ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

ধীর শ্লথগতিতে শ্রীজগন্নাথ এক্সপ্রেস যখন পুরীতে এসে পৌঁছল আকাশ তখনও অন্ধকার। ভোরের আলো একেবারে ফুটে না উঠলেও ফুটিফুটি করছে। পাখির কলরব শোনা যাচ্ছে চারদিক থেকে। সেই সঙ্গে শত শত যাত্রীর চরণের ছন্দ ও কুলিদের হাঁকডাক। সমুদ্রের ডাকে আসা শহরের মানুষগুলোর কয়েকটি দিনের জন্য উদ্দাম হবার সে কী অসীম চঞ্চলতা। এ হল রোজের ব্যাপার। সমুদ্রের ঊর্মিমালার মতো যাত্রীর ঢেউ জলতরঙ্গে জনতরঙ্গ হয়ে দিবারাত্রই আছড়ে পড়ে পুরীর সৈকতে। আসে আর যায়। যায় আর আসে।
এখন জানুয়ারি মাস।
যদিও সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল বলে পুরীতে শীতের কামড় কলকাতার চেয়ে অনেক কম, তবুও স্নেহাংশুবাবু সবকিছুই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ কুড়ি বছর পরে পুরীতে এলেন তিনি। এর আগে যখন এসেছিলেন তখন বিয়ে করেননি। ছাত্র ছিলেন। বাবা-মা ছিলেন সঙ্গে। এখন তাঁরা কেউ নেই। স্ত্রী এবং ছেলে আছে। একমাত্র ছেলে, সব্যসাচী। বড়ই আদরের।
প্রতিবছর এই সময়টায় স্নেহাংশুবাবু দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে বাইরে বেড়াতে যান। কখনও রাজগির, কখনও বিন্ধ্যাচল, কখনও বারাণসী। তবে বারাণসীতেই বেশি যান। কেন না ওখানে গেলে কেমন যেন একটা মাটির টান অনুভব করেন স্নেহাংশুবাবু। তার কারণ ছেলেবেলায় বেশ কয়েকটা বছর বারাণসীতেই কেটেছিল তাঁর। কিন্তু স্ত্রী সরমা এবং ছেলে সব্যসাচীর সাধ মেটাতেই এই বছর তিনি পুরীতে এলেন।
সব্যসাচীর স্কুলের বন্ধুরা বছর বছর পুরী আসে। সমুদ্রের ঢেউ খায়, কত গল্প করে। তাই সমুদ্রের ডাক কলকাতার ঘরে বসেও যেন শুনতে পায় সব্যসাচী। সমুদ্র ওকে ডাকে। বারে বারে। হাতছানি দিয়ে। সেই সমুদ্রের ডাকে সাড়া দিতে সব্যসাচী ওর বাবার গলা জড়িয়ে আবদার করে বলে, এবারে আর কোথাও নয় বাবা। এবার আমাকে পুরী নিয়ে চলো। আমার অনেকদিনের সাধ। একমাত্র ছেলের আবদার স্নেহাংশুবাবুর মতো সহৃদয় বাবা কি না রেখে থাকতে পারেন? তাই এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। সেই সঙ্গে স্ত্রীর মনটাও যাচাই করে নিলেন একবার। স্ত্রীও মত দিলেন পুরী যাওয়ার পক্ষে। বললেন, বিশ্বনাথকে তো বছর বছর দর্শন করি। এ বছরে বরং শ্রীক্ষেত্রে গিয়ে জগন্নাথেরই দর্শন হোক। ছেলেটারও এত আশা যখন।
তাই অনেক জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে পুরীতে আসাই ঠিক হল। দাঁইহাটের ব্যানার্জিদা পুরীতে একটি হলিডে হোম দেখাশোনা করেন। তিনিই ব্যবস্থা করে দিলেন একটা ঘরের। তাঁর সহকর্মী মৃগেনবাবু নিউ কয়লাঘাটা বুকিং অফিস থেকে রেলের স্লিপার কোচে তিনটে বার্থও রিজার্ভ করিয়ে আনলেন। শুধু রিটার্ন রিজার্ভেশনটা কনফর্ম হল না বলে, আসবার সময় ক্যানসেল করিয়ে এলেন টিকিটটা।
ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্মে পা রেখেই সরমা বললেন, ওমা! এখানে একদম শীত নেই দেখো। অথচ সারারাত গাড়িতে কী শীত।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে শীত একটু কমই হয়। গরমও বেশি হয় না।
সরমা বললেন, শীত যে বেশি হয় না, তার প্রমাণ এখনই পাচ্ছি। কিন্তু গরমের কথা বোলো না। ছোটবেলায় একবার বাবার সঙ্গে দ্বারকা গিয়েছিলাম। সেও তো সমুদ্রতীর। আরব সাগরের তীরে রণছোড়জির বিশাল মন্দির। সকাল আটটার পর বালি এমন তেতে উঠত যে সমুদ্রের ধারেকাছেও যেতে পারতুম না।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, বালি তো তাতবেই। কিন্তু ঘরের ভেতর ভ্যাপসা গরম কি টের পেয়েছ? গায়ে ঘামাচি?
না তা অবশ্য পাইনি। পেলেও মনে নেই।
এমন সময় কানের কাছে কে যেন এসে বলল, আপনমানস্কর পণ্ডা কেএ? বৃন্দাবন খুনটিয়া নয়তো?
হঠাৎই আলোচনায় ছেদ পড়ল। একজন নয়, একাধিকজন এসে হেঁকে ধরল ওঁদের, পণ্ডা কেএ বাবু?
স্নেহাংশুবাবু বললেন, আমাদের পাণ্ডা হচ্ছেন লিঙ্গরাজ মিশ্র।
কেউঠু আসুছত্তি? রহিবে কেউঠি?
আমরা গৌরবাটশাহীতে হলিডে হোমে উঠব।
আবার একজন এগিয়ে এলেন, পণ্ডা কেএ বাবু?
স্নেহাংশুবাবু বললেন, মোটা ভীম।
সরমা বললেন, কী যা তা বলছ? মুখে কিছু আটকাচ্ছে না? ওরা রেগে যাবে যে !
স্নেহাংশুবাবু বললেন, রাগ করবেন কেন? পাণ্ডার নামই যে ওই। ভাল নাম তাঁর অবশ্য নিশ্চয়ই আছে। তবে স্থানীয়দের কাছে উনি ওই নামেই পরিচিত। আসলে ব্যানার্জিদা আমাকে বলে দিয়েছেন।
সরমা যেতে যেতে বললেনযেন বিরক্ত ধরে যায়। এত পাণ্ডার অত্যাচার কিন্তু আর কোথাও নেই। স্নেহাংশুবাবু হেসে বললেন, অত্যাচার। অত্যাচার কোথায় দেখলে? অত্যাচার করেনি তো কেউ। শুধু জানতে চেয়েছে কোথা থেকে আসছি, পাণ্ডা কে?
কথার জবাব দিতে দিতে
তাই বলে সবাই মিলে এইভাবে একসঙ্গে?
তুমি কতদিন কালীঘাট আর তারকেশ্বরে যাওনি?
সরমা আর কিছুই বললেন না। একেবারে মুখের মতন জবাব।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, এরা নিশ্চয়ই তাদের চেয়ে বেশি কিছু করছে না? কথা বলতে বলতেই সকলে গেট পেরিয়ে বাইরে এলেন। সঙ্গে সঙ্গে হেঁকে ধরল রিকশাওয়ালার দল।
স্নেহাংশুবাবু আট টাকায় একজন রিকশাওয়ালাকে রাজি করিয়ে, তাতেই চেপে বসলেন। একটা রিকশাতেই ধরে গেল তিনজনকে। ওঁরা স্বামী-স্ত্রী পাশাপাশি বসলেন। সব্যসাচী কোলে। একটা চামড়ার সুটকেশ, সেটা রইল পা-তলায়।
রিকশা তির তির করে এগিয়ে চলল।
কিছু পথ আসার পরই জগন্নাথমন্দিরের চূড়া চোখে
সরমা দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন।
এত সকালেও পুরীর পথঘাট কিন্তু নির্জন নয়।
ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটে উঠছে। পথের ধারে চা-দোকানগুলোতে স্থানীয় লোকজনদের ভিড় হচ্ছে। পুরী যে শুধু তীর্থক্ষেত্র বা ট্যুরিস্ট স্পট তা তো নয়, পূরী এখন মস্ত শহর। রাজধানী ভুবনেশ্বরের পাশেই মহাপ্রভুর পদরেণুধন্য এই নীলাচলে সমুদ্রের ডাকে সারা ভারতবর্ষই হাজির।
যেতে যেতে এক জায়গায় হঠাৎ এমনভাবে ব্রেক কষল রিকশাটা যে, বাবা-মায়ের কোল থেকে একেবারে রাস্তার ওপর ছিটকে পড়ল সব্যসাচী। পড়ামাত্রই রাস্তার খোয়ায় কপালের একটা পাশ কেটে গেল ছোট্ট করে। টপ টপ করে রক্ত ঝরতে লাগল ক্ষতস্থান দিয়ে।
ততক্ষণে হই হই করে অনেক লোকজন ছুটে এসেছে। তার পরে যা হয়। সব্যসাচীকে তুলে দাঁড় করিয়ে মারমুখি হয়ে রিকশাওয়ালাকে ধরে মারতে গেল সবাই।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, না না। মারবেন না। ও বেচারার কী দোষ?
অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট। হঠাৎ একটা ষাঁড় এসে পড়ায় ব্রেক কষতে গিয়ে উলটে গেছে রিকশাটা।
ঘটানাটা তাই। সব্যসাচী রুমাল দিয়ে ওর ক্ষতস্থানটা চেপে ধরল শক্ত করে। রিকশাওয়ালা নিজেই তখন কাঁচুমাচু মুখে পাশের একজনদের বাড়ি থেকে কয়েকটা গাঁদা গাছের পাতা এনে দু’হাতে কচলে সেটা ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিল। গাঁদাপাতার রস অ্যান্টিসেপটিক। এতে অল্পস্বল্প রক্তক্ষরণও বন্ধ হয়।
রিকশা আবার চলতে শুরু করল।
একটু পরেই সকল ব্যথা ভুলে আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠল সব্যসাচী, মা! ওই—ওই দেখো, সমুদ্র।
সত্যই তো! জগন্নাথ স্বামী, নয়নপথগামী। এই সমুদ্রই তো সাক্ষাৎ জগন্নাথ। আকাশ তখন বেশ ভালরকম ফর্সা হয়ে গেছে।
রিকশা স্বর্গদ্বারের পথ ধরে ভেঁপু বাজিয়ে এগিয়ে চলল। কত লোক—— কত লোক—এখন সমুদ্রতীরে।
সামুদ্রিক বাতাসে মনপ্রাণ যেন ভরে উঠল।
নীল সমুদ্র সাদা-ফেনার রাশি নিয়ে বালির বুকে
আছড়ে পড়ছে। পায়ের পাতা
ডুবিয়ে, হাঁটু ডুবিয়ে, এই শীতকালেও সমুদ্রের স্বাদ নিচ্ছে কত লোক। সব্যসাচী বলল, সত্যি, আর যেন তর সইছে না। আমার মনে হচ্ছে এখুনি ছুটে যাই সমুদ্রের কাছে।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, আর তো এসে গেছি। এবার সমুদ্র আর ঘর এই করতে হবে।
সব্যসাচী বলল, মন্দির! মন্দিরে যাবে না?
মন্দিরে যাব বইকী। তবে রোজ তো নয়। একদিন যাব পুজো দিতে।
সরমা বললেন, আমি অবশ্য রিকশায় বসেই বাবার মন্দির দর্শন করে নিয়েছি। সব্যসাচী বলল, কই! কখন? আমাকে দেখালে না?
দেখাব কী? সেই মুহূর্তেই যা হয়ে গেল।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, কেন এমন হল বলো তো? এতদিন বাইরে বেরোচ্ছি, কই কখনও তো এমন হয়নি।
সরমা বললেন, ওইজন্যই দিনক্ষণ দেখে ঘর থেকে বেরোতে হয়।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, আমি না হয় দিনক্ষণ দেখে বেরোই না। যে সব ট্রেনের যাত্রী দুর্ঘটনায় পড়ে তাদের কেউ-ই কি দিনক্ষণ দেখে বেরোয় না? আসলে যখন যেটা হবার সেটা হবেই।
সব্যসাচী বলল, আমি বলব কেন হল? আমি প্রথম আসছি তো, তাই জগবন্ধু আমার রক্তেই তাঁর পূজা নিলেন।
সরমা বললেন, থাম তুই। বাজে বকিস না। আসতে না আসতেই কী বিপদ। পরে না জানি কী হবে।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, সক্কালবেলাতেই মেজাজটা বিগড়ে গেল।
সরমা বললেন, আমি বাপু এর পর আর ওকে সমুদ্রে নামতে দেব না।
রিকশাওয়ালা বলল, এবার একবার আপনাদের নামতে হবে বাবু। একটু খাড়াই আছে এখানটা। খানিক উঠে আবার চাপবেন। মা বসে থাকুন, আপনারা নামুন।
সরমা বললেন, হলিডে হোমটা কতদূরে?
এসে গেছি মা, আর একটুখানি। শ্মশান পার হয়ে হরিদাস মঠ, তারপরই ডানদিকে।
স্নেহাংশুবাবু আর সব্যসাচী রিকশা থেকে নামলে রিকশাটাকে টেনে খাড়াই পথে একটু ওঠানো হল। শুধু ওদের রিকশা নয়, সব রিকশারই যাত্রীদের নামতে হল এখানে।
হলিডে হোমের আরও যাত্রী এসেছেন। দুটো রিকশা বোঝাই। ছোট বড় মিলিয়ে মোট ছ'জন। কুচোকাচাগুলো আনন্দে পাখির মতো কল কল করছে সব। কী আনন্দ তাদের। তারাও নেমে হাঁটা শুরু করল। বাঁদিকে নীল সমুদ্রের অশান্ত ঢেউ তখন বালুচরে লুটিয়ে পড়ছে।
সব্যসাচী সমুদ্রের রূপ দেখে অধীর হয়ে উঠল।
জীবনে প্রথম শীতের সোনালি রোদে নীল সমুদ্রের হাতছানি যে পেয়েছে তার মনের অবস্থা যে কী কাউকে কি বোঝানো যায়? ওর মনের অবস্থাও তাই, কাউকেই বলা যাবে না।
ওরা আবার রিকশায় চেপে বসলে, রিকশা তির তির করে এগিয়ে চলল। একটু পরেই রিকশা যেখানে এসে থামল সেই জায়গাটাকে এক কথায় হলিডে হোমের পাড়া বলা চলে।
রিকশাওয়ালা বলল, এই আপনার হলিডে হোম। বাঁদিকের রাস্তাটা সোজা চলে গেছে সমুদ্রের দিকে।
স্নেহাংশুবাবু রিকশা থেকে নেমে রিকশার ভাড়া দিলেন। রিকশাওয়ালা বেশ চকচকে নোট পেয়ে খুশি হয়ে চলে গেল।
এখানে চারদিকেই তো হলিডে হোম। তাই দলে দলে রিকশা এসে থামতে লাগল তাদের নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে। ডানদিকে, বাঁদিকে, সামনে, পেছনে, সর্বত্র।
স্নেহাংশুবাবু ঠিকানা লেখা কাগজটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। রিকশাওয়ালা ঠিক জায়গাতেই নিয়ে এসেছে। এই তো বাড়ির গায়ে লেখা আছে কৃষ্ণানন্দধাম। গৌরবাটশাহী। ওপরে হলিডে হোমের বোর্ড।
হলিডে হোমের লাগোয়া একটা গুমটি ঘরের মতো দোকান। এই দোকানটা হল সাধন তালুকদারের।
সাধনবাবু ফটোগ্রাফার। সমুদ্রতীরে যাত্রীদের কুইক সার্ভিসে ফোটো তুলে দেন। আর কয়েকটি হলিডে হোম দেখাশোনা করেন।
এই হলিডে হোমেরও উনি একজন কেয়ার টেকার। দোতলার বারান্দায় একজন মাসি দাঁড়িয়েছিল।
স্নেহাংশুবাবুকে হাতের কাগজে সব কিছু মিলিয়ে নিতে দেখে বলল, ওপরে উঠে আসুন।
স্নেহাংশুবাবু সুটকেস হাতে সপরিবারে ওপরে উঠলেন। খুব একটা উন্নতমানের না হলেও হলিডে হোমের অবস্থান এবং পরিবেশটা খুবই ভাল লাগল স্নেহাংশুবাবুর।
তখন ভালভাবে সকাল হয়ে গেছে। রোদে ঝলমল করছে চারদিক। সামনের রাস্তায় তাই সূর্যোদয় দেখে ফিরে আসা লোকজনের ভিড়। দলে দলে লোক এমনভাবে আসছে যেন কোনও মিছিলে গিয়েছিল তারা।
ওরা ওপরে উঠতেই মাসি ঘর খুলে দিল। একবার শুধু জিজ্ঞেস করল, আপনারা কি ব্যানার্জিবাবুর লোক?
স্নেহাংশুবাবু বললেন, হ্যাঁ।
তা হলে এই ঘর।
সরমা বললেন, আপনি আমাদের চিনলেন কী করে?
ব্যানার্জিবাবুর চিঠি পেয়েছিলাম। তাতেই উনি লিখেছিলেন আজকের তারিখে আপনাদের আসবার কথা। স্বামী-স্ত্রী একটা বাচ্চা।
সব্যসাচী বলল, উনি লিখলে কী হবে? আমি কিন্তু আর বাচ্চা নই। ওর কথায় হেসে উঠল সবাই।
মালপত্তর নিয়ে ঘরে ঢুকতেই সাধনবাবু উঠে এলেন ওপরে। স্নেহাংশুবাবুর হাত থেকে কাগজটা নিয়ে বললেন, ব্যানার্জিবাবুর চিঠি পেয়েছি। আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। কিছু মনে করবেন না যেন। এই মাসিই আপনাদের সব কাজকর্ম করে দেবে, জল এনে দেবে। কোনওরকম কিছু অসুবিধে হলে আমাকে বলবেন।
কথা শেষ হতে-না-হতেই অন্য ঘরের যাত্রীরা এসে পড়ল। এনারা এক নম্বরের বড় ঘরটা নিয়েছেন।
সাধনবাবু ওঁদের নিয়ে ব্যস্ত হলেন এবার।
বাইরে তখন একদল যাত্রীর সঙ্গে একটি ট্যুরিস্ট বাসের ড্রাইভার-কন্ডাক্টারের তুমুল বচসা শুরু হয়ে গেছে।
জানুয়ারি মাসের নির্মেঘ আকাশ থেকে নরম রোদ যখন গলে গলে পড়ে, চারদিক তখন ঝলমল করে। কী সুন্দর, কী মিষ্টি, কী অপূর্ব। হলিডে হোমের বারান্দা থেকে পথের দৃশ্য দেখতে দেখতে দূরের সমুদ্রের দিকে তাকাল সব্যসাচী। সমুদ্র এখান থেকে দেখা যায়, তবে বালুচরে ঢেউ ভেঙে পড়ার দৃশ্য নজরে আসে না। অথচ হলিডে হোমের সামনে দিয়েই সমুদ্রে নামার পথ। কিন্তু অদূরে একটি একতলা বাড়ি এমনই বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে-সেটার জন্য ঢেউ দেখা অসম্ভব।
সব্যসাচী সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠল।
এবার সমুদ্রকে বহুদূর পর্যন্ত আরও ভাল করে দেখা যাচ্ছে। নজরে আসছে আশপাশের অনেক গাছপালার সবুজ দৃশ্য। আর দূরে একটা মন্দির। দুরন্ত হাওয়ায় পত পত করে লম্বা ফিতের মতো ধ্বজা উড়ছে তার। ওটা নিশ্চয়ই পুরীর মন্দির। টি ভি-তে সিনেমায়, খবরের কাগজে, ক্যালেন্ডারের পাতায় কত ছবিই তো দেখেছে ওই মন্দিরের। ও মন্দির কি চিনিয়ে দিতে হয়?
সব্যসাচী দু’হাত জোড় করে প্রণাম করল।
ছাদের মাঝখানে সতরঞ্চি বিছিয়ে পাজামা আর স্যান্ডো গেঞ্জিপরা এক যুবক কতকগুলো খাতাপত্তর নিয়ে কী যেন লেখালিখি করছিলেন। যুবকের গায়ের রং ফর্সা। চাপ দাড়ি। একটু ছিপ ছিপে লম্বাটে ধরনের চেহারা। যুবক একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন সব্যসাচীকে। তারপর নস্যির ডিবে থেকে নস্যি বার করে এক টিপ নিয়ে আবার কাজে মন দিলেন।
সব্যসাচী ভাল করে লক্ষ করল যুবককে। কেমন যেন গম্ভীর আর ভারিক্কি বলে মনে হল। তবুও সে যুবকের কাছে গিয়ে বলল, আপনি নিশ্চয়ই দু'নম্বর ঘরে আছেন?
তোমরা তিন নম্বরে উঠেছ তাই না?
আপনি কী করে জানলেন?
সাধন বলছিল।
সাধন কে?
সাধন নয়, সাধনদা। এখানকার কেয়ার টেকার।
সব্যসাচী জিভ কেটে বলল, স্যরি। উনি তো আমার সাধনদাই হবেন।
খুব ভাল ছেলে।
কে? আমি, না সাধনদা?
তুমি ভাল ছেলে একথা এখনই বলি কী করে? দু'চার দিন থাক। দেখি, তবে তো! ক'দিন থাকবে তোমরা?
জানি না। বাবার তো এক সপ্তাহের ছুটি। ফেরার রিজার্ভেশন পাইনি আমরা, তাই যে কোনওদিন চলে যেতে পারি।
আসতে-না-আসতেই চলে যাবার কথা বলতে নেই। কোনারক, ভুবনেশ্বর যাবে নিশ্চয়ই? ঠিক বলতে
পারব না।
যদি যাও, বাবাকে বলবে মিশ্রজির ছেলের দোকানে যোগাযোগ করতে। সামনেই গুমটি ওদের। ওরাই বাসের ব্যবস্থা করে দেবে।
সব্যসাচী ছাদের চারপাশ একবার ঘুরে নিয়ে বলল, আপনি একা এসেছেন বুঝি?
যুবক মুখ মুচকে সামান্য একটু হেসে বললেন, পৃথিবীতে সবাই একা আসে, একাই যায়।
কে বলল! যমজ ভাইরা তো একা আসে না। আর বাস খাদে পড়লে সবাই তো একসঙ্গেই যায়।
যুবক কিছুক্ষণ অবাকচোখে তাকিয়ে রইলেন সব্যসাচীর দিকে। তারপর বললেন, তুমি অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট ছেলে তো! কী নাম তোমার? আমার নাম সব্যসাচী।
থাক কোথায়?
কলকাতার বেহালায়।
আমি তো ম্যানটনে থাকি।
আমরা থাকি পড়ুই দাস পাড়া রোডে। নবপল্লীর কাছে।
এমন সময় দোতলা থেকে মায়ের গলা শোনা গেল, খোকা! খোকা! সব্যসাচী সাড়া দিল, যাই মা। তারপর বলল, মা ডাকছেন। এখন আসি, কেমন? পরে আপনার সঙ্গে কথা বলব। বলেই তর তর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল দোতলায়।
মা বললেন, কীরে! ওপরে কী করছিলি?
কিছু না। চারদিকের দৃশ্য দেখছিলাম।
নে। কিছু খেয়ে নে। নিয়ে চল সমুদ্রের ধার থেকে একটু ঘুরে বাজার করে নিয়ে আসি।
মাসি কাছেই ছিল। বলল, না না। রান্না করে যদি খেতে চান, তা হলে আগে বাজার করে নিয়ে আসুন। তারপরে যেখানে ইচ্ছে যান। আর যদি হোটেলে খান, তা হলে আলাদা কথা। ছোট্ট বাজার এখানকার। এখুনি সব শেষ হয়ে যাবে।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, আমার মতে আজ আর রান্নার ঝামেলা না করে হোটেলে খেলেই হয়।
সরমা বললেন, হোটেলে খাব কেন? এখানে যখন এমন চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে, তখন শুধু শুধু হোটেলে বেশি পয়সা দিয়ে বাজে খাবার খেয়ে লাভ কী? আগে ঘুরে গিয়ে দেখি চলো, কোথায় কী পাওয়া যায়, তারপর যা হয় হবে। স্নেহাংশুবাবু বললেন, যা তোমার ইচ্ছা।
এরপর সবাই মিলে জলযোগ পর্ব শেষ করে বাইরে এলেন।
হলিডে হোম থেকে বেরিয়ে ডানদিকে দু’পা যেতেই চোখে পড়ল জমজমাট বাজার। কত আনাজপত্তর, শাক-সবজি কত কী। মাছ-মাংস-ডিম সবই পাওয়া যায়। প্রত্যেক দোকানে কেরোসিনও আছে। তাদের কাছ থেকে চাল, ডাল, তেল, নুন, মশলা কিনলেই তারা প্রয়োজন মাফিক কেরোসিন দেবে।
সরমা প্রথমেই একটা ভাঙড় মাছ কিনলেন। একদম টাটকা। তারপর কিছু কাঁচা আনাজ। একটা টাকা দিতেই মাছ কেটে বেছে দিল ওরা।
স্নেহাংশুবাবু সেগুলো চট করে হলিডে হোমে রেখে এসে সরমা ও সব্যসাচীকে নিয়ে বেড়াতে চললেন সমুদ্রের দিকে।
সমুদ্রের ঢেউ যত না তোলপাড় করে, সব্যসাচীর মন তার চেয়েও অনেক বেশি তোলপাড় করে সমুদ্রের কাছে যাবার জন্য। যদিও রিকশায় বসেই সমুদ্রদর্শন হয়ে গেছে, তবুও পায়ের পাতায় সাদা সাদা ফেনাগুলো মাখবার জন্য মনপ্রাণ যেন উতলা হয়ে উঠল।
যেতে যেতে একসময় একটি ভাঙা বাড়ির আড়াল সরে যেতেই চোখে পড়ল সমুদ্র। একটা পিচ বাঁধানো রাস্তা দূরের দিকে চলে গেছে। সেখানে সারি সারি কতকগুলো স্তম্ভের ওপর পাখা লাগানো। সব্যসাচী বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ওগুলো কীসের পাখা?
স্নেহাংশুবাবু বললেন, আমিও ঠিক জানি না। তবে মনে হয়, এগুলো ঘোরার ফলেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে এখানে।
ওরা রাস্তাটা পার হয়ে সমুদ্রবেলায় নামল। সেখানে বালির ওপর কত পরিত্যক্ত নৌকো রয়েছে দেখল। সেগুলোর মধ্যে কোনও কোনওটিতে মেরামতির কাজও চলছে।
সব্যসাচী হঠাৎ একটি ঢেউকে বালুচরে আছড়ে পড়তে দেখে ‘হুরররে’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। তারপর একছুটে একেবারে জলের কাছে।
সরমা চেঁচিয়ে বললেন, বেশি জলে যাস না খোকা। তোর অভ্যেস নেই। সব্যসাচী সে কথার উত্তর না দিয়ে অল্প জলেই তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাগল।
হঠাৎ একটি মেয়ে ওর পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলে গেল, জাস্ট লাইক এ মাংকি।
রাগে মাথাটা গরম হয়ে উঠল সব্যসাচীর। ওর চেয়েও কম বয়স মেয়েটির। এত সাহস তার! সেও তাই চেঁচিয়ে বলল, তুমি একটি আউলনী।
মেয়েটি এবার ফিরে এসে রেগে ওর মুখোমুখি হয়ে বলল, তার মানে? আউলনীটা আবার কোন শব্দ? কোনও ডিকসেনারিতে তো নেই।
আউল মানে কী? প্যাঁচা তো? তা হলে আউলনী মানে?
প্যাচানী।
তুমি একটি প্যাঁচানী।
আমি প্যাচানী? আমাকে প্যাঁচার মতন দেখতে? জান সবাই আমার ফেস কাটিং-এর কত প্রশংসা করে?
তুমি জান, আমাকেও সবাই রাজপুত্তুর বলে।
তুমি রাজপুত্তুরই তো।
তা হলে কেন আমাকে তুমি বাঁদরের সঙ্গে তুলনা করলে?
কেন করব না? তোমার কি বোঝা উচিত ছিল না, আমি তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাই?
কী করে বুঝব? আমি কি তোমাকে কখনও দেখেছি?
আমি কিন্তু দেখেছি তোমাকে।
কী করে দেখলে?
একটু আগে তুমি যখন এই রাজপুত্তুরের মতো চেহারা নিয়ে বোকা বোকা মুখ করে ছাদে ঘুরছিলে, তখনই দেখেছি। আমি তোমার সামনের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখছিলাম। কিন্তু তুমি একবারও আমার দিকে তাকালে না। এতে আমার মনে দুঃখ হয় না বুঝি?
সব্যসাচী হেসে ফেলল এবার। বলল, ওঃ এই কথা? তা হলে ঠিক আছে, আমার কথা আমি ফিরিয়ে নিচ্ছি।
আমার কথাও আমি ফিরিয়ে নিলাম তা হলে। যাকগে, তোমরা তো এই একটু আগে এলে। ঢেউ খেতে আসবে কখন?
এখন বাড়ি ফিরে মা রান্নাবান্না শেষ করলেই আসব।
আমরাও তাই। বারোটা একটা হবে। ওই সময়ে এসো, আমরা দু'জনে একসঙ্গে ঢেউ খাব কেমন? আমার এখন খুব সাহস হয়ে গেছে। আমরা তিনদিন এসেছি। কত ঢেউ যে খেয়েছি তার ঠিক নেই। তোমাকে আমি ঢেউ খাওয়া শিখিয়ে দেব। C
কিন্তু আমার যে খুব ভয় করবে। জলকে আমার দারুণ ভয়।
সাঁতার জান না বুঝি?
না। তা ছাড়া সাঁতার জানলেও এই মহাসমুদ্রে সাঁতার কাটবে কে? আমিও সাঁতার জানি না। একদিন শুধু নুলিয়া ধরে নেমেছিলাম। তারপরেই ভয়টা কেটে গেছে। কোথা থেকে এসেছ তোমরা? ?
বেহালা থেকে। তুমি
তানপুরা থেকে।
তানপুরা! সেটা আবার কোথায়?
সেটাও আছে মশাই। লিলুয়ার পরে যেমন হালুয়া আছে, বেহালার পরেই তেমনি তানপুরা আছে। বড়িশার নাম শুনেছ? বড়িশা চণ্ডীতলা? আমি সেই চণ্ডীতলার মেয়ে। সবাই আমাকে রণচণ্ডী বলে।
বলো কী! আমরা তো প্রতিবছর মেলার সময় ওখানে ঠাকুর দেখতে যাই। আমিও প্রতিবছর মেলার সময় ওখানে আমার বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াই। ভলেন্টিয়ার হই। ফাংশনে গান গাই। যাকগে, আমার মামা, মামি, দিদিমা ওরা অনেকটা এগিয়ে গেছে। আমি এখন আসি, কেমন?
বেলায় আসছ তো?
বয়ে গেছে। ল্যাদারুশ ছেলেদের সঙ্গে আমি মিশি না। বলেই একটা ভেংচি কেটে দৌড়ে পালাল মেয়েটা।
ততক্ষণে স্নেহাংশুবাবু ও সরমা এসে পড়েছেন।
সরমা বললেন, কেরে মেয়েটা?
জানি না। ও বলল, ও নাকি একটা রণচণ্ডী। বড়িশায় থাকে।
কী বলছিল তোকে?
কিছুই না। এমনি আলাপ হল। আমাদের সামনের হলিডে হোমে উঠেছে ওরা। বেশ দেখতে তো মেয়েটিকে। ভারী ফুটফুটে। ঠিক যেন প্রজাপতির মতো পাখা মেলে উড়ে গেল, তাই না?
স্নেহাংশুবাবু বললেন, প্রজাপতি, চামচিকে কত কী-ই তো দেখলে। এখন ঢেউ দেখো, ঢেউ দেখো। যা দেখলে কাজ হবে। ওই দেখো, কত বড় একটা ঢেউ কীভাবে ছুটে আসছে।
বলতে বলতেই একরাশ ফেনা নিয়ে ঢেউটা এসে এমন ভাবে আছড়ে পড়ল পায়ের কাছে যে জামাকাপড় সব ভিজে গেল। শুধু কী তাই, কত লোক যে উলটে পালটে পড়ল তার আর হিসেব নেই। সব্যসাচীও তিড়িংবিড়িং করছিল। কিন্তু উয়ের ধাক্কায় বালির ওপর এক আছাড়। তারপর জলের টানে হড় হড় করে নেমেও গেল খানিকটা। ভাগ্যে স্নেহাংশুবাবু সময়মতো ধরে ফেলেছিলেন। না হলেই হয়েছিল আর কী।
এমন সময় হঠাৎ এক জায়গা থেকে প্রচণ্ড একটা শোরগোল উঠল। কী হল কে জানে? সবাই ছুটল সেইদিকে। সব্যসাচীও ছুটল।
সরমা চেঁচিয়ে বললেন, খোকা ফিরে আয়। যাস না।
কিন্তু কে শোনে কার কথা।
সব্যসাচী গিয়ে দেখল এক জায়গায় এক ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা এবং তাঁদের ছেলেমেয়েরা বালির ওপর আছাড়কাছাড় করছে। বহু লোক জড়ো হয়ে তাঁদের ঘিরে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করছে।
কয়েকজন নুলিয়া হই হই করে ছুটল জলের দিকে।
ব্যাপার কী? না, এই পরিবারেই একটি ছোট ছেলে সমুদ্রতীরে কয়েকজনের সঙ্গে ছুটোছুটি করে খেলা করছিল। হঠাৎ করে একটি বড় ঢেউ এসে পড়ায়, সবাই বেসামাল হয়ে গেলে ছেলেটি হাতছাড়া হয়ে যায়। তারপর আর দেখা যাচ্ছে না তাকে। তার মায়ের সে কী কান্না। সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে সেই কান্নার স্বর যেন বালুচর কাঁপিয়ে দেয়।
নুলিয়ারা জলে নেমে জল তোলপাড় করে।
অন্যান্য স্নানার্থীরাও শুরু করে খোঁজাখুঁজি। কিন্তু না, সকলের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।
সমুদ্র যে চোখের পলকে কোথায় নিয়ে গেল তাকে, তা কে জানে? ভিড় বাড়ে। পুলিশ আসে।
জেলেরা নাও নিয়ে জলে নামে। কিন্তু নিখোঁজের খোঁজ দিতে পারে না কেউ। ফলে বাধ্য হয়েই আশা ছেড়ে দিতে হয়।
এমন একটা মর্মান্তিক খবর শুনে কারই বা মাথার ঠিক থাকে? সরমা তাই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেন সব্যসাচীকে।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, সময়মতো না ধরলে আমার ছেলেটাও তলিয়ে গিয়েছিল আর কী!
সেই ছেলেটির মা তখন চিৎকার করছেন, বাবা জগন্নাথ! কৃপা করো। হে সমুদ্রনারায়ণ! আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও। ও তো কোনও দোষ করেনি বাবা। আনন্দে নেচে নেচে তোমার কোলে খেলা করছিল। দয়া করে ওকে ফিরিয়ে দাও। তুমি অনন্ত—তুমি অপার— তুমি মহৎ— তুমি উদার। তুমি তো কারও কিছুই নাও না। তবে কেন ওকে অমন করে টেনে নিলে? হয় তুমি আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও, না হলে আমাকেও তুমি নাও।
শোকার্ত জননীর বিলাপ কি এইভাবে কান পেতে শোনা যায়? তাই সব্যসাচীকে নিয়ে সমুদ্রতীর থেকে আবার হলিডে হোমে ফিরে এলেন স্নেহাংশুবাবু ও সরমা। কারও মুখে কথা নেই। কী কথাই বা বলবেন?
অনেক পরে স্নেহাংশুবাবু বললেন, এবারের জার্নিটাই আমাদের খারাপ। এক তো সকালে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে ছেলেটা একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসল। তার ওপর এই এক দৃশ্য। প্রথম দিনেই মনটা গেল বিষিয়ে।
তাই না তাই।
সব্যসাচী বলল, বাবা! আমরা আজ সমুদ্রে স্নান করতে যাব না?
না বাবা। এইসব দেখেশুনে আজ আর নয়।
কত লোক তো স্নান করছে।
করবেও। দিঘায়, পুরীতে এসব হামেশা হয়। তবে কিনা আজই স্বচক্ষে এই দৃশ্য দেখার পর মন চাইছে না।
ওই ছেলেটাকে আর পাওয়া যাবে না?
নিশ্চয়ই যাবে। তবে জীবিত অবস্থায় নয়। তাও কখন কোনখানে যে ডেড বডি মিলবে ওর, তা কে জানে?
সরমা বললেন, আমার কিন্তু আর একদমই মন চাইছে না এখানে থাকতে। আজকের দিনটা এখানে থেকে কাল একটা রিকশা নিয়ে যা যা দেখবার দেখে পরশু সকালেই নীলাচল ধরে চলে যাই চলো।
সব্যসাচী ব্যথা পেয়ে বলল, সে কী মা। এত আশা নিয়ে এখানে এসে চলে যাবে তোমরা?
সরমা বললে, হ্যাঁ বাবা। কেন জানি না, আমার মনটা কেবলই কু-গাইছে। স্নেহাংশুবাবু দু'হাতের ভরে মাথা রেখে চুপ চাপ বসে রইলেন।
ছোট্ট ঘটনা। হামেশাই হয়।
তবু ছেলেটির সমুদ্রগ্রাসের খবর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র।
মুহূর্তের জন্য, কিছুসময়ের জন্য, হয়তো বা দু'চার ঘণ্টার জন্য সাবধান হবে সবাই। তারপর সবাই সব কিছু ভুলে যাবে। আবার আনন্দে উদ্দাম হয়ে, উত্তাল তরঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়বে সবাই। এই সমস্ত ঘটনা তুচ্ছ মনে হবে তখন। এই বিষাদের সুর রেখাপাতও করবে না কারও মনের কোণে। হঠাৎ কানে এলে কেউ হয়তো বলে বসবে, অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট। কী আর করা যাবে। অমন কত হয়।
সময়ের নিয়মই এই। সময়ের ধর্মই এই।
স্নেহাংশুবাবু বাথরুমে গেলেন। সকাল সকাল স্নানটা সেরে নিতে হবে।
সরমা ঢুকলেন রান্নাঘরে।
সব্যসাচী অনেক বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে এক-পা দু’-পা করে নীচে এল। সেই দামাল মেয়েটা তখন ওর বাড়ির লোকেদের সঙ্গে হলিডে হোমে ফিরছে। এই মুহূর্তে কী স্মার্ট মেয়েটি। আড়চোখে একবার ওর দিকে তাকিয়ে দেখল বটে, তবে এমন ভান করল যেন চেনেই না।
সব্যসাচী মনে মনে ভাবল এর জবাব ও অবশ্যই দেবে। পাশাপাশি হেঁটে গেলে ফিরেও তাকাবে না ওর দিকে।
সাধারণত যা হয় অর্থাৎ কিনা দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর সবাই একটু শুয়ে ঘুমোয়। বিশেষ করে সারারাত ট্রেন জার্নির পর ঘুম একটু আসেই চোখে। কিন্তু সব্যসাচীর চোখে ঘুম নেই।
মা-বাবা দু'জনেই শুয়ে ঘুমোচ্ছেন দেখে, ও একটু এপাশ ওপাশ করে উঠে পড়ল। আসলে দিবানিদ্রা ওর হয় না। হবেই বা কেন? সারাটা দুপুর তো স্কুলেই সময় কাটে। ছুটির দিন ঘরে বসে বই পড়ে। বুক সেলফ ঠাসা বই ওর। পাণ্ডব গোয়েন্দার সব ক'টি খণ্ডই ওর আছে। আর আছে দুর্দান্ত একটা অ্যাডভেঞ্চারের বই, সোনার গণপতি হিরের চোখ।
সব্যসাচী বিছানা থেকে উঠে পা টিপে টিপে এসে দরজা খুলে বারান্দায় এল। তারপর আলতো করে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে এক্কেবারে ছাদের ওপর।
শীতের ঝলমলে রোদ্দুরে কী ভাল যে লাগল ছাদটা। ওই তো দূরে সমুদ্রের নীল জলরাশি কী সুন্দর দেখতে লাগছে। সব্যসাচী একভাবে সেইদিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ মুখের ওপর কীসের একটা আলো এসে পড়ল।
কী জোরালো সেই আলো। মনে হল কাচ বা অন্যকিছুর ওপর প্রতিফলিত হয়ে আলোটা ওর মুখে এসে লাগছে।
ও চোখদুটো বুজে একটু সরে দাঁড়াল।
সাময়িক বিরতি। তারপরে আবার। বেশ বোঝা গেল কেউ ইচ্ছে করেই করছে
এই কাণ্ডটা। কিন্তু সব্যসাচী বার বার চেষ্টা করেও দেখতে পেল না তাকে। আয়নায় রোদ্দুর ধরে অপরের মুখের ওপর ফেলা, এটা একটা দারুণ অসভ্যতা। অমার্জনীয় অপরাধ এটা। কিন্তু কী আর করা যাবে? যে করছে সে করেই লুকিয়ে পড়ছে। আবার—আবার সেই প্রতিফলন।
সব্যসাচী দেখল এ সেই পাকলুর কাণ্ড। সেই ডানপিটে মেয়েটির কীর্তি। সামনের হলিডে হোমের ছাদে দাঁড়িয়ে এই কাজ করছে, আর লুকিয়ে পড়ছে। শুধু এইবারেই যা লুকিয়ে পড়ল না।
সব্যসাচী রেগে ওর দিকে তাকালে ও দুষ্টুর মতো মিষ্টি হাসল।
মেয়েটির ব্যবহারের উপযুক্ত জবাব দেবার এই সুযোগ। এ সুযোগ হেলায় হারাল না সব্যসাচী। সে কোনওরকম প্রশ্রয় না দিয়ে বারান্দায় নেমে এল। ওর মুখের দিকেও তাকাবে না সে।
কিন্তু কী জ্বালা। বারান্দাতেও সেই একই উপদ্রব।
ও এবার দারুণ রেগে ঘরে ঢুকে গেল। তারপর হঠাৎ কী মনে হতেই সিঁড়ি বেয়ে তর তর করে নীচে নেমে রাস্তা পার হয়েই সামনের হলিডে হোমে। কাউকে কোনও কথা না বলে তর তর করে একেবারে ছাদে।
মেয়েটি তখনও আলশের ধারে ঝুঁকে ওকে খুঁজছে।
ও একেবারে পেছনদিক থেকে গিয়েই শক্ত করে চেপে ধরল ওর হাতদুটো। মেয়েটি দারুণ ভয় পেয়ে ঘুরে তাকাল ওর দিকে।
সব্যসাচী বলল, ঘুঘু দেখেছ, কিন্তু ফঁাঁদ দেখনি। এইসব বদ অভ্যাস তোমার কতদিনের?
হাত ছাড়ো বলছি। আমার গায়ে হাত দেবার সাহস তোমার কী করে হল? ঠিক যেমন করে আমার মুখের ওপর আলো ফেলার দুঃসাহস হয়েছে তোমার।
মেয়েটি আর কোনও উত্তর দিতে পারল না। কিছু সময় নীরব থেকে বলল,
তুমি খুব শক্ত করে ধরেছ আমাকে, ছাড়ো।
সব্যসাচী হাত ছেড়ে সরে দাঁড়াল।
মেয়েটি বলল, তুমি সমুদ্রে এলে না কেন?
কী করে যাব? আমার বাবা-মা কেউ যে গেলেন না।
কেন গেলেন না?
আসলে ওই ছেলেটির ব্যাপারে মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল তাই। কিন্তু তুমি তখন আমাকে চিনেও অমন না চেনার ভান করে চলে এলে যে?
তুমি একটা রামবুদ্ধু। আমার মামা ছিলেন না? মামা অত্যন্ত কড়া লোক। কারও সঙ্গে বেশি কথা বলা একদম পছন্দ করেন না। বিশেষ করে সমবয়সি ছেলেদের সঙ্গে কথা বললে মামা মারাত্মক খাপচুরিয়াস।
তোমার বাবা-মা আসেননি?
না। আমার মা নেই। বাবা আবার বিয়ে করেছেন। তাই আমি মামার বাড়িতে মানুষ।
সব্যসাচী এবার একটু নরম হয়ে স্নেহভরা গলায় বলল, আমার ব্যবহারের জন্য তুমি কিন্তু কিছু মনে কোরো না। আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম তোমার ওপর।
রাগটা হঠাৎ পড়ে গেল কেন? আমার মা নেই, বাবা থেকেও নেই, এই সব শুনে?
উঁহু। তা হলে তো তোমাকে দয়া দেখাতে হয়। আসলে তুমি খুব সহজ, সরল।
আর কী?
ভীষণ ছেলেমানুষ।
মেয়েটি খিল খিল করে হেসে উঠল। তারপর বলল, তুমি আর থেক না এখানে। আমার মামা যদি ওপরে উঠে আসেন আর তোমার সঙ্গে কথা বলছি দেখতে পান তা হলে কিন্তু রেগে যাবেন খুব। তুমি বরং তোমাদের ছাদে চলে যাও, আমি এখানে থাকি।
সব্যসাচী বলল, যা তুমি বলবে। বলেই চলে আসতে যাচ্ছিল।
মেয়েটি হঠাৎ ছুটে এল ওর দিকে। বলল, কী বললে তুমি? যা আমি বলব? এখন যদি আমি বলি তুমি সমুদ্রের ধারে গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করো, তাই তুমি করবে?
সব্যসাচী বলল, নিশ্চয়ই করব।
তোমার মা-বাবা বকবে না?
ওরা এখন ঘুমোচ্ছেন।
তা হলে এক কাজ করো, তুমি এই পাশের রাস্তাটা দিয়েই সমুদ্রে চলে যাও। আমি এদিকটা একটু ম্যানেজ করেই যাচ্ছি। দেরি হলে রাগ কোরো না যেন। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে আমার।
মেয়েটির কথায় ঘাড় নেড়ে সব্যসাচী হলিডে হোমের বাইরে এল। তারপর গৌরবাটশাহীর পথ ধরে সোজা সমুদ্রতীরে। শীতকাল হলে কী হয়, কী চড়া রোদ এখানে। তবুও ও বালিয়াড়ির ওপরে পড়ে থাকা একটা কালো রঙের আধভাঙা জেলেডিঙির পাশে গিয়ে চুপ করে বসে রইল।
এই মেয়েটিকে কেন কে জানে খুব ভাল লেগেছে ওর। কী সুন্দর গোলাপি আভা মেয়েটির। আর ভারী মিষ্টি ওর মুখ। শুধু একটু যা চঞ্চল প্রকৃতির।
তা হোক, এমন একটি মিষ্টি মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলে ক্ষতি কী?
সব্যসাচী অনেকক্ষণ বসে থাকার পরও যখন মেয়েটি এল না তখন সে মনে মনে অত্যন্ত রেগে গেল। এত ফাজিল কেউ হয়? নিশ্চয়ই ওকে সমুদ্রে পাঠিয়ে ওর ধৈর্য পরীক্ষা করবার জন্য এই কীর্তি করেছে সে। এরপর হতাশ হয়ে, বিরক্ত হয়ে যখন ও ফিরে যাবে তখন আবার হয়তো আয়নার রোদ ওর মুখে ফেলে খিল খিল করে হাসবে।
খুব রেগে গেছ তো ল্যাদারুশবাবু?
সব্যসাচী ঘুরে তাকিয়ে দেখল মেয়েটি ওর ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে ওর কাঁধে হাত রেখে ওকে এই কথা বলছে।
সব্যসাচী বলল, এত দেরি হল যে?
ওমা দেরি কোথায়? তুমি চলে আসার পরই তো আমি এলাম।
মিথ্যে কথা বলবার জায়গা পাওনি? আমি ঠায় ওইদিকে চেয়ে বসে আছি। মাঝে মাঝে সমুদ্রও দেখছিলে। বালিতে হিজিবিজি কাটছিলে
কিন্তু এর ফাঁকে তুমি এলে কখন?
অনেকক্ষণ। আমি তো ওইপথে আসিনি। এসেছি হরিদাস স্বামীর সমাধিমন্দিরের পাশ দিয়ে। আমি কখন যে এসে এখানে দাঁড়িয়েছি তা তুমি টেরও পাওনি।
কেন ওদিক দিয়ে এলে কেন?
তুমি যখন বোকার মতো এদিকে তাকিয়ে থাকবে, আমি তখন অন্যদিক থেকে এসে তোমাকে চমকে দেব বলে।
সব্যসাচী বলল, তুমি একটি হাড়বজ্জাত মেয়ে।
মেয়েটি বলল, তুমি খুব রেগেছ। নাও, আমার দিদিমার তৈরি কুলের আচার খাও।
মেয়েটি একটা পলিপ্যাকের মধ্যে করে আনা কুলের আচার বের করে সব্যসাচীকে দিল। তারপর দু'জনে দু'জনের দিকে চেয়ে একটু একটু করে সেই আচার খেতে লাগল।
সব্যসাচী বলল, এবার বলো কেন ডেকেছিলে। তুমি না বলেছিলে আমার সঙ্গে অনেক কথা আছে, কী সে কথা?
মেয়েটি বলল, তার আগে বলো তোমার নাম কী? নামটাই তো জানা হল না। আমার নাম সব্যসাচী। তোমার নাম?
আমার নাম আন্নাকালী।
ধ্যাত। তোমার মতো মেয়ের ওই নাম হয় নাকি? ঠিক করে বলো।
আমার নাম জয়া।
হ্যাঁ। এই তোমার ঠিক নাম। আমি যতগুলো এই নামের মেয়ে দেখেছি তারা সবাই ভীষণ খেয়ালি হয়। ডানপিটে হয়।
সব্যসাচীর কথা শেষ হতেই ফোঁস করে উঠল জয়া। বলল, ওরে চোরাবালি। তুমি তা হলে অনেক মেয়ের সঙ্গেই মিশেছ। যাও খোকন ঘরে যাও। যে সব ছেলে মেয়েদের সঙ্গে বেশি মেশে আমি তাদের পাত্তা দিই না।
সব্যসাচী বলল, বাঃ রে। আমার কাকিমার মেয়ের নাম জয়া। সে ড্যাং-গুলি খেলে মাথা ফাটিয়েছিল। আমার পাশের বাড়ির বকুলদির ছোট বোন জয়া। সে একবার পেয়ারাগাছের ডাল থেকে লাফিয়ে পড়ে পা ভেঙেছিল। আর আমার মামার বাড়ি হরিপালের যে কাজের মেয়েটা, সে পাড়ার একটা ছেলেকে ঝাঁটা দিয়ে এমন পিটিয়েছিল যে সেই থেকে তার নামই হয়েছিল রায়বাঘিনী।
জয়া তখন আপন মনেই কোনওদিকে না তাকিয়ে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলেছে।
সব্যসাচী যেতে যেতে বলল, কী ব্যাপার! কথা বলছ না কেন? তুমি কি আমার ওপর রাগ করলে? আমি কিন্তু জয়া নামের আরও একটি মেয়েকে জানি, যে খুব কথায় কথায় মাথাগরম করে, যে খুব ভ্যাংচায়, যে আয়নায় রোদ্দুর ধরে ছেলেদের মুখে ফেলে।
জয়া রাগত অথচ হাসি হাসি মুখে ঘুরে তাকিয়ে বলল, উঃ। একটান! কী সব বকে চলেছ পাগলের মতো? তোমার টেপ রেকর্ডারটা একটু থামাবে? টেপ রেকর্ডার?
হ্যা। তোমার ওই মুখটা একটু বন্ধ করো। সমুদ্রের ডাক শোনো। জলের ভাষা বোঝো।
ও আমি বুঝতে পারব না। কিন্তু তুমি আমাকে কী জন্যে ডেকেছিলে সেটা তো কই বললে না?
জয়া এবার থমকে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে সব্যসাচীর মুখের দিকে তাকাল। তারপর ওর চোখে চোখ রেখে বলল, ওঃ হো। কেন ডেকেছিলাম বলো তো? সেটা তুমিই জানো।
জয়া উল্লসিত হয়ে বলল, হ্যাঁ মনে পড়েছে। তুমি আমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবে?
কোথায়?
সেখানে একা যেতে আমার সাহস হচ্ছে না।
কতদূরে সে জায়গাটা ?
জানি না। তবে দূর আছে। এই যে দেখছ পথটা সোজা দূরের দিকে চলে গেছে—সারিবদ্ধ পাখার সারি, ওই দিকে।
সব্যসাচী সেইদিকে চেয়ে থেকে বলল, এই পথটা সকাল থেকে কেন জানি না আমাকেও টানছে।
কাল থেকে আমাকেও। ওই দেখো, দূরে বহুদূরে আবছা কালো মতো কী যেন একটা দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ওটা একটা পাহাড়। কে যেন একজন সকালেই বলছিল ওই জায়গাটা নাকি ভারী সুন্দর। ওখানে একটা নদী এসে মিলেছে সমুদ্রে।
তার মানে মোহানা।
তাই হবে। যাবে ওদিকে? আমার সকাল থেকে কেবলই মনে হচ্ছিল মনের মতো একজন সঙ্গী পেলে ওখানেই যাই।
সব্যসাচী বলল, ফিরতে দেরি হয় যদি?
কী আর হবে? না হয় একটু বকুনি খাব।
চলো তবে।
কুলের আচার খাওয়া শেষ হয়েছে। ওরা দু'জনেই তখন চটচটে এঁটো হাতটা কদমে দূরের দিকে এগিয়ে চলল।
সমুদ্রের জলে ধুয়ে ভিজে বালি মাড়িয়ে জোর পশ্চিমি রোদ তখন ওদের মুখের ওপর।
চারদিকে তখনও কত লোক। কত স্নানার্থী।
কত জেলে জাল ফেলে মাছ ধরছে।
কত সামুদ্রিক পাখি ঘুরপাক খাচ্ছে মাথার ওপর। মরা কাছিমের পচা গন্ধ নাকে আসছে।
জগৎ পারাবারের তীরে এই দুই কিশোরকিশোরী তখন প্রাণের জোয়ারে যেন ভেসে চলেছে এক অজানার উজানে। ওদের মনে আনন্দ আর ধরে না।
ভিজে বালির ওপর দিয়ে পথ চলতে চলতে একসময় ওরা বালিয়াড়ি পার হয়ে পাকা রাস্তায় উঠল।
নির্জন পথ। মাঝে মাঝে দু’-একটা পোড়ো বাড়ি চোখে পড়ল। কোনও কোনও জায়গায় অবশ্য হলিডে হোম অথবা ওই ধরনের কিছু যাত্রীনিবাস গড়ে উঠছে।
কিন্তু পথের যে শেষ হয় না।
সব্যসাচী বলল, আর কতদূর?
জয়া বলল, কী করে জানব? আমি কি গেছি কখনও? সেই জন্যই তো ডেকে আনলাম তোমাকে। এত দূরের পথ কি একা আসা যায়?
আমার কিন্তু খুব ভয় করছে।
কীসের ভয়! ভূতের?
না, তা নয়। কী নির্জন দেখছ না। মাঝি, মাল্লা, নুলিয়া, জেলে কেউ নেই এখানে। কাউকে যে কিছু জিজ্ঞেস করব সে সম্ভাবনাও নেই।
না থাক। এসেছি যখন জায়গাটা না দেখে ফিরছি না।
যেতে যেতে একসময় পিচ ঢালা পাকা রাস্তাটা শেষ হয়ে গেল। তখন ওরা এমন এক জায়গায় এসে পড়ল যে জায়গাটাকে একটা মরুভূমি বললেও ভুল হয় না। বাঁদিকে সমুদ্রকে বাদ দিলে সত্যি সত্যিই সেটা যেন একটা মরুভূমি। এইখানে হঠাৎ কয়েকজন কাঠুরিয়ার সঙ্গে ওদের দেখা হয়ে গেল। তারা মাথায় ঝাউকাঠের বোঝা নিয়ে স্বর্গদ্বারের দিকে যাচ্ছিল।
সব্যসাচী জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, নদী যেখানে সাগরে মিশেছে সে জায়গাটা আর কতদূরে গো ?
তারা থমকে দাঁড়িয়ে বলল, এমন অবেলায় সেখানে গিয়ে কী করবে? আর একটু পরে সূর্য ডুবলেই তো সন্ধে হয়ে যাবে।
কেন যাওয়া যাবে না?
যাবে না কেন? যাবে আর আসবে। একদম দেরি কোরো না। জায়গাটা খুব খারাপ।
জয়া বলল, কিন্তু কতদূরে?
এই তো এসে গেছ।
ওরা বালির ওপর দিয়ে খানিক এগোতেই দেখতে পেল কী সুন্দর ঘন নীল জলের একটা নদী সমুদ্রে এসে মিশেছে।
সব্যসাচী লাফিয়ে উঠল, ওঃ কী সুন্দর এই জায়গাটা।
জয়া বলল, কেন যে লোকে স্বর্গদ্বারের বালি কামড়ে পড়ে থাকে তা কে জানে? এই তো বেড়াবার উপযুক্ত জায়গা।
সব্যসাচী বলল, জয়!
জয় নয়, জয়া।
ওই হল। ওই দেখো তোমার পাহাড়।
পাহাড় কোথায়? ওটা তো দেখছি উঁচু বালিয়াড়ির ওপরে একটা ঘন ঝাউবন। যদি সকালের দিকে আসতাম তা হলে যেভাবেই হোক নদী পার হয়ে চলে যেতাম ওখানে।
জয়া হঠাৎ আনন্দে চিৎকার করে উঠল, সব্যসাচী! পেয়েছি পেয়েছি পেয়েছি। কী
পেয়েছ?
যা কেউ পায় না। আস্ত একটা শাঁখ। তাও আবার জ্যান্ত।
সব্যসাচী ছুটে গেল, কই দেখি?
জয়া শাঁখটাকে হাতে করে ছুড়ে দিল ওর দিকে। বলল, সাবধানে দেখবে কিন্তু। এরা খুব কামড়ে দেয়।
পঞ্চমুখী শাঁখ। খুব একটা বড় নয়। তবে নেহাত ছোটও নয়। খুঁজতে খুঁজতে আরও অনেক ছোট ছোট শাঁখ মিলল। সেই সঙ্গে রংবাহারি অজস্র ঝিনুক। ওরা যে কী করবে তা ভেবে পেল না। সমুদ্র তার এত সম্পদ যে ওদের জন্যে থরে থরে সাজিয়ে রাখবে এখানে তা কে জানত? কিন্তু মুশকিল হল এত সব ওরা নিয়ে যাবে কী করে? ওরা যে কিচ্ছু আনেনি। এমনকী কারও কাছে একটা রুমাল পর্যন্ত নেই।
জয়া বলল, কী করি বলো তো? এ জিনিস ছেড়ে গেলে সারারাত আমি ঘুমোতে পারব না।
আমিও কি পারব ভেবেছ?
যদি তুমি কিছু মনে না করো, একটা কথা বলব?
বলো।
তুমি তো ছেলে। ভেতরে গেঞ্জি একটা পরে আছ নিশ্চয়ই। তা এক কাজ করো না, তোমার জামাটা খুলে ওর মধ্যেই মুড়ে নাও। আমি মেয়ে। আমার পক্ষে ওই ভাবে কিছু নেওয়ার অসুবিধে আছে। তাও যদি বুদ্ধি করে চুড়িদারটা পরে আসতাম তা হলেও না হয় হত। কিন্তু ফ্রক পরেই যে কাল করেছি।
সব্যসাচী বলল, ঠিক আছে। আমি আমার জামার মধ্যেই সব নেব। তুমি আরও কুড়োও। আমি বরং ওই বালিয়াড়ির ওপরটায় উঠে গিয়ে একটু দেখি ওগুলো নিয়ে যাবার মতো কোনও কিছু পাই কিনা।
কী পাবে ওখানে?
দেখে মনে হচ্ছে এখানে মড়াটড়া পোড়ানো হয়। কোনও কলসি বা পলিপ্যাক জাতীয় কিছু যদি পাই তো মন্দ কী?
দেখো তবে। কিন্তু মড়াদের জিনিসপত্তর কিছু যেন নিয়ো না। ওরা ভারী বদ। স্বপ্নে দেখা দিয়ে সব কিছু ফেরত চায়। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থেকে ভয় দেখায়।
সব্যসাচী ওর কথায় হেসে উঠে বলল, তোমার মুণ্ডু। বলেই একটা কলসি নিয়ে এসে কুড়নো ঝিনুক শামুক শাঁখ কড়িগুলো তার মধ্যে পুরে নিল।
তারপর নদীর একটা খাড়ি যেখানে বালিয়াড়ির মধ্যে ঢুকেছে সেইখানে উঁচু একটা বালির ঢিবিতে উঠে চারপাশ দেখেই কেমন যেন উৎফুল্ল হয়ে নেমে এল। জয়া তখনও এক মনে ঝিনুক কুড়িয়ে চলেছে।
সব্যসাচী বলল, জয়া! একবার ওই বালির ঢিবিতে ওঠো।
কেন, কী আছে ওখানে?
ওখানে কিছুই নেই। যা আছে তা এই নদীটার ওপারে। কী
সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য সেখানকার। না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না।
তুমি কি ওপারে যেতে চাও?
যদি তুমিও যাও।
জয়া এবার মিলনমুখী নদীর জলধারার দিকে তাকিয়ে বলল, নদীর এখানে গভীরতা খুব কম। হয়তো হাঁটু জল। কিন্তু মোহানার নদী। পার হতে পারবে তো?
খুব পারব। এতদূর যখন এসেছি তখন ওপারটা না দেখে কি যাওয়া ঠিক? ওপারে গিয়ে ওই বালিয়াড়ির উঁচুতে উঠে আরও ওপারে কী আছে দেখে তবেই ফিরব।
বেলা পড়ে আসছে কিন্তু।
আসুক না। যাব আর আসব।
আর কথা নয়।
দু’জনেই তখন নেমে পড়ল জলে। ওঃ সে কী টান জলের। তেমনি ঠান্ডা। দু'জনে দু'জনকে ধরে টলমল করতে করতে বহু কষ্টে নদীটা পার হল।
ওপারে গিয়ে যখন পৌছল তখন যেন বিশ্বজয়ের আনন্দ ওদের মনে।
নদীটা এইদিক দিয়েই বয়ে আসছে।
এখানে একটা বাঁক আছে। সেই বাঁকের মুখে গিয়ে ওরা দেখল কী দারুণ নির্জন আর অনবদ্য প্রকৃতির বুক চিরে বয়ে আসছে নদীটা। ঘন নীল তার জলের রং। কত সামুদ্রিক পাখি উড়ছে সেই নদী আর বালিয়াড়ির মাঝখানে। ওরা দু’জনে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই নদীর গতিপথের দিকে। তারপর বালিয়াড়ি পার হয়ে ওপরের ডাঙায় উঠতে লাগল।
খানিক এসেই ওদের চক্ষুস্থির। কত ঝিনুক-কড়ি যে এখানে ছড়ানো আছে, তা কে জানে। দেখে চোখ কপালে উঠল ওদের।
জয়া তো সব ভুলে আবার শুরু করল ঝিনুক কুড়োতে।
সব্যসাচী বলল, শোনো জয়া, বেশি লোভ কোরো না। কাল বরং আমরা আবার আসব। সঙ্গে একটা ব্যাগ নিয়ে আসব। আর তখনই আমরা লুটে নেব এই কুবেরের ভাণ্ডার।
জয়া বলল, কালকের কথা কাল। আজ আমি এগুলোকে ছেড়ে যেতে পারব না।
প্লিজ। আর দেরি করলে ফিরতে রাত হয়ে যাবে। এখনই সন্ধে হয়ে আসছে
তা হলে চলে এসো তুমি।
আমি যে ওপরে উঠে একটু দেখতে চাই।
আমিও যে এগুলো সব কুড়োতে চাই।
তুমি তা হলে তোমার কাজ করো, আমি বরং প্রকৃতি দেখি।
সুবুদ্ধি হোক তোমার।
সব্যসাচী ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগল। চারদিকে কত কাঁটাগাছ এখানে।
ছোটখাটো ঝোপঝাড়। ওপরটা ঠিক যেন পাহাড়ের মতো উঁচু।
ওপরে উঠেই মুগ্ধ হয়ে গেল সব্যসাচী। সে কী অনন্ত সৌন্দর্য সেখানে। কী বিশাল ঝাউবন। ঘন থেকে ঘনতর হয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেছে। আর কী ভয়াবহ নির্জনতা চারদিকে।
সব্যসাচী মুগ্ধ চোখে চারদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ কী দেখে যেন চমকে উঠল। সে চোখদুটো বড় বড় করে অবাক বিস্ময়ে সেইদিকে চেয়ে থেকে ডাকল, জয়া! শিগগির একবার এদিকে এসো। খুব তাড়াতাড়ি।
কিন্তু আমার এই জিনিসগুলো?
ওগুলো ওখানে পড়ে থাক। আগে এসো তুমি।
এক মিনিট। এখুনি যাচ্ছি।
সব্যসাচীর ডাক শুনে দ্রুতপায়ে বালিয়াড়ির ওপরে উঠল জয়া। খুব তাড়াতাড়ি কি ওঠা যায় ? বালিতে পা হড়কে ওপরে ওঠার সে কী কষ্ট। সূর্য তখন অস্তাচলে।
লাল রঙের সূর্যটা সমুদ্রের জলের ওপর বসে পড়েছে দিগন্তে তখন সে কী রঙের খেলা তখন।
রংবাহারি মেঘ। রঙিন আকাশ। রঙে রাঙা চারদিক।
সেই সঙ্গে দিগন্ত জুড়ে বিভীষিকা।
কেন না সন্ধে হয়ে আসছে তখন। সমুদ্রের গর্জন দ্বিগুণ হচ্ছে। সেই জনমানবহীন প্রান্তরের নিস্তব্ধ নির্জনতায় ওরা যা দেখল তা রীতিমতো ভয়ের এবং বিস্ময়ের।
কী দেখল ওরা?
ওরা দেখল ঝাউবনে নয়, নদীগর্ভে নয়, নদী আর বালিয়াড়ির মাঝামাঝি একটা অংশে যেখানে অনেক বুনো ঘাস, শন, কাঁটাঝোপ ঠিক সেইখানে, দশ বারো বছরের একটি বালকের দেহ অনড় হয়ে পড়ে আছে। দেখে বেশ ভদ্রঘরের ছেলে বলেই মনে হল।
সব্যসাচী বলল, এ নিশ্চয়ই সে।
জয়া বলল, কে ও?
সকালবেলা সমুদ্রতীর হতে নিখোঁজ হয়েছিল যে ছেলেটি।
কী করে জানলে?
মনে হয়।
সে কী করে এখানে আসবে?
জানি না। শুনেছি সমুদ্র নাকি যাদের টেনে নেয় তাদের মৃতদেহ ফেলে দেয় অনেক দূরে।
তাই বলে এতদূরে?
এই তো নিয়ম। আমার খুব ভয় করছে কিন্তু। চলে এসো এখন থেকে। সে কী! ছেলেটার কাছে গিয়ে একবার দেখবে না? কী দেখব? দেখবার কী আছে? ওটা তো একটা মড়া। আমরা ফিরে গিয়ে ওর মা-বাবার খোঁজ করে খবর তো একটা দিতে পারব। জয়া দারুণ ভয় পেয়ে বলল, আমি যাব না। তুমি যাও। সব্যসাচী এক-পা দু’-পা করে এগিয়ে গেল ছেলেটির কাছে। তারপর উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা ছেলেটিকে চিৎ করে দিতেই, ওর মনে হল ছেলেটা একটা
দীর্ঘশ্বাস ফেলল যেন।
শুধু তাই নয়, একবার একটু চোখ মেলে তাকিয়েই চোখটা বুজে নিল।
জয়া ওপর থেকেই হেঁকে বলল, সব্যসাচী! তোমাকে এখনও বলছি তুমি চলে এসো। না হলে কিন্তু তুমি মরবে।
সব্যসাচী ছেলেটির কাছ থেকে সরে না এসেই বলল, তুমি মিছেই ভয় পাচ্ছ জয়া। ছেলেটা মরেনি।
ভীত সন্ত্রস্ত জয়া বলল, কী করে বুঝলে?
তুমি একবার এসে দেখো।
আমার দারুণ ভয় করছে, আমি যাব না। উঃ কী বিপদেই যে পড়লাম। ভয় পাবার কিছু নেই। এখানে তুমি একা নও। আমি তো আছি। ছেলেটা একটা শ্বাস ফেলল।
সে কী !
চোখ মেলে তাকাল।
মানে!
তার মানে ও বেঁচে আছে।
কেমন যেন কান্নাধরা গলায় জয়া বলল, ও বেঁচে নেই সব্যসাচী। এই রকম অবস্থায় ও যে কী তা কি তোমাকে বলে দিতে হবে?
ওসব কিছু নয়, তুমি কি ভাবছ ও মরে ভূত হয়েছে? পাগলি কোথাকার। এসো, নেমে এসো এখানে। এসে হাত লাগাও।
কী করতে চাও তুমি ওকে নিয়ে?
কিছু না। আমরা দু'জনে মিলে ওকে ধরাধরি করে একটু পরিষ্কার জায়গায় বালির ওপর শোয়াব
তুমি কী ! তোমাকে কি দানোতে ভর করেছে?
সব্যসাচী মনে মনে হেসে ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে ওকে আর ভালও করে পরীক্ষা করতে লাগল। যদি আবার একবার ওর দিকে চোখ মেলে চায় সেই আশায়। ওর বুকের জামা সরিয়ে বুকে হাত দিয়ে দেখল গা ঠান্ডা কি না। মড়াদের গা তো ঠান্ডা হয়। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না ও।
জয়া হেঁকে বলল, সব্যসাচী! এখনও বলছি তুমি চলে এসো।
একটু দাঁড়াও।
তা হলে থাকো তুমি ওকে নিয়ে। আমি পালাই। এই বলেই পিছু
ফিরল সে।
সব্যসাচী ব্যাকুল হয়ে বলল, না না, এরকম কোরো না। আজ সকালে ওর মা-বাবার কান্না শোননি তো? বাবা জগন্নাথের অসীম দয়া যে, ছেলেটা বেঁচে আছে। এসো আমরা দু'জনে মিলে ওকে সুস্থ করি।
কিন্তু কাকে বলা? জয়া তখন বালিয়াড়ির ওপর থেকেই উধাও।
সব্যসাচী চিৎকার করে বলল, জয়া, তুমি যেয়ো না। তুমি চলে গেলে একা একা আমারও এখানে ভয় করবে। তা ছাড়া এইভাবে কাউকে ফেলে রেখে চলে যেতে নেই। তুমি চলে গেলে একা আমি বিপদে পড়ে যাব। মনে রেখো তোমাকে একটা নদী পার হতে হবে।
সব্যসাচীর সে কথার কোনও উত্তরই দিল না জয়া।
সব্যসাচী খুব ভয় পেয়ে গেল তখন।
হাজার হলেও সেও ছেলেমানুষ তো। এই অন্ধকারে সে যে কী করবে তা ভেবে পেল না।
এমন সময় ছেলেটি একবার মা বলে ডেকে উঠল যেন।
ছেলেটি কি সত্যিই জীবিত? না, মরে ভূত হয়ে অমন করছে? কে জানে তা। সে তখন খুব জোরে জোরে চেঁচাতে লাগল, জয়া! জয়া! জয়া ফিরে এসো, জয়া !
এমন সময় ঝাউবনের দিক থেকে দুটো টর্চের আলো এসে গায়ে পড়ল ওর।
কারা যেন হেঁকে বলল, কে? কে ওখানে?
সব্যসাচী ভয়ে ভয়ে বলল, আমি।
আমিটা কে?
আপনারা আমাকে চিনবেন না। আমি সব্যসাচী। একবার আসুন না এখানে। আমার খুব ভয় করছে।
দু’জন লোক দ্রুতপায়ে হেঁটে এসে বলল, কে তুমি! এমন অসময়ে এখানে তুমি কী করছ?
সব্যসাচী বলল, আমি এখানে ছিলাম মোহানা দেখতে। জয়া নামে একটি মেয়েও ছিল আমার সঙ্গে। মেয়েটি হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে আমাকে ফেলে পালিয়ে গেল।
ভয় পেয়ে?
হ্যাঁ, ভয় পেয়ে।
লোক দু’জন পরস্পরের দিকে তাকাল, কেন ভয় পেল কেন? কিছু কি দেখেছ তোমরা?
সব্যসাচী তখন সকালের ঘটনাটা বলল ওদের। তারপর দেখিয়ে দিল ছেলেটাকে। দিয়ে বলল, মনে হয় ও বেঁচে আছে। কিন্তু মেয়েটা ভাবল ও বুঝি মরে ভূত হয়েছে, তাই ভয়ে পালিয়ে গেল।
আর কিছু দেখনি তো? বলে ওরা এগিয়ে গেল ছেলেটির কাছে। গিয়ে কী সব দেখেটেখে বলল, রাখে হরি তো মারে কে? সমুদ্রের গ্রাস থেকে এইভাবে কেউ বাঁচে না। তবে মজার ব্যাপার এই, ছেলেটি প্রাণে বাঁচলেও ওর বড়ি তো এখানে আসবার কথা নয়। আসেও যদি সে-দেহে প্রাণ থাকবে না। মনে হয় দেহটা কেউ বয়ে এনেছে।
সব্যসাচী বলল, সে কী! কে আনবে?
কে আনবে বা আনতে পারে সেটা তদন্তের ব্যাপার। হয়তো ছেলেটি সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে গিয়ে জেলেদের জালে আটকে যায়। তাই জাল ধরে জ্ঞান হারিয়েও প্রাণে বাঁচে। পরে জেলেরা ওকে এইখানে নিরাপদ জায়গায় এনে মড়া মনে করে ফেলে রেখে চলে যায়।
এটা কি ওদের উচিত হল?
কখনই না। হয়তো পুলিশি ঝামেলার ভয়ে ওরা এড়িয়ে গেছে ব্যাপারটাকে। তা ছাড়া এমনও হতে পারে, ছেলেটি আদৌ সমুদ্রে তলায়নি। জলে পড়ার পরই সুকৌশলে ওকে অপহরণ করেছে কেউ।
কী বলছেন আপনারা? অপহরণ!
হ্যা, অপহরণ। ছেলেটির বাবা-মায়ের ওপর হয়তো রাগ ছিল কারও। তাই কিডন্যাপ করে জলে জলেই টেনে আনার পর ছেলেটির অবস্থা খারাপ দেখে এইখানেই ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
সব্যসাচী বলল, উঃ, কী সাংঘাতিক।
ঠিক আছে, তুমি বসো। আমরা দেখছি ওর কী ব্যবস্থা করতে পারি। এই বলে ওরা দু'জনে নানারকম কসরত করল ছেলেটিকে নিয়ে। ওর পেট থেকে জল বার করে ওকে সুস্থ করবার চেষ্টা করতে লাগল।
আর সব্যসাচী? সে উঁচু একটা বালিয়াড়ির ওপর বসে কত কী ভাবতে লাগল। বেশি করে ভাবতে লাগল কথা। মড়া দেখে ভূতের পেয়ে যে মেয়ে পালাতে পারে, সে এই আবিল অন্ধকারে একা এই দীর্ঘপথ কী করে যাবে, তা সে ভেবে পেল না। তবু দুঃখ এই, মেয়েটা কী স্বার্থপর। সঙ্গীকে এইভাবে একা রেখে কেউ পালায়? ওর কি হৃদয় বলেও কিছু নেই? নাকি ওর প্রকৃতিই এইরকম? আর এই লোক দু'জন? এরাও তো রহস্যময়। এই নির্জনে অন্ধকারে কী করছিল এরা? এমন পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছে যে বোঝাই যাচ্ছে এরা বাঙালি। তা হলে? ওই অন্ধকার ঝাউবনে এই অসময়ে কেউ থাকে? তাও এই গভীর নির্জনে?
বেশ কিছুক্ষণ পরে ওরা ডাকল, এই যে খোকা! কী যেন নাম বললে তোমার? সব্যসাচী না কী! এদিকে এসো।
সব্যসাচী ওদের কাছে যেতেই বলল, যা ভেবেছি তাই। ছেলেটি সমুদ্রগ্রাসে পড়েনি। ওকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। ওর গলায় ঘাড়ে চারদিকে মানুষের নখের দাগ। ওর গলা টিপে মেরে ফেলবার চেষ্টা করেছিল কেউ। কিন্তু পারেনি। সব্যসাচী শিউরে উঠল, তা হলে?
তা হলে আর কী, এ যাত্রায় বেঁচে গেল ছেলেটি। কিন্তু মুশকিল হল। এই দীর্ঘ পথ ওকে তুমি নিয়ে যাবে কী করে?
ওর জ্ঞান ফিরেছে?
হ্যাঁ। কিন্তু পথ হাঁটার ক্ষমতা ওর নেই।
একটা কিছু উপায় আপনারা বার করুন।
কী তাই তো ভাবছিরে ভাই। ওকে আর তোমাকে নিয়েই যে এখন সমস্যা। করা যায়।
আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আমি ঠিক যেতে পারব। কিন্তু আপনারা কি পারবেন দূরের ওই পাখাগুলোর কাছ পর্যন্ত আমাদের একটু পৌঁছে দিতে?
অসম্ভব। আমরা এখুনি চলে যাব। ওই দেখো আমাদের ডিঙি বাঁধা। সাগরে
এখন জোয়ার এসেছে। তাই উজান বেয়ে চলে যাব এখুনি। আমরা!
কিছু তো করার নেই আমাদের। চলেই যাচ্ছিলাম, এমন সময় তোমরা এলে। আমরা দূর থেকে অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ করছিলাম তোমাদের। সন্ধের জন্যও অপেক্ষা করছিলাম। মেয়েটা তোমাকে ফেলে রেখে কীভাবে চলে গেল তাও দেখলাম। এখন বিদায় নিতে হবে আমাদের।
সব্যসাচী বলল, আমি তা হলে একা থাকব?
তোমরা তো দু’জন। এই দেখো উঠে বসেছে ছেলেটা। সব্যসাচী বলল, বেশ। ও একটু সুস্থ না-হওয়া পর্যন্ত বসেই থাকি তা হলে। বেশিক্ষণ বসতে হবে না। লোকজন এখুনি এসে যাবে। সব্যসাচী সবিস্ময়ে বলল, কোথা থেকে আসবে লোকজন?
ওরা হেসে বলল, দেখই না কোথা থেকে আসে। তোমার সঙ্গী সেই মেয়েটি নিশ্চয়ই কিছুদুরে গিয়ে চেঁচামেচি করে তোমার এবং এই ছেলেটির কথা বলবে সকলকে। আর তখনই লোকজন ছুটে আসবে হই হই করে।
সব্যসাচী হতাশার সুরে বলল, তা হলে তো ভালই হয়। কিন্তু ও মেয়ে কি আমাদের কথা বলবে কাউকে? হয়তো চেপেই যাবে ব্যাপারটা।
ওরা হাসল, তা কেন? ওই—ওই আসছে। ওই দেখো দূরে, বহু দূরে
বহুলোক। কতকগুলো টর্চ একসঙ্গে নিভছে জ্বলছে।
সব্যসাচী সেইদিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ, তাই তো।
ওরা বলল, তা হলে চলি আমরা? বিদায় বন্ধু বিদায়।
কিন্তু আপনাদের পরিচয়? এই বিপদে এইভাবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন আপনারা, অথচ আপনাদের পরিচয় তো জানা হল না।
ওরা হো হো করে হেসে বলল, পরিচয় জানবার দরকার নেই আমাদের। আমরা খুব খারাপ লোক। আমাদের কথা কিন্তু কাউকে বোলো না। বেশ বলব না।
লোক দু’জন ডিঙি নিয়ে জোয়ারের স্রোতে ভেসে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। আর সব্যসাচী দেখল একদল লোক টর্চের আলো ফেলে ক্রমশ ওদের দিকে এগিয়ে আসছে।
ওদের সঙ্গে জয়াও আছে নিশ্চয়ই।
হঠাৎ জয়ার কণ্ঠস্বর শোনা গেল। দূর থেকেই চেঁচিয়ে ডাকছে সে, স—ব্য সা—চী—ই—।
সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে সেই স্বর কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে যেন।
সব্যসাচীও মুখের দু'পাশে হাত রেখে ওর ডাকে সাড়া দিল, আমি এ— খা— নে—এ।
কোথায় তুমি–ই–ই।
এই তো এ—খা—নে—।
সব্যসাচী ছেলেটিকে বলল, তুমি কি আমার সঙ্গে একটু আসতে পারবে ভাই? কতদূরে?
সামান্য একটু পথ। ওই যে ওরা যেখান থেকে ডাকছে আমাদের।
তুমি আমাকে ধরে থাকলে পারব।
সত্যসত্যই ছেলেটির তখন উঠে দাঁড়ানোরও ক্ষমতা
নেই। তবু সব্যসাচী ওকে হাত ধরে টেনে তুলল। কিন্তু দু’-এক পা গিয়েই ধপাস।
সব্যসাচী বলল, এক কাজ করো ভাই, আমার গলাটা আঁকড়ে ধরো তুমি। আমি তোমাকে এইটুক পথ পিঠে করেই বয়ে নিয়ে যাই।
ছেলেটি বলল, তোমার কষ্ট হবে না?
হলেই বা করবটা কী? তোমাকে তো এইভাবে এখানে ফেলে রেখে আমি চলে যাব না। গেলে অনেক আগেই যেতে পারতাম।
সব্যসাচী ছেলেটিকে বহু কষ্টে তুলে দাঁড় করাল। তারপর ওর হাত দুটি কাঁধের দু'পাশ দিয়ে টেনে ধরে বয়ে নিয়ে চলল ওকে। কিন্তু সামান্য পথ এসেই হাঁফিয়ে পড়ল। এসব কী ওর মতো ছেলের কাজ? কত শক্তি রাখতে হয় দেহে। ছেলেটি বলল, এভাবে তুমি আমাকে নিয়ে যেতে পারবে না ভাই। তোমার কষ্ট হবে।
তা হলে তুমি যাবে কী করে? এইখানে এইভাবে তো সারারাত থাকা যাবে না। তা ছাড়া আমারও মা-বাবা চিন্তা করবেন।
সারারাত হয়তো থাকব না। কেন না সমুদ্রের হাওয়ায় এখন আমি একটু যেন সুস্থ বোধ করছি।
তা হলে এক-পা দু’-পা করে এগিয়ে এসো।
ছেলেটি সব্যসাচীর কাঁধে ভর করে, হাত ধরে কাঁপা কাঁপা পায়ে এগোতে লাগল।
কী জোরে হাওয়া বইছে তখন।
গভীর সমুদ্র অন্ধকার।
অথচ আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র মহানীলে চুমকির মতো চিকমিক করছে। প্রকৃতির এ এক অনবদ্য রূপ।
দূর থেকে স্বর্গদ্বারের আলোর রোশনাই দেখে ওদের মনে হল ওখানে যেন আজ উৎসবের রাত।
সব্যসাচী যেতে যেতেই বলল, আর একটু কষ্ট করে এসো। ওই দেখো, কারা সব আসছে।
অনেকগুলো টর্চের আলো তখন এসে পড়েছে ওদের গায়ে। জয়ার সঙ্গে প্রায় দশ বারোজন লোক।
জয়া তো ছুটে এসেই জড়িয়ে ধরল সব্যসাচীকে।
সব্যসাচীর চোখমুখ লাল হয়ে উঠল। এত লোকের সামনে এ কী! মেয়েটা কি হাফ পাগলি, না ফুল ম্যাড?
সব্যসাচী ওর হাত ছাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, ছাড়ো ছাড়ো। কী হচ্ছে। লোকে কী বলবে?
জয়া বলল, সব্যসাচী! তুমি আমাকে ভুল বোঝনি তো?
না। তবে তোমার ব্যবহারে দুঃখ পেয়েছি। আমাকে ওই ভাবে একা ফেলে পালিয়ে গেলে কেন?
তার আগে বলো তুমি কি আমার কথা শুনেছিলে?
আমি ছেলেটার মধ্যে প্রাণের স্পন্দন দেখেছিলাম।
আমি দেখেছিলাম ভূত। আসলে ভূতকে আমার দারুণ ভয়। আমি মড়া বয়ে নিয়ে যাওয়াও দেখতে পারি না।
সে কী!
তাই তুমি যেই বললে, ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, চোখ মেলে তাকাল, তখন আমার কী ভয় যে হল, তা তোমাকে কী বলব। তোমাকে আমি বার বার বললাম পালিয়ে আসতে, কিন্তু তুমি এলে না।
তোমার ডাকে চলে গেলে পালাতে হয়তো পারতাম! কিন্তু ছেলেটাকে তো বাঁচাতে পারতাম না।
অন্যান্য লোকজন যারা এসেছিল, মানে জয়া ডেকে এনেছিল যাদের, তারা বলল, এই বুঝি সেই ছেলেটি?
হ্যাঁ। এই সেই।
আমার নাম পার্থ।
তুমি এখানে এলে কী করে?
জানি না। সমুদ্রে পড়ে গিয়ে হঠাৎ ভেসে গেলাম। তারপর হল, কিছুই আমার মনে নেই।
একটু কিছু মনে পড়ছে না?
না। চোখ মেলেই আমি আমার এই বন্ধুটিকে দেখলাম।
তুমি কি আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে?
কীভাবে যে কী
না। আপনারা আমাকে একটা গাড়ি করে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করুন। আমার যে কী হচ্ছে তা আপনাদের বলে বোঝাতে পারব না। আমাকে আমার মা-বাবার কাছে নিয়ে চলুন।
সবাই তখন অসুস্থ ছেলেটিকে বয়ে নিয়েই চলল লোকালয়ের দিকে। বেশিদূর অবশ্য যেতে হবে না।
খানিক যাবার পর পাকা রাস্তায় উঠলে কিছু-না-কিছু মিলবেই। সবার পেছনে পরস্পরের হাত ধরে চলল জয়া ও সব্যসাচী। জয়া বলল, আজ যা বাড়িতে হবে না।
সব্যসাচী বলল, আমারও।
এতক্ষণে ওরা নিশ্চয়ই আমাদের খোঁজে চারদিক তোলপাড় করছে। পুলিশে খবর দিয়েছে।
মনে হয় তাই। আমার বাবা-মা, আর তোমার মামা-মামি সবাই একজোট হয়ে হয়তো ঘরবার করছেন।
একজন ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী ভাই?
এই ভাবে কথা বলতে বলতে ওরা বেশ খানিকটা এগিয়ে যাবার পর, এখানকার ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের একটি গাড়ি দেখতে পেল। ওদের সহযোগী মানুষজন যারা ছিল তারা সবাই গিয়ে ওদের বিপদের কথাটা খুলে বলল গাড়ির ড্রাইভারকে।
এক কথায় কাজ।
ড্রাইভার সব্যসাচীকে, জয়াকে, পার্থকে এবং সেই সঙ্গে আরও দু’জনকে তুলে নিলেন গাড়িতে। তারপর বললেন, যাবার আগে থানায় একটা ফোন করে যাই। তা হলে স্বর্গদ্বারে পৌঁছলেই ছেলেটির বাবা-মায়ের সন্ধান পেয়ে যাব। এই বলে ড্রাইভার ফোন করে এসে গাড়িতে স্টার্ট দিলেন।
সঙ্গে আরও যেসব লোকজন ছিল তারা হাত নেড়ে বিদায় জানাল সবাইকে।
ফাঁকা রাস্তা ধরে কিছু সময়ের মধ্যেই ওরা এসে পৌঁছল স্বর্গদ্বারে। শুধু পুলিশ নয়, পার্থর বাবা-মা, জয়ার মামা, সব্যসাচীর মা-বাবা সবাই হাজির সেখানে।
সরমা তো হারানিধি ফিরে পাওয়ার মতো বুকে জড়িয়ে ধরলেন সব্যসাচীকে। স্নেহাংশুবাবু বললেন, কী চিন্তা যে হয়েছিল আমার। তবে তোমরা যে একটি ছেলের জীবন রক্ষা করতে পেরেছ তাতে তিরস্কার নয়, তোমাদের দু'জনকেই পুরস্কার দেব আমি। কী চাই বলো।
জয়ার মামা বললেন, আমার তরফ থেকেও একটা পুরস্কার ঘোষণা করলাম আমি।
পার্থর বাবা-মা বললেন, না না। ওদের দু'জনকে তো আমরাই পুরস্কার দেব। এই ছেলেকে যে ফিরে পাব তা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। বাবা জগন্নাথ আমাদের ডাক শুনেছেন।
কিন্তু কীভাবে কী হল?
সব্যসাচী দুপুর থেকে সন্ধে পর্যন্ত আগাগোড়া সমস্ত ঘটনার কথাই বলল সকলকে।
পুলিশও সব শুনল।
সব্যসাচী কিন্তু ভুলেও সেই দু'জনের কথা বলল না কাউকে। পুলিশ যখন পার্থর মা-বাবা ও পার্থকে নিয়ে ব্যস্ত, ওরা তখন যে যার ঘরে ফিরে এল।
সবার মনেই আনন্দ। বিশেষ করে এই সময়টুকুর মধ্যে জয়ার মামা ও স্নেহাংশুবাবুর রীতিমতো বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠায় সব্যসাচী খুশি হল খুব। কেন না এরপর থেকে ওদের মেলামেশায় বা ঘুরে বেড়ানোর ব্যাপারে মনে হয় কোনও বাধা-বিপত্তি আর আসবে না।
সে রাত্রে বাবা-মায়ের কোলের কাছে শুয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোলেও ভোরবেলা সাগর যাত্রীদের কলরবে ঘুমটা ভেঙে গেল। সব্যসাচী ধীরে ধীরে শয্যা ত্যাগ করে বাইরে বারান্দায় আসতেই দেখল কত লোক চলেছে দলে দলে।
বারান্দায় আলো জ্বলছে।
ওদের পাশের ঘরেই সেই চাপদাড়ি যুবক, তাঁর ভাইঝিকে নিয়ে সূর্যোদয় দেখতে যাবেন বলে বেরোচ্ছেন। সব্যসাচীকে এইভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, আরে! কী ব্যাপার! গুড বয় যে! এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ? যাবে তো চলো।
সব্যসাচী বলল, বাবা-মা দু'জনেই ঘুমোচ্ছেন।
তুমি তো ঘুমিয়ে নেই।
সব্যসাচী যুবকের মুখের দিকে তাকিয়ে এক মিনিট। বলেই ঘরে গিয়ে সোয়েটারটা গায়ে দিয়ে, গলায় মাফলার জড়িয়ে মাকে ডাকল, মা।
সরমা বিস্মিত হয়ে বললেন, কী হল?
আমি সমুদ্রে যাচ্ছি।
না। সাহস তো কম নয়! আমাদের সঙ্গে ছাড়া কোখাও যাবে না তুমি। আমি একা একা যাচ্ছি না। পাশের ঘরের দাদাও যাচ্ছেন, ওনার সঙ্গেই যাচ্ছি। , যাচ্ছ যাও। বেশি দেরি করবে
স্নেহাংশুবাবু পাশ ফিরে শুতে গিয়ে বললেন না কিন্তু। আর জলে নামবে না একদম।
সব্যসাচী জুতোটা পায়ে দিয়েই বেরিয়ে এল।
সরমাও এলেন।
যুবক হাসিমুখে বললেন, ভয় নেই। আপনার ছেলে আমার সঙ্গেই যাচ্ছে। ভাইঝি আছে সঙ্গে। রোদ উঠলেই ফিরে আসব আমরা।
সরমা বললেন, আসলে দস্যি ছেলে তো। তাই কোথাও যেতে চাইলে ভয় করে। তবে আপনি যখন আছেন...।
আমার ভাইঝি লিপিও আছে।
পিঠের ওপর লম্বা বেণী দোলানো কিশোরী লিপি মিষ্টি করে হাসল সরমার দিকে চেয়ে।
সরমাও হেসে বললেন, সাবধানে যেয়ো।
ওরা তিনজনে নীচে নেমে এল।
একদল গোরু তখন টুং টাং করে গলার ঘণ্টি নেড়ে চরতে যাচ্ছে। গোরুগুলো চলে গেলে ওরা ধীর পায়ে এগোতে লাগল।
ওরা স্বর্গদ্বারের পথ না ধরে হলিডে হোমের সামনের পথ ধরেই চলল। একেবারে নবনির্মিত রাজপথের ওপর এসে দাঁড়াল তিনজনে।
ডানদিকের পথটা চলে গেছে সেই পাখাগুলো ছাড়িয়ে মোহানার দিকে। বাঁদিকের পথ স্বর্গদ্বারে। সামনে সমুদ্র।
এতক্ষণ তিনজনেই চুপচাপ ছিল। এবার তিনজনেই সরব হল। যুবক বললেন, তুমি তো সাংঘাতিক ছেলে হে?
সব্যসাচী বলল, কেন?
আবার জিজ্ঞেস করছ কেন? কী কীর্তিটা করলে বাবা কাল? কী করেছি? কিছুই না।
কাল সকালে তোমার সঙ্গে কথাই বলেই বুঝেছি তুমি সাধারণ ছেলে নও। তা হলে কি অসাধারণ ?
লিপি বলল, শুধু তাই নয়, অসামান্য। তুমি তো এখন হিরো। সব্যসাচী হেসে লিপির দিকে তাকিয়ে বলল, বলো কী!
ছিপছিপে পাতলা চেহারার শ্যামাঙ্গী কিশোরী বলল, কাল সারাটা দুপুর আর বিকেল আমরা তোমাদের কথাই আলোচনা করছিলাম। তোমার সঙ্গে ওই যে মেয়েটি ছিল, কী যেন নাম?
জয়া।
ভারী মিষ্টি মেয়েটি।
তোমার সঙ্গে আলাপ আছে?
না। দেখেছি এইমাত্র।
আজই আলাপ করিয়ে দেব।
কথা বলতে বলতেই ওরা স্বর্গদ্বারের দিকে এগোতে থাকল। স্বর্গদ্বার এই সময়ে বেশ জমজমাটি হয়। অবশ্য এই সময় বললে ভুল হবে। সর্বক্ষণ। আসলে ওই জায়গাটার আকর্ষণই আলাদা।
খানিক গিয়ে এক জায়গায় থমকে দাঁড়াল ওরা।
চায় কফি বাবু।
ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। সামনের বেঞ্চিতে এক নববিবাহিত তরুণ-তরুণী বসে আছে।
চা-ওয়ালা ওদের দেখতে পেয়েই বলল, চায় কফি—।
যুবক বললেন, চা না কফি, কোনটা?
লিপি বলল, আমরা কী বলব?
যা হোক বলো।
সব্যসাচী বলল, কফি।
যুবক বললেন, ঠিক বলেছ। কফির গন্ধ ছাড়া সি-বিচে বসে এইসব দোকানের চা খেলেই বমি উঠে আসবে।
লিপি নাক সিঁটকে বলল, ছোটকা !
যুবক হেসে আর একটি বেঞ্চি টেনে নিয়ে লিপি ও সব্যসাচীকে দু'পাশে বসিয়ে নিজে মাঝখানে বসলেন।
চা-ওয়ালা কফি করতে লাগল।
আকাশ তখনও অনন্ত নক্ষত্রে ভরা।
সমুদ্রের নীল জল অবিরাম ঢেউ নিয়ে তোলপাড় করছে। মাঝে মাঝে এক ঝাঁক মানুষ, কখনও বা দু’-একজন, লঘু পায়ে চলে যাচ্ছে সামনে দিয়ে।
যুবক দূরের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একসময় বললেন, সব্যসাচী, কাল তুমি যা করেছ তার তুলনা হয় না। তবে একটা কথা, তুমি কী এর মধ্যে অন্য কিছুর গন্ধ পাওনি?
সব্যসাচী বলল, রহস্যের গন্ধ পেয়েছি।
কীরকম একটু শুনতে পারি কি?
এই যেমন ধরুন, ছেলেটিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে দুষ্কৃতীদের কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে তা ভেবে পাচ্ছি না।
আর কিছু?
অত লোকের চোখের সামনে ওরা কীভাবে কিডন্যাপ করল ছেলেটাকে? জলে জলে অতদূর নিয়ে যাওয়াও বড় সহজ কথা নয়, আর বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে নিয়ে গেলেও লক্ষ জনতার ভিড়ে ধরা পড়বার ভয় ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, ছেলেটিকে অপহরণ করেও তাকে ওরা ওইভাবে ফেলে রেখে গেল কেন? ওকে ওরা গলা টিপে মারতে গিয়েছিল। কিন্তু সে কাজেও ওরা সফল হয়নি।
তুমি ঠিক জান?
আমি স্বচক্ষে দেখেছি ওর গলার পাশে কালসিটে আর নখের দাগ।
এমনও তো হতে পারে, মারতে গিয়ে মমতার বশে হয়তো না-মেরে ছেলেটাকে মৃত ভেবেই ফেলে রেখে চলে গেছে ওরা।
অসম্ভব। খুন যারা করে আর অপহরণ যাদের পেশা, ওইসব মায়ামমতার ব্যাপার স্যাপারগুলো তাদের ভেতরে থাকেই না। অন্ধকারেই রইল?
ব্যাপারটা তা হলে রহস্যের হয়তো। তবে রহস্য এখানে একটা নয়। আরও আছে।
কীরকম?
যেমন ধরুন...।
সাসপেন্সে রেখ না, বলে ফেলো।
স বা সাচীর গো য়ে দাগিরি
চা-ওয়ালা কফি নিয়ে এল, আপনাদের কফি।
ওরা তিনজনেই কফি নিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কফি খেতে লাগল। খেতে খেতেই সব্যসাচী বলল, আমার মনে হয় ওই জায়গায়, ওই নির্জনতার আড়ালে অপরাধ জগতের কালোছায়াও কিছুটা প্রভাব বিস্তার করেছে।
তার মানে নিশ্চয়ই তুমি আরও এমন কিছু দেখেছ বা অনুভব করেছ যাতেই তোমার এইরকম ধারণা হয়েছে।
ঠিক তাই। অবশ্য এই ব্যাপারে আমি এখনও কিছু স্পষ্ট করে বলতে পারব না, তবে ওই জায়গাটায় পুলিশের একটু নজর রাখা উচিত।
যুবক বললেন, কাল সি-বিচ থেকে ছেলেটি উধাও হবার পর, ওর মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে আমি জেনেছি, ওদের কোনও শত্রু ছিল না। ফলে আমিও এটাকে দুর্ঘটনা বলেই মনে করেছিলাম। কিন্তু তুমি যা বলেছ, তাতে তো মনে হচ্ছে এটা একটা সংগঠিত দলের কাজ।
সব্যসাচী বলল, দলের কাজ তো বটেই। না হলে এইরকম দুঃসাহসিক অপহরণ কী করে সম্ভব।
অপহরণে পরের ব্যাপারটাই তো রহস্যময়।
আমার মনে হয় রং টার্গেট !
লিপি এতক্ষণে কথা বলল, রং টার্গেট?
হ্যাঁ, যে কারণে মারতে গিয়েও ওরা মারেনি ছেলেটাকে। যখনই বুঝতে পেরেছে শিকার গ্রহণে গলদ রয়ে গেছে। তখনই ওরা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু ওরা কারা? আর ওদের শিকারই বা কে ছিল? সেটা না জানতে পারলে...।
যুবক বললেন, তোমার ভেতরে দেখছি ঝানু গোয়েন্দার বীজ রয়েছে। লিপি হেসে বলল, তুমি তা হলে এই ব্যাপারে একটু গোয়েন্দাগিরি করবে নাকি?
সব্যসাচী হেসে বলল, থাকব ক’দিন তাই জানি না।
যুবক কফি খাওয়া শেষ করে বললেন, একটু
আমাকে ওই জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে?
সব্যসাচী বলল, ওরে বাবা। সে অনেকদূরের পথ।
ভয় নেই। হাঁটতে হবে না। একটা অটো করব।
তা হলে আমি রাজি।
বেলায় রোদ উঠলে তুমি
শুধু তুমি আর আমি যাব। কেমন?
লিপি বলল, ওই দেখো ছোটকা, আকাশটা কেমন লাল হচ্ছে। যুবক বললেন, চলো, স্বর্গদ্বারে যাওয়া যাক। বলে কফির দাম মিটিয়ে এগিয়ে চললেন দু'জনের মাঝখানে।
ওরা ভোরের অস্পষ্টতায় পথ হাঁটতে লাগল।
সব্যসাচী যেতে যেতেই বলল, যদি কিছু মনে না করেন তো বলি, আপনার সঙ্গে এমন পরিচয় হল, অথচ আপনার নামটাই জানা হল না। এরপরে আবার দেখা হলে কী বলে ডাকব আপনাকে?
যুবক হেসে বললেন, ঠিক। নামটা তো জানা দরকার। আমার নাম হচ্ছে বি রায়। অর্থাৎ বিজয় রায়। সবাই আমাকে বিজুদা বলে ডাকে। তুমিও তাই ডাকবে।
সব্যসাচী বলল, আচ্ছা বিজুদা, আপনি যে অত খাতাপত্তর দেখছিলেন, ওগুলো কীসের খাতা?
ওসব আমার ক্লায়েন্টদের হিসেবনিকেশের খাতা।
আপনি কি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট?
বিজুদা হেসে বললেন, ঠিক ধরেছ। বলে একটা সিগারেট বার করে ধরাবার চেষ্টা করতে লাগলেন।
প্রচণ্ড সামুদ্রিক হাওয়ায় দেশলাইয়ের কাঠি কিছুতেই যখন জ্বলল না। তখন হঠাৎ কোথা থেকে একটা লাইটারসুদ্ধু হাত এগিয়ে এল তাঁর মুখের দিকে।
বিশাল শরীর এক বীভৎস চেহারা লোক, বয়সে বিজুদারই মতন, সেই
লাইটার বিজুদার মুখের কাছে ধরে এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। বিজুদা সিগারেট ধরিয়ে কঠিন চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী ব্যাপাররে! তুই এখানে?
শুনলাম তুই পুরী বেড়াতে এসেছিস। তাই বেনারসে গিয়ে কী করব বল? তার মানে আমার খোঁজেই এসেছিস?
তাই তো মনে হয়।
কোনও লাভ হবে না কিন্তু।
লাভ লোকসানের হিসেব পরে হবে। এখনও সময় আছে, ওটা ভালয় ভালয় ফিরিয়ে দে।
তোর কি ধারণা ওটাকে আমি সঙ্গে করে এনেছি?
শুধু তাই নয়, হয়তো এখনও তোর কাছেই আছে!
বিজুদা হাসলেন। বললেন, বুদ্ধু কোথাকার। রাস্তা ছাড়।
এটা কিন্তু আমার কথার জবাব হল না।
বিজুদা সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়াটা লোকটার মুখের ওপর ছেড়ে বললেন, এই তোর জবাব।
বলার সঙ্গে সঙ্গেই লোকটা বিজুদার চোয়াল লক্ষ্য করে মারল এক ঘুসি। কিন্তু বিজুদা তৈরিই ছিলেন। তাই ঘুসিটা চোয়ালের কাছ পর্যন্ত আসবার আগেই শক্ত মুঠিতে ধরে ফেললেন কবজিটাকে। তারপর সজোরে একটা মোচড় দিয়ে বললেন, ক্রাইম করতে গেলে হাতটাকে একটু ভাল করে তৈরি করতে হয়। এমন মেয়েলি হাতে কী করে কী করবি?
ঠিক সেই সময় আশপাশ থেকে আরও কয়েকজন এসে
কোথা থেকে একটি মারুতি গাড়িও এসে হাজির হল সেখানে
ঘিরে ফেলল ওদের। ।
একজন চোখের পলকে লিপিকে উঠিয়ে নিল সেই গাড়িতে। আর একজন বলল, এবার দিবি নিশ্চয়ই?
বিজুদা বললেন, যদি ভাল চাস তো মেয়েটাকে নামিয়ে দে।
ওরা হেসে বলল, গিভ অ্যান্ড টেক।
ওদিকে লিপি ভয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠতেই ওরা শক্ত করে ওর মুখ চেপে ধরল।
একজন বলল, টু শব্দটি কোরো না। তা হলে এই ননীর শরীর খাস্তার গজা
হয়ে যাবে। যেমন আছ তেমনি থাকো।
সব্যসাচী সেই মুহূর্তে জনারণ্যে ছুটে গিয়ে প্রচণ্ড হাঁকডাক শুরু করেছে, কে কোথায় আছেন, শিগগির আসুন। ডাকাত ডাকাত।
হই হই করে অনেক লোক ছুটে এসেছে তখন। কিন্তু এলে কী হবে? ততক্ষণে
যা হবার তা হয়ে গেছে।
অর্থাৎ লিপিকে নিয়ে মারুতি হাওয়া।
আর দু'হাতে পেট চেপে বসে পড়েছেন বিজুদা।
সব্যসাচী ছুটে গিয়ে বিজুদাকে ধরল, কী হল বিজুদা! কী হল আপনার? ছুরিটুরি মেরেছে নাকি ওরা?
বিজুদা কী একটা জিনিস চকিতে সব্যসাচীর হাতে দিয়ে বললেন, এটাকে সাবধানে রাখিস। কাউকে কিছু বলিস না। এখানে না থেকে ঘরে যা তুই। না হলে তোর বাবা-মা চিন্তা করবেন।
কিন্তু আপনার কী হল?
তেমন কিছু না।
আরও অনেক লোক যারা এসেছিল, সবাই মিলে ধরাধরি করে তুলল বিজুদাকে।
দুষ্কৃতীদের একজন বিজুদার তলপেটে বুট দিয়ে এমন একটা লাথি মেরেছে
যে মারাত্মক লেগেছে সেটা। তারই যন্ত্রণায় ছটফট করছেন বিজুদা।
জনতার ভেতর থেকে কেউ কেউ বলল, আপনাকে কী আমরা বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিয়ে আসব দাদা?
বিজুদা বললেন, আমি নিজেই যেতে পারব। তারপর সব্যসাচীর দিকে.তাকিয়ে বললেন, লিপিকে ওরা কোনদিকে নিয়ে গেল রে? মোহানার দিকে।
একটা সাইকেল রিকশা আসছিল। সেটাকে দাঁড় করিয়ে বিজুদা সব্যসাচীকে ধরে অতিকষ্টে উঠে বসলেন তাইতে। তারপর সকলের কাছে বিদেয় নিয়ে এগিয়ে যেতে বললেন রিকশাটাকে।
আকাশ তখন ফর্সা হয়েছে।
সমুদ্রস্নান সেরে রক্তিম সূর্য একটু একটু করে উদয় হচ্ছে। হাজারও জনতার জোড়া জোড়া চোখের দৃষ্টি তখন সেই উদয় মুহূর্তের দিকে। আকাশ জুড়ে তখন রঙের খেলা।
হঠাৎ ও কী!
একটা অ্যামবাস্যাডার যেন দ্রুত ছুটে আসছে ওদের দিকে। হ্যাঁ তাই তো। গতিবেগ দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় মতলব ভাল নয় ওটার।
রিকশাওয়ালাও ভয় পেয়ে গেল তাই দেখে।
বিজুদা চেঁচিয়ে বললেন, সব্যসাচী লাফিয়ে পড়।
শুধু বলার অপেক্ষা। সব্যসাচী চলন্ত রিকশা থেকেই লাফিয়ে পড়ল বালির ওপর।
বিজুদা নামতে পারলেন না।
মোটর এসে রিকশার একদিকের চাকায় ধাক্কা দিতেই পথের ধারে ছিটকে পড়ল রিকশাটা। বিজুদাও কয়েক হাত দূরে গিয়ে পড়লেন।
বিজুদার মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে। প্রচণ্ড আঘাতে বিজুদা প্রাণহীন কি সংজ্ঞাহীন তা বোঝা যাচ্ছে না।
মোটর থেকে নেমে দু’জন লোক গিয়ে সার্চ করতে লাগল বিজুদাকে।
পথচারী যারা ছিল তারা সবাই তখন ছুটে এল বিজুদাকে সাহায্য করতে। দুষ্কৃতীরা বীরবিক্রমে জনতার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েই রিভলভার তাগ করল। ব্যস। ওতেই যথেষ্ট। একেবারে ভিড় ফাঁকা। সবাই পেছু হটল ভয়ে।
জনতা পেছু হটলে দুষ্কৃতীরা গাড়ি নিয়ে চলে গেল পুরী হোটেলের দিকে। আর সব্যসাচী কী করবে কিছুই ভেবে পেল না। রিকশা থেকে লাফিয়ে পড়ায় ওকেও লেগেছে খুব।
ও দেখল কয়েকজন লোক পাঁজাকোলা করে তুলে নিল বিজুদাকে। তারপর বাবুনি পার্কের বেঞ্চিতে নিয়ে গিয়ে শোয়াল। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মনে আনন্দ দেবার জন্য এই বাবুনি পার্কটা সম্প্রতি গড়ে উঠেছে এখানে। একেবারে স্বর্গদ্বারের গায়ে সুন্দর পরিবেশে।
কয়েকজন লোক পাশের একটি লজ থেকে অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করল।
পুলিশও এল একটু পরে।
পুলিশের একজন ইনস্পেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, এনার সঙ্গে কেউ ছিল না? সব্যসাচী বলল, আমি ছিলাম।
ইনস্পেক্টর বললেন, গাড়িটার নম্বর মনে আছে?
হ্যাঁ। এ বি সি ডি এক দুই তিন চার...। এইরকম আবার নম্বর হয় নাকি? এইসব গাড়ির নাম্বার প্লেট থাকে? বুঝেছি। কোথায় উঠেছ তোমরা? কৃষ্ণানন্দ ধাম, হলিডে হোমে।
উনি তোমার কে হন?
কেউ না। বেড়াতে এসে এখানেই পরিচয়। ভদ্রলোকের নাম বি রায়। ওনার ভাইঝিকে দুষ্কৃতীরা নিয়ে গেছে।
ততক্ষণে অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে।
পুলিশের সাহায্য নিয়ে সবাই মিলে ধরাধরি করে স্ট্রেচারে শুইয়ে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দিল বিজুদাকে।
সব্যসাচী ফিরে এল হলিডে হোমে।
এই দুঃসংবাদটা যে কী করে দেবে লিপির বাবা-মাকে তা সে ভেবে পেল না। ওদের সঙ্গে তো ভাল করে পরিচয়ই হয়নি। ওরা কতজন এসেছেন তাও জানে না। শুধু পাশের ঘরে আছেন এইটুকুই জানা আছে।
চারদিক রোদে ঝলমল করছে। এখন সাগর ফেরা যাত্রীদের ঘরে ফেরার, বাজার করার পালা।
স্বর্গদ্বারের ওই ঘটনাটা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে তখন।
মা-বাবা দু’জনেই অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দায়। আরও কারা যেন আছে।
সব্যসাচী কারওদিকে না তাকিয়ে দোতলায় উঠে সোজা ঘরে ঢুকে বিছানার ওপর বসে পড়ল।
সরমা বললেন, কী হল! তুই একা এলি যে?
স্নেহাংশুবাবু বললেন, কী সব যেন গোলমাল শুনলাম। তুই কিছু শুনেছিস? তোমরা কী শুনেছ তা জানি না। তবে খুব একটা খারাপ ব্যাপার ঘটে গেছে। কীরকম।
সব্যসাচী সব কথা খুলে বলল বাবা-মাকে।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, সে কী! তোর কোনও চোটটোট লাগেনি তো? সব্যসাচী বলল, না। তবে অল্পবিস্তর ব্যথা পেয়েছি। সরমা বললেন, আর এক মুহূর্ত এখানে নয়, আজই আমি চলে যাব এখান থেকে।
স্নেহাংশুবাবু বললেন, আর থাকলে আরও বিপদ হবে। তবে এই খবরটা তো এখনি পৌঁছে দিতে হবে ওদের। পাশাপাশি ঘর যখন, ওদের সঙ্গে থেকে খোঁজখবরও নিতে হবে একটু।
আমি কিন্তু আজই যাব।
যাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। প্রাথমিক ব্যবস্থাটা তো করি আগে।
স্নেহাংশুবাবু পাশের ঘরের যাত্রীদের ডেকে সব বলতেই সেখানে কান্নার রোল উঠল। বিজুদার দাদা-বউদি মেয়ের শোকে দারুণ বিচলিত হয়ে পড়লেন। চরম এক বিপদের আশঙ্কায় কী যে করবেন কিছু ঠিক করতে পারলেন না।
বিজুদার বৃদ্ধা মা ডাক ছেড়ে কাঁদতে লাগলেন।
কেয়ার টেকার সাধনবাবু ছুটে এলেন। নীচের তলার যাত্রীরা এল। আরও অনেকে এলেন। সবাই একজোট হয়ে বিজুদার খোঁজে এবং ঘটনার বিবরণ জানাতে থানায় চললেন প্রথমে।
কী থেকে কী হল, কেন হল, কেউ কিছুই ভেবে পেলেন না।
সব্যসাচীও সব কথা সকলকে খুলে বললেও সেই গোপন জিনিসটা যেটা বিজুদা ওর কাছে গচ্ছিত রেখেছেন সেটার কথা বলল না কাউকেই। সেটা যে কী, তা সে ও জানে না। বিজুদার মতন লোকের সঙ্গে ওই দলটার যে কী সম্পর্ক থাকতে পারে ভেবে পেল না ও। সবকিছুই যেন ঘন রহস্যের ধোঁয়াশায় ভরে যেতে লাগল।
ও মুখহাত ধুয়ে বারান্দায় এসে বসতেই, মা চা-জলখাবার এনে ওকে দিলেন। সামনের হলিডে হোমের বারান্দা থেকে জয়া ওকে ইশারা করতে লাগল। সব্যসাচী একবার এদিক সেদিক তাকিয়ে হাতছানিতে ডাকল ওকে।
জয়াও বিষয়টার গুরুত্ব বুঝে আর ওকে বাইরে আসতে বলল না। ইশারায় ওকে ছাদে যেতে বলে সরে গেল বারান্দা থেকে। তার মানে একটু পরেই ও আসবে। ওর এখন সত্যিই আসা দরকার। না হলে যে হাঁফিয়ে উঠবে ও। একেবারে চুপচাপ এই অস্বস্তিকর পরিবেশে কি থাকা যায়?
জয়া এল। লঘু ছন্দে ধীর পায়ে। এখন ওকে দেখে একবারও মনে হল না এই মেয়েটা সেই দস্যি-দামাল বা রণচণ্ডী মেয়ে বলে। কত শান্ত এবং ধীর। ওর চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। জানার আগ্রহ।
ও আসতেই সব্যসাচী বলল, চলো, ছাদে চলো। অনেক কথা আছে। ওরা পা টিপে টিপে ওপরে উঠল।
সিঁড়ির দরজায় শিকলটা তুলে দিয়ে সব্যসাচী বলল, শুনেছ তো? শুনেছি। তবু তোমার মুখেও শুনতে চাই। কী ব্যাপার বলো? সব্যসাচী এক এক করে সব কথা খুলে বলল জয়াকে।
জয়া চোখদুটো কপালে উঠিয়ে বলল, মেয়েটাকে ওরা নিয়ে গেল অথচ তুমি দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে দেখলে একটুও বাধা দিতে পারলে না?
সেই পরিস্থিতি ছিল না। তা ছাড়া আমি তখন চেঁচিয়ে লোকজন জড়ো করার চেষ্টা করছিলাম।
তোমার সামনে থেকে আমাকেও যদি কেউ ওইভাবে তুলে নিয়ে যেত, তুমি তা হলে চেয়ে চেয়ে দেখতে?
না। মেরে মুখ ফাটিয়ে দিতাম। অবশ্য তার আগেই যদি ওরা আমাকে কবজা করতে না পারে।
এখন তা হলে কী করবে ঠিক করেছ?
কিছু ভেবে পাচ্ছি না। তার কারণ আমার মা আর একমুহূর্ত থাকতে চাইছেন না এখানে। হয়তো আজই চলে যাব আমরা।
জয়া হতাশ হয়ে বলল, সে কী!
অথচ এই ঘটনার প্রত্যক্ষ্যদর্শী হিসেবে এখন আমার এখানে থাকাটা খুবই দরকার।
তার চেয়েও যেটা বেশি দরকার সেটার কথা তো বললে না?
লিপিকে উদ্ধার করা। এই তো?
নিশ্চয়ই। তুমি যখন বলছ লিপিকে নিয়ে দুষ্কৃতীদের গাড়িটা মোহানার দিকে গেছে তখন মনে হয় সেই ঝাউবনেই ওকে ওরা নিয়ে গিয়ে রাখবে। কালকের সেই লোক দু’জন, নিশ্চয়ই এদেরই দুষ্টচক্রের লোক।
ঠিক বলেছ তুমি। তবে জয়া, আমার যেন কেমন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে! আমার মনের মধ্যে নিম্নচাপ উঠেছে একটা। কাল থেকে আজ পর্যন্ত যা যা ঘটে গেল তাতে কোনও ঘটনার সঙ্গেই কোনওটাকে আমি সাজিয়ে উঠতে পারছি না। ওই ছেলেটির উবে যাওয়া, হঠাৎ করে তাকে মোহানার কাছে আবিষ্কার করা, সবই যেমন রহস্যময়, তেমনি রহস্যময় তাকে হত্যার চেষ্টা করেও হত্যা না করা। আজকের ভোরে বিজুদার ওপর আক্রমণ, লিপিহরণ, তার চেয়েও বেশি রহস্যময় যেটা, সেটা হল বিজুদা একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট কিন্তু ওই নোংরা জঘন্য স্বভাবের দুষ্কৃতীদের তিনি চিনলেন কী করে? কথাবার্তা শুনে মনে হল যেন কতদিনের পরিচিত। তা ছাড়া এইসব ক্রাইমের ব্যাপারেও তাঁর কৌতূহল খুব। আমার কাছ থেকে কুরে কুরে অনেক কথাই জানতে চাইছিলেন। এমনকী একটু বেলায় কালকের ওই ঘটনাস্থলে যেতেও চাইছিলেন তিনি। বলো কী !
এবার বলো তো, বিজুদার সম্বন্ধে আমি কোন ধারণাটা করব?
তা হলে শোনো, তোমার ওই বিজুদা লোকটিও কিন্তু খুব একটা সুবিধের নয়। চাপদাড়ির আড়ালে ওর চেহারাটা দেখেছ? দেখলেই একটা রগচটা গুন্ডা বলে মনে হয়।
তা হয়। কিন্তু...।
কোনও কিন্তু নেই এর মধ্যে। তিনি তোমাকে মিথ্যে পরিচয় দিয়েছেন। তা ছাড়া এমন কী জিনিস ওনার কাছে থাকতে পারে, যেটার জন্য ওরা হন্যে হয়ে পুরী পর্যন্ত এসেছে? নিশ্চয়ই কোনও স্মাগলিং-এর ব্যাপারে জড়িত আছেন উমি।
জিনিসটা যে কী তা কিন্তু আমিও দেখিনি। সেটা আমার কাছেই আছে। বার করো তো, দেখি। তা হলেই বুঝব ব্যাপারটা কী।
সব্যসাচী ওর প্যান্টের পকেট থেকে যে জিনিসটা বার করল তা দেখে অবাক হয়ে গেল দু'জনেই। কী আশ্চর্য! এর জন্যে এত?
সব্যসাচী জিনিসটা জয়ার হাতে দিল।
জয়া সেটা অনেকক্ষণ ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। তারপর সব্যসাচীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কিছু বুঝতে পারলে?
না।
আমার মনে হয় এইটাই হচ্ছে ওই দুষ্কৃতীদের তুরুপের তাস।
কিন্তু এর তো কোনও আর্থিক মূল্যই নেই।
তা হয়তো নেই। তবু ওটা খুব যত্নে রাখো তোমার কাছে। জিনিসটার মূল্য তোমার আমার কাছে না থাকলেও ওদের কাছে আছে। তাই তো বিজুদা ওটা সুকৌশলে পাচার করেছেন তোমার হাতে।
এমন সময় ছাদের দরজায় ঠক ঠক শব্দ।
সব্যসাচী দরজা খুলে দিতেই সরমা উঠে এলেন ছাদে। তারপর জয়াকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, ওমা! তুমি কখন এলে?
এই একটু আগে এসেছি মাসিমা।
ছাদের দরজায় শিকল দিয়ে কী করছিলে তোমরা?
সব্যসাচী বলল, কিছু না। কালকের ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। দরজাটা হাওয়া লেগে বার বার খুলে যাচ্ছিল তাই—।
যাকগে। নীচে এসে যদি কিছু খেতে চাস তো খেয়ে নে। পাণ্ডা ঠাকুর এসেছেন। তোর বাবা ফিরে এলেই মন্দিরে যাব একবার। তারপর আর এখানে নয়।
জয়া ও সব্যসাচী মুখ চাওয়া-চায়ি করল। তারপর দু'জনেই নেমে এল দোতলায়।
পাণ্ডা লিঙ্গরাজ মিশ্র বারান্দার বেঞ্চিতে চুপচাপ বসেছিলেন।
ওপাশের এক নম্বর ঘরের যাত্রীরা এত কাণ্ডর পর আজ মন্দিরে যাবেন কি যাবেন না ভেবে পা ঘষতে লাগলেন। কেন না পাশাপাশি দুটি ঘরের বাসিন্দাদের নিয়ে যা হয়ে গেল, তারপরে কোথাও আর যাবার ইচ্ছে নেই। বিশেষ করে লিপির ব্যাপারটায় বিচলিত সবাই।
সরমা মিশ্রজিকে চা করে দিলেন।
সব্যসাচী ও জয়াকেও খেতে দিলেন হালুয়া, টোস্ট।
মিশ্রজি বললেন, আপনারা কি সত্যিই চলে যাবেন মা?
হ্যাঁ বাবা। মাস ছয়েক বাদে যাত্রা পরিবর্তন করে আবার আসব।
কিন্তু পুরীতে এসে জগবন্ধুকে দর্শন না করে চলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? কখনওই না। সত্যিকারের মহাপাতক না হলে এমন দুর্মতিও হয় না কারও। তবু যাবেন?
হ্যাঁ। মন আমার এখানে আর একদম মানছে না।
মিশ্রজি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, মন যদি না চায় তা হলে অবশ্য থাকার কথা বলব না। কিন্তু কী করে যাবেন তাই ভাবছি। রিজার্ভেশন তো পাবেন না। অথচ এমনি সাধারণ বগিতে বসে যাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারি না।
কেন, নীলাচলে যাই যদি?
তা হলে তো আজ নয়, কাল যেতে হবে। নীলাচল তো এখনই ছাড়বার সময় হয়ে গেছে। আর একটা গাড়ি অবশ্য আছে, ধৌলি এক্সপ্রেস। ভুবনেশ্বর থেকে দুপুর দুটোয় ছাড়ে। সেটায় গেলে আজই রাত্রি দশটার মধ্যে হাওড়ায় পৌঁছতে পারবেন। কিন্তু সে গাড়িতে গেলেও এখুনি বেরিয়ে পড়তে হয়।
সরমা বললেন, দেখি ওর বাবা আসুক, কী বলেন। কোথায় গেছেন উনি?
থানায়। সেখান থেকে হাসপাতালে।
মিশ্রজি বললেন, দেখুন, আমরা এতদিন এখানে বাস করছি কিন্তু এই ধরনের উপদ্রব কখনও দেখিনি। শুনিওনি কখনও। আপনাদের নিয়ে যা কিছু হচ্ছে সবই কিন্তু বাইরের লোকেদের কাজ কারবার। মাঝে মধ্যে এখানেও যে ঝুট ঝামেলা কিছু হয় না তা নয়, সে সব চ্যাংড়া মস্তানদের ব্যাপার। ওরকম সব জায়গাতেই হয়। আবার মিটেও যায়।
দরজার সামনেই সিঁড়ির গায়ে একটি ছোট্ট ঘর আছে। সেই ঘরে থাকে এই বাড়ির মালিকের বড় ছেলে। ডাক নাম বাপি। ভাল নাম অমরনাথ। অত্যন্ত রূপবান সুশ্রী, বিনয়ী যুবক। ওর ছেলেবেলাটা কেটেছিল অন্ধ্রের পুত্তাপতিতে সত্য সাইবাবার আশ্রমে। সে এতক্ষণ সব শুনছিল। এবার এগিয়ে এসে সব্যসাচীকে জিজ্ঞেস করল, মেয়েটিকে নিয়ে ওরা কোনদিকে গেল বলতে পারবে?
হ্যাঁ। সব্যসাচী বারান্দা থেকেই পথ দেখিয়ে দিল।
মিশ্রজি গুম হয়ে কী যেন চিন্তা করতে লাগলেন।
বাপি বলল, এবার বুঝেছি ওরা কোথায় গেছে।
মিশ্রজি বললেন, ওই ঝাউবনেই ঢুকবে ওরা। না হলে ওই যে পুরনো ভাড়া বাড়িগুলো আছে ওরই যে কোনও একটাতে গিয়ে জুটবে। আমি দশ-বারোটা ছেলেকে সঙ্গে দিচ্ছি। যাও তো একবার দেখো তো গিয়ে কী ব্যাপার।
বাপি বলল, ওইদিকেই যাবে না ওরা। গেলে ওরা লোকনাথের দিকে যাবে। ওখানকার জঙ্গলই ওদের উপযুক্ত পরিবেশ।
তাই যাও। গিয়ে একটা খোঁজখবর নাও।
বাপি বলল, এক মিনিট। আমাকে একবার আসতে দিন। বলেই জামাটা গায়ে দিয়ে নীচে নামল।
সব্যসাচী বলল, আমি আপনার সঙ্গে যাব বাপিদা?
সরমা ছুটে এলেন, খবরদার বলছি। একদম বেরোবি না ঘর থেকে।
মিশ্রজি বললেন, আপনি কেন অযথা ভয় পাচ্ছেন মা? কোনও ভয় নেই। আর কোনও বিপদ হবে না। ওসব যখন হয় তখন আপনা থেকেই হয়। এখন সব জানাজানি হয়ে গেছে। সবাই সতর্ক। থানা-পুলিশ হচ্ছে। ওরা এখন প্যাচার মতো লুকোবে। এখন আমরা ওদের দেখে ভয় পাব না, ওরা ভয় পাবে আমাদের দেখে।
সব্যসাচী তখন একদম নীচে।
জয়াও আর ওপরে না-থেকে পিছু নিল ওর।
বাপি বলল, সাইকেল চাপতে পার?
সব্যসাচী বলল, হ্যাঁ।
জয়া বলল, আমিও পারি।
বাপি বলল, তুমিও যাবে নাকি?
তবে না তো কী? আপনারা দু'জনে যাবেন আর আমি বসে থাকব এখানে? ওটি হচ্ছে না।
বাপি নিজের সাইকেলটা নিয়ে আর একটা সাইকেল জোগাড় করে আনল। সব্যসাচী বলল, না জয়া, তুমি এসো না। আবার যদি নতুন করে কোনও বিপদ এসে হাজির হয় তা হলে কিন্তু যা তা ব্যাপার ঘটে যাবে তোমাকে নিয়ে।
অভিমানিনী জয়া তখন এক কথাতেই চুপ। একবার শুধু ক্রুদ্ধ চোখে সব্যসাচীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে বলল, বেশ, তোমরাই যাও। বলে আর কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা ওদের হলিডে হোমে ঢুকে গেল।
বাপি বলল, দারুণ রেগেছে মনে হচ্ছে।
সব্যসাচী বলল, এই মেয়ে বড় হলে দিনকে রাত করে দেবে।
ওরা সাইকেল নিয়ে ওদের হলিডে হোমের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা ডানদিকে সোজা চলে গেছে, সেই পথে খানিক গিয়েই বাঁদিকে বাঁক নিল। তারপর আবার ডানদিকে বেঁকে কিছু পথ যেতেই কী সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখতে পেল ওরা। কত যে ছোট ছোট ঘরবাড়ি হয়েছে সেখানে, তার যেন শেষ নেই।
বাপি বলল, তোমার বাবাকে বলো না এইখানে একটা বাড়ি কিনতে। এক-দু'কাঠা জায়গার মধ্যে কী সুন্দর সব বাড়ি দেখেছ?
সব্যসাচী বলল, ভারী মনোরম! তবে কিনা আমরা বছরে একবার কি দু'বার হয়তো আসব। তার জন্যে স্টেটের বাইরে একটা প্রপার্টি রাখার কোনও যুক্তি আছে কি?
ওরে ব্বাবা। তুমি এইটুকু ছেলে অথচ তোমার খুব বৈষয়িক জ্ঞান রয়েছে দেখছি।
যেতে যেতেই হঠাৎ এক জায়গায় ব্রেক কষল বাপি।
সব্যসাচী বলল, কী হল?
ওই যে দেখছ ডানদিকের পথটা মাঠের দিকে নেমে গিয়ে ঘন সবুজের মধ্যে মিশে গেছে, ওই পথেই লোকনাথ। এখন এইখানেই একটু খোঁজখবর নিতে হবে। তবে খুব সাবধান। আমি যাকে যা জিজ্ঞেস করবার করব। তুমি কিন্তু কারও কথার কোনও উত্তর দেবে না। কেমন?
সব্যসাচী বলল, ঠিক আছে।
বাপি বলল, চলো, ওই দোকানটায় গিয়ে একটু চা খাওয়া যাক। কিছু খবরাখবর ওইখান থেকেই পাব।
ওরা সাইকেল থেকে নেমে একটা চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। মাটির ঘর। পাতার ছাউনি। জায়গাটা নিরিবিলি বলে খদ্দেরও কম। তাই ভিড় নেই।
ওরা সাইকেল রেখে দোকানে ঢুকেই সর্বাগ্রে প্লাস্টিকের ওয়াটার পটে রাখা জল নিয়ে ঢক ঢক করে খেল। তারপর বাপি বলল, তোর সেই ছেলেটাকে দেখছি না কেন রে বুলবুল?
চা-ওয়ালার নাম বুলবুল। বলল, আর বলিস না ভাই। সেই যে দু'দিনের ছুটি নিয়ে গেল আর এল না।
অসুখবিসুখ করেনি তো?
কে জানে? তবে শুনেছি ওর বাবার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।
বাপি বলল, তোর এখানে খাবার কী আছে? পিঁয়াজিটিয়াজি হবে কিছু? লঙ্কার বড়া?
গরম চপ হবে। দেব?
দে। আর দু'কাপ চা।
বুলবুল দুটো করে চপ ওদের দিকে এগিয়ে চা করতে লাগল। চা ছাকতে ছাঁকতেই বলল, এদিকে কোথায় যাবি?
ভাবছি একবার লোকনাথে গেলে কেমন হয়? ভাগনাটা এসেছে কাল, তাই ওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি।
আর একটু সকালে আসতে পারতিস।
সকালবেলা ওদিকে একটু ঝামেলা হয়ে গেল।
ওঃ হো। শুনেছি কাদের নাকি একটা মেয়ে চুরি হয়েছে।
কার মুখে শুনলি?
এই তো একটু আগে কে যেন বলল, ভোরে আমি যখন সবে উনুনে আঁচ দিচ্ছি, তখন হঠাৎ দেখি একটা লাল রঙের মারুতি এইদিক দিয়ে ছুটে গেল। একটা অল্পবয়সি মেয়েকে সবাই মিলে শক্ত করে চেপে ধরে আছে। তা আমি ভাবলাম বোধহয় কোনও ট্যুরিস্টের মেয়ে। অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তাই হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। তারপরই শুনি এই কাণ্ড। এমন ব্যাপার জানলে তো বাধা দিতাম। তবে মুখে বলছি বটে, কাজে হয়তো পারতাম না। যা জোরে এল ওরা, কিছু ভাবনা চিন্তা করবার আগেই উধাও হয়ে গেল।
বাপি বলল, তা হলে ঠিকই দেখেছ তুমি।
তার আধ ঘণ্টা পরেই এল একটা পুলিশের গাড়ি। ওরা খোঁজখবর নিলে আমি কিন্তু ঝামেলার ভয়ে বলেই দিলাম কিছু দেখিনি।
কী ভুল করলে বলো তো?
কী করি ভাই, কথায় বলে বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ধরলে অগুণতি। তা ছাড়া সত্যিকথা বলতে কী, কোলাব্যাঙ আর পুলিশ এই দুটোকেই আমি ভয় পাই। একবার হল কী আমার দিদিশাউড়ির একটা—
বাপি চপে কামড় দিয়েই বলল, বাঃ। বেড়ে হয়েছে তো? দেব নাকি আর একটা?
দাও দাও।
সব্যসাচী বলল, আমাকে নয়, আমার এতেই হবে।
চপ খেয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে ওরা দোকানের বাইরে এসে দূরের প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে রইল।
বুলবুল বলল, যাবে তো যাও। সাইকেল যখন আছে, তখন বেশি সময় লাগবে
না। কত লোক পুরী আসে, কিন্তু জানে না বলে অনেকেই লোকনাথ না দেখে ফিরে যায়। তোমরা যাও, দর্শন করো। প্রার্থনা করো বাবার কাছে। বাবা সকলের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন।
সব্যসাচী চাপা গলায় বাপিকে বলল, তা হলে যাওয়া যাক চলো।
গিয়ে আমরা কী করব?
একটু খুঁজেপেতে দেখব কোথাও যদি কোনও হদিস পাওয়া যায় ওর।
আমি বলি কী, আমরা বরং কিছু লোকজন নিয়েই ওদিকে যাই। মিশ্রজি তো কয়েকজনকে সঙ্গে দেবেন বলেছেন। দলবল দেখলে ওরাও ঘাবড়ে যাবে খুব। আমাদেরও সুবিধে হবে।
সব্যসাচী বলল, লোকজন দেখলে ওরা যদি সতর্ক হয়ে যায়? তার চেয়ে চলো যেমন আমরা যাচ্ছি তেমনি দু’জনেই যাই।
বাপি কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর বলল, এসো তা হলে। তোমার কথাই থাক!
ওরা সেই অনবদ্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ভেতর দিয়ে দ্রুত সাইকেল চালিয়ে লোকনাথের দিকে চলল। আজ বে-বার। তাই যাত্রী সংখ্যা অনেক কম। নেই বললেই হয়। যাই হোক, ওরা একসময় প্রশস্ত রাজপথে এসে পড়ল। এখানটাও নির্জন। বাপি বলল, এই পথটা জগন্নাথের মন্দিরে গিয়ে মিশেছে। অনেকে মন্দিরের কাছ থেকেও রিকশায় চেপে এখানে আসে।
ওরা সেই রাজপথ ধরে বাঁদিকে খানিকটা যেতেই দেখতে পেল, পথটা সেখানে দু'ভাগ হয়ে গেছে। বাঁদিকের পথ গেছে লোকনাথে। ডানদিকেরটা ল্যাংটা বাবার আশ্রমে। মস্ত সাধক তিনি। এখন দেহাবসান হয়েছে। নির্জন জায়গায় ছোট্ট একটি টিলা পাহাড়ে তাঁর আশ্রম। চমৎকার পরিবেশ।
বাপি সব্যসাচীকে বলল, চলো, আগে আমরা লোকনাথে যাই। সেখানে কোনও খোঁজখবর না-পেলে তারপর ল্যাংটা বাবার আশ্রমে যাব। যা আপনি বলবেন।
ওরা দ্রুত সাইকেল চালিয়ে লোকনাথের পথ ধরল। খানিক যাবার পরই দেখতে পেল একদল ভিখারি পথের দু'ধারে সারিবদ্ধ ভাবে হাত পেতে বসে আছে।
সামনেই একটি মন্দির দেখা যাচ্ছে। লোকনাথ মহাদেবের মন্দির। দর্শনার্থী নেই বললেই হয়। একদম ফাঁকা।
ওদের দেখে দু’–একজন পাণ্ডা কোমড় বেঁধে এগিয়ে এলেও, বাপিকে চিনতে পেরে পিছিয়ে গেল।
একপাশে সাইকেল আর জুতো রেখে বাপি বলল, মন্দিরে যখন এসেছি আর তুমিও প্রথম এলে তখন দর্শন না করে ফিরে যাওয়া নয়। আগে মন্দিরের কাজটা সেরে নিই, তারপর শুরু হোক খোঁজখবর নেওয়া।
ওরা মন্দিরের প্রাঙ্গণে এসে পাশের কুণ্ডে হাত-পা ধুয়ে সামান্য একটু পূজার ডালি নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করল। কী অপূর্ব রম্যস্থান। মন্দিরে প্রবেশ মাত্রই ভক্তিতে যেন দেহমন আপ্লুত হয়ে ওঠে। শুধু কী বাবা লোকনাথ? কত দেবতাই তো রয়েছে এখানে।
হঠাৎ একদল যাত্রী কোথা থেকে এসে ফাঁকা জায়গাটা ভরিয়ে দিল। সেই যাত্রীদের মধ্যে এমনই একজন ছিল যাকে দেখে বিস্ময়ের অন্ত রইল না সব্যসাচীর।
নাটমন্দিরে যে বিশাল পেতলের ঘণ্টাটা ছিল, সেটার চেন ধরে টেনে টেনে বাজিয়েই চলেছে সে। তার দুটো চোখেই যেন আগুন। আগুন শুধু চোখে কেন? মনে হল সে নিজেই যেন স্ফুলিঙ্গ একটি।
বিস্মিত সব্যসাচী বলল, এ কী জয়া! তুমি এখানে? তুমি কী করে এলে?
জয়া সে কথার কোনও উত্তরই না দিয়ে হাতের ফুলমালাটা নিয়ে ঢুকে গেল মন্দিরের ভেতরে। শুধু যে গেল তা নয়, সব্যসাচীর দিকে ফিরেও তাকাল না একবার।
সব্যসাচী তখন ওর মান ভাঙাতে না গিয়ে খুঁজতে লাগল বাপিকে। বাপিদা! বাপিদা!
বাপি মন্দিরের বাইরের কলে একটু প্রসাদ মুখে দিয়ে জল খাচ্ছিল। বলল, কী হল! ভয় পেল নাকি? আসলে ভিড় দেখে আমি বেরিয়ে এলাম।
সে বেশ করেছ। কিন্তু কে যে এক কাণ্ড হয়েছে।
কী হয়েছে?
সেই মা চণ্ডী এসে হাজির হয়েছেন এখানে। ভীষণ রেগেছে।
কে! কার কথা বলছ তুমি?
জয়া। জয়া এসেছে।
জয়া এসেছে! কোথায় সে?
মন্দিরের ভেতরে। তুমি যাও বাপিদা, ওর মান ভাঙাও। আমাকে দেখলেই ফেটে পড়বে ও।
বাপি কোনওদিকে না তাকিয়ে সোজা ঢুকে গেল মন্দিরের ভেতরে। তারপর একসময় রাগি মেয়েটার হাত ধরে টানতে টানতে যখন বেরিয়ে এল, সব্যসাচীর পাত্তা নেই। কোথায় গেল ছেলেটা!
ওরা মন্দিরের বাইরে এল। কুণ্ডের পাশের সিঁড়ি বেয়ে চত্বরের বাইরে যেখানে ওদের জুতো, সাইকেল রাখা ছিল, সেখানেও এল। কিন্তু না, সব্যসাচীর পাত্তা নেই। বাপি-জয়া দু’জনেই চেঁচিয়ে ডাকল, স-ব্য-সা-চী-ই। তুমি যেখানেই লুকিয়ে থাক চলে এসো।
কিন্তু আসবে কে?
ঘণ্টা কাবার হল। মন্দির দর্শনার্থী শূন্য হল। শুধুমাত্র ওরা দু'জন আর দু’-চারজন পাণ্ডা ছাড়া কেউ কোথাও নেই। চোখের পলকে যেন ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল ছেলেটা।
ওদের দু'জনেরই চোখেমুখে আতঙ্ক একটা ঘনিয়ে এল।
ওরা যখন সেই মর্মান্তিক দুঃসংবাদটা নিয়ে ফিরে এল, ওদিকে তখন আর এক নাটক। পার্থ নামের সেই ছেলেটা, মোহানার বালিয়াড়ি থেকে যাকে উদ্ধার করা হয়েছিল, তাকে ঘিরে তখন দারুণ রহস্য জমে উঠেছে।
পুলিশ অফিসাররা বারবার জেরা করেও কোনও সদুত্তর পাছেন না তার কাছ থেকে।
একজন অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক করে বলো, কীভাবে ওরা কিডন্যাপ করল তোমাকে?
পার্থ বলল, বিশ্বাস করুন, আমি কিচ্ছু মনে করতে পারছি না।
মিথ্যে কথা। আসলে তুমি মনে করবার চেষ্টাই করছ না। সত্যি করে বলো, তুমি কি আদৌ জলে পড়েছিলে?
পাৰ্থ কিছুক্ষণ মাথা হেঁট করে বসে থেকে বলল, জলে তো পড়েছিলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই।
সবই মনে আছে তোমার। কিন্তু তুমি যে কোনও কারণেই হোক চেপে যাচ্ছ। সত্যি কথাটা বলতে চাইছ না। পরে অবশ্য তুমি সংজ্ঞাহীন হয়েছিলে ঠিকই, তখনকার কথা তোমার মনে না থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু আগের কথা ভুলে যাবার কারণটা কী?
পার্থর বাবা-মা বললেন, শুধু শুধু ওকে কেন কষ্ট দিচ্ছেন স্যার? আমাদের তো কোনও অভিযোগ নেই। আজ রাতের গাড়িতে আমাদের রিজার্ভেশন করা আছে। আমরা চলে যাব।
রিজার্ভেশন করা থাকলে সেটা ক্যানসেল করে দিন। আজ আপনাদের কোনও অবস্থাতেই যাওয়া হবে না।
সে কী! তা হলে আমরা থাকব কোথায়? খাব কী? টাকা-পয়সা যা এনেছিলাম তার সবই তো শেষ।
বেশ তো, আপনার যদি এইরকম অবস্থা হয়ে থাকে তা হলে চলে যান আপনারা। ছেলেটাকে রেখে যান পুলিশের হেফাজতে।
বাবা-মা দু'জনেই অফিসারের হাতদুটি জড়িয়ে ধরে বললেন, প্লিজ, আপনি আমাদের এর থেকে অব্যাহতি দিন।
সম্ভব নয়। কারণ ছেলের জবানবন্দির ওপর আমাদের তদন্তের অনেক কিছু নির্ভর করছে। ইতিমধ্যে আমরা এই সমস্ত অঞ্চল তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনওরকম সন্দেহজনক কিছু পাইনি। এর পরেও আজ ভোরে প্রকাশ্য রাজপথ থেকে একটি কিশোরী উধাও গেল। একজনকে হত্যার চেষ্টা করা হল। কিন্তু কেন? কী উদ্দেশে? এটা একটা পর্যটন কেন্দ্র। লক্ষ লক্ষ নরনারী এখানে আসেন অবসর বিনোদনে। অপরাধ সব সময় সর্বত্র ঘটতে পারে। কিন্তু তাকে দমন করবার জন্যই তো আমরা। আপনারা যাদের শিকার, আপনাদের কাছ থেকে তাদের কথা যদি কিছুমাত্র জানতে না পারি তা হলে ধরব কাদের? আর অপরাধী যদি ধরা না পড়ে, তা হলে তো এইভাবে রোজই এক-একজন করে উধাও হতে থাকবে। চুরি ছিনতাই খুন রাহাজানি ঘটতে থাকবে দিনের পর দিন।
পার্থর বাবা-মা তখন পার্থকে বললেন, ঠিক করে বল, কী থেকে কী হল। কোনও ভয় নেই তোর। তুই সত্যি কথা না বললে হয়তো তোকে এখানে রেখে দিয়েই চলে যেতে হবে আমাদের। না হলে এঁরা তোকে ছাড়বেন না।
পার্থ জড়িয়ে ধরল ওর মাকে, আমি কিচ্ছু জানি না মা, সত্যি বলছি আমার পক্ষে কোনও কিছুই বলা সম্ভব নয়।
পুলিশ অফিসার গর্জে উঠলেন, তার মানে তুমি সব জান। এবার বলো তো বাছাধন কাদের পাল্লায় তুমি পড়েছিলে?
পার্থ বলল, আমি যখন সমুদ্রের ধারে অল্প অল্প ফেনার ওপর দিয়ে ছুটোছুটি করছিলাম তখন হঠাৎই একটা বড় ঢেউ এসে পড়ায় আরও অনেকের সঙ্গে আমি মুখ থুবড়ে পড়ে যাই। আর ঠিক তখনই মনে হল কে যেন আমার গলা টিপে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে। আমার ঘাড়ে গলায় নখের দাগ বসিয়ে দিচ্ছে। তারপর?
আমি দু'হাত দিয়ে তার গলাটা ছাড়াবার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ দেখি আমার চুলের মুঠি ধরে টানছে কে। আমি ক্রমশ গভীর সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চললাম। কয়েক ঢোক জলও ঘিটে ফেলেছি তখন। তারপরই জীবনের আশা আর নেই দেখে ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছি।
কিন্তু তুমি ওখান থেকে অতদূরে গেলে কী করে?
একসময় আমার মনে হল আমাকে যেন একটা জেলে ডিঙিতে উঠিয়ে নিয়ে এল কেউ।
পুলিশ অফিসার বললেন, তার মানে-জ্ঞান হারিয়েও তুমি মনে করতে পারলে তোমাকে কেউ জেলে ডিঙিতে উঠিয়ে নিল। এরপরে অজ্ঞান অবস্থায় থেকে আর কী মনে করতে পারলে শুনি?
আর কিছু মনে করতে পারছি না।
এইবার পুলিশ অফিসার একটু নরম সুরে বললেন, শোনো পার্থ। আমাদের মনে হচ্ছে তুমি ইচ্ছে করেই কিছু গোপন করছ। ভয় কী তোমার? তোমার শত্রুদের যদি আমরা ধরি তাতে কি তুমি খুশি হবে না? তোমাকে নিয়ে যা হচ্ছিল তাতে তোমার জীবন চলে যাচ্ছিল। আমরা কথা দিলাম, তাদের সবাইকে আমরা ধরব, আর কঠিন শাস্তি দেব।
পার্থ বলল, না। আমি আর কোনও কিছু লুকব না। সব বলব আপনাদের। সবাই উদ্গ্রীব হয়ে শুনতে লাগলেন পার্থর কথা !
পার্থ বলল, সেদিন জলে আমি নিজের থেকে পড়ে যাইনি। খুব বড় ঢেউটা যখন আসে ঠিক তখনই হুড়মুড়িয়ে অনেকে পড়ে গেলেও, আমার মনে হল কে যেন আমাকে ল্যাং মেরে ফেলে দিল। তারপর হঠাৎই মনে হল কেউ আমাকে ঢেউয়ের তালে তালে উঠিয়ে নামিয়ে দূরে কোথাও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি চেঁচাতে গিয়েও পারলাম না। ঢক ঢক করে খানিকটা লোনা জল খেয়ে ফেললাম। এরপর লোকটা আমাকে টেনেহিঁচড়ে একটা জেলেডিঙিতে উঠিয়ে নিল। লোকটা সাধারণ লোক নয়, নুলিয়াও নয়। মাঝি বা জেলে বলেই মনে হল। ডিঙিতে উঠিয়ে আমার ঘাড়-গলা টিপে ধরে রইল, আর নৌকোটা চলে গেল মাঝসমুদ্রে। অনেক পরে নৌকো যখন ডাঙায় ফিরে এল তখন আমি ক্লান্ত, অবসন্ন। আমাকে নিষ্ঠুরভাবে টেনেহিঁচড়ে ওরা একটা নদীর মোহানার কাছে নিয়ে এল। কী নির্জন সেই জায়গাটা। সেখানে চারজন লোক বসে বসে জটলা করছিল। আমাকে তাদের সামনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল ওরা। তারপর কিছু টাকা নিয়ে চলে গেল। লোকগুলো নেশাগ্রস্ত ছিল। ওদেরই একজন আমার গলা টিপে মারতে এল সেখানেই। আর একজন বলল, এখনই মারিস না একে। দুধের বাচ্চা। ক্ষীর-ননী খেয়ে মানুষ। পারাদ্বীপের কাছে কোথাও নিয়ে গিয়ে রেখে আসি চল। তারপর ঠিকমতো তালিম দেওয়া যাবে। বাবা পুলিশ অফিসার। ছেলে হোক পকেটমার। মাঝে মধ্যে ছেলেকে দিয়ে একটা করে চিঠি লিখিয়ে ওর বাবার কাছে পাঠিয়ে দেব। আর একজন বলল, অত ঝক্কি ঝামেলা পোহাবে কে? ছেলেকে মেরেই বাপের প্রতিশোধ নিতে হয়। মার, মেরে ফেল শয়তানের বাচ্চাকে। লোকটা এমনভাবে আমার গলা টিপে ধরল যে আর একটু হলেই আমি মরে যেতাম। এমন সময় হঠাৎ একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর বলে উঠল, এই এই, করছিস কী? কাকে মারছিস? রং টার্গেট। এ তো সে নয়। এ যে পার্থ।
পুলিশ অফিসার সবিস্ময়ে বললেন, স্ট্রেঞ্জ! লোকটা তোমার নাম বলল ! তার মানে তোমাকে চেনে?
হ্যাঁ। বলল, অপদার্থ শ্যামাটা করেছে কী! কাকে ধরে এনেছে! এ যে পার্থ, আমার—।
পুলিশ অফিসার বললেন, চুপ করলে কেন? বলো? বলো কে সে? বলে ফেলো?
আমার মেজমামা সন্দীপ।
ঘরের মধ্যে বোমা ফাটলেও বুঝি এতটা চমকাত না কেউ।
পার্থর বাবা বললেন, সন্দীপ! সে এখানে কী করে এল? তুই ভুল দেখিসনি তো বাবা? আজ পাঁচ বছর ধরে পুলিশ তাকে খুঁজছে। সদর স্ট্রিট এলাকার একটি ব্যাঙ্ক-ডাকাতির কেসে সে ফেরার। তোর দিদা ওই ছেলের জন্য আত্মঘাতী হল। পুলিশ অফিসার বললেন, তারপর কী হল?
ওরা বলল, তোর ভাগনা! তা হলে তো আরও বিপদ। এ যদি তোর কথা বলে দেয়, তা হলে সবাই আমরা ধরা পড়ে যাব। একে কোনওমতেই বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। ওকে মরতে দে সন্দীপ। মামা বললেন, না। প্রাণ থাকতেও একাজ আমি করতে দেব না। আমি কথা দিচ্ছি ও আমাদের কথা কাউকে বলবে না। আমিও কথা দিলাম, সত্যি বলছি, আমার মা-বাবা ভাই-বোনেদের সবাইকার দিব্যি, আমি প্রাণ থাকতে একথা কাউকে বলব না, দয়া করে আমাকে মেরো না তোমরা। ওরা তবুও বলল, শত্রুর শেষ রাখতে নেই রে। আমাদের মনেও মায়ামমতা থাকতে নেই। আমরা শ্মশানের কুকুর। মড়ার মাংস ছিঁড়ে খাওয়াই আমাদের পেশা। বলেই আমার গলায় এত জোরে চাপ দিল যে আমাতে আর আমি নেই তখন। একজন আমাকে মৃত ভেবে ছুড়ে নদীর খাড়িতে ফেলে দিল।
আমার মামা তখন বজ্রমুষ্ঠিতে চেপে ধরেছে তাদের একজনের গলা। কিন্তু ধরলে কী হবে। ওরা তিনজন, মামা একা। পারবে কেন ওদের সঙ্গে? তারপর কী হল?
ওরা আমার চোখের সামনেই মামাকে খুন করে ওইখানেই পুতে ফেলল। তারপর চলে যাবার সময় বলে গেল, যদি ছেলেটা বেঁচে থাকে আর পুলিশের কানে তোলে এইসব কথা তা হলে যে যেখানে আছে ওর, সব ক'টারই এই হাল করব। এই দৃশ্য দেখার পর সেই যে আমি জ্ঞান হারালাম তারপরে আমাকে উদ্ধার করল সব্যসাচী। ওর ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না।
পার্থর জবানবন্দি শেষ হতেই স্নেহাংশুবাবু এসে উদ্বিগ্ন হয়ে পুলিশ অফিসারকে বললেন, আমার সব্যসাচীও ওদের শিকার হয়েছে স্যার। প্লিজ, একটু কিছু করুন। আমার ওই একটিই মাত্র ছেলে।
স্নেহাংশুবাবুর সঙ্গে বাপিও ছিল।
ওর মুখে সব কথা শুনে পুলিশ সব কিছু লিখেটিখে নিয়ে পার্থকে সঙ্গে করে মোহানার দিকে গেলেন। এক গাড়ি পুলিশ সহ পার্থর বিবরণ যে মিথ্যে নয় তা বোঝাই গেল। শুধু ওর কথা মিথ্যে প্রমাণ করবার জন্য দুষ্কৃতীরা সন্দীপের লাশ শেষরাতেই তুলে নিয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে। বালির অবস্থান দেখেই তা বোঝা গেল। কিন্তু কোথায় লুকল ওরা লাশটাকে? বুকে বালির বস্তা বেঁধে গভীর সমুদ্রে ফেলে দিল? কে জানে? আরও রহস্য এই, সে কোন পুলিশ অফিসার? যার ছেলেকে হত্যার জন্য দুষ্কৃতীরা এতবড় একটা ফাঁদ পেতেছিল? কিন্তু এ কথার উত্তর কে দেবে? সমুদ্রে তরঙ্গ আছে। গর্জন আছে। মহা প্রলয়ের দুর্বার শক্তিও আছে তার, কিন্তু সমুদ্রের তো ভাষা নেই। মানুষের পাপপুণ্যের সাক্ষী হতে পারে সে, সাক্ষী দিতে পারে না। বালুচরও তাই। মূকবধির হয়ে তরঙ্গের আঘাত সয়, কাউকে আঘাত করতে পারে না।
এইদিন দুপুরের পর বিজুদা ছাড়া পেলেন হাসপাতাল থেকে। মাথায় আঘাত পেয়ে কিছু সময়ের জন্য সংজ্ঞাহীন হলেও পরে ঘোরটা কেটে গেলে সুস্থ হন। তবে মাথায় চোট লাগার জন্য ব্যান্ডেজ একটা বাঁধতেই হল। এরজন্য তিনি অবশ্য কাতর নন।
হলিডে হোমে ফিরে এসে সব্যসাচীর খবরটা শুনে দারুণ উত্তেজিত হলেন বিজুদা। তাঁরই ভাইঝির খোঁজে গিয়ে ছেলেটি দুষ্কৃতীদের কবলে পড়েছে শুনে যেমনি বিচলিত হলেন তেমনি আঁশঙ্কিত হলেন অন্য ব্যাপারে। অর্থাৎ সেই যে সেই জিনিসটা, যেটাকে পাবার জন্য এত কিছু সেটা কি সব্যসাচীর কাছেই ছিল? নাকি রেখে গেছে অন্য কোথাও? কে জানে? তবু স্নেহাংশুবাবুকে বললেন, আচ্ছা, বাইরে যাবার আগে ও কি কোনও কিছু রেখে গেছে আপনাদের কাছে? স্নেহাংশুবাবু বললেন, আমি তো কিছু বলতে পারব না ভাই, আমি ছিলামই না বাড়িতে। আপনাদের জন্যই হাসপাতাল-পুলিশ এইসব করছিলাম। ওর মাকে একবার জিজ্ঞেস করুন তো?
সরমা বললেন, না, সেরকম কিছুই রেখে যায়নি ও। জিনিসটা কী?
বিজুদা বললেন, যদি অনুমতি দেন তা হলে আমি একবার ঘরের ভেতরটা
দেখব? ওটা খোয়া গেলে কিন্তু আমার সমস্ত পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে। বেশ তো দেখুন। কিন্তু আমাদের ছেলেটাকে আমরা কি আর কখনও ফিরে পাব?
আমার ভাইঝি লিপির সম্বন্ধেও ওই একই দুশ্চিন্তা আমার। ওকেও কী ফিরে পাব আমরা?
এমন সময় পাণ্ডা লিঙ্গরাজ মিশ্র এসে হাজির হলেন।
এলেন সাধনবাবুও। বললেন, ওইখানে ওদের যাওয়াটাই ভুল হয়েছে। এই ঘটনার পর ওদিকে কেউ যায়?
বাপি ম্লানমুখে দাঁড়িয়েছিল অদূরে। বলল, আমরা তো গেছি লোকনাথে। মনে করুন আমরা না জেনেই গেছি। বিপদ হবে বুঝব কী করে?
বাঃ। মেয়েটাকে নিয়ে মারুতিটা যে ওইদিকে গেছে তা তোমরা জানতে না? কেন জানব না? মারুতিটা ওই পথেই গেছে। কিন্তু লোকনাথে গেছে এমন কোনও প্রমাণ কি ছিল আমাদের কাছে? তা ছাড়া লোকনাথ দেবস্থান। তার ধারেকাছে কোনও মারুতিকে আমরা দেখিওনি।
মিশ্রজি বললেন, আমি তো বলেছিলাম কয়েকজন ছেলেকে সঙ্গে দিচ্ছি। কিন্তু যেমন তোমরা শুনলে না তার ফল ভোগ করো এবার। বেশি লোকজন সঙ্গে থাকলে এই কাণ্ডটা হত না!
স্নেহাংশুবাবু বললেন, আর এখন এইসব বলে লাভ নেই। মিশ্রজি আমার ছেলেও বড় অবাধ্য। এত জেদ যে তা বলবার নয়। বুকের ভেতর একফোঁটা ভয়ডর নেই।
মিশ্রজি বললেন, তবু আপনি কিন্তু ঘাবড়াবেন না বাবু। আমার বেশ কিছু লোকজনকে আমি নজর রাখতে বলেছি ওইসব অঞ্চলে। যত দূরেই ওরা হোক না কেন, পুরী ছেড়ে পালাতে হচ্ছে না বাছাধনদের।
সরমা বললেন, কিন্তু যদি ওরা মেরেই ফেলে ছেলেটাকে?
শুনুন মা, শুধু শুধু খুনের ঝুঁকি গুন্ডাবদমাশরাও নেয় না। ওরা ওর কাছ থেকে ওদের জিনিস পেয়ে গেলেই ছেড়ে দেবে।
সাধনবাবু বললেন, আমিও আমার দু'জন ছেলেকে পাঠিয়েছি। ওদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে। তা ছাড়া এখানকার পুলিশও খুব একটা অলস নয়। মুখে ভান দেখায় যেন কোনও কিছু করবার অবকাশই নেই তাদের, কিন্তু ভেতরে ভেতরে দারুণ সক্রিয়।
সরমা বললেন, তাই যেন হয়। ছেলেটাকে যেন ওরা উদ্ধার করতে পারে। বাপি বলল, আসলে আমার মনে হয় ওরা ওকে ধরবার জন্য অনেকক্ষণ থেকেই ওত পেতে ছিল। হয়তো ভেবেছে ও বিজুদারই কেউ। হতে পারে।
এদিকে বিজুদা ঘরে ঢুকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পেলেন না সেই জিনিসটা, যেটা তিনি বিপদ বুঝে সব্যসাচীর কাছে গচ্ছিত রেখেছিলেন। তাই ম্লানমুখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, আচ্ছা বাপি, সেই মেয়েটাকে একবার ডাকিয়ে আনা যায় না?
কার কথা বলছেন?
ওই যে সেই মেয়েটা, যে কাল ওর সঙ্গে মোহানার দিকে গিয়েছিল।
বাপি বলল, জয়ার কথা বলছেন? ওই ওদিকে সামনের বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখুন, মেয়েটা আপনমনে কী যেন ভাবছে। বলেই একটা হাঁক দিল, জয়া! একবার এইদিকে আসবে?
জয়া বিষণ্ণ বদনে বাপির দিকে তাকিয়ে বলল, কেন?
বিজুদা একবার ডাকছেন তোমাকে।
জয়া এলে বিজুদা বললেন, জয়া, আমরা সবাই জানি সব্যসাচীর সঙ্গে তোমার একটা দারুণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাই জিজ্ঞেস করছি ও তোমার কাছে কোনও কিছু জমা রেখেছে কী? বা কোনও কিছুর ব্যাপারে কিছু কি বলেছে তোমায়?
বলেছে।
তুমি কি জানো সেটা কোথায় আছে?
জানি। ওর কাছেই আছে সেটা।
বিজুদা হতাশ হয়ে বললেন, সর্বনাশ হয়েছে তা হলে।
সরমা বললেন, আমার ছেলের জীবনের চেয়েও আপনার কাছে ওই জিনিসটার গুরুত্ব দেখছি খুব।
আমাকে ভুল বুঝবেন না প্লিজ, আমার কাছে দুটোরই গুরুত্ব অনেক।
তাই যদি হয়, তা হলে ওই মূল্যবান জিনিসটাকে নিয়ে অত ভোরে আপনি পথেই বা নেমেছিলেন কেন?
আসলে কলকাতা থেকে আমার পিছু নিয়ে ওরা যে এখান পর্যন্ত আসবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
জয়া বলল, এবার আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি কি? নিশ্চয়ই পারো।
সব্যসাচীর মুখে সকালের ঘটনাটা শুনে আমার যা মনে হয়েছে তা হল এই, ওই দুষ্কৃতীরা আপনার পূর্ব পরিচিত।
অবশ্যই।
শুধু তাই নয়, আপনার সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিল তাদের। তাও ঠিক।
আপনি তা হলে কে? আপনি তা হলে কী?
আমি আমিই।
না। নিশ্চয়ই ওই দলের লোকেদের সঙ্গে আপনার কোনও হিচ হওয়ায় আপনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন, অথবা কোনওকারণে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন ওদের সঙ্গে। তাই ওরা ছায়ার মতো অনুসরণ করছে আপনাকে। আসলে আপনি নিজেই একটি বাজে লোক। আপনার কুকর্মের জন্য একটি ছেলে এবং মেয়ের জীবন এখন বিপন্ন।
জয়ার মতো অল্পবয়সি একটি মেয়ের কাছে এইরকম জেরার মুখে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেন বিজুদা। তাই ওর কথার কী যে উত্তর দেবেন কিছু ভেবে পেলেন না। তবে তিনি চটলেন না, বা উত্তেজিতও হলেন না। শুধু হেসে বললেন, আমার সম্বন্ধে তুমি অনেক কিছুই ধারণা করেছ দেখছি।
সরমা বললেন, ওই একই ধারণা তো আমারও। ও যা বলল তার পরিষ্কার উত্তর আপনার কাছ থেকে আমরা প্রত্যেকেই আশা করছি।
বিজুদা বললেন, তা হলে শুনুন, ব্যাপারটা যখন থানা পুলিশের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁচেছে তখন কোনও রহস্যই আর গোপন থাকবে না। তবুও এখনই এই ব্যাপারে কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেন না বিষয়টি ক্রমশ প্রকাশ্য।
বিজুদার এই কথার উত্তরে কেউ কিছু না বললেও জয়া বলল, চালাকি করে আপনি কিন্তু পার পাবেন না। আপনার মুখোশ আমি খুলবই। বলে কারও দিকে না তাকিয়ে রাগি-রাগি মুখে নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে।
জয়ার তেজস্বিতায় হতবাক সকলেই।
বিজুদাও ওর ব্যবহারে এবং কথাবার্তায় একটু অপমান বোধ করলেও অন্তরের দৃঢ়তায় তা প্রকাশ করলেন না। অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে কারও সঙ্গে কোনও কথা না বলে, একবার নিজের ঘরে ঢুকে কী সব খুটখাট করে পোশাকটা পরিবর্তন করলেন। তারপর বারান্দায় এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে এক-পা এক-পা করে নেমে এলেন নীচে।
বিজুদার মা বারান্দার কাছে এসে ঝুঁকে পড়ে বললেন, এই অবেলায় কোথায় চললি বিজু ?
বিজুদা বললেন, তুমি আবার বেরিয়ে এলে কেন? ভেতরে যাও। আমার আসতে দেরি হবে।
সরমা তখন এতই রেগেছেন যে আস্তে করে বললেন, আর তুমি এসেছ! তবে পালিয়ে বাঁচবে না তুমি। আমি ঠিক গিয়ে পুলিশকে বলব সব কথা। কী এমন জিনিস, যেটার জন্য এত?
হঠাৎ একটি পুলিশের গাড়ি এসে থামল হলিডে হোমের সামনে। একজন সাব ইনস্পেক্টর ওপরে উঠে এসে স্নেহাংশুবাবুকে বলেন, আপনাকে এখুনি একবার থানায় আসতে হবে স্যার।
স্নেহাংশুবাবু আশান্বিত হয়ে বললেন, কোনও খবরটবর?
ইনস্পেক্টর সরমার দিকে একবার তাকিয়ে স্নেহাংশুবাবুকে বললেন, নীচে আসুন, বলছি।
স্নেহাংশুবাবুর বুক কাঁপতে লাগল।
সরমা বললেন, ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? যা বলার আমাকেও বলুন। ইনস্পেক্টর সে কথায় কান না দিয়ে চাপা গলায় স্নেহাংশুবাবুকে কী যেন বললেন ফিস ফিস করে। তারপর দু'জনেই গাড়িতে উঠে বসলেন।
সরমা একবার সব্যসাচী বলে অস্ফুট আর্তনাদ করে বারান্দাতেই জ্ঞান হারালেন। কী যে হল ব্যাপারটা কেউ কিছু বুঝতেও পারল না।
কৈশোর আর যৌবনের এই যে সন্ধিক্ষণ, এই বয়সটাই কিন্তু মারাত্মক। এই বয়সটায় মন চঞ্চল হয়। রক্তে উত্তেজনা থাকে। তার ওপর একটু যদি জেদি হয়তো কথাই নেই।
সব্যসাচীর এই ব্যাপারটায় জয়ার মন এমনভাবে তোলপাড় করছিল যে, তা বলবার নয়। বিশেষ করে বিজুদাকে কতকগুলো অপ্রিয় কথা বলে এসে মন ওর আরও বেশি উত্তাল হয়ে উঠল। সে ঠিক করল কেউ কিছু করুক-না করুক সে নিজেই খুঁজে বার করবে সব্যসাচীকে। কিন্তু কীভাবে?
বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রসাধন করতে করতেই মনস্থির করল জয়া। বাড়ির সবাই সি-বিচে বেড়াতে যাচ্ছে।
জয়া বলল, আজ আর আমি কোথাও যাব না। শুধু ছাদে বসে সমুদ্র দেখব। তোমরা যাও।
মামি বলেন, ঘরের চাবিটা তা হলে রাখ তোর কাছে?
না না। ও তোমরা নিয়ে যাও। আমি কোথায় হারিয়ে ফেলব তার ঠিক কী? তা ছাড়া এখন ভাল লাগছে না, একটু পরে যদি মন চায় তো যেতেও পারি। মামা বললেন, তা হলে ঘরে থেকেই বা করবিটা কী? সবাই যেমন একসঙ্গে যাই তেমনিই যাই চল।
না মামা, আমার কিছু ভাল লাগছে না। তা ছাড়া আমার যেন কেমন ভয় করছে।
তা হলে থাক। দেখিস যেন অন্য কোনও মতলব করিস না।
মামা, মামি, দিদিমা সবাই চলে গেলে জয়া ধীরে ধীরে নীচে নামল। প্রচণ্ড জেদের কাছে ওর ভয়ভীতি সবকিছুই হার মেনেছে। সূর্য অস্ত যেতে এখনও অনেক দেরি। ও ঠিক করল এই সুযোগে ও একাই চেষ্টা করবে সব্যসাচীকে খুঁজে বার করতে। এই তদন্তের কাজ শুরু করবে সেই মোহানার দিক থেকে। জয়া তৈরিই ছিল।
সবাই চলে গেলে ও ধীরে ধীরে পথে নামল। তারপর আপন মনেই এগিয়ে চলল মোহানার দিকে।
সমুদ্রের গা বেয়ে দীর্ঘ পথ চলে গেছে সেই পাখাগুলো পার হয়ে দূরে বহুদূরে। সেইপথে ও খানিক যেতেই দেখল এক জায়গায় দুটি ছেলে নতুন একটি সাইকেল রেখে একপাশে বালিয়াড়িতে বসে কীসব গল্প করছে।
জয়া মতলব একটা এঁটে সেই ছেলেগুলোর পাশ দিয়ে একবার সমুদ্রে নামল। তারপর পায়ের পাতাদুটি ভিজিয়ে বালিতে পা ঘষে উঠে এল ওপরে। এদিক সেদিক ঘুরল।
অল্পবয়সি ছেলেদুটি এই নির্জন সৈকতে এমন একটি ফুটফুটে কিশোরীকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই চোখ মেলে তাকাল তার দিকে। হয়তো বা ভালও লাগল ওকে।
জয়াও ওদের দিকে তাকাল। তাকিয়ে হাসল একটু।
ছেলেদুটিরও অল্প বয়স। তাই জয়ার সৌজন্যতায় অভিভূত হল। একটি ছেলে খুব ভদ্রভাবেই বলল, তুমি একা কেন? তোমার সঙ্গে আর কেউ নেই?
জয়া হেসে বলল, কে বললে আমি একা? আমার দুই বন্ধুও তো আছে এখানে।
কোথায় তারা?
এই তো আমার সামনেই বসে আছে। আমার সঙ্গে কথা বলছে। ছেলেদুটি আরও খুশি হল, তুমি খুব ভদ্র মেয়ে তো। কোনও মেয়ের কাছ থেকে এমন মার্জিত ব্যবহার আমরা কখনও পাইনি। কোথায় উঠেছ তুমি? জয়া একটা বাড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওই যে, ওই বাড়িটাতে ওরে ব্বাবা। ওদের তো গলাকাটা রেট। তা পুরীতে এত জায়গা থাকতে ওখানে উঠলে কেন?
তা বলতে পারব না। আমার দিদি-জামাইবাবুর সঙ্গে এসেছি।
একজন বলল, বাদাম খাবে? যদি খাও তো নিয়ে আসি।
জয়া বলল, কোথায় কতদূরে আনতে যাবে?
ওই তো। ওই চা-দোকানটায় পাওয়া যায়।
যাও। তবে ভাই একটা কথা। তোমাদের এই সাইকেলটার ওপর আমার কিন্তু দারুণ লোভ। আসলে আমি সাইকেল ছাড়া একদম থাকতে পারি না। আর পুরীতে এসে ওই দূরে কত কী দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু যেতে পারছি না, তাই খুব মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
একটি ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, বেশ তো, এ আর এমন কথা কী? কোথায় কতদূরে যেতে চাও বলো, আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।
ডবল ক্যারি করতে পারবে?
আমরা তো দু'জনে একই সাইকেলে এসেছি।
তা হোক, আমি একা একটু চেপে দেখতে চাই। একা সাইকেলে বসে প্যাডেল করতে দারুণ ভাল লাগে আমার। যা তোমার ইচ্ছা।
তোমরা তা হলে বাদাম কিনে আনো, আমি ততক্ষণে একপাক একটু ঘুরে আসি।
একজন বাদাম কিনতে গেল।
অন্যজন জয়ার সঙ্গে এল পিচ রাস্তায়। এসে বলল, তুমি কিন্তু বেশিদূরে যেয়ো না। এক পাক ঘুরেই চলে এসো। তারপর আমি তোমাকে সাইকেলে চাপিয়ে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে গেলে আর তুমি ফিরতেই চাইবে না।
জয়া চোখদুটো বড় বড় করে বলল, সত্যি! বলেই সাইকেলে চেপে বসল। তারপর বলল, শোনো, আমার যদি ফিরে আসতে দেরি হয়, তা হলে কিন্তু আমার খোঁজ কোরো তোমরা।
দেরি হবে কেন? বেশিদূর যেয়ো না। ওই মুখ পর্যন্ত গিয়েই চলে এসো।
বলা যায় না, যদি কোনও বিপদে পড়ি।
এখানে কারও কোনও বিপদ হয় না। এ তোমাদের কলকাতা নয়। তুমি নির্ভয়ে যেতে পারো।
না। ওই মোহানার দিকটা খুব নির্জন তো।
তুমি মোহানায় গেছ? ওদিকে মোহানা আছে তুমি জানলে কী করে? নদীর ওপারে যে উঁচু বালিয়াড়িটা আছে ওখানটা কিন্তু ভীষণ নির্জন। তুমি তো সবই জান দেখছি।
তারও ওপারে যে ঝাউবন সেটা কিন্তু আরও রহস্যময়। ওদিকে খবরদার যেয়ো না। শোননি কাল ওখানে কী হয়েছে?
সেইজন্যই তো ওইদিকে যাচ্ছি। আমি চাই কারও কোনও হিম্মত থাকে তো আমার কিছু করুক।
শোনো, ওরকমটি কোরো না। প্লিজ, কী নাম তোমার?
আমার নাম মহিষাসুরমর্দিনী। ছাড়ো, পথ ছাড়ো। বলেই ছেলেটিকে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত সাইকেল নিয়ে উধাও হয়ে গেল জয়া।
ছেলেটি চেঁচাতে লাগল, এই শোনো— শোনো—।
ওর অপর বন্ধুটি ততক্ষণে বাদাম নিয়ে ফিরে এসেছে। বলল, ঘণ্টা? কী হল রে
হবে আর কী? দিব্যি মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আমার ঘণ্টায় বারোটা বাজিয়ে চলে গেল।
সে কী !
এ তো দেখছি আর এক ফুলনদেবী।
এখন তা হলে উপায়?
যেভাবেই হোক, মোহানা অব্দি যেতেই হবে আমাদের। বারোশো টাকার সাইকেল, এটাকে তো উদ্ধার করতেই হবে।
কিন্তু সে তো অনেক দূরের পথ।
তবুও যেতে হবে ভাই।
ওরা দ্রুত পা চালিয়ে মোহানার দিকে যেতে যেতেই একটা অটো দেখতে পেল।
জয়া তখন অনেক অনেক দূরে চলে গেছে।
ওরা অটোর চালককে বলল, শোনো ভাই, ওই যে মেয়েটা যাচ্ছে, তুমি যত শিগগির পারো আমাদের দু'জনকে ওর কাছে পৌঁছে দাও। একদম দেরি কোরো না।
চালক ওদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল, ওইসব ধান্দাবাজির কাজ আমি করি না ভাই। মতলবটা কী তোমাদের?
সে তুমি বুঝবে না। যা টাকা লাগে আমরা দেব।
তোমাদের মতন ফুটো ক্যাপ্তেন আমি অনেক দেখেছি। পঞ্চাশটি টাকা আগে বার করো, তারপর যাচ্ছি।
পঞ্চাশ টাকা আমরা এখনই কোথায় পাব? আমাদের বাড়ি চলো, আমরা ঠিক দেব। ওই মেয়েটা আমাদের সাইকেল নিয়ে পালাচ্ছে।
ওইসব মেয়েটেয়ের ঝামেলায় আমি নেই। তোমরা অন্য রাস্তা দেখো। না ।
হলে আমি পুলিশ ডাকব। ভাগো এখান থেকে।
ছেলেদুটি হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল অটো চলে গেল অন্যদিকে।
সূর্য তখন জলে নামলেও মেয়েটি একেবারেই ডুব।
ওরা দু'জনে জোরে জোরে পা চালিয়ে এগিয়ে চলল। পাখাগুলো যেখানে শেষ হয়েছে তার ওধারে আর পথ নেই। শুধু বালি বালি আর বালি। ওরা দেখল সেই বালির ওপর একটি পোস্টের গায়ে ওদের সাইকেলটা রয়েছে বটে, কিন্তু মেয়েটির কোনও চিহ্নও নেই।
তবুও ওরা মোহানার দিকে এগোল। খানিক যাবার পর এক জায়গায় বালির ওপর মেয়েটির সোনালি চটির একপাটি পড়ে থাকতে দেখল। আরও খানিকটা গিয়ে দেখতে পেল আর এক পাটি।
নদীর কাছে গিয়ে ওরা দেখল মোহানার নদী সমুদ্রের জোয়ারে ফুলছে। সে কী ভীষণ বেগ তার। জলও যে কত তা কে জানে? কিন্তু মেয়েটি! মেয়েটি কোথায় গেল? সে কী সত্যিই মেয়ে? না কোনও জাদুকরী? তা যদি না হয়, তা হলে এই ভয়ংকর নির্জনে সে অমন ভোজবাজির মতন অদৃশ্য হয় কী করে?
ঘণ্টার সঙ্গে ওঁর যে বন্ধুটি ছিল তার নাম কাঁসর। সে চিৎকার করে বলল, আরে ও চাঁদবদনি! তুমি যেখানেই থাক ফিরে এসো। আমাদের সাইকেল আমরা পেয়েছি। আমরা তোমাকে কিছুটি বলব না। তুমি না এলে আমরা কিন্তু বিপদে পড়ে যাব। তোমার সঙ্গে যদি কেউ আমাদের কথা বলতে দেখে থাকে তা হলে সে কিন্তু পুলিশের কাছে আমাদের নামই বলবে।
ঘণ্টা আর কাঁসর চেঁচিয়েই সারা হল। ওদের কথাতে সাড়াও দিল না কেউ, এলও না।
ওরা তখন ভয়ে ভয়ে পিছু হাঁটল।
যেতে যেতে ঘণ্টা বলল, ভয় তো অন্য কাউকে নয়, কাল করলাম অটো ডেকে।
কাঁসর বলল, এখন মানে মানে কেটে পড়ি চল।
ওরা খানিক এসেই অন্য পথ ধরে অন্য দিকে উধাও হয়ে গেল।
ওরা চলে যাবার পর একটি ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল জয়া। তারপর ওর চটিদুটো হাতে নিয়ে নদী পার হবার বৃথা চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে বালিয়াড়ির গা বেয়ে এগিয়ে চলল, নদীটা যেদিক থেকে বয়ে এসেছে সেইদিকে। খানিক যাওয়ার পর নদীটা যেখানে বাঁক নিয়েছে সেইখানে আসতেই দেখল কয়েকজন নিম্নশ্রেণীর মেয়েপুরুষ এক জায়গায় বসে জটলা করছে। একপাশে বাঁশের একটি খুঁটির সঙ্গে বাঁধা আছে ছোট্ট একটি পানসি। ও ধীরে ধীরে সেটার ওপর উঠে বাঁধনটা খুলে দিতেই পানসিটা স্রোতের বেগে ভেসে চলল তির তির করে। বেশিদূরে অবশ্য গেল না। খানিক গিয়ে পানসিটা একটু কাত হতেই ও লাফিয়ে পড়ে জলে। তারপর ভিজে সপ সপ করে হাঁটু জল পার হয়ে যখন ডাঙায় উঠল তখন মনে হল এ কী করল সে? এখানে সে কেন এল? সব্যসাচীর খোঁজে এইখানে আসার দরকারটাই বা ছিল কী তার? সে কী পাগল হয়ে গেছে? এখন এই অন্ধকারে সাপ-শেয়াল, নয়তো কোনও বন্যজন্তুর পেটে যেতে হবে তাকে। চারদিকে সামুদ্রিক বাতাসের দীর্ঘশ্বাস। ঘন ঝাউবনের কান্না। নিশাচর পাখিদের ডাক। শুধু অন্ধকার— অন্ধকার— আর অন্ধকার।
হঠাৎ সেই অন্ধকারে ঝাউবনের ভেতর থেকে কারা যেন বেরিয়ে এল এক এক করে।
ওরা এসে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল ওকে। একসঙ্গে অনেকগুলো টর্চের আলো ওর ওপরে পড়ল।
জয়া সভয়ে তাকাল তাদের মুখের দিকে। কিন্তু এই অন্ধকারে কারও মুখই ভাল করে দেখতে পেল না সে।
ওদের একজন জিজ্ঞেস করল, কে তুমি! এখানে কী জন্য এসেছ? জয়া বলল, আমি এখানে আত্মহত্যা করতে এসেছি।
আত্মহত্যা করতে? এতদূরে? কেন সমুদ্রে কী জলের অভাব ছিল?
না। যদি কেউ আমাকে উদ্ধার করে সেই ভয়ে আমি এইখানে চলে এসেছি। কিন্তু এখানে নদীতে ঝাঁপ দিয়েও মরণ হল না। ওপার থেকে একটা পানসি নিয়ে ভেবেছিলাম মাঝসমুদ্রে ভেসে যাব। কিন্তু ফল হল উলটো। পানসিটা ভেসে চলল অন্যদিকে।
তা তো যাবেই। এখন তো জোয়ারের সময়।
তাই আমি মনের দুঃখে নদীতে ঝাঁপ দিই। কিন্তু এমনই কপাল যে নদীতে জল বেশি নেই। তাই বেঁচে গেলাম।
জল আছে। তবে কিনা তুমি নিশ্চয়ই ডাঙার কাছে উলটে ছিলে। বলে জয়ার পোশাকে হাত দিয়ে বলল, আরে সত্যিই তো। তুমি তো দেখছি ভিজে গেছ।
এইবার ভারিক্কি চেহারার একজন এগিয়ে এসে বললেন, কিন্তু কেন তুমি আত্মহত্যা করতে চাও। এমন ফুটফুটে চেহারা তোমার। টাটকা ফুলের মতো মেয়ে তুমি। এ জীবন নষ্ট করবে কেন?
জয়া বলল, আমি জীবনে সুখী নই। আমার মা নেই, বাবা নেই। মামা-মামির কাছে মানুষ। তারা আমাকে দু'বেলা দু'মুঠো পেট ভরে খেতেও দেয় না। আমার লেখাপড়া ছাড়িয়ে দিয়েছে। এখন শুনছি একটা আধবুড়ো লোকের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে।
সঙ্গে সঙ্গে দলের একজন রুখে দাঁড়াল, নেভার। বলেই বলল, নিয়ে আসব ওর মামা-মামিকে?
কখনও না। এই দুনিয়ায় যারা পিতৃমাতৃহীন তাদের সবার জীবনেই এই একই নাটক। কতজনকে টেনে আনবে? আজ আমরাও যদি বাবা-মায়ের আশ্রয়ে থেকে সৎ শিক্ষা পেয়ে নিজেদের মানুষ করতে পারতাম তা হলে কী এই জীবন বেছে নিতে হত আমাদের? আমরা খুনি, আমরা ডাকাত, পুলিশের ভয়ে আমরা বনে-জঙ্গলে লুকিয়ে থাকি। এর মূলেও তো সেই একই ভবিতব্য। রাস্তার ছেলে আমরা, রাস্তায় মানুষ হয়েছি। বাবা-মা কে তাও জানি না। চোখেও দেখিনি তাদের।
মেয়েটাকে নিয়ে তা হলে কী করবে?
আর যাই করি মরতে ওকে দেব না।
কিন্তু ওকে রাখবে কোথায়?
এমন সময় টর্চের আলো ফেলে দু’জন লোক সেখানে এসেই জয়াকে দেখে চমকে উঠল, এ কী! তুমি এখানে?
জয়া কিন্তু চিনতে পারল না তাদের। বলল, আপনারা?
তুমি আমাদের চিনবে না। তোমার নাম তো জয়া? ঠিকই বলেছেন আপনি।
তুমি এখানে কী করতে এসেছ? কে পাঠিয়েছে তোমাকে? সঙ্গে আর কে আছে?
ভারিক্কি চেহারা বললেন, রঘু! তুমি একে চেন? মেয়েটা এখানে আত্মহত্যা করতে এসেছিল।
বাজে কথা। ও যা বলবে তাই বিশ্বাস করতে হবে নাকি? বলেই বলল, পুলিশকে তোমরা কী বলেছ আমাদের নামে?
আপনাদের তো চিনিই না। কাজেই বলবটা কী?
সেই ছোকরাকে তো চেন? সে নিশ্চয়ই বলেছে? বলো হ্যা কি না? জয়া বলল, বুঝেছি। সব্যসাচী তা হলে আপনাদের কথাই বলছিল কাল। সেই রহস্যময় দু'জন।
কিন্তু তুমি এখানে কেন?
আমি সব্যসাচীর খোঁজে এসেছি। বলুন তাকে আপনারা কোথায় লুকিয়েছেন?
ভারিক্কি চেহারা দারুণ রেগে বললেন, ওরে শয়তান মেয়ে। তুমি তা হলে স্পাইগিরি করতে এসেছ এখানে? এই কে আছিস, এখুনি এই বালির মধ্যে দশ হাত গর্ত খুঁড়ে পুঁতে ফ্যাল মেয়েটাকে।
হঠাৎ কোথা থেকে একটা গুলির শব্দ হতেই একজন লোক বুকে হাত চেপে লুটিয়ে পড়ল সেখানে। মুহূর্তের মধ্যে সব ফাঁকা। জয়াও সেই সুযোগে দৌড় দিল গভীর জঙ্গলের দিকে।
ছুট— ছুট— ছুট।
ছুটতে ছুটতে এক জায়গায় বালিতে পা হড়কে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল জয়া। তারপরই যা দেখল তা দেখেই মূর্ছা গেল সে। জয়া দেখল বালির স্তূপের মধ্য থেকে ধড়হীন একটা মুণ্ড উঁকি মারছে। কী করুণ সেই মুখ। মুখটা ভাবলেশহীন চোখে ওর দিকে তাকিয়ে একবার শুধু বলল, জল। একটু জল।
কিছুক্ষণ আচ্ছন্নর মধ্যে থাকার পর আবার যখন সংবিৎ ফিরে পেল জয়া,
লোকটি তখনও বলছে, জল। আমাকে একটু জল দেবে? বড্ড তেষ্টা। জয়া প্রথমে খুব ভয় পেল। লোকটাকে ভূত ভেবে শিউরে উঠল সে। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, কে আপনি?
আমি জয়শংকর প্রসাদ। আমাকে তুমি উদ্ধার করো। ওরা আমাকে হাত-পা বেঁধে বালির সঙ্গে পুঁতে রেখেছে।
জয়া হাতের কাছে যা পেল তাই দিয়েই বালি সরাতে লাগল। তারপর একসময় যখন টেনেহিঁচড়ে উদ্ধার করল তাকে তখন দেখল, পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের এক রূপবান যুবক সে।
জয়শংকর জয়াকে আদর করে বলল, আজ থেকে তুমি আমার ছোট বোন। কী নাম তোমার?
আমার নাম জয়া।
তবে তো ভালই হল। জয়া আর জয়শংকর। কী চমৎকার নামের মিল দেখেছ? কিন্তু এই অন্ধকারে তুমি এখানে কীভাবে এলে? ওরা কি তোমাকে চুরি করে এনেছিল?
জয়া বলল, আমার কথা পরে বলব আপনাকে। আপনার তো খুব জল তেষ্টা পেয়েছে। এখন চলুন কোথাও যদি একটু জল পাই তো দেখি।
জয়শংকর জয়াকে অবলম্বন করে ধীরে ধীরে যেদিকে দু'চোখ যায় সেদিকে এগিয়ে চলল।
একটু পরেই একদল পুলিশ এসে তোলপাড় করতে লাগল চারদিক। তাদের সঙ্গে সেই কাঁসর-ঘণ্টাও ছিল। তারাই পুলিশে খবর দিয়ে ডাকিয়ে এনেছে পুলিশকে।
পুলিশ অফিসার সঙ্গের কনস্টেবলদের বললেন, আর খুঁজে লাভ নেই। আপাতত ডেড বডিটাকে মর্গে পাঠাও। কাল সকালে এসে দিনের আলোয় আর একবার দেখা যাবে।
হঠাৎ একজন কনস্টেবল ছুটে এসে বলল, ওই দেখুন স্যার, ওখানকার বালিটা কীরকম খাবলানো। তার মানে ওখানে নিশ্চয়ই কিছু লুকনো ছিল।
সেই যে সেই ছেলেটা, কী যেন নাম? পার্থ না কী? ওর মামার ডেড বডিও থাকতে পারে। শেয়াল-কুকুরে টেনে তুলেছে হয়তো।
একবার একটু দেখব নাকি স্যার?
কোনও লাভ নেই। তবু বলছ যখন দেখো।
কয়েকজন কনস্টেবল টর্চের আলোয় চারদিক দেখে বলল, নাঃ। কিছুই পাওয়া গেল না এখানে।
তা হলে আর সময় নষ্ট না করে ফিরে চলো।
সবাই চলে গেলে জায়গাটা কেমন যেন এক শূন্যতায় ভরে উঠল। একটা শেয়াল গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে এমন একটা হাঁক দিল যে একসঙ্গে অনেকগুলো শেয়াল ডেকে উঠল একজোটে, হু-হু-হুক্কা-হুয়া-হুয়া-হুয়া-হুয়া। সেইসঙ্গে তীব্র থেকে তীব্রতর হল সমুদ্রের ডাক। ওঃ সে কী গর্জন। যেন কান পাতাও দায়।
এবারে সব্যসাচীর কথায় আসা যাক। বেচারি সব্যসাচী। বাপিকে জয়ার মান ভাঙাবার জন্য ভেতরে পাঠিয়ে মন্দিরের বাইরে গিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। হঠাৎ মনে হল পেছন দিক থেকে কে যেন মুখে একটা রুমাল চাপা দিয়ে টেনে নিল ওকে। তারপর চোখের সামনে সবই যেন অন্ধকার।
না। ক্লোরোফর্ম বা ওই জাতীয় কোনও রাসায়নিকের প্রভাবে ও চোখে অন্ধকার দেখেনি। আসলে কালো কাপড় দিয়ে ওরা ওর মুখ ঢেকে দিয়েছিল। আর সেই রুমালের মিষ্টি গন্ধ নাকে যেতেই নিশ্বাস বন্ধ করেছিল সে। গোয়েন্দা গল্প পড়ে পড়ে ওর ভেতরটা এমনই তৈরি ছিল যে ও জানত এই অবস্থায় কী করতে হয়। পাণ্ডব গোয়েন্দার বাবলু বিলু ভোম্বল কিংবা বাচ্চু বিচ্ছু অথবা সোনার গণপতি হিরের চোখের বিল্টু তিন্নি শুভঙ্কর মউ ওর আদর্শ হয়ে উঠেছে।
তাই দম বন্ধ করে দু’-একবার ছটফট করার ভান করে স্থির হয়ে রইল।
ওরা ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে চলল কোথায় যেন। মন্দিরের পেছন দিকের একটা মাঠে সকালের সেই মারুতিটা রাখা ছিল। ওরা তাইতে করে নিয়ে চলল ওকে।
সব্যসাচীর প্যান্টের পকেটে তখনও ছিল সেই মূল্যবান জিনিসটা। ও ভাবল, এবার নিশ্চয়ই ওরা সার্চ করে কেড়ে নেবে জিনিসটা। কিন্তু সেটা যে ওর কাছেই আছে তা কি জানতে পেরেছে ওরা?
কিন্তু না। ওরা কিছুই করল না ওর।
সব্যসাচী সজ্ঞানে থেকেও অজ্ঞান হওয়ার ভান করে শুনতে লাগল ওদের কথাবার্তা।
মারুরিতে দু’জন ছিল। একজন বলল, তোমরা কি ভুলের পর ভুল করে যাবে? আমি বারবার বলেছিলাম এটাকে স্টেটের বাইরে পাচার করে দাও, কিন্তু শুনলে না। এখন—।
এখন কী? পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে এই গাড়ি নিয়ে উধাও হয়ে যাব, পুলিশও টেরও পাবে না।
ওইরকম চালাকি করতে গেলে ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকতে হয়। কিন্তু এইসব ফাঁকা জায়গায় বিপদের সম্ভাবনা যে কত তা কি তোমাদের বুঝিয়ে বলতে হবে?
সেটা অবশ্য ঠিক। এখন ছেলেটাকে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়েই এটাকে একটা ট্রাকে উঠিয়ে ঢাকাঢুকি দিয়ে পাচার করা হবে।
কিন্তু ছেলেটাকে কিডন্যাপ করার আদৌ কি কোনও প্রয়োজন ছিল?
না। তবে যে মুহূর্তে শুনতে পেলাম ছেলেটি এইদিকে এসেছে তখনই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।
তার মানে পুলিশ এবং তদন্তকারী গোয়েন্দাদের ঢাকঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দেওয়া হল যে আমরা এই অঞ্চলেরই আশপাশে আছি।
এছাড়া কোনও উপায় ছিল না।
কেন, আসল মালটিকে ধরে আনলে ক্ষতিটা কী ছিল?
ক্ষতি ছিল বইকী। তার কাছ থেকে ওই জিনিসটা কি উদ্ধার হত তা হলে? এখন এই ছেলেমেয়েদুটোকে আটকে রেখে ওকে বাধ্য করাব জিনিসটা আমাদের হাতে তুলে দিতে।
প্রথম লোকটি এবার দারুণ রেগে বলল, তা হলে কেন ওই দুর্ঘটনা ঘটালে। লোকটা যদি মরেই যেত?
আপদ চুকে যেত তা হলে।
ও। লোকটা মরে গেলে জিনিসটার পা গজাত আর সেটা হেঁটে এসে আমাদের পকেটে ঢুকত, তাই না?
দ্বিতীয় লোকটি এ কথার কোনও উত্তর দিল না। গাড়ি এসে থামল একটা বনময় প্রান্তরে।
গাড়িতে দু'জনই মাত্র লোক ছিল। একজন ছিল চালকের আসনে, আর একজন সব্যসাচীর কাছে। ওরা গাড়ি থেকে নেমে ছোট্ট একটি টিলার পাশ দিয়ে ওকে কাঁধে নিয়ে এগিয়ে চলল। তারপর একটি পুরনো ধরনের বাড়ির কাছে এসে থামল।
ভেতর থেকে কে যেন একজন বেরিয়ে এসে বলল, এটা আবার কে? সম্ভবত বিজুর ভাইপোটাইপো কেউ হবে।
সবই তা হলে আন্দাজের ওপর চলছে? এদিকের খবর জানো তো, বীর সিং শ্যামাকে জ্যান্ত কবর দিয়েছে।
ওর অপরাধ?
সামান্য একটু ভুল। তদন্তকারী অফিসার মি. ভারতীর ছেলে শুভমের বদলে অন্য একটি ছেলেকে ধরে এনে সমস্ত পরিকল্পনাকে ভেস্তে দেওয়ার ফল। শ্যামা নেই!
না। তার চেয়েও মারাত্মক খবর, বীরাপ্পানের দল আইনজীবী জয়শংকরপ্রসাদকে কিডন্যাপ করেছে এবং পুলিশের সন্দেহ ওটা আমাদেরই কাজ।
সেই মেয়েটা এখন কোথায়?
ওকে এখানেই রাখা হয়েছে।
ছেলেটাকে তা হলে কী করব?
আপাতত জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত এইখানেই রাখো, দিনের বেলা কিছু করতে যেয়ো না। রাত্রিবেলা ওর পরিচয় জেনে ছেড়ে দিয়ে এসো দূরে কোথাও।
সব্যসাচী কানখাড়া করে শুনল সব। ওর অভিনয়ে কেউ জানতেও পারল না ও সচেতন আছে বলে। ওরা ওকে নীচের তলার একটি ঘরে তক্তাপোশের বিছানায় শুইয়ে মুখের ঢাকা সরিয়ে যেমন এসেছিল তেমনি চলে গেল। অবশ্য যাবার আগে দরজায় শিকল দিয়ে যেতে ভুলল না।
ওরা চলে যেতেই উঠে বসল সব্যসাচী। যা ভেবেছে তাই। তক্তাপোশেই একপাশে শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে লিপি। মেয়েটা কেমন বিশ্রীরকমের বেঁকে কাত হয়ে শুয়ে আছে। দেখে মনে হয় ওষুধের প্রভাবে আচ্ছন্ন ভাবটা হয়তো একবার কেটেছিল, পরে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে।
সব্যসাচী উঠে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করে দেখতে লাগল এখান দিয়ে পালাবার কোনও পথ পায় কি না। কিন্তু না। এই ঘরটি এতই ছোট যে, এই ঘরে দেওয়াল ছাড়া কিছু নেই।
একটা আলোবাতাস আসার মতন ব্যবস্থা আছে। দেওয়ালের উপরিভাগে মোটা মোটা লোহার রড দিয়ে ভেন্টিলেটারের মতো করা। তাতে পাল্লা নেই। কিন্তু সেটা এমনই উঁচুতে যে সব্যসাচী চেষ্টা করেও তার নাগাল পেল না। তাই প্রাকৃতিক অবস্থান চোখে না দেখেও অনুমান করা গেল। অর্থাৎ ঘরটা নীচের তলায় হলেও ঠিক আন্ডারগ্রাউন্ডে নয়। জায়গাটা উঁচুনিচু হওয়ার জন্য সামনের দিক থেকে যেটা একতলা বলে মনে হয় আসলে সেটাই দোতলা। এটা হল নীচের তলায়। বাড়িটা বহু পুরনো। এককালে হয়তো কোনও বড়লোকের বাগানবাড়ি ছিল। এই ঘরটা এত ছোট যে এখানে হয়তো ঘুঁটেকয়লা ইত্যাদি রাখা হত। কিন্তু মুশকিল যেটা, সেটা হল, ওই একটি মাত্র দরজাকে ভেঙে না বেরোতে পারলে এখান থেকে পালানো অসম্ভব।
সব্যসাচী অকারণেই ঘরময় পায়চারি করল। একপাশে ছোট একটি টি-টেবিলে কয়েকটা মাখনটোস্ট রাখা ছিল। আর ছিল এক কলসি জল। লিপির জন্যই রেখেছিল নিশ্চয়ই। ও খায়নি। ওষুধের প্রভাবে ও এখনও আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
বেল৷ তো এখন অনেক হয়েছে। ওরা কি ওর জন্যও কিছু আনবে না? খিদেও পেয়েছে ওর। কলসিটা তুলে দেখল জল বেশ ভরতি আছে। ও দ্বিধা না করে দুটো টোস্ট চিবিয়ে খেয়ে ঢক ঢক করে জল খেল এক গেলাস। তারপর পকেটের জিনিসটা বার করে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল সেটাকে। কী এটা? কী আছে এর ভেতরে? বিজুদা কেন এটাকে লুকিয়ে রাখছেন। ওই দলের সঙ্গে কী সম্পর্ক বিজুদার? দুর্ঘটনায় বিজুদার আঘাত কতটা মারাত্মক? জয়া আর বাপিদা কি ওর খোঁজ করছে? নাকি ফিরে গিয়ে খবর দিয়েছে ওর বাবা-মাকে? কিছুই ভেবে পেল না সব্যসাচী।
দরজার পাল্লার কাঠ পুরনো। তবে বেশ মজবুত। ও দু’-একবার টেনে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু না। ওদিক থেকে শিকল থাকার জন্য একটুও ফাঁক করতে পারল না।
ও আবার লিপির কাছে এল। ওকে একটু টেনে ধরে সোজা করে শুইয়ে দিল। কী জ্বালা। মেয়েটা যদি সজ্ঞানে থাকত, তা হলেও ওর সঙ্গে কথা বলে সময় কাটত। কিন্তু এমনই আচ্ছন্ন যে—।
হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেহটাকে টান করে পাশ ফিরে শুল লিপি। সব্যসাচী ওর মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ে আস্তে করে ডাকল, লিপি! লিপি! তন্দ্রার ঘোরেই লিপি একবার সাড়া দিল, উঁ।
একবার উঠে বসো। চেয়ে দেখো আমি কে? আমি সব্যসাচী। লিপি অবচেতন মনেই একটু হেসে আবার ঘুমোতে লাগল।
সব্যসাচী ওর হাতদুটো নিয়ে নাড়াচাড়া করল একটু। চোখ টেনে দেখল। কপালের ওপর হাত বুলিয়ে অবিন্যস্ত চুলগুলো ঠিক করে দিল। তবুও লিপির ঘুম আর ভাঙে না। সত্যি, কারা পাপ করে, কারা শাস্তি পায়। হঠাৎ বাইরে কার যেন পায়ের শব্দ।
সব্যসাচী এক মুহূর্তও দেরি না করে তক্তপোশের বিছানায় দেহটা এলিয়ে দিয়ে ঘুমের ভান করল। কে যেন একজন এল। চোখটা বুজে থাকায় চেহারাটা দেখা গেল না। সে এসে ওদের গায়ের কাছে ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখল। অর্থাৎ ওরা সজ্ঞানে কি অজ্ঞানে দেখল তাই। তারপর টেবিলের ওপর কী সব নাড়াচাড়া করে আবার চলে গেল দরজায় শিকল দিয়ে।
সে চলে যেতেই সব্যসাচী উঠে বসল। তারপর টেবিলের কাছে গিয়ে দেখল দুটো প্লেটে ওদের দু'জনের জন্য সামান্য কিছু ভাত আর বেগুনপোড়া রেখে গেছে। রাগে সব্যসাচীর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, কচুপোড়া খাও অনামুখোরা।
হঠাৎ ওর কানে দূরাগত কিছু ঘণ্টার ধ্বনি ভেসে এল। তার মানে এই নির্জনে নিশ্চয়ই কোথাও কোনও আশ্রম অথবা দেবস্থান আছে।
সব্যসাচীর মাথায় এবার বুদ্ধি এল একটা। কলসি থেকে এক গেলাস জল নিয়ে একটু একটু করে ঝাপটা দিতে লাগল লিপির মুখে।
এই ওষুধেই কাজ হল। দু’-একবার জলের ঝাপটা দিতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে
বসল লিপি। কেমন যেন ভয়ার্ত স্বরে বলে উঠল, আমি কোথায়? তোমরা আমাকে কেন এখানে নিয়ে এসেছ? আমাকে ছেড়ে দাও। সব্যসাচী হঠাৎ ওর মুখ চেপে ধরে বলল, চু—উ—প।
এতক্ষণে ঘোর কাটল লিপির। চোখের সামনে সব্যসাচীকে দেখে সবিস্ময়ে বলল, সব্যসাচী তুমি! তুমি এখানে কেন? ওরা কী তোমাকেও ধরে এনেছে এখানে?
হ্যাঁ। তবে বলতে পারো আমি নিজেই ধরা দিয়েছি।
তুমি ধরা দিয়েছ?
ওরা তোমাকে গুম করল। তোমার কাকা, বিজুদাকে হত্যার চেষ্টা করল। আমি এই খবর হলিডে হোমে পৌঁছে দিলে তোমার বাবা-মা সবাই ছুটোছুটি করছেন। থানা-পুলিশ হচ্ছে। ইতিমধ্যে বাপিদা আর আমি তোমার খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। লোকনাথ মন্দিরের কাছে ওরা আমাকে আচমকা তুলে নিল। তারপর এইখানে এই ঘরে—।
লিপি এবার উঠে বসল।
সব্যসাচী বলল, শোনো, ওরা আমাদের দু'জনের জন্য সামান্য কিছু খাবার রেখে গেছে। আগে খেয়ে নিই এসো। পরে এখান থেকে পালাবার একটা মতলব করা যাবে।
কীভাবে কী করবে?
সেটা ঠিক করব পরে। আপাতত পেটায় নমো করা
যাক।
ওরা আর বাক্যব্যয় না করে বেগুনপোড়া দিয়ে মোটা চালের ভাত বেশ গোগ্রাসেই খেয়ে নিল। তারপর কলসির জলেই মুখহাত ধুয়ে সেই জল আকণ্ঠ পান করে তক্তপোশে এসে বসল দু'জনে।
সব্যসাচী বলল, দেখো লিপি, এই মুহূর্তে তোমার আমার দু'জনেরই জীবন বিপন্ন। কয়েকটি কথার তুমি ঠিক ঠিক উত্তর দাও। তুমি নেহাতই ছেলেমানুষ নও। আগে বলো কোন ক্লাসে পড় তুমি?
আমি ক্লাস নাইনে পড়ি।
এবার বলো তো, তোমার কাকা অর্থাৎ বিজুদা লোকটি কেমন? কী করেন? তাঁর সঙ্গে এই দলের এত বিরোধ কেন? তোমার কাকার দেওয়া একটা মূল্যবান জিনিস আমার কাছে এখনও আছে। এটার ব্যাপারে তুমি কী কিছু জান?
লিপি বলল, সব বলব তোমাকে। কিন্তু এত কাগুর পরও ওই জিনিসটা তোমার কাছ থেকে খোয়া যায়নি কী ভাগ্যিস।
আসলে ওদের কথাবার্তা শুনে আমার মনে হয়েছিল আমাদের দু'জনকে আটকে রেখে মুক্তিপণ হিসেবে ওই জিনিসটা ওরা তোমার কাকার কাছ থেকে আদায় করতে চায়।
সেজন্য তো আমাকে ওরা গুম করেছে। কিন্তু তোমাকে নিয়ে এল কেন?
হয়তো ওরা আমাকেও তোমাদের পরিবারের কেউ বলে মনে করেছিল। তা যাকগে, এখন আসল কথাটা বলো।
লিপি বলল, শোনো তবে, আমার কাকা বরাবরই একটু ডানপিটে এবং একরোখা ধরনের। বাবার মুখে শুনেছি কাকার মনের মধ্যে সবসময়ই কেমন যেন একটা বিদ্রোহী সত্তা কাজ করত। অন্যায় উনি কখনও বরদাস্ত করতেন না। এখনও করেন না। কারও মধ্যে কোনও বেয়াদপি দেখলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে পিটিয়ে ঠান্ডা করে দিতেন। আসলে কাকার চেহারাটাও তো ভারিক্কি।
সব্যসাচী বলল, বিশেষ করে চাপ দাড়ির আড়ালে ওনাকে অত্যন্ত কঠিন পুরুষ বলেই মনে হয়।
অথচ ভেতরে উনি শিশুর মতো সরল।
এই ধরনের লোকেরা এইরকমই হয়।
তবে কাকার একটা ব্যাপারে আমি কিন্তু অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। কোন ব্যাপারে?
কাকা বরাবরই লেখাপড়ায় খুব ভাল। আমার কাকা ইংলিশে অনার্স এবং একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট।
বলো কী!
হ্যাঁ। সত্যিই উনি একজন আদর্শবাদী যুবক। বিয়ে করেননি। আমাকেও অত্যন্ত ভালবাসেন। বলতে গেলে ওই কাকার আদরেই আমি মানুষ। তা কাকা একসময় যে দলের সঙ্গে মিশতেন সেটা একটা রাজনৈতিক দল। সেই দলের জন্য উনি নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু পরে যখন বুঝলেন দল বিভ্রান্ত এবং নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে এমন কোনও জঘন্য কাজ নেই, যা তারা করতে পারে না, তখনই উনি সতর্ক হন এবং ওদের এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। কাকা আমার কাছে এক বিস্ময়। একজন ব্যাড টেম্পারমেন্টের মানুষ লেখাপড়ায় কী করে যে এত ভাল হয়, তা আমার ধারণারও বাইরে।
তারপরে বলো।
এইবারে যা বলব সেটা তুমি মন দিয়ে শোনো। তোমার কি মনে আছে বেশ কিছুদিন আগে রামেরাম আগরওয়ালা নামে কলকাতার একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি খুন হন?
হতে পারে। আমার মনে নেই।
ওই দলটি এই শিল্পপতিকে নানাভাবে ব্ল্যাকমেল করে। ইতিপূর্বে নিজের ব্যবসার সুরক্ষার খাতিরে মাঝেমধ্যেই প্রচুর টাকা ডোনেশান হিসেবে ওই দলটির হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি। পরে বিরক্ত হয়ে তিনিও হাত গুটিয়ে নেন। ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার কাকার যোগাযোগ ছিল। কাকা রামেরামবাবুর ব্যবসার কাগজপত্তর দেখতেন। ইনকাম ট্যাক্সের হিসেব রাখতেন। আর এই দলকে কীভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায় সে সম্পর্কেও পরামর্শ দিতেন। ইতিমধ্যে ওই দলের পাণ্ডারা আমার কাকাকে বেশ কয়েকবার হুমকি দিয়েছে। আর ওই ব্যবসায়ীকেও শাসিয়েছে তাদের সঙ্গে অসহযোগিতা করলে পরিণাম ভাল হবে না বলে। হলও তাই।
উঃ কী সাংঘাতিক।
আমার কাকা ওদের চেয়েও সাংঘাতিক। তাঁর বুদ্ধির চালে ফেঁসে গেল ওরা। দলের যারা রাঘববোয়াল তারা বুদ্ধি করে কোনওরকমে টিকে থাকলেও ছুটকোছাটকারা গা ঢাকা দিল। কাকা বুদ্ধি করে ওই ব্যবসায়ীকে সবসময় তাঁর ঘরে আসা-যাওয়া করত যারা তাদের কথাবার্তা টেপ করে রাখার পরামর্শ দিতেন। ফলে যে যখন যা বলে হুমকি দিত সবই ধরা আছে তাতে। বিশেষ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত এমন কিছু মানুষের কথাবার্তা টেপ করা আছে যা প্রকাশ হলে অনেকেরই মুখোশ এমনভাবে খুলে যাবে যে কেলেঙ্কারি রাখবার জায়গা থাকবে না। সেইসব টেপের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো অবশ্য আর একটি ক্যাসেটে বন্দি হয়ে আমার কাকার কাছে আছে। এবং সেই ক্যাসেটই এখন তোমার কাছে রয়েছে। ওই ক্যাসেট আদালতে পেশ করলে কী হবে আর কী যে হবে না তা কল্পনাও করা যাবে না। বিশেষ করে ওই ক্যাসেটে রামেরামজির মৃত্যুকালীন জবানবন্দিও ধরা আছে। দুষ্কৃতীরা সেদিন রাতে যখন তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে আসে, তখনই উনি তাদের চিনতে পারেন এবং টেপ চালিয়ে কয়েকজনের নাম ধরে চেঁচান। ওরা তাঁকে গুলি করে পালায়। আর রামেরামজি তাঁর শেষ কথাগুলো টেপ করে রাখেন। ঘটনাক্রমে আমার কাকা সে রাতে সেখানে গিয়ে পড়লে সেই ক্যাসেটটি তিনি উদ্ধার করেন। ইতিমধ্যে ওই ব্যবসায়ীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে দু'জন জেল পলাতক। এরাও আবার এদেরই আর একটি বিরুদ্ধ দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
সব্যসাচী সবিস্ময়ে বলল, এ যে দেখছি রীতিমতো গোয়েন্দা গল্পের প্লট।
ইতিমধ্যে ওই মামলার তদন্তকারী ইনস্পেক্টর মি. ভাগবকে ওরা টাকা দিয়ে কেনবার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি ওদের টোপ গেলেন না। ওই মামলার প্রখ্যাত আইনজীবী জয়শংকরপ্রসাদও ওদের আক্রমণের বলি হন। সম্প্রতি এই জয়শংকরের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
স্ট্রেঞ্জ। কিন্তু একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না এই পুরীতে কলকাতার ওই হত্যাকাণ্ড বা তার পরবর্তী ঘটনাবলীর বদলাবদলির ব্যাপারস্যাপারগুলো এমন নাটকীয়ভাবে ঘটছে কী করে?
আসলে ওই ব্যবসায়ী রামেরাম আগরওয়ালার একটি হোটেল আছে রাজধানী ভুবনেশ্বরে। সেইটার ব্যাপারেও কিছু কাজ ছিল। সম্বলপুরের কাছে টিটলাগড় এবং বেরহামপুরের কাছে পলাশাতেও তদন্তের ব্যাপার ছিল একটু। আমাদের পুরী আসার আর এক কারণ ছিল আমার কাকার এই ব্যাপারে কিছু তদন্ত এবং খাতাপত্তরের কাজ করা। সেই তদন্তকারী ইনস্পেক্টর মি. ভার্গবও তাঁর ছেলেবউ নিয়ে এখানে এসেছেন। এসেছিলেন জয়শংকরপ্রসাদ। তবে ভুবনেশ্বরে না থেকে তাঁদের কাজকর্ম এই পুরীতে বসেই করতে চেয়েছিলেন। আমাদের এই হলিডে হোমে থাকার মেয়াদ শেষ হলে আমরা অন্যত্র চলে যেতাম। সেই মর্মে ঘরও বুক করা আছে।
সব্যসাচী ওর পকেট থেকে চামড়ার খাপে মোড়া বস্তুটা বের করে বলল, বুঝেছি। এই তা হলে সেই ক্যাসেট, যার জন্য এত। ভগবান রক্ষে যে এতকাণ্ডতেও হাতছাড়া হয়নি জিনিসটা।
এখন আমাদের চেষ্টা করতে হবে এটা যেন কোনওরকমেই হাত ছাড়া না হয়। সব্যসাচী বলল, তোমার মুখে সব শুনে আমার ভুল ধারণাটা ভাঙল। আমি কিন্তু তোমার কাকাকে অন্যরকম ভেবেছিলাম।
স্বাভাবিক। কিন্তু সব্যসাচী, এখন আমাদের এখান থেকে পালাবার কী হবে? সব্যসাচী বলল, আক্রমণ। আক্রমণ ছাড়া পথ নেই।
কীভাবে আক্রমণ করবে? কাকে করবে?
যে লোকটা আমাদের খাবার দিতে আসবে তাকে। ওই লোককে কবজা করতে না পারলে এখান থেকে আমাদের পালানো অসম্ভব।
আমরা কি পারব ওকে কবজা করতে?
পারতেই হবে। একাজে আশাকরি সফল হব আমরা। কেন না লোকটা একাই আসে এবং দু'হাতে খাবার নিয়ে। ও যখন ঘরে ঢুকবে তখন ওর দু’হাতে থাকবে খাবার। আমরা শিকল খোলার শব্দ পেলেই দু'জনে দরজার দু'পাশে লুকিয়ে পড়ব। তারপর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ঘাড়ে।
লিপির মুখে হাসি ফুটল এবার।
সব্যসাচী বলল, আর দু'চার ঘণ্টা। বেলা গড়িয়ে আসছে। সন্ধেবেলা কিংবা সন্ধের পর রাতের খাবার নিয়ে আসবে ও। তখনই পালাব আমরা।
তুমি পথ চেন? কোথায় কোনদিকে যাব কিছু ঠিক করতে পারবে?
এই ঘরের বাইরে যদি একবার যেতে পারি তা হলে আর আমাদের ধরে কে? কিন্তু মুশকিল হল আমরা কোথায় আছি কীভাবে আছি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি যদি হেঁট হই তুমি আমার কাঁধে পা দিয়ে উঠে বাইরেটা একবার দেখে নিতে পারবে?
লিপি বলল, যদি পড়ে যাই? তার চেয়ে তুমি বরং আমার কাঁধে ওঠো। সব্যসাচী বলল, আমার ভার তুমি রাখতেই পারবে না। যদি তোমাকে সামান্য একটু চাগিয়ে ধরি?
তা হলে অবশ্য হতে পারে।
বলেই কী মনে হতে সব্যসাচী বলল, দাঁড়াও, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। এই টি-টেবিলটাকে কাজে লাগানো যাক। বলে টেবিলটাকে টেনে আনল সব্যসাচী। কিন্তু না। তাতে উঠেও কোনও লাভ হল না। ওপরের ফাঁকটা তখনও নাগালের বাইরে।
লিপি বলল, তুমি আমাকে একটু তুলে ধরো। তা হলেই বাইরেটা দেখতে পাব আমি।
সব্যসাচী তাই করল। লিপিকে একটু তুলে ধরতেই লোহার রডগুলো ধরে ওর কাঁধে ভর করে উঠে দাঁড়াল লিপি। তারপর বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, কী নির্জন। চারদিকে বন-জঙ্গল। আর বালির পাহাড়। সমুদ্র নেই?
না। সমুদ্র তো দেখতে পাচ্ছি না।
এবার তা হলে নেমে এসো।
লিপি নামলে সব্যসাচী বলল, তুমি কি পারবে একটু কষ্ট করে আমাকে একবার তুলে ধরতে?
এ আর এমন কী? খুব পারব।
সত্যিই পারল। ছিপছিপে চেহারা হলে কী হবে। শরীরে শক্তি রাখে বেশ। সব্যসাচীকে ধরে সামান্য একটু চাগিয়ে তুললেই বিপর্যয়। সবসুদ্ধু হুড়মুড়িয়ে পড়ল দু'জনে। পুরনো টেবিলের পায়াটা ভেঙে গিয়েই এই কেলেঙ্কারি। আর ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দ।
সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই লিপি আর সব্যসাচী দু’জনেই ছুটে এল দরজার দু'পাশে। দিনের আলো এখনও আছে। তাই পালাতে অসুবিধে হবে না ওদের। কোনওরকমে একবার শুধু বেরোতে পারলে হয়। যদিও পড়ে গিয়ে দারুণ চোট পেয়েছে দু'জনেই। তবু ওরা তৈরি।
একজন নয়, দু'জন এল ওরা।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওদের সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল সব্যসাচী। তারপর লিপিকে নিয়ে বাইরে বেরিয়েই ঘরের দরজায় শিকল দিয়ে ছোট্ট একটা পাঁচিল টপকে লাফিয়ে পড়ল পাশের বালিয়াড়িতে।
কাজুবাদামের বন যেখানে আরও গভীর, ওরা দু'জনে প্রাণপণে ছোটা শুরু করল সেইদিকে। ছুটতে ছুটতে সন্ধে হয়ে এল। কতদূরে একটা পাতার ঘর দেখা যাচ্ছে। ওরা সেই ঘরখানাই ওদের নিরাপদ আশ্রয় ভেবে এগিয়ে চলল।
ঘরের কাছে গিয়ে দেখল বালির ওপরে তালপাতার ছোট্ট একটা ঝোপড়ি এটা। কোনও ভিখিরির ডেরা ছিল বোধহয়।
এখন এ ঘর কাজে লাগে না, তাই পরিত্যক্ত। তবে আপাতত একটা রাত এখানে কাটানো যায়।
লিপি বলল, সব্যসাচী! আর আমি পারছি না। আমার মনে হয় আজকের রাতটা আমাদের এইখানেই কাটিয়ে দেওয়া উচিত।
সব্যসাচী বলল, এখানে এক রাতও নয়। সাময়িকভাবে কিছুটা সময় আমরা এখানে বিশ্রাম নিতে পারি। কেন না বনের মধ্যে ঘর। ওরা যদি রাতের অন্ধকারে আমাদের খুঁজতে বেরোয় তা হলে সহজেই ধরা পড়ে যাব আমরা। তাই বলি একটু বিশ্রাম নিয়ে অন্ধকারেই পালাই চলো।
লিপি বলল, যা তুমি বলবে। এখন তুমিই আমার বন্ধু, আমার অভিভাবক।
আমার সব। তোমার দেখা না পেলে এই বিপদে কী যে করতাম, কিছু ভেবে পাচ্ছি না। কিন্তু সব্যসাচী, ওই বেগুনপোড়া দিয়ে দুটো শুকনো ভাত খেয়ে পেট তো ভরেইনি, উপরন্তু তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। একটু জলের কি ব্যবস্থা করা যায়?
এখন চোখের জলই আমাদের একমাত্র সম্বল। এই সৈকতমরুতে জল কোথায়? তবে দূরে কয়েকটা ছোট ছোট নারকোলগাছ দেখা যাচ্ছে। দেখি যদি কোনও একটা গাছে উঠে হাত বাড়িয়ে দু’–একটা ডাব পাড়তে পারি।
তাই যাও। আমি বরং এইখানে বসে হাঁফ ছাড়ি একটু। এই বলে ঘরের ভেতর থেকে একটা ধুলো পড়া ময়লা শতরঞ্জি নিয়ে এসে বালির ওপরে পেতে বসে রইল লিপি।
সব্যসাচী গেল ডাব পেড়ে আনতে।
লিপি বসে বসে বালিতে কত আঁকিবুকি কাটল। নাম লিখল দু'জনের। বালির ঘর করল। ও যখন এইসব নিয়ে ব্যস্ত তখন হঠাৎই বুকটা কেঁপে উঠল ওর। দেখল ভারী বুট পায়ে দীর্ঘদেহী একজন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। লিপি তার মুখের দিকেও তাকাতে পারল না। মনে হল ওর মধ্যে ও যেন আর নেই।
এদিকে কিছু সময়ের মধ্যে ডাব নিয়ে যখন ফিরে এল সব্যসাচী তখন লিপিকে না দেখে দারুণ অবাক হয়ে গেল। সূর্য তখন অস্তাচলে। প্রকৃতির যবনিকা ক্রমশ ধূসর হয়ে আসছে। চারদিকে আবছায়া। কিন্তু যার জন্য আনা সে কই? ও দেখল বালির ওপর বেশ বড় বড় হরফে ওদের নাম লেখা। একটা বালির ঘর অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ও ছুটে সেই ঘরের ভেতরে গিয়ে ঢুকল। কিন্তু না, লিপি সেখানেও নেই। তা হলে গেল কোথায় মেয়েটা? ও চিৎকার করে ডাকল লিপি। তুমি কোথায়?
কেউ সাড়া দিল না। ওর ডাকের কোনও প্রত্যুত্তরও ভেসে এল না কোথাও থেকে। ও বালির ওপরে লক্ষ করে দেখল মোটা সোলের জুতোর ছাপ। আর সেই সঙ্গে বালির ওপর দিয়ে কাউকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো একটা দাগ। ডাবগুলো বালির ওপর ফেলে দিয়ে সেই পদচিহ্ন ধরেই এগিয়ে চলল সব্যসাচী। শেষপর্যন্ত লিপিটা আবার ধরা পড়ে গেল?
সব্যসাচীর বুকের ভেতরটা যেন ক্ষোভে ফেটে পড়তে লাগল। একসময় অন্ধকার এমন ঘনিয়ে এল যে পদচিহ্নও আর নজরে এল না। শুধু বন-জঙ্গল আর তারই বুক চিরে বয়ে আসা এক নদী ওর নজরে এল। এটা সেই নদী নয়তো? যে নদীর মোহানায় এই কাহিনির প্রথম পর্বর সূত্রপাত হয়েছিল? সব্যসাচী নিঃশব্দে নদীর ধারে ধারে এগিয়ে চলল। একবার কোনওরকমে মোহানায় পৌঁছতে পারলে হলিডে হোমের পথ ঠিকই খুঁজে নেবে ও।
এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ আসার পর এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল ও। দেখল চার-পাঁচজন লোক চারদিকে টর্চের আলো ফেলে কী যেন খুঁজছে। নিশ্চয়ই সব্যসাচীর খোঁজ করছে ওরা। সব্যসাচী ধরা পড়বার ভয়ে একটা কাজুগাছের মোটা ডালে বসে পাতার আড়ালে লুকিয়ে রইল। ভাগ্যে এই গাছগুলো একটু বেঁটেখাটো হয়।
সব্যসাচী অনেকক্ষণ ধরে স্থির হয়ে বসে থেকে সেই লোকগুলোর গতিবিধি লক্ষ করতে লাগল। ও যখন বসে বসে নিজেকে আড়াল করে ওদের কীর্তিকলাপ দেখছে ঠিক তখনই দেখতে পেল একটা ছোট নৌকোয় চেপে মুখে কালো কাপড় বাঁধা দু’-চারজন সশস্ত্র লোক এইদিকে আসছে। ওদের প্রত্যেকেরই হাতে পাইপ গান, পিস্তল ইত্যাদি।
ভয়ে বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ করতে লাগল ওর। তার চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার যেটা সেটা হল ওরা একে একে সবাই এসে হাজির হল ও যে গাছে ছিল সেই গাছেরই নীচে।
ওদের চাপা কথাবার্তা ও শুনতে পেল।
জল্লাদের মতো চেহারার একজন বলল, বীরাপ্পান আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেরে ভাল্লা। সমস্ত সোনা নিয়ে সে গা ঢাকা দিয়েছে। আমি নিজে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই সোনার হদিস পাইনি।
তা হলে জানেমন, ওর জন্যে একটা বুলেট আমাদের খরচ করতেই হবে, এই তো?
ইয়া আল্লা। মার কা বদলা মার হ্যায়, খুন কা বদলা খুন। দেখলে না জয়শংকরপ্রসাদের হাল ক্যায়শা কর দিয়া হামনে? একেবারে গলা পর্যন্ত বালিতে পুঁতে এমনভাবে রেখে এসেছি যে সারারাত ধরে শেয়াল-কুকুরে ছিড়ে খাবে ওকে। শিবেটা বেশি দরদ দেখাচ্ছিল বলে একটা গুলিতে ওরও মুখ আমি বন্ধ করে এলাম।
কিন্তু এদিককার খবর?
বীরসিংও পুলিশের তাড়া খেয়ে ভাগছে। ওর লোকজনরা লুকোবার জন্য ইঁদুরের গর্ত খুঁজছে। আমরাও অবশ্য না-লড়ে বাঁচব না। হয়তো আজকের রাতই আমাদের শেষরাত। শয়তান বিজুটা নিজেই এবার ফিল্ডে নেমেছে। ইনস্পেক্টর ভাগবকে নিয়ে শিকার করতে আসছে আমাদের। কিন্তু ও জানে না যে ওরাই এখন আমাদের শিকার।
সব্যসাচী সব শুনে শিরদাঁড়া টান করে স্থির হয়ে রইল। তা হলে একটু আগে যাদের উপস্থিতি ওর ভয়ের কারণ হয়েছিল তারা তা হলে পুলিশের লোক? আর তাদের পুরোভাগে ছিলেন ইনস্পেক্টর ভার্গব ও বিজুদা! ভগবান রক্ষে যে ওর সঙ্গে ওদের দেখা হয়নি। তা যদি হত, তা হলে কিছুতেই এই গাছের আশ্রয়ে ওকে থাকতে হত না আর টেরও পেত না এই দুষ্কৃতীদের মতলব। কিন্তু এখন কীভাবে কী করা যায় ?
হঠাৎই ওরা সতর্ক হল। দেখা গেল সেই টর্চের আলো ঘুরেফিরে আবার এইদিকেই আসছে।
ওরা বলল, রেডি হো যাও। আর এক কদম এগোলেই আলোর মুখ লক্ষ্য করে ফায়ার। তার আগে গাছের গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়ো সবাই।
সব্যসাচী যে গাছের পাতার আড়ালে ছিল ঠিক তার নীচেই ছিল একজন। লোকটার হাতে ছিল পাইপগান। সেটা সে চাগিয়ে ধরে আলোর দিকে তাগ করতেই সব্যসাচী নিজের জীবনে পরোয়া না করে আচমকা লাফিয়ে পড়ল তার ঘাড়ে।
লোকটা বিকট চিৎকার করে হুমড়ি খেয়ে পড়তেই ওর পাইপগান চলে এল সব্যসাচীর হাতে। জীবনে কখনও এই যন্ত্র হাতে নেয়নি সে। তবুও সেটাকে বাগিয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, হ্যান্ডস আপ। বলেই একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
ওদিক থেকে তখন ছুটে এসেছে পুলিশের গুলি।
একজন আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল।
সব্যসাচী ওর আক্রমণে পড়ে যাওয়া লোকটার পেটে পাইপগানের নল ঠেকিয়ে বলল, নড়েছ কী মরেছ।
ওদিক থেকে বিজুদার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, এখনও যদি বাঁচতে চাস তো ধরা দে ভাল্লা। এখানে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে চারদিকে আমরা ছড়িয়ে আছি। আর তোদের পালাবার কোনও পথই খোলা নেই।
গাছের আড়াল থেকে কে যেন বলল, আমরা তোদের মেরে নিজেরা মরতে এসেছি বিজু। কাজেই পালানোর প্রশ্নই ওঠে না।
বিজুদা সত্যিই সাংঘাতিক। ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চতুর বেড়ালের মতো এসে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়লেন একজনের ঘাড়ে। বাকি ছিল একজন। সে তখন উপায়ন্তর না দেখে বিজুদাকে লক্ষ্য করে ট্রিগার টিপল টিস্যুম।
চাপা একটা আর্তনাদ ভেসে এল বিজুদার দিক থেকে। তবে সে আর্তনাদ বিজুদার নয়। বিজুদা শুধু হেসে বললেন, তোদের দলের লোককেই শেষ পর্যন্ত খুন করলি? আমি তো জানি, এই ভুলটাই করে বসবি তোরা, তাই ওকে ধরেই আমার বুকের কাছে রেখেছিলাম।
অন্যান্য পুলিশ গিয়ে তখন সেই লোকটিকে ধরে ফেলল।
সব্যসাচী তখন গাছের আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করে বলল, বিজুদা! আমি একটাকে ধরে আছি। মরা ইঁদুরের মতো পড়ে আছে ব্যাটা। ধরো একে। সব্যসাচীর গলা শুনেই ছুটে এলেন বিজুদা, সব্যসাচী তুমি! তুমি এখানে কী করে এলে? লিপি কোথায়?
আমি লিপিকে নিয়ে পালিয়ে আসছিলাম। লিপি আবার ওদের খপ্পরে পড়ে যায়।
পড়লেও পালাতে পারবে না। এখন চলো, আগে তোমাকে তোমার বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসি। আর একটা কথা, সেই জিনিসটাকে তুমি কি রক্ষা করতে পেরেছ?
নিশ্চয়ই। সেটা এখনও আমার কাছে।
বিজুদা সানন্দে সব্যসাচীকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর দারুণ উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন, মি. ভার্গব ! এই সেই সব্যসাচী। ওর কাছে এখনও আছে সেই অমূল্য ধন।
সব্যসাচী ক্যাসেটটা বিজুদাকে দিয়ে দিল।
পুলিশ তখন হত-আহত চারজন দুষ্কৃতীকে বেঁধে ফেলেছে।
এমন সময় হঠাৎ একজন কনস্টেবল ছুটতে ছুটতে এসে বলল, স্যার, ওই দেখুন কারা আসছে।
সবাই দেখল মশালধারী একজন মাল্লার সঙ্গে বীরদর্পে এগিয়ে আসছেন প্রখ্যাত আইনজীবী জয়শংকরপ্রসাদ ও সেই দস্যিদামাল ভীষণ জেদি ও একরোখা মেয়েটা, যার নাম জয়া। জয়া এসেই অন্তরের আবেগে সব্যসাচীর হাত দুটো মুঠো করে ধরল। তারপর সে কী কান্না তার।
অনেক পরে কান্না থামলে বালিয়াড়ি ও বনাঞ্চল্ পেরিয়ে ওরা একসময় পুলিশের গাড়িতে চেপে যখন থানায় এল তখন আর এক চমক। দেখল লিঙ্গরাজ মিশ্রর একজন পোষাগুন্ডা লিপিকে উদ্ধার করে জমা দিয়েছে পুলিশের হাতে। সব্যসাচীর বাবা-মা, জয়ার মামা সবাই ছিলেন থানায়।
স্নেহাংশুবাবু সব্যসাচীকে বুকে জড়িয়ে বললেন, কাল দুপুরে পুলিশের গাড়িতে করে একটি কিশোরের লাশ সনাক্ত করতে গিয়েছিলাম। ভাগ্যে সেটা তুই নয়। ওঃ কী ভয় যে পেয়েছিলাম।
বিজুদা বললন, আপনার এই ছেলেটি কিন্তু বড় হলে একজন ঝানু গোয়েন্দা হবে।
সকলের শুভেচ্ছায় তাই যেন হয়।
লিপি বলল, জানো তো কাকা, আমরা যেখানে বন্দি ছিলাম সব্যসাচী না-থাকলে সেখান থেকে কখনওই বেরোতে পারতাম না।
জয়শংকরপ্রসাদ বললেন, আর এই যে মেয়েটি, জয়া! এ না-থাকলে আমিও প্রাণে বাঁচতাম না।
বিজুদা বললেন, এখন তা হলে আর কোনও ভয় বা আতঙ্ক নেই। অল কোয়ায়েট অন দা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। দুষ্কৃতীরা যে যেখানেই থাকুক ধরা পড়বে। পুলিশ অফিসার বললেন, এখন একটু চা-পর্ব সেরে বাসায় ফিরতে চান নিশ্চয়ই?
বিজুদা বললেন, কখনওই না। চা-পর্ব এখন থাক। আপনারা আমাদের স্বর্গদ্বারে পৌঁছে দিন। আজ আমরা মনের আনন্দে এবং নির্ভয়ে নতুন দিনের সূর্য ওঠা দেখব।
বিজুদার প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে সবাই পুলিশের গাড়িতে স্বর্গদ্বারে এলেন। ভোর হতে তখনও একটু দেরি ছিল। তবু সমুদ্রসৈকতে যাত্রীর অভাব ছিল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন