অভিশপ্ত তিড্ডিম

ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

এক

আমি তখন শ্রীপতি নাট্য কোম্পানি নামে একটা পেশাদার যাত্রাদলে চাকরি করি। আমাদের দল কোলিয়ারি অঞ্চল এবং আসামে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। সেবার আমরা হাফলঙে এলাম আমাদের দল নিয়ে। বড় মনোরম জায়গা। সেখানে গিয়ে আমাদের দল একেবারে জেঁকে বসল প্রায়। ওইটুকু জায়গায় পর পর কয়েকদিন ধরে আমাদের একটানা অভিনয় হল। এবং প্রায় প্রতিদিনই আমরা সেখানকার দর্শকদের মনজয় করে ঘন ঘন করতালি ও অভিনন্দন গ্রহণ করতে লাগলাম।

এইখানে যে বাংলোতে আমরা থাকতাম সেখানে বাহাদুর নামে একজন নেপালি দারোয়ান ছিল। তার সঙ্গে কয়েক দিনের মধ্যেই আমার খুব ভাব জমে উঠল। বাহাদুর এক একদিন আমার অভিনয় দেখে আর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। একদিন কথায় কথায় বাহাদুর আমাকে বলল, আচ্ছা বাবু, আপনি তো অনেক দেশ ঘুরেছেন। সত্যি করে বলুন তো, আপনাকে কোন দেশটা সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে?

আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম। এর কী উত্তর দেব বাহাদুরকে? তবু বললাম, দেখো বাহাদুর; জীবনে আমি অনেক দেশ ঘুরেছি একথা সত্যি। তবে কী জান, যখন যেখানে গেছি তখন আমার সেইখানটাই ভাল লেগেছে। তবুও ভালর চেয়েও ভাললাগা বলে একটা কিছু তো আছে, তা আপার হাফলং-এর এই সৌন্দর্য আমি জীবনে ভুলব না। এত ভাল আমাকে কোনও জায়গা লাগেনি। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সত্যিই আমি মুগ্ধ।

বাহাদুর বলল, সত্যি বলছেন, বাবু?

সত্যি বলছি। এমনিতেই পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল আমাদের শহরের লোকেদের প্রত্যেকেরই ভাল লাগে। তবে আমার কথা আলাদা। আমার ভাল লাগাটা আবার অন্যের চেয়েও একটু বেশি। কেন না ছোটবেলা থেকেই পাহাড়-পর্বতের ওপর আমার একটা সহজাত টান আছে।

সব শুনে অত্যন্ত খুশি হয়ে বাহাদুর ব্লল, তা হলে আমাদের এই হাফলং, আপার হাফলং আপনার খুবই ভাল লেগেছে বলুন?

খু-উ-ব ভাল লেগেছে। দেখছ না, আমি কেমন ফাঁক পেলেই এদিক ওদিক কেটে পড়ি।

হ্যাঁ, আমি সেটা লক্ষ করেছি বাবু। তবে আপনি যদি চান তো, এই আপার হাফলঙের চেয়েও হাজার গুণ ভাল একটা জায়গায় আপনাকে আমি নিয়ে যেতে পারি। যাবেন আপনি সেখানে?

বাহাদুরের আগ্রহ দেখে বুঝতে পারলাম, আমার অজানা নিশ্চয়ই এমন এক মনোরম জায়গা এখানে আছে, যার হদিস আমি কোনও দিনই পাব না। একে আমি ভ্রমণরসিক লোক, প্রকৃতির বৈচিত্র্য দেখবার জন্য আমার মনপ্রাণ সবসময়ে ব্যাকুল হয়ে থাকে, তার ওপরে বাহাদুরের এই আহ্বান, এ সুযোগ আমি ছাড়ি কখনও? বললাম, যাব না মানে? কিন্তু কোথায়?

বাহাদুর একটু গম্ভীর হয়ে বলল, আপনি তিড্ডিমের নাম শুনেছেন?

না। তবে নামটা শোনামাত্রই বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ করছে। বেশ ভাবগম্ভীর নাম। তিড্ডিমটা কোথায়? আমাদের মানচিত্রে আছে?

আছে কি না-আছে তা বলতে পারব না। তবে যে কেউ ইচ্ছে করলেই সেখানে যেতে পারে না।

আমার মন আনন্দে নেচে উঠল।

যে জায়গায় ইচ্ছে করলেই কেউ যেতে পারে না, সেই জায়গায় আমি যাব। বাহাদুর যখন আছে তখন সে জায়গায় যাওয়া আমার আটকায় কে?

বাহাদুর বলল, যেমন মনোরম জায়গা, তেমনি বিপদসংকুল। মরণ যেন পায়ে পায়ে ঘনিয়ে আসে। প্রাণ হাতে নিয়ে যেতে হয়। বলো কী !

হ্যাঁ বাবু। যদি আপনার সাহস থাকে, আর যাবার ইচ্ছে থাকে, তবেই আমি সেখানে আপনাকে নিয়ে যেতে পারি। সেখানে গেলে এমন সব দৃশ্য আপনি দেখতে পাবেন, যা দেখলে মাথাখারাপ হয়ে যাবে। তবে একটা কথা—

কী কথা বলো?

শুধু আপনি আর আমি যাব। আর কেউ নয়। কার ভাগ্যে কী ঘটে কে জানে? আমরা কেন নিমিত্তের ভাগী হব?

আমি বললাম, না না। গেলে তোমাতে আমাতে যাব। ওসব সঙ্গীসাথি আমি জড়াই না। ওরা হল পথের কাঁটা। তা যাক। কবে যাবে? কাল তো আমাদের শো বন্ধ। কাল গেলে হয় না?

বাহাদুর হেসে বলল, না বাবু। সে অনেক দূরের পথ। ওখানে তো হেঁটে যাওয়া যায় না। টাঙ্গা করে যেতে হয়। অনেক টাঙ্গাওলা হয়তো রাজিই হবে না যেতে। সেসব ব্যবস্থা করে তারপর যাওয়া। অন্তত দিন পাঁচেক আমাকে সময় দিতে হবে।

আমি হিসেব করে দেখলাম দিন পাঁচেক পরে আবার একদিন আমাদের শো বন্ধ আছে। ভালই হল। সেই দিনটাই আমরা তিড্ডিম যাবার জন্যে স্থির করলাম। কয়েকটা দিন যে আমার কীভাবে কাটল, তা ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। অধীর আগ্রহে আমি সেই দিনটির জন্যে প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। কতক্ষণে আসবে সেই দিন। কখন যাবার সেই ক্ষণটুকু এসে উপস্থিত হবে?

যাবার আগের দিন রাত্রে বাহাদুর হতাশ হয়ে এসে বলল, নাঃ। অনেক চেষ্টা করেও কোনও টাঙ্গাওলাকে রাজি করাতে পারলাম না।

শুনেই মনটা খারাপ হয়ে গেল, তা হলে উপায়?

উপায় একটা বের করছি। যাওয়া আমাদের হবেই। আমার বন্ধুর একটা টমটম আছে। তাতে করেই যাব। বন্ধুও যেতে রাজি নয়। অগত্যা আমাকেই টমটম চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কাল খুব ভোরে উঠে আমরা দু'জনে রওনা হব। আপনি খাবারদাবার বেঁধে ঠিক করে রাখবেন, কেমন?

যাক! আমার মনটা এতক্ষণে হালকা হয়ে গেল। যেই শুনেছি টাঙ্গা পাওয়া যায়নি, অমনি মনটা যে কী ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল তা কী বলব। চোখফেটে যেন জল আসছিল। এখন যাবার আনন্দে কল্পনার পাখি হয়ে উড়ে চলল মন। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি? সেই কতটুকুর এত্তটুকুও তো জানতে পারব কাল?

পরদিন খুব ভোরে উঠে আকাশের তারা থাকতে থাকতে রওনা হলাম দু'জনে। আমি আর বাহাদুর। বাহাদুর নিজেই টমটম চালাতে লাগল। আপার হাফলঙের পথে ছুটে চলল আমাদের টমটম।

ক্রমে আমরা লোকালয় ছেড়ে এক ঘন অরণ্যভূমির মধ্যে এসে পড়লাম। কত ছোট ছোট নদী ও ঝরনার পাশ দিয়ে যে আমাদের টমটম ছুটে চলল তার ঠিক নেই। আমার মনে হল যেন রূপকথার রাজপুত্র আমি। রথে চড়ে দিগ্বিজয়ে চলেছি। আর বাহাদুর আমার সারথি। ওঃ! সে যে কী আনন্দ!

আমাদের সঙ্গে রয়েছে প্রচুর খাবার। আর দু'জনের জন্যে দুটো ধারালো কুড়ুল। আত্মরক্ষার জন্যে এ-দুটো সঙ্গে নিয়েছি আমরা। যদিও জানি সত্যিকারের বিপদ এসে সামনে দাঁড়ালে হাতের কুড়ল হাতেই থাকবে। তবুও নিয়েছি।

যেতে যেতে ভোরের আলো মুছে গেল এক সময়।

তরুণ রবির অরুণ আলোয় ঝলমলিয়ে উঠল। আহা কী অপরূপ। ফুলের গন্ধে অপরিচিত গাছগাছালির গন্ধে মনপ্রাণ ভরে উঠল। কত পাখির কণ্ঠস্বর কানে এল। কত সুন্দর হরিণ যে চোখে পড়ল, তা বলে বোঝাতে পারব না।

যাই হোক। এইভাবে যেতে যেতে বেলা প্রায় দশটা নাগাদ টমটম এসে এক জায়গায় থামল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তিড্ডিম আর কত দূরে

বাহাদুর?

বাহাদুর বলল, এই তো এসে গেলাম। এই হল তিড্ডিম। অবশ্য এবার আমাদের হাঁটাপথে আরও কিছুটা যেতে হবে। আমি যেখানে নিয়ে যেতে চাই, সেটা আরও গভীরে।

বললাম, এটাই তো ফরেস্ট। আরও গভীরে?

হ্যাঁ বাবু। এখানে সচরাচর কেউ আসে না।

আর বাক্যব্যয় না করে দু'জনেই নেমে পড়লাম টমটম থেকে।

বাহাদুর একটা শাল গাছের গুঁড়ির সঙ্গে টমটম বাঁধল। তারপর ঘোড়াটাকে মুক্ত করে অপর একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে খেতে দিল তাকে।

আমি বললাম, বাহাদুর! এবার আমাদেরও একটু জলযোগ সেরে নেওয়া কী বলো? যাক,

হ্যাঁ। বেলা তো হয়েছে অনেক। এখনও হাঁটাপথ বাকি আছে।

আমাদের সঙ্গে কলা, পাউরুটি, ডিম, সন্দেশ ইত্যাদি ছিল। পেট ভরে খেয়ে নিলাম দু'জনে। খাওয়া হলে দু'জনে দুটো কুণ্ডুল ঘাড়ে করে টর্চ ও খাবারের জায়গা নিয়ে এগিয়ে চললাম। একটা পিস্তলও ছিল আমার সঙ্গে। তবে সেটার কথা বাহাদুরকে বলিনি। খুব বিপদে না-পড়লে সেটা ব্যবহার করব না।

যাই হোক, হাঁটাপথে যেতে যেতে নয়ন-মনোহর সৌন্দর্যে অন্তর ভরে উঠল। এ পথে যে বিপদ আছে, এই পথের প্রতিটি পদক্ষেপে যে মরণ হাতছানি দিয়ে ডাকে, তা আমার মনেই হল না।

বাহাদুরের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি।

প্রকৃতির এমন সালংকারা রূপ এই প্রথম দেখলাম আমি।

বেশ কিছু পথ এসেছি। হঠাৎ হাতে একটা হেঁচকা টান। এমন মারাত্মক টান যে, আর একটু হলেই ছিটকে পড়েছিলাম। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। হল কী?

বাহাদুর হিসস, করে উঠল। তারপর আঙুল দিয়ে দেখাল সামনের দিকে।

আমি দেখলাম আমার ঠিক চোখের সামনেই সবুজ লতার মতো কী যেন একটা দুলছে। যেন কোনও লতানে গাছের শাখাগ্র একটি। বাহাদুর বলল, সাপ।

সাপ?

হ্যাঁ বাবু। পাহাড়ে যে কত রকমের সাপ আছে। নাম জানি না। আর একটু হলেই ওটা আপনার গায়ে ঠেকে যেত। আর ঠেকলেই সর্বনাশ। নিমেষের মধ্যে চুটিয়ে দিত একেবারে।

আমার হাত-পা তখন হিম হয়ে গেছে। বললাম, ভাগ্যে ধরলে? যাক। ওর তলা দিয়ে না-গিয়ে বরং পাশ দিয়ে চলে যাই চলো।

বাহাদুর বলল, এখন যাবেন কী বাবু? ওর কাছ দিয়ে গেলেই ও চুটিয়ে দেবে। বাহাদুরের কথা শেষ হতে না হতেই সেই লতার মতো সাপটা তিরের মতো সাঁত করে ছিটকে গেল একটা ঝোপের দিকে। যাক। আপদ গেল।

বাহাদুর বলল, খুব সাবধান। ভাল করে চারদিক দেখে পথ চলবেন। তাড়াতাড়ি করবেন না। অযথা বেশি কথা বলবেন না। আসুন, যে কোনও মুহূর্তে বিপদ ঘটতে পারে।

ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করছে তখন।

বাহাদুরকে আগে দিয়ে আমি ওর পিছু পিছু পথ চলতে লাগলাম।

খানিকটা পথ আসার পরই দেখি পথ রুদ্ধ। একটা মস্ত গাছকে বেড় দিয়ে কতকগুলো পাহাড়ি-ময়াল সোঁ সোঁ শব্দ করছে। গাছের ডালে পাকিয়ে কোনও ময়ালের মুখ নীচের দিকে দুলছে। একটা ময়াল শিকার ধরেছে। সম্ভবত হরিণ শিশু। তার আধখানা গিলেছে, আর বাকি আধখানা গেলবার চেষ্টা করছে।

আমরা পাশ কাটিয়ে একটু বাঁকা পথে সে রাস্তা পরিত্যাগ করলাম। এইভাবে অনেক পথ হেঁটে এক সময় এক জলাশয়ের ধারে পৌঁছলাম আমরা।

আমি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারলাম না। বিশ্বের অনন্ত সৌন্দর্য যেন এক সঙ্গে জমা হয়েছে এখানে। প্রকৃতির সে কী রূপ। চারদিকে পাহাড়— পাহাড় আর পাহাড়ের চূড়া। দূরদূরান্তেও পাহাড়ের রেখা। তারই গায়ে গায়ে পুষ্পিত বনভূমি। কত রঙের সমারোহ। আর যে জলাশয়ের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম আমরা, সেই জলাশয় পদ্মবনে ভরে আছে। জলাশয়ের আশেপাশে গোলাপের বন। আর জলাশয়ের মধ্যে বড় বড় অতিকায় পদ্মপাতার ফাঁকে ফাঁকে ছোট বড় পদ্মকুঁড়ি ও পদ্মফুলগুলি ফুটে আছে। কত পাপড়ি ঝরে জলের ওপর ভাসছে। যেন ছোট ছোট পাল তোলা নৌকো। দেখে মোহিত হয়ে গেলাম।

সেই জলাশয়ের ধারে একটি পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট একটি গুহা ছিল। গুহার মুখ এত সংকীর্ণ যে, হামাগুড়ি দিয়ে না-ঢুকলে এর ভেতরে ঢোকার কোনও উপায় নেই।

বাহাদুর বলল, এই গুহার ভেতরেই আমাদের আশ্রয় নিতে হবে।

আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, তা তো নিতে হবে। কিন্তু যদি এর ভেতরে কোনও জীবজন্তু বাসা নিয়ে থাকে তা হলে?

যতদূর জানি গুহাটা নিরাপদ। তবু ঢোকার আগে একবার দেখে নেব বইকী। এই বলে গুহামুখের কাছে এগিয়ে গিয়ে মুখের দু'পাশে হাত রেখে ঝুঁকে পড়ে একটু চেঁচিয়ে উঠল বাহাদুর — আ— হু— আ—।

বাহাদুরের সেই কণ্ঠস্বর পাহাড়ে-পর্বতে ধ্বনিত হয়ে কোথায় মিলিয়ে গেল। কিন্তু গুহামুখ থেকে কোনও প্রত্যুত্তর এল না। বাহাদুর তখন আমার হাত থেকে টর্চটা নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেল গুহার ভেতর। একটু পরেই হাসিমুখে আবার বেরিয়ে এল সে। এসে বলল, না। ভয় নেই। আসুন ভেতরে আসুন।

আমি বাহাদুরের সঙ্গে গুহার ভেতরে ঢুকলাম। গুহামুখ সংকীর্ণ হলেও ভেতরটা প্রশস্ত। ভেতরে ঢুকে বেশ ভালভাবে গুছিয়ে বসলাম দু'জনে।

একটু পরে আবার কী মনে করে গুহার বাইরে গেল বাহাদুর। তারপর দু’-একটা গাছের ডাল ভেঙে এনে বড় বড় পাথরের চাঁই গুহামুখে জড়ো করে ভেতরে এসে বলল—এবার নিশ্চিন্তে বসে বাইরের দৃশ্য দেখুন। একটু পরেই দেখবেন বুনো হাতির দল জল খেতে আসবে। সে যে কী দৃশ্য, তা আপনি ভাবতেও পারবেন না। সেই দৃশ্য দেখাবার জন্যই আপনাকে আমি এখানে নিয়ে এসেছি।

গুহার ভেতরে বসে বাইরের জলাশয়ের দিকে চেয়ে রইলাম আমি। বুনো হাতির দল কখন জল খেতে আসবে কে জানে? ততক্ষণে আমরা আমাদের সঙ্গের বাকি খাবারগুলো উদরস্থ করতে লেগে গেলাম।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর, এক সময় বুনো হাতির দলকে দেখা গেল। সামনের একটা খাড়াই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দলে দলে বুনো হাতি সারিবদ্ধভাবে নেমে আসছে দেখলাম। কী চমৎকার তাদের আসবার ভঙ্গি। প্রথমে প্রকাণ্ড চেহারার একটা হাতি, তারপরে তার চেয়ে আকারে একটু ছোট একটি হাতি, তারপরে আরও একটি ছোট হাতি। এইভাবে ঠিক আকৃতি অনুযায়ী পরের পর লাইন দিয়ে আসছে সব। সবার পিছনে একেবারে ছোট্ট হাতিটি। শুঁড় দুলিয়ে সকলে সেই জলাশয়ে নেমে এল। মস্ত জলাশয়। জলে নেমে শুঁড়ে করে জল নিয়ে এ ওর গায়ে ফোয়ারার মতো ছিটোতে লাগল।

এইভাবে সারাক্ষণ ধরে চলতে লাগল তাদের জলক্রীড়া।

ক্রমে দুপুর গড়িয়ে এল।

আমি বললাম, বাহাদুর, এবার ফেরা যাক।

বাহাদুর বলল, এখন কী করে যাবেন? হাতির দল না যাওয়া পর্যন্ত বেরোবার উপায় আছে নাকি? ওরা বড় সাংঘাতিক। একবার যদি দেখতে পায় তো শেষ না করে ছাড়বে না।

বলো কী!

হ্যাঁ।

হঠাৎ বনভূমির ভেতর থেকে একটি ক্রুদ্ধ গর্জন ভেসে এল। সে এমন এক ভয়ংকর ডাক যে রীতিমতো হৃৎকম্প শুরু হয়ে গেল আমাদের। অমন সাহসী বাহাদুরেরও বুক কেঁপে উঠল।

সঙ্গে সঙ্গে রুখে দাঁড়াল হাতির দল। দু'পায়ে দাঁড়িয়ে দু’পা তুলে শুঁড় উঁচু করে প্রত্যুত্তর দিল, হ্যাররো—ও—ও—ও।

বাহাদুর বলল, মনে হচ্ছে সাংঘাতিক একটা বিপদ ঘটবে এবার। জন্তুটা যদি

গুহার ভেতরে আশ্রয় নিতে আসে তা হলে তো বিপদের শেষ থাকবে না। কেন, আমরা তো বেশ নিরাপদ আশ্রয়েই আছি। তা ছাড়া গুহার মুখও তো গাছের ডাল আর পাথর দিয়ে ঘেরা।

তা হলেও ভেতরে ঢুকতে না-পেলে ও কি সহজে চলে যাবে ওর আশ্রয় ছেড়ে? আমরা বেরোলেই আমাদের আক্রমণ করবে।

এবার রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম আমি। বললাম, তা হলে উপায়? উপায় আর কী? লড়াইয়ের জন্য তৈরি হতে হবে।

এমন সময় আবার সেই ডাক।

হাতির দলও তখন রণং দেহি হয়ে তার প্রত্যুত্তর দিল। রাগে শুঁড় দুলিয়ে, অঙ্গ দুলিয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি চালাতে লাগল।

বাহাদুর হঠাৎ বলল, ওই—–ওই—ওই দেখুন।

আমি দেখলাম পাহাড়ের এক উচ্চস্থানে একটা ভয়ংকর জন্তু দাঁড়িয়ে। বৃহদাকৃতির জানোয়ার সেটা। ঘন কালো গায়ের রং। খাড়া খাড়া লোম। চক্ষু রক্তবর্ণ।

বাহাদুর বলল, বাঘ।

বাঘ? বাঘ ওইরকম হয় নাকি?

হ্যাঁ। হিমালয়ের ভয়ংকর অনেক রকমেরই হয়। বাঘের অনেক রকম জাত আছে।

বাঘটা তখন চোখের পলকে সেই উচ্চস্থান থেকে সবচেয়ে বড় হাতিটার পিঠের উপর লাফিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে রক্তে ভেসে গেল হাতির দেহটা। লাল হয়ে উঠল জলাশয়ের জল।

শুরু হল প্রচণ্ড দাপাদাপি আর আর্তনাদ। লেগে গেল ভয়ানক যুদ্ধ। বড় হাতিটা শুঁড়ে করে জড়িয়ে ধরবার চেষ্টা করল বাঘটাকে। কিন্তু পারল না।

অন্যান্য হাতিগুলো তখন ছুটে এল। বাঘটা বেড়ালের মতো থাবা গেড়ে হাতির পিঠে বসে ফ্যাস ফ্যাঁস শব্দ করতে লাগল।

উঃ। সে কী ভয়ংকর দৃশ্য।

বাঘটা ততক্ষণে হাতিটাকে চিরে ফালা ফালা করে ফেলেছে।

মাঝারি সাইজের একটা হাতি এসে ততক্ষণে শুঁড়ে করে জড়িয়ে ফেলল বাঘটাকে। তারপর পাকিয়ে ধরে বড় একটা পাথরের ওপর মারল এক আছাড়। সঙ্গে সঙ্গে অপর একটা হাতি এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঘটার ওপর। তারপর সবাই মিলে লাথির পর লাথি।

বাঘটা প্রচণ্ড চিৎকার করতে করতে নিস্তেজ হয়ে পড়ল একসময়। এবং অসহ্য যন্ত্রণায় মৃত্যুবরণ করল।

বড় হাতিটাও ক্ষতবিক্ষত দেহে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

হাতির দল অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে রইল তাদের দলপতির প্রাণহীন দেহটার দিকে। তারপর সবাই মিলে শুঁড় উঁচিয়ে শেষ প্রণাম জানিয়ে, আবার সারিবদ্ধভাবে চলে গেল যে যার।

আমরাও আর দেরি করলাম না। গুহামুখ থেকে বেরিয়ে আবার সেই পাহাড়িপথ বেয়ে টমটমের কাছে পৌঁছলাম। কিন্তু কে জানত যে এক বিপদ কাটিয়ে এলেও আর এক বিপদ অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্যে? গিয়ে দেখলাম শুধু টমটমটাই পড়ে আছে সেখানে। ঘোড়াটা নেই।

বাহাদুর বলল, সর্বনাশ হয়েছে বাবু। ঘোড়াটাকে বাঘে খেয়েছে।

বাঘ!

হ্যাঁ দেখছেন না রক্তের দাগ আর পায়ের ছাপ?

তা হলে ফিরব কী করে?

কী করে আর ফিরব? এই বনের ভেতরেই কোনও একটা নিরাপদ জায়গা দেখে রাত্রিটা কাটাতে হবে। ফেরার কথা ভাবা যাবে কাল।

আমি হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। সত্যি বলছি, এরকম বিপদে পড়ব জানলে এখানে আমি কোনও মতেই আসতাম না।

দুই

সূর্য তখন কাছেরই একটা পাহাড়ের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। সন্ধ্যা আসন্ন হলেও দিনের আলো একেবারে মুছে যায়নি। সমস্ত পার্বত্য-প্রকৃতি তখন কেমন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।

আমি বাহাদুরকে বললাম, এইভাবে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে বাহাদুর ? আর একটু পরেই তো রাতের অতিথিদের আবির্ভাব ঘটবে। এবার একটা আশ্রয়ের চেষ্টা দেখো।

বাহাদুরকে একটু চিন্তিত দেখাল। বলল, হ্যাঁ। তাই তো ভাবছি। কোথায় যাওয়া যেতে পারে! সেরকম নিরাপদ আশ্রয় এই বনের ভেতর কোথায় পাব? আমার তখন সত্যি বলতে কী, ভয় ভাবটা কেটে গেছে। শুনলে হয়তো মিথ্যে বলে মনে হবে, তবুও বলছি, আমার বেশ আনন্দ হচ্ছিল তখন। সে আনন্দ যে কী, তা কথায় প্রকাশ করে বলতে গেলে এই কথাই বলা যায় যে, আমি এক ধরনের রোমাঞ্চকর আনন্দ উপভোগ করছিলাম। এই রকম অবস্থায় সাহস যে আমার কী করে এল তা আমিই জানি না। সাহসে বুকটা ভরে উঠল। ভাবলাম জীবনের এতগুলো বছর দিব্যি তো নিরাপদে কাটালাম। এবার দেখিই না একটু ভয়ের মুখোমুখি হয়ে। এ সুযোগ আর তো আসবে না। তাই বেশ ঠান্ডামাথায় বাহাদুরকে বললাম, আচ্ছা বাহাদুর, আবার আমাদের সেই গুহায় ফিরে গেলে হয় না?

বাহাদুর চমকে উঠল। বলল, আপনার মাথাখারাপ হয়েছে নাকি? কেন?

দেখছেন না অন্ধকার হয়ে আসছে। সেই দুর্গম পথে এখন কী যাওয়া যায়? তা হলে কি বলতে চাও এখানে দাঁড়িয়ে বাঘের মুখেই বেঘোরে প্রাণটা দেব? না না। তা নয়।

তবে আর দেরি করছ কেন? এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী? আশ্রয় তো পাব না কোথাও। শেষমেশ গাছের ডালে বসে রাত কাটাতে হবে। কিন্তু সেটা করার চেয়ে সেই গুহাতেই ফিরে যাওয়াটা ভাল নয় কি?

বাহাদুর একটুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন। যত দুর্গমই হোক। আমাদের সেইখানে ফিরে যাওয়াটাই ভাল। একটু সতর্ক হয়ে রাত্রিটা কাটাতে পারলে কাল সকালে রওনা হওয়া যাবে। না হলে এভাবে এখানে থাকলে বেঘোরে মরব।

আমরা আর বিলম্ব না করে দ্রুত পা চালিয়ে আবার ফিরে চললাম সেই গুহার দিকে।

ছোট গুহা। গুহামুখও বড় নয়। কোনওরকমে পাথর-টাথর দিয়ে মুখটা বুজিয়ে রাখলে একেবারে নিশ্চিন্তে রাত্রিটা কাটানো যাবে। এই ভেবে আমরা আরও একটু বাঁকা পথে বড় বড় পাথরে পা দিয়ে কিছুটা লাফিয়ে লাফিয়েই সেই গুহার কাছে পৌঁছলাম। একটু বাঁকা পথে এসেছিলাম বলে গুহার ঠিক বিপরীত দিকে অর্থাৎ যেদিক থেকে সেই ভয়ংকর কালো বাঘটা আক্রমণ করেছিল হাতিটাকে, সেই দিকে এসে পড়লাম।

মস্ত বাঘটা দেখলাম মৃত পড়ে আছে। আর কিছু দূরেই রক্তাক্ত কলেবরে মরে আছে অতিকায় হাতিটা। আমি প্রথমে বাঘের পিঠের ওপর উঠে দাঁড়ালাম। তারপর উঠলাম হাতির ওপর। বাহাদুরকে বললাম, কাল সকালে যাবার আগে এই বাঘের ছালটা কিন্তু ছাড়িয়ে নিয়ে যাব। আর সেই সঙ্গে নিয়ে যাব হাতির দাঁতদুটো। কী বড় বড় দাঁত দেখেছ? ও-দুটোর কিন্তু অনেক দাম।

বাহাদুর বলল, কিন্তু এত সব বইবেন কী করে বাবু?

যেমন করেই হোক, বইতে হবে।

এক একটা দাঁতের ওজন জানেন? তা ছাড়া কাল সারাটা পথ আমাদের হেঁটেই যেতে হবে। কী করে নিয়ে যাব?

উপায় একটা বার করতেই হবে বাহাদুর। না হলে এগুলোকে তো ফেলে রেখে যাওয়া যায় না। একান্ত না নিয়ে যেতে পারি, ওই গুহার ভেতরেই যত্ন করে লুকিয়ে রেখে যাব। পরে বরং একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে নিয়ে যাব এসে।

সে পরের কথা পরে আছে।

পরের কথা নয়। আমাদের কাছে কুড়ুল আছে। ছুরি আছে। ছালটা ছাড়াতে, আর দাঁতদুটো কেটে নিতে কতক্ষণ সময় লাগবে?

অবশেষে রাজি হল বাহাদুর। হেসে বলল, বেশ। আপনি যখন বলছেন তখন নেব। দাতদুটো এখুনি কেটে নিচ্ছি। ছালটা ছাড়াব কাল সকালে। কেন না ছাল ছাড়াতে সময় লাগবে তো। এই বলে ঝপাঝপ করে কয়েকটা কোপ মেরে দাঁতদুটো কেটে ফেলল বাহাদুর।

হাতির দাঁত পেয়ে আমার খুব আনন্দ হল। কিন্তু আমার চেয়েও বেশি আনন্দ দেখলাম বাহাদুরের। তবে সে আনন্দ দাঁত পাওয়ার জন্য নয়। সে আনন্দ অন্য রকমের। সে করল কী হাতির গায়ে কোপ বসিয়ে থাবা থাবা মাংস কেটে নিতে লাগল।

আমি অবাক হয়ে বললাম, ও কী হচ্ছে বাহাদুর! মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা কেন?

বাহাদুর হেসে বলল, হাতির মাংস খেয়েছেন বাবু?

না। হাতির মাংস আবার খায় নাকি কেউ?

পায় না তাই খায় না। যখন পেয়েছি তখন ছাড়ি কেন? আমি তো খাবই। আপনিও খাবেন।

আমার দরকার নেই ভাই। তুমিই খাও। কিন্তু রাঁধবে কীসে?

রাঁধব কেন, আগুনে ঝলসে খাব।

বেশ, যা ইচ্ছে করো। এখন তাড়াতাড়ি চলো, আগে গিয়ে গুহায় ঢুকি। বাহাদুর বলল, ঢলুন। বলে হাতির দাঁতদুটো কাঁধে নিয়ে কুড়লটা বাগিয়ে ধরে চলল।

আর আমি সেই তাল তাল মাংস যতটা পারলাম নিয়ে বাহাদুরের পিছু পিছু গুহার কাছে চলে এলাম।

গুহার ভেতরটা তখন ঘন অন্ধকারে ঢাকা। একেই তো গুহা এমনিতে অন্ধকার, তার ওপর সন্ধ্যার অন্ধকারে সে আঁধার আরও ঘনীভূত। আরও জটিল।

বাহাদুর প্রথমেই করল কী, আশপাশ থেকে যত শুকনো ডালপালা এনে জড়ো করল গুহামুখে। তারপর দু'-একটা মোটা কাঠকে চেলা করে কাটল।

গুহামুখে বাহাদুর আর আমি যতটা পারলাম বড় বড় পাথর এনে জড়ো করলাম। পাথরগুলো এমনভাবে সাজালাম যাতে গুহার ভেতরে ঢুকে সেগুলো অনায়াসে ভেতর থেকে টেনে নিয়ে গুহামুখে বন্ধ করে দিতে পারি।

বাহাদুর গুহার ভেতরে ঢোকার আগে আবার সেই বিচিত্র সুরে মুখের দু'পাশে দুটো হাত রেখে চিৎকার করে উঠল, আ—হু—আ—। পরে আমার হাত ধরে এক পাশে সরে দাঁড়াল। এরপর গুহার ভেতর থেকে কোনও প্রত্যুত্তর আসে কি না শোনবার জন্য অপেক্ষা করলাম। কিন্তু না। কোনও উত্তর এল না ভেতর থেকে। শুধু বাহাদুরের কণ্ঠস্বরে তিড্ডিমের সেই প্রেতপুরীর মতো অন্ধকার গুহা ও পার্বত্য বনভূমি কেঁপে উঠল একবার। তারপর প্রতিধ্বনির ঢেউ পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে মিলিয়ে গেল দূর হতে দুরান্তরে।

বাহাদুর গুহামুখে বসে প্রথমেই শুকনো ডালপালা ও কাঠ ধরিয়ে মাংসটাকে ঝলসে নেবার ব্যবস্থা করল। আমি গুহার ভেতরে ঢুকে টর্চের আলো ফেলে গুহাটাকে বেশ ভাল করে ঘুরেফিরে দেখতে লাগলাম।

সন্ধে উত্তীর্ণ হয়ে রাত্রির অন্ধকারে চারদিক ঢেকে গেছে তখন। সেই অন্ধকারে গুহামুখের লাল অগ্নিশিখায় চারদিক রাঙা হয়ে উঠল। কিছুটা আলো গুহার ভিতরেও গিয়ে পড়ল।

আর সেই আলোয় দেখতে পেলাম গুহাটা ভেতরে প্রশস্ত হয়ে কিছুদূরে গিয়ে আবার সংকীর্ণ হয়ে বেঁকে গেছে। বাইরে থেকে ঢুকে টর্চের আলোয় সেই বাঁক সহসা চোখে পড়বে না। মনে হবে বাঁকটা একটা দেওয়ালের কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে বুঝি।

আমি টর্চের আলো ফেলে সামনের দিকে এগোতে লাগলাম। সে কী ভীষণ অন্ধকার।

কালো পাথরের বুকচিরে গুহাটা ক্রমশ ভেতর দিকে চলে গেছে। নেহাত কৌতূহলের বশেই আমি এগোতে লাগলাম সেই পথে।

কিছুদূর যাবার পর বাঁকের মুখে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম।

হঠাৎ একটা শব্দ আমার কানে এল।

শব্দটা অন্য কিছুর নয়। মনে হল কোথায় যেন ছর ছর করে জল পড়ছে। আমি অনেকক্ষণ ধরে কান পেতে সেই জল পড়ার শব্দটা শোনবার চেষ্টা করতে লাগলাম। শব্দটা একটানা। যা শুনে মনে হল এটা কোনও ঝরনা বা জলপ্রপাতের শব্দ। কিন্তু ঠিক কোন দিক দিয়ে যে শব্দটা আসছে তা কিছুতেই অনুমান করতে পারলাম না।

যেদিকে কান পাতি সেদিকেই শব্দ।

হঠাৎ এক জায়গায় গিয়ে দেখি রাস্তাটা শেষ হয়ে গেছে। আর যাবার কোনও পথ নেই। শুধু দেওয়াল আর দেওয়াল। শব্দটা কিন্তু সেখানেও শোনা যাচ্ছে।

পথ না পেয়ে ফিরে আসছি, এমন সময় দেখি, আমার ঠিক বাঁদিক দিয়ে ওইরকম সরু কোনওরকমে একজন লোক যেতে পারে এমন একটি গর্ত অন্ধকারের সঙ্গে মিশে রয়েছে। আমি টর্চের আলো ফেললাম তার ভেতর। দেখলাম এ গর্তটা লম্বা হয়ে দুরে বহু দূরে হারিয়ে গেছে।

আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।

সেই পথ ধরে আরও এগিয়ে যাবার পরই দেখলাম ডাইনে বাঁয়ে ওইরকম সুড়ঙ্গপথ অন্তত আরও দশ পনেরোটি গুহার অন্দরে অন্দরে চলে গেছে। ওরই মধ্যে যেটি একটু বড় আমি সেইটির মধ্যে ঢুকে পড়লাম। কিছুটা আসার পর দেখলাম সেটা এত প্রশস্ত হয়ে গেছে যে মনে হচ্ছে সমস্ত পর্বতটাই বুঝি ফাঁপা। আরও কিছু পথ আসতে দেখলাম শীতল জলে ডুবে যাচ্ছে পায়ের পাতা।

কি ঠাণ্ডা সেই জল।

তবে জলটা স্থির বা জমা জল নয়। বেশ টান আছে।

ছর ছর শব্দটা তখন আরও জোরে শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে খুব কাছ থেকে আসছে শব্দটা। কিন্তু সেই শব্দের উৎস যে কোথায় তা কিছুতেই ঠিক করতে পারলাম না। চারদিকে টর্চের আলো ফেলতে লাগলাম। কিন্তু কোথায় কি?

জল মাড়িয়ে আমি আরও একটু সামনের দিকে এগোলাম। দেখলাম ক্রমশ জলে ডুবে যাচ্ছে পা। অর্থাৎ বেশি জলের দিকে চলে যাচ্ছি। তখন হঠাৎ আমার খেয়াল হল এ আমি কি করছি? বদ্ধ গুহার অভ্যন্তরে এই জলে আমি দাঁড়িয়ে আছি কোন সাহসে? যদি কোনও সাপ অথবা অন্য কোনও জলজ জন্তু আমাকে আক্রমণ করে? তখন? তখন কি হবে?

এই জলরাশি হয়তো পাতালপুরীতে গিয়ে শেষ হয়েছে। একা তো এ পথে অভিযান চালানো যায় না। তাই ফিরে যাওয়াই উচিত। বিশেষ করে বাহাদুর ওখানে একা আছে। যদি গুহার ভেতরে ঢুকে আমাকে দেখতে না পায় তা হলে ভয়ানক চিন্তায় পড়ে যাবে সে। আমি কোথায় গেলাম কি করলাম ভেবে কিছুই কূল পাবে না। তাই আস্তে আস্তে আবার যে পথে এসেছি সেই পথে ফিরে চললাম।

এমন সময় হঠাৎ দেখি কোনও এক গুহামুখ আলোয় ভরে

তারপর দেখি আর একটা

উঠল। ।

তারপর আরও একটা।

বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি।

তাড়াতাড়ি জল পার হয়ে শুকনো জায়গাটায় উঠে দাঁড়ালাম।

তখন গুহার ভেতরটা একেবারে আলোয় আলোয় ভরে গেছে।

দেখি না সেই অগুনতি গুহামুখ থেকে শত শত প্রদীপ জলের স্রোতে ভেসে আসছে। প্রদীপের পর প্রদীপ। আলোর পরে আলো।

সেই জ্বলন্ত প্রদীপ গাছের ছালে কলার পেটোয় ভেসে জলস্রোতে এগিয়ে চলেছে।

যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। সেই সঙ্গে প্রদীপের আলো। সেই অন্ধকারে প্রদীপের আলোয় যেন হীরা মাণিক জ্বলছে।

আলোর ছটায় চোখের তারা নেচে উঠল আমার। কি অপূর্ব সেই দৃশ্য। হঠাৎ ও কি!

একটা অতিকায় ভয়ঙ্কর পাখি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে সেই জলরাশির বুকের ওপর দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।

আমি ভয়ে দ্রুত ছুটতে লাগলাম।

কিন্তু যাব কোন দিকে? কোথায় আমার পথ? চারদিকে শুধু সংখ্যাতীত গুহামুখ। সেই গুহামুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুল হয়ে গেল আমার। ওদিকে পাখিটাও তখন ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসছে। পাখি তো নয়, যেন মরণ দূত।

আমি তখন কি যে করব কিছু ঠিক করতে পারলাম না। হঠাৎ মাথায় এক বুদ্ধি এল। টর্চের আলোটা সরাসরি তার মুখের ওপর ফেললাম! কিন্তু সে কৌশল ব্যর্থ হল আমার। সে আলোতে অন্য প্রাণীর চোখ ধাঁধাতে পারে কিন্তু সেই ভয়ঙ্করের চোখ ধাঁধাবে কেন? আলো লক্ষ্য করেই এগিয়ে আসতে লাগল সে। পাখিটা এত জোরে আসছে যে তার ডানা ঝাপটানিতে সমস্ত গুহাটা কেঁপে উঠছে।

আমি প্রাণের ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম—–বা-হা-দু-র।

আমার চিৎকারে গুহাটা ঝমঝম করে উঠল।

আমার ডাক সিংহনাদের মতো ছড়িয়ে পড়ল গুহাময়। তারপর দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে গহ্বর বিদীর্ণ করে হারিয়ে গেল দূরে—বহু দূরে—।

আমার চেঁচানিতে ভয়ে থমকে গিয়ে পাখিটা ঘুরপাক খেতে লাগল মাথার ওপর। তবে ঘুরপাক খেলেও তার আসল লক্ষ্য যে আমি তা বুঝতে পারলাম। ততক্ষণে আমি ছোট্ট একটু গুহামুখে ঢুকে পড়েছি।

আর পাখিটা তখন নিষ্ফল আক্রোশে গুহামুখ আগলে বারবার ডানা ঝাপটাতে লাগল এবং চিৎকার করতে লাগল ক্যাক্ ক্যাক্ ক্যাক্ ক-র-র-র।

আমি গুহামুখে ঢুকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তারপর এগিয়ে চললাম ভেতর দিকে। হামাগুড়ি দিয়ে শামুকের মতো গুটি গুটি এগিয়ে চললাম। সেই ভাবে খানিক যাবার পর সোজা হয়ে চলতে শুরু করলাম আবার।

চলতে চলতে হঠাৎ আর এক গোলক ধাঁধায় আটকে গেলাম। সেখানেও দেখি সেই একই ব্যাপার। সুড়ঙ্গের পর সুড়ঙ্গ। ভয়ে আমার হাত পা অবশ হয়ে গেছে তখন। আমি চিৎকার করতে লাগলাম—বাহাদুর...বাহাদুর...

সত্যি বলতে কী, তখন আমি পাগলের মতো হয়ে গেছি। কখনও হামাগুড়ি দিয়ে, কখনও যেখানটা একটু প্রশস্ত সেখানে ছুটে গিয়ে দিশেহারার মতো বেরোবার পথ খুঁজতে লাগলাম। আর চিৎকার করতে লাগলামবাহাদুর...বাহাদুর...। যদি কোনও রকমে বাহাদুর আমার ডাক শুনতে পেয়ে ছুটে আসে তাই।

আমার ডাক হঠাৎই থেমে গেল। মুখ দিয়ে বাহাদুরের বা-টুকুই বেরুল শুধু। বাকিটা বেরুল না।

এই পাতালপুরীতে এসে এ কী দেখছি! এ স্বপ্ন না সত্যি?

দেখলাম আমার চোখের সামনে দু'দুটো মানুষের কঙ্কাল উপুড় হয়ে পড়ে আছে। কবে, কতদিন আগে যে এই দুই হতভাগ্য আমারই মতো এর ভেতরে এসে পড়েছিল তা কে জানে? আমারই মতো তারাও হয়তো বেরোবার পথ খুঁজে পায়নি।

এই গুহাভ্যন্তরে আমার দশাও ওদেরই মতো হবে হয়তো।

ওদের মাথার কাছে মাঝারি সাইজের একটা ব্যাগ মলিন অবস্থায় পড়েছিল।

ব্যাগটা কুড়িয়ে নিলাম আমি। তারপর সেটার চেন টানতেই দেখলাম নীল রঙের একটা মস্ত কাগজে কীসের যেন একটা ম্যাপ আঁকা। দেখে বুঝলাম ম্যাপটা এই গুহারই। ম্যাপের উলটো পিঠে ছোট ছোট অক্ষরে কি যেন লেখা আছে।

আমি ঝুঁকে পড়ে সেই লেখাগুলো পড়বার চেষ্টা করছি এমন সময় পিছন দিক থেকে একটা সাঁ সাঁ শব্দ কানে এল। ফিরে তাকিয়েই দেখি এক অতিকায় পাইথন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে।

আমি আর কালবিলম্ব না করে ছুটে চললাম।

ম্যাপটা গুঁজে নিলাম পকেটে।

সোজা সামনে না ছুটে আমি করলাম কি, বাঁদিকের একটা গুহামুখে ঢুকে পড়লাম।

কিন্তু কে জানত তখন সে অনাদি অনন্তকাল ধরে এমন ঘন শ্যাওলার আস্তরণ জমে ছিল এর ভেতর! তাই ঢোকা মাত্রই সজোরে আছাড় খেয়ে পড়লাম পাথরের ওপর। তারপর হড় হড় করে পিছলে যেতে লাগলাম নিচের দিকে। উঃ কি অসম্ভব ঢালু সেই জায়গাটা। পিছলে যেতে যেতে এক সময় ঝপাং করে পড়ে গেলাম আবার সেই জলরাশিতে।

কি অসম্ভব জলের টান সেখানে।

মাথার উপরটা একটু ফাঁকা। এক পাশ দিয়ে আকাশের তারা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দেখা গেলে কি হবে, সেই মুক্তির জগতে আমি কি করে পৌঁছুব?

শব্দের উৎস এইখানেই। কোন পাহাড়িয়া নদী বা ঝর্ণা ওপরে পাথরের প্রান্তর বেয়ে যেতে যেতে এইখানে ঢালু পেয়ে জলপ্রপাতের মতো হুড় হুড় করে পড়ছে। জলপ্রপাতের শব্দের উৎস এখানে হলেও জলের উৎস কিন্তু এখানে নয়। বেশ ধীর মেজাজে অপরাপর গুহামুখ থেকেও স্তনেক জলস্রোত এখানে এসে মিলছে।

যাই হোক। মাথার ওপর আকাশ নক্ষত্র দেখতে পেলেও সেখানে আমি পৌঁছুতে পারলাম না। কেননা প্রপাতের জল আমাকে ঠেলে নিয়ে চলল সেই জলরাশির দিকে।

আমি জলের তোড়ে তলিয়ে যেতে লাগলাম।

কিছুটা এই ভাবে ভেসে আসার পর জলের স্রোতের বেগ কম অনুভব করলে কোনও রকমে পাথরের দেওয়াল ধরে উঠে দাঁড়ালাম।

তারপর যেদিকটা একটু শুকনো সেই দিকে আবার এগোতে লাগলাম।

এমন ময় আবার শুনে পেলাম সেই ক্যাক ক্যাক শব্দ। দেখলাম সেই জলরাশির ওপর দিয়ে আবার তেড়ে আসছে সেই সাংঘাতিক পাখিটা। ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল আমার। হঠাৎ মনে পড়ল, আরে! আমার কাছেই তো পিস্তল রয়েছে একটা। তবে আর ভয় করি কেন পাখিটাকে? পাখিটা তখন দ্রুত এগিয়ে আসছে আমার দিকে।

উঃ কী বিরাট। কী ভয়ংকর।

ঝড়ের মতো এগিয়ে আসছে।

আমি পিস্তলটা বার করবারও সময় পেলাম না। পাখিটা তার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। তারপর চিল যেমন ছোঁ মেরে কোনও কিছু তুলে নেয়, আমাকেও ঠিক সেই ভাবেই তুলে নিয়ে উড়ে চলল জলরাশির ওপর দিয়ে। দূরে অনেক দূরে সেই জ্বলন্ত প্রদীপ ভেসে চলেছে। আমি চিৎকার করতে লাগলাম, বা-হা-দু-র...বা-হা-দু-র...।

তিন

ভগবান আমাকে আর কিছু দিন বা না-দিন বিপদে সাহস হারাতে দেননি কখনও। তাই এত বড় বিপদেও ঘাবড়ে গেলাম না।

এক হাতে টর্চ যেমন ধরা ছিল, তেমনি ধরাই রইল। অপর হাতে পিস্তল বার করে গুলি করবার জন্য তৈরি হলাম।

এই পাখিটা যে পথে আমাকে নিয়ে চলেছে, সেই পথই হয়তো আমার মুক্তির পথ। এই পথে গেলেই হয়তো গুহার বাইরে আমি যেতে পারব। কিন্তু এই বিশাল গহ্বরের শেষ কোথায়?

পাখিটাকে তাগ করে পিস্তল উঁচিয়ে সবে গুলি করতে যাচ্ছি, এমন সময় পাখিটা আমাকে বড় একটা পাথরের ওপর নামিয়ে দিয়ে ক্যা ক্যা করে একবার এ দেওয়াল, একবার ও দেওয়ালে বসতে লাগল। কিন্তু আশ্চর্য! আমাকে সে আক্রমণই করল না।

আমি টর্চের আলো ফেলে চারদিক দেখতে লাগলাম।

দেখলাম সেই জলরাশি কতকগুলো বড় বড় পাথরের ফাঁক দিয়ে নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু সে ফাঁক এত সংকীর্ণ যে, সেখান দিয়ে জল গলতে পারে, কোনও মানুষ নয়।

আমি অবাক হয়ে গেলাম।

এই রহস্যময় গুহার ভেতরে বন্দি হয়ে যত না ভয় পেলাম তত বিস্মিত হলাম। কেন না এই বিশাল গহ্বরে যেখানে পালাবার সমস্ত পথ রুদ্ধ হয়ে আছে, সেখানে এই অতিকায় পাখি এলই বা কী করে, আর ওই অজস্র প্রদীপ জ্বেলে এই স্রোতে ভাসাচ্ছেই বা কারা? সবচেয়ে আশ্চর্য এই, পাখিটা আমার ক্ষতি না করে চিৎকারই বা শুরু করল কেন? ভূতপ্রেত মানি না। কাজেই ব্যাপারগুলো ভুতুড়ে ভাবতেও ইচ্ছে হল না। অথচ এ যা ঘটল তাকে ঠিক ভৌতিক অঘটন ছাড়া কী-ই বা বলতে পারি?

আমি পাখিটার গায়ে আলো ফেলে দেখলাম পাখিটা একটা পাথরের খাঁজ নখে করে আঁকড়ে বসে বসে হাঁফাচ্ছে। যখন বুঝলাম তার দিক থেকে আমাকে আক্রমণের কোনও আশঙ্কাই নেই, তখন একটু নিরাপদ স্থান দেখে যেখানে জল নেই, এমন একটা শুকনো জায়গায় বসে পকেট থেকে সেই ম্যাপখানা বার করলাম। যে ম্যাপ কিছুক্ষণ আগে সেই কঙ্কালদুটোর ব্যাগ থেকে বার করেছি। ম্যাপটা মেলে ধরে দেখলাম তার পিছন দিকে খুব ছোট ছোট অক্ষরে

কতকগুলো কথা লেখা আছে। অনেক চেষ্টার পর সেই লেখাটা আমি পড়তে পারলাম।

পরিষ্কার বাংলায় লেখা, 'অভিশপ্ত ভিড্ডিমে'র গুহার জঠরে অন্ধ্রের শাতবাহন সাম্রাজ্যের রাজা শাতকর্ণি আশ্রয় নিয়েছিলেন। মণি-মাণিক আর হিরা জহরতে গুহার গোপন কক্ষ ঠাসা। অতিকায় পাইথন আর বিষধর সাপেরা সেই গুপ্তধন পাহারা দিচ্ছে। এই গুহা সাধারণ মানুষের কাছে একটা গোলকধাঁধা। এই গুহার ভিতর একটি ঝরনা ও সপ্তনদীর অসংখ্য গতিপথ আছে। গুহার পশ্চিমদিকে জংলিদের বাস। দেবী নাগেশ্বরীর উপাসনা করে তারা। সন্ধ্যায় মায়া নদীর জলে প্রদীপ ভাসায়। এই প্রদীপ ভাসানোকে ওরা দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের প্রতীক বলে মনে করে। এই প্রদীপ নদীর গতিপথ ধরে ভেসে ভেসে শাতকর্নি গুহায় প্রবেশ করে এবং জলস্রোতে প্রপাতে পড়ে। এই জলপ্রপাত ইতিহাস বিখ্যাত নয়। তবে এই প্রপাতের জল নদীর আকারে প্রবলপ্রবাহ ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে মিশেছে। রাজা শাতকর্ণির এই গুপ্তধনের সন্ধানে এসে বহু প্রাণ বিষধর সাপের দংশনে অথবা পাইথনের গর্ভে লীন হয়ে গেছে। জংলিদের হাতে ধরা পড়েও মরেছে অনেকে। পরিপূর্ণভাবে মানচিত্রজ্ঞান না-রেখে এই গুহায় প্রবেশ করা কারও উচিত নয়। যদি কোনও ভাগ্যবান এই ম্যাপ ধরে ঠিক পথে নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়ে গিয়ে গুপ্তধনের সন্ধান পায়, তবে সেই ভাগ্যবান নিজেই যে শুধু ধন্য হবে তা নয়, ইতিহাসের এক অজ্ঞাত অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও সে আবিষ্কার করতে পারবে। মহেঞ্জোদরো ও হরপ্পা নগরীর ধ্বংসাবশেষের আবিষ্কারকের মতো তার নামও অমর হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায়। জনৈক হতভাগ্য অভিযাত্রী। পাশে তারিখ দেওয়া আছে ২।৯।১৯৪০।

আমি একাগ্রচিত্তে সেই লেখাটা একাধিকবার পড়লাম।

তারপর ম্যাপটার ওপর টর্চের আলো ফেলে খুঁজতে লাগলাম আমার পালাবার পথ। দরকার নেই গুপ্তধনের। প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচি। কিন্তু পালাব কী করে? এই জলরাশি কী করে পার হব?

এমন সময় হঠাৎ আমার গায়ের ওপর কী যেন একটা এসে পড়ল। আমি ভয়ে লাফিয়ে উঠলাম। তারপর বিস্ময়ের ঘোর কাটলে দেখলাম খুব মোটা একটা শক্ত দড়ি। দড়িটা টেনে দেখলাম। বুঝলাম ছেঁড়বার ভয় নেই। এই দড়ি ধরে আমি ওপরে উঠতে পারব। কিন্তু উঠব কোথায়। ওপরে তো ছাদ। অথচ দড়িটা যে কীভাবে এল, তাও বুঝতে পারছি না।

যাক। মরেছি না মরতে বাকি আছি। উঠে তো পড়ি। এই ভেবে দড়ি ধরে আমি ক্রমশ ওপরে উঠতে লাগলাম।

কিছুটা ওঠার পরই দেখলাম এক জায়গায় বারান্দার মতো চওড়া একটু অংশ রয়েছে। সেইখানে দেখলাম একমুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি ও ঝাঁকড়া চুলের বাঘছাল পরা একজন বলিষ্ঠ লোক দাঁড়িয়ে আছে। একপাশে ছোট্ট একটা প্রদীপ জ্বলছে। যেন বিভীষিকার মতো থম থম করছে চারদিক।

আমি তাকে কিছু বলার আগে সে-ই ইশারায় আমাকে চুপ করতে বলল।

তারপর আমার হাত ধরে মৃদু একটু টান দিয়ে আমাকে নিয়ে চলল তার সঙ্গে। আমি তাকে দেখে খুবই অবাক হয়ে গেলাম যদিও, তবুও মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকেই অনুসরণ করলাম। কেন জানি না তার হাবভাব দেখে মনে হল, এ আমার কোনও ক্ষতি করবে না।

তার পিছু পিছু খানিক যাবার পর দেখলাম এক জায়গায় ধাপে ধাপে কয়েকটা সিঁড়ি নীচের দিকে নেমে গেছে। সেই সিঁড়ি বেয়ে আগুপিছু আমরা নামতে লাগলাম।

কয়েক ধাপ নামার পরই দেখলাম দূর থেকে আলোর রেখা ভেসে আসছে। নামতে নামতে আলোটা স্পষ্ট হল। একটা প্রশস্ত ঘরের ভেতর ঢুকলাম। তারপর আর একটা। তারপর আরও একটা।

একেবারে শেষঘরে গিয়ে লোকটি বলল, এই ঘরে আপনি থাকবেন। আপনি নিশ্চয়ই একা এসেছেন?

না দু'জন। অবশ্য এখন আমি একা।

লোকটি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, যাক। ভালই হয়েছে। বাইশ বছর এই গুহার ভেতর আছি। একটিও কথা বলবার লোক পাইনি। বাকি জীবনটা দু’বন্ধুতে কোনওরকমে গল্প করতে করতে কাটিয়ে দেব। আমি অবাক হয়ে বললাম, তার মানে?

আপনাকে মরতে আমি দিচ্ছি না। শুধু আমার কথামতো যদি চলেন, আর পালাবার চেষ্টা যদি না করেন, তা হলে বেঘোরে প্রাণ হারাবার কোনও ভয় নেই।

আমার হাত-পা যেন অবশ হয়ে এল। বললাম, কী বলতে চান, আপনি? বলতে চাই যে এর ভেতর একবার যখন এসে ঢুকেছেন, তখন আর আপনার মুক্তি নেই। তিড্ডিমের অভিশাপ হচ্ছে এই গুহা। এখানে ঢুকলে হয় মৃত্যুকে বেছে নিতে হবে, নয় সারাজীবন বন্দি হয়ে থাকতে হবে আমার মতো। আমি মৃত্যুকেই বেছে নেব। এইভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল।

লোকটি যেন চমকে উঠল, সে কী!

হ্যা। ঠিকই বলছি।

আপনি গুপ্তধন নেবেন না? আপনার মতো আমিও গুপ্তধনের সন্ধানে এসেছিলাম। এখন আমি গুপ্তধনের মালিক। রাজা শাতকর্ণির সমস্ত ধন এখন আমার হাতের মুঠোয়। আমি এখন রাজা, বুঝেছেন?

আমি বুঝতে পারলাম না লোকটার মাথা খারাপ কি না।

লোকটি হঠাৎ বলল, ওঃ হো। আপনার তো কিছুই খাওয়া হয়নি। নিন, রাত অনেক হয়েছে। আপনি যা হোক দুটো খেয়ে নিন। কিন্তু সাবধান। আমি না বললে এখান থেকে নড়বেন না। আমি কথা না বললে কথা বলবেন না। ওরা জানতে পারলে একেবারে শেষ করে ফেলবে।

আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ওরা কারা?

ওরা হল এই পাহাড়পুরীর যক্ষ। আপনার আমার মতো গুপ্তধনের লোভে যারা আসে, ওরা তাদের বন্দি করে। যারা পালাতে যায় তারা মরে। যারা কথা শুনে টিকে থাকে, তারা বাঁচে। কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানেন? আজ পর্যন্ত কেউই এখানে টিকে থাকেনি। কেউ বাঁচেনি, বহুকষ্টে আমিই টিকিয়ে রেখেছি নিজেকে। এই পাহাড়পুরীর যক্ষ হয়ে আছি আমি। তবেই আমি জানতে পেরেছি সেই ধনরাশি কোথায় কীভাবে আছে।

আমি কৌতূহলী হয়ে বললাম, কোথায় আছে?

দেখাব দেখাব সব দেখাব। বলতে বলতে লোকটা চলে গেল ঘর থেকে।

আমি অসহায় ভাবে একা বসে রইলাম ঘরের ভেতর। ভাবতে লাগলাম আকাশপাতাল। এখান থেকে তবে কি সত্যিই আমার মুক্তি নেই? তা যদি হয় এর মতো এই আজীবন বন্দিদশা আমি মেনে নেব না। যেমন করেই হোক আবার বাইরের জগতে পালাবার চেষ্টা করব। একান্ত না পারি...।

হাতের পিস্তলটা একবার কপালে ঠেকালাম। প্রত্যেকটি গুলিই এখনও অবশিষ্ট আছে। কয়েকটি নিজেকে বাঁচাবার জন্য খরচ করে শেষেরটি নিজের মৃত্যুর জন্য খরচ করব। তাড়াতাড়ি কিছু করতে যাব না। দেখিই না ঘটনার গতি কোনদিকে যায়। বাহাদুর আমাকে বাঁচাতে পারে কিনা। হাফলঙে ফিরে গিয়েও সে কী আমাকে উদ্ধার করবার জন্য লোকজন নিয়ে আসবে না?

লোকটি আবার ঘরে ঢুকল। এই লোকটাকেই এখন মূর্তিমান বিভীষিকা বলে মনে হচ্ছে। ঝাঁকড়া চুল, গোঁফ-দাড়ি। উঃ কী ভয়ংকর। তার ওপর একটা বাঘের ছাল পরে আছে। লোকটির হাতে কয়েকটা রামকলা আর একটা পাত্রে দুধ। সেগুলো আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে সে বলল, নাও। খেয়ে নাও। তোমাকে আর আপনি আজ্ঞে নয়। এবার থেকে তুমিই বলব।

আমি হেসে বললাম, বেশ, তাই বলবেন। আপনি তো আমার চেয়ে অনেক বড়।

অনেক মানে, তোমার ছাব্বিশ-সাতাশ, আমার বাহান্ন।

আজ্ঞে আমার আঠাশ বছর বয়স।

ওই একই হল। ভাগ্য ভাল যে ওদের হাতে পড়নি। আমার যেতে আর একটু দেরি হলেই এসে পড়ত ওরা। পাখিটার চিৎকার শুনেই বুঝেছি শিকার জুটেছে। তাই তো এগিয়ে গেলাম। ভগবান রক্ষে যে ওরা ছিল না এই সময়।

আমি বললাম, খুব বাঁচিয়েছেন আপনি। কিন্তু কী পাখি বলুন তো ওটা?

তা কি আমিও জানি? তবে ও পাখি এখন আর দেখা যায় না। ওই পাখিটাও আমার মতো মুক্তি চাইছে। কিন্তু কে দেবে ওকে মুক্তি? কত বছর যে এখানে আছে ও, তাও জানি না। আমাকে ঠিক তোমাকে যেভাবে এখানে নিয়ে এসেছে সেই ভাবেই এনেছিল। শুধু দুধ আর ফল খায়। কবে কোন শিশুকালে এর ভেতরে ঢুকে পড়েছিল কে জানে? দেহটা এখন অসম্ভব বড় হয়ে গেছে। মানুষ দেখলেই চিৎকার করে। হয়তো বা ওর ভাষাতে বলে তোমরা আমাকে মুক্তি দাও।

আমি কলা খেয়ে, দুধে চুমুক দিলাম। কী দুর্গন্ধ দুধে। খেতেই গা গুলিয়ে উঠল।

তিনি বললেন, খাও। দু’-একদিন অমন লাগবে। তারপর সয়ে যাবে। পাহাড়ি গাইয়ের দুধ তো। তাই একটু গন্ধ।

দুধ আর কলায় পেট বেশ ভরে উঠল।

আমার তৃপ্তি দেখে উনি হাসলেন। মৃদু, প্রসন্ন হাসি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি তা হলে বাইশ বছর আছেন এখানে? হ্যাঁ। দু'মাস সতেরো দিন বেশি। ক্যালেন্ডার না থাকলেও পাথরের গায়ে দাগ দিয়ে আমি হিসেব রেখেছি।

আপনি দেখছি অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট। কী নাম আপনার?

আমার নাম রামদুলাল সেন। বাড়ি ছিল রানিগঞ্জে।

কে কে আছে বাড়িতে?

কী করে জানব? মা ছিল, বাবা ছিল, দাদা ছিল। বিয়ে তো করিনি। কাজেই এখন আর কেউ-ই নেই।

আপনি এখানে কী করে এলেন?

সে অনেক কথা। শুনতে চাও?

বলুন না?

আমার বয়স তখন তিরিশ বছর। আমার এক বন্ধু ছিল। তার নাম দীপঙ্কর। দীপঙ্করের বাবা কোলিয়ারির মালিক ছিলেন। ভদ্রলোক হঠাৎ কীভাবে যেন জানতে পারেন তিড্ডিমের এই গুহার কথা। তিনি তাঁর এক বন্ধুকে নিয়ে এখানে গুপ্তধনের সন্ধানে আসেন। কিন্তু সেই আসাই শেষ আসা। তাঁকে আর ফিরে যেতে হয়নি। দীপঙ্কর ও আমি তাঁর পুরনো ডায়েরি পড়ে সেকথা জানতে পারি। এবং আমরাও তাঁদের খোঁজে গুপ্তধনের সন্ধানে এখানে আসি। কিন্তু এখানে এসে আজপর্যন্ত ফিরে যেতে তো পারেনি কেউ। তাই আমরাও পারলাম না। বেরোবার পথ না-জেনে এখানে এসেছিলাম। তাই গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে বন্দি হয়েছি। ওই পাখিটাই ওদের হাতে তুলে দিয়েছে আমাদের। জংলিদের কথা শুনে আমি বাধ্য হলাম, তাই বাঁচলাম। দীপঙ্কর পালাতে গেল, তাই মরল। কথাগুলো শেষ করে রামদুলালবাবু আমার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বললেন, খবরদার পালাতে যাবে না।

এমন সময় হঠাৎ দ্রিম দ্রিম দামামার শব্দে ভেতরটা গমগমিয়ে উঠল। উঃ! সে কী দারুণ শব্দ! সেই সঙ্গে এক বিদঘুটে জংলি গান। আলোয় ভরে উঠল চারদিক।

রামদুলালবাবু ঠোঁটে তর্জনী রেখে ‘হিসস্’ করে আমাকে চুপ করতে বললেন। তারপর বললেন, আমি না-আসা পর্যন্ত তুমি এখানে দেওয়াল ঘেঁসে লুকিয়ে থাকো। একদম বেরিয়ো না। বেরোলেই মরবে।

আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ওরা কারা?

ওরা এই গুহার যক্ষ। রাজা শাতকর্ণির গুপ্তধন ওরা পাহারা দেয়। এমনি, কারও ক্ষতি করে না। কিন্তু কেউ গুপ্তধন নিতে এলে তাকে ফিরে যেতে দেয় না। ওদের দেবী নাগেশ্বরীর কাছে তাকে বলি দেয়। প্রতি রাত্রে ওদের সর্দার আসে গুহায় আরতি করতে।

দামামার শব্দ আরও কাছে এগিয়ে এল।

আমি বললাম, তাই যদি হয় তবে ওরা আপনাকে বলি দেয়নি কেন? আমি ওদের বিশ্বাস উৎপাদন করেছি। এবং এখান থেকে পালাবার চেষ্টা করিনি তাই।

কেন করেননি?

ওদের নজর এড়িয়ে পালাতে পারতাম না বলে। যাক, ওসব কথা পরে হবে। এখন নয়। এখন পালাবার সুযোগ পেলেও আর আমি পালাচ্ছি না। গুপ্তধনের সন্ধানে এসেছিলাম। গুপ্তধন পেয়ে গেছি। এই অতুল ধনরাশি, এই কুবেরের ঐশ্বর্যের আমি এখন মালিক। এসব ছেড়ে আর কোথাও যেতে পারি?

দামামার শব্দে ভেতরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। সেই সঙ্গে ভেসে আসছে বিচিত্র সুরের বিদঘুটে জংলি গান।

ওরা যত এগিয়ে আসছে আমার বুকের স্পন্দন ততই দ্রুত হচ্ছে। উঃ, কী দারুণ সর্বনাশের পথেই না পা দিয়েছি। কেন যে ঢুকতে গেলাম এই পাপ-গুহার ভেতরে। এদের হাত থেকে কতদিন আমি নিজেকে লুকিয়ে রাখব?

রামদুলালবাবু ইশারায় আমাকে লুকিয়ে থাকতে বলে চলে গেলেন জংলিদের কাছে। তারপর একটা মশাল হাতে ওদের সঙ্গেই এগিয়ে চললেন।

আমি পিস্তলটা বার করে হাতের মুঠোয় বাগিয়ে ধরলাম। তারপর খুব সন্তর্পণে চুপি চুপি আড়াল থেকে উঁকি মেরে দেখলাম ওদের।

চেহারা দেখেই বুক শুকিয়ে গেল। যেন মূর্তিমান যমদূত সব। কালো কালো বেঁটে বেঁটে চেহারা। কিম্ভুতকিমাকার। মাথায় পালকের টুপি। পরণে বাঘ অথবা হরিণের ছাল। ভালুকের চামড়াও পরেছে কেউ। গলায় বিভিন্ন ধরনের তবলকির মালা। মালার মাঝখানে একটি করে নরমুণ্ডের করোটি।

জনা-বিশেক জংলি রয়েছে। কারও হাতে মশাল! কারও হাতে বর্শা। কেউ দামামা বাজাচ্ছে। কেউ নেচে নেচে গাইছে। চারজনে একটা পালকিও কাঁধে নিয়েছে। ওর ভেতরেই বসে আছে ওদের সর্দার। একবার একটু দেখতে পেলাম। তাতেই দেখলাম কী বিচ্ছিরি চেহারা ব্যাটার।

রামদুলালবাবুর নিষেধ সত্ত্বেও আমি আড়াল থেকে সরে এসে ওদের পিছু নিলাম। দেখিই না কোথায় যায়! কোনখানে গুপ্তধন আছে? হাতে যখন পিস্তল আছে তখন ভয়টা আমার কী?

যেমন করেই হোক এদের খপ্পর থেকে পালাতে হবে। সঙ্গে যখন ম্যাপ আছে তখন পালাবার রাস্তা পাবই পাব। আমি নিঃশব্দে ওদের অনুসরণ করতে লাগলাম। এমনভাবে দেওয়ালের গা ঘেঁষে চললাম যাতে কেউ না টের পায়।

হঠাৎ এক জায়গায় এসে জংলিরা থেমে পড়ল। গান বন্ধ হয়ে গেল। দামামার শব্দও থেমে গেল। চোখের পলকে একটা জংলি ভয়ংকর মূর্তিতে ছুটে এল আমার দিকে। তারপর বর্শার তীক্ষ্ণ ফলাটা আমার বুকে ঠেকিয়ে পৈশাচিক হাসি হেসে উঠল হোঃ হোঃ করে। আমার হাত-পা থর থর করে কাঁপতে লাগল। কী করে যে কী হয়ে গেল তা ভেবেই পেলাম না। বর্শার খোঁচাটা বড্ড লাগছে। বুকের ভেতর গিঁথে যাবে নাকি?

চার

ততক্ষণে সবাই এসে ঘিরে ফেলেছে আমাকে। সেই কালো কালো বিচ্ছিরি চেহারার জংলিগুলোর চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। পালকি থেকে নেমে এল ওদের সর্দার।

রামদুলালবাবুও এগিয়ে এলেন। যেন আমাকে চেনেনই না, এমন ভান করে মশালটা আমার দিকে তুলে ধরে আমার মুখে আলোকপাত করতে লাগলেন।

জংলিসর্দার এগিয়ে এল আমার কাছে। আমার হাত থেকে পিস্তলটা কেড়ে নিল। তারপর শুরু হল তল্লাসি। আমার কোমরে গোঁজা ছুরি-টর্চ যা ছিল সব কেড়ে নিল। যে আমার বুকে বল্লম ঠেকিয়ে রেখেছিল সর্দার কী যেন বলতেই বল্লমটা সরিয়ে নিল সে।

সর্দার এবার আমার দিকে রক্তচক্ষুতে তাকিয়ে আমার জামার কলার ধরে একটু টান দিয়েই ঠাস করে মারল আমার গালে এক চড়। কী সাংঘাতিক সেই চড়। গাল যেন জ্বলে উঠল।

এবার রামদুলালবাবুকে কী যেন বলল সর্দার।

রামদুলালবাবু কড়া গলায় প্রশ্ন করলেন, কে তুই?

আমি তো বুঝতেই পারছি রামদুলালবাবু আমার সঙ্গে অভিনয় করলেন। উঃ। কী ভুলই না করেছি ওনার কথা না শুনে। বললাম, আমি পথ ভুলে এসে পড়েছি। আপনাদের গুপ্তধনের সন্ধানে আসিনি।

রামদুলালবাবু সেই কথাটা বুঝিয়ে বললেন সর্দারকে।

সর্দার সব শুনে কিছুক্ষণ ধরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর আবার কী যেন বললেন রামদুলালবাবুকে।

রামদুলালবাবু বললেন, সর্দার বলছেন অভিশপ্ত তিড্ডিমে কেউ শখ করে বেড়াতে আসে না। কাজেই পথ হারিয়ে এখানে প্রবেশ করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। বিশেষ করে তোমাকে পরিচয় জানতে চাওয়া হলে তুমি গুপ্তধনের সন্ধানে আসনি এই কথা বলেছ। তার মানে এখানে যে গুপ্তধন আছে তা তুমি জান। আমি আর উত্তর দিতে পারলাম না।

সর্দার নিজে আমাকে সার্চ করতে লাগল এবার। অত যত্নে গুঁজে রাখা সেই ম্যাপটা টেনে বার করল। ম্যাপটা হাতে পেয়েই রাগে ফেটে পড়ল সর্দার। তারপর রামদুলালবাবুকে চিৎকার করে কী যেন বলতেই রামদুলালবাবু বললেন, তুমি থ্যে কথা বলেছ সর্দারকে। এর জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে। কেন না যারা মিথ্যে কথা বলে তারা বিশ্বাসঘাতক হয়।

সর্দার এবার দলের লোকদের কী যেন বলল।

বলতেই সবাই এসে একটা বড় পাথরের থামের সঙ্গে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল আমায়। তারপর আবার ওদের যাত্রার জন্য তৈরি হল। দামামা বেজে উঠল দ্রিম দ্রিম করে। আর দামামার তালে তালে শুরু হল সেই অসভ্য নাচ। নাচ আর গান। সর্দার আবার গিয়ে বসল পালকিতে। বাহকরা পালকি বয়ে নিয়ে চলল।

সবাই চলে গেলে একা আমি বন্দি অবস্থায় রয়ে গেলাম সেখানে। আমার ভুলের জন্যই সব কিছু ভেস্তে গেল। পিস্তল, ছুরি, ম্যাপ, টর্চ সব কিছু খোয়ালাম। নিজেও পড়লাম জংলিদের খপ্পরে। এখন আর আমার নিস্তার নেই।

রামদুলালবাবুর কথা শুনলে তাঁর সাহায্যেই গুপ্তধনের সন্ধানও পেয়ে যেতাম। এখন একমাত্র মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই আমার। এখন আমি নিরস্ত্র। আমি অসহায়।

ভয়ে আমার হাত-পা কাঁপতে লাগল। এরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে? কী করবে? কীভাবে রাখবে? তার কিছুই আমি জানি না। এদের অসাধ্য যে কিছু নেই শুধু এইটুকুই জানি আমি।

এমন সময় হঠাৎ দূর থেকে একটা ক্যা ক্যা শব্দ ভেসে এল। সেই পাখিটার কণ্ঠস্বর। পাখিটা চিৎকার করছে। একটানা একঘেয়ে। চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গেই দেখলাম দু'জন জংলি বল্লম উঁচিয়ে তিরবেগে ছুটে গেল আমার পাশ দিয়ে। তাদের সঙ্গে মশাল হাতে রামদুলালবাবুও গেলেন। যাবার সময় একবার শুধু আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললেন, কেমন হয়েছে? এবার মরো। বিশ্বাসঘাতকের মৃত্যুই হচ্ছে উপযুক্ত পুরস্কার।

আমি মাথা হেঁট করলাম।

খানিকবাদেই দেখলাম একটা লোককে টেনেহিঁচড়ে মারতে মারতে নিয়ে আসছে ওরা। কে ও? আরে, এ যে বাহাদুর! বাহাদুরকে দেখে আমার বুকে যেন হাজার গুণ বল ফিরে এল। আমি চেঁচিয়ে ডাকলাম, বাহাদুর!

বাহাদুরও আমাকে দেখে চমকে উঠল, বাবু ! আপনি এখানে? আমি বন্দি।

জংলিদুটো ততক্ষণে বাহাদুরকে নিয়ে এসে আর একটা থামের সঙ্গে আষ্টেপিষ্টে বেঁধে ফেলল।

রামদুলালবাবু আমাদের সামনে এসে মশালের আলোটা মুখের কাছে তুলে ধরে হো হো করে হেসে উঠে বললেন, কী ভায়ারা, গুপ্তধন নেবে নাকি?

আমি বিনীত ভাবে বললাম, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন রামদুলালবাবু। আপনার কথা না-শুনেই এই কাল ঘটিয়েছি আমি।

রামদুলালবাবু বললেন, আমি তোমাকে একবার সুযোগ দিয়েছি। আর নয়।

অভিশপ্ত তিড্ডিমে শাতকর্ণি গুহায় গুপ্তধন নিতে এসে আজ পর্যন্ত কেউ ফিরে যায়নি। তোমরাও ফিরবে না। তোমরা মৃত্যুর জন্য তৈরি হও।

বাহাদুর ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে তখন। বলল, আপনার দুটি পায়ে পড়ি। আমাদের ছেড়ে দিন। আপনি বিশ্বাস করুন আমরা গুপ্তধনের ব্যাপার কিছুই জানি না। গুপ্তধন নিতেও আসিনি আমরা।

রামদুলালবাবু আবার গুহা ফাটিয়ে হেসে উঠলেন, তোমরা গুপ্তধন নিতেই এসেছ। তোমরা না বললে কী হবে। তবে জেনে রাখো, এই গুপ্তধন তোমরা পাচ্ছ না। পাবে না। আমি এর মালিক। আমি একে বাইশটা বছর ধরে আগলে রেখেছি। আমি মরে গেলেও যক্ষ হয়ে এর ভেতরে বসে এই গুপ্তধন আগলাব। তোমাদের মতো আরও যারা এই গুপ্তধন নিতে আসবে, আমি তাদের প্রত্যেককে গলা টিপে মারব।

আমরা সব শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

রামদুলালবাবু জংলিদুটোকে নিয়ে চলে গেলেন।

রামদুলালবাবু চলে গেলে বাহাদুরকে বললাম, কী কুক্ষণেই না তিড্ডিমে এসেছিলাম।

এ দোষ আপনার নয় বাবু। আমার। আমিই তো আপনাকে এখানে এনেছিলাম। তবে আমি কিন্তু এই গুহার বিপজ্জনক পরিণতির কথা জানতাম না। এটাকে একটা সাধারণ গুহা বলেই জানতাম। কখনও ঢুকিওনি এর ভেতর।

না এর ভেতরে ঢুকতে যাব, না এই কাণ্ডটা হবে। আমার জন্যে তুমিও বিপদে পড়লে।

আমি আপনাকে খুঁজতে এসেই গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাই।

এইটাই তো এ গুহার রহস্য।

তারপর এক জায়গায় আসতেই দেখি শুধু জল আর জল। এমন সময় কোথা থেকে একটা হতচ্ছাড়া সর্বনাশা পাখি, উঃ কী ভীষণ তার চেহারা। অমন পাখি আমি জীবনে দেখিনি। পাখিটা আমার ছোঁ মেরে তুলে নিল। তারপর এক জায়গায় নামিয়েই শুরু করল তার চিৎকার। অমনি জংলিদুটো এসে ধরে ফেলল আমাকে।

আমিও ঠিক ওইভাবেই এসেছি বাহাদুর। তবে আমার অবশ্য বাঁচবার উপায় ছিল। কিন্তু আমি নিজেই তা নষ্ট করেছি। আমি বাঁচলে তোমাকেও বাঁচাতে পারতাম। এখন আমরা দু'জনেই মরব।

বাঁচতে আমাদের হবেই বাবু। যেমন করেই হোক। এভাবে বেঘোরে প্রাণ দেওয়াটা মোটেই উচিত হবে না।

কী করে বাঁচবে?

বুদ্ধির জোরে। বাঁচবার কৌশল একটা বার করতেই হবে। অসম্ভব।

আমার কোমরে একটা ছুরি আছে। সেটা যে করেই হোক বার করে ওরা আসবার আগেই আমাদের বাঁধন খুলে ফেলতে হবে। তারপর আর এক মুহূর্ত এখানে নয়। যেমন করেই হোক পালাতে হবে।

কোথায় পালাবে বাহাদুর? এ গোলক ধাঁধার রাস্তা তো আমাদের জানা নেই। তা ছাড়া আমরা নিরস্ত্র। ওদের সঙ্গে পেরে উঠব কেন?

বাহাদুর হতাশ হয়ে বলল, সবই জানি। তবুও একবার চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী? ধরা যখন পড়েছি মরতে তখন হবেই। তবুও বিপদের মুখোমুখি হয়ে বাঁচার চেষ্টা করব না কেন?

সবই বুঝলাম। কিন্তু তোমার কোমরের ছুরি কী করে বার করব? দু'জনেই তো বাঁধা।

আপনি এক কাজ করুন।

কী করব বলো?

হাত দুটোই বাঁধা আছে আমাদের। পা তো বাঁধা নেই। কোনওরকমে পায়ে করে আমার কোমর থেকে ছুরিটা বার করার চেষ্টা করুন।

বাহাদুরের যুক্তিটা আমার নেহাত মন্দ বলে মনে হল না। আমি অতিকষ্টে পাদুটো তুলে বাহাদুরের কোমর থেকে ছুরিটা বার করবার চেষ্টা করলাম। বৃথা চেষ্টা। পায়ের আঙুল কোনওরকমে ওর কোমরের কাছ অবধি গেল বটে, কিন্তু আসল জিনিসের নাগাল পেলাম না। আবার চেষ্টা করলাম। বার বার করলাম। বাহাদুরকে বললাম, তুমি একটু কাত হয়ে বেঁকে দাঁড়াও তো।

বাহাদুর একটু সরবার চেষ্টা করল। তারপর নিশ্বাস বন্ধ করে প্রাণপণে দেহটা টান টান করে আমার দিকে যতটা সম্ভব নিজেকে এগিয়ে দিল।

আমি আমার পায়ের আঙুলে করে ওর ছোরার বাঁটটা একটু টেনে ধরলাম। কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর ওর হাতে দিতে পারলাম সেটা।

ততক্ষণে দূর থেকে আবার সেই দামামার শব্দ ভেসে আসছে। বাহাদুর ! কুইক। আর দেরি কোরো না।

বাহাদুর সত্যিই দেরি করল না। পিছন থেকে অদ্ভুত কায়দায় নিজের বাঁধন কেটে নিল।

ডিম দ্রিম শব্দ তখন কাছের দিকে এগিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে ভেসে আসছে জংলিদের বর্বর ভাষায় বিচিত্র সুরের গান।

নিজের বাঁধন কেটেই বাহাদুর আমাকে বাঁধন মুক্ত করল। বাঁধন মুক্ত হয়ে যে পথে আমরা এসেছিলাম সেই পথেই দৌড় দিলাম দু'জনে। ছুটতে ছুটতে আবার সেই বারান্দার কাছে এসে পড়লাম। কিন্তু পথ কোথায়! কোন দিকে পথ? এদিকে আমাদের দেখতে পেয়েই সেই ভয়ংকর পাখিটা আবার চিৎকার শুরু করে দিয়েছে।

বাহাদুর বলল, বাবু সাঁতার জানেন তো?

জানি।

তা হলে আর কোনও কথা নয়। এখুনি এই জলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন। তারপর স্রোতে ভেসে যতদূর পারি চলে যাব।

আমি অত বিপদেও হাসলাম। বললাম, কোনও লাভ হবে না বাহাদুর। কেন!

যাবার পথ নেই।

সে কী! এত জল তা হলে যাচ্ছে কোথায়! এই জল নিশ্চয়ই কোনও-না-কোনও জায়গা দিয়ে পাশ করছে।

করছে। খুব সামান্য ফাঁক আছে এক জায়গায়। সেইখান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে জল। আমি আসবার সময় দেখেছি। কিন্তু সে ফাঁক এতই সামান্য যে, সেখান দিয়ে জলই শুধু বেরোতে পারে কোনও মানুষ নয়।

পাখিটা সমানে চিৎকার করছে তখন।

আর পাখির চিৎকারকে ছাপিয়েও শোনা যাচ্ছে দ্রিম দ্রিম দামামার শব্দ। সেই সঙ্গে দ্রুত ছুটে আসা কতকগুলো পায়ের আওয়াজ।

মশালের আলোয় অন্ধকারও ফিকে হয়ে আসছে।

বাহাদুর হঠাৎ একদিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, বাবু! ওই দেখুন—

চেয়ে দেখি বারান্দার এক কোণে বহুদিনের পুরনো বড় বড় ঢাকের মতো কতকগুলো দামামা সারি দেওয়া আছে।

বাহাদুর বলল, আপাতত এর ভেতরেই আত্মগোপন করা যাক।

তাই চলো।

আমরা আর কাল বিলম্ব না করে একটা দামামার ভেতর ঢুকে পড়লাম দু'জনে। ভেতর থেকে বাইরের অবস্থা কিছুই দেখতে পেলাম না। শুধু অনুমানে বুঝতে পারলাম ওরা এসে চারদিকে ছুটোছুটি করছে সকলে। মশালের আলোয় লাল হয়ে উঠেছে চারদিক। এমন সময় হঠাৎ আমার চুলের মুঠিটাকে ধরে কে যেন টান দিল।

সোজা উঠে দাঁড়ালাম। দেখলাম আগুনচোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে জংলিসর্দার। যাঃ। এত কাণ্ড করেও ধরা পড়ে গেলাম। বাহাদুরও ধরা পড়ল। আমরা সেই ভাঙা দামামার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলাম দু'জনে।

জংলিসর্দার কী যেন বলল বিড় বিড় করে।

রামদুলালবাবু এগিয়ে এসে বললেন, তোমাদের মুক্তি নেই। সর্দারের আদেশ।

সর্দার আবার কী যেন বলল।

রামদুলালবাবু বললেন, আজ থেকে তিন দিন পরে দেবী নাগেশ্বরীর কাছে বলি দেওয়া হবে তোমাদের।

বাহাদুর, আমি দু’জনেই কাঁপছি তখন। আমাদের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। সর্দারের ইঙ্গিতে দু'জন জংলি এগিয়ে এল এবার। তারপর আমাদের চোখ বেঁধে পিছন মুড়ে হাত বাঁধল। বাহাদুরের কাছে যে ছুরিটা ছিল সেটাও কেড়ে নিল ওরা।

আমি এবার ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত সচেতন হলাম। কেন না আবার যদি কোনওরকমে এদের খপ্পর থেকে পালাতে পারি, তা হলে পালাবার পথ খুঁজে বার করতে মানে আবার ঠিক এইখানেই যাতে ফিরে আসতে পারি, সে সম্বন্ধে সজাগ রইলাম। এরা যে ভাবে আমাদের নিয়ে যাবে প্রতিটি পদক্ষেপ, ঠিক সেই ভাবে স্মরণে রাখতে হবে! অর্থাৎ কীভাবে কতটা পথ যাচ্ছি মনে রাখতে হবে সেটা।

ওরা আমাদের যেতে বলল।

প্রথমেই ডানদিকে ঘুরলাম। তারপর চললাম পা মেপে বিশ পা। বুঝলাম বারান্দা ধরেই চলেছি। এবার ঘরঘর শব্দ করে কী যেন সরে গেল একটা। একটু শীতল হাওয়া বয়ে গেল শরীরের ওপর দিয়ে। এক-পা এক-পা করে নীচে নামতে লাগলাম। নামছি তো নামছিই। একেবারে একশো ধাপ নামলাম। বাঁদিকে ঘুরলাম। বিশ পা গেলাম। একটা ঘরের ভেতরে ঢোকাল ওরা। সর্দার কী যেন বলল। কথাটা বুঝতে পারলাম না। একজন এসে আমাদের বাঁধন খুলে দিল।

দেখলাম একটা ছোট্ট ঘরে ওরা নিয়ে এসেছে আমাদের। ঘরের বাইরে গিস গিস করছে একদল কালো ভূতের মতো চেহারার জংলি। গায়ের গন্ধে ভূত পালাবে এমন বোটকা গন্ধ তাদের। বিটকেল বিচ্ছিরি বিদঘুটে।

সর্দার আমাদের দিকে উল্লসিত চোখে তাকাল। তাতে আর সেই আগুনের হলকা নেই। যা আছে তা হ’ল অনাবিল আনন্দ। হাতের শোল ফসকে গিয়ে আবার ধরা পড়লে যে আনন্দ হয়, ঠিক সেইরকম আনন্দ।

আমরা ভয়ে ভয়ে তাকালাম।

চিড়িয়াখানায় আমরা যেমন জন্তু-জানোয়ার দেখি—ওরাও ঠিক সেইভাবে দেখছে আমাদের। সর্দার হাতে তালি দিতেই একজন এসে দাঁড়াল। তাকে কী যেন বলল সর্দার। জংলিটা একবার আমাদের দিকে তাকিয়ে চলে গেল।

একটু পরেই দুটো পাত্রে দুধ আর একছড়া কলা নিয়ে এসে আমাদের সামনে ধরে দিল জংলিটা। সেই বড় বড় রামকলা। দেখলে লোভ হয়। কিন্তু একটা কি দুটোর বেশি খাওয়া যায় না।

আমি তো রামদুলালবাবুর কাছে আগেই খেয়েছিলাম। তাই আর খেলাম না। বাহাদুরকে বললাম, তুমি খেয়ে নাও বাহাদুর। আমি আগেই খেয়েছি। বাহাদুর কোনও কথা না বলে খেতে শুরু করে দিল।

আমাদের ঘরটা এতক্ষণ মশালের আলোতে উদ্ভাসিত ছিল। এবার একটা বড় প্রদীপ জ্বালানো হল ঘরের ভেতর। প্রদীপের ভেতর একজন পাতলা চ্যাটচেটে কী একটা জিনিস ঢেলে দিল। তেল কি ঘি, কি অন্য কিছু তা এরাই জানে। আমরা শুধু বলির মানুষ দু’জন সবকিছু দেখতেই লাগলাম।

গুহার এমন গভীর প্রান্তেও কী করে যে অক্সিজেন আসছে তা ভেবে পেলাম না। সকাল না হলে রাতের অন্ধকারে বোঝা যাবে না কিছুই। তবে ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। যেন শান্তির শীতলতা বিরাজ করছে সর্বক্ষণ।

বাহাদুরের খাওয়া হলে দু’জন জংলি এসে আমাদের বেঁধে ফেলল।

সর্দার এবার হাত তুলে আমাদের উদ্দেশ্য করে বলল, 'আখোবা'। অর্থাৎ ওদের ভাষায় শুভরাত্রি। তারপর দরজা বন্ধ করে চলে গেল সকলে।

বাহাদুর আর আমি অসহায় বন্দি দু'জন সকালের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। তিনদিন পরেই তো আমাদের ছিন্ন শির লুটিয়ে পড়বে দেবী নাগেশ্বরীর পায়ে। তাই কানখাড়া করে মৃত্যুর পদধ্বনি শোনবার আশায় রইলাম। মনে মনে ভগবানকেও ডাকতে লাগলাম। এই তিনদিনের ভেতর অভিশপ্ত তিড্ডিমের এই গুহা থেকে মুক্তি কি আমরা সত্যিই পাব না?

পাঁচ

রাত এখন কত তা জানি না। বাহাদুর বা আমার কারও চোখেই ঘুম নেই। দু'জনেই অসহায়। দু'জনেই বন্দি। কী কঠিন সেই বন্ধন। কিন্তু সে বন্ধনও আমরা শেষ পর্যন্ত খুলে ফেললাম। ওরা আমাদের বেঁধে রেখেছে বটে, তবে শুধু পা বেঁধেই ফেলে রেখেছে। অন্য কিছুর সঙ্গে বেঁধে রাখেনি। তার ওপর ঘরের ভেতর একটা প্রদীপও জ্বেলে রেখে গেছে।

চারদিক যখন একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল আমরা দু'জনে তখন গড়িয়ে গড়িয়ে সেই প্রদীপের কাছে গেলাম। প্রদীপের শিখার মুখে হাতের বন্ধনটা তুলে দিতেই সেটা জ্বলে উঠে ছিঁড়ে গেল। পায়ের বাঁধন অনায়াসে খুলে ফেললাম এবার। তারপর নিজে মুক্ত হয়ে বাহাদুরকেও বাঁধনমুক্ত করলাম।

বাহাদুর বলল, সব তো হল, কিন্তু ঘর থেকে বেরোব কী করে?

আমি আস্তে আস্তে দরজার কাছে গেলাম। গিয়ে দরজাটা টানতেই দেখলাম সেটা একটু ফাঁক হল। ফাঁক হতে দেখলাম দরজার কড়াতে দড়ি বাঁধা। তাড়াতাড়ি প্রদীপটা এনে শিখাটা সেই দড়ির মুখে ধরতেই জ্বলে উঠল সেটা। এবং পরে দরজায় টান দিতেই দরজাও খুলে গেল।

আমরা দু'জনেই সন্তর্পণে বাইরে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু এ কী! বাইরে বেরোতেই দেখি চোখের সামনে এক মূর্তিমান যম দাঁড়িয়ে। অন্ধকারে তার কালো রং এমনভাবে মিশেছিল যে তা লক্ষই করিনি। জংলিটা বল্লম হাতে পাহারা দিচ্ছিল। আমাদের দেখেই বল্লমটা উঁচিয়ে ধরল সে। অন্ধকারে তার কালো মুখে সাদা দাঁতের সারিগুলো ঝিকমিক করে উঠল। অর্থাৎ হাসল।

আমি বাহাদুরের দিকে তাকালাম। বাহাদুর আমার দিকে তাকাল। ইশারা হয়ে গেল চোখে চোখে। বাহাদুর চোখের পলকে একবার উবু হয়ে বসেই লাফিয়ে উঠে বল্লমের মুখটা চেপে ধরে সেটা ওপর দিকে করে দিল। আর আমি সেই ফাঁকে জোড়া পায়ে মারলাম এক লাথি জংলিটার পেটের ওপর।

একবার শুধু কোঁক করে একটু শব্দ। তারপর পেটটাকে চেপে ধরে দু'হাত দূরে ছিটকে পড়ল বেচারা।

আমরা ছুটে গেলাম তার কাছে। বাহাদুর একেবারে তার বুকে চেপে বসল! বসেই টিপে ধরল মুখটা। তারপর মাথাটা কয়েকবার মেঝেতে ঠুকে দিতেই অচৈতন্য হয়ে পড়ল সে। যখন দেখা গেল আর সে নড়াচড়া করতে পারছে না, তখন দু'জনে মিলে তাকে ধরাধরি করে যে ঘরে আমরা বন্দি ছিলাম সেইঘরেই এনে ঢোকালাম। তারপর হাত-পা বেঁধে রেখে প্রদীপ নিভিয়ে দরজার কড়ায় দড়ি বেঁধে পালাবার জন্য তৈরি হলাম।

বাহাদুর বলল, এখন আমরা কোনদিকে যাব?

যেদিক দিয়ে এসেছি সেই পথে।

কিন্তু সে পথ চিনে কি যেতে পারবেন?

পারব। আমার মনে আছে। চোখ বাঁধা থাকলেও আমি সতর্ক ছিলাম।

আমরা ফিরে চললাম। ঠিক যেভাবে এসেছিলাম সেইভাবে। প্রতিটি পদক্ষেপ গুনে গুনে। বিশ পা যাবার পরই সিঁড়ি পেলাম ওপরে ওঠার। আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে উঠলাম। গুনে গুনে একশো ধাপ। একশো ধাপ ওঠার পরই দেখলাম পথ রুদ্ধ। তবে হতাশ হলাম না। হাত দিয়ে বুঝলাম কাঠের দরজা একটা। গুহার কালো পাথরের সঙ্গে এবং সেই ঘন ঘোর অন্ধকারে দরজাটা এমনভাবে মিশেছিল যে, তা নজরেও পড়ল না। হাতড়ে হাতড়ে বুঝলাম দরজাটা ফাঁক হয়ে গেল। দরজা পেরিয়ে আমরা সেই বারান্দায় গিয়ে পৌঁছলাম।

দরজা আবার আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে গেল। আমরা অন্ধকারে মিশে পা টিপে টিপে চললাম। কারণ একবার যদি সেই পাখিটা আমাদের দেখতে পায়, তা হলে তার চিৎকারে সব পণ্ড হয়ে যাবে। আমরা আবার ধরা পড়ে যাব।

এবার বাঁদিক ধরে বিশ পা এগোতেই সেই জায়গায় এসে পৌঁছলাম। সেখান দিয়ে রামদুলালবাবু আমাকে তাঁর ঘরের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। যে পথ ধরে জংলিরা আরতি করতে গিয়েছিল, সেই পথে নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম আমরা। আমাদের খোয়া যাওয়া জিনিসগুলো উদ্ধার করতেই হবে। না হলে প্রাণেও বাঁচব না এবং এখান থেকে পালাতেও পারব না।

যেতে যেতে রামদুলালবাবুর ঘরের কাছে এসে পড়লাম আমরা। বাইরে থেকে দেখলাম একটা হরিণের চামড়া পেতে তার ওপরে শুয়ে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাচ্ছেন রামদুলালবাবু। একবার ভাবলাম ডাকি। আবার ভাবলাম, না থাক। অযথা বিপদ বাড়িয়ে লাভ নেই। মুক্তির পথ না পেয়ে এই বদ্ধ গুহায় থেকে থেকে মাথা খারাপ হয়ে গেছে বোধহয় লোকটার। অবশ্য মাথার আর দোষ কী! একজন মানুষের জীবনে দীর্ঘ বাইশটা বছর কি বড় কম কথা?

আমরা রামদুলালবাবুর ঘরের পাশ দিয়ে পা টিপে টিপে এগিয়ে চললাম। খানিক যাবার পরই সিঁড়ি পেলাম। মাত্র কয়েকটি ধাপ। তারপর নীচে নেমেই অবাক হয়ে গেলাম। ডাইনে বাঁয়ে নিকষ অন্ধকার। এখানে কোথায় গুপ্তধনের ঘর, কোথায় কী।

বাহাদুর হঠাৎ চাপা গলায় বলে উঠল, বাবু! ওই দেখুন।

আমি দেখলাম। দেখে বিস্মিত হলাম। এ কী সত্যি! ঘুমের ঘোরে কোনও স্বপ্ন দেখছি না তো?

দেখলাম সিঁড়ির শেষধাপে যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি সেখানে মাথার ওপর কোনও ছাদ নেই। ওপর দিকে চেয়ে দেখলাম ধূ ধূ করছে নীল আকাশ। সেই আকাশ অসংখ্য তারায় ঝিকমিক করছে। এই তো মুক্তি। এত সহজে যে গুহা থেকে বেরোতে পারব তা ভাবতেও পারিনি। আকাশ যে কত সুন্দর, তা এই প্রথম অনুভব করলাম।

সামনেই পাঁচিলের মতো একটা পাথরের খাড়াই, উচ্চতায় আট ফুটের মতে৷ হবে। একটু চেষ্টা করলেই সেটা টপকানো যায়।

আমি কোনও কিছু না পেয়ে বাহাদুরের কাঁধে পা দিয়েই পাথরের খাড়াতে উঠলাম। তারপর একটা হাত বাড়িয়ে দিলাম বাহাদুরের দিকে। সেই হাত ধরে বাহাদুরও উঠে পড়ল খাড়াইয়ের ওপর।

এখন শেষ রাত। অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। আর একটু পরেই ভোর হবে। এই ভোর আমাদের জীবনে এক আশ্চর্য সুন্দর স্মরণীয় ভোর। তারপর আমাদের মুক্তির সূর্য উঠবে। দিনের আলো ফোটার আগেই আমরা এই অভিশপ্ত গুহা থেকে অনেক দূরে চলে যেতে পারব।

খাড়াইটার ওপর বসে দেখলাম আমাদের সম্মুখেই ধু ধু করছে লতাগুল্মে ভরা এক প্রান্তর। ছোট ছোট ঝোপঝাড়ও আছে অনেক। মাঝেমধ্যে বড় গাছও আছে। আর আছে ছায়া ছায়া পাহাড়ের সারি।

আমরা খাড়াইয়ের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়লাম নীচে। পাদুটো একবার একটু কনকনিয়ে উঠল। তারপর সুমুখপানে ছুট— ছুট— ছুট।

খুব বেশি ছোটা গেল না। একে পথ পরিষ্কার নয়, তার ওপর খানিকটা ছুটে হাঁপিয়ে পড়লাম। তবু চলতে লাগলাম। পথ আর শেষ হয় না। ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটে উঠছে। চারদিকের বিশাল পর্বতচূড়াগুলো প্রেতের মতো দেখাচ্ছে। এক জায়গায় গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলাম। এ কী! পথ কই? যেদিকে তাকাই সেদিকেই অতলস্পর্শী খাদ। খাদের হাজার হাজার ফুট নীচেটা যেন ধোঁয়ার মতো দেখাচ্ছে। গায়ের রক্ত জল হয়ে গেল দেখে। মুক্তির যে আনন্দ এতক্ষণ ভরিয়ে তুলেছিল আমাদের তা এক মুহূর্তে উবে গেল।

বাহাদুর বলল, এ তো মহা মুশকিল দেখছি।

আমি কথাটি বলতে পারলাম না। আমার দু'চোখ ফেটে যেন জল আসতে লাগল। ওঃ! এমন বিপদেও মানুষ পড়ে? তবুও আমরা হতাশ না হয়ে খাদের গা ঘেঁষে পথ চলতে লাগলাম। দেখিই না কোনওদিক দিয়ে একটুও যদি নামার পথ পাই।

এদিকে সকাল হয়ে গেছে। সূর্যও উঠেছে।

দিনের আলোয় ঝলমল করছে চারদিক।

জংলিরা যখন দেখবে আমরা নেই, যখন দেখবে ওদের দলের লোকের ওইরকম অবস্থা করে এসেছি আমরা, তখন নিশ্চয়ই চুপ করে বসে থাকবে না। চারদিকে তন্ন তন্ন করে খুঁজবে আমাদের। খুঁজতে খুঁজতে যদি এইদিকে আসে? এইসব ছোট ছোট ঝোপগুলো কি লুকিয়ে রাখতে পারবে আমাদের? যা সাংঘাতিক ওরা তাতে ঠিক খুঁজে বার করে ফেলবে।

খাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতেই হঠাৎ ঘটে গেল দুর্ঘটনা। একপাশের কিছু মাটি ও আলগা পাথর ধসে যেতেই হুমড়ি খেয়ে মুখথুবড়ে পড়লাম আমি। তারপর হড়হড় করে নেমে যেতে লাগলাম খাদের দিকে। আমি হাতের সামনে যা পেলাম, তাই আঁকড়ে ধরে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে লাগলাম। প্রথমেই ধরলাম একমুঠো ঘাস। কিন্তু তা নিমেষের মধ্যে মাটি থেকে গোড়াসুদ্ধ উপড়ে এল। আমার বুকের স্পন্দন মনে হল থেমে যাবে বুঝি। গড়িয়ে পড়ার গতিও বেড়ে গেল। কত— কত নীচে যে পড়ব, তা কে জানে? ঘর্ষণে হাত-পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে রক্ষা করতে পারলাম না। হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম। তবে একেবারে নীচে নয়। ভগবান রক্ষা করলেন। খাদের গায়ে পাথরের ফাটলে একটা মাঝারি ধরনের বটগাছ গজিয়ে উঠেছিল, সেটারই একটা ডাল ধরে ঝুলে পড়লাম। প্রথম কয়েকটা মিনিট স্থিরভাবে ঝুলে রইলাম। তারপর একটু একটু করে চোখ মেলে তাকালাম নীচের দিকে। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। ওপরদিকে তাকালাম। ওপরে শুধু পাথরের দেওয়াল আর আকাশ। হাতদুটো অসম্ভব ভারী হয়ে আসছে। এইভাবে কি ঝুলে থাকা যায়? একবার অতি কষ্টে ডাকলাম, বা— হা – দু― র! আমার ডাক প্রতিধ্বনি হয়ে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় ধাক্কা খেয়ে ঘুরতে লাগল। একটু পরেই বাহাদুরের গলা শুনতে পেলাম, আমি এইখানে-এ।

আমি সাড়া দিলাম, আমাকে বাঁচাও বাহাদুর। যেমন করেই হোক বাঁচাও।

আমি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না।

আমাকে দেখবার চেষ্টা কোরো না। তা হলে তুমিও পড়ে যাবে।

ওপর থেকে বাহাদুরের গলা শোনা গেল, আপনি একটু অপেক্ষা করুন।

বাহাদুরের কথায় আশ্বস্ত হলেও আর যে ঝুলতে পারছি না। দেহের ভারে হাতদুটো যেন ছিঁড়ে যাবার উপক্রম হচ্ছে। মনে হচ্ছে হাতের কবজিদুটো আপনা থেকেই আলগা হয়ে যাবে। এমন সময় কী যেন একটা আমার গায়ের ওপর এসে পড়ল। দেখলাম একটা কঠিন ডাঁটার শক্ত লতা। বুঝলাম বাহাদুরই এটি নিক্ষেপ করেছে। এমন সময় ওপর থেকে বাহাদুরের গলা শোনা গেল, বাবু পেয়েছেন? পেয়েছি।

ওটা শক্ত করে ধরুন।

আমি দেখলাম সেটা এমনভাবে ঝুলছে যে সেটাকে ধরতে গেলে হাত বাড়িয়ে একটু রিস্ক নিয়ে ধরতে হবে। আর রিস্ক নিতে গিয়ে যদি কোনওরকমে একবার হাত ফসকাই তো ব্যস। একেবারেই ফর্সা।

ওপর থেকে বাহাদুরের গলা আবার শোনা গেল, পেয়েছেন তো...?

আমি বললাম, তুমি ওটা আর একটু নামিয়ে দাও।

বাহাদুর আমার কথা শুনতে পেয়ে আর একটু নামিয়ে দিল সেটা।

আমার তখন ঘাম ছুটে যাচ্ছে। আমি প্রথমেই সেটাকে দু'পায়ের আঙুলের টিপনিতে ধরলাম। তারপর দাঁতে করে কামড়ে এক হাত দিয়ে টেনে দু’ হাতে ধরলাম।

এবার যেন একটু হাঁফ ছাড়লাম।

তারপর ভুলেও আর নীচের দিকে না তাকিয়ে সেই লতা ধরে উঠে এলাম ওপরে। ওপরে উঠে দেখলাম শক্ত লতাটাকে একটা গাছের সঙ্গে ভাল করে বেঁধে নীচে ঝুলিয়ে দিয়েছে বাহাদুর। দিয়ে পাছে বাঁধন খুলে না যায়, তাই বাহাদুর নিজেও সেটাকে ধরে আছে।

আমি ওপরে উঠে আমার জীবনদাতা বাহাদুরকে বেশ কিছুক্ষণ দু'চোখ ভরে দেখলাম। তারপর মাটিতে বসে শুয়ে পড়লাম সটান হয়ে। বুকটা তখনও টিপ ঢিপ করছে। বাহাদুরকে কিছু বলার আগেই সে এসে ম্যাসেজ করে দিল আমাকে। বেশ কিছুক্ষণ ম্যাসেজের পর একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে বসলাম। আমার পুনর্জন্ম হল।

এখান থেকে দূরে অভিশপ্ত তিড্ডিমের সেই গুহাটাকে দেখা যাচ্ছে। কাল থেকে আজ পর্যন্ত যা ঘটে গেল, তার সবকিছুই আমার কাছে ছায়াছবির দৃশ্যের মতো মনে হচ্ছে।

বাহাদুর বলল, আমি তো ভাবলাম আর বুঝি ফিরেই পেলাম না আপনাকে।

আমিও ভাবতে পারিনি ওইরকমভাবে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাব বলে।

কী ভাগ্যি গাছের ডালটাকে ধরে ফেলেছিলেন।

সবই ভগবানের দয়ায় বাহাদুর। না হলে ওইরকম জায়গায় কখনও গাছ গজায়? তাঁরই কৃপায় আমরা বারবার বেঁচে যাচ্ছি।

আমরা বসে বসে এইসব কথা বলছি। এমন সময় হঠাৎ বাহাদুর একটু শঙ্কিত দৃষ্টিতে কী যেন দেখে বলল, ওই দেখুন বাবু!

দেখেই চমকে উঠলাম আমি। দেখি না আমরা যেখানে বসে আছি ঠিক সেইখানেই একটা ঝোপের ভিতর কী যেন একটা জুল জ্বল করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ভাল করে নজর দিতেই দেখলাম একটা বাঘের বাচ্চা। তবে নেহাত শিশু নয়। ইচ্ছে করলেই আক্রমণ করতে পারে।

বাহাদুর বলল, আপনি ওর চোখে চোখ রেখে চুপ করে বসে থাকুন। তুমি কী করবে?

মারব ব্যাটাকে।

খুব সাবধানে। কাছেপিঠে যদি ওর মা থাকে তা হলে কিন্তু একেবারে শেষ করে ফেলবে আমাদের।

বাহাদুর বলল, সে জানি। বলে পা টিপেটিপে উঠে গেল সে।

আমি বাঘের চোখে চোখ রেখে স্থির হয়ে বসে রইলাম।

একটু পরেই বাহাদুরের ছায়াটা আমার পায়ের কাছে পড়ল। দেখলাম ওর হাতে বড় একটা পাথর। পাথরটা সঙ্গোরে বাঘের মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল বাহাদুর।

এক ঘায়েই কাত। একটু চিৎকার করবারও সময় পেল না বেচারি। মাথাটা একেবারে গুঁড়িয়ে থেঁতো হয়ে গেল। অল্পক্ষণ একটু ধড়ফড় ছটফট করেই স্থির হয়ে গেল বাঘটা আমার ঠিক এভাবে মারার ইচ্ছা ছিল না বাঘটাকে। তবু বাহাদুরকে বাধাও দিলাম না। হাজার হলেও বাঘের বিক্রম। একবার ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়লে, আমরা নিরস্ত্র অবস্থায় কিছুই করতে পারতাম না ওর। বেঘোরে প্রাণটা দিতে হত।

এমন সময় দূর থেকে দামামার শব্দ ভেসে এল। দ্রিম দ্রিম দ্রিম দ্রিম। সেই সঙ্গে অস্পষ্ট একটু কোলাহল।

আমাদের দু'জনেরই মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেল। ভয়ে ঢিপ ঢিপ করতে লাগল বুকের ভেতরটা। আবার মৃত্যুর পদধ্বনি। আবার শত্রুর মুখোমুখি হওয়া। মরণের ডঙ্কা ওইতো বাজছে। দ্রিম... দ্রিম... দ্রিম... দ্রিম।

আমি বাহাদুরের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলাম।

বাহাদুর এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে এক্ষুনি কী করা উচিত তা ভেবে নিল। আমি বললাম, জংলিরা মনে হয় আমাদের খোঁজেই বেরিয়েছে।

আমারও তাই মনে হচ্ছে। এখন কী করবেন ঠিক করেছেন?

আর পালাবার বৃথা চেষ্টা না করে, এখানেই কোনও একটা ঝোপের ভেতর লুকিয়ে পড়ব।

আমারও তাই মত। তবে লুকোবার আগে এই পাপটাকে কিন্তু এখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।

মৃত বাঘটা তখন রক্তাক্ত কলেবরে পড়ে আছে। আমরা আর একটুও দেরি না করে সেটাকে ছুড়ে ফেলে দিলাম খাদের মধ্যে। না হলে ওটাকে দেখতে পেলেই ওরা হইচই পাকিয়ে আমাদের অস্তিত্ব টের পেয়ে যাবে। বাঘটাকে লোপাট করে আমরা হামাগুড়ি দিয়ে একটা ঝোপের ভেতর ঢুকলাম। আত্মগোপন করবার এ এক চমৎকার জায়গা। নেহাতই কপালটা মন্দ না হলে বাইরে থেকে কেউ দেখতেই পাবে না আমাদের।

দামামার শব্দটা ক্রমশ কাছের দিকে এগিয়ে আসছে। আর সেই শব্দের প্রতিধ্বনির ঢেউ নাচছে পাহাড়ে পাহাড়ে। চারদিক যেন গমগমিয়ে উঠছে। শুধু কোলাহল আর শব্দের তরঙ্গ।

দ্রিম...দ্রিম...দ্রিম...দ্রিম।

আমরা একদম নড়াচড়া না করে স্থিরভাবে বসে রইলাম। মনে মনে ডাকতে লাগলাম ভগবানকে। প্রতিবারের মতো এবারেও কি ভগবান আমাদের রক্ষা করবেন না?

ছয়

আমরা ঘন ঝোপের ভেতর ঠিক খরগোশের মতো আত্মগোপন করে বসে রইলাম।

জংলিগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।

তাদের দাদামার শব্দে বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ করতে লাগল।

ওদের কথাবার্তা আর হইচই খুব কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে এবার। একটা আতঙ্কের ভাব যেন মনের মধ্যে ক্রমশ জমাট বেঁধে উঠছে। আমাদের ঠিক পাশ দিয়েই দু'জন চলে গেল।

হঠাৎ একজন কী বলে যেন চেঁচিয়ে উঠল।

সঙ্গে সঙ্গে হই হই করে ছুটে এল সকলে। মোট বারো জন। যেন বারোটা পিশাচ। তাদের দুর্বোধ্য ভাষার কথা শোনা যাচ্ছে। প্রত্যেকেই উত্তেজিত। অনুমানে বুঝলাম গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা সেই লতাটাকে দেখতে পেয়েছে ওরা। আমরা ঝোপের ভেতর থেকে উঁকি মেরে দেখলাম লতাটাকে ধরে কী যেন বলাবলি করছে সবাই।

একজন একটু টেনে দেখল লতাটাকে। কী দেখল কে জানে, হয়তো দেখল যে ওই লতাটা ধরে আমরা ওদের ভয়ে খাদের দিকে ঝুলছি কি না। কিন্তু টান দেওয়ার পর যখন বুঝতে পারল ওধারে ভারী কিছু নেই তখন দু’-একবার সেটাকে ধরে টানাহেঁচড়া করে ঝাঁকানি দিল। তারপর সরসর করে খানিকটা টেনেও তুলল। পরে বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিল সেটাকে।

এবারে হাতমুখ নেড়ে চলল নানারকম যুক্তি। যুক্তির পর জনা সাতেক জংলি পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল সেদিকে। তারপর খাদের মাটি-পাথর ধরে ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগল নীচের অবস্থাটা।

যেই না দেখতে যাওয়া অমনি ঘটে গেল বিপর্যয়। ওরা দলবদ্ধ হয়ে ঢালের এমন একটা অংশে গিয়ে পড়েছিল, যেখানকার আলগা মাটি অতগুলো লোকের ভার সইতে না পেরে হুড়মুড় করে ধসে পড়ল খাদের ভেতর।

চোখের পলকে সাতজনই সাফ হয়ে গেল।

ওদের অন্তিম আর্তনাদ ও ধসের শব্দে গুরুগম্ভীর ধ্বনি ও প্রতিধ্বনিতে ভরে উঠল চারদিক।

বাদবাকি জংলিগুলো যারা অদূরে দাঁড়িয়েছিল তারা তখন প্রচণ্ড চিৎকার করে লাফাতে গল সেখানে। কয়েকজন শূন্যে হাত-পা ছুড়ে কাঁদতে লাগল। তারপর বিলাপ করতে করতে যে পথে এসেছিল ওরা, দলবদ্ধ হয়ে সেই পথেই ছুটল। বুঝলাম এই নিদারুণ দুঃসংবাদটা দলের লোকেদের দিতে গেল ওরা।

যাক। বিপদ কাটল এখনকার মতো।

এতক্ষণ রুদ্ধশ্বাসে বসেছিলাম আমরা। এবার যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বাহাদুরকে বললাম, এইবার আমাদের একটু সতর্ক হয়ে চলতে হবে বাহাদুর। কেন না বুঝতে পারছ তো ওরা গিয়ে ওদের দলের লোককে খবর দিলেই, যে যেখানে আছে ওদের, সবাই হই হই করে ছুটে আসবে।

তা হলে?

তা হলে আর কী? এই সময়টুকুর মধ্যে যেভাবেই হোক আমাদের কোনও একটা নিরাপদ জায়গা দেখে লুকিয়ে পড়তে হবে।

সেরকম নিরাপদ জায়গা এখানে কোথায়?

খুঁজে বার করতে হবে। আপাতত এই ঝোপ থেকে বেরিয়ে আরও একটু এগিয়ে চলো। তারপর ওরা যখন ফিরে এসে এখানে ওদের শোকপ্রকাশ করবে, আমরা তখন গুহার দিকেই দৌড়ব।

বাহাদুর যেন শিউরে উঠল, না না না। আপনার কি মাথাখারাপ হয়েছে? এ আপনি কী বলছেন?

কেন?

এত কষ্ট করে বেরিয়ে এসে আবার ওই অভিশপ্ত গুহায় ঢোকে কেউ?

এছাড়া যে আর কোনও উপায় নেই বাহাদুর। এখন জংলিদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে আবার ওই গুহাতেই যেতে হবে। পরে অবশ্য ঘটনার সঙ্গে তাল রেখে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করা যাবে। না হলে ওইখানে ফিরে যেতে আর কি কারও মন চায়?

জংলিগুলো চলে যাবার বেশ কিছুক্ষণ পরে আমরা ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলাম।

যখন দেখলাম ওরা অনেক দূরে চলে গেছে, তখন ওদের পথ অনুসরণ করলাম আমরা।

খানিক যাবার পর ঘন পত্রবিশিষ্ট একটি প্রকাণ্ড গাছ দেখতে পেয়ে বাহাদুরকে বললাম, বাহাদুর, এখনই আর বেশি এগনো ঠিক হবে না। যদি ওরা ফিরে আসতে শুরু করে তো একেবারে মুখোমুখি পড়ে যাব। আপাতত এই গাছে উঠেই আমরা লুকিয়ে বসে থাকি এসো। এর চেয়ে লুকানোর পক্ষে নিরাপদ জায়গা এখানে আর নেই। ওরা যখন দলবল নিয়ে আবার এইদিকে আসবে, আমরা তখন বিপরীত দিকে ছুটে গুহায় গিয়ে ঢুকব।

বাহাদুর একটু বিমর্ষ হয়েই বলল, যা আপনি বলবেন।

বুঝতে পারছি ওই গুহায় আবার ফিরে যেতে বাহাদুরের আর একটুও মন নেই। মন কী আমারও আছে। খাঁচার পাখি খাঁচা ছেড়ে একবার বেরিয়ে গেলে আর কি খাঁচায় ফিরে যায়। কিন্তু এমনই ঘটনাপ্রবাহ যে, ওই ছেড়ে আসা গুহাই এখন আমাদের একমাত্র নিরাপদ স্থান।

যাই হোক। আমরা আর দেরি না করে গাছে ওঠা শুরু করলাম। মোটা মোটা ঘেঁস ঘেঁস ডালে পা দিয়ে তর তর করে ওপরে উঠতে একটুও বেগ পেতে হল না।

ওপরে উঠতে উঠতে বাহাদুর বলল, একটা জিনিস লক্ষ করেছেন বাবু? কী?

ওরা মানে জংলিরা কিন্তু গুহার দিকে যাচ্ছে না।

আমি অবাক হয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, কালো কালো পিঁপড়ের মতো জংলিরা গুহার ডানদিকের পথ ধরে হারিয়ে গেল পাহাড়ের বাঁকে। আমি মধ্যপথে একটি শক্ত ডাল ধরে বসে রইলাম।

বাহাদুর গাছের আরও ওপরে উঠল। আমি বললাম, কিছু নজরে পড়ছে? হ্যাঁ পড়ছে। একটা নদী দেখতে পাচ্ছি। নদী?

হ্যাঁ বাবু।

সত্যি সত্যি নদী দেখতে পাচ্ছ, না অন্য কিছু? ভাল করে লক্ষ করো কিন্তু। হ্যা ভাল করেই দেখছি। ওটা নদীই।

ওখানে কোনও খাদ নজরে পড়ছে?

না প্রায় সমতলের মতো। কোনও খাদ নেই।

তা হলে তো ওই নদীটা ডিঙোতে পারলেই আমাদের মুক্তি। সমস্ত বিপদের শেষ।

আমারও তাই মনে হচ্ছে বাবু। এবারে আমরা অনায়াসে পালাতে পারব।

আনন্দের আবেগে আমিও তখন একটু একটু করে গাছের একেবারে মগডালে বাহাদুরের কাছাকাছি উঠে গেলাম। বেশ নিরাপদ এখানটা। ঘন পাতার আড়ালে খুব নিশ্চিন্তে লুকিয়ে থাকা যায়। শুধু যা একটু কাঠপিঁপড়ের উপদ্রব। তা হোক। সহ্য করা যাবে। আত্মরক্ষার জন্য এটুকু কষ্ট না করলে চলবে কেন?

ওপরে উঠে আমিও তীক্ষ্ণ চোখে সবকিছু লক্ষ করতে লাগলাম। না, বাহাদুর ভুল দেখেনি। ওই তো রুপোলি ফিতের মতো একটা নদী বহু দূরে সূর্যালোকে চকচক করছে।

বেশ কিছুটা সময় গাছের ডালে বসেই কেটে গেল।

তারপর যা ভেবেছিলাম হয়ে গেল তাই। অর্থাৎ সেই জংলিগুলো দলবদ্ধভাবে হই হই করে ছুটে আসতে লাগল এদিকে। ওরা সঙ্গে করে একটা পালকিও বয়ে এনেছে দেখলাম। সেই পালকিতে নিশ্চয়ই ওদের সর্দার আছে। মনে মনে ভাবলাম এসো বাছাধনরা। এই তো আমরা চাইছিলাম। আসতে অবশ্য অনেকটা সময় লাগল ওদের। একে তো ঝোপভরতি পথ, তার ওপর দূরত্বও কম নয়।

ওরা এল। এবং সেই বিশাল গাছতলা দিয়ে চলেও গেল। আমরাও সময় নষ্ট না করে নেমে পড়লাম গাছ থেকে

নামবার আগে অবশ্য ভাল করে বেশ চারদিক একবার দেখেও নিলাম। যখন দেখলাম আর কেউ নেই, তখনই নামলাম।

তারপর সোজা এগিয়ে চললাম যে পথ দিয়ে জংলিরা এসেছিল, সেইদিকে। লক্ষ্য আমাদের নদী।

যেতে যেতে বাহাদুর বলল, আচ্ছা বাবু ওদের সঙ্গে সেই লোকটিকে দেখলাম না তো?

কোন লোকটি?

ওই যে সেই বুড়ো, ঝাঁকড়া চুল।

ও রামদুলালবাবু।

আপনি নামও জেনে গেছেন?

হ্যাঁ। তিনি আর এখানে এসে কী করবেন? এ হল জংলিদের ব্যাপার। তিনি হলেন ভিন্ন জাত। এদের তো নন।

যাই হোক, আমরা কখনও জোরে পা চালিয়ে, কখনও ছুটে গুহার দিকেই চললাম। তবে আর তো গুহায় ঢোকার প্রয়োজন নেই। তাই ডানদিকের পথটা ধরে নদীর দিকে এগোলাম আমরা।

কিছু পথ যাবার পর দেখলাম, এক জায়গায় সাতটি ঝরনা বা সপ্ত নদীর ধারা একত্রিত হয়ে প্রবল প্রবাহে নেমে আসছে একটি পাহাড়ের গা বেয়ে। দূর থেকে এটি অবশ্য আমাদের নজরে পড়েনি। কেন না এটি একটি খাড়াই পাহাড়ের বাঁকে ছিল।

নদীর ওপারে পাহাড়ের বাঁকে এক মনোরম ঢাল। কত বিচিত্র বর্ণের নুড়িপাথর যে পড়ে আছে সেখানে, তার আর শেষ নেই। দেখে মনে হয় কিছু পাথর খুবই মূল্যবান। যাই হোক, সেই মূল্যবান নুড়িপাথরের ঢালের গায়ে ঘন সবুজ নিবিড় বন। গাছপালার চেহারা দেখলে কাশ্মীর উপত্যকার কথা মনে হয়। কুলু কাংড়ার সৌন্দর্যও যেন প্রকটিত হয়ে উঠেছে এখানে।

আত্মগোপনের চমৎকার একটি জায়গা। কোনওরকমে নদীটা একবার পার হতে পারলে মুক্তিও মিলতে পারে। তবে তা দুরূহ প্রচেষ্টা। কেন না যা খরস্রোতা নদী।

নদীটা প্রবল প্রবাহে ধোঁয়ার আকারে একপাশে প্রায় দু’ হাজার ফুট নিচু খাদে পড়ছে।

কিন্তু নদীর ওপারে কী করে যাব?

যা বেগ তাতে তো কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। বড় বড় বোল্ডারের মতো পাথরের চাঁই যা দু’-একটা রয়েছে, তাতে তো শ্যাওলা ধরে আছে। সবচেয়ে মারাত্মক যা, তা হল নদীর বালি ও পাথরের খাঁজে হাঁ করে আছে বড় বড় কুমির। যারা আলুভাতের মতো দু'জনকে মুখে পুরে নিতে একটুও কষ্ট বোধ করবে না।

আমি হতাশ হয়ে বললাম, আমরা ভারতবর্ষেই আছি তো? নাকি ভুল করে আফ্রিকার জঙ্গলে ঢুকে পড়েছি?

বাহাদুর বলল, আমরা ঠিক জায়গাতেই আছি বাবু। এটা হচ্ছে লুসাই পাহাড়ের রেঞ্জ। এও হিমালয়।

এইরকম বিচ্ছিন্ন পরিবেশের প্রভাবেই এই মানুষগুলো আজও জংলি হয়ে আছে। এবং দুর্লঙ্ঘ প্রাকৃতিক অবস্থানের জন্য কেউ এদের অস্তিত্ব টেরও পায় না। ফলে এরা যেমনি অসভ্য, তেমনি বর্বর।

যাই হোক। নদী পার হবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই দেখে, আমরা মাথায় হাত দিয়ে বসলাম।

এমন সময় বাহাদুরই হঠাৎ বলল, ওই দেখুন বাবু কী বিচিত্র একটা জিনিস।

দেখলাম একটা প্রকাণ্ড পাথরকে কুঁদে এক ভয়ংকর মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। মূর্তিটা সম্পূর্ণ নয়। গলা থেকে মুখ ও মাথা পর্যন্ত। মুখটা প্রকাণ্ড এবং হাঁ করা। যেন সর্বস্ব গিলে খেতে চাইছে সেই হাঁ মুখে।

তার সেই ক্ষুধার নিবৃত্তির জন্যই বুঝি একটি গ্যাজলা ওঠা তেলভরতি মাটির প্রদীপ দীপ্ত শিখায় জ্বলছে সেই মুখগহ্বরে। এই কি তবে নাগেশ্বরী? জংলিদের আরাধ্যা দেবী নাগমাতা?

মূর্তিটার সামনে যেতেই দেখলাম, এক ঝাঁক বুনো হাঁস কোথা থেকে যেন বেরিয়ে এসে প্যাক প্যাক করে ডানা ঝাপটে উড়তে লাগল।

তাদের দেখাদেখি এক ঝাঁক পাখিও।

সে এক দেখবার মতো দৃশ্য।

এখানে সারিবদ্ধ কতকগুলো ছোট ছোট ঘরও আছে দেখলাম। এই তা হলে জংলিদের বস্তি।

ঘরগুলো এমন যে ওগুলোকে দেখলে ঘর বলে মনেই হবে না। মনে হে পাথরের খাঁজে খাঁজে গজিয়ে ওঠা কতকগুলো ঝোপ। প্রতিটি ঘরই বাইরের দিক থেকে বুনো লতাপাতায় ঢাকা। সেইসব লতা গাছে রকমারি সুগন্ধি ফুলও আছে।

ঘরগুলোয় ঢোকবার জন্য কোনও দরজার বালাই নেই। সামান্য একটু আটকান দেওয়া। ঘাড় হেঁট করে গর্তের মতো জায়গা দিয়ে শুধু ঢুকে পড়া।

যাই হোক, আমি চট করে সেগুলোর ভেতরে ঢুকে পড়ে একটু তল্লাশি চালালাম। খুঁজেপেতে দেখলাম, যদি পাওয়া যায় আমাদের খোয়া যাওয়া সেইসব জিনিসগুলো।

বাহাদুরও চুপচাপ রইল না। সেও শুরু করল খোঁজাখুঁজি। দু'জনের সমবেত চেষ্টায় যদি পাওয়া যায়।

এরই মধ্যে একটি ঝোপড়ি ঘর দেখলাম, বেশ উন্নত ধরনের। বুঝলাম এইটাই সর্দারের ঘর।

বাহাদুরকে বললাম, বাহাদুর, তুমি একটু বাইরের দিকে নজর রাখো। আমি ভেতরটা খুঁজে দেখি।

কেন বেকার সময় নষ্ট করছেন?

আমার মনে হচ্ছে জিনিসগুলো এখানেই আছে।

তাড়াতাড়ি করুন তা হলে। আমি বরং একটা গাছের ওপর উঠে ওদের দিকে নজর রাখি। বিপদ বুঝলেই শিস দেব। আপনি বেরিয়ে আসবেন।

বাহাদুরের যুক্তিটা মন্দ নয়।

এখানে সবসময় সতর্ক থাকা দরকার।

তবে বিপদ বা ধরা পড়ার ভয়ও যেমন আছে, তেমনি আরও কিছু না থাক, লুকিয়ে পড়ার জন্য এইসব বৃহদাকৃতি গাছও আছে। বিশেষ করে ওই রাক্ষুসি দেবী নাগেশ্বরী যেখানে আছেন তার ঠিক পিছনেই আছে একটি প্রকাণ্ড গাছ। তার ডালপালাগুলোও যেন হাত বাড়িয়ে আকাশটাকে ধরতে যাচ্ছে। কী গাছ তা জানি না। ঘন ডালপালা। বড় বড় পাতা। আর যেন অন্ধকারময়। পাহাড়-জঙ্গলে এরকম কত গাছ যে আছে, কে আর অত নাম জেনে বসে আছে সব।

বাহাদুর গাছে উঠল।

আমি ঝোপড়ির ভেতরে ঢুকলাম।

ঢুকেই অবাক। দেখি না আমাদের অতি যত্নে কেটে রাখা সেই হাতির দাঁতদুটো ঝোপড়ি ঘরের এক কোণে পড়ে আছে।

এমনকী সেই বাঘের ছালটাও ছাড়িয়ে এনেছে দেখছি।

অবশ্য এসবের জন্য এখন আর আমার মনে কোনও ক্ষোভ নেই। এখন শুধু আমাদের আসল জিনিসগুলো এবং প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচি। তবুও খুব তৎপরতার সঙ্গে এটা ওটা সেটা দেখতেই পেয়ে গেলাম ম্যাপখানা।

মনটা উল্লাসে নেচে উঠল।

সর্দারের বিছানার নীচে গোঁজা ছিল ম্যাপটা। এতটুকু মলিন হয়নি। নকশা লেখা যেমন ছিল তেমনিই আছে। ম্যাপটা নিয়ে হাতড়াতে লাগলাম আরও কিছু পাওয়া যায় কি না তা দেখবার জন্য।

ঘরের ভেতরে একটা মাচা মতন ছিল। টর্চ, পিস্তল আর ছুরিটা সেখানেই পেয়ে গেলাম।

ঠিক তার ঘর থেকে বেরিয়ে আসার মুখেই দেখলাম যে ঘরে সর্দার থাকে, পাশের ঘরেই সারি সারি সাজানো আছে তরমুজ, পেঁপে আর রামকলার কাঁদি। আমি তাড়াতাড়ি করে কয়েক ছড়া কলা আর পেঁপে নিয়ে পালিয়ে এলাম। কেন না প্রাণ বাঁচানোর জন্য এবং পালিয়ে যাবার জন্য যতই চেষ্টা করি, ক্ষুধায় খাদ্য না পেলে পেট কোনও কথা শুনবে না।

এমন সময় শিসের সংকেত শুনতে পেলাম। এ তো বাহাদুরের শিস।

নিশ্চয়ই ওরা ফিরে আসছে এবার।

বাহাদুর তাই সতর্ক করে দিচ্ছে।

আমি আর একটুও বিলম্ব করলাম না। আর বিলম্বের দরকারই বা কী? আমার কাজ তো হাসিল হয়ে গেছে।

আমি যা নেবার তা নিয়ে এক লাফে বাইরে বেরিয়েই তাড়াতাড়ি করে গাছে উঠতে লাগলাম। গাছে ওঠার ব্যাপারে আমি বরাবরই পটু। তাই খুব একটা অসুবিধা হল না। বিশেষ করে এখানকার গাছপালার ডালগুলো ঘন এবং মোটা বলে চটপট করে ওপরে ওঠা যায়।

আমি ডালপালা ধরে ওপরে উঠে আসতেই বাহাদুর জিজ্ঞেস করল, লাভ হল কিছু? পেয়েছেন?

আমি হেসে বললাম, ভগবান সহায়। পেয়েছি।

ওরাও আসছে। ওই দেখুন।

ওরা আসবে, সে তো জানিই। গেছে যখন ফিরতেই হবে। তবু তাকিয়ে দেখলাম দূরে— অনেক দূরে ঝোপজঙ্গল পেরিয়ে জংলিরা দলে দলে আসছে। বাহাদুর এইসময় একবার আড়চোখে আমার হাতের দিকে তাকাল অর্থাৎ সংগ্রহ করে আনা সেই ফলমূলগুলোর দিকে।

আমি বললাম, ওরা আসার আগেই খাওয়াটা সেরে নেওয়া যাক। পরে হয়তো সময় পাব না।

বাহাদুর বলল, খুব খিদে পেয়ে গিয়েছিল। এতসব কোথায় পেলেন বাবু? সর্দারের ঘরে।

ওঃ বাঁচালেন আপনি।

আমরা দু'জনেই তখন সর্বাগ্রে গোগ্রাসে খেতে শুরু করে দিলাম সেগুলো।

খেয়ে ফলের খোসাগুলো গাছেরই একটা ফোকরে গুঁজে রাখলাম। না হলে নীচে পড়লেই চোখে পড়বে ওদের। আর চোখে পড়লেই সর্বনাশ। যদি গাছের দিকে তাকায়, তা হলে আবার ধরা পড়ে যাব।

বাহাদুর খাওয়া শেষ করে বলল, তা বাবু আমাদের এইভাবে এখানে সময় নষ্ট করে গাছের ডালে বসে না থেকে, পালাবার চেষ্টা করলে হত না? এইভাবে পিঁপড়ের কামড় খেয়ে কতক্ষণ বসে থাকব?

সারাদিন। এখন পালাতে গেলেই ধরা পড়ব। সে খেয়াল আছে? সব ব্যাপারে বেশি আঁকুপাঁকু করলে হয় না। অসীম ধৈর্যে বুক বেঁধে বসে থাকতে হবে আমাদের।

কিন্তু এখানে বসে থেকেও যদি ধরা পড়ি?

সেটা নেহাতই দুর্ভাগ্য বলতে হবে। তবে একটা ব্যাপারে এখন আমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারি এই যে, ওরা কিন্তু ধরেই নিয়েছে আমরা পাহাড় টপকে পালাতে গিয়ে খাদে পড়ে মারা গেছি। কাজেই এখন আর ওরা আমাদের নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবে না। ওরা এখন ওদের দলের লোকদের মৃত্যু নিয়েই চিন্তিত। তাই আমাদের প্রতি আর ওদের নজর নেই।

তা অবশ্য ঠিক।

তবুও এখানকার প্রকৃতিগত অবস্থানের জন্যে যে বাধা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে আমার মনে হচ্ছে সময় ও সুযোগ বুঝে আমাদের পালাতে গেলেও ওই গুহার ভেতর দিয়েই পালাতে হবে।

বাহাদুর আক্ষেপের সুরে বলল, আবার ওই গুহা। গুহা দেখছি আমাদের ছাড়বে না।

না গুহাপথ ছাড়া সত্যি সত্যিই আর আমাদের কোনও পথ নেই। কেন না এখানকার প্রাকৃতিক অবস্থা অনেকটা মধ্যপ্রদেশের অমরকণ্টক পাহাড়ের শোণ প্রপাতের জায়গাটার মতো।

তা হলে কখন যাবেন ঠিক করছেন?

দিনমানে তো সম্ভব নয়। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রাতের অন্ধকারেই যেতে হবে আমাদের।

বাহাদুর বলল, ওই ম্যাপটার মধ্যে কি গুহাপথের কোনও নির্দেশ দেওয়া আছে?

আছে বইকী। সেইজন্যেই তো এত কষ্ট করে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করলাম এটাকে। এইখানে নিরাপদে বসে সেই ম্যাপ দেখে গুহাপথের নির্দেশ বুঝে নিয়ে তবেই আবার ভেতরে ঢুকব।

আর তা হলে কোনও ভয় নেই বাবু, কী বলুন?

ভরসাও নেই। সমুদ্রে পেতেছি শয্যা শিশিরে কী ভয়? শুধু সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপ এগিয়ে যেতে হবে আমাদের।

এমন সময় বাহাদুর হিস্ করে উঠল।

ওর সংকেত বুঝতে পেরেই আমার রোমকূপগুলো খাড়া হয়ে উঠল তখন। এই অবস্থায় ঠিক কী করা উচিত, তা আমার জানা আছে। একদম নড়াচড়া নয়। একেবারে স্থিরভাবে বসে থাকতে হবে। না হলেই মৃত্যু।

উঃ। কী দারুণ হিমশীতল ঠান্ডা সেই পিচ্ছিল পরশ। পাহাড়ি সাপটা যে কখন গাছের ডাল বেয়ে এসে আমার কাঁধে নেমেছে তা টেরই পাইনি।

কাঁধের ওপর থেকে আস্তে আস্তে সেটা আমার বুকে নামল। তারপর কুতকুতে চোখে মাথাটা একটু দুলিয়ে সড় সড় করে চলে গেল সামনের একটি ডাল বেয়ে।

এতক্ষণ আমি নিশ্বাস পর্যন্ত ফেলিনি। এবার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। হঠাৎ একটা পিলে চমকানো শব্দে বুকটা কেঁপে উঠল। জংলিরা কখন যে এসে গাছতলায় দাঁড়িয়েছে তা খেয়াল করিনি।

পাগলের মতো উন্মত্ত হয়ে দামামা বাজাতে লাগল তারা। দ্রিম দ্রিম দ্রিম সেই সঙ্গে বিকট চিৎকার।

কেউ কেউ বুক চাপড়ে কান্নাও শুরু করে দিয়েছে।

সেই ভয়ংকরী দেবীমূর্তির সামনে এসে লুটিয়ে পড়ছে সবাই।

সর্দার নতজানু হয়ে দেবীকে প্রণাম করল। তারপর কী ভেবে যেন ওপর দিকে তাকাতে গিয়েই থেমে গেল সর্দার। কান্না মাথায় উঠে গেল তার। সোজা খাড়া হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে 'আকুকুক্’ করে একটা অদ্ভুত শব্দ বার করে সমস্ত জংলিদের হাতছানি দিয়ে ডাকল।

জংলিগুলো কান্না থামিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ছুটে এল সর্দারের কাছে।

সর্দার আঙুল তুলে গাছের ওপর দেখতে বলল সকলকে। ইসরে। ধরা পড়ে গেলাম।

গাছের দিকে তাকানো মাত্রই হনুমানের মতো লম্ফঝম্ফ শুরু হয়ে গেল জংলিদের। তারপর বল্লম উঁচিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল গাছের দিকে। আমাদের চোখে যেন জল এল।

হাত-পা কাঁপতে লাগল ভয়ে। নাঃ। বিধি বাম। তাই এত চেষ্টা করেও মুক্তির স্বাদ পেলাম না। অভিশপ্ত তিড্ডিমের এই অভিশপ্ত প্রান্তরেই বল্লমের খোঁচা খেয়ে অসহায়ভাবে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে আমাদের।

আমরা আবার ওদের নজরে পড়ে গেলাম।

বাহাদুর ভয়ে চোখ বুজল।

আসলে কিন্তু আমরা যে ভয় করছিলাম, তা ঠিক নয়। ওরা আমাদের দেখতেই পায়নি। ওরা যা দেখে ছুটে এসেছিল তা হল একটা সাপ। বোধহয় খুব ভয়ংকর জাতের সাপ। না হলে এই সাপের রাজত্বে বাস করে সাপ দেখে ছুটে আসবে কেন?

সাত

সাপটা গাছের ডালে নিজের দেহটা পাকিয়ে এমনভাবে মুখটা লুকিয়ে রেখেছিল যে, সেটা অতর্কিতে সর্দারের চোখে পড়ে যায়।

একটু আগেই তো ওটার পাশ দিয়ে আমরা ওপরে উঠেছি।

গাছের ডালের সঙ্গে জড়িয়ে রঙে রং মিলিয়ে এমনভাবে ছিল ওটা যে তখন আমরা ভুলেও ওটাকে সাপ বলে মনে করতে পারিনি। কী ভাগ্য যে ছোবল মারেনি আমাদের। তা হলে বাঁচার আর কোনও উপায়ই থাকত না।

সাপটাকে দেখে জংলিরা খুব তৎপরতার সঙ্গে অদ্ভুত কায়দায় তার চোখ লক্ষ্য করে এমনভাবে বর্শা বিদ্ধ করল যে, প্রথমে সেটা কুঁকড়ে গেল। তারপর গোটা দেহটা দুমড়েমুচড়ে পাকিয়ে নিজের থেকেই পাক খুলে ধীরে ধীরে নেমে এল সেটা।

অনেক উঁচু ডালে বসে পাতার আড়ালে আত্মগোপন করে এইসব দেখলাম আমরা।

কী প্রকাণ্ড সাপ।

যেন আস্ত একটা গাছের গুঁড়ি।

খুব কম করেও পঁচিশ-ত্রিশ হাত লম্বা হবে।

সাপটা নেমে এলে জংলিরা একত্রিত হয়ে মেরে ফেলল সেটাকে। তারপর দলবদ্ধ হয়ে তাকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে চলল নদীর দিকে।

নদী তো কাছেই।

নদীর জলে তিনবার ওরা সাপটাকে চুবিয়ে ছুড়ে দিল খাদের দিকে। আবার বেজে উঠল দামামা।

দ্রিম। দ্রিম। দ্রিম। দ্রিম।

একটু পরেই দেখলাম গুহার ভেতর থেকে রামদুলালবাবু বেরিয়ে এলেন।

সর্দার তাঁকে কী যেন বলতেই রামদুলালবাবু বললেন, মায়ের কী মহিমা। মা কখনওই বিশ্বাসঘাতক ও লোভীকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়েন না। শাতকর্ণি গুহার এই গুপ্তধন একমাত্র আমরা ছাড়া আর কারও ভোগ করবার অধিকার নেই। এই বলে ধীরে ধীরে দেবী নাগেশ্বরীর মূর্তির কাছে এগিয়ে গেলেন রামদুলালবাবু। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে দু' হাত জোড় করে অর্ধ নিমীলিত চোখে কী সব বিড় বিড় করে বলে প্রার্থনা করতে লাগলেন।

হঠাৎ সর্দার চেঁচিয়ে উঠে কী যেন আদেশ দিল।

সঙ্গে সঙ্গে জংলিরা যে যেখানে ছিল এসে হাজির হল সেখানে। তারপর সবাই মিলে দেবীর কাছে প্রার্থনা করতে লাগল।

প্রার্থনা শেষ হলে কয়েকজন নিজ নিজ ঝোপড়ির ভেতরে ঢুকে বিচিত্র সব সাজ পরে এল।

মাথায় পরল হালকা কাঠের ফণাওয়ালা পঞ্চমুখী সাপ।

দেবী নাগেশ্বরীর সামনে শুকনো কাঠ জড়ো করে তাইতে আগুন ধরানো হল। আর সেই আগুনের লেলিহান শিখাকে ঘিরে শুরু হল আধ ন্যাংটো জংলিদের হাত-পা তুলে বর্বর নাচ।

দামামার ছন্দ এবার অন্যরকম হয়ে গেল।

এবারে আর দ্রিম দ্রিম নয়। কেটে কেটে থেমে থেমে ত্রিমাত্রিক ছন্দে বাজতে লাগল দামামা – দুম দুম বা। দুম দুম বা। দুম দুম বা। -

বাঁশের চোঙায় করে রস এল। সেই রস আকণ্ঠ পান করল সকলে। দারুণ নেশা জমে উঠল এবার। নাচের উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল। নাচের সঙ্গে গানও শুরু হল এবার।

কেঁপে উঠল তিড্ডিমের পার্বত্যঅঞ্চল, বনভূমি ও উপত্যকা। পাহাড়ে-পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হতে লাগল। পাখিরা চক্রাকারে ঘুরপাক খেতে লাগল আকাশে।

বিচিত্র সুরে, বিচিত্র ভাষায়, বিচিত্র কণ্ঠের গান জমে উঠল তখন—

“আম্বুম্‌বো আম্বুবে আম্বুম্‌বিপে-এঃ”

বাহাদুর বলল, এসব গানের ভাষা তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কী যে ছাই বলে। আসলে এটা বোধহয় ওদের শোক উৎসব।

হ্যাঁ। অতগুলো লোক মরে যাওয়ায় ওরা দুঃখ পেয়েছে খুব।

প্রচণ্ড মাতালও হয়েছে।

তাই তো দেখছি। যে নাচন নাচছে, তাতে মনে হচ্ছে, আজই বোধহয় ওদের সকলের শেষদিন। এ নাচ কি দেখা যায়? আমার তো সর্বাঙ্গে কাঁটা দিচ্ছে। মানুষের মতো চোহারা। কিন্তু কী দারুণ অমানুষিক নাচ যখন দারুণ জমে উঠেছে, তখন হঠাৎ হই হই রবে চিৎকার করে উঠল জংলিগুলো। মুহূর্তের মধ্যে নাচগান থেমে গেল সব।

বল্লম নিয়ে রুখে দাঁড়াল লে।

শুরু হল প্রচণ্ড কোলাহল।

রামদুলালবাবু ছুটে গিয়ে নাগেশ্বরীর মূর্তির পিছনে একটি বড় পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করলেন। কাঁকড়াগুলো যেমন বিপদ বুঝলে মাটির গর্তে, ফাটলে নিজেদের ঢুকিয়ে নেয়, ঠিক সেইভাবে পাহাড়ের পাথরের খাঁজে নিজের দেহটা ঢুকিয়ে নিলেন রামদুলালবাবু।

এমন সময় সেই প্রচণ্ড কোলাহলকে ছাপিয়েও পাহাড়-পর্বত কাঁপিয়ে একটা ক্রুদ্ধ গর্জন ভেসে এল গোঁ গোঁ করে।

বাহাদুরের মুখ দিয়ে শুধু বেরিয়ে এল ‘ওরে ব্বাবা’!

দেখলাম মস্ত লম্বা একটি ডোরাকাটা বৃহদায়তন বাঘ সেই কোলাহলের মধ্য থেকেও ঝাঁপিয়ে পড়ে জংলিদের একজনকে মুখে নিয়ে চোখের পলকে হারিয়ে গেল সেখান থেকে।

ইতিমধ্যেই জংলিদের অব্যর্থ টিপে বাঘের পিছনদিকের রানে একটি বল্লম গেঁথে গেছে যদিও, তবুও বাঘ তাকে গ্রাহ্য করল না। শিকার মুখে নিয়ে দৌড়। বাঘটা উধাও হবার সঙ্গে সঙ্গেই জংলির দল বল্লম উঁচিয়ে পিছু নিল তার। হই হই চিৎকার করতে করতে ছুটল তার চলে যাওয়া পথের দিকে।

রামদুলালবাবু নিরাপদ বুঝে পাথরের খাঁজ থেকে আত্মপ্রকাশ করলেন এবার। তারপর আর একবার দেবীকে প্রণাম করে চলে গেলেন। সর্দার দেবীর বেদিতে অনেকক্ষণ ধরে মাথা খুঁড়ে কান্নাকাটি করল। তারপর কান্না শেষ হলে চোখের জল মুছে একজনকে কী যেন বলল।

সে আস্তে আস্তে সর্দারের ঘর থেকে বড় একটা কলার কাঁদি নিয়ে এল ঘাড়ে করে।

তারপর আবার গেল।

দুটো বড় বড় পেঁপে নিয়ে এল।

সর্দার একটি পেঁপে ও দু’ছড়া কলা লোকটিকে দিতেই, লোকটি ঢুকে গেল গুহার ভেতর। অর্থাৎ রামদুলালবাবুকে বা পাখিটাকে দিতে গেল। সর্দার নিজেও কিছু ফল খেল।

তারপর কী মনে করে যেন উঠে দাঁড়িয়ে টলতে টলতে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে।

সমস্ত আবহাওয়াটাই কীরকম হয়ে গেল যেন।

বাহাদুর বলল, সকালে আমরা যে বাঘের বাচ্চাটাকে মেরেছিলাম এটা বোধহয় তার মা। মরিয়া হয়ে এসে তার সন্তানহত্যার প্রতিশোধ নিয়ে গেল।

ঠিক বলেছ তুমি। ওর ধারণা এই জংলিরাই ওর বাচ্চাকে মেরেছে। সত্যি, এত লোকের সামনে থেকে যে কী করে তুলে নিল জংলিটাকে তা ভাবাই গেল না। অথচ দোষটা আমাদেরই। এখানে এসে এই একটিই খারাপ কাজ করে ফেলেছি আমরা।

খুব অন্যায় করেছি। ওটাকে না মারলেই হত।

যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন আর এর জন্য আপশোশ করে কোনও লাভ নেই।

বুকের ভেতরটা এখনও যেন ঢিপ ঢিপ করছে।

নীচে আগুনের তেজ একটু একটু করে কমে আসছে তখন। সর্দার গেছে ঝোপড়িতে।

জংলিরা গেছে বাঘ মারতে।

দু’–একজন শুধু নাগেশ্বরীর মূর্তির কাছে শুয়েবসে ঝিমুচ্ছে।

আমি গাছের ডালে বসে গুহার ম্যাপখানা মেলে ধরলাম। ম্যাপের প্রথমেই একটি ক্রুশ চিহ্ন আঁকা আছে। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের দিক নির্ণয় করছে চিহ্নটা।

বাহাদুর বলল, এই সংকেত থেকেই আমরা রাস্তার হদিস পেয়ে যাব। কী বলুন?

হ্যা। আজ রাত্রে জংলিরা আরতি করে ফিরে এসে খেয়েদেয়ে ঘুমোলেই আমরা পালাব। ততক্ষণে পথের হদিসটা জেনে নিই।

কিন্তু গুপ্তধন? গুপ্তধনের কী হবে?

গুপ্তধনের সন্ধান দেবে রামদুলালবাবু। ভাল কথায় রাজি না হলে পিস্তল দেখিয়ে জেনে নেব।

কী বিচিত্র ধাঁধার মতো ম্যাপ। মোটা সবুজ কাগজে লাল কালিতে আঁকা। সূর্যটা মাথার ওপর যেখানে আছে, সেখান থেকে আমরা দিকনির্ণয় শুরু করলাম। অর্থাৎ আমরা এখন উত্তরে আছি।

গুহার প্রধান মুখ মানে যে পথে আমরা প্রবেশ করেছি সেটা দক্ষিণে। পূর্বে নদী। পশ্চিমে গিরিখাত।

এক জায়গায় লেখা গুপ্তধন। লেখাটা সাংকেতিক। একটা বিচিত্র ধাঁধানীল তারা ঝিকমিক, বিশ গতি ডানদিক, রাধা মোড় ছ'চরণ, সাবধানে হে মরণ। শিলাটন খান তিন অমাবস্যা সারাদিন, একুশে চরণ রেখো, সামনে তাকিয়ে দেখো। বাহাদুর বলল, এর মানে কী বাবু?

এর মানে কি আমিও জানি? তা হলে তো সব সমস্যার সমাধান এখুনি হয়েই যেত। শুধু ভেবে চ্ছি না অনেক অনুসন্ধানের পর এই গুহার মানচিত্র যিনি তৈরি করলেন তিনি এর সন্ধান পেলেন কী করে? এবং সন্ধান পেয়েও গুপ্তধন নিতে পারলেন না কেন?

হয়তো মর্মান্তিক মৃত্যুই তার কারণ।

বাহাদুর আমি দু'জনেই ঝুঁকে পড়লাম ম্যাপের ওপর। কী জটিল সেই নকশা। রেখার পর রেখা এমনভাবে মিলেছে যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

আমরা প্রধান মুখে যেদিকে ঢুকেছি সেই দিকটাই এখন প্রস্থানপথ ভেবে বিপরীত দিক অর্থাৎ যেদিকে সেই অতিকায় পাখি এবং জলস্রোত রয়েছে, সেইদিক থেকে এখানকার যাত্রাপথ নির্ণয় করতে লাগলাম।

এই তো এক দুই তিন অর্থাৎ অর্ধবৃত্তাকারে এদিককার গুহামুখ থেকে ডানদিকে তিন পাক বেরোলে গুহার মধ্যস্থলে গিয়ে পড়ব। বাঁদিকে নিষেধ। লাল ডট দেওয়া আছে। তারপর সোজা দুটি গহ্বর ডাইনে রেখে সূর্য আঁকা তৃতীয় গহ্বর বাঁদিকে। তারপর আর দেখা হল না।

নীচে তখন প্রচণ্ড চেঁচামেচি।

সর্দার ঝোপড়ি থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার করছে। আর তিড়িং-বিড়িং করে লাফাচ্ছে।

যে দু’-একজন সেখানে উপস্থিত ছিল তারাও ছুটে গেল সর্দারের কাছে। সর্দার কী যেন বলতেই একজন ছুটল গুহার দিকে। তারপর রামদুলালবাবুকে

ধরে টানতে টানতে নিয়ে এল।

রামদুলালবাবু এসেই বললেন, তা

সর্দার আবার কী যেন বলল।

কী করে হয়? তারা তো মরে গেছে।

রামদুলালবাবু বললেন, তুমি বিশ্বাস করো সর্দার, আমি তাদের পালিয়ে যেতে কোনওরকম সাহায্য করিনি। তা ছাড়া ওই ম্যাপও চুরি করিনি আমি। ওরাই নিয়ে পালিয়েছে। পালাতে গিয়ে মরেছে।

সর্দার এবার গম্ভীরভাবে কী যেন বলল রামদুলালবাবুকে।

রামদুলালবাবু বললেন, বেশ তো, যদি তোমার সন্দেহ হয়, তা হলে আমার ঘরের ভেতরটা খুঁজে পেতে দেখো যদি কিছু পাও। আমি এই মায়ের দিব্যি দিলাম। মা নাগেশ্বরীর সঙ্গে যারা বেইমানি করেছে তারা যেন মরে। আমারও মৃত্যু হোক।

সর্দার একবার দু’হাতে নিজের চুলের মুঠি ধরে মাথাটাকে ঝাঁকানি দিয়ে নিল। তারপর রামদুলালবাবুর কাছে এগিয়ে এসে হাতে হাত মিলিয়ে বলল, চেল্লিটাল্লিচো। অর্থাৎ বিশ্বাস করলাম।

রামদুলালবাবু বললেন, তারা মরেছে সর্দার। এদিকে জলের মধ্যে শত শত কুমিরের পাহারা, ওদিকে গভীর গিরিখাদ। ওরা যাবে কোনদিকে?

রামদুলালবাবু আবার বললেন, ওরা পালাতে গিয়েই মরেছে। মা ধ্বংস করেছেন ওদের। মা কখনও ওদের ক্ষমা করেননি। মায়ের ওপর বিশ্বাস হারিয়ো না সর্দার।

বেলা তখন পড়ে আসছে।

দূর থেকে বিচিত্র বুনো গানের সুরও ভেসে আসছে। অর্থাৎ জংলিরা ফিরছে। হই হই রব শোনা যাচ্ছে।

দামামা বাজছে দ্রিম দ্রিম দ্রিম।

জোরে জোরে বাজছে।

কাঁপছে তিড্ডিম। কেঁপে কেঁপে উঠছে লুসাই পাহাড়ের সুদীর্ঘ রেঞ্জ। ভেসে আসছে প্রচণ্ড কোলাহল।

হই হই করে ছুটে আসছে সব। বিজয়উল্লাসে চিৎকার করতে করতে আসছে। বাহাদুর দূরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, আরে! কী সাংঘাতিক। ওই দেখুন বাবু। সেই বাঘটাকে মেরে ওরা ঘাড়ে করে আনছে।

একটু পরেই বাঘটাকে নিয়ে এসে পড়ল ওরা। বর্শাবিদ্ধ করে বাঘটার শরীরের কোনও অংশ ওরা অক্ষত রাখেনি।

যে জংলিটাকে বাঘে ধরেছিল, তাকেও বয়ে নিয়ে এল কয়েকজন। কী মর্মান্তিক অবস্থা তার।

জংলিটা মরে গেছে।

বাঘে বীভৎসভাবে তার পেটটা খেয়ে ফেলছে। কী সাংঘাতিক দৃশ্য। চোখে দেখা যায় না।

মৃত জংলিকে ওরা নাগেশ্বরীর সামনে রাখল।

বাঘটাকেও রাখল একপাশে।

দু’জন খুব যত্ন সহকারে বাঘের ছাল ছাড়াতে বসল। বেশি সময় লাগল না। ছাল ছাড়িয়ে বাঘটাকে ওরা নদীতে ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল সেই হা করে থাকা বুভুক্ষু কুমিরগুলোর আনন্দভোজ।

কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটল।

তারপর দেবীর কাছে অনেক প্রার্থনার পর দলের লোকেরা সেই মৃত জংলিটাকেও ছুড়ে দিল ক্ষুধার্ত কুমিরের গ্রাসে।

আবার দামামা বাজল।

দেবীর সামনে জ্বলে উঠল অগ্নিকুণ্ড।

আবার শুরু হল নাচ।

লকলকে আগুনের লেলিহান শিখায় দেবীর রাক্ষসী মূর্তি ঝকমক করে উঠল। নাচগান শেষ হলে একজন ঝোড়া বোঝাই করে হাতে গড়া মাটির প্রদীপ এনে ঢালতে লাগল সেখানে। কয়েকজন সেই প্রদীপ সাজাতে বসল। আর বাদবাকিরা কলার মান্দাসে গাছের ছালে সেই প্রদীপ সাজিয়ে পলতের মুখ জ্বেলে ভাসিয়ে দিতে লাগল নদীর জলে। যেখানে স্রোতের বেগ একটু কম, সেখানে স্রোতের টানে প্রদীপগুলো খাদের দিকে না-পড়ে কয়েকটি গুহামুখের ভেতর দিয়ে ভেসে যেতে লাগল।

তিড্ডিমের এই আলোকিত সন্ধ্যা মনোরম হয়ে উঠল। কী অপূর্ব সেই দৃশ্য। সে দৃশ্য ভোলা যায় না।

প্রদীপ ভাসানো শেষ হলে শিঙা ফুঁকে সর্দারকে বসানো হল একটা পালকিতে।

কয়েকজন পালকি নিয়ে ঝোপড়িগুলোর পিছনদিক দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। বোধহয় শাতকর্ণি গুহায় সাতবাহন রাজার গুপ্তধনের আরতি করতে গেল।

বাহাদুর আর আমি অবাক হয়ে সব দেখলাম।

বাহাদুর বলল, এবার নামবেন তো বাবু?

এখন কী? ওরা ফিরে আসুক। রাত বাড়ুক। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তবে তো। আমরা আজই পালাতে পারব। কী বলুন? আর ভাল লাগছে না এখানে। ভাল কি আমারও লাগছে? তবু দেখিই না কী আছে কপালে।

আমি কিন্তু এখন পালাবার কথা নয়, অন্য কথা ভাবছি। সেই সাংকেতিক ধাঁধাটার কথা। ভেবে ভেবে কোনও কূলই পেলাম না। ভাবনার জটগুলো পাকিয়ে মাথাটাই শুধু ঝিম ঝিম করতে লাগল।

এখন কত রাত তা জানি না।

জংলিরা একটু আগেই ফিরে এসে শুয়ে পড়েছে যে যার ঘরে। বাহাদুর আর আমি আস্তে আস্তে নেমে এলাম গাছ থেকে। চারদিক নিঝুম।

আট

আমরা ধীর পায়ে গুহামুখের কাছে এলাম।

টর্চের আলোয় পথ দেখে গুহামুখের সামনে সেই পাঁচিলের মতো খাড়াই পাথরটার কাছে গেলাম।

এইখান দিয়ে বারবার এই বাধা অতিক্রম করে জংলিটা যে কী করে যাতায়াত করছে তা ভেবে পেলাম না। নাকি অন্য কোনও পথ আছে?

এদিক ওদিক দেখতে দেখতেই খাড়াইটার গা দিয়ে সরুমতো একটি প্যাসেজ নজরে পড়ল। প্যাসেজটা এত ছোট যে তা নজরে পড়বার নয়। বড় জোর একজন লোক তার ভেতর দিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি দু'জন নয়। বাহাদুরকে নিয়ে আমি আগুপিছু হয়ে সেটায় প্রবেশ করলাম। এবং খাড়াইটার পাশে পৌঁছে গেলাম।

এইখান দিয়েই আমরা খাড়াই ডিঙিয়ে এখানে এসেছিলাম। যাই হোক, পথটা জেনে আবার আমরা খাড়াইয়ের ওপাশে চলে গেলাম। কেন না যে পথে পালকি চেপে জংলিদের সর্দারকে আমরা যেতে দেখলাম, সে পথটা আমাদের অতি অবশ্যই একবার জেনে রাখা দরকার।

ঝোপড়ির পিছনদিক দিয়ে পথ। আমরা সেই পথে গেলাম।

যেতে যেতে এক জায়গায় দেখলাম পাথরের ছাদের নীচে মস্ত একটি গোশালা। গোরু ভরতি গোশালাটা মোটা মোটা শাল কাঠের খুঁটি দিয়ে ঘেরা। তারই একপাশে পালকিটা পড়ে আছে।

গোশালার বাঁদিকে একটি পাথরের দেওয়ালে মস্ত দরজা। দরজার আংটায় দড়ি বাঁধা।

খুব সাবধানে দড়িটা খুলে আমরা ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ঢুকেই সিঁড়ি পেলাম নীচে নামার।

সিঁড়ি বেয়ে আস্তে আস্তে নীচে নামতে লাগলাম দু'জনে। কয়েক ধাপ নামতেই দেখলাম দালান মতো একটা অংশ।

বাহাদুর চমকে উঠে বলল, আরে! এ তো সেই জায়গা!

সেই জায়গা মানে?

যেখানে জংলিরা আমাদের বন্দি করে রেখেছিল।

যাক এ পথটা চেনা হয়ে গেল।

আমরা সেই জায়গা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেদিকে সেই সর্বনাশা পাখিটা আছে সেদিকের বারান্দায় গেলাম।

তারপর পাখিটার নজর এড়িয়ে পা টিপে টিপে বারান্দা পার হতেই আবার সিঁড়ি। ওই তো রামদুলালবাবুর ঘর।

রামদুলালবাবু তখন নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাচ্ছিলেন।

ঘরে গিয়ে বাহাদুর আর আমি ঝুঁকে পড়ে রামদুলালবাবুকে একবার ডাকতে গিয়েও থেমে গেলাম।

থাক। দরকার নেই। মাথাপাগলা লোক। বোঝালে হয়তো বুঝবে না। যদি চেঁচিয়েমেচিয়ে ওঠে?

তার চেয়ে নিজেরাই একবার চেষ্টা করে দেখি।

তাই মানচিত্রের নির্দেশমতো পথে এগিয়ে চললাম।

ওই তো মাথার ওপর নীল আকাশ। এই তো সেই পাঁচিলের খাড়াই। পথ শেষ। কিন্তু গুপ্তধন? গুপ্তধন কোথায়?

অথচ গুপ্তধনের নির্দেশ এইখানেই দেওয়া আছে। ভাবতে গেলেও মাথাটা যেন ঘুলিয়ে যায়।

বাহাদুর বলল, কেন আর আলেয়ার পিছনে ছুটতে গিয়ে মিথ্যে দেরি করছেন বাবু? দরকার নেই গুপ্তধনের। এখন ভালয় ভালয় কেটে পড়ি চলুন।

সত্যি কথা বলতে কী, আমাকে তখন গুপ্তধনের নেশায় পেয়ে বসেছে। বললাম, না বাহাদুর। ম্যাপ যখন রয়েছে, তখন পালাবার পথ খুঁজে বার করা আমাদের পক্ষে এমন কিছু কঠিন হবে না। তবুও ভাগ্যচক্রে একবার যখন এসে পড়েছি এখানে, তখন রাজা শাতকর্ণির সেই রত্ন ভাণ্ডার না দেখে যাব না।

সে কি আমারও ইচ্ছে নয় বাবু? যদি পারি তো সঙ্গে করে কিছু নিয়েও যাব। সে পরের কথা। এখন আমাদের যেমন করেই হোক খুঁজে বার করতে হবে গুপ্তধন কোথায় আছে। সংকেত অনুযায়ী গুপ্তধন এখানেই থাকবার কথা। কিন্তু মানচিত্রের ধাঁধা বড় জটিল।

আমি বারবার ধাঁধাটার সমাধানের চেষ্টা করতে লাগলাম। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ জট খুলে গেল। আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।

বাহাদুর বলল, হদিস পেলেন কিছু?

নিশ্চয়ই।

বাহাদুরের মুখও আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যাক। আমাদের এই প্ৰচষ্টা তা হলে বিফলে যাবে না। রাজা হবার বাসনা আমরা রাখি না। শুধু রহস্যের আবরণটা খুলে দেখতে চাই।

আমি ধাঁধাটার যা মানে করলাম, তা হল এইরকম, ‘নীল তারা ঝিকমিক, বিশ গতি ডানদিক।' অর্থাৎ আমাদের মাথার ওপর সেখানে নীল তারা ঝিকমিক করছে তার ডানদিকে বিশ পা যেতে হবে। আমরা পা মেপে সেইভাবেই গেলাম।

সামনেই পাথরের দেওয়াল। পথ নেই।

এবার লেখা আছে ‘রাধা মোড় ছ’ চরণ, সাবধানে হে মরণ।' রাধা মোড়ের মানে বুঝলাম না। তবে অনুমান করলাম রাধা তো কৃষ্ণের বাঁদিকে থাকে। অর্থাৎ এখানকার এই ঘন অন্ধকারকে যদি কৃষ্ণ ধরা হয়, তবে এর বাঁদিকে ছ’ চরণ অর্থাৎ ছয়-পা যেতে হবে।

তাই গেলাম। টর্চের আলোয় পথ দেখে দেখে গেলাম।

তারপর সাবধানে হে মরণ'। এবার সাবধান হতে বলেছ। সত্যিই ছ’-পা যাবার পর আর এক পাও যাবার জায়গা নেই।

গভীর গর্ত। গর্তটা অন্তত দু’ হাত চওড়া।

না জেনে কেউ যদি আচমকা এসে পড়ে এখানে, তা হলেই গুপ্তধন নেওয়া মাথায় উঠে যাবে তার।

বাহাদুরকে দাঁড়াতে বলে আমিই আগে লাফ দিয়ে গর্তটা পার হলাম। তারপর এল বাহাদুর।

ওকে অবশ্য লাফাতে হল না। এক জায়গায় চওড়া মোটা একটা শক্ত কাঠের তক্তা ছিল, সেটা পেতে দিতেই চলে এল সে।

এবার লেখা আছে, ‘শিলাটন খান তিন, অমাবস্যা সারাদিন।'

মিলিয়ে দেখলাম একেবারে অঙ্কের হিসাবের মতো সবই ঠিক ঠিক মিলে যাচ্ছে। ঘন অন্ধকার যেন আরও ঘন, আরও জটিল সেখানে। কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই।

সেইখানে তিনটে আংটাওয়ালা পাথর ছিল। সেগুলো টেনে তুলতেই নীচে নামার সিঁড়ি পেলাম।

এবার ‘একুশে চরণ রেখো, সামনে তাকিয়ে দেখো।' একুশ ধাপের সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমেই সামনে তাকালাম।

দেখলাম একটি প্রকাণ্ড সিংহ দরজায় মস্ত একটি তালা ঝুলছে। পাশেই দেওয়ালে আছে চাবি। সেই চাবি দিয়ে তালা খুলে দরজাটা ফাঁক করতেই সব অন্ধকার যেন দূর হয়ে গেল। দেখলাম প্রকাণ্ড একটি সোনার পিলসুজে মস্ত একটি সোনার প্রদীপ জ্বলছে। আর তার পিছনে রুপোর রেলিং দেওয়া একটি ঘরের মধ্যে মস্ত একটি রত্ন সিংহাসন। সিংহাসনকে বেড় দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে মস্ত একটা সাপ। দেখলে বুক যেন শুকিয়ে যায়।

ঘরের ভেতর শত শত কলসিতে মোহর ভরা।

শুধু তাই নয়। আরও কত যে ধনরত্ন রয়েছে সেখানে, তার আর সীমা নেই। বিশ্বের ঐশ্বর্য যেন একত্রিত হয়েছে এখানে। এরকম ধনভাণ্ডার বোধহয় এর আগে কখনও কোথাও ছিল না। চোখে দেখেও অবিশ্বাস্য বলে মনে হতে লাগল সব। মনে হল যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এক স্বপ্নের জগতে বিচরণ করছি। বড় বড় হিরের টুকরোগুলো ঘরময় এমনভাবে ছড়ানো যে, দেখলে লোভ লাগে। হয়তো এইরকমই কুবেরের ঐশ্বর্য। যেমনি ধনসম্পদ, তেমনি সাপের রাজত্ব সেখানে। ছোট বড় নানা ধরনের সাপ কিলবিল করছে। আমার মনে হল এগুলো সাপের ফণা তো নয়, মৃত্যুরূপী প্রলোভন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমরা মুগ্ধ নেত্রে এবং অপলকে সেই লোভনীয় ধনরাশির দিকে চেয়ে রইলাম।

বাহাদুর বলল, বাবু! এর কিছুও কি আমরা নিয়ে যেতে পারব না? না। কী করে নেবে? এইসব সাপেরা হল মূর্তিমান যখ। এমনকী এই জংলিরাও। তাই এই সম্পদে কেউ হাত দেয় না। যে দিতে যায় সে মরে। একমাত্র রাজা শাতকর্ণি নিজে যদি কখনও নরদেহ নিয়ে পৃথিবীতে আসেন এবং পথ ভুলে তোমার আমার মতো এই গুহায় কখনও যদি ঢুকে পড়েন, তা হলে গুপ্তধন তিনিই শুধু নিতে পারবেন। যখের ধনের এই নিয়ম। তুমি আমি তো সে লোক নই। অতএব এর ওপর আমাদের কোনও অধিকারও নেই।

কে বললে আমরা সে লোক নই। এই তো, আপনিই মহারাজ শাতকর্ণি আর আমি আপনার মহামন্ত্রী। ওই দেখুন আপনার কপালে রাজ চক্রবর্তী তিলক। আসুন এ সবই আমরা লুটে পুটে নিই।

তোমাকেও দেখছি এখন রামদুলালি রোগে ধরেছে। এসো চলে এসো। বলে ওর হাত ধরে টান দিলাম।

বাহাদুর একটুও নড়ল না। দু’হাতে শক্ত করে সেই রেলিংগুলো ধরে দাঁড়িয়ে রইল। আমিও।

আবার অনেকক্ষণ ধরে সেই গুপ্তধনের জৌলুস দেখে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা। আসবার সময় যেমন তালা দেওয়া ছিল, ঠিক সেইভাবে তালা দিয়ে যেভাবে এসেছিলাম সেইভাবেই ফিরে এলাম।

বাহাদুর বলল, এবার কি আমরা ফিরছি?

হ্যাঁ। একবার জল পার হতে পারলে আর কোনও ভয় পাখিটা যদি আবার চেঁচামেচি শুরু করে?

নেই।

করলেই বা। ওর চিৎকার জংলিদের কানে যাবে না। তারা এখন গুহার বাইরে

ঝোপড়িতে আছে। তবে রামদুলালবাবু ছুটে আসতে পারেন। ওকে কবজা করতে এক মিনিটও লাগবে না আমার।

আমরা ফিরে আসতে আসতে রামদুলালবাবুর ঘরের কাছে থমকে দাঁড়ালাম একবার। তারপর আবার সেই বারান্দায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। একপাশে একটি প্রদীপ জ্বলছে।

প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় গুহার সেই ঘন অন্ধকার একটুও দূর হয়নি। আমরা যেতে আমাদের দেখে কর্কশ কণ্ঠে বিকট চিৎকার শুরু করে দিল পাখিটা।

বাহাদুর বলল, ফায়ার। বাবু, এখুনি গুলি করুন ওটাকে। না হলে ওর চিৎকার আমাদের বিপদ ডেকে আনবে।

না। অযথা একটা প্রাণকে নষ্ট করতে চাই না আমি।

বারান্দার একপাশে সেই মোটা শক্ত দড়িটা তখনও ঝুলছে দেখলাম। সেই দড়ি ধরেই নামতে যাচ্ছি এমন সময় রামদুলালবাবু এসে হাজির, এ কী! তোমরা এখানে?

ভয়ে বাহাদুরের মুখ শুকিয়ে গেল। আমি বললাম, বিদায় রামদুলালবাবু। রামদুলালবাবু বিস্মিতভাবে বললেন, তোমরা এখনও বেঁচে আছ? শুধু শুধু মরব কেন? তোমরা তা হলে পালাতে গিয়ে মরনি? না। এই তো দেখছেন দিব্যি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু...। কোনও কিন্তু নয়। এখন বলুন আপনিও আমাদের সঙ্গে যাবেন কি না? রামদুলালবাবু চমকে উঠলেন, না না। আমি যাব না। আমি কোথাও যাব তোমরাও যেয়ো না। গেলেই মরবে।

না।

আমরা মরব না রামদুলালবাবু। দেখছেন তো এখনও পর্যন্ত এদের কবলে থেকেও কেমন অক্ষত শরীরে বঁচে আছি। এরা আমাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি। আমাদের বুদ্ধিই আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

রামদুলালবাবু কী যেন ভাবতে লাগলেন। তারপর বললেন, তোমরা তা হলে সত্যিই পালাতে চাও?

চাই কেন, পালাচ্ছি তো?

গুপ্তধন নিতে তোমরা তা হলে আসনি? না।

তোমরা যে পালাবে, পালাবার পথ জান?

আপনি জানেন?

না। তা হলে তো কবেই পালাতাম।

তার মানে পালাবার ইচ্ছে আপনারও আছে। শুধু উপযুক্ত সঙ্গীর অভাবে পালাতে সাহস করেননি। এই তো?

হ্যাঁ।

আমাদের কাছে ম্যাপ আছে। সেই ম্যাপ দেখে পালাব। কোনওরকমে একবার গুহার বাইরে যেতে পারলেই ব্যস।

কিন্তু ম্যাপের নকশা যদি ভুল হয়? তা হলে কিন্তু অবধারিত মৃত্যু। তা জেনে রেখো। এই গুহার জঠরে জঠরে অতিকায় পাইথনের বাস।

আপনার কোনও ভয় নেই রামদুলালবাবু। আসুন আমাদের সঙ্গে। রামদুলালবাবু এবার সাহস পেয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, বেশ, আমিও যাব। তবে তার আগে...

তার আগে? বলুন তার আগে কী?

কিছু গুপ্তধন আমাদের নিয়ে যেতে হবে।

বাহাদুর বলল, ঠিক বলেছেন। আমারও তাই ইচ্ছে।

আমি বললাম, না ওতে আমাদের কোনও লোভ নেই।

রামদুলালবাবু বললেন, আমার আছে। আমি যে গুপ্তধনের লোভেই এখানে এসেছিলাম।

আমি রামদুলালবাবুকে বুঝিয়ে বললাম, দেখুন গুপ্তধন যে কোথায় কীভাবে আছে তা আমরা দেখে এসেছি। সেই অতুল ধনরাশি আমরা গাড়ি বোঝাই করেও নিয়ে যেতে পারব না। কাজেই কোনও লাভ নেই।

রামদুলালবাবু এবার খেপে উঠলেন, তবে দূর হও তোমরা। যেমন যাচ্ছ তেমনি চলে যাও। আমাকে ডেক না। তোমাদের জমিদারি আছে, দেশে গিয়ে তোমরা তাই ভাগ করবে। কিন্তু আমার কী আছে? আমি কী খাব? আমি কি ভিক্ষে করব? না ডাকাতি করব?

আমি বললাম, কিচ্ছু করতে হবে না আপনাকে। আমি একটা যাত্রাদলে অভিনয় করি। আমাদের অধিকারীকে বলেকয়ে সেই দলেই আমি আপনার একটা কাজ করে দিতে পারব। সে ক্ষমতা আমার আছে। যতদিন না কাজ হয়, ততদিন আপনি আমার কাছেই থাকবেন।

আমার কথায় রামদুলালবাবু আশ্বস্ত হলেন। বললেন, বেশ, তা হলে চলো। তবে যাবার আগে দুটো কাজ আমাদের করতে হবে। কী কাজ?

প্রথম হচ্ছে পাখিটাকে মুক্তি দেওয়া। আর দ্বিতীয় কাজ হল এই গুপ্তধন যাতে কেউ কখনও আবিষ্কার করতে না পারে সেই ব্যবস্থা করে যাওয়া। অর্থাৎ এখানকার সবকিছুই আমি ধ্বংস করে দিতে চাই। যে জিনিস আমরা পেলাম না, তা কাউকে নিতে দেব না।

বাহাদুর আমি পরস্পরের মুখের দিকে তাকালাম।

রামদুলালবাবুর চোখমুখ কেমন যেন নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে।

আমি বললাম, কী করে ধ্বংস করবেন?

বিস্ফোরণ ঘটাব। সব চুরমার করে দেব। ধ্বংস করে দিয়ে যাব এখানকার সবকিছু। অভিশপ্ত তিড্ডিমের সমস্ত অভিশাপের শেষ হয়ে যাবে। আমার মতো জীবনের এই দীর্ঘ বাইশটা বছর কাউকে আর গুহার অন্ধকারে বন্দি হয়ে থাকতে হবে না। কোনও মানুষের অমূল্য জীবন আর কখনও জংলিদের সংস্কারের বলি হয়ে বৃথা নষ্ট হবে না।

সেরকম কিছু কি আছে আপনার কাছে?

আছে।

কী আছে?

ধ্বংসের বারুদ। এসো, দেখবে এসো।

আমরা রামদুলালবাবুকে অনুসরণ করলাম। এ অবশ্য মন্দ নয়। এখানকার সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাক, সেটা যে একান্তভাবে আমরাও চাই।

আমরা রামদুলালবাবুর সঙ্গে অন্যত্র ফিরে গেলাম। রামদুলালবাবুকে যে, দলে টানতে পেরেছি এতে আমাদের মনোবল বেড়ে গেছে খুব। মনকে তবু তো বোঝাতে পারব অভিশপ্ত তিড্ডিমে গিয়ে আর কিছু হোক, বা না হোক তার অভিশাপের কবল থেকে একটা মানুষকেও আমরা ফিরিয়ে আনতে পেরেছি।

রামদুলালবাবু গুহার অন্ধকার কোণ থেকে কী যেন একটা বাঁধা অবস্থায় নিয়ে এলেন। কাছে আনতে বাহাদুর আমি অবাক হয়ে বললাম, কী এটা? -

ধ্বংসের বারুদ। খুলে দেখো।

আমরা সব দেখে চমকে উঠলাম, আরে! এ কোথায় পেলেন?

সংগ্রহ করেছি।

সে তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কী করে?

কিছুদিন আগে জনা চারেক লোক এখানে এসেছিল। জংলিরা তাদের প্রত্যেককে হত্যা করেছে। এসব তাদেরই। আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম। শুধু ফিটিং করতে জানি না বলে কাজে লাগাতে পারিনি। আর বেরোবার পথ জানি না বলে, পালাতেও সাহস করিনি। পারবে তোমরা এগুলো দিয়ে এখানকার সবকিছুকে লণ্ডভণ্ড করে দিতে?

আমি বললাম, পারতেই হবে।

বাহাদুরও এতক্ষণ অবাক হয়ে দেখছিল। বলল, এ তো খুব হেভি ওয়েটের ডিনামাইট দেখছি।

হ্যা। তারে তারে জুড়ে দিয়ে পলতের মুখে শুধু একটু আগুন ছুঁইয়ে দেবার অপেক্ষা। পারবে? সাহস আছে?

বাহাদুর বলল, কী যে বলেন। সাত বছর মিলিটারিতে চাকরি করেছি। তবে এগুলোকে ফিটিং করতে সময় লাগবে একটু।

লাগুক। এখন আমি তো তোমাদের সহায়। আর ভয় কী?

আমিও পিস্তলটা উঁচিয়ে ধরে বললাম, আপনি তো সহায় রইলেনই। তবুও বাধা যদি কিছু আসে তখন এটা তো সঙ্গে আছেই।

নয়

বাহাদুর ততক্ষণে তার খুলে বসে পড়েছে ডিনামাইট ফিট করতে।

আমি বললাম, প্রথমেই আমাদের নদীর গতিপথ যেখানে পাথরের খাঁজ বেয়ে নীচে পড়ছে, সেই জায়গাটাকে ধসিয়ে দিতে হবে। তা হলে ফাকটা বড় হলেই ভেতরের জল হুড়হুড় করে কমে যাবে। আর ফাঁক বড় হলে পাখিটাও মুক্তি পাবে এই বন্দি দশা থেকে।

রামদুলালবাবু বললেন, জল কমে গেলে আমরাও দিব্যি এখানটা পার হয়ে গুহার সুড়ঙ্গে ঢুকতে পারব।

বাহাদুর ততক্ষণে বেশ খানিকটা তার জুড়ে ফেলেছে।

আমি বললাম, বাহাদুর, তুমি তোমার কাজ করো। আমি খাঁজগুলোর কাছে যাই। কোনখানে কীভাবে কী করবে তা দেখে রাখি।

রামদুলালবাবু বললেন, আমিও যাব সঙ্গে।

আসুন।

আমরা বারান্দার কাছে যেতেই পাখিটা আবার চেঁচাতে লাগল। রামদুলালবাবু মুখ দিয়ে একরকম বিচিত্র শব্দ বার করে চুপ করালেন পাখিটাকে। তবে একবারে যে চুপ করে গেল তা নয়। খুব মৃদু স্বরে কি কি কি কি শব্দ করে একবার এ দেওয়াল, একবার ও দেওয়াল করে বসতে লাগল পাখিটা।

আমি বারান্দার দড়ি ধরে নেমে পড়লাম নীচে। কী বিদঘুটে অন্ধকার। ওপরে যে প্রদীপ জ্বলছে তার ছিটেফোঁটা আলোকপাতও নীচে হচ্ছে না। তাই নেমেই টর্চ জ্বাললাম।

জলস্রোত ধীর ও গম্ভীর মেজাজে বয়ে চলেছে। তোড় না-থাকলেও, টান আছে বেশ।

রামদুলালবাবু ওপর থেকে বললেন, যদি অসুবিধে হয় তা হলে একটা মশাল জ্বেলে দিই?

ভেবে দেখলাম টর্চের চেয়েও মশালের আলো একটু জোরালো হবে। বললাম, তাই দিন। পারেন তো আপনিও নীচে আসুন।

একটু পরেই মশাল হাতে নেমে এলেন রামদুলালবাবু।

দু’-তিনটে বড় বড় পাথরের গা বেয়ে জলটা ঢুকে যাচ্ছে আরও ভেতর দিকে। আমরা দু'জনে প্রায় এক হাঁটু জল ভেঙে ভেতর দিকে ঢুকে গেলাম। ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম গুহামুখ সরু হয়ে গেছে। আর সাত-আটটি বড় বড় পাথরের ফাঁক দিয়ে জলস্রোত বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। পাথরগুলোর অবস্থান দেখে মনে হল এগুলো এই গুহার ভো আপনা থেকেই জড়ো হয়নি। এগুলো খুব যত্ন সহকারে এখানে নিয়ে এসে, এর সাহায্যে বাইরে যাবার এবং ভেতরে ঢোকার পথ বন্ধ করা হয়েছে। তলাকার ফাঁক দিয়ে জল বেরিয়ে যাচ্ছে এবং ওপরের ফাঁক পাথর দিয়ে বোজানো আছে। ওপরের ফাঁক যদিও শাবলের ঘা মেরে ধসানো যায়, নীচের ফাঁক বড় করতে গেলে ডিনামাইটের একান্ত প্রয়োজন। রামদুলালবাবু বললেন, কী ভাবছেন?

ভাবছি একটা শাবল পেলে হত।

তার জন্য কী? সব আছে এখানে। আনছি।

তাড়াতাড়ি যান।

তাড়াতাড়ির প্রয়োজন নেই। যা হবে সব ধীরেসুস্থে। কেন না সকাল না হলে

আমরা গুহার বাইরে গিয়েও এই দুর্ভেদ্য জঙ্গল পার হতে পারব না। তা অবশ্য পারব না। জংলিদের হাত থেকে পরিত্রাণ পেলেও বাঘের হাতে মরতে হবে।

আমি বসে রইলাম। রামদুলালবাবু চলে গেলেন। একটার জায়গায় দুটো শাবল নিয়ে ফিরে এলেন রামদুলালবাবু।

মশালটা এক জায়গায় কায়দামাফিক রেখে শুরু করলাম আমাদের কাজ।

শাবলের ঘা পড়তেই ঝর ঝর করে ঝরতে লাগল সব। ছোট বড় পাথর নোনা ধরা দেওয়ালের মতো ধসতে লাগল। তারপর ফাঁক হল একটু। এইভাবে অনেকগুলো ফাঁক হল। সেইসব ফাঁকের মাঝামাঝি জায়গায় ডিনামাইট বসিয়ে দিয়ে পলতেয় আগুন দিলেই একেবারে নীচ থেকে ওপর পর্যন্ত সব কিছু উড়ে গিয়ে একদিকের দেওয়াল আর ছাদ বেরিয়ে যাবে।

ফাঁকের ভেতর দিয়ে ফুরফুর করে হাওয়া ঢুকছে। এদিকে ওপরের মাটি-পাথর চাপা পড়ে নীচের অনেকগুলো ফাঁকের মুখ বুজে যাওয়ায় জলনিকাশেও দারুণ বাধা পাচ্ছে। সুতরাং জমা জল ফুলতে লাগল একটু একটু করে।

রামদুলালবাবু বললেন, সেরেছে। এ যে দেখি কাছা দিতে গিয়ে কেঁাঁচা খুলে যায়।

আমিও চিন্তায় পড়লাম। কেন না জল বেড়ে গেলে সব চাল ভেস্তে যাবে। আর সপ্ত নদীর গতিপথ যেখানে একই মুখে বের হচ্ছে, সেখানে জল জমে যেতে খুব একটা সময়ও লাগবে না। আর জল জমে গেলে ডিনামাইট ফিট করা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। রামদুলালবাবুকে বললাম, আপনি এক্ষুনি চলে যান। বাহাদুরকে তাড়া দিন। আমি ততক্ষণে নীচের ফাঁকগুলো একটু পরিষ্কার করবার চেষ্টা করি।

রামদুলালবাবু চলে গেলেন।

আমি প্রাণপণে শাবলের খোঁচা দিয়ে সেই মুখগুলো পরিষ্কার করতে লাগলাম। দিনের বেলা হলে কষ্ট হত না। রাত্রি বলেই অসুবিধে। দেখতে দেখতে দু’ দুটো রাত শেষ হতে চলল। আর কত কষ্ট যে তোলা আছে আমাদের তা ভগবানই জানেন।

এমন সময় হঠাৎ মনে হল আমি শূন্যে উঠে যাচ্ছি। নরম থলথলে শুঁড়ের মতো কী যেন একটা আমাকে জড়িয়ে ধরে শূন্যে তুলে নিল। দেখলাম জলের ভেতর থেকে অক্টোপাশের মতো কী যেন একটা আমাকে পাকিয়ে ধরেছে। আমি চিৎকার করে উঠলাম।

পাখিটা দেওয়ালের গায়ে এক জায়গায় বসেছিল। হঠাৎ বাজের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সেটার ওপর। তারপর চলল টানাটানি। আমি এমন বেকায়দায় পড়লাম যে, তা বলবার নয়। এদিকে আমার চিৎকারে বাহাদুর ও রামদুলালবাবুও ছুটে এসেছে তখন। আমি সভয়ে দেখলাম ওটা অক্টোপাস নয়, অনেকটা মাকড়সার মতো দেখতে একটা জীবকে পাখিটা তখন নখে করে টেনে জল থেকে তুলছে। পাখিটার আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়েই সেটা আর আমাকে খুব বেশি কষ্ট দিতে পারল না। তার বাকি শুঁড়গুলো দিয়ে আলিঙ্গন করল অযাচিত শত্রু সেই পাখিটাকেই।

রামদুলালবাবু বারান্দায় ঝোলানো দড়ির একপ্রান্ত আমার দিকে ছুড়ে দিলেন। আমি সেটা ধরে শুঁড়বদ্ধ অবস্থায় নিজেকে টেনে বারান্দার কাছে আনতেই বাহাদুর ছুরি দিয়ে শুঁড়টা কেটে আমাকে মুক্ত করল। আমি বাঁচলাম।

এদিকে সেই অতিকায় পাখিটার সঙ্গে জলজ মাকড়সার তখন পুরোমাত্রায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সেটা তার সব ক'টি শুঁড় দিয়ে পাখিটাকে বেষ্টন করে ঝুলছে। তার মাঝের অংশটা একবার স্ফীত, একবার সংকুচিত হচ্ছে। যেন অতিকায় গোলালো কচ্ছপ একটা। গায়ে কালো ভেলভেটের মতো রোঁয়া। পাখিটা ঠোটে করে সেটাকে ছেঁড়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। শুঁড়গুলো দিয়ে পাখিটার গলা এমনভাবে সে জড়িয়ে রেখেছে যে, পাখিটা একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েছে।

আমি আর বিলম্ব করলাম না। পিস্তলটা উঁচিয়ে ধরলাম। এই প্রথম আমার পিস্তল গর্জে উঠল। জলজ সেই মাকড়সার মাঝের অংশটা চুরমার হয়ে গেল। সেই সঙ্গে পাখিটাও রক্তাক্ত কলেবরে ঝপাস করে পড়ে গেল জলের ওপর। গুলিটা সেটাকে ভেদ করে পাখিকে আঘাত করেছে। রক্তে লাল হয়ে উঠল জল। জলের স্রোতে চাপ চাপ রক্ত ভেসে চলল কুলকুল করে। এদিকে জল তখন অনেক বেড়ে গেছে।

আমি বললাম, আর দেরি নয় বাহাদুর। তুমি তৈরি তো?

হ্যাঁ।

জল তখন হাঁটু পেরিয়ে কোমরে উঠেছে। বাহাদুর মাথায় অসম্ভব বেঁটে। তাই বাহাদুরকে আমি কাঁধে নিয়ে ফাঁকগুলোর কাছে গেলাম। যেখানে যেটা বসাবার বাহাদুর তা বসিয়ে দিল। অত্যন্ত পাকা লোক। কত সহজে যে কাজ করে ফেলল তা ভাবলেও অবাক হতে হয়।

মশালটা যেমন জ্বলছিল, তেমনি জ্বলতে লাগল।

আমি তবু টর্চের আলো ফেলে বাহাদুরকে সাহায্য করতে লাগলাম। কাজ শেষ হলে বাহাদুর বলল, ঠিক আছে। এবার আপনি আমাকে বারান্দায় পৌঁছে দিয়ে পলতেয় আগুন দিয়ে পালিয়ে আসুন।

আমি আগে বাহাদুরকে পৌঁছে দিলাম বারান্দায়। সে দড়ি ধরে ওপরে উঠে গেল। আর আমি মশালের আগুনে পলতের মুখ ধরিয়ে দিয়েই পালিয়ে এলাম। পলতেটা পুড়তে পাঁচ মিনিট সময় নেবে। তারপর এক এক করে সাত-সাতটা ডিনামাইট ফেটে উঠবে ভয়ংকর বিপর্যয় ঘটিয়ে। কিন্তু যার জন্য এত কাণ্ড সেই পাখিটাকে তো আর বাঁচানো যাবে না। না যাক। আমরা নিজেদের পালাবার পথটাই পরিষ্কার করি। পলতেটা ধরিয়ে দড়ি বেয়ে তাড়াতাড়ি বারান্দায় উঠে এলাম আমি। তারপর কোনওদিকে না তাকিয়ে তিনজনেই রামদুলালবাবুর ঘরের দিকে দৌড়লাম।

বাহাদুর বলল, কানে আঙুল দিন।

আমরা তিনজনেই কানে আঙুল দিলাম। সামান্য কিছু সময়। তারপরই বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের পর ছুটে গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখলাম একটা দিক একদম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বাইরে নীল আকাশ চাঁদ তারা সবকিছুই দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ছায়া ছায়া পাহাড়ের কায়া। সেই জলজ মাকড়সা আর পাখিটা জলের তোড়ে কখন ভেসে গেছে। সেই জলরাশিও তখন হুড়হুড় করে প্রপাতের মতো ঝরে পড়ছে নীচের দিকে। জল কমে একেবারে চেটোয় এসে ঠেকল।

রামদুলালবাবু বললেন, এতদিনে একটা কাজের কাজ হল।

আমি বললাম, হ্যাঁ। এইবার আসল কাজটা বাকি। আর দেরি নয়। পা চালান। তাড়াতাড়ি।

আমরা দ্রুত চললাম। কিন্তু বেশিদূর যেতে হল না। যেখানে সেই ‘নীল তারা ঝিকমিক’ অর্থাৎ গুহাটা শেষ হচ্ছে সেখানে যেতেই বুকটা ধড়াস করে উঠল। বিপদের পর বিপদ। আর এক বিপদ।

বাহাদুর আর্তকণ্ঠে বলল, ফায়ার।

কিন্তু গুলি করব,—না রামদুলালবাবুকে সামলাব? সেদিকে তাকিয়েই রামদুলালবাবু অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

দশ

আমরা দেখলাম আমাদের চোখের সামনে গুহাটা যেখানে শেষ হয়েছে এবং সামনেই পাঁচিলের খাড়াই ঠিক সেইখানে কে যেন একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীরের অর্ধাংশ দেখা যাচ্ছে না। বাকিটা দেখা যাচ্ছে।

তাকে যে কী বলব তা ভেবে পেলাম না। সেটা না দৈত্য, না দানব, না অন্য কিছু। শুধু এক অতিকায় নবরূপী ভয়ংকর। এক কথায় অবশ্য তাকে নর-দানব বলা যেতে পারে।

খুব কম করেও বারো থেকে পনেরো ফুট উঁচু তার দেহ। গায়ে ঘন লোম। বনমানুষের মতো। কিন্তু জন্তু নয়। তবে দেখে মনে হল গরিলার চেয়েও সাংঘাতিক।

সেখানে দাঁড়িয়ে গুহার দিকে তাকিয়ে যেন ওত পেতে আছে সে। আমাদের দেখেই সেটা চোখের পলকে সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

বাহাদুর বলল, কী সাংঘাতিক।

আমরা প্রায় অচৈতন্য রামদুলালবাবুকে ধরাধরি করে তাঁর ঘরে নিয়ে এলাম। তারপর অনেকক্ষণ ধরে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতেই জ্ঞান ফিরে এল রামদুলালবাবুর। জ্ঞান ফিরতেই রামদুলালবাবু প্রথম কথা বললেন, সেটা গেছে? আমি বললাম, সেটা যাক বা না-যাক তাতে আমাদের কিছুই আসে যায় না। এখন বলুন আপনি সুস্থ কি না?

হ্যাঁ। আমি সুস্থ।

বাহাদুরকে বললাম, বাহাদুর, আর দেরি নয়। এবার চলো ওই রত্নভাণ্ডারটাকে ধ্বংস করে দিয়ে আসি।

রামদুলালবাবু বললেন, আমিও যাব। আমাকেও সঙ্গে নাও। তোমরা দু'জনে যেয়ো না।

আমরা ধ্বংসের বারুদ নিয়ে ধ্বংস করতে চললাম।

যখন আবার সেই পাঁচিলের খাড়াইয়ের কাছে এসেছি, বাইরে তখন প্রচণ্ড হট্টগোল। চারদিক আলোয় আলো।

জেগে উঠেছে জংলিরা। হই হই করছে সব।

সেই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে প্রাণান্তকর চিৎকার আর আর্তনাদ।

অভিশপ্ত তিড্ডিমে মূর্তিমান বিভীষিকা যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে। সে এক ভয়াবহ ব্যাপার। তবে কি ওরা টের পেয়েছে? ওরা কি জানতে পেরেছে, যে আমরাই এই ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছি?

বাহাদুর বলল, একবার দেখব বাবু উঁকি মেরে?

আমি বাধা দিলাম, কী দরকার? এখন তাড়াতাড়ির সময়। চলো গুপ্তধনের ঘরে যাই।

যদি ওরা সতর্ক হয়ে গিয়ে থাকে?

তবুও যাব। তবে ওদের কোলাহল শুনে মনে হচ্ছে ওরা অন্য কোনও ব্যাপারে দাপাদাপি করছে। আর যদি ওরা জেনেও গিয়ে থাকে, তবুও আমাদের বাঁচার পক্ষে ওই জায়গাটাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ। শুধু ওদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য নয়, ওই নর-দানবের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্যও বটে। ওটা আর যাই করুক এখানকার পথ খুঁজে ওই জায়গায় কিছুতেই পৌঁছতে পারবে না।

বাহাদুর বলল, তা হলে চলুন।

রামদুলালবাবু একটা মশাল ধরিয়ে আগে আগে চললেন। আমরা চললাম পিছনে। যেতে যেতে রামদুলালবাবু বললেন, আমি এখানে এতদিন আছি কিন্তু ওইরকম বিভীষিকার মুখোমুখি কখনও হইনি। ওরকম জীব দেখা তো দূরের কথা, অমন যে হতে পারে বা আছে, তা ধারণাতেও ছিল না।

আমি বললাম, হিমালয়ের তুষারমানবের কথা শুনেছি বটে। খবরের কাগজে পড়েছি পাহাড়ের উচ্চস্থানে বরফের ওপর মাঝে মাঝে তাদের অতিকায় পায়ের ছাপও নাকি দেখা যায়।

বাহাদুর বলল, তা যদি হয়, তা হলে তুষারমানব তো বরফের দেশে থাকবে। এখানে কেন? এখানে তো বরফ নেই?

কে জানে? তবে আমার মনে হয় এটাও ওইরকমই জীব। এরাই যখন বরফের ওপর দিয়ে চলে, তখন এদেরই পায়ের ছাপ দেখে আমরা চমকে উঠি। বরফের ওপর দিয়ে চলবার সময় ঝুরঝুরে বরফে এদের সর্বাঙ্গ ঢাকা পড়ে যায়। তখন এদের দেখলে মনে হবে একটা বরফের তৈরি মানুষই যেন বরফের দেশে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে।

কিন্তু ওটা এখানে কী করে এল?

কাছাকাছিই ছিল হয়তো। ডিনামাইটের শব্দে ভয় পেয়ে চলে এসেছে। কিন্তু বরফের মানুষ এই রুক্ষ প্রান্তরে কী করে আসবে?

ওটা যে কী তাই তো আদৌ জানি না। ওর সম্বন্ধে যা কিছু আলোচনা করলাম, সবই কল্পনার ওপর নির্ভর করে।

কথা বলতে বলতেই আমরা যথাস্থানে পৌঁছে গেলাম।

তারপর পাথর সরিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে, সিংহ দরজার তালা খুলে ফেললাম। আলোয় ভরে আছে ঘর। কী অপরূপ ছটা চারদিকে। সোনার পিলসুজে সোনার প্রদীপ জ্বলছে। আর রেলিংঘেরা ঘরের ভেতর বাস করছে বিষধর সাপেরা। কত ধনরত্ন থরে থরে সাজানো আছে সেখানে।

রামদুলালবাবু বললেন, এর কিছুও যদি পেতাম।

আমি বললাম, লোভ করবেন না রামদুলালবাবু। যা আমাদের নয়, তা পাবার চেষ্টা করবেন না।

বাহাদুর ততক্ষণে সেই তারে বাঁধা ডিনামাইট রেলিংঘেরা ঘরের মধ্যে ঢোকাতে শুরু করেছে। রেলিং-এর ফাঁকে ফাঁকে তার জড়িয়ে জোড়ের মুখে ডিনামাইট ফিট করে ওপরে উঠে এল।

তারপর একেবারে শেষপ্রান্তে চলে এসে শেষমাথাতেও একটি ডিনামাইট ফিট করে পলতেটা একটু লম্বা করে রাখল।

অনেকটা তার ছিল। তাই গুহামুখে সেই পাঁচিলের মতো খাড়াইটা যেখানে ছিল, সেখান পর্যন্ত চলে এল তারটা।

হাতের কাছেই রইল সবকিছু। এখন সময়মতো পলতের মুখে আগুনটা ছুঁইয়ে দিতে পারলেই সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে।

বাইরে তখন প্রচণ্ড কোলাহল। সেই সঙ্গে লকলকে আগুনের হলকা ছুটছে চারদিকে।

আগুনের লেলিহান শিখায় চারদিকে লালে লাল। দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। যেন কোনও বহ্ন্যুৎসব শুরু হয়ে গেছে এই তিড্ডিমের পাহাড়ে।

জ্বলছে আগুন। আর সেই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে গোঁ গোঁ শব্দ।

জংলিরা চিৎকার করছে।

পোড়া গন্ধে, কোলাহলে, চিৎকারে আর অগ্নিশিখার আলোয় শেষরাতের অন্ধকার যেন সংহার মূর্তি ধারণ করছে তখন।

আমরা সবে পলতের মুখে আগুনটা দিতে যাচ্ছি, এমন সময় দেখি গুহার ভেতর দিক থেকে হুড়হুড় করে একদল জংলি ছুটতে ছুটতে আসছে।

কাজেই আগুন আর দেওয়া হল না। চকিতে আমরা তিনজনে অন্ধকারে দেওয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে সরে দাঁড়ালাম।

জংলিদের হাতে মশালের আগুন।

তারা সেই মশাল হাতে নিয়ে কাচ্চাবাচ্চা সমেত হই হই করতে করতে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসছে।

আমরা নিশ্বাস বন্ধ করে এমনভাবে লুকিয়ে রইলাম যে, ওরা আমাদের অস্তিত্বও টের পেল না।

আস ওরা তখন প্রাণভয়ে ভীত।

পাঁচিলের খাড়াইয়ের পথে বাধা পেয়ে বিপরীত দিকের পথ ধরে আসছে। প্রত্যেকেই দেখলাম নিরস্ত্র। তার মানে, হয় তারা অস্ত্র নেবার সময় পায়নি, নয়তো সেই ভয়ংকরের মুখোমুখি হতে গিয়ে সব কিছুই খুইয়ে বসে আছে। ওরা সকলেই গুপ্তকক্ষের দিকে চলেছে। একদল ঢুকে যেতেই দেখি আর একদল আসছে।

সে দলটা ঢুকে যেতেই দেখা গেল সর্দার এবং তার দুই অনুচরকে।

সর্দারও এখন পালকি চেপে নয়, আসছে ছুটতে ছুটতে। প্রাণের দায়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে। আর ওদের ঠিক পিছনেই তাড়া করে আসছে সেই ভয়ংকর দানবের মতন না-মানুষ না-জন্তুটা।

বাহাদুর চেঁচিয়ে উঠল, ফায়ার।

আমরা তিনজনেই এবার ছুটে গেলাম দেওয়ালের পাশ থেকে সেই পাঁচিলের খাড়াইয়ের দিকে।

সর্দার আমাদের দেখেই চমকে উঠল। শুধু চমকে ওঠা নয়, তার তখনকার সেই মুখের অবস্থা অবর্ণনীয়।

রামদুলালবাবু বললেন, ভয় নেই সর্দার। আমরা এদের ভুল বুঝেছিলাম। আসলে এরা আমাদের বন্ধু। আমাদের কোনও ক্ষতি করবে না। ততক্ষণে আমার পিস্তল গর্জে উঠেছে।

গুহা কাঁপিয়ে সেই নর-দানবের বুকে লেগেছে গুলি। গুলি খেয়েই এক অমানবিক চিৎকারে এবং প্রচণ্ড আর্তনাদে মুখর করে তুলল চারদিক। সে কী ভয়ংকর ডাক ছাড়তে লাগল এক একটা।

সর্দার তখন সাহস পেয়ে ছুটে এল আমাদের কাছে। কিন্তু সর্দারের সঙ্গী দু’জন এদিকে না-এসে দারুণ ভয় পেয়ে ছুটে ঢুকে গেল রত্নভাণ্ডারের দিকে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে আড়াল থেকেই জন্তুটার পিছনদিক লক্ষ্য করে আর একটা গুলি ছুড়লাম৷ অমন বিশাল শরীর যেখানে, সেখানে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার কোনও ব্যাপারই নেই। তাই অব্যর্থ লক্ষ্যভেদে গুলি গিয়ে লাগল তার পিঠে। লাগা মাত্রই আবার একটা হাঁফ ছেড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সে।

এতক্ষণে আমরা আত্মপ্রকাশ করলাম।

সর্দার আনন্দে রামদুলালবাবুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর এগিয়ে এল আমার দিকে।

রামদুলালবাবু ওদের ভাষায় সর্দারকে বুঝিয়ে বললেন, এরা আমাদের বন্ধু। এরা গুপ্তধন নেবে না। গুপ্তধন নিতে এরা আসেনি। সত্যি সত্যিই ভুল করে গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। এবং সেইজন্যই দেবী নাগেশ্বরীও বিপদে এদের রক্ষা করেছেন।

সর্দার খুশি হয়ে কী যেন বলল।

রামদুলালবাবু বললেন, সর্দার খুশি হয়েছেন তোমাদের ওপর। তোমরা সর্দারের প্রাণ বাঁচিয়েছ। সেজন্যে সর্দার তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তোমরা মুক্তি পাবে।

আমরা সেই নর-দানবটার কাছে এগিয়ে গেলাম। সেটা তখনও যন্ত্রণায় চিৎকার করছে আর হাত-পা ছুড়ছে। তার সে কষ্ট দেখা যায় না। তাই তার সমস্ত কষ্টের অবসান ঘটাতে আমি তার বুকের বাঁদিক লক্ষ্য করে আর একটা গুলি করলাম।

গুলি খেয়ে সেটা যেন তার আর্তনাদের মাত্রা আরও একটু বাড়িয়ে তুলল। এদিকে গুলির শব্দে জংলিদের মধ্য থেকে মানে যারা গুপ্তকক্ষে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের দু’–একজন করল কী, ব্যাপারটা কী হচ্ছে দেখবার জন্য বেরিয়ে এল।

আমাদের সঙ্গে সর্দারকে দেখেই সাহস যেন বেড়ে গেল তাদের।

পথের ধারে একদিকে আমরা। অপরদিকে জংলিরা।

মধ্যে সেই অতিমানব, নর-দানব বা জন্তুটা।

সেটা অর্তনাদ করে হাত-পা ছুড়ে তার যন্ত্রণার প্রকাশ করতে লাগল। যখন সেটা একেবারেই নিস্তেজ হয়ে স্থির হয়ে গেল, তখন ওদিক থেকে জংলিদের একজন জন্তুটার বুকের ওপর এসে দাঁড়াল।

তারপর একেবারেই মরে গেছে কি না দেখবার জন্য একটা মশাল নিয়ে সেটার মুখে একটু ছুইয়ে দিতে আর একবার নড়ে উঠল সেটা।

যেই না নড়ে ওঠা, অমনি হাতের মশাল ফেলে দারুণ ভয় পেয়ে এক লাফ দিল জংলিটা। তারপর আবার ভেতর দিকে ছুটে গেল। ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে।

প্রচণ্ড ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল বাহাদুর, বাবু! সর্বনাশ হয়েছে। শিগগির পালিয়ে চলুন।

কী হয়েছে রে?

ওই দেখুন পলতেয় আগুন ধরে গেছে।

সে কী!

ওই— ওই— দেখুন।

দেখলাম জংলিটার হাত থেকে মশালটা ছিটকে পড়ে পলতেয় আগুন ধরে গেছে।

তখন এমনই অবস্থা যে আর কোনও উপায় নেই, সেই ভয়াবহ ধ্বংসলীলার হাত থেকে শাতকর্ণি গুহার গুপ্তকক্ষে আশ্রিত অতগুলো জীবনকে রক্ষা করবার।

আগুন তখন ডিনামাইট ছুঁই ছুঁই করছে। বাহাদুর বলল, আর কেন? এবার নিজেদের প্রাণ বাঁচান। শিগগির চলে এসো সর্দার। না হলে সবাই মরব।

সর্দারও বোধহয় বুঝতে পারল ব্যাপারটা। কাজেই আর একটুও দেরি না করে আমাদের পিছু নিল।

আমরা ঊর্ধ্বশ্বাসে গুহার ভেতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে সেই বারান্দার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম, যেখানে মাত্র কিছুক্ষণ আগে ডিনামাইট চার্জ করে পথ পরিষ্কার করে এসেছি আমরা

হঠাৎ আমাদের মনে হল চারদিকে যেন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে, কী প্রচ শব্দ। শব্দের পর শব্দ।

সব যেন থরথর করে কাঁপতে লাগল। যেন এখুনি একটা মহাপ্রলয়ে শেষ হয়ে যাবে সবকিছু। শেষ অবশ্য হল একসময়। চারদিক আবার আগের মতোই চিরশান্ত, নিশ্চুপ হয়ে গেল। ধ্যানগম্ভীর তিড্ডিমের আগেকার পরিবেশ আবার থমথম করতে লাগল।

আমরা যখন আবার ফিরে এলাম আগেকার জায়গায়, তখন কিছুই আর চেনা যাচ্ছে না।

সেই ভয়ংকর নর-দানবের শরীরের অর্ধেক আছে, অর্ধেক বিস্ফোরণে উধাও। কোথাও কিছু নেই। সব ফাঁকা। শুধু পাথর ও মাটির বিরাট একটা স্তূপ চোখে পড়ল আমাদের।

আমি বললাম, দুঃখ কোরো না সর্দার। পারো তো আমাদের ক্ষমা কোরো। এর জন্য আমরাই দায়ী।

সর্দার কী যেন বলল বিড় বিড় করে।

রামদুলালবাবু বললেন, সর্দার বলছেন উনি জানতেন এরকমটা হবেই। ওদের পুরাণে আছে, যা কিছু সৃষ্ট হয়, তা ধ্বংস হবার জন্য। শুধু তিড্ডিমের এই অংশটা নয়, সমস্ত পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে যাবে একদিন। এই ধ্বংসলীলার হাত থেকে কারও রক্ষা নেই। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা— যা কিছু দেখছ সবই ধ্বংস হবে।

রাতের আঁধার মুছে গিয়ে ভোর হয়ে আসছে তখন। আঁধারের ধূসর যবনিকা একটু একটু করে ফিকে হয়ে আসছে। পাখিরাও একটি দুটি করে ডাকতে আরম্ভ করেছে। আর একটু পরেই মেতে উঠবে কলরবে। পুবের আকাশটা লাল হবে। নানান রঙের ছটা ছড়িয়ে সূর্য উঠবে আলোর রথে।

আমরাও আবার ফিরে যাব আমাদের মুক্তির জগতে।

সর্দারের কাছে বিদায় চাইলাম আমরা।

সর্দার নীরবে নিজেই আমাদের পথপ্রদর্শক হল। এবং একটি অজ্ঞাত সুড়ঙ্গপথ দিয়ে কিছু সময়ের মধ্যেই আমাদের গুহার বাইরে, যেখান দিয়ে আমরা প্রথম প্রবেশ করেছিলাম সেইখানে পৌঁছে দিল।

বাহাদুর, আমি আর রামদুলালবাবু সর্দারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিড্ডিমের অরণ্যভূমি পার হয়ে এগিয়ে চললাম।

গুহামুখে দাঁড়িয়ে সর্দার আমাদের বিদায় জানাল।

সর্দারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কিছুটা পথ এগিয়ে এসে পিছু ফিরেই দেখি অদ্ভুত কাণ্ড। সর্দার ততক্ষণে নিজের কোমর থেকে ধারালো ছুরিটা বার করে নিজের বুকেই আমূল বসিয়ে দিয়েছে।

আমরা তিনজনেই ছুটে গেলাম সর্দারের কাছে।

রামদুলালবাবু বললেন, এ তুমি কী করলে সর্দার?

সর্দার সে কথার কোনও উত্তর না দিয়ে শুধু ইঙ্গিতে আমাদের চলে যেতে বলল।

আমরা একটু সময় থেমে দাঁড়িয়ে চলে এলাম।

দিনের আলোয় চারদিক তখন সোনারোদে ঝলমল করছে।

কিছু পথ হেঁটে আসার পর দেখলাম, এক জায়গায় ছোট ছোট কয়েকটা তাঁবু পড়েছে। এবং কিছু লোক সেখানে শিকারশেষে ফিরে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। তাদের সঙ্গে জিপও আছে দুটো। আমরা আমাদের বিপদের কথা তাদেরকে বুঝিয়ে বলে হাফলঙে ফেরার জন্য তাদের সঙ্গী হয়ে গেলাম।

অধ্যায় ১০ / ১০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%