প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
সিধুজ্যাঠা বাড়িতেই ছিলেন, বিশেষ দরকার না পড়লে এমনিতেও পারতপক্ষে ঘর ছেড়ে নড়েন না। আমরা দিল্লী যাচ্ছি শুনে প্রায় চোখ কপালে তুলে বললেন, “একেই বলে সমাপতন। আজকেই ভাবছিলাম ফেলুরামের বাড়িতে একবার যাওয়া দরকার, আর ভাবতে না ভাবতেই তোমরা এসে হাজির। দরকারটা যে দিল্লী যাওয়া নিয়েই।”
ফেলুদা একটু হেসে বলল, “উলটোটাই সাধারণত হয়ে থাকে বলে মনে হচ্ছে একটা আরজেন্সি আছে। তাই কী?”
“আরজেন্সি তো বটেই। আর তুমি ছাড়া এ সমস্যার সমাধান কেউ করতে পারবে বলে মনে হয় না, তোমার হাতে সময় আছে কিনা সেটা জানাটাও খুব জরুরি।”
“নিশ্চয়, আপনি বলুন কী সমস্যা।”
সিধুজ্যাঠা তক্তপোশে বসতে বসতে বললেন, “তার আগে বলো জয়পুরের রুবি-আইড প্যারট-এর নাম শুনেছ কিনা?”
“নাহ, সেরকম তো কিছু খেয়াল পড়ছে না।”
“১৮৭৩ সালে জয়পুরের মহারাজের জন্য এই টিয়া বানিয়েছিলেন প্যারিসের এক মণিকার। মহারাজার কালেকশনের স্টার আইটেম এই রুবি-আইড প্যারট। এর পুরো শরীরটাই প্রায় নিখাদ সোনা দিয়ে বানানো। চোখ, ঝুঁটি আর পাখায় বসানো রয়েছে দুর্মূল্য রুবি। পান্নাসবুজ এনামেলের কারুকাজ রয়েছে পুরো শরীরটায়। টিয়াপাখি বসে আছে একটা ডালের ওপরে, আর তার মুখে ধরা একটা ফুল। এগুলোতেও হিরে, পান্না, রুবির ছড়াছড়ি। টিয়াপাখিটি দেখে মহারাজের এতই ভালো লেগে যায় যে, তিনি সেই ফরাসি শিল্পীকে দিয়ে আর এক পিস বানিয়েছিলেন। তো দুখানা টিয়ার মধ্যে একটি এখনও জয়পুরের প্যালেসেই আছে, অন্যটি গেছে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়মে।”
“আমার এই বিষয়ে একটু পড়াশোনা ছিল বলে দু বছর আগে একটা আর্ট জার্নালে এই টিয়াপাখিদের নিয়ে বিশদে লিখি। তখন কিছু চিঠিপত্র পেয়েছিলাম। কিন্তু ওই পর্যন্তই, তারপর সে নিয়ে আর বিশেষ কোনও চর্চার কারণ ঘটেনি। কয়েক মাস আগে হঠাৎই আমি দিল্লী থেকে একটি ট্রাঙ্ককল পাই, ফোনটি যিনি করেছিলেন তাঁর নাম অনুকূল ভদ্র।”
ফেলুদা মাঝখানে বলল, “অনুকূল ভদ্র নামটা কীরকম চেনা চেনা ঠেকছে।”
“চেনা চেনা ঠেকতেই পারে। এককালে বরোদার সয়াজিরাও ইউনিভার্সিটির ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর ছিলেন, বেশ নাম-টামও হয়েছিল। তারপর খানিকটা আচমকাই রিটায়ারমেন্ট নিয়ে চলে যান, কোথায় যে চলে যান কেউ জানত না। এই এবারে ফোনে বলল, এখন ও দিল্লীতে থাকে। আমার আগের পাড়াতেই ওর বাড়ি ছিল, কিন্তু ওকে শেষ দেখেছি তা প্রায় বছর দশেক তো হবেই।”
“অনুকূল আমাকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল, বুঝলে। বলল জয়পুরের মহারাজার জন্য আরও একটি টিয়া বানানো হয়েছিল, এরকম কোনও খবর আমার কাছে আছে কিনা।”
“মানে তিন নম্বর টিয়া?”
“একজ্যাক্টলি সো, তিন নম্বর টিয়া। আমি অনুকূলকে বললাম আমার কাছে এরকম কোনও খবর নেই, আমি যতদূর জানি দুটো টিয়াই বানানো হয়েছিল। ওকে আমার লেখাটার রেফারেন্সও দিলাম। বলল, লেখাটা পড়েছিল বলেই আমাকে ফোন করেছে।”
“যাই হোক অনুকূল তারপর ফোন রেখে দিল, আমিও টিয়ার কথা ভুলে গেছি। তারপর হঠাৎ হপ্তাখানেক আগে আবার তার ফোন। বলল, দুজন ভদ্রলোককে আমার কাছে পাঠাচ্ছে কী এক আর্জেন্ট দরকারে। দুদিন পরেই তারা এসে হাজির — একজনের নাম পবনদেও জয়সওয়াল আর অন্যজন মাধবরাও যোশী। যোশীর হাতে একটা অ্যাটাচি কেস।
“বললে বিশ্বাস করবে না। সেই অ্যাটাচি কেস থেকে কী বেরোল জানো? তিন নম্বর টিয়া। আমি তো দেখে থ।”
ফেলুদা জিজ্ঞাসা করল, “টিয়াটি উদয় হল কোথা থেকে?”

“সে কথাতেই যাচ্ছি। মাধবরাও যোশী গুজরাটের একজন আর্ট কালেক্টর এবং পেশার খাতিরে অনুকূলের পূর্বপরিচিত। ছমাস আগে উদয়পুরে ঘুরতে গিয়ে এই টিয়ার খবর পান পবনদেও জয়সওয়ালের কাছে। জয়পুরের মহারাজার পার্সোনাল ফিজিসিয়ানের বংশধর হলেন এই পবনদেও জয়সওয়াল।
পবনদেও জানালেন মহারাজার চিকিৎসক অন্তত দুবার ওনাকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মহারাজ তাই তিন নম্বর টিয়াটি সেই চিকিৎসকের হাতে তুলে দেন। জয়পুরের রাজা মারা যাওয়ার পর তিনি উদয়পুরের মহারাজার কাছে চাকরি নিয়ে চলে যান। পবনদেওর রিয়াল এস্টেটের বিজনেসে মন্দা চলছে বলে টিয়াটি যোশীর কাছে বেচতে চান। কিন্তু বুঝতেই পারছ টিয়া আসল কিনা সেটা আগে ভেরিফাই করা দরকার। যোশী তাই অনূকুলের সাজেশনে জয়সওয়াল এবং টিয়া দুজনকে নিয়েই আমার কাছে ভেরিফাই করতে চলে এসেছেন। সোনাদানা খাঁটি কিনা সে তো যে কোনও স্যাকরাই বলে দেবে। কিন্তু আসল কথাটা হল প্যারিসের সেই শিল্পীই এই টিয়া বানিয়েছিলেন কিনা সেটা জানা দরকার।”
“পেলেন প্রমাণ?”
“দাঁড়াও, তোমাকে সে টিয়ার একটা ছবি দেখাই। জয়সওয়ালই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।” তক্তপোশে রাখা গাদাখানেক বইয়ের একটার ভেতর থেকে সিধুজ্যাঠা একটা ফটোগ্রাফ টেনে বার করলেন, “ফেলু, ওদিক থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা দাও তো।”
কালারড ছবিতেই টিয়া পাখিকে দেখে আমার মাথা প্রায় ঘুরে যাচ্ছিল, এরকম চোখধাঁধানো শিল্পকর্ম আমি আগে দেখিনি। টিয়ার দুটো চোখের রুবিগুলো ছবিতেও যেন ঝলসে ঝলসে উঠছে, ডানায় অর্ধচন্দ্রাকারে সার দিয়ে বসানো হিরেগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে এ জিনিস অমূল্য।
টিয়াপাখির মুখে ধরা যে ফুল তার ওপর এবার ম্যাগনিফাইং গ্লাস ফেললেন সিধুজ্যাঠা, “কিছু দেখতে পাচ্ছ ফেলু?”
“পেয়েছি। ফুলের তিনটি পাপড়ির ওপর সোনার জলে তিনটি ইংরেজি অক্ষর খোদাই করা – এইচ, এম, ভি। খুবই ছোট করে খোদাই করা যদিও।”
“ফ্যান্টাসটিক। এই এইচ এম ভি-র মানে কিন্তু হিজ মাস্টার্স ভয়েজ নয়। এই তিন আদ্যক্ষরের মানে হেনরিয়েটা মারিয়া ভিনসেন্ট।”
ফেলুদা একটু অবাক হয়ে বলল, “শিল্পী তাহলে মহিলা ছিলেন?”
“উঁহু, হেনরিয়েটা মারিয়া ছিলেন শিল্পীর স্ত্রী। জয়পুরের মহারাজা নিজেই অনুরোধ করেছিলেন শিল্পীকে তাঁর নামের আদ্যক্ষরগুলো কাজটিতে রেখে দিতে। ভদ্রলোক নিজের নামের জায়গায় তাঁর স্ত্রীর নামটি অমর করে দিয়ে গেছেন। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষই শিল্পীর এই কেরামতির খবরটুকু রাখেন।”
“এ তো বিশাল খবর! তাহলে মাধবরাও যোশী এই তৃতীয় টিয়ার বর্তমান মালিক?”
সিধুজ্যাঠা বসে পড়লেন, “সেখানেই যে সমস্যা ফেলু, জিনিসটা থাকলে তবে তো মালিক। সে টিয়া মিসিং।”
“মিসিং?” ফেলুদার চোখের পলক নড়ছে না।
“খুবই রহস্যজনক ব্যাপার ফেলু। কাগজে দেখেছ বোধ হয় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের এমপ্লয়িরা সারা সপ্তাহ ধরে স্ট্রাইক ডেকেছে। তাই খানিকটা বাধ্য হয়েই ওদের বিকালবেলার রাজধানী এক্সপ্রেস নিতে হয়েছিল। সকালবেলা উঠে দেখছে অ্যাটাচি কেস যেমনকার তেমন আছে, শুধু ভেতরে টিয়াটাই নেই। অথচ অ্যাটাচি কেসের চাবি যোশীর কোটের ভেতরের পকেট থেকে এক চুলও নড়েনি।”
“ভেরি স্ট্রেঞ্জ। কিন্তু আপনি জানলেন কী করে?”
“গতকাল জয়সওয়াল ফোন করেছিল। সেই জানাল সব খবর। বলা বাহুল্য যে, যোশী এবং জয়সওয়াল দুজনেই অত্যন্ত ওরিড, যেনতেনপ্রকারেণ তারা টিয়াটি ফেরত পেতে চায়। জয়সওয়াল পার্সোন্যালি রিকুয়েস্ট করেছে তুমি যাতে কেসটা নাও।”
“জয়সওয়াল আমাকে চেনেন নাকি?” ফেলুদার মুখ দেখেই বোঝা গেল এ খবরটা সত্যিই চমকপ্রদ।
সিধুজ্যাঠা হাসলেন, “চিনত না। এই এবারে আমার বাড়ি এসেই চিনেছে। ওদের কাছে গল্প করছিলাম রেসকোর্সের খুনের মামলাটা তুমি কী ব্রিলিয়ান্টলি সলভ করেছ। বুঝতেই পারছ, তোমার কীর্তিকলাপ জয়সওয়ালকে কতটা ইনফ্লুয়েন্স করেছে। আর পুলিশের ব্যাপার তো জানোই, তাদের আঠারো মাসে বছর।”
ফেলুদা চুপ করে কিছু একটা ভাবছিল। সিধুজ্যাঠার কথা শেষ হলে বলল, “আপনি ওনাকে জানিয়ে দিন আমি আসছি। আজ বিষ্যুতবার, শনিবার আমরা দিল্লী পৌঁছব রাজধানী এক্সপ্রেসে। সেরকম হলে নয় রবিবারেই জয়সওয়ালের সঙ্গে দেখা করা যাবে।”
“বাঁচালে ফেলু।” সিধুজ্যাঠা ফেলুর হাত ধরে বললেন, “জয়সওয়াল উঠেছে হোটেল মেট্রোপলিটানে, আমি তোমাকে হোটেলের অ্যাড্রেস আর ফোন নম্বরটা দিয়ে দিচ্ছি। তুমি দিল্লী পৌঁছেই ওর সাথে দেখা করে নিও।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন