পঞ্চম অধ্যায়

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

কাল রাতে হোটেল ফিরতে বেশ দেরি হল। পুলিশকে খবর দেওয়ার ব্যাপার তো ছিলই। পুলিশ আসার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও বেশ কিছুটা সময় যায়। ভাগ্যক্রমে গ্রেটার কৈলাশ থানার ইন্সপেকটরটিও বাঙালি, রবীন তরফদার। মাস ছয়েক আগে পাশের চিত্তরঞ্জন পার্ক থানা থেকে বদলি হয়ে এসেছেন। এবং সবথেকে বড় কথা তিনি ফেলুদার নাম জানেন। জিজ্ঞাসাবাদের শেষে হ্যান্ডশেক করে বলে গেলেন ফেলুদার দিল্লী থাকাকালীন কোনও অসুবিধা হলে সবার আগে ওনাকে জানাতে।

সমস্যা হল দিল্লীতে আর কদিন থাকা হবে, আদৌ থাকা হবে কিনা সেটা নিয়েই ফেলুদা নিশ্চিত নয়। জয়সওয়াল উধাও হওয়ার ফলে আগের সব প্ল্যানই ভেস্তে গেছে। দুপুরবেলা যিনি রিসেপশনে ছিলেন, তিনি কনফার্ম করেছেন দুপুর একটা নাগাদ জয়সওয়ালকে হোটেল থেকে বেরোতে দেখা গেছিল।

সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ ফেলুদার নামে ফোন এল হোটেলে। ফেলুদা ঘুরে এসে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল।

“কী হল মশাই? কার ফোন?” উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞাসা করলেন জটায়ু।

“ইন্সপেকটর রবীন তরফদারের, জানালেন খুনটা হয়েছে দুপুর বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে।”

“সর্বনাশের মাথায় বাড়ি। আপনি তো প্রায় ওই সময়েই জয়সওয়ালকে ফোন করেছিলেন, তাই না?”

“সে তো বটেই। কিন্তু জয়সওয়াল আমার ফোনটা ধরতেই বা গেল কেন সেটা তো বুঝতে পারছি না? যে লোকটা সদ্য একটা খুন করেছে, তার তো ফোন ধরার কোনও কারণই নেই।”

“আর জয়পুরের টিয়া?”

“সেটাও আরেকটা প্রশ্ন। জয়সওয়ালের নিজেরই যখন টিয়াটা ছিল, সেটার জন্য নিশ্চয় যোশীকে খুন ও করবে না। তাহলে ধরে নেওয়া যায় যে, টিয়াটা সত্যিই চুরি হয়েছে। এবং করেছে অন্য কেউ, যে কলকাতা থেকে ওদের ফলো করেছে। এবং একই ট্রেনে দিল্লী অবধি এসেছে।”

লালমোহনবাবু হেঁচকি তোলার মতন একটা আওয়াজ করে বললেন, “এ যে রহস্যের খাসমহল মশাই। আমার মাথা এখনই ভোঁ ভোঁ করছে।”

লাঞ্চের পর ফেলুদা বলল কনট প্লেসের কেমব্রিজ বুক স্টোরে ওর কী দরকার আছে, সেটা সেরে রবীনবাবুর সঙ্গেও একবার দেখা করতে যাবে। ফিরতে ফিরতে বিকেল। যাওয়ার আগে বলে গেল, “তুই চাইলে জটায়ুকে নিয়ে আরেকবার চিত্তরঞ্জন পার্কের পুজোয় ঘুরে আসতে পারিস।”

জটায়ু কালকের ভয়াবহ ঘটনাটা দেখার পর থেকে কী রকম চুপসে আছেন। ফেলুদার কথা শুনে মনে হল চিত্তরঞ্জন পার্কে ওনাকে নিয়ে গেলে মন্দ হয় না, হয়তো একটু চাঙ্গা হয়ে উঠবেন। লালমোহনবাবু যদিও বললেন, তার আগে একবার সফদরজং এনক্লেভের কালীবাড়িতে ঘুরে আসতে চান। “এত দূর এসে কালীবাড়ির দুর্গাপুজোটা না দেখলে বড় আফশোস থেকে যাবে ভাই। সময় তো অফুরন্ত, একবার ঘুরেই আসা যাক, কী বলো?”

আমারও আপত্তির কোনও কারণ নেই। আর হোটেলের ম্যানেজার জানালেন হোটেলের সামনে থেকেই ৫০৫ নম্বর বাস সোজা যায় সফদরজং এনক্লেভ, সেখান থেকে অল্প একটু হাঁটা।

ষষ্ঠীর দিন হলেও দুপুর বলেই বোধ হয় খুব একটা বেশি ভিড় নেই কালীবাড়িতে। লালমোহনবাবু কালীমূর্তি দেখে মহা আহ্লাদিত। দেখলাম প্রায় সাষ্টাঙ্গে একটা প্রণাম করলেন। প্রণাম করে ওঠার সময় যদিও দেখা গেল ব্যাপারটা অল্প বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। ‘আহহ্’ বলে এমন কাতরে উঠলেন তাতে বেশ বোঝা গেল বেকায়দায় উঠতে গিয়ে কোমরে লেগেছে।

ভদ্রলোককে ধরে ধরে বাইরে নিয়ে আসছি, হঠাৎ শুনি “কী ব্যাপার মিস্টার গাঙ্গুলি? আপনি ঠিক আছেন?”

মুখ তুলে দেখি সামনে দাঁড়িয়ে সত্যেন্দ্র সোলাঙ্কি।

লালমোহনবাবু বোধ হয় ভাবতেই পারেননি সোলাঙ্কির সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যাবে। একটু থতমত মুখে বললেন, “এই কোমরটায় একটু... হেঁ হেঁ... ওই আর কী।”

“আমার গাড়ি দাঁড় করানো আছে। আপনাদের অসুবিধা না থাকলে আমি কিন্তু আপনাদের হোটেল অবধি ছেড়ে দিতে পারি। আমার ভেতরে জাস্ট পাঁচ মিনিটের কাজ আছে।”

লালমোহনবাবুর কোমরের যা অবস্থা দেখছি, তাতে চিত্তরঞ্জন পার্ক যাওয়াটা ঠিক হবে বলে মনে হল না। ভালোই হয়েছে সোলাঙ্কির সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়ে। সোলাঙ্কি মন্দিরের ভেতরে যাওয়ার পর জটায়ু বললেন, “লোকটিকে বড় পছন্দ হয়েছে তপেশ। এরকম হেল্পফুল সোল আজকালকার দিনে আর কটা পাওয়া যায় বলো?”

পাঁচ মিনিটও অবশ্য লাগল না, সোলাঙ্কি দু মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলেন। মুখটা অসম্ভব গম্ভীর।

গাড়িতে উঠে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সোলাঙ্কি বললেন, “আমি ভাবতেই পারিনি আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। আমার প্ল্যান ছিল আজকে সন্ধ্যার দিকে চিত্তরঞ্জন পার্কের পুজোয় যাওয়ার।”

“আপনিও সাহিত্যমেলা নিয়ে ইন্টারেস্টেড বুঝি?” শুধোলেন জটায়ু।

“মেলা নয় মিস্টার গাঙ্গুলি, আমার দরকার মিস্টার মিটারকে। ওনার প্রফেশনাল হেল্প চাই আমার।”

জটায়ু আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী ব্যাপার বলুন তো?”

“আজ দুদিন হল আমার বিজনেস পার্টনারকে পাওয়া যাচ্ছে না।” একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন সত্যেন্দ্র সোলাঙ্কি।

“মি... মিসিং?” জটায়ুর প্রায় বাক্যস্ফূর্তি হচ্ছিল না।

“হ্যাঁ। প্রথমে ওর হোটেলে টেলিফোন করেছিলাম, পেলাম না। কাল রাত্রে গিয়ে শুনলাম হোটেলে ফেরেনি। আজকে সকাল থেকে বসে ছিলাম হোটেলে, দেখা নেই। শেষে হোটেলের ম্যানেজার সাজেশন দিল কালীবাড়িতে এসে একবার খুঁজতে, ও দিল্লী এলেই নাকি একবার কালীবাড়ি ঘুরে যাবেই।”

“কালীবাড়িতেও পেলেন না?”

“নাহ, এখানেও আসেনি। থ্যাঙ্কফুলি ওর একটা পাসপোর্ট ফটো আমার কাছে ছিল, সেটাই দেখালাম। কেউই আইডেন্টিফাই করতে পারল না।”

“আঁ... আঁ... আঁ।”

আমি জানি জটায়ুর গলা থেকে কেন আর্তনাদ ছিটকে বেরোচ্ছে। ফটোর মধ্যে থেকে যে ভদ্রলোক আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন তাঁকে কালীবাড়ির কেউ না চিনলেও আমরা বিলক্ষণ চিনি।

হোটেল মেট্রোপলিটানের ঘরের মেঝেতে কাল এনারই নিঃস্পন্দ শরীর আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম, ইনিই মাধবরাও যোশী।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%