সপ্তম অধ্যায়

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

ব্যোমকেশ ফিরিল বিকাল নাগাদ, দেখিলাম প্লেগের বইটিও সঙ্গে লইয়া গেছিল। সুবিমল ছদ্মবেশের প্রসঙ্গ তুলিয়াছেন শুনে কেন জানি ভ্রূকুঞ্চন করিল।

বলিলাম, “টাকার বন্দোবস্ত যে হয়ে গেছে তাও দেখে এলাম। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার শ্রীশ সামন্ত নিজে টাকার সুটকেস নিয়ে ঢুকছিলেন।”

ব্যোমকেশ প্রথমটায় ভালো করিয়া শুনতে পায় নাই, বলল, “সুবিমল সান্যাল টাকার বন্দোবস্ত যে ঠিকই করতে পারবেন, তা অপহরণকারী জানে।”

বলিতে বলিতে আমার দিকে ঘুরিয়া সবিস্ময়ে বলিল, “কী বললে? শ্রীশ সামন্ত নিজে টাকা নিয়ে গেছেন?”

স্বীকার করিলাম।

“কিন্তু ব্যাঙ্ক ম্যানেজার নিজে কেন টাকা নিয়ে যাবে সুবিমল সান্যালের বাড়ি?”

“দেখো, হয়তো এত বড় ক্লায়েন্ট বলে নিজেই সেবা দিচ্ছেন।”

ব্যোমকেশ বলিল, “তা হতে পারে, কিন্তু কী যেন মিলছে না।” বলিয়া একটি সাদা কাগজে হিজিবিজি কাটিতে শুরু করিল। বুঝিলাম আপাতত কথোপকথন বন্ধ রাখিতে হইবে। আধঘণ্টা পর ঝড়ের গতিতে বাহির হইয়া গেল, শুনিলাম রান্নাঘরে পুঁটিরামের সঙ্গে কী কথাবার্তা চলিতেছে।

বেরনোর সময় ব্যোমকেশকে বলিলাম, “খুনী যেরকম নৃশংস প্রকৃতির তার সঙ্গে সামনাসামনি মোলাকাতের জন্য তো সশস্ত্র থাকা প্রয়োজন। তুমি কিছু ব্যবস্থা করেছ নাকি?”

“সে আর বলতে, এই যে,” দেখি ব্যোমকেশের হাতে মস্ত একখানি টর্চ। আমি রাগত স্বরে অনুযোগ জানাইতে যাচ্ছিলাম, ব্যোমকেশ হাত তুলিয়া অভয় প্রদান করিল।

রামবাগানের বড়রাস্তার উলটোদিকের গলিতে যখন দুজনে পৌঁছাইলাম, তখন আটটা বাজতে মিনিট পাঁচেক বাকি। ব্যোমকেশকে ফিসফিস করিয়া বলিলাম, “ব্ল্যাক আউটের বাজারে রোজ যে এরকম রাত্রে বেরোচ্ছ, পুলিশ ধরলে বলবে কী?”

“বলব, বীরেনবাবু বলেছেন দুদিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।”

গরলতমসা

হাসিয়া ফেলিলাম, এমন সময়ে ব্যোমকেশ একটি মৃদু ধাক্কা দিল। দেখি কুহু আসিয়া ল্যাম্পপোস্টের তলায় দাঁড়াইয়াছে, চাঁদের আলোয় আজ তার অন্য রূপ দেখিলাম। ভরা শীতের রাত্রেও তাহাকে রঙ্গিণী সাজিতে হইয়াছে। তার চড়া প্রসাধন, ফিনফিনে শাড়ি সবই রাস্তার এই পার থেকেও দেখা যাইতেছে। কাঁধে আলগোছে একটি চাদর ফেলা।

ব্যোমকেশ এদিক থেকে হাত তুলিল। কুহুও আমাদের দেখিতে পাইয়াছে।

রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। আমার ঘড়ির কাঁটার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দই কানে আসিতেছে না, এয়ার রেইডের ভয়ে রাস্তার ঘড়িগুলিও খুলিয়া ফেলা হইয়াছে। মিনিট পাঁচেক পর খেয়াল হইল ব্যোমকেশের দিক থেকে সাড়া শব্দ আসিতেছে না। ঘুরিয়া দেখি ব্যোমকেশ উদগ্রীব হইয়া চাহিয়া রহিয়াছে, কিন্তু বড় রাস্তার দিকে নয়, বরং আমাদের গলির ভিতরের দিকে।

কয়েক হাত পরেই গলিটি বাঁকিয়া গিয়াছে। মনে হইল একটি ছায়ামূর্তি অগ্রসর হইতেছে। ডাকিলাম, “ব্যোমকেশ!”

উত্তর এল, “চিন্তা নেই, তুমি রাস্তার দিকে দেখো।”

মিনিটখানেকের মধ্যে সে ছায়ামূর্তি এসে ব্যোমকেশের পিছনে দাঁড়াইল।

“বাঁটুল কোথায় পুঁটিরাম?”

“আজ্ঞে, আপনার কথা মতন সে অন্য গলির সামনে নজর রাখছে।”

আমি অধীর হইয়া ফিসফিস করিয়া বলিলাম, “ব্যোমকেশ, কী হচ্ছে বলো তো?”

ব্যোমকেশ চাপা স্বরে বলিল, “এখন ব্যাখ্যা করার সময় নেই অজিত। আর কী হচ্ছে বা হতে চলেছে তা আমি নিজেও পুরোপুরি জানি না। পুঁটিরাম, তোমার বন্ধু কোথায়?”

“ওই যে, এসে গেছে।”

দেখিলাম ল্যাম্পপোস্টের নীচে আর একটি লোক উদয় হইয়াছে, কুহুকে কিছু বলিতেছে। রাস্তার এপার থেকে না বোঝা গেলেও মনে হইল একটি তর্কাতর্কি বাধিয়া উঠিতেছে। কুহুও যাইবে না, আর এ ব্যক্তিও নাছোড়বান্দা।

ব্যোমকেশ সজোরে হাত ধরে টানিল, “অজিত এসো।”

ব্যোমকেশ প্রায় দৌড়াইতে শুরু করিল, বাধ্য হয়ে আমিও। গলি ত্যাগ করিবার পূর্বে দেখিলাম পুঁটিরাম আমাদের জায়গাটি লইয়াছে, ব্যোমকেশের শাল দিয়া তার মস্তক আবৃত।

ব্যোমকেশকে বলিলাম, “কুহুকে যে বিরক্ত করিতেছে সেই লোকটির কী হবে?”

ব্যোমকেশ মাথা না ঘুরাইয়াই জবাব দিল, “চিন্তা নেই, ও আমারই লোক। আর মিনিট দুয়েক পরেই চলে যাবে।”

অন্য গলি দিয়া বার হইয়া দ্রুতবেগে বড় রাস্তা অতিক্রম করিলাম দুজনে। দূরে ডানদিকে দেখিলাম ল্যাম্পপোস্টের নীচে কুহু এখনও দাঁড়িয়ে, পুঁটিরামের বন্ধু বাকবিতণ্ডা শেষ করিয়া চলিয়া যাইতেছে। বড় রাস্তা অতিক্রম করিয়া উলটোদিকের গলিতে ঢোকা মাত্র আরেক ব্যক্তি ছুটিয়া আসিল।

“কর্তা, উনি মিনিট পাঁচেক হল এ গলিতে ঢুকেছেন।”

“সর্বনাশ, অজিত এসো।”

এই গলি ধরিয়া ছুটিতে ছুটিতে অনুধাবন করিলাম পূর্বদিন এখানেই এসেছিলাম। গলিঘুঁজি পার হইয়া কখন সেই পোড়োবাড়ির কাছে আসিয়া পড়েছি। ব্যোমকেশ টর্চের আলো ফেলিল, কেউ নেই। কিন্তু ব্যোমকেশ দেখিলাম উৎকণ্ঠিত হয়ে কী যেন শুনিবার চেষ্টা করিতেছে। এইবার আমিও শুনতে পাইয়াছি। ক্ষীণ শব্দ, কিন্তু মনে হচ্ছে কাছেই কোথাও ধস্তাধস্তি চলিতেছে।

“এদিকে অজিত, শিগগির।” পোড়ো বাড়িটির পাশ দিয়ে আর একটা ছোট্ট গলি চলে গেছে। সেই গলির অন্য পাশে টানা পাঁচিল।

ব্যোমকেশের টর্চের জোরালো আলো গিয়া গলির শেষপ্রান্তে পড়িল। চোখের সামনে উন্মোচিত হইল একটি বীভৎস অপরাধের প্রেক্ষাপট।

নোনাধরা দেওয়ালের পাশটিতেই একটি পুরুষদেহ পড়িয়া রহিয়াছে, আর তার পাশেই হাঁটু মুড়ে বসিয়া আছে প্রেতবৎ একটি মূর্তি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%