ষষ্ঠ অধ্যায়

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পরদিন সকাল দশটা নাগাদ বীরেনবাবুর দেখা মিলিল। তাঁর মুখ অস্বাভাবিক রকমের গম্ভীর, “কমিশনার সাহেব জানতে চাইলেন আপনার তদন্ত কিছু এগোল কিনা?”

ব্যোমকেশ মাথা নাড়িল, “তদন্ত চলছে তার নিজের গতিতে, এখনও সাহেবকে বলার মতন কোনও জায়গায় পৌঁছয়নি।”

বীরেনবাবুর অধরে ক্ষণিকের জন্য বক্রহাসির আভাস পাইলাম, বলিলেন, “দেখুন তাহলে কবে রহস্য উদঘাটন করতে পারেন। তবে ও তল্লাটে আপাতত আপনাদের না যাওয়াই ভালো, যা খুনজখম চলছে।”

বীরেনবাবুর কথায় ব্যোমকেশ আরামকেদারার হেলান ছাড়িয়া উঠিয়া বসিল, “আবারও কিছু ঘটেছে নাকি?”

“ঘটেছে, কাল রাত্রে ওই চত্বরেই আবার খুন হয়েছে। তবে এ খুনের সঙ্গে আগের তিন খুনের কোনও সম্পর্ক নেই, রাতের অন্ধকারে পেছন থেকে পিঠে ছোরা বিঁধিয়ে মারা হয়েছে। পোস্ট মরটেম রিপোর্ট অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে এ খুন হয়েছে।”

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে আটটা! ওই সময়েই তো আমরা কুহুর আস্তানায় ছিলাম।

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল, “রামবাগানেরই কেউ?”

বীরেনবাবু বলিলেন, “নাহ, তবে এ লোকটির রামবাগান চত্বরে ভালোই যাতায়াত ছিল। বাগবাজারের ব্যবসায়ী সাধুখান বাড়ির ছেলে, নাম দেবদত্ত।”

খবর শুনিয়া কিছুক্ষণ আমাদের দুজনের মুখেই কথা যোগাইল না। বীরেনবাবু আমাদের অবস্থা দেখিয়া পুনরায় বলিলেন, “ভয় পাওয়ার মতনই কথা। আপনারা আর নিজের প্রাণ বিপন্ন করবেন না, যা করার পুলিশই করবে।”

ব্যোমকেশ কিয়ৎক্ষণ স্থাণুবৎ বসিয়া রহিল। তারপর বীরেনবাবুর দিকে ফিরিয়া বলিল, “দেবদত্ত সাধুখান কি চৌরঙ্গী থেকে সরাসরি রামবাগানে এসেছিল?”

বীরেনবাবু মহা বিস্ময়ে বলিয়া উঠিলেন, “আপনি সে কথা জানলেন কী করে? হ্যাঁ, চৌরঙ্গীর একটি ক্লাব থেকে এসেছিল বলেই এখনও অবধি খবর পাওয়া গেছে।”

“কীভাবে জানলাম সে কথা পরে হবে। কেন গেছিল সে ব্যাপারে কিছু জানেন?”

“দেবদত্তর পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা নোট পাওয়া গেছে, তাকে কেউ ডেকে পাঠিয়েছিল বলেই মনে হয়।”

“সে লেখা একবার দেখতে পাওয়া যেতে পারে?”

বীরেনবাবু অসহিষ্ণু মুখে বলিলেন, “আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি আগের কেসের কোনও সুরাহা না করে আবার এই কেস নিয়ে পড়লেন কেন?”

ব্যোমকেশ কঠিন স্বরে বলিল, “ভুলে যাবেন না এই খুনও রামবাগানেই হয়েছে। আপনি যতক্ষণ না কাগজে কলমে প্রমাণ করতে পারছেন এ অন্য খুনী, ততক্ষণ আমার সঙ্গে সহযোগিতা করা ছাড়া আপনার গতি নেই।”

বীরেনবাবু দ্বিরুক্তি না করে ব্যোমকেশের হাতে একটি ভেজা ভেজা কাগজের টুকরো তুলে দিলেন। উঁকি মারিয়া দেখিলাম তাতে লেখা “ওলাবিবির মন্দিরের সামনে অপেক্ষা করব, সাড়ে সাতটা নাগাদ। জরুরি দরকার, সাক্ষাতের কথা গোপন রেখো।”

জিজ্ঞাসা করিলাম, “ওলাবিবির মন্দির আছে নাকি রামবাগানে?”

বীরেনবাবু বলিলেন, “হ্যাঁ, পুরনো মন্দির। তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে কলেরায় ছারখার হয়ে গেছিল ও চত্বর, তখনই বানানো হয়।”

ব্যোমকেশের দিকে তাকিয়ে দেখি সে কতকটা মুহ্যমান হইয়া বসিয়া রহিয়াছে। আধ মিনিট পর ক্ষীণস্বরে কহিল, “আপনি কাগজটা রেখে যান বীরেনবাবু, আমি কাল সকালে এ কাগজ ফেরত দেব আপনাকে।”

বীরেনবাবু নিজের অসন্তুষ্টি গোপন করবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া বিড়বিড় করিতে করিতে বিদায় নিলেন। বীরেনবাবু দরজা দিয়ে অদৃশ্য হওয়া মাত্র ব্যোমকেশ ডাকিল, “পুঁটিরাম।”

পুঁটিরাম বীরেনবাবুর জন্য চা করিয়া আনিয়াছিল, ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিল, “ও বাবু চলে গেলেন?”

“হ্যাঁ, চা রেখে যাও। অজিত খেয়ে নেবে। তোমার মনে আছে দুদিন আগে এক ভদ্রলোক বিকালবেলা বাড়ি এসেছিলেন?”

পুঁটিরাম ঘাড় নাড়িল।

“তিনি কি কাল কিছু আমার জন্য পাঠিয়েছেন?”

“আজ্ঞা বাবু, কাল অত রাতে ফিরেছিলেন বলে আর দিইনি।”

কয়েক মিনিটের মধ্যে পুঁটিরাম একটি সিলবন্ধ খাম আনিয়া ব্যোমকেশের হাতে দিল। খামের ভিতরে দেখি একটি চিঠি, অমিয়র অপহরণকারীর পাঠানো দ্বিতীয় চিঠি।

ব্যোমকেশ বীরেনবাবুর কাগজ আর এই চিঠি দুটি পাশাপাশি রেখে পরীক্ষা করিতেছিল। আমার মাথায় হঠাৎ বিদ্যুৎচমক খেলিয়া গেল।

বলিলাম, “ব্যোমকেশ, দুটি চিঠি কি একই হাতের লেখা?”

ব্যোমকেশ ধীরে ধীরে মাথা নাড়িল, “না এক হাতের লেখা নয়। আর রহস্যটা সেখানেই।” বলিতে বলিতে উঠিয়া গিয়া নিজের দেরাজ থেকে তৃতীয় একটি কাগজ বাহির করিয়া আনিল, দেখিলাম এটি অপহরণকারীর প্রথম চিঠি।

অপহরণকারীর দুটি চিঠি পাশাপাশি রাখিয়া বলিল, “এ দুটি চিঠিও এক হাতের লেখা নয়।”

আমি হতবুদ্ধি হইয়া বসিয়া রহিলাম, বলিলাম। “তবে কি দুজন মিলে অমিয়কে অপহরণ করেছে? দুজনেই একটি একটি করে চিঠি লিখে পাঠিয়েছে?”

ব্যোমকেশ কিছুই বলিল না, শুধু অপহরণকারীর দ্বিতীয় চিঠিটা নামাইয়া লইয়া তার স্থানে দেবদত্তর পাঞ্জাবির পকেট থেকে পাওয়া কাগজটি রাখিল। বলিল, “এবার দেখো।”

দেখিলাম, দুটি চিঠির হাতের লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র মিল নেই। প্রথম চিঠিটি দেখলে মনে হয় যেন কোনও বাচ্চা ছেলে লিখিয়াছে, দেবদত্তর পাওয়া কাগজের লেখায় কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কসুলভ মুনশিয়ানা রহিয়াছে।

ব্যোমকেশকে বলিলাম, “এ দুটিও তো এক নয়, তার মানে তিনজন বিভিন্ন ব্যক্তি চিঠি তিনটে লিখেছে।”

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিয়া বলিল, “এ দুটি কিন্তু এক লোকের লেখা।”

আমি এতই বিভ্রান্ত বোধ করিলাম যে, এই প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকে রেহাই নিতে হল।

ব্যোমকেশের মুখ থেকে অবশ্য হাসি সরিয়া গিয়াছে। আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, “রহস্য বড় গভীর অজিত, ভেবো না শুধু তুমিই বিভ্রান্ত হয়ে আছ।”

দেখিলাম ব্যোমকেশ বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হইতেছে। অবাক হইয়া বলিলাম, “এখন আবার চললে কোথায়?”

“ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি,” গায়ে শাল ফেলিয়া ব্যোমকেশ বাহির হইয়া গেল। মিনিটখানেকের মধ্যে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, “ওহ, তোমাকেও একটা কাজ করতে হবে। মনে আছে তো আগামীকাল সুবিমল সান্যালের টাকা দিতে যাওয়ার কথা? তুমি একবার ওনার বাড়িতে গিয়ে কথা বলে এসো। জানিও ওঁর সঙ্গে আমরাও থাকতে চাই, সময়টা ঠিক করে নেওয়া দরকার।”

সুবিমল সান্যাল আমাকে দেখিয়া যেন একটু অপ্রস্তুত হইলেন, “ওহ আপনি। তা ব্যোমকেশবাবু এলেন না?”

জানাইলাম তদন্তের অভিপ্রায়ে আমার আগমন ঘটেনি, আগামীকল্য তাঁর সঙ্গে কখন মিলিত হইব সেটি জানতেই আসা।

সুবিমল মিনিটখানেক চুপ করিয়া রইলেন। তারপর বলিলেন, “আপনারা কি ছদ্মবেশে যাবেন?”

আমি আমতা আমতা করিয়া বলিলাম, “সেরকম তো এখনও কিছু জানি না। ব্যোমকেশ বলিতে পারিবে।”

“আমার মনে হয় ছদ্মবেশ ধারণ করাই ভালো। কোনও কারণে যদি লোকগুলি আপনাদের দেখতে পায়, কে বলতে পারে তারা অমিয়র কোনও ক্ষতি করবে না?”

যুক্তিসঙ্গত কথাই বটে। বলিলাম, ব্যোমকেশের সঙ্গে কথা বলিয়া ওনাকে জানাইব।

সুবিমলের থেকে বিদায় লইয়া গেটের বাহিরে যাব এমন সময় মনে হল উনি পিছন থেকে ‘অজিতবাবু’ বলে একবার ডাকিলেন। আর ঠিক সে সময়েই দ্বিতীয় এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটিল। ইনি অবশ্য আমার পরিচিত, নাম শ্রীশ সামন্ত, আমাদের পাড়ার ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। শ্রীশ বাবুর হাতে একটি বড় সুটকেস, বুঝিলাম টাকার বন্দোবস্ত চলিতেছে। আমি ঘুরিয়া সুবিমলকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “কিছু বলছেন?”

সুবিমল মাথা নাড়িলেন, “নাহ, কিছু না। মিছিমিছিই আপনার পিছু ডাকলাম।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%