প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পরেরদিন সাতসকালে বাঁটুল সর্দার আসিয়া উপস্থিত। তাহাকে দেখিয়া প্রসন্ন বোধ না করিলেও বুঝিলাম ব্যোমকেশের কার্যসূত্রেই তার আগমন। বাঁটুলের গুন্ডামি আমাদের পাড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকিলেও উত্তর ও মধ্য কলিকাতার অপরাধ জগতের ঠিকুজি কুলুজি তার নখদর্পণে। ব্যোমকেশ তাহাকে যথারীতি সিগারেট ও চা সহকারে আপ্যায়ন করিল। সিগারেটের ঘ্রাণে দেখিলাম বাঁটুলের ধূর্ত মুখটিতে বিশেষ সন্তোষের উদয় হইল, পরে চায়ের পেয়ালাটি তুলিয়া লইয়া ব্যোমকেশকে বলিল, “আপনার কথামতন কালকে ও চত্বরে গেছিলাম কর্তা।”
ব্যোমকেশ বাঁটুলের চোখে চোখ রাখিয়া বলিল, “কী খবর পেলে?”
“খবর পাওয়া কি সোজা কথা, সবাই মুখে কুলুপটি আটকে বসে আছে। তার ওপর রামবাগানের দিকে বহুকাল যাওয়া হয়নি, এবারে গিয়ে দেখি কত যে নতুন মুখ। প্রতিদিন ভিড় বাড়ছে। গ্যাঁটের কড়ি কিছু ফেলতে হল, খবরও মিলেছে কিছু।
“প্রথমজনের নাম কুন্তী, রামবাগানে এসেছিল বছর পাঁচেক আগে, মাঝ তিরিশেক বয়স। দ্বিতীয়জনের নাম রমলা, সে রামবাগানেরই মেয়ে। তার মা-ও ওখানেই থাকত, যদিও সে গত হয়েছে প্রায় বছরখানেক হল। রমলার বয়স তুলনায় কম, বছর কুড়িও নয়। আর তৃতীয় শ্যামা, বছর দুইও হয়নি ও চত্বরে, চল্লিশের ওপরে বয়স।”
ব্যোমকেশ একটু ভাবিয়া বলিল, “কুন্তী আর শ্যামা এর আগে কোথায় থাকত সে, নিয়ে কিছু খবর পেলে?”
বাঁটুল সিগারেটে একটি সুখটান দিয়া বলিল, “কুন্তীর ব্যাপারে কোনও খবর পাওয়া যায়নি, শ্যামা এসেছিল সিলেট থেকে।”
“আর কিছু?”
বাঁটুলের বর্তুলাকার চক্ষুদ্বয় কুঞ্চিত হইল, ব্যোমকেশের দিকে ঝুঁকিয়া বলিল, “ওই টাকায় আর কত খবর হয় কর্তা? মাগ্যিগন্ডার বাজার, বোঝেনই তো।”
ব্যোমকেশ সম্ভবত একথা শোনার জন্য প্রস্তুতই ছিল। শান্ত স্বরে বলিল, “টাকা পাবে। কিন্তু শর্ত আছে।”
বাঁটুল থমকাইয়া বলিল, “শর্তও আছে? আমি তো ভাবছিলাম আপনারই আমাকে দরকার।”
“দরকার তো বটেই, তাই জন্যই আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে একবার ও তল্লাটে যেতে চাই।”
বাঁটুলের মুখে একটি বিচিত্র হাসি ফুটিয়া উঠিল। সামান্য ব্যঙ্গের স্বরেই বলিল, “আপনারা ভদ্রলোক, ও তল্লাটে গেলে কি ভালো দেখায়?”
