ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

ভাল নাম চন্দ্রকান্ত হলে কী হয়, ডাক নাম কিন্তু চাঁদু। চাঁদের মতোই ছেলে। যেমন সুন্দর মুখশ্রী, তেমনি ফর্সা গায়ের রং। বাপের একমাত্র ছেলে না হলেও খুবই আদরের। যেমনি ডাকাবুকো, তেমনি সাহসী। লেখাপড়াতে ও এমন কিছু অসাধারণ নয়। তবে রেজাল্ট মোটামুটি ভালই করে।
সেই ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েই জেদ ধরল এবারে আর কোনও কথা নয়, বিলাসপুরে সুজয়দের বাড়ি যাবেই যাবে। সুজয় ওর একমাত্র বন্ধু। পাশের বাড়িতে থাকত। এক স্কুলে পড়ত। তারপর হল কী, একদিন সুজয়ের বাবা বদলির অর্ডার পেয়ে চলে গেলেন বিলাসপুরে। সেও তো চার বছর আগেরকার কথা। সেই থেকে চিঠিপত্রে যোগাযোগ।
সুজয় কতবার চিঠি লিখেছে ওকে। প্রত্যেক চিঠিতেই একান্তভাবে বিলাসপুরে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু আমন্ত্রণ পেলেই তো হল না, সময় এবং সুযোগ দুটোই পাওয়া চাই।
তা এখন পরীক্ষার পর বেশ কিছুদিনের অখণ্ড অবসর। অন্তত মাস দুয়েকের তো বটেই। তার ওপর মাত্র কিছুদিন আগে সুজয়ের আর একটা চিঠি এসেছে। সুজয় লিখেছে, ভাই চাঁদু, পরীক্ষার ফল বের হলে যে করেই হোক একবার তুই চলে আয়। এলেই বুঝবি, কী জায়গায় আমরা আছি। বিলাসপুর শহরের একেবারে শেষপ্রান্তে আমরা জমি কিনে বাড়ি করেছি। চমৎকার একটা বাড়ি। হাওড়ায় আমরা যে বাড়িতে থাকতাম তার চেয়ে অনেক ভাল। আমাদের এই জায়গাটা হাওড়ার মতো ঘিঞ্জি নয়। চারদিক বেশ ফাঁকা ফাঁকা। আর খুব সুন্দর করে সাজানো। দেখলে মন ভরে যাবে। তুই এলে তোকে নিয়ে টেনগন মডা আর খোংগসরার জঙ্গলে বেড়াতে যাব। না হলে চলে যাব পেনড্রা রোড হয়ে অমরকণ্টক। অথবা অনুপপুর থেকে চিরিমিরিও যেতে পারি। তুই এলে যে কী ভাল লাগবে আমার, তা বলে বোঝাতে পারব না। কতদিন তোকে দেখিনি, একসঙ্গে ঘুরিনি। এখানে আসার কোনও ঝামেলা নেই। হাওড়া থেকে অনেক ট্রেন আছে। গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস, আমেদাবাদ এক্সপ্রেস, বম্বে মেল। তবে তুই এলে বম্বে মেলেই আসিস। টিকিট কেটেই তার করিস আমাকে। আমি স্টেশনে থাকব। লক্ষ্মীটি, একবার আসিস ভাই। এলে খুব খুশি হব। সব জায়গা আমিও যে খুব ভাল করে ঘুরেছি তা নয়। চেনা-অচেনা জায়গাগুলো দু’ বন্ধুতে একসঙ্গেই ঘুরব। কেমন?
এই চিঠি পাওয়ার পর আর কী চুপ করে থাকা যায়? কিন্তু যেতে গেলে মা-বাবা দাদাদের অনুমতি নিতে হবে। তা ছাড়া যে গাড়িতে যাবে তার রিজার্ভেশন করাতে হবে। অমনি যাব মনে করলেই হল না। তাই চিঠিটা বাবার হাতে দিয়েই চাঁদু বলল, তুমি যে ভাবেই হোক আমাকে একটা টিকিট কেটে বিলাসপুরে যাবার ব্যবস্থা করে দাও বাবা। দিন দশেকের জন্য ওদের ওখান থেকে আমি ঘুরে আসি।
চাঁদুর বাবা তারাপদবাবু অত্যন্ত বদমেজাজি এবং রাশভারী প্রকৃতির লোক। তাঁর অন্যান্য ছেলেরা, এমনকী স্ত্রী পর্যন্ত ভয় করেন তাঁকে। একমাত্র চাঁদু ছাড়া। তার কারণ চাঁদুই একটু বেশিরকম ভালবাসা পায় বাপের কাছ থেকে।
তারাপদবাবু চিঠিখানা হাতে নিয়ে বেশ কয়েকবার পড়ে বললেন, বিলাসপুর যাবে, দিনকতক ঘুরে আসবে তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু পরীক্ষায় পাশ করে তবেই তোমার যাওয়া উচিত।
বাঃ রে। তখন স্কুল-কলেজে ভরতি হওয়ার একটা ব্যাপার আছে না? সেসময় তো যেতেই পারব না।
বুঝলাম, কিন্তু এখন যা রাস্তাঘাটের অবস্থা, দিনকাল যা খারাপ পড়েছে তাতে তোমাকে একাই বা ছাড়ি কী করে?
হলেই বা একা? গাড়িতে কি আর লোক থাকবে না? তা ছাড়া আমিও আর আগের মতো ছোটটি নেই। এখন আমি অনেক বড় হয়ে গেছি। মাধ্যমিক পরীক্ষা দিলাম। রাতের বম্বে মেলে তোমরা আমাকে চাপিয়ে দিলেই সকালে বিলাসপুরে ঠিক আমি নেমে পড়তে পারব। বিশেষ করে খবর পেলে সুজয় তো স্টেশনে আসবেই আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য।
ধরো যদি কোনওকারণে সে না-আসতে পারে?
তাই কখনও হয়? আমার টিকিট কাটা হলেই টেলিগ্রাম করব ওকে। ও না-আসতে পারলেও কেউ-না-কেউ তো আসবে।
তবু তোমাকে আমি একা ছাড়তে পারি না। আজকাল ট্রেনে উঠতে আমাদেরই ভয় করে। এ তো হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল বর্ধমান নয়, বিলাসপুর বলে কথা। তুমি বরং মধুপুরে যাও। সেখানে দিদি আছেন, দিন কতক থেকে এসো। মধুপুর তোমার অচেনা জায়গা নয়। আমিও নির্ভাবনায় তোমাকে ছেড়ে দিতে পারব।
চাঁদু বলল, মধুপুরে যাবার একটুও ইচ্ছে নেই আমার। কতবার গেছি বলো তো? একই জায়গায় বারবার যেতে ভাল লাগে? তা ছাড়া সত্যি বলতে কী, সুজয়ের জন্য আমার ভীষণ মন কেমন করছে।
শুনে মা বললেন, বাপরে! এমনই কী বন্ধুত্ব যে, এইভাবে মন কেমন করা? ওরা তো গেছেও আজ চার বছর। সুজয় নিজেও কি একবার এসেছে তারপর থেকে?
বাবা বললেন, অবশ্যই। তা ছাড়া ওদের রেলের পাস আছে। ট্রেনে চাপলে ভাড়া লাগে না। সে যখন আসে না, তখন তার জন্য তোমার এত দরদ কীসের? চাঁদু বলল, সে কী করতে আসবে বলো? কী আছে এখানে যে আসবে? তা ছাড়া এটা তার পুরনো জায়গা।
ওখানেই বা হাতিঘোড়া কী আছেটা শুনি?
ওখানে যা আছে তা এখানে নেই। ওখানে আছে নয়নাভিরাম দৃশ্য। পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, নদী-ঝরনা।
তোমার মুণ্ডু। মানচিত্র-জ্ঞান আছে কিছু? বিলাসপুরে আবার ঝরনা কোথায়? বিলাসপুরে না-থাকলেও তার আশপাশে তো আছেই? মা বললেন, না নেই।
তার মানে, সোজা কথায় তোমরা আমাকে যেতে দেবে না।
তারাপদবাবু এবার একটু নরম হয়ে বললেন, শোনো, তুমি সুজয়কে চিঠি লেখো। সুজয় অথবা ওর বাবা যদি নিজে এসে তোমাকে নিয়ে যান, তা হলে অবশ্য আমি তোমাকে ছাড়তে পারি। না হলে নয়।
চাঁদুর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এর পরে আর কোনও যুক্তিই খাটে না। তাই আর কোনও কথা না বলে একটু গম্ভীর হয়ে জামাটা গায়ে দিয়েই বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে।
ও জানত বিলাসপুরে যাওয়ার ব্যাপারে ওর মা-বাবা রাজি হবেন না। তবু ওর তো উচিত যাবার আগে একবার বাড়িতে জানানো। এখন পরের পদক্ষেপটা কী হবে, তা-ও নিজেই স্থির করবে। আপাতত রতনদের বাড়িতে একবার যাওয়া যাক। রতন ওর ইদানীংকালের বন্ধু। কৈলাস বসু লেনের একটা গলির ভেতর ওরা থাকে। চাঁদু গিয়ে দরজায় নক করতেই রতনের বোন সাড়া দিল, কে? আমি চাঁদু।
ছিপছিপে লম্বাটে চেহারার এক কিশোরী হাসিমুখে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। তারপর ভ্রমরের মতো চোখদুটো নাচিয়ে বলল, এ কী! চাঁদুদা !
এতে অবাক হবার কী আছে? রতন কই?
দাদা তো বাড়ি নেই। মাকে নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে গেছে। তুই গেলি না কেন?
ওরে বাবা! বাসে উঠলেই আমার বমি পায়। তা এইভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলবেন, না ভেতরে আসবেন?
রতন যখন নেই, তখন কী করতে যাব? ওর সঙ্গেই দরকার ছিল। ও, আমি বুঝি কেউ নই?
নিশ্চয়ই। তুই আমার বোন তো বটেই।
তা হলে ভেতরে এসো।
অগত্যা ভেতরে ঢুকল চাঁদু। খুবই গরিব এরা। কিন্তু হলে কী হবে, মনটা এদের অতি সরল। যেমনি রতন, তেমনি ওর আদুরে বোন জুলি। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা মেয়ে। অথচ চোখদুটো কী দারুণ সাদা। কই মাছের মতন ছটফট করে সর্বক্ষণ। ওর মা-ও তেমনি। চাঁদুকে ঠিক নিজের ছেলের মতন ভালবাসেন। তাঁর খুবই দুশ্চিন্তা জুলিকে নিয়ে। একে গরিব, তায় কালো মেয়ে। কী যে ওর ভবিষ্যৎ তা কে জানে?
চাঁদু জুলির সঙ্গে ওদের ঘরে এসে বসল। একটিই মাত্র ঘর ওদের। পাঁচ ইঞ্চি, বাই দশ ইঞ্চি গাঁথনি দেওয়া। মাথার ওপর টিনের শেড। চেরা বাঁশে দরমা সেঁটে হালকা একটা সিলিং এমনভাবে আটকানো যাতে তাপ রোধ হয় না। শুধু শীতকালে টিনের ঘাম থেকে বাঁচা যায় একটু।
চাঁদুকে ঘরে বসিয়ে জুলি বলল, তুমি এলে, কিন্তু তোমাকে কী খাওয়াই বলো তো চাঁদুদা? ঘরে আমাদের কিছু নেই।
তোদের পাড়ায় মোড়ের মাথার সেই দোকানটায় আগের মতো হিংয়ের কচুরি করে না?
করে না আবার? ওই কচুরি বেচে ব’লৈ ওরা দোতলা হাঁকিয়ে ফেলল।
তা ঠিক আছে। চট করে খান দশেক কচুরি নিয়ে আয় দেখি। তোতে-আমাতে খাই। এই নে টাকা। বলে পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার নোট বের করে ওর হাতে দিল।
জুলি কচুরি খাবার আনন্দে টাকাটা নিয়ে ফ্রক উড়িয়ে, বেণী দুলিয়ে দুষ্টু প্রজাপতির মতো ছুটে চলে গেল গলির মোড়ে।
চাঁদু আপন মনে বসে বসে ভাবতে লাগল মানুষের দুরবস্থার কথা। কী কষ্টের সংসার এদের। রতনের বাবা সরকারি কর্মচারী ছিলেন। তিনি মারা যাবার পর ওর মা নিয়মিত পেনশেনটা পাচ্ছেন এই যা রক্ষে। না হলে কী যে হত। অবসর সময়ে মা ঘরে বসে ঠোঙা তৈরি করেন। সেই ঠোঙা দু’-ভাইবোন দোকানে দোকানে দিয়ে আসে। এতেই ওদের খাওয়াপরা স্কুলের মাইনে সব কিছুই হয়ে যায়।
চাঁদুর খুব ভাল লাগে এদের। রতন, জুলি, ওর মা। এত দুঃখেও কী দারুণ সুখের সংসারটি গড়ে তুলেছেন ওরা সব। শত দুঃখেও দুঃখকে জয় করে দুঃখজয়ী হয়েছেন. তাই ওদের জয়যাত্রা রয়েছে অব্যাহত। কিন্তু এত দেরি করছে কেন জুলিটা? এই তো কাছেই দোকান। কচুরি কি তবে ভাজিয়ে আনছে? এক ঘণ্টার ওপর হয়ে গেল। বসে বসে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে গেল চাঁদুর। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হল। লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ডুবে গেল হাওড়া শহর। কিন্তু জুলি কই? সে ফিরে এল না কেন? অথচ ঘর ফেলে যেতে পারছে না চাঁদু। আরও এক ঘণ্টা হয়ে গেল। না-ফিরল রতনকে নিয়ে ওর মা, না-ফিরল জুলি। চাঁদুর খুব ভয় করতে লাগল। তাই একসময় ঘরের দরজায় শিকল দিয়ে চোরের মতোই চুপিসারে চলে আসতে হল ওকে।
পরদিন সকালেই রতন ছুটতে ছুটতে এল ওদের বাড়িতে। কিন্তু এলে কী হবে? সিঁড়ির মুখেই ওকে আটকালেন তারাপদবাবু। বললেন, কাকে চাই? চাঁদুকে একবার ভেকে দিন না কাকাবাবু, বিশেষ দরকার। তুমি কৈলাস বসু লেনের বস্তিতে থাক না?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তোমারই নাম রতন?
হ্যাঁ। চাঁদু আমি একসঙ্গে একই স্কুলে পড়ি।
জানি। কিন্তু চাঁদুর সঙ্গে তো দেখা হবে না।
আমি আপনার দুটি পায়ে পড়ি কাকাবাবু। একবার অন্তত আপনি ওর সঙ্গে আমাকে দেখা করতে দিন।
বললাম তো দেখা হবে না।
তারাপদবাবুর এইরকম ব্যবহারে বিস্মিত হয়ে গেল রতন। এর আগেও তো কয়েকবার এ-বাড়িতে এসেছে ও। কই তখন তো তিনি এরকম করেননি। সে ছলছল চোখে বলল, শুনুন, আমার বোন জুলি...। জানি।
এই ব্যাপারেই আমি চাঁদুর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
এই ব্যাপারে ওর সঙ্গে কোনও কথাই তুমি বলবে না। প্লিজ, ইউ গো ব্যাক। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না কাকাবাবু। কাল বিকেলে আমাদের বাড়ি গিয়েছিল।
বিশ্বাস করি না।
রতন বিনীতভাবে বলল, বেশ তো। আপনি ওকেই জিজ্ঞেস করুন। তা ছাড়া প্রতিবেশীরা দেখেছে। তাই ওকে দু’-একটা কথা জিজ্ঞেস না করলেই নয়। সে এখানে নেই। কাল রাতের গাড়িতেই সে বিলাসপুর চলে গেছে। তুমি এখন যেতে পারো।
এবার কেমন একটু হতাশ হয়ে পড়ল রতন, কাল সে বিলাসপুর চলে গেছে? কোন গাড়িতে?
অত কৈফিয়ত তো আমি তোমাকে দিতে পারব না বাবা।
কাকাবাবু!
তুমি কি ভাল ব্যবস্থায় যাবে? না আমি অন্য রাস্তা দেখব।
রতন এবার বিমর্ষ গলায় বলল, শুনুন কাকাবাবু! চাঁদু আমার ভাইয়ের মতো। ওকে কোনওভাবে জড়াবার বা সন্দেহ করবার প্রশ্নই ওঠে না। আপনি আমাকে তাড়ালেও পুলিশকে কিন্তু ঠেকাতে পারবেন না। একটু পরেই পুলিশ আসবে ওর খোঁজে। আমি যাচ্ছি। ও ঘরে থাকলে ওকে বলবেন আমি এসেছিলাম।
রতন যখন ফিরে আসছে তখনই সিঁড়ির ওপর থেকে চাঁদুর গলা শোনা গেল, তুই যাস না রতন। শোন, তোর সঙ্গে আমার কথা আছে।
ধমকে উঠলেন তারাপদবাবু, চাঁদু !
বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে চাঁদু বলল, আমাকে ওর সঙ্গে দু’-একটা কথা
বলতে দাও বাবা। আমি সত্যি সত্যিই কাল বিকেলে ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তারাপদবাবু বললেন, তা তো গিয়েছিলে। কিন্তু তুমি কি জান কাল কী হয়েছিল?
না। কিছু জানি না আমি। কাল যখন আমি ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম তখন রতন বা ওর মা কেউই ঘরে ছিল না। আমি ফিরে আসছিলাম। ওর বোন জুলি আমাকে ডেকে নিয়ে ঘরে বসায়। ওদের বাড়িতে তখন এমন কিছু ছিল না যে খেতে দেয় আমাকে।
তুমি কি বাড়িতে খেতে পাও না যে লোকের বাড়ি খেতে গেছ?
আমি ওদের বাড়ি খেতে যাইনি বাবা। গিয়েছিলাম রতনের খোঁজে অন্য একটা দরকারে। তবে মানুষের বাড়িতে মানুষ গেলে স্বাভাবিক ভাবেই একটু খেতে দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে। কিছু-না-হোক এক কাপ চা-ও দেওয়া হয়। আমরাও তো দিই। তার মানে কি এই যে, আমাদের বাড়িতে যাঁরা আসেন তারা খেতে পান না?
তুমি দেখছি এর মধ্যে অনেক কথা শিখে গেছ? তারপর কী হল বলো।
তারপর আমি ওকে পাঁচটা টাকা দিয়ে মোড়ের মাথা থেকে কচুরি আনতে বলি। ও হিংয়ের কচুরি খেতে খুব ভালবাসত, আমিও। কিন্তু সেই যে গেল ও আর ফিরল না। দেরি দেখে ভয় পেয়ে গেলাম আমি। ঘরের দরজায় শিকল দিয়ে চুপি চুপি পালিয়ে এলাম। আমি কিন্তু এখনও জানি না ওর কী হয়েছে। তবে আমার মন বলছে নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে ওর।
চাঁদুর কথা শেষ হতেই রতন ডুকরে কেঁদে উঠল। বলল, কেষ্ট মিত্তিরের সেই বখাটে ছেলে রাজুর কথা মনে আছে তোর?
হ্যাঁ। বছরখানেক আগে স্কুল থেকে ফেরার পথে জুলিকে বিরক্ত করেছিল বলে তুই আমি খুব করে পিটিয়েছিলাম ওকে এবং শাসিয়েছিলাম ফের কখনও এইরকম হলে জান্ত কবর দেব বলে। কিন্তু এখানে রাজুর প্রসঙ্গ আসছে কেন? সে তো এখন খুব ভাল ছেলে হয়ে গেছে। নলহাটিতে পড়াশুনা করছে।
দিনকতক হল সে বাড়ি এসেছে। কাল বিকেলে মানে সন্ধের মুখে জুলি যখন মোড়ের মাথায় কচুরি কিনতে যায়, রাজু তখন ওর কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিল। জুলিকে দেখেই এগিয়ে যায় সে। ওকে তোর আর আমার কথা জিজ্ঞেস করে। জুলি প্রথমটা এড়িয়ে যায় ওকে। তারপর কচুরির অর্ডার দিয়ে বেশ ভালভাবেই কথা বলতে থাকে ওর সঙ্গে। মনে হয় কোনও অশোভন আচরণ করেনি ও। তারপর কথা বলতে বলতে একটু দূরের দিকে এগিয়ে যায় ওরা।
চাঁদুর চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে।
তারাপদবাবু বললেন, ওঃ মাই গড। আমি ভেবে পাচ্ছি না এই সেদিনের ছেলে তোমরা ভেতরে ভেতরে এতখানি অ্যাডাল্ট কী করে হলে? এসব কী শুনছি? চাঁদু বলল, তারপর কী হল বল?
তারপর থেকেই জুলি নিখোঁজ। তবে রাজুর লাশটা বৈষ্ণবপাড়ায় হাওয়াপুকুরের কাছে পাওয়া গেছে। কিন্তু জুলির কোনও খবর নেই। এসব খবর তোকে কে দিল?
রাজুর বন্ধুরা। তা ছাড়া পুলিশও বলেছে। পুলিশ তো কাল রাত থেকে জেরায় জেরায় প্রাণ ওষ্ঠাগত করে তুলেছে আমাদের। শুধু পাড়ার লোকেদের জন্যে এখনও আমাকে অ্যারেস্ট করেনি। তবে ওর বাবা কেষ্ট মিত্তির পুলিশকে বলেছে জুলির নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা নাকি একটা সাজানো নাটক। আসলে আমরা নাকি ষড়যন্ত্র করে কোনও কিছুর বদলা নেবার জন্যই রাজুকে খুন করেছি বা করিয়েছি। কেষ্ট মিত্তির তাই উঠি-পড়ি করে লেগেছেন তাঁর একমাত্র ছেলের হত্যাকারী হিসেবে তোকে-আমাকে আইনের জালে জড়াতে। ঘটনার দিন তুই যে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলি সে-কথাও লোকমুখে শুনে খোঁজখবর নিয়ে কেষ্ট মিত্তির পুলিশকে বলেছে।
চাঁদুর মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
রতন বলল, পুলিশ তোর কাছেও আসবে। তবে জুলিকে খুঁজে না-পাওয়া পর্যন্ত সম্ভবত ওরা আমাদের দিকে নজর দেবে না। অথচ আসল সর্বনাশটা হল কিন্তু আমাদেরই। এক তো বোনটাকে পাওয়া যাচ্ছে না, তার ওপর কাগজে কী লিখেছে জানিস?
কী লিখেছে?
তারাপদবাবুর হাতে সেদিনের খবরের কাগজটা ছিল। সেটা চাঁদুর দিকে মেলে ধরলেন।
চাঁদু কাগজ পড়েই চমকে উঠল।
বড় বড় হরফে কাগজের প্রথম পাতায় লেখা আছে 'বিখ্যাত ব্যবসায়ী কেষ্ট মিত্তিরের একমাত্র পুত্রকে হত্যা করে খুনি কিশোরী নিখোঁজ।'
চাঁদু বলল, না না। এ হতে পারে না। এ মিথ্যা! ওই খুন যদিও কেউ করে থাকে— জুলি নয়। করলেও বাধ্য হয়েই করেছে। তা ছাড়া রাজুর সঙ্গে গায়ের জোরে ও পেরে উঠবে কেন? আর খুন করতে গেলে যে কোনও একটা অস্ত্র হাতের কাছে থাকা চাই। কাগজে লিখছে ক্ষুরজাতীয় কোনও ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলার নলিটাকে দু’ ফাঁক করা হয়েছে, কিন্তু জুলির পক্ষে তা কী করে সম্ভব! ওইসময়ে হাতের কাছে সে ক্ষুরই বা পাবে কোথায়?
রতন অশ্রুসজল চোখে বলল, সেইজন্যেই তোর কাছে ছুটে এসেছি ভাই। পুলিশ এলে শুধু এই কথাটাই পুলিশকে তুই বুঝিয়ে বলবি। বলবই তো।
তারাপদবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, পুলিশ এ বাড়িতে আসবে না। সে-ব্যাপারে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।
চাঁদু বলল, কেন আসবে না?
পুলিশের মুখ আমি বন্ধ করে দিয়েছি।
রতন ও চাঁদু মুখ চাওয়াচায়ি করল।
তারাপদবাবু বললেন, পুলিশ কাল রাত্তিরেই এসেছিল। পুলিশকে যা বলবার আমি বলেছি।
রতন বলল, পুলিশকে আপনি কী বলেছেন?
বলেছি আমার ছেলে এই ঘটনার বেশ কয়েকদিন আগে কলকাতার বাইরে ওর বন্ধুর বাড়িতে চলে গেছে। এবং আগামী দু’-এক মাসের মধ্যে সে এখানে আসবে না।
কিন্তু পুলিশ তো জানে ও কাল আমাদের বাড়িতে ছিল।
জানে বলেই তো এখানে এসেছিল। কিন্তু আমার টাকা জানিয়ে দিয়েছে ও এখানে ছিল না।
রতন খুব দুঃখের সঙ্গে বলল, কাকাবাবু! আপনার অনেক টাকা। তাই আপনি এই কাজ করতে পেরেছেন। কিন্তু...।
নিজের ছেলেকে বাঁচাবার জন্য সব বাবাই এই কাজ করে থাকেন। তা ছাড়া আমার চাঁদু নির্দোষ। আমি ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।
কিন্তু আমার অসহায় বোনটি? সেও তো নির্দোষ।
ঘটনা কিন্তু তা বলে না। যাই হোক, ওর ব্যাপারটা আদালতেই প্রমাণ হবে। তুমি এখন যেতে পার।
রতন নীরবে দু’ ফোঁটা চোখের জল ফেলে বিদায় নিল সেখান থেকে।
রতন চলে গেলে তারাপদবাবু সস্নেহে ছেলের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আজ সারাদিনে তুমি একদম ঘর থেকে বেরোবে না। শুধু তাই নয়, আজ রাতের গাড়িতেই তোমাকে বিলাসপুরে যেতে হবে। ওখানে সুজয়দের বাড়িতে তুমি যতদিন ইচ্ছে থাকবে। আমি আর তোমাকে আটকাব না। আমি নিজে গিয়ে তোমাকে ট্রেনে চাপিয়ে দিয়ে আসব। আমি এখুনি ওর বাবার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করছি।
সে তুমি করতে পারো বাবা। তবে এখন আমি আমার মতের পরিবর্তন করেছি।
তার মানে?
তার মানে আমি যাচ্ছি না।
কী বলত চাও তুমি?
এই অবস্থায় আমার পক্ষে এইভাবে চোরের মতো পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
তারাপদবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন এবার, যেতে তোমাকে হবেই। এখন ভাবছি তুমি নিজের থেকে যখন যেতে চেয়েছিলে তখনই আমার রাজি হওয়া উচিত ছিল। তা হলে হয়তো এই জালে তোমাকে জড়িয়ে পড়তে হত না। মনে রেখো, কেষ্ট মিত্তিরের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের শত্রুতা। এবং সেও একটা ক্রিমিন্যাল। তার একমাত্র ছেলের হত্যাকারীকে সে সহজে ছাড়বে না।
কিন্তু বাবা! জুলি এ কাজ করতে পারে না।
কে কী পারে, না পারে সে চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। এটা তো ঠিক, দিস ইজ এ কেস অব মার্ডার?
তা হলে এটাও তো ঠিক শুধুমাত্র আমারই জন্যে একটি পরিবারের বুকে আজ এত বড় একটা বিপর্যয় ঘনিয়ে এল? না আমি ওকে কচুরি কিনতে পাঠাব, না এই কাণ্ডটা হবে।
এর নাম নিয়তি। ললাটের লিখন কেউ রোধ করতে পারে না। তুমি উপলক্ষ মাত্র।
চাঁদু কী যে করবে কিছু ঠিক করতে পারল না। ওর মনের মধ্যে সব যেন কেমন গোলমাল হয়ে যেতে লাগল। ও আবার ঘরে এসে দরজা বন্ধ করল। বাবার হুকুম অমান্য করবার মতো সাহস এবং স্পর্ধা ওর নেই। অথচ এই অবস্থায় ও চলে গেলে রতনটা কী ভাববে? সহায়-সম্বলহীন ফুলের মতো পবিত্র মেয়েটা এইভাবে শুকনো পাতার মতো ঝরে যাবে, এ কী ভাবা যায়? জুলির ভ্রমরের মতো চোখদুটো ওর চোখের সামনে যেন ভাসতে লাগল।
সারাটা দিন যে কীভাবে কাটল চাঁদুর তা সেই জানে। সন্ধের পর বাবা ওকে নিয়ে হাওড়া স্টেশনে এসে বম্বে মেলের বিলাসপুর কোচে চাপিয়ে দিয়ে গেলেন। প্রথম শ্রেণীর একটি কুপে কোচ অ্যাটেনডেন্টকে বলে ওর একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে তবেই গেলেন তিনি।
এই নিরানন্দ যাত্রায় চাঁদুর বুকের গভীরে যে কী দারুণ যন্ত্রণা তা বুঝবে কে? বাবা শুধু তাঁর নিজের স্বার্থটাই দেখলেন। কিন্তু এক কন্যাহারা জননীর মর্মবেদনা একবারও উপলব্ধি করলেন না। তাই দ্রুতগামী ট্রেনের কামরায় শুয়ে চাঁদু জুলির কথাই ভাবতে লাগল শুধু। জুলির এই বিপদের জন্য বার বার নিজেকেই অপরাধী মনে হতে লাগল ওর। কেন যে মরতে ওদের বাড়ি গিয়েছিল। যদি না যেত, দুর্ঘটনাটা যদি ওকে বাদ দিয়েই ঘটত, তা হলে কিন্তু এতটুকুও অনুশোচনা হত না। ভাবত জুলির এটা দুদৈব ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু যেখানে ও নিজে জড়িত সেখানে কি অন্য কিছু ভাবা যায়?
এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন একসময় ঘুমিয়ে পড়ল চাঁদু। ট্রেনের দোলানিতে সেই ঘুম আরও গভীর হল। ঘুম যখন ভাঙল তখন সকাল হয়ে গেছে। ট্রেন এসে থামল চম্পা স্টেশনে। কী সুন্দর নাম স্টেশনটার। এখানে বেশিক্ষণ থামল না গাড়ি। বোধ হয় দু’-পাঁচ মিনিট থেমেই আবার শোঁ শোঁ করে ঝড়ের গতিতে ছুটতে লাগল।
চম্পার পরই বিলাসপুর। স্টেশনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ও গেটের কাছে চেকারের পাশে সুজয়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। জানালা দিয়েই হেঁকে ডাকল, সু-জ-য় !
সুজয়ও হাত নাড়ল দুর থেকে, চাঁদু! তার মানে সেও ওকে দেখেছে এবং ওর ডাক শুনেছে। তা ছাড়া গাড়ির গতির সঙ্গে ছুটতে ছুটতে সুজয় এসে ওর কম্পার্টমেন্টের সামনে দাঁড়াল। চাঁদুও সুটকেশটা নিয়ে ঝুপ করে নেমে পড়ল স্টেশনে। বেশ জমকালো স্টেশন। হইহই করছে চারদিকে লোকজন। তার ওপর বম্বে মেল বলে কথা। যেমনি নামার ভিড়, তেমনি ওঠার। সেই ভিড়ের মধ্যেই মহামিলন।
চাঁদু ট্রেন থেকে নামতেই সুজয় জড়িয়ে ধরল ওকে! বলল, শেষ পর্যন্ত এলি তা হলে?
এলাম। তবে খুব একটা আনন্দ নিয়ে আসিনি। ওখানকার খবর শুনেছিস নিশ্চয়ই?
শুনেছি। তোর বাবা ফোনে সব কথা আমার বাবাকে জানিয়েছেন। তা ওই কেলটিটা শেষপর্যন্ত খুন করতে গেল কেন?
ছিঃ সুজয়। অন্যের বোন সম্বন্ধে এইরকম মন্তব্য কেউ করে? জুলির গায়ের রংটাই শুধু দেখলি, ওর চোখদুটো দেখিসনি? ওরকম পদ্মচক্ষু ক’টা মেয়ের হয়? তা ছাড়া ও তো আমাদেরও বোন। চোখের সামনে লাউ ডগাটির মতো কেমন ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছিল।
তোকে কাব্যরোগে পেল নাকি? একটা শুঁটকি কালটি মেয়ে...। আবার!
আচ্ছা বাবা আচ্ছা। আর বলব না।
জুলিকে তুই ভুল বুঝিস না রে। ওর মতো মেয়ে হয় না। ও কখনওই খুন করতে পারে না।
সুজয় চাঁদুর সুটকেশটা হাতে নিয়ে গেট পার হয়ে বাইরে এল। তারপর একটা রিকশায় চেপে পাশাপাশি বসল দু’জনে। বলল, বেশ, তা না হয় না করল। কিন্তু গেল কোথায় মেয়েটা?
সেইটাই তো রহস্য।
আমার মনে হয় কী জানিস, রাজুটা তো ভেঁপো ছেলে। প্রথমে ভাল ব্যবহার করে পরে নিশ্চয়ই আড়ালে নিয়ে গিয়ে ওকে ভয়টয় দেখিয়েছে। আর জুলি তখন ওর অস্ত্রেই ঘায়েল করেছে ওকে। তারপর পালিয়েছে।
আমি কিন্তু ও কথা একদম ভাবছি না। তুই জানিস না সুজয়, রাজুর গায়ে কী অসম্ভব জোর। রতন- আমি দু'জনে মিলে একবার ওকে পেটাতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে গেছি। তা ছাড়া হাওয়াপুকুর তো ওখান থেকে অনেক দূরে। সেখান পর্যন্ত জুলিকে ও নিয়ে যাবে কী করে?
তা হলে কী বলতে চাস তুই?
আমার মনে হয় রাজুর এই ব্যাপারটা প্রি-প্ল্যানড মার্ডার। জুলি ঘটনাচক্রে জড়িয়ে পড়েছে। আসলে রাজুকে যারা মার্ডার করেছে, তারাই কিডন্যাপ করেছে জ্বলিকে।
কী বলছিস তুই?
ঠিকই বলছি। আর এই সংকটমুহূর্তে মেয়েটাকে যেখানে উদ্ধার করবার জন্য খোঁজখবর নেওয়ার দরকার সেখানে আমার বাবা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আমাকে সরিয়ে দিলেন।
তুই থেকেই বা কী করতিস? গোয়েন্দাগিরি? বই পড়ে সবাই কি পাণ্ডব গোয়েন্দা হয়? না হওয়া যায়?
তা কেন? তবে চেষ্টা করবার মানসিকতা তো আসে? আর সেইজন্যই তো বই পড়া। না হলে বই পড়বার প্রয়োজনীয়তাই বা কী? পরের ব্যাপারে বেশি মাথা না ঘামানোই ভাল।
ঘামাতাম না রে। যদি না মেয়েটাকে আমি নিজে পকেট থেকে টাকা বার করে কচুরি কিনতে পাঠাতাম। ওর মা-ও তো এখন ভাবতে পারে যে, এইরকম একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার ঘটবে জেনেই আমি অসময়ে ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম বা ওকে কচুরি আনতে পাঠিয়েছিলাম। অর্থাৎ ওই দুষ্টুচক্রের চক্রীদের মধ্যে আমিও একজন।
সুজয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, হুঁ। এরকম অবশ্য উনি ভাবতে পারেন। ভাবাটা অন্যায় নয়।
রিকশা স্টেশন থেকে বেরিয়ে ডানদিকে বেঁকে রেল কোয়ার্টারের দিকে এগোতে লাগল। কী সুন্দর এলাকাটা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সাজানো গোছানো। এখানকার রাস্তাঘাট এবং পরিবেশ দেখে প্রথমদর্শনেই মুগ্ধ হয়ে গেল চাঁদু সুজয়রা এখানে কী সুখেই না আছে।
রিকশা ওদের কোয়ার্টারের সামনে আসতেই ওর মা-বাবা হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন, এসো বাবা, এসো। আসতে কোনও অসুবিধে হয়নি তো?
সুজয়ের বাবা-মাকে প্রণাম করে ঘরে ঢুকল চাঁদু। ওইটুকু সময়ের মধ্যে কত কথাই না হল।
সুজয়ের মা বললেন, কী সব আজকালকার ছেলেমেয়ে বাবা। কতই বা বয়স — এর মধ্যেই খুনখারাপি!
বাবা বললেন, কিন্তু মেয়েটা গেলই বা কোথায়? ও না-পালালে তো তোমাকে কেউ সন্দেহ করত না।
চাঁদু বলল, সন্দেহ তো করেনি কেউ। তবে কালচক্রে ঘটনাটার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি আমি।
সুজয় বলল, আসতে-না-আসতেই এসব কথা কেন? ওসব এখন ভুলে যাও। ওই প্রসঙ্গে কোনও আলোচনাই কেউ কোরো না তোমরা।
চাঁদু প্রথমেই বাথরুমে গিয়ে দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। তারপর গাড়িতে পরে আসা জামাপ্যান্ট ছেড়ে পাজামা-পাঞ্জাবি পরল।
এক বিদ্যুৎবর্ণা কিশোরী এসে লাজুক লাজুক মুখে দু’ কাপ চা আর টোস্ট এনে ওদের সামনে রাখল। তারপর চাঁদুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে যেতেই বাধা দিল চাঁদু, এ কী! আমাকে প্রণাম করছ কেন?
মেয়েটি বলল, তাতে কী হয়েছে?
সুজয় বলল, এ কে জানিস? আমরা মামাতো বোন গোলাপ। খুব ভাল মেয়ে। দারুণ স্মার্ট। এ বছর ফার্স্ট হয়ে ক্লাস নাইনে উঠেছে। এইট থেকে নাইন।
চাঁদু বলল, এইবার মনে পড়েছে। যদিও ওকে দেখিনি এর আগে। তবে তোর মুখে ওর কথা অনেকবার শুনেছি। ওরা ধানবাদে থাকত না?
এখনও থাকে । মামা-মামি এসেছিলেন। ওঁরা চলে গেছেন, ও আছে। থাকবে এখানে মাসখানেক। খুব সময়ে এসে পড়েছিস তুই। তিনজনে দাপিয়ে বেড়াব চারদিক। আজকের দিনটা যাক। কাল থেকে প্রথমেই শুরু করব সিনেমা দেখা।
সে কী! তোর মা-বাবা কিছু বলবে না?
এখানে কেউ কিছু বলে না। ছেলে, মেয়ে, বুড়ো, বুড়ি সবাই সিনেমা দেখে এখানে । ঘরে ঘরে টিভি। সবাই বুঝে গেছে এসবে ছেলেমেয়ে খারাপ হয় না! গোলাপ কি সিনেমা কম দেখে? তবুও ক্লাসে ফার্স্ট হয় । আসলে পড়াশুনাটা হল মেধার ব্যাপার! ও যার আছে তার কোনও কিছুতেই আটকাবে না। আমার তো মনে হয় যারা যত বেশি শাসনে থাকে তারা তত বেশি খারাপ হয়।
চাঁদু বলল, ওখানে একদম সিনেমা দেখতে পাই না রে। টিভিই দেখতে পাই না বাড়িতে। অথচ কত দামি কালার টিভি বসানো আছে বড়ঘরে। টিভি শুরু হলে আর ঘরে ঢোকবার উপায় নেই আমার।
এখানে ওসব নেই । দেখবি কী সুন্দর সব সাজানোগোছানো সিনেমা হল । ওরকম হল হাওড়া, কলকাতায় একটাও নেই। হল দেখলেই মাথা ঘুরে যাবে। সিনেমা দেখা তো দূরের কথা।
গোলাপ ওদের জলখাবার দিয়ে চলে গেল।
এরপর মাসিমা এলেন আরও কত খাবার নিয়ে । শিঙাড়া, জিলিপি, লাড্ডু, প্যাড়া— কত কী।
চাঁদু তৃপ্তির সঙ্গে খেতে লাগল।
খাওয়া হলে সুজয় বলল, চল তোকে আমাদের রেলওয়ে কলোনিটা ঘুরিয়ে আনি। এই কলোনির জন্যেই বিলাসপুর বিখ্যাত। কত রকমারি বাংলো আর কোয়ার্টার যে আছে এখানে তা দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। আর দেখবি নানান জাতের মানুষের মেলা। আসলে এই জায়গাটাকে মানুষের চিড়িয়াখানা বলতে পারিস।
সুজয়ের কথা শুনে হাসল চাঁদু। বলল, কী সব আবোল-তাবোল বকছিস! চল কোথায় নিয়ে যাবি।
ওরা যখন বেরোচ্ছে তখন পাকা গিন্নির মতো গোলাপ এসে দাঁড়াল দরজার কাছে। বলল, খুব বেশি দেরি কোরো না যেন। কত দূর থেকে এল ছেলেটা, আসতে-না-আসতেই তাকে নিয়ে চলল।
ছেলেটা অর্থাৎ চাঁদু।
সুজয় বলল, ছেলেটা তুই কাকে বলছিস? ও তোর চেয়েও দু’ বছরের বড় তা জানিস?
গোলাপ চোখে তারায় ঝিলিক মেরে বলল, জানি। আমার বুড়ো দাদুর বয়সি তো নয়? বলে একবার তাকাল চাঁদুর দিকে। তাকিয়ে বলল, আপনার বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ঘরের কথা ভুলে যাবেন না যেন। কাল সারারাত ট্রেন জার্নি করেছেন। আজ একটু সকাল সকাল খেয়ে শুয়ে পড়বেন। না হলে শরীর খারাপ করবে। বিলাসপুরের রেল কলোনি একদিনে ঘুরে দেখার নয়।
সুজয়ের সাইকেল ছিল। সেই সাইকেলে চেপেই ওরা চলল পথপরিক্রমায়। চাঁদুকে সামনের রডে বসিয়ে ডবল ক্যারি করতে লাগল সুজয়। যেতে যেতেই বলল, এই যে আমার মামাতো বোনকে দেখলি। কী সুন্দর মেয়ে বল তো? অত ভাল চোখমুখের গড়ন, ফর্সা গায়ের রং সচরাচর দেখা যায় না। গোলাপ তো, গোলাপ। যেন সত্যিকারের একটি গোলাপ ফুল। তেমনি লেখাপড়ায়। অথচ ওর মধ্যে কোনও অহংকার নেই। কত সহজে মানুষকে আপন করে নেয় ও, তা ভাবতেও পারবি না। তুই আসবি শুনে আনন্দে কী যে করবে তার ঠিক নেই। ওইটুকু মেয়ে। রান্নার কাজ থেকে সব কাজই শিখেছে ও । বাপের একমাত্র মেয়ে। আদরিণী কিন্তু গরবিনী নয়।
চাঁদু বলল, সেটা আমাকে যখন প্রণাম করতে এল তখনই বুঝেছি। আজ পর্যন্ত আমার পায়ে কেউ হাত দেয়নিরে। এই প্রথম ও দিল। যেহেতু তুই আমার বন্ধু।
অনেক দুঃখ, বেদনা আর বিবেকের দংশন নিয়ে তোর এখানে এসেছিলাম। মনে হচ্ছে ক'টা দিন এখানে ভালই কাটবে।
তুই না এলে আজই আমরা অমরকণ্টক যেতাম। মা, আমি আর গোলাপ। তোর বাবা দুপুরে ফোন করতেই যাওয়া বাতিল করে দিলাম। ঠিক হল তুই এলেই যাব। তবে মা হয়তো নাও যেতে পারেন। এখন তুই, আমি আর গোলাপ, এই তিনমূর্তিতে তোলপাড় করব চারদিক।
কেন মাসিমা যাবেন না কেন?
আসলে গোলাপ আমাদের কাছে যতই ছোট হোক, তবু বয়সের মেয়ে তো।
চোদ্দো বছর বয়স হল। তাই একা আমার সঙ্গে ওকে পাঠাতে মা ঠিক ভরসা পাচ্ছিলেন না। বলা যায় না কখন কী বিপদ ঘটে। এখন তুই এসে পড়ায় আর কোনও দুশ্চিন্তা রইল না।
তা হোক। তবু মাসিমার আমাদের সঙ্গে যাওয়া উচিত। মাথার ওপর একজন অভিভাবক থাকলে আমরা শান্তিতে ঘুরে বেড়াতে পারব। না হলে যতই ও আমাদের বোন হোক, তবু অনেকে অনেকরকম ভাবতে পারে। বাইরের লোকের মনে আমাদের সম্বন্ধে কোনও বাজে ধারণা আমরা জন্মাতে দেব কেন?
যা তুই বলবি।
কথা বলতে বলতে ওরা অনেক দূরে চলে এল । কাছেই একটা নদী দেখা যাচ্ছে। নদীতে জল একদম নেই বললেই চলে। শুধু বলি আর বালি। ওরা নদীতে নেমে বালির ওপর রুমাল পেতে বসল।
এরপর অনেকক্ষণ চুপচাপ। একসময় সুজয়ই বলল, আজ কাল দু’দিন তুই রেস্ট নে। পরশু সকালের ট্রেনে আমরা রওনা হব।
চাঁদু অবাক বিস্ময়ে বলল, কোথায় যাব?
এতক্ষণ তা হলে কোথায় যাবার কথা হল? অমরকণ্টক।
ও। সেখানে বুঝি ট্রেনে করে যেতে হয়?
হ্যাঁ। বিলাসপুর থেকে ইন্দোর এক্সপ্রেসে পেনড্রা রোড নামে একটা স্টেশন আছে, সেখানে যেতে হবে। তারপর পেনড্রা রোড থেকে বাসে অমরকণ্টক। কালিদাসের মেঘদূতে যে মেকল পর্বতের নাম আছে, সেই মেকল পর্বতই হল অমরকণ্টক। ওইখানে শোন আর নর্মদার উৎস। ভারী মনোরম জায়গা।
চাঁদ বালিতে আঁচড় কাটতে কাটতে অন্যমনস্ক ভাবেই বলল একসময়, তোদের এখানে বাংলা খবরের কাগজ পাওয়া যায় না?
কেন যাবে না? কালকের কাগজটা আজকে পাবি।
কালকেরটা তো দেখা।
আজকের কাগজ পাবি কাল সকালে।
আমাকে একটা কাগজ জোগাড় করে দিস তো কাল। আনন্দবাজার আনবি। আমাদের বেঙ্গলি ক্লাবে সব কাগজই যায়। তোকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব। সেখানেই দেখে নিবি তুই।
চাঁদু আর কোনও কথা না বলে দূরের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে লাগল।
সুজয় বলল, তুই আসলে জুলির ব্যাপারটা একদম মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিস না, নারে?
ঠিক তাই। আমার মনের ভেতরটা যে কী হচ্ছে সুজয় তোকে কী বলব?
আমার কী মনে হচ্ছে জানিস, মনে হচ্ছে এখুনি যে কোনও একটা ট্রেন ধরে হাওড়ায় ফিরে যাই। তারপর ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকি কোথাও, আর ভেতরে ভেতরে খোঁজখবর লাগাই।
সে তো খুব ভাল কথা। কিন্তু তাতে লাভ?
হয়তো কোনও-না-কোনও সূত্র ধরে রাজুর হত্যাকারীর সন্ধান পাব। আর জুলিরও যদি ওইরকম কোনও মর্মান্তিক পরিণতি না হয়ে থাকে, তা হলে জুলিকেও উদ্ধার করতে পারব।
তোর কি মনে হয় জুলি বেঁচে আছে?
নিশ্চয়ই। না হলে ওর ডেড বডিটা তো পাওয়া
যেত।
আমি বলি কী, তুই এক কাজ কর। যা হবার তা হয়ে গেছে। দু'-চারদিন এখানে বসে খবরের কাগজগুলো লক্ষ কর। তারপর কী করবি-না-করবি সিদ্ধান্ত নে । ইতিমধ্যে পুলিশ যদি এই ব্যাপারে কোনও কিনারা করতে পারে তা হলে তো কথাই নেই। না হলে যা মন চায় করিস। তবে যাবার আগে তোর বাবাকে কিন্তু জানিয়ে যাস।
বাবা জানতে পারলে আমাকে যেতেই মানা করবেন।
উনি কিন্তু আমাদের ওপর ভরসা করেই ছেড়ে দিয়েছেন তোকে। এখন ওইসব গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে তোর যদি কোনও বিপদ হয়, তা হলে আমরা তাঁর কাছে কী কৈফিয়ত দেব বল?
কোনও বিপদই হবে না আমার।
না হোক। তবু আমাদের স্বার্থে একাজ তোকে করতেই হবে ভাই।
চাঁদু কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর বলল, বেশ। তাই হবে। বাড়িতে ফোন করেই আমি উধাও হয়ে যাব। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কেউ কিছুই জানবে না। কাউকে কিছু জানাবও না।
ওরা যখন নদীর বালিতে বসে এইরকম সব আলোচনা করছে, তেমন সময় একজন লোক স্কুটার নিয়ে ধুলোবালি উড়িয়ে ওদের পাশ দিয়ে চলে গেল। যাবার সময় কেন যেন এক রহস্যময় চোখে তাকিয়ে গেল ওদের দিকে।
চাঁদু বলল, লোকটা কে রে?
না। তবে চেনা চেনা লাগছে?
চিনিস তুই?
আমারও কেমন যেন চেনা চেনা লাগল। কেবলই মনে হচ্ছে কোথায় যেন দেখেছি।
আমার কিন্তু খুব ভয় করছে।
কীসের ভয়?
তোর পিছনে সি আই ডি লাগেনি তো?
চাঁদু ঘাড় নেড়ে বলল, না। তারপর বলল, সি আই ডি-দের তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে আমার পিছনে লাগতে যাবে। তা ছাড়া বাবা ওদিকটা সামলে নিয়েছেন।
তা হলে?
এমনি কেউ হতে পারে।
সুজয় বলল, যেই হোক। এখন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে চল দেখি?
চাঁদু বলল, আর একবার যদি এসে পড়ে লোকটা, ফের ওইভাবে তাকায়, তা হলে দেব ওর চোখের মধ্যে বালি পুরে।
সুজয় লাফিয়ে উঠল, তোর সাহস তো কম নয়। গায়ের জোরে পেরে উঠবি তুই ওই লোকটার সঙ্গে?
খুব পারব। চোখে ধুলো পড়লে সবাই অন্ধ হয়। গায়ের জোর তখন কোন কাজে লাগবে শুনি?
এমন সময় স্কুটারে চড়া লোকটি আবার ওদের দিকে এগিয়ে এল। বেশ ভারিক্কি এবং বলিষ্ঠ চেহারার লোক। লোকটি ওদের দিকে তাকিয়ে স্কুটার থেকে না-নেমেই বলল, তোমার নাম চাঁদু না?
হ্যাঁ, ভাল নাম চন্দ্রকান্ত। এখানে বসে কী করছ?
দেখতেই তো পাচ্ছেন এমনি বসে আছি।
ও ছেলেটি কে?
এত সব কথা জানবার কোনও অধিকার আপনার আছে কি? লোকটি হেসে বলল, মনে হচ্ছে এখানকার বি এস আই-এর ছেলে। সবই তো জানেন দেখছি। কিন্তু আপনাকে ঠিক চিনতে পারলুম না তো? আমাকে চেনার অসুবিধে আছে ভাই। আমাকে না চেনাই ভাল। তা হলে কেটে পড়ুন এখান থেকে।
কেটে তো পড়বই। কিন্তু তোমার বাবা হঠাৎ এত ভয় পেয়ে তোমাকে সরিয়ে দিলেন কেন?
সে কথাটা আমার বাবাকেই জিজ্ঞেস করবেন।
খবরটা পেয়েই সকাল থেকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি তোমাকে।
চাঁদু বলল, আপনি মাথামোটা লোক তাই অযথা এত পরিশ্রম করলেন। সকালে বম্বে মেলের সময়ে স্টেশনে গেলেই তো দর্শন পেতেন আমার।
হ্যা আমি খবর পেয়ে যখন স্টেশনে গেলাম বম্বে মেল তখন রায়পুরে পৌঁছে গেছে।
এখন আপনি কী করতে চান?
আমি তোমাকে সতর্ক করে দিতে এসেছি। তোমার মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে দু'জন লোক আজই মধ্যরাতে বিলাসপুরে এসে পৌঁছুবে। সম্ভবত ওরা গীতাঞ্জলিতে আসছে। কাজ হাসিল করলেই প্রচুর অর্থ পাবে ওরা। শিউরে উঠল চাঁদু, সত্যি! কিন্তু আমার অপরাধ? আমি তো ওদের কোনও ক্ষতি করিনি। ওদের কেন, কারও ক্ষতিই করিনি আমি। তা হলে? বাঃ রে। কেষ্ট মিত্তির তার পুত্রহত্যার প্রতিশোধ নেবে না?
কেষ্ট মিত্তিরের ছেলের খুন হওয়ার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? রাগটা তোমার বাবার ওপর।
আমার বাবাও তো খুন করেননি।
করাতে তো পারেন।
না। আমার বাবা এ কাজ করতে পারেন না।
জুলিও পারে না।
আপনি চেনেন জুলিকে?
তোমাকেও চিনি, তোমার বাবাকেও চিনি। যাক। আমার কাজ শেষ। তোমাকে যে খুঁজে পেয়েছি এতেই আমি খুশি।
জুলি এখন কোথায়? আপনি যখন সবই জানেন তখন দয়া করে একবার বলুন না সে কোথায়? আমি ওকে ওর মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে নিশ্চিন্ত হই। তারপর খুন হই, যা হই কোনও কিছুতেই আমার আপত্তি নেই।
লোকটি স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে বলল, আমার সময় খুব কম। আজই রাত্রের মধ্যে যেখানে হোক পালিয়ে যেয়ো তুমি। শুধু বাড়ি যেয়ো না। গেলেই বিপদ। বিলাসপুরেও থেক না।
পালিয়ে কোথায় যাব একটু বলে দিন না?
কাকপক্ষীতেও যেন টের না পায়। ইন্দোর ভূপাল জব্বলপুর ইটারসি যে দিকে হোক কেটে পড়ো। আচ্ছা চলি । বাই বাই।
লোকটা চলে যেতেই লাফিয়ে উঠল সুজয়। বলল, এ যে রীতিমতো নাটক জমে উঠল রে ভাই।
তাই তো দেখছি।
ওরা পায়ে পায়ে বালি হেঁটে ওপরে বাঁধে উঠে সাইকেল নিয়ে চলে গেল। দু’জনের কারও মুখে আর একটুও কথা নেই।
থমথমে মুখ নিয়ে বাড়ি ফিরল দু'জনে। দু'জনেরই চোখেমুখে আতঙ্ক। মনের মধ্যে উৎকণ্ঠা। কে এই রহস্যময় লোক? সে কি সত্যিই কোনও হিতৈষী? নাকি ওকে পথে বার করে সহজে গুম করবার কোনও অভিনব ফন্দি এঁটেছে?
মা বললেন, কী রে! এত দেরি করলি কেন?
সুজয় বলল, দেরি কোথায় মা?
সেই কখন গেছিস বল তো?
চাঁদুকে রেল কলোনিটা ঘুরিয়ে দেখালাম। নদী দেখাতে নিয়ে গেলাম। তাই বল। এবার চানটান করে নে দেখি? খেয়েদেয়ে ছেলেটা একটু ঘুমোক। ওদের ভাবান্তর গোলাপের নজর এড়াল না। সে তেলের বাটি আর তোয়ালে এগিয়ে দিতে এসে চাঁদুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কী ব্যাপার! হঠাৎ কী হল আপনাদের? কারও মুখে হাসি নেই, কিছু নেই। গম্ভীর গম্ভীর ভাব।
সুজয় চোখ টিপে দিল চাঁদুকে।
চাঁদু তবুও মরা চাঁদের মতো ম্লান হেসে বলল, সে তুমি বুঝবে না গোলাপ, আমার যে কী জ্বালা। কতদিনের আশা ছিল বিলাসপুরে বেড়াতে আসার। কিন্তু সেই আশা এমনভাবে পূর্ণ হল যে আর মনে হচ্ছে না এক মিনিটও এখানে থাকি।
কোনও খারাপ খবরটবর পেলেন নাকি কিছু ?
মাসিমাকে কিছু যেন বোলো না। খুবই খারাপ খবর। কীরকম তবু শুনি?
হয়তো খাওয়াদাওয়া করেই আমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। কোথায় যাবেন?
জানি না।
পাণ্ডুর হয়ে গেল গোলাপের মুখ। সে একবার করুণভাবে সুজয়ের দিকে তাকাতেই মুখ নামিয়ে নিল সুজয়।
চাঁদু খুব তাড়াতাড়ি ব্যস্ততার সঙ্গে স্নানপর্বটা মিটিয়ে নিল। চাঁদুর হলে সুজয় ঢুকল বাথরুমে। গোলাপ অনেক আগে থেকেই শুচিস্নিগ্ধ হয়ে ছিল। ঘড়ির কাঁটায় দেড়টা।
মাসিমা ডাইনিং টেবিলে খেতে দিলেন তিনজনকেই। তবে চাঁদু ও সুজয় পাশাপাশি বসলেও গোলাপ কিন্তু বসল না। ও নিজেও মাসিমার সঙ্গে পরিবেশনের কাজে হাত লাগাল। কত কী রান্না করেছেন মাসিমা। গোলাপও সহযোগিতা করেছে। সরু চালের ভাত, মাংস, মাছ দু'-তিন রকমের তরকারি, চাটনি।
চাঁদু ও সুজয় ঘাড় হেঁট করে খেয়ে যেতে লাগল। কারও মুখে কথা নেই। গোলাপও নীরব।
মাসিমা বললেন, কী রে তোরা সব এমন বোবা হয়ে গেলি কেন?
কেউ কোনও উত্তর দিল না।
একটা-দুটো কথাটতা বল? তবে তো ভাল লাগবে। মাংসটা গোলাপ রেঁধেছে। বেশি ঝাল হয়নি তো?
চাঁদু জোর করে মুখে হাসি এনে বলল, খুবই উপাদেয় হয়েছে। মনে হচ্ছে আরও খাই। অনেক খাই।
তা খাও না বাবা। দেব আর একটু?
না মাসিমা। একদম নয়। এত রান্না না হলে আরও খেতাম। অনেক খেতাম। খাওয়া হলে ঘরের দরজা বন্ধ করে আলোচনা করতে বসল ওরা, চাঁদু আর সুজয়।
সুজয় বলল, তুই তা হলে কী ঠিক করলি বল?
চাঁদু বলল, পালাব। এমনিতেই আমার মন চাইছিল না থাকতে। তার ওপর লোকটা যখন অযাচিতভাবে এসে চলে যাবার কথা বলেই গেল তখন আর অযথা মায়া বাড়িয়ে লাভ কী?
তা হলে কোথায় যাবি তুই?
ভাবছি অচেনা জায়গায় দূরে কোথাও না গিয়ে ঘরের ছেলে ঘরেই ফিরে যাব।
ও লোকটা কিন্তু বাড়ি যেতে নিষেধ করেছে তোকে।
কিন্তু অচেনা জায়গায় গিয়ে আমি করবটা কী? কোথায় থাকব-না-থাকব এসবের কিছুই তো জানি না আমি। তা ছাড়া অত টাকা-পয়সাও আমার কাছে নেই।
আমি তোকে গোটা পঞ্চাশেক টাকা দিতে পারি।
আমার কাছে দু’ হাজার টাকা আছে। তাতেই আমি যেতে সাহস করছি না, তোর ওই পঞ্চাশ টাকায় আমার কী হবে?
সুজয় চুপ করে গেল।
ঘড়িতে দুটো বাজল।
সুজয় বলল, কখন যাবি তা হলে?
সন্ধে হলেই যাব। আমি চলে গেলে তারপরে তোর মাকে যা বলার বলবি। আগে কিছু বলিস না যেন। গোলাপকেও কিছু বলার দরকার নেই। আমি এদিক-ওদিক করতে করতে সুট করে কেটে পড়ব একসময়।
ওরা দরজা বন্ধ করে কথা বললেও উৎসাহী গোলাপের কান যে জানালার পাশে সজাগ হয়ে আছে তা ওরা ভাবেওনি। গোলাপ খুবই সতর্কতার সঙ্গে ওদের কথাবার্তা শুনছিল, এমন সময় মাসিমা ডাক দিলেন, ওখানে জানলার কাছে কী করছিস গোলাপ? আর দেরি না করে খেতে আয়।
গোলাপ ত্ৰস্তে সরে গেল সেখান থেকে।
পরক্ষণেই মাসিমা এসে ঘরে ঢুকলেন, এ কী শুনছি বাবা? তুমি নাকি চলে যাচ্ছ?
মাসিমা ঘরে ঢুকলেও গোলাপ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
চাঁদু বলল, গোলাপ বলেছে বুঝি?
তোমরা তো বলনি বাবা। কিন্তু চলেই যাবে যদি তা হলে এলে কেন? একটা রাত অন্তত থেকে গেলে হয় না?
গোলাপ বলল, আসলে আমরা তো ওনার সেবাযত্ন করতে পারছি না ঠিক মতো তাই বোধহয় উনি চলে যাচ্ছেন।
চাঁদু বলল, না না। তা নয়।
সুজয়ই এবার সেই ভয়ংকর কথাটা শুনিয়ে দিল মাকে। বলল, ওর চলে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই মা। গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস রাত বারোটা নাগাদ এখানে আসবে। তারপরে আর একটা মুহূর্ত ও যদি এখানে থাকে, তা হলে খুন হয়ে যাবে ও।
মা দু'হাতে কানঢেকে শিউরে উঠলেন, চুপ চুপ! আর বলিস না। কী সাংঘাতিক কথা! শিগগির তোর বাবাকে ফোন কর।
কাউকে কিছু করবার দরকার নেই। কাকপক্ষীতে টের পাবার আগে বেড়ালের মতো নিঃশব্দে পালাতে হবে ওকে। কোথায় যাবে ও?
সেটা ওকেই ঠিক করে নিতে হবে। এমনকী বাড়িও যেতে পারবে না বেচারি। ওর মৃত্যুদূতেরা সেখানেও অপেক্ষা করছে ওর জন্য।
গোলাপও এবার ছুটে ঢুকে এল ঘরের ভেতর। বলল, একথা তোমরা এতক্ষণ বলনি কেন?
সুজয় বলল, এ কী পাঁচকান করবার কথা রে? ভেবেছিলাম কাউকে না জানিয়েই চুপি চুপি পাঠিয়ে দেব ওকে।
গোলাপের চোখে জল এসে গেল এবার। বলল, চাঁদুদা ছেলেমানুষ। একা উনি কোথায় যাবেন? এইভাবে ওনাকে কি ছেড়ে দেওয়া যায়? বিশেষ করে এই বিদেশবিভুঁয়ে?
ছেড়ে যে দিতেই হবে বোন। ও যেখানে হোক চলে যাক। তারপর সুবিধেমতো সেখান থেকে ফোন করে ওর বাড়িতে যোগাযোগ করুক। এবার ওর বাবা-মা যা ভাল বুঝবেন করবেন।
আমি বলি কী, তুমিও ওর সঙ্গে যাও।
মাসিমা বললেন, না না। তা হয় না। সুজয়কে আমি কাছ ছাড়া করতে পারব না। কার কোপ কার ঘাড়ে পড়ে কেউ কি তা বলতে পারে? এই জালে আমার ছেলেকে আমি কিছুতেই জড়াতে দেব না।
চাঁদু বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন মাসিমা। আমার সময় এখন খারাপ। কখন কী হয় তা বলা যায় না। আমি চলে গেলেও আমার খোঁজে ওরা হয়তো এখানে আসবে। তখন কী যে হবে তা ভগবানই জানেন । সুজয়কে আপনি একটু সাবধানে রাখবেন। পারলে আশপাশের কারও বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন।
কী বললে? এখানে আসবে? তোমার খোঁজে? সর্বনাশ। তোমাকে না-পেয়ে যদি ওরা সুজয়কে পায়?
সেই জন্যেই তো বলছি ওকে একটু সাবধানে রাখবেন।
তুমি আর সন্ধের জন্য অপেক্ষা কোরো না। এখুনি চলে যাও। তোমার বাবা তোমাকে পাঠাবার আর জায়গা পেলেন না, এইখানে পাঠালেন। আর কোথাও কি কেউ ছিল না তোমাদের?
সুজয় বলল, মা।
গোলাপ বলল, এসব কী যা তা বলছেন আপনি? তা ছাড়া সন্ধে হতে আর দেরিই বা কত? দিনের আলোয় পাঁচজনকে দেখিয়ে কোথায় যাবেন উনি? যে চুলোয় হোক যাক। এখুনি বিদেয় হতে বল ওকে।
অপমানে, দুঃখে পায়ের তলার শেষ মার্টিটুকুও যেন সরে যেতে লাগল চাঁদুর। এই সুজয়ের মা। এদের এখানে আসবার জন্যই এতদিন ধরে মনে মনে এত রঙিন স্বপ্ন দেখেছিল ও? সত্যি, বিপদে না-পড়লে মানুষকে চেনা যায় না। এই জন্যেই বাবা বলেন, কখনও কারও আশ্রয়ে উঠতে নেই । তা সে যত আপনজনই হোক।
সুজয়ের মাকে প্রণাম করে চাঁদু বলল, আমি এখুনি চলে যাচ্ছি মাসিমা। আমি চাই না আমাকে ঘিরে আপনাদের পরিবারে কোনও বিপদের মেঘ ঘনিয়ে আসুক। বলে চকিতে নিজের ব্যাগটাকে গুছিয়ে নিয়ে সুজয়কে বলল, আসিরে সুজয়।
সুজয় বলল, সাবধানে যাস।
এরপর গোলাপের কাছে এসে বলল, সুজয়ের মুখে তোমার কথা আমি অনেক শুনেছিলাম। দেখবার ইচ্ছেও ছিল তোমাকে। দেখা হল। এখন আসি কেমন?
মৌন গোলাপের ডালিমের মতো গালদুটি বেয়ে বিন্দু বিন্দু অশ্রুজল মুক্তোর মতো ঝরে পড়ল। সে একভাবে চেয়ে রইল ওর চলে যাওয়া পথের দিকে।
সুজয়ের মা বললেন, ওর জন্যে তোর চোখে জল কেন? ও কে তোর? নিজের দাদা নয়, কিছু নয়, কোনও আত্মীয়স্বজনও নয়। ন্যাকামো।
গোলাপ চোখের জল মুছে বলল, পিসিমা। আপনি শুধু সুজয়দার কথাটাই চিন্তা করলেন। ওই খুনিরা এলে আমারও যে কী বিপদ হতে পারে কই একথা তো একবারও ভাবলেন না? আর চাঁদুদা আপনার নিজের ছেলে না হলেও আর এক মায়ের ছেলে তো সে। নিজের স্বার্থের কথা ভেবে তাকে আপনি এইভাবে ঠেলে দিলেন ঘাতকের মুখে?
সুজয় বলল, তুই এবার খেয়ে নে গোলাপ।
আমার খিদে নেই। তা ছাড়া আজ রাতে যদি কোনও গোলমাল হয় তাই আমিও আর এখানে থাকতে সাহস পাচ্ছি না। আমি আজই রাতের ট্রেনে যে কোনও গাড়িতে কলকাতায় যাব। বাবা-মা'র জন্যে ভীষণ মন খারাপ করছে আমার। এখন ভাবছি সেদিন ওদের সঙ্গে চলে গেলেই হত। তুই চলে যাবি! বিনা রিজার্ভেশনে একা একা?
সব গাড়িতেই লেডিজ কম্পার্টমেন্ট থাকে। মেয়েদের অসুবিধে কোথায়? তা ছাড়া টাকা ফেললে একটা বার্থ কোনও-না-কোনও গাড়িতে মিলেও যেতে পারে।
কলকাতা যাবার কোনও গাড়ি আছে এখন?
জানি না। যে গাড়ি পাব তাতেই উঠব।
গোলাপও আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে জিনিসপত্তর গোছাতে লাগল ওর। ওকে দেখে মনে হল বয়সে ছেলেমানুষ হলেও মনের দিক থেকে ও যেন অনেক বড় হয়ে গেছে।
মৃত্যুভয় যে কী সাংঘাতিক তা যে না পেয়েছে তাকে বোঝানো যাবে না। রাস্তায় নেমেই চাঁদু টের পেল ওর মতো অসহায় বুঝি আর কেউ নেই। এই দূরদেশে একা ও কোথায় যাবে? যে লোকটি এত বড় একটা খবর দিয়ে সাবধান করল ওকে, সেই বা কে? অজ্ঞাত আততায়ীরা এসে চাঁদুকে খুন করলে তার কী এসে যেত? শুধু তাই নয়, সে বলল, ওকে, ওর বাবাকে সবাইকেই নাকি চেনে। এমনকী জুলিকেও। লোকটি তা হলে কে? আর লোকটিকে চিনতে না পারলেও চেনাচেনা লাগছে। কিন্তু মনে করতে পারছে না কিছুতেই।
চাঁদু প্রথমেই নির্জন পথ এড়িয়ে জনারণ্যে মিশে গেল। ওরা নাকি মধ্যরাতে
গীতাঞ্জলিতে আসবে। কিন্তু তার আগেই যদি এসে পড়ে? এখনও যদি এসে থাকে? ওরা এই ভিড়েও ওকে লক্ষ করছে না তো? না কি এ সবই লোকটার চাল? তবে লোকটি যে মিথ্যে বলছে এমন বলেও মনে হল না। কিন্তু ও কিছুতেই ভেবে পেল না কোথায় যাবে এখন। বাড়ি যেতে পারলে সব থেকে ভাল হত। অথচ বাড়ির দিকে যাওয়া মানেই মরণকে বরণ করা। তাই জুলির থেকেও নিজেকে রক্ষা করার চিন্তাটাই ওকে পেয়ে বসল বেশি।
ও পায়ে পায়ে স্টেশনে এল।
সন্ধে উত্তীর্ণ হয়েছে তখন। টিকিটঘরের সামনে এসে একবার চুপ করে দাঁড়াল। কাউস্টারে দীর্ঘ লাইন। কোন ট্রেন কোনদিকে যাচ্ছে, কোথায় কীভাবে যেতে হয় কিছুই তো জানে না ও। তাই উদ্দেশ্যহীনভাবে ও যখন নানারকম ভাবতে ভাবতে পায়চারি করছে তেমন সময় হঠাৎই একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর ওর কানে এল, চাঁদুদা !
কে?
চাঁদু ঘুরে তাকিয়েই অবাক। দেখল একটা কাঁধে ঝোলাব্যাগ নিয়ে কোথায় যেন যাবার জন্য তৈরি হয়েই এসে হাজির হয়েছে গোলাপ। বলল, কী ব্যাপার। তুমি এখানে?
ছল ছল চোখে গোলাপ বলল, আমিও চলে এলাম। যে ভাবে ওরা আপনাকে তাড়িয়ে দিল তাতে খুবই খারাপ লাগল আমার।
তা তো এলে । কিন্তু এই রাতদুপুরে তুমি যাবে কোথায়?
আমি বাড়ি ফিরে যাব।
ওরা তোমাকে একা আসতে দিল?
আমাকে ওরা চেনে। আমি যদি যাব মনে করি, কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। তা ছাড়া আমি তো ঘরকুনো মেয়ে নই। একা একা যাতায়াত আমি করেই থাকি।
সে তোমাকে দেখলেই বোঝা যায়। অত্যন্ত স্মার্ট মেয়ে তুমি।
গয়া, দেওঘর, রাজগির, পুরী, বেনারস এসব আমি একাই যেতে পারি। তুমি বুঝি অনেকবার গেছ ওইসব জায়গায় ?
বাবা-মায়ের সঙ্গে বছর বছর গেছি।
তা হলে আমাকে তুমি রাজগির বা বেনারসের কোনও একটা ঠিকানা বলে দাও না গোলাপ। আমি সেখানে গিয়ে লুকিয়ে থাকি কিছুদিন। পুরী হলেও মন্দ হয় না।
গোলাপ বলল, আমি একটা কথা বলব চাঁদুদা?
বলো।
আপনি বরং আমাদের বাড়ি চলুন। আমার মা-বাবা খুব খুশি হবেন আপনাকে দেখে। আমাকেও একা যেতে হবে না। তা ছাড়া আপনি গেলে আমার খুব ভাল লাগবে।
চাঁদু যেন অকূলে কূল পেল এবার। সে গোলাপের হাতদুটি ধরে বলল, গোলাপ। মায়ের মুখে শুনেছিলাম যার কেউ নেই তার ভগবান আছেন। এখন দেখছি সত্যিই তাই। তুমিই আমার ভগবান। একা একা কী খারাপ যে লাগছিল তা কী বলব। এখন তোমার সঙ্গে দুটো কথা বলে বাঁচব। তোমাদের বাড়িতে কয়েকটা দিন থাকতে পেলে আমিও শান্তিতে থাকব। তার পর বাবা এসে যখন নিয়ে যাবেন তখন হাসিমুখে বিদায় নেব তোমাদের কাছ থেকে। এখন দেখো ধানবাদ যাবার গাড়ি কখন আছে।
গোলাপ বলল, ধানবাদ যাবার গাড়ি এখানে কোথায় পাবেন? এখন আমাদের যে কোনও ট্রেন ধরে যেভাবেই হোক যেতে হবে হাওড়ায়। তারপর ওইখান থেকে অন্য ট্রেনে ধানবাদ।
হাওড়ার নাম শুনেই মুখ শুকিয়ে গেল চাঁদুর। বলল, এবার তা হলে আর যাওয়া হল না তোমার সঙ্গে।
কেন? কেন?
তুমি তো সবই শুনেছ? হাওড়াতেই যদি যাব তা হলে আর বাড়ি যেতে দোষ কী? মিছিমিছি তোমাদের কষ্ট দিতে যাব কেন? হাওড়ায় গেলেই তো আমি খুন হয়ে যাব।
গোলাপ শিউরে উঠে বলল, না না তা হলে গিয়ে কাজ নেই। এ কথাটা মনেই ছিল না আমার।
তাই বলি তুমি রাজগির, পুরী কিংবা বেনারসে যাবার রাস্তাটা বলে দাও। আমি ঠিক চলে যাব। ওখানে গিয়ে কোথায় থাকব, কী করব যদি জানা থাকে তাও বলো।
গোলাপ বলল, আপনি যেসব জায়গার নাম বললেন, এখান থেকে সেগুলো অনেক-অনেক দূরে। রাজগির বেনারস গেলে প্রথমেই আমাদের হাওড়ায় যেতে হবে। তারপর আবার অন্য ট্রেনে রাজগির, বেনারস। সেও এক রাতের রাস্তা। অর্থাৎ মোট দু' রাতের জার্নি। পুরীও তাই। পুরী গেলে অবশ্য খড়্গপুরে নামলেই চলবে। সেখান থেকে...।
থাক। আর দরকার নেই। তোমাকে হাওড়ার গাড়িতে তুলে দিয়ে আমি ভাবছি টিকিট না-কেটে যেখানে হোক চলে যেতে পারব।
সে কী। চেকার এসে ধরলে অনেক টাকা ফাইন দিতে হবে তা জানেন? তার ওপর গাড়ি যেখান থেকে আসছে সেইখান থেকে ভাড়া দিতে হবে।
না দিতে পারলে?
জেল।
জেল থেকে পালানো যায় না?
কী করে পালাবেন? চারদিকে পুলিশের কড়া পাহারা।
চাঁদু যেন অকূলে কূল পেল না এবার। বলল, তা হলে গোলাপ, আমার মনে হয় বিনা টিকিটেই ট্রেনে চাপা ভাল। চেকার ধরলে ভাড়া দেব না। যদিও দু’ হাজারের মতো টাকা আছে আমার কাছে। আর ভাড়া না দিলেই জেল। জেলে থাকলে সেখানে তো কেউ আমাকে খুন করতে পারবে না।
গোলাপ বলল, ভারী দুষ্টু বুদ্ধি তো আপনার। তাই যদি মনে করেন তা হলে সোজা এখানকার থানায় গিয়ে সব কথা খুলে বললেই তো হয়।
এমন সময় অচেনা একটি ছেলে এসে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, এইভাবে এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছ কেন তোমরা? সবাই দেখছে যে? চাঁদু বলল, কে তুমি?
তোমার বন্ধু। শিগগির পালাও! গা ঢাকা দাও। ভূপাল এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে আছে, এক্ষুনি ছাড়বে। ওইতে চেপে ভূপালের দিকেই পালাও।
চাঁদু ভয়ে ভয়ে বলল, ভূপাল কী করে যাব?
ওই গাড়িতে চেপেই যাবে। পেনড্রা রোড, অনুপপুর, কাটনি হয়ে যাচ্ছে ট্রেন। সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেস ওটা। লেট গাড়ি, এক্ষুনি ছাড়বে। চলে যাও।
টিকিট কাউন্টরে তখন অনেক ভিড়। তাই না দেখে গোলাপ ওর ঝোলা ব্যাগটা চাঁদুর কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে ছুট্টে চলে গেল টিকিট কাটতে। লেডিজ কাউন্টার একেবারে ফাঁকা। ও গিয়ে দুটো টিকিট কেটেই চাঁদুর হাতে টান দিয়ে বলল, চলে আসুন।
ওরা প্ল্যাটফর্মে ঢুকেই দেখল ট্রেন ছাড়ার সিগন্যাল হয়ে গেছে। দু'জনে প্রায় হন্তদন্ত হয়ে একটা কামরার হাতল ধরে কোনওরকমে ভেতরে ঢুকতেই একজন কোচ অ্যাটেনডেন্ট হা হা করে ছুটে এলেন, ইয়ে থ্রি-টিয়র হ্যায়। ইসমে মাত চড়িয়ে।
গোলাপ বলল, আমরা মাত্র দুটো স্টেশন যাব।
লেকিন ইয়ে গাড়ি তুমহারে লিয়ে নেহি। ইয়ে সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেস। একশো চার রুপিয়া নিকাল। তুমকো জুরমানা দেনে পড়েগা।
ট্রেন তখন ছেড়ে দিয়েছে।
চাঁদু বলল, আমাদের কাছে কোনও রুপিয়াই আর নেই।
অ্যাটেনডেন্ট গজ গজ করতে করতে চলে গেলেন।
অত্যন্ত দ্রুতগামী ট্রেন। ছাড়ার পরই ভয়ংকর গর্জনে অজগরের মতো ফুঁসতে ফুঁসতে ছুটতে লাগল ঝড়ের বেগে!
চাঁদু বলল, এটা কী হল?
গোলাপ বলল, কীসের কী হল?
আমরা এই গাড়িতে যাচ্ছিটা কোথায়? তা ছাড়া তুমি তো বাড়ি যাচ্ছিলে? যাচ্ছিলাম। কিন্তু আপনাকে ছেড়ে যেতে পারলাম কই? আপনার এই অসহায় অবস্থার কথা আর কেউ না বুঝুক আমি তো বুঝি। তা ছাড়া এখনই আমার কলকাতা যাওয়ার ট্রেন না-ও থাকতে পারে। তাই আমার বিশেষ পরিচিত একটি জায়গাতেই আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে আপনাকে রেখে তবেই বাড়ি ফিরব আমি। অবশ্য এখন আমার বাড়ি ফেরবার তাড়াও নেই। শুধু বাবাকে একটা ফোন করে দেব, তা হলেই হবে।
কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে এলে, তোমার বাবা যদি রাগ করেন? আমি তো তোমাদের কেউ নই।
এক সময় কেউ ছিলেন না ঠিকই। এখন নিশ্চয়ই কেউ। না হলে আমিই বা এলাম কেন আপনার সঙ্গে? দু’-এক বছরের তো ছোটবড় আমরা। ভাইবোনও হতে পারি। বন্ধুও হতে পারি।
তুমি কোনটা হতে চাও বলো?
আমি শেষেরটাই চাই।
আমিও। বন্ধুত্বের সম্পর্ক হলে মেলামেশায় কোনও জড়তা থাকবে না। ভাইবোনের মতো পবিত্র বন্ধন থাকবে। অথচ ব্যবহার হবে বন্ধুর মতো।
না হলে দাদাগিরির মধ্যে একটা কেমন যেন গাম্ভীর্য এসে যায়।
তা যদি হয় তা হলে কিন্তু এখন থেকে আর আপনি নয়। তুমি আমাকে তুমিই বলবে।
গোলাপ মিষ্টি হেসে বলল, তাই বলব।
এখন বলো তো এই রাতদুপুরে তুমি আমাকে
কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
আমরা যাচ্ছি অমরকণ্টক। কালিদাসের মেঘদূতের সেই মেকল পর্বতে। ওখানে বরফানিবাবার আশ্রমে আমরা উঠব। আমার বিশেষ পরিচিত জায়গা। গিরিধারীদাদা নামে একজন আছেন ওখানে। তিনি আমার খুবই পরিচিত। দরকার হলে উনি নিজে সঙ্গে করে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসবেন আপনার বাড়িতে।
তুমি কিন্তু শর্ত ভুলে যাচ্ছ গোলাপ। আমাকে আবার আপনি বলছ। আয়্যাম ভেরি স্যরি ব্রাদার।
ব্রাদার।
নিশ্চয়ই। যতই আমরা বন্ধু হই না কেন। সুজয়দার বন্ধু তো আপনি। না না, আপনি নয়, তুমি।
চাঁদু বলল, তুমি সঙ্গে আছ বলে এখন কিন্তু আমার আর কোথাও যেতে ভয় করছে না।
আপাতত বরফানিবাবার আশ্রমটাই তোমার নিরাপদ আশ্রয়। কাল ওখানে পৌঁছে প্রথমেই বাড়িতে একটা ফোন করবে। আমিও করব।
আজ রাতে কোথায় থাকব আমরা?
পেনড্রা রোডেই। ওখানে নর্মদা লজে উঠব আমরা। ঠিক আছে।
গোলাপ এবার অন্য একটা প্রশ্ন করল, জুলির জন্য তোমার এখনও মন খারাপ করছে চাঁদুদা?
এই মুহূর্তে না করলেও মনে পড়লেই করছে। কোথায় যে তলিয়ে গেল মেয়েটা?
আচ্ছা ধরো, এই মুহূর্তে আমাকেও যদি কেউ চুরি করে নিয়ে যায়। তুমি তা হলে কার কথা বেশি ভাববে? আমার কথা, না জুলির?
দু’জনকার কথাই ভাব। তবে ভগবান করুক আর কোনও দুর্ঘটনা যেন না ঘটে।
ট্রেন এসে পেনড্রা রোডে থামল।
রাত্রি তখন আটটা।
স্টেশনের কাছেই নর্মদা লজ। ম্যানেজার খুবই পরিচিত গোলাপের। ওকে দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল, এ কী দিদিভাই? আউর সব কাহা? আসছেন।
গোলাপ মিথ্যে করে বলল, মা-বাবা কালপরশু
এখন কোথা থেকে এলে? বিলাসপুর থেকে?
হ্যাঁ। সেখানে আমাদের এক রিলেটিভের বাড়িতে ছিলাম। ইনি কে আছেন?
আমার দাদা।
ম্যানেজার তিনতলার একটা ডাবল বেডের রুম খুলে দিয়ে বলল, খানা পিনার কুছু ব্যবস্থা হোবে?
ওমলেট ভাজি আর পুরী।
সবজি কুছ?
নেহি।
মাটন কারি মিলেগা।
লে আইয়ে।
সে রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর শরীরে অনেক ক্লান্তি নিয়ে শুয়ে পড়ল দু'জনে। শুয়ে শুয়ে কত কী চিন্তা করতে লাগল চাঁদু।
গোলাপ বলল, এখন তো নিশ্চিন্দি। এত কী ভাবছ চাঁদুদা? ভাবছি কী থেকে কী হয়ে গেল। কেষ্ট মিত্তির আমার পিছনে কেন গুন্ডা লাগাল বলো তো? আমার বাবার সঙ্গে ওর দীর্ঘদিনের শত্রুতা তা জানি। তাই বলে আমাকে মেরে বদলা নিতে হবে? সবচেয়ে বড় কথা ওই লোকটিই বা এত সব জানল কী করে? শুধু আমার বা আমাদের কথা নয়। জুলির কথাও। তা ছাড়া ও বিলাসপুরেই বা এল কেন? ওর কি এখানে বাড়ি? কেষ্ট মিত্তিরের ছেলের খুন হওয়ার পিছনে ওর কি কোনও হাত আছে? আমাকে বাঁচানোর জন্যই বা ওর অত প্রয়াস কেন?
গোলাপ বলল, সবই কেমন যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে না? আমি আর কিছুই ভাবতে পারছি না গোলাপ।
আর ভাবতে হবে না। চুপ করে শুয়ে ঘুমোও তো দেখি?
ঘুম আসছে না। দুশ্চিন্তা যে কী ভয়ংকর তা আজ বুঝতে পারছি। গোলাপ বলল, তবু ভাল, ওই অচেনা আগন্তুকরা তোমাকে সাবধান করে দিল। আমার মনে হয় ওরা আর যাই হোক, তোমার হিতৈষী। হলেই ভাল।
চাঁদু চোখ বুজে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়ল একসময়। ঘুমিয়ে পড়ল গোলাপও। আঃ কী সুন্দর, নিবিড় গভীর ঘুম। আর তেমনই মধুময় এই পেনড্রার নর্মদা লজ।
খুব ভোরে ঘুম ভাঙল দু'জনার। ঘুম ভাঙতেই উঠে পড়ল। বেশি তৎপরতা গোলাপের। বলল, আর এখানে থাকা নয়। এখুনি সকালের বাসেই চলে যেতে হবে আমাদের।
অতএব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে পথে নামা।
পেনড্রা রোড শহরটি খুবই ছোট্ট। স্টেশনের কাছেই বাসস্ট্যান্ড। আবার নর্মদা লজ থেকেও স্টেশন বেশি দূরে নয়। ওরা স্টেশনে আসতেই অমরকণ্টকের বাস পেল। সকালের বাস বলে ভিড় বেশি নেই। বাসে উঠে বসবার জায়গাও পেল। ওরা জানলার ধারে সাইড সিটে বসল দু’জনে। বাস ছাড়লে বাসে বসেই পেনড্রা রোডের যা কিছু দেখবার তা দেখে নিল। কাল রাতের অন্ধকারে কিছুই তো দেখা হয়নি। গোলাপের যদিও এ শহর দেখা, কিন্তু চাঁদুর প্রথম। শহরের দোকানপাটে নানা দ্রব্যের পসারি। পথে অটো, বাস, টাঙ্গা, সাইকেল-রিকশা কী নেই? এমনকী সিনেমা হলও আছে।
অল্প সময়ের মধ্যেই শহর ছেড়ে পার্বত্যপথে এসে পৌঁছল বাস। তারপর পাক খেয়ে খেয়ে পাহাড়ে ওঠা। ঘন সবুজ গাছপালায় আবৃত পাহাড়ের শোভা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল চাঁদু। কী সুন্দর প্রকৃতির দৃশ্য। মাঝে মাঝে বাস থামছে। আর দলে দলে লোক উঠছে। এরা সবাই স্থানীয় অধিবাসী। যাবে নর্মদা তীর্থে। স্নানপুণ্য সঞ্চয়ে। মাঝে মাঝে মনের আনন্দ প্রকাশ করে ধ্বনি দিচ্ছে, নর্মদা মায়ি কী জয়।
বাসে চেপে যেতে যেতে কত হনুমান আর ময়ূর দেখতে পেল ওরা।
গোলাপ বলল, আগে এই পাহাড়ে বুনো বাঘ আর ভালুকের দাপট ছিল খুব। যেসময় এখানে বাস ছিল না সেই সময় পদব্রজে লোক এখানে আসত। কত মানুষ যে বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছে তখন তার লেখাজোখা নেই। তবে সে ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা। পাহাড়কে জয় করার, দুর্গম পন্থাকে লঙ্ঘন করার আনন্দই ছিল আলাদা। অরণ্যের ঘ্রাণ নিয়ে বন্য জন্তুদের সঙ্গে যুদ্ধ অথবা মিতালি করতে করতে সেই পথচলার আনন্দ বাসযাত্রায় কই?
সে পথে তুমি গেছ কখনও ?
বাবার মুখে শুনেছি। আমার ঠাকুরদাদা নাকি একবার ওইভাবে এখানে এসেছিলেন। নর্মদা পরিক্রমা করেছিলেন তো উনি। তখনই এসেছিলেন। আমরা যতবার এসেছি, ততবার বাসে। আসলে বাস চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকেই পায়ে হাঁটা পথের মহাপ্রস্থানও হয়ে গেছে।
ওদের পাশে এক সাধুবাবা বসেছিলেন। বললেন, তুম দোনো নর্মদা মায়ি কী দর্শন করনে যা রহে হো?
ওরা বলল, হ্যাঁ।
বহৎ কমতি উমর তুমহারা। তারপর মিষ্টি হেসে বললেন, নর্মদা পরিক্রমা করো গে?
গোলাপ বলল, না। শুধুই দর্শন করব। দু’-একটা দিন থাকব।
সাধু কী যেন দেখলেন, কী যেন বুঝলেন। তারপর বললেন, জিন্দগি ভর তুম দোনো এক সাথ দোস্তিমে রহো। ভগবান করে বিছোড় না হো।
চাঁদু ও গোলাপ আবেগভরা চোখে তাকাল সাধুর দিকে। সাধুজি বললেন, ক্যা নাম তুমহারা?
চাঁদু বলল, আমার নাম চন্দ্ৰকান্ত।
গোলাপ বলল, আমার নাম গোলাপ।
সাধু বললেন, ফুল য্যায়সি। তো তুমকো গুলাব নেহি গুলেবকায়লি হোনা চাহিয়ে। ও ফুল নন্দনকানন কা পারিজাত কী মফিক। ও কঁহি নেহি মিলতা। স্রেফ ইধরিসে মিলতা। দেখোগে? হাম তুমকো দিখলায়গা।
সাধুজি বড়ই রসিক। আর অত্যন্ত ভাল মানুষ। ওঁর মুখেই ওরা শুনল নর্মদা কী কহানি।
এক গভীর অরণ্যবেষ্টিত উচ্চ গিরিচূড়ায় শিব ছিলেন কঠোর তপস্যারত। কতদিন, কত বছর, কত যুগ ধরে যে তিনি তন্ময় ধ্যানময় হয়েছিলেন তার হিসেব শিবও রাখেননি। ঠিক এমনিই সময়ে এক শুভক্ষণে শিবের নীলকণ্ঠ থেকে নির্গত হলেন নর্মদা। আবির্ভূতা হয়েই তিনি শিবের দক্ষিণ চরণে দাঁড়িয়ে শুরু করলেন শিবের তপস্যা। সেই তপস্যার প্রভাবে শিবের তপস্যাও টলে গেল। একটু একটু করে চোখ মেলে তাকালেন তিনি। দেখলেন এক অপূর্ব সুন্দরী কুমারী কন্যা তাঁর দক্ষিণ চরণে করজোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই কুমারী তাপসীর ধ্যানভঙ্গ করিয়ে সস্নেহে ডাকলেন তিনি, কে মা তুমি? কন্যা বললেন, আমি যে আপনার নীলকণ্ঠ নিঃসৃতা কন্যা। শিব বললেন, তোমার তপস্যায় আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। কী বর চাও তুমি বলো? কন্যা বললেন, আমি আপনার নীলকণ্ঠ নিঃসৃতা হলেও যেন বর প্রভাবে অমৃতময়ী হতে পারি। শুধু তাই নয়, গঙ্গার মতো মাহাত্ম্য যেন আমারও হয়। আমার সলিলে স্নান করে যেন সর্বপাপমুক্ত হয় মানুষ। শিব বললেন, তাই হবে। শুধু স্নানে নয়, তোমাকে দর্শন করলেও মোক্ষ হবে মানুষের। কলিযুগের পাঁচ হাজার বছর পরে গঙ্গার মাহাত্ম নষ্ট হলে গঙ্গামাহাত্ম্যও লাভ করবে তুমি। কন্যা বললেন, আমি আরও বর চাই পিতা। শিব বললেন, আরও কী বর চাও তুমি? কন্যা বললেন, আপনার দেহ হতে নির্গত হয়েছি আমি। তাই এমন বর দিন যেন সবসময় আপনার সঙ্গে আমি একাত্ম থাকতে পারি। শিব প্রসন্ন হয়ে বললেন, বেশ। আজ থেকেই তুমি শিব মহিমায় মহিমান্বিত হবে। আমার নিত্যতৃপ্তিবিধায়িনী হয়ে চিরকুমারী থাকবে। তোমার নাম হবে নর্মদা। যেখানে তুমি, সেখানে আমি। তাই তো নর্মদা কী কঙ্কর বিলকুল শংকর।
কাহিনি শুনে অবাক হয়ে গেল দু'জনে।
সাধুজি আবার বললেন, এই নর্মদা হল আটশো মাইল দীর্ঘ। এই দীর্ঘপথে কোথাও পর্বত, কোথাও অরণ্য, কোথাও মরুভূমি, আবার কোথাও বা সমৃদ্ধ জনপদ। আর সেই গতিপথের উভয় তীরেই অসংখ্য শিবের মন্দির। বাস এসে অমরকণ্টকে থামল।
সবাই নেমে গেলে সব শেষে নামল চাঁদু ও গোলাপ। আর জটাজুটধারী সাধুবাবা।
সাধু ব্ললেন, তোমরা দু'জনেই এসেছে তা হলে? আর কেউ আসেনি? না।
তোমাদের দেখে বড় কৌতূহল হচ্ছে আমার। তোমাদের পরিচয়?
গোলাপ বলল, তার আগে বলুন আপনি কি এখানেই থাকেন না তীর্থ করতে
এসেছেন?
আমি এখানেই থাকি মা। দুগ্ধধারার কাছে নির্জনে আমার আশ্রম।
আপনি বাঙালি?
একজন যোগী এবং ভারতীয়।
গোলাপ বলল, আমরা নিরাশ্রয়।
বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিস বুঝি?
না বাবা, ঠিক তা নয়। এই যে ছেলেটিকে দেখছেন এর জীবন বিপন্ন। ভেবেছিলাম বরফানিবাবার আশ্রমে ওকে লুকিয়ে রাখব কয়েকটা দিন। এখন আপনি যদি একটু কৃপা করেন...।
সাধুবাবা সস্নেহে চাঁদুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, এই কথা। কোনও ভয় নেই তোদের। আয়, আমার সঙ্গে আয়। তবে অনেকটা পথ হাঁটতে হবে কিন্তু। পারবি তো?
ওরা দু'জনেই বলল, হ্যাঁ পারব।
যেতে যেতেই ওরা ওদের পরিচয় দিয়ে সব কথা খুলে বলল সাধুবাবাকে। আগাগোড়া সমস্ত কথা।
সাধুবাবা সব শুনে একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, এখানে যখন এসে পড়েছিস তখন আর ভয় নেই। কেউ তোদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। শান্তিতে থাক তোরা। তোদের বাড়িতে খবর পাঠানোর ব্যবস্থা আমিই করব। এমন সময় ওদেরই বয়সি একটি ছেলেকে সাইকেলে চেপে নির্জন পাহাড়িপথ ধরে আসতে দেখে চেঁচিয়ে ডাকলেন সাধুজি, বিরজু ! এ বিরজু ! জেরা ইধার তো আও।
স্বাস্থ্যবান সুন্দর একটি ছেলে সাইকেল নিয়ে ওদের কাছে এল।
সাধুজি বললেন, এই, তোদের ধর্মশালায় একটা ঘর পাওয়া যাবে রে? বিরজু ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যা পাওয়া যাবে। এখন তো যাত্রী একদম নেই। তা হলে এই ছেলেমেয়ে দুটোকে ঢুকিয়ে দে তো একটা ঘরে।
বিরজু ওদের দু'জনকে দেখে বলল, আমার মাতাজি রাজি হবেন না। কানুন নেহি।
কাহে কো?
না। এইরকম বয়সের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে গার্জেন না থাকলে ঘর দেওয়া যায় না।
তোমার মাজিকো আমার প্রণাম তো দেও। আমি গিয়ে দেখা করছি মাজির সঙ্গে। আর তোমার পিতাজির সঙ্গেও একটু বাতচিত আছে আমার।
বিরজু বলল, ঠিক আছে, তবে ওরা আসুক।
চাঁদু বলল, ধর্মশালা কেন। আপনার আশ্রমে আমাদের নিয়ে যাবেন না বাবাজি?
সাধুজি বললেন, তোদের যাতে কোনওরকম অসুবিধে না হয় আমি সেইজন্যেই এইরকম ব্যবস্থা করলাম রে বেটা। আমার আশ্রম এখান থেকে অনেক দূর। তা ছাড়া ওখানে সন্ধের পর বাঘ-ভালুকের উপদ্রব আছে। আর ওখানে থাকলে তোরা খাবার পাবি না। ঘুরে বেড়াতে পারবি না। এই যে ছেলেটি তোদের নিয়ে যাচ্ছে এ তো বড় সাংঘাতিক ছেলে। এই হবে তোদের বডিগার্ড। আমি ওকে সব বলে দেব। রামবাঈ ধর্মশালার কেয়ারটেকার ওরা। কাজেই কোনও অসুবিধে হবে না তোদের।
চাঁদু ও গোলাপ বাবাজিকে প্রণাম করে বিরজুর সঙ্গে চলল।
সাধুবাবা বললেন, আজকের দিনটা বিশ্রাম নে। কোথাও যাস নে যেন। কাল সকালে একবার দেখা করিস।
ওরা বিরজুর সঙ্গে রামবাঈ ধর্মশালায় এসে হাজির হল। খুব একটা উন্নতমানের ধর্মশালা নয়। তবে থাকা যায়। ধর্মশালাটি অমরকণ্টকের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে। এর আশেপাশে জমজমাট দোকান পসার হোটেল প্রভৃতি। একপাশে একটু উচ্চস্থানে টিলার ওপর সার্কিট হাউস।
ওরা যেতে ওদের বসিয়ে রেখে বিরজু একটা খাতা নিয়ে এসে ওদের নামধাম লিখে নিল। তারপর একটি ঘর খুলে দিয়ে বলল, সামকো বিস্তারা মিলেগা। আভি তুম সামান রাখো। এহি মে রহো।
বিরজুর মা এসে একবার দেখে গেলেন ওদের।
বিরজু বলল, চায় পিয়োগে? এক এক রুপাইয়া।
গোলাপ বলল, এখন আর চা খাব না। এবার স্নানটান করে ভাত খেয়ে নেব একেবারে।
চাঁদু বলল, খাই না এক কাপ। এমন সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ এখানকার। স্নান খাওয়া আরও একটু বেলা করেই করব।
চাঁদু বিরজুকে চা আনতে বলল।
কিছু সময়ের মধ্যেই দু’জনের জন্য দু’ কাপ চা নিয়ে চলে এল বিরজু। ওরা আয়েশ করে তৃপ্তির সঙ্গে চা খেতে লাগল ঘরের ভেতরে বসে।
যে ঘরটিতে ওরা জায়গা পেয়েছিল তার মাটির মেঝে। দেওয়ালও মাটির। মাথায় টিনের চাল। স্যাঁত স্যাঁত করছে চারদিক। ঘরের মেঝেয় একটা পুরু শতরঞ্চি পাতা আছে। সেটা এত বিশাল যে যাত্রার আসরে পাতার মতো। কিন্তু সেও এমন স্যাঁতসেতে যে তাতেও শোয়া যাবে না। অথচ শীত এখানে প্রচণ্ড।
এত বেশি শীত যে পৌষ মাসের কনকনে ঠান্ডাকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে। পেনড্রা থেকে দূরত্ব মাত্র তেতাল্লিশ কিমির। উচ্চতাও তিন হাজার চারশো তিরানব্বই ফুট। তবু কী প্রচণ্ড শীত।
গোলাপ বলল, এখানে সারা বছরই শীত। মধ্যপ্রদেশ সরকারের গ্রীষ্মাবাস হচ্ছে এ অমরকণ্টক। তুমি মেঘদূত পড়েছ চাঁদুদা? না।
আমি পড়েছি। যদি পড়তে তা হলে দেখতে এই অমরকণ্টক তোমার চোখে নতুন রূপে ধরা দিত। কালিদাসের বর্ণনার সেই আম্রকূটই আজকের অমরকণ্টক। মেকল পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়া। নর্মদার উৎপত্তি এইখানেই। আর্যাবর্ত ও দাক্ষিণাত্যের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে এই নদী। এর একদিকে বিন্ধ্য পর্বতমালা, অপরদিকে সাতপুরা। শাডোল, মান্ডালা, নরসিংপুর, হোসাঙ্গাবাদ, খান্ডোয়া ও খরগোন জেলার ওপর দিয়ে গুজরাটে সৌরাষ্ট্রের কাছে ব্রোচে সমুদ্রে মিলেছে নর্মদা।
নর্মদা সঙ্গম দেখেছ তুমি?
না যাইনি। তবে যাবার খুব ইচ্ছে আছে।
চা খাওয়া শেষ করে ওরা ঘরের দরজায় শিকল দিয়ে বাইরে এল। একটা তালা তো চাই। গোলাপ গিয়ে বিরজুর মাকে বলতেই উনি তালার ব্যবস্থা করে দিলেন।
অমৃতভূমি অমরকণ্টক গোলাপের একাধিকবারের পরিচিত স্থান। বছর বছর আসে ওরা। কখনও সার্কিট হাউসে, কখনও বরফানিবাবার আশ্রমে থাকে। তা ছাড়া একমাত্র শিবরাত্রির মেলার সময় ছাড়া এখানে থাকার তো কোনও অসুবিধে নেই। তাই ফাঁকায় ফাঁকায় ঘুরে বেড়ায় ওরা। এখন শীতের দাপট বেশি বলে যাত্রীর ভিড় একদমই নেই। আসলে এপ্রিল থেকে জুনই হচ্ছে এর উপযুক্ত সময়। তবুও এর মধ্যে হঠাৎ করে যদি কখনও বৃষ্টি হয় তা হলে বৈশাখেও মাঘের শীত।
গোলাপের সঙ্গে বিরহী যক্ষের বেদনাবিধুর এই মেকল পর্বতে পরিভ্রমণ করতে সত্যিই ভাল লাগল চাঁদুর। প্রকৃতি যে কত সুন্দর হতে পারে তা এখানে না এলে বুঝি অনুভব করা যায় না। যেতে যেতেই হঠাৎ একসময় বলল চাঁদু, এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি গোলাপ?
আপাতত নর্মদা মায়ের মন্দিরে। সেখানেই দেখতে পাবে এই পবিত্র নদীর উৎস।
এখন আমার কী মনে হচ্ছে জান?
কী মনে হচ্ছে?
মৃত্যুরূপী মহাকাল আমাদের তাড়া করতে করতে একেবারে স্বর্গের উদ্যানে নিয়ে এসে ফেলেছে। তোমাকে মনে হচ্ছে তুমি গোলাপও নও, সাধুবাবার গোলেবকায়লিও নও, তুমি এক গন্ধর্বকন্যা। আমার হাত ধরে আমাকে নিয়ে এসেছ এই স্বর্গলোকে। নিজেকেও আর অসহায় বলে মনে হচ্ছে না আমার। মনে হচ্ছে আমি নিজেও এক দেবদূত। এই অপূর্ব সুন্দর প্রকৃতির রাজ্যে আমিও এক দিগ্বিজয়ী বীরের মতো রাজত্ব স্থাপন করতে পারি। এই অরণ্য-পর্বতে আমার প্রাসাদ গড়ে উঠবে। আমি পৌরাণিক রাজাদের মতো ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধ করতে যাব। মৃগয়া করব। তুমি...।
সর্বনাশ! তোমার বাবা-মা কাঁদবে না? জুলির কী হবে? বাড়ি ফিরতে হবে না?
চাঁদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সত্যিই আর ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করছে না। খাঁচার পাখি একবার ছাড়া পেলে আর কী সে খাঁচার ভেতর ফিরতে চায়? আমারও তাই একবারও মনে হচ্ছে-না ঘরে ফিরি। মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল ধরে এখানে থেকে যাই।
মনে হচ্ছে। মনে হওয়া ভাল। তেমন সুযোগ যদি পাও সত্যিই কি তুমি পারবে এখানে থাকতে?
পারব। অবশ্য তুমিও যদি আমার সঙ্গে থাকো।
গোলাপ বলল, ওই দেখো মায়ের মন্দির।
চাঁদু দেখল এই তীর্থভূমিতে শ্বেতশুভ্র একটি মন্দির সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। মন্দিরের চূড়ায় ধ্বজা উড়ছে পতপত করে। মন্দিরের সামনেই একটু কুণ্ড। কত লোক স্নান করছে সেখানে।
গোলাপ বলল, এই হল নর্মদাকুণ্ড।
চাঁদু বলল, এইখানে স্নান করেই মানুষের মোক্ষ লাভ হয়?
হ্যাঁ। আর ওই যে দেখছ ক্ষীণ জলধারা, ওই হচ্ছে নর্মদার উৎস। চাঁদু লক্ষ করল একটা পাথরের গোমুখে নর্মদার জল গড়িয়ে এসে কুণ্ডে পড়ছে। তারপর সেইখান থেকেই ক্ষীণ স্রোতে বয়ে চলেছে সুদূর সুরাতে সাগরসঙ্গমের দিকে।
স্নানের সরঞ্জাম সঙ্গে আনেনি ওরা। তাই স্নান হল না। নর্মদার জল স্পর্শ করে মাথায় ছিটাল। এরপর পিছনদিকের নির্জন পাহাড়িপথ ধরে খানিক এগোতেই দেখতে পেল বহু পুরাতন কালের একটি সুদৃশ্য ভগ্ন মন্দির।
এ মন্দিরটা কীসের?
স্থানীয় একজন বলল, করণ মন্দির।
কর্ণ মন্দির?
মহাভারতীয় করণ ইয়ে শিবজি কা আদি মন্দির বনায়া।
ওরা যখন অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে মন্দিরের কারুকার্যগুলি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তখন সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কিছু লোক সেখানে কী সব যেন মাপজোক করতে এল। তাঁদেরই মধ্যে একজন প্রবীণ শিক্ষাবিদ ছিলেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ এটা মহাভারতের কর্ণ মন্দিরের নামে খ্যাত হলেও এর নির্মাতা কিন্তু কর্ণ নন। যদিও লোকের ধারণা এটা কর্ণেরই মন্দির। এবং যেহেতু কৌরব কর্তৃক দ্রৌপদীর লাঞ্ছনার ব্যাপারে কর্ণের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল, সেই পাপে এখানে তাঁর মন্দির বিশেষ মর্যাদা পায়নি। কেন না নর্মদা চিরপবিত্রা। তাই নর্মদা শংকর কর্ণের ওই পূজা গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে কর্ণের মন্দির আজও অবহেলিতই রয়ে গেছে। তবুও এই কর্ণমন্দির কিন্তু অমরকণ্টকের প্রাচীনতম মন্দির। তবে ইতিহাস বলে এই মন্দিরের আসল প্রতিষ্ঠাতা হলেন কলচুরি বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কর্ণদেব। তিনি চেদীরাজ মহাচন্দ্র নামে খ্যাত ছিলেন। এই মন্দিরের নির্মাণকাল দশম বা একাদশ শতাব্দী।
কর্ণমন্দির দেখে ওরা পায়ে পায়ে বাজারের কাছে এল। ফুলের মতো ফুটফুটে গোলাপকে দেখে কয়েকটি বখাটে ছেলে খারাপ মন্তব্য করল। ওরা ওসব গায়েও মাখল না। প্রচণ্ড খিদে নিয়ে একটা হোটেলে খেতে বসল ওরা।
কী সুন্দর বাসমতী চালের ভাত এখানকার। তার সঙ্গে ঘন ডাল ও সুস্বাদু তরকারি। পেট ভরে তৃপ্তি করে খেল ওরা। তারপর আবার ফিরে এল ধর্মশালায়। এখন একটু বিশ্রাম নিতে হবে। কিন্তু বিশ্রাম তো নেবে। শোবে কোথায়? এর থেকে বরফানিবাবার আশ্রমটা ভাল ছিল। সবকিছুই মিলত সেখানে। অথচ সাধুবাবা নিজে আগ্রহ করে যখন বিরজুকে ডেকে ব্যবস্থা একটা করে দিলেন তখন হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা উচিত না। তা ছাড়া এটা তো ঠিক, সমবয়সি একটি ছেলেমেয়ের মধ্যে যতই বন্ধুত্ব থাক, তাদের একসঙ্গে এক ঘরে থাকাটা খুবই সন্দেহের। সেই সন্দেহের বশে ওখানেও যদি আশ্রয় না মিলত?
বিরজুর মাতাজিকে জানাতেই ওদের বিছানার ব্যবস্থা হয়ে গেল। নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ছারপোকায় ভরা শোবার অযোগ্য বিছানা। দেখেই তো গা ঘুলিয়ে উঠল ওদের।
গোলাপ বলল, এইভাবে একটা মুহূর্তও এখানে থাকা সম্ভব নয়।
চাঁদু বলল, আমি জানি তোমার খুব কষ্ট হবে। তাই বলছিলাম তুমি বাড়ি ফিরে গেলেই পারতে। কেন আমার সঙ্গে এত কষ্ট করছ?
আমি বাড়ি চলে গেলে তোমার বরাতে এটুকু আশ্রয়ও জুটত না। তুমি কত কষ্ট পেতে বলো তো? তুমি কি পারতে এত সহজে এইভাবে এখানে বা অন্য কোথাও থাকতে? ভয় করত তোমার। কখনও তো ঘর থেকে বেরোওনি।
যাক, একটু তুমি বসো, আমি এখুনি আসছি।
কোথায় যাবে তুমি?
আসছি। যাব কি আসব।
আমার খুব ভয় করবে কিন্তু। যদি কেউ কিছু করে তোমার? গোলাপ বলল, এত সস্তা নয়। গোলাপে কাঁটা আছে জানো তো? বলেই গোলাপ চলে গেল।
আধঘণ্টার মধ্যেই হাসি মুখে ফিরে এল সে। বলল, আর কষ্ট ভোগ করতে হবে না। সার্কিট হাউসে একটা ঘর পেয়ে গেছি। চমৎকার ঘর, অ্যাটাচড় বাথ। গদি, বিছানা, মশারি সবকিছু আছে। ওখানে গিয়ে আর এমনভাবে হি হি করে কাঁপতে হবে না শীতে।
আনন্দে লাফিয়ে উঠল চাঁদু
মাতাজির হাতে দশটা টাকা দিয়ে ঘর খালি করে চলে এল ওরা। মাথাগোঁজার জায়গাটা একটু ভদ্রস্থ না হলে চলে?
কথায় বলে সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। গোলাপ নিজেও বুঝি সেটা জানে। তা ছাড়া চাঁদুও তো কম সুন্দর নয়। টকটকে ফর্সা গায়ের রং। সুঠাম দেহ নধরকান্তি। তাই তো আদর করে ওর চাঁদ মুখ দেখে ঠাকুরমা ওর নাম রেখেছিলেন চন্দ্ৰকান্ত। তা এই মুখ দেখিয়ে বা রূপ দেখিয়েই বুঝি বাজিমাত করল গোলাপ। সার্কিট হাউসে গিয়ে একটু ইনিয়ে বিনিয়ে বলতেই ঘর একটা পেয়ে গেল। এবং ঘর পাবার সঙ্গে সঙ্গেই দশটি টাকা কেয়ারটেকারকে দিতে খুব খুশি সে।
ওর সঙ্গে চাঁদুর চেহারার এমন এক আভিজাত্যের মিল আছে যে, ওদের দু’জনকে কোলেপিঠের ভাইবোনের অতিরিক্ত কিছু বলে মনেও হল না কারও। ওরা যখন সার্কিট হাউসে এল তখন সন্ধ্যা সমাগত। এখানে তালাচাবির ব্যবস্থা আছে। অবশ্য না থাকলেও ক্ষতি কিছু নেই। কীই বা আছে ওদের, যে চোরে নেবে? টাকা-পয়সা যা কিছু তা তো সঙ্গেই আছে।
মন্দিরে মন্দিরে তখন স্তোত্রপাঠ ও ঘণ্টা ধ্বনি হচ্ছে।
ওরা পায়ে পায়ে বাসস্ট্যান্ড যেদিকে সেইদিকে গেল। এদিকে একপাশে ঘন অরণ্যের হাতছানি। একপাশে মঠ ও মন্দিরের সমারোহ। তারই মাঝখানে চওড়া পিচ ঢালা রাস্তা। যতক্ষণ না অন্ধকার হয়, ততক্ষণ ঘুরে বেড়াল ওরা। তারপর রাতের খাবারের জন্য একটা দোকান থেকে হাতে গড়া গরম রুটি, তরকারি আর প্যাড়া নিয়ে ফিরে এল। সঙ্গে উপযুক্ত শীতবস্ত্র নেই। অতএব এইভাবে ঠান্ডায় ঘোরাটা ঠিক নয়।
কেয়ারটেকার ওদের কাছ থেকে একরাতের জন্য পঁচাত্তর টাকা ভাড়া নিল। তা নিক। আপাতত দু'-চারটে দিন তো আরামে থাকা যাবে ওখানে। তারপর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে যা হয় করা যাবে। ওরা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে এসে মুখহাত ধুয়ে বিছানায় দেহ এলিয়ে দিল। এখন সবে সন্ধে সাতটা। এখনই দু’চোখ জুড়ে ঘুম আসছে। তবে এখনই ওরা ঘুমোবে না। অন্তত রাত্রি ন'টা না হলে শয্যা গ্রহণ করা উচিত নয়।
গোলাপ বলল, আজ আর শরীর বইছে না। ভাবছি কাল সকালেই বাড়িতে যোগাযোগ করব। এদের ফোন আছে। কাজেই যোগাযোগের অসুবিধে হবে না। কিন্তু সাধুবাবা যে বললেন, উনিই বাড়িতে খবর পাঠাবার ব্যবস্থা করবেন? উনি একটা কথার কথা বলেছেন।
তবু আমার মনে হয় কাল সকালেই একবার ওনার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ করা উচিত।
সে তো করবই। বিরজুই আমাদের নিয়ে যাবে সাধুবাবার কাছে। সাধুবাবা যে তখন বললেন বিরজুই আমাদের বডিগার্ড, তা বিরজুইর তো পাত্তা নেই।
হয়তো গেছে কোথাও।
এমন সময় দরজায় টকটক শব্দ।
গোলাপ উঠে গিয়ে দরজাটা খুলেই দেখল একজন জাঁদরেল চেহারার কনস্টেবল এবং তাঁর পাশে পুলিশের একজন ইনস্পেক্টর দাঁড়িয়ে আছেন। ভয়ে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল ওদের।
কনস্টেবল বলল, ঘবড়াও মাত। আমি বিরজুর বাবা আছি। সকালে যে সাধুজির সঙ্গে তোমাদের মুলাকাত হয়েছিল ওই সিদ্ধিবাবা আমাকে সব কুছু বলেছেন। আমি ওই রামবাঈ ধরমশালার কেয়ারটেকার। কখন কোন ফাঁকে তোমরা চলে এলে আমি জানি না।
চাঁদু বলল, আমরা তো মাতাজির সঙ্গে দেখা করে ভাড়া মিটিয়ে এসেছি।
আরে জয়রামজি কী। ও বাত নেহি। তোমরা ভাল ঘরের ছেলেমেয়ে। ওই জায়গায় তোমরা কখনও থাকতে পার? কোনও তখলিফ হলে আমিই তোমাদের ভেজিয়ে দিতাম এইখানে। আমার লেড়কা বিরজু আজ হঠাৎ একটা কাজে শাডোল চলে গেছে। ও তোমাদের এখানকার সবকিছু ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে। কাল দশ বাজে বিরজু মিলে গা তুমকো।
গোলাপ বলল, আমি এখানকার সবকিছুই জানি সেপাইজি। বছরে একবার আমি এখানে আসি আমার বাবা-মা'র সঙ্গে।
তব তো কোঈ বাত নেহি। লেকিন আভি তুমহারা জিন্দেগি খতরেমে হো। ইসি লিয়ে বিরজুকো সাথ রাখনা তুমহারে লিয়ে সেফটি হোগা। বেশ তো, বিরজু থাকবে আমাদের সঙ্গে।
আভি তুমহারা প্রবলেম সাবকো বতাও।
ইনস্পেক্টর ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসলেন। তারপর মন দিয়ে সব কথা শুনে বললেন, ঠিক আছে। দু'-একটা দিন তোমরা একটু সাবধানে থাক। বিলাসপুরিয়া পার্টি যখন, এখানে আসতে ওদের খুব একটা দেরি হবে না। চাঁদু বলল, আমরা এখানে আছি ওরা জানবে কী করে?
তোমরা বিলাসপুরে আছ ওরা খবর পেল কী করে? কিন্তু ওরা তো আমার কোনও ক্ষতি করতে চায় না।
তোমার গতিবিধির ওপর নজর তো রাখে। তোমরা যখন কাউন্টারে টিকিট কেটেছ তখনই ওরা জেনে গেছে তোমরা কোথায় যাচ্ছ। চাঁদু ও গোলাপ যুক্তি খুঁজে পেল ইনস্পেক্টরের কথায়।
ইনস্পেক্টর বললেন, তবে ওদের কথা যদি ঠিক হয় আর লোকগুলো যদি গীতাঞ্জলিতে আসে, তা হলে ট্রেন থেকে নামলেই অ্যারেস্ট হয়ে যাবে ওরা। আমি এখুনি বিলাসপুরের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।
গোলাপ এবার ইনস্পেক্টরের হাতদুটি ধরে করুণভাবে বলল, আমাদের দু'জনের বাড়িতে খবর দেবার কী হবে? আপনি কি অনুগ্রহ করে একটু সেই ব্যবস্থা করে দিতে পারেন?
অবকোর্স। নিশ্চয়ই পারি। ফোন নাম্বার আছে কিছু?
গোলাপ ও চাঁদু দু'জনেই ওদের নাম, বাবার নাম সহ ফোন নম্বরটা ইনস্পেক্টরকে দিয়ে দিল।
উনি যাবার সময় বলে গেলেন কাল সকালের দিকে ওদের দু'জনকে অবশ্যই একবার থানায় যোগাযোগ করতে।
ওরাও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
এরপর আর কি দেরি করা উচিত? তাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে রাতের খাওয়া খেয়ে আলো জ্বেলেই শুয়ে পড়ল দু'জনে। আলোটা জ্বললে ঘরটা একটু গরম থাকবে হয়তো।
সকাল সকাল শোয়ার জন্য খুব ভোরেই ঘুম ভাঙল ওদের। কিন্তু এত ভোরে কে আর ওঠে, একমাত্র পাখিরা ছাড়া? চারদিকে যেমনই সবুজ বনানী, তেমনি পাখিদের কিচির মিচির। ওরা লেপমুড়ি দিয়ে চুপচাপ পড়ে রইল। ডবল বেডেড রুম। কিন্তু বিছানা সেপারেট। খুব ভাল ব্যবস্থা। মশা নেই। ছারপোকাও নেই।
গোলাপ বলল, এই সময় একটু চা পেলে বেশ হত।
চাঁদু বলল, যা বলেছ। একবার একটু রোদ উঠুক। তবেই ঘর থেকে বেরোব। এখন তো চোখেমুখে জল দিতেও ভয় লাগছে।
গোলাপ বলল, কাল রাত্তিরে পুলিশ দেখে আমি কিন্তু খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
আমিও।
এমন সময় দরজায় টক টক শব্দ।
চাঁদু উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল একটি আট-দশ বছরের ছেলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
ছেলেটি বলল, চায় কফি কুছ পিয়োগে?
গোলাপ বলল, হ্যাঁ জরুর। তবে গরম থাকে যেন।
ছেলেটি চলে যাচ্ছিল। গোলাপ বলল, এই শোনো, একটু গরম পানির ব্যবস্থা করে দিতে পার? মুখ ধোব।
ছেলেটি আমতা আমতা করতে লাগল।
রুপিয়া মিলেগা। এক রুপিয়া দেগা তুমকো।
রুপিয়ার নাম শুনেই লাফিয়ে উঠল ছেলেটি। কোনওদিকে না তাকিয়ে ছুটে চলে গেল দোকানের দিকে। পরক্ষণেই এক মগ ফুটন্ত জল এনে বলল, লিজিয়ে।
বাথরুমে কলের জল তখন বরফের মতো ঠান্ডা। সেই জলের সঙ্গে গরম জল মিশিয়ে চোখমুখ ধুয়ে পরিষ্কার করল। তারপর ছেলেটি চা নিয়ে এলে চা খেল। চায়ের দাম জলের দাম নিয়ে ছেলেটি চলে যেতেই, ওরা নিজেদের একটু চাঙ্গা মনে করল এবার। অল্প অল্প রোদের আভাও তখন ফুটে বেরোচ্ছে পূবের আকাশ থেকে। তাই আর ঘরে থাকতে ভাল লাগল না কারও। দু'জনেই হি হি করতে করতে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তারপর ঢাল বেয়ে একটু নামতেই দেখতে পেল বিরজুকে।
বিরজু ওদের দেখেই ছুটে এল। বলল, এই আমি ভাবছিলাম তোমাদের ওখানে যাব। মন্দির দর্শন করিয়ে আনব।
গোলাপ বলল, মন্দির দর্শন কাল আমরা নিজেরাই করে নিয়েছি। আসলে এটা তো আমার চেনা জায়গা।
তা হলে শোনমুড়া চলো।
শোনমুড়া হচ্ছে শোন নদের উৎস।
গোলাপ বলল, শোনো বিরজু, তোমাকে শোনমুড়া, কপিলধারা, দুধধারা কোথাও নিয়ে যেতে হবে না। তুমি যদি পার তো, আমাদের দু'জনকে একবার ভৃগুকমণ্ডল নিয়ে চলো। ওই একটা জায়গাই আমরা সাহস করে যেতে পারব না। ভৃগুকমণ্ডলের নাম শুনে বিরজু কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ও হাম নেহি যা সকতা। কাহে?
ও রাস্তা মুঝে মালুম নেহি। তা ছাড়া আমার মাজি হামকো উধার নেহি জানে দেঙ্গে।
ওদের কথা শুনে একজন দোকানদার বলল, ও জায়গায় দল বেঁধে না-গেলে যাওয়া যায় না। গভীর বনের ভেতর দিয়ে পথ। বাঘ-ভালুক সবকিছুই মিলতে পারে ও পথে।
চাঁদু উৎসাহিত হয়ে বলল, তাই নাকি?
গোলাপ বলল, আমি একবারই গিয়েছিলাম বাবার সঙ্গে। আমাদের দলে অন্তত পঞ্চাশজন যাত্রী ছিল।
দোকানদার বলল, কী হবে ওখানে গিয়ে? অনেকেই যায় না। এখানেই যা আছে দেখলে মন ভরে যাবে। যাও না, কপিলধারায় গিয়ে বসে থাকো। গোলাপ বলল, কপিলধারায় তো যাবই। ওই তো এখানকার স্বর্গ।
বিরজু বলল, তোমরা এক কাজ করো, কপিলধারা অনেক দূর। হেঁটে তো যেতে পারবে না। তাই তোমাদের টাঙ্গা একটা করতেই হবে। তাতে হবে কী টাকা লেগে যাবে অনেক। এখন আমার কথা যদি শোনো তা হলে এক কাজ করো, এইখানে ঘণ্টা হিসেবে সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। তোমরা সাইকেল চাপতে জান?
চাঁদু বলল, জানি।
গোলাপ বলল, আমিও জানি।
তোমরা তা হলে দু’জনে দুটো সাইকেল নিয়ে নাও। আট আনা করে ঘণ্টা। দু'জনে এক টাকায় হয়ে যাবে। এখন ওই সাইকেলে চেপে তোমরা কপিলধারা শোনমুড়া যেখানে যাবে চলে যাও। কাজ মিটে গেলে সাইকেল জমা দাও। পরে আবার ভাড়া নাও।
চাঁদু বলল, দি আইডিয়া।
গোলাপ বলল, তুমি বেশ ভাল যুক্তি দিয়েছ তো। এখন চলো সাইকেলের দোকানটা একবার আমাদের দেখিয়ে দাও।
বিরজু ওদের সাইকেলের দোকান দেখিয়ে দিল।
ওরা বিরজুর সঙ্গে আলাপ করতে করতে একটা চায়ের দোকানে ঢুকল। ঘন দুধ দিয়ে কী সুন্দর চা তৈরি করেছে ওরা। শুধু তাই নয় এত বড় বড় শিঙাড়া আর অমৃতি তৈরি করেছে যে দেখেই লোভ হল ওদের।
ওরা প্রত্যেকে দুটো করে শিঙাড়া-অমৃতি খেয়ে চা খেল এক কাপ করে। তারপর দু'জনে দুটো সাইকেল নিয়ে হাওয়ায় উড়ে চলল শোনমুড়ার দিকে। সাতপুরা আর বিন্ধ পর্বতের মিলনস্থল হচ্ছে মেকল। অর্থাৎ এই অমরকণ্টক। এরই একান্তে অতি নির্জনে শোন নদের উৎস। উৎসের কাছ থেকে এই নদ ঝরনার রূপ ধরে ঝরে পড়ছে অনেক নীচে। তারপর যে কী হচ্ছে তা দেখা যায় না।
ওরা সাইকেল রেখে উঁকিঝুঁকি মেরে নীচে তাকিয়ে দেখল, কিছু দেখা যায় কি না। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। এরপরে চলে গেল নর্মদা মায়ের বাগিচা বা উদ্যানে। ঘন বনের মধ্যস্থলে উঁচুনিচু পাহাড়ের পটভূমিতে এ এক মনোরম উদ্যান। নাম মাঈ কি বাগিয়া। এইখানেই ওদের চোখে পড়ল সেই বিখ্যাত গোলেবকায়লি ফুল। যার কথা বাসে আসা সেই সিদ্ধিবাবা বলেছিলেন। যে ফুলের সঙ্গে গোলাপের তুলনা করেছিলেন। যে ফুলের প্রশংসায় উর্দু কবিরা পঞ্চমুখ। একমাত্র এইখানকার মাটিতে ছাড়া যে ফুল কোথাও গজায় না। এই ফুল চোখের পক্ষেও খুব উপকারী। এই ফুলের সুরমাও তাই বিক্রি হচ্ছে এখানে। অনেকের দেখাদেখি গোলাপও ওর চোখের কোলে সুরমার রেখা আঁকল।
মাঈ কি বাগিয়া থেকে ওরা আবার এল নর্মদা মন্দিরের কাছে। সেখানে তখন অগণিত তীর্থযাত্রীর ভিড়। ওরা এবার অন্য কোথাও না গিয়ে অমরেশ্বর শিবের মন্দিরে একটা প্রণাম করে চলল কপিলধারায়। এই অঞ্চলের প্রধান দর্শনীয় স্থানে।
কপিলধারার পথ দুর্গম নয়। তবে অতুলনীয় প্রকৃতির শোভা সৌন্দর্যমণ্ডিত। অমরকণ্টক থেকে প্রায় দশ কিলোমিটারের পথ। কিন্তু প্রকৃতি যেখানে অনবদ্য সেখানে এই পথ এমন আর কী? পথ কখনও উঁচুনিচু, কখনও এবড়ো খেবড়ো। উৎস থেকে নির্গত হয়ে নর্মদা গায়ত্রী সাবিত্রী সঙ্গমের পর গভীর অরণ্যের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে কপিলধারায় পুনরাবির্ভূতা। এইখানে আরও দুটি ছোট পাহাড়িয়া নদী এসে মিশেছে নর্মদার সঙ্গে। তার একটির নাম এরশ্তী, অপরটির নাম কপিলা। এরণ্ড ও কপিল এই দুই মহামুনির নামেই নদী দুটির নাম। এবং এইখানেই প্রায় সত্তর ফুট নীচে নর্মদার প্রথম প্রপাত।
ওরা ক্লান্ত অবসন্ন দেহে একপাশে সাইকেল দুটিকে শুইয়ে রেখে পিচ্ছিল পথে সেই ধারার কাছে এসে প্রপাত দেখতে লাগল। একটি দশ বারো বছরের ছেলে বসেছিল সেখানে। চাঁদু তাকে জিজ্ঞেস করল, সিদ্ধিবাবাকা আশ্রম কিধার? ছেলেটি বলল, আউর নীচে উতারো। দুধধারা কি পাস।
চাঁদু গোলাপের মুখের দিকে তাকাল।
গোলাপ বলল, আমি দুধধারায় গেছি এর আগে অনেকবার। কিন্তু ওই সাধুকে কখনও দেখিনি।
রাস্তা চেনো তুমি?
চেনাচিনির কিছু নেই। একটাই রাস্তা এর।
ওরা সেই নির্জনে বৃক্ষছায়ায় অন্ধকারে কপিলধারার গতিপথ ধরে আরও নীচে নামতে লাগল। অনেকটা নামার পর এক জায়গায় একটু উচ্চস্থানে সত্যি সত্যিই একটা আশ্রম দেখতে পেল ওরা।
সিদ্ধিবাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন আশ্রমের সামনেই। ওদের দেখে বললেন, এত দেরি হল যে?
আমরা মাঈ কি বাগিয়া দেখতে গিয়েছিলাম বাবা।
তা হলে নিশ্চয়ই তোমরা গুলেবকায়লি ফুল দেখেছ? একটা দুটো।
সিদ্ধিবাবা ওদের আশ্রমের দাওয়ায় বসিয়ে বললেন, দেখেছ তো কীরকম জায়গায় আমি থাকি? তোমরা এখানে এক দণ্ডও থাকতে পারতে না। তা ওদিককার খবর কী? বিরজু এল না কেন? ওর তো আসার কথা ছিল তোমাদের সঙ্গে।
গোলাপ বলল, এ পর্যন্ত রাস্তা আমার চেনা। তাই ওকে সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। আর ওদিককার খবর বলতে আমরা সার্কিট হাউসে জায়গা পেয়ে গেছি। তাই রামবাঈ ধর্মশালায় থাকিনি। কাল রাতে বিরজুর বাবার সঙ্গে একজন ইনস্পেক্টর এসেছিলেন। আমরা তাঁকে সব বলেছি। উনি হয়তো টেলিফোনে আমাদের বাড়িতেও খবর পাঠিয়েছেন।
তা হলে তো সমস্ত প্রবলেমই সলভড্ হয়ে গেছে। তবু তোমরা দু’-একটা দিন সাবধানে থেকো। কেমন? বিপদ একটা ঘটে যেতে বেশিক্ষণ নয়। অবশ্য অমরকণ্টক খুব ছোট্ট জায়গা। এখানে বদমায়েশি করে কেউ পার পাবে না। তোমরা বিকেলে মন্দির এলাকায় থেকো। আমি গিয়ে ধরে নেব তোমাদের। সকলকে একটু বলেকয়েও দেব, যাতে কোথাও কোনও অসুবিধে না হয়।
ওরা সিদ্ধিবাবাকে প্রণাম করে ফিরে এল।
ওপরে উঠতেই বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল ওদের। সর্বনাশ, সাইকেলদুটো তো এখানেই ছিল। গেল কোথায়? ভাড়া করা পরের সাইকেল। কে নিল? দু’-দুটো সাইকেলের দাম নেহাত কম নয়। এখন গুণাগার দিতে হলেই তো ফর্সা। তা হলে?
ওরা সাইকেলের দাগ ধরে এদিক সেদিক লক্ষ করতে করতে হঠাৎ এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল। চোখের সামনে ওটা কী ও? দেখেই ভয়ে চিৎকার করে দু'জন দু'জনকে জড়িয়ে ধরল প্রাণপণে। আর থর থর করে কাঁপতে লাগল। দু'জনেরই শিরদাঁড়া বেয়ে কনকনে একটা হিমস্রোত।
একটা চিতাবাঘ কপিলধারার কাছে উঁচু একটা পাথরের ওপর দিব্যি আয়েশ করে শুয়ে আছে, আর ওদের দিকে তাকিয়ে চোখ পিট পিটিয়ে দেখছে। এই দৃশ্য দেখলে কার না হাত-পা ঠান্ডা হয়? যদিও বাঘটা খুব একটা বড়সড় নয়। অ্যালসেশিয়ান কুকুরের সাইজ। তবু বাঘ তো?
কথায় বলে সাপের লেখা বাঘের দেখা। কিন্তু বরাত ভাল হলে যমেও পরে আসব বলে কেটে পড়ে। তা কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র। বাঘটা হঠাৎ একটা লাফ মেরে জঙ্গলের গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ওরা তখনও স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে আছে।
খানিক বাদে দু’জনে একটু প্রকৃতিস্থ হবার চেষ্টা
করল।
চাঁদু বলল, যেন পুনর্জন্ম হল। বাঘের মুখ থেকে বাঁচা এ কখনও সম্ভব! কাউকে বললেও বিশ্বাস করবে না।
গোলাপ বলল, না করুক। কিছু যায় আসে না তাতে। এখন আর এখানে থাকা নয়। এমনও তো হতে পারে বাঘটা এখান থেকে সরে গিয়ে অন্য কোনও জায়গায় ঘাপটি মেরে আছে?
কিন্তু সাইকেল? সাইকেলদুটো কোথায় গেল?
গোল্লায় যাক। দু'-দু'জন মানুষের জীবনের চেয়ে সাইকেলদুটোর দাম নিশ্চয়ই খুব একটা বেশি নয়। হেঁটেই যাব আমরা।
অগত্যা ওরা বাধ্য হয়েই হাঁটা পথ ধরল। এছাড়া উপায়ই বা কী? ফিরে তো আসতে হবে। গভীর ঘন বনানীর মাঝখান দিয়ে সাপের পিঠের মতো অমরকণ্টকের পথ। পিচ ঢালা পরিষ্কার। নেহাত এ সময় ট্যুরিস্ট নেই তাই, না হলে টাঙ্গা আর অটোতে জমজম করত চারদিক। মোটরের মিছিল এসে যেত।
ওরা সবে কয়েক পা এগিয়েছে এমন সময় জঙ্গলের ভেতর থেকে তিনজন যুবক এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। তিনজনেই অপ্রকৃতিস্থ। আর কী ভয়ংকর চোখের চাউনি তাদের। দেখেই বুক শুকিয়ে গেল। ওরা তিনজনে এমনভাবে ওদের পথ রোধ করে দাঁড়াল যে আর এক পা-ও এগোতে পারল না ওরা।
গোলাপের মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেছে তখন।
চাঁদু ভয় পেয়েও বীরত্ব দেখাতে ছাড়ল না। বলল, রাস্তা ছোড়ো।
নেহি ছোডুঙ্গা তো?
চাঁদু বলল, তো তুমহারা হাল হাম বেহাল কর দেগা। বলেই আচমকা একজনের একটা হাত ধরে এমন একটা হেঁচকা টান দিল যে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সে।
কিন্তু বাকি দু’জন ভয়ংকর ক্রোধে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। তারপর একজন করল কী গোলাপকে তুলে নিয়েই ছুটে চলল বনের দিকে।
গোলাপ চিৎকার করে উঠল। ওর কণ্ঠস্বর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগল চারদিকে। পাহাড় ও বনভূমি মুখর হয়ে উঠল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অঘটন। প্রথমে একটা পাথর গড়িয়ে পড়ল ওপর থেকে। পরক্ষণেই সেই বাঘটা ঝাঁপিয়ে পড়ল আর একজনের ওপর। তারপর আলুভাতের মতো লোকটাকে মুখে নিয়ে পাথরের খাঁজে খাঁজে লাফিয়ে হারিয়ে গেল কোথায় যেন। যে লোকটা চাঁদুর হাতে ঝাড় খেয়ে পড়ে গিয়েছিল সে তখন কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়েই প্রাণপণে ছোটা শুরু করেছে।
গোলাপের চিৎকার তখনও দূর থেকে শোনা যাচ্ছে, ছাড়। ছাড় বলছি। ছেড়ে দে আমাকে। আর মাঝে মধ্যে, বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও।
চাঁদু তখন পলায়মান লোকটাকে ধাওয়া করছে। হঠাৎ হাতের কাছে একটা ভারী পাথর পেয়েই ছুড়ে মারল লোকটাকে। পাথরটা গিয়ে লোকটার মাথায় লাগল। এক ঘা-ই যথেষ্ট। ‘মর গয়ি’ বলে বসে পড়ল লোকটি। তারপর শুধুই চিৎকার।
ততক্ষণে গোলাপও ছুটে এসেছে ওর দিকে। সে তখন থরথর করে কাঁপছে।
চাঁদু বলল, তুমি ফিরে এসেছ গোলাপ? কীভাবে রক্ষা পেলে ওর কবল থেকে?
কাঁপা কাঁপা গলায় গোলাপ বলল, ওই পাজির চোখদুটোকে আমি উবড়ে নিয়েছি এই নখ দিয়ে, দেখো।
চাঁদু দেখল গোলাপের হাতের আঙুলগুলো রক্তে মাখামাখি। ওর পোশাকআশাক কাঁটায় বা শুকনো ডালপালার খোঁচায় ছিন্নভিন্ন। ভয়ংকর একটা বিপদের হাত থেকে বেঁচে ফিরে ও যেন কেমন হয়ে গেছে।
চাঁদু বলল, ভগবান আমাদের দু'-দু'বার বাঁচালেন।
গোলাপ বলল, বাঘ মানুষের শত্রু হয় আবার বন্ধুও। ওই লোকটাকে বাঘে না ধরলে তুমি কিছুতেই রক্ষা পেতে না।
চাঁদু তোমার তুলনা নেই। তাই বলি আর কারও ভয়ে পালিয়ে না গিয়ে চলো এবার যে যার বাড়ির দিকে ফিরে যাই। বাঘ যেখানে বশ মানল আর নিয়তি যেখানে উদার সেখানে কার সাধ্য কেউ আমাদের কিছু করে?
বলল, সে যা হত তা হত। আক্রমণটা তো প্রথমে আমিই করেছি।
চাঁদু বলল, ঠিক বলেছ তুমি। বরং এখন থেকে আমরা সবসময় তৈরি থাকব আর প্রতিটি আক্রমণের মোকাবিলা করব।
ওরা আবার পথ চলা শুরু করল।
খানিক এসেই গোলাপের কী মনে হতে থমকে দাঁড়াল সে। বলল, আমরা এভাবে হেঁটে যাচ্ছি কেন?
তবে কীভাবে যাব? বাঘের পিঠে চেপে?
তা কেন? আমাদের সাইকেলে।
সাইকেল! সাইকেল কোথায়?
ওই লোকগুলোর কাছে। ওরাই চুরি করেছে আমাদের সাইকেল! ওদের মোচড় দিলেই সব বেরোবে।
ঠিক বলেছ তুমি। এই কথাটা তো একবারও মনে হয়নি আমার। সাইকেল চুরি ওরা ছাড়া আর কেউ করতেই পারে না।
অতএব আবার পিছু হটতে হল ওদের।
যে লোকটার মাথায় পাথর ছুড়ে মেরেছিল সে তখনও মাথা ধরে পথের ওপর বসে আছে।
চাঁদু ও গোলাপকে দেখেই গাঁক করে উঠল সে।
গোলাপ বলল, এই তোমরা আমাদের সাইকেল কোথায় রেখেছ?
লোকটি অতি কষ্টে বলল, হম নেহি জানতা।
চাঁদু বলল, শোনো, তোমাদের এক বন্ধু বাঘের পেটে গেছে। এই মেয়েটি একজনের চোখ উবড়ে দিয়েছে। বাকি আছ তুমি। তোমার অবস্থাও খুব একটা ভাল নয়। তা এবার বলবে কি সাইকেলদুটো কোথায়? না বললে কিন্তু অবস্থা আরও খারাপ করে দেব।
ম্যায় কুছ ভি নেহি জানতা। তুমহারা সাইকিল হমলোক নেহি চুরায়া।
তা হলে কি বলতে চাও যে সাইকেলদুটোকে ভূতে পেল আর ওরা অমনি গড়াতে গড়াতে চলে গেল?
লোকটি চুপ করে রইল।
আর চাঁদু করল কী, বড় সড় একটা পাথর এনে বলল, দেব এটা দিয়ে মাথার ওপর এক ঘা?
লোকটি তখন বলল, নেহি। মাত মারো মুঝে
তা হলে বলো আমাদের সাইকেল কোথায়?
লোকটি কাঁপা কাঁপা হাতে দূরের দিকে দেখিয়ে বলল, উধার যাও। রামুকো পুছো।
রামু! কে রামু?
উ দেখো।
ওরা তাকিয়ে দেখল কপিলধারার কাছে যে নিরীহ ছেলেটি বসেছিল বা যাকে ওরা জিজ্ঞেস করেছিল সিদ্ধিবাবার আশ্রম কোথায়, সেই ছেলেটি উঁচু একটা পাথরের ওপর বসে ওদের গতিবিধি লক্ষ করছে। ওরা সেদিকে লক্ষ করে কয়েক পা এগোতেই ছেলেটি ওদের লক্ষ করে পাথর ছুড়তে লাগল। বড় বড় পাথর। বৃষ্টির ফোঁটার মতো এসে পড়তে লাগল ওদের সামনে। ছেলেটি ছিল ওপরে, ওরা নীচে। ফলে পালটা আক্রমণ করা ওদের পক্ষে সম্ভব হল না। এমন সময় হঠাৎ একটা পাথর এসে চাঁদুর কপালে লাগল। লাগামাত্রই ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটতে লাগল সেখান থেকে। সে কী রক্ত! লালে লাল হয়ে গেল। কপালে হাত চেপে পথের একপাশে বসে পড়ল চাঁদু। পাথর আসার তবুও বিরাম নেই। গোলাপ চকিতে চাঁদুকে টেনে আনল একটা বড় পাথরের আড়ালে। চাঁদু তখন থরথর করে কাঁপছে। হঠাৎ ওর বমি পেল। গা-মাথা ঘুলিয়ে চারদিক দুলে উঠল যেন। তারপর ক্রমশই একটু একটু করে নেতিয়ে পড়তে লাগল। একসময় দু’চোখ বুজে অবশ হয়ে গেল ও।
এই মুহূর্তে গোলাপ যে কী করবে কিছু ভেবে পেল না। এখানে চারদিকেই ওদের শত্রু। ওই শান্ত সুবোধ ছেলেটি ওদের শত্রু। যে লোকটি আহত হয়ে বসে আছে সে শত্রু। এছাড়াও আছে সেই নরখাদক বাঘটা। শুধু তাই নয়, ধারেকাছে কোথাও এমন একটু জলও নেই যে ওর মুখে এনে দেয়। আর এইভাবে তো এখানে বসে থাকা যায় না। অথচ লোকালয় এখান থেকে অনেক দূরে। তাই এই অবস্থায় ওর কী করা উচিত কিছুই ভেবে পেল না ও। তবু আশপাশের পরিস্থিতি দেখে ভাল-মন্দর দিকটা একটু বিবেচনা করে হঠাৎ সাহসে ভর করে চাঁদুর হাতদুটো ওর দু’ কাঁধের পাশ দিয়ে টেনে ধরে ওকে পিঠে নিয়েই পথ চলা শুরু করল। দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা। খানিক আসার পরই ঘেমে উঠল সে। পথ অসম্ভব খাড়াই। তাই বুকে টান ধরতে লাগল, তবুও হাল ছাড়ল না সে। কষ্ট করেও এগিয়ে চলল।
এইভাবে বেশ খানিকটা পথ যাবার পর একটা পাহাড়িয়া নদী দেখতে পেল সে। ঝরনার আকারে উপলখণ্ডের ওপর দিয়ে যেন নেচে নেচে বয়ে চলেছে। সেইখানে এনে মাটিতে ঘাসের ওপর চাঁদুকে শুইয়ে ওর চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিল। তারপর রুমালটা ভিজিয়ে ক্ষতস্থান মুছিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিল।
এইবার একটু একটু করে চোখ মেলল চাঁদু। বলল, আমি কোথায়?
গোলাপ বলল, তুমি ঠিক জায়গাতেই আছ। তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে চাঁদুদা ?
মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে।
করবেই তো। অতবড় একটা পাথরের টুকরো এসে লেগেছে। ডিপ হয়ে কেটে গেছে কপালের পাশটা। অমরকণ্টকে ফিরেই তোমাকে ডাক্তার দেখাতে হবে। সেলাই করতে হবে মনে হচ্ছে।
খুব ব্লিডিং হয়েছে না?
হয়েছেই তো।
সেইজন্যেই বোধহয় এত বমি ভাব আসছে।
তা আসুক। এখন তুমি কি আমার হাত ধরে একটু একটু করে চলতে পারবে? চেষ্টা করব। কিন্তু এখানে আমি কী করে এলাম? এখানে তো ছিলাম না। আমি অনেক কষ্ট করে তোমাকে পিঠে করে বয়ে এনেছি এখানে। আর পারছি না। বড় ক্লান্ত আমি।
তোমার ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না। এত কষ্ট করলে তুমি আমার জন্য?
বন্ধুর জন্য নিজের জীবনও দিতে পারি আমি। কিন্তু এখন আমি হেরে গেছি। সত্যিই আর পারছি না। আসলে ঢালু পথে কোনও কষ্ট নেই। কিন্তু এত খাড়াই যে দম বেরিয়ে গেছে।
গোলাপকে ভর করে কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল চাঁদু। তারপর ধীর পায়ে একটু একটু করে এগিয়ে চলল। পা যেন চলছে না। গা-মাথা সব টলছে। মনে হচ্ছে যেন কোনও একটা ভারী অসুখ থেকে উঠেছে। তবু যেতে তো হবে।
খানিকটা পথ এসেছে এমন সময় হঠাৎ দেখা হয়ে গেল একদল কাঠুরের সঙ্গে। এরা এখানকার পাহাড়ি। গভীর জঙ্গল থেকে অরণ্যের নিধন করে কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে ফিরছিল। ওদের দু'জনের ওইরকম অবস্থ। দেখেই ছুটে এল তারা, কা হুয়ারে মুন্নু?
গোলাপ আধা হিন্দি আধা বাংলায় সব কথা খুলে বলল ওদের।
সব শোনার পর দলের একজন বলল, থোড়া বইঠিয়ে। ও সাইকিল মিল যায়েগা তুমকো। লেকিন ইধার শের ক্যায়সে আ গিয়া?
চাঁদু বলল, ক্যায়সে আ গিয়া তা জানি না ভাই। তবে এসেছে, একজনকে নিয়েও গেছে। আর সাইকেলের জন্য আমরা চিন্তা করি না। আমরা এখুনি গিয়ে থানায় খবর দিচ্ছি। সাইকেল আমরা পাবই।
নেহি নেহি। পোলিশবালেকা পাস যানেকা জরুরত নেহি। সে কী! পুলিশে খবর দেব না?
আর একজন বলল, তুম সব জেরা বইঠো না বাবা। ইতনা দূর পয়দাল কিউ যাবে? ও রামু ছোকরাকা দিমাগ ঠিক নেহি। কুছ গড়বড়ি হ্যায়। ওহি নে চুরায়া তুমহারা সাইকিল। হম আতে হেঁ। বলেই একজনকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেল লোকটি। "
ওরা বসে রইল। দেখাই যাক না, যদি পাওয়া যায় সাইকেলদুটো। হাজার হলেও পরের তো।
ওরা বসে বসে পাহাড়িদের সঙ্গে নানারকম গল্প করতে লাগল। এই অমরকণ্টকের পথে চোর ডাকাতের গল্প। হিংস্র জন্তুজানোয়ারের গল্প, পাহাড়ের ধস নামার গল্প। ওরা বলল, অমরকণ্টকের পথ এখন সুগম হলেও ভৃগুকমণ্ডলের পথ নাকি এখনও দুর্গম। এখনও সেখানে দিনমানেও বাঘ-ভালুক বের হয়।
এইভাবে কথা বলতে বলতেই মিনিট কুড়ি হয়ে গেলে সাইকেলদুটো নিয়ে পাহাড়ি দু’জন ফিরে এল। সেই সঙ্গে কান ধরে টেনে আনল সেই ছেলেটিকে, যে পাথর ছুড়ে চাঁদুর কপাল ফাটিয়েছিল। ওরা ছেলেটিকে টেনে এনেই চাঁদুকে দেখিয়ে বেশ কয়েক ঘা চড়চাপড় দিল। দিয়ে বলল, দেখাতনি, ক্যায়সা হাল বনা দিয়া তু নে?
রামু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল ওদের দিকে। সে চাহনি এমনই যে ও স্বচক্ষে দেখেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, এই কাজ ও করেছে। কিছুক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখল। তারপর কাঁদতে কাঁদতে চোখদুটোকে নামিয়ে নিল সে।
গোলাপ ওর পা থেকে চটি খুলে মারতে যাচ্ছিল ওকে। চাঁদুই বারণ করল। ছেলেটার যখন সত্যি সত্যিই মাথার ঠিক নেই, তখন অযথা ওকে মারধোর করেই বা লাভ কী? স্বভাবের তো পরিবর্তন হবে না।
কাঠুরেরা বলল, রামু ছেলেটা যে বদ্ধ উন্মাদ তা নয়। মগজ যখন ঠিক থাকে তখন খুব ভাল। কিন্তু যখন বেগড়ায় তখন কী যে না করে, তার ঠিক নেই। তখন ওকে ধরে রাখাই দায়।
যাই হোক, ওরা সাইকেল পেয়ে কাঠুরেদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে চলল সার্কিট হাউসের দিকে।
চাঁদু যে কীভাবে সাইকেলে চেপে যাচ্ছিল তা সে-ই জানে। কেবলই মনে হচ্ছিল সাইকেলসুদ্ধ গড়িয়ে অন্যদিকে চলে যাবে বুঝি।
ওর অবস্থা দেখে গোলাপ বলল, তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে চাঁদুদা?
হ্যাঁ। মনে হচ্ছে পড়ে যাব। ঠিকমতো ব্যালান্স রাখতে পারছি না। গোলাপ সাইকেল থামিয়ে বলল, তা হলে নেমে পড়ো। তুমি বরং আমার সাইকেলে এসে বসো। আমি তোমাকে ডবল ক্যারি করি।
সাইকেল থেকে নেমে চাঁদু বলল, তা হলে এই সাইকেলটার কী হবে? ওটাকে এখানেই কোথাও লুকিয়ে রাখো। পরে আমি কারও সঙ্গে এসে বরং নিয়ে যাব।
তার চেয়ে আমি বলি কী, তোমাকে ডবল ক্যারিও করতে হবে না, কিছুই না। তুমি একটু জোরে সাইকেল চালিয়ে সোজা থানায় চলে যাও। তারপর সেখানে গিয়ে আমার অবস্থার কথা বিরজুর বাবাকে বলে কাউকে নিয়ে চলে এসো। বিরজু যদি থাকে তো ওকেও নিয়ে আসতে পার।
সেটা কি ঠিক হবে।
কেন ঠিক হবে না কেন?
একে তোমার ওপর একটা অশুভ গ্রহর কোপ পড়েছে। তার ওপর এই নির্জনে একা একা থাকবে? একটু আগেই একজনকে বাঘে ধরেছে। মনে আছে তো?
ভয় নেই। আমি সাবধানেই থাকব।
থেকো তা হলে। আমি এখুনি আসছি।
চাঁদু পথের ধারে এক জায়গায় সাইকেলটা রেখে একটি পাথরের ওপর বসে রইল। আর গোলাপ সাইকেল নিয়ে ঝড়ের বেগে হারিয়ে গেল সেই নির্জন পাহাড়ে পথের বাঁকে।
সেই যে গেল গোলাপ আর তার ফিরে আসার নামটি নেই। চাঁদু বসে থেকে থেকে অধৈর্য হয়ে উঠল। এত সময় তো লাগার কথা নয়। তা হলে কি কাউকে পায়নি ও? না পেলে ও নিজেও তো ফিরে আসতে পারত।
চাঁদু আর অপেক্ষা না করে উঠে দাঁড়াল এবার। দুশ্চিন্তা এবং উত্তেজনা ওকে এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে এখন আর নিজেকে আগের মতো দুর্বল মনে হচ্ছে না। ও সাইকেল নিয়ে পথে নামল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল সার্কিট হাউসের দিকে।
ও যখন শহরের কাছাকাছি এসে গেছে, তেমন সময় দেখল অন্য একটা সাইকেলে বিরজু দ্রুত আসছে ওর দিকে।
ওকে দেখেই সাইকেলের ব্রেক কষল বিরজু, হাল ক্যায়সা?
চাঁদু বলল, দেখতেই তো পাচ্ছ ভাই। কিন্তু তুমি এত দেরি করলে কেন? ছিলে না বুঝি?
এই তো খবর পেলাম।
সে কী! গোলাপ এতক্ষণ কী করছিল?
আর বলো কেন? একটা স্টোন চিপ গেঁথে গিয়ে ওর সাইকেলের সামনের চাকার টায়ারটা ফেটে যায়। প্রায় দু’ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটেই গেছে বেচারি। আর আমি এদিকে হানটান করছি।
বিরজু একটা চায়ের দোকানের সামনে এসে সাইকেল থামিয়ে বলল, চা পিয়োগে?
এখন নয়।
আরে পিয়ো পিয়ো।
দোকানদারকে দু’ কাপ চা করতে বলে বিরজু হঠাৎ একটা প্রশ্ন করল, আচ্ছা দোস্ত, সাচ মুচ একটা কথা বলবে?
কী কথা বলো?
ওই যে লেড়কি তোমার সঙ্গে রয়েছে ওর সাথে তোমার কী সম্পর্ক আছে? চাঁদু হেসে বলল, হঠাং এরকম প্রশ্ন করলে যে?
বুরা না মানো ভাই। কী সুন্দর ফেস কাটিং ওর। কী চমৎকার দেখতে। তাতে কী হয়েছে?
ও তোমার আপনা বহিন ভি না আছে।
দোকানদার চা দিলে, চা খেতে খেতে খেতে চাঁদু বলল, বিরজু ভাই, তোমার যদি কোনও বহিন থাকত আর সে যদি কোনওকারণে এইভাবে আমার সঙ্গে জুটে যেত, তবে কি তুমি কোনও সম্পর্ক যাচাই করতে? ও আমার বহিন কা মাফিক।
লেকিন তোমার নামে তো একটু পুলিশ কেস হয়ে আছে
। আমার নামে! কীরকম?
তোমার নামে রিপোর্ট আছে তুমি বিলাসপুর থেকে ওই লেড়কিকে নিয়ে পালিয়ে এসেছ।
মিথ্যে কথা। ও নিজেই এসেছে এবং স্বেচ্ছায় এসেছে।
হ্যাঁ, লেকিন যাদের মেয়ে তারা তো সন্দেহ করছে
তোমাকে।
বয়ে গেল। ওতে আমি ভয় পাই না। তার কারণ আমি নির্দোষ। তোমার বাবাকে এবং ইনস্পেক্টরকে কাল রাতে সব কথা খুলে বলেছি আমি। আমাদের দু'জনেরই বাড়ির ফোন নম্বর দিয়েছি। কাজেই পালিয়ে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। এর পরেও ওরা যদি গায়ের জ্বালায় কিছু বলে তো বলুক। গোলাপ নিশ্চয়ই সে কথা বলবে না।
ও সে কথা বলছেও না। তবে সম্ভবত ওকে বিলাসপুরেই পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
বেশ তো। ও যদি যেতে চায় যাক না।
চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে ওরা সোজা থানায় এল। এসেই দেখল সুজয়ের বাবা গম্ভীর মেজাজ়ে বসে আছেন। বিরজুর বাবাও আছে। আর রাগি গোলাপ স্থির হয়ে বসে আছে একপাশে। ইনস্পেক্টর নেই। পরিবেশটা কেমন থমথমে।
চাঁদুকে দেখেই বোমার মতো ফেটে পড়লেন সুজয়ের বাবা। বিরজুর বাবাকে বললেন, ইমিডিয়েটলি এই ছোকরাকে লকআপে ঢোকাও। জেলের ঘানি না-টানিয়ে আমি ছাড়ব না একে। এইটুকু বয়সে একটা ক্রিমিনাল তৈরি হয়ে গেছে।
চাঁদু বলল, এসব কী বলছেন আপনি?
চোপ। বদমাশ কোথাকার।
আপনি অযথা উত্তেজিত হচ্ছেন।
অযথা উত্তেজিত হচ্ছি? কেন তুমি চোরের মতো আমার বাড়ি থেকে পালিয়ে এলে?
চোরের মতো পালিয়ে আসব কেন? আমি প্রকাশ্যে দিবালোকে সকলকে সব কথা জানিয়েই চলে এসেছি। না-আসা ছাড়া আমার কোনও উপায়ও ছিল না। আসবার আগে আমার সঙ্গে একবার দেখা করে আসা উচিত ছিল না? ছিল। কিন্তু সময় ছিল না।
তুমি এই মেয়েটাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে এলে কেন?
ওর আসার ব্যাপারটা আপনি বাড়িতে ভাল করে শুনেছেন?
শুনেছি। কিন্তু তোমার সঙ্গে যে এসেছে এই খবরটা তখন পাইনি। যখন পেলাম, তখন মনে হল এটা একটা সাজানো নাটক। তোমার বিপদটা কোথায় আমি জানি। কিন্তু তাই বলে পরের মেয়েকে ভুলিয়ে নিয়ে আসা শিক্ষিত ভদ্রছেলের কাজ নয়। তুমি চলে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েটা যেভাবে বাড়ি থেকে চলে এল এবং তোমার সঙ্গেই এল তাই তে বুঝতে বাকি থাকে না তোমার চাতুরিটা কোথায়।
আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আপনাকে আমি একটু মাথা ঠান্ডা করে ব্যাপারটা বুঝে দেখবার অনুরোধ করছি। বিষয়টাকে আপনি এইভাবে নেবেন না প্লিজ। শোনো চাঁদু, ও যদি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে সোজা ওর বাবার কাছে ধানবাদে চলে যেত, তা হলে কিন্তু আমার বলবার কিছু ছিল না। কিন্তু যেই শুনলাম স্টেশনে এসে দু'জনে একসঙ্গে হয়েছ এবং পেনড্রা রোডের টিকিট কেটেছ, তখনই মাথাটা গরম হয়ে উঠল আমার। তাই তোমাকে আমি ছাড়ব না। মেয়ে চুরির কেসে জেলের ঘানি টানাব।
লজ্জায়, অপমানে আর শারীরিক অবসন্নতায় চাঁদু তখন থরথর করে কাঁপছে। গোলাপ এতক্ষণ পরে মুখ খুলল, চাঁদুদা! তুমি একদম উত্তেজিত হয়ো না। একটু বসো। অফিসারকে আসতে দাও। তারপর এই সমস্ত নির্বোধ লোকের কথার জবাব কী করে দিতে হয় আমি জানি।
চাঁদু কোনও কথা না বলে একটা চেয়ারে বসে কপালটা ধরে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল। রক্তে ওর রুমালটাও তখন ভিজে গেছে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে সমানে রক্ত পড়ছে তখনও।
সুজয়ের বাবা বললেন, তুই আমাকে নির্বোধ বললি? গুরুজনের সঙ্গে এইভাবে কথা বলতে কে শেখাল তোকে? এই ছেলেটা?
ও কেন শেখাবে? আপনাদের ব্যবহারই আমার চোখ ফুটিয়ে দিয়েছে! আপনার নিজের যদি মেয়ে থাকত। আর সেও যদি এইভাবেই তার দাদার বন্ধুর কোনও বিপদে এগিয়ে আসত তা হলে তাকেও কি সন্দেহ করতেন আপনি? আজকের দিনে একটি ছেলেমেয়ের মেলামেশাকে আপনারা সহজভাবে মেনে নিতে শেখেননি?
আমার নিজের মেয়ে হলে কোনও কিছুই আমি ভাবতাম না। কিন্তু তুই যে এইভাবে চলে এলি, তোর বাবাকে আমি কী কৈফিয়ত দেব বল?
গোলাপ ফোঁস করে উঠল, কৈফিয়ত আপনি কী দেবেন? যা বলবার আমিই আমার বাবাকে বলব। আপনার অনুপস্থিতিতে কাল এমন কিছু ও বাড়িতে ঘটে গেছে যাতে বাড়ি ছাড়তে আমি বাধ্য হয়েছি।
তোর বাবার সঙ্গে ফোনে আমার কথা হয়েছে। তুই এখুনি আমার সঙ্গে যাবি। তোর বাবা এসে আমার ওখান থেকে তোকে নিয়ে যাবে।
আমার বাবার সঙ্গে আপনার যা কথা হয়েছে তা এক তরফা। আমি নিজে বাবার সঙ্গে কথা না বলে কোনও সিদ্ধান্তই নেব না। তবে এ-ও জানবেন, বাবা-মা দু’জনে বললেও ওই বাড়িতে আর কখনও যাব না আমি।
বেশ, না যাবি। কিন্তু ওই খুনে ছেলেটার সঙ্গেও থাকতে পাবি না তুই। দরকার হলে আমি পুলিশ হেফাজতে থাকব।
চাঁদু এবার উত্তেজিত হয়ে বলল, না জেনেশুনে আপনি কিন্তু যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছেন। আমি খুনি নই। বরং আমাকে খুন করবার জন্য কিছু দুষ্কৃতী ওত পেতে আছে। এই দেখুন, আমারই কপাল দিয়ে খুন ঝরছে। যদিও এটাকে আমি দৈব-দুর্ঘটনা বলে মনে করছি। তবু এর পিছনেও কোনও চক্রান্ত থাকতে পারে! আমি হয়তো তারই বলি।
সুজয়ের বাবা বললেন, তুমি বলছ, তুমি খুনি নও। কিন্তু কলকাতার কাগজ বলছে, রেডিয়ো, টিভি বলছে। আমরা কার কথা বিশ্বাস করব! তোমার, না সরকারি রেফারেন্সের?
জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো চুপসে গেল চাঁদু।
গোলাপও এবার কীরকম যেন ভয়ে ভয়ে চাঁদুর দিকে তাকাল। ভাবটা এই ফুলের মতো সুন্দর এই সুকুমারমতি ছেলেটা সত্যিই কি খুনি? আজকাল তো এরকম কত হয়। কিন্তু ওর যা ব্যবহার, ওর মধ্যে যে সরলতা আছে, তা দেখে তো, ওকে সেরকম বলে মনে হয় না। হয়তো বড়লোকের ছেলে, রাগের মাথায় বা ঘটনাক্রমে খুন একটা করেইছে। তাই ওর বাবাও চাইছে ছেলেটিকে চোখের আড়ালে পাঠিয়ে অবস্থার সামাল দিতে। না হলে ওর পিছনেই বা লোক লাগবে কেন? কিন্তু ওর মুখের দিকে তাকালে তো বারেকের তরেও মনে হয় না ও কখনও ওই ধরনের অপরাধ করে থাকতে পারে বলে।
এমন একটা সময় পুলিশের জিপ এসে থামল বাইরে থানার সামনে। ইনস্পেক্টর এবং আরও দু’জন অফিসার ঘরে ঢুকলেন।
বিরজুর বাবা এবং অন্যান্য কনস্টেবলরা উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট জানাল। চাঁদুকে দেখেই শিউরে উঠলেন ইনস্পেক্টর, এ ক্যা!
চাঁদু সব কথা খুলে বলল ইনস্পেক্টরকে। তো তুম ডক্টরকো পাস কিউ নেহি গিয়া? চাঁদু বলল, আমরা তো এইমাত্র আসছি।
ইনস্পেক্টর বিরজুর বাবাকে বললেন, তুম বহৎ বুঢ়া হো গিয়া বাবা। নোকরি ছোড় দো। ইতনা উমর হো গিয়া লেকিন আভি তক ইয়ে খেয়াল নেহি হুয়া যো ডক্টরকো বোলনা চাহিয়ে?
মেরা বাত তো শুনিয়ে।
হম কুছ নেহি শুননা চাতে।বলেই রিসিভার তুলে ডায়াল ঘুরিয়ে বললেন, হ্যালো! ডক্টর লোহিয়া! ম্যায় পুলিশ ইনস্পেক্টর বোল রহা হুঁ। জলদি আইয়ে আপ। এক লেড়কাকো শির মে বহুতই চোট লাগা। খুন নিকলতা। থোড়া ফার্স্ট এড দেনে পড়েগা।
ফোন করে রিসিভার নামিয়ে রেখে ইনস্পেক্টর সুজয়ের বাবাকে বললেন, বঙ্গালিবাবু! আপনি কিন্তু কাল একটু ফলস স্টেটমেন্ট দিয়েছেন পুলিশকে। একটা ভাল ছেলের নামে আপনি কিডন্যাপিং কেস চাপিয়ে দিয়েছেন?
তার মানে? আমার স্টেটমেন্ট ফলস? তা হলে এই যে মেয়েটে এখানে বসে আছে এটাও কি মিথ্যে?
বসে আছে তো কী হল? কাল রাত্রে আমি এদের মুখে সবকিছু শুনেই বিলাসপুর পুলিশকে জানাই। বিলাসপুর পুলিশ আমাকে জানায় কাল নাকি ওই ছেলেটার নামে থানায় একটা রিপোর্টও করেছেন আপনি। যেটা ঠিক নয়। করবই তো?
আচ্ছা মশাই বলুন তো, পুলিশে রিপোর্ট তো আপনি করলেন। কিন্তু আপনার বাড়িতে থাকা এই দুটি ছেলেমেয়েকে আপনি প্রোটেকশন দিতে পারলেন না কেন? এদের বাবা-মা তো আপনার বাড়িতে নির্ভাবনায় রেখেছিল এদের। এখন যদি এদের কিছু হয়ে যেত তা হলে তাদের কী কৈফিয়ত দিতেন আপনি? ওই পুলিশের খাতায় লেখানো ডায়েরি দেখিয়েই কি আপনি পার পেতেন?
ছেলেটি বা মেয়েটির চলে আসার ব্যাপারে আমি কিন্তু কিছুই জানতাম না। ছেলেটির অবশ্য লাইফ ডেঞ্জার হয়ে উঠেছিল—
সে কথা পুলিশকে জানিয়েছিলেন?
না। কারণ আমি কোনও কিছুই জানতাম না। বাড়ি গিয়েই সব শুনলাম। আর এও শুনলাম মেয়েটিও বাড়ি থেকে রাগারাগি করে চলে গেছে।
চলে গেছে না তাড়িয়ে দিয়েছিল আপনার বাড়ির লোকেরা?
তাড়িয়ে দেবে কেন? আসলে মেয়েটা অসম্ভব জেদি। ও একবার যাব বললে, ওকে কেউ আটকাতে পারে না।
তাই? তবু আপনার পরিবারের কারও তো সঙ্গে আসা উচিত ছিল!
আমি বাড়িতে থাকলে সে ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হত। কিন্তু না-থাকাতেই যত গোলমাল। ও-ও চলে এল। ওরাও যেতে দিল।
তা হলে বলছেন মেয়েটিকে আপনারা তাড়িয়ে দেননি, ও স্বেচ্ছায় চলে এসেছে?
হ্যাঁ। নিজের থেকেই চলে এসেছে।
আপনি কীরকম ভদ্দরলোক মশাই? আপনার জবানের কোনও দামই নেই দেখছি। আপনি অমরকণ্টক-পুলিশকে বলছেন, মেয়েটি নিজের ইচ্ছেয় চলে এসেছে। আর বিলাসপুর-পুলিশকে বলেছেন মেয়েটিকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। আপনাকে তো অ্যারেস্ট করা উচিত।
সুজয়ের বাবা মাথা হেঁট করে বসে রইলেন।
ইনস্পেক্টর চাঁদুকে বললেন, তোমার স্টেটমেন্ট কাল আমি বিলাসপুর-পুলিশকে জানিয়েছিলাম। সেইমতো কাল রাত্রে চিরুনি অভিযান চালিয়ে গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেসে যারা এসেছিল তাদের অ্যারেস্ট করা হয়েছে।
চাঁদুর বুকটা যেন হালকা হয়ে গেল। বলল, তা হলে আর আমার কোনও ভয় নেই, কী বলুন?
মনে তো হয় তাই। লেকিন উয়ো তিসরা আদমি কৌন আছে?
কার কথা বলছেন আপনি?
ওই বিলাসপুরবালে। যে তোমাকে হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল।
তা তো জানি না।
কথা বলতে বলতেই ডাক্তারবাবু এসে গেলেন। এই অঞ্চলের নামকরা ডাক্তার। আগে মিলিটারিতে ছিলেন। এখন এখানে আছেন। ডাক্তারবাবু চাঁদুকে বেশ ভাল করে পরীক্ষা করে ওর ক্ষতস্থান দেখে বললেন, স্টিচ করনা পড়েগা। ইধার নেহি হোগা, অনুপপুর হসপিটালমে ভেজ দিজিয়ে।
চাঁদু তো লাফিয়ে উঠল, ওরে বাবা! হাসপাতালে যাব না আমি। তাতে যা হয় হবে।
যা না হি পড়েগা। হামারা পাস ইন্সট্রুমেন্ট নেহি। আউর তুমকো নার্সিং, ড্রেসিং করেগা কৌন? দু'-চার রোজ-কে লিয়ে রেস্টেরও জরুরত আছে তোমার।
চাঁদুর চোখদুটো ছল ছলিয়ে উঠল।
থানা থেকেই ডাক্তারবাবু ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স আনালেন, আর তাতে করেই ওরা ওকে নিয়ে গেল অনুপপুর হাসপাতালে।
গোলাপও যাচ্ছিল সঙ্গে। কিন্তু ইনস্পেক্টর যেতে দিলেন না, বললেন, তুম কাঁহা যাওগী? বৈঠো।
গোলাপ বসে রইল চুপ করে।
এরপর সঙ্গে আসা পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে কী সব আলোচনা করে ইনস্পেক্টর গোলাপকে বললেন, তুম এক কাম করো। বিলাসপুর চলা যাও।
বিলাসপুর! কেন? সেখানে কী আছে? গেলে আমি আমার বাড়িই চলে যাব। আপনি কি আমার বাবাকে কোনও খবর দিতে পেরেছেন? না। সময় করে উঠতে পারিনি।
সুজয়ের বাবা বললেন, আমি খবর দিয়েছি। তোমার বাবা শিগগির আসছেন। তুমি আমার সঙ্গে চলো।
না। আমি আর ও বাড়িতে ফিরে যাব না।
ইনস্পেক্টর বললেন, তব তুম ক্যা করোগে?
আমি এইখানেই থাকব। বাবা বিলাসপুরে এলে, বাবাকে পাঠিয়ে দেবেন। বাবার সঙ্গেই যাব আমি।
লেকিন এখানে তুমি থাকবে কোথায়?
কেন যেখানে আছি। সার্কিট হাউসে।
ও নেহি হো সকতা। অকেলে তুম মাত ঠারো।
আমার কিছু হবে না ইনস্পেক্টর। দু'-চারটে দিন বইতো নয়। আমি ঠিক থাকতে পারব। ততক্ষণে চাঁদুদাও সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে। ওকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাব। আর সার্কিট হাউসে থাকার যা খরচ, তা আমার বাবাই দিয়ে দেবেন। সুজয়ের বাবা এবার অন্য সুরে কথা বললেন, কেন এরকম করছিস গোলাপ?
যদি কিছু দোষত্রুটি হয়ে থাকে আমাদের তা হলে সেটা তুই ক্ষমা করে নে। আমি তো একবার বলেছি ওখানে আমি যাব না।
আর কখনও যেতে হবে না তোকে, কিন্তু এইবারের মতো চল।
ইনস্পেক্টর বললেন, বুরা মাত বনে৷। যানা হি আচ্ছা হোগা তুমহারে লিয়ে। গোলাপ মাথা হেঁট করে বসে রইল।
সুজয়ের বাবা বললেন, আমি কিন্তু আর অনুরোধ করব না। এবারে জোর করব। তোমার মালপত্তর কী আছে নিয়ে এসো। যাও। একদম দেরি কোরো না। আমি ট্যাক্সির ব্যবস্থা করছি।
দু’ ফোঁটা চোখের জল ফেলে উঠে গেল গোলাপ। সুরে বাঁধা বীণার তারটা হঠাৎই কীরকম যেন ছিঁড়ে গেল। চাঁদুদা এখন কী করছে কে জানে? এই দূর দেশে ছেলেটা এখন কতই না অসহায়।
কিন্তু সেই যে গেল গোলাপ, ঘণ্টা পার হলেও আর এল না। সুজয়ের বাবা ইনস্পেক্টরকে সঙ্গে নিয়ে সার্কিট হাউসে গিয়েই শুনলেন মেয়েটি অনেক আগেই এখানকার হিসাবনিকাশ চুকিয়ে দিয়ে চলে গেছে।
সমস্যার পর সমস্যা।
গোলাপ কি সত্যিই পালাল? নাকি তরতাজা ফুলের মতো মেয়ে দেখে হাপিস করে দিল কেউ?
ইনস্পেক্টর সঙ্গে সঙ্গে থানায় এসে ফোনে ফোনে খবর পাঠালেন চারদিকে। আর এই সময়ই বিলাসপুর থেকে এক নিদারুণ তারবার্তায় জানা গেল কাল রাতে ধৃত দু’জন আসামিই এক রহস্যময় উপায়ে লকআপ থেকে পালিয়েছে।
অনুপপুর জায়গাটা মন্দ নয়। অমরকণ্টকের যাত্রীরা অনেকে এখান দিয়েও আসেন। যেমন জব্বলপুরের দিক থেকে যারা আসছেন তাঁরা খামোকা পেনড্রা রোডে নামতে যাবেন কেন? তাই এখান থেকেও নিয়মিত বাস চলাচল করছে। শুধু অমরকণ্টক নয়। মনেন্দ্রগড়, চিরিমিরি আরও অনেক জায়গার বাস পাওয়া যায় এখান থেকে।
সকালের সোনার রোদ্দুরে চারদিক যখন ভরে উঠেছে, তখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কত কী ভাবছিল চাঁদু। গোলাপকে কাল ওরা আসতে দেয়নি। আজ নিশ্চয়ই দেবে। সার্কিট হাউসের ওই নিরালা পরিবেশে একা একা কী করছে সে কে জানে? কাল ওর মাথায় স্টিচ করে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। আজ আর কাল দু’দিন থাকলেই ওর ছুটি। অবশ্য ছুটি পেলে আজকেই ও চলে যেতে পারে। কিন্তু তা দেবে না ওরা।
লছমি নামের একজন ছত্তিশগড়িয়া মেয়ে ওর দেখাশোনা করছে। মেয়েটি বড় ভাল। ও বলেছে ওর এই বিপদের খবর পেয়ে ওর বাবা যখন ওকে নিতে আসবেন, তখন বেশ মোটা রকমের বকশিশ দেবে ওকে। বকশিশের লোভেই হোক বা যে কোনও কারণেই হোক লছমি কিন্তু খুব খুশি ওর ওপর।
চাঁদু অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে নানারকম ভাবনা চিন্তা করল। প্রাণহানির আশঙ্কাটা ওর মন থেকে একেবারেই দূর হয়ে গেছে। তাই নির্ভয়ে এক সময় উঠে দাঁড়িয়ে ঘরময় পায়চারি করে অন্যান্য রোগীদের দেখে দরজার কাছে এল। এমন সময় দূর থেকে যাকে আসতে দেখল, তাকে দেখেই, আনন্দে ভরে উঠল ওর মন। ও দেখল স্বয়ং সিদ্ধিবাবা জোর কদমে হেঁটে আসছেন ওর দিকে।
উনি কাছাকাছি আসতেই চাঁদু এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করল সিদ্ধিবাবাকে। সিদ্ধিবাবা বললেন, কেমন আছিস বেটা?
আমি ভাল আছি বাবা। এখনও আমি চলে যেতে পারি। কিন্তু এরা বলছে আরও দু'দিন আমাকে এখানে থাকতে।
বেশ তো। ঠারো। আয়েশ করো।
আপনি কী করে খবর পেলেন আমি এখানে আছি?
কাল বিকেলে নর্মদা মায়ের মন্দিরে গিয়ে আমি সব শুনলাম। থানায় গেলাম। আমি কাল তোমার বাড়িতে ফোন করে সবকিছু জানিয়েছি। কিন্তু তোমার সঙ্গে ওই যে লেড়কি ছিল, ও তো নো পাত্তা হয়ে গেছে। সে কী!
পুলিশ অনেক চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনওরকম সন্ধান করতে পারছে না। আর তোমরা যে দু'জনকে কপিলধারার কাছে ঘায়েল করেছ, ওদেরও পুলিশ ধরে এনে খুব পেটাচ্ছে। একজনকে বিলাসপুরে পাঠানো হয়েছে। ওর তো দোনো আঁখো বরবাদ হয়ে গেছে।
কিন্তু ওই মেয়েটা গেল কোথায় বাবা?
ভগবান জানে। বাসে, ট্রেনে, হোটেলে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না মেয়েটাকে। কেউ ওকে কিডন্যাপ করেনি তো?
হো ভি সকতা।
চাঁদুর মনে হল ওর পায়ের নীচে মার্টিটাও যেন দুলছে। মেঘের পরে মেঘ যেন সরতে আর চায় না। কী বিভ্রাট!
চাঁদু বলল, বাবাজি, আমি কিন্তু এখন বেশ সুস্থ। আপনি একটু বলে কয়ে আমার ছুটির ব্যবস্থা করে দিন। এখানে আমি আর এক মুহূর্ত থাকতে পারব না। গোলাপকে যেভাবেই হোক খুঁজে বার করতেই হবে। এই অমরকণ্টকে এমন কোনও রহস্য আছে যা আমাদের কাঁটার মতো বিধছে। যেমন দুধধারার ওই পাগলা রামু। ওই ভয়ংকর লোকদুটো। গোলাপের অন্তর্ধান। সবই তো দেখছি একই সুতোয় বাঁধা। অমরকণ্টক আমাদের নিয়তি। না হলে এত জায়গা থাকতে মরতে আমরা এখানেই বা আসব কেন।
রহস্য আরও আছে। তোমার আততায়ীরাও খুব রহস্যময়ভাবে লকআপ থেকে উধাও হয়েছে।
কী করে?
যে করে রহস্যের পর রহস্য তার জালকে বিস্তার করে চলেছে, সেইভাবে। বিলাসপুরের ওই অচেনা লোকটিও তো আর এক রহস্য।
সিদ্ধিবাবা ঘাড় নাড়লেন। তারপর বললেন, তুমি বেশি বাইরে ঘোরাফেরা কোরো না। হাসপাতালের বেড়েই শুয়ে বসে থাক। আমি পুলিশকে বলছি তোমার দিকে একটু নজর রাখতে। ওই পলাতক লোক দু'জন এখানেও তো আসতে পারে। ওরা এসে গেলে তোমার জিন্দগি বরবাদ করে দেবে।
চাঁদু কঠিন গলায় বলল, ওরা আসুক। আর আমি কাউকে ভয় খাই না। আর আমি পালিয়ে বেড়াব না। এবার লড়ে মরব আমি। বাবাজি, আপনি একটু এইখানকার বনে পাহাড়ে গোলাপকে খুঁজে দেখুন। আমার মনে হয় ও এখানেই কোথাও আছে। কেন না পুলিশ যদি সত্যিই ওর খোঁজে লোক লাগিয়ে থাকে তা হলে এতক্ষণে ধরা ও পড়তই। ওকে কেউ গুম করে এখানেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। তাই ওর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ওর কাছে টাকা-পয়সা আছে, মালপত্তর আছে। সেইসব নিয়েও ও তো হেঁটে যাবে না। বাস অথবা ট্রেনে ওকে উঠতেই হবে। উঠলেই ধরা পড়ত।
আমারও তাই মনে হয়। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই আমি কয়েকজনকে কাজে লাগিয়েছি। সমস্ত পাহাড়িদের খবর দিয়েছি। ও যদি সকলের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েও গিয়ে থাকে, তা হলেও কোথাও না কোথাও আশ্রয় নিতে গেলেই ধরা পড়বে। ওর চিন্তা তুমি একদম কোরো না।
সিদ্ধিবাবা চলে গেলেন।
সিদ্ধিবাবা চলে যেতেই লছমি কাছে এসে বলল, তোমার কী হয়েছে ভাইয়া? কী বলছিলে তুমি সাধুজিকে?
চাঁদু বলল, ও তুই বুঝবি নারে।
সমঝানে সে ভি নেহি সমঝেগা?
কিন্তু বুঝেই বা তুই করবি কী?
তবু বোলো না ভাইয়া।
চাঁদু তখন ওর দুঃখের কথা এক এক করে সব বলল।
সব শুনে শিউরে উঠল লছমি। বলল, ইয়ে বাত? তো মালুম হোতা হ্যায় তুমহারা গুলাবকো ও শয়তান রকি নে উঠাকে লে গয়া।
রকি! রকি আবার কে?
রামরূপ সিং কি লেড়কা। বহৎই বদমাশ। ও জরুর বুলানারা মে হোগা। চাঁদু বলল, বুলানারা! সেটা কোথায়?
বহৎ দূর। অমরকণ্টক সে কমসে কম দশ মিল হোগা। হিয়াসে ভি জায়দা দূর। হুঁয়া চারো তরফ পাহাড়ো পাহাড়।
চাঁদু লছমির হাতদুটো ধরে বলল, তুই আমাকে সেখানে নিয়ে যাবি লছমি? তুই এইখানকার মেয়ে। রাস্তাঘাট চিনিস। তুই ছাড়া আমাকে কেউ নিয়ে যেতে পারবে না। গোলাপকে উদ্ধার করতে পারলে তুইও লাভবান হবি। ওর বাবার অনেক টাকা। তা ছাড়া একমাত্র মেয়ে। ওর বাবা খুশি হয়ে অনেক টাকা দেবেন তোকে।
লছমি বলল, ভাইয়া, তুম হামকো রুপিয়া কি লালস মাত দিখাও। আমি গরিব ঘর কি লেড়কি। পেটকে লিয়ে এখানে আয়ার কাম করতে এসেছি। তুমহারে লিয়ে ইয়ে কাম হম জরুর করেঙ্গী।
তা হলে তুই আমাকে এখুনি নিয়ে চলো সেখানে।
হুঁয়া যানে সে ফায়দা ক্যা হোগা?
ওই শয়তান রকির খপ্পর থেকে গোলাপকে মুক্ত করব।
ও রকি বহতই খতরনক। ও সব লেড়কি কো লে যাতা। মার ডালতা। কলকাত্তা বোম্বাই ভেজ দেতা।
সে কী !
হ্যাঁ। অ্যায়শা হি করতা ও লোগ। উধার কোঈ আদমি যানে সে বহৎ মারতা। তা হলে?
চলো, আমরা বরং পুলিশে খবর দিই। ও লোগ জরুর পাকড়েঙ্গে।
চাঁদু বলল, খবরদার নয়। পুলিশে খবর দিলে পুলিশ হইচই পাকিয়ে সব ভেস্তে দেবে। আর পুলিশের মধ্যে যদি ওদের কোনও স্পাই থাকে তা হলে ওরাও ওদের সাবধান করে দেবে। আমরা লুকিয়ে ওখানে যাব। এমনভাবে যাব যাতে সবাই ভাববে বুঝি জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে যাচ্ছি। মাথায় কাঠের বোঝা থাকবে। ময়লা জামাপ্যান্ট পরে থাকব।
লেকিন তোমার এমন সুন্দর চেহারা লুকোবে কী করে?
ও ঠিক পালটি হয়ে যাবে। ওর জন্যে ভাবিস না।
তোমার তবিয়ত ঠিক আছে তো ভাইয়া?
খুব ভাল আছে। বল খেলতে গিয়ে এইরকম মাথা অনেকের অনেকবার ফেটেছে। কিন্তু তুই আর দেরি করিস না। এখুনি চল। থোড়া দের হোগা।
চাঁদু রেগে মেগে বলল, তা হলে আমি একাই যাব।
লছমি হাসল, তুম! বুলানারা যাওগে? অউর অকেলে? ও বহতই নটখটিয়া রাস্তা ভাইয়া। বলে যা বলল তার অর্থ হল, আর এক ঘণ্টা বাদেই ওর ডিউটি খতম হয়ে যাবে। তখন গেলে ওর নোকরি যাবার ভয় থাকবে না। চাঁদু তো একেবারেই যাবে। কিন্তু ওকে যে আবার ফিরে আসতে হবে, তাই।
অগত্যা এক ঘণ্টা বাদেই যেতে রাজি হল চাঁদু। লছমিকে বলল, যাবার সময় তুই আমার মাথা ঢাকবার জন্যে একটা টুপি, আর বিপদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য একটা ছুরি আনিস। তুই-ও ছুরি রাখিস সঙ্গে। বলা যায় না কখন কী হয়।
লছমি ওকে বেড়ে যেতে বলে নিজের কাজে মন দিল।
একটু পরেই ডাক্তার এসে রোগীদের পরীক্ষা করলেন। চাঁদুকেও একবার দেখে একটা ইঞ্জেকশান দিয়ে চলে গেলেন।
দেখতে দেখতেই ঘণ্টা কাবার হয়ে গেল।
লছমির পর বুধবারি নামে একজন এল। সে এলে ডিউটি খতম হল লছমির। ও তখন চাঁদুকে ইশারা করে নিজের মনে গুণগুণিয়ে গান গাইতে গাইতে বাড়ির দিকে চলল।
চাঁদুও সকলের নজর এড়িয়ে লছমিকে অনুসরণ করে চলতে লাগল এক-পা এক-পা করে।
বেশ খানিকটা যাবার পর লছমি কথা বলল ওর সঙ্গে। বলল, তুম হিয়া ঠারো। আভি হম আ রহে।
যে জায়গায় ওকে থামতে বলল লছমি, সে জায়গাটা খুবই নির্জন। অনুপপুরও পাহাড়ি এলাকা। যদিও পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হওয়ায় এবং জঙ্গল কাটার ফলে বছরে বছরে জায়গাটার দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, তবুও ফাঁকা। পিছনেই জঙ্গলের শুরু। গভীর নয়, পাতলা। বড় গাছ একটিও নেই। ছোট ছোট গাছ। বনবাদাড়ে ভরা। চাঁদু ওইখানেই একটি বড় পাথরের খাঁজের আড়ালে বসে রইল চুপটি করে। এইসময় ওর কাছে এক একটি মুহূর্ত যেন এক একটি যুগ বলে মনে হতে লাগল। লছমি যতক্ষণ না ফিরে আসে ততক্ষণ ওর পক্ষে একা বসে থাকাও যেন একটা দায় হয়ে উঠল।
কতক্ষণ বসেছিল ওর ঠিক মনে নেই। ও যখন বসে বসে লছমির জন্য অপেক্ষা করছে ঠিক সেই সময় দু'জন মানুষের ছায়া লম্বালম্বিভাবে ওর সামনে পড়তে দেখল। সভয়ে পিছনে তাকিয়েই দেখল বলিষ্ঠ চেহারায় দু'জন যুবক শিকারি বাঘের মতো থাবা উঁচিয়ে ওর দিকে এগিয়ে আসছে।
ও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েই বলল, কী চাই তোমাদের?
ওরা হেসে বলল, আমরা তোমাকে চাই। তোমাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যাচ্ছি আমরা। কী কাণ্ড করে যে পুলিশের চোখ ধুলো দিয়ে এসেছি তা আমরাই জানি। কিন্তু তুমি তো হাসপাতালে ভরতি ছিলে, এখানে কী করে এলে?
যেভাবেই আসি না কেন, সেকথা জানবার কোনও অধিকার তোমাদের আছে বলে মনে করি না।
তা না করতে পারো। কিন্তু তোমাকে আমাদের প্রয়োজন আছে। কোনওরকম চিৎকার চেঁচামেচি না করে আমাদের সঙ্গে চলে এসো। যদি না যাই?
তা হলে আমরা অন্য উপায়ে নিয়ে যাব।
চাঁদু আড়চোখে এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখল, কেউ কোথাও নেই। অনেক দূরে অবশ্য দু’-একজনকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এখান থেকে হেঁকে তাদের ডাকতে গেলে দুষ্কৃতীরা ওকে শেষ করে পালাতে পারবে। কেউ নাগালও পাবে না ওদের। তাই বুদ্ধিমানের মতো বলল, কোথায় যেতে হবে?
যেখানে আমরা নিয়ে যাব।
আমাকে নিয়ে যাবার দরকারটাই বা কী? তোমরা যদি আমাকে মারবার জন্যই এসে থাক তা হলে মেরে ফেলো। অযথা অপহরণের ঝুঁকি নিচ্ছ কেন?
ওরা হাসল। হেসে বলল, তোমাকে মারব কি মারব না সেটা ঠিক করব পরে। আগে তোমার বাবার সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়া হোক। তোমার বাবাকে মোচড় দিয়ে কোনও মালকড়ি আদায় করতে পারি কি না দেখি। তবে তো।
এই যদি তোমাদের মতলব তা হলে এতদূর আসতে গেলে কেন তোমরা? এটা তো পাড়াতেই হতে পারত।
পারত। তবে তখন আমাদের ওইরকম কোনও পরিকল্পনা ছিল না। ঘটনাচক্রে এইরকম করতে বাধ্য হচ্ছি। তা যাকগে, এখন এসব কথা নয়। আগে তোমাকে কোনও একটা জায়গায় লুকিয়ে রাখি। তারপর সব ঠিক করব। পুলিশ খুব খোঁজাখুঁজি করছে আমাদের। সন্দীপটা বিশ্বাসঘাতকতা করল তাই। না হলে পুলিশেও আমাদের ধরত না। তোমাকেও সাবাড় করে দিতুম বিলাসপুরে।
কথা বলতে বলতে ওরা জঙ্গলের পথধরে খানিকটা এগোবার পর একটা পাকা রাস্তা দেখতে পেল। পথটি নির্জন, কিন্তু এই পথে মোটর বাস যাতায়াত করে। একজন এইখানে একটি পাহাড়ের বড় পাথরের আড়ালে চাঁদুকে নিয়ে লুকিয়ে রইল। আর একজন অনেক চেষ্টার পর একটা ভ্যানগাড়িকে হাত দেখিয়ে থামাল। এতে কিছু প্রসাধন সামগ্রী যাচ্ছিল। সেই ভ্যানে ওকে উঠিয়ে একজন ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে বলল, বুলানারা।
ড্রাইভার কঠিন গলায় বলল, উধার হম নেহি যায়েঙ্গে।
লোকটি এবার একটা রিভলভার বার করে ড্রাইভারের ঘাড়ের কাছে ধরতেই গাড়িতে স্টার্ট দিল ড্রাইভার।
বুলানারা নাম শুনেই চমকে উঠেছিল চাঁদু। ও তো সেখানেই যাচ্ছিল। কিন্তু এইভাবে এত সহজে যে সে সেখানে পৌঁছতে পারবে তা ভাবতেও পারেনি। শয়তান রকি গোলাপকে সেখানেই তো নিয়ে গিয়ে রেখেছে। গোলাপের সঙ্গে আর একবার দেখা হবে এই আশাতেই ওর বুকটা ভরে উঠল। কিন্তু রকির সঙ্গে এই লোকদুটোর সম্পর্ক কী? এরা তো বাঙালি। থাকে হাওড়া অথবা কলকাতায় কিম্বা তারই আশেপাশে কোনও শহরতলিতে। অথচ এই মেকল পর্বতের ঘন অরণ্যের সঙ্গে এদের যোগসূত্র কীসের?
বেশ কিছুটা পথ যাবার পর এক জায়গায় ভ্যানটাকে থামাল ওরা। তারপর যা করল তা যেমনই বর্বরোচিত, তেমনই অমানুষিক। ওরা ভ্যান থেকে নেমেই গায়ের জোরে ভ্যানটাকে পাহাড়ের খাদের দিকে ঠেলে দিল। প্রাণভয়ে চিৎকার করে উঠল ড্রাইভার। কিন্তু কে শোনে তার আর্তনাদ। ভ্যানটা গড়িয়ে পড়ল খাদে। সব শেষ।
চাঁদু ভয়ে কাঠ হয়ে গেল।
ওরা চাঁদুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ভয় কী! এরকম আমরা অনেক করেছি। ওটাকে না-মারলে ও গিয়ে পুলিশে খবর দিত। তখন বিপদের আর শেষ থাকত না। তাই শত্রুর শেষ আগেই করে দিলাম।
ওরা ওকে বনপথ ধরে এক জায়গায় একটি পুরনো বাড়ির কাছে নিয়ে এল।
বাড়িটাকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে একতলা। কিন্তু ভেতরে ঢোকার মুখেই কার্পেটের নীচে যে কবজা আঁটা কাঠের ডালাটা আছে, সেটাকে তুলতেই দেখা গেল নীচে নামার একটা সিঁড়ি আছে। ওরা ওকে সেইখানে নিয়ে এসে বলল, যা। নীচে যা।
চাঁদু কী করবে কিছুই ভেবে না পেয়ে নীচে নামল। বেশ কয়েক ধাপ নামার পরে দেখল নীচের তলায় মুখোমুখি দু'-তিনটি ঘর। একজন পাহাড়ি সেখানে একটি ঘরের কাছে টুল পেতে বসে আছে। ওকে দেখেই এগিয়ে এসে বলল, আও দোস্ত। বলে একটা ঘরের শিকল খুলে দরজাটা ফাঁক করেই এক ধাক্কায় ওকে ঘরের ভেতর ঠেলে দিল।
সেই ধাক্কার টাল সামলাতে পারল না চাঁদু। একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ল গিয়ে ঘরের মেঝেয়। একে মাথার ওই অবস্থা, তার ওপরে ওইভাবে পড়ে যাওয়া। চোখে যেন সর্ষে ফুল দেখল। কী ভাগ্যে মাথাটায় লাগেনি। সেই ঘরে আর একজন যে ছিল তাকে দেখেই চিনতে পারল চাঁদু। সেই লোক। সেই তৃতীয় ব্যক্তি। বলল, এ কী! আপনি এখানে?
তোর জন্যই তো এখানে আসতে হল আমাকে। কেন?
বাঃ রে। তোকে বাঁচাতে গিয়েই তো এদের হাতে
বন্দি হলুম। আপনি বন্দি?
দেখছিস না হাতদুটো পিছনদিকে মুড়ে বাঁধা।
তা হলে কেন আপনি আমাকে বাঁচাতে গেলেন?
ভুল করলাম। আমার কথা না শুনে তুইও ভুল করলি। এখন তুই, আমি, জুলি তিনজনেই মরব।
জুলি! জুলি কোথায়?
সে আছে, পরে সব বলব। তোকে আমি কত করে বললাম, তুই দূরে কোথাও পালিয়ে যা। কিন্তু কেন একটা মেয়ের পাল্লায় পড়ে এখানে আসতে গেলি? তারপর থানা-পুলিশ করে এমন কাণ্ড করলি যে আমার সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। তোর ওই আততায়ীরা আমারও শত্রু। ওদের মারব বলে এমন ফাঁদ পেতেছিলাম যে পুলিশের চালে নষ্ট হয়ে গেল সব। ওরা এমনই শয়তান যে ওদের না মেরে ধরে রাখা যায় না। হলও তাই। ধরা পড়া মাত্রই ওরা রকির কারসাব্জিতে ফসকে পালাল। ইতিমধ্যে পুলিশের হইচইতে আমরা সবাই জেনে গেছি অমরকণ্টকের সার্কিট হাউসে উঠেছিস তোরা। রকির তিন সঙ্গী তোদের কপিলধারায় আটকাতে গেলে তোরা তাদের রীতিমতো ঘায়েল করেছিস। কিন্তু তারপরও মেয়েটা ওদের খপ্পর থেকে রেহাই পেল না। তুইও ধরা পড়লি।
অনুপপুর হাসপাতাল থেকে ওরা তোকে নিয়ে এল কী করে?
চাঁদু তখন আগাগোড়া সব বলল তারপর বলল, ওরা একজন সন্দীপের নাম করছিল। আপনিই কি সন্দীপবাবু?
বাবুটাবু কিছু নই। সন্দীপদা বলবি।
আচ্ছা, গোলাপকে ওরা কোথায় রেখেছে? জুলি কোথায়?
গোলাপ কে?
আমার সঙ্গের মেয়েটি।
ওর কথা বলতে পারব না। তবে জুলিকে আমি চম্পায় লুকিয়ে রেখেছি। চম্পা! সেটা কোথায়?
বিলাসপুরের কাছে। চম্পার ওপর দিয়েই তো এলি।
ও, হ্যাঁ। মনে পড়েছে।
মনে না পড়াটাই স্বাভাবিক। ভোরে ট্রেনটা থেমেছিল। তখন হয়তো ঘুমোচ্ছিলি।
চাঁদু বলল, সন্দীপদা, আমার সব কেমন ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে। কী থেকে যে কী হল। কোন রহস্যের জালে কীভাবে জড়িয়ে পড়লাম। কিছুই বুঝতে পারছি না। কোথায় ছিলাম আমরা। কোথায় এলাম। কোথায় আমাদের হাওড়া শহর, আর কোথায় এই অমরকণ্টকের মেকল পাহাড়।
এর পিছনে অনেক জটিল রহস্য আছে ভাই।
রাজুর খুন হওয়া, জুলির হারিয়ে যাওয়া, সবই তো রহস্যময়। তা ছাড়া আমি তো কারও কিছুই করিনি। তবু কেন ওরা আমাকে বাঁচতে দিতে চায় না? আপনি তো আমাকে চোনেন না, আমিও আপনাকে চিনি না। আপনি যেসব জায়গায় আমাকে পালাতে বললেন, সেখানে পালালে আমার কোনও বিপদ হত না। শুধু আমার কেন, গোলাপেরও হত না কিছু। কী সুন্দর ফুলের মতো মেয়েটা।
ওরা দুষ্কৃতী। ওদের কাছে ফুলের পাপড়ি ঝরানোও যা, একটা মেয়েকে অপহরণ করে লোপাট করে দেওয়াও তাই। ভাগ্যে জুলিটাকে আমার কাছে রাখিনি। ওকে ওরা হন্যে হয়ে খুঁজছে। এখন যেভাবেই হোক এখান থেকে পালাতে না পারলে আমাদের বাঁচোয়া নেই। জুলিকে বিলাসপুরেই আমি তোর হাতে তুলে দিতে পারতাম। কিন্তু তখন তোরই জীবন বিপন্ন ছিল।
এখন কি এখান থেকে পালানো যায় না?
না। বুলানারার এই বন্দি গুহায় একবার কেউ এসে হাজির হলে মৃত্যুই তার একমাত্র মুক্তি। তবু মরবার আগে মানুষ একবার অন্তত বাঁচবার চেষ্টা করে। আমরাও করব। আর এও বলে রাখি, এখান থেকে পালাবার একমাত্র পথ কিন্তু, যে-পথে এলি সেই দিকেই। বাঁদিকের পথ বিপজ্জনক। ও পথে অবধারিত মৃত্যু।
ওইটাই প্রকৃত গুহামুখ। কিন্তু এই গুহামুখের নীচেই প্রায় সাতশো থেকে হাজার ফুট গভীর খাদ। গুহা থেকে বেরোবার কোনও পথ নেই। অর্থাৎ একটা দেওয়ালের মতো খাড়াই চাঁছা পাহাড়ের গায়ে এই গুহা। গুহার ভেতর থেকে বাইরের প্রকৃতি দেখা যায়। কিন্তু বেরোতে গেলেই শেষ। আর গুহামুখ এমনই পিচ্ছিল যে সেখানে যাবার আগেই শ্যাওলায় হড়কে একবারে মোক্ষধাম। তা হলে?
তা হলে আর কী? এখন চেষ্টা করে দেখ দেখি আমার হাতকড়াটা কোনওরকমে খুলতে পারিস কি না।
চাঁদু অনেক চেষ্টা করল সে দুটো খোলবার। কিন্তু পারল না। বলল, আমার সাধ্যের বাইরে। কিন্তু এই হাতকড়া তো পুলিশের লোকেরা আসামিদের বন্দি করবার জন্যে ব্যবহার করে। ওরা পেল কোথায়?
তা হলেই বুঝতে পারছিস তো লকআপ থেকে শংকর আর অর্জুনের বেরিয়ে আসাটা অত সহজ কী করে হয়েছিল?
শংকর আর অর্জুন!
তোকে যারা এখানে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু তুমি ওদের সবাইকে কী করে
চিনলে সন্দীপদা?
সে সব অনেক কথা। আর হয়তো বলবার সময় পাব না! এইবেলা বলে রাখি। বলেও লাভ হবে না। তবু কোনওরকমে যদি এদের খপ্পর থেকে পালাতে পারিস তা হলে হয়তো কাজে লাগবে। তবে আমাকে ওরা মারবেই। রকি এলেই মরতে হবে আমাকে। ও যে রকম নির্দেশ দেবে সেইভাবেই মারবে। কী ভয়ংকর পৈশাচিক মৃত্যু আমার জন্যে অপেক্ষা করছে তা কে জানে?
চাঁদু সবকিছু শোনবার আশায় অধীর আগ্রহে সন্দীপের মুখের দিকে চেয়ে রইল। এই ঘনঘোর রহস্যের অন্ধকারে সন্দীপদা নতুন কোনও আলোকপাত হয়তো করতে পারবে না, কিন্তু অতীতের তমসা তো দূর করতে পারবে।
এই বন্দি গুহায় চাঁদু অনুভব করল এখানে চারদিকেই মৃত্যুর শীতলতা। বেলা এখন কত তা কে জানে? খিদেও পেয়েছে খুব। লছমির মুখে বুলানারার কথা শুনে ও মনে মনে বুলানারা সম্বন্ধে আলাদা একটা ছবিই এঁকে ফেলেছিল। এখন এখানে এসে বুঝল, কল্পনার সঙ্গে এই বাস্তব সম্পূর্ণ ভিন্ন। বুলানারা একটা পাতালপুরী বা জ্যান্ত মানুষের কবরখানা ছাড়া কিছুই নয়। এখানে দয়া নেই, মায়া নেই, করুণা নেই, কিছুই নেই। আছে শুধু নির্মম নিষ্ঠুর নিয়তির হাতছানি। নেহাতই দুর্ভাগ্য না হলে এখানে কেউ এসে পৌঁছয় না।
তবু এই মৃত্যুপুরীতেই জুলির খবর পাওয়া গেল। মেয়েটা জীবিত কি মৃত তা নিয়ে ঘোর সংশয় ছিল ওর মনে। এখন কোনওরকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারলে, জুলিকে নিয়েই ফিরে যাবে ওর মায়ের কাছে। কিন্তু গোলাপ! গোলাপের কী হবে? সে কোথায়? সে কি এখানে এই বুলানারাতেই আছে? এই মৃত্যুগুহায়? যদি থাকে তা হলে কোথায়? কোনখানে?
চাঁদু বলল, আমি না হয় বোকার মতো নিজের থেকেই ধরা দিয়েছি এদের হাতে। কিন্তু তোমাকে এরা ধরল কীভাবে?
সে অনেক কথা। শোন তবে।
সন্দীপ বলতে লাগল, আমার নাম সন্দীপ সরকার। আমি শালিমারের কাছে ভড়পার রোডে থাকি। শালিমারে রেলের গোডাউনে গুন্ডাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ওয়াগন ভাঙার কাজ করি। বিলাসপুর, কাটনি, ঝাড়সুগড়া প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় মাঝে মধ্যে রেললাইনের ফিস প্লেট সরিয়ে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটাই। আগে তোর বাবা তারাপদবাবু আর কেষ্ট মিত্তির ছিলেন আমাদের লিডার। তোদের ওই যে বিশাল বাড়িটা। কেষ্ট মিত্তিরের ওই যে ফ্ল্যাট বাড়িগুলো সব ওই পাপের টাকায়।
সন্দীপদা!
উত্তেজিত হোস না। তুই যে এত বড়টা হয়েছিস, লেখাপড়া শিখেছিস, এই যে ভাল ভাল পোশাক পরছিস সবই কিন্তু ওই পাপের টাকায়। অসৎপথে উপার্জিত অর্থে প্রতিপালিত হওয়া একজন হলি তুই বা তোদের সবাই। তা যাক গে। তোর আর দোষ কী বল? তবে একটা কথা, তুই যেন তোর বাবার মতো হোস না।
তুমি যা বলছ তা সত্যি?
মৃত্যু আসন্ন জেনেও কেউ কি মিথ্যে বলে?
তারপর?
তুই যখন খুব ছোট, তখন আমি কতবার তোদের বাড়িতে গেছি। তোকে কোলে করে আদর করেছি। তোর ওপর আমার মায়া পড়ে গিয়েছিল।
সেইজন্য সেদিন বিলাসপুরে নদীর ধারে তোমাকে দেখার সময় মনে হয়েছিল তুমি আমার কত চেনা। কতবার যেন দেখেছি। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না।
এখনও নিশ্চয়ই মনে পড়েনি। মনে পড়বার কথাও নয়। তা যাক, এই সময় অরিন্দম হাজরা নামে এক ঘুঘু এই লাইনে ভীষণভাবে মাথা চাড়া দেয়। সেই অরিন্দম হাজরারই দুই ছেলে শংকর ও অর্জুন। শয়তানিতে এদের জুড়ি নেই। সবাই বলে শংকরার্জুন। তা সেই অরিন্দম হাজরা শালিমারের তিন নম্বর গেটের কাছে নৃশংসভাবে খুন হন। খুনটা অবশ্য আমরাই করেছিলাম। চক্রান্তের মধ্যমণি ছিলেন তোর বাবা এবং কেষ্ট মিত্তির দু'জনেই। অনেকদিন পরে ব্যাপারটা যখন ফাঁস হয়, কেষ্ট মিত্তির তখন পুরো দায়টা আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজে সাধু সাজেন। এবং শংকর-অর্জুনকে দলে রাখেন।
চাঁদু দু’হাতে মুখ ঢেকে বলল, আমার বাবা খুনি?
অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে। যাই হোক, এর পরে নিজেদের মধ্যে হিস্যা নিয়ে বিবাদ এবং অবিশ্বাস দেখা দেওয়ায় বা লাইনে ক্রমাগত নতুন লোকের আমদানি হওয়ার ফলে আমাদের দলটা পুরোপুরি ভেঙে যায়। তোর বাবা এখন সম্পূর্ণ অন্য ধরনের মানুষ হয়ে গেছেন। অর্থ প্রতিপত্তি কোনও কিছুরই অভাব নেই তাঁর। কেষ্ট মিত্তিরও এখন এক ঝানু ব্যবসাদার। আর আমি তো চুনোপুঁটি। মাঝে মধ্যে খারাপ কাজ একটু আধটু করলেও মূলত এখন আমি কোল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার কাছে একটা ছোট্ট কারখানা করেছি। সম্প্রতি এইখানে বহিরাগত এক অত্যাচারী গুন্ডা এই পাহাড়-জঙ্গলে বেশ পাকাপাকিভাবে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। জনা কয়েক লোককে নিয়ে সে ওয়াগন ভাঙা থেকে শুরু করে ড্রাগের ব্যবসা পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে ছোট বড় মেয়ে দেখলেই চুরি করে পাচার করছে অন্য শহরে। আমি রকির দলেও কিছুদিন কাজ করেছি। তাই ওর সবকিছু এত ভাল করে বলতে পারলাম।
ওর দল তুমি ছেড়ে দিলে কেন?
একটাই মাত্র কারণে। সেটা হল মেয়েচুরি। ওকে আমি অনেক বারণ করেছি, কিন্তু ও শোনেনি। সেই নিয়ে ওর সঙ্গে আমার দারুণ মতভেদ। পালটা দল আমারও আছে। আমি বেশ কিছুদিন ধরেই ওকে এই পথ থেকে সরিয়ে দেবার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু মুশকিল হল কী, ওরই দু’–একজন লোক যে ওর স্পাই হয়ে আমার দলে ভিড়ে কাজ করছিল তা আমি ভাবিনি। না হলে আমি হচ্ছি ফাঁকা মাঠের বেড়াল। আমার হাতে বেড়ি দেবে এমন কেউ ছিল না। অর্থাৎ তোমার দলের লোকই তোমাকে ফাঁসাল!
ঠিক তাই।
কিন্তু শংকর ও অর্জুনের সঙ্গে রকির সম্পর্ক কী?
স্মাগলিং-এর। ওরা দু'জনেই এখন ওর দলের লোক। পুলিশ যদি না আসত তা হলে ওরা দু'জনেই খুন হত আমার হাতে। শুধু তোকে সতর্ক করতে গিয়েই সব চাল ভেস্তে গেল। উলটে আমিই ওদের প্যাঁচে জড়িয়ে পড়লাম।
চাঁদু সব কিছু শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। বলল, বুঝেছি। এই কারণেই বাবা বাড়ি আসার ব্যাপারে প্রথমে প্রচণ্ড আপত্তি জানিয়েছিলেন। উনি চাননি এই বেল্টে আমি কখনও আসি।
ঠিক তাই।
পরে অবশ্য ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উনি আমাকে এখানেই পাঠান। কেন না তিনি হয়তো ভেবেছিলেন কেষ্ট মিত্তিরের কালো হাত এত দূরে পৌঁছবে না। এবং আমাকেও ফোনে সতর্ক করে বলেছিলেন, ছেলেটাকে একটু দেখিস। স্ট্রেঞ্জ! বাবা জানতেন তুমি এখানে আছ?
না হলে আমি জানলাম কী করে তুই এখানে আসছিস? শংকর আর অর্জুন যে তোকে খুন করবার জন্যে এখানে আসছে বা আসতে পারে, সে খবরও তোর বাবার কাছ থেকেই পাই?
চাঁদু বলল, সন্দীপদা! আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না। আমার মরে যাওয়াই ভাল।
তুই কি বাঁচবি? মরতে তোকে হবেই। আমাকেও। রকি এলে আমাদের দু’জনকেই ওই গুহামুখের কাছ থেকে খাদের ভেতর ফেলে দেবে। চাঁদু শিউরে উঠল।
সন্দীপ বলল, কীরে ! মরবার নাম শুনে ভয় পেলি? অথচ একটু আগেই তো মরতে চাইছিলি তুই?
চাইছিলাম। কিন্তু এইরকম মৃত্যুকে চাইছিলাম না।
মরণ সুমনোহর বেশে সবার জীবনে আসে না রে। এরপর দীর্ঘ নীরবতা।
চাঁদু বলল, সব শুনলাম। সব বুঝলাম। এখন বলো জুলিকে তুমি পেলে কোথায়?
হ্যাঁ, এবার জুলির কথাই বলি। সেই অভিশপ্ত দিনটিতে ফিরে যাওয়া যাক। জুলি আমাকে বলেছে তুই নাকি ওকে টাকা দিয়ে পাঠিয়েছিলি মোড়ের মাথার একটা দোকান থেকে কচুরি কিনে আনতে।
হ্যা। জুলি ঠিকই বলেছে। আমিই পাঠিয়েছিলাম ওকে।
বেচারি জুলি। নিষ্পাপ মেয়েটি যখন মোড়ের মাথায় এল ঠিক তখনই...। এমন সময় বাইরে মস মস শব্দ।
সন্দীপ চুপ করে গেল। কে বা কারা যেন আসছে। চাঁদুও সভয়ে পিছিয়ে এল দরজার কাছে।
ঘরের শিকল খুলে ভেতরে ঢুকল শংকর আর অর্জুন। ওরা এসে সন্দীপের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, তা হলে সন্দীপবাবু! আমাদের মারতে গিয়ে তুমি নিজেই এই মরণফাঁদে ধরা পড়লে শেষকালে? যাক, ভালই হয়েছে। এখন আমাদের কোনও শত্রু নেই। এবার বলো তো, সেই মেয়েটাকে কোথায় রেখেছ? সন্দীপ হেসে বলল, লাভ কী তাতে? বললেও মরব। না বললেও মরব।
মরবে তো নিশ্চয়ই। এই যে কেউটের বাচ্চাটা। এও তো মরবে। একে টোপ দিয়েই তো এর বাবাকে চারে ফেলব। এর বাবা লোকটা নিশ্চয়ই আমাদের খুন করবার জন্য মদত দিয়েছিল তোমাকে? কেষ্ট মিত্তিরের মুখে সব শুনেছি আমরা। জেনে রেখো বাবার হত্যাকারীদের কিন্তু আমরা সহজে ছাড়ব না। সেই হত্যার বদলা আমরা হত্যা দিয়েই নেব। এতদিন ওত পেতেছিলাম। এবার কাজ শুরু করেছি।
সন্দীপ হোঃ হোঃ করে হেসে উঠে বলল, এতই যদি বাবার ওপর দরদ তোমাদের, এতই যদি আদর্শের জোর, তা হলে যে কেষ্ট মিত্তিরের হয়ে এতদিন কাজ করলে সেই কেষ্ট মিত্তিরও তো তাদেরই একজন।
সেটা অবশ্য আগে জানতে পারিনি। যেদিন পারলাম সেদিন থেকেই চেষ্টা করতে লাগলাম ওর ক্ষতি করবার। শুধু রকির দলে জড়িয়ে পড়ায় আর পুলিশের তাড়া খেয়ে পালিয়ে বেড়ানোর জন্যই এতদিন তা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই যে মুহূর্তে সুযোগ পেলাম সেই মুহূর্তেই সরিয়ে দিলাম ছেলেটাকে।
তোমরাই তা হলে রাজুর হত্যাকারী?
হ্যাঁ। এবার পালা কেষ্ট মিত্তিরের। তবে এখনও ওর সময় হয়নি। ওকে তিল তির করে শোষণ করে একেবারে ছিবড়ে করে দিয়ে তবেই মারব। অবশ্যই ওর মরণও হবে এই মরণগুহায়।
চমৎকার পরিকল্পনা। কিন্তু এমন আদর্শবাদী যুবক হয়ে তোমাদের বোনের বয়সি একটি নিষ্পাপ কিশোরীর নামে খুনের বদনামটা চাপিয়ে দিতে বিবেকে বাধল না?
বাঃ রে। আমরা কেন বদনাম দেব? পুলিশ দিয়েছে। খবরের কাগজ দিয়েছে। রাজুর বন্ধুরা মেয়েটিকে ওর সঙ্গে যেতে দেখেছে। দোকানদার দেখেছে, আরে! মেয়েটাকে তো আমরা খুন করছি না। হোক না মেয়েটা দাগি। কী যায় আসে তাতে? ও তো এখন আমাদের মূলধন। কিন্তু তুমি আমাদের মুখের গ্রাম কেড়ে নিলে কেন?
তোমরা তো জান ভাই, আমার দুর্বলতাটা কোথায়? আমার মা যখন আমাদের নিয়ে কলকাতার ফুটপাথে বড়লোকের গাড়ি বারান্দার নীচে রাত কাটাতেন, তখন এক গভীর রাতে আমার দশ বছরের আদরের ফুটফুটে বোনটাকে কখন কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেল। সেই শোকে মা আমার হাওড়ার ব্রিজ থেকে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিলেন। তাই কোনও মেয়ের গায়ে কেউ হাত দিলে বা মেয়েচুরির কাজ করলে আমি তাকে ক্ষমা করতে পারি না।
ঠিক তাই কি?
না হলে তোমাদের কারও সঙ্গে অন্য কোনও ব্যাপারে আমার গরমিল কখনও হয়েছে। এই রকির সঙ্গেও আমার বিবাদ তো সেই নিয়ে। আজ আমি অসহায়। আমি বন্দি। ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যুর প্রহর গুণছি। কিন্তু একবার তোমরা ভেবে দেখো তো, কেন তোমরা আমাকে মারতে এসেছ? কেন চাইছ এই অসহায় নির্দোষ ছেলেটাকে মেরে ফেলতে? বাবার হত্যার বদলা নিতে। এই তো? এখন আমিও যদি আমার বোনের অপহরণকারীদের না-পেয়ে ওই ধরনের কাজ যারা করে তাদের বিরোধিতা করি তা হলে কী অন্যায়টা করেছি? আমার আপত্তি তো শুধু ওই কাজটিতে। এর বাইরে তো আমরা সবাই এক। আমাদের সবারই তো একই পরিচয়— ওয়াগন ব্রেকার। আমরা সবাই তো একই সূত্রে গাঁথা এক-একটি ক্রিমিনাল। তাই না?
শংকর আর অর্জুন চুপ করে রইল।
সন্দীপ আবার বলল, এখনও সময় আছে ভাই, রকিকে তোমরা বোঝাও। এই সর্বনাশা মেয়েচুরির খেলা ও যেন বন্ধ করে।
অর্জুন বলল, ঠিক আছে। এতসব ব্যাপার আমরা জানতাম না। মেয়েচুরির কাজে ঝক্কি অনেক। টাকাও অনেক। ও কাজ আর করব না। এখন তোমাকে আমরা মুক্তি দিতে পারি। কিন্তু একটি মাত্র শর্তে।
রকির হাতে মর্মান্তিক মৃত্যু আমি কামনা করি না। এখনও আমি বাঁচতে চাই। মুক্তির বিনিময়ে আমি যে কোনও শর্তে রাজি।
ওই জুলি মেয়েটার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। ও কখনও ওর মায়ের কাছে ফিরে যাবে না। কেন না ও ফিরে গেলে পুলিশের জেরার মুখে যদি সব কথা বলে দেয়, তা হলে কিন্তু খুনের দায়ে ধরা পড়ব আমরা। তার চেয়ে মেয়েটা তোমার কাছেই থাক। তোমার হারানো বোনের অভাব পূর্ণ করুক।
সন্দীপ বলল, ভাল কথাই বলেছ। তবে এও জেনো মেয়েটা বললেই কী, না বললেই কী পুলিশের খাতা থেকে আমাদের ব্ল্যাক লিস্টের নাম তো কেউ মুছে দিতে পারবে না। তা ছাড়া খুন তো আরও হবে। কেষ্ট মিত্তিরের জন্য একটা বুলেট খরচা করতে হবে না? তোমরা ওর ছেলেকে মেরেছ। আমি মারব ওকে। বিশ্বাসঘাতক শয়তান। তোমাদের বাবার হত্যাকারীদের চক্রে আমিও একজন ছিলাম। কিন্তু আমি তখন সাধারণ একজন কর্মী মাত্র। এই ছেলেটির বাবাও ছিলেন নেপথ্যে। কিন্তু আসল ঘুঘু কেষ্ট মিত্তির। ওইসব ঘটনার পর এর বাবা অবশ্য একেবারেই লাইন ছেড়ে সরে যায়। কিন্তু কেষ্ট মিত্তির এখনও সমানে ওর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
শংকর বলল, ছেলেটা তো সব শুনল। ও বলে দেবে না?
না। ওর চোখ দেখছ না? ও নিজেও চাইছে ওর অপরাধী বাপের হাতে হাতকড়া পড়ুক। একটু আগে আমার মুখে ওর পিতৃপরিচয় পেয়ে ও নিজেই মরতে চাইছিল।
শংকর আর অর্জুন দু'জনেই সবিস্ময়ে বলল, তাই নাকি? সত্যিই কী বাপের কী ছেলে। অবশ্য আমরা যখন ওকে চুরি করে আনি, তখন কিন্তু ও একটুও বেগ দেয়নি আমাদের।
শংকর ডাকল, মুশা !
সেই বামনাকৃতি দারোয়ান গোছের লোকটা ভেতরে এল।
অর্জুন বলল, হাতকড়াটা খুলে দাও।
নেহি। রকি হামকো বহুত মারেগা।
শংকর এক ঝটকায় ফেলে দিল মুশাকে।
আর সঙ্গে সঙ্গে দুটো গুলির শব্দ শোনা গেল, ডিস্যুম ডিস্যুম।
শংকর আর অর্জুনের দেহ লুটিয়ে পড়ল মেঝেয়।
দু’জন লোককে সঙ্গে নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে এলেন এক সর্দারজি। চাঁদুকে দেখেই বললেন, ইয়ে লেড়কা কৌন হ্যায়? কাঁহাসে আয়া?
দারোয়ানটা বলল, উয়ো দোনো বদমাশনে লে আয়া।
সর্দারজি মাথার পাগড়ি, চোখের কালো চশমা আর নকল দাড়ি এক টানে খুলে বললেন, বাহার লে যাও। ফিক দো নীচে। যাও, জলদি করো।
চাঁদুর শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা হিমস্রোত নেমে এল। এই কি রকি ! লোকটি ওকে হাত ধরে টেনে আনল ঘরের বাইরে।
চাঁদু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, জল। একটু জল দাও আমাকে।
লোকটির দয়া হল বুঝি। সে হিংস্র চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, হাঁ। মরণে সে পহলে পি লো। বলে পিছন ফিরতেই চাঁদু ওর পায়ের ফাঁকে পা গলিয়ে জোরে একটা টান দিল। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল লোকটা। আর সেই মুহূর্তেই চোখের পলকে বন্দিগৃহের দরজাটা টেনেই তাইতে শিকল আটকে দিল চাঁদু।
ভেতরে যারা ছিল দরজার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। চিৎকার করে বলতে লাগল, খোলো খোলো। দরোয়াজা খোলো। এ মুশা!
আর মুশা। চাঁদু তখন আবার নিজমূর্তি ধরেছে। যে টুলটার ওপর বসে বসে চৌকিদারি করছিল মুশা, সেই টুলটার বাড়ি বেশ ঘা কতক দিয়ে ওর নাকমুখ থেঁতো করে দিল। মুশার যখন আর উঠে দাঁড়াবারও শক্তি রইল না চাঁদু তখন ওর বুকের ওপর চেপে বলল, গোলাপ কোথায়? কোন ঘরে রেখেছিস তাকে?
মুশার কথা বলবারও শক্তি নেই। তবু কোনওরকমে বলল, মুঝে না মালুম।
তুমহারা বস এক লেড়কি কো চুরাকে লে আয়া। ও কাঁহা হ্যায়? মুশার সেই একই উত্তর, মুঝে না মালুম। চাঁদু সেই টুলের বাড়ি ওর মুখের ওপর আরও এক ঘা দিয়ে বলল, এবার মালুম হয়েছে?
নেহি।
ফের এক ঘা দিয়ে বলল, এবার?
আভি হুয়া।
কাঁহা হ্যায় ও।
মুশা বহুকষ্টে আঙুল দেখিয়ে বলল, উ-উ-উধার।
পাশের একটা ঘরে, মানে যে ঘরে মুশা থাকত, সেই ঘরের দরজার শিকল খুলে মুশাকে টেনেহিঁচড়ে ঢোকাল চাঁদু। ওর যদিও আর নড়বার ক্ষমতা নেই, তবু কথায় আছে সাবধানের মার নেই। তাই ওকে ঘরে ঢুকিয়ে ঘরের ভেতর হাতড়ে একটা টচ আর একটা গুপ্তি ছোরা বার করে দরজায় শিকল দিল। শিকল দিয়ে ফিরে আসতে গিয়েও কী ভেবে যেন আবার শিকল খুলে ঘরে ঢুকে একটা তালাচাবি জোগাড় করে সেই বন্দি ঘরে তালা দিল।
ভেতর থেকে আস্ফালন তখনও সমানে চলছে।
চাঁদু বাইরে থেকেই বলল, সন্দীপদা! আমি যে ভাবেই হোক পুলিশ নিয়ে এখানে আসছি। আর কয়েক ঘণ্টা কষ্ট করো তুমি। আমাকে ভুল বুঝো না যেন। সন্দীপ ভেতর থেকেই বলল, কিচ্ছু ভুল বুঝব না। খুব চালাকিটা করেছিস তুই। দরজা খুললে তুইও মরবি, আমিও মরব। মাঝখান থেকে এই পাপীরা পার পেয়ে যাবে। তার চেয়ে তুই বাঁচলে অনেকে বাঁচবে। চম্পার দেবীমন্দিরে পূজারিজির ঘরে জুলিকে রেখেছি। ওকে উদ্ধার করিস। আর এই বাড়ির বাইরের দিকে পিছনের অংশে একটা সিঁড়ি দেখতে পাবি। সেই সিঁড়ির নীচে... ডিস্যুম।
আবার একটা গুলির শব্দে। আর সেই গুলির শব্দের সঙ্গেই সন্দীপের কণ্ঠস্বর নীরব হয়ে গেল।
চাঁদু বলল, সন্দীপদা! কী হল তোমার?
ভেতর থেকে ক্রুদ্ধ কন্ঠস্বর শোনা গেল, দরোয়াজা খোল শয়তানকা বাচ্চা। নেহি তো তেরা ভি অ্যায়শা হাল হোগা।
চাঁদু বলল, দরজা খুললে আমার হাল যে কী হবে তা তো জানি। তাই এ দরজা আমি কখনও খুলছি না।
চাঁদু এক-পা এক-পা করে বাইরে এল এবার। তারপর এদিক সেদিক করে অনেক খুঁজেও সিঁড়ি কোথাও দেখতে পেল না। ও যখন ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে কী করবে ভাবছে তেমন সময় হঠাৎই এক জায়গা থেকে একটা কুকুর ভৌ ভৌ করে
ছুটে আসতেই, ও একটা পাথর কুড়িয়ে ছুড়ে মারল কুকুরটাকে। পাথরটার মোক্ষম ঘা কুকুরের মুখে পড়তেই ‘ভ্যাক’ করে একটা ডাক ছেড়ে পালাল কুকুরটা। আর তখনই চাঁদু দেখতে পেল, ছোট একটা দেড় ফুটের মতো সরু সিঁড়ি একটা কাঠের আগড়ে ঢাকা আছে। সেটা সরিয়ে একটু ঝুঁকে নীচে নামতেই একটা বড়সড় গুহার ভেতরে এসে পড়ল। কিন্তু সেই গুহামুখে জেলখানার মতো মোটা মোটা লোহার গরাদের একটা আটকানো আছে। সেটাও আবার তালা দেওয়া। বেশ ভারী ধরনের মজবুত তালা। ভাগ্যে মুশার ঘর থেকে টর্চটা নিয়েছিল তাই এদিক সেদিক ফেলতেই এক জায়গায় পেরেক ঝোলানো একটা চাবি দেখতে পেল ও। চাবিটা নিয়ে এসে তালা খুলে, তালাটা একপাশে রেখে, চাবিটা পকেটে পুরে নিল। বলা যায় না কেউ যদি দূর থেকে লক্ষ করে থাকে ওকে, তা হলে আবার হয়তো এই তালাতেই বন্দি হবে ও। তালা খুলে ভেতরে ঢুকল চাঁদু। এর ভেতরে শত্রুপক্ষের কেউ নেই। তা বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু বাইরে যদি কেউ থাকে? তাই বেশ কিছুক্ষণ ঘাপটি মেরে বসে রইল। কেউ এসে ওকে আটকাবার চেষ্টা করলেই ও গুপ্তি হোরার ফলা দিয়ে লড়ে যাবে তার সঙ্গে।
কিন্তু না। প্রায় মিনিট দশেক কেটে গেলেও কেউ এল না।
ও তখন টর্চের আলোয় পথ দেখে এক-পা এক-পা করে নীচে নামতে লাগল। ওঃ সে কী ভীষণ অন্ধকার। ভাগ্যে টর্চটা এনেছিল। স্যাঁতস্যাঁতে হিমশীতল অন্ধকারের গুহা। আলো নেই, বাতাস নেই, কিছুই নেই। শুধু ওই লৌহদণ্ডের আটকানোর ফাঁক দিয়ে যেটুকু অক্সিজেন ভেতরে ঢোকে। কী ভয়ংকর! কে বা কারা আবিষ্কার করেছিল এই গুহাটাকে তা কে জানে? সেকালের কোনও রাজা রাজড়া হয়তো। দুষ্ট প্রজাদের ধরে এনে হয়তো বা বন্দি করে রাখত এখানে। নয়তো এটাই ছিল তাদের কোষাগার, এখন দুষ্কৃতীরা এটাকে তাদের কাজে লাগাচ্ছে।
চাঁদু ভয়ে ভয়ে আলতো পায়ে সিঁড়ির নীচে নেমে এল।
এখানটা বেশ প্রশস্ত।
আবার একটা জেলখানার মতো ঘর চোখে পড়ল। সেই ঘরের প্রকাণ্ড লৌহদরজায় তালা দেওয়া। ঘরের ভেতরটা অবশ্য তত অন্ধকার নয়। একটা চিমনি লণ্ঠন জ্বলছে একপাশে। তাতেই ও দেখতে পেল সেই ঘরের এক কোণে দু’ হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে এক সোনার প্রতিমা। এ নিশ্চয়ই গোলাপ। গোলাপ ছাড়া আর কেউ নয়।
চাঁদু ডাকল, গোলাপ।
কে! কে তুমি!
আমি চন্দ্ৰকান্ত।
তুমি ! তুমি এখানে কী করে এলে চাঁদুদা? এ আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? ততক্ষণে চাঁদু পাশের একটি খোপে রাখা চাবি নিয়ে তালাটা খুলে ফেলেছে। আর গোলাপ! সে সবকিছু ভুলে মুক্তির আনন্দে ছুটে এসেই জড়িয়ে ধরল চাঁদুকে। সে কী প্রবল উচ্ছ্বাস। চাঁদুও ওকে যেন একগুচ্ছ রজনীগন্ধার মতো লুফে নিল।
গোলাপ বলল, তুমি কি আমাকে উদ্ধার করবার জন্য এখানে এসেছ? কী করে জানতে পারলে আমি এখানে আছি?
পরে তোমাকে সব বলব। শুধু জেনে রাখো লছমি নামের একটি মেয়ের জন্য।
ভাগ্যিস এলে। না হলে ওরা আমাকে কোথায় পাচার করে দিত কে জানে? চাঁদু বলল, দিলেই হল? ভগবান নেই?
আছে আছে। নিশ্চয়ই আছে। ভগবান আছে বলেই তো তুমি আমার ভগবান হয়ে এখানে এলে। না হলে আমি তো ভাবতেও পারিনি এই অবস্থা থেকে কখনও মুক্তি পাব বলে। দেখছ না সূর্যের আলোও এখানে আসতে ভয় পায়।
চাঁদু বলল, যাক। আর কোনও ভয় নেই। এবার একটা সুখবর শোনো, তোমাকে যারা বন্দি করে রেখেছিল আমি কৌশলে তাদের বন্দি করেছি। আমাকে হত্যা করবার জন্য যারা এগিয়ে এসেছিল তারা দু'জনেই মরেছে। আর জুলিরও সন্ধান পেয়েছি। তুমি আমি দু'জনেই গিয়ে উদ্ধার করব তাকে।
গোলাপ যেন একটু আহত হয়ে বলল, তবে আর কী। এবার নিশ্চয়ই ভুলে যাবে তুমি আমাকে।
চাঁদু হেসে বলল, এই জাল থেকে একবার কেটে বেরোলে জুলিদের বাড়িই আর কখনও যাব না আমি।
সে কী! তা হলে তো আমাদের বাড়িও যাবে না।
চাঁদু হঠাৎ ছল ছল চোখে বলল, আচ্ছা গোলাপ! তুমি তো তোমার বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। আমি যদি তোমার মা-বাবার কাছে বরাবরের জন্য তাঁদের ছেলের মতো থাকতে চাই, তোমার বন্ধু হিসেবে, তাঁরা কি আমাকে রাখবেন না?
তোমার কথার মানেটা আমি ঠিক বুঝলুম না।
আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু এটা নয়।
তোমার বাবা-মা আত্মীয়স্বজন, ঘরবাড়ি সব ছেড়ে তুমি আমাদের বাড়ি কেন থাকবে? পারবে থাকতে?
যদি তোমার মা-বাবা আমাকে থাকতে দেন তা হলে নিশ্চয়ই থাকব। না হলে এই আমাদের শেষ দেখা। আমি কিন্তু আর কখনও ঘরে ফিরব না।
তোমার কী হল তা জানি না। যদি তাই হয় তা হলে জেনো, আমাদের বাড়িতে তোমার অবারিত দ্বার।
চাঁদু গোলাপের একটা হাত ধরে বলল, যদি তুমি আমাকে বন্ধুর মতো ভাবো তা হলে আমি তোমাকে দেখব বোনের মতো।
সেভাবেই বলেই বলল, না। আর দেরি নয়। চলো আমরা অমরকণ্টকে ফিরে যাই। গিয়ে সব কথা সকলকে বলি। তুমিও আমার সব শুনবে।
চাঁদু ও গোলাপ যখন সেই গুহা থেকে বেরিয়ে এল বাইরে তখন প্রচুর পুলিশ। অমরকণ্টকের সেই ইনস্পেক্টর আছেন। লছমি, বিরজু আছে। আর আছেন সিদ্ধিবাবা।
সিদ্ধিবাবা আনন্দে উল্লসিত হয়ে বললেন, ওই ওইতো ছেলেমেয়ে দুটো। লছমিবেটির কথাই তো ঠিক দেখছি।
চাঁদু আর গোলাপ সিদ্ধিবাবাকে প্রণাম করল।
লছমি ছুটে এসে চাঁদুর হাতদুটি ধরে বলল, তুম কাঁহা থে দাদা?
চাঁদু বলল, আমার স্বপ্নের বুলানারায়। কিন্তু তুই সেই যে গেলি, আসতে অত দেরি করলি কেন? তাই তো আমি ওই খারাপ লোকদুটোর পাল্লায় পড়ে গেলাম। মুছে মাফ কর দো।
দিলাম। তবে ওদের পাল্লায় পড়ে আমার খারাপ হয়নি। ভালই হয়েছে।
সিদ্ধিবাবা বললেন, হঠাৎ কীভাবে কী হয়ে গেল আমাকে একটু বুঝিয়ে বলো তো শুনি। আমি তো সকালেই তোমার সঙ্গে দেখা করলাম। তারপর তুমি এখানে এলে কী করে?
চাঁদু সব বলল।
সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল সকলে। সবাই তখন হইহই করে ছুটে চলল সেই বন্দিগুহায়।
চাঁদুর কাছে চাবি ছিল। তাতেই তালা খুলে ভেতরে ঢুকেই টেনে বার করল রকি ও তার সঙ্গীদের। সেই সঙ্গে সন্দীপ, শংকর ও অর্জুনের লাশ। সন্দীপের হাতকড়ার চাবি মুশার কাছে ছিল। ওর পকেট হাতড়ে সেই চাবি বার করে হাতকড়া খোলা হল সন্দীপের। এরপর শুরু হল ঘরে ঘরে হানা দিয়ে তল্লাশি। অর্ধমৃত মুশাকেও অ্যারেস্ট করা হল।
চাঁদ সিদ্ধিবাবাকে বলল, বাবাজি, আপনি কীভাবে জানতে পারলেন আমার খবর?
বাবাজি দেখিয়ে দিলেন লছমিকে।
লছমি যা বলল, তা হল এই— ও তো চাঁদুকে বসিয়ে রেখে বাড়ি চলে গেল। সেখানে ওর ঘরের কাজ সামান্য একটু সেরে কিছু লাড্ডু আর চানা সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসে দেখল চাঁদু নেই। প্রথমটায় ভাবল এদিক সেদিক কোথাও গেছে বুঝি। আবার একবার হাসপাতালেও ফিরে এসে দেখল। কিন্তু কোথায় কে? ও তখন উঁচু একটা গাছের ডালে উঠেই দেখতে পেল দু’জন লোকের সঙ্গে বহু দূরে চাঁদু কোথায় যেন যাচ্ছে। গাছ থেকে নেমে ও যে কী করবে তা ভেবে পেল না। কেন না ও তো চাঁদুর মুখে ওর কথা সব শুনেছে। তাই ও বুঝতে পারল সে নিশ্চয়ই রকির লোকেদের পাল্লায় পড়ে গেছে। ঠিক এই সময়ই এসে পড়েছিল বিরজু। সে এসেছিল চাঁদুকে দেখতে।
লছমি চিনত বিরজুকে। তাই ছুটে গিয়ে ওকে সব কথা বলল। সব শুনেই বিরজু অমরকণ্টককে ফোন করে জানিয়ে দিল সব কথা। অমরকণ্টকও জানাল অনুপপুরকে। বিরজু আর লছমি অনুপপুর পুলিশের গাড়িতে চেপে বুলানারায় এল। সিদ্ধিবাবাও এলেন অমরকণ্টকের দিক থেকে। তিনি যখন ফিরে আসছিলেন ঠিক সেই সময়েই পথে অমরকণ্টকের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে গেলে তিনিও ওদের সঙ্গেই চলে এলেন। সবে ওনারা নেমে কীভাবে কোনদিক দিয়ে তল্লাশি শুরু করবেন ভাবছেন এমন সময়ই চাঁদু ও গোলাপের দেখা পেলেন ওঁরা।
পুলিশের কাজ পুলিশ করতে লাগল। অন্য একটা জিপে সিদ্ধিবাবা সকলকে নিয়ে অমরকণ্টকে ফিরে এলেন।
চাঁদু আর গোলাপ আবার যখন সার্কিট হাউসে ফিরে এল দুপুর তখন গড়িয়ে গেছে। খিদে পেয়েছে দু'জনেরই। লছমি চলে গেছে সিদ্ধিবাবার আশ্রমে। দু’-একটা দিন সেখানে থেকে আবার ও ফিরে যাবে ওর নিজের কাজে, অনুপপুরের হাসপাতালে।
টাকা-পয়সা চাঁদুর কাছে যেমনটি যা ছিল তা ঠিকই আছে। শুধু জিনিসপত্তরগুলোই যা খোয়া গেছে।
চাঁদু বলল, কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছি না তুমি কী করে রকির পাল্লায় পড়লে? গোলাপ বলল, এখনই শুনবে? বড্ড খিদে পেয়েছে কিন্তু। তা হলে চলো। খেতে খেতেই গল্প করা যাবে।
অমরকণ্টকের সব হোটেলেই খাওয়াদাওয়া ভাল। এক এক সময় মনে হয় জায়গাটা কী ভারতের বাইরে? না হলে এই ‘নেই নেই’-এর দেশে এরা এত সব ভাল ভাল খাবার পায় কোত্থেকে?
বেশ তৃপ্তির সঙ্গে খেতে খেতে গোলাপ ওর কথা বলতে লাগল, তুমি তো চলে গেলে অনুপপুরে। আমার মনটা কেমন যেন বিষাদে ভরে উঠল। বেশ তো বন্ধুর মতো ছিলুম দু'জনে। তার ওপর সবাই আমাকে জোর করতে লাগল বিলাসপুরে ফিরে যাবার জন্য। আমি আর কী করি, আমার জিনিসপত্তর আনতে যাবার নাম করে সার্কিট হাউসের টাকা মিটিয়ে মালপত্তর নিয়ে সোজা পালাতে গেলুম কপিলধারার দিকে। ভেবেছিলাম বাবাজির আশ্রমে গিয়ে সব কথা বলে ওইখানে থেকে যাব দু’-একটা দিন। তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত। তারপর সোজা তোমাকে নিয়ে চলে যাব আমাদের বাড়িতে। আসলে কী জানো, বুদ্ধিভ্রম আমারও হয়েছিল। যেমন ধরো, হাওড়া স্টেশনে, হাওড়া শহরে বা তোমার বাড়ির কাছে তোমার বিপদ হলেও ধানবাদে তো নয়। আর ধানবাদে যেতে হলে যে হাওড়ায় আমাদের যেতেই হত তারই বা কী মানে আছে? টাটানগর থেকেও তো আসানসোল হয়ে সব মুকিলের আসান করা যেত।
চাঁদু বলল, তা যেত। তবে ভাগ্যে এখানে এসে পড়েছিলাম, তাই তো শত্রুমুক্ত হলাম। জুলিটারও খবর পেলাম! ওর মায়ের কী অবস্থা বলো তো?
গোলাপ বলল, সত্যি, এই তীর্থভূমির কিন্তু মহাত্ম্য আছে। জাগ্রত অমরেশ্বর, মা নর্মদা, আমাদের কীভাবে রক্ষা করলেন তা ভাবা যায়? মা নর্মদা চিরকুমারী। তাই বুঝি আমার অবমাননা মা সহ্য করলেন না। আর আমার মতো অসহায় যারা, তাদের যারা উৎপীড়ন করে তাদেরও ধরিয়ে দিলেন তোমার আমার হাত দিয়ে।
চাঁদু বলল, আমিও কী আশ্চর্য উপায়ে বেঁচে গেলাম বলো তো? ওই মুশাটা
যদি আমাকে জল খাওয়াতে না গিয়ে সত্যিই ফেলে দিত তা হলে কী করতাম? গোলাপ বলল, আমি কপিলধারার পথে গাছপালার ছায়ায় ছায়ায় আড়ালে লুকিয়ে যখন খানিকটা এসেছি, তখনই হঠাৎ কয়েকজন লোক আমাকে পিছনদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে একটা জিপে তুলে নিল। তারপর নাকে একটা ক্লোরোফর্ম দেওয়া রুমাল এমনভাবে চেপে ধরল যার ফলে আর কিছুই আমার মনে নেই। জ্ঞান যখন ফিরল, তখন আমি ওই অভিশপ্ত গুহায়। যে গুহায় পাষাণে মাথা খুঁড়ে অনেক মেয়েই একটু আলোর প্রত্যাশা করেছে। অথবা ফুরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে কোথাও কোনও দূর জনপদে।
খাওয়াদাওয়ার পর ওরা পায়ে পায়ে নর্মদা মায়ের মন্দিরের কাছে এল। আজ আর আরতি না দেখে সার্কিট হাউসে ফেরা নয়। রাতের খাওয়ার তো প্রয়োজন নেই। খুব বেশি হলে ঘণ্টাখানেক বাদে হয়তো এক কাপ চা খেতে পারে।
মন্দিরের গায়ে নর্মদাকুণ্ডের সিঁড়িতে বসে গোলাপ বলল, এবার তোমার কথা বলো। এরই মধ্যে এমন কী হল তোমার যে তুমি আর বাড়িতেই ফিরতে চাও না?
চাঁদু বলল, হ্যাঁ বলব। সব কথা খুলে বলব তোমাকে। তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবার আগে আমার পরিচয়টা তোমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাওয়া দরকার। হয়তো সব শুনলে তুমি এখুনি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। তা যাও। তবু আত্মপরিচয় আমি কিছুতেই গোপন করব না।
কী সব আজেবাজে বকছ তুমি?
শোনো গোলাপ, তোমার সঙ্গে পরিচয় হবার আগে আমি নিজেও কিন্তু জানতাম না আমি কে।
কে তুমি?
একজন কুখ্যাত সমাজবিরোধী, ওয়াগন ব্রেকার এবং এক খুনি বেড়ালতপস্বীর ছেলে আমি।
গোলাপ হেসে বলল, এইসব কে মাথায় ঢোকাল তোমার?
চাঁদু তখন লছমির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসার পর থেকে সমস্ত ঘটনা আগাগোড়া বলল গোলাপকে।
সব শুনে গোলাপ বলল, হ্যাঁ, এইসব শুনে সত্যিই নিজের ওপর ধারণাটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু চাঁদুদা, তুমি তো শিক্ষিত ছেলে। বাল্মীকির উপাখ্যান পড়নি? সেই যে ‘চ্যবন ঋষির পুত্র নাম রত্নাকর।' মনে আছে, দস্যু রত্নাকর যখন তার পাপের ভাগ নেবার জন্য তার বাবা-মা-স্ত্রী প্রত্যেকের কাছে গেল তখনকার কথা? কী বলেছিলেন তাঁরা? বলেছিলেন, তুমি পুত্র, তুমি স্বামী। আমাদের প্রতিপালন করবার দায়িত্ব তোমার। তুমি সৎপথে উপার্জন করে আমাদের পালন করবে কি দস্যুবৃত্তি করবে তা আমরা কি জানি? আমরা তোমার কর্তব্যের সুযোগ নেব। কিন্তু পাপের ভাগ তো নেব না। আমাদের কি দোষ? তেমনি বাবা-মা তোমাকে জন্ম দিয়েছেন, পালন করেছেন। এই যথেষ্ট। তাঁরা কীভাবে কী করছেন সে দেখবার অধিকার তো তোমার নেই। এখন তুমি বড় হয়েছ, বুঝতে শিখেছ। এখন যদি তুমি সৎ আদর্শে অনুপ্রাণিত হও তবে ওদের মন্দ যা কিছু তার কিছুই তুমি গ্রহণ করো না। দৈত্যকুলেও প্রহ্লাদ জন্মায়। তুমি যদি সৎভাবে জীবন কাটাতে চাও নিশ্চয়ই আমার সহযোগিতা পাবে। তুমি আমাদের কাছেই থাকবে। তোমার বাবা যদি নিজের ভুল বুঝতে পেরে থাকেন, তিনি যদি তাঁর মত এবং পথ পরিবর্তন করে থাকেন, তবে নিশ্চয়ই তোমার সাধুবাদ জানানো উচিত তাঁকে। তাই রাগের মাথায় এমন কিছু করো না যাতে তিনি দুঃখ পান বা অপমান বোধ করেন।
কথা বলতে বলতে কখন যে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়েছে তা কারও খেয়ালই নেই। শীত পাচ্ছে খুব। আরতি শুরু হচ্ছে। মন্দিরে কাঁসর ঘণ্টা বেজেও উঠল। ওরা ভেতরে ঢুকল।
আরতির প্রসাদ নিয়ে যখন ওরা বাইরে এল তখন হঠাৎ বিরজুর সঙ্গে দেখা। বিরজু বলল, কাঁহা গয়ে থা দোস্ত? তোমাদের ছুঁড়তে ছুঁড়তে হাম তো হয়রান হো গিয়া। চলো থানায় চলো।
চাঁদু বলল, আবার থানা! কী ব্যাপার?
আরে চলো না ইয়ার।
ওরা তিনজনেই থানায় এল।
পুলিশ ইনস্পেক্টর ওদের সস্নেহে বসতে বলে বললেন, দেখো তো ও সামান তুমহারা কি নেহি?
গোলাপ ও চাঁদু দু'জনেই বলল, হ্যাঁ। এই তো আমাদের সবকিছু। কোথায় পেলেন?
বিরজু বলল, ওগুলো সাইকেলে চেপে খুঁজে আমিই উদ্ধার করেছি। ইনাম মিলেগা তো?
গোলাপ বলল, জরুর।
পুলিশ এবার ধীরে সুস্থে ওদের দু'জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সবকিছু জেনে নিল। এমনকী জুলি যে হত্যাকারী নয় সে খবরও পেয়ে গেল চাঁদুর মুখে। মেয়েটি অপহৃতা। এবং সে চম্পায় আছে জেনে অমরকণ্টক-পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ফোনে জানিয়ে দিল বিলাসপুরকে। বিলাসপুর খবর দিল চম্পাকে। মাত্র কয়েকটা মিনিটের ব্যাপার।
চাঁদু আর গোলাপ পরদিন সকালেই চম্পায় যাবার মন করে ফিরে এল সার্কিট হাউসে। এবার বিশ্রাম।
বিছানায় শোয়া মাত্রই ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়ল দেহটা। সারাটা দিন যে কীভাবে কেটেছে তা ওরাই জানে। একেই অসুস্থ শরীর চাঁদুর। মাথার মধ্যে তাই টিস টিস করতে লাগল। খুব খারাপ লাগল ওর। এ সময় একটু সেবার প্রয়োজন ছিল। অমরকণ্টকে না এসে অনুপপুরেই ফিরে গেলে ভাল করত বোধহয়। হাসপাতালে ওষুধ, নার্সিং দুই-ই পেত।
পরদিন সকালে ঘুম যখন ভাঙল তখন অনেকবেলা হয়ে গেছে। রোদ্দুরে ঝলমল করছে চারদিক। কিন্তু চাঁদুর আর ওঠার ক্ষমতা নেই। সারাটা গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
গোলাপ ছুটে গিয়ে বিরজুকে খবর দিতেই, বিরজু ডাক্তার ডেকে আনল। ওর বাবা-মা এল।
ডাক্তারবাবু সব দেখে শুনে বললেন, ভয়ের কিছু নেই। টিটেনাস দেওয়া আছে। তা ছাড়া অতিরিক্ত পরিশ্রম, ঠান্ডালাগা এবং উৎকণ্ঠার জ্বর এটা। এখন ফুল রেস্ট আর ব্যথা মরার কয়েকটা ক্যাপসুল খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। গোলাপ টাকা দিতে গেলে ডাক্তারবাবু নিলেন না।
বিরজু প্রেসক্রিপসনটা হাতে নিয়ে গোলাপের টাকায় কয়েকটা ক্যাপসুল কিনে এনে দিল।
সিদ্ধিবাবা আর লছমিও এসে হাজির হল একটু পরে।
সার্কিট হাউসের এই ঘরটা ভরে উঠল সকলের আনাগোনায়। এই দূর দেশে চাঁদুর একবারের জন্যও মনে হল না যে সে নিজের বাড়িতে নেই। বিরজুর বাবা কেটলি ভরতি গরম চা এনে খাওয়ালেন সকলকে। লছমি ওদের ঘরটা ঝেড়েমুছে বিছানাটা গুছিয়ে দিল। যেন এখানেও ও ডিউটি করছে।
গোলাপ সিদ্ধিবাবাকে বলল, বাবা! আমাদের যদি আরও দু'-একটা দিন এখানে থাকতে হয় লছমিকে রাখুন না আমাদের কাছে?
সিদ্ধিবাবা বললেন, তা হয় না মা। ও যে লছমি। আর্তের সেবাই ওর ধর্ম। অনুপপুরের হাসপাতালে অনেক রোগী ওর জন্য প্রতীক্ষা করে আছে। ওকে যেতেই হবে মা। আমি ওকে বাসে তুলে দিয়ে আসি।
চাঁদু ওর পকেট থেকে একশোটা টাকা বার করে লছমিকে দিয়ে বলল, তুই আমার বহিন কা মাফিক। এটা রাখ তুই। কিছু কিনে খাস।
সে টাকা কিছুতেই নেবে না লছমি। অবশেষে চাঁদু ও গোলাপের অনুরোধে, সিদ্ধিবাবা অনেক করে বলতে তবেই নিতে রাজি হল।
গোলাপ বলল, ও আর একটা দুটো দিন এখানে থাকলে আমাদের খুব সুবিধে হত। চাঁদুদার এইরকম শরীর খারাপ। তায় আমি একা।
এমন সময় দরজার বাইরে থেকে কে যেন বলল, কে বলল তুমি একা। আমি
আছি না? আমাদের দু’ বোনের সেবায় চাঁদুদা শিগগির ভাল হয়ে উঠবে। কণ্ঠস্বর শুনেই চমকে উঠল চাঁদু। এ কী জুলি! তুই এখানে কী করে এলি?
জুলি তখন নবসাজে সজ্জিতা হয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই মাজা কালো গায়ের রং, ভ্রমরের মতো চোখ, হাসিখুশি মুখ। দেখলেই ভাল লাগে। জুলি ছুটে এসে চাঁদুকে প্রণাম করে ওর পাশে বসে বলল, কেমন আছ চাঁদুদা? মাথা ফাটালে কী করে?
আমি ভালই আছি। দুর্বল শরীরে বেশি উত্তেজনা, তার ওপর কাল আরতি দেখতে গিয়ে ঠান্ডাও লেগেছে। তাই জ্বর হয়েছে একটু। ওষুধ খেয়েছি। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তুই কার সঙ্গে এলি?
জুলি বলল, যে দেবতা আমাকে দানবদের কবল থেকে উদ্ধার করেছিলেন তিনি আমাকে চম্পার মাতৃমন্দিরে রেখেছিলেন। সেখানে মেয়ের মতোই ছিলাম। দেখছ না আমার সাজপোশাক। কী চমৎকার একখানি শাড়ি পরেছি। আমি ওঁদের কাছে দীক্ষা নিয়েছি। তা কাল রাত্তিরবেলা পুলিশ আমাকে সেখান থেকে নিয়ে আসে বিলাসপুরে। তারপর এখানে। তোমার বাবা, গোলাপদির বাবা সবাই এসেছেন। একই সঙ্গে এসেছি আমরা। উঃ কী বিপদ গেল বলো তো? গোলাপ বলল, ওঁরা কোথায়।
থানায় আছেন। আসবেন এখুনি। আমি বিরজুদার সঙ্গে এলাম।
চাঁদু বলল, ওরে বাবা। এর মধ্যেই বিরজুর সঙ্গে দাদা পাতিয়ে ফেলেছিস? বাঃ রে। আমার কত দাদা। তাই তো বোনের কোনও বিপদ হল না। আমার বাড়ির খবর কিছু জান চাঁদুদা?
চাঁদু বলল, কিছুই জানি না রে। আমিও তো ঘর ছাড়া। তবে তোকে হারিয়ে ওদের আর দিন কাটছে না। আমার বাবা, কেষ্ট মিত্তির, সমাজের এই সমস্ত মাথাওয়ালা লোকেরা যতদিন মাথা উঁচু করে থাকবেন ততদিন তোর-আমার মতো অভাগাদের ভাগ্যের আকাশে নিত্যনতুন ধূমকেতু উঠবে।
চাঁদুর কথা শেষ হওয়া মাত্রই তারাপদবাবু ও সোমনাথবাবু ঘরে এলেন। ছোট্টঘরে এত লোক আর ধরে না। সঙ্গে পুলিশের লোক।
তারাপদবাবু বললেন, কেমন আছ তুমি?
চাঁদু কোনও উত্তর না দিয়ে মুখ নামিয়ে নিল। গোলাপ ছুটে গিয়ে ওর বাবার বুকে মাথা রাখল। তারাপদবাবু বললে, আমার কথা তুমি শুনতে পেলে না? তারাপদবাবুর মুখটা পাণ্ডুর হয়ে গেল, কী শুনেছ শুনি?
আপনার সব কথাই আমি সন্দীপদার মুখে শুনেছি।
শালিমারের সেই অন্ধকার দিনগুলোর সব কথাই শুনেছি। যদি অনুমতি দেন তো সবার সামনেই চেঁচিয়ে বলি।
তারাপদবাবু উত্তেজনা দমন করে বললেন, কোথায় সেই পাজি হতচ্ছাড়া শয়তানটা ?
সে একজন সমাজবিরোধীর ছেলের জীবনরক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে।
গোলাপের বাবা সোমনাথবাবু বললেন, এখন এসব আলোচনা থাক। তোমরা যে বেঁচে ফিরেছ এই ঢের।
গোলাপ বলল, জান তো বাপি, চাঁদুদা আমার জন্য কত করেছে। ওর জন্যই আবার আমি তোমাকে ফিরে পেলাম। আবার আমি বাড়ি যেতে পারব। এই জুলি নামের মেয়েটাও উদ্ধার হল। সবই চাঁদুদার জন্য। চাঁদুদার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ও আর হাওড়ার ওই বিষাক্ত পরিবেশে থাকবে না। চাঁদুদা ধানবাদে আমাদের বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করবে।
সোমনাথবাবু বললেন, বেশ তো, ক্ষতি কী? তারাপদবাবু যদি তাঁর ছেলেকে আমাদের কাছে রাখেন তা হলে আমার কোনও আপত্তি নেই।
তারাপদবাবু বললেন, আমি এক কথায় রাজি। আমার প্রথম জীবনের ভুলের মাণ্ডল যে আমাকে এইভাবে দিতে হবে তা আমি কখনও ভাবিনি। আমি তো ওকে দূরে কোথাও বোর্ডিংয়ে রেখে আসব ভেবেছিলাম।
সোমনাথবাবু বললেন, কোনও দরকার নেই। ও ধানবাদে আমার ওখানে থেকে আসানসোল কিম্বা চিত্তরঞ্জনে কলেজে পড়বে।
সিদ্ধিবাবা এতক্ষণ বসে বসে সব শুনছিলেন। এবার লছমিকে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ঠিক আছে। আমরা যাচ্ছি। এখন আপনারা আয়াস করুন। নর্মদে হয়।
চাঁদু দরজা পর্যন্ত উঠে এসে বিদায় জানাল সিদ্ধিবাবাকে।
ওই সার্কিট হাউসে আরও একটি ঘর পাওয়া গেল। সেই ঘরটা সোমনাথবাবু নিলেন। একটা দিনের ব্যাপার। কালই চলে যাবেন সবাই। জুলি, গোলাপ ও চাঁদু একঘরে রইল শুধু গল্প করার জন্য। সবাই চলে গেলেও বিরজু ছিল ওদের কাছে। চাঁদু ওর হাতে টাকা দিয়ে গরম গরম শিঙাড়া, কচুরি, লাড্ডু, জিলিপি ইত্যাদি আনতে দিল। বেশি করেই আনতে বলল। যাতে তারাপদবাবু ও সোমনাথবাবুও ভাগ পান।
বিরজু চলে গেলে চাঁদু জুলিকে বলল, তোর কী ব্যাপার বল তো? কীভাবে কী হল সেদিন। সন্দীপদার সঙ্গে তোর পরিচয় কীভাবে হল?
জুলি বলল, আবার কেন সেই অভিশপ্ত দিনটার কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছ চাঁদুদা ?
না হলে সবকিছুই যে অস্পষ্ট হয়ে যাবে।
তোর মুখে তোর বিপদের কথা শুনতে হবে
না?
জুলি বলল, তুমি তো আমাকে কচুরি কিনতে পাঠালে। আমিও গেলাম। তখন সন্ধের মুখ। হঠাৎ মোড়ের মাথায় গিয়েই দেখি একজনদের রকে বসে গল্প করছে ওই রাজু শয়তানটা। আমি জানতাম ও নলহাটিতে বোর্ডিং-এ আছে। কিন্তু এইভাবে যে ওকে এখানে দেখব তা ভাবিনি। তাই ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম।
রাজু আমার ভয় দেখে আড্ডা ছেড়ে উঠে এসে বলল, কীরে কালটি! এত ভয় পেলি কেন? আমি আর আগের মতো নেই। অনেক ভাল হয়ে গেছি। এখন থেকে আমি ভাল ছেলেই হয়ে থাকব। তোর দাদা আর ওই চেঁদোটা একবার আমাকে পিটিয়েছিল মনে আছে?
সেটা তুমি আমাকে বিরক্ত করেছিলে তাই।
ওদের বলিস, আমি আবার ফিরে এসেছি। ওদের সঙ্গে আমি দোস্তি চাই।
আগেকার সব কথা যেন ভুলে যায় ওরা।
বেশ বলব। এখন আমার পথ ছাড়ো।
না ছাড়লে?
চেঁচাব।
রাজু একটা শিশি বার করে বলল, এটাতে কী আছে জানিস? জানি না।
অ্যাসিড আছে। তোর মুখ তো এমনিতেই কালো। ওখানে আর ঢেলে কী হবে? তবে তোর ওই লালটুস চাঁদুদা, ওর বদন আমি বেগড়াবই। অনেকক্ষণ তোদের ঘরে গিয়ে ঢুকেছে। একবার আমার কাছে পাঠিয়ে দে। না হলে তুইও কিন্তু ছাড় পাবি না।
আমি বললাম, পারব না।
বলার সঙ্গে সঙ্গেই আমার মুখে অ্যাসিডটা ঢালবার জন্য শিশি থেকে ছিপিটা খুলল রাজু। এবং ঠিক সেই মুহূর্তে কে যেন আমাকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে গেল। পরক্ষণেই রাজুর আর্তনাদ শুনতে পেলাম। যে আমাকে টেনে নিয়ে গেল সে আমার পেটের কাছে ছোরা ঠেকিয়ে মন্টুদার গ্যারেজে নিয়ে ঢোকাল। অন্ধকার ভাঙা গ্যারেজ ঘর। বলল, খবরদার চেঁচাবি না। আর তুই পালাতে পারবি না। পালালেও বাঁচবি না। এখন থেকে তুই আমাদের। আমরা তোকে যেখানে নিয়ে যাব যাবি। যদি আমাদের কথা না শুনিস, তা হলে কিন্তু তোর মা আর দাদাকে হারাতে হবে। মনে থাকবে?
আমি কেঁদে বললাম, তোমরা যে যা বলবে আমি তাই করব। আমার দাদার কোনও ক্ষতি কোরো না তোমরা।
ঠিক তো? আমাদের কথা শুনলে আমরা কারও ক্ষতি করব না। তোরও না। তা ছাড়া এখন আমরা তোকে ছেড়ে দিলেও তোর বিপদ কিন্তু কমবে না। দেখলি তো রাজুটা কীভাবে খুন হল?
খুন হতে আমি দেখিনি তো?
আঃ। চেঁচানি তো শুনেছিস। এতক্ষণে ওর লাশ চলে গেছে হাওয়াপুকুরের ধারে। ওর বন্ধুরা কিন্তু তোর সঙ্গেই ওকে দেখেছে। তারপরই এই খুন। সবাই কী ভাববে বল তো? তুই-ই খুনটা করেছিস। তার ওপরে ওর বাবা আবার কেষ্ট মিত্তির। তাই বলছি আমরা ছেড়ে দিলেও তোকে কিন্তু সারাজীবন জেলের ঘানি টানতে হবে। নয়তো লটকাতে হবে ফাঁসির দড়িতে। আর আমাদের সঙ্গে এলে তোর হবে সুখের জীবন। তা ছাড়া ও তো অ্যাসিড দিয়েই পুড়িয়ে দিচ্ছিল তোর মুখটাকে। সারাজীবন এই মুখ নিয়ে কী করতিস? আমরা সেদিক থেকেও তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছি।
আমি বললাম, আমি কোনওরকম গোলমাল করব না। তোমরা যে যা বলবে তাই শুনব।
এই তো লক্ষ্মী মেয়ের মতো কথা। তা ছাড়া আর দু'দিন বাদে একটু বড় হলে শ্বশুরবাড়ি তো তোকে যেতেই হত। মনে কর না সেইরকম কোথাও যাচ্ছিস। আমি দু’ ফোঁটা চোখের জল ফেলে অনুসরণ করলাম ওদের।
ওরা সেই রাতে আমাকে খড়্গপুরে নিয়ে গিয়ে রাখল। পরদিন আবার ট্রেনে করে কোথায় যেন নিয়ে চলল ওরা। এইসময় ট্রেনের মধ্যেই দেখা হল সেই দেবতার সঙ্গে। ওদের সঙ্গে আমাকে দেখে অনেকক্ষণ থেকেই নজরদারি করছিলেন তিনি। পরে আমি যখন বাথরুমে গেছি তখন আমার কাছে এসে চুপি চুপি জিজ্ঞেস করলেন সব কথা। আমি ভয়ে ভয়ে সব বললাম।
উনি বললেন, তোর কোনও ভয় নেই। তুই আমার সঙ্গে আয়। তারপর দেখছি ওদের দৌড় কত।
কিন্তু আপনার সঙ্গে গেলে যদি ওরা আমার মা বা দাদার কিছু করে?
কিছু করবে না। তুই চলে গেলেই ওরা ভুবন অন্ধকার দেখবে। তুই যদি পুলিশকেও বলে দিস ওদের কথা, সেই ভয়ে ওরা আর কোনওরকম গোলমাল করবে না। তুই নির্ভয়ে চলে আয় আমার সঙ্গে। ,
আমার কেন জানি না মনে হল উনি ঠিকই বলছেন। তাই আমি ভাগ্যের হাতে
নিজের ভবিষ্যৎ সঁপে দিয়ে তখনকার মতো ওদের নজর এড়াবার জন্যে গাড়ির ভেতরে ভেতরে খানিকটা এগিয়ে নিজেকে আড়াল করলাম। তারপর সেই দেবতার সঙ্গে নেমে পড়লাম পরের স্টেশনে। স্টেশনটার নাম চম্পা। উনি বললেন, দেখ, আমি যে তোকে নামিয়ে নিলাম এটা কিন্তু ওরা বুঝতে পারবে। তাই ওদের যত রাগ পড়বে আমার ওপর। আমি অবশ্য তাতে ভয় পাই না। কিন্তু আমি তোকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছি তুই সেখানে সাবধানে থাকবি। একদম ঘর থেকে বেরোবি না। সময়মতো হাওয়া বুঝে তোর বাড়িতেও আমি খবর দেব। তারপর ওই শয়তানদুটোকে সমুচিত শিক্ষা দিয়ে আমি নিজে তোকে পৌঁছে দিয়ে আসব তোর বাড়িতে। ইতিমধ্যে পারি তো ওই কেষ্ট মিত্তিরকেও দেখে নেব।
চাঁদু বলল, সন্দীপদা কত মহৎ। যাক, ভগবান রক্ষে যে ওর নজরে পড়ে গিয়েছিলি তুই। আর কালচক্রে ওরা নিজেরাই ফেঁসে গেল বলে তোকে-আমাকেও বেশিদিন বাইরে থাকতে হল না।
বিরজু খাবার নিয়ে এলে, সেই খাবার ভাগ করে খেল সবাই। তারাপদবাবু ও সোমনাথবাবুও বাদ গেলেন না। খেতে খেতেই ঠিক হল দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর একটা টাঙ্গায় করে অমরকণ্টকের সবকিছুই ঘুরে দেখে নেবেন ওরা। চাঁদুর ইচ্ছে হলে ওদের সঙ্গে যাবে। না হলে শুয়েবসেই কাটিয়ে দেবে সময়টা। কাল সকাল হলেই চলে যাবার তাড়া। এই তীর্থভূমি যতই রমণীয় হোক, আর এখানে পড়ে থাকা ঠিক নয়। কেন না মুখে কিছু না বললেও জুলির মনটা ওর বাড়ির জন্য ছটফট করছে তো?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন