প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রবীনবাবুর কনস্টেবলরা অনুকূলবাবুকে নিয়ে গেছে ওনার বাড়িতেই, সেখানে খানাতল্লাশি হওয়ার পর যাবে হোটেল মেট্রোপলিটান।
আমরা এখন দিল্লীর বাঙালি অ্যাসোশিয়েনের অফিসঘরে বসে। আমরা তিনজন ছাড়াও আছেন রবীনবাবু এবং সৌরাংশু সিংহ। সৌরাংশু সিংহ শুনে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। “এ তো মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া খবর মশাই। কে বিশ্বাস করবে অনুকূল ভদ্র খুনী আসামী? আমরা তো ওনাকে শিল্পী মানুষ বলেই জানতাম। তা ছাড়া আড্ডাবাজও ছিলেন, প্রত্যেক বছর নাটক মঞ্চস্থ করতে সাহায্য করতেন।”
ফেলুদা সৌরাংশুবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “যার কথার সূত্রে এই কেসে আমার জড়িয়ে পড়া, সেই সিদ্ধেশ্বর বোস ওরফে আমার সিধুজ্যাঠা জানিয়েছিলেন অনুকূল ভদ্র বরোদার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ছিলেন। কিন্তু আচমকা রিটায়ারমেন্ট নিয়ে দিল্লীতে এসে সেটল করেন। আজ কলকাতায় আমার এক বন্ধুকে ফোন করে জানতে পারি অনুকূল ভদ্র বরোদা এমনি এমনি ছাড়েননি। বরোদার পুলিশে খাতায় ওনার নাম উঠেছিল স্মাগলিং-এর কারণে।”
“স্মাগলিং?” চমকে উঠলেন সৌরাংশুবাবু।
“হ্যাঁ, আর্ট আইটেম স্মাগলিং। তবে অনুকূলবাবু আর্ট স্মাগলার ছিলেন না। আমার ধারণা ওনাকে এই স্মাগলিং চক্রের চাঁই মোটা টাকার অফার দিয়েছিল একটি চোরাই মাল বেচে দেওয়ার জন্য। প্রফেশনাল কারণেই ভদ্রলোকের বহু বিদেশী আর্ট কালেক্টরের সঙ্গে আলাপ ছিল। অনুকূলবাবু জানতেন না যে জিনিসটি চোরাই, ভেবেছিলেন উনি স্রেফ মিডিয়েটরের কাজ করছেন। এবং এই ভেবে না জেনেই জড়িয়ে পড়েছিলেন এই চক্রের সঙ্গে। ওনার দুর্ভাগ্য যে বরোদা পুলিশ এই চোরাই মালের কারবারটি ধরে ফেলে। যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে আদালতে ওনার এগেন্সটে কেস টেঁকেনি, কিন্তু ওনার চাকরিটি যায়। বলা বাহুল্য যে, ভদ্রলোকের কলিগ এবং বন্ধুরাও ওনাকে একঘরে করেন। ফলে বরোদার পাট উঠিয়ে চলে আসতে হয় ওনাকে।
“ভালো কথা, এই স্মাগলিং চক্রের চাঁইটিকে কিন্তু আপনারা চেনেন।”
ফেলুদা দম নেওয়ার জন্য একটু থেমেছিল, আমি সেই ফাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, “মাধবরাও যোশী?”
“ভেরি গুড তোপসে, হ্যাঁ মাধবরাও যোশী-ই। সেই যোশী, যে দিল্লী এলেই কালীবাড়ি ছুটত। হুডিনির কথাটা মনে পড়ছে তোর?”
আমি ঘাড় নাড়লাম। সত্যিই, যে যত ভণ্ড তার ভক্তিও তত বেশি।
“বরোদার পাট চুকিয়ে দিল্লী আসার পরেও যোশীর সঙ্গে অনুকূল ভদ্রের যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি। সম্ভবত যোশীর কথাতেই ওনার দিল্লী আসা। যোশীর এনে দেওয়া আর্ট আইটেম বিক্রি করেই ওনার থাকা-খাওয়ার খরচ উঠে আসত। অনুকূলবাবুকে জিজ্ঞাসা করলে সবই জানা যাবে। তবে আমার ধারণা এগুলো চোরাই মাল নয়।”
রবীনবাবু বললেন, “তার মানে বলছেন বরোদার ঘটনা নিয়ে যোশী এবং অনুকূল ভদ্রের মধ্যে কোনও মনোমালিন্য ঘটেনি?”
“মনোমালিন্য ঘটেনি। কিন্তু সেটা অনুকূলবাবু কিছু বুঝতে দেননি বলেই। যোশীর শয়তানিতে অনুকূল ভদ্রের জীবন প্রায় শেষ হয়ে গেছিল, উনি চরম প্রতিহিংসা নেবেন বলে ঠিকই করে রেখেছিলেন। খালি সুযোগ খুঁজছিলেন সঠিক সময় এবং সুযোগের। এদিকে যোশীর সময়ও ভালো যাচ্ছিল না, সেও একটা মোটা দাঁও মারার অপেক্ষায় ছিল। এমন সময়ে যোশীকে অজান্তে প্ল্যান দিয়ে বসলেন লালমোহনবাবু।”
লালমোহনবাবুকে দেখে মনে হল দুষ্কর্মটি করার জন্য তিনি সত্যিই লজ্জিত। সৌরাংশু সিংহ ঘটনাটা জানতেন না, তাঁকে বলার পর এতক্ষণে মুখে হাসি ফুটে উঠল।
“যোশীর এবারের আর্ট আইটেমটি দেখে অনুকূলবাবুর প্রথম থেকেই সন্দেহ হয়। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়, যখন যোশী ওনাকে স্পেশ্যালি আমেরিকান আর্ট কালেক্টরদের অ্যাপ্রোচ করতে বলে। অনুকূলবাবু নিজেও তিন নম্বর টিয়ার কথা বিশ্বাস করেননি। ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানের গল্পটা যোশীরই বানানো, অনুকূল সেটা বুঝেওছিলেন। কিন্তু যোশীকে কিছু না বলে তিনি একটা ডিটেইলড প্ল্যান ভাঁজেন। নিয়ে আসেন তাঁর নতুন অবতার পবনদেও জয়সওয়ালকে, যে নাকি জয়পুরের মহারাজার ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানের বংশধর। যোশীকে সম্ভবত বুঝিয়েছিলেন যে, পুরনো ঘটনার জন্যই অনুকুল ভদ্রকে তিনি সবার চোখের আড়ালে রাখতে চান। যোশীর স্বভাবতই আপত্তি করার কিছু ছিল না।”
“কিন্তু টিয়াটা জয়সওয়াল চুরি করলেন কখন?” জিজ্ঞাসা করলেন জটায়ু।
“টিয়া তো চুরিই হয়নি মশাই।”
লালমোহনবাবু হাঁ করে তাকিয়ে আছেন দেখে ফেলুদা বলল, “সে কথাতেই আসছিলাম। কলকাতা থেকে ফিরে আসার পর অনুকূল ভদ্র জয়সওয়াল সেজে ফের ফোন করেন সিধুজ্যাঠাকে। সিধুজ্যাঠার পক্ষে অফ কোর্স এত কিছু জানা সম্ভব নয়। তিনি চুরির কথা সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করলেন, অথচ সেই টিয়া তখন বহাল তবিয়তে যোশীর কাছেই আছে।”
সৌরাংশু সিংহ এবার হাত তুলে বললেন, “কিন্তু যেচে একজন গোয়েন্দাকে এর মধ্যে টেনে আনার কারণ কী মিত্তির মশাই?”
“এটাই তো অনুকূল ভদ্রর সবথেকে বড় চাল। তিনি খুনের মোটিভটা দেখাতে চেয়েছিলেন লোভ। যোশীকে খুন করে জয়সওয়াল উধাও হলে প্রথমেই মোটিভের প্রশ্ন আসবে। রাজধানী এক্সপ্রেসে চুরির ঘটনাটা থাকলে সেখানে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ব্যক্তিই চুরি করে থাকুক, জয়সওয়ালের তার সঙ্গে সাঁট ছিল। সিধুজ্যাঠাকে যে গল্পই দুজনে বলে আসুক না কেন, অনুকূল জানতেন যে, তদন্ত শুরু হলে এ কথা প্রকাশ পাবেই যে টিয়াটা কেনার কথা ছিল জয়সওয়ালের। সিধুজ্যাঠাকে যদিও বলা হয়েছে জয়সওয়াল সেই চিকিৎসকের বংশধর, কিন্তু তদন্ত শুরু হলে দেখা যাবে সেটা ভুয়ো খবর। তাহলে এই জয়সওয়াল আসলে কে? কোনও একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি, যে যোশীকে ঠকিয়ে এবং খুন করে পালিয়েছে।”
ঘরে দমবন্ধ করা উত্তেজনা, জটায়ুর কপালে দেখলাম বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
“কিন্তু অনুকূল তো খুন করছেন স্রেফ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য, টিয়া তিনি পেলেন কি পেলেন না সেটা ম্যাটার করে না।”
ফেলুদা এবার থেমে আমার আর জটায়ুর দিকে তাকিয়ে বলল, “সোলাঙ্কির বাড়ি কলকাতায় হওয়া সত্ত্বেও যোশী ওকে কেন দিল্লী আসতে বলেছিল বল দেখি? টাকাটা তো সে সোলাঙ্কিকে কলকাতায় দিলেই পারত।”
আমি বোকার মতন মাথা নাড়লাম, সত্যিই কোনও উত্তর নেই আমার কাছে।
ফেলুদা বলল, “দুঃখ করিস না, এটা যে একটা ইম্পরট্যান্ট পয়েন্ট সেটা আমার মাথাতেও আসেনি। আজ সকালে দেবরাজ বলল দিল্লীতে নাকি গত শুক্রবার থেকে এক বিশাল আর্ট কনভেনশন শুরু হয়েছে, দেশ বিদেশের অসংখ্য আর্ট কালেক্টর সেখানে এসেছেন।”
“যোশী এই কনভেনশনটাকেই টার্গেট করেছিল। প্ল্যান ছিল এখানেই কোনও বিদেশী আর্ট কালেক্টরকে টিয়াটা বেচে দিয়ে সোলাঙ্কি এবং অনুকূলকে তাদের টাকার ভাগ দিয়ে দেবেন। অনুকূল অবশ্য সোলাঙ্কির ব্যাপারে কিছু জানতেন না।”
“আচ্ছা, কুতব মিনারে তাহলে আমাদের ভয় কি অনুকূলই দেখিয়েছিলেন?”
“সে কথা আর বলতে। অবশ্য তখন উনি ছিলেন জয়সওয়ালের অবতারে। একটা রিস্ক অবশ্যই নিয়েছিলেন। কিন্তু চুরির মোটিভটাকে শক্ত করার জন্যই এই রিস্ক নেওয়া। মনে করে দেখুন সেই হুমকি চিরকুটে কি লেখা ছিল?”
“রবীনবাবু, অনুকূল ভদ্রের বাড়ি থেকে একটা ট্যুইডের জ্যাকেট পাওয়ার কথা আপনাদের। জয়সওয়াল ওটা পরেই মেট্রোপলিটান হোটেল থেকে কুতব মিনার গেছিলেন আমাদের ভয় দেখাতে।” বলল ফেলুদা।
সৌরাংশু সিংহ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লেন, “কী শক্ত নার্ভ মশাই। জলজ্যান্ত একটা খুন করে এসে আপনাদের ভয় দেখালেন। তারপর পুজোর এখানে এসে সারাদিন কাটালেন, এমনকী পরের দিন নাটকের মঞ্চসজ্জা-মেকআপ সব কাজই করে দিলেন।”
“খুনের দিনক্ষণ অনেক আগে থেকেই ঠিক হয়ে গেছিল সৌরাংশুবাবু। সিধুজ্যাঠার ফোনে আসা খবরটা ওনাকে একটা বাড়তি অ্যাডভান্টেজ দিয়েছিল মাত্র। দ্বিতীয়বার বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলে অনুকূল ভদ্র যোশীকে ডিসট্র্যাক্ট করে দেন, ফলে যোশীর অসতর্ক মুহূর্তে ওর বুকে ছোরা বসাতে আরোই সুবিধা হয়ে যায় অনুকূলের।”
“ভালোই আটঘাট বেঁধেই কাজে নেমেছিলেন ভদ্রলোক।” বললেন জটায়ু।
“বিলক্ষণ। শনিবার দিন জয়সওয়াল আর যোশীর একসঙ্গেই আর্ট কনভেনশনে যাওয়ার কথা ছিল। জয়সওয়াল যোশীকে খুন করে টিয়া পাখিটা নিয়ে ফের অনুকূল ভদ্র হয়ে গেলেন। যদিও টিয়া বিক্রি করার কোনও ইচ্ছে ওনার ছিল না। প্ল্যান ছিল প্রথম সুযোগেই এ শহর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া। শনিবারে খুন, রবিবারে নাটক। আর আজ, অর্থাৎ সোমবার দিনই ওনাকে বেরোতে হত।”
“কিন্তু ফেলুদা, উনি যে হাওড়া রাজধানীতেই যাবেন সেটা তুমি জানতে?”
“এটা নেহাতই অনুমান। সবুজ তোতাকে নিয়ে নতুন কোন শহরেই বা আচম্বিতে হাজির হতেন অনুকূলবাবু? সেফ অপশন হল কলকাতায় ফিরে যাওয়া। সমস্ত অতীত ভুলে, নিজের শহরেই আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চাইছিলেন ভদ্রলোক। আর অত দামি একটা জিনিস নিয়ে সাধারণ কোনও ট্রেনে চড়বেন বলে মনে হয়নি আমার।”
জটায়ু শেষ কয়েক মিনিটে একটু কিন্তু কিন্তু ভাব করছিলেন। এবারে খানিকটা মরীয়া হয়েই বলে ফেললেন, “ফেলুবাবু সেই টিয়াটা একবার দেখা যাবে না?”
“যাবে বইকি। থানায় নিয়ে যাওয়ার আগে আপনাদের দেখাব বলেই তো এটা বয়ে নিয়ে এলাম।” বলে উঠলেন রবীন তরফদার। ওনার হাতে জয়সওয়ালের সেই অ্যাটাচি কেস। কম্বিনেশন লকের নম্বর অনুকূল ভদ্রই বলে দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী পর পর নম্বর ডায়াল করে একটা মোক্ষম মোচড় দিতেই খুলে গেল অ্যাটাচি কেস।
রবীনবাবুর হাতে অবশেষে উঠে এসেছে রুবি-আইড প্যারট। সবুজ টিয়ার ডানায় বসানো হিরের সারি ঝিকমিক করে উঠল, আর আধো অন্ধকার ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল এক অপার্থিব সবুজ আভা। ফেলুদার দৌলতে আমি জানি এ সেই ময়সেনাইট, কত আলোকবর্ষ দূর থেকে উল্কায় করে একদিন এসে পড়েছিল পৃথিবীর বুকে।
ফেলুদা ফিসফিস করে বলল, “প্রাণ ভরে দেখে নে তোপসে, এ জিনিস দেখার আর স্কোপ পাবি না।”
আমাদের সবার চোখই উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছে। জ্বলজ্বল করছে টিয়ার চোখ দুটোও, সেও বোধ হয় জানে একশ বছরের পুরনো আস্তানাতে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে এবার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন