প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রাজধানীতে জটায়ু এই বোধ হয় প্রথম চড়লেন। সিটের গদিতে যে ভাবে বারকয়েক হাত বোলালেন তাতে বোঝাই গেল দারুণ ইম্প্রেসড হয়েছেন।
“বুঝলেন, আমাদের পাড়ার নগেন সমাদ্দার বলছিল লালুদা ওই ট্রেনে চড়ার পর আর অন্য সব ট্রেন মনে হবে মার্টিনের ন্যারোগেজের ছ্যাকরাগাড়ি। ছোঁড়া একদম খাঁটি কথা বলেছে।” এই সময় ট্রেনের অ্যাটেন্ডান্ট আমাদের কুপে ঢুকে প্রত্যেককে একটা করে গোলাপ ফুল দিয়ে গেলেন।
লালমোহনবাবু ফুলটা ধরে বললেন, “নিজেকে শাহাজান- শাহাজান মনে হচ্ছে মশাই। উফফ! গাড়িতে উঠতে না উঠতেই কী খাতির যত্ন।”
ফেলুদা সুটকেসটা সিটের তলার ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, “তাহলেই ভাবুন, শাহাজানেই এই। শাজাহান বললে না জানি আরও কত আদর আপ্যায়ন পাবেন।”
লালমোহনবাবু একটু থমকে গেছিলেন, তারপর গদিতে একটা জোর চাপড় দিয়ে হেসে উঠতে গিয়েও থেমে গেলেন। কুপের চতুর্থ যাত্রীটি ঢুকে পড়েছেন। লালমোহনবাবু আমার দিকে তাকিয়ে যে রকম মুখভঙ্গি করলেন তাতে বেশ টের পাওয়া গেল আমরা তিনজন ছাড়াও যে আরেকজন যাবেন সেই সম্ভাবনার কথাটা ওনার মাথাতেই ছিল না।
ভদ্রলোক আমাদের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “গুড ইভনিং।” চল্লিশ পেরিয়ে গেছেন বলেই মনে হল, মাথার চুলে যদিও সামান্য পাক ধরেছে।
“গুড ইভনিং মিস্টার সোলাঙ্কি।” বলল ফেলুদা।
ভদ্রলোক এবার স্পষ্ট বাংলায় বললেন, “আপনি কী গাঙ্গুলি না মিটার?”
লালমোহনবাবু দুজনের কথাবার্তা শুনে প্রায় হাঁ হয়ে গেছিলেন। আমাকে তাই বলতে হল কামরার বাইরে রাখা রিজার্ভেশন লিস্টে চোখ বোলালেই সবার পদবিগুলো দেখে নেওয়া যায়।
“মিটার, আমার নাম প্রদোষ মিত্র। এ আমার খুড়তুতো ভাই তপেশরঞ্জন মিত্র, আর ইনি আমাদের বন্ধু লালমোহন গাঙ্গুলি।”
সোলাঙ্কি ফেলুদা আর লালমোহনবাবু দুজনকেই একটা করে ভিজিটিং কার্ড দিলেন। ফেলুদা কার্ডে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, “লিটল রাসেল স্ট্রিটের সোলাঙ্কি জুয়েলার্সটা কি আপনারই দোকান?”
“গ্রেট, একদম ঠিক ধরেছেন।” জানালেন সত্যেন্দ্র সোলাঙ্কি। “জুয়েলরি নিয়ে আমাদের চার পুরুষের ব্যবসা। কলকাতায় ব্যবসাটা আমিই দেখি। নর্থ ইন্ডিয়ায় ব্যবসা চালায় আমার ভাইরা। দিল্লীতে বিজনেসের কাজেই যাচ্ছি যদিও, ভাইদের সঙ্গেও দেখা হয়ে যাবে। আপনাদেরও বিজনেস নাকি ঘুরতে চললেন?”
ফেলুদাকে খানিকটা বাধ্য হয়েই নিজের কার্ডটা দিতে হল। কার্ড দেখে সোলাঙ্কি বললেন, “কী বলব মিস্টার মিটার, জীবনে এই প্রথম কোনও প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের সঙ্গে আলাপ হল। তা দিল্লী চললেন কি কোনও কেসের কাজে?”
ফেলুদা লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “এনার জন্যই দিল্লী যাওয়া। কলকাতায় বসে যা যা প্লট ভাবার ছিল সব ভেবে ফেলেছেন, এখন শহরের বাইরে যাওয়া ছাড়া গতি নেই।”
“কেয়াবাত মিস্টার গাঙ্গুলি, আপনি রাইটার নাকি?”
“হেঃ, ওই একটু আধটু।” লালমোহনবাবু দেখলাম বিনয় দেখাতে গিয়ে প্রায় চোখ বুজে ফেললেন। সোলাঙ্কি বাঙালি রাইটারদের ভুরি ভুরি প্রশংসা করে বললেন, “আমি একটু টয়লেট থেকে ফ্রেস হয়ে আসি। এসে কিন্তু আপনার লেখার গল্প শুনব। কাস্টমারদের বায়নাক্কা শুনে শুনেই জীবন কেটে গেল, কোনও উত্তেজনা নেই মশাই লাইফে। একটু থ্রিল না হলে চলে, বলুন তো?”
সোলাঙ্কি বেরোলে লালমোহনবাবু বললেন, “দিব্যি লোক। একজন অবাঙালি বাংলা সাহিত্য নিয়ে এত খোঁজখবর রেখেছে, ভাবাই যায় না। কি বলেন?”
ফেলুদা ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবছিল। লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “হুঁ, একটু বেশিই খবর রাখেন।”
লালমোহনবাবু ধড়মড় করে উঠে বসে বললেন, “কী ব্যাপার মশাই? এর মধ্যেই সাসপিশাস কিছু দেখলেন নাকি?”
“নাহ, সেরকম কিছু নয়। আপনারা বসুন, আমি একটু ঘুরে আসি।” ফেলুদার গলাটা একটু অন্যমনস্ক কি?
লালমোহনবাবু ঝিম মেরে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার দাদার কী ব্যাপার বলো তো তপেশ? আমার কিন্তু সোলাঙ্কিকে দিব্যি লাগল।” ফেলুদা যে কী ভাবছে, তা নিয়ে আমারও কোনও ধারণা নেই, সেটাই বললাম ভদ্রলোককে।
“অনেকদিন হাতে কেস আসেনি বলে বোধ হয় তোমার দাদা একটু উত্তেজিত হয়ে আছেন।” লালমোহনবাবুর কথায় খেয়াল পড়ল ফেলুদা এখনও ওনাকে জয়পুরী টিয়া নিয়ে কিছু বলেনি।
ফেলুদা একটু পরেই ফিরে এল, এখন একেবারে স্বাভাবিক মুখ। আর একটু পরেই সোলাঙ্কিও এসে ঢুকলেন। চান করে এলেন বোঝা যাচ্ছে, গা থেকে ভুরভুর করে পারফিউমের গন্ধ বেরোচ্ছে। বাকি সময়টুকু গল্পগুজবেই কেটে গেল। সোলাঙ্কি লালমোহনবাবুর প্লট শুনে কখনও বললেন, “গুড গড!” কখনও বললেন “লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে মশাই!” ফেলুদা সেরকম ভাবে আড্ডায় না ঢুকলেও টুকটাক কথা বলছিল অবশ্য।
খাওয়ার পরে সোলাঙ্কি বললেন, “দুটো আপারই তো আপনাদের। আমি যদি একটা লোয়ারে শুয়ে পড়ি, উড ইউ মাইন্ড? আমার আবার কালকে দিল্লী পৌঁছেই ছোটাছুটি করতে হবে, একটা ভালো ঘুম দরকার।”
আমাদের কারোরই অসুবিধা নেই। সোলাঙ্কির ওপরের আপার বার্থে গেলাম আমি। লালমোহনবাবু নিলেন অন্য আপার বার্থ। বললেন ইদানীং আপার বার্থেই নাকি ওনার ভালো ঘুম হয়।
মাঝরাতের দিকে একবার ঘুমটা ভেঙে যেতে নীচে কোনাকুনি নজর গেল।
কুপের হালকা নীলচে আলোতেও দেখতে পেলাম ফেলুদার চোখ দুটো খোলা।
সোলাঙ্কি ভালোই ঘুমোচ্ছেন, হালকা নাক ডাকার একটা আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
আবার কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই, সকালে ব্রেকফাস্ট নিয়ে অ্যাটেন্ডান্ট আসার পর ঘুম ভাঙল।
সকাল দশটা কুড়িতে পৌঁছনোর কথা, নিউ দিল্লী স্টেশনে রাজধানী ঢুকে গেল দশটা পনেরোয়। লালমোহনবাবু বললেন, “ভারতবর্ষে একটা ট্রেন বিফোর টাইম পৌঁছচ্ছে, এটা ভাবতে পারেন? ধন্য রাজধানী এক্সপ্রেস।” সোলাঙ্কি যাওয়ার আগে হ্যান্ডশেক করে গেলেন। ফেলুদাকে বললেন “কলকাতায় ফিরলে একবার আসবেন আমাদের দোকানে, খুব ভালো লাগবে।”
জনপথের কাছে লালমোহনবাবুই হোটেলের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। ফেলুদা হোটেলে ঢুকেই আগে রিসেপশনে গেল ফোন করতে। বুঝলাম জয়সওয়ালকে পৌঁছনোর সংবাদটা দেবে। আমাকে বলে গেল জটায়ুর ঘরে ওয়েট করতে।
লালমোহনবাবু বিছানায় আয়েশ করে ঠেস দিয়ে বসে বললেন, “সেই সিমলা যাওয়ার সময়ে দিল্লী এসেছিলাম, মনে আছে তপেশ?”
মনে আর থাকবে না? এখনও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। খুব অল্প সময়ের জন্যই দিল্লীতে ছিলাম, কিন্তু তার মাঝেই ফেলুদার ওপর হামলা হয়েছিল।
হামলার কথা লালমোহনবাবুর খেয়াল আছে কিনা বোঝা গেল না। আমাকে বললেন, “দিল্লী নিয়ে এথিনিয়াম ইস্কুলের বৈকুণ্ঠ মল্লিক এমন কবিতা লিখেছিলেন, এখনও আবৃত্তি করলে লোম খাড়া হয়ে ওঠে। শুনবে নাকি?” বলে অবশ্য আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই চোখ বুজে আবৃত্তি শুরু করলেন।
নিখিল বিশ্ব ক্রন্দনরত, ভেসেছে যমুনা তীর
তৈমুর নামে ঘাতকে তোমার ছিন্ন করেছে শির।
হৃদিমূলে মম জ্বলেছে বহ্নি, রুষিয়া উঠেছে তেজ,
তবু দেখি ঠাঁই পেয়েছে হেথায় মুঘল আর ইংরেজ।
অহো দিল্লী, তুমিই সেই জনগণরাজধানী
হিংসারে ফেলি রেখেছ যতনে চিরশান্তির বাণী।
লালমোহনবাবু চোখ বন্ধ করেই বললেন, “শহরটা নিয়ে কবির আবেগ দেখেছ তপেশ? আর প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসাই যে আসল কথা সেটা দু লাইনেই কেমন মনে করিয়ে দিলেন, বলো?”
“খুব ভালোবেসে বোধ হয় মুঘল বা ইংরেজ কাউকেই এ শহর ঠাঁই দেয়নি।” ফেলুদা যে কখন ফিরে এসেছে, খেয়াল করিনি।
লালমোহনবাবু প্রতিবাদের ভঙ্গিতে হাতটা ওঠালেন, “কী বলছেন মশাই? কত বছর ধরে রাজত্ব করে গেল সব।”
“সেটাই কথা লালমোহনবাবু, রাজত্ব করার জন্যই তো এসেছিল। ভালোবাসা পেতে এসেছিল কি?”
কথাটা লালমোহনবাবুর খুব একটা পছন্দ হয়েছে বলে মনে হল না। ফেলুদা অবশ্য তাতে পাত্তা না দিয়ে বলল, “চলুন, খাওয়াদাওয়াটা সেরে ফেলা যাক। আপনার সাহিত্যমেলা তো শুরু হচ্ছে আজ বিকালে, তাই না? দিল্লী শহরটা ঘোরার মতন এখনও কিছু সময় আছে তাহলে।”
আমার মনটা ছটফট করছিল ফোনে কী কথা হল শোনার জন্য। কিন্তু ফেলুদা দেখলাম সেসবের ধারেকাছে গেল না।
অক্টোবরের শুরু বলে দুপুরের দিকটাতেও বেশ চমৎকার আবহাওয়া। আমরা জনপথ থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা চলে এসেছি কুতব মিনারে। ঘুরতে আসার প্ল্যানটা ফেলুদারই। লালমোহনবাবু ট্যাক্সিতে আসতে আসতেই বলছিলেন, “গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ভাই তপেশ, কুতুব মিনার দেখার শখ কী আজকের? ফরটি টু-তে জ্যাঠা মোহিনীমোহন দিল্লী ঘুরতে এসেছিলেন। গড়পারের বাড়িতে বসে কুতুব মিনারের কত গপ্পো যেই শুনিচি, ওফ! বেলাডোনা পালসেটিলা খেতাম আর স্বপ্ন দেখতাম আমিও একদিন ঘুরতে আসব। তা সে স্বপ্ন অ্যাদ্দিনে সত্যি হতে চলেছে।”
প্রায় সাড়ে সাতশ বছর আগে কুতব উদ দিন আয়বক যে মিনার বানিয়ে গেছিলেন, সেটা অবশ্য এখন দেখা যাবে না। প্রথমে বাজ পড়ে, তারপর ভূমিকম্পে আসল মিনার প্রায় বেপাত্তা হয়ে আছে। এখন যা রয়ে গেছে তা মূলত ব্রিটিশ আমলে বানানো। কুতব মিনারের প্রায় পাশেই বিখ্যাত লৌহস্তম্ভ। শোনা যায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, যাঁকে আমরা বিক্রমাদিত্য নামে জানি, নাকি বানিয়েছিলেন এই লোহার পিলারটি। লালমোহনবাবু খানিকক্ষণ হাঁ করে থেকে বললেন, “এক ফোঁটা মরচে নেই। ভাবতে পারো? অথচ সেই যে রাজস্থানে নেপালি কুকরিটা নিয়ে গেছিলাম, তাতে অলরেডি জং ধরে গেছে। কলিযুগে বেঁচে থেকে সুখ নেই ভায়া।”
ফেলুদা সবে প্রশ্ন করেছে “বিক্রমাদিত্য কোন যুগের রাজা ছিলেন বলে আপনার মনে হয়”, আর ঠিক সেই সময় একটা ঢিল এসে লালমোহনবাবুর কাঁধে থাকা ঝোলায় লেগে পড়ে গেল। লালমোহনবাবু চমকে উঠে পড়েই যাচ্ছিলেন, আমি তাড়াতাড়ি ধরে না ফেললে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। ফেলুদাকে ডাকব বলে ঘুরে দেখি ফেলুদা বাহারি কাজ করা খিলানগুলোর দিকে সোজা দৌড় দিয়েছে।
“ভাই তপেশ, এটা কী ব্যাপার বলো তো?” ঘুরে দেখি লালামোহনবাবুর হাতে ধরা একটা ছোট্ট চিরকুট। ভদ্রলোকের মুখটা পুরো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
চিরকুটটা হাতে নিয়ে দেখি ইংরেজিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা — ‘টিয়ার হদিশ ছেড়ে কলকাতা ফিরে যাও, নইলে ঘোর বিপদ।’
মিনিট পাঁচেক বাদে ফেলুদা ফিরল। ওকে চিরকুটটা দিতে শুধু এক ঝলক দেখে গম্ভীর গলার বলল, “হুঁ।”
তারপর লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি ঠিক আছেন তো? আমাদের এখানে আরও ঘণ্টাখানেক কাটানো দরকার।”
লালমোহনবাবু ঘাড় নাড়লেন, খুব একটা ইচ্ছা নেই বলেই মনে হল যদিও। এরকম একটা দুর্ঘটনার পরেও ফেলুদা থাকার জন্য বলছে দেখে আমিও একটু অবাক হলাম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন