নয়নাগিরি অভিযান

ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

এক

হঠাৎই অপ্রত্যাশিতভাবে কোনও শুভ সংবাদ যদি পেয়ে যায় কেউ, তা হলে কি আনন্দের আর শেষ থাকে? বন্যাপাড়ার মাঠে যযাতি সংঘের ফুটবল ম্যাচ ছিল, তাই দেখতেই গিয়েছিল গৌতম। এদিকে বাবার কড়া নিষেধ। যেখানে খুশি চলে যাও, ঘোরোফেরো কোনও আপত্তি নেই, শুধু সন্ধের আগে ঘরে ফিরো এবং বন্যাপাড়ায় যেয়ো না। বড় কুখ্যাত জায়গা ওটা। এক তো ওর চারদিক ঘিরে সমাজবিরোধীদের ঘাঁটি, তার ওপর শ্রাবণ মাসে জগৎগৌরীর মেলাতেও ওখানে সাপের কামড়ে একজন-দু’জন মরেই থাকে। তাই কাউকে কিছু না বলে চুপিচুপি লুকিয়েই এসেছিল গৌতম। কিন্তু ফেরার পথে বন্ধু পল্টনের মুখে এমন একটা খবর পেল যে আনন্দের উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারল না। চোখদুটো বড় বড় করে বলল, সত্যি !

পল্টন বলল, সত্যি না-তো কি মিথ্যে? কালই আমাদের যেতে হচ্ছে। কিন্তু তুই এত দেরি করলি কেন?

তোকে বলা হয়নি রে। আমি বন্যাপাড়ায় ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলাম।

আমিও আন্দাজ করেছিলাম তাই। সেইজন্যেই শোঁটেদার দোকানে ডিম-টোস্ট খেয়ে তোর জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। তোদের বাড়ি গিয়ে শুনলুম তুই স্কুল থেকে এসে বইপত্তর রেখেই ছুটেছিস। জলখাবারও খাসনি। খিদে পায়নি তোর?

পেয়েছে। তুইও আয় আমাদের বাড়ি। এক সঙ্গে খাব।

যাবই তো। তোর বাবা আমাকে তোরই খোঁজে পাঠালেন। তোকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে না?

বাবা! এমন সময় বাবা কোত্থেকে আসবেন?

তা তো জানি না। তবে আমাকে দেখেই বললেন, বন্ধু তো বাড়ি নেই। যাও যেখান থেকে পারো ধরে নিয়ে এসো।

তারপর?

আমি তখন সাহস করে ভয়ে ভয়ে বলেই ফেললাম কথাটা।

কী বললেন উনি?

এক কথায় রাজি।

আমি কিন্তু এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।

বিশ্বাস না হবার কথাই বটে। তোর বোন ঝুমুও যেতে চাইছিল। ঝুমুকে অবশ্য যেতে দেবেন না তোর মা। তবে তুই যাচ্ছিস।

কথা বলতে বলতেই ওরা বাড়ি এল।

ছোট্ট ঝুমু ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল দাদাকে। বলল, এই দাদা, বাবলিদির বিয়েতে তুই নেমতন্ন যাচ্ছিস। আমাকে নিয়ে যাবি রে? আমাকেও নেমতন্ন করেছে।

মা শুনতে পেয়ে বললেন, শখ মন্দ নয়। এ যেন এপাড়া ওপাড়া। কোথায় হাওড়া, কোথায় পাটনা। তা ছাড়া এই তো সেদিন বম্বে থেকে ঘুরে এলি।

বাঃ রে। তা হলে দাদা যাচ্ছে কেন? দাদাও তো বম্বে গিয়েছিল। দাদার বেলায় দোষ নেই, যত দোষ আমার বেলায়?

বলতে লজ্জা করে না? দাদা সামনের বছর ফাইনাল দেবে। আর তুই? দশ বছরের মেয়ে এখনও রাত্তির বেলা বিছানায়...।

জোঁকের মুখে নুন। কাঠবিড়ালির মতো তুণ্ডুক করে লাফিয়ে পালাল ঝুমু। রোজ তো নয়, না হয় মাঝেমধ্যে একআধদিন রাত্তিরবেলা ঘুমের ঘোরে একটু হয়েই যায়, তাই বলে কি একেবারে পল্টনদার সামনে এইভাবে হাটে হাঁড়ি ভাঙতে হবে?

গৌতম হাত-পা ধুয়ে ঘরে ঢুকল।

বাবা বললেন, কী রে! কোথায় গিয়েছিলি?

কোথাও নয় বাবা। একটু পুলকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। পুলক হচ্ছে পল্টন ও গৌতমের বন্ধু। বাবা-মা সবাই ওকে চেনেন। এ বাড়িতে ঘন ঘন যাতায়াতও আছে। তাই আর কেউ কিছু বললেন না। ভাবলেন হবেও বা।

গৌতম বলল, তুমি আজ এত সকাল সকাল চলে এলে যে বাবা? মা জল খাবারের ডিশ হাতে ঘরে এসে বললেন, কেন উনি আসায় তুমি কি খুশি নও?

বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, আঃ। এইভাবে কখনও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলে? আমি তো রোজ এই সময় আসি না, তাই ও জিজ্ঞেস করেছে। এতে ওর দোষটা কোথায়? বলে গৌতমকে বললেন, আজ আমাদের অফিসের স্পোর্টস। সেইজন্যে দুটোর সময় ছুটি হয়ে গেছে। আমি তো খেলাধুলোর ভক্ত নই। তাই মাঠে না গিয়ে বাড়ি চলে এলাম। এসে শুনলাম তোমাদের বাবলিদির বিয়ে। আর সেই বিয়েতে যাবার জন্যে তোমাদের দু'ভাই-বোনেই নিমন্ত্রিত হয়েছ।

আমি যাব বাবা?

নিশ্চয়ই যাবে। বাবলিদির বিয়ে বলে কথা।

মা বললেন, বাবলির দেখাশোনা চলছিল অনেক দিন ধরেই। কিন্তু বিয়ে হচ্ছিল না। এবার মনে হয় রাতারাতি কোনও ব্যবস্থা হয়ে গেছে। কিন্তু যতই রাতারাতি হোক। বিয়ে বলে কথা। কিছু দিনের একটা তোড়জোড় তো ছিলই।

সবই তো ছিল।

তা হলে? রেজেস্ট্রি করে চিঠি দেওয়া উচিত ছিল ওদের।

রেজেন্ট্রি চিঠিই তো এসেছে দশ দিন বাদে।

বাবা বললেন, এই জন্যেই আজকাল লোকে ক্যুরিয়ার সার্ভিসে চিঠি পাঠায়। এতে খরচও কম। চিঠিও তাড়াতাড়ি যায়।

ওদের জলখাবার খাওয়া হলে গৌতম বলল, আমি পল্টনের সঙ্গে একবার ওদের বাড়ি যাব মা?

এখন ক'টা বাজে জানো? পড়তে বসতে হবে না?

আজ একদম পড়ায় মন বসছে না, বিশ্বাস করো।

বাবা হেসে বললেন, ঠিক আছে যাও। ওদের বাড়িতে কী সব আলোচনা হয় শুনে এসো। বিয়ে বাড়ি যাচ্ছ। শুধুহাতে তো যাওয়া যায় না। কিছু একটা নিয়ে যেতে হবে। যদি সময় থাকে তা হলে আজ নয়তো কাল সকালেই কিনে ফেলতে হবে জিনিসটা। কী দেওয়া যায় বলো তো? বলে মায়ের দিকে তাকালেন বাবা।

মা বললেন, কী বলব বলো? এত তাড়াতাড়ি যে ভেবে দেখারও সময় পাব না। যা হোক কিছু দেবে। ছোট ছেলে। ভাইয়ের মতো।

গৌতম আর দেরি করল না। পল্টনের সঙ্গে ওদের বাড়ির দিকে চলল। খুব বেশি দূরে নয়। ওদের বাড়ি থেকে সোজা এগিয়ে দুটো মোড় পার হলেই পল্টনদের বাড়ি।

পল্টনের কাকামণি রুদ্রমশাই একজন বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ। গানের গলা ভাল নয়। তবে গান জানেন। বাংলা এবং বিহারের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর অনেক ছাত্রছাত্রী আছে। তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনেকেই রেডিয়ো বা টিভিতে গানটান গায়। সংগীত গুরু হিসেবেই তাঁর খ্যাতি। বিয়েথা করেননি। ভাইপো-ভাইঝিদের তিনি নিজের ছেলেমেয়ের মতোই দেখেন। সর্বাধিক স্নেহ করেন তিনি পল্টনকে।

দুই

পাটনা শহরের আর এক সংগীতগুরু সত্যসুন্দরবাবুর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। সত্যবাবু প্রবাসী বাঙালি। তিনি কলকাতায় এলে কাকামণির কাছে ওঠেন। কাকামণিও পাটনায় গিয়ে ওঠেন তাঁর বাড়িতে। প্রায় একটানা চল্লিশ বছর ধরে এইরকম চলছে। সেই সূত্রেই পরিচয়। বাবলিদি সত্যবাবুর একমাত্র মেয়ে। মেয়ে তো নয়, যেন দুর্গাপ্রতিমা। যেমনি রূপ, তেমনি গানের গলা। পাটনা রেডিয়ো সেন্টারে নিয়মিত গান গাইবার সুযোগ পান। গৌতমরা কতবার রেডিয়োর নব ঘুরিয়ে শুনেছে সেই গান।

কলকাতায় এলে কাকামণির সঙ্গে গৌতমদের বাড়িতেও কতবার এসেছেন বাবলিদি। পল্টনের মায়ের সঙ্গেও এসেছেন। সত্যবাবু কোনও কাজে কলকাতায় এলেই বাবলিদিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। আসলে মেয়েকে ছেড়ে একদম থাকতে পারেন না তিনি। তা সেই বাবলিদির বিয়ে। আর সেই বিয়েতে যাবার জন্যে নিজে হাতে চিঠি লিখেছেন বাবলিদি। কাকামণিকে যে চিঠি লিখেছেন তারই একপাশে লেখা আছে, আপনাদের সকলেরই আসা চাই। আর বিশেষ অনুরোধ, পল্টনের বন্ধু গৌতম ও ঝুমুকেও সঙ্গে আনতে ভুলবেন না। ওরা যেন বাদ না যায়। গৌতম আশা করি নিশ্চয়ই আসবে। সেই সঙ্গে ঝুমুও! বিয়ের পরে আর কখনও ওদিকে যেতে পারব কি না জানি না। অনেক দূরে চলে যাব তো। তাই ওদেরও একটু দেখতে চাই।

এইরকম চিঠি পাবার পর কি না-গিয়ে থাকা যায়? এখন মুশকিল হল একটাই, পল্টনের কাকামণি রুদ্রমশাই বাড়িতে নেই। কী একটি বিশেষ কাজে তিনি এলাহাবাদ গেছেন। চিঠিটা যদি দিনকতক আগেও আসত তা হলে কোনও ভাবনা ছিল না। এল এমন সময় যখন তিনিই নেই।

পল্টন যখন খুব ছোট তখনই ওর বাবা মারা যান। বিধবা মা, দুই দিদি আর পল্টনের দায়িত্ব নেন কাকামণি। উনি বিয়ে-থা করেননি তাই রক্ষে। কঠিন হাতে সংসারের হাল ধরলেন।

সেই কাকামণির অভিন্নহৃদয় বন্ধু হলেন সত্যবাবু। তাঁর মেয়ে বাবলিদির বিয়ে, অথচ কাকামণি নেই। এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কী-ই বা হতে পারে? এখন বাড়িসুদ্ধু সবাই চলে গেলে কাকামণি হঠাৎ করে যদি ফিরে আসেন তা হলে ঘরে ঢুকতে পারবেন না। অবশ্য তেমন হলে না হয় উনি কোনও ছাত্রছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে উঠবেন। কিন্তু পাটনা পর্যন্ত বাড়িসুদ্ধু সকলের যাওয়াটাই কী মুখের কথা?

গৌতমকে দেখে পল্টনের মা বললেন, এই যে এসেছিস বাবা, বেশ করেছিস। বাবলির বিয়ের চিঠি এসেছে। তোদের দু ভাইবোনকেই যেতে লিখেছে।

তা তো জানি। বোন যাবে না। তবে আমাকে বাবা যাবার অনুমতি দিয়েছেন।

কিন্তু পল্টনের চিন্তা হচ্ছে আপনি কী করে যাবেন? কাকামণি নেই।

ওই একটা চিন্তা তো আমারও। এতগুলো লোকের গাড়িভাড়া, দেওয়াথোয়ার ব্যাপার, কাকামণি থাকলে সামলাতে পারতেন। হয়তো একটা সোনার জিনিসই দিতেন। কিন্তু আমি কী করে কী করব?

গৌতম বলল, আমি একটা কথা বলব, কিছু মনে করবেন না তো?

না না। কী মনে করব?

কাকামণি যখন নেই তখন আপনি বরং একবার আমার বাবার সঙ্গে দেখা করুন। দেওয়ার ব্যাপারটা না হয় কাকামণি এলেই হবে। এই বিয়েতে সবাই মিলে আনন্দ করে যাওয়াটা অন্তত হোক। আমাদের সকলের গাড়িভাড়ার টাকাটা বাবা যে করেই হোক ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। এখন না হয় তাঁর কাছ থেকে ধার হিসেবেই টাকাটা নিন। পরে কাকামণি এলে দিয়ে দেবেন।

মা বললেন, তা কি হয় বাবা? কাকামণি হঠাৎ ফিরে এসে যদি দেখেন আমরা নেই, তা হলে খুবই দুঃখ পাবেন। তা ছাড়া এ অনেকগুলো টাকার ব্যাপার। বিশেষ করে সবাই চলে গেলে বাড়ি একদম ফাঁকা থাকবে। তার চেয়ে তোমরাই দু’বন্ধুতে যাও।

তা হলে দিদিরাও যাক।

না বাবা। দিদিরা এখন বড় হয়েছে। কাদের ভরসায় যাবে ওরা? আমি থাকলে আলাদা কথা। তোমরা ছোট ছেলে।

কী যে বলেন কাকিমা? আমরা নাকি এখনও ছোট। সেদিন খেজুরবাগানে মোষওয়ালাটাকে পল্টন আমি কীরকম পিটিয়েছিলাম জানেন না তো? সে কী! শুনিনি তো? তোমরা দু'জনে মারপিট করে বেড়ােচ্ছ নাকি? কী সাংঘাতিক!

তাই বলছিলাম দিদিরা সঙ্গে গেলে কোনও অসুবিধাই নেই।

তা হয়তো নেই। তবে কাকামণি রাগ করবেন। তা ছাড়া ওরা আমাকে ছেড়ে যাবে না। বিয়েবাড়ি বলে কথা। কত লোকজন আসবে। তার ঠিক কী? বিশেষ করে আমরা কখনও কেউ যাইনি ওখানে। কীরকম জায়গা তাও জানি না। এ অবস্থায় অত বড় মেয়েদের তোমাদের ভরসায় ছাড়া যায় না! তোমরা দু'বন্ধুতেই যাও। তোমার বাবাকে বলো উনি যেন তোমাদের দু’বন্ধুকে কাল ট্রেনে তুলে দিয়ে আসেন।

সেই ডাল। কাকামণি যখন নেই আর বিয়েও যখন হঠাৎ করেই ঠিক হয়ে গেছে, বিশেষ করে চিঠিও এসেছে দেরিতে, তখন কিছুই আর করবার নেই। দু'বন্ধুতেই যাওয়া যাক। সত্যি, কী মজাটাই না হবে।

গৌতম বলল, তা হলে আমরা কালই যাব কাকিমা?

হ্যাঁ। কালই যেতে হবে। কেন না পরশু তো বিয়ে। কাল তা হলে কোন গাড়িতে যাব?

সকালে গেলে তুফানে যেতে পারো। আর রাতের গাড়িতে যদি যাও তা হলে পঞ্জাব মেলে। দানাপুর এক্সপ্রেস, দিল্লি এক্সপ্রেস, জনতা এক্সপ্রেস যাতে খুশি যাওয়া যায়। তোমার বাবাকে বলবে, উনিই গিয়ে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসবেন তোমাদের।

গৌতম লাফিয়ে উঠল, হুর্ রে।

পল্টন বলল, তা হলে তুমি একবার চলো না মা ওদের বাড়িতে। ওর বাবাকে একটু বলে আসবে।

হ্যা। যাব বইকী! আমি না গেলে হয়?

এরপর গৌতম ও পল্টনকে নিয়ে পল্টনের মা ওদের বাড়িতে গেলেন।

গৌতমের বাবা সব শুনে বললেন, না না। কাকামণি যখন নেই তখন একেবারে ঘর ফাঁকা রেখে চলে যাওয়াটা ঠিক নয়। ওরা দু’বন্ধুতেই যাক। আপনি কোনও চিন্তা করবেন না। আমি নিজে গিয়ে ট্রেনের টিকিট কেটে ওদের গাড়িতে তুলে দিয়ে আসব।

কোন গাড়িতে যাবে তা হলে ওরা? সকালের গাড়িতে গেলে দশটার মধ্যে হাওড়ায় পৌঁছতে হবে ওদের। দশটা কত-র যেন ট্রেন!

সকালের গাড়িতে কেন যাবে? পরশু যখন বিয়ে তখন রাতের গাড়িতেই যাওয়া ভাল। সকালের গাড়িতে গেলে সেই রাতদুপুরে স্টেশনে নেমে ঠিকানা খুঁজে বার করতে অসুবিধে হয়ে যাবে। রাতের গাড়িতে গেলে ভোর ভোর পৌঁছবে। সারাটা দিন সময়। এর মধ্যে আমিও দেখি না চেষ্টা করে ওদের কোনও রিজার্ভেশন পাই কি না।

অতএব রাতের গাড়িতেই যাওয়া ঠিক হল।

পল্টনকে নিয়ে ওর মা চলে গেলে গৌতমের মা বললেন, আমার বাপু ভয় করে। দু’-দুটো ছেলে অত দূরে একটা নতুন জায়গায় যাবে। সঙ্গে বড় কেউ নেই। তাতে কী হয়েছে? কত লোক যাচ্ছে। পাটনায় নামবে, এমন অনেক লোক পাওয়া যাবে গাড়িতে। আমি ওদের গাড়িতে উঠিয়ে সকলকে বলেকয়ে দেব। পাটনায় নেমে যদি ওরা জায়গা ঠিক করতে না পারে?

খুব পারবে। স্টেশনের সামনেই অটো, রিকশা যা চাইবে তাই পাবে। তাদের হাতে ঠিকানা লেখা কাগজ ধরিয়ে দিলে তারাই পৌঁছে দেবে বাড়িতে। তা হলে কোনও ভয় নেই বলছ?

ভয় কী? ছেলেপুলেদের যত ঘরে আটকে রাখবে ততই ওরা ঘরকুনো হবে। আমি তো চাইছিলুম ছেলেটা এবার থেকে একটু করে ডানামেলে উড়তে শিখুক।

সে রাতটা প্রায় আনন্দের স্বপ্ন দেখেই কাটল। বাবলিদির বিয়ের জন্য যে ঠিক, তা নয়। পল্টনের সঙ্গে পাটনা যাবার আনন্দে। পাটনায় যাবার শখ কী ওর কম? ওদের বাড়ি যে গোয়ালাটা দুধ দিতে আসে তারও বাড়ি পাটনায়। গঙ্গার ওপারে ছাপরা জেলায়। প্রত্যেক বছর কার্তিক পূর্ণিমায় ওদের ওখানে শোনপুরের মেলা বসে। খুব নামকরা মেলা। সবাই বলে হরিহর ছত্রের মেলা। তা ওর মুখেই গল্প শুনে পাটনায় যাবার ইচ্ছেটা ওর খুব। ওখানে পুনপুন নামে একটি নদী আছে। ছোট্ট নদী। কিন্তু বর্ষায় নাকি এমনই হয় যে সেই নদীই ভয়ংকরী হয়ে ওঠে। তখন তাকে ধরে রাখা দায়। বাঁধভেঙে প্লাবন বইয়ে দেয় চারদিকে। আর আছেন পতিত পাবনী মা গঙ্গা। বাবলিদির মুখেও পাটনা শহরের কথা, গঙ্গার কথা কত শুনেছে গৌতম।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাই যাবার তোড়জোড়।

ঝুমুটার অবশ্য মুখ ভার। সে দূরে দাঁড়িয়ে আড়চোখে দেখছে দাদাকে, আর চোখে চোখ পড়লেই মুখ ঘুরিয়ে এমনভাবে চলে যাচ্ছে যে ভাবটা এই, এঃ তুমি যাচ্ছ তো আমার কী? আমি তো যাচ্ছি না। আমার আনন্দ করতে বয়েই গেছে।

সন্ধেবেলা হাওড়া স্টেশনে এসে বাবা ওদের পঞ্জাব মেলেই তুলে দিলেন। পঞ্জাব মেল মানে থ্রি জিরো জিরো ফাইভ আপ অমৃতসর মেল। না, কোনও গাড়িতেই কোনও রিজার্ভেশন পাওয়া যায়নি। তাই একটা কুলিকে টাকা দিয়ে জানলার ধারে মুখোমুখি দুটো সিটের ব্যবস্থা করলেন।

পল্টন ও গৌতম এতেই খুশি। একটা রাত বই তো নয়। দিব্যি গল্প করতে করতে কেটে যাবে। ঘুমোবার জন্য রোজ বাড়ির বিছানা আছে। ট্রেনে উঠে আবার ঘুম কী? তা ছাড়া ঘুমোবেই যদি তো দেখবে কখন? রাতের গাড়িতে সাঁ সাঁ করে ছুটে যেতে যেতে কালো ধূসর প্রকৃতির চেহারা না দেখলে কি দেখা হল? তা ছাড়া আসবার সময় মা বলে দিয়েছেন মধুপুর, জসিডি পেরোবার পর নাকি ছোট বড় অনেক পাহাড় আর ঘন বনানী চোখে পড়ে। রাতের অন্ধকারে সেই বনানীর ছায়ারূপ তো দেখতেই হবে।

যদিও ওরা খেয়ে এসেছিল তবুও রাতের খাবার দু'জনদের বাড়ি থেকেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মায়েরা। পল্টনের মা টিফিন কৌটো ভরতি করে লুচি, আলুর দম আর বোঁদে দিয়েছিলেন। গৌতমের মা দিয়েছিলেন লুচি, হালুয়া আর সন্দেশ। সেই সঙ্গে ওয়াটার বটল ভরতি করে জল। কত খাবে খাও না কেন?

তিন

যথা সময়ে ট্রেন ছাড়ল।

বাবা বিদায় নিলেন। যাবার আগে বলে গেলেন, কাল সকালের আগে ভুলেও যেন কোনও স্টেশনে না নামে।

এখন নভেম্বর মাস। তাই শীত শীত ভাব আছে। বিহারে নাকি কলকাতার চেয়ে এখন অনেক বেশি ঠান্ডা। গাড়িতেই ওরা ট্রেন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সোয়েটার ইত্যাদি পরে নিল। পল্টনের ঠান্ডার ধাত বেশি। তাই গলায় মাফলার জড়িয়ে বসে রইল চুপ চাপ। গৌতমের সঙ্গে মাংকি ক্যাপ ছিল। কিন্তু সেটা সে পরল না। কেন না এখনও এত শীত পড়েনি যে এরই মধ্যে মাংকি ক্যাপ চাপাতে হবে। ও পকেট থেকে একটি ছোট্ট নোটবুক বার করে পল্টনের হাতে দিয়ে বলল, এই দেখ।

কী ওটা?

বল দিকিনি ওটা কী? ভাল করে দেখ।

পল্টন নোটবুকটা হাতে নিয়ে বলল, এটা তো একটা নোটবুক।

খুলে দেখ আগে।

পল্টন নোটবুকটা খুলে দেখল কতকগুলো জায়গার নাম ওর নোটবুকে নোট করা আছে। এই নামগুলোর প্রত্যেকটিই ওর পরিচিত। বলল, এই নামগুলো এতে টুকে রাখার মানে?

মানে একটাই। রথ দেখার সঙ্গে সঙ্গে কলা বেচাও হবে। অর্থাৎ বাবলিদির বিয়েতে গিয়ে আমরা কি শুধুই নেমন্তন্ন খাব আর হই হুল্লোড় করব? মোটেই না। পাটনা শহরটা চষে বেড়াব আমরা। কখনও রিকশায়, কখনও অটোয়, কখনও পায়ে হেঁটে। পাটনা হচ্ছে বিহারের রাজধানী। ষোড়শ শতাব্দীতে শের শাহের হাতে এই শহরের গোড়াপত্তন। এই পাটনাই প্রাচীন মগধ। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে অজাতশত্রু রাজত্ব করেছেন এখানে। সম্রাট অশোকের রাজধানী।

অশোক তো পাটলিপুত্রের রাজা ছিলেন।

সেই পাটলিপুত্ৰই আজকের পাটনা। মৌর্যযুগের রাজধানী।

বলিস কী রে! জানতাম না তো?

সবাই জানে। বিশেষ করে আমার আগে তোরই জানা উচিত ছিল।

তা হলে নিশ্চয়ই সেকালের নিদর্শনও কিছু দেখতে পাব আমরা!

এক বাঙালি ভদ্রলোক সামনের দিকের বাঙ্কের ওপর ঘুমনোর ভান করে শুয়েছিলেন। এদের কথাবার্তা শুনে বললেন, পেতে। যদি না, ১৫৩৪ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে সবকিছু চাপা পড়ে যেত। গৌতম বলল, আপনি কি পাটনায় থাকেন? না। আমি থাকি দানাপুরে।

পাটনায় দেখবার কী কী আছে বলুন তো?

দেখবার মতো আহামরি কিছুই নেই ওখানে। মিউজিয়াম, হরমন্দির, গোলঘর এইসব দেখতে পারো। তা ছাড়া সদাকত আশ্রমটা দেখো। আচ্ছা, গোলঘরটা কী জিনিস?

গোলঘর কী জানো, এটি একটি শষ্যাগার। অনেকটা মৌচাকের মতো গড়ে ওঠা একটি ঘর। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের দুর্ভিক্ষের স্মৃতি মনে রেখে ক্যাপটেন জন গারস্টিন এই শষ্যাগারটি ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করান। এর মাথায় ওঠবার সিঁড়ি আছে। সেখান থেকে পাটনা শহরের দৃশ্য এবং গঙ্গার সৌন্দর্য খুব ভাল করে দেখা যায়।

আমাদের উঠতে দেবে?

কেন দেবে না। সবাই ওঠে।

ওটা তা হলে মনুমেন্ট বলুন?

ঠিক তাই।

ওখানে আর কিছু দেখার নেই?

ওখানেই আছে, হরিমন্দির বা হরমন্দির। আগে ওটা ছিল একটা মস্ত বড় হাবেলি। নাম জহুরি শালিস রায়ের হাবেলি। এই জহুরি ছিলেন খুব হরিভক্ত। ওই হাবেলিতে তিনি দানধ্যান করতেন। হরি সংকীর্তন করতেন। তোমরা নিশ্চয়ই শিখদের দশম গুরু, গুরু গোবিন্দ সিং-এর নাম শুনেছ? তাঁর জন্মস্থান ছিল পাটনা। সেই কথা স্মরণে রেখেই পঞ্জাব কেশরী রণজিত সিং এখানে একটি গুরদোয়ারা তৈরি করে দেন। গম্বুজাকৃতি এই গুরুদ্বার বা গুরদোয়ারাটি পাঁচতলা উঁচু। শ্বেত পাথরে তৈরি। সোনা দিয়ে মোড়া এর প্রধান দ্বার। শিখদের পবিত্র তীর্থ। ওই গুরদোয়ারাটা কিন্তু তোমরা দেখো।

আর এক ভদ্রলোক এক পাশে বসেছিলেন। তিনি বললেন, তবে তুমি ওই যে তখন বললে পাটলিপুত্রের কথা, তা অশোকের আগেও মানে আজ থেকে প্রায় দু'হাজার তিনশো বছর আগে আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলুকাশকে যিনি পরাজিত করেছিলেন সেই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজধানী ছিল পাটনা। তাঁর পুত্র অশোক তো পরে রাজত্ব করেন। আর একটা জিনিস তোমরা নোট করে নাও, খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকে ভগবান বুদ্ধ এখানে এসেছিলেন।

কথা বলতে বলতে কত সময় যে কীভাবে কেটে গেল তা কেউ টের পেল না। ট্রেন এসে বর্ধমানে থামল।

থেমেই ছাড়ল। মেল ট্রেন তো। বেশিক্ষণ থামে না।

সবাই যে যার খাবার দাবার বার করে খেতে লাগল।

পল্টন ও গৌতমও বাদ গেল না। অনেক খাবার। এত কী খাওয়া যায়?

কয়েকজন দেহাতি আশপাশে বসে বসে খইনি টিপছিল। পল্টন কিছু খাবার ওদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এগুলো খেয়ে নাও দেখি?

কমতি হো ওরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ি করে বলল, লেকিন তুমহারা যায়েগা না?

না বাবা। আমাদের পেট কী মধ্যে জায়গা নেই। সেই জন্যেই তুম সবাইকে খিলাতা হ্যায়।

পল্টনের হিন্দি শুনে ফিক করে হেসে ফেলল গৌতম। হিন্দি সে-ও খুব একটা ভাল বলতে পারে না। তবে এতটা খারাপ বলে না।

দেহাতিদের খাবার দিয়ে নিজেরাও খেতে লাগল।

ট্রেন ছুটছে ঝড়ের বেগে। কী ভাল যে লাগছে। ট্রেনের দুলুনিতে বসে থাকতে থাকতেই এক সময় ঘুমে দু'চোখ লুটিয়ে এল ওদের। রাত জেগে আঁধারের প্রকৃতি দেখা মাথায় উঠল।

ওরা আর থাকতে না পেরে মেঝেতেই বেডসিটটা পেতে নিয়ে শুয়ে পড়ল টান হয়ে। তারপর নাক ডাকিয়ে সে কी ঘুম।

চার

শেষরাতে ট্রেন এসে থামল পাটনা জংশনে! ঘড়ির কাঁটায় তখন চারটে। একে ঠিক শেষরাত নয়, ভোরই বলা উচিত। ওরা ঘুমোচ্ছিল। কে যেন একজন ডেকে

তুলে দিল ওদের, কী গো ভাইয়েরা, পাটনা তো এসে গেছে। নামবে না? পল্টন-গৌতম দু’জনেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। তারপর যে যার ঝোলাব্যাগ সামলে নেমে পড়ল টুক করে।

আলো ঝলমল পাটনা জংশনে তখন শুধুই লোকের ব্যস্ততা।

ওরা গেটে টিকিট জমা দিয়ে স্টেশনের বাইরে এল। এত ভোরেও স্টেশন এলাকাটা জমজমাট।

অটো, রিকশা, বাস কী না নেই সেখানে?

একজন চাওয়ালা জ্বলন্ত উনুনের ওপর বড় একটা কেতলি বসিয়ে চা তৈরি করছিল। ওরা সেখানে গিয়ে সেই চা, এক ভাঁড় করে খেল। সে চায়ের স্বাদই আলাদা। চায়ের দোকানের রেডিয়োয় লতা মঙ্গেশকরের 'মেরা নাম হ্যায় চামেলি' গান হচ্ছে। ওরা চা খেয়ে চারদিকে পায়চারি করতে লাগল।

তারপর একটু একটু করে আলো ফুটলে ওরা একটা রিকশায় চেপে বলল, দরিয়াপুর!

রিকশাওয়ালা বলল, তিন রুপিয়া লাগে গা। চলে তো।

রিকশা ‘পিকু পিঁকু’ করে ভেঁপু বাজিয়ে ওদের নিয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে চলল রাজপথ ধরে। অজানা দেশ, অচেনা জায়গা। তবু কী ভাল যে লাগল, তা বলবার নয়। ভাল লাগবে নাই বা কেন? হাজার হলেও রাজধানী শহর তো। বিহারের রাজধানী। তার একটা ঐতিহ্য আছে বইকী। কত উন্নতমানের ঘরবাড়ি যে ওদের নজরে পড়ল তার যেন শেষ নেই।

ওরা এ পথ সে পথ করে এক সময় দরিয়াপুর এসে পৌঁছুল। একটি নোংরা গলির মুখে রিকশা থামলে, ওরা রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মেটাল। তারপর একটি পানের দোকানে গিয়ে সত্যসুন্দরবাবুর নাম করতেই দোকানদার বলল, মাস্টারজিকা মকান?

পল্টন বলল, হ্যাঁ!

ইস গলি কা অন্দর।

ওরা দু’জনে গলির ভেতরে ঢুকে যেতেই বাঁদিকে বহুদিনের পুরনো একটি কোঠা বাড়ি নজরে পড়ল। সাবেক কালের বাড়ি। তার পাঁচিলটাই দশ ইঞ্জি ইটের গাঁথনি দেওয়া। পাঁচিলের গায়ে অজস্র ঘুঁটে। তারই একপাশে খটিয়া বস্তি।

একটি পেয়ারা গাছ, তার ডালে কেমন পেয়ারা হয়েছে দেখাবার জন্যই বুঝি পাঁচিল টপকে ঝুঁকে পড়েছে রাস্তার ওপর। পল্টন বলল, এই বাড়ি।

ওরা দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে গুরুগম্ভীর একটা স্বর ভেসে এল, কে?

পল্টন বলল, আমি ! বলেই গৌতমের দিকে তাকিয়ে বলল, কাকুমণির বাবা। সদাশিববাবু। কাকামণির বন্ধু বলে সত্যসুন্দরবাবুকে ওরা কাকুমণি বলে!

গৌতম বলল, ওরে বাবা! কাকুমণির বাবা মানে তো অনেক বয়স। এখনও বেঁচে আছেন?

বেঁচে আছেন বলেই তো সাড়া দিচ্ছেন। কীরকম লম্বাচওড়া দশাসই চেহারা দেখবি। ঠিক যেন সম্রাট সাজাহান।

আমি কে? ভেতর থেকে আবার সাড়া এল,

আমি পল্টন। হাওড়া থেকে আসছি।

সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন সত্যসুন্দরবাবু। বললেন, তা হলে? আর সব কই? চিঠি পেয়েছ আর কেউ নেই। শুধু আমরাই দু'জনে এসেছি।

সে কী! রুদ্রদা, তোমার মা, বোনেরা কেউ এল না?

কী করে আসবে? কাকামণিই যে বাড়িতে নেই। কোথায় গেছেন?

ইলাহাবাদে।

অ। বুঝেছি। প্রয়াগ সংগীত সম্মেলনের ব্যাপার।

আপনার চিঠিটা আর কিছুদিন আগে পেলেই হত। এমন সময় পেলাম যে এক তো কাকামণি নেই, তায় বিয়েটা একেবারে মাথায় মাথায়।

এসো এসো। ভেতরে এসো।

ওরা বাইরের দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল।

ভেতরদিকে বাড়ির বাইরের অংশে একটি চালাঘর আছে। সেই ঘরে সত্যসুন্দরবাবু ক্লাস করেন। রেওয়াজ করেন। বাইরের গেস্টরা এলে থাকতে দেন। পল্টন আর গৌতমকে নিয়ে সেই ঘরে গেলেন তিনি।

সাজাহানের মতো শুভ্রকেশ ও দাড়িওয়ালা দীর্ঘ উন্নত সদাশিববাবু এগিয়ে এসে বললেন, তোমাদের বাড়ি খুঁজে আসতে কোনও অসুবিধে হয়নি তো? পল্টন বলল, কিছুমাত্র না।

ওরা দু'জনেই সদাশিববাবু ও সত্যসন্দুরবাবুকে প্রণাম করল।

সদাশিববাবু বললেন, তুমি পল্টন, তোমাকে তো চিনলাম। কিন্তু ও ছেলেটি কে? গৌতম বুঝি?

গৌতম বলল, আপনি ঠিকই ধরেছেন। কিন্তু আমাকে তো আপনি দেখেননি কখনও, আমার নাম জানলেন কী করে?

তোমার কথা বাবলির মুখে কী কম শুনেছি আমি? তোমার বোনের নাম ঝুমু। ঠিক কি না?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

পল্টন বলল, যাই। ভেতরে গিয়ে বাবলিদি আর কাকিমার সঙ্গে দেখা করে আসি। ওঁরা এতক্ষণে ঘুম থেকে উঠেছেন নিশ্চয়ই?

সত্যবাবু বললেন, ওরা তো কেউ নেই। বাড়ি একেবারে ফাঁকা।

সে কী? কেউ নেই কেন?

বিয়ের জন্যে আমি

এত বড় বাড়ি থাকতে?

কদমকুঁয়ায় একটা অন্য বাড়ি ভাড়া নিয়েছি।

এই নোংরা গলির ভেতর পুরনো ভাঙা বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। তা ছাড়া আমার নিমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যাও অনেক। তাই সবাইকে সরিয়ে দিয়ে শুধু বাবা আর আমি পাহারা দিচ্ছি। এখানে চোরের উপদ্রব খুব। কেউ বাড়িতে না থাকলে তালা ওরা ভাঙবেই।

গৌতম বলল, বাবলিদির কোথায় বিয়ে হচ্ছে কাকুমণি?

ফৈজাবাদে।

সে তো অনেকদূর।

হ্যাঁ। তবে ভালই হয়েছে। রুদ্রদা অবশ্য দেখেছেন ছেলেটিকে। তা যাক। তোমরা সারারাত ট্রেন জার্নি করে এসেছ। ক্লান্ত শরীর তোমাদের। এখন মুখহাত ধুয়ে একটু চা-টা খেয়ে নাও। পরে তোমাদের কদমকুঁয়ায় পাঠিয়ে দেব।

সদাশিববাবু বললেন, এখন ওদের কদমকুঁয়ায় যাবার দরকারটাই বা কী? একেবারে সন্ধেবেলা যাবে, ওই হইহট্টগোলে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যাবে ওদের। তার চেয়ে বরং চারদিক একটু ঘুরে দেখুক ওরা।

সে ওরা যা ভাল বুঝবে।

সত্যবাবু ওদের বাথরুম দেখিয়ে দিয়ে বাইরে চলে গেলেন।

ওরা দাঁত মাজতে মাজতে উঠোনময় ঘোরাঘুরি করে বাথরুমের কাজ সেরে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নিল। তারপর ঘরে এসে পোশাক পালটে কৌচে হেলান দিয়ে বসে যখন সদাশিববাবুর সঙ্গে গল্পে মেতেছে, তেমন সময় একটি মেয়ে ওদের জন্য চা-জলখাবার নিয়ে এল। জলখাবার মানে বড় বড় কচুরি-লাড্ডু-গজা আর অমৃতি। সেই সঙ্গে ধূমায়িত চা।

পল্টন ও গৌতম অবাক হয়ে গেল খুব অবাক হবার কারণও অবশ্য যথেষ্ট ছিল। যেখানে বাড়িসুদ্ধু লোক সবাই চলে গেছে সেখানে এই মেয়েটি এল কোত্থেকে? তা ছাড়া মেয়েটি কে? মেয়েটির সুন্দর মুখ, শরীরস্বাস্থ্য, ফুটফুটে চেহারা আর গায়ের রং দেখে তাকে মেয়ে বলেও মনে হয় না। তা হলে?

স্কার্টপরা চোদ্দো-পনেরো বছরের ভদ্র মেয়েটি, বেশ লাজুক লাজুক মুখে খাবারের জায়গাগুলো ওদের সামনের চা-টেবিলে রেখে অদৃশ্য হয়ে গেল।

একটু পরেই একেবারে বেরোবার জন্য তৈরি হয়ে সত্যসুন্দরবাবু এলেন। এসে বললেন, তোমরা তা হলে যখন হোক চলে যেয়ো। কদমকুঁয়ায় গিয়ে পড়লে বিয়েবাড়ি চিনে নিতে অসুবিধে হবে না। যদি এ বেলা যাও, তা হলে ওখানেই খাওয়াদাওয়া করে নিতে পারো। আর যদি বিকেলে যাও তা হলে গোপাকে বলে দিয়ো ও দুটো ঝোল ভাত রেঁধে দেবে তোমাদের। বাবার জন্যে তো রান্না করবেই। অমনি তোমাদেরও হয়ে যাবে।

পল্টন বলল, গোপা কে কাকুমণি?

সত্যসুন্দরবাবু হাসি হাসি মুখে বললেন, বড় ভাল মেয়ে। ওর মা আমার কাছে গান শিখত। এখন ও শেখে। ওর গানের গলা শুনলে অবাক হয়ে যাবে। আচমকা শুনলে মনে হবে রেডিয়োয় গাইছে বুঝি কেউ। বাবার তো বিয়েবাড়ির ভিড়ভাট্টা সহ্য হবে না আর গুরুপাক খাওয়াও চলবে না। সেইজন্যে বাবার দেখাশোনা করছে ও।

সে কী! ও তা হলে বিয়েবাড়ি যাবে না?

কেন যাবে না? বিকেলবেলা বাবাকে নিয়ে যাবে ও। তোমরা কী করবে বলো?

সদাশিববাবুই ওদের হয়ে বললেন, কী আবার করবে? ওরা এতখানি জার্নি করে এসেছে, এখন একটু ঠান্ডা হোক। দুপুরে এখানেই ঝোলভাত খেয়ে নিক দুটো। একটু ঘুমিয়ে নিক। তারপর বিকেলে বিয়েবাড়ি যাবে। দু'বেলাই গুরুপাক খেলে শরীর খারাপ করবে যে।

গৌতম বলল, উনি ঠিক কথাই বলেছেন কাকুমণি। আমরা বিকেলেই যাব। এখন একটু রেস্টের খুবই দরকার।

আমি তা হলে গোপাকে বলে যাই। বলে ভেতর বাড়িতে চলে গেলেন সত্যসুন্দরবাবু। তারপর যাবার সময় আর একবার দেখা করতে এলেন সদাশিববাবুর সঙ্গে, আপনি তা হলে একটু সাবধানে থাকবেন বাবা। বেলাবেলি গোপাকে নিয়ে চলে যাবেন।

সদাশিববাবু বললেন, আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক সময়েই যাব। সত্যসুন্দরবাবু চলে গেলেন। এখন তাঁর কত কাজ। হাজার হলেও কন্যাদায় বলে কথা। সব কিছুর তদারকি তো তাঁকেই করতে হবে।

পাঁচ

পল্টন আর গৌতম তখন খোশগল্পে মেতে উঠল সদাশিববাবুর সঙ্গে। এমন রসিক এবং আলাপী মানুষ খুব কমই দেখেছে ওরা। একথা সেকথার পর সদাশিববাবু বললেন, তোমরা ছেলেমানুষ। কী আর বলব বাবা তোমাদের। বিয়েটা ভালয় ভালয় মিটে গেলে যেন বাঁচি। দিনকাল এত খারাপ পড়ছে যে, তা বলবার নয়। মস্তান-গুন্ডার দাপটে এখানে বাস করা দায় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এই এলাকাটা খুবই খারাপ। না হলে এতবড় বাড়ি থাকতে এতখানি জায়গা থাকতে, কখনও অন্য জায়গায় ঘর ভাড়া নিয়ে নাতনির বিয়ে দিই। ,

পল্টন বলল, আমিও তাই অবাক হয়ে গেলাম।

বাবলির বিয়ের যেদিন ঠিক হল সেইদিনই একটা চিঠি এল গফুরগুন্ডার কাছ থেকে। বিয়ের দিন ওকে নগদ দশ হাজার টাকা দিতে হবে আর পঞ্চাশজন লোককে খাওয়াতে হবে। এটা না হলে বরকনেকে বেরোতেই দেবে না এই গলির ভেতর থেকে।

সে কী!

তবে আর বলছি কী। তা ছাড়া এই যে মেয়েটিকে দেখলে গোপা, একে নিয়েও কী কম ঝামেলা?

কেন? ওকে নিয়ে আবার ঝামেলা কীসের?

মেয়েটাকে উঠোনে, ছাদে দেখলেই আশপাশ থেকে ঢিল ছুড়ছে। পরের মেয়ে। কী জ্বালা বলো তো?

গৌতম বলল, ওর অপরাধ?

অপরাধের ব্যাপার তো নয়। আসলে মেয়ে একটু বড় হলেই এই সব এলাকায় থাকা বিপদ। বাবলিটাকে যে কীভাবে আগলে রেখেছিলুম তা ভগবান জানেন। এবার শুভ কাজটা ভালয় ভালয় মিটে গেলে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।

পল্টন ও গৌতম ভীষণ উত্তেজিত হল।

পল্টন বলল, হোত আমাদের ওখানে...।

এমন সময় দড়াম করে বাড়ির উঠোনের ওপর একটা ইট এসে পড়ল। সদাশিববাবু বললেন, এই চলছে।

এ কী অসভ্যতা?

আসলে ওই যে টাকাটা দেওয়া হয়নি। তার ওপর বিয়ের দু'দিন আগে থেকেই সরে গেছি সব। সেই রাগে কী যে করবে কিছু ভেবে পাচ্ছে না। তাই যত রাগ ওদের গোপার ওপর। মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যেতে পারলে বুঝি বাঁচে।

গৌতম বলল, গোপার বাড়ি কোথায় ?

কাশীতে। দু'দিন মাত্র এসেছে। এই দু'দিনেই দু’অবস্থা করে ছেড়েছে ওর। আজ বিয়েটা মিটলে আমি ভাবছি কাল সকালে অথবা পরশুই বাড়ি পাঠিয়ে দেব ওকে। পল্টন বলল, ওর মা-বাবা আসেননি?

বাবা তো নেই। মা আসতে পারেননি শরীর খারাপের জন্য। ও একাই এসেছে।

সে কী! কাশী থেকে একা এসেছে?

ও তো প্রায়ই আসে। কাশী তো এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মেল এক্সপ্রেসে তিন-চার ঘণ্টার পথ।

পল্টন বলল, সেই ভাল। ওকে বরং বাড়িই পাঠিয়ে দিন। তবে একা ছাড়বেন না। সঙ্গে কেউ যাবেন।

কে যাবে বাবা? তবে খোকা গিয়ে ওকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসবে। খোকা হচ্ছে সত্যসুন্দরবাবুর ডাকনাম।

গৌতম বলল, সে না হয় হল। কিন্তু গফুরগুন্ডার যেরকম রাগ দেখছি আপনাদের ওপর তাতে বিয়ের পরে আপনারা কী করবেন?

সেই ভয়েই তো আমি ঘুমোতে পারছি না বাবা। আমি তো ঘর থেকে বেরোতে পারি না। বেরোইও না। কিন্তু বউমা ঘরে থাকে। খোকা অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে। আমার ভয় যে খোকাকে নিয়ে। কী যে হবে তা ভগবানই জানেন। অথচ বাড়ি বেচে দিয়ে চলে যাবারও নয়। এতবড় বাড়ি কিনবে কে?

পল্টন বলল, আপনারা থানায় কোনও রিপোর্ট করেননি গফুরের নামে? ওরে বাবা। থানা-পুলিশ করলে রক্ষে আছে? গোটা বাড়ি জ্বালিয়ে দেবে। তা ছাড়া এদের গাঁটছড়া তো পুলিশের সঙ্গেই বাঁধা। পুলিশ সহায় না হলে ওরা কখনও এত বাড় বাড়তে পারে?

ওরা ওখানে কোনও ঝামেলা করবে না?

না। কদমকুঁয়াটা ওদের এলাকার বাইরে।

সদাশিববাবু বললেন বটে, তবুও পল্টন-গৌতমের মন আশ্বস্ত হল না। কদমকুঁয়া গফুরগুন্ডার এলাকার বাইরে হলেও, ও যদি ভয়ানক হয়, তা হলে আতঙ্কের গ্যাসও সেখানেও ছড়াবে। কারণ কদমকুঁয়া দরিয়াপুর-বস্তির বাইরে হলেও পাটনা শহরের বাইরে তো নয়।

এমন সময় বাইরের দরজায় দমাদুম লাথি পড়ল কয়েকটা।

ভীতা হরিণীর মতো ছুটে এসে ঘরে ঢুকল গোপা।

পল্টন ও গৌতম তাকাল গোপার দিকে।

এর আগে যখন চা দিতে এসেছিল তখন ওরা ভাল করে দেখেনি গোপাকে। আসলে দেখার ব্যাপারে মনোযোগ দেয়নি। ভেবেছিল কে না কে। এখন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায় অবস্থাটা উপলব্ধি করেই গভীর সহানুভূতিতে ভরে উঠল ওদের মন।

গৌতম অনিমেষে তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে।

ওরা সদাশিববাবুর দিকে তাকাল।

দরজায় আবার দুম দুম শব্দ।

পল্টন ও গৌতম রুখে দাঁড়াল দু'জনেই।

সদাশিববাবু বললেন, খবরদার, সামনে যেয়ো না ওদের। পল্টন বলল, তাই বলে ওদের এই বেয়াদপি সহ্য করতে হবে? উপায় নেই। আসলে খোকাকে ওরা বাইরে যেতে দেখেছে। কিন্তু ভোরবেলা তোমাদের আসতে দেখেনি। তাই ভেবেছে এখানে বাধা দেবার কেউ নেই। যা খুশি করবে।

পল্টন আর গৌতম এগিয়ে গেল দু'জনেই। গিয়ে চুপিসাড়ে দরজার ছিটকিনিটা খুলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল দরজার দু'পাশে।

খানিক বাদেই হঠাৎ দরজায় একটা লাথি। আর লাথি মারার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ থুবড়ে উঠোনের ওপর এসে পড়ল একজন।

যেই না-পড়া পল্টন অমনি ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। তারপর একেবারে বুকের ওপর চেপে বসেই দু'হাতে গলাটা টিপে ধরল তার।

যেটা পড়েছিল সেটা একটা ঘোড়ামুখো পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবক। ঘোড়ার মতো মুখে গাধার মতো চেঁচাতে লাগল। ব্যাপারটা যে এমন হবে সে বোধহয় আগে বুঝতে পারেনি। ওর চেচানিতে আরও কয়েকজন যুবক এসে হাজির হল সেখানে। গলায় রুমাল বাঁধা। মস্তান চেহারা। প্রায় চার পাঁচজন।

একজন বলল, ক্যা রে বে। ইয়ে দোনো কাঁহাসে আ গিয়া?

গৌতম তখন টেনে একটা ঘুসি মেরেছে মস্তানটার মুখে। মারের নিয়মই হচ্ছে সাহস করে যে প্রথমে মারে সেই জেতে। তাই যারা মারতে অভ্যস্ত তারা মার খেলেই ঘাবড়ে যায়। বিশেষ করে এই খালি বাড়িতে দু’জন অল্পবয়সি কিশোরের হাতে মার খেয়ে শুধু ঘাবড়ে যাওয়া নয়, রীতিমতো অবাকও হয়ে গেল। কোনওরকমে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করল, তু–তু—তু কৌন?

গৌতম বলল, মেরা জবাব তেরা মু’পর দে দিয়া। আভি পুছতা হ্যায় ম্যায় কৌন? তো ইয়ে দেখ, বলেই পেটে একটা লাথি।

গৌতমের ফুটবল খেলা বলিষ্ঠ পায়ের লাথি সে সহ্য করতে পারবে কেন? তাই ‘আঁক’ করে পেটধরে বসে পড়ল সে।

অন্যান্য যারা ছিল তারা ন্যাকার মতো ‘হুয়া ক্যা। ক্যা তামাশা হো রহে হিয়া পর’ বলে দু'জনকেই ধরাধরি করে তুলে দাঁড় করাল।

একজন বলল, বাঙালি ভাই, এ কাম তু নে আচ্ছা নেহি কিয়া।

গৌতম বলল, ফির মারেগা, বহুত মারেগা। যা ভাগ। বুলা তেরি গফফুর বাবাকো। হট হিয়াসে।

আর কিছু বলতে হল না। খেঁকি কুকুরের মতো গলা করে বীরপুঙ্গবরা বাড়ির বাইরে গিয়ে ভ্যাংচাতে লাগল, হট হিয়াসে, হট হিয়াসে। হ্যাঃ হ্যাঃ হ্যাঃ।

তারপরই দরজার ওপর আবার একটা ইট।

গরম তেলে জল।

পল্টন আর গৌতম দু'জনেই তখন উঠোনের ওপর পড়ে থাকা একটা মরচে ধরা সাইকেলের চেন ও একটা চ্যালাকাঠ নিয়ে ছুটে গেল বাইরে। গিয়েই যাকে সামনে পেল তাকেই পেটাতে লাগল। রীতিমতো রক্তারক্তি কাণ্ড। সে কী বেদম মার।

হইহই করে ছুটে এল লোকজন। ব্যাপার কী? এত মারামারি কেন?

গৌতম আর পল্টন সবাইকে খুলে বলল সব কথা।

কথায় বলে মারে ভূত ভাগে। তাই হল। চ্যাংড়ার দল কেটে পড়ল। তবে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে চাপা আক্রোশে ফুলতে লাগল সব। দুই বাঙালি কিশোরের এই বিক্রমে স্তব্ধ এবং হতচকিত হয়ে গেল সকলে। পল্টন থানায় যাচ্ছিল।

কয়েকজন মুরুব্বি গোছের লোক মানা করল। বলল, পোলিশবালেকো পাশ মাত যাইয়ে। এ লোক আউর কুছ নেহি কিয়েগা। মাস্টারজি আচ্ছা আদমি। উনকা সাথ অ্যায়শা দুশমণি হামলোগ বরদাস্ত নেহি কীয়েগা।

ওরা যখন ফিরে আসছে, তখন দেখা গেল, বেশ কয়েকজন ছেলেকে নিয়ে এলাকার সন্ত্রাস গফুরগুন্ডা একটা লোহার রড হাতে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে।

গফুরকে দেখেই ভিড় পাতলা হয়ে গেল।

মাতব্বররা বলল, তু চলা যা গফুর। তেরা আদমি নে কাম খারাপি কিয়া। ছোড় দো ইয়ে বাচ্চো কো।

গৌতম বলল, ছাড়াছাড়ির কী আছে? মস্তানি করতে হয় বাইরে করুক। বাড়ির ভেতরে ঢুকতে আসে কোন সাহসে?

গফুর এসে সামনে দাঁড়িয়ে হিন্দি ছবির ভিলেনের মতো ওদের দিকে তাকিয়ে রডটা দুলিয়ে দুলিয়ে বলল, তু কাহাসে আয়ারে চুনমুন? কাঁহাকা চিড়িয়া?

পল্টন আর গৌতম তখনও ফুলছে।

বৃদ্ধ সদাশিববাবু তখন দরজার কাছে চলে এসেছেন। গোপাও এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে। সকলেরই চোখেমুখে ভয় ও উৎকণ্ঠা।

গৌতম বলল, তুমিই গফুর?

গফুর বাঘের বিক্রম নিয়ে বলল, পহলে বোল তু কাহাসে আয়া?

গৌতম বলল, কলকাত্তা সে।

যদি বাঁচতে চাস তো এখুনি চলে যা। তুরন্ত চলা যা হিয়াসে।

আমরা তোকে রিপিট করব বলে এসেছি গফুর। চলে যাবার জন্য নয়। যদি একান্তই যেতে হয় তা হলে তোকে নিয়েই যাব। মাস্টারমশাইকে একলা পেয়ে খুব রংবাজি করেছিস। এখন ভাল চাস তো পালা।

গফুর হতভম্ব। গত কয়েক বছরের মধ্যে ওর মতো একজন পেশাদার গুন্ডা ও খুনির সঙ্গে এই ভাবে কথা বলেনি কেউ। ওকে দেখামাত্রই দূর থেকে পালায় সব। যারা হঠাৎ করে সামনে পড়ে যায়, তারা ভয়ে থর থর করে কাঁপে। আর এই দুই স্ফুলিঙ্গ এত লোকের সামনে ওর বীরত্বের মর্যাদায় গোবর মাখিয়ে দিল। গফুর হাতের ডান্ডাটাকে শক্ত করে ধরে কাঁপতে লাগল থর থর করে। রাগে লাল হয়ে উঠল ওর মুখচোখ। কঠিন গলায় বলল, আল্লা কসম। এক ঘণ্টার মধ্যে তোরা এখান থেকে চলে যাবি। না হলে তোদের লাশও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

গৌতম তখন মরচেধরা চেনটাকে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, শোলে দেখেছিস গফুর? ওই সিনটাকে একটু মনে কর। আমরা দু'জন ধর্মেন্দ্র আর অমিতাভর রোল নিয়ে এসেছি। আর তুই হচ্ছিস সিনেমার সেই গব্বর সিং। ওরা গব্বরকে যেভাবে পিটিয়েছিল, আমরাও তোকে ঠিক সেইভাবেই পেটাব। আমরা তোকে এক ঘণ্টা নয়। মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দিলুম। হয় যাবি, না হলে দেখছিস? বলেই চেন দেখাল।

গফুর আর ঠিক রাখতে পারল না নিজেকে। হিংস্ৰ উন্মাদনায় ডান্ডা উঁচিয়ে মারতে গেল গৌতমকে। কিন্তু ও মারবার আগেই গৌতমের চেন গফুরের ঘাড় ও মাথার ওপর পড়েছে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল গফুর, ইয়া আল্লা।

গৌতম একটা হেঁচকা টান দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে মুখ থুবড়ে পাশের কাদা ভরভর ড্রেনের ওপর পড়ল গফুর। তারপর যেই-না উঠে দাঁড়াতে যাবে অমনি পল্টনের এক লাথি। আবার যেই উঠতে যাবে আবার লাথি। ফের লাথি।

তবুও ওরই মধ্যে পাঁকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা শোল মাছের মতো পিছলে সরে এল গফুর। তারপর কাদামাখা রক্তমাখা দেহে উঠে দাঁড়িয়েই ডান্ডা ফেলে, চাকু বার করল। কত মানুষের জীবন যে ওই চাকুর মুখে গেছে তার হিসেব বুঝি গফুরেরও নেই।

সদাশিববার চিৎকার করে উঠলেন, কী হচ্ছে এসব। গফুর তোমায় জোড়হাত! তোমার দশ হাজার টাকা তুমি পাবেই। ওদের ছেড়ে দাও। আমার কথা রাখো।

গফুর বলল, অনেক দেরি হয়ে গেছে বুড়া বাবা। খোদার কসম খেয়েছি আমি! ওদের সিনা আমি ফুটো করবই।

গৌতমের চেন এবার গফুরের কবজির ওপর পড়ল। হেঁচকা একটা টান। চাকু ছিটকে পড়ল রাস্তায়! গৌতম সেটা কুড়িয়ে নিয়েই ওর একটা কান কচ করে কেটে দিয়ে বলল, যা ভাগ। জিন্দগিভর ইয়াদ রাখনা।

মুহুর্তের মধ্যে কী যে হয়ে গেল কেউ কিছু ভেবে পেল না। সেই বিখ্যাত গফুরগুণ্ডা দুটি কিশোরের হাতে এমনভাবে পরাজিত হবে কেউ কি ভেবেছিল? হইহই করে উঠল সকলে। তা হলে গুন্ডা বদমাশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে তাদের প্রতিরোধ করা যায়? বস্তিবাসী সকলেই ছুটে এল এবার। এবং সবাই সমর্থন করল গৌতম ও পল্টনকে।

কানকাটা গফুরকে ওর দলের লোকেরা ধরাধরি করে নিয়ে গেল।

সদাশিববাবু পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁরও দু'চোখে তখন প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। রণক্লান্ত গৌতম ও পল্টনকে বললেন, তোমাদের অভিনন্দন জানাবার মতো ভাষা আমার জানা নেই বাবা। আজ তোমরা যা করলে তার তুলনা হয় না। তোমরা চলে গেলে বিপদ হয়তো আমাদের আরও বাড়বে। তবু তোমরা এই ভাবে সর্বত্র জয়যুক্ত হও এই কামনা করি।

পল্টন বলল, আমরা এতটা উত্তেজিত হতাম না দাদুভাই। যদি না গোপাকে বিরক্ত করবার জন্য এগিয়ে আসত ওরা। তাতেই খুন চেপে গেল।

গৌতম বলল, আমরা না থাকলে ওরা জোর করে বাড়িতে ঢুকত।

পল্টন বলল, গোপাকে দেখেই আমার দিদিদের কথা মনে হল। তাদের কেউ অমর্যাদা করবে আর আমরা বসে বসে দেখব তা কী হয়? মা-বোনেদের মর্যাদা রক্ষা করতে যদি নিজের জীবনও বিপন্ন করতে হয়, তা করতেও আমরা প্রস্তুত। যাকে নিয়ে এত কাণ্ড সেই গোপার তখন ভাবান্তর। সে অবাক চোখে চেয়ে রইল পল্টন ও গৌতমের দিকে। গৌতমের সেই বিক্রম, ওর ওই সুন্দর সুগঠিত শরীরে রুখে দাঁড়ানোর ভঙ্গি, ওর ওইভাবে সিনেমার নায়কদের মতো চেন ঘোরানো, সবই নাটকের দৃশ্যের মতো মনে হল। ওর খুব ইচ্ছে হল দুটো জয়মাল্য পরিয়ে দেয় এই দুই বীর কিশোরের গলায়। কিন্তু মালা তো এখানে নেই। তাই ও চোখের পাতা ফেলতেও ভুলে গেল।

গৌতম ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল একটু।

খুশিতে উপচে পড়ল গোপা। আনন্দে নন্দিত হয়ে ফুলেভরা মাধবী লতাটির মতো দুলে উঠল।

ওরা ঘরে এলে গোপা বলল, বসো। তোমাদের জন্যে চা করে আনছি। গৌতম ও পল্টন সোফায় এলিয়ে দিল দেহটা।

ছয়

দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পর ভেতরবাড়িতে শুতে গেল ওরা। সদাশিববাবু বাইরের ঘরেই রইলেন। পল্টন আর গৌতম দু'জনেই শুয়ে শুয়ে নানারকম আলোচনা করতে লাগল। আলোচনাটা অবশ্যই গফুরকে নিয়ে। ওর কান কেটে সমুচিত শিক্ষা তো ওকে দিয়েছে। কিন্তু ওরা চলে গেলে এই ঝাপটাটা সত্যসুন্দরবাবু যে কী করে সামলাবেন সেটাও একটা ভাবনার বিষয়। আলোচনা করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়ল পল্টন।

গৌতম শুধুই এপাশ ওপাশ করতে লাগল। টেবিলের ওপর প্লাস্টিক জাগে জল ছিল। ঢক ঢক করে খেল খানিকটা। তারপর সিঁড়ি বেয়ে ওপরের ছাদে উঠল।

এখানে এখন কনকনে ঠান্ডা। অথচ ছাদে কত রোদ্দুর। আর খোলা আকাশের নীচে এই ছাদের ওপর থেকে আজকের পাটনা বা অতীতের পাটলিপুত্র কী অপরূপ।

ছাদে উঠেই গৌতম দেখল গোপা সেই মিঠেকড়া রোদে বসে নিশ্চিন্ত মনে কেমন চুল শুকোচ্ছে। গৌতমকে দেখেই খুশিতে উপচে পড়ে বলল, কী হল! ঘুম হল না বুঝি সাহেবের?

না। পল্টনটা যা নাক ডাকাচ্ছে তাতে ঘুম আর আসবে না। তা ছাড়া দিনে আমি ঘুমোতে পারি না।

ঠিক আমারই মতো।

তুমি তা হলে দিনের বেলা না ঘুমিয়ে ছাদে বসে চুল শুকোও?

সব সময় নয়। তারপর বলল, তবে যা বীরত্ব তুমি দেখিয়েছ, তাতে একটু ঘুমিয়ে পড়া তোমার উচিত ছিল। তোমাকে দেখে তখন আমার কী মনে হচ্ছিল জানো?

তোমার মনের কথা আমি কী করে জানব?

আমার মনে হচ্ছিল তুমি সেই সিনেমায় দেখা স্বপ্ন কি সওদাগর। ভয় লাগছিল। আবার ভালও লাগছিল।

তাই নাকি?

তবে অতটা বাড়াবাড়ি না করলেও পারতে।

তোমার জন্যই তো করলাম। যেই শুনেছি তুমি আসার পর থেকেই ওরা তোমাকে অযথা বিরক্ত করছে, অমনি মাথাটা গেল গরম হয়ে। মেয়েদের কেউ বিরক্ত করলে আমার খুব রাগ হয়।

গোপা গৌতমকে ছাদের আলশের দিকে টেনে নিয়ে গেল। তারপর বলল, ভাগ্যে বাবলিদির বিয়ে উপলক্ষে এখানে এসেছিলাম, তাই তো তোমার মতো একজন বীরপুরুষের দেখা পেলাম। এখানে এসে একা একা কী বোর যে লাগছিল তা কী বলব। তার ওপরে ওই উপদ্রব। অথচ কাকুমণি বা দাদুভাইকে ফেলে যেতেও পারছিলাম না। আজ এই যে বিয়ে বাড়িতে যাব আর ফিরছি না। আমি এখান থেকেই পালাব কাল! মাসে একবার গান শিখতে আসতাম। তাও আর আসা হবে না পাপেদের জ্বালায়। কাকুমণি যখন আমাদের ওখানে যাবেন তখনই একটু তালিম নিয়ে নেব।

গৌতম বলল, সেই ভাল। এখানকার যা অবস্থা তাতে আর তোমার এখানে না-আসাই উচিত। এলেও মাকে নিয়ে আসবে।

আমার না খুব ইচ্ছে করছে আমার মায়ের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিতে। আমার বন্ধুদের দেখিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে যে, আজকালকার ছেলেরা সবাই কাপুরুষ নয়। আর সব গৌতমই, বুদ্ধদেব নয়। মগধের মাটিতে কলির গৌতমও পৌরুষে ঘা লাগলে চণ্ডাশোক হয়ে ওঠে। এতক্ষণ ছাদে বসে আমি তোমার কথা খুব বেশি করে ভাবছিলাম! আমার মতো এক অতি নগন্যা মেয়ের জন্যে আর একটু হলেই তুমি জীবন দিতে যাচ্ছিলে। যদি কোনও অঘটন ঘটত তা হলে কী হত বলো তো?

কী আবার হত? মরে যেতাম। সব মানুষই মরণশীল। তবে শত্রুর শেষ করে যদি মরতাম, তোমরা কিছুদিন শান্তিতে থাকতে। মনুষ্যত্বের বিকাশ তার বেঁচে থাকায় নয়, প্রতিরোধ করবার ক্ষমতা রাখায়।

গোপা অবাক হয়ে গেল গৌতমের কথা শুনে। এইটুকু একটা ছেলের মুখে এমন জ্ঞানের কথা কী করে আসে? কতই বা বয়স গৌতমের? এখনও স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি হয়তো। সবে গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে। ও অপলকে চেয়ে রইল ওর মুখের দিকে।

গোপার দিকে চেয়ে থাকতে গৌতমেরও ভাল লাগল খুব। গোপার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ওর মুখে। আজকাল ফ্রকের বদলে মেয়েরা স্কার্ট পরে। গোপাও তাই পরেছে। লম্বা বেণীটি পিঠ বেয়ে কোমরের কাছে দুলছে। ওর ফর্সা রং রোদের ছটায় ফুট ফুট করছে। ঠিক যেন একটি গন্ধরাজ অথবা ঝরে পড়া শিউলি ফুলটি।

মাথার ওপর দিয়ে একটা হেলিকপ্টার উড়ে গেল কোথায়।

গোপা বলল, তুমি কলেজে পড়?

উঁহু! সামনের এপ্রিলে ফাইনাল দেব।

মাধ্যমিক?

হ্যাঁ। তুমি?

আমি দেব সামনের বছর।

তারপর আরও পড়বে নিশ্চয়ই?

হ্যা। আর্টস নিয়ে পড়ব। বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনেছ তো? শুনেছি। মদনমোহন মালব্য যার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আমি সেইখানেই ভরতি হব।

তোমার কী ভাগ্য।

তোমার ভাগ্যটাই বা খারাপ কী? বাঙালির ছেলে বাংলায় আছ। বাংলা পড়ছ। একাধিক স্কুল-কলেজ আছে। আমাদের তো সবই হিন্দি। তবে লেখাপড়ার মান খুব একটা খারাপ নয় আমাদের। ক’ ভাইবোন তোমরা?

আমি আর আমার বোন।

আমি একা। বাবা মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। শুধু মা আর আমি! অগস্তকুণ্ডার গলিতে একটা ছোট্ট বাড়ি আছে আমাদের। সেখানেই থাকি। তবে যে শুনলুম কাশীতে থাক।

বারাণসী। অগস্তকুণ্ডা কাশীরই একটা জায়গার কাশীতেই তো। যে কাশী সেই নাম। গোধুলিয়ার মোড়ের কাছে।

গোধুলিয়া! ভারী চমৎকার নাম তো।

কাশীর চৌরঙ্গি হল গোধুলিয়া। সবচেয়ে ব্যস্ত এবং যানজটের জায়গা। একবার এসো না আমাদের কাশীতে। খুব ভাল লাগবে তোমার। আমি তোমায় সব কিছু ঘুরিয়ে দেখাব। গঙ্গার ওপারে ব্যাসকাশী নিয়ে যাব। সারনাথে গৌতমবুদ্ধ যেখানে পঞ্চশিষ্যকে সর্বপ্রথম উপদেশ দেন, সেখানে যাব।

আমি যাব। নিশ্চয়ই যাব।

যেয়ো। তোমার আমার বন্ধুত্ব যেন এখানেই শেষ না হয়ে যায়। আমার মাকে তোমার কথা বলব। এই শীতেই তোমার বাবা-মাকে নিয়ে চলে এসো কাশীতে। তোমরা আমাদের বাড়িতেই থাকবে। আমরা সবাই মিলে হইচই করব। তোমার বোন, আমি, তুমি সব সময় গঙ্গার ঘাটে ঘাটে ঘুরব। বেণীমাধবের ধ্বজায় উঠব।

খুব ভাল হবে। তোমার ঠিকানাটা আমাকে দিয়ো। আমার ঠিকানা তুমি নিয়ো। তুমি আমাকে চিঠি লিখবে। আমি তোমাকে চিঠি লিখব। আসলে আমার অনেক ছেলেবন্ধু আছে। মেয়েবন্ধু একজনও নেই। তাই তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে আমার খুব ইচ্ছে করছে। তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হলে ভালই হয়।

এমন সময় পল্টন এসে হাজির হল সেখানে। বলল, কী রে! ছাদে এসে কী করছিস?

গোপার সঙ্গে একটু গল্প করছিলাম।

এদিকে যে তিনটে বাজল। তৈরি হতে হবে না?

গোপা বলল, তিনটে বেজে গেছে? তা হলে আর নয়। চলো তোমাদের একটু চা করে খাওয়াই। দাদুভাইকে চা দিই।

পল্টন বলল, চা খাওয়াও আর যাই করো, কদমকুঁয়ায় গিয়ে বাবলিদির বিয়ের আসরে তোমার একটা গান কিন্তু আমরা শুনব।

নিশ্চয়ই শুনবে। একটা কেন? যত বলবে তত গাইব। তবে যে গান গাইব সে গান শুনলে তোমরা কিন্তু কানে আঙুল দেবে।

কেন?

সে দোষ অবশ্য আমার নয়। কাকুমণি তো আমাকে বাসরঘরে গাইবার গান শেখাননি। উনি শিখিয়েছেন উচ্চাঙ্গ সংগীত। খেয়াল-ঠুংরি এই সব।

গৌতম ও পল্টন হেসে উঠল হো হো করে।

ওপর থেকে নেমে এসেই ওদের সাজগোজের প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়ে গেল। ওইটুকু মেয়ে। কিন্তু কী চটপটে। হিটারে চায়ের জল চাপিয়ে দুধ, চিনি, চা-পাতা এক সঙ্গে ফুটিয়ে চোখের পলকে করে ফেলল কয়েক কাপ চা। তারপর বাথরুমে ঢুকে একটু সাবান মেখে তৈরি হয়ে নিতে যেটুকু সময়।

সদাশিববাবু ধুতি-পাঞ্জাবি-শাল চড়িয়ে বললেন, নাতনির বিয়ে। কত আনন্দ করব, তার জায়গায় কী হয়ে গেল। এখন ঘর ফেলে বেরোতে ভয় করছে।

পল্টন বলল, কোনও ভয় নেই দাদুভাই। আজ সকালে যা হয়ে গেছে তারপরে আর কোনও মিয়া আসবে না এখানে ঝামেলা করতে। গফুরও তো এখন নার্সিংহোমে। আগে ও নিজের কান সামলাক। পরে অন্যের প্রাণ নেবে। ওরা ঘরে তালাচাবি দিয়ে বাড়ির বাইরে এল।

গলির মোড়ে যে পানওয়ালাটা ছিল সদাশিববাবু তাকে বললেন, তুমি তা হলে দোকান বন্ধ করে সময়মতো যেয়ো বচনভাই। আর একটু নজর রেখো বাড়িটার দিকে।

বচনভাই বলল, আপনি কোনও চিন্তা করবেন না বাবুজি। আজ আর কোনও ভয় নেই। যে মার খেয়েছে সব, ধারেকাছে কেউ নেই। আসলে এদের আমরা চিনি তো, এদের স্বরূপ দেখেছি। তাই ভয়ে কিছু বলতে পারি না। এই ছেলেদুটো হচ্ছে নতুন। উঠতি হিরো। টগবগে বয়স। কাজেই রাগের মাথায় দিয়েছে পিটিয়ে। তবে এই বয়সের ছেলে যে এত দুঃসাহসী হয়, তা কিন্তু ভাবিনি কেউ। গফুরের ইজ্জত একেবারে ধুলোয় লুটিয়েছে।

সদাশিববাবু একটু হেসে বড় রাস্তায় রিকশার দর করতে যেতেই একটা মোটর এসে থামল সেখানে। এক সুদর্শন যুবক সদাশিববাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকেই নিতে আসছিলাম। মাস্টারমশাই পাঠালেন।

তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারলুম না বাবা!

আমি ওনার ছাত্র। প্রকাশ।

কিন্তু আমরা যে চার জন।

গাড়িতে আরও তিনজন ছিলেন। অবাঙালি। প্রকাশ বলল, দু'জন হতে পারে। দু’জন উঠে আসুন, আর দু'জন রিকশায় চলে যাক। পল্টন বলল, সেই ভাল। গোপাকে নিয়ে আপনি উঠে পড়ুন। আমরা রিকশায় যাই।

সদাশিববাবু আর গোপা মোটরে বসল।

পল্টন আর গৌতম চলল রিকশাতে। রিকশা এগিয়ে চলল, কদমকুঁয়ার পথে। বেশ কিছুটা পথ এসেছে এমন সময় অঘটন।

হঠাৎ কোথা থেকে হেলমেটপরা এক দানব স্কুটার চালিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে এল ওদের দিকে। তারপর পল্টনদের রিকশার চাকায় একটা ধাক্কা দিয়েই কেটে পড়ল চোখের পলকে।

হালকা রিকশা সেই আঘাত সহ্য করতে পারবে কেন? তাই ধাক্কা লাগার সঙ্গে সঙ্গেই উলটে গেল রিকশাটা। পল্টন আর গৌতম দু’জনেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল রিকশা থেকে। পল্টন একেবারে ড্রেনের ওপর। আর গৌতম রাস্তার মাঝখানে। রিকশাওয়ালাও হুমড়ি খেয়ে পড়ল একটা লরির কাছে। ভাগ্য ভাল যে চাকার তলায় যায়নি।

আশপাশ থেকে অনেক লোক তখন একসঙ্গে হইহই করে ছুটে এল সেখানে। তারপর সবাই মিলে ধরাধরি করে ওদের টেনে তুলল। গৌতমের হাত-পা ছড়ে গেছে। জামাটাও ছিঁড়ে গেছে এক জায়গায়। শুধু তাই নয়, চিৎ হয়ে পড়ার জন্য মাথার পিছন দিকেও লেগেছে খুব। আর পল্টন? তার অন্য কিছু না হলেও ড্রেনের ময়লায় জামাপ্যান্ট মাখামাখি হয়ে গেছে।

পাশের একটি কল থেকে জল নিয়ে সেসব ধুয়েমুছে ফেললেও দাগ একটা রয়েই গেল। তার ওপর এই শীতকালে ভিজে জামাপ্যান্টে যেন কাঁপুনি ধরে গেল সারা শরীরে। একটি ওষুধের দোকানের কর্মচারীরা সহৃদয়ভাবে গৌতমকে একটু ফার্স্ট এড দিয়ে ছেড়ে দিল। সবই হল। এখন সমস্যা যেটা দাঁড়াল সেটা হল, এই অবস্থায় এই রকম ভেকে বিয়ে বাড়ি যাওয়া যায় কী করে?

যে রিকশায় ওরা আসছিল, সে রিকশার অনেক কিছুরই ক্ষতি হয়েছে। তাই সে আর যেতে চাইল না। ওরা তাই অন্য আর একটি রিকশা ভাড়া নিয়ে এগিয়ে চলল কদমকুঁয়ার পথে।

মিনিট দশেকের মধ্যেই কদমকুঁয়ায় পৌঁছে গেল ওরা।

তখন সন্ধে উত্তীর্ণ হয়েছে। সানাইয়ের পাগল করা সুরে সুরভিত আলোঝলমল একটি বিয়েবাড়ির সামনে ওরা রিকশা থেকে নামল।

সত্যবাবু কাছাকাছিই ছিলেন। অতিথি অভ্যাগতদের অভ্যর্থনা করছিলেন।

ওদের দেখেই ছুটে এলেন, কী ব্যাপার! এ কী অবস্থা তোমাদের? গৌতম বলল, আর বলবেন না। একটা স্কুটার এসে এমন ধাক্কা দিল রিকশাতে যে তার পরেই এই অবস্থা।

এঃ। তোমার তো অনেক জায়গাতেই চোট লেগেছে দেখছি। লোকটা ধরা পড়ল?

কে ধরবে? কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই তো হাওয়া। যেমন ঝড়ের বেগে এসেছিল তেমনই চলে গেছে।

সত্যবাবু পল্টনের হাত ধরে বললেন, এসো এসো, ভেতরে এসো। আপাতত আমার একটা ধুতি পরে শাল চাপাও গায়ে। না হলে এই ঠান্ডায় ভিজে পরে থাকলে অসুখ করে যাবে। বাবা কি তোমাদের সঙ্গেই আসছেন? না পরে আসবেন? আমি অত করে বলে এলাম একটু সকাল করে আসতে। বুড়োমানুষ। গৌতম বিস্মিত হয়ে বলল, সে কী! উনি আসেননি?

কই ননা—তো!

ওঁর তো আমাদের আগেই এসে যাওয়ার কথা। গোপাকে নিয়ে উনি মোটরে এসেছেন।

মোটর কোথায় পেলেন?

গৌতম আর পল্টন তখন সব বলল।

সত্যবাবু বললেন, সেরেছে। আমার ছাত্রদের কি বাবা চেনেন না? তা ছাড়া প্রকাশ নামে আমার কোনও ছাত্রই নেই।

গৌতম ও পল্টনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

কাকিমা কান্নাকাটি করতে লাগলেন। সত্যবাবুকে দোষারোপ করে বললেন, যত নষ্টের গোড়া হচ্ছ তুমি। কী দরকার ছিল এত সব ঝামেলার? গফুরকে একটু বুঝিয়েবাঝিয়ে ওর কথাটা মেনে নিলেই তো ব্যাপারটা চুকে যেত। এখন সারাজীবন শত্রুতা করবে ও। বাবা বুড়োমানুষ। কোনওরকম হেনস্থাই তিনি সহ্য করতে পারবেন না। তা ছাড়া গোপা পরের মেয়ে। ওর মাকে আমরা কী কৈফিয়ত দেব?

হঠাৎই বিয়েবাড়িতে একটা শোকের ছায়া নেমে এল। সানাইয়ের সুর নীরব হল। অতিথি অভ্যাগতদের মুখে কথা নেই।

এরই মধ্যে পল্টন ওর পোশাক পরিবর্তন করল।

বাবলিদি কী সুন্দর করে সেজেছিলেন। কিন্তু কান্নার অশ্রুতে সেই সাজের বাহার অনেকটাই ম্লান হয়ে গেল। গৌতম আর পল্টনকে কাছে টেনে বাবলিদি বললেন, তোমরা এসেছ এ যে আমার কী আনন্দ। কিন্তু এই আনন্দের দিনে এমন এক নিরানন্দের ব্যাপার ঘটে গেল যে তোমাদের সঙ্গে ভাল করে কথাও বলতে পারছি না। কারা এ কাজ করল বল তো? গফুর, না আর কেউ?

পল্টন বলল, আর কেউ কেন হবে বাবলিদি?

আমার মনটা যেন তাই বলছে। আচ্ছা, প্রকাশ না কী যেন নাম বললে, কেমন দেখতে তাকে?

খুব সুন্দর। ভদ্র চেহারা। তা ছাড়া মোটরেও তিনজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। অবশ্য সবাই অবাঙালি। আমরা ভাবলাম তাঁরা নিশ্চয়ই বিয়ে বাড়িতেই আসছেন, তাই কোনও সন্দেহ হল না।

তবেই বোঝো। গফুরকে তো তোমরা দেখনি। তা হলে বুঝতে ওর সঙ্গে

কোনও ভদ্র-চেহারার মানুষের যোগাযোগই সম্ভব নয়।

পল্টন বলল, দেখিনি মানে? আমরা ওর কান কেটে ছেড়ে দিয়েছি আজ। পল্টনের কথা শুনে বাবলিদি অবাক। কাকিমা এবং সত্যবাবুও বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, কী রকম!

গৌতম বলল, আপনারা জানেন না? গফুরের ব্যাপার নিয়ে পাটনা শহর তোলপাড় হচ্ছে আজ।

সত্যবাবু বললেন, আমরা কেউ কিছু জানি না। আসলে সারাটা দিন বিয়ে বিয়ে করে ধকলটা যাচ্ছে, তার ঠ্যালা সামলাতেই অস্থির হয়ে উঠেছি। কোনও কথাই কানে আসেনি আমাদের। কোনওদিকেই মন দিতে পারছি না।

কাকিমা বললেন, কী হয়েছে আগাগোড়া সব ব্যাপারটা খুলে বলো তো? পল্টন আর গৌতম সবিস্তারে বলল সব।

শুনে কপাল টিপে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন সত্যবাবু। তাঁর মাথার ভেতরটা যেন ঝিমঝিম করতে লাগল।

বাবলিদি বললেন, এই যদি হয়ে থাকে তা হলে দাদুভাই আর গোপাকে যারা নিয়ে গেছে তারা গফুরের লোক নাও হতে পারে! গফুর নিজেই যেখানে আহত সেখানে এমন প্ল্যানমাফিক অপহরণ করবার মতো সাহস এবং বুদ্ধিটা জোগাবে কে? শুধু কী তাই? ওই রিকশার ব্যাপারটাও নিছক দুর্ঘটনা নয়। ওটাও পরিকল্পনামতো শয়তানি। শত্রুপক্ষ যেই হোক না কেন, সে ওদের দু'জনকেই মেরে ফেলতে চেয়েছিল।

গৌতম বলল, তা যদি হয় এ তা হলে গফুরেরই কাজ। আমরা ওর কান কেটেছি। এর পরেও ও প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবে না তা কী হয়? আমাদের ওপর রাগ হওয়াটা ওর পক্ষে স্বাভাবিক। এখানে অন্য কেউ আসে কোত্থেকে? বাবলিদি বললেন, গোপাকে যেভাবে কিডন্যাপ করা হয়েছে। তাতেই অন্য লোকের সন্দেহটা মনের মধ্যে উঁকি মারছে। বিশেষ করে আজ কয়েক বছর এইসব এলাকা থেকে ছেলেমেয়ে চুরির হিড়িক পড়ে গেছে একটা।

কিন্তু সেইসঙ্গে দাদুভাইকেও নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী?

সন্দেহমুক্ত হবার জন্য। ওরা শুধু গোপাকে নিতে চাইলে তোমরা কি যেতে দিতে?

না।

তা হলে?

এমন সময় গৌতম হঠাৎ বলল, আচ্ছা বাবলিদি, এমনকী হতে পারে না? মাথামোটা গফুরকে পরিচালনা করত হয়তো একটি বিশেষ দল! তারা হয়তো সমাজের কোনও বিশেষ প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা এমনভাবে সবার চোখের আড়ালে থাকত যে, তাদের সন্দেহও করত না কেউ। তারাই হয়তো গফুরকে দিয়ে খারাপ খারাপ কাজগুলো করিয়ে প্রোটেকশন দিত। এখন গফুর বেকাদায় পড়ায়, তারা ধরা পড়ার ভয়েই হোক বা গফুরের ইমেজ নষ্ট হলে নিজেদের স্বার্থে ঘা পড়বে ভেবেই হোক, নিজেরাই ফিল্ডে নেমে পড়েছে।

ঠিক। তোমার অঙ্কে এতটুকুও ভুল নেই। তুমি ঠিকই অনুমান করেছ গৌতম। এখন এই মুহূর্তে ওরা তোমাদের মেরে গোপাকে অপহরণ করে সমস্ত অপরাধগুলো গফুরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছে। এখন যা কিছুই হোক-না-কেন সবাই সন্দেহ করবে গফুরকে। এমনকী পুলিশও এই সব অভিযোগের ভিত্তিতে গফুরকে অ্যারেস্ট করতে বাধ্য। অতএব ভেবে দেখতে হবে এই অলক্ষ্য শত্রুটি কে?

সত্যসুন্দরবাবু সব শুনে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, শোনো আমাকে এখুনি একবার যেতেই হচ্ছে থানায়। তোমরা একটু সাবধানে থেকো। বর আসবারও সময় হয়েছে। তবু আমাকে যেতে হচ্ছে। আমি না-আসা পর্যন্ত বাইরের কোনও লোককে তোমরা ওপরে উঠতে দেবে না। যে কোনও একজনকে আমি সিঁড়ির মুখে মোতায়েন রাখছি। বাবলির ঘর ভেতর থেকে বন্ধ থাকবে। ও ঘরে কেউ যেন না ঢোকে। পল্টন আর গৌতম থাক বাবলির কাছে। ওর ঘরে টাকাকড়ি, গয়নাগাটি সব কিছুই আছে। ও জিনিস খোয়া গেলে বিয়েই বন্ধ হয়ে যাবে হয় তো।

গৌতম বলল, আপনি একা যাবেন? আমিও যাই না কাকুমণি আপনার সঙ্গে? খবরদার নয়। ওই শত্রুদের হাতে তোমাদের জীবনও বিপন্ন। ওরা যেখানে তোমাদের প্রাণনাশের চেষ্টা করছে, সেখানে এই রাতের অন্ধকারে কখনও বাইরে বেরোয়? ঘরেই থাকো তোমরা।

কাকিমা বললেন, তাই বলে তুমি একা যাবে? কাউকে অন্তত সঙ্গে নাও। রঘুরাইকে ডাকাব?

আমার জন্যে চিন্তা কোরো না।

সত্যবাবু আর একটুও দেরি না করে, সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামলেন। তাঁর কয়েকজন ছাত্রও তখন এসে উপস্থিত হয়েছে। সত্যবাবু তাদের সকলকেই খুলে বললেন সব কথা। তারপর বর এলে যাতে অভ্যর্থনার কোনও ত্রুটি না হয়, এই রকম পরামর্শ দিয়ে থানায় যাবার জন্য যেই-না স্কুটারে উঠতে যাবেন, অমনি একটা পুলিশের গাড়ি এসে থামল সেখানে।

একজন ইনস্পেক্টর গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বললেন, আজ আপনার মেয়ের বিয়ে। কিন্তু এই শুভদিনে একটা খুব খারাপ খবর নিয়ে আসতে হল আমাকে।

সত্যবাবু আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ছল ছল চোখে আশঙ্কা প্রকাশ করলেন, আমার বাবার ডেড বডিটা ওরা কোথায় ফেলে রেখেছে? আপনি জানতেন ব্যাপারটা?

হ্যাঁ। একটু আগেই খবর পেলাম। তা যাক। বলুন ডেড বডিটা কোথায় পাওয়া গেছে?

মহেন্দুঘাটের কাছে। তবে উনি মৃত নন। সম্ভবত ওনাকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

মেয়েটার খবর কী?

মেয়েটা! কোন মেয়েটা?

আমার ছাত্রী গোপা। চোদ্দো-পনেরো বছরের কিশোরী।

তা তো বলতে পারব না। তবে আপনার বাবাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তুলে এনে হসপিটালে ভরতি করা হয়েছে। উনি কথাই বলতে পারছেন না। কাজেই মেয়েটার ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না। জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ওঁর মুখে না শুনে তো কিছু করা যাবে না।

সত্যবাবু বললেন, বাবাকে যখন মহেন্দ্রঘাটের কাছে পাওয়া গেছে, তখন মেয়েটাকে নিশ্চয়ই ওরা কাছে রাখেনি। জলপথে পাচার করেছে। আপনারা যে ভাবেই হোক উদ্ধার করুন তাকে। পারলে গফুরগুন্ডাকে অ্যারেস্ট করুন।

মেয়েটার একটা ফটো দিতে পারবেন?

না। ফটো কোথায় পাব?

তা হলে তো কিছুই করতে পারব না আমরা।

বেশ। আপাতত গফুরকে অ্যারেস্ট করুন। ও-ই সব বলবে। এটা ওরই কাজ। দলের লোক দিয়ে করিয়েছে।

ইনস্পেক্টর বললেন, গফুরকে কোথায় পাব? সে তো আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সত্যবাবু হেসে বললেন, দেখুন মানুষের ধৈর্যের একটা সীমা আছে। আপনারাই তো আশকারা দিয়ে মাথায় তুলেছেন ওদের। নেলোগুন্ডা, গফুর— এরা আপনাদের মদত না-পেলে এত বাড় বাড়তে পারে? আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। আপনি গফুরকে যে ভাবেই হোক ধরুন। ওকে ধরলেই মেয়েটাকে পেয়ে যাব।

দেখুন, গফুরকে ধরবার সাধ্য আমাদের নেই। তবে মেয়েটার ব্যাপারে আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। এখন আসুন আপনি আমাদের সঙ্গে হসপিটালে। আপনার বাবার সঙ্গে দেখা করুন, আর থানায় গিয়ে আমাদের খাতায় একটা মিসিং ডায়েরি লিখিয়ে যান।

ততক্ষণে পল্টন-গৌতম সবাই নেমে এসেছিল নীচে। কাকিমাও এসেছিলেন। গৌতম বলল, চলুন তো। আমরাও আপনার সঙ্গে যাই। থানায় গিয়ে ও সি-র সঙ্গে দেখা করে বলি গফুরকে ধরতে, পুলিশের বাধাটা কোথায়?

ইনস্পেক্টর বললেন, ও সি কেন? স্বয়ং পুলিশ কমিশনার এলেও অ্যারেস্ট করতে পারবে না গফুরকে।

কেন?

সে অমরাবতী নার্সিং হোমে এক অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে খুন হয়েছে আজই দুপুরে। তার ডেড বড়ি এখন পুলিশমর্গে। প্রকাশ্য দিবালোকে আততায়ী নার্সিং হোমে ঢুকে বন্দুকের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়ে গেছে ওকে।

সত্যবাবু বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন, গফুর খুন হয়েছে! ওকে মারে এমন দুঃসাহস কার?

হয়তো আপনার। নয়তো যে সাহসী ছেলেদুটো ওর কান কেটে দিয়েছিল তাদের। তাও যদি না হয়, বিরুদ্ধ কোনও শক্তি কাজ করেছে ওর বিপক্ষে।

গৌতম বলল, গোপাকে যারা অপহরণ করেছে তাদের মধ্যে এক সুদর্শন যুবকও ছিল। নাম প্রকাশ।

সেটা তদন্ত সাপেক্ষ। আমার দিক থেকে আমি অবশ্য চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখব না।

সত্যবাবু বললেন, ধন্যবাদ। মেয়েটার জন্য কিছু অন্তত করুন। ওকে খুঁজে না পাওয়া গেলে হয়তো আমাকে সুইসাইড করতে হবে। বিধবার একমাত্র সন্তান। তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারব না আমি।

সত্যবাবু পুলিশের জিপেই চলে গেলেন। কাজেই স্কুটার নিয়ে যাবার প্রয়োজন আর হল না তাঁর।

সত্যবাবু চলে যাবার পরমুহূর্তেই বরের গাড়ি এসে হাজির হল। কাকিমাই চোখের জলে বরণ করলেন জামাইকে। এ বাড়ির বিপদের কথা তখন লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। বরকর্তা বললেন, আপনারা কোনওরকমেই নিজেদের অসহায় ভাববেন না। শুভ কাজ মিটিয়ে নেওয়ার দায়িত্বটা আমিই নিচ্ছি। পুরোহিতের কাজ পুরোহিত করুক।

কাকিমা যেন আশার আলো দেখতে পেলেন।

সাত

সত্যবাবুর ছাত্রদের মধ্যে কাছাকাছি বাড়ি ছিল একজনের। সেসব শুনেটুনে পল্টন ও গৌতমকে নিয়ে গেল ওদের বাড়ি। তারপর নিজের প্যান্টজামা, সোয়েটার ইত্যাদি পল্টনকে পরতে দিল।

পল্টন বলল, তুমি যখন এতই করলে ভাই, তখন কিছু টাকার ব্যবস্থা আমাদের করে দাও। সঙ্গে রাখি। দাদুভাইকে যখন মহেন্দুঘাটের কাছাকাছি পাওয়া গেছে তখন ওরা নিশ্চয়ই গঙ্গার ওপারে পাচার করেছে গোপাকে।

হতে পারে। ওপারে ছাপরা জেলা। হয়তো বা শোনপুরের ভেতর দিয়ে পাচার করেছে উত্তরপ্রদেশে বা অন্য কোথাও। কিন্তু তোমরা দু'জনে এই অচেনা জায়গায় রাতদুপুরে ওদের খোঁজে যাবে নাকি?

ইচ্ছেটা তাই।

খুব সাবধান। মহেন্দ্রঘাটের এলাকাটা মোটেই ভাল নয়।

আমরা এমনভাবে যাব যাতে কেউ টেরও পাবে না।

কিন্তু তোমরা তো আদৌ চেনোই না জায়গাটা।

যদি নতুন করে তোমাদেরই কোনও বিপদ হয়?

খোঁজখবর করে যেতে গিয়ে

কী আর করা যাবে? তবু আমরা একটু চেষ্টা করে দেখি যদি কোনও ক্লু পাই। অর্থাৎ মেয়েটাকে ওরা ওইখান দিয়েই নিয়ে গেছে কি না বা যদিও নিয়ে গিয়ে থাকে তা হলে কীভাবে এবং ঠিক কতক্ষণ আগে—একটু জানবার চেষ্টা করি। ছেলেটি বলল, মাস্টারমশাই ফিরে এসে যদি জানতে চান তোমাদের কথা, তা হলে কী বলব?

সত্যি কথাই বলবে।

পল্টন ও গৌতম আর দেরি না করে কদমকুঁয়ার মোড় থেকে একটা রিকশা নিয়ে মহেন্দুঘাটে এল। আলোঝলমল পাটনা শহরের পথঘাট তখনও জমজমাট। ঘাটের কাছে একটি হনুমানমন্দিরে তখন ঢোল-খোল পিটিয়ে জোরে গানবাজনা হচ্ছে। এখানটা কোথাও আলো, কোথাও অন্ধকার। ওরা রিকশা থেকে নেমে চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে রাখতে লঞ্চঘাটের দোতলা কফি হাউসে উঠে এল। আর ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠল ওরা।

প্রকাশ নামের সেই সুদর্শন যুবক তখন এক কোণে বসে এক সর্দারজির সঙ্গে চাপা গলায় কী যেন বলছে ফিসফিস করে আর কফি খাচ্ছে।

ওরা ইচ্ছে করেই সেদিকে না তাকানোর ভান করে ওদের দিকে পিছু হয়ে দু'কাপ কফির অর্ডার দিল।

এই শীতেও যেন গায়ে ঘাম দিচ্ছে ওদের।

এরই ফাঁকে ওরা আড়চোখে দেখে নিল প্রকাশের চেয়ারের পাশে মেঝেয় একটা অ্যাটাচি রাখা আছে।

পল্টন বলল, যে ভাবেই হোক ওই অ্যাটাচিটা ওর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতেই হবে।

গৌতম বলল, কী ভাবে নিবি?

পল্টন বলল, তোর কাছে কিছু টাকা রাখ। একটু পরেই আমরা দু'জনে বিচ্ছিন্ন হয়ে আশপাশে কোথাও অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকব। তারপর ওরা যেই উঠে আসবে অমনি তুই একটা ল্যাং দিবি লোকটাকে। অথবা পড়ে যাওয়ার ভান করবি। সেই সুযোগে আমি ওটা ছিনিয়ে নিয়ে পালাব।

পারবি তো?

পারতেই হবে।

যদি ধরা পড়িস?

তা হলে ও নিশ্চয়ই আমাকে পুলিশে দেবে। আর পুলিশে দিলে, পুলিশকেই আমরা সব কথা খুলে বলব।

গৌতম বলল, আমার কাছে এখন সবচেয়ে রহস্যের ব্যাপার কী জানিস? কী?

এইরকম একজন অপরাধী একটি খুন, একটি আধা খুন এবং মেয়েচুরির মতো নোংরা কাজ করেও শহরের বুকে এমন প্রকাশ্য জায়গায় বসে আছে কী করে?

তার একমাত্র কারণ ও ধরেই নিয়েছে ওকে চেনা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। গফুরকে খুন করেছে ওদের পোষা গুন্ডা। দাদুভাইকে চলন্ত মোটর থেকে যেভাবে ফেলে দিয়েছে, তাতে ওরা ধরেই নিয়েছে সেই মহাপতনেই বৃদ্ধের মৃত্যু ঘটবে। আর গোপাকে অপরহরণ? ও তো শুধু নিয়েই এসেছে। তাকে নিয়ে গেছে অন্য লোক। ওর কাজ হয়তো শেষ। তা ছাড়া ওর চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে রীতিমতো ধনী লোকের ছেলে ও। কাজেই ওকে সন্দেহ করা বা ওর নাগাল পাওয়া একটা রীতিমতো কঠিন ব্যাপার। টাকার পাহাড় দিয়ে ওর সমস্ত অপরাধ হয়তো ওর বাবা ঢেকে দেবে।

ওরা যখন এই সব আলোচনা করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ওরা দু'জনে কথা শেষ করে উঠে দাঁড়াল। সর্দারজি আর প্রকাশ।

পল্টন ও গৌতম সতর্ক হয়ে সরে দাঁড়াল অন্ধকার ঘেঁষে একপাশে।

ওপার থেকে একটি লঞ্চ এপারে আসছে। হয়তো ওরা পার হবে এই লঞ্চে। গৌতম বলল, এখনই আক্রমণ না করে ওদের পিছু নে পল্টন। লঞ্চে গেলে ওদের ফলো করতে অসুবিধা হবে না। মোটরে গেলেই বিপদ।

তবে ওরা লঞ্চ এপারে এলেও ধরবার জন্য এগোল না। গেটের কাছে থমকে দাঁড়াল।

দু’জন ভোজপুরী সভয়ে এগিয়ে এল ওদের দিকে। প্রকাশ বলল, সব ঠিক হ্যায়?

বহুত গড়বড় হো গয়া শংকরজি।

ক্যা হুয়া?

ও অচানক পানিমে কুদ পড়ি। ইম্পসিবল!

ইচ্ছা করকে কুদ পড়ি ও। লাফিয়ে পড়েছে।

তুমি টেলিফোন কিঁউ নেহি কিয়া?

ফোন নাম্বার তো মুঝে মালুম নেহি।

সর্দারজি বাংলায় বলল, আরে বাবা লঞ্চের কাউন্টারে গেলে তো এপারে রিং করে দিত। তা ছাড়া তোমরাও তো সঙ্গে সঙ্গে জলে লাফিয়ে পড়তে পারতে? আন্ধেরিমে কুছ মালুম নেহি হুয়া ও কীধার গিরে হুয়ে।

তুমহারে লিয়ে ইয়ে দশ হাজার রুপাইয়া হামারা লুকসান হো গিয়া। আব ম্যায় ক্যা করু?

ভোজপুরী দু'জন নীরব।

সর্দারজি বলল, শেঠকো এ রুপিয়া বাপস দে দো শংকরভাইয়া। আউর উধার নয়নাগিরিমে ফোন কর দো মাল নেহি পঁহুছেঙ্গে।

শংকর বলল, তুম এক কাম করো। রাতভর চক্কর লাগাও। ও ডেড বডি পুলিশকো নেহি মিলনা চাইয়ে।

সর্দারজি বলল, মিলনে সে ভি লুকসান ক্যা হোগা? দিস ইজ অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট। আমরা তো ওকে মার্ডার করে ফেলে দিইনি। কাজেই পুলিশি ঝামেলা কিছু হবে না।

আরে তুমি বুঝছ না কেন দয়ালদা, মার্ডার আমরা না করলেও কিডন্যাপ তো করেছি। এদিকে গফুরের কেসটা আমাদের ঘাড়ে চাপছে। ওকে মার্ডারই বা করল কে?

নেলোর দল, আবার কে? গফুরের জন্য মাথা তুলতে পারছিল না। এখন এই ব্যাপারটাতেও আমরা জড়িয়ে পড়লাম। পুলিশ ভাববে কোনও পুরনো শত্রুতার প্রতিশোধ নিতেই বুঝি আমরা ওকে গঙ্গার জলে ফেলে দিয়েছি। তার মানে দু’ দুটো মার্ডার কেস।

আর মেয়েগুলো কোথায়?

ডিসুজার বাংলোয় আছে। ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে ওদের। গফুরের খুনের ব্যাপারটা না ঘটলে আজই পাচার করে দিতাম। তবে ওদের পাচার করতে হবে মুখখোলা কফিনে পুরে ওষুধের ভ্যান গাড়িতে।

ওরা কথা বলতে বলতেই সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামল।

ওরা নেমে যাওয়ার পর পল্টন ও গৌতমও নেমে এল। ভোজপুরীদুটো গিয়ে ঢুকল একটা বস্তির খোলার ঘরে। গৌতম ও পল্টন ভিলেনদের পিছু নিল।

যেতে যেতে চাপা গলার কথাবার্তা শুনতে পেল ওরা। প্রকাশ ওরফে শংকর বলল, মেয়েটার ওপর অনেকদিন ধরেই নজর ছিল আমার। চমৎকার মেয়ে। বয়স কম। বেনারসে থাকে। লুকিয়ে ওর বাড়িও আমি দেখে এসেছি। কৃষ্ণমূর্তিজি যেমনটি চাইছিলেন ঠিক সেইরকম। বেনারসে সুবিধে করতে পারিনি। তাই এখানেই কতদিন ওত পেতেছিলাম। আজকেই মওকা মিলল। বাবার বিজনেস পার্টনারদের নিয়ে রুবি হাউসে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি মাস্টারজির বাবা মেয়েটিকে নিয়ে রিকশা খুঁজছেন। দুটো ছেলেও ছিল সঙ্গে। গফুরের কান কেটে দিয়ে যে ছেলেদুটো?

সম্ভবত। আমিও একটা টোপ ফেলে দেখলাম লাগে কি না। ভাগ্য ভাল। বঁড়শিতে মাছ গিথল। ওরা গাড়িতে উঠতেই আমি করলুম কী, রুবি হাউসে পার্টনাদের নামিয়ে দিয়ে গাড়ি ছোটালাম মহেন্দ্রঘাটের দিকে। বুড়োটা চেঁচিয়ে পুলিশ ডাকতে গেল। তাই দিলাম এক ঝটকায় গাড়ি থেকে ফেলে। মেয়েটাকে বললাম, খুব সাবধান। চেঁচালেই বিপদ হবে। তা মেয়েটা তখনকার মতো চুপ করে গেল। আমি ওকে সোজা নিয়ে গিয়ে তুললাম ডিসুজার বাংলোয়। ডিসুজা আগের মেয়েগুলোকে তখনও বাগে আনতে পারেনি। তার ওপর কোত্থেকে দুটো ছেলেকে ধরে নিয়ে এসেছে। সব এক সঙ্গে পাঠাতে চায়।

সর্দারজি ওরফে দয়ালদা বলল, ডিসুজার দিকটা উনি সামলান। তুমি এক কাজ করো, এই মেয়েটার ব্যাপারে একটু নজর রাখো। মেয়েটি জলে ঝাঁপ দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু যদি ও কোনওরকমে প্রাণে বাঁচে তা হলে কিন্তু ঘোর বিপদ।

বিপদ কীসের?

বিপদের রাস্তাটা তুমিই তো দেখিয়েছ ভাই। ওকে ডিসুজার বাংলোয় নিয়ে যেতে তোমাকে কে বলেছিল? তা ছাড়া এতদিন এ লাইনে আছ, এখনও বুঝলে না, যারা বাধা না দিয়ে ভাল মানুষের মতো চুপচাপ থাকে, তারাই সবচেয়ে সাংঘাতিক হয়। মেয়েটি ভয় পাওয়ার ভান করে চুপ হয়ে গিয়েছিল। আর তুমি ভাবছিলে ও পোষা হরিণের মতো তোমার বাধ্য হয়ে গেছে। তা ছাড়া এও জেনে রেখো, জল এমন মারাত্মক জিনিস যে সাঁতার জানে না সে কখনওই নিজের থেকে জলে ঝাঁপিয়ে পড়বে না।

তোমার এ যুক্তিটা আমি মানতে পারলাম না। মেয়েটি আত্মহত্যার জন্যেও তো জলে ঝাঁপ দিতে পারে?

তা যদি হয় তবেই মঙ্গল। না হলে ও যদি বেঁচে ফিরে আসে তা হলে ডিসুজার বাংলোর খবর ও পুলিশকে দেবেই।

ডিসুজার বাংলো ও চিনবে না।

চোদ্দো বছরের মেয়ে। বয়সটা নেহাত ফেলনা নয়। এই বয়সে কত মেয়ের বিয়েই হয়ে যায়। ওদের স্মৃতিশক্তি এবং অনুসন্ধান করবার ক্ষমতা তোমার আমার চেয়েও ঢের বেশি।

কথা বলতে বলতে বেশ খানিকটা পথ যাবার পর একটা গলির ভেতরে ঢুকে পড়ল ওরা।

গলির মুখেই মস্ত একটি বাংলো। সেই বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপে ওরা অপেক্ষা করতে লাগল।

এমন সময় ওদের মধ্য থেকে হঠাৎই একজন দেখতে পেল ওদের। পল্টন ও গৌতম তখন গলির মুখে দাঁড়িয়ে দুষ্কৃতীদের গতিবিধি লক্ষ করছিল।

দুষ্কৃতীরা দেখামাত্রই ছুটে এল ওদের দিকে।

পল্টন হঠাৎ শংকরের দিকে একটা পা এগিয়ে দিতেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সে।

আর গৌতম করল কী, ছদ্মবেশী দয়ালদার দাড়িধরে ঝুলে পড়তেই নকল দাড়িগোঁফ সব খুলে গেল তার। কিন্তু সে কিছু করবার আগেই গৌতম ওর চোখ লক্ষ্য করে সজোরে একটা ঘুসি ছুড়ল।

দয়ালদা তখন চোখে হাত দিয়ে বসে পড়েছে সেখানে। ঘুসিটা বেশ মোক্ষম জায়গাতেই লেগেছে মনে হচ্ছে।

এদিকে যে বাড়ির দরজায় কলিং বেল টেপা হয়েছিল সেই বাড়ি থেকেও দু'-তিনজন লোক বেড়িয়ে ওই রকম দৃশ্য দেখে ছুটে এল ওদের দিকে।

পল্টন আর গৌতম তখন উপায়ান্তর না দেখে প্রাণপণে ছুটে চলল যে পথে এসেছিল সেই পথে। গৌতম পল্টনের আগে আগে ছুটছে। পল্টন পিছনে।

ছুটতে ছুটতে পল্টন বলল, আগুপিছু তাকাবি না। যেদিকে সুবিধে বুঝবি পালাবি।

গৌতম বলল, কিন্তু আমরা কি এইভাবে ছুটে পারব ওদের খপ্পর থেকে নিজেদের বাঁচাতে?

পারতেই হবে।

শত্রুরা তখন বুলডগের মতো ছুটে আসছে। ভাবটা এই, পেলেই যেন ছিঁড়ে খাবে।

হঠাৎ একটা ইট এসে লাগল পল্টনের মাথায়।

ও আর ছুটতে পারল না। মাথাটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করতে লাগল। মাথায় হাত দিয়ে ‘বাবারে’ বলে বসে পড়ল পল্টন।

ওরা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর।

গৌতম দেখেও থামল না। ছোটার গতি আরও একটু বাড়িয়ে দিল। বলা যায় না, থামতে গিয়ে যদি বা ধরা পড়ে! এখন ওকে পালাতেই হবে। পালিয়ে বাঁচতে হবে। না হলে কেউ-ই উদ্ধার হবে না।

পল্টনকে যখন ওরা ধরল, শংকরও তখন উঠে এসেছে।

শংকর বলল, আর একটা কই? আর একটা? তারপর পলায়মান গৌতমকে দেখে বলল, ওই তো! ওই—ওই...পালাচ্ছে। ধর ধর।

গৌতম তখন অনেক দূরে চলে এসেছে। ও যেখানে এসেছে সেখানেই মোড়ের মাথায় এক জায়গায় কতকগুলো কংক্রিটের ড্রেন পাইপ জড়ো করা ছিল।

ও তারই একটার মধ্যে ঢুকে পড়ল।

ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই মুখের ওপর একটা লাথি এসে পড়ল। সেই সঙ্গে অশ্রাব্য গালাগালি।

গৌতম নিরুপায় হয়ে মুখটাকে চেপে ধরল তার। যাতে আর না চেঁচায়।

শুরু হয়ে গেল প্রচণ্ড ধ্বস্তাধ্বস্তি। আর তারই ফলে ড্রেন পাইপগুলো দুড়দাড় করে পড়তে আর গড়াতে লাগল। ফলে হল কী, ধ্বস্তাধস্তির বদলে নিজেদের রক্ষা করতে দু'জনেই দু'জনকে জড়িয়ে ধরল।

গৌতম বুঝল প্রতিপক্ষ একটি মেয়ে। মেয়েটি বুঝল আগন্তুক একটি ছেলে।

গৌতম চাপা গলায় বলল, তুই মেয়েটা এত রাত্তিরে এর ভেতরে কী করছিস রে?

তু কৌন হো পুছনেবালি?

গৌতম বলল, কয়েকজন লোক আমাকে ধরবে বলে তাড়া করেছে। তাই আমি ভয়ে এর ভেতর ঢুকে পড়েছি। কিন্তু তুই যে এর ভেতরে থাকবি তা কী করে জানব? ওঃ। যা জোরে একটা লাথি মেরেছিস না?

মুঝে মাফ কর দো ভাইয়া। ম্যায় বুরা সমঝা তুমকো।

গৌতম বলল, কে তুই?

মেয়েটি বলল, বাঙালিদাদা, আমি রাস্তার মেয়ে। বেওয়ারিশ লেড়কি আছি। ,

আমার মা-বাবাকে আমি কখনও চোখে দেখি নাই। ভিখ মেঙে খাই। রাতে বিরেতে কত রকম লোক ঘুরে বেড়ায় চারদিকে। যদি কেউ আমাকে নিয়ে পালায় তখুন আমি কী করব। সেই ডরসে ভাগে হুয়ে আমি এইসব জায়গায় লুকিয়ে থাকি। আমি জেগে থাকব তো, আমার গায়ে কেউ হাত দিতে এলে তাকে আর আস্ত রাখব না। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়লে তো আমি জানব না কিছুই?

গৌতম বলল, ঠিক আছে। তোর কোনও ভয় নেই। তবে তোর পক্ষে এই জায়গাটাও খুব নিরাপদ নয়! তার কারণ এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে যে একটা বাড়ি আছে, ওই বাড়িটা হল শয়তানের ঘাঁটি। ওখানে তোর মতো মেয়েদের কিছু লোক চুরি করে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখে। পরে নয়নাগিরি না কোথায় যেন পাচার করে দেয়।

মেয়েটি বলল, সমঝ গিয়া। ও লোগ একরোজ ধান্দা লেকে হামারা পাস ভি আয়া থা।

তারপর?

হামকো কাম করনে বোলা ও আদমিকা সাথ। ম্যায় তো মু’পর থু কর দিয়া। কেন?

আরে বুরাই কা কাম। দেখো ভাইয়া, ম্যায় ইনসান সে পয়দা হুয়া লেড়কি। ভগবান মেরা মা-বাপ। শয়তানকা কাম কিউ করেগি? ম্যায় ভিখ মাংতা। লেকিন কিসিকা কোই চিজ চোরি করতা নেহি।

গৌতম বলল, তুই গরিব হলেও তোর মনটা খুব ভালরে। কী নাম তোর? মেরা নাম দুলালি।

গৌতম বলল, দেখ দুলালি, আমারই এক বন্ধুকে ওরা ওই বাড়ির ভেতরে আটকে রেখেছে। আমাদের পরিচিত একটি মেয়েকে নিয়ে ওরা পালিয়ে এসেছিল বলে আমরা ওদের পিছু নিয়েছিলুম। এখন বন্ধুকে কী করে উদ্ধার করি বল দেখি? তুই ওই বাড়ির ভেতর গেছিস কখনও?

নেহি তো।

তা হলে উপায়?

দুলালি কী যেন ভাবল। তারপর বলল, আচ্ছা বাহার তো নিকাল পহলে। ওরা হামাগুড়ি দিয়ে ড্রেন পাইপের বাইরে এল দু'জনে।

তখন বেশ রাত হয়েছে। তাই চারদিক নিঝুম। এই নোংরা গলিপথে রাস্তার কুকুরগুলো ছাড়া জনপ্রাণী নেই। ড্রেন পাইপ থেকে বেরিয়ে এসে গৌতম দেখল ভিখারিণী দুলালি, ওদেরই বয়সি একটি মেয়ে। ঘন কালো গায়ের রং। এত কালো যে সচরাচর দেখা যায় না। আর তেমনি সাদা ওর চোখদুটো। রুপোলি মাছের মতো যেন চক চক করছে। লম্বা একটি বেণী দুলছে পিঠের ওপর।

শতছিন্ন মলিন একটি ফ্রকপরে আছে। সম্ভবত নিয়মিত স্নান করে। তাই গা-হাত-পা বেশ পরিষ্কার।

দুলালি বলল, আভি বতাও তামাশা ক্যা।

গৌতম আগাগোড়া সব কথা খুলে বলল ওকে।

সব শুনে দুলালি বলল, দেখো ভাইয়া ও আদমি পুলিশকা এক জবরদস্ত অফিসার থা। আভি ও নোকরি নেহি করতা।

অবসর নিয়েছেন বুঝি?

হো সকতা। ও তো মুঝে মালুম নেহি। লেকিন কাম বহুত খারাবি করতা। করুক। ওর খপ্পর থেকে আমার বন্ধুটিকে কী করে উদ্ধার করি বল তো?

তা দুলালি কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর গৌতমকে বলল, আও মেরা সাথ। বলে গলির পর গলি, তস্য গলি পার হয়ে আবার যখন মহেন্দুঘাটের কাছে এল, তখন সেখানে একজন পানওয়ালা দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করছে। দুলালিকে দেখেই বেশ আদুরে গলায় বলল, ক্যারে দুলালিয়া। ক্যা ভৈল তেরি? ইতনা রাত হো গৈল, তোহরকা নিদ না আয়ি?

দুলালি ছুটে গিয়ে সব কথা বলল পানওয়ালাকে।

পানওয়ালা একবার দেখল গৌতমকে। তারপর বলল, এক মিলে গা তুমকো। লেকিন দুসরা নেহি মিলেগা!

গৌতম বলল, এক মিলেগা মানে?

আও মেরা সাথ।

বেশ খানিকটা ওর সঙ্গে যাবার পর একটা অনুন্নত এলাকায় এল ওরা। পানওয়ালা ওদের নিয়ে একটা বাড়ির ভেতর ঢুকতেই চমকে উঠল গৌতম। ছোট্ট একটি ঘরের মধ্যে এক খটিয়া পরিবারের লোকেদের সঙ্গে ময়লা

একটি ডুরে শাড়ি পরে বসে আছে গোপা।

গৌতমকে দেখেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল সে।

গৌতমও অবাক, এ কী! গোপা তুমি এখানে?

হঠাৎ দু'হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল গোপা। বলল, আমি আর কখনও এখানে আসব না। চাই না আমি গান শিখতে। তুমি আমাকে আমার মায়ের কাছে দিয়ে আসবে চলো লক্ষ্মীটি। তোমার দুটি পায়ে পড়ি।

গৌতম বলল, অবুঝ মেয়ের মতো কাঁদে না। এখানে তুমি কী করে এলে? আমাদের কত বিপদ তা জানো?

এইবার একটু আশ্বস্ত হয়ে গোপা বলল, কী বিপদ তোমাদের?

দাদুভাইকে ওরা গাড়ি থেকে ফেলে দিয়েছিল তা নিশ্চয়ই জানো? জানি। উনি কি বেঁচে আছেন?

হয়তো মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। আমরা এই খবর শুনে তোমার খোঁজে মহেন্দুঘাটে আসি। এখানে এসে শুনি তুমি ওদের চোখে ধুলো দিয়ে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েছ। কিন্তু তুমি যে প্রাণে বাঁচবে তা ভাবতেও পারিনি।

আমার বেঁচে থাকবার কথা নয়। যেমনি ঠান্ডা এখানকার গঙ্গার জল, তেমনি হচ্ছে জলের টান। কী ভাগ্যিস এই বাড়ির মেয়েরা তখন ঘাটের ধারে ছিল। তাই এদের এখানেই উঠেছি। এরা আমাকে একটু বেশি রাতে কদমকুঁয়ায় পৌঁছে দেবে বলেছে। তা ভালই হয়েছে তুমি এসে পড়েছ। আমি আর কদমকুঁয়ায় যাব না। ওই অভিশপ্ত জায়গায় আর না যাওয়াই ভাল। তুমি আমাকে এখুনি নিয়ে চলো স্টেশনে। আমাকে আমার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এসো!

গৌতম বলল, তাই কী হয়? বাড়ি যে যাবে গাড়ি ভাড়া আছে সঙ্গে? টাকা চাই না? তা ছাড়া কাকুমণি কী ভাববেন? তাঁরা বুঝি চিন্তা করছেন না আমাদের কথা? তাঁদের না জানিয়ে এইভাবে ছেলেমানুষের মতো কি চলে যাওয়া উচিত? তা ছাড়া আমাদের বিপদের কথা তো তুমি শোনইনি। তোমার খোঁজে এসে দু'জন দুষ্কৃতীর পিছু নিতে গিয়ে আমাদের কী অবস্থা হয়েছে জান? ওরা আমাদের এমন তাড়া করেছে যে আমি পালাতে সক্ষম হলেও পল্টন বেচারি আহত হয়ে ওদের কবজায় পড়ে গেছে।

শিউরে উঠল গোপা, তা হলে কী হবে?

যেভাবেই হোক ওকে শয়তানের খপ্পর থেকে ছিনিয়ে আনতে হবে। এখনই গিয়ে পুলিশকে বলতে হবে কথাটা।

দুলালি বলল, পুলিশবালে মদত নেহি করে গা।

গোপা বলল, তুমি কে?

গৌতম বলল, ও বেচারা বড় দুঃখী। ও ছিল বলেই তো এমন নাটকীয়ভাবে তোমাকে পেলাম।

ও কী করে জানল আমি এখানে আছি?

পানওয়ালাকে দেখিয়ে গৌতম বলল, ও আমাকে পল্টনের ব্যাপারে সাহায্যের আশায় এই দাদার কাছে নিয়ে আসে। ওনার কাছে এসেই তোমাকে পেলাম। তার আগে কেউই জানতাম না তুমি কোথায় আছ।

পানওয়ালা বলল, দেখো ভাই, একটা কথা। আমরা গরিব লোক। আর ওরা হল রাজা উজির। ওদের সঙ্গে লেগে আমরা পেরে উঠব না। ওই ডিসুজাসাহেব একজন সাসপেন্ড হওয়া জাঁদরেল পুলিশ অফিসার। অনেক তাবড় তাবড় লোক ওঁদের চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। কাজেই থানা-পুলিশ করেও খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না। এখানকার পুলিশ সব জানে। তাই ভয়ে ওদের এড়িয়ে চলে। এরা সব মাফিয়াচক্রের লোক। এখন তোমরা যেভাবেই হোক গা-ঢাকা দিয়ে পালাও। ওদের শিকারকে আমরা ঘরে ঢোকাই না। তবে আমি তো বাঙালির ছেলে। বহুদিন এই দেশে আছি। এখানকার মেয়ে বিয়ে করে ঘরসংসার করছি। এখন আর আমার মধ্যে কোনও বাঙালিয়ানা নেই। রীতিমতো খটিয়া বনে গেছি। তবু মেয়েটার বিপদের কথা শুনে ওকে আশ্রয় দিলাম। এখন যাও, চুপি চুপি চলে যাও তোমরা এখান থেকে। দুলালি তোমাদের পথ চিনিয়ে এগিয়ে দিয়ে আসবে।

কিন্তু আমার বন্ধুর কী হবে?

তা কী করে বলব? ওকে উদ্ধার করবার চেষ্টা তোমরা অন্য কোনও উপায়ে কোরো। কিন্তু দয়া করে যেন আমাদের জড়িয়ো না। এখন ভালয় ভালয় মেয়েটিকে নিয়ে পালাও। যদি ওরা কোনওরকমে জানতে পারে আমরা মেয়েটিকে এখানে আশ্রয় দিয়েছি, তা হলেও হয়তো আমাদের বিপদ হবে।

গৌতম বলল, না না। কোনও ভয় নেই তোমাদের। এই বিপদের দিনে তোমরা যা করেছ তার তুলনা হয় না। কেউ জানতে পারবে না এখানকার কথা। এমনকী পুলিশও না। পুলিশ জিজ্ঞেস করলে ও বলবে অতি কষ্টে সাঁতার কেটে ডাঙায় উঠে নিজেই চলে এসেছে ও।

তা হলে আর দেরি নয়। এই বেলা চলে যাও। গলি থেকে বেরিয়েই বড় রাস্তা পাবে। সেখানে অটো, রিকশা সব কিছুই পেয়ে যাবে তোমরা।

ওরা তখনই রওনা হল। এখানে থাকার প্রয়োজনটাই বা কী আর? এখন ঘরে ফেরা একান্ত দরকার।

দুলালিও চলল ওদের সঙ্গে।

বড় রাস্তার মুখে এসে গৌতম ওর পকেট থেকে দশটা টাকা বার করে দুলালির হাতে দিয়ে বলল, তুই এটা রেখে দে দুলালি। আর ভিক্ষে করা ছেড়ে দে। তুই খুব ভাল মেয়ে। ভালভাবে বাঁচবার চেষ্টা কর। ভিক্ষে না করে ঝি-গিরি কর।

দুলালি হেসে বলল, এ রুপিয়া তু রাখ দে ভাইয়া।

কেন? রেখে দেব কেন? আমি তোর দাদা হই। তোকে মিষ্টি খেতে দিলুম। আর শোন, তোর তো কেউ কোথাও নেই। আমাদের এইসব ঝামেলা মিটে গেলে আমি তোকে আমাদের দেশে নিয়ে যাব।

দুলালি হেসে বলল, নেহি ভাইয়া। ইয়ে শহর ছোড়কর ম্যায় কঁহি নেহি যাউঙ্গি। ইয়ে মেরা জনমভূমি হ্যায়। গঙ্গাজি মেরা মা। পাটনা মেরা বাপ। আচ্ছা ঠিক আছে। দেখা যাবে যাস কি না স। আমারও একটা বো

আছে। তোর চেয়ে অবশ্য অনেক ছোট। সে বড় হলে তার যখন বিয়ে দেব তখনও কী সে তার জন্মভূমির দোহাই দিয়ে শ্বশুরবাড়ি না-গিয়ে মা-বাবার কাছে পড়ে থাকবে ভেবেছিস? ওরে তুই একটা মেয়ে। তুই তো একদিন আরও বড় হবি। তুই কি চিরকাল ফুটপাথে পড়ে থাকবি আমরা থাকতে? আমার মা-বাবা তোর মা-বাবা হবে। আমি তোর দাদা হব। তোর মতো মেয়েকে কখনও ভেসে যেতে দিই? আজ এই মুহূর্তে তোর জন্যে কিছু করতে না পারলেও ঝামেলাটা একটু মিটতে দে। তারপর দেখবি কী করি। দুলালি অস্ফুটে উচ্চারণ করল, ভাইয়া!

গৌতম বলল, আসছিরে।

গোপা ততক্ষণে একটা অটোকে দাঁড় করিয়েছে। ওরা অটোয় চেপেই বলল, কদমকুঁয়া।

গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দুলালিকে হাত নেড়ে বিদায় জানাল ওরা। তারপর প্রশস্ত রাজপথের ওপর দিয়ে ছুটে চলল কদমকুঁয়ার পথে।

আট

অটো একেবারে বিয়েবাড়ির সামনে এসে থামল। নিমন্ত্রিতরা প্রায় সকলেই বিদায় নিয়েছে তখন। বরযাত্রীরা আছে। আছে কিছু পুলিশ। তবু যেন শ্মশানের নীরবতা। কারও মুখে কথাটি নেই।

ওরা যেতেই হই হই করে উঠল সকলে।

সত্যবাবু হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। এসেই গোপাকে জড়িয়ে ধরলেন বুকের ভেতর। বললেন, তোকে যে আর কখনও ফিরে পাব ত! স্বপ্নেও ভাবিনি মা। কীভাবে কী হল শুনি? তারপরই হঠাৎ কী মনে পড়তে বললেন, পল্টন কোথায়? ওকে দেখছি না কেন?

গৌতম কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, গোপাকে উদ্ধার করার মধ্যে কোনও কৃতিত্ব নেই। শুধু ভাগ্যজোরে ফিরে পেয়েছি ওকে। তবে—। তবে কী !

পল্টনকে হারিয়েছি।

তার মানে?

পুলিশের লোকেরাও তখন হেঁকে ধরেছে গৌতমকে। সচ মুচ বতাইয়ে ক্যা হুয়া থা?

গৌতম বলল, এক মিনিট। মেয়েটাকে আগে যথাস্থানে রেখে আসি। তারপর সব বলছি।

গোপার হাত ধরে প্রায় টানতে টানতেই ওপরে নিয়ে এল গৌতম।

শুভকার্য তখন সম্পন্ন হয়েছে।

বাসরঘর আলো করে বাবলিদি বসে আছেন। কাকিমাও ছিলেন আশপাশেই। গৌতম গোপাকে কাকিমার হাতে তুলে দিয়ে বলল, বহু কষ্টে গোপাকে ফিরিয়ে এনেছি কাকিমা। তবে পল্টনের খুব বিপদ। ও একেবারে শয়তানদের হাতে পড়ে গেছে। ওর খোঁজেই যাব এবার। গোপাকে সাবধানে রাখুন।

কাকিমা বললেন, সে কী! ওকে ফিরে পাব তো?

ভগবান জানেন। আমি আসছি। কাকুমণি নীচে আছেন।

গৌতম আর একটুও সময় নষ্ট না করে তরতর করে নীচে নেমে এল! তারপর 'আগাগোড়া যা যা ব্যাপার ঘটেছিল সব খুলে বলল সকলকে। শুধু দুলালির ব্যাপারটাই যা চেপে গেল। এবং বলল না কীভাবে উদ্ধার করেছে গোপাকে। শুধু এইটুকুই বলল, তাড়া খেয়ে পালিয়ে আসবার সময় হঠাৎ করে গঙ্গার ধারে অসহায় অবস্থায় আবিষ্কার করেছে গোপাকে।

গৌতমের কথা সকলে যেমন বিশ্বাস করল, তেমনি ভয় পেল ডিসুজার কথা শুনে।

কী ভাগ্যিস কাকুমণি জিজ্ঞেস করেননি, যে মেয়েটি চুড়িদার পরে উধাও হয়েছিল সে হঠাৎ ডুরে শাড়িটি পরে ফিরে এল কী করে?

পুলিশের যে এস আই এখানে ছিলেন তিনি সব শুনে বললেন, গফুরকে নেলোর দল খুন করবে এটা অবশ্য ভাবতে পারিনি। তবে আলোচনাটা যা শুনেছে এরা তাতে পরিষ্কার হয়ে গেছে একাজ নেলোই করেছে। এখন শংকর ও দয়ালদা নামের যে লোকটার কথা বলছে তাতে তো কেসটা আরও জটিল হয়ে গেল। বিশেষ করে ডিসুজার নাম শুনে তো নার্ভাস হয়ে পড়েছি। একেবারে মণিকাঞ্চন যোগ হয়ে গেছে। ডিসুজা এই অঞ্চলের সন্ত্রাস এবং কুখ্যাত ব্যক্তি। শংকর এবং দয়ালের সঙ্গে ডিসুজার যোগাযোগ অপ্রত্যাশিত। কেন না এই দুই ক্রিমিনালকে হত্যা করবার জন্য একসময়ে ডিসুজা উঠেপড়ে লেগেছিলেন। অথচ এরই মধ্যে এমন জোট, ধারণার বাইরে। ডিসুজাকে চ্যালেঞ্জ করাও বুকের পাটার দরকার। শংকর আর দয়াল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত। মাঝেমধ্যে ভাল ভাল ছেলেমেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে ওদের ছবির কাজে লাগায়। কিন্তু ডিসুজার কাজ হল ছেলেমেয়ে বিদেশে পাচার করা। সেটা আরও বিপজ্জনক। এখন শংকর ও দয়াল ওর সঙ্গে হাত মেলালে তো রক্ষে নেই।

সত্যবাবু বললেন, গৌতমের সাক্ষ্য নিয়ে ডিসুজার বাড়ি সার্চ করতে আমাদের অসুবিধেটা কোথায়? ডিসুজার গায়ে হাত না-দেওয়া যায়, শংকর ও দয়ালকে তো অ্যারেস্ট করা যাতে পারে?'

পারে। কিন্তু ওদের জামিনে বেরিয়ে আসাটা আটকাবেন কী করে? শংকর কে জানেন?

কে?

এস আই সত্যবাবুর কানের কাছে মুখ এনে কী যেন বললেন।

সত্যবাবু চোখদুটো বড় বড় করে বললেন, ওরে বাবা!

তা হলেই বুঝছেন তো কোথাকার জল কোথায় গড়িয়েছে? ভাগ্যবিপর্যয়ে এই কালচক্রে জড়িয়ে পড়েছেন আপনারা। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়েছে। বিপদটা আপনাদের ক্ষেত্রেও যেমনি চরম, আমাদের ক্ষেত্রেও কম নয়। তা হলে কী হবে?

কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না। আপাতত থানায় চলুন। ও সি কী নির্দেশ দেন দেখি। তাই চলুন তা হলে।

দু’জনেই গাড়িতে উঠুন।

সত্যবাবু গৌতমকে নিয়ে ভ্যানে উঠলেন। পল্টনকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ঘোর সংশয় দেখা দিল সত্যবাবুর মনে। যেতে যেতেই উনি বললেন, ছুটোছুটি আর উত্তেজনায় তোমার তো কিছুই খাওয়া হল না বাবা। খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই?

গৌতম বলল, অন্যদিন হলে খিদেয় পেট ছিঁড়ে যেত এতক্ষণে। আজ কিন্তু একটুও খিদে পায়নি। যা টেনশন যাচ্ছে। এতে কি খিদে পায়? তা অবশ্য ঠিক।

দাদুভাইকে কেমন দেখে এলেন?

ভাল নয়। শোনো, তোমাকে একটা কথা বলি। এত দুর্যোগ সত্ত্বেও বাবলির বিয়েটা ভালয় ভালয় মিটে গেছে। সব চেয়ে বড় কথা গোপাকে তুমি ফিরিয়ে আনতে পেরেছ। তুমি যে আমার কী উপকার করেছ তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। ওকে ফিরে না পেলে ওর মাকে আমি কী কৈফিয়ত দিতাম? তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবার মতো মুখও থাকত না আমার। ওই মেয়েটি ছাড়া ওর মায়ের কেউ নেই আর। একমাত্র মেয়ে। পরের মেয়ের দায়িত্ব যে কত, তা আজ বুঝলাম। তাই বলি বাব৷ যত কষ্টই হোক, ভোরের ট্রেনেই তুমি ওকে রেখে এসো ওর মায়ের কাছে। আমাকে দায়মুক্ত করো।

কিন্তু কাকুমণি, পল্টনের কোনও খোঁজখবর না-পেলে আমি কী করে যাব? ও যে এখন শত্রুর কবলে।

জানি। তবুও বলি, ঝামেলা যা কিছু তা গোপাকে নিয়েই। পল্টনকে নিয়ে নয়। তা ছাড়া শয়তানের ঘাঁটিটা যখন তুমি পুলিশকে বলে দিতে পেরেছ তখন ভয় কী? ও যদি বেঁচে থাকে তা হলে ওকে উদ্ধার আমরা করবই। কিন্তু মেয়েটাকে এক্ষুনি সরিয়ে না ফেললে নয়। তার কারণ শত্রুপক্ষ জানে মেয়েটা জলে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে মরেছে। কিন্তু পুলিশ জেনে গেছে ওকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। তা হলেই বুঝতে পারছ তো ব্যাপারটা জানাজানি হতে খুব একটা দেরি হবে না। আর তখন হবে কী ওকে হয়তো এই শহর থেকেই বার করতে পারব না আমরা।

গৌতম বলল, বেশ, তাই করব। আপনি পল্টনের ব্যাপারটা দেখবেন তা হলে?

নিশ্চয়ই দেখব। ওকে না দেখলে রুদ্রদাকে আমি কৈফিয়ত দেব কী? তুমি ভোরের ট্রেনেই ওকে নিয়ে চলে যাও। তারপর ওইখান থেকে সোজা বাড়ি ফিরে যেয়ো। ইতিমধ্যে আমি বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দিচ্ছি। তোমাদের বাড়িতে টেলিফোন আছে?

না। তবে আমাদের পাশের বাড়িতে আছে।

ফোন নম্বরটা মনে আছে তোমার?

হ্যাঁ। কাগজ দিন, লিখে দিচ্ছি।

সত্যবাবু একটা হিসেব লেখা কাগজ গৌতমের দিকে এগিয়ে দিলে তাইতে ফোন নম্বরটা লিখে দিল গৌতম। এরপর উৎকণ্ঠার নীরবতা। ভ্যান এসে থামল পুলিশের হেড কোয়ার্টারে।

নয়

ও সি বলরাম ত্রিবেদী সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, ও শয়তান ডিসুজা যব তক জিয়েগা তব তক সবকো জ্বালায়গা। বহুত খতরনক ও আদমি। পুলিশকো ভি ট্রাবল দেতা। আদমি কো ভি। ঠিক হ্যায়...। বলে এস আইকে বললেন, যাও মকান সার্চ করো। জলদি যাও। লেকিন...।

ডরো মাত।

এস আইকে তবুও ইতস্তত করতে দেখে ত্রিবেদী দারুণ রেগে গেলেন। তারপর নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সমঝ গিয়া। ম্যায় যা রহা হুঁ।

এস আই বললেন, হামকো গলদ মাত সমঝিয়ে স্যার। ও হামরা ডিপার্টমেন্ট কা এক বড়া অফিসার থা

লেকিন আভি ও এক মোস্ট অর্ডিনারি ক্রিমিনাল।

এস আই মাথা হেঁট করলেন।

ত্রিবেদী বললেন, চলুন। দেখি কোথায় ওরা আপনাদের ছেলেকে আটকে রেখেছে।

পুলিশের গাড়ি ঝড়ের বেগে ছুটে চলল রাজপথ ধরে। গৌতম সঙ্গে থাকলেও সে বুঝতে পারল না কোথা দিয়ে এবং কীভাবে ওরা পৌঁছে গেল সেই গলির মুখে।

একদল পুলিশ সহ মি. ত্রিবেদী, সত্যবাবু ও গৌতমকে সঙ্গে নিয়ে সেই কুখ্যাত বাড়িটার কাছে এসে হাজির হল।

বাড়ির দরজায় নক করতেই এক বৃদ্ধ চাকর এসে দরজা খুলে দিল।

ঘরের ভেতর ঢুকতেই সকলে দেখল দানবাকৃতি এক মধ্যবয়সি ভারিক্কি চেহারার লোক দু'জন বন্ধুর সঙ্গে তাস খেলছেন। ত্রিবেদীকে দেখেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, আরে ত্রিবেদীজি। আপ খুদ চলে আয়ে মেরে গরিবখানে পর? আইয়ে আইয়ে বয়ঠিয়ে।

ত্রিবেদী বললেন, আমি এখানে বসবার জন্য আসিনি মি. ডিসুজা। আমি জানতে এসেছি আপনি আপনার ওই নোংরা ব্যবসাটা এবার বন্ধ করবেন কি না? ডিসুজা হো হো করে হেসে বললেন, ত্রিবেদীসাব, আপ তো কানুন কা ধর্মাবতার। লেকিন ইতনা কলঙ্ক মুঝ পর মাত দিজিয়ে।

গৌতম বলল, কলঙ্ক তো আপনি নিজেই নিজের গায়ে মাখছেন মশাই। আমার এক বন্ধুকে আপনার লোকেরা নিয়ে এসে লুকিয়ে রেখেছে এখানে। তা ছাড়া আপনার দুই সাগরেদ শংকর আর দয়ালদার মুখে শুনেছি কয়েকটি ছেলেমেয়েকেও আটকে রেখেছেন আপনার এই বাংলোতে।

ডিসুজা এবার চোখ লাল করে বললেন, শয়তান কা বাচ্চা। অ্যায়শা কাম ম্যায় নেহি করতা। তেরা দোস্ত ইধার চোরি করনে আয়া তো মার মারকে উসকো জাহান্নমমে ভেজ দিয়া। বলে ত্রিবেদীকে বললেন, আপ অন্দর যাইয়ে। সার্চ করকে দেখিয়ে। লেকিন এক বাত। ফির কভি অচানক আকে হামকো ডিসটার্ব মাত কর না, সমঝা?

ত্রিবেদী বললেন, মি. ডিসুজা, আপনার এখানে সার্চ করে আমি যে কিছুই পাব না তা আমি জানি। তবু অভিযোগের ভিত্তিতে এখানে এসেছি। তবে একটা কথা মনে রাখবেন এখন কিন্তু আপনি আর এস পি নন। নিজের দোষে নিজের নাম সরকারি ব্ল্যাক লিস্টে উঠিয়ে সাসপেন্ড হয়ে বসে আছেন। আজ যারা আপনাকে মদত দিচ্ছে— এতটুকু স্বার্থে ঘা লাগলে কাল কিন্তু তারাই আপনাকে ব্ল্যাকমেল করবে। আর সেদিন আমি নিজে এসে আপনার হাতে হাতকড়া পরাব। এবং সেদিনেরও খুব বেশি দেরি নেই। আচ্ছা গুড বাই। বলে সকলকে বললেন, চলুন।

সত্যবাবু বললেন, একবার একটু খুঁজে দেখবেন না ছেলেটাকে যদি কোথাও লুকিয়ে রেখে থাকে?

কী লাভ? ও এখানে নেই। যেভাবেই হোক আমার আসার খবর পেয়ে পাচার করে দিয়েছে ছেলেটাকে। সেই সঙ্গে অন্য মেয়েদেরও। দেখছেন না উনি নিজের থেকেই জোর গলায় সার্চ করতে বলছেন।

এবার গৌতম বলল, আচ্ছা, নয়নাগিরিটা কোথায়?

ত্রিবেদী বললেন, নয়নাগিরি? ও নাম তো কখনও শুনিনি।

ওদের মুখে শুনেছি ওরা ওইখানেই সকলকে পাচার করে। সেখান থেকেই যা হবার হয়।

তা হলে অন্য কোনও স্টেটে। বিহারে নয়। তবে নামটা যখন কানে এসেছে তখন খোঁজখবর আমি নেবই।

সত্যবাবু বললেন, আপনি বাঙালি স্যার?

হ্যাঁ। অবশ্য বাংলার বাঙালি নই। প্রবাসী বাঙালি। আমার দেশ ছিল পূর্ববঙ্গে। যশোর জেলায়।

ছেলেটার ব্যাপারে তা হলে কী হবে?

চেষ্টা করব। ওরা নিজেরাই যখন ওদের ফাঁদে পা দিয়েছে, তখন ফল ভোগ করতেই হবে। ডিসুজা তো বলেই দিল জাহান্নমে পাঠিয়ে দিয়েছে। তা ওর জাহান্নম নয়নাগিরিও হতে পারে, আবার বুকে পাথর বাঁধা অবস্থায় গঙ্গার নীচেটাও হতে পারে। ছেলেটাকে আদৌ বাঁচিয়ে রেখেছে কিনা তাই বা কে জানে? এক এক সময় মনে হয় গুপ্তঘাতক দিয়ে মেরে ফেলি শয়তানটাকে। কিন্তু ওর সার্কেলটা এমনই যে, সব জেনেশুনেও আমরা অসহায়। আমিও ফ্যামিলিম্যান তো?

গৌতম বলল, আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না? মহেন্দুঘাটের বস্তিতে ভোজপুরী লোকদুটিকে ঢুকতে দেখেছিলাম, মানে যারা গোপাকে নিয়ে পালাচ্ছিল বা যাদের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েছিল গোপা। সেই লোকদুটোকে মোচড় দিয়ে কোনও কথা আদায় করা যায় না?

ত্রিবেদী বললেন, হ্যাঁ। সেটা অবশ্য করা যায়। চলো তো দেখি।

ওরা মহেন্দুঘাটে এসে যখন পৌঁছল তখন নিস্তব্ধ চারদিক। কেউ কোথাও নেই। একে তো শীতকাল। তায় রাতও গভীর। সবাই ঘরের ভেতর দরজা জানালা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছে যে যার।

তারই মধ্যে পুলিশ নিয়ে ঠিক জায়গায় গিয়ে হাজির হল গৌতম। কিন্তু হলে কী হবে? বাড়ি ঠিক করতে পারল না।

ত্রিবেদী নিজেই এবার চিৎকার করে উঠলেন, পুলিশ পুলিশ। তারপর ঢিসুম ডুসুম করে দুটো বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করালেন একজন কনস্টেবলকে দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিকের মতো কাজ হল। বেশ কয়েকজন লোক কাঁচা ঘুম ভেঙে ঘর থেকে বেরিয়ে এল বাইরে। তাদের সঙ্গে সেই ভোজপুরী দুটোকেও দেখা গেল।

গৌতম দেখেই চিনতে পারল তাদের। বলল, ওই তো। ওই সেই লোকদুটো। পুলিশ দেখেই ওরা ছুটতে গেল।

ত্রিবেদী হুংকার দিলেন, হল্ট।

একজন থামল আর একজন যেই পালাতে গেল ত্রিবেদী বললেন, ফায়ার। কনস্টেবলরা গুলি করল।

গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল লোকটি।

যে লোকটি ধরা দিল ত্রিবেদী তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে বললেন, ক্যা নাম তুমহারা।

মেরা নাম যজ্ঞেশ্বর।

সামকো তুম ও লেড়কিকো কাঁহা লেকে ভাগা?

বাবু, মেরা বাত তো শুনিয়ে...।

ঠাস করে গালে একটা চড়।

কতদিন করছ এইসব নোংরা কাজ? কিতনা রুপিয়া মিলতা তুমকো?

রুপিয়া নেহি মিলতা বাবু। ও ডিসুজা সাব কা আদমি শংকরবাবু শোনপুরমে ভেজা থা। হাম দোনো ভাই মিল কর গিয়া। শংকরবাবুকা বাত নেহি শুননেসে ও হামকো বস্তিসে নিকাল দেগা।

শোনপুরে কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?

নেহি গিয়া সাব। ও লেড়কি অচানক পানিমে কুদ পড়ি তো হাম বাপস আয়ি। শোনপুরকা পতা?

ও তো মুঝে মালুম নেহি। শংকরজিনে কহা থা তুম স্টেশন পর চলা যাও, হুঁয়া আদমি মিলেগা।

ওই আদমিকে তুমি চেনো?

জি সাব।

কী নাম?

নাম নেহি মালুম। লেকিন ম্যায়নে বহুত দফে দেখা উনকো।

তোমরা কি আজ শুধু মেয়েই পাচার করছিলে? না কোনও ছেলেও পাচার করেছ?

ম্যায়নে তো এক আধা মুর্দা লেড়কা কো হাই ড্রেনমে ফিক দিয়া। ও মাই গড। কাঁহা পর?

চলিয়ে ম্যায় দিখাতা হুঁ!

যজ্ঞেশ্বরের সঙ্গে সকলেই চলল হাই ড্রেনের দিকে। গৌতম তখন কেঁদে ফেলেছে। বাড়ি ফিরে কী বলবে ওর মাকে? অর্ধমৃত পল্টন হাইড্রেনের অন্ধকূপে বিষাক্ত গ্যাসে এতক্ষণে মরেই গেছে হয়তো।

সত্যবাবুর চোখে জল। কী থেকে কী হয়ে গেল। সংকট এমনই একটা দিকে মোড় নিয়েছে যে মৃত্যুপথযাত্রী বাবার কাছে মুখে একটু জল দেবার জন্যও থাকবার উপায় নেই।

হাইড্রেনের কাছে গিয়ে ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে যজ্ঞেশ্বর বলল, এর্হি পর ফিক দিয়া ও লেড়কাকো।

পুলিশ নাকে রুমাল চাপা দিয়ে টর্চের আলো ফেলেও ভেতরে পাঁক আর নোংরা জল ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। পল্টনের কোনও অস্তিত্বই সেখানে নেই।

সত্যবাবু জিজ্ঞেস করলেন, কতক্ষণ আগে ফেলেছ তোমরা ছেলেটাকে? এক-দেড় ঘণ্টা পহলে।

ত্রিবেদী হতাশ হয়ে বললেন, চলুন থানায় চলুন। ও ছেলের আশা ছেড়ে দিন। কাল সকালের আগে আর কিছু হবে না। সকালবেলা ভেতরে লোক নামিয়ে চেষ্টা করব ডেড বডিটা উদ্ধার করবার।

পুলিশের গাড়িতে চেপেই ফিরে এলেন সকলে।

এস আই সত্যবাবুকে বললেন, আপ ঘর চলা যাইয়ে। আপকা পিতাজিক৷ নিধন হো গিয়া।

শিশুর মতন ডুকরে কেঁদে উঠলেন সত্যবাবু, বাবা নেই!

না। আভি খবর আয়া। সবেরে আদমি লেকে হসপিটাল চলা আইয়ে। ডেড বডি মিল যায়ে গা।

সত্যবাবুর চোখের সামনে সমস্ত চরাচরটা যেন দুলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে গৌতমকে নিয়ে একটা অটোয় করে চলে এলেন কদমকুঁয়ায়।

এরই মধ্যে সত্যবাবু অসম্ভব রকমের শক্ত করে নিলেন নিজেকে। গৌতমকে বললেন, শোনো, হাতে আর আধঘণ্টা সময় আছে। তুমি এখুনি গোপাকে নিয়ে চলে যাও এখান থেকে।

অসম্ভব। আপনি কী বলছেন কাকুমণি!

ঠিকই বলছি বাবা। পল্টনের নিয়তি ওকে কোথায় টেনে নিয়ে গেছে জানি না। মেয়েটাও যমের মুখ থেকে ফিরে এসেছে। আর এতটুকু রিস্ক নিতে আমি চাইছি না। গোপাও ছুটে এসেছে তখন। সে করুণভাবে বলল, এই সময় আমাদের চলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?

যাবার এই তো সময় মা। আর একটু পরেই আমাদের এ বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। এখন আমাদের শোকতাপ কান্নাকাটির পালা। সারাদিন আমরা বাবার শেষকৃত্য নিয়ে মেতে থাকব। ওই সময় তোমাদের দেখাশোনা করবে কে? আমাদের দেখবার লোকের অভাব হবে না। তোমরা এই বিশ্রী পরিবেশ থেকে সরে যাও। তা ছাড়া বলা যায় না ইতিমধ্যে আবার কী অঘটন ঘটে। বলে মানিব্যাগ বার করে দুটো একশো টাকার নোট গৌতমের হাতে দিয়ে বললেন, গোপাকে একা ছাড়তে সাহস পাচ্ছি না, তাই তোমাকে পাঠালাম। নিজের বোনের মতো সঙ্গে করে নিয়ে যেয়ো। তা ছাড়া এই পরিবেশে তোমারও থাকা চলে না। তুমি কাশীতে ওদের বাড়ি দু’-চারদিন থাকো। আমি তোমার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলে নেব। যাতে তিনি গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসেন সেইরকম ব্যবস্থাই করব। পল্টনের জন্য দুঃখ কোরো না। ওইরকম দুর্ভাগ্য তোমারও হতে পারত।

গৌতম ও গোপা প্রণাম করতে গেল সত্যবাবুকে। উনি বললেন, আমার অশৌচ অবস্থা। এ সময় আমাকে প্রণাম করতে নেই।

ওরা বাবলিদির সঙ্গে দেখা করতে গেল। কিন্তু বাবলিদি তখন আর প্রকৃতিস্থ নেই। কাকিমাকে জড়িয়ে ধরে ফুলে ফুলে কাঁদছেন বাবলিদি। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো দেহটা যেন ওঠা-নামা করছে।

গোপা আর গৌতম স্তব্ধ হয়ে গেল।

ওদের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা জামাকাপড়ের ব্যাগ ও অন্যান্য টুকিটাকি জিনিসপত্তর সব দরিয়াপুরে কাকুমণির বাড়িতেই রয়ে গেছে। তা থাক। জিনিসপত্তরের চেয়ে নিরাপত্তা বড়। ওরা আর বিলম্ব না করে বড় রাস্তায় এসে দাঁড়াল।

কাকুমণির সেই ছাত্রটি যে ওদের টাকা দিয়েছিল সে-ই তৎপর হয়ে অটোর ব্যবস্থা করে দিল।

গৌতম বলল, তোমার কাছে আমরা দুই বন্ধু ঋণী রয়ে গেলাম।

কী জন্য ভাই? ওই টাকাটার ব্যাপারে?

ঠিক তাই। আমাদের সব কিছুই তো কাকুমণির বাড়িতে।

ওর জন্যে তোমরা চিন্তা কোরো না। বিদেশে বিভুঁয়ে এরকম হতেই পারে। এখন তোমরা নিরাপদে নির্বিঘ্নে পৌঁছলে আমরা সবচেয়ে বেশি খুশি হব। ওখানে গিয়েই কিন্তু পৌঁছনো সংবাদ দিয়ো।

গৌতম বলল, কীভাবে দেব?

আমাদের বাড়ি ফোন আছে।

গোপা বলল, আমার মা জানেন। উনি তো মাঝে মাঝে ফোন করেন কাকুমণিকে। ফোনেই খবর দেব আমি। আপনারা একটু দেখবেন দাদুভাইয়ের শেষকাজটা যাতে ভালভাবে হয়।

গৌতম বলল, যেতে মন চাইছে না তবু যেতেই হবে।

থেকেই বা কী করবে? তার চেয়ে চলে যাওয়াই ভাল। এইরকম শোকতাপের পরিবেশে না-থাকাই উচিত।

গৌতম বলল, তা ছাড়া গোপাকে তো আর এখানে রাখা ঠিক নয়। হারানিধি যখন একবার ফিরে পাওয়া গেছে, তখন ওকে ওর মায়ের কাছেই পৌঁছে দিতে হবে।

আমি কি স্টেশন পর্যন্ত যাব তোমাদের সঙ্গে?

গোপা বলল, কোনও দরকার নেই। আপনি বরং কাকুমণিকে দেখুন। বাবলিদি যাতে নির্বিঘ্নে শ্বশুরবাড়ি যেতে পারেন সেই ব্যবস্থা করুন। অটো স্টার্ট নিল।

ওরা হাত নেড়ে টা টা করে বিদায় জানাল।

অটো এ-পথ, সে-পথ করে ফাঁকা রাস্তায় ছুটে চলল স্টেশনের দিকে।

বেশ খানিকটা এসেছে এমন সময় হঠাৎ বুঝতে পারল একটা স্কুটার ভয়ংকর গতিতে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। তাই না দেখে তো, ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল ওদের।

সর্বনাশ। দুর্ঘটনা ঘটবে না তো?

গৌতম অটো ড্রাইভারকে বলল, মেহেরবানি করকে জেরা হুঁশিয়ারিসে চালাইয়ে ভাই।

কুছ নেহি হোগা।

উধার দেখিয়ে।

স্কুটারটা তখন আরও কাছে এগিয়ে আসছে। একেবারে মুখোমুখি। তবে ধাক্কাটাক্কা না দিয়েই পাশ কাটিয়ে সোঁ করে বেরিয়ে গেল সেটা।

তারই মধ্যে আরোহীকে দেখে চমক উঠল গৌতম। সেই ভীষণ দানবাকৃতি শয়তানটা। যে ওদের রিকশায় ধাক্কা দিয়ে পালিয়েছিল।

গৌতম বলল, আবার বোধহয় আমরা একটা জালে জড়াতে যাচ্ছি। কীরকম।

ওই স্কুটারই আমাদের ধাক্কা দিয়েছিল কাল বিকেলে কদমকুঁয়ায় যাবার পথে। এখন আবার আমাদের টার্গেট করছে।

সে কী! তা হলে তো ভয়ানক ব্যাপার? আবার কী আমরা ওদের খপ্পরে পড়ে গেলাম?

মনে হচ্ছে তাই।

কী হবে তা হলে?

জানি না। এখন তোমাকে নিয়েই আমার ভয়।

গোপা সভয়ে জড়িয়ে ধরল গৌতমকে। দু' চোখ বুজে ওর কোলে মুখ লুকল।

গৌতম বলল, ভয় পেয়ো না। এই সময় অসীম ধৈর্য এবং সাহস সঞ্চয় করতে না পারলে সমূহ বিপদ। ওরা যে ভাবেই হোক টের পেয়ে গেছে আমরা পালাচ্ছি বলে।

কিন্তু কীভাবে পেল?

হয়তো বা ওদের কোনও চর ঘুরঘুর করছিল আমাদের আশপাশে।

ওই ওই আসছে। আবার আসছে।

সত্যিই এল। সেই দানব আবার ধেয়ে এল ওদের দিকে। এবং পাশ কাটিয়ে চলেও গেল।

ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে বলল, দুশমন হামকো টার্গেট করতা কিউ?

গৌতম বলল, ওর টার্গেট তুমি নও। আমরা।

সঙ্গে সঙ্গে অটো থামাল ড্রাইভার। বলল, উতারো।

গৌতম ভয় পেয়ে বলল, এই আধোঅন্ধকারে নির্জন পথে তুমি আমাদের নামিয়ে দেবে?

হ্যাঁ। ওই লোকের টার্গেট যখন তোমরা, তখন হামকো ছোড় দিজিয়ে। ওর সঙ্গে দুশমনি আমি করব না। ও অ্যাকসিডেন্ট করেগা তো হামারা গাড়ি টুট যায়েগা।

কিন্তু এইভাবে বাঘের মুখে ছেড়ে দিলে ও আমাদের মেরে ফেলবে যে।

তুমহারা বদনসিবমে যে হোগা ও-তো হোগাই।

স্কুটার তখন আবার সজোরে ছুটে এসেছে এদের দিকে।

অটো থেকে ওরা তখন নেমে পড়েছে। না-নামা ছাড়া উপায়ই বা কী? যতক্ষণ ওর খোশামোদ করবে ততক্ষণ আত্মরক্ষার অন্য কোনও উপায় ঠিক করে নেবে।

ওরা নামতেই স্কুটার এসে থামল ওদের পাশে।

নেলো বলল, কী হল, গাড়ি খারাপ হয়ে গেল নাকি?

গোপা-গৌতমের মুখে কথা নেই।

ড্রাইভার অটো নিয়ে পালাচ্ছিল। নেলো ঘুরে গিয়ে ধরল তাকে। একেবারে অটোর সামনে এমনভাবে স্কুটারটাকে নিয়ে গেল যে আর এগোতে পারল না সে।

নেলো স্কুটার থেকে নেমে এসে ড্রাইভারকে বলল, কাঁহা ভাগতা তুম? ড্রাইভার বলল, ও সব ঝুট ঝামেলাকি কাম হামি না করবে নেলোদাদা। ইসি লিয়ে নিকাল দিয়া দোনো কো। আভি তুম সামালো। ও লড়কা কিসিকা লেড়কি লেকে ভাতা কৌন জানে?

নেলো তখন ঠাস করে একটা চড় কষিয়ে দিয়েছে ড্রাইভারের গালে। ড্রাইভার গালে হাত বুলোতে বুলোতে বলল, মেরা ক্যা কসুর?

উঠাও উসকো। কাঁহা যা রহে ও?

স্টেশন পর।

লে চলো।

কিন্তু কাদের নিয়ে যাবে?

গৌতম ও গোপা তখন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে।

কালো রাত শেষ হয়ে এলেও আলোর আভাস নেই। স্ট্রিট লাইট এবং অন্যান্য যানবাহনের আলোয় পিচ ঢালা পথ যেন অজগরের পিঠ। তারই ওপর দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে দু'জনে। গৌতম একটা হাত শক্ত করে ধরে আছে গোপার। মাঝে মাঝে পিছু ফিরে দেখছে।

অটো আর স্কুটার দুটোই ওদের অনুসরণ করল।

ওরা কোনদিকে যাবে, কোথায় যে লুকোবে, কিছু ঠিক করতে পারল না। নেলো স্কুটার নিয়ে ওদের সামনে এসে পথ রোধ করল। থমকে দাঁড়াল ওরা।

নেলো বলল, পালাচ্ছ কেন তোমরা? এইভাবে ছুটে হেঁটে কি স্টেশনে যাওয়া যায়?

গৌতম বলল, পালাচ্ছি তার কারণ আছে। কাল বিকেলে তুমিই-না আমাদের রিকশাতে ধাক্কা দিয়েছিলে?

হ্যা দিয়েছিলাম। তখন অন্য একটা উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এখন আর প্রয়োজন নেই তার। তখন ভেবেছিলাম আমার দোষটা অন্যের ঘাড়ে চাপাতে পারব। কিন্তু এখন দেখছি ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে। তা ছাড়া তোমাদের ওপর তো আমার কোনও রাগ নেই। তাই অযথা তোমাদের কষ্ট দিতে চাই না। গফুর আমার দীর্ঘদিনের শত্রু। ওর সমুচিত শিক্ষা তোমরা দিয়েছ। আমিও ওকে উচিত শিক্ষা দিয়েছি। এখন নির্ভয়ে তোমরা স্টেশনে চলে যাও।

সেই অটো ওদের কাছে এসে বলল, উঠিয়ে

গোপা দু’হাতে গৌতমকে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে লাগল থরথর করে। বলল, না উঠো না গৌতম। এসবই এদের ছলচাতুরি।

নেলো বলল, ভয় নেই। আমি তোমাদের ক্ষতি করব না। ওঠো। এমন সময় স্টেশনে যাচ্ছ যখন নিশ্চয়ই তোমরা পঞ্জাব মেল ধরবে? তাড়াতাড়ি যাও। গোপা বলল, না না না।

গৌতম বলল, তুমি যা বলছ তা যদি সত্যি হয়। তবুও যে তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না ভাই।

আমাকে কেউ বিশ্বাস করে না। তবে তোমাদের মতো বীরকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি।

তোমার মনে কোনও মতলব না থাকলে এই শেষরাতে তুমি আমাদের পিছু নিলে কেন?

আমার মনে মতলব থাকলে এতক্ষণে আমি আমার কাজ করেই ফেলতাম। আসলে কাল বিকেলে আমি যেমন দুর্ঘটনা ঘটাতে চেয়েছিলাম, এখন আমি তার উলটোটাই করছি। এখন তোমাদের বডি গার্ড হয়ে এসেছি।

গোপার চোখে জল। বলল, মিথ্যে কথা।

গৌতম বলল, হঠাৎ এই পরিবর্তনের কারণ?

কারণ একটাই, গফুরের সামনে যারা বুকফুলিয়ে রুখে দাঁড়ায় তারা আমার সত্যিকারের দোস্ত। তোমরা ওর কান কাটলে, আর আমি তোমাদের প্রাণ নেব? তা ছাড়া আমি জানি তোমরা পালাতে গেলেই ডিসুজার লোক তোমাদের পিছু নেবে। হয়তো গুলি চালাবে। তাই সেসব কিছু যাতে না হয়, সেইজন্য আমি তোমাদের পিছু নিয়েছি। না হলে তো কখন ধাক্কা মেরে উলটে দিতাম অটোটা। নাও তাড়াতাড়ি করো।

গৌতম বলল, ডিসুজার লোক কি আমাদের পিছু নিয়েছে?

চোখে তো পড়েনি। বলেই রিভলভার বার করে বলল, এই দেখো, আমি একেবারে তৈরি হয়েই বেরিয়েছি। এই ডিসুজা শয়তানটা আমার পথের কাঁটা। আর ওর ওই চামচা দুটো। ওদের মেরে আমি গাড়োয়ালের দিকে পালাব। এখন তোমরা পালাও।

গোপা ও গৌতম অটোয় বসল।

নেলো ড্রাইভারকে বলল, এদের কাছ থেকে ভাড়া নেবে না।

নেহি লেগা।

এতক্ষণ এদের সঙ্গে আমার কী কথাবার্তা হল কিছু শুনলে?

কুছ না শুনেছি আমি।

ভেরি গুড। যদি কিছু শুনে থাক তা হলে—। বলেই রিভলভার দেখাল ড্রাইভারকে।

ড্রাইভার ভয়ে চোখ বুজল।

আ আবার চলতে শুরু করলে নেলো সেই একইভাবে ওদের অনুসরণ করল। তারপর স্টেশন এলাকায় এসে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে কেটে পড়ল সে।

ওরা অটো থেকে নামতেই ভাড়া না-নিয়ে পালাল অটোওয়ালা। ওরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

গোপা প্রায়ই আসা-যাওয়া করে, তাই লেডিজ কাউন্টার চেনে। গৌতমের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছুটে গিয়ে দুটো টিকিট করে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।

ট্রেন তখন এসে ছেড়ে যাবার সময় হয়েছে। খুব একটা ভিড় ছিল না তাই রক্ষে। ওরা ট্রেনে উঠে একটু বসবারও জায়গা পেয়ে গেল।

ট্রেন ছুটে চলল ঝড়ের বেগে।

অন্ধকার দূর হয়ে তখন একটু একটু করে ফর্সা হচ্ছে আকাশটা।

গোপা মনে মনে নেলোর ব্যাপারে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও, গৌতমের কিন্তু বারবার মনে পড়তে লাগল পল্টনের কথা। ওর মায়ের মুখখানিও চোখের সামনে ফুটে উঠল। এই মর্মান্তিক সংবাদ পেলে ওর মা নিশ্চয়ই আছাড়কাছাড় করে কাঁদবেন। দিদিরাও। আর বৃদ্ধ কাকামণি ইলাহাবাদ থেকে ফিরে এসে যখন শুনবেন এই খবরটা, তখন কী যে করবেন তা কি ভাবা যায়? অথচ নাটকের দৃশ্যের মতো পরপর ঘটনাগুলো এমনভাবে ঘটে গেল যে, ওরা যেন নীরব দর্শক। গৌতমের মা-বাবাই বা কীভাবে নেবেন ব্যাপারটা তাই বা কে জানে? বাবা কি সত্যি সত্যিই ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কাশীতে ছুটে আসবেন? এইসব কত কীর কথা চিন্তা করতে করতে দু’চোখ বুজে এল গৌতমের। সারাটা দিন দুপুর, রাত্রিতে এতটুকু শোয়াবসার সময় পায়নি। তাই যত রাজ্যের ঘুম নেমে এল দু’চোখ জুড়ে।

গোপাও বসে বসে ঢুলতে লাগল।

এবারে পল্টনের কথায় আসা যাক।

গৌতম তো ওদের খপ্পর থেকে কোনওরকমে পালিয়ে বাঁচল। কিন্তু পল্টন বেচারি ধরা পড়ে গেল শয়তানদের হাতে। আসলে মাথায় ইটটা না লাগলে ও ছোটা থামাত না। ইটটা লাগতেই ওর গা-মাথা কেমন যেন ঘুলিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ‘উঃ বাবারে’ করে বসে পড়ল। আর যেই না বসে পড়া, ওমনি ওরা এসে ধরে ফেলল ওকে।

এরপর পাঁজাকোলা করে ওকে ওরা তুলে নিয়ে গেল ডিসুজার বাংলোয়। শংকর আর দয়াল বলল, এই ছেলেটা আমাদের ফলো করছিল বস। ডিসুজা বলল, তাই নাকি! কে ছেলেটি?

দশ

সম্ভবত গফুরের কান কেটেছিল যারা তাদেরই একজন। আর একজন কোথায়?

পালিয়েছে।

ডিসুজা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তোমরা এতজন, আর এরা দু'জন। তাতেও পালায় কী করে?

শংকর বলল, গফুরের কান কাটার মতো দুঃসাহস যারা রাখে তাদের অসাধ্য কি কিছু আছে?

চমৎকার। তা হলে আর আমার হাতে হাত মিলিয়ে লাভ কী? এদেরই লিডার করে তোমাদের কাজ কারবার চালিয়ে যাও।

সকলের মাথা তখন হেঁট।

ডিসুজা বললেন, এরা তোমাদের কোথা থেকে ফলো করছিল? তা তো জানি না।

দয়ালদা বলল, সম্ভবত মেয়েটার খোঁজেই এসেছিল এরা।

কিন্তু মেয়েটাকে যে তোমরাই কিডন্যাপ করেছ, তা এরা জানল কী করে? সেটা ওকেই জিজ্ঞেস করুন বস।

ডিসুজা এবার এক পা-এক পা করে এগিয়ে এলেন পল্টনের দিকে। তারপর ওর চুলের মুঠি ধরে বললেন, কী নাম তোর?

পল্টন।

তোর আর এক বন্ধুর নাম?

গৌতম।

গফুরের কান তোরা কেটেছিলি?

হ্যাঁ।

হঠাৎ ওই ভূত চাপল কেন তোদের মাথায়?

ওর লোকেরা আমাদের এক বোনকে খুব বিরক্ত করছিল। সেইজন্যে তাদের আমরা শিক্ষা দিয়েছিলুম একটু। তা গফুর খবর পেয়ে আমাদের ওপর চড়াও হল। সেই রাগে আমরা ওকেও একটু শিক্ষা দিয়ে দিলুম।

তোদের সেই বোন এখন কোথায়?

গঙ্গার জলে।

তার মানে?

এই শয়তান শংকর তাকে কিডন্যাপ করে আপনার এখানে নিয়ে এসে তুলেছিল। পরে নয়নাগিরি না-কোথায় যেন পাচার করবার তালে ছিল। মেয়েটাকে লঞ্চে গঙ্গা পার করবার সময় সে ওদের অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপরই নিখোঁজ।

বোমার মতো ফেটে পড়লেন ডিসুজা, হোপলেস। তারপর শংকর আর দয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, শোনো, তোমরা কিন্তু খুব শিগগির ফেঁসে যাবে। এইসব কাজের ঝুঁকি নেবার আগে ভাল করে আটঘাট বেঁধে নিতে হয়। এখন কোনওরকমে মেয়েটি যদি বেঁচে যায় তা হলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে জানো? বিশেষ করে এই ছেলে দুটি যখন বাড়ি চিনে গেছে, তখন কেলেঙ্কারি একটা করবেই। তার ওপর নয়নাগিরির নামও জেনেছে।

শংকর বলল, মেয়েটা নির্ঘাত মরেছে। এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত্ত থাকতে পারেন বস। আর পালালেও ছেলেটাকে ধরে আনার দায়িত্ব আমাদের।

থাক। আর অত কাজ দেখাতে হবে না। এখন ছেলেটা যদি পুলিশে খবর দিয়ে থাকে কিংবা বাড়ি পৌঁছে থাকে তা হলে ওকে ধরতে যাওয়া মানেই আর এক কেলেঙ্কারির ব্যাপার।

দয়ালদা বলল, আপাতত এটাকে তো ভোগে পাঠিয়ে দিই?

ডিসুজা বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন, ওটা তো খুব সহজ কাজ। এখন কঠিন কাজটা আগে করো দেখি?

কী কাজ বলুন?

যে ছেলেমেয়েগুলোকে ডার্করুমে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এখুনি তাদের সরিয়ে ফেলো এখান থেকে।

কোথায় সরাব?

যেখানে হোক। মনে রেখো মি. ত্রিবেদী কিন্তু আমাদের ঘোর শত্রু। অনেক চেষ্টা করেও আমি ওকে বাগে আনতে পারিনি। যদি কোনওরকমে খবর পায় তা হলে কিন্তু সর্বনাশ হয়ে যাবে। দলবল নিয়ে এসে খেয়ে ফেলবে একেবারে।

শংকর বলল, আপাতত ওদের শোনপুরেই পাঠিয়ে দিই।

ইডিয়ট। এতটুকু বুদ্ধিশুদ্ধি যদি থাকত মাথায়। ওদের খোঁজে পুলিশ যদি এতক্ষণে মহেন্দুঘাটে এসে থাকে তা হলে কী করবে?

আমরা লঞ্চে পার করব কেন? আঘাটায় নিয়ে গিয়ে নৌকোয় পাচার করব। মাঝিমাল্লারা যদি পুলিশকে বলে?

দয়ালদা বলল, তার চেয়ে একটা কাজ করা হোক। আপনি ডা. সাহানিকে একবার ফোন করে দিন। আপাতত ওনার নার্সিংহোমের কোনও একটা ঘরে এখনকার মতো ঢুকিয়ে দিক ওদের।

ডিসুজা দয়ালের কথাটা শুনলেন। তারপর বললেন, হ্যাঁ, এখন এছাড়া আর কোনও পথ নেই। বলেই বললেন, তুমি এখুনি চলে যাও সাহানির কাছে। গিয়ে সব বলে ওনার অ্যাম্বুলেন্সটা নিয়ে চলে এসো। দেরি কোরো না। পুলিশ আসবেই। কাজ হয়ে গেলে তোমরাও গা ঢাকা দাও। ফোনে কথা বলার চেয়ে সেইটাই কাজের কাজ হবে।

শংকর বলল, আমি তা হলে...?

তুমি একটা সাইকেল নিয়ে চলে যাও। ওই ভোজপুরী বলদদুটোকে এখুনি ধরে আনো। এই ছেলেটার ব্যবস্থা ওরাই করুক। তারপর বললেন, না থাক। তুমি যেয়ো না। আমি অন্য লোক পাঠাচ্ছি। বলে ভেতরঘরে ঢুকে গেলেন ডিসুজা। বললেন, অশোককে পাঠালাম।

অশোক হচ্ছে দলেরই একজন।

শংকর বলল, আমিও কি গাঢাকা দেব কিছুদিনের জন্য?

শুধু তুমি কেন? আমিও দেব। তবে ত্রিবেদীর সঙ্গে একটু মোকাবিলা করে।

তুমি যে বারণ করছ বস। না হলে কবে আমি ওটাকে শেষ করে দিতাম। তোমার ভবিষ্যৎ ভেবেই বারণ করেছি। ফাঁসির দড়িকে যদি ভয় না পাও, তা হলে ও কাজ করতে পারো। তুমি জেলের ঘানি টানবে আর আমি শত্রুমুক্ত হয়ে সমানে ব্যবসা চালিয়ে যাব। সেটা যদি পারো তা হলে বলো। ত্রিবেদী-হত্যা ব্যাপারে আমি তোমাকে বিশেষভাবে মদত করতে রাজি আছি।

আপনি একটু এস পি, ডি এস পি-কে সামলান।

তাতে লাভ কী? মি. ত্রিবেদীর নৌকোর কাছি আরও অনেক বড় গাছের ডালে বাঁধা আছে। সেন্ট্রালের একজন মিনিস্টারও নাকি ওঁর স্ত্রীর সম্পর্কে কে হন। তা ছাড়া খুন করার পর যদি তুমি কোনওরকমে একবার ধরা পড় তখন মারের চোটে আগে আমার নামটাই বলে দেবে। অত কাঁচা কাজ কখনও আমি করি? আমাকে আমার ব্যবসা করতে দাও, তুমি তোমার কাজ করো। তা মেয়েটাকে যে ধরলে এখুনি তাকে নয়নাগিরি পাঠাতে হল কেন?

শংকর বলল, এইরকম একটি মেয়ের কথা কৃষ্ণমূর্তিজি আমাকে বেশ কিছুদিন ধরেই বলছিলেন। ওঁর সেই জন্মান্ধ ছেলেটির বিয়ে দেবার জন্য কোনও মেয়ে পাচ্ছিলেন না। তা একবার দূর থেকে উনি মেয়েটিকে দেখে বলেছিলেন ঠিক এইরকম একটি মেয়েকে পেলে লক্ষাধিক টাকাতেও কিনে নিতে রাজি আছেন। তা ওই ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবার উপযুক্ত মেয়ে পাওয়া গেলেও ফুটফুটে সুন্দরী মেয়ে একটিও পাওয়া যায়নি। সেইজন্যই আমি ওকে টার্গেট করেছিলাম। এমনকী দশ হাজার টাকা অ্যাডভান্সও নিয়েছি আমি।

বুঝেছি। কৃষ্ণমূর্তিজির উদ্দেশ্য অবশ্যই মহৎ। মেয়েটা সুখেই থাকত। কিন্তু আমার এখানে কী মেয়ের অভাব ছিল?

না। এ মেয়েটির বয়স খুব কম। তা ছাড়া আরও একটা অন্য ব্যাপার আছে। কী ব্যাপার!

কৃষ্ণমূর্তিজীর সেই হারানো মেয়েটির সঙ্গে নাকি এই মেয়েটির মুখের এক আশ্চর্য রকমের মিল আছে। তাই একদিকে তিনি কিশোর পুত্রের জন্য কিশোরী বধূ, অপরদিকে নিজের মেয়ের শোক ভুলতেন এই মেয়েটিকে পেয়ে। এই অপহরণের মধ্যে কোনও খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। ওকে আমাদের কোনও ছবির কাজেও লাগাতাম না, বিদেশেও পাচার করা হত না। পরে অবশ্য কৃষ্ণমূর্তিজি সস্ত্রীক এসে ওর মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতেন। বা এই ব্যাপারটা ওর মাকে মেনে নিতে বলতেন।

আমিও তাই ভাবছি। কারণ কৃষ্ণমূর্তিজি আমাদের সঙ্গে অনেক আজেবাজে ব্যাপারে যুক্ত থাকলেও, মেয়েঘটিত কোনও ব্যাপারে ওনার দুর্নাম নেই। তা মেয়েটির বাবা নেই?

শুধু মা ছাড়া কেউ নেই। তাও এখানকার মেয়ে নয়। কাশীর একটা অন্ধকার গলিতে ওরা থাকে।

কথা বলতে বলতেই অ্যাম্বুলেন্স এসে গেল।

দয়ালদা ঘরে এসেই বলল, সাহানিকে ম্যানেজ করেছি বহু কষ্টে। ওদের আনা যেতে পারে এবার।

দয়ালদা, শংকর এবং আরও জনা দুই-তিন লোক মিলে বিশেষ তৎপরতার সঙ্গে কয়েকজন নানাবয়সি ছেলেমেয়েকে বার করে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠাল। ডিসুজা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করলেন।

পল্টন ও ডিসুজাকে একা পেয়ে একটা মতলব ঠিক করল। ডিসুজা যেই ওদের বিদায় দিয়ে ঘরে ঢুকেছেন ও অমনি একটা চিনা মাটির ফুলদানি নিয়ে ডিসুজার মাথায় মারবার জন্য ছুটে গেল দরজার কাছে।

এতক্ষণ সবকিছু শুনছিল দেখছিল। কেনও ঢুঁ শব্দটি করেনি। এইবার হাজার হলেও ডিসুজা ছিলেন পুলিশের লোক। এইরকম পরিস্থিতিতে ঠিক কী করা উচিত তা তিনি জানতেন। তাই পল্টন কিছু করবার আগেই অতর্কিতে ওর হাতের কবজিতে একটা ঝটকা দিতেই ফুলদানিটা ছিটকে পড়ল হাত থেকে। ছিটকে সেটা পাশের দেওয়ালে লেগে চুরমার হয়ে গেল।

আর ঠিক সেই সময়েই সাক্ষাৎ যমের মতো দরজার সামনে এসে দাঁড়াল সেই ভোজপুরীদুটো, ফরমাইয়ে সাব।

ডিসুজা বললেন, চেহারা দুটো তো তৈরি করেছ নৃসিংহ অবতারের মতো। বলি খুপরিতে কি কিছুই রাখনি?

ভোজপুরীদুটো অসহায়ভাবে বলল, গলতি হো গিয়া হুজুর। অ্যায়শা তো কভি নেহি হুয়া। আভি হামকো কাম দিজিয়ে।

পল্টনকে দেখিয়ে ডিসুজা বললেন, ইয়ে লেড়কাকো লে যাও। মার মারকে গন্ধি নালা মে ডাল দো। জিন্দা মাত ছোড় না। আউর ইয়াদ রাখো। পোলিশ আনেবালে। ও জরুর আ যায়ে গা।

ভোজপুরী দু'জন বেড়ালে যেমন ইঁদুর ধরে ঠিক সেইভাবে ধরল এসে পল্টনকে।

ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল পল্টনের।

অসহায়ভাবে ওদের শিকার হল।

ওরা মারতে মারতে গলির মুখে নিয়ে এল ওকে।

দু'-চার ঘা খেতেই অবসন্ন হয়ে পড়ল ও। তাই ইচ্ছে করেই একটু বেশি রকমের নেতিয়ে পড়ার ভান দেখাল।

ভোজপুরীদুটোর একজন করল কী একটা হাই ড্রেনের ঢাকনা খুলে ওকে ফেলে দিল তার ভেতর। দিয়েই মুখটা এঁটে দিল। তারপর এদিকসেদিক তাকিয়ে দ্রুত চলে গেল নিজেদের বস্তির দিকে।

এগারো

সেই অন্তিম মুহূর্তে আতঙ্কে-ভয়ে পল্টনের মনের যে কী অবস্থা হয়েছিল তা ওইরকম বিপদের মুখোমুখি যে না-হয়েছে, সে ঠিক বুঝতে পারবে না। ওই আসুরিক শক্তির ধারক ভোজপুরীদুটোর হাতে মার খেয়ে ও সত্যিই নির্জীব হয়ে পড়েছিল। তারপর যে মুহূর্তে ওরা ওকে ম্যানহোলের ঢাকা খুলে একমানুষ গভীর ড্রেনের মধ্যে ফেলে দিল, তখন জীবনের আশা একেবারেই ছেড়ে দিল ও।

তবু জলমগ্ন ব্যক্তিও ডুবে মরার আগে একবার কুটো ধরে বাঁচতে চায়।

তাই সেও এই গর্তে নামার সময় পাছে বিষাক্ত গ্যাসটা সহসা ওর নাকে না যায় সেইজন্যে জীবনে শেষবারের মতো বুক ভরে একটা নিশ্বাস নিল। তারপরই সব অন্ধকার।

কাদায়-পাঁকে কোমর পর্যন্ত এমনভাবে ডুবে গেল যে একেবারে মাখামাখি হয়ে গেল ও। ভেবেছিল ওরা চলে গেলে নীচে থেকে ঢাকনাটা খুলে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু তা আর হল না। ড্রেনের দু'পাশের দেওয়াল এত দূরে যে পা গেল না। আর দমও রাখতে পারল না বেশিক্ষণ। নিশ্বাস ছেড়ে আর একবার দম নিতেই গা-মাথা ঘুলিয়ে কীরকম যেন হয়ে গেল। ঝিমঝিম করতে লাগল মাথাটা। বিষপ্রবাহ ঘটে গেল যেন সারা শরীরে।

এই নরকে মৃত্যুর পদধ্বনি শোনার আগে বড় বেশি করে মনে পড়ল মায়ের কথা।

এমন সময় হঠাৎই কোন জাদুতে খুলে গেল ঢাকনাটা।

ওর তখন সংজ্ঞাহীন হবার মতো অবস্থা।

একটা মুখ উঁকি দিল ওপর থেকে। কী যেন বলল। শুনতে পেল না। তারপরই নেমে এল একটা দড়ি।

এমন আশ্চর্যজনক ঘটনাও নাকি ঘটে?

ও সেই দড়ি ধরে কোনওরকমে কাদা-পাঁক থেকে নিজেকে মুক্ত করে ম্যানহোলের মুখের কাছে পৌঁছল। তারপর দু'হাতে ভর করে পায়ের বুড়ো আঙুলের টিপনিতে দড়িটা ধরে ওপরে উঠে এল। ওপরে উঠে আসার মুহূর্তেই একটি হাত টেনে তুলল ওকে।

বাইরের খোলা বাতাসে নিশ্বাস নেবার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন করে গা-মাথা আর একবার ঘুলিয়ে উঠল। হুড় হুড় করে বমি করল খানিকটা। তারপর কিছুই আর মনে নেই।

ঘোর কাটল অনেক পরে। যখন বুঝল কেউ যেন ওর শরীরের বোঝাটা অতিকষ্টে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। কতকগুলো রাস্তার কুকুরও ওদের সঙ্গে চলেছে।

ও ভয় পেয়ে বলল, কে! কে তুমি!

একটি মেয়েগলায় উত্তর এল, ঘাবড়াইয়ে মাত।

ওর তখন প্রচণ্ড শীত করছে।

মেয়েটি ওকে নামিয়ে দিয়ে হাত ধরে টানতে টানতে এক জায়গায় কতকগুলো ড্রেন পাইপের কাছে নিয়ে এসে বলল, অন্দর ঘুসো!

ড্রেন পাইপগুলো এত বড় বড় যে তার ভেতর দিব্যি শোয়াবসা যায়। তবে দাঁড়ানো যায় না।

অন্ধকারে মেয়েটির মুখ ভাল বোঝা যাচ্ছে না। অবশ্য এটুকু বোঝা যাচ্ছে এই মেয়েটি না-থাকলে ওকে ওই ভয়াবহ নরকেই পচে মরতে হত। কিন্তু কে এই রহস্যময়ী?

পল্টন কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, কে তুমি! তোমার পরিচয় দাও আমাকে। তুমি আমার জীবন রক্ষা করেছ। আমার আরও কাছে এসো। একটু দেখি তোমায়।

মেয়েটি বলল, ম্যায়নে তো কুছ নেহি কিয়া। যো কুছ কিয়া ও উপরওয়ালানে।

ওইসব কথা আমাকে বোলো না। আমি জানতে চাই তুমি কে?

দুলালি।

কিন্তু কার ?

ম্যায় তো আসমান সে পয়দা হুয়া লেড়কি। ভগবান মেরা মা-বাপ। আমি ভগবানকা দুলালি।

তুমি নিশ্চয়ই ভগবানের দুলালি। শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ। তুমি হচ্ছ সেই অমৃতের পুত্রী। কোথায় থাকো তুমি?

এই তো, এইখানে। হিয়াপর।

পল্টন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, শোনো দুলালি, যদি সত্যিই তোমার কেউ না থাকে তা হলে আজ থেকেই তুমি আমার বন্ধু হয়ে যাও। আমার সঙ্গে থাকো। বাড়িতে আমার মা-দিদিরা আছেন, আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে গেলে তুমি তাদের কাছেই থাকবে।

সচ! কিন্তু দু'দিন বাদে যদি তোমরা আমাকে তাড়িয়ে দাও?

এই ব্যাপারে তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। এতখানি বেইমানি আমরা করব না। আচ্ছা, তোমার যখন কেউ নেই তখন তোমার চলে কী করে? ভগবান চালিয়ে দেন। আমি ভিখ মেঙ্গে খাই।

তা হলে তোমার ভাবনা কী? আমরা যদি কখনও তোমাকে তাড়িয়ে দিই তখনই তুমি তোমার পুরনো ব্যবসায় আবার নতুন করে লেগে পড়তে পারবে। ও চাকরি ফিরে পেতে তো দেরি হবে না।

বেশ। আমি তোমার সঙ্গে যেতে রাজি আছি। এখন তোমার খুব শীত করছে নিশ্চয়ই? খুব যে কাঁপছ দেখছি।

হ্যাঁ। দারুণ শীত করছে আমার। সবই তো ভিজে গেছে।

তা হলে গায়ের জামাটামা খুলে এই চটগুলো তুমি চাপা দাও। বলে কোথা থেকে যেন এক বান্ডিল নোংরা ময়লা চট এনে পল্টনকে দিল।

পল্টন ওর জামাগেঞ্জি খুলে চট চাপা দিল গায়ে।

একটু আগুন করব?

কীসে করবে?

খড় আছে আমার কাছে। দিয়াশালাই আছে। সবকিছু আছে। এই ড্রেন পাইপের মধ্যেই আছে আমার ছোট্ট সংসার।

দুলালির কথা শুনে অবাক হয়ে গেল পল্টন। বলল, তা হলে একটু আগুন যদি করতে পারো তো মন্দ হয় না। বড্ড কাঁপ দিচ্ছে আমার!

দুলালি তখনই দেশলাই জ্বেলে খড়ের নুটি এনে আগুন করল সেই ড্রেন পাইপের ভেতরে।

এতক্ষণে মেয়েটির মুখ দেখতে পেল পল্টন। দেখে অবাক হয়ে গেল। এমন সুন্দর চোখমুখ। এই মেয়ে ভিক্ষে করে? গায়ের রং কালো, তা হোক। মাথায় ঘন চুল। খুবই ভাল লাগল পল্টনের।

আগুন জ্বালতেই গরম হয়ে উঠল ভেতরটা। তবে মুশকিল হল এই বদ্ধ জায়গায় ধোঁয়ার চোটে দম বন্ধ হয়ে গেল প্রায়। তাই নিভিয়ে দিতে পথ পেল না।

পল্টন বলল, তুমি একা থাক তোমার ভয় করে না? উঁহু।

সারাটা দিন তুমি কী করো?

সকাল থেকে গঙ্গার ঘাটে বসে ভিক্ষা করি। তারপর অনেক বেলা পর্যন্ত ভিক্ষে করে কোনও গাছতলায় বসে ডাল-ভাত একটু রেঁধে নিই। বিকেলে মন্দিরে যাই। সেখানেও ভিক্ষে করি। জুতো আগলাই। ভাল পয়সা পাওয়া যায়। সন্ধেবেলা কোনও হোটেলে ঢুকে মাংস-রুটি খাই। তারপর নাইট শো’তে একটা সিনেমা দেখে, যেখানে হোক পড়ে থাকি। তবে এখন বড় হচ্ছি তো, তাই রাত্রিবেলা যেখানে সেখানে থাকতে খুব ভয় করে। ইদানীং এই নিরাপদ জায়গাটা আমি বেছে নিয়েছি।

চমৎকার। ভিক্ষে করে তোমার কত রোজগার হয়?

কোনওদিন বিশ-পঁচিশ রুপাইয়া। কোনওদিন আরও বেশি। জুতো জমা নিয়ে পঞ্চাশ-একশো রুপিয়া পাই। আর পালেপার্বণে এক এক দিনে দু’-পাঁচশোও হয়ে যায়।

বলো কী! এত টাকা তুমি কী করো?

আমি একটা পোস্ট অফিসে জমিয়ে রাখি। আমার এখন অনেক টাকা। জানো?

তবু তুমি ভিক্ষে করো?

বাঃ রে। এতে যে আমার অনেক লাভ। খাটতে হয় না, কষ্ট করতে হয় না। অথচ বসে বসে রোজগার। তবে আমার আরও অনেক অনেক টাকা হলে তখন ভেবে দেখব কী করব।

পল্টন বলল, তা না হয় করলে। কিন্তু এইরকম ছেঁড়া একটা ফ্রকপরে ড্রেন পাইপের ভেতরে একা একা থেকে নিজেকে কষ্ট দাও কেন?

এসব আমার জন্ম থেকেই সয়ে গেছে দোস্ত।

নিদেন কোথাও একটা ছোটখাটো ঘরও তো ভাড়া নিতে পারো?

কী হবে? সাজগোছ করলে খারাপ লোকে নজর দেবে। ঘরভাড়া নিয়ে থাকলে লোকে ঝিয়ের কাম করতে বলবে। কেউ ভিক্ষে দেবে না। আমার ব্যবসা নষ্ট হয়ে যাবে। তা ছাড়া এসব আমার সয়ে গেছে। তবে দোস্ত! আমি লোকের কাছে হাত পেতে ভিক্ষে করলেও খারাপ মেয়ে নই। আর ঘর ভাড়া নিয়ে থাকার কথা বলছ? আমাকে ঘরভাড়া দেবেই বা কে? সবাই তো আমাকে চেনে। তা ছাড়া ঘরভাড়া করলে রুপিয়া লাগবে না? আমার পুঁজি ফুরিয়ে যাবে তখন। তুমি যে পোস্ট অফিসে টাকা রাখ তোমার পাস বই আছে?

হ্যাঁ। ওসব আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। কাল সকালে আমি তোমাকে সব দেখাব।

ঠিক আছে দেখিয়ো। আজকাল পোস্ট অফিসে টাকা জমা রাখলে পাঁচ-ছ' বছর বাদে তা দ্বিগুণ হয়ে যায়। আমি তোমাকে সেইসব নিয়মগুলো বলে দেব। পোস্টমাস্টার মশাইও আমাকে অনেকবার বলেছিলেন ওইভাবে টাকা রাখতে। আমি রাখিনি।

ভুল করেছ। তা যাক, আমাকে একটা কথা ঠিক করে বল তো, আমি ওই ড্রেনের মধ্যে ছিলাম তুমি কী করে জানলে?

বাঃ রে। আমি যে নিজের চোখে সব দেখলাম। তাই যেই দেখলাম তোমাকে ওরা ওর ভেতরে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল তখুনি আমি ছুটে গেলাম তোমাকে বাঁচাতে। এখানে দড়ির অভাব নেই। তাই নামিয়ে দিলাম একটা। আমি না-থাকলে তুমি মরে যেতে। ওর ভেতর বেশিক্ষণ থাকা যায় না। দম বন্ধ হয়ে যায়।

পল্টন বলল, তুমি না-গেলে মরে আমি যেতাম ঠিকই। কিন্তু আমি যে বেঁচে আছি তুমি সেটা বুঝলে কী করে?

ওরা যে তোমাকে মারতে মারতে নিয়ে এল তাই। মরাকে কেউ মারে? তোমার ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না। আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে

গেলে আমার মা তোমাকে খুব ভালবাসবেন। এত রাত্রে যদি তুমি জেগে না-থাকতে তা হলে আমার অবস্থাটা যে কী হত তা একবার ভেবে দেখেছ? আমি তোমার জন্যই জেগে ছিলাম। আমার জন্য?

হ্যাঁ। তোমার দোস্তের সঙ্গে আমার মুলাকাত হয়েছে। তোমাদের একটি মেয়েকে গুন্ডারা নিয়ে পালিয়েছিল। তারও খোঁজ পাওয়া গেছে। তোমার দোস্তই আমাকে তোমার কথা বলেছিল। ডিসুজার লোকেরা নাকি তোমাকে ওই বাড়ির ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিল। তাই আমি, তোমার দোস্ত আর ওই মেয়েটাকে কদমকুঁয়ায় পাঠিয়ে দিয়ে এখান থেকে ওই বাড়িটার দিকে লক্ষ রাখছিলাম। এমন সময় দেখতে পেলাম তোমাকে ওইভাবে মারতে মারতে নিয়ে আসছে। তারপর ওরা তোমাকে ফেলে দিয়ে পালাতেই ছুটে গেলাম আমি। ভাগ্যে তুমি ভেতরেই অজ্ঞান হয়ে যাওনি। তা হলে তোমাকে বাঁচাতে পারতাম না। আমি তো নামতে পারতাম না ওর ভেতরে। নামলে আমিও উঠতে পারতাম না। দম বন্ধ হয়ে মরে যেতাম।

ঠিক। ওর ভেতরে যে কী বিচ্ছিরি একটা গ্যাস, তা তোমাকে কী করে বলব। আমি একবার শ্বাস নিয়েই বুঝেছি। গা-মাথা যেন ঘুরে উঠল। তাই তো ওপরে উঠেই জ্ঞান হারালাম। এরপর তুমি যে আমাকে নিয়ে কীভাবে কী করলে তা কিছুই জানি না।

আমি তোমাকে বহু কষ্টে আমার পিঠে করে বয়ে নিয়ে গেলাম গঙ্গার ঘাটে। তবে আঘাটায়। সেইখানে গঙ্গার জলে তোমার সমস্ত কাদা ধুয়ে পরিষ্কার করলাম। তারপর আমার ঘরে তোমাকে নিয়ে আসছি এমন সময় আবার জ্ঞান ফিরল তোমার।

কথা বলতে বলতেই ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটে উঠল।

পল্টন বলল, শোনো, আর দেরি করে লাভ নেই। আমি এখন একটু সুস্থ হয়েছি। কাল সারাটা রাত যা ধকল গেছে আমার ওপর তা কী বলব। শুধু রাত কেন? বিকেল থেকেই তো চলছে। এবার বেরিয়ে পড়া যাক।

তুমি চলে যাবে?

বাঃ রে। যেতে হবে না? আমার জন্যে ওরা কত চিন্তা করছে বলো তো? তা ছাড়া সকাল হলে দিনের আলোয় যদি আবার ধরা পড়ে যাই?

তা হলে যাও। কিন্তু তোমার জামাপ্যান্ট সব তো ভিজে।

তা কী করব। তুমি তো মেয়ে। ছেলে হলে না হয় তোমারই একটা কিছু পরতাম।

তাড়াতাড়ি পরে নাও তা হলে। মোড়ের দোকানে তোমাকে একটু চা খাইয়ে দিই। কাল রাতে তোমায় তো কিছু খেতে দিতে পারলাম না। আমার ঘরেও কিছুই নেই। সারারাত নিশ্চয়ই খাওয়া হয়নি তোমার?

না। এসেছিলাম বিয়েবাড়ি নেমন্তন্ন খেতে। তার জায়গায় মারধোর খেয়ে মরলাম। সবই কপাল।

দুলালি হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে এল। ওর পিছু পিছু চটমুড়ি দিয়ে পল্টন। এ কী! এই অবস্থায় যাবে নাকি তুমি?

তা ছাড়া উপায় নেই। ভিজেগুলো পরতে পারছি না!

দুলালি ফিক করে হাসল। বলল, চলো।

তুমি যাবে না?

আমি কোথায় যাব?

আমার সঙ্গে?

দুলালি ঘাড় নাড়ল, নেহি। তারপর বলল, তুমি আগে বাড়ি যাও। তোমার বাড়িতে গিয়ে আমার কথা বলো। তোমার মা-বাবা যদি সব শুনে আমাকে নিয়ে যান তা হলে ভেবে দেখব। না হলে আমি যেমন আছি তেমনি থাকি।

তুমি তা হলে আমাকে বিশ্বাস করছ না?

হামকো বুরা মাত সমঝো। তুমি এখন যেখানে যাচ্ছ তারা এইখানকারই লোক। আমাকে দেখলেই চিনতে পারবে। আর দূর দূর করে তাড়াবে!

এত সস্তা নাকি? তুমি চলোই না আমার সঙ্গে। তারপর দেখি কে কী বলে? কী পাগলামি করছ বলো তো তুমি? আমি একটা ভিখিরির মেয়ে। আর তুমি

লিখাপড়া জানা ভদ্দরলোকের ছেলে।

পল্টন ওই অবস্থায় নিজের জামাসোয়েটার বগলদাবা করে দুলালির হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল।

দুলালি বলল, হাত ছাড়ো। চলো আগে মোড়ের দোকানে একটু চা খাই। তারপর যেখানে বলবে সেখানেই যাব। তোমাদের দু’ বন্ধুর একটু শিক্ষা হওয়া দরকার। তোমরা দু'জনেই আমাকে নিয়ে যেতে চাইছ। লেকিন একবারও ভেবে দেখছ না, ইয়ে নেহি হো সকতা।

গৌতমও তোমাকে নিয়ে যাবার কথা বলেছিল বুঝি? হ্যাঁ।

বলবেই তো। তোমার মতো মেয়ে হয় না।

দুলালি বলল, তোমরা বলছ বটে। কিন্তু এখানে আমি কেমন স্বাধীনভাবে ছিলাম বলো তো? ভিক্ষেদুঃখু করে যা পাই তাই খেয়ে গাছতলায় শুয়ে কেমন সুন্দরভাবে দিনগুলো কাটিয়ে দিচ্ছিলাম। এখন তোমরা দয়া করে দুটি খেতে দিলে তবে তো খেতে পাব।

সেরকম বুঝলে পালিয়ে আসবে তুমি।

ওরা বড় রাস্তার ধারে একটা দোকানে এসে দেখল এরই মধ্যে চায়ের দোকান জমজমাট। শিঙাড়া, জিলিপি ভাজা হয়েছে। চা হচ্ছে।

পল্টনের ওইরকম অবস্থা দেখে সবাই তাকাতে লাগল ওর দিকে। কেউ কেউ দুলালিকেও দেখল।

পল্টনের কাছে টাকা ছিল। ও চায়ের অর্ডার দিয়ে শিঙাড়া, জিলিপি নিয়ে অর্থেক দুলালিকে দিয়ে, অর্থেক নিজে খেল।

একজন পল্টনকে দেখে বলল, এ হাল ক্যায়সে হুয়া ভাই?

দুলালি বলল, পানিমে গির গিয়া।

গঙ্গাজিমে?

হ্যাঁ।

চা খাওয়া হলে দাম দিতে গেল পল্টন। কিন্তু দুলালি কিছুতেই তা দিতে দিল না। এবং ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে দোকানদারও দাম নিল না। বলল, ঠিক হ্যায় বাবা। পহলে তুম ঘর তো চলা যাও।

অগত্যা একটা রিকশা ডেকে তাইতেই উঠে পড়ল পল্টন। দুলালিকেও প্রায় জোর করে টেনে তুলল রিকশায়। কিন্তু সে গেল না। রিকশায় উঠেই লাফিয়ে পড়ল। বলল, মুঝে সরম লাগতা। তুমি যাও দোস্ত। আমি না। বলে ছুটে চলে গেল গলির মোড়ে। সেখান থেকেই একবার হাত নেড়ে হারিয়ে গেল কোথায় যেন।

দুলালির এই চপলতা ওর এই সরলতা খুবই ভাল লাগল পল্টনের। ও মনে মনে ঠিক করল গৌতমকে সঙ্গে নিয়েই দুলালিকে নিতে আসবে কাল। এমন একটি জীবন কিছুতেই অবহেলায় ঝরে যেতে দেবে না।

রিকশাওয়ালা বলল, কিধার যানে হোগা বাবু?

কদমকুঁয়া।

রিকশা তরতরিয়ে এগিয়ে চলল কদমকুঁয়ার দিকে। আকাশ এখনও ভাল করে ফর্সা হয়নি।

রাস্তায় আলো এখনও জ্বলছে।

চট জড়ানো পল্টনও রিকশায় বসে শীতে কাঁপছে ঠকঠক করে। কদমকুঁয়া পৌঁছতে খুব একটা বেশি সময় লাগল না।

ওকে ওইরকম চট মুড়ি দেওয়া অবস্থায় রিকশা থেকে নামতে দেখেই ছুটে এল সকলে। যারা এল তাদের অনেককেই অবশ্য ও চেনে না। এদের কেউ কাকুমণির ছাত্র, কেউ বা বরযাত্রীর লোক।

ও কিন্তু কারও দিকে না তাকিয়ে হনহন করে উঠে গেল ওপরে।

কাকিমা ওকে দেখেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন, এই তো! এই তো ফিরে এসেছে

পল্টন। বাবা বিশ্বনাথ। আমি কাশী গিয়ে তোমার পুজো দিয়ে আসব বাবা। পরের ছেলে, পরের বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে এসে যদি গুন্ডা-বদমাশের পাল্লায় পড়ে, তবে এর চেয়ে দুশ্চিন্তার কিছু আছে কি? সারাজীবনের জন্য দায়ী থেকে যেতুম আমরা।

বাবলিদি বললেন, তোকে নিয়ে যে কী দুর্ভাবনা হয়েছিল আমাদের তা কী বলব। কিন্তু তোর এই দশা কী করে হল? জামা-প্যান্ট-সোয়েটারের বদলে চটমুড়ি দিয়ে, ব্যাপারটা কী?

বলব বলব, সব বলব। কাকুমণি কোথায়?

কাকিমা বাবলিদি দু'জনেই কেঁদে ফেললেন এবার, দাদুভাইকে আনতে গেছে হাসপাতাল থেকে।

দাদুভাই...... !

দাদুভাই মারা গেছেন। গুন্ডারা গোপা আর দাদুভাইকে চুরি করে নিয়ে পালাবার সময় গাড়ি থেকে লাথি মেরে ফেলে দিয়েছিল দাদুভাইকে। তাতে আঘাত পেয়েছিলেন খুব। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা গেছেন ইন্টারন্যাল হ্যামারেজ হয়ে। কোমরের হাড়ও ভেঙেছিল।

একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল পল্টনের বুক থেকে। বলল, সে কী! গৌতম কই? গোপাকে দেখছি না কেন?

ওদের বেনারসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বেনারসে! কার সঙ্গে গেল?

গৌতমই নিয়ে গেছে গোপাকে। না হলে ওকে একা তো ছাড়তে পারি না। ভাল করেছেন। কখন গেল?

ভোরবেলা, পঞ্জাব মেলে। তা তোমার ব্যাপার কী বলো তো? তুমি কীভাবে রেহাই পেলে ওদের খপ্পর থেকে? তোমার কাকুমণির মুখে যা শুনলাম সেটা অত্যন্ত খারাপ খবর। তোমাকে নাকি আধমরা করে ওরা ড্রেনের ভেতর ফেলে দিয়েছিল?

হ্যা। খুবই ভুল করেছিল ওরা। ওদের সেই ভুলের জন্যেই আমি এখন এখানে।

বাবলিদি বললেন, কীভাবে কী হয়েছিল শুনি?

পল্টন তখন আগাগোড়া সব কথা খুলে বলল, কাকিমা ও বাবলিদিকে।

কাকিমা বললেন, আহারে! কত কষ্টই না পেয়েছিস তুই। তবে ভিখিরির মেয়ে হোক, ওই দুলালি না কী যেন নাম বললি, ওই তোর ভাগ্যলক্ষ্মী। ও না থাকলে তোকে বেঁচে ফিরতে হত না।

ওর ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না কাকিমা। আমার জীবনরক্ষার জন্য ভগবান ওকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

ও ঋণ কী শোধ করা যায়?

বাবলিদি বললেন, পল্টন! আমি তোমার দিদির মতো। আমি বলছি ওই হতভাগীকে কোনওমতেই পথের ধুলোয় ঝরে যেতে দিয়ো না। যেভাবেই হোক বুঝিয়ে বাঝিয়ে নিয়ে এসো তুমি। ওর জন্যে কিছু করা তোমার একটা পবিত্র কর্তব্য। তোমার দিদিরা আছেন। যদি ওর বয়সি তোমার আর একটি বোনই থাকত, তা হলে? মনে করবে ও— ও তোমার এক দুখিনি বোন।

আমি তো ওকে নিয়েই যেতে চাই। কিন্তু ও না এলে? তা ছাড়া বাবলিদি, আর একটা কথা। আমি তো ইস্কুলে পড়ি। চাকরি বাকরি কিছুই করি না এখন। বড় হয়ে এই বাজারে আদৌ চাকরি পাব কি না তাও জানি না। এখন কাকামণিই আমাদের ভরসা। উনি কি ঘরে নেবেন ওকে?

কাকিমা বললেন, তোমার কাকামণিকে তুমি আজও চেননি তা হলে। ওঁর মতো মানুষ হয় না। বিশেষ করে যে মেয়ের জন্যে তোমার জীবন রক্ষা হয়েছে, তাকে ঘরে ঠাঁই দেবেন না মানে? যদি না দেন তখন আমি তো আছি। বাবলি চলে গেলে তো ঘর আমার ফাঁকা। আমি ওকে আমার কাছে রাখব। অত বড় মেয়ে একা একা যেখানে সেখানে পড়ে থাকবে। ভিক্ষে করবে। তাই কখনও হয়? তুমি আজই ওকে এখানে নিয়ে এসো।

বাবলিদি বললেন, এখন থাক। আর তুমি বাইরে বেরিয়ো না। ওরা জানে তুমি মৃত। সেই জানাটুকুই ওদের অভ্রান্ত হোক। আর পরোপকার করতে গিয়ে নিজের বিপদ বাড়িয়ো না।

পল্টন এইসব কথাবার্তার ফাঁকেই ওর পোশাক পরিবর্তন করল।

সারারাত খাওয়াদাওয়া নেই বেচারির।

কাকিমা তাই ওকে নিজে হাতে ওর পছন্দমতো বাসি

খাবার দই-মিষ্টি সব পেট ভরে খাইয়ে দিলেন।

কিছুক্ষণ পরে চোখের জলে বিদায় নিতে হল বাবলিদিকে।

সত্যবাবু তখন শ্মশানে।

বাবলিদি চলে গেলে একটা অটো ডেকে কাকিমা পল্টনকে নিয়ে চলে এলেন দরিয়াপুরের বাড়িতে।

চারদিক তখন শান্ত। কোথাও কোনও উত্তেজনা নেই।

অনেক বেলায় শ্মশান থেকে ফিরে এসে পল্টনকে একবার আড়চোখে দেখলেন সত্যবাবু। তবে চমকালেন না। কেন না ছাত্রদের মুখে শ্মশানে বসেই তিনি পল্টনের ফিরে আসার সংবাদ পেয়েছেন। তাই শুধু আদর করে ওর গায়েমাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিলেন তিনি। তারপর বাবার বিছানায় লুটিয়ে পড়ে শিশুর মতো সে কী কান্না।

বারো

কাল সারারাত ঘুম হয়নি। দুপুরবেলা তাই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল পল্টন। বিকেলে যখন ঘুম থেকে উঠল, শরীর তখন অনেক ঝরঝরে। কোনও ক্লান্তিবোধ আর নেই।

কাকুমণি অন্যের মুখে সব কিছু শুনলেও ওর মুখেও আবার নতুন করে শুনলেন সব। শুনে বললেন, তুমি যে মেয়েটির কথা বলছ ওকে আমি চিনি। খুব ছোট থেকেই ভিক্ষে করতে দেখছি ওকে। তা ও যদি সত্যি সত্যিই কোনও গেরস্থ বাড়িতে থাকতে চায় তা হলে আমিই ওকে থাকতে দিতে পারি। বাবলির বিয়ে হয়ে গেল। বাবা চলে গেলেন। ঘর তো আমার ফাঁকা। ছেলে নেই যে তার একটা বিয়ে দিয়ে বউ নিয়ে আসব। এই অবস্থায় আমি বাইরে থাকলে তোমার কাকিমার একা থাকতে অসহ্য লাগবে। অতএব মেয়েটিকে পেলে কিন্তু মন্দ হয় না।

পল্টন বলল, আপনার এখানে স্থান পেলে তো ওর পক্ষেও খুব ভাল হয়। কেন না এখানকার গঙ্গা এবং পাটনা শহর দুটোর কোনওটাকেই ছেড়ে থাকতে পারবে না ও।

কাকুমণি বললেন, আচ্ছা, ওকে এখানে আনার ব্যবস্থা করছি।

হিতৈষী কয়েকজন ছিলেন। তাঁরা সব শুনে বললেন, আনছ আনো, তবে কিনা ওইসব মেয়েকে পোষ মানানো বড়ই কঠিন ব্যাপার। কোনওদিন হয়তো চুরিচামারি করে পালাবে। না হলে বাইরের চোরডাকাতকে ঘরের সম্পত্তির কথা বলে দেবে। তা ছাড়া এই তো একটা মেয়েকে দু'দিনের জন্য রেখে কী কাণ্ড। আবার সেই কাজ করবে?

কাকুমণি এবার ভয় পেয়ে গেলেন। বললেন, তা অবশ্য ঠিক। শেষকালে আবার নতুন করে কোন ঝামেলা দেখা দেয় তা কে জানে?

পল্টন বলল, আবার কী ঝামেলা দেখা দেবে? আসল ঝামেলা যারা করত তাদের পাণ্ডা তো মরেছে। আর ও মেয়েও রাস্তার মেয়ে। ওকে কেউ বিরক্ত করলে সেও ছেড়ে কথা বলবে না।

তবুও আমাদের মতে ও পাপ ঘরে না-ঢোকানোই ভাল।

পল্টন বলল, বেশ। আমিই তা হলে ওকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাব। ও আমার মায়ের কাছেই থাকবে।

কাকুমণি বললেন, সেটা হলে তো খুবই ভাল হয়। তবে কি না তোমার মুখে যা শুনলাম তাতে ও যেতে চাইবে কি?

না যায় কী আর করব? চেষ্টা করব ওর ভাল করবার।

এরপর সন্ধে পর্যন্ত আরও অনেক লোকজন এল। কত কথাবার্তা হল। এই আকস্মিক বিপদের জন্য সহানুভূতি জানালেন অনেকে। সান্ত্বনা দিলেন। আগামীকাল বাবলিদির বউভাত। অথচ কী করে যে কী করবেন সত্যবাবু তা ভেবে পেলেন না। যদিও এখন আর তাঁর করণীয় কিছুই নেই। বরপক্ষের ওরা বলেই গেছে ব্যাপারটা ওরাই সেরে নেবে। তবুও মন কী মানে?

সন্ধের পরে সত্যবাবুর সেই ছাত্রটি এল, যে কিনা ওদের টাকা দিয়েছিল এবং যাদের বাড়ি টেলিফোন আছে।

সত্যবাবু বললেন, দিবাকর! তুমি একটু বেনারসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পার? ছেলেমেয়ে দুটো সেই ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে চলে গেল, কীভাবে পৌঁছুল না পৌঁছুল কিছুই জানতে পারলুম না। একবার দেখো না চেষ্টা করে, যদি লাইন পাওয়া যায়?

দেখছি। তবে বেনারসের লাইন খুব ডিসটার্ব করছে ক’দিন ধরে। পল্টন বলল, আমিও যাব তোমাদের বাড়ি। যদি লাইন পাওয়া যায়, তা হলে গৌতমের সঙ্গে কথা বলব একটু।

সত্যবাবু বললেন, বেশ তো যাও। তারপর দিবাকরকে বললেন, ওকে বরং তোমাদের বাড়িই রেখে দাও। আর এখানে পাঠিয়ে কাজ নেই। কাল বাবলির বউভাতে নিয়ে যেয়ো তোমাদের সঙ্গে। পরশু ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দেব। একা ছাড়বেন?

পল্টন বলল, একা ছাড়লে ক্ষতি কী? গুন্ডারা এসে আবার আমাকে ধরবে? অত ভয় আমি করি না। তা হলে ওদের কবল থেকে এইভাবে পালিয়ে আসতে পারতুম না। তা ছাড়া ট্রেনের কামরায় একবার ঢুকে পড়লে কে আমার কী করবে শুনি?

তুমি যদি যেতে পার আমার আপত্তি নেই। একা যদি যাও তা হলে রাতের গাড়ি নয়, দিনের বেলা তুফানে তোমাকে চাপিয়ে দেব। সকালে চাপলে সন্ধেবেলা হাওড়ায় পৌঁছে যাবে।

সেই ভাল। পারি তো ওই মেয়েটাকেও সঙ্গে নেব।

কাকুমণি হাসলেন।

দিবাকর বলল, কোন মেয়েটি?

যেতে যেতে তোমাকে সব বলব।

পল্টন ওর এবং গৌতমের ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে দিবাকরের সঙ্গে সাইকেলে ওদের বাড়ির দিকে চলল, যেতে যেতেই সব কথা সবিস্তারে খুলে বলল দিবাকরকে।

দিবাকর বলল, বুঝেছি তুমি কোন মেয়েটির কথা বলছ। মেয়েটি সকালে ঘাটে ভিক্ষে করে আর সন্ধের পর মন্দিরের সামনে বসে দর্শনার্থীদের জুতো আগলায়। মেয়েটা ভাল। ঘরে নিয়ে যাবার মতো। বলতে গেলে ও শুধু তোমার কেন, তোমাদের দু’ বন্ধুরই উপকার করেছে। এমনকী গোপাকে ফিরে পাওয়ার মাধ্যমও ওই মেয়েটি।

ঠিক তাই।

আবার কদমকুঁয়ার কাছেই দিবাকরদের ফ্ল্যাটবাড়িতে এল ওরা। দিবাকররা এই ফ্ল্যাটের দোতলায় থাকে। গৌতমকে নিয়ে এর আগেই তো এখানে এসেছিল পল্টন। ওর কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল। ওর জামা-প্যান্ট-সোয়েটার নিয়েছিল। আবার এল। দিবাকর যদিও ওদের চেয়ে কয়েক বছরের বড়, কলেজে পড়ে, তবুও ওদের সঙ্গে বন্ধুর মতোই ব্যবহার করেছিল।

সেই দিবাকরের বাড়িতে এসেই বারাণসীতে ট্রাঙ্ককল করল। টেলিফোন গোপাদেরও নেই। ওদের পাশের বাড়িতে আছে, যেখানে ফোন করলে ওদের পাওয়া যায়।

প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টার পর লাইন পাওয়া গেল। ওধার থেকে উত্তর এল, হ্যালো......। একটু গোপাকে ডেকে দেবেন?

কে গোপা?

আপনাদের পাশের বাড়িতে থাকে। ও আর ওর মা।

আপনি কোথা থেকে ফোন করছেন?

পাটনা থেকে।

বুঝেছি। আপনি খুকুর কথা বলছেন?

কে খুকু! আমি তো জানি না। গোপাকে জানি। পাটনার দরিয়াপুরে সত্যসুন্দরবাবুর কাছে গান শেখে।

একটু ধরুন। ডেকে দিচ্ছি।

খানিক ধরে থাকার পরই এক মহিলার কণ্ঠ শোনা গেল, হ্যালো! কে বলছেন?

তুমি কি গোপা?

আমি ওর মা ফোন করছি। আপনি কে?

আমাকে আপনি বলবেন না মাসিমা। আমি পল্টন। বাবলিদির বিয়েতে এসেছি।

তুমি পল্টন!

হ্যাঁ।

কী আশ্চর্য! তোমার জন্যে ছেলেমেয়ে দুটো ভেবে সারা হয়ে যাচ্ছে। তোমার তো খুব বিপদ হয়ে গিয়েছিল। এখন কেমন আছ তুমি?

আপনার আশীর্বাদে ভালই আছি।

তোমরা দু’ বন্ধুতে আমার মেয়ের জন্যে যা করেছ তার তুলনা নেই। আমি কী বলে যে তোমাদের ধন্যবাদ জানাব তা ভেবে পাচ্ছি না। আমার বুকের মাণিক ফিরিয়ে দিয়েছ তোমরা। মাস্টারমশাইয়ের খবর কী?

একরকম। আমি এখন ও বাড়িতে নেই। যেখান থেকে ফোন করছি সেই বাড়িতে আছি।

দিবাকরদের বাড়ি। খুব ভাল ছেলে ও।

আপনি একবার গৌতমকে ডেকে দিন।

ওরা তো কেউ নেই। সারা দুপুর ঘুমিয়ে এখন একটু দশাশ্বমেধের দিকে গেছে।

সেটা আবার কী?

এখানকার একটা ঘাটের নাম। আমি আজই রাত্তিরে ফোন করতাম। তুমি যখন করলে তখন ভালই হল। তা বলছিলাম কী, তুমিই বা ওই বিষাক্ত পরিবেশে একা থেকে কী করবে? চলে এসো এখানে। দিনকতক থেকে ঘুরে বেরিয়ে যাও। আমার এক পরিচিত ভদ্রলোক কাল কলকাতা যাচ্ছেন। আমি তাঁর হাত দিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমাদের বাড়িতে। কাজেই কোনও চিন্তা নেই। তোমরা আনন্দে কিছুদিন ঘুরতে পারবে এখানে। তারপর আমি টিকিট কেটে রিজার্ভেশন করিয়ে গাড়িতে চাপিয়ে দেব। নির্ভাবনায় বাড়ি পৌঁছে যাবে। ওখানকার যা অবস্থা তাতে আর একদিনও ওখানে থাকা ঠিক নয় তোমার। আপনি যা বললেন সে তো খুব ভাল কথা। কিন্তু আমি কখনও বেনারসে

যাইনি। কী করে যাব?

শোনো! তুমি দিবাকরকে বলো ভোরবেলা পঞ্জাব মেলে তোমাকে তুলে দিতে। তা ছাড়া এখনও সময় আছে। তুমি অমৃতসর এক্সপ্রেসটা যদি ধরতে পার তো খুব ভাল হয়। তা হলে একেবারে সকাল ন'টার মধ্যে বারাণসী পৌঁছে যাবে। গোপাকে নিয়ে আমি নিজে স্টেশনে থাকব। তোমার কাছে যদি গাড়ি ভাড়া না থাকে তা হলে দিবাকরকে বলো ও দিয়ে দেবে।

না না। এখন আমার কাছে টাকা আছে। আমরা তো ফিরে যাবার গাড়ি ভাড়া সঙ্গে নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম।

তা হলে আর দেরি কোরো না। এই বেলা তৈরি হয়ে নাও। রাত দুটো পঞ্চাশে অমৃতসর এক্সপ্রেস পাটনা থেকে ছাড়ে। বারোটা-একটা নাগাদ স্টেশনে চলে এসো। তবে একা এসো না, দিবাকরকে সঙ্গে নিয়েই এসো। ঠিক আছে। আমি যাবই।

তুমি একবার দিবাকরকে দাও।

পল্টন রিসিভারটা দিবাকরের হাতে দিয়ে বলল, গোপার মা।

দিবাকরের সঙ্গে ফোনে অনেক কথা হল।

দিবাকর বলল, বেশ তো, ওর জন্যে আপনি কোনও চিন্তা করবেন না। আমি নিজে গিয়ে ওকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসব।

ফোনে কথাবার্তা শেষ হলে পল্টন বলল, কত আনন্দ নিয়ে এখানে এসেছিলাম কিন্তু এখন আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে কতক্ষণে যাই।

দিবাকর বলল, আমারও মনে হয় তোমার চলে যাওয়াই ভাল। মাস্টারমশাইকে আমি বলে আসছি সেই কথা। তারপর তোমাকে অমৃতসর এক্সপ্রেসেই তুলে দিয়ে আসব।

পল্টন বলল, তার আগে একটা অনুরোধ। তোমাকে আমার একটা উপকার করতে হবে ভাই।

কী করতে হবে বলো?

তুমি যে ভাবেই হোক একবার ওই মেয়েটির সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দাও। কার কথা বলছ?

দুলালির কথা বলছি।

কী হবে দেখা করে?

পল্টন বলল, তা ঠিক। তবে কি না এই শহরে আর তো আমি ভুলেও কখনও আসব না। তাই যাবার আগে একবার ওর সঙ্গে একটু কথা বলে নিতে চাই। কেন না ইতিমধ্যে যদি ও কোনওকারণে মনস্থির করে থাকে, তা হলে কিন্তু আমি আর না গেলে ও ভীষণ দুঃখ পাবে। ভাববে হয়তো কথার কথা বলেছি ওকে। অন্তর দিয়ে বলিনি। এখন যদি ও যেতে রাজি না হয় তা হলে নিজের কাছে আমি ঠিক থাকব। ও-ও আমাকে ভুল বুঝবে না। বা কোনও দোষারোপ করবে না।

দিবাকর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তা অবশ্য ঠিক। তবে আমার মনে হয় ওসবের ভেতরে আর নিজেকে না-জড়ানোই ভাল। তা ছাড়া ওই জায়গায় আবার তুমি যাবে সেটা ঠিক নয়।

তা হলে এক কাজ করো না, তুমিই ওকে নিয়ে এসো না এখানে?

আমার বাড়ির লোক সেটা পছন্দ করবেন না।

পল্টন আহত হয়ে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি তা হলে কাকুমণিকে জানিয়ে এসো আমি আজই চলে যাচ্ছি।

দিবাকর ঘড়ি দেখে বলল, এখন সবে পৌনে আটটা। তুমি একটু বিশ্রাম নাও। মাকে বলে যাচ্ছি তোমার খাওয়া-দাওয়ার কোনও অসুবিধে হবে না। আমার তো এখন অনেক কাজ। মাস্টারমশাই আমাকে অনেক কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি দশটা-এগারোটা নাগাদ ফিরে এসে তোমাকে নিয়ে যাব। তবে হয়তো তার আগে তোমাকে একবার থানাতেও যেতে হতে পারে। কেন না পুলিশ জেনেছে তুমি নিখোঁজ হওনি।

পুলিশকে এ খবর কে দিল?

আমরাই দিয়েছি। না হলে অযথা ওরা তোমাকে খুঁজতে ড্রেনের ভেতর তোলপাড় করত।

আমি কোনও অবস্থাতেই পুলিশের কাছে যাব না। পুলিশের সাহায্য ছাড়াই যখন আমি বেঁচে ফিরেছি, তখন ওদের এড়িয়েই আমি চলে যাব।

পুলিশ চাইলে যেতে তোমাকে হবেই। তবে কি না একান্তই যদি যেতে হয় তা হলে পুলিশকে এই কথাটাই বলবে কার সাহায্যে এবং কীভাবে তুমি প্রাণে বেঁচেছ।

পল্টন বলল, তার মানে যে মেয়েটির দয়ায় আমি জীবন ফিরে পেলাম পুলিশের কাছে তার নামটি বলে তাকে আরও বিপদের জালে জড়িয়ে দেব। এই তো?

দিবাকর আর কিছু না বলে চলে গেল।

ও চলে গেলে পল্টন খস খস করে একটা চিঠি লিখে টেবিলের ওপর রেখে পেপারওয়েট চাপা দিল। তারপর কাউকে কিছু না জানিয়ে শুধু টাকা ছাড়া অন্য কোনও কিছু না নিয়েই একেবারে বড় রাস্তায় এসে রিকশা ধরল। নেবার মধ্যে নিয়েছিল শুধু মাংকি ক্যাপটা। সেটাতে মুখ ঢেকে নিজেকে এমন করে নিল যে ওকে কারও চেনবার উপায়টি রইল না। আজ এবেলায় শীত একটু কম। তাই পথেও কোনও কষ্ট হল না।

ও ঠিক জায়গায় এসে টুপ করে রিকশা থেকে নামল। তারপর চুপিসাড়ে সেই ড্রেন পাইপগুলোর কাছে গিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও দুলালিকে দেখতে পেল না। হঠাৎ মনে হল রাত তো বেশি নয়। তা হলে ও তো এখন মন্দিরে থাকবে। কিন্তু মন্দিরটা কোথায়? ও অনুমানে গঙ্গার দিকে একটু এগোতেই ঢোল-খোলের শব্দ শুনতে পেল। সেই শব্দ লক্ষ্য করে খানিকটা যেতেই দেখতে পেল মন্দিরটা।

মন্দিরের কাছাকাছি আসতেই দেখল দুলালি একটা বিস্তীর্ণ চাতালের পাশে লাঠি হাতে বসে বসে বসে দর্শনার্থীদের জুতো পাহারা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে গোরু-ছাগল এলে তাড়াচ্ছে। চারদিক বেশ জমজমাট।

পল্টন একটু কেশে ওর দিকে চোখ রেখে এক পা এক পা করে এগোতেই ওকে দেখতে পেল দুলালি।

ও কোনও কথা না বলে মাংকি ক্যাপটা একবার তুলে মুখটা বার করে দেখাল। তারপর আবার ঢেকে ফেলল মুখখানা।

দুলালি কেমন যেন ভয় পেয়ে ছুটে এল ওর কাছে। তারপর চাপা গলায় বলল, আরে! তুমি ইধার কিউ আয়া?

তোমার সঙ্গে দেখা করব বলে।

হিস্। ডিসুজাকা আদমি পূজা দেনে আয়া হিয়া পর। চলো চলো, উধার চলো।

দুলালি পল্টনের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল এক অন্ধকার নির্জনে।

পল্টন বলল, শোন, আমাকে আজই এখান থেকে বেনারসে চলে যেতে হচ্ছে। না হলে হয়তো পুলিশ আমাকে টানাহেঁচড়া করবে। যাবার আগে আমি শেষবারের মতো তোমার কাছে এসেছি। তুমি কী ভদ্রসুস্থ একটা জীবনকে বেছে নেবে? না এইভাবে ভিক্ষে করে দিন কাটাবে? তুমি বড় হচ্ছ। রাত্রিবেলা ড্রেনপাইপের ভেতরে লুকিয়ে আর কত রাত নিজেকে আড়ালে রাখবে?

হামকো শোচনে দো।

ভাববার সময় কিন্তু আর পাবে না। আমাকে যেতেই হবে। কেন না পুলিশের খপ্পরে আমি পড়ছি না। আর পাটনা শহরেও দ্বিতীয়বার আসছি না।

দুলালি কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর বলল, তুমি কি সত্যিই আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাও?

না হলে কি এই রাতদুপুরে আমি সিনেমা করতে এসেছি?

তো ঠিক হ্যায়। তুম স্টেশন পর চলা যাও। অকেলে। এক নম্বর খিড়কি পর ইন্তেজার করো। হাম যা রহেঁ। জলদি যাও।

পল্টন বলল, যদি টাকার দরকার থাকে নিতে পার। যাবার সময় কোনও দোকান থেকে একটা নতুন কিছু কিনে নিয়ো। এই ছেঁড়াটাকে ত্যাগ করতে হবে এবার।

দুলালি বলল, ম্যায় যানে কে লিয়ে তৈয়ার হুঁ। সব কুছ হ্যায় হামারা পাস তুম যাও।

পল্টন চলে গেল।

ওর চলে যাওয়া পথের দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কী যেন ভাবল দুলালি। তারপর মন্দিরে এসে বজরঙ্গবলিকে একটা প্রণাম করে পাশের গলিতে হারিয়ে গেল।

পল্টনকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ও যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দুলালি গিয়ে হাজির হল। দুলালির সাজপোশাক দেখে তো প্রথমে চিনতেই পারেনি পল্টন। এ কাকে দেখছে ও? নতুন চুড়িদার পরা বন্যসৌন্দর্যে ভরা খুশি খুশি ঝলমলে একটি মেয়ে।

পল্টন অবাক হয়ে বলল, এমন ঝকঝকে মেয়ে তুমি। আর নিজেকে কী করে রেখেছিলে? কী চমৎকার দেখাচ্ছে তোমাকে তা জানো? সত্যি বলতে কী, তোমাকে দেখে এখন আমার একেবারে অন্যরকম লাগছে।

ট্রেন ক বাজে মিলেগা ?

রাত্রি দুটোর পর।

আভি দশ বাজ গিয়া হোগা?

সাড়ে দশটা। এখন চলো কোনও একটা হোটেলে ঢুকে পেট ভরে দুটো খেয়ে নিই। খিদে পাচ্ছে খুব।

দুলালি বলল, শোনো, তোমার সঙ্গে আমাকে দেখলে অনেকে হয়তো অন্যরকম ভাববে। কেউ খারাপ কথা বললে তুমি যেন কিছু বলবে না। রাগটা একটু সামলে রাখবে, কেমন?

ঠিক আছে।

ওরা বাইরের হোটেলে না খেয়ে রেলের ক্যান্টিনে খেল। পল্টনের প্রতি মুহূর্তে ভয় হচ্ছিল ধরা পড়বার। যদি ওর চিঠি পেয়ে দিবাকর বা কাকুমণি ছুটে আসেন, তা হলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। তার ওপর এইরকম সুসজ্জিতা দুলালিকে দেখে অন্যরকম সন্দেহ করেন যদি? ভয় হল কাকুমণিকে। ও তো ঝোঁকের মাথায় ছিঁড়ে আনল এই বনফুল। তিনিও যদি অন্য রকম কিছু ভেবে বসেন?

খাওয়া দাওয়া করে ওরা বেনারসের দুটো টিকিট কেটে প্ল্যাটফর্মে আসতেই দেখল একটা প্রায় ফাঁকা গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে।

পল্টন একজন চেকারকে জিজ্ঞেস করল, এ গাড়িটা কোথায় যাবে?

তোমরা কোথায় যাবে?

আমরা বেনারস যাব।

এটা ভাগলপুর বোম্বাই এক্সপ্রেস। বেনারস যাবে না। তবে তোমরা মুঘলসরাই পর্যন্ত চলে যেতে পার এই গাড়িতে। ওখান থেকে যে কোনও ট্রেনে অথবা বাসে চলে যেয়ো বেনারসে।

ওরা আর বিলম্ব না করে চলন্ত ট্রেনের হাতল ধরেই উঠে পড়ল ট্রেনে। দুলালি আগে উঠলে, ছুটে উঠল পল্টন। গাড়িটা জনতা গাড়ি। সব বগিই সেকেন্ড ক্লাস। লোক্যাল যাত্রীদের ভিড় নেই বললেই হয়। তাই বসবার কোনও অসুবিধে হল না। পরের স্টেশন দানাপুরে একজন যাত্রী নেমে যেতে বাঙ্কও পেয়ে গেল একটা।

একজন সহযাত্রীর মুখে শুনল একেবারে শেষ রাতে অথবা ভোরে এ গাড়ি মুঘলসরাই পৌঁছবে। তাই ওরা দু'জনেই সেই বাঙ্কটি দখল করে বসে রইল চুপচাপ। ঘুম এলে শুয়েও পড়া যাবে।

রাতের অন্ধকারে চলমান ট্রেনের কামরায় সমস্ত বিপদের মেঘ যেন কেটে গেল।

দুলালি ওর বুকের কাছে গুঁজে রাখা পলিথিনে মোড়া কী যেন একটা বার করে পল্টনের হাতে দিল। পল্টন বলল, কী এটা?

দেখোই না। তুমি তো লিখাপড়া জানো। তুমি পড়তে পারবে। পল্টন সেটা খুলে দেখল পোস্ট অফিসের একটি পাস বই। তারই পাতায় ওর দিনে দিনে সংগ্রহ করা ভিক্ষালব্ধ অর্থের এক অসামান্য সঞ্চয়। মাত্র চার বছরে পঞ্চাশ হাজার টাকার ওপর জমে গেছে। পল্টন বিস্মিত হয়ে বলল, এ কী করে সম্ভব !

দুলালি বলল, আমি সারা দিন ভিক্ষে করে পঁচিশ থেকে ত্রিশ রুপাইয়া পাই। আর জুতো রাখার ব্যবসায় কম করেও পঞ্চাশ থেকে একশো রুপিয়া, কখনও দেড়শো-দুশোও হয়ে যায়! পালেপার্বণে তো কথাই নেই। আগে এগুলো একটা কৌটোয় জমিয়ে রাখতুম। তারপর মাস্টারমশাইয়ের কথায় পোস্ট অফিসে জমা রাখছি।

পল্টন বলল, তুমি তো অনেকের চেয়ে দেখছি বড়লোক। তা যাকগে এই টাকার কথা তুমি কাউকে বলবে না কিন্তু।

দুলালি বলল, এই বইটা এখন থেকে তোমার কাছেই থাকবে। আমি আর রাখতে পারব না।

পল্টন বলল, এখন আমি রাখছি। পরে আমার কাছেও রাখব না। আমার কাকুমণির কাছে রেখে দেব। উনি পোস্ট অফিসের অনেক ব্যাপারস্যাপার জানেন। পাঁচ বছর, ছ’ বছরে এই টাকা পোস্ট অফিসে ডবল হয়ে যায়। উনি সেই ব্যবস্থাই করে দেবেন।

দুলালি হঠাৎ কোমরে বাঁধা একটা গেঁজে বার করে বলল, এতেও অনেক রুপিয়া আছে। কাল আজ সারাদিনের কামাই। গুণে দেখো তো কত? এর ভেতর থেকে সামান্য কিছু খরচ করেছি। এই চুড়িদারটা কিনেছি। ট্রেনের ভাড়া অবশ্য তুমি দিয়েছ, খাইয়েছ।

পল্টন সেই সব টাকা-পয়সা গুণে দেখল কিছু কম পঞ্চাশ টাকা। দুলালি বলল, ওগুলোও তোমার কাছে রাখো।

পল্টন বলল, না। কোনও অবস্থাতেই নিঃসম্বল হওয়া উচিত নয়। এগুলো

এর ভেতরে যেমন ছিল তেমনি থাক। বলা যায় না কখন কী হয়।

অগত্যা দুলালি ওগুলো আবার আগের মতোই নিজের কাছে রেখে দিল। পল্টন বলল, সবাই যদি তোমার মতো হিসেবি হত?

দুলালি বলল, পোস্ট অফিসের খোঁজ সবাই এখন জেনে গেছে। পোস্টমাস্টারমশাই রোজ গঙ্গায় চান করতে যান। আর আমাদের মতন ভিখিরিদের রুপিয়া নিয়ে বই করে দেন। আবদুলের মা'র এখন এক লাখসে জায়দা রুপিয়া হয়ে গেছে।

তবুও সে ভিক্ষে করে?

আমিও তো করি। আমাদের ঘরভাড়া লাগে না। ভিক্ষের চাল-ডাল ফুটিয়ে খাই। বসে বসে রুপিয়া পাই। আমার খরচা শুধু সকালেবিকেলে এক কাপ করে

চা। রাত্রে হোটেলে মাংস-রুটি। আমি মাংস খেতে খুব ভালবাসি। তা দশ টাকার মধ্যেই হয়ে যায়।

সেই সঙ্গে সিনেমা দেখতেও তো ভালবাস।

তা বাসি। নাইট শোতে একটা যে কোনও সিনেমা দেখা আমার চাই-ই। আমাদের বাড়ি গেলে সিনেমা দেখাটি কিন্তু তোমার চলবে না।

দুলালি বলল, আমি সব সময় তোমার মাকে জড়িয়ে ধরে থাকব। তোমাদের ঘরের সব কাজ করে দেব। থালাবাসন মেজে দেব। তোমার দিদিরা কোথাও বেড়াতে গেলে তাদের সঙ্গে যাব। তবে আমার এই রুপিয়াগুলো ডবল হয়ে গেলে তুমি যদি রাজি থাকো তা হলে ছোটখাটো একটা ব্যবসা করব।

তুমি এইটুকু মেয়ে তোমাকে ব্যবসার বুদ্ধি কে দিল?

আমাদের গাঙ্গুরামকে তো তুমি চেনো না? ও মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে দু’-হাজার রুপিয়া নিয়েছিল। সেই টাকায় কলকাতা গিয়ে রথের মেলা আর দুর্গাপুজোয় তালপাতার বাঁশি বেচে দশ হাজার রুপিয়া করেছে। তুমিও বড় হয়ে চাকরি না করে বিজনেস করবে।

পল্টন বলল, তোমাদের গাঙ্গুরামরা যা পারে, আমরা যে তা পারি না দুলালি। আমরা জীবনে বড় হবার স্বপ্ন দেখি। আশায় আশায় দিন গুনি। আমাদের কত সুন্দর ফুলের মতো জীবনগুলো একসময় পাপড়ির মতো ঝরে যায়। আমরা যখন জীবনে হেরে যাই তখন ভগবানকে দোষারোপ করে স্যুইসাইড করি। আর তোমাদের দেশ থেকে তোমাদের জাতভাইরা আমাদের দেশে এসে আট হাতি ধুতি আর কাঁধে গামছা নিয়ে ফুটপাথে শুয়ে ছাতু খেয়ে শুধু চানা বেচে বড় বড় শেঠ হয়ে যায়।

তবে! তুমিও তাই হবে। দরকার হলে আমি তোমাকে রুপিয়া দেব। তুমি আমাকে এতখানি বিশ্বাস কেন করলে?

তা জানি না। তবে আমার জন্যে আমার মনে যখন দরদ আমি মালুম পেয়েছি, তখনই বুঝেছি তুমি আমার সত্যিকারের দোস্ত। আমি তোমার সঙ্গে আসতে চাইলাম না। ছুটে পালিয়ে গেলাম। তারপরেও তুমি আমার কাছে এলে। সেই জন্যেই আমিও আমার ব্যবসা ছেড়ে, মুলুক ছেড়ে, তোমার সঙ্গে দোস্তি করতে চলে এলাম।

পল্টন বলল, আসলে আমারও তোমাকে খুব ভাল লেগেছিল। তুমি আমায় প্রাণে বাঁচালে। কত করলে আমার জন্যে। তা বড় হয়ে তোমার কথামতো চাকরির সোনার বণের পিছনে না ছুটে ব্যবসা করলে কিন্তু মন্দ হয় না। জীবনে দাঁড়াবার জন্যে দরকার হলে তোমাদের গাঙ্গুরামের মতো তালপাতার বাঁশিই বেচব। তোমরা বিহার ইউ পি থেকে কলকাতায় আসছ। আমি হাওড়া কলকাতা থেকে তোমাদের দেশে যাব। তা হলে কেউ আমাকে চিনবে না। আমরা তো বেনারসে যাচ্ছি। শুনেছি বেনারস খুব ভাল জায়গা। এখন সব দেখেশুনে যাই। পরে বেনারস থেকেই আমার ব্যবসা শুরু করব।

ট্রেন এসে আবার একটা স্টেশনে থামল। জনতা গাড়ি তো। মেল-এক্সপ্রেসের ভাড়া নিয়েও সব স্টেশনে থামে। লোকজন অবশ্য খুব বেশি ওঠানামা করল না। কথা বলতে বলতে দু'জনেরই চোখে ঘুম আসছিল। তাই দু'জনে দু'দিকে মাথা করে একটু টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল যে যার।

ট্রেন চলতে লাগল।

ওরাও ঘুমিয়ে পড়ল এক সময়।

সকালবেলা একজন চেকারের ধাক্কায় ঘুম ভাঙল পল্টনের।

টিকট দিখাইয়ে।

পল্টনের মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে তখন। তবুও ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দেখল দুলালি নেই। গাড়িতে এখন ভিড়ে ভিড়। বসবার জায়গা না-পেয়ে কত লোক যে দাঁড়িয়ে আছে তার ঠিক নেই।

টিকট কাহা।

পল্টন টিকিট দেখাল।

এ টিকট তো মুঘলসরাইমে খতম হো গিয়া। বনারস কা

টিকট। পল্টন বলল, হ্যাঁ বেনারসের টিকিট।

তুমকো জুরমানা দেনে পড়ে গা।

জরিমানা দেবার টাকা আমার কাছে তো নেই।

তব জেল যা না পড়ে গা। তুমহারা আউর সাথি কাহা?

জানি না। বোধহয় বাথরুমে গেছে।

ডাকো। আউর হিয়া উতারো।

পল্টন বাঙ্ক থেকে নেমে বাথরুমে গিয়ে খোঁজাখুঁজি করল। কিন্তু কোথায় দুলালি? কেউ কোথাও নেই। শুধু যেখানে ওরা শুয়ে ছিল তার এক পাশে ওর কাচের চুড়িগুলো ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। আর এক পাশে পড়ে আছে এক পাটি জুতো। তবে কী! মনে হওয়ামাত্রই শিউরে উঠল পল্টন। তবে কি কেউ কোনও ঘুমের ওষুধ ওর নাকে চেপে দুলালিকে নিয়ে পালিয়েছে? না হলে কী করে সম্ভব এই রহস্যময় অন্তর্ধান? কেনই বা ঘুমনোর পর ওর মাথাটাও ঝিমঝিম করছে? মির্জাপুর আ গিয়া তুম হিয়া উতারো।

চেকার বলল,

পল্টন ছলছল চোখে নেমে পড়ল ট্রেন থেকে। তারপর সব কথা খুলে বলল চেকারকে। দুলালির চেহারার বর্ণনা দিয়ে বলল নিশ্চয়ই মেয়েটাকে গুম করেছে কেউ।

চেকার ওকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে জি আর পি-তে ডায়েরি লেখালেন। তারপর পাটনায় সত্যবাবুর বাড়ির ঠিকানাটা নোট করে ছেড়ে দিলেন ওকে। জরিমানা দিতে হল না।

মির্জাপুর থেকে বারাণসীর ঘন ঘন বাস ছাড়ে। তারই একটাতে জি আর পি-র লোকেরা বসিয়ে দিল ওকে। ও সেই বাসে চেপে বারাণসী এল। ময়দাগিন নামে একটা জায়গায় বাস থেকে নেমে ও রিকশা করল। ঠিকানা তো জানে না। তাই শুধু অগস্ত্যকুণ্ডার কথা বলল। রিকশাওয়ালা ওকে নিয়ে এল গোধূলিয়ায়। তারপর ঘোড়ার গাড়ির স্ট্যান্ডের পিছন দিকের গলিটা দেখিয়ে বলল, অগস্ত্যকুণ্ডা উধার মিলে গা।

অনেক বেলা হয়েছে তখন। তা প্রায় একটা-দেড়টা।

পল্টন এই অচেনা জায়গায় এসে ঘাবড়ে গেল খুব। নাম জানে না, ঠিকানা জানে না, এই অবস্থায় কাউকে কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব? তবু একজন বাঙালিকে দেখে বলল, আচ্ছা এখানে গোপাদের বাড়িটা কোথায় বলতে পারবেন? গোপা? কে গোপা? বাবার নাম কী? ঠিকানা কত?

পল্টন ওর বিপদের কথা বলল।

ভদ্রলোক বললেন, এভাবে তো খুঁজে বার করা মুশকিল। তবু দেখি কী করতে পারি। বলে একজনদের বাড়ির একটি মেয়েকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, খুকি শোনো! তোমরা তো এই মহল্লায় থাক, এখানে গোপা নামে কেউ থাকে জানো?

মেয়েটি বলল, জানি। কিন্তু কী ব্যাপার বলুন তো?

এই ছেলেটি নতুন এসেছে এখানে। ওদের বাড়ি যেতে চায়।

গোপা আমার বন্ধু। তবে বাড়ি তো দেখাব না। কেন না একটু দুষ্টচক্রের নজর পড়েছে ওর দিকে। পাটনায় গিয়ে ওর খুব বিপদ হয়েছিল। তা ওর নাম এবং কোথা থেকে আসছে জানালে আমি ওর মাকে গিয়ে বলতে পারি। এর পরে ওঁরা যদি নিয়ে যেতে বলেন তা হলে নিয়ো যাব।

পল্টন বলল, তা হলেই হবে। একটা কাগজ দাও, আমি আমার পরিচয় লিখে দিচ্ছি।

মেয়েটি একটি কাগজ দিলে, পল্টন লিখল, আমি এসে গেছি। আমাকে নিয়ে যাও।—পল্টন সেই চিরকুটটা নিয়ে মেয়েটি চলে গেল। একটু পরেই দেখা গেল গৌতম ও গোপা হন্তদন্ত হয়ে আসছে ওর দিকে।

গৌতম তো এসেই জড়িয়ে ধরল পল্টনকে। তারপর বলল, ব্যাপারটা কী! আমরা দু'জনে স্টেশনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলা হয়ে গেলাম। অমৃতসর এক্সপ্রেসে এলি না, পঞ্জাব মেলে এলি না। তাই ভাবলাম হয়তো কোনওকারণে আসতে পারলি না তুই। ওখান থেকে ফিরে এসে সবে স্নান খাওয়া সেরেছি। এমন সময় তুই এলি।

পল্টন বলল, হ্যা এলাম। তবে মনের মধ্যে মুক্তির আনন্দ নিয়ে আসিনি ভাই। বুকভরা চাপা কান্না নিয়ে এসেছি।

দাদুভাইয়ের ওইরকম মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য তো? কী আর করবি বল, যার যা নিয়তি তার তো তাই হবে।

নারে। আমি আমার এক সত্যিকারের বন্ধুকে চিরকালের জন্য হারালাম আজ। বনের ফুল ছিঁড়ে নিয়ে চলে আসছিলাম। সে ফুল অপরে নিয়ে গেল। ওর এতবড় ক্ষতিটা হয়ে গেল শুধু আমার জন্য। কেন যে ওকে আনতে গেলাম?

কার কথা বলছিস তুই?

যে তোকে সাহায্য করেছিল, গোপার খোঁজ দিয়েছিল, আমার জীবন রক্ষা করেছিল, তার কথা।

অর্থাৎ দুলালি? সেই নিষ্পাপ সুন্দর মেয়েটি?

হ্যাঁ।

কী ব্যাপার বল তো?

গোপা বলল, রাস্তায় কথা বলার দরকার নেই। ঘরে চলো।

ওরা গোপাদের বাড়ি এল।

এখান থেকে গঙ্গা খুব কাছে। তবুও অনেক বেলা হয়ে গেছে বলে পল্টন বাড়িতেই স্নান করল। ছোট্ট দোতলা বাড়ি। কিন্তু কী সুন্দর। নীচের তলাটা অন্ধকার। ওপরটা খোলামেলা। কাশীর সব বাড়িই প্রায় এই রকম। এই বাড়িও তার ব্যতিক্রম নয়।

দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর ছাদে রোদ্দুরে শুয়ে আগাগোড়া সমস্ত ঘটনার কথা ওদের দু'জনকে খুলে বলল পল্টন।

সব শুনে স্তব্ধ এবং মর্মাহত হয়ে গেল ওরা।

গোপা বলল, আর কেউ নয়, নির্ঘাত ওই শয়তান ডিসুজার লোকই পিছু নিয়েছিল তোমাদের। ছদ্মবেশে ট্রেনের কামরায় উঠেছিল। পরে তোমরা ঘুমিয়ে পড়লে নাকে ক্লোরোফর্ম মাখানো রুমাল চেপে আরও ঘুম পাড়িয়ে কাজ হাসিল করে।

গৌতম বলল, ঠিক তাই। পল্টন দুলালিকে ডাকতে গিয়েই ভুল করেছিল। তখন থেকেই ওকে ফলে! করেছে ওরা। তারপর স্টেশনে এসে দু'জনকে ভাগতে দেখেই নেয়। ট্রেনের কামরায় দু'জনকে একসঙ্গে পেয়ে সুবিধেই হয়েছে ওদের। টার্গেটটা বেশি করে গিয়ে পড়ে দুলালির ওপর। পল্টনকে ছেড়ে দুলালিকে নিয়েই পালায় ওরা।

পল্টন বলল, কিন্তু কামরায় তো আরও অনেক লোক ছিল। ছিল। হয় তারা অঘোরে ঘুমোচ্ছিল, নয়তো ছোরা-রিভলভার নিয়ে ভয় দেখিয়েছিল তাদের।

পল্টন বলল, এখন তা হলে উপায়?

নয়নাগিরি অভিযান।

নয়নাগিরি কোথায় তাই তো জানি না আমরা।

সেটা জানতে হবে এবং জীবন দিয়েও দুলালিকে ওদের কবল থেকে উদ্ধার করতে হবে। যার জন্যে গোপাকে আমরা ফিরে পেয়েছি, তোর জীবন রক্ষা হয়েছে, তার জন্যে প্রয়োজন হলে যমের সঙ্গে লড়ে যাব আমরা।

কিন্তু নয়নাগিরির সন্ধান আমরা কী করে পাব?

নয়নাগিরির সন্ধান পেতে গেলে আজই বিকেলে রাণামহলের ঘাটে ঘুরঘুট্টিবাবার দর্শন পেতে হবে আমাদের!

ঘুরঘুট্টিবাবা কে?

তুই চিনবি না। উনি পায়ে হেঁটে সারা ভারত ভ্রমণ করেছেন। চিত্রকূট পর্বতে থাকেন উনি। এখন একমাস কাশীতে থাকবেন। কাল ওনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আমাদের। চমৎকার এবং নির্লোভ সাধু। উনি নিশ্চয়ই বলতে পারবেন নয়নাগিরিটা কোথায়।

পল্টন বলল, তা হলে আর দেরি নয়। একটু বিশ্রাম নিয়েই চল গিয়ে দেখা করে আসি।

গৌতম বলল, আমার মনে হয় নয়নাগিরিটা পাটনা এবং বেনারসের মাঝামাঝি অথবা কাছাকাছি।

এইরকম মনে হওয়ার কারণ?

কারণ একটাই, এই ধরনের কাণ্ডকারখানা মূল কেন্দ্র থেকে খুব বেশি দূরে হওয়াটা সম্ভব নয়। ত্রিবেদী বলেছিলেন, বিহারে নয়নাগিরি নামে কোনও জায়গা নেই। তা যদি হয় তা হলে নয়নাগিরি উত্তরপ্রদেশে হতে বাধা কোথায়? বিশেষত অপহরণটা যখন বক্সার ও মুঘলসরাইয়ের মধ্যে হয়েছে।

পল্টন বলল, তুই ঠিক বলেছিস। আমি মির্জাপুরে জি আর পি-তে ডায়েরি লেখালেও এখানকার পুলিশকে একবার জানাই চল। ওঁরা ত্রিবেদীর সঙ্গেও কথা বলে নেবেন। আর আমরা ঘুরঘুট্টিবাবার কাছ থেকে জানবার চেষ্টা করব নয়নাগিরিটা কোথায়?

ওরা এইসব আলোচন করছে সেই সময় গোপার মা এলেন। আলোচনাটা তাই অন্য দিকে মোড় নিল। চোখ বুজে শুয়ে থাকতে থাকতে গত রাতের ট্রেন জার্নির ক্লান্তিতে গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়ল পল্টন।

চোদ্দো

বিকেলবেলা চা-টা খেয়ে সবাই এল দশাশ্বমেধ ঘাটে। প্রচুর জনসমাগমে ঘাট তখন জমজমাট। অর্ধচন্দ্রাকৃতি এই ঘাটগুলোর ধারে ধারে কত যে মন্দির তার যেন লেখাজোখা নেই। সামনেই নীল জলের গঙ্গা। কী চমৎকার। সেই গঙ্গার জলে সারি সারি নৌকা আর বজরা বাঁধা আছে। মন্দিরে মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে। কত ভিখারি বসে আছে ঘাটের সিঁড়িতে। কত হিপি ও অন্যান্য বিদেশিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর আছে অগণিত ভ্রমণার্থী।

পল্টন মুগ্ধ বিস্ময়ে বলল, এই কাশী! এত সুন্দর!

গোপা বলল, হ্যাঁ, এই কাশী। অপর নাম বারাণসী। এর আরও একটা নাম আছে। গৌতম বলল, কী নাম!

অবিমুক্তক্ষেত্র।

পল্টন বলল, দুলালিকে যদি ওরা চুরি না করত, তা হলে আজকের এই পরিবেশ আমাদের কাছে আরও রমণীয় হয়ে উঠত।

গৌতম বলল, আমার এত ভাল লেগেছে যে মনে হচ্ছে এখুনি বাড়িতে একটা টেলিগ্রাম করে সবাইকে ডাকিয়ে আনি।

পল্টন বলল, আমারও তাই মনে হচ্ছে। কিছু না হোক মাকে একবার আনতেই হবে। আমার মায়ের অনেক দিনের আশা কাশীতে আসবার। আচ্ছা, বিশ্বনাথের মন্দিরটা কোথায়?

সন্ধের পর নিয়ে যাব। আগে চলো আমরা ঘুরঘুট্টি বাবার সঙ্গে দেখা করি। ওরা পায়ে পায়ে রাণামহলের ঘাটের দিকে এগোল।

পল্টন বলল, এরকম কতগুলো ঘাট আছে এখানে?

চারশো একটি। রাজঘাট থেকে অসিঘাট পর্যন্ত। গঙ্গা-বরুণা-অসি তিন নিয়ে বারাণসী। বরুণা নদী সারনাথ গেলে দেখতে পাবে।

গৌতম বলল, এবারে কিছুই দেখা হবে না। পরের বার সবাইকে নিয়ে আসব, দল বেঁধে হইহই করে ঘুরব সকলে।

রাণামহলে ঘাটের সিঁড়িতে ঘুরঘুট্টিবাবা বসে বসে তপজপ করছিলেন। ওদের দেখেই হাসিমুখে হাত নেড়ে কাছে ডাকলেন।

গোপা গৌতম পল্টন তাঁর কাছে দিয়ে বসল। গোপা বাবাজির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল পল্টনের। তারপর আসল কথায় এল।

গৌতম বলল, এ পর্যন্ত আপনি কতদেশ ঘুরেছেন বাবাজি!

ও তো মুঝে ইয়াদ নেহি বাবা। বহুত তীরথ ঘুমা ম্যায়নে। ইয়ে বাত কিউ পুছ রহে তুম?

পল্টন বলল, বাবা চা খাবেন?

খিলানে সে খায়গা জরুর, চা নেহি পিয়েঙ্গে তো জীয়েঙ্গে ক্যায়সে? পল্টন চা আনতে চলে গেল।

গোপা বলল, আপনি নয়নাগিরি গেছেন বাবাজি?

নয়নাগিরি! ও নাম তো ম্যায়নে কভি নেহি শুনা। ক্যা হ্যায় হুঁয়া পর? তা জানি না। কয়েকজন লোক বলাবলি করছিল কি না তাই।

এমন সময় কোথা থেকে এক বাঙালি সাধু এসে জুটে গেলেন সেখানে। বললেন, এলাহাবাদে গঙ্গাযমুনা সঙ্গমের এপারে হল নৈনি। ওইখানে অনেক ছোট ছোট বুনো পাহাড় আছে। বিন্ধ্যাচলের শাখাপ্রশাখা। তা ছাড়া বিন্ধ্যাচলের কাছেই আছে কালীকুঁয়া, সীতাকুণ্ড, পর পর। নয়নাগিরি ওইখানেই কোথাও হবে!

হ্যাঁ।

তা হলে এক কাজ করো, কাল সকালের বাসেই তোমরা বিন্ধ্যাচলে যাও। ওখানে বিন্দুবাসিনী দেখে সীতাকুণ্ড কালীকুঁয়া দর্শন করো। তবে একটা কথা, ওসব জায়গা কিন্তু খুব খারাপ। চোরডাকাতের আড্ডা ওখানে। দুষ্কৃতীরা ওখানে এমনই সক্রিয় যে জলজ্যান্ত একটা মানুষকেও হাপিস করে দিতে পারে। তোমরা বিন্ধ্যাচলে গিয়েই ছত্রী ধর্মশালায় উঠবে। খুব ভদ্র ব্যবহার ওদের। তারপর কালীকুঁয়ায় গিয়ে বজরঙ্গবাবা নামে একজন সাধুর সঙ্গে দেখা করবে। উনিই তোমাদের বলে দেবেন নয়নাগিরি কোথায়। তবে আমার মনে হয় ওইখানেই আশেপাশে হবে।

পল্টন তখন চা নিয়ে এসেছে। ওর ভাগেরটা সেই আগন্তুক সাধুকে দিয়ে ও নিজের জন্য এক কাপ আনতে গেল। চা খাওয়া হলে ঘুরঘুট্টিবাবাকে প্রণাম করে সন্ধে পর্যন্ত গঙ্গাবক্ষে ঘুরে বেড়াল একটা বজরা ভাড়া নিয়ে। এরপর অন্নপূর্ণা ও বিশ্বনাথ দর্শন করে ওরা থানায় এসে রিপোর্ট করল কালকের ঘটনাটা।

পুলিশ অফিসার সব শুনে যা বললেন তা হল এই উত্তরপ্রদেশের আয়তন দু’ লক্ষ চুরানব্বুই হাজার চারশো তেরো স্কোয়ার কিমি। এক বিশাল এলাকা। এখানকার ধারেকাছে নয়নাগিরি নামে কোনও পাহাড় আছে কি না তাঁদের জানা নেই। তা ছাড়া আদৌ ওরা দুলালিকে নয়নাগিরি নিয়ে গেছে কি না তাই কে জানে? বা ওই একই দল যে ওই কাজ করেছে তারই বা প্রমাণ কী?

গোপা বলল, তা হলে এক্ষেত্রে কি আপনাদের কিছুই করণীয় নেই? নেহি। বারাণসী পুলিশ কুছ নেহি কিয়েগা। ইয়ে বিহার-পুলিশ ঔর রেলওয়ে-পুলিশ কা কাম। হামারা কাম স্রেফ তুমকো অ্যারেস্ট করনা।

অ্যারেস্ট করবেন? আমাদের অপরাধ?

ও লেড়কিকো সাথ লেকে কৌন আয়া থা? পল্টন বলল, আমি।

অন্দর ঘুসো। বলে প্রায় ধাক্কা দিয়েই পল্টনকে লকআপে পুরে দিল পুলিশের লোকেরা।

পল্টনের চোখে তখন জল এসে গেছে।

পুলিশ বলল, এটা একটা নাবালিকা অপহরণের কেস।

গোপা বলল, কিন্তু মেয়েটির তো কেউ কোথাও নেই। স্বেচ্ছায় এসেছিল সে। আমরা কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে তাকে আমাদের পরিবারের মধ্যে আশ্রয় দিতে চেয়েছিলাম।

ও হামলোগ নেহি সমঝে গা। মি. ত্রিবেদীকা রিপোর্ট মিলনেসে তব ছোড়ে গা। নেহি তো কোর্ট মে ভেজেঙ্গে কানুন মোতাবিক।

ঠালা সামলাও। অপমানে দুঃখে রাগে কী যে করবে পল্টন কিছু ঠিক করতে পারল না। হিতে বিপরীত একেই বলে।

গোপা ও গৌতম তখুনি ছুটল বাড়িতে। ওর মা এই দুঃসংবাদ পেয়েই একে ওকে তাকে ধরে অনেক চেষ্টা করলেন পল্টনকে ছাড়াবার। কিন্তু না, পুলিশ কোনও অবস্থাতেই ওকে জামিন দিতে রাজি হল না। আবার নতুন করে একটা দুশ্চিন্তার মেঘ ঘনিয়ে এল সকলের মনে।

সারারাত ঘুম হল না কারও।

গোপা আর গৌতম দু'জনেই পাটনায় ফোন করে সত্যসুন্দরবাবুকে পল্টনের অ্যারেস্ট হওয়ার খবরটা জানিয়ে দিল। এবং এও বলল এই ব্যাপারে মি. ত্রিবেদীকে একটু সাহায্য করতে।

অপহৃতা দুলালির খোঁজে বিন্ধ্যাচলে যাওয়া মাথায় উঠল ওদের। এখন থানা-পুলিশ কোর্ট-কাছারিতে জড়িয়ে পড়লে আরও অনেক কিছুই মাথায় উঠবে। আবার বিন্ধ্যাচলে গেলেই যে নয়নাগিরি যেতে পারবে তারও কোনও মানে নেই। তবু মনের ভেতরটা কেন কে জানে বার বার বলছে মেয়েটির খোঁজে একবার অন্তত যাওয়া উচিত। নয়নাগিরির খোঁজ পেলে শুধু দুলালি নয়, আরও অনেকের অনেক দুলালিরই মান রক্ষা হবে।

ভোরবেলা পুলিশ এসে পৌঁছে দিয়ে গেল পল্টনকে। মি. ত্রিবেদী সত্যসুন্দরবাবুর রিপোর্ট অনুযায়ী এখানকার থানায় বিশদ জানিয়েছেন। এবং এও জানিয়েছেন কাল রাতে ডিসুজার লোকেরা নাকি প্রাণনাশের চেষ্টা করেছিল মি. ত্রিবেদীর। শংকর, দয়াল এবং ডিসুজার নামে ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই তিন কুখ্যাত শয়তান সম্ভবত উত্তরপ্রদেশেই গা ঢাকা দিয়েছে কোথাও। তা সে নয়নাগিরিতেই হোক বা যেখানেই হোক।

এখানকার পুলিশকেও তাই সতর্ক থাকতে অনুরোধ করেছেন তিনি! পল্টনকে ফিরে পেয়ে আনন্দে অধীর হয়ে উঠল গৌতম।

পল্টন বলল, এখন আনন্দ প্রকাশের সময় নয়। যেভাবেই হোক আগে নয়নাগিরিতেই যাই চল।

গোপার মা বললেন, সেটা আবার কোথায়?

তা আমরাও জানি না। তবে এক সাধুর মুখে শুনেছি ওটা বিন্ধ্যাচলের কাছাকাছি। আমরা এখুনি যাব সেখানে।

কিন্তু যদি তোমাদের কোনও বিপদ হয়?

হোক। তবু যাব। তা ছাড়া দুলালিকে যদি আমাদেরই একজন বলে মনে করি তা হলে এ বিপদ তো আমাদেরই। বিশেষ করে মেয়েটি আমাদের ভরসাতেই তার দেশ ছেড়ে এসেছিল।

তবু আমার ভয় করে বাবা।

গৌতম বলল, ভয় করলেই ভয়। ভয় না পেলেই জয়। তা ছাড়া আপনার মেয়ের জন্যও তো আমরা জীবন বিপন্ন করে বিপদের ঝুঁকি নিয়েছিলাম। পল্টনের ব্যাপারটা একবার চিন্তা করে দেখুন তো?

মা এরপরে আর কোনও কথাই বললেন না। সঙ্গে সঙ্গে স্টোভ ধরিয়ে ওদের জলখাবারের ব্যবস্থা করে দিলেন।

পল্টন আর গৌতম যাবার জন্য তৈরি হতেই গোপা বলল, আমিও যাব। মা বললেন, তুই কোথায় যাবি?

আমি যাবই।

গৌতম বলল, না গোপা। তোমার যাওয়া উপযুক্ত মনে করছি না আমরা। কীভাবে তোমাকে রক্ষা করেছিলাম বলো তো?

জানি। তবে আমি যদি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে না পড়তাম তা হলে কি পারতে আমাকে উদ্ধার করতে? ওই শয়তানদের উপযুক্ত শিক্ষা আমিই দেব। তোমরা দু'জনে শুধু আমার পাশে থাকবে। তারপর যা করবার করব আমি। তবে যাবার আগে—।

যাবার আগে কী?

এক মিনিট বসো। আমি এখনি আসছি।

গোপা কাউকে কোনও কথা না বলে তর তর করে নেমে গেল নীচে। অনেক পরে যখন সে ফিরে এল তখন ওর বেশ খুশি খুশি মুখ। আর চেহারাতেও পরিবর্তন হয়েছে অনেক। ওর এতদিনের লম্বা বেণীটাকে কেটে চাইনিজ কাট দিয়েছে চুলে। কেমন যেন একটা গোলাপি রঙের স্কার্ট পরে এসেছে কোনও এক বান্ধবীর কাছ থেকে চেয়ে। কী স্মার্ট যে দেখাচ্ছে ওকে তা বলবার নয়। এসেই বলল, শোনো, আমাদের বিন্ধ্যাচলে যাবার একটা ব্যবস্থা করে এলাম। বাস ধরবার জন্য সেই ময়দাগিনে ছুটতে হবে না। গোধূলিয়ার মোড় থেকে একটা ট্যুরিস্ট বাস ছাড়ছে চুনার বিন্ধ্যাচলের। আমরা সেই বাসেই যাব। ওরা আগে বিন্ধ্যাচল গিয়ে পরে চুনার যাবে। লাক্সারি বাস। আমরা বিন্ধ্যাচলে নেমে ওই বাস ছেড়ে দেব।

কত করে ভাড়া নেবে কিছু জেনেছ?

হ্যাঁ। আপ-ডাউনের ভাড়া পঞ্চাশ টাকা। আমাদের ত্রিশ টাকা করে দিলেই চলবে। এখুনি ছাড়বে বাস। এসো।

গোপা, গৌতম, পল্টন মাকে প্রণাম করে বিদায় নিল। মা শুধু ম্লান মুখে একবার ভগবানকে ডাকলেন, বাবা বিশ্বনাথ ওদের রক্ষা কোরো।

ওরা খুব জোরে পথ হেঁটে গোধূলিয়ার মোড়ে এল। বাস তখন ছাড়ব ছাড়ব করছে। বোধহয় ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই বিন্ধ্যাচলে পৌঁছে গেল ওরা। সেখানে তখন মন্দিরে পুজো দেবার দারুণ ভিড়। সমস্ত যাত্রীদের পূজাপাঠ শেষ হলে তবেই ছাড়বে বাস। অথচ এদের আর ধৈর্য নেই।

ছোট্ট একটি পাহাড়ের ওপর মা বিন্ধ্যবাসিনীর মন্দির। একান্নটি সতীপীঠের অন্তর্গত একটি পীঠ। তাই মহিমা এখানে খুব। এই পাহাড়ে কোনও গাছপালা নেই। শুধু ঘরবাড়ি আর দোকানপত্তর।

প্রায় ঘণ্টাখানেক দেরি হয়ে গেল এখানে। তারপর বাস এল সীতাকুণ্ডে। ঘন জঙ্গলে ভরা একটি পাহাড়ের পাদদেশে বাস থামতেই নেমে পড়ল যাত্রীরা। এইখান থেকেই পাহাড়ের মাথার ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হবে কালীকুঁয়ায়।

অতএব শুরু হল পর্বতারোহণ। পাহাড়ের ওপরে ওঠার ভাল ব্যবস্থা আছে। তবে অসংখ্য হনুমানের উপদ্রব এখানে। ওরা দলবদ্ধ ছিল তাই হনুমানগুলো ওদের আক্রমণ করল না। শুধু দাঁতমুখ খিঁচিয়েই ছেড়ে দিল।

সীতাকুণ্ডে একটি ঝরনা আছে। আর আছে একটি সাধুর আশ্রম। ওরা সহযাত্রীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেই আশ্রমে বসে সাধুদের সঙ্গে গল্প জমাল। তারপর ঝরনার জল খেল পয়সা দিয়ে। একজন সাধুবাবা লোটা ডুবিয়ে জল খাওয়ালেন ওদের। এই কুণ্ড কোনও যাত্রীকে স্পর্শ করতে দেন না সাধুরা।

জলটল খেয়ে ওরা একজন সাধুকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা বাবা, এই যে পাহাড় এর নাম কী?

বিন্ধ্যাচল। অষ্টভূজা ভি কহা যাতা হ্যায়।

তা হলে নয়নাগিরিটা

কোথায়?

ও মুঝে মালুম নেহি।

এখানে বজরঙ্গবাবা নামে কেউ আছেন?

হাঁ হাঁ। কালীকুঁয়া চলা যাও। হুঁয়া মিল যায়ে গা।

ওরা আশায় বুক বেঁধে এগিয়ে চলল। কিছু পথ যাবার পরই দেখল এক জায়গায় একটি সুবৃহৎ ঝরনা রয়েছে। দেখেই মনে হল বর্ষায় এর রূপ ভয়ংকর। এখন জলহীন হলেও তখন এখানে ঝরনা নয়, জলপ্রপাত হয়। বন-জঙ্গলে ভরা এখানকার চারদিক।

গোপা বলল, আমার মনে হয় আমরা ঠিক জায়গাতেই এসেছি।

গৌতম বলল, তুমি কি বলতে চাও এইটাই, এটা না হলেও এর ধারে কাছেই হবে।

নয়নাগিরি?

ওরা যখন এই সব আলোচনা করছে তেমন সময় জঙ্গলের ভেতর থেকে জটাধারী এক সন্ন্যাসী লোটা হাতে বেরিয়ে এলেন। এসেই বাজখাঁই গলায় বললেন, এ! তুম সব হিয়া ক্যা করতে হো?

আমরা বেড়াতে এসেছি এখানে।

ইধার মাত ঠারো। কালীকুঁয়া চলা যাও।

আামরা কালীকুঁয়াই যাচ্ছি, ওখানে বজরঙ্গবাবার সঙ্গে দেখা করতে।

বজরঙ্গবাবা? বজরঙ্গবাবা তো ম্যায় হুঁ। মেরা নাম কিনোনে বতায়া তুমকো? বেনারসের এক সাধুবাবা।

সমঝ গিয়া। ও বঙ্গালিবাবা প্রেমদাসনে বতায়া তুমকো। বোলো ক্যা মতলব? গৌতম বলতে যাচ্ছিল।

বজরঙ্গবাবা বললেন, হিয়া নেহি। আশ্রম পর চলো।

ওরা যাবার পথে এক অন্ধকার গুহায় অষ্টভূজার মূর্তি দর্শন করল। সে কী অন্ধকার। তায় আবার মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকতে হয়। ভয়ও লাগে। তারপর পাহাড় থেকে নেমে পাদদেশে কালীকুঁয়ায় এল। এক ভয়ংকরী দেবী হাঁ করে আছেন সেখানকার মন্দিরে। সেকালে ভাকাতরা নাকি নরবলি দিয়ে সেই রক্ত এই দেবীর হাঁ মুখে ঢেলে দিত। দেবী যদি সেই রক্ত পান করতেন, তবেই ডাকাতরা যেত ডাকাতি করতে, আর যদি সেই রক্ত দেবীর মুখ দিয়ে গল গল করে বেরিয়ে আসত, তা হলে আর ভয়ে যেত না। উঠল।

শুনে গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে বজরঙ্গবাবা বললেন, আগে তো এখানে মহারণ্য ছিল। বিশ পঁচিশ বছর আগেও এখানে যেসব ডাকাতরা ছিল, তারাও ছিল মারাত্মক। এখনও এখানে চোরডাকাত নেহাত কম নেই। বেশ কয়েক বছর আগে একবার বিকেলের দিকে মোটর বাইকে চেপে এক ভদ্রলোক এলেন এখানে পুজো দিতে। কোনও যাত্রী নেই। নির্জন চারদিক। সঙ্গে বহুরানি আর চার-পাঁচ সাল কি উমরের এক লেড়কা ছিল। তা ওদের মন্দিরে রেখে পুজোর ডালি কিনতে গেলেন ভদ্রলোক। ফিরে এসে দেখলেন কেউ নেই। মন্দিরের পূজারি সাধুরা বললেন, তু ঘর চলা যা বেটা, তেরা বহু-বাচ্চা নেহি মিলেগা। তা সেই ভদ্রলোক তো খুব কান্নাকাটি করলেন। তারপর পুজোর ডালি নিয়ে মোটর বাইক চেপে যেমন এসেছিলেন তেমনি চলে গেলেন। খানিক বাদেই হল কী এই সমস্ত এলাকাটা মিলিটারিতে ঘিরে ফেলল। আসলে ভদ্রলোক ছিলেন সেনাবাহিনীর এক পদস্থ অফিসার। সেটা কেউ জানত না, তাই ভুল জায়গাতেই হাত দিয়ে ফেলেছিল। তা এখানে যত পাণ্ডা আর সাধু ছিল সব ক'টাকে ধরে তখন সে কী মার। মারের চোটে তারা যখন সত্যিকথা বলল তখন দেখা গেল শিশুটিকে গলাটিপে মেরে এক জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। আর মহিলার গা থেকে গয়নাগাটি নেবার জন্য তাকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। সেই রাতে আমি এখানে ছিলাম না, তাই বেঁচে গেছি। না হলে এখানে যে যেখানে ছিল সবাইকে গুলি করে মেরেছিল তারা। একজনও প্রাণে বাঁচেনি। সেই এক রাতেই সমস্ত ডাকাতকে নির্মূল করে দিয়েছিল। কতদিন যে কার্ফু ছিল তার ঠিক নেই। পরে অবশ্য আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অপরাধে সেই অফিসারকে সাসপেন্ড করেন কেন্দ্রীয় সরকার। এরপর মাঝে বেশ কয়েক বছর শান্ত ছিল জায়গাটা। আবার নতুন করে দুষ্টচক্র দানা বাঁধছে। বলেন কী!

এখন তোমরা বলো আমার কাছে কী জন্য এসেছ, ক্যা জাননে চাতা হ্যায় তুম?

আপনি তো দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে আছেন, বলতে পারেন নয়নাগিরিটা কোথায়?

বজরঙ্গবাবা চমকে উঠলেন। মুখটা কেমন শুকিয়ে গেল। ভয়ে নয়। এক অশুভ ইঙ্গিত পেয়ে। বললেন, তুমহারা কোঈ বিছোড় গিয়া?

পল্টন বলল, আপনি কী করে জানলেন বাবা?

বজরঙ্গবাবা হাসলেন, যব তুমনে নয়নাগিরিকা নাম পুছা তব হামে মালুম হো গিয়া। ও পাপ কা পীঠস্থান।

আমাদের একটি মেয়ে চুরি হয়ে গেছে। আমরা কোনওরকমে জানতে পেরেছি ওকে নয়নাগিরিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ নয়নাগিরি যে কোথায় তা কেউ জানে না। তাই বলতেও পারছে না কেউ।

নয়নাগিরি নজদিকমেই হ্যায়।

গোপা বলল, বলুন না বাবা কোনখানে?

তুম উধার মাত যাও বেটি।

আমরা তিনজনেই যাব।

তুম বহুতই খুবসুরত লেড়কি। উধার তুমকো যানা ঠিক নেহি।

গৌতম বলল, ও না গেলেও আমাদের যেতেই হবে

। ফায়দা ক্যা। ও নেহি মিলেগা তুমকো।

তাঁর নিশ্চিত ধারণা দেখে ভয় পেয়ে গেল ওরা। তবে কি সত্যিই মেয়েটাকে উদ্ধার করা যাবে না? বজরঙ্গবাবা বললেন, ক্যা বিগড় গয়া তুমহারা সাচমুচ বতাও।

বজরঙ্গবাবার কথায় আশার আলো দেখতে পেলেও গৌতম আর পল্টন তখন সব কথা খুলে বলল বজরঙ্গবাবাকে। সব শুনে বজরঙ্গবাবা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বললন, ও লেড়কি কাঁহা লোপাট হুয়া থা?

ঠিক বলতে পারব না। তবে বক্সার ও মুঘলসরাইয়ের মধ্যে।

কৌন সা গাড়ি থা?

ভাগলপুর বোম্বাই এক্সপ্রেস।

সাধুবাবা বললেন, ও লেড়কি মিল যায়ে গা।

আপনি কী করে জানলেন বাবাজি?

পাহাড় পর যাঁহা তুমহারা সাথ মুলাকাত হুয়া উধার দোনো আদমিকা বাতচিত শুনা। ও তুমহারে বারে মে কহতা থা। মালুম হোতা ওহি আদমিনে চুরায়া ও লেড়কি কো।

গৌতম বলল, ওই জঙ্গলে ওরা কী করছিল?

ও লোগ ও সি ত্রিবেদীকো মারনে গিয়া। পুলিশ পিছে পড়া তো ভাগকে চলা আয়া হিয়া পর।

গৌতম বলল, তা হলে তো এখনি গিয়ে আমরা পুলিশে খবর দিতে পারি। অ্যায়শা বুরবাকি কাম না করো। পহলে ও লেড়কি কা জানমান বাঁচাও, উসকে বাদ যো কুছ করনা হ্যায় করো। আভি সাম হোনে বালে। হামারা আশ্রমমে এক রাত আরাম করো। কাল সবেরে নয়নাগিরি চলা যাও। নয়নাগিরিটা কোথায়?

বজরঙ্গবালা বললেন, তুম চুনার গিয়া থা?

না।

ওই পর্বতকা নাম চরণাগড়। দূর সে এক চরণকা মাফিক নজর আতি হই। চরণাগড় সে চুনার হো গয়া। লেকিন রাজা ভর্তৃহরি নে ওই পর্বতপর যব কিলা বনায়া থা তব উসকা নাম থা নয়নাগিরি। এরপর বাবাজি আরও যা বললেন তাতে বোঝা গেল কারও মতে ওই পর্বতের প্রাকৃতিক অবস্থান চরণের মতো, কারও বা মতে নয়নের মতো। প্রাচীনকালে তাই ওই পর্বতের নাম ছিল নয়নাগিরি। এখন ও নাম কেউ জানেও না, বলেও না। এইখানে পাহাড়ের গায়ে গুপ্তযুগের একটি শিলালিপি আছে। পাহাড়ের ওপর যে দুর্গ আছে সেটি এখন সেনাবাহিনীর দখলে। এই পাহাড়ের পিছনদিকে বয়ে চলেছেন পুণ্যসলিলা ভাগীরথী। পাহাড়ের ওপর থেকে গঙ্গার দৃশ্য দেখলে মন যেন ভরে যায়। প্রাচীনকালে এই পাহাড়ের সঙ্গে গঙ্গার মধ্যে অনেকগুলি সুড়ঙ্গপথ ছিল। তারই একটির মধ্যে দুষ্কৃতীদের আস্তানা। ওরা ওদের কাজের সুবিধার জন্য সাংকেতিক হিসাবে প্রাচীন নামটিই বেছে নেয়।

শুনে গৌতম বলল, সে কী! সেনাবাহিনীর লোকেরা বাধা দেয় না?

না। তার কারণ হয় তাদের কারও সঙ্গে ওই দুষ্কৃতীদের কোনও গোপন আঁতাত আছে অথবা ব্যাপারটাই তারা জানে না।

গৌতম বলল, আমরা তা হলে ট্যুরিস্টদের দলে মিশে কাল সকালে ওখানে অভিযান চালাব। তবে আজ একবার জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে খুঁজে দেখব ওই দুই পলাতককে। মনে হচ্ছে ওরা শংকর ও দয়াল ছাড়া অন্য কেউ নয়।

বজরঙ্গবাবা বললেন, যো তুমহারা মর্জি ওহি করো। লেকিন লেড়কিকো লে যাও মাত।

তখন সন্ধে হয়ে আসছে। গৌতম ও পল্টন গোপাকে সাধুর আশ্রমে রেখে দু'জনে দুটো বল্লম নিয়ে আবার পাহাড়ে উঠল।

গোপা ওদের সঙ্গে না-গেলেও লোকজনের আনাগোনা দেখতে কালীকুঁয়ার মন্দিরের চাতালে বসল। পাহাড়ি এলাকা হলেও এখানে বিন্ধ্যাচল থেকে অনেক লোকজন আসে পুজো দিতে। একদল হনুমান চারদিকে প্রহরীর মতো বসে আছে। তারা যাত্রীদের কাছ থেকে হাত পেতে বাদাম, চানা, কলা ইত্যাদি নিচ্ছে। গোপা বসে বসে এই সব দেখতে লাগল।

এমন সময় হঠাৎ সেখানে একটা অ্যামবাসাডার এসে থামল। গাড়ি থেকে যিনি নামলেন তাঁকে দেখেই ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল ওর! সে কোনওরকমে উঠে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল একটা থামের আড়ালে। এই সময় গৌতম ও পল্টন কাছে থাকলে ও এতটা ভয় পেত না। ও সেখানে দাঁড়িয়ে থেকেই কেমন যেন একটা বিপদের পদধ্বনি শুনতে পেল। ও দেখল লোকটা মন্দিরের দিকেই এগিয়ে আসছে।

পনেরো

পল্টন ও গৌতম সাহসে ভর করে সেই অন্ধকার নির্জনে এগিয়ে চলল গিরিপথ ধরে। জঙ্গল খুব একটা ঘন না হলেও পাহাড়ের আকৃতি ভয়াবহ। ওরা ধীরে ধীরে সেই বড় ঝরনাটার কাছে এসে থমকে দাড়াল। দু'জন লোকের অস্পষ্ট কথা বলার আওয়াজ ওদের কানে এল। ওরা পাথরের খাঁজে পা দিয়ে একটু উচ্চস্থানে উঠে দেখল একটি পাথরের চাতালে বসে দু’জন লোক নিশ্চিন্তে বিড়ি ফুঁকছে। ওরা দেখেই বুঝতে পারল এদের একজন হচ্ছে শংকর, অপরজন দয়াল। ওরা নিঃশব্দে চতুর বেড়ালের মতো ওদের অনেকটা কাছাকাছি এসে বড় একটা পাথর গড়িয়ে দিল ওদের দিকে।

আচমকা এই রকমটা হয়ে যাওয়ায় চমকে উঠল দু'জনে। কিন্তু সেই আধো অন্ধকারে ওরা বুঝতে পারল না কোথা থেকে এবং কীভাবে পড়ল পাথরটা। তাই ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল, কে! কে ওখানে?

গৌতম বলল, আমি ত্রিবেদী। তোদের দু'জনকে ফাঁসির দড়িতে লটকাব বলে এখানে এসেছি।

ওরা দু'জনেই লাফিয়ে উঠেছে তখন। দু'জনের হাতেই চলে এসেছে রিভলভার।

পল্টন বলল, রিভলভার দেখিয়ে খুব একটা সুবিধে হবে না। অজস্র পুলিশ এই পাহাড়টাকে ঘিরে আছে। এখন ভাল চাও তো বলো, ট্রেনের কামরা থেকে পরশু রাতে ওই মেয়েটাকে চুরি করে তোমরা কোথায় লুকিয়ে রেখেছ?

শংকর বলল, ওকে আমরা বিক্রি করে দিয়েছি। এমনই জায়গায় পাচার করেছি যে ওকে আর ফিরে পাবার কোনও সম্ভাবনা নেই।

বলার সঙ্গে সঙ্গেই পল্টন একটা পাথর ছুড়ে মারল একজনের মুখে। একেবারে মোক্ষম টিপ যাকে বলে। নাক-মুখ ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল সেই পাথরের ঘায়ে। পাথরটা লেগেছে দয়ালকে।

শংকর তখন আন্দাজে ভর করেই গুলি চালিয়েছে একটা। এই নির্জনে গুলির শব্দ ভয়ংকর শোনাল। তবে পাথরের আড়ালে থাকায় গুলি লাগল না কাউকেই। গৌতম বলল, কোথায় কতদূরে পাচার করেছিস তাকে?

শংকর বলল, যদি ক্ষমতা থাকে আমাকে অ্যারেস্ট করো। কোর্টে দাঁড়িয়ে যা বলবার বলব। ত্রিবেদীর গলার স্বর আমি চিনি। এই পাহাড় যদি অজস্র পুলিশে ঘিরে থাকে তা হলে তাদেরও আসতে বলো। আমি একাই মোকাবিলা করব তাদের।

গৌতম বলল, ওই দেখ তোর পিছনে যম এসে দাঁড়িয়েছে।

শংকর পিছু ফিরতেই পল্টন আর একটা পাথর ছুড়ে দিল শংকরের দিকে। কিন্তু গাথরটা তাকে লাগল না। তবে সেই মুহূর্তে সত্যি সত্যিই যমের মতো একজন এসে পথ রোধ করে দাঁড়াল।

শংকর বলল, এ কী! তুই এখানে?

তোদের খোঁজে এলাম। তোরা ত্রিবেদীর ভ্যানে বোমা ছুড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস। ত্রিবেদী মরেনি। তোরাও এমন কাঁচা কাজ করলি যে আর কখনও ভুলেও তোরা পাটনা শহরের ধারেকাছে যেতে পারবি না। তোর বাবা নিজে চাইছেন পুলিশ তোকে অ্যারেস্ট করুক। গফুরকে মেরেছি। এখন আমার টার্গেট হল ডিসুজা। ওর বাড়িতে চড়াও হয়ে ওকে পেলাম না। তবে ওর চাকরবাকরদের মোচড় দিয়ে জানতে পারলাম তোরা নয়নাগিরি অথবা এইখানে লুকিয়ে আছিস। এখন তোদের দেখা পেলেও নয়নাগিরির খোঁজ পাইনি। বল সেই শয়তানের ঘাঁটিটা কোথায়?

শংকর বলল, বলব না।

বল তোরা একটি অসহায় মেয়েটাকে রাতদুপুরে ট্রেন থেকে নামিয়ে নিলি কেন?

ওই শয়তান মেয়েটা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল।

তোদের ধারণা ভুল। আসলে পাপের ভারা এখন এত বেশি হয়েছে যে তোরা তোদের নিজেদের ছায়া দেখেও ভয় পাচ্ছিস।

শংকর বলল, দেখ নেলো, আমরা এখন মরিয়া। আমাদের সঙ্গে লাগতে আসিস না।

আসতুম না। যদি না তোরা এই মেয়েটার গায়ে হাত দিতিস। কত ছোট থেকে দেখেছি ওকে। তোরা কিনা শেষকালে ওর গায়ে হাত দিলি? লজ্জা করল না?

নেলো! পথ ছাড় বলছি।

শুনলি না একটু আগেই ওরা কী বলল তোকে? যম এসে দাঁড়িয়েছে। আমি সেই যম। যম কারও পথও ছাড়ে না, ফিরে যেতেও জানে না। তোর হাতে রিভলভার আছে। আমি রিভলভার সঙ্গে নিয়েও শুধু হাতে আছি। কেন বল তো?

ক্যা—ক্যা—কেন?

তোরই রিভলভার দিয়ে তোকে গুলি করে মারব বলে।

নেলোর কথা শেষ হওয়ামাত্রই ওর দিকে রিভলভার তাগ করল শংকর। নেলো চকিতে ওর হাতটা ধরে মট করে মটকে দিল একটু।

যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল শংকর।

ওর হাত থেকে রিভলভারটা তখন কেড়ে নিল নেলো। তারপর ওর দিকে সেটা তাগ করে বলল, গফুরকে ঠিক যেভাবে মেরেছিলুম, তোকেও সেইভাবেই মারব। তোদের দু'জনকেই।

শংকর বলল, আ-আ আমাকে ছেড়ে দে নেলো। আমার হাত ভেঙে দিয়েছিস তুই। এর চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কী দিবি?

ওকে কোথায় রেখেছিস?

এই পাহাড়ের পিছন দিকে একটা গুহায়। আমাকে ক্ষমা কর ভাই। ছেড়ে দে এবারের মতো।

নেলো হাসল। বলল, একেবারেই ছেড়ে দেব। বলেই ট্রিগারে চাপ দিল ‘গুড়ুম’। আবার একটা চাপ। শংকরের দেহটা ছিটকে লাফিয়ে উঠল। তারপর পাথরের চটানে পড়ে স্থির হয়ে গেল একসময় সেই সঙ্গে আরও একটা গুলির শব্দ শোনা গেল। আর সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠল নেলো।

ওরা ছুটে গিয়ে নেলোকে ধরতেই আবার একটা গুলি এসে লাগল নেলোর বুকে।

আহত দয়ালদা এইরকম অবস্থাতেও শত্রুর শেষ রাখল না। দুটি বুলেট খরচা করে মরণ কামড় দিল।

গৌতম তখন লাফিয়ে পড়েছে দয়ালের ওপর। ওর হাতটাকে পা দিয়ে টিপে ধরে কবজি শিথিল করে দিল।

দয়ালদা হেসে বলল, ওতে আর গুলিই নেই।

পল্টন তখন নেলো আর দয়ালদার হাত থেকে রিভলভার দুটো কেড়ে নিয়েছে। মৃত্যুপথযাত্রী নেলো গৌতমকে বলল, দোস্ত ! একটু পানি পিয়াও। বড্ড জলতেষ্টা পেয়েছে।

গৌতম তখুনি ছুটে গেল ঝরনার কাছে। খুব সামান্য একটু জল ছির ছির করে পড়ছিল একদিকে। তাই থেকে এক আঁজলা জল এনে ওর মুখে দিতেই একটু দূরের দিকে আঙুল তুলে কী যেন দেখাল নেলো। তারপর জল খেয়ে আঃ করে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল।

ওরা সেই ঝরনা পাথরের পিছন দিকের একটা মোচাকৃতি পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে কাকে যেন উঠতে দেখল তখন। যে উঠছে সে একটি মেয়ে। দেখেই মনে হল জীবন বিপন্ন করে প্রাণভয়ে পালাচ্ছে বেচারি। এবং এই মেয়ে দুলালি ছাড়া কেউ নয়।

ওরা এবড়ো খেবড়ো পাথরে পা দিয়ে ছুটে গিয়ে দাঁড়াল সেখানে।

পল্টন বলল, দুলালি নেমে এসো। আমরা এসে গেছি। কোনও ভয় নেই তোমার, আমাদের শত্রুর, নিপাত গেছে।

দুলালি বলল, আমি নামতে পারব না। আমার হাত-পা কাঁপছে। গির পড়ি *তো মুঝে বচায়গা কৌন?

গৌতম বলল, ঠিক আছে। তুই যেমন আছিস থাক। একদম নড়াচড়া করবি

না। আমি এখুনি লোকজন ডেকে আনছি। পল্টন, তুই ততক্ষণ পাহারা দে ওকে। গৌতমকে অবশ্য বেশি দূরে যেতে হল না। খানিক যাবার পরই দেখল বজরঙ্গবাবা একদল লোক নিয়ে ওদের খোঁজে আসছেন। যারা আসছে তাদের কারও হাতে বন্দুক, কারও হাতে ভোজালি, কেউ বা লাঠি, বল্লমও নিয়েছে কেউ। আসলে গুলির শব্দ শুনেই সতর্ক হয়েছে সবাই এবং বজরঙ্গবাবার মুখে আরও কিছু শুনে তৈরি হয়ে এসেছে। এসেই যা দেখল তাতেই তো চক্ষুস্থির। একজনকে অর্ধমৃত এবং দু'জনের মৃতদেহ দেখে শিউরে উঠল সবাই। পল্টন আর গৌতম সব কথা খুলে বলল সকলকে।

দয়ালদার হাত-পা বেঁধে কয়েকজন টানতে টানতে তাকে নিয়ে গেল পাহাড়ের নীচে। মৃতদেহ অবশ্য ছুঁল না কেউ। পুলিশ এসে যা করবার করুক। ওরা সবাই মিলে তখন অসহায় দুলালিকে উদ্ধার করবার জন্য ছুটে গেল। গাছের ডালে, বড় পাথরে দড়ি বেঁধে কী কাণ্ড করে যে নামানো হল তাকে সে এক বিপজ্জনক ব্যাপার। তবুও যা হোক করে মেয়েটাকে উদ্ধার তো করা হল।

সবচেয়ে খুশি হল পল্টন। ও সযত্নে ধরে ধরে বজরঙ্গবাবার আশ্রমে নিয়ে চলল দুলালিকে। দুলালি এখন ক্ষুধায় তৃষ্ণায় পরিশ্রমে ক্লান্ত। খুবই অবসন্ন হয়ে পড়েছে তাই।

ওরা যখন আশ্রমে ফিরে এল চারদিক তখন নিশুতি হয়ে গেছে। অথচ রাত বেশি নয়, সবে সাড়ে সাতটা। কালীমায়ের মন্দিরে আরতির শঙ্খ-ঘণ্টা বাজছে। কিন্তু গোপা কই? কোথায় গেল মেয়েটা? না মন্দিরে, না সাধুর আশ্রমে, কোনওখানেই পাওয়া গেল না তাকে। বিপদের পর বিপদ আবার নতুন করে দেখা দিল।

একটি ছোট ছেলে কালীমন্দিরের সামনে দোকানে বসে ফুল বিক্রি করছিল। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করতে সে বলল, এক আদমি আয়া থা। টোপি ঔর চশমাবালা। ও লেকে ভাগা।

বজরঙ্গবাবা বহুত আদমি থা। লেকিন উনকো হাতমে রিভলভার থা, ইসি লিয়ে সব চুপ চাপ হো গিয়া।

বললেন, আউর আদমি নেহি থা হিয়া পর?

ও আদমি কৌন থা?

মুঝে না মালুম।

সব যখন ফাঁস হয়ে গেল তখন মুখ খুলল অনেকেই। সবাই বলল মেয়েটি বোধহয় আগন্তুককে চিনত। তাই ভয়ে লুকিয়ে পড়েছিল একটি থামের আড়ালে। যে এসেছিল সে সবার চোখের সামনে পকেটের শিশি থেকে কী একটা ওষুধ রুমালে মাখিয়ে নাকে চেপে ধরল মেয়েটার। তারপর সকলকে রিভলভার দেখিয়ে বলল, কিসিকো মাত বোল না। বলে তাকে তুলে নিয়ে চলে গেল।

গৌতম বজরঙ্গবাবাকে বলল, এই আগন্তুক ডিসুজা ছাড়া কেউ নয়। আমি এখুনি নয়নাগিরি যাব। আপনারা দয়ালটাকে নজরে রাখুন। পুলিশে খবর দিন। দেখবেন ও যেন পালাতে না পারে।

পালাবে কী? দয়ালকে তখন পিছমোড়া করে বেঁধে রেখেছে স্থানীয় লোকেরা।

মন্দিরের সামনেই একটি টাঙ্গা ছিল। ওরা তাতে করেই বিন্ধ্যাচলে এল। সেখান থেকে বাসে মির্জাপুরে।

গৌতম পল্টনকে বলল, তুই দুলালিকে নিয়ে এখানকার জি আর পিতে চলে যা। সেখানে তোর তো ডায়েরি করাই আছে। তাই পুলিশকে গিয়ে সব কথা খুলে বল, আর পারিস তো কিছু পুলিশ সঙ্গে নিয়ে নয়নাগিরিতে চলে আয়।

দুলালি বলল, ভাইয়া আমি কিছুতেই থানা-পুলিশের ঝামেলায় যাব না। আমি তোমার সঙ্গে যাব। আমার দোস্ত বরং পুলিশে খবর দিক। তুম হামকো সাথ লে চলো।

পল্টন বলল, সেই ভাল। কেন না এই যাত্রায় আমার ভাগ্য যেভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে তাতে আমি আর কাউকেই সঙ্গে নিতে ভরসা পাচ্ছি না। তুই ওকে নিয়েই যা। তবু একজন সঙ্গী পাবি। আমি পুলিশ নিয়ে কখন যাব তার ঠিক কী। তা ছাড়া জি আর পি মানেই রেল পুলিশ। রেলের আওতার বাইরে আদৌ তারা যাবে কিনা তাই বা কে জানে?

তবুও তুই গিয়ে সব কথা খুলে বল। ওরা না গেলেও লোক্যাল পুলিশকে জানিয়ে দেবে সব কথা। আমিও যেতাম তোর সঙ্গে। কিন্তু আর এক মুহূর্ত দেরি করতে আমার মন চাইছে না। তা ছাড়া পুলিশ দেখলে ওরা হয়তো সতর্ক হয়ে যাবে! আবার আমাদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের সাহায্যও দরকার। আমরা ততক্ষণে কোনও ক্লু পাই কি না দেখি। জ্যোৎস্না রাত, পথ চলার অসুবিধে খুব একটা হবে না। সারারাত ধরে তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরব চারদিক।

এই রাতদুপুরে ওই দুর্গ পাহাড়ে যেতে গিয়ে কোনও বিপদ ঘটাবি না তো? বিপদ যে কোনও মুহূর্তেই ঘটতে পারে।

তা আমি বলছিলাম কী, আর অযথা থানা-পুলিশ না করে আমরা তিনজনেই এক সঙ্গে গেলে কেমন হয়?

অতটা ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। এ পথে পরিবহনের অভাব নেই। পুলিশে খবর দিয়েই চলে আয় তুই। আর যদি পারিস তো পুলিশ সঙ্গে নিয়ে আসিস।

পল্টন ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।

ও চলে গেলে দুলালি বলল, দশ মিনিট ইন্তেজার করো না ভাইয়া। দোস্ত কো আনে দো।

গৌতম বলল, বেশ! দশ মিনিট অপেক্ষা করছি। অবশ্য এখুনি যে বাস পাব চুনারের তারও ঠিক নেই।

দশ মিনিটের জায়গায় কুড়ি মিনিট হয়ে গেল। তবুও পল্টন ফিরল না দেখে দুলালিকে নিয়ে গৌতম বারাণসীর বাসে চাপল। এই বাসই চুনার হয়ে বেনারস যাবে।

প্রায় ঘণ্টা দেড়েক সময় লাগল বাসে। ওরা যখন চুনারে পৌঁছুল তখন চারদিকে জমাজমাট অন্ধকার।

গৌতম বলল, আজকের এই নৈশ অভিযান আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভয়ানক বিপদের ঝুঁকি নিয়ে করতে হবে এই কাজটুকু। ডিসুজাকে কোনওরকমে ফাঁদে ফেলতে পারলেই আমাদের অভিযান সফল হবে। তা ছাড়া গোপাকে উদ্ধার করতেই হবে।

জরুর হবে। ভাইয়া, তুমি যদি গোঁসা না করো তো একটা কথা বলি। কী কথা?

তোমাকে আর গোপাকে এক সঙ্গে দেখলে আমার খুব ভাল লাগে। তোমরা দু'জনেই খুব সুন্দর। তাই বলছিলাম কী—

থাক, আর বলতে হবে না। তুই কী বলবি তা আমি জানি। তুই যে একটা পাকলু মেয়ে তা আমি বেশ বুঝতে পারছি।

তা হলে তুমি গোপার জন্য এত করছ কেন?

কর্তব্যের খাতিরে। আমরা সবাই যে এখন একসূত্রে গাঁথা। বন্ধুর মতো। ওসব কথা থাক। চল আগে কোনও একটা হোটেলে দুটো খেয়ে নিই। খিদে পাচ্ছে খুব।

ওরা দু'জনে একটা হোটেলে বসে পেট ভরে মাংস-ভাত খেল। তারপর একজন বৃদ্ধ টাঙ্গাওয়ালাকে ডেকে বলল চারদিক ভাল করে ঘুরিয়ে দিতে।

টাঙ্গাওয়ালা বলল, লেকিন দাদাবাবু এখন তো তোমরা গড় পর চড়তে পারবে না।

গৌতম বলল, কেন?

কিল্লা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সামকো পাঁচ বাজকে বাদ উধার কা খিড়কি বন্ধ হো যাতা।

তা হলে?

কিলা কি অন্দর যানে নেহি দেঙ্গে ও লোগ। লেকিন গঙ্গা কি কিনারে মে তো চলো।

গৌতম নকসা করে বলল, এই রাতদুপুরে গঙ্গার ধারে কোনও ভয় নেই তো? বৃদ্ধ টাঙ্গাওয়ালা এক চোখ টিপে বলল, দাদাবাবু। আমার নাম আছে রহমত। যবতক আমি জিন্দা থাকব তবতক কারও সাধ্যি হবে না রহমতের সওয়ারির গায়ে হাত দেয়।

বেশ! তুমি কী নেবে বলো?

কিতনা টাইম ঘুমোগে তুম?

ধরো সারারাত।

রহমত অবাক চোখে তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। তারপর বলল, হাম দো ঘণ্টেসে জায়দা নেহি ঘুমায়েঙ্গে। পঁচিশ রুপিয়া লেগা। হ্যায় তুমহারা পাস? হ্যাঁ! চলো উস তরফ।

চাঁদনি রাতে পাথুরে রাস্তায় টগবগ টগবগ করে টাঙ্গা ছুটে চলল। পূর্ণিমার গোল চাঁদটা যেন আকাশ থেকেই হাতছানি দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল ওদের। জ্যোৎস্নালোকে চুনার দুর্গ ওদের কাছে ভয়বহ এবং বিভীষিকাময় বলে মনে হল। কোথাও কোনও গাছপালা নেই, কিছু নেই, শুধু পাথর আর পাথর। যেন পাথরের খাড়াই দেওয়াল একটা আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা গঙ্গার ধারে এসে মুগ্ধ এবং অভিভূত হয়ে গেল। তবু মনের মধ্যে রইল দারুণ একটা উৎকণ্ঠা।

রহমত ওদের দেখাতে লাগল এই পাহাড়ের উপরিভাগে যে দুর্গ আছে তার সঙ্গে গোপন সুড়ঙ্গপথে এই গঙ্গার সাথে প্রাচীন কালের যোগাযোগের নিদর্শনগুলো। ওরা তীক্ষ্ণ চোখে সব কিছু দেখল। কিন্তু সেখানে সন্দেহজনক কিছুই পেল না।

প্রায় ঘণ্টা দুই পরে রহমত বলল, আভি হামকো ছুট্টি দে দো। হামকো ঘর যানা হ্যায়।

গৌতম তিরিশটা টাকা রহমতের হাতে দিয়ে বলল, এই নাও।

রহমত বলল, হামকো পঁচিশ রুপিয়া চাহিয়ে।

পাঁচ টাকা বকশিশ দিলাম তোমাকে।

রহমত হেসে বলল, মেরা পাপ্পু মেহনত কা দাম লেতা বকশিশ নেহি। কিন্তু পাপ্পুর বাবা রহমতকে যদি আমরা চা খেতে দিই তা হলে? তব ভি নেহি।

গৌতম রহমতের কাছ থেকে দশ টাকা ফেরত নিয়ে পাঁচ টাকা দিল। রহমত বলল, এক বাত পুছেগা তুমকো?

কী কথা বলো?

এত রাতে তোমরা এখানে কী করতে এসেছ? তোমাদের বয়সি ছেলেমেয়ে রাত্তিরে এইখানে ঘুরেবেড়ালে পুলিশ তোমাদের পাকড়ে লিবে।

গৌতম বলল, দেখো রহমত, তোমাকে দেখেই বুঝেছি তুমি একজন সাচ্চা আদমি। তোমার কাছে লুকোব না, আমরা কিন্তু কোনও খারাপ মতলব নিয়ে এখানে আসিনি। এমনকী বেড়াতেও আসিনি এখানে। আমরা বিন্ধ্যাচল গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের দলের একটি মেয়েকে দুষ্টচক্রের লোকেরা অপহরণ করে। আমরা জানতে পেরেছি এইখানেই কোথাও এনে ওরা লুকিয়ে রেখেছে তাকে।

রহমত বলল, ইয়ে বাত? তো তুম পহলে কিঁউ নেহি বতায়া? তোমরা তো গলদ রাস্তায় চলে এসেছে।

এটা নয়নাগিরি নয় ?

ইয়ে নয়নাগিরি, চরণাদ্রি, চুনার। সব কুছ। উঠো উঠো জলদি উঠো। ওরা উঠে বসতেই টাঙ্গা ঘুরে গেল এই পাহাড়ের উলটো দিকে।

এক জায়গায় টাঙ্গা থামিয়ে রহমত বলল, থোড়া দূর পয়দাল চলা যাও। হাম রোড পর যা রহে। পোলিশবালে আনেসে হাম উধার ভেজ দেঙ্গে। তুম দোনো উধার নজর রাখো। ও রহেগা তো উধারই রহে গা।

ওরা রহমতের কথামতো টাঙ্গা থেকে নেমে সোজাপথ না-ধরে খাড়াই পাহাড়ের গা ঘেঁষে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। এক জায়গায় বড় একটি পাথরের আড়াল থেকে দেখল বেশ কিছু দূরে একটি গুহার সামনে একটি অ্যামবাসাডার দাঁড়িয়ে আছে। আর তার সামনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ডিসুজা। তবে দেখে মনে হচ্ছে কোথাও যাবার উপক্রম করছেন।

গৌতমের বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। ডিসুজা গোপাকে নিয়ে কোথাও পালাবার তাল করছেন না তো? গৌতম দুলালির কানের কাছে মুখ এনে চাপা গলায় বলল, তুই যেভাবেই হোক একবার মেইন রোডে চলে যা। গিয়ে রহমতকে খবর দে। ও নিশ্চয়ই লোকজন নিয়ে আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে।

দুলালি বলল, আমি একা যাব ভাইয়া? পথ যে অনেক দূর। যদি আমাকে একা পেয়ে আবার কেউ চুরি করে নেয়?

গৌতম বলল, ঠিক বলেছিস। তুই বরং এক কাজ কর, এইখানেই কোথাও ঘাপটি মেরে থাক। আমি চুপি চুপি গিয়ে বাধা দেবার চেষ্টা করি ওকে। পল্টন পুলিশ নিয়ে এলে এদিকে পাঠিয়ে দিস।

তুমি কীভাবে যাবে ওখানে? চারদিক ফাঁকা। তুমি গেলেই ও দেখতে পাবে তোমাকে।

তবু যেতে হবে।

গৌতম সবে এক পা এগিয়েছে অমনি দেখল সেই গুহামুখের দরজার পাল্লা খুলে দু’জন লোক কাকে যেন পাঁজাকোলা করে নিয়ে এল। আসামাত্রই ডিসুজা তাকে কাঁধের ওপর শুইয়ে নিলেন। তারপর এক হাতে রিভলভার ধরে পাহাড়ের ঢালুতে নেমে চললেন হন হন করে।

লোকদুটো আবার গুহায় ঢুকে বন্ধ করে দিল দরজাটা।

গৌতম তখন ওদের নাগাল পাবার জন্য প্রাণপণে ছুটছে। ডিসুজাও পাহাড়ের একটি বাঁকের আড়ালে। ও ছুটে ছুটে যখন সেই গুহামুখের কাছে এল তখন দেখল এটা একটা মোটর মেরামতির ঘাঁটি ছাড়া কিছুই নয়। ওপরে একটা সাইনবোর্ডও রয়েছে সেইরকম। অর্থাৎ লোকের চোখে ধুলো দেবার একটা সহজ উপায় মাত্র। তবে এটা যে একটা শয়তানের ঘাঁটি তা হয়তো অনেকেই জানে। না হলে রহমত এত সহজে এই ঠেকটা ওদের চিনিয়ে দিতে পারত না। সেই গুহামুখ পার হয়ে বাঁকের মুখে এসেই দেখল ডিসুজা রিভলভার হাতে গোপাকে কাঁধে নিয়ে এদিকওদিক তাকাতে তাকাতে গঙ্গার দিকে চলেছে। কিন্তু মুশকিল হল এই যে, শুধুমাত্র গোপার জন্যই হাতের মুঠোয় পেয়েও ডিসুজাকে আক্রমণ করতে পারল না ও।

হঠাৎ একটা কালপ্যাঁচা এমন বিশ্রীভাবে কর্কশ ডাকে ডেকে উঠে উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে যে চমকে উঠলেন ডিসুজা। প্যাঁচাটা আর একবার ডাকতেই সেটাকে লক্ষ্য করে ‘ডিস্যুম’ করে গুলি করলেন একটা।

আর সেই মুহূর্তে গৌতম একটা ভয়াবহ চিৎকার করে উঠল, আ—আ আ—-।

থমকে দাঁড়ালেন ডিসুজা। ব্যাপারটা যে কী হল কিছু ভেবে পেলেন না। গুলি করলেন প্যাঁচাকে, কিন্তু তার প্রত্যুত্তরে মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসে কী করে? অচৈতন্য গোপাকে শুইয়ে রেখে ব্যাপারটা কী হল দেখবার জন্য এগিয়ে আসতেই গৌতম একটি পাথরের খাঁজে সেট হয়ে দাঁড়াল। তারপর যেই না ডিসুজা এসে হাজির হলেন সেখানে অমনি সেই অন্ধকারের আড়াল থেকে একটা ল্যাং মারল ওঁকে। ডিসুজা কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন পাশের খাদে। এবার ওরই গলা দিয়ে একটা মরণ আর্তনাদ বেরিয়ে এল—আ—আ—আ।

শয়তানের খেলা শেষ।

গৌতম ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল গোপার কাছে। তারপর ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ধীর পায়ে নেমে এল গঙ্গার ধারে। বড় একটি পাথরের ওপর ওকে শুইয়ে পর পর কয়েকবার ওর চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতেই চোখ মেলে তাকাল ও। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, আমি কোথায়?

গৌতম বলল, তুমি আমি দু'জনেই এখন নয়নাগিরিতে। আর আমাদের কোনও ভয় নেই। আমাদের অভিযান সফল হয়েছে। এখন দু'চোখ মেলে গঙ্গার দৃশ্য দ্যাখো। এমন শোভ৷ কিন্তু কাশীতেও নেই।

গোপা আদুরে মেয়ের মতো বলল, লক্ষ্মীটি, তুমি কাশীর সঙ্গে কারও তুলনা কোরো না। প্লিজ।

গৌতম বলল, চলো, আমরা দু'জনে একটা নৌকায় চেপে গঙ্গার মাঝখান থেকে ঘুরে আসি। খুব ভাল লাগবে কিন্তু।

তাই কী হয়? তোমার বন্ধু খোঁজ করবে না? দুলালিই বা কী ভাববে? ওরা সব কোথায়?

ওরা এখানেই আছে। চলো ওঠা যাক।

গোপার একটি হাত ধরে গৌতম যখন ফিরে আবার উপক্রম করছে, তখনই দেখতে পেল একদল পুলিশ নিয়ে পল্টন আসছে লাফাতে লাফাতে। ওর সঙ্গে দুলালিও আছে।

দেখা হতেই পল্টন গৌতমকে এবং দুলালি গোপাকে জড়িয়ে ধরল।

পুলিশ অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, কাঁহা হ্যায় ও বদমাশ?

গৌতম আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলল, উপর।

তারপর গৌতম ওদের সকলকে নিয়ে ঠিক জায়গাটিতে এসে খাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে সকলকে বলল, ওই দেখুন।

খাদটা খুব একটা গভীর নয়। তবু মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে অবস্থা কাহিল হয়েছে ডিসুজার। মাথা ফেটে, নাকেমুখে আঘাত পেয়ে রক্তে যেন স্নান করেছে। অথচ পালাতেও পারছে না।

একদল পুলিশ সেই খাদে নেমে তুলে আনল ডিসুজাকে। তারপর ওপরে এনে হাতকড়া পরাল।

এরপর পুলিশের লোকেরা সেই গুহাচক্রে হানা দিয়ে পঞ্চাশটিরও বেশি ছেলেমেয়েকে উদ্ধার করল। আর সুন্দর একটি সরকারি রেস্ট হাউসে সে রাতে আশ্রয় পেল গৌতমরা। তবে ওরা কিন্তু না-ঘুমিয়ে সারারাত জেগে, জ্যোৎস্নালোকে এখানকার পার্বত্য প্রকৃতি ও নয়নাভিরাম গঙ্গার সৌন্দর্য উপভোগ করল।

পরদিন সকালে বিখ্যাত চুনার দুর্গ ঘুরে দেখল সেনাবাহিনীর লোকেদের সাথে। তারপর রহমতের টাঙ্গায় চেপে চারদিক ঘুরে, চিনামাটির ফুলদানি থেকে শুরু করে নানারকম কেনাকাটা করে আবার ফিরে এল বারাণসীতে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%