প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
সোলাঙ্কি আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন গ্রেটার কৈলাশ থানায়। যাওয়ার আগে বলে গেলেন পরের দিন দুপুরে আসবেন ফেলুদার সঙ্গে দেখা করার জন্য। ভদ্রলোক শকড বললেও কিছুই বলা হয় না। আমাদের কাছ থেকে খারাপ খবরটা পাওয়ার পর বাকি রাস্তা আর কথাই বলতে পারলেন না। বিড়বিড় করে দু-তিনবার খালি জিজ্ঞাসা করলেন, “আর ইউ অ্যাবসোলিউটলি সার্টেন? ঠিক দেখেছেন আপনারা?”
ঘরে ঢুকে দেখি ফেলুদাও ফিরে এসেছে। বিছানার ওপর একটা মস্ত বই ফেলে মন দিয়ে কী যেন দেখছে।
“মশাই, এদিকে কী সর্বনেশে কাণ্ড ঘটেছে আপনি ভাবতেই পারবেন না।” ফেলুদাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠলেন লালমোহনবাবু। “একের পর এক থ্রিলিং ব্যাপার-স্যাপার ঘটে চলেছে।” বলতে বলতে ভদ্রলোক প্রায় লাফিয়ে উঠেছিলেন, তারপর ‘উফ্’ বলে কোমর ধরে বিছানাতেই বসে পড়লেন।
লালমোহনবাবুকে একটু ধাতস্থ হতে দিয়ে ফেলুদা মন দিয়ে আমাদের কাছে শুনল পুরো ঘটনাটা। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, “থ্রিলিং নিঃসন্দেহে, তবে এবারে হয়তো আরেকটু আলো দেখা যাবে। সোলাঙ্কি কেন যোশীকে মিট করতে দিল্লী এসেছেন সেটাও একটা প্রশ্ন বটে।”
লালমোহনবাবু হাত তুলে বললেন, “ওই যে বললাম, ওনারা দুজনে বিজনেস পার্টনার ছিলেন।”
ফেলুদা টেবলে রাখা অ্যাশট্রেটা তুলে নিয়ে সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “বিজনেসটা কী নিয়ে সেটাই ভাবাচ্ছে লালমোহনবাবু। যোশী নয় এসেছিলেন জয়সওয়ালের থেকে টিয়াটা কিনতে, সোলাঙ্কির আসার কারণটা কী?”
আমি এর মধ্যে বিছানায় রাখা বইটার নামটা দেখে নিয়েছি, ‘প্রিন্সলি রাজস্থান : আর্ট অ্যান্ড স্কালপ্চর’।
“তুমি এই বইটা কিনতেই কনট প্লেস গেছিলে?”
“ঠিক ধরেছিস। সেদিনকে সিধুজ্যাঠার পড়ার টেবলে এই বইটাই দেখেছিলাম, কাল থেকে কেন জানি মনে হচ্ছিল এই বইটা একবার দেখা দরকার। গাট ফিলিংটা আদৌ অমূলক ছিল না, ২৩৫ নম্বর পাতায় গিয়ে দ্যাখ।”
ঠিক কথা। ২৩৫ থেকে শুরু করে ২৪৫, এই দশ পাতা জুড়ে লেখকের আলোচনার বিষয়বস্তু একটাই। জয়পুরের মহারাজার দ্য রুবি-আইড প্যারট। লেখক গর্ডন উইলসন, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়মের কিউরেটর। জয়পুরের টিয়াপাখি নিয়ে কেন এতটা উৎসাহ সেটা এবার বেশ বোঝা যাচ্ছে।
ফেলুদা সিগারেটটা শেষ করেই ফের বইটা পড়তে শুরু করল। আমি আর লালমোহনবাবু ফল-ফুল-পাখি-নাম-দেশ খেলতে শুরু করলাম। চার রাউন্ড খেলার পর পাঁচ নম্বর রাউন্ডে অক্ষর পড়ল ট। লালমোহনবাবু ট দিয়ে পাখির নাম কী লিখবেন সেটা মোটামুটি জানাই ছিল, আমাকে তাই অন্য নাম ভাবতে হল।
“ট দিয়ে আমার পাখি টুনটুনি। লালমোহনবাবু, আপনার কি টিয়া?”
লালমোহনবাবু ভারিক্কি চালে বললেন, “অত বোকা আমাকে পাওনি তপেশ। আমি অবশ্য ভাবছিলাম তুমিই টিয়া লিখবে।”
এই রে, আমিও দেখছি বেকুব বনেছি। “তাহলে আপনার পাখির কী নাম?”
“টেরোড্যাকটিল।”
টেরোড্যাকটিল শুনে বেজায় হাসি পাচ্ছিল, কিন্তু ভদ্রলোক কিছুতেই মানবেন না যে টেরোড্যাকটিল পাখি নয়। শেষে ঠিক হল ফেলুদাকেই জিজ্ঞাসা করা হবে।
ফেলুদাকে ডাকতে গিয়ে দেখি ও কপালের রগ ধরে বসে আছে, শিরাগুলো দপদপ করছে। এখন ওর হাতে বইটা নেই, বরং আছে জয়পুরের টিয়ার সেই ছবি যেটা ও সিধুজ্যাঠার থেকে নিয়ে এসেছে।
“ফেলুদা, ফেলুদা।”
ফেলুদা কী রকম একটা ঘোরের মধ্যে থেকে বলল, “সমস্ত হিসেব গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। সিধুজ্যাঠাকে এক্ষুনি একটা ট্রাঙ্ককল করা দরকার। লালমোহনবাবু, আপনি ঘরেই থাকুন। তোপসে, তুই চট করে হাওয়াই চপ্পলটা গলিয়ে আমার সঙ্গে নীচে চল, আর সঙ্গে একটা কাগজ-পেন্সিল রাখিস।”
ফেলুদা প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে দুটো করে সিঁড়ি একসঙ্গে টপকাতে টপকাতে নীচে নামল। ট্রাঙ্ককল পেতে বিশেষ অসুবিধা হল না। ফোনে অবশ্য একদিকের কথাই শুনতে পাওয়া গেল। আর সেটাই সুবিধের জন্য এখানে তুলে দিলাম।
“সিধুজ্যাঠা, ফেলু বলছি দিল্লী থেকে। আপনার সঙ্গে একটা জরুরি দরকার আছে।”
---------
“বলছি, প্রিন্সলি রাজস্থান বইটার ২৪৩ নম্বর পাতার সেকন্ড প্যারাটা একটু পড়ুন। আমি ফোন হোল্ড করছি।”
---------
“সে কী? আপনি অলরেডি জানেন!”
---------
“কিন্তু আপনার লেখাটা যখন বেরোয় তখন এই খবরটা জানা ছিল না?”
---------
“তাই নাকি? আপনি অলরেডি ফোন করে জানিয়েছিলেন? সেদিন সকালেই?”
---------
“ওহ, জয়সওয়াল কী বলল?”
---------
“আচ্ছা, জয়সওয়ালকে কেমন দেখতে বলুন তো?”
---------
“না, এখনও দেখা হয়নি। আমি পরে বিশদে জানাচ্ছি আপনাকে।”
---------
“হ্যাঁ, এক সেকন্ড ধরুন...” বলে মাউথপিসে হাত চাপা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “সিধুজ্যাঠা জয়সওয়ালের ডেসক্রিপশন দিচ্ছেন। আমি রিপিট করব কথাগুলো, তুই লিখে রাখবি। ঠিক হ্যায়?”
আমি ঘাড় নাড়তে ফের ফোন ধরে বলল, “হ্যাঁ, বলুন সিধুজ্যাঠা।”
“লম্বায় পাঁচ-নয়? আচ্ছা। পেন্সিল গোঁফ? ইন্টারেস্টিং!”
---------
“চোখের রঙ কটা বললেন? ওকে। চোখে চশমা ছিল?”
---------
“ছিল না? ওহ, সানগ্লাসটা পকেটে রাখা ছিল বলছেন?”
---------
“আচ্ছা, অনেক ধন্যবাদ সিধুজ্যাঠা। আমি কাল পরশুর মধ্যেই আবার ফোন করব আপনাকে।”
“কী ব্যাপার মশাই? হঠাৎ এরকম তড়িঘড়ি ফোন করতে ছুটলেন যে?” আমাদের ঘরে ঢুকতে দেখে জটায়ু উঠে বসেছেন।
ফেলুদা পাতাটা খুলে লালমোহনবাবুকে বলল, “সেকন্ড প্যারাগ্রাফটা পড়ে ফেলুন চট করে।”
মিনিট পাঁচেক পর লালমহনবাবু মুখ তুলে বললেন, “তাই নাকি মশাই? এ খবরটা তাহলে আগে আপনার কাছে ছিল না?”
“নাহ, বইটা পড়েই তো জানলাম। এবার আপনি ছবিটা নিয়ে মেলান।”
ফেলুদা এবার আমার দিকে ঘুরে বলল, “উইলসন সাহেব জানাচ্ছেন ১৯০৮ সালে টিয়াটি চুরির চেষ্টা হয়, নিরাপত্তারক্ষীরা টের পেয়ে চোরকে গুলি করে এবং চোরের রক্ত ছিটকে রুবি আইড প্যারটের ডানার একটি হিরেতে লাগে। অমঙ্গলের আশঙ্কায় জয়পুর স্টেটের তৎকালীন মহারাজা সেই হিরেটিকে রিপ্লেস করেন হীরের মতন দেখতে কিন্তু হিরের থেকেও দামি এক টুকরো ময়সেনাইট ক্রিস্টাল দিয়ে। ময়সেনাইট এখন গবেষণাগারে তৈরি হলেও সে সময় প্রাকৃতিক ময়সেনাইট একবারই পাওয়া গেছিল, তাও একটা উল্কার মধ্যে। বুঝতেই পারছিস কতটা রেয়ার এই ক্রিস্টাল।”
ফেলুদা একটু থেমে বলল, “হিরে আর ময়সেনাইটের তফাৎ চট করে খালি চোখে ধরা পড়া মুশকিল। কিন্তু আলোর মধ্যে ধরে দেখলে দেখা যাবে ময়সেনাইটের একটা হাল্কা সবজে আভা আছে।”
“লালমোহনবাবু, কিছু দেখতে পেলেন?”
“পেলাম বইকি, ওপর থেকে চার নম্বর পাথরটায় সত্যি একটা সবজে আভা দেখা যাচ্ছে। ওইটেই তাহলে ময়সেনাইট?”
“ঠিক। কিন্তু আসল খবর তো সেটা নয় লালমোহনবাবু। আসল খবরটা কী বলুন?”
লালমোহনবাবু চুপ। কিন্তু আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “তার মানে... তার মানে... তিন নম্বর টিয়া?”
“এক্সেলেন্ট, তোপসে। মানে দাঁড়াচ্ছে, যে টিয়ার ছবি আমরা দেখছি, সেটা এসেছে জয়পুর প্যালেস থেকেই। অর্থাৎ তিন নম্বর টিয়া নেই, বানানোই হয়নি।”
লালমোহনবাবু অবাক হয়ে বললেন, “কিমাশ্চর্যম! তাহলে জয়সওয়াল?”
“একটি চিট এবং একটি চোর। মাধবরাও যোশীকে চোরাই মাল বেচার চেষ্টা করছিল জয়সওয়াল। আমাদের এখন অবিলম্বে পুলিশকে খবর দিতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভেরিফাই করা দরকার জয়পুর প্যালেসে অরিজিনাল টিয়া বলে যেটি এখন শোভা পাচ্ছে সেটি নকল কিনা।”
লালমোহনবাবু এত ইনফরমেশনের ধাক্কাতে একটু কাবু হয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বললেন, “কিন্তু তিন নম্বর টিয়া না থাকুক, এক নম্বরটাও এখনও মিসিং। সেটা কার কাছে গেল?”
“সেটাই তো লাখ টাকার প্রশ্ন । ওখানেই একটা বড় খটকা রয়ে যাচ্ছে। জয়সওয়াল তো নিজেই টিয়াটা যোশীকে বেচার চেষ্টা করছিল। সে একটা চিটিংবাজ হলেও নিজের জিনিস তো আর নিজে চুরি করবে না? এনিওয়ে, আমি ফোন করতে গেলাম। রবীনবাবুকে খবরটা দিতে হবে।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন