প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বাড়ি ফিরিয়া ব্যোমকেশের সেই নিশ্চল সমাহিত রূপটি আবার জাগ্রত হইল। দ্বিপ্রহরে আহারাদির সময়টুকু বাদ দিয়া তার সহিত আর বিশেষ কথোপকথন হইল না। পাঁচটার দিকে আমার ঘরে আসিয়া বলিল, “ওহে, এবার তো গাত্রোত্থান করতে হয়।” শীতের দুপুরে দিবানিদ্রা দেওয়া ইস্তক শরীরটি খুব একটা জুতের ঠেকিতেছিল না, পুঁটিরাম আনীত এক পেয়ালা চায়ে চুমুক দিয়া শুধাইলাম, “সেই তো সন্ধ্যাবেলায় বাঁটুলের সঙ্গে যেতে হবে রামবাগানে। এই অবেলায় আবার টানাটানি কেন?”
ব্যোমকেশ পায়চারি করিতে করিতে বলিল, “দুখানা কেস একসঙ্গে চলছে, সেই হিসাবে এটুকু দৌড়োদৌড়ি তো নস্যি। তবে আমার ধারণা ভাগ্য সহায় থাকলে এই সময়টাতেই দেবদত্তর সঙ্গে দেখা হতে পারে,” আমার দিকে চোরা কটাক্ষ হেনে বলিল, “সবাই তো আর শীতের দুপুর-বিকেলটা ঘুমিয়ে কাটায় না।”
অগত্যা উঠিতেই হইল। জানালা দিয়া শীতের অপরাহ্ণের মিঠে রোদ আসিতেছিল। ভাবিতেছিলাম বারান্দায় আর এক কাপ চা লইয়া বসিব, সে বাসনা আপাতত জলাঞ্জলি।
চৌরঙ্গীর পৌঁছাইয়া ক্লাব রিগ্যাল খুঁজিয়া পাইতে আদপেই অসুবিধা হইল না। গ্র্যান্ড হোটেলকে বাঁয়ে রাখিয়া হগ সাহেবের মার্কেটের দিকে যাওয়ার পথে ডানদিকের একটি গলির মধ্যে পড়ে। বাহির থেকে বিশেষ কিছু না বোঝা গেলেও ভেতরে ঢুকিলে স্পষ্টই বোঝা যায় সমাজের উচ্চকোটি মানুষ ব্যতীত বাকিদের এ চত্বরে ঢোকা সহজ হইবে না।
ব্যোমকেশ আসিবার পূর্বে ফোন করিয়া ম্যানেজারকে তার আসার অভিপ্রায়টুকু জানাইয়াছিল, তাই ঢুকিতে কোনও সমস্যা হইল না। ম্যানেজারটিও দেখিলাম বাঙালি, ত্রিদিবেন্দ্র মজুমদার। ত্রিদিবেন্দ্র জানিতেন না অমিয় নিরুদ্দেশ হইয়াছে, খবর পাইয়া অতীব বিস্মিত হইলেও প্রতিশ্রুতি দিলেন তদন্তের কাজে যথাসাধ্য সাহায্য করার। ত্রিদিবেন্দ্রর সঙ্গে কথা বলিয়া বুঝিলাম ক্লাবের মধ্যে অন্তত অমিয় কখনই বেচাল কিছু ঘটায়নি, মোটের ওপর সদস্যরা অমিয়র আচারব্যবহারে বেশ প্রীতই বলা যায়।
ব্যোমকেশ একটি আরামকেদারায় বসিয়া সিগারেট ধরাইয়াছিল। খান দুই লম্বা লম্বা টান দিতে দিতে ত্রিদিবেন্দ্রকে শুধাইল, “কিন্তু অমিয়র ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে বোধ হয় কেউই নেই, তাই না?”
ত্রিদিবেন্দ্র অল্প ভাবিত মুখে বলিলেন, “সে কথা একপ্রকার সত্যি। তবে সবার সঙ্গে পরিচিতি না থাকলেও অন্তত একজন সদস্যর সঙ্গে অমিয়র কিছুটা অন্তরঙ্গতা ছিল বলেই আমার ধারণা।”
“কে বলুন তো?”
“দেবদত্ত সাধুখান। বাগবাজারের বনেদী বাড়ির ছেলে ইনি।”
ব্যোমকেশ ভাবলেশহীন মুখে বলিল, “ওহ, তাই নাকি? তা ইনি কী করেন?”
ত্রিদিবেন্দ্র ঈষৎ হাসিয়া কণ্ঠস্বরটি খাদে নামাইলেন, “তিন-চারপুরুষের ব্যবসা মশাই, তবে দেবদত্তর পরের প্রজন্মের জন্য সে ব্যবসা টিকে থাকবে কিনা কে জানে। অবশ্য যা হালচাল, তাতে পরের প্রজন্ম আদৌ আসে কিনা...” বলিতে বলিতে ভদ্রলোকের বোধ হয় খেয়াল হইল যে, প্রথম আলাপচারিতার হিসাবে কিছু বেশিই খবর ফাঁস হইয়া যাইতেছে। নিজেকে সামলাইয়া লইয়া বলিলেন, “সে কথা যাক গে। আপনারা কি দেবদত্তর সঙ্গে কথা বলতে চান?”
ব্যোমকেশ সচকিত হইয়া বলিল, “তিনি এ মুহূর্তে ক্লাবেই নাকি?”
ত্রিদিবেন্দ্র হাসিয়া উঠিলেন, “বলেন কী ব্যোমকেশবাবু। শীতসন্ধ্যার ছটা বাজতে যায়, দেবদত্ত ক্লাবের বারে না এসে কি বাড়ির বৈঠকখানায় বসে চা খাবে? আসুন এদিকে।”
দেবদত্ত সাধুখান যে একটি দ্রষ্টব্য বিশেষ, তা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। ক্লাবের প্রায় সব সদস্যই সাহেবি বেশভূষা পরিহিত, এবং বোঝাও যাইতেছে যে তাঁরা সে পোশাকেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। দেবদত্তর পোশাক বাকিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তার পরনে গিলে করা পাঞ্জাবি এবং চুনোট ধুতি। দুই হস্তের একাধিক অঙ্গুলিতে মূল্যবান কিছু আংটি দেখিতে পাওয়া গেল, বামহস্তে একটি ততোধিক দামী ছড়ি।
দূর থেকে মনে হইল লোকটি বাকচতুরও বটে, এমন রঙ্গপরিহাস চলিতেছিল যে, উপস্থিত বাকি সভ্যরা হাস্যতাড়নায় প্রায় কাতরাইতে শুরু করিয়াছিলেন। এমন সময় ত্রিদিবেন্দ্র যাইয়া দেবদত্তর কানে কানে কিছু বলিলেন। দেবদত্ত তার গল্প থামাইয়া আমাদের দিকে তাকিয়া দেখিল, মনে হইল মুখে হাসির একটা আভাস পাইলাম।
ব্যোমকেশ কৌতুকপূর্ণ স্বরে বলিল, “দশ টাকা বাজি, এ লোক খালি গ্লাস নিয়ে আমাদের সামনে আসবে না।”
গ্লাস দূরস্থান, দেবদত্তের হস্তে ছড়ি ব্যতীত অন্য কিছু না দেখিয়া ব্যোমকেশের কাছে টাকা দাবি করিতে যাইতেছিলাম। শেষমুহূর্তে দেখি তার গতিপথ বদলাইয়া গেছে। একটি বেয়ারা ট্রে ভর্তি করিয়া সুরাসামগ্রী নিয়া আসিতেছিল, দেবদত্ত সেখান থেকেই একটি গ্লাস প্রায় ছোঁ মারিয়া তুলিয়া লইল।
ব্যোমকেশ মৃদু হাসিল।
“শুনলাম আপনারা আমার খোঁজেই এসেছেন?” দেবদত্ত ফিরিয়া আসিয়াছে।
ব্যোমকেশ বলিল, “ঠিক আপনার খোঁজে নয়। ত্রিদিবেন্দ্রবাবু আশা করি আপনাকে বলেছেন যে অমিয়কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে ব্যাপারেই আসা, এসে শুনলাম এ ক্লাবে অমিয়র ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে এক আছেন আপনিই। তাই ভাবলাম আপনার সঙ্গেও একবার কথা বলে দেখা যাক।”
দেবদত্তর মুখে একটি বক্রহাসি ফুটিয়ে উঠিল, “আর অমিয়কে খুঁজে বার করবে কে শুনি? আপনি? গোয়েন্দা নাকি?”
ব্যোমকেশ অনুত্তেজিত গলায় বলিল, “গোয়েন্দা শব্দটি নিয়ে আমার বিশেষ আপত্তি আছে। আমি নিজেকে সত্যান্বেষী বলিয়া পরিচয় দিই। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী।”
দেবদত্তর মুখের হাসিটি চওড়া হইয়া উঠিল, “তা সত্যের অন্বষণে বেরিয়ে মিথ্যা কথা বলাই কি আপনার দস্তুর?”
“কী বলতে চান আপনি?”
“আপনি কি বলতে চান ব্যোমকেশবাবু? এই যে অমিয়র বাবার কাছ থেকে আপনি আমার ব্যাপারে কোনও কথাই শোনেননি, ক্লাবে আসার পর তবেই আমার ব্যাপারে জেনেছেন?”
আমি প্রমাদ গণিলাম। ব্যোমকেশ অবশ্য এখনও উত্তেজিত হইল না। শান্তভাবেই বলিল, “হয়তো আপনার নামটাই শুনেছি। কিন্তু চোখে না দেখা অবধি তো জানা যাবে না আপনি আসলে কে। সত্য অন্বেষণের জন্য চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করাটাও দস্তুর বই কি।”
“বটে!” দেবদত্ত বলিল, “তবে সে কথা আমিও মানি। কোনওরকম প্রি-কনসিভড নোশনস আমিও রাখতে চাই না। তাই অমিয় যখন বলেছিল সে কত দুঃখে আছে, তার কথা আমি মানিনি। তার বাড়ি না গিয়ে, তার বাবাকে না দেখে আমি তার কথা বিশ্বাস করতে চাইনি। কিন্তু যে মুহূর্তে দেখলাম, তাতে মনে হল একাকিত্বর নরকযন্ত্রণা থেকে ছেলেটিকে মুক্তি দিতে হবেই, নাহলে সে পাগল হয়ে যাবে।”
ব্যোমকেশ দেবদত্তর পানে কিছুক্ষণ ভ্রূ তুলিয়া চাহিয়া রহিল। মিনিটখানেক পর গম্ভীরস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “অমিয়র দুঃখে আপনি এত কাতর হয়ে পড়েছিলেন জেনে ভালো লাগল। কিন্তু তার দুঃখ ঘোচাতে গিয়ে নরকের আর কোন কোন দ্বার খুলেছেন আপনি?”
দেবদত্ত ব্যোমকেশের কথায় অট্টহাস্য করিয়া উঠিল। তার কাপ্তান ভাবটি সরিয়া গিয়াছিল, মুহূর্তের জন্য একটি ইতর মানুষকে চোখের সামনে দেখিতে পাইলাম। “অত খবরে আপনার দরকার কি ব্যোমকেশবাবু? সত্যসন্ধানের অছিলায় সে কুহক পৃথিবীর সব খবর মাগনা পেয়ে যাবেন তাও কি হয়? প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও অমিয় ছিল দুধের শিশু, তাকে আমি দুনিয়াটা চিনিয়ে দিয়েছি মাত্র।”
দেবদত্তর চোখের ইশারায় এবার একটি কুশ্রী ইঙ্গিত ধরা পড়িল, “ব্যাচেলর নাকি মশায়? যদি নিতান্তই চান, তবে সে সুলুকসন্ধান আপনিও পেতে পারেন বইকি, তবে কমিশনটুকু দিতে হবে।” বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ এবং তর্জনীর সাহায্যে একটি বিশেষ মুদ্রা দেখাইল, দেখিলাম দেবদত্তর মুখে সেই কদর্য হাসিটুকু এখনও লাগিয়া রহিয়াছে।
রাগে আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করিতেছিল। ব্যোমকেশ নিতান্তই স্বাভাবিক গলায় বলিল, “বৈতরণী যে বিনামূল্যে আপনি পার করান না, সে খবর আমি জানি দেবদত্তবাবু। অমিয়র দেরাজে রসিদের পর রসিদ আমাকে সে কথাই বলেছে।”
দেবদত্তর মুখ হইতে সমস্ত ব্যঙ্গবিদ্রূপের চিহ্ন সরিয়া গেল, তীব্র আক্রোশে সে বলিয়া উঠিল, “আপনি কি আমাকে জোচ্চোর ঠাউরেছেন নাকি? জোচ্চোর হলে কোথায় পেতেন ওসব রসিদ? অমিয় নিজেই রসিদ লিখতে অস্বীকার করেছে। কিন্তু আমার পাকা কাজ। আর টাকা নেব নাই বা কেন? দিনের পর দিন রামবাগানে যে মেহফিল আর মদের আসর বসেছে তার খরচ কে দেবে? অমিয়র বাপ? তখন তো সেসব টাকা আমার পকেট থেকেই গেছে।”
ত্রিদিবেন্দ্র দূর থেকে আমাদের লক্ষ করিতেছিলেন, মনে হইল গন্ডগোলের একটা আঁচ পাইয়া তিনি এদিক পানে আসিতেছেন।
ব্যোমকেশের মেজাজের বলিহারি যাই, সামান্যতম চঞ্চলতা প্রকাশ না করিয়া বলিল, “রামবাগানের কোথায়?”
“কোথায় নয়? যান যান, নিজে খুঁজুনগে যান। যত্তসব, এই বলে দিলাম অমিয়কে খোঁজার সাধ্যি আপনার সাত পুরুষের নেই।”
ত্রিদিবেন্দ্র আসিয়া পড়িয়াছিলেন, আমরা ধন্যবাদজ্ঞাপন করিয়া বাহিরে আসিলাম। সভ্যরাও একে একে বাহিরে আসিতেছিলেন, ব্ল্যাক আউটের জন্য সন্ধ্যা থেকেই ক্লাবে তালাচাবি পড়বে। ভাগ্যে ব্যোমকেশ বিকাল বিকাল টানিয়া আনিয়াছিল।
চৌরঙ্গী থেকে একটি ট্যাক্সি পাইয়া গেলাম। বিডন স্ট্রিটে আসিয়া অবশ্য গাড়িটি ছাড়িয়া দিতে হইল। শহর কলিকাতায় অকালরাত্রি ঘনাইয়া আসিতেছে, অন্ধকারের মধ্যে গাড়িঘোড়া আপাতত চলিবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন