সপ্তম অধ্যায়

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পরের দিন দুপুর একটা নাগাদ সোলাঙ্কি দেখা করতে এলেন। ভদ্রলোককে বিধ্বস্ত লাগছিল, যোশীর খুনের খবরটা এখনও সামলে উঠতে পারেননি। ফেলুদার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললেন, “ভাবতেই পারছি না মিস্টার মিটার এরকম কিছু ঘটে যেতে পারে। কে খুন করল, কেন খুন করল কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”

ফেলুদা সহানুভূতির স্বরে বলল, “আমাদের সবার মনেই সেই এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মিস্টার সোলাঙ্কি। কিন্তু আপনি ঠিক কী কারণে দিল্লী এসেছিলেন?”

সোলাঙ্কি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “যোশীর থেকে একটা পেমেন্ট পাওয়ার কথা ছিল আমার। বেশ কয়েক হাজার টাকা।”

ফেলুদা একদৃষ্টে সোলাঙ্কির দিকে তাকিয়ে, “কয়েক হাজার টাকা?”

“হ্যাঁ, তাই। যোশী আমার অনেকদিনের ক্লায়েন্ট, দু-তিন বছর আগে অবধিও রীতিমতন ভালো বিজনেস পেতাম ওনার থেকে। তারপর থেকে বোধ হয় ওর ফাইন্যান্সিয়াল কন্ডিশন খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। মাস ছয়েক আগে এসে আমাকে একটা আইটেম ডেলিভার করতে বললেন। এও বললেন যে আইটেমটা বানিয়ে দিলে উনি ফিফটি পারসেন্ট টাকা দিয়ে দেবেন। বাকি ফিফটি পারসেন্ট পাওয়া যাবে তার মাস দুয়েক পরে। টাকার অ্যামাউন্টটাও খারাপ ছিল না, প্লাস পুরনো ক্লায়েন্ট, আমিও রাজি হয়ে গেলাম। সেই ফিফটি পারসেন্ট নেওয়ার জন্যই দিল্লী আসা।”

ফেলুদার কি শরীর খারাপ লাগছে? মাথা নীচু করে বসে আছে কেন?

“কী বোকাই না বনলাম রে তোপসে।” ফেলুদা আবার সোজা হয়ে বসেছে। টেবলের ওপর রাখা টিয়ার ছবিটা এক ঝটকায় টেনে নিয়ে সোলাঙ্কির দিকে ছুঁড়ে দিল।

“মিস্টার সোলাঙ্কি, ভালো করে দেখুন তো। যোশী আপনাকে এই ধরণের কিছু বানাতে দিয়েছিলেন কিনা?”

সোলাঙ্কি ছবিটা দেখে উত্তেজনার চোটে দাঁড়িয়ে পড়লেন। “এই তো, এই তোতা পাখিটাই তো বানিয়ে দিলাম যোশীকে। অফ কোর্স, এত দামী কাজ ছিল না। কিন্তু আপনি কী করে জানলেন?”

ফেলুদা সে কথার জবাব না দিয়ে তাকিয়ে রইল সোলাঙ্কির দিকে। “আপনি কি জানতেন আপনার ক্লায়েন্টটি ঠিক সাধুপুরুষ নন?”

সোলাঙ্কি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “সে কথা আমারও মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে। কিন্তু আমার এখানে কী যায় আসে মিস্টার মিটার? উনি টাকা দিচ্ছেন, আমি আমার কাজ করে দিচ্ছি। এর বাইরে গিয়ে আমি কেন ভাবব বলুন তো?”

“ভাবা উচিত ছিল মিস্টার সোলাঙ্কি। আর কিছু না হোক, টাকার লোভটা না করে যোশীর হয়ে কাজ না করাই উচিত ছিল। এখন যে আপনাকে বহু জবাবদিহি দিতে হবে। আমার ধারণা মাধবরাও যোশী আপনাকে দিয়ে জয়পুর প্যালেসের একটি মহামূল্যবান শিল্পকর্মের নকল বানিয়ে আসল জিনিসটিকে কোনও ভাবে সরিয়েছেন।”

সোলাঙ্কির মুখটা ছাইয়ের মতন সাদা হয়ে গেছে। “কী বলছেন প্রদোষবাবু, আমি এর বিন্দু বিসর্গ জানতাম না।”

ফেলুদা ছবিটা ফেরত নিতে নিতে বলল, “আমি আপনাকে বিশ্বাস করার চেষ্টা করছি, কিন্তু পুলিশ সে কথা মানলে হয়। যাই হোক, আপনি আপনার হোটেলের ঠিকানাটা দিয়ে যান, আর দিল্লী থেকে এখন বেরোবেন না। বুঝতেই পারছেন দিল্লী এবং জয়পুরের পুলিশের প্রচুর প্রশ্ন থাকবে আপনার কাছে, আমার সাজেশন হল, যা জানেন সব স্পষ্টাস্পষ্টি বলে দিন।”

সোলাঙ্কিকে দেখে মনে হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক হতে চলেছে। অতি কষ্টে মাথা নাড়ালেন ফেলুদার কথায় সায় দেওয়ার জন্য।

সোলাঙ্কি বেরোতে যাবেন এই সময়ে ফেলুদা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল, “আমার বন্ধুটিকে বোধ হয় আপনি আগে থেকেই চিনতেন, তাই না?” সোলাঙ্কি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, “আপনার বন্ধু?”

ফেলুদার আঙুল লালমোহনবাবুর দিকে, “এই ইনি। স্বয়ং লালমোহন গাঙ্গুলি।”

সোলাঙ্কি আমতা আমতা করে বললেন, “মিস্টার মিটার, আপনাদের সবার সঙ্গেই তো প্রথম দেখা রাজধানী এক্সপ্রেসে। এর আগে সত্যিই আমাদের দেখা হয়নি কোথাও।”

“চেনার জন্য কি সব সময় দেখা হওয়া জরুরি? আমার ধারণা আপনি শ্রী জটায়ুকে মুখে না চিনলেও নামে চেনেন। নাহলে জটায়ু যে থ্রিলার লেখেন সে কথা আপনি জানবেন কেমন করে? মনে পড়ছে ট্রেনে আলাপ হতে না হতেই কী বলেছিলেন? লাইফে কোনও থ্রিল নেই মশাই। যিনি জটায়ুকে চেনেনই না, তিনি হঠাৎ থ্রিলের প্রসঙ্গ টানবেন এটা একটু বড় ধরনের কো-ইনসিডেন্স নয় কি? তাছাড়া ট্রেন অ্যাটেন্ডান্টের সঙ্গে কথা বলে আমি জেনেছি আপনি শেষ মুহূর্তে আপনার অরিজিন্যাল কামরা বদল করে আমাদেরটাতে এসে ঢোকেন।”

সোলাঙ্কি চুপ করে দাঁড়িয়ে। ফেলুদা বলল, “আমার ধারণা আপনি এখনও সব কথা খুলে বলছেন না। মিথ্যাচারণ করে আপনার কোনও লাভ নেই মিস্টার সোলাঙ্কি, এখন একমাত্র সত্যি কথাই আপনাকে বাঁচাতে পারে।”

ভদ্রলোক এবার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লেন, “মিস্টার মিটার, আমাকে বাঁচান। আমি চুরি করিনি।”

“কিন্তু চুরির টাকার ভাগ পাবেন এরকমই কথা হয়েছিল, তাই নয় কি? যোশীর প্ল্যান আপনি জানতেন?”

“জানতাম। গোটা আইডিয়াটাই ও পেয়েছিল একটা হিন্দি বই থেকে। অথরের ছবি সেই বইয়েই ছিল। সেদিন তাই হাওড়া স্টেশনে অথরকে দেখে আর কৌতূহল সামলাতে পারিনি।”

জটায়ু এতক্ষণ টেনিস ম্যাচ দেখার মতন এদিক থেকে ওদিক আর ওদিক থেকে এদিক ঘাড় ঘোরাচ্ছিলেন। এবার খাটের ওপর একটা বিশাল থাপ্পড় মেরে বললেন, “আরররে... কহানি ঝুটি হিরা কি।”

তারপর প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার ‘হিড়িম্বা মন্দিরের হিরে’র হিন্দি অনুবাদ মশাই। এই ফেব্রুয়ারিতে বেরিয়েছে। ভিলেন হিড়িম্বা দেবীর মন্দিরে রাখা আসল হিরেটা গায়েব করে দেবে। বদলে রেখে আসবে একটা নকল হিরে। পুরো কাজটাই করবে রাত্রিবেলা স্কাইলাইটের ভেতর দিয়ে গলে, দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে।”

সোলাঙ্কি বিদায় নিয়েছেন বেশ কিছুক্ষণ, ভদ্রলোকের চোখমুখের অবস্থা দেখে মায়াই হচ্ছিল। ফেলুদা লালমোহনবাবু কে বলল, “আপনার উপন্যাসগুলো বান্ডিল ধরে সব রজনী সেন রোডের বাড়িতে রেখে যাবেন তো। কলকাতায় ফিরেই প্রত্যেকটা বই ধরে ধরে পড়তে হবে। আপনার গাঁজা যে হারে বাস্তব হয়ে উঠছে, ঐ গাঁজাতেই দম না দিলে ফেলু মিত্তিরে ভাত জুটবে না।”

“মাই প্লেজার ফেলুবাবু।” জটায়ু এবার টেনশন মাখানো গলায় বলে উঠলেন, “কিন্তু এদিকে কী হয়ে চলেছে বলুন তো? কিচ্ছুটি মাথায় ঢুকছে না।”

ফেলুদা চাপা গলায় বলে উঠল, “আমরা আসলে প্রথম থেকেই ভুল পথে চলছিলাম লালমোহনবাবু, সেটাই সমস্যা। সিধুজ্যাঠা বলুন বা আমি, সবাই প্রথম থেকেই জেনে আসছি যে এ টিয়া বেচছিল জয়সওয়াল আর কিনছিল যোশী। এখন তো বুঝতেই পারছেন যে, ঘটনাটা উলটো। কিনছিল আসলে জয়সওয়ালই আর বেচছিল যোশী। জয়পুর প্যালেস থেকে আসল টিয়াটি বাগানোর সময় মনে হয় প্যালেসের এক বা একাধিক কর্মচারীকে হাত করেছিলেন যোশী।”

“কিন্তু খুনটা?”

ফেলুদা খাটের সঙ্গে লাগোয়া একটা চেয়ারে বসে পড়েছে, ওর নজর এখন সিলিং এর দিকে। “সিধুজ্যাঠা কাল ফোনে বললেন আমরা যেদিন দিল্লী রাজধানীতে উঠলাম, উনি সেদিন রাত্রেই উইলসন সাহেবের বইটা পড়তে গিয়ে ময়সেনাইটের ব্যাপারটা লক্ষ করেন। পরের দিন সাতসকালেই উনি জয়সওয়ালকে ফোন করেন। জয়সওয়াল পুরো ব্যাপারটা অস্বীকার করে ফোন কেটে দেয়। উনি ভাবছিলেন আমাকে টেলিগ্রাম করবেন, কিন্তু তখনই আমার ফোনটা যায়।”

আমি বললাম, “জয়সওয়ালও নিশ্চয় জানত যে টিয়াটা জয়পুর থেকে চুরি করা হয়েছে?”

“সেটা হওয়াই সম্ভব। যোশীর মতন জয়সওয়ালও যখন একটি নিখাদ চিটিংবাজ। কিন্তু খুনটা কেন করতে যাবে সেটাই তো স্পষ্ট হচ্ছে না।”

লালমোহনবাবু বললেন, “এরকম একটা খুনী লোক দিল্লীর রাস্তায় ওপেন ঘুরে বেড়াচ্ছে, এটা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে কিন্তু।”

“সে কি আর নিজের চেহারায় ঘুরে বেড়াচ্ছে লালমোহনবাবু? সম্ভবত কোনও ছদ্মবেশ নিয়েছে। ছদ্মবেশ... মূর্খ, মূর্খ!”

শেষের কথাটায় লালমোহনবাবু একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “আজ্ঞে?”

“আপনাকে বলিনি লালমোহনবাবু, কথাটা নিজেকে বললাম।” ফেলুদার চোখ জ্বলজ্বল করছে, “কী আশ্চর্য! এই কথাটা আগে মাথায় আসেনি।”

“কোন কথাটা মশাই?” লালমোহনবাবু আরোই হতভম্ব, আমিও।

“পরে বলছি আপনাদের। তোপসে, চট করে আমার ওয়ালেটটা দে তো। কলকাতায় আরও একটা ট্রাঙ্ককল করা দরকার।”

“কাকে ফোন করবে ফেলুদা?”

ফেলুদা ঝড়ের গতিতে বেরোতে বেরোতে বলল, “আমার বন্ধু দেবরাজকে, দেবরাজ গোস্বামী। রবীন্দ্রভারতীর ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%