবরেটরির চারিপাশে তো একেবারে জেড টু দি পাওয়ার এন টাইপের সুরক্ষাবলয়। ওই তিনতলা বাড়িটারই দোতলার একটা ঘরে পোলোনিয়াম নীডলটা রাখা ছিল।

ঘরটায় জানলা নেই। একটাই মাত্র ছ’ইঞ্চি পুরু লোহার দরজা, যার গায়ে কম্বিনেশন লক লাগানো রয়েছে। ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস ডিপার্টমেন্ট’-এর ভারপ্রাপ্ত অফিসার, উইং-কম্যান্ডার প্রদীপ সাকসেনা ছাড়া, সেই নাম্বার কম্বিনেশন জানেন শুধু এয়ার-বেসের বড়কর্তা এয়ার-কমোডোর বাসুদেব গায়কোয়াড়। ওঁদের দু’জনকে যে কোনো রকমের সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখা যায় শুধু এই কারণেই যে, পোলোনিয়াম নীডল দুটো খুঁজে না পাওয়া গেলে ওঁরা দু’জনেই সবার আগে কোর্ট মার্শালের মুখে পড়বেন।

আমি জানতাম না যে, বেশিরভাগ রেডিও-অ্যাকটিভ মেটিরিয়ালকে ছোট সুচের আকারেই বানানো হয় এবং সেই জন্যেই তাদের নীডল বলে। থোরিয়াম নীডল, রেডিয়াম নীডল, পোলোনিয়াম নীডল এটসেটরা। এই নীডলটাকে আনা হয়েছিল সবে এক সপ্তাহ আগে। তারপর গত একসপ্তাহ ধরে ওই ল্যাবরেটরির সায়েন্টিস্টরা ওই নীডল নিয়ে তাদের রিসার্চের কাজ করেছেন।

রেডিও-অ্যাকটিভ এলিমেন্টস নিয়ে যেখানে কাজ করা হয়, সেখানে কিছু প্রোটোকল মেনে চলতে হয়। প্রথমত, ঘরের দরজায় বড় করে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে রাখতে হয় যে, সেখানে অমন তেজস্ক্রিয় বস্তু রাখা আছে। দ্বিতীয়ত, উপযুক্ত পোশাক-আশাক এবং মাস্ক ছাড়া ও-ঘরে কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হয় না। তৃতীয়ত, নিয়মিত ওই ঘরের তেজস্ক্রিয়তা মাপতে হয় শুধু এইটা দেখার জন্যে যে, ওই তেজস্ক্রিয়তা অসাবধানে বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে কিনা। ওই ল্যাবরেটরিতে এই সব প্রিকশনই নেওয়া হয়েছিল।

এয়ার-মার্শাল প্রদীপ সাকসেনা গতকাল নিজে আমাকে স্পেশাল জ্যাকেট, মাস্ক এইসব পরিয়ে ওই ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন। দেখিয়েছিলেন, ঠিক কোন তাকের ওপরে, কেমনভাবে নীডলটা রাখা ছিল। যা দেখলাম তাতে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল। ইচ্ছে থাকলে যে কারও পক্ষেই নীডলটাকে পকেটে পুরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন ছিল না। নীডল যে চুরি হয়েছে সেটা বুঝতে সময় লাগত এবং তাই লেগেছে। বজ্র আঁটুনিই হয়ে দাঁড়িয়েছে ফস্কা গেরো। যে জিঙ্কের কন্টেনারের মধ্যে পোলোনিয়াম-নীডল রাখা ছিল সেই কন্টেনারটাই বুঝতে দেয়নি যে ভেতরের জিনিসটা হাওয়া হয়ে গেছে। কন্টেনারটা কাচের হলে এই অসুবিধে হতো না। কিন্তু রেডিও-অ্যাকটিভ এলিমেন্টকে সব সময়েই জিঙ্কের কন্টেনারের মধ্যেই রাখতে হয়। জিঙ্ক অর্থাৎ দস্তা রেডিয়েশনকে আটকে দেয় কিনা, তাই।

এখন আপনি বলবেন, এমন দুঃসাহসী চোর কে আছে, যে নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে নীডল চুরি করবে? ওই জিনিস সামান্য সময়ের জন্যেও খালি হাতে নাড়াচাড়া করার অর্থ তো ক্যানসারের বিষকে শরীরের মধ্যে ডেকে আনা।

ঠিক তাই। তার মানে, যে চুরি করেছে. তার শরীরে প্রোটেকটিভ গিয়ার ছিল। ছিল জ্যাকেট, মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদি। এবং সর্বোপরি, তার ওই ঘরে ঢোকার অনুমতি ছিল।

প্রদীপ সাকসেনা এবং তার বস বাসুদেব গায়কোয়াড়কে বাদ দিলে ওই ঘরে ঢোকার পারমিশন ছিল একমাত্র সায়েন্টিস্টদের। কিন্তু কাল যেহেতু ছিল রবিবার, তাই সায়েন্টিস্টরা কেউই কাজে আসেননি। এ কথা সাকসেনাসাহেব নিজেই স্বীকার করেছেন। করিডরের সি.সি. টিভির ফুটেজ চেক করে দেখেছি, ওঁর কথা ঠিক।

হাসিমারা এয়ার-বেসের নিজস্ব সায়েন্টিস্টরা গতকাল আসেননি। কিন্তু দিল্লি থেকে এসেছিলেন অন্য দু’জন সায়েন্টিস্ট। ওঁরা দু’জনেই ইন্ডিয়ান আর্মির বিরাট উচ্চপদে আসীন। এতটাই উচ্চপদে যে, সায়েন্টিস্ট হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের দুজনকে সায়েন্স নিয়ে আর কোনো কাজ করতেই হয় না। তারা এখন সারা ভারতে ঘুরে আর্মির বিভিন্ন ল্যাবরেটরি আর ওয়ার্কশপ পরিদর্শন-টরিদর্শন করেন। তাঁদের দেওয়া সার্টিফিকেটের জোরে ল্যাবরেটরি আর ওয়ার্কশপগুলো কোটি কোটি টাকার ‘গ্র্যান্ট’ মানে যাকে বাংলায় বলে অনুদান, তাই পায়। অনুদান পেলে তবেই তাদের রিসার্চের কাজ চালু থাকে।

অতএব বুঝতেই পারছেন, ওঁদের দু’জনের কেমন খাতির। সেইজন্যেই ওঁদের ভিজিটের আয়োজন করা হয়েছিল রবিবার, যাতে জুনিয়ার সায়েন্টিস্টরা কোনোরকম বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রশ্ন করে ওঁদের বিরক্ত করতে না পারে।

তাছাড়া ওঁরা যাতে পরিদর্শনের মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজ সেরে, ভুটানের দিকে একটু বেড়িয়ে আসতে পারেন, সে ব্যবস্থাও করে রেখেছিলেন উইং-কম্যান্ডার সাকসেনা। তিনি দেখেছেন, এর আগে যতবার এরকম কাজে কোনো বড়সাহেব হাসিমারায় এসেছেন, তাঁরা ভুটানে বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহ দেখিয়েছেন।

এবারেও তাই সাকসেনা সাহেব ওই দুই বড়কর্তাকে সকাল সকাল ল্যাবরেটরিতে একবার ঘুরিয়ে এনে ভুটানের দিকে রওনা করিয়ে দিয়েছিলেন। আর্মির হাড়সার গাড়ির বদলে বিলাসবহুল বিদেশি গাড়ি, শিলিগুড়ির তিনতারা হোটেলের লাঞ্চ এবং পানীয়— সবকিছু সঙ্গে দিয়েই ওনাদের ভুটানের রাস্তায় রওনা করে দিয়েছিলেন সাকসেনা সাহেব। ওঁর ব্যবস্থাপনায় খুশি হয়ে দুই বড়কর্তাই কথা দিয়েছিলেন, সামনের বারে যাতে ল্যাবরেটরির গ্র্যান্ট আরো কয়েক লক্ষ টাকা বাড়ে সেটা ওঁরা নিশ্চয়ই দেখবেন।

ওঁরা রওনা হয়ে যাওয়ার পরেই ল্যাবরেটরি থেকে সাকসেনাসাহেবের কাছে জরুরি কল আসে।

দিল্লির সাহেবরা ল্যাবরেটরি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরে দু’জন জুনিয়র স্টাফ সাকসেনা সাহেবের নির্দেশেই ল্যাবরেটরিতে ঢোকে, তেজস্ক্রিয়তা মাপতে। এই কাজটা প্রোটোকলের মধ্যেই পড়ে, এড়ানো যায় না। তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই আবিষ্কার করেন যে পোলোনিয়াম-নীডল হাওয়া এবং পড়িমরি করে ওই ল্যাবরেটরি থেকেই ফোন করেন সাকসেনা সাহেবকে।

ফোন পেয়েই গেটের কাছ থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসেছিলেন প্রদীপ সাকসেনা। একা আসেননি, সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন ইনস্টিটিউটের নিজস্ব একজন বৈজ্ঞানিককে। তাঁরা প্রথমেই ওই দু’জন জুনিয়র স্টাফের বডি সার্চ করেন। তারপর ল্যাবরেটরির প্রতিটি কোনা তন্ন তন্ন করে খোঁজেন। সুচ যে চুরি গেছে সেটা বুঝতে বেশি সময় লাগে না। আধঘণ্টার মধ্যে এয়ার-কমোডর বাসুদেব গায়কোয়াড়ের পারমিশন নিয়ে সাকসেনা

আমাকে ফোন করেন। আমি ওখানে পৌঁছোই আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাদে। তার মানে, দিল্লির সায়েন্টিস্টরা ল্যাবরেটরি ছাড়ার ম্যাক্সিমাম দেড়ঘণ্টার মধ্যে আমি ওখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম।

ইয়েস স্যার। আপনার সঙ্গে আমি একমত। সারকামস্টেনসিয়াল এভিডেন্স বলছে, ওই দুই বিজ্ঞানীর মধ্যেই একজন কেউ পোলোনিয়াম নীডল হাতসাফাই করে পালিয়েছেন। এই সাদা কথাটা আমরা তখনই বুঝতে পেরেছিলাম।

প্রবলেমটা অন্য জায়গায়। সরাসরি তো ওঁদের গিয়ে বলা যায় না যে চোরাই মালটা ফেরত দিন। যে ওই কথা সাহস করে বলবে, পাঁচ মিনিটের মধ্যে তার চাকরি যাবে; যদি না সে একদম কংক্রিট এভিডেন্স দিতে পারে যে, নীডলটা ওঁদের মধ্যেই কারও কাছে আছে।

দেন অ্যান্ড দেয়ার আমি একটা ডিসিশন নিলাম স্যার। আমি ঠিক করলাম, এয়ার বেসের গেস্টহাউসে ওই দুই বৈজ্ঞানিকের ঘরদুটো সার্চ করব। অবশ্যই এমনভাবে, যাতে ওঁরা ফিরে আসার পরে কিছু বুঝতে না পারেন।

তিন

কিছু পেলে না তো? এতক্ষণ বাদে মুখ খুললেন চৌবেসাহেব।

বিনায়ক বেশ আহত স্বরে বলল, পাব না সেটাই আশা করছিলেন? কেন? আমার স্টেপটা ভুল ছিল?

আহা, সেন্টিমেন্টাল হয়ো না বিনায়ক। ভেবে দ্যাখো, ওঁদের দু’জনের যা সামাজিক অবস্থান, তাতে ঘরে বা পকেটে ওরকম একটা চোরাই মাল বেশিক্ষণ বয়ে নিয়ে বেড়াবার রিস্ক কি নেবেন? ধরা পড়লে তো যা-তা কাণ্ড হয়ে যাবে। আর অন্য রিস্কটার কথাও ভুলে যেও না। ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে আসার পরেই নিশ্চয় ওঁদের স্পেশাল জ্যাকেট, মাস্ক, গ্লাভস সবকিছুই খুলে ফেলতে হয়েছিল। তারপরেও কি ওঁরা পোলোনিয়াম-নীডল নিয়ে ঘোরাফেরা করবেন? প্রাণের মায়া তো সকলেরই থাকে। এই ধরনের বদমাইশদের বোধহয় একটু বেশিই থাকে।

বিনায়ক বলল, তাহলে?

রোদ বাড়ছিল। চৌবে সাহেব গায়ের উইন্ড-চিটারটা খুলে চেয়ারের পেছনে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, তাহলে ভেবে দ্যাখো, জিনিসটা অন্য কারও কাছে গচ্ছিত রেখে গেছেন কিনা!

মানে? ওঁরা তো সাকসেনা সাহেবের সঙ্গেই এয়ার-বেস থেকে বেরিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠেছেন। একা তো কখনো হননি।

হননি? তাই কি? হবার কথা কিন্তু। রেডিয়েশন-প্রুফ জ্যাকেট, ওভারঅল এগুলো তো পাবলিকলি চেঞ্জ করা যায় না। কোনো চেঞ্জ-রুম...

চৌবেসাহেবের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই বিনায়ক চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে প্রায় চিৎকার করে উঠল—ওহ মাই গড। ওহ মাই গড। সত্যিই তো! ওই ফ্লোরে, ল্যাবরেটরি রুমের ঠিক বাইরেই তো আলাদা আলাদা দুটো কিউবিকল রয়েছে। দুটো চেঞ্জ-রুম। কেন আমার এতক্ষণ মনে পড়েনি?

দাঁড়াও দাঁড়াও। এখনই অত উত্তেজিত হয়ো না বিনায়ক। আরো কিছু প্রশ্ন রয়েছে। ধরো ওঁদের মধ্যে একজন চেঞ্জ রুমে জ্যাকেটটা রেখে বেরিয়ে এলেন। সেই জ্যাকেটের পকেটে রইল পোলোনিয়াম নীডল। তারপর? তারপর থেকে তো ওঁরা সবার চোখের সামনেই রইলেন। ইনফ্যাক্ট, ওই মাপের ভি.আই.পি-রা কখনোই একা হন না। ওঁরা আর চেঞ্জ রুমে ফিরলেনও না; আজ সকালের ফ্লাইটে দিল্লি চলে গেলেন। তাহলে নীডলটা সরিয়ে কী লাভ হল?

বিনায়ক উত্তেজিত গলায় বলল, অ্যাকমপ্লিশের কথা বলছেন বুঝতে পারছি। দুষ্কর্মের সঙ্গী; যে পরে গিয়ে ওই নীডল নিয়ে বাইরে পাচার করেছে। কিন্তু সে কে হতে পারে?

সেটা তো এই মুহূর্তে বলতে পারব না বিনায়ক। তবে আমি যদি ওই অসৎ বৈজ্ঞানিক হতাম, তাহলে কাকে ওই কাজের জন্যে প্রথম অ্যাপ্রোচ করতাম জানো? রেডিয়েশন-প্রুফ জ্যাকেট-ট্যাকেটগুলো গুছিয়ে তুলে রাখার দায়িত্বে যে ছেলেটির, তাকে। কেন জানো? তাহলে প্রতিদিন যে ছন্দে ওই ল্যাবরেটরিতে কাজ চলে, সেই ছন্দের এতটুকুও পতন ঘটত না। অথচ চোরাই মাল বাইরে চলে যেত।

আর একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় আসছে। এটা একটা অনুমান বলতে পারো। হয়তো খোঁজ নিয়ে দেখবে, ওই যে ছেলেটা চেঞ্জ রুমের দায়িত্ব রয়েছে তার সঙ্গে আবার কোনো না কোনোভাবে কোনো বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিরও যোগাযোগ রয়েছে।

কেন স্যার?

আমার চাকরির অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই ধরনের রেডিও-অ্যাক্টিভ নীডল শেষ অবধি কালোবাজারে ওদের হাতেই পৌঁছোয়। সাদাবাজারে পোলোনিয়াম কিনে, তাই দিয়ে ক্যানসারের ওষুধ বানিয়ে ওরা যতটা লাভ করে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি লাভ করে এরকম চোরাই নীডল থেকে।

চৌবেসাহেবের মুখের দিকে কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে, বিনায়ক হঠাৎই উঠে পড়ল। মিনিট তিনেক বাদেই চৌবেসাহেবের বাড়ির গেটের সামনে থেকে স্টার্ট নিয়ে আলিপুরদুয়ার থানার জিপটা তিরবেগে ছুটে গেল হাসিমারার রাস্তায়।

চৌবেসাহেব ভেতরের ঘরের দিকে মুখ ফিরিয়ে গলা তুলে বললেন, ওগো শুনছ? আমাকে এখন আর কর্নফ্লেক্স দিও না। বরং চট করে একটু ভাতে ভাত বসিয়ে দাও। চান করতে যাচ্ছি। বাথরুম থেকে বেরিয়েই খেতে বসব।

চৌবেসাহেবের স্ত্রী ঘর থেকে লাগোয়া টেরাসে বেরিয়ে এসে অবাক গলায় জিগ্যেস করলেন, এত সকালে চান-খাওয়া সেরে কোথায় বেরোবে?

বিনায়কের কাছে যাব।

তার মানে! বিনায়ক তো এই ঘুরে গেল।

তাতে কী হয়েছে? আবার আমাকে দেখতে ইচ্ছে করতে পারে না?

চৌবেসাহেবের স্ত্রী মুখ বেঁকিয়ে বললেন, হুঁঃ, কি আমার উত্তমকুমার এলেন রে! তাকে নাকি ঘড়ি ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে করছে লোকের। ঠিক আছে, তাই দিচ্ছি।

দু’ঘণ্টা নয়, ঠিক একঘণ্টা সাঁইত্রিশ মিনিটের মাথায় চৌবেসাহেবকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আবার আলিপুরদুয়ার থানার গাড়ি তাঁর বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াল।

ইতিমধ্যে ফোনে ফোনেই চৌবেসাহেব বিনায়কের কাছ থেকে যা শোনার শুনে নিয়েছেন।

চেঞ্জ রুমের দায়িত্বে যে ছিল সে ছেলে নয়, মেয়ে। পঁচিশ বছরের একটি মেয়ে। নাম আয়ূষী কর্মকার। মেয়েটির নিজের বাড়ি এদিকেই, ধূপগুড়িতে। এক বছর আগে ওর বিয়ে হয়েছে। বর থাকে কলকাতার বেলঘরিয়ায়।

বিয়ের পর থেকেই আয়ূষী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল কলকাতার কোথাও একটা চাকরি জোগাড় করার। ক’দিন আগেই সেই চেষ্টার ফল মিলেছে। কলকাতার একটা কলেজে চাকরি পেয়ে গেছে আয়ূষী। সামনের মাসেই সে এয়ার-বেসের এই চাকরিটা ছেড়ে দেবে।

আয়ূষী এখন হাসিমারা গুরুদোয়ারার পেছনে একটা মেয়েদের পিজি-তে থাকে। মাসে একবার করে কলকাতায় যায়। কালকেই উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসে ওর কলকাতা যাওয়ার টিকিট কাটা রয়েছে।

যে ছেলেটির সঙ্গে আয়ূষীর বিয়ে হয়েছে, তার নাম বরুণ দাশ। বরুণ গেটওয়েল ফার্মা নামে একটা কোম্পানির সেলস এগজিকিউটিভ। বিনায়ক নেট সার্চ করে দেখেছে, সস্তায় ক্যানসারের চিকিৎসার জন্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ বানানোয় গেটওয়েল ফার্মার বিশেষ সুনাম রয়েছে। এই শেষ তথ্যটা চৌবেসাহেবকে বলার সময় বিনায়কের গলাটা শোনাচ্ছিল সেই ক্লাস ফাইভের বাচ্চাটার মতো, যার ইউনিফর্মের পকেটের ভেতর থেকে ম্যাজিসিয়ান সবেমাত্র একটা জ্যান্ত পায়রা বার করেছেন।

সব শুনেটুনে চৌবেসাহেব বলেছিলেন, তাহলে আবার আমাকে নিয়ে টানাটানি করছ কেন? আয়ুষীর কাছ থেকে নীডলটা উদ্ধার করতে পারছ না?

তিতিবিরক্ত গলায় বিনায়ক উত্তর দিয়েছিল, না স্যার। মেয়েটা অত্যন্ত কঠিন ধাতুতে তৈরি। ইন্টারোগেশনের সময় এমন হাবভাব করছে যেন পোলোনিয়াম নীডল বলে কোনো জিনিসের কথা জীবনে প্রথম শুনল।

ওর ঘর সার্চ করেছ?

করেছি। ইনস্টিটিউট থেকে গাইগার মুলার কাউন্টার অবধি নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কিছুই পাইনি।

বডি সার্চ করা হয়েছে?

ইয়েস স্যার। আমি থানা থেকে লেডি অফিসার নিয়েই গিয়েছিলাম।

তাহলে তো একবার গিয়ে দেখতেই হচ্ছে।

চার

চৌবেসাহেব, বিনায়ক, হাসিমারা এয়ার-বেসের একজন সায়েন্টিস্ট আর একজন লেডি পুলিশ ইনস্পেক্টর একসঙ্গেই আয়ূষীর ঘরে ঢুকলেন। আয়ূষী নিজেই দরজা খুলে দিয়ে ওদের ভেতরে ডাকল, আসুন। এই স্যার আমার ঘরের যা হাল করে দিয়ে গেছেন, কোথায় বসতে বলব বুঝতে পারছি না। আয়ূষী ইঙ্গিতে বিনায়কের দিকে দেখাল। কিন্তু ওর বলার মধ্যে কোনো রাগ কিংবা উত্তেজনার চিহ্ন ছিল না।

সত্যিই, বিনায়ক অ্যান্ড কোম্পানির সার্চিংয়ের ঠেলায় ঘরটা তখনো লন্ডভন্ড হয়ে রয়েছে। আয়ূষী কিছুটা গুছিয়ে তুলেছে, সবটা পারেনি।

বিনায়ক বলল, স্যরি। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। প্রয়োজন মনে করলে আরো দশবার আপনার ঘর সার্চ করব।

ছোটখাটো চেহারার মেয়েটার মুখে এবারেও নতুন কোনো অনুভূতির চিহ্ন ফুটল না। ভাবলেশহীন মুখে বলল, বুঝতে পারছি স্যার। কী করবেন? আপনিও তো ডিউটি-বাউন্ড।

চৌবেসাহেব মনে মনে বললেন, হার্ড নাট টু ক্র্যাক।

আয়ূষী দুটো মোড়া আর একটা চেয়ারে পুরুষ অতিথিদের বসিয়ে, লেডি ইনস্পেক্টরের সঙ্গে ছোট চৌকিটার একপাশে বসল। বলল, যা করবেন যদি একটু তাড়াতাড়ি করেন। আমাকে বেরোতে হবে।

চৌবেসাহেব বললেন, কোথায় যাবে মা? ও, দেখেছ! নিজের পরিচয়টাই দিইনি। আমার নাম উমাশঙ্কর চৌবে। এই বোস সাহেবের বন্ধু বলতে পারো। কোথায় যাবে বললে না তো?

একবার স্টেশনে যাব। কাল আমার কলকাতায় ফেরার টিকিট কাটা ছিল। এখন আমার এমপ্লয়াররা বলছেন, যাওয়া হবে না। টিকিট-টা ক্যানসেল করাব।

আয়ূষীর বাড়িতে কে কে রয়েছেন, তার ভাই কোন কলেজে পড়ে, হাসিমারায় এবারে ভালো কমলালেবু পাওয়া যাচ্ছে কিনা—ইত্যাদি অবান্তর কথা বলতে বলতে চৌবেসাহেব ছোট ঘরটার এদিক থেকে ওদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। হাতে তুলে দেখছিলেন এটা সেটা। মনে মনে বলছিলেন, আয়ূষী এমন কোথাও নীডলটা লুকিয়ে রাখবে, যেখানে ওর প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, যতই রেডিয়েশন-প্রুফ পাত্রে রাখুক, কোনো মানুষই চাইবে না পোলোনিয়াম নীডল নিয়ে অহেতুক বেশি নাড়াচাড়া করতে।

এখন সেটাই খুঁজে বার করার। এই ঘরে এমন কী রয়েছে, যেটা আয়ূষী ব্যবহার করে না?

আধঘণ্টা কেটে গেল, চৌবেসাহেব তেমন কিছুই খুঁজে পেলেন না। বিদেশে থাকতে গেলে যেমন সামান্য কিছু জিনিস নিয়ে মানুষ দিন কাটায়, আয়ূষীও মনে হল সেইভাবেই দিন কাটাচ্ছে। অল্প কিছু জামাকাপড়, দু’জোড়া মাত্র স্লিপার, খান পাঁচেক গল্পের বই। ড্রেসিং টেবিলের বদলে দেয়ালে একটা তাক লাগানো আয়না ঝুলছে। সেই তাকে একটা সুরমাদানি, নাইট ক্রিম, ক্লিনজার আর ময়েশ্চারাইজার ছাড়া আর কিছুই নেই।

চৌবেসাহেব ভালো করে আয়ূষীর মুখের দিকে তাকালেন। ও বেরোবার জন্যে তৈরি হয়েছে। কিন্তু সাজগোজ বলতে গেলে কিছুই করেনি। হয়তো ওই ময়েশ্চরাইজারটাই একটু মুখে মেখেছে। আর কিছু না। লিপস্টিক, নেল-এনামেলের তো প্রশ্নই নেই, এমনকী কপালে একটা টিপ অবধি নেই।

কোথায় যেন একটা অসঙ্গতি রয়েছে। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও চৌবেসাহেব আবার ফিরে এসে আয়ূষীর দেয়াল-আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

আচ্ছা, সুরমা জিনিসটা এখনো চালু আছে? সুরমার বদলে এখন মেয়েরা আই-শ্যাডো, আই-লাইনার এইসব কী যেন ইউজ করে না? তাছাড়া যে-মেয়ের কসমেটিক্সের তাকে লিপস্টিক নেই, নেল-এনামেল নেই, তার কাছে সুরমা রয়েছে, এটাই তো অসঙ্গতি।

চৌবেসাহেব খুব সাবধানে সুরমাদানিটা হাতে তুলে নিলেন। ছোট্ট একটা রুপোর কলসির মতো পাত্র। কলসির মুখে ময়ূরপুচ্ছের মতো ফিলিগ্রির কাজ করা ঢাকনা। চৌবেসাহেবের মনে পড়ল, তাঁর স্ত্রীয়েরও এরকম একটা সুরমাদানি ছিল। ওই পেখমের মতো ঢাকনাটাকে প্যাঁচ দিয়ে খুলে ফেললে দেখা যাবে, ভেতরে একটা রুপোর কাঠি লাগানো রয়েছে। রুপোর কাঠিটা কলসির সুরমার মধ্যে ডুবে থাকে। কোথাও বেরোতে হলে, অন্য সব সাজগোজের শেষে ওই কাঠির গায়ে লেগে থাকা সুরমা হালকা করে চোখের পাতায় টেনে দিত পারমিতা, তাঁর স্ত্রী।

এই সুরমাদানিটাও ঠিক পারমিতার সুরমাদানিটার মতোই, কিন্তু অনেক বেশি ভারী। দস্তা ধাতুটার ওজন খুব বেশি। ওপরে রুপোর মতো পালিশ করে রাখলেও ওজনকে লুকোনো যায় না।

সুরমাদানিটা হাতে নিয়ে চৌবেসাহেব আবার আয়ূষীর চোখের দিকে তাকালেন। ওই সপ্রতিভ চোখদুটোতে এখন স্পষ্ট ভয়। কিন্তু চৌবেসাহেব ভয় খুঁজছিলেন না। তিনি খুঁজছিলেন, সুরমার চিহ্ন। না, নেই। তিনি নিশ্চিত, আয়ূষী কোনোদিনই চোখের পাতায় কোনো প্রসাধনী ব্যবহার করেনি। সুরমা তো অনেক দূরের কথা।

চৌবেসাহেব চোখের ইশারায় হাসিমারা এয়ার-বেসের সায়েন্টিস্টকে গাইগার মুলার কাউন্টারটা অন করতে বলে সুরমাদানির ভেতর থেকে রুপোর কাঠিটা বার করে আনলেন। পাগলা ঘণ্টির মতো বেজে উঠল কাউন্টারের বিপদ সংকেত।

চৌবেসাহেব বেশ জোরেই হেসে উঠলেন। রুপো নয়। পোলোনিয়াম। কাঠি নয়, নীডল।

পুলিশের জিপে উঠতে উঠতে আয়ূষী একবার ঘাড় ঘুরিয়ে উমাশঙ্কর চৌবের দিকে তাকাল।

কিছু বলবে? চৌবেসাহেব ওর দিকে দু’পা এগিয়ে গেলেন।

নাঃ। শুধু ভাবছিলাম, ক’দিন আগে থেকে যদি চোখে একটু সুরমা মাখতাম। যদি আরো কিছু কসমেটিক্স কিনে ওই আয়নার সামনে রেখে দিতাম। তাহলেও কি আপনি ধরতে পারতেন?

চৌবেসাহেব বললেন, না। পারতাম না।

বিনায়ক পাশ থেকে খুব কঠিন গলায় বলে উঠল, আপনি নিজেকে চেনেন না স্যার। তখনো পারতেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%