ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

চারদিকে পাহাড়। পাহাড়ের পর পাহাড় যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। ওই পাহাড়ের কোল বেয়ে বয়ে চলেছে সোনার নদী। বিস্তৃত শালবন, গভীর অরণ্যানি শ্যামল উপত্যকা, আর সব কিছুর শেষে যে বড় পাহাড়, সেই পাহাড়ের এক সুবিশাল গুহার ভেতরে...।
এই পর্যন্ত পড়ে থেমে যেতে হল দীপংকরকে। কেন না বাকিটা কীভাবে যেন অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। কিন্তু থেমে গেলেও এক অদম্য কৌতূহল ওর কিশোরমনকে তোলপাড় করতে লাগল। কী ছিল সেই গুহার ভেতরে? গুপ্তধন? নাকি অন্য কিছু? কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর যিনি দেবেন তিনি আজ আর ইহলোকে নেই। দীপংকর তবুও বার বার সেই পুড়ে যাওয়া ডায়েরির পাতার ওপর চোখ বোলাতে লাগল।
ঘড়ির কাঁটায় রাত দশটা।
মা এসে বললেন, কীরে, এখনও জেগে আছিস তুই? এবার শুয়ে পড়। দীপংকর মা'র দিকে ওর ডাগর ডাগর চোখদুটি তুলে বলল, মা বাপি কখন আসবে?
ওর আসতে দেরি হবে বাবা। হয়তো রাত বারোটাও হতে পারে। কিন্তু উনি এসে যদি দেখেন, তুই এখনও জেগে বসে ওইসব পড়ছিস তা হলে কিন্তু খুব রেগে যাবেন।
আচ্ছা মা, জেঠুর কাগজপত্তরে হাত দিলে তোমরা এত রেগে যাও কেন?
তোমার বাপি পছন্দ করেন না বলে। চিরকাল বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছেন, আর ডায়েরির পর ডায়েরি লিখে গেছেন। তাঁর মতন লোকের যে এমন পরিণতি হবে তা কি কেউ জানত?
মা। দীপংকর বলল, এই ডায়েরিটা লেখার সময়েই জেঠু খুন হয়েছিলেন তাই না
হ্যাঁ।
কিন্তু কেন? কেন ওরা আমার জেঠুকে খুন করল? উনি তো অত্যন্ত পরোপকারী লোক ছিলেন। কী চমৎকার কথাবার্তা বলতেন। আর কী দারুণ রসিক। প্রত্যেকটি কথায় রসিকতা মাখানো ছিল তাঁর। এমন মানুষকে কেউ খুন করে?
যারা খুনি তাদের ছুরিকাঘাতে কেউই বাদ যায় না বাবা।
আমার মনে হয় এই ডায়েরিটা লেখার সময় নিশ্চয়ই জেঠুর টেবিলে কোনও মোমবাতি ছিল। খুনের সময় সেটি উলটে যায়, আর তাতেই বাকি অংশটা পুড়ে যায়।
অনেক রাত হয়েছে দীপু। এসো শোবে এসো। যতক্ষণ না তোমার বাপি আসেন, আমি ততক্ষণ তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেব। ওটা রেখে দাও তুমি। ওখানে অনেক দরকারি কাগজপত্তর আছে।
অতএব ডায়েরিটা মুড়ে যথাস্থানে রেখে দিল দীপংকর। তারপর বিছানায় এসে শুতে মা ওর কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
দীপংকর বলল, মা, তুমি দেখে রেখো, আমি বড় হয়ে যে ভাবেই হোক আমার জেঠুর হত্যাকারীকে ধরবই। যারা আমার জেঠুকে হত্যা করেছে ভগবান ক্ষমা করলেও, আমি তাদের ক্ষমা করব না।
মা বললেন, ভগবানও কাউকে ক্ষমা করেন না বাবা। তাঁর হিসাবের খাতায় সব কিছু জমা হয়ে থাকে। সময় মতো তিনি যার যা পাওনা তাকে তা কড়ায়গণ্ডায় পাইয়ে দেন। তোমার জেঠু দেবতার মতো লোক ছিলেন। কাজেই তাঁকে যারা হত্যা করেছে তারা কিছুতেই রেহাই পাবে না।
দীপংকর একবার চোখ বুজে ঘুমোবার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। বারবার ডায়েরির পাতার ওই কয়েক ছত্র লেখাটার কথা মনে পড়তে লাগল তার। কী আছে ওই গুহায়? গুপ্তধন? যদি থাকে তবে লোকজন নিয়ে তিনি তা উদ্ধার করবার চেষ্টা না করে ডায়েরির পাতায় লিখতে গেলেন কেন? কেন তিনি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন?
দীপংকর একটুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে একসময় বলল, আচ্ছা মা, সোনার নদী কোথায়? সোনার নদী কি সত্যিই আছে? কী জানি বাবা।
জেঠু ডায়েরিতে লিখেছেন কিনা!
লিখেছেন নাকি? হয়তো সেরকম কোনও নদীর সন্ধান তিনি কোথাও পেয়েছিলেন। তাই হয়তো দুর্বৃত্তেরা হত্যা করেছে তাঁকে। আচ্ছা মা, জেঠুর অনেক টাকা ছিল তাই না?
হ্যাঁ। জেঠুর সব টাকার মালিক এখন তুই। ব্রিটিশ আমলের লোক উনি। জাহাজে চাকরি করতেন। কত দেশ-বিদেশ যে ঘুরেছেন তার ঠিক কী? সাহেবরা খুশি হয়ে তোর জেঠুকে গিনি উপহার দিতেন আর সেগুলো তিনি নিয়ে এসে জমা করতেন ঘরের সিন্দুকে। সেদিন চাবি খুলে দেখি প্রায় একশোটারও বেশি গিনি আছে তার ভেতরে। ব্যাঙ্ক ভরতি জেঠুর টাকা। তবে খুব বুদ্ধিমান লোক ছিলেন তো উনি, তাই সবকিছুর উইল করে গেছেন তোর নামে। মাসে মাসে মোটা টাকা ব্যাঙ্ক থেকে সুদ পেতেন, আর সেই টাকা নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। অরণ্য ছিল তাঁর প্রাণ। তিনিই ছিলেন যেন বনের রাজা।
দীপংকর এবার একটু উঠে বসে বলল, মা, জেঠু ঠিক কোন জায়গায় খুন হয়েছিলেন তুমি জানো? আমার মনে হয় সোনার নদী সেখানেই কাছেপিঠে কোথাও আছে।
জায়গাটার কথা আমি ঠিক বলতে পারব না! তবে সিংভূমের অরণ্যে এইটুকু জানি।
এমন সময় ডোরবেল বেজে উঠল। নিশ্চয়ই বাপি এসেছেন। দীপংকর চোখ বুজল। মা উঠে গেলেন দরজা খুলতে।
দরজা খুলতেই বাপির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, দীপুটা ঘুমিয়েছে?
শুয়েছে অনেকক্ষণ।
আজও কাজের কাজ কিছু হল না। তা ছাড়া মনে হচ্ছে আমার পিছনেও লোক লেগেছে।
মা শিউরে উঠলেন, সে কী!
দীপংকরের বুকটাও ভয়ে ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। বাপির পিছনেও লোক লেগেছে! কিন্তু কেন? বাপি তো কোনও ঝামেলায় থাকেন না। তবে কি ওরা বাপিকেও খুন করবে? কী এমন অপরাধ করেছেন জেঠু, যে তার ফল বাপিকেও ভোগ করতে হবে?
মা বললেন, তুমি কী করে বুঝলে যে তোমার পিছনেও লোক লেগেছে? সাকচি বাজারের কাছে একজন লোক এমনভাবে মোটর বাইক নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল যে আর একটু হলেই চাপা দিত আমাকে! তুমি রক্ষা পেলে কীভাবে?
হঠাৎ একটি মিলিটারি ট্রাক এসে পড়ায় কেটে পড়ল লোকটা। তারপর স্টেশনে ট্রেনে উঠতে যাচ্ছি, তেমন সময় একজন বিচ্ছিরি চেহারার লোক, গালের একটা পাশ আগুনে পোড়া। আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, বাবু ম্যাচিস। আমি তাকে দেশলাইটা দিতেই একটা বিড়ি ধরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে খিক খিক করে হাসল লোকটা। তারপর কী বলল জানো? কী বলল ?
বলল, আপনি তো মানিকবাবুর ভাই, তাই না? আমি বললাম, তুমি কে? তার উত্তরে লোকটি বলল, সময় হলেই আমাকে চিনতে পারবেন বাবু। আচ্ছা চলি। বলে আমাকে এক চোখ বুজে এক চোখ দেখিয়ে চলে গেল। দীপংকরের শরীরের ওপর দিয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে
গেল। মা বললেন, তুমি আর ওখানে যেয়ো না। তোমার দুটি পায়ে পড়ি। ওনার যা হবার তা হয়েছে। এখন পুলিশের কাজ পুলিশ করুক।
আমিও তাই ভাবছি। শুধু ভেবে পাচ্ছি না ওরা কী চায়? দাদাকে ওরা খুনই বা করল কেন, আর আমার ওপরই বা ওদের রাগের কারণ কী?
ঘড়িতে তখন ঢং ঢং করে বারোটা বাজল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দীপংকর পড়তে বসেও পড়ায় মন বসাতে পারল না। বারবার বাপির কথাটা ওর কানে ঘুরেফিরে বাজতে লাগল। একটা টেপ যেন অনবরত বেজে চলেছে মনে হচ্ছে আমার পিছনেও লোক লেগেছে।' তবে কি বাপিকেও ওরা মেরে ফেলবে? না না এ হতে পারে না। দীপংকর দু’ হাতে ওর চুলের মুঠি ধরে মাথাটাকে একবার ঝাঁকিয়ে নিল। না। মানসিক উত্তেজনা তাতেও কমল না।
ও উঠে গিয়ে দেখল রান্নাঘরে মা উনুনে হাওয়া করছেন। মা'র চোখে জল। বাপি খবরের কাগজ পড়ছেন। দৃষ্টি কাগজের পাতায়। কিন্তু কী যেন ভাবছেন উনি।
দীপংকর আস্তে করে ডাকল, বাপি? উঁ?
তুমি আর টাটানগরে যেয়ো না। কী হবে গিয়ে? জেঠু খুন হয়েছেন। যদি তোমারও কিছু একটা হয়ে যায়? টাটানগরের ওই বাড়ি তুমি বিক্রি করে দাও।
ও বাড়ির মালিক এখন তুমি। আমি কি বেচতে পারি? তা হলে আমিই বেচে দেব।
আগে তুমি বড় হও। তারপর তোমার সম্পত্তি নিয়ে তুমি যা খুশি করো। এখন তুমি নাবালক। এখন কোনও কিছুই করা চলবে না।
তা হলে যেভাবে যে অবস্থায় পড়ে আছে বাড়িটা তেমনি থাক।
আপাতত তাই থাকবে।
দীপংকর অত্যন্ত আদরের সঙ্গে ওর বাপিকে জড়িয়ে ধরে বলল, আচ্ছা বাপি, জেঠু ওনার ডায়েরিতে যেসব জায়গার কথা লিখে গেছেন সেগুলো কি সত্যিই আছে?
আছে বইকী। না থাকলে কি এমনি লিখেছেন?
তা হলে সোনার নদীর কথা নিশ্চয়ই মিথ্যে নয়?
সোনার নদী! জেঠু লিখেছেন নাকি?
হ্যাঁ। আচ্ছা বাপি সিংভূমের কোথায় খুন হয়েছিলেন জেঠু? সিংভূম কোথায়?
ছোটনাগপুরের একটা জায়গার নাম। ধারাগিরি ঝরনার ধারে তোমার জেঠু রাতের অন্ধকারে খুন হয়েছিলেন গুপ্তঘাতকের হাতে। ওনার একজন ‘হো’ চাকর ছিল। তাকেও অর্ধমৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পাওয়া যায়নি শুধু ভেলুকে। অর্থাৎ তোমার জেঠুর শিকারি কুকুরকে। কুকুরটা টাটানগরে তোমার জেঠুর বাড়ি পাহারা দিত। আর জেঠুর সঙ্গে জঙ্গলে যেত। একবার দলমা পাহাড়ে কয়েকজন, দুষ্কৃতকারী তোমার জেঠুকে আক্রমণ করবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ভেলু তাদের এমন শিক্ষা দিয়েছিল যে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল বাছাধনরা।
সেই রাতে ভেলু তা হলে কোথায় ছিল?
সেটাই তো রহস্যময়। ওরা হয়তো জেঠুকে খুন করার আগে তাকেও মেরে ফেলেছিল।
তা হলে তো ভেলুর মৃতদেহ সেখানেই পড়ে থাকত বাপি?
বাপি হেসে বললেন, তোমার বুদ্ধিমত্তায় আমি খুব খুশি হয়েছি। বড় হয়ে তুমি ভাল গোয়েন্দা হতে পারবে। তবে এখন তোমার লেখাপড়ার সময়। জেঠুর খুনের ব্যাপারটা নিয়ে এখন তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে। আর শোনো, জেঠুর কাগজপত্তর বেশি ঘেঁটো না। তুমি যখন বড় হবে, তখন হয়তো ওগুলো তোমার কাজে লাগবে। শুধু তোমার আর তোমার মায়ের মুখ চেয়ে আমি এখুনি কিছু করব না। আমাকে সাবধান হতেই হবে। তুমি নির্ভাবনায় থাকো। কেমন?
দীপংকর ‘হ্যাঁ’ বলে তখনকার মতো চলে গেল।
দুপুরে বাপি যখন অফিসে, আর মা যখন ঘুমোতে গেছেন, তেমন সময় দীপংকর আবার শুরু করল তার কাজ। চুপি চুপি জেঠুর ঘরে ঢুকে সব কিছু উলটেপালটে দেখতে লাগল।
ইদানীং জেঠু বেশির ভাগ সময় সাকচিতে থাকতেন। মাঝেমধ্যে যখন আসতেন, তখন অনেক কিছুই রেখে যেতেন। তার মধ্যে সারা বছরের লেখা ডায়েরিটাই খুব যত্নের সঙ্গে রাখতেন তিনি। অথচ আশ্চর্য! ডায়েরিতে তিনি কত কী লিখেছেন, কিন্তু ভুলেও কোনও শত্রুর কথা লেখেননি। তা হলে কি জেঠু হঠাৎই খুন হয়েছেন? ভুলবশত? তবু সেই যে কথায় আছে, ‘যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই’, দীপংকরও তাই করতে লাগল। একটার পর একটা ডায়েরির পাতা ওলটাতে ওলটাতে এক জায়গায় একটু রহস্যের গন্ধ পেল ও। জেঠু লিখেছেন, 'অনেকদিনের পর কুন্দনলালের সঙ্গে হঠাৎই দেখা হয়ে গেল গোলবাজারে। লোকটা একটি পাক্কা শয়তান। ভিক্টোরিয়া জাহাজে মিলারসাহেবকে ওই লোকটাই খুন করে। ওই জাহাজে প্রচুর সোনা ছিল। সেগুলো নিয়ে ভাগবার তালে ছিল ও। কিন্তু আমি হাতেনাতে ধরে ফেলি ওকে।
গভীর রাতে আমার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করবার সময় জাহাজের ডেক থেকে জলে পড়ে যায় ও। সেই সময় গঙ্গায় ষাঁড়াষাঁড়ির বান আসে। তারপর ওর আর কোনও হদিস পাওয়া যায় না। ভেবেছিলাম লোকটা মরে গেছে। কিন্তু না! এতদিনে এই পরিণত বয়সে বুঝলাম শয়তানের মৃত্যু নেই। ওর হাতে হয়তো আরও অনেকের মৃত্যু আছে।'
এরপর কুন্দনলাল প্রসঙ্গে আর কিছুই লেখেননি জেঠু। ডায়েরির পাতায় সাল তারিখ সহ লেখা ‘খড়্গপুর’। তার মানে গোলবাজারটা খড়্গপুরেই।
আর একদিনের ডায়েরিতে জেঠু লিখেছেন— 'জানি না কাজটা ভাল করলাম কি না। লুটের ধন। তার ওপর শুধুই সোনা। পুলিশকে জানালে হইচই হবে। আমাকেই হয়তো জড়িয়ে দেবে জালে। আর ওরাও যখন টের পাবে তখন পুলিশে খবর দেওয়ার জন্যে আমাকেই দেবে ডিস্যুম করে। তার চেয়ে ও জিনিস লুকনো থাক। সোনার নদীর দেশে এই গভীর অরণ্যে গহন গিরিকন্দরেই লুকানো থাক মাটির তলায়।'
এই পর্যন্ত পড়ে যা যেখানে ছিল সব ঠিকঠাক সেইখানে রেখে জেঠুর ঘর থেকে বেরিয়ে এল দীপংকর। এইবার বুঝতে পেরেছে জেঠুর মৃত্যুর রহস্যটা কী। ওই লুকানো সোনার সন্ধানেই কোনও দুষ্কৃতকারীর দল জেঠুকে বিরক্ত করতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত না-পেয়ে তাঁকে হত্যা করে। কিন্তু তাই যদি হয়, তা হলে ওরা পিছন থেকে মারবে কেন জেঠুকে? ওরা তো জেঠুকে ধরে নিয়ে যাবে, ভয় দেখাবে, তারপর নানারকম অত্যাচারের শেষে নৃশংসভাবে হত্যা করবে ওরা।
যাই হোক। জেঠুর ডায়েরি পড়ে দীপংকর এই সত্যে উপনীত হল যে, নিজের অজান্তেই জেঠু কিছু ক্রিমিন্যালের চক্রে পড়ে যান এবং তার পিছনেও রয়েছে ওই লুকানো সোনা আর সেই ক্রিমিন্যালদের নায়ক হয়তো কুন্দনলাল। কিন্তু এই কুন্দনলালকে চেনা যাবে কী করে? জেঠু তো তার চেহারার কোনও বর্ণনা দেননি।
ভেবে ভেবে কোনও কূলকিনারা পেল না দীপংকর। ওর বাবার কাছে টাটানগর স্টেশনে যে বিকৃত চেহারার লোকটা দেশলাই চেয়েছিল, সে-লোকটাও তো কুন্দনলাল হতে পারে?
জেঠু মারা গেছেন প্রায় এক মাস হয়ে গেল। বিহার-পুলিশ এখনও তাঁর খুনের কোনও কিনারা করতে পারল না। জেঠুর ‘হো’ চাকরটাকে অর্ধমৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কিন্তু এই লোকটার নাম কী? এই লোকটা নিশ্চয়ই পুলিশের হেফাজতে হাসপাতালে আছে। আচ্ছা কোন রকমে এই লোকটার সঙ্গে যোগাযোগ করলে জেঠুর সম্বন্ধে কিছু জানা যায় না? কারা কী কারণে জেঠুর পিছনে লেগেছিল সেকথা ওর চেয়ে ভাল আর কে বলতে পারবে? ওই লুঠের মাল জেঠুর নেবারই বা দরকার কী ছিল? বাপির মুখে শুনেছে জেঠুর নাকি অনেক—অনেক টাকা। কিন্তু এত টাকা জেঠু পেতেন কোথায়? ব্রিটিশরাজ তো কবেই শেষ হয়ে গেছে। এখন তো সাহেবরা আর জেঠুকে ডেকে আদর করে গিনি উপহার দেন না। তা ছাড়া যে জিনিস গহন গিরিকন্দরে মাটির নীচে লুকিয়ে রেখেছেন জেঠু, সে জিনিসের সন্ধান তিনি পেলেন কী করে? আর পেলেন যখন তখন সেইসব তিনি ঘরেই বা নিয়ে এলেন না কেন? তার মানে জেঠু ভালমানুষ হলেও খুব রহস্যময় লোক ছিলেন। অত সোনা উনি লুকিয়ে রাখলেন মাটির তলায়— আবার বনের রাজা হয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, সব যেন কীরকম জট পাকিয়ে যাচ্ছে মাথার ভেতর।
বিকেলবেলা নিজের অভ্যাসবশে দীপংকর একা একাই বেড়াতে চলল। এমনিতে ছেলে হিসাবে সে খুব মেধাবী। দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানোর বাসনা প্রবল। খুব চাপা আর জেদি প্রকৃতির। তবে খুব ঠান্ডা মাথার।
রামকৃষ্ণপুর ঘাটে ক্রেনজেটির সামনে এসে দীপংকর বসল ট্রেলপারের ওপর। গঙ্গায় এখন জোয়ার ভরতি। বড় বড় গাদা বোটগুলো মাল বোঝাই হচ্ছে। মাথার ওপর ঘর ঘর শব্দে ক্রেনে করে মাল আসা-যাওয়া চলছে। দূরে খিদিরপুরের ডকে সারি সারি জাহাজ মাস্তুল খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে ও দেখতে পেল। এইরকমই কোনও একটি জাহাজে মিলারসাহেবের আন্ডারে কাজ করতেন জেঠু। আজ সেই মিলারসাহেবও নেই, জেঠুও নেই। দুর্ভাগ্য দু’জনেরই। দু’জনেই নিহত হলেন গুপ্তঘাতকের হাতে।
দীপংকর ট্রেলপারে বসে গঙ্গায় ঢেউ গুনতে লাগল। ওর মনের ভেতরে এখনও এক অস্থির উত্তেজনা। সেই সঙ্গে অনেক কিছু হারাবার ভয়। যদি কোনওদিন দুষ্কৃতকারীরা অফিস থেকে ফেরার পথে ওর বাপিকে কলকাতার রাজপথেই গাড়ি চাপা দেয়? ও যখন স্কুলে থাকবে এবং ওর বাপি যখন অফিসে সেইসময় ওরা এসে যদি ওর মাকেই কোনওদিন খুন করে রেখে যায় তা হলে? তা হলে কী হবে? উঃ ভগবান, কেন যে জেঠু বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন, কেন যে সোনা সোনা করে পাগলা হতেন, তা কে জানে?
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে না-আসা পর্যন্ত দীপংকর ট্রেলপারে বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরে আসবার সময়ই দেখল বেঁটেখাটো গোলগাল চেহারার একটি বখাটে ছেলে শিস দিতে দিতে কেমন যেন নাচের ভঙ্গিমায় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা ওর চেয়েও দু’-এক বছরের বড়ই হবে। তবে তার পোশাকপরিচ্ছদ দেখলে মনে হবে বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে, কিন্তু বখাটে।
লঞ্চঘাটের দিক থেকে দুটি ফ্রকপরা কিশোরী মেয়ে সেই পথে আসছিল তখন।
তাদের দেখেই বখাটে ছেলেটার শিস দেবার ধুম বেড়ে গেল।
পথে লোকজন তখন ছিল না বললেই হয়। ফলে ছেলেটির সাহস বেড়ে গেল খুব।
মেয়েদুটিও তখন বিব্রত বোধ করতে লাগল নিজেদের। দু'-একবার আড়চোখে দেখল দীপংকরকে! তারপর আরও জোরে যাবার জন্য পা চালাল।
বখাটে ছেলেটিও এবার একটি হিন্দি গানের সুর ভেঁজে ওদের পিছু নিল।
মেয়েদুটি হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তারপর ঘুরে তাকিয়ে বলল, এ কী, আপনি সেই থেকে আমাদের পিছু পিছু আসছেন কেন?
ছেলেটি দু’হাত কোমড়ে রেখে কঠিন গলায় বলল, পিছু পিছু কেন যাব? সরকারি রাস্তায় পথ চলছি। তোমাদের গায়ে লাগছে কেন?
দীপংকর আর থাকতে পারল না। ছেলেটির মুখোমুখি হয়ে বলল, চেহারাটি তো বেশ ভদ্রলোকের মতো। তা আমার বোনেদের বিরক্ত করতে এসেছ কেন বাবা? এখানে যে আমিও আছি তা দেখনি বুঝি?
ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে দীপংকরের জামার কলারটি ধরে কাছে টেনে আনল একবার। তারপর এক ঝটকায় ছুড়ে ফেলে দিল রাস্তার ওপর।
মেয়েদুটি ছুটে গিয়ে হাত ধরে তুলে দাঁড় করাল দীপংকরকে।
বখাটে ছেলেটি তখন হাঃ হাঃ করে হাসতে লাগল। বলল, এক ফোঁটা ছেলে আমার সঙ্গে লাগতে এসেছিস ব্যাটা। ফোট এখান থেকে।
দীপংকর তখন চোট খাওয়া বাঘের মতো রুখে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ উত্তেজনায় হাতের ঘুসি পাকিয়ে যথাশক্তি দিয়ে ছেলেটার তলপেটে প্রচণ্ড আঘাত করল। একবার শুধু ‘ওক’ করে একটা শব্দ। তারপরই গল গল করে রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগল ছেলেটির মুখ দিয়ে।
মেয়েদুটি সভয়ে পিছিয়ে এসে বলল, এ কী? এ কী করলে ভাই? ও যে মরে যাবে। এ তো খুন!
কিন্তু আমি তো তোমাদেরই মর্যাদা রক্ষা করতে...।
ওই দেখো ওর জিভটা কীরকম বেরিয়ে আসছে। পালাও পালাও, তুমি এখান থেকে। এখুনি পালাও। আমরা কাউকে কিছু বলব না। তুমি শিগগির পালাও। নইলে তোমাকে পুলিশে ধরবে।
দীপংকর হতচকিত। কী যে করবে তা সে ভেবে পেল না। এমনটি হবে তা ভাবতেও পারেনি ও। কী করতে গিয়ে কী হয়ে গেল। দীপংকর খুন করল! তার মানে এবার পুলিশ ওকে খুঁজবে। ধরা পড়লে বিচার হবে। ফাঁসি হবে কি? যাবজ্জীবন কারাদণ্ড তো হবেই। শিশু অপরাধীদের জেলে ওকে রাখা হবে। উঃ। সে কী ভয়ংকর ব্যাপার। খাঁচার পাখির মতো বন্দি হয়ে থাকতে হবে সারা জীবন। ওর দিকে আঙুল দেখিয়ে লোকে বলবে ‘ওই যে দেখছ ছেলেটা, ও খুনি।' তার মানে আজ থেকে দীপংকর ও কুন্দনলাল এক।
দীপংকর দেখল সেই বখাটে ছেলেটা দু'হাতে পেট চেপে লুটিয়ে পড়ল রাস্তার ওপর।
মেয়েদুটি এক ফাঁকে কখন সরে পড়েছে।
ওই তো দূরে একটা কীসের যেন হেড লাইট এগিয়ে আসছে না? নিশ্চয়ই পুলিশের গাড়ি। না হলে এমন সময় আলো জ্বেলে ওই গাড়িটা এদিকেই বা আসবে কেন? দীপংকর আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। যেদিকে এসেছিল সেইদিকেই ছুটল। ছুট—ছুট—ছুট।
ফরসোর রোড পার হয়ে আবার সেই ট্রেলপারে এসে হাঁসফাঁস করে হাঁপাতে লাগল। এ কী! পুলিশ কেন? খইনি টিপতে টিপতে দুটো পুলিশ যে এদিকেই আসছে। ওরা কি ওয়ারলেসে খবর পেয়ে গেছে! নিশ্চয়ই পেয়েছে এবং সেই খবর পেয়েই ওকে ধরবে বলে আসছে ওরা।
দীপংকর আবার ছুটল।
ছুটতে ছুটতে এক জায়গায় এসে পড়তেই...
ক্যাক ক্যাচ। খুব জোরে ব্রেক কষল গাড়িটা। আর একটু হলেই থেঁতলে যেত দীপংকর। তবু যেটুকু ধাক্কা ও পেয়েছে তাতেই একটু একটু করে সবকিছু ঘোলাটে হয়ে গেল।
লরির ড্রাইভার বলল, খুব বেঁচে গেছে এ যাত্রা।
আর একজন কে বলল, ইন্টারন্যাল হ্যামারেজ হয়ে যেতে পারে। কী করব ওস্তাদ, এখানেই ফেলে রেখে যাব, না তুলে নেব গাড়িতে?
দীপংকর চোখ না-মেলেই বুঝল একজন লোক পাঁজাকোলা করে তুলে নিল ওকে। ওর মাথাটা আরও ঝিম ঝিম করতে লাগল। তারপর আর কিছুই ওর মনে নেই।
জ্ঞান যখন ফিরল তখন ভোরের আভাস অল্প অল্প করে ফুটে উঠছে। দূর আকাশে তারার দীপগুলি নিভু নিভু। দ্রুতগামী ট্রাকের ওপর শুয়ে অসহায় দীপংকর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। এ কোন দেশ? এ কোন রাজ্যে ও এসে পড়েছে? কী চমৎকার বাতাসের ঘ্রাণ এখানকার। নিশ্বাস নিতে বুক যেন ভরে উঠল।
ট্রাক প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলেছে। কখনও উঁচুতে কখনও ঢালু পথে। মাঝে মাঝে বড় বড় গাছের ডালপালা ট্রাকের মাথা ছুঁয়ে যাচ্ছে। সর সর করে আওয়াজ হচ্ছে।
দীপংকর ধীরে ধীরে মাথাটা তুলে বসল। নাঃ, মাথাটা ঠিকই আছে। শুধু সর্বাঙ্গে ব্যথা। উঠে বসতেই অবাক হয়ে গেল। এ কোথায় এসেছে ও! কী বিশাল বনভূমি। চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। ওদের ট্রাকটা সেই পাহাড়ের ওপর দিয়ে পাকদণ্ডি পথ বেয়ে চলেছে। কিন্তু পাহাড়ের ওপরও এত জোরে ছুটছে কেন ট্রাক?
এইভাবে আরও কিছুক্ষণ যাবার পর একসময় ট্রাকটা এক জায়গায় এসে থামল।
লুঙ্গিপরা দু'জন লোক এসে উঁকি মেরে দেখল ওকে। তারপর বলল, আরে তুমি বসে আছ? আমরা তো ভাবলাম মরেই গেছ তুমি।
দীপংকর লোকদুটোকে ভাল করে দেখে বুঝল বর্ন ক্রিমিন্যাল বলতে যা বোঝায়, এরা ঠিক তাই। কিন্তু এরা কারা? ওকে ট্রাকে করে এখানে নিয়ে এল কেন? কী ওদের অভিপ্রায়?
দীপংকর বলল, আমি কোথায়?
তুমি এখন কলকাতা থেকে অনেক দূরে। তা কাল হঠাৎ কী হয়েছিল? পকেট মেরেছিলে কারও? না হলে, সন্ধেরাতে অমন করে ছুটছিলে কেন? সময়মতো ব্রেক না কষলে যে গাড়ির চাকায় চেপটে যেতে বাবা। অযথা আমরা খুনের দায়ে দায়ী হতাম। আমি বাইশ বছর স্টিয়ারিং ধরছি, এখনও পর্যন্ত চাপা দিইনি কাউকে। শুধু তুমিই আমার বদনাম করে দিচ্ছিলে। বেশ ছেলে যা হোক।
দীপংকর ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল লোকটির মুখের দিকে।
আর একজন বলল, চেয়ে দেখছ কী? এবার নেমে পড়ো। এখানে ঝরনার জলে মুখহাত ধুয়ে যা হোক কিছু খেয়ে নাও। আমরা তো ভেবেছিলাম লরির ধাক্কায় শেষই হয়ে গেছ। ওই জন্যে তুলে নিয়ে চলে এলাম। ভেবেছিলাম ডেড বডিটা পাহাড়ের জঙ্গলে যেখানে হোক ছুড়ে ফেলে দেব। তা যখন বেঁচেই গেছ তখন এসো। এসে কিছু মুখে দাও।
ওরা দীপংকরকে ট্রাক থেকে নেমে আসতে সাহায্য করল।
একজন বলল, তোমার নাম কী?
দীপংকর বলল, নাম কী? কী জানি। নাম কী আবার?
সে কী! নাম কী জান না? রাম, শ্যাম, যদু, মধু – এই হচ্ছে নাম। যেমন আমার নাম কালনেমি, ওর নাম ময়নিহান। তেমনি তোমার নাম? আমার কোনও নাম নেই।
ময়নিহান হাঃ হাঃ করে হেসে বলল, বল না ব্যাটা তোর নাম রাজকাপুর। কালনেমি বলল, সত্যিই তোর কোনও নাম নেই? নাকি নকশা করছিস? সত্যি বলছি আমার কোনও নাম নেই।
তোর বাবার নাম? বাবার নাম খগেন, না অন্য কিছু? মনে পড়ছে? কে আমার বাবা?
আরে যে তোকে জন্ম দিয়েছে। তোর মা আছে? না কি মাও নেই। বল এবার আপনা থেকে কুমড়োর মতো খেত-এ গজিয়েছিস?
দীপংকর কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, আমার কিছু মনে নেই। আমি কিছু মনে করতে পারছি না। তোমরা আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করো না।
কালনেমি বলল, হুঁ। বুঝেছি। কাল রাতের কথা তোর কিছু মনে পড়ে? না আমার কিছু মনে পড়ছে না। কিছু মনে নেই আমার। আমি কোথায় ছিলাম, আমার কে কে ছিল, কিছুই মনে নেই।
অ। তা এবার একটু মনে কর দিকিনি এই ট্রাকে তুই এলি কী করে? মনে কর। তাও মনে নেই।
সে কী রে! আমরা কে বল তো?
জানি না। আমি কিচ্ছু জানি না।
কালনেমি আর ময়নিহান একটু সরে গিয়ে বলাবলি করতে লাগল, মনে হচ্ছে ছেলেটার স্মৃতি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ওর তো কারও কথাই মনে নেই।
ময়নিহান বলল, বাঁচা গেছে। আমাদের ট্রাকেই যে ও ধাক্কা খেয়েছে এটা তা
হলে ও জানবে না। ও শুধু আমাদের দু'জনকে ওর উদ্ধারকারী বলেই ভাববে। ভুল হল। যেখানকার জিনিস সেখানে ফেলে রেখে এলেই হত। কোনও ঝামেলাই থাকত না তা হলে।
ঝামেলা থাকত না মানে? রাস্তায় এ অবস্থায় ছেলেটাকে ফেলে রাখলে দারুণ হইচই হত। কাছেপিঠে কোনও পুলিশের গাড়ি থাকলে তাড়া লাগাত আমাদের। এখন তা হলে কী করবি ছেলেটাকে নিয়ে?
কী আবার করব? কাছাকাছি কোথাও লোকালয় দেখে ছেড়ে দেব। না হলে কে হুজ্জোতি পোহাবে? ওর বাবা-মা কি এতক্ষণে থানা-পুলিশ করেনি ভেবেছিস? চারদিকে খবর চলে গেছে হয়তো।
দীপংকর তখন পাশেই একটি ঝরনার জলে গিয়ে মুখহাত ধুয়ে নিল।
এইখানে এক জায়গায় পাহাড়ের কোলে ঘন জঙ্গলের ধারে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান ছিল! ছিটে বেড়ার ঘর। দোকানে নেড়ো বিস্কুট, আর চা ছাড়া কিছুই নেই। মুড়ি হয়তো আছে। দোকানের লোকটি বেসন ফ্যানাচ্ছে, গরম কিছু ভাজি তৈরি করবার জন্য।
কালনেমি আর ময়নিহান কাঁধে গামছা নিয়ে জঙ্গলে চলে গেল। দোকানিকে বলে গেল দীপংকরের দিকে নজর রাখতে এবং একটু কিছু দিতে।
দীপংকর চা-দোকানের বেঞ্চিতে বসে এদিক ওদিক চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। কী সুন্দর সকাল। বুনো গাছ-গাছালির সবুজ পাতার কী চমৎকার গন্ধ। আর কত যে পাখি ডাকছে গাছে। ওটা কী পাখি, ঠিক টিয়ার মতো দেখতে, লম্বা লেজ আর ঘন নীল গায়ের রং। মাথার কাছটা বাদামি।
দোকানদার বলল, কী খোকাবাবু। মুলুক কাঁহা? কাঁহা সে ভাগাকে লে আয়া এ লোক?
দীপংকর বলল, জানি না। আমার কিচ্ছু মনে নেই। আমি কিছু মনে করতে পারছি না।
এ কেয়া বাত! কুছ ইয়াদ নেহি?
না। আমার বাবা-মা কাউকে মনে পড়ছে না। কোথায় ছিলাম তাও মনে নেই। হুঁ। তো এ দোনো বদমাশ কো কাঁহা মিলা?
তাও মনে নেই।
কুছ ইয়াদ নেহি আয়েগা তো ক্যা কিয়েগা? ক্যায়সে ঘর যাওগে তুম?
দীপংকর বলল, আমার খুব খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে দেবে? হাঁ হাঁ জরুর দেগা। বইঠো। চা পিয়োগে?
হ্যাঁ।
লোকটি তাড়াতাড়ি টিনের বাক্স থেকে মুড়ি বার করে, একটু চানাচুর মিশিয়ে ওকে খেতে দিল। ততক্ষণে পিঁয়াজি ভাজা শুরু হয়ে গেছে। পিঁয়াজি ভাজা হলে
তাও দিল শালপাতার ঠোঙায় করে।
দীপংকর খেতে খেতে বলল, আচ্ছা আমি এখন কোথায়?
তুমি এখন ছোটনাগপুরের জঙ্গলে।
ছোটনাগপুর! সেটা কোথায়?
সেটা এইখানে। তুম পড়িলিখি লেড়কা। ছোটনাগপুর মালুম নেহি? সিংভূম জিলা। ঘাটশিলা হিয়াসে দু' মিল।
ঘাটশিলা দু’ মাইল!
হাঁ।
এমন সময় কালনেমি আর ময়নিহান ফিরে এল। এসে বলল, কীরে ছেলে, ঘরবাড়ির কথা কিছু মনে পড়ছে?
না।
তোকে আমাদের ট্রাকে কে উঠিয়েছিল?
বলছি তো আমার কিচ্ছু মনে নেই।
ঠিক আছে। ওসব কথা মনে না-থাকাই ভাল। তা এখন কী করবি ঠিক করেছিস? আমরা তোকে এইখানেই ছেড়ে দেব। দিনের আলোয় তোকে নিয়ে যাবার দায়িত্ব নেব না আমরা।
আমি তোমাদের সঙ্গে যাব।
আমাদের সঙ্গে তো অনেকদূর এসেছ বাবা। এবার এখানেই থেমে থাকো, আর বেশি এগিয়ো না। আমরা ভাল লোক নই। বুঝলে?
দীপংকর চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে বলল, কে বলে তোমরা ভাল লোক নও? তোমরা খারাপ লোক হলে তো আমাকে মেরেই ফেলতে!
ময়নিহান বলল, অ্যা-অ্যা-অ্যাই দেখো। এসব কী উলটোপালটা বলে রে পাখি। ওরে আমরা হলুম জেল-ভাঙা কয়েদি। আমাদের কাজ হল লুটমার করা, মানুষের বুকে ছুরি মারা, আর চোরাই মাল পাচার করা। এখন আমরা অনেক দূর র্যাব। চক্রধরপুর থেকে মাল নিয়ে চাঁইবাসা। তারপর সেখান থেকে চলে যাব রাঁচিতে।
বলো কী! আবার কবে ফিরবে?
আমাদের ফেরার কোনও দিনক্ষণ নেই। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে যদি ধরা না-পড়ি তা হলে তিনদিন পর। আর ধরা পড়লে দশ বছর জেলের ঘানি টেনে তারপর।
দোকানদার কালনেমি ও ময়নিহানকে গরম গরম পিঁয়াজি দিয়ে চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দিল।
ময়নিহান বলল, ঠাকুর সিং?
দোকানদার বলল, বোলিয়ে।
ছেলেটাকে রাখবে তোমার কাছে?
জরুর। লেকিন কুছ ঝামেলা হো যায়েগা তো?
কুছ নেহি হোগা বাবা। কিছু হলে ব্লবে কোথা থেকে কীভাবে এসেছে তুমি কিছুই জান না। তুমি শুধু ওর আশ্রয়দাদা।
কালনেমি ও ময়নিহান চা খেয়ে গাড়িতে উঠে বসল। তারপর গাড়ি স্টার্ট করার আগে দশটা টাকা বার করে দীপংকরের হাতে দিয়ে বলল, এটা রাখো তোমার কাছে। কিছু কিনে খাবে। সব যখন ভুলে মেরে দিয়েছ তখন তোমার দুর্গতি দূর করে কে? ছিলে আদরের দুলাল। এখন রাস্তায় ঘুরে ভিক্ষে করো। বলে চলে গেল ওরা।
দীপংকরের ইচ্ছে ছিল না টাকা নেবার। তবু ও নিল, না-নিলে চলবে কেন? ওর পকেটে তো মাত্র দুটো টাকা পড়ে আছে। এতে কী হবে? কাল রাত থেকে খাওয়া নেই। খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে একেবারে। এখন দু'মাইল হেঁটে ঘাটশিলায় পৌঁছোতে পারলে নিশ্চয়ই কোনও খাবার হোটেল পাওয়া যাবে। ওকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে ঠাকুর সিং বলল, আভি তুম ক্যা করোগে কুছ সোচা? কী
আর করব?
যাও দিন ভর ঘুমো। লেকিন স্যামকো হিয়া চলি আনা, সমঝা?
দীপংকর বলল, হ্যাঁ। তা আমি একবার ঘাটশিলায় যেতে চাই। কোনদিক দিয়ে যাব?
ইয়ে রাস্তা চলা গিয়া।
দীপংকর বলল, ঠিক আছে ঠাকুর সিং। আমি যাচ্ছি। সন্ধেবেলা যদি কোথাও থাকার জায়গা না পাই তো, আপনার এখানেই চলে আসব।
এমন সময় হঠাৎ একটা মারুতি গাড়ি উলটো দিক থেকে এসে ব্রেক কষল দোকানের সামনে। ভেতর থেকে এক ভদ্রলোক মুখ বাড়িয়ে বললেন, কুছ খবর আয়া ঠাকুর সাব?
নেহি আয়া।
গাড়িটা স্টার্ট দিতে যাবে এমন সময় ঠাকুর সিং বলল, এ লেড়কা কো ঘাটশিলা পর ছোড় দেনা লালব্জি, থোড়া সা মেহেরবানি।
আরে মেহেরবানিকা কোই বাত নেহি। আও বাচ্চে।
দীপংকর বেশ প্রফুল্ল চিত্তে মারুতির ভেতরে ঢুকে বসল। ঠাকুর সিং হাত নেড়ে বিদায় জানাল দীপংকরকে।
মিনিট দশেকেরও কম সময়ের মধ্যে মারুতি গাড়িখানা ঘাটশিলায় এসে পৌঁছল। একেবারে স্টেশনের সামনে নামিয়ে দিয়ে আবার হুশ করে চলে গেল মোটরখানা।
দীপংকর প্রথমেই একটা বাঙালির খাবারের দোকানে গিয়ে ঢুকল। এখানে নিশ্চয়ই খবরের কাগজ থাকবে। আর সেই খবরের কাগজের প্রথম পাতাতে নিশ্চয়ই থাকবে গত সন্ধ্যার ওর ওই কু-কীর্তির কথা।
কিন্তু যা ভাবল তা হল না। পেট ভরে কচুরি-মিষ্টি খেয়ে যখন খবরের কাগজের পাতায় চোখ বোলাল, তখন দেখল এর সবক'টি খবরই ওর পড়া। অর্থাৎ এ কাগজ কালকের। আজকের কাগজ আসতে সেই বেলা দশটা। হাওড়া থেকে ইস্পাত এক্সেপ্রেস এসে না-পৌঁছুনো পর্যন্ত কাগজ পাওয়া যাবে না।
যাক এখনও কিছু সময়ের জন্য নিশ্চিন্তে থাকা যাবে। কেন না ওর ওই হত্যাকাণ্ডের কথা এখানকার লোকদের জেনে ফেলার এখনও অনেক দেরি আছে।
খুব চালাকি করে হাবাগোবা সেজে অভিনয় করে পার পেয়েছে ও কালনেমি আর ময়নিহানের হাত থেকে। এমনকী ঠাকুর সিংকেও জানতে দেয়নি ওর আসল পরিচয়। কী দরকার। অচেনা পরিবেশে ছদ্মবেশই ভাল। না হলে কে কখন গিয়ে টুক করে পুলিশের কানে খবরটা তুলে দেয় তার ঠিক কী? এখন সমস্যা যেটা দাঁড়াল সেটা হল ও তো এখানে মানিলেস। সামান্য এই ক'টা টাকায় ও কী করবে। এ যা টাকা এতে ওর একটা দিন চলবে খুব জোর, কিন্তু তারপর? তারপর কোথা যাবে? কী খাবে? কী করবে? ভেবে ভেবে কোনও কূলকিনারাই পেল না ও। পুলিশের ভয়ে একবস্ত্রে পালিয়ে এসেছে।
যাই হোক। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় এসে একটা নদী দেখতে পেল ও। কী চমৎকার সব পাথর, যেন বাসুকি নাগের মতো ফণা উঁচিয়ে আছে নদীর গর্ভে। এমন ও কখনও দেখেনি। কাচের মতো স্বচ্ছ নদীর জলধারা। বালিতে অভ্ররেণু চিকচিক করছে। একজনকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, এই নদীর নাম সুবর্ণরেখা। ছোটনাগপুরের পাহাড়মালা থেকে উৎপন্ন হয়েছে এই নদী। এই নদীর বালিতে সোনার রেণু আছে।
হঠাৎ ও দেখল দু’জন লোক ছোট কুলোয় করে বালি ছেঁকে হেঁকে কী যেন তুলছে।
ও কাছে গিয়ে বলল, বালিতে তোমরা কী খুঁজছ গো?
আমরা সোনা খুঁজছি।
সোনা খুঁজছ!
হ্যা গো। আমরা হলুম সোনাখোঁচা। এই থেকেই হেঁকেছুকে আমরা সোনার রেণু বার করব। তারপর সেগুলো জমিয়ে বিক্রি করব বাজারে।
দীপংকর বলল, সব নদীতেই কি সোনা পাওয়া যায়? আমাদের দেশেও তো নদী আছে। কই সেখানে তো কেউ সোনা খোঁজে না।
একজন হেসে বলল, সব নদীতে যে সোনা মেলে না বাবা। এ যে সোনার নদী। তাই এখানে মেলে।
দীপংকরের বুকের ভেতরটা যেন কীরকম করে উঠল। বলল, সোনার নদী! এই তা হলে সেই কল্পনার সোনার নদী। অর্থাৎ যে নদীতে সোনা পাওয়া যায়? হ্যাঁ গোঁ হ্যাঁ। সোনার নদী সুবর্ণরেখা।
দীপংকর অবাক হয়ে গেল। ওর জেঠু তা হলে মিথ্যে কিছু লেখেননি। বাড়িয়েও কিছু না। সোনার নদী তা হলে সত্যিই আছে।
লোকটি বলল, কী নাম তোমার খোকাবাবু?
আমার নাম? আমার নাম সোনাচাঁদ।
সুনাচাঁদ ? বাঃ বেশ নাম তো?
তোমার নাম কী?
আমার নাম হাঁসুলি।
কোথায় ঘর তোমার?
আমার ঘর নদীর ওপারে! ওই যে দেখছ পাহাড়ের কোলে জঙ্গলের ভেতরে ছোট্ট গ্রামখানা ওই গ্রামেই আমার বাড়ি।
আমাকে নিয়ে যাবে তোমার বাড়িতে?
কেন গো বাবু? আমার বাড়ি গিয়ে কী করবে
থাকি। তোমাকে বসতে দেব কোথায়?
গরিব লোক আমি। মাটির ঘরে
যেখানে হোক দিয়ো। তবু আমি তোমার সঙ্গে যাব।
তোমার মা-বাবা বকবেন না?
তাঁরা কেউ নেই এখানে। আমি একা।
সে কী! বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছ নাকি তুমি?
দীপংকরের চোখদুটো ছলছলিয়ে উঠল একবার। বলল, হ্যাঁ। পালিয়েই এসেছি।
কেন পরীক্ষায় পাস করতে পারনি?
তা নয়, আসলে আমার সৎ মা তো। মারধোর করেন খুব।
তা বেশ করেছ। সৎ মায়ের মার খাওয়ার চেয়ে ঘর থেকে পালিয়ে আসা বরং ভাল। জীবনে দাঁড়াতে পারবে। বাড়ি কোথায় তোমার? বর্ধমানে।
বর্ধমানের কোন জায়গায়?
বসিরহাটে।
বসিরহাটে? বর্ধমানে আবার বসিরহাট কোথায় পেলে গো? বসিরহাট তো চব্বিশ পরগনায়।
আছে আছে। বর্ধমানেও আছে। যেমন ধর্মতলা কি শুধু কলকাতায়? ধর্মতলা সব জায়গাতেই আছে।
লোকটি বলল, তুমি তা হলে সত্যিই আমার বাড়িতে যাবে খোকাবাবু? হ্যাঁ যাব।
চলো তবে।
কী বিচ্ছিরি কালো ভূতের মতো চেহারা লোকটার। অথচ কী চমৎকার কথাবার্তা। একটা যাত্রীবাহী নৌকোয় দীপংকরকে উঠিয়ে নিজে ছাঁকনি জাল আর মাটির হাঁড়ি নিয়ে অদ্ভুত কায়দায় সাঁতার কেটে ওপারে গিয়ে উঠল। এ নদীতে জল খুব কম। কোথাও এক হাঁটু, কোথাও এক কোমর, কোথাও বা এক বুক জল। ...তার বেশি নেই। তবুও পারাপারের জন্য নৌকা বাওয়া।
নৌকা ওপারে ভিড়তেই মাঝির হাতে দশটা পয়সা দিয়ে দিল দীপংকর।.
লোকটি সঙ্গে সঙ্গে হাঁ হাঁ করে উঠল, না না। পয়সা দিয়ো না। এ নৌকা আমার, আর ওই মাঝি আমার ছেলে।
দীপংকর অবাক। এই বাপ আর ওই ছেল! ছেলের হাতে দামি রিস্টওয়াচ। নৌকার খোলের মধ্যে ট্রানজিস্টার বাজছে। টেরিকটের পায়াগুটোনো প্যান্ট পরে আছে। আর পরে আছে নাইলনের গেঞ্জি। বেশ নধর গড়নের সুঠাম দেহ। কত তফাত।
ওপারে নেমে বড় বড় ঘাসের বন, নল খাগড়া, কাশ ইত্যাদি ঠেলে উঁচু ডাঙায় উঠল ওরা। পাহাড়ি গাছপালা, বুড়ো মহুয়া, বেঁটে পলাশ সবই আছে ওখানে। ছোট ছোট টিলা দু’–একটা পেরিয়ে একটি ছোট্ট গ্রামে গিয়ে ওরা পৌঁছুল। গ্রামটি আদিবাসীপ্রধান। নিকানো মুছানো একটি উঠোনে দাঁড়িয়ে এক বুড়ি অপলকে তাকিয়ে রইল দীপংকরের দিকে। মাঠের রাখালরা লাঠির ওপর ভর দিয়ে ওর দিকে চেয়ে রইল। চাইবে নাই বা কেন? ওই কালো কুচ্ছিত সোনাখোঁচাটার সঙ্গে এমন টুকটুকেপানা ছেলেকে দেখলে বিস্ময় না-হবেই বা কার? শুধু মানুষ কেন, গোরুগুলো পর্যন্ত এই পাথর কাঁকরের দেশে খুঁজে পেতে যে দু’-এক কল ঘাস মুখে পুরেছিল, তারাও এই অচেনা কিশোরকে দেখে ঘাস চিবোতে ভুলে গেল যেন। মুখের ঘাস মুখেই রইল তাদের।
দীপংকর যে সোনাখোঁচাটার সঙ্গে গিয়েছিল, আগেই বলেছি তার নাম হাঁসুলি। রাঙা মাটির নিকোনো মুছানো উঠোনের এক প্রান্তে খড়ের ছাউনি দেওয়া হাঁসুলির ঘর।
হাঁসুলির বউ দাওয়ায় বসে রান্না করছিল। অবাক হয়ে বলল, ই ছেইলেটো কে বটেক?
হাঁসুলি বলল, একটা ছেইলে বটেক। বাপ-মায়ের ওপর রাগ করে পালিয়ে এসেছে। দুটি ভাত খাবে। দু’-একদিন থাকবে। তারপর চলে যাবে। হাঁসুলির বউ বলল, কী নাম গো তোমার?
আমার নাম সোনাচাঁদ।
তা সুনাচাদের মতোই দেখতে বটে। বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছ? মা-বাবা কাঁদবে না?
দীপংকর বলল, না! আমার তো সৎ মা। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে আমাকে।
ও বুঝেছি। তা দেখো আমাদের এখানে দু’দিন থেকে। থাকতে পারো কি না। দীপংকর বলল, হ্যাঁ পারব।
হাঁসুলির বউ তখনই ওকে মুখহাত ধোবার জল দিল। তারপর মুড়ি আর পিঁয়াজকুঁচো একটা বাটিতে করে খেতে দিল।
দীপংকর সেই খেয়ে, এক গেলাস জল খেতেই তৃপ্তিতে ভরে উঠল ও। কী সুন্দর জলের স্বাদ এখানকার ! এমন জল তো হাওড়ায় নেই।
দীপংকর দেখল হাঁসুলি যে সোনামাখা বালি কুড়িয়ে এনেছিল সেগুলি খুব যত্ন করে একটি বাঁশের চোঙায় ভরে দেওয়ালের পেরেকে ঝুলিয়ে রাখল। হাঁসুলির বউ বলল, তা সুনাচাঁদ। তোমরা কী জাত গো বাবা? আমরা বামুন।
ও মা গো। তা আমাদের রাঁধা ভাত তুমি খাবে?
কেন খাব না?
আমরা যে জাতিতে ঝোরা। ওই ও বাড়ির ওরা হচ্ছে গণ্ড। আমরা হলুম সবচেয়ে ছোট জাত।
দীপংকর বলল, কে বলল? মানুষের একটাই জাত। সে জাত হল মানুষ। হাঁসুলির বউ গলায় আঁচল দিয়ে প্রণাম করল দীপংকরকে। দীপংকর লাফিয়ে
উঠল, এ কী করছেন! আমি আপনার ছেলের মতো।
তা হোক বাবা। তুমি বামুনের ছেলে। দেবতা। আমাদের কত ভাগ্য যে, আজ তুমি আমাদের বাড়িতে এসেছ। তা বাবা একটা কথা বলি। ডিম খাও তুমি? আমি সব কিছুই খাই।
হাঁসুলিও তখন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে দু' পা ছড়িয়ে মুড়ি খেতে বসেছে। দীপংকর বলল, আচ্ছা ওই সোনা তোমরা বালি থেকে হেঁকে বার করবে কী করে?
সে অনেক হেফাজত গো। ছোট ছেলে তুমি। ওসব বুঝবে না। তবু লেখাপড়া জানা ভাল ভদ্রলোকের ঘরের ছেলে তো, তাই বলছি তোমাকে। বিশেষ করে তোমার যখন জানবার এত ইচ্ছে, তখন শোনো। প্রথমে আমরা সোনার রেণু মাখা বালি নদী থেকে অথবা পাথরের গা থেকে চেঁচে নিয়ে কুলোর মতো একটা পাত্রে রেখে বড় বড় পাথর ঢ্যালা কাঁকর বেছে ফেলে দিই। তারপর সেই কুলোটা নেড়ে চেড়ে ছোট কাঁকর ও অন্য পদার্থগুলো ফেলে দিই! এরপরে যে বালিটা পড়ে থাকে তাকে বেশ ভাল করে ধুয়ে নিই। এইভাবে বার বার ধুতে ধুতে কাদা-কাঁকর সব যখন ধুয়ে যায়, তখন কালো কালো বালি সামান্য কিছু পড়ে থাকে। তারই মাঝে মাঝে সোনার রেণুগুলো আমরা আলাদা করে নিই। ,
হাঁসুলির বউ বলল, তবে কী জানো বাবা, এতে আমাদের মজুরি পোষায় না। এই মানভূম সিংভূম অঞ্চলের সোনাখোঁচাদের তাই দুঃখের শেষ নেই। কাজেই তিনশো বছর আগেও আমাদের যে অবস্থা ছিল। আজও তাই আছে।
হাঁসুলি বলল, শুধু উপযুক্ত ব্যবস্থার অভাবে কত সোনা নষ্ট হয় এখানে। অথচ এই নদী সোনার নদী। এত সোনা এখানে আর কোথাও নেই। আর আছে আসামে। তবে ওখানকার ব্যবস্থাও ভাল। সেখানে যে নদীতে সোনা আছে, তার ধারে ধারে গড়ে উঠেছে সোনাখোঁচাদের বাস।
দীপংকর বলল, আচ্ছা, কোথায় সোনা আছে ওরা খোঁজ পায় কী করে?
এমন কিছু শক্ত নয়। সোনাখোঁচারা ঘুরে বেড়ায়। নদী যেখানে হঠাৎ বেঁকে গেছে, বা স্রোত খুব দ্রুত এবং পাড় উঁচু ও ভাঙা ভাঙা, তার অপর পাড়ে প্রচুর সোনা পাওয়া যায়। অবশ্য প্রথমে বাঁশে করে নদী থেকে কতকটা বালি তুলে তাইতে সোনা আছে কি না দেখতে হয়। সেই বালিতে দশ বারোটা সোনার রেণু চিক চিক করলেই বুঝে নিতে হবে এতে সোনা আছে। এরপর নদীর ওপর একটা বাঁধ দেওয়া হয়। এবং মনোনীত জায়গাটির ওপর দিয়ে বয়ে যেতে দেওয়া হয় স্রোতকে। এইভাবে স্রোতে কাদা প্রভৃতি ময়লা পদার্থগুলি ধুয়ে গেলে দেখা যাবে, সোনার রেণু মাখা বালি তলায় চিক চিক করছে। তা হলে দেখা যাচ্ছে যে আমাদের এখানকার নিয়মের চেয়ে ওখানকার ওই নিয়মে অল্প মেহনতে ওইরকম পরিষ্কার সোনামাখা বালি পেয়ে যাচ্ছে ওখানকার লোকেরা।
দীপংকর বলল, ওই নিয়ম এখানে খাটে না?
না। এখানে সে সুবিধে নেই।
তারপর?
তারপর ওরা করে কী সেই বালি চেঁচে একটা বাঁশের চালুনির ওপর জমা করে। এবং লাউয়ের খোলায় করে তার ওপর ধীরে ধীরে জল ঢালতে শুরু করে, আর নাড়তে থাকে চালুনিটাকে। তার ফলে সোনামাখা বালি ধুয়ে নীচের একটি পাত্রে পড়ে। অবশ্য অল্প কাঁকর-পাথর যা থাকে সেগুলোকে ফেলে দেওয়া হয়। এইভাবে এক এক খেপে প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ ঝুড়ি বালি ধোয়া হয়। এইবার এই ছাঁকা বালিতে পারা মিশিয়ে দেওয়া হয়। পারা দিলেই সোনার রেণুগুলো জড়িয়ে যায় পারার গায়ে। তখন এতে অল্প অল্প ঢাললেই সেই বালি ধুয়ে যায় এবং পারামাখা সোনা আলাদা হয়ে যায়।
দীপংকর বলল, বাঃ বেশ মজা তো। কিন্তু পারা থেকে সোনাগুলোকে বার করে কী করে?
আর কোনও অসুবিধে নেই। সেই পারামাখা স্বর্ণখণ্ড এক-একটা শামুকের ভেতরে রেখে সেগুলো আগুনে পোড়ালেই শামুক পুড়ে চুন হয়ে যায়, আর পারা উঠে গিয়ে সোনাটা বিশুদ্ধ হয়ে পড়ে থাকে।
দীপংকর বলল, ভাগ্যে তোমাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হল। না হলে এসবের কিছুই তো জানতাম না আমি।
হাঁসুলি বলল, আজকাল লোকজন বড় খারাপ হয়ে গেছে বাবা। তাই এ কাজে আর আনন্দ নেই। এই সোনা সোনা করে কত যে মারপিট, দাঙ্গা, খুন-খারাপি হয়ে চলেছে তা কী বলব।
দীপংকরের চোখদুটো যেন কীসের আশায় চকচকিয়ে উঠল! ওর তিমিরাবৃত মনে সামান্য একটু আলোকপাত হল যেন। ওর জেঠুও তো খুন হয়েছেন এই সোনা সোনা করেই। এই সোনার জন্যই তো গুপ্তঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে তাঁকে। দীপংকর তাই অবাক হয়ে বলল, এই সামান্য একটু সোনার জন্য খুন !
সামান্য সোনা নয় খোকাবাবু। এই নদী, ওই দূরের পাহাড় এসব হল স্বর্ণ-প্রসবিনী। ওই যে দেখছ পাহাড়গুলো, ওই পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় সোনা। ওইসব সোনাই তো বৃষ্টির জলে ধুয়ে বয়ে আসে নদীর স্রোতে।
ওই পাহাড়ে যদি অত সোনা তো তোমরা এত কষ্ট করে নদীর বালি ঘেঁটে সোনা বার করো কেন?
এই দেখো। আমরা যে হলাম সোনাখোঁচার জাত। গণ্ড, ঝোরা। আর ওই পাহাড়ে সোনা নিতে গেলে পাহাড়িরা তা নিতে দেবে কেন?
ওই পাহাড়ে অনেক সোনা!
অনেক! সোনার গুহা পর্যন্ত আছে।
বলো কী। সোনার গুহা! তা যদি সত্যি হয় তা হলে গভর্নমেন্টের লোকেরা এসে ওইসব সোনা নিয়ে যায়নি কেন?
আরে সবাই কি সন্ধান জানে? ওই সন্ধান জানতে গিয়েই তো সেবার এক বাঙালিবাবু গভীর রাতে খুন হয়ে গেল। সোনার সন্ধান কেউ পেলে তার আর রক্ষে নেই। ওখানকার লোকেরা সঙ্গে সঙ্গে তাকে মেরে ফেলবে।
দীপংকর বললে, উঃ কী ভয়ানক।
হাঁসুলি বলল, সোনা যদি লোহার মতো সস্তা হত, তা হলে খুনখারাপি কিছুই হত না। ওই বাঙালিবাবু ছিলেন স্বর্ণ-সন্ধানী। পাহাড়ে-জঙ্গলে শুধু ঘুরতেন, আর সোনা খুঁজে বেড়াতেন।
দীপংকর বলল, আচ্ছা ওই পাহাড়ে আমি যেতে পারি না?
কেন পারবে না? তবে ওই পাহাড়গুলো এখান থেকে কাছে মনে হলেও ওগুলো কিন্তু অনেক দূরে। তা ছাড়া ওই পাহাড়ে গেলেই যে তুমি সোনা দেখতে পাবে তা তো নয়! কোথায় সোনা লুকিয়ে আছে খুঁজে বার করতে হবে। দুই পাহাড়ের মাঝের খাঁজে পাথরের মধ্যে সোনা থাকে। কালক্রমে যে পাথরে সোনা থাকে সেই পাথর পচে বর্ষার জলে নদীতে গিয়ে পড়ে। কোয়ার্টজ নামে এক ধরনের পাথরের মধ্যেই শুধু সোনা দেখতে পাওয়া যায়। এই পাথরের খাঁজে খাঁজে যেখানে সোনা থাকে তাকে স্বর্ণশিরা বলে। যে কোয়ার্টজ পাথরের খাঁজে সোনা থাকে, সেখানে শুধু কোদাল দিয়ে খুঁড়েই কত লোক বড়লোক হয়ে গেছে। ওই পাহাড়ে কখনও গেলে দেখবে কূপের মতো বড় বড় গর্ত। তা প্রায় পঞ্চাশ ষাট হাতের মতো গর্ত অনেক আছে। বহুকাল থেকেই মানুষ ওইখান থেকে সোনা সংগ্রহ করছে। এক এক জায়গায় সেই গর্ত এত বেশি যে, সেখানে বড় বড় গুহার সৃষ্টি হয়ে গেছে।
দীপংকর বলল, আমি যাব।
হাঁসুলি বলল, খবরদার খোকাবাবু! ওই কাজটি কোরো না।
কেন করব না?
ঘাঁটি ওখানে।
ওখানকার লোকজন ভাল নয়। তা ছাড়া বড় বড় ডাকাতের কাজেই সোনার সন্ধানে ওখানে গেলে কেউ ফেরে না।
দীপংকর বলল, আচ্ছা সেই যে বাঙালিবাবু খুন হয়েছেন বললে, ওই বাঙালিবাবুর নাম কী জান?
না বাবু। নাম জানি না। ওই বাঙালিবাবুর একটা এদেশি চাকর ছিল। সেও আধা খুন হয়ে গেল। তবে প্রাণে বেঁচেছে সে লোকটা।
লোকটা কোথায় থাকে।
ও থাকে বাসাড়েরা গ্রামে। ওর নাম ইকলু।
এমন সময় খাবারের ডাক পড়ল। হাঁসুলির বউ দাওয়ায় চাটাইয়ের আসন পেতে কলাইয়ের থালায় লাল মোটা চালের ভাত, ডাল, পোস্ত আর ডিমের ঝোল খেতে দিল দু’জনকে।
দীপংকরের দারুণ খিদে পেয়েছিল। তাই সে পরম তৃপ্তির সঙ্গে খেয়ে নিল সেই ভাত, তরকারি। এরপর বিশ্রাম। একটি ছোট্ট টিলার গায়ে গাছের ছায়ায় শুয়ে শুয়ে দীপংকর ঠিক করে নিল আর এখানে নয়। বেলা পড়ে আসছে। ওকে যেভাবেই হোক ঠাকুর সিং-এর আস্তানায় গিয়ে পৌঁছতেই হবে। কেন না ওই পাহাড় জঙ্গল ওইখান থেকেই তো শুরু। ওখানে থাকলে ওর অভিযান খুবই সহজ হয়ে উঠবে। ওই জঙ্গল ভেদ করে পাহাড় টপকে ও যেভাবেই হোক পৌঁছে যাবে বাসাডেরায়। ইকলুদের গ্রামে। আর সেখানে গিয়ে ইকলুকে খুঁজে বার করতে পারলেই ও অনেক কথা জানতে পেরে যাবে।
একটা খুন তো নিজের অজান্তেই হয়ে গেছে। পুলিশের খাতায় ওর নাম নিশ্চয়ই জ্বলজ্বল করছে এতক্ষণে। আর কয়েকটা খুন ওকে করতে হবে। ওর প্রথম টার্গেট কুন্দনলাল। যে ওর বাবাকে ভয় দেখিয়েছিল, যার জন্য টাটানগরের ওই বাড়িতে ওরা যেতে পারছে না। যে ওর বাবাকে সাকচি বাজারে মোটর বাইক চাপা দিতে গিয়েছিল। যদিও এ কাজ যে কুন্দনলালেরই তার কোনও প্রমাণ নেই, তবুও ওর মন বলছে এ কাজ ও ছাড়া আর কেউ করতে পারে না। কেন না জেঠু তো লিখেইছেন, ‘শয়তানের মৃত্যু নেই। ওর হাতে হয়তো আরও অনেকের মৃত্যু আছে।' দীপংকরের স্থির বিশ্বাস ওর জেঠুর হত্যাকারীও কুন্দনলাল ছাড়া আর কেউ নয়। কিন্তু কীভাবে ধরা যায় লোকটাকে? এবং কী কৌশলে ওকে বধ করা যায়? ও তো নিরস্ত্র। আর যা কিছুই করুক না কেন, সবকিছুই করতে হবে ওকে খুব তাড়াতাড়ি। কারণ হত্যাকারীকে না-পেলে ওয়ারেন্ট বেরোবেই এবং যেখানেই গা ঢাক৷ দিয়ে থাকুক না ও, পুলিশ ওকে ধরবেই। তবে ভগবান সহায় তাই ও এইখানে অর্থাৎ এই সোনার নদীর দেশেই এসে পৌঁছেছিল। এই কথাটা মনে হতেই কেমন যেন শিহরিত হয়ে উঠল দীপংকর। তবে কি সত্যি সত্যিই ও ঈশ্বরের ইচ্ছায় এখানে এসেছে? না হলে ওর হাতে একটা মানুষ খুনই বা হল কেন? কেনই বা পালাতে গিয়ে ওই দুর্ঘটনা ঘটল? আর ঘটল যখন, তখন ওরা ওকে ট্রাকে না-তুলে রাস্তাতেই বা ফেলে দিয়ে এল না কেন? এবং এল যখন এই সোনার নদীর দেশে কেন? আসানসোল, দেওঘর অথবা বালেশ্বর, খুরদার দিকেও তো যেতে পারত? কিন্তু তা যখন হয়নি এবং ওর নিয়তিই যখন ওকে এই সোনার নদীর দেশে নিয়ে এসেছে, তখন তাঁর অভিপ্রায় কিছু একটা আছেই। অতএব হার ও মানবে না। তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’র মতন ও-ই হয়তো ওর জেঠুর হত্যাকারীদের ব্রহ্মাস্ত্র।
দীপংকর কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর এইসব ভাবনাচিন্তা করে হাঁসুলির কাছ থেকে বিদায় নেবে বলে আবার ওদের ঘরে এল।
হাঁসুলির ছেলে, মানে সুবর্ণরেখার সেই মাঝি তখন খেতে বসেছে। খেতে খেতেই সে বলছে, আমি বলি কী, চুপি চুপি ওকে পুলিশের হাতে তুলে দাও। না হলে পরে ঝামেলা হলে আমাদেরই কোমরে দড়ি পড়বে।
হাঁসুলি দাওয়ায় শুয়ে বলছে, তাই কী হয়? তার চেয়ে পরশু তো আমি কলকেতা যাব। তখনই না-হয় ওর বাড়িতে একটা খবর দেব?
আরে এটা বুঝছ না কেন? ওর বাড়ির লোকে কি থানা-পুলিশ করেনি? তার ওপর এখানে চারদিকে ঢি ঢি পড়ে গেছে, একটি ভদ্দর লোকের ছেলে আমাদের বাড়ি এসে উঠেছে বলে। এখন পুলিশের কানে গেলে কী অবস্থা হবে? তার চেয়ে এখনও সময় আছে। যদি বাঁচতে চাও তো পুলিশে খবর দাও। না হলে ছেলে চুরির দায়ে ফাঁসবে একথা কিন্তু বলে দিলাম।
পুলিশের নাম শুনেই ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল দীপংকরের। সর্বনাশ! এরা যদি পুলিশ ডাকে এবং ওকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়, তা হলে তো সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। কেন না এখানকার পুলিশ ওকে আটক করেই খবর দেবে বেঙ্গল পুলিশকে। আর তারপরই জেল, হাজত, ফাঁসি।
দীপংকর এক মুহূর্তও আর রইল না সেখানে। সামান্য একটু পিছু হটে এসে নদীর পথ ধরল। ওর ইচ্ছে হল পালাতে। কিন্তু তা সে করল না। কেন না ছুটতে গেলেই ও পালাচ্ছে বলে জেনে যাবে সকলে। এবং তখন ধরেবেঁধে ওকে পুলিশের হাতে তুলে দেবে ওরা। ওর জেঠুর হত্যাকারীদের খুঁজে বের করবার আর কোনও সম্ভাবনাই থাকবে না তখন।
গ্রাম থেকে বের হয়ে উঁচুনিচু জমি পার হয়ে টিলা পাহাড়ের পরিবেশ ছেড়ে নদীর ঘাটে এসে পড়ল দীপংকর।
সুবর্ণরেখার মাঝি এখন অন্য লোক।
যাত্রী বোঝাই নৌকোটা ছাড়বার অপেক্ষায় ছিল। দীপংকর যেতেই ওকে তুলে নিয়ে তির তির করে ওপারের দিকে এগিয়ে চলল নৌকোটা। দু’ মিনিটও সময় লাগল না। নদীর গর্ভে একটি বড় পাথরের গায়ে এসে ঠেকল।
দীপংকর নৌকো থেকে নেমেই ঠিক করে নিল আর কোনও দিকে নয়, একেবারে সোজা গিয়ে উঠবে ঠাকুর সিং-এর ডেরায়। কেন না ওই গভীর অরণ্যে ও পর্বতে অভিযান চালাতে গেলে ঠাকুর সিং-এর আশ্রয়টাই ঠিক। ঠাকুর সিং-এর মন জুগিয়ে দু’-চারটে দিন থেকে বাসাডেরায় গিয়ে ইকলুর সঙ্গে দেখা করবে ও। তারপর ইকলুর মুখ থেকে সেদিনের ঘটনার কথা কিছু শুনে খোঁজখবর করবে ওর জেঠুর হত্যাকারীর। এবং যে মুহূর্তে ও সব জেনে ফেলবে সেই মুহূর্তে যেভাবেই হোক জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে গিয়েও আঘাত হানবে হত্যাকারীকে। অর্থাৎ বদলা ও নেবেই। এবং বদলা নেবার পর নিজেই গিয়ে ধরা দেবে পুলিশকে। তখন আর লুকিয়ে থাকবার কোনও দরকারই হবে না।
সুবর্ণরেখার পাড় থেকে উঠে এসে একটু উঁচুনিচু পথে চলার পর ঘাটশিলা শহরে ঢুকল।
দীপংকরের মনে হল এখান থেকেই ওকে আবার অভিনয় শুরু করতে হবে। অর্থাৎ কিনা ওকে দেখাতে হবে ও একজন স্মৃতিহারা কিশোর। দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পাবার পর থেকে ওর পূর্ব-স্মৃতি লোপ পেয়েছে। ওর কোনও নাম নেই, ঠিকানা নেই, এই ওর পরিচয়।
দীপংকর একবার ভাবল একটা দোকানে বসে ও আজকের কাগজটা দেখে। আজকের কাগজে নিশ্চয়ই ছবিসহ গতকালের খুনের ঘটনাটা ফলাও করে ছাপা হবে। আর তাই থেকেই জানতে পারবে ওকে গ্রেপ্তার করবার জন্য পুলিশ কীভাবে চারদিকে তোলপাড় করছে। কিন্তু মনে হলেও সাহস হল না! যদি ওই গুরুত্বপূর্ণ খবরটা দেখবার সময় কেউ ওকে চিনে ফেলে? তা হলে? তা হলে কী হবে?
না। তার চেয়ে ওসব কৌতূহল মনের মধ্যে চেপে রেখেই ঠাকুর সিং-এর ডেরায় চলে যাওয়া ভাল।
দীপংকর আর অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করে ধীরে ধীরে পাহাড় ও জঙ্গলের পথ ধরল। দিনের আলো নিভে আসছে একটু একটু করে। পাখিরা কলরব করে ঘরে ফিরছে। হঠাৎই কেমন যেন বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল ওর। একটা চাপা কান্না যেন বুক থেকে হাহাকার করে বেরিয়ে আসতে চাইল। মা'র কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল বাবার কথা। মা-বাবাকে ছেড়ে ও যে কখনও একা থাকেনি। কোথাও যায়নি। ওর অভাবে ওর মা-বাবার অবস্থাই বা কেমন? দীপংকরকে না পেলে তাঁরা কি বাঁচবেন? ওর কত ইচ্ছে হল এখুনি বাড়ি ফিরে যেতে। কিন্তু কী করে যাবে ও? যেতে পারলে মা-বাবাকে সব কথা খুলে বললে তাঁরা হয়তো সবই বুঝবেন। কিন্তু পুলিশ তো বুঝবে না। তারা ঠিক এসে ওকে ওর মায়ের বুক থেকে কেড়ে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরবে। তারপর...।
আরে! তুম আ গিয়া?
দীপংকর চেয়ে দেখল পশ্চিমদেশীয় একজন দেহাতি লোক, হাঁটুর ওপরে কাপড়পরা, ওর দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটাকে ও চেনে না। বলল, কে তুমি? তুম ওহি লেড়কা যো নাম বতানে নেহি সতা? ক্যা নাম হ্যায় তুমহারা? জানি না।
সমঝ গিয়া। হাম তো তুমকো দিন ভর চুঁড়নে লাগা। ঠাকুর সিং নে ভেজা হামকো।
দীপংকর বলল, তুমি ঠাকুর সিং-এর লোক? ভালই হয়েছে জায়গাটা আমি ঠিক মনে করতে পারছিলাম না। আমি ঠাকুর সিং-এর কাছেই যাচ্ছিলাম। চলো তোমার সঙ্গেই যাই।
দীপংকর লোকটির সঙ্গে কিছুটা পথ যেতেই চিনতে পারল সকালবেলার সেই জায়গাটিকে।
সন্ধ্যার অন্ধকার বিভীষিকার মতো ঢেকে গেছে চারদিকে। অরণ্যের জন্য অন্ধকার আরও ঘন। আরও জটিল।
ঠাকুর সিং-এর দোকানে টিম টিম করে আলো জ্বলছে।
ওকে দেখেই ঠাকুর সিং পরমাদরে ডাকল, আও মুন্নে। কাঁহা গয়ে থে? খানা পিনা কুছু হুয়া?
দীপংকর বলল, হ্যাঁ।
লেকিন ঠারনে কা জায়গা নেহি মিলা। এহি তো—
আমি আপনার এখানেই থাকব।
আভি তক্ কুছ ইয়াদ আয়া?
না। আমি কোনও কিচ্ছু মনে করতে পারছি না।
ঠাকুর সিং বলল, ঠিক হ্যায়! তুম হিয়া ঠার যাও। বলেই ডাকল, চম্পা! এ চম্পা! কিউ?
ও লেড়কা আ গয়া। উসকো লে কর ঘর চলা যা তু।
দীপংকর দেখল ছোট একটি লণ্ঠন হাতে নিয়ে দোকানের ভেতর থেকে এক কিশোরী বেরিয়ে এল। চম্পা তো চম্পা। যেন সত্যিকারের চাঁপাফুল একটি। নামের সঙ্গে রূপের এমন সামঞ্জস্য সচরাচর দেখা যায় না। কথায় বলে দুধে আলতায় গোলা রং। ঠিক তাই। চাঁপার পাপড়ির মতো। ওর কালো কালো ভাসা ভাসা চোখদুটো কই মাছের মতো ছটফট করছে যেন।
দীপংকরকে ওর মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে ঠাকুর সিং বলল, আমার লেড়কি। যাও, উসিকি সাথ মেরা ঘর চলা যাও। হিয়া রহনা ঠিক নেহি।
চম্পা ওর দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল, আও মেরা সাথ। কী চমৎকার ডাক। যেন কত পরিচিত। কত দিনের ভাব ভালবাসা। কত আপনজন।
দীপংকর চম্পার সঙ্গ নিল।
অন্ধকার বনপথে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল ওরা। যেতে যেতে চম্পা বলল, ক্যা নাম তুমহারা।
জানি না।
আরে নাম ইয়াদ নেহি?
না।
চম্পা এবার থেমে দাঁড়াল একবার। তারপর ভাল করে দীপংকরকে দেখে বলল, বেচারা। পরে বলল, ঠিক আছে। হাম তুমহারা নয়া নাম দে দেগা।
বেশ তো দাও। কী নাম দেবে?
আমি তোমার নাম দেব বন্ধু।
এ কী! তুমি বাংলা বলছ?
আমি বাংলা বলতে পারি। থোড়া থোড়া।
থোড়া থোড়া কেন, বেশ ভালই তো বলছ তুমি।
আমি তোমার কাছে আরও ভাল বাংলা শিখে নেব।
সেই অন্ধকারে ওরা যে কোনদিকে যাচ্ছিল তার কিছুই বুঝতে পারছিল না দীপংকর। তবে আলো হাতে সম্পূর্ণ অজানা অচেনা এক দেশে চম্পার সঙ্গে পথ চলতে খুব ভাল লাগছিল ওর। কতই বা বয়স চম্পার? খুব জোর তেরো কি চোদ্দো। দীপংকরের সমবয়সি। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যে।
এক জায়গায় এসে থামল চম্পা। তারপর বলল,
মেরা হাত পাকড়িয়ে। দীপংকর বলল, আবার হিন্দি বলে ফেললে তো?
চম্পা হেসে বলল, স্যরি মিস্টার, স্যরি। আমার হাত ধরো।
দীপংকর বলল, বাঃ। তুমি ইংরেজিও জান দেখছি। এই বনবাসে থেকে এত স্মার্ট কী করে হলে তুমি?
তুমি কি মনে করো আমি একটা জংলি মেয়ে। জঙ্গলে থাকলেও পড়া-লিখা করি আমি। এই বছর আমি ক্লাস সেভেনে উঠেছি। তুমি?
দীপংকর চুপ করে রইল।
চম্পা করুণ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, কী, মনে করতে পারছ না? দীপংকর ঘাড় নাড়ল।
ঠিক আছে। দু’-চারদিন কে বাদ সব ইয়াদ আ যায় গা। এখন আমার হাতটা ধরে নেমে এসো একটু।
দীপংকর চম্পার হাত ধরে একটু গড়ানে জায়গা থেকে নেমে চলে এল। তারপর ওরা দু'জনে আর একটু পথ এক সঙ্গে চলে একটি ছোট কুটিরে এসে হাজির হল।
চম্পা বলল, হামারা মকান। তুমি হয়তো বড় লোকের ছেলে। পাক্কা মকানে থাক। গদি বিস্তারায় শোও। লেকিন হাম গরিব আদমি-
দীপংকর সঙ্গে সঙ্গে চম্পার মুখে হাত রাখল। বলল, আর একবার ওই কথা
বললে আমি কিন্তু রাগ করব খুব। চলে যাব এখান থেকে। গরিব আবার কী? চম্পা তেমনি মধুর করে হেসে বলল, তোমার কষ্ট হোবে না তো এখানে? দীপংকর বলল, হোবে নয়, হবে।
চম্পা ফিক করে হেসে বলল, কষ্ট হলই বা করব কী? আমাদের আর কিছু নেই।
তোমার মা নেই চম্পা?
না। বাবা ছাড়া আমার কেউ নেই।
তোমার বাবা খুব ভাল। উনি যদি আমাকে আশ্রয় না-দিতেন তো আমি কোথায় যেতাম বলো তো? তার চেয়েও বড় কথা সকালে এখান থেকে চলে গিয়ে আর যদি ফিরে না আসতাম, তা হলে তোমাকে পেতাম না। চম্পা, আমার বোন নেই। অথচ আমার বোনের খুব শখ। আমার একটি বোন থাকবে। সে আমাকে দাদা বলে ডাকবে। তুমি আমার সেই অপূর্ণ সাধ পূরণ করো চম্পা!
তবে যে তুমি বললে তুমি কিছু ইয়াদ করতে পারছ না? এই তো, এই তো ইয়াদ হচ্ছে তোমার।
আর একটু হলেই ধরা পড়ে গিয়েছিল আর কী। দীপংকর হঠাৎ দু'হাতে কপালটাকে টিপে ধরে বলল, না না না। কিছু মনে পড়ছে না আমার। সব কিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। চম্পা! আমাকে ধরো। একটু জল দাও আমাকে। উঃ। কী দারুণ ঘুরছে মাথাটা।
চম্পা ওকে ধরে দাওয়ার ওপর বসিয়ে দিয়ে বলল, তুমকো কুছ ইয়াদ করনে নেহি হোগা। চুপচাপ বসো তুমি। ইয়াদ করতে গেলেই মাথার কষ্ট হবে। তবে আমার মনে হচ্ছে একটু একটু করে সবই মনে পড়বে তোমার। এই বলে এক গেলাস জল এনে দিল ওকে।
দীপংকর এক নিশ্বাসে জলটা খেয়ে নিল। আঃ। কী অপূর্ব স্বাদ এখানকার জলের।
চম্পা বলল, তুমি শোবে? যদি শুতে চাও তো বলো। দাওয়ায় চাটাই বিছিয়ে দিই। তারপর রাতের খানা বানাই।
দীপংকর বলল, না। এখনই শোব না। তুমি খাবার তৈরি করো। আমি তোমার সঙ্গে বসে বসে গল্প করি।
দীপংকর দাওয়ায় বসে ফুরফুরে হাওয়ায় দেহটাকে চাঙ্গা করে তুলল। কিন্তু ওর এখানে সবচেয়ে অসুবিধে যেটা হল সেটা হচ্ছে এই, পরে থাকা জামা আর প্যান্ট ছাড়া একটা কিছু তো নেই। টাকা-পয়সা বলতে ওর নিজের দু’ টাকা, এবং সকালে পাওয়া সেই দশটি টাকা আছে। এতে কী হবে? চম্পা যদি ছেলে হত তা হলে ওর কাছ থেকে একটা প্যান্টসার্ট চেয়ে নিয়ে পরতে পারত। কিন্তু ও তো মেয়ে।
দীপংকর বসে বসে চম্পার কাজ দেখতে লাগল। কত কম বয়স। অথচ কী কাজের। আসলে মা নেই তো। তাই সব কাজই ওকে করতে হয়।
একটু পরেই একটি আট-ন' বছরের ছেলেকে একটা ঘটিতে করে দুধ নিয়ে আসতে দেখা গেল। ছেলেটি বাইরের গেটের কাছ থেকে ডাকল, চম্পাদিদি। আ যাও বাবুয়া।
দুধের ঘটিটা নিয়ে ছেলেটি ঢুকতেই ইয়া কেঁদো বাঘের মতো একটা কুকুরও এসে ঢুকল। কুকুরটা দীপংকরকে দেখেই চিৎকার করে উঠল, ভৌ-উ-উ-উ-উ। চম্পা বলল, চেল্লাও মাৎ। দেখা নেহি মেহমান আয়া। যাও, উধার যাও। খানা খালো!
বলতেই কুকুরটা সরে গেল একপাশে। তারপর একটি মাটির গামলায় রাখা এঁটো ভাত-ডাল ইত্যাদি খেতে লাগল।
ছেলেটি দুধের ঘটিটা দাওয়ায় রেখে চলে গেল আবার।
দীপংকর বলল, ছেলেটি কে গো?
বাবুয়া। উধারবালা গাঁও কা এক গোয়ালাকি লেড়কা। খুব ভাল ছেলে। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চম্পা কিছু কাঠকুটো জোগাড় করে দাওয়ায় পাতা উনুনে কাঠের জ্বাল দিয়ে চায়ের জল বসাল। তুমি চা খাও?
দীপংকর বলল, হ্যাঁ খাই।
আমি চা না-খেয়ে একদম কাজ করতে পারি না।
চা তৈরি হলে, উনুনে ডাল বসিয়ে রুটির ময়দা মাখতে লাগল চম্পা। আর সেই কুকুরটা হঠাৎ ওপরে উঠে এসে দীপংকরের গায়ে গা ঠেকিয়ে শুয়ে লেজ নাড়তে লাগল।
দীপংকর চা খেতে খেতে বলল, তোমার মা কতদিন মারা গেছেন চম্পা? মালুম নেহি।
সে কী! তুমি তখন খুব ছোট বুঝি? মায়ের কথা মনে পড়ে না তোমার? মনে পড়ে লাভ কী বলো? ও জিন্দা তো নেহি হোগা।
তোমার বাবুজি কখন আসবেন?
বাবুজি? বাবুজি আসবেন কেন? দোকান ফেলে কী আসতে পারেন বাবুজি। তা হলে তুমি একা থাকবে?
চম্পা হেসে বলল, একা থাকব কেন? তুমি তো আছ।
সে না হয় আজ। কিন্তু এর আগে কী করে থাকতে? পরে কী করবে?
চম্পা মুখ তুলে দেখিয়ে দিল কুকুরটাকে। বলল, ও থাকত আমার কাছে। এখন তুমিও থাকবে। আমরা তিনজন হয়ে গেলাম। এখন থেকে তুমি, আমি আর ভেলুয়া।
ভেলুয়া!
হ্যা। কুকুরটার নাম। এক বাঙালিবাবুর কুকুর ছিল ও। কুকুরটা আমাকে খুব ভালবাসত। তা সেই বাঙালিবাবু মরে গেলে ও আমার কাছেই রয়ে গেল।
এই ঘন অন্ধকারে যেন একটা আলোর শিখা দেখতে পেল দীপংকর। এই ভেলুয়াকে দিয়েই কাজ হবে। চম্পাকে দিয়েও হবে। একটু একটু করে কুরে কুরে সব কিছু জেনে নেবে ও।
দীপংকর বলল, বাঙালিবাবু কী করে মরল? অসুখ করেছিল বুঝি? উঁহু। কুছ বুরা আদমি অচানক মার ডালা উনকো। সে কী! খুন !
চম্পা ঠোটে তর্জনী রেখে বলল, চুপ। অ্যায়শা বাত মাৎ বোল না।
দীপংকর চুপ করল।
রান্না শেষ করে দীপংকরকে খেতে দিল চম্পা। তারপর ভেলুয়াকে সঙ্গে নিয়ে ওর বাবার কাছে খাবার পৌঁছে দিতে চলে গেল। যাবার সময় দীপংকরকে বলে গেল ঘুম পেলে দাওয়াতেই শুয়ে পড়তে। দীপংকর ঘাড় নেড়ে ‘হ্যা’ বলল।
খুব ভোরে যখন ঘুম ভাঙল দীপংকরের, তখন পাখিদের কলরবে চারদিক মুখ হয়ে উঠেছে। মাটির ঘরের মাটির দাওয়ায় শুয়ে পাহাড় আর জঙ্গলের পরিবেশে ভোরের গন্ধ শুঁকে ওর মনে হল সারাজীবন ও এই অরণ্যেই কাটাবে। দরকার নেই শহরের ইট, চুন, সুড়কির বিলাসবাহুল্যে। এই মন ভরানো, প্রাণ মাতানো প্রকৃতির কোলে উদ্দাম শিশুর মতো ছুটোছুটি করবে। আজ ও বুঝতে পারল কেন ওর জেঠু অত টাকার মালিক হয়েও অমন সোনার সম্পদ মাটিতে পুঁতে রেখে চির বনবাস যাপন করতেন। টাটানগরের সাকচিতে মস্ত দোতলা হাঁকালেও জেঠুর প্রাণ ছিল এই পাহাড়, নদী, ঝরনা ও গভীর বন। না হলে ভোগবিলাসী মানুষ হলেও কিছুতেই উনি তাঁবু খাটিয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরতেন না।
দীপংকর ঘুম ভেঙে আড়মোড়া ভাঙতেই ওর মাথার নীচে বালিশ এবং গায়ে চাদর অনুভব করল। আসলে ও ঘুমিয়ে পড়বার পর, যখন বাবুজিকে খাবার দিয়ে ফিরে আসে চম্পা, তখনই এই ব্যবস্থা ও করে। কিন্তু কোথায় চম্পা! চম্পা কই? ঘরের দরজায় তো শিকল দেওয়া। তার মানে ঘরেই ছিল। বাইরে কোথাও যাবার আগে শিকল দিয়ে গেছে।
দীপংকর দাওয়া থেকে নেমে বাইরে এল। রাতের আঁধার সবে কেটেছে। এখানে চারদিকে শুধু টিলার পর টিলা আর কত মহুয়া গাছ। দীপংকর ধীরে ধীরে একটি টিলার কাছে এগিয়ে এল! কী নির্জন চারদিক। পাঁচ ছ’ ঘর মানুষের বসতি এখানে। তারপর শুধুই জঙ্গল। শুধুই পাহাড়। আহা! কী অপূর্ব পরিবেশ। দীপংকরের জীবনে এই প্রথম পাহাড় দেখা। এর আগে ছবিতেই যা পাহাড় দেখেছে। সেই পাহাড় এখন জীবন্ত।
দীপংকর ধীরে ধীরে একটি টিলার ওপর উঠল। টিলা মানে ন্যাড়াটিলা নয়। গাছ-গাছালিতে ভরতি। টিলার ওপরে উঠেই দেখল দূরে একটি ছোট ঝরনার পাশ দিয়ে মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে চম্পা ঘরের দিকে আসছে। ওকে দেখে যেন বুকে বল এল দীপংকরের। সে দূর থেকেই ডাকল, চম্পা! এই চম্পাকলি! আমি যাব?
চম্পা থমকে দাঁড়িয়ে উত্তর দিল, কিউ?
তোমার কাঠের বোঝাটা আমি মাথায় নিয়ে আসব?
চম্পা দূর থেকেই বলল, নেহি। তুম নেহি সকোগে। তুমি পারবে না। আমাদের ঘাড় শক্ত। তুমি এখনও কচি নরম আছ। বাচ্চা ছেলে।
দীপংকর তখন দ্রুত পায়ে ছুটে টিলার ওপর থেকে নামতে লাগল নীচে। তাই দেখে চিৎকার করতে লাগল চম্পা, রুখ যাও। রুখ যাও। এ কী করছ। থামো! দীপংকর থেমে পড়ল।
চম্পা বলল, এইবার আস্তে আস্তে নেমে এসো। পাহাড় থেকে, টিলা থেকে বা কোনও গড়ানো জায়গা থেকে কখনও অমন ছুটে নামতে যাবে না। তা হলেই পড়বে।
দীপংকর চম্পার কথা মতো তাই করল। তারপর টিলা থেকে নেমে যখন ওর কাছে গেল তখন কী আনন্দ দু'জনের।
চম্পা বলল, আমাকে ঘরে না দেখে তুমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলে না?
খুব ভয় করছিল আমার!
কেন, ভয় করছিল কেন? তুমি না ব্যাটাছেলে?
বাঃ রে। আমি তোমাদের অতিথি। এখানে তুমি ছাড়া আমার আপনজন কেউ নেই। আমি কোথা থেকে এসেছি, আমি কে, কিছুই আমার মনে নেই। কাজেই ভয় করবে না? তোমাকে হারালে এই বনে-জঙ্গলে আমি কোথায় যাব? কার কাছে থাকব?
চম্পা ওর উজ্জ্বল ঝকঝকে দাঁতের সারিতে ঝিলিক দিয়ে হাসল এবার। তারপর বলল, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। এই ডাকাতের আস্তানায়—। বলেই থেমে গেল চম্পা।
দীপংকর অভিনয় করে বলল, ডাকাতের আস্তানা? ডাকাত কী গো চম্পা? ডাকাত কাকে বলে?
সে তুমি বুঝবে না। বোঝবার চেষ্টা করো না। যাক। মুখহাত ধুয়েছ? না।
চলো ঝরনার কাছে। মুখ ধোবে। এখানেই আমি সব কিছু করি। বেলায় এখানে আমরা দু'জনে এসে চান করব।
দীপংকর একটা আশ শ্যাওড়ার ডাল ভেঙে দাঁতন করতে করতে চলল। চম্পা ওর মাথার কাঠের বোঝাটা মাটিতে নামিয়ে দীপংকরের হাত ধরে উঁচুনিচু পাথরে পা রেখে ঝরনার কাছে এগিয়ে গেল। পাহাড়িয়া ঝরনা ঝিরিঝিরি বইছে। কী স্নিগ্ধ শীতল জল।
দীপংকর সেই ঝরনার জলে বেশটি করে মুখ ধুয়ে কুলকুচি করে নিল। চম্পা বলল, চলো। ঘরে চলো। তোমাকে কিছু খেতে দিই গে। বাবুজির দোকান থেকে মুড়ি আর পিঁয়াজি আনতে হবে। চা খাবে তো? দীপংকর বলল, হ্যাঁ। আমার মা রোজ সকালে আমাকে চা করে খাওয়াতেন। এখন তুমি খাওয়াও।
তোমার মায়ের কথা মনে পড়ছে এবার?
উঁহু। শুধু চা খেতাম, রুটি খেতাম, ভাত খেতাম এই সব মনে পড়ছে। এ ছাড়া আর কিচ্ছু না।
চম্পা বলল, জানো, তোমাকে দেখে আমার মনে হচ্ছে তুমি এক ভিনদেশি রাজপুত্তুর। আমাকে পাতালপুরী থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে বলে এসেছ।
আমারও কী মনে হচ্ছে জানো, তুমি এক বন্দিনী রাজকন্যা। আমি যুদ্ধ করে তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। তবে পাতালপুরী থেকে নয়। দুর্গম গিরিকাস্তার থেকে।
চম্পা হোঃ হোঃ করে হেসে গড়িয়ে পড়ল। সেই হাসিতে দীপংকরও যোগ দিল।
এমন সময় দূর থেকে ঠাকুর সিংকে আসতে দেখা গেল সেখানে।
চম্পা তাড়াতাড়ি কাঠের বোঝাটা মাথায় তুলে নিয়ে বলল, বাবুজি আরহা হ্যায়।
ঠাকুর সিং কাছে এসে বলল, আরে চম্পা! তু হিয়া ক্যা করতে হো?
জঙ্গলমে গিয়া থা বাবুজি ! লকড়ি লেনে কে লিয়ে।
ঠাকুর সিং এবার দীপংকরকে সস্নেহে বলল, হিয়া কুছ তকলিফ নেহি হোতি
তো বেটা? হামারা চম্পা বিটিয়াক৷ সাথ রহো। আপনা বহিন সমঝো। উঁ? হামকো গ্যালুডি যা না হ্যায়। সামকো আপস আউঙ্গা।
দীপংকর বলল, আপনি নিশ্চিন্তে যান বাবুজি।
ক্যা কহা তুমনে? বাবুজি?
হ্যাঁ। আপনি চম্পারও বাবুজি। আমারও। তা আপনি যেখানে যাচ্ছেন সেখান থেকে আমার জন্যে একটা প্যান্ট আর গেঞ্জি নিয়ে আসবেন? কেন না এই যা পরে আছি এর বেশি আমার কিছু নেই।
ঠাকুর সিং বলল, জরুর লে শোয়েঙ্গে।
চম্পা বলল, বাবুজি আমার জন্যে কাচের চুড়ি আর রঙিন ফিতে আনবে কেমন?
ঠাকুর সিং ‘আচ্ছা, সব কুছ লেকে আয়েঙ্গে হাম’ বলে চলে গেল।
দীপংকর আর চম্পা অনেকক্ষণ ধরে ঠাকুর সিং-এর চলে যাওয়া দেখল। তারপর দু’জনে গুন গুন ভোমরার মতো গান গাইতে গাইতে ফিরে এল ওদের পর্ণকুটিরে। কুটির অবশ্য ফাঁকা ছিল না। দাওয়ার ওপর থাবা গেড়ে বাঘের মতো বসেছিল ভেলুয়া। ওরা যেতেই দাওয়া থেকে নেমে এসে ওদের পায়ের কছে শুয়ে কুঁই কুঁই করে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
এই সুন্দর সকালে দীপংকর ও চম্পা যেন আনন্দের আতিশয্যে ভরে উঠল। ঠাকুর সিং-এর এই পর্ণকুটিরের পিছন দিকে পাহাড়ের কোল পর্যন্ত অনেকটা জায়গা বাঁশ-কঞ্চির বেড়া দিয়ে ঘেরা। সেইখানে নানা রকম সবজির ব্যবস্থা আছে। আলু কপি রাঙালু টমেটো শাক সব রকমই হয়। আশপাশে কোনও ঘরবাড়ি নেই। যা আছে তা বেশ দূরে দূরে।
চম্পা বলল, আগে এখানে অনেক লোকের বাস ছিল। এখন মৌভাণ্ডারে চাকরি পেয়ে সবাই শহরের দিকে চলে গেছে। আমরাই শুধু পড়ে আছি এখানে। এখন এখানে মোট দশ ঘর লোকের বাস। তাও দূরে দূরে। পাহাড়ের কোলে যে যার সুবিধেমতো জায়গায় ঘর করে নিয়েছে।
চম্পা কথা বলতে বলতেই ওর কাজ করতে লাগল। এরই ফাঁকে একবার দীপংকর একটা বালতি করে জল নিয়ে এল ঝরনা থেকে। অবশ্য ভেলুয়াও ওর পিছু পিছু গেল। আর চম্পা? সে সরু সরু লকড়ির জ্বালানিতে তেলচিটে ময়লা কড়ায় তেজপাতা আর গুড় দিয়ে হালুয়া বানাতে বসল।
গরম গরম সেই হালুয়ার স্বাদ অমৃতের মতো লাগল দীপংকরের।
হালুয়া খেতে খেতে দীপংকর বলল, আচ্ছা চম্পা, তোমার বাবা তোমাকে একা রেখে দোকানে থাকেন কেন? তুমি বড় হয়েছ, তোমাকে এমন চমৎকার দেখতে, যদি কেউ তোমাকে চুরি করে নিয়ে যায়?
কে আমাকে চুরি করবে? কার এমন সাধ্যি আছে যে ঠাকুর সিং-এর লেড়কির গায়ে হাত দেয়?
কিন্তু একা থাকতে তোমার ভয় করে না?
আমি তো একাই। ভয় করবে কেন? তা ছাড়া আমি ডাকাতের মেয়ে। আমার কী ভয় ডর আছে।
তুমি ডাকাতের মেয়ে?
চম্পা এবার হাঁটুতে মুখগুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল। তারপর বলল, তুমি আমাকে ঘৃণা করছ না তো? আমি তোমাকে ঠকাব না। আমার সব কথা তোমাকে বলব। শুধু একটা অনুরোধ, তুমি আমাকে ভুলে যেয়ো না।
দীপংকর বলল, চম্পা, তুমি আমার কাছে বড় রহস্যময় হয়ে উঠছ। তুমি আমাকে সব কথা খুলে বলো।
চম্পা বলল, বাবুজি তো আজ গালুডি চলে গেছেন সন্ধের আগে ফিরবেন না। আমি তোমাকে নিয়ে এক দূর গাঁওতে চলে যাব। সেখানে আজ হাট বসবে। আর ওখানে এক ঠাকুরমন্দির আছে। সেইখানে আমি তোমার জন্যে মানত করব।
কী মানত করবে তুমি?
তা তো বলব না। যদি তোমার স্মৃতি ফিরে আসে তা হলে তোমাকে নিয়ে সোজা তোমাদের বাড়িতে চলে যাব। আর ফিরব না। আশা করি তোমার মা-বাবা আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না।
সে কী! বাবুজির জন্য মন কেমন করবে না তোমার?
করবে। কেন না ছোটবেলা থেকে ওকেই তো আমার বাবুজি বলে জেনে এসেছি। কিন্তু আমি জানি, ঠাকুর সিং আমার কেউ না।
দীপংকর অবাক হয়ে বলল, ঠাকুর সিং তোমার বাবুজি নয়?
না। অনেকদিন আগে গালুডির কাছে একবার এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা হয়। সেই সময় আমার মা-বাবা নাকি মারা যান। আমি লাইনের ধারে ছিটকে পড়ে কাঁদছিলাম। তখন ঠাকুর সিং আমাকে কুড়িয়ে এনে মানুষ করেন। আমার বয়স তখন পাঁচ বছর। আমার মা-বাবাকে আমি মনে করতে পারি না। তবে ঠাকুর সিং ও তার বউকে আমি ‘আম্মা-বাবুজি’ বললেও আমি জানি ওরা আমার কেউ নয়।
কাঠের জ্বাল দিতে দিতে উনুনে ভাত বসাল চম্পা। গোটা চারেক মুরগির ডিমও ফেলে দিল ভাতের মধ্যে। জ্বলন্ত অগ্নিশিখায় কিশোরী চম্পাকে সোনা দিয়ে তৈরি একটি মেয়ের মতো মনে হল।
চম্পা বলল, আমি স্কুলে যাই। ডাকাতের মেয়ে বলে অনেকে আমাকে বিদ্রূপ করে। এখন গরমের জন্যে এক মাস স্কুল বন্ধ। কিন্তু আমার স্কুলে যেতে একটুও ভাল লাগে না। আমি কী বাড়ির মেয়ে ছিলাম তা জানি না। কিন্তু এখন তো আমি ডাকাতের মেয়ে।
তোমার বাবা, মানে ঠাকুর সিং ডাকাত?
হ্যাঁ, এই জঙ্গলে আরও যারা আছে, তারা সবাই ডাকাত। এরা চোরা কাটরা করে জঙ্গলের কাঠ পাচার করে। স্মাগলিং জিনিস জঙ্গলের ভেতরে লুকিয়ে রাখে। ট্রেনে ডাকাতি করে। তবে আমার বাবুজি, ঠাকুর সিং ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের খুব ভালবাসেন। তাই তোমাকে এখানে নিয়ে এসে রেখেছেন। তুমি তো তোমার কোনও কথা ইয়াদ করতে পারছ না। যদি পারতে তা হলে এখনি আমি তোমাকে নিয়ে তোমার মা-বাবার কাছে চলে যেতাম। এইভাবে বনে-জঙ্গলে পড়ে থাকতাম না। যদিও এই পাহাড়, এই বন, এই ঝরনা, আমার কাছে স্বর্গ, তবুও আমার বাবুজি মরে গেলে এই জঙ্গলে আমি কী করব? একদিন আমি বড় হব তো! তখন?
দীপংকর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি তোমাকে আমার মা-বাবার কাছে নিয়ে গেলে তারা তোমাকে আদর করে রাখবেন, এই আশ্বাস তোমাকে দিতে পারি চম্পা। তবে—
তবে কিনা তুমি কোনও কিছুই মনে করতে পারছ না এই তো? হ্যাঁ।
আচ্ছা আমি যদি তোমাকে কিছু কিছু মনে করিয়ে দিই? তা হলে? তা হলে তোমার মনে পড়বে না বাড়ির কথা?
দীপংকর অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল চম্পার দিকে। বলল, তুমি! তুমি কি মনে করিয়ে দেবে আমাকে? আমার সম্বন্ধে কতটুকু তুমি জান? তোমার সম্বন্ধে আমি যা জানি, তুমি নিজেই তা জান না।
তার মানে?
তুমি কি জান, তুমি এখানে নজরবন্দি হয়ে আছ? আর আমি তোমার পাহারাদার।
চম্পা!
তুমি কি জান, দুটি মেয়ের ইজ্জৎ বাঁচাতে তুমি একজনকে খুন করেছ? তুমি কি জান, তারপর এক লরি দুর্ঘটনা হয়েছিল তোমার এবং তাইতেই স্মৃতিভ্রংশ হয়েছ তুমি? তুমি কি জান, তোমাকে খুঁজে বার করবার জন্য পুলিশ হন্যে হয়ে ঘুরছে?
দীপংকরের অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। বলল, এসব কী বলছ তুমি? আমিআমি তো কিছুই মনে করতে পারছি না।
কাল রাতে আমি সব শুনেছি দীপংকর।
দীপংকর! কে দীপংকর!
তুমি। কাল সকালে কালনেমি আর ময়নিহান যখন তোমাকে আমার বাবার কাছে দিয়ে চলে যায় তখনও কেউ জানত না তোমার পরিচয়। এখানকার নামকরা ডাকাত, অবশ্য সবাই জানে উনি একজন মান্যগণ্য শেঠজি কুন্দনলাল, তোমাকে মোটরে করে ঘাটশিলায় পৌঁছে দেয়। এখন তুমি তারই নজরবন্দি। কাল বিকেলে সমস্ত কাগজে তোমার ছবি ছাপা হয়েছে, ওই ঘটনার বিবরণ সহ। তারপর থেকেই তোমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে কুন্দনলালের লোকেরা। কেন না তোমার জেঠু যিনি এই অরণ্যে কুন্দনলালের লোকদের হাতে খুন হয়েছেন তিনি ছিলেন, কুন্দনলালের চিরশত্রু। তাঁর জীবিত বংশধরদে করতে চাইবে। তারপর তোমার বাবাকে এবং তোমাকেও হত্যা করবে ওরা। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে তা হতে দেব না। আমি আজই তোমাকে এখান থেকে সরিয়ে দেব দীপংকর।
দীপংকর বলল, তোমার কথা শুনে আমার সব কেমন ওলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে।
আমার বাবুজি, ঠাকুর সিং কিন্তু তোমার ভাল চান। উনি এখন চুরিডাকাতি ছেড়ে দিয়েছেন। আমি জ্ঞানে ওঁকে কোনও ডাকাতি করতে দেখিনি। তবুও ডাকাত নাম তো রটে গেছে। তাই আমার কোনও মর্যাদা নেই ডাকাতের মেয়ে বলে। বাবুজি আজ গালুড়িতে গেছেন কুন্দনলাল শয়তানের সঙ্গে দেখা করতে। উনি তোমাকে অন্য কোথাও না-সরিয়ে, আমাদের কাছেই যদি তুমি থাক সেই অনুমতি নিতে গেছেন।
কিন্তু কেন? এতে ওঁর লাভ?
আমার অনুরোধে। তা ছাড়া সত্যি বলতে কী, বাবুজি এক সময় ডাকাত থাকলেও এখন ওঁর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। একটু আধটু খারাপ কাজ যে এখনও করেন না তা নয়। তবে তোমার ওপর বাবুজির একটু দুর্বলতা এসে গেছে। কিন্তু তবুও কুন্দনলাল যদি রাজি না হন, তা হলে বাবুজি তোমাকে কুন্দনলালের হাতে তুলে দেবেন, কিন্তু ভুলেও তোমাকে তোমার বাবা-মা'র কাছে পৌঁছে দিয়ে আসবেন না। এখানেই বাবুজির সঙ্গে আমার অমিল। তাই বাবুজিকে আমি ভালবেসেও ভালবাসতে পারিনি। আর সেজন্যই বাবুজিকে ছেড়ে কোথাও চলে যেতেও আমার মন কাঁদবে না।
তোমার কি মনে হয় চম্পা, কুন্দনলাল আমাকে তোমাদের এখানে থাকতে দেবে?
জানি না। তবে বাবুজি তোমাকে রাখবার চেষ্টা করবেন। কেন না তুমি তো আগেকার কথা কিছুই মনে করতে পারছ না। এইটেই যা রক্ষে।
দীপংকর বলল, কিন্তু কুন্দনলাল যদি আমাকে তোমাদের এখানে থাকতে না দেয়?
না দিতেও পারে। তাই আমি আজই তোমাকে সরিয়ে দেব এখান থেকে।
কোথায়?
সে এক জায়গায়।
তাতে যদি কুন্দনলাল তোমার বাবাকে সন্দেহ করে?
করবে না। আমরা রটিয়ে দেব তুমি জর খেয়ালেই কোথাও চলে গেছ। দীপংকরের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে ভেবে পেল না এখনও সে চম্পার কাছে আত্মপ্রকাশ করবে কি না। একবার মনে হল তার সব কথা সে খুলে বলে চম্পাকে। আবার ভাবল, না। ওকে স্বাভাবিক প্রতিপন্ন করবার সময় এখনও হয়নি। শুধু দুঃখ হল এই ভেবে কেন যে সেদিন গঙ্গার ধারে ও বেড়াতে গিয়েছিল। কেন যে রাগের মাথায় ওই রকম অস্থানে মেরে দিল ছেলেটাকে। ওই কাজ না করলে তো আজ ওকে এইভাবে চোরের মতো লুকিয়ে বেড়াতে হত না। ওর মা, ওর বাবা কত আদরযত্নে মানুষ করেছেন ওকে। ওর জন্যে তাঁরা কতই না দুঃখ পাচ্ছেন। দুঃখ কি ও-ই পাচ্ছে কম? মাকে বাবাকে একবার দু'চোখ ভরে দেখবার কত ইচ্ছে হচ্ছে ওর। কিন্তু না, আর কোনওদিনই ও বাবা-মায়ের কাছে ফিরতে পারবে না। কেন না ফিরলেই থানা-পুলিশ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ফাঁসি। এইসব ভাবতে ভাবতে প্রচণ্ড উত্তেজনায় দীপংকর চিৎকার করে উঠল না—নানা না।
চম্পা ছুটে এসে ধরল দীপংকরকে। পরম স্নেহে ওর গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, কী হল? এমন করে চেঁচিয়ে উঠলে যে? হল কী তোমার?
দীপংকর ওর চেঁচিয়ে ওঠার আসল কারণ না জানিয়ে বলল, চম্পা, তুমি আমাকে তোমার কাছ থেকে সরিয়ে কোথায় রেখে আসবে বলো? যদি তারা আমাকে ওই শয়তান কুন্দনলালের হাতে তুলে দেয়?
চম্পা বলল, না। সে ভয় নেই তোমার। আমি তোমাকে এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখব যেখানে কুন্দনলালের ছায়াও প্রবেশ করতে পারবে না।
দীপংকরের চোখে এবার সত্যিই জল এসে গেল। আসবে না-ই বা কেন? এক সম্পূর্ণ অজানা অচেনা এই পাহাড়িয়া ললনার বুকে তার মতো এক অপরিচিত কিশোরের জন্য এই মধুর মমত্ববোধ কোথা থেকে এল? কেন এল? এ কথা কিছুতেই সে ভেবে পেল না। তবে কি জন্মান্তর বলে সত্যিই কিছু আছে? এই চম্পা কি ওর কেউ ছিল? কোনও সহোদরা? হয়তো হবে। তবে দীপংকর ওকে ছাড়বে না। ওর এখানকার কাজ শেষ হলে, ও নিজেই হাওড়ায় ফিরে ধরা দেবে পুলিশকে। তারপর যা ওর কপালে আছে তাই হবে। শুধু চম্পাকে তুলে দেবে ওর মা-বাবার হাতে এবং ওর শূন্যস্থান চম্পাকে দিয়ে পূর্ণ করিয়ে যে মায়া মমতায় দীপংকরকে মানুষ করেছেন ওর বাবা-মা সেই মধুর অপত্যস্নেহে চম্পাকেও মানুষ করবার অনুরোধ জানাবে। তারপর চম্পা বড় হবে। ওর বাবা-মা চম্পার বিয়ে দেবে। জীবিত থাকলে জেলে বসেও ওর শুভ কামনা করবে দীপংকর। আর যদি ফাঁসির দড়ি গলায় পরে মৃত্যু হয়, তা হলে মরণের ওপার থেকে ওকে ওর শুভেচ্ছা জানাবে। আশীর্বাদ করবে।
হঠাৎ ভেলুয়ার চিৎকারে সচকিত হয়ে উঠল ওরা। নিশ্চয়ই কেউ আসছে। কোনও আগন্তুককে না-দেখলে তো এইভাবে চেঁচাবে না ভেলুয়া।
চম্পা ইশারায় দীপংকরকে ঘরের ভেতরে লুকিয়ে পড়তে বলে নিজে দাওয়ার কাছে এসে খুঁটিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল, কৌন হ্যায়রে? ওদিক থেকে উত্তর এল, কুত্তা সামালো।
চম্পা ধমক দিল ভেলুয়াকে, চল হ্যাট। চুপ রহো। আঃ আঃ আযা হিয়া পর।
চচচ।
ভেলুয়া লেজ নেড়ে নেড়ে পথ ছেড়ে পিছিয়ে এল দাওয়ার কাছে। একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠের আওয়াজ এবার শুনতে পেল দীপংকর, ও লেড়কা কাঁহা হ্যায়?
চম্পা বলল, ও তো সবেরেই ঘাটশিলা চলা গিয়া।
কাহেকো ছোড়া উসকো? তেরা বাবুজি কাঁহা? আপকা সাথ মুলাকাত করনেকে লিয়ে গালুডি চলা গিয়া।
কব?
সবেরে।
আউর ও লেড়কা?
বাবুজি যানে কা বাদ ও ভি কাঁহা চলা গিয়া।
ঠিক হ্যায়। ও ফিন আ যায়ে গা তো উসকো জেরা খেয়াল রাখ না। উঁ? কী খেয়াল রাখবে চম্পা? তবু হ্যা বলতে হয় হ্যাঁ বলল। এখন মরো তোমরা খুঁজে। চম্পা ওর কাজ ঠিকই করে যাবে। কুন্দনলাল চলে যাবার পরও অনেকক্ষণ দাওয়ার খুঁটিতে ঠেস দিয়ে ওই রকম একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল চম্পা। কেন না যদি আবার কোনও নতুন কথা বলতে ফিরে আসে? কিন্তু না। কুন্দনলাল যখন আর ফিরে এল না, তখন চম্পা ডাকল দীপংকরকে, দীপ! বাইরে এসো। দীপংকর ধীরে ধীরে বাইরে এসে বলল, কুন্দনলাল চলে গেছে?
হ্যাঁ। আমিও এখুনি তোমাকে সরিয়ে দিচ্ছি এখান থেকে।
তা না হয় দিলে, কিন্তু কতক্ষণ এবং কতদিন তুমি আমাকে ওইভাবে লুকিয়ে রাখবে চম্পা। ওরা কি ভাবছ বন-জঙ্গল তোলপাড় করবে না?
করবে। তবু তোমার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না। যাও এখন চট করে ঝরনায় গিয়ে চানটা করে এসো। তারপর পেট ভরে খেয়ে নাও দু'মুঠো। আচ্ছা থাক। একা যেতে হবে না। আমিও যাচ্ছি তোমার সঙ্গে। চলো।
দীপংকর একবার ইতস্তত করল। তারপর চম্পা ওকে ছেঁড়া ময়লা দুটো তেলচিটে গামছা বার করে দিতেই জামাপ্যান্ট ছেড়ে ওর সঙ্গে স্নান করতে চলল সে। দেখা যাক ওর ভাগ্য এবার ওকে কোন পথে নিয়ে যায়।
খুব তাড়াতাড়ি দু’জনে দু'মুঠো খেয়ে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল। একটা নতুন গামছায় ছাতু চিঁড়ে আর ভেলি গুড় বেঁধে নিল চম্পা। তারপর পরিপাটি চুল আঁচড়ে বিনুনি করে সাপের মতো বেণীটা ঝুলিয়ে দিল পিছন দিকে। ভাঙা আয়নায় মুখ দেখল। দীপংকরের চুলগুলোও যত্ন করে আঁচড়ে দিয়ে দরজায় শিকল তুলে বেরিয়ে পড়ল দু'জনে।
কিছুদূর আসার পরই ওদের পিছনে আরও একজনের অস্তিত্ব অনুভব করল ওরা। সে হল ভেলুয়া।
চম্পা বলল, যা। ঘর যা ভেলুয়া। উধার যা কে সব কুছ দেখভাল কর। দীপংকর বলল, কেন, আসুক না ও। দূর পথ যাত্রায় ও যদি আমাদের সঙ্গী হয় তো মন্দ কী? বলেই ডাক দিল সে, আয়রে ভেলুয়া। কিন্তু।
কোনও কিন্তু নয় চম্পা। তুমি আমাকে কোথায় কোনখানে লুকিয়ে রাখবে তা তো জানি না। তবু আমার নিরাপত্তার জন্যে ভেলুয়ার কাছে থাকাটা খুবই দরকার। তা ছাড়া তুমি তো একা ফিরবে। এই জঙ্গলে যদি তোমার কোনও বিপদ হয়? ভেলুয়া থাকলে কেউ তোমার দিকে এগোতে সাহস করবে না।
তা হলে আসুক।
ভেলুয়া তখন ছুটে এসে ওদের পায়ের কাছে লুটোপুটি খেতে লাগল। তারপর ওদের পথপ্রদর্শক হয়ে চলতে লাগল ও।
দীপংকর বলল, কী আশ্চর্য! ও কী করে জানল আমরা কোথায় যাব?
ও সব জানে। আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে যাবার এই একটিই মাত্র পথ।
আমরা কোথায় যাচ্ছি?
গেলেই দেখতে পাবে।
ওরা ঝরনার পাশ দিয়ে কিছু পথ এসে একটি ছোট্ট টিলার ওপর উঠল। তারপর সেটা অতিক্রম করে প্রবেশ করল এক গভীর বনে। শাল আর সেগুনের ঘন অরণ্যানির মাঝে সুঁড়ি পথ ধরে ওরা এগোতে লাগল। এখানে চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। যাঝে একটা শীর্ণা নদী পড়ল। চম্পার কোমল হাতখানি ধরে সে নদীও পার হল দীপংকর। এবার পাহাড়ে ওঠা। একটি বড় পাহাড়ের পাকদণ্ডি বেয়ে উঠতে লাগল ওরা। এ পথে জঙ্গলে কাঠ আনতে লরি যাতায়াত করে। সেই নির্জন প্রান্তরে অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে দীপংকর অভিভূত হয়ে গেল। ওর মনে হল, এই তো, বেশ তো। আর কেন ঘরে ফেরা? কেনই বা অনুসন্ধান? এই অরণ্যে চম্পা ও ভেলুয়াকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে যাক ও। আর শহর সভ্যতায় কাজ নেই। চির বনবাসেই এ জীবনটা কাটিয়ে দিক ওরা।
ওরা যে পাহাড়ে উঠেছিল সেই পাহাড় অতিক্রম করার পর নামার মুখে দেখল আরও মনোহারী শোভা৷ এই কালো কোয়ার্টজাইট পাথরের পটভূমিতে রঙিন ফুলের শোভায় এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই খররৌদ্র মধ্যাহ্নে মায়াময় হয়ে উঠেছে। ওরা যত এগোয় অরণ্যের সৌন্দর্য ততই প্রকট হয়। কাছে দূরের শৈলমালা, দু’–একটি বন্যগ্রাম, শ্বেতশুভ্র ইউক্যালিপ্টাসের কণ্ঠ জড়ানো ঘন পত্রের চিহড় লতা সবই আকর্ষণীয়।
দীপংকর অভিভূত হয়ে বলল, কী সুন্দর।
চম্পা রসিকতা করে বলল, কোনটা? এই বনভূমি? না আমি? দুটোই। আমার কী মনে হচ্ছে জান?
কী মনে হচ্ছে?
আর কোথাও না গিয়ে এইখানেই আমরা থেকে যাই। তারপর?
তারপর আবার কী? এই অরণ্যে প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষদের মতো আমরা গাছের বাকল পরে ঘুরে বেড়াব।
ওমা! সে কী? খাব কী আমরা?
বনের ফলমূল।
এটা রামায়ণের যুগ নয় গো মশাই। এ বনে শাল, সেগুন, পলাশ, শিমুল ই আছে। প্রাণধারণ করে বেঁচে থাকার মতো কোনও ফলের গাছ নেই।
আমার কিন্তু ইচ্ছে করছে এইখানে এই পাহাড়ের কোলে ওই যে ঝিরিঝিরি ঝরনাটা ঝরে পড়ছে, ওর ঠিক পাশটিতে একটি ঘর করি।
বেশ তো করো না। এই বনডুংরির শৈলমালায় তরুণ যোগী হয়ে তুমি মহাদেবের মতো তপস্যা করো আর আমি তোমার সেবাযত্ন করি। আবার পথ চলা।
যেতে যেতে চম্পা বলল, ওই দেখো দীপ। ওগুলো কী বলো তো? কী জানি। এ তো দেখছি গাছের ওপর ঘর।
হ্যাঁ। বুনো হাতি, ভালুক, শুয়োরের পাল এসে খেতের ফসল নষ্ট করে।
তাই গাছের ওপর ঘর করে মানুষ পাহারা দেয়। জন্তুজানোয়ারেরা দলবদ্ধ হয়ে এসে পড়লেই ক্যানেস্তারা বাজিয়ে ওরা মুখে বিকট শব্দ করে তাড়া দেয়।
কাছেপিঠে গ্রাম আছে বুঝি?
হ্যাঁ। এসে গেছি আমরা। ওই যে দেখছ দূরের গ্রামখানা। আমি ওখানেই তোমাকে রেখে যাব।
তুমি চলে যাবে চম্পা?
যেতে তো হবেই। না হলে তোমারই বিপদ হবে। ওরা যখনই জেনে যাবে আমি তোমার সঙ্গে পালিয়ে গেছি তখনই চারদিক তোলপাড় করতে থাকবে। তার চেয়ে আমি ফিরে গেলে ওদের গতিবিধির দিকে নজর রাখতে পারব। মাঝেমধ্যে তোমাকে এসে দেখে যাব। তার যদি কোনওরকমে তোমার বাড়ির ঠিকানা পাই তা হলে সঙ্গে সঙ্গে আমি চলে যাব তোমার মা-বাবার কাছে। কী করে যাবে?
কেন? ট্রেনে করে। ওখানে গিয়ে চারদিক ছুঁড়ে তোমার ঠিকানা খুঁজে বার করব।
খুব ভাল হয় তা হলে।
যাই হোক, ওরা পাহাড় থেকে নেমে এক জায়গায় মালভূমির মতো অংশে এসে একটি গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করল। পাহাড়িয়া ছোট্ট গাঁও। কী সুন্দর!
চম্পা বলল, এই গাঁওয়ের শেষ সীমানায় মা রংকিনীর মন্দির আছে। আসল মন্দির অবশ্য যদুগোড়ার পথে। ঘাটশিলা থানার পাশে মায়ের আসল মূর্তিটা আছে। তবে এখানেও মা খুব জাগ্রত। শনি-মঙ্গলবারে বলি হয়। হাট বসে। আজ হাটবার।
ওরা যখন মন্দিরের কাছে গেল তখন কেউ নেই সেখানে। সকালে বারোটার মধ্যে পুজো হয়ে গেছে। এখন সবাই অদূরে হাট নিয়ে ব্যস্ত।
চম্পা মন্দিরের ঘণ্টায় ঢং করে একটা শব্দ করল। তারপর এক ভয়ংকরী দেবীমূর্তির সামনে স্থির হয়ে বসল। চাঁপাফুলের পাপড়ির মতো গায়ের রং যার, এমন একটি চোদ্দো-পনেরো বছরের সুন্দর মুখ স্কার্টপরা মেয়েকে এই পরিবেশে এক নবীনা যোগিনী বলে মনে হল।
দু’চোখ বুজে অনেকক্ষণ ধরে চম্পা কী যেন প্রার্থনা করল দেবীর কাছে, তারপর দীপংকরকে বসতে বলে কোথায় যেন চলে গেল। একটু পরেই আবার যখন ফিরে এল তখন ওর দু'হাত ভরতি অজস্র বনফুল। সেই ফুল দেবীর চরণে অঞ্জলি দিয়ে বলল, দেবীকে প্রণাম করো।
চম্পা দীপংকর দু'জনেই সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল দেবীকে।
তারপর উঠে দাঁড়াল দু'জনে।
চম্পা বলল, এসো, তোমাকে ভিলসর্দারের কাছে নিয়ে যাই। এই সর্দার আমাকে নিজের লেড়কির মতো পেয়ার করেন। লালজির সঙ্গে ওর একদম দোস্তি নেই। তাই লালজির লোকেরা এই গাঁওতে ঢোকে না।
সর্দার যদি আমাকে রাখতে না চান? চাইবেন। শুধু একটা কথা। কী?
মাটির নীচে একটা সুড়ঙ্গ ঘরে তোমাকে থাকতে হবে। দিনের বেলা সেখানে লুকিয়ে থাকবে! রাত্রে বাইরে আসবে। সর্দারের কথার কখনও অবাধ্য হবে না। তারপর দেখছি দু’-চারদিন পরে তোমাকে নিয়ে কী করা যায়। তোমার দেখভাল তো আমাকেই করতে হবে।
কিন্তু আমাকে সেখানে একা রেখে তুমি যদি চলে যাও, আমি তো পাগল হয়ে যাব চম্পা।
তবু যেতে আমাকে হবেই।
না। তোমাকে আমি ছাড়ব না।
বোকামি কোরো না ছাড়ো।
এখন বেলা কত জানো? ওই দেখো বিকেল গড়িয়ে পড়ছে। আকাশের রং লাল। এই দূর বনপথে একা তুমি কী করে যাবে? ভেলুয়া সঙ্গে গেলেও অত বড় একটা পাহাড় তোমাকে ডিঙোতে হবে। জঙ্গলে যারা কাঠ কাটতে আসে তাদের ভয়, অন্ধকারে বাঘের ভয়, তা ছাড়া কত ভালুকও এখন রাতের আঁধারে ঝরনায় নদীতে জল খেতে আসবে। এইসব জেনেশুনে আমি কখনও তোমাকে ছেড়ে দিতে পারি? কাজেই তুমি যাচ্ছ না। আজও না। কালও না।
কিন্তু...।
কোনও কিন্তু নয়। তুমি এখন থেকে আমার কাছেই থাকবে। আমার কাজ শেষ হলেই এখান থেকে চলে যাব আমরা।
কোথায়?
আমাদের বাড়ি। যেখানে আমার মা আছেন, বাবা আছেন।
চম্পা সবিস্ময়ে বলল, কী বলছ তুমি দীপ? তুমি বড় রহস্যময় হয়ে উঠছ। এখানে তোমার কীসের কাজ? তা ছাড়া তুমি তো সবই ভুলে গেছ। কী করে নিয়ে যাবে আমাকে তোমার মা-বাবার কাছে?
দীপংকর চম্পার দুটি হাত মুঠোর মধ্যে ধরে সস্নেহে বলল, ওগো বনবালা আমি কিছুই ভুলিনি। আমার সব কিছুই মনে আছে। শুধু নিজেকে বাঁচাবার জন্য তোমাদের কাছে অভিনয় করেছিলাম এতক্ষণ। তোমার সরল অন্তঃকরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি যখন বুঝলাম তুমি সত্যই আমার হিতৈষী তখন আর তোমার কাছে সত্য গোপন করে লাভ কী? আমার জেঠুর হত্যাকারীকে আমি খুঁজে বার করব, এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে এখানে এসেছি। না-হলে ঘাটশিলা থেকেই বিদায় নিতাম! তুমি আমাকে সাহায্য করবে চম্পা। কেন না আমার জেঠুর সঙ্গে তোমার পরিচয় ছিল। তুমি চরা গ্রাম চিনিয়ে আমাকে নিয়ে যাবে। সেখানে আমার জেঠুর বিশ্বস্ত ভৃত্য ইকলু আছে। আর ওই ভেলুয়া! ও তো আমার জেঠুরই পোষা কুকুর। আমি জেঠুর লেখা ডায়েরি পড়েছি। তাই তো জেনেছি আমার জেঠু প্রচুর সোনাদানা এই অরণ্যে পাহাড়ে কোথায় যেন লুকিয়ে রেখেছেন। সেগুলো খুঁজে বার করতে হবে। কাজেই এখন তুমি যাবে কি? তুমি আমার পাশে না থাকলে আমি যে কিছুই করতে পারব না।
দীপংকরের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল চম্পা। অবাক বিস্ময়ে বলল, দীপ তুমি এত বুদ্ধিমান? সত্যিই যদি তুমি আত্মবিস্মৃত হওয়ার এই অভিনয় না করতে, তা হলে খুবই বিপদে পড়ে যেতে। কালনেমি বা ময়নিহানই হয়তো শেষ করে ফেলত তোমাকে। না হলে তুলে দিত লালজির হাতে। লালজি ভারী নৃশংস লোক। ওর মনে কোনও মায়াদয়া নেই।
এখন বলো সব কথা আগে থেকে তোমাকে খুলে না বলে তোমাকে এবং ভেলুয়াকে নিয়ে এই দূর অঞ্চলে চলে এসে ভাল কাজ করেছি কি ন!? খুব ভাল কাজ করেছ দীপ। তোমার জেঠুকে আমিও জেঠু বলতাম। মানিকজেঠু। তিনি আমাকে মেয়ের মতো ভালবাসতেন। এই ভেলুয়া ছিল তাঁর প্রাণ। সেদিন যদি ভেলুয়া ওঁর কাছে থাকত তা হলে কখনওই দুর্বৃত্তরা ওঁকে হত্যা করতে পারত না। আমি মাঝেমধ্যে ওনার কাছে যেতাম। সেদিনও গিয়েছিলাম। আমার ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে উনি ভেলুয়াকে আমার সঙ্গে দিয়েছিলেন। ভেলুয়া সে রাতে আমার কাছেই ছিল। আর সেই সুযোগে ওরা শেষ করে দিল ওনাকে।
ওরা কারা?
কারা আবার! লালজির লোকেরা। এই অঞ্চলের অনেক গাঁওবালে তো লালজির লোক। আসলে তোমার জেঠু অনেক সোনা ওদের খপ্পর থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন তো, তাই এত রাগ। এখানে রংকিনীর সেবাইত যে ভিলসর্দার আছে, সেও তোমার জেঠুরই লোক। তোমার জেঠুর জন্যেই এখানে গুপ্তকক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। মানে উনি নিজেই করিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে থাকতেন সেখানে। তোমার জেঠুর সমাধিও দেখিয়ে আনব! আমি মাঝে মাঝে সেখানে ফুল দিয়ে আসি। তুমিও দেবে।
দীপংকর বিস্মিত হয়ে বলল, জেঠুর সমাধি? আমার জেঠুকে দাহ করা হয়নি? না। ওনার যেসব লোকেরা সোনা সংগ্রহের কাজ করত তাদের বেশিরভাগই ছিল খ্রিস্টান। তারা সবাই সিংভূমের আদিবাসী ‘হো’ হো?
হ্যাঁ। ‘হো’ মানে মানুষ। ওদের ধারণা ওরাই পৃথিবীতে প্রথম মানুষ জাতি। আমার জেঠুর চাকর ইকলুও তো হো ছিল।
এখনও আছে। সেও খ্রিস্টান। চলো না তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। দীপংকর বলল, তা হলে তুমি ঘরে ফিরছ না। এখন থেকে আমার কাছেই থাকছ। অতএব ভিলসর্দারের ওখানে আমরা দু'জনেই থেকে যাই এসো। চম্পা বলল, না। ভিলসর্দারের ওখানে আর আমাদের থাকবার কোনও প্রয়োজন নেই। ওদের সঙ্গে আর দেখা না-হওয়াটাই ভাল। কেন না তোমাকে রেখে দিয়ে চলে যেতাম সে কথা আলাদা। আমিও যদি থাকি তা হলে ধরা পড়ে যাবার ভয় আছে। কেন না আমার বাবুজি গালুডি থেকে ফিরে যখন আমাদের দু’জনকে দেখবেন না, তখন চারদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকবেন। যদি এখানে এসে হাজির হন তা হলেই ধরা পড়ে যাব। উনি কিছুতেই তোমার সঙ্গে আমাকে চলে যেতে দেবেন না। আমাকে উনি দারুণ ভালবাসেন।
তা হলে বেলা থাকতে থাকতে চলো কোথাও কোনও গুহায় গিয়ে আশ্রয় নিই।
চলো।
চম্পা ডাকল, আয় ভেলুয়া। আ যা মেরা সাথ।
ভেলুয়া এতক্ষণ কাছে-পিঠেই ঘুর ঘুর করছিল। এবার চম্পার ডাকে লেজ নেড়ে নেড়ে ছুটে এল। তারপর এগিয়ে চলল ওরা দূরের পাহাড়ের দিকে।
দীপংকর বলল, চম্পা, তোমাকে আমার একটা কথা বলা হয়নি। তুমি তো এত কিছু জেনেছ, কিন্তু জান কি কেন আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি?
কেন?
আমি একজনকে খুন করেছি।
জানি।
অবশ্য খুন করব বলে নয়। দুটি মেয়ের ইজ্জত বাঁচাতে গিয়ে একজনকে অস্থানে মেরে বসি। আর সেই আঘাতেই সে মারা যায়। আমি তখন ভয়ে ছুটে পালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ি। ময়নিহান ও কালনেমি আমাকে তখনই লরি করে এখানে নিয়ে আসে। তারপর তো সবই জান। এখন প্রশ্ন হল এইভাবে কদ্দিন আমি লুকিয়ে বেড়াব? লোকালয়ে একদিন তো আমাকে যেতেই হবে। তখন? তখন তো হাতে হাতকড়া পড়বে আমার। তারপর জেল, হাজত, ফাঁসি কিংবা দ্বীপান্তর। তবে তোমার ভয় নেই চম্পা। তোমাকে আমি ঠিক আমার মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসব।
চম্পা বলল, যদি তাই হয় তা হলে কী দরকার ফেরবার? এই অরণ্যেই দিন কাটিয়ে দেব আমরা। তোমার জেঠুর অনেক সোনা লুকনো আছে। তার কিছু আছে আমার জন্যে। সেগুলো আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। তাতেই আমাদের দিন চলে যাবে।
তোমার জন্য! আমার জেঠু তোমাকে দিয়ে গেছেন?
হ্যা। আমি বড় হলে আমার বিয়ের খরচের জন্য। আমার বাবুজিও তা জানেন না। আমি শুধু আমার অংশটার কথা জানি। বাকি কোথায় লুকনো আছে তা জানি না।
সেগুলোর জন্যই সম্ভবত জেঠু খুন হয়েছেন। কুন্দনলালজি আমাকে আটকে রেখে আমার বাবাকে মোচড় দিয়ে জানতে চাইবেন, সেগুলোর সন্ধান আমাদের জানা আছে কি না। কিন্তু বিশ্বাস করো আমার বাপি এসবের কিছু জানেন না।
তবে দীপংকর, আমার মনে হয় ঝড়ি থেকে পালিয়ে এসে তুমি বোধহয় ভুলই করেছ।
ভুল করেছি।
হ্যাঁ। কেন না তুমি তো নির্দোষ। তুমি তো খুনি নও। তা ছাড়া এখনও নাবালক তুমি। দুটি মেয়ের ইজ্জত বাঁচাতে কাউকে আক্রমণ করতে গিয়ে যদি কোনও অঘটন ঘটে যায় তার জন্যে তো তুমি দায়ী নও। সেটা একটা অ্যাকসিডেন্ট। ওই মেয়েদুটিও তো তোমার হয়ে সাক্ষী দিত। তারা যখন বলত তাদের জন্যই এ কাজ তুমি করেছ, তখনই তো সত্যাসত্য প্রমাণ হয়ে যেত।
তুমি ঠিক বলেছ চম্পা। এই কথাটা তো আমার একবারও মনে হয়নি। চলো আগে গুপ্তধনের ব্যবস্থা করি। লালজি শয়তানের বারোটা বাজাই। তারপর নিজেই গিয়ে ধরা দেব। দেখি কী হয়।
ওরা যখন চলা শুরু করল বেলা তখন গড়িয়ে আসছে। কাছে দূরের পাহাড়ে পাহাড়ে তখন অস্তরাগের সিঁদুর খেলা।
ওরা পায়ে পায়ে হাটের দিকে এগোল। ছদ্মবেশ ত্যাগ করে দীপংকরকে যেমন সুখী লাগছে, সুন্দরী চম্পাও তেমনি কলকে ফুলের মালা গলায় এই অরণ্যভূমে অপরূপা।
দীপংকর বলল, বড্ড খিদে লাগছে। চলো কোথাও কিছু খাওয়া যাক।
কী খাবে? পয়সা আছে তোমার কাছে? আমার তো কিচ্ছু নেই।
আছে। যা আছে তাতে দু'জনের হয়ে যাবে।
ওরা কথা বলতে বলতে হাটে এল। আদিবাসী হাট। বেতের জিনিস, কাঁচা তরিতরকারি, চুনো পুঁটি মাছ, শাড়িকাপড়, কাচের চুড়ি, খেলনা পুতুল সব কিছুই আছে। ওরই মধ্যে এক জায়গায় গরম জিলিপি ভাজছে একজন। আর একজন নিয়ে বসেছে মুড়ি আর তেলেভাজা।
ওরা দু'জনে একটি গাছতলায় বসে গরম জিপিলি খেল এক ঠোঙা করে। তারপর একটা নতুন গামছা কিনে তাইতে কিছু মুড়ি আর তেলেভাজা বেঁধে নিয়ে যাত্রা শুরু করল। একটা প্লাস্টিক বোতল চেয়ে নিল একজনের কাছ থেকে। তাই তে খানিক জল ভরে নিল। না হলে রাতবিরেতে জলতেষ্টা পেলে যাবে কোথায়? পথের সম্বল এটুকু থাক। সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগেই ওদের যে কোনও একটা আশ্রয়ে মাথা গুঁজতে হবে। না হলে এই বাঘ ভালুকের দেশে প্রাণট! খোয়াতে হবে বেঘোরেই।
হাট থেকে বেরিয়ে ওরা দুই পাহাড়ের মাঝের বনপথ ধরে গভীর জঙ্গলের দিকে এগোতে লাগল। ভেলুয়াও ওদের সঙ্গে সমানে চলেছে। পথ চলায় ওর যেন ক্লান্তি নেই। ভেলুয়া আগে আগেই চলছিল। যেতে যেতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল ও।
কী হল! কী হল রে ভেলুয়া?
ওরা দেখল পথের মাঝখানে কিছু ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ। নিশ্চয়ই কাউকে বাঘে খেয়েছে। এই দেখে ওরা আর এগোতে সাহস করল না। কিন্তু মা-এগোলেও থাকবে কোথায়?
হঠাৎ দীপংকরের নজরে পড়ল কিছু দূরে একটা কুণ্ডুল পড়ে আছে।
ও কাছে গিয়ে সেটা কুড়িয়ে নিল। আর তখনই দেখতে পেল সেই ভয়াবহ দৃশ্যটা। একটা লোক অদূরে জঙ্গলের ভেতর বড়সড় একটা পাথরে শুয়ে আছে। লোকটার বুক পেট ফালা ফালা। প্রাণটুকু অবশিষ্ট আছে। সেটুকুও আর থাকবে না হয়তো।
চম্পা বলল, নিশ্চয়ই ভালুকের হাতে পড়েছিল লোকটা। চলো ওর মুখে একটু জল দিয়ে আসি। এই বলে ওরা দু'জনে লোকটার কাছে গেল। কিন্তু জল দেবার আগেই একবার শেষবারের মতো কেঁপে উঠে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করল সে।
চম্পা বলল, আর এক মুহূর্ত নয়। যেভাবেই হোক কোনও পাহাড়ি গাঁওয়ে গিয়ে পৌঁছতে হবে আমাদের। চলো, চলো, পা চালাও।
এমন সময় কয়েকজন হাট ফেরতা বুনো লোক এসে পড়ল সেখানে। যাক বাবা বাঁচা গেল। ওরা কুসুমডি গ্রামে যাচ্ছিল। চম্পা ওদের চিনত। তাই দলে ভিড়ে গেল।
কুসুমডি বেশি দূরে নয়। মিনিট দশেকের পথ। ওরা ওদের পিছু পিছু দশ মিনিট হেঁটে সেই গ্রামে এসে পৌঁছুল। শুধু পাহাড় আর পাহাড় এখানে।
এখানে পাহাড়ের কালো বুনোদের ঘরবাড়ি কয়েকটি থাকলেও, ওরা ওদের বলেকয়ে একটি সুউচ্চ গাছের মাথায় জঙ্গল পাহারা দেবার জন্য যে ঘর, সেই ঘরই একটি এক রাতের জন্য চেয়ে নিল। আর বলে দিল কেউ এসে ওদের খোঁজ করলে ওরা যে এখানে আছে সে কথা যেন না বলে।
আর ওরা দু'জনে দড়ির মই বেয়ে একটি ঘনপত্র বিশিষ্ট গাছের মাথায় যে ঘর, সেই ঘরে গিয়ে জুটল। কী ছোট ঘর। কাঠের তৈরি। ডালপালা দিয়ে। তাইতে খড় বিছানো। এক পাশে একটি ক্যানেস্তারা। আসলে ফসলের সময় ফসল পাহারা দেবার জন্যে যখন এই ঘরে থাকা হয় তখন এটা কাজে লাগে।
চম্পা বলল, শোনো ঘুম পেলে দু'জনেরই এখানে ঘুমিয়ে পড়াটা ঠিক হবে না। যখন তুমি ঘুমোবে তখন আমি জাগব, যখন আমি ঘুমোব তখন তুমি জাগবে। কেমন?
দীপংকর বলল, সে তো বটেই।
দীপংকরের বুক তখন ভয়ে ঢিপ ঢিপ করছে। কেন না বাতাসের আন্দোলনে ডালগুলো যখন দুলে উঠছে, তখন বার বারই মনে হচ্ছে এই বুঝি ঘরটা ভেঙে পড়বে মাটিতে। না হলে চারপাশের বন্য প্রকৃতির শোভা এখানে অপরূপ। এমন পরিবেশে তো জীবনে থাকেনি কখনও, এই বনবাসর তাই ওর কাছে স্বর্গীয়। চম্পা বনবালা। এরকম অঢেল সৌন্দর্য ওর দেখা আছে। কিন্তু ও তো এই.প্রথম দেখছে। একটু পরেই আকাশের সুগোল চাঁদ পরিষ্কার দেখা গেল। জোছনায় ফুল ফুটছে যেন চারদিকে। পূর্ণিমা এগিয়ে আসছে হয়তো। তাই এত আলো।
দীপংকর চম্পার অনিন্দ্যসুন্দর মুখখানির দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ! তারপর এক সময় বলল, আমার জেঠুর ব্যাপারে তুমি কি কিছু আমাকে বলবে?
চম্পা বলল, নিশ্চয়ই বলব। তোমার জেঠু ছিলেন এই পাহাড় বনের দেবতা। এখানকার বন্যেরা সকলেই তাঁর কাছে উপকৃত। উনি প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সকলের সুখ দুঃখের খোঁজ নিতেন। মানুষের আপদেবিপদে অসুখেবিসুখে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। সাইকেলে চেপে হোমিওপ্যাথি ওষুধ নিয়ে গ্রাম গ্রামান্তরে গিয়েও বিনামূল্যে চিকিৎসা করতেন রোগীদের। ওনার ওষুধের এমনই গুণ ছিল যে এক ফোঁটা ওষুধ খেলেই রোগ সেরে যেত। একবার হল কী আমার খুব অসুখ হল। রাত্রিবেলা। কোথাও ডাক্তার পাওয়া যায় না। বাবুজি ছুটলেন তোমার জেঠুর কাছে। সে সময় উনি কাছাকাছিই ছিলেন তাই রক্ষে। খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে এলেন আমাদের ঘরে। তারপর এমন ওষুধ দিলেন যে খাওয়া মাত্রই ভাল হয়ে গেলাম। সেদিন থেকে যতদিন পর্যন্ত না আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হলাম ততদিন উনি রোজ এসে আমাকে ওষুধ দিয়ে যেতেন।
তারপর?
তারপর আর কী? ভাল হবার পর আমিও যখনতখন যেতাম তোমার জেঠুর কাছে। তোমার জেঠু খুব ভোজনরসিক লোক ছিলেন। অনেক টাকার মালিক তো। প্রতিদিন একটা দুটো করে মুরগির মাংস উনি রান্না করে খেতেন। ওনার ইকলু চাকরটা আদিবাসী হলে কী হয় রান্নার ব্যাপারে খুব পটু ও। ভাল সাইকেল চালাতে পারত। ঘাটশিলা থেকে জেঠুর জন্যে ভাল ভাল সন্দেশ-রসগোল্লা নিয়ে আসত। তবে জেঠু কিন্তু সবই একা খেতেন না। পঁচিশ-ত্রিশ টাকার মিষ্টি কিনে এনে নিজে সামান্য কিছু খেয়ে, বাকি সব ইকলুকে দিয়ে বিলিয়ে দিতেন। আমি আসলে ওই সব ভাল ভাল জিনিস খাবার লোভেই এখানে আসতাম। মাঝে মাঝে তোমার জেঠুকে বলতাম, আচ্ছা জেঠুমণি! তুমি চাকরি করো না, চুরিডাকাতি করো না। তবু তুমি এত টাকা পাও কোথা থেকে? জেঠু হেসে বলতেন, ভগবান দেয়। ওরে বেটি! আমি যা কখনও চিন্তাও করিনি ওই ওপরতলা ভগবান না চাইতেই আমাকে তাই দিয়েছেন। আমার অনেক— অনেক টাকা। আমার যা টাকা আছে তাতে আমি এই শহরটাকেই কিনে ফেলতে পারি। তাই শুনে আমি বলতাম, তা হলে তুমি এই বনেজঙ্গলে তাঁবুতে রাত কাটাও কেন? গাছের ওপর ঘর করে থাক কেন? ভিলসর্দারের ওখানে মাটির নীচে ঘরের ভেতর লুকাও কেন?
তা জেঠু বলতেন, জানিস বেটি, টাকা-পয়সা বিষয়সম্পত্তি এসব হচ্ছে মানুষের ভালভাবে বেঁচে থাকবার একটা অবলম্বন। বহু কষ্ট করে এসব অর্জন করতে হয়। কিন্তু আমি যখন কষ্ট না করেই এইসব পেয়ে গেছি তখন কেন ছুটব আলেয়ার পিছনে? এই যে অরণ্য এর রূপ, রস, গন্ধ যে মানুষ ভোগ না করল, তার জীবনই বৃথা। গভীর নিশীথে এই ঝরনা বা নদীতীরে হরিণের জল খেতে আসা যে দেখল না তার কীসের জনম? এই গাছের ওপর ঘরে শুয়ে পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত বনভূমির সৌন্দর্য যে উপভোগ করতে না এল তার কি জন্য পৃথিবীতে আসা? অবশ্য ইচ্ছে থাকলেও অনেকের জীবনে তা ঘটে ওঠে না। কেন না তাদের ঘর আছে, সংসার আছে, তাদের রুজি রোজগারের জন্যে ছুটতে হয়। আমার তো তা নেই। এই অরণ্য তার যে সম্পদ আমার হাতে তুলে দিয়েছে তাতে আমি রাজার ঐশ্বর্য পেয়ে গেছি।
দীপংকর অবাক বিস্ময়ে চম্পার মুখের দিকে চেয়ে সব কথা শুনে যেতে লাগল। যদিও এই ছোট ডালপাতার ঘরে কোনও আলো না থাকায়, ওর মুখ ভাল করে দেখা যাচ্ছিল না, তবুও ওর ভ্রমরকালো চোখদুটো যেন কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে কই মাছের মতো ছটফট করছিল। দীপংকর বলল, বলে যাও। বলে যাও চম্পা। তারপর ?
তারপর আমি জেঠুর গলা দু'হাতে জড়িয়ে ধরে বললাম এই অরণ্য তোমার হাতে কী সম্পদ তুলে দিয়েছে জেঠু! জেঠু বললেন, অমূল্য সম্পদ। এক সময় আমি জাহাজে চাকরি করতাম। সাহেবদের কাছ থেকে অনেক গিনি মোহর উপহার পেতাম। এরকম অনেক আমার ভাইয়ের কাছে গচ্ছিত আছে। আমার ভাই, বউমা এবং তোর বয়সি ওদের একটি ফুটফুটে ছেলেও আছে। ওই গিনি আমি তাদের ভোগ করবার জন্যে দিয়েছি। তাদের বলেই রেখেছি আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন কেউ ওতে হাত দেবে না। আমি মরে গেলে যদি কখনও খুব বিপদে পড়, তখনই শুধু খরচা করবে ওগুলো। কারণ অযথা বড়লোক হবার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু সংগ্রহ করতে নেই, বা পুঁজি নষ্ট করতে নেই। এতে মানুষ নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনে। যাই হোক, ওদের কাছে গিনিগুলৈা গচ্ছিত রাখলেও নিজের জন্য উপার্জিত অর্থ কিছু রেখেছিলাম। তাই দিয়ে টাটানগরে একটা বাড়ি করেছি। ব্যাঙ্কেও রেখেছি প্রচুর টাকা। এ টাকা অবশ্য জাহাজে কাজ করে উপার্জন করিনি। এটা সোনা কেনাবেচার দালালি করে উপার্জন করেছি। এই সোনার নদীর দেশের রেণু থেকে সোনাখোঁচারা স্বর্ণসন্ধান করলে তা আমার মধ্যস্থতায় বিক্রি হত। এইভাবেই যখন অল্প পরিশ্রমে আমি প্রচুর টাকার মালিক হলাম, তখন এই অরণ্যমায়ায় পড়ে গেছি। ভাবলাম আর কী হবে অর্থ? অনেক—অনেক তো হয়েছে। এত যে তা সারাজীবনে দু'হাতে খরচ করেও শেষ করতে পারব না। অতএব পেটের চিন্তা যখন নেই তখন পরম নিশ্চিন্তে জীবনের বাকি দিনগুলো প্রকৃতির রূপ, রস, গন্ধ উপভোগ করে যাই। মানুষের সেবা করি। এইভাবেই আমার অরণ্যজীবন শুরু হল।
দীপংকর বলল, আমার কী মনে হচ্ছে জানো চম্পা, তুমি যেন রূপকথার কোনও গল্প আমাকে শোনাতে বসেছ। সবচেয়ে আশ্চর্য, এতক্ষণ ধরে বাংলায় কথা বলছ তুমি, অথচ তোমার জিভের কোনও জড়তা নেই। কী পরিষ্কার বাংলা, আমার মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই তোমার মা-বাবা বাঙালি ছিলেন।
হয়তো। তবে বাংলায় কথা বলতে আমার খুব ভাল লাগে। আর অনর্গল যখন বলতে থাকি তখন বলার মধ্যে বেশ সরলতা এসে যায়। কিন্তু পরে আবার যে কে সেই। ঠিক দু’-এক কথার মাঝে হিন্দি বলে ফেলি। রোজ যদি তোমার সঙ্গে কথা বলি তা হলে দেখবে আর আমার কথায় হিন্দির টান আসবে না।
দীপংকর বলল, রাত এখন কত তা কে জানে? সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তুমি আবার শুরু করো আমার জেঠুর কথা।
হ্যাঁ। তোমার জেঠু বলেছিলেন, এইভাবে অরণ্যবাস করতে করতে একদিন তিনি ভেলুয়াকে সঙ্গে নিয়ে ধারাগিরি পার হয়ে আরও গভীর জঙ্গল ও পাহাড়ের মধ্যে চলে যান। এমন সময় হঠাৎ দেখলেন কয়েকজন লোক ছোট ছোট ঘোড়ার পিঠে মালপত্তর চাপিয়ে কোথায় যেন চলেছে। তাদের একজনের হাতে বন্দুকও ছিল। জেঠু সহসা আক্রমণ না করে, সাহসে ভর করে ওদের অনুসরণ করেন। ওরা একটি গুহার মধ্যে সেই সব মাল খালাস করে চলে যায়। ওরা চলে যাবার পর, জেঠু ওদের লুকিয়ে রাখা মালপত্তরগুলো পরীক্ষা করতে গিয়েই অবাক হয়ে যান। দেখেন কিনা তাল তাল সোনা। আর সেই সোনার সঙ্গে কিছু অলংকার দেখেই জেঠুর মনের কোণে কীসের একটা সন্দেহ যেন ঝিলিক মেরে ওঠে। জেঠু বার বার সেগুলো দেখতে থাকেন। এ যে তাঁর অতি পরিচিত। এই অলংকার মিলারসাহেবের মেম হেনরিয়েটার। আর ওই মুদ্রাও তো মিলারসাহেবেরই চুরি করা। অর্থাৎ এত সব চুরি করেও আশ মেটেনি। তাই আরও অধিক কিছু পাবার লোভে খুন করে মিলারসাহেবকে। কিন্তু খুন যে করে সে তো কুন্দনলাল। তবে কী...।
জেঠুর ডায়েরির সেই অংশটার কথা মনে পড়ল দীপংকরের। চম্পা আর কিছু বলার আগেই দীপংকর বলল, জেঠুর ডায়েরি আমি পড়েছি! কুন্দনলাল মিলারসাহেবকে খুন করে প্রচুর সোনা নিয়ে পালাতে যাবার সময় আমার জেঠু ওকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। সেই সময় দু'জনের ধস্তাধস্তিতে কুন্দনলাল ভিক্টোরিয়া জাহাজ থেকে গঙ্গার জলে পড়ে যায়। গঙ্গায় তখন ষাঁড়াষাঁড়ির বান! সেই বানের তোড়ে কোথায় ভেসে যায় কুন্দনলাল তা কে জানে? তারপর হঠাৎ একদিন তার সাথে অনেক— অনেকদিন পরে দেখা হয় খড়্গপুরের গোলবাজারে। সে যাই হোক, কুন্দনলালের লুট করা ওই সোনার ব্যাপারে আর কিছু জানা যায় না। সেগুলো কি জাহাজেই পড়ে থাকে? না জেঠু নিজেই সেগুলো নিজের কাছে রেখে দেন? না হলে এত অর্থ ওই জাহাজের চাকরি ছাড়ার পরই কী করে উপার্জন করেন জেঠু?
চম্পা বলল, সে ব্যাপারটা আমাদের অবশ্য না-জানলেও চলবে। তা ওই সম্পত্তি মানে ওই গুহার ভেতর থেকে সোনার তাল, অলংকার, গিনিগুলো জেঠু উদ্ধার করে আনেন। তারপর সেগুলো এমন এক জায়গায় উনি লুকিয়ে রাখেন যে তা কেউ জানে না। একমাত্র আমি ছাড়া।
সে কী!
হ্যাঁ। তুমি কি বিশ্বাস করবে দীপংকর! উনি আমাকে এত ভালবেসে ফেলেছিলেন যে, বলে গেছেন, হঠাৎ যদি কখনও আমি মারা যাই তা হলে ওগুলো তোর হবে। তোর বিয়ের জন্য যৌতুক হিসেবে আমি ওগুলো রেখে গেলাম। দেখিস, যেন ভুলেও এ কথা কাউকে বলিস না। তা হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তুই-ই বঞ্চিত হবি তোর প্রাপ্তি থেকে।
তুমি জানো সেগুলো কোথায় আছে?
জানি। তোমাকেও দেখাব। কাল সকালে আমরা সেখানে গিয়ে উদ্ধার করব সেগুলো। সব হয়তো পারব না। করব কিছু কিছু। তারপর তোমাকে নিয়ে চলে যাব তোমাদের বাড়িতে।
কিন্তু জেঠুর খুনের ব্যাপারটা?
হ্যাঁ। ওই সোনার তাল, মুদ্রা এবং অলংকার সেই গুহা থেকে সরিয়ে আনার পর হঠাৎ কিছু লোক ওই জেঠুকে সন্দেহ করে পিছনে লাগে। তাদের মধ্যমণি ছিলেন লালজি। অর্থাৎ ওই কুন্দনলাল। তবে এখানকার বুনোরা বা মা রংকিনীর সেবায়েত ওই ভিলরা জেঠুর সহায় ছিলেন বলে লালজি খুব একটা সুবিধে করতে পারছিলেন না। আমার মনে হয় সেইজন্যে লালব্জিই জেঠুকে খুন করেছেন। যে রাতে জেঠুকে খুন করা হয়, ভেলুয়া সে রাতে আমার কাছে ছিল। সেদিন ছিল শনিবার। আমি কুসুমডির হাটে ঘুরে বেড়িয়ে তোমার জেঠুর দেওয়া কাচের চুড়িতে দু’হাত ভরিয়ে যখন বাড়ি ফিরতে গেলাম, তখন বেলা গড়িয়েছে। তাই জেঠু ভেলুয়াকে আমার সঙ্গে দিলেন। ব্যস। সেই সুযোগে সেই রাতেই খুন হয়ে গেলেন জেঠু।
হঠাৎ ভয়ংকর একটা নিনাদে সেই অরণ্যভূমি থর থর করে কেঁপে উঠল। দীপংকর ভয়ে চিৎকার করে দু'হাতে আঁকড়ে ধরল চম্পাকে। ওর মধ্যে ও যেন আর নেই তখন।
চম্পাও ভয় পেয়ে গিয়েছিল প্রথমে। তারপর বলল, ও কিছু না। বাঘের ডাক। পরক্ষণেই চারদিক থেকে ক্যানেস্তারা পেটানোর শব্দ শুনতে পাওয়া গেল। শুরু হল কুকুরের ক্রুদ্ধ চিৎকার। বনের পাখিরা ভয় পেয়ে আকাশময় উড়ে এলোমেলো ভাবে পাক খেতে লাগল। কী বিপর্যয়। ওরা ওপর থেকে উঁকি মেরে দেখল, একটা বিশাল দেহ বাঘ ওদেরই গাছের নীচে বসে ঘন ঘন ল্যাজ নাড়ছে। দীপংকর ভয়ে কানে আঙুল দিয়ে চোখ বুজল। বাঘটা চলে গেল একটু পরেই। কেন না ক্যানেস্তারা বেজে উঠলে মানুষ জেগে উঠেছে বুঝলে বাঘ আর থাকে না। একটু পরে দীপংকর ঘুমিয়ে পড়ল।
বনমোরগের ডাকে যখন ঘুম ভাঙল দীপংকরের, তখন দেখল অল্প অল্প করে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে এই মৌনীস্তব্ধ গিরিঅরণ্যে।
এক সময় চম্পাও উঠে বসল। তারপর দু'হাত টান করে হাই তুলে বলল, স্যরি। জেগে থাকতে থাকতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চলো চলো, আর দেরি নয়। দিনের আলোতেই যত ভয়। ইকলুদের গ্রামে না-পৌঁছনো পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। কেন না আমার মন বলছে বাবুজির লোকজন সকাল হলেই এইদিকে আমাদের খোঁজে আসবে। বলেই দড়ির মইটা ওপর থেকে ঝুলিয়ে দিল চম্পা। তারপর সেই মই বেয়ে দু'জনেই নামল গাছ থেকে। কুড়িয়ে পাওয়া সেই কুণ্ডুলটা দীপংকর কিন্তু সঙ্গে রাখতে ভুলল না।
ভেলুয়া কাছেপিঠেই ছিল। ওদের নামতে দেখেই লেজনেড়ে ছুটে এল সেখানে। তারপর আবার চরৈবেতি। অর্থাৎ চলা শুরু হল।
পাহাড়ের পথে একটা উত্তরাই পেরোতেই ওরা একটা ঝরনার ধারে এসে পৌঁছুল। সেখানে ঝরনার জলে মুখহাত ধুয়ে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নিল ওরা।
দীপংকর বলল, আমার খুব খিদে পাচ্ছে। কী করি বলো তো?
কী আর করবে? আমারও খিদে পাচ্ছে খুব। কিন্তু এখানে এই অরণ্যে কোথাও কিছু নেই। কাল থেকে পথ হাঁটা কী কম হল? ভেলুয়াটাও খায়নি কিছু। এই সময় একটু কিছু পেটে না-দিলে যে আর পথ চলতে পাচ্ছি না।
এমন সময় জঙ্গলের ভেতর থেকে দু'জন সশস্ত্র যুবক কালো প্যান্টি আর ডোরাকাটা গেঞ্জি গায়ে ওদের সামনে হাসতে হাসতে এসে দাঁড়াল। দু'জনেরই চেহারা দানবাকৃতি। চোখেমুখে নৃশংসতার ছাপ। ওদের হাতে উদ্ধৃত ছোরা। ওদের একজন বলল, আরে চম্পা! তু হিয়াতক ক্যায়সে আ গিয়া? ও লেড়কা কৌন হ্যায়?
চম্পা রেগে বলল, তু পুছনেয়ালা কৌন?
আর একজন বলল, তুই লালজির সাথে টক্কর মারতে যাচ্ছিস চম্পা! তুই কি ভেবেছিস এই লেড়কাকে নিয়ে ভাগবি, আর মানিকবাবুর লুটেরা মাল হাপিস করবি, তা আমরা বসে বসে দেখব? কাল রাত থেকে তোদের দু'জনকে খুঁজছি আমরা। কোথায় যাচ্ছিস তোরা? গুপ্তধন নিতে?
চম্পা বলল, পথ ছোড়ো। বদমাশ কাহাকা। হট
আমরা হটে যাবার জন্যে আসিনি চম্পা। তোদের যাও।
দু'জনকে লালজির কাছে
পৌঁছে দেবার জন্য আমরা এসেছি। বলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল চম্পার ওপর। চম্পা চিৎকার করে উঠল, বাঁচাও বাঁচাও।
ভেলুয়া তখন বাঘের মতো লাফ দিয়ে লোকটার ঘাড়ে পড়েছে। তারপর আঁচড়েকামড়ে একশা করতেই, চম্পাকে নামিয়ে দিয়ে পালাতে গেল। ভেলুয়া খ্যাপার মতো তাড়া করল তাকে।
আর একজন হতভম্ব হয়ে যেই-না ছোরা উঁচিয়ে আক্রমণ করতে আসবে দীপংকরকে, সেও অমনি কুড়ল উচিয়ে আক্রমণ করল তাকে।
মুহূর্তের ব্যাপার। দেখা গেল সেই ভয়াবহ আক্রমণকারীর ছোরাধরা কাটা হাতটা পড়ে আছে পাথরের ওপর। আর সে থরথর করে কাঁপছে, এ ক্যা কর দিয়া তুমনের মেরা হাত দে দো।
দীপংকর বলল, এই হাত দিয়েই তোরা আমার জেঠুকে খুন করেছিলি। তোকে দিয়েই আমার বদলা নেবার পালা শুরু। শেষ হবে কুন্দনলালকে দিয়ে। যদি আর একটা হাত খোয়াতে না-চাস তো ভাগ এখান থেকে।
লোকটা পালাল।
আগের লোকটাকে তাড়িয়ে ভেলুয়া তখন ছুটতে ছুটতে আসছে। ভেলুয়া এলে চম্পা, দীপংকরও ছুট লাগাল। আর কেউ থাকে এখানে?
ওরা দু'জনে এবং ভেলুয়া একটি সংকীর্ণ বনপথ ধরে ছোটা শুরু করল। একটু ছুটে আসার পরই পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল দীপংকর, উ হু হু। বাবারে, মরে গেলুম।
কী হল! কী হল দীপ।
দীপংকরের পায়ের বুড়ো আঙুলের মাথাটা কেটে গিয়ে তখন গল গল করে রক্ত ঝরছে।
চম্পা বলল, লেগেছে খুব?
হ্যা। ভীষণ জ্বালা করছে।
ওতে কিছু হবে না। পাথুরে জায়গা। আমার অমন কত লাগে। দাঁড়াও এক্ষুনি রক্ত বন্ধ করে দিচ্ছি। বলে ছুটে গিয়ে তিন রকম গাছের পাতা হাতের তালুতে কচলে লাগিয়ে দিল দীপংকরের পায়ে। এরপর ওর পায়ের দু’-এক জায়গায় অতি চমৎকারভাবে ম্যাসেজ করে ওর হাতধরে টেনে তুলল ওকে।
দীপংকর বলল, খুল লেগেছে। আর একদম ছুটতে পারব না।
আর ছুটতে হবেও না। আমার হাত ধরো। ধরে একটু একটু করে পা ফেলে এগিয়ে এসো।
দীপংকর তাই করল। চম্পার হাত ধরে উঠে দাঁড়িয়ে ওর কাঁধে ভর করে একটু একটু চলা শুরু করল। এইভাবে কিছু পথ আসতেই এক জায়গায় থেমে দাঁড়িয়ে চম্পা বলল, আরে এসে গেছি। ওই দেখা যায় বাসাড়েরা গ্রাম। ওখানেই আমাদের ইকলু থাকে। তবে কী জানো দীপ, এখানেও আমরা বিপদমুক্ত নই। তার কারণ লালজির লোকেরা জেনে গেছে আমরা পালিয়ে এসেছি এখানে। হয়তো আমার বাবুজিও জেনে যাবে। কাজেই ওই পাহাড়ে তোমার জেঠুর সম্পত্তি যেখানে আছে, সেখানে যাওয়াটা হয়তো আমাদের উচিত হবে না। সে কী! তা হলে এত কষ্ট করে এখানে আসাটাই তো বৃথা।
যেতে পারি। কিন্তু প্রচণ্ড লড়াই বেধে যাবে। হয়তো সেই যুদ্ধে তোমাকে আমাকে দু'জনকেই মরতে হতে পারে। রাজি?
রাজি। আমি মরতে চাই। তবে ওই ধনরত্নের সন্ধান লুঠেরাদের হাতে তুলে দিয়ে নয়। ওদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে। তোমাকে জেঠু নিজে হাতে যা দিয়ে গেছেন তা উদ্ধার না করে আমি যাব না। আমার হয়তো ফাঁসি হবে, কিন্তু তোমার তো দীর্ঘ জীবন আছে।
চম্পা দীপংকরের মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল, বার বার তুমি ওকথা বলো না দীপ। তা হলে আমার মন খুবই খারাপ হয়ে যাবে। মা রংকিনীর ওপর ভরসা রাখো। মা নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট হবেন। হয়তো শেষ পর্যন্ত তোমার কিছুই হবে না।
এই বলে কথা বলতে বলতে ওরা বাসাড়েরা গ্রামে পৌঁছুল। ওই তো ইকলুর কাঠের ঘরের দোতলায় ইকলু বসে বসে কী যেন খাচ্ছে। জেঠুর পয়সায় ইকলুও তো এখন বড়লোক।
চম্পা দূর থেকেই ডাকল, ই-ক-লু...উ...।
ভেলুয়া ইকলুকে দেখেই ভৌ ভৌ ডাক ছেড়ে মনের আনন্দে ছুটল ইকলুর বাড়ির দিকে।
ইকলুও তখন বারান্দা থেকে ওদের দেখতে পেয়ে হাত নেড়ে নেড়ে ডাকছে। কী আনন্দ! কী আনন্দ!
ওরা ইকলুদের বাড়িতে যেতেই কোনও আত্মীয়কুটুম্ব সব এলে যে রকম হয়, সেই রকম হইচই পড়ে গেল। ইকলু দোতলা থেকে নেমে এসে চম্পাকে দু'হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে ঝর ঝর করে কাঁদতে লাগল।
আর ভেলুয়া করল কী, ইকলুকে আঁকড়ে ধরে অনবরত কেঁউ কেঁউ করতে লাগল। ধুলোয় গড়াগড়ি খেতে লাগল! ইকলু পরমাদরে তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল তখন।
চম্পা বলল, আমাদের খুব বিপদ। এই বিপদে তোমাকে একটু সাহায্য করতে হবে ইকলুভাই।
বলুন দিদিভাই কী করতে হবে?
তার আগে পরিচয় করিয়ে দিই এই ছেলেটির সঙ্গে। এই যে ছেলেটি দেখছ, এ হচ্ছে তোমার মনিব সেই মানিকজেঠুর ভাইপো।
হ্যাঁ হ্যাঁ। দীপংকর। ডাক নাম দীপু। বাবুর কাছে অনেকবার শুনেছি ওর কথা। ছোটবেলায় ওকে তো দেখেওছি। বাবু টাটানগরে বাড়ি করবার পর তো ও এসেছিল। তখন অবশ্য ও ছোট ছিল খুব। তা ও এখানে কী করে এল?
সেই কথাই তো বলব তোমায়। এখন আমরা কয়েকটা দিন থাকব তোমাদের এখানে। আমাদের দু'জনকে এখানে একটু আশ্রয় দিতে হবে। আর খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে আমাদের। এখুনি তুমি আমাদের দু'জনকে কিছু খেতে দাও। কাল থেকে প্রায় না-খেয়েই আছি আমরা। খেতে খেতে সব বলব।
ইকলু অবাক চোখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল দীপংকরের দিকে। তারপর বলল, বসো। বসো তোমরা। আমি এক্ষুনি ব্যবস্থা করছি তোমাদের জলখাবারের। বলেই ভেতর বাড়িতে ঢুকে গিয়ে সম্ভবত ওর বউকে কোনও কিছু করবার নির্দেশ দিয়ে এল।
একটু পরেই ওপরের ঘরে ইকলুর বউ ও মেয়েরা দু’থালাভর্তি
সিদ্ধ আর আলু-মরিচ দিয়ে গেল।
মুড়ি, রাঙালু
ইকলুর বউ বলল, চা খাও তো তোমরা? চা আনছি আমি।
দীপংকর ও চম্পা হাসি মুখে বলল, হ্যাঁ খাই। বলে খুব তৃপ্তি করে সেই সব খেতে লাগল। খেতে খেতেই সব কথা খুলে বলল ইকলুকে।
সব কিছু শোনার পর রাগে লাল হয়ে উঠল ইকলুর মুখ। ওর দু'চোখে যেন আগুন ছুটতে লাগল। বেশ বজ্রকঠিন গলায় বলল, তোমাদের কোনও ভয় নেই ভাই। যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি ততক্ষণ এই গ্রামে ঢুকে ওরা তোমাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না। বাবুজিকে খুন করার অপরাধে এখানকার বুনোরা এখন এমন খেপে আছে যে লালজির লোকদের দেখলেই মেরে ফেলবে ওরা।
কিন্তু তবুও ওরা তো আমাদের খোঁজে না এসে পারবে না।
শুধু তোমাদের খোঁজে কেন, ওদের মুখের গ্রাস বাবুজি যেভাবে ছিনিয়ে নিয়েছেন, তাতে সেই সবের খোঁজেও ওদের আসতে হবে! চোরাগোপ্তাভাবে রাতের অন্ধকারে আসেও ওরা এখানে। তবে এ গ্রামে নয়। ওই ওধারে যে পাহাড়গুলো রয়েছে দেখছ ওইখানে।
চম্পা বলল, জানি আমি। ওই গহন গিরিকন্দরে গুহায় গুহায় কেন ওরা কীসের আসায় ছুটে বেড়ায় জানি। আজ এখনই ওইখানে আমাদের যেতে হবে। তাই—।
না দিদিভাই। ওখানে পাহাড়ের ফাটলের গায়ে যে স্বর্ণশিরা আছে, তাই থেকে সোনার সন্ধানে এখনও ওই পাহাড়মালার অধিবাসীরা রুজি-রোজগারের ধান্দা দেখছে। ওদের সঙ্গেও লালজির লোকদের যোগাযোগ। কাজেই ওখানে তোমাদের যাওয়া ঠিক হবে না।
তা হলে জেঠু নিজে হাতে আমাকে যা দিয়ে গেছেন, তা তো চিরকাল ওইখানে লুকানো থাকবে।
তা কেন? খুব সাবধানে এবং কৌশলে ওগুলো আনতে হবে। কিন্তু সে কাজ এখনই না। আরও দু’-চার দিন যাক। তার আগে ওদের গতিবিধি আমি লক্ষ করি।
চম্পা বলল, আচ্ছা ইকলুভাই, ওখানকার পাহাড়িরা তো আমাকে চেনে। আমি যদি ঘুরে বেড়ানোর ছলে ওখানে যাই?
না যেয়ো না। তার কারণ তখন তুমি এমনই যেতে। তোমার জেঠুকে সবাই মানত, ভয়ও করত। এখন তিনি নেই এবং তুমি ছেলেমানুষ, কাজেই ওইসব মালপত্তর নিয়ে আসতে গেলেই বিপদে পড়বে তুমি। ওরা ঠিক তোমার পিছু নেবে এবং ছিনতাই করবে। তা ছাড়া তোমায় তো বলেইছি ওই লালজির অনেক লোক ওখানে আছে। বিশেষ করে লালজির গোপনীয় অনেক কিছুই লুকানো আছে ওই সব গুহায়। কাজেই ওখানে গেলে তোমাদের দু'জনকে আলুভাতের মতো মুখে পুরে নেবে ওরা। এক, যেতে পারো রাত্রিবেলা। কিন্তু তখন হিংস্র জানোয়ারগুলোর উপদ্রবে পথ চলতে পারবে না। কাজেই ওখানে যাওয়ার ব্যাপারে একটা মতলব বার করতে হবে।
ওরা যখন এইসব আলোচনা করছে তেমন সময় একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল ওরা, ইকলু! এ ইকলু ভেইয়া? জেরা শুনো তো?
ইকলু সেই ডাক শুনে বারান্দার রেলিং ধরে ঝুঁকে বলল, আরে ঠাকুর সিং? কী ব্যাপার!
থোড়া সা গড়বড়। আমার চম্পা বিটিয়া তুমহারা পাশ আয়া কি নেহি? চম্পা! কই না তো!
আয়া নেহি?
না। তবে বাবুজির কুকুর ভেলুকে আজ সকাল থেকে এখানে দেখছি! একথা না-বলা ছাড়া অবশ্য আর কোনও উপায় ছিল না। তার কারণ ভেলুয়া অদূরেই উঠোনে শুয়ে শুকনো মুড়ি চিবোচ্ছিল। ইকলু বলল, চম্পাদিদি এখানেই বা আসবে কেন? আপনি কি বকাঝকা করেছেন কিছু?
ওসব কোনও ব্যাপারই নয়। তো ঠিক আছে, ও যদি এখানে আসে তা হলে যেভাবেই হোক ওকে এখানে আটকে রাখবে। ওর সঙ্গে একটা ছেলেও থাকবে হয়তো। আমি বিকেলের দিকে আর একবার এখানে খোঁজ নিতে আসব। ভেলুয়া যখন এখানে এসেছে তখন ওরা খুব কাছাকাছিই আছে।
ইকলু বলল, ঠাকুর সিং? আপনি আর কোনও সময়েই এখানে আসবেন না। কারণ আমাদের এখানকার লোকেরা আপনার ওপরেও খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। চম্পা আমার কাছে কোনওরকমে এসে পড়লে আপনি জানবেন ও খুব নিরাপদেই থাকবে। কিন্তু আপনার লালব্জির নজর নেই তো ওর ওপর?
আছে ইকলু ভাই। ওর সঙ্গে একটা লেড়কাও আছে। ওই লেড়কা মানিকবাবুর ভাই কা লেড়কা! মাথার একটু গোলমাল আছে। বাড়ির কথা মনে করতে পারছে না। কাউকে চিনতে পারছে না। তা ওই লেড়কাটাকে বাড়িতে রেখেই আমি ভুল করেছি। চম্পা বিটিয়াকে সাথে নিয়ে ও ভেগেছে। ওর জন্যে আমার লেড়কি বিপদে পড়ে যাবে।
ইকলু সব শুনে বলল, বাবুর ভাইয়ের লেড়কাকে তুমি ঘরে রেখেছ। লালজির সঙ্গে ওদের দুশমনি, আর তুমি বলছ ও তোমার বিটিকে নিয়ে ভেগেছে। ঠাকুর সিং! তোমার উমর কত হল? তুমি কি এই কথাটা একবারও মনে করতে পারছ না যে, ওই লালজিই ওদের দু'জনকে ধরে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রেখেছে কোথাও?
ঠাকুর সিং প্রায় চিৎকার করে উঠল, ইকলু! তুমি— তুমি ঠিকই বলেছ ইকলু। এই কথাটা তো আমার একবারও মনে হয়নি। লালজির লোকেরাও ওদের সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এই ভেলুয়াটা ওরা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এইখানে এসে জুটল কী করে?
ইকলু বলল, আমি এদিকটা দেখছি। তুমি লালজির দিকে নজর রাখো ঠাকুর সিং। যাও দেরি কোরো না।
ঠাকুর সিং দেরি করল না। অদূরে গাছের ডালে বেঁধে রাখা একটা দেশি ঘোড়ার পিঠে চেপে পাহাড়ি পথের বাঁকে উধাও হয়ে গেল।
ঠাকুর সিং চলে যাবার অনেক পরে ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল দু'জনে। পেট ভরে জল খাবার খেয়ে, চা খেয়ে ওরা এখন তৃপ্ত।
ইকলু বলল, আর তোমাদের ভয় নেই। আমি এখুনি লোক লাগিয়ে দিচ্ছি। তারা চারদিকে নজর রাখবে। এই এলাকার ভেতরে কেউ ঢুকলেই তির কাঁড় দিয়ে শেষ করে দেবে তাকে। বলেই ইকলু হন হন করে কোথায় যেন চলে গেল। চম্পা ও দীপংকর দেখল একজন আদিবাসী লোক উঠোনের প্রান্তে বসে
মুরগি কাটছে। তার মানে দুপুরে মাংস-ভাত ভালই জমবে।
চম্পা বলল, চলো দীপ, তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাই। কোথায়?
যেখানে আমাদের জেঠুর সমাধি সেইখানে।
একথা শুনেই দীপংকরের মন উতলা হয়ে উঠল। বলল, চলো চলো। আগে সেখানে যাই।
চম্পা ডাকল, আয় ভেলুয়া। আ যা মেরা সাথ।
দীপংকর বলল, আবার হিন্দি!
স্যরি!
ওরা দু'জনে ইকলুদের গ্রাম ছেড়ে কোথায় যেন এগিয়ে চলল। সঙ্গে চলল ভেলুয়া।
বেশ কিছু পথ আসার পর ঝর ঝর করে একটা জল পড়ার শব্দ শোনা গেল। দীপংকর কানখাড়া করে সেই শব্দ শোনার পর বলল, ও কীসের শব্দ! মনে হচ্ছে যেন, কাছেই কোনও জলপ্রপাত আছে।
হ্যাঁ। ওই সেই বিখ্যাত ঝরনা ধারাগিরি। ওই—ওই দেখো। আর ওইখানে ওই যে যিশু ক্রশ দেখছ, ওটাই হচ্ছে জেঠুর সমাধি।
ভেলুয়া এতক্ষণ মন্থর গতিতে ওদের সঙ্গে আসছিল। এবার তিরবেগে ছুটে সেই সমাধির ওপর গড়াগড়ি খেতে লাগল।
দীপংকর ও চম্পাও ছুটল।
চম্পা বলল, এই এখানে তোমার জেঠু তাঁবু খাঁটিয়ে থাকতেন।
কিন্তু এ তো দেখছি গভীর জঙ্গল চারদিকে। এখানে বাঘ আসত না? বাব্বাঃ। তা আবার আসত না? তবে উনি খুব সাহসী লোক ছিলেন। তার ওপর জাল দিয়ে চারদিক ঘেরা থাকত। তাই বাঘ-ভালুকে কোনও ক্ষতিই করতে পারত না জেঠুর।
কথা বলতে বলতেই ওরা এখান-সেখান থেকে কিছু বনফুল তুলে ফেলল। তারপর সেগুলো এপিটাফের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে প্রণাম জানাল জেঠুর স্মৃতির উদ্দেশে।
আর ভেলুয়া? সে সমানে গড়াগড়ি খেতে লাগল সেখানে। মুখ দিয়ে ‘আঁউ আঁউ’ শব্দ করে কী করুণভাবে কাঁদতে লাগল।
চম্পা বলল, আজ দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর আমরা আবার আসব এই পথে। তারপর?
তারপর আজই যাব ওই দূরের পাহাড়ে। সেখানে ছোট্ট একটি গুহার ভেতরে এক গোপন স্থানে আমার সম্পত্তি লুকানো আছে। যা তোমারও।
কিন্তু আমার যে খুব ভয় করছে।
কীসের ভয়?
যদি বাঘ-ভালুকের হাতে পড়ি?
সে ভয় যে নেই তা নয়। তবু সাবধানে সাহসে ভর করে যেতে হবে। ইকলুকে জানাব না। ওর ওখান থেকে গোটা দুই ছোরা নিয়ে লুকিয়ে পালাব। একটা দড়ি জোগাড় করতে হবে।
ওসব কী হবে?
পাহাড়ে উঠতে গেলে এগুলো চাই।
আমি বলছিলাম কী, আজকের দিনটা বিশ্রাম নিয়ে কাল সকালে যদি খুব ভোর ভোর যেতে?
তা গেলেও হয়। তবে সকালের দিকে লোকজন এসে পড়ার সম্ভাবনাটা খুব। কারণ মাঝেমাঝে অনেকে ওইখানে পাথর কাটতে আসে। ওরা থাকলে কিন্তু আমাদের জিনিসপত্তর ওদের চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে আসা একটা অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। তার চেয়ে আমি চাই কী, ওগুলো সংগ্রহ করে রাতটা ওই গুহায় কাটিয়ে কাল খুব ভোর ভোর উঠে রওনা দেব। তারপর যেখানেই হোক পালাব এখান থেকে।
তা না হয় হল। কিন্তু ওই রত্নসামগ্রী নিয়ে দিনমানেও কি পালাতে পারব আমরা? যদি কেউ কেড়ে নেয়?
সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। এখন চলো ঘরে ফেরা যাক।
এমন সময় ইকলুর গলা শোনা গেল, চম্পা দিদিভাই! ও চম্পা দিদিভাই ! বলি এখানে কী করছ?
চম্পা হাসি মুখ করে বলল, দীপংকরকে দেখাচ্ছিলাম, ওর জেঠুর সমাধি। আমাকে বলে আসা উচিত ছিল তো? আমি কত ভাবছি তোমাদের কথা।
তোমরা এখন এমন একজনের নজরে রয়েছ, যার চোখ থেকে তোমাদের আড়াল করা অসম্ভব। অথচ রক্ষা তোমাদের করতেই হবে।
চম্পা বলল, ইকলুভাই, আমি কালই দীপুকে নিয়ে পালাতে চাই কলকাতায়। তুমি কি একটু ব্যবস্থা করে দেবে? কালই চলে যাবে?
হ্যাঁ।
তোমার জিনিসগুলো নেবার তা হলে কী হবে?
ভাবছি লোভ করব না। যেখানকার জিনিস সেখানেই থাক। আমরা আপাতত পালিয়ে বাঁচি।
ইকলু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, না না। তা ঠিক নয়। জীবনে বেঁচে থাকতে গেলে কিছু কিছু জিনিসের খুবই প্রয়োজন আছে। তোমার জিনিস তুমি নিয়ে যেয়ো। ওর মূল্য অনেক। আমি তো বাবুজির সামান্য ভৃত্য ছিলাম একজন। উনি আমাকেও বঞ্চিত করেননি। আমাকে উনি যা দিয়ে গেছেন তাতে এই গ্রামটাকে এখন আমি কিনতে পারি। এখনও অনেক— অনেক ধন রত্ন আমার ঘরের ভেতর মেঝের নীচে পৌঁতা আছে। যা পেয়েছি তার দশভাগের এক ভাগেই আমি বড়লোক। বাকি ন’ভাগ এ জীবনে হয়তো খরচই করতে পারব না।
চম্পা বলল, আমি কিন্তু তোমার ওপর ভরসা রাখছি।
ইকলু বলল, বেশ। আজই আমি একটা খড়বোঝাই গোরুর গাড়ি ঠিক করে রাখব। তোমরা ওগুলো উদ্ধার করে নিয়ে এলেই ওই খড় চাপা দিয়ে আমি তোমাদের ঘাটশিলায় পৌঁছে দেব, কেমন?
এই চমৎকার প্রস্তাবে ওরা দু'জনেই আনন্দে নেচে উঠল। দীপংকর ঠিক করল ভেলুয়াকেও ওদের সঙ্গে নিয়ে যাবে। এখন পেটভরে খেয়েদেয়ে ইকলুর ঘরে তেড়ে একটা ঘুম দিলেই সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে দু’জনের। ওরা পায়ে পায়ে ঘরের দিকে এগোল।
ইকলুর বাড়িতে পেটভরে ভাত খেয়ে চম্পা ও দীপংকর যখন ওপরের ঘরে শুতে গেল তখন ভরতি দুপুর। ইকলুও ওদের সঙ্গে এল।
একটা চাটাই বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে নানা রকম গল্প করতে লাগল ওরা।
ইকলু বলল, আমাদের চম্পাদিদিভাইকে বাবুজি একেবারে মেয়ের মতন ভালবাসতেন। তা দীপংকরভাই, তুমি ওকে এখান থেকে নিয়ে গেলে ভালই করবে। বাবুজি ওর জন্যে যা রেখে গেছেন, তাতে তোমার মা-বাবাকে কষ্ট করে ওর বিয়ে দিতে হবে না। অবশ্য বাবুজি তো তোমাকেও অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। টাটানগরের বাড়িটা তুমি পেয়েছ। ব্যাঙ্কের প্রচুর টাকা। সবই তোমার। দীপংকর বলল, আচ্ছা ইকলুভাই, বাবুজি খুন হলেন কেন? কে বা কারা করল এ কাজ? তোমাকেই বা মারধর করল কারা।
ওই ব্যাটা কুন্দনলালের লোকেরা। শেঠজি হয়ে ঘুরে বেড়ালে কী হবে। ওই লালজি হচ্ছে পাক্কা শয়তান একটা। এই সোনার নদীর দেশে সোনার লোভে ব্যাটা রক্তের স্রোত বহাতে এসেছিল। ওই পাহাড়ে গুহার ভেতরে ওরা ঘাঁটি গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু বাবুজির জন্য তা পারেনি। ও এইখানকার পাহাড়-জঙ্গল থেকে সোনা খুঁজে বের করত। আর সেই সোনা বিদেশে পাচার করত। কিন্তু বাবুজি তা হতে দেননি। ও বাবুজিকে বখরা দেবে বলে হাতে হাত মেলাতে এসেছিল। কিন্তু বাবুজি ঘৃণা ভরে ওকে দূরে সরিয়ে দেয়। সেই ওর রাগ।
বাবুজি মারা যাবার পরও কি একাজ ও করছে?
জোর কদমে। এতেই তো ফুলে লাল হয়ে গেল। আমাকে কী কম মেরেছিল ওরা? মেরে হাড় গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। তবু আমি মুখ খুলিনি। ওরা আমায় অনেক-- অনেক টাকার লোভ দেখিয়েছিল। কিন্তু বাবুজির কসম, ওদের গ্রাস থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সেই সব ধনরত্নের হদিস আমি দিইনি। যখন কিছুতেই ওরা আমার মুখ থেকে কথা আদায় করতে পারল না, তখন প্রায় শেষ করে দিয়ে গেল আমাকে। সাত আট জায়গায় ছোরা মারল। আসলে সেদিন আমরা কেউই তৈরি ছিলাম না। সবচেয়ে বড় কথা ভেলুও কাছে ছিল না সেদিন।
দীপংকর বলল, তুমি ওদের মুখ চিনতে পারবে?
ইকলু বলল, মুখে ওদের কালো কাপড় ঢাকা ছিল। কিন্তু থাকলে কী হবে? ওদের প্রত্যেকের গলার স্বর আমার চেনা। তবে সুযোগ পেলে ওদের আমি বদলা নিতে ছাড়ব না।
চম্পা বলল, আমার বাবুজি! বাবুজিও ছিল নাকি দলে?
না দিদিভাই। তোমার বাবুজির একটাই দোষ ও লালজির টাকা খেয়ে কাজ করে। ইনফরমার! অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। অথচ নিজে কিছু করে না। তবে এককালে কিন্তু তোমার বাবুজির নামের ডাকে পাহাড়-পর্বত কাঁপত। তখনকার যত ট্রেনডাকাতি ও ট্রেনদুর্ঘটনা ঘটানোর নায়ক ছিল তোমার বাবুজি।
দীপংকর হঠাৎ বলল, আচ্ছা ইকলুভাই আমার জেঠু তো ডায়েরি লিখতেন। তোমার কাছে সে রকম লেখা টেখা কিছু নেই?
ইকলু লাফিয়ে উঠল, আছে বইকী! কত চাই? সব এই মাচার ওপর তোলা আছে। ঘরের কোণ থেকে ওই টুলটা নিয়ে এসে তার ওপর দাঁড়িয়ে পেড়ে নাও। বলেই বলল, আচ্ছা দাঁড়াও আমিই পেড়ে দিচ্ছি। বলে ইকলু নিজেই টুলে উঠে দশ-বারোখানা মলাট দেওয়া খাতা পেড়ে দিল।
দীপংকর সেগুলো সযতনে কুড়িয়ে নিতেই ইকলু বলল, ওগুলো তুমি ইচ্ছে করলে নিয়েও যেতে পারো। কেন না আমার কাছে থাকলে এগুলো উইয়ে কেটে নষ্ট করবে। আমি তো ওর মর্ম বুঝব না। আমি বাংলা বলতে পারি, বুঝতে পারি। কিন্তু লিখতে বা পড়তে পারি না।
দীপংকর বলল, সত্যি! তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব ইকলুভাই। ইকলু বলল, যাক। এতদিনে আমি নিশ্চিন্ত হলাম, যাদের জিনিস তাদের হাতেই তুলে দিতে পারলাম বলে।
দীপংকর ডায়েরির পাতাগুলো মেলে ধরে তার ওপর দু'চোখ স্থির করে যেন গ্রোগ্রাসে গিলতে লাগল লেখাগুলো। ওর একাগ্রতা দেখে ইকলু বলল, তুমি ততক্ষণ এগুলোয় একবার চোখ বুলিয়ে নাও। আমি বরং নীচের ঘরে গিয়ে শুই।
দীপংকর বলল, তাই যাও। তারপর চম্পার ঢুলু ঢুলু চোখ দেখে বলল, তুমিও পারো তো একটু ঘুমিয়ে নাও। কেমন! আমি একবার পড়ে দেখি এর ভেতর কোথায় কী আছে।
চম্পা ঘাড় নেড়ে পাশ ফিরে শুল।
আর দীপংকর গভীর মনোযোগে পড়তে লাগল ডায়েরির লেখাগুলো—
না। আমি কোনও ভুল করিনি। আজ এখানকার গভীর বন প্রদেশে গিরিগুহার আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে দেখি জনাচারেক লোক ছোট ছোট ঘোড়ার পিঠে মাল চাপিয়ে কী যেন বয়ে আনছে। তাই না দেখেই আমার সন্দেহ ও কৌতূহল বেড়ে গেল। দেখলাম ওরা একটা গুহার ভেতরে ঢুকল।
ইকলুকে এক জায়গায় পাহারায় রেখে ভেলুকে নিয়ে আমি চুপিসাড়ে ওদের অনুসরণ করলাম। দেখলাম ওরা গুহার একেবারে শেষপ্রান্তে গিয়ে, একপাশ থেকে একটি লোহার সরু মই টেনে নিয়ে এসে তাতে ভর করে বেশ একটু উচ্চস্থানে উঠে সেগুলো কোথায় যেন রেখে এল। তারপর নীচে নেমে দেওয়ালের গায়ে লাগানো একটা হুকে মইটা আটকে রেখে চলে গেল।
ওরা চলে যাবার অনেক পরে আমি গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম্। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। কাজেই না-চলে আসা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না।
সেইরাত্রেই আমরা দু'জনে সশস্ত্র হয়ে আবার এলাম সেই গুহাতে। জানতেই হবে এর রহস্য। দেখতেই হবে ওর ভেতরে কী আছে। দেখলাম, শুধু গিনি আর অলংকার। এ তো সবই আমার পরিচিত। মনে পড়ল সেই ভিক্টোরিয়া জাহাজের কথা। মিলারসাহেব ও তার মেম হেনরিয়েটার কথা। মনে পড়ল কয়েক মাস আগে গোলবাজারে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া কুন্দনলালের কথা। এসব তা হলে ওই শয়তানটারই কাজ। কিন্তু এগুলো ও নিজের জিম্মায় না রেখে এখানেই বা লুকিয়ে রেখেছে কেন? পুলিশের ভয়ে? হয়তো তাই। যাই হোক, শুধু গিনি আর অলংকারই যে ছিল ওর ভেতরে তা নয়। ড্যালা ড্যালা সোনাও ছিল। যা এখানকার পাহাড়-পর্বতের নিজস্ব সম্পদ। আমরা আসবার সময় দুটি ঘোড়া সঙ্গে এনেছিলাম। সেগুলো তাদের পিঠে চাপিয়ে চলে এলাম আমাদের জায়গায়। ধারাগিরি ঝরনার পাশে একটা জায়গায় গর্ত করে সেই সোনার ড্যালাগুলো পুঁতে রাখলাম। গিনিগুলো লুকিয়ে রাখলাম ইকলুর বাড়িতে। কিছু ওকে দেব এবং বাদবাকি পাঠিয়ে দেব ভাইয়ের কাছে। কাজে লাগবে ওর। তবু এই দুর্বৃত্তদের এইসব আমি কিছুতেই ভোগ করতে দেব না।
...জিনিসগুলো হাতছাড়া হওয়ায় কুন্দনলাল খ্যাপা কুকুরের মতো হয়ে উঠল। একদিন সরাসরি আমার সামনে এসে দাঁড়াল সে। তখন সন্ধে হয় হয়। ওর সঙ্গে দু'জন নৃশংস চেহারার লোক। কুন্দনলাল বলল, আমাকে চিনতে পারছ মানিকবাবু?
আমি তখন গভীর মনোযোগে টলস্টয়ের একটা বই পড়ছিলাম। মুখ না তুলেই বললাম, কেমন আছ কুন্দনলাল?
এটা কিন্তু আমার জবাব হল না।
সে কী? তোমার নাম ধরে কুশল প্রশ্ন করলাম। তারপরেও কী বলতে হবে, হ্যা চিনতে পারছি?
তুমি আমার দীর্ঘ দিনের শত্রু মানিকবাবু। ভিক্টোরিয়া জাহাজ থেকে তুমি আমাকে জলে ফেলে দিয়েছিলে মনে আছে?
আমি ফেলে দিইনি। তুমি নিজেই অসাবধানে পড়ে গিয়েছিলে।
মিলারসাহেবের সমস্ত মালপত্তর হাপিস করে আজ তুমি প্রচুর টাকার মালিক হয়েছ।
হয়েছি। তবে মিলারসাহেবের জীবিত অবস্থায় তাঁর সঙ্গে আমি কোনওরকম তঞ্চকতা করিনি কুন্দনলাল। যা তুমি দিনের পর দিন করেছিলে। কিন্তু তাতেও তুমি সন্তুষ্ট হওনি। মিলারসাহেব এবং হেনরিয়েটাকে খুন করে সব নিয়ে তুমি পালাতে চেয়েছিলে। তাই বাধা দিয়েছিলাম।
তুমি যদি এতই মহৎ তো ওই জিনিস তুমি নিয়েছিলে কেন? বিবেকে বাধল না?
না। তার কারণ মিলারসাহেবের উত্তরাধিকারী আর কেউ ছিল না। অতএব তাঁর সবচেয়ে কাছের লোক হিসেবে আমি এগুলো আমার কাছে রেখেছি। এতে দোষ কোথায়?
কুন্দনলাল জ্বলে উঠল এবার। বলল, দোষ কোথায়? ওই জাহাজে কি একা তুমি ছিলে? আর কেউ ছিল না?
নিশ্চয়ই ছিল। ছিল বলেই আমি তোমার রাখা মালগুলোই শুধু হাপিস করে কেটে পড়েছিলাম। জাহাজটাকে তো নিয়ে পালাইনি। ওই জাহাজে অন্যান্য যারা ছিল তাদের জন্য তো গোটা জাহাজটাই রেখে এসেছি।
বটে! তা যাক। কিন্তু ওই গুহার ভেতর থেকে যে মাল তুমি সরিয়েছ তা যদি আমাকে ফেরত না-দাও তা হলে...।
তোমার স্মাগলিং বিজনেস কেমন চলছে কুন্দনলাল?
তার আগে বলো এগুলো তুমি ফেরত দেবে কি না?
ও মালগুলো আমিই নিয়েছি এমন ধারণা হল কেন তোমার? ওগুলো তো অন্য কেউও নিতে পারে?
ও। তুমি তা হলে স্বীকার করবে না। আমার দু'পাশে যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের দেখছ তো? ওরা শুধু হাতে আসেনি।
আমি হেসে বললাম, তা হলে তুমিও পিছনে ফিরে চেয়ে দেখতে পারো আমার লোকেরাও কিন্তু শুধু হাতে দাঁড়িয়ে নেই।
আমার কথা শুনে পিছন ফিরে তাকিয়েই অবাক হয়ে গেল কুন্দনলাল। দেখল তির-কাঁড় নিয়ে সারি সারি বেশ কয়েকজন আদিবাসী ওদের ফেরার পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। আর আমার একান্ত অনুগত ভৃত্য পিকলুও রিভলভার নিয়ে তৈরি। আদরের কুকুর ভেলুও আমাকে কেউ আক্রমণ করলেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় আছে।
কুন্দনলাল বলল, বেশ আমি চলে যাচ্ছি। তবে এও জেনে রেখো আমার পথের কাঁটা আমি ওপড়াবই। যদি ভাল চাও তা হলে সাত দিনের মধ্যে এই এলাকা ছেড়ে তুমি চলে যাবে।
আমারও ওই একই দাবি। আমি চাই না তুমি এই শান্তির রাজত্বে বিঘ্ন ঘটিয়ে বেড়াও। তোমার স্মাগলিং বিজনেস নিয়ে যেমন তুমি মেতে আছ তেমনি থাকো। কিন্তু একান্ত এখানকার সোনার সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে দিনের পর দিন তুমি দেশের সর্বনাশ ঘটাবে এ আমি হতে দেব না।
মানিকবাবু! জেনেশুনে গোখরা সাপের গর্তে হাত দিয়ো না। তুমি তো জান আমি অত্যন্ত বিষখোবরা লোক।
তুমি নিশ্চয়ই ভুলে গেছ কুন্দনলাল, যে আমি বিষাক্ত সাপের বিষদাঁত ওপড়াতে ভালবাসি।
ও। তুমি তা হলে এই পাহাড় ও অরণ্যের অধিকার আমাকে দেবে না?
না। তার কারণ তুমি দিনের পর দিন সরকারি কনট্রাকটার এই মিথ্যে পরিচয় দিয়ে এখানকার সরল আদিবাসীদের ঠকাচ্ছ। আমি তোমার ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জেনেছি সামান্য পয়সা দিয়ে এখানকার মূল্যবান পাথরগুলো তুমি কাটিয়ে নিয়ে, অন্যত্র গিয়ে ওর ভেতর থেকে আসল মালটি বার করে নিচ্ছ। পুলিশ তোমাকে চোখেচোখে রাখছে। কিন্তু তুমি বড় চতুর, তাই তোমাকে হাতেনাতে ধরতে পারছে না। আমি যদি এখানকার আদিবাসীদের একথা বলে দিই, তা হলে কি পারবে আর ওদের দিয়ে কাজ করাতে? তার চেয়ে যা করছ তাই করো, আর এ পথে এসো না। যাও।
কুন্দনলাল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, বেশ। ঠিক আছে। মনে থাকবে তোমার কথা, এই বলে ও চলে গেল।
এরপর একদিন পুলিশ এসে গভীর রাতে হামলা করল আমার ওপর। কিন্তু করলে কী হবে? নিজের কাছে তো আমি কিছুই রাখতাম না। কাজেই কুন্দনলালের চুকলিতে পুলিশ বৃথাই এসে আমাকে বিরক্ত করে হায়রান হয়ে ফিরে গেল।
আর একদিনের ডায়েরিতে লেখা আছে
কুন্দনলালের ব্যবসা বন্ধ করেছি। কিন্তু কী করে কে জানে এই পাহাড়ের শিরায় শিরায় যে সোনার অস্তিত্ব আছে তা বুঝি টের পেয়েছে আদিবাসীরা। ওরা .আমাকে দেবতার মতো মান্য করে। কিন্তু যে কারণেই হোক ওই পাহাড়ে বিশেষ করে যে সব অংশে সোনা আছে সেখানে আমার যাতায়াত ওরা পছন্দ করে না। এদের মধ্যেও কি কুন্দনলালের কোনও স্পাই আছে? হয়তো তারা আমার নামে মিথ্যে করে লাগিয়েছে ওদের, হয়তো বুঝিয়েছে আমার এই অরণ্যপ্রেম, প্রেম নয়। আসলে আমিও স্বর্ণসন্ধানী। কথাটা তো একদিক থেকে ঠিক। সোনার সন্ধান তো আমিও করছি। সেই সঙ্গে বাধা দিচ্ছি সোনা লুঠেরাদের। পুলিশকে জানাইনি তার কারণ তাতে এখানকার শান্তি বিঘ্নিত হবে। কুন্দনলাল পিছু হটলেও আমি মাঝেমধ্যে বুঝতে পারি ও আমাকে চোখেচোখে রাখছে। এবং চেষ্টা করছে ও আমার দ্বারা অপহৃত সেই লুঠের মালকে উদ্ধার করবার। আজকাল আমি তাঁবুতে থাকি না। কুসুমডিতে ভিলসর্দারের বাড়ির নীচে আন্ডার গ্রাউন্ডে থাকি। কেন না আমি বেশ বুঝতে পারছি ও আমাকে হত্যা করবার ষড়যন্ত্র করছে এবং আমাকে মারবার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমার জেদ চেপে গেছে এই যে ও যাই করুক না কেন, আমার জীবিত অবস্থায় ওকে আমি এখানকার সম্পদে হাত দিতে দেব না।
...হ্যাঁ ! আমার দিন শেষ হয়ে আসছে। চম্পা মেয়েটি বড় ভাল। কেন জানি না ওকে দেখলে আমার খুব মায়া হয়। তাই হেনরিয়েটার অপহৃত অলংকারগুলি এবং কিছু গিনি ও মোহর চম্পার জন্য লুকিয়ে রাখলাম এই পাহাড়েরই এক সংকীর্ণ গুহায়। মেয়েটাকেও দেখিয়ে রাখলাম। এরপরে ওর কপাল।
..কয়েকদিন ধরে ভাবছিলাম আর বনবাস নয়। এবার ঘরে ফিরি। কিন্তু পারলাম না। হঠাৎই একদিন ওইসব পাহাড়ে এবং গিরিগুহায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে এক গোপন রত্নভাণ্ডারের সন্ধান পেলাম। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারলাম না আমি। এও কি সম্ভব। ভাগ্যে কুন্দনলালরা সন্ধান পায়নি। তা হলে সবই উধাও হয়ে যেত। যাক। আমার এই ডায়েরিতেই সেই গুপ্তধনের পথের সন্ধান দিয়ে রাখি। আমার দীপু বড় হয়ে যদি কখনও এখানে আসে বা ওর হাতে এই ডায়েরি পড়ে, তা হলে ও নিশ্চয়ই ওগুলো উদ্ধার করতে পারবে। আমি পারতাম, কিন্তু আমি তো নজরবন্দি। ও মাল বার করতে গেলেই জানাজানি হয়ে যাবে। তার চেয়ে যেখানকার জিনিস সেখানেই থাক। বরং এই নক্সাটা ভাইয়ের কাছে দিয়ে রাখব ভবিষ্যতে দীপংকরের সুবিধের জন্যে।
এই পর্যন্ত পড়ে আর পড়ল না দীপংকর। সে বেশ গভীর মনোযোগে সেই নক্সাটার খুঁটিনাটি লক্ষ করতে লাগল। তারপর ঘরের কুলঙ্গি থেকে একটা পেন নিয়ে এসে আলাদা একটা কাগজে সেটা এঁকে নিল।
এই নক্সাটার কথা কি ইকলু জানে? বোধহয় জানে না। এসব কথা ওকে না বলাই ভাল।
চম্পা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক। ওকেও বলব না। বরং যথাস্থানে গিয়ে ওকে চমকে দেব।
এমন সময় ইকলু চা নিয়ে ওপরে এল চম্পা ও দীপংকরের জন্য। চম্পা তো ঘুমোচ্ছে। অতএব একটা দীপংকরকে দিয়ে বাকিটা নিজে খেল।
দীপংকর বলল, আচ্ছা ইকলুভাই, কাল যদি খুব ভোর ভোর আমরা ওখানে যাই তা হলে ওখানকার আদিবাসীরা আমাদের সন্দেহ করবে না তো?
না। তা কেন করবে? তোমরা ছেলেমানুষ। তা ছাড়া চম্পাদিদিভাইকে ওরা সবাই চেনে। আর লোক যে ওখানে সব সময়েই থাকে তা তো নয়। পাহাড় কাটার কাজ এখন বন্ধ। তার কারণ সোনার খনি তো নেই এখানে। মাঝেমাঝে ফাটলের গায়ে যা দেখা যেত তার সবই তো কুন্দনলাল শেষ করে দিয়েছে। তবে কী জানো, এই পাহাড়ের অনেক গুহার কোনও একটির ভেতরে নাকি শুনেছি একসময় রাক্ষসেরা বাস করত। তারা নাকি দেশ-বিদেশের রাজা-মহারাজাকে বধ করে তাদের মূল্যবান সম্পদগুলো লুকিয়ে রাখত। অবশ্য সে যে কোন যুগের কথা তা কেউ জানে না। সত্য কী তাও জানে না কেউ। তবু সেই অন্ধ বিশ্বাসের ওপর ভর করে এখানকার আদিবাসীরা এসব এলাকায় কাউকে ঢুকতে দেখলেই রেগে যায়। কুন্দনলালের ধারণা, বাবুজি এই গুপ্তধনের সন্ধান জানত বলেই এখানকার মায়া কাটাতে পারত না। তাই সে শেষদিন পর্যন্ত বাবুজির পিছনে ছায়ার মতো লেগে ছিল। তারপর মওকা বুঝে একদিন আচমকা ছোবলটা মারল সে। এই গুহাগুলোর দিকে কুন্দনলালের নজর আছে। ওরাই যা চোরের মতো সন্ধান রাখে ওখানে। ওখানকার আদিবাসীরাও কুন্দনলালের ওপর সন্তুষ্ট নয়। কারণ তারা বেশ বুঝেছে যে পাথর কাটানোর নাম করে কুন্দনলাল দিনের পর দিন তাদের ঠকিয়েছে। এখন তারা হুঁশিয়ার। তাই বাইরের কাউকে এই এলাকায় ওরা আর যেতে দেয় না। তা ছাড়া ওরাও জানে এই পাহাড়ের কোনও এক গুহায় রাক্ষসদের রাখা গুপ্তধন আছে। কিন্তু সেটা যে কোথায় বা সত্যিই আছে কি না তা কেউ জানে না। এই আদিবাসীরাও যেমন খ্যাপার মতো খুঁজে বেড়ায় এই রত্নভাণ্ডারকে, তেমনি কুন্দনলালও গোপন অভিযান চালায় এই রত্নভাণ্ডার আবিষ্কারের।
দীপংকর তো জেঠুর ডায়েরি পড়ে সব কিছুই জেনেছে। তবু ও ইকলুকে পরীক্ষা করবার জন্য একবার জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা ইকলুভাই তোমার কী মনে হয়? ওই রকম রত্নভাণ্ডার সত্যিই কোথাও আছে? না থাকতে পারে?
তা বলা মুশকিল। কেন না রাক্ষস দৈত্য এসব আমার মনে হয় কল্পনা।
আমি কিন্তু তা মনে করি না ইকলুভাই। প্রাগৈতিহাসিক যুগের জন্তুজানোয়ার, বর্তমানে যাদের কোনওরকম অস্তিত্ব নেই তারাও যেমন সত্য, তেমনি এই সব রাক্ষস-দৈত্যরাও মিথ্যা নয়। আসলে এরা ছিল নররূপী বিশাল দেহ, বীভৎস চেহারা এবং নরখাদক ও বিকৃত রুচি। মানুষের সঙ্গে তফাত তো শুধু এইটুকুই। হতে পারে। তা ছাড়া আমরা তো ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি এখানকার সোনার সনদ। ব্রিটিশ আমলেও ওই সব পাহাড় কেটে সোনার আকরিক বের করে নেওয়ার অনেক নজির রয়েছে দেখতে পাবে। সোনার সন্ধানে এসে মানুষই পাহাড় কাটতে কাটতে কত যে গুহার সৃষ্টি করে রেখেছে তার আর ইয়ত্তা নেই। এক একটা বড় বড় খাদ দেখলে মাথা ঘুরে যাবে। এইসব সোনা সংগ্রহ একদিন দু'দিন ধরে হয়নি। বহু বছর ধরে হয়েছে। আমার মনে আছে একবার ওই পাহাড়ের ফাটলের গায়ে কিছু না-হলেও আধমন ওজনের একটা সোনার চাঁই পেয়েছিলাম আমরা। ভেবেছিলাম কপাল ফিরে গেল। কিন্তু বাবুজি, তোমার জেঠু বললেন, না। যা আমরা পেয়েছি তা যথেষ্ট। আর সোনাতে কাজ নেই। বলে সেই সোনার চাই এমনভাবে পাহাড়ের একটি খাঁজের ভেতর ফেলে দিলেন যে, ওই পাহাড়টাকে গোটাটা কেটে না-ফেললে ওই সোনাকে উদ্ধার করা কারও পক্ষে সম্ভব হবে না। বাবুজির সোনা অভিযানের নেশাও যেমন প্রবল ছিল, তেমনি সোনার সনদ প্রয়োজনের বাইরে তিনি ব্যবহারও করতেন না। শুধু কুন্দনলালের লুঠের মালই যা আমাদের কাছে আছে তাই আমরা সারাজীবনে খরচ করতে পারব না। এখনও ধারাগিরি ঝরনাধারার পাশে তাল তাল সোনা বিশ ফুট মাটির নীচে পোঁতা আছে। তোমরা যদি কাল ভোরে ওই পাহাড়ে যাও, তা হলে দেখবে চম্পাদিদিভাইয়ের জন্যেই তোমার জেঠু যে সোনার অলংকার বা সোনা রেখে গেছেন তা আজকের দিনে কারও বাড়িতে নেই। তবু ওগুলো তোমরা খুব সাবধানে আনবে। এবং দিনমানে নয়, সঙ্কের মুখে। সারাদিন সব কিছু ঠিকঠাক করে রাখবে, নিয়ে আসবে সুবিধেমতো। খুব সাবধানে। কুন্দনলালের বেশি নজর এখন গুহার দিকে! কারণ ওরা জানে চম্পাদিদিভাই এবং তুমি গোপন কিছুর সন্ধান নিশ্চয়ই জানবে তাই অলক্ষ্যে থেকে ওরা তোমাদের পিছু নেবেই। অতএব সাবধান।
যদি আমরা রাতের অন্ধকারে যাই?
সেটা আরও বিপজ্জনক। এক হিংস্র জন্তুজানোয়ারের ভয়। আর এক ভয় আদিবাসীদের। দিনের বেলা পাহাড় দেখার ছলে গেলে ওরা অবিশ্বাস করবে না। কিন্তু রাতের অন্ধকারে ওদের চোখে পড়লে রক্ষে নেই।
আচ্ছা ইকলুভাই, তুমি কী পারো না এই অভিযানে আমাদের সঙ্গে থাকতে? না। আমি তো আগেই বলেছি ও জায়গা আমার পক্ষে নিরাপদ নয়। তার চেয়েও সাংঘাতিক যেটা তোমাদের সঙ্গে আমাকে দেখলে সবাই বুঝে যাবে আমরা কোনও কিছুর সন্ধানে চলেছি। তখন হবে কী, তোমাদেরও যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। আমিও বিপদে পড়ব। তাই বলি কী, তোমরা দু'জনেই যাও। বরং ফিরে এসো সন্ধেবেলা। আমি কাছাকাছিই থাকব।
দীপংকর বলল, বেশ তাই হবে। কাল খুব ভোরেই আমরা রওনা দেব।
এমন সময় হঠাৎ একটা ঠান্ডাস্রোত ওদের গায়ের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। দীপংকর বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখল কী প্রচণ্ড মেঘ করেছে আকাশে।
সেই মেঘ ছড়িয়ে গেল আকাশময়। তারপর শুরু হল ঝড়জলের উন্মত্ত তাণ্ডব। সে কী ভয়ংকর দুর্যোগ। গাছপালা ভেঙে পড়ছে যেন। পাহাড় ধসে যাচ্ছে। কী বিচ্ছিরি ব্যাপার।
জানলা-দরজা খোলবার উপায় নেই। ঝোড়ো বাতাস উন্মত্ত উল্লাসে গর্জন করতে করতে ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতর।
ইকলু দুটো লোমওয়ালা ভালুকের ছাল দিয়ে গেল ওদের। বলল, রাতবিরেতে একা কেউ বাইরে বেরিয়ো না, তবুও কারও যদি একান্তই বেরোবার দরকার হয়, তা হলে এগুলো পরে নিয়ে বেরিয়ো। ছাতার কাজ করবে।
ওরা ভালুকের ছালগুলো দেওয়ালের পেরেকে ঝুলিয়ে রেখে চুপচাপ শুয়ে রইল খাটিয়ায়। দু'জনের জন্য দুটো খাটিয়াও দিয়ে গেছে ইকলু। একটা টাও দিয়েছে। ঘরের কোণে একটা বল্লমও রয়েছে। অর্থাৎ আচমকা কোনও বিপদআপদ ঘটলে ওটার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
ভেলুয়া শুয়ে আছে চম্পার খাটিয়ার নীচে।
দীপংকরের মনে ভয়। এই রকম দুর্যোগ চলতে থাকলে কাল কি যাওয়া সম্ভব হবে? অথচ যেভাবেই হোক চম্পার ওই অলংকার এবং গুপ্তধনের খোঁজ নিতেই হবে ওদের। কিন্তু দুর্যোগ যেভাবে চলছে তাতে তো কমবার কোনও আশাই নেই। এখন সবে সন্ধেরাত। দেখা যাক সারারাতে কী হয়।
দুর্যোগ বেড়েই চলল। রাতও হল। সামান্য কিছু গুড়মুড়ি আর কলা খেয়ে শুয়ে পড়ল ওরা। এর বেশি এই দুর্যোগের রাতে আর কী-ই বা আশা করা যায়? অনেকক্ষণ ধরে দু’জনে জল্পনাকল্পনা করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়ল একসময়। রাত তখন কত তা কে জানে?
চম্পার করস্পর্শে চোখমেলে তাকাল দীপংকর। ছোট চিমনি লণ্ঠনটা তখনও টিম টিম করে জ্বলছে। চম্পা সেটা অল্প একটু উসকে দিয়ে চাপা গলায় ডাকল, দীপ! এই দীপ! দীপংকর !
চোখমেলে দীপংকর দেখল চম্পা ওর বুকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ওর মুখের দিকে ঝুঁকে আছে। ওর ঘন নিশ্বাস পড়ছে গায়ের ওপর। দীপংকর বলল, কী!
ওঠো।
কেন?
ওঠো না একবার।
দুর্যোগ কমেছে?
না আরও বেড়েছে।
তবে? বাইরে যাবে?
হ্যাঁ।
দীপংকর উঠল। তারপর দু'জনে ঘরের দেওয়ালে পেরেকে ঝোলানো সেই ভালুকের মোটা লোমওয়ালা ছালদুটো পেড়ে নিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই, দমকা বাতাসে ঘরের সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেল। লণ্ঠনটাও নিভে গেল ধূপ করে। সে কী কাণ্ড। ওরা জালঘেরা বারান্দা থেকে নীচের দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে গেল। আশপাশের বড় বড় গাছগুলো ডালপালা ভেঙে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে উঠোনের ওপর। উঠোনের মাঝখানে কিছু না হলেও এক হাঁটু জল। একটা প্রকাণ্ড ময়াল সাপ রান্নাঘরের চালার ওপর থেকে পাশের একটি গাছের ডালে উঠতে যাচ্ছে। উঠানের শেষে পাঁচিলের গায়ে লাগানো দরজাটা পাঁচিল সমেত ভেঙে পড়ে আছে। এ যেন প্ৰলয়নাচন নাচছে প্রকৃতি।
ওরা টর্চের আলো ফেলে নীচে নামার সময় ইকলুর ঘরের দরজাটা একটু ঠেলে দেখল। ও এখন বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। এমন সময় হঠাৎই দীপংকরের হাত ধরে টান দিল চম্পা। বলল, দীপ! ওই দেখো।
ওরা সবিস্ময়ে দেখল বাইরে ধসে যাওয়া পাঁচিল ও ভেঙে পড়া দরজার কাছে কালো বর্ষাতিপরা চারজন আগন্তুক এসে দাঁড়িয়েছে। ওদের প্রত্যেকেরই হাতে একটি করে জোরালো টর্চ ও একটি করে রিভলবার। ওরা সেই টর্চের আলোয় পথ দেখে উঠোন পার হয়ে ঘরের দিকে এগোচ্ছে।
কিন্তু ঘরের দিকে এগোলে কী হবে? দালানে ঢোকার মুখে যে দরজা সেটাও তো বন্ধ। ওরা এসে একবার একটু ঠেলে দেখল। তারপর ইশারায় কী যেন কথা হল ওদের নিজেদের মধ্যে। একজন পকেট থেকে একটি আংটা লাগানো দড়ি নিয়ে লটকে দিল বারান্দার কাঠের রেলিংয়ে। তারপর চুপিসাড়ে দড়ি বেয়ে একটু একটু করে উঠতে লাগল ওপরে।
চম্পা চাপা গলায় বলল, নিশ্চয়ই লালজির লোক এরা। আমাদের খোঁজে এসেছে।
আমারও তাই মনে হয়। দুর্যোগের রাতে বাধা পাবার ভয় নেই বুঝেই এসেছে ওরা।
আমাদের এখুনি ইকলুভাইকে ডাকা উচিত।
না। ডাকাডাকি করবার আর সময় নেই। ওরা সতর্ক হয়ে যাবে। পালাবে ওরা। তার চেয়ে চলো আমরাই ওদের উচিত শিক্ষা দিই। কী করে কী করবে?
তুমি চুপিসাড়ে চট করে ঘরে ঢুকে বল্লমটা বার করে নিয়ে এসো। আমি ততক্ষণ এই ডান্ডাটা নিয়ে এগোচ্ছি। বলেই দরজার কাছে ঠেস দিয়ে রাখা দু’-চারটে লোহার রডের ভেতর থেকে একটা বেছে নিয়ে গুঁড়ি মেরে উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে।
আগন্তুক ততক্ষণে দড়ি বেয়ে বারান্দার ওপরের রেলিংয়ে পা রেখেছে। কিন্তু বাধা দিল লোহার জাল। মানুষের অসাধ্য তো নেই। তাই সেই লোহার জালকেও কেটে ফেলল একসময়। এবার অল্প একটু একটু করে মাথাটা গলিয়ে ভেতরে ঢুকতে যেতেই দীপংকর সেই লোহার রডের বাড়ি সজোরে এক ঘা মেরে দিল লোকটার মাথায়। লোকটা চেঁচাতেও পারল না। করে একটা শব্দ করেই স্থির হয়ে গেল। একবার শুধু ‘ওঁক’
নীচে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা কিছুই বুঝতে না-পেরে বার বার টর্চের আলো ফেলতে লাগল ওপর দিকে। দীপংকর তখন বুকে হেঁটে লোকটার কাছে গিয়ে ওর চুলের মুঠি ধরে একটু ঠেলা দিতেই ধুপ করে নীচে পড়ে গেল লোকটা।
ব্যাপারটা কী এরা ঠিক বুঝতে পারল না বোধহয়। কেন না ঝড় এবং জল এমনভাবে একটানা হচ্ছে যে কারও কিছু বোঝবার উপায় নেই। ওরা ভাবল নীচে পড়ে গিয়েই বুঝি মাথাটা ফেটে গেল লোকটার।
তাই আর একজন ওঠার চেষ্টা করল।
এর জন্যে বল্লম রেডি ছিল। ওপরে উঠে জালের ফাঁক দিয়ে মাথাটা গলাতেই, দীপংকর ওর চোয়ালের নীচ থেকে মুখের ওপর পর্যন্ত এফোঁড় ওফোড় করে দিল বল্লমটা। লোকটা অসহায় ভাবে ছটফট করতে লাগল দেখে নীচের লোক দু'জন এবার একটু ঘাবড়ে গেল। তারপর বেকায়দা বুঝেই এদের ফেলে রেখে পালাল ওরা।
দীপংকর এ লোকটাকেও বল্লমমুক্ত করে ফেলে দিল নীচে। উঠোনে একহাঁটু জল। লোকটা তাতেই পড়ে দু’-একবার শূন্যে পা ছুড়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরল। আগের লোকটা ততক্ষণে জলের ওপর কাছিমের মতো আধডোবা হয়ে ভাসছে। দীপংকর বলল, এইবার ইকলুভাইকে ডাকা যাক।
চম্পা বলল, উহু। ওকে আরও ঘুমোতে দাও। এমন চমৎকার সুযোগ আর আসবে না দীপ।
কীসের?
পালাবার।
পালাবে? কোন দুঃখে! কাল সকালে যাবে না ওই পাহাড়ে?
না। আজই, এখনই যাব।
চম্পা তুমি কি অপ্রকৃতিস্থ?
না দীপ। এই ভয়ংকর দুর্যোগে কেউ কোথাও নেই। হিংস্ৰ শ্বাপদরা পর্যন্ত তাদের ডেরা ছেড়ে বেরোয়নি। আদিবাসীগুলোও বাধা দিতে আসবে না। এই সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে? চলো এই মুহূর্তে আমরা বেরিয়ে পড়ি। আর কী, সর্বাঙ্গ তো ভিজে গেছে। দু'-দুটো খুনও হয়ে গেল। তবে কেন দেরি? ওই দেখো দূরের পাহাড়গুলো আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। চলো। বেরিয়ে পড়ি।
দীপংকর কিছুক্ষণ বিস্ময়ভরা চোখে চম্পার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। খুনের উত্তেজনায় এবং অভিযানের উন্মাদনায় শিরদাঁড়া টান করে বলল, চলো।
ঝড়ের দাপট একটু কম হয়েছে তখন। কিন্তু বৃষ্টির বেগ আরও প্রবল।
চারদিকে শুধু জল জল আর জল। এই জল হয়তো বেশিক্ষণ থাকবে না। এখন পাহাড়ধোয়া জলের ঢলে ঢেউ খেলে যায় চারদিকে।
চম্পা এই দুর্যোগে ভেলুয়াকেও টেনে আনল। জেঠুর আদরের কুকুর ভেলু। চম্পার ভেলুয়া। শুরু হল অভিযান।
ওরা নীচের দরজাটা খুলল না। ওপরের বারান্দা থেকেই সেই ছেঁড়া জালের ফাঁক দিয়ে দড়ি বেয়ে নামল। আগে দীপংকর। তারপর ভেলুয়াকে নিয়ে চম্পা। ওদের একজনের হাতে টর্চ! একজনের হাতে বল্লম।
সেই হাঁটুজল পার হয়ে বাইরে এল ওরা। যেখানটা একটু ঢালু সেখান দিয়ে কী অসম্ভব বেগে জলের স্রোত যে ছুটছে তা না-দেখলে কল্পনা করা যাবে না!
ওরা তবু দ্রুত পা চালিয়ে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে ধারাগিরি বাঁদিকে রেখে জঙ্গলের পথ ধরল। ওদের হাতে আংটাওয়ালা সেই দড়িটাও আছে। পাহাড়ে ওঠার সময় হয়তো এটা খুবই কাজে লাগবে ওদের। ভাগ্যে এটা এনেছিল লোকগুলো।
ক্রমশ ওরা উঁচুতে উঠতে লাগল। ওদের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে ভেলুয়াও জলের বাধা অতিক্রম করে উপরে উঠল।
কিন্তু উঠলে কী হবে? জলের হাত থেকে তো পরিত্রাণ নেই। পাহাড়ে ওঠার মুখে জল যেন আরও বেশি। ওপরের জল হুড় হুড় করে ওদের গায়ে এসে পড়তে লাগল। এখানে ওদের এমনই অবস্থা যে কী করবে ভালুকের ছাল?
এইভাবে বেশ খানিকটা যাবার পর পাহাড় আরও খাড়াই হতে লাগল। সেই খাড়াই পাহাড়ে কাজে লাগল ওই দড়ির আংটা। আংটাটা দূরে নিক্ষেপ করে যে কোনও ঝোপেঝাড়ে আটকে দড়ি বেয়ে ওরা উঠতে লাগল ওপরে। কেন না জলস্রোত এখন এত বেশি যে পথঘাট কিছুই চেনা যাচ্ছে না। দেখাও যাচ্ছে না।
এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ ওপরে ওঠার পর হাঁপিয়ে পড়ল দু'জনেই। ভেলুয়াও হাঁপাচ্ছে। এমনি ওঠা আর জলের বেগ ঠেলে ওঠায় তফাত আছে বইকী। দীপংকর বলল, আমরা ঠিক পথেই চলেছি তো?
হ্যাঁ। কিন্তু আর যে পারি না। শরীর যেন অবশ হয়ে আসছে।
আর কত দূর !
ওই তো। ওই পাহাড়টায়।
তা হলে এসো,
তুমি আমার হাত ধরো।
দীপংকর চম্পার কোমল হাতখানি শক্ত করে ধরল। কী দারুণ ঠান্ডা। বরফের মতো শীতল।
চম্পা বলল, পাদুটো জড়িয়ে পড়ছে যেন।
ওরা তখন অনেকটা ওপর-ধাপে উঠে গেছে। বৃষ্টিতে সপ সপ করছে সর্বাঙ্গ। ভেলুয়া থর থর করে কাঁপছে।
একটু করে চলতে লাগল। দীপংকর বলল, তোমার যদি খুব বেশি কষ্ট হয়, তুমি তা হলে আমার পিঠে উঠতে পারো।
চম্পা দীপংকরের কাঁধে ভর দিয়ে একটু
চম্পা হেসে বলল, ভারী বাহাদুর ছেলে তুমি। এই পাহাড়ি রাস্তায় আমাকে পিঠে নিয়ে কখনও উঠতে পারো?
এসোই না, দেখি পারি কি না।
দীপংকরের এখন দারুণ উৎসাহ। চম্পাকে পিঠে নিয়েই বল্লমে ভর করে, সে একটু একটু করে ওপরে উঠতে লাগল। যতটা সহজ ভেবেছিল দীপংকর ততটা নয়। খানিক ওঠার পরই মুখ লাল হয়ে উঠল ওর। অবশেষে একসময় ওপরে উঠে এল।
চম্পা বলল, এবার আমায় নামিয়ে দাও। যেতে পারব।
ওরা পা টিপে টিপে পাহাড়ের এক প্রান্তে এসে হঠাৎ এক জায়গায় জলের তোড়ের সঙ্গে একটি বড় সাপ দেখে থমকে দাঁড়াল। কী সাপ এটা। ময়াল? হয়তো তাই। কী প্রকাণ্ড তার চেহারা। আর কী দারুণ লম্বা।
ভালুকের ছাল পরে থাকা সত্ত্বেও ওরা প্রবল বর্ষণে ভিজে কাকের মতো হয়ে গেছে।
দীপংকর বলল, ভিজেই যখন গেলাম তখন আর এটাকে বয়ে লাভ কী?
তা হোক। তবু তো কিছুটা বাঁচছে। পাহাড়ি ঢলে ভিজে গেলেও বৃষ্টির জল তো ততটা লাগছে না।
ওরা কথা বলতে বলতে একটা বাঁকের মাথায় এসে থেমে পড়ল।
চম্পা বলল, ওই যে দেখছ গ্রামখানা, ওটাই এখানকার আদিবাসীদের গ্রাম। আর এই দেখো পাহাড়ের চেহারা। সোনার লোভে পাহাড়কে কেটে কেটে কেমন শ্রীহীন করেছে। ওপাশের ওইসব গর্তগুলো দেখো। ওগুলো কিন্তু গুহা নয়। সবই পাথরকাটার ফল।
এখন ওখানে সোনা নেই?
আছে। যেসব পাথরে আছে, তাই থেকে সোনা বার করা খুব ব্যয়সাপেক্ষ।
ও। তা আমাদের যেখানে প্রয়োজন সেই গুহাটা কোথায়?
চলো, সেখানেই আগে যাই। বলে একধাপ নীচে নেমে একটি ছোট্ট গুহার কাছে এসে দাঁড়াল ওরা।
গুহামুখের সামনে বড় বড় কয়েকটি পাথর আড়াল করা। সামনেটা ঝোপঝাড়ে ভরতি। জানা না থাকলে বোঝার উপায় নেই যে এটা গুহা।
ওরা প্রথমে অনেকক্ষণ ধরে বল্লম দিয়ে নাড়া দিল সেখানটা, তারপর যখন বুঝল সাপখোপ কিছু নেই সেখানে, তখন পাথরগুলো একটু একটু করে সরিয়ে ফাঁক করল। এবার ভেতরটা টর্চের আলোয় বেশ ভাল করে দেখে, এক এক করে ঢুকে পড়ল ওরা। ভেলুয়া ঢুকল সর্বপ্রথম। তারপর ওরা।
এ জায়গাটা খুব গড়ানো। যারা কখনও ঢোকেনি এর ভেতর, তারা ভাববে এই ঢাল বোধহয় পাতাল পর্যন্ত। কিন্তু না। বেশ কিছুক্ষণ হড় হড় করে নেমে আসার পরই ওরা পায়ের তলায় শক্ত পাথর পেল। এবার মাথা তুলে উঠে দাঁড়াল ওরা। উঃ সে কী দারুণ অন্ধকার। সেই অন্ধকারে টর্চের আলোয় পথ দেখে ওরা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল।
বেশ কয়েক পা যাবার পর দেখা গেল গুহামুখ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। ওরা সেখানেও টর্চের আলো ফেলে ঘাড় নুইয়ে এগিয়ে চলল। তারপর আরও ঝুঁকে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল। এক জায়গায় বেশ কিছু নুড়িপাথর জমা করা ছিল। চম্পা দু'হাতে সরাতে লাগল সেগুলো। হঠাৎ একসময় কী দেখে যেন চিৎকার করে উঠল চম্পা। কী দেখল ও? দীপংকর টর্চের আলোয় দেখল সেই নুড়ি পাথরের ফাঁকে ফাঁকে কিলবিল করছে অজস্র কাঁকড়াবিছে।
ওরা একটু পিছিয়ে এসে বল্লমের ডগায় করে সেই নুড়িপাথর সরাতে লাগল। দীপংকর জিজ্ঞেস করল, কামড়ে দেয়নি তো?
চম্পা বলল, না।
নুড়িপাথর সরাতে সরাতে হঠাৎ একটা লোহার চেন নজরে এল ওদের।
চম্পা বলল, ওটা ধরে জোরে টান দাও।
দীপংকর তাই করল। আর করার সঙ্গে সঙ্গেই মস্ত একটা গোসাপ উঠে এল তার ভেতর থেকে। অবশ্য সেটা সত্যিকারের নয়। রবারের। চম্পা সেটাকে ওপরে তুলেই তার বুকের চেন ধরে টানল। দেখল যেখানকার যা সেখানে তা ঠিকই আছে। কিন্তু সেটা এত ভারী যে, তাকে বয়ে নিয়ে যাওয়াও অসম্ভব। হবে নাই বা কেন? দীপংকর নিজে হাতে এক এক করে গুণে দেখল মোট সাতশো চল্লিশটা গিনি, একুশটা দুষ্প্রাপ্য মোহর এবং সোনা ও হিরের নেকলেশ পঁচিশটা। তা ছাড়া আরও অনেক অনেক অলংকার। দীর্ঘ দিনের লুটের মাল দুর্বৃত্তদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে জেঠু সঞ্চয় করে রেখে গেছেন এই বনবালার জন্যে।
ওরা ওগুলো আবার যথাস্থানে রেখে, মানে সেই গোসাপের ভেতরে পুরে শক্ত করে যখন চেন আঁটল তখন বন্যার স্রোতের মতো জল ছুটে আসছে গুহার ভেতর। গুহামুখের পাথরগুলো সরে যাওয়ায় জল আসার সুবিধে হয়েছে। তাই ওরা আর একটুও বিলম্ব না করে বেরিয়ে আসবার চেষ্টা করল। অনেক চেষ্টার পর ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এল ওরা। বহু কষ্টে বুকে হেঁটে যখন ওপরে উঠল ওরা, তখন সেই ভালুকের ছালগুলো যেন লোহার মতো ভারী ঠেকছে।
দীপংকর বলল, আর এগুলোর মায়া নয়। এগুলোকে আর বয়ে বেড়াতে পারছি না। ভিজি ভিজব। পড়ে থাক ওগুলো। বলে গা থেকে খুলে ফেলে দিল। চম্পা বলল, হ্যা আমারও অসহ্য লাগছে। উঃ কী ভারী। তার ওপর এই গোসাপটাকে টেনে নিয়ে যেতে হবে।
ওরা ওপরে জলস্রোতের ঢাল বহু কষ্টে পেরিয়ে যখন গুহামুখে এল, তখন আনন্দের আর অবধি রইল না ওদের।
চম্পা নেচে উঠল, বলল ছর র রে। বৃষ্টি থেমে গেছে। দুর্যোগ কেটে গেছে আজকের মতো।
দীপংকরও বেরিয়ে এল তখন সেই গোসাপটাকে টানতে টানতে। বেরিয়ে এসে বাইরের প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে সেও লাফিয়ে উঠল। আনন্দের আবেগে দীপংকর তো চম্পাকে জড়িয়ে ধরে বাঁই বাঁই করে ঘোরাতে লেগে গেল।
চম্পা বলল, আরে ! আরে! এ কী করছ! ছাড়ো শিগগির। এখন এসবের সময় নয়। তা ছাড়া এইভাবে ঘোরালে মাথা ঘুরে যাবে যে।
দীপংকর চম্পাকে নামিয়ে দিয়ে বলল, আমার মনে হচ্ছে তোমাকে এখুনি কাঁধে নিয়ে নাচি।
চম্পা বলল, দীপ! ওই দেখো আকাশে চাঁদ।
আরে তাই তো! দুর্যোগ যে একেবারেই কেটে
গেছে।
ওরা একটা বড় পাথরের ওপর বসে বর্ষণসিক্ত পাহাড় ও বনতলের অবস্থা
দেখতে লাগল। বৃষ্টি থেমে গেলেও পাহাড়ধোয়া ঢল কিন্তু হদ হদ করে সামনে নামছে। তা নামুক। একটু একটু করে সব মেঘ কেটে যাচ্ছে। একটি দুটি করে তারাও ফুটে উঠছে আকাশে।
চম্পা বলল, জানি দুর্যোগের শেষ হবেই।
দীপংকর বলল, শুনেছি দুর্দিনও বেশিদিন থাকে না। কিন্তু আমার জীবনের মেঘ কি কাটবে চম্পা? তোমাকে পেলাম। তোমার গোপন সম্পত্তিও উদ্ধার হল। কিন্তু আমার কী হল? শহরে গেলেই তো পুলিশ আমার হাতে হাতকড়া পরাবে খুনের অপরাধে।
চম্পা বলল, আমি বলি কী দীপ, এক কাজ করো। আমরা বরং এখানেই থেকে যাই। তুমি ইকলুর বাড়িতে কিছুদিন থাকো। আমি তোমার বাড়িতে গিয়ে চুপি চুপি তোমার মা-বাবাকে সব কথা জানাই। তারপর ওদের এখানে নিয়ে এসে এই জঙ্গলে ইকলুদের গ্রামেই একটা ছোট্ট ঘর করে দু'জনে থেকে যাই। তোমার মা-বাবাও যদি থাকতে চান তো থাকবেন। জেঠুর কৃপায় আমরা তো এখন কুবেরের ঐশ্বর্য পেয়ে গেছি।
ঠিক বলেছ। আমি এখানেই থাকি। তুমি কালই গিয়ে বরং আমার বাবা-মাকে খবরটা দিয়ে এসো। কেমন?
চলো তা হলে, আর দেরি করে কাজ নেই। আয় ভেলুয়া।
দীপংকর বলল, না। এখুনি নয়। আমাদের এখন আরও একটা কাজ বাকি আছে।
কী কাজ?
সেই গুপ্তধনের গুহাটা আবিষ্কার করা।
তুমি কি পাগল? এই গিরিগুহার গুপ্তধনের গল্প স্রেফ রূপকথা ছাড়া কিছু নয়। না না চম্পা। রূপকথা নয়। গুপ্তধন আছে। এই দেখো তার নকশা। জেঠুর ডায়েরি থেকে আমি পেয়েছি।
তাই নাকি? কোথায় কোন গুহায়?
এখানে যে গুহার মাথার ওপর শিবের ত্রিশূল আঁকা আছে সেই গুহায়। শিবের ত্রিশূল! ওই—ওই দেখো, ওই গুহাটার মাথার ওপর বড় পাথরের বুকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষেরা খোদাই করে রেখেছে শিবের ত্রিশূল।
দীপংকর অবাক হয়ে সেইদিকে তাকিয়ে বলল, কী আশ্চর্য! ওই এত উঁচুতে ও ত্রিশূল খোদাই করল কী করে? এই তা হলে সেই যথার্থ রাক্ষসগুহা! চলো খুব সাবধানে আমরা ওর ভেতর ঢুকে দেখে আসি সেই গুপ্তধনের ভাণ্ডার। যদি পারি তো দু'হাত ভরে মুঠো মুঠো নিয়েও আসব।
তাতে লাভ? এই গোসাপটার শরীরের ভেতর যা লুকনো আছে তাই কি পারব সারা জীবনে খরচ করতে? এর ওপর আবার লোভ? না না, এ ঠিক নয়। তা ছাড়া এই গুহায় আমি তো বহুবার এসেছি। কই এর ভেতরে, গুপ্তধনের কোনও নমুনাও তো কখনও পাইনি।
ঠিক জায়গায় হয়তো যেতে পারনি তাই।
ওরা ভেলুয়াকে সেই সুবিশাল গুহার বাইরে পাহারায় রেখে গোসাপটাকে ধরে টানতে টানতে ভেতরে ঢুকল। উঃ সে কী দারুণ অন্ধকার। টর্চের আলোতেও কাজ হচ্ছে না। চারদিকে শুধু কালো— কালো আর কালো পাথরের গোলকধাঁধা।
চম্পা বলল, আর বেশি ভেতরে ঢুকো না দীপ। এই গুহার একদম ভেতর পর্যন্ত কেউ যায় না। এর শেষ নেই।
দীপংকর বলল, আছে আছে। শেষ আছে। বলে অনেকদূর গিয়ে ওরা আর যাবার পথ পেল না-গুহা শেষ।
চম্পা বলল, এই তো শেষপ্রান্তে চলে এলাম। কিন্তু কোথায় তোমার গুপ্তধন? দীপংকর কোনও কথা না বলে টর্চের আলো ফেলে সেই গুহার গায়ে কী যেন খুঁজতে লাগল। হঠাৎ এক জায়গায় আলোটা পড়তেই চিৎকার করে উঠল চম্পা, দীপু! আর নয়। চলো, চলো। এখান থেকে। ও দৃশ্য আমি দেখতে পাচ্ছি না।
ওরা দেখল এক ভীষণাকৃতি রাক্ষসীর মুখ ওদের যেন হাঁ করে গিলে খেতে আসছে। সত্যিই সে ভয়াবহ হাঁ করা মুখ দেখা যায় না। দীপংকর সেই হাঁ করা মুখের একটি দাঁতের সঙ্গে গোসাপের চেনটা বেঁধে চম্পার হাত ধরে টানতে টানতে সেই মুখের ভেতর ঢুকে পড়ল।
মুখগহ্বর পার হয়ে আর একটি গুহায় এসে পড়ল ওরা। এখানে এসেই চম্পাকে নিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল দীপংকর। জেঠুর নির্দেশমতো এখানে চলা নিষেধ। ওরা তাই বসে বসে পা ঘষে ঘষে খানিক এগোতেই বুঝতে পারল একটা বিশাল গাড্ডা রয়েছে সেখানে। অর্থাৎ না-জেনে হেঁটে এলেই যে কেউ পড়ে যাবে এই গাড্ডার ভেতরে। গাড্ডাটা নেহাত কম নয়। দুশো ফুটেরও কিছু বেশি। এর চারদিকে চারটি পাথরের আংটা। আর সেই আংটার লাগোয়া শক্ত কাছির মতো কী যেন ঝুলছে। ওরা ওইরকম দুটো কাছি ধরে ঝুলে ঝুলে নামতে লাগল নীচের দিকে। নীচে নেমেই একটি হলঘরের মতো বড় ঘর দেখতে পেল ওরা। সেই ঘরে কী না নেই? একটা প্রকাণ্ড সোনার সিংহাসনে অন্তত চারফুট লম্বা এক জোড়া রত্নপাদুকা রয়েছে! কার তা কে জানে? এ ছাড়া কত রকমের মূল্যবান রত্ন ও পাথর আছে তার আর ইয়ত্তা নেই। এক জায়গায় একটি পাথরের মূর্তির গলায় হিরের একটি নেকলেশ রয়েছে। অত বড় হিরে সচরাচর দেখা যায় না। চম্পা ছুটে গিয়ে সর্বাগ্রে সেটাকে গলায় পরে নিল। আর এক জায়গায় হয়তো কোনও রাজপুত্রের গলার মণিমুক্তার মালা রয়েছে। দীপংকরও সেটাকে পরে নিল। তারপর দু'জনেই জোড় হাতে সেই অতুল ধনরাশিকে প্রণাম জানিয়ে উঠে এল ওপরে। ওপরে উঠে সেই রাক্ষসীর মুখ থেকে বেরিয়ে হার ও মালাগুলো গলা থেকে খুলে গোসাপের পেটের ভেতর ঢোকাল। তারপর সেটাকে টানতে টানতে গুহামুখের কাছাকাছি এসে চম্পা ডাকল, ভেলুয়া...!
কিন্তু কোথায় ভেলুয়া? কেউ কোথাও নেই। ওদের কেমন ভয় হল। ওরা গোসাপটাকে এক কোণে সরিয়ে রেখে বাইরে বেরিয়ে এল ব্যাপারটাকে কী দেখতে। কিন্তু দেখতে এসেই যা দেখল তাতে ওদের বুক শুকিয়ে গেল!
ওরা দেখল একটা তেজি ঘোড়ার পিঠে চেপে ওদের দিকে রিভলভার তাক করে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ংকর চেহারার লোক। লোকটি বলল, কাল থেকে তোমাদের তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি। আ তোমরা এইখানে এসে লুকিয়ে আছ?
চম্পা ভয়ে ভয়ে বলল, কে তুমি?
এখানে কী করতে এসেছিলে? গুপ্তধন নিতে? ওই যেটাকে টেনে আনছিলে কী আছে ওটার ভেতর?
দীপংকর বলল, তোমার মুণ্ডু আছে।
লোকটি বলল, ঠিক করে বলো, কী আছে ওর ভেতর? না হলে কিন্তু আমি তোমাদের গুলি করব।
চম্পা বলল, কিছুই নেই ওতে।
তা হলে ওটা দিয়ে দাও আমাকে।
দীপংকর বলল, না। প্রাণ থাকতে নয়।
বেশ এবার তা হলে মৃত্যুর জন্যে তৈরি হও। প্রথমে একজনকে মারব। তারপরও যদি কবুল না করো তা হলে দু'জনকেই মেরে ফেলব। রেডিএক— দুই – তিন।
তিন বলার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল পাহাড়ের এক উচ্চস্থান থেকে হঠাৎ বাঘের মতো লোকটির ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ভেলুয়া। এই আকস্মিক আক্রমণে টাল সামলাতে না পেরে ঘোড়ার পিঠের ওপর থেকে ছিটকে পড়ে গেল লোকটা। রিভলভারটাও খসে পড়ল হাত থেকে।
দীপংকর ছুটে গিয়ে সেটাকে কুড়িয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল পাহাড়ের ঢালে। ঘোড়াটাও ভয় পেয়ে চিঁ হি-হি করে দৌড়ে পালাল।
আর এদিকে কুকুরে-মানুষে চলল তুমুল লড়াই। ভেলুয়া আঁচড়েকামড়ে অস্থির করে তুলল লোকটাকে। যেখানে কামড়ায় সেখান থেকেই এক খাবলা করে মাংস তুলে নেয়।
চম্পা বলল, চলো দীপ! এই সুযোগ। ভেলুয়া ওকে রাখুক। আমরা পালাই। বলে আবার গুহায় ঢুকে গোসাপটাকে বার করতে যাবে যেই, অমনি ঘটে গেল এক মারাত্মক দুর্ঘটনা।
যে গুহার ভেতর ওরা ঢুকেছিল হঠাৎ এক ভয়ংকর ধসে সেই গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল।
অসহায় দীপংকর ও চম্পা প্রাণভয়ে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু না। কোনও লাভই হল না তাতে।
দীপংকর বলল, কী হবে চম্পা। আমরা যে অক্সিজেনের অভাবে দম বন্ধ হয়ে মরে যাব। এই ভয়ংকর ধস বাইরে থেকে কেউ না সরালে আমরা তো মুক্তি পাব না।
চম্পা বলল, ভবিতব্য তো কেউ খণ্ডাতে পারে না। তাই হয়তো আমাদের দু'জনকেই এই গিরিগুহার বদ্ধ জঠরে যক্ষ হয়ে পাহারা দিতে হবে। দীপংকর বলল, আমার তো এখুনি দম বন্ধ হয়ে আসছে।
চম্পা বলল, এক কাজ করি এসো। মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা বাঁচার জন্য সংগ্রাম করে যাই। শেষ চেষ্টা একবার করে দেখি। কী করবে?
ভেতরের দিক থেকে যতটা পারি পাথর সরাতে থাকি। এইভাবে যদি কোনওরকমে একটু ফাঁক হয় তা হলে হয়তো মুক্তি পেতেও পারি। আর দেরি কোরো না। এসো।
দীপংকর ও চম্পা দু'জনেই তখন যথাশক্তিতে কাজ শুরু করল। উঃ কী ভয়ংকর পরিণতি। আলো নেই, বাতাস নেই, জল নেই, খাদ্য নেই। তবুও বাঁচার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে ওরা দু'জনে একটির পর একটি পাথর সরিয়ে চলল। এক অসহ্য গুমোটে দর দর করে ঘাম ছুটতে লাগল। তবু চেষ্টা করতে লাগল। শুধু মাটি আর পাথর। বড় বড় পাথরের চাঁই। এক একটা এত বড় যে বহু চেষ্টা করেও তাকে এতটুকু নড়াতে পারল না ওরা। বল্লমের খোঁচায় ছোট পাথরগুলোকে একটু আধটু ধসিয়ে ওরা পরিষ্কার করতে লাগল। কিন্তু যে ভয়াবহ ধস নেমেছে এই গুহামুখে, তা তো ওরা জানে না। তাই অযথা পরিশ্রম করতে লাগল দু'জনে। অল্প সময়ের মধ্যেই আলোবাতাসের অভাবে নেতিয়ে পড়ল ওরা। ধসের কাদামাটি সর্বাঙ্গে মেখে কিম্ভুতকিমাকার চেহারা হয়ে গেল ওদের! কিন্তু না। বৃথা চেষ্টা। কোনও লাভই হল না এতে।
চম্পা বলল, আর কেন? এসো আমরা দু'জনে হাতে হাত রেখে মৃত্যুর উপাসনা করি।
এমন সময় হঠাৎ একটা হিস হিস শব্দে সচকিত হল দু'জনে। টর্চের আলোয় ওরা দেখল গুহার একটি ফাটলের ভেতর থেকে এক অতিকায় ময়াল তার বিশাল দেহ নিয়ে পাথরে ছোবল মারতে মারতে আসছে। ওরা ভয়ে সরে গেল এক পাশে।
ময়ালটা বার বার সেই ধস চাপা গুহামুখে ছোবল মারতে লাগল। তারপর আস্তে আস্তে করে তার মুখটা পাথর ও মাটির বুকে গুঁজে দিয়ে একটু একটু করে বাইরে বেরোতে লাগল।
সাপটা লম্বায় প্রায় কুড়ি ফুটেরও বেশি। ওর অর্ধেকেরও বেশি শরীরটা যখন বাইরে চলে গেছে তখন চম্পা বলল, এই আমাদের শেষ চেষ্টা। ধরো, ধরো, সাপটাকে। শক্ত করে টিপে ধরো ওর লেজের দিকটা।
ওরা ছুটে গিয়ে সাপটাকে ধরতে যেতেই কী যেন মনে হল দীপংকরের। বলল, না। কোনও দরকার নেই। বুঝেছি তুমি কী বলতে চাও। কে না ধরে কেমন কাজ হবে দেখো। বলেই বল্লমটা উঁচিয়ে সাপটার লেজের দিকে প্রায় একহাত গেঁথে দিল! এইবার শুরু হল খেলা। সাপটা তার শেষাংশ বার করতে না পেরে ওই বিশাল শরীর দিয়ে অসম্ভব রকমের ছটফটানি শুরু করল। পাক দিয়ে মোচড় দিয়ে, এমন কাণ্ড আরম্ভ করল যে ঝর ঝর করে মাটি-পাথর ঝরে একটা জায়গা সামান্য একটু ফাঁক হয়ে গেল।
দীপংকর বলল, আর দরকার নেই। এবার স্বস্থানে প্রস্থান করো তুমি। বলে বল্লমটা খুলে নিতেই সর সর করে পালিয়ে বাঁচল সাপটা।
সামান্য একটু ছোট্ট ফাঁক, এত সংকীর্ণ যে সেখান দিয়ে অল্প একটু আলো বাতাস প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু একটা মানুষ গলে বেরোতে পারে না। চম্পা বলল, এতেই হবে। অন্তত দম আটকে মরতে হবে না।
এই বলে ওরা দু’জনে কিছু পাথর সাজিয়ে সেই গর্তের মুখ পর্যন্ত উঁচু করে তার ওপর বসে রইল। জল না থাক। খাদ্য না থাক। আলো আর অক্সিজেন তো আছে। আরও দু'-একটা দিন জীবনধারণ করা যাবে। যদিও জীবনের কোনও আশা নেই তবুও দু'জনে মুখোমুখি বসে ধসের গায়ে ঠেস দিয়ে সেই ফোকরের দিকে তাকিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে লাগল।
এইভাবে কেটে গেল সারাবেলা। ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল দু'জনে। জোর করে শ্বাস টেনে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ভাল করে কথাও বলতে পারছে না কেউ। চম্পা কেমন অবসন্ন হয়ে চুপ হয়ে গেছে। দীপংকরও নেতিয়ে পড়েছে। এই অন্ধকারে কেউ কারও মুখ দেখতে পাচ্ছে না ভাল করে। এভাবে আর কতক্ষণ? মৃত্যুর প্রহর গোনা বুঝি শেষ আর হয় না। সময়েরও কোনও হিসেব নেই। একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটল বলে মনে হল। কোথায় ঘটল! গুহার একেবারে শেষপ্রান্তে। অর্থাৎ আবার একটা ধস নামল।
হঠাৎ এক সময় চম্পা বলল, কিছু বুঝতে পারছ দীপ! কীসের কী?
আমরা কী মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছি। আমাদের অস্তিমসময় এগিয়ে এসেছে এবার। আবার — আবার — ধস নামছে। এবার গোটা গুহাটা ভেঙে পড়বে আমাদের ওপর। দেখছ আমরা কেমন নীচে নেমে যাচ্ছি?
সত্যিই তো, ওরা সেই মাটিপাথরের স্তূপ সমেত ক্রমশ ধসে যেতে লাগল। ওরা একটু একটু করে ধসে নেমে যাচ্ছে— উঃ— ভগবান! রক্ষা করো। দু'জনে দু’জনকে জড়িয়ে ধরে জ্ঞান হারাল ওরা।
জ্ঞান যখন ফিরল তখন রাত গভীর। চম্পা ও দীপংকর ধীরে ধীরে চোখ মেলে দেখল, চারদিকে শুধু মশালের আলো। ওরা দু'জনে মাটিকাদায় মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে। যেমনি চম্পা, তেমনি ও।
ওদের মাথার শিয়রে ওরা কারা! দলে দলে আদিবাসীরা সারবন্দি দাঁড়িয়ে আছে। আর অসংখ্য পুলিশ। ওই তো ইকলুভাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে। দীপংকর হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল, মা! মাগো। দীপংকরের মা জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে।
বাপিও এসে ওর সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
ওদিক থেকে ঠাকুর সিংও ছুটে এসে বুকে টেনে নিল চম্পাকে, চম্পা? চম্পা মা আমার।
সবই যেন অকল্পনীয় ব্যাপার বলে মনে হল। এও কি সম্ভব! এই গভীর রাতে গিরিগুহার সামনে বাপি, মা, ঠাকুর সিং। না না। এ সত্যি নয়। ওরা হয়তো মরেই গেছে। তাই প্রেত হয়ে এইসব অবাস্তব দৃশ্য দেখছে ওরা, অথবা এ সবই স্বপ্ন। কিন্তু না। এই জগতে মৃত্যু যেমন অমোঘ, স্বপ্ন যেমন সত্যি, তেমনি অবাস্তব ও বাস্তব।
মা দীপংকরকে বুকে নিয়ে বললেন, কোথায় লেগেছে বাবা? কী কষ্ট হচ্ছে তোর? তোকে কে এখানে নিয়ে এল?
ওদিকে চম্পা বলল, বাবুজি। মুঝে মাপ কর দো বাবুজি।
ঠাকুর সিং চম্পাকে বুকে নিয়ে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলেন।
আর ভেলু? সে এসে দীপংকর ও চম্পার পায়ের কাছে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
ইকলু বলল, এই ভেলুয়ার জন্যেই আজ তোমরা রক্ষা পেলে ভাই। ও গিয়ে খবর না দিলে আমরা জানতেই পারতাম না তোমরা কে কোথায় আছ। দীপংকর বলল, আমি ভেবে পাচ্ছি না তোমরা কীভাবে আমাদের উদ্ধার করলে?
পুলিশ অফিসার মি. লালচাঁদ শর্মা হাসতে হাসতে এসে বললেন, শুনবে শুনবে। সব কিছুই শুনবে। আগে সব স্নান করে পরিষ্কার হও। কিছু খাও-টাও তারপর সব শুনবে। একদিন একরাত পড়েছিল তো গুহাবন্দি হয়ে। যে ভাবে তোমাদের উদ্ধার করেছি তা আর শুনে কাজ নেই, বরাত জোর যে দু'জনেই বেঁচে গেছ এ যাত্রায়।
অতএব তাই হল।
চম্পা ও দীপংকরকে স্ট্রেচারে শুইয়ে সবাই মিলে সেই অন্ধকারেই ধরে নিয়ে চলল ইকলুদের গ্রামে। পথে ধারাগিরির ঝরনার জলে বেশ ভাল করে স্নান করতেই ধুলোকাদা ধুয়ে গিয়ে দু'জনের তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ আবার ফুটে উঠল। আগের মতো।
এরপর ইকলুর বাসায় গিয়ে ইকলুর একটা ধুতি পরে ফেলল দীপংকর এবং চম্পাকেও পরানো হল ইকলুর বউয়ের একটা শাড়ি। এক গেলাস করে গরম দুধও খাওয়ানো হল দু'জনকে।
দলে দলে লোক এসে জুটল তখন সেখানে। পুলিশও এল।
তারপর কথা প্রসঙ্গে সব কিছু যখন শুনল ওরা তখন বুঝতে পারল ঠাকুর সিং, ইকলু এবং ভেলুয়া না-থাকলে কোনও কিছুই হত না। ওই গুহার ভেতর দমবন্ধ হয়ে পচে মরতে হত ওদের।
ঘটনাটা এই রকম—
সেদিন ইকলুদের গ্রাম থেকে ফিরে এসেই ঠাকুর সিং কুন্দনলালের মুখোমুখি হয়। ঠাকুর সিং-এর স্থির বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল যে কুন্দনলালই গোপনে কিছু জানার জন্য চম্পাকে এবং হত্যার অথবা ব্ল্যাকমেলের জন্য দীপংকরকে গুম করেছে।
এই নিয়ে তুমুল কলহ দু'জনের।
ঠাকুর সিং কুন্দনলালকে শাঁসিয়ে এল, যদি সে তার লেড়কিকে ফেরত না দেয় তা হলে সমুচিত শিক্ষা দেবে তাকে। এই কথা বলেও কিন্তু ঠাকুর সিং চুপ থাকেনি। সোজা ট্রেনে চেপে হাওড়া স্টেশনে এসে ওখানকার পুলিশকে দীপংকরের বৃত্তান্ত জানায়। দীপংকরের অন্তর্ধানরহস্য নিয়ে চারদিকে তখন হইচই হচ্ছিল খুব। কাজেই ওর ঠিকানা খুঁজে বার করতে দেরি হল না। দীপংকরের মা-বাবা দু'জনেই নিকটবর্তী থানায় ঠাকুর সিং-এর বক্তব্য পেশ করিয়ে সোজা চলে আসেন ঘাটশিলায়। তারপর সব কথা খুলে বলেন এখানকার ভারপ্রাপ্ত অফিসার লালচাঁদ শর্মাকে।
এদিকে ইকলুও ছুটে আসে থানায়। কেন না ওই ভয়ংকর দুর্যোগের রাতেই বাড়িতে দু'দুটো খুন এবং সেই সঙ্গে চম্পা ও দীপংকরের উধাও হয়ে যাওয়াটা ওকে সাংঘাতিক রকমের ভাবিয়ে তুলল। সেদিন অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে পড়েছিল ওরা। হঠাৎ ভেলুয়ার চিৎকারে ঘুম ভাঙে। ঘুম ভেঙে উঠেই বাইরের দৃশ্য দেখে ছুটে ওপরে যায়। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। তার ওপর ভেলুয়া বার বার কাপড়ের খুট ধরে ওকে টানাটানি করতে থাকে বলে ভেলুয়ার পিছু নেয় ও। ওর পিছু পিছু সেই গুহামুখের কাছে এসে যে ভয়াবহ ধস দেখে তাতে ওর সর্বাঙ্গ শিউরে ওঠে। এদিকে গুহার সামনেই ভেলুয়ার আক্রমণে বীভৎস চেহারা নিয়ে একজন পাক্কা শয়তানকেও মৃতঅবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তখন ও বুঝতে পারে চম্পা ও দীপংকর ধস চাপা পড়েছে। তাই আর কাল বিলম্ব না করে ছুটে আসে থানায়। এখানেই দীপংকরের বাবা-মা এবং ঠাকুর সিং-এর সাথে দেখা হয়।
এরপর চলে আদিবাসীদের এবং সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় ধস মুক্তির অভিযান।
ভগবান সহায়। তাই দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় ধসমুক্ত করে ওদের উদ্ধার করা হয়।
লালচাঁদের বক্তব্য, কুন্দনলালকে তার দলবল সহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কিন্তু দীপংকর ও চম্পা যে সে রাতে ওই গুহায় কী কারণে গিয়েছিল সেকথা পুলিশকে কিছুতেই বলল না। শুধু বলল লালজির ভয়ে ঠাকুর সিং-এর বাসা থেকে পালিয়ে আসে ওরা এবং ইকলুর বাসায় ওই লোকরা ওদের গুম করতে এসেছিল দেখে ওদের দু'জনকে শেষ করে ওরাও নিরাপদ হবার জন্য ওই গুহায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই রকম ভয়াবহ ধসের মুখে যে ওরা পড়বে তা ওরা স্বপ্নেও ভাবেনি।
ইকলু বলল, ধস তো হবেই। সোনার লোভে পাহাড় কেটে চারদিক তো ফেঁাপড়া করে দিয়েছে। তার ওপরে এই প্রবল বর্ষণ। কাজেই ওপরের ভারী পাথরের চাপ নীচের শূন্যস্থান সহ্য করতে পারবে কেন? অতএব অনিবার্যভাবে যা ঘটবার তা ঘটে গেছে।
ওরা যখন কথা বলছে তখন ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটে উঠছে। আদিবাসীদের জ্বলন্ত মশালও তখন নিভু নিভু।
মা বললেন, কিন্তু তুই এখানে কী করে এলি দীপু? তোর জন্য আমরা যে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম।
দীপংকর তখন সব কথা খুলে বলল সকলকে।
শুনে মা-বাপি দু’জনেই মাথায় হাত দিয়ে বললেন, হায় কপাল! এই জন্যে তুই পালিয়ে এসেছিলি? কেন আমরা কি কেউ নই? একবার এসে আমাদের ওকথা বলতে পারিসনি? মা-বাবাকে না-জানিয়ে পালানোর ফলটা টের পেলি তো? তোকে কোথাও লুকিয়ে রাখবার প্রয়োজন হলে সে ব্যবস্থা তো আমরাই করতাম। তোর জেঠুর কৃপায় আমাদের কী কোনও অভাব আছে রে?
সত্যি মা খুব ভুল হয়ে গেছে। আসলে আমি তখন এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে কী বলব। তার ওপর ওই দুর্ঘটনা।
তা হলে শোন বোকা ছেলে, তুই যাকে ঘুসি মেরে পালিয়েছিলি সে আসলে মরেইনি। দিব্যি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। ওর বাবা-মা অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে সারিয়ে তুলেছেন ওকে। আর ওই মেয়েদুটো, যাদের জন্যে তুই ওই কাজ করেছিলি তারা তোর ব্যাপারে সব কথা বলেছে পুলিশকে। কাজেই ভুল বুঝে বৃথাই কষ্ট পেলি তুই।
বৃথা নয় মা। ভাগ্যিস এসেছিলাম তাই তো তোমাদের চিরশত্রু কুন্দনলালকে দলবল সমেত ধরাতে পারলাম। আমার বদলে আমার জেঠুর হত্যাকারীই এখন ফাঁসির মঞ্চে উঠবে আশা করি। আর এখানে ওইভাবে না এলে চম্পাকেও তো পেতাম না। মা, মাগো! আমি চম্পাকে কথা দিয়েছি মা, ও এখন থেকে আমাদের কাছেই থাকবে। ,
মা সঙ্গে সঙ্গে চম্পাকে বুকে টেনে নিয়ে ওর ডালিমের মতো লাল টুক টুক গালে চুমু খেয়ে বললেন, সে কথা তুই কী বলবি। আমিই তো বলব। এখন ওর বাবা যদি দয়া করে মেয়েটাকে আমায় দেন তবেই—।
ঠাকুর সিং আনন্দের আবেগে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল এবার। তারপর মায়ের পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে বলল, আমি এখুনি ওকে তোমার পায়ে অর্ঘ্য দিলাম মা। এ সংসারে ওর কেউ নেই। আমার তো উমর জায়দা হয়ে গেছে। কবে আছি, কবে নেই। তাই ওকে তোমরা তোমাদের সাথে নিয়ে যাও। আমার জীবনের শেষ ক'টা দিন আমি একটু শান্তিতে থাকি। বলে পুলিশ অফিসার লালচাঁদের দিকে নিজের হাতদুটি এগিয়ে দিয়ে বলল, আপনি আমাকে গ্রেপ্তার করুন হুজুর! জীবনে আমি অনেক খারাপ কাজ করেছি। আমায় জেলে রাখুন, ফাঁসি দিন, যা ইচ্ছা করুন।
লালচাঁদ হেসে বললেন, পুলিশের কাছে গ্রেফতার হতে চাইলেই গ্রেফতার হওয়া যায় না ঠাকুর সিং। তুমি ভাল লোক ছিলে না এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু সবই তো শোনা কথা। তোমার বিরুদ্ধে প্রমাণ কই? তা ছাড়া আমাদের খাতায় তোমার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগও নেই, পরোয়ানাও নেই। অতএব কোন আইনে আমি তোমাকে অ্যারেস্ট করব? তাই তুমি যেমন ছিলে তেমনই থাকবে।
মা বললেন, হ্যাঁ। তেমনই থাকবে। তবে এখানে নয় তোমার মেয়ের কাছে। আমাদের বাড়িতে।
ঠাকুর সিং হতবাক।
লালচাঁদ বললেন, চলুন, আপনাদের সবাইকে আমার জিপে করে ঘাটশিলায় পৌঁছে দিয়ে আসি।
অতএব ইকলুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জিপে উঠল ওরা। বাপি, মা, দীপংকর, চম্পা, ঠাকুর সিং সবাই উঠল।
ওরা যখন জিপে উঠেছে তেমন সময় সেই রবারের গোসাপটাকে ইকলুভাই টানতে টানতে নিয়ে এসে চম্পার হাতে তুলে দিয়ে বলল, এই নাও চম্পাদিদি। আমি আমার ভালবাসার দান হিসেবে এটা তোমাকে উপহার দিলাম।
চম্পা ও দীপংকর এটার কথা ভুলেই গিয়েছিল এতক্ষণ। ইকলু যে কখন কোন ফাকে দেখতে পেয়ে এটাকে সরিয়ে ফেলেছিল তা কে জানে? তাই আবেগের উচ্ছ্বাসে গোসাপটাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল ওরা।
লালচাঁদ বললেন, কী ওটা?
ঠাকুর সিং ইকলুর দিকে এক নজর তাকিয়েই হেসে বলল, বাচ্চো কা খিলোনা।
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করল।
এবার প্রত্যাবর্তন।
কিন্তু এই বিদায় মুহূর্তে ভেলুয়া! ভেলুয়া কই? ওকে তো রেখে যাওয়া হবে না। কোথায় গেল সে? খোঁজ খোঁজ শুরু হল চারদিকে। কোথায় গেল ভেলুয়া? ভেলুয়াকে পাওয়া গেল না। কোথায় যে গেল সে, কে জানে? কিন্তু কেউ না-জানলেও আমি জানি। আমি জানি সে তখন কোথায় ছিল। ধারাগিরি ঝরনার কাছে ওর মনিবের সমাধির উপর শুয়ে সে তখন নীরবে নিভৃতে কাঁদছিল। ওর দু'চোখের জল যখন টপ টপ করে ঝরে পড়ছিল সমাধির ওপর, তখন বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে এই পাহাড় ও বনতল ভরে উঠছিল বুঝি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন