প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ব্যোমকেশের ফিরিতে ফিরিতে দুপুর গড়াইয়া বিকাল হইয়া গেল। জিজ্ঞাসা করিলাম, “কী বুঝলে? কূলকিনারা সম্ভব?”
ব্যোমকেশ গায়ের শালটি আলনায় রাখিতে রাখিতে বলল, “লালবাজারের কারোরই মনে হয় না কূলে ওঠার বিশেষ ইচ্ছা আছে। গতিক যা দেখছি, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃতিটি এত নৃশংস না হলে পুলিশ ভুলেও মাথা ঘামাত না।”
আমাকে বিস্মিত হতে দেখিয়া ব্যোমকেশ ততোধিক বিস্মিত হইল, “যুদ্ধের বাজার, তায় খুন হয়েছে রামবাগানের বারবধূ । তোমার আক্কেলকেও বলিহারি।”
হতাশ হইয়া বলিলাম, “তাহলে সারা সকালের খাটুনি নেহাতই পণ্ডশ্রম?”
ব্যোমকেশ একটা হাই তুলিয়া বলিল, “তা বলতে পারো। লালবাজার যা যা পণ্ড করে বসে আছেন, তাকে ঢেলে সাজাতে যথেষ্টই শ্রম দিতে হয়েছে আজকে। ভাবতে পারো তিনজনের একজনেরও নামধাম জানে না পুলিস? মানে রামবাগানের কোন কোঠায় তারা থাকত সেটুকু জানে, কিন্তু কবে তারা সেখানে এসেছে, কোথা থেকে এসেছে সেসব নিয়ে বিন্দুবিসর্গ ধারণা নেই কারোর।
“মর্গে গিয়ে দেখি বীরেনবাবুর পর্যবেক্ষণও পুরোপুরি ঠিক নয়। ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোই যে শুধু বার করেছে তা নয়, বীভৎসতার চিহ্ন রয়ে গেছে চামড়ার ওপরেও। যেমন ধরো তৃতীয় ভিকটিমের অনামিকাটিও পাওয়া যাচ্ছে না, মৃতদেহ দেখে বুঝলাম সেটিও কেটেই নিয়ে গেছে।”
বিবমিষা বোধ হইল। বলিলাম, “কলকাতায় এই ঘোরতর উন্মাদটি কোথা থেকে এল ব্যোমকেশ? এরকম নরাধমও মানুষ হয়?”
ব্যোমকেশ কিছু বলিল না, শুধু দেখিলাম তার ললাটরেখায় কুঞ্চনের আভাস। এ সময়ে দরজার কড়া নড়িয়া উঠিল। মিনিট দুয়েক পরে পুঁটিরামের পিছন পিছন দোহারা গড়নের এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকিলেন, পরনে ধুতি পাঞ্জাবি, হাতে একটি পোর্টম্যান্টো। প্রথম দর্শনে ছাপোষা বাঙালিই বোধ হয়, যদিও পাঞ্জাবিতে লাগানো একাধিক সোনার বোতাম সাক্ষ্য দিতেছে যে, এনার বিত্তটি নেহাত মধ্যমানের নয়। গৌরবর্ণ, বয়স মনে হয় ষাটের কম হইবে না।
পরিচয়পর্বের পর সুবিমল সান্যাল বলিলেন, “আশা করি আমার তার পেয়েছিলেন। ব্যোমকেশবাবুর অনুমতি ব্যতিরেকেই চলে এসেছি বলে ক্ষমা করবেন। কিন্তু এমন বিপদে পড়েছি যে, অনুমতির জন্য অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। আপনার খবর আমাকে দিয়েছেন আপনার বন্ধু, প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত।”
ব্যোমকেশ একটা চেয়ার আগাইয়া দিয়া বলিল, “বসুন। একটু জিরিয়ে নিন, তারপর আপনার বিপদের কথা বিশদে শোনা যাবে।”
“জিরোনোর সময় যদি থাকত ব্যোমকেশবাবু! প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছে অমিয়কে বুঝি আর দেখতে পাব না। মনকে প্রবোধ দেওয়ার শক্তিটুকুও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে।”
“অমিয় কে হয় আপনার?”
“অমিয় আমার ছেলে ব্যোমকেশবাবু, একমাত্র ছেলে। আজ এক সপ্তাহ হল সে নিরুদ্দেশ। নিরুদ্দেশ বলছি বটে, আসলে তাকে কেউ বা কারা অপহরণ করেছে।”
ব্যোমকেশ ধীরে ধীরে বলিল, “অপহরণ করেছে বুঝলেন কী করে? আপনি কি অনুমান করছেন?”
“অনুমান নয় ব্যোমকেশবাবু, এই দেখুন।” সুবিমলবাবু পোর্টম্যান্টো হইতে একটি লেফাফা বার করিয়া ব্যোমকেশকে দিলেন।
ব্যোমকেশ লেফাফার ভেতরের কাগজটি আলোর সম্মুখে ধরায় অদ্ভুত ধাঁচের ট্যারাবেঁকা কিছু অক্ষরে কতকগুলি শব্দ ফুটিয়া উঠিল — ‘তিনদিনের মধ্যে তিরিশ হাজার টাকার বন্দোবস্ত করার জন্য প্রস্তুত হও, নইলে ইহজীবনে ছেলের মুখ আর দেখবে না।’
ব্যোমকেশ বলিল, “এতে তো কোনও ঠিকানা নেই দেখছি। টাকা কি আদৌ পাঠিয়েছিলেন?”
“অবশ্যই। ওরা আরেকটি চিঠিতে জানিয়েছিল, লোহাপট্টির ভেতরের এক গলিতে টাকাটা নিয়ে সন্ধ্যা সাতটার সময় অপেক্ষা করতে হবে। আমার বিশ্বস্ত কাজের লোক মন্মথই নিয়ে গেছিল সে টাকা।”
ব্যোমকেশ শান্ত চক্ষে সুবিমলবাবুকে নিরীক্ষণ করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিল, “আপনার কি কোনও জ্ঞাত শত্রু আছে?”
সুবিমল সান্যাল কয়েক মিনিটের জন্য নীরব থাকিয়া বলিলেন, “ব্যোমকেশবাবু, আমি ব্যবসায়ী, ঈশ্বরের দয়ায় আজ বেশ কিছু বছর ধরেই সে ব্যবসা ভালো চলছে। তাতে কার কার চোখ টাটিয়েছে সে কথা তো বলতে পারি না, তবে আমার জানা এমন কোনও লোক নেই, যে এরকম ঘৃণ্য কাজ করতে পারে।”
“কীসের ব্যবসা আপনার?”
“কাঠের। আমি কিন্তু গরিব ঘরের ছেলে, অনেক কষ্ট করে এ জায়গায় পৌঁছেছি। আমার ভাগ্য খোলে বার্মায় কাঠের ঠিকাদারি করতে গিয়ে।”
“বার্মা?” ব্যোমকেশ চকিত স্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “সে দেশে কত বছর ছিলেন?”
“তা বছর দশেক তো হবেই। সে দেশ আমাকে দিয়েছে অনেক কিছুই, আবার ছিনিয়েও নিয়েছে বইকি। আমার স্ত্রীকে রেঙ্গুনেই দাহ করে এসেছি। সে ছিল আমার ভাগ্যলক্ষ্মী, তার মৃত্যুর পরেই ঠিক করলাম আর নয়, এবার কলকাতায় ফিরতে হবে।” বলিতে বলিতে সুবিমল সান্যালের গলাটি ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল।
ঘরের পরিবেশটি ভারী হইয়া উঠিয়াছিল, ব্যোমকেশই নীরবতা ভঙ্গ করিয়া বলিল, “কী হয়েছিল আপনার স্ত্রীর?”
“প্লেগ ব্যোমকেশবাবু, সে মহামারীতে তখন রেঙ্গুনসহ সারা বার্মাতেই কাতারে কাতারে লোক মারা যাচ্ছিল। সর্বনাশী আমার পরিবারকেও ছাড়ল না। অমিয় তখন কলকাতায় কলেজে পড়ছে, প্লেগের জন্যই তাকে তখন রেঙ্গুনে আসতে বারণ করে দিয়েছিলাম। মাকে শেষবারের জন্য দেখতেও পায়নি সে।”
অমিয়র প্রসঙ্গ উঠিতেই সুবিমলের চৈতন্য ফিরিল। ব্যোমকেশের হাত দুটি ধরিয়া বলিলেন, “টাকা দেওয়ার পর আরও চারদিন কেটে গেছে ব্যোমকেশবাবু, অমিয়র এখনও কোনও খোঁজ নেই। তার মধ্যে আজ আবার চিঠি এসেছে। এবারে দাবি আরও তিরিশ হাজার টাকার। তিনদিনের মধ্যে জোগাড় করে দিতে হবে।”
ব্যোমকেশ ঈষৎ অবাক হইল, “বলেন কী, এক সপ্তাহের মধ্যে আবার তিরিশ হাজার টাকার দাবি? পুলিসে খবর বোধ হয় দিয়ে উঠতে পারেননি?”
সুবিমল সান্যাল মাথা নাড়িলেন, “বুঝতেই তো পারছেন। মা মরা একমাত্র ছেলে, তার সামান্যতম ক্ষতিটুকুও যাতে না হয়, সে কথা আমাকে অনবরত ভাবতে হচ্ছে। পুলিসে খবর দিলে যদি হিতে বিপরীত হয়। সে জন্যই তো আপনার কাছে ছুটে আসা।”
ব্যোমকেশ বলিল, “অমিয়র বন্ধু কেউ আছে? তার নিরুদ্দেশ হওয়ার কথা আর কেউ জানে?”
সুবিমলবাবু একটু চিন্তা করিয়া বলিলেন, “আমি আর মন্মথ ছাড়া নিরুদ্দেশ হওয়ার খবর আর কেউ জানে না বলেই ধারণা। অমিয় ইদানীং আমার অফিসে বসত, ব্যবসার কাজের দেখাশোনা করত। সেরকম ঘনিষ্ঠ কোনও বন্ধু আছে বলে তো জানি না, তবে সন্ধ্যার দিকে মাঝেমাঝে চৌরঙ্গী এলাকার একটি ক্লাবে যেত।”
“অমিয়র কত বয়স এখন?”
“পঁচিশ। আপনার জন্য ওর একটি ছবিও এনেছি, এই যে।”
ছবিটি এক ঝলক দেখে বোধ হইল অমিয়র মুখমণ্ডলটিতে সামান্য বিষণ্ণতার ইঙ্গিত। উজ্জ্বল এক তরুণ, কিন্তু তার অন্তরে কোথাও যেন একটি চাপা বেদনা থাকিয়া গিয়াছে। ব্যোমকেশ ছবিটি পকেটস্থ করিতে করিতে বলিল, “আপনার বাড়ি একবার যাওয়া দরকার সুবিমলবাবু। কাল সকালে একবার ঘুরে আসা যেতে পারে? আর হ্যাঁ, ওই চিঠিটাও দিয়ে যান।”
“অতি অবশ্য,” ভদ্রলোক হাঁফ ছাড়িয়া বলিলেন, “আমি পারলে এখনই আপনাদের নিয়ে যেতাম। কিন্তু একটু পরেই রাস্তাঘাটের আলো নিভে যাবে, গিয়ে কোনও সুবিধাও হবে না। অমিয়কে খুঁজে পাওয়ার দায়িত্বটি আপনাকে দিতে পেরে কী যে নিশ্চিন্ত বোধ করছি কী বলব।”
সুবিমল সান্যাল প্রস্থান করিলে ব্যোমকেশকে বলিলাম, “যুদ্ধের বাজারে শহর তো অপরাধের আখড়া হয়ে উঠল দেখছি।”
সারাদিনের শ্রান্তি ব্যোমকেশকে গ্রাস করিয়াছিল। চোখ বুজিয়া বলিল, “তাতে যে আমাদের খুব কিছু সুবিধে হল, এমন কথা মোটেও ভেবো না।”
বলিলাম, “তার অর্থ?”
“অর্থ এই যে, সব অপরাধেরই সুরাহা হতে হবে এমন দিব্যি কেউ দেয়নি।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন