অষ্টম অধ্যায়

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

গরলতমসা

পতিত পুরুষটির গলার কাছটিতেই ঝিকমিকিয়ে উঠিয়াছে শ্বাপদনখের ন্যায় বক্র একটি ছোরা। ছোরার মালিকের ঊর্ধ্বাঙ্গটি চাদরাবৃত, শুধু চোখ দুটি দেখা যাইতেছে। পাশবিক হিংস্রতায় সেগুলিও শ্বাপদচক্ষুর মতনই জ্বলজ্বল করিতেছে। আমাদের দেখিয়াও মূর্তিটি নড়িল না, শুধু গলা দিয়া একটা অব্যক্ত আওয়াজ বাহির হইল। সে আওয়াজ বড়ই জান্তব।

ব্যোমকেশ দুঃখিতস্বরে বলিল, “প্রতিহিংসারও রকমফের আছে, এ পথ বেছে কী-ই বা পেলেন?”

প্রেতমূর্তির অস্বাভাবিক উজ্জ্বল চোখ দুটি যেন একপলকের জন্য স্তিমিত হইল। পরমুহূর্তেই মর্মান্তিক আর্তনাদে রাত্রির নৈঃশব্দ চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া গেল। ব্যোমকেশ গলির প্রান্তে দৌড়াইয়া গেল, আমার পা আর উঠিল না। মূর্তিটি নিজের গলাতেই আড়াআড়ি ছোরা চালাইয়াছে, কালো চাদরের ওপর দিয়া ঝলকে ঝলকে রক্তের স্রোত বহিতে দেখিয়া আমার প্রাণশক্তি একেবারে নিঃশেষ হইয়া গেছিল।

ব্যোমকেশ যতক্ষণে পৌঁছাইল, ততক্ষণে সব শেষ। দেহটি কয়েকবার কাঁপিয়া উঠিয়া নিথর হইয়া গেল। ব্যোমকেশ অন্য পুরুষটির নাড়ি পরীক্ষা করিতে করিতে বলল, “অজিত, আমি সুবিমলবাবুকে দেখছি। তুমি বাঁটুলকে নিয়ে অবিলম্বে বড় রাস্তায় যাও। কুহুকে ধরা চাই।”

কিছুই বুঝিলাম না, কিন্তু ব্যোমকেশের গলায় এমন উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেল যে শরীরের সব শক্তি জড়ো করিয়া ছুটিলাম বড় রাস্তার দিকে। মাঝপথে বাঁটুলের সঙ্গে দেখা, তাহাকে কোনওপ্রকারে বুঝাইলাম আমার পিছনে পিছনে আসিতে।

আমাকে দৌড়াইয়া আসিতে দেখিয়াই কুহু কিছু আঁচ করিয়াছিল। পাশের গলিতে ঢুকিবার সুযোগ অবশ্য ছিল না। আমাকে দৌড়াইতে দেখিয়া কুহুর উলটোদিকের গলি থেকে বেরিয়ে এসেছে পুঁটিরাম, আর কুহুর বাঁদিক থেকে ভোজবাজির মতন ফের উদয় হয়েছে পুঁটিরামের বন্ধু। চব্বিশ ঘণ্টা আগে যে কুহুকে দেখিয়াছিলাম, তার সঙ্গে এর আকাশপাতাল তফাত, ফাঁদে পড়া বাঘিনীর মতন তাহাকে ভয়ঙ্কর দেখাইতেছিল।

কীভাবে সে বাঘিনীকে বাগে আনতাম জানি না, কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া গেল না।

কুহুর দিকে আর এক পা মাত্র এগিয়েছি, এমন সময় মনে হইল পায়ের নীচ থেকে মাটি সরিয়া গেল। দু পাশের ঘরবাড়ি দুলিতে লাগিল, কানে আসিল মেদিনী বিদীর্ণকারী এক ভয়াবহ শব্দ। হতভম্ব হইয়া বোঝার চেষ্টা করিতেছি ঠিক কী ঘটিতেছে, বাঁটুল পিছন হইতে আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, “মাথা নীচু করুন কর্তা, শুয়ে পড়ুন, শুয়ে পড়ুন।” আর ঠিক সেই মুহূর্তে শোনা গেল জাপানী বোমারু বিমানের গর্জন, মাসাধিককালের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত করিয়া কলিকাতার আকাশ এখন শত্রুপক্ষের দখলে।

