ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

সেদিন সকালে খবরের কাগজের পাতায় একটা চাঞ্চল্যকর সংবাদ দেখে চমকে উঠল হিরণ। পর পর ক'দিন ধরেই এইরকম ঘটনার কথা ছাপা হচ্ছে কাগজে। কিন্তু আজকের খবরটা মারাত্মাক। আজকের কাগজে যে খবরটি ছাপা হয়েছে তা শুধু চমকপ্রদই নয়। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
হিরণ যখন কাগজের পাতার ওপর ঝুঁকে খবরটা পড়ছে, তেমন সময় মা এসে ঘরে ঢুকলেন, কীরে ! মুখহাত ধুয়েছিস? আমি এদিকে কখন থেকে চা নিয়ে বসে আছি। জুড়িয়ে জল হয়ে গেল যে।
হিরণ বলল, কাল রাতে বাপি কখন বাড়ি ফিরেছেন মা?
তুই ঘুমিয়ে পড়বার পর।
হিরণ কাগজটা মাকে দেখিয়ে বলল, খবরটা পড়ে দেখো।
মা একবার চোখ বুলিয়েই বললেন, কী দুঃসাহস!
হিরণ বাথরুমে গিয়ে ভাল করে দাঁত মেজে, মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। তারপর চা-টেবিলে বসে ক্রিমক্র্যাকার বিস্কুট আর চা খেতে খেতে বার বার পড়ে যেতে লাগল খবরটা।
এমন সময় বাপি এসে পিছনে দাঁড়ালেন। বললেন, কীরে! আজ এত সকালে কাগজ দিয়ে গেল যে? এই তো সবে সাতটা। ও তো ন'টার আগে আসে না।
হিরণ বলল, এই ক’দিন কেন জানি না, একটু সকালসকালই কাগজ দিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। কিন্তু বাপি, কী হচ্ছে এসব তোমাদের ওখানে?
হিরণের বাবা বাসব মজুমদার একজন পদস্থ গোয়েন্দা অফিসার। বললেন, কাগজে বেরিয়েছে বুঝি?
হিরণ বলল, এই দেখো?
বাসববাবু কাগজের খবরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। খবরের শিরোনামে ছিল, লালবাজারে চুরি। গোয়েন্দারা অতিষ্ঠ। সংবাদটা ছিল এইরকম, লালবাজারের ভেতর থেকে চুরির ঠেলায় খোদ গোয়েন্দা বিভাগই অতিষ্ঠ। চোরের হাত থেকে বাঁচতে এখন মোটর বাইক, স্কুটার, এমনকী অন্যান্য মূল্যবান জিনিসও দোতলায় তুলে রাখতে হচ্ছে। গোয়েন্দা বিভাগের দোতলায় সিঁড়ির মুখ এবং একতলার সিঁড়ির পাশের খোলা জায়গাটা নানারকমের মোটর বাইকে বোঝাই। গোয়েন্দা বিভাগের এক পদস্থ অফিসার বলেন, কোনও জিনিসই আর নীচে রাখা যাচ্ছে না। চোরেরা হেডলাইট, ব্যাটারি—সবই খুলে নিচ্ছে। খুলে নেওয়া যায় এমন সব কিছুই চুরি হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে তাঁর ঘরের সামনের অত্যন্ত সুরক্ষিত বারান্দা থেকে একটি আটক করা দামি মোটর বাইকের হেডলাইট ও ব্যাটারি চুরি হয়ে যায়। সবটা পড়ে একটু গম্ভীর হয়ে যান বাসবাবু। তারপর একসময় বললেন, হ্যাঁ। বেশ কিছুদিন ধরেই এইসব উপদ্রবগুলো হচ্ছে।
হিরণ বলল, এরপর হয়তো কাগজওয়ালারা বিদ্রূপ করে সম্পাদকীয়ও লিখবে।
লিখবেই তো। আর সে লেখার হেডিং হবে, বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা।
তা যদি হয়, তা হলে এই যে কাগজে সব ফাঁস হয়ে গেল, এতে সাধারণ মানুষের মনে কী প্রতিক্রিয়াটা হবে? সবাই তো বলবে, গোয়েন্দারা যদি নিজেদের ঘর নিজেরা সামলাতে না পারেন, তা হলে সাধারণ মানুষের বিপদে কী করে তাঁরা পাশে এসে দাঁড়াবেন?
মা বললেন, তাই বলে গোয়েন্দারা তো অন্তর্যামী হবেন না।
বাসববাবু বললেন, ওকথা বললে তো জনগণ শুনবে না। কেন না এই কাজের জন্যই যে আমরা মোটা টাকা মাইনে পাচ্ছি। গাড়ি চাপছি। নানারকম সুযোগ সুবিধে পাচ্ছি। এখানে আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্যের ব্যাপারটা এসে যাচ্ছে না? হিরণ বলল, আসলে আমার মনে হয় বাপি, তোমরা এইসব খুঁটিনাটি
ব্যাপারগুলোর দিকে গোড়ায় খুব একটা নজর দাওনি। তাই এমন হচ্ছে।
ঠিক। এবার থেকে মনে হচ্ছে কোনও কিছুই আর কিছু নয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কেন না এত বেশি ক্রিমিন্যালের আবির্ভাব হয়েছে এই শহরে যে, সবসময় চারদিক থেকে যেন ব্যতিব্যস্ত করে মারছে। আর তারই ফলে অবস্থা এখন এমনই যে কাছা দিতে গিয়ে কেঁাঁচা খুলে যাচ্ছে আমাদের। এককালে চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি এইসবগুলো হত বিশেষ একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। আমরা গোয়েন্দারা যেতাম, তদন্ত করতাম। উপযুক্ত প্রমাণ বা সূত্রসন্ধান পেলে অপরাধীকে ধরতাম। কোনও কিছু না পেলে ব্যর্থ হতাম। কিন্তু এখনকার অপরাধীরা অপরাধ করার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ এবং প্রশাসনকে বিরক্ত এবং বিভ্রান্ত করে মজা পাচ্ছে বেশি। পুলিশ ডিপার্টমেন্টের চেয়েও ওরা যে অনেক বেশি শক্তিশালী আকারে ইঙ্গিতে সেই কথাটাই যেন বুঝিয়ে দিতে চাইছে।
হিরণ বলল, এটা তা হলে চুরির জন্যে চুরি নয় বলো, রসিকতার জন্যে চুরি! অবশ্যই! না হলে পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে চুরি হয়? এই তো সেদিনের খবর। দেখেছিস নিশ্চয়ই? ওরা জানে এইসব করলেই কাগজওয়ালারা রসিয়ে রসিয়ে লিখবে আর জনসাধারণ চায়ের পেয়ালায় তুফান উড়িয়ে হাসাহাসি করবে। ধিক্কার দেবে পুলিশকে। এগুলো স্রেফ বদমায়েশি।
হিরণ বলল, আমার মনে হয় বাপি তোমার ধারণাটা যেমন ঠিক, তেমনি এও ঠিক, ওরা আসলে কোনও বড় দলের খুচরো লোক। যারা কি না চাইছে পুলিশ যদি এইসব ছিঁচকে চোরেদের ধরবার জন্যে সব সময় নিজেদের কেন্দ্রে ব্যস্ত থাকে তা হলে নিরাপদে, নিরুপদ্রবে ওরা অবাধ লুণ্ঠন, ব্যাঙ্কডাকাতি ইত্যাদি করতে পারবে।
মা বললেন, তবে যাই বলো বাপু, আমার তো মনে হয় তোমাদেরই ভেতর থেকে কোনও নিচুত্তরের দুষ্ট প্রকৃতির কেউ এইসব করছে। না হলে চোরেদের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, তারা যাবে লালবাজারে চুরি করতে। ধরা পড়লে মার খেয়ে মরবে তা কি তারা জানে না?
বাসববাবু বললেন, তোমার সন্দেহটাও অমূলক নয়। কেন না ভূত তো সর্ষের ভেতরেও থাকে।
এমন সময় হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠতেই বাসবাবু এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুললেন, হ্যালো! কে বলছেন?
মি. মজুমদার নাকি?
হ্যাঁ, বলছি।
আজকের কাগজে খবরটা দেখেছেন?
এইমাত্র দেখলাম।
লালবাজার অঞ্চলে রাহাজানির ঘটনাটা মনে আছে আপনার?
আপনি কে বলছেন?
আপনার একজন পুরাতন বন্ধু, কার্লস জ্যাকল।
রাগে লাল হয়ে উঠল বাসববাবুর মুখ। বললেন, তুমি জেল থেকে ছাড়া পেলে কবে?
আরে! আমি তো উমর কয়েদের আসামি। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আমার। জেল খাটতে ভাল লাগল না বলে জেলভেঙে পালিয়ে এলাম। তাই ভাবলাম আমার এই শুভমুক্তির খবরটা আপনাকেই প্রথম জানানো উচিত। এবার তো মাঝেমধ্যেই দেখাসাক্ষাত হবে। তাই হঠাৎ দেখে ভূত ভেবে যাতে চমকে না ওঠেন সেইজন্যেই ফোন করে জানিয়ে দিলাম। একটা চায়ের দোকানে বসে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে হঠাৎই খবরটা চোখে পড়ল। লালবাজারে চুরি! হাঃ হাঃ। আমি লালবাজার অঞ্চলে রাহাজানি করে ধরা পড়েছিলাম খড়্গপুরের গোলবাজারে। আর খোদ লালবাজারের ভেতরে আপনারই দপ্তরের মধ্যে চোরেরা দিনের পর দিন দিব্যি চুরি করে বহাল তবিয়েতে ঘুরে বেড়াচ্ছে! এ কেমন রসিকতা মি. মজুমদার?
বাসববাবু কঠিন গলায় বললেন, তোমার আর কিছু
বলার আছে?
বলবার তো অনেক কিছুই ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে আমার পুনরাবির্ভাবে আপনি মোটেই সন্তুষ্ট নন। ঠিক আছে। পরে বরং একদিন একটু ভাল করে আলাপ আলোচনাটা করা যাবে। কী বলুন?
বাসববাবু সশব্দে রিসিভারট! নামিয়ে রাখলেন।
হিরণ বলল, কার ফোন বাপি?
বাসববাবু নিরুত্তর।
লোকটা কি মোস্ট ডেঞ্জারাস? না হলে তুমি অমন গম্ভীর হয়ে গেলে কেন? মা বললেন, কে ও? কোনও খুনের আসামি বুঝি?
বাসববাবু গম্ভীর মুখে বললেন, লালবাজারে রাহাজানির সেই নায়ককে তোমার মনে আছে?
সেই সাংঘাতিক লোকটা? কী যেন নাম, কার্লস জ্যাকল না কী?
হ্যাঁ। শেয়ালের মতো মুখ। হায়নার মতো চোখ। আর চিতার মতো হিংস্র।
সেই লোকটাকে তুমিই তো কোনও একটি কুখ্যাত অঞ্চল থেকে ধরে এনে জেলে ঢুকিয়েছিলে। লোকটা এত তাড়াতাড়ি জেল থেকে ছাড়া পেল কী করে? না। ছাড়া সে পায়নি। জেলভেঙে পালিয়ে এসেছে।
হিরণ বলল, কার্লস জ্যাকল! এ নাম আমি তোমার মুখে অনেকবার শুনেছি।
শুধু মজা দেখবার জন্যেই মেয়েদের মুখে অ্যাসিড বাল্ব ছুড়ে মজা দেখত লোকটা। গ্রামগঞ্জ থেকে ছেলেমেয়ে চুরি করে এনে কলকাতার ফুটপাথে ছেড়ে দিত। আর সবচেয়ে বড় কথা—।
টেলিফোনটা আবার বেজে উঠল।
বাসববাবু ফোন ধরেই জিজ্ঞেস করলেন, হ্যালো! কে বলছেন? স্যার আমি লালবাজার থেকে ফোন করছি নীহার তালুকদার।
কী ব্যাপার বলো।
এই একটু আগে একটা প্যাকেট পেলাম। তাইতে মোড়কের ভেতরে একটি কাটা মুণ্ডু পাওয়া গেছে। তার কপালে লেখা আছে বাসব মজুমদার।
তুমি রসিকতা করছ না তো?
না স্যার। তবে প্রেরকের নাম দেখে বিস্মিত হয়েছি।
কী নাম তার।
কার্লস জ্যাকল।
আমি এক্ষুনি যাচ্ছি। তোমরা গাড়ি পাঠাও।
মা বললেন, কোথায় যাচ্ছ?
লালবাজার। আবার সেই শয়তানের খেলা শুরু হয়ে গেছে। কত নিরীহ লোকের মাথা যে যাবে এবার তা কে জানে? আজই একজনের কাটা মুণ্ডু উপহার পাঠিয়েছে লালবাজারে।
মা শিউরে উঠলেন, কার ?
জানি না। তবে আমার নাম লেখা আছে তাতে।
হিরণ সবিস্ময়ে বলল, তোমার নাম লেখা আছে কেন বাপি? হয়তো বোঝাতে চাইছে কার্লস জ্যাকেলের পরের শিকার আমি। মা বললেন, তুমি তা হলে যাবে না, কিছুতেই যাবে না ওখানে। বাসববাবু বললেন, যেতে আমাকে হবেই। যাওয়াটাই আমার কাজ। চাকরি তো ছাড়তে পারব না। তা ছাড়া গায়ে নোংরা মাখলে যেমন যমে ছাড়ে না, তেমনি চাকরি ছেড়ে বনে গেলেও ওরা আমাকে ছেড়ে দেবে না। বরং এইখানেই আমার চ্যালেঞ্জ।
সারাজীবন ধরে শুধু চ্যালেঞ্জই নাও তোমরা, আর আমরা শাঁখাসিঁদুর খোয়াবার ভয়ে ঘরের কোণে বসে ভগবানকে ডাকি। এই ধরনের ক্রিমিন্যালদের ধরার সঙ্গে সঙ্গেই মেরে ফেলতে পার না?
বাসববাবু তৈরি হতে হতেই বললেন, গোয়েন্দা বা পুলিশের কাজ তো প্রাণ নেওয়া নয়। অপরাধীকে হাতেনাতে ধরে শাস্তি দেওয়া। এতেই তাদের আনন্দ। তার চেয়েও বেশি আনন্দ বোধহয় আমাদের মতো নিরীহ মানুষগুলোর জীবন উৎকণ্ঠায় ভরিয়ে দেওয়ায়। এই যে জেল ভেঙে পালিয়ে এল লোকটা, অকারণে প্যানিক সৃষ্টির জন্যে একজন নিরীহ মানুষের মাথা নিল, এর জন্য দায়ী কে? তোমাদের ভুল সিদ্ধান্ত আর আইনের প্রতি আনুগত্য নয় কী? কত কষ্ট করে দিনের পর দিন নিজের জীবন বিপন্ন করে কী ভাবে লোকটাকে ধরেছিলে সে কথা কি ভুলে গেছ? কার্লস জ্যাকল হল ফাঁকা মাঠের বেড়াল। একবার যখন ও বেড়া টপকে পালিয়েছে আর কখনও ওকে ধরতে পার? এখন আমার একটাই ভয়, ও তোমার না কিছু করে বসে।
বাসববাবু বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বললেন, আমার ব্যাপারে এখুনি খুব বেশি চিন্তাভাবনা না করলেও চলবে। শুধু ছেলেটাকে সাবধানে রেখো। একা যেন অকারণে বেশি ঘোরাফেরা না করে। আমার ভয় ওকে নিয়ে। তোমারও ক্ষতি করতে পারে তবে থাবা যখন বাড়িয়েছে তখন প্রথম কোপটা ওরা ওকেই দেবে।
মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
একটু পরেই গাড়ি এল। বাসববাবু স্ত্রী-পুত্রকে সাবধানে থাকতে বলে দারুণ উত্তেজনা নিয়ে চলে গেলেন। একজন লোক মোড়ের মাথার চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিল। পুলিশের গাড়ি চলে যেতেই লোকটি দোকান থেকে বেরিয়ে এসে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর সিগারেটে দু'-একটা টান দিয়ে সেটা আধখাওয়া করে ফেলে দিল রাস্তায়। জুতো দিয়ে চেপে আগুনটা নিভিয়ে দিল। দিয়ে বাসববাবুর বাড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পথের বাঁকে হারিয়ে গেল সে।
কর্মব্যস্ত, কলকাতা মহানগরীর বুকে ডালহৌসি অঞ্চলে লালবাজার শুধু কলকাতার নয়, সমগ্র পশ্চিমবাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানকার পুলিশ ও প্রশাসনের সুমহান ঐতিহ্য আজও অটুট আছে। কিন্তু কালে কালে নদী যেমন তার গতিপথের পরিবর্তন করে, তেমনি অপরাধীরাও তাদের অপরাধের ধারাকে ভিন্নমুখী করে তোলে। ফলে দুই আর দুইয়ে চার না হয়ে, বারো মাইনাস আট হয়ে যায়।
বাসব মজুমদার একজন পদস্থ গোয়েন্দা অফিসার। তাঁর নির্দিষ্ট সময়সূচির মধ্যে বা বাইরেও জীবনের নানান ঝুঁকি নিয়ে জলের তলায় ডুব দিয়েও অপরাধীদের খুঁজে বার করেছেন। কলকাতার পুলিশ প্রশাসন তাই বাসববাবুর অবদানে মুগ্ধ। বাসবাবু তাঁর চাকরি জীবনের দিনগুলিতে কখনও কোনও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেননি। এমনকী নিজেও কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েননি। শুধু বাসববাবু কেন, তাঁর সহকর্মী নীহার তালুকদার, রঞ্জন বসু এঁরাও অতি সজ্জন লোক। নীহার এবং রঞ্জনের তুলনা হয় না। একই দিনে পরপর কয়েকটি খুন ও রাহাজানিকে কেন্দ্র করে যখন তিন বছর আগে কার্লস জ্যাকলের পিছু ধাওয়া করেছিলেন, তখন এই দুই অসমসাহসী যুবকের অবদানের কথা তিনি কখনও ভুলবেন না। এরা পাশে না থাকলে হয়তো বেঘোরে মরতে হত সেদিন।
খিদিরপুর এবং ওয়াটগঞ্জ অঞ্চলের সন্ত্রাস ছিল এই কার্লস জ্যাকল। লোকটা আগে ছিল রিপন অঞ্চলের গুন্ডা। ছিপছিপে দোহারা চেহারা। মা বাঙালি। বাবা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। ওকে চার বছরের রেখে ওর বাবা এক ভয়ংকর পথদুর্ঘটনায় মারা যান। তারপর মা কোনওরকমে ভিক্ষেদুঃখু করে মানুষ করেন ওকে। মানুষ অবশ্য হয় না ছেলে। আলিজান আর দুলিয়াজান নামে দুই কুখ্যাত সঙ্গীর সংস্পর্শে এসে চুরি, ছিনতাই, স্মাগলিং প্রভৃতিতে হাত পাকায়। বাপও নেহাত ভাল মানুষ ছিলেন না। তাই শরীরের বদরক্ত অ্যালকোহলের মতো মিশে থাকে। সেই রক্তে শুধু একটি দেশলাই কাঠি ধরিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা। আলিজান আর দুলিয়াজান সেই কাজটাই করে দিল ওর। রক্তের আগুন জ্বলে উঠল দাউ দাউ করে।
মধ্য কলকাতার একটি সিমেনা হলে টিকিট ব্ল্যাকের সময় সাধারণ একটি খুন নিয়ে ওর অপরাধজীবনের শুরু। এবং ছেলের জন্যে ভাবনায় চিন্তায় অর্ধাহারে অনাহারে ওর দুঃখিনী মায়ের মৃত্যু ওকে অপরাধজগতের সিঁড়ি বেয়ে অনেক নীচে নামাতে থাকে। কলকাতা পুলিশের ব্রহ্মতালুতে বিষফোঁড়ার মতো টন টন করতে থাকে কার্লস জ্যাকল। ওর ডাক নাম ছিল ডেভিড। কিন্তু কার্লস জ্যাকল নামটা যে কে চাপাল ওর ঘাড়ে তা কে জানে? পুলিশের খাতায় এই নামেই ও এখন প্রসিদ্ধ। বাংলার আতঙ্ক, কলকাতার আতঙ্ক, লালবাজারে রাহাজানির অন্যতম নায়ক কার্লস জ্যাকল আবার ফিরে এসেছে অপরাধজগতে। সে দেখিয়ে দিয়েছে একমাত্র মৃত্যুদণ্ড ছাড়া, আর কোনও দণ্ডেই তাকে দমিয়ে রাখা যাবে না। লোহার খাঁচায় বনের বাঘকে আটকে রাখা যায় কিন্তু কার্লস জ্যাকলকে নয়। কার্লস জ্যাকল জাদু জানে। সে পালাব মনে করলে লোহার খাঁচাও তার কাছে তারের খাঁচা হয়ে যায়।
লালবাজারের বিশাল চত্বরে গাড়ি থেকে নেমে গম্ভীর মুখে দোতলায় নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে চললেন বাসববাবু। কর্মব্যস্ত এই মহানগরী এত খুন, এত দাঙ্গা, এত কিছু সত্ত্বেও কেমন স্বাভাবিক। মানুষের চলাফেরায় এতটুকু অসাচ্ছন্দ্য নেই। অথচ বাসববাবুর মনের মধ্যে এখন দুশ্চিন্তার ঊর্মিমালা ভয়ানক তোলপাড় করছে।
কার্লস জ্যাকলের নোটিশ পেয়েছেন বাসববাবু। ওই কাটা মুণ্ডটাই সেই নোটিশ বহন করে এনেছে। তিনি দ্রুত ঘরে যেতেই বেয়ারারা সেলাম ঠুকল তাঁকে। তারপর যে যার চেয়ারে গিয়ে বসল। প্রতিটি চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী এখন চেয়ারের মর্যাদা পেয়েছেন। এটি খুবই সম্মানজনক ব্যবস্থা। তবে বাপের বয়সি কর্মচারীদের তরুণ পদস্থ অফিসাররা অনেকেই নাম ধরে ডাকেন, এটা অবশ্য বাসববাবুর পছন্দ নয়। বয়স্ক পিওন বেয়ারাকেও উনি আপনি আজ্ঞে করেন। বাসববাবু ঘরে গিয়ে সিটে বসতেই বৃদ্ধ আর্দালি গোকুল দাস কাছে এসে দাঁড়াল। বাসববাবু বললেন, আমাকে এক গেলাস জল দিয়ে একবার নীহারবাবুকে
ডাকুন তো।
গোকুল দাসকে অবশ্য ডাকতে হল না। নীহারবাবু নিজেই এসে হাজির হলেন। বয়সে তরুণ নীহারবাবু বললেন, কী ভয়ানক ব্যাপার! তাজা একটি মানুষের মুণ্ডু কখন যে রেখে গেছে তা কে জানে?
বাসববাবু বললেন, বাইরের লোক এখানে আসে কী করে? সেটাই তো রহস্য।
বিশেষ করে এত সব ঘটনার পরেই বহিরাগতদের ওপর নজর রাখা হয় না, কেন, আমি তো কিছুই বুঝছি না। আজকের কাগজটা দেখেছ? যে খবরটা ছেপে বেরিয়েছে তা কতখানি লজ্জার তা জানো? এইরকম হতে থাকলে লোকের কাছে মুখ দেখানো যাবে না যে। গোটা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ওপর মানুষের ধারণা খারাপ হয়ে যাবে।
নীহারবাবু বললেন, কাটা মুণ্ডুটা আপনি একবার দেখবেন স্যার? অবশ্যই। তার আগে কয়েকটা প্রশ্ন।
কীরকম!
ওই প্যাকেটটা প্রথমে কার নজরে পড়ে। পিয়ন বেয়ারারা সেই সময় কী করছিল? ওটা হাতে করে খুলেছিল কে? খোলবার আগে অন্য কোনওরকম সন্দেহ কী হয়নি? মানে ওর ভেতরে বিস্ফোরক কিছুও তো থাকতে পারত। এই ঘটনার কথা কে কে জানে? সি পি-র কানে উঠেছে কি কথাটা? খবরের কাগজের সাংবাদিকদের কাছে খবর পৌঁছে যায়নি তো?
নীহারবাবু বললেন, ব্যাপারটা কিন্তু আর চাপা নেই স্যার। আমার আর্দালি রজনীই প্রথম দেখতে পায়। তখন অন্যান্য পিয়ন-বেয়ারারাও হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ওতে হাত দেওয়ার আগে আমরা মেটাল ডিটেক্টর লাগিয়ে পরীক্ষা করে নিই। যখন বিপদ সংকেত কিছু পাই না তখনই হাত দিই ওতে। ভুল অবশ্য একটু হয়েছিল। অনেকের সামনেই খুলে দেখা হয়েছিল ওটা। তবে সবাই চুপচাপ আছে। কেন না, সি পি-র কানে গেলে উনি নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন। সকলকেই তলব করবেন। কর্তব্যে অবহেলার জন্য বকুনিও খাবেন কেউ কেউ। তবে খবরের কাগজের লোকেদের জানানো হয়নি কথাটা।
এমন সময় বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকার দু’জন সাংবাদিক এসে হাজির হলেন সেখানে, কই স্যার! কোথায় সেই কাটা মুণ্ডু। দেখি, দু’-একটা ছবিটবি তুলি। বাসববাবু এবং নীহারবাবু দু'জনেই অবাক হবার ভান করলেন। কাটা মুণ্ডু! কই কোথায়?
একজন সাংবাদিক বললেন, ব্যাপারটা চেপে যাবেন না স্যার! সব কাজ ফেলে ছুটে এলাম। রগরগে খবর হবে কালকের কাগজে। চায়ের টেবিলে বসে লোকে চেটে চেটে খাবে। জিভ দিয়ে নয় অবশ্য, চোখ দিয়ে।
বাসববাবু বললেন, সেই সঙ্গে আবার নতুন করে প্রমাণ হবে প্রশাসনের ব্যর্থতা, আর আমাদের অকর্মণ্যতা, এই তো? আচ্ছা মশাই, কারও বাড়ির ছেলেমেয়ে যদি সুইসাইড করে তা হলে তার বাপ-মা কী করতে পারে বলুন?
এত মানুষ, এত ভিড় এর ভেতরে হঠাৎ দু'-একটা খুন হলে আমরাই বা কী করতে পারি? আমাদের কাজ হল অপরাধীকে ধরা এবং তাদের শাস্তি দেওয়া। কিন্তু অপরাধ কেউ করবে না এমন গ্যারান্টি তো দিতে পারি না। আজ শুধু কলকাতায় নয়, পশ্চিমবঙ্গে নয়, সারা ভারতের দিকে তাকিয়ে দেখুন। তাকিয়ে দেখুন ভারতের বাইরের দেশগুলোর দিকে, দেখবেন সর্বত্র অপরাধ করবার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। আসলে ওই একটা কথা আছে না, মা যা হতে চাইছেন। তেমনি প্রকৃতিও যা হতে চাইছেন তাকে না হওয়ার হাত থেকে আমরা আটকাব কী করে? সারা বিশ্বের মানুষের কাছে আজ অনেক সমস্যা। সারা বিশ্বের মানুষ আজ উচ্ছৃঙ্খল। এর জন্যে কে বা কারা দায়ী তা জানি না। তবে আমি বলব এর জন্য মানুষই দায়ী। আমরা সৎ থাকব কি না বা আমরা আইনশৃঙ্খলাগুলো মেনে চলব কি না সে তো আমরাই ঠিক করব। যাক চা খাবেন?
কিন্তু ওই কাটা মুণ্ডু?
ওটা নেহাতই উড়ো খবর।
সাংবাদিকরা হেসে বললেন, কার্লস জ্যাকলকে চেনেন?
বাসববাবু স্নান হয়ে গেলেন। বললেন, না চেনবার কী আছে? আমি নিজে তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে জেলের ঘানি টানতে পাঠিয়েছি তাকে। তিনি এখন কোন জেলে আছেন জানতে পারি কি?
বাসববাবু বললেন, তা ঠিক বলতে পারব না।
আজ কয়েকদিন হল জেলপলাতক হয়ে এই শহরেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। উনিই আমাদের ফোন করে জানিয়েছেন তাঁর দেওয়া উপহার সেই নরমুণ্ডুর কথা। একবার দেখান না স্যার একটা ফটো তুলি।
বাসববাবু বললেন, কার্লস জ্যাকল জেল ভেঙে পালিয়েছে আপনারা ঠিক জানেন?
আপনিও জানেন।
বাসববাবু বললেন, শুনুন ওই রকম একটা ফোন আমরাও পেয়েছি। জেল কর্তৃপক্ষও এতক্ষণে এই সংবাদ পুলিশকে নিশ্চয়ই জানিয়েছে বা জানাবে। কিন্তু যতক্ষণ না সরকারিভাবে আমরা কোনও রিপোর্ট পাচ্ছি, ততক্ষণ সাংবাদিকদের কাছে কী করে মুখ খুলি বলুন।
মুখ আপনাদের খুলতে হবে না। কাল সকালে কাগজ খুললে সবাই তা জেনে যাবে।
বাসববাবু সাংবাদিকদের মুখের দিকে তাকালেন।
সাংবাদিকরা বললেন, পুলিশ ছাড়া আমরা অনেক সূত্র থেকেই খবর পাই। জেল কর্তৃপক্ষই আমাদের জানিয়েছেন। আর জানিয়েছে স্বয়ং কার্লস জ্যাকল।
না হলে ওই কাটা মুণ্ডের কথা আমরা কি জানতে পারতাম?
বাসুববাবু বললেন, সব কিছু জেনেই যখন এসেছেন তখন আর কিছু লুকোব না। তবে মশাই, যা লিখবেন একটু বুঝেশুনে। অযথা মানুষকে উত্তেজিত করবেন না। আসলে সত্যি কথা বলতে কী, আমি নিজেও দেখিনি এখনও। ফোনে খবর পেয়ে এই সবে আসছি।
একটু পরেই রঞ্জনবাবু এবং আরও কয়েকজন অফিসার ঘরে এসে ঢুকলেন।
যাই হোক, ব্যাপারটা আর চাপা রইল না। কাটা মুণ্ডটা যেখানে রাখা ছিল সেইখানে গিয়ে সকলেই দেখলেন, মৃতের কপালে একটি পিনগেঁথা কাগজে নাম লেখা আছে বাসব মজুমদার। কী ভয়ংকর সেই দৃশ্য। চোখে দেখা যায় না। বাসববাবু এক পলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিলেন।
একজন সাংবাদিক বললেন, লোকটা কী সাংঘাতিক।
আর একজন সমবেদনার সুরে বললেন, আপনার ভয় করছে না স্যার? করছে না তা কী করে বলি? কেউ কাউকে মারব মনে করলে তাকে কি রোখা যায়? কাজেই সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কী ভয়?
এখন তা হলে কী করবেন?
চিড়িয়াখানা থেকে হঠাৎ করে পালিয়ে যাওয়া কোনও জন্তুকে যেমন আবার ধরে এনে খাঁচায় পোরে, ঠিক সেই ভাবেই কার্লস জ্যাকলকেও খুঁজে বার করে আবার পুরতে হবে হাজতে।
কাজটা কি খুব একটা সহজ হবে?
না। এ হচ্ছে সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন। উত্তরটা জানা আছে। শুধু প্রসেসটা ঠিকমতো করে নিয়ে হবে। অপরাধী আমাদের পরিচিত। অপরাধও প্রমাণিত। শুধু খোঁজার ব্যাপারটা নিখুঁতভাবে চালিয়ে যেতে হবে আমাদের। আর বিশেষ করে আত্মরক্ষার ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকতে হবে আমাকে।
সাংবাদিকরা ফটো তুলে বিদায় নিলেন।
অফিসাররা বসলেন গোপন বৈঠকে। অনেক অনুসন্ধানের পর তাঁরা জানতে পারলেন একজন অচেনা পুলিশ অফিসার আজ সকালে এসেছিলেন এখানে। সঙ্গে তাঁর একজন বেয়ারাও ছিল। এছাড়া আর কোনও আগন্তুকের পাদস্পর্শই হয়নি। এই অফিসারকে আগে কখনও দেখেনি কেউ। তবে তাঁর সাজপোশাক দেখে সকলে সমীহ করে উঠে দাঁড়িয়েছিল। তিনি যদি সত্যিকারের পুলিশ অফিসার না হন তা হলে—
যারা দেখেছিল তারা বলল, উচ্চতায় প্রায় ছ'ফুটের ওপর। গায়ের রং কালো। চাপদাড়ি। মাথায় টুপি। তবে মুখের দিকটা কালো হলেও হাতের আঙুলগুলো ফর্সা।
বাসববাবু বললেন, আর বলবার দরকার নেই। কার্লস জ্যাকল !
এত সাহস লোকটার? একেবারে পুলিশের ছদ্মবেশে এসে ঢুকে পড়ল! নীহারবাবু বললেন, সেটার ব্যাপারে কীভাবে এগনো যাবে সে বিষয়ে কিছু চিন্তা-ভাবনা করেছেন স্যার?
না। তবে একটা ব্যাপারে আমি তোমার একটু সাহায্য চাই।
বলুন, কী করতে পারি?
আচ্ছা, তোমার দিদিমা তো কাশীবাস করেছেন,
তোমাদের একটা বাড়িও আছে সেখানে, তাই না?
বাড়িটা আমাদের না। ডা. দীপঙ্কর ঘোষের বাড়ি।
আমি যদি কিছু দিনের জন্যে ওই বাড়ির একটা ঘর চাই দিতে পারবে? এ আর এমন কী? বাড়িটা তো ফাঁকাই পড়ে আছে।
তা হলে আমি আশা করতে পারি?
নিশ্চয়ই। কিন্তু এই সময়ে আপনার বেনারসে চলে যাওয়াটা কী ঠিক হবে?
মোটেই না। আমি আমার জন্যে বলছি না। ভাবছি ছেলেটাকে সরিয়ে দেব এখান থেকে। ওর মা-ও যাবে। কিন্তু খুব সাবধান। কাকপক্ষীতেও যেন জানতে না পারে একথা। এমনকী হিরণ বা ওর মা-ও জানবে না ওরা কোথায় যাচ্ছে। দু’–একটা মাস। তার ভেতরে ওই শয়তানটার হেস্তনেস্ত একটা করবই আমরা। ঠিক এই সময়ে ওদের এখানে রাখা খুব একটা যুক্তিপূর্ণ বলে মনে করছি না। তার কারণ এখানে থাকলে কার্লস জ্যাকলের এক একবারের ফোনের চমক ওদের ভয় পাইয়ে দেবে। ওরা যত ভয় পাবে আমিও ততই দমে যাব। কিন্তু আমি যদি একা থাকি তা হলে ভাবনাচিন্তা করে একটা কিছু করবার সুবিধে হবে আমার।
এটা অবশ্য মন্দ যুক্তি নয়। ঠিক আছে, আমি গোপনে সব কিছুরই ব্যবস্থা করছি। আশা করছি ট্রেনের টিকিটও পেয়ে যাব।
বাসববাবু জলের গেলাসে চুমুক দিয়ে বললেন, চলো, কার্লস জ্যাকলের পুরনো পাড়া খিদিরপুর গার্ডেনরিচ আর ওয়াটগঞ্জের দিক থেকে একটু ঘুরে আসি।
নীহারবাবু, রঞ্জনবাবু এবং বাসববাবু তিনজনেই যথারীতি তৈরি হয়ে সাদা পোশাকে একেবারে সম্পূর্ণ অন্য রকম চেহারায় বেরিয়ে পড়লেন অফিস থেকে। বেলা তখন দশটা। সারাটা দিনের এখনও কত বাকি।
হিরণ ছাদে বসে গভীর মনোযোগে কী একটা বই পড়ছিল। এমন সময় পাশের বাড়ির ছাদে ওরই বয়সি ফুটফুটে একটি ফ্রকপরা মেয়ে একটা পলিথিনের বালতিতে করে কতকগুলো ভিজে জামাকাপড় রোদ্দুরে শুকোতে দিতে এল। মেয়েটির নাম স্বপ্না। হিরণ এ বছর মাধ্যমিক দেবে। ও দেবে পরের বছর। হিরণকে ওইভাবে এক মনে বই পড়তে দেখে স্বপ্না আলশের কাছে এসে ঝুঁকে পড়ে বলল, কী বই পড়ছ হিরণদা, অত মন দিয়ে?
হিরণ ওর দিকে চোখ মেলে বলল, 'লালবাজারে রাহাজানি'। স্বপ্না হেসে বলল, ওই নামে আবার বই হয় নাকি?
বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখো।
স্বপ্না বই দেখে হেসে বলল, যাঃ। এটা তো পাণ্ডব গোয়েন্দা।
হলেই বা! খুব শিগগিরই এই নামে একটা বই বেরোবে। যার নায়ক কার্লস নিশ্চয়ই। নায়িকার নাম হবে স্বপ্না বোস।
জ্যাকল নামে এক জেলভাঙা কয়েদি। তার গোয়েন্দা হবেন হিরণ মজুমদার। সে বইতে কোনও নায়িকা থাকবে না?
সে বই লিখবে কে?
ভাবছি পাণ্ডব গোয়েন্দার লেখককে দিয়েই লেখাব।
তোমার যত সব উদ্ভট চিন্তা। তা হঠাৎ লালবাজারে রাহাজানির কথাটা মনে এল কেন? তা ছাড়া তুমি তো সচরাচর স্কুল কামাই করো না, আজ হঠাৎ ঘরে যে?
আজ সকালে খুব একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার ঘটে গেছে।
স্বপ্না কৌতূহলী হয়ে বলল, কীরকম শুনি তবু একটু?
তুই আয় না দুপুরবেলা আমাদের বাড়ি, সব বলব।
আজ আমার একটুও সময় নেই। চিত্তরঞ্জন থেকে আমার মামাতো বোন এসেছে। ওকে ছেড়ে যাই কী করে বলো?
বেশ তো, ওকে নিয়েই চলে আয়।
আজ হবে না।
এমন সময় ওবাড়ির সিঁড়ির দরজায় একটি ফুটফুটে কিশোরীর মুখ উঁকি দিয়েই আড়াল হয়ে গেল। হিরণ পলকের দেখাতেই খুশি হল। কী সুন্দর মেয়েটি, সোনার প্রতিমা যেন। বলল, ও বুঝি?
স্বপ্না বলল, ও মানে।
এই মাত্র সিঁড়ির দরজায় কে যেন একজন উঁকি দিয়েই নীচে নেমে গেল।
তুমি নিশ্চয়ই রিয়ার কথা বলছ। আমার মামাতো বোন। ছাদে আসছিল। আসলে তোমাকে দেখে লজ্জায় নেমে গেছে। ও না ভীষণ লাজুক। হিরণ বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, তাই নাকি? আজকের দিনে এমন মেয়েও আছে?
কেউ না থাক, রিয়া আছে। আসলে ওকে দেখতে তো খুব সুন্দর। সামনে এসে দাঁড়ালে অনেকেই ওকে দেখে চোখের পাতা ফেলতে ভুলে যায়। তাই ওর এত লজ্জা।
হিরণ কিছুক্ষণ স্বপ্নার দিকে চেয়ে রইল একভাবে। তারপর বলল, বেশ। সময় মতো আসিস তা হলে। বলে আবার গল্পের বইতে মনোনিবেশ করল। এমন সময় স্বপ্নার গলা শুনতে পেল, আয় না। চলে আয়, লজ্জা কী? ও আমাদের হিরণদা। খুব ভাল ছেলে।
স্বপ্নার ডাকে সিঁড়ির দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল রিয়া। তারপর অভ্যস্থ হাতে স্বপ্নার কাজের সহযোগিতা করল।
হিরণ বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে দেখতে লাগল রিয়াকে।
একসময় বই মুড়ে আলশের ধারে এসে দাঁড়িয়ে বলল, এই তোমার মামাতো বোন রিয়া?
স্বপ্না বলল, হ্যা। প্রায় ছ'-সাত বছর পরে এল। এর আগেও তুমি ওকে দেখেছ। তখন অবশ্য ও আরও ছোট ছিল।
আমিও সাত বছরের ছিলাম। তুইও ছ' বছরের ছিলি। কাজেই সেই সময় ওরও বয়স তো তাই। ও কি তোরই সঙ্গে পরীক্ষা দেবে? হ্যাঁ, আমরা দু'জনেই আগামী বছর মাধ্যমিক দেব। হিরণ বলল, ওরা কোথায় যেন থাকে?
চিত্তরঞ্জনে।
চিত্তরঞ্জন শুনেছি খুব ভাল জায়গা। চিত্তরঞ্জনের কোথায় থাকে ওরা? এতক্ষণে রিয়া মুখ খুলল। স্বপ্নাকে বলল, ওকে জিজ্ঞেস কর, ও কি
চিত্তরঞ্জনে গেছে কখনও? বললে চিনতে পারবে?
বলল, না। তা অবশ্য পারব না। আমি যাইনি কখনও। তবে আমার বাপি কয়েকবার গেছেন সরকারি কাজে সুন্দর পাহাড়িতে।
রিয়া এবার সরাসরি হিরণকে বলল, আমরা উত্তর সুন্দর পাহাড়িতে থাকি। ওই জন্যই বোধহয় তোমাকে এত সুন্দর দেখতে।
রিয়া বলল, যারা সুন্দরপাহাড়ির বাইরে থাকে তারাও তো দেখছি কম সুন্দর নয়।
এমন সময় মা উঠলেন ছাদে। হিরণকে গল্প করতে দেখে বললেন, ওমা, তুই এখানে? আমি তো ভরে মরি। চারদিক খোঁজাখুঁজি করছি। তারপর হঠাৎ নজর পড়ল রিয়ার দিকে। স্বপ্নার দিকে তাকিয়ে সবিস্ময়ে বললেন, তোর সেই মামাতো বোনটা না? কত বড় হয়ে গেছে রে? কবে এল?
স্বপ্না বলল, কাল রাত্তিরে।
কার সঙ্গে এল? ওর মা এসেছে?
মা-বাবা সবাই এসেছেন। ওনারা অবশ্য আজ বিকেলেই চলে যাবেন। ও থাকবে।
তা বেশ বেশ। মা নীচে গেলেন।
হিরণ আর রইল না ওপরে। ধীরে ধীরে নেমে এল নীচে। মনটা ওরও আজ ভাল নেই। কেন না খবরের কাগজ খুললেই যা সব দেখছে তাতে সাধারণ মানুষ থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী কারও কোনও নিরাপত্তাই আর নেই। কে যে কখন একটা খবর হয়ে যাবে তা কে জানে? বিশেষ করে ওই শয়তান লোকটা সত্যিই যদি বাপির কোনও ক্ষতি করে এই আশঙ্কাতেই ও মনমরা হয়ে গেল। কী দুঃসাহস। জলজ্যান্ত একজন মানুষকে খুন করে দিব্যি ওর বাপির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে গেল। হিরণের মনে হচ্ছে ও যদি ওর বাপির মতন হত তা হলে এই মূহূর্তে ওই দুষ্কৃতীকে খুঁজে বার করে ছাল-চামড়া ছাড়িয়ে নিত ওর। কিন্তু বাপি কেন যে তা করেন না তা ও কিছুতেই বুঝতে পারে না। কথায় আছে শত্রুর শেষ রাখতে নেই। একথা যে কতখানি সত্য তা আজ মর্মেমর্মে বুঝতে পারছে ও। কিন্তু বাপি কেন বোঝেন না?
দুপুরে স্নান-খাওয়ার পর সবে একটু শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে এমন সময় স্বপ্না ও রিয়া এসে হই হই করে ওর ঘরে ঢুকল। ওদের মায়েরাও এসেছেন। হিরণের মায়ের সঙ্গে পাশের ঘরে গল্পে মাতলেন তাঁরা। স্বপ্না আর রিয়া এসে বিরক্ত করতে শুরু করল হিরণকে।
স্বপ্না বলল, এ কী! আর ক'মাস বাদে যে ছেলে মাধ্যমিক দেবে সে কিনা এই ভরদুপুরে ঘুমোতে শুয়েছে?
হিরণ উঠে বসে বলল, না না। দিবানিদ্রা আমার ধাতে সয় না। এমনি একটু গড়িয়ে নিচ্ছিলাম আর কী।
রিয়া আর স্বপ্না দু'জনেই এসে খাটের ওপর ওর বিছানায় বসল।
স্বপ্না বলল, এই হচ্ছে হিরণের ঘর। কেমন সুন্দর সাজানো-গোছানো বল দেখি?
তুই এটাকে ঘর বলছিস স্বপ্না? আমি তো স্টুডিয়ো বলতে যাচ্ছিলাম।
হিরণদার বাবা পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তরের একজন বড় অফিসার। তাঁর ছেলের ঘর, কেন হবে না বল ?
সেটাই বড় কথা নয়, ঘর সাজানোটা হচ্ছে রুচির ব্যাপার।
হিরণ বলল, এই ঘরে যা কিছু দেখছ সবই আমার মায়ের পরিকল্পনায়। স্বপ্না হলল, সে যাই হোক। কিন্তু হিরণদা, তুমি তো স্কুল কামাই করে ঘরে থাকবার ছেলে নও।
হিরণ বলল, আমি কখনও অপ্রয়োজনে স্কুল কামাই করি না। খুব একটা জরুরি কাজ না থাকলে বা শরীর খারাপ না হলে রোজই আমি স্কুলে যাই। তবে আজ সকালে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেছে যে ভীষণ একটা দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেছি আমরা।
কী রকম?
হিরণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। একবার স্বপ্নার দিকে তাকাল। একবার দেখল রিয়াকে। ঢল ঢল কচি কিশোরীর মুখদুটোতে কৌতূহল ফুটে উঠেছে যেন। হিরণ বলল, আমাদের সকলেরই জীবন বিপন্ন।
স্বপ্না অবাক হয়ে বলল, সে কী! তোমার বাবা অতবড় একজন গোয়েন্দা
অফিসার, আর তুমি এই কথা বলছ?
হিরণ বলল, শুনবে? কিন্তু কথা দাও কাউকে এসব কথা বলবে না?
স্বপ্না-রিয়া দু'জনেই বলল, কথা দিলাম।
হিরণ তখন এক এক করে সব কথা খুলে বলল ওদের।
ওরা সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। বলল, তা হলে তো যে কোনও মুহূর্তে প্রতিশোধ নেবার জন্যে ওরা এসে হাজির হতে পারে এখানে।
তাই চুপচাপ শুয়েছিলাম। আর ভাবছিলাম কত কিছু।
রিয়া বলল, কিন্তু এইভাবে কতদিন ঘরে বসে থাকবে?
জানি না। তবে আগামী দু’–একটা দিন হয়তো যাব না। তার মধ্যে আশা করি কিছু একটা হয়ে যাবে। যতক্ষণ না কিছু হয় ততক্ষণ ঘরেই পড়াশোনা করি।
স্বপ্না বলল, ঘরের পড়াশোনা মানে তো গল্পের বই।
হিরণ বলল, তখন পড়ছিলাম বলে? আরে না না।
গল্পের বই পড়ি সময় কাটাবার জন্যে। স্কুলের বই পড়তে আমি কিন্তু একদম ফাঁকি দিই না।
রিয়া হঠাৎ বলল, আচ্ছা হিরণদা, তুমি ওই কার্লস জ্যাকল না, কী যেন নাম বললে, যতদিন না লোকটা ধরা পড়ে ততদিনের জন্যে তুমি দূরে কোথায় চলে যেতে পার না?
কোথায় যাব? কার কাছে যাব? কেউ তো নেই আমাদের।
ধরো না কেন, আমাদের সুন্দর পাহাড়িতেই যদি যাও?
হিরণ হেসে বলল, তা হলে তো খুব ভালই হয়, তবে কি না জেনেশুনে অকারণে তোমাদের শান্তির নীড়ে অশান্তির বীজ পুঁতে আসব কেন? অশান্তির বীজ!
তা নয়তো কী? কার্লস জ্যাকলের নজর এড়িয়ে আমি বাঁচব কোথায়? জলের তলায় লুকোলে ও সেখানে থেকেও খুঁজে বার করে আনবে আমাকে। লোকটা এতবড় শয়তান যে অত কড়া প্রহরা সত্ত্বেও সকলের নজর এড়িয়ে একটা কাটা মুণ্ডু ঠিক গিয়ে রেখে তো এল।
তাতে কী?
তাতে কী মানে? আমার ওপর বদলা নিতে গিয়ে তোমাকেই তুলে নিয়ে যাবে যখন, তুমি কী করবে?
এত সস্তা নাকি? ছুঁয়ে দেখুক না একবার আমাকে।
স্বপ্না বলল, তুই যে দেশলাই কাঠির বারুদের মতো ফস করে উঠলি। ব্যাপারটা কী? তোর সেই লজ্জা কোথায় গেল?
রিয়া বলল, হিরণদাকে দেখে ওর কথা শুনে কেন জানি না আমার আড়ষ্ট ভাবটা কেটে গেছে। শুধু তাই নয়, আমার কী মনে হচ্ছে জানিস, কেউ হিরণদার গায়ে হাত দিতে এলে তার দুটো হাতই কেটে দিই।
বলিস কীরে ! খুব সাহস দেখছি।
আজকাল সাহসী না হলে বাঁচার উপায় আছে? মেয়েরা যদি মেয়েই হয়, আর ঘোমটা টানা বউ হয় তা হলে কিন্তু অশেষ দুর্গতি তাদের।
হিরণ বলল, আমি কিন্তু এই ব্যাপারে এক মত। সরকার এক সময় আইন করে বাঙালির হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছিলেন! কিন্তু সেই দিন আসছে যেদিন আবার আইন করে সকলকেই আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র নিতে বাধ্য করা হবে। বিশেষ করে মেয়েদের।
রিয়া হ্যান্ডসেক করবার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল হিরণের দিকে।
হিরণ ওর হাতে হাত মেলাল। আর ঠিক তেমনি সময় টেলিফোন বেজে উঠল তার মতো করে। ক্রিরিরিং... ক্রিরিরিং—। হিরণ ছুটে গিয়ে টেলিফোনের রিসিভার তুলে কানের কাছে ধরে অভ্যস্ত গলায় বলল, হ্যালো।
কে হিরণ নাকি?
বলছি। আপনি কে?
তুমি আজ স্কুলে গেলে না কেন?
আমি আর কখনও স্কুলে যাব না।
না, না। স্কুলে যাবে, লেখাপড়া শিখবে। পাস করে কলেজে ভরতি হবে। তবে না? তোমার বাবা কিন্তু খুব ভয় পেয়ে গেছেন। আমি বলি ভয় কী? মরতে তো একদিন হবেই। দু'দিন আগে, না হয় পরে।
হিরণ উত্তেজিত গলায় বলল, কিন্তু আপনি কে? আপনার নাম বলছেন না কেন?
আরে আমি কি তোমার বাবার মতন সি আই ডি অফিসার, যে নাম বললেই তুমি চিনবে। আমি একটা ফালতু লোক।
তা হলে তুমি বিদেয় হও। বলেই সশব্দে নামিয়ে রাখল রিসিভারটা।
মা পাশের ঘর থেকে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, কে ফোন করেছিল রে?
সেই শয়তান লোকটা নয় তো? কী বলল সে?
পরিচয় দিল না। শুধু জানতে চাইল আমি স্কুলে যাইনি কেন?
শিউরে উঠলেন মা, সে কী!
স্বপ্না ও রিয়ার মা পাশেই ছিলেন। বললেন, কী ঝামেলা বাবা। আবার ছেলেপুলের ওপর নজর দেওয়া কেন?
ওকে আমি পই পই করে বলেছিলাম শয়তানটাকে ধরেই শেষ করে দিতে। কিন্তু কেন যে শুনল না ও আমার কথা।
এমন সময় প্রচণ্ড শব্দে একটা বোমা ফাটল বাইরের দরজার কাছে। পরক্ষণেই একটা গুলির শব্দ। কে যেন আর্তনাদ করে উঠল, আ-আ-আ। ধোঁয়ায় ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে উঠল চারদিক। হিরণ দরজা খুলে দেখতে যাচ্ছিল। স্বপ্না আর রিয়া দু'দিক থেকে দুটো হাত টেনে ধরল ওর।
মা বললেন, যাচ্ছিস কোথায়? এই অবস্থায় কেউ বাইরে যায়?
বাইরে তখন প্রচণ্ড হট্টগোল।
হিরণ বলল, আমাকে বাইরে যেতে না দাও ছাদে উঠে দেখতে দাও অন্তত। দরজার সামনে বোমা, গুলি। কী থেকে কী হল দেখতে হবে না?
অতএব সবাই ছাদে উঠল। ছাদে উঠে যে দৃশ্য দেখল, সেই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে গেল সকলেই। দেখল ডোরা কাটা লুঙ্গিপরা নিম্নশ্রেণীর এক মুসলমান যুবক পথের ওপর উপুড় হয়ে ছটফট করছে। তাকে ঘিরে জনতার ভিড়। এই যুবকই বাড়ির সামনে বোমা ফাটিয়েছিল। কিন্তু ওর কী হল? হিরণের মনে হল নীচে নেমে এসে একবার ভাল করে সার্চ করে দেখে লোকটিকে। কিন্তু না। তা সে করল না। এ কাজের জন্যে বাপি তো আছেন।
রাত্রিবেলা ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে বাসববাবু স্ত্রীকে বললেন, তোমাদের ভালই জন্যেই এই ব্যবস্থা আমি করছি। বিশেষ করে ছেলেটাকে এখান থেকে সরাতে না পারলে আমার কোনও কাজে মন লাগবে না।
বুঝলাম। কিন্তু এই রাহুর গ্রাসের মুখে তোমাকে একা ফেলে রেখে আমরাই বা যাই কী করে? আমাদেরও কি মন টিকবে? সবই বুঝি! তবে এ ছাড়া কোনও উপায় নেই। ওই দুর্ধর্ষ শত্রুর মুখোমুখি আমাকে হতেই হবে। ওর বিষদাঁত যদি ওপড়াতে না পারি তা হলে জেনে রেখো জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে কোথাও আমরা শান্তিতে বসবাস করতে পারব না।
তুমি যেখানে পাঠাচ্ছ আমাদের, সেখানেই যে আমরা নিরাপদে থাকব তারই বা প্রমাণ কী?
ওটা স্টেটের বাইরে। তা ছাড়া কাকপক্ষীতেও টের পাবে না কোথায় যাচ্ছ তোমরা। তোমাদের নিরাপত্তার জন্য ওখানেও সাদা পোশাকের নজরদারি পুলিশ থাকবে!
ভুলে যেয়ো না ওর নাম কার্লস জ্যাকল। এই মুহূর্তে আমরা যে কী আলোচনা করছি সেটাও হয়তো সে জানতে পারছে।
সে ভয় করলে আমাকে এখনই হাল ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে হয়। জানি বিপদ আমাদের পদে পদে। তবে যতটা পারি সতর্ক থাকি। সাবধানের মার নেই! আজ বাড়ির সামনে ওরা বোমা ছুড়েছে। কাল যে আরও কোনও বড় ধরনের বিস্ফোরণ কিছু ঘটাবে না, তাই বা কে বলতে পারে?
কিন্তু ওই লোকটা কে? ওর পরিচয় কিছু পেলে?
ওর নাম রহমত। মানিকতলার মোড়ে ফল বিক্রি করে। বাড়ি রাজাবাজারের বস্তিতে। লোকটা গুলি খেয়ে পুলিশ হাসপাতালে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। কার্লস জ্যাকলের হয়ে কাজ করতে এসেছিল লোকটা।
তা হলে ওকে গুলি করল কে?
বাসববাবু হেসে বললেন, যারা ওকে দিয়ে বোমা ছুড়িয়েছে হয়তো প্রমাণ লোপের জন্য তারাই করেছে এই কাজ। তাড়াতাড়িতে অথবা ধোঁয়ার জন্যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গুলিটা বুকে না-লেগে কোমরে লেগেছে। তুমি গিয়েছিলে পুলিশ-হসপিটালে?
গিয়েছিলাম বইকী। লোকটি কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে আছে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়বে কতক্ষণ তা কে জানে? তবু পুলিশি জেরার কাছে যেটুকু মুখ খুলেছে তাতেই ওর নাম আর ঠিকানাটা জানা গেছে।
আর ওই লোকটার ব্যাপারে কোনও খোঁজ পেলে? কার কথা বলছ তুমি?
যার কাটা মুণ্ডুটা এনে কার্লস জ্যাকল উপহার দিয়েছিল তোমাদের।
হ্যাঁ। কালীঘাট স্টেশনের কাছে আজ ভোরের দিকে একজন লোক ট্রেনে কাটা পড়ে। তার মুণ্ডুটা পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু ধড়টা পড়েছিল লাইনের ধারে। এমন সময় পাশের ঘর থেকে হিরণ এসে দরজার কাছে দাঁড়াল। বলল, বাপি, লোকটা কাটা পড়েছে ঠিকই। এমনও তো হতে পারে লোকটাকে কেউ মেরে লাইনের ওপর ফেলে রেখেছে। না হলে কার্লস জ্যাকল সঙ্গে সঙ্গে নরমুণ্ডু পায় কী করে? ধড়ের সঙ্গে মুণ্ডুটা কি মিলিয়ে দেখেছ তোমরা?
দেখেছি। আর সেই জন্যই তো পোস্টমর্টমের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। রিপোর্ট এলেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা আসলে কী? তবে ইতিমধ্যে মৃত-র বাড়ির লোকেরাও সনাক্ত করছে দেহটিকে। এই লোকটি যে খুন হতে পারে, এমন সন্দেহ ওর বাড়ির লোকেদেরও কারও হয়নি। এমনকী মৃতের পকেটে আত্মহত্যার কারণ সম্বন্ধে কোনও চিঠিপত্তরও ছিল না। অতএব ধরা যেতে পারে কার্লস জ্যাকলের লোকেরা খেলাচ্ছলেই ঠান্ডামাথায় খুন করেছে লোকটিকে।
কিন্তু এত লোক থাকতে ওই লোকটাকেই বা বেছে নিল কেন কার্লস জ্যাকল?
যাকে হোক একজনকে নিতে তো হতই। হয়তো এই লোকটির ওপর পুরনো কোনও কিছুর হিস্যা নিয়েছে। লোকটা কোর্টের মুহুরি ছিল।
না। লোকটি খুন হয়েছে রবিবার ভোরে। সেই সময় নিশ্চয়ই কোর্ট খোলা ছিল বাসববাবু বললেন, তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করি। উনি একটা কাজে শিয়ালদহ হয়ে বনগাঁ যাবার জন্যে স্টেশনে আসছিলেন। শর্টকাট করবার জন্য রেলপথ ধরেই হাঁটছিলেন ! আর কোনও প্রশ্ন কোরো না। এবার শুয়ে পড়ো। কালই আমি এখান থেকে সরিয়ে দেব তোমাদের!
হিরণ বলল, আমরা তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।
তোমার ভালর জন্যেই বলছি বাবা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখো রাত বারোটা। যাও শুয়ে পড়ো।
হিরণ আর কোনও কথা না বলে নিজের বিছানায় এসে শুল। শুয়ে অনেকক্ষণ ধরে এপাশ ওপাশ করেও যখন ঘুম ধরে না, তখন এক সময় উঠে বসল। তারপর ছাদের সিঁড়ি বেয়ে এক-পা এক-পা করে উঠে গেল ওপরে। খোলা আকাশের বুকে নক্ষত্রমালার দিকে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে গেল সে।
অসংখ্য চিন্তা ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে এখন। পরিস্থিতি ক্রমশ এমনই জটিল হয়ে উঠছে যে, কোনও কিছুই আর স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না! কার্লস জ্যাকল থাবা বাড়িয়েছে যখন, শিকার না-নিয়ে সে পিছু হটবে না। বাপি অত্যন্ত ভালমানুষ। মানুষকে কত সহজে বিশ্বাস করেন। উনি কি পারবেন এই শয়তানের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে? নাকি কার্লসের প্রথম শিকার ও নিজে? রহমত নামের লোকটা প্রকাশ্য দিবালোকে ওদের বাড়ির সামনে বোমা ছুড়তে এল কেন? লোকটা চাইছিল কী? প্যানিক সৃষ্টি করতে? না অপহরণ করতে? ও যদি কার্লস জ্যাকলেরই হয়ে কাজ করতে এসে থাকে তা হলে ওকে গুলিটা করল কে? বাপি ওদের দূরে সরিয়ে দিতে চাইছেন, হয়তো ভালই জন্যই। কিন্তু দূরে গিয়ে বাপির চিন্তায় গুমরে গুমরে মরার মতো কষ্টকর আর কিছু কি আছে। বাপিকে একা পেয়ে সত্যিই যদি কিছু করে ওরা।
হিরণ কতক্ষণ যে নিজের মনে এইসব চিন্তা করল, তার ঠিক নেই। তারপর এক সময় ভাবল, মৃত্যু যখন শিয়রে, জীবনের যখন কিছুমাত্র নিশ্চয়তা নেই, তখন ওই কার্লস জ্যাকলের মুখোমুখি সে নিজেও কি হতে পারে না? আর সেইজন্য ওকে এখন থেকেই প্রস্তুত হতে হবে। কারও কোনও বাধা আর ও মানবে না। কাল থেকে ও নিয়মিতই স্কুলে যাবে। কখনও একা, কখনও বা বন্ধুদের সঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে। আর সেই সময় কার্লস জ্যাকল যদি ওর দিকে থাবা বাড়ায় তা হলে—।
মতলবটা মাথায় আসা মাত্রই ধীরে ধীরে নীচে নেমে এল ও। বাপির ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। বাপি তখন ঘুমোচ্ছেন। ঘরের ভেতর ডিম লাইটটা জ্বলছে। ও পা টিপে ঘরে ঢুকল।
তারপর—?
সকালবেলা স্ত্রীর কান্নাকাটিতে ঘুম ভেঙে গেল বাসববাবুর। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে বললেন, কী ব্যাপার! হয়েছেটা কী?
সর্বনাশ হয়ে গেছে। হিরণকে কোথাও দেখছি না।
সে কী! গেল কোথায় সে?
জানি না, শুধু দেখছি সে নেই।
পাশের বাড়ির স্বপ্নাকে জিজ্ঞেস করেছ? যদি ওদের বাড়িতে গিয়ে থাকে? তুমি যে বললে ওর মামাতো বোন না কে যেন এসেছে?
করেছি। ওদের বাড়িতেও নেই। মেয়েদুটো তো ছাদেই ঘুরছে দেখলাম।
তা হলে তো ভয়ের ব্যাপার। দুশ্চিন্তার কালো মেঘ একটা ঘনিয়ে এল বাসববাবুর মুখে। উনি নিজেও তন্ন তন্ন করে চারদিক খুঁজলেন। হঠাৎ এক সময় বললেন, ছেলেটাকে কেউ এখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়নি, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিন্ত।
কী করে বুঝলে?
ও বাসি জামাপ্যান্ট ছেড়ে অন্যটা পরেছে। জুতোও পরেছে দেখতে পাচ্ছি। কাজেই কেউ ওকে নিয়ে গেলে নিশ্চয়ই জামাজোড়া পরিয়ে নিয়ে যেত না। তার মানে ও নিজে থেকেই কোথাও গেছে। হয়তো ফিরতে দেরি হবে। অথবা বাইরে বেরিয়েই বিপদে পড়েছে।
কী হবে তা হলে?
কখন গেছে, কীভাবে গেছে, কেন গেছে, এইসব না জেনে তো কিছু বলা যাবে না। আপাতত আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।
এমন সময় হঠাৎ কী দেখে যেন বাসববাবু এগিয়ে গেলেন টেবিলের দিকে। দেখলেন ড্রয়ারটা ঠিকমতো বন্ধ হয়নি। কেউ যেন খুলেছিল ওটা। তারপর ঠিকভাবে না—এঁটেই চলে গেছে। এমনকী চাবিটাও সরিয়ে রাখতে ভুলে গেছে সে। চাবিটা লাগানোই ছিল। বাসববাবু ড্রয়ারটা খুলেই অবাক। ভেতরের জিনিসগুলো নেড়েচেড়ে দেখলেন। কী যেন না-পেয়ে অস্ফুট উচ্চারণ করলেন, স্ট্রেঞ্জ!
মা বললেন, কী হল! কী দেখলে তুমি?
বাসববাবু সে কথার উত্তর না দিয়ে টেলিফোনের নম্বর ডায়াল করে কথা বললেন নীহারবাবুর সঙ্গে
ওদিক থেকে সাড়া আসতেই বললেন, ভাই! খুব একটা যা তা কাণ্ড হয়ে গেছে। ছেলেটাকে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পাচ্ছি না। আর সেই সঙ্গে খুঁজে পাচ্ছি না একটা মূল্যবান জিনিস।
কী জিনিস?
একটা পিস্তল।
সর্বনাশ। পিস্তল শুটিং জানে ও?
শুধু জানে বললে ভুল বলা হবে। অব্যর্থ টিপ ওর। কিন্তু এটা ও কেন নিল তা ভেবে পাচ্ছি না।
মনে হয় কাউকে ও ফলো করেছে।
তা যদি হয় তা হলে তো ভয়ের ব্যাপার। একেবারে শিকারির মুখেই গিয়ে শিকার হয়ে ধরা দেবে।
ওদিক থেকে উত্তর এল, আপনি কোনও চিন্তা করবেন না। আমি ওর খোঁজে লোক লাগাচ্ছি।
বাসববাবু ফোন রেখে হিরণের ঘরে ঢুকে বইপত্তর ঘেঁটে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলেন যদি কোথাও একটুকু চিরকুটও রেখে দিয়ে থাকে ও। কিন্তু না। সেইসব কিছুই পেলেন না তিনি।
এমন সময় স্বপ্না আর রিয়া এসে ঘরে ঢুকল, হিরণদা ফিরেছে কাকিমা? না না। কোথায় যে গেল ছেলেটা কে জানে?
স্বপ্না বলল, ও পাড়ার বংশীদার সঙ্গে বাবার দেখা হয়েছে। বাবা বংশীদার মুখে শুনেছেন হিরণদা নাকি ভোরবেলা খুব জোরে হেঁটে কোনদিকে যাচ্ছিল। এটাকে মর্নিং ওয়াক ভেবে হিরণদাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
বাসববাবু বললেন, দেখলে তো, আমার ধারণাটা ভুল নয়। কিন্তু এইভাবে কাউকে কিছু না বলে কোথায় গেল ও? কোথায় যেতে পারে? কেনই বা গেল? মা বললেন, কাল সারাদিন ও ঘর থেকে বেরোয়নি। চুপচাপ শুয়ে-বসে ছিল। ছাদে বসে বই পড়ছিল।
বাসববাবু বললেন, অনবরত গল্পের বই পড়ে পড়ে এই রকমটা হয়েছে ওর। যত্ত সব গাঁজাখুরি গল্প পড়েই মাথাটা গেছে। এখন নিজেকেই ও একজন হিরো ভেবে নিয়েছে। আর সেই ভেবেই পিস্তলটা নিয়ে কোনও কিছুর মোকাবিলা করতে গেছে নির্ঘাত।
রিয়া বলল, তা কেন, হিরণদা ওটা আত্মরক্ষার জন্যও তো কাছে রাখতে পারে।
স্বপ্না বলল, তা অবশ্য পারে। কিন্তু এইভাবে কাউকে কিছু না জানিয়ে বেরোবার দরকারটা কী ছিল। জানে তো বাড়িতে ভাববে।
মা বললেন, উঃ। কী সাংঘাতিক ছেলে। কী যে করি আমি। বাসববাবু বললেন, কী আর করবে? বসে বসে কপাল চাপড়াও।
স্বপ্না আর রিয়া দু'জনেই তখন হিরণের শোবার ঘরে ঢুকে ওর বইপত্তর ঘেঁটে কাগজপত্তর খুলে দেখতে লাগল কোথাও কোনও চিরকূট বা ওই জাতীয় কোনও চিঠিপত্তর কিছু রেখে গেছে কি না। ওরাও হতাশ হল। ব্যাপারটা বেশ রহস্যময় বলেই মনে হল ওদের কাছেও। ওরা এ-ঘর ও-ঘর করে ছাদে উঠল। ছাদে উঠে এদিক সেদিক করে তাকিয়েই ওরা দেখল মোড়ের মাথায় একজন লোক দাঁড়িয়ে লক্ষ করছে বাড়িটার দিকে।
রিয়া স্বপ্নাকে বলল, দেখেছিস সপু, লোকটা কেমন বাড়িটার দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে?
স্বপ্না বলল, আরে তাই তো! মনে হচ্ছে কোনও মতলব আছে ওর। শুধু তাই নয়, আমরা যে ওকে দেখছি সেটা টের পেয়েই ও চোখ নামিয়ে অন্য কোনও কিছুর দিকে মন দিচ্ছে।
তা সত্ত্বেও মাঝে মাঝে কেমন পটলচেরা চোখ মেলে তাকিয়ে দেখছে দেখ। চল তো নীচে গিয়ে লোকটাকে একটু চেজ করি।
ওরা যখন নীচে নেমে এল তখন দেখল বাসববাবু ইউনিফর্ম পরে বাইরে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছেন। ওরা একবার ভাবল বাসববাবুকে লোকটির কথা বলে। কিন্তু তা না বলেই বাইরে এল ওরা। তারপর দ্রুত পায়ে মোড়ের মাথায় এগিয়ে গেল। গিয়ে দেখল কোথায় কে? সেই বিশেষ লোকটির চিহ্নমাত্র নেই কোথাও।
স্বপ্না বলল, অবাক কাণ্ড তো?
রিয়া বলল, মোটেই অবাক কাণ্ড নয়। লোকটা আসলে বুঝতে পেরেছে আমরা ওর মতলব বুঝে ফেলেছি। তাই আমরা ছাদ থেকে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গেই গা ঢাকা দিয়েছে।
আমার মনে হয় ব্যাপারটা কাকাবাবুকে একটু জানিয়ে রাখা ভাল।
কী হবে জানিয়ে? একেই ছেলের জন্যে ওঁর মন খারাপ তার ওপরে এইসব শুনিয়ে ওনাকে বিব্রত করে লাভ কি?
ওরা আবার যখন ফিরে এল বাসববাবু তখন একদৃষ্টে সেদিনকার খবরের কাগজের হেডিংগুলোর দিকে তাকিয়ে আছেন। এক জায়গায় বড় বড় হরফে লেখা আছে, আবার কার্লস জ্যাকল! অপরাধজগতের কুখ্যাত নায়ক এখন কলকাতায়। জেলপলাতক কার্লস জ্যাকলের নতুন শিকার একজন নিরীহ নাগরিক। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে গোয়েন্দা হানা।
স্বপ্না আর রিয়া দু'জনেই এসে কাকাবাবুর সামনে এসে দাঁড়াল।
বাসববাবু স্বপ্না বলল, একজন লোক অনেকক্ষণ থেকে এই বাড়িটার দিকে নজর রাখছিল। আমরা ছাদ থেকে নেমে লোকটাকে ধরব বলে যেই গেলাম, অমনি দেখি লোকটা ভ্যানিস হয়ে গেছে।
কাগজের পাতা থেকে চোখ তুলে বললেন, কিছু বলবি মা?
কতক্ষণ আগে?
এই তো। এইমাত্র।
লোকটাকে কী রকম দেখতে বলো তো?
ওরা দু'জনেই চেহারার বর্ণনা দিল।
বাসববাবু বললেন, লোকটাকে আবার কখনও দেখলে আমাকে জানাবি। কথা বলতে বলতেই অফিসের গাড়ি এসে গেল। বাসববাবু রিয়া আর স্বপ্নাকে বললেন, তোমাদের কাকিমাকে একটু দেখো। আর ছেলেটা যদি ফিরে আসে আমাকে একটা ফোন কোরো কেমন? কাকিমার কাছ থেকে নাম্বারটা জেনে নিয়ো।
স্বপ্না বলল, আজ কি আপনার না গেলেই নয়?
বাসববাবু বললেন, আজই তো আমি বেরোব মা। লেটা যদি কোনও বদ লোকের খপ্পরে পড়ে থাকে তা হলে সেখান থেকে ওকে উদ্ধার করে আনতে হবে তো।
অবশ্যই। আপনি যান, আমরা দেখছি কাকিমাকে।
বাসববাবু যাবার জন্যে যে মুহূর্তে এক পা এগিয়েছেন অমনি নীহারবাবু এসে হাজির। বললেন, এবার বোধহয় চাকরিটা ছেড়ে দিতে হল স্যার।
বাসববাবু মুখ কালো করে বললেন, কেন কী হল আবার? কার্লস জ্যাকলের কাছে আমরা হেরে গেলাম।
আবার নতুন কিছু?
হ্যাঁ, অত প্রহরা সত্ত্বেও আমার বাড়ির বাথরুমের ভেতর থেকে – একটা কাটা মুণ্ড উপহার পেয়েছ। এই তো?
ঠিক তাই।
এবং তার কপালে পিনআঁটা কাগজে তোমার নামও লেখা আছে। ভয়ে আমার বুক কাঁপছে স্যার।
ভয়ে পেয়ো না। সাহসে বুক বেঁধে এগিয়ে এসো, দেখবে ভয় কেটে গেছে। তা ছাড়া এখন ভয়কে জয় না করলে সমূহ বিপদ। আমাদের জীবনই এই। লোকে তো বোঝে না, তারা ভাবে গোয়েন্দাদের হাতে আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ আছে। তাই দিয়েই তারা গল্পের গোয়েন্দাদের মতো অপরাধীদের পটাপট ধরে ফেলবে। আমরা যে কত অসহায়, কী কঠিন মূল্য যে দিতে হয় আমাদের, তা কে বোঝে? কাজেই সমস্ত সংশয় মন থেকে দূরে সরিয়ে নির্ভয়ে এগিয়ে এসো।
নীহারবাবু বললেন, আরও খারাপ খবর আছে। আমার হিরণকেও ওরা...।
না না, তা নয়। একটু আগে পুলিশ-হাসপাতালে ঢুকে রহমতকে ওরা শেষ করে দিয়ে গেছে।
বাসববাবু রেগে বললেন, ওখানে ওরা ঢোকে কী করে? সিকিউরিটি কী করছিল?
পুলিশের দু'জন লোক পাহারায় ছিল। একজন বাথরুমে গেলে অপরজনকে ওরা কবজা করে ভেতরে ঢোকে। দলে ওরা তিনজন ছিল। সেই তিনজনের একজন অবশ্য এক অজ্ঞাত আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছে। পিছনদিক থেকে কেউ যেন গুলি করেছে তাকে।
লোকটাকে চিনতে পেরেছে?
না। তবে চেহারা দেখে মনে হয় পেশাদার খুনে একজন। ডেড বডি মর্গে পাঠানো হয়েছে?
যথারীতি।
এমন সময় টেলিফোনটা বেজে উঠতেই বাসববাবু রিসিভার তুলে বললেন, হ্যালো, মি. মজুমদার বলছি।
ওদিক থেকে উত্তর এল, গুড মর্নিং।
গলাটা খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে।
সে তো চিনবেনই। আমি যে আপনার পুরাতন বন্ধু। কার্লস জ্যাকল!
ঠিক ধরেছেন। নীহারবাবু আপনার ওখানেই আছেন নিশ্চয়। আর খুব ভয় পেয়ে গেছেন। আমার লোক যে একেবারে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়বে এটা উনি ভাবতেও পারেননি। আসলে এও এক ধরনের খেলা। বুঝলেন কিনা, চোর-পুলিশ খেলা যাকে বলে। আজকের কাগজ দেখেছেন? কী সব কেচ্ছা-কেলেঙ্কারিগুলো ছাপা হয়েছে আপনাদের?
রাগে বাসববাবুর মুখ দিয়ে একটা খারাপ কথা বেরিয়ে এল। ওদিক থেকে উত্তর এল, আপনি কিন্তু বড় বেশি রেগে যাচ্ছেন। আসলে আমি এখন চাইছি আপনার সঙ্গে আমার একটা দোস্তির সম্পর্ক গড়ে তুলতে। আসুন না আমার এখানে, একটু পায়ের ধুলো দিয়ে যান। তবে যাই বলুন না কেন, ছেলেটাকে কিন্তু খাসা তৈরি করেছেন। ওই রকম একটা ছেলে আমার খুব দরকার।
ছেলেটা কোথায়?
যাঃ বাব্বা। তা আমি কী করে জানব?
তুমি সব জানো শয়তান।
আপনি অকারণে এইসব যা তা বলছেন আমাকে। তাই তো বলছি একবার একটু পায়ের ধুলো দিন। আজ দুপুরে একটা দেড়টা নাগাদ বাবুঘাটে আসুন। অবশ্যই নিরস্ত্র এবং পুলিশবাহিনী না নিয়ে। আমার লোক সসম্মানে সেখান থেকে নিয়ে আসবে আপনাকে।
বাসববাবু ফোন রেখে নীহারবাবুকে সব বললেন। তারপর বললেন, নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবে নাকি?
প্রশ্নই ওঠে না।
বাসববাবু বললেন, আমার এখন মনে হচ্ছে কী জান? ওর দলের লোকই বোধহয় এখন ওর পেছনে লেগেছে। না হলে কাল আমার বাড়ির সামনে রহমত বোমা ফাটাতে এলে ওকে গুলিই বা করল কে, আর আজ ওকে যারা হত্যা করতে এল তাদেরও একজনকে সরিয়ে দিল কে? কে করেছে এই কাজ? আমার মনে হয় একই লোকের কাজ এটা।
নীহারবাবু বললেন, না। রহমতকে গুলি করেছে আমারই পাঠানো একজন লোক। সে সব সময় আপনার বাড়ির দিকে গোপনে নজর রাখত। আপনার অনুমতি না নিয়েই আমি তাকে নিযুক্ত করেছিলাম এই কাজে। ওর উচিত ছিল রহমতকে গুলি না করে হাতেনাতে ধরা। হয়তো বা বোমার শব্দে উত্তেজিত হয়েই গুলি করেছে। আর সেই রাগেই সম্ভবত কার্লস জ্যাকল আমার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে একটা কাটা মুণ্ডু উপহার পাঠিয়েছে কাউকে দিয়ে। তবে যাই হোক, লোকটার কিন্তু হিম্মত আছে। কিন্তু আজকের ঘটনার নেপথ্যে যে কে আছে তা কে জানে?
নীহারবাবুর কথা বলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হিরণ এসে ঘরে ঢুকল। বলল, আমি জানি।
বাসববাবু ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। মা ছুটে এসে ধরলেন হিরণকে। স্বপ্না আর রিয়া ভর্ৎসনার সুরে বলল, তুমি কী বলো তো হিরণদা? এইভাবে না বলে কেউ যায়? একটা চিঠি অন্তত লিখে রেখে যাবে তো?
হিরণ বলল, আরে বাবা, আমি তো একেবারেই চলে যাব বলে যাইনি। কাজেই চিঠি লেখার প্রশ্ন ওঠে না।
বাসববাবু বললেন, তোমার জন্যে আমরা কত ভাবছিলাম জানো? এখন তোমার মুখ থেকেই শুনতে চাই কে গুলি করেছে লোকটাকে। হিরণ বলল, আমি।
তুমি গুলি করেছ?
হ্যাঁ। আমি ওকে গুলি করেছি। আমি তো তোমারই ছেলে, কাজেই তোমার কোনও কাজে সহযোগিতা করবার অধিকার আমার নিশ্চয়ই আছে?
আছে। কিন্তু এ যে আগুন নিয়ে খেলা। এই চক্র বড়ই সাংঘাতিক। আমাদের এই পুলিশবাহিনী এক প্রচণ্ড সংগঠিত শক্তি। শয়তানের মারপ্যাচে আমরাই যেখানে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। সেইখানে কিনা তুমি গিয়ে ওদের ক্রোধানলে ঘি দিয়ে এলে?
মা বললেন, যাবার আগে তোর কি উচিত ছিল না বাড়িতে বলে যাওয়া? বললে কি তোমরা যেতে দিতে?
বাসববাবু বললেন, ঠিক ওই সময়েই পুলিশ-হসপিটালে তুমিই বা গিয়ে হাজির হলে কী করে?
এটা একটা মিরাক্যাল বলা যেতে পারে। কাল রাত থেকেই আমার মনের মধ্যে একটা প্রচণ্ড ঝড় তোলপাড় করছিল। আর এও বুঝতে পারছিলাম তোমার সঙ্গে শত্রুতা মানেই ওদের টার্গেট আমিও। এবং সেইজন্যেই তুমি আমায় ঘর থেকে বেরোতে দিচ্ছ না। আজ হোক, কাল হোক, ওদের খপ্পরে পড়তে আমাকে হতই। আমাকে মেরে অথবা কিডন্যাপ করেই ওরা প্রতিশোধ নিত। তাই মরবার আগে ওদেরও একটা মরণকামড় আমি দিতে চেয়েছিলাম। কাল রাতে চুপি চুপি তোমার ঘরে ঢুকে সরিয়েছিলাম পিস্তলটা। তারপর ভোরবেলা ওটা সঙ্গে নিয়েই পথে বেরিয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিল ওদের সতর্ক চোখ এই বাড়ির দিকে সব সময় তাকিয়ে থাকবে। তাই আমি বাইরে বেরোলেই আমাকে কিডন্যাপ করতে এগিয়ে আসবে ওরা। কিন্তু অনেকক্ষণ পথ চলার পরও যখন তেমন সন্দেহজনক কাউকে আমার পিছু নিতে দেখলাম না, তখন কেন জানি না, আমার মনে হল একবার রহমতের সঙ্গে দেখা করে আসি। যদি ওর মুখ থেকে কার্লস জ্যাকলের কোনও ঠিকানা আদায় করতে পারি, তা হলে যেভাবেই হোক লুকিয়ে ওকে খতম করে আসব।
হিরণের কথায় শিউরে উঠল সকলে।
মা বললেন, তার মানে নিজের মৃত্যু নিজেই ডেকে আনবে।
হিরণ বলল, আমি যখন জানতে পেরেছি আমরা এখন কার্লস জ্যাকলের শিকার, তখন এই কাজ কেন করব না বলো? প্যাঁচার মতো ওর ভয়ে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা বা পালিয়ে বেড়ানোর চেয়ে ওর সঙ্গে সংঘর্ষের পথেই চলে যাওয়াটা ঠিক নয় কি?
বাসববাবু হিরণের পিঠ চাপড়ে বললেন, আমার ছেলের উপযুক্ত কথাই তুমি বলেছ। কিন্তু ব্যাপারটা কী জানো? কার্লস জ্যাকল সাধারণ ক্রিমিন্যাল নয়। ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াবার আগেই ও তোমাকে শেষ করে দেবে।
হিরণ বলল, বেশ, তুমি তা হলে আমার স্কুলের নাম কেটে দিয়ে এসো, আমি আজ থেকেই আর ঘরের বাইরে যাব না। নন্দলাল হয়ে চুপ করে বসে থাকব।
মা বললেন, হ্যাঁ তাই করবে। আমি সব সময়ে তোমাকে চাবি দিয়ে রাখব ঘরের ভেতর। ওদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে যাবার বয়স তোমার হোক, তখন যা-ইচ্ছে করবে, এখন নয়।
আমার প্রথম অভিযানেই আমি কিন্তু একটাকে চিরতরে সরিয়ে দিয়ে এসেছি।
মা বললেন, ওটা একটা অ্যাকসিডেন্ট।
বাসববাবু বুকে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। বললেন, তুমি যে ভেতরে ভেতরে কতটা বড় হয়েছ তা আমি বুঝিনি বাবা। তোমার গলায় আমি জয়ের মালা পরিয়ে দেব। পুলিশের চাকরি করছি বলে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করবার দায়িত্ব শুধু আমার একার তা তো নয়। এ অধিকার সবার। শুধু আমার ছেলে হিসেবে যে তোমার তা নয়, তোমার মায়েরও আছে। আছে একজন সাধারণ নাগরিকেরও। বেশি সংখ্যক মানুষ যখন অসৎ হয়, বিভ্রান্ত হয়, তখন দেশের সামনে এমন এক সংকট পাহাড়ের মতো বাধা হয়ে দাঁড়ায় যে তাকে ঠেলে সরানোর কাজে এগিয়ে আসতে হয় সকলকেই। পুলিশ প্রশাসন বা একজন সরকারি কর্মচারীর ওপর যেমন অনেক দায়দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে, তেমনি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও ঠিক একই দায়িত্ব সমানভাবে বর্তায়। আলাদাভাবে নয়, সকলকে এক হয়ে একজোটে কাজ করতে হয়। একতাবদ্ধ না হলে এ দেশকে রক্ষা করা অসম্ভব।
মা ফোঁস করে উঠলেন এবার, তোমার লেকচার থামাও তো। কুখ্যাত দাগি আসামিগুলোকে ধরে আনছ, একদিন দু'দিন আটকে রাখছ, আর ছেড়ে দিচ্ছ। এই এলাকার মধ্যেই তোমার বাড়ির আশপাশে ওইরকম কত ঘুরে বেড়াচ্ছে তা তুমি জান না?
কেন জানব না? সবই জানি। আমরা কাজ করি বলেই তো ওদের টুটিটিপে লকআপে পুরি। জানি বলেই তো নিজের জীবন বিপন্ন করেও ধরে আনি ওদের। তারপর তাদের ছেড়েও দিই। দিতে বাধ্য হই। সব চেষ্টা বিফল হয়ে যায়। অত পরিশ্রম, অত হানাহানি, মারামারি, দাপাদাপি সবই নাটক হয়ে যায় একসময়। এই নাটক তোমরাই তো সৃষ্টি করো।
করতে বাধ্য হই। না করে উপায় আছে? আজ তুমি যাকে কুখ্যাত সমাজবিরোধী বলে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছ, কাল সকালে তাকে যদি অ্যারেস্ট করি তখন দেখবে তোমার পাশের বাড়িরই অমুকবাবু, তমুকবাবুরা তার সুনজরে থাকবার জন্যে দল বেঁধে তাকে ছাড়াতে যাবে। এ ছাড়াও সমাজের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তো যাবেনই, অথবা আবেদন নিবেদন করে তাঁদের যেতে বাধ্য করা হবে। তা হলে? তোমাকে, আমাকে, অমুকবাবুকে, তমুকবাবুকে নিয়েই তো আমরা। এবার বুঝেছ তো আমাদের ক্ষমতা কতটা সীমিত? যাক, ওসব কথা বুঝিয়ে বলতে গেলে সাতকাহন হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষ যতদিন না একজোট হয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হবে, পরস্পর পরস্পরের পাশে এসে না দাঁড়াবে, ততদিন কিচ্ছু হবে না, চলতেই থাকবে এইসব। তা ছাড়া মানুষের অভাব অনটন দারিদ্র যত প্রবল হবে, শিক্ষার প্রসার যত কম হবে, ততই বাড়বে অপরাধের মাত্রা। একে রোধ করবে কে?
নীহারবাবু বললেন, হিরণ, তুমি আজ যেভাবে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে এক ভয়ংকর শত্রুর মোকাবিলা করতে গিয়েছিলে, তা তোমার মতো সব ছেলেরই আদর্শ হোক।
হিরণ বলল, হওয়া উচিত। তবে, ভাগ্যিস আমি পিস্তল শুটিংটা শিখেছিলাম আর আমার বাবা একজন পুলিশ অফিসার, তাই হয়তো আমি এতটা দুঃসাহসী হতে পেরেছি।
তাও ঠিক নয়। তুমি সাহসী ছেলে বলেই পেরেছ। না হলে পারতে না। অনেক পুলিশ অফিসারের অনেক ছেলেই আছে, তারা কি সবাই পারে তোমার মতন সাহসে ভর করে এগিয়ে যেতে? তোমার ভেতরে যে ওই বীজ ছিল বাবা।
বাসববাবু বললেন, এবার আমাকে বেরোতে হবে। যে পর্যন্ত তুমি বলেছিলে তার পর থেকে বলো কীভাবে কী হল।
হিরণ বলল, হ্যাঁ, আমি তো রহমতের সঙ্গে দেখা করব বলে গেলাম, যেই না গেছি অমনি দেখি সন্দেহভাজন দু'-তিনজন ঘোরাফেরা করছে সেখানে। দেখেই বুঝলাম গতিক সুবিধের নয়, একটু আড়ালে লুকিয়ে ওদের কথাবার্তা শোনবার চেষ্টা করলাম। টুকরো টুকরো কথা যা দু’-একটা কানে এল তাতেই বুঝলাম ওরা রহমতকে খুন করবার মতলব নিয়ে এসেছে। এই অবস্থায় আমি কী করব যখন ভাবছি, তখন হঠাৎ দেখি ওদের একজন চোখের পলকে হাসপাতালে ঢুকে গেল। তারপরই শোনা গেল গুলির শব্দ, আর হই-হট্টগোল। বুঝলাম অপারেশন সাকশেসফুল। রাগে তখন আমার হাত-পা কাঁপছে। লোকটা বেরিয়ে আসতেই আমি আড়াল থেকে গুলি করলাম লোকটাকে। ইচ্ছে ছিল পায়ে গুলি করবার। তা হলে লোকটা ধরাও পড়ত, ওকে মোচড় দিয়ে অনেক কথাও বার করা যেত। কিন্তু এই প্রথম টার্গেট তো আমার। আর গুলি ছিল মাত্র একটাই। পায়ে গুলি করতে গিয়ে যদি গুলিটা ফসকে যায়, তাই বডি লক্ষ্য করেই গুলি করেছি।
বেশ করেছ। কিন্তু তুমি ভয়ানক রিস্ক নিয়েছ। যদি ওরা পালটা গুলি করত তোমাকে, তা হলে তুমি কী করতে?
হয় পালাতাম, নয় মরতাম।
স্বপ্না আর রিয়া চোখদুটো বড় বড় করে বলল, ওরে বাবা! তুমি যে দেখছি ক্ষুদে রবিনহুড।
মা বললেন, তাই তো দেখছি। নাও, এবার হাতমুখ ধুয়ে একটু কিছু মুখে দাও।
বাসববাবু বললেন, হ্যাঁ, সেই কোন সকালে বেরিয়েছ। এবার জলটল খেয়ে বিশ্রাম নাও। আমি না বলা পর্যন্ত এখন স্কুলে যাবার দরকার নেই। এই বলে নীহারবাবুকে নিয়ে যাবার জন্যে তৈরি হলেন।
মা বললেন, দুটো খেয়ে গেলে হত না?
দেরি হয়ে যাবে।
বাসববাবু চলে গেলেন। যেতে তো হবেই। অপরাধীদের ধরার ব্যাপারে এখুনি তৎপর না হলে মুখ দেখানো যাবে না। এমনিতেই রাজ্যের বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতিগুলো নিয়ে পুলিশ দফতর হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। শুধু বাজে কাজ করতে গিয়েই সময় নষ্ট হচ্ছে কত। এরপর আছে ফুটপাত হকারমুক্ত করা। সকালে তাড়াও, বিকেলে আবার ঠিক বসে যাবে। পাবলিক যদি সাপোর্ট করে তো, রাজনৈতিক নেতারা বিরোধিতা করে। ঠিক কোনও-না-কোনও দাদা দাঁড়িয়ে যাবে ওদের হয়ে। তারপর আছে বেআইনি বাড়ি ভাঙা, যেখানে সেখানে গজিয়ে ওঠা মন্দির ভাঙা। মন্দির একটা গজাল তো পুজো দেবার সে কী ধুম। প্রতিরোধ করতে কেউ এগিয়ে আসবে না। কিন্তু গালাগালি দেবার সময় চায়ের দোকানে বসে ধুয়ে দেবে প্রশাসনকে। সব ক্ষেত্রে সকলের যেমন করবার কিছু থাকে না, তেমনি অনেক ক্ষেত্রেই তো এগিয়ে আসা যায়। দুঃখের বিষয় আসবে না কেউ। আর এই সব ডামাডোলের ভেতর দিয়েই চলতে থাকবে আরও অন্য অসামাজিক কার্যকলাপ। মাথাচাড়া দেবে মগ্ন মৈনাকের মতো কার্লস জ্যাকলের দল। জীবন বিপন্ন হবে বাসববাবুদের। ওদের কথা কেউ ভেবেও দেখবে না। ওরা হবে যূপকাষ্ঠের বলি। অপরাধ? ওরা যে পুলিশ।
বাসববাবু চলে গেলেন। মা যে কখন কোন ফাঁকে ঠাকুরের মানসিক করে ফেলেছিলেন তা কে জানে? হিরণের কপালে একটা টাকা ঠেকিয়ে ঠাকুরের জায়গায় রেখে এসে মেতে উঠলেন ছেলেকে নিয়ে। তারপর স্বপ্না আর রিয়ার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে ছেলের জন্য এটা ওটা সেটা কত কী করতে লাগলেন। হিরণ বাথরুমে ঢুকে ভাল করে মুখহাত ধুয়ে, ধপাস করে ওর বিছানায় এসে দেহটা এলিয়ে দিল। কুখ্যাত লোকগুলোর একটাকেও যে খতম করতে পেরেছে, এতেই ওর আনন্দ।
রিয়ার মা কাল সন্ধ্যাবেলা চলে গেছেন।
স্বপ্নার মা এলেন একটু পরে। সব শুনেটুনে কত বোঝালেন হিরণকে। বললেন, তুমি এখন ছেলেমানুষ বাবা। বড়দের কাজ কি তোমাকে সাজে?
হিরণ বলল, ছেলেমানুষ হলেও বালক তো নই। মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। তা ছাড়া আমার বাবা যেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন, সেখানে তাঁর ছেলে হয়ে আমি কী করে নীরব থাকি?
বুঝলাম। কিন্তু তোমার বাবা এইসব কাজে অভ্যস্ত। তুমি তো নও। তা ছাড়া যে কাজ তোমার বাবা করে থাকেন সে কাজ করার আইনগত অধিকারও তোমার নেই।
আজ আমার হাতেখড়ি হল।
মা বললেন, শুনেছ ছেলের কথা, এতটুকু ভয়ডর নেই।
হিরণ বলল, ভয় কী। আঘাতের পালটা আঘাত না করলে ওরা আমাদের দুর্বল ভাববে।
রিয়া বলল, এর বদলাও তো নিতে পারে ওরা।
তা অবশ্য পারে। কিন্তু ওদের কিছু না করেও আমরা ওদের টার্গেট হয়ে গেছি বলেই অতটা রিস্ক নিয়েছিলাম। বাপি সব সময় আইন মোতাবেক কাজ করেন। কিন্তু তাতে করে আইনের অনেক ফাঁকও থেকে যায়। ফলে ওই সব কালপ্রিটদের সহজে ঢিট করা যায় না। ওদের জন্যে যেমন কুকুর, তেমনি মুগুর হওয়া দরকার। কার্লস জ্যাকলটাকে একটু শিক্ষা দেওয়ার দরকার ছিল। না হলে ও ভেবেছিল যা খুশি তাই করে যাবে।
মা বললেন, এবার তোমাকেও একটু শিক্ষা দেওয়ার দরকার। দিন কতকের জন্যে তোমাকে মামার বাড়িতে না পাঠালে দেখছি চলছে না। রিয়া বলল, ওর মামার বাড়ি কোথায়?
চন্দননগরে।
তাতে আর লাভ কী হবে, একটু দূরে বরং কোথাও সরিয়ে দিন।
দূরে কোথায় পাঠাব? ওর বাবা অবশ্য বলছিল কিছুদিনের জন্যে কাশী চলে যেতে। কিন্তু এখানকার যা অবস্থা তাতে ওর বাবাকে ছেড়ে এক-পাও যেতে আমার মন চাইছে না।
রিয়া উল্লসিত হয়ে বলল, হিরণদাকে তা হলে আমাদের চিত্তরঞ্জনেই নিয়ে যাই না কেন?
স্বপ্না বলল, সেটা হলে কিন্তু মন্দ হয় না। হিরণদাও ওদের জিম্মায় রইল, আর আপনিও কাকাবাবুর দেখাশোনা করতে পারবেন। হিরণদা চিত্তরঞ্জনে থাকলে ইচ্ছামতো ফোনেও যোগাযোগ করতে পারবেন।
মা রিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের ফোন আছে?
আমাদের নেই। তবে পাশের বাড়িতে আছে। ওরা খুব ভাল লোক।
স্বপ্নার মা বললেন, সেই ভাল। হিরণকে ওদের ওখানেই পাঠিয়ে দিন। ওর বাবা এলে আলোচনা করে দেখুন, উনি কী বলেন।
উনি এক কথায় রাজি হয়ে যাবেন। কেন না, উনি মোটেই চান না ছেলেটা এখানে থাকুক। তবে কথাটা যেন পাঁচকান না হয়। না না কেউ জানবে না।
রিয়ার আনন্দ ধরে না। হিরণদাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে যাবার আনন্দে অধীর হয়ে উঠল সে। আনন্দের আতিশয্যে বলল, তুমি কিন্তু এই ব্যাপারে গোঁয়ার্তুমি কোরো না যেন।
রণ বলল, চিত্তরঞ্জনে হলে যেতে রাজি আছি। অন্য কোথাও নয়। শুনেছি তোমাদের চিত্তরঞ্জনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নাকি খুব ভাল। মনে মনে ওই জায়গায় বেড়াতে যাবার স্বপ্নও দেখেছি কত।
তুমি যদি যাও, তোমাকে নিয়ে চারদিক ঘুরে বেড়াব আমি। তোমাদের কলকাতার চেয়ে ঢের ভাল জায়গা। এমন দম বন্ধ হয়ে আসে না!
সবই তো বুঝলুম। কিন্তু তুমি এখানে কতদিন পরে এলে, আসতে-না-আসতেই চলে যাবে, তা কি ঠিক? স্বপ্নারা কী ভাববে?
স্বপ্না বলল, তাতে কী হয়েছে। তোমার এমন বিপদ। এই বিপদে যদি কিছু দিনের জন্যে তোমাকে একটু সেল্টার দেওয়া যায় তো মন্দ কি? তা ছাড়া তুমি তো আজই যাচ্ছ না।
রিয়া বলল, সত্যি বলতে কী, এখানে আমার একটুও ভাল লাগে না। স্বপ্নাকে দেখবার খুব ইচ্ছে ছিল, অনেকদিন দেখিনি বলেই এসেছিলাম। এখন দেখাশোনা হয়ে গেছে তাই আজ গেলেও ক্ষতি নেই, কাল গেলেও না।
স্বপ্না বলল, বেশ মেয়ে তুই।
আমাকে ভুল বুঝিস নারে। আসলে কী জানিস, আমাদের বাড়িতে কেউ যাবে বললে আমার খুব আনন্দ হয়। তুইও তো যেতে পারিস আমাদের সঙ্গে। আমি আবার কেন তোদের মাঝখানে বাধা হই!
এটা তোর অভিমানের কথা।
হিরণ বলল, ঠিক আছে বাবা আমি কোথাও যাচ্ছি না। ঘরেই থাকছি আমি। কারও মান-অভিমানের দরকার নেই।
স্বপ্না বলল, মান-অভিমানের কী আছে?
নেই যদি তো বাধা হই কথাটা বললে কেন?
ও এমনি কথার কথা।
রিয়া বলল, মোটেই না। তুই এমনভাবে বললি যেন মনে হচ্ছে তোর হিরণদাকে আমি কেড়ে নিচ্ছি।
সে ভাবে আমি বলিইনি।
তোর কথার তো তাই মানে হয়। হিরণদা আমাদের ওখানে কতদিন থাকবে বল? খুব জোর পনেরো দিন কি একমাস। আরও বেশি হলে আর একটা মাস। তার বেশি তো নয়। তুই হিরণদাকে সব সময় পাবি। পাশাপাশি বাড়ি তোদের। রোজ দেখবি, কথা বলবি, যেখানে খুশি যাবি। আমি দূরে থাকব। কিছুদিন পরে তোরা আমার কথা ভুলেই যাবি।
ওদের রকম দেখে মায়েরা হেসেই অস্থির।
চিত্তরঞ্জনে যাবার প্রসঙ্গ আসতেই হঠাৎ করে যেন আবহাওয়ার মোড়টাই ঘুরে গেল। খুন, জখম, ডাকাতি, রাহাজানি, ফোনাতঙ্ক, কাটা মুণ্ডু, কার্লস জ্যাকল সব উড়ে গেল কোথায়। এক লহমায় নিম্নচাপের ঘূর্ণিঝড়ে যেমন গুমোট গরম কেটে যায়, তেমনিই ঠান্ডা হয়ে গেল আবহাওয়াটা।
মা বললেন, এদিকে মুখে সব বড় বড় কথা। আমরা কি আর ছোটটি আছি? অথচ ঝগড়া করছে দেখো, ঠিক ছেলেমানুষের মতন।
স্বপ্নার মা বললেন, আসলে রিয়াকে ও দারুণ ভালবাসে। ওকে পেয়ে মেয়েটা যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছিল।
রিয়া বলল, সেই জন্যেই তো বলছি ওকেও আমাদের সঙ্গে যেতে। সবাই মিলে বেশ হইচই করে ঘুরে বেড়াব।
মন্দ কী? তবে আমাকে ছেড়ে এক রাতও কখনও থাকেনি ও। যদি থাকতে পারে যাক।
মা বললেন, ওমা, সে কী! বিয়ে হলে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তা হলে কী করবে? এখন থেকে অভ্যেস করুক।
হিরণ বলল, আপনিও তা হলে সঙ্গে চলুন?
আমি! আমি কী করে যাব বাবা? আমি কখনও হুট করতেই ঘর-সংসার ফেলে রেখে যেতে পারি? আমার যাওয়া হবে না!
রিয়া স্বপ্নাকে বলল, কীরে ! যাবি তুই?
স্বপ্না ছোট্ট করে বলল, দেখি।
হিরণ বলল, দেখি কেন? মায়ের জন্যে মন কেমন করবে? ওই একই প্রবলেম আমারও। তুই তো জানিস, আমিও কখনও মাকে ছেড়ে থাকিনি।
স্বপ্নার মা বললেন, এদিক থেকে রিয়া কিন্তু অন্যরকম। ও সবাইকে ছেড়ে থাকতে পারে। স্কুলের বান্ধবীদের সঙ্গে তো প্রায়ই এখানে ওখানে চলে যায়। একবার তিনদিনের জন্যে গিরিডি যাচ্ছি বলে সেই যে গেল, এক সপ্তা কাটিয়ে এল। ওর মা-বাবা তো ভয়েই মরে। ওর ওসবে হেলদোল নেই।
স্বপ্নার মা এরপর আরও অনেকক্ষণ রইলেন এ বাড়িতে। তারপর চলে গেলেন।
স্বপ্না ও রিয়াও গেল। যাবার সময় হিরণ ওদের দু'জনকেই বলল, দুপুরে এলে যাবে।
কিন্তু খুশি হব। যাওয়ার ব্যাপারে একটা পরিকল্পনা করা
স্বপ্না একটা ভেংচি কাটল।
রিয়া বলল, ভাল দেখে একটা গল্পের বই রাখবেন।
মা বললেন, বেশ মেয়েটি।
হিরণ বলল, কার কথা বলছ মা?
রিয়ার কথা বলছি। মেয়েটা যেমন দেখতে তেমনি মিশুকে। ওর মা-টাও খুব ভাল। এখন দেখি তোর বাবার সঙ্গে কথা বলে, উনি রাজি হন কি না।
রাজি না হবার কী আছে? তুমিই তো বললে বাপি চান আমি কিছুদিন দূরে কোথাও থাকি। সেই হিসেবে চিত্তরঞ্জন কিন্তু আইডিয়াল প্লেস। যাই না, দিনকতক ঘুরেই আসি। তোমরা একটু সাবধানে থেকো।
মা বললেন, থাক, আর পাকামো করতে হবে না। আসলে যা শত্রু পেছনে লেগেছে তাতে ওরা যে চিত্তরঞ্জনেও গিয়ে হাজির হবে না তাই বা কে বলতে পারে? ভয়টা তো সেইজন্যেই। তার ওপরে আজ যা করে এলি তুই—
তবে মা, হাত আমার খুলে গেছে। ফের যদি ওইরকম কিছু দেখি তো সব ক'টাকে শেষ করে দেব।
খুব বাহাদুর। বেঁচে যদি থাকি, তোমাকে তোমার বাবার মতন পুলিশের চাকরি আমি করতে দেব না।
হিরণ হেসে বলল, তুমিও জেনে রেখো, বড় হয়ে চাকরিই যদি আমি করি, তা হলে পুলিশের চাকরিই করব।
পুলিশের চাকরির ওপর তোমার এত দুর্বলতার কারণটা একবার জানতে পারি কি? সরকারি ক্ষমতা হাতে নিয়ে দুর্বল মানুষের মাথায় ডান্ডা মারবার অধিকারটা অর্জন করবে বলে নিশ্চয়ই?
হিরণ বলল, তুমি ভুল বুঝেছ মা। পুলিশের লোক কি সবাই খারাপ? আমার বাপিও তো একজন পদস্থ পুলিশ অফিসার। তাঁর সম্বন্ধেও কি তোমার ওই একই ধারণা? স্বীকার করছি পুলিশের ভেতর অনেক খারাপ লোক আছেন, কিন্তু আমরা জনসাধারণও কি সবাই খুব ভাল? সাধুর দলে কি চোর নেই? কোনও কিছুর মধ্যেই শুধু খারাপ দিকটা দেখো না, ভাল দিকটাও দেখো। একজন ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় দাঁড়িয়ে দু’পয়সা ঘুষ খেলে সেই অন্যায়টা তোমরা দেখো, কিন্তু জ্যৈষ্ঠের দুপুরে ‘লু’ মাথায় নিয়ে তার ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার কষ্টটা তোমরা দেখো না।
মা বললন, তুই থামবি? ভাল কাজ করলেও পুলিশের কাজে জীবনের ঝুঁকি কত তা কি তুই জানিস না?
জানি বলেই তো বলছি মা, জনগণের সেবা করবার এত বড় মাধ্যম আর কোন কাজে আছে বলো? তাই, আমি শুধু পুলিশ অফিসার না, পুলিশ কমিশনার হবার স্বপ্ন দেখি। তোমাদের আশীর্বাদে তা যদি হতে পারি, তা হলে দুর্নীতি কী করে দমন করতে হয়, আমি দেখিয়ে দেব।
মা বললেন, কী যে আছে আমার কপালে, তা কে জানে? বলে গৃহকর্মে মন দিলেন।
হিরণও আর কোনও কথা না বলে ওর বহুবার পড়া পাণ্ডব গোয়েন্দার একটা খণ্ড নিয়ে পড়তে শুরু করল। পড়তে পড়তেই মনটা আবার অন্যরকম হয়ে গেল তার। কত কী যে মনে এল, তার আর শেষ নেই। মনে মনে নানারকম ফন্দিফিকিরও আঁটল। তারপর একসময় ঘুম নেমে এল দু’ চোখ জুড়ে।
স্বপ্না আর রিয়া এল দুপুরবেলা। হিরণ তখন ক্যাসেটে গান শুনছে। আজ খুব জোর খাওয়াদাওয়া হয়েছে। মা ছেলের জন্যে কত কী যে করেছিলেন তার ঠিক নেই। আসলে হিরণ যে আবার ফিরে আসবে তা কেউ ভাবতেও পারেনি। বিশেষ করে বাবা-মা অশুভ আশঙ্কাটাই করেছিলেন বেশি। তাই ছেলেকে ফিরে পেয়ে মায়ের আনন্দের কি শেষ ছিল? ছেলে যা যা খেতে ভালবাসে মা তার সব কিছুই করেছিলেন।
স্বপ্না আর রিয়া ঘরে আসতেই হিরণ উল্লসিত হয়ে বলল, এই ক্যাসেটটা ক’দিন হল কিনেছি। কেমন? ভাল না?
রিয়া বলল, খুব ভাল। তা বলছিলাম কী হিরণদা, তুমি তো গল্পের বইয়ের পোকা। কিন্তু তুমি যে এমন সংগীতরসিক তা তো আগে জানতাম না। হিরণ হেসে বলল, সংগীতরসিক মানে ফিল্মি সংগীতের রসিক, অন্য গানের নয়।
সে যাই হোক, গান গানই। কিন্তু তোমাকে যে বলেছিলাম আমার জন্য বই রাখতে, রেখেছ?
উঁহু। বই তুমি বেছে নেবে। বলেই বুক সেলফের কাছে গিয়ে চাবিটা খুলে বলল, এই দ্যাখো কত বই।
বই দেখে তো অবাক হয়ে গেল রিয়া।
স্বপ্না অবশ্য চোখ কপালে তুলল না। কেন না ও তো সবই জানে। হিরণের কেনা প্রায় সমস্ত বই-ই ওর পড়া।
রিয়া বলল, এত বই তোমার।
এর ভেতর থেকে তোমার যে বই ইচ্ছে
স্বপ্না বলল, পাণ্ডব গোয়েন্দা পড়।
নাও।
পাণ্ডব গোয়েন্দা আমার সব পড়া। শুকতারায় পড়েছি, আনন্দমেলায় পড়েছি, বই কিনেছি, প্রাইজ পেয়েছি, এক একটা বই দশবার করে পড়েছি। বলেই বইয়ের তাক থেকে দুটো বই টেনে বার করে নিল। একটা হল ‘সেরা রহস্য পঁচিশ’ আর একটা ‘সোনার গণপতি হিরের চোখ'।
স্বপ্না বলল, এই বইদুটো তুমি কবে কিনলে?
এই তো পয়লা বৈশাখে।
স্বপ্না রিয়ার হাত থেকে সোনার গণপতি টেনে নিয়ে পড়তে বসে গেল। রিয়া বলল, তা হলে হিরণদা, যাবার ব্যাপারে আর কোনও দ্বিমত নেই তো? আছে। স্বপ্না না গেলে আমি যাব না।
স্বপ্না বলল, আমি কোন দুঃখে যাব? আমার পেছনে কি কার্লস জ্যাকল ছুরি নিয়ে ঘুরছে?
হিরণ বলল, দ্যাখ স্বপ্না, ঘুসি মেরে তোর পিঠ আমি ভেঙে দেব। একসঙ্গে দু’জনে পাশাপাশি বাড়িতে থাকি। দু'দিন বাদে বদলি হলে কোথায় চলে যাবি তার ঠিক কি? হইহুল্লোড় করবার এখনই তো সময়। এমন মওকা কিন্তু আর আসবে না। তাই বলি এই চান্স ছাড়িস না কিন্তু। তা ছাড়া তুই গেলে ভালই হয়। মনে একটু জোর পাই।
দেখি বাড়িতে বলে। ছাড়ে কি না, দু’-একদিনের জন্য তো নয়।
বেশ তো অসুবিধে থাকে দু’-একদিনই থাকবি। তুমি তো বললে, তারপর দিতে আসবে কে? আমি না হয় পৌঁছে দিয়ে যাব?
স্বপ্না হাসল।
রিয়া বলল, ও না যাক। তুমিই চলো হিরণদা। যাবার আগে একটু গোছগাছ করে নাও। তোমার জামাপ্যান্ট ইত্যাদি প্রয়োজনীয় যা কিছু সব নিয়ো। তার সঙ্গে এই সব গানের ক্যাসেট আর বাছাই করা খানকতক বই। আমাদের পরিবেশে কিছুদিন থাকলে আর তোমার এখানে আসতে ইচ্ছে করবে না।
হিরণ বলল, তোমাদের ওখানে পাহাড় আছে?
ছোটখাটো টিলা আছে দু’-একটা। তবে পাহাড় আছে কাছাকাছিই। গিরিডি, দেওঘর, শিমুলতলা, চারদিকে পাহাড়। ওখান থেকে বহুদূরে পাহাড়ের রেখা দেখা যায়।
হিরণ বলল, আমি যাব। কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। আর এও জেনে রেখো, আমি বেশ তৈরি হয়েই যাব। কার্লস জ্যাকলের ছায়াও যদি ওখানে গিয়ে হাজির হয় তা হলে তাকেও আর ফিরে আসতে হবে না।
রিয়া বলল, মধুপুরে আমার মাসিমার বাড়ি। সেখানে গেলে বাগান দেখবে কাকে বলে। কত যে ফুলগাছ রয়েছে সেখানে, তার যেন শেষ নেই। তুমি আপনমনে ঘুরবে অর আমি লক্ষ করব কেউ তোমাকে টার্গেট করছে কি না। যদি করে তুমি অমনি তাকে ডিস্যুম করে দেবে। আচ্ছা হিরণদা তুমি আমাকে ওটা শিখিয়ে দিতে পারো না? ওই পিস্তল চালানোর ব্যাপারটা।
নিশ্চয়ই পারি। ও এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। পিস্তল চালাতে যে কেউ পারে। তবে বাপি কি ওটা সঙ্গে রাখতে দেবেন?
কেন, দেবেন না কেন? তোমার আত্মরক্ষার জন্য ওটা তো অবশ্যই দেওয়া উচিত।
হিরণ বলল, ও জিনিস কাছে থাকলে আমি যমকেও ডরাই না।
রিয়া বলল, তুমি গেলে আমার বাবা-মা দারুণ খুশি হবেন। কবে যাবে তুমি? যেদিন তুমি নিয়ে যাবে।
তোমার বাবা যদি ছাড়পত্র দেন তা হলে কালই আমি নিয়ে যাব তোমাকে। কাল কখন যাব আমরা?
যখন মনে করবে। সকালে ব্ল্যাকডায়মন্ড ধরে আসানসোলে নেমে আমাদের ওখানে যেতে পারো। যে কোনও লোক্যাল ট্রেনে বর্ধমান হয়েও চিত্তরঞ্জন যাওয়া যায়। একটু বেলায় দশটা নাগাদ তুফান আছে। আর আছে অজস্র গাড়ি।
স্বপ্না তখন একমনে ‘সোনার গণপতি হিরের চোখ’ পড়ছিল। এবার বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে বলল, আর কাকাবাবু যদি মত না দেন?
তা হলে যাব না। অবশ্য সেইসঙ্গে রিয়াবাবুকেও যেতে দেব না। রিয়া তো হেসে গড়িয়ে পড়ল। বলল, কী কাণ্ড! আমি আবার বাবু হলাম কবে থেকে?
আজ থেকেই। চিত্তরঞ্জনে যাওয়া যদি না হয় তা হলে এখন থেকেই তুমি আমার সহকারী হিসেবে কাজ করবে। অবশ্য তোমার হাতেও একটা পিস্তল যাতে তুলে দেওয়া যায় সেই ব্যবস্থাও আমি করব। কার্লস জ্যাকল লালবাজারে কী রাহাজানি করেছে, তার ডবল রাহাজানি আমি ওর ওপরেও করব।
রিয়া বলল, সত্যিই তুমি আমাকে পিস্তল ধরাবে?
নিশ্চয়ই। তোমাকে আমি কিশোরী ফুলনদেবী করে ছাড়ব। বাপি রাজি না হলেও নীহারকাকুকে ধরে তোমার আমার জন্যে দুটো পিস্তল আমি জোগাড় করবই।
আনন্দে যেন খুশির বন্যা বয়ে গেল রিয়ার হৃদয়ে। আর স্বপ্না?
হঠাৎ সে বই মুড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি আসি রে। তোরা গল্প কর। বলেই দ্রুত চলে গেল ঘর থেকে।
রিয়ার মুখটা ম্লান হয়ে গেল। বলল, কী হল হিরণদা? সপুটা ওইভাবে চলে গেল কেন? মনে হল যেন ওর খুব রাগ হয়েছে?
হিরণ একটু গম্ভীর হয়ে বলল, আসলে ব্যাপারটা কী জানো? ও বোধহয় মনে মনে চায় না, আমি তোমার সঙ্গে তোমাদের ওখানে যাই।
রিয়ার চোখদুটো জলে ভরে এল। বলল, এই যদি হয় তা হলে আর আমার এখানে না থাকাই ভাল। আমি আজই চলে যাব এখান থেকে।
সে কী! আমাকে নিয়ে যাবে না?
তোমার জন্যই তো এত কাণ্ড। তোমাকে নিয়ে গেলেই ওর চোখ টাটাবে। যখন থেকে তোমাকে নিয়ে যাব বলেছি, তখন থেকেই ও উলটোপালটা বকছে। ও এত সেন্টিমেন্টাল তা জানতাম না।
রিয়া এবার ছুটে গিয়ে হিরণের বিছানায় উপুড় হয়ে ওর বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করল।
হিরণ বলল, আর কাঁদতে হবে না। আমি কালই যাব তোমাদের বাড়ি। তুমি এক কাজ করো, তোমার মনের মতন কতকগুলো বই আর প্রিয় গানের ক্যাসেট কিছু আমার এই সুটকেসে গুছিয়ে নাও দেখি? বলে একটা চামড়ার সুটকেস এগিয়ে দিল ওর দিকে।
এতক্ষণে কাজ হল। চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল রিয়া। ওঃ। কী মেয়েরে বাবা। এরই মধ্যে ফর্সা মুখ কেঁদে লাল করে ফেলেছে।
রিয়া সুটকেসটা টেনে নিয়ে বই আর ক্যাসেট গোছাতে গোছাতে বলল, নেহাত তুমি যাচ্ছ তাই। না হলে এখুনি আমি চলে যেতাম। একা তুমি যেতে পারতে?
না পারবার কী আছে? কাল যখন তোমাকে নিয়ে যাব, তখন দেখবে পারি কি না।
হিরণ একদৃষ্টে রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ওর কর্মতৎপরতা। স্বপ্না একটু আগে অভিমান করে চলে গেছে। দরজাটা খোলা আছে তাই। ও সেটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখল, মা পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছেন। কিন্তু এ কী! ছাদে ওঠার সিঁড়ির ধাপে পরম নিশ্চিন্তে গালে হাত দিয়ে বসে থাকা গোঁফ-দাড়ি ভুরুহীন ন্যাড়া মাথা বানরাকৃতি ওই লোকটা কে? চার ফুটের একটুও বেশি হবে না লোকটা। পরণে হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি। হিরণের চোখে চোখ পড়তেই কুতকুতে চোখে ওর দিকে তাকিয়ে হাসল লোকটা। কী সাহস! একেবারে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু কী হিংস্র ওর চাহনি। মুখে হাসি, চোখে বিষ।
হিরণ বলল, কে তুমি
লোকটি তেমনই হেসে বলল, বন্ধু। তারপর আবার খিক খিক হাসি। ভয় নেই, ডর নেই। যেন এটা ওর নিজেরই বাড়ি।
ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল হিরণের। বলল, কার হুকুমে তুমি বাড়ির ভেতর ঢুকেছ?
রিয়া তখন দরজার কাছে। ওর দু’চোখে বিস্ময়। বলল, ও কে হিরণদা? জানি না। মাকে একবার ডাকো তো?
লোকটি ধূর্তর হাসি হেসে বলল, মাকে এখন হাজার ডাকলেও উঠবে না। এ ঘুম সহজে ভাঙবে না ভাই।
তার মানে ঘরে ঢুকেই ক্লোরোফর্ম ইউজ করেছ তুমি, তাই না?
লোকটি আবার সেই গা জ্বালানো হাসি হাসতে লাগল।
হিরণ বলল, শয়তান!
লোকটি বলল, কোথায় পালাবার মতলব হচ্ছিল?
সে জেনে তোমার লাভ।
লাভ আছে বইকী ভায়া। তোমার ওপর নজর রাখার ডিউটিই যে আমার। তুমি স্বর্গে গেলেও আমাকে তোমার পিছু পিছু যেতে হবে, আবার নরকে গেলেও তাই।
সেই জন্যেই বুঝি তুমি এখানে এসেছ?
লোকটি ঘাড় নেড়ে বলল, ঠিক তাই। অনেকক্ষণ ধরেই বাড়ির ভেতর ঢোকবার চেষ্টা করছিলুম। হঠাৎ সুযোগ মিলল। একটি মেয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতেই আমিও সুট করে ঢুকে পড়লাম। ভাগ্যে তোমরা দরজায় খিল দাওনি। না হলে কী অসুবিধেই যে হত।
কিন্তু তুমি কি জানো, বাঘের ঘরে ঢুকেছ তুমি?
কই না তো। বাঘের ঘর তো চিড়িয়াখানায়। তা ছাড়া বাঘের ঘরে বাঘের গায়ের বোঁটকা গন্ধ ছাড়ে। এখানে তো মিষ্টি গন্ধ। ফুলদানিতে ফুল। এমন একটি মিষ্টি মেয়ে। কী নাম গো তোমার? মিষ্টি মেয়েটি? ভারী মিষ্টি মিষ্টি গোলাপি গন্ধ ছাড়ছে তোমার গা থেকে।
হিরণ বলল, ওর নাম যাই হোক, তুমি এই মুহূর্তে এখান থেকে বিদেয় হও মি. মাংকি। না হলে ফল কিন্তু ভাল হবে না।
লোকটি হেসে বলল, আরে আমাকে বাঁদরের মতন দেখতে হলে কী হবে, আমার নাম মি. মাংকি নয়। মংপু।
আই সে ইউ গেট আউট।
এত সহজে আমি এখান থেকে যাচ্ছি না ব্রাদার।
যাবে না?
না। আমি যে তোমার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছি।
ভুল করেছ। তুমি কি করে ভাবলে যে, আমি তোমার মতন একটা কিম্ভুতকিমাকারের সঙ্গে আলাপ করব?
লোকটির চোখদুটো এবার জ্বলে উঠল দপ করে। কঠিন গলায় সে বলল, আমার হাতে সময় খুব কম। আর আলাপ করবার মতো পরিবেশও এটা নয়। আমার গাড়ি আছে। চলো, দু’ বন্ধুতে কাছাকাছি কোনও পার্কে বসে একটু দোস্তি করে আসি।
হিরণ বলল, বেশ, তা হলে একটু দাঁড়াও জামাটা ছেড়ে আসি আমি।
মংপু শয়তানের হাসি হেসে বলল, বেশি দেরি করো না কিন্তু।
রিয়া ভয়ার্ত স্বরে বলল, না তুমি যেয়ো না। যেতে পাবে না। ওর চোখদুটো দেখছ না। ও নিশ্চয়ই কার্লস জ্যাকলের লোক। তোমাকে ও দোস্তি করবার জন্যে নিয়ে যাচ্ছে না। তোমাকে খুন করবার মতলব নিয়েই ও এসেছে।
হিরণ বলল, আমি জানি। তুমি আর এখানে থেকো না রিয়া। আমার জন্যে তুমিও কেন বিপদে পড়বে। তাই আমি বলি কী, তুমি এখুনি ঘরে যাও। বলেই রিয়াকে ইশারা করল হিরণ।
রিয়া আর কোনও কথা না বলে মাথা হেঁট করে দরজার কাছে যেতেই মংপু বাধা দিল ওকে। বলল, যাচ্ছো কথায় মিষ্টিমুখী। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো। আমি ওকে নিয়ে বাইরের দরজায় শিকল দিয়ে চলে গেলে লোকজন ডেকে দরজা খুলিয়ে যা ইচ্ছে করবে। এখন এক-পাও এগোবে না।
হিরণ ততক্ষণে জামা ছাড়বার অছিলায় ঘরে ঢুকেই পিস্তলটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। শুধু পিস্তল নয়, গুলিও নিয়েছে একাধিক। যে ভাবেই হোক মনুষ্যরূপী এই মর্কটটাকে খুন না করে ও ছাড়বে না। কিন্তু ট্রিগারে হাত দিয়েই চমকে উঠল ও। দেখল সেই বেঁটেখাটো পিশাচটার হাতেও একটা রিভলভার রয়েছে। সাপের চোখের মতো তাকিয়ে লোকটা এমন হিস হিস করে হাসছে যা দেখে গা জ্বলে গেল। তার ওপরে লোকটা রিয়াকে এমনভাবে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তার গায়ে রিভলভারের নলটা ঠেকিয়ে রেখেছে যে কোনও ভাবেই ওকে গুলি করা যাবে না।
হিরণকে আশাহত দেখে মংপু বলল, রং টার্গেট হয়ে গেল বন্ধু। ভেবেছিলে তুমি খুব চালাক, জামা ছাড়বার অছিলায় ঘরে ঢুকে পিস্তলটা বার করে এনে আমাকে সাবাড় করে দেবে। হাতের কাছে ভাগ্যিস মেয়েটা ছিল, না হলে হয়েছিল আর কী। হিরণ বলল, তোমার অনুমান ঠিক। তবে তুমিও দেখছি ধড়িবাজ কম নয়।
মংপু বলল, যদি এই মেয়েটার কোনওরকম ক্ষতি না চাও তা হলে এখুনি ফেলে দাও ওটা।
রিয়া চিৎকার করে বলল, না। কখনও ও কাজ করো না হিরণদা। ও আগে আমাকে ছাড়ুক। তারপর দেবে।
মংপু বলল, ঠিক আছে। আজ হাতে বেশি সময় নেই। আর রিস্কটাও একটু বেশি রকম নেওয়া হয়েছে। আজ এই মিষ্টিটাকেই নিয়ে যাই। কাল তোমাকে নিয়ে যাব। কখন কোথায় তুমি থাকবে সেটা ফোনেই জানাব। বলে রিয়াকে শক্ত করে ধরে এক-পা এক-পা করে পিছু হটতে লাগল মংপু।
হিরণ বললে, ওকে ছেড়ে দাও। ও আমাদের বাড়ির মেয়ে নয়। আমাদের পরিবারেরও কেউ নয়। আমি আজই যাচ্ছি তোমার সঙ্গে।
পিস্তলটা তা হলে আমার দিকে ছুড়ে দাও।
এর ভেতরে গুলি পোরা আছে মূর্খ। যদি ফসকায় তো আমাদের তিনজন এখুনি দু’জন হয়ে যাব। বলে পিস্তলটা ও মেঝেয় শুইয়ে রাখল।
আর সেই মুহূর্তেই মংপু এক ধাক্কায় রিয়াকে ফেলে দিয়ে বাঁহাতে হিরণের জামার কলারটা ধরে ডান হাতে ওর গালে টেনে একটা চড় মারল। তারপর ওকে শক্ত করে টিপে ধরে ওর নাকে একটা রুমাল চাপাতেই একটুক্ষণ ছটফটানি। পরক্ষণেই সব স্থির।
মংপুর ধাক্কার বেগ সামলাতে না-পেরে দেওয়ালে চোট লেগে মাথাটা ফুলে উঠেছে রিয়ার। যা জোর লেগেছে তাতে ঝিম ঝিম করছে মাথাটা। কী ভাগ্যিস ফেটে যায়নি এই ঢের। কিন্তু এই মুহূর্তে ও যে কী করবে, তা ভেবে পেল না। তবুও বিপদকালে উপস্থিত বুদ্ধিটা হারাল না ও। মেঝের ওপর নামিয়ে রাখা হিরণের পিস্তলটা কুড়িয়ে নিতে গিয়েই বিপত্তি ঘটে গেল। বেঁটে শয়তানটা পা দিয়ে সরিয়ে দিল পিস্তলটা। এত জোরে সরাল যে সেটা সিঁড়ির ধাপে লাগতেই সশব্দে একটা গুলি ছিটকে এসে পায়ে লাগল রিয়ার। রিয়া আর্তনাদ করে উঠল। হিরণ এতক্ষণ অজ্ঞান হওয়ার ভান করে নেতিয়ে পড়েছিল মংপুর কাঁধের ওপর। এইবার দু'হাতে ওর গলা টিপে এমনভাবে ঝুলে পড়ল পেছন দিকে যে, ওর পক্ষে তা শ্বাসরোধকারী হয়ে উঠল।
ততক্ষণে রিয়াও বুঝে গেছে এবার ওকে কী করতে হবে। সে ছুটে ঘরের ভেতর ঢুকে টেবিলের ওপর থেকে ফুলদানিটা পেড়ে এনে সজোরে এক ঘা মাথার ওপর বসিয়ে দিতেই রক্তাক্ত মংপু লুটিয়ে পড়ল মেঝেয়।
রিয়া বলল, হিরণদা তুমি তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে! তুমি কী করে গলায় চাপ দিলে ওর?
হিরণ বলল, ওর হাতের চড় খেয়ে বদনচন্দ্র বিগড়ে গিয়েছিল অবশ্য, তবে যে মুহূর্তে ও আমার নাকে রুমাল চেপে ধরেছিল সেই মুহূর্তে আমি নিশ্বাস বন্ধ করে অজ্ঞান হওয়ার ভান করেছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি ওর হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে, আর আমিও ওর সঙ্গে গিয়ে ঘাঁটিটা ওদের দেখে আসব। কিন্তু তোমার পায়ে গুলি লাগায় আর আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। এখন এসো এটাকে দু'জনে মিলে সজোরে বেঁধে ফেলি। তারপর?
তারপর জ্ঞান ফিরলে মারের চোটে ভুবন অন্ধকার করে দেব ওর। কার্লস জ্যাকলের ঘাঁটির সন্ধান ওর কাছ থেকেই পাব। সব জেনে নিয়ে ওরই কাটা মুণ্ডু উপহার পাঠাব কার্লস জ্যাকলকে। ওকে বুঝিয়ে দেব চোরের ওপর বাটপাড়ি কী করে করতে হয়। হিরণ আর একটুও দেরি না করে রিয়ার সাহায্য নিয়ে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল মংপুকে।
রিয়া বলল, দেখো হিরণ, এর ওপর বলপ্রয়োগ করতে আর আমাদের কোনও অসুবিধা নেই। তবে কিনা এর কাটা মুণ্ডু কাউকে উপহার পাঠাবার তো দরকার নেই। যে অপরাধের জন্যে কার্লস জ্যাকল কুখ্যাত হয়েছে সেই একই অপরাধ আমরা কেন করব? তার চেয়ে বরং তোমার বাপির হাতেই তুলে দেব একে। উনি একে জেলের ঘানি টানাবেন।
হিরণ বলল, এদের আটকে রাখবে এমন কোনও জেলখানা এখনও তৈরি হয়নি রিয়া। এদের একমাত্র ওষুধ হচ্ছে একেবারে নাশ করা। শত্রুর শেষ রাখতে নেই। আপাতত চলো একে কয়লা-ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখি।
সিঁড়ির নীচেই একটা ঘরে ঘুঁটে কয়লা ইত্যাদি রাখা হয়। জ্বালানি গ্যাস কমে গেলে ওগুলোর তো প্রয়োজন, তাই ওরা সেই রক্তাক্ত মংপুর ছোট্ট শরীরটাকে টানতে টানতে সেখানে নিয়ে গিয়ে দরজা খুলেই অবাক। দেখল একটা ডেড বডি কে বা কারা যেন শুইয়ে রেখেছে তার ভেতরে।
শিউরে উঠল হিরণ।
রিয়া চিৎকার করে সভয়ে পিছিয়ে এল। ওর গুলিবিদ্ধ পায়ের যন্ত্রণাও নিমেষের মধ্যে ভুলে গেল যেন। কেমন যেন এক গভীর আতঙ্কে থমথম করে উঠল ওর মুখ। কেন না এই লোকটাকেই তো স্বপ্না আর ও এই বাড়ির দিকে নজর রাখতে দেখেছিল। কিন্তু ওর এমন মর্মান্তিক পরিণতিটা করল কে? এ নিশ্চয়ই মংপুর কাজ?
হিরণ বলল, তুমি এঁকে চেনো?
রিয়া কোনওরকমে ঘাড় নেড়ে হ্যা বলেই বসে পড়ল সেখানে। ও কেমন যেন হয়ে গেল। এমন চটপটে মেয়ে ও কি শেষকালে ভয় পেয়ে গেল?
হিরণ একাই কয়লা-ঘরের ভেতর মংপুকে টেনেহিঁচড়ে ঢুকিয়ে শিকল তুলে দিল দরজায়। তারপর বাথরুমে ঢুকে এক আঁজলা জল এনে ওর চোখেমুখে দিয়ে ছাদে উঠে গেল। দ্রুত আলশের কাছে গিয়ে পাশের বাড়ির দিকে ঝুঁকে পড়ে ডাকল, স্বপ্না! স্বপ্না!
ওর মা উঠে এলেন ছাদে, ও তো তোমাদের বাড়িতে।
আমাদের বাড়ি থেকে অনেকক্ষণ চলে গেছে ও।
সে কী! গেল কোথায় মেয়েটা! বাড়ি আসেনি তো?
দেখুন ঘরে শুয়ে ঘুমোচ্ছে বোধহয়।
আমি নিজে খিল দিয়েছি। ও এলে দরজা তো আমিই খুলতাম।
তা ছাড়া রিয়াও আছে তোমাদের বাড়ি।
হিরণ বলল, হ্যাঁ, ও আছে। বলে একটু থেমেই হিরণ বলল, আপনি একবার শিগগির আমাদের বাড়ি আসুন। খুব বিপদ হয়ে গেছে আমাদের।
স্বপ্নার মা আতঙ্কিত হয়ে বললেন, কী হয়েছে?
আমার মা অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছেন। রিয়াও কেমন যেন হয়ে গেছে। আর স্বপ্না যখন ঘরে ফেরেনি, তখন সেটাও তো খুব ভয়ের ব্যাপার।
ওমা! সে কী! কী করব আমি? বলেই দ্রুত ছাদ থেকে নেমে চলে এলেন ওদের বাড়ি।
কিন্তু রিয়া কোথায়? ক্লান্ত রিয়া যে কয়লা-ঘরের সামনেই উদাস হয়ে বসে পড়েছিল। কেমন যেন ভয় পেয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। এরই মধ্যে কোথায় গেল সে?
হিরণ মায়ের ঘরে ঢুকল। মা তেমনিই শুয়ে আছেন। পাশের ঘরে, মানে যে ঘরে হিরণের সব কিছু থাকে রিয়া সেখানেও নেই। তা হলে? তা হলে কোথায় গেল রিয়া?
স্বপ্নার মা বললেন, রিয়া কই? স্বপ্না কোথায়? কী হয়েছে বলো না বাবা? এখানে এত রক্ত কেন? তোমার মায়ের কী হয়েছে?
এতগুলো কথার উত্তর একসঙ্গে কী করে দেবে হিরণ? ওর মাথাটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করতে লাগল। রিয়ার পায়ে গুলি লেগেছে। এই অবস্থায় সে কোথায় যেতে পারে? স্বপ্না! স্বপ্নার কী হল? ও ঘরে ফিরল না কেন?
স্বপ্নার মায়ের হাঁকডাকে ততক্ষণে অন্যান্য প্রতিবেশীরাও ছুটে এসেছেন সবাই মিলে। হিরণের মায়ের চোখেমুখে জল দিয়ে জ্ঞান ফেরাবার চেষ্টা করতে লাগলেন।
হিরণের এবার কেমন যেন সন্দেহ হল। সে কোনওরকমে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে কয়লা-ঘরের কাছে এসেই দেখল দরজার শিকল খোলা। এমন তো হবার কথা নয়। সে নিজে শিকল দিয়ে গিয়েছিল দরজায়। তাই সন্দেহটা প্রকট হল। আতঙ্কিত হয়ে চমকে উঠল সে। রিয়া তো নেই। সেইসঙ্গে মংপুও উধাও হল কী করে? শুধু সেই ডেড বডিটা তেমনিই পড়ে আছে ঘরের ভেতর। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে মংপুর পেছনেও লোক ছিল। হয়তো বা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল দূরে কোথাও। পরে দেরি দেখে বাড়িতে আসে, আর ওর ছাদে ওঠার সুযোগ নিয়েই কিডন্যাপ করে রিয়াকে। তারপর রক্তের দাগ দেখেই হোক বা রিয়াকে ভয় দেখিয়েই হোক মংপুকে কয়লা-ঘরের ভেতর থেকে খুঁজে বার করে এবং ওকে নিয়ে যাবার সময় রিয়াকেও সঙ্গে নিতে ভুল করে না।
হিরণ আর একটুও দেরি না করে টেলিফোনের রিসিভার তুলে নম্বর ডায়াল করল, হ্যালো লালবাজার...হ্যালো...হ্যালো...।
বাসববাবু টেলিফোনে খবর পেয়েই বাড়ি চলে এলেন। তখন সন্ধে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। নীহারবাবু, রঞ্জনবাবু এবং আরও কয়েকজন গোয়েন্দা অফিসার সঙ্গে এসেছেন। এসেছে এক গাদা পুলিশ। কয়লা-ঘরের ভেতর থেকে যে ডেড বডিটা উদ্ধার করা হল তাকে হিরণ না চিনলেও সে ছিল সাদা পোশাকের পুলিশ। নীহারবাবু তাকে এই বাড়ির দিকে নজরে রাখার কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। সেইমতো সে গোপনে কাজও করছিল। কিন্তু কার্লস জ্যাকলের লোকেরা যে তাকে চিনতে পেরে হঠাৎ অতর্কিতে আক্রমণ করবে তা সে ভাবতেও পারেনি।
বাসববাবু বাড়িতে এসে দেখলেন হিরণ কেমন মনমরা হয়ে বসে আছে। স্ত্রীর জ্ঞান ফিরেছে একটু আগে। ডাক্তারের ওষুধ আর ইঞ্জেকশানের প্রভাবে তিনি এখন স্বাভাবিক। কী থেকে কী যে হয়ে গেল তার কিছুই টের পাননি তিনি। তাঁর ঘুমিয়ে থাকার সময়েই মংপু শয়তানটা একটু বেশিমাত্রায় ক্লোরোফর্ম প্রয়োগ করেছিল তাঁর ওপর। ফলে সেই ঘুম ভাঙতে দেরি হল অনেক।
স্বপ্নার ব্যাপারেও দুশ্চিন্তার মেঘ কেটে গেছে। কেন না এই বাড়ির নাটকীয় সব ঘটনাগুলোর পরই সে ফিরে এসেছে। আসলে হিরণ ও রিয়ার অন্তরঙ্গ কথাবার্তা শুনে ওর কেবলই নিজেকে অপাংক্তেয় মনে হচ্ছিল। ওর মনে হচ্ছিল নেহাতই ওকে দলে না রাখলে খারাপ দেখায় তাই বুঝি ওকে চিত্তরঞ্জনে যাবার কথা বলা হচ্ছে। তাই ওর অভিমান হয়েছিল খুব। এবং যদি মা কিছু বলেন তাই ঘরে না-গিয়ে কাছাকাছি ওর এক বান্ধবীর বাড়ি গিয়ে হাজির হয়েছিল। তখন কি ও ঘুণাক্ষরেও জানত যে ও দরজা খুলে চলে যাবার পরই ওই বাড়িতে অমন একটা রোমহর্ষক ঘটনা হয়ে যাবে বলে? অবশ্য দরজা ও না খুললেও মংপু এ বাড়িতে ঢুকতই। লালবাজার অঞ্চলে সেই ভয়াবহ ডাকাতি ও রাহাজানির কুশীলবদের মধ্যে মংপুও তো একজন ছিল। কলকাতার কুখ্যাত ক্রিমিন্যালদের মধ্যে নৃশংতায় মংপুর নামও ছিল ব্ল্যাক লিস্টের বিশেষ তালিকায়। তা মংপুকে হাতের মুঠোয় পেয়েও সেই মুঠো ফসকে যাওয়ায় পুলিশমহল ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। তবে উৎকণ্ঠা যেটুকু রইল তা হল রিয়ার ব্যাপারে। ওরা যখন ওকে কিডন্যাপ করেছে তখন নিশ্চয়ই অকথ্য অত্যাচার করবে ওর ওপর। তার ওপর মেয়েটার পায়ে গুলি লেগেছে। সেই গুলিতে ক্ষতস্থান কত গভীর বা গুলি বিধে আছে কি না তাও তো দেখা দরকার। গুলি যদি ভেতরে থাকে সেটাকে বারও করতে হবে। কিন্তু এসব করবে কে?
বাসববাবুর আদেশানুযায়ী পুলিশের লোকেরা থানায় খবর পাঠিয়ে যেখানে
যত বদের আখড়া ছিল সর্বত্র তোলপাড় শুরু করে দিল। কেন না পুলিশের কাজের পদ্ধতিই এই, যেখানে দেখিবে ছাই। এইভাবে কাজও হয়। অভাবিত সাফল্য নেমে আসে। এখন কার্লস জ্যাকলের চেয়েও রিয়াকে খুঁজে বার করাটা একান্তভাবে দরকার। পুলিশের কাছে এ এক মস্ত চ্যালেঞ্জ।
স্বপ্নার বাবা বাসব মজুমদারের দুটি হাত ধরে বললেন, দেখুন মশাই! আপনি আমার প্রতিবেশী। পাশাপাশি বাড়িতে থাকি। তাই বলতে দ্বিধা নেই, আমার স্বপ্নার কিছু যে হয়নি এর চেয়ে সুখের আর কিছুই নেই। কিন্তু রিয়া পরের মেয়ে। ওর বাবা-মায়ের কাছে আমি কী করে মুখ দেখাব? আপনি যেভাবেই হোক উদ্ধার করুন ওকে।
বাসববাবু বললেন, আমার দিক থেকে ওই মেয়েটিকে খুঁজে বার করবার ব্যাপারে কোনও ত্রুটিই হবে না। বিশেষ করে ও যখন আমারই বাড়ি থেকে গুম হয়েছে তখন বিরাট দায়িত্ব এবং কর্তব্যবোধ তো একটা থেকেই যায়। তা ছাড়া ও বুদ্ধি করে ফুলদানি এনে মংপুকে ঘায়েল না করলে হিরণ একা কিছুই করতে পারত না। অতএব আপনি একটু ধৈর্য ধরুন এবং নিশ্চিত থাকুন।
যদি ওরা ওকে মেরে ফেলে?
না এইরকম কেসে চোদ্দো-পনেরো বছরের একটা মেয়েকে অপহরণ করলে শত্রুপক্ষ তাদের মারে না। বরং মোটা টাকার বিনিময়ে তাকে বিক্রি করে দেয়। সেইরকমটা যাতে হতে না পারে আমি সেই ব্যবস্থাই করছি। ওরা সেই ভুলটাই করতে যাবে এবং ধরা পড়বে।
তবু আমার হাত-পা যেন কাঁপছে। ওর মা-বাবা খবর পেলে কী যে করবে তা ভেবে পাচ্ছি না।
এখুনি ওর মা-বাবাকে খবর দেবার দরকারটা কী?
সে কী! যাদের মেয়েকে হারালাম তাদের একটা খবর দেব না?
না দেবেন না। একটু দেখুন না দু’-একটা দিন।
কিন্তু ওকে কি আমরা সত্যিই ফিরে পাব? মেয়েটার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছেন? কী সুন্দর মুখ। গায়ের রং দেখেছেন? যেন দুধে-আলতায় গোলা। মেয়ে বড় হচ্ছে। আর হয়তো দু'-চার বছর বাদেই ওর বিয়ে দিতে হবে, এখন এই অবস্থায়...।
মেয়েটাকে আগে উদ্ধার করি। তারপর ওইসব ব্যাপার নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যাবে।
আপনি তো বললেনই মশাই। আপনার তো মেয়ে নেই, থাকলে বুঝতেন মেয়ের বাপেদের জ্বালা কত।
বাসববাবু হেসে বললেন, সব বুঝি আমি। আরে আমার মেয়ে নাই বা থাকল, আমার স্ত্রী তো একজনের মেয়ে। আমার স্বর্গগতা মা-ও তো একজনের মেয়ে ছিলেন। তা ছাড়া ভুলে যাবেন না, আমার কিন্তু একটা ছেলেও আছে। অতএব মেয়েটাকে যদি ফিরে পাই, তা হলে কিন্তু ওর ব্যাপারে সব দায়িত্বই আমার। হিরণের মুখে যা শুনলাম তাতে বুঝতে পেরেছি, মা আমার যা তা মেয়ে নয়। অবশ্যই হিরণই বা আমার কম কীসে? মংপুর মতন ওইরকম একজন ঘোড়েল গুন্ডাকে ওইভাবে কাবু করা কি যা তা কাজ? আমার তো এখনও ওর মুখে শোনা ঘটনাগুলো ছায়াছবির দৃশ্য বলেই মনে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আমি কী ভাবছি জানেন? চাকরি থেকে অবসর নিয়ে এবার বই লেখা শুরু করব। বই লিখবেন?
হ্যাঁ, এই লালবাজারকে নিয়ে, লালবাজারের রাহাজানি নিয়ে, কার্লস জ্যাকলকে নিয়ে, মংপুকে নিয়ে। এই লেখার মধ্যে কোনও গোঁজামিল থাকবে না। একেবারে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কাহিনি। কম দেখলাম এ জীবনে? লালবাজারের চৌহদ্দিতেও কখনও পা না দিয়ে কষ্টকল্পিত কাহিনি লিখে পুলিশের ঘাড়ে ব্যর্থতার বোঝা চাপিয়ে শখের গোয়েন্দার বাহাদুরি দেখিয়ে কত লেখক লালে লাল হয়ে গেল। আর আমি লিখলে সে বই চলবে না?
রঞ্জনবাবু বললেন, নিশ্চয়ই চলবে। পুলিশের কাব্য পুলিশে লিখলে ভালই তো হয়। তবে হিরণবাবুর কৃতিত্ব কিন্তু অবিস্মরণীয়। ও যেভাবে মংপুকে ফাঁদে ফেলেছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। আমরা হলে বোধহয় এমনটি পারতাম না।
হিরণ এতক্ষণ স্থিরভাবে ওর মায়ের পাশে বসে সব শুনছিল। এবার থাকতে না পেরে বলল, এখন কি এই সব আলোচনার সময়? তা ছাড়া আপনারা পারতেন না, এমন কথা বলছেন কেন? জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করে কার্লস জ্যাকলের হাতে হাত কড়া তো একদিন আপনারাই পরিয়েছেন। শুধু একটু অসাবধানতার জন্যে লোকটা পালিয়েছে জেল ভেঙে।
নীহারবাবু রঞ্জনবাবুকে বললেন, শুনেছি জেলারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। মা বললেন, তাতে আর লাভটা কী?
বাসববাবু বললেন, লাভ-লোকসানের ব্যাপার নয়। সরকারি কাজকর্মের একটা বিধিনিষেধ তো আছে।
রঞ্জনবাবু বললেন, আর আমাদের কপালেও আছে অযথা ছুটোছুটি, দৌড়োদৌড়ি। হিরণবাবু যেভাবে মংপুকে কবজা করেছিল, তাতে ওই লোকটাকে নিংড়েই কার্লস জ্যাকলের ঘাঁটিতে হানা দেওয়া যেত।
হিরণ বলল, দেখুন, মংপুকে ধরার মধ্যে সত্য সত্যই আমার কোনও কৃতিত্ব নেই। ওটা অ্যাকসিডেন্ট। মাথা মোটা মংপু আমাকে নেহাতই ছেলেমানুষ ভেবে সিন ক্রিয়েট করতে গিয়েই ওর বিপদ ডেকে এনেছিল। আমরাও আত্মরক্ষার খাতিরে একটু কৌশল প্রয়োগ করেছিলাম মাত্র। এর বেশি কিছু নয়। তাও তো শেষরক্ষে হল না।
নীহারবাবু বললেন, তোমরা সবই করলে সেই সঙ্গে একটু ভুল করে ফেলেছিলে তোমরা। মংপুর হাত-পা বেঁধে আগেই যদি বাইরের দরজায় খিলটা দিয়ে দিতে তা হলে আর অন্য কেউ ভেতরে ঢুকে ওদের অপহরণ করতে পারত না।
আসলে এই রকম যে ঘটবে তা ভাবতেও পারিনি। তাই মাথার ঠিক ছিল না। রঞ্জনবাবু বললেন, ঠিক আছে, ধরা ওরা পড়বেই। হয় আজ, নয় কাল। তবে আজ থেকেই এই বাড়ির সামনে একদল পুলিশ সদা সতর্ক থাকবে। ,
মা বললেন, এই ব্যবস্থাটা আগে করলে তো এমনটি হত না। মাঝখান থেকে নিরীহ একটা মেয়ে ওদের কবলে পড়ে কোথায় যেন লোপাট হয়ে গেল। খুনও হল একজন। কী দরকার ছিল একা বেচারিকে দিয়ে নজরদারি করবার? ওই দুর্ধর্ষ শত্রুর মোকাবিলা কখনও একা একজনকে দিয়ে হয়? আমার তো মনে পড়লেও গা শিউরে উঠছে।
বাসববাবু বললেন, ভুল যা হবার তা হয়ে গেছে। আসলে ব্যাপারটা যে এতদূর গড়াবে তা ভাবতেও পারিনি।
এর পরে আর কোনও কথাবার্তা নয়। বাসববাবু সকলকে নিয়ে একটু চা-পান করেই আবার বিদায় নিলেন। যাবার আগে বলে গেলেন, ফিরতেও পারি, নাও পারি! আমার জন্য চিন্তা করো না। তোমরা সাবধানে থেকো।
স্বপ্নার বাবাও বিদায় নিলেন।
হিরণ দরজা বন্ধ করে ওর বিছানায় উপুড় হয়ে শুল। কিছু ভাল লাগছে না ওর। রিয়ার জন্য ওর ভীষণ মন কেমন করছে। সত্যি, কী যে করছে মেয়েটা। ওর বদলে যদি ওরা তখন ওকে তুলে নিয়ে যেত তা হলে আর যাই হোক কার্লস জ্যাকলের মুখোমুখি হতে পারত সে।
হিরণ যখন বিছানায় শুয়ে রিয়ার ব্যাপারে নানারকম ভাবছে ঠিক তখনই—। ক্রিরিরিং...। ক্রিরিরিং।
হিরণ উঠে গিয়ে রিসিভার ধরল, হ্যালো।
কার্লস জ্যাকল।
গলাটা গম্ভীর করে হিরণ বলল, বাসব মজুমদার বলছি।
আওয়াজটা একটু অন্যরকম ঠেকছে। খুব রেগে আছেন নিশ্চয়ই তা যাকগে, আমার লোকেরা আপনার ছেলের বদলে কাদের একটা মেয়েকে তুলে নিতে এসেছে। মেয়েটার ভারী মিষ্টি চেহারা কিন্তু। ওর পায়ের গোড়ালির কাছে একটা গুলি লেগেছিল। সেটা ডাক্তার দেখিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি। ওর জন্যে চিন্তা করবেন না। আসলে আমার খুব দেখবার ইচ্ছে ছিল আপনার ছেলেকে।
হিরণ বলল, মেয়েটা এখন কোথায়?
কোথায় বলি বলুন তো? এখুনি নিয়ে যাবেন? অবশ্যই।
খুব ভাল হয় তা হলে। কেন না খুন জখম চুরি ডাকাতি রাহাজানি আমি এই সব কাজে সত্যিই আনন্দ পাই। তবে ওই সব ছেলেমেয়ে চুরির ব্যাপারে আমি নেই। তাই বলছিলাম...
কোথায় দেখা করব বলুন?
কে আপনি?
বাসব মজুমদার।
গলা শুনে প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিল আমার। বাসব মজুমদার আমাকে ভুলেও কখনও আপনি বলেননি। তুমি নিশ্চয়ই তাঁর সেই সুযোগ্য পুত্র যে কিনা মংপুর মতন একজন কুখ্যাত গুন্ডাকে আর একটু হলেই দিয়েছিল শেষ করে।
হিরণ বলল, হ্যাঁ আমিই সেই।
তুমি নির্ভয়ে চলে এসো। মেয়েটাকে নিয়ে যাও। তুমি এলে ভালই হবে। কেন না তোমাকে একবার দেখবার ইচ্ছে আমার বহু দিনের।
হিরণ হেসে বলল, বলেন কী! আপনাকে দেখবার সাধও আমার কম নয় কিন্তু। হাজার হলেও আপনি আমার বাবার বন্ধু তো?
ওদিক থেকে হা হা করে একটা হাসির সুর শোনা গেল। তারপরই শোনা গেল, তুমি তা হলে এখুনি একবার চলে এসো বাবুঘাটে। আমার গাড়ি তোমার জন্যে ওইখানেই অপেক্ষা করবে। আর হ্যাঁ, কোনওরকম চালাকি করবার যেন চেষ্টা কোরো না।
না। চালাকি কিছু করব না। তবে আশা করি মেয়েটাকে সুস্থ শরীরেই ফেরত পাব।
দেরি না করে চলে এসো।
ওদিক থেকে ফোন নামিয়ে রাখার শব্দ শোনা গেল।
মা হিরণকে টেলিফোনে কথা বলতে শুনে এগিয়ে এলেন এবার, কে ফোন করেছিল রে?
রঞ্জনকাকু।
কী বলছিল?
বলছিলেন বাপি চলে যাওয়ার পর আর কেউ কোনওরকম ঝামেলা পাকাতে এসেছিল কি না।
তুই কিন্তু ঠিক বলছিস না হিরণ। ফোনে অন্যরকম কথাবার্তা শুনছিলাম। তুমি সব তাতেই এত সন্দেহ কর কেন বলো তো মা?
মা বললেন, কী জানি বাবা। ভয় করে।
হিরণ একবার অকারণেই এ-ঘর ও-ঘর করে ছাদে উঠে এল। তারপর আলশের কাছে গিয়ে ডাকল, স্বপ্না। স্বপ্নারে! স্বপ্না উঠে এল ছাদে।
হিরণ চাপা গলায় বলল, একটু আগে একটা ফোন এসেছিল। আবার ফোন!
হ্যাঁ, রিয়ার ব্যাপার! কার্লস জ্যাকল ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বলছে। সত্যি!
হ্যাঁ।
কিন্তু কে যাবে? তুমি?
সেইরকমই কথা হয়েছে।
যদি ওরা তোমাকে আটকে দেয়।
সে কী আর না-দেবে ভেবেছিস? তবে মুশকিল হচ্ছে একটাই, আমাদের বাড়ির সামনে যেরকম পুলিশ পাহারা রয়েছে তাতে এখান থেকে বেরোব কী করে তাই ভাবছি।
স্বপ্না বলল, ফোনে কী কী কথা হল শুনি?
হিরণ সব বলল।
শুনে স্বপ্না বলল, তুমি যেয়ো না হিরণদা। ওদের মতলব ভাল নয়। বরং তোমার বাবা এলে সব কথা খুলে বলো তুমি তাঁকে। এমন ভুল কখনও কোরো না।
তা না হয় না করলাম। এদিকে বাপির কানে উঠলে, বাপি যদি অন্য কোনও স্টেপ নিতে যান, তা হলে যে মেয়েটাকেই খুন করে ফেলে দেবে। তখন কী হবে?
তা হলে তুমি যাবে?
হ্যা, আর যদি আমি আজ রাত্রের মধ্যে না-ফিরি, কাল সকালে বাপিকে তুই সব বলবি।
ওরা তোমাকে কোথায় যেতে বলেছে যেন? বাবুঘাটে ?
হ্যাঁ।
তুমি এক কাজ করো হিরণদা, একেবারে তৈরি হয়ে পেছনের দরজা দিয়ে আমাদের বাড়ি চলে এসো। আর শোনো, আসবার সময় তোমার একস্ট্রা প্যান্টজামা একটা নিয়ে এসো।
প্যান্টজামা কী হবে?
নিয়েই এসো না, এলে সব বলব। আপাতত একটা বুদ্ধি এসেছে আমার মাথায়। তবে পিস্তলটা যেন রেডি থাকে।
ও বুঝেছি। তার মানে তুইও যেতে চাস আমার সঙ্গে?
আঃ। এসোই না তুমি।
স্বপ্নার কথামতো হিরণ বেশ ভালভাবেই তৈরি হয়ে নিল। প্যান্টের হিপ পকেটে ছুরি, পকেটের ভেতর পিস্তল, আলাদা কিছু বুলেট ইত্যাদি। তারপর স্বপ্নার কথামতো এক্সট্রা একটা জামাপ্যান্ট নিয়ে মাকে বলল, মা, আমি একটু সপুদের বাড়ি যাচ্ছি।
ভেতর দিয়ে যা।
তা নয় তো কি এই রাতদুপুরে বাইরে দিয়ে যাব?
স্বপ্না তৈরিই ছিল। হিরণ যেতেই ওকে নিয়ে ওর পড়ার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। বলল, শোনো হিরণদা, একা তোমার কখনওই যাওয়া চলবে না ওখানে। তোমার জামা প্যান্ট পরে আমিও যাব। আমার একটা প্যারেড করতে যাওয়া টুপি আছে, সেটা পরে থাকলে আমাকে কখনই মেয়ে বলে মনে হবে না। আমরা দু’জনেই যাব। একসঙ্গে নয়, আলাদা আলাদা ভাবে। আমি তোমার হয়ে দেখা করব ওদের সঙ্গে। তোমাদের ব্যাপারে সব কিছুই তো আমি জানি, তাই উত্তরও দিতে পারব যথাযথভাবে। তুমি হবে আমার বডিগার্ড। দূর থেকে সব কিছু লক্ষ করবে, পিছু নেবে, দরকার হলে ফাইট করবে রীতিমতো। একান্ত না পার ফোনে তোমার বাবাকে জানাবে।
হিরণ লাফিয়ে উঠল আনন্দে, দি আইডিয়া। প্ল্যান একটা যা করছিস তা কিন্তু ভারী চমৎকার। এ যে একেবারে পাণ্ডব গোয়েন্দার অভিযান হয়ে গেল। আমরা শুধু পাঁচের বদলে তিন আর পঞ্চ নামের কোনও কুকুর আমাদের সঙ্গে নেই, তফাত এইটুকুই।
স্বপ্না বলল, এইটুকু সময়ের মধ্যে আমি কীভাবে তৈরি হয়েছি জান? এই দেখো।
হিরণ দেখল স্বপ্না ওর কোমরে কাল রঙের কী যেন একটা জড়িয়েছে। কী ওটা?
নাইলনের ফিতে। বিশ ফুটের মতো।
কোথায় পেলি তুই?
কিনে আনলাম। যদি ওরা কোনওভাবে আমাকে চিনে ফেলে বা আটকে রাখে তা হলে এটা হয়তো কাজে লাগবে। আর নিয়েছি আগুন ধরাবার জন্যে একটা সিগারেট লাইটার।
আর?
আর কী নেব? ছুরি, ব্লেড এসব তো আছেই।
হিরণ ওর প্যান্টসার্ট দিলে স্বপ্না সেটা পরে তৈরি হয়ে নিল।
মা ডাকলেন, সপু, খাবি আয়। যাচ্ছি মা।
ঘরে কে রে?
হিরণদার সঙ্গে একটু কথা বলছি।
হিরণ বলল, আমি তা হলে আসি?
স্বপ্না এক চোখ টিপে বলল, হ্যাঁ, এসো।
ওরা দু'জনেই তখন এক এক করে পথে নামল। বাইরে এসে আড়চোখে তাকিয়ে দেখল হিরণ, সেখানে কী দারুণ পুলিশি ব্যবস্থা। ওরা ছায়ান্ধকারে দেওয়ালের গা ঘেঁষে একটু একটু করে এগিয়ে পথের বাঁকে হারিয়ে গেল। তারপর বড় রাস্তায় এসেই একটা ট্যাক্সি দেখতে পেয়ে উঠে বসল তাতে। ট্যাক্সির ড্রাইভার একজন সর্দারজি। বললেন, কিধার যানা হোগা বাবুসাব? হিরণ বলল, ধরমতল্লা।
ধরমশালা তো নেহি?
হিরণ বলল, কে তুমি?
কাজ। সর্দারজি হাসতে হাসতে বললেন, হুকুমত সিং। হুকুম তামিল করাই আমার হিরণ তখন পকেটে হাত দিয়েছে।
সর্দারজি সামনের আয়নায় সেটা দেখে বুঝতে পেরেই বললেন, ইয়ে বুরা কাম মাত করো ভাই। পিছে দেখো।
হিরণ দেখল ওদের ঠিক পেছনেই একটা ট্যাক্সি ওদেরকে অনুসরণ করে আসছে। আর সেই ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসে আছে দু'জন শক্ত-সমর্থ লোক। দানবের মতো চেহারা। কী ভীষণ। দেখেই বোঝা গেল এরা দু'জনেই হচ্ছে পেশাদার কোনও গুন্ডা। যারা নাকি কার্লস জ্যাকলের হয়ে কাজ করে।
হিরণ বলল, তুমি তা হলে কার্লস জ্যাকলের লোক?
সর্দারজি হেসে বললেন, সন্দেহ আছে না কি?
আমাদের তুমি কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
নিয়ে গেলেই দেখতে পাবে।
এটা তো বাবুঘাটের পথ নয়, আমাদের মেয়ে কই? তার কাছেই তো নিয়ে যাচ্ছি তোমাদের।
তোমাদের কথায় বিশ্বাস করে দেখছি ভুল করেছি।
কথার খেলাপ করেই ভুল করেছ। তোমার একা আসবার কথা ছিল, তুমি সঙ্গে একজনকে এনেছ। তোমার সঙ্গে কথা ছিল কোনওরকম চালাকি করবে না কিন্তু, তুমি রিভলভার অথবা পিস্তল যা হোক কিছু একটা বার করতে যাচ্ছিলে। তা হলেই বুঝলে তো কথার খেলাপটা তুমিই করেছ? আসলে পুলিশের লোককে কখনও বিশ্বাস নেই। ওরা হল কেউটে সাপের জাত। আর সেই পুলিশের ছেলে হল সাপের বাচ্চা। তাই শত্রুর শেষ আমরা রাখব না। মেয়েটা মুক্তি পাবে, কিন্তু তুমি পাবে না। আর বাসব মজুমদার...। ওর যা অবস্থা হবে তা শুনলেও তুমি শিউরে উঠবে।
কী করবে আমার বাপির?
‘শোলে’ দেখেছ?
মেট্রোয় দেখেছি, জ্যোতিতে দেখেছি।
গব্বর সিং-এর অভিনয় মনে আছে?
ও কি ভোলবার?
আমরাও গব্বর সিং হয়ে তোমার বাপির দুটো হাতই কেটে নেব। তারপর সেই হাত দুটো লালবাজারের সদর দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়ে এখানকার পাট চুকিয়ে বরাবরের জন্য চলে যাব আমরা।
কোথায় যাবে?
আমাদের লালমহলে।
সেটা আবার কোথায়?
সে এমনই এক দেশ সেখানে লালবাজারের বাসব মজুমদারের দৃষ্টি গিয়ে পৌঁছবে না।
বাপির হাত কেটে নেবে শুনেই হিরণ তখন ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে উঠেছে! ও মুহূর্তের মধ্যে পিস্তলটা বার করে তাইতে গুলি ভরে নিল।
সর্দারজির হাতেও তখন রিভলভার। হিরণের দিকে তাগ করে বলল, খবরদার। কোনওরকম বেয়াদপি করবে তো এখুনি শেষ করে দেব। হিরণ বলল, গাড়ি থামাও। মেয়েটাকে নেমে যেতে দাও। সর্দারজি একটা অশ্রাব্য গালাগালি করল।
পর মুহূর্তেই যা হয়ে গেল তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
স্বপ্না এইসব কথাবার্তার ফাঁকেই কখন যে ওর ছুরিটা বার করে ফেলেছিল কেউ দেখেনি। সে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই ছুরি দিয়ে পেঁচিয়ে দিল সর্দারজির গলাটা। গাড়ি তখন দ্বিতীয় হুগলি সেতুর কাছে এসে ক্যা-ক্যাচ্ করে ব্রেক কষ টার্গেট একটু রং হয়ে গেছে। হয়তো বা বরাতজোের। তাই গলার নলিটা দু 'ফাঁক না হয়ে তার পাশ থেকেই ঘাড় অব্দি চিরে গেল ভীষণভাবে। রক্তে ভেসে গেল সারা শরীর।
পরক্ষণে অপর ট্যাক্সি থেকে গুন্ডা দু'জন নেমে এসে জাপটে ধরল ওদের। ওরই মধ্যে একজনকে লক্ষ্য করে একটা গুলি করেছে হিরণ। গুলিটা ওর বাঁদিকের কাঁধে গিয়ে লাগল।
আহত লোকটি ডান হাতে বাঁ কাঁধটা চেপে ধরে হিরণকে এক ঝটকায় ফেলে দিল রাস্তার ওপর।
এতেই যথেষ্ট। হিরণের আর নড়বারও শক্তি রইল না।
স্বপ্না ও হিরণকে পেছনের ট্যাক্সিতে তুলে নিয়ে ওরা সকলে যখন দ্রুত সেই পথ ধরে এগোতে লাগল, তখন দেখল পুলিশের একটা টহলদারি জিপ ওদের পিছু নিয়েছে।
হরিণ শিকার করে শিকারিরা যেভাবে মৃত পশুগুলোকে নিয়ে যায়, ওরা ঠিক সেইভাবে স্বপ্না ও হিরণকে নিয়ে চলল।
স্বপ্না তারই মধ্য থেকে চিৎকার করতে লাগল, বাঁচাও বাঁচাও বাঁচাও।
গাড়ি খিদিরপুর পার হতেই জ্যামে আটকাল। ততক্ষণে একটা ট্রাফিক সিগন্যালে ধাক্কা দিয়ে দু’–একজন পথচারীকে চাপা দিয়ে একটা গলির মুখে এসে থামল ট্যাক্সিটা।
পুলিশের গাড়ি অবশ্য অতদূর এল না। আসবেই বা কি করে? ওরই মধ্যে চারদিক থেকে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমাবৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। কে বা কারা যে একাজ করছে তা কে জানে? হয়তো বা কার্লস জ্যাকলের সংগঠিত শক্তি অথবা অন্য কোনও দুষ্কৃতীর দল পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে বাধা দিচ্ছে। পুলিশের গুলিও হার মানল সেই বোমাতঙ্কের কাছে। কাজেই পিছু হটতে হল তাদের। অনেক পরে যখন সমস্ত এলাকাটা পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ হয়ে গেল অপারেশন তখন সাকশেসফুল। বাড়ি বাড়ি তল্লাসি চালিয়ে হিরণ এবং স্বপ্নার হদিসও পাওয়া গেল না কোথাও।
হাঙ্গার ফোর্ট স্ট্রিট থেকে লালবাজার কতটুকুই বা পথ। ঠিক পার্ক স্ট্রিটের মুখের কাছে আসতেই একটা বেপরোয়া লরি এসে ধাক্কা মারল বাসববাবুর জিপটাকে। কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাসব মজুমদার ছিটকে পড়লেন চৌরঙ্গি রোডের ওপর। জিপের ড্রাইভার হরকিষণ গুরুতর আহত অবস্থায় স্টিয়ারিং ধরে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ল। জিপটাও ভেঙে চুরে পড়ে রইল রাস্তায়। এই রকম অবস্থায় যা হয়, পথচারীরা হই হই করে ছুটে গেল সেই দিকে। বাসববাবু সংজ্ঞাহীন না হলেও প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন তিনি। হরষিণের কী হবে তা কে জানে?
কয়েকজন লোক ধরাধরি করে তুলে বসাল বাসববাবুকে। ডান পায়ের হাঁটুতে অসহ্য যন্ত্রণা। মাথাতেও আঘাত লেগেছে প্রচণ্ড। দুর্ঘটনার ঘোর তাই কাটিয়ে উঠতে সময় লাগল একটু। প্রথমত তিনি কোনও কথা বলতে পারলেন না। অনেক পরে একটু যখন প্রকৃতিস্থ হলেন তখন দেখলেন খবর পেয়ে সাহায্যকারী পুলিশবাহিনী এসে গেছে। কেউ নিশ্চয়ই কোথাও থেকে ফোনে পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছে এই দুর্ঘটনার কথা। যাই হোক, পুলিশের অনেক হোমরাচোমরা অফিসারও ছুটে এলেন ঘটনাস্থলে।
বাসব মজুমদার এবং হরকিষণ দু'জনকেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। বাসব মজুমদারকে ছেড়ে দেওয়া হল ফার্স্ট এড দিয়ে। কিন্তু হরষিণের অবস্থা এখনতখন। স্যালাইন, ব্লাড প্রয়োজনীয় সবকিছুই দিতে হল তাকে।
এদিকে ঠিক ওই দুর্ঘটনার সময়টিতেই ভবানীপুরের পিনাকী গুপ্ত নামে এক যুবক হঠাৎ করেই এসে পড়েছিল সেইখানে। ডালহৌসি এলাকার একটা নামী ব্যাঙ্কের কর্মচারী সে। ওর এক বন্ধুকে সি অফ করবার জন্য হাওড়া স্টেশনে গিয়েছিল। তারপর ধর্মতলায় ব্যক্তিগত প্রয়োজনের দু'-একটা টুকিটাকি জিনিস কেনাকাটা করে ওই পথ দিয়ে ফিরছিল। পিনাকী গুপ্তকে দেখতে সুন্দর। বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ বছর। মাথায় হেলমেট পরে থাকায় তাকে সৈনিকের মতো দেখাচ্ছিল। একটা লাল রঙের স্কুটারে চেপে ঝড়ের বেগে আসছিল সে। তার চোখের সামনেই ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটা ঘটতে দেখে বারেকের তরে থমকে দাঁড়াল। তারপর এই মুহূর্তে ঠিক কী করা উচিত, তা ভেবে স্থির করে নিল। অর্থাৎ আহত পুলিশ অফিসারের দিকে সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে সে সামান্য একটু দূরত্ব বজায় রেখে পিছু নিল ধাবমান লরিটির। যেতে যেতেই লরির নাম্বারটা নোট করে নিল। যদিও সে জানে এইসব গাড়ির নাম্বার প্লেট কখনও থাকে না তবু নিজের সুবিধের জন্যেই এই কাজ করল।
লরিটির পিছনে ধাওয়া করে পিনাকীর একটা কথাই বার বার মনে হতে লাগল নিছক অসাবধানতার ফলে এই দুর্ঘটনা নয়, হত্যার উদ্দেশেই ঘটানো হয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে।
লরিটি চলছে তো চলছেই, থামবার আর নাম নেই। অবশেষে কালীঘাট স্টেশনের কাছে একটু নির্জনে এক জায়গায় গিয়ে থামল লরিটা। পিনাকী সেটাকে অতিক্রম করে বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়ে স্কুটারটাকে এক জায়গায় দাঁড় করাল। তারপর দেখতে লাগল ওদের গতিবিধি।
একজন স্যুটেডবুটেড লোক ছায়ান্ধকারে নেমে এলেন লরির ভেতর থেকে। ড্রাইভারও নামল।
লোকটি পাশের একটি সুদৃশ্য ফ্ল্যাটের মধ্যে ঢুকে গেল। আর কয়েকজন লোক এসে সেই ট্রাক থেকে কিছু মালপত্তর নামিয়ে গাদা করতে লাগল টিনের শেড দেওয়া একটি ঘরের ভেতর। মাল খালাস হতে সময় লাগল অনেক। তারপর লরিটি ধীরে ধীরে যেমন এসেছিল তেমনি চলে গেল।
পিনাকী দেখল লরির নাম্বার প্লেট আবার বদলে দেওয়া হয়েছে। দুটো নাম্বারই সে তার নোটবুকে লিখে রেখে যখন আবার স্কুটারে এসে বসতে যাবে, তখনই পেছন দিক থেকে ঘাড়ে একটা রদ্দা। পিনাকী দেখল বানরাকৃতি একটা লোক অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ফিক ফিক করে হাসছে তার দিকে চেয়ে। লোকটার মাথায় ব্যান্ডেজ। মারধর খেয়েছে বোধহয় কোথাও।
পিনাকী চোখে অন্ধকার দেখল যেন। পরক্ষণেই বলল, কে তুই? বানরাকৃতি বলল, তুমি কে?
পিনাকী বলল, তোর বাবা। বলেই লোকটার চোয়াল লক্ষ্য করে মারল এক ঘুসি।
আকৃতি বানরের মতো হলেও প্রকৃতিও তাই। লোকটা ওই অবস্থাতেই এমন একটা লাফ দিল যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হল পিনাকীর।
ততক্ষণে লোকটা একটা শিস দিয়েছে। আর অমনি মালখালাস করা সেই লোকগুলো এসে ঘিরে ধরল পিনাকীকে।
পিনাকী বুঝল আর বাঁচার কোনও উপায় নেই। তাই কৌশলে সেই অন্ধকারে নোটবুকটা টুক করে ঘাসের ওপর ফেলে দিল। তারপর কাউকে আক্রমণ করবার কোনওরকম চেষ্টা না করে স্থির হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
লোকগুলো এসেই বলল, ইয়ে আদমি কৌন হ্যায় মংপু?
হম না জানে। সি আই ডি মালুম হোতা। ইসকো আভি লে যাও অন্দরমে। সেই সুদৃশ্য বাড়ির ভেতরেই পিনাকীকে নিয়ে গেল ওরা। ছ'-সাত জন লোক। ওর জামার কলার ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল। রাত এখন কত তা কে জানে? কিন্তু এই ঘরের বাসিন্দারা যে কেউ ঘুমিয়ে নেই, তা সে ভালই বুঝতে পারল।
ভেতর সন্দেহভাজন লোকজন সব।
একটি ঘরের ভেতর ভয়ংকর চেহারার একজন বসেছিল। কী অমানুষিক মুখ। খারাপ লোকগুলোকে দেখতে সত্যিই কি একইরকম হয়? চোখের দিকে তাকালে বুক যেন শুকিয়ে আসে। যারা পিনাকীকে সেই ঘরে নিয়ে গেল তারা এক ধাক্কায় ঘরের ভেতর ফেলে দিল পিনাকীকে। অন্ধকার রাতে বাঘের চোখ যদি কেউ দেখে থাকে সে-ই তা হলে অনুমান করতে পারবে সেই লোকটির চোখের চাহনি কী ভীষণ!
লোকটি পিনাকীর দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে বলল, এত রাত্রে এখানে
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তুমি কী করছিলে?
পিনাকী বলল, তার আগে জানতে পারি কি আপনি কে?
লোকটি হাসল। বলল, আমার আসল নাম আমিই ভুলে গেছি। তোমাকে কী বলব? তবে সবাই জানে আমি।... যাক তোমার নাম কী বলো? আমার নাম পিনাকীরঞ্জন গুপ্ত।
বাড়ি কোথায়?
ভবানীপুরে।
তার মানে কলকাতার ছেলে। বয়স তো খুব একটা বেশি নয়।
এখানে কী করছিলে?
একটা বেপরোয়া লরি পার্ক স্ট্রিটের কাছে এসে পুলিশের জিপে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে এসেছে। আমি সেই লরির পিছু নিয়ে এখানে এসেছি।
বলো কী! তুমি তো বেশ বাহাদুর ছেলে দেখছি। লরিটা এখন কোথায়? এইমাত্র আপনার বাড়ির সামনে কিছু মাল খালাস করেই চলে গেল। আর তারপরই আপনার লোকেরা আমাকে ধরে নিয়ে এল এখানে।
ওই লরির ভেতরে তো আমিও ছিলাম।
পিনাকী বলল, আপনি ইচ্ছে করেই তা হলে জিপটাকে ধাক্কা দেবার নির্দেশ দিয়েছিলেন?
হ্যাঁ। বাসব মজুমদারকে একটু শিক্ষা দিতে চেয়েছিলাম।
হয়তো মারা যাননি উনি।
জানি। ওনাকে কই মাছের মতো জিইয়ে রেখে তিল তিল করে মারব আমরা। একেবারে তো মারব না।
আমি এসব কিছুই জানতাম না। শুধু দুর্ঘটনা দেখে উত্তেজিত হয়ে লরিটার পিছু নিয়েছিলাম।
লরির ভেতর থেকে আমি সব দেখেছি। তুমি সেটা বুঝতে পারনি।
যাই হোক, তোমার ঠিকানাটা দাও। স্কুটার তোমার বাড়িতে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করছি।
পিনাকী বলল, ধন্যবাদ। ওটা এখন আমি নিজেই নিয়ে যেতে পারব।
পিনাকীর কথা শুনে ঘর ফাটিয়ে হো হো করে হেসে উঠল লোকটি। তারপর বলল, এই বাড়িতে ঢোকবার মুখে কোনও কিছু অদ্ভুত জিনিস তুমি লক্ষ করেছ? না। আসলে আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম।
মস্ত একটা ভিমরুলের চাক তোমার চোখে পড়েনি? পড়লে বুঝতে ওটা আসল নয়। সিমেন্ট বালি জমিয়ে করা হয়েছে। তা সেই ভিমরুলের চাকে তুমি শুধু হাতই দাওনি, একেবারে তার ভেতরে ঢুকে পড়েছ। এখান থেকে তুমি বেরোবে কী করে?
পিনাকী মনে সাহস এনে বলল, যেভাবে আপনার লোকেরা এখান থেকে বেরোয়, আমিও ঠিক সেইভাবেই বেরুব।
তাই নাকি?
হ্য৷৷ অর্থাৎ আমি কিছু দেখিনি, শুনিনি, জানি না। তা হলেই তো ল্যাঠা চুকে
গেল। যেমন ছিলাম তেমন হয়ে যাব।
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি কী করো?
ডালহৌসি পাড়ায় একটি ব্যাঙ্কে চাকরি করি।
আমার সঙ্গে হাত মেলাবে তুমি? আপত্তি কী?
যদি বিশ্বাসঘাতকতা করো?
আপনার মতো লোকের কি শাস্তি দিতে একটুও আটকাবে তা হলে?
লোকটি পিনাকীর পিঠ চাপড়ে বলল, সাব্বাস। এইরকম একজন স্মার্ট ইয়ংম্যানকেই আমি খুঁজছিলাম।
এমন সময় মংপু এসে ঘরে ঢুকল। তারপর কী যেন একটা লোকটির হাতে তুলে দিতেই লোকটি ভুরু কুঁচকে বলল, এটা কী?
একটা নোটবুক। এই ছোকরা এটা ঘাসের ওপর ফেলে এসেছিল।
কী আছে এতে?
পিনাকী বলল, বিশেষ কিছুই না, হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল ওটা। আমার প্রয়োজনীয় কিছু টুকিটাকি এর মধ্যে নোট করে রাখি। এতে আমার বাড়ির ঠিকানাও আছে। অফিসের ফোন নম্বরও আছে। আর ওই বেপরোয়া লরির দুটো নম্বরই নোট করে রেখেছি, আপনার সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো আজ রাতে অথবা কাল সকালেই আমি পুলিশকে জানিয়ে আসতাম।
কিস্যু লাভ হতো না তাতে। লরির দুটো নম্বরই ফলস। আমার লরির নম্বর অন্য। তা ছাড়া এই বাড়ির মধ্যে সন্দেহজনক কোনও কিছুই পেত না পুলিশ। আমার আসল যা কিছু তা আছে...। কার্লস জ্যাকলের নাম শুনেছ?
পিনাকী বলল, সে কোথায় থাকে? কার্লস জ্যাকল তো শুনেছি খুব নামকরা স্মাগলার। জেলপলাতক দাগি আসামি।
এবং সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠার সংবাদ। কিন্তু ওর স্টিয়ারিং আমার হাতে। যাই হোক, এটা জেনে রেখো আমার খাতায় নাম একবার লেখালে মৃত্যুই কিন্তু তার একমাত্র মুক্তির পথ। যদি বিশ্বাসঘাতকতা না কর, তা হলে আমার দিক থেকে ভয়ের কোনও কারণ নেই। আমার হয়ে যারা কাজ করে আমি তাদের হয়ে লড়াই করি। পারলেন কী বাসব মজুমদার জেলের গরাদে কার্লস জ্যাকলকে বেশিদিন আটকে রাখতে? জেলারের একমাত্র ছেলেকে কিডন্যাপ করতেই সে ফাঁদে পা দিল। কার্লসকে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দিতেই ফেরত পেয়ে গেল ছেলে।
কাগজে দেখেছিলাম জেলার নাকি সাসপেন্ড হয়েছেন?
সে তো হবেনই। তবে আমরাও ওঁকে এত টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি যাতে আমাদের উপকার করতে গিয়ে খেতে না-পেয়ে মরে না যান উনি। কিন্তু বাসব মজুমদারের ওপর আপনার এত রাগ কেন?
অনেক লোভ দেখিয়েও ওনাকে আমরা বাগে আনতে পারিনি তাই। শুধু বাসব মজুমদার নয়, ওনার সাগরেদ দু'জনও ভয়ানক জেদি। এই লোকগুলোর জন্যে কোনও ডাকাতি রাহাজানিতেই আমরা সাকশেসফুল হতে পারছিলাম না। কার্লস জ্যাকলকে ধরবার জন্য ওনারা খড়্গপুর পর্যন্ত ধাওয়া করেছিলেন। তবে সহ্যশক্তি বটে কার্লসের। পুলিশের মার কী জিনিস তা তো জানো না, সেই মার খেয়েও ও মুখ খোলেনি। ভুলেও বলেনি আমার নাম। তোমাকে অবশ্য এখুনি এত কথা বলার প্রয়োজন ছিল না। তবে তোমার কথাবার্তা শুনেই বুঝেছি তুমি পুলিশের স্পাই নও। তা ছাড়া সকলকেই তো সন্দেহ করলে চলে না, কোনও কোনও মানুষকে বিশ্বাস করতে হয়। না হলে দল চলবে কী করে? তোমার অল্প বয়স, তুমি দুঃসাহসী, স্পষ্টবক্তা এবং জেদি। তাই তোমাকে দলে নিলাম।
পিনাকী বলল, কী করতে হবে আমাকে?
তুমি রাইফেল শুটিং জানো? পিস্তল, রিভলভার চালিয়েছে কখনও? না।
শিখে নিতে হবে। তারপর অকারণেই একটু পায়চারি করে বলল, বিয়ে করেছ? বাড়িতে কে কে আছে তোমার?
বিয়ে করিনি। দলে নাম লেখালে করবও না। বাড়িতে বাবা, মা, ভাই, বোন সবাই আছে।
বোনের বয়স কত?
আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট।
দেখাশোনা চলছে?
হ্যাঁ।
ওর বিয়ের দায়িত্ব আমাদের। ব্যবস্থা করেই জানাবে, সব টাকা আমরা দেব। পিনাকী বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল লোকটির মুখের দিকে।
রহস্যময় লোকটি বলল, বিয়ে যখন করনি তখন ও চেষ্টা আর কোরো না। এখন শুধু দলের হয়েই কাজ করো।
যা আপনি বলবেন।
শোনো, পার্ক স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট আর লালবাজার এই তিনটি এলাকাই আমাদের। লালবাজার অঞ্চলে আমাদের কাজ হল নানারকম ঝুট ঝামেলা পাকিয়ে, উড়ো চিঠি দিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করা। আর আচমকা খুন জখম ডাকাতি রাহাজানি করে পুলিশকে খেপিয়ে তোলা। বড় ধরনের দাও মারতে গেলে আমাদের আসরে নামতে হবে ডালহৌসিতে। তুমি যখন ওই এলাকাতেই আছ তখন তোমার ব্যাঙ্কের সমস্ত খবরাখবর তুমি আমাকে দেবে। কেন না ওইটাই হেড অফিস তো। এরপর আমি যখন যেমন নির্দেশ দেব তখন ঠিক তেমনটিই করবে তুমি।
আপনার হুকুম তামিল করতে আমি সব সময়ই প্রস্তুত।
লোকটি এবার ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর বলল, রাত অনেক হল। মংপু! ওকে একটু এগিয়ে দাও।
পিনাকী বলল, প্রয়োজন হবে না। আমি নিজেই যেতে পারব।
মংপু তবুও খানিকটা পথ সঙ্গে এল।
পিনাকী ওর স্কুটারে স্টার্ট দিতেই মংপু বলল, বিদায় দোস্ত। তখনকার ব্যাপারটা নিয়ে যেন মন খারাপ কোরো না। ওটা ভুলে যেয়ো। । মংপু আবার সেই রকম গা জ্বালানো খি খি হাসি হাসল।
পিনাকী হেসে বলল, ব্যথাটা না কমলে কিন্তু ভুলছি না
পিনাকী বিদায় নিল ওর কাছ থেকে। তারপর স্কুটারে চেপে দ্রুত এগিয়ে চলল গন্তব্যের দিকে।
ওর গন্তব্য কিন্তু ভবানীপুর নয়।
ও সোজা লালবাজারে এসে দোতলায় উঠে গেল। নীহার তালুকদার এবং রঞ্জন রায় দু’জনেই ছিলেন। কার্লস জ্যাকলের অশুভ আবির্ভাবের ফলে ওঁদের রাতের ঘুম চলে গেছে। তার ওপর বাসব মজুমদারকে এইভাবে হত্যার চেষ্টা। রিয়ার অপহরণ এবং স্বপ্না ও হিরণের অন্তর্ধান ওদের দারুণ ভাবিয়ে তুলেছে। খিদিরপুরে টহলদারি পুলিশের গাড়িতে হামলা আরও একটি দুঃসংবাদ। তাই পুলিশের কাজের ব্যস্ততা সত্যিই চরমে। এর ওপর আছে সমস্ত এলাকার ওপর কড়া নজরদারি। সব সময়েই গভীর উৎকণ্ঠা, কী হয়, কী হয়।
ডালহৌসি পাড়ার একটি নামী ব্যাঙ্কের একজন কর্মচারী হিসেবে নীহারবাবু, সব রঞ্জনবাবু, বাসববাবু এবং আরও অনেক পদস্থ পুলিশ অফিসারের সঙ্গেই যোগাযোগ আছে পিনাকীর। কার্লস জ্যাকলকে ঘিরে কাণ্ড-কারখানাগুলো চলছে তা কারও অজানা নয়, তাই ভিমরুল চাকের খবরটা পুলিশকে দেবার জন্যই পিনাকী ছুটে এল এখানে।
বিস্মিত রঞ্জন রায় জিজ্ঞেস করলেন, কী খবর পিনাকী! এত রাতে তুমি এখানে?
পিনাকী বলল, আই অ্যাম ইন গ্রেট ডেঞ্জার।
নীহারবাবু বললেন, কেন! হলটা কী? তুমি তো ভবানীপুরে থাক, এত রাতে এখানে কী করে এলে?
সে অনেক কাণ্ড করে এসেছি। ট্রাফিক পুলিশকে হাজারটা কৈফিয়ত দিতে দিতে। মি. মজুমদার কেমন আছেন?
ভালই আছেন। ওনার ডান পায়ের হাঁটুতে চিড় ধরেছে। প্লাস্টার করে হসপিটাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ওনাকে। উনি বাড়ি ফিরে গেছেন। তবে হরকিষেণটা মারা গেল এইমাত্র।
হরষিণের হত্যাকারীর সন্ধান আমি পেয়েছি।
পিনাকীকে ঘিরে তখন হুমড়ি খেয়ে পড়লেন সমস্ত পুলিশ অফিসাররা।
পিনাকী এক এক করে সব কথা খুলে বলল। তারপর বলল, আমি জানি। এরপর ওরা আর আমাকে বাঁচিয়ে রাখব না। তবু খবরটা আমি আপনাদের জানিয়ে দিলাম। কার্লস জ্যাকলকে যিনি পরিচালনা করছেন তিনি এমন একজন...
নীহারবাবু সঙ্গে সঙ্গে খবরটা জানালেন বাসব মজুমদারকে।
ফোন পেয়েই বাসব মজুমদার বললেন, এখুনি তোমরা আমার বাড়িতে একটা গাড়ি পাঠিয়ে দাও। আর শোনো, ভবানীপুর পি এসকে বলে পিনাকীর বাড়ির দিকে সাদা পোশাকের কিছু পুলিশকে নজর রাখতে বলো। একাধিক লোক যেন বাড়ির চারপাশে পাহারায় থাকে।
সে ব্যবস্থা এখুনি করছি। কিন্তু স্যার! আপনি এই অবস্থায় কেন আসবেন? আমার জন্যে চিন্তা কোরো না। জানো তো, পুলিশের চাকরি বিছানায় শুয়ে থাকবার জন্য নয়। কষ্ট হলেও আমি ঠিকই যেতে পারব।
আচ্ছা স্যার, আমি গাড়ির ব্যবস্থা করছি।
ফোন রেখে আবার রিসিভার তুলে নতুন করে নাম্বার ডায়াল করলেন নীহারবাবু, হ্যালো, ভবানীপুর...
মংপু পিনাকীকে বিদায় দিয়ে এসেই ঘরের ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভে ফেটে পড়ল, এটা কী হল মি. ডলফিন?
ভয়ংকর লোকটি তখন নিশ্চিত্তে বসে তাঁর রিভলভারের নলগুলি পরীক্ষা করছিল। যেন কিছুই বুঝল না এমনভাবে বলল, কীসের কী হল?
ওই লোকটাকে আপনি অতটা বিশ্বাস করলেন কেন?
তোমাকেও তো একদিন বিশ্বাস করেছিলাম।
এই কথা শুনে মংপু চুপ করে গেল। তারপর বলল, হ্যাঁ করেছিলেন, তার আগে আপনি জেনেছিলেন আমি কী। আর এই লোকটা...। এ যদি পুলিশের লোক হয়, তা হলে...? ,
তা হলে কী?
ও তো এখুনি থানায় খবর দিয়ে আমাদের দলবল সমেত ধরিয়ে দেবে। দিক না। ক্ষতি কী? একদল গবেট নিয়ে কাজ কারবার করার চেয়ে দল উঠিয়ে দেওয়াই ভাল।
আপনার কথার অর্থ আমি ঠিক বুঝলাম না।
আজ দুপুরে বেশি চালাকি করতে গিয়ে তুমিই যে কাণ্ডটা করেছিলে তাতে সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে যদি উদ্ধার করতে না পারতাম, তা হলে তোমাকে নিংড়ে এতক্ষণে পুলিশ তো আমাদের সব ঘাঁটিই দখল করে নিত। তোমার মতো একটা দুর্ধর্ষ শয়তান যদি একটা বাচ্চা ছেলের কাছে হেরে যায়, তা হলে কার ওপরে ভরসা করব? তাই বাধ্য হয়েই আমাকে নতুন লোক দেখতে হচ্ছে।
মংপু মাথা হেঁট করল। বলল, এর জন্য আমি লজ্জিত বস। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। কিন্তু পুলিশ এখন যেভাবে খেপে আছে তাতে এই লোকটা যদি পুলিশের স্পাই হয়, তা হলে তো ভয়ের ব্যাপার।
জয় তো ভয়ের ভেতর দিয়েই হয়। যেখানে ভয় নেই সেখানে জয়ও নেই। আমি কিন্তু ব্যাপারটা ভাল বুঝছি না।
ডলফিন হেসে বলল, তোমার কি ওকে পুলিশের লোক বলে সন্দেহ হচ্ছে? অবশ্যই। ছোকরার তেজ দেখলেন না? আমি ওর ঘাড়ে একটা রদ্দা দিতেই এমন একটা ঘুসি ছুড়েছিল যে লাগলে আমি মরে যেতাম। তা ছাড়া ওর উদ্ধত কথাবার্তা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। ভিমরুলের চাকে এসেও ওর ভয় নেই। আপনার সামনে দাঁড়িয়েও বুক কাঁপেনি ওর। এতেও কি মনে হচ্ছে না ও পুলিশের লোক ছাড়া কেউ নয়?
ধরো তাই যদি হয় তা হলে? পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাবার উপায় একটা করতে হবে তো?
অবশ্যই। আমাদের এখুনি গা ঢাকা দেওয়া দরকার।
না। আজ এখানে মরণবাঁচনের লড়াই হবে। ওই ছোকরা যে পুলিশের স্পাই তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এই ব্যাপারে আমি তোমার সঙ্গে এক মত। আমার দু'জন লোক ওর পিছু নিয়েছে তারা জানালেই আমি সতর্ক হব। ডালহৌসি পাড়ার অতবড় একটি ব্যাঙ্কের কর্মচারী, অথচ তার সঙ্গে লালবাজারের পুলিশদের চেনা-পরিচয় থাকবে না, এ হতে পারে না।
ব্যাঙ্কে চাকরি করে না ছাই। এ পরিচয়টাও মিথ্যে হতে পারে।
না ওর নোটবুক দেখে বুঝেছি ও মিথ্যে বলেনি।
এমন সময় ফোন বেজে উঠল।
ডলফিন রিসিভার উঠিয়ে সব কথা শুনেই বললেন, আমার অনুমান তা হলে মিথ্যে নয়। ঠিক আছে তোমরা ওকে আক্রমণ করনি তো?
ওদিক থেকে কী যেন উত্তর হল।
চলে এসো তোমরা। বলে ফোন নামিয়ে রাখল ডলফিন।
মংপু বলল, কার ফোন?
ওই ছোকরার ব্যাপারে। ও লালবাজারের সদর দপ্তরে এই রাতেই গিয়ে ঢুকে পড়েছে।
মংপু চিৎকার করে উঠল। বলল, একবার শুধু আদেশ করুন বস, ওর বাবা, মা, ভাই বোন যে যেখানে আছে সব ব্যাটাকে কেটে বাড়িটাকে জ্বালিয়ে দিয়ে আসি। এই মুহূর্তে ওই ছোকরার মাথাটা আমার চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে।
শান্ত হও বৎস। অত বেশি উত্তেজিত হোয়ো না। মাথা গরম করে এখন কখনও ওইসব করতে যায়? পুলিশ এত বোকা নয়, এখন ওর বাড়ির চারপাশেই কড়া নজর পুলিশের। গেলেই ধরা পড়বে।
কিন্তু ওই লোকটাকে লালবাজার অব্দি পৌঁছতে দেওয়া হল কেন? তার আগেই তো ওকে সরিয়ে দেওয়া যেত। আমাকে বললে, আমিই ওর পিছু নিয়ে একটি গুলিতে দিতাম ওর ভবলীলা সাঙ্গ করে।
ডলফিন হেসে বলল, পুলিশের গতিবিধির ওপর তোমার কোনও ধারণা নেই বলেই তুমি এই কথা বলছ। বাসব মজুমদারকে আঘাত করার পর ওই একই এলাকায় আজ কখনও খুন-জখমের ঝুঁকি নেয় কেউ?
তা হলে কী হবে বস?
ওদেরকে আসতে দাও। আমার অনেক দিনের পাতা ফাঁদ। সেই ফাঁদে পা দিতে দাও ওদের।
ওরা এলে তো একা আসবে না। আসবে বিরাট পুলিশবাহিনী নিয়ে। ওদের সঙ্গে লড়ে আমরা পেরে উঠব কেন?
শোনো, ছোকরা চলে যাওয়ার পরমুহূর্তেই আমি ঠিক করে ফেলেছি এই তাসের ঘর আর রাখব না।
মংপু হাঁ করে তাকিয়ে রইল ডলফিনের মুখের দিকে।
ডলফিন বলল, মাথায় ঢুকল না তো কিছু?
মংপু বলল, না।
পুলিশ এলে গোডাউনের ভেতর আর এই বাড়ির মধ্যে পরম সমাদরে ঢুকিয়ে নিতে হবে তাদের। তারপর শুরু হবে খেল। একটু দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে...
তার আগে বাড়িটা ফাঁকা করতে হবে তো?
বাড়িতে আছেটা কী? আছেই বা কে? সবাই বাইরে গা ঢাকা দিয়ে আছে। এবার আমরাও চলে যাব এখানকার পাট চুকিয়ে। কখন যাব?
সংকেত এলেই। নীচের দরজাটা বন্ধ থাকবে। আমরা বারান্দা টপকে পালাব। ঘরের ভেতর আলো জ্বলবে, যদি লোডশেড়িং হয়, এমার্জেন্সি কাজ করবে। গোডাউনের দরজাও খোলা থাকবে আমাদের। পুলিশ এসে ওর ভেতরে ঢুকে পড়লেই...
বলুন, থামলেন কেন?
দুটো প্রচণ্ড শক্তিশালী বোমা রাখা আছে দু'জায়গায়। আর এই হচ্ছে ডিটোনেটর। এর মধ্যে দুটো বোতাম আছে। ওপরের বোতামটা টিপলে এক নম্বরটা ফাটবে। আর নীচেরটা টিপলে ফাটবে দু'নম্বরটা।
মংপু দারুণ উত্তেজিত হয়ে বলল, পায়ের ধুলো দিন বস।
এমন সময় দরজার সামনে রেড এলার্ম বেজে উঠল। উত্তেজিত ডলফিন বলল, কুইক। পুলিশ এল বলে।
মংপু বলল, আপনি এত তাড়াতাড়ি কী করে এই ব্যবস্থাটা করলেন?
তাড়াতাড়ি নয় তো? এ আমার অনেক দিনের পরিকল্পনা। সব রেডিই ছিল। শুধু ওই ছোকরাকে আমার লরির পেছনে ধাওয়া করতে দেখেই মনস্থির করলাম নাটকটা আজই শেষ করে দেব বলে।
কিন্তু ধরুন যদি ও আপনার প্রস্তাবে রাজি হত?
তা হলেও নজরে রাখতাম ওকে। তারপর ডালহৌসির ওই ব্যাঙ্কে অপারেশন শেষ হলে ওকেও সরিয়ে দিতাম। তবে কিছু টাকা অবশ্য পেত ওর বাড়ির লোকেরা।
ডলফিন আর সময় নষ্ট না করে কৌশলে চলে এল বাড়ির বাইরে। মংপুও সঙ্গে এল।
এক বিরাট পুলিশবাহিনী তখন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ভিমরুলের চাকের দিকে। ওরা জানেই না কি নিদারুণ মরণফাঁদ ওদের জন্য পেতে রেখেছে দুষ্কৃতীরা। এই নিষ্ঠুর চক্রান্তে ভগবানও শিউরে উঠলেন বুঝি।
মাঝেরহাট ব্রিজের কাছে একটি বাড়িতে কাল দুপুর থেকে রিয়াকে বন্দি করে রেখেছিল ওরা। কী থেকে কী হয়ে গেল রিয়া ভেবেও পেল না। হিরণ ছাদে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই দু'জন লোক কাল কাপড়ে ওর মুখ বেঁধে নাকে রুমাল চেপে ধরল। তারপর নিয়ে এল এই বাড়িতে। পা থেকে গুলি বার করে ইঞ্জেকশান দিয়ে পায়ে ব্যান্ডেজ করে এই বাড়ির দোতলার একটি চিলেকোঠায় ওকে আটকে রাখল। হাত-পা বাঁধেনি, কিন্তু বাইরে থেকে দরজায় শিকল দিয়ে রেখেছে। ঘরের ভেতরে আছে গেলাস ঢাকা খাবার-জলের একটা কলসি। আর কোনও কিছু নেই। ঘরের পেছনদিকের দেওয়ালে আছে ছোট্ট একটি জানলা। সেখান দিয়ে সে অনবরত ট্রেনের যাতায়াত দেখেছে সারাদিনে। আর দেখেছে একজনকে। সে হল কার্লস জ্যাকল। লোকটা নামেও যেমনি ভয়ংকর, চেহারাতেও তেমনি। হিরণের মুখে ওর অত্যাচারের কাহিনি আর চেহারার বর্ণনা তো শুনেই ছিল, এখন চাক্ষুস দেখে বুঝল হিংস্র পশুর প্রকৃতি নিয়ে মানুষ কীভাবে ঘুরে বেড়ায়।
ওকে নিয়ে এসে ওরা যখন এই ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল, ঠিক তখনই অশুভ আবির্ভাব হল কার্লস জ্যাকলের।
কার্লস জ্যাকল ঘরে ঢুকেই বলল, মংপুর ওইরকম হাল কে করেছে? রিয়া ওর মূর্তি দেখে কাঁপতে লাগল ভয়ে। বলল, আমরা।
আমরা মানে? আর কে ছিল?
রিয়া সভয়ে মুখটা নামিয়ে নিল।
বুঝেছি, সেই শয়তানের বাচ্চাটা। ওটাকে আমি জ্যান্ত কবর দেব।
রিয়া বলল, ওর তো কোনও দোষ নেই। তোমার মংপুই তো বাড়ির ভেতর ঢুকে বেয়াদপি আরম্ভ করেছিল। আমরা তার প্রতিফল হাতে হাতে দিয়েছি।
আর আমি তার প্রতিদান মুখে মুখে দেব। তোর এই সুন্দর মুখে যখন অ্যাসিডের বোতলটা উপুড় করে দেব তখন যা দেখতে লাগবে না তোকে। আমি কম করেও একশোটা মেয়ের মুখে অ্যাসিড ঢেলেছি। আসলে কারণ কী জানিস, সুন্দর মুখ আমি সহ্য করতে পারি না। আমি চাই সবার মুখই আমার মতন কুৎসিত হোক। ভগবান আমাকে যেমন কুৎসিত করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তেমনি তাঁর সৃষ্টিতেও সব কিছুই কুৎসিত হয়ে যাক। ভগবানকে পেলে তার মুখেও আমি অ্যাসিড ঢেলে দিতাম।
রিয়া বলল, তার মানে আপনি ভগবান বিশ্বাস করেন?
আরক্ত চোখে কার্লস জ্যাকল বলল, একটু একটু। তবে
ভগবানকে ভয় পাই না। কেন না তিনি কখনও আমার সঙ্গে থাকেন না।
তা হলে আপনার গলায় ওই যিশুক্রশটা রেখেছেন কেন? ফর শো।
এমন সময় যে লোক দু'জন রিয়াকে এনে এখানে রেখেছিল তারা চাপা গলায় ফিস ফিস করে কী যেন বলতেই, চলে গেল কার্লস জ্যাকল।
অল্পবয়সি বামনাকৃতি একজন দরজার কাছে পাহারায় রইল। দরজার পাশেও ছোট্ট একটি জানলা। রিয়া সেখান দিয়ে উঁকি মেরে দেখল বামনটিকে। বামনটিও রিয়ার মুখের আকর্ষণে বার বার তাকাতে লাগল।
রিয়া কাছে ডাকল বামনকে, এই শোনো।
কী? বামন এগিয়ে এসে বলল,
নাম কী তোমার?
আমার নাম বেঁটে বাঁটুল।
তুমি বাঙালি?
হ্যাঁ। তোমার বাড়ি কোথায়?
মছলন্দপুর নাম শুনেছ? ওইখানে। আমার ঘরবাড়ি সবই এখন এখানে। আমি একা। কেউ নেই আমার।
এদের হয়ে কাজ করছ কতদিন?
তা ধরো না কেন বছর দশেক।
এইসব খারাপ লোকেদের সঙ্গে কাজ করে নিজের জীবনকে নষ্ট করছ, যদি ধরা পড় ফল কী হবে জানো?
কী হবে? কিচ্ছু হবে না। ধরা পড়লে খুব জোর দু’-চার বছর জেল হবে। তার বেশি কিছু নয়। আমরা তো চুনোপুঁটি। পেটের দায়ে চাকরি করছি। তা ছাড়া আমাকে ধরতে এলে পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে পালাব আমি।
তুমি যখন একা, তখন পেটের দায়ে এই কাজই বা করছ কেন? ভাল কাজ করতে পারো না? তা হলে তো পায়ের ফাঁক দিয়ে পালাতে হয় না।
আমি খারাপ কাজটা কী করছি? তুমি ঘরে আছ, আমি বাইরে থেকে তোমাকে পাহারা দিচ্ছি। এর বেশি তো কিছু নয়।
এমন সময় সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা যেতেই বামন বলল, চুপ। আর কোনও কথা বোলো না আমার সঙ্গে। জানলা বন্ধ করো।
রিয়া জানলা বন্ধ করে পিছিয়ে এল।
একটু পরেই দেখল একজন লোক একটা শালপাতার ঠোঙায় গোটাকতক কচুরি আর একটা মিষ্টি রেখে চলে গেল।
রিয়ার খিদে পেয়েছিল খুব। সে খাবার খেয়ে, কলসি থেকে জল পান করে জানলা খুলে আবার ডাকল, এই।
বামন কাছে এসে বলল, কী বলছ?
রিয়া বলল, আমাকে কেমন দেখতে বলো তো?
বামন সরল হেসে বলল, খুব সুন্দর দেখতে।
কার্লস জ্যাকল কি সত্যিই আমার এই মুখটাকে অ্যাসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেবে? বামন চুপ করে থেকে বলল, ওর অসাধ্য কিছুই নেই। তবে আমাদের ডলফিনসাহেবের আদেশ না-পাওয়া পর্যন্ত কিছুই করবে না ও।
ডলফিনসাহেব! তিনি আবার কে?
আমাদের বিগ বস। অর্থাৎ গড ফাদার যাকে বলে।
ও নাম তো শুনিনি কখনও?
উনি গভীর জলের মাছ। ওনার নির্দেশেই সব কিছু হয়। কিন্তু সন্ত্রাসের নাম কার্লস জ্যাকল। এই যে এত খুন, জখম, ব্যাঙ্কডাকাতি সবই হচ্ছে ওনার পরিকল্পনায়। নিজে উনি মঞ্চে আসেন না। তবে সকলকে মদত দেন। রিয়া বলল, শোনো, আমার এই সুন্দর মুখটা যদি পুড়িয়ে দেয় ওরা, তা হলে কী হবে বলো তো? তাই বলি তুমি এক কাজ করো না ভাই—।
বামন ভয়ে ভয়ে বলল, কী কাজ?
আমাকে এখান থেকে পালিয়ে যাবার একটা উপায় বলে দাও না।
তারপরে আমার অবস্থা কী হবে জানো? তা ছাড়া পালিয়ে তুমি যাবে কোথায়? ওরা ঠিক তোমাকে খুঁজে বার করবে।
রিয়া বলল, আরে পালিয়ে কি আমি একা যাব? তোমাকেও সঙ্গে নেব। তুমিও তো যাবে আমার সঙ্গে।
আমি যাব তোমার সঙ্গে?
নিশ্চয়ই। আমি একা যাব কেন? আমি কি এখানকার পথঘাট কিছু চিনি? পালিয়ে গেলে হবে কী, আমারও মুখ পুড়বে না, তুমিও প্রাণে মরবে না। এই তো পাশেই রেলপথ, চলো না আমরা দু’জনে ট্রেনে চেপে কোথাও পালিয়ে যাই।
বামন এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল একবার। তারপর বলল, শোনো, আমারও যে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে না তা নয়। কিন্তু সেরকম সঙ্গী পাইনি বলে যাইনি। তা ছাড়া এরাও শুনছি বেশিদিন থাকবে না এখানে। বাসব মজুমদার নামে যে পুলিশ অফিসার আছে তাকে আর অন্য দু'জনকে খুন করেই ওরা চলে যাবে। বিহারের দলমা পাহাড়ের কোলে ডিমনা লেকের কাছে কোথায় যেন পাঁচ তারা হোটেল করেছে ওরা সেইখানে যাবে। নাম দিয়েছে লালমহল।
তাই না কি? তবে তো ভালই হল। ওরা যদি বিহারে যায়, আমরা যাব উত্তরপ্রদেশে। কিছু টাকা-পয়সা হাতিয়ে আমাকে নিয়ে পালাও না তুমি। তোমার মা-বাবা যদি পুলিশে খবর দিয়ে থাকেন, পুলিশ যদি পিছনে লাগে আমাদের?
আমার মা-বাবাই নেই তো পুলিশে খবর দেবে কে? আমি তো বাসব মজুমদারের বাড়ি কাজ করি।
তুমি মিথ্যে কথা বলছ। কাজের মেয়ের চেহারা তোমার নয়।
বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? আচ্ছা, আমার যদি মা থাকত তা হলে কী আমি এতক্ষণ তাদের জন্যে একবারও কাঁদতাম না? আমার চোখে কি একটুও জল দেখেছ? তবে আমার মুখ পুড়িয়ে দেবে শুনে আমি দারুণ ভয়ে পেয়ে গেছি।
বামন বলল, না না, তোমার এমন সুন্দর মুখ কখনও নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। তা ছাড়া এইভাবে বেঁচে থাকতে ভালও লাগছে না আমার। ডলফিনসাহেবের গোডাউনে বেশ ছিলাম। কিন্তু এই কার্লস জ্যাকলটা ফিরে আসার পর থেকেই হতচ্ছাড়া জায়গায় ডিউটি পড়েছে আমার। বাসব মজুমদার খুন না-হওয়া পর্যন্ত ওরা এখানে থাকবে। শুধু বাসব মজুমদার নয়, ওর ছেলেটাও নোটিশে আছে ওদের।
রিয়া বলল, ওর অপরাধ?
আমরা আদার ব্যাপারী। অত খোঁজে আমাদের দরকার কী?
রিয়া বলল, ঠিক বলেছ। এখন আমাদের আসল কাজ হল এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া। তুমি সেই ব্যবস্থাই করো। তুমি গোলাগুলি ছুড়তে পার তো? বামন হেসে বলল, কী যে বল। এই দ্যাখো একটা পয়েন্ট থ্রি এইট রিভলভার। যা তা জিনিস নয়। এটা সব সময় আমার সঙ্গে থাকে।
রিয়া বলল, ঠিক আছে। তবুও তুমি আমাকে ধারালো ছোরা একটা এনে দেবে। পালাতে গিয়ে যদি কোনও বিপদ হয় তা হলে নিজেকে রক্ষা করতে পারব। আমাকে কেউ মারতে এলে তুমি রুখবে, তোমাকে কেউ মারতে এলে আমি রুখব।
বামন বলল, ভারী মজার ব্যাপার তো। যাক, তোমাকে নিয়ে আমি পালাবই।
কেউ আমাকে রুখতে পারবে না। তবে এখনই নয়, সন্ধের পর। এখন গেলে জানতে পারবে ওরা। তুমি জানলা বন্ধ করে চুপচাপ থাকো। আমি সব ব্যবস্থা করছি। তোমার নামটা তো আমার জানা হল না।
রিয়া বলল, আমার আবার নাম। আমার নাম খুকুমণি।
বাঃ, বাঃ। কী সুন্দর নাম। কিন্তু খুকুমণি, তুমি আমাকে ফেলে পালাবে না তো? তা হলে কিন্তু মনে আমি খুব দুঃখু পাব।
ছিঃ ছিঃ। কী যে বলো, আমাকে তা হলে দেখবে কে? আমার বুঝি কেউ আছে?
তা ঠিক, তা ঠিক। আমি বরং কোথাও একটা দোকানটোকান দেখে কাজকর্ম জুটিয়ে নিয়ে চালিয়ে নেব দু'জনের, কী বলো?
তবে? তোমার মতন সুন্দর মানুষ কি হয়?
কী বললে? আমি সুন্দর? সবাই আমাকে বেঁটেবাঁটুল বলে, আর তুমি আমাকে সুন্দর বলছ?
নিশ্চয়ই। যার মন সুন্দর, তার সবই সুন্দর। চেহারাটাই কী সব? যে অন্যের ভাল করতে চায় তার ভালই হয়। তুমি যখন আমার ভাল করতে চেয়েছ তোমার ভাল তখন হবেই।
বামন বলল, আমি তোমার জন্যে জীবন দিয়ে দেব খুকুমণি। তুমি চুপ করে
বসে থাকো, আমি এখুনি একবার এলুম বলে।
বামন চলে গেল দরজায় তালা দিয়ে।
রিয়া বুঝল টোপ গিলেছে বামনটা। একে দিয়েই কাজ হবে।
খানিক বাদেই বামন আবার ফিরে এল। তার হাতে এক প্যাকেট ভাল ভাল খাবার। বলল, নাও। তুমি পেট ভরে এগুলো খেয়ে নাও দেখি, আর এই টাকাগুলো তোমার কাছে রেখে দাও। আমি আরও টাকা নিয়ে আসছি। অনেক টাকা লাগবে তো আমাদের।
কিন্তু আমার ছোরা? আমার যে একটা ধারালো ছোরা চাই।
বামন বলল, সে ব্যবস্থা হবে।
রিয়া বলল, তা হলে ঠিক সন্ধের সময়। মনে থাকবে?
মনে থাকবে না মানে? এই সুযোগ কখনও ছাড়ি? দরকার হলে কার্লস জ্যাকলকেও আমি খতম করে দেব। শত্রুর শেষ আমি রাখব না।
রিয়া অভিনয় করল, খবরদার ও কাজ করতে যেয়ো না। কার্লস জ্যাকলকে মারতে গিয়ে যদি তুমি মরো, তা হলে কিন্তু এই জগতে আমার আর কেউ থাকবে না।
বামন বলল, আচ্ছা, আচ্ছা। সে দেখা যাবে। তুমি ততক্ষণে মনে মনে ঠিক করো আমরা কোথায় যাব। কেন না দূরের পথঘাট আমি চিনি না।
রিয়া বলল, আমি চিনি। আমি অনেকবার চিত্তরঞ্জনে গেছি। প্রথমে আমরা সেইখানেই চলে যাব। তারপর সেখানে গিয়ে ঠিক করব কোথায় কোন দূরদেশে যাওয়া যায়।
বামন বলল, আর কোনও কথা নয়। আমি শুধু তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার ব্যবস্থাটা পাকা করে আসি। সন্ধে হলেই লোডশেডিং হবে আর সেই সুযোগে আমরাও পালাব।
রিয়া জানলার পাল্লা বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইল। পা-টা জখম তাই। না হলে মুক্তি পেলে ছোটা কাকে বলে দেখিয়ে দিত। তবু কোনওরকমে একবার যদি পালাতে পারে এখান থেকে সেই আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল ও।
সন্ধের পরই লোডশেডিং হয়ে গেল। ইতিমধ্যেই এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে রিয়া মনে মনে অনেকরকম পরিকল্পনা করে ফেলেছে। কিন্তু বামনটা আসছে না কেন? তার কোনও সাড়াশব্দও নেই। কী হল তার?
অনেক পরে রিয়া জানালাটা একবার ফাঁক করতেই দেখল অন্য একজন লোক বসে আছে সেখানে। ভয়ে বুক কেঁপে উঠল ওর। বোকাটা নিশ্চয়ই কার্লস জ্যাকলকে কোনওভাবে টেক্কা দিতে গিয়ে গোলমাল বাধিয়ে বসে আছে। নইলে তো এমন হবার কথা নয়। অথচ বুদ্ধি করে একটা ছোরা যদি আগে ভাগে দিয়ে যেত ও, তা হলে যেভাবেই হোক একটু কৌশলে ওই লোকটাকে জখম করে পালাতে পারত। কিন্তু এখন আর তা হবার নয়। রিয়ার চোখে যেন জল এসে গেল।
অন্ধকার ক্রমশ ঘন হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে পায়ের ব্যথাও। হাতে একটা ইঞ্জেকশানও করেছে ওরা। সেখানেও ব্যথা লাগছে। কিন্তু জীবন যেখানে বিপন্ন সেখানে এসব ব্যথা কিছুই নয়। এত অন্ধকার, অথচ একটা চিমনির ব্যবস্থাও করল না ওরা। তার ওপর কী সাংঘাতিক কুটকুটে মশা। যেখানে কামড়াচ্ছে সেখানটাই ফুলে উঠছে।
এইভাবে অনেকক্ষণ অতিবাহিত হবার পর রিয়ার মাথায় একটা পরিকল্পনা এল। অন্ধকার হাতড়ে জলের কলসিটা নিয়ে সে সরে এসে দাঁড়াল দরজার একপাশে। তারপর আচমকা একটা চিৎকার দিতেই যে লোকটি পাহারায় ছিল সে ছুটে এল, ক্যা হুয়া? কাহে চিল্লাতা?
রিয়া বলল, কী একটা কামড়ে দিল আমার পায়ে।
লোকটি দরজা খুলে যেই না টর্চ ফেলে দেখতে গেল ভেতরটা, অমনি রিয়া সেই জলপূর্ণ কলসির বাড়ি তার মাথায় বসিয়ে দিল এক ঘা। দিয়েই বাইরে এসে শেকল তুলে দিল দরজাতে।
লোকটি তখন ভীষণ চিৎকার করছে। আর লাথি মেরে ভেঙে ফেলবার চেষ্টা করছে দরজাটা।
রিয়া দেখল মহা বিপদ। এখুনি তো লোকজন ছুটে আসবে এই হাঁক ডাকে। সে তখনই মন স্থির করে এদিক ওদিক তাকিয়েই ছাদের এক কোণে একটা মরচে ধরা শাবল দেখতে পেল। শাবলটা কুড়িয়েই সে সশব্দে খুলে দিল দরজার শেকলটা।
লোকটি তেমনিই চেঁচাতে চেঁচাতে ভিজে জামাকাপড়ে বেরিয়ে এল, আরে ভাগারে ভাগারে ভাগা। পাকড়ো... পাকড়ো...
আর চেঁচাতে হল না, রিয়া শাবলের বাড়ি সজোরে এক ঘা দিতেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল লোকটা।
ও তখন কোনদিক দিয়ে যে পালাবে কিছুই ঠিক করতে পারল না। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গেলে বিপদ। আবার ছাদের আলশে ধরেও লাফিয়ে পড়া যায় না! এই বাড়ির পাশেই ছাদ আছে। কিন্তু উচ্চতা যা তাতে সেখানেও লাফিয়ে পড়া অসম্ভব। এখানে ঘিঞ্জি গলির ভেতর গায়ে গায়ে বাড়ি। কোনও গাছপালার ডাল ঝুঁকে নেই যে সেটা ধরে পালাবে। ততক্ষণে লোকটির রিভলভার ও টর্চ ও হাতে নিয়েছে। এদিকে সিঁড়িতেও ধুপধাপ শব্দ। পালানোর রাস্তা একদম নেই দেখে রিয়া ছুটে এসে সিঁড়ির দরজায় শেকল দিল। এইভাবে কিছু সময়ও যদি লোকগুলোকে আটকে রাখা যায় তো মন্দ কী?
ওরা এসে ধাক্কা মারতে লাগল দরজায়। আর রিয়া আলশের কাছে এসে পাশের ছাদেই লাফিয়ে পড়বার মন করল। এমন সময় হঠাৎই সে দেখতে পেল একটা লম্বা দড়ি পিলারের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় নীচের দিকে ঝুলছে। এ নিশ্চয়ই বামনটার কাজ। এইভাবেই ওদের পালাবার পথ সুগম করে রেখেছিল সে, কিন্তু কোনওকারণে সেই সুযোগ আর পেল না বেচারি। ও আর একটুও সময় নষ্ট না করে, সেই দড়ি ধরেই ঝুলে পড়ল। তারপর সুড়সুড় করে নেমে এল পাশের ছাদে। সেখান থেকেও ওই একই কায়দায় গলির মুখে।
পথ যে কোন দিকে তা সে জানে না। গলি থেকে বড় রাস্তায় যেই পৌঁছল, অমনি কোথা থেকে যেন বামনটা তুড়ক তুণ্ডুক করে লাফাতে লাফাতে এসে হাজির। বলল, এ কি খুকুমণি! কোথায় যাচ্ছ তুমি?
আমি তোমাকেই খুঁজতে বেরিয়েছিলাম।
কী আশ্চর্য! তুমি ওই ঘর থেকে বেরোলে কী করে? রিয়া সব বলল।
বামন বলল, কাজটা তুমি ভাল করোনি খুকুমনি। এখন আর কিছুই করা যাবে না। আমি ভেবেছিলাম একটু বেশি রাতে তোমাকে নিয়ে পালাব। কিন্তু তুমি তো আমাকে বলেছিল সন্ধের পর।
কী করব। হঠাৎ একটা কাজের জন্যে ডলফিনসাহেবের লোকেরা আমাকে ধরে নিয়ে গেল যে। আমি এক ধরনের প্রচণ্ড শক্তিশালী বোমা তৈরি করতে পারি। সেটা রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে ফাটানো যায়। সেই বোমা তৈরির কাজে আমাকে যেতে হয়েছিল।
রিয়া বলল, উঃ। কী সাংঘাতিক।
তুমি ভয় পাচ্ছ খুকুমণি? কী করব, এদের দলে এই তো আমার কাজ। ছোটবেলা থেকে এরা আমাকে চুরি করে এনে এই কাজই শিখিয়েছে। আমার চেহারা এমন মর্কটের মতো হলে কী হয়, এই সব কাজে আমি কিন্তু সিদ্ধহস্ত। তেমনি অব্যর্থ আমার হাতের টিপ। ওদের নির্দেশে ঝোপেঝাড়ে লুকিয়ে কত খুন করেছি আমি তার ঠিক নেই। এসব কাজ আমি করতে চাই না। তোমাকে নিয়ে পালিয়ে গেলে আর এসব করব না আমি। তোমার গা ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি আমি।
রিয়া চোখদুটো বড় বড় করে বলল, ওই বোমার সাহায্যে কাকে মারবে ওরা? শুনলাম ফোর জিরো নাইন টু'র একটা হেভি ওয়েটের ট্রাক নিয়ে বস নিজেই গেছেন আজ বাসব মজুমদারের মোকাবিলায়। বড় ধরনের একটা দুর্ঘটনা ঘটাবার পরিকল্পনা আছে। শুধু তাই নয়, উড়ো টেলিফোনে পুলিশকে ডাকিয়ে এনে ওই ঘাঁটির ভেতর ঢুকিয়ে সব কিছু উড়িয়ে দেবার পরিকল্পনাও হয়েছে।
রিয়া বলল, তুমি কী? মানুষের এমন সর্বনাশ কেউ করতে পারে?
বামন এবার হেসে বলল, তা হলে শোনো, আমি যখন তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার ঠিক করেছি ঠিক সেই সময় ওরা আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে গেল বলে আমি কী করেছি, জানো? রাগের মাথায় আমি এমন বোমা তৈরি করেছি যার ভেতরে ধুলো ছাড়া কিছুই নেই।
রিয়া উল্লিসিত হয়ে বলল, সত্যি বলছ তুমি?
তবে না তো কী? আমি চাই ওরা সবাই এবার ধরা পড়ুক। ওরা ধরা নাপড়লে পৃথিবীর কোথাও গিয়ে আমরা শান্তিতে থাকতে পারব না। এখন কার্লস জ্যাকলটাকে একটু শিক্ষা দিতে হবে। কেন না বস বারণ করা সত্ত্বেও ও ঠিক করেছিল আজ রাতের মধ্যেই তোমাদের তিনজনের গলা কেটে মুণ্ডুগুলো তোমাদের বাড়ির সামনে রেখে আসবে। তাই...
রিয়া বিস্মিত হয়ে বলল, আমাদের তিনজনের? আমি তো একা। আর দু'জন কোথায়?
তোমাদের আরও একটা ছেলে আর মেয়েকে তো এইখানেই অন্য একটা বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছে ওরা।
কোথায়? কোনখানে? শিগগির চলো, আগে তাদের উদ্ধার করি। আর দেরি হলে যদি ওদের মেরে ফেলে?
বামন বলল, তুমি কোথায় যাবে? তুমি গেলে বিপদ। আমিই বরং যাই। কার্লস জ্যাকলের মুখোমুখি হলে আমি অবস্থাটা সামাল দিতে পারব। কিন্তু তোমাকে দেখলেই ওরা সন্দেহ করবে আমাকে।
আমি তা হলে কোথায় থাকব?
এসো তুমি আমার সঙ্গে।
অন্ধকার গলিপথে খানিকটা গিয়ে একটা জীর্ণ পুরাতন বাড়ির কাছে এসে বামনটা বলল, এর পেছনে ড্রেনের ধারে তুমি লুকিয়ে থাকো। আমি না-আসা পর্যন্ত কোথাও যেয়ো না যেন।
রিয়া বলল, আচ্ছা।
বামনটা একটু পরেই ঘুরে এসে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে খুকুমণি। ওরা তো এখানে নেই।
তা হলে ? তা হলে কী হবে?
এতক্ষণে ওদের ধড়গুলো বোধহয় হাইড্রেনের নীচে।
রিয়া যেন চোখেমুখে অন্ধকার দেখল। এমন সময় হঠাৎ কাদের পদশব্দ শোনা গেল। আর সেই সঙ্গে, এই তো, এই তো এরা এখানে। পালাবে কোথায় বাছাধন।
জোড়া জোড়া টর্চের আলো এসে পড়েছে তখন ওদের ওপর।
কার্লস জ্যাকল।
হ্যাঁ কার্লস জ্যাকলও ছিল ওদের দলে। শক্ত হাতে বামনটার গলা টিপে ধরে কার্লস বলল, বিশ্বাসঘাতক! তোর গায়ে গরম তেল ঢেলে পুড়িয়ে মারব আজ। কী বোমা করে এসেছিস তুই? বলেই এক আছাড়।
বামনটা আর্তনাদ করে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে একটা গুলির গর্জন ডিস্যুম।
অফিসারদের সঙ্গে যখন ভিমরুলের চাকের সামনে এলেন চারদিকে তখন থমথম করছে।
বিরাট পুলিশবাহিনী নিয়ে বাসব মজুমদার অন্যান্য পদস্থ পিনাকী বলল, এই বাড়ি।
বাসব মজুমদার বললেন, এই বাড়ি? ঠিক বলছ তুমি? ওই দেখুন ভিমরুলের চাক।
জানো এই বাড়িটা কার?
তা তো জানি না। তবে এই সেই বাড়ি।
এই বাড়ির মালিকের নাম রসময় রায়। আমার বিশেষ পরিচিত এবং বন্ধু লোক। অত্যন্ত সৎ এবং সজ্জন তিনি।
রঞ্জনবাবু বললেন, সেই সৎ সজ্জনের ভেতরেই হয়তো কোনও দুর্জন বাসা বেঁধে আছে।
এ অসম্ভব। আমার মনে হয় কেউ তাকে ব্ল্যাকমেল করে সাময়িকভাবে এই বাড়িটাকে দখল করে নিয়েছে। হয়তো এই বাড়িরই গুপ্তকক্ষে বন্দি আছেন তিনি। আমরা রেড করতে ঢুকে তাঁকে অ্যারেস্ট করে হাতকড়া পরাব, আর আসল অপরাধী সমস্ত অপরাধের বোঝা ওই নিরীহ ভদ্রলোকের ঘাড়ে চাপিয়ে পার পেয়ে যাবে।
রঞ্জনবাবু বললেন, এত লোডশেডিংয়েও যখন বাড়ির ভেতরে এমার্জেন্সি আলো জ্বলছে, তখন নিশ্চয়ই লোকজন আছে এর ভেতর। চলুন ঢুকে পড়া যাক। আর গুদাম ঘরেরও তালা ভাঙা হোক।
বাসববাবু বললেন, খবরদার নয়। কোনওভাবেই ঢোকা নয় ওর ভেতর। মনে রেখো এটা রিমোট কনট্রোলের যুগ। চারদিক থেকে এলাকাটাকে ভালভাবে ঘিরে রাখো। আর মাইকে ঘোষণা করো ওদের আত্মসমর্পণ করবার। ভুলেও কেউ ভেতরে ঢুকো না।
বাসববাবুর আদেশ মতোই কাজ হল।
একটু পরেই কারেন্ট এসে যাওয়ায় আশেপাশের ঘরবাড়ির আলোও জ্বলে উঠল। অনেক গৃহস্থের বাড়ি আশেপাশে। রাতদুপুরে পুলিশ দেখে ছাদে বারান্দায় তাই লোকে লোকারণ্য।
মি. ডলফিন আর মংপু ডিটোনেটার হাতে বেশ কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়েছিল। ডিটোনেটারটা ছিল মংপুর হাতে। ডলফিন ছিল আরও দূরে। কিন্তু পুলিশ যখন বাড়ির কাছে এল অথচ বাড়িতে ঢুকল না, ঠিক তখনই প্রমাদ গনল দু'জনে। সমস্ত পরিকল্পনাটাই বানচাল হতে বসেছে দেখে ডলফিন সংকেত দিল মংপুকে। মংপু এক নম্বর এবং দু'নম্বর বোতাম দুটোই একসঙ্গে টিপে দিল। কিন্তু কোথায় কী? একটা পটকা ফাটার শব্দও শোনা গেল না যে। সে বার বার টিপেও যখন যখন সফল হল না, তখন এক-পা এক-পা করে পিছু হটল। ডলফিন কোনওরকমে পালাতে সক্ষম হলেও মংপু ধরা পড়ল পুলিশের হাতে। অবশ্যই জীবিত অবস্থায় নয়। কেন না আশপাশ থেকে তখন ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি বৃষ্টি হচ্ছে। তারই একটিতে মংপুর খেল খতম।
অনেক পরে পুলিশ বাড়ির ভেতরে ঢুকে উদ্ধার করলেন রসময়বাবুকে। স্ত্রীপুত্র সহ তিনি ওষুধ ও ইঞ্জেকশনের প্রভাবে গভীর ঘুমে ঘুমিয়েছিলেন। কিন্তু সারা বাড়ি তোলপাড় করেও স্বপ্না-রিয়া বা হিরণের দেখা পেলেন না কেউ। সেই সঙ্গে খোঁজ পেলেন না কার্লস জ্যাকলেরও। কিন্তু আশ্চর্য! সেই লোকটি কোথায়? সে কি আগেই পালিয়েছে? কোথায় গেল পিনাকী গুপ্তর বর্ণনায় সেই গড ফাদার? পুলিশ ও দুষ্কৃতীদের গুলির লড়াই তখন তুঙ্গে উঠেছে! এই অভিযানে পুলিশ এখানে। এসেছে দলবল সহ কয়েক ব্যাটেলিয়ান। সেই সঙ্গে এসেছে চার-পাঁচটি বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত গোয়েন্দা কুকুর। তারাই আশপাশে লুকিয়ে থাকা সশস্ত্র দু'জন দুষ্কৃতীকে আঁচড়ে কামড়ে ধরিয়ে দিল। তাদের ধরে ঘা-কতক দিতেই সব কিছু ফাঁস করে দিল তারা। তাদেরই কথামতো তাদের সঙ্গে নিয়েই পুলিশের গাড়ি ছুটে চলল মাঝের হাটের দিকে। যেখানে কার্লস জ্যাকলের হেফাজতে ছেলেমেয়েগুলো বন্দি আছে।
এই পথ খুব একটা দীর্ঘ নয়। তবু বাসব মজুমদারের এক একটি মুহূর্ত যেন এক একটি ঘণ্টা বলে মনে হতে লাগল।
এক সময় পুলিশ যখন যথাস্থানে এসে পৌঁছল তখন কেউ কোথাও নেই সেখানে। শুধু গলির মুখে নর্দমার ধারে যে মৃতদেহটা পড়েছিল, তার মুখে টর্চের আলো ফেলেই চমকে উঠলেন বাসববাবু। সিংহগর্জনে চিৎকার করলেন, কার্লস জ্যাকল।
এরপরে শুরু হল চিরুনি অভিযান। পুলিশ কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে শুরু করল সে কী দারুণ তল্লাসি! বাড়ি বাড়ি ঢুকে চলতে থাকল তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ।
এই তিন কিশোর-কিশোরীর অনিষ্ট আশঙ্কায় সকলেরই বুক কেঁপে উঠল। বাসব মজুমদারের বার বারই মনে হল কার্লস জ্যাকলের কাছে তিনি হেরে গেলেন। তাঁর একমাত্র ছেলেই যদি হারিয়ে যায়, তো কার্লস জ্যাকলের ডেড বড়িতে তাঁর প্রয়োজনটা কী? কিন্তু কোথায় গেল ওরা? ওদের কাটা লাশ কি এখন গঙ্গার স্রোতে ভাসছে? নাকি পচন ধরার অপেক্ষায় ঘুমিয়ে আছে কোনও ম্যানহোলের গর্তে? বাসব মজুমদার কোনও কিছুই তাই ভাবতে পারলেন না আর।
রহস্যের মায়াজাল ছেঁড়া যাক এইবার।
এই চক্রের গড ফাদার মি. ডলফিন কোনওরকমে পালিয়ে এসে গোপন সংবাদপ্রেরক যন্ত্রের সাহায্যে কার্লস জ্যাকলকে জানিয়ে দেয় বেঁটেবাঁটুলের বিশ্বাসঘাতকতার কথা। আর কার্লস তখুনি দলবল নিয়ে খুঁজতে বেরোয় বামনটাকে। ইতিমধ্যে রিয়ার অন্তর্ধানে কার্লস জ্যাকল খুবই চিন্তিত ছিল। তাই স্বপ্না ও হিরণকে আগের জায়গা থেকে অন্যত্র সরিয়ে ওত পেতে ছিল ওইখানেই। সে জানত এর মধ্যে বামনটার কোনও কারসাজি থাকলে সে নিশ্চয়ই ওদের উদ্ধার করতে ওইখানে আসবে। এবং এলও তাই। চাল ভুল একটুও হয়নি কার্লস জ্যাকলের। কিন্তু ক্ষুদেটাকে যে আছাড় মারবার সঙ্গে সঙ্গে ওই ওইভাবে লাফিয়ে পড়ে ওকেই গুলি করবে তা সে ভাবতেও পারেনি। একেই বলে অদৃষ্টের পরিহাস। অমন বৃহৎ শক্তি যাকে লোহার খাঁচায় রেখেও ধরে রাখতে পারল না, একটা ক্ষুদে বামন তাকে এক লহমায় মৃত্যুর মুখে পৌঁছে দিল।
কার্লস জ্যাকল খুন হতেই দলের লোকেরা যে যেদিকে পারল পালাল। লোক অবশ্য খুব একটা বেশি ছিল না। পাঁচ-ছ'জন। বামনটাকে লক্ষ্য করে ওরাও কয়েকটা গুলি চালাল। কিন্তু ক্ষুদেটা তুডুকতুডুক করে লাফিয়ে ডিগবাজি খেয়ে এদিক সেদিকে লুকিয়ে পড়ায় সব কটা গুলিই ফসকাল। অতএব ওরা আর অযথা গুলি নষ্ট না করে পুলিশের মোকাবিলার জন্য কিছু সঙ্গে রেখেই কেটে পড়বার সিদ্ধান্ত নিল।
ওরা চলে গেল। কিন্তু খুকুমণি কোথায়? তাকে তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তবে কি ওরা সঙ্গে করে নিয়ে গেল খুকুমণিকে? বামনের চোখে যেন জল এল। এরই মধ্যে খুকুমণিকে ঘিরে কত মধুর স্বপ্ন দেখে ফেলেছিল সে। খুকুমণির জন্যই ভাল হতে চেয়েছিল। ভেবেছিল কোনও একটা দূরদেশে চলে যাবে। সেখানে একটা ভদ্র পল্লীতে ঘর ভাড়া নিয়ে খুকুমণিকে রাখবে। ও তো একটা বেঁটেবাঁটুল। ওকে নিয়ে মজা করবে লোকে। তাই লোকের খোশামোদ করে চা জল বয়ে দিয়ে কোনও দোকান-ঢোকানে কাজও জুটিয়ে নেবে একটা। আর নির্ভীক সৈনিকের মতো পাহারা দেবে খুকুমণিকে। ওকে ও দিদিভাই বলে ডাকবে। আর সারাজীবন অতন্দ্র প্রহরীর মতো ছায়ার মতো, সঙ্গে থাকবে ওরা। খারাপ কাজ ও করবে না। কিন্তু কোনও দুষ্টু লোক কখনও খুকুমণিকে বিরক্ত করলে, তখনই দেখিয়ে দেবে ওর পয়েন্ট থ্রি এইটের খেল। এটাকে ও কখনও হাতছাড়া করবে না। সবসময় রক্ষাকবচের মতো এটাকেও রেখে দেবে মাথার বালিশের নীচে। অনিষ্টকারী কীটপতঙ্গকে যেমন বিনাশ করতে হয় তেমনি দুষ্ট লোকেদেরও শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দিতে নেই।
বামন খুকুমণির শোকে মুহ্যমান হয়ে কার্লস জ্যাকলের পরিত্যক্ত ঘাঁটিতেই আবার এসে ঢুকল। শূন্য খাঁচার মতো বাড়িটার ভেতরে ঢুকে প্রতিটি ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল সে। আর পাগলের মতো ডেকে চলল, খুকুমণি... খুকুমণি...। কিন্তু না। ওর ডাকে কেউই সাড়া দিল না। ও ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে লাগল। ছাদে উঠেই দেখল চিলেকোঠার সামনে কে যেন একজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। সম্ভবত খুকুমণি এই লোকটাকে জখম করে ওর পালাবার পথ পরিষ্কার করে নিয়েছিল। কিন্তু ওকে গুলি করল কে? এ নিশ্চয়ই ক্রোধে উন্মত্ত কার্লস জ্যাকলের কাজ। যাই হোক, এখন থেকে আর একটি লোকও কার্লস জ্যাকলের শিকার হবে না। কিন্তু খুকুমণি...?
হঠাৎ দূরের দিকে লক্ষ পড়ায় কী যেন দেখে চমকে উঠল বামন। ও আলোঅন্ধকারের বুক চিরে স্থির হয়ে পড়ে থাকা রেলের লাইনগুলোর দিকে তাকিয়ে যখনই ভাবছিল খুকুমণিকে ওরা ওইখান দিয়েই কোনও দূরদেশে নিয়ে চলে গেছে কি না, তখনই ওর নজরে পড়ল। কী একটা যেন। দেখেই লাফিয়ে উঠল সে। আর এতটুকু দেরি করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। এখুনি ওখানে যেতে নাপারলে খুকুমণিকে আর বাঁচানো যাবে না।
ও তুর তুর করে সিঁড়ি বেয়ে ছুটে এসে যেই না নীচের ধাপে পা দিয়েছে, অমনি দেখল কাতারে কাতারে পুলিশ এসে ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভেতর। তাই না দেখে বোকার মতো আবার উঠে এল ছাদের ওপর। তারপর ওরই বেঁধে রাখা সেই দড়ি ধরে ঝুলে পড়েই পাশের ছাদে মারল এক লাফ। আর সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে একটা গুলি এসে লাগল ওর গায়ে। ও তাতে ভ্রূক্ষেপও করল না। কেন না এখুনি একটা মালগাড়ি আসবার সময় হয়ে গেছে। তাই ছাদের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়েই ওই অবস্থাতেই আবার ছুটে চলল রেল লাইনের দিকে। পেছনদিক থেকে একদল পুলিশও তাড়া করল ওকে! তারা সমানে চেঁচাতে লাগল, হল্ট— হল্ট—
কিন্তু কে শোনে কার কথা?
এমন সময় কে যেন বলে উঠল, ফায়ার।
নিস্তব্ধতা কাঁপিয়ে একটা গুলির শব্দ। বামনের দেহটা একবার বলের মতো লাফিয়ে উঠে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল। তারপর ক্রমশ স্থির হয়ে আসতে লাগল সব কিছু।
বাসববাবু, রঞ্জনবাবু আর নীহারবাবু ছুটে এলেন বামনটার কাছে।
নীহারবাবু ওর জামার কলার ধরে মাটি থেকে টেনে তুললেন ওকে। বললেন, কে তুই?
বামনের চোখে জল।
সে অতিকষ্টে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, খু-কু-ম-ণি।
তোর নাম খুকুমণি?
বামন ঘাড় নেড়ে না বলল । তারপর দূরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, খু-কু-ম-ণি!
তুই কার্লস জ্যাকলের লোক?
বামন ঘাড় নাড়ল।
আমাদের ছেলেমেয়েগুলোকে ওরা কোথায় রেখেছে জানিস? বামন আঙুল দিয়ে কী যেন দেখাতে গেল। কিন্তু পারল না। কেন না তার আগেই স্থির হয়ে গেল সে।
বাসববাবু বললেন, চলো তো সামনের দিকে। মনে হচ্ছে ওইদিকেই ওরা নিয়ে গেছে ওদের। লোকটা বারবার ওইদিকেই যখন দেখাচ্ছে...। পুলিশ, কুকুর, কনেস্টবল এবং অফিসাররা সবাই ছুটলেন রেললাইনের দিকে। খানিকটা যাবার পরই কুকুরের চিৎকারে ছুটে গেলেন সবাই। দেখলেন সে এক রোমহর্ষক দৃশ্য। অন্ধকার রেলপথের একটু নির্জনে তিনটি ছেলেমেয়েকেই দুষ্কৃতীরা লাইনের সঙ্গে লম্বালম্বিভাবে এমন করে বেঁধে ফেলে রেখেছে যে কোনও একটা ট্রেন যদি হঠাৎ এসে পড়ত তা হলে কী যে হত ভাবা যায় না।
পুলিশ ওদের সকলকেই মুক্ত করলে হিরণ বলল, আমরা যে এখানে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় ছিলাম তোমরা কী করে জানলে বাপি? বাসববাবু বললেন, আর বলিস না। একটা ক্ষুদে বামন...।
বাসববাবুর কথা শেষ হবার আগেই রিয়া বলে উঠল, কই কোথায়? কোথায় সে?
বিস্মিত বাসবাববাবু বললেন, তুমি তাকে চেনো?
চিনি মানে? আমাদের এই চরম বিপদে সেই তো একমাত্র বন্ধু। ও না থাকলে সব শেষ হয়ে যেত আজ। আপনারাও বাঁচতেন না, আমরাও না।
সে কী! কিন্তু...।
রিয়া অল্পক্ষণের মধ্যেই সব কথা খুলে বলল সকলকে।
সব শুনে সকলেরই মাথা হেঁটে।
এই চরম মুহূর্তে যে মানুষ নিস্বার্থভাবে জীবনরক্ষা করে গেল সকলের তাকেই কিনা শত্রু ভেবে...
গুলির আদেশ রঞ্জনবাবু দিয়েছিলেন। তাই তাঁর প্রাণেই আঘাতটা লাগল বেশি।
বাসববাবু বললেন, ওই জন্যই ও বার বার খুকুমণি খুকুমণি করছিল। রিয়া কেঁদে ফেলল ঝর ঝর করে। বলল, আমাকে শিগগির ওর কাছে নিয়ে চলুন আপনারা। ওকে একবার শেষ দেখা আমি দেখব।
হিরণ ও স্বপ্না বলল, আমরাও যাব। ওই মহৎপ্রাণকে শেষবিদায় আমরাও জানিয়ে আসব সবাই।
একটা মালগাড়ি তখন গম গম করে মাটি কাঁপিয়ে বজবজের দিকে চলে গেল। আর একটু দেরি হলে এই গাড়ির চাকার তলাতেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত ওরা। খুব সময়ে ওদের তিনজনকেই উদ্ধার করা গেছে। সবই ঠাকুরের কৃপা এবং বামন অবতারের দয়া। ওই ক্ষুদ্র মানুষটি না-থাকলে এই কাহিনিটিই অন্য রকম হয়ে যেত আজ।
ওরা বামন অবতারকে শ্রদ্ধা জানিয়ে যখন বাড়ি ফিরে এল, তখন ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।
ক্লান্ত অবসন্ন বাসববাবু সোফায় দেহটা এলিয়ে দিতেই টেলিফোনটা বেজে উঠল, ক্রি রিং রিং। ক্রি রিং রিং।
বাসববাবু রিসিভার কানে দিয়ে বললেন, হ্যালো, মি. মজুমদার স্পিকিং... গুড মর্নিং মি. মজুমদার। আশা করি ভালয় ভালয় বাড়ি ফিরেছেন। কে! কে তুমি?
সে কী! আমার গলা চিনতে পারছেন না?
কার্লস জ্যাকল।
কার্লস জ্যাকল মৃত। কিন্তু আমার মৃত্যু নেই। আমি ডলফিন জ্যাকল। অপরাধজগতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আমি ঘুণপোকার মতো মিশে থাকব। চি-র-কা-ল। তবে আপাতত আমি দূরে— অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। লালবাজারে রাহাজানি করে কার্লস জ্যাকলের নামে একদিন আমিই কলকাতার আতঙ্ক ছিলাম। এখন আমার লালমহলে গিয়ে আপনারাই রাহাজানি করুন। বিদায়, বন্ধু বিদায়!
শয়তান ! এতদিন তুমিই তা হলে নাম ভাঁড়িয়ে আমাকে ধোঁকা দিয়ে এসেছ? ওদিক থেকে কী যেন উত্তর ভেসে এল ঠিক বোঝা গেল না। বাসববাবু দু’বার-তিনবার হ্যালো হ্যালো করলেন। তারপর বললেন, ইডিয়ট। বলেই সশব্দে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন।
ছেলেমেয়েদের ফিরে পেয়ে পাশাপাশি দুটি বাড়িতেই তখন আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন