হিন্দোলসর্দারের কেল্লা

ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

এক

কোনও কিছু টের পাবার আগেই যা ঘটবার তা ঘটে গেল। সে রাতে জ্যোৎস্না ছিল অঢেল। আকাশের গোল চাঁদটাও যেন ট্রেনের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছুটেছিল। ছায়া ছায়া কালো কালো দূরের পাহাড়গুলো স্বপ্নের দেশের মতো মনে হচ্ছিল তখন। রঞ্জন অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছিল তাই। দ্রুতগামী ট্রেনের চলার ছন্দে হঠাৎই যতিভঙ্গ হল। অনেকটা হোঁচট খাওয়ার মতোই একবার শূন্যে লাফিয়ে উঠল ট্রেনটা। তারপর সব স্থির। সব অন্ধকার।

অনেক পরে যখন জ্ঞান ফিরল, তখনও উদ্ধারকার্য শুরু হয়নি। চারদিকে হতাহত মানুষের দেহ খেলাঘরের পুতুলের মতো ছড়ানো। যন্ত্রণাকাতর মানুষগুলোর সে কী করুণ আর্তনাদ।

রঞ্জন ধীরে ধীরে উঠে বসল। সর্বাঙ্গে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করল সে। মাথাটা এখনও ঝিম ঝিম করছে। আঘাত কি খুবই গুরুতর? না। হাত, পা, ধড়, মুণ্ডু সবই যথাস্থানে ঠিকঠাক আছে। মাথার কাছে সুটকেসটা রাখা ছিল। হাত বাড়িয়ে নিতে গেল সেটা। কিন্তু পেল না। কোথায় ছিটকে পড়েছে কে জানে?

ওর সামনের বার্থে মি. গোমেশ নামে এক ভদ্রলোক শুয়েছিলেন। বার্থের নীচে ভারী ভারী ট্রাঙ্কগুলো রাখা ছিল তাঁর। সেগুলো যে কোনদিকে কোনটা ছিটকে পড়েছে তা বোঝা গেল না। শুধু মি. গোমেশ তাঁর প্রাণহীন দেহটা নিয়ে বার্থের লোহার চেনে ঝুলছেন। কী ভয়াবহ পরিণতি। আর এক ভদ্রলোক, সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মুখে গোঁ গোঁ শব্দ। মাথার খুলি ফেটে—।

এ দৃশ্য দেখা যায় না।

রঞ্জন কোনওরকমে এর ওর গায়ে পা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। হঠাৎই জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখল বাইরেটা। একদল লোক মশাল আর টর্চ নিয়ে ছুটোছুটি করছে। নিশ্চয়ই খবর পেয়ে রিলিফ ভ্যান নিয়ে উদ্ধারকারীরা এসে গেছে। কিন্তু এ কী! ওদের হাতে স্ট্রেচারে শোয়ানো হতাহত মানুষের বদলে মালপত্তর কেন? তবে কি ডাকাতির জন্যই এই দুর্ঘটনা? কালো কালো বলিষ্ঠ চেহারার মানুষগুলোর মাথায় নীল কাপড়ের ফেত্তি বাঁধা। হাতে রক্ত মাখা ধারালো অস্ত্র। উঃ কী ভয়ংকর। রঞ্জন একবার হিপ পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিল ওর ওগুলো যথাস্থানেই আছে কি না, দেখে আশ্বস্ত হল। একশো টাকার দশখানি নোট খুবই যত্ন সহকারে গোঁজা ছিল সেখানে। সেগুলো যথাস্থানেই আছে। আসলে দুষ্কৃতীরা ছেলেমানুষ ভেবেই হয়তো হাত দিয়ে দেখেনি ওখানে। অথবা বুঝে উঠতে পারিনি এই ধ্বংসস্তূপের এক কোণে একটি তাজা প্রাণ এখনও অবশিষ্ট আছে বলে।

ভোরের আলো ফোটেনি এখনও। শুরু হয়নি পাখিদের কলরব। শুধু চারদিক থেকেই শোনা যাচ্ছে মানুষের অস্তিম আর্তনাদের সুর। আবছা অন্ধকারে ভরে আছে ভেতরটা। বাইরে ফুটফুটে জ্যোৎস্না। বন-পাহাড় চারদিকে। তবু এই মৃত্যুপুরীর ভেতর থেকে উদ্ধার পাবার জন্য টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল রঞ্জন। ভেতরে কত যাত্রী যে হতাহত হয়ে রয়েছে তার হিসেব কে রাখে? হাতড়ে হুতড়ে কোনওরকমে দরজার কাছে যেতে গিয়েই হঠাৎ ওর কানে এল, পানি— পানি—থোড়া পানি দিজিয়ে।

মেয়েলি গলার করুণ প্রার্থনা।

এই সময় শত বিপদেও, অসুবিধা সত্ত্বেও এই অন্তিম প্রার্থনাকে উপেক্ষা করে কি চলে যাওয়া যায়? কিন্তু জল এখানে পাবে কোথায়? তা ছাড়া চারদিক থেকেই তো ওই একই প্রার্থনা, জল দাও – পানি দাও—প্লিজ গিভ মি এ ড্রপ অফ ওয়াটার। কত লোকের মুখে জল দেবে ও? হঠাৎ একটা কীসের ওপর যেন পা পড়ল। দেখল একটা টর্চ গড়াগড়ি খাচ্ছে সেখানে। এই চরম বিপদের মুহূর্তে এই টর্চটা খুবই কাজে লাগবে।

রঞ্জন ঝুঁকে পড়ে টর্চটা কুড়িয়ে নিয়ে চারদিকে ফেলতে লাগল। হঠাৎই নজরে পড়ল কম্পার্টমেন্টের ভেতরে জানালার পাশের হুকে ঝোলানো ওয়াটার বটলগুলোর দিকে। তারই একটা নিয়ে এসে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল ও।

কাছে গিয়ে দেখল একটি ওরই বয়সি মেয়ে এক পাশে মেঝেয় পড়ে কাতরাচ্ছে, পানি—থোড়া পানি দিজিয়ে।

রঞ্জন টর্চ রেখে ওয়াটার বটল থেকে জল নিয়ে মেয়েটির চোখেমুখে ঝাপটা দিল প্রথমে। ওর নাক দিয়ে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মূল্যবান চুড়িদারটা রক্তে ভিজে সপ সপ করছে। দু’-একবার ঝাপটা দেবার পর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল মেয়েটি। তারপর বলল, ম্যায় কাঁহা হুঁ? থোড়া পানি—।

রঞ্জন কোনও উত্তর না দিয়ে মেয়েটির ঘাড়ের কাছে হাত রেখে মাথাটা একটু তুলে ওয়াটার বটলটা ওর মুখের কাছে ধরল। এক নিশ্বাসে সমস্ত জলটুকু পান করে মেয়েটি যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তারপর রঞ্জনের একটা হাত ধরে উঠে বসবার চেষ্টা করে বলল, তুম কৌন হো?

রঞ্জন বলল, আমিও তোমারই মতো এই ট্রেনের একজন যাত্রী ছিলাম।

মাঝরাত্তিরে ট্রেনটি ভয়ংকর এক দুর্ঘটনায় পড়ে। নেহাত মিডল বার্থে শুয়েছিলাম, তাই প্রাণে মরিনি। লোহার চেনে আটকে বেঁচে গেছি। আমি লোয়ার বার্থে ছিলাম।

তার ওপর বিপরীতমুখী হওয়ায় ছিটকে পড়েছ তুমি। নিশ্চয়ই খুব লেগেছে তোমার?

মেয়েটি ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ।

এই অভিশপ্ত ট্রেনের অনেক যাত্রীই বেঁচে নেই। আহত হয়েছেন বহু লোক। আমাদের উদ্ধার করবার জন্য এখনও পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি। কিছু লোক অবশ্য এসেছে লুঠপাট করতে, কিন্তু তারা আমাদের কোনওরকম সাহায্য করবে না।

মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমার আব্বাজান?

কোথায় তিনি?

আপার বার্থে শুয়েছিলেন।

রঞ্জন টর্চ নিয়ে চারদিকে ঘোরাতে লাগল। কিন্তু না। কোনও বার্থেই কেউ নেই।

মেয়েটিও উঠে দাঁড়াল এবার। তারপর আলো ধরে খুঁজতে খুঁজতে দেখতে পেল ওর আব্বাজানকে। সুন্দর স্বাস্থ্যবান এক মধ্যবয়সি ভদ্রলোক ঘাড়গুঁজে পড়ে আছেন একদিকে। তাঁর বুকের ওপর একটি ট্রাঙ্ক চাপা। সেই দৃশ্য দেখে মেয়েটি অধীর হয়ে উঠল। রঞ্জনের সাহায্যে কোনওরকমে ট্রাঙ্কটি সরিয়ে তার আব্বাজানের বুকে হাত রাখতেই বুঝল তিনি মৃত। রঞ্জনও স্পর্শ করে দেখল ভদ্রলোকের হিমশীতল অঙ্গ বাস্তবিকই তাঁর মৃত্যু ঘোষণা করছে। মেয়েটি ওর আব্বাজানের বুকের ওপর লুটিয়ে পড়ে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ল।

প্রিয়জন হারানোর বিচ্ছেদ যে কত মর্মান্তিক, তা অনুভব করল রঞ্জন। ভাগ্যে ও একা এসেছিল। মেয়েটির কান্না আর থামে না। জোয়ারের গঙ্গার মতো ফুলেফুলে কাঁদছে মেয়েটি। ওর কান্না থামে না দেখে রঞ্জন বলল, শোনো, এইভাবে কেঁদে কোনও লাভ হবে না। চলো, আমরা বরং ট্রেন থেকে নেমে কাছেপিঠে কোনও লোকালয় থাকলে সেখানে খবর দিই। তারা নিশ্চয়ই এই রকম দুর্ঘটনার সংবাদ পেলে ছুটে আসবে।

মেয়েটির কিছুতেই তার বাবাকে ছেড়ে যাবার ইচ্ছা হল না। অথচ না-গিয়ে উপায়ই বা কী? রঞ্জন আর একটুও দেরি করতে রাজি নয়। কেন না আর্ত মানুষের এই অন্তিম হাহাকার কান পেতে শোনা যায় না।

রঞ্জনের বহু অনুরোধে মেয়েটি যখন শেষবারের মতো ওর আব্বাজানের ললাট চুম্বন করে উঠে দাঁড়াল, তখন দেখল আর একজন কে যেন বহু কষ্টে ওদের দিকে এগিয়ে আসছেন। ভদ্রলোক প্রবীণ। বললেন, তোমরা কি তোমাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছ?

মেয়েটি বলল, হ্যাঁ।

আমিও হারিয়েছি। আমার একমাত্র সন্তান এই দুর্ঘটনায় আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তোমরা যদি সুস্থ থাক তো এই মুহূর্তে পালিয়ে যাও এখান থেকে। চারদিকে লুঠপাট শুরু হয়ে গেছে। তা ছাড়া এই চক্করের বাইরে গিয়ে রেলের কাছ থেকে ডেড বডি আদায় করো। এখন কোনও মতেই এখানে থেক না। হয়তো বিপদে পড়ে যাবে।

রঞ্জন বললে, কেন?

যা বলছি তাই করো। একেবারে অপারগ না হলে থেক না। থাকতে নেই। তোমাদের রক্ষা করার দায়িত্ব এখন তোমাদেরই। আর কারও নয়। আমার একটা পা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। তবুও আমি চলে যাচ্ছি। হাতের কাছে নিজেদের জিনিসপত্তর যদি কিছু পাও তো নিয়ে নাও। ফেলে রেখে যেয়ো না।

মেয়েটি হয়তো বুঝল ব্যাপারটা। তাই কাঁদতে কাঁদতে ওর বাবার পাঞ্জাবির সোনার বোতাম, রিস্টওয়াচ আর পকেটের টাকাগুলো বার করে নিল। তারপর বহু কষ্টে দরজার হাতল ধরে ওপরে উঠে লাফিয়ে নামল পাশের লাইনে।

এখানে চারদিকেই শুধু জঙ্গল আর পাহাড়। নিশ্চয়ই কেউ ফিস প্লেট সরিয়ে এই অপকর্মটা ঘটিয়েছে। ওদের মতো আহত, অল্প আহত, অক্ষত আরও অনেকেই নেমেছে দেখা গেল। কিন্তু মজার ব্যাপার সামান্য কিছু লোক ছাড়া বেশির ভাগ লোকই জঙ্গলের পথ ধরে পালাচ্ছে। কেন? কেন পালাচ্ছে ওরা? মেয়েটির হাতধরে রঞ্জনও এগোতে শুরু করল।

রঞ্জনের ছোটা অভ্যাস আছে। কিন্তু মেয়েটির? ও কি পারবে ওর সঙ্গে ছুটতে অথবা দ্রুত পা চালাতে? অবশ্য সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা এবং আঘাতের অবসাদ নিয়ে দ্রুত পথ চলা খুবই কষ্টকর। তবু ওরা চলতে লাগল।

কিছুটা পথ যাবার পরই হাঁপিয়ে উঠল ওরা। দু'জনেরই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মেয়েটির অবস্থা খুবই শোচনীয়। একে সদ্য পিতৃ-বিয়োগে দারুণভাবে ভেঙে পড়েছে মেয়েটি, তার ওপর ব্যথা-বেদনার শরীর নিয়ে পথচলা একেবারেই অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে এই পাহাড়-জঙ্গলের দেশে।

ওদের সম্মুখের পথটা ক্রমশ উঁচু দিকে উঠে গেছে। অর্থাৎ ওরা মালভূমির মতো অংশে একটা বড়সড় টিলার দিকে এগোচ্ছে। তারই খাড়াই পথের আকর্ষণ হাঁফ ধরাচ্ছে ওদের। এখানে শুধু শিমুল ও মহুয়ার বন। মাঝেমধ্যে দু’-একটা ঘন পাতার সেগুন গাছও দেখতে পাচ্ছে ওরা। রঞ্জন মেয়েটির একটি হাত শক্ত করে ধরে আছে।

যেতে যেতে এক সময় মেয়েটি বলল, আর কতদূর যেতে হবে আমাদের? আর যে পারছি না।

রঞ্জনও কি পারছে? ওরও পাদুটো যেন ভারী অসুখ থেকে উঠলে যেমন হয়, সেই রকম ভেরিয়ে পড়ছে। না হলে এই ফুলের মতো মেয়েটিকে পিঠে নিয়েই চা-বাগানের কুলির মতো উঠে যেত ঠিক। রঞ্জন তো আর পাঁচটা ছেলের মতো নয়। রীতিমতো শরীর চর্চা করে। ওর হাতের একটা চড় অথবা ঘুসি হজম করা অনেক শক্তিমান লোকের পক্ষেও অসম্ভব। তবুও এই দুর্ঘটনার পর কী যে হয়ে গেল। সবসময় যেন মাথাটা ঝিমঝিম করছে। হাত খুব বেশি জোরে মুঠো করতে পারছে না। পা কাঁপছে। এক এক সময় মনে হচ্ছে সত্যি সত্যিই ও বেঁচে আছে তো? এই চাঁদনি রাতের জ্যোৎস্নালোকে শিমুল-মহুয়ার বনে টিলা পাহাড়ে এক অনাত্মীয় কিশোরীর হাতধরে পথচলা এ তো স্বপ্নময়।

মেয়েটি বলল, আর যে পারছি না। উঃ কী কষ্ট।

আর একটু। এই টিলাটার ওপরে উঠে একটু বিশ্রাম নেব আমরা। ।

আমি আর পারছি না

আমিও পারছি না। তবু এসো। একটু কষ্ট করে চলে এসো এটুকু পথ।

রঞ্জন মেয়েটির দেহের ভার অনেকটা নিজের ওপর নিয়ে নিল। মেয়েটির চুল এলিয়ে পড়েছে। সে ওর মাথাটা রঞ্জনের কাঁধের ওপর কাত করে রেখে টলতে টলতে উঠতে শুরু করল বাকি পথটুকু।

পথ শেষ হল এক সময়।

তারায় ভরা আকাশের নীচে লাল টিলার মাথার ওপর বন-জ্যোৎস্না গায়ে মেখে ধুপ ধাপ বসে পড়ল দু'জনে। আঃ কী নিবিড় শান্তি এখানে। মেয়েটি বসে পড়েই একটি পাথরের বুকে ‘হায় আল্লা’ বলে লুটিয়ে পড়ল।

রঞ্জনের কিশোরমন এই অনাত্মীয় কিশোরীর বিয়োগবেদনা দেখে ব্যথিত হল। ওর চোখদুটো অশ্রুসজল হয়ে উঠল এবার। ওর মা-বাবা সঙ্গে থাকলে আজ তাদের ভাগ্যেও এই রকম করুণ পরিণতি জুটত কি না কে জানে? প্রত্যেক যাত্রায় প্রতিটি মানুষের নিয়তি নির্ধারণ করা থাকে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মানুষ নিয়তির দাস। এই কিশোরী কোথায় যাচ্ছিল কে জানে, ট্রেন-ভ্রমণের আনন্দময় অভিযানের আগে স্বপ্নেও কি ভেবেছিল, যে নিঠুর নিয়তি এই মায়াভরা জ্যোৎস্নারাতে এই বনে-পাহাড়ে তার মায়৷কাঠি দিয়ে ওর আব্বাজানকে ওর বুক থেকে ছিনিয়ে নেবে বলে?

এতক্ষণ মনে উত্তেজনা থাকায় মেয়েটির দিকে ভাল করে নজর দিতে পারেনি রঞ্জন। এখন রাত্রি শেষের জ্যোৎস্নালোকে খুব ভাল করে দেখল ওকে। মনে হল যেন এই বাসন্তী পূর্ণিমার রাতে শিলাখণ্ডের ওপর লুটিয়ে পড়া ওই কিশোরী মেয়ে নয়। শরতের একরাশ শুভ্র শেফালি। সাদা কাগজের মতো গায়ের রং। যেন একটা শ্বেতকবুতর কিশোরীর শরীর পেয়ে এই বন-জ্যোৎস্নায় ফুট ফুট করছে। এত ফর্সাও কেউ হয়? এর ওপর জ্যোৎস্নার আলো পড়ে মেয়েটি যেন দুধসাগরে ভাসছে। কতই বা বয়স হবে? খুব জোর বছর পনেরো। রঞ্জনেরই সমবয়সি। দেখে মনে হয় অবস্থাপন্ন ঘরেরই মেয়ে। ওর রক্তেভেজা চুড়িদার সস্তা কাপড়ের নয়। পায়ে জুতো নেই। খুলে রেখে শুয়েছিল হয়তো। কোথায় ছিটকে গেছে কে জানে? রঞ্জনও খালি পা। ওই অন্ধকারে আর ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর জুতো খোঁজার ব্যাপারটা ওরও মনের কোণে উদয় হয়নি।

রঞ্জন কিশোরীর খুব কাছে এগিয়ে গিয়ে সস্নেহে ওর মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, এই শোনো। এভাবে কেঁদ না। অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট। এটাকে এভাবেই মেনে নাও। যা হবার, তা বেশ হয়ে গেছে। এখন একটু বিশ্রাম নিয়ে চলো আমরা শহরের দিকে যাই।

মেয়েটি এক হাতে ওর কপালের ওপর লুটিয়ে পড়া চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর সেও পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল তার উদ্ধারকর্তা এই বন্ধুটিকে। এক সময় শান্ত গলায় বলল, না। আর কাঁদব না। আমার সব কান্নার শেষ হয়ে গেছে। তোমায় ধন্যবাদ। তুমি আমায় ওই নরক থেকে মুক্ত করে এনেছ। তুমি না থাকলে হয়তো ওই প্রেতপুরীতে আমিও মরে পড়ে থাকতাম। এক নিশ্বাসে কথাগুলি বলে নিজের রক্তভেজা পোশাকের দিকে তাকাল।

রঞ্জন বলল, কাল সকালেই শহরে গিয়ে আগে তোমার জন্য একটা নতুন স্কার্ট বা চুড়িদার কিনব। যেটা পরে আছো সেটা পরে তো পথচলা যাবে না। মেয়েটি বলল, তুমি কোনও আঘাত পাওনি তো?

পেয়েছি। সামান্য। মাথায় খুব জোর লেগেছে।

তা হলে তোমার জামার ওই রক্ত!

ও তোমারই। আমরা এক সঙ্গে আসছিলাম, তাই লেগে গেছে।

এখানে কোথাও কি জল পাওয়া যাবে? তা হলে আপাতত একটু ধুয়ে নিতাম। এমন সময় কাছেরই একটি গাছের ডাল থেকে কুহু কুহু করে একটা কোকিল ডেকে উঠল। তারপর একটি দুটি করে পাখি। তার মানে ভোর হয়ে আসছে।

রঞ্জন বলল, পূবের আকাশে সামান্য একটু লালাভা দেখা দিচ্ছে। গাছে গাছে পাখি ডাকছে। রাতের শেষ। দিনের শুরু। চলো আমরা নীচে নামি। টিলার ওপারে নীচের দিকে একটা পাহাড়িয়া নদী আছে মনে হচ্ছে। আমরা ওখানেই যাই। মুখহাত ধুয়ে নিই। জামা থেকে রক্তের দাগ তুলি। তারপর বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করা যাবে। ট্রেন তো চলবে না। অন্য কিছু যদি ম্যানেজ করা যায় তো সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

মেয়েটি বলল, তাই চলো। দূরের ওই নদীর জলে আমরা একটু পরিষ্কার হয়ে নিই। তারপর কাছেপিঠে কোনও শহরে গিয়ে বাড়িতে একটা তার করব। রঞ্জন বলল, সেই ভাল।

মেয়েটি উঠে দাঁড়াতে গেল, কিন্তু পারল না। খানিক উঠেই ধপ করে বসে পড়ল। বলল, পায়ে বড় ব্যথা। খালি পায়ে হাঁটা অভ্যেস নেই। কী করে যে যাব তা জানি না।

রঞ্জন ওর হাতধরে টেনে তুলল। বলল, আস্তে আস্তে এসো। কোথাও ওষুধের দোকান থাকলে দু’-চারটে ট্যাবলেট খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

মেয়েটি ওর হাত ধরে ধীরে ধীরে পথ চলতে লাগল। রঞ্জন বলল, যদি কিছু মনে না কর, একটা কথা বলি? কী কথা বলো।

আমরা দু'জনে এতক্ষণ আছি, কিন্তু কেউ কারও নাম জানি না। এটা কি ঠিক? মেয়েটি মরা চাঁদের মতো ম্লান হেসে বলল, না। মোটেই ঠিক নয়। কী নাম তোমার?

আমার নাম রঞ্জন।

তুমি হিন্দু। আমার নাম শবনম। আমি মুসলমান। আমি কলকাতায় পার্ক সার্কাসের কাছে পার্ল স্ট্রিটে থাকি।

আমি থাকি বালিগঞ্জে ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনে।

ওখানে আমার এক বান্ধবী থাকে।

আমার কিন্তু কোনও বান্ধবী কোথাও থাকে না।

সে কী! তোমার বান্ধবী তো এখন তোমার পাশেই আছে। মুসলমানের মেয়ে বলে আমি কি পারি না কোনও হিন্দু ছেলের বান্ধবী হতে?

কেন পার না? আমাদের ঈশ্বর বা তোমাদের আল্লার কাছে সত্যিই কি কোনও ভেদাভেদ আছে? সবার রক্তের রংই তো লাল। এই দেখ না তোমার রক্ত আমার গায়ে, আমার জামায় লেগে আছে।

তুমি বড় ভাল।

তুমি ও। তোমার মতো মেয়ে আমি কখনও দেখিনি। ঈশ্বর করুন তোমার সঙ্গে আমার বিচ্ছেদ যেন কখনও না হয়। বাড়িতে তোমার কে কে আছে শবনম?

আমার কেউ নেই। মা মারা গেছেন ছেলেবেলায়। আব্বাজান আর আমি।

আমার দাদা ছিল। সে মাফিয়া দলের সঙ্গে মিশে উচ্ছন্নে গেছে। আব্বা তার মুখ দেখেন না। চাচা-চাচি আছেন। লোক সুবিধের নয় তাঁরা।

আমিও আমার বাবার একমাত্র সন্তান বলতে পার। আমার বড় দিদি ছিলেন। তিনি মারা গেছেন গত বছর। আমার দিদির ছেলেরা খুব ছোট। একজনের বয়স ছ’বছর। একজনের চার। আমি সম্বলপুরে তাদের কাছেই যাচ্ছিলাম।

আমি আব্বার সঙ্গে যাচ্ছিলাম হীরাকুদে।

এমন সময় গাছপালার আড়াল থেকে জনাচারেক লোক বেরিয়ে এসে বলল, তা তো যাচ্ছিলে। কিন্তু তোমার হাতে ওগুলো কী বাবা?

ওরা দু'জনেই চমকে উঠল এই নির্জন টিলায় ওই গুন্ডাকৃতি আগন্তুকদের দেখে।

শবনমের হাতে ওর আব্বাজানের ঘড়ি, বোতাম আর মানিব্যাগটা ছিল। একজন এসে ছিনিয়ে নিল সেটা।

আর একজন বলল, বেশ জায়গাটি বেছে নিয়েছ বাছাধনরা। ভেবেছ এখানে এসে গা ঢাকা দিলে কেউ আর দেখতে পাবে না তোমাদের। কিন্তু এটাই যে আমাদের স্বর্গরাজ্য। তা বুঝি জানতে না?

রঞ্জন বুঝল লোকগুলোর মুখ দিয়ে বিশ্রী গন্ধ ছাড়ছে। তার মানে নেশা করেছে ওরা। চারজনের মধ্যে দু'জন খুবই অপ্রকৃতিস্থ

রঞ্জন বলল, এটা স্বর্গই হোক আর নরকই হোক। যেগুলো নিয়েছ সেগুলো ফেরত দাও।

চুপ কর বদমাশ কোথাকার। মেরে মুখ ভেঙে দেব। এক ফোঁটা ছেলেমেয়ে এই বয়সেই চরতে শিখেছ? রাতের অন্ধকারে বনে-জঙ্গলে ঘুরতে এসে শুরু করেছ ছিনতাইবাজি?

রঞ্জন বলল, আমরা ছিনতাইবাজি করতে এসেছি, না তোমরাই লুটপাট করবার জন্যে রাতের অন্ধকারে ফিস প্লেট সরিয়ে নিয়েছিলে লাইন থেকে?

লোকগুলো এবার গম্ভীর মুখে পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করতে লাগল।

তারপর একজন এগিয়ে এসে বলল, তুই কী ম্যানেজ করেছিস দেখি? রঞ্জন বলল, এই দেখ। বলেই সে সজোরে লোকটার তলপেটে একটা ঘুসি মারল।

মারার সঙ্গে সঙ্গেই মুখটা বিকৃত হয়ে জিভটা ঝুলে পড়ল লোকটির। ঠোঁটের কষ বেয়ে গল গল করে রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগল।

একটি কিশোর বয়স্ক ছেলের হাতে একজন সঙ্গীর ওই রকম দুর্দশা দেখে বাকি তিনজন থতিয়ে গেল প্রথমে। ওদেরই একজন পিছন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল রঞ্জনের ওপর। কিন্তু এই কিশোরের শারীরিক শক্তি এবং জুজুৎসুর প্যাঁচের নমুনা জানা ছিল না বাছাধনদের। তাই নিমেষে লোকদুটোকে ধরাশায়ী করে আবার রুখে দাঁড়াতেই একজনের লাথির ঘায়ে ছিটকে পড়ল ও। সেই সময়টুকুর মধ্যেই বাকি দু'জন ওর পকেট হাতড়ে যা যেখানে ছিল সব কিছু সাফ করে নিল। রঞ্জন বাধা দেবার আর কোনওরকম সুযোগই পেল না। উপরন্তু একজন দু’হাতে সজোরে ওর গলাটাকে টিপে ধরল।

এই আকস্মিক বিপদে হতভম্ব হয়ে শবনম বেচারা বোবার মতো দাঁড়িয়ে ভয়ে থর থর করে কাঁপছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে রঞ্জনের অবস্থা দেখে শিউরে উঠল ও। ওদের অন্য মনস্কতার সুযোগ নিয়ে একটা বড় পাথর কুড়িয়ে যে লোকটা রঞ্জনের গলা টিপে ধরেছিল তার মাথার ওপর সজোরে বসিয়ে দিল। এক ঘা-ই যথেষ্ট। ভারী পাথরের আঘাতে মাথাটা গুঁড়িয়ে গেল একেবারে।

বাকি রইল আর দু'জন। ক্রুদ্ধ কুকুরের মতন এগিয়ে এল তারা শবনমের দিকে। বলল, তবে রে শয়তান মেয়ে।

একজন বলল, আয় তোকে পাহাড় থেকে ছুড়ে ফেলে দিই।

আর একজন বলল, না। ওকে মেরে ফেললে চলবে না। ওর গায়ের রং মুখশ্রী দেখেছিস? বড় হলে ও নূরজাহান হবে। আমাদের সঙ্গেই ওকে নিয়ে চলে যাই চল।

শবনম বলল, খবরদার এক পাও এগোবে না বলছি আমার দিকে। খুব সাবধান। আমি কিন্তু জ্যান্ত গোখরো সাপ। এমন ছোবল দেব যে তা ভাবতেও পারবে না।

কিন্তু চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনি। যাদের বলা হল, তারা কর্ণপাতও করল না শবনমের কথায়। একজন এসে জোর করে কাঁধে উঠিয়ে নিল শবনমকে।

শবনম চিৎকার করতে লাগল, ছাড়ো ছাড়ো। ছাড়ো বলছি আমাকে। ছেড়ে দাও। রঞ্জন!

রঞ্জন তখন অতি কষ্টে আবার উঠে বসতে যাচ্ছে। কিন্তু যতবার উঠতে যাচ্ছে ততবারই পড়ে যাচ্ছে ও।

শবনম তখনও চিৎকার করছে, আমাকে বাঁচাও ! রঞ্জন! এরা আমাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

যে লোকটি ওকে কাঁধে নিয়েছিল সে বলল, তোমার বন্ধু এখন হাজার চেষ্টা করলেও তোমাকে বাঁচাতে আসবে না খুকুমণি। এখন চলো তুমি আমাদের গুহাতীর্থে বন্দিনী হবে বলে।

শবনম বলল, এখনও বলছি তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। না হলে তুমি মরবে। কে মারবে আমাকে! তোমার ওই হিরো?

ও নয়। আমিই মারব তোমাকে। বলার সঙ্গে সঙ্গে যা করবার তা করে ফেলল শবনম।

লোকটি যেন সাপের ছোবল খেয়ে চিৎকার করে উঠল। দেখা গেল নিজের গুপ্তস্থান থেকে ছোট্ট একটি পেনসিল কাটা ছুরি দিয়ে লোকটার গলার নালি দু'ফাঁক করে দিয়েছে শবনম।

ততক্ষণে রঞ্জনও উঠে দাঁড়িয়েছে। ওরও নাকেমুখে রক্ত। কপালের একটা পাশ কেটে গেছে।

আক্রমণকারী দলের বাকি একজন দারুশ বিপাকে পড়ে গেল এবার! দুটি কিশোর কিশোরীর হাতে ওর তিন সঙ্গীর ওই দুর্দশা দেখে আর এগোতে সাহস করল না সে। এবার এক-পা এক-পা করে পিছু হটতে লাগল তাই।

ছোট্ট ছুরির তীক্ষ্ণ ফলাটা হাতে নিয়ে শবনমও কেউটে সাপের মতো হিল হিল করে এগোতে লাগল ওর দিকে, আয় না। কাছে আয়। পালিয়ে যাচ্ছিস কেন? লোকটি এবার পিছু হটতে হটতে প্রাণের দায়ে দৌড়তে লাগল।

আকাশের পট থেকে শেষরাতের সমস্ত গ্লানি মুছে গেছে তখন। জ্যোৎস্নারাতের যদিও গ্লানি থাকে না, তবুও দুধফিকে অস্পষ্টতা যেটুকু ছিল সেটুকুও পরিষ্কার হয়ে গেল।

কী অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ এখানকার। চারদিকে পাহাড়ের ঢেউ। সবুজ বনানী। তীরে শিমুল-পলাশে রাঙ্গ গহন বনরাজি। গাছে পাখির ডাক। কী চমৎকার।

রঞ্জন টলতে টলতে এসে শবনমের একটা হাত ধরল। ওর চোখের কোলে চিক চিক করছে মুক্তোর মতো জল।

শবনম বলল, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, রঞ্জন?

হ্যাঁ। প্রচণ্ড মার দিয়েছে ওরা। গলাটা এত জোরে টিপে ধরেছিল যে এখনও কেড়ে নিয়েছে।

লাগছে। তা ছাড়া ওরা আমার সব টাকাগুলো আমারও। এখন কী করি বল তো?

কী আর করবে? আপাতত লোকালয়ে যাই চলো।

ওরা উঁচু টিলার ঢাল বেয়ে নীচে নামতে লাগল। হঠাৎই কী মনে পড়ে যেতে শবনম বলল, রঞ্জন, আমার মনে হয় ওই লোকগুলোর পকেট হাতড়ালে হয়তো আমাদের খোয়া যাওয়া জিনিসপত্তরগুলো পাওয়া যেতে পারে।

রঞ্জন বলল, ঠিক বলেছ তো। চলো চলো। ওদের চারজনের তিনজনকেই আমরা শেষ করে দিয়েছি। বাকি একজন কি সব নিয়ে পালাতে পেরেছে?

শবনম রঞ্জনকে বলল, তুমি একটু ধীরে ধীরে এসো। আমি ততক্ষণ দেখছি।

রঞ্জন বলল, তাই যাও। যা করবার তাড়াতাড়ি কোরো। না হলে লোকজন এসে পড়বে এখুনি। ভোর হয়েছে। সকাল হতেও বেশি দেরি নেই। কেউ আসার আগেই কেটে পড়তে হবে আমাদের। না হলে খুনের দায়ে ধরা পড়ব আমরা।

শবনম অত্যন্ত চতুরা। এই কৈশোর বয়সেই তার বুদ্ধি, সাহস এবং কর্মতৎপরতা সত্যিই প্রশংসা করবার মতো। সে ক্ষিপ্রগতিতে তিনজনের দেহ উলটে পালটে পকেট হাতড়ে অনেক কিছুই বার করে ফেলল।

রঞ্জন এসে উদ্ধার করল শবনমের আব্বাজানের সোনার বোতামটা। পাওয়া গেল না শুধু ঘড়ি আর মানি ব্যাগ। রঞ্জনের টাকাগুলো যে হাতিয়েছিল তার মাথা তো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল শবনম। কাজেই সেগুলো উদ্ধার করতে খুব একটা কষ্ট হল না।

এমন সময় ওরা বহু দূর থেকে দুম দাম শব্দ শুনতে পেল।

শবনম বলল, ও কীসের শব্দ?

মনে হয় গুলির। ব্লাঙ্ক ফায়ার করে রেলপুলিশ নিশ্চয়ই দুর্ঘটনাস্থল থেকে লোকজন সরাচ্ছে।

তার মানে রেসকিউ পার্টির লোকেরা এসে গেছে?

মনে হয়।

রঞ্জন! আমার আব্বাজান?

দুঃখ কোরো না শবনম! এই পাহাড়-জঙ্গলের দেশ থেকে কলকাতার পথে আপাতত আমরা পাড়ি দিতে পারব না। বরং চলো কোথাও থেকে তার করে যে যার বাড়িতে আমাদের অবস্থার কথা জানাই। তোমার আব্বাজানকে পেলেই বা এখন তুমি কী করবে? তুমি আমি দু'জনে কি পারব তাঁর মৃতদেহ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে?

শবনম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এসো। টিলার নীচে ওই নদীতে গিয়ে বরং আমরা আগে একটু পরিষ্কার হই।

রঞ্জন নিজের টাকা শবনমের আব্বাজানের বোতাম ছাড়াও ওদের পকেট হাতড়ে যা কিছু পেয়েছিল সব নিজের কাছে রেখে দিল। বলল, বলা যায় না, এই কাগজপত্রের ভেতর দিয়েই হয়তো ওদের পরিচয় এবং অনেক গোপন তথ্য পেয়ে যাব। আর সেগুলো পুলিশের হাতে তুলে দিলে নিশ্চয়ই দুষ্কৃতীরা দলকে দল ধরা পড়বে।

ঠিক বলেছ তুমি। আল্লা করেন যেন তাই হয়। দলকে দল ধরা পড়ে ওরা। আমরা তো তিনজনের বদলা নিয়েইছি।

ওরা আর একটুও বিলম্ব না করে সেই ঘন গাছপালায় ভরা উচ্চ টিলার ওপর থেকে নীচে নেমে এল। একেবারে নীচে নেমে আসার পর দেখল ছোট্ট একটি গিরিনদী এঁকেবেঁকে পাহাড়ের খাঁজেখাঁজে অশান্ত গতিতে বয়ে চলেছে।

শবনম বলল, তুমি এইখানে একটু আড়ালে বসে থাক। আমি ততক্ষণ এগুলো পরিষ্কার করে নিই।

রঞ্জন বসে রইল।

সামান্য কিছু সময়ের মধ্যেই মুখহাত ধুয়ে পোশাকে লেগে থাকা রক্তের দাগ মুছে উঠে এল শবনম। বলল, এবার আমি বসি, তুমি যাও।

রঞ্জন বলল, তা তো যাব। কিন্তু এই সাতসকালে একেবারে সব যে ভিজিয়ে ফেললে তুমি। এখন উপায়?

উপায় আর কী বল? আমি তো তোমার মতো ছেলে নই। না হলে খালি গায়ে থাকতাম। গায়ে জল বসুক আর যাই হোক ভিজে জামাই পড়ে থাকতে হবে। সত্যিই তো। উপায় কী?

রঞ্জন নিজেও এবার নদীতে নেমে মুখহাত ধুয়ে পরিষ্কার হল। ওর জামাতেও যে সব জায়গায় রক্তের দাগ লেগেছিল, সেগুলো পরিষ্কার করল। পরিষ্কার করতে গিয়ে নিজের জামাও ভিজিয়ে ফেলল রঞ্জন। তারপর ভিজে জামা গায়ে দিয়েই উপরে উঠে এল।

ঠিক এই সময়ই পাহাড়ের ঘন শাল বনের ভেতর থেকে প্রভাতসূর্যের আলোর ছটা ওদের গায়ে এসে পড়ল। গাছের সবুজ পাতায় লাল আলো কী অপরূপ।

ইতিমধ্যেই চারদিকে লোকজনের চলাচল শুরু হয়েছে। তবে তা নেহাতই দেহাতি লোকজনের। ওরা সেই পথে যেতে যেতে বনের ভেতর হঠাৎ একটা মন্দির দেখতে পেল।

রঞ্জন বলল, যাক বাবা, বাঁচা গেছে। ওইখানে উঠে ওদের আশ্রমে যে ভাবেই হোক একটু থাকার ব্যবস্থা করে নেব। তারপর স্থানীয় কোনও সরকারি-বেসরকারি অফিস অথবা পোস্ট অফিস থেকে ট্রাঙ্ককল করব বাড়িতে। শবনম বলল, হ্যাঁ। না হলে আজকের কাগজে এই দুর্ঘটনার কথা যদি ছাপা হয়ে থাকে তা হলে সবাই খুব চিন্তা করবে। আর চাচাজিকে খবর না দিতে

পারলে আমার আব্বাজানের ডেড বডিও বেপাত্তা হয়ে যাবে।

আমার সন্দেহ হচ্ছে কী জান শবনম, হয়তো শেষ পর্যন্ত তোমার আব্বাজানের ডেড বডি পাওয়াই যাবে না।

পাওয়া যাবে না! কেন?

তা জানি না। তবে শুনেছি রেল দুর্ঘটনায় এই রকমই নাকি হয়।

কথা বলতে বলতে ওরা সেই মন্দিরের কাছে এসে পড়ল। মন্দিরের বাইরের গেটে লেখা আছে গোবিন্দজির মন্দির। বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে মন্দিরটা। কয়েকটি তালাবন্ধ ঘরও রয়েছে।

রঞ্জন বলল, এইখানেই আমরা আজকের মতো আশ্রয় নেব। তারপর এদের সাহায্য নিয়ে যা করবার করব।

মন্দিরের সেবায়েত গিরিধারীজি ওদের দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। যদিও অবাঙালি, তবুও পরিষ্কার বাংলায় বললেন, এসো এসো। ভেতরে এসো। শবনম ও রঞ্জন ভেতরে ঢুকল।

গিরিধারীজি বললেন, এ কী! তোমাদের এই রকম অবস্থা কেন? এই সাতসকালে ভিজে কাপড়ে ব্যাপারটা কী?

রঞ্জন বলল, পূজারিজি, আমরা মাত্র একদিনের জন্য আপনার এখানে আশ্রয় চাই। আজ আপনার মন্দিরে আমাদের দু'জনের জন্য প্রসাদের ব্যবস্থাও করতে হবে। যা লাগে দেব আমরা। খুব বিপদ আমাদের।

গিরিধারীজি সস্নেহে বললেন এবার, প্রসাদ জরুর মিলেগা। লেকিন তুম দোনো কৌন হো? কাঁহাসে আ রহে হো তুম! কীসের বিপদ তোমাদের? রঞ্জন বলল, কাল রাত্রে ওই টিলার ওপরে যে বন, সেইখানে এক গুরুতর রেল দুর্ঘটনা হয়েছে।

হাঁ হাঁ শুনা। বহুত আদমিকা নিধন হো চুকা।

আমরাও ওই রেলের যাত্রী ছিলাম। ওই দুর্ঘটনার পর ভয়ে পালিয়ে এসেছি আমরা।

আঃ হা। বঢ়ি আপশোশ কী বাত। ঠিক হ্যায়। মাত ডরো। হিয়া ঘর ভি মিলেগা, খানা ভি মিলেগা। এ লেড়কি তুমহারা কৌন হ্যায়? বহিনকা মাফিক।

বহিন কা মাফিক? বহিন নেহি? বলেই ডাকলেন, জানকি বেটি? এ জানকি বেটি?

ভেতর থেকে উত্তর এল, যাতে হেঁ।

গিরিধারীজি বললেন, জলদি আ যাও। তারপর রঞ্জনকে বললেন, খুব জোর অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে শুনলুম। কোনও আদমিকে ওখানে যেতে দিচ্ছে না পুলিশ?

রঞ্জন বলল, না। তারপর বলল, একটু বেলায় এখানে কোথাও থেকে বাড়িতে একটা ট্রাঙ্কল করা যাবে?

হাঁ হাঁ। নিশ্চয়ই করা যাবে।

এমন সময় মধ্যবয়সি এক মহিলা সম্ভবত জানকি বিটিয়া এসে দাঁড়ালেন সেখানে। তারপর ওদের দেখে কতকটা নিজের মনেই যেন আস্তে করে বললেন, দোনো কাঁহাসে আ গিয়া?

গিরিধারীজি বললেন, দুর্ঘটনা সে ফাঁস গয়া বেচারা। যাও কুছ খানা লে আও। জানকি বিটিয়া একটু সময়ের মধ্যেই দুটো প্লেটে দুটো করে মুগের লাড্ডু ভাল ঘিয়ের হালুয়া নিয়ে এলেন।

গিরিধারীজি বললেন, তোমরা কলকাতা থেকে আসছ নিশ্চয়ই? পাথুরেঘাটার দুনিচাঁদবাবুকে চেনো?

রঞ্জন বলল, না।

জানকি বিটিয়া বললেন, ইয়ে মন্দির উনহোনে বনায়া।

গিরিধারীজি বললেন, যাও, ও বগলবালা ঘর ও লেড়কাকো দে দো। আউর লেড়কিকো সাথ রাখো তুমহারা। আচ্ছা সে দেখভাল করো।

রঞ্জন বলল, ওর সব কিছু ভিজে আছে। দয়া করে ওকে একটা শুকনো কিছু পরবার জন্য দিন।

গিরিধারীজি বললেন, চিন্তা মাত করো বেটা। এটা দেবস্থান। গোবিন্দজির মন্দিরে যখন এসে পড়েছ তখন সব কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে তোমাদের। দরকার হলে আমিই তোমাদের বাড়িতে খবর পাঠাব। ভাবনা কোরো না। তারপর বললেন, ক্যা নাম হ্যায় তুমহারা।

আমার নাম রঞ্জন রায়।

আর উস লেড়কি কো?

শবনম।

বিনা মেঘে যেন বজ্রপাত হয়ে গেল। লাফিয়ে উঠলেন গিরিধারীজি, কেয়া নাম বতায়া? শবনম?

শবনম বলল, হ্যাঁ।

মহামেডান!

জি হ্যাঁ?

নিকালো, নিকালো, আভি নিকালো হিয়াসে। এটা গোবিন্দজির মন্দির। বাবু জানতে পারলে আমার নোকরি থাকবে না। হিন্দুর মন্দিরে মুসলমানের কোনও স্থান নেই। অন্য কোথাও রাস্তা দেখ তোমরা।

খাওয়া অর্ধপথেই রইল। রঞ্জন মুখের গ্রাস নামিয়ে বলল, সে কী পূজারিজি! এই অচেনা জায়গায় আমরা কোথায় রাস্তা দেখব? শুধু মুসলমান হওয়ার অপরাধে এই ফুলের মতো মেয়েটা হিন্দুর মন্দিরে আশ্রয় পাবে না?

না পাবে না। বলেই শবনমকে বললেন, তুমি এখুনি মন্দিরের বাইরে চলে যাও।

শবনমের দু'চোখে জল এল।

রঞ্জন দুঃখ করে বলল, পূজারিজি, আপনি যে গোবিন্দজির সেবা করছেন সেই গোবিন্দজিরই উপাসক চৈতন্যমহাপ্রভু, যবন হরিদাসকে তাঁর বুকের মাঝে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আর আপনি? ছিঃ ছিঃ ছিঃ।

আরে থামো। ফালতু বকোয়াস মাত করো ছোকরা। ভাগো হিয়াসে।

রঞ্জন না-খেয়েই উঠে দাঁড়াল। তারপর থুঃ করে একটা থুতু ফেলে চলে এল মন্দির থেকে। শবনম কাঁদছিল।

রঞ্জন বলল, কেঁদো না। আমাদের পুরোহিত-ব্রাহ্মণরা এই রকমই। আমাদের সংস্কারও এই রকম। এখন চলো যেদিকে লোকবসতি আছে সেই দিকে যাই। শবনম বলল, আমার জন্যে তুমিও আশ্রয়হীন হলে। তার চেয়ে তুমি থাকো, আমি যাই।

ছিঃ শবনম। তুমি আমাকে এত হীন ভাবলে? মন্দির আর মসজিদের মহিমা ওরা কী বুঝবে? তা যদি বুঝত তা হলে কি এত কষ্ট থাকত মানুষের? যিনি খ্রিস্ট তিনি কৃষ্ণ তিনিই আল্লা এই সরল সত্যকে যুগে যুগে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন আমাদের মনীষীরা। তবুও আমাদের মাঝে এর এত ভেদাভেদ। তুমি কিছু মনে কোরো না। আমিও তো হিন্দুর ছেলে। একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ তোমাকে প্রত্যাখ্যান করলেও, আর এক হিন্দু ভাই যে তোমাকে গ্রহণ করতে চায়, তার বেলা?

শবনমের মুখে এবার একটু হাসি ফুটল। বলল, চলো, চলে যাই। কাল রাত্রি থেকে কী যে হচ্ছে। কিছু বুঝতে পারছি না। আমার খুব খিদে পাচ্ছে। তোমারও পাচ্ছে নিশ্চয়ই?

ওরা দু'জনে ধীরে ধীরে বনপথ-রেখা ধরে এগিয়ে চলল। বেশ কিছুদূর যাবার পর লোকজনের দেখা মিলল। এরা সব লাইন দিয়ে জঙ্গলের কাঠ কাটতে চলেছে। ওদের প্রত্যেকেরই মুখে গত রাতের ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার কথা।

রঞ্জন ওদেরই একজনকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা ভাই, এখানে কাছেপিঠে কোথাও কোনও দোকানটোকান আছে?

হাঁ হাঁ। সিধা চলা যাইয়ে! দুকান মিলেগা। সবজি মণ্ডি মিলেগা। সব কুছ হ্যায় হুঁয়া পর।

ওরা আশান্বিত হয়ে সেই দিকেই এগিয়ে চলল।

খানিক যাবার পর দু’-একটা করে ঘরবাড়ি চোখে পড়ল ওদের। অবশেষে ছোট্ট একটি বাজারের কাছে এসে পড়ল ওরা। একটি দোকানে গরম গরম কচুরি আর জিলিপি ভাজা হচ্ছিল। দোকানের বাইরে পেতে রাখা একটা নড়বড়ে বেঞ্চিতে এসে বসল দু'জনে।

ওদের ভিজে পোশাকপরা চেহারার দিকে তাকিয়ে দোকানদার বলল, তুম দোনো কাঁহা সে আ রহে ভাই?

রঞ্জন বলল, কাল রাত্রে যে ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছে আমরা তারই যাত্রী ছিলাম।

এখন তোমাদের দেশে এসেছি। যে ভাবেই হোক আমাদের কলকাতায় ফিরে যাবার একটা পথ বলে দাও।

ক্যায়সে যাওগে? সব রাস্তা বন্ধ।

তা হলে?

তা হলে কেয়া? কুছ না কুছ হোগা। আভি বতাইয়ে ক্যা চাহিয়ে।

আপাতত চারটে করে কচুরি আর একশো গ্রাম করে জিলিপি দাও। আমাদের কাছুে টাকা-পয়সা আছে। দাম দিতে পারব।

দোকানদার একটু জিভ কেটে বলল, হায় রাম। হাম এতনা বুঢ়া আদমি নেহি। তুমহারা পাশ পইসা নেহি রহনে সে ভি খিলায়াগা তুমকো। আও, অন্দর চলা আও।

রঞ্জন বলল, কেন, বেশ তো বাইরে আছি।

আরে খোকাবাবু! ও তো স্রেফ দেহাতি লোগোকে লিয়ে। তুম দোনো অন্দরমে আ যাও।

কিন্তু আমি হিন্দু, আর ও মুসলমান। ভেতরে ঢুকলে দোকানের জাত যাবে না তো?

দোকানদার ফিক করে একটু হেসে বলল, নেহি। হোটেল রেস্টুরেন্ট মে হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান সবকো একই নজর সে দেখা যাতি হ্যায়। তুম ডরো মাত।

ওরা দু'জনে দোকানের ভেতরে ঢুকে পেটভরে কচুরি আর জিলিপি খেল। শবনম বলল, আমি চা খাব না। তুমি খাও তো খেতে পারো।

রঞ্জন নিজের জন্য একটা চা বলল।

চা খেতে খেতে রঞ্জন দোকানদারকে বলল, ভাই সাব, হিয়া ঠারনেকে লিয়ে হোটেল মিলেগা?

নেহি ভাই। লেকিন একঠে। ধরমশালা হ্যায় নদীকা কিনারা মে। হুঁয়া চলা যাও।

ওরা দু'জনে খাবারের দাম মিটিয়ে বাইরে এসে বাজারের কাছে একটি দোকান থেকে দু'জোড়া চটি ও শবনমের জন্য একটা স্কার্ট কিনে ধর্মশালার দিকে চলল। ধর্মশালাটি যদিও মাড়োয়াড়ির, তবুও দেখাশোনার জন্য একজন বাঙালি ভদ্রলোক ছিলেন। রঞ্জনের মুখে সব শুনে বললেন, ঘর আমাদের আছে। কিন্তু শত বিপদেও এই ধর্মশালায় কোনও মুসলমানকে ঘর দেবার হুকুম নেই।

রঞ্জন বলল, তা হলে আমরা কোথায় যাব?

তা তো বলতে পারব না। শুধু এইটুকু বলতে পারি এই ধর্মশালায় তোমাদের স্থান হচ্ছে না।

রঞ্জন আর এক মুহূর্ত রইল না সেখানে। শবনমের হাত ধরে চলে এল সেখান থেকে। তারপর নদীর ধারে পাথরের একটি খাঁজের কাছে এসে বলল, তুমি একটু আড়ালে গিয়ে পোশাকটা পালটে নাও শবনম। আর সভ্যতার আলোয় নয়, দেবস্থানে ধর্মশালাতেও নয়, চলো আমরা জঙ্গলে যাই। সেখানে কোনও অরণ্যবাসীর গৃহে আশ্রয় নেব, নয়তো গাছের ডালে বসে রাত কাটাব। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে আমার।

বাড়িতে ফোন করার তা হলে কী হবে?

সে ব্যাপারে তোমার কোনও চিন্তা নেই। ওটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। আগে একটা থাকার জায়গা ঠিক করি। তারপর সব কিছুর ব্যবস্থা করব। ওরা ধীরে ধীরে জঙ্গলমুখো হল।

গভীর জঙ্গলে ঢোকার মুখে আবার পড়ল সেই নদীটা। তবে এখানে নদী পারাপারের জন্য একটা শক্ত মোটা গাছের গুঁড়ি রাখা আছে। তার মানে এখান দিয়ে লোকজন যাওয়া আসা করে। ওরা খুব সাবধানে সেই গুঁড়ির ওপর পা রেখে নদী পার হল। ছোট্ট নদী। বড় বড় পাথরের ওপর পা দিয়েও পারাপার হওয়া যায়।

নদী পার হয়ে কিছু দূর যাবার পরই এক জায়গায় পাহাড়ের গায়ে একটি গুহা দেখতে পেল। ওরা আশান্বিত হয়ে সেই গুহার কাছে এসে থমকে দাঁড়াল।

রঞ্জন বলল, এই আমাদের উপযুক্ত জায়গা। এখানে কেউ আমাদের জাত জানতে চাইবে না। কেউ বিরক্ত করবে না, খুব শান্তিতে থাকতে পারব আমরা। শবনম বলল, তা না হয় হল। কিন্তু রাত্তিরে যদি বাঘ-ভালুক এসে ঢোকে?

রঞ্জন বলল, সে ব্যবস্থাও করব বইকী। জঙ্গলে গাছের ডাল ভেঙে এনে পাথর সাজিয়ে মুখটাকে ছোট করে দেব। দিব্যি আরামে থাকব আমরা। দু'-একদিন থাকলেই যথেষ্ট। রাস্তা খুলে যাবে। এখন এখানটা পরিষ্কার করে চলো একটু বেলায় স্নান করে আবার শহরে যাই। সেখানে খেয়েদেয়ে সন্ধের আগেই এখানে ফিরে আসব।

শবনম খুশি মনে রঞ্জনের হাত ধরে গুহায় ঢুকল।

গুহার ভেতরটা খুবই অপরিষ্কার। দু’-একটি শূন্য বোতল বা বিড়ির টুকরোও পাওয়া গেল সেখানে। তার মানে এখানে কেউ আসে। ওরা বেশ ভাল ভাবে গুহার ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। খুব যে একটা বড়সড় গুহা তা নয়। তবে দু'-দশজন লোক অনায়াসে দিনের পর দিন থাকতে পারে এখানে।

দুই

শবনম বলল, চমৎকার জায়গা। এই গভীর জঙ্গলে গুহার আশ্রয়ের কাছে ধর্মশালার ওই ঘর কোথায় লাগে। এখন এসো সর্বাগ্রে দু'জনে মিলে এর ভেতরটা পরিষ্কার করে ফেলি।

রঞ্জন তক্ষুনি গুহার বাইরে গিয়ে কয়েকটি আগাছা উপড়ে এনে ঝাঁট দিতে শুরু করল। সে কাজে শবনমও হাত লাগাল বইকী। তারপরে দু’জনে ঘাসপাতা ইত্যাদি নিয়ে এসে মেঝের পাথরের ওপর বিছাল। কেন না একেবারে কঠিন পাষাণের বুকে তো শোয়া যায় না।

এরপর দু'জনে আশপাশে ঘুরে হঠাৎ এক জায়গায় ছোট্ট একটি ঝরনা আবিষ্কার করল।

রঞ্জন উল্লসিত হয়ে উঠল ঝরনা দেখে। বলল, এখানে স্নান এবং খাবার জলের সমস্যাটা মিটে গেল।

শবনম বলল, তাই তো। দাঁড়াও, কিছুটা জল ওই শূন্য বোতল গুলোয় ভরে রাখি। বলে গুহার ভেতর থেকে দুটি বোতল এনে জল ভরল। তারপর সেগুলো রেখে এসে বলল, একটু স্নান করতে পারলে শরীরটা ঝরঝরে হত। কিন্তু গা মুছব কীসে?

রঞ্জন বলল, একটু পরেই তো আমরা খেতে যাব। অমনি দুটো গামছা কিনে আনব। আর এই ঘাসপাতায় বিছোবার জন্যে একটা শতরঞ্জি।

শবনম বলল, সেই সঙ্গে দেশলাই, মোমবাতি সম্ভব হলে একটা কেরোসিনের কুপি অথবা হ্যারিকেনও নেওয়া যেতে পারে। টর্চ তো আছেই সঙ্গে। আর তার সঙ্গে রাতের খাবার। ঠিক বলেছ।

শুধু তাই নয়, কালকের জন্যেও কিছু দোকান বাজার করে আনব। সম্ভব হলে এই জঙ্গলেই পিকনিকের মতো নিজেরা রেঁধে খাব আমরা। দি আইডিয়া।

তারপর বেলাবেলি ফিরে এসে গুহার মুখটাকে বন্ধ করবার চেষ্টা করব। করতেই হবে। না হলে নির্ঘাত বাঘের পেটে যাব। কাছেই যখন ঝরনা, তখন বুনো জন্তুর দল ওখানে জল খেতে আসবেই। সেই সময় মানুষের গন্ধ পেয়ে যদি কেউ ঢোকে তো ব্যস। কেল্লা ফতে করে ছেড়ে দেবে।

ওরা আবার বনভূমির পথ ধরে নদী পার হয়ে এপারে এল। তারপর প্রথমেই ওরা নিকটবর্তী পোস্ট অফিসে গিয়ে ট্রাঙ্ককল করল শবনমের বাড়িতে।

শবনমের চাচাজি বললেন, এইমাত্র রেডিয়ো সংবাদটা শুনেছেন তিনি। শবনমকে একটু সাবধানে থাকতে বললেন, ডেড বডি আনার ব্যাপারে ঝামেলা অনেক। কেন না এখন তিনি ইচ্ছে করলেও ঘটনাস্থলে যেতে পারবেন না। তবে যদি কোনও উপায়ে কিছু করা সম্ভব হয় তো তিনি তা করবেনই। রিসিভার নামিয়ে রেখে শবনম ছলছল চোখে রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বলল, এখন আমার জীবনে একমাত্র তুমি ছাড়া আর কেউ নেই রঞ্জন।

রঞ্জন ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, সবই ঈশ্বরের ইচ্ছা। আল্লার মরজি। এই পোস্ট অফিস থেকেই রঞ্জন ওর বাড়িতে এবং দিদির বাড়ি সম্বলপুরে দুটো টেলিগ্রাম করে ওর কুশলবার্তা জানিয়ে দিল।

এবার প্রয়োজনীয় জিনিস পত্তর যা যা দরকার সব কিছু একটা ঝোলা ব্যাগ কিনে তাতে রাখল। তারপর দুপুরের খাওয়া সেরে ফেরার সময় একটা বেশ ধারালো কাটারিও কিনল রঞ্জন।

শবনম অবাক হয়ে বলল, এটা দিয়ে তুমি কী করবে?

এটা আমাদের আত্মরক্ষার হাতিয়ার। তা ছাড়া বনের কাঠ কাটতে এরকম একটা কিছুর তো খুবই দরকার। তাই নিলাম।

ওরা যেন একটা নতুন পরিবেশে থাকবার আনন্দে বিভোর হয়ে সেই গুহার দিকে এগিয়ে চলল।

এই অল্প সময়ের মধ্যেই শবনম নিজের মনকে খুব শক্ত করে বেঁধে নিল। আব্বাজানের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ওর সমস্ত স্নেহমমতা এবং মায়াবন্ধনের দরজা রুদ্ধ হয়েছে। এখন ৩.। মনে হচ্ছে আর শহরে নয়, এই ঘন অরণ্যের বুকে গুহাবাসী হয়ে ওর এই কিশোর সঙ্গীটিকে নিয়ে যদি দিনের পর দিন কাটাতে হয়, তাতেও সে রাজি! চাচা-চাচির নিষ্ঠুরতার বলি সে হতে চায় না। অবশ্য আল্লার দোয়ায় এমনিতেই কারও মুখাপেক্ষী তাকে হতে হবে না। আব্বাজান যা রেখে গেছেন ওর জন্যে, তাতে সারা জীবন কোনও কিছু না করলেও খাবার অভাব হবে না ওর। কিন্তু মনে মনে স্বপ্ন দেখলেও বরাবরের জন্য তো এই অরণ্যবাস সম্ভব নয়। শবনম তার সব কিছু হারালেও রঞ্জনের তো সবাই আছে। ঘরের ছেলে ও ঘরে। তো ফিরতেই হবে ওকে।

যাই হোক। কিছু সময়ের মধ্যেই জঙ্গলের গভীরে সেই গুহার কাছে চলে এল ওরা।

গুহার ভেতরটা অন্ধকার। ছোট্ট একটা চিমনি জ্বেলে সেই অন্ধকারে ক্ষীণ আলোর ব্যবস্থা করা হল। শবনম রঞ্জনের কাঁধ থেকে ঝোলা ব্যাগটা নিয়ে একপাশে রেখে, পুরু করে পেতে রাখা সেই ঘাসপাতার ওপর শতরঞ্জিটা বিছিয়ে, টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল একবার।

রঞ্জন বলল, কী ব্যাপার! শরীর খারাপ করছে নাকি?

না। বড় ক্লান্ত। ঘুম পাচ্ছে।

ঠিক আছে। তুমি বিশ্রাম করো। আমি ততক্ষণে একটু চেষ্টা করে দেখি কীভাবে এই গুহার মুখটাকে আটকানো যায়।

শবনম শুয়ে থেকেই বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে লাফিয়ে উঠল, ওঃ হো। এখন তো বিশ্রামের সময় নয়। তুমি একা কেন, এসো আমরা দু'জনে মিলেই হাত লাগাই।

রঞ্জন বলল, এসো তবে।

প্রথমেই ওরা শুকনো কাঠকুটো যা কিছু পারল সব এনে জড়ো করল গুহার ভেতর। তারপর বয়ে আনা যায় এমন বড় বড় পাথর জড়ো করে গুহার মুখটাকে সংকীর্ণ করে ফেলল। এবার জঙ্গলের শক্ত মোটা গাছের ডাল এনে সেগুলো গুহামুখে আটকে এমন একটা ঘর সৃষ্টি করল যে, একমাত্র সাপ আর ইঁদুর ছাড়া কারও সাধ্য নেই এর ভেতরে ঢোকে।

দু’জনের অক্লান্ত পরিশ্রম সন্ধের মধ্যেই হয়ে গেল সব কিছু। এবার গুহার ভেতরে বসে দীর্ঘরাত্রির অবসানের প্রতীক্ষা করা।

চিমনি লণ্ঠনের আলোটা উসকে দিয়ে ওরা নিজের জিনিসগুলো গোছগাছ করতে লাগল।

রাতের খাবারের ব্যবস্থা করেই এনেছে ওরা। পাঁউরুটি, কলা, বিস্কুট, মিষ্টি সব কিছুই আছে। খাবারের জন্য জলও আছে দু'বোতল ভরতি।

গুহার দেওয়ালে ঠেস দিয়ে শবনম পাদুটো লম্বালম্বি ভাবে ছড়িয়ে উদাস হয়ে বসে রইল। রঞ্জনও ঠিক ওই একইভাবে বসে রইল ক্লান্ত দেহ নিয়ে। দুই শহরবাসী কিশোর কিশোরীর দৈব দুর্ঘটনায় এই অরণ্যবাস অভূতপূর্ব। রঞ্জন বলল, তুমি নিয়তি মানো শবনম?

মানি বইকী।

একদিন আগেও আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না।

এখন তো চিনেছি।

তোমার ভয় করছে না তো?

উ হুঁ। ভয় করবে কেন? আসলে আমাদের জীবনে

ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনা নাঘটলে এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা কি হত আমাদের? এই ঘন অরণ্যের গভীরে একটি গুহার ভেতরে পরম নিশ্চিন্তে এইভাবে বসে থাকা কি কখনও সম্ভব হত?

না। তা অবশ্য হত না।

এই উদাহরণ তোমার কাছে কেমন লাগছে রঞ্জন?

অপূর্ব। আমার কী মনে হচ্ছে জানো?

কী মনে হচ্ছে?

মনে হচ্ছে আমার কোনও অতীত বলে কখনও কিছু ছিল না, মনে হচ্ছে আমি যেন প্রকৃতই এই গুহারই বাসিন্দা।

আশ্চর্য! ঠিক ওইকথাই আমারও বার বার মনে হচ্ছে। আরও কী মনে হচ্ছে জানো? কী?

মনে হচ্ছে এই গুহা ছেড়ে কখনও আর শহরের চার দেওয়ালের ঘরে যেন ফিরে না যাই। আমার তো সর্বস্ব গেছে। আর একাও থাকতে পারব না। তুমি যদি আমার সঙ্গে থাকতে রঞ্জন, তা হলে সারা জীবন আমি এই জঙ্গলে গুহার ভেতরে কাটিয়ে দিতে পারতাম। প্রকৃতির বুকে এমন নিবিড় শান্তির স্বর্গ যে রচনা করা যায়, তা এখানে না-এলে অনুভবই করতে পারতাম না।

রঞ্জন কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর বলল, আচ্ছা শবনম, একটা কাজ করলে হয় না? আমরা যদি ইচ্ছে করেই কয়েকটা দিন এখানে থেকে যাই, তা হলে কেমন হয়?

শবনমের চোখদুটো চকচকিয়ে উঠল।

রঞ্জন বলল, নতুন করে আবার কখনও আসা হয়তো হয়ে উঠবে না। কিন্তু এসে যখন পড়েছি, এই গুহার ভেতরে নিজেদের ঘর নিজেরাই যখন তৈরি করে নিয়েছি, তখন থেকেই যাই না কিছুদিন।

শবনম বলল, আমি রাজি। যে বাড়িতে আমার আব্বাজান নেই, সে বাড়িতে ফিরতে আমার মন একটুও চাইছে না রঞ্জন। এখানে তবু তুমি আছ বলে বহু কষ্টে আমার বুকটাকে বেঁধেছি। কিন্তু কলকাতায় ফিরে গেলে আমি পাগল হয়ে যাব।

রঞ্জন বলল, তবু ফিরতে তো হবেই।

জানি। কিন্তু তাড়াতাড়ি নয়। তুমি আমার জীবন রক্ষা করেছ। আমার এত বড় বিপদে আমার পাশে আছ। নিজের স্বার্থত্যাগ করেও আমাকে নিয়ে এই গুহায় এসে কত কষ্ট করছ। এখন তুমিই আমার সব। তাই তুমি থাকলে আমি থাকব। তুমি গেলে আমাকেও যেতে হবে। একা তো এই বনের ভেতরে থাকা যায় না। তাই, যদি পার তো কিছুদিন থেকেই যাও এখানে।

রঞ্জন হেসে বলল, থাকব। তা ছাড়া সত্যি বলতে কী, আমার কোনও বোন বা বান্ধবী নেই। আর তোমার মতন এত ফর্সা, এত স্মার্ট মেয়েও আমি কখনও দেখিনি। এই সারাদিনে তোমার ওপর আমার অনেক মায়া পড়ে গেছে। তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না শবনম, তোমাকে ছেড়ে যেতে আমার মন কেমন করবে।

শবনমের চোখদুটি জলে ভরে এল। বলল, সত্যি বলছ?

রঞ্জন ওর কাঁধের ওপর হাত বলল, তোমার গা ছুঁয়ে বলছি। তারপর বলল, আমি এখনও স্কুলের গণ্ডি অতিক্রম করিনি। সামনের বছর ফাইনাল দেব। আমি যদি বড় হতাম নিজের পায়ে দাঁড়াতাম, তা হলে তোমার সব দায়িত্ব আমি নিয়ে নিতাম। হিন্দু-মুসলমানের কোনও ভেদাভেদ আমার মধ্যে নেই। কিন্তু আমার মা-বাবা আছেন। তাঁরা কীভাবে নেবেন তোমাকে? তুমি যদি মুসলমান না হতে, তা হলে তোমাকে আর পার্ল স্ট্রিটের বাড়িতে তোমার চাচা-চাচির সঙ্গে থাকতে যেতে হত না। আমি ঠিক তোমাকে নিয়ে হাজির হতাম আমাদের বাড়িতে। এখন থেকে তুমি আমার কাছেই থাকতে পারতে। কিন্তু তা যে হবার নয়। আমি সংস্কারমুক্ত হলেও তাঁরা হবেন কেন?

শবনম রঞ্জনের একটি হাত স্নেহভরে ওর বুকে নিয়ে বলল, আচ্ছা রঞ্জন, আমি যদি হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে হিন্দু হয়ে যাই? তা হলে তোমার মা-বাবা পারবেন না আমাকে তোমার কাছে থাকতে দিতে?

রঞ্জন বলল, কিন্তু আমাদের ধর্মের যে গোঁড়ামি অনেক। হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়া যায়, কিন্তু মুসলমান থেকে হিন্দু হওয়া যায় কি না আমি জানি না। কথায় কথায় অনেক রাত হয়ে গেল। দু'জনে রাতের খাওয়া সেরে আলো নিভিয়ে সেই গদির মতো তৃণশয্যায় রেখে শুয়ে পড়ল চুপচাপ।

রাত তখন কত তা কে জানে? শবনমের ঠ্যালা পেয়ে ঘুম ভাঙল রঞ্জনের। আর ঘুম ভাঙতেই শুনতে পেল বাইরে ঘোড়ার খুরের শব্দ। মশালের আলোর আভাও সংকীর্ণ গুহামুখ দিয়ে ফুটে উঠল।

রঞ্জন বলল, নিশ্চয়ই কোনও দুষ্কৃতীর দল এসে জুটেছে এখানে।

আমার ভয় করছে রঞ্জন।

রঞ্জনের মুখও ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বোকার মতো এখানে আশ্রয় নেওয়াটা খুবই কাঁচা কাজ হয়েছে। চোরডাকাত প্রভৃতি দুষ্কৃতকারীদের আড্ডার জায়গাই হল এই সব পরিত্যক্ত গুহা। এখন ওরা যদি ওদের ঘাঁটি দখল করতে আসে? তা হলে সমূহ বিপদ। রঞ্জন নিজের জন্য চিন্তা করছে না। ভয় ওর শবনমকে নিয়ে। ওর সুন্দর মুখশ্রী এবং গায়ের রং সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয়। এখন ওরা এই রাতে যদি গুহা দখল করে, তা হলে শবনমকে রক্ষা করা দুষ্কর হয়ে পড়বে ওর পক্ষে।

শবনম ভয়ে ভয়ে বলল, কী হবে রঞ্জন?

রঞ্জন কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না। বলল, ভেঙে পড়ো না। দেখাই যাক না ওরা কী করে। তুমি এক কাজ করো, গুহামুখের দেওয়ালের কোণে একেবারে লেপটে থাকো। যদি ওরা ঢোকে তা হলে আমি আগে মোকাবিলা করব ওদের। বলেই ঘাসপাতার বিছানা থেকে শতরঞ্জিটা তুলে ওর হাতে দিয়ে বলল, তুমি এটা মুড়ি দিয়ে লুকিয়ে থাকো। যাও।

তুমি?

আমি এখানেই থাকব। এমন ভান দেখাব যেন আমায় জোর করে কেউ এখানে আটকে রেখে গেছে।

রঞ্জনের কথামতো তাই করল শবনম। শতরঞ্জিটা সর্বাঙ্গে মুড়ি দিয়ে গুহামুখের একপাশে অন্ধকার কোণে লুকিয়ে রইল।

একটু পরেই ওরা যা আশঙ্কা করেছিল তাই হল। বাইরে থেকে গম্ভীর গলায় একটা হাঁক শোনা গেল, অন্দরমে কৌন হ্যায় রে। জলদি বাহার নিকালো। রঞ্জন কোনও সাড়া শব্দ না দিয়ে চুপ চাপ বসে রইল।

ওদিক থেকে তখন কাঠের আটকান ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে।

রঞ্জনও এক-পা দু’-পা করে পিছু হটতে লাগল। আর পথ নেই। দেয়ালের শেষপ্রান্তে ঠেস দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। কাটারিটা এই অন্ধকারে কোথায় রয়েছে কে জানে? সঙ্গে থাকলে ভাল হত। কেউ আক্রমণ করলে সমুচিত শিক্ষা দিত তাকে।

কাঠের আগল ভেঙে দু’-এক ধাপ পাথর সরাতেই একজন লোকের গলে ঢোকার মতো পথ হয়ে গেল।

রঞ্জন সবিস্ময়ে দেখল মাথায় পাগড়ি, অর্ধেক মুখ কাপড়ঢাকা বন্দুকধারী একজন ভেতরে ঢোকার জন্য মাথা গলাল। শরীরের অর্ধেক ঢুকেছে কি নাঢুকেছে হঠাৎ দেখা গেল মাথাটি তার খসে পড়ল ধর থেকে। রঞ্জন শিউরে উঠল। এ কী করল শবনম ! এমন কাঁচা কাজ কেউ করে? বাইরে ওরা কতজন আছে-না-আছে তা কে জানে? যদি ওরা টের পায়? রঞ্জন ছুটে এসে লোকটার হাতদুটো ধরে হিড় হিড় করে টানতেই পুরো দেহটা ভেতরে চলে এল। কয়েকটি পাথরও ধসে পড়ল দুড়দাড় করে। তার পর দেহটা এক ধারে সরিয়ে রেখে বন্দুকটা ছিনিয়ে নিল সর্বাগ্রে।

শবনম বলল, তুমি বন্দুক ছুড়তে পার?

না।

তা হলে ওটা নিয়ে কী করবে?

ওদের ভয় দেখাব।

শবনম হেসে বলল, তা হলেই হয়েছে। দাও ওটা আমাকে দাও। আর বন্দুক চালানো কাকে বলে চেয়ে দেখো।

তুমি পার রাইফেল শুটিং করতে?

পারি বলেই তো মুণ্ডুটা ওর নামিয়ে

কিন্তু মৌচাকে ঢিল ছুড়লে তো?

দিলাম।

তা ছুড়লাম। যাক, তুমি কি কাটারিটা নেবে?

নেব! আমি ভেবেই পাচ্ছি না কোন ফাঁকে কাটারিটা তুমি নিলে।

বাইরে থেকে তখন হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে, আরে এ শম্ভু ভেইয়া। কা ভৈল? খানিক বাদেই মস মস জুতোর শব্দ। এ লোকটিও আগের লোকটির মতো মাথা গলাতেই রঞ্জনের কাটারির ঘা পড়ল তার ঘাড়ের ওপর। অনভ্যস্ত হাত। তাই এক কোপে বিচ্ছিন্ন হল না। লোকটি যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল।

রঞ্জন ওই অবস্থাতেই লোকটিকে ঢোকাল ভেতরে। সেই যন্ত্রণার দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। শবনম একটুও দেরি না করে ওর বুকের বাঁদিকে একটা গুলি করল।

বাইরে থেকে একজনকে বলতে শোনা গেল, আরে বাঃ। এ জাদু গুল্ফা হো গিয়া ক্যা। যো অন্দর মে ঘুসতা ও বাহার নেহি নিকাল তা।

আর একজন কে বলল, চোপ রহো বুরবাক কাহাকা। অন্দরমে গোলি কা শব্দ শুনা?

আর একজন বলল, হাঁ হুঁ৷ শুনা। আভি চলো, ভাগো হিয়াসে। জরুর কুছ গড়বড় হো গিয়া হোগা।

কিন্তু ভাগবে কী? গুহার ভেতর থেকে শবনমের বন্দুক তখন গর্জে উঠেছে ‘ডিস্যুম ডিস্যুম’।

দু’-দুটো তাজা প্রাণ লুটিয়ে পড়ল মাটির বুকে। ঘোড়াগুলো চিঁহি-হি-হি শব্দ করে ঊর্ধ্বপদ হয়ে লাফিয়ে উঠল একবার। কয়েকজন অশ্বারোহীর পলায়নের শব্দও শোনা গেল।

শবনমের কীর্তি দেখে রঞ্জন স্তব্ধ হয়ে গেল। এমন সুন্দর কান্তি যার, যার মুখের দিকে তাকালে স্বর্গের সুষমা অনুভব করা যায়, তার হাতে এমন মৃত্যুমাদল কী করে বেজে উঠল? তাই ভয়ে ভয়ে বলল, এবার আমরা কী করব?

শবনমের চেহারাটাই তখন অন্যরকম হয়ে গেছে। কী দারুণ তেজ ওর শরীরে। কে বলবে ও একটি সদ্য পিতৃহারা কিশোরী মেয়ে। ওর দিকে চোখ মেলে তাকাতেও এখন ভয় করল রঞ্জনের।

শবনম একটু স্বাভাবিক হয়ে বলল, এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কিছু নেই যদিও, তবুও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

এই ডেড বডি দুটোর কী হবে?

দুটো তো ভেতরে। বাইরে আরও দুটো আছে। এখন এই রাতে যে যেখানে আছে সে সেখানেই থাকুক।

কিন্তু ওরা যদি একটু পরে দলবল নিয়ে আবার ফিরে আসে?

শবনম একটু চিন্তা করে বলল, তোমার ধারণাটা অবশ্য অমূলক নয়। এবং তা যদি হয় তা হলে সকাল পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। আর সেই যুদ্ধে মরবে ওরাই। আমাদের গায়ে আঁচড়টিও লাগবে না।

কেন?

আমরা গুহার ভেতর থেকে পাথরের খাঁজ দিয়ে ওদের লক্ষ করতে পারব। কিন্তু ওরা বাইরে থেকে তা পারবে না। কোনওরকমে রাত্রিটা কাটাতে পারলে দিনের আলোয় পালাবে ওরা। আমরা তখন বেরোতে পারব।

কিন্তু সারারাত লড়াই করার মতো গুলি কি দুটো বন্দুকে আছে? বন্দুকে না থাকলেও ওদের কাছে আছে। তা ছাড়া বাইরে যে দু’জন ঘুমিয়ে আছে তাদের কাছ থেকেও নিয়ে আসতে হবে বন্দুকদুটো।

রঞ্জন ভয় পেয়ে বলল, না না। বাইরে যাবার দরকার নেই। এই দুটোতেই কাজ চলুক।

শবনম বলল, ও দুটো আনতেই হবে রঞ্জন। লড়াই যখন শুরু করেছি, তখন শেষ না, হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যাব।

তা হলে নিয়েই আসি ও দুটো?

উঁহু। তুমি নয়, আমি।

কেন আমিই যাই না?

তুমি ভয় পেয়েছ রঞ্জন। তা ছাড়া যদি কোনও বিপদ আসে সেটা আমার ওপর দিয়েই আসুক। বিপদ এলে বন্দুক নিয়ে আমি লড়তে পারব। তুমি পারবে না।

শবনম বেরোতে যাচ্ছে, রঞ্জন ওর একটি হাত ধরে টান দিল। বলল, তার চেয়ে বলি কী, এখুনি এই গুহা ছেড়ে আমরা কোথাও পালিয়ে যাই চলো।

কোথায় যাব? এই জঙ্গলে রাতদুপুরে চিতার পেটে যাব যে। এখান থেকে সকালের আগে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। হাত ছাড়ো।

শবনম বন্দুক নিয়ে সেই সংকীর্ণ গুহামুখে পাথরের আটকানের ফাঁক দিয়ে বাইরে গেল।

রঞ্জন ভেতর থেকেই দেখতে পেল, চারপাশ একবার ভালভাবে দেখে নিয়ে ডাকাতদের মশালের আলোয় কী দ্রুত গতিতে কাজ সারল শবনম। চটপট বন্দুকগুলো কেড়ে নিয়েই রঞ্জনের দিকে এগিয়ে দিল। তারপর ওদের পকেট হাতড়ে দোনলা রিভলভার বার করল দুটো। সেই সঙ্গে কয়েকটি কার্তুজ। আর তারপরই যা করল তা একেবারে অভাবনীয়। সেই লোকদুটোর একজনের পোশাকপরে মাথায় ফেত্তি বেঁধে মিলিটারি মেজাজে আবার গুহার ভেতরে এসে ঢুকল। ওদের ফেলে যাওয়া মশালও একটা নিয়ে আসতে ভুলল না।

ওর ওই রণচণ্ডীমূর্তি দেখে রঞ্জন ভয় পেয়ে গেল খুব। বলল, না না। এই পোশাকে তোমাকে মানায় না।

শবনম ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল হো হো করে। বলল, তুমি ভয় পেয়েছ রঞ্জন?

হ্যাঁ হ্যাঁ পেয়েছি। সত্যিই ভয় পেয়েছি আমি। মায়ের মুখে দশমহাবিদ্যার গল্প শুনেছিলাম। সতী পিতৃগৃহে যাবার জন্যে শিবকে যে রূপ দেখিয়েছিলেন তোমার মধ্যেও আমি এই গুহার ভেতর সেই রূপ দেখতে পাচ্ছি। তুমিই সেই ছিন্নমস্তা, বগলা, ধূমাবতী। তুমিই সব। না না শবনম, আবার তুমি আবেগের মতো হয়ে যাও। তোমাকে দেখে আমার বুকের ভেতরে কীরকম যেন হচ্ছে।

আমারও। বলে রঞ্জনের কাঁধে একটা হাত রেখে শবনম বলল, আমারও তাই মনে হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি হঠাৎ কী করে যেন আমি বদলে গেছি। আসলে এই বন্দুকের নলে আমি যেন মহাশক্তির উৎস খুঁজে পেয়েছি। না-হলে এই বন্দুক হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অমন ভয়ংকর দস্যুদের চার-চারজন প্রাণ হারাল কী করে? আসলে কোনও এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে দিয়ে কোনও কাজ করাতে চায়। না হলে এ রকম দুর্ঘটনাই বা ঘটবে কেন, আর আমরাই বা এখানে আসব কেন? আমি আমার পথ খুঁজে পেয়েছি রঞ্জন। এই বন্দুকের নল দিয়েই আমি আমার আব্বাজানের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তাদের মৃত্যুর কোলে শুইয়ে দেব।

রঞ্জন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, তুমি কি ফুলনদেবী হতে চাও?

হতে চাই কেন? হয়েছি। এই পোশাক যখন পরেছি, এই বন্দুক ও রিভলভার যখন হাতে নিয়েছি তখন আর আমি এখান থেকে যাচ্ছি না। আমি খুঁজে বার করব এই দস্যুর দলকে। ওদের সঙ্গে হাত মেলাব। তারপর তাদের অস্ত্রে তাদেরকেই এক এক করে সমুচিত শিক্ষা দেব আমি।

তারপর?

তারপর! জঙ্গলের আরও গভীরে এই রকমই একটি পরিত্যক্ত গুহা বেছে নিয়ে সেখানে একাকী রাজত্ব করব। আমি নিজেও একটা দল গড়ে তুলব এখানে। অত্যাচারীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমার বন্দুকের নল গর্জে উঠবে।

পারবে তুমি নিরন্নের মুখে অন্ন দিতে?

পারব।

এখানকার অনুন্নত সম্প্রদায়কে বহিরাগত, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে?

পারব।

পারবে আরণ্যকদের অরণ্যের অধিকার ফিরিয়ে দিতে? পারব।

যদি না পার?

এই রিভলভারের শেষ গুলিটি খরচা করব আমি আমার নিজের জন্য।

এই তোমার শেষ কথা?

হ্যাঁ। এই আমার শেষ কথা। আমি মরে গেছি। এই বন্দুকের গুলির শব্দ আমার পুনর্জন্ম ঘোষণা করেছে।

তোমাকে ভূতে পেয়েছে। তাই এত আবোল তাবোল বকছ।

আমি আবোল তাবোল বকছি? তা হলে এই যে প্রাণহীন দেহগুলো এখানে পড়ে আছে এগুলোও কি মিথ্যে? আমি ফুলনদেবী নই রঞ্জন। এমনকী শবনমও নই। এখন আর আমার কোনও জাত নেই। আমি নইকো হিন্দু, নই মুসলমান, নইকো বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান।

তা হলে তুমি কী?

গুহামুখের সংকীর্ণ ফাঁকটুকুর ভেতর দিয়ে ‘গুডুম গুড্‌ম' শব্দে দু'বার গুলি করে শবনম বলল, আজ থেকে আমি এই অরণ্যের দেবী। আমাকে অরণ্যদেবী বলতে পারো। লোকে ভয়ে ভক্তি করবে আমাকে। অবশ্যই দুষ্ট লোকে। ভাল লোকেদের সঙ্গে আমার ভাল সম্পর্ক থাকবে। খারাপ লোকেদের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সাপ আর নেউলের। তাদের কাছে আমি হব ভয়ংকরী। দেবী ভয়ংকরী হবে আমার নাম।

শবনমের দুটি চোখের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন ঝিমঝিমিয়ে উঠল রঞ্জনের মাথাটা। তারপর হঠাৎই একসময় জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল সে। অবশ্য মেঝেতে পড়ার আগেই শবনম তাকে ধরে ফেলল। তারপর ওকে শুইয়ে দিল ওদেরই সৃষ্ট সেই তৃণশয্যায়। ওর বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল কান্নার মতো হয়ে। মুখে অস্ফুট উচ্চারণ করল, 'ছেলেমানুষ'।

খুব ভোরে যখন হুঁশ ফিরল বা ঘুম ভাঙল রঞ্জনের, তখন ধীরে ধীরে উঠে বসল সে। দেখল ওর পায়ের কাছে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে শবনম। এই নাকি অরণ্যদেবী! দেবী ভয়ংকরী। পাগলি আর কাকে বলে।

রঞ্জন উঠে দাঁড়িয়ে যেই না গুহার বাইরের অবস্থাটা দেখতে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছে অমনি বাধা পেল। আরে! করছে কী মেয়েটা! ওর পায়ের সঙ্গে একটা দড়ি বেঁধে নিজের পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে। সেই টান পেয়ে শবনমও উঠে বসল। বলল, কী ব্যাপার! একা একা কোথায় যাচ্ছ? আমাকে ফেলে রেখে পালাচ্ছ বুঝি?

না না। তা কেন? আসলে কাল অনেক রাত অব্দি জেগে তুমি ঘুমচ্ছ তাই ডাকিনি।

শবনম হেসে বলল, দেখলে তো কেমন বুদ্ধি? তুমি যে চুপি চুপি পালাবে সে উপায় রাখিনি।

রঞ্জন বলল, হ্যাঁ, বুদ্ধির তোমার প্রশংসা করি। কিন্তু বাইরে দুটো, ভেতরে দুটো ডেড বডি রেখে তুমি যে এমন নিশ্চিন্তে নিদ্রা খাচ্ছিলে তা সেই সুযোগে যদি কোনও বাঘটাঘ এসে ঢুকত?

তা ঢুকতে পারত। তবে সারারাত জেগে ভোরের দিকেই একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি। এখন চলো দেখি ঝরনার জলে গিয়ে মুখহাতগুলো ধুয়ে আসি। সত্যি, যা গেল কাল।

ওরা গুহামুখের পাথর সরিয়ে পথ প্রশস্ত করে বাইরে এল। দুটি ডেড বড়ির একটিও তখন বাইরে নেই। না থাক! ওরা ঘন অরণ্যানির মধ্যে দিয়ে সেই ঝরনাতলায় গিয়ে মুখহাত ধুয়ে পরিষ্কার হল।

শবনম বলল, এই সময় একটু চা-টোস্ট পেলে কেমন হত রঞ্জন?

মন্দ হত না। কিন্তু ওসব যে খেতে যাব সে উপায়ও তো রাখনি তুমি। যে পোশাক চড়িয়েছ অঙ্গে এই পোশাকে কি শহরে যাওয়া যায়? মাথার ভূত যদি ছেড়ে গিয়ে থাকে তা হলে এখুনি পোশাকটা ছেড়ে আগের মতো ভাল হয়ে এসো। না হলে এই পোশাক দেখলে নির্ঘাত পুলিশে ধরবে।

রঞ্জনের কথায় হোঃ হোঃ করে গগনফাটিয়ে হেসে উঠল শবনম। বলল, ওটি হচ্ছে না। আমার আব্বাজান মিলিটারির লোক ছিলেন। ঘোড়ায় চড়া থেকে কার ড্রাইভিং এবং বন্দুক চালানো থেকে পর্বতারোহণ সবই আব্বাজান আমাকে শিখিয়ে গেছেন। এই যন্ত্র হাতে যখন পেয়েছি, তখন লড়ে যাব একবার। যাও, বাকি বন্দুক রিভলভার যা আছে তা গুছিয়ে গাছিয়ে রেখে এসো। প্রয়োজনে পরে এসে নিয়ে যাব।

রঞ্জন ইতস্তত করতে লাগল দেখে শবনম আবার বলল, যাও। চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকো না। ভয় নেই, নিজের স্বার্থের জন্য তোমার জীবন নষ্ট করব না। তোমার দয়ায় এই প্রাণ আমি ফিরে পেয়েছি। আমার উপযুক্ত একটা জায়গা পেয়ে গেলেই আমি তোমাকে ছেড়ে দেব। তুমি তোমার মা-বাবার কাছে ফিরে যাবে।

রঞ্জন একান্ত বাধ্য অনুগতর মতো আবার গুহার ভেতরে ঢুকে সব কিছু চাপা চুপি দিয়ে রেখে এল। তারপর শবনমের নির্দেশ মতো বনপথ ধরে চলতে শুরু করল ওরা।

পাহাড়টা এবার ক্রমশ চালু হয়ে গভীরতর জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে মিশেছে। সেই ঢালু পথে হঠাৎ একটি তেজস্বী ঘোড়াকে ঘাস খেতে দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠল শবনম। বলল, পেয়েছি। পেয়েছি।

কী পেয়েছ?

আমার নতুন বন্ধুকে।

ঘোড়াটা তোমার বন্ধু?

নিশ্চয়ই। কাল যারা ডাকাতি করতে এসেছিল এ তাদেরই ঘোড়া। কী করে বুঝলে?

দেখছ না ঘোড়ার পিঠে বসার জায়গায় জিন লাগানো আছে। বুনো ঘোড়া হলে এসব থাকত না। তা ছাড়া বুনো ঘোড়ার চেহারায় এত চাকচিক্য থাকে না। এ বাইরের দেশের ঘোড়া। হয়তো অস্ট্রেলিয়ার।

রঞ্জন মনে মনে শবনমের বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারল না।

শবনম ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ঘোড়াটার কাছে। তারপর ওর লাগাম ধরে টান দিয়ে ওকে কাছে এনে এমন অদ্ভুত কায়দায় ওর ঘাড়েগলায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল যে ঘোড়াটা একটুও ছটফট করল না, বা বিরক্ত হল না। বরং একদৃষ্টে কিছুক্ষণ শবনমের দিকে চেয়ে থেকে ওর গা শুঁকতে লাগল।

এই সুযোগে শবনম চড়ে বসল ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়াটা বাধা দিল না। বরং টান হয়ে গলা উঁচিয়ে আদেশের প্রতীক্ষা করল।

রঞ্জন অবাকবিস্ময়ে তাকিয়ে রইল শবনমের দিকে। পুরুষের পোশাকপরা, মাথায় ফেত্তি বাঁধা কাঁধে বন্দুক আর এক হাতে রিভলভার ধরা এই মেয়েটি যে এক দস্যুনেত্রী নয়, তা কে বলবে? ওকে দেখে ওর রীতিমতো ভয় করতে লাগল।

শবনম বলল, তুমিও এসে বসো না আমার পিছনে।

আমি উঠতে পারব না। তা ছাড়া সত্যি বলতে কী, আমার খুব ভয় করছে। তাই বলি, তুমি বরং ঘোড়ায় চেপেই চলো। আমি হেঁটে যাই।

শবনম হেসে বলল, আমাকে দেখেও তোমার ভয় কাটছে না রঞ্জন? তুমি না ছেলে? এসো। উঠে এসো। হাত ধরো আমার। বলে, একটা হাত বাড়িয়ে দিল শবনম।

রঞ্জন তবুও উঠল না। ঘোড়ার লাগাম ধরে হেঁটে হেঁটেই পথ চলল। শবনম ধীরে ধীরে অশ্বচালনা করল। পাহাড়ের সেই ঢালু পথবেয়ে ঘোড়াটা ওদের দু'জনকে পিঠে নিয়ে এগিয়ে চলল।

খানিকটা পথ যাবার পর এক জায়গায় ওরা ‘ঠক ঠক' করে একটানা একটা শব্দ শুনতে পেল। শব্দটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ঘোড়ার রাশ টেনে ধরল শবনম। তারপর রঞ্জনকে নিয়ে নেমে পড়ল ঘোড়ার পিঠ থেকে। পাশেরই একটি গাছের শুঁড়ির সঙ্গে ঘোড়াটাকে বেঁধে, ওরা সেই শব্দ শুনে এগিয়ে চলল। কিছু দূর যাবার পরই দেখতে পেল, এক জায়গায় কিছু অনুন্নত শ্রেণীর পাহাড়িয়া লোকজন নির্মম কুঠারের আঘাতে বড় বড় গাছপালার ডাল কেটে ফাঁকা করে দিচ্ছে।

শবনম বাঘিনীর মতো হুংকার দিয়ে উঠল, হুঁশিয়ার।

সবাই চুপ। ঠুক ঠাক শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেল। সকলেরই চোখেমুখে বিস্ময়,

আবার কে রে বাবা!

শবনম বলল, এ তোমরা কী করছ?

আমরা গরিব মানুষ মা। দুটি ভাত-রুটির জন্য গাছ কাটছি।

কার হুকুমে?

আজ্ঞে শেঠ মংঘীরামজির হুকুমে।

কত টাকা পাও তোমরা?

গাছ প্রতি বিশ টাকা।

শবনম গম্ভীর মেজাজে এদিক থেকে সেদিকে পায়চারি করতে করতে বলল, মাত্র বিশ টাকা! তোমরা কী জানো এই পাহাড়ে এমন গাছও আছে যার দাম বিশহাজার টাকা থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত।

না মা।

তোমরা কোথায় থাক?

আজ্ঞে এই পাহাড়েই।

সামান্য ক'টা টাকার লোভে তোমরা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনছ ! জান, এই সবুজ বনবীথির মধ্যেও প্রাণ আছে। প্রতিটি কুঠারাঘাতের সঙ্গে বাতাসের হু হু শব্দে ওদের বুকফাটা কান্না তোমাদের অভিশাপ দেয়। এইভাবে গাছ কাটতে কাটতে এই অরণ্য যেদিন নির্মূল হয়ে যাবে, সেদিন কোনও শেঠজিই আর টাকার থলি নিয়ে এগিয়ে আসবে না তোমাদের কাছে। সেদিন কী হবে একবার ভেবে দেখেছ? সেদিন এই শ্রীহীন প্রান্তরে তোমরা শুকিয়ে মরবে। ঝরনার পানি শুকিয়ে যাবে। শীতে শীত পড়বে না। গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন চারদিক জ্বলেপুড়ে খার হয়ে যাবে, তখন বৃষ্টির পানি দিতে আকাশে ঘন কালো মেঘ আসবে না। চারদিক খরায় জ্বলবে। ফসল ফলবে না।

তা হলে এখন আমরা কী করব?

অরণ্যকে রক্ষা করে অরণ্যের অধিকার নেবে! তোমাদের এই অরণ্যজগতে বাইরের কোনও মানুষকে সহসা ঢুকতে দেবে না। অবশ্য অরণ্যকে ভালবেসে কোনও অরণ্য-প্রেমিক যদি কখনও এখানে এসে উপস্থিত হয়, তা হলে তাকেই শুধু উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে বরণ করে নিয়ো। এই অরণ্যের ফুলফল সব কিছু শুধু তোমরাই ভোগ করবে।

এক বৃদ্ধ পাহাড়ি এগিয়ে এসে বলল, সবই তো বুঝলুম মা। কিন্তু এখন যে আমরা না খেয়ে মরব তা হলে।

সে ব্যবস্থা আমি করে দেব।

কিন্তু মা! তোমার বয়স কম। কে তুমি, কোথা থেকে এলে জানি না তাও। এই অরণ্যে যেমন বাঘ-ভালুক আছে তেমনি আছে চোরডাকাত এবং নানা ধরনের হিংস্র মানুষের দল। তারা যে আমাদের সুস্থভাবে খেয়েপরে বাঁচতে দেবে না।

তাদের শায়েস্তা করার জন্য আমি আছি। তোমাদের প্রধান কে? আমি মা।

নাম কী তোমার?

হিংলাজ পাটসানি। ওড়িশার ঢেনকানালের কাছে দারুথাং-এ আমাদের পূর্বনিবাস। আমরা বুনো। বনে বনেই ঘুরে বেড়াই।

এই বনে তোমরা কত দিন আছ?

তা মা কম করেও বছরবারো তো আছি।

ওই শেঠজির সঙ্গে তোমাদের যোগাযোগ কী ভাবে হল?

হঠাৎই হয়ে গেল। ওই শেঠজিই একদিন সরকারের লোকেদের নজর এড়িয়ে আমাদের কাছে এসে লুকিয়ে কাঠ কাটার মতলব দিলে। আমরা টাকার লোভে, ওর কথা মতো কাজ শুরু করলাম।

ঠিক আছে। যা করেছ করেছ, আর ও কাজ কোরো না।

তা হলে আমরা কী করে বাঁচব মা?

এই কাজ করার আগে যে ভাবে বেঁচেছিলে সেই ভাবে বাঁচবে। এখন তোমরা আমাদের দু'জনকে তোমাদের গ্রামে নিয়ে চলো। তারপর তোমাদের নিয়ে একটু ভাবনাচিন্তা করা যাবে।

বেশ তো চলো।

শবনম ওদের একটু অপেক্ষা করতে বলে, একাই চলে গেল গাছের গুঁড়িতে বেঁধে রাখা ঘোড়াটকে খুলে আনতে। কিন্তু কী আশ্চর্য! কোথায় গেল ঘোড়াটা? ওর অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে কে খুলে নিয়ে গেল ওটাকে?

শবনম ফিরে এসে বলল, আমার ঘোড়াকে একটা গাছের ডালে বেঁধে রেখে এসেছিলাম। এখন দেখছি সে সেখানে বাঁধা নেই। এটা কী করে সম্ভব! কার এত সাহস?

হিংলাজ হাতজোড় বলল, তুমি কে মা তা জানি না। তবে তোমাকে দেখে কোনও দেবী অথবা দস্যুকন্যা বলে মনে হচ্ছে। এই পাহাড়ের পশ্চিম দিকে একটি উচ্চ চূড়ায় মস্ত একটি গুহা আছে, সেই গুহার ভেতরে হিন্দোলসর্দার নামে এক কুখ্যাত ডাকাত বাস করে। আমার মনে হয় এ কাজ তারই। আমি ওই দস্যুসর্দারের সন্ধান চাই।

কিন্তু মা। ও বড় নৃশংস। খুন জখম ডাকাতি রাহাজানি সব কিছুরই নায়ক ও।

ব্যাঙ্ক ডাকাতি, ট্রেনডাকাতি কী না করে ও। আমরা সবাই ওকে যমের মতো ভয় করি। দূর থেকে ওকে দেখতে পেলে লুকিয়ে পড়ি আমরা। তাই নাকি?

হ্যাঁ।

আমি যে ওই লোককেই খুঁজে বেড়াচ্ছি হিংলাজ। আমাকে একবার ওর কাছে নিয়ে যাবে?

বলার সঙ্গে সঙ্গেই পিছন থেকে কে বা কারা যেন বলে উঠল, আমরা তোমাকে আমাদের সর্দারের কাছে নিয়ে যাবার জন্যই এখানে এসেছি দেবী।

যারা এসেছে তাদের দিকে তাকিয়ে ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল রঞ্জনের। কী ভয়ানক চেহারা তাদের। যেন এক একটি জ্যান্ত নরখাদক।

শবনম বলল, তোমরা কারা?

আমরা হিন্দোলসর্দারের লোক।

পাহাড়ি লোকগুলোও ভয় পেয়ে গেল এই লোকগুলোকে দেখে।

শবনম কিন্তু একটুও ভয় পেল না। বলল, ঠিক আছে চলো। দেখি তোমাদের সর্দার কী রকম। যদি বুঝি তো তোমাদের দলেই ভিড়ে যাব আমি। তবে তোমরা খুব ভীতু আর অকর্মণ্য। না হলে কাল রাতে তোমাদের চার-চারজনকে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম, অথচ তোমরা আমাদের কিছুমাত্র করতে পারলে না।

বেশি বাজে কথা না বলে আমাদের সঙ্গে এসো।

আমার ঘোড়া কই?

ও ঘোড়া তোমার কেন হবে? আমাদের ঘোড়া আমরা খুলে নিয়ে গেছি। এখন আমাদের বন্দুকটা ভালয় ভালয় দিয়ে দাও দেখি।

শবনম বলল, বন্দুক নিয়ে কী করবে? কাক মারবে! এ বন্দুক তোমাদের হাতে শোভা পায় না। যারা চার-চারজন সঙ্গীর মরণদশা দেখেও বিনা যুদ্ধে পালিয়ে যায়, তাদের হাতে বন্দুকের বদলে একটা করে ছাতার বাঁট ধরিয়ে দেওয়াই উচিত।

এই কথা শুনে একজন হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল শবনমের ওপর। তারপর গায়ের জ়োরে ওর হাত থেকে কেড়ে নিল বন্দুকটা। বলল, শখ মন্দ নয়। ফুলনদেবী হবে। যা ভাগ।

কিন্তু শবনমের মধ্যে যে প্রেতিনী ভর করেছে, তার ব্যাপারে ওরা সচেতন ছিল না বলেই এই ভুলটা করে বসল। নাই বা থাকল বন্দুক। শবনম রিভলভারটাই কাজে লাগাল এবার। কোমর থেকে সেটা টেনে নিয়েই ছুটিয়ে দিল ‘দড়াদ্দুম’। ঢিপ ঢাপ করে কলাগাছ পড়ার মতন পড়ে গেল দু'-তিনজন। বাকি একজন বন্দুক ওঠাবার চেষ্টা করতেই হঠাৎ একটা পাথর এসে লাগল তার মুখে। লোকটি আর্তনাদ করে পড়ে গেল।

কে ছুড়ল পাথর!

রঞ্জন বলল, আমি।

শবনম ওর পিঠ চাপড়ে বলল, শাবাশ দোস্ত। এই তো হাত খুলে গেছে তোমার। এসো তোমাকেই আমি এই পাহাড় বনের রাজা করে দিই। তারপর দখল করি হিন্দোলসর্দারের কেল্লা। আল্লার দোয়া যদি হয় তো ওকে আমি প্রাণে মারব না রঞ্জন। ওর দুটো হাত কেটে নিয়ে তোমাদের কালীঠাকুরের মতো আমার কোমরে বেঁধে নৃত্য করব।

কিন্তু আমরা দু’জনে কি পারব এ কাজ করতে?

কে বললে আমরা দু'জন? এই তো আমাদের বন্ধুরা সব দলে দলে রয়েছে এখানে। পারবে না তোমরা আমাদের সাহায্য করতে?

হিংলাজসর্দার ছুটে এসে শবনমের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। বলল, পারব মা। নিশ্চয়ই পারব। ওই হিন্দোলসর্দার বড় অত্যাচারী। ও বা ওর দলের লোকেরা মা-বোনেদেরও মর্যাদা দেয় না। ওর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমার একমাত্র মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে।

শবনম চিৎকার করে উঠল, আর তুমি বদলা না-নিয়ে চুপচাপ বসে আছ?

কী করব মাগো, আমরা যে গরিব লোক। মংঘীরামের মতো লোকেরা তাদের সুবিধার জন্য আমাদের ডাকে। কিন্তু আমাদের বিপদে আমাদের ডাকে কেউ এসে পাশে দাঁড়ায় না। তা ছাড়া আমরা দুর্বল। কুণ্ডুল দিয়ে গাছ কাটতে পারি। শুধু হাতে দুশমনের সঙ্গে লড়ে যেতে পারি, কিন্তু বন্দুকের সামনে তো রুখে দাঁড়াতে পারি না।

কেন পার না? মরবার ভয়ে? কই তোমার মেয়েটা তো গলায় ফাঁস দিয়ে লটকাবার সময় মরবার ভয় করল না। তা হলে তুমি কেন মরবার ভয় করছ?

তুমি ঠিক বলেছ তো মা। এই কথাটা তো আমি কখনও ভাবিনি। আজ এই মুহূর্তে আমি আমার মরা মেয়ের নামে শপথ করে বলছি, আমি আমার লোকজন নিয়ে এখন থেকেই তোমার দাস হয়ে গেলাম।

কতজন আছ তোমরা?

আমরা উনিশজন আছি। তা ছাড়া আমাদের বউবাচ্চা সব আছে। তোমাদের বসতি কতদূরে?

কাছেই।

-পা বেঁধে নিয়ে চলো। ওর পেট থেকে কিছু কথা আদায় করতে হবে।

আমাদের নিয়ে চলো সেখানে। আর এই আহত লোকটিকেও হাত হিংলাজ গর্জে উঠল, এই। বাঁধো ইসকো। লে চলো ঝোপড়ি পর।

শবনম বলল, আমাদের খুব খিদে পেয়েছে। তোমরা তোমাদের ডেরায় নিয়ে গিয়ে আগে আমাদের কিছু খাবার ব্যবস্থা করে দাও। তারপর আমরা দলবদ্ধ ভাবে মোকাবিলা করব হিন্দোলসর্দারের।

হিংলাজ বলল, এসো মা। গরিবের কুঁড়েতে পায়ের ধুলো দেবে এসো। ওরা হিংলাজকে অনুসরণ করল।

তিন

পাহাড়িদের সঙ্গে পায়ে পায়ে ওরা যখন একটু নিচুতে এক অপূর্ব পাহাড়িয়া গাঁওতে এসে হাজির হল তখন নয়নমন ভরে গেল। ওরা যাওয়া মাত্রই এখানকার আঞ্চলিক দেশীয় প্রথায় শিঙা আর ডুগডুগি বাজিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হল ওদের।

শবনম বলল, এখন থেকে আমরা দু'জন তোমাদের গ্রামেই থাকব। তোমরা আমাদের জন্য একটা ঘরের ব্যবস্থা করো।

কিছু লোক সঙ্গে সঙ্গে বাঁশ কঞ্চি তালপাতা ইত্যাদি নিয়ে লেগে গেল ঘর তৈরির কাজে। এই অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে পাহাড়ের একটি ঢালের গায়ে ওরাই দেখিয়ে দিল ওদের উপযুক্ত স্থান। এখান থেকে নীচেকার দৃশ্য অতি মনোরম। বহু দূরে আরও উচ্চস্থানে ঘন অরণ্যের মধ্যে একটি মোচাকৃতি পাহাড়ের চূড়ায় একটি গুহা নজরে পড়ল।

হিংলাজ বলল, ওই হল হিন্দোলসর্দারের কেল্লা। ওই অরণ্যদুর্গে এক সময় এক চোখো এক অসুর বাস করত। শোনা যায় সেই অসুর ছিল এই অঞ্চলের রাজা। ওই গুহায় সে অনেক ধনরত্ন সঞ্চিত রেখে একবার এক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়াই করতে যায়। সেই যাওয়াই তার শেষ যাওয়া। আর ফেরে না। ওই গুহার জঠরে কোথায় যে তার ধনসম্পদ সে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে তা কেউ জানে না। এসব হল পুরনো দিনের কথা। কয়েক বছর আগেও এখানে আমরা সুখেশান্তিতে ছিলাম। এখন নিত্যনতুন উপদ্রবে আমরা সদ্য শঙ্কিত থাকি।

এইসব কথা শুনতে শুনতে শবনমের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরোতে লাগল। শুধু বলল, তোমাদের মা কালী আর দেবী দুর্গা যখন অসুরনিধন করেন তখন তাদেরই মধ্যে থেকে কয়েকটা ছিটকে ছাটকে পাতালেটাতালে গিয়ে লুকিয়ে পড়েছিল। এখন তারাই এসে তোমাদের জ্বালিয়ে মারছে। আমি মা কালী আর দেবী দুর্গার কৃপায় নবশক্তিতে নবরূপে ভয়ংকর মূর্তিতে এখানে এসে হাজির হয়েছি। শুধু তোমরা আমার সঙ্গে থেকো। ওই কেল্লা দখল করে আমি থাকব ওখানে। আমি অতন্দ্রপ্রহরীর মতো সদা সতর্ক হয়ে পাহারা দেব তোমাদের। আমি সর্বহারা হয়ে এখানে এসেছি। তোমরা আমাকে দেখো। আমি তোমাদের দেখব।

শবনমের রুদ্রমূর্তি, রক্তচক্ষু এবং ওই ডাকাতরানির মতো পোশাক দেখে ওর কথাটা যে নেহাতই ফাঁকা বুলি তা বলে কেউ মনে করল না। সবাই বিশ্বাস করল, হ্যাঁ এবার সত্যিকারের এমন একজন ওদের মাঝে এসেছে যে কিনা ওদের হয়ে লড়তে পারবে।

শবনম বলল, শোনো, শুধুহাতে ওই দুর্ধর্ষ ডাকাতদের সঙ্গে লড়াই করা যায় না। তাই আমি তোমাদেরকেও বন্দুকবাজি শেখাব। ওরা দলে কত জন আছে জান?

তা পনেরো-কুড়িজন তো বটেই।

তার মধ্যে কয়েকজনকে আমি একাই মায়ের ভোগে পাঠিয়ে দিয়েছি। বাকিগুলোকে আমরা সবাই মিলে বলি দেব। ওদের একটা লোক তো আমাদের হাতে বন্দি হয়েছে।

হ্যাঁ।

লোকটাকে কড়া পাহারায় রাখো। ওকে মোচড় দিয়েই ওদের গুপ্তকথা আমি টেনে বার করব।

একজন বলল, একটা শিরীষ গাছের গুঁড়ির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রেখেছি ওকে।

ঠিক আছে। তোমাদের কিছু লোক এই এলাকাটা পাহারা দাও এবার। যাতে ওরা আচমকা এখানে এসে উপদ্রব করতে বা ওই লোকটাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে না পারে। আর ওদের বন্দুকগুলো আমার জিম্মায় রেখে লাশগুলো ফেলে দাও পাহাড়ের খাদে।

সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শবনমের কথা শুনে গেল। রঞ্জন ওর মায়ের মুখে শুনেছে ঠাকুর দেবতার ‘ভড়’ হওয়ার কথা। ‘ভড়’ যদি ভণ্ডামি বা ভড়ং না হয় তা হলে নাকি ওই অবস্থায় সে যাকে যা বলে তাই ফলে, শবনমের মধ্যেও কি ওই রকম কোনও শক্তি ‘ভড়’ করল? না হলে চোদ্দো-পনেরো বছরের একটি মেয়ের মধ্যে এত বিক্রম এল কী করে? এই সামান্য সময়ের মধ্যে এতগুলো দুর্ধর্ষ মানুষের জীবনান্ত যেন রূপকথার গল্পের মতো ঘটে গেল। এই কিশোরীর ব্যক্তিত্বর কাছে এই পাহাড়ি মানুষগুলো যেন হুকুমের চাকর হয়ে উঠল। এর রহস্য কী? কোন শক্তির প্রভাবে এই অসম্ভব সম্ভব হল!

হিংলাজসর্দারের মাটির দাওয়ায় ওদের জলখাবারের ব্যবস্থা হল! আলু ভাজা, মুড়ি আর ভেলিগুড়ের হালুয়া।

একটি সাত-আট বছরের বালিকা এসে ডেকে নিয়ে গেল ওদের। কালো কষ্টিপাথরের মতো ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটি।

ওরা মুখ, হাত-পা ধুয়ে দাওয়ায় পাতা চাটাইতে বসে জলযোগ করতে লাগল। এর সঙ্গে এল মশলা দেওয়া চা। ভারী চমৎকার। খেয়ে মুখ ছেড়ে গেল যেন।

একটা কুকুর অনেকক্ষণ থেকে ছোঁক ছোঁক করছিল।

শবনম সামান্য দুটি মুড়ি ছড়িয়ে একটু হালুয়া দিতেই কুকুরটার আনন্দের আর অবধি রইল না। সে ঘন ঘন লেজ নেড়ে তার আনুগত্য প্রকাশ করতে লাগল।

রঞ্জনের খুব ভাল লেগে গেল এখানকার আরণ্যক পরিবেশ। হিংলাজ পাটসানির দাওয়ায় বসেই অরণ্যের গভীরতা উপলব্ধি করা যায়। এ বাড়ির চৌহদ্দির বাইরেই ধানের গোছার মতো বড় বড় সাবাই ঘাসের সবুজ শোভা মনকে মোহিত করে দেয়।

ওরা পেট ভরে জলখাবার খেয়ে দাওয়ায় নেমে পায়চারি করতে লাগল। আর কুকুরটা ঘুরতে লাগল ওদের পায়ে পায়ে। শবনম ওর মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে ওকে আরও আপন করে নিল।

রঞ্জন বলল, একবার ওই লোকটার কাছে আমাদের গেলে হত না? কোন লোকটার কাছে?

যাকে শিরীষ গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে।

শবনম হাসল। হেসে বলল, হ্যাঁ, যেতে তো হবেই। কিছু কথা ওর পেট থেকে বার করতে না-পারলে হিন্দোল সর্দারের কেল্লায় ঢোকা যাবে না।

ওরা হিংলাজকে সঙ্গে নিয়ে সেই লোকটির কাছে গিয়ে হাজির হল। রঞ্জনের পাথরের আঘাতে লোকটির নাককেটে রক্ত ঝরছে। সেই অবস্থাতেই একটি বড় গাছের সঙ্গে পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। দু'জন লোক সমানে পাহারা দিচ্ছে লোকটাকে।

শবনম ভয়ংকরী মূর্তিতে লোকটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রঞ্জন রইল একপাশে।

শবনম লোকটিকে বলল, কী নাম তোর? বলব না।

হিন্দোলসর্দারের দলে কতদিন আছিস?

বলব না।

দলে তোরা কতজন?

বলব না।

লোকটির জেদ দেখে রঞ্জনের মাথায় যেন খুন চেপে গেল। আসলে রক্ত ঝরানোর নেশাটাই একটা উন্মাদনা এনে দেয়। বিশেষ করে এ সব ক্ষেত্রে প্রতিহিংসা প্রবল হয় অতি। কেন না ওদের এই কষ্টের, আজকের এই বনবাসের মূলেই তো এরা। রঞ্জন বলল, এখনও বলছি যা জিজ্ঞেস করব ভালভাবে তার উত্তর দিবি। না হলে কিন্তু জীবন সংশয় হবে তোর।

লোকটি রক্তচক্ষুতে রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে থুঃ করে একটু থুতু ছেটাল।

অমনি রঞ্জন একটা শক্ত মোটা গাছের ডাল ভেঙে বেধড়ক পেটাতে লাগল লোকটাকে। সে কী প্রচণ্ড মার। সারা গায়ে কালশিটে পড়ে গেল। লোকটি তবুও জেদের সঙ্গে বলল, বলব না।

এমন সময় রঙ্গমঞ্চে একজনের আবির্ভাব হল।

এক বিশাল শরীর ঘোড়া থেকে নেমে ঘোড়াটিকে একটি গাছের ডালে বেঁধে সদর্পে এগিয়ে এসে বলল, এ এ ক্যা তামাশা হো রহা হ্যয়া? তুম সব কাম পর নেহি গিয়া কিউ?

পাহাড়িরা নীরব। সবাই শবনমের দিকে তাকাল।

শবনম বন্দির দিক থেকে নজর সরিয়ে আগন্তুকের দিকে তাকাল। তারপর বলল, কৌন হো তুম?

আগন্তুক বলল, তুম কৌন হো?

আমি এই অরণ্যের দেবী।

দেবী? হিয়া দেবীটেবী কুছ হ্যায়ই নেহি। বলে পাহাড়িদের বলল, চলো, তুম সব কাম পর চলো। তারপর বেঁধে রাখ৷ লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, এ আদমি কৌন?

শবনম বলল, আমার শিকার।

শিকার? মেরা সমঝমে তো কুছ নেহি আতা।

শবনম এবার পরিষ্কার করে বলল, তুমিই বুঝিঝ শেঠ মংঘীরামজি ?

এ মাত পুছো। বলে পাহাড়িদের বলল, চলো চলো, কাম পর চলো।

শবনম বলল, না। আজ থেকে ওরা আর কেউ তোমার কাজে যাবে না। তোমার বাত ভি শুনবে না। আমি এই পাহাড় বনের রানি। এখানকার দেবী। আমি যা বলব, তাই শুনবে ওরা।

মংঘীরাম চিৎকার করে উঠল, নেহি। ও লোগ হামারা বাত শুনেগা। কাম করনেহি পড়েগা সবকো।

না করলে?

জিন্দা মার ডালুঙ্গা।

শবনম বলল, মংঘীরামজি, এতদিনে তোমার পালা শেষ। গাছ প্রতি বিশ রুপিয়া হাতে গুঁজে দিয়ে অনেক ফায়দা লুটেছ তুমি। এখন তার খেসারত দাও।

কুড়ি টাকার গাছ লক্ষ টাকায় বেচেছ। অসহায় মানুষগুলোর রক্তচুষে তুমি হয়েছ শেঠ। কিন্তু আর তো তা হচ্ছে না।

মংঘীরাম চেঁচিয়ে উঠল, তুম সব খাড়ে হোকর ক্যা দেখতে হো? এ লেড়কি তুমহারা রোটি মারনে মাংতা। পাকড়ো ইসকো। বলেই ডাকল, আগারাম, বাগারাম ইধার আ যাও তো।

বলার সঙ্গে সঙ্গে দু’জন তাগড়াই চেহারার ভোজপুরী এসে দাঁড়াল সেখানে। শবনম বলল, খবরদার! আগে মাত বাড়ো। বলেই পাহাড়িদের বলল, তোমরা মংঘীরামকে ধরে রাখো। ওর সঙ্গে একটু বেশি রকম বোঝাপড়া করতে হবে আমাকে।

পাহাড়ি লোকগুলো তখন ঝাঁপিয়ে পড়ল মংঘীরামের ওপর। তারপর ওকেও বেশ শক্ত করে বেঁধে ফেলল একটা গাছের সঙ্গে।

ভোজপুরী দুটো মংঘীরামকে উদ্ধার করবার জন্য আসছিল। কিন্তু শবনমের বন্দুক ও পাহাড়িদের বিরুদ্ধ আচরণ দেখে ভয় পেয়ে গেল ওরা। তা ছাড়াও শবনমের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কুকুরটার মতিগতি ওদের সুবিধের মনে হল না। কুকুরটা কেমন যেন ক্রুদ্ধ চোখে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ওদের দিকে তাকাচ্ছে।

মংঘীরাম বাঁধা পড়ে ছটফট করতে লাগল।

শবনম ওর বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে বলল, শোনো মংঘীরামজি এখন থেকে আমি এই জঙ্গলের দেখাশোনা করব। এখানকার মানুষজন আমার প্রজা। তাই এদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আমার কিছু টাকার প্রয়োজন। তুমি এদের ঠকিয়ে আসল প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে অনেক অর্থ রোজকার করেছ। তার এক মুঠো আমার এক্ষুনি প্রয়োজন। আশা করি আমার ক্ষমতা সম্বন্ধে এতক্ষণে তোমার একটা ধারণা জন্মে গেছে। তুমি অবিলম্বে লাখ খানেক টাকা আমাকে পাঠিয়ে দেবে।

মংঘীরাম চেঁচিয়ে বলল, নেহি, হাম পুলিশকো বুলায়গা।

মংঘীরামের কথা শুনে আকাশ কাঁপিয়ে হেসে উঠল শবনম। বলল, যাও। আভি যাকে বোলাও। বলে বলল, তুমি জঙ্গলের কাঠ চোরাইপথে চালান দাও। তুমি যাবে পুলিশের কাছে? ওসব ভয় অন্য লোককে দেখাবে। খুব শিগগির আমি হিন্দোলসর্দারের কেল্লা দখল করব। তখন আর আমার কোনও অভাব থাকবে না। কিন্তু যতক্ষণ না তা করি ততক্ষণ তুমি আমাকে টাকার জোগান দেবে।

ঠিক হ্যায়। রুপিয়া মিল যায়ে গা, লেকিন—

লেকিনটেক্নি কিছু নেই। আমার টাকার দরকার। টাকা চাই। তোমার সঙ্গে আমার শত্রুতার নয়, বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠুক এই আমি চাই।

মংঘীরাম এবার যেন বুকে বল ফিরে পেল। বলল, তব তো রুপিয়া জরুর মিলেগা। তো তুম এক কাম করো। হামারা সাথি হো যাও। দোস্তি করো। আউর তুমহারা আদমি কো বোলো জঙ্গল কাটনে কে লিয়ে।

না। জঙ্গল কাটা চলবে না। তুমি অন্য কোনও বিজনেসের ধান্দা করো মংঘীরামজি। এখন এদের ঠকিয়ে যে পয়সা কামিয়েছ, তা একটু একটু করে ফেরত দাও। আমি জানি তুমি পুলিশের কাছে যাবে না। গেলে বিপদে পড়বে। তাই বলি ভালয় ভালয় নোট ছাড়ো। না হলে কিন্তু তোমার বাড়িতে গিয়েও চড়াও হব আমরা। হিন্দোলসর্দারকে তুমি কত করে টাকা দাও?

আমি কাউকে কিছু দিই না।

মিথ্যে কথা। হিন্দোলসর্দার এই পাহাড় বনের সন্ত্রাস। সে এক কুখ্যাত দস্যু। তার এলাকায় এসে তুমি লাখ লাখ টাকার সম্পদ কেটে নিয়ে যাবে, আর সে দিনের পর দিন মুখ বুজে তাই দেখবে, এ কথা আমাকে বিশ্বাস করতে বলো? বলো কত করে দাও তাকে?

মংঘীরামজি মাথা হেঁট করে বলল, তাকে যা দিই তোমাকেও যে তাই দেব, সে আশা তুমি কোরো না খুকি।

শবনম চমকে উঠল, খুকি কী? দেবী বলো।

হাঁ হাঁ দেবীজি। তবে একটা বাত আমার বলবার আছে। হিন্দোলসর্দারের সঙ্গে লড়বার আগে নিজের ক্ষমতাটা একটু বাজিয়ে দেখো। আমাদের বিমে তুমি খাড়া হলে তুমি আর জিন্দা থাকবে না। তোমার লোক ভি মরবে। তুমি ভি মরবে।

শবনম বলল, শোনো। তোমার সামনে ওই যে লোকটা বাঁধা রয়েছে দেখছ ও হিন্দোলসর্দারের লোক। ওদের দলের বেশ কয়েকজনকে আমি শেষ করেছি। এবার ওকেও করব। আমি তোমাকে মারব না। কেন না আমার অর্থের এবং অন্যান্য প্রয়োজনে কই মাছের মতো জিইয়ে রাখব তোমাকে। যতক্ষণ কথা শুনবে ততক্ষণ ঠিক থাকবে। অন্যমতি হলেই ‘ডিস্যুম'। কী বুঝলে? আর হ্যাঁ, এখন থেকে হিন্দোলসর্দারের পাওনাটা আমিই নেব। আজ থেকেই ওর টাকা বন্ধ করে দাও তুমি।

হিন্দোলসর্দারের সঙ্গে দুশমনি করলে ও আমাকে প্রাণে মারবে।

আমার কথা না-শুনলে আমিও তোমাকে প্রাণে মারব। এখন তোমাকে আমি মুক্তি দেব। আজ সন্ধ্যার মধ্যে তুমি আমাকে এক লাখ টাকা পৌঁছে দেবে। আর কিছু বন্দুক ও কার্তুজ কয়েক দিনের মধ্যে পাঠিয়ে দেবে এখানে। এই পাহাড়িদের আমি যুদ্ধ করা শেখাব। না হলে এরা চিরকাল পড়ে পড়ে মার খাবে।

কিন্তু জঙ্গল কা লকড়ি নেহি মিলনে সে হাম তো মর যাউঙ্গা দেবীজি। শবনম বলল, তোমার মতন লোকের কখনও শুধু একটা লকড়ির ব্যবসা থাকতে পারে না। তোমার আরও অনেক ব্যবসা নিশ্চয়ই আছে। তুমি সেই দিকে নজর দাও। যাও! এখুনি গিয়ে টাকার ব্যবস্থা করো।

মংঘারামজি একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ঠিক হ্যায়। ছোড় দিজিয়ে।

শবনম পাহাড়িদের বলল, মংঘীরামকে ছেড়ে দিতে।

মংঘীরামজি ছাড়া পেল। ছাড়া পেয়ে চলেও গেল।

শবনম আবার তাকাল বন্দির দিকে। বলল, এই তোমাকে শেষ সুযোগ দিলাম বলবার। কিছু বলবে?

না।

শবনম বলল, এই লোকটাকে তোমরা পিছমোড়া করে বেঁধে গলা পর্যন্ত পুঁতে রাখো। আর ওর মুখের কাছে রেখে দাও কয়েকটা শুকনো রুটি এবং এক গেলাস জল।

পাহাড়িরা এখন রীতিমতো খেপে উঠেছে। যে মংঘীরামকে ওরা বাঘের মতো ভয় করত, সেই মংঘীরামকে এই এক রত্তি মেয়েটা কী ভয়ংকর ভাবেই না শাসিয়েছে। আর ওই হিন্দোলসর্দার! ফণাওয়ালা গোখরো সাপ একটা। তারও বিরুদ্ধে যে কঠিন সংগ্রাম করেছে মেয়েটি, তা রীতিমতো দুঃসাহসিক। এ মেয়ে তো মেয়ে নয়, যেন এক দেবকন্যা। দৈবশক্তি না থাকলে এই অসম্ভব কী করে সম্ভব হয়?

শবনমের কথায় ওরা ধৃত লোকটাকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল। তারপর সত্যি সত্যিই কোদাল গাঁইতি নিয়ে এই কঠিন শিলাস্তরের বুকে যেখানে একটু মাটি আছে সেখানে গর্ত খুঁড়তে লাগল।

এতক্ষণে ভয় পেল লোকটি। বলল, ম্যায় সব কুছ বতাতা হুঁ। লেকিন। লেকিন? লেকিন কী?

লেকিন। আমার কথা শেষ হলেই তোমরা আমাকে গুলি করে মারবে।

রঞ্জন বলল, শুধু শুধু মারব কেন?

লোকটি বলল, তোমরা যদি না মারো হিন্দোলসর্দার মারবে। তবে সে মৃত্যু হবে অতি নৃশংস। হাত-পা কেটে, চোখ উপড়ে, জিভ টেনে বার করে মারবে। বেশ। তাই করব। এখন বলো ওই গুহা দুর্গে যাবার উপায় কী? শুনেছি ওর ধারেকাছে নাকি যাওয়া যায় না।

না। ওই দুর্গের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুপ্তকক্ষ আছে। কেউ ভুল করেও তার পাঁচশো গজের মধ্যে গিয়ে পড়লে সেই গুপ্তকক্ষের ভেতর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে আসে। যদি কোনওরকমে সেই আসন্ন মৃত্যুকে আড়াল করে গুহাতে পৌঁছানো যায়। তা হলেও কিন্তু রহস্য ভেদ হবে না। তার কারণ ওই গুহার গোলকধাঁধায় অনেক সময় আমরাও ধাঁধিয়ে যাই।

বেশ, এখন প্রশ্ন, ওই গুহার পিছন দিকে আর কোনও গুপ্তপথ আছে কি না? বলতে পারব না। তবে মনে হয় নেই। কেন না গুহাটি প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে এমনভাবে সৃষ্ট হয়েছে যে, এই গুহায় প্রবেশ করে পাতালপুরীর মতো ক্রমশ অনেকটা পথ নামবার পর দেখা যাবে গুহাটা প্রশস্ত হয়েছে। আসলে ওইটি একটি ফাঁপা পর্বত বলা যেতে পারে।

হুঁ। দলে তোমরা কতজন আছ?

এখনও পর্যন্ত জীবিত আছি এগারোজন।

পরশু মধ্যরাতে যে ভয়ংকর ট্রেন দুর্ঘটনাটি ঘটে ওটিতে তোমরা কারা অংশ নিয়েছিলে?

ওটি নেহাতই দুর্ঘটনা। ওতে আমাদের কোনও হাত ছিল না।

রঞ্জন তখন সজোরে একটা ঘুসি মেরে দিয়েছে লোকটির মুখে! সেই ঘুসির আঘাতে ঠোঁটের কষ বেয়ে রক্ত নেমে এল। রঞ্জন বলল, আমরা স্বচক্ষে দেখেছি কিছু লোক যাত্রীদের জিনিসপত্তর লুণ্ঠন করছিল। এই অঞ্চলে তোমরা ছাড়া কারা করবে ওই সব কাজ?

মংঘীরামজিও সাধুপুরুষ নন। তাঁর লোকজন অথবা অন্য দলও এ কাজ করতে পারে।

মংঘীরামের দলের লোক কত?

তা বিশ-পঁচিশজন হবে।

লুঠের মালপত্তর ওরা রাখে কোথায় ?

মংখীরামজির গোডাউনে।

ঠিক বলছ?

মিথ্যে বলে লাভ?

মংঘীরামজির গোডাউন কোথায়?

এই পাহাড়ের নীচে যে নদীটা আছে, সেই নদীর ওপারে হনুমান মন্দিরের পিছনে।

দুর্ঘটনাস্থল থেকে জায়গাটা কত দূর?

তা এক কিলোমাটির তো হবে।

শবনম বলল, দুর্ঘটনা যখন ঘটে তখন কি তুমি সেখানে ছিলে? লোকটি নীরব।

বলো ছিলে কি না?

ছিলাম।

এই কাজ করার আগে বিবেকে একবার বাধল না? লুঠের মাল তো মংঘীরাম আর হিন্দোলসর্দার ভাগাভাগি করে নেবে। কিন্তু তোমরা কোন স্বার্থে এই কাজ করতে গেলে? তুমি কি জান, এই দুর্ঘটনায় আমি আমার আব্বাজানকে হারিয়েছি! অনেক বাবা-মা তাদের একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছে। কত নিরীহ মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে। সে খবর রাখ?

লোকটির চোখদুটি এবার জলে ভরে এল।

রঞ্জন বলল, এ জল তোমার চোখে মানায় না ভাই।

লোকটি বলল, তা হলে শোনো, তোমাদের বন্দুক থেকে মাত্র একটা গুলি তোমরা আমার জন্যে খরচ করো। না হলে যতদিন বাঁচব ততদিন এই দুর্ঘটনার কথাটা আমি ভুলতে পারব না। আসলে এই দুর্ঘটনার মূলে ওই মংঘীরামজি। কী রকম!

সর্দার আমাদের বলেছিলেন ডাউন লাইনের ফিসপ্লেট সরিয়ে দিতে। কারণ একটি মালগাড়িকে ফেলে দিয়ে লুঠপাট করবার মতলব ছিল আমাদের। ঘটনাস্থলে হঠাৎ ওই মংঘীরাম গিয়ে সব গোলমাল করে দেয়। সে বার বার বলতে থাকে, সর্দার নাকি বলেছেন ডাউন নয় আপ লাইনেই খুলতে হবে ফিস প্লেট। আমরা ওর কথামতো কাজ করতে গিয়েই এই অবস্থা হয়। আসলে যাত্রীবাহী ট্রেন ওলটানোর কোনও পরিকল্পনাই ছিল না আমাদের। পরে দুর্ঘটনার পর যখন সর্দারকে গিয়ে খবর দিই সর্দার তখন একটা মোটা দাঁও হাতছাড়া হওয়ার ক্ষোভে বোমার মতো ফেটে পড়েন। এতে আমাদের লাভ কিছুই হয় না। মাঝখান থেকে ছিঁচকে চোরের দল সব কিছু লুটেপুটে খায়।

শবনম কিছুক্ষণ লোকটির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি কাঁদছ কেন? তোমার তো অনুশোচনা করবার কিছু নেই। কুখ্যাত দস্যুর দলে রয়েছ তুমি। খুন-জখম-লুণ্ঠন এ সব তো তোমাদের পেশা। তা হলে?

লোকটি বলল, হ্যা ঠিকই। তবে তোমার মতন মেয়ে আমি কখনও দেখিনি। তোমাকে দেখেই মনে হচ্ছে তুমি কোনও ভদ্র ঘরের মেয়ে। কত কম বয়স তোমার। অথচ এই বয়সে যেন ভোজবাজির মতো হঠাৎ একটা ভেলকি লাগিয়ে দিলে। আমি বুঝতে পারছি তোমার হাতেই আমাদের নিয়তি। নারীশক্তির কাছে অসুরকেও হার মানতে হয়। তাই তোমার কাছেও আমাদের হার মানতে হবে। অত্যাচারী হিন্দোলসর্দার তোমার শক্তিতেই বধ হবেন।

শবনম বলল, তোমার নাম?

আমার নাম বিক্রমজিৎ।

তুমি কতদিন এই দলে আছ?

তা কম করেও দশ বছর।

তুমি পারবে ওই দল ছেড়ে আমার দলে চলে আসতে?

পারব। না পারা ছাড়া উপায় নেই। না হলে এখান থেকে শুধু হাতে ফিরে গেলে সর্দার আমাকে ছিঁড়ে খাবে। আমি তোমার দলেই থাকব।

তা হলে অবশ্য আমার সুবিধে হয়। তবে হ্যাঁ, আমি নিরীহ মানুষদের ওপর কোনও অত্যাচার করব না। কিন্তু মংঘীরাম ও হিন্দোলসর্দারকে আমি কাঁচা খাব। ওদের দু'জনকে শেষ করেই সাঙ্গ করব আমার হত্যালীলা। তারপর ওই অরণ্যদুর্গে হিন্দোলকেল্লা লুণ্ঠন করে ওই গুম্ফার কাছে আমি মন্দির-মসজিদ বানিয়ে আমার জীবন উৎসর্গ করব। একদিকে আমার এই তরুণ বন্ধুটি দেবী দুর্গার স্তোত্র পড়বে। অপর দিকে আমি পাঠ করব পবিত্র কোরান শরিফ। আর ও যদি থাকতে না চায়, তা হলে কোনও সাধুসন্ন্যাসীকে এনে আশ্রম করতে বলব এখানে। ব্যস। আমার কাজ শেষ। তোমরা যারা আমার কাছে থাকবে তাদের সঙ্গেই আমি হাতে হাত মিলিয়ে রক্ষা করব এই বনভূমিকে। আমরা কেউ না থাকলে এই অরণ্য আবার সমাজবিরোধীদের ঘাঁটি হয়ে উঠবে।

শবনমের নির্দেশে বিক্রমজিৎকে ছেড়ে দেওয়া হল।

পাহাড়িরা বিক্রমজিৎকে ওদের ঘরে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিকভাবে একটু শুশ্রূষা করল। তারপর ক্ষতস্থানগুলোতে দেশীয় প্রথায় কিছু গাছগাছড়ার রস লাগিয়ে ছেঁড়া কাপড় দিয়ে একটু বেঁধেছেদে দিল। এরপর হিংলাজসর্দারের দাওয়ায় বসিয়ে পেট ভরে গুড় মুড়ি খাওয়ানো হল ওকে।

বিক্রমজিৎ এখানকার সকলেরই অত্যন্ত পরিচিত। কেন না এই পাহাড়জঙ্গলে হিন্দোলসর্দারের লোক হিসাবে অবাধ গতিবিধি ছিল ওদের। ওকদিন এই লোকের চেহারা দেখলেই গ্রামবাসীরা ভয়ে পালাত। আর আজ এমন ভাবে কালের চাকা ঘুরে গেল যে, সেই লোকই দাওয়ায় বসে অতিথি হয়ে ক্ষুধার খাদ্য গ্রহণ করছে।

খেয়েদেয়ে বিক্রমজিৎ আবার শবনমের কাছে এল। শবনম তখন ওর ঘর তৈরি দেখছে।

রঞ্জন তদারক করছে।

অন্যান্য পাহাড়িরা দলবদ্ধ হয়ে কেউ কাজ করছে, কেউ বা নজর রাখছে দুর্গের দিকে। হঠাৎ যদি সেদিক থেকে কোনও আক্রমণ আসে তাই।

বিক্রমজিৎ শবনমকে বলল, দেবী!

শবনম বলল, কিছু বলবে?

তোমার ঘোড়াকে আমিই খুলে নিয়ে গিয়েছিলাম। বাইরে একটু দূরে একট বড় গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে এসেছি। নিয়ে আসব সেটাকে?

নিশ্চয়ই। ঘোড়ায় না চেপে আমার পক্ষে শুধু পায়ে হেঁটে দূর দূরান্তরে যাওয়া অসম্ভব। তুমি নিশ্চয়ই যাবে। শুধু ওই ঘোড়াটা নয় অন্যগুলোকেও যদি দেখতে পাও ধরে নিয়ে এসো।

অন্যগুলো ছাড়া পেয়ে ওদের ডেরাতেই ফিরে গেছে। ওই ঘোড়াটা বাঁধা ছিল। তাই ওটাকেই আমরা ফিরে পাব।

রঞ্জন বলল, ইতিমধ্যে ওই ঘোড়াটাকে কেউ খুলে নিয়ে যায়নি তো?

কে নিয়ে যাবে? আমরা যারা এখানে এসেছিলাম তাদের মধ্যে একমাত্র আমিই তো জীবিত আছি।

শবনম বলল, ঠিক আছে দাও।

বিক্রমজিৎ ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলল। তারপর আঁকাবাঁকা পার্বত্যপথে কিছুদূর গিয়ে একটি বড় পাথরের আড়ালে সেগুন গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে রাখা সেই সাদা ঘোড়াটাকে বাঁধন মুক্ত করেই লাফিয়ে তার পিঠে চড়ল। ঘোড়াও আর বিলম্ব করল না। বিক্রমকে পিঠে নিয়ে খটাখট শব্দ তুলে এগিয়ে চলল হিন্দোলকেল্লার দিকে।

পাহাড়িদের এই ছোট্ট বস্তিতে মুরগির অভাব ছিল না। কাজেই গরম ভাত আর মুরগির মাংস দিয়ে দুপুরের খাওয়াটা দমভোর খেয়ে নিল ওরা। খাওয়া-দাওয়ার পর একটু বিশ্রামের জন্য ওদের নতুন পর্ণকুটিরে এল ওরা। খড় বিছিয়ে চাটাই পেতে সুন্দর বিছানা হয়েছে দুটো।

শবনম ও রঞ্জন দু'জনেই দু'পাশে শুয়ে পড়ল।

রঞ্জন বলল, মানুষকে বিশ্বাস করার ফল দেখলে তো? কেমন চমৎকারভাবে নিজেকে স্যারেন্ডার করিয়ে আবার ব্লাফ মেরে পালাল লোকটা।

শবনম বলল, ও যে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করবে তা কিন্তু ভাবতেই পারিনি। ওই জন্যেই এই ধরনের ক্রিমিন্যালদের বাঁচিয়ে রাখতে নেই। শত্রুকে হাতে পেয়েও ছেড়ে দেবার ফল কী ভয়ংকর।

তবে আমার মনে হয় আমাদের শত্রুপক্ষ যে কোনও কারণেই হোক খুব ভয় পেয়ে গেছে।

কী করে বুঝলে?

প্রথমত, কাল রাতের ওই আঘাত ওদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আজ সকালে সশস্ত্র কিছু লোককে আমাদের সন্ধানে পাঠিয়েও ওরা পরাস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছে এলাকার পাহাড়িরা ওদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে বলে। যে মানুষগুলো একদিন ওদের দেখলে বাঘের মতো ভয় পেত, সেই মানুষগুলিই আজ সব ভয়ভীতি ভুলে এমনভাবে মারমুখী হয়েছে যে আর কখনও এদের কবজা করা ওদের পক্ষে অসম্ভব বলে মনে হয়েছে। এইবার এই এতগুলি মারমুখী মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে ওদের ঘাঁটি আগলানো প্রায় দুঃস্বপ্নের মতো।

তা হলে?

তা হলে আর কী। ওরা প্রকাশ্য দিবালোকে তো আসবে না। গভীর রাতের অন্ধকারে আচমকা ওদের মেশিনগান বা রাইফেল ব্যবহার করে পুরো বস্তিটার ওপর হামলা চালাবে। তারপর ওই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর এলাকা ছেড়ে চলে যাবে কিছু দিনের জন্য। প্রাচীনকালের সেই অসুরও যেমন ওই গুহার জঠরে তার সর্বস্ব জমা রেখে বরাবরের জন্য চলে গিয়েছিল, এদেরও সেই অবস্থাই হবে।

কিন্তু তোমার কথাই যদি সত্যি হয়, তা হলে তো রীতিমতো ভয়ের ব্যাপার। আমাদের উসকানিতে মেতে ওঠার ফলে এই সব অসহায় মানুষগুলোর মৃত্যুর জন্য আমরাই তো দায়ী হব।

এইটাই আমার ভয়। তা ছাড়া আমাদের এখন উভয় শত্রু। একদিকে মংঘীরাম, অপর দিকে হিন্দোলসর্দার। এই উভয় প্রতিপক্ষকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে আমাদের।

কিন্তু কীভাবে?

রঞ্জন! তুমি একটু জেগে থাকতে পারবে? আমার বড় ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমব। দুপুরটা গড়িয়ে গেলেই আমাকে ডেকে দেবে কিন্তু। আমি চুপি চুপি একটা বড় গাছের ডালে বসে সারা রাত জেগে বন্দুক নিয়ে পাহারা দেব এদের।

রঞ্জন বলল, ঠিক বলেছ। না হলে যে কোনও মুহূর্তে একটা বিপদ ঘটে যেতে পারে। তুমি ঘুমোও। আমি জাগছি। ইতিমধ্যে মংঘীরামের কাছ থেকে কেউ যদি আসে তোমাকে ডাকব কি?

মংঘীরামের কাছ থেকে কেউ কোনওদিনই আসবে না রঞ্জন। ওদের টাকা এত সস্তা নয় যে আমি চাইলেই দিয়ে দেবে ওরা। মংঘীরামের কাছ থেকে টাকা চেয়ে পাব না। জোর করে আদায় করতে হবে।

রঞ্জন অবাক চোখে চেয়ে রইল শবনমের মুখের দিকে। কী সুন্দর ফুলের মতো মেয়েটি। কিন্তু ওর এই সৌন্দর্যের মধ্যেও অমন খুনের নেশা কোথায় কোন গোপনে ঘুমিয়েছিল? তা ছাড়া এমন প্রখর বুদ্ধি, এমন ভয়ানক দুঃসাহস ওর কী করে হল?

রঞ্জন বলল, তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমোও শবনম। আমি তো আছি। তুমি ঠিকই বলেছ, আমাদের রাত জেগেই পাহারা দিতে হবে।

শবনম সেই খড়ের শয্যায় হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। শোয়ামাত্রই ঘুম ঘুম ঘুম।

রঞ্জন নিদ্রিত শবনমের মুখের দিকে অপলকে চেয়ে রইল। শবনমকে এই মহারণ্যে ফেলে রেখে ও কী করে ফিরে যাবে নিজের দেশে? শবনম ফুলনদেবী হবে, পাহাড়-বনের রানি হবে। কিন্তু তার সঙ্গে ওর যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে, সেটাকে সে কাটিয়ে উঠবে কেমন করে? তাই আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে যে ভাবেই হোক বুঝিয়েবাঝিয়ে ভুলিয়েভালিয়ে শবনমকে প্রকৃতিস্থ করে আবার শহর-সভ্যতার সংস্পর্শে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার।

রঞ্জন অনেকক্ষণ ধরে নিজের মনের সঙ্গে অনেক বোঝাপড়া করে ঠিক করল কাল সকালেই ওরা ফিরে যাবে এখান থেকে। রঞ্জন শবনমকে নিয়ে ওদের বাড়িতেই গিয়ে উঠবে। শবনমের আপত্তি না থাকলে সে থাকবে ওদেরই কাছে। যেই না মনে হওয়া অমনি আনন্দে উত্তেজনায় বুক ভরে উঠল রঞ্জনের। এত সহজে যে জিনিসের মীমাংসা হয়ে যায় তার জন্য এত ভাবনাচিন্তার কোনও প্রয়োজন ছিল কি? রঞ্জন একবার ঝুঁকে পড়ে দেখল শবনমকে। তারপর খুব আলতো করে ওর কপালে একটু হাত বুলিয়ে দিতেই চোখ মেলল শবনম। একবার ঝেড়ে উঠে বসেই বলল, কী হল রঞ্জন! ভয় পেলে? না।

তাই ভাল। তারপর মৃদু হেসে বলল, হঠাৎ এত আদরের ব্যাপার কী? আমি একটা সিদ্ধান্তে এসেছি।

কী সিদ্ধান্ত বলো?

ভাবছি এইসব ঝামেলায় আর নিজেদের না জড়িয়ে কাল সকালেই চলে যাই চলো।

কোথায়?

যেখান থেকে এসেছি সেখানেই।

শবনম হঠাৎ কীরকম দপ করে জ্বলে উঠল। বলল, তুমি কী করে ভাবলে যে আমি আমার আব্বাজানের হত্যাকারীদের বদলা না নিয়ে ফিরে যাব? তা ছাড়া এই মুহূর্তে আমরা আমাদের আদর্শচ্যুত হয়ে চলে গেলে এই পাহাড়িদের অবস্থাটা কী হবে তা একবার ভেবে দেখেছ? মংঘীরাম আর হিন্দোলসর্দারের লোকেরা বিদ্রোহী হওয়ার অপরাধে এদের পিঠের চামড়া ছাড়িয়ে নেবে। এই সহজ সরল নির্বোধ মানুষগুলোকে অসহায় ভাবে শত্রুর মুখে ঠেলে দিয়ে আমরা চলে যাব? তুমি যাও রঞ্জন। কাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই এই এলাকা ছেড়ে চলে যাও তুমি। আমার কাজ আমাকে করতে দাও।

রঞ্জনের চোখদুটো ছল ছলিয়ে উঠল। বলল, তুমি আমায় ভুল বুঝলে শবনম। তোমাকে ছেড়ে যাবার হলে আমি কি এতটা সময় থাকতাম তোমার কাছে? আমি কি পারতাম না সেই গোবিন্দজির মন্দিরে আমার নিজের ব্যবস্থাটা করে নিতে? শুধু তোমার অসহায়তার কথা ভেবেই তো আমি আমার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে গুহাবাসী হলাম। আর তুমিই কি না আমাকে চলে যেতে বলছ? ঠিক আছে, বদলা নিয়েই না হয় যাব আমরা। শবনম! জেনে রেখো, আমি এক সদ্বংশজাত ভদ্র পরিবারের ছেলে। এবং নেহাত বালকও নই! সত্যের জন্যে, ধর্মের জন্যে এবং তোমার জন্যে আমি জীবনও দিতে পারি।

শবনম মাথা নত করে বলল, তুমি আমাকে ক্ষমা করো রঞ্জন। আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম। তবু তুমি নিজেই একবার ভেবে দেখো, যে কথাটা তুমি বললে সেটা নিছক স্বার্থপরের মতো কি না?

কতকটা তাই। তবে এই বদলা নেওয়ার কাজটা পুলিশকে দিয়েও করানো যেত।

যেত না। কিছু কিছু কাজের জন্য জনসাধারণকেও এগিয়ে আসতে হয়। পুলিশকে দিয়ে সব কাজ যদি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যেত, তা হলে এদেশে এত কড়াকড়ির মধ্যেও মংঘীরাম ও হিন্দোলসর্দারের অত্যাচার প্রাধান্য পেত না। এখানকার এই দুই প্রধান শত্রুর মোকাবিলা না করে আমরা ফিরতে পারি না রঞ্জন। এতে পাহাড়িদের প্রতি আমাদের বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।

রঞ্জন বলল, হ্যাঁ। তুমি ঠিকই বলেছ। আমি আমাদের দিকটাই চিন্তা করেছিলাম, কিন্তু এদের কথাটা ভাবিনি।

এমন সময় কয়েকজন পাহাড়ি ছুটে এসে বলল, দেবীজি! পাহাড়ের নীচের দিক থেকে কিছু লোক আমাদের এই দিকে আসছে। ওদের হাতে বন্দুক ভি আছে।

ওরা কারা?

মালুম নেহি। তবে মনে হচ্ছে পুলিশের লোক।

ওরা কতজন আছে বলতে পারো?

তা বিশ-পঁচিশজন তো হবেই।

রঞ্জন আর শবনম পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করল।

রঞ্জনের বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল ভয়ে। কিন্তু শবনম বেপরোয়া। যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে বলল, বুঝেছি। মংঘীরাম আমার সঙ্গে দোস্তি নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আসছে। তবে আমিও খোদাতালার নাম নিয়ে বলছি ওদের একটাকেও আমি ফিরে যেতে দেব না। আমি জানি ওরা কারা। ওরা কখনওই পুলিশের লোক নয়।

পাহাড়িরা বলল, কিন্তু দেবী। একা আপনি লড়বেন কী করে ওদের সঙ্গে? ওরা বিশ-পঁচিশ জন। আপনি একা। আমরা কেউ যুদ্ধ জানি না। বন্দুকের চেহারা দেখেছি। কিন্তু বন্দুক চালাবার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি।

শবনম তখন রুখে দাঁড়িয়েছে।

আবার যেন এক প্রেতিনী ভর করল তার ওপর। বজ্রমুষ্ঠিতে বন্দুক ধরে বলল, ঠিক আছে। তোমরা একটু বালবাচ্চা নিয়ে সাবধানে থেকো। পারো তো কাছেপিঠে কোনও গুহাটুহা থাকলে লুকিয়ে পড়ো সেখানে। সন্ধে হয়ে আসছে। আর দেরি কোরো না। যাও। রঞ্জন তুমিও যাও ওদের সঙ্গে।

রঞ্জন শবনমের একটা হাত শক্ত করে টিপে ধরে বলল, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে শবনম? একা তুমি অতগুলো লোকের সঙ্গে লড়বে কী করে? চলে এসো। ওরা এখুনি মেরে ফেলবে তোমাকে।

শবনম বন্দুকে টোটা পুরে বলল, রঞ্জন! আমার জন্যে চিন্তা কোরো না। শুধু জেনে রেখো, যে মানুষ মরতে চায় তার মরণ হয় না। তাকে মারতে কেউ পারে না। মরে তারাই যাঁরা বাঁচবার জন্যে হাঁকপাঁক করে। তবে হ্যাঁ, এ কাজে ঝুঁকি আছে। তাই তোমাকে সঙ্গে নিচ্ছি না। তুমি ওদের সঙ্গে যাও।

না। তোমাকে আমি ছাড়ব না। মরলে দু'জনেই একসঙ্গে মরব।

এমন সময় হিংলাজসর্দার এগিয়ে এসে বলল, এ লড়াই বাঁচার লড়াই। আমরাও তোমাদের একা ছাড়ব না। তোমাদের এই দুই নাবালক ছেলেমেয়েকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে আমরা কি চুপচাপ বসে থাকব ভেবেছ? তোমরা যদি আমাদের জন্য জীবন বিপন্ন করতে পার, তা হলে আমরাই বা নিজেদের জন্যে লড়তে পিছব কেন? শুধু ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে অন্য কোথাও সরিয়ে দিয়ে এসো আমরা সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

আর একজন বলল, ঠিক। সর্দার যা বলেছে তা ঠিক। অনেক মার খেয়েছি আমরা। আর মার খাওয়া নয়। এবার আমরা পালটা মার দেব। কেউ পালাব না এখান থেকে। মরলে সবাই মরব একসঙ্গে। আজ রাতের অন্ধকারে হয় ওরা মরবে, নয়তো আমরা শেষ হয়ে যাব। আমরা জানি ওরা কী করবে। ওরা আমাদের ঘরে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেবে। দিক। আমাদের একজনও যদি বাঁচি তা হলে ওই আগুনকে দাবানল করে ছড়িয়ে দেব চারদিকে।

কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তির, কাঁড়া, বল্লম, কুডুল হাতে হাতে চলে এসো সব।

শবনম বন্দুকের নল শূন্যে উঁচিয়ে একটা শব্দ করল। আর সেই শব্দের সঙ্গে হই হই করে উঠল আরণ্যকরা।

সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, জয় দেবী ভয়ংকরীর জয়। আমাদের অরণ্যদেবী অমর রহে।

রঞ্জন বন্দুক চালাতে না পারলেও সঙ্গে নিয়েছে একটা।

অদূরে হিন্দোলকেল্লার মাথায় একটা মশালও জ্বলতে দেখা গেল। সেই মশাল নেড়ে কে যেন কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে কি বন্দুকধারী ওই যোদ্ধারা মংঘীরামের লোক নয়? এরা কি হিন্দোলসর্দারেরই সৈন্যবাহিনী? সব যেন কীরকম জট পাকিয়েছে যাচ্ছে।

পাহাড়ের নীচে আর পাহাড়ের চূড়ায় এই দুই ঘোড়েল শয়তানকে জব্দ করা বড়ই কঠিন ব্যাপার। তবুও সাহসে বুকবেঁধে ওরা এগিয়ে চলল সন্তর্পণে। পা টিপে টিপে। বাঘিনী যেভাবে তার শিকারের দিকে এগোয় ঠিক সেইভাবে শবনমও এগিয়ে চলল ধীরে ধীরে।

এক জায়গায় বড় একটি পাথরের আড়ালে এসে থামল শবনম।

ওই তো দূরে পাহাড়ের ঢালে দেখা যাচ্ছে লোকগুলোকে। দেখে মনে হচ্ছে ওরা পুলিশেরই লোক। কিন্তু মংঘীরাম এত তাড়াতাড়ি পুলিশকে ফিল্ডে নামাবে কী করে? এরা নকল-পুলিশ নয় তো? তা ছাড়া হিন্দোলকেল্লার মাথায় ওই মশালের আলো কীসের বার্তা বহন করছে? কোনও কিছুই বোঝা যাচ্ছে না এই ভয়ানক পরিস্থিতিতে।

শবনম সকলকে বলল, তোমরা যে যার সুবিধামতো বড় বড় গাছের ডালপালায় লুকিয়ে থাকো। ওদিক থেকে বাধা না পেলে বা আমি না বললে কাউকে আক্রমণ করো না।

নীচের লোকগুলি বন্দুক উঁচিয়ে এমনভাবে এগিয়ে আসছে যে, মনে হচ্ছে রাতের অন্ধকার না হলে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়বে না।

কিন্তু মুশকিলটা হল এই যে, এই সন্ধ্যার ধূসর যবনিকায় ওরা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে। ওদের ছায়া ছায়া কালো কালো মূর্তিগুলো এক সময় আর দেখাই গেল না। তবে এটুকু বেশ বুঝতে পারা গেল যে ওরা আসছে— আসছে— আসছে।

ধীরে ধীরে অতি সন্তর্পণে শিকারি বাঘের মতো থাবা উঁচিয়ে এগিয়ে আসছে ওরা।

শবনম কিছুতেই ভেবে পেল না, এই মুহূর্তে তার করণীয় কী? এদিকে পাহাড়িরাও আসন্ন যুদ্ধের মোকাবিলা করবার জন্য দারুণভাবে মরিয়া। আসলে সুপ্ত চেতনা জাগরিত হলে যা হয় আর কী? তবে ওরা শুধু আদেশের অপেক্ষায় আছে। কতক্ষণে ওদের দেবী একবার শুধু বলবে ‘মারো'। কিন্তু শবনম তো এখনি সে কথা বলতে পারে না। কেন না যদি এরা সত্যিই পুলিশের লোক হয়।

চার

ওই ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পর পুলিশও তো চুপ করে বসে থাকবে না। তারাও তন্ন তন্ন করে চারদিক থেকে লুঠের মাল উদ্ধারের চেষ্টা করবে। হয়তো ওরা সেই সূত্রেই এই গিরি-অরণ্যে অভিযান চালিয়েছে।

রঞ্জন শবনমের খুব কাছেই ছিল। বলল, কীভাবে কী করবে ঠিক করলে কিছু ? না।

তোমার কী মনে হয় ওরা সত্যিকারের পুলিশ? ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

তা হলে?

ওরা আর একটু কাছে আসুক।

আমার কিন্তু মন বলছে ওরা পুলিশের লোক নয়।

তোমার এইরকম মনে হওয়ার কারণ?

কেন না পুলিশের লোক হলে এই অন্ধকারে ওরা চুপি চুপি চোরের মতো আসত না। প্রকাশ্য দিবালোকেই আসত।

ঠিক। তবে এমনও তো হতে পারে, ওরা অতর্কিতে আক্রমণ করবে বলেই এইভাবে আসছে।

মানলাম। তা হলে হিন্দোলসর্দারের কেল্লা থেকে মশালের আলোর সংকেতে কাদের দৃষ্টি ওরা আকর্ষণ করছে?

সেটা আর একটু পরেই জানা যাবে। ওই শোনো বুটের শব্দ।

হ্যাঁ। সত্যিই তো। বেশ ভারী পায়ের মসমস শব্দ কাছের দিকে এগিয়ে আসছে ক্রমশ।

শবনম হঠাৎ রঞ্জনকে কিছু না বলেই ওর গুপ্তস্থান থেকে বেরিয়ে গিয়ে আর একটি বড় পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে রাইফেল তাগ করে বলল, হল্ট।

পায়ের শব্দ থেমে গেল।

শবনম বলল, তুম সব কৌন হো?

হাম পুলিশকা আদমি। তুম?

ম্যায় ইস পাহাড়-জঙ্গলকা রানি হুঁ।

সমঝ গিয়া। তুম ডাকু সর্দারকা আদমি। আভি বন্দুক ফিক দো। নেহি তো মুশকিল হো যায়ে গা।

শবনম এবার আত্মপ্রকাশ করে বলল, আমি এই জঙ্গলের রানি। যদিও কোনও রাজা নেই। তবুও আমি রানি। এরা আমার প্রজা। এখানকার সব কিছুর ওপরই আধিপত্য আছে আমার। তবে হিন্দোলসর্দারের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। অবশ্য একেবারে যে নেই তা নয়। দুশমনির সম্পর্কটা আছে! তা আপনারা কি হিন্দোলসর্দারের খোঁজে যাচ্ছেন?

হ্যাঁ। কিন্তু তুমি তো বেশ ভাল বাংলা বলতে পার দেখছি। কী নাম তোমার? আমার নাম শবনম। আমি উর্দুতে পড়াশুনা করলেও, কলকাতার মেয়ে। বাংলা ভালই জানি। আপনি?

আমিও বাংলা জানি।

কিন্তু আপনি যে ডাকুসর্দারের খোঁজে চলেছেন আপনি কি জানেন ওই কেল্লার কাছাকাছি গেলেই অতর্কিতে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি কেল্লার ভেতর থেকে ছুটে আসে?

জানি।

তা হলে?

আমরা জেনেশুনেই এসেছি! আমাদের একজন লোক ছদ্মবেশে ওদের দলে আছে। সে-ই ডাকিয়েছে আমাদের। ওই দেখো আলোর সংকেত।

শবনম দেখল বেশ কিছু পুলিশের লোক রাইফেল-স্টেনগান ইত্যাদি নিয়ে জড়ো হয়েছে সেখানে। অদূরে কেল্লার মাথা থেকে আলোর সংকেতও দেখা যাচ্ছে।

রঞ্জনও কখন যেন চুপি চুপি এসে দাঁড়িয়েছে ওদের পাশে। অন্যান্য পাহাড়িরাও ঘিরে আছে চারদিক।

শবনম বলল, আপনি নিশ্চয়ই ইনস্পেক্টর?

হ্যাঁ। আমিই ইনস্পেক্টর জেনারেল বলতে পারো। তবে আসল নয়। নকল। আর এরা আমার দলের লোক।

শবনম সবিস্ময়ে বলল, সে কী! তা হলে কে আপনি?

আমার নাম লালচাঁদ রায়। বাঙালি। চিরকাল মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডোয়াতে কাটিয়েছি। ওই ডাকাতসর্দার আমার সঙ্গে কোনও একটা ব্যাপারে বেইমানি করেছে। তাই সেই বেইমানির বদলা নিতেই এসেছি আমি। আমার একজন লোক ওদের দলে আছে। ওই আলোর সংকেত সেই দেখাচ্ছে।

শবনম উৎসাহিত হয়ে বলল, কী নাম বলুন তো?

তুমি চিনবে না! ওর নাম ভীমা গাড়োয়াল।

ওর ভরসায় আপনারা এমন ঝুঁকি নিয়ে এসেছেন? কিন্তু ও যদি আপনাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে?

গাড়োয়ালরা কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করে না।

কে বললে? ওই গাড়োয়াল হিন্দোলসর্দারের সঙ্গে তার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করছে না কি?

লালচাঁদ এবার চমকে উঠলেন। বললেন, কে তুমি! এই অল্প বয়সে এমন প্রখর বুদ্ধি রাখ।

আমি যে কে, তা আমিই জানি না। এখন আমি এই অরণ্যের দেবী। এই যে দেখছেন সহজ সরল পাহাড়িরা, ওই অত্যাচারীর অত্যাচারে ওরা জর্জরিত। ওই কেল্লাপাহাড়ে হিন্দোল আর নীচের অরণ্যে মংঘীরাম এই দুই অত্যাচারীর অত্যাচার ও শোষণে এরা আধমরা হয়ে আছে। এরা এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বহু মানুষের জীবনহানি ঘটিয়েছে। সেই দুর্ঘটনায় আমি আমার আব্বাজানকে হারিয়েছি! আরও কতজন কতজনকে যে হারিয়েছে তার ঠিক নেই। তাই আমিও চাইছি ওই শয়তানের কেল্লা দখল করে ওর মুণ্ডু হাতে নিয়ে মা কালীর মতো নাচতে।

লালচাঁদের চোখদুটো জ্বলে উঠল। বললেন, তোমার আর আমার পথ একই। কিন্তু এই জঙ্গলে হত্যার নেশায় মেতে ডাকাতরানি সেজে তুমি কতক্ষণ লড়বে? একমাত্র তোমার হাতে ছাড়া আর কারও হাতেই তো বন্দুক দেখছি না।

শবনম বলল, এই একটিমাত্র বন্দুকেই আমি এ পর্যন্ত অনেকগুলো প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছি। হিন্দোলসর্দারের দলের অনেক লোককে একা আমিই খতম করেছি এই বন্দুক দিয়ে।

তাই নাকি? কিন্তু এটা কী করে সম্ভব হল?

আমার আব্বাজান মিলিটারির লোক ছিলেন। উনি আমায় সবকিছু শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।

লালচাঁদ দলের লোকেদের বললেন, এই মেয়েটিকে দেখে তোমরা শেখো প্রতিশোধ কী করে নিতে হয়। একে দিয়েই তোমরা অনুভব করো মানুষ মরিয়া হলে কী না করতে পারে। তারপর শবনমকে বললেন, তুমি যদি সত্যিই ওই দুরাত্মার প্রতিশোধ নিতে চাও তা হলে আমার সঙ্গে হাত মেলাতে পারো। আমি তোমাকে সব রকমের সাহায্য করব।

সত্যি বলছেন?

তোমাকে মিথ্যে বলে লাভ? তোমার চোখে যে আগুন আমি দেখেছি, তোমার মনের মধ্যে যে বারুদের স্তূপ আমি আবিষ্কার করেছি, তাতে বেশ বুঝতে পারছি আর এক নতুন পুতলিবাঈ জন্ম নিয়েছে এখানে। কাজেই আমার স্বার্থের জন্যে, দলের প্রয়োজনের জন্যে, তোমাকে আমার একান্তভাবে প্রয়োজন। আমি রাজি।

ওদিকে হিন্দোলকেল্লার মাথার ওপর আলোর সংকেত আবার দুলে উঠল। ওই দেখো! সুবর্ণ সুযোগ। আমি আমার বদলা নিতে চলেছি। তুমিও তোমার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে চলেছ। গো-অ্যাহেড।

শবনম এবার রঞ্জনের দুটি হাত শক্ত করে ধরে বলল, রঞ্জন! তুমি থাকো। আমি যাই। ওই কেল্লা বিজয় করে কাল সকালের আগেই আমি ফিরে আসব।

আমি না-আসা পর্যন্ত একটু একা থাকো। আমাদের পাতার ঘরে নির্ভয়ে বিশ্রাম করো তুমি।

হিংলাজসর্দার এবং তার দলের লোকেরা বলল, ওই কেল্লা যদি সত্যিই দখল হয় তা হলে চলো না কেন আমরাও সবাই মিলে দল বেঁধে যাই। শত্রুর শেষ একদিনেই হয়ে যাক।

লালচাঁদ বললেন, না। সবাই গেলে ওরা আমার চাতুরি ধরে ফেলবে। হিন্দোল আমার চিরশত্রু। আমি ছদ্মবেশে এসেছি। ছদ্মবেশেই ঢুকব। ওর অত্যাচারে ওর দলের অনেক লোকই দল ত্যাগ করেছে।

শবনম বলল, বাকি যারা ছিল তাদের ভেতর থেকেও কয়েকজনকে আমি খসিয়ে দিয়েছি।

বেশ করেছ। এখন আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট নয়। চলো সবাই সতর্ক হয়ে যাই।

রঞ্জনের এ ব্যাপারে খুব একটা সায় ছিল না। তাই বলল, শবনমের কি না গেলেই নয় ?

শবনম বলল, ভয় নেই, আমি আবার ফিরে আসব। হিন্দোলসর্দারের সাধ্য কী যে আমায় ধরে রাখে? তা ছাড়া এখন আমরা দলে অনেক ভারী।

রঞ্জনের চোখদুটি ছলছলিয়ে উঠল। বলল, খোদা মেহেরবান। তুমি জয়যুক্ত হয়ে ফিরে এসো শবনম।

সেই আলোর সংকেত ধরে ওরা সবাই পা টিপে টিপে দুর্গমপথে হিন্দোলকেল্লার দিকে এগোতে থাকল। আলোর সংকেত থেমে গেছে। তবু ওরা এগিয়ে চলল। এইভাবে ছলচাতুরি না করে ওই কেল্লায় ঢোকবার কোনও পথই তো জানা নেই।

যেতে যেতে লালচাঁদ বললেন, একবার শুধু ভেতরে ঢুকি। তারপর আজই রাতের অন্ধকারে তোমার বুক চিরে আমি রক্তপান করব ঘোড়েল শয়তান। তোমার বেইমানির বদলা আমি নেবই।

ওরা ধীরে ধীরে এগোতে থাকল।

বন্দুক উঁচিয়ে নিঃশব্দে কেল্লার কাছাকাছি যেই না গেছে ওরা অমনি হঠাৎ রাতের অন্ধকার বিদীর্ণ করে শব্দ হল, ডিস্যুম, ডিস্যুম, ডিস্যুম। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি দুর্গ প্রাকার থেকে ছিটকে এসে ঝাঁঝরা করে দিল ওদের। এক লহমায় কয়েকটি তাজা প্রাণ লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

কেল্লার মাথায় বুরুজের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভীমা গাড়োয়াল দাঁড়িয়েই রইল একভাবে। ওর হাত থেকে খসে পড়েছে মশালের আলোটা। ধড় থেকে মুণ্ডুটাও ছিটকে পড়েছে এক কোণে। ভীমার মাথাটা একজন এসে কুড়িয়ে নিয়ে বুরুজের লৌহ শলাকায় গেঁথে রাখল। আর যে অস্ত্রের ঘায়ে ওর ধড় থেকে বিচ্যুত হয়েছিল মুণ্ডুটা, সেই অস্ত্রের গায়ে লেগে থাকা রক্তের দাগ নিয়ে নিজের কপালে একটা টিপ্পা দিলেন সর্দার। সর্দারের রক্তচক্ষুতে তখন আগুন জ্বলছে। কেল্লার মাথা থেকেই চিৎকার করে উঠলেন সর্দার, আগ লাগা দো বস্তি মে। আউর ফুলনদেবী বননেবালী উস লেড়কিকো পাকড়কে লে আও। যাও। আভি চলা যাও সব।

চোখের পলকে পাঁচজন অশ্বারোহী মশাল ও বন্দুক নিয়ে সেই অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলল পাহাড়ি বস্তির দিকে। কিছুটা পথ যাবার পর পাঁচজন পাঁচদিক থেকে ঘিরে ফেলল বস্তিটাকে। কেন না সর্দারের হুকুম অমান্য করার সাহস ওদের নেই। অথচ সুন্দরী কিশোরী ডাকু শবনমের বেপরোয়া অব্যর্থ গুলি চালানোর কাহিনিও শোনা এবং জানা আছে। তাই সব দিক থেকে আক্রমণের জন্যই ওরা এই ব্যবস্থাটা নিল।

একেবারেই অতর্কিত আক্রমণ।

যুদ্ধ না করা সরল প্রাণ পাহাড়িরা তখন একেবারেই নিশ্চিন্ত ছিল। বরং হিন্দোলকেল্লার দিক থেকে ছুটে আসা গুলির শব্দকে ওরা নকল পুলিশবাহিনীর আক্রমণ ভেবে আনন্দে উল্লাস করছিল। এমন সময় হঠাৎ হতচকিত হয়ে ওরা দেখল রাতের অন্ধকারে ওদের পাতার ঘরগুলো দাউ দাউ করে জ্বলছে। কোনও কিছু ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই ওরা দেখল, ওদের ক্ষুদ্র বস্তিতে যেন বহ্ন্যুৎসব শুরু হয়ে গেছে। ওরা হতভম্ব হয়ে দেখতে লাগল কয়েকজন ডাকাত ঘোড়ার পিঠে চেপে এদিক সেদিকে ছুটোছুটি করছে।

তির, কাঁড়, টাঙি, বল্লম, শাবল, কুড়ুল নিয়ে যারা ওদের বাধা দিতে গেল, তারা মরল। যারা প্রাণের ভয়ে লুকোল, তারা বাঁচল।

ওদেরই ভেতর থেকে একজন ঘোড়ার পিঠে বসেই হঠাৎ চোখের সামনে হিংলাজসর্দারকে দেখতে পেয়ে তার বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে বলল, লেডকি কাঁহা হ্যায়?

হিংলাজসর্দার তখন ছুটতে গিয়ে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেছে। সেই অবস্থাতেই তাকে উঠতে না দিয়ে ঘোড়ায় বসা লোকটি রক্তচক্ষুতে বলল, বোল জলদি ও লেড়কি কাঁহা হ্যায়?

অন্য ডাকাতরা তখন বন্দুক তাগ করে কয়েকজন পাহাড়িকে ধরে এনেছে সেখানে। তারা বলল, তুম সবকো সর্দারকা পাশ জানা হোগা।

পাহাড়িরা বলল, দোহাই। আমাদের প্রাণে মেরো না। গরিব মানুষ আমরা। এখন থেকে তোমরা যা বলবে তাই শুনব। আর কখনও বিদ্রোহী হব না। মারো চপ্পল বদমাশকো। জলদি চল সর্দারকে পাস।

আর এক ডাকাত পাহাড়ি বস্তির কয়েকজন রমণীকে জোর করে টেনে আনছে।

হিংলাজসর্দার মরিয়া হয়ে বন্দুকের নলটা শক্ত করে ধরে হেঁচকা টান দিল একটা। কিন্তু তাতে অবশ্য লাভ হল না কিছু। ডাকাতের গায়ে প্রচণ্ড শক্তি। সে যেমন বসেছিল তেমনিই রইল। শুধু হিংলাজ তার বুকের ওপর থেকে কোনওরকমে নলটা নীচের মাটিতে নামাতে পারল।

ঘোড়সওয়ার ভয়ংকর রেগে আবার বলল, ও লেড়কি কাঁহা হ্যায়? নেহি বতাউঙ্গা।

তো ঠিক হ্যায়। আপনা ভগবান কো ইয়াদ করো। রাম-দো-তিন...। ডিস্যুম।

পাহাড় ও বনভূমি কাঁপিয়ে একটা বন্দুকের গুলির শব্দ। আর সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা ডাকাতের মাথাটা তুবড়ির মতো উড়ে গেল।

সবাই হতচকিত। এ কী জাদুরে বাবা। অন্যান্য ডাকাতরা তখন ভয়ে থর থর করে কাঁপছে।

এমন সময় সেই অন্ধকারে হঠাৎই শবনমের গলা শোনা গেল, বন্দুক ফিক দো শয়তান ডাকু।

ডাকুদের আর বন্দুক ফিকতে হল না। পাহাড়িরাই আবার তাদের নেত্রীর কণ্ঠস্বর শুনে ঝপাঝপ লাফ মেরে কেড়ে নিল বন্দুকগুলো। দিশেহারা ডাকাতরা তখন প্রাণভয়ে পালাতে গেল। কিন্তু সেই অন্ধকারে গাছের ডালে ধাক্কা খেয়ে জখম হয়ে দু'জন পড়ে গেল মাটিতে। আর বাকি দু'জন শবনমের গুলিতে নিহত হয়ে ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে ঢিপ ঢাপ পড়ল।

হিংলাজসর্দার নিজেই পাকড়াল একজন ডাকাতকে।

অন্য একজনকে বাকিরা।

আর ঘোড়াগুলোর সব ক'টাই ধরে ফেলল সকলে মিলে।

ঘোড়াগুলোকে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে ধৃত ডাকাত দুটিকে কবজা করল ওরা।

ভয়ে কথা বলতে পারছে না ডাকাতরা! কেন না ওরা বুঝতেই পারছে কী ভয়ংকর পরিণতিটাই না ঘটতে চলেছে এবার। এই কিশোরীডাকু ওদের সর্দারের চেয়েও মারাত্মক। ওরা ভয়ে ভয়ে দেখল একটা বাঘিনী যেন একটা ছুরি হাতে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। ছুরির ফলাটা ওদের চোখের দিকে তাগ করা।

বাঘিনী এগিয়ে আসছে। ওই অনন্ত সৌন্দর্যের মধ্যে এইটুকু একটা মেয়ের সে

কী ভয়ংকরী রূপ। ওরা চিৎকার করে উঠল, নেহি নেহি নেহি।

বল শয়তানরা এখানে তোরা কী করতে এসেছিলি? তোরা কি জানতিস না এই অরণ্যে আমি ডাকিনী মন্ত্র নিয়ে অরণ্যকে পাহারা দিচ্ছি? এর আগে তোদের অন্যান্য সঙ্গীদের আমি কী ভাবে হত্যা করেছি সে কথা কি ভুলে গেছিস? ভুলিনি দেবী।

তা হলে কোন সাহসে আবার এসেছিলি এখানে? কেন এদের ধরে নিয়ে যাচ্ছিলি? কেন এখানকার মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছিলি? বল? কেন এ কাজ করতে এসেছিলি?

সর্দারের হুকুমে।

তোদের সর্দারের ওপর তো দেখছি দারুণ ভয় তোদের। কিন্তু আমাকে তোরা ভয় পাস না?

ওরা কাঁপতে কাঁপতে বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ পাই।

তা হলে কোন সাহসে এসেছিলি আমার ঘরে আগুন দিতে? এক লহমায় কী ভয়ানক কাণ্ডটা করে ফেলেছিস তোরা তা জানিস? এত দুঃসাহস তোদের কী করে হল?

আমাদের এবারের মতো ক্ষমা করুন দেবী। আমরা কথা দিচ্ছি আর কখনও আপনার সঙ্গে লাগতে আসব না। আমরা দস্যুবৃত্তি ছেড়ে দেব। আপনার গোলাম হয়ে থাকব আমরা।

এই রকম কথা তো আরও একজন দিয়েছিল। কিন্তু তাকে ক্ষমা করার পরও সে আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

কে সে?

তার নাম মুখে আনতেও ঘৃণা হয়।

না বললে আমরা কী করে বুঝব বলুন?

ওর নাম ‘থুঃ’।

হিংলাজসর্দার বলল, ওই বিশ্বাসঘাতকের নাম বিক্রমজিৎ।

বিক্রমজিৎ! কিন্তু সে তো এখন আমাদের দলে নেই। সে তো ফেরার। দলত্যাগী।

তোমরা মিথ্যে কথা বলছ। সেই বিশ্বাসঘাতক এখান থেকে ছাড়া পেয়েই তোমাদের কেল্লায় ফিরে যায়। সে শঠ। প্রবঞ্চক।

হতে পারে। আপনাদের এখান থেকে ছাড়া পেয়ে সে পালিয়েছিল ঠিকই। তবে আমাদের দুর্গে সে ফিরে যায়নি। দুর্গের প্রহরীদের সে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল, আমাদের অত্যাচার আর অনাচারের ফল নাকি আমরা হাতেনাতেই পাব এবার। আমরা যেন হিন্দোলকেল্লা ছেড়ে এখুনি পালাই। নয়তো শিগগির প্রাণে মরব। কেন না এক কিশোরীর শরীরে এখানকার জাগ্রতা অরণ্যদেবী ভর করেছেন। তিনি অতি নিষ্ঠুরা। এই বলে সে দ্রুত অন্য পথে পালিয়ে যায়। সর্দার তখন কেল্লায় ছিলেন না। তাই তাকে মৃত্যুদণ্ড আমরা দিতে পারিনি কেউ।

শবনম বলল, পালিয়ে সে কোথায় যেতে পারে? সে তো আমার কাছেই আসতে পারত?

পালিয়ে সে একটি জায়গাতেই যেতে পারে, সেটি হল শহরের পুলিশচৌকিতে।

কিন্তু সেখানে গেলে তো অ্যারেস্ট হয়ে যাবে সে।

হবে। তার চোখেমুখে আমরা তীব্র অনুশোচনা এবং কঠিন সংকল্প দেখেছি। আমরা বুঝেছি মরতে সে আর একটুও ভয় পায় না। সর্দার তাকে দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের একজন লোক সব সময় খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে।

লালচাঁদ ও তাঁর সাতজন যোদ্ধা শবনমের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। দুর্গের ভেতর থেকে গুলি ছিটকে আসার সঙ্গে সঙ্গেই যারা ছোট বড় পাথরের আড়ালে কোনওরকমে লুকিয়ে পড়ে প্রাণট! বাঁচাতে পেরেছে একমাত্র তারাই ফিরে এসেছে এখানে। লালচাঁদ পাকা লোক। তবুও তিনি ভাবতে পারেননি এমন একটা কাণ্ড আচমকা ঘটে যাবে বলে। তবে শবনমের সতর্কবাণীর জন্য তিনি একটু সাবধান হয়ে গিয়েছিলেন তাই রক্ষে। গুলির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই শবনমকে জড়িয়ে ধরে বড় একটি পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। তারপর আর না এগিয়ে ধীরে ধীরে এক-পা এক-পা করে পিছু হটতে থাকেন। দলের লোকেদের বলেন যারা বেঁচে আছ তারা লুকিয়ে থাকো। আর একদম এগিয়ো না। এগোলেই মরণ। কেন না ওরা দুর্গের আড়ালে আছে। আমরা আছি প্রকাশ্যে। আমরা গুলি ছুড়লে ওদের গায়ে লাগবে না। কিন্তু ওরা গুলি ছুড়লে আমরা সবাই মরব।

অতএব লালচাঁদ ব্যর্থ হয়েই ফিরে এসেছেন।

ধৃত লোকদুটির দিকে তাকিয়ে লালচাঁদ বললেন, আমাকে চিনতে পারো চেৎ সিং আর কালুরাম?

লালবাবু !

হ্যা। আমি মরিনি। আমি এখনও জিদা আছি। ওই শয়তান সর্দার আমার চরম সর্বনাশ করেছে। ওর বদলা নেব বলেই আমি এসেছি। ভীমা গাড়োয়াল বিক্রমকে দিয়েই আমার কাছে খবর পাঠায়। সে এখন আমারই এক গোপন ঘাঁটিতে লুকিয়ে আছে। তিনদিনের মধ্যে আমার দিক থেকে কোনও খবর না-গেলে সে ফোনে পুলিশকে জানাবে।

কিন্তু ভীমাকে তো সর্দার খতম করে দিয়েছে।

করছে? সর্দারের অজানা কিছু আছে কি? বাতাস ওর কানে কানে সব কথা বলে দেয়। যাক। এখন তোদের জন্যে আমরা কী শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারি বলো? আমাদের এবারের মতো ক্ষমা করো লালবাবু।

সর্দার টের পেল কী করে যে ভীমা আমার হয়ে কাজ তোদের ক্ষমা করব আমি? আমার সর্বনাশের সময় তোরা তো কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকিসনি। আমার চোখের সামনে আমার ছেলেকে তোরা গুলি করে মেরেছিস। আমার বউ, তাকে যে তোরা কোথায় নিয়ে গেছিস, তার খোঁজ আজও পাইনি। ওই হিন্দোলকেল্লার ভেতরে তাকে কি আমি আবার ফিরে পেতে পারি?

না। সর্দার তাকে গুলি করে মেরেছে।

তার অপরাধ?

কোনও অপরাধ নেই। তবে সর্দার বেশিদিন কাউকে বেঁচে থাকতে দেন না। তা হলে এর পরেও কি করে তোরা বলিস তোদের ক্ষমা করতে? তোদের শক্তিতেই তো ওর শক্তি। ডাক এবার তোদের ভগবানকে। এক— দুই— তিন। চিৎকার করে উঠল শবনম, না। আপনি ওদের মারবেন না। ওদের শাস্তি আমি দেব। এটা আমার এলাকা। ওরা যেমন এই পাহাড়ের বুক থেকে নিভৃত শান্তির ঘরগুলো পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। অসহায় শিশু, গোরু, ছাগল, যেমন অসহায়ভাবে পুড়ে মরেছে, তেমনি ওদেরকেও পুড়ে মরতে হবে তিল তিল করে। আমি ওদের জীবন্ত অগ্নিতে আহুতি দেব। রঞ্জন! তুমি ওদের চিতা সাজাও। হাত-পা বেঁধে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ওদের ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে মারব আমি। রঞ্জন!

কিন্তু কোথায় রঞ্জন!

শবনম চিৎকার করে ডাকল, রঞ্জন!

কোনও সাড়া নেই। শব্দ নেই। ডাকের পর ডাক। তবু কোনও প্রত্যুত্তর নেই। শুধু ওর দীপ্ত কণ্ঠস্বর পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরতে লাগল, রঞ্জন! রঞ্জন! রঞ্জন! তুমি কোথায়? কোথায়? কোথায় উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠল সকলে। তাই তো! গেল কোথায় ছেলেটা? খোঁজ খোঁজ। সবাই এতক্ষণ এই ধৃতদের নিয়ে আর প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে বেসামাল হয়ে পড়েছিল। কে কার খোঁজ রাখে তখন। বস্তির আগুনের হলকায় সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।

শবনমের হঠাৎই তখন মনে হল সেই ভয়ানক কথাটা। বলল, ও আমাদের পাতার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিল না তো?

হিংলাজসর্দার বলল, হ্যাঁ মা! ওকে তো আমরা ওখানেই থাকতে দেখেছি।

হয়তো বেচারা ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই পাতার ঘর? সে ঘর কি আস্ত আছে? কী জানি?

দু'জন লোককে ধৃতদের পাহারায় রেখে সবাই ছুটল সেই পাতার ঘরের দিকে। কিন্তু না। সেখানে ঘরের চিহ্নও কোথাও নেই। নিভু নিভু আগুনের ক্ষীণ স্ফুলিঙ্গ তখন ধিকি ধিকি জ্বলছে। তাই দেখে সেই কঠিন পাষাণের বুকে আছড়ে পড়ল শবনম, রঞ্জন! আমাকে ক্ষমা করো বন্ধু। তুমিই আমার জীবন দান করলে, অথচ আমারই জেদের জন্যে আজ তোমাকে এই ভাবে পুড়ে মরতে হল। তবে আল্লা কসম। আমি পবিত্র কোরান শরিফের নামে শপথ নিয়ে বলছি, আল্লার নামে শপথ নিয়ে বলছি, আমার প্রতিশোধ নেওয়ার পালা শেষ হলে আমিও জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে আমার আত্মাহুতি দেব। আমার জন্যে যে কষ্ট তুমি পেয়েছ সেই কষ্টের ভাগ আমিও সমানভাবে ভাগ করে নেব। তোমার এই মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী।

সমস্ত পাহাড়িরা তখন শোকস্তব্ধ হয়ে জড়ো হয়েছে সেখানে। অনেকেরই চোখে জল।

লালচাদের লোকেরা সেই অগ্নিকুণ্ডের ছাইভস্ম ঘেঁটে রঞ্জনের আধপোড়া শরীরটাকেও যদি পাওয়া যায় সেই চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু না। সেখানে শুধু মুঠো মুঠো ছাই ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

শবনম ভয়ংকরী মূর্তিতে সাপিনীর মতো ফুঁসে উঠে বলল, নিয়ে এসো ওই শয়তান দুটোকে।

পাহাড়িরা ধৃত ডাকাত দুটিকে নিয়ে এল।

এইখানে এই গাছটার সঙ্গে বাঁধো।

একটা আধমরা পলাশ গাছের গুঁড়িতে আষ্টেপিষ্ঠে বাঁধা হল দু'জনকে।

শয়তানদুটো তখনও নির্লজ্জের মতো প্রাণভয়ে ভীত হয়ে চেঁচাতে লাগল, একবার। শুধু একবার আমাদের ক্ষমা করো দেবী। আমরা কসম খাচ্ছি, আজ থেকেই এই দস্যুবৃত্তি ছেড়ে দেব আমরা। আমরা ভাল হব।

শবনম বলল, ভাল তোমরা এমনিতেই হবে। কারণ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অগ্নিশুদ্ধি হয়ে আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যাবে তোমরা। আবার নতুন করে মাতৃগর্ভে জন্ম নিয়ে নতুন দেহ ধারণ করে পৃথিবীতে এসে সৎভাবে জীবন যাপন করবে। তখন ভাল হবার চেষ্টা কোরো। এ জনমে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে আর ভাল হতে যেয়ো না।

কিন্তু দেবী, আমরা যে এ জন্মেই বেঁচে থেকে সৎভাবে জীবন যাপন করতে চাই। ভাল হতে চাই।

তা তো আর সম্ভব নয়। সময় পার হয়ে গেছে।

কোনও উপায়েই কি এই অসম্ভবকে সম্ভব করানো যায় না? একটু কৃপা করুন দেবী।

শবনম বলল, আমি এখনি তোমাদের মুক্তি দিতে পারি। কিন্তু একটি মাত্র শর্তে। শর্ত?

বলুন কী সে

আমার রঞ্জনকে ফিরিয়ে দিতে হবে! তোমাদের নৃশংস অত্যাচার ও অগ্নিকাণ্ডর ফলে এই পাহাড়িদের যে সব নিরীহ নারীপুরুষ যুবা বৃদ্ধ শিশু পুড়ে মরেছে, তাদের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে হবে। পারবে? যদি পার মুক্তি দেব। তা কী করে সম্ভব?

তা হলে তোমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। বলেই ভয়ংকরী নাদে চিৎকার করে উঠল শবনম, আগুন আগুন আগুন জ্বালাও। পুড়িয়ে ছারখার করে দাও এই পাপিষ্ঠদের।

প্রচুর শুকনো ডালপাতা এবং খড় এনে ওই ধৃত বন্দিদের গায়ের ওপর রাখা হল। তারপর একটা জ্বলন্ত মশাল এনে ধরিয়ে দিতেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। আর সেই অগ্নিশিখার লেলিহান জিহ্বার গ্রাসের ভেতর থেকে অত্যাচারীদের অন্তিম হাহাকার শোনা যেতে লাগল। ওরা অগ্নিদগ্ধ হয়ে যত চিৎকার করতে লাগল, শবনম ততই হাসতে লাগল হো হো করে। সে কী ভয়ংকর পৈশাচিক হাসি। এ যেন স্বাভাবিক কোনও মানুষের নয়। সম্পূর্ণ অপ্রকৃতিস্থ এক কিশোরীর অথবা ফুলনদেবী বা দুর্ধর্ষ পুতলিবাঈ-এর।

হাসতে হাসতেই এক সময় সংজ্ঞাহীন হয়ে লুটিয়ে পড়ল শবনম।

হিংলাজসর্দার তাকে ধরে পাঁজাকোলা করে বেশ বড় সড় একটা পাথরের ওপর শুইয়ে দিল। পাহাড়ি মেয়েরা এসে ওর চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগল। কিন্তু শবনমের জ্ঞান ফিরল না। সে নিথর নিষ্পন্দ হয়ে গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে রইল যেন।

অবশেষে কালরাত্রির অবসান হল। গভীর অরণ্যানির মধ্যে ভোরের বারতা নিয়ে কলতান করে উঠল বনের পাখিরা। মানুষের সুখদুঃখের কথা ওরা কি বুঝতে পারে? বোধ হয় পারে না। তাই ওদের এই চঞ্চলতায় কোথাও কোনও মলিনতা নেই। জগতের আনন্দযজ্ঞে ওরা তাই সদানন্দময়। এ ডাল থেকে ও ডালে গান গেয়ে গেয়ে নেচে বেড়াচ্ছে সব। কেউ বা মহাশূন্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। শবনমকে

ঘিরে অনেকগুলি রাতজাগা মানুষ তখন উৎকণ্ঠিত হয়ে বসে আছে। পাহাড়িয়া বস্তিতে তখন কান্নার রোল। সকলের সবক'টি ঝোপড়ি ভস্মীভূত হয়েছে। শিশু ও বৃদ্ধ সহ মোট পাঁচজন মারা গেছে আগুনে পুড়ে। সেই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখা যায় না।

পাহাড়িদের মধ্যে যারা একটু বলবান, তারা আবার শুরু করল তাদের কাজ। অর্থাৎ গাছের ডালপাতা কেটে নতুন নতুন ঝোপড়ি তৈরি করতে লেগে গেল! আবার নতুন করে বাঁচতে হবে তো।

হিংলাজসর্দারের পোষা কুকুরটাকে দেখা যাচ্ছে না। সেটাও আগুনে পুড়ে মরল নাকি? কত হাঁস মুরগি গোরু ছাগল যে পুড়ে মরেছে তার শেষ নেই। কুকুরটা কোথায় গেল কে জানে?

ওরা যখন আবার নতুন করে বাঁচার কথা ভাবছে তখন সেই শান্ত প্রকৃতির বুকে পাহাড় ও বনভূমি ভেদ করেই যেন আবির্ভূত হলেন এক তেজোময় সন্ন্যাসী। কী দারুণ সৌম্য মূর্তি তাঁর। মাথায় জটা। গলায় রুদ্রাক্ষ, পরণে লাল চেলি। এক হাতে চিমটা অপর হাতে কমণ্ডুলু। সন্ন্যাসী খালি পায়ে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে এগিয়ে এলেন, অসতো মা সদ্‌গময়ো তমসো মা জ্যোতির্গময়ো...। তারপর এই ধ্বসংস্তূপের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন। বললেন, আহারে! এমন সাজানো সংসার ছারখার করে দিল কে?

হিংলাজসর্দার লুটিয়ে পড়ল সন্ন্যাসীর পায়ে। বলল, কে আপনি প্রভু? সাধু মহাত্মা! এই গরিবের দেশে পায়ের ধুলো দিলেন? এর আগে আর তো কখনও আপনাকে দেখিনি এখানে?

সন্ন্যাসী হাসলেন। বললেন, আমাকে তোরা দেখবি কী করে? আমি তো এখানকার লোক নই। দীর্ঘ কুড়ি বছর আগে আমি এই জায়গা ছেড়ে চলে গেছি। এখন ওঙ্কার তীর্থ থেকে আসছি। পায়ে হেঁটে পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে শুধু পথ চলেছি, পথই চলেছি।

হিংলাজ বলল, এই পথ চলার শেষ হবে কোথায়?

তা তো জানি না। শুধু পথের রেখা ধরে যে দিকে দু'চোখ যায় সেদিকে চলে যাব। দু'দিন বিশ্রাম করব। ভাল লাগলে সেখানে কিছুদিন থাকব। না লাগলে একদিনও না থেকে চলে যাব।

বাঃ। বেশ মজার ব্যাপার তো। কী সুখের জীবন আপনার। কিন্তু বাবা! আপনি কি কোনও কারণেই স্থায়ী ভাবে ডেরা পাতবেন না কোথাও?

কেন পাতব না? তবে স্থায়ী ভাবে ডেরা পাতবার মতো কোনও সুযোগ সুবিধা যদি কখনও আসে বা সেরকম পরিবেশ পাই, তা হলে নিশ্চয়ই থেকে যাব। কিন্তু তোমাদের এই সুখের স্বর্গ শ্মশান হল কী করে?

অন্যান্য পাহাড়িরাও তখন ঘিরে ধরেছে সন্ন্যাসীকে। এই সন্ন্যাসীকে দেখলে বেশ বুদ্ধিমান, জ্ঞানবান, বিবেচক এবং সাধক বলেই মনে হয়। সকলে একে একে সন্ন্যাসীকে প্রণাম করে বলল, আমরা এক সন্ত্রাসের রাজত্বে বাস করছি সাধুবাবা। কী রকম!

হিন্দোলসর্দার নামে এক কুখ্যাত দস্যু আমাদের ওপর যখন তখন অত্যাচার করে। তার নৃশংস অত্যাচারের বলি কয়েকটি তাজা প্রাণ আর আমাদের এই পাতার ঘরগুলোর ভষ্মাবশেষ।

তোমরা প্রতিরোধ করতে পারনি?

আমরা নিরস্ত্র। তার ওপর ওরা অতর্কিতে আমাদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে এই কাণ্ড করেছে।

সন্ন্যাসীর দু'চোখে ক্রোধের আগুন। বললেন, তাই নাকি?

হ্যাঁ বাবা। দৈবক্রমে একটি কিশোরী হঠাৎ কোথা থেকে এখানে এসে পড়ে বন্দুক চালিয়ে ওদের বদলা নেয় বা আমাদের জীবন রক্ষা করে। ওর এক সঙ্গী কিশোরও এই অগ্নিকাণ্ডে মারা যায়। তাই কাল রাত থেকে মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।

বলো কী! কে সেই মেয়ে? কোথায় সে?

সে যে কে তা ঈশ্বরই জানেন। মানবী কি দেবী না কোনও মন্ত্রসিদ্ধ যক্ষিণী তা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। চোদ্দো-পনেরো বছরের মেয়ে। জাতিতে মুসলমান। সঙ্গে এক কিশোর। সে হল হিন্দু। একটা ট্রেন দুর্ঘটনার পর ভীষণ প্রতিজ্ঞা নিয়ে দুর্ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের বদলা নেবার উদ্দেশে এখানে এসে হাজির হয়। মজার কথা ওই কিশোরী মেয়েটি যেন হঠাৎই এক দৈবশক্তির প্রভাবে ভয়ংকরী হয়ে ওঠে। সে একাই ওই দুর্ধর্ষ ডাকাতদের প্রায় নির্মূল করে এনেছে। কৌশলে ডাকাত মেরে তাদের বন্দুক ছিনতাই করে ডাকাতদের মধ্যে মড়ক সৃষ্টি করে দিয়েছে। সে যেন এক কিশোরী ফুলনদেবী। আমরা তাকে দেবী বলি।

সন্ন্যাসী লাফিয়ে উঠলেন, জয় মা! জয় মা! এসেছে। এসেছে। এতদিন আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে।

কে এসেছে বাবা?

সে তোমরা বুঝবে না। কিন্তু আমি জানি সে কে। আমার ডাকে সাড়া দিয়ে সে এসেছে। তাকে আসতেই হবে। না হলে আমার এতদিনের সাধনা বিফল হয়ে যাবে যে।

আমরা আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।

আমি তোমাদের বুঝিয়ে দেব। ওই যে মেয়েটি ভয়ংকরী মূর্তিতে তোমাদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে, ও তো মানবী নয়। দেবী। মা ভবানী। এই পাহাড়ের এক গোপন স্থানে মা ভবানী দীর্ঘ কুড়ি বছর উপবাসী আছেন। তাই মা তাঁর রক্ত পিপাসা মেটাতে আবির্ভূতা হয়েছেন ওই কিশোরীর রূপে।

কিন্তু বাবা, আমরা হিন্দু। মা ভবানী আমাদের দেবী। ও যে মুসলমানের মেয়ে।

ওরে নির্বোধ। আমরা সবাই মায়ের সন্তান। আমাদের কি জাত আছে? না আমাদের কোনও নির্দিষ্ট ধর্ম আছে? আমাদের জাত একটাই। আমরা মানুষ। গোরু নয়, বাঁদরও নয়। তবে আমাদের অনেকের প্রকৃতির মধ্যে অবশ্য অনেক হিংস্র জানোয়ারের মিল আছে।

কিন্তু ওরা তো গোরু খায়।

ওরা তো জলও খায়! তোরা জল খাস না? সূর্যের কিরণ ওরা গায়ে মাখে। তোরা মাখিস না? যে বাতাসে ওরা শ্বাসপ্রশ্বাস নেয় সেই বাতাস তোরাও তো নিস? তার বেলা? মা যে কবে তোদের সুমতি দেবে! তা চল দেখি কোথায় তোদের সেই দেবী। আমাকে এখুনি নিয়ে চল তার কাছে।

সবাই তখন সব কাজ ফেলে সেই মহাপুরুষকে নিয়ে চলল শবনমের কাছে। সন্ন্যাসী ঠাকুর যেন এই মানুষগুলোর আশার প্রদীপ।

লালচাঁদ ও তার দলের লোকেরা এবং কয়েকজন পাহাড়ি মেয়েপুরুষ গাছতলায় বড় একটি পাথরের বুকে শায়িতা শবনমকে ঘিরে ছিল।

সন্ন্যাসীকে দেখেই সসম্ভ্রমে সরে বসল সকলে। সন্ন্যাসী তাঁর দীর্ঘ শরীর নিয়ে

বলিষ্ঠ পদক্ষেপে ছোট একটি পাথরে পা দিয়ে উঠে পড়লেন পাথরের চটানে! শবনমের তখন জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু সে বড় ক্লান্ত। বন্দুকটা ওর পাশেই শোয়ানো আছে। ও ধীরে ধীরে চোখ মেলে ফ্যাল ফ্যাল করে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল।

সন্ন্যাসী কাছে গিয়ে কমণ্ডুলু থেকে খানিকটা জল নিয়ে ওর চোখেমুখে ঝাপটা দিয়ে বললেন, এখন কেমন আছিস মা?

শবনমের ঠোঁটদুটি বারেকের তরে একবার কেঁপে উঠল। কী যেন বলতে গেল সে কিন্তু পারল না।

সন্ন্যাসী বললেন, তোর কথা আমি সব শুনেছি। একটু সুস্থ হ তুই। আমি নিজে হাতে ফুল এনে তোর পুজো করব। মালা গেঁথে তোকে পরাব। নিজে হাতে তোকে পেট ভরে খাওয়াব। তুই যে দীর্ঘদিন উপবাসী আছিস। আজ কুড়ি বছর কেউ তোকে ফুল বেলপাতা দিয়ে পুজো করেনি। আজ তোর নতুন করে অভিষেক হবে মা।

বিস্মিত শবনম ধীরে ধীরে উঠে বসল। বলল, হে যোগীরাজ! কে আপনি?

কাকে কী বলছেন? আপনি কি জানেন আমি যবনকন্যা?

তুই কি জানিস অসুর নিধনের জন্যে মা ভবানীকেও একদিন কালী হতে হয়েছিল? আমি সন্ন্যাসী। আমার যেমন জাত নেই, তুই তেমনি দেবী। তোরও কোনও জাত নেই। কী নাম তোর?

আমার নাম শবনম।

সন্ন্যাসী গগন কাঁপিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন।

আপনি হাসছেন কেন বাবা?

ওরে পাগলি। তোর নামই যে বলে দিচ্ছে তোর কোনও জাত নেই। আমার নামই বলে দিচ্ছে আমার কোনও জাত নেই?

হ্যাঁ। তোর নামের মধ্যেই যে তোর পরিচয় লুকিয়ে আছে। তোর প্রকাশ যে তোর নামেই।

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

পারবি না তো। আসলে নিজেকে বোঝবার চেষ্টা কেউ করে না। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, 'সর্ব ধর্মাণ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।' অর্থাৎ হে ব্রজবাসীগণ তোমরা ধর্ম ধর্ম করে অযথা হানাহানি না করে সর্ব ধর্ম পরিত্যাগ করে আমাকে অর্থাৎ 'আমি কৃষ্ণকে’ শরণ করো। বা নিজেকে চিন্তা করো।

তা হলে কি বলতে চান ধর্ম বলে কিছু নেই?

আছে বইকী। মানুষের কর্মই ধর্ম। তোর নাম শবনম। শবনম মানে শিশির। কিন্তু অন্য অর্থে ‘শব’ কাকে বলে জানিস?

মরা মানুষকে।

মড়ার জাত আছে?

নেই।

‘নম’ মানে?

নমো।

তা হলে কী দাঁড়াচ্ছে? তুই শব অর্থাৎ তোর কোনও জাত নেই। আর নেই বলেই তোকে নমো করছি। পুজো করব বলে।

শবনম সন্ন্যাসীর পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ল। বলল, বাবা! আজ থেকে আমি আপনার মেয়ে। আমাকে আপনার চরণে আশ্রয় দিন বাবা।

ওরে পাগলি! তোর যে এখন অনেক কাজ বাকি। অসুরনিধন করবি না? ওহে ও লালচাঁদ ! এ বেটিকে একটু বুঝিয়ে দাও। এত সহজে আশ্রয় নিলে নদী যে মজে যাবে। আরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছ কী? মেয়েটাকে কিছু খেতেটেতে দাও। আর তুমি বাবু তোমার ওই পুলিশি পোশাক ছাড়ো। ওই পোশাকে তোমাকে মানায় না। যদি পারো তো, একটু দুধ গরম করে খাওয়াও মেয়েটাকে।

হিংলাজসর্দার বলল, দুধ তো এখানে পাওয়া যাবে না। আমাদের গবাদি পশুগুলো অর্ধেক মরেছে, অর্ধেক ছাড়া পেয়ে পালিয়েছে।

সে যাই হোক। এখনই ওর কিছু খাদ্যের প্রয়োজন। ও বড় দুর্বল। আমার এক শিষ্যকে আমি অন্য কাজে লাগিয়েছি। সে একাই চেষ্টা করছে মা ভবানীর মূর্তিটাকে জঙ্গলের ভেতর থেকে উদ্ধার করতে। জঙ্গল সেখানে এত গভীর যে একা পেরে উঠবে না সে। মূর্তিটা আশা করি ওখানেই থাকবে। কেন না পাহাড়ের গুহার ভেতরে বড় পাথর কুঁদে তৈরি মূর্তি। কেউ নিয়ে যেতে পারবে না। আমি যাবার আগে ওই ছোট্ট গুহামুখ পাথর দিয়ে এঁটে গিয়েছিলাম। সেখানটা তো চেনাই যায় না। লোকটা একা আছে। আমি এসেছিলাম আরও কিছু লোকজন সংগ্রহের আশায়। এমন সময় এখানে এসে দেখি এই কাণ্ড। সত্যি! এই দীর্ঘ কুড়ি বছরে কত পরিবর্তন না হয়েছে। তুমিও অনেক পালটে গেছ লালচাঁদ। মোটা হয়েছ। কিন্তু এই বেশে এখানে যে তোমাকে আমি দেখব তা স্বপ্নেও ভাবিনি। আসলে ব্যাপার কী জানো, পাপের ভারা পূর্ণ না হলে পাপীর পতন হয় না। রাবণ বংশ একদিনে ধ্বংস হয়নি। তেমনি, সময় না হলে হাজার চেষ্টা করলেও যার সঙ্গে দেখা হবার নয়, তার দেখা পাওয়া যাবে না। তবু ভাল। দেবী আমার ডাক শুনেছেন। আজ গুহামন্দির সংস্কার করে এসো আমরা সবাই মিলে মা ভবানীর অভিষেক করি। তাড়াতাড়ি চলো সবাই।

লালচাঁদ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন সন্ন্যাসীর দিকে। সে দৃষ্টিতে যে কী

প্রচণ্ড বিস্ময় তা বলে বোঝানো যাবে না। লালচাঁদ বললেন আ-আ আপনি—! মনে করে দেখো। দীর্ঘ কুড়িটা বছর পিছিয়ে যাও লালচাঁদ। খোংগসারার জঙ্গলে ওই বিশ্বাসঘাতকের বিশ্বাসঘাতকতার বলি হয়েছিলাম আমরা। বিনা অপরাধে আমার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছিল। তোমারই সহযোগিতায় জেল-হাজত থেকে পালাতে পেরেছিলাম আমি। তুমি তোমার একমাত্র পুত্রকে হারিয়েছিলে।

আমার স্ত্রীকেও ওই শয়তানের চরেরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

তারপর থেকে কত খুঁজেছি তোমাকে। কিন্তু বৃথা চেষ্টা করেছি। এমন সময় এক সদ্গুরুর সন্ধান পাই। তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাসজীবন যাপন করছি। বেশ আছি। ছিলাম নর্মদার তীরে ওস্কার তীর্থে। হঠাৎ একদিন স্বপ্ন দেখলাম মা ভবানীকে। দেখলাম মা'র চোখে জল। মা যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছেন। সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমার এক চ্যালাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম এখানে। এসে দেখি এই সব কাণ্ড।

লালচাঁদ লাফিয়ে উঠলেন, জয় মা ভবানী। জয় জগদম্বে। কিন্তু আপনি যে এখনও বেঁচে আছেন, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি সর্দার। আপনি ওষ্কার তীর্থে, আমি খাণ্ডোয়ায়। কত কাছাকাছি। অথচ কেউ কাউকে দেখিনি এতদিন!

ওঙ্কারতীর্থে আমি কিছুদিন আগে এসেছিলাম। সেখানে থেকে তোমার সমস্ত খোঁজখবরই রাখতাম আমি। তার আগে দীর্ঘদিন ছিলাম কর্ণাটকে তুঙ্গভদ্রার তীরে।

ঠিক আছে। ওই শয়তানের কেল্লা দখল করে আপনার কেল্লা আপনারই হাতে তুলে দেব সর্দার। হিন্দোলকেল্লা হিন্দোলসর্দারেরই থাকবে। জয় হিন্দোলসর্দারের জয়। জয় মা ভবানীর জয়।

শবনম বলল, আপনিই হিন্দোলসর্দার!

হ্যাঁ মা, যে মানুষ ডাকাত ছিল, কিন্তু কখনও কোনও নিরীহ প্রাণীকে অকারণে হত্যা করেনি, আমিই সেই। ডাকাত হলেও আমি মা ভবানীর উপাসক ছিলাম। তাই বুঝি মা আমার প্রাণহানিটা ঘটতে দেননি।

তা হলে ওই লোকটা কে?

ওর নাম দুর্জন সিং। আমার দলে ছিল। ভেতরে ভেতরে ওর দলের কিছু লোককে আমার দলে ঢুকিয়ে আমার লোকেদের সরিয়ে দিয়ে আমাদের দু’জনের ওপর চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে ওই কেল্লায় সর্দার হয়ে বসে। সবাই জানে ওটা হিন্দোলসর্দারের কেল্লা। কিন্তু শয়তান দুর্জন সিং-এর কথা কেউ জানে না। আর জানে না ওর বিশ্বাসঘাতকতার কথা। নতুন যুগের মানুষরা ওই অত্যাচারীটাকেই হিন্দোলসর্দার বলে জানে। আমার নামকে কলঙ্কিত করেছে ওই শয়তানটা। পাছে কেউ চিনে ফেলে তাই মুখে কাপড় বেঁধে ডাকাতি করতে যায়। নানারকম নোংরামি করে দিনের পর দিন আমার নামে চালিয়ে যায়। সমস্ত কুকর্মের দায় আমার ঘাড়ে পড়ে। এখন ও নিজেকেই হিন্দোলসর্দার বলে প্রচার করছে।

শবনম বলল, তাতে ওর লাভ?

আমি পলাতক। আইনের চোখে আমি মারাত্মক অপরাধী। তাই সব রকমের কুকর্মের দায় আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া তো খুব সোজা। ওর পাপ আমার খাতায় দিনের পর দিন জমা হয়। আর আমি ধরা পড়বার ভয়ে সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে স্রোতের ধারার মতো গড়িয়ে বেড়াই। না পারি দল গঠন করতে, না পারি ওকে আক্রমণ করতে। শুধু জানতে পারি আমার কেল্লা দখল করে ও দারুণ মজা লুটছে।

শবনম বলল, এর কি কোনও প্রতিকার নেই?

থাকবে না কেন? তবে এখন আমি সাধনমার্গে আসার পর আমার মনের অবস্থা এমনই যে, ওই তুচ্ছ ভোগ দখলের ব্যাপারটা বা প্রতিশোধ নেবার ব্যাপারটা মন থেকে দূর হয়েছে! তবে একেবারে যে আসক্তিহীন তাও নয়।

বিশেষ করে মা ভবানীর সেবা পূজা করবার জন্যে মনটা আমার বড়ই উন্মুখ হয়ে আছে। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে এখানে কোনও মানুষের বসতি ছিল না। সেই দুর্ভেদ্য অরণ্যে দিনের আলো প্রবেশ করত না। শিবাজির পুণা দুর্গের মতো আমার কেল্লাও ছিল অপ্রতিরোধ্য। অবশ্য এখনও তাই। আসলে এখানকার প্রাকৃতিক অবস্থান সব কিছুকেই দুর্ভেদ্য করে রেখেছে।

শবনম বলল, আপনি কি পারেন না আবার স্বরূপে এখানে প্রতিষ্ঠিত হতে? কেন পারব না? সকলের সহযোগিতা পেলে নিশ্চয়ই পারব। তবে মা, আগের মতো ভোগবাসনা এখন আর নেই আমার। কিন্তু প্রতিশোধ একটা নেওয়া দরকার। তা ছাড়া ওই দুরাত্মার অত্যাচার এখুনি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। যে নারীকে আমি চিরকাল মায়ের মর্যাদা দিয়ে এসেছি, ওই পাপাত্মা তাকেও কলঙ্কিত করেছে। আমি আজকে সাধু হলেও একসময় ডাকাত ছিলাম। এখন রত্নাকর থেকে বাল্মীকি হলেও তখন আমার মধ্যে প্রচণ্ড বদ বুদ্ধি ছিল। অনেক বড় বড় ডাকাতি করেছি। আমার চিঠি নিয়ে লোক যেত। আমার চাহিদার কথা জানিয়ে দিত। পাওনা পেলে চলে আসতাম। বাধা পেলে লড়াই জমত।

কিন্তু কেন আপনি এসব করতেন বাবা?

ওরে পাগলি! কৈশোর বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে যে ছেলে পথে পথে ঘোরে, আর সামান্য একটু পেট ভরাবার তাগিদে মানুষের কাছ থেকে যে দুর্ব্যবহার পায় সে যদি কখনও বদলা নেবার সুযোগ পায়, তা হলে কেন সে বিপথগামী হবে না? তোর ফুলনদেবী আর পুতলিবাঈ কি এমনি ডাকাতনী হয়েছিল?

আপনি কী করে ডাকাতদের দলে ভিড়েছিলেন?

সে অনেক কথা। বলতে পারিস মা ভবানীর কৃপায়। এই যে তুই একটা ভাল ঘরের মেয়ে। তুই কেন খুনের নেশায় মেতে উঠেছিস? এমনিই অবস্থার ফেরে মানুষ আর মানুষ থাকে না। তবে দুর্জন সিংটা বিশ্বাসঘাতক। না হলে এই লালচাঁদও তো আমার হাতে গড়া। কই ও-তো কখনও বেইমানি করেনি। বরং আমার ফাঁসির আদেশ হবার পর ও দলবল নিয়ে এমনভাবে আমাকে পালাবার সুযোগ করে দেয় যে, ওর ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না। ওই কাজ করতে গিয়ে ও এবং দু'-একজন ছাড়া সবাই পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। এদিকে দুর্জন সিং তার লোকেদের নিয়ে কেল্লা এমনভাবে দখল করে যে তার ধারেকাছে কারও যাবার উপায় থাকে না। তা যাক। ওসব আলোচনা এখন না করাই ভাল। এখন আর বৃথা সময় নষ্ট না করে চলো সবাই মা ভবানীর গুহামন্দির সংস্কারের কাজে যাই।

সবাই তখন ‘জয় হিন্দোল সর্দারের জয়' বলে কোদাল, কুণ্ডুল, গাঁইতি নিয়ে সন্ন্যাসীর সঙ্গে এগিয়ে চলল।

লালচাঁদ তাঁর কয়েকজন লোককে হিন্দোলকেল্লার দিকে নজর রাখতে বলে দু’জনের কানে কানে ফিস ফিস করে কী যেন বলতেই তারা চলে গেল সম্পূর্ণ অন্যদিকে।

পাহাড়িদের মনে এখন দারুণ আনন্দের জোয়ার। তাদের একঘেয়ে কর্মময় ক্রীতদাসের মতো যাপন করা জীবনে যেন নবসূর্যোদয়। ওরা হই হই করে এক জায়গায় গিয়ে দেখল সাধুবাবার একজন লোক জঙ্গলের গভীরে পাহাড়ের ত্রিকোণাকৃতি একটি অংশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

সাধু বললেন, ওই সেই স্থান। যেখানে আছে ছোট্ট একটি গুহামুখ। সংকীর্ণ একটু অংশের মধ্য দিয়ে মাত্র দু’ ফুট ফাঁক। সেটিকে অতিক্রম করতে পারলে মা ভবানীর গুহায় প্রবেশ করা যাবে।

হিংলাজসর্দার বলল, কিন্তু বাবা, গুহার মুখ কোনখানে? আমরা তো বুঝতেই পারছি না।

কী করে পারবি? সে মুখ আমি বুজিয়ে দিয়ে গেছি। তোদের কাছে গেলাম তবে কী জন্যে? ওই মুখ আজ এখুনি খুলব। নে, এখন তোরা এই জায়গাটার জঙ্গল সাফ কর।

সবাই একবার তাকিয়ে দেখল শবনমের দিকে।

শবনম বলল, দেখবার কিছু নেই। কাটো। প্রয়োজনে অনেক কিছুই করবে! কিন্তু অপ্রয়োজনে কিছুই করবে না। তবে এক কাজ করো। সামনের দিকটা জঙ্গল রেখে একেবারে গুহামুখের দিক থেকে চার হাত মাপ করে কাটো।

এগুলো অবশ্য ভাল গাছের জঙ্গল নয়। বড় বড় চিহড়লতায় ঘনান্ধকার করে ঢাকা। আগাছা, কাঁটাবন ও বনতুলসির ঝাড়।

সাধুবাবা বললেন, জঙ্গলের গাছপালার ওপর তোর খুব মমতা দেখছি। হ্যাঁ বাবা। একটা গাছের ডাল কাটলে আমার মনে হয় কেউ যেন আমার একটা হাতই কেটে নিচ্ছে।

কোদাল, কুড়ুল, গাঁইতির ব্যবহারে মিনিট কয়েকের মধ্যেই বুনো ঝোপগুলো সাফ হয়ে গেল। ওগুলোকে এমনভাবে কাটা হল যাতে করে হঠাৎ কেউ এসে পড়লে বাইরের জঙ্গল দেখেই বুঝতে পারবে না এর ভেতরে এমন পরিষ্কার

পাঁচ

জায়গা আছে। জঙ্গল পরিষ্কারের সময় দু’-একটা খরগোশ গর্তর ভেতর দিয়ে লাফিয়ে পালাল। একটা বিষাক্ত সাপ ফাটল থেকে বেরিয়ে ফোঁস করে উঠতেই হিংলাজসর্দারের গাঁইতির ঘায়ে শেষ হয়ে গেল সেটা।

সাধুবাবা বললেন, ভুল করলি বেটা। এমনিভাবে কোনও নিরীহ প্রাণীকে মারে না কেউ। ওকে কিছু না বললে ও এমনিই পালিয়ে যেত। যাক, এখন ওই পাথরের খাঁজে খাঁজে চাড় দে।

সবাই মিলে গাঁইতির চাড় দিতেই এক এক করে সাজানো পাথর খসে খসে পড়তে লাগল। শাবলের ঘা আর গাঁইতির চাড়। কিছু সময়ের মধ্যেই অপরিসর একটি মানুষপ্রমাণ পাহাড়ের খাঁজ ফাঁকা হয়ে গেল।

সাধু বললেন, জয় মা ভবানী। এবার চলো সব এক এক করে ঢুকে দেখি আমার মা কী অবস্থায় আছে। তবে এখুনি সবাই নয়। আগে আমি আর এই জ্যান্ত ভবানী ভেতরে ঢুকব।

শবনম সাধুবাবার হাত টেনে ধরে বলল, একটু অপেক্ষা করুন বাবা। এখুনি ঢুকবেন না।

ভয় কীরে পাগলি?

ভয় আছে বইকী। কুড়ি বছরের বদ্ধ গুহা আলো-বাতাসের সংস্পর্শে না থাকায় এর ভেতরে একটা বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হয়ে আছে। এখন যে ঢুকবে সেই মরবে। সাধুবাবা বললেন, তুই ঠিক বলেছিস তো। এই সহজ কথাটা আমার মাথায় আসেনি। অক্সিজেনের অভাবে এর ভেতরটা যে কী হয়ে আছে তা কে জানে? এই বদ্ধ গুহায় ঢুকলেই এখন মৃত্যু।

তার প্রমাণ অবশ্য হাতে হাতেই পাওয়া গেল।

গুহামুখ অর্গলমুক্ত হওয়ার ফলে গুহার ভেতর থেকে একটা গরম ভাপানি যেন ভক ভক করে বেরিয়ে আসতে লাগল। ভেতরটা যত অক্সিজেনে ভরতে লাগল, বাইরের শীতল বাতাস ততই ঢুকতে লাগল হু হু করে।

সাধুবাবা হিংলাজকে বলেন, কাছেই একটা ছোট্ট ঝরনা ছিল। সেটা শুকিয়ে গেছে কি?

না বাবা, ঝরনার মিঠা পানি খেয়েই তো আমরা বেঁচে আছি।

তা হলে যাও। তোমাদের বস্তি থেকে কয়েকটা বালতি নিয়ে একটু ঝরনার জল এনে জায়গাটা ধুয়েমুছে দাও। আর কাউকে পাঠিয়ে দাও কোথাও থেকে পাহাড়ি গাছ-গাছড়ার ফুল নিয়ে আসতে। কিছু বেলপাতাও নিয়ে এসো। এখানে অনেক বেলগাছ আমি বসিয়েছিলাম। সে সব গাছ এখনও আছে দেখছি। যাও দেরি কোরো না। মায়ের থান পরিষ্কার করতে হবে। মাকে ঝরনার জল দিয়ে স্নান করাতে হবে।

শবনম বলল, একটু আলোর ব্যবস্থাও তো করতে হবে। অনেকগুলো মশাল পড়ে আছে আশপাশে।

হিংলাজ বলল, সব ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি।

প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সবকিছুর ব্যবস্থা হয়ে গেল। পাহাড়ি ললনারা প্রচুর ফুল বেলপাতা সংগ্রহ করল। বেশির ভাগই আকন্দ, কলকে, করবী, জুঁই ও গুলঞ্চ। সাধুরই সযত্নে বসিয়ে যাওয়া গাছেরা বংশানুক্রমে ফুল দিয়ে যাচ্ছে। তবে এই ফুল এতদিন শুকিয়ে মাটিতে ঝরছিল। এখন মালা হয়ে দেবীর গলায় দুলবে।

মশাল হাতে নিয়ে সাধু শবনমের একটি হাত ধরে ভেতরে ঢুকলেন। লালচাঁদও ঢুকল ভেতরে। বাকিরা রইল প্রতীক্ষায়।

সাধু ভেতরে ঢুকেই দেখলেন মা ভবানী যেখানকার সেখানেই প্রতিষ্ঠিতা আছেন। শুধু চারদিক মাকড়সার জালে ভরে আছে।

সেটুকু পরিষ্কার করতে আর কতক্ষণ?

পাহাড়িরা বালতি বালতি জল এনে দিতে লাগল। সাধু শবনমকে বললেন, ঢাল বেটি দেবীর মাথায়।

কিন্তু বাবা !

আরে! আমি তো বলছি। আজই তোকে আমি দীক্ষা দেব। এমন ধর্মে দীক্ষা, যে ধর্মে কোনও হিন্দু-মুসলমানে ভেদাভেদ নেই। তুই মাকে স্নান করাবি, গা মুছিয়ে দিবি। তোর হাতে গাঁথা মালা যখন মা ভবানীর গলায় দুলবে তখন ত্রিলোক পর্যন্ত দুলে উঠবে। হিন্দু-মুসলমানের কোনও ভেদাভেদ থাকবে না। জয় মা ভবানী। নে ঢাল দেবীর মাথায় জলের ধারা।

আনন্দের আবেগে শবনমের দু'চোখে যেন জল এসে গেল। আজ এই চরম সুখের মুহূর্তটিতে ওর বড় বেশি করে মনে পড়ল রঞ্জনের কথা। ওই সুস্থ সুন্দর সুদর্শন কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা ও এখনও ভুলতে পারছে না। আজ যদি রঞ্জন ওর পাশে থাকত। ওর বুক ভরে উঠত এক অনাস্বাদিত সুখে। ওর বাবা-মা জানেনও না তাদের অতি আদরের ছেলেটির এই নিঠুর নিয়তির কথা। ‘তার’ পেয়ে তাঁরা এখনও কত নিশ্চিন্তে আছেন। কিন্তু যখন দিনের পর দিন যাবে, অথচ ঘরের ছেলে ঘরে ফিরবে না, তখন কী যে করবেন তাঁরা? তা কেই বা জানে? রঞ্জনের ঠিকানাও জানে না শবনম, যে খবর দেবে। কিন্তু কী খবরই বা দেবে? ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে কি ওই নামের কোনও নিরুদ্দিষ্ট ছেলের বাবা-মা'র খোঁজ নিয়ে তাঁদের কাছে গিয়ে বলবে ‘আমি এক ভাগ্যহীনা কিশোরী, আমার জেদের বলি হয়ে আপনাদের ছেলেকে কিছু নরপিশাচের পৈশাচিক কর্মের জন্য অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে।' রঞ্জনের কথা মনে হতেই হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল শবনম। সাধুবাবা বললেন, কী হল! হঠাৎ এত কান্না এল কেন?

আমি আর পারছি না বাবা। এখন আমার মৃত্যু হলেই ভাল হয়। মৃত্যু অমোঘ। তাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। অযথা ওইসব ভেবে মন খারাপ করিস না।

কিন্তু রঞ্জনকে যে আমি ভুলতে পারছি না বাবা।

ভুলতেই হবে মা। এই জন্যে তোর চোখে জল? তাকা একবার আমার মুখের দিকে। মা’র ছেলে মা'র কাছে গেছে। এই জন্যে তুই কাঁদবি কেন?

ওকে যে আমার জন্যেই যেতে হল বাবা।

কেউ কারও জন্যেই যায় না। যে যার নিজের ভবিতব্যে যায়। আসলে তোর চোখ দেখে আমি বুঝতে পারছি তুই ওকে ঘিরে অন্য স্বপ্ন দেখেছিলি। কিন্তু মা ! তুই যে ভবানীর মেয়ে। তোকে যে তাঁর কাজ করতে হবে। ও সুখ তোর সইবে কেন? সেইজন্যেই একে একে তোর সব বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। মা গেছেন, বাবা গেছেন। তোর কিশোর বন্ধুটিও গেল। এই তো ভাল হল রে। কারও জন্যে আর চিন্তা-ভাবনা রইল না। এখন প্রাণ ভরে মাকে ডাক।

শবনম তবুও কান্না থামাতে পারল না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলল।

ওরে এক কূল হারিয়ে তবে মানুষ আর এক কূল পায়। তোর তো একূল ওকূল দু'কূল যায়নি। এই দেখ তোর ওপার ভেসে গেছে, এপারে আমি আছি। আমরা আছি। সময়ের ব্যবধানে সব ভুলে যাবি। নে আর দেরি করিস না। জল ঢাল মায়ের মাথায়।

সাধুবাবা অতীতে ডাকাত হলেও এখন তো সাধু। তাই সাধুজনচিত ব্যবহার তাঁর। তা ছাড়া ডাকাত থাকার সময়েও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে মা ভবানীর পুজো করতেন। বললেন, ওরে মায়ের ওপর ভরসা রাখ। আমি ভরসা রেখেছিলাম বলেই না আজ আবার নতুন করে মাকে ফিরে পেলাম, সবাইকে ফিরে পেলাম।

শবনম চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল। তারপর দেবী ভবানীর মূর্তির মাথায় জল ঢালতে লাগল বালতি বালতি।

পাহাড়িরা দু’-একটা ঝাড়ু এনেছিল।

লালচাঁদ ও সাধুবাবা ঝাড়ু নিয়ে নিজেরাই লেগে পড়লেন ঝাঁটপাট দিতে। আসলে বাইরেটা বন্ধ থাকায় সামান্য একটু ধুলোর আস্তরণ ছাড়া আবর্জনা বিশেষ কিছু জমতে পারেনি। তবে কাঁকড়া বিছের একটা আড়ত হয়েছিল। ঝাঁটার খোঁচায় আর জলের ধারায় পালিয়ে গেল সব।

ধোয়ামোছা শেষ হবার পর সবাই চলল ঝরনার জলে স্নান করতে।

একে একে স্নান-পর্ব শেষ হতেই শুরু হল দেবীর আরাধনা। সাধুবাবা জোরে জোরে মন্ত্র উচ্চারণ করে পূজা করতে লাগলেন। কাঁসর, ঘণ্টা, কোশাকুশি, কমণ্ডুলু, চন্দনপিড়ি, চন্দনকাঠ সবই ছিল, আর ছিল নৈবেদ্য রাখবার বড় বড় রুপোর থালা। ফল কাটবার জন্য বঁটি, কাটারি, কুড়ুনি সব। লোহার জিনিসগুলোয় তাদের ধর্মে জং ধরেছে। যাই হোক, গাছের পেঁপে, কলা, পেয়ারা আর কাঁচা পাকা বেল দিয়ে নৈবেদ্য সাজাল শবনম। সাধুবাবা খুঁজে পেতে তাঁর পরিচিত নির্দিষ্ট স্থান থেকে সরাল নামে একপ্রকার সুস্বাদু কন্দ তুলে নিয়ে এলেন। ব্যস শুরু হল ভোগের ব্যবস্থা।

সাধুর বজ্রগভীর অথচ সুললিত কণ্ঠস্বরের মন্ত্রধ্বনিতে ও ঘণ্টার শব্দে জায়গাটার পরিবেশই যেন পালটে গেল। সাধু মা ভবানীর কণ্ঠে বেশ মোটা করে গাঁথা জবার মালা, বেলপাতার মালা, লঞ্চের মালা ও কলকে ফুলের মালা পরিয়ে একটি গুলঞ্চের মালা শবনমের গলাতে পরিয়ে দিলেন। তারপর এক হাতে দেবীকে ও অপর হাতে শবনমকে পুজো করতে লাগলেন। শবনমের তপ্তকাঞ্চনবর্ণ কপাল রক্তচন্দনে রাঙিয়ে শিঙায় ফুঁ দিলেন। তারপর বললেন, ওরে হতভাগী! মায়ের পদতলে তোর ওই বন্দুকটা আগে রাখ। রেখে প্রণাম কর। তোর এখন পুনর্জন্ম হল। তুই এখন বিশ্বমাতার কন্যা হলি। আদিপুরুষের নাম ধর্ম নিরঞ্জন, ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর পুত্র তিনজন। সেই নিরঞ্জনই তোর পিতা-মাতা হল। তিনি হিন্দু-মুসলমান সবকিছুর ঊর্ধ্বে। অলখ-নিরঞ্জন। তাঁর কোনও ভেদাভেদ নেই। তাঁর কোনও জাত নেই।

শবনমের দু'চোখে জলের ধারা। সাধুর কথায় বন্দুকটা দেবীর পদতলে রেখে প্রণাম করল।

সাধু বললেন, এই সেই অভিশপ্ত ও মন্ত্রঃপূত বন্দুক। দেবীর ইচ্ছায় তোর হাতে এসে পড়েছিল। এখন যার জিনিস তার কাছে ফিরিয়ে দে। এই বন্দুকের নলে যে শক্তির উৎস, তাকে ওরা অন্য কাজে লাগিয়েছিল। তাই সেই অস্ত্রে ওরাই মরল। এখন তুই বুঝছিস তো পাগলি, কীসের প্রভাবে তুই একটা সাধারণ মেয়ে অসাধারণ হয়ে উঠেছিলি?

বুঝলাম।

এখন এই অস্ত্রে ওদের সব কটাকে নিধন করতে হবে। আগে মা ভবানীকে বল-

কী বলব?

কী বলবি? তাই তো রে! কী বলবি বল তো? হ্যাঁ হ্যাঁ। বল, মা আজ থেকে আমার কোনও জাত নেই, ধর্ম নেই। আমি ভীষণ প্রতিজ্ঞা করে তোমারই হলাম। শবনম তাই বলল।

বল, যে ধর্ম মানুষকে মানুষ বলে বিচার করে আমি সেই ধর্মে আজ দীক্ষা নিলাম।

সাধুর কথার সঙ্গে সঙ্গে শবনমের ঠোঁটও নড়তে লাগল।

সাধু বললেন, আমি তোকে দেবী বলেই ডাকব। তুই আমাদের মা ভবানী। আর একটা কথা, এখন তো তোর নতুন জাত। তুই নতুন ধর্ম গ্রহণ করছিস। এখন থেকে আর তুই কখনও মাছ-মাংস খাবি না। যদিও আমাদের ধর্মে ও সব নিষিদ্ধ নয়, তবুও তুই একটু নতুন করে বেঁচে ওঠ দেখি?

শবনম বলল, আপনি যা বলবেন, আমি তাই করব বাবা।

গুহার বাইরে তখন পাহাড়িরা আনন্দে নৃত্য শুরু করে দিয়েছে। শবনম নিজে

হাতে কাঁচা শালপাতায় করে মা ভবানীর প্রসাদ সকলকে বিতরণ করতে লাগল। কর্মক্লান্ত ক্ষুধার্ত মানুষগুলো গোগ্রাসে খেতে লাগল দেবীর প্রসাদ। নানারকম ফলের সঙ্গে সেই সুস্বাদু কন্দে সকলের ক্ষুধাতৃষ্ণা দূর হল। ক্ষুধাকে জয় করার এবং দীর্ঘ মেয়াদি পরিতৃপ্তির এক অত্যাশ্চর্য উপাদান আছে কন্দমূলে। শবনম নিজেও খেল। সাধুও খেলেন।

সাধু বললেন, আজ এইভাবেই শুরু হল। কাল থেকে মায়ের পুজো আরও বেশি করে জাঁকিয়ে হবে। বড় বড় কড়াইতে করে ভোগ রান্না হবে মায়ের। খিচুড়ি ভোগ। রাত্রিবেলা হালুয়া পুরি। সেই ভোগের প্রসাদ আমরা সবাই পেট ভরে এক পংক্তিতে বসে খাব। আর আমাদের এই মা ভবানী সবাইকে তা পরিবেশন করবে।

লালচাঁদ হেসে বললেন, কিন্তু কালকের মধ্যে অত সরঞ্জাম সংগ্রহ করে উঠতে পারবেন?

কেন পারব না লালচাঁদ? তুমি কি এখনও বিশ্বাস করতে পারছ না, আজ রাতের মধ্যেই আমরা আবার আমাদের কেল্লা দখল করব বলে?

লালচাঁদ হাসলেন। বললেন, ও হ্যাঁ। ভুলে গিয়েছিলাম। আজই তো আমরা কেল্লা দখল করছি। আর ওই কেল্লার ভেতর তো আমাদের সবকিছুই আছে। অবশ্য যদি ও সবকিছু রেখে থাকে।

রাখবে রাখবে। ওদের নিজেদের ব্যবহারের প্রয়োজনেই ওরা রাখবে বা রেখেছে। না রাখলে অত লোকের ভোজনপর্ব চলছে কী করে? সাধু বললেন, আজ রাতের অন্ধকারে শয়তান দুর্জন সিং ভূত দেখবে।

শবনম বলল, শুধু দুর্জন সিং নয়। ওই মংঘীরামকেও ভূত দেখাতে হবে। বিক্রমের কথা যদি সত্যি হয়, তা হলে তো ওই মংঘীরামের জন্যই আমার আব্বাজানকে হারিয়েছি আমি। তা ছাড়া ও আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

লালচাঁদ বললেন, সবই তো হল। কিন্তু ওই কেল্লায় আপনি প্রবেশ করবেন কী করে?

সাধু হাসলেন। বললেন, সেই গোপন পথের সন্ধান তোমরা কেউ জানতে না। আজ জানবে। ওই মহা শয়তান দুর্জনও জানে না। তোমার লোকেদের বলবে সামনের দিক দিয়ে দুম দাম গুলিগালা ছুড়ে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। আর সেই সুযোগে...।

সেই সুযোগে?

আমরা পিলপিল করে গোপন পথ দিয়ে ভেতরে ডুকব। আজ থেকেই ওই কেল্লায় আমাদের বিজয়পতাকা উড়বে। আজ রাত থেকে ওই কেল্লা আর দস্যুপুরী থাকবে না। আমরা ওর ভেতরে যেখানে যত বন্দি আছে সবাইকে মুক্তি দিয়ে দেব। আর কাল প্রভাতসূর্যের সঙ্গে সঙ্গে তোমরা তোমাদের ওইসব জঘন্য পোশাকপরিচ্ছদ ত্যাগ করে গেরুয়া পরবে।

আমরা কি তা হলে দস্যুবৃত্তি ছেড়ে দেব সর্দার?

হ্যাঁ। কী হবে মানুষ খুন করে? এত খুনজখম তো করলে জীবনে, শান্তি পেলে কি? ওই কেল্লা দখল করতে পারলে আমাদের কোনও অভাব থাকবে না। তখন মা ভবানীর সেবা-পূজা করে সুখেশান্তিতে থাকতে পারব আমরা। এই কেল্লার নাম হবে ভবানী মন্দির।

লালচাঁদ বললেন, যা আপনি বলবেন তাই হবে সর্দার। তবে অদ্যই হোক আমাদের মানুষ মারার শেষ রজনী।

এমন সময় একজন লোক এসে লালচাঁদের কানে ফিস ফিস করে কী যেন বলতেই লালচাঁদ চোখ লাল করে দূরের দিকে তাকালেন। তারপর কাউকে কোনও কথা না বলে হন হন করে এগিয়ে গেলেন লোকটির সঙ্গে।

বেশ কিছু দূর যাবার পর এক নৃশংস দৃশ্য দেখতে পেলেন লালচাঁদ। সে দৃশ্য বড় মর্মান্তিক এবং রোমহর্ষক। দেখেন একজন লোকের দু'চোখ অন্ধ করে তাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। চোখদুটো খুবলে বার করে নেওয়ায় রক্তে ভেসে যাচ্ছে সারা শরীর। মুখ দেখে তাকে আর চেনবার উপায় নেই সে কে। লালচাঁদ বললেন, কে তুমি?

আমি যোগীন্দর।

যোগীন্দর! তোমার এই অবস্থা কে করল?

জানি না। আমি কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই কে যেন পিছন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার চোখদুটো খুবলে বার করে নিল। তারপর এইভাবে বেঁধে রাখল আমাকে। আমি কত বললাম ওকে, এ শাস্তি আমার প্রাপ্য নয়। আমাকে একেবারে মেরে ফেলো। কিন্তু সে কথা ও কিছুতেই শুনল না।

তোমার পরিচয়?

এমন সময় ঝোপের আড়াল থেকে যে বেরিয়ে এল তাকে দেখেই চমকে উঠলেন লালচাঁদ, এ কী বিক্রম! তুমি এখানে?

এই শয়তানটার পরিচয় দেব বলে লুকিয়ে বসেছিলাম।

ওর এই দশা কে করেছে? তুমি?

হ্যাঁ। আমাকে হত্যা করবার জন্য এই লোকটাকে কাজে লাগিয়েছিল শয়তানটা। অবশ্য এতটা নির্দয় আমি হতাম না ওর ওপর, যদি না ও আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করত।

কীরকম বিশ্বাসঘাতকতা?

আমি ওকে চিনে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই সাবধান করে দিই এবং বলি ওকেও আমার মতো দলত্যাগী হতে। ও প্রথমটা রাজি হয়নি। পরে অবশ্য অনেক বোঝাতে রাজি হয়। কিন্তু তখন বুঝিনি ওর এই রাজি হওয়াটা অভিনয় ছাড়া কিছু নয়। আমি ওকে বিশ্বাস করে সঙ্গে নিয়ে পথ চলছি এমন সময় দেখি পাহাড়ি বস্তির হিংলাজসর্দারের পোষা কুকুরটা ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে ছুটতে ছুটতে কী একটা যেন মুখে নিয়ে বস্তির দিকে যাচ্ছে। আমি যেই সেদিকে তাকিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়েছি, অমনি শয়তানটা আমাকে পিছন দিক থেকে ধাক্কা মেরে পাহাড়ের খাদে ফেলে দেয়।

তারপর?

ভগবান রক্ষে যে পড়ে গিয়েও একটা শক্ত মোটা চিহড়লতাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে গেলাম। আমার চিৎকার শুনে এবং পড়ে যাওয়া দেখে ও ধরেই নিয়েছিল আমি খাদে পড়ে মরে গেছি। কিন্তু আমি যে নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়ে আবার ওকে ফলো করব, তা ও ভাবতেও পারেনি। এই শয়তানটা চিরকাল নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন করে তাদের চোখ খুবলে নিত। তাই আমিও ওর অস্তিমসময়ে আমার নিজস্ব আদালতের বিচারে ওকে ওই শাস্তিই দিলাম।

ঠিক করেছ।

লালচাঁদ এবার লোকটির কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর চুলের মুঠি ধরে বললেন, বিক্রম যা বলল তা ঠিক?

লোকটি নীরব।

তোমার নীরবতাই জানিয়ে দিচ্ছে ওর কথাই সত্য। যাক। তোমার উপযুক্ত শাস্তি তুমি পেয়েছ। এখন তোমার নিয়তিই তোমার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেবে। এখন তুমি পাহাড় থেকে পড়ে মরবে কি পুলিশের গুলি খাবে সেটা নির্ভর করবে তোমার ভবিতব্যের ওপর। বলে একজনকে বললেন, দে, এর বাঁধনটা খুলে দে।

একজন লোক বাঁধন খুলে দিল।

বাঁধন খুলে দিতেই দু'হাতে চোখ ঢেকে সেখানেই বসে পড়ল লোকটি। লালচাঁদ, বিক্রমজিৎ এবং তাঁর অনুচরকে সঙ্গে নিয়ে আবার যথাস্থানে ফিরে এলেন।

হিংলাজসর্দারের পোষা কুকুরটা আসায় সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। সবচেয়ে বিস্ময়কর যেটা হল, তাতে সবাই একটা আশার আলো দেখতে পেল। ওই অগ্নিকাণ্ডর পর থেকে কুকুরটা নিখোঁজ হওয়ায় সবাই প্রায় ধরেই নিয়েছিল ওটা পুড়ে মরেছে। কিন্তু তার এই সুস্থ শরীরে ফিরে আসা এবং তার এই মুখের বস্তুটি চমক লাগিয়ে দিল সকলকে।

কুকুরটা ফিরে এসেই শবনমের পায়ের কাছে কী যেন একটা রেখে কুঁই কুঁই করে ছটফট করতে লাগল।

কী ওটা? কী রাখল?

শবনম সেটা কুড়িয়ে নিয়েই চেঁচিয়ে উঠল, কোথায়? কোথায় পেলি এটা? আমাকে তুই নিয়ে চল সেখানে। আমার বন্দুক! বন্দুকটা কেউ আমাকে এনে দাও। মা ভবানীর মন্ত্রপূত বন্দুক। যার নিশানা ব্যর্থ হবার নয়।

সাধু বললেন, কী হল মা! ওটা কী? কী পেয়ে তুই এমন উত্তেজিত হয়ে উঠলি? আমাকে বল?

সে মরেনি বাবা। সে নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। কেউ কোথাও লুকিয়ে রেখেছে তাকে। এই দেখুন তার রুমাল। এই রুমাল মুখে নিয়ে ও যখন আমার কাছে এসেছে, আর বারে বারে ছটফট করছে, তখন ও নিশ্চয়ই জানে সে কোথায় আছে। আমি এখনি তার খোঁজে যেতে চাই। আর দেরি করলে হয়তো তার আরও বিপদ হবে।

সাধু ডাকলেন, লালচাঁদ !

বলুন সর্দার।

একে মদত করো। তুমিও সঙ্গে যাও। পারলে সঙ্গে নাও আরও দু’-একজনকে। আমি এদিকটা দেখছি। তুমি ওদিকে দেখো। দেবীকে একা ছাড়া ঠিক হবে না।

লালচাঁদ তক্ষনি তাঁর দলের সবাইকে ডেকে নিলেন। দু’জন রইল দুর্গ পাহারায়। আর রইল পাহাড়িয়া মানুষগুলো। ওরা এমনভাবে দুর্গ ঘিরে রইল যাতে ওদিক থেকে কেউ গুলিগালা ছুড়লে এদিকের কারও গায়ে না লাগে, আবার ওদিকের দুর্গ থেকেও কেউ বেরোতে গেলে এদিকের গুলির মুখে পড়ে। এই অবরোধ এমনই যে দুর্গ থেকে বেরোতে না পারলে খাদ্য এবং পানীয় জলের অভাবে তিল তিল করে শুকিয়ে মরবে ওরা। ঘুঘুরা এখন নিজেদের ফাঁদে নিজেরাই পড়েছে।

শবনম, লালচাঁদ, বিক্রমজিৎ তিনজনে তিনটে ঘোড়ায় চেপে বসল। বাকিরা চলশ পদব্রজে। সবার আগে চলল কুকুরটা। আর কুকুরের নির্দেশিত পথে ওরা সকলে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল এবং বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হল।

পাহাড়ের ঢালু পথে নামতে নামতে ভীষণ জঙ্গল পার হয়ে একসময় ওরা এক প্রাসাদোপম বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।

দরোয়ান পাহারা দিচ্ছিল গেটে।

বিক্রম ওর কাছে গিয়ে বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে বলল, দরোয়াজা খুলো।

দরোয়ান বলল, হুকুম নেহি।

শবনম বলল, না খুললে বিপদ হবে। খোলো দরোয়াজা।

দরোয়ান বলল, শেঠজি হামকো নোকরি সে নিকাল দেগা।

লালচাঁদ বললেন, দরজা না খুললে আমরাও তোমাকে জিন্দগি থেকে নিকাল দেব।

দরোয়ানটি সঙ্গে সঙ্গে একটা কলিংবেলের সুইচ টিপে দিতেই চারদিক থেকে

বিপজ্জনক ঘণ্টি বাজতে শুরু করল।

বিক্রমের বন্দুক গর্জন করে উঠল ‘গুডুম'।

রক্তাক্ত কলেবরে লুটিয়ে পড়ল দরোয়ান।

ওরা এবার নিজেরাই দরোয়ানের পকেট থেকে চাবি নিয়ে গেট খুলে ফেলল।

তারপর হই হই করে ঢুকে পড়ল ভেতরে। আর ঢোকা মাত্রই দেখল দশ-বারোজন যোদ্ধা স্টেনগান উঁচিয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে ওদের জন্য।

এরা ঢুকতেই ওরা বলল, জলদি বাহার নিকালো। নেহি তো...।

লালচাঁদ বললেন, ও লেড়কা কাঁহা হ্যায়?

শবনম বলল, কাঁহা হ্যায় ও লেড়কা?

কাঁহা হ্যায় দেখোগে? বলার সঙ্গে সঙ্গেই ওরা গুলি চালানো শুরু করল।

বিক্রম, লালচাঁদ এবং শবনম তিনজনেই ছিটকে পড়ল গুলি খেয়ে। ঘোড়াগুলো প্রচণ্ড আর্তনাদ করে শূন্যে দু'পা তুলে লাফিয়ে উঠল একবার। আর সঙ্গে সঙ্গেই লালচাঁদের লোকেরা উঁচু পাঁচলের ওপর থেকে গুলির পর গুলি চালিয়ে সেই আক্রমণকারীদের সব কটাকে মাটিতে লুটিয়ে দিল। তারপর পাঁচিল থেকে লাফিয়ে পড়ে মেন গেটটা বন্ধ করে দিল একেবারে। লাফ দিয়ে ছুটে এসে বিক্রম, লালচাঁদ আর শবনমকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বারান্দার নীচে শোয়াল।

বিক্রমের বুক গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। ওর আর বাঁচার আশা নেই। ।

লালচাঁদও গুরুতর রকমের জখম হয়েছেন শবনমের বাঁ কাঁধে গুলি লেগেছে।

অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে সকলে।

শবনম এক হাতে ওর বাঁ কাঁধটা চেপে ধরেছে। ঝর ঝর করে লাল রক্ত ঝরে পড়ছে সেখান দিয়ে। যন্ত্রণা এত প্রবল যে মনে হচ্ছে এখুনি হার্টফেল করবে বুঝি। গায়ে যেন জ্বর আসছে। এই অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকা ঠিক নয়। এখুনি গুলি বার করতে না পারলে পরে ভয়ানক ক্ষতি হয়ে যাবে। তখন আর কোনও কিছু করাই সম্ভব হবে না।

একজন লোক লালচাঁদকে ঘোড়ায় তুলে সঙ্গে সঙ্গেই স্থান ত্যাগ করল। যদি কোনও ডাক্তারের কাছে গিয়ে অস্ত্রোপচার করে কোনওরকমে মানুষটাকে বাঁচানো যায়।

আর একজন শবনমকে বলল, চলুন দেবীজি। আপনারও গা থেকে ওই বুলেটগুলো বার করা দরকার। না হলে খারাপ হয়ে যাবে। কোনও ডাক্তারখানায় গিয়ে ওগুলো বার করে দু’–একটা সুইটুই নিয়ে নেবেন।

শবনম বলল, আগে যে কাজে এসেছি সেই কাজ করি। তোমরা সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে দেখো কোথায় লুকিয়েছে ওরা ছেলেটাকে।

এই ডামাডোলের মধ্যে ওরা কেউ নজরই দেয়নি কুকুরটার দিকে। কুকুরটা তখন উঠোনময় ছুটোছুটি করে এক জায়গায় গিয়ে প্রচণ্ড রকমের চিৎকার করতে লাগল। ঘেউ ঘেউ ঘেউ ঘেউ ঘেউ ঘেউ–উ–উ–উ।

শবনম সেই অবস্থাতেই ছুটে গেল সেখানে। গিয়ে দেখল একটা আংটাওয়ালা কাঠের ডালা উঠোনের এক প্রান্তে নীচের একটি গর্তমুখে ঢাকা দেওয়া আছে। বলল, নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনও গোপন ঘর বা ওই জাতীয় কিছু আছে। আমার মন বলছে এখানেই আছে রঞ্জন।

একজন লোক শবনমকে সরিয়ে এনে এক জায়গায় বসাল। বলল, আপনি আহত। বেশি পরিশ্রম করবেন না বা উত্তেজিত হবেন না। আমরা দেখছি ওর ভিতরে কী আছে না আছে।

শবনম বলল, আমিও নামব ওর ভেতরে।

তা হলে আমাে রক্ষা করবে কে? সবাই গেলে কি হয়? এই বলে দু’জন লোক সেই ডালা তুলে যেই না ভেতরে নামতে যাবে অমনি দোতলার বারান্দা থেকে দুটো বুলেট যেন হাওয়ায় ছিটকে এসে শেষ করে দিল দু'জনকে।

বাকি দু’জন তখন একটু নিরাপদ দূরত্ব থেকে সেই বারান্দা লক্ষ্য করে গুলি ছোটাতে লাগল।

একজন চেঁচিয়ে বলল, দেবীজি! তুম হঠ যাও হিয়াসে। ইয়ে আদমি বহুত খতরনক হ্যায়। তুম আভি কোঈ ডাক্তারকা পাশ চলা যাও। নেহি তো বহুত দের হো যায়গা।

শবনম একটু সময় কী যেন ভাবল। তারপর লাফিয়ে বসল একটা ঘোড়ার পিঠে।

ওদিক থেকে হঠাৎ একজন চিৎকার করে উঠল, ইধার মাত আও দেবীজি। ও শয়তানকা বাচ্চা উপর সে গোলি চালায়গা।

শবনম তখন আবার সেই আগের মতো প্রেতিনী হয়ে উঠল। বাঁ কাঁধের যন্ত্রণার কষ্ট ভুলে বন্দুকটা বাগিয়ে ধরে ঘোড়ায় চেপেই একেবারে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।

ওর ওই রণরঙ্গিনী মূর্তি দেখে যে যেদিকে পারল পালাল। যে বাধা দিতে এল সেই পড়ল গুলির মুখে।

ঘোড়া তখন ঘরের ভেতর ঢুকে প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে একেবারে দোতলায় উঠে পড়ল।

দু'জন লোক তখন বারান্দার থামের আড়াল থেকে গুলির জবাব গুলিতে দিচ্ছে।

শবনম ঘোড়া থেকে না নেমেই পিছন দিক থেকে গুলি করল লোক দু'জনকে।

গুলি খেয়ে দু'জনে দু'দিকে ছিটকে পড়ল আর্তনাদ করে।

শবনম বারান্দায় এসে হাত নেড়ে ওদের জানাল আর কোনও ভয় নেই। এবার তোমরা বিপদমুক্ত।

লোকগুলো এবার নির্ভয়ে নীচের উঠোনে ঘোরাফেরা করতে লাগল।

দু'জন লোক সেই কুকুরের চিৎকারের সূত্র ধরে তরতর করে নীচে নেমে গেল। কিন্তু না। সেখানে তখন ফাঁকা ঘর। কেউ কোথাও নেই।

শবনম দু’জন লোককে ওপরে ডেকে প্রতি ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কিন্তু না। কেউ কোত্থাও নেই। একটি ঘরের দরজা শুধু ভেতর থেকে বন্ধ। ওরা আঘাতের পর আঘাত করেও যখন সে দরজা খুলতে পারল না, তখন একজন লোক নীচে নেমে একটা শাবল জোগাড় করে এসে তাইতে চাড় দিয়ে ভেঙে ফেলল দরজাটা।

সেই ঘরের ভেতরে বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে শেঠ মংঘীরামজি থরথর করে কাঁপছিলেন।

শবনমকে দেখেই চিৎকার করে উঠলেন মংঘীরাম, নেহি নেহি নেহি। মুঝে মাত মারো দেবীজি। মুঝে মাত মারো।

শবনম বলল, বড্ড প্রাণের মায়া যে। শয়তান। লোকের সর্বনাশ করার সময়, ট্রেন ওলটানোর সময় এই প্রাণে খুব ফুর্তি হয় না? এখন তোর প্রাণ নিয়ে আমি ফুটবল খেলব।

ম্যায় গোড় পাকড়তি হুঁ দেবীজি! মুঝে মাফ করো।

আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলি কেন? কী বলে পালিয়ে এসেছিলি ওখান থেকে? কোন সাহসে আমার সঙ্গে বেইমানি করলি, বল?

মুঝে মাফ কর দো। মেরা গলতি হো গিয়া।

ফের ওই এক কথা?

মংঘীরামের বউ-ছেলেমেয়ে সবাই তখন ছুটে এসে শবনমের পাদুটো জড়িয়ে ধরল। বলল, উনকো মাত মারো দেবীজি। হাম সব অনাথ হো যাউঙ্গা।

শবনম বলল, এই কথা বলতে সরম লাগছে না তোমাদের? এই পাপীর পাপের পয়সা নিয়ে দিব্যি তো সুখভোগ করছিলে? এখন অনাথ হয়ে যাবার শোকে নাকিকান্না কাঁদছ? কেন তোমরা বাধা দাওনি ওকে ওইসব কাজ করতে?

মংঘীরামের বউ ডুকরে কেঁদে উঠল।

শবনম ওর গলার হারটা এক টানে ছিড়ে দিয়ে বলল, এ হার কার? মেরা।

তোমার? না ট্রেনডাকাতি করে পাওয়া লুটের মাল? সত্যি করে বলো? ও হার মেরা।

শবনম সেটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, তোমরা একটু ওপাশের ঘরে যাও। এ শয়তানটার সঙ্গে আমার একটু বোঝাপড়া আছে।

নেহি। ম্যায় নেহি যাউঙ্গা] তুম উনকো মার ডালোগে।

শবনম ওর লোকেদের বলল, মংঘীরামের স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েকে অন্য ঘরে সরিয়ে দিতে।

কিন্তু ওরা এমনভাবে কান্নাকাটি করতে লাগল যে তা আর সম্ভব হল না। অগত্যা ওরা মংঘীরামকেই টেনে বার করতে গেল হিড়হিড় করে।

মংঘীরাম ছুটে গিয়ে সিন্দুক খুলে গাদা গাদা নোটের বান্ডিল ছুড়ে দিতে লাগল শবনমের দিকে, ইয়ে লো। তুম মুছে এক লাখ দেনে কো লিয়ে বোলা থা, ইয়ে লো দশ লাখ রুপয়া। সোনাদানা যো কুছ হ্যায় লে লো। লেকিন মুঝে জিনে দো।

শবনম তখনও ঘোড়ার পিঠেই চেপে আছে। একবারও নামেনি। মংঘীরামের কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠে বলল, ও মুঝে নেহি চাইয়ে মংঘীরাম।

তো ক্যা চাহিয়ে তুমকো? হামারা আব্বাজান কা জিন্দগি আউর রঞ্জনকো চাহিয়ে। ও লেড়কা মিল যায়ে গা। লেকিন আব্বাজান কি বারেমে ম্যায় কুছ নেহি জানতা।

তো লেড়কা কো আপস দে দো।

ও মিট্টিকা অন্দর হ্যায়।

জিন্দা না মুর্দা?

জিন্দা। আন্ডারগ্রাউন্ড মে হ্যায় ও।

চলো নিকালো।

মংঘীরাম ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বিয়ে নীচে নামল। শবনমও ঘোড়া নিয়ে নামতে লাগল নীচে। তারপর ওরা সেই কাঠের আংটাওয়ালা পাটাতনটার কাছে যেতেই শবনম বলল, ইসকো অন্দরমে কোঈ নেহি হ্যায়। হাম সব পহলেই দেখা

হ্যায়। লাস্ট স্টেপিং পর যানে কা বাদ এক সুইচ বোর্ড মিলেগা। হুঁয়া তিন নম্বরমে পুস করনে সে এক অলগ কামরা কা ওয়াল হট যায়েগা। রঞ্জনবাবু হুঁয়া পর হ্যায়।

ঠিক হ্যায়, লেকে আও।

মংঘীরাম বলল, আপ ভি আইয়ে।

শবনম ঘোড়া থেকে নেমে যেই না ভেতরে ঢুকতে গেল অমনি লোক দু'জন বাধা দিল ওকে। বলল, আপ মাত যাইয়ে দেবীজি। উনকো যানে দিজিয়ে। হাম দোনো যাউঙ্গা ও শয়তান কা সাথ।

এদিকে ‘জলদি আইয়ে’ বলে

মংঘীরাম সেই কাঠের পাটাতনের ডালা তুলে আন্ডারগ্রাউন্ডে নেমেই ডালাটা ফেলে ভিতর থেকে লক করে দিল। শবনম এবং তার লোকেরা বারবার চেষ্টা করতে লাগল সেটাকে ভেঙে ফেলবার, কিন্তু পারল না।

বাইরে তখন সাইরেনের শব্দ।

শবনমের লোকেরা চেঁচিয়ে উঠল, পুলিশ! পুলিশ! জলদি ভাগো হিয়াসে। দেবীজি চলা আও। কিন্তু যাবে কোনদিকে?

একজন বলল, আমরা এর ভেতরে ঢুকেই বাইরে পালাবার রাস্তা দেখে এসেছি। ওই পিছন দিকে একটা তালাওয়ের পাড় দিয়ে রাস্তা। উধার সে ভাগো।

ওরা পিছনের দরজা দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল।

মেন দরজায় তখন ঘন ঘন পুলিশের করাঘাত। পুলিশের একজন লোক তখন একটি গাছের ডালে উঠে পাঁচিল টপকে ঠিক যেভাবে লালচাঁদের লোকেরা এসেছিল সেইভাবে ভেতরে ঢুকল। তারপর এদিকের বন্ধ দরোজাটা খুলে দিতেই ভ্যান ভরতি পুলিশ হই হই করে ঢুকল ভেতরে।

পুলিশকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই মংঘীরামের বাড়ির চাকরবাকর সহযে যেখানে ছিল ছুটে এল। ওর বউ-ছেলেমেয়েরাও ছুটে এসে বলল, আপ লোগোনে ইতনা দেরি কিউ কিয়া? ও ডাকু আকে হামারা সর্বনাশ কর দিয়া।

পুলিশ অফিসার বললেন, থামুন। আপনারা যে কী চিজ আমি জানি। দিনের পর দিন হাজার হাজার লোকের সর্বনাশ করে বেড়াবেন আর আপনাদের সর্বনাশ কেউ করতে এলে চেঁচামেচি করবেন, এ কীরকম কথা?

মংঘীরামের স্ত্রী বললেন, দেখিয়ে তো কিতনা আদমি কো মার ডালা ও ডাকুনে।

এইসব লোক আপনাদের?

জি হাঁ।

আমি তো এদেরকেই ডাকাত মনে করেছিলাম। এত স্টেনগান বন্দুক এরা পেল কী করে?

মংঘীরামের স্ত্রী এবার চুপ করে রইলেন।

পুলিশ অফিসার বললেন, শুনুন, দুর্নীতির অভিযোগে এখানকার এস পি-কে বদলি করা হয়েছে। নতুন এস পি হুকুমত সিং অত্যন্ত কড়া লোক। আপনাদের রামরাজত্বের অবসান একেবারেই হয়ে গেছে ধরে নিতে পারেন। আর আমিও এখানে নতুন এসেছি। শুধু আগের এস পি সাহেবের জন্যে কিছু করতে পারছিলাম না। এখন বলুন শেঠজি কোথায়?

ডাকুরানি উসকো লেকে ভাগা।

ডাকুরানি?

হাঁ হাঁ। কাঁহাসে এক বদমাশ লেড়কি ফুলনদেবী বনকে আয়া। ও সবকো মারতা।

কোথায় থাকে সে?

ওই পাহাড় পর যো হিন্দোলগড় হ্যায়, হুঁয়াকা বস্তিমে।

হিন্দোলগড়! ও তো আর এক জায়গা। যতসব কুখ্যাত সমাজবিরোধীদের ঘাঁটি একটা। ওর ধারেকাছে গেলেই তো শুনেছি গুলি করে। আমি অনেকবার এস পি সাহেবকে বলেছিলাম ওই পুরনো কেল্লায় রেড করতে। কিন্তু ওনার কী যে স্বার্থ ছিল তা কে জানে, ওই কেল্লার কথা উঠলেই তেড়ে একটা ধমক দিতেন।

পুলিশের লোকেরা তখন ডেড বড়ির গাদা করেছে।

তরুণ অফিসার চারদিক ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সেই কাঠের ডালার কাছে এসে বললেন, এটা এখানে কী?

মংঘীরামের স্ত্রী বললেন, উধার কুছ নেহি। ও আন্ডারগ্রাউন্ড কা দরোয়াজা। তোড়ো। হাম দেখেঙ্গে। কনস্টেবল! তোড়ো ইস ডালে কো।

পুলিশের লোকেরা সঙ্গে সঙ্গে এর ডালা ভেঙে ফেলল। তারপর টর্চের আলো ফেলে ভেতরে ঢুকেই আর যাবার পথ পেল না।

পুলিশ অফিসার বললেন, ব্যস। এইটুকু নামার জন্যে এত কাণ্ড? মংঘীরামের স্ত্রী বললেন, হাম তো পহলেই আপকো বোলা ইসকো অন্দরমে কুছ হ্যায়ই নেহি। আপ তো শুনা নেহি মেরি বাত।

কিন্তু একটা কথা আমি ভেবে পাচ্ছি না, এর ভেতরে কিছু যদি না-ই থাকবে তা হলে এর ডালাটা ভেতর থেকে লক করেছিল কে?

মংঘীরামের স্ত্রী এবার জবাব দিতে পারলেন না।

পুলিশ অফিসার বললেন, শুনুন। এ যাত্রায় আপনাদের বাঁচবার কোনও রাস্তাই আমি দেখতে পাচ্ছি না। এখনও বলছি যদি নিজেদের মঙ্গল চান তো পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করুন।

হাম আপকো বহুত রুপিয়া দেঙ্গে। আপ হামারা পতিকো বাঁচাইয়ে।

পুলিশ অফিসার বললেন, একটা কথা জেনে রাখুন, পুলিশের মধ্যে অনেক খারাপ লোক যেমন আছে, তেমনি ভাল লোকও অনেক আছেন। আমি মধ্যবিত্ত বাঙালির ছেলে। এই বিদেশে পুলিশের চাকরি করতে এসেছি। আমার অনেক অভাব আছে। তাই বলে টাকার লোভে কোনও বর্ন ক্রিমিন্যালকে আমি প্রশ্রয় দেব না। আপনাদের ওই পাপের টাকায় হাত দেব না আমি। আমার সন্তান এই পবিত্র ভারতভূমির মাটিতে ঘুষের টাকায় পালিত হয়ে হাওয়াগাড়ি চেপে ঘুরে বেড়াবে এই নীচতা আমার রক্তে নেই। জনগণের আত্মসাৎ করা টাকা আমি সরকারের হাতেই তুলে দেব। কিন্তু এখন বলুন শেঠজি কোথায় বা এর ভেতরে ঢোকার সোজা পথ কোনদিকে?

কথা বলতে বলতেই সুইচ বোর্ডটা নজরে পড়ে গেল অফিসারের। তিনটে সুইচ। দুটো ফলস। একটা আসল। তৃতীয়টায় হাত পড়তেই দু'ফাঁক হয়ে গেল দেওয়ালটা।

পুলিশ অফিসারের নির্দেশে সকলে হই হই করে ঢুকে পড়ল ভেতরে।

পরপর অনেকগুলি ঘর। প্রতিটি ঘরের দেওয়ালের পেরেকে চাবি আটকানো। সেই চাবি নিয়ে দরজা খুলতেই বিস্ময়ের পর বিস্ময় দেখা দিতে লাগল। একটি ঘরের ভেতর থেকে উদ্ধার হল গাঁজা-চরস ইত্যাদি কিছু মাদক দ্রব্য। আর একটি ঘর থেকে দশ-বারোজন সুন্দরী

মহিলাকে উদ্ধার করা হল। একটি ঘরে ছিল ট্রেনডাকাতি করে পাওয়া প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার।

আর একটি ঘরে একশো টাকার জাল নোটের হাজার হাজার বান্ডিল। শেষ ঘরটিতে ছিল হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক কিশোর।

পুলিশ অফিসার গিয়ে তার বাঁধন খুলে দিয়ে বললেন, বাঙালির বাচ্চা বলে মনে হচ্ছে! কী নাম তোমার?

আমার নাম রঞ্জন। আমি কোথায়?

তুমি এখন কুখ্যাত মংঘীরাম শেঠের গুপ্তকক্ষে আছ।

শবনম কোথায়? সে কেমন আছে? তার কোনও ক্ষতি হয়নি তো?

শবনম কে?

বলব বলব। সব বলব। আগে আমাকে একটু জল খেতে দিন।

পুলিশ অফিসার তাঁর সঙ্গের কনস্টেবলদের বললেন, যাও একে বাইরে বার করে নিয়ে যাও। শেঠের বাড়ির ভেতরে ঢুকে ভাল জল খাইয়ে একটু সুস্থ হতে দাও। তারপর ওর কথা শোনা যাবে।

ওরা রঞ্জনকে বার করে নিয়ে গেলে পুলিশ অফিসার মংঘীরামের স্ত্রীকে বললেন, আপনার স্বামী কোথায়?

কৌন জানে ও কাঁহা হ্যায়।

ঠিক সে বোলিয়ে আপকা পতি মংঘীরাম কাঁহা হ্যায়? কিধার সে ভাগা ও শয়তান, মুঝে বাতাইয়ে।

মংঘীরামের স্ত্রী এবার রীতিমতো ভয় পেয়ে একটি দেওয়ালের নীচের দিকের সুইচ টিপতেই দেওয়ালটা ওপর দিকে উঠে গেল। আর তখনই দেখা গেল একটি ছোট্ট ঘরের মেঝেয় বসে মংঘীরামজি থর থর করে কাঁপছেন।

পুলিশ অফিসার বললেন, বাঃ শেঠজি। বেশ ভাল একটা নিরিবিলি তপস্যার জায়গা বেছে বার করে নিয়েছেন দেখছি। তা আর কেন? এবার বেরিয়ে আসুন ওর ভেতর থেকে।

হাম জানে নেহি সকতা স্যার। হামারা ব্লাড প্রেশার জায়দা হো গিয়া।

ও এক্ষুনি রুলের গুঁতোয় কমে যাবে। বেরিয়ে আসুন।

হাম আপকো বহুত রুপইয়া দেগা। হামকো ক্ষমা কর দিজিয়ে সাব। পুলিশ অফিসার বললেন, এই, এর হাতে হ্যান্ডকাপ লাগা তো কেউ! হ্যান্ডকাপের নামে তীব্র একটা আর্তনাদ করে উঠলেন মংঘীরাম।

নাউ, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট। এখন বলুন আপনার এই ধর্মপুরীতে কোথায় কী লুকানো আছে?

কনস্টেবলরা সঙ্গে সঙ্গে মংঘীরামের হাতে হাতকড়া পরাল। তারপর সবাই মিলে টেনে হিঁচড়ে বাইরে বার করে আনল তাকে।

মংঘীরামের স্ত্রী যখন বুঝলেন কোনও প্রলোভনেই এই তরুণ বাঙালি পুলিশ অফিসারকে বশে আনানো যাবে না, তখন অকথ্য ভাষায় গালাগালি শুরু করে দিলেন। অবশ্য তাতে লাভ হল না কিছুই। পুলিশ অফিসারের কড়া ধমক ছাড়া কিছুই জুটল না তাঁর বরাতে।

বাইরে এসে মংঘীরাম হঠাৎ নিজমূর্তি ধরলেন। বললেন, বাঙ্গালিবাবু! আপ নয়া অফিসার মালুম হচ্ছে। আপনি কিন্তু ভিমরুলের চাকে হাত দিয়ে ফেলেছেন। আমার নজরানা আপনি নিলেন না, লেকিন আপনার হয়তো জানা নেই যে, আপনার এস পি বাবা আমার জিগরি দোস্ত। কোনও হাজতেই আপনি আমাকে আটকে রাখতে পারবেন না। যে রুপিয়া আপনি আপনার অনেস্টি দেখাতে গিয়ে নিলেনই না, ওই রুপিয়া আমাকে ছাড়িয়ে আনবে, আর আপনাকে ট্রান্সফার করিয়ে দেবে অনেক দূরে। এখনও ভেবে দেখুন কী করবেন। আমি এখনও আপনার সঙ্গে দোস্তি করতে রাজি আছি।

তরুণ পুলিশ অফিসার তখন আর থাকতে না পেরে সবুট একটা লাথি দড়াম করে মেরে বসলেন মংঘীরামের পেটে।

মংঘীরাম লাথি খেয়ে একবার ‘ঘ্যাক্’ করে মুখ দিয়ে এক বিটকেল শব্দ বার করে বসে পড়লেন।

পুলিশ অফিসার বললেন, তোমার হয়তো জানা নেই বাবা নাদুসরাম, যে... জি ম্যায় নাদুসরাম নেহি। মংঘীরাম।

তুমি নাদুসরামই। তোমার হয়তো জানা নেই যে ওই ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই এবং আরও অন্যান্য অনেকগুলি অভিযোগে এখানকার এস পি সাহেব হঠাৎ বদলি হয়ে গেছেন। তাঁর জায়গায় এখন এসেছেন হুকুমত সিং। তোমার সম্বন্ধে সব কিছুই তিনি শুনেছেন। এমন সময় টেলিফোনে চোরের ওপর বাটপাড়ি হচ্ছে খবর শুনে আমি লোকজন নিয়ে তৈরি হয়ে ছুটে এসেছি। এস পি সাহেবের আদেশ, আমি এখান থেকে ফিরে যাবার সময় যেন তোমার গায়ের চামড়াটা ছাড়িয়ে নিয়ে যাই। সেটা কীভাবে নিলে তোমার সুবিধে হয় চট করে বলে ফেলো দেখি?

মংঘীরাম থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।

তোমার গোডাউন কোথায়?

আমার কোত্থাও কিছু নেই স্যার। যা কুছু সব এইখানেই আছে।

মিথ্যে কথা।

হুজুর ! মংঘীরাম ধার্মিক লোক। মিথ্যা কোথা বোলে না, মিথ্যা কোথা বললে পাপ হয়।

পুলিশ অফিসার এবার মংঘীরামের পায়ের গাঁটে এক ঘা রুলের বাড়ি বসিয়ে দিতেই ‘ভ্যা ভ্যা’ করে চেঁচাতে লাগলেন মংঘীরাম। আর এক ঘা দেব?

নেহি। ম্যায় সব কুছ বাতাতা হুঁ। ও নদীকা কিনার মে হামারা এক টিম্বারকা গোডাউন হ্যায়। ব্যস। আউর কুছ নেহি।

পুলিশ অফিসার বললেন, ওখানেও রেড হবে আজ। তারপর এস পি সাহেবের নির্দেশমতো ব্যবস্থা হবে তোমার।

কনস্টেবলরা বলল, একে এখন কোথায় নিয়ে যাব স্যার?

কোত্থাও না। এইখানেই বেঁধে ফেলে রেখে দাও। আগে ওর বাড়ির ভেতরটা সার্চ করি, পরে ওর ব্যবস্থা হবে।

পুলিশ অফিসার এবার মংঘীরামের বাড়ির বউ-ছেলেমেয়ে চাকরবাকর প্রত্যেককেই পৃথক পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে সকলকে এক ঘরে পুলিশ পাহারায় রেখে বাড়ি সার্চ করতে লাগলেন লোকজন নিয়ে।

দোতলায় একটি ঘরের ভেতর মেঝেময় ছড়ানো একশো টাকার নোটের বান্ডিলগুলো দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। বললেন, এত টাকা। এগুলো জাল নোট নয় তো?

নোটগুলো বান্ডিল বেঁধে রেখে একতাড়া নোট স্যাম্পেল হিসেবে নিয়ে রঞ্জনের কাছে এলেন। বললেন, এবার বলো তো বাবা তুমি এখানে কীভাবে এলে?

রঞ্জন তখন ট্রেন দুর্ঘটনার রাতের ঘটনা থেকে এক এক করে সব কিছু খুলে বলল পুলিশকে। তারপর বলল, আপনারা যেভাবেই হোক রক্ষা করুন শবনমকে। ওই শয়তান দস্যুটাকে মেরে শবনমকে সুপথে ফিরিয়ে আনুন। না হলে মেয়েটা একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে। ওর দায়িত্ব আমি নেব। ওকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাব।

তোমার কি ধারণা মেয়েটি এখনও বেঁচে আছে?

ওর মধ্যে এক অলৌকিক শক্তি ভর করেছে। ওর কোনও ক্ষতি কেউ করতে পারবে বলে মনে হয় না। তবুও বিশ্বাস তো নেই।

তোমাকে ওরা এখানে নিয়ে এল কী করে?

ঠিক বুঝতে পারলাম না। ঝোপড়ির ঘরে শুয়ে একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম, হঠাৎ দেখি চারিদিকে আগুন আগুন চিৎকার। আর তারই সঙ্গে দেখতে পাই ঘোড়ায় চড়া কয়েকটা ডাকাত চারদিকময় ছুটোছুটি করছে। তারপর?

আমি তখন দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম, কী যে করব, কিছু ভেবে পাচ্ছিলাম না। ভাবলাম এই সময় বোকার মতো এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে যদি ডাকাতদের নজরে পড়ে যাই তো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে ওরা। তাই প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পালাতে গেলাম। হিংলাজসর্দারের একটা কুকুর ছিল। সেটা আমার পাশেই শুয়েছিল। আমাকে পাহারা দেবে বলে। ওই কুকুরটাকে নিয়েই পালাতে গেলাম। হঠাৎ অন্ধকারে দু'তিনজন লোক আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে তুলে নিয়ে চলে এল।

এই লোকগুলো মংঘীরামের?

হ্যাঁ। আসলে মংঘীরামের নির্দেশমতো লোকগুলো আমাদের দু'জনের ওপর আক্রমণের জন্যই আসছিল। কেন না শবনমের জন্য ওর এতদিনের ঠগবাজির ব্যবসা নষ্ট হতে বসেছিল প্রায়। তাই ও চেয়েছিল আমাদের দু'জনকে ওর কয়েদখানায় পুরে পয়েজন করে মেরে ফেলতে। কিন্তু আমরা যে সদাসতর্ক ছিলাম, তা বুঝতে পেরেই ওরা প্রকাশ্য বিদ্রোহে না এসে অপেক্ষা করছিল গভীর রাতের অন্যমনস্কতার। এমন সময় লালচাঁদের আবির্ভাব, শবনমের কেল্লা অভিযান এবং ওই অকস্মাৎ অগ্নিকাণ্ড, তদুপরি আমার আত্মরক্ষার্থে পলায়ন ওদের কাছে একটা লোভনীয় সুযোগ হয়ে দেখা দেয়।

তোমাকে ওরা মারধোর করেনি?

না। শুধু বলেছিল শবনমকে নিয়ে আসার পর আমাদের দু'জনকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।

পুলিশ অফিসার দাঁতে দাঁত চেপে ভয়ংকর রেগে বললেন, তাই নাকি? হ্যাঁ।

ঠিক আছে। আজ তুমি আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে চলো। ওখানে রাতটুকু খেয়ে ঘুমিয়ে আরামে কাটাতে পারবে। তারপর কাল সকালে আমি এস পি সাহেবকে সঙ্গে নিয়েই ওই কেল্লা-পাহাড়ে অভিযান করব।

কিন্তু তাতে যে অনেক দেরি হয়ে

যাবে।

এছাড়া তো উপায় নেই বাবা।

কেন উপায় নেই?

এই রাতদুপুরে ঘন অন্ধকারে কেল্লা-পাহাড়ে উঠব কী করে? পথঘাট চিনি না কিছু।

আমি চিনিয়ে নিয়ে যাব।

তুমিও চিনতে পারবে না। এই অন্ধকারে এক হাত দূরের দৃশ্য দেখা যায় না। বাঃ রে। আপনাদের তো টর্চ আছে!

তা আছে। তবুও ওই পাহাড়ে যেতে গেলে এই ক'টা লোক নিয়ে হবে না। আরও অন্তত দু’ ব্যাটেলিয়ান লোক চাই। প্রয়োজন হলে ওই কেল্লাটাকে আমরা উড়িয়ে দেব।

কিন্তু ততক্ষণে শবনমকে কি উদ্ধার করা যাবে?

না। ওর ভেতরে সত্যিই যদি কোনও অলৌকিক কিছু ভর করে থাকে তা হলে ওর কোনও ক্ষতিই হবে না। যদি তা না হয়ে থাকে, তা হলে কেল্লায় পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই ও শেষ হয়ে গেছে। তা ছাড়া আমাদের এখুনি একবার হেড কোয়ার্টারে খবর দিয়ে মংঘীরামের গোডাউনটা রেড করা দরকার। এদিকে বিলম্ব করলে ওর লোকেরা তৎপর হয়ে মালপত্তর সব হাপিস করে দেবে। কিন্তু হিন্দোলকেল্লার গুপ্তধন নষ্ট হবে না বা ওর ভেতর বসবাসকারীরা নিজেরাও পালাতে অথবা মালপত্তর সরাতে পারবে না। তার কারণ ওখানে তোমার শবনম আছে। লালচাঁদ আছেন। তুমি অযথা ভয় পেয়ো না।

ভয় পাচ্ছি তো আমি অন্য কারণে। ওরা ওইভাবে হিন্দোলকেল্লা আক্রমণ করার পরই দস্যুরা এসে বস্তিতে আগুন ধরাল কী করে? তার মানে নিশ্চয়ই লালচাঁদ হার মেনেছেন। নিশ্চয়ই শবনমের ক্ষতি হয়েছে।

তোমার এই সন্দেহটা অবশ্য অমূলক নয়। ঠিক আছে। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি এস পি সাহেবের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে তাঁর মতামতটা নিচ্ছি। ততক্ষণ তুমি আমার বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম করো। যাও। বলে একজন লোককে বললেন, কোথাও থেকে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে রঞ্জনকে ওনার বাসায় পৌঁছে দিতে।

লোকটি রঞ্জনের হাত ধরে বলল, এসো।

রঞ্জন বলল, আমার এখন কোথাও যেতে ভাল লাগছে না। আমি আপনাদের সঙ্গেই যাব। কেন না আমার মনে যে দুশ্চিন্তা রয়েছে তাতে কিছুতেই শুয়ে ঘুমোতে পারব না আমি।

তা হোক। তবু যাও।

অগত্যা যেতেই হল। কিছু দূর যাবার পর একটি বাড়িতে এসে পুলিশের লোকটি দরজায় নক করতেই একজন লোক বেরিয়ে এল, কী ব্যাপার! এত রাত্রে? আপনার বাইকটা একবার দেবেন? ওই ছেলেটাকে বড়বাবুর বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব।

ঠিক আছে দাঁড়াও একটু। চাবিটা নিয়ে আসি। বলে লোকটি চাবি এনে দালানে রাখা বাইকটা বার করে বলল, ছেলেটাকে পেলে কোথায়? মংঘীরামের বাড়িতে।

ও আবার ছেলেচুরির কারবারেও নেমেছে নাকি?

ছেলেমেয়ে সবই চুরি করছে। তবে আজ ওর বাড়ি রেড করে একেবারে সবকিছু তছনছ করে দিয়েছেন বড়বাবু।। কয়েক বস্তা জাল নোট পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

বলো কী? কিন্তু ধরলে কী হবে? ধরে রাখতে পারবে ওকে? ও তো ঠিক টাকার বান্ডিল দিয়ে বেরিয়ে আসবে।

এবার আর ওটি হচ্ছে না। ওস্তাদের মার শেষরাতে জানেন তো? আগের এস পি হঠাৎ বদলি।

যাই হোক। রঞ্জনকে বাইকের পিছন দিকে বসিয়ে লোকটি রাতের অন্ধকারে অনেক দূর গিয়ে একটি বাড়ির কাছে এসে হর্ন বাজাল। তারপর বাইক থেকে নেমে দরজায় কলিং বেল টিপতেই ভেতর থেকে সুরেলা গলায় সাড়া এল।

কে?

আমি দুলাল। বড়বাবু একটি ছেলেকে পাঠিয়েছেন। ও আজকের রাতটা এখানে থাকবে।

সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। একজন সুন্দরী মহিলা দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। তারপর রঞ্জনকে দেখে স্মিত হেসে বললেন, এসো ভাই, ভেতরে এসো।

রঞ্জন ভেতরে ঢুকলে, লোকটিও পুলিশ অফিসারের স্ত্রী সেই সুন্দরী মহিলা বললেন, কী নাম তোমার? আমার নাম রঞ্জন।

আবার চলে গেল বাইক নিয়ে।

বাড়ি কোথায় ?

কলকাতায়।

এই রাতদুপুরে কোত্থেকে এলে? কিছু খাওয়াদাওয়া হয়নি নিশ্চয়ই? না। সারাদিন কিছু খাইনি। বড্ড খিদে পেয়েছে। যদি কিছু থাকে তো দিতে পারেন।

মহিলা মধুর হেসে বললেন, দুষ্টু ছেলে। যদি কিছু থাকে মানে? যাও। বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এসো। আমি তোমার খাবার তৈরি করে দিচ্ছি।

রঞ্জন বাথরুমে গিয়ে মুখহাত ধুয়ে আসতেই দেখল মায়ের মতো স্নেহময়ী সেই মহিলা ততক্ষণে আটা মেখে গ্যাসের উনুনে পরোটা ভাজার আয়োজন করছেন। রঞ্জন আসতেই বললেন, কই বলো দেখি তোমার কথা, গল্পও শুনি কাজও করি।

রঞ্জন তখন এক এক করে সব বলল।

সব শুনে মহিলা বললেন, ওমা! কী কেলেঙ্কারি কাণ্ড। জানি না বাবা পুলিশের ব্যাপার স্যাপার। কয়েকটি লোককে তোমার সঙ্গে দিয়ে আজ রাত্রেই তোমাকে ওখানে পাঠিয়ে দিতে পারত।

উনিও ইচ্ছে করলে যেতে পারতেন।

হয়তো অসুবিধে ছিল। তার কারণ ওই পাহাড়-জঙ্গলে গাড়ি তো ঢুকবে না। তা ছাড়া ডাকাতরা অতর্কিতে যদি আক্রমণ চালায় আর তাতে যদি কোনও ক্ষয়-ক্ষতি হয় বা প্রাণহানি ঘটে সে কৈফিয়ত দিতে হবে ওনাকেই। কেন না কেল্লা-অভিযানের কাজে উনি যাননি। উনি গেছেন মংঘীরামজির বাড়ি রেড করতে।

রঞ্জন বলল, এখন ধরুন মংঘীরামের বাড়িতে যে ডাকাতরা এসেছিল তাদেরই কারও পিছু নেবার দরকার হলে পুলিশকে তো জঙ্গলে ঢুকতেই হত।

তা হত বইকী। তবে পুলিশের চাকরির মজাটা এই যে পুলিশকে দুঃসাহসও যেমনি দেখাতে হয়, তেমনি ক্ষয়-ক্ষতির দিকেও নজর রাখতে হয়। হিন্দোলকেল্লার ডাকাতদের সঙ্গে লড়াইতে আরও শক্তিশালী পুলিশবাহিনীর দরকার। তা ছাড়া ওই ধরনের কাজের ঝুঁকি একা একা নিজের থেকেও নেওয়া যায় না। এস পি সাহেবের অনুমতির দরকার। এস পি সাহেব যদি বলেন তা হলে কি-বা দিন, কি-বা রাত। যখন ইচ্ছে যাওয়া যেতে পারে। যাক। আর একটু সময় অপেক্ষা করো। এখনই তো রাত বারোটা। দেখতে দেখতে সকাল হয়ে যাবে।

রঞ্জনের ঘুম আসছে না। মনের মধ্যে দারুণ উত্তেজনা। তবু শুনতেই হল। একে অন্ধকার রাত, তায় গভীর জঙ্গল। তাকে অতিক্রম করে পালিয়েও যেতে পারবে না ও। অবশ্য পালাবার সুযোগ পেলেও যাবে না। কেন না ওই শ্বাপদসংকুল অরণ্যে ওই কাজ করতে গেলে হয় বাঘের পেটে যেতে হবে, নয়তো ভালুকের আঁচড় খেয়ে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে থাকতে হবে।

রঞ্জন তাই এই গভীর রাতের সুখশয্যায় শুয়ে নিদারুণ উৎকণ্ঠায় প্রহর গুণতে

লাগল। অবশ্য বেশিক্ষণ নয়। কিছু সময়ের মধ্যেই বড়বাবু ফিরে এলেন। দরজায় কলিংবেল বাজতেই সেই মাতৃপ্রতিম মহিলা গিয়ে দরজা খুলে দিলেন।

রঞ্জনও উঠে গেল।

তরুণ পুলিশ অফিসার কয়েকজন কনস্টেবলকে নিয়ে ঘরে এসে এক গ্লাস জল খেয়ে বললেন, ভয় নেই রঞ্জনবাবু। তোমাকে অযথা আমি আটকে রাখব না। সকাল হলেই রওনা দেব লোকজন নিয়ে। কেল্লাটাকে যাতে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলা যায় সেই ব্যবস্থাই করতে যাচ্ছি।

মংঘীরামের গোডাউনে কিছু পেলেন?

না। আমি যা ভয় করেছিলাম তাই হয়েছে। অর্থাৎ আমরা যাবার আগেই ওর লোকজনেরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে চারদিক থেকে। মংঘীরামকে বেদম পিটিয়েছি। ওর বাড়ির ভেতরেই আমাদের একটা ছোটখাটো ক্যাম্প বসে গেছে। কিছু অপহৃতা মহিলা, জাল নোটের বস্তা, সোনাদানা সব রাখা আছে। আমি এখুনি হেড কোয়ার্টারে চলে যাচ্ছি। আমার ফিরে আসতে সকাল আটটা হয়ে যাবে। একটু অপেক্ষা করো। আরও পুলিশ, আরও গাড়ি অনেক কিছুরই প্রয়োজন। এস পি সাহেব নিজেও হয়তো যেতে পারেন। তুমি শুধু আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করো এখানে। কেমন? বলে যেমন এসেছিলেন তেমনি চলে গেলেন।

এরপরে আর কী ঘুম আসে?

ঘড়ির কাঁটায় টং করে রাত একটা বাজল। রঞ্জন বিছানায় শুয়ে আবার সেই নিঃসঙ্গ শয্যায় প্রহর গুণতে লাগল, আর ভাবতে লাগল শবনমের কথা। শুধু যে শবনমের কথা তা নয়। এবার ওর বাড়ির কথা মনে হতে লাগল। মনে হচ্ছে যেন কতদিন বিদেশে আছে ও। মা'র মুখখানি মনে পড়ল। বাবার জন্য মন কেমন করল। ওর সঙ্গে তো ট্রাঙ্ককলে কথা হয়েইছে। তাঁরা নিশ্চিন্তই আছেন। তাঁদের অত্যন্ত আদরের ছেলেটি যে এই অচেনা পরিবেশে ডাকাতপুরীতে পাহাড়-জঙ্গলের দেশে কী জালে জড়িয়েছে তা তাঁরা কল্পনাও করতে পারবেন না।

রক্তাক্ত শবনম রাতের অন্ধকারে ঘোড়ায় চেপে ছুটে চলেছে। রঞ্জনকে উদ্ধার না করেই শবনমের এইভাবে চলে যাবার ইচ্ছেটা ছিল না। কিন্তু ঘটনাটা এমনভাবে মোড় নিল যে না-পালানো ছাড়া উপায়ও ছিল না তখন। কেন না ঠিক সেই মুহূর্তে পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সবদিক কেঁচে যাবে। আগে তো প্রতিশোধ, তারপরে পুলিশ। বিশেষ করে একজনের ধরা পড়া মানেই দলকে দল ধরা পড়া। তা ছাড়া শবনম আরও একটা দিক চিন্তা করে দেখল পুলিশ যখন এসেছে, তখন এই শত্রুপুরীতে রঞ্জন যদিও থেকে থাকে, তা হলে ওর নিরাপত্তার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া যেতে পারে।

বিক্রমজিৎ ঘটনাস্থলেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে।

লালচাঁদ গুরুতর রকমের জখম হয়েছেন। ও নিজেও আহত হয়েছে বেশ ভালরকম। তাই কোনওরকমে মংঘীরামের প্রাসাদ থেকে পালিয়ে সুচিকিৎসার জন্য পাহাড়ের একটি খাদের কাছে আত্মগোপন করল। লালচাঁদও এখানেই যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।

ওরা অতি নির্জন এবং নিরাপদ একটি স্থান দেখে সেখানে বসে ক্লান্তি দূর করতে লাগল। লালচাঁদের কয়েকজন লোক চলে গেল লোকালয়ের দিকে। যে ভাবেই হোক একজন ডাক্তারকে ডেকে এনে ওদের শরীর থেকে গুলিগুলো বার করাতে না পারলে, ফল এমনই খারাপ হবে যে, তখন আর কিছুতেই কিছু করা যাবে না।

ছয়

একজন প্রবীন ডাক্তার এসে শবনমের ক্ষতস্থান দেখলেন। তারপর অভ্যস্থ হতে শুরু করলেন কাজ। দুটি গুলির টুকরো বিঁধেছিল ভেতরে। সেগুলো বার করে ওষুধ দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে একটা ইঞ্জেকশান দিলেন। তারপর লালচাঁদের বুক থেকে বুলেট বার করতে গিয়েই থমকে গেলেন।

শবনম বলল, কী হল?

এনার তো একেবারেই শেষ অবস্থা।

তা হলে?

তা হলে আর কী? দেখি চেষ্টা করে। তবে মনে হয় বাঁচাতে পারব না।

লালচাঁদ বললেন, আমাকে বাঁচতেই হবে ডাক্তার। যে ভাবেই হোক বাঁচান। এখনও আমার অনেক কাজ বাকি।

কী করে বাঁচাব? এসব কাজ কি এইভাবে যেখানেসেখানে হয়? নেহাত তোমাদের ডাকাতের প্রাণ তাই। অন্য কেউ হলে মরেই যেত এতক্ষণ। মরতে আমিও চাই ডাক্তার। শুধু আজ রাতটুকুর মতো তুমি আমাকে বাঁচিয়ে দাও।

মরলে তুমি এখুনি মরবে। রাত কাটলে আর তোমাকে মারে কে? দেখি চেষ্টা করে কতদূর কী করতে পারি।

ডাক্তারের কাজ শেষ হলে শবনম বলল, আমরা এই মুহূর্তে আপনার পারিশ্রমিক দিতে পারলাম না। তবে আপনার কার্ডটা রেখে যান। আমাদের লোক যথাসময়ে গিয়ে আপনার টাকা পৌঁছে দিয়ে আসবে।

ডাক্তারবাবু বললেন, টাকাই কী জীবনের সব মা? এসব কাজ পুলিশকে লুকিয়ে আমাদের প্রায়ই করতে হয়। তবে একটাই অনুরোধ, কখনও কোনও বিপদে যদি পড়ি, তখন তোমাদের সাহায্য চাইলে একটু পাশে এসে দাঁড়িয়ো।

শবনম বলল, যদি বেঁচে থাকি আর ওইরকম দিন যদি সত্যিই কখনও আসে, তা হলে নিশ্চয়ই আপনার পাশে গিয়ে দাঁড়াব আমরা।

ডাক্তারবাবু চলে গেলন।

লালচাঁদকে বহু কষ্টে ঘোড়ায় বসিয়ে সবাই আবার সেই ঘনান্ধকারে কেল্লা-পাহাড়ের ওপরে উঠতে লাগল।

সাধু ওদের জন্য হানটান করছিলেন এতক্ষণ।

বিক্রমের মৃত্যুর কথা এবং লালচাঁদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা শুনে, একদিকে যেমন দুঃখ পেলেন, অপর দিকে তেমনি ক্রোধে ফেটে পড়লেন। এই ক্রোধ অবশ্যই ওই শয়তান দুর্জন সিং-এর ওপর। মংঘীরামের ওপর।

যাই হোক। লালচাঁদকে পাহাড়িদের জিম্মায় রেখে সাধু বললেন, আর দেরি নয়। এই হচ্ছে প্রকৃত শুভক্ষণ। এইবার আমরা গোপন পথে কেল্লার ভেতরে ঢুকব।

হিংলাজসর্দার বলল, আমিও আপনাদের সঙ্গে যাব বাবা। ওই শয়তানের শয়তানির উপযুক্ত জবাব আমিও দিতে চাই।

বাইরে তা হলে নেতৃত্ব দেবে কে?

লালচাঁদ অতিকষ্টে বললেন, বাইরেটা আমিই দেখতে পারব সর্দার। আপনি ভেতরে ঢুকুন। কেল্লা দখল হয়ে গেলেই আলোর সংকেত দেবেন। আমরাও তখন ভেতরে ঢুকব। কিন্তু যতক্ষণ তা না হয় ততক্ষণ যে ওই কেল্লার ভেতর থেকে বেরোতে যাবে তাকেই গুলি করে মারব। অতএব সাবধান। সংকেত না দিয়ে কেউ যেন সামনের ফটক দিয়ে বেরোতে যাবেন না।

সাধু শবনমের একটি হাত ধরে টান দিলেন, আয় মা। দেবীর চরণস্পর্শ করানো এই বন্দুক আর একবার দেবীর পদতলে রেখে চল ওই দুষ্টুকে দমন করতে।

সাধুবাবা, শবনম, হিংলাজ এবং লালচাঁদের দলের আরও জনা-চারেক যোদ্ধাকে সঙ্গে নিলেন। এদিকে পাহাড়ি বস্তির সবাই প্রায় তির, কাঁড়, টাঙি, বল্লম, কুণ্ডুল নিয়ে তৈরি। সবাই যেতে চায় সাধুর সঙ্গে ওই কেল্লার ভেতরে।

সাধু একটু কী যেন চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, ঠিক আছে, সবাই আয়। তবে এই গোপন পথের সন্ধান কাউকে দিবি না। বিশেষ করে পুলিশকে। আজ রাতেই হোক, আর কাল সকালেই হোক পুলিশ এখানে আসবেই। পুলিশ না যাওয়া পর্যন্ত আমি এই গুহার জঠরে লুকিয়ে থাকব। যদিও পুলিশ আমাকে চিনবে না। কেন না এখনকার নতুন নতুন পুলিশ আমার চেহারাটাই দেখেনি কখনও। তা ছাড়া আমি একজন তান্ত্রিক সাধু, এই হবে আমার পরিচয়। ভয় শুধু লালচাঁদকে নিয়ে।

লালচাঁদ বললেন, ভয় নেই। পুলিশ এলে আমিও গা ঢাকা দেব। আমার লোকেরাও সরে পড়বে। তারপর পুলিশ চলে গেলে সাধারণ মানুষের মতো আমরা আবার এসে জুটে যাব ঠিক। তা ছাড়া আপনার আশীর্বাদে, মা ভবানীর কৃপায়, আমার দুর্বলতা একটু একটু করে কাটছে। মনে হচ্ছে এ যাত্রা হয়তো আমি বেঁচেও যেতে পারি।

মা ভবানী তোমার ভাল করুন। কেল্লাটা দখল করতে পারলে ওর ভেতরে পেট ভরে একটু খাওয়াদাওয়া করতে পারবে। আরামে ঘুমোতে পারবে। প্রয়োজন হলে শহরের হাসপাতাল থেকে কাল সকালে যে কোনও ডাক্তারকে ডেকে এনে তোমার আরও ভাল চিকিৎসা করাতে পারব। ওষুধ-ইঞ্জেকশান দেওয়াতে পারব।

ঠিক আছে সর্দার। এখন মায়ের নাম নিয়ে ঢুকে পড়ুন। আর দেরি করবেন না। রাত বাড়ছে। দেরি হয়ে আসছে ক্রমশ।

সাধু হাত তুলে ইঙ্গিত দিলেন, জয় ভবানী। সবাই বলল, জয় ভবানী। ভবানী কসম।

শবনম বলল, আল্লা কসম।

সাধুর হাতে জ্বলন্ত মশাল।

সেই মশালের আলোয় পথ দেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল সকলে। ভবানী মূর্তির পিছন দিকের একটি ত্রিকোণাকৃতি অংশের কাছে গিয়ে সাধু কয়েকজনকে বললেন, এইখানে একটু শাবলের চাড় দে তো।

একজন খুব জোরে শাবলের চাড় দিতেই একটা আলকাতরা মাখানো কালো কাঠের দেওয়াল সরে গেল। পাটাতনের ওপাশে কিছু ভারী পাথর থাকে থাকে সাজানো। এবার সবাই মিলে সেই পাথরগুলো এক এক করে নামাতেই একটি অপরিসর সুড়ঙ্গমুখ নজরে এল।

সাধু একজনের হাতে মশালটা দিয়ে সঙ্গে আনা রাইফেলটা উঁচিয়ে ধরলেন। তারপর পা টিপে টিপে এগিয়ে চললেন সামনের দিকে। এক জায়গায় গিয়ে হাতের ইঙ্গিতে সকলকে থামতে বললেন। তারপর নিঃশব্দে পাথরের দেওয়ালে গা ঘেঁষে একটু একটু করে এগোতে লাগলেন। কিছুটা পথ যাবার পরই পৌঁছে গেলেন সঠিক জায়গায়। দু'জন লোক যেখানে বসে দুর্গের বাইরের দিকে নজরদারি করছিল এবং ধারে কাছে কেউ এলে তাকে গুলি করবার জন্য অপেক্ষা করছিল, ঠিক সেইখানে।

এমন নিঃশব্দ পদসঞ্চারণ যে, লোকদুটি টেরই পেল না কী চতুর পদক্ষেপে মর্মান্তিক মৃত্যু ধীরে ধীরে তাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

সাধুর দু’চোখে এখন প্রতিহিংসার আগুন। এই গুহার জঠরে পা দেওয়া মাত্রই তাঁর পূর্ব স্মৃতি যেন আবার ফিরে এল। সেই দস্যুসর্দারের মেজাজ আচ্ছন্ন করে ফেলল তাঁর দেহমনকে। তিনি আবার সেই বিশ বছর আগের হিন্দোলসর্দার হয়ে উঠলেন। বন্দুকটা উঁচিয়ে ধরে একবার শুধু বলে উঠলেন, জয় ভবানী।

ডাকাত দুটি নিদারুণ ভয়ে চমকে উঠে ফিরে তাকাতেই সুনিপুণভাবে ট্রিগার টিপলেন, ডিস্যুম, ডিস্যুম।

দু'দুটো প্ৰাণ লুটিয়ে পড়ে কবুতরের মতন ছটফট করতে লাগল।

ওদের বুকের রক্তে তিলক কেটে ইঙ্গিতে সবাইকে চলে আসতে বললেন।

বিনা যুদ্ধে আসল জায়গাটাই কবজা হয়ে গেছে। কেল্লা এখন হাতের মুঠোয়। সাধুর ডাক শুনে হই হই করে ছুটে এল সবাই।

একজনের হাত থেকে মশালটা টেনে নিয়েই একেবারে বুরুজের মাথায় উঠে গেলেন সাধু। তারপর ঘন ঘন মশাল আন্দোলন করে চেঁচাতে লাগলেন, এসো,

এসো, সবাই চলে এসো ভেতরে। এবার শুধু দেখো আর মারো।

সাধুর ইঙ্গিত পেয়েই লালচাঁদ তার দলবল নিয়ে কেল্লার মুখে ছুটে এলেন। বিশাল তোরণ ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। তাই ঘন ঘন দরজায় লাথি আর ধাক্কা দিতে লাগল।

সাধু ওপর থেেেক নেমে এসে ফটকের দরজাটা খুলে দিতে বললেন সকলকে।

হিংলাজসর্দার নিজে গেলেন দরজা খুলতে। কিন্তু দরজার মুখেই বাধা। যমের মতন দু'জন লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল হিংলাজের ওপর।

সাধু চেঁচিয়ে উঠলেন, খবরদার। যানে দো উসকো।

লোকদুটি সাধুর কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল। একজন বলল, আপ— কৌন হ্যায়? তোদের বাবা। এই কণ্ঠস্বর তোরা অনেকদিন শুনতে পাসনি নারে? স—স —–সর্দার! আপ জিন্দা হ্যায়?

হ্যা। আমি জিন্দা আছি। কিন্তু তোমরা এবার মরবার জন্য তৈরি হও। শবনম বন্দুক উঁচিয়েছিল।

সাধু বললেন, না। ওভাবে নয়। টাঙ্গি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে কেটে ফেলো ওদের। কেউ গিয়ে দরজাটা খুলে দাও। লালচাঁদ ভেতরে ঢুকুক। ওর লোকজন বাইরে অপেক্ষা করছে।

নির্দেশ পাওয়া মাত্রই হিংলাজের লোকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই লোকদুটির ওপর। টাঙ্গির কোপে কচুকাটা করে ফেলল আক্রমণকারীদের। ফটকের দরজায় খিল খুলে দিতেই লালচাঁদ তাঁর দলবল নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। তারপর হই হই করে ছুটে চললেন সামনের দিকে।

লালচাঁদের এসবই তো পরিচিত। হিন্দোলসর্দারের সবচেয়ে প্রিয় পাত্র ছিলেন তিনি। কিন্তু ভবিতব্য এবং দুর্জনের বিশ্বাসঘাতকতায় দীর্ঘ কুড়িটা বছর এই কেল্লার মসনদ থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। লালচাঁদ দুর্বার গতিতে এগিয়ে চললেন। তিনি যে আহত। তাঁর এখন বিশ্রামের প্রয়োজন তা তিনি মনেই করলেন না।

ওরা দলবল সমেত যেই কেল্লার মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে পৌঁচেছে অমনি দেখল চারদিক থেকে দুর্জন সিং-এর লোকেরা ঘিরে ফেলল ওদের।

লালচাদের লোকেরাও তো নিরস্ত্র নয়। তাই বন্দুক উঁচিয়ে রুখে দাঁড়াল। শত্রুপক্ষের হাতেহাতে মেশিনগান। তারা এমনই মরিয়া যে লালচাঁদের লোকেদের আক্রমণ করবার কোনওরকম সুযোগ না দিয়েই শুরু করে দিলট্রা-রা-রা-রা-রা।

লালচাঁদ মাঝামাঝি জায়গায় ছিলেন। তাই কোনওরকমে বসে পড়ে প্রাণ বাঁচালেন। কিন্তু তাঁর দলের লোকেদের দু'-তিনজন একেবারে চিরনিদ্রায় শুয়ে পড়ল।

শত্রুপক্ষের লোকও মরল বইকী।

একজন ছাড়া প্রায় সবাই শেষ।

যে একজন বেঁচে ছিল, শবনমের গুলিতেও সেও লুটিয়ে পড়ল।

কিন্তু আসল মাল কোথায়? সেই দুর্জন সিং?

সাধু চিৎকার করে উঠলেন, কোথায় গেল সেই শয়তান কুত্তাটা। বেরিয়ে আয় আমার সামনে। বেরো বলছি।

কারও কোনও সাড়াশব্দ নেই।

সাধু বললেন, শোনো তোমরা! এই কেল্লার ভেতরে যেদিকে এতটুকু ফাঁক পাবে সে দিকেই ঢুকে পড়ো সবাই। চারদিকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখো কে কোথায় আছে। বুরুজের মাথায় উঠে যাও কয়েকজন। এখনও নিশ্চিন্ত হবার কোনও কারণ নেই। ওই শয়তান দুর্জন সিং আড়াল থেকে লুকিয়েও আক্রমণ করতে পারে।

এমন সময় হিংলাজসর্দার ছুটে এসে বলল, সাধুজি! একটা জেলখানার মতো ঘরে কতকগুলো মেয়েকে আটকে রেখেছে ওরা। আমার মেয়েটাকেও বোধহয় ওইখানেই রেখেছিল।

বার করে আনো।

কিন্তু লোহার গরাদে তালা দেওয়া।

ভাঙতে পারলে না? ভাঙো।

আমার লোকেরা তালা ভাঙার কাজে লেগে গেছে বাবা। আর একজন ছুটে এসে বলল, আমরা এইমাত্র দুটো ছেলেকে মুক্ত করে আনলাম।

ওদের তোমাদের জিম্মায় রাখো। আর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখো দুর্জন সিং লুকল কোথায়? ওকে খুঁজে বার করতেই হবে।

যে ঘরে বন্দিনী মেয়েদের আটকে রেখেছিল দুর্জন সিং-এর লোকেরা, শবনম সেই ঘরের দিকে গেল।

মেয়েরা ভেতর থেকে চিৎকার করছে, আমাদের মুক্তি দিন। আমাদের বাঁচান।

শবনম বলল, আমার মা-ভগিনীরা। আপনাদের কোনও ভয় নেই। এই কেল্লা আমরা দখল করেছি। এখন আপনারা মুক্ত। আমরা আপনাদের প্রত্যেককে যার যার ঠিকানায় পৌঁছে দেব।

বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায় তালা ভাঙা হতেই মেয়েরা বেরিয়ে পড়ল।

এমন সময় হঠাৎ এক পৈশাচিক উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল হিংলাজসর্দার, পেয়েছি পেয়েছি। শয়তানের বাচ্চাটাকে পেয়েছি। সাধুবাবা ছুটে এলেন, কাকে পেয়েছ হিংলাজ?

এই দেখুন!

বিশ্বাসঘাতক কোথায় লুকিয়েছিল এতক্ষণ?

হিংলাজ বলল, এই চৌবাচ্চাটার ভেতর। আমি চারদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখি চৌবাচ্চার মাথায় একটা কাঠের তক্তা ঢাকা দেওয়া আছে। দেখেই সন্দেহ হল। যেই না ঢাকাটা সরিয়েছি অমনি শয়তানটা বন্দুক উঠিয়েছে। মারলুম মুখে এক ঘুসি।

আর মেরো না। ওকে আমার হাতে ছেড়ে দাও।

না। ওর জন্যে আমার মেয়েটা আত্মঘাতী

আমি নিজের হাতে ওর গলার টুটি ছিঁড়ব।

ও কাজটা আমাকে করতে দাও হিংলাজ।

হয়েছে। ওকে আমি ছাড়ব না।

দুর্জন সিং ভয়ে থর থর করে কাঁপছে তখন। তার আর পালাবার পথ নেই। চারদিক থেকে সবাই ছেঁকে ধরেছে ওকে।

সাধু বজ্র নির্ঘোষে বললেন, মাথার ওপর হাত ওঠাও দুর্জন। অদ্যই তোমার শেষ রজনী। কিছুক্ষণ সময় দিচ্ছি শুধু নিজের প্রিয় মুখগুলিকে একবার চিন্তা করে নাও। তারপর তোমাকে আমি একটু একটু করে মৃত্যুর দরজায় ঠেলে দেব। তার আগে একবার ভাল করে তাকিয়ে দেখ আমায় তুমি চিনতে পারো কি না?

দুর্জন একবার তাকিয়ে দেখেই বলল, সর্দার তুম!

হ্যাঁ আমি।

তুম আভি তক জিন্দা হ্যায়?

না। আমি মরে গেছি। এটা আমার প্রেতাত্মা। তোমার সঙ্গে জীবনের শেষ দেখা করতে এসেছি আমি ছোরা, টাঙ্গি আর বন্দুকের গুলি নিয়ে। বলো এর মধ্যে কোনটা তোমার পছন্দ?

দুর্জন কাঁপতে কাঁপতে বলল, এর কোনওটাই আমার পছন্দ নয়। তুমি আমাকে আর একবার জীবনের শেষবার, তোমার সঙ্গে দোস্তি করবার সুযোগ দাও সর্দার। -

লালচাঁদও তখন দুর্জনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। বললেন, তোমার সঙ্গে দোস্তি করলে আমি আমার বউ-ছেলেকে ফিরে পাব?

দুর্জন শিউরে উঠল লালচাঁদকে দেখে।

লালচাঁদ দুটো পেরেক দু’হাতে নিয়ে এগিয়ে আসতে লাগলেন ওর হিংস্র চোখদুটোর দিকে।

দুর্জন চিৎকার করে উঠল, নেহি। নেহি। নেহি।

বল শয়তান, কীসের লোভে আমার ছেলেটাকে গুলি করে মারলি? কেন আমাদের অমন সর্বনাশ করলি? আমার বউকে খুঁজে পেলাম না কেন? কেন তুই সর্দারের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করলি? বল, বল, কেন করতে গেলি ওইরকম বেইমানি?

ম্যায় তুমহারা গোড় পাকড়তি হুঁ। মুঝে মাফ করো লালচাঁদ। এ সাজা মুঝে মাত দো।

সাধু তখন সাধু নয়। আবার হিন্দোলসর্দার। বহুদিনের অভ্যস্ত পায়ে এক লাথি মারলেন দুর্জনকে। সে লাথি হজম করার শক্তি দুর্জন সিং-এর নেই। তাই দশ হাত দূরে ছিটকে পড়ল।

ততক্ষণে হিংলাজসর্দার আবার ঝাঁপিয়ে পড়েছে দুর্জনের ওপর।

ওদিক থেকে শবনমও ছুটে এসেছে তখন, ওকে ছেড়ে দাও, ওকে ছেড়ে দাও সর্দার। আমি যে ভীষণ প্রতিজ্ঞা নিয়েছি ওকে কুকুরের মতো গুলি করে মারবার। সাধু সাবধান করলেন। লালচাঁদও বাধা দিলেন।

সেই সুযোগে শয়তান আবার নিজমূর্তি ধরল। হঠাৎ লাফিয়ে উঠেই এলোপাথাড়ি গুলি করতে লাগল চারদিকে। দু’-চারজন পাহাড়িয়া গুলি খেয়ে ছটফট করতে লাগল। তারপরই সব শেষ! গুলিও শেষ। আর যেই না শেষ হওয়া, অমনি প্রাণভয়ে ফটকের দিকে দৌড়ল দুর্জন।

শবনম ওকে ভয়ংকরভাবে তাড়া করে চলল, পালাবি কোথায় শয়তান? আজ আমার হাতেই তোর মরণ। জয় মা ভবানী।

দুর্জন তখন কেল্লার বাইরে। শবনমও বেরিয়ে এসেছে। কেল্লার ভেতরে থাকায় বুঝতেই পারেনি কেউ, কখন যে এক সময় ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। শবনমকে একা পেয়ে রুখে দাঁড়াল দুর্জন।

আর শবনম তখন সেই অভিশপ্ত বন্দুকের গুলিতে ঝাঁজরা করে দিল দুর্জনের দেহটা। গুলির পর গুলির আঘাতে দুর্জনের দেহটা ছিটকে পড়ল পাথরের বুকে। একবার শুধু থর থর করে কেঁপে উঠল দেহটা। তারপর একেবারে স্থির হয়ে গেল।

ক্লান্ত শবনম তখন সেইখানেই বসে পড়েছে। আঃ কী দারুণ শান্তি। ভোরের বার্তা নিয়ে প্রকৃতি ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে তার আপন বৈচিত্র্যে।

সাধু এসে শবনমের মাথায় হাত রাখলেন।

শবনম ডাকল, বাবা!

মা!

আপনি এবার আত্মগোপন করুন।

কেন রে পাগলি? আমি চোর না ডাকাত? এখন আমি মা ভবানীর উপাসক। আমার অতীতও নেই। ভবিষ্যৎও নেই। আছে শুধু বর্তমান। আমার আসল পরিচয়টা কাউকে দিস না। তা হলেই হবে।

সাধু ও শবনমের কাছে লালচাঁদও এসে

দাঁড়ালেন।

সাধু বললেন, ওদিককার কাজ কতদূর?

হিংলাজের লোকেরা ধোয়ামোছার কাজে লেগে গেছে। ডেড বডিগুলোকেও বুরুজের মাথা থেকে ফেলে দিচ্ছে নীচের খাদে।

বারুদ বন্দুক বা অন্যান্য মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র যা কিছু আছে, কেল্লার বাইরে দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে সব লুকিয়ে ফেলো।

লালচাঁদ চলে গেলেন।

এমন সময় বহু দূর থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠস্বরটি আবার শোনা গেল শ ব—ন—ম!

কে! কে ডাকে! রঞ্জন! রঞ্জন তুমি কোথায়?

এই তো আমি এখানে।

কী আশ্চর্য! তুমি ওখানে গেলে কী করে?

আমি পথ ভুল করেছি শবনম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তোমার কাছে চলে এসেছি। আমার সামনে গভীর খাদ।

তুমি ওইখানেই থাকো। যেন লাফিয়ে আসতে যেয়ো না। পড়ে যাবে। আমি হিংলাজসর্দারকে পাঠাচ্ছি। তোমাকে পথ চিনিয়ে নিয়ে আসবে। একটু অপেক্ষা করো তুমি।

রঞ্জন বলল, মায়ের নাম নিয়ে একটা লাফ দেব?

শবনম তখন খাদের কাছাকাছি চলে গেছে। বলল, খবরদার ওই কাজ করতে যেয়ো না। অযথা জীবনের ঝুঁকি কেন নেবে?

কিন্তু দুরন্ত দুর্বার দামাল কিশোর কি পিছিয়ে থাকতে পারে? হঠাৎ একটু পিছিয়ে গিয়ে ছুটে এসে মারল এক লাফ।

শবনম কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরল রঞ্জনকে। ওর গায়েমাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তুমি ভাল আছ তো?

আমি ভাল আছি। তোমার কাঁধে ব্যান্ডেজ কেন?

ও কিছু নয়। একটা গুলি লেগেছিল। কিন্তু এই বিপজ্জনক পথে একা তুমি কীভাবে এলে?

সে অনেক কথা। পরে বলব খন। এক অফিসারের ঘরে রাত্রিতে ছিলাম! শেষরাতে তোমার কথা ভেবে ভেবে আর থাকতে পারলাম না! কাউকে কিছু না জানিয়েই পালিয়ে এসেছি।

এটা তুমি খুবই অন্যায় করেছ রঞ্জন। কী ভাববেন বল তো তাঁরা। তা ছাড়া এই বন্দুক তুমি পেলে কোথায়?

পথে আসতে আসতে কুড়িয়ে পেয়েছি।

বন্দুক কী করে চালাতে হয় তাই জানো না, অথচ বন্দুক ঘাড়ে নিয়েছ দুষ্টু কোথাকার।

রঞ্জনকে দেখে সাধুবাবাও এগিয়ে এলেন।

শবনম বলল, বাবা এই সেই। আমার রঞ্জন।

বাঃ ভারী সুন্দর। তোমরা যে দেখছি একেবারে মাণিক-জোড়! ওকে যে আবার ফিরে পাব তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি বাবা।

রঞ্জন বলল, আমাদের কেল্লাঅভিযান হয়ে গেছে?

হ্যাঁ। যার নামে এই কেল্লা ইনিই তিনি। হিন্দোলসর্দার। সে কী! ইনি তো একজন সাধুবাবা।

এঁর পরিচয় পরে দেব তোমাকে। পুলিশের ঝামেলাটা আগে চুকে যাক। তবে

একটু জেনে রেখো আসল শয়তানকে আমি নিজেহাতে গুলি করে মেরেছি। এমন সময় হিংলাজসর্দার এসে রঞ্জনকে দেখেই উল্লসিত হয়ে উঠল, এই তো খোকাবাবু এসে গেছেন দেখছি। আসুন ভেতরে আসুন। মুখহাত ধুয়ে গরম গরম হালুয়া-পুরি খেয়ে শরীরটাকে একটু চাঙ্গা করে নিন।

সাধু বললেন, ঠিক বলেছ। এইবার শরীরটাকে একটু চাঙ্গা করার দরকার। চলো ভেতরে চলো।

ওরা যখন কেল্লার ভেতরে ঢুকল তখন পুবের পাহাড়গুলোর চূড়া ডিঙিয়ে সোনার বরণ তরুণ তপন রাঙামুখে উদয় হচ্ছে।

ভবানী মন্দিরে আজ জোর পুজোর আয়োজন। আজকের এই পরিবেশ দেখলে কেউ ধারণাই করতে পারবে না যে এখানে একটা ডাকাতের ঘাঁটি ছিল বা এরাও মোস্ট ডেঞ্জারাস বলে। চারদিকে শুধুই পুজো পুজো গন্ধ। বন্দিনী মেয়েরা সবাই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে শবনমের সাথে এক যোগে কাজে লেগেছে। সাধু একজন লোককে নীচে পাঠিয়ে কিছু নতুন বস্ত্র কিনে আনিয়েছেন। শবনমও ওর ডাকাতরানির পোশাক ত্যাগ করেছে। সাবান মেখে ঝরনার জলে স্নান করে রঙিন একটি ডুরে শাড়ি পরে প্রজাপতির মতো যেন উড়ে বেড়াচ্ছে। ওর চেয়ে সুখী বোধহয় আর কেউ নেই।

রঞ্জনও শবনমের পরিবর্তনে অভিভূত। এই না হলে মেয়ে। কী ভাল যে লাগছে শবনমকে। এমন সুন্দর মেয়েটি কোথাও কিছু নেই হঠাৎ ফুলনদেবী হয়ে বসে রইল। এর চোখে গভীর প্রশান্তির কোলে ওই হত্যার ঝিলিক একেবারেই অসহ্য।

আজ শুধু দেবীর গলায় নয়। সবার গলাতেই ফুলের মালা। রক্তচন্দনের টিপ। ভবানীমন্দিরের গুহার জঠরে শুধু ধূপধুনোর গন্ধ। কাটা ফলের সুবাস। হিন্দোলকেল্লার চূড়ায় আজ পত পত করে উড়ছে হলুদে ছোবানো পতাকা। কেল্লার ভেতর থেকে বড় বড় হাঁড়ি-কড়া ইত্যাদি এনে বাইরে ভিয়েন বসানো

হয়েছে। বড় বড় কড়াইতে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে।

এরই মধ্যে সাধুর নির্দেশে কেল্লার ভেতরে গুপ্তকক্ষগুলিতে যাবার পথগুলো পাথর সাজিয়ে রুদ্ধ করে দিয়েছে সকলে। হিংলাজসর্দারের লোকেরা লালচাঁদের লোকেদের নিয়ে দলবদ্ধ হয়ে এই কাজ করেছে। লালচাঁদের লোক অবশ্য দু’-চার জন। ওদের লোকই বেশি। এমনভাবে পথ রোধ করেছে যাতে অচেনা কেউ এর ভেতরে ঢুকলে ওদিকে যে যাবার রাস্তা আছে তা বুঝতে না পারে।

বেলা প্রায় বারোটা নাগাদ পুলিশ এল।

তরুণ পুলিশ অফিসার এসেই রঞ্জনকে বকাবকি করলেন, কী হে ছোকরা! তুমি যে ওইভাবে পালিয়ে এলে, তোমার সাহস তো কম নয়? আর একটু তর সইল না তোমার? এই জঙ্গলের পথে একা একা চলে এলে ভয় করল না? আমি তো ভাবলাম নিয়তি তোমাকে ডেকেছে। নির্ঘাত তুমি বাঘের পেটে গেছ।

রঞ্জন বলল, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমি কিছুতেই থাকতে পারছিলাম না। জানি খুবই অন্যায় করেছি। তা আমাদের এস পি সাহেব কোথায়? তাঁকে দেখছি না কেন? ওঁর তো আসবার কথা ছিল।

উনি হঠাৎ একটা অন্য কাজে আটকে পড়েছেন। তবে ওনার ইচ্ছে যে আমি তোমাদের দু'জনকে নিয়ে একবার ওনার বাসাতে যাই। বলে তাঁর লোকেদের বললেন, এই হাঁ করে সব দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কেল্লাটাকে ঘিরে ফেল।

এই কথা শুনে এক ডিশ পুজোর প্রসাদ নিয়ে হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে

শবনম বলল, তার আর প্রয়োজন হবে না। এখন এগুলো খেয়ে নিন দেখি। তরুণ অফিসার মুগ্ধ হয়ে গেলেন শবনমকে দেখে। বললেন, তুমি কে মা? নিশ্চয়ই আমাদের নতুন ডাকাতরানি শবনমদেবী?

সাধু নিজে এবার এগিয়ে এসে বললেন, না। শুধু দেবী।

তরুণ অফিসার এগিয়ে এসে সাধুকে দেখে ভক্তিভরে প্রণাম করে বললেন, আপনি কে বাবা?

আমি এক ভবঘুরে সন্ন্যাসী। ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে দেখি হঠাৎ এক কাণ্ড। তা এই সব পাহাড়ি লোকজনদের সঙ্গে নিয়ে বহু কষ্টে মেরেধরে তাড়িয়েছি দুর্বৃত্তগুলোকে। কেল্লা এখন শত্রুমুক্ত। এইসব আদিবাসীরা আশ্রয়হীন হয়ে বড় কষ্ট পাচ্ছিল। আমি ওদের সবাইকেই ঢুকিয়ে দিয়েছি ওই কেল্লার ভেতর। এখানে এক জায়গায় মা ভবানীর একটি মূর্তিও রয়েছে দেখছি। তাঁরই আরাধনা করছিলাম এতক্ষণ।

আপনার নেতৃত্বই এদের প্রেরণা জুগিয়েছে বাবা। আপনি তা হলে এক কাজ করুন না, এখানেই থেকে যান না বরাবরের জন্য।

এরাও তাই বলছে। আমিও ভাবছি। আমরা দলবদ্ধ হয়ে এখানে বসবাস করলে এই কেল্লা চিরকাল শত্রুমুক্ত থাকবে।

শুধু তাই নয়, এইসব লোকজনগুলোও মানুষ হয়ে যাবে। আপনি থেকে যান। আমিও এই বিদেশে একঘেয়ে দিন কাটাচ্ছি। মাঝেমধ্যে আপনার বউমাকে নিয়ে এখানে বেড়িয়েও যাব। চাই কী কেল্লার ভেতরে থেকেও যাব দু’-একটা দিন।

সাধু বললেন, ভালই হবে।

যাক। পুলিশের দায়িত্ব আপনারাই অনেকটা পালন করে দিয়েছেন। আপনাদের কখনও কোনও অসুবিধা হলে আমাকে জানাবেন। আমি সব রকমের সাহায্য করব। হ্যাঁ, একটা কথা। ওদের ঘাঁটি থেকে কোনও মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র কিছু পাননি?

সাধু জানতেন পুলিশ একথা জানতে চাইবে। তাই কিছু অস্ত্র পুলিশকে দেবার জন্য হাতের কাছেই রেখেছিলেন।

পুলিশের লোকেরা সেগুলো গ্রহণ করল।

সাধু বললেন, অনেক অসহায় মেয়ে এখানে বন্দিজীবন কাটাচ্ছিল। তাদের যার যার বাড়িতে ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থাটা একটু তাড়াতাড়ি করে দিতে হবে কিন্তু।

মেয়েরা সবাই বলল, না। আজ আমরা কোথাও যাব না। যা হবে কাল। আজ আমরা এখানে মাতৃ-আরাধনা করব।

সাধু বললেন, শবনম তুমি কী করবে?

রঞ্জন?

রঞ্জন বলল, এখন এখান থেকে চলে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। আরও দু’–একটা দিন থাকতেই হবে এখানে।

শবনম বলল, না বাবা। ওকে যেতেই হবে। না হলে ওর মা-বাবা চিন্তা করবে খুব। আমি কিন্তু আপনাকে ছেড়ে যাব না। এই কেল্লা, ওই পাহাড়, এই অরণ্য এর চেয়ে মধুময় আমার কাছে আর কিছুই নেই। তা ছাড়া আমি চলে গেলে মা ভবানীর সেবা পুজোর জোগাড় করে দেবে কে?

রঞ্জন বলল, কী পাগলের মতো বকছ যা তা! তোমার সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। লেখাপড়া করবে। বড় হবে। যেতেই হবে তোমাকে। আমি তোমাকে নিয়ে যাব।

সাধু বললন, ও ঠিকই বলেছে মা। এই বনবাস তোমার সাজে না। তা ছাড়া এখন তো আর তোমার জাতপাত নেই। তুমি এখন দেবী। তুমি আমার মেয়ে। মা ভবানীর মেয়ে।

তবু আমি এখানেই থাকব। এই ভবানী মন্দিরে দেবদাসী হয়ে বেঁচে থাকব সারাজীবন। আপনাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। রঞ্জনকে যেতেই হবে। ও যাক। বরং আমাদের বন্ধুত্বকে স্মরণীয় করে রাখতে মাঝেমধ্যে ও চলে আসবে এখানে। পারলে ওর মা-বাবাকেও নিয়ে আসবে।

রঞ্জনের চোখে যেন জল এসে গেল। বলল, তুমি যাবে না শবনম?

শবনম স্মিত হেসে ঘাড় নাড়ল, না।

পুলিশ অফিসার বিদায় নিলেন। পাহাড়িয়া মানুষগুলো আবার নতুন করে কাজে মেতে উঠল। শবনম রঞ্জনের হাত ধরে টানতে টানতে কেল্লার বুরুজের মাথায় উঠে গেল। অভিমানে রঞ্জনের বুক তখন ভরে উঠেছে।

শবনম বলল, তোমার ভালর জন্যই আমি যাচ্ছি না। তুমি বড় হও। নিজের পায়ে দাঁড়াও। তারপরও যদি আমার কথা মনে থাকে তা হলে আমাকে এসে নিয়ে যেয়ো, আমি যাব। এই মুহূর্তে যদি তোমার মা-বাবা অরাজি হন আমি তা হলে যাব কোথায়? ওই পার্ল স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে আমি আর ফিরছি না। তুমি আমাকে ভুল বুঝ না রঞ্জন। এখানে আমি সুখেই থাকব।

রঞ্জন বুরুজের খাঁজে মাথা রেখে কাঁদছিল।

শবনম আলতো করে পিঠে হাত রেখে ডাকল, রাজা।

উঁ।

জলভরা চোখে রঞ্জন তাকাল শবনমের দিকে। শবনম ওর আঁচলের খুট দিয়ে রঞ্জনের চোখের জল মুছিয়ে দিল।

রঞ্জন বলল, আমি ফিরে গেলে তুমি আমাকে ভুলে যাবে না তো?

আল্লার কসম। মা ভবানীর দিব্যি। আমার এই বন্ধু রাজাকে আমি কি ভুলতে পারি? তুমি ফিরে যাও। মাঝে মাঝে তোমার মা-বাবাকে নিয়ে এখানে বেড়াতে এসো। আমি তোমার স্মৃতি বুকে নিয়ে এখানে সুখে থাকি। রাজ্যপাট চালাই। তারপর যখন আমরা আরও বড় হব, তখন যা হয় হবে।

হিন্দোলকেল্লার বুরুজের মাথায় ওরা দু'জনে হাতে হাত রেখে গঙ্গা-যমুনার ধারার মতো এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে বইতে লাগল। চারদিকের পাহাড় ও বনভূমিতে উজ্জ্বল দিন এবং আকাশের নীলিমায় সাদা মেঘের নিরুদ্দেশ যাত্রা উদাস করে দিল মনকে। নীচে ভবানী মন্দিরে ভোগারতির ঘণ্টা বাজল বুঝি। এক ঝাঁক রঙিন টিয়া, রঙের বাহার নিয়ে হারিয়ে গেল সুদূর বনরেখায়। এই বন, এই পাহাড়, সবই যেন কাব্যময় হয়ে উঠল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%