দেখিলাম ব্যোমকেশের মুখের একটি মাংসপেশিও নড়িল না, সামান্য কঠিন স্বরে বলিল, “বদনাম রটলে তোমাকে সালিশির জন্য ডাকব না বাঁটুল। আজকে সন্ধ্যাবেলাই যাওয়া চাই।”
ব্যোমকেশের দৃঢ় কণ্ঠস্বরে বাঁটুল অপ্রস্তুত হইয়াছিল, সন্ধ্যাবেলায় হাজিরা দিবে স্বীকার করিয়া বিদায় লইল। আমি মুখ খুলিবার আগেই ব্যোমকেশ হাসিয়া উঠিল, “তোমার মুখের চেহারাটা দেখার মতন হয়েছিল অজিত। বাঁটুল যে তোমার ঠিক প্রীতির পাত্র নয় তা জানি বটে, তবে আজ তোমার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল পারলে দু ঘা কষিয়ে দাও।”
“ট্যারাব্যাঁকা কথাগুলো শুনলে না? আমার তো গা জ্বলে গেল রীতিমতন।”
ব্যোমকেশ হাসিতে হাসিতেই বলিল, “ট্যারাব্যাঁকা নয় হে, ও ওর মতন করে সোজাসুজি কথাই বলেছে। তোমার মার্জিত রুচির সঙ্গে সে কথা খাপ খায় না বটে, কী আর করা।”
আমি একটি দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া বলিলাম, “ক্লাস ডিফারেন্সকে আর অস্বীকার করি কি করে বলো?”
ব্যোমকেশ তড়াক করিয়া উঠিয়া আলমারি থেকে একটি ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি বাহির করিল, “ক্লাস ডিফারেন্সের কথা মনে করিয়ে ভালো করলে।”
আমার বিস্ময়মিশ্রিত দৃষ্টি দেখিয়া বলিল, “সুবিমল সান্যাল এককালে গরিব ছিলেন বলে এখনও ওনাকে সমতুল্য মনে করছ নাকি?”
গতদিনই সুবিমল সান্যালের সাজসজ্জা দেখিয়া একটা আঁচ পাইয়াছিলাম। কিন্তু আজ বিডন স্ট্রিটের মোড়ে তাঁর প্রাসাদোপম বাড়িটি দেখিয়া হতবাক হইয়া গেলাম। ব্যোমকেশ দরোয়ানকে দিয়া এত্তেলা পাঠাইতেছিল, দরোয়ান যাওয়ার পর বলিলাম, “এ বাড়ির ছেলেকে ধরবে না তো কাকে ধরবে বলো দিকিন?”
ব্যোমকেশ চাপা স্বরে বলিল, “হুম, বার্মাফেরত ভাগ্যলক্ষ্মীটি ঝাঁপি একেবারে উপুড় করে দিয়েছেন।”
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুবিমল সান্যাল আসিয়া অভ্যর্থনা জানাইলেন। ভদ্রলোকের চোখ দুটি রক্তাভ, স্লিপিং গাউনটি ছাড়ার সুযোগ পাননি, মুখটি যেন আজ আরও শুষ্ক দেখাইতেছে। ব্যোমকেশ ধীরস্বরে বলিল, “যদি অসুবিধা না থাকে তাহলে অমিয়র ঘরটি একবার দেখতে চাই।” সুবিমল ক্লান্ত স্বরে সম্মতিজ্ঞাপন করিলেন।
অমিয়র ঘরটি দ্বিতলে অবস্থিত, ছিমছাম এবং বেশ পরিপাটি করিয়া সাজানো। একটি বুক শেলফও আছে, সেখানে দর্শন এবং গণিতের কিছু ভারী ভারী বইয়ের পাশে আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যর বইও নজরে আসিল। ব্যোমকেশ অমিয়র পড়ার টেবিলটি দেখিতেছিল। সেখানেও কিছু বই, কিছু কাগজপত্র। ব্যোমকেশ একটি বই হাতে তুলিয়া লইয়া দেখিতেছিল, নাম দেখিয়া বুঝিলাম প্লেগের চিকিৎসা নিয়ে লেখা। সুবিমলও আমাদের সঙ্গে ঘরে প্রবেশ করিয়াছিলেন। ব্যোমকেশ তাঁর দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাইয়া বলিল, “এ বইটি দেখছি অমিয় বেশ মন দিয়েই পড়েছে, জায়গায় জায়গায় পেন্সিলের দাগ। প্লেগ নিয়ে কেন চর্চা করছিল তা কিছু জানেন?”
সুবিমল সামান্য চমকিত হইলেন। তারপর মাথা নাড়িলেন, “সে তো ঠিক জানি না। তবে আপনাকে বলেছিলাম যে ওর মা প্লেগে মারা গেছিলেন, সেই সূত্রেই বোধ করি ওই রোগ নিয়ে পড়াশোনা করছিল।”
ব্যোমকেশ সম্মতিসূচক মাথা নাড়িল। টেবিলের লাগোয়া একটি দেরাজ, সেটির মধ্যে এক ঝাঁক হ্যান্ডবিল এবং রসিদ দেখা গেল। ব্যোমকেশ রসিদগুলো তদগত চিত্তে উলটাইয়া পালটাইয়া দেখিতেছিল। আচমকা প্রশ্ন করিল, “দেবদত্ত সাধুখান নামে কাউকে চেনেন নাকি? অমিয় এনাকে বেশ কিছু টাকা দিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে, অন্তত রসিদ তাই বলছে দেখছি।”
সুবিমলের মুখে দেখিলাম যথেষ্ট বিরক্তির উদ্রেক ঘটিল। “চিনি বইকি,” কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া সুবিমল বলিলেন, “আপনার কাছে লুকোব না ব্যোমকেশবাবু। সম্প্রতি অমিয়র স্বভাবচরিত্রে কিছু পরিবর্তন এসেছিল, যার ফলে বাবা ছেলের স্বাভাবিক সম্পর্কটি কিছুটা হলেও নষ্ট হয়েছে। এবং সেটার জন্য পুরোপুরি দায়ী এই লোকটি, দেবদত্ত।”
ব্যোমকেশ চকিত হইয়া বলিল, “আর একটু বিশদে আলোকপাত করতে পারেন?”
“এই দেবদত্তের সঙ্গে আমার ছেলের আলাপ রিগ্যালে, চৌরঙ্গীর এই ক্লাবটিতে ও যেতে শুরু করে গত বছরের শুরুর দিকে। শুরু শুরুতে সামান্য গানবাজনা, একটু আধটু টেনিস খেলা এইসবই করত। বিকাল সন্ধ্যা নাগাদ যেত, ঘণ্টা দুই-আড়াই কাটিয়ে চলে আসত। বছরখানেক আগে থেকে লক্ষ করলাম অমিয়র মাঝে মাঝেই বাড়ি ফিরতে বেশ দেরি হচ্ছে, দু-একদিন তো ফিরল প্রায় মাঝরাতের পর। প্রথম প্রথম প্রশ্ন করলে একটু বিব্রত হত, এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। তখনই জেনেছিলাম দেবদত্তই ওকে নিয়ে নানা পাড়ায় ঘুরতে যেত। বাপের মন বুঝতেই পারছেন, নানারকম চিন্তা আসত। কিন্তু ওকে বিব্রত হতে দেখে খুব কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতাম না। যত দিন যেতে লাগল, বিব্রতবোধটা কেটে গিয়ে যেন একটা ঔদ্ধত্য চাগাড় দিতে লাগল, তারপর একদিন...” সুবিমলকে সামান্য দিশাহারা লাগিল, যেন মনস্থির করিতে পারিছেন না কথাটা আমাদেরকে বলিবেন কিনা।
খানিক চুপ থাকিয়া, সামান্য ধরা গলায় ফের বলিলেন, “একদিন ফিরল ভোররাতে, সম্পূর্ণ মাতাল হয়ে। আমি জেগেই ছিলাম। অমিয়র অবস্থা দেখে গা জ্বলে গেল, কিছু কড়া কথা শোনালাম। জীবনে এই প্রথমবার অমিয় আমার ওপর গলা চড়াল। কী বলব ব্যোমকেশবাবু, চাকরবাকরদের সামনে আমার মাথা কাটা গেছিল সেদিন। সবার সামনে চেঁচিয়ে জানাল সারারাত সে কোথায় কাটিয়েছে, সে খারাপ জায়গার নাম আমি মুখেও আনতে চাই না। আরও কত যে অকথা কুকথা, সেসব আর নাই বা বললাম। সেদিনের পর থেকে আমিও আর কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করিনি ওকে, বাড়ি থেকে কখন বেরোত কখন ঢুকত সেসব নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। বলতে গেলে সেদিনের পর থেকে ওর সঙ্গে আমার আর ভালো করে কথাবার্তাই হয়নি। হয়তো আমারই দোষ, বাপের অহঙ্কার ত্যাগ করে আরেকবার ওর সামনে দাঁড়ালে আজ ওকে হয়তো হারাতে হত না।”
ব্যোমকেশ সহানুভূতিশীল কন্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “এটি কতদিন আগের কথা?”
“তা ধরুন, মাসতিনেক তো হবেই।”
সুবিমল দাঁতে দাঁত চাপিয়া বলিলেন, “ওই দেবদত্ত স্কাউন্ড্রেলটির পাল্লায় না পড়লে এসব কিছুই হত না। আর আপনি তো নিজের চোখেই দেখলেন কীভাবে অমিয়র মাথা মুড়িয়ে চলেছিল। যত টাকা সে নিয়েছে অমিয়র থেকে, তার পুরো হিসেবও বোধ হয় নেই। কতবার যে বারণ করলাম ওকে, নিজের ছেলে না শুনলে আর কী করব।”
“আপনি দেবদত্তকে দেখেছেন?”
“হ্যাঁ, একবারই দেখা হয়েছিল। অমিয়ই নিয়ে এসেছিল ওকে এ বাড়িতে। প্রথম দর্শনেই আমার এত বিতৃষ্ণা জেগেছিল যে পরে লোকটি এ বাড়িতে এলেও আমি আর দেখা করিনি।”
ব্যোমকেশ হাতঘড়ির দিকে এক ঝলক দেখিয়া বলিল, “এ মুহূর্তে আর কোনও প্রশ্ন নেই, তবে হয়তো দু-এক দিনের মধ্যেই আপনার বাড়িতে একবার ফেরত আসতে হবে। ভালো কথা, ওই প্লেগের বইটি আমি নিয়ে যাচ্ছি। আশা করি আপনার অসুবিধা নেই।”
“স্বচ্ছন্দে নিয়ে যান। কিন্তু কী বুঝছেন ব্যোমকেশবাবু? অমিয়কে কীভাবে ফিরে পাব?”
ব্যোমকেশ অন্যমনস্ক স্বরে বলিল, “এই মুহূর্তে কিছু বলা মুশকিল। কিছু জায়গায় যাওয়া দরকার, আরও খোঁজখবর চাই।”
সুবিমল সান্যাল সামান্য আশাহত স্বরে বলিলেন, “দেখুন কী করতে পারেন। মনে হচ্ছে পরের কিস্তির টাকার ব্যবস্থাও করতেই হবে, দুদিনই যা সময়।”
ব্যোমকেশ আর বাক্যব্যয় না করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। সিঁড়ি দিয়া নামিয়ে যাওয়ার মুখে হঠাৎ সুবিমলের দিকে ফিরিয়া বলিল, “ভালো কথা। দ্বিতীয় যে চিঠিটি আপনার কাছে এসেছিল সেটি একবার দেখাতে পারেন?”
“হাতের কাছে তো নেই। আমি আপনার বাড়িতে আজ বিকালের মধ্যে পাঠিয়ে দেব।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন