প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
“আপনাকে আজ রাত্রেই ধীরে সুস্থে বলব ভেবেছিলাম। কিন্তু ঘটনা যে দিকে মোড় নিয়েছে তাতে আপনাকে আর অপেক্ষা করিয়ে লাভ নেই।” আমরা চিত্তরঞ্জন পার্কের একটা চায়ের দোকানে এখন বসে। জটায়ুর মূহ্যমান ভাবটা এখনও ঠিক কাটেনি, ফেলুদার কথায় এবার একটু নড়েচড়ে উঠলেন। “কী ব্যপার বলুন তো ফেলুবাবু?”
ফেলুদার থেকে জয়পুরের টিয়ার ঘটনাটা শোনার পরে লালমোহনবাবু বেশ অবাকই হলেন। “কিন্তু মশাই, আপনি তো কেসটা বলতে গেলে হাতেই নেননি। অকুস্থলে গিয়েই উঠতে পারলেন না, অথচ এর মধ্যেই পেছনে লোক লেগে গেল?”
“লোক যে লেগেছে সেটা পরিষ্কার, কিন্তু কখন থেকে লেগেছে সেটাই প্রশ্ন।”
“তার মানে বলছেন আমরা হোটেল থেকে বেরনো ইস্তক ফলো করছিল?”
ফেলুদা মাথা নাড়ল, “লোকটাকে এক ঝলকই দেখতে পেয়েছিলাম। দূর থেকে মনে হল একটা ট্যুইডের জ্যাকেট পরেছিল। হোটেল থেকে বেরনোর সময় এরকম কাউকে চোখে পড়েনি। হতেই পারে যে ফলো করছিল তার চোখে ধুলো দেওয়ার অসীম ক্ষমতা। যদি না...”
“যদি না কী মশাই?”
“কলকাতা থেকেই পিছু নিয়ে থাকে।”
লালমোহনবাবু কপালের ঘাম মুছে বললেন, “বলেন কী? ক্ক-কলকাতা থেকেই?”
ফেলুদা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল, “সম্ভব সবই। আমাকে আরও একটা জিনিস ভাবাচ্ছে।” বলে চুপ করে গেল।
আমি আর লালমোহনবাবু দুজনেই তাকিয়ে আছি বুঝতে পেরে তারপর অবশ্য মুখ খুলল, “জয়সওয়াল কেন এলেন না।”
আমি অবাক। জয়সওয়ালেরও তাহলে কুতব মিনারে আসার কথা ছিল?
“সকালে উনিই তো সাজেস্ট করলেন। বললেন দিল্লীর ওই দিকটাই একটু নিরিবিলি আছে, আর দুপুরের দিকে একটু কম লোক থাকে।” বলল ফেলুদা।
আমি বললাম, “আর কী বললেন জয়সওয়াল?”
“বেশি কিছু নয়, তবে গলাটা শুনে মনে হল বেশ ঘাবড়ে আছে। আমাকে বললেন যোশীর সঙ্গে মিট করানোর আগে উনি আলাদা করে আমার সঙ্গে দেখা করতে চান, কিছু জরুরি কথা আছে। ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। দেখি, হোটেলে ফিরে আবার ফোন করতে হবে।”
লালমোহনবাবু এতক্ষণে একটু চাঙ্গা হয়েছেন বলে মনে হল। হাসি হাসি মুখে বললেন, “আপনি রহস্যকে ছাড়তে চাইলেও মশাই রহস্য আপনাকে ছাড়বে না। আপনার কাছে যদিও এ রহস্য নস্যি। চুরির মাল ফেরত পেতে বেশি সময় লাগবে না।”
ফেলুদা চারমিনারে আগুন ধরাতে ধরাতে বলল, “আপনার মুখে আবার খাবো দেদার পড়ুক, সিধুজ্যাঠাকে আশাহত হতে দেখলে সত্যিই খারাপ লাগবে।”
চায়ের দোকান থেকে বেঙ্গলি অ্যাসোশিয়েশনের অফিস কাম পুজোর জায়গাটা হেঁটে আরও মিনিট দশেক মতন। লালমোহনবাবু ওই দশ মিনিট হাঁটতে গিয়ে একেবারে ছেলেমানুষের মতন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে শুরু করলেন। শুরু হয়েছিল ‘কমলা ভাণ্ডার’ নামের একটা মুদির দোকানে দশকর্মার জিনিসপত্র দেখে। তারপর ‘বেঙ্গল স্যুইটস হোম’-এ রসগোল্লা আর পান্তুয়ার সাজানো ট্রে দেখে বেজায় খুশি হলেন। শেষে বৈকালিক মাছের বাজারে ঢাউস ঢাউস রুই আর কাতলা মাছ কাটা হচ্ছে দেখে উত্তেজনার চোটে ফেলুদার জামার আস্তিন ধরে বললেন, “বাঙালিরা করেছে কী মশাই? পুরো দিল্লী তো আমাদেরই দখলে।”
ফেলুদা বলল, “তাও তো দুর্গাপুজোর কথাটাই বাদ গেল। তবে দিল্লীর পুজো শুধু বাঙালির নয়, সেটা মনে রাখা দরকার।”
আজকে পঞ্চমী, কিন্তু শনিবার পড়েছে বলে পুজোর জায়গায় মেলা লোক। লালমোহনবাবু গিয়ে হাজির হতে বেশ সাড়াই পড়ে গেল। বাঙালি অ্যাসোসিয়েশনের তরফ থেকে যিনি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তিনি লালমোহনবাবুর পূর্বপরিচিত, নাম সৌরাংশু সিংহ। সৌরাংশুবাবু দুহাত জড়ো করে বললেন, “স্বনামধন্য গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্র আমাদের পুজোয় এসেছেন, এটা ভাবাই যাচ্ছে না।”
ফেলুদা নমস্কার ফিরিয়ে বলল, “আমি যে গোয়েন্দা সে কথা আপনি জানলেন কী করে? লালমোহনবাবু বলেছেন নাকি?”
“কী বলছেন মশাই, আপনি এখানে লালমোহনবাবুর মতনই সেলিব্রিটি। আনন্দবাজারটা আমরা সবাই পড়ি এখানে। হ্যাঁ, সকালের টাটকা খবর পেতে পেতে সন্ধ্যা হয়ে যায়, কিন্তু তাও পড়া চাই। রেসকোর্সে খুন বলুন বা উইলিয়াম ড্যানিয়েলের ছবি চুরি — রিসেন্ট টাইমসে যা যা কেস আপনি সলভ করেছেন, তা আমাদের মুখস্থ।”
ফেলুদা একটা বিব্রত হাসি দিতে যাচ্ছিল, আচমকা কিছু একটা মনে পড়ায় সৌরাংশুবাবুকে বলল, “ওহ হো, একটা কথা ছিল। অনুকূল ভদ্র নামে কাউকে চেনেন কি? দিল্লীতে বছর দশেক হল আছেন।”
সৌরাংশুবাবু আশ্চর্য হয়ে বললেন, “অনুকূলদার সঙ্গে আপনার আলাপ আছে নাকি? আমার তো ধারণা ছিল বেঙ্গলি অ্যাসোশিয়নের লোকজন ছাড়া কেউই ওনাকে চেনেন না। উনি তো এখানেই আছেন এখন।”
বলে সৌরাংশুবাবু ভেতরের দিকে তাকিয়ে হাঁক ছাড়লেন, “অনুকূলদাকে একটু পাঠিয়ে দাও তো এদিকে। বলো ওনার সঙ্গে দেখা করতে কয়েকজন ভদ্রলোক এসেছেন।”
সৌরাংশুবাবুর কথা শুনে আমি আর লালমোহনবাবু দুজনেই বেশ চমকেছি। ফেলুদা শান্ত স্বরেই জিজ্ঞাসা করল, “দিল্লীর বাঙালিরা তাহলে মোটামুটি সবাই সবাইকে চেনেন?”
সৌরাংশুবাবু হেসে ফেললেন, “আজ্ঞে তা ঠিক নয়। তবে অনুকূলবাবু আমাদের সম্মানীয় সদস্য, প্রায় সাত-আট বছর হল অ্যাসোশিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত।”
ভেতর থেকে একটি ছেলে এসে খবর দিয়ে গেল অনুকূলবাবু কী কাজে ব্যস্ত আছেন, আসতে একটু দেরি হবে। সৌরাংশুবাবু বললেন, “আপনারা ততক্ষণ একটু বিশ্রাম নিন। অনুকূলদা বোধ হয় কালকে আমাদের যে নাটকটা হবে তার সাজসজ্জার তদারকি করছেন।”
ফেলুদা বলল, “ততক্ষণে বরং প্রতিমা দেখে আসা যাক।”
একচালার প্রতিমাটা বেশ লাগল আমার। অবশ্য শুধু মূর্তি নয়, আন্তরিকতার দিক থেকেও এখানে একটা ঘরোয়া ব্যাপার খুঁজে পেলাম। আজকে যদিও অ্যাসোশিয়েশনের সদস্যরা বেশি ব্যস্ত সাহিত্যমেলার ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
লালমোহনবাবু যে দিল্লী নিয়ে থরোলি ইম্প্রেসড সেটা বেশ বোঝা গেল, যখন উনি বললেন, “অসুরকে কী রকম তেজীয়ান বানিয়েছে দেখছেন, দেখলেই মনে হয় মা দুর্গার সঙ্গে সমানে ফাইট দিয়ে যাবে। কলকাতার অসুরগুলোকে মশাই দেখলে মনে হয় সদ্য ম্যালেরিয়া থেকে উঠে এসেছে।”
“ইয়ে, এ প্রতিমা কিন্তু কুমোরটুলির শিল্পীরাই বানিয়েছেন। প্রত্যেকবারই ওনারা দিল্লীতে এসে প্রতিমা বানিয়ে দিয়ে যান।”
পেছন থেকে কথাগুলো ভেসে আসতে ঘুরে দেখি হাই পাওয়ারের চশমা পরা এক ক্লিন শেভড ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। আমাদের দেখে হেসে বললেন, “নমস্কার, আশা করি কিছু মনে করেননি আগ বাড়িয়ে কথা বলার জন্য।”
“মনে করার কোনও প্রশ্নই নেই, তবে এ অসুর কলকাত্তাইয়া শুনে আমার বন্ধুটি সম্ভবত নিরাশ হয়েছেন। আপনার পরিচয়টা?”
ভদ্রলোক হাসলেন, “আমার নাম হয়তো আপনারা সিদ্ধেশ্বরবাবুর থেকে শুনে থাকবেন, অনুকূল ভদ্র।”
“অফ কোর্স, আমি তো ভাবছিলাম আজকে রাত্রেই না একবার আপনার কাছে যেতে হয়।”
ভদ্রলোক একটু আশ্চর্য হলেন, “আমার কাছে? কোনও দরকার ছিল কি?”
ফেলুদা বলল, “তার আগে বলুন তো আপনি কি শুনেছেন জয়পুরের সেই টিয়াটি মিসিং?”
অনুকূল ভদ্র আকাশ থেকে পড়লেন, “কী বলছেন? কবে ঘটল এ কাণ্ড? আমি তো কিছুই জানি না।”
“পবনদেও বা মাধবরাও কেউই তাহলে আপনাকে এ ব্যাপারে কিছু জানাননি?”

“নাহ্, ইন ফ্যাক্ট সিদ্ধেশ্বরবাবুর কাছে ওরা যাওয়ার পর থেকে আর কোনও কথাই হয়নি।”
“হুম।”
ফেলুদা আর কিছু বলল না দেখে অনুকূলবাবু জটায়ুর দিকে ঘুরে বললেন, “আপনার বক্তৃতা শোনার জন্য কিন্তু মুখিয়ে আছি মশাই।”
লালমোহনবাবু হাসতে যাচ্ছিলেন, আচম্বিতে মুখটা কী রকম শুকিয়ে গেল। আমি জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি কী হয়েছে, এমন সময়ে সৌরাংশু সিংহ এসে হাজির। “এবার তাহলে প্রোগ্রামটা শুরু করি লালমোহনবাবু? আপনাকে দিয়েই শুরু, তারপর সাহিত্যপাঠের আসর শুরুর হবে।” এই সময় অনুকুলবাবুর দিকে চোখ পড়াতে বলে উঠলেন, “অনুকূলদা, কালকের নাটকের জন্য সব রেডি তো?”
“নাটক নিয়ে কোনও চিন্তা নেই ভাই, সব তৈরি। মেক আপের সরঞ্জামগুলো খালি বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে হবে কাল। তোমার নাটককে উতরিয়ে দিয়ে তবে আমার ছুটি।”
সৌরাংশুবাবু ফেলুদার দিকে হেসে বললেন, “অনুকূলদা যবে থেকে দিল্লীতে আস্তানা গেড়েছেন, বেঙ্গলি অ্যাসোশিয়েশনকে বাৎসরিক নাটক নিয়ে আর চিন্তা করতে হয় না। স্টেজ ডেকরেশন বলুন, কস্টিউম, মেক আপ সব কিছুর দায়িত্ব অনুকূলদার।”
অনুকূলবাবুকে দেখে ইস্তক আমার কী একটা অস্বস্তি হচ্ছিল, সৌরাংশু সিংহের সঙ্গে ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর ফেলুদাকে সে কথা বলতে উত্তর এল, “সিঁথি।”
যাঃ বাবা! সে আবার কী?
“ভদ্রলোকের চুলের সিঁথিটা ডানদিকে করা। আপনিও কী উলটোদিকে সিঁথি দেখেই নার্ভাস হয়ে পড়লেন লালমোহনবাবু?”
ফেলুদার কথায় একেবারে হাঁইমাই করে উঠলেন ভদ্রলোক “আরে মশাই, আমাকে যে কিছু বলতে হবে সেটাই ভুলে গেছিলাম। এখন পা কাঁপছে।”
“এটা একটা কথা হল! এত প্লট গজগজ করছে মাথায়, মিনিট কুড়ি-তিরিশ ম্যানেজ করতে পারবেন না?”
ফেলুদা যে নেহাতই মজা করছে সেটা বুঝতে জটায়ুর অসুবিধা হয়নি। তবে স্লাইট খোঁচাটা বোধ হয় ধরতে পারেননি। বিনীত স্বরে অভিযোগ করলেন, “মাঝে মাঝে এত লজ্জায় ফেলে দেন ফেলুবাবু।”
খারাপ অবশ্য বললেন না ভদ্রলোক। কিশোর-কিশোরীদের জন্য কল্পনার রাজ্য উন্মুক্ত করে দিতে রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসেরও যে অবদান আছে, সেটাই ছিল ওনার মূল বক্তব্য। শুরুতে খালি রবীন্দ্রনাথের ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা’ লাইনটা বার দুয়েক রিপিট করে হাল ছেড়ে দিলেন, বোধ হয় বাকিটা মনে ছিল না। আর শেষের দিকে ওনার আণবিক দানব উপন্যাসে আইনস্টাইনের কী প্রভাব ছিল সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আপেলগাছের কথা টেনে এনেছিলেন। আমি বক্তৃতার শেষে ভুলটা ধরিয়ে দিতে জটায়ু মোটেও মাইন্ড করলেন না, বেশ খুশ মেজাজেই বললেন, “তপেশ ভাই, আপেলটা কার মাথায় পড়েছিল সেটা আসল কথা নয়, কথাটা হল আপেলটা পড়েছিল বলেই না আইডিয়াটা এসেছিল। ভালো কথা, ফেলুবাবু কই?”
তাকিয়ে দেখি ফেলুদা অনুকূল ভদ্রের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমাদের দিকেই আসছে। এসে বলল, “হোটেল মেট্রোপলিটানে ফোন করে জয়সওয়ালকে পাওয়া গেল না। ওনার রুমে ফোন বেজেই যাচ্ছে। ভাবছি একবার হোটেলটা ঘুরেই আসি। হয়তো কোথাও বেরিয়েছেন, আমরা আসতে আসতে চলে আসবেন। অনুকূলবাবু বললেন মেট্রোপলিটান হোটেলটা গ্রেটার কৈলাশে, এখান থেকে মিনিট পনেরোর পথ। উনিও আমাদের সঙ্গে আসছেন। তাই তো, অনুকূলবাবু?”
ভদ্রলোক সাগ্রহে ঘাড় নাড়লেন, “সে কথা আর বলতে মশাই। এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে, অথচ ওরা কেউ কিছু জানাল না, ভেবে খুব অবাক হচ্ছি। আমিও একবার দেখা করে আসি।”
বাইরে বেরিয়ে টের পেলাম বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়েছে। লালমোহনবাবু দেখলাম ওনার ঝোলা থেকে একটা মাঙ্কি ক্যাপ বার করে সেটা চাপিয়ে নিলেন। অনুকূলবাবু চিত্তরঞ্জন পার্কের ভেতরের রাস্তা দিয়ে নিয়ে চললেন আমাদের।
গলিঘুঁজির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে খারাপ লাগছিল না। মাঝে মাঝে দেখলাম এক একটা বাড়ি থেকে ‘সা রে গা মা’-র আওয়াজও ভেসে আসছে। বাঙালি পাড়া বলেই বোধ হয় সন্ধের রেওয়াজের চলটা এ চত্বরেও আছে। মাঝরাস্তায় একটা চপের দোকান দেখে লালমোহনবাবু প্রায় দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। ফেলুদা ঘড়ি দেখে রায় দিল ফেরার পথে দাঁড়ালেই বেটার হয়।
সত্যিই দেখি মিনিট পনেরো হাঁটার পর আমরা গ্রেটার কৈলাশে পৌঁছে গেছি। আর সবথেকে ভালো ব্যাপার, বড় রাস্তার ওপর থেকেই হোটেল মেট্রোপলিটানের নিওন বোর্ডটা দেখা যাচ্ছে।
হোটেলের রিসেপশন থেকে ফের ফোন করা হল জয়সওয়ালের রুমে। রিসেপশনিস্ট বেশ কিছুক্ষণ রিসিভার কানে ঠেকিয়ে রেখে ঘাড় নাড়ল, এখনও ফোন বেজে যাচ্ছে।
মিনিট পনেরো কুড়ি হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করার পর লালমোহনবাবু বললেন, “এই ঠান্ডায় মশাই আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী? ভদ্রলোক যে এক্ষুনি ফিরবেন এরকমও তো জানা নেই। কালকে সকালে এসে দেখলে হয় না?”
অনুকূলবাবুও একটু অবাক, “এই শীতের রাতে গেলেন কোথায় ভদ্রলোক?”
ফেলুদার কপালে একাধিক ভাঁজ, কী ভাবছে কে জানে।
আরও মিনিট দশেক পর লালমোহনবাবু আর ধৈর্য ধরতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ভাবছেন ফেলুবাবু?”
ফেলুদা দেখি উত্তর না দিয়ে হনহন করে ফের রিসেপশনের দিকে যাচ্ছে। গিয়ে হিন্দিতে যা বলল, তার মর্মার্থ জয়সওয়াল যে অজ্ঞান হয়ে ঘরেই পড়ে নেই, এরকম কোনও গ্যারান্টি কি হোটেল ম্যানেজার দিতে পারবে? হোটেলের জানা উচিত ভদ্রলোকের কী সাঙ্ঘাতিক হার্টের প্রবলেম।
ফেলুদার গলায় এমন কিছু একটা ছিল যে, রিসেপশনিস্ট বিনা বাক্যব্যয়ে হোটেলের মাস্টার-কি নিয়ে তিনতলার জয়সওয়ালের ঘরের দিকে রওনা দিল। ফেলুদা চাপা গলায় বলল, “মিথ্যাচারণ করতে হল বটে, কিন্তু একটা দুশ্চিন্তা মনটাকে ছেয়ে ফেলছে। একবার ঘরে গিয়ে না দেখা অবধি শান্তি পাচ্ছি না।”
৩০৫ নম্বর ঘরের কাছে গিয়ে দেখা গেল দরজা বন্ধ। রিসেপশনিস্ট ভদ্রলোক বেশ কয়েকবার নক করার পরেও সাড়া না পেয়ে মাস্টার-কি দিয়ে ঘরের দরজা খুলে ফেললেন।
ভেতরটা নিকষ অন্ধকার, জানলার পর্দাগুলোও সব টানা।
লালমোহনবাবু রিসেপশনিস্ট ভদ্রলোককেও ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছিলেন, হঠাৎ “উরে বাবা... গেলুম” বলে একটা বিকট চিৎকার করে উঠলেন।
“নির্ঘাত হোঁচট খেয়েছেন। তোপসে, এদিকে আয়। মিস্টার মালহোত্রা, আপ জারা দেখিয়ে না ইয়ে সুইচবোর্ড কিস দিওয়ার পে হ্যায়।”
আলো জ্বলে উঠতে দেখা গেল লালমোহনবাবু প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন। আমরা বাকি চারজনই অবশ্য দাঁড়িয়ে পড়েছি।
লালমোহনবাবুকে দেখে নয়।
লালমোহনবাবুর পাশেই আর এক জোড়া পা দেখা যাচ্ছে। ওই পায়ে ধাক্কা লেগেই ভদ্রলোক পড়ে গেছেন।

এবং স্পষ্টতই সে পা জোড়ার মালিকের শরীরে কোনও প্রাণ নেই।
“ফেলুদা!”
“এগোস না আর। লালমোনবাবু, আপনিও উঠে আসুন।”
“লাশ! কী সর্বনাশ!” লালমোহনবাবু যদিও উঠে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু মুখের চেহারা দেখে মনে হল আবার টলে পড়ে যাবেন।
লাশই বটে, বুকের বাঁদিক থেকে উঠে থাকা ছোরার হাতলটি দেখে কোনোই সন্দেহ থাকার কথা নয়।
আমারও হার্টবিট মারাত্মক রকম বেড়ে গেছে। ফেলুদাকে জিজ্ঞাসা করলাম “জয়সওয়াল কতক্ষণ খুন হয়েছেন বলে মনে হয়?”
“পোস্ট মরটেম রিপোর্ট না আসা অবধি সেটা বোঝা যাবে না।”
“কিন্তু খুন তো উনি হননি।” বলে উঠলেন অনুকূল ভদ্র।
দেখি ভদ্রলোক ভয়ঙ্কর ফ্যাকাশে মুখে মৃতদেহর দিকে তাকিয়ে আছেন। আমাদের হতবাক মুখগুলোর দিকে নজর পড়তেই বোধ হয় সম্বিৎ ফিরল ওনার, “জয়সওয়াল নয়, এ লাশ মাধবরাও যোশীর।”
এক সেকেন্ডের জন্য মনে হল আমার হার্টবিট বন্ধই হয়ে গেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন