অষ্টম অধ্যায়

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

দেবরাজ গোস্বামীকে ফোন করার পর পরেই বোধ হয় রবীন তরফদারকেও ফোন করেছিল ফেলুদা। আধঘণ্টার মধ্যেই দেখি জিপে চড়ে রবীনবাবু আমাদের হোটেলে এসে হাজির, সঙ্গে আবার দুজন কনস্টেবল। ফেলুদাকে দেখে বললেন, “পাখি উড়ে গেছে বলেই মনে হচ্ছে।”

“কিন্তু উড়ে বেশি দূর যেতে পারবে না। তার জন্য ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সেরও একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য।”

ফেলুদা একটা ট্যাক্সি ডাকতে যাচ্ছিল, তাতে রবীনবাবু বললেন জিপেই তিনজনের জায়গা হয়ে যাবে। লালমোহনবাবু বেশ কিছুক্ষণ ধরে উসখুস করছিলেন। জিপে উঠে বললেন, “কোথায় যাচ্ছি মশাই?”

“সবুর, লালমোহনবাবু সবুর। একটু পরেই দেখতে পাবেন।”

লালমোহনবাবু অবশ্য পাঁচ মিনিটও চুপ করে থাকতে পারলেন না, “আপনার বন্ধুর সঙ্গে কথা হল?”

“দেবরাজের কথা বলছেন? হ্যাঁ, কথা হয়েছে। দুটো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন দিয়েছে সে।”

জিপটা যখন যন্তর মন্তরকে বাঁ দিকে রেখে গোল চক্করে পড়ল, তখনই একটা সন্দেহ হচ্ছিল। ফেলুদাকে বললাম “আজমের গেটের দিকে যাচ্ছি, তাই না?”

ফেলুদা আমার পিঠে একটা চাপড় দিতে যাচ্ছে আর ঠিক সেই সময় জিপটা বিশ্রী একটা ব্রেক কষল। ফলে চাপড়টা যতটা জোরে আসার কথা ছিল তার প্রায় দ্বিগুণ জোরে এসে পিঠে পড়ল।

“কী হল রবীনবাবু?”

“এই দেখুন না, সামনে অযথা ঝঞ্ঝাট।”

ঝঞ্ঝাট বলে ঝঞ্ঝাট! কোথা থেকে একটি ষাঁড় এসে রাস্তার ওপর বসে পড়েছে। ষাঁড়বাবাজীবনের যা চেহারা দেখা গেল, রবীনবাবু ওনার কনস্টেবলদের পাঠাতেও বিশেষ ভরসা পেলেন না। চারপাশ থেকে বাইক, বাস এবং গাড়ির অসংখ্য হর্নেও দেখা গেল তার ভ্রুক্ষেপ নেই।

মিনিট কুড়ি অপেক্ষা করার পর ফেলুদা বলল, “রবীনবাবু, হাত থেকে সময় বেরিয়ে যাচ্ছে। অন্য রাস্তা নেই?”

“আছে, পঞ্চকুইয়া রোড ধরে গিয়ে পাহাড়গঞ্জ দিয়ে ঢোকা যেতে পারে। কিন্তু তাতে আরও আধঘণ্টা মতন লাগবে ধরুন।”

“সর্বনাশ!” ফেলুদা বার বার রিস্টওয়াচের দিকে দেখছে, “ড্রাইভার সাব, হামে পাঁচ বাজে তক পঁহচনা হ্যায়। জারা জলদি চলিয়ে।”

“জি, জরুর।” একে পুলিশের জিপ, তায় ফেলুদার অনুরোধ। আমাদের গাড়ি এত জোরে চলতে শুরু করল যে, মিনিটখানেকের জন্য জটায়ুর মুখ থেকে সব রক্ত সরে গেল। “কী চালাচ্ছে ভাই তপেশ, পেটের মধ্যে মনে হচ্ছে হাজারখানা প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে।”

ফেলুদা একবার আমাদের দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বলল, “আরতুরো কারতোফোলি।”

“কার কথা বলছেন মশাই? আড় কে?”

আমি জানি ফেলুদা কার কথা বলছে। টিনটিনের অ্যাডভেঞ্চার “দ্য ক্যালকুলাস অ্যাফেয়ার”-এর সেই ইটালিয়ান ড্রাইভার, যার গাড়িতে করে টিনটিন প্রায় উড়ে উড়ে বরডুরিয়ান এজেন্টদের ধাওয়া করেছিল। কিন্তু জটায়ুকে অত কিছু বোঝানোর মতন সময় নেই এখন।

নিউ দিল্লী স্টেশনে যখন আমরা পৌঁছলাম, তখন পাঁচটা বাজতে মিনিট কুড়ি মতন বাজে।

রবীনবাবু জিপ থেকে নামতে নামতে বললেন, “রাজধানী আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়ছে।”

“হ্যাঁ, আর কাকে খুঁজতে হবে আপনি জানেন নিশ্চয়। মনে রাখবেন স্বনামে সে থাকবে না। সুতরাং রিজার্ভেশন লিস্ট চেক করে লাভ নেই, অযথা সময় নষ্ট।” ফুটব্রিজে উঠতে উঠতে বলল ফেলুদা।

“কোনও চিন্তা করবেন না, তপেশের লেখা কাগজটাও তো আমাকে দিয়েই রেখেছেন।”

সেই ডেসক্রিপশনওলা চিরকুট? তাহলে কী জয়সওয়ালের খোঁজ পাওয়া গেছে?

ফেলুদাকে অবশ্য সে কথা জিজ্ঞাসা করার উপায় নেই। ফেলুদা আট নম্বর প্ল্যাটফর্মে নেমে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় ঠেলাগাড়ি, কুলি, কলার খোসা সব কাটিয়ে কাটিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়চ্ছে। প্ল্যাটফর্মে নামার আগে চিৎকার করে বলে গেল, “আমি সামনের কামরা থেকে উঠছি, রবীনবাবুরা শেষেরটা থেকে। চেয়ারকারগুলো মাঝে আছে, তুই ওখান থেকে দেখতে শুরু কর তোপসে। মনে রাখিস চোখের রঙ কটা।”

আমিও দৌড়চ্ছি, একজন কুলিকে জিজ্ঞাসা করাতে বলল সাত নম্বর কামরা থেকে চেয়ারকার শুরু। লালমোহনবাবু পেছন থেকে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, “তোমরা এগিয়ে যাও তপেশ, আমি আসছি।”

একের পর এক কামরা পার হয়ে যাচ্ছি, না চোখে পড়ছে পেন্সিল গোঁফ, না কটা চোখ। তাও ভাগ্য ভালো রাজধানী বলে এক কামরা থেকে অন্য কামরায় খুব সহজেই যাওয়া যায়। দশ মিনিটের মাথায় উলটো দিক থেকে ফেলুদাকে আসতে দেখা গেল।

ফেলুদা দুদিকে তাকাতে তাকাতে আসছে।

আমাকে দেখতে পেয়েছে, হাত নাড়ল।

আমি চট করে ঘড়ির দিকে তাকালাম, আর পাঁচ মিনিট মতনই হাতে আছে। কোথায় বসে আছে জয়সওয়াল? রবীনবাবুই বা কোথায়?

ফেলুদা বোধ হয় রবীনবাবুর কথাই জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল আমাকে। কিন্তু ওর দৃষ্টি এখন অন্য দিকে। যে দিক থেকে এসেছিল সেদিকেই আবার ঘুরে গেছে।

তিন নম্বর সিট থেকে এক ভদ্রলোক উঠে দরজার দিকে এগোচ্ছেন। হাতে অ্যাটাচি কেস।

আমরা দুজনেই ভদ্রলোকের পেছনে, কিন্তু এক ঝলকে দেখতে পেলাম ভদ্রলোকের চোখে সানগ্লাস।

আমি এখন ফেলুদার পাশে, ফেলুদা একটা চাপা হিসহিসে স্বরে বলল, “বিকাল পাঁচটার সময় ট্রেনের ভেতর কে সানগ্লাস পরে?”

ভদ্রলোক কি ট্রেন থেকে নামার চেষ্টা করছেন? বাথরুমের দজার সামনে পৌঁছেছেন, ফেলুদা পেছন থেকে ডাকল, “এক্সকিউজ মি, মিস্টার জয়সওয়াল?”

ভদ্রলোক ঘুরে তাকিয়েছেন। এনার মুখের সঙ্গে জয়সওয়ালের মুখ মিলছে না, পেন্সিল গোঁফের বদলে এনার মুখে ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। সানগ্লাস থাকার জন্য অবশ্য চোখের রঙটা বোঝা যাচ্ছে না। আমি জানি এনাকে কোনওদিন আমি দেখিনি, কিন্তু তাও যেন মনে হচ্ছে চিনি।

ঘড়ঘড়ে গলায় ইংরেজিতে জবাব এল, “আপনি ভুল করছেন। আমার নাম মোহনলাল সোমানি।”

ফেলুদা স্বর ইস্পাতের মতন কঠিন, “আমি জানি আপনি জয়সওয়াল নন। কিন্তু আপনি যে সোমানিও নন।”

সানগ্লাসের পেছনে চোখটা কি একটু নড়ে উঠল?

“আমি জানি না আপনি কী বলছেন, আমি জানতেও চাই না। কিন্তু আমাকে এবারে ট্রেন থেকে নামতে হবে। উড ইউ মাইন্ড?”

“সার্টেনলি আই উড।”

ফেলুদা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে।

“মেকআপটা ভালোই করেছিলেন, কিন্তু তাড়াহুড়োয় সিঁথিটা ডান দিক থেকে আর সরানো হয়নি।”

চোখের নিমেষে ভদ্রলোকের হাতে একটা পিস্তল উঠে এসেছে।

রাজধানীতে তুলকালাম

“আমি দুঃখিত প্রদোষবাবু, আপনি চান কী না চান তাতে আমার কিছু যায় আসে না। এ ট্রেন থেকে নামতেই হবে আমাকে।”

“কিন্তু খুন? খুনটা করলেন কেন?”

প্রায় একটা চাপা গর্জন বেরিয়ে এল ভদ্রলোকের মুখ থেকে, “এক ভুল কতবার সইতে পারে মানুষ? যে ভুলের জন্য আপনি অতীতে সব কিছু খুইয়েছেন? সব কিছু! টাকাপয়সা, মান ইজ্জত — সব। দ্যাট স্কাউন্ড্রেল, আমার কোনও আফশোস নেই ওর জন্য।”

রাজধানীর ইঞ্জিনের ভোঁ শোনা গেল, ট্রেন ছাড়ার সময় হয়েছে।

কিন্তু সেই আওয়াজ ছাপিয়ে ফেলুদার কথা শোনা যাচ্ছে, “সেটা যে পুরোপুরি সত্যি কথা নয়। মাধবরাও যোশীর দ্বিতীয়বার বিশ্বাসঘাতকতার খবর আপনি পেয়েছেন মাত্র দুদিন হল। অথচ চুরির গল্প ফেঁদেছিলেন তার কত আগেই, তাই না? আপনি যে খুনের মতলব অনেক দিন ধরেই ভেঁজে রেখেছেন, না হলে আগ বাড়িয়ে কেন ফেলু মিত্তিরকে চুরির গল্প বলে ডেকে পাঠাবেন? কিন্তু ঘোলা জলে যে মাছ আপনি ধরেছেন সে যে নেহাতই রেড হেরিং, তা বুঝতে আমার বাকি নেই।”

“আপনি অনেক বড় বড় কথা বলেছেন মিস্টার মিটার। আপনাকে আর কথা বলতে আমি দেব না। সরুন সরুন, যান ওদিকে। যান বলছি। এক পা এগোলেও গুলি করতে আমার হাত কাঁপবে না।”

ফেলুদাকে ধমক দিতে গিয়ে ভদ্রলোকের সেই ঘড়ঘড়ে গলার স্বর উধাও হয়ে গেছে। আর এই নতুন গলার স্বর আমি চিনি।

ভদ্রলোক পিস্তল উঁচিয়ে এক পা এক পা করে পিছোচ্ছিলেন। ট্রেনের দরজাটা খুলবেন বলে হ্যান্ডলে হাত রেখেছেন আর ঠিক এই সময়ে বাইরের দিক থেকে দরজাটা দমাস করে খুলে গেল। দরজাটা এত জোরে এসে লাগল ভদ্রলোকের মাথায়, ভদ্রলোক ট্রেনের ভেতরে মুখ থুবড়ে পড়লেন। যদিও তার আগে ভদ্রলোকের আঙ্গুল পিস্তলের ঘোড়ায় চাপ দিয়ে গেছে। আমাদের ভাগ্য ভালো সে গুলি ট্রেনের সিলিং-এ গিয়ে লেগেছে।

কামরার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন শ্রী লালমোহন গাঙ্গুলি।

আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কোথায় ছিলেন আপনারা? কতক্ষণ ধরে প্ল্যাটফর্ম ধরে ছুটতে ছুটতে জানলার ভেতর দিয়ে দেখছি। কিছুতেই পাই না। এই কামরার প্রথম জানলাটাতে উঁকি মারতে গিয়ে মনে হল ফেলুবাবুর গলা শুনছি। তাই কপালে যা থাকে বলে উঠে পড়লাম।”

ফেলুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এবারের ঘটনাটা যখন লিখবি পাঠকদের আগেভাগে জানিয়ে দিস ফেলু মিত্তিরের কোনও রোলই এবার নেই। সবই জটায়ুর দয়া।”

লালমোহনবাবু হেঁঃ হেঁঃ করে হাসতে গিয়ে বিষম খেলেন, ওনার এতক্ষণে নজর পড়েছে মেঝের দিকে। গুলির আওয়াজ শুনেই রবীনবাবুরাও এসে পড়েছেন।

“ইনিই জয়সওয়াল?”

“ওরফে মোহনলাল সোমানি। তবে আপনারা এনাকে অন্য আরেকটি নামে চেনেন, অনুকূল ভদ্র। রবীনবাবু, সানগ্লাসটা খুলে নিলে দেখবেন কটা রঙের একটি কনট্যাক্ট লেন্স আছে ওনার চোখে। অত হাই পাওয়ারের চশমা লুকনোর জন্য লেন্স ছাড়া উপায় ছিল না।”

জটায়ুর হাঁ-মুখ আর বন্ধ হল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%