ব্ল্যাক আউটের মধ্যেই জাপানীরা বোমা ফেলা শুরু করিয়াছে। বোমার অভিঘাতে যেন সারা শহর টলিতে শুরু করিল।

দশটি মিনিট মাত্র, কিন্তু প্রতি পলে মনে হইতে লাগিল এ যাত্রায় প্রাণ নিয়ে আর ফেরা গেল না। মানুষের আর্তনাদ, বোমার শব্দ, ধ্বংসস্তূপের ধোঁয়া — সবকিছু মিলিয়া এক অতিপ্রাকৃত ব্যাপার চোখের সম্মুখে ঘটিতে গেল।

বোমারু বিমান মিলিয়ে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর যখন মাথা তুলিলাম, দেখিলাম কুহুর চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু কুহুর কথা চিন্তা করিবার মতন অবসর আমার কাছে ছিল না। পড়ি কী মরি দৌড়াইয়া সেই পোড়ো বাড়ির কাছে ফের ফিরিলাম, সৌভাগ্যবশত বিমানহানায় ব্যোমকেশ বা সুবিমল কেউই আহত হননি।

ব্যোমকেশ আমাকে দেখিয়াই বলিল, “তাকে ধরতে পারলে না?”

আমাকে নিরুত্তর দেখিয়া মাথা নাড়িল, “ভাগ্যের মার, তুমি আমি নিমিত্ত মাত্র। নাহলে এনারই বা এ অবস্থা হয় কেন?”

এতক্ষণে আমার নজর পড়িল আততায়ীর মৃতদেহের দিকে। কিছুক্ষণ আগের স্মৃতি পুঙ্খনাপুঙ্খ মনে পড়িয়া গেল, শিহরিয়া উঠিলাম।

জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ কে ব্যোমকেশ?”

ব্যোমকেশ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া মৃতের মুখ হইতে চাদরটি সরাইয়া দিল, “চিনতে পারছ?”

বিলক্ষণ, এনার ছবি শেষ তিনদিনে বেশ কয়েকবার দেখিতে হইয়াছে। ইনি অমিয় সান্যাল, সুবিমল সান্যালের একমাত্র পুত্র।

বিস্মিত হইয়া ব্যোমকেশকে বলিলাম, “কিন্তু ইনি ছিলেন কোথায়? আর এসবের অর্থই বা কী?”

“কুহু যেখানে ছিল, অমিয় সান্যালও সেখানেই ছিল, অর্থাৎ...” বলিয়া সামনের বাড়িটির দিকে তাকাইয়া রহিল। তারপর বাড়িটির দিকে অগ্রসর হইতে হইতে বলিল, “অর্থ খোঁজার জন্য এ বাড়ির ভিতর আরেকবার না গেলেই নয়। অজিত তুমি বাঁটুলকে নিয়ে বাইরে থাকো, পুঁটিরাম গিয়ে পুলিশে খবর দিক।”

বাকি রাত্রির হাঙ্গামা মিটিবার পর পরদিন সকালে বীরেনবাবু দুজন কনস্টেবল লইয়া উপস্থিত হইলেন। পুলিশের জিপগাড়িতেই সুবিমল সান্যালের বাড়ি যাইতে হইল। প্রবেশ করিবার সময় সুবিমলের ভৃত্যটি কিছু বলিতে আসছিল, পুলিশ দেখিয়া সরিয়া পড়ার চেষ্টা করিল। বীরেনবাবু প্রকাণ্ড এক হুঙ্কার দিয়া বলিলেন, “তোর বাবু কোথায়?”

সে কাঁপিতে কাঁপিতে বৈঠকখানার ঘরের দিকে ইশারা করিল। ব্যোমকেশ পা বাড়াইতে বাড়াইতে বীরেনবাবুকে বলিল “একে যেতে দেবেন না, দরকার পড়বে।”

বৈঠকখানার ঘরে প্রবেশ করিয়া মনে হইল রাতারাতি সুবিমলের বয়স পনেরো-কুড়ি বছর বাড়িয়া গিয়াছে, যেন অশীতিপর এক বৃদ্ধর দিকে তাকাইয়া রহিয়াছি।

বীরেনবাবু ব্যোমকেশের দিকে একবার তাকাইলেন তারপর সুবিমলের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, “আমি দুঃখিত আপনার এই সময়ে বিরক্ত করতে হচ্ছে। কিন্তু আপনার জবানবন্দী নেওয়া নিতান্তই প্রয়োজন।”

সুবিমল যেন কথাটা ঠিক বুঝিতে পারিলেন না, “কীসের জবানবন্দী?”

বীরেনবাবু অসহিষ্ণু গলায় বলিলেন, “আশা করি আপনি জেনেছেন যে আপনার ছেলেই অপরাধী। সে একটা দুটো নয়, চার-চারটে খুন করেছে। ব্যোমকেশবাবু না পৌঁছলে সেটা পাঁচটা হত, নিজের ছেলের হাতেই খুন হতেন। অপরাধী কেন একাজ করল সেটা সবিস্তারে জানা প্রয়োজন।”

ব্যোমকেশ এতক্ষণ চুপ করিয়া ছিল। এবার বলিল, “কিন্তু অপরাধ তো একটা নয়, অপরাধীও একজন নয়। তাই অপরাধীর মোটিভ নিয়ে আলোচনা করার আগে একবার অপরাধের ফিরিস্তি নিয়ে আলোচনা হোক।”

বীরেনবাবু বিস্মিত হইয়া পড়িলেন, “আমি জানি মেয়েটিকে ধরা যায়নি এখনও। কিন্তু সে আলাদা করে কী অপরাধ করেছে ব্যোমকেশবাবু? সে ছিল নেহাতই অমিয়র দোসর।”

ব্যোমকেশ নির্লিপ্ত স্বরে বলিল, “বীরেনবাবু, আশা করছি এই মুহূর্তে আপনার হাতে কিছুটা সময় আছে।”

বীরেনবাবু অধিকতর অবাক হইয়া বলিলেন, “তা আছে। কিন্তু কেন বলুন তো?”

ব্যোমকেশের দৃষ্টি সুবিমল সান্যালকে ছুঁইয়া গেল, “কারণ অপরাধের ফিরিস্তি দিতে একটু সময় লাগবে। এটাও মনে রাখা দরকার যে এই নৃশংস অপরাধের সূত্রপাত কলিকাতায় নয়, রেঙ্গুনে।”

“রেঙ্গুন, মানে বার্মা?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। আমাদের কাছে আজ সকালেই শুনেছেন যে সুবিমল সান্যাল বার্মায় কাঠের ব্যবসা করতে গিয়ে ভাগ্য ফিরিয়েছিলেন। কিন্তু আমার ধারণা শুধু কাঠের ব্যবসা করে সুবিমল সান্যাল এত অর্থ উপার্জন করেননি।”

ব্যোমকেশ সুবিমলের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়া বলিল, “আপনি নিজে থেকে কি কিছু বলতে চান সুবিমলবাবু?”

সুবিমল উত্তর দিলেন না, শুধু শূন্য দৃষ্টিতে সামনে তাকাইয়া রহিলেন।

ব্যোমকেশ বলিল, “বেশ, আমি নিজেই বলছি তাহলে। কিছু জায়গায় আমার নিজের থিয়োরি আছে বটে, কিন্তু আমার ধারণা সে থিয়োরি নির্ভুল।

“কাঠের ব্যবসা করে সুবিমল সান্যাল দু পয়সার মুখ ঠিকই দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি অতি দ্রুত বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। আর সেই স্বপ্ন সার্থক করতে তিনি লগ্নি করেছিলেন কিছু বেআইনি ব্যবসায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার বেশ কিছু বছর আগের কথা, কিন্তু রেঙ্গুনের অবস্থা পড়তে শুরু করেছে। অথচ বাংলায় তার থেকেও খারাপ অবস্থা, দলে দলে মানুষ বার্মাতে পাড়ি জমাচ্ছেন সামান্য কিছু অর্থোপার্জনের আশায়।

“সুবিমল ঠিক এই সুযোগটাই নিলেন। রেঙ্গুনের ব্রথেলগুলোতে টাকা খাটাতে শুরু করলেন তিনি। সেই সঙ্গে সুবিমলের লোকেরা অসংখ্য বাঙালি মহিলাদের ঠকিয়ে, পয়সার লোভ দেখিয়ে এই ব্রথেলগুলোতে নিয়ে আসতে শুরু করল। আর একই সাথে শুরু হল ড্রাগের চোরাচালান। চিন থেকে যে ড্রাগ ভারতে আসে তার মালিকানা অনেকের, দামও অনেক বেশি। সুবিমল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকে অনেক সস্তায় কোকেন কিনে ভায়া রেঙ্গুন চালান করতে লাগলেন কলকাতায়।”

ব্যোমকেশ আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, “মনে আছে কুহু কী বলেছিল? রমলা ছিল তার সই। কিন্তু যেটা সে বলেনি, তা হল কুন্তী এবং শ্যামা দুজনকেই সম্ভবত সে আগে থেকে চিনত। এবং চিনেছিল ওই রেঙ্গুনেই।”

আমি অবাক হইয়া বলিলাম, “কুহুও রেঙ্গুনের মেয়ে?”

“কুহুর কথায় পরে আসছি। কিন্তু আমার ধারণা কুন্তী এবং শ্যামা দুজনেই কলকাতায় এসেছিল রেঙ্গুন থেকেই। শ্যামা হয়তো সত্যিই সিলেটের মেয়ে, কিন্তু পুরোদস্তুর খোঁজখবর নিলে দেখা যাবে কলকাতায় আসার আগে সে রেঙ্গুনেই ছিল।”

বীরেনবাবু অধৈর্য হইয়া বলিলেন “কিন্তু অমিয় সান্যাল এদের খুন করল কেন?”

“সে কথাতেই আসছি বীরেনবাবু। কিন্তু তার আগে রেঙ্গুনের কথা শেষ করতে হবে। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়, বছর পাঁচ-ছয় আগে বার্মা প্লেগে ছারখার হয়ে গেছিল। খোদ রেঙ্গুনেও নয় নয় করে কম মানুষ মারা যাননি। সুবিমল সান্যাল মানুষের এই দুর্যোগেও নিজের লাভ এবং লোভের কথা ভুলতে পারলেন না।

“উধাও হওয়ার আগে অমিয় সান্যাল প্লেগের চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি বই গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েছিল। সে বই আমার হাতে আসে, দেখি জায়গায় জায়গায় অমিয় নোট নিয়েছে, বইয়ের কিছু কিছু জায়গা আবার পেনসিল দিয়ে দাগানো। এরকমই একটি জায়গায় একটি অদ্ভুত অথ্য পাই, যেখানে বইয়ের লেখক বেলাডোনা বিষের কথা বলেছেন, বেলাডোনা বিষে মানুষ মরলে নাকি মৃতের শরীরে প্লেগের মতনই লক্ষণ দেখা যায়। ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি গিয়ে খোঁজ করতেও একই তথ্য পাওয়া গেল, সেখানে অবশ্য একাধিক বই জানিয়েছে বেলাডোনার সঙ্গে আরও কিছু বিষ মিশিয়ে এক ধরনের সিরাম তৈরি করা যায় যা দিয়ে মানুষ মারলে তিন-চারদিনের জন্য বোঝা যাবে না মানুষটি প্লেগে মরেছে না বিষক্রিয়ায়।”

ব্যোমকেশ বীরেনবাবুর দিকে তাকাইয়া বলিল, “আর ঠিক এই সময়টিতেই বার্মা ভারতের থেকে আলাদা হয়ে গেল, ফলে স্থলসীমান্ত দিয়ে কোকেন চোরাচালানে সুবিমল সান্যালের বিস্তর অসুবিধা ঘটছিল। সেই সময় কিছুভাবে ইনি বেলাডোনা বিষের হদিশ পান।”

সুবিমল সান্যালের এতক্ষণে যেন সম্বিৎ ফিরিল, ব্যোমকেশের দিকে তাকাইয়া সরোষে বলিলেন, “আমার এই চূড়ান্ত দুঃখের সময়ে রাশি রাশি আজগুবি কথা বানিয়ে আপনার কী লাভ হচ্ছে ব্যোমকেশবাবু?”

ব্যোমকেশ তীব্র স্বরে বলিল, “আজগুবি কিনা সে কথা আদালত বিচার করবেন। কিন্তু নিজের ছেলে কেন খুন করতে চেয়েছিল আপনাকে, সে কথা কি নিতান্তই জানতে চাইবেন না?”

জোঁকের মুখে যেন নুন পড়িল, সুবিমল সান্যাল চুপ করিয়া গেলেন।

“বেলাডোনা বিষের কথায় ফিরছি, কিন্তু তার আগে আপনার কাজের লোকটিকে একটি প্রশ্ন করতে চাই,” ব্যোমকেশ সুবিমলের ভৃত্যর দিকে তাকাইয়া বলিল, “রামবাগানের বাড়ি থেকে ভাড়া আদায় করতে তুমিই তো যেতে?”

ভৃত্যটি চুপ করিয়া আছে দেখে ব্যোমকেশ তার দিকে তর্জনী উত্থাপন করিয়া বলিল, “চার-চারটি খুনের মামলা। এখন কথা না-ই বলতে পারো কিন্তু মনে রেখো আদালতে তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য লোপাটের দোষ প্রমাণিত হলে ফাঁসি না হলেও আট-দশ বছরের জেল তো হবেই। খুনী থাকত ওই বাড়িতেই। এ বাড়ি ভাড়া বোধ হয় তুমি তোমার বাবুকে জানিয়ে দাওনি?”

ভৃত্যটি ভয়ে ডুকরাইয়া উঠিল, “কর্তা জানতেন না। টাকার লোভে করে ফেলেছি বাবু।”

ব্যোমকেশের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হইয়া উঠিল “কিন্তু কর্তা যে যে বাড়ির কথা জানতেন, তার সংখ্যাও তো কম নয়। রামবাগান এলাকায় সুবিমল কটা ঝুপড়িঘরে ভাড়া খাটাতেন?”

সুবিমলের দিকে একবার ভীত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া ভৃত্যটি বলিল, “খান পঞ্চাশেক হবে।”

ঘরে উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হইয়া গেলাম। ব্যোমকেশ বীরেনবাবুকে বলিল, “বুঝেছেন তো? রেঙ্গুনের মতন কলকাতার ব্রথেলেও ইনি যথেষ্ট লগ্নি করেছিলেন। আমার ধারণা ওই বস্তির শেষের পোড়ো বাড়িটি ওনার ড্রাগ চোরাচালানের গুদাম, সে কারণেই প্রায় সব ঘরই বন্ধ।

“যাই হোক, বেলাডোনা বিষের কথায় ফিরি। আমার অনুমান সুবিমল রেঙ্গুনের ব্রথেল থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সি কিছু মহিলাকে হাত করেন। এই মহিলারা বেছে বেছে অনভিজ্ঞ, নতুন কম বয়সি বাঙালি মেয়েদের সুবিমলের কাছে পাঠাত। সুবিমল এদেরকে যথেষ্ট টাকা পয়সা দিতেন, তাই নতুন মেয়েগুলি সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেলেও এরা টুঁ শব্দটি করত না। কুন্তী এবং শ্যামা, এই দুজনেই সম্ভবত ছিল সুবিমলের অপকর্মের দোসর। তবে তাদের ধারণা ছিল সুবিমল নিজের লালসা চরিতার্থ করে এদের অন্য কোথাও বেচে দেন, হয়তো সুবিমল নিজেই তাই বুঝিয়েছিলেন।”

ব্যোমকেশ একবারের জন্য থামিল, আমাদের সবার দিকে তাকাইয়া সামান্য নাটকীয় ভঙ্গীতে বলিল, “কিন্তু সুবিমল বিকৃতকাম মানুষ নন।

“তিনি তার থেকেও বড় পিশাচ।

“এই মেয়েগুলিকে তিনি বেলাডোনা এবং আরও কিছু বিষের সিরাম দিয়ে প্রাণে মারতেন। আর তারপর তাদের শরীর ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বার করে নিয়ে ভরতেন কোকেনের প্যাকেট। আর তারপর সেই দেহগুলিকে কফিনে পুরে জাহাজে চাপিয়ে নিয়ে আসা হত মাঝসমুদ্রে। সমুদ্রের অতলে চিরবিলীন হওয়ার আগে তাদের শরীর কেটে কোকেনের প্যাকেটগুলোকে পুনরুদ্ধার করা হত। প্লেগের লাশ দেখে পুলিশ বা কাস্টমস কেউই অন্য কিছু ভাবত না।”

অমিয় সান্যালের নৃশংসতাকেও যেন এ কাহিনি হার মানায়, ঘরশুদ্ধ লোক আতঙ্কে সুবিমল সান্যালের দিকে ঘাড় ঘুরাইল।

ব্যোমকেশ বলিল, “কিন্তু শুধু এই মেয়েগুলিই নয়, বেলাডোনা বিষ প্রাণ কেড়েছিল আরও একজনের। সেখানে অবশ্য লোভ কাজ করেনি, কাজ করেছিল ভয়।”

দেখিলাম সুবিমল সান্যালের রগ দপদপ করিতেছে।

ব্যোমকেশ গাঢ়স্বরে বলিল, “আপনার অনেক অপরাধই আপনার স্ত্রী মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু মানুষ খুন অবধি আর সহ্য করতে পারেননি। পুলিশে যাওয়ার ভয় দেখিয়েছিলেন কি?”

সুবিমল উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

বীরেনবাবু এবং তাঁর দুই কনস্টেবলও লাফ দিয়া উঠিলেন। সুবিমল ক্লান্ত স্বরে বলিলেন, “আমি কোথাও যাচ্ছি না। কিন্তু ব্যোমকেশবাবুর এই অনৃতভাষণ আমার শরীর আর নিতে পারছে না। আমাকে মাফ করবেন, কিন্তু আমার চোখেমুখে জল দেওয়া নিতান্তই দরকার।”

বীরেনবাবু একবার ব্যোমকেশের দিকে তাকাইলেন, তারপর কী ভেবে বলিলেন, “যান। কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসবেন।”

সুবিমল প্রায় টলিতে টলিতে বৈঠকখানার পাশের বাথরুমটিতে ঢুকিলেন।

বীরেনবাবু বলিলেন, “কিন্তু অমিয় সান্যাল বাপের পথটি কেন ধরল?”

ব্যোমকেশ ক্ষণেক তাঁর দিকে চাহিয়া বলিল, “এখনও বুঝলেন না? এ যে নিতান্তই প্রতিহিংসা।”

বীরেনবাবু অবাক হইয়া বলিলেন, “প্রতিহিংসা?”

ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িল, “বাপের প্রতি। সে জানতে পেরেছিল সুবিমল সান্যালের হাতেই তার মা খুন হয়েছেন। সে এও জানতে পেরেছিল যে, শ্যামা আর কুন্তী দুজনেই ছিল সুবিমলের ডানহাত। খেয়াল করুন, হত্যার পর দুজনের শরীরের ভেতর থেকেই কীভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বার করে নেওয়া হয়েছিল। ঠিক যেভাবে বার করে নেওয়া হয়েছিল রেঙ্গুনের নিরীহ বাঙালি মেয়েগুলির শরীর থেকে।”

বীরেনবাবু চিন্তিত স্বরে বলিলেন, “বুঝতে পারছি। কিন্তু সে খবর অমিয় পেল কোথা থেকে?”

ব্যোমকেশ একটি ক্ষুদ্র শ্বাস ফেলিয়া বলিল, “কুহু তাকে খবর দিয়েছিল বীরেনবাবু। কিন্তু কুহু যে কে, সে নিয়ে আমার কোনও ধারণা নেই। শুধু মনে হয় সুবিমলের অসংখ্য পাপকাজে তার জীবনটিও কিছুভাবে সর্বস্বান্ত হয়েছিল।”

এই সময় বীরেনবাবুর কনস্টেবলদের একজন আসিয়া বলিলেন, “স্যার, বাথরুমের কল থেকে একটানা জল পড়ার শব্দ হচ্ছে।”

“সে কী হে, বাথরুমের মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে গেল নাকি লোকটা?”

ব্যোমকেশ হঠাৎ ‘সর্বনাশ’ বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। তারপর দৌড়াইয়া গিয়া বাথরুমের দরজায় ক্রমান্বয়ে ধাক্কা দিতে লাগিল। ব্যোমকেশের চিৎকারে কিছু একটা ছিল, বীরেনবাবু এবং কনস্টেবলরাও দৌড়াইয়া আসিলেন, চারজন মানুষ সর্বশক্তি দিয়া দরজায় ধাক্কা দিতে লাগিলেন। মিনিট তিন-চার পর বাথরুমের দরজার পাল্লাটি খুলিয়া এল।

আমরা হুড়মুড় করিয়া বাথরুমে ঢুকিয়া পড়িলাম।

বাথরুমের মাটিতে সুবিমল সান্যাল পড়িয়া রহিয়াছেন, বাঁ হাতে ধরা একটি সিরিঞ্জ। মুখ থেকে গ্যাঁজলা ফেনাইয়া উঠিতেছে। সুবিমলের ডান পাশে একটি সিরামের বোতল, তার ভিতরে আর কোনও পদার্থ নেই বলেই বোধ হল।

ব্যোমকেশ এক ঝলক দেখিয়া বলিল, “নিজের শাস্তিটি যথাযোগ্য বেছেছেন ভদ্রলোক। এ সেই বেলাডোনা বিষের সিরাম।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%